
Reva Khanda
A Narmadā (Revā)–centered sacred-geography unit mapping tīrthas and devotional memory along the river’s banks. The chapter’s frame situates narration at Naimiṣāraṇya (a classical Purāṇic recitation landscape), from which the Revā region is described through hymnic praise, origin inquiry, and tīrtha-oriented questioning.
232 chapters to explore.

Revā-stutiḥ, Naimiṣa-saṃvādaḥ, Purāṇa-prāmāṇya-nirdeśaḥ (Invocation to Revā; Naimiṣa Dialogue; On the Authority of Purāṇa)
অধ্যায়টি মঙ্গলাচরণ দিয়ে শুরু হয়ে রেবা/নর্মদার বিস্তৃত স্তোত্রে প্রবেশ করে। নর্মদাকে দুঃকর্ম-নাশিনী, দেবতা-ঋষি-মানবের আরাধ্যা, এবং তপস্বীরাও যার তীর কামনা করেন—এমন পরম পবিত্র নদী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর কাহিনি নৈমিষারণ্যের পুরাণীয় পরিসরে আসে। যজ্ঞসত্রে উপবিষ্ট শৌনক, সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—ব্রাহ্মী ও বিষ্ণু-নদীর পরে ‘তৃতীয়’ মহা নদী যে রৌদ্রী নদী রেবা, তার অবস্থান কোথায়, রুদ্র-সম্পর্কিত উৎপত্তি কী, এবং তার তীরবর্তী তীর্থসমূহ কোনগুলি। সূত প্রশ্নের প্রশংসা করে শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণকে পরস্পর-পরিপূরক প্রমাণ বলে প্রতিষ্ঠা করেন; পুরাণকে ‘পঞ্চম বেদ’ সদৃশ মহাপ্রামাণ্য বলে উল্লেখ করে পুরাণের পঞ্চলক্ষণ ব্যাখ্যা করেন। তারপর অষ্টাদশ মহাপুরাণের নাম ও শ্লোকসংখ্যা, এবং উপপুরাণগুলির তালিকা প্রদান করে; শেষে শ্রবণ-পাঠে মহাপুণ্য ও শুভ পরলোকপ্রাপ্তির ফলশ্রুতি জানানো হয়।

रेवातीर्थकथाप्रस्तावः — Janamejaya’s Inquiry and the Vindhya Āśrama Prelude
দ্বিতীয় অধ্যায়ে সূত নর্মদার তীর্থসমূহের বিস্তৃত মাহাত্ম্য আরম্ভ করে বলেন—এগুলির সম্পূর্ণ বর্ণনা করা অত্যন্ত দুরূহ। এরপর তিনি পূর্বপ্রসঙ্গ স্মরণ করান: মহাযজ্ঞের মধ্যে রাজা জনমেজয়, পাশাখেলায় পরাজয়ের পর নির্বাসিত পাণ্ডবদের তীর্থসেবার কথা জানতে ব্যাসশিষ্য বৈশম্পায়নের কাছে প্রশ্ন করেন। বৈশম্পায়ন বিরূপাক্ষ শিব ও ব্যাসকে প্রণাম করে কাহিনি বলার প্রতিজ্ঞা করেন। পাণ্ডবরা দ্রৌপদী ও ব্রাহ্মণ সঙ্গীদের নিয়ে বহু তীর্থে স্নান করতে করতে বিন্ধ্য অঞ্চলে পৌঁছান। সেখানে এক আদর্শ তপোবনের আশ্রমভূমি বিস্তারে বর্ণিত—পুষ্প-ফলসমৃদ্ধ বন, নির্মল জলধারা, শান্ত পরিবেশ, এবং অহিংস পশুপাখির সহাবস্থান; তপস্যা ও প্রকৃতির সুষমা একত্রে ফুটে ওঠে। সেই অরণ্যে মুনি মার্কণ্ডেয় শৃঙ্খলাবদ্ধ ঋষিদের দ্বারা পরিবৃত, নানাবিধ তপস্যায় রত অবস্থায় দেখা দেন। যুধিষ্ঠির শ্রদ্ধাভরে তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন—প্রলয়ের মধ্যেও তাঁর আশ্চর্য দীর্ঘায়ুর রহস্য কী, এবং প্রলয়ে কোন কোন নদী স্থায়ী থাকে বা লুপ্ত হয়। মার্কণ্ডেয় রুদ্রভাষিত পুরাণের প্রশংসা করে ভক্তিভরে শ্রবণের মহাফল বলেন, প্রধান নদীগুলির নাম উল্লেখ করেন এবং জানান যে সমুদ্র ও নদী কালচক্রে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়; কিন্তু নর্মদা সাতটি কল্পান্ত পর্যন্তও অবিনশ্বর থাকে—এভাবেই পরবর্তী ব্যাখ্যার ভূমিকা রচিত হয়।

Mārkaṇḍeya’s Account of Yuga-Dissolution and the Matsya-Form Encounter (युगक्षय-वर्णनं मत्स्यरूप-समागमश्च)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির মুনি মার্কণ্ডেয়কে জিজ্ঞাসা করেন—তিনি বারবার যুগক্ষয়ের সময়ে যে ভয়ংকর অবস্থা দেখেছেন, তা কেমন। মার্কণ্ডেয় বলেন, দীর্ঘ অনাবৃষ্টি, ঔষধি‑লতার ক্ষয়, নদী‑সরোবর শুকিয়ে যাওয়া এবং জীবদের উচ্চলোকের দিকে গমন—এসবই যুগান্তের লক্ষণ। এরপর তিনি পুরাণ‑শ্রবণের প্রামাণ্য পরম্পরা স্থাপন করেন—শম্ভু → বায়ু → স্কন্দ → বসিষ্ঠ → পরাশর → জাতূকর্ণ্য → অন্যান্য ঋষি—এবং বলেন, পুরাণ শ্রবণ জন্মজন্মান্তরের সঞ্চিত মল দূর করে মুক্তির সহায়ক। তারপর তিনি প্রলয়ের দৃশ্য বর্ণনা করেন—বারো সূর্যের তাপে জগৎ দগ্ধ হয়ে এক মহাসমুদ্রে পরিণত হয়। জলে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে তিনি আদ্য দীপ্তিমান পরম সত্তার দর্শন পান এবং অন্ধকার সমুদ্রে আরেক মনুকে বংশধরসহ বিচরণ করতে দেখেন। ভয়ে ও ক্লান্তিতে তিনি এক মহামৎস্যরূপের সম্মুখীন হন; তাকে মহেশ্বর বলে চেনা যায়, এবং তিনি মার্কণ্ডেয়কে কাছে ডাকেন। সমুদ্রের মধ্যে নদীর মতো আশ্চর্য স্রোত দেখা দেয়; ‘অবলা’ নামে এক দিব্য নারী জানান, তিনি ঈশ্বরের দেহ থেকে উদ্ভূত এবং শঙ্করের সান্নিধ্যে যুক্ত নৌকাই নিরাপদ আশ্রয়। মার্কণ্ডেয় মনুর সঙ্গে নৌকায় উঠে শৈব স্তোত্র পাঠ করেন—সদ্যোজাত, বামদেব, ভদ্রকালী, রুদ্র প্রভৃতি রূপে জগত্কারণ শিবকে স্তব করেন। শেষে মহাদেব প্রসন্ন হয়ে বর প্রার্থনা করতে বলেন; নশ্বরতার মধ্যে ভক্তি ও প্রামাণ্য শ্রবণই আশ্রয়—এটাই অধ্যায়ের মর্ম।

Origin and Boons of Revā (Narmadā) as Rudra-born River
এই অধ্যায়ে সংলাপ-পরম্পরার মাধ্যমে রেবা (নর্মদা)-র উৎপত্তি ও মহিমা বর্ণিত। মার্কণ্ডেয় ত্রিকূট শিখরে মহাদেবের নিকট গিয়ে প্রণাম ও পূজা করেন। পরে যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন—অন্ধকারময় মহাসাগরে বিচরণকারী পদ্মলোচনা এক নারী কে, যে নিজেকে রুদ্রজ বলে দাবি করে? মার্কণ্ডেয় বলেন, তিনি একদা মনুকেও এই প্রশ্ন করেছিলেন; মনু জানান—উমাসহ শিব ঋক্ষশৈলে কঠোর তপস্যা করেন, আর শিবের স্বেদ থেকে এক পরম পুণ্যবতী নদীর আবির্ভাব হয়—সেই দেবীই পদ্মলোচনা রেবা। কৃতযুগে নদীটি নারীরূপে রুদ্রের আরাধনা করে বর প্রার্থনা করে—প্রলয়েও অবিনাশিতা, ভক্তিসহ স্নানে মহাপাপ নাশের শক্তি, ‘দক্ষিণ গঙ্গা’ রূপে খ্যাতি, তার স্নানফল মহাযজ্ঞাদির সমতুল্য হওয়া, এবং তীরে তীরে শিবের নিত্য সান্নিধ্য। শিব বরদান করে উত্তর ও দক্ষিণ তীরবাসীদের জন্য পৃথক ফল নির্দেশ করেন এবং সর্বজনের মুক্তিদায়ক কল্যাণ বিস্তার করেন। শেষে রুদ্রোৎপত্তি-সম্পর্কিত নদী ও উপনদীর নামসমূহের তালিকা এবং ফলশ্রুতি—এই নাম স্মরণ, পাঠ বা শ্রবণে মহাপুণ্য ও উত্তম পরলোকগতি লাভ হয়।

नर्मदाया उत्पत्तिः, नामकरणं च (Origin and Naming of Narmadā; Kalpa-Framing Discourse)
এই অধ্যায়টি প্রশ্নোত্তরধর্মী তত্ত্বচিন্তায় গঠিত। যুধিষ্ঠির ঋষিসভাসহ নর্মদার পবিত্রতায় বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন—সাত কল্পের অবসানে অন্য সবকিছু লয় পেলেও দেবী-নদী নর্মদা কেন নাশ হয় না। তিনি প্রলয়, জগতের জলরূপ অবস্থান, পুনঃসৃষ্টি ও পালন—এই মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার ধর্মতত্ত্বও জানতে চান। পাশাপাশি নর্মদা, রেবা ইত্যাদি বহু নামের অর্থ ও উপাসনাগত কারণ, এবং পুরাণজ্ঞদের মধ্যে ‘বৈষ্ণবী’ নামে পরিচিতির ভিত্তিও প্রশ্ন করেন। মার্কণ্ডেয় মহেশ্বর থেকে বায়ুর মাধ্যমে প্রাপ্ত পরম্পরার উল্লেখ করে কল্পভেদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেন এবং সৃষ্টির রূপরেখা আঁকেন—আদি অন্ধকার থেকে তত্ত্বের উদ্ভব, হিরণ্যাণ্ডের সৃষ্টি ও ব্রহ্মার প্রকাশ। এরপর নর্মদার পৌরাণিক জন্মকথা আসে: উমা-রুদ্র-সম্পর্কিত দীপ্তিময় কন্যা দেব-দানবকে মোহিত করে; শিব এক ক্রীড়ানিয়ম স্থাপন করেন, কন্যা দূরে দূরে অন্তর্ধান ও পুনঃপ্রকাশ ঘটায়, এবং শেষে ‘নর্ম’ (হাস্য) ও দিব্য লীলার সূত্রে শিব তাঁর নাম রাখেন ‘নর্মদা’। অধ্যায়ের শেষে তাঁকে মহাসমুদ্রে অর্পণ, পর্বতপ্রদেশ থেকে সমুদ্রে প্রবেশ, এবং বিশেষ কল্প-পরিসরে (ব্রাহ্ম/মাত্স্য স্মরণসহ) তাঁর আবির্ভাবের উল্লেখ আছে।

Narmadā–Revā Utpatti and Nāma-Nirukti (Origin and Etymologies of the River’s Names)
মার্কণ্ডেয় বলেন—যুগান্তের মহাপ্রলয়ে মহাদেব প্রথমে অগ্নিময়, পরে মেঘসদৃশ বিশ্বরূপ ধারণ করে সমগ্র জগতকে এক মহাসাগরে নিমজ্জিত করেন। অন্ধকার আদিজলে শিবশক্তির কার্যরূপে এক দীপ্ত ময়ূর-আকৃতি প্রকাশ পায়; তার থেকেই পুনঃসৃষ্টির ধারা শুরু হয়। সেই সময় নর্মদা পুণ্যনদী-দেবী হিসেবে দৃশ্যমান হন; দিব্য অনুগ্রহে প্রলয়েও তিনি বিনষ্ট হন না। শিবের আদেশে জগত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়; ময়ূরের পাখা থেকে দেব ও অসুরগণ উদ্ভূত হয়, ত্রিকূট পর্বত প্রকাশিত হয় এবং পরে নদীপ্রবাহের দ্বারা ভূগোল পুনর্গঠিত হয়। এরপর নর্মদার নাম ও নামনিরুক্তির তালিকা দেওয়া হয়—মহতী, শোণা, কৃপা, মন্দাকিনী, মহার্ণবা, রেবা, বিপাপা, বিপাশা, বিমলা, রঞ্জনা প্রভৃতি—যেগুলি শুদ্ধিকরণ, করুণা, সংসার-তরণ ও মঙ্গলদর্শনের গুণ নির্দেশ করে। উপসংহারে বলা হয়, এই নামসমূহ ও তাদের উৎপত্তি জানা পাপমোচন করে এবং রুদ্রলোকপ্রাপ্তি দান করে।

Kūrma-Prādurbhāva and the Epiphany of Devī Narmadā (Revā’s Manifestation)
মার্কণ্ডেয় প্রলয়ের মহাচিত্র বর্ণনা করেন—স্থাবর-জঙ্গম সমগ্র জগৎ অন্ধকারে লীন হয়ে এক ভয়ংকর ‘একর্ণব’ সমুদ্রে বিলুপ্ত। সেই জলরাশির মধ্যে একাকী ব্রহ্মা এক মহাতেজস্বী দেবতাকে কূর্ম-রূপে দর্শন করেন; তাঁর রূপ বিশ্বব্যাপী ও অতিশয় মহিমাময়। ব্রহ্মা তাঁকে স্নিগ্ধভাবে জাগিয়ে বেদ-বিদাঙ্গের ভাষাভঙ্গিতে মঙ্গলস্তব করেন এবং পূর্বে সংহৃত লোকসমূহ পুনরায় প্রকাশের প্রার্থনা জানান। দেবতা উঠেই ত্রিলোক, দেব-দানব-গন্ধর্ব-যক্ষ-নাগ-রাক্ষস প্রভৃতি সকল সত্তা এবং সূর্য-চন্দ্র-নক্ষত্রাদি পুনরায় প্রসারিত করেন। তখন পৃথিবী পর্বত, দ্বীপ, সমুদ্র ও লোকালোকসহ বিস্তৃত হয়ে দৃশ্যমান হয়। এই নবসৃষ্টির মধ্যে জল থেকে দিব্য অলংকারভূষিতা নারী-রূপে দেবী নর্মদা (রেবা) আবির্ভূত হন; ভক্তিভরে তাঁর স্তব ও প্রণাম করে নিকটবর্তী হওয়া হয়। অধ্যায়ের শেষে ফলশ্রুতির ন্যায় বলা হয়—এই কূর্মপ্রাদুর্ভাব-কথা শ্রবণ বা অধ্যয়নে কিল্বিষ, অর্থাৎ পাপ, বিনাশ হয়।

बकरूपेण महेश्वरदर्शनं तथा नर्मदामाहात्म्योपदेशः | Mahādeva as the Crane and the Instruction on Narmadā’s Sanctity
মার্কণ্ডেয় বলেন—প্রলয়কালে সমগ্র জগৎ জলে নিমজ্জিত হলে তিনি দীর্ঘকাল মহাসমুদ্রের মাঝখানে ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং মহাপ্লাবন পার করান এমন দেবতার ধ্যানে নিমগ্ন হন। তখন তিনি বক/সারস সদৃশ এক দীপ্তিমান দিব্য পক্ষীকে দেখেন এবং ভয়ংকর সমুদ্রে এমন সত্তা কীভাবে প্রকাশ পেল তা জিজ্ঞাসা করেন। পক্ষী নিজেকে মহাদেব বলে পরিচয় দেয়—ব্রহ্মা-বিষ্ণুকেও ধারণকারী পরম তত্ত্ব—এবং জানায় যে এখন বিশ্ব সংহৃত। মহেশ্বর তাঁকে নিজের ডানার আশ্রয়ে বিশ্রাম দেন; মুনির কাছে তা যেন মহাকালের সীমা অতিক্রমের অভিজ্ঞতা। এরপর নূপুরধ্বনির সঙ্গে দশ অলংকৃত কন্যা দিক্দিগন্ত থেকে এসে পক্ষীর পূজা করে এবং গোপন, পর্বতগর্ভ সদৃশ এক অন্তর্লোকে প্রবেশ করে। সেখানে এক আশ্চর্য নগরী, দীপ্ত নদী এবং বহুবর্ণ বিস্ময়কর লিঙ্গ দর্শিত হয়; সংহারের অবস্থায় দেবগণ তাকে পরিবেষ্টন করে থাকে। পরে এক জ্যোতির্ময়ী কন্যা নিজেকে নর্মদা (রেবা) বলে জানায়—রুদ্রদেহজাত—এবং বলে দশ কন্যাই দিকসমূহ। সে ব্যাখ্যা করে, মহাযোগী মহাদেব সংকোচকালে-ও পূজার জন্য লিঙ্গকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘লিঙ্গ’ সেই তত্ত্ব যেখানে স্থাবর-জঙ্গম জগৎ লীন হয়; দেবতারা এখন মায়ায় সংহৃত, সৃষ্টিতে পুনরায় প্রকাশ পাবে। উপদেশ—নর্মদাজলে মন্ত্র ও বিধি অনুসারে মহাদেবের স্নান-অর্চনা করলে পাপ ক্ষয় হয়; নর্মদা মানবলোকে মহাপাবনী।

युगान्तप्रलयः, वेदापहारः, मत्स्यावतारः, नर्मदामाहात्म्यम् (Yugānta-Pralaya, Veda-Abduction, Matsya Intervention, and Narmadā Māhātmya)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় যুগান্ত-প্রলয়ের বর্ণনা দেন। সমগ্র জগৎ জলমগ্ন হয়ে যায়; দেব-ঋষি ও দিব্যসত্তারা দেখেন—পরমেশ্বর শিব প্রকৃতির আশ্রয়ে যোগসমাধিতে শয়ন করছেন, এবং সকলেই তাঁর স্তব করেন। এরপর ব্রহ্মা চার বেদের অপহরণে শোক প্রকাশ করে বলেন—সৃষ্টি, কালের স্মৃতি (ভূত-বর্তমানাদি) ও শাস্ত্রসম্মত জ্ঞানের ক্রম রক্ষায় বেদ অপরিহার্য। শিবের প্রশ্নে নর্মদা কারণ জানান—মধু ও কৈটভ নামক দুই শক্তিশালী দৈত্য দেবনিদ্রার সুযোগ নিয়ে বেদ লুকিয়ে সমুদ্রগর্ভে গোপন করে। পরে বৈষ্ণব হস্তক্ষেপ স্মরণ করা হয়: ভগবান মৎস্যরূপ ধারণ করে পাতালে গিয়ে বেদ উদ্ধার করেন, দৈত্যদ্বয়কে বধ করে ব্রহ্মার কাছে বেদ ফিরিয়ে দেন; ফলে পুনরায় সৃষ্টি-প্রবাহ শুরু হয়। শেষে গঙ্গা, রেবা (নর্মদা) ও সরস্বতীকে এক পবিত্র শক্তির তিন প্রকাশ বলা হয়েছে, যা বিভিন্ন দেবরূপের সঙ্গে যুক্ত। নর্মদাকে সূক্ষ্ম, সর্বব্যাপী, পবিত্রকারী ও সংসার-তরণীরূপে প্রশংসা করে বলা হয়—তাঁর জলের স্পর্শ ও তীরে শিবপূজায় শুদ্ধি ও উচ্চতর আধ্যাত্মিক ফল লাভ হয়।

Revātīra-āśrayaḥ: Kalpānta-anāvṛṣṭi, Ṛṣi-saṅgama, and Narmadā’s Salvific Efficacy (रेवातीराश्रयः)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির কল্প-সময়ের পরিমাপ ও নর্মদা-ক্ষেত্রের বিন্যাস সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। মর্কণ্ডেয় পূর্ব কল্পান্তের কাহিনি বলেন—ভয়ংকর অনাবৃষ্টিতে নদী-সমুদ্র শুকিয়ে যায়, ক্ষুধায় মানুষ দিশাহারা হয়, হোম-বলি প্রভৃতি যজ্ঞাচার ভেঙে পড়ে এবং শৌচ-শুদ্ধির নিয়ম লুপ্ত হয়। তখন কুরুক্ষেত্রবাসী, বৈখানস, গুহাবাসী তপস্বীসহ বহু ঋষি পথনির্দেশ চাইলে তিনি তাদের উত্তর দিক ত্যাগ করে দক্ষিণে, বিশেষত সিদ্ধসেবিত পরম পুণ্য নর্মদা-তীরে আশ্রয় নিতে বলেন। রেবা-তটকে অনন্য আশ্রয়রূপে দেখানো হয়েছে—মন্দির ও আশ্রম সমৃদ্ধ, অগ্নিহোত্র অব্যাহত, এবং পঞ্চাগ্নি, উপবাস, চন্দ্রায়ণ, কৃচ্ছ্র প্রভৃতি নানা তপোব্রত পালিত হয়। এখানে মহেশ্বরের শৈব-উপাসনার সঙ্গে নিত্য নারায়ণ-স্মরণও যুক্ত; স্বভাবানুগ ভক্তি তদনুরূপ ফল দেয়, কিন্তু বৃক্ষ ছেড়ে শাখায় আসক্তি (আংশিক আশ্রয়ে আবদ্ধতা) সংসারবন্ধন বাড়ায়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—রেবা-তীরে নিয়মিত বাস ও উপাসনা করলে অপুনরাবৃত্তি লাভ হয়; নর্মদাজলে দেহত্যাগ করলেও উচ্চ গতি প্রাপ্তি ঘটে। শেষে অধ্যায়পাঠ-শ্রবণকে রুদ্রবচনসম্মত পবিত্র জ্ঞানদায়ক বলা হয়েছে।

Śraddhā, Narmadā-tīra Sādhanā, and the Pāśupata-Oriented Ethical Code (श्रद्धा–रेवातीरसाधना–पाशुपतधर्मः)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন—যুগান্তের মতো সংকটকালেও কেন কিছু তীর্থ ও সাধনা কার্যকর থাকে, এবং ঋষিরা কীভাবে নির্দিষ্ট নিয়ম (নিয়ম-নিষ্ঠা) মেনে মুক্তি লাভ করেন। মার্কণ্ডেয় বলেন, শ্রদ্ধাই অপরিহার্য মূল শক্তি—শ্রদ্ধা ছাড়া কর্ম নিষ্ফল; আর বহু জন্মের সঞ্চিত পুণ্যের পরিপাকে শ্রদ্ধাসহ শঙ্করভক্তি লাভ হয়। এরপর রেবা-তীর/নর্মদা-তীরকে দ্রুত সিদ্ধিদায়ক তীর্থরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। শিবপূজা, বিশেষত লিঙ্গপূজা, নিয়মিত স্নান এবং ভস্মধারণ পাপক্ষয়কারী—পূর্বে নৈতিকভাবে পতিত ব্যক্তিরও দ্রুত শুদ্ধি ঘটায় বলে বলা হয়েছে। পরে অশুচি-আহারনির্ভরতা, বিশেষ করে ‘শূদ্রান্ন’ প্রসঙ্গে, ভোজনকে কর্মফল ও আধ্যাত্মিক অবনতির সঙ্গে যুক্ত করে সতর্ক করা হয়েছে। পাশুপত-অনুগত আন্তরিক আচারের প্রশংসা করে ভণ্ডামি, লোভ ও দম্ভকে তীর্থফল নষ্টকারী দোষ বলা হয়েছে। নন্দীর উপদেশস্বরূপ অংশে লোভত্যাগ, শিবে স্থির ভক্তি, পঞ্চাক্ষরী মন্ত্রজপ এবং রেবার পবিত্রতায় আশ্রয়ের আহ্বান আছে। শেষে রুদ্রাধ্যায়, বৈদিক পাঠ, নর্মদাতীরে পুরাণপাঠ/শ্রবণ ও নিয়মবদ্ধ সাধনা শুদ্ধি ও উচ্চ গতি দেয়; যুগান্তের খরায় ঋষিদের নর্মদাতীরে আশ্রয় নেওয়া রেবাকে চিরন্তন আশ্রয় ও ‘নদীশ্রেষ্ঠা’ প্রমাণ করে।

नर्मदास्तोत्रम् (Narmadā-Stotra) — Hymn of Praise to the Revā
মার্কণ্ডেয় রাজসভা-শ্রোতা-পরিবেশে বলেন, পূর্বোক্ত উপদেশ শুনে সমবেত ঋষিগণ আনন্দিত হয়ে করজোড়ে নর্মদা (রেবা)-দেবীর স্তব শুরু করেন। এই অধ্যায়টি একটানা স্তোত্ররূপে প্রবাহিত, যেখানে নর্মদাকে পবিত্রকারী জলশক্তি, পাপহরিণী, তীর্থসমূহের আশ্রয় এবং রুদ্রের অঙ্গ থেকে উদ্ভূতা (রুদ্রাঙ্গসমুদ্ভবা) দেবী হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। স্তোত্রে দুঃখ ও নৈতিক ভ্রান্তিতে পীড়িত জীবদের শুদ্ধি ও রক্ষার ক্ষমতা, যন্ত্রণাময় অবস্থায় ঘুরে বেড়ানোর বিপরীতে নর্মদাজল-স্পর্শের মুক্তিদায়কতা, এবং কলিযুগে অন্য জলধারা ক্ষীণ/দূষিত হলেও নর্মদার স্থির পবিত্রতা—এই ভাবগুলি প্রকাশ পায়। শেষে ফলশ্রুতি জানায়, নর্মদাস্নানের পর যে এই স্তোত্র পাঠ বা শ্রবণ করে, সে শুদ্ধ গতি লাভ করে দিব্য যান ও অলংকারে ভূষিত হয়ে মহেশ্বর/রুদ্রের সান্নিধ্যে পৌঁছে যায়।

नर्मदाया दिव्यदर्शनं कल्पान्तरस्थैर्यं च (Narmadā’s Divine Epiphany and Her Continuity Across Kalpas)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় নর্মদা/রেবাকে রক্ষাকারী ও চিরস্থায়ী দেবশক্তি রূপে বর্ণনা করেন। ঋষিদের স্তবে প্রসন্ন হয়ে দেবী বরদানের সংকল্প করেন এবং রাত্রে স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে আশ্বাস দেন—“আমার তীরে নির্ভয়ে বাস করো; অভাব বা দুঃখ তোমাদের হবে না।” পরে আশ্রমের কাছে প্রচুর মাছ ইত্যাদি অলৌকিক প্রকাশ দেবীকৃপা নির্দেশ করে এবং তপস্বী সমাজের জীবিকা ও সাধনা রক্ষা পায়। দীর্ঘকালীন চিত্রে ঋষিগণ নর্মদাতীরে জপ, তপ, পিতৃ-দেবতার ক্রিয়া সম্পাদন করেন; তীরভূমি বহু লিঙ্গ-আশ্রয় ও সংযমী ব্রাহ্মণে দীপ্ত হয়। এরপর মধ্যরাতে জলের ভিতর থেকে তেজোময়ী কন্যারূপা দেবী প্রকাশিত হন—ত্রিশূলধারিণী, সাপ-যজ্ঞোপবীতধারিণী—এবং প্রলয়ের আগমন জানিয়ে পরিবারসহ ঋষিদের রক্ষার্থে তাঁর মধ্যে (নদীতে) প্রবেশ করতে বলেন। শেষে নর্মদার বহু কল্প জুড়ে অবিনাশী স্থিতি ঘোষিত হয়; তাঁকে শঙ্করী-শক্তি বলা হয় এবং যে যে কল্পে তিনি বিনষ্ট হন না, তার উল্লেখ করে নদীকে পবিত্র ভূগোল ও মহাজাগতিক তত্ত্বরূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

नीललोहितप्रवेशः तथा रौद्रदेव्याः जगत्संहारवर्णनम् | Entry into the Śaiva State and the Description of the Fierce Devī in Cosmic Dissolution
এই অধ্যায়টি রাজর্ষি-সংলাপরূপে বিন্যস্ত। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন—নর্মদাতীরের ঋষিরা উচ্চলোকে গমন করার পর কী অসাধারণ ঘটনা ঘটেছিল। মার্কণ্ডেয় ‘রৌদ্র-সংহার’ নামে এক মহাজাগতিক সংকটের বর্ণনা দেন; ব্রহ্মা-বিষ্ণু প্রমুখ দেবগণ কৈলাসে চিরন্তন মহাদেবকে স্তব করে মহাকালচক্রের অন্তে সংহারের প্রার্থনা জানান। এখানে ত্রিমুখী তত্ত্ব স্থির হয়—একই পরম সত্তা ব্রাহ্মী (সৃষ্টি), বৈষ্ণবী (স্থিতি/পালন) ও শৈবী (সংহার) রূপে প্রকাশিত; শেষে ভূততত্ত্বাতীত শৈব ‘পদ’-এ প্রবেশের কথা বলা হয়। তারপর সংহারের উদ্দীপনা ঘটে। মহাদেব দেবীকে কোমল রূপ ত্যাগ করে রুদ্র-সম্বন্ধীয় উগ্র রূপ ধারণ করতে আদেশ দেন; করুণাবশে দেবী প্রথমে অস্বীকার করেন, কিন্তু শিবের ক্রুদ্ধ বাক্যে তিনি কালরাত্রি-সদৃশ রৌদ্রী রূপে রূপান্তরিত হন। তাঁর ভয়ংকর মূর্তি, অসংখ্য রূপে বিস্তার, গণদের সহচর্য এবং ত্রিলোকের ক্রমাগত অস্থিরতা ও দহন—সবই সংহারকে আকস্মিক বিপর্যয় নয়, বরং শাস্ত্রসম্মত দেবীয় বিধানরূপ প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিপন্ন করে।

Amarāṅkaṭa at the Narmadā: Kālarātri, the Mātṛgaṇas, and Śiva’s Yuga-End Vision (अमरंकट-माहात्म्य तथा संहारा-दर्शनम्)
মার্কণ্ডেয় যুগান্ত-সদৃশ এক মহাবিনাশ-দর্শনের কথা বলেন। ভয়ংকর মাতৃগণ দ্বারা পরিবৃতা কালরাত্রি জগৎকে আচ্ছন্ন করে। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব-শক্তির রূপধারিণী এবং ভূত ও দিক্পাল-তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত মাতৃরা দশ দিক জুড়ে অস্ত্র হাতে বিচরণ করে; তাদের হুঙ্কার ও পদধ্বনিতে ত্রিলোক দগ্ধ হয়ে ওঠে। ধ্বংস সাত দ্বীপ-মহাদেশে ছড়ায়; রক্তপান ও জীবভক্ষণ ইত্যাদি চিত্র প্রলয়ের ইঙ্গিত দেয়। তারপর কাহিনি পবিত্র কেন্দ্রে ফিরে আসে—নর্মদা-তীরে অমরাঙ্কটে শিবের সান্নিধ্য। “অমরা” ও “কটা” শব্দের ব্যুৎপত্তি দিয়ে স্থানের নাম ব্যাখ্যা করা হয়। উমাসহ শঙ্কর গণ, মাতৃগণ এবং ব্যক্তিরূপে উপস্থিত মৃত্যুর সঙ্গে উল্লাসময় তাণ্ডবে মেতে ওঠেন—রুদ্রের ভয়ংকর ও আশ্রয়দাতা দুই রূপই প্রকাশ পায়। নর্মদা বিশ্ববন্দিতা মাতৃনদী হিসেবে প্রশংসিত, তার প্রবল ও উত্তাল রূপও বর্ণিত। শেষে দেবদর্শন আরও তীব্র হয়—রুদ্রের মুখ থেকে সংবর্ত-বায়ু উঠে সমুদ্র শুকিয়ে দেয়। শ্মশানচিহ্নধারী, মহাতেজস্বী শিব সংহার সম্পাদন করলেও কালরাত্রি, মাতৃগণ ও গণদের পরম আরাধ্য তিনিই। উপসংহারে হরি-হর/শিবের রক্ষাকারী স্তব আছে—তিনি বিশ্বকারণ এবং নিত্য স্মরণের বিষয়।

Saṃvartaka-Kāla Nṛtya and Mahādeva-Stotra (Cosmic Dissolution Motif)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় উচ্চতত্ত্বময় কাহিনি বর্ণনা করেন। শূলধারী হর/শম্ভু ভয়ংকর ভূতগণের মাঝে গজচর্ম পরিধান করে, ধোঁয়া ও স্ফুলিঙ্গের বিভীষিকাময় চিত্রসহ, বডবামুখের মতো উন্মুক্ত মুখে সংহার-পরিবেশ সূচিত করে নৃত্য করেন। তাঁর দিব্য অট্টহাসের প্রচণ্ড ধ্বনি দিক্বিদিকে প্রতিধ্বনিত হয়ে সমুদ্রকে আলোড়িত করে এবং ব্রহ্মলোকে পৌঁছে ঋষিদের উদ্বিগ্ন করে; তারা ব্রহ্মার কাছে ব্যাখ্যা চান। ব্রহ্মা বলেন, এ হলো স্বয়ং ‘কাল’-তত্ত্ব—সংবৎসর, পরিবৎসর প্রভৃতি বর্ষচক্র, সূক্ষ্ম/অণু-পরিমাপ এবং পরম অধিপত্যরূপে বর্ণিত। এরপর স্তোত্রাংশে ব্রহ্মা মন্ত্রময় বাক্যে মহাদেবের স্তব করেন—যিনি শঙ্কর, বিষ্ণু ও সৃষ্টিতত্ত্বকে ধারণ করেন এবং বাক্-মন অতিক্রমী। মহাদেব আশ্বাস দিয়ে ব্রহ্মাকে বহু মুখে দগ্ধমান জগতের আকর্ষিত হওয়ার দর্শন করতে বলেন এবং অন্তর্ধান করেন। ফলশ্রুতিতে এই স্তোত্র শ্রবণ-পাঠে শুভগতি, ভয়নাশ ও যুদ্ধ, চুরি, অগ্নি, বন, সমুদ্র প্রভৃতি বিপদে রক্ষা লাভের কথা বলা হয়েছে; শিবকে নির্ভরযোগ্য অভিভাবক রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

रुद्रवक्त्रप्रलयवर्णनम् (Description of the Dissolution Imagery from Rudra’s Mouth)
এই অধ্যায়ে মুনি মার্কণ্ডেয় রাজাকে প্রলয়ের তীব্র ও ভয়ংকর রূপ বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, পরমেশ্বর প্রকাশিত জগতকে সংহার করেন এবং দেব-ঋষিগণ তাঁর স্তব করেন। বিশেষ করে মহাদেবের দক্ষিণ মুখের ভয়াল প্রতিমা তুলে ধরা হয়েছে—দীপ্ত চোখ, বিশাল দংশন, সর্পচিহ্নিত অঙ্গ এবং গ্রাসকারী জিহ্বা—যার মধ্যে জগতের লয়কে নদীর সাগরে মিলনের উপমায় দেখানো হয়েছে। সেই মুখ থেকে প্রচণ্ড অগ্নিশিখা নির্গত হয়, পরে দ্বাদশ আদিত্যের তেজ প্রকাশ পেয়ে পৃথিবী, পর্বত, সমুদ্র ও পাতাললোককে দগ্ধ করে; সপ্ত পাতাল ও নাগলোক পর্যন্ত তাপে আচ্ছন্ন হয়। সর্বদাহ ও মহাপর্বতশ্রেণির ভাঙনের মধ্যেও রেবা-নর্মদা তীর্থ নষ্ট হয় না—এই স্মরণে তীর্থকেন্দ্রিক পবিত্র ভূগোলের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

Saṃvartaka-megha-prādurbhāvaḥ (The Manifestation of the Saṃvartaka Clouds) / Cosmic Inundation and the Search for Refuge
অধ্যায় ১৮-এ শ্রী মার্কণ্ডেয় প্রলয়ের ভয়াবহ চিত্র বর্ণনা করেন। সূর্যের প্রচণ্ড তাপে জগৎ যেন দগ্ধ হয়ে যায়; তারপর এক দিব্য উৎস থেকে সংবর্তক মেঘসমূহ আবির্ভূত হয়—বহুবর্ণ, পর্বত-হস্তী-দুর্গসদৃশ বিশাল, বিদ্যুৎ ও গর্জনে ভরা। সংবর্তক দলের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তাদের বর্ষণে সমগ্র লোক প্লাবিত হয়; সমুদ্র, দ্বীপ, নদী ও পৃথিবীমণ্ডল সব এক মহাজলরাশিতে—একর্ণবে—পরিণত হয়। তখন দৃষ্টিশক্তি লুপ্ত; সূর্য-চন্দ্র-তারা দেখা যায় না, ঘোর অন্ধকার নেমে আসে, বাতাসও স্তব্ধ মনে হয়—সর্বত্র দিশাহারা অবস্থা। এই মহাপ্লাবনে বক্তা স্তব করে ভাবেন, প্রকৃত আশ্রয় কোথায়; তিনি শরণ্য দেবতার স্মরণ ও ধ্যানে অন্তর্মুখ হন। বাহ্য অবলম্বন নষ্ট হলে শৃঙ্খলিত স্মৃতি, ভক্তি ও ধ্যানই ধর্মসম্মত পথ; দেবকৃপায় স্থৈর্য আসে এবং জলরাশি অতিক্রম করার শক্তি লাভ হয়।

एकोर्णवप्रलये नर्मदागोरूपिण्या रक्षणम् तथा वाराहावतारवर्णनम् | Markandeya’s Rescue by Narmadā (Cow-Form) and the Varāha Cosmogony
এই অধ্যায়ে মārkaṇḍeya ঋষির প্রথম-পুরুষ বর্ণনায় দুই ভাগের ধর্মতাত্ত্বিক কাহিনি আছে। একার্ণব-প্রলয়ে চারদিকে শুধু জল; ঋষি ক্লান্ত, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর ও মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। তখন জলের উপর চলমান এক দীপ্তিময়ী গাভী দেখা দেয়। সে আশ্বাস দেয়—মহাদেবের কৃপায় তাঁর মৃত্যু হবে না; লেজ ধরতে বলে এবং দিব্য দুধ পান করায়, ফলে ক্ষুধা-তৃষ্ণা দূর হয় ও আশ্চর্য প্রাণশক্তি ফিরে আসে। গাভী নিজেকে নর্মদা বলে পরিচয় দেয়—রুদ্র ব্রাহ্মণকে রক্ষার জন্য তাঁকে পাঠিয়েছেন; এতে নর্মদা নদীকে সচেতন উদ্ধারক ও শৈব অনুগ্রহের বাহক রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর সৃষ্টি-দর্শনের অংশে বক্তা জলে পরমেশ্বরকে উমা ও বিশ্বশক্তির সঙ্গে দর্শন করেন। দেব জাগ্রত হয়ে বরাহরূপ ধারণ করে নিমজ্জিত পৃথিবীকে উদ্ধার করেন। অধ্যায়টি রুদ্র-হরি-স্রষ্টা-কার্যের পরমার্থিক অভেদ ঘোষণা করে এবং বিভেদমূলক বিদ্বেষ থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করে। শেষে ফলশ্রুতি—নিত্য পাঠ/শ্রবণে পবিত্রতা ও শুভ পরলোকপ্রাপ্তি।

Pralaya-lakṣaṇa, Dvādaśa-Āditya Vision, and the Revelation of Revā (Narmadā) as Refuge
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির মার্কণ্ডেয়কে শার্ঙ্গধন্বা (বিষ্ণু)-র অনুভূত প্রভাব বর্ণনা করতে অনুরোধ করেন। মার্কণ্ডেয় প্রলয়ের লক্ষণ বলেন—উল্কাপাত, ভূমিকম্প, ধূলিবৃষ্টি, ভয়ংকর শব্দ—এবং জীবজগৎ ও ভূদৃশ্যের লয়ের কথা জানান। তারপর তিনি দ্বাদশ আদিত্যের দর্শন বর্ণনা করেন; তাদের দাহে জগৎ দগ্ধ হয়, অথচ অদগ্ধ থাকে কেবল রেবা এবং তিনি নিজে। তৃষায় কাতর হয়ে তিনি ঊর্ধ্বে গিয়ে এক বিশাল অলংকৃত বিশ্বধাম দেখেন এবং সেখানে শঙ্খ-চক্র-গদাধারী পরম পুরুষ (পুরুষোত্তম)-কে শয়িত অবস্থায় দর্শন করেন। তিনি দীর্ঘ স্তব করে বিষ্ণুকে জগতের আশ্রয়, কাল-যুগ, সৃষ্টি ও প্রলয়ের অধিষ্ঠান রূপে বন্দনা করেন। তখন হর (শিব) প্রকাশিত হন এবং পরে দেবীর আবির্ভাবে এক ধর্মসংকট ওঠে—শিশুর মৃত্যু রোধে স্তন্যপান করানো উচিত কি না; ব্রাহ্মণ-সংস্কারের বিধান (শেষে অষ্টচত্বারিংশৎ/আটচল্লিশ সংস্কার) আলোচিত হয়, কিন্তু দেবী শিশুকে অবহেলা করলে মহাপাপ হবে বলে সতর্ক করেন। দীর্ঘ স্বপ্নসদৃশ সময়ের পর দেবী পরিচয় প্রকাশ করেন—শয়িত পুরুষ কৃষ্ণ/বিষ্ণু, দ্বিতীয় জন হর, চার কলস সমুদ্র, শিশু ব্রহ্মা, আর তিনি নিজে সপ্তদ্বীপবতী পৃথিবী; রেবাই নর্মদা, তিনি বিনাশপ্রাপ্ত হন না। শেষে এই বৃত্তান্ত-শ্রবণের পবিত্রতা পুনরায় ঘোষিত হয় এবং আরও জিজ্ঞাসার আহ্বান জানানো হয়।

अमरकण्टक-रेवा-माहात्म्य तथा कपिला-नदी-उत्पत्ति (Amarakantaka and Revā Māhātmya; Origin of the Kapilā River)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির ও মার্কণ্ডেয়ের প্রশ্নোত্তর-আলোচনায় রেবা/নর্মদার অতুল শুদ্ধিদায়িনী মহিমা ঘোষিত হয়েছে। গঙ্গা প্রভৃতি নদীর পবিত্রতা অনেক সময় স্থানবিশেষে নির্ভরশীল, কিন্তু রেবা সর্বত্রই স্বভাবত পবিত্র—এ কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে। অমরকণ্টককে সিদ্ধিক্ষেত্র রূপে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে দেব, গন্ধর্ব ও ঋষিদের নিত্য গমনাগমন; উভয় তীরে অসংখ্য তীর্থের ঘনত্ব ও প্রায় অক্ষয়তা উল্লেখিত। এরপর উত্তর ও দক্ষিণ তীরের তীর্থসমূহের নামক্রম আসে—উত্তর তীরে চরুকা-সঙ্গম, চরুকেশ্বর, দারুকেশ্বর, ব্যতীপাতেশ্বর, পাতালেশ্বর, কোটিযজ্ঞ এবং অমরেশ্বরের নিকটে লিঙ্গসমূহ; দক্ষিণ তীরে কেদার-তীর্থ, ব্রহ্মেশ্বর, রুদ্রাষ্টক, সাবিত্র ও সোম-তীর্থ। বিধান দেওয়া হয়েছে—সংযমসহ স্নান, উপবাস, ব্রহ্মচর্য এবং পিতৃকর্ম; তিলোদকে তর্পণ ও পিণ্ডদান করলে দীর্ঘ স্বর্গভোগ ও শুভ পুনর্জন্মের ফল লাভ হয়। আরও বলা হয়েছে, ঈশ্বরানুগ্রহে সেখানে সম্পাদিত কর্ম ‘কোটি-গুণ’ বৃদ্ধি পায়; নর্মদাজলের স্পর্শে বৃক্ষ ও পশুও পুণ্যভাগী হয়। বিশল্যা প্রভৃতি অতিরিক্ত পবিত্র জলের কথাও উল্লিখিত। শেষে কপিলা নদীর উৎপত্তিকথা—শিবের সঙ্গে নর্মদায় ক্রীড়ার সময় দাক্ষায়ণী (পার্বতী)-র স্নানবস্ত্র থেকে নিঃসৃত জল কপিলা নামে প্রবাহিত হয়; এইভাবে তার নাম, স্বভাব ও বিশেষ পুণ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

Viśalyā–Kapilā-hrada Māhātmya (The Etiology of the ‘Arrowless/Healed’ Tīrtha)
মার্কণ্ডেয় বিষল্যা ও কপিলা-হ্রদের উৎপত্তি ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। ব্রহ্মার মানসপুত্র, বৈদিক অগ্নিদের প্রধান অগ্নি নদীতীরে তপস্যা করেন। মহাদেবের বরদানে নর্মদা ও আরও পনেরোটি নদী তাঁর পত্নী হন; সমষ্টিগতভাবে তাঁরা ‘ধীষ্ণী’ (নদী-পত্নী) নামে খ্যাত, এবং তাঁদের সন্তানরা যজ্ঞাগ্নি (অধ্বর-অগ্নি) রূপে প্রলয় পর্যন্ত স্থিত থাকে। নর্মদা থেকে মহাবলী পুত্র ধীষ্ণীন্দ্র জন্ম নেয়। এরপর মায়াতারক-সম্পর্কিত দেবাসুর-যুদ্ধে দেবতারা বিষ্ণুর শরণ নেন। বিষ্ণু পাৱক (অগ্নি) ও মারুত (বায়ু) আহ্বান করে ধীষ্ণী/পাৱকেন্দ্রকে নর্মদেয় দানবদের দগ্ধ করতে আদেশ দেন। শত্রুরা দিব্যাস্ত্রে অগ্নিকে ঘিরতে চাইলেও অগ্নি ও বায়ু তাদের গ্রাস করে; বহু দানব পাতাল-জলে নিক্ষিপ্ত হয়। বিজয়ের পরে দেবতারা নর্মদা-পুত্র তরুণ অগ্নিকে সম্মান করেন। যুদ্ধাস্ত্রে বিদ্ধ হয়ে তিনি ‘সশল্য’ অবস্থায় মাতার কাছে আসেন; নর্মদা তাঁকে আলিঙ্গন করে কপিলা-হ্রদে প্রবেশ করলে সেই জলে মুহূর্তে শল্য-দুঃখ নাশ হয় এবং তিনি ‘বিষল্য’ হন। বলা হয়, সেখানে স্নান করলে ‘পাপ-শল্য’ দূর হয়, আর সেখানে দেহত্যাগ করলে স্বর্গগতি লাভ হয়—এইভাবেই তীর্থের নাম ও উদ্ধারক মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত।

Viśalyā–Saṅgama Māhātmya (Glory of the Viśalyā Confluence) — Chapter 23
মার্কণ্ডেয় রাজাকে উপদেশ দেন যে পবিত্র সঙ্গমে পরম ভক্তিসহ দেহত্যাগ মুক্তিদায়ক, এবং বিশেষত রেবা (নর্মদা)-জল অতুল শুদ্ধিকারী। অধ্যায়ে ক্রমান্বয়ে ফল বলা হয়েছে—(১) বিশল্যা-সঙ্গমে সর্বোচ্চ ভক্তিতে প্রাণত্যাগীরা পরম গতি লাভ করে; (২) সন্ন্যাসভাব নিয়ে সকল সংকল্প ত্যাগ করে দেহত্যাগ করলে অমরেশ্বরের নিকট গিয়ে স্বর্গলোকে বাস হয়; (৩) শৈলেন্দ্রে দেহত্যাগকারী সূর্যবর্ণ বিমানে অমরাবতীতে আরোহণ করে, অপ্সরারা তার গৌরবগান করে। এরপর জলের শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণ করা হয়—কিছু পণ্ডিত সরস্বতী ও গঙ্গাকে সমান বলেন, কিন্তু তত্ত্বজ্ঞেরা রেবা-জলকে তাদেরও ঊর্ধ্বে স্থাপন করেন; এ বিষয়ে বিতর্ক না করতে বলা হয়। রেবা-প্রদেশ বিদ্যাধর ও কিন্নরসদৃশ দিব্য সত্তায় পূর্ণ; যে শ্রদ্ধায় রেবা-জল শিরে ধারণ করে, সে ইন্দ্রলোকের সান্নিধ্য লাভ করে। যে পুনরায় সংসারসাগর দেখতে চায় না, তার নর্মদাসেবা নিত্য করা উচিত; তিনি ত্রিলোক পবিত্র করেন, এবং তাঁর অঞ্চলে যেখানেই মৃত্যু হোক গণেশ্বরী (দিব্য পরিচারক) গতি মেলে। তট যজ্ঞস্থলে ঘেরা; পাপীরাও সেখানে মরলে স্বর্গ পায়। কপিলা ও বিশল্যাকে ঈশ্বরের প্রাচীন লোকহিতকর সৃষ্টি বলা হয়েছে; উপবাস ও ইন্দ্রিয়সংযমসহ স্নান অশ্বমেধফল দেয়। এই তীর্থে অনাশক-ব্রত সর্বপাপহর ও শিবধামপ্রদ, আর বিশল্যা-সঙ্গমে একবার স্নান পৃথিবীজুড়ে সমুদ্রপর্যন্ত স্নান-দানফলের সমান বলা হয়েছে।

Kara–Narmadā Saṅgama Māhātmya (The Glory of the Kara–Narmadā Confluence at Māndhātṛpura)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় মাণ্ডহাত্রপুরে কর নদী ও নর্মদা (রেবা)-র সঙ্গমকে বিশেষ তীর্থরূপে নির্দেশ করেন। সেখানে গিয়ে সঙ্গমে স্নান করা এবং বিষ্ণুভক্তিতে—পূজা, স্মরণ ও শুদ্ধিচিত্ত সাধনায়—নিয়োজিত হওয়াই সংক্ষিপ্ত বিধানরূপে বলা হয়েছে। এরপর তীর্থের মাহাত্ম্যের কারণকথা বর্ণিত হয়। এক দৈত্যবধের উদ্দেশ্যে ভগবান বিষ্ণু চক্র ধারণ করলে তাঁর স্বেদ থেকে এক উৎকৃষ্ট নদীর উৎপত্তি হয়; সেই নদী ঐ স্থানেই রেবায় মিলিত হয়ে সঙ্গম সৃষ্টি করে। অতএব সেখানে স্নান করলে পাপক্ষয় হয় এবং শুদ্ধি লাভ হয়—এই ফলশ্রুতি দিয়ে অধ্যায় সমাপ্ত।

Revā–Nīlagāṅgā Saṅgama Māhātmya (Confluence Theology and Ritual Fruits)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় বলেন, ওংকারের পূর্বভাগে এক প্রসিদ্ধ তীর্থ আছে, যেখানে রেবা নদী নীলগঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। সেই সঙ্গমে স্নান ও জপ করলে জাগতিক কামনা-বাসনা সিদ্ধ হয়—তাই স্থানটিকে বিশেষ কর্মফলদায়ক তীর্থরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। আরও বলা হয়, সেখানে সাধনা করলে মৃত্যুর পরে নীলকণ্ঠপুরে ষাট হাজার বছর পবিত্র নিবাস লাভ হয়, যা শৈব-ধামের সঙ্গে এই ভূগোলকে যুক্ত করে। শ্রাদ্ধকালে তিল-মিশ্রিত জলে পিতৃদের তর্পণ করলে সাধক নিজের সঙ্গে একুশ জনকে উদ্ধার করে—উদ্ধার ব্যক্তিগতও, বংশগতও।

