
Tirtha Mahatmya
This section is oriented to sacred-place glorification (māhātmya) and locates the episode in the Ānarta region (आनर्तविषय), described as a hermitage-forest landscape populated by ascetics and marked by a distinctive ethic of non-hostility among animals—an idealized purāṇic ecology used to frame ritual authority, transgression, and restoration.
279 chapters to explore.

हाटकेश्वरलिङ्गप्रतिष्ठा — Establishment of the Hāṭakeśvara Liṅga
অধ্যায় ১-এ ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—অন্য দেবরূপের তুলনায় শিবলিঙ্গের বিশেষ পূজা কেন করা হয়। সূত আনর্ত-বনের কাহিনি বলেন—সতী-বিয়োগে শোকাকুল ত্রিপুরান্তক শিব দিগম্বর, কপাল-পাত্র হাতে ভিক্ষা চাইতে তপোবনে প্রবেশ করেন। তাঁকে দেখে আশ্রমের নারীরা মোহিত হয়ে নিত্যকর্ম ত্যাগ করে; পুরুষ তপস্বীরা এটিকে আশ্রমধর্মের ব্যাঘাত মনে করে শিবকে শাপ দেয়, ফলে তাঁর লিঙ্গ ভূমিতে পতিত হয়। পতিত লিঙ্গ পৃথিবী বিদীর্ণ করে পাতালে নেমে যায়; ত্রিলোকে কম্পন, উৎপাত ও অমঙ্গলসূচক লক্ষণ দেখা দেয়। দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নেন; ব্রহ্মা কারণ নির্ণয় করে তাঁদের শিবের কাছে নিয়ে যান। শিব বলেন—দেবতা ও দ্বিজসমাজ পরিশ্রমসহকারে লিঙ্গপূজা না করলে তিনি তা পুনঃস্থাপন করবেন না। দেবতারা আশ্বাস দেন—সতী হিমালয়ের কন্যা গৌরী রূপে পুনর্জন্ম নেবেন। তখন ব্রহ্মা পাতালে লিঙ্গপূজা করেন; বিষ্ণু ও অন্যান্য দেবতাও অনুসরণ করেন। শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন ও লিঙ্গ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন; ব্রহ্মা স্বর্ণলিঙ্গ নির্মাণ করে স্থাপন করেন, যা পাতালে ‘হাটকেশ্বর’ নামে খ্যাত হয়। শেষে নির্দেশ—শ্রদ্ধায় নিয়মিত স্পর্শ, দর্শন ও স্তবসহ লিঙ্গপূজা করলে তা মহাতত্ত্বসমূহের পূর্ণ সম্মান এবং শুভ আধ্যাত্মিক ফলদায়ক।

त्रिशङ्कु-तत्त्वप्रश्नः तथा तीर्थस्नान-प्रभावः (Triśaṅku’s Inquiry and the Efficacy of Tīrtha Bathing)
এই অধ্যায়ে সূত মুনি এক মহাতীর্থের বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণনা করেন। একটি লিঙ্গ উপড়ে যাওয়ার ফলে সেই পথ দিয়ে পাতাল থেকে জাহ্নবী (গঙ্গা) জল প্রকাশিত হয়; তা সর্বপাপহর ও কামনাপূরক বলে তীর্থ-মাহাত্ম্যে প্রশংসিত। সেই তীর্থে স্নান করে চাণ্ডাল-অবস্থায় পতিত রাজা ত্রিশঙ্কু পুনরায় রাজোচিত দেহ লাভ করেন—এ এক লোকবিস্ময়কর কাহিনি। ঋষিগণ ত্রিশঙ্কুর পতনের কারণ বিস্তারিত জানতে চান। সূত প্রাচীন পবিত্র আখ্যান বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ত্রিশঙ্কুর বংশ ও গুণাবলি স্মরণ করান—সূর্যবংশীয় জন্ম, বশিষ্ঠের শিষ্যত্ব, অগ্নিষ্টোম প্রভৃতি যজ্ঞের নিয়মিত পালন, পূর্ণ দক্ষিণা, বিশেষত যোগ্য ও দরিদ্র ব্রাহ্মণদের প্রতি মহাদান, ব্রতাচরণ, শরণাগত রক্ষা এবং সুশাসন। এরপর রাজসভায় ত্রিশঙ্কু বশিষ্ঠকে অনুরোধ করেন—এমন যজ্ঞ করুন যাতে তিনি এই দেহসহ স্বর্গে যেতে পারেন। বশিষ্ঠ তা অসম্ভব বলে নিষেধ করেন এবং বলেন, স্বর্গলাভ কর্মফলে দেহান্তরের পরে হয়; দেহসহ স্বর্গারোহণের কোনো দৃষ্টান্তও তিনি জানতে চান। ত্রিশঙ্কু মুনিশক্তির উপর জোর দিয়ে পুনরায় অনুরোধ করেন, না হলে অন্য ঋত্বিক খুঁজবেন বলে হুমকি দেন; বশিষ্ঠ হাসতে হাসতে ‘ইচ্ছামতো কর’ বলে অনুমতি দেন।

Triśaṅku’s Curse, Social Degradation, and Renunciation (त्रिशङ्कु-शापः अन्त्यजत्वं च वनप्रवेशः)
সূত বর্ণনা করেন—রাজা পূর্বে বশিষ্ঠকে অনুরোধ করার পর আবার বশিষ্ঠপুত্রদের কাছে গিয়ে দেহসহ স্বর্গারোহণের জন্য যজ্ঞ-সহায়তা চান। ঋষিরা এ দাবি অনুচিত বলে প্রত্যাখ্যান করেন। রাজা অন্য পুরোহিত বসাবেন বলে হুমকি দিলে তারা কঠোর বাক্যে শাপ দেন—রাজা অন্ত্যজ/চাণ্ডাল হয়ে যাবে। শাপে তার দেহে বিকৃতি-চিহ্ন দেখা দেয় এবং সমাজ তাকে অপমান করে বহিষ্কার করে; নানা জন তাকে তাড়না করে। রাজা বংশধর্মের পতনে বিলাপ করে, পরিবার ও আশ্রিতদের মুখোমুখি হতে ভয় পায়, এবং নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিণাম ভেবে আত্মবিনাশের কথাও চিন্তা করে। রাতে সে নির্জন নগরদ্বারে ফিরে এসে পুত্র ও মন্ত্রীদের ডেকে শাপবৃত্তান্ত জানায়। সভা শোকাহত হয়, ঋষিদের কঠোরতা নিন্দা করে এবং রাজার ভাগ্য ভাগ করে নেওয়ার কথা বলে। ত্রিশঙ্কু জ্যেষ্ঠপুত্র হরিশ্চন্দ্রকে উত্তরাধিকারী করে, দেহসহ স্বর্গারোহণ বা মৃত্যু—যে কোনো এক লক্ষ্য স্থির করে বনে প্রস্থান করে; মন্ত্রীরা শঙ্খ-ভেরীর ধ্বনিতে হরিশ্চন্দ্রকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করেন।

त्रिशङ्कु-विश्वामित्र-तीर्थयात्रा तथा हाटकेश्वरशुद्धिः (Triśaṅku and Viśvāmitra: Pilgrimage Circuit and Purification at Hāṭakeśvara)
সূত বললেন—বসিষ্ঠপুত্রদের শাপে ত্রিশঙ্কু চাণ্ডাল-অবস্থায় পতিত হলে তিনি স্থির করলেন যে বিশ্বামিত্রই তাঁর একমাত্র আশ্রয়। তিনি কুরুক্ষেত্রে এসে নদীতীরে বিশ্বামিত্রের আশ্রমে পৌঁছান; দেহচিহ্ন দেখে শিষ্যরা তাঁকে চিনতে না পেরে তিরস্কার করে। তখন ত্রিশঙ্কু নিজের পরিচয় দিয়ে বিবাদটি জানালেন—দেহসহ স্বর্গারোহণের জন্য যজ্ঞ প্রার্থনা প্রত্যাখ্যাত হয়, তিনি পরিত্যক্ত হন এবং পরে শাপগ্রস্ত হন। বসিষ্ঠবংশের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবস্থানকারী বিশ্বামিত্র তাঁকে শুদ্ধ করে পুনরায় বৈদিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে তীর্থযাত্রার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কুরুক্ষেত্র, সরস্বতী, প্রভাস, নৈমিষ, পুষ্কর, বারাণসী, প্রয়াগ, কেদার, শ্রবণা নদী, চিত্রকূট, গোকর্ণ, শালিগ্রাম প্রভৃতি বহু তীর্থ পরিক্রমা করেও ত্রিশঙ্কুর অশুদ্ধি দূর হল না, যতক্ষণ না তাঁরা অর্বুদে পৌঁছালেন। সেখানে মার্কণ্ডেয় অনর্ত-দেশে পাতাল-সংযুক্ত ও জাহ্নবীজল-সম্পৃক্ত হাটকেশ্বর লিঙ্গের পথ নির্দেশ করলেন। ভূগর্ভপথে প্রবেশ করে ত্রিশঙ্কু বিধিপূর্বক স্নান করলেন এবং হাটকেশ্বর দর্শনে চাণ্ডালত্বমুক্ত হয়ে পুনরায় দীপ্তিমান হলেন। পরে বিশ্বামিত্র তাঁকে যথাযথ দক্ষিণাসহ যজ্ঞ করতে বললেন এবং দেহসহ স্বর্গারোহণের যজ্ঞ-স্বীকৃতির জন্য ব্রহ্মার কাছে প্রার্থনা করলেন; ব্রহ্মা সিদ্ধান্ত জানালেন—একই দেহে যজ্ঞবলেই স্বর্গলাভ হয় না, বৈদিক বিধিতে সাধারণ নিয়ম দেহত্যাগ করেই গতি।

Triśaṅku’s Dīrghasatra under Viśvāmitra: Ritual Authority, Public Yajña, and the Quest for Svarga
সূত বলিলেন—ব্রহ্মার বাক্যে উদ্দীপ্ত হয়ে মহাতপস্বী বিশ্বামিত্র নিজের তপোবলের প্রভাব প্রকাশ করিবার জন্য ত্রিশঙ্কুর উদ্দেশ্যে বিধিপূর্বক বৈদিক যজ্ঞ-দীর্ঘসত্র সম্পাদনের সংকল্প করিলেন। তিনি শুভ অরণ্যে যজ্ঞমণ্ডপ নির্মাণ করিয়া অধ্বর্যু, হোতা, ব্রহ্মা, উদ্গাতা প্রভৃতি বহু ঋত্বিজ ও সহকারী বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করিলেন, যাতে যজ্ঞের পূর্ণতা ও শাস্ত্রীয় মর্যাদা স্পষ্ট হয়। যজ্ঞটি এক মহাজনসমাবেশে পরিণত হইল—পণ্ডিত ব্রাহ্মণ, তর্কবিদ, গৃহস্থ, দরিদ্র জন ও নট-গায়ক পর্যন্ত উপস্থিত; দান ও ভোজন-বিতরণের ধ্বনি সর্বত্র উঠিল। শস্যের ‘পর্বত’, স্বর্ণ-রৌপ্য-রত্নের প্রাচুর্য, এবং অগণিত গাভী, অশ্ব, গজ দানের জন্য প্রস্তুত—এই সমৃদ্ধির চিত্র বর্ণিত। কিন্তু দেবতারা স্বয়ং আহুতি গ্রহণ করেন না; দেবমুখ অগ্নিই হব্য গ্রহণ করেন। বারো বৎসর সত্র চলিলেও ত্রিশঙ্কুর কাম্য ফল সিদ্ধ হইল না। অবভৃথস্নানের পরে যথোচিত দক্ষিণা প্রদান করিয়া ত্রিশঙ্কু লজ্জিত অথচ ভক্তিভরে বিশ্বামিত্রকে কৃতজ্ঞতা জানাইলেন—তিনি তার মর্যাদা ফিরাইয়াছেন ও চাণ্ডাল-অবস্থা দূর করিয়াছেন; তবু দেহসহ স্বর্গারোহণ অসম্পূর্ণ থাকায় তিনি শোক প্রকাশ করিলেন। লোকহাস্য ও বশিষ্ঠের উক্তি সত্য প্রমাণিত হইবার ভয়ে তিনি রাজ্য ত্যাগ করিয়া অরণ্যে গিয়া তপস্যায় প্রবৃত্ত হইবার সিদ্ধান্ত নিলেন—এভাবে অধ্যায়ে যজ্ঞের পাশাপাশি তপস্যাকে বিকল্প সাধনাপথ রূপে নির্দেশ করা হয়।

Viśvāmitra’s Hymn to Śiva and the Resolve to Create a New Sṛṣṭi (Triśaṅku Episode)
এই অধ্যায়ে সূতের বর্ণনার মধ্যে রাজর্ষিদের সংলাপ এগিয়ে যায়। ত্রিশঙ্কুর অবস্থা শুনে বিশ্বামিত্র রাজাকে আশ্বাস দেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন—একই দেহসহ তাঁকে স্বর্গে পৌঁছে দেবেন। এখানে অসাধারণ সংকল্পশক্তি এবং যজ্ঞ-আচার পরিচালনার অধিকার নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এরপর বিশ্বামিত্র দেবলোকের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে ঘোষণা করেন যে তাঁর তপোবলে তিনি নিজস্ব নতুন সৃষ্টিও আরম্ভ করতে সক্ষম। এই সন্ধিক্ষণে কাহিনি ভক্তিতত্ত্বে প্রবেশ করে। বিশ্বামিত্র শিব (শঙ্কর, শশিশেখর)-এর নিকট গিয়ে বিধিপূর্বক প্রণাম করে স্তোত্র পাঠ করেন, যেখানে শিবকে নানা দেবতা ও বিশ্বকার্যের এক পরম সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—পুরাণীয় সমন্বয়ে তাঁর মহিমা প্রকাশিত। শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন; বিশ্বামিত্র শিবকৃপায় “সৃষ্টিমাহাত্ম্য” (সৃষ্টির শক্তি/জ্ঞান) প্রার্থনা করেন। শিব তা দান করে অন্তর্ধান করেন; বিশ্বামিত্র ধ্যানস্থ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভঙ্গিতে চতুর্বিধ সৃষ্টির নির্মাণে প্রবৃত্ত হন—ভক্তি, তপঃশক্তি ও মহাজাগতিক পরীক্ষার যোগসূত্রে তীর্থকথা সম্পূর্ণ হয়।

Viśvāmitra’s Secondary Creation and the Resolution of Triśaṅku’s Ascent (विश्वामित्र-सृष्टि तथा त्रिशङ्कु-प्रकरण)
সূত বলেন—বিশ্বামিত্র কঠোর তপস্যা ও দৃঢ় ধ্যানসংকল্পে জলে প্রবেশ করে ‘যুগ্ম সন্ধ্যা’ বা দ্বিগুণ সন্ধ্যা সৃষ্টি করেন, যা নাকি আজও অনুভূত হয়। এরপর তিনি দেবগণ, আকাশচারী সত্তা, নক্ষত্র-গ্রহ, মানুষ, নাগ, রাক্ষস, উদ্ভিদ, এমনকি সপ্তর্ষি ও ধ্রুব পর্যন্ত—সমান্তরাল এক নতুন সৃষ্টিজগৎ নির্মাণ করেন। ফলে দুই সূর্য, দুই নিশাপতি এবং দ্বিগুণ গ্রহ-নক্ষত্রমণ্ডল দেখা দেয়; দুই আকাশ-ব্যবস্থার সংঘাতে জগতে প্রবল বিভ্রান্তি ছড়ায়। ইন্দ্র (শক্র) আতঙ্কিত হয়ে দেবতাদের সঙ্গে পদ্মাসন ব্রহ্মার শরণ নেন এবং বৈদিক স্তোত্রে স্তব করে প্রার্থনা জানান—এই নতুন সৃষ্টি পুরাতন বিশ্বব্যবস্থাকে গ্রাস করবে। ব্রহ্মা বিশ্বামিত্রকে সৃষ্টিনিবৃত্তির অনুরোধ করেন, যাতে দেবলোকের বিনাশ না ঘটে। বিশ্বামিত্র শর্ত দেন—ত্রিশঙ্কু যেন বর্তমান দেহসহ দিব্যলোকে গমন করতে পারে। ব্রহ্মা সম্মতি দিয়ে ত্রিশঙ্কুকে ব্রহ্মলোক/ত্রিবিষ্টপে নিয়ে যান এবং বিশ্বামিত্রের অভূতপূর্ব কর্মের প্রশংসা করেন; তবে সীমা নির্ধারণ করেন—এই সৃষ্টি স্থিতিশীল থাকবে, কিন্তু যজ্ঞাদি ধর্মকর্মের যোগ্য হবে না। শেষে ব্রহ্মা ত্রিশঙ্কুসহ প্রস্থান করেন, আর বিশ্বামিত্র তপঃস্থানে প্রতিষ্ঠিত থাকেন।

Hāṭakeśvara-māhātmya and the Nāga-bila: Indra’s Purification Narrative (हाटकेश्वर-माहात्म्य)
সূত মুনি ত্রিলোকখ্যাত এক তীর্থের উদ্ভব বর্ণনা করেন, যা বিশ্বামিত্রের প্রচেষ্টায় ত্রিশঙ্কুর আশ্চর্য আরোহণের সঙ্গে যুক্ত। বলা হয়, এই স্থানে কলিযুগের দোষ লাগে না; গুরুতর পাপও এখানে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এই তীর্থে স্নান এবং সেখানে দেহত্যাগ শিবলোকে গমনের উপায়; এমনকি পশুপাখিও এর পুণ্যফলের অংশীদার বলে ঘোষিত। পরবর্তীতে লোকেরা একটিমাত্র সাধনায়—স্নান ও লিঙ্গভক্তিতে—নির্ভর করতে থাকে, ফলে যজ্ঞ-তপস্যা ও অন্যান্য আচারের অবনতি ঘটে। দেবতারা যজ্ঞভাগ বন্ধ হওয়ায় উদ্বিগ্ন হন; ইন্দ্র ধূলি ফেলে তীর্থ আচ্ছাদিত করার আদেশ দেন। পরে সেই স্থানে উইঢিবি থেকে ‘নাগ-বিল’ সৃষ্টি হয়, যার পথে নাগেরা পাতাল ও পৃথিবীর মধ্যে যাতায়াত করে। এরপর ছলপূর্বক বৃত্রবধের ফলে ইন্দ্রের উপর ব্রহ্মহত্যার দোষ আসে; বৃত্রের তপস্যা, বরলাভ ও দেববিরোধের কথাও বলা হয়। ইন্দ্র বহু তীর্থ পরিক্রমা করেও শুদ্ধ হন না; তখন দিব্যবাণী তাঁকে নাগ-বিল পথে পাতালে যেতে নির্দেশ দেয়। পাতালগঙ্গায় স্নান করে ও হাটকেশ্বরের পূজা করে তিনি তৎক্ষণাৎ পবিত্রতা ও দীপ্তি ফিরে পান। শেষে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ রোধে সেই পথ পুনরায় সিল করার বিধান এবং ভক্তিভরে পাঠ-শ্রবণকারীদের পরম ফলের ফলশ্রুতি উচ্চারিত।

Nāga-bila-pūraṇa and Raktaśṛṅga-sthāpanā at Hāṭakeśvara-kṣetra (नागबिलपूरणं रक्तशृङ्गस्थापनं च)
এই অধ্যায়ে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে অবস্থিত ভয়ংকর ভূগর্ভস্থ পথ ‘মহান নাগ-বিল’ কীভাবে বন্ধ ও পবিত্র হয়, তার স্থান-মাহাত্ম্য বর্ণিত। সূত বলেন—ইন্দ্র সংবর্তক বায়ুকে আদেশ দেন গর্তটি ধুলো দিয়ে পূরণ করতে; কিন্তু বায়ু অস্বীকার করে পূর্বকথা জানায়—একবার লিঙ্গ আচ্ছাদিত করার ফলে সে শাপে পতিত হয়ে মিশ্র গন্ধবাহী হয় এবং ত্রিপুরারি শিবের ভয়ে আর সে কাজ করতে চায় না। ইন্দ্র চিন্তিত হলে দেবেজ্য (বৃহস্পতি) হিমালয়ের তিন পুত্রের কথা বলেন—মৈনাক (সমুদ্রে গোপন), নন্দিবর্ধন (বশিষ্ঠাশ্রমের নিকট অসম্পূর্ণ ফাটলের সঙ্গে যুক্ত), এবং রক্তশৃঙ্গ (উপলব্ধ); এদের মধ্যে রক্তশৃঙ্গই নাগ-বিল সিল করার একমাত্র সক্ষম। ইন্দ্র হিমালয়ের কাছে প্রার্থনা করেন; রক্তশৃঙ্গ মানবলোকে কঠোরতা ও অধর্মের আধিক্য এবং ইন্দ্র কর্তৃক নিজের ডানা কাটা হওয়ার স্মৃতিতে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। ইন্দ্র তাকে বাধ্য করে প্রতিশ্রুতি দেন—সেখানে বৃক্ষ, তীর্থ, মন্দির ও ঋষিদের আশ্রম গড়ে উঠবে; পাপী মানুষও রক্তশৃঙ্গের সান্নিধ্যে শুদ্ধ হবে। এরপর রক্তশৃঙ্গকে নাগ-বিলে নাসিকা পর্যন্ত নিমজ্জিত করে স্থাপন করা হয়; তার উপর লতা-পাতা ও পাখিরা শোভা পায়। ইন্দ্র বর দেন—ভবিষ্যতে এক রাজা তার শিরে ব্রাহ্মণকল্যাণার্থে নগর স্থাপন করবে; চৈত্র কৃষ্ণ চতুর্দশীতে ইন্দ্র হাটকেশ্বরের পূজা করবে; এবং শিব দেবতাদের সঙ্গে একদিন সেখানে অবস্থান করে ত্রিলোকে খ্যাতি দান করবেন। শেষে বলা হয়, সেই সিল করা স্থানের উপর সত্যিই তীর্থ, দেবালয় ও তপোবন উদ্ভূত হয়।

Śaṅkhatīrtha-prabhāvaḥ (The Efficacy of Śaṅkhatīrtha) — Chapter 10
সূত বললেন—আনর্তদেশের রাজা চমৎকার একদিন শিকারে গিয়ে এক গাছতলায় শান্তভাবে শাবককে দুধ খাওয়াচ্ছে এমন এক হরিণীকে দেখলেন। উল্লাসের বশে তিনি তীর ছুড়ে তাকে বিদ্ধ করলেন। মৃত্যুপথযাত্রী হরিণী রাজাকে বলল—নিজের মৃত্যুর চেয়ে দুধনির্ভর অসহায় শাবকের দুর্দশাই তার বেশি বেদনার; আর সে ক্ষত্রিয়ের শিকারধর্মের সীমা জানাল—মৈথুনরত, নিদ্রিত, দুধ খাওয়াচ্ছে/খাচ্ছে এমন, দুর্বল বা জলে আশ্রিত প্রাণীকে হত্যা করলে হত্যাকারী পাপে লিপ্ত হয়। তাই সে অভিশাপ দিল—রাজা তৎক্ষণাৎ কুষ্ঠসদৃশ রোগে আক্রান্ত হবে। রাজা যুক্তি দিলেন যে রাজধর্মে কখনও বনজ প্রাণীর নিয়ন্ত্রণও থাকে; হরিণী সাধারণ নীতি মেনে নিলেও এই ক্ষেত্রে নিয়মভঙ্গ ও অধর্ম স্পষ্ট করল। হরিণীর মৃত্যুর পরই রাজা রোগগ্রস্ত হলেন; তিনি তা বুঝে তপস্যা, শিবপূজা, বন্ধু-শত্রুতে সমভাব এবং তীর্থভ্রমণ গ্রহণ করলেন। শেষে ব্রাহ্মণদের উপদেশে তিনি হাটকেশ্বরক্ষেত্রের প্রসিদ্ধ শঙ্খতীর্থে গিয়ে স্নান করতেই রোগমুক্ত ও দীপ্তিমান হলেন—এ অধ্যায়ে তীর্থমাহাত্ম্য ও সংযমের নীতি একসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত।

शंखतीर्थोत्पत्तिमाहात्म्य एवं चमत्कारभूपतिना ब्राह्मणेभ्यो नगरदानवर्णनम् (Origin and Glory of Śaṅkhatīrtha; the King Camatkāra’s Gift of a Town to Brahmins)
ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করলেন—রাজা চমৎকার কীভাবে কুষ্ঠরোগ থেকে মুক্ত হলেন, তাঁকে পথ দেখানো ব্রাহ্মণরা কারা, আর শঙ্খতীর্থ কোথায় ও তার শক্তি কী। সূত বললেন, রাজা বহু তীর্থে ঘুরে বেড়ালেন, ঔষধ ও মন্ত্রও খুঁজলেন, কিন্তু কোনো প্রতিকার পেলেন না। এক মহাপুণ্য অঞ্চলে কঠোরভাবে বাস করতে করতে তিনি তীর্থযাত্রী ব্রাহ্মণদের দেখলেন এবং মানবীয় বা দৈব—যে কোনো উপায়ে রোগনাশের পথ জানতে চাইলেন। ব্রাহ্মণরা নিকটবর্তী শঙ্খতীর্থকে সর্বরোগনাশক বলে বর্ণনা করলেন—বিশেষত চৈত্র মাসের চতুর্দশীতে, চন্দ্র যখন চিত্রা নক্ষত্রে থাকে, উপবাসসহ স্নান করলে মহাফল লাভ হয়। তাঁরা তীর্থের উৎপত্তিকথাও বললেন—তপস্বী ভ্রাতা লিখিত ও শঙ্খের কাহিনি। লিখিতের শূন্য আশ্রম থেকে শঙ্খ ফল নিয়েছিলেন এবং দোষ নিজের ওপর নেন; ক্রোধে লিখিত তাঁর হাত কেটে দেন। শঙ্খ কঠোর তপস্যা করলে শিব আবির্ভূত হয়ে তাঁর হাত ফিরিয়ে দেন এবং শঙ্খনামে তীর্থ প্রতিষ্ঠা করে স্নানকারীদের শুদ্ধি ও নবজীবনের বর দেন; নির্দিষ্ট সেই রাত্রিতে শ্রাদ্ধ করলে পিতৃগণ তৃপ্ত হন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। ব্রাহ্মণদের নির্দেশে রাজা যথাসময়ে স্নান করে রোগমুক্ত ও দীপ্তিমান হন। কৃতজ্ঞতায় তিনি রাজ্য-ধন দান করতে চাইলে ব্রাহ্মণরা শাস্ত্রানুসারে প্রাচীর ও পরিখা-রক্ষিত, বিদ্বান গৃহস্থদের অধ্যয়ন ও যজ্ঞকর্মের জন্য একটি বসতি চান; রাজা সুপরিকল্পিত নগর নির্মাণ করে দানবণ্টন করেন এবং শেষে বৈরাগ্য ও তপোমুখী জীবনে অগ্রসর হন।

Śaṅkha-tīrtha: Brāhmaṇa-nagarī-nivedana and Rakṣaṇa-upadeśa (शंखतीर्थे ब्राह्मणनगरनिवेदन-रक्षणोपदेशः)
সূত বর্ণনা করেন—রাজা বসুধাপাল ইন্দ্রের পুরন্দরপুরীর ন্যায় এক অপূর্ব ঐশ্বর্যময় নগরী নির্মাণ করলেন। সেখানে রত্নখচিত গৃহ, কৈলাসশিখরের তুল্য স্ফটিকপ্রাসাদ, ধ্বজা-পতাকা, স্বর্ণদ্বার, মণিময় সোপানযুক্ত পুষ্করিণী, উদ্যান, কূপ ও নগর-উপকরণ সবই সুসজ্জিত ছিল। পরে তিনি এই সম্পূর্ণ সজ্জিত ব্রাহ্মণ-নগরী শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের নিকট নিবেদন করে কর্তব্যসিদ্ধি লাভ করলেন। শঙ্খতীর্থে অবস্থান করে তিনি পুত্র, পৌত্র ও অনুচরদের ডেকে আদেশ দিলেন—দানকৃত এই নগরীকে নিরন্তর যত্নে রক্ষা করতে হবে, যাতে সকল ব্রাহ্মণ সন্তুষ্ট থাকেন। যে শাসক ভক্তিভাবে ব্রাহ্মণদের রক্ষা করে, সে ব্রাহ্মণ-কৃপায় অতুল তেজ, অজেয়তা, সমৃদ্ধি, দীর্ঘায়ু, আরোগ্য ও বংশবৃদ্ধি লাভ করে; আর যে বিদ্বেষ করে, সে দুঃখ, পরাজয়, প্রিয়বিয়োগ, রোগ, নিন্দা, বংশচ্ছেদ এবং শেষে যমলোকে পতিত হয়। অধ্যায়ের শেষে রাজা তপস্যায় প্রবৃত্ত হন, আর তাঁর বংশধরেরা সেই উপদেশ মান্য করে রক্ষণধর্মের ধারাবাহিকতা স্থাপন করে।

अचलेश्वर-प्रतिष्ठा-माहात्म्य (The Māhātmya of Acaleśvara: Establishment and Proof-Sign)
সূত বললেন—এক রাজা নিজের রাজ্য ও নগর পুত্রদের হাতে সমর্পণ করে, দ্বিজদের একটি বসতি দান করে মহাদেবকে প্রসন্ন করতে কঠোর তপস্যা শুরু করলেন। তিনি দীর্ঘকাল ধরে ক্রমে ফলাহার, তারপর শুকনো পাতা, তারপর শুধু জল, এবং শেষে বায়ুভক্ষণ—এই কঠিন নিয়ম পালন করে তপস্যায় মহেশ্বরকে সন্তুষ্ট করলেন; সন্তুষ্ট হয়ে শিব আবির্ভূত হয়ে বর দিতে উদ্যত হলেন। রাজা প্রার্থনা করলেন—হাটকেশ্বর-সম্পর্কিত পরম পুণ্যক্ষেত্রটি যেন ভগবানের স্থায়ী নিবাসে আরও পবিত্র হয়। মহাদেব সম্মতি দিয়ে বললেন, তিনি সেখানে অচলভাবে অবস্থান করবেন এবং তিন লোকেই “অচলেশ্বর” নামে খ্যাত হবেন; ভক্তিভরে দর্শনকারী ভক্তদের স্থির সমৃদ্ধি দান করবেন। মাঘ শুক্ল চতুর্দশীতে লিঙ্গে “ঘৃত-কম্বল” অর্পণের ব্রতও বলা হয়েছে—এতে জীবনের সব পর্যায়ে কৃত পাপ নাশ হয়। রাজাকে লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠা করতে বলা হল; দেব অন্তর্ধান করলে রাজা মনোরম মন্দির নির্মাণ করলেন। আকাশবাণীতে প্রমাণ-চিহ্ন জানানো হল—লিঙ্গের ছায়া স্থির থাকবে, সাধারণ নিয়মে দিক অনুসারে চলবে না; রাজা তা দেখে কৃতার্থ হলেন, এবং বলা হয় আজও সেই আশ্চর্য ছায়া দেখা যায়। আরও বলা হয়েছে—যার মৃত্যু ছয় মাসের মধ্যে অবশ্যম্ভাবী, সে সেই ছায়া দেখতে পারে না। শেষে ঘোষণা করা হয়, চমৎকারপুরের নিকটে মহাদেব অচলেশ্বর রূপে সদা বিরাজমান; এই তীর্থ কামনা পূরণ ও মোক্ষদায়ী, এবং এর অসাধারণ শক্তির কারণে বাধাস্বরূপ দোষ-দেবতাদেরও লোককে সেখানে যেতে বাধা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

Cāmatkārapura-pradakṣiṇā-māhātmya (Theological Account of Circumambulation at Cāmatkārapura)
এই অধ্যায়ে সূত একটি শিক্ষামূলক কাহিনি বলেন। জন্মসূত্রে বৈশ্য, মূক ও দরিদ্র এক ব্যক্তি গোপাল (গরু চরানো) করে জীবিকা নির্বাহ করত। চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষ চতুর্দশীতে তার একটি পশু অজান্তে হারিয়ে যায়। মালিক তাকে দোষারোপ করে সঙ্গে সঙ্গে পশুটি ফিরিয়ে আনতে বলে। ভয়ে সে না খেয়ে, হাতে লাঠি নিয়ে বনে খুঁজতে বের হয়। খুরের চিহ্ন অনুসরণ করতে করতে সে পুরো চামত্কারপুরের পরিধি ঘুরে ফেলে—অজান্তেই তা প্রদক্ষিণা হয়ে যায়। রাত শেষে পশুটি পেয়ে সে ফিরিয়ে দেয়। গ্রন্থে বলা হয়, এই বিশেষ তিথিতে দেবগণ পুণ্যক্ষেত্রে সমবেত হন, ফলে এমন কর্মের পুণ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পরে সেই গোপাল (উপবাসী, মৌনব্রতী ও অস্নাত অবস্থায়) এবং পশুটিও যথাকালে মৃত্যুবরণ করে। গোপাল দশার্ণ রাজার পুত্ররূপে পুনর্জন্ম লাভ করে এবং পূর্বজন্মের স্মৃতি বজায় রাখে। রাজা হয়ে সে প্রতি বছর মন্ত্রীর সঙ্গে পায়ে হেঁটে, উপবাস ও মৌন পালন করে সচেতনভাবে চামত্কারপুর প্রদক্ষিণা করে। বিশ্বামিত্র-সম্পর্কিত পাপহরণ তীর্থে আগত ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—এত তীর্থ ও মন্দির থাকতে সে কেন এই বিশেষ বিধিতেই এত অনুরক্ত। রাজা পূর্বজন্মের কাহিনি প্রকাশ করে। ঋষিরা তাকে প্রশংসা করে নিজেরাও প্রদক্ষিণা করেন এবং এমন এক অসাধারণ সিদ্ধি লাভ করেন যা জপ, যজ্ঞ, দান ও অন্যান্য তীর্থসেবাতেও দুর্লভ বলা হয়েছে। শেষে রাজা ও মন্ত্রী দিব্যসত্তা হয়ে আকাশে তারকার মতো দৃশ্যমান হন—এটাই প্রদক্ষিণার ফলপ্রমাণ।

Vṛndā’s Rescue, Māyā-Encounter with Hari, and the Etiology of Vṛndāvana (तुलसी-वृंदावन-प्रादुर्भाव)
নারদপ্রদত্ত এই অধ্যায়ে হরি/নারায়ণ তপস্বীর বেশে এক রাক্ষসকে বধ করে বিপন্না নারী বৃন্দা (বৃন্দারিকা)-কে রক্ষা করেন। পরে তিনি তাকে ভয়ংকর অরণ্য পেরিয়ে এক আশ্চর্য আশ্রমে নিয়ে যান—সেখানে স্বর্ণবর্ণ পাখি, অমৃতসম নদী ও মধু-ঝরা বৃক্ষ তীর্থের অলৌকিক মহিমা প্রকাশ করে। এরপর “চিত্রশালা”-য় দিব্য মায়ায় বৃন্দা স্বামীর সদৃশ এক পুরুষকে দেখে; সান্নিধ্যে সে মোহগ্রস্ত হয়ে অন্তরঙ্গতায় প্রবৃত্ত হয়। তখন হরি নিজের পরিচয় প্রকাশ করে শিব ও হরির পরমার্থগত অভেদ ঘোষণা করেন এবং জালন্ধরের মৃত্যুসংবাদ দেন। বৃন্দা নীতিগত প্রতিবাদ জানিয়ে শাপ দেয়—যেমন তপস্বীর মায়ায় সে বিভ্রান্ত হয়েছে, তেমনি হরিও অনুরূপ মোহের অধীন হবেন। শেষে বৃন্দা কঠোর তপস্যার সংকল্পে যোগসমাধিতে দেহত্যাগ করে; তার অবশেষ বিধিপূর্বক সংস্কৃত হয়। যে স্থানে সে দেহ ত্যাগ করেছিল, গোবর্ধনের নিকটে তা “বৃন্দাবন” নামে প্রসিদ্ধ হয় এবং তার রূপান্তরেই অঞ্চলের পবিত্রতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

रक्तशृङ्गसांनिध्यसेवनफलश्रैष्ठ्यवर्णनम् (Exposition on the Supremacy of the Fruits of Serving the Proximity of Raktaśṛṅga)
এই ষোড়শ অধ্যায়ে সূত বলেন—হাটকেশ্বর-সম্ভব পবিত্র ক্ষেত্রে রক্তশৃঙ্গের সান্নিধ্যে ভক্তিসেবা সর্বোত্তম ফলদায়ক। জ্ঞানীদের অন্য কর্ম ত্যাগ করে সেই স্থানের উপস্থিতিতে অবস্থান করে সেবায় নিয়োজিত হতে বলা হয়েছে। দান, ক্রিয়াকাণ্ড, পূর্ণ দক্ষিণাসহ অগ্নিষ্টোমাদি যজ্ঞ, চন্দ্রায়ণ ও কৃচ্ছ্রের মতো কঠোর ব্রত, এবং প্রভাস ও গঙ্গার মতো প্রসিদ্ধ তীর্থ—এসবের পুণ্য তুলনা করে বলা হয়েছে যে, এগুলি এই ক্ষেত্রের পুণ্যের ষোড়শাংশেরও সমান নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়—পূর্বের রাজর্ষিরা সেখানে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন; আর কালের বশে বিনষ্ট পশু-পাখি, সাপ ও হিংস্র প্রাণীরাও সেই স্থানের সংযোগে দিব্যলোক প্রাপ্ত হয়। তীর্থ বাসে শুদ্ধ করে, কিন্তু হাটকেশ্বর-ক্ষেত্র স্মরণে, দর্শনে এবং বিশেষত স্পর্শে অধিক শুদ্ধি দেয়—এভাবেই দেহ-সংস্পর্শে পবিত্রতার তত্ত্ব প্রকাশিত।

चमत्कारपुर-क्षेत्रप्रमाण-वर्णनम् तथा विदूरथ-नृपकथा (Chamatkārapura Kṣetra Boundaries and the Tale of King Vidūratha)
এই অধ্যায়ে ঋষিগণ সূতকে চমৎকারপুর-ক্ষেত্রের যথার্থ পরিমাপ এবং সেখানে অবস্থিত পুণ্যতীর্থ ও দেবালয়সমূহের বিবরণ জানতে চান। সূত বলেন—এই ক্ষেত্র পাঁচ ক্রোশ বিস্তৃত; পূর্বে গয়াশির, পশ্চিমে হরির পদচিহ্ন, আর দক্ষিণ ও উত্তরে গোকর্ণেশ্বরের পবিত্র স্থানদ্বয় সীমারূপে গণ্য। তিনি আরও জানান যে পূর্বে এ স্থানের নাম ছিল হাটকেশ্বর এবং এটি পাপবিনাশী হিসেবে প্রসিদ্ধ। এরপর ব্রাহ্মণদের অনুরোধে সূত রাজা বিদূরথের কাহিনি শুরু করেন। শিকারে বেরিয়ে রাজা ক্রমে ভয়ংকর তাড়া-ধাওয়ায় জড়িয়ে পড়েন; কাঁটায় ভরা, জলহীন, ছায়াহীন অরণ্যে প্রচণ্ড তাপ ও হিংস্র জন্তুর আশঙ্কা তাকে পীড়িত করে। সেনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি ক্লান্ত ও বিপন্ন হন; শেষে তাঁর অশ্ব লুটিয়ে পড়ে—যা পরবর্তী অংশে ক্ষেত্রের মাহাত্ম্য ও ধর্মার্থের প্রকাশের ভূমিকা রচনা করে।

प्रेतसंवादः — विदूरथस्य प्रेतैः सह संवादः तथा जैमिन्याश्रमप्रवेशः (Dialogue with Pretas and Entry into Jaimini’s Āśrama)
এই অধ্যায়ে দুটি পর্ব পরস্পর যুক্ত। প্রথমে, কঠিন অরণ্যে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ক্লান্ত রাজা বিদূরথ তিন ভয়ংকর প্রেতের সম্মুখীন হন। সংলাপে তারা নিজেদের কর্মনাম জানায়—মাংসাদ, বিদৈবত, কৃতঘ্ন—এবং বলে যে ধারাবাহিক অধর্মাচরণ, পূজা-উপাসনার অবহেলা, অকৃতজ্ঞতা, অতিথি-অপমান, অশৌচ প্রভৃতি পাপ থেকে প্রেতাবস্থা জন্মায়। এরপর গৃহস্থ-ধর্ম ও শ্রাদ্ধাচারের ব্যবহারিক নির্দেশ দেওয়া হয়—অশুভ সময়ে শ্রাদ্ধ, অপর্যাপ্ত দক্ষিণা, বৈশ্বদেব ত্যাগ, অতিথিসেবা অবহেলা, খাদ্যের অশুদ্ধি/দূষণ, গৃহে অমঙ্গল ইত্যাদি অবস্থায় প্রেতেরা অন্ন-হবির ‘ভোগ’ করে বলে উল্লেখ আছে। পরদারগমন, চুরি, নিন্দা, বিশ্বাসঘাত, পরধন অপব্যবহার, ব্রাহ্মণ-দান রোধ, নির্দোষ পত্নী ত্যাগ প্রভৃতি প্রেতত্বের কারণ; আর বিপরীতে পরস্ত্রীকে মাতৃবৎ দেখা, দান, সমতা, করুণা, যজ্ঞ-তীর্থপরায়ণতা এবং কূপ-তটাক নির্মাণের মতো লোকহিতকর্ম রক্ষাকবচ। প্রেতেরা গয়া-শ্রাদ্ধকে প্রধান প্রতিকার বলে প্রার্থনা করে। দ্বিতীয় পর্বে রাজা উত্তরদিকে গিয়ে সরোবরতীরের শান্ত জৈমিনি-আশ্রমে পৌঁছান। ঋষি জৈমিনি ও তপস্বীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জল-ফল গ্রহণ করেন, নিজের দুর্দশা জানান এবং সন্ধ্যার আচারকর্মে অংশ নেন; রাত্রির বর্ণনায় নৈশভয়ের চিত্র নীতিশিক্ষার রূপ পায়।

सत्योपदेशः—गयाशीर्षे श्राद्धेन प्रेतमोक्षणम् (Instruction on Truthfulness—Preta-Liberation through Śrāddha at Gayāśiras)
সূত বলেন—রাজা বিদূরথ দুঃখাকুল অনুচরদের সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়ে ঋষিদের অরণ্যে বিশ্রাম নেন এবং পরে মাহিষ্মতীর দিকে ফিরতে ফিরতে গয়াশীর্ষ তীর্থে যান। সেখানে তিনি গভীর শ্রদ্ধায় শ্রাদ্ধ করেন। স্বপ্নদর্শনে ‘মাংসাদ’ নামে এক প্রেত দিব্যরূপে আবির্ভূত হয়ে জানায় যে রাজার শ্রাদ্ধকর্মের ফলে সে প্রেতত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে। পরে ‘কৃতঘ্ন’ নামে আরেক প্রেত—অকৃতজ্ঞ এবং সরোবর-ধন চুরির সঙ্গে যুক্ত—পাপবাধায় এখনও কষ্টভোগ করে বলে যে মুক্তির মূল উপায় সত্য। সে সত্যের মাহাত্ম্য ঘোষণা করে—সত্যই পরব্রহ্ম, সত্যই তপস্যা, সত্যই জ্ঞান, এবং সত্যের উপরেই বিশ্বধর্ম প্রতিষ্ঠিত; সত্য না থাকলে তীর্থসেবা, দান, স্বাধ্যায় ও গুরুসেবা নিষ্ফল হয়। তারপর সে স্থান-নির্দেশ দেয়: হাটকেশ্বর ক্ষেত্রের চামৎকারপুরে বালুর নিচে গয়াশীর্ষ গোপন; প্লক্ষবৃক্ষের তলায় দর্ভ, বনশাক ও বনজ তিল নিয়ে দ্রুত শ্রাদ্ধ করতে হবে। বিদূরথ ছোট কূপ খুঁড়ে জল সংগ্রহ করে শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করেন; সঙ্গে সঙ্গে কৃতঘ্ন প্রেত দিব্যদেহ লাভ করে বিমানে আরূঢ় হয়ে প্রস্থান করে। শেষে সেই কূপের খ্যাতি পিতৃদের নিত্য উপকারকারী বলে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রেতপক্ষের অমাবস্যায় কালশাক, বনজ তিল ও কাটা দর্ভ দিয়ে সেখানে শ্রাদ্ধ করলে ‘কৃতঘ্ন-প্রেত-তীর্থ’-এর পূর্ণ ফল মেলে; নানা পিতৃগণ সেখানে সদা উপস্থিত—অতএব যথাসময়ে বা বিশেষ তিথি ছাড়াও সেখানে শ্রাদ্ধ করা পিতৃতৃপ্তির জন্য প্রশংসিত।

Pitṛ-kūpikā-śrāddha, Gokarṇa-gamana, and Bālamaṇḍana-tīrtha Śuddhi (पितृकूपिका-श्राद्धम्, गोकर्णगमनम्, बालमण्डनतीर्थशुद्धिः)
সূত বলেন—বনবাসকালে রাম সীতা ও লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে ‘পিতৃ-কূপিকা’ নামে স্থানে উপস্থিত হলেন। সন্ধ্যাকর্ম সম্পন্ন করে রাম স্বপ্নে আনন্দিত ও অলংকৃত দশরথকে দেখলেন। ব্রাহ্মণদের পরামর্শে জানা গেল, এটি পিতৃগণের পক্ষ থেকে শ্রাদ্ধের অনুরোধ; তাই বনলভ্য নিবারা ধান, শাক, মূল ও তিল প্রভৃতি দিয়ে কঠোর বিধিতে শ্রাদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হল। রাম আমন্ত্রিত ব্রাহ্মণদের নিয়ে যথাবিধি শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করলেন। শ্রাদ্ধকালে সীতা লজ্জাবশত সরে দাঁড়ালেন। পরে তিনি বললেন—ব্রাহ্মণদের মধ্যেই তিনি দশরথ ও অন্যান্য পিতৃপুরুষকে প্রত্যক্ষ অনুভব করেছিলেন, তাই আচরণগত সংকোচ হয়েছিল। রাম তাঁর শুদ্ধ উদ্দেশ্যকে ধর্মসম্মত বলে মেনে নিয়ে সেই দ্বন্দ্বের সমাধান করলেন। এরপর লক্ষ্মণ নিজেকে কেবল সেবাকর্মে আবদ্ধ মনে করে ক্রুদ্ধ হন এবং মনে অনুচিত চিন্তা জাগে; পরে মিলন ও নৈতিক সংশোধন ঘটে। তখন ঋষি মার্কণ্ডেয় এসে তীর্থশুদ্ধির কথা বলেন এবং আশ্রমের নিকট বালমণ্ডন-তীর্থে স্নানের বিধান দেন—যা মানসিক অপরাধসহ গুরুতর দোষও দূর করে। তাঁরা সেখানে স্নান করে পিতামহের দর্শন লাভ করে দক্ষিণাভিমুখে যাত্রা করেন; স্থান, শ্রাদ্ধ ও নীতিশুদ্ধি একসূত্রে যুক্ত হয়।

बालसख्यतीर्थप्रादुर्भावः — Origin of Bālasakhya Tīrtha and Brahmā’s Grace to Mārkaṇḍeya
অধ্যায়ের শুরুতে ব্রাহ্মণেরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—মার্কণ্ডেয় কোথায় ছিলেন, ব্রহ্মার প্রতিষ্ঠাস্থান কোথায় এবং ঋষির আশ্রম কোথায়। সূত বলেন, চমৎকারপুরের নিকটে মৃকণ্ডু মুনি তপোবনে বাস করতেন; সেখানেই দীপ্তিমান পুত্র মার্কণ্ডেয়ের জন্ম হয়। এক সামুদ্রিক-বিদ্যাজ্ঞ ব্রাহ্মণ এসে ভবিষ্যদ্বাণী করে যে শিশুটি ছয় মাসের মধ্যে মারা যাবে। তখন মৃকণ্ডু শিশুকে নিয়মাচার শেখান এবং বিশেষ করে ভ্রমণকারী ব্রাহ্মণ ও ঋষিদের প্রতি শ্রদ্ধাভরে প্রণাম করার কথা বলেন। শিশু বারবার প্রণাম করলে বহু ঋষি তাকে “দীর্ঘায়ু” আশীর্বাদ দেন; কিন্তু সত্যরক্ষার্থে বশিষ্ঠ বলেন, তৃতীয় দিনেই মৃত্যু নির্ধারিত—এতে আশীর্বাদের সত্যতা নিয়ে সংকট দেখা দেয়। সকল ঋষি স্থির করেন, নির্ধারিত মৃত্যুকে কেবল পিতামহ ব্রহ্মাই নিবারণ করতে পারেন। তাঁরা ব্রহ্মলোকে গিয়ে বৈদিক স্তোত্রে ব্রহ্মার স্তব করেন ও বিষয়টি নিবেদন করেন। ব্রহ্মা শিশুকে জরা-মৃত্যুহীনতার বর দেন এবং বলেন, পিতা যেন পুত্রদর্শনের আগে শোকে প্রাণ না হারান। ঋষিরা ফিরে এসে অগ্নিতীর্থের কাছে আশ্রমসন্নিধানে শিশুকে রেখে তীর্থযাত্রায় অগ্রসর হন। এদিকে মৃকণ্ডু ও তাঁর পত্নী শিশুকে হারিয়েছে মনে করে এবং ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ করে দুঃখে আত্মদাহে উদ্যত হন; তখন শিশু ফিরে এসে ঋষিদের কৃত্য ও ব্রহ্মার বর জানায়। কৃতজ্ঞ মৃকণ্ডু ঋষিদের সৎকার করেন; তাঁরা প্রতিদানরূপে সেই স্থানে ব্রহ্মার প্রতিষ্ঠা ও পূজার বিধান দেন। স্থানটি “বালসখ্য” নামে খ্যাত হয়—শিশুদের মঙ্গলকারী, রোগনাশক, ভয়হর এবং গ্রহ-ভূত-পিশাচবাধা নিবারক। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, শ্রদ্ধায় স্নানমাত্রেই উচ্চ গতি লাভ হয়; জ্যৈষ্ঠ মাসে স্নানে বছরভর ক্লেশমুক্তি হয়।

बालमण्डनतीर्थोत्पत्तिः — Origin of the Bālamaṇḍana Tīrtha and the Śakreśvara Observance
ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—কোন তীর্থে লক্ষ্মণ ও ইন্দ্র স্বামিদ্রোহ (ন্যায়সঙ্গত অধিপতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা)-পাপ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন? সূত সেই তীর্থের উৎপত্তিকথা বলেন। দক্ষের বংশপরম্পরায় কশ্যপের দুই প্রধান পত্নী—অদিতি ও দিতি—থেকে দেব ও অধিক বলবান দৈত্যদের জন্ম, এবং তাদের সংঘর্ষের বিবরণ আসে। দেবদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ পুত্র লাভের জন্য দিতি কঠোর ব্রত পালন করেন; শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন। ভবিষ্যদ্বাণীতে ভীত ইন্দ্র দিতির সেবা করতে থাকেন এবং ব্রতভঙ্গের সুযোগ খোঁজেন। প্রসবকালে দিতি ঘুমিয়ে পড়লে ইন্দ্র গর্ভে প্রবেশ করে ভ্রূণকে সাত ভাগে, পরে প্রতিটি ভাগকে আবার সাত ভাগে ছিন্ন করেন—এভাবে ঊনপঞ্চাশ শিশু জন্মায়। দিতি ইন্দ্রের সত্য স্বীকারোক্তি শুনে ফলকে কল্যাণময় করেন—শিশুরা ‘মরুত’ নামে পরিচিত হয়, দৈত্যত্ব থেকে মুক্ত হয়ে ইন্দ্রের সহায় ও যজ্ঞভাগের অধিকারী হয়। স্থানটি ‘বালমণ্ডন’ নামে খ্যাত; গর্ভবতী নারীর জন্য সেখানে স্নান ও প্রসবসময়ে সেই জল পান রক্ষাকর বলা হয়েছে। স্বামিদ্রোহের প্রায়শ্চিত্তে ইন্দ্র সেখানে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে ‘শক্রেশ্বর’ রূপে সহস্র বছর পূজা করেন। শিব ইন্দ্রের পাপ মোচন করেন এবং মানবভক্তদেরও সেখানে স্নান-দর্শন-উপাসনায় পাপক্ষয়ের বর দেন। আশ্বিন শুক্ল দশমী থেকে পূর্ণিমা (পঞ্চদশী) পর্যন্ত শ্রাদ্ধ করলে সর্বতীর্থস্নানের ফল, এমনকি অশ্বমেধসম পুণ্য লাভ হয়; সেই সময় ইন্দ্রের সান্নিধ্যে যেন সব তীর্থই সেখানে মিলিত হয়। শেষে নারদোক্ত দুই শ্লোকে বলা হয়—বালমণ্ডনে স্নান ও আশ্বিন-ব্রতকালে শক্রেশ্বর দর্শনে পাপমুক্তি ঘটে।

मृगतीर्थमाहात्म्य (Mṛgatīrtha Māhātmya — The Glory of the Deer-Tīrtha)
সূত মুনি পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এক মহাপবিত্র তীর্থ ‘মৃগতীর্থ’-এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। তিনি বলেন—চৈত্র শুক্ল চতুর্দশীতে সূর্যোদয়ের সময় যে ব্যক্তি যথাযথ শ্রদ্ধায় সেখানে স্নান করে, সে গুরুতর পাপভারযুক্ত হলেও পশুযোনিতে পতিত হয় না; তীর্থস্নান দ্বারা শুদ্ধি ও উত্তরণ লাভ হয়। ঋষিগণ তখন তীর্থের উৎপত্তি ও বিশেষ ফল জানতে চান। সূত কাহিনি বলেন—এক মহাবনে শিকারিরা হরিণের পালকে তাড়া করে। তীরবিদ্ধ ও ভীত হরিণেরা এক গভীর জলাশয়ে প্রবেশ করে। সেই জলের প্রভাবে তারা মানবত্ব লাভ করে; কেবল স্নানমাত্রেই তাদের বাহ্য লক্ষণে শোভা ও পরিশীলন প্রকাশ পায়। এর কারণরূপে বলা হয়—এই জল পূর্বোক্ত লিঙ্গ-ভেদ-উদ্ভবের সঙ্গে সংযুক্ত। ধূলায় আচ্ছন্ন উৎসটি দেববিধানে উইপোকার ঢিবি (বল্মীক)-এর ছিদ্র দিয়ে পুনরায় প্রকাশ পায় এবং ক্রমে সেই স্থানে প্রসিদ্ধ হয়। আরও দৃষ্টান্তে ত্রিশঙ্কু, সামাজিকভাবে অবনত অবস্থায় থেকেও, সেখানে স্নান করে দিব্যরূপ পুনরুদ্ধার করেন। অতএব শিকারি ও হরিণ—উভয়েই—এই তীর্থে স্নান করলে পাপমল থেকে মুক্ত হয়ে শ্রেষ্ঠ গতি লাভ করে।

विष्णुपद-तीर्थमाहात्म्यम् (The Māhātmya of the Viṣṇupada Tīrtha)
এই অধ্যায়ে সূত মুনি ‘বিষ্ণুপদ’ নামক তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন—এটি পরম মঙ্গলময় এবং সর্বপাপ-নাশক। দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়নের সন্ধিক্ষণে যে ভক্ত একাগ্রতা ও শ্রদ্ধায় বিষ্ণুর পদচিহ্ন পূজা করে আত্মনিবেদন করে, সে বিষ্ণুর পরম পদ লাভ করে। ঋষিগণ তীর্থের উৎপত্তি এবং দর্শন, স্পর্শ ও স্নানের ফল জানতে চান। সুত ত্রিবিক্রম কাহিনি বলেন—বিষ্ণু বলিকে বেঁধে তিন পদক্ষেপে ত্রিলোক ব্যাপ্ত করেন; তখনই নির্মল দিব্য জলের অবতরণ ঘটে, যা পরে গঙ্গা নামে প্রসিদ্ধ হয় এবং ‘বিষ্ণুপদী’ রূপে স্মৃত, সেই অঞ্চলে পবিত্রতা বিস্তার করে। বিধিপূর্বক স্নানের পর পদচিহ্ন স্পর্শ করলে পরম গতি লাভ হয়; সেখানে শ্রাদ্ধ করলে গয়ার তুল্য ফল, মাঘস্নান করলে প্রয়াগসম ফল; দীর্ঘ সাধনা ও অস্থি-বিসর্জনও মুক্তিতে সহায়ক বলা হয়েছে। নারদপ্রোক্ত গাথার দ্বারা বলা হয়—বিষ্ণুপদী জলে একবার স্নান বহু তীর্থ, দান ও তপস্যার সম্মিলিত ফল দেয়। শেষে অয়ন-ব্রতের মন্ত্র দেওয়া হয়েছে—ছয় মাসের মধ্যে মৃত্যু হলেও বিষ্ণুর পদচিহ্নই যেন আশ্রয় হয়; তারপর ব্রাহ্মণ পূজা ও সমবেত ভোজনকে ধর্মাচরণের পূর্ণতা বলা হয়েছে।

विष्णुपदीगङ्गाप्रभावः — The Efficacy of the Viṣṇupadī Gaṅgā
সূত গঙ্গা-মাহাত্ম্যরূপে এক শিক্ষাপ্রদ কাহিনি বলেন। চমৎকারপুরের শৃঙ্খলাবান ব্রাহ্মণ চণ্ডশর্মা যৌবনের আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে। এক রাত্রে তৃষ্ণার্ত হয়ে সে জল ভেবে এক গণিকার হাতে দেওয়া মদ্য পান করে—গণিকাও ভুল করে তাকে জলই মনে করেছিল। ব্রাহ্মণের জন্য এই লঙ্ঘনের কথা বুঝে সে প্রায়শ্চিত্ত জানতে বিদ্বান ব্রাহ্মণসমাজে যায়; তারা ধর্মশাস্ত্র অনুসারে পান করা মদের পরিমাণ অনুযায়ী অগ্নিবর্ণ ঘৃত পান করার বিধান জানায়। প্রায়শ্চিত্তের প্রস্তুতিতে তার পিতা-মাতা এসে পড়েন। পিতা শাস্ত্র দেখে কঠোর উপায় ভাবেন, আবার দান ও তীর্থযাত্রার মতো বিকল্পও বলেন; কিন্তু পুত্র নির্দিষ্ট বিধি (মৌঞ্জী-হোম প্রভৃতি) করতেই দৃঢ় থাকে। পিতা-মাতাও পুত্রের সঙ্গে অগ্নিপ্রবেশের সংকল্প করেন। এই সংকটে তীর্থযাত্রী ঋষি শাণ্ডিল্য উপস্থিত হয়ে বলেন—গঙ্গা যেখানে সহজলভ্য, সেখানে অকারণে মৃত্যু কেন; কঠোর তপস্যা গঙ্গাহীন স্থানের জন্যই নির্দিষ্ট। তিনি সবাইকে বিষ্ণুপদী গঙ্গায় নিয়ে যান; আচমন ও স্নানমাত্রে চণ্ডশর্মা তৎক্ষণাৎ শুদ্ধ হয়, এবং দিব্যবাণী (ভারতী) তা নিশ্চিত করে। অধ্যায়ে পশ্চিম সীমান্তের এই তীর্থকে ‘পাপনাশিনী’ বলে গঙ্গার সর্বপাপহর শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

हाटकेश्वरक्षेत्रमाहात्म्योपदेशः (Instruction on the Glory of Hāṭakeśvara Kṣetra)
অধ্যায়ে সূত মুনি কাহিনি শুরু করে দক্ষিণ–উত্তর সীমান্ত-প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। মথুরায় যমুনা-তীরে ‘গোকর্ণ’ নামে দুইজন খ্যাতিমান ব্রাহ্মণের পরিচয় দেওয়া হয়। যমরাজের আদেশে দূত ভুল করে দীর্ঘায়ু ব্রাহ্মণকে ধরে নিয়ে আসে; যমরাজ সেই ভুল সংশোধন করে ধর্ম-ন্যায় ও কর্মফল বিষয়ে ব্রাহ্মণের সঙ্গে আলোচনা করেন। দারিদ্র্যে ক্লিষ্ট এক ব্রাহ্মণ মৃত্যুকামনা প্রকাশ করে এবং যমরাজের নিরপেক্ষতা, কর্মের বিধান ও শাস্তির কার্যপ্রণালী জানতে চান; পাশাপাশি নরকের শ্রেণিবিভাগও প্রার্থনা করেন। যমরাজ বৈতরণীসহ একুশটি নরকের বিবরণ দেন এবং চুরি, বিশ্বাসঘাতকতা, মিথ্যা সাক্ষ্য, হিংসা ইত্যাদি পাপের সঙ্গে তাদের ফল সংযুক্ত করে বলেন। এরপর বর্ণনা শাস্তি থেকে নীতিশিক্ষায় মোড় নেয়—তীর্থযাত্রা, দেবপূজা, অতিথিসেবা, অন্ন-জল-আশ্রয় দান, সংযম, স্বাধ্যায় এবং জনকল্যাণমূলক কাজ (কূপ, পুকুর, মন্দির নির্মাণ) রক্ষাকবচরূপে নির্দেশিত হয়। শেষে যমরাজ এক ‘গুপ্ত’ মুক্তিদায়ক উপদেশ প্রকাশ করেন—আনর্ত অঞ্চলের হাটকেশ্বর ক্ষেত্রে শিবভক্তি অল্প সময়ের জন্যও মহাপাপ নাশ করে শিবলোকে উন্নীত করে। দুই গোকর্ণ সেখানে পূজা করে সীমান্তে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন, তপস্যা করে দিব্যগতি লাভ করেন। চতুর্দশীর রাত্রিজাগরণ বিশেষ প্রশংসিত—সন্তান, ধন এবং শেষ পর্যন্ত মোক্ষ প্রদানকারী। ক্ষেত্রে বাস, কৃষিকর্ম, স্নান, এমনকি পশুর মৃত্যু পর্যন্ত পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে; আর ধর্মবিরোধীরা বারবার শুভ অবস্থা থেকে পতিত হয় বলে উল্লেখ আছে।

युगप्रमाण-स्वरूप-माहात्म्यवर्णनम् (Yuga Measures, Characteristics, and Their Theological Significance)
এই অধ্যায়ে চার যুগের প্রমাণ (কালমান), স্বরূপ (লক্ষণ) ও মাহাত্ম্য (ধর্ম-নৈতিক তাৎপর্য) ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত। ঋষিগণ সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—কৃত, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিযুগের সম্পূর্ণ বিবরণ দিন। সূত প্রাচীন প্রসঙ্গ বলেন: দেবসভায় ইন্দ্র (শক্র) দেবগণের সঙ্গে বসে বृहস্পতিকে যুগের উৎপত্তি ও মানদণ্ড বিষয়ে বিনীতভাবে প্রশ্ন করেন। বৃহস্পতি কৃতযুগে ধর্মকে চতুষ্পদ, আয়ুকে দীর্ঘ, যজ্ঞ-আচারকে সুশৃঙ্খল বলেন; রোগ, নরকভয় ও প্রেতাবস্থা প্রভৃতি দুঃখ নেই, মানুষ নিষ্কামভাবে কর্ম করে। ত্রেতাযুগে ধর্ম ত্রিপদ হয়, প্রতিযোগিতা ও কাম্যধর্ম বৃদ্ধি পায়; গ্রন্থের দৃষ্টিতে মিশ্র-সংযোগ থেকে সমাজে নানা সংকর-গোষ্ঠীর উদ্ভবের শ্রেণিবিভাগও উল্লিখিত। দ্বাপরে ধর্ম ও পাপ সমান (দুই-দুই), সংশয় বাড়ে এবং ফল অনেকাংশে সংকল্প/ভাব অনুসারে হয়। কলিযুগে ধর্ম একপদ, সামাজিক বিশ্বাস ভেঙে পড়ে, আয়ু হ্রাস পায়, প্রকৃতি ও নৈতিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও অবক্ষয়িত হয়। শেষে ফলশ্রুতি—এই যুগোপদেশ পাঠ বা শ্রবণ করলে জন্মান্তরব্যাপী পাপক্ষয় হয়।

Hāṭakeśvara-kṣetra: Tīrthānāṃ Kali-bhaya-śaraṇya (Hāṭakeśvara as a refuge of tīrthas from Kali)
এই অধ্যায়ে সূত মুনিসভায় বর্ণনা করেন। দেবসভায় প্রভাস প্রভৃতি দেহধারী তীর্থসমূহ কলিযুগের আগমনে শঙ্কিত হয়ে প্রার্থনা করে—অশুচি সংস্পর্শে যেন তাদের তীর্থ-প্রভাব নষ্ট না হয়; তাই তারা কলিদোষে অস্পৃষ্ট এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল চায়। করুণাবশে শক্র (ইন্দ্র) বৃহস্পতির কাছে জিজ্ঞাসা করেন, কোথায় এমন স্থান আছে যা ‘কলি-অস্পর্শ’ এবং যেখানে তীর্থরা একত্রে আশ্রয় নিতে পারে। বৃহস্পতি চিন্তা করে অতুলনীয় হাটকেশ্বর ক্ষেত্রের কথা বলেন—শূলধারী শিবের লিঙ্গের ‘পতন’ থেকে যার উদ্ভব, এবং ত্রিশঙ্কুর জন্য বিশ্বামিত্রের তপস্যার স্মৃতিবাহী। প্রসঙ্গে ত্রিশঙ্কুর কলঙ্কিত অবস্থা ত্যাগ করে দেহসহ স্বর্গলাভের কাহিনি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, ফলে এই স্থান নৈতিক ও আচারগত উলটফের/উদ্ধারের তীর্থরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। রক্ষাব্যবস্থাও বলা হয়েছে—ইন্দ্রের আদেশে সংবর্তক বায়ু তীর্থকে ধূলিতে পূর্ণ করেছিল; কলিযুগে নীচে হাটকেশ্বর এবং উপরে অচলেশ্বর রক্ষা করেন। পাঁচ ক্রোশ পরিমিত এই ক্ষেত্র কলির অধিগম্যতার বাইরে; তাই তীর্থরা নিজেদের ‘অংশ’ রূপে সেখানে গমন করে। শেষে অসংখ্য তীর্থের উপস্থিতি জানিয়ে পরবর্তী অংশে নাম-স্থান-ফল তালিকা দেওয়ার সূচনা করা হয়; আর ফলশ্রুতিতে শ্রবণ, ধ্যান, স্নান, দান ও স্পর্শকে পাপহর বলা হয়েছে।

Siddheśvara-liṅga Māhātmya and the Śaiva Ṣaḍakṣara: Longevity, Release from Curse, and Ahiṃsā-Instruction
অধ্যায় ২৯-এ সূত একটি প্রসিদ্ধ ক্ষেত্রের কথা বলেন, যেখানে ঋষি, তপস্বী ও রাজারা তপস্যা ও সিদ্ধির জন্য সমবেত হন। হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে অবস্থিত সিদ্ধেশ্বর-লিঙ্গের মাহাত্ম্য বর্ণিত—স্মরণ, দর্শন ও স্পর্শমাত্রেই তা সিদ্ধিদায়ক। এরপর দক্ষিণামূর্তি-প্রসঙ্গসহ শৈব ষড়ক্ষর মন্ত্রের কথা ওঠে; জপসংখ্যা অনুযায়ী আয়ু বৃদ্ধি হয় শুনে ঋষিরা বিস্মিত হন। সূত প্রত্যক্ষ দেখা এক দৃষ্টান্ত বলেন—বৎস নামের এক ব্রাহ্মণ বহু বয়সী হয়েও যুবকের মতোই দেখায়। তিনি জানান, সিদ্ধেশ্বরের নিকটে দীর্ঘকাল ষড়ক্ষর-জপের ফলে যৌবন স্থির হয়েছে, জ্ঞান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সুস্থতা বজায় আছে। তারপর অন্তর্কথা: এক ধনী যুবক শিবোৎসবে বিঘ্ন ঘটায়; শিষ্যের উক্তিতে সে সাপরূপে অভিশপ্ত হয়। পরে তাকে শেখানো হয় যে ষড়ক্ষর মন্ত্র গুরুতর দোষও শুদ্ধ করতে পারে; বৎস জলসাপকে আঘাত করতেই এক দিব্য রূপ মুক্ত হয়ে অভিশাপমোচন ঘটে। অধ্যায়ে নীতিশিক্ষাও আছে—সাপহত্যা ত্যাগ, অহিংসাকে পরম ধর্ম বলে প্রতিষ্ঠা, মাংসাহারের যুক্তির সমালোচনা এবং হিংসায় সহভাগিতার নানা স্তর। শেষে শ্রবণ-পাঠ ও মন্ত্রজপকে রক্ষাকারী, পুণ্যদায়ক ও পাপনাশক সাধনা বলে ফলশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে।

Siddheśvara at Camatkārapura: Hamsa’s Tapas, Liṅga-Pūjā, and Ṣaḍakṣara-Mantra Phala
অধ্যায় ৩০-এ ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—সেই স্থানে সিদ্ধেশ্বর কীভাবে প্রসন্ন হলেন। সূত পূর্বকথা বলেন—হংস নামে এক সিদ্ধ সন্তানহীনতা ও বার্ধক্যে কাতর হয়ে উপায় খুঁজতে অঙ্গিরসপুত্র বৃহস্পতির শরণ নেন। তিনি তীর্থ, ব্রত বা শান্তিকর্মের মধ্যে কোনটি সন্তানের জন্য ফলদায়ক—এ কথা জানতে চান। বৃহস্পতি চিন্তা করে তাঁকে চমৎকারপুর ক্ষেত্রের নির্দেশ দেন এবং বলেন, সেখানে তপস্যাই শুভ উপায়; তাতেই বংশধারক যোগ্য পুত্র লাভ হবে। হংস সেখানে গিয়ে বিধিপূর্বক লিঙ্গপূজা করেন এবং দিনরাত নিয়ম-সংযমে ভক্তি অব্যাহত রাখেন—পুষ্প, নৈবেদ্য, গীত-বাদ্য ও কঠোর তপসহ। তিনি চন্দ্রায়ণ, কৃচ্ছ্র, প্রাজাপত্য/পরাক প্রভৃতি ব্রত এবং মাসব্যাপী উপবাসও পালন করেন। সহস্র বছর পরে মহাদেব উমাসহ প্রকাশ হয়ে দর্শন দেন ও বর চাইতে বলেন। হংস বংশস্থাপনার জন্য পুত্র প্রার্থনা করেন। শিব সেই লিঙ্গের চিরস্থায়ী প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করে সাধারণ প্রতিশ্রুতি দেন—যে সেখানে ভক্তিভরে পূজা করবে, সে ইষ্টফল পাবে; আর লিঙ্গের দক্ষিণ দিক থেকে জপ করলে ষড়ক্ষর মন্ত্র লাভ হয় এবং দীর্ঘায়ু ও পুত্রলাভসহ নানা ফল মেলে। পরে শিব অন্তর্ধান করেন; হংস গৃহে ফিরে পুত্রপ্রাপ্ত হন। শেষে দুর্লভ কামনার সাধকদের জন্য স্পর্শ, পূজা, প্রণাম ও শক্তিশালী ষড়ক্ষর-জপের বিধান বলা হয়েছে।

Nāgatīrtha–Nāgahṛda Māhātmya (श्रावणपञ्चमी-व्रत, नागपूजा, श्राद्ध-फलश्रुति)
অধ্যায় ৩১-এ নাগতীর্থ ‘নাগহ্রদ’-এর মাহাত্ম্য বর্ণিত। এখানে স্নান করলে সাপের ভয় দূর হয়। বিশেষত শ্রাবণ মাসের কৃষ্ণপক্ষ পঞ্চমীতে স্নান করলে বংশপরম্পরায়ও সর্পদংশনাদি বিপদ থেকে রক্ষা মেলে—এমন কালনির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণকথায় শेष প্রমুখ প্রধান নাগদের কথা আছে—মাতৃশাপের চাপে তারা তপস্যা করে, তাদের বংশবৃদ্ধি মানবসমাজের জন্য উপদ্রব হয়ে ওঠে। পীড়িত প্রাণীরা ব্রহ্মার শরণ নেয়। ব্রহ্মা নয়জন নাগনেতাকে সন্তানসংযমের উপদেশ দেন; তা ব্যর্থ হলে তিনি শাসনব্যবস্থা স্থাপন করেন—পতালবাসের বিধান এবং পৃথিবীতে আগমনের জন্য পঞ্চমীকে নির্দিষ্ট সময়। ধর্মনিয়মও বলেন: নির্দোষ মানুষ, বিশেষত মন্ত্র-ঔষধে রক্ষিত জনকে ক্ষতি করা উচিত নয়। এরপর ফলকথা—শ্রাবণ পঞ্চমীতে নাগপূজা করলে ইষ্টসিদ্ধি হয়; সেখানে করা শ্রাদ্ধ বিশেষ ফলদায়ক, সন্তানকামীদের জন্যও এবং সর্পদংশনে মৃতদের জন্যও। বলা হয়েছে, যথাযথ শ্রাদ্ধ না হলে এমন মৃতের প্রেতত্ব স্থায়ী হতে পারে। দৃষ্টান্তে রাজা ইন্দ্রসেন সাপের কামড়ে মারা যান; পুত্র অন্যত্র শ্রাদ্ধ করেও ফল পায় না, স্বপ্নাদেশে চমৎকারপুর/নাগহ্রদে শ্রাদ্ধ করে। শ্রাদ্ধভোজী ব্রাহ্মণ পাওয়া কঠিন হলেও দেবশর্মা গ্রহণ করেন, এবং আকাশবাণী পিতার মুক্তি ঘোষণা করে। শেষে ফলশ্রুতি—পঞ্চমীতে এই মাহাত্ম্য শ্রবণ-পাঠে সর্পভয় নাশ, ভক্ষণজনিতসহ পাপক্ষয়, গয়া-শ্রাদ্ধসম ফল; শ্রাদ্ধকালে পাঠ করলে দ্রব্য, ব্রত বা পুরোহিত-সংক্রান্ত ত্রুটিও প্রশমিত হয়।

सप्तर्ष्याश्रम-माहात्म्य तथा लोभ-निरोधोपदेशः (Glory of the Saptarṣi Āśrama and Instruction on Restraining Greed)
সূত শুভ ক্ষেত্রের মধ্যে প্রসিদ্ধ সপ্তর্ষি-আশ্রমের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। শ্রাবণ পূর্ণিমা/পঞ্চদশীতে স্নান করলে ইষ্টফল লাভ হয়, আর বনজ ফল-মূলাদি দিয়ে সরলভাবে করা শ্রাদ্ধও মহাসোমযাগের সমান পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে। ভাদ্রপদ শুক্ল পঞ্চমীতে ক্রমান্বয়ে পূজার বিধান দেওয়া হয়—অত্রি, বসিষ্ঠ, কশ্যপ, ভরদ্বাজ, গৌতম, কৌশিক (বিশ্বামিত্র), জমদগ্নি ও অরুন্ধতীর নামে মন্ত্রসহ আরাধনা করতে বলা হয়েছে। এরপর বারো বছরের দুর্ভিক্ষের কাহিনি আসে—বৃষ্টি না হওয়ায় সমাজধর্ম ভেঙে পড়ে, তবু ক্ষুধার্ত ঋষিরা অধর্মে প্রবৃত্ত হন না। রাজা বৃষাদর্ভি তাঁদের প্রতিগ্রহ (রাজদান গ্রহণ) করতে বলেন, কিন্তু তাঁরা তা নৈতিক বিপদ জেনে প্রত্যাখ্যান করেন। রাজা সোনাভর্তি উদুম্বর রেখে পরীক্ষা করেন; ঋষিরা গোপন ধন ত্যাগ করে অপরিগ্রহ, সন্তোষ এবং কামনার ক্রমবর্ধমান স্বভাব বিষয়ে উপদেশ দেন। চমৎকারপুর-ক্ষেত্রে তাঁরা কুকুর-মুখ ভিক্ষুককে দেখেন (পরে যিনি ইন্দ্র/পুরন্দর বলে প্রকাশিত)। সে তাঁদের সংগ্রহ করা পদ্মনাল কেড়ে নিয়ে প্রতিজ্ঞা ও ধর্মনিষ্ঠা জাগিয়ে তোলে; পরে ইন্দ্র পরীক্ষা প্রকাশ করে তাঁদের নির্লোভতা প্রশংসা করে বর দেন। ঋষিরা আশ্রমকে চিরপবিত্র, পাপনাশক তীর্থ করার বর চান; ইন্দ্র বলেন, সেখানে শ্রাবণে করা শ্রাদ্ধ ইষ্টসিদ্ধি দেবে এবং নিষ্কাম কর্ম মোক্ষপ্রদ হবে। তাঁরা তপস্যায় স্থিত থেকে অমরত্বসদৃশ পদ লাভ করেন, শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন; তার দর্শন-পূজায় শুদ্ধি ও মুক্তির ফল বলা হয়েছে। শেষে ফলশ্রুতিতে এই আশ্রমকথা আয়ুবর্ধক ও পাপহর বলে ঘোষিত।

अगस्त्याश्रम-माहात्म्य तथा विंध्य-निग्रहः (Agastya’s Hermitage: Sanctity, the Vindhya Episode, and the Solar Observance)
সূত বলেন—অগস্ত্য মুনির পবিত্র আশ্রমে মহাদেবের নিত্য পূজা হয়। চৈত্র শুক্ল চতুর্দশীতে দিবাকর (সূর্য) সেখানে এসে শঙ্করের আরাধনা করেন—এ কথা প্রসিদ্ধ। যে ভক্তিভরে সেখানে শিবপূজা করে, সে দিব্য সান্নিধ্য লাভ করে; আর যথাযথ শ্রদ্ধায় করা শ্রাদ্ধ পিতৃদের তৃপ্ত করে, যেন বিধিবদ্ধ পিতৃকর্মই সম্পন্ন হল। ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—সূর্য কেন অগস্ত্যাশ্রম পরিক্রমা করেন? সূত বিন্ধ্যোপাখ্যান বলেন—সুমেরুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিন্ধ্য সূর্যের পথ রোধ করে, ফলে কালগণনা, ঋতুচক্র ও যজ্ঞাদি কর্মব্যবস্থা বিপন্ন হয়। সূর্য ব্রাহ্মণবেশে অগস্ত্যের শরণ নেন; অগস্ত্য বিন্ধ্যকে আদেশ দেন—উচ্চতা কমিয়ে আমার দক্ষিণযাত্রা পর্যন্ত তেমনই স্থির থাক। পরে অগস্ত্য একটি লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে সূর্যকে নির্দেশ দেন—প্রতি বছর ঐ তিথিতে এই লিঙ্গের পূজা কর; যে মানুষ ঐ চতুর্দশীতে পূজা করবে, সে সূর্যলোক ও মোক্ষাভিমুখ পুণ্য লাভ করবে। শেষে সূত সেখানে সূর্যের পুনরাগমন নিশ্চিত করে আরও প্রশ্নের আহ্বান জানান।

अध्याय ३४ — देवासुरसंग्रामे शंभोः परित्राणकथनम् (Chapter 34: Śambhu’s Intervention in the Deva–Dānava Battle)
অধ্যায় ৩৪-এ ঋষিরা সূতকে পূর্বোক্ত এক প্রসঙ্গ—এক মুনি ও ক্ষীরসাগর (পয়সাং-নিধি)—সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। সূত তখন এক প্রাচীন সংকটের কাহিনি বলেন, যেখানে কালেয়/কালিকেয় নামে প্রবল দানবেরা আবির্ভূত হয়ে দেবতাদের তেজ হরণ করে এবং ত্রিলোকের স্থিতি কাঁপিয়ে তোলে। দেবদের দুর্দশা দেখে বিষ্ণু মহেশ্বরের শরণ নেন এবং অবিলম্বে প্রতিরোধের প্রয়োজন জানান। বিষ্ণু, রুদ্র ও ইন্দ্রের নেতৃত্বে দেবগণ যুদ্ধের জন্য সমবেত হন; সংঘর্ষ বিশ্ব-কম্পনকারী রূপ নেয়। বিশেষ ঘটনায় ইন্দ্রের সঙ্গে দানব কালপ্রভের মুখোমুখি যুদ্ধ হয়—কালপ্রভ ইন্দ্রের বজ্র কেড়ে নেয় এবং ভীষণ গদাঘাতে ইন্দ্রকে ভূমিতে ফেলে দেয়; ভয়ে দেবসেনা বিশৃঙ্খলভাবে পশ্চাদপসরণ করে। তখন গরুড়ারূঢ় বিষ্ণু অস্ত্রজাল ছিন্ন করে দানবদের ছত্রভঙ্গ করেন, কিন্তু কালখঞ্জ বিষ্ণু ও গরুড়কে আহত করে। বিষ্ণু সুদর্শনচক্র নিক্ষেপ করলে দানব তা সরাসরি প্রতিহত করতে উদ্যত হয়, ফলে বিষ্ণুর সংকট আরও ঘনীভূত হয়। এই মুহূর্তে ত্রিপুরান্তক শিব দৃঢ়ভাবে আবির্ভূত হয়ে শূলাঘাতে আক্রমণকারী দানবকে বধ করেন এবং কালপ্রভসহ ‘কাল’-উপাধিধারী প্রধান দানবনায়কদের পরাস্ত করেন। শত্রুনেতৃত্ব ভেঙে গেলে ইন্দ্র ও বিষ্ণু স্থিরচিত্ত হয়ে মহাদেবের স্তব করেন; দেবগণ অবশিষ্ট দানবদের তাড়িয়ে দেয়। আহত ও নেতৃহীন দানবেরা পালিয়ে বরুণের ধামে আশ্রয় নেয়। অধ্যায়ের শিক্ষা—দেবসমবায়ের প্রয়াসে ধর্মরক্ষা হয়, আর শম্ভুর রক্ষাকর্মে ত্রিলোকের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