Jāleśvara Tīrtha-प्रशंसा, Tripura-उपद्रवः, तथा Madhūkā (Lalitā) Vrata-विधानम् | Praise of Jāleśvara, the Tripura crisis, and the Madhūkā vow
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির মার্কণ্ডেয়কে জিজ্ঞাসা করেন—পূর্বে উল্লিখিত জালেশ্বর তীর্থ কীভাবে অতুল পুণ্য প্রদান করে এবং সিদ্ধ‑ঋষিদের কাছে কেন এত শ্রদ্ধেয়। মার্কণ্ডেয় জালেশ্বরকে অনন্য তীর্থ বলে মহিমা বর্ণনা করে তার পটভূমি বলেন—বাণ ও ত্রিপুরাসংযুক্ত অসুরেরা দেবতা ও ঋষিদের উৎপীড়ন করে। তারা প্রথমে ব্রহ্মার শরণ নেয়; ব্রহ্মা জানান বাণ প্রায় অবধ্য, কেবল শিবই তাকে দমন করতে সক্ষম। এরপর দেবগণ মহাদেবের স্তব করেন, যেখানে পঞ্চাক্ষর, পঞ্চবক্ত্র ও অষ্টমূর্তি‑ভাবের মাধ্যমে শিবতত্ত্ব প্রকাশিত হয়। শিব সংকট নিবারণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারদকে সহায়ক রূপে আহ্বান করেন। নারদ ত্রিপুরায় গিয়ে “বহু ধর্ম” সৃষ্টি করে অন্তর্দ্বন্দ্ব জাগাতে বাণের ঐশ্বর্যময় নগরে সম্মানসহ প্রবেশ করেন এবং বাণ ও রাণীর সঙ্গে উপদেশমূলক কথোপকথন করেন। এরপর অধ্যায়টি বিধানমুখী হয়—নারীসমাজের জন্য তিথি‑নির্ভর ব্রত‑দান পদ্ধতি, অন্ন‑বস্ত্র‑লবণ‑ঘৃত প্রভৃতি দানের তালিকা ও তাদের ফল—আরোগ্য, সৌভাগ্য, বংশবৃদ্ধি ও মঙ্গল—বর্ণিত হয়। বিশেষভাবে চৈত্র শুক্ল তৃতীয়ায় আরম্ভ হওয়া মধূকা/ললিতা ব্রতের বিধান বিস্তারিত—মধূক বৃক্ষের প্রতিমায় শিব‑উমার প্রতিষ্ঠা, মন্ত্রসহ অঙ্গপূজা, অর্ঘ্য ও করক‑দানের মন্ত্র, মাসিক নিয়ম এবং বর্ষশেষে উদ্যাপন করে গুরু/আচার্যকে দান। শেষে ফলশ্রুতিতে অমঙ্গল নাশ, দাম্পত্য‑সৌহার্দ্য ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি এবং ধর্মসম্মত শুভ জন্মলাভের কথা বলা হয়েছে।

Dāna-viveka and Pati-dharma Assertion (दानविवेकः पतिधर्मप्रतिज्ञा च)
এই অধ্যায়ে নারদের বাণী শুনে রানি তাঁকে স্বর্ণ, রত্ন, উৎকৃষ্ট বস্ত্র ও বিরল দ্রব্য দান করতে উদ্যত হন। কিন্তু নারদ ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি গ্রহণ না করে দানের বিবেক শেখান—ঋষিগণ সঞ্চয়ে নয়, ভক্তিতে জীবিত; অতএব দান হওয়া উচিত ক্ষীণবৃত্তি, দরিদ্র ব্রাহ্মণদের উদ্দেশে। তখন রানি বেদ ও বেদাঙ্গে পারদর্শী অভাবী ব্রাহ্মণদের আহ্বান করে নারদের নির্দেশমতো দান করেন এবং বলেন, এ দান হরি ও শঙ্করের প্রীতির জন্য। এরপর তিনি পতিধর্মের প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করেন—বাণই তাঁর একমাত্র দেবতা; তাঁর দীর্ঘায়ু ও জন্মজন্মান্তরে সঙ্গ কাম্য, তবু নারদের উপদেশ মেনে দান করেছেন বলেও জানান। নারদ বিদায় নিয়ে প্রস্থান করলে নারীরা ফ্যাকাশে ও দীপ্তিহীন, যেন নারদ-বচনে বিমূঢ়—এভাবে ঋষি-সংলাপের প্রভাবে মনোভাব ও সামাজিক ফল বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

दग्धत्रिपुरप्रसङ्गः, बाणस्तोत्रम्, अमरकण्टक-ज्वालेश्वरमाहात्म्यम् (Burning of Tripura, Bāṇa’s Hymn, and the Māhātmya of Amarakāṇṭaka–Jvāleśvara)
মার্কণ্ডেয় বর্ণনা করেন—নর্মদা-তীরে উমাসহ রুদ্র অবস্থান করছেন; সেখানে নারদ বাণ ও তার প্রাসাদের ঐশ্বর্যের সংবাদ দেন। তখন শিব ত্রিপুর-বিজয়ের সংকল্প করে দেবতা, বেদ, ছন্দ ও তত্ত্বকে রথের অঙ্গে অঙ্গে নিয়োজিত করে এক বিশ্বরথ ও দিব্য অস্ত্রব্যবস্থা নির্মাণ করেন। তিন পুর একত্র সমরেখ হলে তিনি শর নিক্ষেপ করেন; তাতে ত্রিপুর দগ্ধ হয়ে ধ্বংস হয়। অমঙ্গল-লক্ষণ, দাহের বিভীষিকা ও নগরে সামাজিক বিভ্রান্তির চিত্রও বলা হয়েছে। বাণ নিজের নৈতিক দোষ ও ধ্বংসের কারণ উপলব্ধি করে শিবের শরণ নেয় এবং দীর্ঘ স্তোত্রে তাঁকে সর্বব্যাপী, দেবতা ও ভূত-তত্ত্বের আধাররূপে স্তব করে। শিবের ক্রোধ প্রশমিত হয়; তিনি বাণকে অভয় ও মর্যাদা দেন এবং দাহাগ্নির এক অংশ নিবৃত্ত করেন। এরপর দগ্ধ ত্রিপুরের জ্বলন্ত খণ্ডাংশ শ্রীশৈল ও অমরকণ্টকের পবিত্র স্থানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়; ‘জ্বালেশ্বর’ নামের কারণ ও তীর্থযাত্রার ধর্মতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কণ্ডেয় অমরকণ্টকে নির্দিষ্ট ‘পাতন’ সাধনার বিধি—কৃচ্ছ্র, জপ, হোম ও পূজা—বর্ণনা করেন এবং রেবার দক্ষিণ তীরে নিকটবর্তী তীর্থসমূহ গণনা করে নিয়মানুবর্তিতা, পিতৃতর্পণ ও দোষনাশের গুরুত্ব জানান।

Kāverī–Narmadā Saṅgama Māhātmya (Kubera’s Observance and the Fruits of Tīrtha-Discipline)
এই অধ্যায়টি প্রশ্ন–উত্তরধর্মী ধর্মতাত্ত্বিক সংলাপ। যুধিষ্ঠির কাবেরী নদীর খ্যাতি এবং তার পবিত্র প্রসঙ্গে দর্শন, স্পর্শ, স্নান, জপ, দান ও উপবাসের নির্দিষ্ট ফল জানতে চান। মার্কণ্ডেয় কাবেরী–নর্মদা সঙ্গমকে সর্বজনবিদিত তীর্থ বলে ঘোষণা করে একটি দৃষ্টান্ত-কাহিনির মাধ্যমে তার শক্তি প্রতিষ্ঠা করেন। কাহিনিতে শক্তিমান যক্ষ কুবের সঙ্গমে দীর্ঘকাল নিয়মনিষ্ঠ তপস্যা করেন—শুচিতা রক্ষা, মহাদেবের বিধিবদ্ধ পূজা, ধাপে ধাপে আহার-সংযম, নির্দিষ্ট সময়ে উপবাস এবং কঠোর ব্রত পালন। শিব প্রসন্ন হয়ে আবির্ভূত হন ও বর দেন; কুবের যক্ষদের অধিপত্য, অটুট ভক্তি এবং ধর্মে স্থিতি প্রার্থনা করেন, শিব তা অনুমোদন করেন। এরপর ফলশ্রুতির মতো সঙ্গম-মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়—এটি পাপবিনাশী, স্বর্গপ্রদায়ক, পিতৃকল্যাণে দান-তর্পণের বিশেষ ফলদায়ক এবং মহাযজ্ঞসম পুণ্যদায়ী। অমরেশ্বর অঞ্চলে ক্ষেত্রপাল, নদীর রক্ষিত যোগ এবং নামযুক্ত লিঙ্গসমূহের উল্লেখ আছে; পাশাপাশি সতর্ক করা হয় যে পবিত্র ক্ষেত্রে কৃত পাপকর্মের ফল বিশেষ গুরুতর। শেষে কাবেরীর রুদ্র-উৎপন্ন পবিত্রতা ও অতুল মহিমা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

Dārutīrtha-māhātmya (The Glory of Dārutīrtha on the Narmadā)
এই অধ্যায়ে সংলাপরূপে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত প্রসিদ্ধ দারুতীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। তীর্থের নামের সঙ্গে যুক্ত দারু—ভার্গব বংশীয়, বেদ ও বেদাঙ্গে পারদর্শী এক বিদ্বান ব্রাহ্মণ। তাঁর জীবন আশ্রম-ক্রমে (ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ) অগ্রসর হয়ে শেষে যতি-ধর্মানুগ তপস্যা ও সন্ন্যাসনিষ্ঠায় পরিণত হয়; তিনি আজীবন মহাদেবের ধ্যানে স্থিত থেকে তীর্থের খ্যাতি ত্রিলোকে প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর বিধান দেওয়া হয়েছে—নিয়মমাফিক স্নান, পিতৃ ও দেবতার পূজা। সত্যবাদিতা, ক্রোধসংযম ও সর্বভূতের কল্যাণ—এই নৈতিক গুণের সঙ্গে অভীষ্টসিদ্ধির ফল প্রতিশ্রুত। সত্য ও শৌচসহ উপবাস এবং ঋক্-সাম-যজুর্বেদের পাঠকে উৎকৃষ্ট ফলদায়ক বলা হয়েছে। শেষে শংকরের উক্তিরূপে ফলশ্রুতি—যে ব্যক্তি বিধিপূর্বক সেখানে দেহত্যাগ করে, সে অনাবর্তিকা গতি, অর্থাৎ পুনরাগমনহীন পরম পথ লাভ করে।

ब्रह्मावर्ततीर्थमाहात्म्य — The Glory of the Brahmāvarta Tīrtha
মার্কণ্ডেয় রাজশ্রোতাকে ব্রহ্মাবর্ত নামে প্রসিদ্ধ তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন, যা সকল অশুচিতা ও পাপমল নাশকারী। সেখানে ব্রহ্মা চিরকাল উপস্থিত—কঠোর তপস্যা, নিয়ম-সংযম এবং মহেশ্বর-ধ্যানে একাগ্র। বিধান দেওয়া হয়েছে—নিয়মমাফিক স্নান করতে হবে, পিতৃ ও দেবতাদের উদ্দেশে তর্পণ দিতে হবে, এবং ঈশান (শিব) অথবা বিষ্ণুকে পরমেশ্বর জেনে পূজা করতে হবে। এই তীর্থের প্রভাবে যথাবিধি যজ্ঞ ও দক্ষিণাসহ সম্পন্ন কর্মের সমান পুণ্যফল লাভ হয়। আরও বলা হয়—মানুষের জন্য স্থান আপনাআপনি পবিত্র হয় না; দৃঢ় সংকল্প, সক্ষমতা ও স্থৈর্য সাফল্য আনে, আর অবহেলা ও লোভ পতনের কারণ। শেষে সিদ্ধান্ত—যেখানে সংযতাত্মা মুনি বাস করেন, সেই স্থান কুরুক্ষেত্র, নৈমিষ ও পুষ্কর প্রভৃতি মহাক্ষেত্রের তুল্য হয়ে ওঠে।

पत्त्रेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Patreśvara Tīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির মার্কণ্ডেয়কে জিজ্ঞাসা করেন—পাপহর পত্ত্রেশ্বর তীর্থের সঙ্গে যুক্ত মহাশক্তিমান সিদ্ধ কে। মার্কণ্ডেয় বলেন, চিত্র (চিত্ৰা)-পুত্র দীপ্তিমান পত্ত্রেশ্বর, যাঁকে ‘জয়’ নামেও ডাকা হয়, দেবসভায় মেনকার নৃত্য দেখে মোহিত হয়ে সংযম হারান। ইন্দ্র এই ইন্দ্রিয়-অসংযম দেখে নীতিশিক্ষা হিসেবে তাঁকে দীর্ঘকাল মর্ত্যজীবন ভোগের শাপ দেন। শাপমোচনের উপায় হিসেবে তাঁকে নর্মদা (রেবা) তীরে বারো বছর নিয়মশৃঙ্খল সাধনা করতে বলা হয়। তিনি স্নান, জপ, শঙ্কর-আরাধনা ও পঞ্চাগ্নি তপস্যা প্রভৃতি কঠোর ব্রত পালন করলে শিব প্রসন্ন হয়ে দর্শন দেন ও বর প্রার্থনা করতে বলেন। ভক্ত চান—এই তীর্থে তাঁর নামেই শিব স্থিত থাকুন; ফলে পত্ত্রেশ্বর লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ত্রিলোকে খ্যাতি লাভ করে। শেষে ফলশ্রুতি—একবার স্নানে পাপনাশ, সেখানে পূজায় অশ্বমেধ-সদৃশ যজ্ঞফল, স্বর্গসুখ, শুভ পুনর্জন্ম, দীর্ঘায়ু, রোগ-শোকমুক্তি এবং তীর্থজলের স্মৃতি অটুট থাকে।

अग्नितीर्थमाहात्म्य — Agnitīrtha Māhātmya (The Glory of Agni-Tīrtha)
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে অগ্নিতীর্থে গমনের বিধান বলেন এবং ব্যাখ্যা করেন—ইচ্ছা ও লোকধর্ম-নৈতিক কারণবশত অগ্নি কীভাবে কোনো স্থানে ‘সন্নিহিত’ হন। কৃতযুগে মাহিষ্মতীর রাজা দুর্যোধন নর্মদার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে সुदর্শনা নামে কন্যাসন্তান লাভ করেন। কন্যা যৌবনে পৌঁছালে অগ্নি দরিদ্র ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে এসে তার হাত চান; কিন্তু রাজা ধন-প্রতিষ্ঠার অযোগ্যতা দেখিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর যজ্ঞাগ্নি থেকে অগ্নি অন্তর্ধান করেন, যাগযজ্ঞের ক্রিয়া ব্যাহত হয়, ব্রাহ্মণরা আতঙ্কিত হন। অনুসন্ধান ও তপস্যার পর অগ্নি স্বপ্নে জানান—কন্যাদান প্রত্যাখ্যানই তাঁর প্রত্যাহারের কারণ। ব্রাহ্মণরা শর্ত জানায়—রাজা কন্যাকে অগ্নির হাতে দিলে গৃহাগ্নি পুনরায় প্রজ্বলিত হবে। রাজা সম্মত হন, বিবাহ সম্পন্ন হয়, এবং অগ্নি মাহিষ্মতীতে চিরকাল উপস্থিত থাকেন; তাই স্থানটির নাম ‘অগ্নিতীর্থ’। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—পক্ষসন্ধিতে স্নান-দান, পিতৃ ও দেবতাদের উদ্দেশে তর্পণ-অর্চনা, স্বর্ণদান ভূমিদানের সমফল, এবং উপবাসব্রতে অগ্নিলোকে ভোগলাভ। অধ্যায়ের শেষে বলা হয়, এই তীর্থের কেবল শ্রবণও পবিত্র ও কল্যাণদায়ক।

Āditya’s Manifestation at a Narmadā Tīrtha and the Stated Fruits of Worship (आदित्य-तत्त्व एवं तीर्थफल-प्रशंसा)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় নর্মদা-তীরে মহা আদিত্যের আরেকটি কাহিনি যুধিষ্ঠিরকে শোনান। যুধিষ্ঠির বিস্মিত হয়ে শোনেন যে দেবতা সর্বব্যাপী এবং সকল জীবের উদ্ধারক। কুলিক বংশের এক ব্রাহ্মণ-ভক্ত কঠোর তীর্থব্রত গ্রহণ করে—দীর্ঘ পথযাত্রা, অন্নবর্জন ও অল্প জল—তখন দেবতা স্বপ্নে প্রকাশ হয়ে তাকে ব্রত সংযত করতে বলেন এবং তত্ত্ব শিক্ষা দেন যে চল-অচল জগতে দিব্য সত্তাই পরিব্যাপ্ত। বর চাইতে বললে ভক্ত নর্মদার উত্তর তীরে আদিত্যের স্থায়ী সান্নিধ্য প্রার্থনা করে এবং দূরদেশ থেকেও যারা স্মরণ বা পূজা করবে তাদের কল্যাণ ও করুণা, আর দেহগত প্রতিবন্ধকতায় পীড়িতদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ কামনা করে। এরপর তীর্থফল-প্রশংসা বর্ণিত হয়—স্নান ও অর্ঘ্য-দান প্রভৃতিতে অগ্নিষ্টোম যজ্ঞসম পুণ্য; এবং জীবনের অন্তিমকালে সেখানে কৃত কর্মে অগ্নিলোক, বরুণলোক বা স্বর্গে দীর্ঘ সম্মান লাভের কথা বলা হয়। প্রভাতে ভাস্করের নিত্য স্মরণ জীবনে সঞ্চিত পাপ নাশ করে—এ কথাও ঘোষিত।

मेघनादतीर्थ-प्रादुर्भावः (Origin and Merit of Meghnāda Tīrtha)
এই অধ্যায়টি সংলাপরূপে বর্ণিত। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন—মহাদেব কেন নর্মদার জলের মধ্যধারায় প্রতিষ্ঠিত, তীরের কোনো এক পাশে নয়? মার্কণ্ডেয় ঋষি কারণকথা বলেন। ত্রেতাযুগে রাবণ বিন্ধ্য অঞ্চলে দানব মায়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং মায়ার কন্যা মন্দোদরীর কঠোর তপস্যার কথা শুনে তাকে পত্নীরূপে প্রার্থনা করে; মায়া তাকে রাবণকে প্রদান করেন ও বিবাহ সম্পন্ন হয়। তাঁদের পুত্রের গর্জনে জগৎ স্তম্ভিত হয়; ব্রহ্মা তার নাম রাখেন ‘মেঘনাদ’। মেঘনাদ শঙ্কর-উমার কঠোর ব্রত ও পূজায় আরাধনা করে কৈলাস থেকে দুইটি লিঙ্গ নিয়ে দক্ষিণদিকে যাত্রা করে। নর্মদাতীরে স্নান-উপাসনা শেষে লঙ্কায় নিয়ে যেতে লিঙ্গ তুলতে গেলে এক মহালিঙ্গ নর্মদায় পড়ে মধ্যধারায় স্থির হয়ে যায়; দিব্যবাণী তাকে অগ্রসর হতে বলে। মেঘনাদ প্রণাম করে চলে যায়। সেই থেকে তীর্থটি ‘মেঘনাদতীর্থ’ নামে প্রসিদ্ধ হয়; পূর্বে এর নাম ছিল ‘গর্জন’। এখানে দিন-রাত্রি অবস্থানসহ স্নান করলে অশ্বমেধসম পুণ্য, পিণ্ডদান করলে সত্ত্রযজ্ঞের ফল, ষড়রস ভোজনে ব্রাহ্মণকে ভোজন করালে অক্ষয় পুণ্য, এবং স্বেচ্ছামৃত্যু করলে প্রলয় পর্যন্ত শঙ্করলোকে বাস লাভ হয়।

दारुतीर्थमाहात्म्य (Darutīrtha Māhātmya) — Origin Narrative and Pilgrimage Merits
এই অধ্যায়টি উপদেশমূলক সংলাপরূপে দারুতীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে। যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে মার্কণ্ডেয় নর্মদা-তীরে অবস্থিত এই শ্রেষ্ঠ তীর্থের উৎপত্তিকথা বলেন। পূর্বপ্রসঙ্গে ইন্দ্রের সারথি মাতলি কোনো কারণে নিজের পুত্রকে অভিশাপ দেন; অভিশাপে পীড়িত সে ইন্দ্রের শরণাপন্ন হয়। ইন্দ্র তাকে নর্মদা-তীরে দীর্ঘ তপস্যাবাসের নির্দেশ দিয়ে মহেশ্বরভক্তি করতে বলেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে সে ‘দারুক’ নামে প্রসিদ্ধ তপস্বী হয়ে পুনর্জন্ম লাভ করবে; শঙ্খ-চক্র-গদাধারী পরম দেবের ভক্তিতেও সিদ্ধি ও শুভ গতি পাবে। পরবর্তী অংশে তীর্থসেবার বিধি ও ফলশ্রুতি বলা হয়েছে। যে তীর্থযাত্রী বিধিপূর্বক স্নান করে, সন্ধ্যা করে, শিবপূজা করে এবং বেদাধ্যয়ন করে, সে অশ্বমেধ যজ্ঞসম মহাপুণ্য লাভ করে। ব্রাহ্মণভোজন মহাফলদায়ক, আর স্নান, দান, জপ, হোম, স্বাধ্যায় ও দেবপূজা শুদ্ধ অভিপ্রায়ে করলে সম্পূর্ণ ফলপ্রদ হয়।

देवतीर्थमाहात्म्यम् (Devatīrtha Māhātmya: The Glory of Devatīrtha on the Narmadā)
এই অধ্যায়ে ঋষি মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে নর্মদা-তীরে অবস্থিত ‘দেবতীর্থ’-এর অতুল মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, সেখানে স্নান করে তেত্রিশ দেবতা পরম সিদ্ধি লাভ করেছিলেন; তা শুনে যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করেন—শক্তিশালী দৈত্যদের কাছে পরাজিত দেবতারা কীভাবে ওই স্থানে স্নান করে আবার সাফল্য পেলেন। তখন ঋষি বর্ণনা করেন, ইন্দ্রসহ দেবগণ যুদ্ধে পরাভূত হয়ে, দুঃখিত ও পরিবার-বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ব্রহ্মার শরণ নেন। ব্রহ্মা উপদেশ দেন—দৈত্যদের প্রতিরোধের শ্রেষ্ঠ শক্তি তপস্যা; নর্মদার তীরে তপ করো। রেবা-জলের মতো পাপ-নাশক ও শুদ্ধিদায়ক কোনো মন্ত্র বা কর্ম নেই। অগ্নির নেতৃত্বে দেবগণ নর্মদায় গিয়ে দীর্ঘ তপস্যা করে সিদ্ধি অর্জন করেন; সেই থেকে স্থানটি ত্রিলোকে ‘দেবতীর্থ’ নামে সর্বপাপহর হিসেবে খ্যাত হয়। এরপর আচরণ ও ফল নির্দিষ্ট করা হয়েছে—সংযমী ব্যক্তি ভক্তিভরে সেখানে স্নান করলে মুক্তার মতো ফল পায়; ব্রাহ্মণভোজন করলে বহু গুণ পুণ্য বৃদ্ধি পায়; দেবশিলা উপস্থিত থাকলে পুণ্য আরও বাড়ে। কিছু মৃত্যু-সম্পর্কিত আচরণ (সন্ন্যাস-মরণ, অগ্নিপ্রবেশ ইত্যাদি) স্থায়ী বা উচ্চ গতি প্রদান করে বলা হয়েছে। এই তীর্থে স্নান, জপ, হোম, স্বাধ্যায় ও পূজার ফল অক্ষয়। শেষে ফলশ্রুতি—এই পাপহর কাহিনি পাঠ বা শ্রবণ করলে দুঃখমুক্ত হয়ে দিব্যলোকে গমন হয়।

गुहावासी-नर्मदेश्वर-उत्पत्ति (Guhāvāsī and the Origin of Narmadeśvara)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির মর্কণ্ডেয়কে জিজ্ঞাসা করেন—জগদ্গুরু মহাদেব কেন দীর্ঘকাল গুহায় বাস করেছিলেন। মর্কণ্ডেয় কৃতযুগের দারুবন আশ্রমের কাহিনি বলেন, যেখানে সকল আশ্রমের সংযমী সাধকেরা বাস করতেন। উমার অনুরোধে শিব কপালিক-সদৃশ বেশ ধারণ করেন—জটা, ভস্ম, ব্যাঘ্রচর্ম, কপাল-পাত্র ও ডমরু সহ—এবং বনে প্রবেশ করলে আশ্রমের নারীদের মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ঋষিরা ফিরে এসে এই অস্থিরতা দেখে একত্রে সত্য-প্রয়োগ করেন; ফলে শিবলিঙ্গ পতিত হয় এবং বিশ্বে মহা উৎপাত দেখা দেয়। দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নেন; ঋষিরা শিবকে ব্রাহ্মণ্য তপস্যা ও ক্রোধের প্রভাব বোঝান, তারপর সমাধান ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে। পরে শিব নর্মদা-তীরে ‘গুহাবাসী’ মহাব্রত পালন করে সেখানে লিঙ্গ স্থাপন করেন—তাই নাম হয় নর্মদেশ্বর। শেষে তীর্থবিধি ও ফলশ্রুতি—স্নান, পূজা, পিতৃতর্পণ, ব্রাহ্মণভোজন, দান, নির্দিষ্ট তিথিতে উপবাস ইত্যাদির ফল ও রক্ষাকবচ বলা হয়েছে; ভক্তিভরে পাঠ বা শ্রবণ করলেও স্নানের পুণ্য লাভ হয়।

कपिलातीर्थमाहात्म्य (Kapilā-tīrtha Māhātmya: The Glory and Origin of Kapilā Tīrtha)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির নর্মদা (রেবা) তীরে অবস্থিত কপিলা-তীর্থের মাহাত্ম্য ও উৎপত্তি জানতে চান, আর ঋষি মার্কণ্ডেয় তা ব্যাখ্যা করেন। শুরুতেই ফলশ্রুতি বলা হয়—ভক্তিভরে কপিলা-তীর্থে স্নানমাত্র করলেও সঞ্চিত অশুচিতা ও পাপ ক্ষয় হয়। কৃতযুগের প্রভাতে ব্রহ্মা ধ্যান-যজ্ঞে নিমগ্ন ছিলেন। তখন এক প্রজ্বলিত কুণ্ড থেকে অগ্নিস্বরূপা, তেজোময়ী কপিলা প্রকাশিত হন। ব্রহ্মা তাঁকে নানা দেবশক্তি ও কাল-পরিমাপের রূপে সর্বব্যাপিনী জেনে স্তব করেন। কপিলা প্রসন্ন হয়ে ব্রহ্মার অভিপ্রায় জিজ্ঞাসা করলে ব্রহ্মা লোককল্যাণের জন্য তাঁকে দিব্যলোক থেকে মর্ত্যে অবতরণ করতে আদেশ দেন। কপিলা পবিত্র নর্মদার তীরে এসে তপস্যা করেন এবং সেখানেই তীর্থের স্থায়ী প্রতিষ্ঠা ঘটে। পরবর্তী অংশে যুধিষ্ঠিরের প্রশ্ন অনুযায়ী কপিলার দেহে লোক ও দেবতাদের অবস্থান বর্ণিত—পৃষ্ঠে লোকসমূহ, মুখে অগ্নি, জিহ্বায় সরস্বতী, নাসিকায় বায়ু, ললাটে শিব ইত্যাদি। গৃহস্থের কপিলা-পূজা, প্রদক্ষিণা, অর্ঘ্য-নৈবেদ্য, স্নানবিধি, উপবাস ও পিতৃতর্পণকে মহাপুণ্য বলা হয়েছে; তার ফল পূর্বপুরুষ ও বংশধর পর্যন্ত প্রসারিত। শেষে এই মাহাত্ম্য শ্রবণও পবিত্রকারী বলে পুনরুচ্চারিত।

Karañjeśvara Tīrtha Māhātmya (करञ्जेश्वरतीर्थमाहात्म्य) / The Glory of the Karañjeśvara Pilgrimage-Site
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে মার্কণ্ডেয় করঞ্জেশ্বর তীর্থের সঙ্গে যুক্ত এক মহাসিদ্ধের কাহিনি বলেন। কৃতযুগের আদিবংশপরম্পরা দিয়ে বর্ণনা শুরু—মানসপুত্র ঋষি মরীচি, পরে কশ্যপ, এবং দক্ষের কন্যাগণ (অদিতি, দিতি, দনু প্রভৃতি)। দনুর বংশে করঞ্জ নামে এক দৈত্য জন্মায়; সে শুভলক্ষণযুক্ত এবং নর্মদা-তীরে দীর্ঘকাল নিয়ম, সংযত আহার ও কঠোর তপস্যায় রত থাকে। তার তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে ত্রিপুরান্তক শিব উমাসহ আবির্ভূত হয়ে বর দেন। করঞ্জ প্রার্থনা করে—তার বংশধররা যেন ধর্মপরায়ণ হয়। দেবতার অন্তর্ধানের পর করঞ্জ নিজের নামে শিবালয় স্থাপন করে; সেই লিঙ্গ ‘করঞ্জেশ্বর’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—এই তীর্থে স্নানে পাপক্ষয় হয়; পিতৃদের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য-দান করলে অগ্নিষ্টোম যজ্ঞসম পুণ্য লাভ হয়; উপবাসাদি তপস্যায় রুদ্রলোক প্রাপ্তি ঘটে। এখানে অগ্নি বা জলে মৃত্যু শিবধামে দীর্ঘবাস এবং পরে বিদ্যা, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধিসহ শুভ জন্মের কারণ বলা হয়েছে। শ্রবণ-পাঠ এবং বিশেষত শ্রাদ্ধকালে পাঠ অক্ষয় পুণ্যদায়ক—এই প্রশংসায় অধ্যায় সমাপ্ত।

कुण्डलेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Kundaleśvara Tīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়ে ঋষি–রাজ সংলাপের মাধ্যমে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে কুণ্ডলেশ্বর তীর্থের মহিমা জানান। ত্রেতাযুগে পুলস্ত্যবংশীয় বিশ্রবা দীর্ঘ তপস্যা করে ধনদ (বৈশ্রবণ/কুবের)কে জন্ম দেন; তাঁকে ধনের অধিপতি ও লোকপাল নিযুক্ত করা হয়। সেই বংশ থেকেই যক্ষ কুণ্ড/কুণ্ডলের আবির্ভাব। কুণ্ডল পিতামাতার অনুমতি নিয়ে নর্মদা তীরে কঠোর তপ করে—তাপ, বৃষ্টি, শীত সহ্য, প্রাণসংযম ও দীর্ঘ উপবাস। বৃষবাহন শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন—কুণ্ডল অজেয় গণ হবে এবং যক্ষাধিপতির অনুগ্রহে সর্বত্র স্বেচ্ছায় বিচরণ করবে। শিব কৈলাসে গমন করলে কুণ্ডল সেখানে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে ‘কুণ্ডলেশ্বর’ নামে দেবতাকে পূজা করে, অলংকৃত করে এবং ব্রাহ্মণদের অন্ন ও দান দিয়ে সম্মানিত করে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—এই তীর্থে উপবাস ও পূজায় পাপক্ষয় হয়; দানে স্বর্গসুখ লাভ; স্নান করে একটিমাত্র ঋক্ পাঠ করলেও পূর্ণ ফল; গোধনে গোরোমসংখ্যা-সম দীর্ঘ স্বর্গবাস এবং শেষে মহেশের লোকপ্রাপ্তি হয়।

पिप्पलादचरितं पिप्पलेश्वरतीर्थमाहात्म्यं च | Pippalāda’s Account and the Māhātmya of Pippaleśvara Tīrtha
যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে মার্কণ্ডেয় মুনি পিপ্পলেশ্বর-তীর্থের উৎপত্তিকথা বর্ণনা করেন। যাজ্ঞবল্ক্যের তপস্যা ও গৃহধর্মসংক্রান্ত এক জটিল ঘটনার মধ্যে তাঁর বিধবা ভগিনীর প্রসঙ্গ আসে; সেই সূত্রে এক শিশু জন্ম নিয়ে অশ্বত্থ (পিপ্পল) বৃক্ষের তলে পরিত্যক্ত হয়। শিশুটি অলৌকিকভাবে বেঁচে থেকে পিপ্পলাদ নামে বড় হয়। পরে শনৈশ্চর (শনি) পিপ্পলাদের ক্রোধে ভীত হয়ে মুক্তি প্রার্থনা করে; তখন একটি সীমা নির্ধারিত হয়—ষোলো বছর পর্যন্ত শিশুদের উপর শনি বিশেষ কষ্ট আরোপ করবে না—এই নীতিনিয়মটি পৌরাণিক সংলাপে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর পিপ্পলাদের রোষ থেকে যাজ্ঞবল্ক্যকে বিনাশ করতে এক ভয়ংকর কৃত্যা উৎপন্ন হয়। মুনি একের পর এক দিব্যলোকে আশ্রয় খুঁজে শেষে শিবের শরণ নেন; শিব রক্ষা করে সংকটের অবসান ঘটান। পিপ্পলাদ নর্মদা-তীরে কঠোর তপস্যা করে তীর্থে শিবের স্থায়ী অধিষ্ঠান প্রার্থনা করে এবং শিবপূজার প্রতিষ্ঠা করে। অধ্যায়ের শেষে তীর্থযাত্রার বিধান—স্নান, তর্পণ, ব্রাহ্মণভোজন ও শিবপূজা—উপদেশ দেওয়া হয়েছে। অশ্বমেধসম পুণ্যসহ ফলবচন এবং পাঠ/শ্রবণে পাপনাশ ও দুঃস্বপ্ননিবারণের ফলশ্রুতি ঘোষিত হয়েছে।

Vimalēśvara–Puṣkariṇī–Dīvakara-japa and Revā/Narmadā Purificatory Doctrine (विमलेश्वर-तीर्थमाहात्म्यं तथा दिवाकरजपः)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে তীর্থসাধনার ক্রম ও ফল শিক্ষা দেন। প্রথমে বিমলেশ্বর তীর্থের কথা বলা হয়েছে, যেখানে দেবতাদের নির্মিত ‘দেবশিলা’ বর্ণিত। সেখানে স্নান ও ব্রাহ্মণ-সম্মান করলে অল্প দানেও অক্ষয় পুণ্য লাভ হয়। পরে শুদ্ধির জন্য স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, রত্ন-মুক্তা, ভূমি ও গোধন ইত্যাদি দানের প্রশংসা করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—এই তীর্থে দেহত্যাগ করলে প্রলয় পর্যন্ত রুদ্রলোকে বাস মেলে; উপবাস, অগ্নি বা জলের দ্বারা বিধিপূর্বক প্রাণত্যাগকে পরম অবস্থালাভের উপায় বলা হয়েছে। এরপর পবিত্রকারী পুষ্করিণীতে সূর্যভক্তি ও জপের বিধান—একটি ঋক বা এক অক্ষর মাত্র জপও বৈদিক ফল দেয় এবং কলুষ দূর করে; যথাবিধি করলে পুণ্য কোটি-গুণ বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী অংশে চার বর্ণের জন্য অন্তিমকালের নীতি—কাম-ক্রোধ সংযম, শাস্ত্রানুগ আচরণ, দেবসেবা—উপদেশ দেওয়া হয়েছে; বিচ্যুতি নরক ও অধম জন্মের কারণ বলা হয়েছে। শেষে রেবা/নর্মদার রুদ্রসম্ভূতা সর্বতারিণী মহিমা কীর্তিত হয় এবং প্রাতে উঠে ভূমি স্পর্শ করে নিত্য জপ্য এক সংক্ষিপ্ত মন্ত্র দেওয়া হয়েছে, যা নদীকে পাপহারিণী ও শুদ্ধিদায়িনী বলে প্রণাম করে।

शूलभेदतीर्थमाहात्म्य (Śūlabheda Tīrtha Māhātmya) — The Glory of the Śūlabheda Pilgrimage-Site
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠিরের মোক্ষ-প্রশ্নের উত্তরে মার্কণ্ডেয় উপদেশ দেন। রেবার দক্ষিণ তীরে ভৃগু-পাহাড়ের শিখরে শূলপাণি শিব মানবজাতির মুক্তির জন্য যে পরম তীর্থ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা ত্রিলোকে “শূলভেদ” নামে প্রসিদ্ধ। তীর্থের কীর্তন ও দর্শনে বাক্, মন ও দেহের দোষ দূর হয়; পাঁচ ক্রোশ পরিসরকে পুণ্যক্ষেত্র বলে একে ভুক্তি ও মুক্তিদাতা বলা হয়েছে। এরপর জল-পুরাণকথা—পাতাল-সম্পর্কিত ভোগবতী থেকে গঙ্গাধারা শূলের ‘ভেদ’ দ্বারা উদ্ভূত হয়ে পাপহরিণী প্রবাহে পরিণত হয়। শূলের আঘাতে শিলা ভাঙার স্থানে সরস্বতীর এক কুণ্ডে পতনের কথা “প্রাচীন-অঘবিমোচনী” রূপে বলা হয়েছে। কেদার, প্রয়াগ, কুরুক্ষেত্র, গয়া প্রভৃতি বিখ্যাত তীর্থও পূর্ণমাত্রায় শূলভেদের সমান নয়—এমন তুলনা করা হয়েছে। শ্রাদ্ধে পিণ্ড ও তিলোদক অর্পণ, তীর্থজল নিয়মিত পান, কপট ও ক্রোধ ত্যাগ করে যোগ্য ব্রাহ্মণদের সম্মান, এবং তেরো দিনের দান-অনুষ্ঠানে অধিক পুণ্যলাভের বিধান আছে। গণনাথ/গজানন দর্শন, কম্বলক্ষেত্রপকে প্রণাম, তারপর শূলপাণি মহাদেব, উমা ও গুহাবাসী মার্কণ্ডেয়েশের পূজা বর্ণিত। গুহায় প্রবেশ করে “ত্র্যক্ষর” মন্ত্রজপে নীলপর্বতের পুণ্যের অংশ মেলে; স্থানকে সর্বদেবময় ও কোটিলিঙ্গ-সম্পর্কিত বলা হয়েছে। স্নানের সময় লিঙ্গে স্ফুলিঙ্গ বা নড়াচড়া দেখা এবং তেলের ফোঁটা না ছড়ানো—এগুলো তীর্থপ্রভাবের প্রমাণ। শেষে গোপনীয়তা, সর্বপাপনাশ এবং দিনে তিনবার শূলভেদের শ্রবণ-স্মরণে অন্তঃবাহ্য শুদ্ধির ফলশ্রুতি বলা হয়েছে।

अन्धकस्य रेवातटे तपोवरप्राप्तिः (Andhaka’s Austerity on the Revā Bank and the Granting of a Boon)
মার্কণ্ডেয় স্মরণ করান যে পূর্বে রাজা উত্তানপাদ দেবর্ষি ও দেবসমাজে মহেশ্বরকে এক অতি গোপন ও পরম পুণ্যদায়ক তীর্থ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন—“শূলভেদ”-এর উৎপত্তি কী এবং সেই স্থানের মাহাত্ম্য কেন। ঈশ্বর তখন দৈত্য অন্ধকের কথা বলেন—অসাধারণ শক্তিশালী ও অহংকারী, যে নির্বিঘ্নে রাজত্ব করত। মহাদেবকে প্রসন্ন করতে অন্ধক রেবা-তীরে গিয়ে সহস্র সহস্র বছর ধরে চার ধাপে কঠোর তপস্যা করে—প্রথমে উপবাস, পরে শুধু জল, তারপর ধোঁয়া-আহার, এবং শেষে দীর্ঘ যোগসাধনা; ক্রমে সে অস্থি-চর্মমাত্র অবশিষ্ট থাকে। তার তপস্যার তেজ কৈলাস পর্যন্ত পৌঁছে; উমা এই অভূতপূর্ব কঠোরতা দেখে প্রশ্ন করেন এবং দ্রুত বরদান দেওয়ার যথার্থতা নিয়ে আপত্তি তোলেন। শিব উমাসহ তপস্বীর কাছে এসে বর দিতে চান। অন্ধক সকল দেবতার উপর বিজয় প্রার্থনা করে; শিব তা অনুচিত বলে প্রত্যাখ্যান করে অন্য বর চাইতে বলেন। অন্ধক হতাশায় লুটিয়ে পড়ে; উমা বলেন, ভক্তকে অবহেলা করলে শিবের ভক্তরক্ষার খ্যাতি ক্ষুণ্ণ হবে। তখন সমঝোতার বর স্থির হয়—বিষ্ণু ব্যতীত অন্ধক সকল দেবকে জয় করতে পারবে, কিন্তু শিবকে নয়। পুনরুজ্জীবিত হয়ে অন্ধক বর গ্রহণ করে, শিব কৈলাসে প্রত্যাবর্তন করেন; এই কাহিনি তপস্যা, কামনা ও বর-নিয়মের ধর্মতত্ত্ব তীর্থ-মাহাত্ম্যের সঙ্গে যুক্ত করে।

अन्धकस्य स्वपुरप्रवेशः स्वर्गागमनं च (Andhaka’s Return, Ascent to Heaven, and the Abduction of Śacī)
মার্কণ্ডেয় বলেন—শম্ভুর বরপ্রভাবে শক্তিমান দৈত্য অন্ধক নিজ নগরে প্রত্যাবর্তন করলে জনসমাজ মহোৎসবে তাকে বরণ করে। অলংকৃত চত্বর, উদ্যান, পুষ্করিণী ও মন্দির; বেদপাঠ, মঙ্গলধ্বনি, দান ও সমবেত আনন্দে নগর মুখরিত হয়। অন্ধক কিছু কাল ঐশ্বর্যে বাস করে। পরে দেবগণ জানতে পারেন যে বরদানে সে অজেয়। সকলেই বাষব ইন্দ্রের শরণে গিয়ে পরামর্শ করতে থাকেন। এদিকে অন্ধক একাই মেরুর দুর্গম শিখরে উঠে ইন্দ্রের সুরক্ষিত স্বর্গপুরীতে এমনভাবে প্রবেশ করে যেন তা তারই অধিকার। ভীত ইন্দ্র রক্ষক না পেয়ে অতিথিসৎকার করেন এবং অন্ধকের অনুরোধে স্বর্গীয় ঐশ্বর্য প্রদর্শন করেন—ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবা, উর্বশীসহ অপ্সরাগণ, পারিজাত-পুষ্প, সংগীত ও বাদ্য। রঙ্গমঞ্চে নৃত্যগীতের সময় অন্ধকের দৃষ্টি শচীর প্রতি স্থির হয়; সে ইন্দ্রপত্নীকে বলপূর্বক হরণ করে চলে যায়। ফলে যুদ্ধ বাধে এবং অন্ধকের একক শক্তিতে দেবগণ পর্যুদস্ত হন—বরবল যখন অদম্য কামনা ও দমননীতির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন বিশ্বব্যবস্থা অস্থির হয়ে ওঠে।

अन्धकविघ्ननिवेदनम् — The Devas Seek Refuge from Andhaka
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় মুনি দেবতাদের সংকটের বিবরণ দেন। ইন্দ্রের নেতৃত্বে দেবগণ মহিমান্বিত বিমানযোগে ব্রহ্মলোকে গিয়ে ব্রহ্মাকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে স্তব করেন এবং দুঃখ নিবেদন করেন—পরাক্রমী অসুর অন্ধক তাদের পরাজিত করে ধনরত্ন লুণ্ঠন করেছে, এমনকি ইন্দ্রের পত্নীকেও বলপূর্বক হরণ করেছে; ফলে দেবতারা অপমানিত ও বিপন্ন। ব্রহ্মা চিন্তা করে বলেন, অন্ধক দেবতাদের পক্ষে ‘অবধ্য’, অর্থাৎ পূর্ববর বা বিধির কারণে দেবশক্তিতে তাকে সহজে বধ করা যায় না। তখন ব্রহ্মার অগ্রে দেবগণ কেশব/জনার্দন বিষ্ণুর শরণে যান, স্তোত্র পাঠ করে আত্মসমর্পণ করেন। বিষ্ণু তাদের সাদরে গ্রহণ করে কারণ জিজ্ঞাসা করেন এবং সব শুনে প্রতিজ্ঞা করেন—অন্ধক পাতাল, পৃথিবী বা স্বর্গ যেখানেই থাকুক, আমি সেই অধর্মচারীকে বধ করব। তিনি শঙ্খ-চক্র-গদা-ধনুক ধারণ করে উঠেন, দেবতাদের আশ্বস্ত করে নিজ নিজ ধামে ফিরতে বলেন; এভাবেই দেবরক্ষার ও ধর্মস্থাপনের অঙ্গীকারে অধ্যায় সমাপ্ত হয়।

अन्धकस्य विष्णुस्तुतिः शिवयुद्धप्राप्तिः च (Andhaka’s Hymn to Viṣṇu and the Provocation of Śiva for Battle)
রাজা জিজ্ঞাসা করলে মহাদেব বলেন—দেবতাদের দমন করে অন্ধক পাতালে প্রবেশ করে ধ্বংসাত্মক কর্মে লিপ্ত। কেশব ধনুক হাতে এসে আগ্নেয় অস্ত্র প্রয়োগ করেন; অন্ধক প্রবল বারুণ অস্ত্রে প্রতিউত্তর দেয়। বাণের পথ ধরে অন্ধক প্রকাশ পেয়ে জনার্দনকে চ্যালেঞ্জ করে, কিন্তু নিকটযুদ্ধে পরাভূত হয়ে সংঘর্ষ ত্যাগ করে ‘সাম’ অবলম্বন করে এবং বিষ্ণুর দীর্ঘ স্তব করে—নৃসিংহ, বামন, বরাহ প্রভৃতি রূপ স্মরণ করে তাঁর করুণার প্রশংসা করে। বিষ্ণু প্রসন্ন হয়ে বর দেন। অন্ধক চায় এমন এক পবিত্র ও গৌরবময় যুদ্ধ, যাতে সে উচ্চলোক লাভ করতে পারে। বিষ্ণু নিজে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করে তাকে মহাদেবের দিকে পাঠান এবং বলেন—কৈলাসশিখর কাঁপিয়ে শিবের ক্রোধ জাগাও। অন্ধক তাই করলে বিশ্বে কম্পন ও অশুভ লক্ষণ দেখা দেয়; উমা লক্ষণ জিজ্ঞাসা করেন, শিব অপরাধীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে স্থির হন। দেবগণ দিব্য রথ প্রস্তুত করে; শিব অগ্রসর হন এবং মহাযুদ্ধ শুরু হয়—অগ্নেয়, বারুণ, বায়ব্য, সার্প, গারুড়, নারসিংহ অস্ত্র পরস্পরকে নিবারণ করে। শেষে মল্লযুদ্ধে শিব ক্ষণিক স্তব্ধ হলেও পুনরুদ্ধার করে অন্ধককে মহাশস্ত্রে বিদ্ধ করে শূলে আরোপ করেন। তার রক্তবিন্দু থেকে নতুন দানব জন্মাতে থাকলে শিব দুর্গা/চামুণ্ডাকে আহ্বান করেন; তিনি পতিত রক্ত পান করে বৃদ্ধি রোধ করেন। বিপদ থামলে অন্ধক শিবস্তব করে, আর শিব বর দিয়ে তাকে গণদের মধ্যে ভৃঙ্গীশ রূপে স্থান দেন—শত্রুতা থেকে শিবানুগত্যে প্রতিষ্ঠা।

Śūlabheda Tīrtha-Māhātmya (The Glory of the Śūlabheda Pilgrimage Site)
মার্কণ্ডেয় বর্ণনা করেন—অন্ধক বধের পর মহাদেব উমাসহ কৈলাসে প্রত্যাবর্তন করেন। সেখানে দেবগণ সমবেত হলে শিব তাঁদের আসনে বসতে নির্দেশ দেন এবং বলেন, দানব নিহত হলেও তাঁর ত্রিশূল রক্ত-মলিন রয়ে গেছে; কেবল প্রচলিত ব্রত-আচারেই তা শুদ্ধ হয় না। তাই তিনি দেবতাদের সঙ্গে নিয়মিতভাবে তীর্থযাত্রার সংকল্প করেন। প্রভাস থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত বহু তীর্থে স্নান করেও প্রত্যাশিত শুদ্ধি না পেয়ে তিনি রেবা (নর্মদা) তীরে আসেন, উভয় তীরে স্নান করে ভৃগু-সম্পর্কিত পর্বতে ক্লান্ত হয়ে বিরতি নেন এবং সেখানে এক বিশেষ মনোহর, বিধিসম্মত স্থান চিহ্নিত করেন। শিব ত্রিশূল দিয়ে পর্বত বিদীর্ণ করে নীচের দিকে ফাটল সৃষ্টি করেন; তখন ত্রিশূল নির্মল হয়ে ওঠে এবং ‘শূলভেদ’ তীর্থের শুদ্ধিদায়ক কারণ প্রতিষ্ঠিত হয়। পর্বত থেকে পুণ্যময়ী সরস্বতী প্রকাশিত হয়ে দ্বিতীয় সঙ্গম গঠন করেন—যার উপমা প্রয়াগের শ্বেত-শ্যাম সঙ্গমের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। ব্রহ্মা দুঃখনাশক ব্রহ্মেশ/ব্রহ্মেশ্বর লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিষ্ণুর দক্ষিণাংশে নিত্য উপস্থিতির কথাও বলা হয়। এরপর তীর্থের রীতিভূগোল বর্ণিত—ত্রিশূলাগ্রের রেখা জলধারাকে পথ দেখিয়ে রেবায় প্রবাহিত করে; ‘জল-লিঙ্গ’ ও ঘূর্ণিস্রোতযুক্ত তিনটি কুণ্ডের উল্লেখ আছে। স্নানবিধি, মন্ত্রবিকল্প (দশাক্ষরী ও বৈদিক মন্ত্র), বর্ণ ও নারী-পুরুষের প্রক্রিয়াভিত্তিক অধিকার, এবং স্নানের সঙ্গে তর্পণ, শ্রাদ্ধসদৃশ কর্ম ও দানের যোগ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিনায়ক ও ক্ষেত্রপাল রক্ষক; অসদাচারীদের জন্য বিঘ্ন উৎপন্ন হয়—তীর্থযাত্রা নৈতিক শৃঙ্খলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফলশ্রুতিতে শূলভেদে বিধিপূর্বক আচরণে পাপক্ষয়, দোষনিবারণ ও পিতৃউদ্ধারের মহিমা ঘোষিত।

द्विजपात्रता-दानविधि-तीर्थश्राद्धकन्यादानोपदेशः (Eligibility of Brahmins, Ethics of Dāna, Tīrtha-Śrāddha, and Guidance on Kanyādāna)
এই অধ্যায়ে উত্তানপাদ ও ঈশ্বরের সংলাপে দান‑সৎকারে ‘পাত্রতা’ নির্ণয় করা হয়েছে। উপমা দিয়ে বলা হয়—যে ব্রাহ্মণ বেদাধ্যয়নহীন (অনধীয়ান/অনৃচ), সে কেবল নামমাত্র দ্বিজ; এমন অপাত্রকে দান‑সম্মান দিলে যজ্ঞফল জন্মায় না। এরপর নৈতিক, আচারগত, যাগকর্ম ও সামাজিক অপরাধসমূহের তালিকা দিয়ে স্থির করা হয় যে অপাত্রে প্রদত্ত দান নিষ্ফল। পরে তীর্থ‑শ্রাদ্ধের বিধান বর্ণিত—গৃহশ্রাদ্ধের পর শৌচ‑শুদ্ধি, সীমা‑নিয়ম পালন, নির্দিষ্ট তীর্থে গমন, স্নান, এবং একাধিক স্থানে শ্রাদ্ধকর্ম; পায়স, মধু, ঘৃতসহ পিণ্ড নিবেদন ইত্যাদি। ফলশ্রুতিতে পিতৃগণের দীর্ঘকাল তৃপ্তি এবং পাদুকা, শয্যা, অশ্ব, ছত্র, ধান্যসহ গৃহ, তিলধেনু, জল‑অন্ন প্রভৃতি দানের অনুপাতে স্বর্গফল বলা হয়েছে; বিশেষত অন্নদানের মহিমা উচ্চারিত। শেষে কন্যাদান‑উপদেশ—সব দানের মধ্যে এর শ্রেষ্ঠতা, কুলীন‑সদাচারী‑বিদ্বান বরই যোগ্য পাত্র, বিবাহে অর্থ নিয়ে সম্বন্ধ স্থির করার নিন্দা, এবং অযাচিত‑আহূত‑যাচিত ভেদে দানের প্রকারভেদ। অক্ষমকে দান না করা ও অপাত্রের দানগ্রহণ বর্জনের সতর্কবাণীতে অধ্যায় সমাপ্ত।

Śrāddha-kāla-nirṇaya, Viṣṇu-jāgaraṇa, and Markaṇḍeśvara-guhā-liṅga Māhātmya (Ritual Timing and Cave-Shrine Observances)
অধ্যায়টি সংলাপরূপে বিন্যস্ত। উত্তানপাদ ঈশ্বরকে জিজ্ঞাসা করেন—শ্রাদ্ধ, দান ও তীর্থযাত্রা কখন করা উচিত। ঈশ্বর মাসভিত্তিক শুভ শ্রাদ্ধ-সময় নির্ণয় করেন—নির্দিষ্ট তিথি, অয়ন-সন্ধি, অষ্টকা, সংক্রান্তি, ব্যতীপাত ও গ্রহণকাল ইত্যাদি—এবং বলেন, এই সময়ে দান করলে অক্ষয় ফল লাভ হয়। এরপর ভক্তিচর্চার বিধান আসে: মধু-মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীতে উপবাস, বিষ্ণুর চরণসন্নিধানে রাত্রিজাগরণ, ধূপ-দীপ-নৈবেদ্য-মাল্য দ্বারা পূজা, এবং পূর্বোক্ত পবিত্র কাহিনি পাঠ/শ্রবণ। বৈদিক সূক্ত-জপকে শুদ্ধিকারী ও মোক্ষদায়ক বলা হয়েছে। প্রাতে শ্রদ্ধাসহ শ্রাদ্ধ, ব্রাহ্মণদের যথাযথ সম্মান, এবং সামর্থ্য অনুযায়ী স্বর্ণ, গাভী, বস্ত্রাদি দান করলে পিতৃগণের দীর্ঘ তৃপ্তি হয়। পরে তীর্থবিধানে ত্রয়োদশীতে গুহাস্থ লিঙ্গ দর্শনের নির্দেশ আছে—এটি ঋষি মার্কণ্ডেয় কঠোর তপস্যা ও যোগসাধনার পর ‘মার্কণ্ডেশ্বর’ নামে প্রতিষ্ঠা করেন। গুহায় স্নান, উপবাস, ইন্দ্রিয়নিগ্রহ, জাগরণ, দীপদান, পঞ্চামৃত/পঞ্চগব্য অভিষেক এবং বিস্তৃত মন্ত্রজপ (সাবিত্রী-জপের গণনা সহ) নির্দিষ্ট; পাত্রপরীক্ষার গুরুত্বও বলা হয়েছে। অষ্টপুষ্পরূপ মানসিক অর্ঘ্য—অহিংসা, ইন্দ্রিয়নিগ্রহ, দয়া, ক্ষমা, ধ্যান, তপ, জ্ঞান, সত্য—কে শ্রেষ্ঠ পূজা বলা হয়েছে। শেষে যান, শস্য, কৃষি-উপকরণ প্রভৃতি দান, বিশেষত গোদান, এবং গ্রহণকালে অতুল্য পুণ্যের কথা; যেখানে গাভী দেখা যায় সেখানে সকল তীর্থের সন্নিধি, আর তীর্থস্মরণ/পুনরাগমন বা সেখানে মৃত্যু রুদ্রসান্নিধ্যের কারণ বলা হয়েছে।

Dīrghatapā-āśrama and the Account of Ṛkṣaśṛṅga (दीर्घतपा-आश्रमः तथा ऋक्षशृङ्गोपाख्यानप्रस्तावः)
অধ্যায় ৫২-এ ঈশ্বর পূর্বকথা ঘোষণা করেন—এক মহাতপস্বী তাঁর পরিবারসহ স্বর্গলাভ করেছিলেন; তা শুনে রাজা উত্তানপাদ সেই উপাখ্যান জানতে প্রার্থনা করেন। এরপর বর্ণনা কাশীর দিকে গড়ায়: রাজা চিত্রসেনের শাসনে বারাণসীর সমৃদ্ধি, বেদপাঠের ধ্বনি, নগর-বাণিজ্যের ব্যস্ততা এবং মন্দির-আশ্রমের প্রাচুর্য তুলে ধরা হয়। নগরের উত্তরে মন্দারবনের মধ্যে এক প্রসিদ্ধ আশ্রমের পরিচয় দেওয়া হয়। সেখানে ব্রাহ্মণ তপস্বী দীর্ঘতপা কঠোর তপস্যায় খ্যাত; এবং দেখানো হয় যে গৃহস্থ-পরিসরেও তপস্যা সম্ভব—তিনি স্ত্রী, পুত্র ও পুত্রবধূসহ বাস করেন, পাঁচ পুত্র তাঁর সেবা করে। কনিষ্ঠ ঋক্ষশৃঙ্গ বেদবিদ, ব্রহ্মচারী, সদাচারী, যোগনিষ্ঠ ও সংযত আহারী। বিশেষভাবে বলা হয়, তিনি হরিণরূপে বিচরণ করে হরিণদলের সঙ্গে মিশে থাকেন, তবু প্রতিদিন পিতা-মাতার বন্দনা ও সেবা করেন—তপস্যার পরিবেশে পিতৃভক্তির শৃঙ্খলা প্রকাশ পায়। শেষে দৈবযোগে ঋক্ষশৃঙ্গের মৃত্যু ঘটে, যা পরবর্তী অংশে ভাগ্য, পুণ্য ও পরলোকগতির আলোচনা সূচিত করে।

चित्रसेन-ऋक्षशृङ्गसंवादः (King Citrasena and Sage Ṛkṣaśṛṅga: Accidental Injury and Ethical Remediation)
ঈশ্বর উত্তানপাদকে উপদেশরূপে এই কাহিনি বলেন—শ্রদ্ধাভরে শ্রবণ করলে পাপশুদ্ধি হয়। কাশীর ধর্মপরায়ণ ও পরাক্রান্ত রাজা চিত্রসেন বহু মিত্ররাজসহ শিকারে বেরিয়ে অরণ্যে ধুলো ও কোলাহলে সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হন। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ক্লান্ত হয়ে তিনি এক দিব্য সরোবরে পৌঁছে স্নান করেন, পিতৃ ও দেবতাদের তर्पণ দেন এবং পদ্মফুলে শঙ্করের পূজা করেন। সেখানে তিনি নানা ভঙ্গিতে অবস্থানরত বহু হরিণের মাঝে মহাতপস্বী ঋক্ষশৃঙ্গকে বসে থাকতে দেখেন। শিকারের সুযোগ ভেবে রাজা তীর ছোড়েন, কিন্তু অজান্তে তা ঋষির দেহে বিদ্ধ হয়। ঋষি মানববাণীতে কথা বললে রাজা বিস্মিত হয়ে অনিচ্ছাকৃত অপরাধ স্বীকার করেন এবং ব্রহ্মহত্যাকে সর্বাধিক গুরুতর জেনে আত্মদাহকে প্রায়শ্চিত্ত বলে প্রস্তাব করেন। ঋক্ষশৃঙ্গ তা নিবারণ করে বলেন—এতে তাঁর আশ্রিত পরিবারে আরও মৃত্যুর কারণ হবে। তিনি নির্দেশ দেন, রাজা যেন তাঁকে পিতা-মাতার আশ্রমে নিয়ে গিয়ে মায়ের কাছে ‘পুত্রঘাতক’ রূপে সত্য স্বীকার করেন; তাঁরা শান্তির পথ বলবেন। রাজা বহন করতে করতে বারবার থামলে ঋষি যোগসমাধিতে দেহত্যাগ করেন। রাজা বিধিমতো অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন করে শোকে বিলাপ করেন—পরবর্তী প্রায়শ্চিত্ত ও নৈতিক দায়বোধের শিক্ষার ভূমিকা রচিত হয়।

अध्याय ५४ — शूलभेदतीर्थ-माहात्म्य तथा चित्रसेनस्य प्रायश्चित्त-मार्गः (Shūlabheda Tīrtha-Māhātmya and King Citraseṇa’s Expiatory Path)
এই অধ্যায়ে নৈতিক কারণ‑কার্য ও তার প্রায়শ্চিত্তের পথ বর্ণিত। শিকারের বিভ্রমে রাজা চিত্রসেন ঋষি দীর্ঘতপা‑র পুত্র ঋক্ষশৃঙ্গকে হত্যা করেন এবং অপরাধ স্বীকার করে আশ্রমে আসেন। শোকে মাতা বিলাপ করতে করতে অচেতন হয়ে প্রাণত্যাগ করেন; পুত্রগণ ও পুত্রবধূরাও বিনষ্ট হয়—তপস্বী‑হিংসার সামাজিক ও কর্মফলগত গুরুতা প্রকাশ পায়। দীর্ঘতপা প্রথমে রাজাকে তিরস্কার করেন, পরে কর্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন—মানুষ পূর্বকর্মের প্রেরণায় কাজ করলেও ফল অনিবার্য। তিনি প্রায়শ্চিত্ত নির্দেশ দেন: সমগ্র পরিবারের দাহসংস্কার করে দক্ষিণ নর্মদা‑তীরে প্রসিদ্ধ শূলভেদ তীর্থে অস্থি বিসর্জন করতে হবে; এই তীর্থ পাপ‑দুঃখনাশক। চিত্রসেন দাহকর্ম সম্পন্ন করে পদব্রজে, অল্পাহারে ও বারংবার স্নান করতে করতে দক্ষিণে যাত্রা করেন; পথে মুনিদের কাছে দিশা জেনে তীর্থে পৌঁছান। সেখানে তীর্থপ্রভাবে এক জীবের রূপান্তরিত মুক্তির দর্শন ঘটে, যা স্থানের মাহাত্ম্য প্রমাণ করে। রাজা স্নান করে তিলমিশ্রিত জলে তর্পণ দেন ও অস্থি নিমজ্জন করেন। মৃতেরা দিব্যরূপে বিমানসহ প্রকাশিত হয়; উন্নত দীর্ঘতপা রাজাকে আশীর্বাদ করে বলেন—এই বিধি আদর্শ, শুদ্ধি ও কাম্যফল প্রদানকারী।

Śūlabheda-Tīrtha Māhātmya (शूलभेदतीर्थमाहात्म्य) — The Glory of the Śūlabheda Sacred Ford
তীর্থের মহিমা প্রত্যক্ষ করে উত্তানপাদ রাজা চিত্রসেনের কথা জিজ্ঞাসা করেন। ঈশ্বর বলেন—চিত্রসেন ভৃগুতুঙ্গে উঠে এক কুণ্ডের কাছে কঠোর তপস্যা করেন এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরকে ধ্যান করতে করতে অকালেই দেহত্যাগে উদ্যত হন। তখন রুদ্র ও কেশব স্বয়ং প্রকাশ হয়ে তাঁকে নিবৃত্ত করেন এবং ধর্মমতে ফিরে গিয়ে ন্যায়সঙ্গত ঐশ্বর্য ভোগ করে নির্বিঘ্নে রাজ্যশাসন করতে উপদেশ দেন। কিন্তু চিত্রসেন রাজভোগ ত্যাগ করে বর চান—ত্রিদেব যেন এই স্থানে স্থায়ীভাবে বিরাজ করেন, স্থানটি গয়াশিরের সমতুল্য পুণ্যদায়ক হোক, এবং তিনি শিবগণের মধ্যে নেতৃত্ব লাভ করুন। ঈশ্বর বর দেন—শূলভেদ তীর্থে ত্রিকাল জুড়ে অংশরূপে ত্রিদেবের নিবাস হবে; চিত্রসেন ‘নন্দি’ নামক গণাধিপতি হয়ে গণেশের ন্যায় কার্যসম্পাদন করবেন এবং শিবের নিকটে পূজায় অগ্রাধিকার পাবেন। অধ্যায়ে তীর্থের তুলনামূলক পুণ্য (গয়া ব্যতীত অন্য তীর্থের চেয়ে শ্রেষ্ঠ), কুণ্ড-পরিসরের পরিমাপ ও ক্রিয়াবিধি, এবং শ্রাদ্ধ-পিণ্ডদানের ফল বলা হয়েছে—পিতৃমুক্তি, কঠিন মৃত্যুবরণকারীরও উপকার, কেবল স্নানেই অজান্ত পাপশুদ্ধি, এবং সেখানে সন্ন্যাস গ্রহণে উচ্চ গতি। শেষে ফলশ্রুতিতে বলা হয়—এই মাহাত্ম্য পাঠ, শ্রবণ, লিখন ও দান করলে পাপক্ষয়, ইষ্টসিদ্ধি এবং গ্রন্থ যতদিন রক্ষিত থাকে ততদিন রুদ্রলোকে বাস লাভ হয়।

देवशिला-शूलभेद-तीर्थमाहात्म्य तथा भानुमती-व्रताख्यान (Devāśilā–Śūlabheda Tīrtha Māhātmya and the Bhānumatī Vrata Narrative)
অধ্যায় ৫৬ প্রশ্নোত্তরধর্মী ধর্মতত্ত্ব-আলোচনা। উত্তানপাদ গঙ্গার অবতরণ ও মহাপুণ্যদায়িনী দেবশিলার উৎপত্তি জানতে চাইলে ঈশ্বর পবিত্র ভূগোল-উৎপত্তির কাহিনি বলেন—দেবতাদের প্রার্থনায় গঙ্গা আবির্ভূত হন, রুদ্র জটাজাল থেকে তাঁকে মুক্ত করেন, মানবকল্যাণে দেবনদী-রূপে প্রবাহিত হন, এবং শূলভেদ, দেবশিলা ও প্রাচী সরস্বতী-সংলগ্ন তীর্থসমষ্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর আচরণগত বিধান—স্নান, তর্পণ, যোগ্য ব্রাহ্মণ দ্বারা শ্রাদ্ধ, একাদশী উপবাস, রাত্রিজাগরণ, পুরাণপাঠ ও দানকে পাপশুদ্ধি ও পিতৃতৃপ্তির উপায় বলা হয়েছে। দৃষ্টান্তকথায় রাজা বীরসেনের বিধবা কন্যা ভানুমতী কঠোর ব্রত গ্রহণ করে বহু বছরের তীর্থযাত্রা (গঙ্গা থেকে দক্ষিণপথ, রেবা-অঞ্চল ও নানা তীর্থ) সম্পন্ন করে শূলভেদ/দেবশিলায় নিয়মিত বাস, পূজা ও ব্রাহ্মণ-অতিথিসেবা অব্যাহত রাখেন। আরেক দৃষ্টান্তে দুর্ভিক্ষপীড়িত শবর/ব্যাধ ও তার স্ত্রী ফুল-ফল অর্পণ, একাদশী পালন, তীর্থকর্মে অংশগ্রহণ এবং সত্য-দাননীতির দ্বারা জীবিকা ও মনোভাবকে ভক্তিপুণ্যের দিকে ফেরায়। শেষে তিল, দীপ, ভূমি, হিরণ্য প্রভৃতি দানের ফলের সংক্ষিপ্ত শ্রেণিবিভাগ আছে; ব্রহ্মদানকে শ্রেষ্ঠ এবং ফল নির্ধারণে ‘ভাব’কে প্রধান বলা হয়েছে।

Padmaka-parva and the Śabara’s Liberation at Markaṇḍa-hrada (Revā Khaṇḍa, Adhyāya 57)
এই অধ্যায়ে দ্বিখণ্ড ধর্মতাত্ত্বিক বর্ণনা আছে। প্রথম ভাগে ভানুমতী চন্দ্রতিথির ক্রমে শৈব-অনুষ্ঠান পালন করেন—ব্রাহ্মণভোজন করান, উপবাস-নিয়ম গ্রহণ করেন, মার্কণ্ডেয়-হ্রদে স্নান করেন এবং বৃষভধ্বজ মহেশ্বরকে পঞ্চামৃত, গন্ধ, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, পুষ্প ইত্যাদিতে পূজা করেন। রাত্রিজাগরণে পুরাণপাঠ, গান, নৃত্য ও স্তোত্রের মাধ্যমে আরাধনা সম্পন্ন হয়। ব্রাহ্মণেরা একে “পদ্মক” নামক পর্ব বলে নির্দিষ্ট করে তিথি-নক্ষত্র-যোগ-করনের লক্ষণ জানান এবং বলেন—এখানে দান, হোম ও জপ অক্ষয় ফল দেয়। দ্বিতীয় ভাগে ভানুমতী ভৃগুমূর্ধন পর্বতে এক শবরকে স্ত্রীসহ ঝাঁপ দিয়ে প্রাণত্যাগ করতে উদ্যত দেখেন। সে তৎক্ষণাৎ দুঃখে নয়, সংসারভয় ও মানবজন্ম পেয়েও ধর্মাচরণ ব্যর্থ হবে—এই আশঙ্কায় স্থিরপ্রতিজ্ঞ। ভানুমতী বোঝান—এখনও সময় আছে, ব্রত ও দানে শুদ্ধি হয়। শবর ধনভিত্তিক সাহায্য প্রত্যাখ্যান করে পরান্নদোষের কথা বলে—“অন্যের অন্ন খেলে তার পাপও ভোগ করতে হয়”—এবং অর্ধবস্ত্রে সংযম রেখে হরিধ্যান করে পতিত হয়। অল্পক্ষণ পরে সে ও তার স্ত্রীকে দিব্য বিমানে আরূঢ় হতে দেখা যায়—যা মুক্তি বা শ্রেষ্ঠ গতি নির্দেশ করে।

Śūlabheda-tīrtha Māhātmya (Glory of the Śūlabheda Sacred Site)
এই অধ্যায়ে শূলভেদ তীর্থের মাহাত্ম্য ও শেষে ফলশ্রুতি বর্ণিত। উত্তানপাদ ঈশ্বরকে ভানুমতীর কর্মের তাৎপর্য জিজ্ঞাসা করেন। ঈশ্বর বলেন—ভানুমতী এক পুণ্যকুণ্ডের কাছে গিয়ে তার পবিত্রতা বুঝে সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণদের আহ্বান করে সম্মান করেন, বিধিমতো দান দেন এবং নিজের সংকল্প দৃঢ় করেন। পরে তিনি পিতৃ ও দেবপূজা করেন, মধুমাসে পাক্ষিককাল নিয়ম পালন করে অমাবস্যায় পর্বতপ্রদেশে যান। শিখরে উঠে ব্রাহ্মণদের অনুরোধ করেন—পরিবার ও আত্মীয়দের কাছে মিলনের বার্তা পৌঁছে দিতে; তিনি শূলভেদে স্বশক্তির তপস্যায় দেহত্যাগ করে স্বর্গগতি লাভ করবেন। ব্রাহ্মণরা সম্মতি দিয়ে তাঁর সংশয় দূর করেন। তখন তিনি বস্ত্র দৃঢ় করে একাগ্রচিত্তে দেহ ত্যাগ করেন; দিব্য নারীরা এসে তাঁকে বিমানে তুলে কৈলাসের দিকে নিয়ে যায়, এবং সকলের সামনে তিনি ঊর্ধ্বগমন করেন। মার্কণ্ডেয় পরম্পরাগতভাবে এই কাহিনি প্রতিষ্ঠা করে শক্তিশালী ফলশ্রুতি বলেন—তীর্থে বা মন্দিরে ভক্তিভরে পাঠ-শ্রবণ করলে দীর্ঘদিনের মহাপাপও নাশ হয়; সামাজিক অপরাধ, আচারভঙ্গ, বিশ্বাসঘাতকতা প্রভৃতি বহু দোষ ‘শূলভেদ’-প্রভাবে ছিন্ন হয়। শ্রাদ্ধকালে ব্রাহ্মণভোজনের মধ্যে পাঠ করলে পিতৃগণ আনন্দিত হন; শ্রোতারা মঙ্গল, আরোগ্য, দীর্ঘায়ু ও যশ লাভ করেন।

पुष्करिणीतीर्थमाहात्म्यं (Puṣkariṇī Tīrtha Māhātmya on the Revā’s Northern Bank)
মার্কণ্ডেয় ঋষি পাপহরণকারী এক পবিত্র পুষ্করিণীর কথা বলেন, যেখানে শুদ্ধির জন্য গমন করা উচিত। এটি রেবা (নর্মদা)-র উত্তর তীরে অবস্থিত এবং অতিশয় মঙ্গলময়, কারণ বেদমূর্তি দিবাকর (সূর্য) সেখানে সদা বিরাজ করেন। এই তীর্থের মাহাত্ম্য কুরুক্ষেত্রের সমতুল্য—বিশেষত সর্বকামফল প্রদানকারী এবং দানের বৃদ্ধি ঘটায় বলে বর্ণিত। সূর্যগ্রহণকালে স্নান করে বিধিপূর্বক দান—ধনরত্ন, স্বর্ণ-রৌপ্য ও গবাদি পশু ইত্যাদি—করলে মহাফল লাভ হয়; ব্রাহ্মণকে স্বর্ণ-রৌপ্য দানের ফল তেরো দিন ধরে বৃদ্ধি পায় বলা হয়েছে। তিলমিশ্রিত জলে পিতৃ ও দেবতার তर्पণ তৃপ্তিদায়ক; পায়স, মধু ও ঘৃতসহ শ্রাদ্ধ পিতৃদের স্বর্গ ও অক্ষয় ফল দেয়। অক্ষত, বদর, বিল্ব, ইঙ্গুদ, তিল প্রভৃতি শস্য-ফল নিবেদনও অক্ষয় ফলদায়ক বলা হয়েছে। অন্তে সূর্যোপাসনাই মূল—স্নান, দিবাকরের পূজা, আদিত্যহৃদয় পাঠ এবং বৈদিক জপ। একটিমাত্র ঋক/যজুঃ/সাম মন্ত্র জপ করলেও সমগ্র বেদফল, পাপনাশ ও উৎকৃষ্ট লোকপ্রাপ্তি হয়। শেষে বলা হয়েছে, বিধিমতে সেখানে দেহত্যাগ করলে সূর্যসম্বন্ধীয় পরম পদ লাভ হয়।

रवितीर्थ-आदित्येश्वर-माहात्म्य एवं नर्मदास्तोत्रफलम् (Ravītīrtha–Ādityeśvara Māhātmya and the Fruit of the Narmadā Hymn)
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দিতে গিয়ে রভিতীর্থ ও আদিত্যেশ্বরের মহিমা বর্ণনা করেন—এটি এমন এক শ্রেষ্ঠ পবিত্র ক্ষেত্র, যা প্রসিদ্ধ তীর্থগুলির ফলকেও অতিক্রম করে। তিনি রুদ্রের সান্নিধ্যে শোনা কাহিনি বলেন: দুর্ভিক্ষকালে বহু ঋষি নর্মদা-তীরে সমবেত হয়ে বনঘেরা এক তীর্থভূমিতে পৌঁছান। সেখানে ফাঁসধারী ভয়ংকর নারী-পুরুষ তাদের ‘প্রভুদের’ কাছে তীর্থে যেতে তাগিদ দেয়। ঋষিরা তখন নর্মদার দীর্ঘ স্তোত্র পাঠ করে তাঁর পবিত্রকারী ও রক্ষাকারী শক্তির প্রশংসা করেন। দেবী প্রকাশিত হয়ে অসাধারণ বর দেন এবং মোক্ষাভিমুখ এক দুর্লভ আশ্বাসও প্রদান করেন। পরে স্নান-উপাসনায় রত পাঁচ শক্তিমান পুরুষ জানান—এই তীর্থের প্রভাবে ঘোর পাপও ক্ষয় হয়; তারা ভাস্কর-আরাধনা ও অন্তরে হরি-স্মরণ করে, যার রূপান্তরকারী ফল ঋষিরা প্রত্যক্ষ করেন। অধ্যায়ে রভিতীর্থের আচারবিধি নির্দিষ্ট করা হয়েছে—গ্রহণকালে ও পুণ্য তিথি-সন্ধিক্ষণে দর্শন, উপবাস, রাত্রিজাগরণ, দীপদান, বৈষ্ণব কথা ও বেদপাঠ, গায়ত্রী-জপ, ব্রাহ্মণ-সম্মান এবং অন্ন, স্বর্ণ, ভূমি, বস্ত্র, আশ্রয়, যান ইত্যাদি দান। ফলশ্রুতিতে শ্রদ্ধাবান শ্রোতার শুদ্ধি ও সূর্যলোকে বাসের কথা বলা হয়েছে, এবং গুরুতর নীতিভ্রষ্টদের কাছে তীর্থরহস্য প্রচারে সংযমের উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

शक्रतीर्थ-शक्रेश्वर-माहात्म्य (Glory of Śakra-tīrtha and Śakreśvara)
মার্কণ্ডেয় শ্রোতাকে নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত অতিশয় পুণ্যদায়ক শক্রতীর্থের কথা জানান, যা সঞ্চিত পাপ নাশকারী বলে খ্যাত। তীর্থের মাহাত্ম্য একটি কারণ-কথায় প্রতিষ্ঠিত—পূর্বে ইন্দ্র (শক্র) এখানে মহেশ্বর শিবের প্রতি গভীর ভক্তিতে কঠোর তপস্যা করেন; উমাপতি প্রসন্ন হয়ে তাঁকে দেবেন্দ্রত্ব, রাজসমৃদ্ধি এবং দানবজয়ের শক্তি বর দেন। এরপর বিধান দেওয়া হয়—কার্তিক কৃষ্ণ ত্রয়োদশীতে ভক্তিভরে উপবাস-ব্রত করলে পাপমোচন হয়, দুঃস্বপ্ন, অশুভ লক্ষণ এবং গ্রহ-শাকিনী প্রভৃতি উপদ্রব প্রশমিত হয়। শক্রেশ্বর দর্শন জন্মার্জিত দোষ নাশ করে বলা হয়েছে, এবং নানা নিষিদ্ধ কর্মের ক্ষেত্রেও এখানে শুদ্ধির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। শেষে স্বর্গকামী ভক্তের জন্য দানের নির্দেশ—বিশেষত সৎ ব্রাহ্মণকে গোধন (বা উপযুক্ত বাহন-পশু) দান করতে বলা হয়; তীর্থের ফল সংক্ষেপে ঘোষণা করে অধ্যায় সমাপ্ত হয়।

क्रोडीतीर्थ-माहात्म्य (Kroḍī Tīrtha Māhātmya) — The Glory of the Kroḍīśvara Shrine
এই অধ্যায়ে ঋষি মার্কণ্ডেয় রাজাকে ক্রোড়ীশ্বর নামে প্রসিদ্ধ তীর্থ দর্শনের বিধান বলেন। দানববিনাশের পর বিজয়োন্মত্ত দেবগণ ছিন্ন মস্তকসমূহ সংগ্রহ করে নর্মদার জলে বিসর্জন দেন এবং আত্মীয়তার স্মরণে স্নান করেন। পরে তাঁরা উমাপতি শিবকে প্রতিষ্ঠা করে লোকসিদ্ধি ও কল্যাণার্থে পূজা করেন; এই তীর্থই পৃথিবীতে “ক্রোড়ী” নামে পাপঘ্ন তীর্থরূপে খ্যাত হয়। বিধানে উভয় পক্ষের অষ্টমী ও চতুর্দশীতে ভক্তিসহ উপবাস, শূলিনের সম্মুখে রাত্রিজাগরণ, পবিত্র কাহিনি-শ্রবণ ও বেদাধ্যয়ন, প্রাতে ত্রিদশেশ্বর পূজা, পঞ্চামৃতাভিষেক, চন্দনলেপন, বিল্বপত্র-পুষ্পার্পণ, দক্ষিণাভিমুখ মন্ত্রজপ এবং নিয়ত জলনিমজ্জনের কথা বলা হয়েছে। পিতৃদের উদ্দেশে দক্ষিণমুখে তিলাঞ্জলি, শ্রাদ্ধ এবং বেদনিষ্ঠ সংযত ব্রাহ্মণদের ভোজন-দান করলে বহু গুণ পুণ্য বৃদ্ধি পায়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—নিয়মমতে তীর্থে মৃত্যু হলে, যতদিন অস্থি নর্মদাজলে থাকে ততদিন শিবলোকে দীর্ঘবাস; পরে ধনবান, সম্মানিত, সদাচারী ও দীর্ঘায়ু জন্ম লাভ হয় এবং শেষে ক্রোড়ীশ্বর পূজায় পরম গতি প্রাপ্তি ঘটে। রেবার উত্তর তীরে সত্যোপার্জিত ধনে মন্দির নির্মাণ, সকল বর্ণ ও নারীর জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী সুলভ—এ কথা বলে অধ্যায়টি উপসংহারে জানায় যে এই মাহাত্ম্য ভক্তিভরে শ্রবণ করলে ছয় মাসের মধ্যে পাপ নাশ হয়।

कुमारेश्वरतीर्थ-माहात्म्य (Kumāreśvara Tīrtha Māhātmya)
মার্কণ্ডেয় রাজশ্রোতাকে নির্দেশ দেন—অগস্ত্যেশ্বরের নিকটে নর্মদা-তীরে অবস্থিত প্রসিদ্ধ কুমারেশ্বর তীর্থে গমন করো। প্রাচীন কালে ষণ্মুখ (স্কন্দ) সেখানে গভীর ভক্তিতে আরাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেন, দেবসেনার নেতা হন এবং শত্রুদমনকারী শক্তি অর্জন করেন; সেই কারণেই নর্মদার তীরে এই স্থান মহাশক্তিশালী তীর্থরূপে খ্যাত। তীর্থযাত্রীদের জন্য বিধান বলা হয়েছে—একাগ্রচিত্ত ও ইন্দ্রিয়সংযমসহ সেখানে উপস্থিত হওয়া, বিশেষত কার্ত্তিক চতুর্দশী ও অষ্টমীতে বিশেষ ব্রত পালন। গিরিজানাথ (শিব)-এর দধি, দুধ ও ঘৃত দ্বারা অভিষেক, ভক্তিগীতি, এবং শাস্ত্রসম্মত পিণ্ডদান করা উচিত—বিশেষ করে বৈদিক কর্মে নিয়োজিত বিদ্বান ব্রাহ্মণদের উপস্থিতিতে। ফলশ্রুতি অনুযায়ী সেখানে যা দান করা হয় তা অক্ষয় হয়; এই তীর্থকে সর্বতীর্থময় বলা হয়েছে এবং কুমারের দর্শনে মহাপুণ্য লাভ হয়। শেষে বলা হয়—এই পুণ্যকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে সেখানে দেহত্যাগ করে, সে স্বর্গপ্রাপ্ত হয়; এ প্রভুর সত্য ঘোষণা।

अगस्त्येश्वरतीर्थमाहात्म्य (Agastyeśvara Tīrtha-Māhātmya)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় রাজাকে সম্বোধন করে অবন্তীখণ্ডের অতি পুণ্যতীর্থ “অগস্ত্যেশ্বর”-এর কথা বলেন। তীর্থটিকে পাপক্ষয়ের স্থাননির্ভর উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে, যেখানে যথাযথ আচরণে নৈতিক দোষ দূর হয়। এখানে প্রধান বিধান তীর্থস্নান—যা ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি মহাপাপের মোচনের সঙ্গে যুক্ত। সময়ও নির্দিষ্ট: কার্ত্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে স্নান করলে কাল, দেশ ও কর্ম একত্রে ধর্মবিধি হয়ে ওঠে। আরও বলা হয়েছে, সমাধিস্থ ও ইন্দ্রিয়সংযমী হয়ে ঘৃত দিয়ে দেবতার অভিষেক করতে হবে। দানবিধানেও ধন, পাদুকা, ছাতা, ঘৃতকম্বল এবং সকলকে অন্নদান—এসবের দ্বারা পুণ্যফল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। শিক্ষা এই যে, তীর্থযাত্রা কেবল ভ্রমণ নয়; নিয়ম, ভক্তি ও দানের সমন্বয়েই শুদ্ধি লাভ হয়।

Ānandeśvara-tīrtha Māhātmya (Glory of the Ānandeśvara Tīrtha)
এই অধ্যায়ে সংলাপের মাধ্যমে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ‘আনন্দেশ্বর’ তীর্থের মাহাত্ম্য বোঝান। অসুরবধের পর দেবতা ও অন্যান্য দিব্য সত্তারা মহেশ্বরকে পূজা করেন; তখন শিব গৌরীসহ ভৈরব-রূপ ধারণ করে নর্মদাতটে আনন্দময় নৃত্য করেন। সেই আদিঘটনার স্মৃতিতেই তীর্থটির নাম ‘আনন্দেশ্বর’ হয় এবং একে মহাপবিত্র শুদ্ধিকর স্থল বলে ঘোষণা করা হয়। এরপর আচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—অষ্টমী, চতুর্দশী ও পূর্ণিমায় দেবপূজা, সুগন্ধি দ্রব্যে অনুলেপন/অভিষেক, এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রাহ্মণ-সত্কার করা উচিত। গো-দান ও বস্ত্র-দানের প্রশংসাও আছে। বসন্তকালের ত্রয়োদশীতে বিশেষ শ্রাদ্ধবিধি, এবং ইঙ্গুদ, বদর, বিল্ব, অক্ষত ও জল প্রভৃতি সহজ নিবেদনের কথা বলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে পিতৃগণের দীর্ঘ তৃপ্তি ও বহু জন্ম ধরে বংশধারার স্থায়িত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্মকর্মের দূরগামী কল্যাণ তুলে ধরা হয়েছে।

मातृतीर्थमाहात्म्य (Mātṛtīrtha Māhātmya: The Glory of the Mothers’ Pilgrimage Site)
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে নির্দেশ দেন—নর্মদার দক্ষিণ তীরে সঙ্গমের নিকটে অবস্থিত অতুল মাতৃতীর্থে গমন করতে। সেখানে নদীতটে মাতৃগণ প্রকাশিত হয়েছিলেন; যোগিনীদের সভার প্রার্থনায় শিব—যিনি উমাকে অর্ধাঙ্গরূপে ধারণ করেন এবং নাগকে যজ্ঞোপবীতরূপে বহন করেন—তীর্থটিকে পৃথিবীতে প্রসিদ্ধ হওয়ার অনুমতি দিয়ে অন্তর্ধান করেন। এই দেবানুমোদনেই তীর্থের পবিত্রতা প্রতিষ্ঠিত। নবমী তিথিতে শুচি-নিয়মপরায়ণ ভক্ত উপবাস করে মাতৃগোচরে পূজা করবে; তাতে মাতৃগণ ও শিব প্রসন্ন হন। বন্ধ্যা, সন্তানহারা বা পুত্রহীন নারীদের জন্য মন্ত্র-শাস্ত্রজ্ঞ আচার্য পাঁচ রত্ন ও ফলসহ স্বর্ণকলশে স্নানবিধি আরম্ভ করান; পুত্রলাভের উদ্দেশ্যে কাঁসার পাত্রে স্নান করানো হয়। শেষে বলা হয়েছে—যে কামনা মনে করা হয় তা লাভ হয়, এবং মাতৃতীর্থের তুল্য কোনো তীর্থ নেই।

Luṅkeśvara/Liṅgeśvara Tīrtha Māhātmya and the Daitya Kālapṛṣṭha’s Boon
অধ্যায় ৬৭-এ মārkaṇḍেয় তীর্থকেন্দ্রিক ধর্মকথা বর্ণনা করেন। জলে অবস্থিত অত্যন্ত পুণ্যদায়ক তীর্থ ‘লুঙ্কেশ্বর’-এর পরিচয় দেওয়া হয়েছে; ‘লিঙ্গেশ্বর’ বা ‘স্পর্শ-লিঙ্গ’ যুক্তিতেও এর ব্যাখ্যা করা হয়। কাহিনির মূল হলো বর-সংকট। দৈত্য কালপৃষ্ঠ ধূমপান-ব্রতসহ কঠোর তপস্যা করে; পার্বতী শিবকে বর দিতে অনুরোধ করেন। শিব অনুচিত প্ররোচনায় বর দেওয়ার নৈতিক ঝুঁকি স্মরণ করিয়েও ভয়ংকর বর দেন—দৈত্য যার মাথায় হাত ছোঁয়াবে, সে ভস্ম হয়ে যাবে। দৈত্য সেই শক্তি শিবের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে ধাওয়া করে; শিব সাহায্য চান, নারদ বিষ্ণুর কাছে যান। বিষ্ণু মায়ায় মনোরম বসন্ত-উদ্যান ও মোহিনী কন্যা প্রকাশ করেন; কামমোহিত দৈত্য সামাজিক রীতির ইঙ্গিতে নিজের মাথায় নিজের হাত রাখে এবং তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট হয়। শেষে ফলশ্রুতি ও আচারের নির্দেশ—লুঙ্কেশ্বরে স্নান-পান করলে দেহের নানা অংশগত পাপ ও দীর্ঘকালীন কর্মবন্ধন নাশ হয়। নির্দিষ্ট তিথিতে উপবাস, বিদ্বান ব্রাহ্মণকে সামান্য দানও মহাপুণ্যবর্ধক বলা হয়েছে; তীর্থের পবিত্রতা রক্ষাকারী দেব-রক্ষকদের কথাও উল্লেখ আছে।

धनदतीर्थमाहात्म्य (Glory of Dhanada Tīrtha on the Southern Bank of the Narmadā)
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দেন—নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ধনদা-তীর্থে গমন করো। এই তীর্থ সর্বপাপ-নাশক এবং সকল তীর্থের ফলদায়ক বলে বর্ণিত। চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশীতে সাধক সংযমী হয়ে উপবাস করবে ও রাত্রিজাগরণ করবে। সেখানে ‘ধনদা’-র পঞ্চামৃতাভিষেক, ঘৃতপ্রদীপ অর্পণ এবং ভক্তিভরে গান-বাদ্য ইত্যাদি সেবার বিধান আছে। প্রভাতে দান গ্রহণে যোগ্য, বিদ্যা ও শাস্ত্রার্থে প্রতিষ্ঠিত, শ্রৌত-স্মার্ত আচরণে রত এবং শীল-সংযমসম্পন্ন ব্রাহ্মণদের সম্মান করতে বলা হয়েছে। গাভী, স্বর্ণ, বস্ত্র, পাদুকা, অন্ন এবং ইচ্ছানুসারে ছত্র ও শয্যা দান করলে তিন জন্মের পাপও সম্পূর্ণ নাশ হয় বলে ফলশ্রুতি। ফলভেদও বলা হয়েছে—অসংযমীর স্বর্গলাভ, সংযমীর মোক্ষ; দরিদ্রের বারংবার অন্নপ্রাপ্তি; সহজাত কুলীনতা ও দুঃখনাশ; এবং নর্মদাজলে রোগনাশ। বিশেষত ধনদা-তীর্থে বিদ্যাদান করলে নিরাময় সূর্যলোক লাভ হয়; আর রেবার দক্ষিণ তীরে দেবদ্রোণীতে প্রচুর দান-যজ্ঞাদি করলে শোকহীন শঙ্করলোক প্রাপ্তি হয়।

Maṅgaleśvara-liṅga Pratiṣṭhā and Aṅgāraka-vrata (मङ्गलेश्वरलिङ्गप्रतिष्ठा तथा अङ्गारकव्रत)
মার্কণ্ডেয় তীর্থযাত্রার ক্রমে শ্রেষ্ঠ মঙ্গলেশ্বর তীর্থের কথা বলেন। ভূমিপুত্র মঙ্গল (অঙ্গারক) সকল জীবের মঙ্গলার্থে এই শিবক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করেন। চতুর্দশী তিথিতে তীব্র ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে শঙ্কর-শশিশেখর মঙ্গলেশ্বর রূপে প্রকাশিত হন এবং বর প্রদান করেন। মঙ্গল জন্মে জন্মে অনুগ্রহ প্রার্থনা করে এবং জানায়—সে শিবদেহের স্বেদ থেকে উৎপন্ন, গ্রহমণ্ডলে বাস করে; দেবতাদের দ্বারা স্বনামে স্বীকৃতি ও পূজাও চায়। শিব বর দেন—এই স্থানে প্রভু মঙ্গলের নামেই প্রসিদ্ধ হবেন—এবং অন্তর্ধান করেন। পরে মঙ্গল যোগবল দ্বারা লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে পূজা করে। এরপর বিধান অংশে বলা হয়—মঙ্গলেশ্বর লিঙ্গ দুঃখনাশক; তীর্থে ব্রাহ্মণদের তৃপ্ত করা, বিশেষত পত্নীসহ আচার করা, এবং অঙ্গারক-ব্রত পালন করা উচিত। ব্রতশেষে শিবের উদ্দেশ্যে গাভী/বৃষ, লাল বস্ত্র, নির্দিষ্ট বর্ণের পশু, ছাতা-শয্যা, লাল মালা ও অনুলেপনাদি অন্তঃশুদ্ধিতে দান করার নির্দেশ আছে। উভয় পক্ষের চতুর্থী ও অষ্টমীতে শ্রাদ্ধ করতে এবং অর্থ-প্রতারণা বর্জন করতে বলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে পিতৃগণের যুগপর্যন্ত তৃপ্তি, শুভ সন্তান, উত্তম অবস্থাসহ পুনর্জন্ম, তীর্থপ্রভাবে দেহকান্তি, এবং ভক্তিভরে নিয়মিত পাঠকারীর পাপনাশের কথা বলা হয়েছে।

Ravi-kṛta Tīrtha on the Northern Bank of Revā (रविणा निर्मितं तीर्थम् — रेवोत्तरतीरमाहात्म्यम्)
মার্কণ্ডেয় ঋষি রেবা (নর্মদা)-র উত্তর তীরে অবস্থিত এক “অতিশয় দীপ্তিময়” তীর্থের বর্ণনা দেন, যা রবি (সূর্য) কর্তৃক নির্মিত বলে খ্যাত। এই তীর্থ পাপক্ষয়ের উপায়, এবং বলা হয়েছে—ভাস্কর স্বীয় অংশে নর্মদা-ভূমির এই উত্তর তীরে নিত্য বিরাজমান। এরপর কালবিধান বলা হয়—বিশেষত ষষ্ঠী, অষ্টমী ও চতুর্দশী তিথিতে স্নান করে, প্রেত/পিতৃদের উদ্দেশে ভক্তিভরে শ্রাদ্ধ করা কর্তব্য। ফল হিসেবে তৎক্ষণাৎ শুদ্ধি, সূর্যলোকে মহিমা লাভ, পরে স্বর্গ থেকে ফিরে শুদ্ধ কুলে জন্ম, ধনসম্পদ এবং জন্মজন্মান্তরে রোগমুক্তি—এইভাবে স্থান-কাল-ক্রিয়া-ফলকে একত্র করে সংক্ষিপ্ত তীর্থমাহাত্ম্য উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

Kāmeśvara-tīrtha Māhātmya (कामेश्वरतीर्थमाहात्म्य) / The Glory of the Kāmeśvara Sacred Site
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দিতে দিতে কামেশ্বর-সম্পর্কিত এক পবিত্র তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। সেখানে গৌরীর পরাক্রমশালী পুত্র গণাধ্যক্ষ সিদ্ধ-স্বরূপে বিরাজমান—এই স্থানের স্মরণ ও দর্শন ভক্তির উদ্দীপক এবং পাপক্ষয়কারী বলে বলা হয়েছে। অধ্যায়ে উপাসনার বিধি নির্দিষ্ট করা হয়েছে—ভক্তি ও সংযমসম্পন্ন সাধক প্রথমে স্নান করবে, তারপর পঞ্চামৃত দিয়ে অভিষেক করবে; পরে ধূপ ও নৈবেদ্য নিবেদন করে বিধিপূর্বক পূজা সম্পন্ন করবে। এর ফল হিসেবে সর্বপাপমোচন ও শুদ্ধি প্রতিশ্রুত। বিশেষ করে মার্গশীর্ষ মাসের অষ্টমী তিথিতে এই তীর্থে স্নান মহাফলদায়ক বলা হয়েছে। শেষে নীতিবাক্য—যে উদ্দেশ্যে আরাধনা করা হয়, সেই উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফল লাভ হয়; যে কামনা নিয়ে পূজা, সেই কামনাই সিদ্ধ হয়।

Maṇināgeśvara-tīrtha Māhātmya (मणिनागेश्वरतीर्थमाहात्म्य) — Origin Legend and Ritual Merits
মার্কণ্ডেয় রাজশ্রোতাকে নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত শুভ মণিনাগেশ্বর তীর্থের মাহাত্ম্য জানান। নাগরাজ মণিনাগ সকল জীবের কল্যাণে এই শিবক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করেন; একে পাপনাশক বলা হয়েছে। যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করেন—বিষধর সাপ কীভাবে ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করল? তখন কশ্যপের পত্নী কদ্রূ ও বিনতার উচ্ছৈঃশ্রবা ঘোড়ার রং নিয়ে পণ, কদ্রূর প্রতারণা, সাপদের ঘোড়ার কেশ কালো করতে বাধ্য করা, কারও মান্য করা ও কারও মাতৃশাপের ভয়ে পালিয়ে জলভূমি ও নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ার প্রাচীন বংশকথা বর্ণিত হয়। শাপের পরিণামভয়ে মণিনাগ নর্মদার উত্তর তীরে কঠোর তপস্যা করে অবিনশ্বর তত্ত্বে ধ্যান করেন। তখন ত্রিপুরান্তক শিব আবির্ভূত হয়ে ভক্তির প্রশংসা করেন, তাকে বিপদ থেকে রক্ষা ও উচ্চতর বাসস্থান এবং বংশকল্যাণের বর দেন। মণিনাগের প্রার্থনায় শিব অংশরূপে সেখানে অবস্থান স্বীকার করেন এবং লিঙ্গ প্রতিষ্ঠার আদেশ দেন—এভাবেই তীর্থের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী অংশে নির্দিষ্ট তিথিতে পূজাকাল, দধি-মধু-ঘৃত-ক্ষীর দ্বারা অভিষেক, শ্রাদ্ধবিধি, দানদ্রব্য ও পুরোহিতদের আচরণনীতি বলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে পাপমোচন, শুভ গতি, সাপ-ভয় নিবারণ এবং তীর্থকথা শ্রবণ-পাঠে বিশেষ পুণ্যের কথা ঘোষিত।

गोपारेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Gopāreśvara Tīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়টি প্রশ্ন–উত্তরধর্মী। যুধিষ্ঠির মুনি মার্কণ্ডেয়কে জিজ্ঞাসা করেন—নর্মদার দক্ষিণ তীরে মণিনাগের কাছে “গোর দেহ থেকে নির্গত লিঙ্গ” কেন প্রতিষ্ঠিত, এবং তা কীভাবে পাপ-নাশক। মার্কণ্ডেয় বলেন, লোককল্যাণের জন্য সুরভি/কপিলা গাভী মহেশ্বরের ভক্তিসহ ধ্যান ও তপস্যা করেন; শিব প্রসন্ন হয়ে প্রকাশিত হন এবং সেই তীর্থে বাস করতে সম্মত হন, তাই একবার স্নানেই দ্রুত শুদ্ধি লাভের খ্যাতি জন্মায়। এরপর দানধর্মের বিধি নির্দিষ্ট করা হয়—ভক্তিভরে “গোপারেশ্বর-গোদান” করতে হবে: যোগ্য গাভীকে (নির্দেশিত স্বর্ণ/অলংকারসহ) উপযুক্ত ব্রাহ্মণকে দান। কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী বা অষ্টমী, বিশেষত কার্ত্তিক মাসে, এর মহাফল বলা হয়েছে। প্রেতোদ্ধারের জন্য পিণ্ডদান, দৈনিক রুদ্র-নমস্কারকে পাপক্ষয়কারী, এবং বৃষোৎসর্গকে পিতৃকল্যাণ ও শিবলোকে দীর্ঘ সম্মানপ্রাপ্তির কারণ বলা হয়—বৃষের লোমসংখ্যার অনুপাতে সেখানে মান লাভ হয়, পরে শুভ জন্মও ঘটে। শেষে নর্মদার দক্ষিণ তীরে গোপারেশ্বর তীর্থের মহিমা ও লিঙ্গের অলৌকিক উৎপত্তি তীর্থপবিত্রতার চিহ্ন হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

Gautameśvara-tīrtha Māhātmya (गौतमेश्वरतीर्थमाहात्म्य) — Revā’s Northern Bank
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় সংলাপরূপে রেবা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত অতিশয় দীপ্তিমান গৌতমেশ্বর তীর্থের মাহাত্ম্য সংক্ষেপে বর্ণনা করেন। এর উৎপত্তি ঋষি গৌতমের সঙ্গে যুক্ত; লোককল্যাণের জন্য তিনি এটি প্রতিষ্ঠা করেন, এবং পুরাণীয় পুণ্যভাষায় একে ‘স্বর্গে ওঠার সোপান’ বলা হয়েছে। যে ভক্তিভরে ‘লোকগুরু’ দেবতার সান্নিধ্যে এই তীর্থে তীর্থযাত্রা করে, তার পাপক্ষয়, নৈতিক শুদ্ধি ও স্বর্গবাসের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জয়লাভ, দুঃখনাশ, সৌভাগ্যবৃদ্ধি ইত্যাদি ফলও উল্লেখিত; পিতৃকর্মে একবার পিণ্ডদানেই বংশের তিন পুরুষের উদ্ধার হয়—এমন দাবিও আছে। শেষে বলা হয়—ভক্তিসহকারে অল্প বা অধিক যা-ই দান করা হোক, গৌতমের প্রভাবে তা বহুগুণ ফল দেয়। এই তীর্থকে ‘তীর্থসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ’ বলা হয়েছে এবং রুদ্রের উক্তি হিসেবে শৈব প্রামাণ্যও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