अगस्त्येन सागरशोषणं तथा कालेयदानवनिग्रहः (Agastya Dries the Ocean and the Suppression of the Kāleya Asuras)
এই অধ্যায়ে কালেয় দৈত্যরা সমুদ্রে আশ্রয় নিয়ে রাত্রিকালে ঋষি, যজ্ঞকারী ও ধর্মনিষ্ঠ জনপদে আক্রমণ করে; ফলে পৃথিবীতে যজ্ঞ-ধর্মের ধারা ভেঙে পড়ে। যজ্ঞভাগ না পেয়ে দেবগণ গভীর দুঃখে পড়েন এবং বোঝেন—সমুদ্রের আড়ালে থাকা শত্রুকে দমন করা কঠিন। তাই তাঁরা চামৎকারপুরের পবিত্র ক্ষেত্রে অবস্থানরত মহর্ষি অগস্ত্যের শরণ নেন। অগস্ত্য দেবদের সম্মান করে বর্ষশেষে বিদ্যা-বল ও যোগিনীশক্তির আশ্রয়ে সমুদ্র শোষণ করার প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি পীঠসমূহ স্থাপন করে যোগিনী-গণকে—বিশেষত কন্যারূপিণীদের—বিধিপূর্বক পূজা করেন, দিকপাল ও ক্ষেত্রপালদের আরাধনা করেন এবং ‘শোষিণী’ বিদ্যার সঙ্গে যুক্ত আকাশগামিনী দেবীকে প্রসন্ন করেন। দেবী সিদ্ধি দান করে অগস্ত্যের মুখে প্রবেশ করলে অগস্ত্য সমুদ্র পান করেন; সমুদ্র ভূমির ন্যায় হয়ে যায়। তখন দেবগণ প্রকাশিত দৈত্যদের পরাজিত করেন, অবশিষ্টরা পাতালে পালায়। জল ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধে অগস্ত্য ভবিষ্যৎ কাহিনি বলেন—সগরের ষাট হাজার পুত্রের খনন ও ভগীরথের গঙ্গা-আনয়নে গঙ্গাপ্রবাহে সমুদ্র পুনরায় পূর্ণ হবে। শেষে অগস্ত্য চান চামৎকারপুরে পীঠসমূহ স্থায়ী থাকুক; অষ্টমী ও চতুর্দশীতে পূজায় ইষ্টসিদ্ধি হবে—দেবগণ ‘চিত্রেশ্বর’ নামে এক পীঠ স্থাপন করে পাপভারাক্রান্তেরও দ্রুত ফলপ্রাপ্তির আশ্বাস দেন।

चित्रेश्वरपीठ-मन्त्रजप-माहात्म्य (Glorification of Mantra-Japa at the Citreśvara Pīṭha)
অধ্যায় ৩৬-এ ঋষিরা অগস্ত্যপ্রতিষ্ঠিত চিত্রেশ্বর পীঠের পরিমাপ ও প্রভাব জানতে চান। সূত সেই তীর্থের মহিমা অতিশয়ভাবে বর্ণনা করে বলেন—সেখানে মন্ত্রজপ করলে যোগীদের সিদ্ধি লাভ হয় এবং নানা অভীষ্ট পূর্ণ হয়: পুত্রলাভ, রক্ষা, দুঃখনিবারণ, সমাজ ও রাজসম্মান, ধন-সমৃদ্ধি, যাত্রাসাফল্য; আর রোগ, গ্রহপীড়া, ভূতবাধা, বিষ, সাপ, বন্যপশু, চুরি, বিবাদ ও শত্রুভয় প্রশমিত হয়। এরপর ঋষিরা প্রশ্ন করেন—জপ কীভাবে ফলপ্রদ হয়? সূত পিতার কাছ থেকে শোনা পরম্পরা ও দুর্বাসা-সংলাপ স্মরণ করে বিধিনিষ্ঠ ক্রম বলেন—প্রথমে লক্ষজপ, পরে অতিরিক্ত জপ, এবং জপের দশাংশ হোম; শান্তি-পৌষ্টিক প্রভৃতি সৌম্যকর্ম অনুযায়ী আহুতি নির্ধারিত। কৃত-ত্রেতা-দ্বাপর-কলি যুগভেদে সাধনার মানও পরিবর্তিত। শেষে বিধিবদ্ধ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলে সাধকের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়—এ সিদ্ধি নিয়মশাসিত, আকস্মিক অলৌকিকতা নয়।

Durvāsā, Suśīla, and the Establishment of the Duḥśīla-Prāsāda (Śiva Shrine Narrative)
এই অধ্যায়ে বিদ্বান ব্রাহ্মণসমাজের এক সভার কথা বলা হয়েছে, যেখানে বেদব্যাখ্যা, যজ্ঞ-আচার আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কে সবাই মগ্ন। সেই সময় ঋষি দুর্বাসা শিব-আয়তন/প্রাসাদ স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান জানতে চান, কিন্তু পাণ্ডিত্য-অহংকার ও বিতর্কে আসক্তির কারণে সভা উত্তর দেয় না। দুর্বাসা জ্ঞান, ধন ও বংশ—এই তিন প্রকার মদের দোষ দেখিয়ে তাদের দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিবাদের পূর্বাভাস দিয়ে শাপ প্রদান করেন। তখন প্রবীণ ব্রাহ্মণ সুশীল ঋষির পিছু নেন, ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং মন্দির নির্মাণের জন্য ভূমি দান করেন। দুর্বাসা তা গ্রহণ করে মঙ্গলকর্ম সম্পন্ন করে শিবপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। কিন্তু অন্য ব্রাহ্মণরা সুশীলের একক দানে ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে সমাজচ্যুত করে এবং মন্দির-প্রকল্পকে নিন্দা করে, খ্যাতি ও নামের দিক থেকে ‘অসম্পূর্ণ’ বলে অপবাদ দিয়ে ‘দুঃশীল’ নামে প্রচার করে। তবু শেষে সেই তীর্থই প্রসিদ্ধ হয়—তার দর্শনমাত্রে পাপক্ষয় হয় বলা হয়েছে। বিশেষত শুক্লাষ্টমীতে মধ্যলিঙ্গ দর্শন ও মননে যে ব্যক্তি স্থিরচিত্তে দেখে, সে নরকলোক দর্শন করে না। অধ্যায়টি বিনয় ও প্রায়শ্চিত্তের মহিমা এবং দলাদলি-অহংকারের নিন্দা করে, সঙ্গে মন্দিরপ্রতিষ্ঠা ও লিঙ্গদর্শনের ধর্মশক্তি প্রতিষ্ঠা করে।

धुन्धुमारेश्वर-माहात्म्य (The Māhātmya of Dhundhumāreśvara)
এই অধ্যায়ে সূত–ঋষি সংলাপের মাধ্যমে ধুন্ধুমারেশ্বর ক্ষেত্রের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। রাজা ধুন্ধুমার একটি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে রত্নখচিত প্রাসাদ নির্মাণ করান এবং নিকটবর্তী আশ্রমে কঠোর তপস্যা করেন। পাশে একটি বাপী/কুণ্ড স্থাপিত হয়, যা শুদ্ধ, মঙ্গলময় ও সর্বতীর্থসম বলে কীর্তিত; সেখানে স্নান করে ধুন্ধুমারেশ্বর দর্শন করলে যমলোকের নরকীয় দুর্ভোগ ও ‘দুর্গ’ বাধা ভোগ করতে হয় না—এমন ফলশ্রুতি বলা হয়েছে। ঋষিদের প্রশ্নে সূত জানান, রাজা সূর্যবংশীয়, ‘কুবলয়াশ্ব’ উপাধির সঙ্গে তাঁর যোগ আছে, এবং মরুপ্রদেশে দৈত্য ধুন্ধুকে বধ করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। শেষে গৌরী ও গণসহ মহাদেব স্বয়ং প্রকাশ হয়ে বর দেন; রাজা লিঙ্গে চিরস্থায়ী দিব্য সান্নিধ্য প্রার্থনা করেন। শিব তা মঞ্জুর করে চৈত্র শুক্ল চতুর্দশীকে বিশেষ পুণ্যক্ষণ বলে নির্দিষ্ট করেন। উপসংহারে বলা হয়, স্নান ও পূজায় শিবলোকে গমন হয়, আর রাজা মোক্ষাভিমুখ হয়ে সেখানেই অবস্থান করেন।

चमत्कारपुर-क्षेत्रमाहात्म्यं तथा ययाति-लिङ्गप्रतिष्ठा (Cāmatkārapura Kṣetra-Māhātmya and Yayāti’s Liṅga Consecration)
এই অধ্যায়ে সূতবক্তৃতায় বলা হয়েছে—ধুন্ধুমারেশ্বরের উত্তরে চমৎকারপুর নামে এক পুণ্যক্ষেত্র আছে, যেখানে রাজা যযাতি তাঁর রাণী দেবযানী ও শর্মিষ্ঠার সঙ্গে এক “উত্তম লিঙ্গ” প্রতিষ্ঠা করেন। সেই লিঙ্গকে সর্বকামফলপ্রদ বলা হয়েছে—ভক্তিভরে পূজা করলে সকল কামনার ফল দান করে। ভোগবিলাসে তৃপ্ত হয়ে যযাতি রাজ্য পুত্রকে অর্পণ করে পরম কল্যাণের সন্ধানে বিনীতভাবে ঋষি মার্কণ্ডেয়ের শরণ নেন। তিনি সকল তীর্থ ও ক্ষেত্রের মধ্যে সর্বপ্রধান ও সর্বাধিক পবিত্র স্থানের বিচারপূর্ণ বিবরণ চান। মার্কণ্ডেয় চমৎকারপুরকে “সর্বতীর্থ-অলঙ্কৃত” ক্ষেত্র বলেন; সেখানে বিষ্ণুপদী গঙ্গা পাপহরণকারিণী এবং দেবসত্তাদের অধিষ্ঠান প্রসিদ্ধ। অধ্যায়ে এক পবিত্র চিহ্নও উল্লিখিত—পিতামহ ব্রহ্মা দ্বিজদের আনন্দার্থে যে বাহান্ন হস্ত পরিমিত শিলাখণ্ড স্থাপন/মুক্ত করেন। আরও বলা হয়, অন্যত্র যা এক বছরে সিদ্ধ হয়, এখানে তা এক দিনেই লাভ হয়। এই উপদেশে যযাতি রাণীদ্বয়সহ সেখানে গিয়ে শূলধারী শিবের লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে শ্রদ্ধায় পূজা করেন এবং শেষে কিন্নর-চারণদের স্তবের মধ্যে দ্বাদশ সূর্যসম দীপ্তিমান দিব্য বিমানে স্বর্গারোহণ লাভ করেন—এটাই ফলশ্রুতি।

Brahmī-Śilā, Sarasvata-Hrada, and the Ānandeśvara Sthala Narrative (ब्रह्मीशिला–सारस्वतह्रद–आनन्देश्वरकथा)
ঋষিগণ মোক্ষদায়িনী ও পাপনাশিনী ব্রাহ্মী-শিলার কথা জিজ্ঞাসা করেন—কীভাবে তা প্রতিষ্ঠিত হল এবং তার মাহাত্ম্য কী। সূত বলেন, স্বর্গে যজ্ঞ-কর্মের যথাযথ অধিকার না থাকা এবং পৃথিবীতে ত্রি-সন্ধ্যা-আচারের প্রয়োজন ভেবে ব্রহ্মা এক বিশাল শিলা ভূমিতে নিক্ষেপ করেন; তা চামৎকারপুরের পুণ্যক্ষেত্রে পতিত হয়। কর্মের জন্য জল অপরিহার্য দেখে ব্রহ্মা সরস্বতীকে আহ্বান করেন; মানব-স্পর্শের ভয়ে তিনি প্রকাশ্যে পৃথিবীতে প্রবাহিত হতে অস্বীকার করেন, তখন ব্রহ্মা তাঁর নিবাসের জন্য অগম্য মহাহ্রদ নির্মাণ করে নাগদের নিয়োগ করেন যাতে মানুষ স্পর্শ করতে না পারে। সেখানে মঙ্কণক ঋষি উপস্থিত হন; সাপের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েও তিনি জ্ঞানবলে বিষের প্রভাব নিবারণ করে স্নান ও পিতৃতর্পণাদি করেন। পরে হাতে আঘাত পেয়ে উদ্ভিদের রসধারা বেরোতে দেখে তাকে সিদ্ধির লক্ষণ ভেবে উল্লাসে নৃত্য করতে থাকেন, ফলে জগৎ বিচলিত হয়। তখন শিব ব্রাহ্মণবেশে এসে ভস্ম-প্রকাশের শ্রেষ্ঠ লক্ষণ দেখান, তপস্যার ক্ষতিকর নৃত্য বন্ধ করতে উপদেশ দেন এবং সেখানে নিত্য সন্নিধান দান করে ‘আনন্দেশ্বর’ নামে প্রসিদ্ধ হন; স্থানটির নাম হয় ‘আনন্দ’। এই আখ্যানে জল-সাপের নির্বিষ হওয়ার উৎপত্তি, সরস্বত-হ্রদে স্নান ও চিত্রশিলা-স্পর্শের তারক মাহাত্ম্য ঘোষিত হয়। পরে যমের আশঙ্কায় সহজে স্বর্গারোহণ বেড়ে যাচ্ছে বলে ইন্দ্র হ্রদে ধূলি ভরাট করেন—এই সংশোধনী ঘটনাও বলা হয়। শেষে সেখানে তপস্যায় সিদ্ধিলাভের সম্ভাবনা এবং মঙ্কণক-প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গে বিশেষত মাঘ শুক্ল চতুর্দশীতে পূজার মহাপুণ্য পুনরায় প্রতিপাদিত হয়।

अशून्यशयन-व्रतं तथा जलशायी-जनार्दन-माहात्म्यम् | Ashūnyaśayana Vrata and the Māhātmya of Jalaśāyī Janārdana
এই অধ্যায়ে ঋষিদের প্রশ্নে সূত “জলশায়ী” বিষ্ণুর উত্তরদেশীয় প্রসিদ্ধ তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। বলা হয়, এই ক্ষেত্র পাপ ও নৈতিক বাধা দূর করে; এখানে হরির শয়ন–বোধন-অনুষ্ঠান, উপবাস ও ভক্তিসহ পূজা বিশেষভাবে বিধেয়। কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি “অশূন্যশয়না” নামে পরিচিত, যা জলশায়ী জনার্দনের অতি প্রিয় দিন বলে ঘোষিত। পুরাকথায় দৈত্যরাজ বাষ্কলি ইন্দ্র ও দেবতাদের পরাজিত করলে তারা শ্বেতদ্বীপে বিষ্ণুর শরণ নেয়। সেখানে বিষ্ণু শेषনাগের উপর লক্ষ্মীসহ যোগনিদ্রায় জলমধ্যে শয়িত। বিষ্ণু ইন্দ্রকে “চামৎকারপুর” নামে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কঠোর তপস্যা করতে বলেন এবং শ্বেতদ্বীপসদৃশ এক বৃহৎ জলাশয় প্রতিষ্ঠা করেন। অশূন্যশয়না দ্বিতীয়া থেকে চাতুর্মাস্যকাল জুড়ে সেখানে বিষ্ণুপূজায় ইন্দ্র তেজ লাভ করেন। অতঃপর বিষ্ণু সুদর্শনকে ইন্দ্রের সঙ্গে প্রেরণ করেন; বাষ্কলির পরাজয় ঘটে এবং দেবলোকের শাসন পুনঃস্থাপিত হয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—লোককল্যাণার্থে ভগবান সেই সরোবরতীরে সদা বিরাজমান; যারা শ্রদ্ধায়, বিশেষত চাতুর্মাস্যে, জলশায়ীর আরাধনা করে তারা উচ্চ সিদ্ধি ও কাম্য ফল পায়; কাহিনির পরিসরে তীর্থটির দ্বারকার সঙ্গেও যোগ নির্দেশিত।

Viśvāmitra-kuṇḍa Māhātmya and Household-Ethics Discourse (विश्वामित्रकुण्डमाहात्म्य तथा स्त्रीधर्मोपदेशः)
এই অধ্যায়ে দুই ভাগে ধর্মবিচার করা হয়েছে। প্রথমে সূত বিশ্বামিত্র-সম্পর্কিত এক পুণ্য কুণ্ডের মাহাত্ম্য বলেন—এটি কামনাপূরক ও পাপশোধক। চৈত্র শুক্ল তৃতীয়ায় সেখানে স্নান করলে অসাধারণ রূপ-লাবণ্য ও সৌভাগ্য লাভ হয়; নারীদের ক্ষেত্রে সন্তানপ্রাপ্তি ও মঙ্গলসমৃদ্ধির বিশেষ ফল বলা হয়েছে। আরও বলা হয়, সেখানে পূর্বতন এক পবিত্র প্রস্রবণ আছে যেখানে গঙ্গা স্বয়ংপ্রতিষ্ঠিত; তাতে স্নান করলে তৎক্ষণাৎ পাপমোচন ঘটে। সেখানে পিতৃতর্পণাদি কর্ম অক্ষয় ফলদায়ক, আর দান-হোম-অর্ঘ্য-জপ-পাঠে অনন্ত পুণ্য বৃদ্ধি পায়। তারপর এক রূপান্তরক কাহিনি—শিকারির তীরে বিদ্ধ এক হরিণী জলে প্রবেশ করে সেখানেই মৃত্যুবরণ করে; সেই জলের প্রভাবে সে মেনকা নামে দিব্য অপ্সরা হয় এবং একই তিথি-যোগে পুনরায় স্নান করতে ফিরে আসে। এরপর অধ্যায় গৃহস্থধর্মে প্রবেশ করে: মেনকা ঋষি বিশ্বামিত্রকে স্ত্রীধর্ম ও আদর্শ দাম্পত্য-আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। উত্তরে ভর্তৃভক্তি, বাক্-সংযম ও শুদ্ধ ভাষা, সেবা-নিয়ম, শৌচাচার, নিয়ন্ত্রিত আহার, আশ্রিতদের পালন, গুরু-সম্মান, শাস্ত্র-পরম্পরা রক্ষা এবং সৎসঙ্গ-বিবেচনা—এসবের বিস্তৃত উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

ब्रह्मचर्य-रक्षा संवादः (Dialogue on Protecting Brahmacarya and Śaiva Vow-Discipline)
এই অধ্যায়ে ধর্ম-আশ্রিত তীর্থভূমিতে এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর নীতিধর্মীয় সংলাপ বর্ণিত। মেনকা নিজেকে দিব্যলোকের গণিকা-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে পরিচয় দিয়ে এক ব্রাহ্মণ-তপস্বীর প্রতি কামনা প্রকাশ করে; তাঁকে কামদেবের সদৃশ বলে এবং আকর্ষণে দেহ-মন যে অস্থির হয় তা জানায়। সে চাপ সৃষ্টি করে বলে—তপস্বী তাকে গ্রহণ না করলে সে নষ্ট হবে, আর তখন নারীর ক্ষতিসাধনের পাপ ও নিন্দা তপস্বীর ভাগে পড়বে। তপস্বী শিবের বিধানাধীন ব্রতধারী সম্প্রদায়ের কথা তুলে ধরে ব্রহ্মচর্য-রক্ষার তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ব্রহ্মচর্য সকল ব্রতের মূল, বিশেষত শিবভক্তদের জন্য; পাশুপত ব্রতে একবারও কাম-সংস্পর্শ বহু তপস্যাকে বিনষ্ট করতে পারে। তিনি নারী-সঙ্গের স্তর—স্পর্শ, দীর্ঘ সান্নিধ্য, এমনকি কথোপকথন—কেও ব্রতভঙ্গের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ বলেন; এটি ব্যক্তিনিন্দা নয়, ব্রতের অখণ্ডতা রক্ষাই উদ্দেশ্য। শেষে তিনি মেনকাকে দ্রুত প্রস্থান করে অন্যত্র নিজের অভিপ্রায় সাধনের নির্দেশ দেন, যাতে তপস্বীর শৃঙ্খলা ও তীর্থের ধর্মময় পরিবেশ অক্ষুণ্ণ থাকে।

Viśvāmitrakunda-utpatti and Viśvāmitreśvara-māhātmya (विश्वामित्रकुण्डोत्पत्ति–विश्वामित्रेश्वरमाहात्म्य)
এই অধ্যায়ে সূত বর্ণিত ধর্মোপদেশমূলক কথোপকথন প্রকাশ পায়। মেনকা বিশ্বামিত্রের অবস্থানকে প্রশ্ন করলে বিশ্বামিত্র বিশেষত ব্রতধারীদের জন্য বিষয়াসক্তি ও কাম-সংগের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী দেন। এরপর পারস্পরিক শাপের ঘটনা ঘটে—মেনকা তাঁকে অকাল বার্ধক্যের লক্ষণে অভিশাপ দেন, আর বিশ্বামিত্রও অনুরূপ অভিশাপ প্রত্যুত্তরে দেন। তারপর তীর্থের মাহাত্ম্য উন্মোচিত হয়: কুণ্ডের জলে স্নান করামাত্র উভয়ে পূর্বরূপে ফিরে আসেন, ফলে সেই জলের শুদ্ধিকর ও পুনরুদ্ধার-শক্তি প্রমাণিত হয়। মাহাত্ম্য জেনে বিশ্বামিত্র ‘বিশ্বামিত্রেশ্বর’ নামে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে তপস্যা করেন। বলা হয়েছে, এখানে স্নান ও লিঙ্গপূজায় শিবধাম ও দেবলোকপ্রাপ্তি এবং পিতৃগণের সঙ্গে সুখভোগ লাভ হয়। শেষে তীর্থের সর্বলোকে প্রসিদ্ধি ও পাপনাশক ক্ষমতার সংক্ষিপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

पुष्करत्रयमाहात्म्यं (The Māhātmya of the Three Puṣkaras)
এই অধ্যায়ে “পুষ্কর-ত্রয়” তীর্থের পরিচয় ও মহিমা বর্ণিত। সূত বলেন—কার্ত্তিক মাসে কৃত্তিকা-যোগের শুভক্ষণে ঋষি বিশ্বামিত্র দূরবর্তী প্রধান পুষ্করে যেতে না পেরে সমতুল্য পবিত্র স্থান অনুসন্ধান করেন। আকাশবাণী তিন পুষ্করের লক্ষণ জানায়—উর্ধ্বমুখী পদ্ম জ্যেষ্ঠ-পুষ্কর, পার্শ্বমুখী পদ্ম মধ্যম-পুষ্কর এবং অধোমুখী পদ্ম কনিষ্ঠ-পুষ্করের চিহ্ন। এরপর প্রাতঃ, মধ্যাহ্ন ও সন্ধ্যায় তিন স্থানে স্নান-বিধি এবং দর্শন-স্পর্শের মহাশুদ্ধিকারিতা বলা হয়েছে। তারপর রাজা বৃহদ্বল-এর কাহিনি। শিকারকালে তিনি জলে নেমে যোগসময়ে উদ্ভূত অলৌকিক পদ্ম ধরেন; তখন দিব্য শব্দ হয়, পদ্ম অদৃশ্য হয় এবং রাজা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হন। এটি উচ্ছিষ্ট/অশুদ্ধ অবস্থায় পবিত্র বস্তুর স্পর্শজনিত দোষ—এ কথা জেনে বিশ্বামিত্র সূর্যোপাসনার প্রায়শ্চিত্ত নির্দেশ দেন। রাজা সূর্যপ্রতিমা স্থাপন করে বিশেষত রবিবার নিয়মিত পূজা করেন; এক বছরে আরোগ্য লাভ করে মৃত্যুর পরে সূর্যলোকে গমন করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—কার্ত্তিকে পুষ্করে স্নান ব্রহ্মলোকপ্রদ, স্থাপিত সূর্যমূর্তির দর্শনে স্বাস্থ্য ও অভীষ্টসিদ্ধি, পুষ্করে বৃষোৎসর্গে মহাযজ্ঞফল, এবং এই অধ্যায়ের পাঠ-শ্রবণে কামনা পূর্ণ ও উৎকর্ষ লাভ হয়।

सारस्वततीर्थमाहात्म्य — Glory of the Sārasvata Tīrtha (Sarasvatī Tirtha)
অধ্যায়ের শুরুতে ঋষিরা তীর্থসমূহের আরও পূর্ণ ও ক্রমানুসারী বিবরণ চান। সূত হাটকেশ্বরজ-ক্ষেত্রে অবস্থিত প্রসিদ্ধ সারস্বত তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন—এখানে স্নান করলে বাক্দোষ বা জড়তা দূর হয়ে মানুষ বিচক্ষণ বক্তা হয়, এবং কাম্য ফল থেকে উচ্চলোকপ্রাপ্তি পর্যন্ত লাভ হয়। এরপর রাজকাহিনি। রাজা বলবর্ধনের পুত্র অম্বুবীচি জন্ম থেকেই মূক। পিতা যুদ্ধে নিহত হলে মন্ত্রীরা সেই মূক বালককে সিংহাসনে বসান; ফলে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং শক্তিমানরা দুর্বলদের দমন করতে থাকে। মন্ত্রীরা বশিষ্ঠের শরণ নিলে তিনি সারস্বত তীর্থে স্নানের বিধান দেন। স্নানমাত্রেই রাজার বাক্শক্তি ফিরে আসে। নদীর মহিমা জেনে রাজা তীরের মাটি দিয়ে চতুর্ভুজা সরস্বতীর মূর্তি নির্মাণ করে শুদ্ধ শিলাপীঠে প্রতিষ্ঠা করেন, ধূপ-গন্ধ-অনুলেপনে পূজা করেন এবং বাক্, বুদ্ধি, জ্ঞান ও উপলব্ধিতে সর্বত্র বিরাজমান দেবীর দীর্ঘ স্তব পাঠ করেন। দেবী প্রকাশ হয়ে বর দেন, মূর্তিতে অধিষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দেন এবং বলেন—অষ্টমী ও চতুর্দশীতে স্নান-আরাধনা, বিশেষত শ্বেতপুষ্প ও নিয়মভক্তিসহ করলে, সকল ইচ্ছা পূর্ণ হয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—ভক্তরা জন্মে জন্মে বাগ্মী ও মেধাবী হন, বংশ মূঢ়তা থেকে রক্ষিত থাকে; দেবীর সম্মুখে ধর্মশ্রবণে দীর্ঘ স্বর্গফল, এবং গ্রন্থদান, ধর্মশাস্ত্রদান ও তাঁর সান্নিধ্যে বেদাধ্যয়নের ফল অশ্বমেধ-অগ্নিষ্টোম প্রভৃতি মহাযজ্ঞের তুল্য।

महाकाल-जागर-माहात्म्य (Glory of the Mahākāla Night-Vigil in Vaiśākhī)
এই অধ্যায়ে তীর্থ-মাহাত্ম্যরূপে বৈশাখী রাত্রিতে মহাকালের জাগরণ-ব্রতের গৌরব বর্ণিত হয়েছে। ঋষিরা সূতকে মহাকালের মহিমা বিস্তারে বলতে অনুরোধ করলে সূত ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা রুদ্রসেনের আদর্শ আচরণ বলেন—রাজা প্রতি বছর অল্প অনুচরসহ চমৎকারপুর-ক্ষেত্রে গিয়ে মহাকালের সম্মুখে রাত্রিজাগরণ করেন। তিনি উপবাস, ভজন-কীর্তন, নৃত্য-গীত, জপ ও বেদাধ্যয়ন করেন; প্রভাতে স্নান-শুচিতা পালন করে ব্রাহ্মণ, তপস্বী ও দুঃখী-দরিদ্রদের প্রচুর দান দেন। গ্রন্থে বলা হয়, এই ভক্তি-শৃঙ্খলা রাজ্যে সমৃদ্ধি আনে এবং শত্রুবিনাশ ঘটায়—ধর্ম ও রাজনীতির স্থিতি ভক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। পণ্ডিত ব্রাহ্মণসভা রাজাকে জাগরণের কারণ ও ফল জিজ্ঞাসা করলে রাজা পূর্বজন্মকথা বলেন। বিদিশায় দীর্ঘ খরার সময় তিনি দরিদ্র বণিক ছিলেন; স্ত্রীসহ সৌরাষ্ট্রের দিকে যাত্রা করে চমৎকারপুরের কাছে পদ্মভরা সরোবর পান। খাদ্যের জন্য পদ্ম বিক্রি করতে গিয়ে ব্যর্থ হন; ভগ্ন মন্দিরে আশ্রয় নিয়ে পূজার শব্দ শুনে মহাকাল-জাগরণের কথা জানতে পারেন। তখন বাণিজ্য ত্যাগ করে পদ্ম দিয়ে পূজা করেন; ক্ষুধা ও পরিস্থিতির কারণে সারারাত জেগে থাকেন। ভোরে বণিকের মৃত্যু হয় এবং স্ত্রী আত্মদাহ করেন। সেই ভক্তির প্রভাবে তিনি কান্তীর রাজা হয়ে জন্ম নেন, আর স্ত্রী পূর্বস্মৃতিসম্পন্ন রাজকন্যা হয়ে স্বয়ংবরে তাঁর সঙ্গে পুনর্মিলিত হন। শেষে ব্রাহ্মণদের সম্মতিতে বার্ষিক জাগরণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ফলশ্রুতিতে একে পাপনাশক ও মুক্তিসন্নিহিত ফলদায়ক বলা হয়েছে।

Hariścandra-āśrama and Umā–Maheśvara Pratiṣṭhā (Harishchandra’s Austerity, Boon, and Pilgrimage Merit)
সূত বর্ণনা করেন—রাজা হরিশ্চন্দ্রের অঞ্চলে বহু বৃক্ষের ছায়ায় শোভিত এক প্রসিদ্ধ আশ্রম ছিল, যেখানে রাজা তপস্যা করতেন এবং ব্রাহ্মণদের মনঃকামিত দান দিয়ে তুষ্ট করতেন। তিনি সূর্যবংশের আদর্শ নৃপতি; তাঁর রাজ্যে নাগরিক স্থিতি, প্রজাসুখ ও প্রকৃতির প্রাচুর্য ছিল, কিন্তু একটিই অভাব—পুত্রসন্তান নেই। বংশধর লাভের আশায় তিনি চামৎকারপুর ক্ষেত্রেতে কঠোর তপ করেন এবং ভক্তিভরে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। শিব গৌরী ও গণসহ প্রকাশিত হন। দেবীর প্রতি যথোচিত সম্মানে ত্রুটি হওয়ায় বিরোধ দেখা দেয় এবং দেবী শাপ দেন—পুত্র শৈশবেই মৃত্যুজনিত শোকের কারণ হবে। তবু হরিশ্চন্দ্র পূজা, উপবাস-নিয়ম, অর্ঘ্য-উপহার ও দান আরও দৃঢ়ভাবে চালিয়ে যান। পরে শিব-পার্বতী পুনরায় আবির্ভূত হন; দেবী বলেন—বাক্য অটল, শিশু মরবে, কিন্তু তাঁর কৃপায় শীঘ্রই পুনর্জীবিত হয়ে দীর্ঘায়ু, বিজয়ী ও যোগ্য বংশধর হবে। এই তীর্থের মাহাত্ম্যও বলা হয়েছে—যে সেখানে উমা-মহেশ্বরের আরাধনা করে, বিশেষত পঞ্চমীতে, সে ইষ্টসন্তান ও অন্যান্য কামনা লাভ করে। হরিশ্চন্দ্র নিরবিঘ্ন রাজসূয় সিদ্ধিও প্রার্থনা করেন; শিব সম্মতি দেন। রাজা প্রত্যাবর্তন করে এই প্রতিষ্ঠাকে পরবর্তী ভক্তদের জন্য আদর্শরূপে স্থাপন করেন।

Kalaśeśvara-māhātmya: Kalaśa-nṛpateḥ Durvāsasaḥ śāpena vyāghratva-prāptiḥ (कलेशेश्वरमाहात्म्य—कलशनृपतेर्दुर्वाससः शापेन व्याघ्रत्वप्राप्तिः)
সূত মুনি নাগর খণ্ডে সরোবর-তীরে অবস্থিত কলেśeś্বর তীর্থের মহিমা বর্ণনা করেন—এটি ‘সর্বপাপ-নাশক’, এবং এর দর্শনে পাপমুক্তি ঘটে। এই মহাত্ম্যের সঙ্গে একটি কারণ-কথা যুক্ত। যদুবংশীয় রাজা কলশ যজ্ঞে দক্ষ, দানশীল ও প্রজাহিতৈষী। চাতুর্মাস্য-ব্রত সমাপ্ত করে ঋষি দুর্বাসা তাঁর কাছে এলে রাজা অভ্যর্থনা, দণ্ডবৎ প্রণাম, পাদ্য-অর্ঘ্য প্রভৃতি আতিথ্যকর্ম সম্পন্ন করে নিজের সম্পদ নিবেদন করে ঋষির প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করেন। দুর্বাসা পারণার্থে আহার চান। রাজা বহু ব্যঞ্জন পরিবেশন করেন; তাতে মাংসও ছিল। আহারান্তে দুর্বাসা মাংসের স্বাদ/গন্ধ বুঝে এটিকে ব্রত-নিয়মভঙ্গ মনে করে ক্রুদ্ধ হন এবং শাপ দেন—রাজা ভয়ংকর ব্যাঘ্র হবে। রাজা বিনীতভাবে বলেন, ভক্তিভাবে সেবা করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি হয়েছে; শাপ লাঘব করুন। তখন দুর্বাসা বিধি ব্যাখ্যা করেন—শ্রাদ্ধ ও যজ্ঞের মতো বিশেষ প্রসঙ্গ ব্যতীত ব্রতস্থ ব্রাহ্মণের মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ, বিশেষত চাতুর্মাস্য-সমাপ্তিতে; এতে ব্রতফল নষ্ট হয়। অবশেষে তিনি মুক্তির শর্ত দেন—রাজার নন্দিনী নামের গাভী তাকে পূর্বপূজিত ‘বাণার্চিত’ লিঙ্গ দেখাবে; সেই দর্শনে শীঘ্রই মুক্তি হবে। ঋষি প্রস্থান করলে রাজা ব্যাঘ্ররূপ ধারণ করে স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে জীবহিংসায় প্রবৃত্ত হয়ে মহাবনে প্রবেশ করে। মন্ত্রীরা রাজ্য রক্ষা করে শাপান্তের অপেক্ষা করেন। অধ্যায়টি তীর্থমাহাত্ম্যকে নৈতিক সতর্কতা, ব্রতধর্ম ও লিঙ্গদর্শনে মুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে।

नन्दिनी-धेनोः सत्यव्रतं तथा लिङ्ग-स्नापन-माहात्म्यम् (Nandinī’s Vow of Truth and the Significance of Bathing the Liṅga)
এই অধ্যায়ে গোকুল-সংলগ্ন অরণ্যে নীতি ও ধর্মের এক পবিত্র কাহিনি বর্ণিত। শুভলক্ষণযুক্ত নন্দিনী নামের গাভী বনপ্রান্তে গিয়ে দ্বাদশ সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান শিবলিঙ্গ দর্শন করে। সে নির্জনে ভক্তিভরে লিঙ্গের নিকটে দাঁড়িয়ে প্রচুর দুধ ঢেলে স্নাপন (অভিষেক) করে। পরে এক ভীষণ বাঘ এসে উপস্থিত হয় এবং দৈবক্রমে নন্দিনী তার দৃষ্টিতে পড়ে। নন্দিনী নিজের প্রাণের জন্য নয়, গোকুলে বাঁধা তার বাছুরের জন্য কাতর হয়—যার আহার তার ফিরে আসার ওপর নির্ভর। সে বাঘকে অনুরোধ করে, তাকে যেতে দিক; বাছুরকে দুধ খাইয়ে/সঁপে দিয়ে সে আবার ফিরে আসবে। বাঘ সন্দেহ করে—মৃত্যুর মুখ থেকে কে ফিরে আসে? তখন নন্দিনী সত্যব্রত দৃঢ় করে গুরুতর শপথ করে—যদি সে না ফেরে, তবে ব্রহ্মহত্যা, পিতা-মাতাকে প্রতারণা, অপবিত্র/অবৈধ আচরণ, বিশ্বাসঘাতকতা, কৃতঘ্নতা, গাভী-কন্যা-ব্রাহ্মণহিংসা, অপচয়ী রান্না ও অধর্মরূপ মাংসাহার, ব্রতভঙ্গ, মিথ্যা ও কুটিল বাক্য—এই মহাপাপগুলির কলঙ্ক তার ওপর পতিত হোক। অধ্যায়ের মূল শিক্ষা—শিবভক্তি সত্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য; চরম সংকটেও নৈতিক সততাই পূজার প্রমাণ।

कलशेश्वर-लिङ्गमाहात्म्ये नन्दिनी-सत्यव्रत-व्याघ्रमोक्षः (Kalāśeśvara Liṅga Māhātmya: Nandinī’s Vow of Truth and the Tiger’s Liberation)
সূত এক পবিত্র ক্ষেত্র-সংযুক্ত নীতিধর্মের কাহিনি বলেন। অরণ্যে এক বাঘ নন্দিনী গোমাতাকে ধরে; তিনি বাছুরকে দুধ খাইয়ে রক্ষা করার জন্য সত্যশপথ করে সাময়িক মুক্তি চান। নন্দিনী বাছুরের কাছে গিয়ে বিপদ জানিয়ে মাতৃভক্তি ও বন-আচরণের শিক্ষা দেন—লোভ, প্রমাদ ও অতিবিশ্বাস থেকে সাবধান করেন। বাছুর মাকে পরম আশ্রয় বলে সঙ্গে যেতে চায়; কিন্তু নন্দিনী তাকে গোর দলে রেখে অন্য গাভীদের কাছে ক্ষমা চান এবং নিজের অনাথ বাছুরের সামূহিক পরিচর্যার দায় দেন। গাভীরা আপৎকালে শপথভঙ্গকে ‘নির্দোষ অসত্য’ বলে মানতে চাইলেও নন্দিনী সত্যকে ধর্মের ভিত্তি বলে স্থির করে বাঘের কাছে ফিরে যান। তাঁর সত্যনিষ্ঠা দেখে বাঘ অনুতপ্ত হয় এবং হিংসা-নির্ভর জীবনে আত্মকল্যাণের উপায় জানতে চায়। নন্দিনী কলিযুগে দানকে প্রধান সাধনা বলে, বাণ-প্রতিষ্ঠিত বলে খ্যাত কলশেশ্বর লিঙ্গের কথা জানান এবং নিত্য প্রদক্ষিণা ও প্রণাম করতে বলেন। দর্শনমাত্রে বাঘ মুক্ত হয়ে শাপগ্রস্ত হৈহয়বংশীয় রাজা কলাশা রূপে প্রকাশ পায় এবং স্থানকে চমৎকারপুর-ক্ষেত্র, সর্বতীর্থময় ও কামদ বলে স্তব করে। শেষে ফলশ্রুতি—কার্তিকে দীপদান ও মার্গশীর্ষে ভক্তিগীত-নৃত্যাদি করলে পাপক্ষয় ও শিবলোক; এই মাহাত্ম্য পাঠেও সমফল।

Rudrakoṭi–Rudrāvarta Māhātmya (Kapilā–Siddhakṣetra–Triveṇī Context)
এই অধ্যায়ে সূত এক তীর্থকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র-ভূগোল বর্ণনা করেন। এক রাজা উমা-মহেশ্বরের প্রতিষ্ঠা করে মন্দির নির্মাণ করেন এবং সম্মুখে নির্মল পুকুর স্থাপন করেন। পরে দিক অনুসারে পুণ্যস্থানগুলির উল্লেখ—পূর্বে অগস্ত্যকুণ্ডের নিকটে অতি পবিত্র বাপী, দক্ষিণে কপিলা নদী যেখানে কপিল মুনির সাংখ্য-উৎপন্ন সিদ্ধির প্রসঙ্গ, এবং সিদ্ধক্ষেত্র যেখানে অগণিত সিদ্ধ পুরুষ সিদ্ধি লাভ করেছেন। চারদিকে সমান ‘বৈষ্ণবী শিলা’কে পাপ-নাশিনী বলা হয়েছে। গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী সরস্বতী এবং সম্মুখে প্রবাহিত ত্রিবেণীর মাহাত্ম্য বলা হয়—এটি সংসারকল্যাণ ও মোক্ষ উভয়ই প্রদান করে। ত্রিবেণীতে দাহ-সংস্কার/অন্ত্যেষ্টি করলে মুক্তিলাভ হয়, বিশেষত ব্রাহ্মণদের জন্য—এমন কথা আছে; স্থানীয় প্রমাণ হিসেবে গোস্পদ-সদৃশ চিহ্ন দৃশ্যমান বলেও উল্লেখ। শেষে রুদ্রকোটি/রুদ্রাবর্তের কাহিনি—দর্শনে অগ্রাধিকার চাইতে আগত দক্ষিণদেশীয় ব্রাহ্মণদের সামনে মহেশ্বর ‘কোটি’ রূপে প্রকাশিত হয়ে স্থাননাম প্রতিষ্ঠা করেন। চতুর্দশীতে (বিশেষত আষাঢ়, কার্তিক, মাঘ, চৈত্র) দর্শন, শ্রাদ্ধ, উপবাস ও রাত্রিজাগরণ, যোগ্য ব্রাহ্মণকে কপিলা গাভী দান, ষড়াক্ষর জপ ও শতরুদ্রীয় পাঠ, এবং গান-নৃত্যাদি ভক্তিপূর্ণ নিবেদনকে পুণ্যবর্ধক বলা হয়েছে।

Ujjayinī-Mahākāla Pīṭha and the Bhṛūṇagarta Tīrtha: Expiation Narrative of King Saudāsa
এই অধ্যায়ে দুটি তীর্থকেন্দ্রিক ধর্মধারা একত্রে বোনা হয়েছে। প্রথমে উজ্জয়িনীকে সিদ্ধসেবিত পীঠরূপে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে মহাদেব মহাকাল রূপে বিরাজমান। বৈশাখ মাসে শ্রাদ্ধ, দক্ষিণামূর্তি-ভাবমুখী পূজা, যোগিনী-আরাধনা, উপবাস এবং পূর্ণিমার রাত্রিজাগরণকে মহাপুণ্যদায়ক বলা হয়েছে; এর ফলে পিতৃউদ্ধার ও জরা-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী অংশে বিশাল পাপনাশক ভৃূণগর্ত তীর্থের কথা এবং রাজা সৌদাসের প্রায়শ্চিত্ত-কাহিনি এসেছে। ব্রাহ্মণভক্ত রাজা দীর্ঘ যজ্ঞে রাক্ষসের ষড়যন্ত্রে বিপন্ন হন; নিষিদ্ধ মাংসের প্রতারণামূলক অর্ঘ্য থেকে বশিষ্ঠের শাপে তিনি রাক্ষসে পরিণত হন। এরপর ব্রাহ্মণ ও যজ্ঞকর্মে হিংসা করেন; শেষে ক্রূরবুদ্ধি রাক্ষসকে বধ করে মানবদেহ ফিরে পেলেও ব্রহ্মহত্যাসদৃশ কলুষের লক্ষণ—দুর্গন্ধ, তেজহানি ও লোকবর্জন—তাঁকে পীড়িত করে। তীর্থযাত্রা ও সংযমের নির্দেশে তিনি এক ক্ষেত্রে জলভরা গর্তে পতিত হয়ে সেখান থেকে দীপ্তিমান ও শুদ্ধ হয়ে ওঠেন; আকাশবাণী তীর্থপ্রভাবে মুক্তির ঘোষণা করে। পরে ভৃূণগর্তের উৎপত্তি শিবের গূঢ় উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে বিশেষত কৃষ্ণচতুর্দশীতে শ্রাদ্ধের মহাফল বলা হয়েছে; স্নান-দানসহ যত্নপূর্বক আচরণে পিতৃমুক্তির উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

नलनिर्मितचर्ममुण्डामाहात्म्यवर्णनम् / The Māhātmya of Carmamuṇḍā Established by Nala
এই অধ্যায়ে সূত মুনির বর্ণনায় হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে অধিষ্ঠিতা দেবী চর্মমুণ্ডার মাহাত্ম্য বলা হয়েছে; ভক্ত রাজা নল তাঁকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিষধের ধর্মপরায়ণ রাজা নলের গুণাবলি, দময়ন্তীর সঙ্গে বিবাহ, এবং কলির প্রভাবে জুয়ায় সর্বস্ব হারিয়ে রাজ্যচ্যুতি ও অরণ্যে দময়ন্তী-বিচ্ছেদের সংক্ষিপ্ত কাহিনি এখানে আসে। বন থেকে বনে ঘুরতে ঘুরতে নল অবশেষে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে উপস্থিত হন। মহানবমীর পবিত্র তিথিতে উপকরণের অভাবে তিনি মাটির প্রতিমা নির্মাণ করে ফল-মূল দ্বারা পূজা করেন এবং বহু উপাধি-সমৃদ্ধ দীর্ঘ স্তোত্রে দেবীর সর্বব্যাপিতা ও উগ্র-রক্ষাকারী শক্তির স্তব করেন। দেবী প্রসন্ন হয়ে প্রকাশিত হন, বর প্রদান করেন; নল নিষ্কলঙ্কা পত্নীর সঙ্গে পুনর্মিলনের প্রার্থনা করেন। ফলশ্রুতি বলা হয়েছে—যে কেউ এই স্তোত্রে দেবীর স্তব করে, সে সেই দিনই অভীষ্ট ফল লাভ করে। শেষে নাগরখণ্ডের হাটকেশ্বর-ক্ষেত্র-মাহাত্ম্যের অন্তর্গত অধ্যায়-সমাপ্তি নির্দেশ করা হয়েছে।

नलेश्वरमाहात्म्यवर्णनम् (Naleśvara Māhātmya: The Glory of Naleśvara)
অধ্যায় ৫৫-এ নলেশ্বরের মাহাত্ম্য বর্ণিত। সূত বলেন, রাজা নল প্রতিষ্ঠিত এই শিব-প্রতিমা নিকটেই সহজলভ্য; ভক্তিভরে দর্শন করলে পাপক্ষয় হয় এবং মোক্ষাভিমুখ ফল লাভ হয়। মন্দিরের সম্মুখে নির্মল জলের একটি কুণ্ড আছে—সেখানে স্নান করে দর্শন করলে কুষ্ঠ প্রভৃতি চর্মরোগ ও সংশ্লিষ্ট নানা কষ্ট প্রশমিত হয়; কুণ্ডটি পদ্ম ও জলচর প্রাণীতে শোভিত। পরবর্তী সংলাপে, প্রতিষ্ঠায় প্রসন্ন শিব নলকে বর দিতে চান। নল লোককল্যাণের জন্য শিবের চিরসান্নিধ্য ও রোগনিবারণের বর প্রার্থনা করেন। শিব বিশেষত সোমবার প্রাত্যূষকালে সহজপ্রাপ্য হওয়ার বিধান দেন এবং আচারক্রম বলেন—শ্রদ্ধায় কুণ্ডস্নান করে দর্শন, সোমবার রাত্রিশেষে কুণ্ডমাটি দেহে লেপন, এবং নিষ্কামভাবে পুষ্প-ধূপ-গন্ধাদি দিয়ে পূজা। শেষে শিব অন্তর্ধান করেন, নল নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করেন, ব্রাহ্মণেরা বংশপরম্পরায় পূজার ব্রত নেন; স্থায়ী মঙ্গলকামীরা বিশেষত সোমবার দর্শনকে প্রধান্য দিক—এই উপদেশে অধ্যায় সমাপ্ত।

Vaṭāditya (Sāmbāditya) Darśana and Saptamī-Vrata Phala — “वटादित्यदर्शन-सप्तमीव्रतफलम्”
এই অধ্যায়ে সূত তীর্থ-মাহাত্ম্যের প্রসঙ্গে সাম্বাদিত্য/সুরেশ্বরের দর্শনের মহিমা বর্ণনা করেন। ভক্তিভরে দেবদর্শনে হৃদয়ের কামনা পূর্ণ হয়; বিশেষত মাঘ শুক্ল সপ্তমী যদি রবিবারে পড়ে, সেই দিনে দর্শন-অর্চনা করলে নরকগতি এড়ানো যায়—এ কথা বলা হয়েছে। এরপর দৃষ্টান্তরূপে গালব নামক ব্রাহ্মণ-ঋষির কাহিনি আসে। তিনি স্বাধ্যায়নিষ্ঠ, শান্তস্বভাব, যজ্ঞকর্মে দক্ষ ও কৃতজ্ঞ; কিন্তু বার্ধক্যে পুত্রহীন হয়ে শোকে ভেঙে পড়েন। গৃহচিন্তা ত্যাগ করে তিনি সেই স্থানে সূর্যোপাসনা শুরু করেন, পাঞ্চরাত্র বিধিতে প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে ঋতুনিয়ম, ইন্দ্রিয়সংযম ও উপবাসসহ দীর্ঘ তপস্যা করেন। পনেরো বছর পরে বটবৃক্ষের কাছে সূর্যদেব প্রকাশিত হয়ে বর দেন এবং সপ্তমী-ব্রতসংশ্লিষ্ট বংশবর্ধক পুত্র প্রদান করেন। বটের নিকটে জন্ম হওয়ায় পুত্রের নাম হয় বটেশ্বর। পরে তিনি মনোরম মন্দির নির্মাণ করেন এবং দেবতা ‘বটাদিত্য’ নামে সর্বত্র প্রসিদ্ধ হয়ে সন্তানদাতা রূপে পূজিত হন। শেষে ফলশ্রুতি—সপ্তমী/রবিবারে উপবাসসহ বিধিপূর্বক পূজা করলে গৃহস্থের উত্তম পুত্রলাভ হয়; আর নিষ্কাম উপাসনা মোক্ষের পথে নিয়ে যায়। নারদোক্ত গাথায়ও সন্তানপ্রাপ্তির জন্য এই ভক্তিকে সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় বলা হয়েছে।

Bhīṣma at Śarmiṣṭhā-tīrtha: Expiation, Śrāddha Eligibility, and Shrine-Foundation
সূত বলেন, এই ক্ষেত্রে ভীষ্ম ব্রাহ্মণদের সম্মতিতে আদিত্যদেবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। অধ্যায়ে পরশুরামের সঙ্গে ভীষ্মের পূর্ব সংঘর্ষ ও অম্বার প্রতিজ্ঞা স্মরণ করিয়ে ভীষ্মের মনে নিজের বাক্য ও কর্মের ধর্মফল নিয়ে সংশয় জাগে। তিনি ঋষি মার্কণ্ডেয়কে জিজ্ঞাসা করেন—কেবল কথার উসকানিতে কারও মৃত্যু হলে পাপ কার? ঋষি বলেন, যার কর্ম বা প্ররোচনায় নারী বা ব্রাহ্মণ প্রভৃতি প্রাণত্যাগ করে, দোষ তারই; অতএব এমন ব্যক্তিদের ক্রুদ্ধ করা উচিত নয়। এরপর স্ত্রীবধের পাপকে ভয়ংকর ব্রাহ্মণ-হিংসার তুল্য বলা হয় এবং দান-তপ-বরত ইত্যাদি সাধারণ উপায় যথেষ্ট নয়, তীর্থসেবাই শ্রেষ্ঠ প্রায়শ্চিত্ত—এ কথা প্রতিষ্ঠিত হয়। ভীষ্ম গয়াশিরে শ্রাদ্ধ করতে গেলে আকাশবাণী জানায় যে স্ত্রীহত্যা-সম্পর্কিত দোষে তিনি অযোগ্য; বরুণদিকের নিকটবর্তী শর্মিষ্ঠা-তীর্থে যেতে বলা হয়। কৃষ্ণাঙ্গারক-ষষ্ঠী (মঙ্গলবারযুক্ত ষষ্ঠী) তিথিতে সেখানে স্নান করলে সেই পাপমুক্তি হবে—এ বিধান দেওয়া হয়। ভীষ্ম স্নান করে শ্রদ্ধায় শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করলে আকাশবাণী—যা শান্তনুরূপে পরিচিত—তাঁকে শুদ্ধ ঘোষণা করে কর্তব্যপথে ফিরতে নির্দেশ দেয়। পরে ভীষ্ম আদিত্য, বিষ্ণু-সম্পর্কিত মূর্তি, শিবলিঙ্গ ও দুর্গার একাধিক মন্দির স্থাপন করে ব্রাহ্মণদের নিত্যপূজার ভার দেন এবং সূর্যসপ্তমী, শিবাষ্টমী, বিষ্ণুর শয়ন-জাগরণ, দুর্গানবমী প্রভৃতি উৎসবতিথি, কীর্তন-বাদ্য ও আনন্দোৎসবের ব্যবস্থা করে নিয়মিত ভক্তদের উচ্চ ফলের প্রতিশ্রুতি দেন।

शिवगंगामाहात्म्यवर्णनम् (Śiva-Gaṅgā Māhātmya: Theological Discourse on the Sanctity of Śiva-Gaṅgā)
এই অধ্যায়ে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রের প্রেক্ষিতে শিবগঙ্গার মাহাত্ম্য ও তীর্থ-নীতির শিক্ষা বর্ণিত। প্রথমে দেবচতুষ্টয়ের প্রতিষ্ঠার পর শিবলিঙ্গের নিকটে ‘ত্রিপথগামিনী’ গঙ্গাকে বিধিপূর্বক স্থাপন করা হয়। ভীষ্ম ফলশ্রুতি বলেন—যে সেখানে স্নান করে তাঁকে (কথার প্রামাণ্য বক্তা) দর্শন করে, সে পাপমুক্ত হয়ে শিবলোকে গমন করে; কিন্তু সেই তীর্থে মিথ্যা শপথ নিলে দ্রুত যমলোকে পতিত হতে হয়, কারণ তীর্থ সত্য-মিথ্যার ফলকে প্রবল করে। এরপর সতর্কতামূলক দৃষ্টান্ত—শূদ্রজাত পুণ্ড্রক নামে এক যুবক ঠাট্টায় বন্ধুর বই চুরি করে, পরে অস্বীকার করে এবং ভাগীরথীতে স্নান করে শপথও করে। ‘শাস্ত্রচৌর্য’ ও অসত্য বাক্যের ফলে তার দ্রুত কুষ্ঠরোগ, সমাজবর্জন ও দেহগত অক্ষমতা ঘটে। উপসংহারে বলা হয়—হাস্যচ্ছলেও, বিশেষত পবিত্র সাক্ষীর সামনে, শপথ করা উচিত নয়; তীর্থযাত্রার নীতি হলো সংযত বাক্য ও শুদ্ধ আচরণ।

विदुरकृत-देवत्रयप्रतिष्ठा तथा अपुत्रदुःख-प्रशमनम् (Vidura’s Triadic Consecration and the Remedy for Childlessness)
সূত এক প্রাচীন পরম্পরা বর্ণনা করেন, যেখানে হস্তিনাপুর-সম্পর্কিত বিদুর অপুত্র ব্যক্তির পরলোকগত অবস্থা সম্পর্কে উপদেশ চান। ঋষি গালব ধর্মশাস্ত্রে স্বীকৃত ‘পুত্র’-এর বারো প্রকারের কথা শ্রেণিবদ্ধভাবে বলেন এবং জানান—কোনো প্রকারেই পুত্র-সন্ততি না থাকলে পরলোকে দুঃখজনক ফল ভোগ করতে হয়। এ কথা শুনে বিদুর গভীর শোকে আচ্ছন্ন হন। গালব তাঁকে রক্তশৃঙ্গ ও হাটকেশ্বর ক্ষেত্রের নিকটে এক মহাপুণ্য স্থানে বিষ্ণু-স্বরূপ অশ্বত্থকে ‘পুত্রবৃক্ষ’ রূপে প্রতিষ্ঠা করতে বলেন। বিদুর অশ্বত্থ স্থাপন করে তাকে পুত্র-প্রতিনিধি জেনে এক প্রকার প্রতিষ্ঠা-অনুষ্ঠান করেন; পরে বটতলে মাহেশ্বর লিঙ্গ স্থাপন করেন এবং অশ্বত্থতলে বিষ্ণুকে স্থাপন করে সূর্য-শিব-বিষ্ণুর ত্রয়ী পবিত্র ক্ষেত্র গড়ে তোলেন। স্থানীয় ব্রাহ্মণদের নিত্যপূজার দায়িত্ব দেন; তাঁরা বংশপরম্পরায় তা পালন করবেন বলে সম্মত হন। অধ্যায়ে নির্দিষ্ট তিথি-বারের পূজাবিধি আছে—মাঘে সপ্তমীতে রবিবার সূর্যপূজা, সোমবার ও বিশেষত শুক্লপক্ষে অষ্টমীতে শিবপূজা, এবং বিষ্ণুর শয়ন-প্রবোধন ব্রতে যত্নসহকারে আরাধনা। পরে বলা হয়, পাকশাসন ইন্দ্রের কারণে লিঙ্গ মাটিতে ঢেকে যায়; এক অশরীরী বাণী তার স্থান জানায়। বিদুর স্থান উদ্ধার করে প্রাসাদ নির্মাণে অর্থ দেন, ব্রাহ্মণদের জন্য বৃত্তি স্থাপন করে শেষে আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করেন।

Narāditya-pratiṣṭhā and the Mahitthā Devatā: Installation, Worship-Times, and Phala
এই ষাটতম অধ্যায়ে ঋষিগণ ‘মহিত্থা/মহিত্থা’ ক্ষেত্রের উৎপত্তি ও প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। সূত প্রাচীন পরম্পরা বর্ণনা করেন—অগস্ত্য-সম্পর্কিত এবং অথর্বণ-মন্ত্রাধিকারযুক্ত ‘শোষণী বিদ্যা’ প্রয়োগের কথা বলা হয়; তার প্রভাবে ‘চমৎকারপুর’ নামে খ্যাত ক্ষেত্রে বরদায়িনী মহিত্থা দেবতার আবির্ভাব ঘটে। এরপর অধ্যায়টি তীর্থ-মানচিত্রের মতো প্রতিষ্ঠিত দেবতাদের নাম ও ফল জানায়—সূর্য ‘নরাদিত্য’ রূপে রোগশমন ও রক্ষাদান করেন; জনার্দন ‘গোবর্ধনধর’ রূপে সমৃদ্ধি ও গোকল্যাণ প্রদান করেন; নরসিংহ, বিঘ্নহর্তা বিনায়ক এবং নর-নারায়ণের প্রতিষ্ঠাও উল্লেখিত। দ্বাদশী ও চতুর্থী তিথিতে, বিশেষত কার্তিক শুক্লপক্ষে, দর্শন-पूজা অত্যন্ত ফলপ্রদ বলা হয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে অর্জুনের তীর্থযাত্রা বর্ণিত—হাটকেশ্বর-সম্পর্কিত ক্ষেত্রে তিনি সূর্যসহ অন্যান্য দেবতাকে মনোরম মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন, স্থানীয় ব্রাহ্মণদের ধন দান করেন এবং নিত্য স্মরণ-पूজার ভার তাঁদের হাতে অর্পণ করেন। শেষে এই মাহাত্ম্য শ্রবণকে পাপক্ষয়কারী বলা হয়েছে; চতুর্থীতে মোদকাদি নিবেদন করলে ইষ্টফল লাভ ও বিঘ্নমুক্তির ফল ঘোষিত।

विषकन्यकोत्पत्तिवर्णनम् (Origin Narrative of the Viṣakanyā) — Śarmiṣṭhā-tīrtha Context
এই অধ্যায়ে ঋষিরা ‘শর্মিষ্ঠা-তীর্থ’-এর উৎপত্তি ও ফলপ্রদতা জানতে চান। সূত সোমবংশীয় রাজা বৃকের কাহিনি বলেন—তিনি ধর্মপরায়ণ ও প্রজাহিতৈষী। তাঁর পত্নী অশুভ লগ্নে এক কন্যা প্রসব করেন। রাজা জ্যোতিষে পারদর্শী ব্রাহ্মণদের জিজ্ঞাসা করলে তারা কন্যাটিকে ‘বিষকন্যা’ বলে নির্ণয় করে জানায়—তার ভবিষ্যৎ স্বামী ছয় মাসের মধ্যে মৃত্যুবরণ করবে এবং যে গৃহে সে থাকবে সেখানে দারিদ্র্য নেমে আসবে; পিতৃকুল ও শ্বশুরকুল উভয়ই সর্বনাশে পড়বে। রাজা কন্যাকে ত্যাগ করতে অস্বীকার করেন এবং কর্মসিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করেন—পূর্বকৃত কর্ম অনিবার্যভাবে ফল দেয়; বল, বুদ্ধি, মন্ত্র, তপস্যা, দান, তীর্থসেবা বা কেবল সংযম দিয়ে কর্মফল সম্পূর্ণ রোধ করা যায় না। তিনি উপমা দেন—যেমন বাছুর বহু গাভীর মধ্যে মাকে খুঁজে পায়, তেমনই কর্মফলও অনুসরণ করে; আর তেল ফুরোলে প্রদীপ যেমন নিজে নিভে যায়, কর্ম ক্ষয় হলে দুঃখও নিবৃত্ত হয়। শেষে ভাগ্য ও পুরুষার্থ বিষয়ে প্রবাদসহ নীতিশিক্ষা—ধর্মে স্থিত থেকে দায়িত্ব নিয়ে চেষ্টা করো, তবে অতীত কর্মের বন্ধনকে স্বীকার করো।

शर्मिष्ठातीर्थमाहात्म्य (Śarmiṣṭhā-tīrtha Māhātmya) — The Glory of Śarmiṣṭhā Tīrtha
অধ্যায় ৬২ তীর্থমাহাত্ম্য প্রসঙ্গে শর্মিষ্ঠা-তীর্থের উৎপত্তি ও মুক্তিদায়িনী শক্তি বর্ণনা করে। সূত বলেন—এক রাজা উপদেশ সত্ত্বেও “বিষকন্যা” নামে পরিচিত কন্যাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। এরপর শত্রুরা আক্রমণ করে, রাজা যুদ্ধে নিহত হন এবং নগরে আতঙ্ক ছড়ায়। প্রজারা বিপর্যয়ের কারণ কন্যাকেই মনে করে তার হত্যা ও নির্বাসন দাবি করে; লোকনিন্দা শুনে সে বৈরাগ্যসদৃশ সংকল্প নিয়ে হাটকেশ্বর-সম্পর্কিত পুণ্যক্ষেত্রে যায়, সেখানে তার পূর্বজন্মস্মৃতি জাগে। পূর্বজন্মে সে ছিল অবহেলিত নারী; প্রচণ্ড গ্রীষ্মের তৃষ্ণায় করুণাবশে সে এক তৃষিত গাভীকে নিজের অল্প জল দান করেছিল—এটাই পরবর্তী পুণ্যের বীজ। কিন্তু “বিষকন্যা” হওয়ার আরেক কর্মসূত্রও বলা হয়েছে—সে একবার গৌরী/পার্বতীর স্বর্ণমূর্তি স্পর্শ করে ভেঙে বিক্রির উদ্দেশ্যে খণ্ডিত করেছিল, ফলে অশুভ কর্মফল পরিণত হয়। মুক্তির জন্য সে ঋতু-ঋতু ধরে দীর্ঘ তপস্যা, নিয়মিত উপবাস, পূজা ও নিবেদন করে দেবীকে আরাধনা করে। পরীক্ষার জন্য শচী (ইন্দ্রাণী) বর দিতে এলে সে তা প্রত্যাখ্যান করে কেবল পরম দেবী পার্বতীর শরণ গ্রহণের কথা ঘোষণা করে। শেষে শিবসহ পার্বতী প্রকাশিত হয়ে তার স্তোত্র গ্রহণ করেন, বর দেন, তাকে দিব্যরূপে রূপান্তরিত করেন এবং সেই স্থানকে নিজের আশ্রমরূপে প্রতিষ্ঠা করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—মাঘ শুক্ল তৃতীয়ায় এখানে স্নান করলে বিশেষত নারীদের ইষ্টফল লাভ হয়; স্নান-দান দ্বারা গুরুতর পাপও শুদ্ধ হয়, এবং অধ্যায় পাঠ-শ্রবণে শিবলোকের সান্নিধ্য লাভ হয়।

सोमेश्वर-प्रादुर्भावः (Someshvara Liṅga: Origin Narrative and Observance)
এই অধ্যায়ে সোমেশ্বর তীর্থের উৎপত্তি ও তার ব্রত-মাহাত্ম্য বর্ণিত। সূত বলেন, চন্দ্র (সোম) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এক প্রসিদ্ধ শিবলিঙ্গ আছে। এক বছর ধরে প্রতি সোমবার পূজা করার বিধান বলা হয়েছে; এতে যক্ষ্মা (ক্ষয়রোগ) সহ কঠিন ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে মুক্তি লাভ হয়। সোমের রোগের কারণও বলা হয়—দক্ষের সাতাশ কন্যা (নক্ষত্র)কে বিবাহ করেও সোম রোহিণীর প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হন। অন্য স্ত্রীরা অভিযোগ করলে দক্ষ ধর্মের দৃষ্টিতে সোমকে তিরস্কার করেন; সোম সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও পুনরায় একই আচরণ করেন। তখন দক্ষ তাকে ক্ষয়রোগের শাপে অভিশপ্ত করেন। সোম বহু চিকিৎসা ও বৈদ্য খুঁজেও ফল পান না; বৈরাগ্য গ্রহণ করে তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে প্রভাসক্ষেত্রে এসে ঋষি রোমকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রোমক বলেন, শাপ সরাসরি নিবারণ হয় না, তবে শিবভক্তিতে তার প্রভাব প্রশমিত হয়—সোমকে আটষট্টি তীর্থে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে শ্রদ্ধায় পূজা করতে হবে। শিব আবির্ভূত হয়ে দক্ষের সঙ্গে মধ্যস্থতা করেন এবং শাপের সত্যতা রক্ষা করে চন্দ্রের পক্ষক্রমে বৃদ্ধি-ক্ষয়ের নিয়ম স্থাপন করেন। সোমের প্রার্থনায় শিব সোমবার বিশেষ সান্নিধ্য দান করেন; শেষে নানা তীর্থে সোমেশ্বরের প্রকাশের কথা নিশ্চিত করা হয়।

Chamatkārī Devī—Pradakṣiṇā-Phala and the Jātismara King
অধ্যায় ৬৪-এ সূত মুনি তীর্থকেন্দ্রিক দেবীমাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। ‘চমৎকারিণী দেবী’কে এক ‘চমৎকার-নরেন্দ্র’ গভীর শ্রদ্ধায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নবনির্মিত নগর ও প্রজাদের, বিশেষত ভক্ত ব্রাহ্মণদের রক্ষার জন্য। মহা-নবমীতে দেবীপূজা করলে এক বছর ভয়হীনতা লাভ হয়—অশুভ সত্তা, শত্রু, রোগ, চোর ও নানা বিপদ থেকে রক্ষা মেলে। শুক্লাষ্টমীতে শুদ্ধ ভক্ত একাগ্রচিত্তে পূজা করলে ইষ্টসিদ্ধি পায়; নিষ্কাম সাধক দেবীর কৃপায় সুখ ও মোক্ষ লাভ করে। দৃষ্টান্তে দশার্ণের রাজা চিত্ররথের কথা আছে, যিনি শুক্লাষ্টমীতে বিস্তর প্রদক্ষিণা করেন। ব্রাহ্মণদের প্রশ্নে তিনি পূর্বজন্ম বলেন—তিনি দেবীমন্দিরের কাছে থাকা এক টিয়া ছিলেন; বাসায় ঢোকা-বার হওয়ার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রতিদিন প্রদক্ষিণা হয়ে যেত, সেখানেই মৃত্যু হয়ে তিনি জাতিস্মর রাজা রূপে জন্ম নেন। এতে বোঝানো হয়, প্রদক্ষিণা অনিচ্ছায় হলেও ফলদায়ী, আর শ্রদ্ধায় করলে আরও মহাফলদায়ী। শেষে উপদেশ—ভক্তিসহ প্রদক্ষিণা পাপ নাশ করে, মনোবাঞ্ছিত ফল দেয়, মুক্তিলক্ষ্যকে সহায় করে; যে এক বছর এই সাধনা বজায় রাখে, সে তির্যক্ যোনিতে পুনর্জন্ম পায় না।

Ānarteśvara–Śūdrakeśvara Māhātmya (Merit of the Ānarteśvara and Śūdrakeśvara sites)
সূত বলেন—দেবতাদের নির্মিত এক পুকুরের তীরে রাজা আনর্ত (সুহয় নামেও পরিচিত) ‘আনর্তেশ্বর’ নামে একটি লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। অঙ্গারক-ষষ্ঠীতে সেখানে স্নান করলে রাজার মতো সিদ্ধি লাভ হয়—এ কথা শুনে ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন, এমন সিদ্ধি কীভাবে সম্ভব হল। এরপর এক দৃষ্টান্ত—সিদ্ধসেন নামের এক বণিকের কাফেলা ক্লান্ত এক শূদ্র পরিচারককে জনশূন্য মরুভূমিতে ফেলে যায়। রাতে সেই শূদ্র এক ‘প্রেত-রাজ’কে অনুচরসহ দেখে; তারা আতিথ্য চায়, শূদ্র অন্ন-জল দেয়, এবং এই ঘটনা প্রতি রাতেই ঘটে। প্রেত-রাজ জানায়—গঙ্গা-যমুনা সঙ্গমের কাছে হাটকেশ্বর অঞ্চলে এক মহাব্রতধারী কঠোর তপস্বীর প্রভাবে তার রাত্রিকালীন সমৃদ্ধি; সেই তপস্বী কপাল-পাত্রে রাত্রে শুদ্ধিকর্ম করেন। মুক্তির জন্য প্রেত-রাজ অনুরোধ করে—কপালটি গুঁড়ো করে সঙ্গমে নিক্ষেপ করতে হবে এবং গয়াশির তীর্থে পত্রে লেখা নাম অনুযায়ী শ্রাদ্ধ করতে হবে। শূদ্র গোপন ধন পেয়ে কপাল-বিধি ও শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করে; ফলে প্রেতদের পরলোকে উন্নতি হয়। শেষে শূদ্র সেই ক্ষেত্রেই থেকে ‘শূদ্রকেশ্বর’ লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—স্নান ও পূজায় পাপক্ষয়, দান ও ভোজনদানে পিতৃগণের দীর্ঘ তৃপ্তি, অল্প স্বর্ণদানও মহাযজ্ঞসম ফলদায়ক, এবং সেখানে উপবাসে দেহত্যাগ পুনর্জন্ম থেকে মুক্তির উপায়।

रामह्रद-माहात्म्यम् (Glory of Rāmahrada) — Jamadagni, the Cow of Plenty, and Ancestral Tarpaṇa
অধ্যায় ৬৬-এ সূত মুনি ‘রামহ্রদ’ নামে প্রসিদ্ধ তীর্থসরোবরের কথা বলেন, যেখানে রুধির-সম্পর্কিত অর্ঘ্য দ্বারা পিতৃগণ তৃপ্ত হন—এমন খ্যাতি আছে। ঋষিগণ প্রশ্ন তোলেন: পিতৃতর্পণ তো শুদ্ধ জল, তিল প্রভৃতি দ্বারা বিধিসিদ্ধ; রক্তের যোগ অন্য অনুষঙ্গের সঙ্গে বলা হয়—তবে জামদগ্ন্য (পরশুরাম) কেন এমন করলেন? সূত ব্যাখ্যা করেন, এটি ব্রত ও ক্রোধজাত ঘটনা; কারণ হৈহয় রাজা সহস্রার্জুন (কার্তবীর্য অর্জুন) অন্যায়ভাবে মহর্ষি জমদগ্নিকে বধ করেন। কাহিনি বিস্তৃত হয়—জমদগ্নি রাজাকে অতিথি রূপে সম্মান দেন এবং এক অলৌকিক ‘হোমধেনু/কামধেনু-সদৃশ’ গাভীর দ্বারা রাজা ও তার সেনাদলকে বিপুল আতিথ্য প্রদান করেন। রাজা রাজনৈতিক ও সামরিক লাভের আশায় গাভীটি নিতে চায়; জমদগ্নি অস্বীকার করে বলেন, সাধারণ গরুও অবধ্য, গাভীকে পণ্যরূপে দখল করা মহাপাপ। তখন রাজার লোকেরা জমদগ্নিকে হত্যা করে; গাভীর শক্তিতে পুলিন্দ রক্ষকগণ প্রকাশ পেয়ে রাজসেনাকে পরাস্ত করে। রাজা গাভী ত্যাগ করে পলায়ন করে, এবং সতর্কবাণী শোনে—জমদগ্নিপুত্র রাম আসছেন। এভাবে তীর্থ-মাহাত্ম্য ন্যায়নীতি, আতিথ্যধর্ম ও তপস্বীহিংসার পরিণতির সঙ্গে যুক্ত হয়।

हैहयाधिपतिवधः पितृतर्पणप्रतिज्ञा च (Slaying of the Haihaya lord and the vow concerning ancestral offering)
সূত বলেন—পরশুরাম ভ্রাতৃগণের সঙ্গে এসে দেখলেন আশ্রম বিধ্বস্ত, কুলধেনু আহত। ঋষিদের মুখে তিনি জানলেন যে তাঁর পিতা নিহত হয়েছেন এবং মাতা বহু অস্ত্রাঘাতে গুরুতরভাবে ক্ষতবিক্ষত। শোকাবিষ্ট হয়ে তিনি বৈদিক বিধি অনুসারে পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ঋষিরা পিতৃতর্পণের জন্য জলাঞ্জলি দিতে বললে পরশুরাম প্রতিশোধধর্মে প্রতিষ্ঠিত প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করেন—নিরপরাধ পিতৃহত্যা ও মাতার অসংখ্য ক্ষতর প্রতিকার না করে যদি আমি পৃথিবীকে ‘ক্ষত্রিয়শূন্য’ না করি, তবে আমার পাপ হবে। তিনি বলেন, জল নয়—অপরাধীদের রক্ত দিয়েই পিতাকে তৃপ্ত করব। তারপর হৈহয় বাহিনী ও বনবাসী সহযোগীদের সঙ্গে মহাযুদ্ধ শুরু হয়। দৈববশ হৈহয় রাজা ধনুক, খড়্গ, গদা কিছুই চালাতে পারে না; দিব্যাস্ত্র ও মন্ত্রও ব্যর্থ হয়। পরশুরাম তার বাহু ছেদন করে শিরচ্ছেদ করেন, রক্ত সংগ্রহ করান এবং হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে প্রস্তুত গর্তে তা অর্পণ করতে আদেশ দেন—এভাবে তীর্থ-সংযুক্ত পিতৃতর্পণের কারণ ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কর্মধর্মের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।

पितृतर्पण-प्रतिज्ञापूरणम् (Fulfilment of the Vow through Ancestral Oblations)
Chapter 68 continues the transmitted discourse with Sūta as narrator. The episode describes the aftermath of Bhārgava (Paraśurāma) establishing a kṣatriya-less order through violent retribution, after which blood is gathered and conveyed to a pit (garta) associated with ancestral origin (paitṛkī / pitṛ-sambhavā). The narrative then shifts from martial action to ritual resolution: Bhārgava bathes in the blood, prepares abundant sesame (tila), and performs pitr̥-tarpaṇa with the apasavya orientation, in the presence of brahmins and other ascetics as direct witnesses, thereby fulfilling a stated pledge and becoming “free from sorrow” (viśoka). Subsequently, in a world described as bereft of kṣatriyas, he performs an aśvamedha and gives the entire earth as dakṣiṇā to brahmins. The brahmins respond with a governance principle—‘one ruler is remembered’—and instruct him not to remain on their land. A further exchange culminates in a threat to dry the ocean with a fire-weapon; hearing this, the ocean, fearful, withdraws as desired. The chapter thus interweaves ethical tension (violence and authority), ritual technology (tarpaṇa, aśvamedha, dāna), and cosmological geography (ocean’s retreat) as an explanatory charter for place and practice.