Śaṅkhacūḍa-tīrtha-māhātmya (Glory of the Śaṅkhacūḍa Tīrtha on the Narmadā)
মার্কণ্ডেয় নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত অতি পবিত্র ‘শঙ্খচূড়’ তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। বলা হয়, শঙ্খচূড় সেখানে বর্তমান; বৈনতেয় (গরুড়)-ভয়ের থেকে নিরাপত্তা লাভের জন্যই সে ঐ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে—এই ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। এরপর সাধকের জন্য বিধান—শুচি হয়ে একাগ্রচিত্তে তীর্থে গিয়ে দুধ, মধু ও ঘৃত প্রভৃতি মঙ্গলদ্রব্যে ক্রমান্বয়ে শঙ্খচূড়ের অভিষেক করতে হবে এবং দেবতার সম্মুখে রাত্রিজাগরণ (জাগরণ) পালন করতে হবে। প্রশংসিত ব্রতধারী ব্রাহ্মণদের সম্মান করে দধিভক্ত প্রভৃতি অন্ন-ভোগ দান করতে হবে এবং শেষে গো-দান দিতে হবে; একে সর্বপাপহর পবিত্র কর্ম বলা হয়েছে। শেষে বিশেষ ফলশ্রুতি—এই তীর্থে সাপের কামড়ে কষ্টপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে যে তুষ্ট/প্রসন্ন করে, সে শঙ্করের বচনানুসারে পরম লোক লাভ করে; তীর্থমাহাত্ম্য করুণা ও মুক্তিফলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমাপ্ত হয়।

Pāreśvara-Tīrtha Māhātmya and Parāśara’s Vrata on the Narmadā (Chapter 76)
মার্কণ্ডেয় বলেন, নর্মদার পুণ্য তীরে পাড়েশ্বর-তীর্থে ঋষি পরাশর যোগ্য পুত্রলাভের উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা করেন। তখন দেবী—গৌরী নারায়ণী, শঙ্করের পত্নী—প্রকাশিত হয়ে তাঁর ভক্তির প্রশংসা করেন এবং বর দেন: সত্যনিষ্ঠ, শুচি, বেদাধ্যয়নে নিবিষ্ট ও শাস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী এক পুত্র তিনি লাভ করবেন। পরাশর লোককল্যাণের জন্য দেবীকে সেই স্থানে স্থায়ীভাবে বিরাজ করার প্রার্থনা করলে দেবী ‘তথাস্তु’ বলে সেখানে অব্যক্তভাবে অবস্থান করেন। এরপর পরাশর পার্বতীর প্রতিষ্ঠা করেন এবং শঙ্করকেও স্থাপন করেন; দেবতাকে অজেয় ও দেবতাদের পক্ষেও দুর্লভ বলে বর্ণনা করেন। অধ্যায়ে তীর্থভিত্তিক ব্রতবিধান দেওয়া হয়েছে—শুদ্ধ, সংযতচিত্ত, কাম-ক্রোধমুক্ত নারী-পুরুষ ভক্তদের জন্য; শুভ মাস ও শুক্লপক্ষকে বিশেষ প্রশস্ত বলা হয়েছে। উপবাস, রাত্রিজাগরণ, দীপদান এবং ভক্তিমূলক গান-নৃত্যাদি নির্দেশিত। ব্রাহ্মণদের পূজা ও দান—ধন, স্বর্ণ, বস্ত্র, ছাতা, শয্যা, তাম্বুল, অন্ন ইত্যাদি—এবং শ্রাদ্ধের বিধি, দিকনির্দেশসহ আসনবিন্যাস, নারী ও শূদ্রদের জন্য ‘আমা-শ্রাদ্ধ’ ভেদও বলা হয়েছে। শেষে ফলশ্রুতি—শ্রদ্ধায় শ্রবণ করলে মহাপাপ থেকে মুক্তি ও পরম কল্যাণ লাভ।

भीमेश्वरतीर्थे जपदानव्रतफलप्रशंसा | Bhīmeśvara Tīrtha: Praise of Japa, Dāna, and Vrata-Fruits
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় ভীমেশ্বর তীর্থের মাহাত্ম্য ও সাধন-পদ্ধতি বর্ণনা করেন। ভীমেশ্বরকে পাপক্ষয়কারী তীর্থ বলা হয়েছে, যেখানে শুভ নিয়ম-অনুশীলনকারী ঋষিসমূহের সমাবেশ ঘটে। বিধান হলো—ভীমেশ্বরে গমন করে তীর্থস্নান, উপবাস ও ইন্দ্রিয়সংযম পালন, এবং সূর্য উপস্থিত থাকাকালে দিনে উর্ধ্ববাহু হয়ে ‘একাক্ষর’ মন্ত্রজপ করা। এরপর জপ, দান ও ব্রতের ফল ক্রমান্বয়ে প্রশংসিত—বহুজন্মের সঞ্চিত পাপ বিনাশ এবং গায়ত্রী-জপের বিশেষ শুদ্ধিকারিতা। বৈদিক বা লৌকিক—পুনঃপুন জপের শক্তি মন্ত্রকে এমন করে তোলে যে তা অশুচি দগ্ধ করে, যেমন অগ্নি শুকনো ঘাস পোড়ায়। নীতিশিক্ষা হিসেবে বলা হয়েছে—‘দৈবশক্তি’কে অজুহাত করে পাপাচার করা উচিত নয়; অজ্ঞতা দ্রুত নাশ হতে পারে, কিন্তু পাপ তাতে ন্যায্য হয় না। শেষে বলা হয়, এই তীর্থে সামর্থ্য অনুযায়ী দান করলে অক্ষয় ফল লাভ হয়।

नारदतीर्थ-नारदेश्वर-माहात्म्य (Glory of Nārada’s Tīrtha and Nāradeśvara)
এই অধ্যায়টি সংলাপরূপে নারদতীর্থ ও নারদেশ্বরের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে। মার্কণ্ডেয় মুনি নারদপ্রতিষ্ঠিত এক পরম তীর্থের কথা বলেন; যুধিষ্ঠির তার উৎপত্তি জানতে চান। এরপর কাহিনি রেবা (নর্মদা) নদীর উত্তর তীরে নারদের কঠোর তপস্যায় গিয়ে পৌঁছায়; সেখানে ঈশ্বর প্রকাশ হয়ে বর দেন—যোগসিদ্ধি, অচঞ্চল ভক্তি, লোকান্তরে স্বেচ্ছাগমন, ত্রিকালজ্ঞান এবং স্বর-গ্রাম-মূর্চ্ছনা প্রভৃতি সঙ্গীততত্ত্বে পারদর্শিতা; সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দেন যে নারদের তীর্থ বিশ্ববিখ্যাত ও পাপনাশক হবে। শিব অন্তর্ধান করলে নারদ সর্বজনকল্যাণে শূলিন শিবকে প্রতিষ্ঠা করে তীর্থ স্থাপন করেন। এরপর তীর্থযাত্রার নীতি ও বিধান বলা হয়েছে—ইন্দ্রিয়সংযম, উপবাস, ভাদ্রপদ কৃষ্ণ চতুর্দশীতে রাত্রিজাগরণ, যোগ্য ব্রাহ্মণকে ছাতা ইত্যাদি দান, অস্ত্রে নিহতদের শ্রাদ্ধ, পিতৃকল্যাণে কপিলা গাভী দান, দানধর্ম ও ব্রাহ্মণভোজন, দীপদান এবং মন্দিরে ভক্তিগীতি-নৃত্য। হব্যবাহন/অগ্নির পূজা ও হোম (চিত্রভানু প্রমুখ দেবসহ) দারিদ্র্যনাশ ও সমৃদ্ধিদায়ক বলা হয়েছে। শেষে রেবার উত্তর তীরে অবস্থিত এই তীর্থকে মহাপাপনাশক পরম তীর্থ বলে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

दधिस्कन्द-मधुस्कन्दतीर्थमाहात्म्य / The Māhātmya of Dadhiskanda and Madhuskanda Tīrthas
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় রাজশ্রোতার উদ্দেশ্যে উপদেশ দেন যে দধিস্কন্দ ও মধুস্কন্দ—এই দুই তীর্থ অত্যন্ত প্রশংসিত এবং পাপক্ষয়কারী। সাধককে সেখানে গমন করে স্নান ও শ্রদ্ধাসহ দান-ধর্ম পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দধিস্কন্দ তীর্থে স্নানের পর দ্বিজকে দধি (দই) দান করার বিধান আছে। এর ফলে বহু জন্ম ধরে রোগ, বার্ধক্যজনিত কষ্ট, শোক ও ঈর্ষা থেকে মুক্তি এবং দীর্ঘকাল “শুদ্ধ” বংশে জন্মলাভের কথা বলা হয়েছে। মধুস্কন্দ তীর্থে মধু-মিশ্রিত তিল দান এবং পৃথকভাবে মধু-মিশ্রিত পিণ্ড অর্পণ করলে বহু জন্মে যমলোক দর্শন না হওয়া এবং পৌত্র-প্রপৌত্রসহ বংশে স্থায়ী সমৃদ্ধি লাভের ফলশ্রুতি ঘোষিত। শেষে দধি-মিশ্রিত পিণ্ডের নির্দেশও আছে এবং বলা হয়েছে—স্নানের পর দক্ষিণমুখে থেকে ক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এতে পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ বারো বছর তৃপ্ত থাকেন—পিতৃকর্মের কার্যকারিতা স্পষ্টভাবে প্রতিপাদিত।

नन्दिकेश्वरतीर्थमाहात्म्य — Nandikeśvara Tīrtha Māhātmya
মার্কণ্ডেয় ঋষি রাজাকে জানান যে সিদ্ধ নন্দীর সঙ্গে সম্পর্কিত নন্দিকেশ্বর তীর্থ অতি পবিত্র ও শ্রেষ্ঠ। নন্দী সংযমী তীর্থযাত্রার আদর্শ—রেবা নদীকে অগ্রে রেখে তিনি তীর্থে তীর্থে গমন করে অবিরত তপস্যা করেন। দীর্ঘ তপস্যায় সন্তুষ্ট শিব বর দিতে চাইলে নন্দী ধন, সন্তান বা ভোগ কামনা না করে জন্মে জন্মে—এমনকি অন্য যোনিতেও—শিবের পদপদ্মে অচঞ্চল ভক্তি প্রার্থনা করেন। শিব ‘তথাস্তु’ বলে তাঁকে নিজ ধামে নিয়ে যান এবং তীর্থের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে, এখানে স্নান ও ত্রিনয়ন শিবের পূজা করলে অগ্নিষ্টোম যজ্ঞসম পুণ্য লাভ হয়। এই তীর্থে দেহত্যাগ করলে শিবসান্নিধ্য, অক্ষয় কল্পে দীর্ঘ ভোগ এবং পরে শুদ্ধ বংশে বেদজ্ঞান ও দীর্ঘায়ু সহ শুভ জন্ম প্রাপ্তি হয়। শেষে তীর্থের দুর্লভতা ও পাপনাশিনী শক্তি বিশেষভাবে ঘোষিত।

Varuṇeśvara-tīrtha Māhātmya (Glory of Varuṇeśvara Shrine and Charity)
মার্কণ্ডেয় ঋষি রাজাকে উপদেশ দেন যে তিনি মহাপুণ্য বরুণেশ্বর তীর্থে গমন করুন। সেখানে বলা হয়েছে—বরুণ কৃচ্ছ্র ও চন্দ্রায়ণ প্রভৃতি তপস্যার দ্বারা গিরিজানাথ শিবকে প্রসন্ন করে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। অধ্যায়ে তীর্থাচারের বিধান আছে: যে ব্যক্তি সেখানে স্নান করে পিতৃ ও দেবতাদের তर्पণ করে এবং ভক্তিভরে শঙ্করের পূজা করে, সে পরম গতি লাভ করে। এরপর দানের বিশেষ নির্দেশ—কুণ্ডিকা/বর্ধনী বা বৃহৎ জলপাত্র অন্নসহ দান করা শ্রেষ্ঠ; এর ফল বারো বছরের সত্রযজ্ঞের পুণ্যের সমতুল্য বলে ফলশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আরও বলা হয়, দানের মধ্যে অন্নদান সর্বোত্তম এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রীতিদায়ক। যে সৎসংস্কারযুক্ত চিত্তে এই তীর্থে দেহত্যাগ করে, সে প্রলয় পর্যন্ত বরুণপুরীতে বাস করে; পরে মানবলোকে জন্ম নিয়ে নিয়ত অন্নদাতা হয় এবং শতবর্ষ জীবিত থাকে।

Vahnītīrtha–Kauberatīrtha Māhātmya (Glory of the Fire Tīrtha and Kubera Tīrtha)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় রাজাকে উদ্দেশ করে তীর্থবিধির উপদেশ দেন। প্রথমে তিনি নর্মদাতটে অবস্থিত বহ্নীতীর্থের নির্দেশ করেন—দণ্ডকারণ্য-প্রসঙ্গের পর হুতাশন (অগ্নি) এখানে শুদ্ধি লাভ করেছিলেন বলে খ্যাত। সেখানে স্নান, মহেশ্বর-পূজা, ভক্তিকর্ম এবং পিতৃ ও দেবতাদের উদ্দেশে তর্পণ-আদি আচারের বিধান আছে; প্রতিটি ক্রিয়ার নির্দিষ্ট ফল বলা হয়েছে এবং কিছু আচারের ফল মহাযজ্ঞসমতুল্য বলে ঘোষিত। এরপর কৌবেরতীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়, যেখানে কুবের যক্ষদের অধিপতি পদ লাভ করেন। সেখানে স্নান, উমাসহ জগদ্গুরুর পূজা এবং দানধর্ম—বিশেষত ব্রাহ্মণকে স্বর্ণদান—নির্দেশিত, সঙ্গে পুণ্যের পরিমাপও উল্লেখ আছে। শেষে “নর্মদা তীর্থ-পঞ্চক” প্রশংসা করে উত্তম পরলোকগতি ও প্রলয়ে অন্য জল ক্ষীণ হলেও রেবার চিরপবিত্রতা অটুট থাকে—এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

हनूमन्तेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Hanūmanteśvara Tīrtha Māhātmya)
Chapter 83 unfolds as a theological discourse between Mārkaṇḍeya and Yudhiṣṭhira concerning a Revā-bank tīrtha called Hanūmanta/Hanūmanteśvara, described as capable of removing grave demerit (including brahmahatyā-type impurity). The chapter first frames the site’s identity: a distinguished liṅga on the southern bank of the Revā. Yudhiṣṭhira asks how the name Hanūmanteśvara arose. Mārkaṇḍeya narrates an epic backstory: after the Rāma–Rāvaṇa conflict and the destruction of rākṣasas, Hanumān is warned by Nandinī that he bears a burden of impurity from extensive killing and is directed to the Narmadā for austerity and bathing. Hanumān performs prolonged worship; Śiva appears with Umā, reassures him of purity through Narmadā māhātmya and divine दर्शन, and grants additional boons, including enumerated honorific names of Hanumān. Hanumān then establishes a liṅga—Hanūmānīśvara/Hanūmanteśvara—described as wish-granting and indestructible. A second exemplum provides “pratyakṣa-pratyaya” (a demonstrative proof) through a later narrative involving King Supārva and his son Śatabāhu, a morally wayward ruler who encounters a brāhmaṇa tasked with immersing bone-remains at Hanūmanteśvara. The brāhmaṇa recounts a princess’s previous-life memory: her body was killed in the forest; a bone fragment fell into the Narmadā at Hanūmanteśvara, resulting in a meritorious rebirth and strong ethical constraint against remarriage. The rite of collecting and immersing remaining bones is prescribed with temporal markers (Aśvina month, dark fortnight, and Śiva-related tithi), alongside night vigil and post-rite bathing. The narrative culminates in heavenly ascent imagery for those properly aligned, while also warning about greed and mental attachment that can obstruct purification. The chapter closes with ritual prescriptions: specific days (aṣṭamī, caturdaśī; especially Aśvina kṛṣṇa caturdaśī), abhiṣeka substances (honey-milk, ghee, curd with sugar, kuśa-water), sandal paste anointing, bilva and seasonal flowers, lamp offering, śrāddha with qualified brāhmaṇas, and strong emphasis on go-dāna as a superior gift. It articulates a theological rationale for the cow as “sarvadevamayī,” and ends with a phala claim: even distant remembrance of Hanūmanteśvara is said to relieve demerit.

Kapitīrtha–Hanūmanteśvara–Kumbheśvara Māhātmya (कपितीर्थ–हनूमन्तेश्वर–कुम्भेश्वर माहात्म्य)
অধ্যায় ৮৪-এ মার্কণ্ডেয় ঋষি এক প্রাচীন কাহিনি স্মরণ করে বলেন, যার পটভূমি কৈলাসে দেবোপদেশ লাভের প্রসঙ্গে। রাবণ-বধের পর রাক্ষসনাশ ও ধর্ম-প্রতিষ্ঠার পরে হনুমান কৈলাসে আসেন, কিন্তু নন্দী প্রথমে তাঁকে বাধা দেন। হনুমান রাক্ষস-বধজনিত অবশিষ্ট দোষ ও তার প্রায়শ্চিত্ত জানতে চাইলে শিব পবিত্র নদীগুলির কথা বলে সোমনাথের নিকটে রেবা (নর্মদা) নদীর দক্ষিণ তীরে এক শ্রেষ্ঠ তীর্থ নির্দেশ করেন; সেখানে স্নান ও কঠোর তপস্যায় সেই অন্ধকার/দোষ দূর হয়। শিব হনুমানকে আলিঙ্গন করে বর দেন এবং স্থানটিকে ‘কপিতীর্থ’ ঘোষণা করে ‘হনূমন্তেশ্বর’ নামে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন; পাপনাশ, পিতৃকার্য ও দানফল-বৃদ্ধিতে এর মহিমা বর্ণিত। পরে রাম নিজেও রেবা-তীরে (বিশেষত ২৪ বছর) তপস্যা করেন, রাম-লক্ষ্মণ লিঙ্গ স্থাপন করেন, এবং ঋষিদের তীর্থজল-সংগ্রহ ও কুম্ভ-জলের উপাখ্যান থেকে ‘কুম্ভেশ্বর/কালাকুম্ভ’ প্রকাশ পায়। ফলশ্রুতিতে রেবা-স্নান, লিঙ্গদর্শন (ত্রি-লিঙ্গ দর্শনের বিশেষ ইঙ্গিত), শ্রাদ্ধের দ্বারা দীর্ঘকাল পিতৃউদ্ধার, এবং দান—বিশেষত গোদান ও মূল্যবান দানের—অক্ষয় ফলের কথা বলা হয়েছে। শেষে জ্যোতিষ্মতীপুড়ী ও তার আশেপাশে কুম্ভেশ্বরাদি লিঙ্গ নিয়মসহ দর্শনের উপদেশ দিয়ে তীর্থটিকে রেবাখণ্ডের প্রধান তীর্থযাত্রা-স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

सोमनाथतीर्थमाहात्म्य (Somānātha Tīrtha Māhātmya at Revā-saṅgama)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির মার্কণ্ডেয়কে জিজ্ঞাসা করেন—রেবাসঙ্গমের যে তীর্থকে কাশীর সমান পুণ্যদায়ক ও ব্রহ্মহত্যা-নাশক বলা হয়, তার মাহাত্ম্য কী। মার্কণ্ডেয় সৃষ্টিবংশের ধারায় দক্ষ ও চন্দ্রদেব সোমের কথা বলেন—দক্ষের শাপে সোম ক্ষয়প্রাপ্ত হন; তখন সোম ব্রহ্মার শরণ নেন, আর ব্রহ্মা রেবার দুর্লভ তীর্থস্থানগুলিতে, বিশেষত সঙ্গমে, তপস্যা ও পূজা করার নির্দেশ দেন। সোম দীর্ঘকাল শিবের ভক্তিতে আরাধনা করেন; শিব প্রসন্ন হয়ে আবির্ভূত হন এবং এক মহাশক্তিশালী লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করান, যা দুঃখ ও মহাপাপ নাশ করে। উদাহরণ হিসেবে রাজা কণ্বর কাহিনি—হরিণরূপী এক ব্রাহ্মণকে বধ করায় তিনি ব্রহ্মহত্যাদোষে আক্রান্ত হন; রেবাসঙ্গমে স্নান করে সোমনাথের পূজা করলে লালবস্ত্রধারিণী কন্যারূপে ব্রহ্মহত্যা তাকে অনুসরণ করলেও তীর্থপ্রভাবে তিনি মুক্ত হন। এরপর ব্রতবিধান—নির্দিষ্ট তিথিতে উপবাস, রাত্রিজাগরণ, পঞ্চামৃতাভিষেক, নৈবেদ্য-দীপ-ধূপ, সঙ্গীত-বাদ্য, যোগ্য ব্রাহ্মণদের সম্মান-দান এবং নৈতিক সংযম। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—সোমনাথ তীর্থে প্রদক্ষিণা, শ্রবণ ও নিয়মিত সাধনায় মহাপাপ ক্ষয় হয়, স্বাস্থ্য-সমৃদ্ধি লাভ হয় এবং উচ্চলোক প্রাপ্তি ঘটে; সোমের দ্বারা বিভিন্ন স্থানে বহু লিঙ্গ প্রতিষ্ঠার কথাও উল্লেখিত।

Piṅgaleśvara-pratiṣṭhā at Piṅgalāvarta (Agni’s Cure at Revā)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির রেবার উত্তর তীরে সঙ্গমের নিকটে পিঙ্গলাবর্তে প্রতিষ্ঠিত পিঙ্গলেশ্বরের উৎপত্তি সম্পর্কে মার্কণ্ডেয়কে প্রশ্ন করেন। মার্কণ্ডেয় বলেন—হব্যবাহন অগ্নি রুদ্রের বীর্যদাহে দগ্ধ হয়ে রোগাক্রান্ত হন। তখন তিনি তীর্থভ্রমণ করতে করতে রেবাতীরে এসে দীর্ঘকাল কঠোর তপস্যা করেন, বায়ুভক্ষণ প্রভৃতি নিয়ম পালন করে। শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন; অগ্নি নিজের ব্যাধিনাশ প্রার্থনা করেন। শিব সেই তীর্থে স্নানের বিধান করেন; স্নানমাত্রেই অগ্নি তৎক্ষণাৎ দিব্যরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কৃতজ্ঞ অগ্নি সেখানে পিঙ্গলেশ্বরের প্রতিষ্ঠা করেন এবং নামোচ্চারণসহ পূজা ও স্তোত্র পাঠ করেন। শেষে ফলশ্রুতি—যে ক্রোধ জয় করে সেখানে উপবাস করে, সে অসাধারণ ফল লাভ করে এবং শেষে রুদ্রসদৃশ গতি পায়। আরও বলা হয়েছে, অলংকৃত কপিলা গাভী বাছুরসহ যোগ্য ব্রাহ্মণকে দান করলে পরম লক্ষ্য লাভ হয়।

ऋणमोचनतीर्थमाहात्म्य (R̥ṇamocana Tīrtha Māhātmya) — The Glory of the Debt-Removing Pilgrimage Site
মার্কণ্ডেয় রাজাকে রেবা (নর্মদা) নদীর তীরে অবস্থিত অতি পুণ্য ‘ঋণমোচন’ তীর্থে গমন করতে উপদেশ দেন। এই তীর্থ ব্রহ্মবংশীয় ঋষিসভা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত—এ কথা বলে তার আচারগত মর্যাদা ও প্রামাণ্যতা স্থাপন করা হয়েছে। এখানে ‘ঋণ’ মোচনের প্রধান সাধনা বলা হয়েছে—যে সাধক ছয় মাস ভক্তিভরে পিতৃ-তর্পণ করে এবং নর্মদাজলে স্নান করে, সে দেবঋণ, পিতৃঋণ ও মানবঋণ থেকে বিশেষভাবে মুক্ত হয়। কর্মফল, পাপসহ, সেখানে ফলের মতো দৃশ্যমান হয়—এই বর্ণনা নৈতিক কারণ-কার্য সম্পর্ককে দৃঢ় করে। একাগ্রতা, ইন্দ্রিয়সংযম, স্নান, দান এবং গিরিজাপতি (শিব)-এর পূজা—এই আচরণ নির্দেশিত। ফল হিসেবে ঋণত্রয়মুক্তি এবং স্বর্গে দেবতুল্য দীপ্তিময় অবস্থা লাভ হয়।

Kapila-Tīrtha and Kapileśvara Pūjā (कापिलतीर्थ–कपिलेश्वरपूजा)
অধ্যায় ৮৮-এ কপিলতীর্থে পূজার বিধি ও ফলশ্রুতি বলা হয়েছে। কপিল মুনি প্রতিষ্ঠিত এই তীর্থকে সর্বপাপ-নাশক বলা হয়। মার্কণ্ডেয় রাজাকে উপদেশ দেন—শুক্লপক্ষের বিশেষত অষ্টমী ও চতুর্দশীতে স্নান করে দেবসেবা করতে হবে; কপিলা গাভীর দুধ ও ঘি দিয়ে কপিলেশ্বরের অভিষেক, শ্রীখণ্ড-চন্দন লেপন এবং সুগন্ধি শ্বেত পুষ্পে, ক্রোধ সংযত রেখে, পূজা করতে হবে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, কপিলেশ্বরভক্তরা যমের দণ্ডভূমি এড়িয়ে যায়; এই উপাসনায় পণ্ডিতেরা ভয়ংকর যাতনার দৃশ্যের সম্মুখীন হন না। পরে তীর্থযাত্রার নীতি সামাজিক কর্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করে বলা হয়েছে—রেবার পুণ্য জলে স্নানের পর শুভ ব্রাহ্মণদের ভোজন করাতে হবে এবং গরু, বস্ত্র, তিল, ছাতা ও শয্যার দান করতে হবে; এতে রাজা ধর্মিক হন। শেষে তেজ, বল, জীবিত পুত্র, মধুর বাক্য ও শত্রুপক্ষের অভাব—এই ফলগুলি উল্লেখ করা হয়েছে।

पूतिकेश्वरमाहात्म्य (Glory of Pūtikēśvara)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় এক রাজাকে উপদেশ দেন যে নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত পূতিকেশ্বরের মহাতীর্থ দর্শন করা উচিত; সেখানে স্নান করলে সর্বপাপ ক্ষয় হয়। তীর্থের প্রামাণ্য প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয়েছে—জাম্ববান লোককল্যাণের জন্য সেখানে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আরেক কাহিনিতে রাজা প্রসেনজিত ও তাঁর বক্ষস্থলের সঙ্গে যুক্ত এক মণির উল্লেখ আছে; রত্নটি জোর করে খুলে নেওয়া বা ফেলে দিলে ক্ষত সৃষ্টি হয়। সেই তীর্থেই তপস্যার ফলে আরোগ্য লাভ করে তিনি ‘নির্ব্রণ’ (ক্ষতহীন) হন—এতে তীর্থের চিকিৎসাশক্তি প্রকাশ পায়। এরপর বিধান বলা হয়—ভক্তিভরে স্নান করে পরমেশ্বরের পূজা করলে ইষ্টসিদ্ধি হয়। বিশেষত কৃষ্ণাষ্টমী ও চতুর্দশীতে নিয়মিত আরাধনা করলে যমলোকগমন হয় না—এমন ফলশ্রুতি দ্বারা পুরাণীয় নৈতিক কার্যকারণ বোঝানো হয়েছে।

चक्रतीर्थ-माहात्म्य (Cakratīrtha Māhātmya) and जलशायी-तीर्थ (Jalśāyī Tīrtha) on the Revā/Narmadā
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে চক্রতীর্থের উৎপত্তি, বিষ্ণুর অতুল শক্তি এবং রেবা/নর্মদা-সম্পর্কিত পুণ্যের ফল ব্যাখ্যা করেন। তালমেঘ নামক এক দানব দেবতাদের পরাভূত করে; দেবগণ প্রথমে ব্রহ্মার শরণ নেন, পরে ক্ষীরসাগরে জলশায়ী বিষ্ণুর স্তব করেন। বিষ্ণু বিশ্ব-ব্যবস্থা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গরুড়ে আরোহণ করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং ক্রমে অস্ত্র-প্রতিস্ত্রের সংঘাতে শেষে সুদর্শন চক্র নিক্ষেপ করে দানবকে বধ করেন। বিজয়ের পর সুদর্শন চক্র রেবার জলে জলশায়ী-তীর্থের নিকটে পতিত হয়ে ‘শুদ্ধ’ হয়—এতেই চক্রতীর্থের নাম ও মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত। পরবর্তী অংশে মার্গশীর্ষ মাসের শুক্ল একাদশী প্রভৃতি শুভ সময়ে সংযম ও ভক্তিসহ স্নান, দেবদর্শন, রাত্রিজাগরণ, প্রদক্ষিণা, নিবেদন এবং যোগ্য ব্রাহ্মণদের দ্বারা শ্রাদ্ধকর্মের বিধান বলা হয়েছে। তিলধেনু-দান বিষয়ে দাতার নীতি, দানের শুদ্ধতা এবং মৃত্যুর পরে ভয়ংকর লোক অতিক্রম করে নিরাপদ গতি লাভের ফল উল্লেখ করে শ্রবণ-পাঠের ফলশ্রুতি দিয়ে অধ্যায় সমাপ্ত।

चण्डादित्य-तीर्थ-माहात्म्य (Glory of the Caṇḍāditya Tīrtha)
মার্কণ্ডেয় ঋষি রাজাকে চণ্ডাদিত্য-তীর্থের পরম পবিত্র মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। নর্মদার শুভ তীরে ভয়ংকর দৈত্য চণ্ড ও মুণ্ড দীর্ঘ তপস্যা করে ত্রিলোকের অন্ধকার-নাশক সূর্য (ভাস্কর)-কে ধ্যান করে। সহস্রাংশু প্রসন্ন হয়ে বর দেন; তারা সকল দেবতার বিরুদ্ধে অজেয়তা এবং সর্বদা রোগমুক্ত থাকার বর প্রার্থনা করে। সূর্য সেই বর দান করে তাদের ভক্তিপূর্ণ স্থাপনার মাধ্যমে ঐ স্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চণ্ডাদিত্যরূপে প্রসিদ্ধ হন। এরপর তীর্থযাত্রার বিধি ও ফল বলা হয়েছে—আত্মসিদ্ধির জন্য সেখানে গমন, দেব-মানব-পিতৃদের উদ্দেশে তর্পণ, এবং ঘৃতপ্রদীপ অর্পণ; বিশেষত ষষ্ঠী তিথিতে। চণ্ডভানু/চণ্ডাদিত্যের উৎপত্তিকথা শ্রবণে পাপক্ষয় হয়, সূর্যলোক লাভ হয়, এবং দীর্ঘকাল বিজয় ও রোগমুক্তি স্থায়ী হয়।

Yamahāsya-tīrtha Māhātmya (यमहास्यतीर्थमाहात्म्य) — Theological Discourse on the ‘Yamahāsya’ Shrine on the Narmadā
এই অধ্যায়টি সংলাপরূপে রচিত। যুধিষ্ঠির মার্কণ্ডেয়কে নর্মদা-তীরের ‘যমহাস্য’ তীর্থের উৎপত্তি জানতে চান। মার্কণ্ডেয় বলেন, ধর্মরাজ যম আগে রেবা-নদীতে স্নান করতে এসে একবার নিমজ্জনেই যে মহাশুদ্ধি হয় তা দেখে ভাবেন—পাপভারাক্রান্ত লোকেরাও তাঁর লোকেই পৌঁছে যায়, অথচ রেবা-স্নানকে শুভ, এমনকি বৈষ্ণব-গতি দানকারী বলা হয়। যারা সক্ষম হয়েও পবিত্র নদীর দর্শন করে না, তাদের প্রতি যম হাসেন এবং সেখানে ‘যমহাসেশ্বর’ দেবতার প্রতিষ্ঠা করে প্রস্থান করেন। এরপর ব্রতবিধান—আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষ চতুর্দশীতে ভক্তিসহ উপবাস, রাত্রিজাগরণ এবং ঘৃতপ্রদীপে দেবতাকে জাগানো; এটিকে নানা দোষনাশক বলা হয়েছে। অমাবস্যায় ক্রোধজয় করে ব্রাহ্মণসম্মান ও দানধর্ম নির্দেশিত—স্বর্ণ/ভূমি/তিল, কৃষ্ণাজিন, তিলধেনু এবং বিশেষভাবে মহিষী-ধেনুদানের বিস্তারিত আচার। যমলোকের ভয়ংকর যন্ত্রণার তালিকাও আছে, কিন্তু তীর্থস্নান ও দানের প্রভাবে সেগুলি নিষ্প্রভ হয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—এই মাহাত্ম্য শ্রবণমাত্রেই দোষক্ষয় হয় এবং যমধামের দর্শন রোধ হয়।

कल्होडीतीर्थमाहात्म्य (Kalhoḍī Tīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে রেবাতট (নর্মদা-তীর) অবস্থিত প্রসিদ্ধ কল্হোড়ী-তীর্থের মাহাত্ম্য বোঝান। তীর্থটি ভারতবর্ষে পাপহর ও গঙ্গার ন্যায় শুদ্ধিদায়ক বলে খ্যাত; সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখানে পৌঁছানো দুরূহ—এতেই তার অসাধারণ পবিত্রতা প্রকাশ পায়। ‘এটি পুণ্য তীর্থ’—শূলিন (শিব)-এর উক্তি হিসেবে এর প্রামাণ্য স্থাপিত হয়; আরও বলা হয়, জাহ্নবী (গঙ্গা) পশুরূপে সেখানে স্নান করতে এসেছিলেন—এই কাহিনি তীর্থখ্যাতির কারণরূপে বর্ণিত। পূর্ণিমায় তিন রাত্রির ব্রত পালন ও রজ-তম, ক্রোধ, দম্ভ/প্রদর্শন এবং ঈর্ষা ত্যাগের বিধান আছে। তিন দিন ধরে প্রতিদিন তিনবার, বাছুরসহ গাভীর দুধে মধু মিশিয়ে তাম্রপাত্রে দেবতার অভিষেক করতে হবে এবং ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ মন্ত্র জপ করতে হবে। ফলশ্রুতিতে স্বর্গলাভ ও দিব্য নারীদের সান্নিধ্য বলা হয়েছে; যথাবিধি স্নান ও মৃতদের উদ্দেশ্যে দান করলে পিতৃগণ তৃপ্ত হন। বিশেষ দান হিসেবে শ্বেত বাছুরসহ গাভীকে বস্ত্রালঙ্কৃত করে স্বর্ণসহ শুদ্ধ ও গৃহধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণকে দান করলে শাম্ভব-লোক প্রাপ্তি হয়।

नन्दितीर्थ-माहात्म्य (Nanditīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে নর্মদা-তীরে অবস্থিত নন্দিতীর্থে তীর্থযাত্রার ক্রমবিধি জানান। তীর্থটি অতি মঙ্গলময় ও সর্বপাপ-নাশক বলে বর্ণিত, এবং পূর্বকালে শৈব-পরিচর নন্দি কর্তৃক নির্মিত হওয়ায় এর মাহাত্ম্য বিশেষভাবে প্রতিপাদিত। নন্দিনাথে এক অহোরাত্র (দিন-রাত্রি) অবস্থান করার বিধান আছে—সময়-নিয়ন্ত্রিত বাস সাধনার ফল বৃদ্ধি করে। নন্দিকেশ্বরের উদ্দেশ্যে পঞ্চোপচার পূজার নির্দেশ দিয়ে তীর্থসেবাকে শাস্ত্রসম্মত ভক্তি-পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। দানকর্মের কথাও বলা হয়েছে—বিশেষত ব্রাহ্মণদের রত্নদান—যাতে তীর্থযাত্রা নৈতিক বণ্টন ও ধর্মাচরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। ফলশ্রুতিতে পিনাকী শিবের পরম ধাম লাভ, সর্বকল্যাণ, এবং অপ্সরাদের সান্নিধ্যে দিব্য ভোগের কথা বলা হয়েছে—মোক্ষ ও স্বর্গীয় পুরস্কারের পুরাণীয় সংমিশ্রণরূপে।

Badrikāśrama–Narmadā-tīra: Śiva-liṅga-sthāpana, Vrata, and Śrāddha-Vidhi (Chapter 95)
মার্কণ্ডেয় রাজাকে উপদেশ দেন—শম্ভু পূর্বে যে শ্রেষ্ঠ তীর্থের প্রশংসা করেছেন, সেই মহিমান্বিত বদরিকাশ্রম তীর্থে গমন করো। এ স্থান নর-নারায়ণের সঙ্গে যুক্ত; যে জনার্দনের ভক্ত হয়ে সকল জীবের মধ্যে—উচ্চ-নীচ নির্বিশেষে—সমতা দেখে, সে দেবতার প্রিয় হয়। নর-নারায়ণ আশ্রম স্থাপন করেন এবং লোককল্যাণার্থে সেখানে শঙ্কর প্রতিষ্ঠিত হন; ত্রিমূর্তিসংযুক্ত শিবলিঙ্গ স্বর্গপথ ও মুক্তি প্রদান করে বলা হয়েছে। ব্রতাচরণে শৌচ, একরাত্রি উপবাস, রজ-তম ত্যাগ করে সাত্ত্বিক ভাব গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট তিথিতে রাত্রিজাগরণ—মধুমাসের অষ্টমী, উভয় পক্ষের চতুর্দশী, বিশেষত আশ্বিনে—বিধেয়। শিবের অভিষেক পঞ্চামৃত (দুধ, মধু, দই, চিনি, ঘি) দ্বারা করার নির্দেশ আছে। ফলশ্রুতিতে শিবসান্নিধ্য ও ইন্দ্রলোকে গতি; শূলপাণিকে অসম্পূর্ণ প্রণামও বন্ধন শিথিল করে, আর “নমঃ শিবায়” জপ স্থির পুণ্য দান করে। নর্মদাজলে শ্রাদ্ধবিধিও বলা হয়েছে—যোগ্য ব্রাহ্মণকে দান, দুরাচারী/অযোগ্য পুরোহিত বর্জন। স্বর্ণ, অন্ন, বস্ত্র, গাভী, বৃষ, ভূমি, ছাতা প্রভৃতি দান প্রশংসিত এবং স্বর্গপ্রাপ্তি কথিত। তীর্থে বা নিকটে, জলে মৃত্যুও হলে শিবধাম, দীর্ঘ দিব্যলোকবাস, পরে স্মৃতিসম্পন্ন সক্ষম রাজা হয়ে জন্ম নিয়ে পুনরায় সেই তীর্থে আগমনের কথা বলা হয়েছে।

Koṭīśvara-tīrtha Māhātmya (कोटीश्वरतीर्थमाहात्म्य) — Theological Account of the Koṭīśvara Pilgrimage Site
মার্কণ্ডেয় রাজাকে উপদেশ দেন—সর্বোত্তম তীর্থ কোṭীশ্বরে গমন করো। এই স্থানের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই কথায় যে এখানে ‘ঋষিদের এক কোটি’ সমবেত হয়েছিলেন। পরে বলা হয়, শ্রেষ্ঠ ঋষিগণ শুভ বৈদিক মন্ত্রপাঠে পারদর্শী দ্বিজদের সঙ্গে পরামর্শ করে লোককল্যাণ ও রক্ষার জন্য সেখানে শঙ্কর-লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন; এই ধাম বন্ধনমোচক, সংসারচ্ছেদক এবং জীবের দুঃখনাশক। পূর্ণিমায় ভক্তিভরে স্নান বিশেষ ফলদায়ক, বিশেষত শ্রাবণ পূর্ণিমায়। এরপর পিতৃকর্মের প্রসঙ্গ—তর্পণ ও বিধিপূর্বক পিণ্ডদান করলে পিতৃগণ প্রলয় পর্যন্ত অক্ষয় তৃপ্তি লাভ করেন। অধ্যায়ের শেষে রেবা-তীরে অবস্থিত এই তীর্থকে গোপন ও পরম পিতৃস্থান বলে বর্ণনা করা হয়েছে; ঋষিনির্মিত এই স্থান সর্বজীবকে মোক্ষ প্রদান করে।

Vyāsatīrtha-prādurbhāvaḥ — Origin and Merit of Vyāsa Tīrtha (व्यासतीर्थप्रादुर्भावः)
এই অধ্যায়ে মাৰ্কণ্ডেয় রাজা যুধিষ্ঠিরকে ব্যাসতীর্থের দুর্লভতা ও মহাপুণ্য-প্রভাব জানান। তীর্থটি ‘অন্তরিক্ষে অবস্থিত’ বলে খ্যাত, যা রেবা/নর্মদার আশ্চর্য শক্তির ফল—এ কথা ব্যাখ্যা করা হয়। এরপর কারণ-কথা বিস্তৃত—পরাশরের তপস্যা, নৌকার কন্যার রাজকুলজাত সত্যবতী/যোজনগন্ধা রূপে প্রকাশ, চিঠিবাহী তোতার মাধ্যমে বীজ-প্রেরণ, তোতার মৃত্যু, মাছের মধ্যে বীজ প্রবেশ এবং কন্যার উদ্ভব—যার পরিণতিতে মহর্ষি ব্যাসের জন্ম ঘটে। তারপর ব্যাসের তীর্থযাত্রা ও নর্মদাতীরে তপস্যার কথা আসে। শিব পূজায় প্রসন্ন হয়ে দর্শন দেন এবং নর্মদাও ব্যাসের স্তোত্রে অনুগ্রহ করেন। এক ধর্ম-সমস্যা ওঠে—ঋষিরা দক্ষিণ তীরে পার হলে ব্রতভঙ্গের আশঙ্কায় আতিথ্য গ্রহণ করতে চান না; ব্যাস নর্মদাকে প্রার্থনা করেন, প্রথমে তিনি অস্বীকার করেন, ব্যাস মূর্ছিত হন, দেবগণ উদ্বিগ্ন হন, শেষে নর্মদা সম্মতি দেন। এরপর স্নান, তর্পণ, হোম প্রভৃতি এবং লিঙ্গ-প্রাদুর্ভাবের মাধ্যমে তীর্থের নাম প্রতিষ্ঠিত হয়। শেষভাগে কার্ত্তিক শুক্ল চতুর্দশী ও পূর্ণিমায় মহাফলদায়ক ব্রতবিধি, লিঙ্গাভিষেকের দ্রব্য, পুষ্পার্পণ, মন্ত্রজপের বিকল্প, যোগ্য ব্রাহ্মণ-পাত্রের লক্ষণ ও দানবস্তুর নির্দেশ আছে। ফলশ্রুতিতে যমলোকের ভয় থেকে রক্ষা, অর্ঘ্য-দান অনুযায়ী ক্রমবর্ধমান ফল এবং তীর্থ-মহিমায় শুভ পরলোকগতি প্রতিপাদিত হয়েছে।

प्रभासेश्वर-माहात्म्य (Prabhāseśvara Māhātmya) — The Glory of the Prabhāseśvara Tīrtha
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে ত্রিলোকে প্রসিদ্ধ ‘স্বর্গ-সোপান’খ্যাত প্রভাসেশ্বর তীর্থ দর্শনে যেতে নির্দেশ দেন। যুধিষ্ঠির তীর্থের উৎপত্তি ও ফল সংক্ষেপে জানতে চান। কাহিনিতে প্রভা—রবি (সূর্য)-পত্নী—নিজ দুর্ভাগ্যজনিত দুঃখে এক বছর বায়ুভক্ষণ করে কঠোর তপস্যা ও ধ্যানে নিমগ্ন থাকেন; শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন। প্রভা বলেন, নারীর দেবতা স্বামীই—গুণদোষ নির্বিশেষে—এবং নিজের কষ্ট নিবেদন করেন। শিব কৃপায় স্বামীর অনুগ্রহ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন; উমা তা বাস্তবে কীভাবে হবে প্রশ্ন করলে নর্মদার উত্তর তীরে ভানু উপস্থিত হন। শিব সূর্যকে প্রভাকে রক্ষা ও সন্তুষ্ট করতে বলেন; উমা প্রভাকে পত্নীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ করার অনুরোধ করেন, সূর্য সম্মতি দেন। প্রভা তীর্থ ‘উন্মীলন’-এর জন্য সূর্যের একাংশ সেখানে স্থিত থাকার বর চান; সর্বদেবময় লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয়ে ‘প্রভাসেশ’ নামে খ্যাত হয়। এরপর তীর্থযাত্রার বিধি বলা হয়েছে—প্রভাসেশ্বরে স্নানাদি করলে তৎক্ষণাৎ কাম্য ফল লাভ হয়, বিশেষত মাঘ শুক্ল সপ্তমীতে। ব্রাহ্মণ-নির্দেশে অশ্ব-সংযোগ, ভক্তিভরে স্নান ও দ্বিজদের দান নির্দিষ্ট; গো-দানের বিশেষ লক্ষণসহ দানবিধি বর্ণিত। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, এখানে স্নান ও বিশেষত কন্যাদান মহাপাপও নাশ করে; সূর্যলোক ও রুদ্রলোক প্রাপ্তি এবং মহাযজ্ঞসম ফল দেয়। গো-দানের মহিমা চিরন্তন বলে প্রশংসিত, বিশেষ করে চতুর্দশীর গুরুত্ব উল্লেখিত।

Nāgeśvara-liṅga at the Southern Bank of Revā (Vāsuki’s Atonement and Tīrtha Procedure) / रेवायाः दक्षिणतटे नागेश्वरलिङ्गमाहात्म्यम्
এই অধ্যায়টি প্রশ্নোত্তরধর্মী। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন—রেবা (নর্মদা) নদীর দক্ষিণ তীরে বাসুকি কেন প্রতিষ্ঠিত? মার্কণ্ডেয় বলেন—শম্ভুর নৃত্যের সময় শিবের মুকুট থেকে গঙ্গাজল-মিশ্রিত ঘাম নির্গত হয়; এক সাপ তা পান করায় মাণ্ডাকিনী ক্রুদ্ধ হন এবং শাপসদৃশ ফলে সে অজগর-ভাব (অবনত/বাধাগ্রস্ত অবস্থা) প্রাপ্ত হয়। তখন বাসুকি বিনীত বাক্যে নদীর পবিত্রকারী শক্তির স্তব করে করুণা প্রার্থনা করে। গঙ্গা তাকে বিন্ধ্যে শঙ্করের উদ্দেশে তপস্যা করতে বলেন। দীর্ঘ তপস্যার পর শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন এবং রেবার দক্ষিণ তীরে বিধিপূর্বক স্নান করতে নির্দেশ দেন। বাসুকি নর্মদায় প্রবেশ করে শুদ্ধ হয়; সেখানে পাপহর প্রসিদ্ধ নাগেশ্বর-লিঙ্গ প্রতিষ্ঠার কথা বর্ণিত। পরিশেষে তীর্থবিধি ও ফলশ্রুতি—অষ্টমী বা চতুর্দশীতে মধু দিয়ে শিবাভিষেক; সঙ্গমে স্নানে নিঃসন্তান ব্যক্তি সৎ সন্তান লাভ করে; উপবাসসহ শ্রাদ্ধে পিতৃগণ শান্তি পান; এবং নাগপ্রসাদে বংশ সাপের ভয়ে রক্ষিত থাকে।

Mārkaṇḍeśa Tīrtha Māhātmya (मार्कण्डेशतीर्थमाहात्म्य) — Summary of Merits and Ritual Observances
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় মুনি রাজাকে “মহীপাল” ও “পাণ্ডুনন্দন” বলে সম্বোধন করে নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত অতিশয় প্রশংসিত মার্কণ্ডেশ তীর্থে তীর্থযাত্রার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, এ স্থান দেবতাদেরও আরাধ্য এবং শৈব-উপাসনার গোপন পীঠ। নিজে পূর্বে সেখানে পবিত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং শঙ্করের কৃপায় তাঁর মধ্যে মুক্তিদায়ক জ্ঞান উদিত হয়েছিল—এ কথাও তিনি সাক্ষ্যরূপে জানান। তীর্থে জলে প্রবেশকালে জপ করলে সঞ্চিত পাপ ক্ষয় হয়; মন, বাক্য ও কর্মজনিত দোষও শুদ্ধ হয়। দক্ষিণদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পিণ্ডিকা ধারণ করে শূলধারী শিবের নানা রূপে একাগ্র ভক্তিযোগে পূজা করলে দেহান্তে শিবলোকে গমন হয়—এমন ফলশ্রুতি বলা হয়েছে। অষ্টমীর রাত্রিতে ঘৃতপ্রদীপ জ্বালালে স্বর্গলাভ, এবং সেখানে শ্রাদ্ধ করলে প্রলয় পর্যন্ত পিতৃগণের তৃপ্তি হয়। ইঙ্গুদ, বদর, বিল্ব, অক্ষত বা শুধু জল দিয়ে তর্পণ করলে বংশের জন্য ‘জন্মফল’ লাভ হয়—এইভাবে নির্দিষ্ট নদীতটের সঙ্গে যুক্ত সংক্ষিপ্ত আচার-ফলবিধান উপস্থাপিত।

Saṅkarṣaṇa-Tīrtha Māhātmya (संकर्षणतीर्थमाहात्म्य) — The Glory of Saṅkarṣaṇa Tīrtha
অধ্যায় ১০১-এ মার্কণ্ডেয় রাজাকে বলেন—নর্মদার উত্তর তীরে, যজ্ঞবাটের মধ্যভাগে ‘সঙ্কর্ষণ’ নামে এক অতি পুণ্য তীর্থ আছে, যা পাপ নাশ করে। এই তীর্থের মাহাত্ম্য বলভদ্রের পূর্বতপস্যা এবং সেখানে শম্ভু-উমা, কেশব ও দেবগণের নিত্য সান্নিধ্যের কারণে প্রতিষ্ঠিত। প্রাণীদের কল্যাণার্থে বলভদ্র পরম ভক্তিতে সেখানে শঙ্করের প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্থানটিকে যাগ-অনুষ্ঠানের কেন্দ্ররূপে স্থির করেন। বিধান বলা হয়েছে—যে ভক্ত ক্রোধ ও ইন্দ্রিয় সংযত করে সেখানে স্নান করবে, সে শুক্লপক্ষের একাদশীতে মধু দিয়ে শিবের অভিষেক করে পূজা করবে। সেখানে পিতৃদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ-দানও অনুমোদিত; বলভদ্রের ঘোষণানুসারে এতে পরম স্থান লাভ হয়।

मन्मथेश्वर-तीर्थमाहात्म्य (Glory of the Manmatheśvara Tīrtha)
এই অধ্যায়ে মুনি মার্কণ্ডেয় রাজশ্রোতাকে দেবতাপূজিত শৈব তীর্থ ‘মন্মথেশ্বর’-এ গমন ও স্নানের বিধি এবং পুণ্যফলের ক্রম ব্যাখ্যা করেন। কেবল স্নানকেই রক্ষাকারী ও পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে; মনঃশুদ্ধিসহ স্নান ও একরাত্রি উপবাসে মহৎ ফল লাভ হয়; তিনরাত্রি ব্রত‑আচরণে ক্রমে অধিকতর পুণ্য অর্জিত হয়। রাত্রিতে দেবতার সম্মুখে জাগরণ, গান‑বাদ্য, নৃত্য প্রভৃতি ভক্তিকর্ম পরমেশ্বরকে প্রসন্ন করে—এ কথা বলা হয়েছে। মন্মথেশ্বরকে স্বর্গারোহণের ‘সোপান’ রূপে বর্ণনা করে কামকেও শুদ্ধ ভক্তির পথে পবিত্রভাবে প্রবাহিত করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যাকালে শ্রাদ্ধ ও দানের বিধান আছে; বিশেষত অন্নদানের প্রশংসা করা হয়েছে। চৈত্র শুক্ল ত্রয়োদশীতে গোদান এবং রাত্রিজাগরণে ঘৃতপ্রদীপ অর্পণের নির্দেশ দিয়ে শেষে নারী‑পুরুষ উভয়ের জন্য সমান পুণ্যফল ঘোষণা করা হয়েছে।