रामह्रद-माहात्म्य (Rāmahrada Māhātmya: The Glory of Rāma’s Sacred Lake)
সূত বলেন—ক্ষত্রিয়বংশ লুপ্ত হলে ক্ষত্রিয় নারীদের গর্ভে ব্রাহ্মণদের দ্বারা ক্ষেত্রজ পুত্র জন্মায়, তারাই নতুন শাসক হয়ে শক্তি বাড়িয়ে ব্রাহ্মণদের অবমাননা ও দমন করতে থাকে। অত্যাচারিত ব্রাহ্মণরা ভৃগুবংশীয় রাম (পরশুরাম)-এর শরণ নেয়; অশ্বমেধ-প্রসঙ্গে দানকৃত ভূমি ফিরিয়ে দেওয়া এবং দুষ্ট ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে প্রতিকার প্রার্থনা করে। ক্রুদ্ধ রাম শবর, পুলিন্দ, মেদ প্রভৃতি সহচরদের নিয়ে ক্ষত্রিয়দের সংহার করেন; প্রচুর রক্ত সংগ্রহ করে এক গর্ত পূর্ণ করে পিতৃতর্পণ করেন, পরে ভূমি ব্রাহ্মণদের ফিরিয়ে দিয়ে সমুদ্রের দিকে গমন করেন। বর্ণিত আছে যে পৃথিবী একুশবার (সাতবার করে তিন পর্যায়ে) ক্ষত্রিয়শূন্য হয় এবং তর্পণে পিতৃগণ তৃপ্ত হন। একুশতম তর্পণে এক অশরীরী পিতৃবাণী তাঁকে নিন্দিত কর্ম থামাতে বলে, তৃপ্তি জানিয়ে বর প্রদান করে। রাম চান—এই তীর্থ তাঁর নামে প্রসিদ্ধ হোক, রক্তদোষমুক্ত হোক এবং তপস্বীদের আশ্রয়স্থল হোক। পিতৃগণ ঘোষণা করেন—এই তর্পণকূপ তিন লোকেই ‘রামহ্রদ’ নামে খ্যাত হবে; এখানে পিতৃতর্পণ করলে অশ্বমেধসম ফল ও উচ্চ গতি লাভ হয়। ভাদ্রপদ কৃষ্ণপক্ষ চতুর্দশীতে অস্ত্রাহতদের উদ্দেশে ভক্তিসহ শ্রাদ্ধ করলে প্রেতাবস্থা বা নরকে থাকা আত্মাও উন্নত হয়। সাপের দংশন, অগ্নিদগ্ধ, বিষ, বন্ধন ইত্যাদি অকালে মৃতদের শ্রাদ্ধও এখানে মুক্তিদায়ক। অধ্যায় পাঠ-শ্রবণের ফল গয়া-শ্রাদ্ধ, পিতৃমেধ ও সৌত্রামণীর সদৃশ বলা হয়েছে।

Śakti-prakṣepaḥ and Tārakāsura Narrative (Kārttikeya-Śakti and the Origin-Logic of a Purifying Kuṇḍa)
এই অধ্যায়ে সূত কার্ত্তিকেয়-সম্পর্কিত পাপহর ‘শক্তি’ এবং সেই শক্তির সঙ্গে যুক্ত এক বিশাল, স্বচ্ছ জলের কুণ্ডের কথা বলেন। সেখানে স্নান ও পূজা করলে জীবনের সঞ্চিত পাপ তৎক্ষণাৎ নাশ হয় এবং মুক্তিদায়ক ফল লাভ হয়—এমনই মহিমা বর্ণিত। ঋষিরা শক্তির সময়, উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা জানতে চান। তারপর সূত তারকাসুরের কারণকথা বলেন। হিরণ্যাক্ষ-বংশোদ্ভূত দানব তারক গোকর্ণে কঠোর তপস্যা করে শিবকে প্রসন্ন করে; শিব তাকে এমন বর দেন যে সে দেবতাদের কাছে প্রায় অজেয় হবে, তবে শিব নিজে তাকে বধ করবেন না—এই অন্তর্নিহিত শর্ত থাকে। বরলাভে বলবান তারক দীর্ঘকাল দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে; দেবতাদের নানা কৌশল ও অস্ত্র ব্যর্থ হয়। ইন্দ্র বৃহস্পতির শরণ নেন। বৃহস্পতি তত্ত্বগত যুক্তি দেন—শিব নিজের বরপ্রাপ্তকে নাশ করবেন না, তাই শিবের পুত্রই সেনাপতি হয়ে তারককে বধ করবে। শিব পার্বতীসহ কৈলাসে গমন করে গোপন মিলনে প্রবৃত্ত হন; দেবতারা ভয়ে বায়ুকে পাঠিয়ে সেই সৃষ্টিকর্মে বিঘ্ন ঘটায়। শিব তেজস্বী বীর্য সংযত করে কোথায় স্থাপন হবে জিজ্ঞাসা করলে অগ্নি তা ধারণ করে, কিন্তু অসহ্য হওয়ায় পৃথিবীর শরস্তম্বে (নলখাগড়ার ঝোপে) রেখে দেয়। ছয় কৃত্তিকা সেই বীজের রক্ষক হন—এভাবেই স্কন্দ/কার্ত্তিকেয়ের জন্ম ও তারক-বধের পূর্বসূচনা ঘটে। এই কাহিনি কুণ্ড-তীর্থের পবিত্রতাকে দিব্য শক্তির সংরক্ষণ ও স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত করে।

स्कन्दाभिषेकः तारकवधश्च — Consecration of Skanda and the Slaying of Tāraka; Stabilization of Raktaśṛṅga
সূত নাগরখণ্ডে কৌমার-তত্ত্বকেন্দ্রিক এক পবিত্র কাহিনি বলেন। স্কন্দ অপার তেজে জন্মগ্রহণ করেন; কৃত্তিকারা এসে স্তন্যদান ও আলিঙ্গনে তাঁকে লালন করেন, তখন তাঁর রূপ বহু-মুখ ও বহু-বাহুতে বিস্তৃত হয়। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণ সমবেত হয়ে গান-বাদ্য-নৃত্যে উৎসব করেন; দেবতারা তাঁকে “স্কন্দ” নামে অভিষিক্ত করেন এবং শিব তাঁকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। স্কন্দ অচ্যুত বিজয়শক্তি, ময়ূরবাহন ও নানা দেবতার প্রদত্ত দিব্যাস্ত্র লাভ করেন। স্কন্দের নেতৃত্বে দেবগণ তারকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগ্রসর হন। ভয়ংকর সমরে স্কন্দের নিক্ষিপ্ত শক্তি তারকের হৃদয় বিদীর্ণ করে, দানব-ভয় দূর হয়। বিজয়ের পর তিনি রক্তচিহ্নিত শক্তিকে ‘পুরোত্তম’ নগরে প্রতিষ্ঠা করেন; ফলে রক্তশৃঙ্গ পর্বত স্থির ও সুরক্ষিত হয়। পরবর্তীতে পর্বত নড়ে চমৎকারপুর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্রাহ্মণদের প্রাণহানি ঘটে; তারা শাপ দেওয়ার হুমকি দেয়। স্কন্দ সর্বজনহিতের যুক্তি দিয়ে তাদের শান্ত করেন, অমৃত দিয়ে মৃত ব্রাহ্মণদের পুনর্জীবিত করেন, শিখরে শক্তি স্থাপন করে চারদিকে চার দেবী—আম্ববৃদ্ধা, আম্রা, মাহিত্থা, চমৎকারী—কে নিয়োজিত করে পর্বতকে অচল করেন। ব্রাহ্মণরা বর দেন—নগরটি স্কন্দপুর (চমৎকারপুর নামেও) প্রসিদ্ধ হবে; স্কন্দ, চার দেবী ও শক্তির নিত্য পূজা হবে, বিশেষত চৈত্র শুক্ল ষষ্ঠীতে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, ঐ দিনে ভক্তিপূর্বক পূজায় স্কন্দ প্রসন্ন হন এবং বিধিপূর্বক পূজার পর শক্তিতে পিঠ স্পর্শ/ঘষলে এক বছর রোগমুক্তি লাভ হয়।

हाटकेश्वरक्षेत्रमाहात्म्ये कौरवपाण्डवतीर्थयात्रा (Hāṭakeśvara-Kṣetra Māhātmya: The Kaurava–Pāṇḍava Pilgrimage Episode)
এই অধ্যায়ে সূত ঋষিদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন—ধৃতরাষ্ট্র কবে ও কীভাবে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রথমে বংশ-দাম্পত্য প্রসঙ্গ উঠে আসে—শুভলক্ষণ ও সদ্গুণে ভূষিতা বাণুমতীর বিবাহ ধৃতরাষ্ট্রবংশে সম্পন্ন হয়; যাদব-সম্পর্ক ও বিষ্ণু-স্মরণও প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখিত। এরপর ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখসহ কৌরবরা এবং পাঁচ পাণ্ডব সপরিবারে দ্বারাবতীর দিকে যাত্রা করেন। সমৃদ্ধ আনর্ত দেশে প্রবেশ করে তাঁরা হাটকেশ্বর-দেবের সঙ্গে যুক্ত, পাপনাশক প্রসিদ্ধ ক্ষেত্র লাভ করেন। ভীষ্ম সেই স্থানের অসামান্য মাহাত্ম্য জানিয়ে পাঁচ দিন অবস্থানের পরামর্শ দেন; নিজের গুরুতর পাপমোচনের দৃষ্টান্ত দিয়ে তীর্থ ও আয়তন দর্শনের সুযোগের কথা বলেন। ধৃতরাষ্ট্র কর্ণ, শকুনি, কৃপ প্রমুখ ও বহু পুত্রসহ সেনাকে সংযত রাখেন যাতে তপোবনে বিঘ্ন না ঘটে; বেদপাঠের ধ্বনি ও যজ্ঞধূমে চিহ্নিত তপস্বীপূর্ণ অঞ্চলে প্রবেশ হয়। অধ্যায়ে তীর্থযাত্রার বিধি বর্ণিত—নিয়মিত স্নান, দরিদ্র ও সন্ন্যাসীদের দান, তিলমিশ্রিত জলে শ্রাদ্ধ-তর্পণ, হোম-জপ-স্বাধ্যায়, এবং ধ্বজ, শুদ্ধিকরণ, মালা ও নানাবিধ উপহারে দেবালয় পূজা; পশু, বাহন, গরু, বস্ত্র ও স্বর্ণ দানের কথাও আছে। শেষে সবাই শিবিরে ফিরে তীর্থ, মন্দির ও নিয়মনিষ্ঠ তপস্বীদের দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে; শুরুতেই বলা হয়—এই লিঙ্গ দর্শন দুর্যোধনসহ সকলের পাপক্ষয় করে মুক্তির কারণ হয়।

धृतराष्ट्रादिकृतप्रासादस्थापनोद्यमवर्णनम् (Preparations for Palace-Temples and Liṅga Installation by Dhṛtarāṣṭra and Others)
এই অধ্যায়ে দ্বারাবতীতে দুর্যোধন–ভানুমতীর রাজবিবাহ উপলক্ষে মহোৎসবের বর্ণনা আছে—বাদ্য, গান, নৃত্য, বেদপাঠ ও জনসাধারণের আনন্দে নগর মুখরিত হয়। নবম দিনে কুরু–পাণ্ডবদের বয়োজ্যেষ্ঠরা ভগবান বিষ্ণু (পুণ্ডরীকাক্ষ/মাধব)-কে স্নেহভরে প্রণাম করে বলেন, যেতে মন চায় না, তবু এক জরুরি ধর্মকার্যে প্রস্থান করতে হবে। তাঁরা জানান, অনর্ত অঞ্চলে যাত্রাপথে তাঁরা অপূর্ব হাটকেশ্বর-ক্ষেত্র দর্শন করেছেন—যেখানে দীপ্তিমান, নানাবিধ স্থাপত্যরীতির বহু লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত, মহৎ বংশ ও দিব্য সত্তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সেই পুণ্যক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করতে চান; তাই অনুমতি চান এবং পরে আবার দর্শনে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দেন। মাধব সেই ক্ষেত্রকে পরম পুণ্যদায়ক বলে তাঁদের সঙ্গে দর্শন ও লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠার জন্য গমন করতে সম্মত হন। সেখানে পৌঁছে কুরু, পাণ্ডব ও যাদবরা ব্রাহ্মণদের আহ্বান করে ভূমি-অনুমতি ও প্রতিষ্ঠা-অনুষ্ঠানে আচার্যত্ব প্রার্থনা করেন। ব্রাহ্মণরা স্থানসীমা ও পূর্বতন দিব্য নির্মাণের কথা বিবেচনা করেও স্থির করেন—ধর্মার্থে মহাপুরুষদের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান অনুচিত। অতঃপর ক্রমানুসারে প্রত্যেক রাজাকে পৃথক, মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ ও লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হয়; শেষে ধৃতরাষ্ট্র প্রমুখ নির্ধারিত ক্রমে নির্মাণকার্য শুরু করেন।

कौरवपाण्डवयादवकृतलिङ्गप्रतिष्ठावृत्तान्तवर्णनम् (Account of Liṅga Consecrations Performed by the Kauravas, Pāṇḍavas, and Yādavas)
হাটকেশ্বর-ক্ষেত্র-মাহাত্ম্যের পরিপ্রেক্ষিতে সূত লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠা-কেন্দ্রিক এক কাহিনি বর্ণনা করেন। শতপুত্র রাজা ধৃতরাষ্ট্র সেখানে ১০১টি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। পাণ্ডবরা একত্রে পাঁচটি লিঙ্গ স্থাপন করেন; দ্রৌপদী, কুন্তী, গান্ধারী ও ভানুমতীর লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠার কথাও আছে—যাতে রাজপরিবারে ব্যাপক ভক্তিসহযোগিতা প্রকাশ পায়। এরপর কুরুক্ষেত্র-পরিমণ্ডলের প্রধান ব্যক্তিরা—বিদুর, শল্য, যুযুৎসু, বাহ্লীক, কর্ণ, শকুনি, দ্রোণ, কৃপ ও অশ্বত্থামা—‘পরমা ভক্তি’সহ প্রত্যেকে পৃথক লিঙ্গ ‘বর-প্রাসাদ’ নামে বিশেষ মন্দির-গঠনে প্রতিষ্ঠা করেন। পরে বিষ্ণুও শিখরযুক্ত উচ্চ প্রাসাদে একটি লিঙ্গ স্থাপন করেন। তারপর সাত্বত/যাদবগণ—সাম্ব, বলভদ্র, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ প্রমুখ—শ্রদ্ধায় দশটি প্রধান লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। শেষে সকলেই সন্তুষ্ট হয়ে দীর্ঘকাল সেখানে অবস্থান করেন, ধন, গ্রাম, ক্ষেত, গাভী, বস্ত্র, দাস-পরিচারক ইত্যাদি দান করেন এবং সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেন। ফলশ্রুতি—এই লিঙ্গগুলির ভক্তিপূর্বক পূজায় ইষ্টসিদ্ধি হয়; বিশেষত ধৃতরাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ পাপ-নাশক বলে ঘোষিত।

Hāṭakeśvara-liṅga-pratiṣṭhā and the Devayajana Merit-Statement (हाटकेश्वरलिङ्गप्रतिष्ठा तथा देवयजनमाहात्म्यम्)
সূত এক প্রাচীন পুণ্যকথা বর্ণনা করেন—রুদ্র ব্রহ্মাকে এক অতুলনীয় ক্ষেত্র দান করেন, যেখানে হাটকেশ্বর নামে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে শম্ভু কলিযুগের দোষ থেকে ব্রাহ্মণদের রক্ষার জন্য সেই ক্ষেত্র ষণ্মুখ (স্কন্দ/কার্ত্তিকেয়)-এর হাতে অর্পণ করেন। ব্রহ্মার অনুরোধে ও পিতৃ-আদেশ অনুসারে গাঙ্গেয় (কার্ত্তিকেয়) সেখানে বাস গ্রহণ করেন। কার্ত্তিক মাসে কৃত্তিকা-যোগে প্রভুর দর্শন করলে বহু জন্মের পুণ্য লাভ হয় এবং বিদ্বান ও সমৃদ্ধ ব্রাহ্মণরূপে পুনর্জন্ম ঘটে—এমন কাল-নিয়ম বলা হয়েছে। এরপর মহাসেনের উজ্জ্বল প্রাসাদ/মন্দিরকে উচ্চ ও দৃষ্টিনন্দন বলে বর্ণনা করা হয়। তা শুনে দেবতারা কৌতূহলে এসে পবিত্র নগরী দর্শন করেন এবং উত্তর-পূর্ব প্রাঙ্গণে যজ্ঞ করে যথাবিধি দক্ষিণা প্রদান করেন। সেই যজ্ঞস্থান ‘দেবযজন’ নামে প্রসিদ্ধ হয়; সেখানে বিধিপূর্বক এক যজ্ঞের ফল অন্যত্র শত যজ্ঞের সমান—এই মাহাত্ম্য ঘোষিত।

Bhāskara-traya Māhātmya (The Glory of the Three Solar Manifestations: Muṇḍīra, Kālapriya, and Mūlasthāna)
এই অধ্যায়ে সূত ‘ভাস্কর-ত্রয়’—মুণ্ডীর, কালপ্রিয় ও মূলস্থান—এই তিন শুভ সূর্যরূপের মাহাত্ম্য বলেন; তাঁদের দর্শনে মুক্তিলাভ পর্যন্ত ফল বলা হয়েছে। তিন রূপের সঙ্গে সময়-সংযোগও নির্দিষ্ট: রাত্রির অন্তে মুণ্ডীর, মধ্যাহ্নে কালপ্রিয়, আর সন্ধ্যা/রাত্রি-প্রবেশে মূলস্থান। ঋষিরা হাটকেশ্বরজ-ক্ষেত্রে তাঁদের অবস্থান ও উৎপত্তি জানতে চান। সূত একটি দৃষ্টান্ত বলেন—এক ব্রাহ্মণ ভয়ংকর কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত; তাঁর পতিব্রতা স্ত্রী বহু চিকিৎসা করেও ফল পান না। তখন এক পথিক অতিথি নিজের কাহিনি শোনায়: তিন বছর ধরে ক্রমান্বয়ে তিন ভাস্করের উপাসনা—উপবাস, সংযম, রবিবার-ব্রত, জাগরণ ও স্তোত্রপাঠ—করে সে আরোগ্য লাভ করেছে। স্বপ্নে সূর্যদেব এসে কর্মফল (স্বর্ণচুরি) প্রকাশ করেন, রোগ দূর করেন এবং চুরি ত্যাগ ও সামর্থ্য অনুযায়ী দানের উপদেশ দেন। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রাহ্মণ-দম্পতি মুণ্ডীরের দিকে যাত্রা করেন। পথে ব্রাহ্মণ দুর্বল হয়ে মৃত্যুচিন্তা করলে স্ত্রী তাঁকে ত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। চিতা প্রস্তুত করার সময় তিন দীপ্তিমান পুরুষ আবির্ভূত হন—তাঁরাই তিন ভাস্কর—এবং রোগ সারিয়ে দেন। তাঁরা বলেন, ভক্ত যদি তিনটি মন্দির স্থাপন করে তবে তাঁরা সেখানে ত্রিকাল-দর্শনের জন্য অবস্থান করবেন। ব্রাহ্মণ রবিবারে (হস্তার্ক প্রসঙ্গে) তিন রূপ প্রতিষ্ঠা করে ফুল-ধূপে তিন সন্ধিক্ষণে পূজা করেন এবং জীবনের শেষে ভাস্করধামে গমন করেন। ফলশ্রুতিতে সময়মতো ত্রয়দর্শনে কঠিন কামনাও সিদ্ধ হয় এবং নীতিশিক্ষা—চুরি বর্জন ও দান—এই কাহিনির মূল সুর।

हाटकेश्वर-क्षेत्रे शिव-सती-विवाहकथनम् (Śiva–Satī Marriage Narrative at Hāṭakeśvara-kṣetra)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—শিব-উমা যেহেতু বেদিমধ্যস্থ প্রতিষ্ঠিত, তবে তাঁদের বিবাহ কীভাবে পূর্বে ওষধিপ্রস্থে এবং বিস্তারে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে স্মৃত হয়। সূত প্রাচীন মন্বন্তর-চক্রের কথা তুলে ধরে পরে দক্ষ-সম্পর্কিত বিবাহপ্রসঙ্গ বর্ণনা করে এই আপাত বিরোধ দূর করেন। দক্ষ মহা আড়ম্বরে বিবাহের প্রস্তুতি নেন। চৈত্র শুক্ল ত্রয়োদশী, ভাগ নক্ষত্র ও রবিবারের শুভ লগ্নে শিব দেব-গন্ধর্ব-যক্ষ-রাক্ষস প্রভৃতি অসংখ্য গণসহ আগমন করেন। যজ্ঞে এক নীতিধর্মীয় ঘটনা ঘটে—কামাবিষ্ট ব্রহ্মা সতীর ঘোমটায় আচ্ছাদিত মুখ দেখতে চান; অগ্নিযজ্ঞের ধোঁয়ার মাধ্যমে তিনি তা দেখে ফেলেন, তখন শিব তাঁকে তিরস্কার করে প্রায়শ্চিত্ত নির্ধারণ করেন। পতিত বীজ থেকে অঙ্গুষ্ঠ-পরিমিত ‘বালখিল্য’ তপস্বীদের উৎপত্তি হয়; তারা শুদ্ধ তপঃস্থান প্রার্থনা করে সেখানে সিদ্ধি লাভ করে। শেষে শিব সতীসহ বেদিমধ্যে জীবশুদ্ধির জন্য স্থিত হতে সম্মত হন; নির্দিষ্ট কালে দর্শনে পাপক্ষয় ও সৌভাগ্য, বিশেষত বিবাহসংস্কারের মঙ্গল, লাভ হয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—যে ভক্তি সহকারে শ্রবণ করে ও বৃষভধ্বজের পূজা করে, তার বিবাহাদি কর্ম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।

रुद्रशीर्षतीर्थमाहात्म्यम् (Rudraśīrṣa Tīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়ে ঋষিগণ জিজ্ঞাসা করেন—কোন স্থানে ব্রহ্মা ও বালখিল্য ঋষিরা তপস্যা করেছিলেন। সূত দিক-নির্দেশসহ এক পবিত্র ভূখণ্ডের কথা বলেন, যেখানে ‘রুদ্রশীর্ষ’ নামে এক পীঠ/আসন ও একটি কুণ্ড বিদ্যমান; সেই স্থানের তীর্থশক্তিই কাহিনির কেন্দ্র। এরপর নীতি ও আচারঘন এক ঘটনা—অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগে ধরা পড়া এক ব্রাহ্মণী নিজের নির্দোষতা প্রমাণে প্রবীণ ও দেবতাদের সাক্ষ্যে ‘দিব্য-গ্রহ’ (লোকসমক্ষে অগ্নিপরীক্ষা সদৃশ পরীক্ষা) গ্রহণ করে। অগ্নিদেব জানান, কর্মটি ন্যায্য বলে নয়; রুদ্রশীর্ষ-তীর্থের মাহাত্ম্য ও কুণ্ডজলের প্রভাবে তার শুদ্ধি ঘটে। সমাজ স্বামীর অতিরিক্ত কঠোরতাও নিন্দা করে; তবু পরবর্তী বর্ণনায় সতর্ক করা হয়—কাম-মোহে কাছে গেলে ওই অঞ্চলে দাম্পত্যধর্ম ভেঙে পড়ে, শৃঙ্খলা ছাড়া তীর্থশক্তি বিপথে প্রলোভন জাগাতে পারে। দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে রাজা বিদূরথ ক্রোধে কুণ্ড ভরাট করে ও স্থাপনা নষ্ট করে। পাল্টা শাপ/বচনে বলা হয়—যে কুণ্ড ও মন্দির পুনর্নির্মাণ করবে, সে সেখানে সংঘটিত কামদোষের কর্মভারও বহন করবে; এটি নৈতিক নিবৃত্তি ও তীর্থের পুণ্য-পাপের তীব্র অর্থনীতির ঘোষণা। শেষে ফলশ্রুতি: মাঘ শুক্ল চতুর্দশীতে ‘রুদ্রশীর্ষ’ নাম ১০৮ বার জপ ও পূজা করলে ইষ্টসিদ্ধি, দৈনন্দিন পাপক্ষয় এবং পরম গতি লাভ হয়।

Vālakhilya-Muni-Avajñā, Garuḍotpatti, and the Liṅga–Kuṇḍa Phala (वालखिल्यमुन्यवज्ञा–गरुडोत्पत्तिः–लिङ्गकुण्डफलम्)
এই অধ্যায়ে সূত মুনি জিজ্ঞাসু ঋষিদের কাছে কাহিনি বলেন। পবিত্র ক্ষেত্রের দক্ষিণভাগে এক প্রসিদ্ধ লিঙ্গের উল্লেখ আছে, যা পাপশোধক বলে খ্যাত। তার নিকটস্থ কুণ্ডে হোম করলে বিশেষ ফল ও পুণ্যলাভের কথা বলা হয়েছে। দক্ষের সুসজ্জিত যজ্ঞে সহায়তার জন্য বালখিল্য ঋষিরা সমিধ বহন করে যাচ্ছিলেন। পথে জলভরা গর্তে তারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কষ্টে পড়েন। তখন শক্র (ইন্দ্র) যজ্ঞের দিকে যেতে যেতে তাদের দেখে অহংকার ও কৌতূহলে সেই বাধা লাফিয়ে পার হন, ফলে ঋষিদের অপমান হয়। ঋষিরা অথর্বণ মন্ত্রে, মণ্ডলে প্রতিষ্ঠিত পবিত্র কলসের দ্বারা, এক ‘শক্র’-সদৃশ প্রতিরূপ সৃষ্টি করার সংকল্প করেন; তখন ইন্দ্রের জন্য অশুভ লক্ষণ দেখা দেয়। বৃহস্পতি বলেন—এ সব তপস্বীদের অবজ্ঞার ফল। ইন্দ্র দক্ষের শরণ নেন; দক্ষ ঋষিদের সঙ্গে সমঝোতা করে মন্ত্রজাত শক্তি নষ্ট না করে তাকে এমনভাবে নিয়োজিত করেন যে উৎপন্ন সত্তা গরুড় হয়—বিষ্ণুর বাহন—ইন্দ্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। শেষে মিলন ঘটে এবং ফলশ্রুতিতে বলা হয়, এই লিঙ্গের পূজা ও কুণ্ডে হোম শ্রদ্ধায় বা নিষ্কামভাবেও করলে ইষ্টফল ও দুর্লভ আধ্যাত্মিক সাফল্য লাভ হয়।

Suparṇākhyamāhātmya (The Glory of Suparṇa/Garuḍa) — Garuḍa’s Origin, Pilgrimage Quest, and Vaiṣṇava Audience
অধ্যায় ৮০-এ ঋষিরা প্রশ্ন করেন—অসাধারণ তেজ ও বীর্যে সমন্বিত গরুড় কীভাবে ঋষিদের হোম থেকে উৎপন্ন হলেন বলা হয়। সূত ব্যাখ্যা করেন, এটি এক বিধিগত কারণ-সম্পর্ক: অথর্বণ মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত ও বালখিল্য ঋষিদের শক্তিতে পূর্ণ এক পবিত্র কলস কশ্যপ এনে বিনতাকে বলেন—মন্ত্রশুদ্ধ জল পান করো, তাতে মহাবল পুত্র জন্মাবে। বিনতা তৎক্ষণাৎ পান করেন, গর্ভধারণ হয় এবং সর্পদের ভয়ংকর গরুড় জন্ম নেন; পরে তিনি বৈষ্ণব সেবায় প্রতিষ্ঠিত হন—বিষ্ণুর বাহন ও রথধ্বজের চিহ্নরূপে। এরপর দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা ওঠে—গরুড়ের ডানা কীভাবে হারালেন ও পুনরায় পেলেন, এবং মহেশ্বর কীভাবে প্রসন্ন হলেন। কাহিনিতে ভৃগুবংশীয় এক ব্রাহ্মণ বন্ধু প্রবেশ করেন; তিনি কন্যা মাধবীর জন্য যোগ্য বর খুঁজছেন। গরুড় তাঁদের নিয়ে পৃথিবীজুড়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করেন; পথে কেবল রূপ, বংশ, ধন ইত্যাদি বিচ্ছিন্ন মানদণ্ডে বিচার করার দোষ এবং সমন্বিত সদ্গুণের গুরুত্ব শিক্ষারূপে প্রকাশ পায়। যাত্রা পবিত্র ভূগোলের দিকে মোড় নেয়। বৈষ্ণব প্রভাবযুক্ত অঞ্চলে নারদ মিলিত হন এবং হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রের নির্দেশ দেন, যেখানে জনার্দন নির্দিষ্ট সময় জলশায়ী রূপে বিরাজ করেন। প্রবল বৈষ্ণব তেজে অভিভূত হয়ে গরুড় ও নারদ ব্রাহ্মণকে দূরে থাকতে সতর্ক করেন; তাঁরা প্রণামাদি করে দর্শন লাভ করেন। নারদ পৃথিবীর অভিযোগ ব্রহ্মার কাছে জানান—কংস প্রভৃতি দুষ্ট শক্তির দণ্ডসদৃশ ভারে পৃথিবী ক্লিষ্ট, তাই বিষ্ণুর অবতরণের প্রার্থনা। বিষ্ণু সম্মতি দেন এবং শেষে গরুড়কে আগমনের উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করেন—এতেই পরবর্তী অংশের সূত্র স্থাপিত হয়।

माधवी-शापकथा तथा शाण्डिली-ब्रह्मचर्य-प्रसङ्गः (Mādhavī’s Curse Episode and the Śāṇḍilī Brahmacarya Discourse)
অধ্যায় ৮১ বহুস্তর সংলাপের মাধ্যমে এগোয়। গরুড় ভৃগুবংশীয় এক ব্রাহ্মণ বন্ধু ও তাঁর কন্যা মাধবীর কথা বলেন—যার জন্য উপযুক্ত বর পাওয়া যায় না। গরুড় বিষ্ণুকেই রূপ‑গুণে সর্বোত্তম বর মনে করে প্রার্থনা করেন। বিষ্ণু বলেন, দেবতেজের আশঙ্কা দূর করতে কন্যাকে প্রত্যক্ষ দর্শনের জন্য নিয়ে আসা হোক। এরপর গৃহ্য‑অনুষ্ঠানের আবহে টানাপোড়েন দেখা দেয়। লক্ষ্মী কন্যার নিকটতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভেবে শাপ দেন—সে ‘অশ্বমুখী’ (ঘোড়ামুখী) হবে। এতে জনসমাজ আতঙ্কিত হয় এবং ব্রাহ্মণরা ক্ষুব্ধ হন। তখন এক ব্রাহ্মণ যুক্তি দেন—শুধু মৌখিক প্রার্থনা বিবাহ নয়; তাই শাপের প্রযোজ্যতা সীমিত, এবং ফল ভবিষ্যৎ জন্মের সম্পর্কের মধ্যে প্রকাশ পাবে। পরে গরুড় বিষ্ণুর কাছে এক আশ্চর্য বৃদ্ধাকে দেখেন। বিষ্ণু জানান, তিনি শাণ্ডিলী—জ্ঞান ও ব্রহ্মচর্যে প্রসিদ্ধা। নারীদের স্বভাব ও যৌবনের কামনা নিয়ে গরুড় সন্দেহপূর্ণ কথা বলতেই তৎক্ষণাৎ তাঁর ডানা লোপ পায়। এই ঘটনা বাক্সংযম, পক্ষপাত ত্যাগ ও তপস্বিনীর প্রতি শ্রদ্ধার নীতিশিক্ষা দেয়।

Garuda’s Atonement and the Merit of Worship at the Supaṛṇākhyā Shrine (गरुडप्रायश्चित्तं सुपर्णाख्यदेवमाहात्म्यं)
এই অধ্যায়ে তিন পর্বে ধর্মতত্ত্বময় কাহিনি বর্ণিত। বিষ্ণু দেখেন গরুড় হঠাৎ দুর্বল—তার ডানা ঝরে পড়েছে—এবং তিনি বোঝেন, কারণটি কেবল শারীরিক নয়, গভীর নৈতিক-আধ্যাত্মিক। তপস্বিনী শাণ্ডিলীর সঙ্গে সংলাপ হয়। তিনি বলেন, নারীদের প্রতি সামগ্রিক অবমাননার প্রতিকার হিসেবে তিনি তপঃশক্তিতে কেবল মানসিক সংকল্পে গরুড়কে সংযত করেছেন; দেহগত আঘাত নয়। বিষ্ণু সমাধান চান, কিন্তু শাণ্ডিলী নির্দেশ দেন—শঙ্করের পূজা; পুনরুদ্ধার শিবকৃপা-নির্ভর। গরুড় দীর্ঘকাল পাশুপত ভাব নিয়ে চন্দ্রায়ণ ও অন্যান্য কৃচ্ছ্র, ত্রিকাল স্নান, ভস্মাচরণ, রুদ্রমন্ত্র জপ এবং বিধিবৎ পূজা-অর্ঘ্য পালন করে। শেষে মহেশ্বর বর দেন—লিঙ্গসন্নিধানে বাস, ডানার তৎক্ষণাৎ প্রত্যাবর্তন ও দিব্য তেজ। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে, দুষ্কর্মীও স্থির উপাসনায় উন্নতি লাভ করে; সোমবার কেবল দর্শনও মহাপুণ্য; এবং সুপর্ণাখ্য তীর্থে প্রায়োপবেশন করলে পুনর্জন্মের অবসান ঘটে।

सुपर्णाख्यमाहात्म्यवर्णनम् (The Māhātmya of the Supaṇākhya Shrine)
সূত পুরাণপরম্পরায় সংরক্ষিত এক বিস্ময়কর কাহিনি বলেন। সূর্যবংশীয় রাজা বেণু ছিল অবিরাম অধার্মিক—যজ্ঞ-উপাসনা রোধ করত, ব্রাহ্মণদের দান কেড়ে নিত, দুর্বলদের নির্যাতন করত, চোরদের রক্ষা করত, ন্যায় উল্টে দিত এবং নিজেকেই সর্বোচ্চ বলে পূজা দাবি করত। কর্মফলে তার ভয়ংকর কুষ্ঠরোগ হয়, বংশ ধ্বংস হয়; সন্তানহীন ও আশ্রয়হীন হয়ে সে রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয় এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে একা ঘুরে বেড়ায়। শেষে সে পবিত্র ক্ষেত্রের সুপর্ণাখ্য প্রাসাদ/মন্দিরে এসে ক্লান্তিতে সেখানেই প্রাণত্যাগ করে; তা অনিচ্ছাকৃত উপবাসের মতো হয়ে যায়। সেই স্থানের মাহাত্ম্যে সে দিব্যদেহ লাভ করে, বিমানে চড়ে শিবলোকে গমন করে এবং অপ্সরা, গন্ধর্ব, কিন্নরদের দ্বারা সম্মানিত হয়। পার্বতী শিবকে জিজ্ঞাসা করেন—এ নবাগত কে, কোন কর্মে এমন গতি? শিব বলেন—এই মঙ্গলময় প্রাসাদে দেহত্যাগ, বিশেষত প্রায়োপবেশন/আহার-ত্যাগসদৃশ অবস্থায়, মহাফলদায়ক; এখানে কীট, পাখি, পশুও মৃত্যুবরণ করলে উদ্ধার পায়। এ কথা শুনে পার্বতী বিস্মিত হন; এরপর মুক্তিকামী সাধকেরা দূর-দূরান্ত থেকে শ্রদ্ধায় প্রায়োপবেশন করে পরম সিদ্ধি লাভ করে। অধ্যায়ের শেষে একে শ্রীহাটকেশ্বর-ক্ষেত্র মাহাত্ম্যের ‘সর্বপাপ-নাশক’ কাহিনি বলা হয়েছে।

Mādhavī’s Transformation at Hāṭakeśvara-kṣetra (माधवी-रूपपरिवर्तन-प्रसङ्गः)
ঋষিরা বিষ্ণুর সঙ্গে ভগ্নীস্বরূপে সম্পর্কিত মাধবীর বিস্তারিত কাহিনি জানতে চান—কীভাবে তিনি অশ্বমুখী রূপ ধারণ করলেন এবং কীভাবে তপস্যা করলেন। সূত বলেন, নারদ-সম্পর্কিত দিব্য বার্তা পেয়ে বিষ্ণু দেবতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন—পৃথিবীর ভার লাঘব ও অত্যাচারী শক্তির বিনাশের জন্য অবতরণ স্থির হয়। দ্বাপরযুগে বসুদেবের গৃহে জন্মবৃত্তান্ত—দেবকীর গর্ভে ভগবান, রোহিণীর গর্ভে বলভদ্র, আর সুপ্রভায় মাধবীর জন্ম; কিন্তু তিনি বিকৃত অশ্বমুখী রূপে প্রকাশিত হওয়ায় পরিবার ও জনপদে শোক নেমে আসে, এবং কোনো বর তাঁকে গ্রহণ করে না। বিষ্ণু তাঁর দুঃখ দেখে বলদেবসহ তাঁকে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে নিয়ে গিয়ে নিয়মশৃঙ্খল পূজা-উপাসনা করান। ব্রত, দান ও ব্রাহ্মণ-অর্ঘ্য দ্বারা ব্রহ্মা প্রসন্ন হয়ে বর দেন—মাধবী শুভমুখী হয়ে ‘সুভদ্রা’ নামে খ্যাত হবেন, স্বামীর প্রিয়া ও বীরসন্তানের জননী হবেন। মাঘ মাসের দ্বাদশীতে গন্ধ, পুষ্প ও অনুলেপনসহ পূজাবিধি বলা হয়েছে; বিশেষত পরিত্যক্তা বা নিঃসন্তান নারীরা তিন দিনের ক্রমে ভক্তিভরে পূজা করলে কল্যাণফল লাভ করে। শেষে ফলশ্রুতি—শ্রদ্ধায় পাঠ বা শ্রবণে একদিনে সঞ্চিত পাপও ক্ষয় হয়।

Mahalakṣmī’s Restoration from the Gajavaktra Form (गजवक्त्रा-महालक्ष्मी-माहात्म्य / Narrative of Curse, Tapas, and Boon)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—পদ্মা কর্তৃক মাধবীকে দেওয়া শাপের ফল কী, এবং ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণের শাপে কমলা/লক্ষ্মী কীভাবে গজবক্ত্রা (হস্তিমুখী) রূপ ধারণ করলেন ও পরে কীভাবে পুনরায় শুভ মুখ লাভ করলেন। সূত শাপের তৎক্ষণাৎ পরিবর্তন বর্ণনা করেন এবং হরির নির্দেশ জানান—দ্বাপরযুগের অন্ত পর্যন্ত সেই রূপেই থাকতে হবে, তারপর দিব্য শক্তিতে পুনরুদ্ধার হবে। লক্ষ্মী সেই ক্ষেত্রে ত্রিকাল স্নান করে, দিনরাত ক্লান্তিহীনভাবে ব্রহ্মার পূজা করে কঠোর তপস্যা করেন। বর্ষশেষে প্রসন্ন ব্রহ্মা বর প্রদান করলে লক্ষ্মী কেবল পূর্বের মঙ্গলময় রূপ প্রত্যাবর্তন চান। ব্রহ্মা তা দান করেন এবং সেই স্থল-প্রসঙ্গে তাঁকে ‘মহালক্ষ্মী’ নামে প্রতিষ্ঠা করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—গজবক্ত্রা রূপে যিনি তাঁর পূজা করেন, তিনি ঐশ্বর্য লাভ করে গজাধিপতির ন্যায় রাজত্ব পান; আর দ্বিতীয়া তিথিতে ‘মহালক্ষ্মী’ আহ্বান করে শ্রীসূক্তে পূজা করলে সাত জন্ম পর্যন্ত দারিদ্র্যনাশের প্রতিশ্রুতি মেলে। শেষে দেবী কেশবের নিকট প্রত্যাবর্তন করেন, বৈষ্ণব সংযোগ অটুট রেখে তীর্থে ব্রহ্মার বরদাতা-ভূমিকাও প্রতিষ্ঠিত হয়।

सप्तविंशतिका-दुर्गा माहात्म्यम् (Glory of Saptaviṃśatikā Durgā and the Regulation of Lunar Fortune)
এই অধ্যায়ে সপ্তবিংশতিকা দেবীর তীর্থ-মাহাত্ম্য বর্ণিত। সূত বলেন—দক্ষের সাতাশ কন্যা নক্ষত্ররূপে পরিচিত এবং তারা সোমচন্দ্রের পত্নী; কিন্তু রোহিণীর প্রতি সোমের অতিরিক্ত অনুরাগে অন্য কন্যারা দুঃখিত হয়ে সৌভাগ্যহানি ও স্বামী-পরিত্যাগের আশঙ্কায় কাতর হয়। তারা সেই ক্ষেত্রে তপস্যা করে দুর্গার প্রতিষ্ঠা করে অবিরত নৈবেদ্য ও পূজায় দেবীকে সন্তুষ্ট করে। দেবী প্রসন্ন হয়ে বর দেন—তাদের দাম্পত্য-সৌভাগ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং পরিত্যাগ-দুঃখ নিবারিত হবে। এরপর ব্রত-নিয়ম বলা হয়—চতুর্দশীতে উপবাসসহ ভক্তিপূর্বক পূজা, এক বছর একাগ্র সাধনা, এবং ব্রতের গাম্ভীর্য রক্ষায় ক্ষার/লবণজাতীয় আহার বর্জন। বিশেষত আশ্বিন শুক্ল পক্ষের নবমীতে মধ্যরাত্রে পূজা করলে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী সৌভাগ্য লাভ হয়। পরে চন্দ্র-পুরাণ প্রসঙ্গে শূলপাণি সোমের রাজযক্ষ্মা বিষয়ে দক্ষকে প্রশ্ন করেন; দক্ষ শাপের কারণ জানান; শিব বিশ্ব-সমতা স্থাপন করে সোমকে সকল পত্নীর প্রতি সমদৃষ্টি রাখতে আদেশ দেন—ফলে শুক্ল ও কৃষ্ণ পক্ষের বৃদ্ধি-ক্ষয় প্রকাশ পায়। শেষে বলা হয়, দেবী এই ক্ষেত্রে নিত্য বিরাজমান থেকে নারীদের সৌভাগ্য দান করেন; অষ্টমীতে শুচিভাবে পাঠ করলে সৌভাগ্যসিদ্ধি হয়।

Somaprāsāda-māhātmya (Glory of the Lunar Temple)
এই অধ্যায়ে সূত মুনি সোম (চন্দ্র)-এর এক অতি পুণ্য প্রাসাদ/তীর্থের কথা বলেন, যার কেবল দর্শনেই পাপ নাশ হয়। ঋষিরা প্রশ্ন করেন—চন্দ্রমা কীভাবে দেবতাদের মধ্যে সকলের ‘সমাশ্রয়’ বা সাধারণ আশ্রয় হন। সূত উত্তর দেন—জগৎ ‘সোমময়’ বলে স্মৃত; ঔষধি ও শস্য সোম-রসে পরিপুষ্ট; দেবতারা সোমে তৃপ্ত হন, তাই অগ্নিষ্টোম প্রভৃতি সোম-সম্পর্কিত যজ্ঞ এই তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। এরপর সোমপ্রাসাদ নির্মাণের ধর্মনীতি বলা হয়—সোমবার ও অন্যান্য শুভ লক্ষণে, শ্রদ্ধা-শুদ্ধ সংকল্পে নির্মাণ করলে মহাপুণ্য বৃদ্ধি পায়; বিধিবিরুদ্ধ নির্মাণে অমঙ্গল ফলের সতর্কতা দেওয়া হয়। শেষে অম্বারীষ, ধন্ধুমার ও ইক্ষ্বাকু কর্তৃক নির্মিত কয়েকটি সোমপ্রাসাদের উল্লেখ করে তাদের বিরলতা জানানো হয় এবং শ্রবণ-পাঠে পাপক্ষয়ের ফলশ্রুতি বলা হয়।

अम्बावृद्धामाहात्म्यवर्णनम् / The Māhātmya of Ambā-Vṛddhā (Protective Goddesses of Hāṭakeśvara-kṣetra)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—চার স্থানীয় রক্ষক দেবতার মধ্যে পূর্বে উল্লিখিত অম্বা‑বৃদ্ধার মাহাত্ম্য, তাঁর যাত্রা‑ব্রত ও প্রভাবের উৎপত্তি বিস্তারিত বলুন। সূত বলেন, রাজা চমৎকার নগর স্থাপনকালে হাটকেশ্বর‑ক্ষেত্র রক্ষার জন্য চার দেবতার বিধিপূর্বক প্রতিষ্ঠা করেন। সেই রাজবংশে অম্বা ও ‘বৃদ্ধা’ নামে দুই নারী বৈদিক রীতিতে কাশীরাজকে বিবাহ করেন। কালযবনদের সঙ্গে যুদ্ধে রাজা নিহত হলে, দুই বিধবা স্বামীর শত্রু দমন ও রক্ষার অভিপ্রায়ে হাটকেশ্বর‑ক্ষেত্রে গিয়ে দীর্ঘকাল দেবী‑আরাধনা ও তপস্যা করেন। তাদের হোমাগ্নি থেকে ভয়ংকর শক্তির আবির্ভাব হয়; পরে বহু মুখ‑বহু বাহু, নানা অস্ত্র‑বাহন ও বিচিত্র স্বভাবসম্পন্ন অসংখ্য ‘মাতৃ’ শক্তির বিরাট বাহিনী প্রকাশিত হয়। তারা শত্রুসেনা পরাভূত করে ভক্ষণ করতে করতে তাদের রাজ্য ধ্বংস করে এবং শেষে নিজ স্থানে প্রত্যাবর্তন করে। মাতৃগণ বাসস্থান ও আহার প্রার্থনা করলে অম্বা‑বৃদ্ধা কিছু নীতি‑নিষেধ স্থির করেন—অধর্মাচারী, পাপী, দেব‑ব্রাহ্মণদ্রোহী প্রভৃতি ‘ভক্ষ্য’ গণ্য হবে—এভাবে মানব আচরণের সীমারেখা নির্ধারিত হয়। শেষে রাজা দেবীদের জন্য মহৎ আবাস নির্মাণ করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—প্রভাতে তাঁদের মুখদর্শন, কাজের শুরু‑শেষে পূজা এবং নির্দিষ্ট তিথিতে নিবেদন করলে রক্ষা, ইষ্টসিদ্ধি ও কণ্টকহীন (অবিঘ্ন) জীবন লাভ হয়।

Śrīmātuḥ Pādukā-māhātmya (Glory of the Divine Pādukās in Hāṭakeśvara-kṣetra)
এই অধ্যায়ে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে এক স্থানীয় বিপদের কথা বলা হয়েছে। ব্রাহ্মণদের গৃহে রাত্রে শিশুদের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শুরু হয়; দেবগণ সেই “ছিদ্র” (ভেদ) খুঁজতে থাকেন যার দ্বারা অনিষ্ট প্রবেশ করছে। ব্রাহ্মণরা ভক্তিভরে অম্বার শরণ নেয়, রাত্রিকালীন অপহরণের বিবরণ দেয় এবং রক্ষার প্রার্থনা করে; সাহায্য না পেলে স্থানত্যাগের কথাও জানায়। করুণাময়ী অম্বা ভূমিতে আঘাত করে এক গুহা প্রকাশ করেন এবং সেখানে নিজের দিব্য পাদুকা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সীমা-নিয়ম দেন—পরিচারক দেবতারা ভিতরেই থাকবে; অস্থিরতায় সীমা লঙ্ঘন করলে দেবত্বচ্যুত হবে। দেবরা জিজ্ঞাসা করে কে পূজা করবে ও কী নৈবেদ্য হবে; অম্বা বলেন যোগী ও ভক্তরা পূজা করবে, এবং মাংস-মদ্যাদি সহ নৈবেদ্যের ক্রম নির্দিষ্ট করে দুর্লভ সিদ্ধির আশ্বাস দেন। এই উপাসনা প্রসারে অগ্নিষ্টোম প্রভৃতি বৈদিক যজ্ঞ কমে যায়; যজ্ঞভাগ হ্রাসে দেবগণ ব্যথিত হয়ে মহেশ্বরের কাছে যায়। শিব অম্বার অপ্রতিহত মহিমা স্বীকার করে এক “সহজ উপায়” করেন—এক দীপ্তিময় কন্যা সৃষ্টি করে তাকে মন্ত্র ও বিধি শিখিয়ে বংশপরম্পরায় পাদুকা-পূজা চালিয়ে যেতে বলেন। শেষে ফলশ্রুতি—বিশেষত কন্যার হাতে পূজা এবং চতুর্দশী ও অষ্টমীতে শ্রদ্ধায় শ্রবণ করলে ইহলোকে সুখ, পরলোকে মঙ্গল এবং শেষে পরম পদ লাভ হয়।

वह्नितीर्थोत्पत्तिः (Origin of Vahni/Agni Tīrtha) — Chapter 90
ঋষিরা সূতকে অগ্নিতীর্থ ও ব্রহ্মতীর্থের উৎপত্তি ও মাহাত্ম্য জিজ্ঞাসা করেন। সূত শান্তনুর রাজ্যে ভয়ংকর অনাবৃষ্টির কাহিনি বলেন—উত্তরাধিকার-ব্যবস্থায় অনিয়ম মনে করে ইন্দ্র বৃষ্টি রোধ করেন; ফলে দুর্ভিক্ষ ছড়ায় এবং যজ্ঞ-ধর্মের আচরণ ভেঙে পড়ে। ক্ষুধায় কাতর বিশ্বামিত্র কুকুরের মাংস রান্না করলে নিষিদ্ধ ভক্ষণ-সংসর্গের ভয়ে অগ্নি জগৎ থেকে অন্তর্ধান করেন। দেবতারা অগ্নিকে খুঁজতে বেরিয়ে হাতি, টিয়া ও ব্যাঙের কাছ থেকে তাঁর গোপন আশ্রয়স্থল জানতে পারে; প্রকাশ করার দোষে তারা শাপে বাক্/জিহ্বার বিকৃতি লাভ করে। শেষে অগ্নি হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রের এক গভীর জলাশয়ে আশ্রয় নেন; তাঁর তাপে জলচর প্রাণীরা বিনষ্ট হতে থাকে। তখন ব্রহ্মা এসে অগ্নিকে বোঝান—যজ্ঞ থেকে সূর্য, সূর্য থেকে বৃষ্টি, বৃষ্টি থেকে অন্ন, অন্ন থেকে জীবের ধারণ; অতএব অগ্নি বিশ্ব-অপরিহার্য। ব্রহ্মা ইন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতা করে পুনরায় বৃষ্টি চালু করান এবং বর দেন যে সেই জলাশয় ‘বহ্নিতীর্থ/অগ্নিতীর্থ’ নামে প্রসিদ্ধ হবে। এখানে প্রাতঃস্নান, অগ্নিসূক্ত-জপ ও ভক্তিভরে দর্শনকে অগ্নিষ্টোম-সম পুণ্যদায়ক ও সঞ্চিত পাপনাশক বলা হয়েছে। আরও ‘বসোঃধারা’ (অবিচ্ছিন্ন ঘৃতাহুতি)কে শান্তি, পৌষ্টিক ও বৈশ্বদেব কর্মের পূর্ণতার জন্য অপরিহার্য, অগ্নিতোষক এবং দাতার অভীষ্টসিদ্ধিদায়ক রূপে মহিমান্বিত করা হয়েছে।

अग्नितीर्थप्रशंसा (Agni-tīrtha Praise and the Devas’ Consolation)
সূত বর্ণনা করেন—পিতামহ ব্রহ্মা ক্রুদ্ধ পাবক (অগ্নি)-কে শান্ত করে নিজ ধামে প্রত্যাবর্তন করেন। এরপর শক্র, বিষ্ণু, শিব প্রমুখ দেবগণও নিজ নিজ আবাসে ফিরে যান। প্রধান দ্বিজদের অগ্নিহোত্রে অগ্নি প্রতিষ্ঠিত হন, বিধিমতে আহুতি গ্রহণ করেন, এবং সেখানে এক মহিমান্বিত অগ্নিতীর্থের আবির্ভাব ঘটে। এই তীর্থের ফল বলা হয়েছে—যে ব্যক্তি প্রাতে সেখানে স্নান করে, সে দিনের দ্বারা উৎপন্ন (দিনজ) পাপ থেকে মুক্ত হয়। দেবগণ বিদায় নিলে গজেন্দ্র, শুক ও মণ্ডূক কাতর হয়ে এসে জানায়—“আপনাদের কারণেই অগ্নি আমাদের শাপ দিয়েছেন; জিহ্বা-সংক্রান্ত প্রতিকার দিন।” দেবগণ সান্ত্বনা দিয়ে বলেন—জিহ্বার বিকার হলেও তাদের সামর্থ্য নষ্ট হবে না, রাজসভায়ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে। অগ্নিতে ‘বিজিহ্ব’ হওয়া মণ্ডূকের জন্যও বিশেষ ধ্বনি-প্রকার দীর্ঘকাল চলবে—এমন আশ্বাস দিয়ে করুণা দান করে দেবগণ প্রস্থান করেন।

ब्रह्मकुण्डमाहात्म्यवर्णनम् | Brahmakuṇḍa Māhātmya (Glorification of Brahma-Kuṇḍa)
এই অধ্যায়ে সূত মুনি অগ্নিতীর্থের প্রসঙ্গ থেকে এগিয়ে ব্রহ্মকুণ্ডের উৎপত্তি ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। বলা হয়, ঋষি মার্কণ্ডেয় সেখানে পদ্মযোনি ব্রহ্মার প্রতিষ্ঠা করেন এবং নির্মল জলে পূর্ণ এক পবিত্র কুণ্ড নির্মাণ করেন। এরপর বিধান দেওয়া হয়—কার্ত্তিক মাসে চন্দ্র যখন কৃত্তিকা নক্ষত্রে থাকে (কৃত্তিকা-যোগ), তখন ভীষ্ম-ব্রত/ভীষ্ম-পঞ্চক পালন করা উচিত; শুভ জলে স্নান করে প্রথমে ব্রহ্মা, পরে জনার্দন/পুরুষোত্তম বিষ্ণুর পূজা করতে হবে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে, এতে জন্ম ও লোকগত উন্নতি হয়—শূদ্রও উত্তম জন্ম লাভ করে, আর ব্রাহ্মণ ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হয়। উদাহরণে এক গোপাল মার্কণ্ডেয়ের উপদেশ শুনে বিশ্বাসসহ ব্রত পালন করে; কালে দেহত্যাগের পর সে জাতিস্মর হয়ে ব্রাহ্মণকুলে জন্মায়। পূর্ব পিতা-মাতার প্রতি স্নেহ রেখে সে পূর্ব পিতার শ্রাদ্ধকর্ম করে; আত্মীয়রা প্রশ্ন করলে সে পূর্বজন্ম ও ব্রত-প্রভাবে পরিবর্তনের কারণ জানায়। শেষে উত্তরদিকে ব্রহ্মকুণ্ডের খ্যাতি উল্লেখ করে বলা হয়—সেখানে বারবার স্নান করলে সাধক ব্রাহ্মণের বারবার উচ্চ জন্ম/বিপ্রত্ব লাভ হয়।

गोमुखतीर्थमाहात्म्यवर्णनम् (Gomukha Tīrtha Māhātmya—Account of the Glory of Gomukha)
এই অধ্যায়ে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রের অন্তর্গত গোমুখ-তীর্থের উৎপত্তি, গোপন হওয়া ও পুনরায় প্রকাশের কাহিনি বর্ণিত। শুভ তিথি-যোগে তৃষ্ণার্ত এক গাভী ঘাসের গোছা উপড়ে ফেলতেই সেখান থেকে জলধারা বেরিয়ে আসে এবং ক্রমে তা বিস্তৃত হয়ে বৃহৎ কুণ্ডে পরিণত হয়; বহু গাভী সেখানে জল পান করে। রোগাক্রান্ত এক গোপালক সেই জলে নেমে স্নান করতেই তৎক্ষণাৎ রোগমুক্ত ও দীপ্তদেহী হয়ে ওঠে; ঘটনাটি সর্বত্র প্রচারিত হলে স্থানটি “গোমুখ” নামে প্রসিদ্ধ হয়। ঋষিদের প্রশ্নে সূত অম্বরীষ রাজার তপস্যার প্রসঙ্গ বলেন। তাঁর পুত্র কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ছিল, যা পূর্বজন্মে ব্রাহ্মণবধ (ব্রহ্মহত্যা)-জনিত কর্মফল বলে ব্যাখ্যাত—অনধিকার প্রবেশকারী ভেবে এক ব্রাহ্মণকে হত্যা করা হয়েছিল। বিষ্ণু প্রসন্ন হয়ে সূক্ষ্ম ছিদ্রপথে পাতালস্থিত জাহ্নবী (গঙ্গা) জল প্রকাশ করেন ও স্নানের নির্দেশ দেন; পুত্র আরোগ্য লাভ করে এবং ছিদ্রটি পুনরায় গোপন করা হয়। পরে গোমুখ-ঘটনার মাধ্যমে সেই জল পুনরায় ভূলোকে প্রকাশিত হয়। ভক্তিসহ স্নানকে পাপনাশক ও কিছু ব্যাধিনাশক বলা হয়েছে। হাটকেশ্বর অঞ্চলে শ্রাদ্ধ করলে পিতৃঋণ মোচন হয়; বিশেষত রবিবার ভোরের স্নানকে বিশেষ চিকিৎসাফলদায়ক বলা হয়েছে, আর অন্যান্য দিনেও শ্রদ্ধাভক্তিতে স্নান ফলপ্রদ বলে মানা হয়েছে।

लोहयष्टिमाहात्म्य (The Glory of Paraśurāma’s Iron Staff)
এই অধ্যায়ে সূত ঋষিদের প্রশ্নের উত্তরে পবিত্র ক্ষেত্রে বিদ্যমান অতিশয় দীপ্তিমান লোহযষ্টি (লোহার দণ্ড)-এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। পিতৃতর্পণাদি সম্পন্ন করে সমুদ্রস্নানে অগ্রসর পরশুরাম (রাম ভার্গব)-কে সেখানকার মুনি ও ব্রাহ্মণরা কুঠার (পরশু) ত্যাগ করতে উপদেশ দেন—হাতে অস্ত্র থাকলে ক্রোধের সম্ভাবনা থাকে, ব্রতসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে তা অনুচিত। পরশুরাম বলেন, কুঠার ত্যাগ করলে অন্য কেউ তা নিয়ে অপব্যবহার করতে পারে; তখন সে দণ্ডযোগ্য হবে, আর আমি অপরাধ সহ্য করতে পারব না। ব্রাহ্মণদের অনুরোধে তিনি কুঠার ভেঙে লোহার যষ্টি নির্মাণ করে রক্ষার্থে তাদের হাতে অর্পণ করেন। ব্রাহ্মণরা তা সংরক্ষণ ও পূজা করার প্রতিজ্ঞা করে ফলশ্রুতি বলেন—রাজ্যহারা রাজা পুনরায় রাজ্য লাভ করে, ছাত্র ও ব্রাহ্মণ উচ্চতর জ্ঞান এমনকি সর্বজ্ঞতাও পায়, নিঃসন্তান ব্যক্তি সন্তান লাভ করে; বিশেষত আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষ চতুর্দশীতে উপবাসসহ পূজায় মহাপুণ্য হয়। পরশুরাম প্রস্থান করলে তারা মন্দির নির্মাণ করে নিয়মিত পূজা স্থাপন করে, এবং দ্রুত মনস্কামনা পূর্ণ হয়। শেষে বলা হয়, কুঠারটি বিশ্বকর্মা অবিনশ্বর লোহা ও রুদ্রের অগ্নিতেজ মিশিয়ে নির্মাণ করেছিলেন।

अजापालेश्वरीमाहात्म्यवर्णनम् (Ajāpāleśvarī Māhātmya: The Glory of the Goddess Installed by King Ajāpāla)
অধ্যায় ৯৫-এ সূত মুনি ধর্মভাবনায় গাঁথা এক তীর্থকথায় অজাপালেশ্বরী পূজার উৎপত্তি ও ফলপ্রভাব বর্ণনা করেন। রাজা অজাপাল অত্যাচারী কর-আদায়ে প্রজার সামাজিক ক্ষতি দেখে ব্যথিত, তবু প্রজারক্ষা ও রাজ্যচালনার জন্য রাজস্বের প্রয়োজনও বোঝেন। তাই কর-শোষণ নয়, তপস্যার দ্বারা “কণ্টকহীন” (অপরাধমুক্ত) রাজ্য গড়ার সংকল্প করেন এবং দ্রুত ফলদায়ী এমন তীর্থের কথা জানতে বশিষ্ঠকে জিজ্ঞাসা করেন, যেখানে মহাদেব ও দেবগণ সহজে প্রসন্ন হন। বশিষ্ঠ তাঁকে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে নির্দেশ দেন, যেখানে চণ্ডিকা দ্রুত তুষ্ট হন। রাজা ব্রহ্মচর্য, শৌচ, নিয়মিত আহার ও দিনে তিনবার স্নানসহ কঠোর বিধিতে দেবীর আরাধনা করেন। দেবী তাঁকে জ্ঞানসমৃদ্ধ অস্ত্র ও মন্ত্র দান করেন—যাতে চুরি-অপরাধ দমন হয়, পরস্ত্রীগমন প্রভৃতি গুরু অধর্ম রুদ্ধ হয়, রোগও নিয়ন্ত্রিত হয়; ফলে ভয় কমে, পাপ হ্রাস পায় এবং প্রজার কল্যাণ বৃদ্ধি পায়। পাপ ও রোগ কমে যাওয়ায় যমের অধিকার প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং দেবতারা পরামর্শে বসেন। শিব বাঘরূপে এসে রাজার পরীক্ষা নেন; রাজা আত্মরক্ষায় উদ্যত হলে শিব স্বরূপ প্রকাশ করে রাজার অনন্য ধর্মশাসনের প্রশংসা করেন। তিনি আদেশ দেন—রানি সহ অজাপাল পাতালে হাটকেশ্বরে গমন করুন এবং নির্দিষ্ট সময়ে দেবীকুণ্ডের জলে প্রাপ্ত অস্ত্র-মন্ত্রাদি সমর্পণ করুন। শেষে বলা হয়, অজাপাল সেখানে জরা-মৃত্যুহীন হয়ে হাটকেশ্বরের পূজা করতে থাকেন এবং দেবীর প্রতিষ্ঠা স্থায়ী তীর্থ-আশ্রয়রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়; শুক্ল চতুর্দশীতে পূজা ও কুণ্ডস্নানকে বিশেষ রক্ষা ও রোগনাশক বলা হয়েছে।

अध्याय ९६ — दशरथ-शनैश्चरसंवादः, रोहिणीभेद-निवारणम्, राजवापी-माहात्म्यम् (Chapter 96: Daśaratha–Śanaiścara Dialogue; Prevention of Rohiṇī-Disruption; Glory of Rājavāpī)
এই অধ্যায়ে সূত ঋষিদের কাছে রাজবংশের কথা, পুণ্যক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠা এবং এক মহাজাগতিক-নৈতিক ঘটনার বিবরণ দেন। অজপালের রসাতলে অবতরণের পর তাঁর পুত্র রাজা হন; দেবসান্নিধ্য ও বিশ্বস্থিতি রক্ষার জন্য তিনি প্রশংসিত, এমনকি শনি (শনৈশ্চর)কে ‘জয়’ করেছেন বলেও বলা হয়। সেই সৎক্ষেত্রে বিষ্ণু/নারায়ণ প্রসন্ন হয়ে এক মনোরম স্থাপনা ও ‘রাজবাপী’ নামে খ্যাত কূপ/বাপী নির্মিত হয়। রাজবাপীতে পঞ্চমী তিথিতে, বিশেষত প্রেতপক্ষে, শ্রাদ্ধ করলে মহাপুণ্য ও সামাজিক-আধ্যাত্মিক মর্যাদা লাভ হয়। ঋষিরা এরপর জানতে চান—রোহিণীর শকটভেদ (আকাশীয় বিন্যাসের বিঘ্ন) কীভাবে রোধ করা হল। জ্যোতিষীরা বলেন, রোহিণীপথ ভাঙলে বারো বছরের ভয়ংকর অনাবৃষ্টি-দুর্ভিক্ষ, সমাজব্যবস্থার ভাঙন এবং বৈদিক যজ্ঞচক্রের ব্যাঘাত ঘটবে। তখন সূর্যবংশীয় দশরথ (অজের পুত্র) মন্ত্রশক্তিসম্পন্ন দিব্য বাণ নিয়ে শনৈশ্চরের মুখোমুখি হন এবং জনকল্যাণ ও ধর্মের যুক্তিতে তাঁকে রোহিণীপথ ত্যাগ করতে আদেশ দেন। শনি বিস্মিত হয়ে নিজের দৃষ্টির ভয়ংকর প্রভাবের কথা বলে বর দেন; দশরথ চান—শনিবার তেলাভ্যঙ্গকারী, সামর্থ্য অনুযায়ী তিল ও লৌহ দানকারী, এবং তিলহোম, সমিধা ও চালদানা দিয়ে শান্তিকর্মকারী যেন শনি-দোষের পীড়া থেকে রক্ষিত হন। শেষে ফলশ্রুতি—এই অধ্যায় নিয়মিত পাঠ/শ্রবণে শনি-জনিত কষ্ট নিবারিত হয়।

दशरथकृततपःसमुद्योगवर्णनम् (Daśaratha’s Resolve for Austerities to Obtain Progeny)
সূত বলেন—রাজা দশরথের এক অসাধারণ কৃত্যে প্রসন্ন হয়ে ইন্দ্র (শক্র) স্বয়ং এসে তাঁর অতুল কীর্তির প্রশংসা করেন এবং বর দিতে চান। দশরথ ধন বা জয় চাননি; তিনি সকল ধর্মকর্মে স্থায়ী এমন ইন্দ্রের সঙ্গে চিরস্থায়ী মৈত্রী ও সখ্য প্রার্থনা করেন। ইন্দ্র তা মঞ্জুর করে দেবসভায় নিয়মিত উপস্থিত থাকার অনুরোধ করেন। দশরথ সন্ধ্যারিতি সম্পন্ন করে প্রতিদিন দেবসভায় যান, সেখানে দিব্য সংগীত-নৃত্য উপভোগ করেন এবং দেবর্ষিদের মুখে ধর্মোপদেশ ও পবিত্র কাহিনি শোনেন। দশরথ বিদায় নিলে তাঁর আসনে জল ছিটানো (অভ্যুক্ত্ষণ) একটি নিয়ম ছিল। নারদ কারণ জানালে রাজা সন্দেহ করেন—এ কি কোনো গোপন পাপের লক্ষণ? তিনি ব্রাহ্মণ-অপমান, অন্যায় বিচার, সমাজে বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, শরণাগতকে অবহেলা, যজ্ঞক্রিয়ায় ত্রুটি ইত্যাদি সম্ভাব্য দোষের কথা বলেন। ইন্দ্র জানান—তোমার দেহে, রাজ্যে, বংশে, গৃহে বা কর্মচারীদের মধ্যে কোনো বর্তমান দোষ নেই; কিন্তু পুত্রহীনতাই পিতৃঋণরূপ ভবিষ্যৎ দোষ, যা উচ্চ গতি রোধ করে। তাই এই জলছিটানো পিতৃসম্পর্কিত প্রতিরোধক বিধি। ইন্দ্র পুত্রলাভের জন্য সাধনা করে পিতৃঋণ মোচনের উপদেশ দেন। দশরথ অযোধ্যায় ফিরে মন্ত্রীদের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে পুত্রার্থে তপস্যায় প্রবৃত্ত হন। তাঁকে কার্ত্তিকেয়পুরে যাওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়—যেখানে তাঁর পিতা পূর্বে তপস্যা করে অভীষ্ট সিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

राजस्वामिराजवापीमाहात्म्यवर्णनम् (The Māhātmya of the Royal Well ‘Rājavāpī’ and its Merit-Discourse)
সূত বর্ণনা করেন—মন্ত্রীদের দ্বারা অপসারিত হয়ে রাজা দশরথ হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে এসে ভক্তিভরে পরিক্রমা করেন। পিতৃপ্রতিষ্ঠিত দেবীর পূজা, পুণ্যজলে স্নান, প্রধান মন্দিরদর্শন, বহু তীর্থে স্নান ও দান—এইভাবে তিনি ধর্মাচরণ সম্পন্ন করেন। পরে চক্রধারী বিষ্ণুর জন্য মন্দির নির্মাণ করে বৈষ্ণব মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং সাধুগণের প্রশংসিত নির্মল জলের এক রাজকীয় ‘বাপী’/সিঁড়িওয়ালা কূপ নির্মাণ করান। সেই জলতীর্থকে আশ্রয় করে তিনি কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন থাকেন শতবর্ষ। তখন গরুড়ারূঢ় জনার্দন দেবগণসহ প্রকাশিত হয়ে বর দিতে বলেন। দশরথ বংশবৃদ্ধির জন্য পুত্র প্রার্থনা করলে বিষ্ণু প্রতিশ্রুতি দেন—চার রূপে তাঁর গৃহে জন্ম নেবেন এবং ধর্মপথে রাজ্য শাসন করতে বলে তাঁকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন। এই কূপের নাম হয় ‘রাজবাপী’। বলা হয়—পঞ্চমী তিথিতে স্নান ও পূজা করে, এক বছর শ্রাদ্ধ করলে নিঃসন্তানও পুত্রলাভ করে। শেষে এই বরফলে দশরথের চার পুত্র—রাম, ভরত, লক্ষ্মণ, শত্রুঘ্ন—জন্ম নেয়; এক কন্যা লোমপাদকে দেওয়া হয়, এবং রামেশ্বর, লক্ষ্মণেশ্বর ও সীতাপ্রতিষ্ঠা প্রভৃতি রাম-স্মৃতির কথাও উল্লিখিত।

Rāma–Lakṣmaṇa Saṃvāda, Devadūta-Sandeśa, and Durvāsā-Āgamanam (Chapter 99)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—আগে বলা হয়েছে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ একসঙ্গে এসে একসঙ্গেই বনে গিয়েছিলেন, অথচ আবার বলা হয় “সেখানেই” রাম পরে রামেশ্বর প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করেন—এ বিরোধ কীভাবে মেলে? সূত ভিন্ন দিন ও ভিন্ন উপলক্ষের পার্থক্য দেখিয়ে সংশয় দূর করেন এবং বলেন, সেই ক্ষেত্রের পবিত্রতা চিরস্থায়ী; তার মহিমা ক্ষয় হয় না। এরপর কাহিনি রাজপ্রসঙ্গে যায়। লোকনিন্দায় স্পর্শিত রাম সংযমী শাসন করেন; ব্রহ্মচর্যের উল্লেখও আছে। তখন ইন্দ্রের আদেশ নিয়ে এক দেবদূত গোপনে এসে জানায়—রাবণবধের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ হলে রামকে দিব্যলোকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। এই সময়ে ব্রতশেষে ক্ষুধার্ত দুর্বাসা মুনি উপস্থিত হন। লক্ষ্মণের সামনে ধর্মসংকট—রাজার গোপন আদেশ রক্ষা করবেন, না মুনির অভিশাপ থেকে বংশকে বাঁচাবেন? তিনি রামকে জানিয়ে মুনিকে প্রবেশ করান। রাম দেবদূতকে পরে উত্তর দেবেন বলে বিদায় দেন, দুর্বাসাকে অর্ঘ্য-পাদ্য দিয়ে সম্মান করেন এবং নানা ভোজ্যে তৃপ্ত করেন—এভাবে রাজধর্ম, দেবাজ্ঞা ও তপস্বীর দাবির মধ্যে আতিথ্যধর্মের মাধ্যমে সমন্বয় দেখানো হয়।

Lakṣmaṇa-tyāga at Sarayū and the Ethics of Royal Truthfulness (लक्ष्मणत्यागः सरयूतटे)
এই অধ্যায়ে সূত এক ধর্মসংকটের কাহিনি বলেন। দুর্বাসা ঋষি প্রস্থান করলে লক্ষ্মণ তরবারি হাতে শ্রীरामের কাছে এসে অনুরোধ করেন—রামের পূর্বপ্রতিজ্ঞা ও রাজধর্মের সত্যনিষ্ঠা অক্ষুণ্ণ রাখতে যেন তাঁকে দণ্ড দিয়ে বধ করা হয়। রাম নিজের করা শপথ স্মরণ করে অন্তরে ব্যথিত হন এবং মন্ত্রী ও ধর্মজ্ঞ ব্রাহ্মণদের সঙ্গে পরামর্শ করেন; সিদ্ধান্ত হয়—প্রকৃত হত্যা নয়, বরং ত্যাগ/নির্বাসনই দণ্ড, কারণ সাধুর ক্ষেত্রে পরিত্যাগকে মৃত্যুর সমান ধরা হয়। তাই রাম লক্ষ্মণকে অবিলম্বে রাজ্য ত্যাগ করতে ও আর কখনও সাক্ষাৎ না করতে আদেশ দেন। লক্ষ্মণ পরিবারকে কিছু না বলে সরযূতীরে যান, শুদ্ধি সম্পন্ন করে যোগাসনে স্থিত হয়ে ‘ব্রহ্মদ্বার’ দিয়ে যোগিকভাবে তেজ/প্রাণ ত্যাগ করেন; তাঁর দেহ তীরে নিথর হয়ে পড়ে। রাম গভীর শোকে বিলাপ করেন এবং অরণ্যে লক্ষ্মণের সেবা ও রক্ষার স্মৃতি স্মরণ করেন। মন্ত্রীরা অন্ত্যেষ্টির কথা বললে আকাশবাণী জানায়—ব্রহ্মজ্ঞাননিষ্ঠ সন্ন্যাসীর জন্য অগ্নিদাহ/হোম উপযুক্ত নয়; লক্ষ্মণ যোগ-নির্গমনে ব্রহ্মধামে গমন করেছেন। রাম লক্ষ্মণ ছাড়া অযোধ্যায় ফিরতে চান না, কুশকে রাজ্যভার দেওয়ার কথা ভাবেন এবং বিভীষণ ও বানরদেরসহ মিত্ররাজাদের সঙ্গে পরামর্শ করে ভবিষ্যৎ বিশৃঙ্খলা রোধের পরিকল্পনা করেন; এতে সরযূতীর্থ, রাজসত্যব্রত ও সন্ন্যাসধর্মের বিধি একত্রে প্রকাশ পায়।

सेतुमध्ये श्रीरामकृतरामेश्वरप्रतिष्ठावर्णनम् (Rāma’s Installation of the Rāmeśvara Triad in the Midst of the Setu)
সূত বলেন—রাত্রি অতিবাহিত হলে প্রভাতে শ্রীराम পুষ্পক-বিমানে সুগ্রীব, সুষেণ, তারা, কুমুদ, অঙ্গদ প্রমুখ প্রধান বানরদের সঙ্গে দ্রুত লঙ্কায় পৌঁছে পূর্বযুদ্ধের স্থানগুলি পুনরায় দর্শন করলেন। রামের আগমন বুঝে বিভীষণ মন্ত্রী ও পরিচারকদের সঙ্গে এগিয়ে এসে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে লঙ্কায় যথোচিতভাবে তাঁকে গ্রহণ করলেন। বিভীষণের প্রাসাদে আসীন রামকে তিনি রাজ্য ও গৃহকার্যের সম্পূর্ণ সমর্পণ করে উপদেশ প্রার্থনা করলেন। লক্ষ্মণ-বিরহে শোকাকুল এবং দিব্যলোকে গমনের অভিপ্রায়ে শ্রীराम রাজধর্ম-নীতি বললেন—রাজঐশ্বর্য মত্ততা আনে, তাই অহংকার ত্যাগ করো; ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতাদের সম্মান করো; এবং এমন সীমা স্থির করো যাতে রাক্ষসেরা রাম-সেতু অতিক্রম করে মানুষকে ক্ষতি না করে, কারণ মানুষ রামের আশ্রয়ে। কলিযুগে দর্শনার্থী তীর্থযাত্রী ও স্বর্ণলোভের কারণে ভবিষ্যৎ বিপদের কথা বিভীষণ জানালে, রাক্ষসদের অতিক্রমণ ও দোষনিবারণের জন্য রাম সেতুর মধ্যভাগের প্রসিদ্ধ অংশকে বাণে ছিন্ন করে পথকে অগম্য করলেন; চিহ্নিত শৃঙ্গ ও লিঙ্গধারী উঁচু অংশ সমুদ্রে পতিত হল। দশ রাত্রি সেখানে থেকে যুদ্ধকথা বর্ণনা করে রাম নগরের দিকে যাত্রা করলেন; সেতুর প্রান্তে মহাদেব প্রতিষ্ঠা করে শ্রদ্ধাসহ সেতুর আদিতে, মধ্যে ও অন্তে ‘রামেশ্বর-ত্রয়’ স্থাপন করলেন—যাতে চিরস্থায়ী তীর্থাচার ও পূজাবিধি স্থির হল।

Hāṭakeśvara-kṣetra-prabhāvaḥ (The Glory of Hāṭakeśvara and the Foundations of Rāmeśvara–Lakṣmaṇeśvara)
সূত বললেন—রাম পুষ্পক-বিমানে নিজ নিবাসের দিকে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ বিমানের গতি থেমে গেল। কারণ জানতে রাম বায়ুসুত হনুমানকে অনুসন্ধানে পাঠালেন। হনুমান জানালেন, ঠিক নীচে পুণ্যময় হাটকেশ্বর-ক্ষেত্র; সেখানে ব্রহ্মার সান্নিধ্য আছে বলে খ্যাত, আর আদিত্য, বসু, রুদ্র, অশ্বিন ও নানা সিদ্ধগণ বাস করেন। এই দিব্য পবিত্রতার ঘনত্বে পুষ্পক সেই স্থান অতিক্রম করতে পারে না। রাম বানর ও রাক্ষসদের সঙ্গে নেমে তীর্থ ও দেবালয়সমূহ দর্শন করেন, স্নান করেন; কামনা-পূরণকারী কুণ্ডের কথাও আসে। শুদ্ধি সম্পন্ন করে পিতৃতর্পণ করেন এবং ক্ষেত্রের অসাধারণ পুণ্য-মাহাত্ম্য চিন্তা করেন। পূর্বপ্রথা (কেশব-সম্পর্কিত) অনুসারে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠার সংকল্প নেন, স্বর্গারূঢ় লক্ষ্মণের স্মৃতিতে লক্ষ্মণেশ্বরের ভাব স্থাপন করেন, এবং সীতাসহ শুভ, দৃশ্যমান রূপের অভিপ্রায় করেন। রাম ভক্তিভরে পাঁচটি প্রসাদ/মন্দির স্থাপন করেন; অন্যরাও নিজেদের লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে। শেষে ফলশ্রুতি—প্রতিদিন প্রাতে দর্শনে রামায়ণ-শ্রবণের ফল লাভ হয়; আর অষ্টমী ও চতুর্দশীতে রামচরিত পাঠ করলে অশ্বমেধ যজ্ঞসম ফল প্রাপ্ত হয়।

Ānarttīya-taḍāga Māhātmya and Kārttika Dīpadāna (आनर्त्तीयतडाग-माहात्म्यं तथा कार्तिकदीपदानम्)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—এই ক্ষেত্রের মধ্যে বানর ও রাক্ষসদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গগুলির মাহাত্ম্য ও ফল কী। সূত দিক-ক্রমে বর্ণনা করেন—বালমণ্ডনকে স্নান করে সুগ্রীব একটি মুখ-লিঙ্গ স্থাপন করেন, অন্যান্য বানরদলও মুখ-লিঙ্গ স্থাপন করে; পশ্চিমে রাক্ষসরা চতুর্মুখ লিঙ্গ স্থাপন করে; পূর্বদিকে শ্রীराम পাঁচ প্রাসাদ-সমন্বিত পাপনাশক পুণ্যধাম প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণে আনর্ত্তীয়-তড়াগের নিকটে বিষ্ণু-কূপিকা শুদ্ধিদায়িনী; সেখানে দক্ষিণায়নে শ্রাদ্ধ করলে অশ্বমেধ-সম পুণ্য হয় ও পিতৃগণের উন্নতি ঘটে। কার্ত্তিক মাসে দীপদান নরকে পতন রোধ করে এবং জন্মান্তরের অন্ধত্বসহ নানা ক্লেশ নাশ করে। ঋষিদের অনুরোধে সূত আনর্ত্তীয়-তড়াগের অপরিমেয় গৌরব বলেন এবং রাম-অগস্ত্য সাক্ষাতের প্রসঙ্গ আনেন। অগস্ত্য তাঁর রাত্রিকালীন দর্শন বর্ণনা করেন—আনর্ত্ত দেশের প্রাক্তন রাজা শ্বেত দেবযানে থেকেও দীপোৎসবের রাত্রিতে তড়াগ থেকে নিজের পচা দেহ বারবার ভক্ষণ করে, তারপর সাময়িক দৃষ্টি ফিরে পায়; এটি কর্মফলের প্রতীক। রাজা স্বীকার করে—সে দান করেনি, বিশেষত অন্নদান ত্যাগ করেছে; রত্ন লোভে কেড়ে নিয়েছে এবং প্রজার রক্ষা অবহেলা করেছে। ব্রহ্মা ব্যাখ্যা করেন—এই দোষেই উচ্চলোকেও তার ক্ষুধা ও অন্ধত্ব জন্মায়। অগস্ত্য প্রায়শ্চিত্ত নির্দেশ করেন—রত্নখচিত কণ্ঠাভরণ ‘অন্ন-নিষ্ক্রয়’ রূপে দান, দামোদরকে কার্ত্তিকে রত্ন-দীপ অর্পণ, যম/ধর্মরাজ পূজা, তিল ও কালো ডাল দান এবং ব্রাহ্মণ-তর্পণ। এতে রাজা ক্ষুধামুক্ত ও নির্মলদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে তীর্থপ্রভাবে ব্রহ্মলোক লাভ করে। শেষে পুনরায় বলা হয়—কার্ত্তিকে এই তড়াগে স্নান করে দীপদান করলে পাপমুক্তি ও ব্রহ্মলোকে সম্মান লাভ হয়; স্থানটি আনর্ত্তীয়-তড়াগ ও বিষ্ণু-কূপিকা নামে প্রসিদ্ধ।