एरण्डीसङ्गममाहात्म्य — The Māhātmya of the Eraṇḍī–Reva Confluence
অধ্যায় ১০৩ বহুস্তরীয় সংলাপে গঠিত। মার্কণ্ডেয় রাজাকে এরণ্ডী–রেবা সঙ্গমে যেতে নির্দেশ দেন এবং স্মরণ করান—শিব পার্বতীকে এ তীর্থের কথা “গুপ্তেরও অধিক গুপ্ত” রহস্যরূপে বলেছিলেন। শিব অত্রি ও অনসূয়ার সন্তানহীনতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, সন্তান কুলধর্ম রক্ষার আশ্রয় এবং পরলোক-কল্যাণের সহায়। অনসূয়া রেবার উত্তর তীরে সঙ্গমে দীর্ঘ তপস্যা করেন—গ্রীষ্মে পঞ্চাগ্নি, বর্ষায় চন্দ্রায়ণ, শীতে জলবাস; প্রতিদিন স্নান, সন্ধ্যা, দেব-ঋষি তর্পণ, হোম ও পূজা। এরপর ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র গোপন দ্বিজরূপে এসে নিজেদের ঋতু-তত্ত্ব প্রকাশ করেন—বর্ষা/বীজ, শীত/পালন, গ্রীষ্ম/শোষণ—এবং বর প্রদান করেন; ফলে তীর্থের চিরপবিত্রতা ও মনস্কামনা-সিদ্ধির শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে বিশেষত চৈত্র মাসে সঙ্গমস্নান, রাত্রিজাগরণ, দ্বিজভোজন, পিণ্ডদান, প্রদক্ষিণা ও দানবিধির নির্দেশ আছে, যার পুণ্য বহুগুণ বলা হয়েছে। দ্বিতীয় উপাখ্যানে গৃহস্থ গোবিন্দ কাঠ কুড়োতে গিয়ে অনিচ্ছায় শিশুমৃত্যুর কারণ হয়; পরে দেহযন্ত্রণা কর্মফলরূপে দেখা দেয়। সঙ্গমস্নান ও পূজা-দান দ্বারা সে মুক্তি পায়—এটি প্রায়শ্চিত্ত ও তীর্থাচরণের নীতিশিক্ষা। শেষে শ্রবণ-পাঠ, সেখানে বাস/উপবাস, এমনকি জল-মাটি স্পর্শমাত্রেও পুণ্যবৃদ্ধির ফলশ্রুতি ঘোষিত।

सौवर्णशिला-तीर्थमाहात्म्य (Glory of the Sauvarṇaśilā Tīrtha)
মার্কণ্ডেয় রাজাকে উপদেশ দেন—রেবার উত্তর তীরে সঙ্গমের নিকটে প্রসিদ্ধ সৌবর্ণশিলা তীর্থে গমন করো। এ স্থান সর্বপাপহর, পূর্বে ঋষিগণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, দুর্লভ এবং ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও অত্যন্ত শক্তিশালী পুণ্যক্ষেত্র বলে বর্ণিত। বিধান ক্রমানুসারে—সৌবর্ণশিলায় স্নান, মহেশ্বরের পূজা, ভাস্কর (সূর্য)-কে প্রণাম, তারপর ঘৃতমিশ্রিত বিল্ব বা বিল্বপত্র দিয়ে পবিত্র অগ্নিতে আহুতি। একটি সংক্ষিপ্ত প্রার্থনাও দেওয়া হয়েছে—প্রভু প্রসন্ন হোন এবং রোগনাশ করুন। এরপর দানের মাহাত্ম্য—যোগ্য ব্রাহ্মণকে স্বর্ণদানকে বহু স্বর্ণদান ও মহাযজ্ঞের শ্রেষ্ঠ ফলের সমতুল্য বলা হয়েছে। এতে মৃত্যুর পরে স্বর্গারোহণ, রুদ্রের সান্নিধ্যে দীর্ঘকাল অবস্থান, পরে অবতরণে শুদ্ধ ও সমৃদ্ধ বংশে শুভ জন্ম এবং সেই তীর্থজলের স্মৃতি অটুট থাকার ফল কথিত।

करञ्जातीर्थगमनफलम् | The Merit of Going to the Karañjā Tīrtha
এই অধ্যায়ে মুনি মার্কণ্ডেয় ‘রাজেন্দ্র’-কে করঞ্জা তীর্থগমনের বিধি ও ফল সংক্ষেপে বলেন। উপবাস পালন করে ও ইন্দ্রিয়সংযমে স্থিত থেকে সাধক করঞ্জায় গমন করবে; সেখানে স্নানমাত্রেই সে সর্ব পাপ থেকে মুক্ত হয়—এ কথা ঘোষিত। এরপর ভক্তিভরে মহাদেবের পূজা এবং শ্রদ্ধাসহ দান করার ক্রম নির্দেশিত। দানের দ্রব্য হিসেবে স্বর্ণ, রৌপ্য, মণি‑মুক্তা‑প্রবাল প্রভৃতি, এবং পাদুকা, ছাতা, শয্যা, আচ্ছাদন ইত্যাদি উপযোগী সামগ্রীর উল্লেখ আছে। এই তীর্থসেবা‑শৈবপূজা‑দানধর্মের ফল ‘কোটি‑কোটি গুণ’ বলে মহিমা কীর্তিত।

Mahīpāla Tīrtha Māhātmya (Auspiciousness Rite to Umā–Rudra) | महीपालतीर्थमाहात्म्य (उमारुद्र-सौभाग्यविधिः)
এই অধ্যায়ে মārkaṇḍeya রাজাকে মহীপাল-তীর্থের মাহাত্ম্য ও বিধান জানান। নর্মদা-তীরে অবস্থিত এই তীর্থকে অতিশয় মনোরম ও সৌভাগ্যদায়ক বলা হয়েছে; নারী-পুরুষ উভয়েরই, বিশেষত দুর্ভাগ্যপীড়িতদের জন্য এটি কল্যাণকর। এখানে উমা ও রুদ্রের বিশেষ পূজার নির্দেশ আছে—ইন্দ্রিয়সংযমসহ শুদ্ধ আচরণ, তৃতীয়া তিথিতে উপবাস, এবং যোগ্য ব্রাহ্মণ দম্পতিকে ভক্তিভরে নিমন্ত্রণ। আতিথ্য-সেবায় সুগন্ধি, মালা, সুগন্ধ বস্ত্র, পায়স ও কৃসরা (খিচুড়ি) দ্বারা ভোজন, তারপর প্রদক্ষিণা এবং মহাদেব-গৌরীর কৃপা ও অবিচ্ছেদ কামনা করে ভক্তিবাক্য উচ্চারণের কথা বলা হয়েছে। অবহেলা করলে দারিদ্র্য, শোক ও জন্মান্তর পর্যন্ত বন্ধ্যাত্বসহ দীর্ঘ দুর্ভাগ্য বাড়ে; আর বিশেষ করে জ্যৈষ্ঠ শুক্লপক্ষের তৃতীয়ায় বিধিপূর্বক করলে পাপনাশ হয় এবং দানে পুণ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ব্রাহ্মণী ও ব্রাহ্মণকে গৌরী-শিবের প্রতিমূর্তি জেনে পূজা, সিঁদুর-কুমকুমাদি মঙ্গলদ্রব্য অর্পণ, অলংকার, শস্য, অন্ন ও অন্যান্য দানের নির্দেশও আছে। ফলশ্রুতিতে পুণ্যবৃদ্ধি, শঙ্করানুগ ভোগ, প্রভূত সৌভাগ্য, নিঃসন্তানের পুত্রলাভ, দরিদ্রের ধনলাভ এবং নর্মদার এই তীর্থের কামনা-পরিপূরক স্বরূপ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

भण्डारीतीर्थमाहात्म्य (Bhaṇḍārī Tīrtha Māhātmya: The Glory of Bhaṇḍārī Pilgrimage Site)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় ঋষি রেবাখণ্ডের অন্তর্গত এক সংক্ষিপ্ত তীর্থ-উপদেশ রাজাকে প্রদান করেন। তিনি শ্রোতাকে মহিমান্বিত ভাণ্ডারী-তীর্থে গমন করতে বলেন এবং জানান যে সেখানে ধর্মফল এমন যে উনিশ যুগ পর্যন্ত ‘দারিদ্র্যচ্ছেদ’—দারিদ্র্যের বিনাশ—ঘটে। মাহাত্ম্যের কারণকথাও আছে—কুবের (ধনদ) সেখানে তপস্যা করেছিলেন; পদ্মসম্ভব ব্রহ্মা প্রসন্ন হয়ে সেই স্থানে অল্প দান করলেও ধনরক্ষার বর দেন। অতএব বিধান করা হয়—যে ভক্তিভরে সেখানে গিয়ে স্নান করে দান করে, তার ধনে ক্ষয় বা বিঘ্ন (বিত্ত-পরিচ্ছেদ) হয় না; সঞ্চয় নয়, তীর্থযাত্রা, ভক্তি ও নিয়ত দানেই সমৃদ্ধি স্থিত হয়।

रोहिणीतीर्थमाहात्म्य (Rohiṇī Tīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় রাজাকে রোহিণী-তীর্থের উপদেশ দেন—যা ত্রিলোকে প্রসিদ্ধ এবং পাপ-দোষ শোধনকারী। যুধিষ্ঠির তীর্থের ফল স্পষ্টভাবে জানতে চাইলে কাহিনি প্রলয়-পর্ব থেকে শুরু হয়: জলরাশির উপর শয়নকারী পদ্মনাভ/চক্রধারী বিষ্ণুর নাভি থেকে দীপ্ত পদ্ম উদ্ভূত হয় এবং সেখান থেকে ব্রহ্মার জন্ম। ব্রহ্মা নির্দেশ প্রার্থনা করলে বিষ্ণু তাঁকে সৃষ্টিকার্যে নিয়োজিত করেন; পরে ঋষিগণ, দক্ষবংশ এবং দক্ষের কন্যাদের উৎপত্তির বিবরণ আসে। চন্দ্রের পত্নীদের মধ্যে রোহিণীকে বিশেষ প্রিয় বলা হলেও সম্পর্কগত টানাপোড়েনে তিনি বৈরাগ্য গ্রহণ করে নর্মদা-তীরে তপস্যায় প্রবৃত্ত হন। তিনি ধাপে ধাপে উপবাস-ব্রত, বারংবার স্নান এবং নারায়ণী/ভবানী দেবীর শরণ-ভক্তি পালন করেন—যাঁকে রক্ষাকর্ত্রী ও দুঃখনাশিনী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। দেবী ব্রত-নিয়মে প্রসন্ন হয়ে রোহিণীর প্রার্থনা পূর্ণ করেন; তীর্থের নাম ও মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয়—এখানে স্নানকারী দম্পতির কাছে রোহিণীর ন্যায় প্রিয় হয়, আর এখানে দেহত্যাগ করলে সাত জন্ম পর্যন্ত দাম্পত্য-বিচ্ছেদ ঘটে না।

चक्रतीर्थमाहात्म्य (Cakratīrtha Māhātmya) — The Glory of Cakra Tīrtha at Senāpura
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় সেনাপুরে অবস্থিত চক্রতীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। তীর্থটি পাপক্ষয়কারী, দোষশোধক এবং অতুল পবিত্র বলে নির্দেশিত। কাহিনির পটভূমিতে মহাসেনের সেনাপত্যাভিষেকের অনুষ্ঠান—ইন্দ্রপ্রমুখ দেবগণের উপস্থিতি, দানবদমন ও দেবসেনার বিজয়ের উদ্দেশ্য—উল্লেখিত; সেই সময়ে রুরু নামক দানব বাধা সৃষ্টি করে ভয়ংকর যুদ্ধ আরম্ভ করে, যেখানে পুরাণসম্মত অস্ত্র-শস্ত্র ও ব্যূহের বিবরণ আসে। যুদ্ধের মোড় ঘোরে বিষ্ণুর সুদর্শনচক্রের প্রয়োগে—চক্র রুরুর মস্তকচ্ছেদ করে এবং অভিষেকের বিঘ্ন নাশ করে। মুক্ত চক্র দানবকে বিদীর্ণ করে শুদ্ধ জলে পতিত হলে সেই স্থানে ‘চক্রতীর্থ’ নাম ও তার পবিত্রকরণ-শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী অংশে ফলশ্রুতি: এখানে স্নান ও অচ্যুতপূজায় পুণ্ডরীক-যজ্ঞের ফল লাভ; স্নান করে সংযমী ব্রাহ্মণদের সম্মান করলে কোটি গুণ পুণ্য; আর ভক্তিভাবে এখানে দেহত্যাগ করলে বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তি, শুভ ভোগ এবং পরে শ্রেষ্ঠ বংশে পুনর্জন্ম। শেষে তীর্থকে ধন্য, দুঃখনাশক ও পাপনাশক বলে ঘোষণা করে পরবর্তী উপদেশের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

Cakratīrtha-Nikaṭa Vaiṣṇava-Tīrtha Māhātmya (Glorification of the Vaiṣṇava Tīrtha near Cakratīrtha)
মার্কণ্ডেয় এক শুদ্ধিদায়ক তীর্থযাত্রার ক্রম বর্ণনা করেন, যার পরিণতি চক্রতীর্থের নিকটে অবস্থিত এক বৈষ্ণব তীর্থে; এই তীর্থ প্রাচীনকালে বিষ্ণু (জনার্দন) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে কথিত। ভয়ংকর দানব-বধের পরে সেই সংঘর্ষজাত অবশিষ্ট দোষ ও পাপফল নিবারণের জন্য ভগবান এই তীর্থ স্থাপন করেন—এই কাহিনিই স্থানের মাহাত্ম্যের ভিত্তি। এখানে ক্রোধজয়, কঠোর তপস্যা ও মৌনব্রতের প্রশংসা করা হয়েছে; এমন সংযম দেব-অসুরের পক্ষেও সহজসাধ্য নয়। সংক্ষেপে বিধান—স্নান, যোগ্য দ্বিজাতিকে দান, এবং বিধিমতো জপ—এসব তৎক্ষণাৎ গুরুতর পাপও মোচন করে সাধককে বৈষ্ণব পদে অগ্রসর করে।

स्कन्दतीर्थ-सम्भवः (Origin and Merits of Skanda-Tīrtha on the Narmadā)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির স্কন্দের আবির্ভাব-প্রসঙ্গ এবং নর্মদা-তীরে অবস্থিত স্কন্দতীর্থের বিধি ও ফল বিস্তারিত জানতে চান। মার্কণ্ডেয় বলেন—সেনাপতি-শূন্য দেবগণ শিবের শরণ নেন। এরপর উমার প্রতি শিবের সংকল্প, দেবতাদের অনুরোধে অগ্নির মাধ্যমে দিব্য তেজ গ্রহণ, উমার ক্রোধজাত শাপ যাতে দেবদের সন্তান-পরম্পরা ব্যাহত হয়, এবং সেই তেজের ক্রমাগত স্থানান্তরের কাহিনি বর্ণিত। অগ্নি তেজ ধারণে অক্ষম হয়ে তা গঙ্গায় স্থাপন করে; গঙ্গা তা শরস্তম্বে (নলখাগড়ার ঝোপে) রেখে দেন। কৃত্তিকারা শিশুকে লালন করেন; সে ষণ্মুখ রূপে প্রকাশিত হয়ে কার্ত্তিকেয়, কুমার, গঙ্গাগর্ভ, অগ্নিজ প্রভৃতি নামে খ্যাত হয়। দীর্ঘ তপস্যা ও তীর্থপরিক্রমার পর স্কন্দ নর্মদার দক্ষিণ তীরে কঠোর তপস্যা করেন। শিব-উমা প্রসন্ন হয়ে তাঁকে চির সেনাপতি নিযুক্ত করেন এবং ময়ূরবাহন দান করেন। সেই স্থান স্কন্দতীর্থ নামে প্রসিদ্ধ—দুর্লভ ও পাপনাশক। এখানে স্নান ও শিবপূজায় যজ্ঞসম পুণ্য লাভ হয়; তিলমিশ্রিত জলে পিতৃতর্পণ এবং একটিমাত্র বিধিসম্মত পিণ্ডদানে পিতৃগণ বারো বছর তৃপ্ত থাকেন। এখানে কৃত কর্ম অক্ষয় হয়; শাস্ত্রবিধি মেনে দেহত্যাগ করলে শিবলোকে গতি এবং পরে বেদবিদ্যা, স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও বংশধারার সমৃদ্ধিসহ শুভ জন্ম লাভ হয়।

Āṅgirasatīrtha-māhātmya (Glory of the Āṅgirasa Tīrtha)
মার্কণ্ডেয় রাজ-সংবাদীকে নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত আঙ্গিরসতীর্থে যেতে নির্দেশ দেন এবং একে সর্বপাপ-বিনাশক, সর্বজন-পাবন বলে বর্ণনা করেন। এরপর তীর্থের উৎপত্তিকথা বলা হয়—বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণঋষি অঙ্গিরা যুগের আদিতে পুত্রলাভের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ তপস্যা করেন। তিনি ত্রিষবণ স্নান, নিত্য দেবজপ, মহাদেবের পূজা এবং কৃচ্ছ্র ও চন্দ্রায়ণ প্রভৃতি কঠোর নিয়মে শিবকে আরাধনা করেন। বারো বছর তপস্যার পর শিব প্রসন্ন হয়ে বর দিতে চান। অঙ্গিরা এমন এক পুত্র প্রার্থনা করেন যিনি বেদবিদ্যায় পারদর্শী, সংযমী আচরণসম্পন্ন, বহু শাস্ত্রে নিপুণ, দেবতাদের মন্ত্রীসদৃশ এবং সর্বত্র সম্মানিত। শিব বর প্রদান করলে বৃহস্পতির জন্ম হয়। কৃতজ্ঞতায় অঙ্গিরা সেই স্থানে শঙ্করের প্রতিষ্ঠা করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—এই তীর্থে স্নান ও শিবপূজায় পাপ নাশ হয়, দরিদ্রের ধন ও নিঃসন্তানের সন্তান লাভ হয়, ইষ্টকামনা পূর্ণ হয় এবং ভক্ত রুদ্রলোক প্রাপ্ত হয়।

Koṭitīrtha–Ṛṣikoṭi Māhātmya (Merit of Koṭitīrtha and Ṛṣikoṭi)
এই অধ্যায়ে মārkaṇḍেয় রাজাকে যাত্রাপথের মতো নির্দেশ দিয়ে কোṭিতীর্থে যেতে বলেন এবং একে অতুলনীয় পবিত্র তীর্থরূপে বর্ণনা করেন। কাহিনিতে স্মরণ করানো হয় যে এখানে বহু ঋষি পরম সিদ্ধি লাভ করেছিলেন; তাই স্থানটি ‘ঋষিকোṭি’ নামেও প্রসিদ্ধ। এরপর তীর্থ-নির্ভর তিনটি পুণ্যসাধনের কথা বলা হয়েছে—(১) তীর্থস্নান করে ব্রাহ্মণভোজন; এক ব্রাহ্মণকে তৃপ্ত করার ফল ‘কোṭি’ ব্রাহ্মণকে ভোজন করানোর সমান বলে পুণ্যবৃদ্ধি প্রকাশ করা হয়েছে। (২) স্নানের পর পিতৃদেবতার সম্মান/তর্পণ-শ্রাদ্ধ, যাতে তীর্থযাত্রায় পিতৃধর্ম যুক্ত হয়। (৩) সেখানে মহাদেবের পূজা করলে বাজপেয় যজ্ঞের সমান ফল লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এভাবে অধ্যায়টি কোṭিতীর্থের মাহাত্ম্যকে স্থান–কর্ম–ফলশ্রুতি রূপে সংক্ষিপ্তভাবে প্রতিষ্ঠা করে।

अयोनिजतीर्थ-माहात्म्य (Ayonija Tīrtha: Ritual Procedure and Salvific Claim)
এই অধ্যায়ে ঋষি মার্কণ্ডেয় রাজাকে উদ্দেশ করে অয়োনিজ নামে এক মহাপুণ্য তীর্থে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দেন। তীর্থটির লক্ষণ বলা হয়েছে—অসাধারণ সৌন্দর্য, মহান পুণ্যফল, এবং সর্বপাপ-নাশক শক্তি। আচারবিধি খুব সংক্ষেপে নির্দিষ্ট: অয়োনিজে স্নান করে পরমেশ্বরের পূজা, তারপর পিতৃ ও দেবতার উদ্দেশে শ্রদ্ধাভরে তর্পণাদি। শেষে দৃঢ় ফলশ্রুতি—যে ব্যক্তি বিধিপূর্বক সেখানে প্রাণত্যাগ করে, সে ‘যোনি-দ্বার’ অর্থাৎ পুনর্জন্মের দ্বার এড়িয়ে মুক্তিমুখী আশ্বাস লাভ করে; তীর্থসেবাকে নীতি-নিয়মযুক্ত সাধনা হিসেবে কর্মবন্ধন থেকে মুক্তির পথ বলা হয়েছে।

अङ्गारकतीर्थमाहात्म्य (Aṅgāraka Tīrtha Māhātmya) — The Glory of the Aṅgāraka Tīrtha on the Narmadā
মার্কণ্ডেয় রাজাকে নর্মদার তীরে পরম অঙ্গারক-তীর্থের কথা বলেন—যা রূপ-সৌন্দর্য দান করে এবং লোকসমাজে প্রসিদ্ধ। সেখানে ভূমিজ অঙ্গারক অগণিত বছর ধরে কঠোর তপস্যা করেন। তপস্যায় প্রসন্ন মহাদেব স্বয়ং প্রকাশিত হয়ে দেবতাদের মধ্যেও দুর্লভ বর প্রদানের কথা জানান। অঙ্গারক চিরস্থায়ী, অবিনশ্বর পদ প্রার্থনা করেন—গ্রহলোকসমূহে নিত্য বিচরণ এবং পর্বত, সূর্য-চন্দ্র, নদী-সমুদ্র যতদিন স্থিত থাকবে ততদিন বর স্থায়ী থাকুক। শিব বর দিয়ে প্রস্থান করেন; দেব-অসুর সকলেই তাঁর স্তব করে। পরে অঙ্গারক সেই স্থানে শঙ্করকে প্রতিষ্ঠা করে গ্রহমণ্ডলে নিজের স্থান গ্রহণ করেন। বিধান অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তীর্থে স্নান করে পরমেশ্বরের পূজা করে এবং ক্রোধ জয় করে হোম-আহুতি প্রভৃতি নিবেদন করে, সে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ করে। অঙ্গারক-চতুর্থীতে বিধিপূর্বক স্নান ও গ্রহপূজায় শুভফল, রূপলাভ ও দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণ হয়; আর সেখানে মৃত্যু—ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত—রুদ্রসান্নিধ্য ও তাঁর সান্নিধ্যে আনন্দলাভের কারণ বলা হয়েছে।

Pāṇḍu-tīrtha Māhātmya (Glory of Pāṇḍu Tīrtha)
এই অধ্যায়ে মārkaṇḍeya রাজাকে উদ্দেশ করে পাণ্ডু-তীর্থের সংক্ষিপ্ত তীর্থ-মাহাত্ম্য বলেন। পাণ্ডু-তীর্থকে সর্বপাবন বলা হয়েছে; সেখানে স্নান করলে ‘সর্ব-কিল্বিষ’—সমস্ত অশুচিতা ও অপরাধ থেকে মুক্তি মেলে—এটাই প্রধান বিধান। স্নানের পর শুদ্ধ হয়ে স্বর্ণদান (কাঞ্চন-দান) করার নৈতিক-আচারগত নির্দেশ আছে; এতে ভ্রূণহত্যা প্রভৃতি ঘোর পাপও নাশ হয়—এমন দৃঢ় ফলশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এরপর পিণ্ড ও জল অর্পণ (পিণ্ডোদক-প্রদান) করলে বাজপেয় যজ্ঞের সমান ফল লাভ হয় এবং পিতৃগণ ও পিতামহগণ আনন্দিত হন। তীর্থযাত্রা, দান ও পিতৃকর্ম—এই তিনকে একত্রে পাণ্ডু-তীর্থকেন্দ্রিক মুক্তিদায়ক পথে স্থাপন করা হয়েছে।

त्रिलोचनतीर्थमाहात्म्य (Glory of the Trilocana Tīrtha)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় রাজেন্দ্রকে ত্রিলোচন তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন। তীর্থটি পরম পুণ্যদায়ক এবং সর্বলোক-নমস্য দেবেশ ভগবানের বিশেষ সান্নিধ্যস্থল হিসেবে বর্ণিত। বিধানটি সহজ—তীর্থে স্নান করে ভক্তিভরে শঙ্করের পূজা করা। এই পূজার পর যে ভক্ত দেহত্যাগ করে, সে নিঃসন্দেহে রুদ্রলোক লাভ করে—এটাই ফলশ্রুতি। আরও বলা হয়, কল্পক্ষয়ের পরে সে পুনরায় প্রকাশ পেয়ে অবিচ্ছেদভাবে অবস্থান করে এবং একশো বছর সম্মানিত থাকে। তীর্থের প্রভাবকে পুরাণীয় কালতত্ত্বের মধ্যে স্থাপন করে এই উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

इन्द्रतीर्थमाहात्म्य (Indratīrtha Māhātmya) — The Glory of Indra’s Ford on the Narmadā
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ইন্দ্রতীর্থের উৎপত্তি জানতে চান, আর ঋষি মার্কণ্ডেয় প্রশ্নোত্তররূপে প্রাচীন ইতিহাস বর্ণনা করেন। বৃত্রবধের পর ইন্দ্রকে ব্রহ্মহত্যার ভয়ংকর পাপ তাড়া করে; তিনি বহু তীর্থ ও পবিত্র জলে ঘুরেও শান্তি পান না—এতে বোঝানো হয় যে গভীর নৈতিক অপরাধ কেবল সাধারণ তীর্থভ্রমণে দূর হয় না। ইন্দ্র কঠোর তপস্যা, উপবাস ও দীর্ঘ সাধনা করেন; শেষে দেবসমাবেশে ব্রহ্মা পাপকে চার ভাগে বিভক্ত করে জল, ভূমি, নারী এবং কর্ম/পেশাগত ক্ষেত্রসমূহে বণ্টন করেন—যার মাধ্যমে কিছু সামাজিক-ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণকথাও প্রকাশ পায়। নর্মদাতীরে মহাদেবের পূজায় শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন; ইন্দ্র সেখানে চিরস্থায়ী দিব্য সান্নিধ্য প্রার্থনা করলে ইন্দ্রতীর্থ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—ইন্দ্রতীর্থে স্নান, তর্পণ ও পরমেশ্বর-আরাধনায় মহাপাপও ক্ষয় হয় এবং মহাযজ্ঞসম পুণ্য লাভ হয়; এই মাহাত্ম্য শ্রবণও শুদ্ধিদায়ক।

कल्होडीतीर्थमाहात्म्यं तथा कपिलादानप्रशंसा (Kahlodī Tīrtha Māhātmya and the Eulogy of Kapilā-Dāna)
মার্কণ্ডেয় ঋষি রাজাকে উপদেশ দেন—রেবা/নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত শ্রেষ্ঠ কল্হোডী-তীর্থে গমন করো, যা সর্বপাপবিনাশক বলে খ্যাত। এই তীর্থ প্রাচীন মুনিগণ সকল জীবের মঙ্গলার্থে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং নর্মদার মহাজলের সংযোগে তপোবলে এর মহিমা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে—এমন বর্ণনা আছে। এরপর কপিলা-তীর্থের মাহাত্ম্য প্রধানভাবে বলা হয় এবং কপিলা-দান করার বিধান দেওয়া হয়—বিশেষত সদ্য প্রসূতা শুভলক্ষণযুক্ত কপিলা গাভীকে উপবাসসহ, সংযমী চিত্তে ও ক্রোধজয়ে দান করা উচিত। ভূমি, ধন, শস্য, হাতি, ঘোড়া, স্বর্ণ প্রভৃতি দানের তুলনায় কপিলা-দানকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—এই তীর্থে দান করলে সাত জন্মের বাক্, মন ও দেহকৃত পাপ নষ্ট হয়; দাতা অপ্সরাদের প্রশংসিত বিষ্ণুলোক লাভ করে; গাভীর রোমসংখ্যা অনুযায়ী দীর্ঘকাল স্বর্গসুখ ভোগ করে; পরে মানবজন্মে সমৃদ্ধ বংশে জন্ম নিয়ে বেদবিদ্যা, শাস্ত্রদক্ষতা, আরোগ্য ও দীর্ঘায়ু লাভ করে। শেষে কল্হোডী-তীর্থের অতুল পাপমোচন-ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

कम्बुतीर्थ-स्थापनम् (Establishment and Merit of Kambu Tīrtha)
এই অধ্যায়ে ‘কম্বুকেশ্বর/কম্বু’কে কেন্দ্র করে তীর্থ-উৎপত্তি ও কম্বুতীর্থের নামকরণ এবং মহিমা বর্ণিত হয়েছে। শ্রী মার্কণ্ডেয় হিরণ্যকশিপু থেকে প্রহ্লাদ, তারপর বিরোচন, বলি, বাণ, শম্বর হয়ে শেষে কম্বু পর্যন্ত বংশপরম্পরা বলেন। কম্বু নামক অসুর বিষ্ণুর বিশ্বব্যাপী শক্তির কথা স্মরণ করে অন্তর্লীন ভয় উপলব্ধি করে; নর্মদার জলে মৌনব্রত, নিয়মিত স্নান, তপস্বীর বেশ-আহার ও কঠোর আচরণে দীর্ঘকাল মহাদেবের আরাধনা করে। শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন, কিন্তু তত্ত্ব জানিয়ে দেন—জগতের সংঘাতে বিষ্ণুর পরমত্ব কেউ, শিবও, নস্যাৎ করতে পারেন না; হরিদ্বেষে স্থায়ী মঙ্গল হয় না। শিব অন্তর্ধান করলে কম্বু সেখানে শিবের শান্ত ও রোগমুক্ত রূপ প্রতিষ্ঠা করে; সেই স্থান ‘কম্বুতীর্থ’ নামে খ্যাত হয়ে মহাদোষনাশক বলে প্রশংসিত। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—সেখানে স্নান ও পূজা, বিশেষত ঋগ্/যজুঃ/সাম স্তোত্রসহ সূর্যোপাসনা, বৈদিক কর্মের সমতুল্য ফল দেয়; পিতৃতর্পণ ও ঈশানপূজায় অগ্নিষ্টোম সদৃশ ফল; আর সেখানে দেহত্যাগ করলে রুদ্রলোকে গমন হয়।

Candrahāsa–Somatīrtha Māhātmya (Glory of Candrahāsa and Somatīrtha)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে মার্কণ্ডেয় কন্দ্রহাসকে পরবর্তী পবিত্র তীর্থরূপে নির্দেশ করেন এবং স্মরণ করান যে সেখানেই সোমদেব ‘পরা-সিদ্ধি’ লাভ করেছিলেন। দক্ষের শাপে সোমের দুঃখের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়; গৃহস্থধর্মে দাম্পত্য কর্তব্য অবহেলা করলে কর্মফলজনিত ক্লেশ আসে—এই নৈতিক উপদেশও এতে যুক্ত। প্রতিকার হিসেবে সোম নানা তীর্থে ভ্রমণ করে পাপহারিণী নর্মদা/রেবার তীরে পৌঁছান। সেখানে বারো বছর উপবাস, দান, ব্রত ও সংযম পালন করে তিনি অশুচিতা থেকে মুক্ত হন। শেষে মহাদেবের অভিষেক করে শিবের প্রতিষ্ঠা ও পূজা করেন; ফলে অক্ষয় পুণ্য ও শ্রেষ্ঠ গতি লাভ হয়। সোমতীর্থ ও কন্দ্রহাসে স্নান—বিশেষত চন্দ্র-সূর্যগ্রহণ, সংক্রান্তি, ব্যতীপাত, অয়ন ও বিষুবকালে—মহাশুদ্ধি, স্থায়ী পুণ্য এবং সোমসদৃশ দীপ্তি প্রদানকারী বলা হয়েছে। রেবাতটে কন্দ্রহাসের মাহাত্ম্য জেনে যে তীর্থযাত্রী আসে সে ফল পায়; অজ্ঞরা বঞ্চিত থাকে। সেখানে গ্রহণ করা সন্ন্যাসও সোমলোক-সম্পর্কিত অবিচল শুভপথে নিয়ে যায়।

Ko-hanasva Tīrtha Māhātmya and Varṇa–Āśrama Ethical Discourse (कोहनस्वतीर्थमाहात्म्य तथा वर्णाश्रमधर्मोपदेशः)
অধ্যায় ১২২ দুইটি ঘনিষ্ঠ অংশে বিন্যস্ত। প্রথমে মার্কণ্ডেয় ‘কোহনস্ব’ নামে এক তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন—এটি পাপহর ও মৃত্যুভয়নাশক বলে খ্যাত। এরপর যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে চার বর্ণের উৎপত্তি ও কর্মধর্ম ব্যাখ্যা করা হয়: ব্রহ্মাকে আদিকারণ ধরে দেহ-রূপকে ব্রাহ্মণ মুখ থেকে, ক্ষত্রিয় বাহু থেকে, বৈশ্য উরু থেকে এবং শূদ্র পদ থেকে উৎপন্ন বলা হয়েছে। ব্রাহ্মণের স্বাধ্যায়-অধ্যাপন, যজ্ঞ, অগ্নিহোত্র, পঞ্চযজ্ঞ, গৃহস্থধর্ম ও পরবর্তীতে বৈরাগ্য/সন্ন্যাস; ক্ষত্রিয়ের শাসন ও প্রজারক্ষা; বৈশ্যের কৃষি-গোরক্ষা-বাণিজ্য; এবং শূদ্রের সেবাধর্মের নির্দেশ আসে, সঙ্গে মন্ত্র-সংস্কারাধিকারে গ্রন্থের সীমাবদ্ধ বিধানও উল্লিখিত। দ্বিতীয় অংশে দৃষ্টান্তকথা: এক বিদ্বান ব্রাহ্মণ ‘হনস্ব’ নামক অশুভ আদেশ শুনে যম ও তার অনুচরদের দেখে ভীত হয়ে শতারুদ্রীয়সহ রুদ্রস্তব জপ করতে করতে এক লিঙ্গের শরণ নেন। সেখানে তিনি লুটিয়ে পড়লে শিব রক্ষাবাক্য উচ্চারণ করে যমের বাহিনীকে বিতাড়িত করেন। তাই স্থানটি ‘কো-হনস্ব’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। শেষে ফলশ্রুতি—এখানে স্নান ও পূজায় অগ্নিষ্টোম-যজ্ঞসম পুণ্য, এখানে মৃত্যু হলে যমদর্শন হয় না; অগ্নি বা জলে মৃত্যুর বিশেষ ফল এবং পরে সমৃদ্ধিসহ প্রত্যাবর্তনের কথাও বলা হয়েছে।

कर्मदीतीर्थे विघ्नेशपूजा-फलप्रशंसा | Karmadī Tīrtha and the Merit of Vighneśa Observance
এই অধ্যায়ে মুনি মার্কণ্ডেয় রাজাকে উদ্দেশ করে কর্মদী-তীর্থের সংক্ষিপ্ত মাহাত্ম্য বলেন। তিনি শ্রোতাকে সেই পবিত্র তীর্থে গমন করতে নির্দেশ দেন, যেখানে মহাবলী গণনাথ বিঘ্নেশের সান্নিধ্য বিরাজমান। বলা হয়েছে, সেখানে স্নান করলে—আর চতুর্থীর দিনে উপবাসসহ স্নান করলে—সাত জন্মের বিঘ্ন প্রশমিত হয়। সেই স্থানে দান করলে অক্ষয় ফল লাভ হয়—এ কথা ধর্মবচনরূপে সন্দেহহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত; তীর্থযাত্রা, চতুর্থী-ব্রত ও দানকে বিঘ্নেশ-কৃপায় বিঘ্ননাশ তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

नर्मदेश्वरतीर्थमाहात्म्य (The Māhātmya of Narmadeśvara Tīrtha)
এই অধ্যায়ে সংলাপের ভেতর সংক্ষিপ্ত তীর্থ-উপদেশ দেওয়া হয়েছে। শ্রী মার্কণ্ডেয় মহীপাল রাজাকে নর্মদেশ্বর নামক পরম পবিত্র তীর্থে গমন করতে বলেন এবং তাকে শ্রেষ্ঠ তীর্থরূপে বর্ণনা করেন। মূল বক্তব্য মোক্ষ ও প্রায়শ্চিত্তমূলক—যে ব্যক্তি সেই তীর্থে স্নান করে, সে সকল কিল্বিষ (পাপ/দোষ) থেকে মুক্ত হয়। পরে ফল-নির্ণয়ে বলা হয়—অগ্নিতে প্রবেশ করে, জলে, অথবা ‘অননাশক’ (অপ্রভাবী/অবিনাশী) প্রকার মৃত্যুতেও তার গতি ‘অনিবর্তিকা’ (অপরিবর্তনীয়) হয়; এ কথা শংকরের পূর্বোপদেশ হিসেবে উল্লেখিত। শিব-প্রদত্ত প্রামাণ্য-পরম্পরায় তীর্থের উদ্ধারক মহিমা প্রতিষ্ঠিত হয়।

रवीतीर्थ-माहात्म्य एवं आदित्य-तपःकथा (Ravītīrtha Māhātmya and the Discourse on Āditya’s Tapas)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন—যিনি জগতে প্রত্যক্ষ ও সকল দেবতার পূজ্য সেই সূর্যকে কীভাবে তপস্বী বলা হয়, এবং তিনি কীভাবে আদিত্য/ভাস্কর নাম ও মর্যাদা লাভ করলেন। মার্কণ্ডেয় উত্তর দিতে গিয়ে সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা করেন—প্রথমে অন্ধকারের অবস্থা, তারপর দিব্য দীপ্ত তত্ত্বের প্রকাশ, সেখান থেকে ব্যক্ত রূপের উদ্ভব এবং পরবর্তীতে বিশ্বকার্যের বিন্যাস। এরপর নর্মদা-তীরে রভীতীর্থের মাহাত্ম্য বলা হয়, যেখানে স্নান, পূজা, মন্ত্রজপ ও প্রদক্ষিণার মাধ্যমে সূর্যোপাসনা সম্পন্ন হয়। মন্ত্রকে ক্রিয়ার সিদ্ধির মূল শর্ত হিসেবে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; মন্ত্রহীন কর্মকে নিষ্ফল দেখাতে নানা উপমা দেওয়া হয়েছে। শেষে সংক্রান্তি, ব্যতীপাত, অয়ন, বিষুব, গ্রহণ, মাঘ সপ্তমী প্রভৃতি তিথি-কাল ও বিধান, সূর্যের দ্বাদশ নামের স্তব, এবং শুদ্ধি, স্বাস্থ্য, মঙ্গল ও শুভ সামাজিক ফলদানের ফলশ্রুতি বর্ণিত।

अयोनिज-महादेव-तीर्थमाहात्म्य (Glory of the Ayoni-ja Mahādeva Tīrtha)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় ‘অযোনিজ’ নামে এক পরম তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন—যা ‘যোনি-সংকট’ অর্থাৎ জন্ম-বন্ধন ও দেহধর্মজনিত ক্লেশে পীড়িতদের জন্য শমন ও পবিত্রতার আশ্রয়। সেখানে তীর্থস্নান করলে যোনি-সংক্রান্ত দুঃখবোধ ও তার ভার দূর হয়। এরপর ঈশ্বর/মহাদেবের পূজা করতে হয় এবং প্রার্থনা করতে হয়—“সম্ভব (বারংবার জন্ম) ও যোনি-সংকট থেকে আমাকে মুক্ত করুন”; গন্ধ, পুষ্প, ধূপ ইত্যাদি অর্পণে পাপক্ষয় ঘটে। ভক্তিভরে লিঙ্গ-পূরণ/লিঙ্গ-সেবা করলে দেবদেবের সান্নিধ্যে দীর্ঘকাল অবস্থানের ফল ‘সিক্থ-সংখ্যা’ (মোম/বিন্দুর সংখ্যা) দিয়ে অতিশয়োক্তিতে বোঝানো হয়েছে। সুগন্ধি জল, মধু, দুধ বা দই দিয়ে মহাদেবের অভিষেক করলে ‘বিপুল শ্রী’—প্রচুর সমৃদ্ধি—লাভ হয়। শুক্লপক্ষ ও বিশেষত চতুর্দশীতে গান-বাদ্যসহ পূজা, এবং প্রদক্ষিণার সঙ্গে সেই প্রার্থনা-পংক্তির নিরন্তর জপ শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। শেষে ‘নমঃ শিবায়’ ষড়ক্ষরের মহিমা ঘোষণা করে বলা হয়—এটি বহু মন্ত্রবিস্তারের চেয়েও শ্রেষ্ঠ; এর জপেই অধ্যয়ন, শ্রবণ ও ক্রিয়া-সমাপ্তি সম্পন্ন হয়। শিবযোগীদের সেবা, দান্ত-জিতেন্দ্রিয় তপস্বীদের অন্নদান, দান ও জলপ্রদানকে স্নান-পূজার পরিপূরক ধরা হয়েছে; তার পুণ্য মেরু ও সমুদ্রসম মহত্ত্বে তুল্য বলা হয়েছে।

अग्नितीर्थ-माहात्म्य तथा कन्यादान-फलश्रुति (Agni Tīrtha Māhātmya and the Merit of Kanyādāna)
এই অধ্যায়ে রেবাখণ্ডের যাত্রা-নির্দেশরূপে মার্কণ্ডেয় রাজাকে বলেন—অতুল পবিত্র ও অনন্য তীর্থ অগ্নিতীর্থে গমন করো। পক্ষের আরম্ভে সেখানে তীর্থস্নান করার বিধান আছে; এতে সকল কিল্বিষ, পাপ ও আচারগত অশুচিতা নাশ হয় বলে বলা হয়েছে। এরপর কন্যাদান-ধর্মের মাহাত্ম্য বর্ণিত—যথাশক্তি অলংকৃত কন্যাকে দান করলে মহাপুণ্য লাভ হয়। এই ফলকে অগ্নীষ্টোম ও অতিরাত্র প্রভৃতি সোমযাগের ফলের সঙ্গে তুলনা করে বহু গুণে অধিক বলা হয়েছে। শেষে দাতার পুণ্য বংশপরম্পরায় বিস্তৃত—সন্তানধারার অবিচ্ছিন্নতার অনুপাতে (কেশ-গণনার উপমায়) দাতা শিবলোকে আরোহন করে। এভাবে সামাজিক ধারাবাহিকতা, দানকর্তব্য ও শৈব মুক্তিপ্রতিশ্রুতি একত্রে সংযুক্ত হয়েছে।

भृकुटेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Bhrikuṭeśvara Tīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় মুনি রাজাকে ভৃকুটেশ্বরের দিকে অগ্রসর হতে উপদেশ দেন এবং এই তীর্থকে ‘শ্রেষ্ঠ’ পবিত্র স্থান বলে বর্ণনা করেন। তীর্থের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মহর্ষি ভৃগুর তপস্যাজীবনের দ্বারা—তিনি অতিশয় শক্তিমান ও কঠোর স্বভাবের, এবং সন্তানলাভের উদ্দেশ্যে দীর্ঘকাল কঠিন তপস্যা করেছিলেন। তখন ‘অন্ধকঘাতিন’ (অন্ধক-বধকারী) পরমেশ্বর প্রসন্ন হয়ে বর প্রদান করেন, ফলে তীর্থের শৈব অধিষ্ঠান স্পষ্ট হয়। এরপর নির্দিষ্ট কর্ম ও ফল বলা হয়েছে—তীর্থে স্নান করে পরমেশ্বরের পূজা করলে অগ্নিষ্টোম যজ্ঞফলের অষ্টগুণ ফল লাভ হয়। সন্তানপ্রার্থী যদি ঘি ও মধু দিয়ে ভৃকুটেশকে স্নাপন করে, তবে কাম্য পুত্র প্রাপ্ত হয়। দানের মহিমাও উচ্চারিত—ব্রাহ্মণকে স্বর্ণদান, অথবা গাভী ও ভূমিদান, সমুদ্র-গুহা-পর্বত-অরণ্য-উপবনসহ সমগ্র পৃথিবী দানের সমতুল্য পুণ্য দেয়। শেষে বলা হয়, দাতা স্বর্গে দিব্য ভোগ ভোগ করে পরে পৃথিবীতে রাজা বা অত্যন্ত সম্মানিত ব্রাহ্মণরূপে উচ্চ মর্যাদা লাভ করে—স্থাননির্ভর ভক্তি ও দানধর্মের নৈতিক ফলব্যবস্থা এখানে প্রতিষ্ঠিত।

ब्रह्मतीर्थमाहात्म्य (Glory of Brahmatīrtha on the Narmadā)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় এক রাজাকে নর্মদা-তীরস্থিত ব্রহ্মতীর্থের মাহাত্ম্য উপদেশ দেন। ব্রহ্মতীর্থকে সকল তীর্থের মধ্যে অতুলনীয় ও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে; এখানে ব্রহ্মা অধিষ্ঠাতা দেবতা রূপে পূজিত। পাপশুদ্ধিকে বাক্, মন ও কর্ম—এই তিন স্তরে ব্যাখ্যা করে বলা হয় যে কেবল দর্শন/আগমনমাত্রেও শুদ্ধি লাভ হয়। যাঁরা স্নান করে শ্রুতি-স্মৃতিনির্দেশিত বিধি মানেন, তাঁরা প্রায়শ্চিত্ত সম্পন্ন করে স্বর্গবাস লাভ করেন; কিন্তু কাম-লোভে শাস্ত্রত্যাগীরা নিন্দিত, কারণ তারা যথার্থ প্রায়শ্চিত্তপথ থেকে বিচ্যুত। স্নানের পর পিতৃ ও দেবপূজায় অগ্নিষ্টোম যজ্ঞসম পুণ্য হয়; ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে দান অক্ষয় বলে ঘোষিত। সংক্ষিপ্ত গায়ত্রীজপকেও ঋগ্-যজুঃ-সাম—তিন বেদের ফলসম বলে মহিমা করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, তীর্থে দেহত্যাগ করলে ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি হয় এবং পুনরাবর্তন থাকে না; সেখানে দেহাবশেষের সম্পর্কও পুণ্যদায়ক। এই পুণ্যে মানুষ ব্রহ্মজ্ঞানসম্পন্ন, বিদ্বান, সম্মানিত, নিরোগ ও দীর্ঘায়ু হয়ে জন্মায়; এবং মহাত্মা দর্শনার্থীরা তাত্ত্বিক অর্থে ‘অমৃতত্ব’ লাভ করেন।

Devatīrtha Māhātmya (Glory of Devatīrtha on the Southern Bank of the Narmadā)
এই অধ্যায়ে ঋষি মার্কণ্ডেয় রেবা/নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত অতুল পুণ্যতীর্থ ‘দেবতীর্থ’-এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। দেবগণ সেখানে সমবেত হন এবং পরমেশ্বর সেই স্থানে প্রসন্ন হন—এই দিব্য দৃষ্টান্তের দ্বারা তীর্থের পবিত্রতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তীর্থস্নানের যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়েছে—স্নান করতে হবে কাম (বাসনা) ও ক্রোধ ত্যাগ করে, নির্মল অন্তঃকরণে। যে এভাবে স্নান করে, সে সহস্র গোদান-ফলের সমান নিশ্চিত পুণ্য লাভ করে—এতে বোঝানো হয়, বাহ্য আচারের সঙ্গে অন্তরের সংযম যুক্ত না হলে তীর্থযাত্রা সম্পূর্ণ হয় না।

Nāgatīrtha Māhātmya (Legend of the Nāgas’ Fear and Śiva’s Protection) / नागतीर्थमाहात्म्य
অধ্যায় ১৩১-এ ঋষি মার্কণ্ডেয় ও রাজা যুধিষ্ঠিরের সংলাপরূপে কাহিনি এগোয়। শুরুতে নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ‘অতুল’ নাগতীর্থের কথা বলা হয় এবং প্রশ্ন ওঠে—ভয়ংকর আতঙ্কে মহান নাগেরা কেন তপস্যায় প্রবৃত্ত হল। তখন মার্কণ্ডেয় এক প্রাচীন ইতিহাস বলেন—কাশ্যপের দুই পত্নী বিনতা (গরুড়-সম্পর্কিত) ও কদ্রূ (নাগ-সম্পর্কিত) দিব্য অশ্ব উচ্চৈঃশ্রবস দেখে এক পণ করে। কদ্রূ কৌশলে নিজের নাগপুত্রদের প্রতারণায় বাধ্য করে; কেউ মাতৃশাপের ভয়ে মান্য করে, আর কেউ অন্য আশ্রয় খুঁজে তপস্যায় রত হয়। দীর্ঘ তপস্যায় প্রসন্ন মহাদেব বর দেন—বাসুকি শিবসান্নিধ্যে চিররক্ষক রূপে প্রতিষ্ঠিত হন এবং নাগেরা বিশেষত নর্মদাজলে অবগাহনের দ্বারা নিরাপত্তা লাভ করে। শেষে বিধি ও ফলশ্রুতি: পঞ্চমী তিথিতে এই তীর্থে শিবপূজা করলে আট নাগবংশ উপাসককে ক্ষতি করে না, এবং মৃত ব্যক্তি ইচ্ছিত কাল পর্যন্ত শিবের গণ/অনুচর পদ লাভ করে।

वाराहतीर्थमाहात्म्यम् (Glory of Varāha Tīrtha on the Northern Bank of the Narmadā)
মার্কণ্ডেয় রাজাকে উপদেশ দেন যে নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত ‘বরাহ’ নামক তীর্থে গমন করতে হবে, যা সর্বপাপ-নাশক বলে খ্যাত। সেখানে লোকহিতার্থে জগদ্ধাতা সৃষ্টিকর্তা ভগবান বরাহ বিরাজ করেন এবং তিনি সংসারসাগর পার করানোর মুক্তিদাতা পথপ্রদর্শক। বিধানে আছে তীর্থস্নান, ধারাণীধর/বরাহের গন্ধ-পুষ্পমাল্যাদি দ্বারা পূজা, মঙ্গলধ্বনি, এবং উপবাস—বিশেষত দ্বাদশীতে। এরপর রাত্রিজাগরণ করে পবিত্র কাহিনি শ্রবণ/কথন করতে বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে সংস্পর্শ ও সহভোজন বর্জনীয়; বাক্য, স্পর্শ, শ্বাস ও একসঙ্গে আহার দ্বারা অশৌচ সঞ্চারিত হয় বলে উল্লেখ আছে। সামর্থ্য ও বিধি অনুযায়ী ব্রাহ্মণদের সম্মান করাও নির্দেশিত। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, বরাহের মুখের মাত্র দর্শনেই কঠিন পাপ দ্রুত নষ্ট হয়—যেমন গরুড় দেখলে সাপ পালায়, সূর্যে অন্ধকার দূর হয়। মন্ত্রের সরলতা তুলে ধরা হয়েছে: ‘নমো নারায়ণায়’ সর্বার্থসাধক; আর শ্রীকৃষ্ণকে একবার প্রণাম করাও মহাযজ্ঞফলসম, পুনর্জন্মের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। নিয়মনিষ্ঠ ভক্তরা সেখানে দেহত্যাগ করলে ক্ষর-অক্ষরের ভেদাতীত বিষ্ণুর পরম নির্মল ধাম লাভ করে।