Rākṣasa-liṅga-pratiṣṭhā, Kuśa–Vibhīṣaṇa-saṃvāda, and the Tri-kāla Worship of Rāmeśvara
অধ্যায় ১০৪ তীর্থকথার মধ্যে শাসন ও যাত্রার এক ঘটনাকে তুলে ধরে। ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—রাক্ষসরা ভক্তিভরে যে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে, তার মাহাত্ম্য ও ফল কী। সূত বলেন, লঙ্কা থেকে আগত শক্তিশালী রাক্ষসরা হাটকেশ্বররাজ ক্ষেত্রের পশ্চিমভাগে বারবার এসে পথিক ও বাসিন্দাদের ভক্ষণ করে ভয় সৃষ্টি করছে। শরণার্থীরা অযোধ্যায় রাজা কুশকে জানায়—রাক্ষস-মন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত চতুর্মুখ লিঙ্গগুলি হিংস্র আক্রমণকে আকর্ষণ করে; এমনকি অসাবধানতাবশত পূজাও তৎক্ষণাৎ সর্বনাশ ডেকে আনে বলে লোকবিশ্বাস। ব্রাহ্মণরা কুশকে অবহেলার জন্য তিরস্কার করলে তিনি দায় স্বীকার করে বিভীষণকে কঠোর বার্তা পাঠান। দূত সেতু অঞ্চলে গিয়ে জানতে পারে সেতু ভেঙে যাওয়ায় অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। স্থানীয়রা বরং বিভীষণের কঠোর ভক্তিচর্যার কথা বলে—তিনি দিনে তিন সময়ে রামেশ্বরের তিন প্রকাশের পূজা করেন: প্রাতে দ্বার-মন্দিরে, মধ্যাহ্নে জলের মধ্যে সেতুর খণ্ডে, এবং রাত্রিতে। বিভীষণ এসে শিবের গূঢ় স্তব করেন—শিব সর্বদেবময় ও সর্বভূতে অন্তর্ব্যাপ্ত, যেমন কাঠে অগ্নি ও দইয়ে ঘি। তিনি পুষ্প, অলংকার, বাদ্যসহ বিস্তৃত পূজা করে কুশের অভিযোগ শোনেন, অজ্ঞাতে ক্ষতি হয়েছে স্বীকার করেন, অপরাধী রাক্ষসদের জেরা করে শাপে ক্ষুধার্ত ও দীন অবস্থায় নিক্ষেপ করেন এবং সংযমের প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর দূত বিপজ্জনক লিঙ্গগুলি উপড়ে ফেলার অনুরোধ করলে বিভীষণ রামের সামনে করা ব্রত ও ধর্মনিয়ম স্মরণ করান—লিঙ্গ শুভ-অশুভ যে অবস্থাতেই হোক, স্থানচ্যুত করা উচিত নয়। কুশ বাস্তবসম্মত নির্দেশ দেন: লিঙ্গ না সরিয়ে তাদের স্থান মাটি দিয়ে ভরাট/ঢেকে দিতে হবে, যাতে অমঙ্গল নিবারিত হয় এবং স্থানান্তর-নিষেধও রক্ষা পায়। তিনি শাপপ্রাপ্ত সত্তাদের জন্য শ্রাদ্ধ-অবহেলা, দানদোষ ও অনুচিত ভক্ষণ-দোষের সঙ্গে যুক্ত নৈতিক ফলও নির্দিষ্ট করেন এবং বিভীষণের কাছে কঠোর বাক্যের জন্য ক্ষমা চেয়ে বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করেন। দান, মিলন ও নিয়মিত পূজার মাধ্যমে পবিত্র ক্ষেত্র আবার স্থিত হয়।

राक्षसलिङ्गच्छेदनम् (Rākṣasa-liṅga-cchedanam) — “The Episode of the Severed/Damaged Rākṣasa Liṅgas”
সূত বলেন—তুলা রাশিতে সূর্যের অবস্থানের এক সন্ধিক্ষণে পূর্বের লিঙ্গ-প্রাকট্যযুক্ত পবিত্র ভূমি ধুলো ও পলিতে ভরে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। লিঙ্গগুলি অদৃশ্য হয়ে পড়ায় ক্ষেত্রের এক ধরনের ‘ক্ষেম’ বা নিরাপত্তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়; দৃশ্য চিহ্ন লুপ্ত হওয়ায় অন্য লোকসমূহেও শান্তি বিস্তার লাভ করে বলে বর্ণিত। পরবর্তী যুগচক্রে শাল্বদেশ থেকে রাজা বৃহদশ্ব সেখানে এসে প্রাসাদশূন্য বিস্তীর্ণ ভূমি দেখে নির্মাণের সংকল্প করেন। তিনি বহু কারিগর ডেকে গভীর খনন ও পরিষ্কারের আদেশ দেন। খননের সময় অসংখ্য চতুর্মুখ লিঙ্গ প্রকাশ পায়; সেই তেজে ভূমি পরিপূর্ণ দেখে রাজা ও উপস্থিত কারিগররা তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করেন। তারপর থেকে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রের ওই তীর্থে কেউ প্রাসাদ তো দূরের কথা, পুকুর বা কূপও খনন করতে সাহস করে না—ভয় ও ভক্তিভরে; এই নিষেধই পবিত্র বিপদের স্মৃতি হয়ে রয়ে যায়।

Luptatīrthamāhātmya-kathana (Theological Account of Lost Tīrthas)
ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—ধূলিতে আচ্ছন্ন পৃথিবী ও প্রেতদের উপদ্রবে কোন কোন তীর্থ ও লিঙ্গ ‘লুপ্ত’ (গুপ্ত/অদৃশ্য) হয়ে গেছে। সূত বলেন, অসংখ্য পবিত্র স্থান ঢেকে গেছে; তারপর প্রধান উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন চক্রতীর্থ—যেখানে বিষ্ণু চক্র স্থাপন করেছিলেন, এবং মাতৃতীর্থ—যেখানে স্কন্দ/কার্ত্তিকেয় দিব্য মাতৃশক্তিদের প্রতিষ্ঠা করেন। আরও বলা হয়, বহু রাজবংশ ও ঋষিপরম্পরার আশ্রম ও লিঙ্গও কালের প্রবাহে গুপ্ত হয়ে পড়েছে। এরপর ভূমি-ব্যবস্থাপনার সংকট দেখা দেয়—প্রেতরা ধূলিবৃষ্টি করে ভূমি ভরাট করতে চায়, কিন্তু মাতৃগণের রক্ষাশক্তিসংযুক্ত প্রবল বায়ু ধূলি উড়িয়ে দেয়। প্রেতরা রাজা কুশের শরণ নেয়; রাজা রুদ্রের আরাধনা করেন। রুদ্র জানান, এই ক্ষেত্র মাতৃগণের দ্বারা রক্ষিত; কিছু লিঙ্গ রাক্ষস-মন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত, স্পর্শ বা দর্শনও অমঙ্গলজনক—অতএব সেগুলি নিষিদ্ধ অঞ্চল। শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী প্রতিমা উপড়ানো উচিত নয়, আর লিঙ্গ স্থাবর স্বরূপ। তপস্বী ও ব্রাহ্মণদের নিরাপত্তার জন্য রুদ্র মাতৃদের বর্তমান স্থান ত্যাগ করতে বলেন। মাতৃগণ স্কন্দপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা স্মরণ করে একই ক্ষেত্রের মধ্যে সমতুল্য পবিত্র নিবাস চান। রুদ্র তাঁদের অষ্টাষষ্টি (৬৮) রুদ্রক্ষেত্রে পৃথক আবাস প্রদান করে উচ্চ পূজার আশ্বাস দেন। মাতৃরা সরে গেলে প্রেতরা অবিরাম ধূলিতে ভূমি ভরাট করে এবং রুদ্র অন্তর্ধান করেন। এটি নাগরখণ্ডের হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রমাহাত্ম্যে অধ্যায় ১০৬-এর সার।

हाटकेश्वरक्षेत्रमाहात्म्ये ब्राह्मणचित्रशर्मलिङ्गस्थापनवृत्तान्तवर्णनम् (Hāṭakeśvara-kṣetra Māhātmya: Account of Brāhmaṇa Citraśarman’s Liṅga Installation)
অধ্যায়ের শুরুতে ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—শিব-সম্পর্কিত প্রসিদ্ধ ‘অষ্টাষষ্টি’ (আটষট্টি) পবিত্র ক্ষেত্র কীভাবে এক স্থানে অবস্থান করল। সূত বর্ণনা করেন চমৎকারপুরে বসবাসকারী বৎসবংশীয় ব্রাহ্মণ চিত্রশর্মণের পূর্বজীবন। ভক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি পাতালে প্রতিষ্ঠিত বলে খ্যাত হাটকেশ্বর-লিঙ্গকে প্রকাশ করাতে/আনতে দীর্ঘ তপস্যা করেন। শিব প্রসন্ন হয়ে দর্শন দেন, বর প্রদান করেন এবং লিঙ্গ স্থাপনের নির্দেশ দেন; চিত্রশর্মণ মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ করে শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী নিত্য পূজা করেন, ফলে লিঙ্গের খ্যাতি ছড়ায় ও তীর্থযাত্রী সমাগম হয়। চিত্রশর্মণের আকস্মিক মর্যাদা দেখে অন্য ব্রাহ্মণদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জন্মায়। তারা সমমর্যাদা লাভের জন্য কঠোর তপস্যা করে, এমনকি হতাশায় অগ্নিপ্রবেশ (আত্মদাহ) করতে উদ্যত হয়। তখন শিব তাদের নিবৃত্ত করে ইচ্ছা জানতে চান; তারা চান সব ক্ষেত্র-লিঙ্গের সমষ্টি সেখানেই উপস্থিত হোক, যাতে তাদের ক্ষোভ দূর হয়। চিত্রশর্মণ আপত্তি করলে শিব মধ্যস্থতা করে বলেন—কলিযুগে তীর্থের উপর বিপদ আসবে, তাই পবিত্র ক্ষেত্রগুলি এখানে আশ্রয় নেবে; উভয় পক্ষই সম্মান পাবে। চিত্রশর্মণ শ্রাদ্ধ-তর্পণে নামোচ্চারণ-প্রথায় স্থায়ী বংশমর্যাদা লাভ করেন, আর অন্য ব্রাহ্মণরা গোত্রে গোত্রে প্রাসাদ নির্মাণ করে লিঙ্গ স্থাপন করেন; এভাবে আটষট্টি দিব্য মন্দির গড়ে ওঠে। শেষে শিব সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং স্থানটিকে ক্ষেত্রসমূহের স্থির আশ্রয় ও ‘অক্ষয়’ শ্রাদ্ধফলদায়ক বলে ঘোষণা করা হয়।

अष्टषष्टितीर्थवर्णनम् (Enumeration and Definition of the Sixty-Eight Tīrthas)
অধ্যায় ১০৮-এ ঋষিগণ কৌতূহল ও ব্যবহারযোগ্য সূচির জন্য সূতকে অনুরোধ করেন—পূর্বে উল্লিখিত ‘অষ্টষষ্টি’ ক্ষেত্র ও অন্যান্য তীর্থের নামগুলি আবার ক্রমানুসারে বলুন। সূত কৈলাসে শিব–পার্বতীর পূর্বসংলাপ অবলম্বনে ব্যাখ্যা করেন—কলিযুগে সর্বত্র অধর্ম বৃদ্ধির ফলে তীর্থসমূহ যেন পাতালে অন্তর্হিত হয়; তখন পবিত্রতার স্বরূপ ও প্রাপ্তির পথ কী—এই প্রশ্ন জাগে। শিব ‘তীর্থ’ শব্দের বিস্তৃত সংজ্ঞা দেন—মাতা-পিতা, সাধুসঙ্গ, ধর্মচিন্তা, যম-নিয়ম, এবং পুণ্যকথার শ্রবণ-স্মরণও তীর্থরূপে গণ্য। দর্শন, স্মরণ বা স্নানমাত্রেই মহাপাপ পর্যন্ত শুদ্ধ হয়—এমন তত্ত্ব ঘোষিত; তবে স্নান ভক্তিসহ একাগ্রচিত্তে, মহেশ্বর-আরাধনার উদ্দেশ্যে করতে বলা হয়েছে। শেষে সর্বভারতীয় প্রধান তীর্থ/ক্ষেত্রের নামতালিকা দেওয়া হয়, যা পরবর্তী বিশদ বর্ণনার ভিত্তি।

Tīrthas and the Kīrtana of Śiva’s Localized Names (तीर्थेषु शिवनामकीर्तनम्)
এই অধ্যায়টি শৈব সংলাপরূপে বিন্যস্ত। ঈশ্বর বলেন, তিনি ‘তীর্থসমুচ্চয়’-এর সার প্রকাশ করেছেন এবং দেবতা ও ভক্তদের কল্যাণার্থে সকল তীর্থস্থানে তিনি স্বয়ং বিরাজমান। যে মানুষ তীর্থে স্নান করে দেবদর্শন করে এবং সেই তীর্থের উপযুক্ত শিবনাম কীর্তন করে, সে মোক্ষাভিমুখ ফল লাভ করে। শ্রীদেবী প্রত্যেক তীর্থে কোন নাম জপ করতে হবে—তার পূর্ণ তালিকা প্রার্থনা করেন। তখন ঈশ্বর বহু পবিত্র স্থানকে শিবের বিশেষ নাম/রূপের সঙ্গে যুক্ত করে বলেন—যেমন বারাণসী—মহাদেব, প্রয়াগ—মহেশ্বর, উজ্জয়িনী—মহাকাল, কেদার—ঈশান, নেপাল—পশুপালক, শ্রীশৈল—ত্রিপুরান্তক ইত্যাদি। শেষে ফলশ্রুতি: এই তালিকা শ্রবণ বা কীর্তনে পাপক্ষয় হয়। জ্ঞানী সাধকরা প্রাতঃ, মধ্যাহ্ন ও সায়ং—ত্রিকালে এটি পাঠ করবেন, বিশেষত শিবদীক্ষিতরা। গৃহে লিখিতরূপে রাখলেও ভূত-প্রেতজনিত উপদ্রব, রোগ, সাপের ভয়, চোরের ভয় ও অন্যান্য অনিষ্ট নিবারিত হয়।

अष्टषष्टितीर्थमाहात्म्यवर्णनम् (Glorification of the Sixty-Eight Tīrthas; the Supreme Eightfold Tīrtha Cluster)
এই অধ্যায়ে দেবী প্রশ্ন করেন—দীর্ঘায়ু মানুষদের পক্ষেও সর্বত্র তীর্থভ্রমণ কি বাস্তবে সম্ভব? তাই তিনি তীর্থসমূহের ‘সার’ জানতে চান। ঈশ্বর উত্তর দেন যে এক অনুপম তীর্থাষ্টক আছে—নৈমিষ, কেদার, পুষ্কর, কৃমিজঙ্গল, বারাণসী, কুরুক্ষেত্র, প্রভাস ও হাটকেশ্বর—এগুলিতে শ্রদ্ধাভরে স্নান করলে সকল তীর্থের ফল লাভ হয়। দেবী কলিযুগে উপযোগিতা জানতে চাইলে ঈশ্বর হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রকে এই আটটির মধ্যে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করেন এবং বলেন, কলিযুগেও সেখানে দিব্য অনুমতিতে সকল ক্ষেত্র ও অন্যান্য তীর্থ যেন উপস্থিত থাকে। শেষে সূত ফলশ্রুতি দেন—এই সংকলন শ্রবণ বা পাঠ করলে স্নানজাত পুণ্যের সমান ফল হয়; ফলে গ্রন্থশ্রবণ-পাঠও তীর্থকর্মের সমান্তরাল পুণ্যসাধনা রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়।

दमयन्त्युपाख्याने—दमयन्त्या विप्रशापेन शिलात्वप्राप्तिः (Damayantī Episode—Petrification by a Brāhmaṇa’s Curse)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে অনুরোধ করেন—শিবক্ষেত্রসমূহের সঙ্গে যুক্ত ব্রাহ্মণদের গোত্রপরম্পরা, সংখ্যা ও বিবরণ জানাতে। সূত পূর্বোপদেশ স্মরণ করে আনর্তদেশের রাজার কাহিনি বলেন—রাজা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ছিলেন, কিন্তু শঙ্খ-তীর্থে স্নান করামাত্র তীর্থ-মাহাত্ম্য ও শিবকৃপায় তৎক্ষণাৎ আরোগ্য লাভ করেন। কৃতজ্ঞ রাজা তপস্বীদের দান দিতে চান, কিন্তু তারা অপরিগ্রহ-ব্রত পালনকারী হওয়ায় বস্তুগত উপহার গ্রহণ করেন না। তখন নীতিবাক্য প্রকাশ পায়—কৃতঘ্নতা অত্যন্ত গুরুতর দোষ, যার প্রায়শ্চিত্ত সহজ নয়। রাজা উপকারের প্রতিদান কীভাবে দেবেন তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। কার্ত্তিকে ঋষিরা পুষ্কর-যাত্রায় গেলে তিনি দময়ন্তীকে বলেন—ঋষিপত্নীদের অলংকার দান করে সেবা করো, যাতে তপস্বীদের নিয়ম ভঙ্গ না হয়। কিছু তপস্বিনী প্রতিযোগিতার বশে অলংকার গ্রহণ করে, কিন্তু চারজন গ্রহণ করেন না। ঋষিরা ফিরে এসে আশ্রমকে অলংকারে ‘বিকৃত’ দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে শাপ দেন; দময়ন্তী তৎক্ষণাৎ পাথর হয়ে যায়। রাজা শোকে ভেঙে পড়ে ক্ষমা ও সমাধানের পথ খোঁজেন। শিক্ষা এই—ভক্তিভাবে দেওয়া দানও যদি আসক্তি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ব্রতভঙ্গ ঘটায়, তবে তা ধর্মসীমা অতিক্রম করে অধর্মে পরিণত হয়।

Ūṣarotpatti-māhātmya (The Māhātmya of the Origin of the Barren Tract) — Damayanty-upākhyāna Continuation
এই অধ্যায়ে সূতবর্ণনার কাঠামোর মধ্যে নীতি ও তত্ত্বের সুসংবদ্ধ আলোচনা দেখা যায়। আটষট্টি ক্লান্ত ব্রাহ্মণ তপস্বী পদব্রজে ফিরে এসে দেখেন তাঁদের স্ত্রীগণ দিব্য বস্ত্র ও অলংকারে সজ্জিত। ক্ষুধার্ত ও বিচলিত হয়ে তাঁরা জিজ্ঞাসা করেন—তপস্যার শুচিতার বিরুদ্ধে এ সাজসজ্জা কীভাবে? স্ত্রীগণ বলেন, রানি দময়ন্তী রাজপৃষ্ঠপোষকের ন্যায় এসে এই বস্ত্রালংকার দান করেছেন। তপস্বীরা ‘রাজ-প্রতিগ্রহ’কে বিশেষ দোষ মনে করে ক্রোধে হাতে জল নিয়ে রাজা ও রাজ্যকে শাপ দিতে উদ্যত হন। তখন স্ত্রীগণ পাল্টা যুক্তি দেন—গৃহস্থাশ্রমও ‘উত্তম’ পথ, যা ইহলোক-পরলোক উভয়ের কল্যাণসাধক; দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য স্মরণ করিয়ে তাঁরা রাজার কাছে ভূমি ও জীবিকার ব্যবস্থা দাবি করেন, নচেৎ আত্মহানির হুমকি দেন, যার পাপফল ঋষিদের উপর পড়বে। এ কথা শুনে ঋষিরা শাপের জল মাটিতে ফেলে দেন; সেই জল ভূমির একাংশ দগ্ধ করে স্থায়ী লবণাক্ত ঊষর প্রদেশ সৃষ্টি করে, যেখানে শস্য জন্মায় না এবং জন্মও হয় না বলা হয়েছে। শেষে ফলশ্রুতি—ফাল্গুন মাসে রবিবারযুক্ত পূর্ণিমায় সেখানে শ্রাদ্ধ করলে, নিজকর্মদোষে ঘোর নরকে পতিত পিতৃগণও উদ্ধার লাভ করেন।

अग्निकुण्डमाहात्म्यवर्णनम् (Agni-kuṇḍa Māhātmya: Account of the Glory of the Fire-Pond) — त्रिजातकविशुद्धये (for the purification/verification regarding Trijāta)
এই অধ্যায়ে সূত মুনি বহু-দৃশ্যের ধর্মকথা বর্ণনা করেন। প্রথমে এক রাজা গৃহস্থাশ্রমে প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মণদের কাছে শ্রদ্ধাভরে গিয়ে তাঁদের অনুরোধে দুর্গবেষ্টিত বসতি নির্মাণ করেন, বাসস্থান ও দান-ভোগের ব্যবস্থা করেন এবং রক্ষা-পোষণের মাধ্যমে সমাজে স্থিতি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর কাহিনি আনর্তদেশের রাজা প্রভঞ্জনের পূর্বপ্রসঙ্গে যায়। রাজপুত্রের জন্মকালে জ্যোতিষীরা অশুভ গ্রহদোষ নির্ণয় করে ষোলো ব্রাহ্মণ দ্বারা বারংবার শান্তিকর্মের বিধান দেন। কিন্তু আচার সম্পন্ন হলেও রোগ, পশুহানি ও রাজ্যসঙ্কট বাড়তে থাকে। তখন অগ্নিদেব মানবাকারে প্রকাশ হয়ে জানান—যজ্ঞে ‘ত্রিজাত’ (বিতর্কিত/অন্যজন্ম) ব্রাহ্মণের উপস্থিতিতে কর্ম কলুষিত হয়েছে। সরাসরি দোষারোপ এড়াতে অগ্নি নিজের স্বেদজল থেকে একটি কুণ্ড সৃষ্টি করে ষোলো জনকে সেখানে স্নান করান; যে অশুদ্ধ, তার দেহে ফুসকুড়ি/বিস্ফোটকের চিহ্ন ফুটে ওঠে। এরপর চুক্তি স্থির হয়—এই অগ্নিকুণ্ড ব্রাহ্মণদের শুদ্ধি-পরীক্ষার স্থায়ী তীর্থ হবে; অযোগ্য স্নানকারী চিহ্নিত হবে এবং স্নানজনিত দৃশ্যমান শুদ্ধির দ্বারা সামাজিক ও যাজ্ঞিক বৈধতা নির্ণীত হবে। শেষে রাজা যথাযথ শুদ্ধিতে তৎক্ষণাৎ আরোগ্য লাভ করেন; কার্ত্তিক-স্নান প্রভৃতির দ্বারা পাপক্ষয় ও নির্দিষ্ট দোষমোচনের ফলশ্রুতি ঘোষিত হয়।

नगरसंज्ञोत्पत्तिवर्णनम् / Origin Narrative of the Name “Nagara” (Hāṭakeśvara-kṣetra Māhātmya)
সূত বলেন—মাতৃ-দোষজনিত সামাজিক লাঞ্ছনায় দগ্ধ ব্রাহ্মণ তপস্বী ত্রিজাত জলস্রোতের নিকটে কঠোর তপস্যা ও শিব-আরাধনা করেন, যাতে তাঁর মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ভগবান শিব প্রসন্ন হয়ে দর্শন দেন এবং বর দেন—ভবিষ্যতে তিনি চামৎকারপুরের ব্রাহ্মণসমাজে উচ্চ আসন লাভ করবেন। এরপর চামৎকারপুরে দেবরাতের পুত্র ক্রথ অহংকার ও তাড়নায় শ্রাবণ কৃষ্ণ-পঞ্চমীতে নাগ-তীর্থের কাছে রুদ্রামালা নামক এক নাগশিশুকে আঘাত করে হত্যা করে। নাগশিশুর পিতা-মাতা ও সমগ্র নাগসমাজ সমবেত হয়; শेषনাগের নেতৃত্বে প্রতিশোধ নিয়ে তারা ক্রথকে গ্রাস করে এবং নগর ধ্বংস করে দেয়। অঞ্চল জনশূন্য হয়ে নাগদের আবাসে পরিণত হয়, মানুষের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। ভীত ব্রাহ্মণরা ত্রিজাতের শরণ নেয়। ত্রিজাত শিবের কাছে নাগবিনাশ প্রার্থনা করলে শিব নির্বিচার দণ্ডে অসম্মতি জানান—নির্দোষ নাগশিশুর হত্যা এবং শ্রাবণ-পঞ্চমীতে নাগপূজার ধর্মবিধির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেন। পরিবর্তে তিনি সিদ্ধ মন্ত্র প্রদান করেন—“ন গরং ন গরং” (ত্র্যক্ষর); এর উচ্চারণে বিষ প্রশমিত হয় এবং সাপ দূরে সরে যায়, যারা থাকে তারা দুর্বল হয়ে বশীভূত হয়। ত্রিজাত অবশিষ্ট ব্রাহ্মণদের সঙ্গে ফিরে মন্ত্র ঘোষণা করলে নাগরা পালায় বা দমন হয়, নগর পুনরুজ্জীবিত হয়। তখন থেকেই স্থানটি “নগরা” নামে খ্যাত হয়। ফলশ্রুতি—এই কাহিনি পাঠ করলে সাপজনিত ভয় দূর হয়।

त्रिजातेश्वरस्थापनं गोत्रसंख्यानकं च (Establishment of Trijāteśvara and the Enumeration of Gotras)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে ত্রিজাত সম্পর্কে প্রশ্ন করেন—তার নাম, উৎপত্তি, গোত্র এবং ‘ত্রিজাত’ বলে চিহ্নিত হয়েও কেন তিনি আদর্শ। সূত বলেন, তিনি সাঙ্কৃত্য ঋষির বংশধারায় জন্মেছেন; তাঁর খ্যাত নাম প্রভাব, ‘দত্ত’ নামেও তিনি পরিচিত, এবং নিমির বংশের সঙ্গে তাঁর যোগ আছে। ত্রিজাত সেই তীর্থস্থানকে উন্নীত করে শিবের মঙ্গলময় মন্দির ‘ত্রিজাতেশ্বর’ স্থাপন করেন; অবিরত পূজায় তিনি দেহসহ স্বর্গ লাভ করেন। এরপর বিধান বলা হয়—যারা ভক্তিভরে দেবদর্শন করে এবং বিষুবকালে দেবের স্নান করায়, তাদের বংশে ‘ত্রিজাত’ জন্মের পুনরাবৃত্তি হয় না এবং তারা রক্ষিত থাকে। পরে আলোচনা যায় হারিয়ে যাওয়া ও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত গোত্রসমূহের দিকে। ঋষিরা গোত্রগুলির নাম জানতে চাইলে সূত কৌশিক, কাশ্যপ, ভারদ্বাজ, কৌণ্ডিন্য, গর্গ, হারীত, গৌতম প্রভৃতি বহু গোত্রগোষ্ঠীর গণনা করেন; নাগজের ভয়ে পূর্বের বিচ্ছিন্নতা এবং এই স্থানে পুনরায় সমবেত হওয়ার কথা বলেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—এই গোত্রবিবরণ ও ঋষিনাম-স্মরণ পাঠ বা শ্রবণ করলে বংশচ্ছেদ রোধ হয়, জীবনপর্যায়ে সঞ্চিত পাপ প্রশমিত হয় এবং প্রিয়বিচ্ছেদ দূর হয়।

अम्बरेवती-माहात्म्य (Ambarevatī Māhātmya): स्थापना, शाप-वर, नवमी-पूजा-फल
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে প্রসিদ্ধ দেবী অম্বারেবতীর উৎপত্তি, স্বরূপ ও পূজার ফল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। সূত নাগদের নগর-ধ্বংসের নির্দেশ এবং তাতে শোকাকুল রেবতীকে (শেষের প্রিয়া) বর্ণনা করেন। পুত্রহত্যার প্রতিশোধে রেবতী এক ব্রাহ্মণ-গৃহ গ্রাস করে; তখন সেই ব্রাহ্মণের তপস্বিনী ভগিনী ভাট্টিকা শাপ দেন—রেবতীকে নিন্দিত মানবজন্ম, স্বামী ও বংশগত দুঃখ ভোগ করতে হবে। রেবতীর তপস্বিনীকে আঘাত করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়; বিষদাঁতও বিদ্ধ করতে পারে না—তপোবল প্রকাশ পায়। অন্য নাগরাও ব্যর্থ হয়ে ভয়ে সরে যায়। মানবগর্ভধারণ ও নাগরূপ হারানোর আশঙ্কায় ব্যথিত রেবতী সেই ক্ষেত্রেই থেকে অম্বিকাকে গন্ধ-পুষ্প, নৈবেদ্য, গান-বাদ্য ও ভক্তিতে পূজা করেন। দেবী বর দেন—রেবতীর মানবজন্ম হবে দিব্য উদ্দেশ্যে, তিনি পুনরায় রামরূপ শেষের পত্নী হবেন, তাঁর দাঁত ফিরে আসবে, এবং তাঁর নামে পূজা করলে কল্যাণ হবে। রেবতী সেই স্থানে নিজের নামে স্থায়ী অধিষ্ঠান চান এবং নাগ-সম্পর্কিত পূজা নিয়মিত করার সংকল্প করেন, বিশেষত আশ্বিন শুক্লপক্ষের মহানবমীতে। শেষে ফলশ্রুতি—শুদ্ধচিত্তে ও শ্রদ্ধায় বিধিপূর্বক অম্বারেবতী পূজা করলে এক বছর পর্যন্ত কুলজাত বিপদ দূরে থাকে এবং গ্রহ, ভূত, পিশাচাদি বাধা নাশ হয়।

भट्टिकोपाख्यानम् (Bhaṭṭikā’s Legend) and the Origin of a Tīrtha at Kedāra
এই অধ্যায়ে প্রশ্নোত্তর রীতিতে ধর্মতত্ত্বের আলোচনা হয়। ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—ভট্টিকার দেহ থেকে বিষধর সাপের দংশনদাঁত কেন ঝরে পড়ল, এর কারণ তপস্যা না মন্ত্র? সূত বলেন, ভট্টিকা অল্পবয়সে বিধবা হয়ে কেদারে নিত্য ভক্তিসাধনা করতেন এবং প্রতিদিন দেবতার সামনে সুমধুর গান গাইতেন। তাঁর গানের সৌন্দর্য-ভক্তিশক্তিতে আকৃষ্ট হয়ে তক্ষক ও বাসুকি ব্রাহ্মণবেশে আসেন; পরে তক্ষক ভয়ংকর নাগরূপে তাঁকে পাতালে অপহরণ করে। ভট্টিকা নীতিবোধ ও আত্মসংযমে কোনো জবরদস্তি মানেননি; শর্তযুক্ত অভিশাপ উচ্চারণ করলে তক্ষককে সমঝোতার পথ নিতে হয়। ঈর্ষান্বিত নাগপত্নীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে; রক্ষাবিদ্যা প্রয়োগ করা হয় এবং এক নাগিনীর দংশনে তার দাঁত ঝরে যায়—এটাই প্রথম প্রশ্নের কারণ। ভট্টিকা আক্রমণকারিণীকে অভিশাপে মানবী করেন এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেন—তক্ষক সৌরাষ্ট্রে রাজরূপে জন্ম নেবে, আর ভট্টিকা পরে ‘ক্ষেমংকারী’ নামে মানবজন্ম নিয়ে তার সঙ্গে পুনর্মিলিত হবেন। কেদারে ফিরে এলে সমাজ তাঁর শুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ করে। ভট্টিকা স্বেচ্ছায় অগ্নিপরীক্ষায় প্রবেশ করেন; আগুন জল হয়ে যায়, ফুলবৃষ্টি হয়, এবং দিব্যদূত তাঁকে নিষ্কলঙ্ক ঘোষণা করে। শেষে তাঁর নামে একটি তীর্থ প্রতিষ্ঠিত হয়; বিষ্ণুর শয়ন/বোধন ব্রতে সেখানে স্নানকারীদের উচ্চ আধ্যাত্মিক ফলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ভট্টিকা তপস্যা-উপাসনা অব্যাহত রেখে ত্রিবিক্রম মূর্তি ও পরে মহেশ্বর লিঙ্গ এবং মন্দির স্থাপন করেন।

Kṣemaṅkarī–Raivateśvara Utpatti and Hāṭakeśvara-kṣetra Māhātmya (क्षेमंकरी-रैवतेश्वर-उत्पत्तितीर्थमाहात्म्यवर्णन)
ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—সৌরাষ্ট্র/আনর্ত-সম্পর্কিত এই রাজবৃত্তান্তের উৎস কী, এবং হিমালয়-প্রসঙ্গে কেদার-সদৃশ পবিত্রতা কীভাবে প্রকাশ পেল। সূত বলেন ক্ষেমঙ্করীর জন্ম ও নামকরণের কথা—কলহ ও নির্বাসনের সময় রাজ্যে ‘ক্ষেম’ অর্থাৎ মঙ্গল-কল্যাণের উদয় হওয়ায় তাঁর নাম হয় ক্ষেমঙ্করী। এরপর রাজা রৈবত ও ক্ষেমঙ্করীর দাম্পত্যজীবন বর্ণিত—সমৃদ্ধি ছিল, কিন্তু সন্তান না থাকায় বংশধারা ও জীবনের অর্থ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দেয়। তাঁরা মন্ত্রীদের হাতে রাজ্যভার দিয়ে তপস্যায় প্রবৃত্ত হন, কাত্যায়নী (মহিষাসুরমর্দিনী) দেবীর প্রতিষ্ঠা ও পূজা করেন; দেবী বর দিয়ে ক্ষেমজিত নামে পুত্র প্রদান করেন, যিনি বংশবর্ধক ও শত্রুদমনকারী। পুত্রকে রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করে রৈবত হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে গিয়ে আসক্তি ত্যাগ করেন এবং শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে মন্দিরসমূহ নির্মাণ করেন। সেই লিঙ্গ ‘রৈবতেশ্বর’ নামে খ্যাত হয়; কেবল দর্শনেই ‘সর্বপাপকনাশন’ বলা হয়েছে। ক্ষেমঙ্করী সেখানে পূর্বপ্রতিষ্ঠিত দুর্গার জন্যও মন্দির নির্মাণ করেন; দেবী ক্ষেমঙ্করী নামে প্রসিদ্ধ হন। চৈত্র শুক্ল অষ্টমীতে দেবীদর্শনে ইষ্টসিদ্ধি লাভ হয়—এই বিধানসহ অধ্যায়টি তীর্থমাহাত্ম্য ও ভক্তিধর্মের নির্দেশ দিয়ে সমাপ্ত।

Mahīṣa-śāpa, Hāṭakeśvara-kṣetra-tapas, and the Tīrtha-Phala Discourse (महिषशाप-हाटकेश्वरक्षेत्रतपः-तीर्थफलप्रसङ्गः)
অধ্যায়ের শুরুতে ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—দেবী কাত্যায়নী কেন মহিষাসুরকে বধ করলেন, আর সেই অসুর কীভাবে মহিষরূপ ধারণ করল। সূত বলেন, ‘চিত্রসম’ নামে এক সুদর্শন ও বীর দৈত্য মহিষে আরোহনের প্রতি আসক্ত হয়ে অন্য বাহন ত্যাগ করে। জাহ্নবী নদীর তীরে মহিষে চড়ে ঘুরতে গিয়ে তার মহিষ ধ্যানস্থ মুনিকে পদদলিত করে, ফলে মুনির সমাধি ভঙ্গ হয়। ক্রুদ্ধ মুনি তাকে শাপ দেন—জীবনকাল জুড়ে সে মহিষই থাকবে। শাপমোচনের উপায় জানতে সে শুক্রাচার্যের শরণ নেয়। শুক্র তাকে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে মহেশ্বরের একনিষ্ঠ ভক্তি ও তপস্যার নির্দেশ দেন—এই ক্ষেত্র প্রতিকূল যুগেও সিদ্ধিদায়ক বলে বর্ণিত। দীর্ঘ তপস্যায় শিব প্রসন্ন হয়ে দর্শন দেন; শাপ সম্পূর্ণ উঠবে না, তবে শিব ‘সুখোপায়’ দেন—বহুবিধ ভোগ ও সত্তা তার দেহে এসে মিলিত হবে। অজেয়তার বর শিব দেন না; শেষে দৈত্য প্রার্থনা করে—শুধু নারীর হাতেই যেন তার মৃত্যু হয়। শিব তীর্থস্নান-দর্শনের ফলও বলেন—শ্রদ্ধায় স্নান ও দর্শনে সর্বার্থসিদ্ধি, বিঘ্ননাশ, তেজবৃদ্ধি হয়; জ্বর-ব্যাধি প্রশমিত হয়। এরপর দৈত্য দানবদের একত্র করে দেবতাদের আক্রমণ করে। দীর্ঘ স্বর্গীয় যুদ্ধে ইন্দ্রের সেনা দুর্বল হয়ে সরে যায়, অমরাবতী কিছু সময় শূন্য থাকে। দানবরা প্রবেশ করে উৎসব করে ও যজ্ঞভাগ দখল করে। শেষে মহালিঙ্গ প্রতিষ্ঠা ও কৈলাসসদৃশ মন্দির-নির্মাণের উল্লেখে ক্ষেত্রের তীর্থমাহাত্ম্য আরও দৃঢ় হয়।

कात्यायनी-प्रादुर्भावः (Manifestation of Kātyāyanī and the Devas’ Armament Bestowal)
সূত বললেন—শক্র (ইন্দ্র)-প্রধান দেবগণ যুদ্ধে পরাজিত হলে অসুর মহিষ ত্রিলোকে আধিপত্য স্থাপন করে। সে যা কিছু উৎকৃষ্ট—বাহন, ধন, রত্ন ও প্রিয় সম্পদ—সব কেড়ে নিয়ে বিশ্বে অরাজকতা ও অধর্ম বাড়ায়। দেবতারা তার বধের উপায় ভাবতে সমবেত হন; তখন নারদ এসে মহিষের নিপীড়ন, লুণ্ঠন ও অত্যাচারের বিস্তারিত সংবাদ দেন, ফলে দেবদের ক্রোধ আরও তীব্র হয়। সেই ক্রোধ থেকে এমন দাহক তেজ উৎপন্ন হয় যে দিকসমূহ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। তখন কার্ত্তিকেয় (স্কন্দ) এসে কারণ জিজ্ঞাসা করলে নারদ অসুরদের উন্মত্ত অহংকার ও পরসম্পদ-হরণের কথা জানান। দেবগণ ও স্কন্দের সম্মিলিত ক্রোধ-তেজের পরিণতিতে শুভলক্ষণযুক্ত এক দীপ্তিময় কন্যা আবির্ভূত হন; কারণবশত তাঁর নাম হয় ‘কাত্যায়নী’। দেবতারা তাঁকে বজ্র, শক্তি, ধনুক, ত্রিশূল, পাশ, বাণ, কবচ, খড়্গ প্রভৃতি সর্বাস্ত্র ও রক্ষাসামগ্রী প্রদান করেন। তিনি দ্বাদশভুজা হয়ে অস্ত্র ধারণ করে দেবদের আশ্বাস দেন যে তিনি তাদের উদ্দেশ্য সাধন করবেন। দেবরা বলেন—মহিষ কোনো প্রাণীর দ্বারা, বিশেষত পুরুষের দ্বারা, অজেয়; কেবল এক নারীর হাতেই তার বধ সম্ভব, তাই এই কন্যার প্রকাশ। এরপর তাঁকে বিন্ধ্য পর্বতে কঠোর তপস্যার জন্য প্রেরণ করা হয়, তেজবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে; পরে তাঁকে অগ্রে স্থাপন করে মহিষবধ ও দেবাধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশা করা হয়।

महिषासुरपराजय–कात्यायनीमाहात्म्यवर्णनम् (Defeat of Mahīṣa and the Māhātmya of Kātyāyanī/Vindhyavāsinī)
এই অধ্যায়ে সূত বিন্ধ্যপর্বতে সংঘটিত দেবীচরিত বর্ণনা করেন। দেবী ইন্দ্রিয়সংযমে মহেশ্বরকে ধ্যান করে কঠোর তপস্যা করেন; তপস্যা যত বৃদ্ধি পায়, ততই তাঁর তেজ ও সৌন্দর্য উজ্জ্বল হয়। এই অলৌকিক তপস্বিনী কন্যাকে দেখে মহিষাসুরের গুপ্তচররা সংবাদ দেয়। কামে মোহিত মহিষাসুর সেনাসহ এসে রাজ্যদানের প্রলোভন ও বিবাহপ্রস্তাব দিয়ে দেবীকে প্রলুব্ধ করতে চায়, কিন্তু দেবী তাঁর দিব্য উদ্দেশ্য—অসুরের উপদ্রব নিবারণ—স্পষ্ট করে দেন। এরপর যুদ্ধ শুরু হয়। দেবী বাণবৃষ্টিতে অসুরসেনাকে ছত্রভঙ্গ করেন, মহিষকে আঘাত করেন এবং ভয়ংকর হাস্যে সহায়ক যোদ্ধাদল প্রকাশ করেন, যারা দানববল ধ্বংস করে। মহিষাসুর সরাসরি আক্রমণ করলে দেবী যুদ্ধে তার উপর আরূঢ় হয়ে সিংহের সাহায্যে তাকে স্থির করে দেন; দেবতারা তৎক্ষণাৎ বধের অনুরোধ করেন। দেবী খড়্গে তার স্থূল গ্রীবা ছেদন করে দেবলোককে সন্তুষ্ট করেন। পরে এক নীতিগত টানাপোড়েন দেখা দেয়—মহিষ দেবীর স্তব করে শাপমুক্তির কথা বলে করুণা প্রার্থনা করে। দেবতারা বিশ্ববিপদের সতর্কতা দেন। দেবী তাকে পুনরায় হত্যা না করে চিরকাল দমনাধীন রাখার সিদ্ধান্ত নেন। দেবতারা দেবীর ‘বিন্ধ্যবাসিনী/কাত্যায়নী’ নামে ভবিষ্যৎ খ্যাতি ও বিশেষত আশ্বিন শুক্লপক্ষে পূজাবিধান বলেন, যাতে রক্ষা, স্বাস্থ্য ও সিদ্ধি লাভ হয়। শেষে জগতের শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপিত হয় এবং পরবর্তী রাজভক্তি ও দর্শনোৎসবের ফলশ্রুতি উল্লেখিত হয়।

केदार-प्रादुर्भावः (Kedāra Manifestation and the Kuṇḍa Rite)
অধ্যায় ১২২ সূত–ঋষি সংলাপরূপে রচিত; পূর্বের দানব-বধের প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে কেদার-কেন্দ্রিক পাপ-নাশিনী কাহিনি বর্ণিত হয়। ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—হিমালয়ে গঙ্গাদ্বারের নিকটে শ্রুত কেদার কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হল। সূত বলেন, শিবের ঋতুচক্র অনুযায়ী তিনি দীর্ঘকাল হিমালয় অঞ্চলে অবস্থান করেন, কিন্তু তুষারাবৃত মাসে স্থানটি অগম্য হয়ে পড়ে; তাই অন্যত্রও তাঁর উপস্থিতি ও পূজার ব্যবস্থা নির্ধারিত। পুরাকথায় ইন্দ্র হিরণ্যাক্ষ দানব ও তার সহচরদের দ্বারা পদচ্যুত হয়ে গঙ্গাদ্বারে তপস্যা করেন। শিব মহিষরূপে আবির্ভূত হয়ে ইন্দ্রের প্রার্থনা গ্রহণ করেন এবং প্রধান দানবদের সংহার করেন; তাদের অস্ত্র শিবকে আঘাত করতে পারে না। ইন্দ্রের অনুরোধে শিব লোকরক্ষার্থে সেই রূপেই অবস্থান করেন এবং স্ফটিক-স্বচ্ছ এক কুণ্ড প্রতিষ্ঠা করেন। শুদ্ধ ভক্ত কুণ্ড দর্শন করে নির্দিষ্ট হাত/দিক-বিন্যাসে তিনবার জল পান করে এবং মাতৃ-পিতৃ-বংশ ও আত্ম-সম্পর্কিত মুদ্রার দ্বারা দেহক্রিয়াকে দেববিধির সঙ্গে সংযুক্ত করে। ইন্দ্র নিয়ত পূজা স্থাপন করেন, দেবতার নাম ‘কেদার’ রাখেন (বিদারণ/ছেদন অর্থে) এবং এক মনোরম মন্দির নির্মাণ করেন। এরপর হিমালয়ে চার মাস পথ বন্ধ থাকলে—সূর্য বৃশ্চিক থেকে কুম্ভে থাকা পর্যন্ত—শিব আনর্ত দেশের হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে অবস্থান করেন; সেখানে রূপ-প্রতিষ্ঠা, মন্দির নির্মাণ ও নিয়মিত পূজার বিধান দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, চার মাসের উপাসনা শিবসান্নিধ্য দেয়; ঋতুর বাইরে ভক্তিও পাপ নাশ করে; বিদ্বানেরা গান-নৃত্যে স্তব করেন। নারদ-উদ্ধৃত শ্লোকে কেদার-জলপান ও গয়ায় পিণ্ডদানকে ব্রহ্মজ্ঞান ও পুনর্জন্ম-মুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; শ্রবণ, পাঠ বা পাঠ করানোও পাপরাশি নাশ করে বংশোদ্ধার করে।

शुक्लतीर्थमाहात्म्य — The Glory of Śuklatīrtha (Purificatory Water-Site)
এই অধ্যায়ে সূত মুনি শ্বেত দর্ভ-চিহ্নিত অতুলনীয় শুক্লতীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। চামৎকারপুরের নিকটে এক রজক, প্রধান ব্রাহ্মণদের বস্ত্র-ধৌতকারী, ভুলক্রমে মূল্যবান ব্রাহ্মণবস্ত্র নীলীকুণ্ডী/নীলীর রং-পুকুরে ফেলে দেয়। দণ্ড (বন্ধন/মৃত্যু) আশঙ্কায় সে রাত্রে পালাতে উদ্যত হয়; তখন তার কন্যা দাশ-কন্যা সখীর কাছে গিয়ে অপরাধ স্বীকার করে, এবং সখী তাকে নিকটবর্তী দুর্লভ-প্রবেশ্য এক জলাশয়ের কথা বলে। রজক সেখানে বস্ত্র ধুতে মাত্রই সেগুলি স্ফটিকের মতো শ্বেত হয়ে যায়, আর স্নান করলে তার কালো চুলও সাদা হয়ে ওঠে। সে শুদ্ধ বস্ত্র ব্রাহ্মণদের ফিরিয়ে দেয়; ব্রাহ্মণরা পরীক্ষা করে দেখেন—অন্ধকার পদার্থ ও কেশও শ্বেত হয়, এবং বিশ্বাসসহ স্নান করলে বৃদ্ধ-যুবা সকলেই বল ও মঙ্গল লাভ করে। পরে বলা হয়, মানুষের অপব্যবহারের ভয়ে দেবতারা তীর্থকে ধূলায় ঢাকতে চাইলেও সেখানে যা জন্মায় তা জলশক্তিতে শ্বেতই হয়। তীর্থের মৃৎ-লেপ ও স্নান সর্বতীর্থ-স্নানের ফল দেয়; দর্ভ ও বন-তিল দিয়ে তর্পণ করলে পিতৃগণ তুষ্ট হন এবং তা মহাযজ্ঞ/শ্রাদ্ধসম ফলপ্রদ বলা হয়েছে। শেষে তত্ত্ব ব্যাখ্যা—বিষ্ণু শ্বেতদ্বীপকে এখানে স্থাপন করেছেন, যাতে কলিযুগের প্রভাবেও এই শ্বেততা নষ্ট না হয়।

मुखारतीर्थोत्पत्तिवर्णनम् (Origin Narrative of Mukharā Tīrtha)
এই অধ্যায়ে সূত মুখরা-তীর্থের উৎপত্তিকথা নীতিশিক্ষাসহ বর্ণনা করেন। মুখরাকে ‘শ্রেষ্ঠ তীর্থ’ বলা হয়েছে, যেখানে তীর্থযাত্রায় আগত সপ্তর্ষি (মরীচি প্রমুখ) এক দস্যুর মুখোমুখি হন। সে লোহমজঙ্ঘ—মাণ্ডব্য বংশীয় ব্রাহ্মণ, পিতা-মাতা ও স্ত্রীর প্রতি ভক্ত; কিন্তু দীর্ঘ খরায় দুর্ভিক্ষ নেমে এলে প্রাণরক্ষার তাগিদে চুরির পথে যায়। গ্রন্থে ক্ষুধাজনিত আতঙ্ককে দুষ্কৃতির সঙ্গে এক করে দেখা হয় না, তবু চুরিকে নিন্দনীয় কর্ম বলা হয়েছে। সপ্তর্ষিদের দেখে লোহমজঙ্ঘ তাদের ভয় দেখায়; ঋষিরা করুণাভরে তাকে কর্মফলের দায় স্মরণ করিয়ে দেন এবং বলেন—পরিবার কি তার পাপের অংশ নেবে, তা জিজ্ঞাসা করতে। সে পিতা, মাতা ও স্ত্রীকে প্রশ্ন করলে তারা জানায়—কর্মফল প্রত্যেকে নিজেই ভোগ করে, অন্য কেউ ভাগ নেয় না। এতে তার অনুতাপ জাগে এবং সে উপদেশ প্রার্থনা করে। পুলহ ঋষি তাকে ‘জাটঘোটেতি’ মন্ত্র দেন; সে অবিরাম জপ করতে করতে গভীর সমাধিতে নিমগ্ন হয় এবং তার দেহ উইপোকার ঢিবি (বল্মীক) দিয়ে আবৃত হয়ে যায়। পরে ঋষিরা ফিরে এসে তার সিদ্ধি উপলব্ধি করেন; বল্মীকের সঙ্গে যোগে তার নাম হয় ‘বাল্মীকি’, এবং সেই স্থান মুখরা-তীর্থ নামে প্রসিদ্ধ হয়। শেষে ফলশ্রুতি—শ্রাবণ মাসে শ্রদ্ধায় সেখানে স্নান করলে চুরিজনিত পাপ ক্ষয় হয়; তীর্থে অধিষ্ঠিত সিদ্ধপুরুষের ভক্তিতে কাব্যশক্তি বৃদ্ধি পায়, বিশেষত অষ্টমী তিথিতে।

सत्यसन्धनृपतिवृत्तान्तवर्णनम् — The Account of King Satyasaṃdha (and the Karṇotpalā/Gartā Tīrtha Frame)
সূত কর্ণোৎপলা-তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন—এটি প্রসিদ্ধ পবিত্র স্থান, যেখানে স্নান করলে মানবজীবনে ‘বিয়োগ’ বা বিচ্ছেদের আশঙ্কা প্রশমিত হয়। এরপর কাহিনি ইক্ষ্বাকু-বংশীয় রাজা সত্যসন্ধ ও তাঁর অসাধারণ গুণবতী কন্যা কর্ণোৎপলার দিকে যায়। উপযুক্ত মানব বর না পেয়ে রাজা ব্রহ্মার পরামর্শ নিতে ব্রহ্মলোকে গমন করেন; সেখানে ব্রহ্মার সন্ধ্যা-সময় অতিক্রান্ত হলে তিনি তত্ত্বসম্মত উত্তর পান—অতিদীর্ঘ কাল অতিবাহিত হওয়ায় কন্যার বিবাহ আর করা উচিত নয়, এবং দেবগণ মানবীকে পত্নী রূপে গ্রহণ করেন না। ফিরে এসে রাজা ও কন্যা কাল-বিচ্যুতি অনুভব করেন—বার্ধক্য আসে, সমাজ তাঁদের চিনতে পারে না; এতে পুরাণীয় সময়-ধারণা ও জাগতিক মর্যাদার ক্ষণস্থায়িত্ব প্রকাশ পায়। তাঁরা গর্তা-তীর্থ/প্রাপ্তিপুরের নিকটে পৌঁছালে স্থানীয় প্রথা ও পরবর্তীকালে রাজা বৃহদ্বল তাঁদের বংশপরিচয় স্বীকার করেন। সত্যসন্ধ ব্রাহ্মণদের জন্য উঁচু বসতি/ভূমি দান করে স্থায়ী ধর্মখ্যাতি বিস্তারের সংকল্প করেন, তারপর হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে পূর্বপ্রতিষ্ঠিত, ঋষভনাথ-সম্পর্কিত লিঙ্গের পূজা করে তপস্যা করেন; কর্ণোৎপলাও তপ করে গৌরীভক্তি প্রতিষ্ঠা করেন। অধ্যায়ের শেষে দানকৃত বসতি থেকে জীবিকার প্রশ্ন ও রাজার বৈরাগ্য-সীমা উল্লেখ করে দান, পৃষ্ঠপোষকতা ও তপোধর্মের নীতিবোধ দৃঢ় করা হয়।

मर्यादास्थापनम्, गर्तातीर्थद्विज-नियुक्तिः, तथा कार्तिक-लिङ्गयात्रा (Establishment of Communal Boundaries, Appointment of Gartātīrtha Brahmins, and the Kārttika Liṅga Procession)
সূত বর্ণনা করেন—চমৎকারপুর-সম্পর্কিত ব্রাহ্মণেরা এমন এক রাজার কাছে আসেন, যিনি যুদ্ধবল ত্যাগ করেছেন এবং সন্দেহ-দ্বন্দ্ব ও বিবাদের মধ্যে পরাজয়ের মুখে। তারা জানায়, অহংকার ও মিথ্যা মর্যাদা-দাবির ফলে সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে; তাই তাদের প্রথাগত জীবিকা-অনুদান (বৃত্তি) রক্ষা এবং স্থিতিশীল নিয়ম-মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। রাজা চিন্তা করে গর্তাতীর্থজাত, বিদ্বান ও বংশপরম্পরায় যুক্ত ব্রাহ্মণদের নিয়োগ করেন—তারা শাসক-প্রশাসক ও বিচারক হিসেবে মর্যাদা রক্ষা করবে, সংশয় দূর করবে, বিবাদ মীমাংসা করবে এবং রাজকার্যে সিদ্ধান্ত দেবে; সমাজের বৃদ্ধির জন্য ঈর্ষাহীনভাবে তাদের ভরণপোষণও করা হবে। ফলে নগরে ধর্মবর্ধক সীমা-মর্যাদা স্থাপিত হয় এবং সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে রাজা তপস্যার দ্বারা স্বর্গারোহণের কথা ঘোষণা করে নিজের বংশ-সম্পর্কিত এক লিঙ্গ প্রকাশ করেন এবং তার পূজা, বিশেষত রথযাত্রা, ব্রাহ্মণদের দ্বারা সম্পাদনের অনুরোধ করেন। ব্রাহ্মণেরা সম্মতি দিয়ে বলেন—এটি পূর্বে পূজিত ২৭ লিঙ্গের পর ২৮তম লিঙ্গ; কার্ত্তিক মাসে প্রতি বছর নৈবেদ্য, বলি, বাদ্য ও পূজা-সামগ্রীসহ বিধিপূর্বক আচার পালন করতে হবে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—যারা শ্রদ্ধায় কার্ত্তিক জুড়ে স্নান/অভিষেক করে পূজা করে, অথবা এক বছর ধরে সোমবারে বিধিপূর্বক পূজা করে, তারা মুক্তি লাভ করে।

कर्णोत्पलातीर्थमाहात्म्यवर्णनम् (Glorification of Karnotpalā Tīrtha)
ঋষিরা পূর্বে উল্লিখিত কর্ণোৎপলার সম্পূর্ণ কাহিনি জানতে চান। সূত বলেন—গৌরীর চরণ-সম্পর্কিত স্থানে তপস্যারত সেই নারীর ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে দেবী গিরিজা দর্শন দেন এবং বর চাইতে বলেন। কর্ণোৎপলা জানায়—তার পিতা রাজলক্ষ্মীচ্যুত হয়ে শোকে ও বৈরাগ্যে দিন কাটাচ্ছেন; আর সে নিজে বার্ধক্যে পৌঁছেও অবিবাহিতা। তাই সে অতুল সুন্দর স্বামী ও পুনর্যৌবন প্রার্থনা করে, যাতে পিতাও সুখ ফিরে পান। দেবী বিধান দেন—মাঘ মাসের তৃতীয়া তিথিতে, শনিবারে, বাসুদেব-সম্পর্কিত নক্ষত্রে পবিত্র জলে স্নান করে সৌন্দর্য ও যৌবনের ধ্যান করতে হবে; সেই দিনে যে কোনো নারী স্নান করলে অনুরূপ সৌন্দর্য লাভ করে। নির্দিষ্ট সময়ে কর্ণোৎপলা মধ্যরাতে জলে প্রবেশ করে দিব্য দেহ ও যৌবন নিয়ে উঠে আসে; দর্শকেরা বিস্মিত হয়। গৌরীর প্রেরণায় কামদেব (মনোভব) তাকে পত্নী হিসেবে চাইতে আসেন এবং বলেন—প্রেমসহ আগমনের কারণে তার নাম হবে “প্রীতি”। কর্ণোৎপলা অনুরোধ করে, তিনি যেন আগে পিতার কাছে বিধিপূর্বক প্রার্থনা করেন। সে নিজে পিতাকে তপস্যা ও গৌরী-কৃপায় প্রাপ্ত যৌবনের কথা জানিয়ে বিবাহের অনুমতি চায়। পরে কামদেব প্রার্থনা করলে পিতা অগ্নিকে সাক্ষী করে ব্রাহ্মণদের উপস্থিতিতে কন্যাদান করেন। সে “প্রীতি” নামে প্রসিদ্ধ হয় এবং তীর্থও তার নামেই খ্যাত হয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—মাঘ মাসে স্নান করলে প্রয়াগের ফল মেলে; মানুষ রূপবান ও সক্ষম হয় এবং আত্মীয়-বিচ্ছেদের দুঃখ ভোগ করে না।

Aṭeśvarotpatti-māhātmya (Origin and Glory of Aṭeśvara) | अटेश्वरोत्पत्तिमाहात्म्य
এই অধ্যায়ে পরস্পর-সংযুক্ত দুইটি ঘটনা বর্ণিত। প্রথমে সত্যসন্ধ লিঙ্গের দক্ষিণভাগের কাছে যোগাসনে বসে প্রাণসংহার করেন। ব্রাহ্মণেরা অন্ত্যেষ্টির আয়োজন করতে এলে দেহ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়; এতে সকলের বিস্ময় জাগে এবং লিঙ্গের পূজা-নিয়ম আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ক্ষেত্রকে নিত্য বরদাতা ও ভক্তদের পাপ-মল নাশকারী বলা হয়েছে। পরবর্তী অংশে বংশ দুর্বল হওয়ায় রাজাহীন অবস্থায় “মৎস্য-ন্যায়”সদৃশ অরাজকতার আশঙ্কা মন্ত্রী ও ব্রাহ্মণেরা প্রকাশ করেন। সত্যসন্ধ রাজকার্যে পুনঃপ্রবেশে অসম্মতি জানিয়ে পূর্বদৃষ্টান্তভিত্তিক যজ্ঞীয় সমাধান দেন—পরশুরামের ক্ষত্রিয়-সংহারের পরে ক্ষত্রিয়-পত্নীরা সন্তানলাভে ব্রাহ্মণদের আশ্রয় নিয়েছিল এবং ‘ক্ষেত্রজ’ রাজাদের জন্ম হয়েছিল। এরপর বশিষ্ঠ-কুণ্ড নামক বিশেষ সন্তানদায়ী তীর্থের কথা বলা হয়, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে স্নান করলে গর্ভধারণ ঘটে। শেষে প্রসিদ্ধ রাজা অট (অটোন) জন্মগ্রহণ করেন; রাজপথে গমনকালে দিব্য আকাশবাণী তার নামের ব্যাখ্যা দেয়। অট অটেশ্বর-লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন; মাঘ চতুর্দশীতে পূজা ও সন্তানদায়ী কুণ্ডে স্নানকে সন্তানসুখ ও মঙ্গললাভের কার্যকর উপায় বলা হয়েছে।

याज्ञवल्क्यसमुद्रव-आश्रममाहात्म्य (The Māhātmya of Yājñavalkya’s Sacred Water-Site and Āśrama)
সূত যাজ্ঞবল্ক্য-সম্পর্কিত এক প্রসিদ্ধ আশ্রম ও পবিত্র জলতীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন, যা অশিক্ষিতেরও সিদ্ধিলাভ ঘটায় বলে খ্যাত। ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—যাজ্ঞবল্ক্যের পূর্বগুরু কে, এবং কীভাবে বেদ হরণ হয়ে পরে পুনরুদ্ধার হল। সূত শাকল্য নামক বিদ্বান ব্রাহ্মণ আচার্য ও রাজপুরোহিতের পরিচয় দিয়ে রাজসভায় ঘটে যাওয়া এক ঘটনার কথা বলেন, যেখানে রাজশান্তির জন্য যাজ্ঞবল্ক্যকে পাঠানো হয়। রাজা তাঁকে অনুপযুক্ত অবস্থায় দেখে আশীর্বাদ গ্রহণে অস্বীকার করে এবং পবিত্র জল কাঠের স্তম্ভে নিক্ষেপ করতে আদেশ দেয়। যাজ্ঞবল্ক্য বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে জল নিক্ষেপ করলে মুহূর্তে স্তম্ভে পাতা-ফুল-ফল ফুটে ওঠে—মন্ত্রশক্তির প্রকাশ এবং রাজার বিধিজ্ঞানহীনতার উন্মোচন। রাজা অভিষেক চাইলে যাজ্ঞবল্ক্য বলেন, যথাযথ হোম ও বিধি ছাড়া মন্ত্রফল সিদ্ধ হয় না—তাই তিনি অভিষেক করবেন না। শাকল্য পুনরায় রাজদরবারে যেতে জোর করলে যাজ্ঞবল্ক্য ধর্মনীতি স্মরণ করিয়ে দেন—অহংকারী ও কর্তব্যবিমূঢ় গুরুকে ত্যাগ করা যায়। ক্রুদ্ধ শাকল্য অথর্বণ মন্ত্র ও জলের দ্বারা শিক্ষিত বিদ্যার প্রতীকী ত্যাগ করান; যাজ্ঞবল্ক্য স্বাধীনতা ঘোষণা করে অর্জিত জ্ঞান ত্যাগ করেন। পরে সিদ্ধিক্ষেত্র অনুসন্ধানে তাঁকে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে পাঠানো হয়, যেখানে ফল অন্তঃকরণের ভাব অনুযায়ী হয়; সেখানে তিনি তপস্যা ও সূর্যোপাসনা করেন। ভাস্কর প্রসন্ন হয়ে বর দেন—এক কুণ্ডে সরস্বতীসম মন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়; স্নান ও জপে বেদবিদ্যা তৎক্ষণাৎ ধারণ হয় এবং তত্ত্বার্থ কৃপায় স্পষ্ট হয়। যাজ্ঞবল্ক্য মানবগুরু-বন্ধন থেকে মুক্তি চাইলে সূর্য তাঁকে লঘিমা-সিদ্ধি দিয়ে ‘বাজিকর্ণ’ দিব্য অশ্বরূপের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বেদশিক্ষা গ্রহণের নির্দেশ দেন। শেষে ফলশ্রুতি—তীর্থস্নান, সূর্যদর্শন ও নির্দিষ্ট ‘নাদবিন্দু’ জপ মোক্ষাভিমুখ সিদ্ধি দান করে।

Kātyāyanī–Śāṇḍilī Upadeśa and the Hāṭakeśvara-kṣetra Tṛtīyā Vrata (कात्यायनी-शाण्डिली-उपदेशः)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে যাজ্ঞবল্ক্যের পারিবারিক প্রসঙ্গ জিজ্ঞাসা করেন। সূত তাঁর দুই পত্নী—মৈত্রেয়ী ও কাত্যায়নী—এর নাম বলেন এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত দুই তীর্থ/কুণ্ডের কথা জানান, যেখানে স্নান করলে মঙ্গলফল লাভ হয় বলে বর্ণিত। মৈত্রেয়ীর প্রতি যাজ্ঞবল্ক্যের আসক্তি দেখে কাত্যায়নীর সপত্নী-দুঃখ জাগে; তিনি স্নান, আহার ও হাসি থেকে বিমুখ হয়ে শোকে নিমগ্ন হন। প্রতিকার খুঁজতে তিনি দাম্পত্য-সৌহার্দের আদর্শ শাণ্ডিলীর কাছে গোপন উপদেশ চান—যাতে স্বামীর স্নেহ ও সম্মান লাভ করা যায়। শাণ্ডিলী কুরুক্ষেত্রে নিজের পটভূমি বলে নারদের নির্দেশিত ব্রত জানান—হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে গৌরী-সম্পর্কিত পঞ্চপিণ্ড পূজা এক বছর অবিচল শ্রদ্ধায় করতে হবে, বিশেষত তৃতীয়া তিথিতে। দেবী-দেব সংলাপে শিবের শিরে গঙ্গাধারণের লোকরক্ষাকারী কারণও ব্যাখ্যা করা হয়—বৃষ্টি, কৃষি, যজ্ঞ ও বিশ্ব-সমতার ধারাবাহিকতা এতে প্রতিষ্ঠিত।

Īśānotpatti–Pañcapīṇḍikā-Gaurī Māhātmya and Vararuci-sthāpita Gaṇapati Māhātmya (ईशानोत्पत्तिपंचपिंडिकागौरीमाहात्म्य–वररुचिस्थापितगणपतिमाहात्म्य)
এই অধ্যায়ে সন্ধ্যা-উপাসনার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও এক স্থানীয় ব্রত-পরম্পরা একসূত্রে গাঁথা। শিব বলেন—সন্ধ্যাকালে কিছু বৈরী সত্তা সূর্যকে আচ্ছন্ন করে; সাবিত্রী-মন্ত্রসহ অর্ঘ্যরূপ জল নিক্ষেপ করলে তা দিব্য অস্ত্রের মতো তাদের দূর করে, ফলে সন্ধ্যা-জলদানের ধর্মযুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ‘সন্ধ্যা’ দেবীরূপে শিবের প্রণাম দেখে পার্বতী দুঃখিত হয়ে ব্রতসংকল্প করেন; শিবের সূক্ষ্ম মন্ত্রজ্ঞান ও ঈশানমুখী পূজার দ্বারা শেষে মিলন ও শান্তি ঘটে। পরে গৌরীর পঞ্চপিণ্ডময় (পাঁচ পিণ্ড) রূপের বিধিবদ্ধ পূজাপথ বলা হয়েছে—বিশেষত তৃতীয়া তিথিতে, এক বছর পর্যন্ত। এতে দাম্পত্যসুখ, ইষ্টবরলাভ, সন্তানপ্রাপ্তি হয়; আর নিষ্কামভাবে করলে উচ্চ আধ্যাত্মিক সিদ্ধি লাভ হয়। নারদ–শাণ্ডিল্য–সূত মারফত কাহিনি প্রবাহিত; কাত্যায়নী একবর্ষ ব্রত করে যাজ্ঞবল্ক্যকে স্বামী হিসেবে পান এবং গুণবান পুত্র প্রসব করেন। শেষে বররুচি-স্থাপিত গণপতির মাহাত্ম্য বলা হয়েছে—তাঁর পূজা বিদ্যা, অধ্যয়ন ও বৈদিক পারদর্শিতা বৃদ্ধি করে।

वास्तुपदोत्पत्तिमाहात्म्यवर्णनम् (Vāstupada-Utpatti Māhātmya: The Glory of the Origin of Vāstupada)
এই অধ্যায়টি প্রশ্নোত্তরধর্মী ধর্মকথা। ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—কাত্যায়নের সঙ্গে যুক্ত তীর্থ পূর্বে কেন বলা হয়নি এবং সেই মহাত্মা কী পবিত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সূত বলেন, কাত্যায়ন ‘বাস্তুপদ’ নামে এক তীর্থ প্রতিষ্ঠা করেন, যা সর্বকামপ্রদ; সেখানে নির্দিষ্ট দেবসমষ্টি (ত্রিচল্লিশ ও আরও পাঁচ) পূজার বিধান আছে। এরপর উৎপত্তিকথা—পৃথিবী থেকে এক ভয়ংকর সত্তা উদ্ভূত হয়, শুক্রাচার্যের উপদেশে প্রাপ্ত দৈত্য-মন্ত্রবল দ্বারা সে অবধ্য হয়ে ওঠে। দেবতারা তাকে আঘাত করতে পারেন না এবং বিপদে পড়েন। তখন বিষ্ণু নিয়ম-বন্ধনের দ্বারা তাকে বশ করেন: তার দেহে যেখানে যেখানে দেবতা অবস্থান করেন, সেখানে পূজা করলে সে তুষ্ট হয়; পূজা অবহেলা করলে মানুষের অনিষ্ট ঘটে। শান্ত হলে ব্রহ্মা তার নাম ‘বাস্তু’ রাখেন এবং বিষ্ণু বিশ্বকর্মাকে পূজাবিধি সংহত করতে আদেশ দেন। যাজ্ঞবল্ক্যের পুত্র হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে এই বিধি অনুসারে আশ্রমস্থল স্থাপনের জন্য বিশ্বকর্মাকে অনুরোধ করেন। বিশ্বকর্মা নির্দেশমতো বাস্তুপূজা করে স্থান প্রতিষ্ঠা করেন; কাত্যায়ন লোকহিতার্থে এই আচার বিস্তার করেন। শেষে বলা হয়—এই ক্ষেত্রের সংস্পর্শে পাপক্ষয় হয় এবং গৃহদোষ, শিল্পদোষ, কুপদ, কুবাস্তু নাশ হয়; বৈশাখ শুক্ল তৃতীয়া, রোহিণী নক্ষত্রে যথাবিধি পূজায় সমৃদ্ধি ও রাজ্যলাভ হয়।

अजागृहोत्पत्तिमाहात्म्यवर्णनम् | Ajāgṛhā: Origin Narrative and Site-Glory
অধ্যায় ১৩৩ হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে অজাগৃহা তীর্থের উৎপত্তি ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করে। সূত মুনি বলেন, অজাগৃহা নামক দেবতা/দেবী দুঃখ-ক্লেশ ও রোগ হ্রাসে প্রসিদ্ধ। এক ব্রাহ্মণ তীর্থযাত্রী ক্লান্ত হয়ে ছাগলের পালের কাছে বিশ্রাম নেয়; পরে জেগে উঠে রাজযক্ষ্মা, কুষ্ঠ ও পামা—এই তিন রোগে আক্রান্ত হয়। তখন এক দীপ্তিমান পুরুষ আবির্ভূত হয়ে নিজেকে রাজা অজ (অজপাল) বলে পরিচয় দেন এবং জানান, ছাগল-রূপে প্রতীকিত ক্লেশগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে তিনি লোককে রক্ষা করেন। রোগেরা বলে, তাদের মধ্যে দু’টি ব্রহ্মশাপে আবদ্ধ, তাই সাধারণ মন্ত্র-ঔষধে সহজে নিবারণ হয় না; তৃতীয়টি মন্ত্র ও ঔষধে প্রশমিত হতে পারে। তারা আরও সতর্ক করে যে ঐ স্থানের মাটির স্পর্শেও অনুরূপ কষ্ট সংক্রমিত হতে পারে। তখন রাজা দীর্ঘ হোম ও ভক্তিকর্ম করেন—অথর্ববেদীয় জপ, ক্ষেত্রপাল ও বাস্তুস্তবসহ—এবং ভূমি থেকে ক্ষেত্রদেবতা প্রকাশিত হন। দেবতা স্থানকে রোগদোষমুক্ত ঘোষণা করে প্রতিকার-ক্রম নির্দেশ দেন: দেবতার পূজা, চন্দ্রকূপিকা ও সৌভাগ্যকূপিকায় স্নান, খণ্ডশিলা দর্শন/সন্নিকট গমন, এবং রবিবার অপ্সরাসাং কুণ্ডে স্নান করে পামা শান্ত করা। ব্রাহ্মণ বিধি পালন করে ধীরে ধীরে আরোগ্য লাভ করে ফিরে যায়; শেষে বলা হয়, নিয়ম ও ভক্তিসহকারে সেখানে পূজা করলে অজাগৃহা সদা ফল প্রদান করেন।

खण्डशिलासौभाग्यकूपिकोत्पत्तिमाहात्म्यवर्णनम् | Origin-Glory of Khaṇḍaśilā and the Saubhāgya-Kūpikā
অধ্যায় ১৩৪ শ্রীহাটকেশ্বর-ক্ষেত্র/কামেশ্বরপুরের পবিত্র প্রেক্ষাপটে সূত–ঋষি সংলাপরূপে বর্ণিত। ঋষিরা কামদেবের কুষ্ঠরোগের কারণ এবং দুই স্থানীয় পবিত্র চিহ্ন—শিলাখণ্ডা/খণ্ডশিলা দেবী ও সৌভাগ্য-কূপিকা—এর উৎপত্তি জানতে চান। সূত হরীত নামক ব্রাহ্মণ তপস্বীর কাহিনি বলেন: তাঁর অতিশয় পতিব্রতা স্ত্রী কামবাণে ক্ষণিক মানসে বিচলিত হলে হরীত ধর্ম-ন্যায়ে শাপ দেন—কামদেব কুষ্ঠ ও লোকবিমুখতায় আক্রান্ত হন, আর স্ত্রী শিলারূপে পরিণত হন। এরপর পাপের ত্রিবিধতা (মানসিক, বাচিক, কায়িক) ব্যাখ্যা করে মনকেই মূল দায়ের উৎস বলা হয়েছে। কামদেব দুর্বল হওয়ায় প্রজনন ও সংসারধারা ব্যাহত হলে দেবতারা প্রতিকার চান। খণ্ডশিলার পূজা, স্নান এবং সংশ্লিষ্ট জলস্থানে স্পর্শাদি আচারের বিধান দেওয়া হয়; ফলে সেই তীর্থ চর্মরোগনাশক ও সৌভাগ্যদায়ক হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়। শেষে ত্রয়োদশীতে খণ্ডশিলা ও কামেশ্বরের ব্রতসদৃশ পূজার কথা বলা হয়েছে—অপবাদ থেকে রক্ষা, রূপ-লাবণ্য/ভাগ্য পুনরুদ্ধার এবং গৃহকল্যাণের ফলপ্রাপ্তি।

दीर्घिकातीर्थमाहात्म्य — The Glory of Dīrghikā Tīrtha and the Pativratā Narrative
Sūta describes a celebrated lake named Dīrghikā, renowned as a destroyer of sins. Bathing there at sunrise on the fourteenth lunar day (caturdaśī) of the bright fortnight of Jyeṣṭha is presented as especially efficacious for release from sins. The chapter then narrates an exemplum: a learned brāhmaṇa, Vīraśarman, has a daughter marked by unusual bodily proportions, leading to social rejection due to a stated social-ritual fear regarding marriage. She adopts severe austerities and regularly attends Indra’s assembly, where a purity-related sprinkling of her seat prompts her inquiry; Indra explains a perceived impurity due to remaining unmarried despite reaching maturity and advises marriage to restore ritual acceptability. She publicly seeks a husband; a brāhmaṇa afflicted with leprosy agrees to marry her on the condition of lifelong obedience. After marriage, he requests bathing in sixty-eight tīrthas; she constructs a portable hut and carries him on her head across pilgrimage sites, and his body gradually regains radiance. Exhausted at night near the Hāṭakeśvara region, she accidentally disturbs the impaled sage Māṇḍavya, who curses that her husband will die at sunrise; she counters with a truth-act (satya) that the sun will not rise if her husband must die. The sun’s rise is halted, producing social and cosmic disruption: criminals and libertines rejoice, while ritualists and devas suffer due to suspended yajña and dharmic routines. Devas petition Sūrya, who cites fear of the pativratā’s power; they negotiate with the woman, offering compensations. She permits sunrise; her husband dies upon sun-contact but is revived by the devas and restored to youthful form, and she too is transformed into an idealized youthful figure. Māṇḍavya is released from suffering, and the episode concludes as a demonstration of tīrtha merit, satya potency, and the theological valuation of pativratā-dharma within a sacred-geographic frame.

दीर्घिकोत्पत्तिमाहात्म्यवर्णनम् (The Māhātmya of the Origin of Dīrghikā)
এই অধ্যায়ে কর্মফল ও ন্যায়বিচারের অনুপাত নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা আছে। মাণ্ডব্য ঋষি দীর্ঘকাল মৃত্যু না এসে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করে ধর্মরাজকে নিজের দুঃখের নির্দিষ্ট কারণ জিজ্ঞাসা করেন। ধর্মরাজ বলেন—পূর্বজন্মে শিশুকালে মাণ্ডব্য একটি বক (পাখি)কে ধারালো শূলে বিদ্ধ করেছিল; সেই ক্ষুদ্র কর্মের ফলেই বর্তমান যন্ত্রণা। মাণ্ডব্য শাস্তিকে অসামঞ্জস্য মনে করে ধর্মরাজকে শাপ দেন—তিনি শূদ্রযোনিতে জন্ম নিয়ে সামাজিক কষ্ট ভোগ করবেন; তবে শাপ সীমাবদ্ধ—সে জন্মে সন্তান হবে না, পরে তিনি আবার নিজের পদ ফিরে পাবেন। প্রতিকারও বলা হয়—এই ক্ষেত্রেই ত্রিলোচন শিবের উপাসনা করলে ধর্মরাজ দ্রুত মুক্তিরূপ মৃত্যু লাভ করবেন। দেবতারা আরও বর প্রার্থনা করে শূলিকাকে পবিত্র স্পর্শবস্তু করেন—ভোরে স্পর্শ করলেই পাপমোচন। এক পতিব্রতা নারী অনুরোধ করেন, খননকৃত পুকুর/খাত যেন তিন লোকেই ‘দীর্ঘিকা’ নামে প্রসিদ্ধ হয়; দেবগণ বর দেন এবং বলেন, প্রাতে সেখানে স্নান করলে তৎক্ষণাৎ পাপ নাশ হয়। শেষে কালনির্দেশ—সূর্য কন্যারাশিতে থাকাকালে পঞ্চমী তিথিতে দীর্ঘিকাস্নান করলে বন্ধ্যাত্ব দূর হয়ে সন্তানলাভ হয়। পরে সেই পতিব্রতা নিজের তীর্থে ভক্তি স্থাপন করেন, আর ফলশ্রুতিতে বলা হয়—দীর্ঘিকার মাহাত্ম্য কেবল শ্রবণ করলেও পাপমুক্তি হয়।

माण्डव्य-मुनिशूलारोपण-प्रसङ्गः (Mandavya Muni and the Episode of Impalement)
ঋষিরা জিজ্ঞাসা করলেন—মহাতপস্বী মাণ্ডব্য মুনিকে কোন পরিস্থিতিতে শূলায় (খুঁটিতে বিদ্ধ করে) আরোপ করা হয়েছিল? সূত বললেন—তীর্থযাত্রায় রত মাণ্ডব্য গভীর শ্রদ্ধায় এই পুণ্যভূমিতে এসে বিশ্বামিত্র-পরম্পরাসংযুক্ত এক মহাপবিত্র তীর্থে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি পিতৃ-তর্পণ করেন এবং সূর্যব্রত পালন করে ‘বিভ্রাট্’ ধ্বনিযুক্ত ভাস্করপ্রিয় স্তোত্র জপ করতে থাকেন। এ সময় এক চোর লোপত্র (গাঁটরি) চুরি করে লোকের তাড়া খেয়ে নীরব মুনিকে দেখে তাঁর কাছে গাঁটরিটি ফেলে গুহায় লুকিয়ে পড়ে। তাড়াকারীরা এসে মুনির সামনে গাঁটরি দেখে চোর কোন পথে পালাল জিজ্ঞাসা করে। মাণ্ডব্য চোরের অবস্থান জানলেও মৌনব্রতের কারণে কিছু বলেন না। লোকেরা বিবেচনা না করে তাঁকেই ছদ্মবেশী চোর মনে করে বনাঞ্চলে দ্রুত শূলায় আরোপ করে। এই বর্ণনা পূর্বকর্মবিপাকের কঠোর ফলকে নির্দেশ করে—বর্তমানে নির্দোষ হলেও কর্মের গতি গূঢ়; পাশাপাশি নৈতিক বিচার, ব্রতশৃঙ্খলা ও কারণ-কার্যের জটিলতা নিয়ে ধর্মচিন্তা জাগায়।

धर्मराजेश्वरोत्पत्तिवर्णनम् (Origin Account of Dharmarāja’s Manifestation as Vidura)
ঋষিগণ সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—মাণ্ডব্য মুনির শাপ নিবারণের জন্য ধর্মরাজ কী তপস্যা ও ধ্যানচর্চা করেছিলেন। সূত বলেন—শাপে ব্যথিত ধর্মরাজ এক পুণ্যক্ষেত্রে তপস্যা করেন এবং কপর্দিন (শিব)-এর জন্য মন্দির-প্রাসাদসদৃশ স্থান স্থাপন করে ফুল, ধূপ ও চন্দন-লেপে ভক্তিভরে পূজা করেন। মহাদেব প্রসন্ন হয়ে বর দিতে উদ্যত হন। ধর্মরাজ নিবেদন করেন—নিজ ধর্ম পালন করেও তিনি শূদ্রযোনিতে জন্মের শাপে আবদ্ধ; এতে দুঃখ ও জ্ঞাতি-নাশের আশঙ্কা। শিব বলেন—ঋষিবাক্য অটল; তুমি শূদ্রযোনিতে জন্মাবে, কিন্তু সন্তান উৎপন্ন হবে না। আত্মীয়ক্ষয় দেখলেও তুমি শোকে ভেঙে পড়বে না, কারণ তারা তোমার নিষেধ মানবে না—তাই শোকের ভারও লঘু হবে। এরপর বলা হয়—শত বছর তুমি ধর্মপরায়ণ থেকে আত্মীয়দের কল্যাণে বহু উপদেশ দেবে, তারা শ্রদ্ধাহীন ও নীতিভ্রষ্ট হলেও। শত বছর শেষে ব্রহ্মদ্বার দিয়ে দেহ ত্যাগ করে মোক্ষ লাভ করবে। শেষে সূত জানান—এটাই ধর্মরাজের বিদুররূপে অবতরণ; ব্যাস (পারাশর্য)-এর ব্যবস্থায় দাসীর গর্ভে জন্ম নিয়ে মাণ্ডব্যের বাক্য সত্য হয়। এই কাহিনি শ্রবণে পাপনাশ হয়।

धर्मराजेश्वर-माहात्म्य (Dharmarājeśvara Māhātmya) — The Glory of Dharmarājeśvara and the Hāṭakeśvara-kṣetra Liṅga
সূত ধর্মরাজ (যম)-সম্পর্কিত এক প্রসিদ্ধ পবিত্র কাহিনি বলেন। কাশ্যপবংশীয় বিদ্বান ব্রাহ্মণ-উপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ পুত্রের মৃত্যু হলে শোক ও ক্রোধে তিনি যমলোকে গিয়ে কঠোর শাপ দেন—যম ‘পুত্রহীন’ হবেন, লোকপূজা ক্ষীণ হবে, এবং শুভকর্মে যমের নাম উচ্চারণ করলে বিঘ্ন ঘটবে। কর্তব্য পালন করলেও যম ব্রহ্মশাপের ভয়ে ব্যাকুল হয়ে ব্রহ্মার শরণ নেন; ইন্দ্রও বলেন, মৃত্যু নির্ধারিত সময়েই ঘটে, তাই এমন উপায় চাই যাতে যমের কাজও চলে এবং লোকদোষও না লাগে। ব্রহ্মা শাপ নিবারণ করতে না পেরে এক ব্যবস্থা করেন—ব্যাধি/রোগসমূহকে প্রকাশ করে নির্ধারিত সময়ে প্রাণহরণের দায় দেন, যাতে যমের ওপর জনরোষ না পড়ে। যম হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে ‘উত্তম লিঙ্গ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা সর্বপাপ-নাশক; যে ভক্ত প্রাতে দর্শন করে, তাকে যমদূত পরিহার করবে। পরে যম ব্রাহ্মণের পুত্রকে ব্রাহ্মণবেশে ফিরিয়ে দিয়ে মিলন ঘটান। ব্রাহ্মণ শাপ শিথিল করেন—যমের এক দেবজ পুত্র ও এক মানবজ পুত্র হবে, যে মহারাজযজ্ঞ দ্বারা যমকে ‘উদ্ধার’ করবে; পূজা থাকবে, তবে পূর্ব বৈদিক উচ্চারণের বদলে মানব-উদ্ভূত মন্ত্রে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, নির্দিষ্ট মন্ত্রে যমপ্রতিমা পূজা বিশেষত পঞ্চমীতে করলে এক বছর পুত্রশোক থেকে রক্ষা হয়; পঞ্চমীর জপ অপমৃত্যু ও পুত্রশোক নাশ করে।

धर्मराजपुत्राख्यानवर्णनम् | Account of Dharmarāja’s Son (Yudhiṣṭhira) and Pilgrimage-Linked Merit
অধ্যায়টি প্রশ্ন–উত্তরের ধারায় এগোয়। ঋষিরা ধর্মরাজ (যম)-সম্পর্কিত মানবাবতার পুত্রের কথা জিজ্ঞাসা করলে সূত বলেন—তিনি পাণ্ডুর বংশ/ক্ষেত্রে জন্ম নেওয়া যুধিষ্ঠির, ক্ষত্রিয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও ধর্মনিষ্ঠ। তাঁর আদর্শ রাজধর্মের দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়—পূর্ণ দক্ষিণাসহ রাজসূয় যজ্ঞ এবং পাঁচটি অশ্বমেধ যজ্ঞ তিনি সম্পূর্ণভাবে সম্পন্ন করেছিলেন, ফলে তিনি যজ্ঞ-সম্পূর্ণতা ও ধর্মময় রাজত্বের প্রতীক। এরপর একটি মূল্যায়নমূলক নীতি বলা হয়—পুত্র বহু কাম্য হলেও পিতার কর্তব্য-পরিতৃপ্তির জন্য এক পুত্রই যথেষ্ট, যদি সে গয়া গিয়ে পিতৃকর্ম করে, অথবা অশ্বমেধ সম্পন্ন করে, অথবা নীলবৃষ (নীল রঙের ষাঁড়) মুক্ত/উৎসর্গ করে। সূত এই কথাকে ধর্মবৃদ্ধিকারী উপদেশ বলে সমাপ্ত করেন, যেখানে রাজধর্মের আদর্শ ও তীর্থ-সংযুক্ত পুণ্যের গুরুত্ব একত্রে প্রতিপাদিত।

मिष्टान्नदेश्वरमाहात्म्य (Glory of Miṣṭānneśvara, the ‘Giver of Sweet Food’)
সূত বলেন, হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে ‘মিষ্টান্নদেশ্বর’ নামে এক দেবতা বিরাজমান; তাঁর কেবল দর্শনেই মিষ্টান্ন (মধুর ও পুষ্টিকর অন্ন) লাভ হয় বলে কথিত। আনর্ত দেশের রাজা বসুসেন রত্ন, যানবাহন ও বস্ত্র ইত্যাদি দানে অতি উদার ছিলেন, বিশেষত সংক্রান্তি, ব্যতীপাত ও গ্রহণের মতো পুণ্যকালে; কিন্তু অন্ন ও জলের দানকে তুচ্ছ ভেবে অবহেলা করতেন। মৃত্যুর পরে দানফলে স্বর্গে গিয়েও তিনি তীব্র ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর হন এবং স্বর্গকেই নরকসম মনে করে ইন্দ্রের শরণ নেন। ইন্দ্র ধর্মের হিসাব বোঝান—ইহলোক ও পরলোকে স্থায়ী তৃপ্তির জন্য নিয়মিতভাবে যথাযথ পাত্র ও কালে অন্ন-জল দান অপরিহার্য; অন্য দানের প্রাচুর্য তার বিকল্প নয়। বসুসেনের মুক্তি নির্ভর করে পুত্র সত্যসেনের দ্বারা পিতার নামে অন্ন-জল দানের উপর, কিন্তু প্রথমে সে তা করে না। নারদ এসে সব জেনে পৃথিবীতে গিয়ে সত্যসেনকে উপদেশ দেন; সত্যসেন ব্রাহ্মণদের মিষ্টান্ন ভোজন করায় এবং বিশেষত গ্রীষ্মে জলবিতরণের ব্যবস্থা স্থাপন করে। এরপর বারো বছরের ভয়ংকর অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, দানকর্ম ব্যাহত হয়; স্বপ্নে পিতা অন্ন-জল অর্পণের অনুরোধ করেন। সত্যসেন শিবপূজা করে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে, ব্রত-নিয়মে সাধনা করে; শিব প্রসন্ন হয়ে প্রচুর বৃষ্টি ও অন্নোৎপাদনের বর দেন এবং ঘোষণা করেন—প্রভাতে সেই লিঙ্গ দর্শন করলে অমৃতসম মিষ্টান্ন লাভ হবে, আর নিষ্কাম ভক্ত শূলিন (শিব)-এর ধাম প্রাপ্ত হবে; কলিযুগেও এই মহিমা কার্যকর।

Heramba–Gaṇeśa Prādurbhāva and the Triple Gaṇapati: Svargada, Mokṣada, and Martyadā
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—স্থানীয়ভাবে প্রসিদ্ধ “ত্রিবিধ গণপতি” কেন পূজিত, যার ফল ক্রমান্বয়ে স্বর্গপ্রদান, মোক্ষসাধনায় সহায়তা, এবং মর্ত্যজীবনকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা। শুরুতে গণেশকে বিঘ্নহর্তা ও বিদ্যা-যশ প্রভৃতি পুরুষার্থদাতা রূপে বর্ণনা করা হয়। পরে মানব-আকাঙ্ক্ষার তিন ভাগ—উত্তম (মোক্ষপ্রার্থী), মধ্যম (স্বর্গ ও সূক্ষ্ম ভোগপ্রার্থী), অধম (ইন্দ্রিয়বিষয়ে আসক্ত)—উপস্থাপন করে “মর্ত্যদা” গণপতি কেন কাম্য, সেই প্রশ্ন ওঠে। সূত দেবসংকটের কাহিনি বলেন: তপস্যাসিদ্ধ মানুষের স্বর্গাগমন বেড়ে দেবতারা চাপ অনুভব করেন, ইন্দ্র শিবের শরণ নেন। পার্বতী গজমুখ, চতুর্ভুজ ও বিশেষ লক্ষণযুক্ত গণেশরূপ নির্মাণ করে স্বর্গ/মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে যজ্ঞাদি কর্মে প্রবৃত্তদের জন্য বিঘ্ন সৃষ্টির দায়িত্ব দেন—এখানে বিঘ্নকে বিশ্ব-নিয়ন্ত্রণের ধর্মরূপে ব্যাখ্যা করা হয়। বহু গণ তাঁর অধীনে স্থাপিত হয়, এবং দেবতারা অস্ত্র, অক্ষয় পাত্র, বাহন, জ্ঞান-বুদ্ধি-শ্রী-তেজ-প্রভা প্রভৃতি বর দান করেন। শেষে ক্ষেত্রের তিন প্রতিষ্ঠা বলা হয়—ঈশান-সম্পর্কিত মোক্ষদ গণপতি (ব্রহ্মবিদ্যা-সাধকদের জন্য), স্বর্গদ্বারপ্রদ হেরম্ব (স্বর্গকামীদের জন্য), এবং মর্ত্যদা গণপতি যিনি স্বর্গচ্যুতদের নীচ যোনিতে পতন থেকে রক্ষা করেন। ফলশ্রুতিতে শুদ্ধ মাঘ চতুর্থীতে পূজায় এক বছর বিঘ্ননিবারণ এবং এই কাহিনি শ্রবণে প্রতিবন্ধকতা নাশের কথা বলা হয়েছে।

जाबालिक्षोभण-नाम अध्यायः (Chapter on the Disturbance of Jābāli) / Jābāli’s Temptation and the Local Merit of Cītreśvara
সূত বলেন—চিত্রপীঠের মধ্যভাগে অবস্থিত দেবতা শ্রী চিত্রেশ্বর ‘চিত্র-সৌখ্য’ অর্থাৎ বিশেষ কল্যাণ দান করেন। তাঁর দর্শন, পূজা ও স্নানে কামজনিত গুরুতর দোষ-অপরাধ প্রশমিত হয়; বিশেষত চৈত্র শুক্ল চতুর্দশীতে সেখানে উপাসনা অতিশয় ফলপ্রদ। আরও বলা হয়, পূর্বশাপবশত রাজা চিত্রাঙ্গদ, ঋষি জাবালি এবং সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত এক কন্যা লোকসমক্ষে বিস্ময়কর ও দৃষ্টিগোচর রূপে সেখানে অবস্থান করেন। ঋষিরা এই পটভূমি জানতে চান। সূত কাহিনি বলেন—ব্রহ্মচারী তপস্বী জাবালি হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে কঠোর তপস্যা করলে দেবতারা শঙ্কিত হন। ইন্দ্র তাঁর ব্রহ্মচর্য ভঙ্গের জন্য রম্ভাকে বসন্তার সঙ্গে প্রেরণ করেন; তাদের আগমনে ঋতুরূপান্তরের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রম্ভা স্নানের জন্য জলে প্রবেশ করলে জাবালি তাকে দেখে অন্তরে ক্ষুব্ধ হন এবং মন্ত্রধ্যান ত্যাগ করেন। রম্ভা মধুর বাক্যে নিজেকে সহজলভ্য বলে প্রলোভিত করলে জাবালি একদিন কামধর্মে প্রবৃত্ত হন। পরে তিনি সংযম ফিরে পেয়ে শুদ্ধিকর্ম করে পুনরায় তপস্যায় স্থিত হন; রম্ভা দেবলোকেই প্রত্যাবর্তন করে। এই অধ্যায় তপ, প্রলোভন ও প্রায়শ্চিত্তের সঙ্গে তীর্থের কর্তৃত্ব ও নৈতিক সতর্কতা প্রতিষ্ঠা করে।

Phalavatī–Citrāṅgada Narrative and the Establishment of Citreśvara-pīṭha (फलवती–चित्राङ्गदोपाख्यानम् / चित्रेश्वरपीठनिर्णयः)
এই অধ্যায়ে সূত মুনি ফলবতী–চিত্রাঙ্গদ উপাখ্যান এবং চিত্রেশ্বর-পীঠ প্রতিষ্ঠার কারণ বর্ণনা করেন। জাবালি ঋষির প্রসঙ্গের পর অপ্সরা রম্ভা এক কন্যা প্রসব করেন; কন্যাটি ঋষির কাছে অর্পিত হয় এবং তার নাম হয় ‘ফলবতী’। আশ্রমে বড় হলে গন্ধর্ব চিত্রাঙ্গদ তাকে দেখে গোপনে মিলিত হয়; এতে জাবালি ক্রুদ্ধ হয়ে কন্যার প্রতি কঠোরতা করেন এবং চিত্রাঙ্গদকে শাপ দেন—সে দুরারোগ্যে আক্রান্ত হয়ে চলাফেরা ও উড্ডয়নশক্তি হারায়। এরপর কাহিনি শৈব-যোগিনী পরিবেশে প্রবেশ করে। চৈত্র শুক্ল চতুর্দশীতে শিব গণ ও উগ্র যোগিনীদের সঙ্গে চিত্রেশ্বর-পীঠে আগমন করেন; যোগিনীরা বলি/উপহার দাবি করে। চিত্রাঙ্গদ ও ফলবতী চরম শরণাগতির নিদর্শন হিসেবে নিজেদের ‘মাংস’ অর্পণ করতে উদ্যত হয়। শিব কারণ জেনে প্রতিকার নির্দেশ দেন—পীঠে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে এক বছর বিধিপূর্বক পূজা করলে রোগ ধীরে ধীরে নাশ হবে এবং চিত্রাঙ্গদের দিব্য মর্যাদা ফিরে আসবে। ফলবতী পীঠ-সংলগ্ন যোগিনী রূপে প্রতিষ্ঠিত হন; নগ্ন-রূপা প্রতিমা-ধারণায় তিনি পূজ্যা হন এবং ভক্তদের ইষ্টফল প্রদান করেন। পরে জাবালি ও ফলবতীর মধ্যে নারীর নৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক হয়, যা শেষে মিলনে পরিণত হয়। উপদেশ দেওয়া হয়—ফলবতী, জাবালি ও চিত্রাঙ্গদেশ্বর এই ত্রয়ীর পূজা নিত্য সিদ্ধিদায়িনী; আর ফলশ্রুতিতে এই কাহিনি ইহ-পরলোকে সর্বকামপ্রদ বলা হয়েছে।

अमराख्यलिङ्गप्रादुर्भावः (The Manifestation of the Amara Liṅga and the Māgha Caturdaśī Vigil)
ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—পূর্ব ঘটনার সেই তরুণী আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও কেন মৃত্যুবরণ করল না। সূত বলেন, অমরেশ্বর তীর্থে বিশেষত মাঘ মাসের কৃষ্ণ-চতুর্দশীতে মৃত্যুর প্রভাব ক্ষীণ হয়; তীর্থসীমায় মৃত্যু যেন সরে যায়, অকালমৃত্যুর ভয় নাশ হয়। দৈত্যদের সঙ্গে বিরোধে দেবতারা পরাজিত হলে প্রজাপতির কন্যা, কশ্যপের পত্নী অদিতি (দিতির সহোদরা) দীর্ঘ তপস্যা করেন। তপস্যার ফলে ভূমি থেকে শিবলিঙ্গ প্রকাশিত হয়। তখন আকাশবাণী বর দেয়—যুদ্ধে যে লিঙ্গ স্পর্শ করবে সে এক বছর অজেয় থাকবে; আর যে মানুষ মাঘ কৃষ্ণ-চতুর্দশীর রাতে জাগরণ করবে, সে এক বছর রোগমুক্ত থাকবে ও অকালমৃত্যু থেকে রক্ষা পাবে; মৃত্যু নিজেই তীর্থপ্রাঙ্গণ ত্যাগ করে। অদিতি লিঙ্গের মাহাত্ম্য দেবতাদের জানান; তারা শক্তি ফিরে পেয়ে দৈত্যদের পরাস্ত করে। দৈত্যরা যেন অনুকরণ না করতে পারে, তাই দেবতারা সেই তিথিতেই লিঙ্গরক্ষার ব্যবস্থা করেন। কেবল দর্শনেই মৃত্যুনাশ হয় বলে লিঙ্গের নাম ‘অমর’। শেষে লিঙ্গের নিকটে পাঠের ফলশ্রুতি, অদিতির নির্মিত নিকটস্থ কুণ্ডে স্নান, এবং স্নান-দর্শন-জাগরণ—এই তিনটিকেই প্রধান আচরণ বলা হয়েছে।

अमरेश्वरकुण्डमाहात्म्यवर्णन — Description of the Glory of Amareśvara Kuṇḍa
এই অধ্যায়ে ঋষিগণ সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—আদিত্য, বসু, রুদ্র ও অশ্বিনদের নামগুলি নির্দিষ্ট সংখ্যায় বলুন এবং এই ক্ষেত্রের উপাসনার দিন-ক্রমও নির্ধারণ করুন। সূত উত্তর দেন—বৃষধ্বজ, শর্ব, ত্র্যম্বক প্রভৃতি রুদ্রগণ; ধ্রুব, সোম, অনিল, অনল, প্রভাস প্রভৃতি আট বসু; বরুণ, সূর্য, ইন্দ্র, আর্যমন, ধাতা, ভাগ, মিত্র প্রভৃতি বারো আদিত্য; এবং নাসত্য ও দসর—দিব্য চিকিৎসক অশ্বিনযুগল। এরপর বলা হয়, এই তেত্রিশ দেবাধিপতি সর্বদা ক্ষেত্রের মধ্যে ধর্মরক্ষার জন্য উপস্থিত থাকেন। রুদ্রপূজা অষ্টমী ও চতুর্দশীতে, বসুপূজা দশমীতে (বিশেষত অষ্টমীতে), আদিত্যপূজা ষষ্ঠী ও সপ্তমীতে, আর রোগশমনার্থে অশ্বিনপূজা দ্বাদশীতে বিধেয়। এই নিয়মবদ্ধ ভক্তিসাধনায় অপমৃত্যু নিবারণ, স্বর্গ বা উচ্চ গতি লাভ এবং স্বাস্থ্য-কল্যাণের ফল প্রতিশ্রুত।

Vatikēśvara-Māhātmya and the Discourse on Śuka’s Renunciation (वटिकेश्वरमाहात्म्य–शुकवैराग्यसंवादः)
অধ্যায় ১৪৭-এ সূত মুনি স্থানীয় শিবরূপ ‘বটিকেশ্বর’-এর পরিচয় দেন—তিনি পুত্রদাতা ও পাপনাশক। ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন ‘বটিকা’ কী এবং কীভাবে ব্যাসের বংশে কপিঞ্জল/শুক নামে পুত্র লাভ হয়। সূত বলেন, শান্ত ও সর্বজ্ঞ ব্যাস ধর্মরক্ষার্থে বিবাহে প্রবৃত্ত হন এবং জাবালীর কন্যা বটিকা তাঁর পত্নী হন। দীর্ঘ গর্ভধারণে ভ্রূণ বারো বছর গর্ভে থাকে; গর্ভস্থ অবস্থাতেই সে বেদ-সহ বেদাঙ্গ, স্মৃতি, পুরাণ ও মোক্ষশাস্ত্র অধ্যয়ন করে, কিন্তু মাতাকে গভীর কষ্ট দেয়। এরপর ব্যাস ও গর্ভস্থ সন্তানের সংলাপ হয়। সন্তান পূর্বজন্মস্মৃতি, মায়ার প্রতি বৈরাগ্য এবং সরাসরি মুক্তির পথে যাওয়ার সংকল্প প্রকাশ করে; সে বাসুদেবকে ‘প্রতিভূ’ (জামিন/সাক্ষী) করতে অনুরোধ করে। ব্যাস শ্রীকৃষ্ণকে প্রার্থনা করলে বাসুদেব প্রতিভূত্ব গ্রহণ করে জন্মের নির্দেশ দেন। পুত্র প্রায় যুবকসদৃশ রূপে জন্ম নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বন-প্রব্রজ্যার দিকে ধাবিত হয়। পরে ব্যাস ও শুকের মধ্যে সংস্কার ও আশ্রম-ক্রম বনাম তৎক্ষণাৎ সন্ন্যাস নিয়ে দীর্ঘ নীতিদর্শন বিতর্ক হয়—আসক্তির দোষ, সামাজিক কর্তব্য ও সংসারসুখের অনিশ্চয়তা আলোচিত হয়। শেষে শুক বনগমন করে; ব্যাস ও মাতা শোকে ভেঙে পড়েন—বংশধর্ম ও মোক্ষবৈরাগ্যের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়।

Vāpī-Snāna and Liṅga-Pūjā Phala: Pingalā’s Tapas and Mahādeva’s Boons
এই অধ্যায়ে সূত একটি সুসংবদ্ধ তীর্থকথা বর্ণনা করেন। পুত্রহীনতার দুঃখে পীড়িতা পিঙ্গলা এক ঋষির (প্রসঙ্গত ব্যাসের উল্লেখ আছে) অনুমতি নিয়ে মহেশ্বরকে তুষ্ট করতে তপস্যার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গমন করে। সেখানে সে শঙ্করের প্রতিষ্ঠা করে এবং নির্মল জলে পরিপূর্ণ এক প্রশস্ত বাপী নির্মাণ করে, যা পাপনাশক স্নানতীর্থরূপে খ্যাত হয়। তখন ত্রিপুরান্তক মহাদেব প্রকাশিত হয়ে তার তপস্যায় সন্তুষ্ট হন এবং বংশবর্ধক, সদ্গুণসম্পন্ন পুত্রের বর দেন। পরে স্থানের মাহাত্ম্য সর্বজনীনভাবে বলা হয়—বিশেষত শুক্লপক্ষের নির্দিষ্ট তিথিতে নারীরা সেখানে স্নান করে প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গের পূজা করলে উৎকৃষ্ট পুত্র লাভ করে; দুর্ভাগ্যপীড়িতেরা স্নান-পূজার দ্বারা এক বছরের মধ্যে সৌভাগ্য অর্জন করে। পুরুষেরা স্নান ও পূজায় কামনা পূর্ণ করে, আর নিষ্কাম জন মোক্ষ লাভ করে। শেষে মহাদেব অন্তর্ধান করেন, প্রতিশ্রুত পুত্র কপিঞ্জল জন্মায়, এবং কেলীবরী দেবীর পূর্বপ্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ সর্বতোসিদ্ধিদায়িনী হিসেবে আসে।

Keliśvarī Devī-prādurbhāva and Andhaka-upākhyāna (केलीश्वरी देवीप्रादुर्भावः तथा अन्धकोपाख्यानम्)
এই অধ্যায়ে ঋষিদের প্রশ্নের উত্তরে সূত বলেন—দেবী একাই আদ্যাশক্তি; লোককল্যাণ ও উপদ্রবকারী শক্তির দমনার্থে তিনি নানা রূপে প্রকাশিত হন। মহিষাসুর-বধে কাত্যায়নী, শুম্ভ-নিশুম্ভ-বধে চামুণ্ডা, এবং পরবর্তী বিপদচক্রে শ্রীমাতা—এই প্রসিদ্ধ আবির্ভাবগুলির উল্লেখের পর কম পরিচিত কেলীশ্বরী রূপের কথা ওঠে। অন্ধকের উপদ্রবে দেবতারা পদচ্যুত হলে শিব অথর্বণ-ধাঁচের মন্ত্রে পরাশক্তিকে আহ্বান করেন। স্তবের ভাষায় বলা হয়—সমস্ত নারীরূপই তাঁরই বিভূতি। শিব দেবীর কাছে অন্ধক-নিবারণের সহায়তা প্রার্থনা করেন। দেবী ‘কেলিময়’—লীলাময়, বহুরূপী ভাব ধারণ করে অগ্নিসংলগ্ন আহ্বানে প্রকাশিত হওয়ায় ত্রিলোকে তিনি ‘কেলীশ্বরী’ নামে প্রসিদ্ধ—এই নাম-ব্যুৎপত্তিও দেওয়া হয়। অষ্টমী ও চতুর্দশীতে কেলীশ্বরীর পূজা করলে ইষ্টফল লাভ হয়; যুদ্ধকালে রাজদূত তাঁর স্তব পাঠ করলে অল্প সেনা নিয়েও বিজয় নিশ্চিত—এমন ফলশ্রুতি বলা হয়েছে। পরে অন্ধকের বংশকথা ও চরিত্রবিকাশ—হিরণ্যকশিপুর বংশসূত্র, ব্রহ্মার তপস্যা করে বারপ্রার্থনা, পূর্ণ অমরত্বের অস্বীকৃতি, এবং প্রতিশোধে দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধ। অস্ত্রবিনিময়, শিবের আগমন, মাতৃ-যোগিনী শক্তির আবির্ভাব, ‘পুরুষব্রত’ বলে নারীদের আঘাত না করার অন্ধকের সংকল্প, শেষে তমোস্ত্র প্রয়োগ—সব মিলিয়ে যুদ্ধ ও নৈতিক-আচারগত সুর একসঙ্গে ফুটে ওঠে।

Kelīśvarī Devī: Amṛtavatī Vidyā, Devotional Authority, and Phalaśruti
এই অধ্যায়ে সূত ধারাবাহিকভাবে তত্ত্বকথা বলেন। দৈত্যপুরোহিত শুক্র হাটকেশ্বর-সম্পর্কিত সিদ্ধিদায়ক ক্ষেত্রে গিয়ে অথর্বণীয় রৌদ্র মন্ত্রে হোম করেন এবং ত্রিকোণ কুণ্ড নির্মাণ করেন। যজ্ঞে সন্তুষ্ট হয়ে দেবী কেলীশ্বরী প্রকাশিত হন এবং আত্মবিনাশী বলি নিষেধ করে কল্যাণকর বর প্রদানের দিকে কথোপকথন ঘুরিয়ে দেন। শুক্র যুদ্ধে নিহত দৈত্যদের পুনর্জীবনের প্রার্থনা করেন; দেবী সদ্য ভক্ষিত ও ‘যোগিনী-মুখে প্রবিষ্ট’ বলে কথিতদেরও সহ সকলকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি ‘অমৃতবতী বিদ্যা’ নামে এক জ্ঞানশক্তি দান করেন, যার দ্বারা মৃতেরা পুনরায় জীবিত হয়। শুক্র এ সংবাদ অন্ধককে জানিয়ে বিশেষত অষ্টমী ও চতুর্দশীতে অবিরত ভক্তি-উপাসনার উপদেশ দেন এবং বলেন—জগৎব্যাপী পরাশক্তি বলপ্রয়োগে নয়, কেবল ভক্তিতেই লাভ্য। অন্ধক পূর্বক্রোধের জন্য অনুতাপ করে প্রার্থনা করে—যে ভক্তরা এই রূপ ধ্যান করবে ও প্রতিমা স্থাপন করবে, তারা হৃদয়কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধি পাক। দেবী প্রতিমা-স্থাপনকারীকে মোক্ষ, অষ্টমী/চতুর্দশীতে পূজাকারীদের স্বর্গ, আর কেবল দর্শন বা ধ্যানকারীদের রাজভোগের বর দেন। দেবী অন্তর্ধান করলে শুক্র নিহত দৈত্যদের জীবিত করেন এবং অন্ধক পুনরায় আধিপত্য লাভ করে; পরবর্তীতে ব্যাসবংশীয় এক ব্যক্তি সেখানে দেবীর প্রতিষ্ঠা করেন বলে শোনা যায়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—পাঠ/শ্রবণে মহাদুঃখ নাশ হয়; অষ্টমীতে শুনলে পতিত রাজাও বাধাহীন রাজ্য ফিরে পায়; আর যুদ্ধকালে শ্রবণ বিজয় দেয়।

Andhaka–Śaṅkara Saṃvāda: Śūlāgra-stuti, Gaṇatā-prāpti, and Hāṭakeśvara-Bhairava Upāsanā
এই অধ্যায়ে দ্বিখণ্ড ধর্মতাত্ত্বিক বর্ণনা আছে। প্রথম ভাগে শক্তিবৃদ্ধিতে উদ্ধত অন্ধক কৈলাসে দূত পাঠিয়ে শিবের কাছে দম্ভভরা ও বাধ্যতামূলক দাবি জানায়। শিব বীরভদ্র, মহাকাল, নন্দী প্রমুখ প্রধান গণদের পাঠান, কিন্তু তারা প্রথমে পরাভূত হয়; তখন স্বয়ং শঙ্কর যুদ্ধে প্রবেশ করেন। অস্ত্রযুদ্ধ ব্যর্থ হলে ঘনিষ্ঠ কুস্তিযুদ্ধ হয়; অন্ধক ক্ষণিক শিবকে চেপে ধরে, পরে শিব দিব্য অস্ত্রশক্তিতে তাকে বশ করে ত্রিশূলে বিদ্ধ করে শূলাগ্রে স্থাপন করেন। শূলাগ্রে অবস্থানরত অন্ধক দীর্ঘ স্তোত্রে শিবের স্তব করে শত্রুতা ত্যাগ করে অনুতপ্ত ভক্তে পরিণত হয়। শিব তাকে মৃত্যু দেন না; দানবভাব শুদ্ধ করে তাকে গণত্ব প্রদান করেন। অন্ধক বর চায়—যে মর্ত্য ভৈরবরূপ শিবকে ত্রিশূলে বিদ্ধ অন্ধকের প্রতিমাসহ সেই রূপে প্রতিষ্ঠা করে পূজা করবে, সে মোক্ষ লাভ করবে; শিব সম্মতি দেন। দ্বিতীয় ভাগে রাজা সুরথের দৃষ্টান্ত। রাজ্যচ্যুত সুরথ বশিষ্ঠের শরণ নিলে তিনি তাকে সিদ্ধিদায়ক হাটকেশ্বর ক্ষেত্রের নির্দেশ দেন। সেখানে সুরথ ভৈরবরূপ মহাদেবকে ত্রিশূল-চিহ্নিত অন্ধক-প্রতিমাসহ প্রতিষ্ঠা করে নারসিংহ-মন্ত্রে লাল অর্ঘ্যসহ শুচিতা ও নিয়মে পূজা করে। জপসংখ্যা পূর্ণ হলে ভৈরব তাকে রাজ্যফেরত দেন এবং একই বিধি মানা সাধকদের জন্যও সিদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেন; ফলে কাহিনি, প্রতিমা-প্রতিষ্ঠা, মন্ত্রসাধনা ও শুদ্ধাচার এক স্থানভিত্তিক সাধনায় একত্রিত হয়।

चक्रपाणिमाहात्म्यवर्णनम् | Cakrapāṇi Māhātmya (Glorification of Cakrapāṇi)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—কোন কোন তীর্থ কেবল দর্শন বা স্পর্শেই সম্পূর্ণ ও কাম্য ফল দেয়। সূত তীর্থ ও লিঙ্গের অসংখ্যতা স্বীকার করে স্থানীয় পবিত্রভূমির বিশেষ বিধান বলেন—শঙ্খ-তীর্থে স্নান, বিশেষত একাদশীতে, সর্বপুণ্যদায়ক; একাদশ-রুদ্র দর্শন সকল মহেশ্বর দর্শনের সমান; নির্দিষ্ট তিথিতে বটাদিত্য দর্শন সূর্যরূপ দর্শনের তুল্য; গৌরী-দুর্গা প্রভৃতি দেবী ও গণেশের দর্শনও তাঁদের নিজ নিজ দেবগণের সমগ্র দর্শনফল প্রদান করে। পরে ঋষিরা প্রশ্ন করেন—চক্রপাণির মাহাত্ম্য কেন বলা হয়নি এবং কখন তাঁকে দর্শন করা উচিত। সূত বলেন, এই ক্ষেত্রে অর্জুন চক্রপাণিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; স্নান করে ভক্তিভরে দর্শন করলে ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি মহাপাপও নাশ হয়। কৃষ্ণ–অর্জুনকে নর–নারায়ণরূপে চিহ্নিত করে ধর্মস্থাপনের মহৎ উদ্দেশ্যও এখানে প্রকাশিত। একটি নীতিবাক্যও আছে—যে মঙ্গল কামনা করে, সে যেন কোনো ব্যক্তিকে স্ত্রীসহ একান্তে, বিশেষত আত্মীয়কে, না দেখে; এটি সংযম ও সামাজিক শিষ্টাচারের নির্দেশ। এরপর ব্রাহ্মণের চুরি হওয়া গরু উদ্ধার করে অর্জুনের রক্ষা-কর্ম, তীর্থভ্রমণ, বৈষ্ণব মন্দির নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা, এবং চৈত্রে বিষ্ণু-বাসরে হরির শয়ন-বোধন উৎসব প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে। শেষে ফলশ্রুতিতে একাদশী-চক্রে নিয়মিত পূজাকারীদের বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

Apsaraḥ-kuṇḍa / Rūpatīrtha Utpatti-Māhātmya (Origin and Glory of the Apsaras Pond and Rūpatīrtha)
সূত রূপতীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন—এখানে বিধিপূর্বক স্নান করলে অরূপতাও রূপে পরিণত হয়। এরপর উৎপত্তিকথা: ব্রহ্মা তিলোত্তমা নামে অতিসুন্দরী অপ্সরা সৃষ্টি করেন। তিনি শিবকে পূজা করতে কৈলাসে এলে, তাঁর প্রদক্ষিণার সঙ্গে সঙ্গে শিবের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় এবং প্রদক্ষিণার দিকানুসারে অতিরিক্ত মুখ প্রকাশিত হতে থাকে। পার্বতীর মনে ক্ষোভ জাগে; নারদ সামাজিক ইঙ্গিতপূর্ণ কঠোর ব্যাখ্যা দিয়ে সেই ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেন। পার্বতী শিবের নয়ন রুদ্ধ করলে জগতে ধ্বংসাত্মক অসাম্য দেখা দেয়। সৃষ্টির রক্ষার্থে শিব তৃতীয় নয়ন প্রকাশ করেন এবং “ত্র্যম্বক” নামে প্রসিদ্ধ হন। পরে পার্বতী তিলোত্তমাকে বিকৃতরূপের শাপ দেন; তিলোত্তমা শরণ নিলে পার্বতী নিজ প্রতিষ্ঠিত তীর্থে স্নানের বিধান দেন—বিশেষত মাঘ শুক্ল তৃতীয়া, এবং পরে চৈত্র শুক্ল তৃতীয়ার মধ্যাহ্ন স্নানে তিলোত্তমার রূপ পুনরুদ্ধার হয়। তিলোত্তমা নির্মল জলের বিস্তৃত অপ্সরাকুণ্ড নির্মাণ করেন। ফলশ্রুতিতে নারীদের সৌভাগ্য, আকর্ষণীয়তা ও উত্তম সন্তানলাভ, আর পুরুষদের বহু জন্মে রূপ ও ঐশ্বর্যপ্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে।

Citreśvarīpīṭha–Hāṭakeśvarakṣetra Māhātmya (चित्रेश्वरीपीठक्षेत्रमाहात्म्यवर्णनम्)
এই অধ্যায়ে সূত হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রের বিধিবদ্ধ পবিত্র ভূগোল ও তীর্থমাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। গৌরীকুণ্ডের নিকটবর্তী নির্দিষ্ট কুণ্ডে স্নান এবং পার্বতীর দর্শনকে শুদ্ধি ও জন্ম-মৃত্যুর দুঃখক্ষয়ের উপায় বলা হয়েছে। নারীদের উদ্দেশে বিশেষ ফলকথা আছে—নির্দিষ্ট তিথিতে স্নান করলে সৌভাগ্য, দাম্পত্যকল্যাণ, সন্তানলাভ, এমনকি বন্ধ্যাত্বের মতো দোষও নিবারিত হয়। ঋষিরা তীর্থসিদ্ধির যুক্তি জানতে চাইলে সূত এক গূঢ় সাধনাপথ বলেন—লিঙ্গসমূহের মধ্যে উপাসনা, বিশেষত চতুর্দশীতে ব্রত, এবং সাধকের দৃঢ়তা পরীক্ষার জন্য গণেশের ভীষণ রূপে আবির্ভাব। এর বিপরীতে ব্রাহ্মণ্য আদর্শসম্মত সাত্ত্বিক পথও দেখানো হয়েছে—স্নান, শাস্ত্রানুগ আচরণ, প্রাতে তিলদান প্রভৃতি, এবং সংযমী উপবাস/বৈরাগ্য যা মোক্ষাভিমুখ। শেষে ফলশ্রুতি—এই কাহিনি শ্রবণ-পাঠ, ব্যাস/গুরুর সম্মান ও মনোযোগী গ্রহণে মহাপবিত্রতা ও উন্নতি লাভ হয়।

हाटकेश्वरक्षेत्रे वसवादिदेवपूजाविधानम् तथा पुष्पादित्य-माहात्म्ये मणिभद्रवृत्तान्त-प्रस्तावः (Hāṭakeśvara Kṣetra: Rites for Vasus–Ādityas–Rudras–Aśvins and the Puṣpāditya Māhātmya with the Maṇibhadra Narrative Prelude)
এই অধ্যায়ে হাটকেশ্বর ক্ষেত্রের দেব-ব্যবস্থা ও পূজা-তত্ত্ব বর্ণিত হয়েছে। এখানে অধিষ্ঠিত দেবসমূহ—আট বসু, এগারো রুদ্র, বারো আদিত্য এবং অশ্বিনীকুমার—উল্লেখ করে পঞ্জিকা-সময় অনুযায়ী উপাসনার বিধান দেওয়া হয়েছে। শুচিতা ও প্রস্তুতি (স্নান, নির্মল বস্ত্র), কর্মের ক্রম (প্রথমে দ্বিজদের তর্পণ, পরে পূজা) এবং মন্ত্রসহ নৈবেদ্য, ধূপ, আরার্তি প্রভৃতি অর্ঘ্য নিবেদনের নির্দেশ আছে। বিশেষ ব্রতগুলির মধ্যে মধু-মাসের শুক্ল অষ্টমীতে বসুপূজা, সপ্তমীতে—বিশেষত রবিবার—পুষ্প, গন্ধ ও অনুলেপনে আদিত্যপূজা, চৈত্র শুক্ল চতুর্দশীতে শতরুদ্রিয় পাঠসহ রুদ্রপূজা, এবং আশ্বিন পূর্ণিমায় অশ্বিনীসূক্তে অশ্বিনদ্বয়ের আরাধনা বলা হয়েছে। এরপর পুষ্পাদিত্য-মাহাত্ম্য শুরু হয়—যাজ্ঞবল্ক্য কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই দেবতা দর্শন ও পূজায় ইষ্টসিদ্ধি দেন, পাপ নাশ করেন এবং পরম মুক্তির সম্ভাবনাও প্রকাশিত। শেষে সমৃদ্ধ নগরে মণিভদ্রের কাহিনির ভূমিকা—অঢেল ধন, কৃপণতা, দেহক্ষয় ও বিবাহ-আকাঙ্ক্ষা—এবং উপদেশ যে ধনই বহু সামাজিক সম্পর্ক ও কর্মপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

मणिभद्रकृतपुष्पब्राह्मणविडंबनवर्णनम् (Humiliation of the Brāhmaṇa Puṣpa by Maṇibhadra)
সূত মুনি মণিভদ্রের কাহিনী বর্ণনা করেছেন, যিনি কামাসক্ত হয়ে এক ক্ষত্রিয় কন্যাকে অশুভ সময়ে (যখন ভগবান বিষ্ণু শয়নরত ছিলেন) বিবাহ করেন। ধনের লোভে পিতা তার কন্যাকে দান করেন। মণিভদ্র তার স্ত্রীকে গৃহবন্দী করে রাখেন এবং এক নপুংসক প্রহরী নিযুক্ত করেন। তিনি ব্রাহ্মণদের ভোজনের নিমন্ত্রণ করতেন কিন্তু শর্ত দিতেন যে কেউ যেন তার স্ত্রীর দিকে না তাকায়। পুষ্প নামক এক বেদপাঠী ব্রাহ্মণ কৌতূহলবশত তার স্ত্রীকে দেখে ফেলেন। ক্রুদ্ধ মণিভদ্র তাকে প্রহার করে রক্তাক্ত অবস্থায় রাজপথে ফেলে দেন। দয়ালু নাগরিকরা তাকে সুস্থ করেন এবং পুষ্প ন্যায়বিচারের অভাব নিয়ে বিলাপ করেন।

सूर्यसकाशात्पुष्पब्राह्मणस्य वरलब्धिवर्णनम् (The Account of Puṣpa Brāhmaṇa Receiving Boons from Sūrya)
এই অধ্যায়ে সূত বর্ণনা করেন—পুষ্প নামের এক ব্রাহ্মণ দুঃখিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে, নিজের মনে হওয়া দোষের প্রতিকার না পাওয়া পর্যন্ত আহার না করার সংকল্প করে এবং তৎক্ষণাৎ ফলদায়ী দেবতা বা মন্ত্রের সন্ধান করে। স্থানীয় লোকেরা তাকে চামৎকারপুরের সূর্যমন্দিরের কথা বলে, যা যাজ্ঞবল্ক্য প্রতিষ্ঠিত বলে খ্যাত—রবিবারে সপ্তমী তিথিতে হাতে ফল নিয়ে ১০৮ বার প্রদক্ষিণ করলে ইষ্টসিদ্ধি হয়; আর কাশ্মীরের শারদা দেবী উপবাসে সিদ্ধিদাত্রী বলেও তারা জানায়। পুষ্প সেখানে গিয়ে স্নান করে ১০৮ প্রদক্ষিণা সম্পন্ন করে দীর্ঘ স্তব-আরাধনা করে। পরে কুশাণ্ডিকা প্রভৃতি বিধানে হোম শুরু করে—মন্ত্রন्यास, স্থাপন, আহুতি ইত্যাদি ক্রমে ক্রমে সে তামসিক জেদে পড়ে সিদ্ধির জন্য নিজের মাংস পর্যন্ত অর্পণ করতে উদ্যত হয়। তখন সূর্যদেব প্রকাশ হয়ে তাকে নিবৃত্ত করেন এবং শ্বেত ও কৃষ্ণ—দুটি বড়ি দেন, যাতে সাময়িকভাবে রূপান্তর করে আবার নিজ রূপে ফিরতে পারে; বৈদীশার ধনী মণিভদ্র সম্পর্কে জ্ঞানও দান করেন। পুষ্প প্রশ্ন করে—১০৮ প্রদক্ষিণার তৎক্ষণাৎ ফল কেন পেল না? সূর্য বলেন—তামসিক ভাব নিয়ে করা কর্ম নিষ্ফল; বাহ্য আচারের শুদ্ধতা দূষিত অভিপ্রায়কে পূরণ করতে পারে না। সূর্য তার ক্ষত সারিয়ে অন্তর্ধান হন; শিক্ষা—কর্মফলের মূল নিয়ামক ‘ভাব’।

मणिभद्रोपाख्याने मणिभद्रनिधनवर्णनम् (Maṇibhadra-Upākhyāna: Account of Maṇibhadra’s Death)
সূত নাগরখণ্ডে মণিভদ্র-উপাখ্যান বর্ণনা করেন। পুষ্প নামে এক ব্যক্তি এক আশ্চর্য গুটিকা লাভ করে মণিভদ্রের মতো রূপ ধারণ করে; এই ছদ্মবেশে সে নগরে বিভ্রান্তি ও অশান্তি সৃষ্টি করে। আগত ভুয়া মণিভদ্রকে আটকাতে দ্বাররক্ষক ষণ্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়; কিন্তু দ্বারপ্রান্তে প্রকৃত মণিভদ্রই আঘাতপ্রাপ্ত হন, ফলে জনতার মধ্যে তীব্র হাহাকার ওঠে। এরপর পুষ্প আবার মণিভদ্ররূপে উপস্থিত হয়ে পরিচয়-সংকট আরও বাড়িয়ে তোলে। বিবাদ রাজসভায় গিয়ে পৌঁছায়। রাজা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সত্য যাচাই করেন এবং শেষ পর্যন্ত মানব-সাক্ষী হিসেবে মণিভদ্রের পত্নীকে আহ্বান করেন। তিনি স্বামীর প্রকৃত লক্ষণ চিনে ন্যায়সঙ্গত স্বামীকে পৃথক করেন এবং ছদ্মচারীকে প্রকাশ করেন। রাজা প্রতারককে দণ্ডের আদেশ দেন; দণ্ডের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি কামনার বিপদ, প্রতারণার সামাজিক পরিণতি এবং কৃপণতার কঠোর সমালোচনা করে দীর্ঘ নীতিবচন উচ্চারণ করে। সে বলে—ধনের তিন পরিণতি: দান, ভোগ বা নাশ; কেবল সঞ্চয় করলে নিষ্ফল তৃতীয় পরিণতিই অবশ্যম্ভাবী। শেষে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্র-মাহাত্ম্যে এই কাহিনি পবিত্র ভূগোলের অন্তর্গত নীতিদৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

पुष्पविभवप्राप्तिवर्णनम् (Account of Puṣpa’s Attainment and Distribution of Prosperity)
সূত বলেন—ক্ষেত্রের দেবালয়-পরিসরে মণিভদ্রের গৃহে পুষ্প আত্মীয়স্বজনসহ আনন্দে উপস্থিত হয়; শঙ্খ-ভেরি ও ঢাক-ঢোলের মঙ্গলধ্বনি ওঠে। প্রসঙ্গে বলা হয়, ভাস্করদেবের কৃপায় তার সমৃদ্ধি লাভ হয়েছে। পুষ্প আপনজনদের ডেকে লক্ষ্মীর চঞ্চলতা স্মরণ করে এবং পূর্বের দীর্ঘ দুঃখ-কষ্টের দিনগুলির কথা ভাবতে থাকে। ধনের অনিত্যতা বুঝে সে সত্যব্রত গ্রহণ করে উদার দানের সংকল্প করে। আত্মীয়দের মর্যাদা অনুযায়ী বস্ত্র ও অলংকার বণ্টন করে, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের শ্রদ্ধায় ধন-বস্ত্র দান করে, নট-গায়ক প্রভৃতি শিল্পীদের অন্ন-বস্ত্র দেয়, আর বিশেষ করে দরিদ্র ও অন্ধদের সেবা করে তৃপ্ত করে। শেষে সে স্ত্রীর সঙ্গে আহার করে সমবেত জনতাকে বিদায় দেয় এবং প্রাপ্ত সম্পদ নিয়ে শৃঙ্খলিত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনযাপন করে। এই অধ্যায়ে দেখানো হয়েছে—ক্ষেত্র-সংলগ্ন পবিত্র পরিবেশে দান ও জনকল্যাণের মাধ্যমে সমৃদ্ধি ধর্মসম্মত ও শুদ্ধ হয়।

हाटकेश्वरक्षेत्रमाहात्म्ये पुष्पस्य पापक्षालनार्थं हाटकेश्वरक्षेत्रगमन-पुरश्चरणार्थ-ब्राह्मणामन्त्रणवर्णनम् (Puṣpa’s Journey to Hāṭakeśvara for Sin-Removal and the Invitation of Brāhmaṇas for Puraścaraṇa)
এই অধ্যায়ে সূত তীর্থ-মাহাত্ম্যের পরিসরে এক নীতিশিক্ষামূলক কাহিনি বলেন। চমৎকারপুরে সূর্যোপাসনা-প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণ পুষ্প এক মোহনীয় রূপ ধারণ করে। তখন মাহী নামের নারী জিজ্ঞাসা করে—এই রূপান্তর কি মায়া, মন্ত্রসিদ্ধি, না দেবকৃপা? পুষ্প সত্য স্বীকার করে; মণিভদ্রকে ঘিরে পূর্বের প্রতারণা, তার স্ত্রীর অন্যায় হরণ, এবং সেই মিথ্যার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গৃহস্থজীবন ও সন্তান-পরম্পরার কথা প্রকাশ করে। ভোগের পর বার্ধক্যে তার অন্তরে তীব্র অনুতাপ জাগে। নিজের মহাপাপ বুঝে সে পাপক্ষালনের জন্য হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে গমন ও প্রায়শ্চিত্তরূপ পুরশ্চরণ করার সংকল্প করে। পুত্রদের মধ্যে ধন বণ্টন করে, যেখানে আগে সিদ্ধি লাভ করেছিল সেখানে সূর্য-সম্পর্কিত এক মনোরম নির্মাণ করে এবং শুদ্ধির উদ্দেশ্যে চাতুশ্চরণ (চার প্রকার পাঠ-যজ্ঞব্যবস্থা) সম্পাদনের জন্য ব্রাহ্মণদের বিধিপূর্বক আমন্ত্রণ জানায়। এভাবে নৈতিক স্বীকারোক্তি ও ক্ষেত্রের আচার-ব্যবস্থা একত্রে যুক্ত হয়।

Puṣpāditya-māhātmya (Glorification of Pushpāditya and allied rites)
এই অধ্যায়ে সূত ব্রাহ্মণসমাজে অনুষ্ঠিত এক বিচার-বিবেচনার দৃশ্য বর্ণনা করেন। পুষ্প স্ত্রীসহ ভক্তিভরে দ্বিজদের কাছে এসে ভাস্কর (সূর্য) দেবের মন্দির নির্মাণের কথা জানায় এবং তিন লোক জুড়ে খ্যাতির জন্য দেবতার নাম “পুষ্পাদিত্য” রাখার প্রস্তাব দেয়। ব্রাহ্মণরা পূর্বপ্রতিষ্ঠা ও কীর্তিপরম্পরা রক্ষার কথা তুলে ধরে প্রায়শ্চিত্তের বিধান দেন—বিশেষ করে শুদ্ধির জন্য “লক্ষ” পরিমাণ মহাহোম। পুষ্প অনুরোধ করে, নির্বাচিত নামেই যেন দেবতার সর্বদা স্তব হয় এবং স্থানের সঙ্গে যুক্ত দেবীনামে তার স্ত্রীরও সম্মান স্থাপিত হয়। শেষে সিদ্ধান্ত হয়—দেবতা “পুষ্পাদিত্য” নামে স্বীকৃত, দেবী “মাহিকা/মাহী” নামে প্রতিষ্ঠিত। ফলশ্রুতিতে কলিযুগের উপকার বলা হয়েছে—পুষ্পাদিত্যভক্তিতে রবিবারের পাপ নাশ; রবিবারে সপ্তমী যোগে ১০৮ পর্যন্ত ফল নিবেদন ও প্রদক্ষিণায় ইষ্টসিদ্ধি; “মাহিকা” দুর্গার নিয়মিত দর্শনে দুঃখ-কষ্ট দূর হয়; এবং চৈত্র শুক্ল চতুর্দশীতে পূজায় বছরভর অমঙ্গল থেকে রক্ষা।

पुरश्चरणसप्तमीव्रतविधानवर्णनम् (Puraścaraṇa-Saptamī Vrata: Procedure and Rationale)
অধ্যায় ১৬২ নীতি ও আচারভিত্তিক কাহিনি দিয়ে শুরু হয়ে বিস্তৃত ব্রতবিধিতে গিয়ে শেষ হয়। সূত বলেন—মণিভদ্র-বধ সংক্রান্ত বিতর্কিত কর্মের কারণে পুষ্প সমাজে নিন্দিত হয় এবং ব্রাহ্মণরা তাকে তিরস্কার করে; আলোচনায় তাকে মহাপাতকী, এমনকি ব্রহ্মঘ্ন বলেও অভিযুক্ত করা হয়। তার দুঃখ দেখে নাগর ব্রাহ্মণরা শাস্ত্র, স্মৃতি, পুরাণ ও বেদান্ত বিচার করে শুদ্ধির প্রামাণ্য পথ খোঁজেন; তখন চণ্ডশর্মা নামক ব্রাহ্মণ স্কন্দপুরাণোক্ত ‘পুরশ্চরণ-সপ্তমী’কে প্রায়শ্চিত্তরূপে নির্দেশ করেন। পুষ্প সেই ব্রত পালন করে এবং এক বছরের শেষে শুদ্ধ হয় বলে বর্ণিত। এরপর প্রাচীন উপদেশ-সংলাপ সংযোজিত—রাজা রোহিতাশ্ব ঋষি মার্কণ্ডেয়কে জিজ্ঞাসা করেন, মন- বাক্- দেহ দ্বারা কৃত পাপ কীভাবে নাশ হয়। ঋষি বলেন: মানসিক দোষের ক্ষয় অনুতাপে, বাক্দোষের শমন সংযম/অসম্প্রয়োগে, আর দৈহিক দোষের প্রায়শ্চিত্ত ব্রাহ্মণদের কাছে প্রকাশ করে বা রাজশাসনের বিধানে সম্পন্ন হয়। শেষে তিনি সূর্যকেন্দ্রিক ‘পুরশ্চরণ-সপ্তমী’ ব্রত নির্দিষ্ট করেন—মাঘ শুক্লপক্ষে, সূর্য মকরে থাকলে, রবিবার উপবাস, শুচিতা, প্রতিমাপূজা, লাল ফুল ও উপহার, লাল চন্দনযুক্ত অর্ঘ্য, ব্রাহ্মণভোজন ও দক্ষিণা, এবং পঞ্চগব্যাদি শুদ্ধিকারক গ্রহণ। মাসে মাসে দ্রব্য-উপচারের ক্রম বছরভর বলা হয়েছে; শেষে ষষ্ঠাংশসহ দান দিয়ে সম্পূর্ণ শুদ্ধির ফলশ্রুতি ঘোষিত।

ब्राह्मनागरोत्पत्तिवृत्तान्तवर्णनम् (Account of the Brahma-Nāgara origin narrative and communal expiation discourse)
অধ্যায় ১৬৩ ব্রহ্মস্থানে সংঘটিত এক সমাজ-আইন ও আচারনৈতিক ঘটনার বর্ণনা দেয়। কয়েকজন নাগর ব্রাহ্মণ ধনভরা একটি পাত্র পেয়ে সভা ডেকে লোভপ্রসূত অনুচিত গ্রহণ এবং প্রায়শ্চিত্ত প্রদানে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে সিদ্ধান্ত করেন। সমবেত পরামর্শ ছাড়া এক ব্যক্তি একাই প্রায়শ্চিত্ত করিয়েছিল বলে চণ্ডশর্মাকে সমাজের ‘বাহ্য’ হিসেবে অবমানিত করা হয়। পুষ্প ধন ফিরিয়ে দিয়ে ক্ষতিপূরণ করতে চায়, কিন্তু সভা জানায়—রায় ধনলোভে নয়, স্মৃতি-পূরাণের প্রমাণ ও যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক বিধির উপর প্রতিষ্ঠিত। তাদের মতে প্রায়শ্চিত্ত বহু আচার্য/ঋত্বিকসহ, পরামর্শক্রমে ও বিধিবদ্ধভাবে দিতে হয়। বেদনায় পুষ্প কঠোর আত্ম-আঘাতকে অর্ঘ্যরূপে করতে উদ্যত হলে ভাস্বান সূর্য আবির্ভূত হয়ে তাকে নিবৃত্ত করেন এবং বর দেন—চণ্ডশর্মা শুদ্ধ হয়ে ‘ব্রাহ্ম-নাগর’ নামে খ্যাত হবে, তার বংশধর ও সহচররা সম্মান লাভ করবে, এবং পুষ্পের দেহ পুনরুদ্ধার হবে। এই অধ্যায় লোভ, সামুদায়িক কর্তৃত্ব ও প্রায়শ্চিত্তের বৈধ প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধর্মনৈতিক নির্দেশ প্রদান করে, শেষে দেবসমর্থনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটায়।

Nāgareśvara–Nāgarāditya–Śākambharī Utpatti-varṇanam (Origin and Establishment Narratives)
সূত বর্ণনা করেন—পুষ্প নামক ভক্ত আত্মত্যাগময় সংকল্পে সূর্যকে প্রসন্ন করে দুঃখিত ব্রাহ্মণ চণ্ডশর্মাকে সান্ত্বনা ও পথনির্দেশ দেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে চণ্ডশর্মার দেহপতন হবে না এবং নাগরদের মধ্যে তাঁর বংশ বিশেষ খ্যাতি লাভ করবে। পরে তাঁরা পবিত্র সরস্বতীর দক্ষিণ তীরে আশ্রমসদৃশ নিবাস স্থাপন করে বসবাস করেন। চণ্ডশর্মা পূর্বব্রত স্মরণ করে সাতাশ লিঙ্গ-সংক্রান্ত সাধনা গ্রহণ করেন—সরস্বতীতে স্নান, শৌচাচার, ষড়াক্ষর মন্ত্রজপ, লিঙ্গনাম উচ্চারণ ও সাষ্টাঙ্গ প্রণাম। তিনি কাদামাটি দিয়ে লিঙ্গ নির্মাণ করে পূজা করেন এবং নীতিবিধান মানেন—অসুবিধাজনক স্থানে থাকা লিঙ্গও বিচলিত করা যাবে না; এভাবে প্রতিদিন করে সাতাশটি লিঙ্গ পূর্ণ হয়। অতিভক্তিতে প্রসন্ন শিব ভূমি থেকে এক লিঙ্গ প্রকাশ করে বলেন—এর পূজায় সাতাশ লিঙ্গের সম্পূর্ণ ফল লাভ হয়; যে কোনো ভক্ত ভক্তিভরে পূজা করলে একই ফল পায়। চণ্ডশর্মা প্রাসাদ নির্মাণ করে লিঙ্গটির নাম ‘নাগরেশ্বর’ স্থাপন করেন এবং নগরের লিঙ্গস্মৃতির সঙ্গে নামের যোগ ঘটান; শেষে তিনি শিবলোকে গমন করেন। পুষ্প সরস্বতীতীরে ‘নাগরাদিত্য’ নামে সূর্যপ্রতিমা স্থাপন করে বর পান—সেখানে পূজায় চামৎকারপুরের দ্বাদশ সূর্যরূপের পূর্ণ ফল মেলে। চণ্ডশর্মার পত্নী শাকম্ভরী শুভ তীরে দুর্গা প্রতিষ্ঠা করেন; দেবী প্রতিশ্রুতি দেন—ভক্তিপূর্বক পূজায় তৎক্ষণাৎ ফল, বিশেষত আশ্বিন শুক্ল মহানবমীতে; দেবী শাকম্ভরী নামে প্রসিদ্ধ হন। অধ্যায়ের শেষে বলা হয়—সমৃদ্ধির পর পূজা করলে পরবর্তী উন্নতিতে বাধা আসে না।

अश्वतीर्थोत्पत्तिवर्णनम् (Origin Account of Aśvatīrtha)
এই অধ্যায়ে সূত বলেন, এক সময় সরস্বতীর পুণ্য তীর বহিরাগত গোষ্ঠী ও নগরবাসীদের কাছে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। কিন্তু পরে ঋষি বিশ্বামিত্রের শাপে সরস্বতী রক্তবাহিনী হয়ে ওঠে; তার তীরে রাক্ষস, ভূত, প্রেত ও পিশাচ প্রভৃতি সীমান্ত-সত্তা বিচরণ করতে থাকে। ভয়ে মানুষজন সেই অঞ্চল ত্যাগ করে নিরাপদ পবিত্র ভূখণ্ডে, বিশেষত মার্কণ্ডেয়ের আশ্রমসংলগ্ন নর্মদা-তীরে, গমন করে। ঋষিরা শাপের কারণ জিজ্ঞাসা করলে সূত তা বিশ্বামিত্র–বসিষ্ঠের দীর্ঘ বৈরিতা এবং ক্ষত্রিয় থেকে ব্রাহ্মণত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষার প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করেন। এরপর উৎপত্তি-কথায় ভৃগুবংশীয় ঋষি ঋচীক কৌশিকী নদীর নিকট ভোজকটায় আসেন। গাধির কন্যাকে (গৌরীপূজার সঙ্গে যুক্ত) দেখে তিনি ব্রাহ্ম-বিবাহে প্রার্থনা করেন। গাধি কন্যাশুল্ক হিসেবে এক-একটি কালো কানযুক্ত সাতশো দ্রুত অশ্ব দাবি করেন। ঋচীক কান্যকুব্জে গঙ্গাতীরে ‘অশ্বো বোঢা’ মন্ত্র ছন্দ-ঋষি-দেবতা-বিনিয়োগসহ জপ করলে নদী থেকে সেই অশ্বসমূহ প্রকাশ পায়। এইভাবে অশ্বতীর্থের খ্যাতি প্রতিষ্ঠিত হয়; সেখানে স্নানকে অশ্বমেধ যজ্ঞফলের সমতুল্য বলা হয়েছে, ফলে যজ্ঞের মহিমা তীর্থসেবায় সহজলভ্য হয়।

परशुरामोत्पत्तिवर्णनम् / Account of the Origins of Paraśurāma’s Line
এই অধ্যায়ে ঋচীক ও ‘ত্রৈলোক্য-সুন্দরী’ নামে বর্ণিত এক নারীর বিবাহকে কেন্দ্র করে বংশপ্রবর্তনের কাহিনি বলা হয়েছে। বিবাহোত্তর ঋচীক বর প্রদান করে ‘চরু-দ্বয়’ নামক দ্বিভাগ যজ্ঞবিধি সম্পাদন করেন, যাতে ব্রাহ্ম্য তেজ ও ক্ষাত্র তেজ পৃথকভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। তিনি প্রতিটি চরুর সঙ্গে দেহগত প্রতীকও নির্দিষ্ট করেন—একটির জন্য অশ্বত্থ বৃক্ষ আলিঙ্গন, অন্যটির জন্য ন্যগ্রোধ আলিঙ্গন—যাতে বিধি ও ভবিষ্যৎ সন্তানের গুণের যোগসূত্র স্পষ্ট হয়। কিন্তু মাতার প্ররোচনায় চরুর অংশ এবং বৃক্ষ-আলিঙ্গনের ক্রিয়া অদলবদল হয়ে যায়; ফলে বিধিভঙ্গের প্রতিফল গর্ভলক্ষণে দেখা দেয়। স্ত্রীর দোহদ ও প্রবৃত্তি রাজকীয় ও যুদ্ধমুখী হয়ে উঠলে ঋচীক বুঝতে পারেন যে অনुष্ঠান উল্টে গেছে। পরে সমঝোতা হয়—তাৎক্ষণিক পুত্র ব্রাহ্মণত্বে স্থিত থাকবে, কিন্তু প্রবল ক্ষাত্র তেজ নাতির মধ্যে সঞ্চারিত হবে। শেষে জমদগ্নির জন্ম এবং পরবর্তীতে সেই বংশে রাম (পরশুরাম)-এর আবির্ভাব বর্ণিত হয়; তাঁর শৌর্যকে পূর্বকৃত যজ্ঞতেজ ও পূর্বপুরুষের সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে দেখিয়ে নৈতিক কারণ-কার্য, বিধিশুদ্ধি ও বংশনিয়তির সমন্বয় করা হয়েছে।

विश्वामित्रराज्यपरित्यागवर्णनम् (Viśvāmitra’s Renunciation of Kingship)
সূত বিশ্বামিত্রের জন্ম-প্রসঙ্গ ও শৈশব-গঠনের কথা বলেন। তিনি রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেন; তাঁর মাতা তপস্বিনী ও তীর্থযাত্রাপরায়ণা। পিতা গাধি তাঁকে রাজ্যে অভিষিক্ত করলে বিশ্বামিত্র বেদাধ্যয়ন বজায় রেখে ব্রাহ্মণসম্মান ও ধর্মাচরণসহ রাজ্য শাসন করেন। পরে তিনি অরণ্যশিকারে আসক্ত হন এবং একদিন মধ্যাহ্নে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ক্লান্ত হয়ে মহাত্মা বশিষ্ঠের পুণ্য আশ্রমে উপস্থিত হন। বশিষ্ঠ অর্ঘ্য-মধুপর্ক প্রভৃতি দিয়ে রাজাকে যথাযথ আতিথ্য দেন এবং বিশ্রাম ও ভোজনের অনুরোধ করেন। রাজা নিজের ক্ষুধার্ত সৈন্যদলের কথা ভাবলে বশিষ্ঠ কামধেনু নন্দিনীর দ্বারা মুহূর্তে সৈন্য ও পশুদের জন্য বিপুল আহার-পানীয় প্রকাশ করেন। বিস্মিত বিশ্বামিত্র নন্দিনীকে প্রথমে প্রার্থনা করে, পরে বলপ্রয়োগে নিতে চান—রাজাধিকার দেখিয়ে। বশিষ্ঠ ধর্ম-স্মৃতির বিধান স্মরণ করিয়ে কামধেনুর মতো গোরু কেনাবেচা বা হরণ নিষিদ্ধ বলেন। যখন রাজপুরুষেরা নন্দিনীকে টেনে নিয়ে আঘাত করে, তখন সে শবর, পুলিন্দ, ম্লেচ্ছ প্রভৃতি সশস্ত্র দল সৃষ্টি করে রাজসেনা ধ্বংস করে। বশিষ্ঠ দয়ায় অধিক হিংসা রোধ করেন, রাজাকে রক্ষা করেন এবং মায়াবন্ধন থেকে মুক্ত করেন। অপমানিত বিশ্বামিত্র উপলব্ধি করেন যে ক্ষত্রিয়বল ব্রহ্মবলের কাছে তুচ্ছ; তিনি রাজ্য ত্যাগ করে পুত্র বিশ্বসহকে সিংহাসনে বসিয়ে ব্রাহ্মণ-তেজ লাভের জন্য মহাতপস্যার সংকল্প করেন।

धारोत्पत्तिमाहात्म्यवर्णनम् (Origin and Glory of Dhārā in Hāṭakeśvara-kṣetra)
এই অধ্যায়ে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রের অন্তর্গত ‘ধারা’ দেবীর উৎপত্তি ও মাহাত্ম্য বর্ণিত। সূত বলেন—বিশ্বামিত্র হিমালয়ে অতি কঠোর তপস্যা করেন: আকাশে শয়ন, জলে বাস, পঞ্চাগ্নি-সাধনা, ক্রমে উপবাস করতে করতে শেষে বায়ুভক্ষণ পর্যন্ত। তাঁর তপস্যায় ভীত ইন্দ্র বর দিতে এলে বিশ্বামিত্র রাজ্য-ঐশ্বর্য প্রভৃতি সব প্রত্যাখ্যান করে কেবল ব্রাহ্মণ্য (ব্রাহ্মণত্ব) প্রার্থনা করেন—আধ্যাত্মিক সিদ্ধির শ্রেষ্ঠতা প্রতিষ্ঠা করে। পরে ব্রহ্মাও বর দিতে আসেন; বিশ্বামিত্র একই প্রার্থনা পুনরায় জানান। ঋচীক ব্যাখ্যা করেন যে বিশ্বামিত্রের ব্রহ্মর্ষিত্বের জন্য ব্রাহ্মণ-মন্ত্র ও সংস্কৃত চরু-আহুতি পূর্বেই নির্ধারিত ছিল; তাই ব্রহ্মা তাঁকে ব্রহ্মর্ষি ঘোষণা করার অধিকারী। বসিষ্ঠ ক্ষত্রিয়জন্মের ব্রাহ্মণ হওয়া অযৌক্তিক বলে বিতর্ক করে অনর্ত দেশে শঙ্খতীর্থ, ব্রহ্মশিলা ও সরস্বতীর নিকটে গমন করেন। ক্রুদ্ধ বিশ্বামিত্র সামবেদীয় বিধিতে অভিচার করে ভীষণ কৃত্যা সৃষ্টি করেন। বসিষ্ঠ দিব্যদৃষ্টিতে তা জেনে অথর্ব-মন্ত্রে স্তম্ভিত করেন; কৃত্যা কেবল তাঁর দেহ স্পর্শ করে পতিত হয়। তখন বসিষ্ঠ তাকে শান্ত করে চৈত্র শুক্ল অষ্টমীতে পূজার বিধান দেন এবং ভক্তদের এক বছর রোগমুক্তির বর প্রদান করেন। এই শক্তিই ‘ধারা’ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে নগর-উপাসনার বিশেষ রীতিসহ ক্ষেত্র-মাহাত্ম্যে প্রতিষ্ঠিত হয়।

धारानामोत्पत्तिवृत्तान्तः तथा धारादेवीमाहात्म्यवर्णनम् (Origin of Dhārā-nāma and the Māhātmya of Dhārā-devī)
ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—তুষ্টিদায়িনী শক্তি কেন বিশেষভাবে নাগর সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত, এবং তিনি পৃথিবীতে ‘ধারা’ নামে কীভাবে প্রসিদ্ধ হলেন। সূত বলেন—চামৎকারপুরে নাগরী ব্রাহ্মণী ধারা তপস্বিনী অরুন্ধতীর সঙ্গে সখ্য গড়েন। অরুন্ধতী বশিষ্ঠসহ শঙ্খতীর্থে স্নান করতে এসে ধারাকে কঠোর তপস্যায় রত দেখে পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানতে চান। ধারা নিজের নাগর বংশ, অল্পবয়সে বৈধব্য, এবং শঙ্খেশ্বরের মাহাত্ম্য শুনে তীর্থে থেকেই ভক্তিভাবে সাধনা করার সংকল্পের কথা জানান। অরুন্ধতী তাঁকে সরস্বতী-তীরস্থিত আশ্রমে, যেখানে নিত্য শাস্ত্র-আলোচনা হয়, বাসের আমন্ত্রণ দেন। এরপর কাহিনিতে বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠের সংঘর্ষের সঙ্গে যুক্ত এক দিব্য শক্তির কথা আসে, যাকে বশিষ্ঠ স্থিত করে রক্ষাকারী দেবী হিসেবে পূজ্য করেন। ধারা রত্নখচিত প্রাসাদসদৃশ মন্দির নির্মাণ করে স্তোত্র পাঠ করেন—দেবীকে জগতের আধার এবং লক্ষ্মী, শচী, গৌরী, স্বাহা, স্বধা, তুষ্টি, পুষ্টি প্রভৃতি বহু রূপে বন্দনা করেন। দীর্ঘকাল নিত্য পূজার পর চৈত্র শুক্ল অষ্টমীতে স্নান-অর্ঘ্য-নৈবেদ্য নিবেদন করলে দেবী প্রকাশিত হয়ে বর দেন এবং সেই মন্দিরে ‘ধারা’ নাম গ্রহণ করেন। আচারবিধি ঘোষিত হয়—যে নাগর তিনবার প্রদক্ষিণা করে, তিনটি ফল অর্পণ করে ও স্তোত্র পাঠ করে, সে এক বছর রোগভয় থেকে রক্ষা পায়। নারীদের জন্যও ফল বলা হয়েছে—বন্ধ্যাকে সন্তান, দুর্ভাগ্যনাশ, স্বাস্থ্য ও মঙ্গললাভ। শেষে ফলশ্রুতি—এই উৎপত্তিবৃত্তান্ত পাঠ বা শ্রবণ করলে পাপমুক্তি হয়; বিশেষত নাগরদের ভক্তিভাবে অধ্যয়ন করতে বলা হয়েছে।

धारातीर्थोत्पत्तिमाहात्म्यवर्णनम् (Dhārā-tīrtha Origin and Its Sacred Merit)
সূত বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠের প্রসঙ্গে আর-এক আশ্চর্য কাহিনি বলেন। বিশ্বামিত্র বশিষ্ঠের প্রতি যে শত্রু-শক্তি নিক্ষেপ করেন, বশিষ্ঠ অথর্বণ মন্ত্রবলে তা রোধ করে শান্ত করেন। তারপর বশিষ্ঠের দেহে স্বেদ উৎপন্ন হয়; সেই স্বেদ থেকেই শীতল, স্বচ্ছ, পবিত্র জল প্রকাশ পেয়ে তাঁর চরণ থেকে প্রবাহিত হয়ে ভূমি ভেদ করে নির্মল ধারায় বেরিয়ে আসে—গঙ্গাজলের ন্যায় নিষ্কলুষ তীর্থ। এই ধারাতীর্থে স্নান করলে সন্তানহীনা নারীরাও তৎক্ষণাৎ সন্তানলাভ করেন—এমন ফলশ্রুতি বলা হয়েছে; আর যে কেউ স্নান করলে সকল তীর্থের ফল লাভ করে। স্নানের পর দেবীর যথাবিধি দর্শনে ধন, ধান্য, সন্তান এবং রাজসুখ-সম্পর্কিত সৌভাগ্য প্রাপ্ত হয়। চৈত্র শুক্ল অষ্টমীর মধ্যরাত্রিতে নৈবেদ্য ও বলি-পিণ্ডিকা অর্পণের বিধান আছে; সেই পিণ্ডিকা গ্রহণ বা ভক্ষণ করলে বার্ধক্যেও বিশেষ ফলদায়ক বলা হয়েছে। শেষে দেবীকে বহু নাগর বংশের কুলদেবী রূপে স্থাপন করে বলা হয়—যাত্রার পূর্ণতার জন্য নাগরদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

वसिष्ठविश्वामित्रयुद्धे दिव्यास्त्रनिवर्तनवर्णनम् (Restraint of Divine Weapons in the Vasiṣṭha–Viśvāmitra Conflict)
সূত বর্ণনা করেন যে বশিষ্ঠ–বিশ্বামিত্র সংঘর্ষ ক্রমে ভয়ংকর রূপ নেয়। শক্তি নিষ্ফল হওয়ায় ক্রুদ্ধ বিশ্বামিত্র দীক্ষিত দিব্যাস্ত্র, এমনকি ব্রহ্মাস্ত্রও নিক্ষেপ করেন। ফলে উল্কার মতো প্রক্ষেপ, অস্ত্রের বিস্তার, সমুদ্রের কম্পন, পর্বতশিখর ভাঙন ও রক্তবৃষ্টির মতো দৃশ্য দেখা দেয়—যা প্রলয়ের লক্ষণ বলে মনে হয়। দেবতারা আতঙ্কিত হয়ে ব্রহ্মার শরণ নেন; ব্রহ্মা বলেন, এটি দিব্যাস্ত্র-যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, এবং দেবগণকে নিয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আসেন। ব্রহ্মা বিশ্ববিনাশ রোধে যুদ্ধ থামাতে বলেন। বশিষ্ঠ জানান, তিনি প্রতিশোধে নয়, মন্ত্রবলে আত্মরক্ষার্থে আগত অস্ত্রগুলিকে নিষ্ক্রিয় করছেন। ব্রহ্মা বিশ্বামিত্রকে অস্ত্র-মোচন বন্ধ করতে নির্দেশ দেন এবং বাক্য দ্বারা সমাধান চান; তিনি বশিষ্ঠকে ‘ব্রাহ্মণ’ বলে সম্বোধন করে উত্তেজনা কমাতে চেষ্টা করেন। বিশ্বামিত্রের ক্রোধ সম্মান ও স্বীকৃতির প্রশ্নে; কিন্তু বশিষ্ঠ তাঁকে ক্ষত্রিয়জন্মা মনে করে ‘ব্রাহ্মণ’ উপাধি দিতে অস্বীকার করেন এবং ব্রহ্মতেজের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেন। শেষে ব্রহ্মা শাপের ভয় দেখিয়ে দিব্যাস্ত্র ত্যাগ করান। ব্রহ্মা প্রস্থান করলে ঋষিগণ সরস্বতী তীরে অবস্থান করেন। অধ্যায়টি সংযম, শুদ্ধ বাক্য এবং ধ্বংসশক্তিকে ধর্মসীমায় নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়।

सारस्वतजलस्य रुधिरत्व-प्रसङ्गः (The Episode of the Sarasvata Water Turning to Blood)
সূত বলেন—বসিষ্ঠকে ক্ষতি করার জন্য ‘ছিদ্র’ অন্বেষণ করতে করতে বিশ্বামিত্র মহাসরস্বতী নদীকে আহ্বান করেন। নদী নারী-রূপে আবির্ভূত হয়ে উপদেশ জানতে চাইলে বিশ্বামিত্র আদেশ দেন—বসিষ্ঠ যখন স্নান করবেন, তখন প্রবল স্রোতে তাঁকে আমার কাছে টেনে আন, যাতে আমি তাঁকে বধ করতে পারি। সরস্বতী প্রত্যাখ্যান করে বলেন—মহাত্মা বসিষ্ঠের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করব না; ব্রাহ্মণবধ অধর্ম। তিনি ধর্মবাণী স্মরণ করান—ব্রাহ্মণহত্যার মানসিক সংকল্পেও কঠোর প্রায়শ্চিত্ত লাগে, আর এমন হত্যার পক্ষে বাক্যপ্রচারেও শুদ্ধিকর্ম আবশ্যক। ক্রুদ্ধ বিশ্বামিত্র শাপ দেন—আজ্ঞা না মানায় তোমার জল রক্তধারায় পরিণত হবে। তিনি সাতবার জলকে অভিমন্ত্রিত করে নদীতে নিক্ষেপ করেন; সঙ্গে সঙ্গে শঙ্খশুভ্র, পরম পুণ্যদায়ী সরস্বতীর জলও রক্ত হয়ে যায়। ভূত-প্রেত-নিশাচররা জড়ো হয়ে পান করে উল্লাস করে; তপস্বী ও স্থানীয় জনতা দূরে সরে যায়। বসিষ্ঠ অর্বুদ পর্বতে গমন করেন। বিশ্বামিত্র চামৎকারপুরে গিয়ে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে ঘোর তপস্যা করেন এবং সৃষ্টিশক্তিতে ব্রহ্মার সমকক্ষ হওয়ার সামর্থ্য লাভ করেন। শেষে বলা হয়—বিশ্বামিত্রের শাপেই সরস্বতীর জল রক্ত হয়েছিল, এবং চণ্ডশর্মা প্রভৃতি ব্রাহ্মণরা স্থানান্তরিত হয়েছিলেন।

सरस्वती-शापमोचनं तथा साभ्रमत्युत्पत्तिवृत्तान्तः (Release of Sarasvatī from the Curse and the Origin Account of Sābhramatī)
অধ্যায় ১৭৩-এ ঋষিদের প্রশ্নের উত্তরে সূত বলেন—বিশ্বামিত্রের মন্ত্রসিদ্ধি-সম্পর্কিত শাপপ্রভাবে সরস্বতীর জল রক্তসদৃশ হয়ে ওঠে, ফলে নদীটি রক্তপ্রবাহের মতো দেখা দেয়। ক্লিষ্ট সরস্বতী বশিষ্ঠের শরণ নেন এবং জানান—তার স্রোত রক্তৌঘে পরিণত হওয়ায় তপস্বীরা তা পরিত্যাগ করেন, আর বিঘ্নকারী সত্তারা সেখানে বিচরণ করে। তিনি প্রার্থনা করেন যেন তাকে পুনরায় নির্মল সালিলরূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। বশিষ্ঠ সক্ষমতার আশ্বাস দিয়ে প্লক্ষবৃক্ষচিহ্নিত স্থানে সমাধিতে প্রবেশ করেন, বরুণ-সম্পর্কিত মন্ত্রে ভূমি বিদীর্ণ করে প্রচুর জলধারা উদ্গীরণ করেন। দুটি নির্গম বর্ণিত—একটি নবীন সরস্বতী হয়ে প্রবল বেগে রক্তদোষ ধুয়ে নিয়ে যায়; অন্যটি পৃথক নদী হয়ে ‘সাভ্রমতী’ নামে প্রবাহিত হয়। শেষে ফলশ্রুতি—এই সারস্বত ব্যাখ্যা পাঠ বা শ্রবণে সরস্বতীর কৃপায় বুদ্ধির স্বচ্ছতা ও বৃদ্ধি ঘটে।

Pippalāda-utpatti-varṇana and Kaṃsāreśvara-liṅga Māhātmya (पिप्पलादोत्पत्तिवर्णनं; कंसारेश्वरलिङ्गमाहात्म्यम्)
এই অধ্যায়ে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্র-মাহাত্ম্যের অন্তর্গত তীর্থকথা প্রশ্নোত্তর রীতিতে বর্ণিত। সূত বলেন, পিপ্পলাদ প্রতিষ্ঠিত ‘কংসারেশ্বর’ শিবলিঙ্গের দর্শন, নমস্কার ও পূজায় ক্রমে পাপক্ষয়, অশুচি-নাশ ও মহাপুণ্য লাভ হয়। ঋষিরা পিপ্পলাদের পরিচয় ও লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠার কারণ জানতে চান। সূত জন্মকথা বলেন—যাজ্ঞবল্ক্যের ভগিনী কংসারী অনিচ্ছাকৃতভাবে বস্ত্র-সম্পর্কিত শুক্র-মিশ্রিত জলের স্পর্শে গর্ভবতী হন। লজ্জায় গোপনে প্রসব করে অশ্বত্থ (পিপ্পল) গাছের তলে শিশুকে রেখে রক্ষার প্রার্থনা করেন। দিব্যবাণী জানায়, উতথ্যের শাপে বৃহস্পতির এই পৃথিবীতে অবতরণ; পিপ্পল-রসের দ্বারা প্রতিপালিত হওয়ায় তার নাম হবে ‘পিপ্পলাদ’। কংসারী লজ্জায় প্রাণত্যাগ করেন, আর শিশু পিপ্পলের নিকটেই বড় হয়। নারদ মুনি এসে বালকের উৎপত্তি প্রকাশ করেন এবং অথর্ববেদ-সম্পর্কিত সাধনা ও জীবিকা-পথ নির্দেশ দেন। পরে পিপ্পলাদের ক্রোধে শনৈশ্চর পতিত হয়; নারদের মধ্যস্থতায় স্তোত্র ও সমঝোতা স্থির হয়—বিশেষত আট বছর পর্যন্ত শিশুদের রক্ষা, তেল-লেপন, নির্দিষ্ট দান ও পূজাবিধি। শেষে নারদ পিপ্পলাদকে চমৎকারপুরে নিয়ে যাজ্ঞবল্ক্যের হাতে অর্পণ করেন; এভাবে বংশ, স্থান ও লিঙ্গ-মাহাত্ম্য একসূত্রে গাঁথা হয়।