लोकपालतीर्थचतुष्टयमाहात्म्य तथा भूमिदानपालन-उपदेशः (Glory of the Four Lokapāla Tīrthas and Counsel on Protecting Land-Gifts)
মার্কণ্ডেয় ঋষি চারটি পরম তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন—কুবের, বরুণ, যম ও বায়ুর সঙ্গে যুক্ত স্থানসমূহ, যাদের কেবল দর্শনেই পাপ নাশ হয়। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন, কেন লোকপালরা নর্মদা-তীরে তপস্যা করেছিলেন। ঋষি ব্যাখ্যা করেন—অস্থির জগতে স্থির আশ্রয় খুঁজতে তারা তপে প্রবৃত্ত হন, এবং ধর্মই সকল জীবের ধারণ-সমর্থন। ঘোর তপস্যার ফলে শিবের বর লাভ হয়—কুবের যক্ষ ও ধনের অধিপতি হন, যম সংযম ও বিচার-শাসনের কর্তৃত্ব পান, বরুণ জলরাজ্যে সার্বভৌমত্ব লাভ করেন, আর বায়ু সর্বব্যাপী শক্তি অর্জন করেন। তারা নিজ নিজ নামে পৃথক মন্দির স্থাপন করে পূজা ও নিবেদন করেন। এরপর নৈতিক-সামাজিক বিধান আসে—বিদ্বান ব্রাহ্মণদের আহ্বান করে দান, বিশেষত ভূমিদান প্রদান ও রক্ষা করা। ভূমিদান কেড়ে নেওয়া বা বাতিল করা মহাপাপ; এমন কর্মের জন্য দণ্ডবিধান বলা হয়েছে, এবং দান রক্ষা করাকে দান করার থেকেও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। তীর্থফল নির্দিষ্ট করা হয়—কুবেরেশে পূজায় অশ্বমেধসম পুণ্য, যমেশ্বরে জন্মজন্মান্তরের পাপমোচন, বরুণেশে বাজপেয়সম ফল, এবং বাতেশ্বরে জীবনের উদ্দেশ্যসমূহের পূর্ণতা। শেষে ফলশ্রুতি—এই কাহিনি শ্রবণ-পাঠে পাপ নাশ ও মঙ্গলবৃদ্ধি হয়।

Rāmeśvara-tīrtha Māhātmya (रामेश्वरतीर्थमाहात्म्य) — The Glory of Rāmeśvara on the Southern Bank of the Narmadā
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় সংক্ষেপে তীর্থ-মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। রেবা-নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ‘রামেশ্বর’ নামক অতুলনীয় তীর্থকে পাপহর, পুণ্যদায়ক ও সর্বদুঃখনাশক বলা হয়েছে। বিধান এই যে, যে ভক্ত এই তীর্থে স্নান করে মহেশ্বর—মহাদেব, মহাত্মা—এর পূজা করে, সে সকল কিল্বিষ (দোষ/অশুচিতা) থেকে মুক্ত হয়। এভাবে স্থান, ক্রম (স্নান→পূজা) ও ফল (অশুদ্ধিক্ষয়) মিলিয়ে তীর্থযাত্রার সংক্ষিপ্ত নীতি নির্দেশিত হয়েছে।

सिद्धेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Siddheśvara Tīrtha Māhātmya)
মার্কণ্ডেয় সিদ্ধেশ্বর নামে এক মহিমান্বিত তীর্থের কথা বলেন—যা সর্বলোকেই পূজিত এবং পরম সিদ্ধিদায়ক। এই অধ্যায়ের মূল নির্দেশ সংক্ষিপ্ত: তীর্থে স্নান করে উমা‑রুদ্র (উমা‑মহেশ্বর)-এর বিধিপূর্বক পূজা করতে হবে। এভাবে করলে বজপেয় যজ্ঞের সমতুল্য ফল লাভ হয়—স্থানীয় তীর্থভক্তিকে বৈদিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে, সঞ্চিত পুণ্যে মৃত্যুর পরে সাধক স্বর্গে আরোহণ করে, অপ্সরাদের সঙ্গ ও মঙ্গলধ্বনিতে সম্মান পায়; দীর্ঘকাল স্বর্গভোগের পর সে ধন‑ধান্যে সমৃদ্ধ, খ্যাতিমান বংশে জন্মায়, বেদ‑বেদাঙ্গে পারদর্শী, সমাজে সম্মানিত, রোগ‑শোকমুক্ত এবং শতবর্ষ আয়ু লাভ করে।

अहल्येश्वरतीर्थमाहात्म्य (Ahalyeśvara Tīrtha Māhātmya)
মার্কণ্ডেয় ‘অহল্যেশ্বর’ মন্দির ও সংলগ্ন তীর্থের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা করতে অহল্যা–গৌতম–ইন্দ্র উপাখ্যানকে তীর্থকেন্দ্রিকভাবে বর্ণনা করেন। গৌতম আদর্শ ব্রাহ্মণ-তপস্বী, আর অহল্যা অপরূপ সৌন্দর্যে খ্যাত। কামবশ ইন্দ্র (শক্র) গৌতমের ছদ্মবেশ ধারণ করে আশ্রমের নিকটে অহল্যার কাছে যায়। গৌতম ফিরে এসে অপরাধ বুঝে ইন্দ্রকে শাপ দেন; তার দেহে বহু ‘ভগ’-প্রকাশরূপ চিহ্ন জন্মায়, এবং ইন্দ্র রাজ্য ত্যাগ করে তপস্যায় প্রবৃত্ত হয়। অহল্যাও শাপে শিলারূপা হয়, তবে মুক্তির শর্ত নির্দিষ্ট—হাজার বছর পরে বিশ্বামিত্রসহ তীর্থযাত্রায় আগত শ্রীरामের দর্শনে সে শুদ্ধ হয়ে মুক্ত হয়। এরপর সে নর্মদা-তীর্থে স্নান করে চন্দ্রায়ণ প্রভৃতি কৃচ্ছ্র-ব্রতসহ তপ আচার করে। মহাদেব প্রসন্ন হয়ে বর দেন; অহল্যা শিবকে ‘অহল্যেশ্বর’ নামে প্রতিষ্ঠা করে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—যে এই তীর্থে স্নান করে পরমেশ্বরের পূজা করে, সে স্বর্গ লাভ করে এবং পরবর্তী মানবজন্মে সমৃদ্ধি, বিদ্যা, স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও বংশধারা পায়।

कर्कटेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Karkaṭeśvara Tīrtha-Māhātmya)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় মুনি রাজাকে তীর্থ-নির্দেশ দেন এবং নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত পরম শৈব তীর্থ ‘কর্কটেশ্বর’-এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। স্থানটি পাপ-নাশক বলে খ্যাত। বিধি মেনে স্নান করে যে শিবপূজা করে, তার মৃত্যুর পর রুদ্রলোকের দিকে অপ্রত্যাবর্তনীয় গতি স্থির হয়। মুনি বলেন, এই তীর্থের মহিমা সম্পূর্ণ সংক্ষেপে ধরা যায় না; তবু মূল তত্ত্বটি জানান—এখানে করা শুভ বা অশুভ কর্ম ‘অক্ষয়’ হয়ে যায়, অর্থাৎ পবিত্র ক্ষেত্রে কর্মফলের স্থায়িত্ব বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়। বালখিল্য ঋষি ও মরীচি-সম্পর্কিত তপস্বীরা স্বেচ্ছায় এখানে বাস করে আনন্দ পান, এবং দেবী নারায়ণীও এখানে কঠোর তপস্যায় রত থাকেন। শেষে পিতৃতর্পণের বিধান—যে এখানে স্নান করে তর্পণ করে, সে বারো বছর পর্যন্ত পিতৃগণকে তৃপ্ত করে। এভাবে ব্যক্তিগত মুক্তি, নৈতিক আচরণ ও বংশধর্ম এক তীর্থকেন্দ্রিক সাধনায় একত্রিত হয়।

Śakratīrtha Māhātmya (The Glory of Śakra-tīrtha) — Indra’s Restoration and the Merit of Śiva-Pūjā
মার্কণ্ডেয় বলেন—যাত্রীকে অতুল শক্রতীর্থে গমন করতে হবে। এই তীর্থের মাহাত্ম্য এক পুরাকথায় প্রকাশিত: গৌতম ঋষির শাপে শক্র (ইন্দ্র) রাজশ্রী হারান। তখন দেবগণ ও তপস্বী ঋষিরা উদ্বিগ্ন হয়ে গৌতমের কাছে বিনীত ভাষায় প্রার্থনা করেন—ইন্দ্রহীন জগতে দেব-মানব ধর্মব্যবস্থা ও শাসন-শৃঙ্খলা শোভা পায় না; নিজের দোষে লজ্জিত হয়ে যে দেবতা অন্তর্হিত হয়েছে, তার প্রতি করুণা করুন। বেদজ্ঞ শ্রেষ্ঠ গৌতম প্রসন্ন হয়ে বর দেন—যা ছিল ‘সহস্রচিহ্ন’ সেই কলঙ্ক তাঁর অনুগ্রহে ‘সহস্রনয়ন’ হয়ে যায়, ইন্দ্রের মর্যাদা পুনরুদ্ধার হয়। এরপর ইন্দ্র নর্মদায় গিয়ে নির্মল জলে স্নান করেন, ত্রিপুরান্তক শিবের প্রতিষ্ঠা করে পূজা করেন এবং অপ্সরাদের সম্মানে স্বধামে প্রত্যাবর্তন করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—যে এই তীর্থে স্নান করে পরমেশ্বরের পূজা করে, সে পরস্ত্রীগমনের পাপ থেকে মুক্ত হয়; শৈব ভাবধারায় এটি শুদ্ধি ও নৈতিক সংশোধনের তীর্থরূপে খ্যাত।

Somatīrtha Māhātmya (Glory of Somatīrtha) — Ritual Bathing, Solar Contemplation, and Merit of Feeding the Learned
অধ্যায় ১৩৯-এ মার্কণ্ডেয় যাত্রাপথের নির্দেশের মতো করে সোমতীর্থের মাহাত্ম্য বলেন। এটি অতুল পুণ্যতীর্থ, যেখানে সোম তপস্যা করে দিব্য নক্ষত্র-পথ লাভ করেছিলেন। এখানে প্রথমে তীর্থস্নান, তারপর যথাবিধি আচমন ও জপ, এবং শেষে রবি (সূর্য)-ধ্যানের ক্রম নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এই স্থানে সাধনার ফল ঋগ্-যজুঃ-সাম বেদের পাঠ ও গায়ত্রীজপের ফলের সমতুল্য বলা হয়েছে। বহ্বৃচ, অধ্বর্যু, ছান্দোগ প্রভৃতি বেদজ্ঞ ও অধ্যয়ন-সমাপ্ত ব্রাহ্মণদের ভোজন করানো, এবং শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের পাদুকা/চটি, ছাতা, বস্ত্র, কম্বল, অশ্ব ইত্যাদি দান ‘কোটি’ পরিমাণ পুণ্যরূপে প্রশংসিত। শেষে সংযমধর্মের উপদেশ—যেখানে মুনি ইন্দ্রিয়সংযম করেন, সেই স্থান কুরুক্ষেত্র-নৈমিষ-পুষ্করের সমান; তাই গ্রহণ, সংক্রান্তি ও ব্যতীপাতে যোগীদের বিশেষ সম্মান করতে বলা হয়েছে। যে এই তীর্থে সন্ন্যাস গ্রহণ করে, সে বিমানে স্বর্গে গিয়ে সোমের পার্ষদ হয় এবং সোমের মতো দিব্য সুখ ভোগ করে।

नन्दाह्रदमाहात्म्य (Nandāhrada Māhātmya: The Glory of Nandā Lake)
এই অধ্যায়ে রেবাখণ্ডের অন্তর্গত তীর্থযাত্রার নির্দেশরূপে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কণ্ডেয় রাজশ্রোতাকে নন্দাহ্রদে গমন করতে বলেন—এটি অতুল পবিত্র সরোবর, যেখানে সিদ্ধগণ বিরাজ করেন এবং দেবী নন্দা বরপ্রদায়িনী রূপে খ্যাত। তীর্থের মাহাত্ম্য এক পৌরাণিক ঘটনার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত: দেবতাদের ভীতিকর মহিষাসুরকে দেবী শূলিনী-রূপে ত্রিশূল দ্বারা বিদ্ধ করে বধ করেন। পরে বিশালনয়না দেবী সেখানে স্নান করেছিলেন বলেই সরোবরের নাম “নন্দাহ্রদ” প্রসিদ্ধ হয়। বিধানে বলা হয়েছে—নন্দার স্মরণে সেখানে স্নান করে ব্রাহ্মণদের দান করলে অশ্বমেধসম পুণ্য লাভ হয়। ভৈরব, কেদার ও রুদ্র-মহালয়ের মতো দুর্লভ মহাতীর্থের সঙ্গে এর গণনা করা হয়েছে; কিন্তু কাম-আসক্তি ও মোহে বহুজন এর মহিমা উপলব্ধি করতে পারে না। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—সমুদ্রবেষ্টিত পৃথিবীর সর্বত্র স্নান-দান যে ফল দেয়, তা নন্দাহ্রদে স্নানেই সংক্ষিপ্তভাবে প্রাপ্ত হয়।

Tāpeśvara Tīrtha Māhātmya (The Glory of the Tāpeśvara Ford)
মার্কণ্ডেয় তাপেশ্বর তীর্থের উৎপত্তিকথা বর্ণনা করেন। এক ব্যাধ দেখল—ভয়ে কাঁপতে থাকা হরিণী জলে ঝাঁপ দিয়ে ভয়মুক্ত হয়ে আকাশে উত্থিত হল। এই আশ্চর্য দৃশ্য তাকে বিস্মিত ও বৈরাগ্যপূর্ণ করে তোলে; সে ধনুক ত্যাগ করে সহস্র দিব্যবর্ষ কঠোর তপস্যা করে। তপস্যায় প্রসন্ন মহেশ্বর আবির্ভূত হয়ে বর দিতে চাইলে ব্যাধ শিবের সান্নিধ্যে বাস প্রার্থনা করে; ভগবান তা দান করে অন্তর্ধান হন। এরপর ব্যাধ মহেশ্বরের প্রতিষ্ঠা করে বিধিপূর্বক পূজা করে স্বর্গ লাভ করে। তখন থেকেই ত্রিলোকে এই তীর্থ “তাপেশ্বর” নামে খ্যাত হয়—ব্যাধের অনুতাপ ও তপের তাপের স্মারক। এখানে স্নান করে শঙ্করের পূজা করলে শিবলোক প্রাপ্তি হয়; নর্মদার জলে তাপেশ্বরে স্নান করলে তাপত্রয় থেকে মুক্তি মেলে। অষ্টমী, চতুর্দশী ও তৃতীয়ায় বিশেষ স্নানবিধি সর্বপাপশমনের জন্য প্রশস্ত বলা হয়েছে।

रुक्मिणीतीर्थमाहात्म्य (Rukmiṇī Tīrtha Māhātmya) and the Naming of Yodhanīpura
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে রুক্মিণী-তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন। এখানে স্নানমাত্রেই সৌন্দর্য ও সৌভাগ্য লাভ হয়; বিশেষ করে অষ্টমী, চতুর্দশী ও তৃতীয়া তিথিতে স্নান-উপাসনার ফল অতিশয় শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষিত। তারপর তীর্থের প্রামাণ্য স্থাপনে ইতিহাস—কুণ্ডিনের রাজা ভীষ্মকের কন্যা রুক্মিণীকে অশরীরী বাণী জানায় যে তিনি চতুর্ভুজ দেবতার পত্নী হবেন। রাজনীতির কারণে তাঁকে শিশুপালের সঙ্গে প্রতিশ্রুত করা হয়; তখন কৃষ্ণ ও সঙ্কর্ষণ আগমন করেন, হরি ছদ্মবেশে রুক্মিণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কৃষ্ণ তাঁকে হরণ করেন। ধাওয়া ও যুদ্ধ হয়, বলদেবের বীর্যবর্ণনা এবং রুক্মীর সঙ্গে সংঘর্ষ; রুক্মিণীর অনুরোধে সুদর্শনের আঘাত নিবৃত্ত হয়, পরে ভগবান দিব্যরূপ প্রকাশ করে মিলন ঘটান। শেষাংশে কৃষ্ণ সাত ঋষিসদৃশ মানসপুত্রদের সম্মান করে গ্রামদান করেন এবং দানভূমি হরণ না করতে কঠোর উপদেশ দেন, তার পাপফলও বলেন। তীর্থ-মাহাত্ম্যে স্নান, বলদেব-কেশব পূজা, প্রদক্ষিণা, কাপিলা-দান, স্বর্ণ-রৌপ্য, পাদুকা, বস্ত্রাদি দানের বিধান, অন্যান্য প্রসিদ্ধ তীর্থসম পুণ্যতুলনা এবং এই তীর্থক্ষেত্রে অগ্নি/জল/উপবাসে দেহত্যাগকারীদের পরলোকগতির ফলশ্রুতি বর্ণিত।

Yojaneśvara Tīrtha Māhātmya and the Worship of Balakeśava
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় এক রাজাকে যোজনেশ্বর নামে প্রসিদ্ধ পবিত্র তীর্থের মাহাত্ম্য শোনান। বলা হয়েছে, এখানে নর–নারায়ণ ঋষি তপস্যা করে দেব–দানবের আদিযুদ্ধে দেবতাদের বিজয় সাধন করেছিলেন। যুগপরম্পরায় একই দিব্য তত্ত্বের মহিমা সংক্ষেপে প্রকাশিত—ত্রেতাযুগে রাম–লক্ষ্মণের রূপে, যেখানে তীর্থস্নানের পর রাবণবধের মাধ্যমে ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। কলিযুগে সেই শক্তি বাসুদেব বংশে বল–কেশব (বলরাম–কৃষ্ণ) রূপে আবির্ভূত হয়ে কংস, চাণূর, মুষ্টিক, শিশুপাল, জরাসন্ধ প্রভৃতি প্রধান শত্রুকে সংহার করেন; ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বীরদের পতনেও ঈশ্বরীয় কার্যকারণ ইঙ্গিত করা হয়েছে। এরপর বিধান দেওয়া হয়েছে—তীর্থে স্নান, বল–কেশবের পূজা, উপবাস, রাত্রিজাগরণ (প্রজাগর), ভক্তিগীতি/কীর্তন এবং ব্রাহ্মণদের যথোচিত সম্মান। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, এখানে দান ও পূজার ফল অক্ষয়, মহাপাপসহ পাপ নাশ হয়, এবং ধার্মিক ব্যক্তি এই অধ্যায় শ্রবণ, পাঠ বা পারায়ণ করলে পাপমুক্ত হয়ে কল্যাণ ও মুক্তিলাভ করে।

Cakratīrtha–Dvādaśī Tīrtha Māhātmya (Non-diminishing Merit at Cakratīrtha)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় রাজশ্রোতাকে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ-নির্দেশের ভঙ্গিতে উপদেশ দেন। তিনি শ্রোতাকে এক “উৎকৃষ্ট” দ্বাদশী-তীর্থে গমন করতে বলেন এবং সাধারণ ধর্মকর্মের ফলভোগের নিয়মের সঙ্গে চক্রতীর্থের অসাধারণ মর্যাদার তুলনা করেন। বলা হয়েছে—সাধারণ ক্ষেত্রে দান, জপ, হোম ও বলি/উপহার-অর্ঘ্যের ফল সময়ের সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত বা নিঃশেষ হতে পারে; কিন্তু চক্রতীর্থে সম্পাদিত কর্মের পুণ্য অক্ষয়, কখনও হ্রাস পায় না। শেষে অতীত ও ভবিষ্যৎ পর্যন্ত বিস্তৃত এই তীর্থের পরম মাহাত্ম্য পৃথকভাবে স্পষ্ট ও সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—এই উপসংহার-বাক্যে স্তব-পর্বের সমাপ্তি জানানো হয়।

Śivātīrtha Māhātmya (Glory of the Śiva Tīrtha)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় ‘দেশরক্ষক/নেতা’কে সংক্ষিপ্ত তত্ত্বোপদেশ দেন এবং অতুলনীয় শিবতীর্থের দিকে পথনির্দেশ করেন। বলা হয়েছে, শিবতীর্থে দেবদর্শনমাত্রেই সকল পাপ-কলুষ (সর্ব-কিল্বিষ) নাশ হয়। এরপর ক্রোধজয় ও ইন্দ্রিয়সংযমসহ তীর্থস্নান করে মহাদেবের পূজা করার বিধান আছে; এর পুণ্য অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের সমতুল্য বলা হয়েছে। আরও ভক্তিসহ উপবাস (সোপবাস) করে শিবপূজা করলে সাধকের গতি অপরিবর্তনীয় হয় এবং শেষে রুদ্রলোকে গমন নিশ্চিত ফলরূপে ঘোষিত।

Asmahaka Pitṛtīrtha Māhātmya and Piṇḍodaka-Vidhi (अस्माहक-पितृतीर्थ-माहात्म्य एवं पिण्डोदक-विधि)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির ‘অস্মাহক’ নামে শ্রেষ্ঠ পিতৃতীর্থের মাহাত্ম্য জানতে চান। মার্কণ্ডেয় মুনি ঋষি–দেবসমাজে পূর্বেকার প্রামাণ্য প্রশ্নোত্তর উদ্ধৃত করে বলেন—এই তীর্থ বহু তীর্থসমষ্টিরও ঊর্ধ্বে। এখানে একটিমাত্র পিণ্ড ও জল-তর্পণেই পিতৃগণ প্রেতদুঃখ থেকে মুক্ত হন, দীর্ঘকাল তৃপ্ত থাকেন এবং সাধকের স্থায়ী পুণ্য সঞ্চিত হয়। শ্রুতি–স্মৃতি-নির্দিষ্ট মর্যাদা রক্ষা, কর্মফল-নীতি এবং দেহীর ‘বায়ুর ন্যায়’ গমন উল্লেখ করে স্নান, দান, জপ, হোম, স্বাধ্যায়, দেবার্চনা, অতিথিপূজা ও বিশেষত পিণ্ডোদক-প্রদানকে কর্তব্যরূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অমাবস্যা, ব্যতীপাত, মন্বাদি–যুগাদি, অয়ন–বিষুব ও সূর্যসংক্রান্তির সময়ে এখানে শ্রাদ্ধাদি বিশেষ ফলদায়ক বলা হয়েছে। দেবনির্মিত ব্রহ্মশিলাকে গজকুম্ভসদৃশ বর্ণনা করা হয় এবং কলিযুগে বৈশাখ-অমাবস্যার নিকটে তার বিশেষ প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। স্নানের পর নারায়ণ/কেশবের মন্ত্রস্তব, ব্রাহ্মণভোজন, দরভা ও দক্ষিণাসহ শ্রাদ্ধ, এবং দুধ, মধু, দই, শীতল জল প্রভৃতি ঐচ্ছিক অর্ঘ্যকে পিতৃদের প্রত্যক্ষ পোষণরূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দেবতা, পিতৃগণ, নদী, সমুদ্র ও বহু ঋষিকে এই তীর্থের সাক্ষী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে মহাপাপশুদ্ধি, বৃহৎ বৈদিক যজ্ঞসম ফল, নরকস্থিত পিতৃদের উদ্ধার ও পার্থিব সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি আছে; ব্রহ্মা–বিষ্ণু–মহেশ্বরকে কার্যগত ঐক্যে এক শক্তিরূপে সমন্বিত করা হয়েছে।

Siddheśvara-tīrtha-māhātmya (सिद्धेश्वरतीर्थमाहात्म्य) — Merits of Bathing, Śiva Worship, and Śrāddha on the Narmadā’s Southern Bank
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় মুনি রাজাকে (মহীপাল/নৃপসত্তম) নির্দেশ দেন—রেবা/নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত অতুল সিদ্ধেশ্বর তীর্থে গমন করতে। তিনি বলেন, স্থানটি অতি পবিত্র ও মঙ্গলময়; সেখানে স্নান করে বৃষধ্বজ ভগবান শিবের ভক্তিপূর্বক পূজা করা উচিত। সেই তীর্থে স্নান ও শিবপূজা সর্ব পাপ নাশ করে এবং অশ্বমেধ যজ্ঞকারীদের তুল্য পুণ্য দান করে। যত্নসহকারে স্নান করে শ্রাদ্ধ করলে পিতৃগণের পূর্ণ তৃপ্তি হয়—এটাই তীর্থফলরূপে ঘোষিত। যে প্রাণী এই তীর্থে বা এর সম্পর্কযুক্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে স্বভাবত দুঃখময় গর্ভবাসের পুনরাবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়। শেষে তীর্থজলে স্নানকে পুনর্জন্ম-নিবৃত্তির উপায় বলে শৈব ভক্তির পরিসরে মুক্তিসাধক কর্মরূপে স্থাপন করা হয়েছে।

Āṅgāraka-Śiva Tīrtha Vidhi on the Northern Bank of the Narmadā (अङ्गारक-शिवतीर्थविधिः)
মার্কণ্ডেয় রাজাকে নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত অঙ্গারক-সম্পর্কিত শিবতীর্থে গমন করতে বলেন; এই তীর্থকে পাপক্ষয়কারী স্থান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে চতুর্থী ও মঙ্গলবার (চতুর্থী–অঙ্গারক দিন) উপলক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের ব্রত—সংকল্প, সূর্যাস্তে স্নান এবং অবিরত সন্ধ্যা-উপাসনার বিধান দেওয়া হয়েছে। এরপর পূজাক্রম: স্থণ্ডিলে প্রতিষ্ঠা, রক্তচন্দন লেপন, পদ্ম/মণ্ডল পদ্ধতিতে পূজা, এবং কুজ/অঙ্গারকের “ভূমিপুত্র, স্বেদজ” প্রভৃতি নামে অর্চনা। তাম্রপাত্রে রক্তচন্দন-জল, লাল ফুল, তিল ও চালসহ অর্ঘ্য নিবেদন করতে বলা হয়েছে। আহারে টক ও নোনতা বর্জন করে মৃদু, হিতকর স্বাদের খাদ্য গ্রহণের নির্দেশ আছে। বিধি আরও বিস্তৃত—সম্ভব হলে স্বর্ণমূর্তি, দিকনির্দেশে একাধিক করক স্থাপন, শঙ্খ-তূর্যধ্বনি, এবং বিদ্বান, ব্রতশীল, দয়ালু ব্রাহ্মণকে সম্মান। দানে লাল গাভী ও লাল বলদ, প্রদক্ষিণা, পরিবারসহ অংশগ্রহণ, ক্ষমাপ্রার্থনা-সহ সমাপন ও বিসর্জনের কথা বলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে বহু জন্মে সৌন্দর্য ও সৌভাগ্য, মৃত্যুর পরে অঙ্গারকপুর লাভ, দিব্য ভোগ এবং শেষে ধর্মময় রাজত্ব, স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

Liṅgeśvara Tīrtha Māhātmya and Dvādaśī-Māsa-Nāma Kīrtana (लिङ्गेश्वरतीर्थमाहात्म्यं तथा द्वादशी-मासनामकीर्तनम्)
মার্কণ্ডেয় লিঙ্গেশ্বর নামে এক তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন, যেখানে ‘দেবদেব’ দর্শনে পাপক্ষয় হয়। অধ্যায়টি বিষ্ণু-কেন্দ্রিক ভাবধারায় স্থাপন করে ভগবানের রক্ষাশক্তি ও বরাহ-রূপের স্মরণ করায়, এবং তীর্থযাত্রার আচরণ বলে—তীর্থে স্নান, দেবতার প্রতি প্রণাম-উপাসনা, এবং ব্রাহ্মণদের দান, সম্মান ও ভোজনের দ্বারা সেবা। এরপর দ্বাদশীর নিয়ম বলা হয়: উপবাস/সংযমসহ সুগন্ধি দ্রব্য ও পুষ্পমালায় প্রভুর পূজা, পিতৃ ও দেবতাদের তर्पণ, এবং বারোটি দিব্য নামের কীর্তন। চন্দ্রমাস অনুসারে কেশব থেকে দামোদর পর্যন্ত বিষ্ণুর নাম নির্দিষ্ট করে নামস্মরণকে বাক্-মন-কায়ার দোষশোধক পবিত্র সাধনা বলা হয়েছে। শেষে ভক্তের সৌভাগ্য ও ভক্তিহীন জীবনের আধ্যাত্মিক ক্ষতির কথা বলা হয়। গ্রহণ ও অষ্টকা কালে তিল-মিশ্রিত জলে পিতৃতর্পণের নির্দেশ দিয়ে, শান্তিদায়ক বরাহ-হরির স্তবের মাধ্যমে অধ্যায় সমাপ্ত হয়।

कुसुमेश्वर-माहात्म्य (Kusumeśvara Māhātmya: Ananga, Kāma, and the Narmadā-bank Liṅga स्थापना)
মার্কণ্ডেয় রাজাকে নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত মহাপবিত্র কুসুমেশ্বর তীর্থে যেতে বলেন—এটি উপপাপ নাশক এবং কামদেব প্রতিষ্ঠিত বলে ত্রিলোকে প্রসিদ্ধ। তখন যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করেন, দেহহীন অনঙ্গ কাম কীভাবে পুনরায় ‘অঙ্গিত্ব’ লাভ করল। কৃতযুগে মহাদেব গঙ্গাসাগরে কঠোর তপস্যা করেন, ফলে জগৎ ব্যাকুল হয়। দেবতারা ইন্দ্রের কাছে গিয়ে অপ্সরা, বসন্ত, কোকিল, দক্ষিণ বায়ু ও কামকে শিবের তপোভঙ্গের জন্য প্রেরণ করে; কিন্তু শিবের ত্রিবিধ ভাব বর্ণিত হতে হতে তৃতীয় নয়নের অগ্নিতে কাম ভস্মীভূত হয় এবং জগৎ ‘নিষ্কাম’ হয়ে পড়ে। দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নেয়; ব্রহ্মা বৈদিক স্তোত্রে শিবকে সন্তুষ্ট করেন। শিব বলেন কামের দেহফেরা কঠিন, তবু অনঙ্গ প্রাণদাতা রূপে পুনরুদ্ভূত হয়। পরে কাম নর্মদাতীরে তপস্যা করে কুণ্ডলেশ্বরের কাছে বাধাদানকারী সত্তাদের থেকে রক্ষার প্রার্থনা করে এবং বর পায়—সেই তীর্থে শিবের চিরসান্নিধ্য থাকবে। তখন কাম ‘কুসুমেশ্বর’ নামে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে। অধ্যায়ে স্নান-উপবাস, বিশেষত চৈত্র চতুর্দশী/মদন-দিবসে, প্রাতে সূর্যপূজা, তিলমিশ্রিত জলে তর্পণ ও পিণ্ডদান বিধান করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—এখানে পিণ্ডদান দ্বাদশবর্ষীয় সত্রযজ্ঞসম, পিতৃদের দীর্ঘ তৃপ্তিদায়ক, এমনকি এই স্থানে ক্ষুদ্র প্রাণীর মৃত্যুও কল্যাণকর; ভক্তি-ত্যাগ-সংযমে শিবলোকে ভোগ ও শেষে সম্মানিত, সুস্থ, বাক্পটু রাজরূপে পুনর্জন্ম লাভ হয়।

जयवाराहतीर्थमाहात्म्य तथा दशावतारकथनम् (Jaya-Vārāha Tīrtha Māhātmya and the Account of the Ten Avatāras)
এই অধ্যায়টি সংলাপরূপে রচিত। মার্কণ্ডেয় নর্মদার উত্তর তীরে ‘জয়-বারাহ’ নামে খ্যাত এক মহাপুণ্য তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন। সেখানে স্নান ও মধুসূদনের দর্শন পাপক্ষয়কারী, আর বিশেষ করে ভগবানের দশ জন্ম (দশাবতার) স্মরণ বা পাঠ মহাশুদ্ধিদায়ক—এ কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। যুধিষ্ঠির জানতে চান—মৎস্য থেকে কল্কি পর্যন্ত প্রতিটি অবতারে ভগবান কী কী কর্ম করেছিলেন। মার্কণ্ডেয় সংক্ষেপে জানান—মৎস্য ডুবে যাওয়া বেদ উদ্ধার করেন; কূর্ম মথনকার্যে আধার হয়ে পৃথিবী স্থিত করেন; বারাহ পাতাল থেকে পৃথিবী উত্তোলন করেন; নরসিংহ হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন; বামন তিন পদক্ষেপে বলিকে বশ করে সার্বভৌমত্ব প্রকাশ করেন; পরশুরাম অত্যাচারী ক্ষত্রিয়দের দমন করে ভূমি কশ্যপকে অর্পণ করেন; রাম রাবণবধ করে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন; কৃষ্ণ দুষ্ট রাজাদের বিনাশ করে যুধিষ্ঠিরের জয়ের ইঙ্গিত দেন; বুদ্ধকে কলিযুগে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী রূপ বলা হয়েছে; এবং কল্কিকে দশম জন্ম হিসেবে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। শেষে দশাবতার-স্মরণকে পাপবিনাশের কারণ বলে তীর্থমাহাত্ম্য ও অবতারতত্ত্বকে সমাজধর্ম-অবক্ষয়ের সতর্কবার্তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

भार्गलेश्वर-माहात्म्य (Bhārgaleśvara Māhātmya) — Merit of Worship and Final Passage at the Tīrtha
এই সংক্ষিপ্ত ধর্মীয় বর্ণনায় মার্কণ্ডেয় তীর্থযাত্রীকে মহিমান্বিত ভার্গলেশ্বর-ধামে অগ্রসর হতে বলেন। তিনি শঙ্করকে “জগতের প্রাণ” রূপে উল্লেখ করে জানান যে তাঁর কেবল স্মরণমাত্রেই পাপ নাশ হয় (স্মৃতমাত্র-অঘনাশন)। এরপর তীর্থের দুই ফল বলা হয়েছে—(১) যে সেখানে স্নান করে পরমেশ্বরের পূজা করে, সে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ করে; (২) যে সেই তীর্থে প্রাণত্যাগ করে, সে “অনিবর্তিকা গতি” পেয়ে নিঃসন্দেহে রুদ্রলোক প্রাপ্ত হয়। এই অধ্যায়ে শৈব সoteriology-তে ভক্তি, স্থান ও স্মরণকে শক্তিশালী মুক্তিদায়ক উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

रवितीर्थ-आदित्येश्वर-माहात्म्य (Ravi Tīrtha and Ādityeśvara: Theological Account and Merit Framework)
অধ্যায়ের শুরুতে মার্কণ্ডেয় ‘অতুলনীয়’ রবি-তীর্থের কথা বলেন—যার কেবল দর্শনেই পাপক্ষয় হয় বলে বর্ণিত। রবি-তীর্থে স্নান ও ভাস্কর-দর্শনে নির্দিষ্ট ফল লাভের কথা আছে। রবিকে উদ্দেশ করে যোগ্য ব্রাহ্মণকে বিধিপূর্বক দান করলে তার ফল অপরিমেয়—বিশেষত অয়ন, বিষুব, সংক্রান্তি, সূর্য/চন্দ্রগ্রহণ ও ব্যতীপাতে। এখানে তত্ত্বটি এই যে সূর্য ‘প্রতিদাতা’র মতো নিবেদনকে সময়ের পরিসরে, বহু জন্ম পর্যন্তও, প্রতিদান দেন; সময়ভেদে পুণ্যের তারতম্যও বলা হয়েছে। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন, কেন রবি-তীর্থ এত মহাপুণ্যদায়ক। তখন মার্কণ্ডেয় কৃতযুগের উপাখ্যান বলেন—বিদ্বান ব্রাহ্মণ জাবালি ব্রতপালনের কারণে স্ত্রীর ঋতুকালে বারবার সহবাস অস্বীকার করেন; দুঃখিনী স্ত্রী উপবাস করে প্রাণত্যাগ করেন, আর সেই দোষে জাবালি কুষ্ঠসদৃশ রোগ ও দেহক্ষয়ে আক্রান্ত হন। তিনি নর্মদার উত্তর তীরে ভাস্কর-তীর্থ ও আদিত্যেশ্বরের কথা শোনেন, যা সর্বরোগনাশক; কিন্তু অসুস্থতায় যেতে না পেরে কঠোর তপস্যায় আদিত্যেশ্বরকে নিজের স্থানে আবির্ভূত করার সংকল্প নেন। শতবর্ষ তপস্যার পর সূর্য বর দেন ও সেখানে প্রকাশিত হন; স্থানটি পাপ-শোকহর তীর্থ ঘোষিত হয়। বিধান বলা হয়েছে—এক বছর ধরে প্রতি রবিবার স্নান, সাতবার প্রদক্ষিণ, অর্ঘ্য-দান ও সূর্যদর্শন; এতে চর্মরোগ দ্রুত নিবারণ ও সংসারসমৃদ্ধি লাভের কথা আছে। সংক্রান্তিতে সেখানে শ্রাদ্ধ করলে পিতৃগণ তৃপ্ত হন, কারণ ভাস্করকে পিতৃদেবতার সঙ্গে যুক্ত বলা হয়েছে। শেষে আদিত্যেশ্বরের পবিত্রকারী ও রোগনিবারক মাহাত্ম্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

कलकलेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Glory of the Kalakaleśvara Tīrtha)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত প্রসিদ্ধ তীর্থ ‘কলকলেশ্বর’-এর মাহাত্ম্য বলেন, যা স্বয়ং দেব কর্তৃক নির্মিত বলে খ্যাত। অন্ধক বধের পর মহাদেবকে দেবতা, গন্ধর্ব, কিন্নর ও মহাসর্পেরা শঙ্খ, তূর্য, মৃদঙ্গ, পণব, বীণা, বেণু প্রভৃতি বাদ্য এবং সাম, যজুঃ, ছন্দ, ঋক্-মন্ত্রের ধ্বনিতে স্তব-স্তুতি করে সম্মান জানায়—এই শৈব কাহিনি এখানে বর্ণিত। প্রমথ ও বন্দিদের কলকল-ধ্বনির মধ্যেই লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে ‘কলকলেশ্বর’ নামের ব্যুৎপত্তি বলা হয়েছে। বিধান অনুযায়ী এই তীর্থে স্নান করে কলকলেশ্বর দর্শন করলে বাজপেয় যজ্ঞের চেয়েও অধিক পুণ্য লাভ হয়। ফলশ্রুতিতে পাপশুদ্ধি, দিব্য বিমানে স্বর্গারোহণ, অপ্সরাদের প্রশংসা, স্বর্গীয় ভোগ এবং শেষে শুদ্ধ বংশে দীর্ঘায়ু, নিরোগ, বিদ্বান ব্রাহ্মণরূপে পুনর্জন্মের কথা বলা হয়েছে।

शुक्लतीर्थमाहात्म्यम् (The Glory of Śukla Tīrtha on the Narmadā)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত শুক্লতীর্থকে অতুলনীয় ও সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থরূপে নির্দেশ করেন। তীর্থসমূহের মধ্যে এক শ্রেণিবিন্যাস স্থাপন করে বলা হয়—অন্য পবিত্র স্থানগুলি শুক্লতীর্থের প্রভাবের সামান্য অংশেরও সমান নয়। নর্মদার সর্বপাপহরিণী ও সর্বজনপাবনী মহিমাও এখানে গীত হয়েছে। উৎপত্তিকথায় বিষ্ণু শুক্লতীর্থে দীর্ঘ তপস্যা করেন; তখন শিব আবির্ভূত হয়ে সেই ক্ষেত্রকে প্রতিষ্ঠা করেন, যা ইহলোকের মঙ্গল ও মোক্ষ—উভয়ই প্রদান করে। পরে রাজা চাণক্যের উপাখ্যানে শাপগ্রস্ত দুই সত্তা কাকরূপে যমলোকে প্রেরিত হয়; যম ঘোষণা করেন—শুক্লতীর্থে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেন, তাঁরা তাঁর অধিকারের বাইরে, বিচার ছাড়াই উচ্চ গতি লাভ করেন। কাকদ্বয় যমপুরীর দর্শন, নরকভেদ ও কর্মানুসারে দণ্ড, এবং দানীদের দানফলভোগের বিবরণ দেয়। শেষে চাণক্য আসক্তি ত্যাগ করে ধন দান করেন এবং তীর্থস্নানে বৈষ্ণব গতি প্রাপ্ত হন—এভাবে অধ্যায়টি নীতি, দান ও মুক্তির তত্ত্বকে দৃঢ় করে।

शुक्लतीर्थमाहात्म्य (Śukla-tīrtha Māhātmya) — The Glory of Śukla Tīrtha on the Revā
মার্কণ্ডেয় রেবাতটে নর্মদার শুক্লতীর্থকে অতুলনীয় ও সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থরূপে বর্ণনা করেন। দিক-ঢালু ভূমিতে ঋষিসেবিত এই স্থানে স্নান করলে পাপক্ষয় হয়—যেমন ধোপা কাপড় শুদ্ধ করে, তেমনই দোষ দূর হয় বলে বলা হয়েছে। বিশেষত বৈশাখে (এবং কার্ত্তিকেও) কৃষ্ণপক্ষ চতুর্দশীতে কৈলাস থেকে শিব উমাসহ এখানে আগমন করেন; বিধিপূর্বক স্নানের পর তাঁর দর্শন লাভের কথা বলা হয়েছে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র, গন্ধর্ব, অপ্সরা, যক্ষ, সিদ্ধ, বিদ্যাধর ও নাগ প্রভৃতি দিব্যপরিষদ তীর্থের পবিত্র কর্মধারায় অংশ নেয়। রেবাজলে তর্পণ ও অর্ঘ্য-দান করলে পিতৃগণ দীর্ঘকাল তৃপ্ত হন। ঘৃতসিক্ত কম্বল, সামর্থ্য অনুযায়ী স্বর্ণ, এবং পাদুকা, ছাতা, শয্যা, আসন, অন্ন, জল, শস্য ইত্যাদি দানের বিধান আছে; এর ফলে শিবলোক/রুদ্রলোক প্রাপ্তি, আর এক তপোব্রত-প্রসঙ্গে বরুণপুরী লাভের কথাও বলা হয়েছে। মাসব্যাপী উপবাস, প্রদক্ষিণা (পৃথিবী প্রদক্ষিণার সমান), বৃষমোক্ষ, সামর্থ্য অনুযায়ী অলংকৃত কন্যাদান, এবং রুদ্রার্পিত ‘সুন্দর যুগল’-পূজা জন্মে জন্মে বিচ্ছেদ নিবারক বলে ঘোষিত। শেষে ফলশ্রুতি জানায়—ভক্তিভরে শ্রবণ করলে সন্তান, ধন বা মোক্ষ—ইচ্ছিত সিদ্ধি লাভ হয়।

हुङ्कारतीर्थ-माहात्म्य (Glory of Hūṅkāra Tīrtha and Vāsudeva’s Sacred Site)
এই অধ্যায়ে শুক্লতীর্থের নিকটে এক রাজাকে উদ্দেশ করে ঋষি মার্কণ্ডেয় নর্মদা (রেবা) তীরে অবস্থিত প্রসিদ্ধ বাসুদেব-তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। কাহিনিতে বলা হয়, কেবল “হুঁকার” উচ্চারণে নদী এক ক্রোশ সরে গিয়েছিল; তাই স্থানটি পণ্ডিতসমাজে “হুঁকার” এবং স্নানঘাট “হুঁকারতীর্থ” নামে খ্যাত হয়। হুঁকারতীর্থে স্নান করে অবিনশ্বর অচ্যুতের দর্শনে বহু জন্মের সঞ্চিত পাপ ক্ষয় হয়—এভাবে বৈষ্ণব ভক্তি ও তীর্থযাত্রার সাধনা একত্রে প্রতিপাদিত। সংসারসাগরে নিমজ্জিত জীবের শ্রেষ্ঠ উদ্ধারক নারায়ণ; হরিতে নিবেদিত জিহ্বা, মন ও হাত ধন্য, আর হৃদয়ে হরিকে স্থাপন করলে সর্বমঙ্গল লাভ হয়। অন্য দেবতার উপাসনায় যে ফল কাম্য, তা হরিকে অষ্টাঙ্গ প্রণাম করলেও মেলে—এ কথা বলা হয়েছে। মন্দিরের ধূলিস্পর্শ, ঝাড়ু দেওয়া, জল ছিটানো, লেপন প্রভৃতি সেবাকর্মও পাপনাশক; এমনকি পূর্ণ আন্তরিকতা না থাকলেও নমস্কার দ্রুত দোষ ক্ষয় করে বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তি দেয়—এমন ফলশ্রুতি আছে। শেষে বলা হয়, হুঁকারতীর্থে কৃত শুভ-অশুভ কর্মের ফল স্থায়ী হয়, যা তীর্থের তীব্র নৈতিক-আচারগত শক্তি নির্দেশ করে।

Saṅgameśvara-Tīrtha Māhātmya (Glory of the Saṅgameśvara Confluence Shrine)
অধ্যায় ১৫৮-এ মārkaṇḍেয় সাঙ্গমেশ্বর নামে শ্রেষ্ঠ তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। এটি নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত এবং পাপ ও ভয় নাশকারী বলে খ্যাত। বিন্ধ্য পর্বত থেকে উৎসারিত এক পুণ্যধারা এখানে নর্মদায় মিলিত হয়; কালো পাথরে স্ফটিকের মতো দীপ্তি ইত্যাদি স্থায়ী চিহ্নকে বর্তমান প্রমাণ হিসেবে দেখিয়ে স্থানের প্রামাণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এরপর ভক্তিকর্মের স্তরভেদে ফলশ্রুতি বলা হয়েছে—সঙ্গমে স্নান করে সাঙ্গমেশ্বরের পূজা করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়। ঘণ্টা, পতাকা, ছত্র ইত্যাদি দান করলে দিব্য যানপ্রাপ্তি ও রুদ্রের সান্নিধ্য মেলে। দই, নারকেল প্রভৃতি দিয়ে লিঙ্গ-পূরণ এবং দই-মধু-ঘৃতাদি দ্বারা বিধিবৎ অভিষেক করলে শিবলোকে দীর্ঘবাস, স্বর্গীয় ফল এবং ‘সাত জন্ম’ পর্যন্ত পুণ্যধারার কথা বলা হয়েছে। নৈতিক উপদেশও যুক্ত—মহাদেবকে পরম ‘মহাপাত্র’ বলা হয়েছে; ব্রহ্মচর্যসহ পূজার প্রশংসা করা হয়েছে; এবং শিব-যোগীদের সম্মান সর্বোচ্চ। এক জন শিবযোগীকে অন্নদান করা বহু বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণকে ভোজন করানোর চেয়েও অধিক ফলদায়ক বলা হয়েছে। শেষে স্পষ্ট মুক্তিবাক্য—সাঙ্গমেশ্বরে দেহত্যাগ করলে শিবলোক থেকে আর প্রত্যাবর্তন হয় না, পুনর্জন্ম ঘটে না।

नरकेश्वरतीर्थ-माहात्म्यं, वैतरणीदाना-विधानं च (Narakeśvara Tīrtha Glory and the Procedure of Vaitaraṇī-Gift)
অধ্যায়ের শুরুতে মার্কণ্ডেয় রাজাকে নর্মদার এক বিরল ও অতিশয় পবিত্র তীর্থ ‘নরকেশ্বর’-এর কথা বলেন, যা ভয়ংকর ‘নরকদ্বার’-এর আশঙ্কা থেকে রক্ষাকবচরূপে বর্ণিত। এরপর যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করেন—শুভ ও অশুভ কর্মফল ভোগের পর জীবেরা কীভাবে চিহ্নসহ পুনর্জন্ম লাভ করে। মার্কণ্ডেয় কর্মনীতির সুসংবদ্ধ ব্যাখ্যা দেন; নির্দিষ্ট অপরাধ ও নৈতিক বিচ্যুতির সঙ্গে দেহদোষ, দারিদ্র্য, সামাজিক বঞ্চনা বা তির্যক-যোনি ইত্যাদি জন্মের সম্পর্ক দেখিয়ে শিক্ষামূলক তালিকা উপস্থাপন করেন। পরে গর্ভধারণ থেকে মাসে মাসে ভ্রূণের বিকাশ, পঞ্চভূতের সংযোগ এবং ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধির উদ্ভব—সবই ঈশ্বরশাসিত দেহতত্ত্ব হিসেবে বর্ণিত। পরবর্তী অংশে যমদ্বারে বৈতরণী নদীর ভয়াবহ ভূগোল উঠে আসে—দূষিত জল, হিংস্র জলচর এবং পাপীদের জন্য তীব্র যন্ত্রণা; বিশেষত যারা মাতা, আচার্য, গুরু অবমাননা করে, আশ্রিতকে কষ্ট দেয়, দান ও প্রতিশ্রুতিতে প্রতারণা করে, বা কাম-সামাজিক বিধি লঙ্ঘন করে। প্রতিকার হিসেবে ‘বৈতরণী-ধেনু’ দানের বিধান—বিধিমতো অলংকৃত গাভী নির্মাণ করে মন্ত্রসহ দান ও প্রদক্ষিণা করলে নদী ‘সুখবাহিনী’ হয়ে সহজে পার করায়। শেষে আশ্বযুজ কৃষ্ণ চতুর্দশীতে নর্মদাস্নান, শ্রাদ্ধ, রাত্রিজাগরণ, তর্পণ, দীপদান, ব্রাহ্মণভোজন ও শিবপূজার নির্দেশ দিয়ে নরকনিবারণ, উত্তম পরলোকগতি এবং পরবর্তী শুভ মানবফল লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

मोक्षतीर्थमाहात्म्य (Mokṣatīrtha Māhātmya) — The Glory of the Liberation-Fording Place
মার্কণ্ডেয় পাণ্ডুবংশীয় এক ব্যক্তিকে উপদেশ দেন যে এক অতুল মোক্ষতীর্থ আছে, যেখানে দেবতা, গন্ধর্ব ও তপস্বী ঋষিগণ নিত্য গমন করেন। বিষ্ণুর মায়াজনিত মোহে বহু লোক এই তীর্থকে চিনতে পারে না, কিন্তু সিদ্ধ ঋষিরা এখানেই মুক্তি লাভ করেছেন। পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, প্রাচেতস, বসিষ্ঠ, দক্ষ, নারদ প্রভৃতি মহর্ষির নাম উল্লেখ করে বলা হয়—সাত হাজার মহাত্মা পুত্রসহ এখানে মোক্ষপ্রাপ্ত হয়েছেন; তাই এ তীর্থ মোক্ষদায়ক। এরপর সঙ্গমের কথা বলা হয়েছে—প্রবাহের মধ্যভাগে তমহা নামে এক নদী এসে পতিত/মিলিত হয়; সেই সঙ্গম সর্বপাপনাশক বলে প্রশংসিত। এখানে বিধিপূর্বক গায়ত্রীজপ করলে ঋগ্-যজুঃ-সাম বেদের বিস্তৃত অধ্যয়নের ফল লাভ হয়; দান, হোম ও জপ-পাঠাদি এখানে করলে তা অক্ষয় হয় এবং মুক্তির শ্রেষ্ঠ উপায় হয়। শেষে বলা হয়, দ্বিজ সন্ন্যাসীরা এই তীর্থে দেহত্যাগ করলে তীর্থপ্রভাবে অনাবর্তিকা গতি লাভ করেন; বিধান সংক্ষেপে বলা হয়েছে, বিস্তার পুরাণে বর্ণিত।