याज्ञवल्क्येश्वरोत्पत्तिमाहात्म्यवर्णनम् (Origin and Glory of Yājñavalkyeśvara Liṅga)
এই অধ্যায়ে সূতের বর্ণনায় যাজ্ঞবল্ক্য ও ব্রহ্মার সংলাপ প্রকাশিত। অন্তরের দুঃখ ও চিত্তশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষায় যাজ্ঞবল্ক্য এমন প্রায়শ্চিত্ত চান যা আধ্যাত্মিক স্বচ্ছতা দেবে। ব্রহ্মা তাঁকে নির্দেশ দেন—অতিপুণ্যময় হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে শূলিন শিবের লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করো; এই ক্ষেত্র সঞ্চিত পাপ নাশ করে ও শুদ্ধি প্রদান করে। এখানে প্রায়শ্চিত্তের যুক্তি বলা হয়েছে—অজ্ঞানে বা জেনে যে পাপই হোক, শিবমন্দির নির্মাণ ও লিঙ্গকেন্দ্রিক ভক্তিপূজা নৈতিক অন্ধকার দূর করে, যেমন সূর্যোদয় রাত্রির অন্ধকার নাশ করে। কলিযুগে বহু তীর্থের ফলহীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উল্লিখিত, কিন্তু হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রকে তার ব্যতিক্রম হিসেবে বিশেষ ফলদায়ক বলা হয়েছে। ব্রহ্মা প্রস্থান করলে যাজ্ঞবল্ক্য লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন এবং অষ্টমী ও চতুর্দশীতে ভক্তিসহ লিঙ্গাভিষেক (স্নাপন) করার বিধান ঘোষণা করেন—এতে দোষ ক্ষয় হয় ও পবিত্রতা ফিরে আসে। এই লিঙ্গই হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে “যাজ্ঞবল্ক্যেশ্বর” নামে প্রসিদ্ধ হয়।

कंसारीश्वर-उत्पत्तिमाहात्म्य-वर्णनम् (Origin and Glory of Kaṃsārīśvara)
সূত এক তীর্থ-উৎপত্তির কাহিনি বলেন, যেখানে যাজ্ঞবল্ক্যের প্রসঙ্গসহ মাতৃ-শুদ্ধির উদ্দেশ্যে একটি লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রধান উদ্যোগী পিপ্পলাদ শ্রুতি-অধ্যয়ন ও যজ্ঞকর্মে পারদর্শী ব্রাহ্মণদের আহ্বান করে জানান—তাঁর মাতা কংসারীর মৃত্যু হয়েছে; তাঁর স্মৃতিতে তিনি লিঙ্গের অভিষেক-প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তাঁদের পরামর্শে জনসমক্ষে স্বীকৃতি চান। তিনি গোবর্ধনকে নাগর সমাজকে নিয়মিত পূজায় প্রবৃত্ত করার নির্দেশ দেন—নিত্য পূজায় বংশের সমৃদ্ধি, অবহেলায় অবনতি—এই সামাজিক-ধর্মীয় বক্তব্য স্পষ্ট করেন। ব্রাহ্মণসমাজ দেবতার নাম স্থির করে “কংসারীশ্বর”। এরপর পাঠ-শ্রবণ ও দেবসান্নিধ্যে ভক্তিচর্চার ফল বলা হয়—অষ্টমী ও চতুর্দশীতে স্নান, নীলরুদ্র ও অন্যান্য রুদ্র-মন্ত্র জপ, এবং দেবালয়ে অথর্ববেদের পাঠ। এর ফলে গুরুতর পাপক্ষয়, রাজনীতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে রক্ষা, শত্রুনাশ, সময়মতো বৃষ্টি, রোগ-দুঃখের উপশম এবং ধর্মময় শাসনের উদয়—এসব ফল পিপ্পলাদের আশ্বাস ও ক্ষেত্র-মাহাত্ম্যের ভিত্তিতে ঘোষিত।

पञ्चपिण्डिकोत्पत्तिमाहात्म्यवर्णनम् (The Māhātmya of the Origin of Pañcapinḍikā)
এই অধ্যায়ে সূত ঋষিদের সঙ্গে সংলাপরূপে তীর্থ‑অনুষ্ঠান ও ব্রতবিধি বর্ণনা করেন। গৌরীকে এখানে “পঞ্চপিণ্ডিকা” বলা হয়েছে; জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষে, সূর্য বৃষ রাশিতে থাকলে, নারীরা দেবীর উপরে জলযন্ত্র স্থাপন করে পূজা করে। একে বহু কঠিন ব্রতের সংক্ষিপ্ত বিকল্প এবং গৃহস্থ‑সৌভাগ্যদায়ক পুণ্যকর্ম বলা হয়েছে। এরপর ঋষিরা “পাঁচ পিণ্ড”‑এর তাত্ত্বিক ভিত্তি জানতে চান। সূত বলেন, দেবী সর্বব্যাপিনী পরাশক্তি; সৃষ্টি ও রক্ষার জন্য তিনি পঞ্চতত্ত্ব—পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ—রূপে পঞ্চবিধ প্রকাশ ধারণ করেন। এই রূপে উপাসনা করলে পুণ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পরে লক্ষ্মী কাশীর রাজা ও প্রিয় রানি পদ্মাবতীর কাহিনি বলেন—পদ্মাবতী জলস্থানে মাটির পঞ্চপিণ্ডিকা নিত্য পূজা করে সৌভাগ্য বৃদ্ধি করেন, ফলে সহ‑রানিরা রহস্য জিজ্ঞাসা করে। পদ্মাবতী পঞ্চতত্ত্ব‑সংযুক্ত “পঞ্চ‑মন্ত্র” প্রকাশ করেন এবং মরুভূমির সংকটে বালুকা‑পূজা করে দেবীর কৃপা লাভ করে পরে সমৃদ্ধি অর্জন করেন। শেষে পঞ্চ‑মন্ত্র (তত্ত্ব‑নমস্কার) স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে, হাটকেশ্বর‑ক্ষেত্রে লক্ষ্মীর প্রতিষ্ঠার উল্লেখ আছে, এবং ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—সেখানে পূজা করলে নারীরা স্বামীর প্রিয় হন ও পাপমুক্ত হন।

Pañcapinḍikā-Gauryutpatti Māhātmya (The Glory of the Emergence of Pañcapinḍikā Gaurī) | पञ्चपिण्डिकागौर्युत्पत्तिमाहात्म्यम्
এই অধ্যায়ে বহু-কণ্ঠে তত্ত্বকথা প্রবাহিত। লক্ষ্মী নিজের সংকট জানান—গৌরী-পূজায় রাজলক্ষ্মী লাভ হলেও সন্তানহীনতার দুঃখ তাঁকে পীড়িত করে। চাতুর্মাস্যে আনর্ত-রাজার প্রাসাদে দুর্বাসা মুনি আগমন করেন; যথাযথ আতিথ্য ও শুশ্রূষায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি উপদেশ দেন—কাঠ, পাথর বা মাটিতে দেবতা স্বতঃসিদ্ধভাবে বাস করেন না; মন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ভক্তিভাবেই দেবসান্নিধ্য প্রকাশ পায়। দুর্বাসা রাত্রির প্রহরানুসারে চাররূপ গৌরীর নির্মাণ-ব্যবস্থা, ধূপ-দীপ-নৈবেদ্য-অর্ঘ্যাদি সহ পূজা ও বিশেষ আহ্বানযুক্ত নিয়মব্রত নির্ধারণ করেন; প্রভাতে ব্রাহ্মণ দম্পতিকে দান এবং শেষে বাহন-প্রেরণ ও নিগমন-নিক্ষেপরূপ সমাপনী ক্রিয়াও বলেন। পরে দেবীর সংশোধনী নির্দেশ আসে—চার মূর্তিকে জলে বিসর্জন না দিয়ে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে, যাতে নারীদের কল্যাণে অক্ষয় ফল হয়। লক্ষ্মী বর চান—বারংবার মানবগর্ভধারণ থেকে মুক্তি ও বিষ্ণুর সঙ্গে চিরস্থায়ী সংযোগ; ফলশ্রুতিতে শ্রদ্ধাবান পাঠকের স্থায়ী লক্ষ্মী ও দুর্ভাগ্য-নিবারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

Puṣkara-trayotpatti and Yajña-samārambha in Hāṭakeśvara-kṣetra (पुष्करत्रयोत्पत्ति–यज्ञसमारम्भः)
এই অধ্যায়ে সূত হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে অবস্থিত ‘পুষ্কর-ত্রয়’-এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। বলা হয়, এর দর্শন, স্পর্শ বা নাম-স্মরণমাত্রেই পাপ সূর্যের আলোয় অন্ধকারের মতো লয় পায়। ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—ব্রহ্মার তীর্থরূপে প্রসিদ্ধ পুষ্কর কীভাবে এখানে প্রতিষ্ঠিত হল। সূত নারদ-ব্রহ্মা সংলাপের কাহিনি বলেন। নারদ কলিযুগে ধর্মশাসন, যজ্ঞাচার ও সমাজ-শৃঙ্খলার অবক্ষয়ের সংবাদ দেন। কলির প্রভাবে পুষ্কর কলুষিত হবে ভেবে ব্রহ্মা কলিহীন স্থানে তীর্থ স্থাপন করতে স্থির করেন। তিনি একটি পদ্ম পৃথিবীতে পতিত করেন; তা হাটকেশ্বর অঞ্চলে বেদজ্ঞ, সংযমী ব্রাহ্মণ ও তপস্বীদের মধ্যে এসে পড়ে। পদ্মটি তিনবার সরে গিয়ে তিনটি গর্ত সৃষ্টি করে; সেগুলি নির্মল জলে পূর্ণ হয়ে জ্যেষ্ঠ, মধ্য ও কনীয়ক—তিন পুষ্কর-কুণ্ডে পরিণত হয়। ব্রহ্মা ক্ষেত্রের স্তব করেন, স্নানফল ও কার্ত্তিক-শ্রাদ্ধের মহিমা (গয়াশীর্ষসম পুণ্য) ঘোষণা করেন এবং যজ্ঞের আয়োজন শুরু করেন। তিনি বায়ুকে আদেশ দেন ইন্দ্রাদি দেবগণকে আহ্বান করতে; ইন্দ্র প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও যোগ্য ব্রাহ্মণ আনেন, এবং ব্রহ্মা বিধিপূর্বক পূর্ণ দক্ষিণাসহ যজ্ঞ সম্পন্ন করেন।

Brahmayajñopākhyāna: Ṛtvig-vyavasthā, Yajñamaṇḍapa-nirmāṇa, and Deva-sahāya (Chapter 180)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—পবিত্র ক্ষেত্রে ব্রহ্মার সেই মহাযজ্ঞে কোন দেবতার আরাধনা হয়, কোন কোন ঋত্বিক কোন পদে থাকেন, কী দক্ষিণা দেওয়া হয়, এবং অধ্বর্যু প্রভৃতি কর্মকারীদের নিয়োগ কীভাবে স্থির হয়। সূত যজ্ঞের বিধিবদ্ধ প্রস্তুতি ও বিন্যাস বর্ণনা করেন। ইন্দ্র ও শম্ভু তাঁদের দিব্য পরিজনসহ সহায়তার জন্য উপস্থিত হন। ব্রহ্মা শাস্ত্রসম্মত আতিথ্য করে তাঁদের দায়িত্ব বণ্টন করেন। এরপর বিশ্বকর্মাকে যজ্ঞমণ্ডপ নির্মাণের আদেশ দেন—পত্নীশালা, বেদী, অগ্নিকুণ্ড, পাত্র-চষক, যূপ, পাকখাত, বিস্তৃত ইষ্টকাবিন্যাস—এবং হিরণ্ময় পুরুষের স্বর্ণমূর্তি নির্মাণও নির্দিষ্ট করেন। বৃহস্পতিকে ষোলো জন যোগ্য ঋত্বিক আহ্বানের ভার দেওয়া হয়; ব্রহ্মা নিজে তাঁদের পরীক্ষা করে নিয়োগ করেন। শেষে ষোলো ঋত্বিকের নাম ও পদ (হোতা, অধ্বর্যু, উদ্গাতা, অগ্নীধ্র, ব্রহ্মা প্রভৃতি) তালিকাভুক্ত হয় এবং ব্রহ্মা দীক্ষা ও যজ্ঞারম্ভে তাঁদের সহায়তা বিনীতভাবে প্রার্থনা করেন।

गायत्रीतीर्थमाहात्म्यवर्णनम् (Gayatrī-tīrtha Māhātmya: The Glory and Origin of Gayatrī Tīrtha)
অধ্যায় ১৮১-এ হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে যজ্ঞকর্মের বৈধতা নিয়ে ধর্ম-আইনগত বিতর্ক বর্ণিত। নাগর ব্রাহ্মণরা নিজেদের বংশানুক্রমিক অধিকার রক্ষায় মধ্য্যগকে দূত করে পদ্মজ ব্রহ্মার কাছে পাঠায়, কারণ ব্রহ্মা স্থানীয় নাগরদের বাদ দিয়ে বহিরাগত ঋত্বিকদের দিয়ে যজ্ঞ করছিলেন। নাগররা ঘোষণা করে—তাদের বর্জন করে করা যজ্ঞ/শ্রাদ্ধ নিষ্ফল; পূর্বে প্রদত্ত ক্ষেত্র-দান ও সীমারেখায় এই অধিকার নির্দিষ্ট। ব্রহ্মা শান্ত ভাষায় প্রক্রিয়াগত ত্রুটি স্বীকার করে বিধান স্থাপন করেন—এই ক্ষেত্রে নাগরদের বাদ দিয়ে করা কর্ম ফলহীন হবে; আবার নাগররা ক্ষেত্রের বাইরে করলে তাও নিষ্ফল—এভাবে পারস্পরিক অধিকার-নিয়ম স্থির হয়। এরপর যজ্ঞ সম্পন্ন করার তাড়না আসে। সাবিত্রী দেরি করায় নারদ, পরে পুলস্ত্য তাকে আনতে যান; সময় ফুরোতে থাকলে ইন্দ্র এক গোপকন্যাকে নিয়ে আসেন, যাকে বিধিপূর্বক সংস্কার করে ব্রহ্মার বিবাহযোগ্য করা হয়। রুদ্রাদি দেবতা ও ব্রাহ্মণরা তাকে ‘গায়ত্রী’ রূপে স্বীকৃতি দিয়ে বিবাহ সম্পন্ন করেন, যাতে যজ্ঞ পূর্ণ হয়। শেষে তীর্থফলশ্রুতি—এই স্থান মঙ্গল ও সমৃদ্ধিদায়ক; এখানে পাণিগ্রহণ, পিণ্ডদান, কন্যাদান ইত্যাদি করলে বহুগুণ পুণ্য লাভ হয়।

रूपतीर्थोत्पत्तिपूर्वकप्रथमयज्ञदिवसवृत्तान्तवर्णनम् (Origin of Rūpatīrtha and the Account of the First Day of the Sacrifice)
এই অধ্যায়ে যজ্ঞমণ্ডপে সংঘটিত এক পবিত্র ঘটনার বর্ণনা আছে। ব্রহ্মা গায়ত্রীসহ যজ্ঞশালায় প্রবেশ করে মানবভাব ধারণ করেন এবং দণ্ড, অজিন, মেখলা ও মৌনব্রত প্রভৃতি বৈদিক লক্ষণসহ যজ্ঞের প্রস্তুতি সম্পন্ন করান। প্রবর্গ্যকালে জাল্ম নামে নগ্ন, কপালধারী এক তপস্বী অন্ন প্রার্থনা করে; প্রত্যাখ্যাত হলে তার কপাল নিক্ষিপ্ত হয়, কিন্তু তা আশ্চর্যভাবে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে সমগ্র যজ্ঞাঙ্গণ ভরে যজ্ঞের ধারাবাহিকতাকে বিপন্ন করে তোলে। ব্রহ্মা ধ্যানযোগে উপলব্ধি করেন যে এতে শৈব তত্ত্ব নিহিত এবং মহেশ্বরকে শরণ নেন। শিব বলেন—কপাল তাঁর প্রিয় পাত্র, এবং রুদ্রের উদ্দেশ্যে আহুতি না দেওয়াতেই এই বিঘ্ন; তিনি নির্দেশ দেন কপালের মাধ্যমেই রুদ্রার্পিত আহুতি প্রদান করতে, তবেই যজ্ঞ সম্পূর্ণ হবে। ব্রহ্মা ভবিষ্যৎ যজ্ঞে শতরুদ্রীয় পাঠ ও মাটির কপালে রুদ্রার্পণ গ্রহণ করেন; শিব সেখানে কপালেশ্বর রূপে ক্ষেত্ররক্ষক হয়ে প্রকাশিত হন। এরপর ফলশ্রুতি—ব্রহ্মার তিন কুণ্ডে স্নান ও লিঙ্গপূজায় উৎকৃষ্ট আধ্যাত্মিক ফল লাভ হয়; কার্ত্তিক শুক্ল চতুর্দশীতে রাত্রিজাগরণ জন্মগত দোষমোচন করে। দক্ষিণপথ থেকে আগত ঋত্বিক-মুনিরা মধ্যাহ্নতাপে ক্লান্ত হয়ে নিকটবর্তী জলে স্নান করলে তাদের বিকৃত রূপ সুন্দর হয়ে ওঠে; তাই তারা স্থানটির নাম রাখে ‘রূপতীর্থ’ এবং বলে—এখানে স্নানে জন্মজন্মান্তরে সৌন্দর্য, পিতৃকর্মের বৃদ্ধি এবং দানে রাজসমৃদ্ধি হয়। শেষে তারা ফিরে এসে রাত্রি জুড়ে যজ্ঞবিধি নিয়ে শাস্ত্রচর্চা করে—সঠিক দেবতাসমর্পণেই যজ্ঞশৃঙ্খলা রক্ষিত থাকে।

Nāgatīrthotpatti-māhātmya (Origin and Significance of Nāgatīrtha)
এই অধ্যায়ে বহুদিনব্যাপী যজ্ঞে এক বিঘ্নের কাহিনি আছে। এক কিশোর তপস্বী ব্রহ্মচারী (বটু) কৌতুকে এক নিরবিষ জলসাপ যজ্ঞসভায় ছুড়ে দিলে ঋত্বিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। সাপটি হোতৃ বা প্রধান কর্মকারীর গায়ে পেঁচিয়ে বসে; ক্রোধে শাপ উচ্চারিত হয় এবং বটু নিজেই সাপত্বে আক্রান্ত হয়—যজ্ঞশিষ্টাচার ভঙ্গ ও অনিচ্ছাকৃত কর্মফলের পুরাণীয় বোধ প্রকাশ পায়। দুঃখিত বটু ভৃগুর শরণ নেয়; ভৃগু করুণায় বলেন, সাপটি নিরবিষ ছিল, শাস্তি অতিরিক্ত হয়ে গেছে। তখন ব্রহ্মা এসে ঘটনাটিকে দैব-ব্যবস্থারূপে ব্যাখ্যা করেন—বটুর সাপরূপ পৃথিবীতে নবম নাগবংশের উৎপত্তির বীজ হবে, এবং তারা মন্ত্র ও ঔষধবিদ্যার সাধকদের প্রতি অনিষ্টকারী হবে না। হাটকেশ্বর ক্ষেত্রে এক মনোরম জলস্রোতকে ‘নাগতীর্থ’ নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়। শ্রাবণ কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চমী (এবং ভাদ্রপদের উল্লেখসহ) সেখানে স্নান-পূজার বিধান; সাপভয় নাশ, বিষপীড়িতের উপশম, দুর্ভাগ্যহরণ ও সন্তানলাভের শুভফল বলা হয়েছে। বাসুকি, তক্ষক, পুণ্ডরীক, শেষ, কালিয় প্রভৃতি প্রধান নাগদের সমাবেশ বর্ণিত; ব্রহ্মা তাদের যজ্ঞরক্ষার দায়িত্ব দেন এবং নাগতীর্থে নিয়মিত সম্মান স্থাপন করেন। এই মাহাত্ম্য শ্রবণ-পাঠ-লেখন-সংরক্ষণ করলেও রক্ষাফল লাভ হয়; যেখানে গ্রন্থ রাখা থাকে, সেখানে অভয়প্রাপ্তি বলা হয়েছে।

पिंगलोपाख्यानवर्णनम् | Piṅgalā-Upākhyāna (Narrative of Piṅgalā) on the Third Day of the Brahmayajña
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মযজ্ঞের তৃতীয় দিনে যজ্ঞমণ্ডপের বর্ণনা আছে—ঋত্বিজরা নিজ নিজ কর্মে নিয়োজিত, রান্না করা অন্ন, ঘৃত ও দুগ্ধের প্রাচুর্য, এবং দানের জন্য বিপুল ধন-সম্পদে যজ্ঞের সমৃদ্ধি প্রকাশ পায়। এমন ঐশ্বর্যময় পরিবেশেই উচ্চ জ্ঞানের অনুসন্ধান জাগে। তখন ত্রিকালদর্শীর ন্যায় এক জ্ঞানী অতিথি আগমন করেন; তাঁকে সম্মান জানানো হয়, আর পুরোহিতেরা তাঁর অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টির উৎস জানতে চান। অতিথি নিজের জীবনকথা বলে জানান যে তিনি ছয়জন “গুরু” পেয়েছেন—পিঙ্গলা নাম্নী এক গণিকা, কুরর পাখি, সাপ, সারঙ্গ হরিণ, তীর-নির্মাতা ইষুকার, এবং এক কন্যা। তাঁর বক্তব্য—একজন মানব-গুরুর কাছেই নয়, জীবজগতের আচরণ মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ ও মননে থেকেও শিক্ষা লাভ হয়। পিঙ্গলার উপদেশে বলা হয়, আশা-বন্ধ তৃষ্ণা দুঃখ আনে, প্রত্যাশা ত্যাগে শান্তি আসে; সে প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শন ও উৎকণ্ঠিত অপেক্ষা ছাড়ে এবং তৃপ্তচিত্তে নিদ্রা যায়। কথকও সেই বৈরাগ্য গ্রহণ করে দেখান—অন্তঃশান্তি দেহেরও মঙ্গল করে, বিশ্রাম, হজম ও শক্তি বৃদ্ধি পায়। শেষে নীতি—লাভের সঙ্গে কামনা বাড়ে, তাই দিনে এমন কর্ম করো যাতে রাতে নির্ভার ও নির্বিঘ্নে ঘুম আসে।

अतिथ्य-पूजा, वैराग्योपदेशः, यज्ञपुरुष-स्मरणविधिः (Hospitality Worship, Instruction in Renunciation, and the Protocol of Remembering Yajñapuruṣa)
এই অধ্যায়ে অতিথি-রূপ তপস্বী ব্রাহ্মণসমাজের সামনে শিক্ষামূলক আত্মকথা বলেন। তিনি বোঝান যে ধনাসক্তি সামাজিক হেনস্থা ও মানসিক ক্লান্তি বাড়ায়। কুরর পাখির দৃষ্টান্তে তিনি শেখেন—যে বস্তু নিয়ে লড়াই, তা ত্যাগ করলে বিবাদ থামে; তাই তিনি সম্পদ আত্মীয়দের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে শান্তি লাভ করেন। পরে সাপের কাছ থেকে তিনি উপলব্ধি করেন যে গৃহনির্মাণ ও সম্পত্তিকে ‘আমার’ বলে আঁকড়ে ধরা বন্ধন ও দুঃখের কারণ; সত্য যতির লক্ষণ—সীমিত বাস, মধুকরী ভিক্ষা, সমত্ব—এবং সন্ন্যাসভ্রষ্টতার কারণও তিনি উল্লেখ করেন। ভ্রমর থেকে তিনি বহু শাস্ত্র থেকে ‘সার’ সংগ্রহের আদর্শ নেন, আর ইষুকার (তীর-কারিগর) থেকে একাগ্রচিত্ততাকে ব্রহ্মজ্ঞান-প্রাপ্তির দ্বার বলে জানেন। তিনি অন্তর্নিহিত সূর্য/বিশ্বরূপ তত্ত্বে মন স্থির করেন। কন্যার চুড়ির উদাহরণে বলেন—অনেকে থাকলে শব্দ, দু’টি থাকলেও ঠোকাঠুকি, একটিই নীরব; তাই একাকী ভ্রমণ ও গভীর জ্ঞানের পথ প্রশস্ত হয়। পরবর্তী অংশে সূতবর্ণিত প্রসঙ্গে দেবতা ও ঋষিরা সমবেত হন, বর প্রদান করেন এবং যজ্ঞভাগ ছাড়া দেবতা-প্রাপ্তি নিয়ে বিতর্ক ওঠে। মহাদেব বিধান করেন—ভবিষ্যৎ শ্রাদ্ধে (দৈব বা পিতৃকর্মে) শেষে যজ্ঞপুরুষ, অর্থাৎ হরিকে আহ্বান ও পূজা করতে হবে; নচেৎ কর্ম নিষ্ফল। অতিথি হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে নিজের তীর্থের কথা বলেন এবং অঙ্গারক-যুক্ত চতুর্থীতে সেখানে স্নান করলে সর্বতীর্থফল লাভ হয় জানান। শেষে যজ্ঞারম্ভের প্রস্তুতি ও আচার সম্পন্ন হয়।

अतिथिमाहात्म्यवर्णनम् (Atithi-māhātmya: Theological Discourse on the Glory of Hospitality)
এই অধ্যায়ে ঋষিগণ গৃহস্থের অতিথি‑কর্তব্য (অতিথিকৃত্য) সম্পর্কিত সর্বোচ্চ মাহাত্ম্য বিস্তারে জানতে চান। সূত বলেন—অতিথি‑সত্কার গৃহস্থধর্মের পরম অঙ্গ; অতিথিকে অবমাননা করলে ধর্মক্ষয় ও পাপবৃদ্ধি ঘটে, আর যথাযথ সম্মান করলে পুণ্য রক্ষা ও চিত্তস্থিতি লাভ হয়। অতিথি তিন প্রকার—শ্রাদ্ধীয় (শ্রাদ্ধকালে আগত), বৈশ্বদেবীয় (বৈশ্বদেব‑সময়ে আগত) এবং সূর্যোধ (ভোজনের পরে বা রাত্রিতে আগত)। প্রত্যেকের জন্য স্বাগত, আসন, অর্ঘ্য‑পাদ্য ও ভক্তিসহ অন্নদান নির্দিষ্ট; কুল‑গোত্র জিজ্ঞাসায় কঠোরতা না করে যজ্ঞোপবীত প্রভৃতি লক্ষণ দেখে শ্রদ্ধায় সেবা করতে বলা হয়েছে। অতিথির তৃপ্তিকে দেবতা ও বিশ্বতত্ত্বের তৃপ্তির সমান বলা হয়েছে। শেষে ঘোষণা করা হয়—গৃহস্থের নৈতিক সংসারে অতিথি যেন সমগ্র দিব্য উপস্থিতির প্রতীক।

राक्षसप्राप्यश्राद्धवर्णनम् (Account of Śrāddha Offerings Accruing to a Rākṣasa)
সূত চতুর্থ দিনের যজ্ঞে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা বর্ণনা করেন। প্রাস্তাতৃ হোমের জন্য পশুর গুড়-অংশ আলাদা রেখেছিলেন; ক্ষুধায় তাড়িত এক যুব ব্রাহ্মণ তা খেয়ে ফেলে। ফলে হব্য অপবিত্র হয় এবং যজ্ঞে বিঘ্ন উপস্থিত হয়। প্রাস্তাতৃ শাপ দিলে যুবকটি বিকৃতদেহ রাক্ষসে পরিণত হয়; ঋত্বিকেরা রক্ষামন্ত্র ও দেবপ্রার্থনায় যজ্ঞ রক্ষা করেন। রাক্ষসটি পুলস্ত্যপুত্র বিশ্বাবসু বলে পরিচিত—বংশগতভাবে বিদ্বান। সে লোকপিতামহ ব্রহ্মার শরণ নিয়ে স্বীকার করে যে অজ্ঞানতায় নয়, কামনা-প্রবৃত্তিতে এই কাজ হয়েছে। ব্রহ্মা যজ্ঞসিদ্ধির জন্য শাপ প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন, কিন্তু প্রাস্তাতৃ বলেন তাঁর বাক্য অচ্যুত, তাই শাপ ফিরবে না। অতঃপর সমঝোতা স্থির হয়—চামৎকারপুরের পশ্চিমে বিশ্বাবসুর স্থান নির্ধারিত হয় এবং অন্য অশুভ সত্তাদের উপর কর্তৃত্ব দিয়ে নাগরের কল্যাণে নিয়ামক-রক্ষক রূপে স্থাপন করা হয়। পরে বলা হয়, দক্ষিণাহীন, তিল-দর্ভবর্জিত, অপাত্রে দত্ত, অশৌচ/অপরিচ্ছন্ন, অপবিত্র পাত্রে, অকালে বা বিধিভ্রষ্ট যে শ্রাদ্ধ—তা রাক্ষসের “অংশ” হয়; এটি শ্রাদ্ধশুদ্ধি ও আচারের সতর্ক তালিকা।

औदुम्बरी-माहात्म्यं तथा मातृगण-गमनं सावित्रीदत्त-शापवर्णनम् (Audumbarī’s Mahatmya; the arrival of the Mothers; Savitrī’s curse)
এই অধ্যায়ে বৈদিক যজ্ঞের পরিবেশ—সদস, ঋত্বিজ নির্বাচন, হোমের ক্রম, অধ্বর্যুর নির্দেশ এবং উদ্গাতার সামগান-সংযুক্ত কর্ম—যথাবিধি বর্ণিত। সেই সময় গন্ধর্ব পর্বতের কন্যা, জাতিস্মরা ঔদুম্বরী, সামগীতিতে আকৃষ্ট হয়ে শঙ্কু-চিহ্নিত যজ্ঞবিধি দেখে সভায় উপস্থিত হন। তিনি উদ্গাতার ত্রুটি নির্দেশ করে দক্ষিণাগ্নিতে অবিলম্বে হোম করার আদেশ দেন এবং জানান, যজ্ঞে সূক্ষ্ম বিধি-শুদ্ধি রক্ষাকর ও অপরিহার্য। কথোপকথনে তাঁর পূর্বশাপ প্রকাশ পায়—তান/মূর্ছনা প্রভৃতি সঙ্গীত-ভেদের বিষয়ে উপহাস করায় নারদ তাঁকে মানবজন্মে নিক্ষেপ করেন; মুক্তির শর্ত—পিতামহ-যজ্ঞের निर्णায়ক মুহূর্তে তিনি কথা বলবেন এবং সর্বদেব-সভায় তাঁর স্বীকৃতি হবে। ঔদুম্বরী ভবিষ্যৎ যজ্ঞের জন্য স্থায়ী নিয়ম চান—সদসের মধ্যভাগে তাঁর প্রতিমা স্থাপন হবে এবং শঙ্কু-গ্রহণ/প্রবৃত্তির আগে তাঁর পূজা হবে। দেবগণ ও উদ্গাতা এটিকে বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে মান্য করেন এবং ফলশ্রুতি বলেন—ফল, বস্ত্র, অলংকার, গন্ধ-অনুলেপন ইত্যাদি অর্পণ করলে পুণ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পরে নগরের নারীরা কৌতূহল ও ভক্তিতে এসে পূজা করে; তাঁর মানব পিতা-মাতা উপস্থিত হলেও তিনি স্বর্গীয় গতি রক্ষার্থে তাঁদের সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করতে নিষেধ করেন। এরপর বৃহৎ দেবসমাবেশ ও ছিয়াশি মাতৃগণ এসে স্থান ও মর্যাদা প্রার্থনা করেন। পদ্মজ ব্রহ্মা এক ‘নাগর-জন্মা’ বিদ্বান প্রতিনিধিকে প্রত্যেক গোষ্ঠীর জন্য অঞ্চলভিত্তিক আসন-সীমা নির্ধারণ করতে বলেন, ফলে দিব্য আগমন সুশৃঙ্খল পবিত্র ভূগোলে রূপ নেয়। তখন সাভিত্রী সম্মান-বণ্টনে উপেক্ষা বোধ করে শাপ দেন—মাতৃগণের গমন সীমাবদ্ধ হবে, ঋতুচরমতার কষ্ট ভোগ করতে হবে, এবং নগরে পূজা ও গৃহ-আশ্রয় মিলবে না। এই অধ্যায় যজ্ঞবিধির শুদ্ধতা, ঔদুম্বরী-প্রতিষ্ঠার বিধান, দেবসমষ্টির স্থান-ব্যবস্থা এবং সম্মান-অবিচারে শাপজনিত স্থায়ী প্রতিবন্ধের নীতি শিক্ষা দেয়।

औदुम्बर्युत्पत्तिपूर्वकतत्प्राग्जन्मवृत्तान्तवर्णनम् (Origin of Audumbarī and Account of Prior Birth; Hāṭakeśvara-kṣetra Māhātmya)
এই অধ্যায়ে শাপপীড়িত গন্ধর্ব-নারীরা—যারা রাত্রিকালে নৃত্য-গীতে জীবিকা নির্বাহ করে এবং সমাজে অবহেলিত—দেবী ঔদুম্বরীর শরণ নিয়ে বিলাপ করে কল্যাণের পথ জানতে চায়। দেবী সাবিত্রীদেবীর শাপের অটলতা স্বীকার করেও তাকে রক্ষাকবচস্বরূপ বর বলে ব্যাখ্যা করেন—তাদের ‘আটষট্টি গোত্রে’ নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকবে এবং নির্দিষ্ট স্থানে বিধিবদ্ধ পূজার মাধ্যমে তারা স্বীকৃতি লাভ করবে। এরপর নগর-মন্দিরের এক প্রথা বলা হয়—যে গৃহে মণ্ডপ-সম্পর্কিত বিশেষ সমৃদ্ধি বৃদ্ধি ঘটে, তাকে নির্দিষ্ট অর্ঘ্য/ব্রত পালন করতে হবে। নগরদ্বারে নারীদের একটি বিশেষ আচার, হাসি ও অঙ্গভঙ্গিসহ এবং বলিসদৃশ নিবেদনসহ, বিধান করা হয়েছে; পালন করলে যজ্ঞে অংশগ্রহণের মতো তৃপ্তি হয়, আর অবহেলা করলে সন্তানহানি, রোগ ইত্যাদি অমঙ্গল ঘটে। পরে দেবশর্মা ও তাঁর স্ত্রীর প্রসঙ্গে নারদের পূর্বশাপ থেকে ঔদুম্বরীর মানবদেহে অবতরণ এবং দেবীর উপস্থিতি ও আচার-অধিকারের কারণকথা প্রকাশ পায়। শেষে উৎসব ও অবভৃথ-স্নানের প্রসঙ্গ এনে ক্ষেত্রকে সর্বতীর্থময় বলা হয়েছে এবং বিশেষত পূর্ণিমায়, বিশেষ করে নারীদের দ্বারা পালিত ব্রতের অসাধারণ ফল ঘোষণা করা হয়েছে।

ब्रह्मयज्ञावभृथ-यक्ष्मतीर्थोत्पत्ति-माहात्म्य (Brahmā’s Yajña-Avabhṛtha and the Origin-Glory of the Yakṣmā Tīrtha)
এই অধ্যায়ে সূত-মুনির বর্ণনায় গভীর ধর্মতত্ত্ব প্রকাশিত হয়। হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে এক ব্রাহ্মণ পাঁচ রাত্রির পঞ্চরাত্র-ব্রত সম্পন্ন করে, কলিযুগে ক্রিয়াদূষণের আশঙ্কায় ভূমির উদ্ধারের জন্য কোন অর্ঘ্য/দান প্রযোজ্য—তা জানতে নাগর ব্রাহ্মণদের শরণ নেয়। তখন ব্রহ্মা তীর্থগুলির লোকস্থিতি ব্যাখ্যা করেন—নৈমিষ পৃথিবীতে, পুষ্কর অন্তরীক্ষে, আর কুরুক্ষেত্র ত্রিলোকে ব্যাপ্ত; এবং কার্ত্তিক শুক্ল একাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত পুষ্করের পৃথিবীতে সহজ সান্নিধ্য প্রতিশ্রুত হয়। শ্রদ্ধায় কৃত স্নান ও শ্রাদ্ধ অক্ষয় ফলদায়ক বলে ঘোষিত। পরবর্তী অংশে যজ্ঞসমাপ্তির বিধান আসে। পুলস্ত্য ঋষি এসে যজ্ঞবিধির শুদ্ধতা নিশ্চিত করেন এবং বরুণ-সম্পর্কিত সমাপনকর্ম, বিশেষত অবভৃথ-স্নান, নির্দেশ দেন—সে সময় তীর্থসমাগম ঘটে ও অংশগ্রহণকারীরা পবিত্র হয়। ভিড়ের কারণে ব্রহ্মা ইন্দ্রকে আদেশ দেন বাঁশে বাঁধা মৃগচর্ম জলে নিক্ষেপ করে স্নানকালের সংকেত দিতে; ইন্দ্র বার্ষিক রাজকীয় পুনর্নাট্যের অনুমতি চান, যাতে স্নানকারীদের রক্ষা, বিজয় ও বার্ষিক পাপক্ষয় হয়। শেষে যক্ষ্মা নামক রোগদেবতা ব্রহ্মার কাছে প্রার্থনা করে—যজ্ঞফলের জন্য ব্রাহ্মণসন্তোষ অপরিহার্য, তাই তাকে বিধিতে স্বীকৃতি দিতে হবে। ব্রহ্মা অগ্নিসংযুক্ত গৃহস্থদের জন্য বৈশ্বদেবের শেষে বলি-নিয়ম স্থাপন করেন এবং কারণকথায় বলেন, এই নাগর-প্রসঙ্গে যক্ষ্মার উৎপত্তি হবে না। এভাবে অধ্যায়টি তীর্থোৎপত্তি-মাহাত্ম্য ও আচরণবিধি—উভয়ই স্থির করে।

सावित्र्या यज्ञागमनकालिकोत्पाताद्यपशकुनोद्भववर्णनम् | Savitrī’s Journey to the Sacrifice and the Arising of Omens
ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করলেন—পূর্বে সাবিত্রী ও গায়ত্রীর উল্লেখ কেন, যজ্ঞে স্ত্রী-রূপে গায়ত্রীর সংযোগ কীভাবে হল, এবং সাবিত্রী কীভাবে যজ্ঞমণ্ডপের দিকে গিয়ে পত্নীশালায় প্রবেশ করলেন। সূত বললেন—স্বামীর অবস্থার কথা বুঝে সাবিত্রী দৃঢ় সংকল্প স্থির করলেন এবং গৌরী, লক্ষ্মী, শচী, মেধা, অরুন্ধতী, স্বধা, স্বাহা, কীর্তি, বুদ্ধি, পুষ্টি, ক্ষমা, ধৃতি প্রভৃতি দেবপত্নী ও ঘৃতাচী, মেনকা, রম্ভা, উর্বশী, তিলোত্তমা প্রভৃতি অপ্সরাদের সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করলেন। গন্ধর্ব-কিন্নরদের গান ও বাদ্যের আনন্দময় শোভাযাত্রার মধ্যে সাবিত্রী বারবার অশুভ লক্ষণ দেখলেন—ডান চোখ কাঁপা, পশুদের অমঙ্গল গতি, পাখিদের উল্টো ডাক, এবং দেহে অবিরাম স্ফুরণ; এতে তাঁর অন্তরে অস্থিরতা বাড়তে লাগল। কিন্তু সঙ্গিনী দেবীরা পরস্পরের গান-নৃত্যের প্রতিযোগিতায় মগ্ন থাকায় সাবিত্রীর মনে জাগা উৎকণ্ঠা টের পেলেন না। এই অধ্যায়ে যজ্ঞাভিমুখী উৎসবযাত্রার মাঝেই শকুন-উৎপাতের পুরাণীয় সংকেত-ব্যবস্থা ও নৈতিক বিচারের টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়।

सावित्रीमाहात्म्यवर्णनम् (Sāvitrī Māhātmya: The Glory of Sāvitrī at Hāṭakeśvara-kṣetra)
অধ্যায় ১৯২ হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে সাবিত্রীদেবীর মাহাত্ম্যকে একটি তীর্থ-কথার রূপে বর্ণনা করে। মঙ্গলধ্বনির মধ্যে নারদ সেখানে এসে জননীকে আবেগভরে প্রণাম করেন। এরপর যজ্ঞে এক গোপকন্যাকে বিকল্প বধূ হিসেবে আনা হয়; তার নাম গায়ত্রী রাখা হয় এবং সমবেত জনতার বাক্যে তাকে ‘ব্রাহ্মণী’ বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সময় সাবিত্রী যজ্ঞ-মণ্ডপে উপস্থিত হলে দেবতা ও ঋত্বিজরা ভয় ও লজ্জায় নীরব হয়ে যায়। সাবিত্রী যজ্ঞাচারের অনুচিততা ও ধর্ম-সামাজিক বিশৃঙ্খলা নিয়ে দীর্ঘ নৈতিক তিরস্কার করেন এবং ব্রহ্মা (বিধি), গায়ত্রীসহ বহু দেবতা ও পুরোহিতকে শাপ দেন—যার ফলে ভবিষ্যতে পূজাহানি, দুর্ভাগ্য, বন্দিত্ব ও যজ্ঞফলের অবনতি ঘটবে বলে কারণরূপে ব্যাখ্যা করা হয়। পরে তিনি প্রস্থান করে পর্বতঢালে নিজের পবিত্র পদচিহ্ন রেখে যান, যা পাপহর তীর্থচিহ্নে পরিণত হয়। পূর্ণিমায় পূজা, নারীদের দীপদান (নির্দিষ্ট শুভফলদায়ী), ভক্তিনৃত্য-গীতে শুদ্ধি, ফল-অন্নদান, অল্প উপকরণে শ্রাদ্ধ (গয়া-শ্রাদ্ধসম পুণ্য) এবং সাবিত্রীসমক্ষে জপে সঞ্চিত পাপক্ষয়ের বিধান বলা হয়েছে। শেষে চমৎকারপুরে গিয়ে দেবীপূজার আহ্বান ও পাঠ-শ্রবণে শুদ্ধি-কল্যাণের ফলশ্রুতি ঘোষিত।

गायत्रीवरप्रदानम् (Gayatrī’s Bestowal of Boons and the Reframing of Curses)
অধ্যায় ১৯৩ প্রশ্নোত্তরধর্মী তত্ত্ববিচার। ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—সাবিত্রী ক্রোধে প্রস্থান করে শাপ দিলে পরে কী ঘটল, এবং শাপবদ্ধ হয়েও দেবতারা কীভাবে যজ্ঞসভায় অবস্থান করলেন। সূত বলেন, তখন গায়ত্রী উঠে উত্তর দেন—সাবিত্রীদেবীর বাক্য অচল; দেব বা অসুর কেউই তা পরিবর্তন করতে পারে না। সাবিত্রীকে পরম পতিব্রতা ও জ্যেষ্ঠা দেবী বলে স্তব করে তাঁর বাক্যবন্ধনের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা হয়। গায়ত্রী শাপকে সত্য মেনে নিয়েও প্রতিকাররূপে বর-ব্যবস্থা নিরূপণ করেন। ব্রহ্মার পূজ্যতা ও যজ্ঞে কেন্দ্রীয়তা ঘোষিত—ব্রহ্মস্থানে ব্রহ্মা ব্যতীত কর্ম সম্পূর্ণ হয় না; ব্রহ্মদর্শন বিশেষত পর্বদিনে বহুগুণ পুণ্যদায়ক। ভবিষ্য পুরাণকথায় বিষ্ণুর আগাম জন্ম ও দ্বিরূপ, সারথি-সেবা, ইন্দ্রের কারাবাস ও ব্রহ্মার দ্বারা মুক্তি, অগ্নির শুদ্ধি ও পুনরায় পূজাযোগ্যতা, এবং শিবের বিবাহ-পরিবর্তন শেষে হিমাচলকন্যা গৌরীর শ্রেষ্ঠ পত্নীরূপে প্রতিষ্ঠা—এসব বলা হয়। এভাবে পুরাণের প্রক্রিয়া দেখানো হয়: শাপ ধর্মত বৈধ থাকে, কিন্তু বর, পুনর্বিন্যাস ও তীর্থ-উপাসনা-সংযুক্ত পুণ্যনীতির দ্বারা তা সমন্বিত হয়।

हाटकेश्वरक्षेत्रे कुमारिकातीर्थद्वय–गर्तस्थ–सिद्धिपादुकामाहात्म्यम् (Hāṭakeśvara-kṣetra: The Glory of the Two Kumārīkā Tīrthas and the Hidden Siddhi-Pādukā for Attaining Brahma-jñāna)
এই অধ্যায়ে সূত সংলাপের মাধ্যমে তত্ত্বোপদেশ বর্ণনা করেন। শুরুতে দেবতা ও ঋষিদের সম্মতিতে বলা হয়—যে মর্ত্য প্রথমে ব্রহ্মার পূজা করে পরে দেবীর আরাধনা করে, সে পরম গতি লাভ করে; আর নারীরা গায়ত্রীকে নমস্কারসহ শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করলে সৌভাগ্য, শুভ বিবাহ ও গৃহস্থসুখের মতো লৌকিক ফলও পায়। এরপর ঋষিরা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শঙ্করের আয়ু-পরিমাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলে কালগণনার স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান। সূত ত্রুটি, লব প্রভৃতি সূক্ষ্ম সময়মান থেকে দিন-মাস-ঋতু-বৎসর পর্যন্ত ক্রম ব্যাখ্যা করেন এবং মানববর্ষে যুগগুলির স্থিতিকাল নিরূপণ করেন। তিনি দেবতাদের ‘দিন’ ও ‘বৎসর’-মান, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিবের আয়ু, এবং নিশ্বাস-উচ্ছ্বাস গণনার মাধ্যমে সদাশিবের ‘অক্ষয়’ স্বরূপের কথাও উল্লেখ করেন। ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—যদি মহাদেবতারাও নির্দিষ্ট কালের শেষে লয়প্রাপ্ত হন, তবে স্বল্পায়ু মানুষ মোক্ষের কথা কীভাবে বলবে? সূত অনাদি ও সংখ্যাতীত কালের তত্ত্ব স্থাপন করে বলেন—শ্রদ্ধা ও সাধনাজাত ব্রহ্মজ্ঞানে অসংখ্য জীব, দেবতাসহ, মুক্তি লাভ করেছে। তিনি স্বর্গদায়ক যজ্ঞকে পুনরাবৃত্তিফলদায়ী এবং ব্রহ্মজ্ঞানকে পুনর্জন্মচ্ছেদকারী বলে পৃথক করেন, এবং জন্মে জন্মে জ্ঞানসঞ্চয়ের ক্রমবৃদ্ধি বোঝান। শেষে তিনি পিতৃপ্রাপ্ত উপদেশ দেন—হাটকেশ্বরক্ষেত্রে দুই কুমারী (এক ব্রাহ্মণী, এক শূদ্রী) প্রতিষ্ঠিত দুই শুভ তীর্থ আছে। অষ্টমী ও চতুর্দশীতে সেখানে স্নান করে গর্তস্থিত প্রসিদ্ধ গোপন সিদ্ধি-পাদুকার পূজা করলে, এক বছরের ব্রতশেষে ব্রহ্মজ্ঞানের উদয় হয়। ঋষিরা এই বিধান গ্রহণ করে অনুশীলনের সংকল্প করেন।

छान्दोग्यब्राह्मणकन्यावृत्तान्तवर्णनम् (Narrative of the Chāndogya Brāhmaṇa’s Daughter)
অধ্যায় ১৯৫-এ ঋষিরা পূর্বে উল্লিখিত শূদ্রী ও ব্রাহ্মণী—এই দুই চরিত্র এবং হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে অবস্থিত ‘অতুল তীর্থ-যুগল’-এর উৎপত্তি, নির্মাণ ও ‘পাদুকা’ প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত আবির্ভাব-পরম্পরা সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। সূত উত্তর দিতে গিয়ে নাগর সম্প্রদায়ের চাঁদোগ্য নামক এক ব্রাহ্মণের পরিচয় দেন, যিনি সামবেদে পারদর্শী ও গৃহস্থধর্মে প্রতিষ্ঠিত। বার্ধক্যে তাঁর ঘরে শুভলক্ষণযুক্ত এক কন্যা জন্মায়; তার নাম রাখা হয় ব্রাহ্মণী, এবং তার জন্মে গৃহে জ্যোতি ও আনন্দের সঞ্চার হয়। পাশাপাশি রত্নবতী নামে আরেক কন্যার কথাও আসে, যাকে উজ্জ্বল প্রতিমায় বর্ণনা করা হয়েছে। দুই সখী অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে—একসঙ্গে আহার, একসঙ্গে বিশ্রাম, এবং তাদের বন্ধুত্বই কাহিনির কেন্দ্র। বিবাহের প্রসঙ্গ উঠলে বিচ্ছেদের ভয়ে ব্রাহ্মণী বিবাহ মানতে অস্বীকার করে; সখী ছাড়া সে যাবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে এবং জোর করলে আত্মহানির হুমকি দেয়—ফলে বিবাহের বিষয়টি তার ইচ্ছা ও সম্পর্ক-ধর্মের নৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়। মা সমাধান প্রস্তাব করেন—রত্নবতীর বিবাহও একই গৃহ-সম্পর্কে স্থির করে বন্ধন রক্ষা করা হোক; কিন্তু চাঁদোগ্য সমাজাচার দেখিয়ে এটিকে নিন্দনীয় বলে প্রত্যাখ্যান করেন। এভাবে সামাজিক নিয়ম, পিতামাতার কর্তৃত্ব, কন্যার সংকল্প ও সখ্যরক্ষা—সব কিছুর সংঘাত তীর্থকথার ভূমিকা প্রস্তুত করে।

Bṛhadbala’s Journey to Anarteśa’s City (Dāśārṇādhipati–Anarteśa Alliance Narrative)
সূত বলেন—অনর্তদেশের রাজা কন্যা রত্নবতীকে যৌবনপ্রাপ্তা ও অতুল সৌন্দর্যে বিভূষিতা দেখে কন্যাদানের ধর্ম নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলেন। তিনি নীতিবচনে সতর্ক করেন যে কাজসাধনের লোভে অযোগ্য বরকে কন্যা দান মহাদোষজনক এবং অমঙ্গল ফলদায়ক। উপযুক্ত বর না পেয়ে রাজা খ্যাতনামা চিত্রকরদের পৃথিবীময় পাঠালেন—যুবক, কুলীন ও গুণবান রাজাদের প্রতিকৃতি অঙ্কন করে আনতে, যাতে রত্নবতী শাস্ত্রসম্মতভাবে নিজে যোগ্য বর নির্বাচন করতে পারে এবং পিতৃদোষ কমে। চিত্রগুলির মধ্যে দাশার্ণাধিপতি বृहদ্বলকে সর্বগুণসম্পন্ন ও উপযুক্ত বলে নির্ধারিত করা হল। তখন অনর্তরাজ দূতের মাধ্যমে বृहদ্বলকে বিবাহের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাঠালেন এবং খ্যাতা পরমসুন্দরী রত্নবতীর পাণিগ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাব শুনে বृहদ্বল আনন্দিত হয়ে চতুরঙ্গিনী সেনাসহ দ্রুত অনর্তেশের নগরীর দিকে যাত্রা করলেন; এভাবেই দুই রাজার মৈত্রী-যাত্রার সূচনা হয়।

परावसुप्रायश्चित्तविधानवृत्तान्तवर्णनम् (Parāvasu’s Expiation: Narrative of Prāyaścitta Procedure)
সূত বর্ণনা করেন—বিদ্বান ব্রাহ্মণ বিশ্বাবসুর পুত্র পরাবসু মাঘ মাসে ক্লান্ত ও অসতর্ক হয়ে এক গণিকার গৃহে আশ্রয় নেয় এবং জল ভেবে অনিচ্ছাকৃতভাবে মদ্য পান করে ফেলে। কাজটি বুঝতে পেরে সে গভীর অনুতাপে দগ্ধ হয়; শুদ্ধির জন্য শঙ্খ-তীর্থে স্নান করে সামাজিক বিনয়ের ভঙ্গিতে গুরুর কাছে গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত প্রার্থনা করে। প্রথমে বন্ধুরা ঠাট্টা করে অনুচিত উপায় বলে, কিন্তু পরাবসু গুরুতর প্রতিকারেই অটল থাকে। স্মৃতিশাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণদের সঙ্গে পরামর্শে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত পানভেদের সিদ্ধান্ত হয় এবং শাস্ত্রসম্মত প্রায়শ্চিত্ত নির্ধারিত হয়—যতটা মদ্য পান হয়েছে, সেই অনুপাতে অগ্নিতপ্ত ঘৃত পান। পিতা-মাতা প্রাণহানি ও লোকনিন্দার আশঙ্কায় তাকে নিবৃত্ত করতে চান। অতঃপর সমাজ মান্য ভর্তৃযজ্ঞ (সভাপ্রসঙ্গে হরিভদ্র-সম্পর্কিত) এর কাছে বিচার চায়। তিনি দেশ-ধর্ম ও প্রসঙ্গ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে বলেন—রসিকতায় উচ্চারিত বাক্যও বিদ্বৎসম্মত অনুমোদনে স্থানীয় ধর্মে কার্যকর হতে পারে। রাজার সহযোগিতায় সভায় রাজকন্যা রত্নাবতী মাতৃভাব ধারণ করে প্রতীকী শুদ্ধি-পরীক্ষা সম্পন্ন করেন—স্পর্শ ও ওষ্ঠ-সংযোগে রক্ত নয়, দুধ প্রকাশ পায়; এতে পরাবসুর শুদ্ধি সর্বসমক্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়। শেষে নগর-নিয়ম জারি হয়—এমন গৃহে মদ্য ও মাংস নিষিদ্ধ, লঙ্ঘনে দণ্ড; ব্যক্তিগত প্রায়শ্চিত্ত জননৈতিক শাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়।

Ratnāvatī–Brāhmaṇī Tapas and the Revelation of the Twin Tīrthas (Śūdrīnāma & Brāhmaṇīnāma) with a Māheśvara Liṅga
অধ্যায়ের শুরুতে রাজবিবাহের আলোচনা চললেও শুচিতা ও বিবাহযোগ্যতা নিয়ে ধর্ম-আইনি বিতর্কে তা ভেঙে যায়। দাশার্ণের রাজা রত্নাবতীর পরিস্থিতি শুনে তাকে ‘পুনর্ভূ’ বলে কুলপতনের দোষ উল্লেখ করে ফিরে যায়। রত্নাবতী অন্য পাত্র মানতে অস্বীকার করে; একদান-ধর্মের কথা বলে জানায় যে মনঃসংকল্প ও বাক্যদানের দ্বারা, পাণিগ্রহণ না হলেও, বিবাহবন্ধন বাস্তব হয়। পুনর্বিবাহের বদলে সে কঠোর তপস্যার সংকল্প করে; মা নানা ব্যবস্থা দেখালেও রত্নাবতী আপস না করে প্রাণত্যাগ পর্যন্ত প্রতিজ্ঞা করে। তার সঙ্গিনী এক ব্রাহ্মণী ঋতুমতী হওয়ার কারণে সামাজিক-যজ্ঞীয় বিধিনিষেধের কথা জানিয়ে রত্নাবতীর সঙ্গে তপস্যায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভর্তৃযজ্ঞ নামক আচার্য চন্দ্রায়ণ, কৃচ্ছ্র, সান্তপন, ষষ্ঠকাল-ভোজন, ত্রিরাত্র, একভক্ত প্রভৃতি ক্রমশ কঠোর তপের বিধান দেন; অন্তরের সমতা রক্ষার উপদেশ দেন এবং ক্রোধে তপফল নষ্ট হয় বলে সতর্ক করেন। রত্নাবতী ঋতুচক্র পেরিয়ে দীর্ঘকাল কঠোর আহারনিয়মে তপস্যা করে অসাধারণ তপোবল অর্জন করে। শেষে শশিশেখর শিব গৌরীসহ প্রকাশ হয়ে বর দেন। ব্রাহ্মণীর প্রার্থনা ও রত্নাবতীর যাচনায় পদ্মভরা জলাশয় ‘শূদ্রীনাম’ তীর্থ হয়, সঙ্গে ‘ব্রাহ্মণীনাম’ আরেক তীর্থ এবং ভূমি থেকে স্বয়ম্ভূ মাহেশ্বর লিঙ্গ উদ্ভূত হয়। শিব ঘোষণা করেন—শ্রদ্ধায় স্নান, নির্মল জল/পদ্ম গ্রহণ ও পূজায় পাপক্ষয় ও দীর্ঘায়ু লাভ হয়; বিশেষত চৈত্র শুক্ল চতুর্দশী, সোমবারে। যম নরক শূন্য হওয়ায় বিলাপ করে; ইন্দ্রকে ধুলো দিয়ে তীর্থ আচ্ছাদনের দায় দেওয়া হয়, তবু কলিযুগে ওই স্থানের মাটি দিয়ে পবিত্র তিলক ও একই তিথিতে শ্রাদ্ধকে গয়া-শ্রাদ্ধসম ফলদায়ক বলা হয়েছে। শ্রবণ-পাঠে পাপমোচন ও লিঙ্গার্চনায় বিশেষ সিদ্ধির ফলশ্রুতি আছে।

Adhyāya 199: Trika-Tīrtha Saṅgraha and Kali-yuga Upāya (त्रिकतीर्थसंग्रहः कलियुगोपायश्च)
এই অধ্যায়ে ঋষিগণ সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—কলিযুগে স্বল্পায়ু জীবেরা কীভাবে পৃথিবীতে কথিত অসংখ্য তীর্থের স্নানফল লাভ করবে। সূত ধর্মসংক্ষেপে চব্বিশটি পুণ্যসত্তাকে আটটি ত্রয়ে বিন্যস্ত করেন—ক্ষেত্র (কুরুক্ষেত্র, হাটকেশ্বর-ক্ষেত্র, প্রভাস), অরণ্য (পুষ্কর, নৈমিষ, ধর্মারণ্য), পুরী (বারাণসী, দ্বারকা, অবন্তী), বন (বৃন্দাবন, খাণ্ডব, দ্বৈতবন), গ্রাম (কল্পগ্রাম, শালিগ্রাম, নন্দিগ্রাম), তীর্থ (অগ্নিতীর্থ, শুক্লতীর্থ, পিতৃতীর্থ), পর্বত (শ্রীপর্বত, অর্বুদ, রৈবত) এবং নদী (গঙ্গা, নর্মদা, সরস্বতী)। বলা হয়—এক ত্রয়ে স্নান করলে সেই ত্রয়ের ফল, আর সব ত্রয়ে স্নান করলে অসংখ্য তীর্থের সমগ্র পুণ্য লাভ হয়। এরপর ঋষিগণ হাটকেশ্বর অঞ্চলের কথা তোলেন—সেখানে তীর্থ ও দেবালয় এত বেশি যে শতবর্ষেও সম্পূর্ণ করা যায় না; তাই বিশেষত অর্থকষ্টে থাকা লোকদের জন্য সর্বজনীন পুণ্য ও দেবদর্শনের সহজ উপায় চান। সূত প্রাচীন সংলাপ বলেন—এক রাজা বিশ্বামিত্রকে জিজ্ঞাসা করেন, একটিমাত্র তীর্থে স্নান করেও কীভাবে সর্বতীর্থফল পাওয়া যায়। বিশ্বামিত্র চার প্রধান তীর্থ ও আচারের কথা বলেন: (১) গয়া-সম্পর্কিত পবিত্র কূপ, যেখানে নির্দিষ্ট তিথি/সূর্যগ্রহণাদিতে শ্রাদ্ধ করলে পিতৃউদ্ধার হয়; (২) শঙ্খতীর্থে মাঘকালে শঙ্খেশ্বর দর্শন; (৩) বিশ্বামিত্র-প্রতিষ্ঠিত হরলিঙ্গ ‘বিশ্বামিত্রেশ্বর’, শুক্ল অষ্টমীর সঙ্গে যুক্ত; (৪) শক্রতীর্থ (বালমণ্ডন), বহুদিন স্নান ও শক্রেশ্বর দর্শন, বিশেষত আশ্বিন শুক্ল অষ্টমীতে। অধ্যায়টি পরে শ্রাদ্ধবিধির সূক্ষ্ম নিয়ম ব্যাখ্যা করে—স্থানীয় যোগ্য (স্থানোদ্ভব) ব্রাহ্মণের প্রয়োজন, অযোগ্য ব্যক্তি বা অশৌচে কর্ম নিষ্ফল হওয়ার সতর্কতা, এবং কিছু স্থানীয় বংশ (অষ্টকুল প্রভৃতি) বিষয়ে শ্রেষ্ঠতার ক্রম। শেষে শাপ-অপরাধ ও ব্রাহ্মণবেশধারী বহিষ্কৃত ব্যক্তির কাহিনি দিয়ে সামাজিক-যাজ্ঞিক সীমার কারণ দেখিয়ে গ্রন্থের কার্যকারণ-যুক্তি দৃঢ় করা হয়।

Adhyāya 200 — Nāgara-Maryādā, Saṃsarga-Doṣa, and Prāyaścitta-Vidhi (Purity Restoration Protocols)
এই অধ্যায়ে গোপন সামাজিক পরিচয় ও নিয়ন্ত্রিত ধর্মসমাজে সহভোজন/সংসর্গ থেকে উৎপন্ন অশৌচের বিচারধর্মশাস্ত্রীয় আলোচনা আছে। প্রভাতে দীক্ষিত, আহিতাগ্নি গৃহস্থ শুভদ্রের কন্যা বিলাপ করে—তাকে এক অন্ত্যজের হাতে দেওয়া হয়েছে; সে অগ্নিতে প্রবেশ করবে বলে স্থির করে, এতে গৃহে আতঙ্ক ছড়ায়। ব্রাহ্মণেরা জানায়, চন্দ্রপ্রভ নামে এক ব্যক্তি দ্বিজরূপ ধারণ করে দীর্ঘকাল দেব ও পিতৃকর্মে অংশ নিয়েছিল, কিন্তু এখন সে চাণ্ডাল বলে প্রকাশিত; ফলে তার সংসর্গে স্থান, বাসিন্দা এবং যারা সেই গৃহে খেয়েছে-পেয়েছে বা সেখান থেকে আনা অন্ন গ্রহণ করেছে—সবাই দোষগ্রস্ত। অধিকারী দীক্ষিত স্মৃতিশাস্ত্র দেখে ধাপে ধাপে প্রায়শ্চিত্ত নির্ধারণ করেন—শুভদ্রের জন্য দীর্ঘ চন্দ্রায়ণ, গৃহের সঞ্চয় ত্যাগ, অগ্নি পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গৃহশুদ্ধির জন্য বৃহৎ হোম, এবং যতবার ভোজন/যত জলপান হয়েছে তার অনুপাতে বিশেষ তপস্যা। স্পর্শ-সংসর্গে আক্রান্ত বাসিন্দাদের জন্য পৃথক প্রাজাপত্যাদি, নারী-শূদ্র-শিশু-বৃদ্ধদের জন্য লঘু বিধান, এবং মাটির পাত্র পরিত্যাগের নির্দেশ আছে। ব্রহ্মস্থানে স্থান-ধনে কোটিহোম দ্বারা ব্যাপক শুদ্ধিও নির্দিষ্ট। এরপর শ্রাদ্ধাদি কর্মের জন্য ‘নাগর-মর্যাদা’ সীমা-নিয়ম সংকলিত হয়—নাগর-প্রথা উপেক্ষা করে করা কর্ম নিষ্ফল বলা হয়েছে, এবং প্রতিবছর নিজ স্থানের শুদ্ধি করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। শেষে বিশ্বামিত্র রাজাকে বলেন—এটাই প্রতিষ্ঠিত বিধান, যার দ্বারা নাগরগণ শ্রাদ্ধযোগ্য গণ্য হয় এবং ভর্তৃযজ্ঞ-ভিত্তিক নিয়মে সমাজ নিয়ন্ত্রিত থাকে।

नागरप्रश्ननिर्णयवर्णनम् (Nagara Status Inquiry and Adjudication)
এই অধ্যায়ে ব্রাহ্মণগণ বিশ্বামিত্রের কাছে ‘নাগর’ ব্রাহ্মণের শুদ্ধি ও যজ্ঞাধিকার সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক প্রশ্ন করেন—যার পিতৃবংশ অজ্ঞাত, এবং যে দেশান্তরে জন্মেছে বা দেশান্তর থেকে এসেছে। ভর্তৃযজ্ঞ উত্তর দেন যে শুদ্ধি প্রদান ও বিচার প্রধান, সংযমী ও শীলবান ব্রাহ্মণদের দ্বারা হওয়া উচিত; এবং গর্তা-তীর্থজাত এক ব্রাহ্মণকে প্রধান সাক্ষী/মধ্যস্থ হিসেবে স্থাপন করতে হবে। কাম, ক্রোধ, দ্বেষ বা ভয়ে শুদ্ধি দিতে অস্বীকার করা মহাপাপজনক—এভাবে নির্বিচার বর্জনের বিরুদ্ধে নৈতিক বিধিনিষেধ স্থাপিত হয়। শুদ্ধি তিন প্রকার—প্রথমে কুলশুদ্ধি, পরে মাতৃপক্ষশুদ্ধি, শেষে শীল/আচরণশুদ্ধি; তারপর তাকে ‘নাগর’ বলে স্বীকৃতি দিয়ে সাধারণ পদে (সাধারণ যজ্ঞাধিকার) অধিষ্ঠিত করা হয়। বর্ষশেষে ও শরৎকালে সভা, ষোলো জন যোগ্য ব্রাহ্মণের প্রতিষ্ঠা, বৈদিক পাঠভূমিকার সঙ্গে যুক্ত বহু পীঠিকার আসনবিন্যাস, এবং শান্তিপাঠ, সূক্ত/ব্রাহ্মণাংশ ও রুদ্র-প্রধান জপের ধারাবাহিক পাঠ বর্ণিত। শেষে পুণ্যাহ ঘোষণা, বাদ্যধ্বনি, শ্বেতবস্ত্র ও চন্দন, মধ্যস্থের বিনীত নিবেদন, সাধারণ তর্ক নয়—বৈদিক বাক্যক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত; এবং রায় ঘোষণার মুহূর্তে ‘তালত্রয়’ অর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

भर्तृयज्ञवाक्यनिर्णयवर्णनम् (Bhartṛyajña on Adjudicating Speech and Preserving Kṣetra-Sanctity)
অধ্যায় ২০২-এ বিশ্বামিত্রের প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণসভা মধ্যস্থ/বিচারককে সিদ্ধান্তের মানদণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তারা জানতে চায়—মানুষ-উৎপন্ন কথার বদলে কেন রায় বৈদিক বাক্য অনুসারে হবে, এবং কেন মধ্যস্থ ‘ত্রিবিধ তাল’ প্রদান করেন। ভর্তৃযজ্ঞ ব্যাখ্যা করেন যে ব্রহ্মশালায় প্রতিষ্ঠিত পবিত্র ক্ষেত্রের শাসন-নীতিতে নাগরদের মধ্যে মিথ্যা বাক্য উঠতে দেওয়া যায় না; স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বারবার প্রশ্ন করে যাচাই করা কর্তব্য। তিনি কারণ-পরম্পরা দেখান—অপ্রমাণ বাক্যে মাহাত্ম্য ক্ষয় হয়, সেখান থেকে ক্রোধ, তারপর বৈরভাব ও নৈতিক দোষ জন্মায়; তাই সমাজ-শৃঙ্খলা ভাঙন রোধে মধ্যস্থকে পুনঃপুন জিজ্ঞাসা করা হয়। ‘ত্রিবিধ তাল’ শৃঙ্খলার উপায়—ক্রমে (১) অযথা প্রশ্নোত্তরজনিত ক্ষতি, (২) ক্রোধ, (৩) লোভ দমন করে সভার সামঞ্জস্য স্থিত করে। এরপর বলা হয়, চতুর্থ গণ্য হলেও অথর্ববেদ কার্যসিদ্ধির দৃষ্টিতে কেন ‘প্রথম’ রূপে গণ্য। কারণ এতে রক্ষাকর্ম ও কার্যোপযোগী বিধির সমগ্র জ্ঞান, সর্বলোকহিতের উপায় এবং অভিচারিক প্রভৃতি বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত; তাই কাজ সম্পাদনে প্রথমে তার পরামর্শ গ্রহণযোগ্য। এভাবে ক্ষেত্র-পরিসরে প্রশ্ননীতির নৈতিকতা ও প্রামাণ্য বাক্যের মর্যাদা একত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়।

नागरविशुद्धिप्रकारवर्णनम् — Procedure for the Purification/Validation of a Nāgara Dvija
অধ্যায় ২০৩-এ সমাজসমক্ষে নাগর দ্বিজের শুদ্ধি/প্রমাণীকরণের বিধি বর্ণিত হয়েছে। আনর্ত জিজ্ঞাসা করেন—শুদ্ধির জন্য আগত নাগর ব্যক্তি নাগরদের সামনে দাঁড়িয়ে কীভাবে স্বীকৃত শুদ্ধি লাভ করবে। শাস্ত্র বলে, একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থ নিযুক্ত হবে; তিনি মাতা-পিতা, গোত্র, প্রবর ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করবেন এবং পিতৃপক্ষে পিতা–পিতামহ–প্রপিতামহ পর্যন্ত, মাতৃপক্ষেও তদ্রূপ বহু প্রজন্ম ধরে বংশানুক্রম সূক্ষ্মভাবে অনুসন্ধান করবেন। শুদ্ধিকর্মে নিয়োজিত ব্রাহ্মণরা সতর্কভাবে শাখা-আগম ও মূলবংশ নির্ণয় করবেন; বটবৃক্ষের বিস্তৃত মূলের ন্যায় এই মূলবংশকে ভিত্তি বলা হয়েছে। বংশ নির্ধারিত হলে সভায় সিন্দুর-তিলক ও মন্ত্রোচ্চারণে (চতুষ্পদ মন্ত্রের উল্লেখসহ) শুদ্ধিদান হয়। মধ্যস্থ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন, সমাজ তিনবার করতালি/তাড়ন করে সংকেত দেয়, এবং শুদ্ধ ব্যক্তি সাধারণ সামাজিক-ধর্মীয় অধিকার লাভ করে। পরে তিনি অগ্নিতে শরণ নিয়ে অগ্নিকে তৃপ্ত করেন, পঞ্চমুখ মন্ত্রে পূর্ণাহুতি দেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী অন্নসহ দক্ষিণা প্রদান করেন। শেষে সতর্ক করা হয়েছে—যদি বংশমূলভিত্তিক শুদ্ধি প্রতিষ্ঠিত না হয় তবে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য; অশুদ্ধ পুরোহিতের দ্বারা সম্পাদিত শ্রাদ্ধাদি নিষ্ফল—এই কঠোর প্রক্রিয়ার লক্ষ্য স্থান ও কুলপরম্পরার শুদ্ধি।

प्रेतश्राद्धकथनम् (Preta-Śrāddha: Discourse on Ancestral Rites for the Preta-State)
এই অধ্যায়ে তীর্থমাহাত্ম্যের প্রেক্ষিতে দুইটি সংযুক্ত আলোচনা আছে। প্রথমে, বংশপরিচয় লুপ্ত (নষ্টবংশ) হলেও নিজেকে ‘নাগর’ বলে দাবি করা আনর্ত শুদ্ধি-বিধান জানতে চান। বিশ্বামিত্র পূর্ব দৃষ্টান্ত বলেন—ভর্তৃযজ্ঞের মতে আগে ব্যক্তির শীল ও নাগর-ধর্ম/আচারের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করতে হবে; মিল থাকলে বিধিপূর্বক শুদ্ধি সম্পন্ন করে শ্রাদ্ধাদি কর্মের যোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী অংশে হিরণ্যাক্ষের সঙ্গে যুদ্ধে নিহতদের প্রসঙ্গে শক্র–বিষ্ণু সংলাপ শুরু হয়। বিষ্ণু ভেদ করে বলেন—পবিত্র স্থানে (সংলাপে ‘ধারা-তীর্থ’) শত্রুর সম্মুখে নিহত বীরেরা পুনর্জন্মে ফেরে না, কিন্তু পলায়নকালে নিহতরা প্রেত-অবস্থায় পতিত হয়। ইন্দ্র মুক্তির উপায় জিজ্ঞাসা করলে বলা হয়—ভাদ্রপদ (নভাস্য) মাসের কৃষ্ণপক্ষ চতুর্দশীতে, সূর্য কন্যায় থাকলে, বিশেষত গয়ায় পিতৃ-আজ্ঞা অনুসারে শ্রাদ্ধ করতে হবে। এতে পিতৃগণের বার্ষিক তৃপ্তি হয়; অবহেলায় প্রেতদের দুঃখ চলতেই থাকে।

गयाश्राद्धफलमाहात्म्य (Glory of the Fruit of Gayā-Śrāddha) — within Hāṭakeśvara-kṣetra Māhātmya
এই অধ্যায়ে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্র-মাহাত্ম্যের প্রসঙ্গে বিষ্ণু ইন্দ্রকে শ্রাদ্ধবিধি সম্পর্কে উপদেশ দেন। তিনি বলেন—যুদ্ধে শত্রুর মুখোমুখি নিহত হোক বা পিছন থেকে আঘাতে পতিত হোক, এমন পতিত যোদ্ধারাও গয়া-শ্রাদ্ধের সদৃশ পিণ্ড-তর্পণ দ্বারা উপকৃত হতে পারে। তখন ইন্দ্র প্রশ্ন তোলেন—গয়া তো দূরদেশে, আর সেখানে পিতামহ ব্রহ্মা প্রতিবছর বিধি করেন; পৃথিবীতে বাস্তবে কীভাবে শ্রাদ্ধসিদ্ধি সম্ভব? বিশ্বামিত্র বিষ্ণুর উত্তর বর্ণনা করেন—হাটকেশ্বর অঞ্চলে কূপিকার মধ্যস্থলে এক মহাপুণ্য তীর্থ আছে। অমাবস্যা ও চতুর্দশীতে সেখানে ‘গয়া’ সংক্রমণ করে বলে মানা হয়, এবং সেই স্থানে সর্বতীর্থের সমবেত শক্তি বিরাজ করে। আরও বলা হয়—সূর্য কন্যা রাশিতে থাকলে, অষ্টবংশ-প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণদের দ্বারা সেখানে শ্রাদ্ধ করলে প্রেতাবস্থায় থাকা পিতৃগণসহ স্বর্গস্থিত পিতৃগণও উদ্ধার লাভ করেন। এই ব্রাহ্মণদের উৎস হিমালয়-নিকটবর্তী তপস্বী সম্প্রদায়—এ কথাও বলা হয়। বিষ্ণু ইন্দ্রকে নির্দেশ দেন তাঁদের সম্মানসহ আনতে, সামোপায়ে সন্তুষ্ট করতে এবং বিধিমতো শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করতে। শেষে ইন্দ্র সন্তুষ্ট হয়ে হিমালয়ে তাঁদের সন্ধানে যান, আর বিষ্ণু ক্ষীরসাগরে গমন করেন—এভাবে তীর্থের দ্বারা গয়া-সম ফল ও আচার-ব্যবস্থার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

बालमण्डनतीर्थमाहात्म्यवर्णनम् (Glorification of Bālamaṇḍana Tīrtha)
এই অধ্যায়ে তীর্থ-মাহাত্ম্যের প্রেক্ষিতে বিশ্বামিত্র ও আনর্তের সংলাপ বর্ণিত। বিষ্ণুর নির্দেশে ইন্দ্র হিমালয়ে কঠোর তপস্যারত ঋষিদের কাছে গিয়ে চামৎকারপুরের গয়াকূপীতে শ্রাদ্ধকর্মে অংশ নিতে অনুরোধ করেন। ঋষিরা দ্বিধাগ্রস্ত—কলহপ্রিয় জনসমাজের সঙ্গ, ক্রোধে তপস্যাক্ষয়, এবং রাজদানের গ্রহণে সন্ন্যাসধর্মের ক্ষতি হতে পারে। ইন্দ্র বলেন, হাটকেশ্বর-সম্পর্কিত সেই স্থানের প্রভাবে বিবাদ ওঠে বটে, কিন্তু তিনি ক্রোধ ও বিঘ্ন থেকে রক্ষা করবেন এবং গয়া-শ্রাদ্ধের অসাধারণ ফলও ব্যাখ্যা করেন। এরপর সংকট দেখা দেয়—বিশ্বেদেবগণ ব্রহ্মার শ্রাদ্ধে গমন করায় অনুপস্থিত। ইন্দ্র ঘোষণা করেন, বিশ্বেদেব ব্যতীতও মানুষ একোद्दিষ্ট-শ্রাদ্ধ করবে; আকাশবাণী জানায় যে উদ্দেশ্যকৃত পিতৃগণের মুক্তিফল নিশ্চিত। পরে ব্রহ্মা নিয়ম পুনঃস্থাপন করেন—কেবল নির্দিষ্ট দিন ও বিশেষ মৃত্যুপস্থিতিতে (বিশেষত প্রেতপক্ষ চতুর্দশী) বিশ্বেদেব-বর্জিত শ্রাদ্ধ বৈধ। বিশ্বেদেবদের অশ্রু থেকে কূষ্মাণ্ডের উৎপত্তি এবং শ্রাদ্ধপাত্রে ভস্মরেখা টেনে রক্ষাবিধানও বলা হয়েছে। শেষে ইন্দ্র মাঘ শুক্লপক্ষ, পুষ্য নক্ষত্র, রবিবার, ত্রয়োদশীতে বালমণ্ডনের নিকটে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন; সেখানে স্নান ও পিতৃতর্পণের ফল, পুরোহিত-রক্ষণ ও দানধর্ম, এবং অকৃতজ্ঞতার নৈতিক বিপদ নির্দেশিত।

इन्द्रमहोत्सववर्णनम् (Indra Mahotsava—Institution and Ritual Logic)
এই অধ্যায়ে বিশ্বামিত্র প্রথমে তীর্থের শুদ্ধিকর শক্তি, স্নানের ফল এবং নির্দিষ্ট কালের মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করেন। এরপর আনর্ত প্রশ্ন করেন—ইন্দ্রের পার্থিব পূজা কেন মাত্র পাঁচ রাত্রি, এবং কোন ঋতুতে তা বিধেয়। তখন বিশ্বামিত্র গৌতম–অহল্যা উপাখ্যান বলেন—ইন্দ্রের অপরাধ, গৌতমের শাপ (বীর্যহানি, মুখে সহস্র চিহ্ন, এবং পৃথিবীতে পূজা করলে শিরোভেদ-ভয়), অহল্যার শিলারূপ প্রাপ্তি ও ইন্দ্রের প্রত্যাহার। ইন্দ্রের রাজত্ব-অভাবের ফলে জগৎ ব্যাকুল হলে বৃহস্পতি ও দেবগণ গৌতমকে প্রার্থনা করেন। ব্রহ্মা বিষ্ণু ও শিবসহ মধ্যস্থতা করে সংযম ও ক্ষমাধর্মের প্রশংসা করেন, তবে উচ্চারিত বাক্যের সত্যতাও রক্ষা করেন। শাপ আংশিক প্রশমিত হয়—ইন্দ্র মেষজাত অঙ্গ লাভ করেন এবং মুখের চিহ্নগুলি চোখে পরিণত হয়ে তিনি ‘সহস্রাক্ষ’ নামে খ্যাত হন। ইন্দ্র মানবলোকে পুনরায় পূজার অনুমতি চান; গৌতম পাঁচরাত্রব্যাপী পার্থিব ইন্দ্র-মহোৎসব প্রতিষ্ঠা করেন এবং বলেন—যেখানে এই উৎসব পালিত হবে সেখানে স্বাস্থ্য, দুর্ভিক্ষ-নিবারণ ও রাজ্যবিপর্যয়-অভাব থাকবে। বিধি নির্ধারিত হয়—ইন্দ্রের প্রতিমা পূজ্য নয়; বৃক্ষজাত যষ্টি বৈদিক মন্ত্রে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এবং ব্রত পালনের সঙ্গে নৈতিক সংশোধন ও কিছু পাপমোচন যুক্ত। ফলশ্রুতিতে পাঠ/শ্রবণে বর্ষব্যাপী রোগমুক্তি, আর অর্ঘ্য-মন্ত্রে বিশেষ দোষক্ষয় বলা হয়েছে।