सर्पतीर्थमाहात्म्य (Glory of Sarpa-tīrtha)
অধ্যায় ১৬১-এ ঋষি মার্কণ্ডেয় রাজা যুধিষ্ঠিরকে সर्पতীর্থ দর্শনের বিধান বলেন। এই তীর্থকে অতিশয় শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, যেখানে মহৎ নাগগণ কঠোর তপস্যায় সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। বাসুকি, তক্ষক, ঐরাবত, কালিয়, কর্কোটক, ধনঞ্জয়, শঙ্খচূড়, ধৃতরাষ্ট্র, কুলিক, বামন প্রভৃতি নাগ ও তাঁদের বংশপরম্পরার উল্লেখ করে তীর্থকে এক জীবন্ত পবিত্র-রাজ্যরূপে দেখানো হয়েছে, যেখানে তপস্যার ফলে সম্মান ও ভোগ—উভয়ই লাভ হয়। এরপর আচার-ধর্মের নির্দেশ: সर्पতীর্থে স্নান করে পিতৃ ও দেবতাদের তर्पণ দিলে, শঙ্করের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, বাজপেয় যজ্ঞসম পুণ্য হয়। আরও বলা হয়েছে—এখানে স্নানকারী তীর্থযাত্রী সাপ-বিছা প্রভৃতির ভয় থেকে রক্ষিত থাকে। মার্গশীর্ষ কৃষ্ণ অষ্টমীতে বিশেষ ব্রত: উপবাস ও শুচিতা পালন করে তিল দিয়ে লিঙ্গ পূর্ণ করা, গন্ধ-পুষ্পে পূজা, তারপর প্রণাম ও ক্ষমাপ্রার্থনা/প্রায়শ্চিত্ত। ফলশ্রুতিতে তিল ও অর্ঘ্যের পরিমাণানুসারে স্বর্গসুখ, এবং পরে শুদ্ধ কুলে জন্ম, সৌন্দর্য, সৌভাগ্য ও মহাধন লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

गोपेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Gopeśvara Tīrtha-Māhātmya)
অধ্যায় ১৬২-এ অবন্তীখণ্ডের গোপেশ্বর তীর্থের সংক্ষিপ্ত মাহাত্ম্য বর্ণিত। মার্কণ্ডেয় বলেন, সর্পক্ষেত্রের পর পরবর্তী তীর্থযাত্রার গন্তব্য গোপেশ্বর; এখানে কর্ম ও উপাসনার সঙ্গে যুক্ত ক্রমান্বিত মুক্তিফল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একবার তীর্থস্নান করলেই মানুষের পাপক্ষয় হয়—এ কথা বলা হয়েছে। কিন্তু স্নানের পর স্বেচ্ছায় দেহত্যাগকে নিন্দিত করা হয়েছে; এমন ব্যক্তি শিবমন্দিরে পৌঁছালেও ‘পাপ-সংযুক্ত’ই থাকে—তীর্থশক্তির অপব্যবহার থেকে বিরত থাকার নৈতিক সীমা এটি। স্নানের পর ঈশ্বরের পূজা করলে সর্বপাপমুক্তি ও রুদ্রলোকে গমন লাভ হয়। রুদ্রলোকে ভোগের পর সে ধর্মপরায়ণ রাজা হয়ে পুনর্জন্ম পায়; আর পার্থিব ফলে হাতি-ঘোড়া-রথ, অনুচরবৃন্দ, অন্য রাজাদের সম্মান এবং দীর্ঘ সুখময় জীবনের কথা বলা হয়েছে।

नागतीर्थमाहात्म्य (Nāgatīrtha-māhātmya) — Observances at Nāga Tīrtha
মার্কণ্ডেয় রাজশ্রোতাকে বলেন—রেবাতটের পরম পবিত্র নাগতীর্থে গিয়ে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে শুক্ল-পঞ্চমীতে নির্দিষ্ট সময়ে ব্রত পালন করতে হবে। শুচিতা ও সংযম রক্ষা করে রাত্রিতে জাগরণ করবে এবং গন্ধ, ধূপ প্রভৃতি নিবেদনসহ বিধিপূর্বক পূজা করবে। ভোরে শুদ্ধ অবস্থায় তীর্থস্নান করে নিয়মানুসারে শ্রাদ্ধ করার বিধান আছে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—এই অনুষ্ঠানে সর্বপাপ নাশ হয়; আর যে ব্যক্তি সেই তীর্থে দেহত্যাগ করে, সে শিবের ঘোষণানুসারে অনাবর্তনীয় গতি লাভ করে।

सांवाौरतीर्थमाहात्म्य — The Māhātmya of the Sāṃvaura Tīrtha
শ্রী মার্কণ্ডেয় ‘উত্তম’ তীর্থ সাঁৱাউরার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন, যেখানে ভানু (সূর্য) দেব-অসুর সকলের আরাধ্য রূপে বিশেষভাবে বিরাজমান। এই তীর্থকে গভীর দুঃখে নিমজ্জিত মানুষের আশ্রয় বলা হয়েছে—শারীরিক অক্ষমতা, রোগসদৃশ যন্ত্রণা, পরিত্যাগ ও সামাজিক একাকিত্বে ক্লিষ্ট যারা। নর্মদা-তীরে প্রতিষ্ঠিত সাঁৱাউরনাথ তাঁদের রক্ষক, আর্তিহর ও দুঃখনাশক বলে ঘোষিত। বিধান হলো—এক মাস অবিরত তীর্থস্নান করে ভাস্কর (সূর্য) পূজা করা। এর ফলকে নানা দিকের সমুদ্রে স্নানের সমতুল্য বলা হয়েছে, এবং বলা হয়েছে যে যৌবন, প্রৌঢ় ও বার্ধক্যে সঞ্চিত পাপ কেবল স্নানেই বিনষ্ট হয়। রোগ, দারিদ্র্য ও প্রিয়বিচ্ছেদ দূর হয়; সাত জন্ম পর্যন্ত কল্যাণ প্রসারিত হয়। সপ্তমী তিথিতে উপবাস এবং রক্তচন্দনসহ অর্ঘ্যদান বিশেষ পুণ্যকর। নর্মদাজল সর্বপাপনাশিনী বলে প্রশংসিত; যে ভক্ত স্নান করে সাঁৱাউরেশ্বর দর্শন করে সে ধন্য, এবং প্রলয় পর্যন্ত সূর্যলোকে বাস লাভ করে।

सिद्धेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Siddheśvara Tīrtha—Glory and Observances)
মার্কণ্ডেয় নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ‘সিদ্ধেশ্বর’ নামে প্রসিদ্ধ তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। সকল তীর্থের মধ্যে এটিকে বিশেষভাবে পবিত্র বলা হয়েছে। সেখানে স্নান করে পিতৃ ও দেবতাদের উদ্দেশ্যে তর্পণ এবং পিতৃশ্রাদ্ধ করার বিধান দেওয়া হয়েছে; ফলশ্রুতি হিসেবে বলা হয়—সেখানে সম্পন্ন শ্রাদ্ধে পিতৃগণ বারো বছর তৃপ্ত থাকেন। এরপর শৈব ভক্তির অনুশীলনক্রম বলা হয়—ভক্তিসহ স্নান, শিবপূজা, রাত্রিজাগরণ, পুরাণকথা পাঠ/শ্রবণ, এবং নিয়মমাফিক প্রভাতে পুনরায় শুদ্ধ স্নান। এর পরিণামে ভক্ত ‘গিরিজাকান্ত’ শিবের দর্শন লাভ করে উচ্চ অবস্থায় উপনীত হয়—এমন মুক্তিদায়ক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। শেষে কপিল প্রমুখ প্রাচীন সিদ্ধ ও ঋষিদের উল্লেখ করে তীর্থের প্রামাণ্য স্থাপন করা হয়; নর্মদার মহিমাবলে তাঁরা যোগসিদ্ধ হয়ে পরম সিদ্ধি লাভ করেছিলেন—এ কথা বলা হয়েছে।

Siddheśvarī-Vaiṣṇavī Tīrtha Māhātmya (सिद्धेश्वरी-वैष्णवी तीर्थमाहात्म्य) — Ritual Merits of Seeing and Worship
মার্কণ্ডেয় এক পবিত্র তীর্থের কথা বলেন, যেখানে দেবী সিদ্ধেশ্বরী ও বৈষ্ণবী রূপে প্রতিষ্ঠিতা এবং পাপ-নাশিনী। এই তীর্থে দর্শন অতি মঙ্গলদায়ক; সেখানে স্নান করে বিধিপূর্বক আচরণ করতে বলা হয়েছে। স্নানের পর পিতৃ-দেবতার উদ্দেশ্যে ক্রিয়া নিবেদন করে, ভক্তি ও শ্রদ্ধায় দেবীর নিকট গিয়ে পূজা করার ক্রম বর্ণিত। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—ভক্তিভরে দর্শন করলে পাপমোচন হয়। সন্তানহারা বা বন্ধ্যা নারীর সন্তানপ্রাপ্তি ঘটে; আর সঙ্গমে স্নানকারী নারী-পুরুষের পুত্র ও ধনলাভ হয়। দেবী গোত্ররক্ষা করেন এবং যথাবিধি পূজিত হলে সন্তান ও সমাজকে সদা রক্ষা করেন। অষ্টমী ও চতুর্দশীতে বিশেষ পালন, এবং নবমীতে স্নান, উপবাস/সংযম ও শ্রদ্ধাশুদ্ধ চিত্তে পূজার বিধান আছে। শেষে বলা হয়—এখানে উপাসনায় দেবতাদেরও দুর্লভ পরম লোক লাভ হয়।

Mārkaṇḍeya Tīrtha on the Southern Bank of the Narmadā (Śaiva–Vaiṣṇava Installation and Vrata Protocols)
এই অধ্যায়ে তীর্থ-প্রশ্নোত্তরের রূপে যুধিষ্ঠির মুনি মার্কণ্ডেয়কে নর্মদার দক্ষিণ তীরে এক লক্ষণচিহ্নিত তীর্থের পরিচয় ও উৎপত্তি জিজ্ঞাসা করেন। মার্কণ্ডেয় বলেন—তিনি পূর্বে বিন্ধ্য ও দণ্ডকারণ্য অঞ্চলে তপস্যায় অবস্থান করেছিলেন; পরে নর্মদাতটে ফিরে এসে ব্রহ্মচারী, গৃহস্থ, বানপ্রস্থ ও যতি—এই সংযমী আশ্রমবাসীদের নিয়ে এক আশ্রম স্থাপন করেন। দীর্ঘ তপস্যা ও বাসুদেব-ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে স্বয়ং কৃষ্ণ ও শঙ্কর প্রকাশিত হন; মার্কণ্ডেয় তাঁদের কাছে প্রার্থনা করেন যেন তাঁরা দিব্য পারিষদসহ সেখানে চিরকাল, যৌবনময় ও নিরাময় হয়ে অবস্থান করেন। দেবদ্বয় সম্মতি দিয়ে অন্তর্ধান করেন; পরে মার্কণ্ডেয় শঙ্কর ও কৃষ্ণের প্রতিষ্ঠা করে তীর্থে পূজাবিধি স্থির করেন। এরপর বিধানমূলক অংশে তীর্থস্নান করে পরমেশ্বরের ‘মার্কণ্ডেশ্বর’ নামে বিশেষ পূজা এবং বিষ্ণুকে ত্রিলোকেশ্বর রূপে আরাধনার কথা বলা হয়েছে। ঘি, দুধ, দই, মধু, নর্মদাজল, সুগন্ধি, ধূপ, পুষ্প, নৈবেদ্য ইত্যাদি অর্ঘ্য, রাত্রিজাগরণ, জ্যৈষ্ঠ শুক্লপক্ষে উপবাসসহ ব্রত ও দেবপূজা নির্দিষ্ট। শ্রাদ্ধ-তর্পণ, সন্ধ্যা-উপাসনা, ঋগ্/যজুঃ/সাম মন্ত্রজপ এবং লিঙ্গের দক্ষিণ পাশে কলশ স্থাপন করে ‘রুদ্র-একাদশ’ মন্ত্রে স্নানবিধি বর্ণিত—যার ফলে সন্তানলাভ ও দীর্ঘায়ু প্রতিশ্রুত। ফলশ্রুতিতে শ্রবণ-পাঠে পাপশুদ্ধি এবং শৈব-वैষ্ণব উভয় ধারায় মুক্তিমুখী ফল ঘোষিত।

अङ्कूरेश्वरतीर्थमाहात्म्य — The Glory and Origin of Aṅkūreśvara Tīrtha
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ত্রিলোকখ্যাত অঙ্কূরেশ্বর তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন। যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে তীর্থ-সম্পর্কিত রাক্ষসের বংশকথা বর্ণিত হয়—পুলস্ত্য থেকে বিশ্রবা, তারপর বৈশ্রবণ (কুবের), কৈকসীর পুত্র রাবণ-কুম্ভকর্ণ-বিভীষণ; পরে কুম্ভকর্ণের বংশে কুম্ভ ও বিকুম্ভ, এবং কুম্ভের পুত্র অঙ্কূর। অঙ্কূর নিজের বংশপরিচয় জেনে ও বিভীষণের ধর্মনিষ্ঠা দেখে নানা দিকদেশে এবং শেষে নর্মদাতীরে কঠোর তপস্যা করে। শিব প্রসন্ন হয়ে আবির্ভূত হন ও বর দেন। অঙ্কূর প্রথমে দুর্লভ বর—অমরত্ব—প্রার্থনা করে, পরে নিজের নামে তীর্থে শিবের স্থায়ী সান্নিধ্য চায়। শিব শর্ত দেন—যতদিন অঙ্কূরের আচরণ বিভীষণের ধর্মভাবের অনুগামী থাকবে, ততদিন তাঁর নিকট উপস্থিতি থাকবে। এরপর অঙ্কূর বিধিপূর্বক অঙ্কূরেশ্বর লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে ধ্বজা-ছত্র, মঙ্গলধ্বনি ও নানা উপহারে মহাপূজা সম্পন্ন করে। তীর্থসেবার বিধানও বলা হয়েছে—স্নান, সন্ধ্যা, জপ, পিতৃ-দেব-মানব তर्पণ, অষ্টমী বা চতুর্দশীতে উপবাস এবং সংযত মৌন। এখানে পূজার ফল অশ্বমেধসম, যথাবিধি দানের পুণ্য অক্ষয়, এবং হোম-জপ-উপবাস-স্নানের ফল বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। তীর্থে মৃত্যুবরণকারী পশুপাখি প্রভৃতিও মুক্তিলাভ করে—এ কথাও বলা হয়েছে। শেষে ফলশ্রুতি—শ্রদ্ধায় শ্রবণকারী শিবলোকে গমন করে।

माण्डव्यतीर्थमाहात्म्य-प्रस्तावः (Mandavya Tīrtha: Prologue to the Sacred Narrative)
অধ্যায়ের শুরুতে মার্কণ্ডেয় এক পরম পুণ্যদায়ক, পাপ-প্রণাশক তীর্থের কথা বলেন, যা ঋষি মাণ্ডব্য ও নারায়ণের সঙ্গে যুক্ত। তিনি স্মরণ করান—শূলস্থ অবস্থাতেও মাণ্ডব্য নারায়ণের প্রতি ভক্তিভরে শুশ্রূষা করেছিলেন; এ কথা শুনে যুধিষ্ঠির বিস্মিত হয়ে সম্পূর্ণ বিবরণ জানতে চান। তারপর মার্কণ্ডেয় ত্রেতাযুগের পুরাকথা বলেন—দেবপন্ন নামে এক ধর্মপরায়ণ, দানশীল ও প্রজারক্ষক রাজা সমৃদ্ধ হলেও সন্তানহীনতায় দুঃখিত ছিলেন। তিনি স্ত্রী দাত্যায়নীসহ বারো বছর স্নান, হোম, উপবাস ও ব্রত পালন করে স্তোত্রের দ্বারা দেবী চামুণ্ডাকে প্রসন্ন করেন। দেবী দর্শন দিয়ে বলেন—যজ্ঞপুরুষের পূজা ব্যতীত সন্তানলাভ হবে না; রাজা বিধিপূর্বক যজ্ঞ করলে তেজস্বিনী কন্যা জন্মায়, নাম হয় কামপ্রমোদিনী। কন্যা বড় হলে তার রূপ-লাবণ্যের বিস্তৃত বর্ণনা আসে। দেবীপূজায় গিয়ে সে সখীদের সঙ্গে পুকুরে ক্রীড়া করছিল, তখন শম্বর নামক রাক্ষস পাখির রূপ ধরে তাকে অপহরণ করে এবং অলংকারও কেড়ে নেয়। উড়ে যাওয়ার সময় কিছু অলংকার নর্মদা-তীরের কাছে জলে পড়ে, যেখানে মাণ্ডব্য ঋষি নারায়ণের পরম স্থানের সঙ্গে সংযুক্ত এক মাহেশ্বর স্থানে গভীর সমাধিতে নিমগ্ন; অধ্যায়ের শেষে তাঁর ভ্রাতা/পরিচর জনার্দনের ধ্যানে ও সেবায় রত—এই উল্লেখে তীর্থ-মাহাত্ম্যের পরবর্তী ঘটনার ভূমিকা রচিত হয়।

कामप्रमोदिनी-हरणं तथा तपस्वि-दण्डविधान-विपर्यासः (Abduction of Kāmapramodinī and the Misapplied Punishment of an Ascetic)
মার্কণ্ডেয় এক পবিত্র তীর্থ-সরোবরের কাছে ঘটে যাওয়া সংকটের কথা বলেন। দেবসান্নিধ্যে জলাশয়ে ক্রীড়ারত কামপ্রমোদিনীকে হঠাৎ এক শ্যেন (পাখি) ধরে নিয়ে উড়ে যায়। তার সখীরা রাজাকে সংবাদ দিয়ে অনুসন্ধানের অনুরোধ করে; রাজা বৃহৎ চতুরঙ্গিনী সেনা সমবেত করেন, নগর জুড়ে যুদ্ধপ্রস্তুতির উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর নগররক্ষক অপহৃতার অলংকার এনে জানায় যে সেগুলি বহু তপস্বীর মধ্যে তপস্বী মাণ্ডব্যের আশ্রমের নিকটে দেখা গেছে। ক্রোধ ও ভ্রান্তিতে রাজা প্রমাণ-বিচার না করেই মাণ্ডব্যকে ছদ্মবেশী চোর মনে করেন—যেন পাখিরূপ ধারণ করে পালিয়েছে—এবং কার্য-অকার্য বিবেক ত্যাগ করে ব্রাহ্মণ-তপস্বীকে শূলে চড়ানোর আদেশ দেন। নাগরিক ও গ্রামবাসীরা বিলাপ করে প্রতিবাদ জানায়—তপোনিষ্ঠ ব্রাহ্মণের বধ অনুচিত; অভিযোগ থাকলেও সর্বোচ্চ নির্বাসনই দণ্ড হতে পারে। অধ্যায়টি রাজধর্মের কঠিন মুহূর্ত তুলে ধরে—অতিদ্রুত দণ্ড, প্রমাণের অনিশ্চয়তা, এবং তীর্থভূমিতে তপস্বী-সন্তদের পবিত্রতা রক্ষার বিশেষ কর্তব্য।

माण्डव्य-शूलावस्था, कर्मविपाकोपदेशः, शाण्डिली-सत्यव्रत-प्रसङ्गश्च (Māṇḍavya on the Stake: Karmic Consequence Teaching and the Śāṇḍilī Episode)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয়ের বর্ণনার মধ্যে বহু ঋষি—নারদ, বশিষ্ঠ, জমদগ্নি, যাজ্ঞবল্ক্য, বৃহস্পতি, কশ্যপ, অত্রি, ভরদ্বাজ, বিশ্বামিত্র প্রমুখ—শূলবিদ্ধ তপস্বী মাণ্ডব্যকে দেখে নারায়ণের শরণে যান। নারায়ণ রাজাকে দণ্ড দিতে উদ্যত হলেও মাণ্ডব্য তাঁকে নিবৃত্ত করে কর্ম-বিপাকের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন—প্রত্যেকে নিজেরই কর্মফল ভোগ করে, যেমন বাছুর বহু গাভীর মধ্যে নিজের মাকে খুঁজে নেয়। তিনি শৈশবে করা এক ক্ষুদ্র দোষ—উকুনকে কাঁটা/সুঁইয়ের অগ্রে বসানো—কেই বর্তমান যন্ত্রণার বীজ বলে দেখিয়ে সূক্ষ্ম কর্মেরও দায়বদ্ধতা শেখান। পরে দান, স্নান, জপ, হোম, অতিথি-সৎকার, দেবার্চনা ও পিতৃ-শ্রাদ্ধ অবহেলা করলে অধোগতি এবং সংযম, দয়া ও শুচি আচরণে উত্তম গতি লাভের নীতি উপদেশিত হয়। শেষাংশে পতিব্রতা শাণ্ডিলী স্বামীকে বহন করতে গিয়ে অনিচ্ছায় শূলস্থ মুনির সঙ্গে ধাক্কা খায়; তিরস্কৃত হলে সে নিজের পতিব্রত ও আতিথ্যধর্মের মহিমা ঘোষণা করে এবং সংকল্প করে—স্বামীর মৃত্যু হলে সূর্যোদয় হবে না। ফলে বিশ্বে স্থবিরতা নামে; স্বাহা-স্বধা, পঞ্চযজ্ঞ, স্নান-দান-জপ ও শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া ব্যাহত হয়—এভাবে কর্মনিয়মের সঙ্গে ব্রতশক্তির পौरাণিক প্রভাবও একত্রে প্রতিপন্ন হয়।

माण्डव्यतीर्थमाहात्म्यं — Māṇḍavya Tīrtha Māhātmya (Glory of the Māṇḍavya Sacred Ford)
এই অধ্যায়ে দুই ভাগে বিষয়বস্তু বিন্যস্ত। প্রথম ভাগে নর্মদা-তীরে মাণ্ডব্যের পুণ্য আশ্রমে দেবতা ও ঋষিগণ সমবেত হয়ে তাঁর তপস্যাজনিত সিদ্ধির প্রশংসা করেন এবং বর প্রদান করেন। পরে শাপ ও রাক্ষস-সম্পর্কিত একটি প্রসঙ্গ আসে; মাণ্ডব্যকে কন্যাদান করা হয়, বিবাহ সম্পন্ন হয়, এবং রাজপৃষ্ঠপোষকতায় সম্মান, দান ও উপহারের আদান-প্রদান ঘটে। দ্বিতীয় ভাগে মাণ্ডব্যেশ্বর/মাণ্ডব্য-নারায়ণ এবং দেবখাতা প্রভৃতি তীর্থের মাহাত্ম্য ও বিধি-ফলশ্রুতি বলা হয়েছে। স্নান, অভ্যঙ্গ, পূজা, দীপপ্রদীপন, প্রদক্ষিণা, ব্রাহ্মণভোজন, শ্রাদ্ধের সময়নির্ণয় ও ব্রতাচরণ—বিশেষত চতুর্দশীর রাত্রিজাগরণ—উল্লেখিত। মহাযজ্ঞ ও প্রসিদ্ধ তীর্থসম পুণ্যের তুলনা করে পাপনাশ ও পরলোকে শুভগতি লাভের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

शुद्धरुद्रतीर्थ-माहात्म्य (Māhātmya of Śuddharudra Tīrtha / Siddheśvara on the Southern Bank of the Narmadā)
মার্কণ্ডেয় রাজাকে নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত এক অতি পুণ্য তীর্থের কথা বলেন, যা সকল পাপ এবং মহাপাতকও বিনাশ করে। কারণ-কথায় বলা হয়েছে—ব্রহ্মার অসত্য বাক্যের প্রসঙ্গে শিব (ত্রিশূলধারী) ব্রহ্মার এক শিরচ্ছেদ করেন; ফলে তাঁর উপর ব্রহ্মহত্যার ভার পড়ে এবং সেই খুলি তাঁর হাতে লেগে থাকে, কোনোভাবেই ঝরে না। শিব বারাণসী, চার দিকের সমুদ্র ও বহু তীর্থ পরিভ্রমণ করেও মুক্তি পাননি; শেষে কুলকোটির নিকটে নর্মদাতীরের এই তীর্থে প্রায়শ্চিত্ত করলে তিনি অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হন। তখন থেকেই স্থানটি ‘শুদ্ধরুদ্র’ নামে ত্রিলোকে প্রসিদ্ধ, ব্রহ্মহত্যা-নাশক শ্রেষ্ঠ তীর্থ বলে খ্যাত। এখানে নিয়ম বলা হয়েছে—শুক্ল পক্ষের অমাবস্যায় বিধিমতো স্নান করে পিতৃ ও দেবতাদের তर्पণ দিতে হবে এবং অন্তরে পবিত্র সংকল্পে পিণ্ড নিবেদন করতে হবে। পরমেশ্বরকে গন্ধ, ধূপ ও দীপ দ্বারা পূজা করতে বলা হয়েছে; দেবতা ‘শুদ্ধেশ্বর’ নামে পরিচিত এবং শিবলোকে সম্মানিত। এই তীর্থের স্মরণ ও আচরণে সকল পাপমোচন এবং রুদ্রলোকপ্রাপ্তি ফল বলে ঘোষিত।

गोपेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Gopeśvara Tīrtha Māhātmya) — Lamp-offering and Śaiva Merit on the Northern Narmadā Bank
এই অধ্যায়ে ঋষি মার্কণ্ডেয় রাজাকে নির্দেশ দেন যে অবন্তীখণ্ডে নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত গোপেশ্বর তীর্থে গমন করা উচিত। বলা হয়েছে, সেখানে একবার স্নান করলেই পাপদোষ ক্ষয় হয় এবং মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়। এরপর পুণ্যের ক্রম বর্ণিত—প্রথমে তীর্থস্নান; তারপর ইচ্ছানুসারে প্রাণসংক্ষয় (স্বেচ্ছামৃত্যু) করলে দিব্য বিমানে শিবধামে গমন; শিবলোকে ভোগের পর শুভ পুনর্জন্ম, দীর্ঘায়ু, ঐশ্বর্য ও প্রতাপশালী রাজত্ব লাভ। কার্ত্তিক মাসের শুক্ল নবমীতে ব্রতবিধান—উপবাস, শুচিতা, দীপদান, গন্ধ-পুষ্পে পূজা এবং রাত্রিজাগরণ। প্রদীপের সংখ্যার অনুপাতে শিবলোকে সহস্র যুগ সম্মান লাভের ফলশ্রুতি বলা হয়েছে। লিঙ্গ-পূরণ বিধি, পদ্মার্পণ, দধ্যান্ন (দই-ভাত) দান ইত্যাদিও উল্লেখিত; তিল ও পদ্মের সংখ্যামাফিক পুণ্য বৃদ্ধি পায়। শেষে বলা হয়, এই তীর্থে যে কোনো দান কোটি গুণে বৃদ্ধি পেয়ে অগণিত ফল দেয়, এবং তীর্থসমূহের মধ্যে এর শ্রেষ্ঠত্ব অদ্বিতীয়।

कपिलेश्वरतीर्थमाहात्म्य (Kapileśvara Tīrtha Māhātmya)
মার্কণ্ডেয় ঋষি ভৃগু-ক্ষেত্রের মধ্যে নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত কপিলেশ্বরকে পাপ-নাশক শ্রেষ্ঠ তীর্থ বলে নির্দেশ করেন। এখানে কপিলকে বাসুদেব/জগন্নাথেরই প্রকাশ বলা হয়েছে, এবং দেবতার অবস্থানকে অধোলোকসমূহ অতিক্রম করে মহৎ সপ্তম পাতাল পর্যন্ত বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে প্রাচীন পরমেশ্বর বিরাজমান। কাহিনিতে কপিলের সান্নিধ্যে সাগরপুত্রদের আকস্মিক বিনাশ স্মরণ করা হয়। বৈরাগ্য-মনস্ক কপিল সেই ব্যাপক সংহারকে ‘অনুচিত’ মনে করে শোক করেন এবং প্রায়শ্চিত্তের জন্য কপিল-তীর্থের আশ্রয় নেন। পরে তিনি নর্মদা-তীরে কঠোর তপস্যা করে অক্ষয় রুদ্রের পূজা করেন এবং পরম নির্বাণসদৃশ অবস্থায় উপনীত হন। এ অধ্যায়ে বিধি ও ফলশ্রুতি বলা হয়েছে—স্নান ও পূজায় সহস্র-গোদানের পুণ্য; জ্যৈষ্ঠ শুক্ল চতুর্দশীতে যোগ্য ব্রাহ্মণকে দান করলে তা অক্ষয় হয়; নির্দিষ্ট তিথিতে (অঙ্গারক-সম্পর্কিত ব্রতসহ) উপবাস-স্নানে সৌন্দর্য, সমৃদ্ধি ও বংশবৃদ্ধি বহু জন্মে লাভ হয়। পূর্ণিমা-অমাবস্যায় পিতৃতর্পণে পিতৃগণ বারো বছর তৃপ্ত থেকে স্বর্গগামী হন; দীপদান দেহকান্তি বাড়ায়; এবং তীর্থে মৃত্যু হলে শিবধামের দিকে পুনরাগমনহীন পথ প্রাপ্তি হয়।

देवखात-उत्पत्ति एवं पिङ्गलेश्वर-माहात्म्य (Origin of Devakhāta and the Māhātmya of Piṅgaleśvara)
মার্কণ্ডেয় রাজাকে উপদেশ দেন যে পৃথিবীতে দুর্লভ পুণ্যতীর্থ পিঙ্গলাবর্তে গিয়ে পিঙ্গলেশ্বরের সান্নিধ্যে বাক্, মন ও কর্মজাত পাপ লয় পায়। তিনি বলেন, দেবখাতে স্নান ও দান করলে অক্ষয় ফল লাভ হয়; যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে সেই কুণ্ডের উৎপত্তিকথা বর্ণনা করেন। অন্তর্কথায় রুদ্র (শিব) কমণ্ডলু ধারণ করে দেবতাদের সঙ্গে ত্রিশূল-শুদ্ধির জন্য ভ্রমণ করেন। দেবতারা নানা তীর্থে স্নান করে জল এক পাত্রে সংগ্রহ করেন; ত্রিশূল শুদ্ধ হলে ভৃগুকচ্ছ পৌঁছে তারা অগ্নিকে এবং রোগাক্রান্ত, তামাটে-চোখের পিঙ্গলকে মহেশ্বর-ধ্যানে কঠোর তপস্যায় রত দেখতে পান। দেবতারা শিবকে প্রার্থনা করেন—পিঙ্গলকে সুস্থ করুন যাতে তিনি অর্ঘ্য-হবি গ্রহণ করতে পারেন; শিব আদিত্যসদৃশ রূপ ধারণ করে তার ব্যাধি দূর করে দেহ নবীন করেন। পিঙ্গল সকল জীবের মঙ্গলের জন্য শিবের স্থায়ী উপস্থিতি চান—রোগশমন, পাপনাশ ও কল্যাণবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। তখন শিব দেবতাদের আদেশ দেন—তাঁর উত্তরে এক দিব্য দেবখাত খনন করে তাতে সংগৃহীত তীর্থজল ঢাল; সেই জল সর্বপবিত্র ও রোগনাশক হয়। রবিবার স্নান, নর্মদাজলে স্নান, শ্রাদ্ধ-দান ও পিঙ্গেশ পূজার বিধান এবং জ্বর, চর্মরোগ, কুষ্ঠসদৃশ ব্যাধির উপশম ও প্রায়শ্চিত্তফল বলা হয়েছে; বিশেষ করে বহু রবিবার স্নান করে দ্বিজকে তিলপাত্র দানের নিয়মও আছে। শেষে দেবখাতে স্নানের শ্রেষ্ঠতা এবং পিতৃকার্যের পর পিঙ্গলেশ্বর পূজার ফল অশ্বমেধ-বাজপেয়ের সমতুল্য বলা হয়েছে।

Bhūtīśvara-tīrtha Māhātmya and the Taxonomy of Purificatory Snānas (भूतीश्वरतीर्थमाहात्म्यं स्नानविधिवर्गीकरणं च)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে ভূতীশ্বর তীর্থের মাহাত্ম্য বোঝান। বলা হয়েছে, কেবল দর্শনেই পাপ ক্ষয় হয়; শূলধারী শিব এখানে উদ্ধূলন (ভস্মলেপন) করেছিলেন বলেই স্থানের নাম ভূতীশ্বর। পুষ্য-সম্পর্কিত জন্মনক্ষত্রের দিনে এবং অমাবস্যায় এখানে স্নান করলে পিতৃগণের মহৎ উদ্ধারের ফল লাভ হয়। এরপর অঙ্গ-গুণ্ঠন/ভস্মলেপনের ফলক্রম বলা হয়—দেহে যত ভস্মকণা লেগে থাকে, তত দীর্ঘকাল শিবলোকে মান-সম্মান বৃদ্ধি পায়। ভস্মস্নানকে শ্রেষ্ঠ শুদ্ধিকর্ম বলে স্নানের শ্রেণিবিভাগ করা হয়—আগ্নেয়, বারুণ, ব্রাহ্ম্য, বায়ব্য ও দিব্য। আগ্নেয় হলো ভস্মস্নান, বারুণ জলাবগাহন, ব্রাহ্ম্য ‘আপো হি ষ্ঠা’ মন্ত্রে, বায়ব্য গোধূলিতে, আর দিব্য সূর্যদর্শনের সময় স্নান—যা গঙ্গাস্নানের সমান পুণ্যদায়ক। শেষে স্নান ও ঈশানপূজায় বাহ্য-অন্তঃশুদ্ধি, জপে পাপশোধন এবং ধ্যানে অনন্তের দিকে অগ্রগতি বলা হয়েছে। শিবস্তোত্রে নিরাকার পরমতত্ত্বের স্তব আছে, এবং ভূতীশ্বরে স্নানের ফল অশ্বমেধ যজ্ঞের পুণ্যের তুল্য বলে উপসংহার টানা হয়।

Gaṅgāvāhaka-tīrtha Māhātmya (The Glory of the Gaṅgāvāhaka Ford)
মার্কণ্ডেয় নর্মদা/রেবা নদীতে ভৃগুতীর্থের নিকটে অবস্থিত ‘গঙ্গাবাহক’ নামে এক মহিমান্বিত তীর্থের কথা বলেন। এখানে গঙ্গা দীর্ঘ তপস্যা করে জনার্দন-নারায়ণ বিষ্ণুর সঙ্গে ধর্মসংলাপে প্রবেশ করেন। তিনি নিজের অবতরণের কাহিনি জানান এবং বলেন—অসংখ্য মহাপাপভারাক্রান্ত মানুষ তাঁর জলে শুদ্ধি খোঁজে; সেই পাপসঞ্চয়ের প্রতীকময় ভারে তিনি নিজেকে ‘উত্তপ্ত’ বোধ করেন। বিষ্ণু গঙ্গার দুঃখ নিবারণ করে সেখানে নিজের বিশেষ সান্নিধ্য স্থাপন করেন এবং গঙ্গাধরকে সহায় রূপে নির্দেশ দেন। তিনি গঙ্গাকে দেহধারিণী হয়ে রেবায় প্রবেশ করতে বলেন, যাতে গঙ্গা-রেবার মিশ্রজল এক অনন্য পবিত্রতা লাভ করে। বর্ষাকালে জলবৃদ্ধি ও বিষ্ণুর শঙ্খচিহ্নকে কেন্দ্র করে এক বিশেষ পর্ব নির্ধারিত হয়, যা সাধারণ কালসন্ধির চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষিত। এই তীর্থে মিশ্রজলে স্নান, তীর্থে তর্পণ-শ্রাদ্ধ, বাল-কেশবের পূজা এবং রাত্রিজাগরণের বিধান আছে। এর ফলে পাপসমষ্টির ক্ষয়, পিতৃগণের দীর্ঘ তৃপ্তি, এবং সেখানে দেহত্যাগকারী ভক্তদের জন্য অবিচল শুভ পরলোকগতি নিশ্চিত হয়।

Gautameśvara-tīrtha Māhātmya (गौतमेश्वरतीर्थमाहात्म्य) — Rituals, Offerings, and Phala
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে প্রসিদ্ধ গৌতমেশ্বর তীর্থে গমনের উপদেশ দেন। এই তীর্থ সর্বজনবিদিত পাপশোধক। গৌতম ঋষির দীর্ঘ তপস্যায় মহেশ্বর প্রসন্ন হয়ে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হন; তাই দেবতার নাম গৌতমেশ্বর। দেব, গন্ধর্ব, ঋষি এবং পিতৃ-সম্পর্কিত দেবতারা এই স্থানে পরমেশ্বরের পূজা করে শ্রেষ্ঠ সিদ্ধি লাভ করেছেন—এ কথা বলা হয়েছে। এরপর আচারের নির্দেশ আসে—তীর্থস্নান, পিতৃদেবতার পূজন এবং শিবপূজা পাপমুক্তির উপায়। অনেকেই বিষ্ণুমায়ায় মোহিত হয়ে এই মাহাত্ম্য জানে না, তবু শিব সেখানে সন্নিহিত। ব্রহ্মচর্যসহ স্নান ও অর্চনা করলে অশ্বমেধসম পুণ্য হয়; দ্বিজাতিকে দান করলে তা অক্ষয় ফলদায়ক। বিশেষ তিথি-অনুষ্ঠানও নির্দিষ্ট—আশ্বযুজ কৃষ্ণ চতুর্দশীতে শত প্রদীপ দান; কার্তিক অষ্টমী ও চতুর্দশীতে উপবাস এবং ঘি, পঞ্চগব্য, মধু, দধি বা শীতল জলে অভিষেক। পুষ্প-পত্র অর্পণে অখণ্ড বিল্বপত্র বিশেষ প্রশস্ত। ছয় মাস নিরন্তর পূজায় কামনা পূর্ণ হয় এবং শেষে শিবলোকপ্রাপ্তি ঘটে।

Daśāśvamedhika Tīrtha Māhātmya (दशाश्वमेधिकतीर्थमाहात्म्यम्) — Merit of Ten Aśvamedhas through Narmadā Worship
এই অধ্যায়ে রাজর্ষি-সংলাপের মাধ্যমে ধর্মতত্ত্বের আলোচনা হয়েছে। মার্কণ্ডেয় নর্মদা-তীরে অবস্থিত ‘দশাশ্বমেধিক’ তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন—নিয়ম-সংযমসহ উপাসনা করলে দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞের সমান পুণ্য লাভ হয়। যুধিষ্ঠির প্রশ্ন তোলেন, অশ্বমেধ তো ব্যয়বহুল ও সাধারণের অগম্য; তবে সাধারণ সাধক কীভাবে তার ফল পেতে পারে? উত্তরে মার্কণ্ডেয় একটি দৃষ্টান্ত-কথা বলেন। শিব পার্বতীসহ তীর্থে এসে ক্ষুধার্ত তপস্বী-ব্রাহ্মণের রূপ ধারণ করে লোকের শ্রদ্ধা ও আচরণ পরীক্ষা করেন। অনেকেই অবজ্ঞা করে, কিন্তু এক বিদ্বান ব্রাহ্মণ বেদ–স্মৃতি–পুরাণের সাক্ষ্যে আস্থা রেখে স্নান, জপ, শ্রাদ্ধ, দান ও কপিলা-দান সম্পন্ন করে এবং অতিথিধর্মে গোপন শিবকে সেবা করেন। শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন; ব্রাহ্মণ তীর্থে শিবের চিরস্থায়ী সান্নিধ্য প্রার্থনা করেন, ফলে তীর্থের পবিত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর আশ্বিন শুক্ল দশমীর বিধান বলা হয়েছে—উপবাস, ত্রিপুরান্তক শিবপূজা, তীর্থে সরস্বতীর উপস্থিতিকে সম্মান, প্রদক্ষিণা, গোধন, দীপসহ রাত্রিজাগরণ, পাঠ-সংগীত-বাদ্য, এবং ব্রাহ্মণ ও শিবভক্তদের ভোজন। ফলশ্রুতিতে পাপশুদ্ধি, রুদ্রলোকে গমন, শুভ জন্ম, এবং সেখানে বিভিন্ন অবস্থায় মৃত্যু হলে আস্থিক্য ও বিধিপালনের অনুসারে নানা পরলোকগতি বর্ণিত হয়েছে।

Bhṛgutīrtha–Vṛṣakhāta Māhātmya (भृगुतीर्थ–वृषखात माहात्म्य)
এই অধ্যায়টি সংলাপরূপে রচিত। যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে মার্কণ্ডেয় নর্মদাতীরের প্রসিদ্ধ তীর্থ, তার ‘বৃষখাত’ নাম এবং ভৃগুকচ্ছ অঞ্চলে মহর্ষি ভৃগুর উপস্থিতির কথা বলেন। তিনি ভৃগুর কঠোর তপস্যার বর্ণনা দেন এবং শিব-উমার এক দিব্য পর্ব তুলে ধরেন—উমা প্রশ্ন করেন কেন বর দান করা হচ্ছে না; শিব নীতিশিক্ষা দেন যে ক্রোধ তপস্যাকে ক্ষয় করে এবং আধ্যাত্মিক সিদ্ধিতে বাধা আনে। এই শিক্ষা দেখাতে শিব বৃষরূপ এক দূতকে প্রকাশ/প্রেরণ করেন, যে ভৃগুকে উত্তেজিত করে। বৃষ ভৃগুকে নর্মদায় নিক্ষেপ করে; ভৃগু তীব্র ক্রোধে তাকে ধাওয়া করেন। পালাতে থাকা বৃষ দ্বীপ, পাতাল ও ঊর্ধ্বলোক অতিক্রম করে—অসংযত রোষের বিস্তৃত পরিণতি এতে প্রকাশ পায়। শেষে বৃষ শিবের শরণ নেয়; উমা অনুরোধ করেন, ঋষির ক্রোধ প্রশমিত হওয়ার আগে বর দান করা হোক। শিব সেই স্থানকে ‘ক্রোধস্থান’ বলে ঘোষণা করেন। এরপর ভৃগু দীর্ঘ স্তোত্র (যার মধ্যে ‘করুণাভ্যুদয়’ নামে খ্যাত স্তবও আছে) পাঠ করে শিবের স্তব করেন; শিব বর প্রদান করেন। ভৃগু চান—স্থানটি তাঁর নামে সিদ্ধিক্ষেত্র হোক এবং সেখানে দেবসান্নিধ্য স্থায়ী হোক; শেষে তিনি শ্রী (লক্ষ্মী)-র সঙ্গে শুভ স্থান প্রতিষ্ঠা বিষয়ে পরামর্শ করেন, ফলে তীর্থের পরিচয় ভক্তি ও স্থান-প্রতিষ্ঠার ধর্মতত্ত্বে দৃঢ় হয়।

Bhṛgukaccha-utpattiḥ and Koṭitīrtha Māhātmya (भृगुकच्छोत्पत्तिः / कोटितीर्थमाहात्म्यम्)
অধ্যায় ১৮২-এ মাৰ্কণ্ডেয়ের বর্ণনার মাধ্যমে রেবার উত্তর তীরে ভৃগুকচ্ছের উৎপত্তিকথা বলা হয়েছে। ভৃগু ঋষি শ্রী (লক্ষ্মী/রমা)-সহ কূর্মাবতার কচ্ছপের কাছে গিয়ে চাতুর্বিদ্যা-ভিত্তিক বসতি স্থাপনের অনুমতি চান; কূর্ম সম্মতি দেন এবং নিজের নামে দীর্ঘকাল স্থায়ী নগরীর ভবিষ্যদ্বাণী করেন। পরে মাঘ মাস, শুভ তিথি-নক্ষত্র, উত্তর তীরের গভীর জল ও কোটিতীর্থের চিহ্নসহ ক্ষেত্রের অবস্থান এবং নববসতিতে বর্ণভিত্তিক কর্তব্যব্যবস্থা বর্ণিত হয়। লক্ষ্মী দেবলোকে গিয়ে ভৃগুর কাছে চাবি-তালা (কুঞ্চিকা-ট্টাল) রেখে আসেন; ফিরে এসে মালিকানা নিয়ে বিবাদ করেন। বিচার করতে ডাকা ব্রাহ্মণরা ভৃগুর ক্রোধভয়ে নীরব থাকে এবং নিয়ম দাঁড় করায়—যার হাতে চাবি, অধিকার তারই। এতে লক্ষ্মী লোভ ও সত্যত্যাগকে কারণ বলে দ্বিজদের বিদ্যা, স্থিতি ও নৈতিক স্পষ্টতা নষ্ট হওয়ার শাপ দেন। দুঃখিত ভৃগু শংকরকে প্রণাম করে প্রার্থনা করলে শিব স্থানটিকে ‘ক্রোধস্থান’ বলেও ভবিষ্যৎ ব্রাহ্মণদের বিদ্যা নিজের অনুগ্রহে স্থির থাকবে বলেন এবং কোটিতীর্থকে পাপনাশক তীর্থরূপে প্রতিষ্ঠা করেন। শিব বলেন—স্নান ও পূজা মহাযজ্ঞসম ফল দেয়, তর্পণে পিতৃগণ তৃপ্ত হন, দুধ-দই-ঘি-মধু দিয়ে অভিষেক করলে স্বর্গবাস লাভ হয়। সূর্যগ্রহণাদি কালে দান-ব্রত প্রশংসিত; ব্রত, ত্যাগ, সন্ন্যাস এবং এই ক্ষেত্রে মৃত্যুও শুভগতিদায়ক বলা হয়েছে। শিব অম্বিকা (সৌভাগ্যসুন্দরী)-সহ সেখানে নিত্যবাসের ঘোষণা করেন; ভৃগু শেষে ব্রহ্মলোকে গমন করেন। শ্রবণমাত্রেই পবিত্রতা ও ফলশ্রুতি দিয়ে অধ্যায়ের সমাপ্তি।

Kedāra-tīrtha Māhātmya on the Northern Bank of the Narmadā (केदारतीर्थमाहात्म्य)
অধ্যায় ১৮৩ সংলাপরূপে রচিত। মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে কেদার-নামক তীর্থের যাত্রাক্রম ও বিধান বলেন—কেদারে গিয়ে শ্রাদ্ধ করতে হবে, তীর্থজল পান করতে হবে এবং দেবদেবেশের পূজা করতে হবে; এতে কেদার-উৎপন্ন পুণ্য লাভ হয়। এরপর যুধিষ্ঠির নর্মদার উত্তর তীরে কেদারের প্রতিষ্ঠা কীভাবে হল, তা বিস্তারিত জানতে চান। মার্কণ্ডেয় বলেন, কৃতযুগের আদিতে পদ্মা/শ্রী-সম্পর্কিত এক শাপে ভৃগুর অঞ্চল অপবিত্র ও “বেদবিহীন” হয়ে পড়ে। ভৃগু সহস্র বছর কঠোর তপস্যা করেন; তখন শিব পাতালস্তর ভেদ করে লিঙ্গরূপে প্রকাশিত হন। ভৃগু স্থাণু ও ত্র্যম্বকের স্তব করে ক্ষেত্রশুদ্ধির প্রার্থনা জানান। শিব ‘আদি-লিঙ্গ’ হিসেবে কেদার নাম প্রতিষ্ঠা করেন, পরে আরও দশটি লিঙ্গ স্থাপন করেন; মাঝখানে একাদশ এক অদৃশ্য সান্নিধ্য থাকে যা ক্ষেত্রকে পবিত্র করে। সেখানে দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টাদশ দুর্গা, ষোড়শ ক্ষেত্রপাল এবং বীরভদ্র-সম্পর্কিত মাতৃগণ রক্ষাকবচরূপে বিরাজ করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—নাঘ মাসে নিয়মিত প্রাতঃস্নান, কেদারপূজা ও তীর্থে বিধিপূর্বক শ্রাদ্ধ করলে পিতৃগণ তৃপ্ত হন; পাপ ক্ষয় হয়, দুঃখ নাশ হয় এবং মঙ্গলফল লাভ হয়।

धौतपापतीर्थमाहात्म्यम् (Māhātmya of the Dhoutapāpa Tīrtha)
এই অধ্যায়ে নর্মদার উত্তর তীরে ভৃগু-তীর্থের নিকটে অবস্থিত ধৌতপাপ (বিধৌতপাপ) তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। মার্কণ্ডেয় বলেন, এই স্থান পাপ ধৌত করার জন্য প্রসিদ্ধ এবং ভৃগু মুনিকে সম্মান জানাতে মহাদেব শিব এখানে নিত্য বিরাজমান। এখানে স্নান করলে সংকল্পে ত্রুটি থাকলেও পাপমোচন হয়; আর বিধিপূর্বক স্নান, শিবপূজা এবং দেবতা ও পিতৃদের উদ্দেশ্যে তর্পণ-দান করলে সর্বাঙ্গীন শুদ্ধি লাভ হয়। যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করেন—ব্রহ্মহত্যার মতো মহাপাপ কীভাবে এখানে প্রবেশ করে না বা কীভাবে নষ্ট হয়? মার্কণ্ডেয় এক পুরাকথা বলেন—ব্রহ্মার এক শিরচ্ছেদ করার ফলে শিবের উপর ব্রহ্মহত্যা দোষ আরোপিত হয়; দোষটি অনুসরণ করতে থাকে, পরে ধর্ম বৃষরূপে তাকে ঝাঁকিয়ে দূরে সরিয়ে দেন এবং ধৌতেশ্বরী দেবী ব্রহ্মহত্যা-নাশিনী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ব্রহ্মহত্যাকে ভয়ংকর সত্তা রূপে দেখানো হয়েছে, যে এই তীর্থ থেকে দূরে থাকে। এখানে কালবিধানও আছে—আশ্বযুজ শুক্ল নবমী এবং শুক্ল সপ্তমী থেকে তিন দিনের অবকাশ; উপবাস, ঋগ্/যজুঃ/সাম পাঠ ও গায়ত্রী-জপ প্রায়শ্চিত্তের উপায়। ফলশ্রুতিতে গুরুতর অপরাধমোচন, সন্তানলাভের বর এবং মৃত্যুর পরে উত্তম গতি বলা হয়েছে; তীর্থতত্ত্বের অংশ হিসেবে এখানে স্বেচ্ছামৃত্যুতেও দিব্যলোকপ্রাপ্তির কথাও উল্লেখিত।

Ēraṇḍī-tīrtha Māhātmya (एरण्डीतीर्थमाहात्म्य) — Ritual Bathing, Upavāsa, and Tarpaṇa on Āśvayuja Śukla Caturdaśī
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় সংক্ষেপে ধর্মীয় আচার-বিধি উপদেশ দেন। তিনি মহীপালকে বলেন—পবিত্র এরণ্ডী-তীর্থে গিয়ে স্নান কর; সেখানে কেবল স্নানমাত্রেই মহাপাপ ক্ষয় হয় এবং গুরুতর দোষ দূরীভূত হয়। এরপর তিনি নির্দিষ্ট তিথি জানান—আশ্বযুজ মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশীতে উপবাস করে, সংযমসহ স্নান করে, পিতৃ ও দেবতাদের উদ্দেশ্যে তर्पণ করা উচিত। ফলশ্রুতিতে সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্যযুক্ত পুত্রলাভ, দীর্ঘায়ু এবং মৃত্যুর পরে শিবলোকে গমন বলা হয়েছে; এই ফল সম্পর্কে কোনো সন্দেহ না রাখতে দৃঢ়ভাবে বলা হয়।