हाटकेश्वरक्षेत्रमाहात्म्ये गौतमेश्वराहिल्येश्वरशतानन्देश्वरमाहात्म्यवर्णनम् (Hāṭakeśvara-kṣetra Māhātmya: The Glories of Gautameśvara, Ahilyeśvara, and Śatānandeśvara)
এই অধ্যায়ে বিশ্বামিত্র এক রাজার কাছে স্তরবদ্ধ মাহাত্ম্যরূপে কাহিনি বলেন। ইন্দ্রের প্রসঙ্গের পর গৌতমের ক্রোধ, এবং শतानন্দের মাতৃ-অহল্যার অবস্থার জন্য করুণ আবেদন ও শৌচ-অশৌচের প্রশ্ন উঠে আসে। গৌতম অশৌচের কঠোরতা ব্যাখ্যা করে বলেন—সাধারণ প্রায়শ্চিত্তে অহল্যার শুদ্ধি সম্ভব নয়; তখন শतानন্দ চরম আত্মত্যাগের ব্রত গ্রহণ করে। পরে গৌতম ভবিষ্যৎ সমাধান জানান—সূর্যবংশে রাম অবতার নিয়ে রাবণবধ করবেন, এবং তাঁর স্পর্শমাত্রে অহল্যা উদ্ধার পাবেন। রামাবতার প্রসঙ্গে বিশ্বামিত্র কিশোর রামকে যজ্ঞরক্ষায় নিয়ে যান; পথে শাপে শিলারূপিণী অহল্যাকে স্পর্শ করালে তিনি মানবী হন, গৌতমের কাছে এসে পূর্ণ প্রায়শ্চিত্ত চান। গৌতম বহু চন্দ্রায়ণ, কৃচ্ছ্র, প্রাজাপত্য ব্রত ও তীর্থসেবার বিধান দেন। অহল্যা তীর্থযাত্রা করতে করতে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে পৌঁছান, যেখানে দেবতার দর্শন সহজ নয়। তিনি কঠোর তপস্যা করে নিকটে একটি লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন; পরে শतानন্দও এসে সঙ্গে তপস্যা করেন। শেষে গৌতম এসে আরও বৃহৎ তপস্যায় হাটকেশ্বরকে প্রকাশ করার সংকল্প করেন; দীর্ঘ তপস্যার ফলে লিঙ্গ প্রকাশিত হয় এবং শিব স্বয়ং দর্শন দিয়ে ক্ষেত্রের শক্তি ও পরিবারের ভক্তি স্বীকার করেন। গৌতম প্রার্থনা করেন—এখানে দর্শন-পূজায় মহাপুণ্য হোক এবং নির্দিষ্ট তিথিতে ভক্তদের শুভলোকপ্রাপ্তি হোক। শেষাংশে বলা হয়, এই স্থানগুলির কৃপায় নীতিভ্রষ্ট লোকও পুণ্যের দিকে আকৃষ্ট হতে থাকে; এতে দেবতারা উদ্বিগ্ন হয়ে ইন্দ্রকে যজ্ঞ, ব্রত, দান ইত্যাদি সাধারণ ধর্মাচার পুনঃপ্রবর্তনের অনুরোধ করেন, যাতে ধর্মব্যবস্থা ভারসাম্য পায়। ফলশ্রুতিতে শ্রদ্ধাভরে শ্রবণে কিছু পাপক্ষয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

शंखादित्य-शंखतीर्थोत्पत्तिवृत्तान्तवर्णनम् (Origin Account of Śaṅkhatīrtha and Śaṅkheśvara/Āditya Worship)
এই অধ্যায়ে সংলাপের স্তরে স্তরে শঙ্খতীর্থের উৎপত্তি ও মহিমা বর্ণিত। আনর্ত নামক রাজা বিশ্বামিত্রের কাছে শঙ্খতীর্থের সম্পূর্ণ কাহিনি জানতে চান। বিশ্বামিত্র পূর্বকথা বলেন—এক প্রাচীন রাজা কুষ্ঠরোগ, রাজ্যভঙ্গ ও ধনহানিতে ক্লিষ্ট হয়ে নারদের শরণ নেন। নারদ তাঁর কর্মভয় দূর করে জানান, পূর্বজন্মে কোনো পাপ নেই; বরং তিনি সোমবংশের ধর্মপরায়ণ রাজা ছিলেন। তাই দোষ খোঁজার বদলে শাস্ত্রসম্মত প্রতিকার গ্রহণ করতে বলেন। নারদ নির্দিষ্ট তীর্থবিধি নির্দেশ করেন—হাটকেশ্বরক্ষেত্রের শঙ্খতীর্থে মাধব (বৈশাখ) মাসের শুক্ল অষ্টমীতে, রবিবার, সূর্যোদয়ে স্নান করে শঙ্খেশ্বরের দর্শন-पूজা করতে হবে। এতে কুষ্ঠমুক্তি ও অভীষ্টসিদ্ধি হয়। এরপর তীর্থের কারণকথা—বিদ্বান দুই ভাই লিখিত ও শঙ্খ, নির্জন আশ্রম থেকে ফল নেওয়া নিয়ে বিতর্ক করেন; লিখিত ধর্মশাস্ত্র মতে একে চুরি বলেন, আর শঙ্খ তপস্যার ক্ষয় রোধে প্রায়শ্চিত্ত গ্রহণ করেন। কঠোর দণ্ডে তাঁর হাত কাটা হয়; তারপর তিনি হাটকেশ্বরে দীর্ঘ তপস্যা করেন—ঋতুচক্রে কঠোর সাধনা, রুদ্রপাঠ ও সূর্যোপাসনা। শেষে মহাদেব সূর্যতেজসম্ভূত রূপে প্রকাশ হয়ে বর দেন—শঙ্খের হাত পুনরুদ্ধার, লিঙ্গে দেবসন্নিধি প্রতিষ্ঠা, জলাশয়ের ‘শঙ্খতীর্থ’ নাম ও খ্যাতি, এবং ভবিষ্যৎ তীর্থযাত্রীদের জন্য ফলশ্রুতি। উপসংহারে বলা হয়, যে এই কাহিনি শোনে বা পাঠ করে, তার বংশে কুষ্ঠরোগ জন্মায় না।

ताम्बूलोत्पत्तिः तथा ताम्बूलमाहात्म्यवर्णनम् (Origin and Māhātmya of Tāmbūla)
এই অধ্যায়ে শঙ্খতীর্থ-সম্পর্কিত এক পুনরুদ্ধার-প্রসঙ্গ বর্ণিত। এক রাজা রোগাক্রান্ত ছিলেন; মাধব মাসে অষ্টমী তিথি, রবিবার, সূর্যোদয়ের সময় স্নান করে সূর্যোপাসনা করলে নির্দিষ্ট কালের বিধিপালনের ফলে তিনি রোগমুক্ত হন—এভাবে কালনির্দিষ্ট আচার্যের মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়। এরপর তাম্বূল (পান) সেবনের নীতিশাস্ত্র বলা হয়েছে—অযথা বা অশুদ্ধভাবে গ্রহণ করলে দোষ জন্মায় ও সমৃদ্ধি নষ্ট হয়; সেই দোষনাশে প্রায়শ্চিত্ত-বিধিও নির্দেশিত। সমুদ্রমন্থনের কাহিনি অবলম্বনে নাগবল্লীর উৎপত্তি, অমৃত-সম্পর্কিত দিব্য দ্রব্যের সঙ্গে তার আবির্ভাব, পরে মানবলোকে বিস্তার এবং তার ফলে কামবৃদ্ধি ও যাগ-অনুষ্ঠানে শৈথিল্য—এমন সামাজিক ফলও উল্লেখিত। শেষে সংশোধন-রীতি নির্দিষ্ট করা হয়েছে—শুভক্ষণে বিদ্বান ব্রাহ্মণকে নিমন্ত্রণ করে সম্মান করা, স্বর্ণপত্র ও তাম্বূলাদি প্রস্তুত করা, মন্ত্রসহ দোষস্বীকার করে দান প্রদান করা এবং শুদ্ধির আশ্বাস গ্রহণ করা। অধ্যায়টি নিয়ন্ত্রিত ভোগ, নৈতিক সংযম ও দানময় প্রায়শ্চিত্তের আদর্শ স্থাপন করে।

Śaṅkhatīrtha-māhātmya (Glory of Śaṅkhatīrtha)
এই অধ্যায়টি উপদেশমূলক সংলাপরূপে প্রকাশিত। বিশ্বামিত্র রাজার দুঃখ—দারিদ্র্য, কুষ্ঠরোগ ও যুদ্ধে পরাজয়—এর কারণ জানতে চান। নারদ বলেন, রাজার পতনের মূল কারণ ধর্মভ্রষ্টতা: ব্রাহ্মণদের প্রতি অবমাননা, প্রতিশ্রুতি দিয়েও সাহায্য না করা, প্রার্থীদের অপমান করা, এবং পিতৃ-পিতামহের সেই শাসন/বিধান দমন বা অপসারণ করা যা ব্রাহ্মণ-অধিকার ও দান-অনুদানের সঙ্গে যুক্ত। এই অধর্মের ফলে শত্রুরা শক্তি ও সাফল্য লাভ করে। প্রতিকারটি স্পষ্ট ও তীর্থনির্ভর। রাজা ভক্তিসহ শঙ্খতীর্থে গিয়ে স্নান করেন, ব্রাহ্মণদের সমবেত করে শঙ্খাদিত্যের সম্মুখে তাঁদের পদপ্রক্ষালন করেন এবং বহু দানপত্র/অনুদান (নির্দিষ্ট সংখ্যাসহ) প্রদান করে পূর্বে বঞ্চিত অংশ ফিরিয়ে দেন। শেষে ব্রাহ্মণদের প্রসাদে সেখানে উপস্থিত শত্রুরা মৃত্যুবরণ করে—পুরাণের শিক্ষা, সামাজিক-ধর্মীয় প্রতিকার ও শ্রদ্ধাই দেহ ও রাজ্যসৌভাগ্য স্থিত করে।

रत्नादित्यमाहात्म्यवर्णनम् (Ratnāditya Māhātmya — The Glory of Ratnāditya)
অধ্যায়ের শুরুতে ঋষিগণ হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রের প্রসঙ্গে বিশ্বামিত্র-সম্পর্কিত তীর্থের মাহাত্ম্য শুনতে সূতকে অনুরোধ করেন। সূত বিশ্বামিত্রের অসামান্য মহিমা বর্ণনা করে তাঁর নির্মিত কুণ্ডের কথা বলেন, যেখানে জাহ্নবী (গঙ্গা) স্বরূপ পবিত্র জল আবির্ভূত হয়ে পাপ-নাশক শক্তি প্রকাশ করে। সেখানে ভাস্কর (সূর্য) দেবতার প্রতিষ্ঠা ও উপাসনার বিধান আছে; মাঘ মাসের শুক্লপক্ষে রবিবারের সঙ্গে সপ্তমী মিললে স্নান করে সূর্যপূজা করলে কুষ্ঠরোগ ও নৈতিক কলুষতা দূর হয়—এ কথা বলা হয়েছে। পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে ধন্বন্তরির প্রতিষ্ঠিত এক চিকিৎসাদায়ক বাপীর উল্লেখ আছে। ধন্বন্তরির তপস্যায় প্রসন্ন ভাস্কর বর দেন—যথাযথ সময়ে স্নানকারী রোগী তৎক্ষণাৎ আরোগ্য লাভ করবে। এরপর দৃষ্টান্তে অযোধ্যার রাজা রত্নাক্ষ, যিনি অসাধ্য কুষ্ঠে আক্রান্ত, এক কার্পটিক ভিক্ষুকের নির্দেশে তীর্থে এসে বিধিমতো স্নান করে সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ হন এবং ‘রত্নাদিত্য’ নামে সূর্যদেবের প্রতিষ্ঠা করেন। আরেক দৃষ্টান্তে এক বৃদ্ধ গোপালক পশু বাঁচাতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে জলে নামলে কুষ্ঠমুক্ত হয়; পরে নিয়মিত পূজা-জপে বিরল আধ্যাত্মিক সিদ্ধি লাভ করে। শেষে স্নান, পূজা ও বহু সংখ্যক গায়ত্রী-জপের নির্দেশ এবং ফলশ্রুতি—স্বাস্থ্য, কাম্যসিদ্ধি, বৈরাগ্যবানদের জন্য মোক্ষ; তীর্থের নামে শ্রদ্ধাপূর্বক গোধনাদি দান বংশধরকে রোগ থেকে রক্ষা করে—এ কথাও বলা হয়েছে।

Kuharavāsi-Sāmbāditya-prabhāva-varṇana (Glory of Sūrya at Kuharavāsa and the Sāmba Narrative)
এই অধ্যায়ে সূত মুনি সূর্যোপাসনার পবিত্রতা ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। এক পূর্বকথায় এক ব্রাহ্মণ লাল চন্দন দিয়ে সূর্যের প্রতিমা নির্মাণ করে দীর্ঘকাল ভক্তিভরে পূজা করে বর লাভ করেন। তিনি কুষ্ঠরোগ নিবারণ চান; সূর্য নির্দেশ দেন—সপ্তমীযুক্ত রবিবারে পুণ্য সরোবরে স্নান করে হাতে ফল নিয়ে ১০৮ বার প্রদক্ষিণ করতে। এই বিধান রোগনাশক ও অন্য সাধকদের জন্যও মুক্তিদায়ক বলে প্রতিপাদিত। পরে সূর্য সেই স্থানে নিজ আবাস স্থাপন করে নাম দেন “কুহরবাস”, ফলে অলৌকিক ঘটনা স্থায়ী তীর্থপরিচয়ে রূপ নেয়। এরপর কাহিনি বিষ্ণু (কৃষ্ণ)-পুত্র সাম্বকে কেন্দ্র করে। তাঁর সৌন্দর্যে জনসমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং ভুল পরিচয় ও কামবিভ্রান্তি থেকে ধর্মবিরুদ্ধ লজ্জাজনক ঘটনা ঘটে। সাম্ব ধর্মীয় সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে এক ব্রাহ্মণ “টিঙ্গিনী” নামে কঠোর প্রায়শ্চিত্তের বিধান বলেন—গর্ত প্রস্তুত, গোবরচূর্ণ, নিয়ন্ত্রিত দহন, অচল থাকা ও জনার্দনের ধ্যান—যা মহাপাতকনাশক বলে বর্ণিত। সাম্ব পিতার কাছে স্বীকার করলে হরি বলেন, অজ্ঞতা/অভিপ্রায়হীনতায় দোষ লঘু হয়; এবং শুদ্ধির জন্য তীর্থযাত্রা নির্দেশ দেন—মাধব মাসে শুভ লক্ষণে হাটকেশ্বর ক্ষেত্রে মার্তণ্ডের পূজা ও ১০৮ প্রদক্ষিণা। সাম্ব পরিবারের শোক ও আশীর্বাদ নিয়ে যাত্রা করে সঙ্গমে স্নান, পূজা ও দান করেন—যেখানে জীবের পাপহরণের জন্য বিষ্ণুর অবস্থান বলা হয়েছে; শেষে কুষ্ঠমুক্তির দৃঢ় প্রত্যয় লাভ করেন এবং তীর্থকে হাটকেশ্বর/বিশ্বামিত্রীয় পরিসরে নারীদেরও জন্য অতি শুভ বলে ঘোষণা করা হয়।

गणपतिपूजाविधिमाहात्म्यवर्णनम् (Glorification of the Method of Gaṇapati Worship)
অধ্যায় ২১৪-এ বিনায়ক/গণনাথ পূজাকে বিঘ্ন-শান্তির নিশ্চিত উপায় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সূত প্রথমে বিশ্বামিত্র-প্রতিষ্ঠিত গণনাথের কথা বলেন এবং কালনির্দেশ দেন—মাঘ মাসের শুক্লপক্ষে চতুর্থীতে পূজা করলে এক বছরব্যাপী বাধা দূর থাকে। ঋষিদের প্রশ্নে তিনি গণেশের উৎপত্তি (দেবী গৌরীর দেহমল থেকে), তাঁর রূপচিহ্ন (গজমুখ, চতুর্ভুজ, মূষকবাহন, কুঠার, মোদক) এবং দেবসংঘর্ষে তাঁর ভূমিকা বর্ণনা করেন; পরে ইন্দ্র ঘোষণা করেন যে সকল কাজের শুরুতে গণপতি পূজ্য। এরপর উপাখ্যানে রোহিতাশ্ব মার্কণ্ডেয়ের কাছে সারাজীবন বিঘ্ননিবারক এক ব্রত জানতে চান। মার্কণ্ডেয় নন্দিনী কামধেনুকে কেন্দ্র করে বিশ্বামিত্র-বাসিষ্ঠের বিরোধের কথা বলেন, যার ফলে বিশ্বামিত্র কঠোর তপস্যায় প্রবৃত্ত হয়ে কৈলাসে মহেশ্বরের শরণ নেন। শিব শুদ্ধি ও সিদ্ধির জন্য বিনায়ক-পূজার বিধান দেন, সূক্ত-মন্ত্র (জীবসূক্ত-ভাব) দ্বারা গণেশ-তত্ত্বের আবাহন বোঝান এবং সংক্ষিপ্ত ক্রম বলেন—লম্বোদর, গণবিভু, কুঠারধারী, মোদকভক্ষ, একদন্ত প্রভৃতি নামে নমস্কার, মোদক নৈবেদ্য, অর্ঘ্য, এবং কৃপণতা ত্যাগ করে ব্রাহ্মণভোজন। দেবী ফল বলেন—চতুর্থীতে স্মরণ/পূজায় কর্ম স্থির হয় ও সমৃদ্ধি আসে; ফলশ্রুতিতে সন্তানহীনকে পুত্র, দরিদ্রকে ধন, বিজয়, দুঃখিতকে সৌভাগ্যবৃদ্ধি এবং নিত্য পাঠ-শ্রবণে বিঘ্ন না হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

श्राद्धावश्यकताकारणवर्णनम् (Necessity and Rationale of Śrāddha)
এই অধ্যায়ে শ্রাদ্ধ-कल्पের বিধি ও তার নৈতিক কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ঋষিগণ সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—অক্ষয় ফলদায়ী শ্রাদ্ধ কীভাবে করতে হয়, কোন সময় শ্রেয়, কেমন ব্রাহ্মণ উপযুক্ত, এবং কোন দ্রব্য-অন্ন নিবেদন করা উচিত। সূত পূর্বকথা বলেন: মার্কণ্ডেয় সরযূ-সঙ্গম হয়ে অযোধ্যায় এলে রাজা রোহিতাশ্ব তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। ঋষি রাজাকে ধর্মসমৃদ্ধি যাচাই করতে বেদ, বিদ্যা, বিবাহ ও ধনের “সার্থকতা” বিষয়ে প্রশ্ন করেন এবং কার্যভিত্তিক সংজ্ঞা দেন—যেমন অগ্নিহোত্রে বেদের পূর্ণতা, দান ও সদ্ব্যবহারে ধনের পূর্ণতা। এরপর রাজা নানা প্রকার শ্রাদ্ধ জানতে চাইলে মার্কণ্ডেয় ভর্তৃযজ্ঞের আনর্ত-নৃপতিকে প্রদত্ত উপদেশের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। মূল শিক্ষা—দর্শ/অমাবস্যার শ্রাদ্ধ বিশেষভাবে আবশ্যক; পিতৃগণ সূর্যাস্ত পর্যন্ত গৃহদ্বারে অর্ঘ্যের আশায় উপস্থিত থাকেন, অবহেলায় তাঁরা কাতর হন। বংশধারার প্রয়োজনও বলা হয়—জীবেরা কর্মফলে নানা লোকভোগ করে, কিছু অবস্থায় ক্ষুধা-পিপাসার দুঃখ বর্ণিত; উত্তরসূরি-সমর্থন না থাকলে পতনের আশঙ্কা। পুত্র না থাকলে অশ্বত্থ বৃক্ষ রোপণ ও পালনকে বংশস্থিতির বিকল্প হিসেবে বিধান করা হয়েছে। শেষে পিতৃদের উদ্দেশে নিয়মিত অন্ন ও উদক দান, তर्पণ ও শ্রাদ্ধের অনুশাসন; অবহেলা ‘পিতৃদ্রোহ’, আর যথাবিধি তर्पণ-শ্রাদ্ধ ইষ্টসিদ্ধি ও ত্রিবর্গ (ধর্ম-অর্থ-কাম) রক্ষার সহায়ক বলে ঘোষিত।

श्राद्धोत्पत्तिवर्णन (Origin and Authorization of Śrāddha Rites)
এই অধ্যায়ে অমাবস্যা (ইন্দু-ক্ষয়) তিথিতে শ্রাদ্ধের বিশেষ প্রামাণ্য কেন—তার ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। অনর্ত ভর্তৃযজ্ঞকে পিতৃকর্মের শুভ সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি মন্বন্তর/যুগ-সন্ধি, সংক্রান্তি, ব্যতীপাত, গ্রহণ ইত্যাদি বহু পুণ্যকাল উল্লেখ করেন এবং বলেন—যথাযথ ব্রাহ্মণ বা উপযুক্ত দ্রব্য থাকলে পার্বণ-দিনের বাইরেও শ্রাদ্ধ করা যায়। পরে অমাবস্যার কসমিক ব্যাখ্যা আসে—চন্দ্র সূর্যরশ্মিতে অবস্থান করায় সেই সময়ে করা ধর্ম ও পিতৃকৃত্য ‘অক্ষয়’ ফলদায়ক হয়। এরপর পিতৃদের বিভিন্ন শ্রেণি (অগ্নিষ্বাত্ত, বার্হিষদ, আজ্যপ, সোমপ প্রভৃতি), নন্দীমুখ পিতৃদের ভেদ এবং দেব–পিতৃ-ব্যবস্থায় পিতৃতৃপ্তির স্থান বর্ণিত হয়। কাহিনিতে বলা হয়—বংশধরেরা কব্য না দিলে স্বর্গস্থ পিতৃগণ ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ইন্দ্রসভার শরণ নেন, পরে ব্রহ্মার কাছে প্রার্থনা করেন। যুগধর্মের অবক্ষয় দেখে ব্রহ্মা ব্যবস্থা করেন—(১) তিন পুরুষ (পিতৃ-পিতামহ-প্রপিতামহ) উদ্দেশে অর্ঘ্য, (২) নিয়মিত প্রতিকাররূপে অমাবস্যা-শ্রাদ্ধ, (৩) বছরে একবার বিশেষ শ্রাদ্ধের বিকল্প, এবং (৪) সর্বোচ্চ ফলদায়ী গয়াশিরে শ্রাদ্ধ, যা কঠিন দুঃস্থিতিতেও মুক্তিলাভে সহায়ক। শেষে ফলশ্রুতি—‘শ্রাদ্ধোৎপত্তি’ বর্ণনা শ্রবণ/পাঠ করলে উপকরণে ত্রুটি থাকলেও শ্রাদ্ধ সম্পূর্ণ হয়; মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শুদ্ধ সংকল্প, যথার্থ পিতৃ-নিবেদন এবং সামাজিক-নৈতিক স্থিতিতে।

श्राद्धकल्पे श्राद्धार्हपदार्थब्राह्मणकालनिर्णय-वर्णनम् (Śrāddha-kalpa: Eligibility of recipients, proper materials, and timing)
এই অধ্যায়ে আনর্ত শ্রাদ্ধের সম্পূর্ণ বিধি জানতে চান। ভর্তৃযজ্ঞ তিনটি প্রধান নিয়ামকে শ্রাদ্ধকর্মকে সুসংবদ্ধ করেন—(১) শ্রাদ্ধে ব্যবহৃত ধনের ন্যায়সঙ্গত ও শুদ্ধ উপার্জন-গ্রহণ, (২) আমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ নির্বাচনের নীতি—শ্রাদ্ধার্হ (যোগ্য) ও অনার্হ (অযোগ্য) ভেদ এবং অযোগ্যতার বিস্তৃত কারণ, (৩) তিথি ও সংক্রান্তি/বিষুব/অয়ন ইত্যাদি চিহ্নে কালনির্ণয়, যাতে অক্ষয় ফল লাভ হয়। এখানে আমন্ত্রণ-শিষ্টাচারও বলা হয়েছে—বিশ্বেদেব ও পিতৃদের পৃথক আহ্বান, যজমানের সংযম, স্থান-শুদ্ধি ও আসনব্যবস্থা। আরও উল্লেখ আছে কোন কোন দোষে শ্রাদ্ধ ‘ব্যর্থ’ হয়—অশুদ্ধ অন্নাবস্থা, অনুচিত সাক্ষ্য, দক্ষিণার অভাব, কোলাহল ও কলহ, কিংবা ভুল সময়ে ক্রিয়া। শেষে মন্বাদি ও যুগাদি পালনসমূহের তালিকা দিয়ে বলা হয়েছে, যথাকালে তিল-জল অর্পণমাত্রও স্থায়ী পুণ্য প্রদান করে।

Śrāddha-niyama-varṇana (Rules and Ethical Guidelines for Śrāddha)
অধ্যায় ২১৮-এ ভর্তৃযজ্ঞ রাজাকে শ্রাদ্ধকর্মের প্রযুক্তিগত ও নৈতিক বিধান শিক্ষা দেন। প্রথমে সাধারণ শ্রাদ্ধ-নিয়ম পুনরুক্ত হয়, তারপর বলা হয়—নিজ নিজ শাখা/পরম্পরা এবং স্বদেশ–বর্ণ–জাতি অনুযায়ী বিশেষ বিধান ব্যাখ্যা করা হবে। শ্রাদ্ধের মূল ভিত্তি ‘শ্রদ্ধা’; আন্তরিকতা না থাকলে কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। এরপর বোঝানো হয় যে শ্রাদ্ধের পার্শ্বফলস্বরূপ বস্তুসমূহও—ব্রাহ্মণের পদোদক, পড়ে যাওয়া অন্নকণা, সুগন্ধ, আচমনের অবশিষ্ট জল, ও দর্ভের ছড়ানো অংশ—ধারণাগতভাবে বিভিন্ন পিতৃশ্রেণির কাছে, এমনকি প্রেতাবস্থা বা তির্যক্-যোনিতে পতিত সত্তাদের কাছেও, পুষ্টিরূপে পৌঁছে যায়। দক্ষিণার গুরুত্ব বিশেষভাবে ঘোষিত: দক্ষিণাবিহীন শ্রাদ্ধকে বন্ধ্যা বৃষ্টি বা অন্ধকারে সম্পাদিত কর্মের তুল্য বলা হয়েছে; দান-প্রদানকে পূর্ণতার অঙ্গ ধরা হয়েছে। শ্রাদ্ধ দান বা ভোজনের পর নিষেধও আছে—স্বাধ্যায় বর্জন, অন্য গ্রামে গমন না করা, এবং কামসংযম পালন; লঙ্ঘনে ফল নষ্ট হয় বা পিতৃকল্যাণ বিকৃত হয়। অনুচিত নিমন্ত্রণ গ্রহণ ও কর্তার ভোগবিলাসী ভোজনও নিন্দিত। উপসংহারে বলা হয়—যজমান ও অংশগ্রহণকারীরা এই দোষগুলি এড়ালে তবেই শ্রাদ্ধের ফল অক্ষুণ্ণ থাকে।

काम्यश्राद्धवर्णनम् (Kāmya-Śrāddha: Day-wise Results and Exceptions)
অধ্যায় ২১৯-এ ভর্তৃযজ্ঞ রাজাকে কাম্য-শ্রাদ্ধের তত্ত্ব ও বিধান ব্যাখ্যা করেন। প্রেত-পক্ষের কৃষ্ণপক্ষের তিথি অনুযায়ী শ্রাদ্ধ করলে পৃথক পৃথক ফল লাভ হয়—সমৃদ্ধি, বিবাহসাফল্য, অশ্ব-গোপ্রাপ্তি, কৃষি ও বাণিজ্যে উন্নতি, আরোগ্য, রাজানুগ্রহ এবং সর্বকার্যে সিদ্ধি। এরপর ত্রয়োদশীকে সন্তানকামীদের জন্য অনুপযুক্ত বলে অশুভ ফলের সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে; তবে মঘা-ত্রয়োদশীর বিশেষ যোগে মধু-ঘৃতযুক্ত পায়স নিবেদন করে বিশেষ আচারের কথাও বলা হয়েছে। অস্ত্র, বিষ, অগ্নি, জল, সাপ/পশুর আক্রমণ বা ফাঁস ইত্যাদিতে অকালমৃতদের তৃপ্তির জন্য চতুর্দশীতে একোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ নির্দিষ্ট। শেষে অমাবস্যা-শ্রাদ্ধকে পূর্বোক্ত সব কামনা পূরণকারী বলা হয়েছে এবং এই বিধান শ্রবণ/জ্ঞান করলে ইষ্টসিদ্ধি হয়—এমন ফলশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

गजच्छायामाहात्म्यवर्णनम् (The Māhātmya of the “Elephant-Shadow” Tithi and Śrāddha Protocols)
এই অধ্যায়ে শ্রাদ্ধের সময়নির্ণয় ও তার ফল বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা সংলাপরূপে বর্ণিত। অনর্ত ভর্তৃযজ্ঞকে জিজ্ঞাসা করে—ত্রয়োদশী তিথিতে শ্রাদ্ধ করলে কেন বংশক্ষয় ঘটে। ভর্তৃযজ্ঞ ‘গজচ্ছায়া’ নামে এক বিশেষ কাললক্ষণ ব্যাখ্যা করেন—চন্দ্র-নক্ষত্রের নির্দিষ্ট অবস্থান ও গ্রহণ-সন্নিহিত যোগে—যে সময়ে করা শ্রাদ্ধ ‘অক্ষয়’ ফলদায়ক হয় এবং পিতৃগণ বারো বছর পর্যন্ত তৃপ্ত হন। উদাহরণকথায় পূর্বযুগের পাঞ্চালরাজ সীতাশ্বের প্রসঙ্গ আসে। ব্রাহ্মণরা তাঁর শ্রাদ্ধে মধু-দুগ্ধ, কালশাক ও খড়্গ-মাংস প্রভৃতি দেখে বিস্মিত হয়ে কারণ জানতে চান। রাজা জানান, পূর্বজন্মে তিনি শিকারি ছিলেন; ঋষি অগ্নিবেশের মুখে গজচ্ছায়া-শ্রাদ্ধবিধি শুনে অল্প উপকরণে শ্রাদ্ধ করেছিলেন, যার প্রভাবে তিনি রাজজন্ম লাভ করেন এবং তাঁর পিতৃগণ সন্তুষ্ট হন। শেষে দেবতারা ত্রয়োদশী-শ্রাদ্ধের অতিশয় শক্তি দেখে লোকধর্মরক্ষার্থে এক বিধিনিষেধ স্থাপন করেন—পরবর্তীকালে সাধারণভাবে ওই দিনে শ্রাদ্ধ করা আধ্যাত্মিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, এবং করলে বংশক্ষয়ের কারণ হতে পারে। এভাবে গজচ্ছায়ার বিশেষ মাহাত্ম্যও রক্ষিত থাকে, সতর্কতার সীমাও নির্ধারিত হয়।

Śrāddha-kalpa: Sṛṣṭyutpatti-kālika-brahmotsṛṣṭa-śrāddhārha-vastu-parigaṇana (Ritual Materials Authorized for Śrāddha by Cosmogonic Precedent)
অধ্যায় ২২১-এ শ্রাদ্ধকর্মে ‘বিকল্প’ অর্ঘ্য ও দানের তাত্ত্বিক আলোচনা সংলাপ-রূপে উপস্থাপিত। ভর্তৃযজ্ঞ বলেন—নির্দিষ্ট তিথি-কালে পূর্ণ শ্রাদ্ধ না হলেও পিতৃসন্তোষ ও বংশচ্ছেদ-ভয় নিবারণের জন্য কিছু না কিছু অর্পণ অবশ্যই করা উচিত। তিনি ঘি-মধু-যুক্ত পায়স, এবং কয়েকটি বিশেষ মাংস (খড়্গ, বাধৃণস প্রভৃতি) উল্লেখ করেন; তা না মিললে উৎকৃষ্ট ক্ষীরান্ন, আর শেষে তিল-দর্ভ ও স্বর্ণখণ্ড মেশানো জলকেও গ্রহণযোগ্য বিকল্প বলেন। আনার্ত প্রশ্ন তোলেন—শাস্ত্রে নিন্দিত মাংস শ্রাদ্ধে কেন আসে। ভর্তৃযজ্ঞ সৃষ্টিকালীন দৃষ্টান্ত দেন: ব্রহ্মা পিতৃদের জন্য কিছু জীব ও দ্রব্যকে ‘বলিসদৃশ’ অর্ঘ্যরূপে নির্দিষ্ট করেছিলেন; তাই পিতৃকার্যে নিয়মিত সীমার মধ্যে দান করলে দাতার পাপ হয় না। রোহিতাশ্বের ‘অপ্রাপ্যতা’ প্রশ্নে মার্কণ্ডেয় ও ভর্তৃযজ্ঞ অনুমোদিত মাংসের ক্রম, তাতে পিতৃতৃপ্তির স্থায়িত্ব, এবং তিল, মধু, কালশাক, দর্ভ, ঘি, রৌপ্যপাত্র ইত্যাদি শ্রাদ্ধার্হ দ্রব্য ও যোগ্য গ্রহীতা (দৌহিত্রসহ) তালিকাভুক্ত করেন। শেষে শ্রাদ্ধকালে এই বিধান পাঠ/শিক্ষা করলে ‘অক্ষয়’ ফল হয়—এ কথা বলে একে পিতৃগুহ্য রহস্যরূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

चतुर्दशी-शस्त्रहत-श्राद्धनिर्णयवर्णनम् (Decision Narrative on the Caturdaśī Śrāddha for Violent/Untimely Deaths)
এই অধ্যায়ে অস্ত্রে নিহত, দুর্ঘটনা, দুর্যোগ, বিষ, অগ্নি, জল, পশু-আক্রমণ, ফাঁসি ইত্যাদি অপমৃত্যুপ্রাপ্তদের জন্য প্রেতকালীন বিশেষত চতুর্দশী তিথিতে শ্রাদ্ধ করার তাত্ত্বিক কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আনর্ত রাজা প্রশ্ন করেন—কেন চতুর্দশীই নির্দিষ্ট, কেন একোद्दিষ্ট শ্রাদ্ধ বিধেয়, এবং কেন এই প্রসঙ্গে পার্বণ শ্রাদ্ধ নিষিদ্ধ। ভর্তৃযজ্ঞ বৃহৎকল্পের দৃষ্টান্ত বলেন—হিরণ্যাক্ষ ব্রহ্মার কাছে বর চান, যাতে সূর্য কন্যা রাশিতে থাকাকালে প্রেতকালের একদিনে দেওয়া পিণ্ড-উদকাদি দ্বারা প্রেত, ভূত, রাক্ষস প্রভৃতি শ্রেণি এক বছর তৃপ্ত থাকে। ব্রহ্মা বর দেন যে সেই মাসের চতুর্দশীতে নিবেদিত অর্ঘ্য নিশ্চিত তৃপ্তিদায়ক হবে, বিশেষত যুদ্ধমৃত বা হিংসামৃতদের জন্য। পরে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়—আকস্মিক মৃত্যু বা রণমৃত্যুতে ভয়, অনুতাপ, বিভ্রান্তি ইত্যাদিতে চিত্তবিক্ষোভ ঘটে; তাই বীরেরও প্রেতভাব হতে পারে, তাদের শান্তির জন্য এই বিশেষ দিন নির্ধারিত। সেদিন পার্বণ নয়, একোद्दিষ্টই করতে হবে, কারণ উচ্চ পিতৃগণ তখন গ্রহণ করেন না; ভুলভাবে দিলে বরপ্রভাবে অমানুষিক সত্তারা তা গ্রহণ করে। শেষে বলা হয়েছে—শ্রাদ্ধ যথাযথ স্থানীয়/জাতীয় আচার্য দ্বারা করানো উচিত (নাগরের শ্রাদ্ধ নাগর দ্বারা), নচেৎ কর্ম নিষ্ফল।

श्राद्धार्हानर्हब्राह्मणादिवर्णनम् / Classification of Eligible and Ineligible Agents for Śrāddha
এই অধ্যায়ে শ্রাদ্ধকর্মে কে যোগ্য, কে অযোগ্য, এবং কোন সময়ে ও কোন বিধিতে শ্রাদ্ধ করা উচিত—তার সূক্ষ্ম ধর্ম-আচারগত আলোচনা আছে। ভর্তৃযজ্ঞ বলেন, শ্রাদ্ধ অবশ্যই শ্রাদ্ধার্হ ব্রাহ্মণদের দ্বারা/সহকারে করতে হবে; দর্শ প্রভৃতি কালে পার্বণ-বিধান যথাযথভাবে পালন না করলে, বা বিধি উল্টে দিলে, ফল নষ্ট হয়। তিনি আরও জানান, জারজাত প্রভৃতি নিষিদ্ধ জন্ম-চিহ্নযুক্ত ব্যক্তির দ্বারা সম্পাদিত শ্রাদ্ধ নিষ্ফল হয়ে যায়। আনর্ত মনুর ‘দ্বাদশ প্রকার পুত্র’-বর্ণনা স্মরণ করে প্রশ্ন তোলে—পুত্রহীন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও কিছু পুত্র-রূপ স্বীকৃত কি না। তখন ভর্তৃযজ্ঞ যুগভেদে সিদ্ধান্ত দেন—পূর্বযুগে কিছু শ্রেণি মান্য ছিল, কিন্তু কলিযুগে আচার-ক্ষয় ও নৈতিক অবনতির কারণে সেগুলি শুদ্ধিকারক বলে গণ্য নয়; তাই নিয়ম কঠোর। অধ্যায়ে বর্ণসংকর ও নিষিদ্ধ সংযোগের পরিণাম, এবং সেখান থেকে জন্ম নেওয়া অযোগ্য সন্তানের নামসহ উল্লেখ আছে। শেষে ‘সৎপুত্র’ যারা পিতৃগণকে পুম্নাম নরক থেকে রক্ষা করে, এবং যে শ্রেণিগুলি পতনের কারণ—এই ভেদ স্থাপন করে জারজাত-সম্পর্কিত শ্রাদ্ধকে নিষ্ফল বলা হয়েছে।

श्राद्धविधिवर्णनम् (Śrāddha-vidhi-varṇanam) — Procedural Account of the Śrāddha Rite
এই অধ্যায়ে গৃহস্থের জন্য শ্রাদ্ধকর্মের মন্ত্রনিষ্ঠ, ধাপে-ধাপে বিধান বর্ণিত হয়েছে, যার লক্ষ্য পিতৃতৃপ্তি। প্রশ্নকারী জানতে চান—গৃহস্থ কীভাবে যথাবিধি শ্রাদ্ধ করবেন। উপদেশক যোগ্য ব্রাহ্মণ আহ্বান, বিশ্বেদেবাদের আবাহন, পুষ্প-অক্ষত-চন্দনসহ অর্ঘ্য প্রদান, এবং দরভা ও তিলের যথাস্থান প্রয়োগ নির্দেশ করেন। দেবকার্যে সব্য ও পিতৃকার্যে অপসব্য—এই ভেদ, নান্দীমুখ পিতৃদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, আসনবিন্যাস ও দিকনিয়ম (মাতৃপক্ষীয় পিতৃসহ) স্পষ্ট করা হয়েছে। আবাহনে বিভক্তি-সহ ব্যাকরণশুদ্ধিকে কর্মশুদ্ধির মানদণ্ড বলা হয়েছে। অগ্নি ও সোমের উদ্দেশ্যে যথামন্ত্র হোম, লবণ স্পর্শ বা সরাসরি হাতে দান ইত্যাদি ত্রুটিতে শ্রাদ্ধ নিষ্ফল হওয়ার বিধান, ভোজনপ্রদান ও অনুমতি-প্রার্থনার নিয়ম বর্ণিত। ভোজনোত্তর পিণ্ডদান, বেদী প্রস্তুতি, বণ্টনবিধি, শেষে আশীর্বাদ, দক্ষিণা এবং পাত্র স্পর্শের অধিকার-নিষেধ উল্লেখ আছে। শ্রাদ্ধ দিবাকালেই করণীয়; সময়ভ্রষ্ট হলে কর্ম ফলহীন—এই ফলশ্রুতিতে অধ্যায় সমাপ্ত।

सपिण्डीकरणविधिवर्णनम् (Description of the Sapīṇḍīkaraṇa Procedure)
এই অধ্যায়ে অনর্ত পার্বণ-শ্রাদ্ধের পরিচিত বিধানের প্রেক্ষিতে একোद्दিষ্ট-শ্রাদ্ধ (নির্দিষ্ট মৃতকের উদ্দেশ্যে) কীভাবে করতে হয় তা জিজ্ঞাসা করেন। ভর্তৃযজ্ঞ মৃত্যু-সংস্কারসংলগ্ন শ্রাদ্ধগুলির সময় ও ক্রম ব্যাখ্যা করেন—অস্থি-সঞ্চয়নের আগে করণীয়, মৃত্যুস্হানে শ্রাদ্ধ, পথে যেখানে বিশ্রাম নেওয়া হয়েছিল সেখানে একোद्दিষ্ট, এবং তৃতীয়টি সঞ্চয়ন-স্থলে। এরপর দিন-ক্রমে নয়টি শ্রাদ্ধের উল্লেখ করেন (যেমন ১ম, ২য়, ৫ম, ৭ম, ৯ম, ১০ম ইত্যাদি দিন) এবং একোद्दিষ্টে সংক্ষিপ্ত বিধান বলেন—দেব-অংশহীন, একটিমাত্র অর্ঘ্য, একটিমাত্র পবিত্র, এবং আহ্বান পরিত্যাগ। মন্ত্রপ্রয়োগে ব্যাকরণগত সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে—‘পিতৃ/পিতা’ শব্দ, গোত্র ও নামরূপ (শর্মন) যথাযথ বিভক্তিতে উচ্চারণ না হলে পিতৃদের প্রতি শ্রাদ্ধ নিষ্ফল হয়। পরে সপিণ্ডীকরণ প্রসঙ্গ আসে—সাধারণত এক বছর পরে, তবে কিছু অবস্থায় আগে করা যায়। প্রেতের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট অর্ঘ্য/হবির বিশেষ মন্ত্রে তিন পিতৃ-পাত্র ও তিন পিতৃ-পিণ্ডে বণ্টিত হয়; এই মতে চতুর্থ গ্রাহক গ্রহণযোগ্য নয়। সপিণ্ডীকরণের পরে একোद्दিষ্ট নিষিদ্ধ, এবং সপিণ্ডীকৃত প্রেতকে পৃথক পিণ্ড দেওয়া গুরুতর দোষ বলা হয়েছে। শেষে পিতা মৃত হলেও পিতামহ জীবিত থাকলে নাম-ক্রম শুদ্ধ রাখা, পিতামহের তিথিতে পার্বণ-শ্রাদ্ধের বিধান, এবং সপিণ্ডতা স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত কিছু শ্রাদ্ধকর্ম একইভাবে না করার নির্দেশ পুনরায় বলা হয়েছে।

तत्तद्दुरितप्राप्यैकविंशतिनरकयातनातन्निवारणोपायवर्णनम् (Chapter 226: On the Twenty-One Hells, Their Karmic Causes, and Remedial Means)
এই অধ্যায়ে ভর্তৃযজ্ঞ সপিণ্ডীকরণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন—এই ক্রিয়ায় প্রেত-অবস্থা নিবৃত্ত হয়ে মৃতের পিতৃসম্বন্ধ (সপিণ্ডতা) প্রতিষ্ঠিত হয়। পিতৃদের স্বপ্নদর্শন এবং যাদের পরলোকগতির স্থিরতা নেই তাদের অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে; উত্তরে বলা হয়, এমন দর্শন সাধারণত নিজের বংশ-সম্পর্কিত পিতৃদেরই, এবং পরিণতি কর্মানুসারেই নির্ধারিত। পুত্রহীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রতিনিধি/বিকল্পের কথা বলা হয়েছে; যথাযথ শ্রাদ্ধাদি লুপ্ত হলে, বিশেষত অকালে বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে, প্রেতনাশক প্রতিকাররূপে ‘নারায়ণ-বলি’ বিধান করা হয়েছে। এরপর ধর্ম, পাপ ও জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত তিন গতি—স্বর্গ, নরক ও মোক্ষ—উপস্থাপিত হয়। যুধিষ্ঠির-ভীষ্ম সংলাপের ভঙ্গিতে যমের বিচারব্যবস্থা, চিত্র-বিচিত্র নামক লেখক, রৌদ্র ও সৌম্য কার্যসম্পন্ন আট প্রকার যমদূত, যমমার্গ এবং বৈতরণী পারাপারের বিবরণ আসে। একুশ নরকের যাতনা ও তাদের কর্মকারণ বলা হয়, এবং প্রতিকার হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ে শ্রাদ্ধ ও মাসিক/বহুমাসিক দানের ক্রম নির্দেশ করা হয়। শেষে তীর্থযাত্রাকে শুদ্ধির উপায় বলে প্রশংসা করা হয়েছে।

नरकयातनानिरसनोपायवर्णनम् (Means for the Mitigation of Naraka-Sufferings)
নরকের যন্ত্রণা শুনে যুধিষ্ঠির ভীত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন—পাপী মানুষও কি ব্রত, নিয়ম, হোম বা তীর্থসেবার দ্বারা মুক্তি পেতে পারে? ভীষ্ম তখন নরক-শমনকারী কর্মগুলির বিধানক্রমে বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, যাঁদের অস্থি গঙ্গায় নিক্ষিপ্ত হয়, তাঁদের নরকাগ্নি গ্রাস করতে পারে না; আর মৃতের নামে গঙ্গায় শ্রাদ্ধ করলে সে নরক-চিত্র অতিক্রম করে ঊর্ধ্বগতি লাভ করে। যথাবিধি প্রায়শ্চিত্ত এবং দান—বিশেষত স্বর্ণদান—পাপক্ষয়ের উপায় বলে ঘোষিত। এরপর দেশ-কালভেদে বিশেষ পথগুলি বলা হয়—ধারা-তীর্থসহ নানা তীর্থে, এবং বারাণসী, কুরুক্ষেত্র, নৈমিষ, নাগরপুর, প্রয়াগ, প্রভাস প্রভৃতি মহাতীর্থে মৃত্যুবরণ করলে মহাপাপ থাকলেও উদ্ধার ঘটে। জনার্দনভক্তিসহ প্রায়োপবেশন (উপবাসে দেহত্যাগ) ও চিত্রেশ্বরে সংযমিত সাধনার কথাও আছে। দরিদ্র, অন্ধ, নিঃস্ব ও ক্লান্ত তীর্থযাত্রীকে সময়ের বাইরে হলেও অন্নদান নরক থেকে রক্ষাকারী বলা হয়েছে। জলা-ধেনু, তিল-ধেনু দান সূর্যস্থিতি অনুযায়ী, সোমনাথ দর্শন, সমুদ্র ও সরস্বতীতে স্নান, কুরুক্ষেত্রে গ্রহণব্রত, কার্ত্তিকা/কৃত্তিকা যোগে প্রদক্ষিণা ও ত্রিপুষ্করে সাধনা—এসবকে নরকনিবারক কর্মরূপে উপসংহারে স্থাপন করা হয়েছে; সঙ্গে কর্মফল-কারণতা ও ক্ষুদ্র দোষেও পতনের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।

जलशाय्युपाख्याने ब्रह्मदत्तवरप्रदानोद्धतान्धकासुरकृतशंकराज्ञावमाननवर्णनम् (Jalāśāyī Episode: The Boon to Brahmadatta and Andhaka’s Disregard of Śaṅkara’s Command)
অধ্যায় ২২৮ দুইটি সংযুক্ত প্রবাহে এগোয়। প্রথমে সূত বিলদ্বার তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন—সেখানে শेषনাগের উপর শয়নকারী জলশায়ী বিষ্ণুর দর্শন ও পূজায় পাপক্ষয় হয়। চাতুর্মাস্য চার মাস অবিচল ভক্তি করলে বহু তীর্থভ্রমণ ও মহাযজ্ঞের সমতুল্য ফল, এবং মোক্ষলাভের কথা বলা হয়েছে; এমনকি গুরুতর অধার্মিকেরও মুক্তির পথ এখানে প্রকাশিত। ঋষিদের সন্দেহ—ক্ষীরসাগরশায়ী ভগবান কীভাবে বিলদ্বারে উপস্থিত—এর উত্তরে সূত তত্ত্ব স্থির করেন যে পরমেশ্বর ইচ্ছামতো কোনো স্থানে সহজলভ্য রূপে প্রকাশিত হতে পারেন। এরপর পৌরাণিক কারণকথা শুরু হয়—হিরণ্যকশিপুর পতনের পরে প্রহ্লাদ ও অন্ধকের পরিচয়; অন্ধক ব্রহ্মার বর পেয়ে ইন্দ্রের সঙ্গে সংঘর্ষ করে স্বর্গের অধিকার কেড়ে নেয়। ইন্দ্র শঙ্করের শরণ নেন; শঙ্কর বীরভদ্রকে দূত করে অন্ধককে স্বর্গ ত্যাগ করে পিতৃরাজ্যে ফিরতে আদেশ দেন, কিন্তু অন্ধক সেই আদেশ উপহাস করে অমান্য করে—ফলে দैব প্রতিকার ও ধর্মসংস্থাপনের পথ প্রস্তুত হয়।

भृंगीरिट्युत्पत्तिवर्णनम् | Origin Narrative of Bhṛṅgīriṭi
সূত বর্ণনা করেন—শিব ক্রোধে উদ্দীপ্ত হয়ে গণদের সঙ্গে, ইন্দ্রপ্রমুখ দেবতাদের সহায়তায়, অমরাবতীর দিকে অগ্রসর হন। দেবসেনা দেখে অন্ধকও চতুরঙ্গিনী বাহিনী নিয়ে সামনে আসে এবং দীর্ঘকাল ভয়ংকর যুদ্ধ চলতে থাকে। শিবের ত্রিশূলে বিদ্ধ হয়েও ব্রহ্মার বরদানের ফলে অন্ধক মরে না; তাই সংঘর্ষ বহু সময় ধরে প্রসারিত হয়। অবশেষে শিব অন্ধককে ত্রিশূলে বিদ্ধ করে উপরে ঝুলিয়ে রাখেন; তার দেহ ক্রমে ক্ষয় হতে থাকে, শক্তিহানি ও অধর্মের বোধ জাগে। তখন সে আক্রমণ ত্যাগ করে স্তব ও শরণাগতি করে—বলে, শিবনাম উচ্চারণমাত্রেও মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়, আর শিবভক্তিহীন জীবন আধ্যাত্মিকভাবে নিষ্ফল। অন্ধকের শুদ্ধি ও বিনয় দেখে শিব তাকে মুক্ত করেন, শৈবগণের মধ্যে পুনঃ প্রতিষ্ঠা দেন, এবং নতুন নাম ‘ভৃঙ্গীরিটি’ প্রদান করে স্নেহসহ নিকটতা দান করেন। এই অধ্যায়ে অহংকার-হিংসা থেকে আত্মস্বীকৃতি, অনুতাপ ও কৃপায় পুনর্মিলনের নীতিপথ প্রকাশিত।

वृकेन्द्रराज्यलम्भनवर्णनम् (Account of Vṛka’s Acquisition of Indra’s Sovereignty)
এই অধ্যায়ে অন্ধক-বধের পরবর্তী কাহিনিতে অন্ধকের পুত্র বৃককে অবশিষ্ট অসুর-রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। সে প্রথমে সমুদ্রের মধ্যে সুদৃঢ় রক্ষিত আশ্রয়ে গোপনে থাকে, পরে জম্বুদ্বীপে এসে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রকে সিদ্ধিস্থান বলে নির্ণয় করে, কারণ সেখানে পূর্বে অন্ধক তপস্যা করেছিল। গোপনে বৃক ক্রমে কঠোর তপস্যা করে—প্রথমে জলাহারে, পরে বায়ুহারে—দেহসংযম ও একাগ্রতায় কমলসম্ভব পিতামহ ব্রহ্মার ধ্যান করে দীর্ঘকাল স্থিত থাকে। দীর্ঘ তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে ব্রহ্মা আবির্ভূত হন, তাকে অতিতীব্র তপ থেকে নিবৃত্ত হতে বলেন এবং বর প্রদান করেন। বৃক জরা ও মৃত্যুর মুক্তি প্রার্থনা করে; ব্রহ্মা তা দান করে অন্তর্ধান হন। বরপ্রভাবে শক্তিমান বৃক রৈবতক পর্বতে পরিকল্পনা করে ইন্দ্রের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়। ইন্দ্র বৃকের অবধ্যতা বুঝে অমরাবতী ত্যাগ করে দেবগণের সঙ্গে ব্রহ্মলোকে আশ্রয় নেয়। বৃক দেবলোকে প্রবেশ করে ইন্দ্রাসনে অধিষ্ঠিত হয়, শুক্রাচার্যের অভিষেক লাভ করে, এবং আদিত্য-বাসু-রুদ্র-মরুতদের পদে দৈত্যদের বসিয়ে যজ্ঞভাগের বিন্যাসও শুক্রের নির্দেশে পরিবর্তন করে। এই অধ্যায়ে বরদানের শক্তি ও বিপদ, তপস্যাজাত ক্ষমতার নৈতিক দ্ব্যর্থতা এবং বিশ্বশাসনের ভঙ্গুরতা প্রতিপাদিত।

हाटकेश्वरक्षेत्रमाहात्म्ये जलशाय्युपाख्यानम् — Ekādaśī-vrata Māhātmya (Hāṭakeśvara-kṣetra and the Jalāśayī Narrative)
এই অধ্যায়ে দৈত্যরাজ বৃকের আধিপত্যে যজ্ঞ, হোম ও জপের মতো বৈদিক আচারের বিপন্নতা বর্ণিত হয়েছে। সে সাধকদের খুঁজে হত্যা করতে গুপ্তচর পাঠায়; তবু ঋষিরা গোপনে পূজা চালিয়ে যান। সাংকৃতি মুনি হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে চতুর্ভুজ বৈষ্ণব মূর্তির সামনে গোপনে তপস্যা করেন; বিষ্ণুর দীপ্তিতে দৈত্যরা তাঁকে আঘাত করতে পারে না। বৃক নিজে আক্রমণ করলেও তার অস্ত্র ব্যর্থ হয়; মুনির শাপে তার পা পতিত হয়ে সে অক্ষম হয়, ফলে দেবতারা আবার স্থিতি লাভ করে। পরে ব্রহ্মা বৃকের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে পুনরুদ্ধার চান, কিন্তু সাংকৃতি বলেন—সম্পূর্ণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা হলে জগতের ক্ষতি হতে পারে। তাই সময়সীমাবদ্ধ এক সমঝোতা স্থির হয়—বর্ষাকালের নিয়মের সঙ্গে মিলিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরে বৃক আবার চলতে পারে। ইন্দ্র বারবার উৎখাত হওয়ায় ব্যাকুল হয়ে বৃহস্পতির পরামর্শ নেন এবং বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে ‘অশূন্যশয়ন’ ব্রত গ্রহণ করেন। তখন বিষ্ণু চাতুর্মাস্যে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে বৃকের উপর শয়ন করে চার মাস তাকে স্থবির রাখেন ও ইন্দ্রের রাজ্য রক্ষা করেন; শয়নকালের নৈতিক-আচারবিধি এবং শয়ন-একাদশী ও বোধন-একাদশীর অতুল মহিমাও ঘোষিত হয়।

चातुर्मास्यव्रतनियमवर्णनम् (Cāturmāsya Vrata and Niyama Regulations)
ঋষিদের প্রশ্নের উত্তরে—চাতুর্মাস্যে যখন শঙ্খ-চক্র-গদাধারী, গরুড়ধ্বজ ভগবান বিষ্ণুকে ‘শয়নরত’ (প্রসুপ্ত) ধরা হয়, তখন কী করণীয়—সেই প্রসঙ্গে সূত পিতামহ ব্রহ্মার প্রামাণ্য উপদেশ জানান। তিনি বলেন, এই সময়ে শ্রদ্ধাভরে গৃহীত যে-কোনো নিয়মই অনন্তফলদায়ক। অধ্যায়ে চার মাসের জন্য ধাপে ধাপে বিধান আছে—খাদ্যসংযম (একভক্ত, নক্ষত্রানুসারে আহার, পালাক্রমে উপবাস, ষষ্ঠান-কালে আহার, ত্রিরাত্র উপবাস) এবং শৌচ-সংযম (সন্ধ্যা-প্রাতঃ নিয়ম, অযাচিত জীবন, তেল/ঘি মালিশ বর্জন, ব্রহ্মচর্য, তেলবিহীন স্নান, মধু-মাংস বর্জন)। মাসভেদে ত্যাগও বলা হয়েছে—শ্রাবণে শাক, ভাদ্রে দধি, আশ্বিনে ক্ষীর, আর কার্তিকে মাংস ত্যাগ; সঙ্গে কাঁসার পাত্র বর্জন, এবং কার্তিকে বিশেষভাবে মাংস, ক্ষৌরকর্ম, মধু ও যৌনাচার বর্জন। ইতিবাচক ভক্তিকর্ম হিসেবে তিল-অক্ষত দিয়ে বৈষ্ণব মন্ত্রে হোম, পৌরুষ সূক্ত জপ, মৌনসহিত মিত পদক্ষেপে/মিত মুষ্টিতে প্রদক্ষিণা, বিশেষত কার্তিকে ব্রাহ্মণভোজন, বিষ্ণুমন্দিরে বেদস্বাধ্যায়, এবং নৃত্য-গীতাদি অর্পণ উল্লেখিত। জলাশয়ী দেবতার মন্দিরশিখরের কলশে দীপদানকে বিশেষ তীর্থকর্ম বলা হয়েছে, যা পূর্ব নিয়মফলের সমষ্টিগত অংশ প্রদান করে। শেষে সামর্থ্য ও সংকল্প অনুযায়ী নিয়ম পালন, সমাপ্তিতে ব্রাহ্মণকে দান, এবং কোনো নিয়ম ছাড়া চাতুর্মাস্য কাটানোকে নিষ্ফল বলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে শ্রোতা/পাঠকেরও চাতুর্মাস্যদোষ নাশ হয়ে মুক্তিলাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

चातुर्मास्यमाहात्म्ये गंगोदकस्नानफलमाहात्म्यवर्णनम् (Cāturmāsya Māhātmya: The Merit of Bathing with Gaṅgā-Water)
অধ্যায় ২৩৩-এ চাতুর্মাস্য ব্রতের মাহাত্ম্য বহুস্তরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সূত মুনিদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, এবং অন্তর্নিহিত ব্রহ্মা–নারদ সংলাপে প্রতিষ্ঠিত হয় যে চাতুর্মাস্যকাল বিষ্ণুভক্তি ও শুচিতার নিয়ম পালনে বিশেষ ফলদায়ক। বিশেষ করে প্রাতঃস্নানকে প্রধান সাধনা বলা হয়েছে; এতে পাপক্ষয় হয় এবং অন্যান্য ধর্মকর্মের ফলপ্রদতা পুনরায় জাগ্রত হয়—এ কথা বারবার উচ্চারিত। জল ও তীর্থের নানা শ্রেণি উল্লেখ আছে—নদীসমূহ, পুষ্কর ও প্রয়াগের মতো মহাতীর্থ, রেবা/নর্মদা ও গোদাবরী প্রভৃতি আঞ্চলিক জল, সমুদ্র-সঙ্গম, এবং তিল, আমলকি ও বিল্বপত্র মিশ্রিত বিকল্প জল। জলপাত্রের কাছে মনে মনে গঙ্গাকে স্মরণ করলেও স্নানফল লাভ হয়—কারণ গঙ্গা ভগবানের পাদোদকের সঙ্গে যুক্ত—এই ভক্তিমূলক স্মরণ-প্রযুক্তিও বলা হয়েছে। রাত্রিস্নান বর্জন ও সূর্যদর্শনের সঙ্গে শুদ্ধির গুরুত্ব আছে; শেষে শারীরিক স্নান অসম্ভব হলে ভস্মস্নান, মন্ত্রস্নান বা বিষ্ণুর পাদোদকে স্নানকে শুদ্ধিদায়ক বিকল্প হিসেবে মান্য করা হয়েছে।

चातुर्मास्यनियमविधिमाहात्म्यवर्णनम् (Glorification and Procedure of Cāturmāsya Disciplines)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা–নারদ সংলাপের মাধ্যমে চাতুর্মাস্য-মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। স্নানশেষে প্রতিদিন শ্রদ্ধাসহ পিতৃতর্পণ, বিশেষত পুণ্যতীর্থে, এবং সঙ্গমস্থলে দেবতার উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য, জপ ও হোম করলে বিপুল পুণ্য লাভ হয়—এ কথা বলা হয়েছে। এরপর শুভকর্মের পূর্বে গোবিন্দ-স্মরণকে ভিত্তি করে সৎসঙ্গ, দ্বিজভক্তি, গুরু-দেব-অগ্নি তর্পণ, গোদান, বেদপাঠ, সত্যবচন ও অবিরত দান-ভক্তিকে ধর্মের সহায়ক স্তম্ভরূপে গণ্য করা হয়েছে। নারদের প্রশ্নে ব্রহ্মা ‘নিয়ম’-এর লক্ষণ ও ফল ব্যাখ্যা করেন—ইন্দ্রিয় ও আচরণের সংযম, অন্তঃশত্রু ষড়্বর্গ জয়, এবং ক্ষমা-সত্যাদি গুণ প্রতিষ্ঠাই নিয়ম। মনোনিগ্রহকে জ্ঞান ও মোক্ষের কারণ বলে ক্ষমাকে সকল নিয়মের একসূত্র শাসনরূপে দেখানো হয়েছে। সত্যকে পরম ধর্ম, অহিংসাকে ধর্মের মূল, বিশেষত ব্রাহ্মণ ও দেবতার দ্রব্যচুরি বর্জন, অহংকার ত্যাগ, শম-সন্তোষ ও ঈর্ষাহীনতা চর্চার নির্দেশ আছে। শেষে ভূতদয়া—সকল প্রাণীর প্রতি করুণা—অপরিহার্য ধর্ম বলা হয়েছে; কারণ হরি সকলের হৃদয়ে বিরাজমান, তাই প্রাণীহিংসা ধর্মবিরোধী, আর চাতুর্মাস্যে দয়াই সনাতন ধর্মরূপে বিশেষভাবে প্রশংসিত।

Cāturmāsya-dāna-mahimā (Theological Discourse on the Eminence of Charity during Cāturmāsya)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা–নারদ সংলাপে চাতুর্মাস্যের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে, যা ‘হরৌ সুপ্তে’—অর্থাৎ বিষ্ণুর শয়ন-ভাবিত কালে—বিশেষ পুণ্যদায়ক বলে প্রতিপন্ন। প্রথমে দানধর্মকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়, তারপর অন্নদান ও উদকদানকে অতুলনীয় শ্রেষ্ঠ দানরূপে স্থাপন করা হয়; ‘অন্নং ব্রহ্ম’ তত্ত্ব এবং প্রাণধারণ যে অন্ননির্ভর—এই যুক্তিতে তা প্রতিষ্ঠিত। চাতুর্মাস্যে করণীয় পুণ্যকর্মের পরিসরও বলা হয়েছে—অন্ন ও জল দান, গোদান, বেদপাঠ, হোম, গুরু ও ব্রাহ্মণদের ভোজন-তৃপ্তি, ঘৃতদান, পূজা এবং সজ্জনসেবা। সহায়ক দানের মধ্যে দুধজাত দ্রব্য, ফুল, চন্দন/আগরু/ধূপ, ফল, বিদ্যাদান ও ভূমিদানের উল্লেখ আছে। প্রতিজ্ঞাত দান বিষয়ে নৈতিক সতর্কতা দেওয়া হয়েছে: প্রতিশ্রুত দান বিলম্বিত করা আধ্যাত্মিকভাবে বিপজ্জনক, সময়মতো দান করলে পুণ্য বৃদ্ধি পায়; প্রতিজ্ঞাত বস্তু আত্মসাৎ বা অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া নিন্দিত। ফলশ্রুতিতে যমলোক পরিহার, বিশেষ লোকপ্রাপ্তি, ঋণত্রয় থেকে মুক্তি এবং পিতৃগণের উপকারের কথা বলা হয়েছে; এবং অধ্যায়ের অবস্থান নাগরখণ্ডের হাটকেশ্বরক্ষেত্র-মাহাত্ম্য, শেষশয্যা-উপাখ্যান ও চাতুর্মাস্য-মাহাত্ম্য ধারায় নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

इष्टवस्तुपरित्यागमहिमवर्णनम् (The Glory of Renouncing Preferred Objects during Cāturmāsya)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা–নারদ সংলাপে চাতুর্মাস্যের ধর্মোপদেশ দেওয়া হয়েছে। ব্রহ্মা বলেন, এটি নারায়ণ/বিষ্ণুর বিশেষ ভক্তিসাধনার কাল; ত্যাগ ও সংযমের দ্বারা অক্ষয় পুণ্য লাভ হয় এবং ভক্তি দৃঢ় হয়। এখানে বহু বর্জনের কথা আছে—বিশেষত তামার পাত্র ত্যাগ, পলাশ/অর্ক/বট/অশ্বত্থ পাতায় আহার, এবং লবণ, শস্য-ডাল, রস, তেল, মিষ্টি, দুগ্ধজাত, মদ্য ও মাংস প্রভৃতি পরিত্যাগ। কিছু বস্ত্র-রং/ধরন ও চন্দন, কর্পূর, কেশরসদৃশ সুগন্ধি বিলাসবস্তুও বর্জনীয়; হরির যোগনিদ্রাকালে সাজসজ্জা ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা কমাতে বলা হয়েছে। বিশেষভাবে পরনিন্দাকে গুরুতর পাপ বলে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উপসংহারে বলা হয়—সব উপায়ে বিষ্ণুকে সন্তুষ্ট করাই মুখ্য; চাতুর্মাস্যে বিষ্ণুনাম স্মরণ, জপ ও কীর্তন মুক্তিদায়ক এবং মহাফলপ্রদ।

Cāturmāsya-māhātmya and Vrata-mahimā (चातुर्मास्यमाहात्म्ये व्रतमहिमवर्णनम्)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা–নারদ সংলাপের মাধ্যমে বিষ্ণু-উপাসনায় সময়নির্ধারণ, নৈতিক সংযম ও ভক্তিভাবের বিধান বলা হয়েছে। নারদ জিজ্ঞাসা করেন—বিষ্ণুর সান্নিধ্যে বিধি ও নিষেধ কখন গ্রহণীয়? ব্রহ্মা কর্কট-সংক্রান্তিকে কালচিহ্ন রূপে নির্দেশ করে শুভ জাম্বু (জাম) ফলসহ অর্ঘ্য দান এবং বাসুদেবের প্রতি আত্মসমর্পণমূলক মন্ত্র-অভিপ্রায়ে পূজা করতে বলেন। এরপর বিধি (বিহিত কর্ম) ও নিষেধ (নিয়ন্ত্রিত সংযম)কে পরস্পর-পরিপূরক ধর্মনীতি বলা হয়েছে; উভয়েরই মূল আশ্রয় বিষ্ণু, এবং বিশেষত চাতুর্মাস্যে ভক্তিসহ এগুলি পালন করতে বলা হয়েছে—এই সময়কে সর্বমঙ্গলময় বলা হয়েছে। দেবতার “শয়ন”কালে কোন ব্রত সর্বাধিক ফলদায়ক—এ প্রশ্নে ব্রহ্মা বিষ্ণু-ব্রতকে শ্রেষ্ঠ বলেন এবং ব্রহ্মচর্যকে সর্বোচ্চ ব্রত রূপে প্রতিষ্ঠা করেন, যা তপস্যা ও ধর্মের মূল শক্তি। হোম, ব্রাহ্মণ-সম্মান, সত্য, দয়া, অহিংসা, অচৌর্য, আত্মসংযম, অক্রোধ, আসক্তিহীনতা, বেদাধ্যয়ন, জ্ঞান এবং কৃষ্ণার্পিত চিত্ত—এমন গুণাচার তালিকাভুক্ত করে বলা হয়েছে যে এমন সাধক জীবন্মুক্ত ও পাপস্পর্শহীন। উপসংহারে বলা হয়, চাতুর্মাস্যে আংশিক পালনও ফল দেয়, তপস্যায় দেহ শুদ্ধ হয়, এবং হরিভক্তিই ব্রত-ব্যবস্থার প্রধান সমন্বয়সূত্র।

चातुर्मास्यमाहात्म्ये तपोमहिमावर्णनम् (Tapas and the Greatness of Cāturmāsya Observance)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা–নারদ সংলাপে, শেষশায়ী বিষ্ণুর প্রসঙ্গ ধরে, চাতুর্মাস্য কালের তপস্যার প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তপস্যা কেবল উপবাস নয়; ষোড়শোপচারে বিষ্ণু-পূজা, নিত্য পঞ্চযজ্ঞ পালন, সত্যবাদিতা, অহিংসা এবং ইন্দ্রিয়সংযম—এই সমন্বিত সাধনাই চাতুর্মাস্যের তপ। গৃহস্থদের উপযোগী পঞ্চায়তন-ধাঁচের দিকনির্দেশিত পূজাবিধানও বলা হয়েছে—কালকেন্দ্রে সূর্য-চন্দ্র, অগ্নিকোণে গণেশ, নৈঋত্যে বিষ্ণু, বায়ুকোণে কুল/বংশদেবতা, ঈশানে রুদ্র; নির্দিষ্ট ফুল ও সংকল্পের মাধ্যমে বিঘ্ননাশ, রক্ষা, সন্তানলাভ ও অপমৃত্যুনিবারণের উদ্দেশ্য স্থির করা হয়। পরবর্তী অংশে চাতুর্মাস্যের নানা তপোব্রত ধাপে ধাপে তালিকাভুক্ত—নিয়ন্ত্রিত আহার, একভুক্ত/একান্তর, কৃচ্ছ্র-পরাক প্রভৃতি, এবং দ্বাদশী-চিহ্নিত ‘মহাপারাক’ ক্রম। প্রতিটির ফলশ্রুতিতে পাপশুদ্ধি, বৈকুণ্ঠপ্রাপ্তি ও ভক্তিজ্ঞানবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। শেষে শ্রবণ-পাঠের পুণ্য ঘোষণা করে বিষ্ণুর শয়নকালে গৃহস্থদের জন্য এটিকে নীতি-আচারসমৃদ্ধ ধর্মীয় নির্দেশিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

चातुर्मास्यमाहात्म्ये तपोऽधिकार-षोडशोपचार-दीपमहिमवर्णनम् | Cāturmāsya Māhātmya: Sixteenfold Worship and the Merit of Lamp-Offering
অধ্যায় ২৩৯ ব্রহ্মা–নারদ সংলাপে বিন্যস্ত। নারদ জিজ্ঞাসা করেন—বিশেষত হরির শয়ন-ভাব (শায়ন অবস্থায়) ষোড়শোপচার পূজা কীভাবে সম্পন্ন হবে; তিনি বিস্তারিত বিধান চান। ব্রহ্মা বেদের প্রামাণ্য প্রতিষ্ঠা করে বলেন, বিষ্ণুভক্তির ভিত্তি বেদ; এবং আচার-ক্রম বেদ–ব্রাহ্মণ–অগ্নি–যজ্ঞ এই পবিত্র মধ্যস্থতার ধারার সঙ্গে সঙ্গত। এরপর চাতুর্মাস্যের মাহাত্ম্য বর্ণিত—এই সময় হরিকে জল-সম্পর্কিত রূপে ধ্যান করা হয়; জল থেকে অন্ন, আর অন্ন থেকে বিষ্ণু-উৎপন্ন পবিত্র তত্ত্বের যোগ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিবেদনসমূহকে সংসারের পুনঃপুন ক্লেশ থেকে রক্ষাকারী বলা হয়। অন্তঃ ও বহিঃ ন্যাস, বৈকুণ্ঠ-রূপের আহ্বান ও লক্ষণ-সহ বর্ণনা, তারপর আসন, পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমন, সুগন্ধি ও তীর্থজলে স্নান, বস্ত্রদান, যজ্ঞোপবীতের তাৎপর্য, চন্দনলেপন, শুদ্ধ শ্বেত পুষ্পপূজা, মন্ত্রসহ ধূপ, এবং দীপদান—এই ক্রম নির্দেশিত। দীপদানকে অন্ধকার ও পাপ নাশকারী মহাশক্তিশালী কর্ম বলা হয়েছে। সর্বত্র ‘শ্রদ্ধা’কে ফলসিদ্ধির মূল শর্ত হিসেবে পুনঃপুন উচ্চারণ করা হয়, এবং পূজাকে নৈতিক-আধ্যাত্মিক সাধনা রূপে স্থাপন করা হয়েছে। চাতুর্মাস্যে দীপদানাদি কর্মের দৃঢ় ফলশ্রুতি দিয়ে অধ্যায় সমাপ্ত।

Haridīpa-pradāna Māhātmya (Theological Discourse on Offering a Lamp to Hari/Vishnu, especially in Cāturmāsya)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা–নারদ সংলাপে হরি/বিষ্ণুকে দীপদান করার মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। ব্রহ্মা বলেন, অন্যান্য দান-পূজার তুলনায় হরির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত দীপ সর্বশ্রেষ্ঠ; এটি পাপক্ষয়কারী এবং চাতুর্মাস্যে বিশেষভাবে সংকল্পসিদ্ধি ও অভীষ্টফল প্রদান করে। এরপর ধারাবাহিক ভক্তিবিধি বলা হয়—দীপ অর্পণের সঙ্গে বিধিপূর্বক পূজা, ত্রয়োদশীতে নৈবেদ্য নিবেদন, এবং ‘হরি-শয়ন’ কালে চাতুর্মাস্যে প্রতিদিন অর্ঘ্যদান। শঙ্খজলসহ পানপাতা, সুপারি, ফল ইত্যাদি অর্ঘ্যে রেখে কেশবকে মন্ত্রোচ্চারণে অর্পণ করতে বলা হয়েছে; পরে আচমন, আরতি, চতুর্দশীতে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম, এবং পূর্ণিমায় প্রদক্ষিণা—যা বহু তীর্থভ্রমণ ও জলদানসম ফলদায়ক বলে উল্লেখিত। শেষাংশে ধ্যানমুখী উপদেশ: যোগজ্ঞানসম্পন্ন সাধক স্থির প্রতিমার সীমা ছাড়িয়ে সর্বত্র দিব্য সান্নিধ্য ধ্যান করবে, আত্মার সঙ্গে বিষ্ণুর সম্পর্ক বিচার করবে, এবং বৈষ্ণবভাবে দেহধারণের মধ্যেই জীবনমুক্তির পথে অগ্রসর হবে। চাতুর্মাস্যকে এই নিয়মিত ভক্তিসাধনার বিশেষ অনুকূল সময় বলা হয়েছে।

सच्छूद्रकथनम् (Discourse on the 'Sat-Śūdra' and household dharma in Chāturmāsya)
এই অধ্যায়ে সংলাপের মাধ্যমে ধর্মতত্ত্ব ও নীতিশিক্ষা উপস্থাপিত। শুরুতে ঈশ্বর যোগ্য সাধকদের জন্য বিষ্ণু-উপাসনার ষোলো প্রকার বিধি বলেন, যা পরম পদলাভের পথ। এরপর আচার-অধিকার ও বিশেষ কৃষ্ণ-উপাসনা ছাড়াই মুক্তিমুখী পুণ্য কীভাবে অর্জিত হয়—এই প্রশ্ন ওঠে। কার্ত্তিকেয় শূদ্র ও নারীদের ধর্ম জানতে চান। ঈশ্বর বেদপাঠ ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধতার কথা বলে পরে “সৎ-শূদ্র”কে মূলত গৃহস্থধর্মের দ্বারা নির্ণয় করেন—উপযুক্ত গুণসম্পন্ন বিধিবিবাহিতা স্ত্রী, সংযত গৃহস্থজীবন, মন্ত্রবিহীন পঞ্চযজ্ঞ, অতিথিসেবা, দান, এবং দ্বিজ অতিথিদের সেবা। পতিব্রতা-আদর্শ, দাম্পত্য-সামঞ্জস্যের ধর্মফল, বর্ণভেদে বিবাহনীতি, বিবাহপ্রকার ও সন্তানের শ্রেণিবিভাগ স্মৃতি-ধারায় বর্ণিত। শেষে অহিংসা, শ্রদ্ধাপূর্বক দান, নিয়ন্ত্রিত জীবিকা, দৈনন্দিন আচরণ এবং চাতুর্মাস্যে বিশেষ পুণ্যবৃদ্ধির বিধান দেওয়া হয়। গৃহস্থাচার ও ঋতুপালনকে ভিত্তি করে ধাপে ধাপে সাধনামুখী ধর্মপথ দেখানো হয়েছে।

Aṣṭādaśa-prakṛti-kathana (Discourse on the Eighteen Social/Occupational Natures)
অধ্যায় ২৪২ তীর্থ-মাহাত্ম্যের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রহ্মা–নারদ সংলাপরূপে বিন্যস্ত। নারদ “অষ্টাদশ প্রকৃতি” (আঠারো স্বভাব/বর্গ) এবং তাদের যথোচিত বৃত্তি—জীবিকা ও আচরণ—সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেন। ব্রহ্মা তখন সৃষ্টিস্মৃতি বলেন: পদ্ম থেকে তাঁর আবির্ভাব, অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ডের দর্শন, জড়তায় নিমজ্জন, পরে তপস্যার নির্দেশ ও সংশোধন, এবং শেষে সৃষ্টিকার্যের অনুমতি লাভ। এরপর অধ্যায়টি সৃষ্টিবৃত্তান্ত থেকে সামাজিক নীতিধর্মে আসে। বর্ণানুসারে কর্তব্য নিরূপিত হয়—ব্রাহ্মণের সংযম, অধ্যয়ন ও ভক্তি; ক্ষত্রিয়ের প্রজারক্ষা ও দুর্বলের আশ্রয়; বৈশ্যের অর্থ-ব্যবস্থাপনা, দান ও বাণিজ্যধর্ম; শূদ্রের সেবা, শুচিতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা। মন্ত্রবিহীন সৎকর্মের দ্বারাও ভক্তি সাধ্য—এ কথাও বলা হয়েছে। আঠারো প্রকৃতির মধ্যে নানা পেশাগত গোষ্ঠীকে উচ্চ/মধ্য/নিম্নভাবে সংক্ষেপে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। উপসংহারে ঘোষণা করা হয়—বর্ণ, আশ্রম ও প্রকৃতি নির্বিশেষে বিষ্ণুভক্তি সর্বমঙ্গলদায়িনী। ফলশ্রুতিতে এই পবিত্র পুরাণাংশ শ্রবণ-পাঠে পাপক্ষয় হয় এবং সদাচারনিষ্ঠ সাধক বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হন।

शालिग्रामपूजनमाहात्म्यवर्णनम् | The Glory of Śālagrāma Worship (Paijavana Upākhyāna)
ব্রহ্মা ধর্মশিক্ষার জন্য পৈজবন নামে এক শূদ্র গৃহস্থের দৃষ্টান্ত দেন। তিনি সত্যবাদী, ধর্মসম্মত জীবিকা-নির্বাহী, অতিথিসেবী, বিষ্ণুভক্ত ও ব্রাহ্মণভক্ত। ঋতু অনুযায়ী দান, জনকল্যাণমূলক কাজ (কূপ, পুকুর, বিশ্রামশালা) এবং নিয়মিত ব্রতাচরণে তাঁর গৃহ নৈতিক শৃঙ্খলায় প্রতিষ্ঠিত—এতে গৃহস্থধর্মেরও আধ্যাত্মিক ফলপ্রদতা প্রতিপন্ন হয়। গালব ঋষি শিষ্যসহ আগমন করলে পৈজবন যথোচিত সম্মান করেন। তিনি এই আগমনকে পবিত্রকারী মনে করে জিজ্ঞাসা করেন—বেদপাঠের অধিকার না থাকলেও মুক্তিদায়ক কোন সাধনা গ্রহণ করা উচিত। গালব শালগ্রাম-কেন্দ্রিক হরিভক্তির উপদেশ দেন—এতে অক্ষয় পুণ্য হয়, চাতুর্মাস্যে বিশেষ ফল দেয় এবং আশপাশের স্থানও পবিত্র হয়। অধিকার প্রসঙ্গে ‘অসৎ-শূদ্র’ ও ‘সৎ-শূদ্র’-এর ভেদ করে যোগ্য গৃহস্থ ও সদ্গুণবতী নারীদের জন্যও এই উপাসনা স্বীকৃত হয়; সন্দেহ ফল নষ্ট করে—এ কথাও বলা হয়। তুলসী অর্পণ (পুষ্পের চেয়ে শ্রেষ্ঠ), মালা, দীপ, ধূপ, পঞ্চামৃতস্নান এবং শালগ্রামরূপে হরিস্মরণ প্রভৃতি বিধান বর্ণিত; ফল হিসেবে শুদ্ধি, অচ্যুতপদপ্রাপ্তির ন্যায় অচ্যুৎ স্বর্গবাস এবং শেষে মোক্ষের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। শেষে চব্বিশ প্রকার শালগ্রামরূপের উল্লেখে মাহাত্ম্যের পরিসমাপ্তি ঘটে।

चतुर्मास्यमाहात्म्ये चतुर्विंशतिमूर्त्तिनिर्देशः (Cāturmāsya Māhātmya: Enumeration of the Twenty-Four Forms)
এই অধ্যায়ে পাইজবন গুরুর বাক্য-অমৃত শুনেও তৃপ্ত না হয়ে তত্ত্বগত ‘ভেদ’গুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা চান। গালব প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি পুরাণসম্মত এক গণনা-বিধান বলবেন, যার শ্রবণমাত্রেই পাপমোচন ঘটে। এরপর হরি/বিষ্ণুর চব্বিশটি ভক্তিমূর্তি-নাম ক্রমানুসারে নির্দিষ্ট করা হয়—কেশব, মধুসূদন, সঙ্কর্ষণ, দামোদর, বাসুদেব, প্রদ্যুম্ন প্রভৃতি, কৃষ্ণ পর্যন্ত—যা সারা বছর পূজার জন্য প্রামাণ্য সমষ্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই নামসমূহকে তিথি ও বার্ষিক চক্রের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়ন্ত্রিত ভক্তি-অনুশীলনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে এবং চব্বিশ সংখ্যার অন্যান্য সমান্তরাল গণনা (যেমন অবতার-গণনা) সঙ্গেও সামঞ্জস্য দেখানো হয়েছে। শেষে বলা হয়, একাগ্র ভক্তিতে নির্দিষ্ট কালে পূজা করলে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ—চার পুরুষার্থ লাভ হয়; আর ভক্তিসহ শ্রবণ বা পাঠে সৃষ্টিজীবের পালক হরি প্রসন্ন হন।

Devas Returning to Mandarācala for Śiva-darśana (Tāraka-opadrava Context) | मंदराचलंप्रतिगमनवर्णनम्
এই অধ্যায়ে পাইজবন গালবকে জিজ্ঞাসা করেন—শালগ্রামের উৎপত্তি কীভাবে, এবং পাথরের মধ্যেও নিত্য ভগবানের উপস্থিতি কীভাবে বোঝা যায়; ভক্তি স্থির করার উপদেশও চান। গালব পুরাণপ্রসিদ্ধ ইতিহাসের ধারায় উত্তর স্থাপন করে কাহিনি শুরু করেন—দক্ষের শিববিদ্বেষ যজ্ঞে সতীর দেহত্যাগে গিয়ে পৌঁছায়; পরে তিনি পার্বতী রূপে জন্ম নিয়ে মহাদেবের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ তপস্যা করেন। শিব পরীক্ষার ছদ্মবেশে এসে পার্বতীর নিষ্ঠা যাচাই করে তাঁকে গ্রহণ করেন, দেবসমাবেশে বৈদিক বিধিতে বিবাহ সম্পন্ন হয়। এরপর শিবের অনুমতিতে কামদেবের পুনর্দেহধারণের কথা বলা হয়। বরদানে শক্তিশালী তারকের অত্যাচারে কাতর দেবগণ ব্রহ্মার শরণ নেন; ব্রহ্মা জানান—পার্বতীজাত শিবপুত্র সাত দিনের পরে তারককে বধ করবেন। শেষে দেবগণ মন্দরাচলের দিকে অগ্রসর হন; সেখানে শিবগণ সতর্ক প্রহরায় থাকেন, আর দেবগণ চাতুর্মাস্যভাব নিয়ে দীর্ঘ তপস্যায় শিবদর্শন ও প্রসাদ প্রার্থনা করেন।

पार्वत्येन्द्रादीनां शापप्रदानवृत्तान्तवर्णनम् | Parvatī’s Curse upon Indra and the Devas: Narrative Account and Ritual Implications
এই অধ্যায়ে গালব ব্রতচর্যার প্রশ্নের উত্তরে দেবতাদের কাহিনি বলেন। দেবগণ শিবের প্রত্যক্ষ দর্শন না পেয়ে শৈবভাব নিয়ে শিবের এক প্রতিমারূপ কল্পনা করে তপস্যা করেন—ষড়ক্ষর মন্ত্রজপ, চাতুর্মাস্য পালন, এবং ভস্মধারণ, কপাল-দণ্ড, অর্ধচন্দ্র ও পঞ্চবক্ত্র-চিহ্নসহ ব্রতের পরিচায়ক লক্ষণ গ্রহণ করেন। শিব তাঁদের শুদ্ধি ও ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে ‘শুভ মতি’ দান করেন এবং বিধিপূর্বক শতরুদ্রিয় জপ, ধ্যান, দীপদান ও ষোড়শোপচার পূজায় সন্তুষ্ট হন বলে জানান। এরপর এক দিব্য সত্তা পাখিরূপে শিবের নিকট আসে; সেই প্রসঙ্গে পার্বতী ক্রুদ্ধ হয়ে দেবতাদের শাপ দেন—তাঁরা পাষাণসদৃশ ও সন্তানহীন হবেন। দেবগণ দীর্ঘ স্তব করে পার্বতীকে প্রকৃতি, মন্ত্রবীজ এবং সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের চিরন্তন আধাররূপে বন্দনা করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। চাতুর্মাস্যে বিশেষত বিল্বপত্রে পূজা অতিশয় ফলদায়ক বলা হয়; বিনয়, নিয়ম, ও পুনর্মিলনের নীতি এবং শিব-শক্তির পরস্পর-সম্পূরক মহিমাই এই তীর্থকথার প্রধান শিক্ষা।

अश्वत्थमहिमवर्णनम् (Aśvattha-Mahimā Varṇanam) — The Glory of the Aśvattha Tree in Chāturmāsya
অধ্যায়ের শুরুতে পাইজবন প্রশ্ন করেন—শ্রী (লক্ষ্মী) কীভাবে তুলসীতে এবং পার্বতী কীভাবে বিল্ববৃক্ষে অধিষ্ঠিতা। তখন ঋষি গালব পূর্বকথা বলেন—দেব–অসুর সংঘর্ষে পরাজিত ও ভীত দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নেন; ব্রহ্মা পক্ষপাতী হস্তক্ষেপে অস্বীকৃতি জানিয়ে উচ্চতর সমাধানের দিশা দেন। সেখানে হরিহর রূপের বর্ণনা আসে—অর্ধ শিব, অর্ধ বিষ্ণু—অভেদ-তত্ত্বের প্রতীক, যা মতবিরোধে জড়িতদের নির্বাণাভিমুখ পথে প্রেরণা দেয়। এরপর বৃক্ষ-তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়: দেবতারা জানতে পারেন বিল্বে পার্বতী ও তুলসীতে লক্ষ্মীর নিবাস, এবং আকাশবাণীতে শোনেন যে চাতুর্মাস্যে ঈশ্বর করুণাবশত বৃক্ষরূপে অবস্থান করেন। অশ্বত্থ (পিপল) বিশেষ মহিমাময়, বিশেষত বৃহস্পতিবার; স্পর্শ, দর্শন, পূজা, জলদান এবং দুধ ও তিল-মিশ্র নিবেদন দ্বারা শুদ্ধির ফল বলা হয়েছে। অশ্বত্থ স্মরণ ও সেবা পাপ ও যমলোক-ভয় নাশ করে, আর বৃক্ষহানির কঠোর নিষেধ আছে। শেষে বিষ্ণুর ব্যাপ্তি মানচিত্রিত—মূলে বিষ্ণু, কাণ্ডে কেশব, শাখায় নারায়ণ, পাতায় হরি, ফলে অচ্যুত—এবং ভক্তিসহ বৃক্ষসেবা মোক্ষাভিমুখ পুণ্য দেয় বলে ফলশ্রুতি ঘোষিত।

पालाशमहिमवर्णनम् (The Glorification of the Palāśa/Brahma-Tree) — Cāturmāsya Context
এই অধ্যায়ে বাণী পালাশ বৃক্ষকে (ব্রহ্মবৃক্ষ) পবিত্র প্রকৃতির এক দেবময় রূপ হিসেবে মহিমা বর্ণনা করেন। পালাশকে নানা উপচারে সেবা-যোগ্য, মনস্কামনা পূরণকারী এবং মহাপাপ বিনাশকারী বলা হয়েছে। পাতার বাম-ডান-মধ্য অংশে দেবত্রয়ের প্রতীকী বিন্যাস দেখানো হয়; আবার শিকড়, কাণ্ড, শাখা, ফুল, পাতা, ফল, বাকল ও মজ্জা—বৃক্ষের প্রতিটি অঙ্গে দেবতাদের অধিষ্ঠান কল্পনা করে এক ‘বৃক্ষ-দেহতত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পালাশপাতার পাত্রে আহার করলে মহাযজ্ঞের ফল, বহু অশ্বমেধের তুল্য পুণ্য—বিশেষত চাতুর্মাস্যে—লাভ হয় বলে বলা হয়েছে। রবিবার দুধ দিয়ে পূজা এবং বৃহস্পতিবার ভক্তিময় আচরণ বিশেষ প্রশস্ত; ভোরে পালাশ দর্শনও পবিত্রকারী। শেষে পালাশকে ‘দেববীজ’ ও ব্রহ্মের প্রকাশরূপ বলে পুনরুচ্চারিত করে, চাতুর্মাস্যে শ্রদ্ধায় সেবা করাকে শুদ্ধি ও দুঃখনিবারণের নীতিপথ হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে।

तुलसीमाहात्म्यवर्णनम् (Glorification of Tulasī: Virtue, Protection, and Cāturmāsya Practice)
এই অধ্যায়ে তুলসীর মাহাত্ম্য গৃহধর্ম ও ব্রতধর্মের ভক্তিমূলক সাধনা হিসেবে বর্ণিত। বলা হয়েছে, গৃহে তুলসী রোপণ মহাফলদায়ী এবং দারিদ্র্য নিবারক। এরপর তুলসীর দর্শন, রূপ, পাতা, ফুল, ফল, কাঠ, মজ্জা ও বাকলে শ্রী/লক্ষ্মী ও মঙ্গলশক্তির অধিষ্ঠান দেখিয়ে তুলসীকে সর্বাঙ্গে পবিত্রতা ও আশীর্বাদের বাহক বলা হয়েছে। মস্তকে, মুখে, হাতে, হৃদয়ে, কাঁধে ও কণ্ঠে তুলসী ধারণের ক্রমে রক্ষা, রোগ-শোকহরণ, ক্লেশনাশ এবং মোক্ষাভিমুখতা নির্দেশ করা হয়েছে। প্রতিদিন তুলসীপাতা সঙ্গে রাখা ও নিয়মিত জল দেওয়া ভক্তিচর্চা হিসেবে প্রশংসিত; বিশেষত চাতুর্মাস্যে তুলসীসেবা দুর্লভ ও মহাপুণ্যদায়ী—দুধ দিয়ে সিঞ্চন এবং তুলসীর আলভালা/বেসিনের যত্ন-দানও উল্লেখিত। শেষে বলা হয়, হরি সকল বৃক্ষে দীপ্তিমান এবং কমলা (লক্ষ্মী) বৃক্ষে নিবাস করে নিত্য দুঃখনাশ করেন—এভাবে বৈষ্ণব ভক্তি, পবিত্র বৃক্ষ-পরিবেশচেতনা ও ঋতুশৃঙ্খলা একত্রিত হয়।

बिल्वोत्पत्तिवर्णनम् | Origin and Sacred Significance of the Bilva Tree
এই অধ্যায়ে বাণীর সংলাপধারায় বিল্ববৃক্ষের উৎপত্তি ও পবিত্র মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। মন্দর পর্বতে বিচরণকালে ক্লান্ত পার্বতীর দেহ থেকে ঝরা এক ফোঁটা ঘাম ভূমিতে পড়ে এক মহাদিব্য বৃক্ষে পরিণত হয়। তা দেখে দেবী জয়া ও বিজয়াকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে—এ বৃক্ষ দেবীর দেহসম্ভূত, পাপনাশক ও পূজনীয়; তাই এর নামকরণ করা উচিত। পার্বতী এর নাম ‘বিল্ব’ রাখেন এবং ভবিষ্যতে রাজাসহ ভক্তরা শ্রদ্ধাভরে বিল্বপাতা সংগ্রহ করে তাঁর পূজায় অর্পণ করবে—এ কথা ঘোষণা করেন। এরপর ফলশ্রুতি বলা হয়—বিল্বপাতা দর্শন ও বিশ্বাসসহ পূজা ইষ্টসিদ্ধি দেয়; পাতার অগ্রভাগ আস্বাদন করা ও পাতার অগ্র মাথায় স্পর্শ করালে বহু পাপ ক্ষয় হয় এবং দণ্ডদুঃখ থেকে রক্ষা মেলে। শেষে বৃক্ষকে দেবীর জীবন্ত তীর্থ-মন্দিররূপে দেখানো হয়েছে—মূলে গিরিজা, কাণ্ডে দক্ষায়ণী, শাখায় মাহেশ্বরী, পাতায় পার্বতী, ফলে কাত্যায়নী, বাকলে গৌরী, অন্তঃতন্তুতে অপর্ণা, ফুলে দুর্গা, শাখা-অঙ্গে উমা এবং কাঁটায় রক্ষাকারী শক্তির অধিষ্ঠান।

Viṣṇu-śāpaḥ and the Etiology of Śālagrāma (Cāturmāsya Context)
অধ্যায় ২৫১ গালব-সংলাপের কাঠামোয় শালগ্রামের উৎপত্তি ও কারণকথা বর্ণনা করে। চাতুর্মাস্যকালে শুভ আকাশবাণী শোনা যায় এবং দেবতারা চারটি বৃক্ষের বিধিবদ্ধ পূজা করেন। এরপর হরি ও হর একীভূত ‘হরিহরাত্মক’ রূপে প্রকাশিত হয়ে দেবতাদের নিজ নিজ অধিকার ও লোক-ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করেন। তারপর পার্বতীর শাপে কষ্টপ্রাপ্ত দেবতারা বিল্বপত্র ও পুনঃপুন স্তবের দ্বারা দেবীকে প্রসন্ন করেন। দেবী শাপ প্রত্যাহার না করেও করুণায় তাকে লোকহিতের রূপ দেন—দেবতারা মানবলোকে মাসে মাসে প্রতিমা/চিহ্ন-রূপে সহজলভ্য হবেন এবং বিবাহ-সংস্কার, সন্তানপ্রাপ্তি প্রভৃতিতে সমাজকে বরদান করবেন। পরে দেবী বিষ্ণু ও মহেশ্বরকে শাপফল জানান—বিষ্ণু পাষাণরূপে পরিণত হবেন এবং শিব ব্রাহ্মণ-শাপের প্রসঙ্গে লিঙ্গ-সম্পর্কিত পাষাণরূপ ধারণ করবেন; এতে সামাজিক বিরোধ ও দুঃখও দেখা দেবে। বিষ্ণু তখন দেবীর বিধিবৎ স্তব করেন, তাঁকে গুণত্রয়ময়ী মায়া ও ত্রিরূপা শক্তি হিসেবে স্মরণ করেন। পার্বতী মুক্তিদায়িনী ভূগোল নির্দিষ্ট করেন—বিষ্ণু গণ্ডকীর নির্মল জলে শালগ্রাম-শিলা রূপে অবস্থান করবেন; পুরাণজ্ঞেরা স্বর্ণাভ বর্ণ ও চক্রচিহ্নাদি লক্ষণে তাঁকে চিনবেন। তুলসীভক্তিসহ শিলা-রূপ বিষ্ণুপূজায় ভক্তের মনোরথ পূর্ণ হয় ও মুক্তির সান্নিধ্য মেলে; কেবল দর্শনও যমভয় থেকে রক্ষা বলে বলা হয়েছে। শেষে শালগ্রাম-উৎপত্তি ও শাপোত্তর দেব-নিবাসের স্থিতি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

Cāturmāsya-vṛkṣa-devatā-nivāsaḥ (Divine Abiding in Trees during Cāturmāsya)
এই অধ্যায়ে এক শূদ্র প্রশ্নকারী ও ঋষি গালবের প্রশ্নোত্তররূপে আলোচনা হয়েছে। শূদ্র জিজ্ঞাসা করে—চাতুর্মাস্যে দেবতারা কীভাবে বৃক্ষরূপ ধারণ করে গাছে বাস করেন। গালব বলেন, দেবসঙ্কল্পে এই সময়ে জল অমৃতসম গণ্য হয়; বৃক্ষদেবতারা তা ‘পান’ করে বল, তেজ, সৌন্দর্য ও উদ্যমের গুণ প্রকাশ করেন। এরপর আচার-নৈতিক নির্দেশ দেওয়া হয়—সব মাসেই বৃক্ষসেবা প্রশস্ত, তবে চাতুর্মাস্যে বিশেষ ফলদায়ক। তিলমিশ্রিত জল (তিলোদক) দিয়ে গাছে জল দেওয়া ইচ্ছাপূরণকারী বলা হয়েছে; তিলকে শুদ্ধিকারক, ধর্ম-অর্থের সহায়ক এবং দানে প্রধান বস্তু হিসেবে মহিমা দেওয়া হয়েছে। পরে বিভিন্ন বৃক্ষের সঙ্গে দেবতা ও নানা গণের (গন্ধর্ব, যক্ষ, নাগ, সিদ্ধ প্রভৃতি) সম্পর্ক তালিকাভাবে বর্ণিত—যেমন বটবৃক্ষে ব্রহ্মা, যবে ইন্দ্র ইত্যাদি। শেষে পিপ্পল/অশ্বত্থ ও তুলসীর সেবাকে সমগ্র উদ্ভিদজগতের সেবার সমান বলা হয়েছে; যজ্ঞের প্রয়োজন ছাড়া চাতুর্মাস্যে বৃক্ষচ্ছেদন নিষেধ। জাম্বু গাছের তলায় ব্রাহ্মণভোজন ও বৃক্ষপূজায় সমৃদ্ধি এবং চার পুরুষার্থসিদ্ধির ফলশ্রুতি ঘোষিত।

शंकरकृतपार्वत्यनुनयः (Śaṅkara’s Appeasement of Pārvatī) — Cāturmāsya-Māhātmya Context
অধ্যায় ২৫৩-এ সংলাপরূপে এক ধর্মতাত্ত্বিক-নৈতিক প্রসঙ্গ বর্ণিত। প্রশ্ন ওঠে—পার্বতীর ক্রোধ, তাঁর শাপ, এবং রুদ্রকে বিকৃত অবস্থায় দেখিয়ে পরে দিব্যরূপে প্রত্যাবর্তনের অর্থ কী। গালব বলেন, দেবীর ভয়ে দেবতারা অদৃশ্য হয়ে মানবলোকে প্রতিমারূপে প্রতিষ্ঠিত হন; পরে দেবী প্রসন্ন হয়ে অনুগ্রহ দান করেন। বিষ্ণুকে জগন্মাতা ও পাপনাশিনী রূপে স্তব করা হয়। এরপর নীতিধর্মের উপদেশ—অপরাধ হলে সংশোধন ও দমন (নিগ্রহ) কর্তব্য, তা পিতা-পুত্র, গুরু-শিষ্য, স্বামী-স্ত্রী প্রভৃতি সম্পর্কেও যথোচিতভাবে পালনীয়; কুল-জাতি-দেশধর্ম ত্যাগ মহাদোষ বলে সতর্ক করা হয়। পার্বতী শোক ও ক্রোধে শিবকে তিরস্কার করেন এবং ব্রাহ্মণদের দ্বারা শিবের ক্ষতির আশঙ্কাও উচ্চারণ করেন। শিব করুণা ও অহিংসার যুক্তি দিয়ে ধীরে ধীরে তাঁকে শান্ত করেন। সমাধান আসে ব্রত-নিয়মের মাধ্যমে—পার্বতী চাতুর্মাস্য পালন, ব্রহ্মচর্য এবং দেবসমক্ষে প্রকাশ্য তাণ্ডবের শর্ত দেন। শিব সম্মতি দিলে শাপ অনুগ্রহে পরিণত হয়। শেষে ফলশ্রুতি—শ্রদ্ধায় শ্রবণে দৃঢ়তা, সিদ্ধি ও মঙ্গলময় আশ্রয় লাভ হয়।

चातुर्मास्य-माहात्म्ये हरताण्डवनृत्य-वर्णनम् | Description of Śiva’s Haratāṇḍava Dance within the Glory of Cāturmāsya
অধ্যায়ের শুরুতে এক প্রশ্নকারী (শূদ্র) বিস্ময় ও ভক্তিভরে জিজ্ঞাসা করে—দেবতাদের মাঝে মহাদেব কীভাবে নৃত্য করলেন, চাতুর্মাস্য-ব্রতের উৎপত্তি ও গ্রহণযোগ্য সংকল্প কী, এবং কোন দিব্য অনুগ্রহ প্রকাশ পেল। ঋষি গালব পুণ্যদায়ক কাহিনি বলেন। চাতুর্মাস্য এলে হর ব্রহ্মচর্য-ব্রত গ্রহণ করে মন্দর পর্বতে দেব ও ঋষিদের আহ্বান করেন এবং ভবানীকে তুষ্ট করতে হরতাণ্ডব নৃত্য শুরু করেন। দেবতা, ঋষি, সিদ্ধ, যক্ষ, গন্ধর্ব, অপ্সরা ও গণদের মহাসভা গঠিত হয়; নানা বাদ্য, তাল ও গায়ন-পরম্পরার বর্ণনা আসে। এরপর শিব থেকে উদ্ভূত রাগসমূহকে পত্নীসহ ব্যক্তিরূপে দেখানো হয়; চক্রাদি সূক্ষ্মদেহ-ইঙ্গিতের সঙ্গে নান্দনিক-তত্ত্বের মিলন ঘটে। ঋতুচক্র সম্পূর্ণ হলে পার্বতী প্রসন্ন হয়ে ভবিষ্যৎ ঘটনা বলেন—এক ব্রাহ্মণের শাপে পতিত এক লিঙ্গ নর্মদার জলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জগৎ-নমস্য হবে। পরে শিবস্তোত্র ও তার ফলশ্রুতি: ভক্তিসহ পাঠকারীর ইষ্ট-বিচ্ছেদ হয় না, জন্মে জন্মে স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি লাভ হয়, ভোগসুখ প্রাপ্ত হয় এবং শেষে শিবলোকে গমন ঘটে। শেষে ব্রহ্মা প্রমুখ দেবগণ শিবের সর্বব্যাপিতা ও শিব-বিষ্ণুর অভেদ স্তব করেন; গালব দেবরূপ-ধ্যানকারীদের মুক্তিদায়ক উপসংহার জানান।

लक्ष्मीनारायणमहिमवर्णनम् (Glorification of Lakṣmī–Nārāyaṇa and Śāligrāma Worship during Cāturmāsya)
অধ্যায় ২৫৫ তীর্থতত্ত্ব ও গৃহস্থ-আচারকে একসূত্রে বেঁধেছে। এখানে গণ্ডকী নদীর শালগ্রামকে স্বয়ম্ভূ (মানব-নির্মিত নয়) বলা হয়েছে এবং নর্মদাকে মহেশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করে প্রকৃতিতে প্রকাশিত পবিত্র চিহ্নগুলির এক বিশেষ ধর্মতত্ত্ব স্থাপন করা হয়েছে। এরপর শ্রবণ, আংশিক পাঠ, সম্পূর্ণ পাঠ এবং কপটহীন পাঠ—এই ভক্তিমার্গগুলিকে শোকমুক্ত ‘পরম পদ’ লাভের উপায় বলা হয়েছে। চাতুর্মাস্যকে কেন্দ্র করে সাধনার নিয়ম দেওয়া হয়েছে—লাভের জন্য গণেশপূজা, আরোগ্যের জন্য সূর্যপূজা এবং গৃহস্থদের জন্য পঞ্চায়তন-উপাসনা; চার মাসের ব্রতে ফল বিশেষ বৃদ্ধি পায়। শালগ্রামের মাধ্যমে লক্ষ্মী–নারায়ণ পূজা, সঙ্গে দ্বারাবতী-শিলা, তুলসী ও দক্ষিণাবর্ত শঙ্খের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে শুদ্ধি, সমৃদ্ধি, গৃহে ‘শ্রী’-র স্থিতি এবং মোক্ষাভিমুখ ফলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। শেষে বলা হয়েছে—সর্বব্যাপী প্রভুর পূজাই সমগ্র জগতের পূজা, তাই ভক্তিই সকলের জন্য যথেষ্ট।

रामनाममहिमवर्णनम् (Glorification of the Name “Rāma” and Mantra-Discipline in Cāturmāsya)
অধ্যায়ের শুরু কৈলাসে—রুদ্র উমার সঙ্গে উপবিষ্ট, চারদিকে অসংখ্য গণ; তাঁদের নাম একে একে উল্লেখ করে এক পবিত্র, বিশ্বব্যাপী দেবসভা-পরিবেশ নির্মিত হয়। বসন্ত এলে ইন্দ্রিয়মুগ্ধ সৌন্দর্য ও ক্রীড়াচাঞ্চল্য ছড়ায়; তখন শিব গণদের বলেন, অযথা কৌতুক ত্যাগ করে তপস্যায় প্রবৃত্ত হও। পার্বতী শিবের জপমালা দেখে জিজ্ঞাসা করেন—আদিদেব হয়েও আপনি কী জপ করেন, কোন পরম তত্ত্ব ধ্যান করেন। শিব বলেন, তিনি সর্বদা হরির সহস্রনামের সার ধ্যান করেন এবং মন্ত্রতত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। প্রণব ও দ্বাদশাক্ষর মন্ত্রকে তিনি বেদসার, শুদ্ধ, মোক্ষদায়ক বলেন; বিশেষত চাতুর্মাস্যে এর মহাফল—অগাধ পাপসঞ্চয়ের বিনাশ ইত্যাদি—ঘোষণা করেন। পরে অধিকার-নিয়ম প্রসারিত হয়: প্রণবযুক্ত রূপের আলোচনা থাকলেও, যাঁরা প্রণব ব্যবহার করেন না তাঁদের জন্য দুই অক্ষরের “রাম” নামকে সর্বশ্রেষ্ঠ মন্ত্র বলা হয়। শেষে “রাম” নামের মহিমা গীত হয়—ভয় ও রোগ নাশক, জয়দায়ক, সর্বপবিত্রকারী; চাতুর্মাস্যে নামাশ্রয়ে বাধা দূর হয় এবং দণ্ডরূপ পরলোকফলও নিবারিত হয়।

द्वादशाक्षरनाममहिमपूर्वकपार्वतीतपोवर्णनम् (The Glory of the Twelve-Syllable Mantra and the Account of Pārvatī’s Austerity)
এই অধ্যায়ে মন্ত্র-অধিকার ও তপস্যা-ভক্তির শৃঙ্খলা নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক সংলাপ বর্ণিত। পার্বতী দ্বাদশাক্ষর মন্ত্রের মহিমা, শুদ্ধ রূপ, ফল ও জপবিধি জানতে চান। মহাদেব বর্ণ-আশ্রমভেদে নিয়ম বলেন—দ্বিজদের জন্য প্রণব (ওঁ) সহ জপ, আর নারী ও শূদ্রদের জন্য পুরাণ-স্মৃতি-নির্ণয় অনুসারে প্রণববর্জিত, নমস্কার-সহ “নমো ভগবতে বাসুদেবায়” মন্ত্র। নির্ধারিত ক্রম ভঙ্গ করলে দোষ হয় এবং অশুভ ফল হতে পারে—এ কথাও তিনি সতর্ক করেন। পার্বতী প্রশ্ন তোলেন—তিনি তিন মাত্রা দ্বারা উপাসনা করেন, তবু প্রণবাধিকার কেন নেই? শিব প্রণবকে আদিতত্ত্ব বলে ব্যাখ্যা করেন; ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের ধারণাগত ভিত্তি তাতেই। তবে অধিকার তপস্যায় লাভ হয়, বিশেষত হরিপ্রীতির জন্য চাতুর্মাস্য ব্রত পালনে। তপস্যা ফলদায়ক ও গুণবর্ধক হলেও কঠিন; হরিভক্তিই তপস্যার প্রকৃত বৃদ্ধি, ভক্তিহীন তপস্যা ক্ষীণ বলে চিত্রিত। বিষ্ণুস্মরণ বাক্যকে পবিত্র করে, আর হরিকথা প্রদীপের মতো পাপ ও অন্ধকার দূর করে। শেষে পার্বতী হিমাচলে ব্রহ্মচর্য ও সরলতা নিয়ে চাতুর্মাস্য তপস্যা গ্রহণ করেন এবং নির্দিষ্ট সময়ে হরি-শঙ্করের ধ্যান করেন। উপসংহারে (গালবের উক্তিতে) তাঁকে জগন্মাতা, গুণাতীত প্রকৃতি বলে স্তব করা হয় এবং তাঁর তপস্যা এই ব্রত-ক্ষেত্রধারায় আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়।

हरशापः (Haraśāpaḥ) — “The Curse upon Hara / Śiva”
এই অধ্যায়ে মুনি-সংলাপের ভঙ্গিতে গালবের প্রশ্ন থেকে কাহিনি শুরু হয়। শৈলপুত্রী পার্বতী কঠোর তপস্যায় রত, আর কামপীড়িত শিব শান্তি খুঁজতে ঘুরে যমুনার তীরে আসেন। তাঁর তপোময় তেজে যমুনার জল বিকৃত হয়ে শ্যামবর্ণ ধারণ করে; পরে ফলশ্রুতিতে বলা হয়—সেখানে স্নান করলে বিপুল পাপরাশি নাশ হয়, এবং স্থানটি “হরতীর্থ” নামে পবিত্র খ্যাতি লাভ করে। এরপর শিব মনোহর, ক্রীড়াময় তপস্বীর বেশে ঋষিদের আশ্রমে আশ্রমে বিচরণ করেন। ঋষিপত্নীরা মানসে আকৃষ্ট হয়ে পড়লে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। ঋষিরা দেবতাকে চিনতে না পেরে ক্রোধে অপমানসূচক শাপ দেন; শাপে শিবের দেহে ভয়ংকর বিকার প্রকাশ পায়, জগতে কম্পন ও দেবতাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। তখন ঋষিরা নিজেদের অজ্ঞানজনিত অপরাধ বুঝে অনুতপ্ত হন এবং শিবের পরাত্পর স্বরূপ স্বীকার করে স্তব করেন। দেবীকে সর্বব্যাপিনী ও জগত্কর্মের মূল আধার রূপে স্তোত্র উচ্চারিত হয়, আর শিব শাপপ্রভাব নিবারণের জন্য প্রসাদ প্রার্থনা করেন—এভাবে তীর্থপ্রতিষ্ঠা, তড়িঘড়ি বিচার না করার নীতি ও দিব্য তত্ত্বচিন্তা একত্রে উপদেশিত হয়।

अमरकण्टक-नर्मदा-लिङ्गप्रतिष्ठा तथा नीलवृषभ-स्तुति (Amarakantaka–Narmadā Liṅga स्थापना and the Praise of Nīla the Bull)
অধ্যায় ২৫৯-এ তীর্থমাহাত্ম্যের বহুপর্ব বর্ণনা আছে। ঋষিরা এক বিশাল পতিত লিঙ্গ দেখে তাতে যুগযুগান্তরের সঞ্চিত সর্বব্যাপী শক্তি অনুভব করেন এবং পৃথিবীর কষ্টের কথা বলা হয়। তাঁরা বিধিপূর্বক লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন; একই সঙ্গে জলের পবিত্র পরিচয় স্থির হয়—জল রেবা-নর্মদা নামে প্রসিদ্ধ হয় এবং লিঙ্গ অমরকণ্টক-সম্পর্কিত নামে খ্যাতি লাভ করে। এরপর নর্মদায় স্নান ও আচমন, পিতৃ-তর্পণ এবং নর্মদা-সংযুক্ত লিঙ্গপূজার ফল বলা হয়েছে। বিশেষ করে চাতুর্মাস্য পালনে লিঙ্গপূজা, রুদ্রজপ, হরাপূজা, পঞ্চামৃতাভিষেক, মধুধারা ও দীপদান—এসবের মহিমা উচ্চারিত। পরে ব্রহ্মার বাণী ঋষিদের বিশ্ব-বিক্ষোভের আশঙ্কা প্রকাশ করে; দেবতারা এসে ব্রাহ্মণদের দীর্ঘ স্তব করেন, বাক্-শক্তির মাহাত্ম্য বোঝান এবং ব্রাহ্মণ-ক্রোধ উদ্রেক না করার নৈতিক নির্দেশ দেন। এরপর কাহিনি গোলোকে গিয়ে সুরভির পুত্র ‘নীল’ নামক বৃষভকে দেখায়; কেন তিনি নীল, এবং ধর্ম ও শিবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়। ঋষিরা নীলকে জগতের আধার ও ধর্মস্বরূপ বলে স্তব করেন; দিব্য বৃষভ/ধর্মের বিরুদ্ধে অপরাধের সতর্কতা এবং শ্রাদ্ধে মৃতের জন্য বৃষভ-উৎসর্গ না করলে যে দোষফল হয় তাও বলা হয়েছে। শেষে নীলকে চক্র-শূল প্রভৃতি প্রতীকে সজ্জিত করে গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর বিচরণ দেখানো হয় এবং রেবাজলে শাপ, ভক্তি ও শিলারূপান্তরের যোগসূত্রে একটি শ্লোক দিয়ে উপসংহার করা হয়।

Cāturmāsya Māhātmya and the Worship of Śālagrāma-Hari and Liṅga-Maheśvara (Paijavana-upākhyāna context)
এই অধ্যায়ে শালগ্রাম-কথানকের ধারাবাহিক ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা চলতে থাকে। মহেশ্বরের আবির্ভাবের স্মৃতি তুলে ধরে লিঙ্গ-রূপের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শালগ্রাম-রূপে হরির ভক্তিপূর্বক পূজা এবং হরি-হর (বিষ্ণু-শিব) যুগল দেবতার আরাধনা—বিশেষত চাতুর্মাস্য কালে—অত্যন্ত মহিমাময় বলে প্রশংসিত; এ পূজাকে স্বর্গ ও মোক্ষদায়িনী সাধনা বলা হয়েছে। এছাড়া ধর্মাচরণের সহায়ক বিধানও নির্দেশিত—বেদোক্ত কর্ম, ইষ্ট-পূর্ত কর্ম, পঞ্চায়তন পূজা, সত্যবাদিতা ও লোভমুক্ত জীবন। যোগ্যতা ও নৈতিক গঠন প্রসঙ্গে বিবেক, ব্রহ্মচর্য এবং দ্বাদশাক্ষর মন্ত্রের ধ্যানকে মুখ্য বলা হয়েছে। ষোড়শ উপচারে পূজা করতে বলা হয়েছে, মন্ত্র না থাকলেও; শেষে রাত্রি অতিবাহিত হলে সবাই প্রস্থান করে এবং ফলশ্রুতিতে শ্রবণ-পাঠ-উপদেশে পুণ্যক্ষয় হয় না—এ কথা ঘোষিত।

ध्यानयोगः (Dhyāna-yoga) — Cāturmāsya Māhātmya within Brahmā–Nārada Dialogue
এই অধ্যায়ে নাগরখণ্ডের তীর্থ-প্রসঙ্গের মধ্যে ব্রহ্মা–নারদ সংলাপ বর্ণিত। নারদ জিজ্ঞাসা করেন—চাতুর্মাস্যে হরির যোগনিদ্রাকালে দ্বাদশাক্ষর মন্ত্ররাজের দ্বারা সদামঙ্গলময়ী পার্বতী কীভাবে গভীর যোগসিদ্ধি লাভ করলেন। ব্রহ্মা বলেন—মন, বাক্য ও কর্মে ভক্তি রেখে তিনি দেবতা, দ্বিজ, অগ্নি, অশ্বত্থবৃক্ষ ও অতিথিদের পূজা করেন এবং পিনাকধারী শিবের নির্দেশমতো নিয়মব্রত ও মন্ত্রজপ পালন করেন। তখন বিষ্ণু চতুর্ভুজ, শঙ্খ-চক্রধারী, গরুড়ারূঢ়, দিব্য তেজে প্রকাশিত হয়ে দর্শন দেন। পার্বতী পুনর্জন্ম-নিবারক নির্মল জ্ঞান প্রার্থনা করলে বিষ্ণু পরম উপদেশ শিবের নিকট অর্পণ করে বলেন—পরম তত্ত্বই অন্তর-বাহিরের সাক্ষী এবং ধর্মের ভিত্তি। শিব আগমন করলে বিষ্ণু লীন হন। শিব পার্বতীকে দিব্যযানে এক দিব্য নদী ও শরবনসদৃশ অরণ্যে নিয়ে যান; সেখানে কৃত্তিকারা দীপ্তিমান ষণ্মুখ বালক কার্ত্তিকেয়কে প্রকাশ করেন, পার্বতী তাঁকে আলিঙ্গন করেন। পরে দ্বীপ-সমুদ্র অতিক্রম করে শ্বেত অঞ্চলের শ্বেত শিখরে শিব গোপন, শ্রুতিতীত উপদেশ দেন—প্রণবযুক্ত মন্ত্র ও ধ্যানবিধি: আসন, অন্তঃপূজা, নিমীলিত নয়ন, হস্তমুদ্রা ও বিশ্বপুরুষের ভাবনা। চাতুর্মাস্যে অল্প ধ্যানেও মলক্ষয় ও শুদ্ধি হয়—এটাই ফলশ্রুতি।

ज्ञानयोगकथनम् (Jñānayoga-kathana) — Discourse on the Yoga of Knowledge
এই অধ্যায়ে পার্বতী ধ্যানযোগের এমন উপায় জানতে চান, যার দ্বারা ক্রমে জ্ঞানযোগ লাভ করে ‘অমর’ অবস্থা অর্জিত হয়। ঈশ্বর বারো অক্ষরের ‘মন্ত্ররাজ’-এর বিশদ ব্যাখ্যা দেন—ঋষি, ছন্দ, দেবতা ও বিনিয়োগসহ, এবং অক্ষর-অক্ষরে বর্ণ, তত্ত্ব-বীজ, সংশ্লিষ্ট ঋষি ও প্রয়োগফল নির্দিষ্ট করেন। পরে পাদ থেকে নাভি, হৃদয়, কণ্ঠ, হাত, জিহ্বা/মুখ, কান, চোখ ও শির পর্যন্ত দেহ-ন্যাসের স্থাপনাবিধি এবং লিঙ্গ, যোনি, ধেনু—এই তিন মুদ্রার প্রয়োগ উল্লেখিত হয়। এরপর আলোচনা ধ্যানতত্ত্বে প্রবেশ করে: ধ্যানকে পাপক্ষয় ও শুদ্ধির নির্ণায়ক সাধন বলা হয়েছে। যোগের দুই রূপ পৃথক করা হয়—সালম্বন ধ্যান, যা নারায়ণ-দর্শনে নিয়ে যায়; এবং উচ্চতর নিরালম্বন জ্ঞানযোগ, যা নিরাকার, অমেয় ব্রহ্মের দিকে প্রবৃত্ত করে। নির্বিকল্প, নিরঞ্জন, সাক্ষীমাত্র প্রভৃতি অদ্বৈত-লক্ষণ বর্ণিত হলেও শিক্ষার্থীর জন্য দেহ-আশ্রিত সেতু রাখা হয়েছে; বিশেষত শিরকে যোগ-ধারণার প্রধান কেন্দ্র বলা হয়েছে, এবং চাতুর্মাস্যে সাধনার বিশেষ ফলপ্রদতা ঘোষিত। নৈতিক বিধান হিসেবে বলা হয়—অশৃঙ্খল বা দুষ্টের কাছে এই শিক্ষা প্রকাশ্য নয়; কিন্তু ভক্ত, সংযমী ও শুদ্ধ সাধককে, সামাজিক ভেদ নির্বিশেষে, প্রদান করা যায়। উপসংহারে দেহকে ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ বলে দেবতা, নদী ও গ্রহের দেহস্থিতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে, নাদ-অনুসন্ধান ও বিষ্ণু-কেন্দ্রিক ধ্যানাভ্যাসে মুক্তিলাভ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

मत्स्येन्द्रनाथोत्पत्तिकथनम् (Origin Account of Matsyendranātha)
এই অধ্যায়ে ঈশ্বর কর্ম, জ্ঞান ও যোগের তত্ত্বোপদেশ দেন। শুদ্ধচিত্তে, অনাসক্তিতে ও ভক্তিসহ হরি/বিষ্ণুর উদ্দেশে নিবেদিত কর্ম বন্ধন সৃষ্টি করে না—এ কথা স্পষ্ট করা হয়েছে। শম, বিচার, সন্তোষ ও সাধুসঙ্গকে মোক্ষপথরূপ ‘নগর’-এর চার ‘দ্বাররক্ষক’ বলা হয়েছে; আর গুরুর উপদেশকে দেহে অবস্থান করেও ব্রহ্মভাব উপলব্ধি ও জীবন্মুক্তির নির্ণায়ক উপায় বলা হয়েছে। এরপর মন্ত্রকেন্দ্রিক প্রসঙ্গ আসে। দ্বাদশাক্ষর মন্ত্রকে পবিত্রকারী বীজ ও ধ্যানের কেন্দ্র হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে। চাতুর্মাস্যকে বিশেষ পুণ্যকাল বলে, সেই সময় ব্রতপালন ও কাহিনি শ্রবণে সঞ্চিত দোষ দগ্ধ হয়—এমন ফলশ্রুতি বলা হয়েছে। পরে ব্রহ্মা কাহিনি বলেন—হর এক আশ্চর্য মৎস্যরূপী সত্তাকে দেখে প্রশ্ন করেন। সেই মৎস্য বংশভয়ের কারণে পরিত্যাগ, দীর্ঘকাল আবদ্ধ থাকা, এবং শিবের বাক্যে জ্ঞানযোগ জাগ্রত হওয়ার কথা জানায়। মুক্ত হয়ে তার নাম হয় ‘মৎস্যেন্দ্রনাথ’; তাকে ঈর্ষাহীন, অদ্বৈতনিষ্ঠ, বৈরাগ্যবান ও ব্রহ্মসেবাপরায়ণ শ্রেষ্ঠ যোগী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। শেষে শ্রবণ-মাহাত্ম্য—বিশেষত চাতুর্মাস্যে এই কাহিনি শ্রবণ মহাপুণ্যদায়ী এবং অশ্বমেধযজ্ঞসম ফলপ্রদ বলে ঘোষিত।

तारकासुरवधः (Tārakāsura-vadha) — The Slaying of Tārakāsura
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা গঙ্গাতীরে পার্বতী ও শিবের সান্নিধ্যে কিশোর স্কন্দ/কার্ত্তিকেয়ের দিব্য লীলার বর্ণনা করেন, যাতে দেবতার পবিত্র ভূদৃশ্যের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা প্রকাশ পায়। তারকাসুরের অত্যাচারে কাতর দেবগণ শঙ্করের শরণ নেন; স্কন্দকে সেনাপতি করা হয়, দেববাদ্য-জয়ধ্বনি ও অগ্নিশক্তি প্রভৃতি মহাজাগতিক সহায়তার সঙ্গে। পরে তাম্রবতী নামক স্থানে স্কন্দের শঙ্খনাদে যুদ্ধ শুরু হয়; দেব-অসুরের ভয়ংকর সংঘর্ষ, পরাজয় ও ধ্বংসের চিত্র ফুটে ওঠে। শেষে তারক বধ হয়, বিজয়ানুষ্ঠান ও উৎসব হয়, এবং পার্বতী স্কন্দকে আলিঙ্গন করেন। এরপর কথোপকথন জ্ঞান-বৈরাগ্যের দিকে মোড় নেয়। শিব বিবাহ (পাণিগ্রহণ) প্রসঙ্গ তুললে স্কন্দ আসক্তিহীনতা, সমদৃষ্টি এবং জ্ঞানের দুর্লভতা ও রক্ষার কথা বলেন। সর্বব্যাপী ব্রহ্ম উপলব্ধি হলে যোগীর কর্ম থেমে যায়—আসক্ত মন অস্থির, সমচিত্ত শান্ত; জ্ঞানই কঠিন ও নির্ণায়ক সাধনা। তারপর স্কন্দ ক্রৌঞ্চপর্বতে তপস্যা, দ্বাদশাক্ষর বীজমন্ত্র জপ, ইন্দ্রিয়সংযম ও সিদ্ধির বিভ্রান্তি জয় করতে গমন করেন। শেষে শিব পার্বতীকে সান্ত্বনা দিয়ে চাতুর্মাস্য-মাহাত্ম্যকে পাপনাশক বলেন; সূত শ্রোতাদের আরও শ্রবণে আহ্বান করে পুরাণীয় সংলাপধারা রক্ষা করেন।

अशून्यशयनव्रतमाहात्म्यवर्णन (The Māhātmya of the Aśūnya-Śayana Vrata)
অধ্যায় ২৬৫ দুই পর্বে উপদেশ দেয়। প্রথমে ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—দুর্বল বা কোমল দেহের লোকেরা বহু নিয়ম-ব্রত কীভাবে পালন করবে? সূত কার্তিক শুক্লপক্ষে একাদশী থেকে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের সহজ “ভীষ্ম-পঞ্চক” ব্রত নির্দেশ করেন। প্রাতঃস্নান-শুদ্ধি, বাসুদেব-কেন্দ্রিক নিয়ম, উপবাস বা উপবাস অসম্ভব হলে দান দ্বারা প্রতিস্থাপন, ব্রাহ্মণকে হবিশ্যান্ন অর্পণ, জলশায়ী হৃষীকেশের ধূপ-গন্ধ-নৈবেদ্যসহ পূজা, রাত্রি জাগরণ এবং ষষ্ঠ দিনে ব্রাহ্মণ-সম্মান করে পঞ্চগব্য-প্রারম্ভের পর নিজে ভোজন করে সমাপ্তি—এ সবই বলা হয়েছে। একাদশীতে জাতি-পুষ্প, দ্বাদশীতে বিল্বপত্র ইত্যাদি দিনভিত্তিক পুষ্প/পত্র অর্পণ ও অর্ঘ্য-মন্ত্রও উল্লেখিত। দ্বিতীয় পর্বে ঋষিরা “অশূন্য-শয়ন ব্রত”-এর বিস্তৃত বিধান চান, যা পূর্বে ইন্দ্র চক্রপাণিকে তুষ্ট করতে করেছিলেন। শ্রাবণী অতিক্রান্ত হলে দ্বিতীয়া তিথিতে, বিষ্ণু-সম্পর্কিত নক্ষত্রে ব্রত আরম্ভ এবং পাপী/পতিত/ম্লেচ্ছ প্রভৃতির সঙ্গে কথাবার্তা বর্জনের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। মধ্যাহ্নে স্নান করে শুচি বস্ত্র পরিধান করে জলশায়ী বিষ্ণুর পূজা ও গৃহসমৃদ্ধি, পিতৃ, অগ্নি, দেবতা এবং দাম্পত্যধর্ম অক্ষুণ্ণ থাকার প্রার্থনা করা হয়—লক্ষ্মী-বিষ্ণুর ঐক্য ও জন্মজন্মান্তরে ‘শয্যা অশূন্য’ থাকার ভাব এতে প্রকাশ পায়। ভাদ্রপদ-আশ্বিন-কার্তিক জুড়ে তেল-ত্যাগ প্রভৃতি আহার-নিয়মসহ ব্রত চলে। শেষে ফল-চাল-বস্ত্রসহ শয্যা-দান ও স্বর্ণ-দক্ষিণা দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে উপবাসে অধিক পুণ্য, দেবতার সন্তোষ, সঞ্চিত পাপক্ষয়, নারীর শুদ্ধি ও মনঃস্থৈর্য, কন্যার বিবাহ-সিদ্ধি এবং নিষ্কাম সাধকের চাতুর্মাস্য-নিয়মফল লাভের কথা বলা হয়েছে।

शिवारात्रिमाहात्म्यवर्णनम् (The Māhātmya of Śivarātri)
অধ্যায় ২৬৬-এ ঋষিরা প্রধান তীর্থ ও এমন প্রসিদ্ধ লিঙ্গসমূহের তালিকা চান, যাদের দর্শনে সর্বাঙ্গীন পুণ্য লাভ হয়। সূত মঙ্কণেশ্বর ও সিদ্ধেশ্বর প্রভৃতি লিঙ্গের উল্লেখ করে বিশেষভাবে মঙ্কণেশ্বরের ফল বর্ণনা করেন, বিশেষত শিবরাত্রি-ব্রতের সঙ্গে। শিবরাত্রি বলা হয়েছে মাঘ মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর রাত্রি; সেই রাত্রিতে শিব সকল লিঙ্গে ‘প্রবেশ’ বা ব্যাপ্ত হন—মঙ্কণেশ্বরে এর বিশেষ খ্যাতি। কাহিনিতে রাজা অশ্বসেন কলিযুগে অল্প পরিশ্রমে মহাফলদায়ী ব্রত জানতে ঋষি ভর্তৃযজ্ঞকে প্রশ্ন করেন। ঋষি একরাত্রি জাগরণ-রূপ শিবরাত্রির প্রশংসা করে বলেন—সেই রাত্রিতে দান, পূজা, হোম ও জপ ‘অক্ষয়’ ফল দেয়। দেবতারাও মানবশুদ্ধির জন্য একদিন-রাত্রির সাধনা প্রার্থনা করলে শিব সেই তিথিতে অবতরণের প্রতিশ্রুতি দেন এবং সংক্ষিপ্ত পঞ্চবক্ত্র-ক্রমের মন্ত্র, অর্ঘ্য-উপচার, ব্রাহ্মণ-সত্কার, ভক্তিকথা, সঙ্গীত-নৃত্যসহ পূজাবিধি নির্দেশ করেন। এরপর নীতিদৃষ্টান্ত—এক চোর অনিচ্ছায় লিঙ্গের কাছে গাছে বসে জেগে থাকে এবং পাতা ঝরায়; অপবিত্র উদ্দেশ্য থাকলেও সে ব্রতের পুণ্য লাভ করে উত্তম জন্ম পায় ও পরে মন্দির নির্মাণ করে। শেষে শিবরাত্রিকে পরম তপস্যা ও মহান পবিত্রকারী বলে তুলনামূলক মহিমা ও পাঠ-শ্রবণের ফলশ্রুতি বলা হয়েছে।

तुलापुरुषदानमाहात्म्यवर्णनम् | Tula-Puruṣa Donation: Procedure and Merit (Siddheśvara Context)
অধ্যায় ২৬৭-এ সংলাপের মাধ্যমে বিধি ও তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সূত বলেন, শিবরাত্রি প্রভৃতি ব্রত উভয় লোকেই কল্যাণদায়ক। মঙ্কণেশ্বর ও শিবরাত্রির প্রশংসা শুনে আনর্ত সিদ্ধেশ্বরের আবির্ভাবের পূর্ণ বিবরণ জানতে চান; তখন ভর্তৃযজ্ঞ সিদ্ধেশ্বর-দর্শনের ফল—বিশেষত রাজসাম্রাজ্য ও চক্রবর্তী-সমৃদ্ধি—উল্লেখ করে তুলাপুরুষ দানকে শ্রেষ্ঠ কর্ম বলে নির্দেশ দেন। এরপর তুলাপুরুষ দানের বিধান বলা হয়—গ্রহণ, অয়নান্ত ও বিষুবের মতো শুভ সময়ে মণ্ডপ ও বেদি নির্মাণ, যোগ্য ব্রাহ্মণ নির্বাচন এবং নিয়মমাফিক দান-বিতরণ। নির্দিষ্ট শুভ বৃক্ষের কাঠের স্তম্ভে তুলা স্থাপন করে দাতা তুলা-দেবীর আহ্বান করেন, নিজের দেহকে স্বর্ণ-রৌপ্য বা ইচ্ছিত দ্রব্যের সমান ওজন করে, জল ও তিলসহ বিধিপূর্বক অর্পণ করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—দানের পরিমাণ অনুযায়ী সঞ্চিত পাপ ক্ষয় হয়, নানা উপদ্রব থেকে রক্ষা মেলে, এবং সিদ্ধেশ্বরের সম্মুখে দান করলে সহস্রগুণ ফল বৃদ্ধি পায়। শেষে এই ক্ষেত্রের সমন্বিত পবিত্রতা—এক স্থানে বহু তীর্থ ও দেবালয়ের সমাবেশ—এবং সিদ্ধেশ্বরের দর্শন, স্পর্শ ও পূজায় সর্বাঙ্গীন কল্যাণ লাভের কথা ঘোষিত হয়েছে।

पृथ्वीदानमाहात्म्यवर्णनम् (The Glory and Procedure of the Earth-Gift)
এই অধ্যায়ে আনর্ত ভর্তৃযজ্ঞকে জিজ্ঞাসা করেন—কোন কর্মফলে চক্রবর্তিত্ব লাভ হয় এবং কীভাবে তা অর্জিত হয়। ভর্তৃযজ্ঞ বলেন, রাজত্ব অত্যন্ত দুর্লভ ও পুণ্যনির্ভর; যে রাজা গৌতমেশ্বরের সম্মুখে শ্রদ্ধাভরে স্বর্ণময় পৃথিবীর প্রতিরূপ (হিরণ্ময়ী পৃথ্বী) দান করে, সে চক্রবর্তী হয়। মন্ধাতা, হরিশ্চন্দ্র, ভরত, কার্তবীর্য প্রভৃতি রাজাদের দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। এরপর দানবিধির সূক্ষ্ম বর্ণনা—নির্দিষ্ট ওজন-পরিমাপে পৃথিবী-প্রতিমা নির্মাণ, ধনে প্রতারণা না করা। তাতে সাত সমুদ্র (লবণ, ইক্ষুরস, সুরা, ঘৃত, দধি, ক্ষীর, জল), সাত দ্বীপ, মেরু প্রভৃতি পর্বত ও গঙ্গা-প্রধান নদীগুলি প্রতীকীভাবে স্থাপন করা হয়। মণ্ডপ, কুণ্ড, তোরণ, মধ্য বেদি, পঞ্চগব্য ও শুদ্ধ জলে অভিষেক, এবং মন্ত্রসহ স্নান, বস্ত্র, ধূপ, আরতি, শস্য-অর্ঘ্য ইত্যাদি নির্দিষ্ট। দাতা পৃথিবীকে জগতাধার রূপে স্তব করে দানের জন্য তাঁর উপস্থিতি প্রার্থনা করে। দানটি জলে প্রতীকভাবে অর্পণ করা হয়—মাটিতে রাখা হয় না, গ্রহীতার হাতে সরাসরি দেওয়াও নয়। শেষে বিসর্জন করে ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ফলশ্রুতিতে রাজ্যহানি না হওয়া, শ্রবণমাত্রে পাপনাশ, গৌতমেশ্বরে করলে বহু জন্মের ফল ও বিষ্ণুর অব্যয় ধামের সান্নিধ্য, এবং অন্যের দানকৃত ভূমি দখল নিষিদ্ধ—এই নীতিবাক্য ঘোষিত।

कपालमोचन-ईश्वर-उत्पत्तिमाहात्म्यवर्णनम् (Kapālamocaneśvara: Origin and Glory of the Skull-Release Lord)
অধ্যায়ের শুরুতে সূত কপালমোচন-ক্ষেত্রের কপালেশ্বরের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন এবং বলেন—শুধু শ্রবণ করলেই পবিত্রতা লাভ হয়। ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—কে কপালেশ্বর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, দর্শন ও পূজার ফল কী, ইন্দ্রের ব্রহ্মহত্যা কীভাবে জন্মাল ও কীভাবে নাশ হল, এবং “পাপ-পুরুষ” (পাপের প্রতীক) অর্পণের সঠিক বিধি, মন্ত্র ও উপকরণ কী। সূত জানান—ব্রহ্মহত্যা থেকে মুক্তির জন্য ইন্দ্রই দেবতাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে কারণকথা বলা হয়—ত্বষ্টার পুত্র বৃত্র ব্রহ্মার বর পেয়ে ব্রাহ্মণ-ভাব লাভ করে এবং ব্রাহ্মণভক্ত হয়; দেব-দানবের যুদ্ধ শুরু হয়। বৃহস্পতি ইন্দ্রকে কৌশলগত উপায় শেখান এবং পরে দধীচির অস্থি দিয়ে বজ্র নির্মাণের নির্দেশ দেন। ইন্দ্র ব্রহ্মভূত বলে বর্ণিত বৃত্রকে বধ করলে ব্রহ্মহত্যা-দোষ প্রকাশ পায়; তেজ হ্রাস ও দুর্গন্ধসহ অশুচিতা দেখা দেয়। ব্রহ্মা ইন্দ্রকে তীর্থপরিক্রমা করে স্নান, মন্ত্রসহ স্বর্ণময় দেহরূপ “পাপ-পুরুষ” ব্রাহ্মণকে দান, এবং হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে কপাল স্থাপন করে পূজা করতে বলেন। ইন্দ্র বিশ্বামিত্র-হ্রদে স্নান করলে কপাল পতিত হয়; হরের পঞ্চমুখ-সম্পর্কিত পাঁচ মন্ত্রে পূজা করে তার অশুচিতা দূর হয়। বাতক নামের এক ব্রাহ্মণ স্বর্ণ-পাপ-পুরুষ গ্রহণ করে লোকনিন্দা সহ্য করেন; সংলাপে গ্রহণের ধর্মনীতি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্থানটির স্থায়ী আচারাধিকার ও “কপালমোচন” তীর্থের খ্যাতি চিরস্থায়ী হবে বলা হয়। শেষে এই কাহিনি শ্রবণ-পাঠকে পাপনাশক এবং তীর্থকে ব্রহ্মহত্যা-নিবারক বলে পুনরুক্ত করা হয়েছে।

पापपिण्डप्रदानविधानवर्णनम् | Procedure for the Donation of the Pāpa-Piṇḍa (Sin-Effigy)
এই অধ্যায়ে অজ্ঞতা, অবহেলা, কামনা বা অপরিণত বুদ্ধি থেকে সংঘটিত পাপের জন্য—যে ব্যক্তি প্রচলিত প্রায়শ্চিত্ত করেনি—তার দ্রুত শুদ্ধির বিধান বলা হয়েছে। আনর্ত তৎক্ষণাৎ পাপক্ষয়কারী উপায় জানতে চাইলে ভর্তৃযজ্ঞ ‘পাপ-পিণ্ড’ দানের ক্রিয়া নির্দেশ করেন—পঁচিশ পল পরিমাণ স্বর্ণপিণ্ড। অপরপক্ষে স্নান, শুচি বস্ত্র ধারণ এবং মণ্ডপ/বেদী প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। দাতা পৃথিবী থেকে শুরু করে তত্ত্বক্রমে ভূত ও ইন্দ্রিয়সমূহকে মন্ত্রোচ্চারণসহ পূজা করে। এরপর বেদ-বিদ্যাঙ্গে পারদর্শী ব্রাহ্মণকে আহ্বান করে পাদ্য, বস্ত্র, অলংকার ইত্যাদিতে সম্মান জানিয়ে উপযুক্ত মূর্তি/পিণ্ড প্রদান করা হয়; আনুষ্ঠানিক মন্ত্রে পূর্বপাপ সেই দানরূপে অর্পিত হচ্ছে—এ ঘোষণা করা হয়। ব্রাহ্মণ প্রতিগ্রহ-মন্ত্র পাঠ করে গ্রহণ স্বীকার করেন; পরে দক্ষিণা দিয়ে শ্রদ্ধাসহ বিদায় দেওয়া হয়। ফললক্ষণ হিসেবে দেহে হালকাভাব, তেজ বৃদ্ধি ও শুভ স্বপ্নের উল্লেখ আছে; এমনকি এই বিধান শ্রবণমাত্রও পবিত্রকারী বলা হয়েছে। কপালেশ্বর প্রসঙ্গে এর ফল অধিক হয় এবং গায়ত্রীসহ হোম করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

Liṅgasaptaka-pratiṣṭhā and Indradyumna’s Fame: The Hāṭakeśvara-kṣetra Narrative (लिङ्गसप्तक-माहात्म्यं तथा इन्द्रद्युम्न-कीर्तिः)
অধ্যায় ২৭১-এ সূত হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে অবস্থিত সাত লিঙ্গের (লিঙ্গসপ্তক) মহাপুণ্যফল বর্ণনা করেন। এদের দর্শন ও পূজায় দীর্ঘায়ু, রোগমুক্তি ও পাপক্ষয় হয়। মর্কণ্ডেশ্বর, ইন্দ্রদ্যুম্নেশ্বর, পালেশ্বর, ঘণ্টাশিব, কলশেশ্বর (বানরেশ্বর-সম্পর্কিত) এবং ঈশান/ক্ষেত্রেশ্বর প্রভৃতি লিঙ্গের নাম উল্লেখিত। ঋষিরা জানতে চান—কে কোন লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কী বিধি এবং কী দান নির্দিষ্ট। এরপর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের দৃষ্টান্তকথা আসে—অসংখ্য যজ্ঞ-দান সত্ত্বেও পৃথিবীতে তাঁর কীর্তি ক্ষীণ হলে স্বর্গীয় মর্যাদা বিপন্ন হয়; তাই কীর্তি পুনর্নবীকরণের জন্য তিনি পুনরায় পুণ্যকর্মে প্রবৃত্ত হন। অতি দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে নিজের পরিচয়ের প্রমাণ খুঁজতে তিনি ক্রমে মর্কণ্ডেয়, বক/নাড়ীজঙ্ঘ, উলূক, গৃধ্র, কূর্ম (মন্থরক) এবং শেষে লোমশ ঋষির কাছে যান। তাঁরা বলেন—শিবভক্তি (যেমন বিল্বপত্র-অর্চনা) থেকেই তাঁদের দীর্ঘায়ু, আর পশুযোনি তপস্বীর শাপফল। শেষে ভর্তৃযজ্ঞ ও সংবর্ত-সম্পর্কিত উপদেশে হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে লিঙ্গসপ্তক প্রতিষ্ঠা এবং ‘পর্বত-দান’ রূপে মেরু, কৈলাস, হিমালয়, গন্ধমাদন, সুবেল, বিন্ধ্য ও শৃঙ্গী—এই সাত পর্বতের প্রতীক দান নির্দিষ্ট দ্রব্যে করার বিধান দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—প্রভাতে কেবল দর্শনেই অজান্ত পাপও মোচন হয়; আর বিধিপূর্বক পূজা-দান করলে শিবসান্নিধ্য (গণত্ব), দীর্ঘ স্বর্গসুখ এবং পুনর্জন্মে উচ্চ রাজ্য-সমৃদ্ধি লাভ হয়।

युगस्वरूपवर्णनम् (Description of the Nature of the Yugas and Measures of Time)
এই অধ্যায়ে ঋষিগণ পূর্বে ঈশান ও এক রাজপুরুষের প্রসঙ্গে উল্লিখিত ‘দিন’-এর পরিমাপ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। সূত মুনি সূক্ষ্মতম কালমান থেকে শুরু করে নিমেষাদি ক্ষুদ্র একক, তারপর দিন-রাত্রি, মাস, ঋতু, অয়ন ও বর্ষ পর্যন্ত সময়ের ক্রমবিন্যাস শাস্ত্রসম্মতভাবে ব্যাখ্যা করেন। এরপর যুগতত্ত্ব বর্ণিত হয়—কৃত, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিতে ধর্ম ও পাপের অনুপাত, সমাজ-নৈতিক অবস্থা, আচার-ব্যবহার এবং যজ্ঞকর্মের প্রবাহ ও স্বর্গলাভের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। কলিযুগে লোভ, বিদ্বেষ, বিদ্যা-আচারের ক্ষয়, অভাব-দুর্ভিক্ষের লক্ষণ এবং আশ্রমধর্মের বিকৃতি ইত্যাদি বিশদে বলা হয়; শেষে চক্রাকারে ভবিষ্যতে পুনরায় কৃতযুগের আবির্ভাবের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এই কালমানকে ব্রহ্মার দিন-বর্ষের মহামাপের সঙ্গে যুক্ত করে শিব-শক্তি-সম্বন্ধীয় বিশ্বরূপের আভাস দেওয়া হয়। নাগরখণ্ডের হাটকেশ্বরক্ষেত্রমাহাত্ম্যে এটি ‘যুগস্বরূপবর্ণন’ অধ্যায়।

युगप्रमाणवर्णनम् (Yuga-Pramāṇa Varṇana) — Description of Cosmic Time Measures
এই অধ্যায়ে সূত মহর্ষি যুগ, মন্বন্তর এবং শক্র (ইন্দ্র)-পদের ধারাবাহিকতা সহ কাল-প্রমাণের তাত্ত্বিক আলোচনা করেন। তিনি পূর্ববর্তী শক্রদের ক্রম গণনা করে বর্তমান শক্রকে “জায়ন্ত” এবং বর্তমান মনুকে বৈবস্বত বলে নির্দিষ্ট করেন। ভবিষ্যতে “বলি” শক্রপদ লাভ করবে—এটি বাসুদেব-প্রসাদ ও পূর্বপ্রতিশ্রুতির ফল, কারণ পরবর্তী এক মন্বন্তরে রাজ্যপ্রাপ্তির আশ্বাস তাকে দেওয়া হয়েছিল। এরপর সময়-গণনায় ব্রহ্মার কাল-হিসাবের উল্লেখ করে চারটি ব্যবহারিক মান বলেন—সৌর, সাবন, চান্দ্র এবং নাক্ষত্র/আর্ক্ষ। ঋতুচক্র (শীত-উষ্ণ-বর্ষা), কৃষিকর্ম ও মহাযজ্ঞ সৌর মানে; সামাজিক লেনদেন ও শুভকর্ম সাবন মানে; চান্দ্র গণনায় অধিমাস সংযোজন প্রয়োজন; আর গ্রহ-গণনা নক্ষত্রভিত্তিক মানে নির্ভরশীল। শেষে ফলশ্রুতি—ভক্তিভরে এই যুগ-কাল-প্রমাণ পাঠ করলে রক্ষা হয় এবং অকালমৃত্যুর ভয় থেকেও মুক্তি মেলে।

Durvāsas-स्थापित-त्रिनेत्र-लिङ्गमाहात्म्य (The Glory of the Trinetra Liṅga Established by Durvāsas)
এই অধ্যায়ে সূত–ঋষি সংলাপে দুর্বাসা-প্রতিষ্ঠিত ত্রিনেত্র লিঙ্গের মাহাত্ম্য বর্ণিত। এক মঠাধ্যক্ষ লিঙ্গপূজা করলেও লেনদেনের লাভ লোভে জমিয়ে রাখে এবং সোনা তালাবদ্ধ সিন্দুকে গোপন করে। দুḥশীল নামের এক চোর সন্ন্যাসের ভান করে মঠে ঢুকে শৈব দীক্ষা গ্রহণ করে সুযোগের অপেক্ষা করে; যাত্রাপথে মুরলা নদীর তীরে বিশ্রামের সময় গুরুর বিশ্বাস বাড়লে সিন্দুক কিছুক্ষণ অরক্ষিত হয়, তখন সে সোনা চুরি করে পালায়। পরে গৃহস্থ হয়ে সে এক তীর্থে দুর্বাসার সাক্ষাৎ পায় এবং লিঙ্গের সামনে নৃত্য-গীতসহ ভক্তি-অনুষ্ঠান দেখে। দুর্বাসা বলেন, মহেশ্বর নৃত্য-গীত-স্তব ইত্যাদি ভক্তিতে প্রসন্ন হন বলেই তিনি এই লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এরপর তিনি প্রায়শ্চিত্ত ও নীতিধর্মের বিধান দেন—কৃষ্ণাজিন দান, স্বর্ণসহ তিলপাত্রে নিয়মিত তিলদান, অসম্পূর্ণ প্রাসাদ/মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ করে গুরুদক্ষিণা প্রদান, এবং পুষ্প-নৈবেদ্য ও ভক্তিকলার অর্পণ। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—চৈত্রমাসে দর্শনে বার্ষিক পাপ নাশ, স্নান-অভিষেকে বহু দশকের পাপ ক্ষয়, আর দেবসমক্ষে নৃত্য-গীতে আজীবন পাপমোচন ও মোক্ষোপযোগী পুণ্য লাভ হয়।

Nimbēśvara–Śākambharī Utpatti Māhātmya (Origin-Glory of Nimbēśvara and Śākambharī)
সূত বলেন—দুঃশীল নামে এক ব্যক্তি, আচরণে ত্রুটি থাকলেও, গুরুর চরণ স্মরণ করে গুরুর নামেই এক শিব-মন্দির প্রতিষ্ঠা করে। মন্দিরটি দক্ষিণ দিকে অবস্থিত বলে বর্ণিত এবং “নিম্বেশ্বর” নামে প্রসিদ্ধ হয়। ভক্তিভরে ভিত্তিস্থাপন করে সে গুরুভক্তিকে প্রধান সাধন মনে করে। তার স্ত্রী শাকম্ভরী নিজের নামেই দুর্গার প্রতিমা স্থাপন করেন; ফলে শিব–দেবীর যুগল তীর্থক্ষেত্র গড়ে ওঠে। দম্পতি অবশিষ্ট ধন পূজা-ব্যবস্থায় নিয়োজিত করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের দান করেন, তারপর ভিক্ষাবৃত্তিতে জীবনযাপন করেন। কালে দুঃশীলের মৃত্যু হলে শাকম্ভরী দৃঢ়চিত্তে স্বামীর দেহ ধারণ করে চিতাগ্নিতে প্রবেশ করেন—এটি এখানে ধর্মীয় আদর্শ-উদাহরণ, আইনগত নির্দেশ নয়। পরে উভয়েই দিব্য বিমানে, উৎকৃষ্ট অপ্সরাদের সঙ্গসহ, স্বর্গে আরোহণ করেন। শেষের ফলশ্রুতি জানায়—এই উত্তম আখ্যান পাঠ করলে অজ্ঞতাবশত কৃত পাপ থেকে মুক্তি মেলে; ভক্তি, দান ও তীর্থ-সংযোগের মাহাত্ম্য প্রকাশিত হয়।

एकादशरुद्रोत्पत्ति-वर्णनम् | Origin Account of the Eleven Rudras (at Hāṭakeśvara-kṣetra)
এই অধ্যায়ে সংলাপের মাধ্যমে এক ধর্মতাত্ত্বিক সংশয় দূর করা হয়েছে। ঋষিরা প্রশ্ন করেন—রুদ্র তো এক, গৌরীর পতী ও স্কন্দের পিতা বলে প্রসিদ্ধ; তবে একাদশ রুদ্র কীভাবে? সূত রুদ্রের ঐক্য স্বীকার করে বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে শিব একাদশ রূপে প্রকাশিত হন। বারাণসীতে তপস্বীরা হাটকেশ্বরের প্রথম দর্শন লাভের ব্রত নেন। প্রতিযোগিতা দেখা দেয় এবং নিয়ম হয়—যে প্রথম দর্শন করতে ব্যর্থ হবে, সে সকলের ক্লান্তিজনিত দোষ বহন করবে। শিব তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাব জেনেও ভক্তিকে সম্মান করে নাগ-দ্বার দিয়ে পাতাল থেকে উদ্ভূত হন এবং ত্রিশূলধারী, ত্রিনয়ন, কপর্দা-ভূষিত একাদশমূর্তি ধারণ করেন। তপস্বীরা প্রণাম করে দিক-সম্পর্কিত রুদ্র ও রক্ষাকারী রূপগুলির স্তব করেন। শিব ঘোষণা করেন—আমি একাদশরূপেই বিরাজমান—এবং বর দেন। তপস্বীরা প্রার্থনা করেন, সর্বতীর্থ-স্বরূপ হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে তিনি একাদশ রূপে স্থায়ীভাবে অবস্থান করুন। শিব সম্মতি দেন, বলেন একটি রূপ কৈলাসে থাকবে, এবং উপাসনার বিধি স্থাপন করেন—বিশ্বামিত্র-হ্রদে স্নান, নাম ধরে মূর্তিপূজা; এতে পুণ্য বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। ফলশ্রুতিতে আধ্যাত্মিক উন্নতি, দরিদ্রের সমৃদ্ধি, নিঃসন্তানের সন্তানলাভ, রোগীর আরোগ্য ও শত্রুজয় বলা হয়েছে; ভস্মস্নান-নিয়মী দীক্ষিতের ক্ষেত্রে ষড়ক্ষর মন্ত্রে অল্প নিবেদনেও ফল অধিক হয়। চৈত্র শুক্ল চতুর্দশীতে বিশেষ পূজার কথা বলে, একাদশ রুদ্রকে মহাদেবেরই মূর্তিরূপে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

एकादशरुद्रसमीपे दानमाहात्म्यवर्णनम् (The Glory of Donations in the Presence of the Eleven Rudras)
এই অধ্যায়ে প্রশ্নোত্তর রীতিতে ধর্মতত্ত্বের আলোচনা হয়েছে। ঋষিগণ বারাণসীতে রুদ্র-সম্পর্কিত ব্রাহ্মণ-নামসমূহের একাদশ গোষ্ঠী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। কথক হরির বিধানে নির্দিষ্ট রুদ্ররূপগুলির নাম গণনা করেন—মৃগব্যাধ, সর্বজ্ঞ, নিন্দিত, মহাযশ, অজৈকপাদ, অহির্বুধ্ন্য, পিনাকী, পরন্তপ, দহন, ঈশ্বর ও কপালী। এরপর ঋষিরা দানবিধি ও পূর্বোক্ত জপ সম্পর্কে নির্দেশ চান। কথক ক্রমানুসারে দানের বিধান দেন—প্রত্যক্ষ (বাস্তব) ধেনু একে একে দান করতে হবে, এবং প্রতিটি ধেনু নির্দিষ্ট দ্রব্য-উৎপত্তি/সম্পর্কযুক্ত হবে, যেমন গুড়-সম্পর্কিত, মাখন-সম্পর্কিত, ঘি-সম্পর্কিত, স্বর্ণ-সম্পর্কিত, লবণ-সম্পর্কিত, রস-সম্পর্কিত, অন্ন-সম্পর্কিত, জল-সম্পর্কিত ইত্যাদি। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, এই দান করলে দাতা চক্রবর্তী হন; বিশেষত পবিত্র উপস্থিতির নিকটে প্রদত্ত দান অধিক ফলদায়ক। সব দিতে না পারলে, সকল রুদ্রের উদ্দেশ্যে নিবেদন জেনে অন্তত এক গাভী যত্নসহকারে দান করতে বলা হয়েছে।

द्वादशार्कोत्पत्तिरत्नादित्योत्पत्तिमाहात्म्ये याज्ञवल्क्यवृत्तान्तवर्णनम् (Origin of the Twelve Suns and the Ratnāditya: Account of Yājñavalkya)
এই অধ্যায়ে সূত ঋষিদের জানান—আকাশে সূর্য একটিই দেখা গেলেও হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রে কেন বারোটি সূর্যরূপ বিধিপূর্বক প্রতিষ্ঠিত। এই সौर-প্রতিষ্ঠার সূত্র যাজ্ঞবল্ক্যের দীক্ষা ও অভিষেকের সঙ্গে যুক্ত; সাবিত্রী-শাপে ব্রহ্মার অবতরণ এবং তার ফলে দাম্পত্য-ক্রম ও যজ্ঞাচারের শুদ্ধতা নিয়ে যে নৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়, তাও বর্ণিত। এরপর রাজাদের বারবার শান্তিকর্মের অনুরোধকে কেন্দ্র করে গুরু শাকল্য ও যাজ্ঞবল্ক্যের বিরোধ ঘটে—অবমাননা, প্রত্যাখ্যান ও গুরু-শিষ্য সংঘাত ক্রমে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে যাজ্ঞবল্ক্য পূর্বশিক্ষার প্রতীকী ত্যাগরূপে অর্জিত বিদ্যা ‘উগরে’ দেন। পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি সূর্যের কঠোর ভক্তি করেন, বারোটি সূর্যমূর্তি নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা করেন, প্রামাণ্য তালিকা অনুযায়ী তাদের নাম উচ্চারণ করে অর্ঘ্য-উপহারে পূজা করেন। সূর্যদেব প্রত্যক্ষ হয়ে বর দেন এবং সূর্য-অশ্বের কর্ণে উপদেশের আশ্চর্য পদ্ধতিতে যাজ্ঞবল্ক্যকে পুনরায় বৈদিক জ্ঞান দান করে তাঁর বৈদিক অধিকার পুনঃস্থাপন করেন। শেষে এই শিক্ষা প্রচারিত হয়; তীর্থফল হিসেবে পাপক্ষয়, উন্নতি ও মুক্তির কথা বলা হয়, এবং রবিবার দর্শনকে বিশেষ ফলদায়ক বলে ঘোষণা করে ক্ষেত্রের সौर-উপাসনাকে আচার ও শিক্ষার পবিত্র ঐতিহ্যরূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

पुराणश्रवणमाहात्म्यवर्णन (Glorification of Listening to the Purāṇa)
অধ্যায় ২৭৯-এ সূত মুনি ধর্মোপদেশের ভঙ্গিতে স্কন্দপুরাণের প্রামাণ্য প্রতিষ্ঠা করেন। স্কন্দ ভৃগুকে (ব্রহ্মার পুত্র বলে উল্লিখিত) পুরাণ শিক্ষা দেন; সেখান থেকে অঙ্গিরস, চ্যবন ও ঋচীকের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে তা প্রবাহিত হয়—এই পরম্পরাই শাস্ত্রের কর্তৃত্বের আদর্শ। এরপর ফলশ্রুতি—সজ্জনসমাজে স্কন্দপুরাণ শ্রবণ সঞ্চিত পাপমল নাশ করে, আয়ু বৃদ্ধি করে এবং সকল বর্ণ-আশ্রমের মঙ্গল সাধন করে। হাটকেশ্বর-ক্ষেত্রের মাহাত্ম্য অপরিমেয় পুণ্যদায়ক; এই ধর্ম-মাহাত্ম্য ব্রাহ্মণকে দান করলে দীর্ঘ স্বর্গফল লাভ হয় বলা হয়েছে। পুত্রলাভ, ধনসমৃদ্ধি, বিবাহসিদ্ধি, আত্মীয়-মিলন ও রাজবিজয়ের মতো ব্যবহারিক ফলও উল্লেখিত। বক্তা/গুরুর সম্মান ব্রহ্মা-বিষ্ণু-রুদ্রের সম্মানের সমতুল্য; সামান্য উপদেশও ধনে শোধ করা যায় না, তাই যথোচিত দক্ষিণা ও আতিথ্যে গুরুকে তুষ্ট করতে বলা হয়েছে। শ্রবণকে সকল তীর্থফলের সমান এবং বহু জন্মের দোষ প্রশমক বলা হয়েছে।
The place is presented as an ascetic forest in Ānarta where a crisis triggered by the falling of Śiva’s liṅga becomes the basis for establishing liṅga worship as uniquely authoritative; the site’s “glory” lies in being a setting where cosmic disorder is resolved through proper devotion and reinstatement of the liṅga.
Merit is framed through devotional correctness: sustained, faith-filled liṅga-pūjā (including tri-kāla worship) is said to lead to elevated spiritual outcomes (“parā gati”), and the act of honoring the liṅga is treated as honoring the triad of Śiva, Viṣṇu, and Brahmā.
The core legend is Śiva’s wandering after Satī’s separation, the ascetics’ curse causing the liṅga to fall into the earth and enter Pātāla, the ensuing cosmic omens, and the devas’ intervention culminating in the installation and worship of a golden liṅga named Hāṭakeśvara.