Garuḍa-tapas, Mahādeva-varadāna, and Cāmuṇḍā–Kanakeśvarī-stuti at a Tīrtha
মার্কণ্ডেয় একটি তীর্থকেন্দ্রিক কাহিনি বর্ণনা করেন। এক মহাপবিত্র স্থানে গরুড় মহেশ্বরের উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা ও পূজা করেন; তাতে শিব আবির্ভূত হয়ে বর-সংলাপ করেন। গরুড় দুই দুর্লভ বর চান—বিষ্ণুর বাহন হওয়া এবং পক্ষীদের মধ্যে ‘ইন্দ্রত্ব/দ্বিজেন্দ্রত্ব’ অর্থাৎ সর্বোচ্চ অধিপত্য। শিব নারায়ণের সর্বাধার স্বরূপ ও ইন্দ্রপদের অনন্যতা স্মরণ করিয়ে এই প্রার্থনার তাত্ত্বিক জটিলতা জানান, তবু শর্তসাপেক্ষে বর দেন—গরুড় শঙ্খ-চক্র-গদাধারী প্রভুর বাহক হবেন এবং পক্ষীদের প্রধানও হবেন। শিব অন্তর্ধান করলে গরুড় ভয়ংকর দেবী চামুণ্ডাকে প্রসন্ন করেন—যাঁর রূপ শ্মশান-চিহ্ন ও যোগিনী-সংযোগে বর্ণিত—এবং দীর্ঘ স্তব করেন। স্তবে দেবীকে দীপ্ত রক্ষিকা ‘কনকেশ্বরী’ রূপে পরাশক্তি বলা হয়, যিনি সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ে ক্রিয়াশীল। চামুণ্ডা গরুড়কে অজেয়তা, দেব-অসুর উভয়ের উপর বিজয় এবং তীর্থের নিকটে অবস্থানের বর দেন। শেষে তীর্থফল বলা হয়—স্নান ও পূজায় যজ্ঞসম পুণ্য, যোগসিদ্ধি এবং যোগিনীসমূহের সহচর্যে শুভ পরলোকগতি লাভ হয়।

कालाग्निरुद्र-स्वयम्भू-लिङ्गमाहात्म्य (Kālāgnirudra Svayambhū Liṅga Māhātmya)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় মুনি এক রাজাকে তীর্থযাত্রার ক্রম ও এক প্রসিদ্ধ লিঙ্গের তাত্ত্বিক মাহাত্ম্য উপদেশ দেন। তিনি ভৃগুকচ্ছস্থিত জালেশ্বরকে অতি প্রাচীন স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ বলে পরিচয় করান, যা ‘কালাগ্নিরুদ্র’ নামে খ্যাত। ক্ষেত্রটি ‘ক্ষেত্র-পাপ’ নিবারণের জন্য করুণাবশে প্রকাশিত, পাপশমন ও দুঃখনাশক পবিত্র কেন্দ্র—এভাবে বর্ণিত। পূর্বকল্পে অসুরেরা ত্রিলোক আক্রমণ করলে এবং বৈদিক যজ্ঞ-ধর্ম ক্ষীণ হলে কালাগ্নিরুদ্র থেকে আদ্য ধূম উৎপন্ন হয়; সেই ধূম থেকেই লিঙ্গ প্রকাশ পেয়ে সপ্ত পাতাল ভেদ করে দক্ষিণাবর্ত গর্তসহ প্রতিষ্ঠিত হয়—এমন কাহিনি বলা হয়েছে। শিবের পুরদাহ-সম্পর্কিত জ্বালা-উৎপন্ন কুণ্ড এবং ধূমাবর্ত নামে ঘূর্ণির মতো এক স্থানও উল্লেখিত। বিধান হলো—তীর্থে ও নর্মদাজলে স্নান, পিতৃশ্রাদ্ধ, ত্রিলোচন (শিব)-পূজা এবং কালাগ্নিরুদ্রের নামজপ; এর ফলে ‘পরমা গতি’ লাভ হয়। আরও বলা হয়, কাম্যকর্ম, অপায়নিবারণ/শান্তিকর্ম, শত্রুনাশের উদ্দেশ্য এবং বংশ-সম্পর্কিত সংকল্প এখানে দ্রুত সিদ্ধ হয়—এটি তীর্থপ্রভাবের ঘোষণা।

Śālagrāma-tīrtha Māhātmya (शालग्रामतीर्थमाहात्म्य) — Observances on the Revā/Narmadā Bank
মার্কণ্ডেয় রাজাকে উপদেশ দেন যে রেবা/নর্মদার তীরে অবস্থিত শালগ্রাম নামক পবিত্র তীর্থে গমন করা উচিত। এ স্থান সর্ব দেবতার আরাধিত, এবং এখানে ভগবান বাসুদেব—ত্রিবিক্রম ও জনার্দনরূপে—জীবকল্যাণের জন্য অধিষ্ঠান করেন বলে খ্যাত। তপস্বীদের প্রাচীন সাধনা ও দ্বিজ-সাধকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ধর্মকর্ম-ক্ষেত্রের কারণে শালগ্রামের মাহাত্ম্য বিশেষভাবে বর্ণিত। মার্গশীর্ষ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীতে রেবায় স্নান করে উপবাস করতে, রাত্রিজাগরণসহ জনার্দনের পূজা করতে বলা হয়েছে। পরদিন দ্বাদশীতে পুনরায় স্নান করে দেবতা ও পিতৃগণের তर्पণ করে বিধিপূর্বক শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করতে হবে। সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রাহ্মণদের সম্মান করে স্বর্ণ, বস্ত্র, অন্ন প্রভৃতি দান, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং খগধ্বজ প্রভৃতি নামে ভগবানের ভক্তিপূর্বক স্মরণও বিধান। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—এতে শোক-দুঃখ নাশ হয় এবং ব্রহ্মহত্যাসহ ঘোর পাপ থেকে মুক্তি লাভ হয়। শালগ্রামের পুনঃপুন দর্শন ও নারায়ণস্মরণে মোক্ষাভিমুখ অবস্থা লাভ হয়; ধ্যাননিষ্ঠ সন্ন্যাসীরাও সেখানে মুরারির পরম পদ প্রাপ্ত হন।

पञ्चवराहदर्शन-व्रत-फलश्रुति (Vision of the Five Varāhas: Vrata Procedure and Promised Fruits)
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে এক ‘পরম-শোভন’ তীর্থের কথা বলেন, যেখানে বরাহরূপ বিষ্ণুকে ধরণীধর—পৃথিবী-উদ্ধারক—রূপে স্মরণ করা হয়। অন্তর্নিহিত সৃষ্টিকথায় হরি ক্ষীরসাগরে শেষশয্যায় যোগনিদ্রায় থাকেন; পৃথিবী ভারে নিমজ্জিত হলে দেবতারা ব্যাকুল হয়ে তাঁকে জাগিয়ে জগতের স্থিতি রক্ষার প্রার্থনা করেন। তখন বিষ্ণু ভয়ংকর দন্তধারী বরাহরূপ ধারণ করে দন্তে পৃথিবীকে তুলে স্থিতি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর নর্মদার উত্তর তীরে বরাহের পাঁচ প্রকার প্রকাশের বর্ণনা আসে—গ্রন্থে উল্লিখিত প্রথম থেকে পঞ্চম স্থানে দর্শন ও পূজার বিধান; পঞ্চমটি ‘উদীর্ণ-বরাহ’, ভৃগুকচ্ছের সঙ্গে যুক্ত। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষে, বিশেষত একাদশীতে, তীর্থযাত্রী হবিশ্য আহার, রাত্রিজাগরণ, নদীস্নান, তিল-যব দ্বারা পিতৃ ও দেবতার তर्पণ, এবং যোগ্য ব্রাহ্মণকে ক্রমানুসারে গাভী, অশ্ব, স্বর্ণ ও ভূমিদান করে প্রতিটি বরাহস্থানে উপাসনা করে। ফলশ্রুতি বলে—পাঁচ বরাহের একযোগে দর্শন, নর্মদা-কর্ম ও নারায়ণস্মরণ মহাপাপও নাশ করে মোক্ষ দান করে; শঙ্কর-প্রমাণে যথাসময়ে লোটাণেশ্বর দর্শনকে দেহবন্ধন-মোচনের কারণ বলা হয়েছে।

चन्द्रहास-समतीर्थमाहात्म्य (Chandra-hāsa & Somatīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়টি সংলাপরূপে গঠিত। যুধিষ্ঠির মার্কণ্ডেয় ঋষিকে জিজ্ঞাসা করেন—সব দেবতার পূজিত সোমতীর্থ, যা চন্দ্রহাস নামেও প্রসিদ্ধ, সেখানে সোম (চন্দ্রদেব) কীভাবে পরম সিদ্ধি লাভ করলেন। মার্কণ্ডেয় বলেন, দাক্ষ সোমকে গৃহধর্ম ও দাম্পত্য কর্তব্য অবহেলার কারণে ক্ষয়রোগের শাপে শাপিত করেন; এই প্রসঙ্গে গৃহস্থের নীতি, কর্তব্য-অকর্তব্য এবং কর্মফলের ব্যাখ্যা বিস্তৃত হয়। এরপর তীর্থযাত্রা ও সাধনার বিধান আসে। সোম বহু তীর্থ পরিভ্রমণ করে নর্মদা তীরে পৌঁছে বারো বছর উপবাস, দান, ব্রত, নিয়ম ও সংযম পালন করেন এবং শেষে রোগমুক্ত হন। তিনি মহাদেব (শিব)-কে মহাপাপ-নাশক রূপে প্রতিষ্ঠা করে পূজা করেন ও উচ্চ লোক প্রাপ্ত হন; চন্দ্রহাস/সোমতীর্থে স্নান-অর্চনা, তিথি, সোমবার ও গ্রহণকালে বিশেষ আচারের ফল হিসেবে শুদ্ধি, মঙ্গল, আরোগ্য ও দোষমোচনের কথা বলা হয়েছে।

सिद्धेश्वर-लिङ्गमाहात्म्यं तथा द्वादशादित्य-तपःफल-प्रशंसा (Siddheśvara Liṅga Māhātmya and the Merit of the Twelve Ādityas’ Austerity)
অধ্যায়ের শুরুতে মার্কণ্ডেয় তীর্থযাত্রীকে সিদ্ধেশ্বরে যেতে নির্দেশ দেন এবং সন্নিকটে অবস্থিত স্বয়ম্ভূ ‘অমৃত-স্রাবী’ লিঙ্গের কথা বলেন—যার দর্শনমাত্রেই মহাপুণ্য লাভ হয়। এরপর যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করেন, দেবতারা কীভাবে সিদ্ধেশ্বরে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন, বিশেষত ‘দ্বাদশ আদিত্য’ প্রসঙ্গটি কী। মার্কণ্ডেয় দ্বাদশ আদিত্য—ইন্দ্র, ধাতা, ভাগ, ত্বষ্টা, মিত্র, বরুণ, আর্যমণ, বিবস্বান, সবিতা, পূষা, অংশুমান ও বিষ্ণু—এর নাম করে বলেন, সূর্যত্বের আকাঙ্ক্ষায় তাঁরা নর্মদা-তীরে সিদ্ধেশ্বরে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তপস্যার ফলে সেই তীর্থে সূর্যের ‘অংশ’ বণ্টনের মাধ্যমে দিবাকরের প্রতিষ্ঠা হয় এবং স্থানটির খ্যাতি বিস্তার লাভ করে। পরে প্রলয়কালে আদিত্যদের বিশ্বকার্য এবং দিকসমূহে সৌরশক্তির বিন্যাস (দিক্-ব্যবস্থা) সম্পর্কেও বর্ণনা আসে। শেষে তীর্থাচার ও ফলশ্রুতি বলা হয়েছে—প্রভাতে স্নান করে দ্বাদশাদিত্য-দর্শনে বাক্, মন ও কর্মজাত পাপ নাশ হয়; প্রদক্ষিণা পৃথিবী-পরিক্রমার সমতুল্য; এই তীর্থে সপ্তমীতে উপবাস অসাধারণ ফলদায়ক; বারংবার প্রদক্ষিণায় রোগমুক্তি, স্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও সন্তানলাভ—এসব ফল নিয়মিত ভক্তিতে প্রাপ্ত হয়।

देवतीर्थ-दर्शनम्, नरनारायण-तपः, उर्वश्युत्पत्तिः (Devatīrtha, the Nara–Nārāyaṇa Austerity, and the Origin of Urvaśī)
অধ্যায় ১৯২-এ মার্কণ্ডেয় এক মহাপুণ্য দেবতীর্থের কথা বলেন, যার দর্শনে পাপক্ষয় হয়। এই প্রসঙ্গে যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন—“শ্রীপতি কে, এবং কেশবের সঙ্গে ভৃগুবংশের সম্পর্ক কী?” মার্কণ্ডেয় সংক্ষেপে বংশ-পরম্পরা জানান—নারায়ণ থেকে ব্রহ্মা, ব্রহ্মা থেকে দক্ষ, তারপর ধর্ম; ধর্মের দশ ধর্মপত্নীর নাম উচ্চারিত হয়, এবং তাদের থেকে উৎপন্ন সাধ্যদের পুত্র হিসেবে নর, নারায়ণ, হরি ও কৃষ্ণের উল্লেখ আসে—যাঁরা বিষ্ণুর অংশরূপে বর্ণিত। এরপর নর-নারায়ণ গন্ধমাদনে কঠোর তপস্যা করেন, ফলে জগতে আলোড়ন ওঠে। তাঁদের তপোবলে শঙ্কিত ইন্দ্র কাম ও বসন্তাকে সঙ্গে নিয়ে অপ্সরাদের পাঠান—নৃত্য, গান, সৌন্দর্য ও ইন্দ্রিয়-আকর্ষণে তপস্যা ভাঙার জন্য। কিন্তু দুই ঋষি অচঞ্চল থাকেন—নির্বাত প্রদীপ ও অক্ষুব্ধ সমুদ্রের মতো। তখন নারায়ণ নিজের ঊরু থেকে এক অতুলনীয়া নারীর আবির্ভাব ঘটান—উর্বশী—যিনি অপ্সরাদের সৌন্দর্যকেও অতিক্রম করেন। দেবদূতেরা নর-নারায়ণের প্রশংসা করে। নারায়ণ তত্ত্বোপদেশ দেন—পরমাত্মা সর্বভূতে ব্যাপ্ত; তাই রাগ-দ্বেষ ও বিভেদবুদ্ধি সম্যক্ বিবেকীদের আশ্রয় পায় না। তিনি বলেন, উর্বশীকে ইন্দ্রের কাছে নিয়ে যাও; তাঁদের তপস্যা ভোগ বা দেবতাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নয়, বরং সৎপথ প্রদর্শন ও লোকরক্ষার জন্য।

नारायणस्य विश्वरूपदर्शनम् (Nārāyaṇa’s Vision of the Cosmic Form)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয়ের বর্ণনার মাধ্যমে গভীর তত্ত্বকথা প্রকাশিত হয়। বসন্তকামা ও উর্বশী প্রমুখ অপ্সরাগণ বারংবার নারায়ণকে প্রণাম করে প্রত্যক্ষ বিশ্বরূপ দর্শনের প্রার্থনা জানায় এবং বলে যে পূর্ব উপদেশে তাদের কাম্য সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়েছে। তখন নারায়ণ প্রকাশ করেন—সমস্ত লোক ও সকল জীব তাঁরই দেহে বিদ্যমান; সেখানে ব্রহ্মা, ইন্দ্র, রুদ্র, আদিত্য, বসু, যক্ষ-গন্ধর্ব-সিদ্ধ, মানুষ, পশুপাখি, বৃক্ষলতা, নদী, পর্বত, সমুদ্র, দ্বীপ এবং আকাশমণ্ডল পর্যন্ত দেখা যায়। অপ্সরাগণ দীর্ঘ স্তবের দ্বারা নারায়ণকে ভূততত্ত্ব ও ইন্দ্রিয়সমূহের আধার, একমাত্র জ্ঞাতা-দ্রষ্টা এবং সেই পরম উৎস বলে বন্দনা করে—যাঁর মধ্যে সকল সত্তা অংশরূপে অংশীদার। দর্শনের তীব্রতায় বিহ্বল হয়ে তারা বিশ্বরূপ সংহারের অনুরোধ করে; নারায়ণ রূপ সংবরণ করে বলেন, সকল প্রাণীই তাঁর অংশ, এবং দেব-মানব-পশু সকলের প্রতি সমদৃষ্টি (সমতা) ধারণ করতে উপদেশ দেন। শেষে মার্কণ্ডেয় রাজাকে বলেন—সর্বভূতে বিরাজমান কেশবের ধ্যান মুক্তির সহায়; জগৎকে বাসুদেবময় জেনে বৈর, দ্বেষ ও বিভেদ ক্ষীণ হয়।

मूलश्रीपतिवैश्वानरूपदर्शनम् तथा नारायणगिरि-देवतीर्थ-प्रादुर्भावः (Vision of the Vaiśvarūpa, the cult of Mūlaśrīpati, and the arising of Nārāyaṇagiri & Devatīrtha)
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে বলেন—বৈষ্ণব বিশ্বরূপের ঘোষণা শুনে দেবতারা বিস্মিত হন এবং উর্বশীর আবির্ভাবেও চমৎকৃত হন। ভৃগুবংশজাত শ্রী (লক্ষ্মী) নারায়ণকে স্বামীরূপে লাভ করতে ব্রত, দান, নিয়ম ও সেবার বিচার করে সমুদ্রতটে সহস্র দিব্যবর্ষ কঠোর তপস্যা করেন। দেবগণ নিজেরা বিশ্বরূপ প্রকাশে অক্ষম হয়ে নারায়ণের কাছে নিবেদন করেন; বিষ্ণু শ্রী-র কাছে এসে তাঁর প্রার্থনা পূর্ণ করে বিশ্বরূপ দর্শন করান। নারায়ণ পাঞ্চরাত্র-ভক্তির অনুকূলে উপাসনার শিক্ষা দেন—নিত্য পূজায় ঐশ্বর্য, যশ ও মান বৃদ্ধি পায়; ব্রহ্মচর্যকে মূল তপ বলা হয়েছে; দেবতার উপাধি “মূলশ্রীপতি”। সংযমসহ রেবা-জলে স্নানকে কাম্যফলদায়ক এবং দানে পুণ্য বহুগুণিতকারী বলা হয়। শ্রী ধর্মময় গৃহস্থাশ্রমের প্রতিষ্ঠা চান; তখন নারায়ণ “নারায়ণগিরি” নাম স্থাপন করে তার স্মরণকে উদ্ধারক বলে ব্যাখ্যা করেন। এরপর দিব্য বিবাহ-যজ্ঞের বর্ণনা—ব্রহ্মা ও ঋষিরা ঋত্বিক হন, সমুদ্র রত্নভাণ্ডার প্রদান করে, কুবের ধন দেন, বিশ্বকর্মা মণিময় গৃহ নির্মাণ করেন। শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্রাহ্মণদের বসতি স্থাপিত হয়। শেষে অবভৃথ-স্নানের জন্য তীর্থ প্রকাশ পায়—বিষ্ণুর পদোদক থেকে জাহ্নবীসদৃশ পবিত্র ধারা রেবায় মিলিত হয়ে “দেবতীর্থ” নামে খ্যাত হয়; বহু অশ্বমেধ অবভৃথের চেয়েও শ্রেষ্ঠ পুণ্যদায়ক বলে প্রশংসিত।

Devatīrtha Māhātmya and Ekādaśī–Nīrājana Observances (देवतीर्थमाहात्म्य तथा एकादशी-नीराजनविधानम्)
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির দেবতীর্থের নাম, মাহাত্ম্য এবং সেখানে স্নান-দান করলে কী ফল হয় তা জিজ্ঞাসা করেন। মার্কণ্ডেয় বলেন—দেবতা ও ঋষিদের পূজিত সকল তীর্থ বিষ্ণুর ধ্যানে দেবতীর্থে একত্রিত হয়; তাই এটি পরম বৈষ্ণব তীর্থ, এবং এখানে স্নান করা যেন সর্বতীর্থে স্নানের সমান। গ্রহণকালে করা কর্ম ‘অনন্ত’ ফল দেয়—এই কথা বলে স্বর্ণ, ভূমি, গাভী প্রভৃতি দানের দেবতা-সম্পর্কিত মহিমা বর্ণিত হয়; শেষে বলা হয়, দেবতীর্থে শ্রদ্ধায় যে কোনো দান অক্ষয় ফলদায়ক। এরপর একাদশী-কেন্দ্রিক বিধান—স্নান (নর্মদাজলসহ), উপবাস, শ্রীপতি পূজা, রাত্রিজাগরণ ও ঘৃত-প্রদীপে নীরাজন। দ্বাদশীর প্রাতে ব্রাহ্মণ ও দম্পতিকে বস্ত্র, অলংকার, তাম্বুল, পুষ্প, ধূপ ও অনুলেপনে সম্মান করে দান করতে বলা হয়েছে। দুধজাত দ্রব্য, তীর্থজল, উৎকৃষ্ট বস্ত্র, সুগন্ধি, নৈবেদ্য ও দীপ প্রভৃতি পূজাসামগ্রীও নির্দিষ্ট; এভাবে সাধক বৈষ্ণব-চিহ্নসহ বিষ্ণুলোক লাভ করে। শেষে নিত্য নীরাজনের রক্ষা ও স্বাস্থ্যদায়ক ফল, প্রদীপের অবশিষ্ট চোখে প্রয়োগ, এবং মাহাত্ম্য শ্রবণ-পাঠের পুণ্য—শ্রাদ্ধে পাঠ করলে পিতৃতৃপ্তি—ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে।

हंसतीर्थमाहात्म्य (Hamsa Tīrtha Māhātmya) — Merit of Bathing, Donation, and Renunciation
অধ্যায় ১৯৬-এ মার্কণ্ডেয় শ্রোতাকে হংসতীর্থে গমন করার নির্দেশ দেন এবং একে অতুলনীয়, সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থ বলে বর্ণনা করেন। তীর্থের প্রামাণ্য একটি কারণ-কথায় প্রতিষ্ঠিত—এই স্থানে এক হংস তপস্যা করে ব্রহ্মার বাহন হওয়ার মর্যাদা (ব্রহ্ম-বাহনতাঃ) লাভ করে; তাই এই তীর্থের মহাশক্তি প্রসিদ্ধ। এরপর আচরণ-অনুষ্ঠানের বিধান বলা হয়—যে তীর্থযাত্রী হংসতীর্থে স্নান করে স্বর্ণদান (কাঞ্চন-দান) করে, সে সর্বপাপমুক্ত হয়ে ব্রহ্মলোকে গমন করে। ফলশ্রুতি দিব্য চিত্রকল্পে বর্ণিত—হংসযোজিত বিমানে, নবসূর্যের ন্যায় দীপ্ত, কাম্য ভোগে সমৃদ্ধ, অপ্সরাগণের সেবায় সে যাত্রা করে। ইচ্ছামতো ভোগ উপভোগ করে সে জাতিস্মরণসহ পুনরায় মানবজন্ম লাভ করে—যাতে জন্মান্তরের নৈতিক ধারাবাহিকতা ইঙ্গিতিত। শেষে মুক্তির উপসংহার—যে সন্ন্যাস গ্রহণ করে দেহত্যাগ করে, সে মোক্ষ লাভ করে। তীর্থফল সংক্ষেপে পাপনাশক, পুণ্যদায়ক ও শোকনিবারক বলে ঘোষিত।

Mūlasthāna-Sūryatīrtha Māhātmya (Glorification of the Mūlasthāna Solar Tīrtha)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় নর্মদা-তীরে অবস্থিত ‘মূলস্থান’ নামে প্রসিদ্ধ এক পরম সূর্যতীর্থের মহিমা বর্ণনা করেন। এটি শুভ ‘মূল-স্থান’, পদ্মজা (ব্রহ্মা)-সম্পর্কিত এবং এখানেই ভাস্কর (সূর্যদেব)-এর প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। নিয়মপরায়ণ তীর্থযাত্রীকে সংযতচিত্তে স্নান করে পিণ্ড ও জল দ্বারা পিতৃ ও দেবতাদের তर्पণ করতে হয়, তারপর মূলস্থান মন্দির দর্শন করতে হয়। বিশেষ বিধান—শুক্ল সপ্তমী যদি রবিবার (আদিত্যবাসর)-এ পড়ে, তবে রেবা-জলে স্নান, তर्पণ, সামর্থ্য অনুযায়ী দান, করবীর ফুল ও লাল চন্দন-মিশ্রিত জল দিয়ে ভাস্করের স্থাপন/পূজা, কুন্দা ফুলসহ ধূপার্পণ, চারদিকে দীপ প্রজ্বালন, উপবাস এবং ভক্তিগীতি-বাদ্যসহ রাত্রিজাগরণ করতে বলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে তীব্র দুঃখের নিবৃত্তি এবং দীর্ঘকাল সূর্যলোকে বাস, গন্ধর্ব-অপ্সরাদের সান্নিধ্যসহ, প্রতিশ্রুত।

Śūlatīrtha–Śūleśvarī–Śūleśvara Māhātmya (Origin of the Shula Tirtha and the Manifestation of Devī and Śiva)
মার্কণ্ডেয় শ্রোতাকে ভদ্রকালী-সঙ্গমের দিকে নির্দেশ করেন, যা দেবতাদের নিত্যসেবিত, দিব্যপ্রতিষ্ঠিত এবং ‘শূলতীর্থ’ নামে খ্যাত। বলা হয়, সেখানে কেবল দর্শনও—বিশেষত স্নান ও দানের সঙ্গে—দুর্ভাগ্য, অশুভ লক্ষণ, শাপের প্রভাব ও নানা পাপদোষ নাশ করে। তখন যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করেন, নর্মদাতীরে দেবী কীভাবে ‘শূলেশ্বরী’ এবং শিব কীভাবে ‘শূলেশ্বর’ নামে পরিচিত হলেন। মার্কণ্ডেয় মাণ্ডব্য নামক ব্রাহ্মণ তপস্বীর কাহিনি বলেন। তিনি মৌনব্রতে কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন ছিলেন; চোরেরা তাঁর আশ্রমে চুরি করা দ্রব্য লুকিয়ে রাখে। রাজরক্ষীরা জিজ্ঞাসা করলেও মৌনী ঋষি উত্তর দেন না; ফলে তাঁকে শূলে বিদ্ধ করে দণ্ড দেওয়া হয়। দীর্ঘ যন্ত্রণাতেও মাণ্ডব্য শিবস্মরণে অচল থাকেন। শিব আবির্ভূত হয়ে শূল কেটে দেন এবং কর্মবিপাক ব্যাখ্যা করেন—পূর্বকর্ম থেকেই সুখদুঃখ আসে; ধর্মনিন্দা না করে ধৈর্যে সহ্য করাও তপস্যা। মাণ্ডব্য শূলের অমৃতসম প্রভাবের রহস্য জানতে চান এবং শূলের মূল ও অগ্রে শিব-উমার স্থায়ী উপস্থিতি প্রার্থনা করেন। তৎক্ষণাৎ শূলমূলে শিবলিঙ্গ এবং বামদিকে দেবীমূর্তি প্রকাশিত হয়; এভাবেই শূলেশ্বর-শূলেশ্বরীর উপাসনা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে দেবী নানা তীর্থে নিজের বহু নাম-রূপের তালিকা দেন। শেষে ফলশ্রুতি ও বিধান—পূজা, নিবেদন, পিতৃকর্ম, উপবাস-জাগরণে শুদ্ধি ও শিবলোকসান্নিধ্য লাভ হয়; তীর্থটি ‘শূলেশ্বরী-তীর্থ’ নামে চিরখ্যাত হয়।

Aśvinī Tīrtha Māhātmya (The Glory of the Aśvinī Pilgrimage Ford)
মার্কণ্ডেয় তীর্থ-তালিকার ধারাবাহিক বর্ণনায় অশ্বিনী তীর্থের মাহাত্ম্য প্রকাশ করেন। এই তীর্থকে “কামিক”—অর্থাৎ মনোবাঞ্ছিত ফলদায়ক—এবং জীবদের সিদ্ধিদাতা বলা হয়েছে। এখানে দিব্য চিকিৎসক অশ্বিনীকুমার নাসত্যৌ দীর্ঘ তপস্যা করে যজ্ঞভাগের অধিকার লাভ করেন এবং দেবসমাজের সর্বসম্মত অনুমোদন পান। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন, তাঁরা কেন সূর্যের পুত্র নামে পরিচিত। মার্কণ্ডেয় সংক্ষেপে কাহিনি বলেন—এক রাণী সূর্যের অতিরিক্ত তেজ সহ্য করতে না পেরে মেরু-প্রদেশে কঠোর তপস্যা করেন; সূর্য কামবশত অশ্বরূপ ধারণ করে তাঁর নিকট আসেন; নাসিকা-পথে গর্ভসঞ্চার ঘটে এবং প্রসিদ্ধ নাসত্যৌ জন্মগ্রহণ করেন। পরে নর্মদা-তীরের প্রসঙ্গ আসে—ভৃগুকচ্ছের নিকটে নদীতটে তাঁরা দুঃসাধ্য তপস্যা করে পরম সিদ্ধি অর্জন করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি এই তীর্থে স্নান করে পিতৃ ও দেবতাদের তर्पণ করে, সে যেখানেই জন্মাক না কেন সৌন্দর্য ও সৌভাগ্য লাভ করে।

Sāvitrī-tīrtha Māhātmya and Sandhyā–Gāyatrī Discipline (सावित्रीतीर्थमाहात्म्यं तथा सन्ध्यागायत्रीविधानम्)
এই অধ্যায়টি সংলাপরূপে রচিত; এখানে মārkaṇḍeya যুধিষ্ঠিরকে সāvitrī-তীর্থের মহিমা বর্ণনা করে একে শ্রেষ্ঠ পবিত্র তীর্থ বলে প্রতিষ্ঠা করেন। পরে যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে তিনি সāvitrī দেবীর পরিচয় দেন—তাঁকে বেদ-মাতা রূপে, পদ্ম-প্রতীকে অলংকৃত ধ্যানমূর্তি হিসেবে, এবং প্রাতঃ, মধ্যাহ্ন ও সায়ং—তিন সन्ध্যায় সময়ভেদে পৃথক ধ্যান ও উপাসনা-বিধি নির্দেশ করেন। তীর্থযাত্রীদের শুদ্ধিক্রমও বলা হয়েছে: স্নান ও আচমন, প্রाणায়াম দ্বারা সঞ্চিত দোষদাহ, ‘আপো হি ষ্ঠা’ মন্ত্রে প্রোক্ষণ, এবং অঘমর্ষণ প্রভৃতি বৈদিক মন্ত্রে পাপক্ষয়। সन्ध্যার পর নিয়মিত গায়ত্রী-জপকে প্রধান সাধনা বলা হয়েছে—এর ফলে পাপনাশ ও উচ্চলোকপ্রাপ্তির ফলশ্রুতি ঘোষিত। তীর্থে পিতৃকর্ম/শ্রাদ্ধ ও অন্তিম আচরণ করলে বিশেষ ফল, মৃত্যুর পরে উৎকৃষ্ট গতি এবং পরবর্তীতে শুভ জন্মের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অধ্যায়টি বিধিনিষ্ঠ ধর্মাচারকে গুরুত্ব দেয়।

देवतीर्थमाहात्म्यम् | Devatīrtha Māhātmya (Glorification of Devatīrtha)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় মহীপালকে উদ্দেশ করে তীর্থ-উপদেশরূপে দেবতীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন এবং যুধিষ্ঠিরকে ধর্মনিষ্ঠ রাজধর্মের আদর্শ হিসেবে স্মরণ করান। দেবতীর্থকে ‘অতুলনীয়’ বলা হয়েছে—যেখানে সিদ্ধগণ ও ইন্দ্রসহ দেবতারা উপস্থিত থাকেন। এখানে স্নান, দান, জপ, হোম, স্বাধ্যায় ও দেবতা-অর্চনা ইত্যাদি পুণ্যকর্ম তীর্থের স্বভাবশক্তিতে ‘অনন্ত’ ফল প্রদান করে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ভাদ্রপদ মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীকে বিশেষ প্রধান তিথি বলা হয়েছে, কারণ প্রাচীনকালে এ তিথিতে দেবতাদের বাস ছিল। ত্রয়োদশীতে স্নান করে বিধিমতো শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করে দেবতাদের প্রতিষ্ঠিত বৃষভধ্বজ (শিব)-এর পূজা করতে বলা হয়েছে। এর ফলে সর্বপাপ শুদ্ধ হয় এবং রুদ্রলোক প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

Śikhitīrtha-māhātmya (The Glory of Śikhitīrtha) / शिखितीर्थमाहात्म्य
মার্কণ্ডেয় শিখিতীর্থ নামে এক মহাপুণ্য তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন—এটি প্রধান তীর্থ এবং উৎকৃষ্ট ‘পঞ্চায়তন’ উপাসনা-পরিসর। এখানে হব্যবাহন (অগ্নি) তপস্যা করে ‘শিখা’ লাভ করেন, ‘শিখী’ নামে প্রসিদ্ধ হন এবং ‘শিখা’সম্পর্কিত উপাধিতে শিবের উপস্থিতি—শিখাখ্য শিবলিঙ্গ—প্রতিষ্ঠা করেন। আশ্বযুজ মাসের নির্দিষ্ট চন্দ্রকালে তীর্থে গিয়ে নর্মদায় স্নান, দেব-ঋষি-পিতৃদের তিলজল দিয়ে তর্পণ, ব্রাহ্মণকে স্বর্ণদান এবং অগ্নিকে তৃপ্ত/সম্মান করা বিধেয়। শেষে গন্ধ, মালা ও ধূপে শিবপূজা করলে ফলশ্রুতিতে রুদ্রলোকে গমন হয়—সূর্যবর্ণ বিমানে অপ্সরাদের সঙ্গে, গন্ধর্বদের স্তবের মধ্যে; আর ইহলোকে শত্রুনাশ ও তেজ/দীপ্তি লাভ হয়।

कोटितीर्थमाहात्म्य (Koṭitīrtha Māhātmya) — Ritual Efficacy of the Koṭitīrtha
মার্কণ্ডেয় কোটিতীর্থকে ‘অতুল’ তীর্থরূপে বর্ণনা করেন—এখানে অসংখ্য সিদ্ধের নিবাস এবং বহু মহর্ষির সমাবেশে ক্ষেত্রটি মহাপবিত্র। দীর্ঘ তপস্যার পর ঋষিগণ এখানে শিবকে প্রতিষ্ঠা করেন; সঙ্গে দেবীকে কোটীশ্বরী ও চামুণ্ডা (মহিষাসুরমর্দিনী) রূপে স্থাপন করা হয়—ফলে এটি শৈব-শাক্ত মিলিত পুণ্যধাম। ভাদ্রপদ মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে, হস্ত নক্ষত্রযুক্ত দিনে, এই তীর্থকে সর্বপাপবিনাশক বলা হয়েছে। তীর্থস্নান, তিলোদক অর্পণ ও শ্রাদ্ধ করলে মহাফল লাভ হয়; পিতৃগণের তৃপ্তি হয় এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তির নরক থেকে দ্রুত উত্তরণের কথাও বলা হয়েছে। শেষে নীতি ঘোষিত—এই তীর্থের প্রভাবে স্নান, দান, জপ, হোম, স্বাধ্যায় ও দেবতার অর্চনা ‘কোটি-গুণ’ ফল দেয়; অর্থাৎ স্থানবিশেষের মহিমায় ধর্মকর্মের কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

Paitāmaha Tīrtha (Bhṛgu Tīrtha) Māhātmya — ब्रह्मशाप-शमनं, श्राद्ध-फलश्रुति, रुद्रलोक-गति
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় ভৃগু-তীর্থকে সর্বপুণ্যদায়ক ‘পৈতামহ তীর্থ’ বলে বর্ণনা করেন, যা পাপক্ষয়কারী। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন—পিতামহ ব্রহ্মা কেন মহেশ্বরকে এত তীব্র ভক্তিতে পূজা করেছিলেন? মার্কণ্ডেয় প্রাচীন ইতিহাস শোনান—নিজ কন্যার প্রতি আসক্তি জন্মালে শিব ব্রহ্মাকে শাপ দেন; ফলে তাঁর বেদবিদ্যা ক্ষীণ হয় এবং লোকসমাজে পূজ্যতা হ্রাস পায়। দুঃখাকুল ব্রহ্মা রেবার (নর্মদা) উত্তর তীরে তিনশো বছর তপস্যা করেন, স্নান করে শিবকে প্রসন্ন করেন। শঙ্কর সন্তুষ্ট হয়ে উৎসব-পার্বণে ব্রহ্মার পূজ্যতা পুনঃস্থাপন করেন এবং দেবতা ও পিতৃগণের সঙ্গে সেখানে নিজের নিত্য সান্নিধ্য ঘোষণা করেন। তাই এই তীর্থ ‘পৈতামহ’ নামে তীর্থশ্রেষ্ঠ রূপে প্রসিদ্ধ হয়। এরপর কাল-নির্দেশ ও ফলশ্রুতি—ভাদ্রপদ কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যায় স্নান করে পিতৃ ও দেবতাদের তর্পণ করলে, অল্প নিবেদন (একটি পিণ্ড বা তিলজল) দিয়েও পিতৃগণ দীর্ঘকাল তৃপ্ত হন। সূর্য কন্যা রাশিতে থাকাকালে শ্রাদ্ধাচরণের বিশেষ মাহাত্ম্য বলা হয়েছে, এবং বলা হয়—সমস্ত পিতৃতীর্থের শ্রাদ্ধফল এই তীর্থে অমাবস্যায় লাভ হয়। শেষে বলা হয়েছে—যে স্নান করে শিবপূজা করে সে মহা-লঘু দোষ থেকে মুক্ত হয়; আর সংযতচিত্তে এই তীর্থে দেহত্যাগ করলে রুদ্রলোকে গমন করে, পুনরাগমন হয় না।

कुर्कुरीतीर्थमाहात्म्य (Kurkuri Tīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় রাজাকে কুরকুরী নামে অতি পুণ্য তীর্থে গমন করতে বলেন। তীর্থটি সর্বপাপপ্রণাশক ও অত্যন্ত মঙ্গলদায়ক বলে বর্ণিত। কুরকুরী তীর্থদেবতা হিসেবে ইষ্টফলদাত্রী—ভক্তির দ্বারা প্রসন্ন হয়ে গবাদিপশু, পুত্র ও ধন প্রভৃতি কাম্য ফল প্রদান করেন। সেখানে ‘ঢৌণ্ডেশ’ নামে এক ক্ষেত্রপাল অধিষ্ঠিত আছেন; নারী-পুরুষ উভয়েরই তাঁর পূজা কল্যাণকর বলে নির্দেশিত। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে, দর্শন-অর্চনায় দুর্ভাগ্য হ্রাস পায়, সন্তানহীনতা দূর হয়, দারিদ্র্য নাশ হয় এবং অভীষ্ট সিদ্ধি লাভ হয়। শেষে বলা হয়, বিধিপূর্বক তীর্থস্পর্শ ও দর্শনই এই ফলপ্রাপ্তির প্রধান উপায়।

Daśakanyā-Tīrtha Māhātmya (The Glory of the ‘Ten Maidens’ Sacred Ford)
মার্কণ্ডেয় রাজাকে (ক্ষোণিনাথ/নরাধিপ) সম্বোধন করে ‘দশকন্যা’ নামে এক পরম পুণ্য তীর্থের নির্দেশ দেন—যা অতিশয় সুন্দর ও সর্বপাপ-নাশক। তীর্থের মাহাত্ম্য শৈব কারণ-কথায় প্রতিষ্ঠিত: এই তীর্থে মহাদেবের সঙ্গে দশ জন সদ্গুণী কন্যার যোগ, এবং ব্রহ্মার সঙ্গে তাদের বিবাহ-ব্যবস্থার প্রসঙ্গ বর্ণিত; সেই থেকেই স্থানটি ‘দশকন্যা’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। এরপর বিধানমূলক অংশে বলা হয়, এই তীর্থে অলংকৃত কন্যাকে বিবাহে দান (কন্যাদান) করলে অপরিমেয় পুণ্য লাভ হয়—চুলের সংখ্যা যত বছর শিবের সান্নিধ্যে বাস, তারপর দুর্লভ মানবজন্ম এবং শেষে মহাধন-সমৃদ্ধি। ভক্তিসহ স্নান করে শান্ত ব্রাহ্মণকে স্বর্ণদান করাও নির্দেশিত; স্বর্ণের অল্প পরিমাণও বাক্, মন ও দেহের পূর্বদোষ নাশ করে। ফলশ্রুতিতে স্বর্গারোহণ, বিদ্যাধর ও সিদ্ধদের মধ্যে সম্মান, এবং প্রলয় পর্যন্ত বাসের কথা বলা হয়েছে—এ তীর্থে আচার, নীতি ও মহাজাগতিক ফল একত্রে সংযুক্ত।

स्वर्णबिन्दुतीर्थमाहात्म्य (Glory of the Svarṇabindu Tīrtha)
মার্কণ্ডেয় ‘স্বর্ণবিন্দু’ নামে এক পবিত্র তীর্থের পরিচয় দেন এবং তার আচার-বিধি ও ফলশ্রুতি বর্ণনা করেন। এই অধ্যায়ে তীর্থে স্নান করে ব্রাহ্মণকে কাঞ্চন (সোনা) দানকে মহাপুণ্যকর বলা হয়েছে। সোনাকে অগ্নির তেজ থেকে উৎপন্ন ‘শ্রেষ্ঠ রত্ন’ হিসেবে দেখিয়ে দানের ক্ষেত্রে তার বিশেষ শক্তি ব্যাখ্যা করা হয়। বলা হয়েছে, কেশাগ্র-পরিমাণ সামান্য সোনাও যদি এই তীর্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিধিপূর্বক দান করা হয়, তবে সেখানে মৃত্যু হলে স্বর্গারোহণ লাভ হয়। দাতা বিদ্যাধর ও সিদ্ধদের মধ্যে সম্মানিত হন, উৎকৃষ্ট বিমানে কল্পান্ত পর্যন্ত বাস করেন, পরে ধনবান কুলে দ্বিজরূপে উত্তম মানবজন্ম লাভ করেন। এই তীর্থে স্বর্ণদান মন-বাক্য-কায়ার পাপ দ্রুত নাশ করে—এমন কর্মশুদ্ধির উপদেশই অধ্যায়ের নৈতিক সুর।

पितृऋणमोचनतीर्थप्रशंसा — Praise of the Tīrtha that Releases Ancestral Debt (Pitṛ-ṛṇa-mocana)
এই অধ্যায়ে ঋষি মার্কণ্ডেয় এক রাজাকে ‘পিতৃণাম্ ঋণমোচনম্’ নামে খ্যাত তীর্থের মাহাত্ম্য বোঝান, যা ত্রিলোকে পিতৃঋণ মোচনকারী বলে প্রসিদ্ধ। বিধি মেনে স্নান, তারপর পিতৃদেবতাদের উদ্দেশে তर्पণ, এবং দান—এই ক্রমে মানুষ ‘অনৃণ’ অর্থাৎ ঋণমুক্ত হয় বলে বলা হয়েছে। পুত্রের প্রয়োজনীয়তার তত্ত্বও ব্যাখ্যা করা হয়—পিতৃগণ পুত্র কামনা করেন, কারণ পুত্রকে ‘পুণ্ণামা’ নরক থেকে উদ্ধারকারী হিসেবে কল্পনা করা হয়; তাই শ্রাদ্ধ-তर्पণাদি আচার-পরম্পরা অবিচ্ছিন্ন থাকা জরুরি। এরপর ঋণত্রয়ের আলোচনা: পিতৃঋণ পিণ্ডদান ও জলতर्पণে, দেবঋণ অগ্নিহোত্র ও যজ্ঞে, এবং মানব/সামাজিক ঋণ ব্রাহ্মণদের প্রতিশ্রুত দান, তীর্থসেবা ও মন্দিরকার্যে কর্তব্যপালনের মাধ্যমে শোধ হয়। শেষে ফলশ্রুতি—এই তীর্থে দান-তर्पণ করলে ও গুরুজনকে সন্তুষ্ট করলে অক্ষয় ফল লাভ হয়; সেই পুণ্য সাত জন্ম পর্যন্ত মৃত পিতৃপুরুষদেরও উপকার করে। অধ্যায়টি বংশকল্যাণ ও ধর্মকর্তব্যের নৈতিক-আচারগত দিশা প্রদান করে।

भारभूतीतीर्थ-माहात्म्य / The Māhātmya of Bhārabhūti Tīrtha (Bhāreśvara) on the Revā (Narmadā)
মার্কণ্ডেয় মুনি ক্রমে নর্মদা-তীরের নানা তীর্থ—পুষ্কলী, ক্ষমানাথ প্রভৃতি—উল্লেখ করে রেবাতটে অবস্থিত ভারভূতি তীর্থের উৎপত্তি বলেন, যেখানে শিব রুদ্র-মহেশ্বর রূপে বিরাজমান। যুধিষ্ঠির ‘ভারভূতি’ নামের কারণ জানতে চান। প্রথম দৃষ্টান্তে ধর্মপরায়ণ ব্রাহ্মণ বিষ্ণুশর্মা সংযম ও তপস্যায় জীবনযাপন করেন; মহাদেব বটু (শিষ্য) রূপে এসে তাঁর কাছে অধ্যয়ন করেন। অন্নরন্ধন নিয়ে অন্য শিষ্যদের সঙ্গে বিবাদ হলে পণ স্থির হয়; শিব অঢেল অন্ন প্রকাশ করেন এবং পরে নদীতীরে পণ অনুযায়ী শিষ্যদের ‘ভার’সহ নর্মদায় নিক্ষেপ করে নিজেই উদ্ধার করেন। তখনই ‘ভারভূতি’ নামে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ব্রাহ্মণের পাপভয় দূর হয়। দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে এক বণিক বিশ্বাসী বন্ধুকে হত্যা করে বিশ্বাসঘাতকতা করে; মৃত্যুর পর সে কঠোর শাস্তি ভোগ করে বহু যোনিতে ঘুরে ধর্মবান রাজার গৃহে ভারবাহী বলদ হয়ে জন্মায়। কার্ত্তিক মাসে শিবরাত্রিতে ভারেশ্বরে রাজা স্নান, পূজা-অর্ঘ্য, রাত্রির প্রহরে চার প্রকার লিঙ্গ-পূরণ, স্বর্ণ-তিল-বস্ত্র-গোদান প্রভৃতি দান ও জাগরণ করেন; তাতে বলদ শুদ্ধ হয়ে উত্তম গতি লাভ করে। ফলশ্রুতি—এ তীর্থে স্নান ও ব্রতাচরণে মহাপাপও নাশ হয়, সামান্য দানেও অক্ষয় পুণ্য হয়; এখানে মৃত্যু হলে অবিচ্ছিন্ন শিবলোক, অথবা শুভ জন্ম হয়ে পুনরায় মুক্তির পথ লাভ হয়।

पुङ्खतीर्थमाहात्म्य (Puṅkha Tīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় পুঙ্খ তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে একে “উত্তম” তীর্থরূপে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পূর্বকালে এই তীর্থে পুঙ্খের সিদ্ধিলাভের দৃষ্টান্ত স্মরণ করিয়ে তীর্থের পবিত্রতা প্রমাণ করেন। এরপর তীর্থের খ্যাতিকে জামদগ্ন্য (পরশুরাম)-এর তপস্যার সঙ্গে যুক্ত করা হয়—ক্ষত্রিয়-প্রাধান্য নিবারণকারী সেই মহাবীর নর্মদার উত্তর তীরে দীর্ঘকাল কঠোর তপ করেন। তারপর ফলশ্রুতি ক্রমান্বয়ে বলা হয়—তীর্থস্নান ও পরমেশ্বর পূজায় ইহলোকে বল এবং পরলোকে মুক্তি লাভ হয়; দেব ও পিতৃ-তর্পণ/পূজায় পিতৃঋণমুক্তি ঘটে; সেখানে প্রাণত্যাগ করলে রুদ্রলোক পর্যন্ত অবর্তনীয় গতি নিশ্চিত হয়। স্নানে অশ্বমেধ যজ্ঞফল, ব্রাহ্মণভোজনে বিপুল পুণ্যবৃদ্ধি (একজনকে ভোজন করালেও বহুজনের সমতুল্য ফল), এবং বৃষভধ্বজ (শিব)-আরাধনায় বাজপেয় যজ্ঞফল প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। এভাবে স্থাননির্ভর শৈব আচারকে উচ্চফলদায়ী ধর্ম-প্রযুক্তি হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে।

Atithi-dharma Parīkṣā on the Narmadā Bank and the Māheśvara Āyatana ‘Muṇḍināma’ (अतिथिधर्मपरीक्षा तथा ‘मुण्डिनाम’ आयतनमाहात्म्यम्)
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে নর্মদা-তীরে শ্রাদ্ধকালে ঘটে যাওয়া এক কাহিনি বলেন। এক ব্রাহ্মণ গৃহস্থ ব্রাহ্মণদের ভোজন করাতে বসিয়েছিলেন। সেই সময় মহেশ্বর কুষ্ঠরোগী, দুর্গন্ধযুক্ত ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে এসে সকলের সঙ্গে ভোজনের প্রার্থনা করেন; কিন্তু গৃহস্থ ও উপস্থিত ব্রাহ্মণরা তাঁকে অপবিত্র ভেবে কঠোর বাক্যে তাড়িয়ে দেয়। দেবতা চলে যেতেই ভোজনে অদ্ভুত বিপর্যয় ঘটে—পাত্রে পাত্রে কৃমি দেখা দেয়, সবাই বিস্মিত হয়। তখন এক বিচক্ষণ ব্রাহ্মণ বলেন, এটি অতিথি-অপমানের বিপাক; আগন্তুক স্বয়ং পরমেশ্বর, ধর্মপরীক্ষার জন্য এসেছিলেন। তিনি বিধান স্মরণ করান—অতিথিকে রূপ (সুন্দর/কুৎসিত), অবস্থা (শুচি/অশুচি) বা বাহ্য পরিচয়ে বিচার করা উচিত নয়; বিশেষত শ্রাদ্ধে অবহেলা করলে বিনাশকারী শক্তি হব্য-অন্ন গ্রাস করে। সবাই তাঁকে খুঁজে স্তম্ভের মতো স্থির দাঁড়ানো সেই রূপকে দেখে প্রণাম ও প্রার্থনা করে। মহেশ্বর করুণায় প্রসন্ন হয়ে ভোজন পুনরায় শুদ্ধ/প্রদান করেন এবং তাঁর মণ্ডল-উপাসনা অব্যাহত রাখতে বলেন। শেষে ত্রিশূলধারী প্রভুর ‘মুণ্ডিনাম’ নামক আয়তনের মাহাত্ম্য ঘোষিত—এটি মঙ্গলদায়ক, পাপনাশক, কার্ত্তিকে বিশেষ ফলপ্রদ এবং পুণ্যে গয়া-তীর্থসম।

Dīṇḍimeśvaranāmotpattiḥ (Origin of the Name Dīṇḍimeśvara) / The Etiology of Dindimeshvara
মার্কণ্ডেয় বলেন—মহেশ্বর ভিক্ষুরূপ ধারণ করে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে এক গ্রামে প্রবেশ করেন। তাঁর দেহ ভস্মলিপ্ত, গলায় অক্ষসূত্র, হাতে ত্রিশূল, জটা ও অলংকারে ভূষিত; তিনি ডমরু বাজান, যার ধ্বনি দিণ্ডিম (নগাড়া)-সদৃশ বলে বর্ণিত। শিশু ও গ্রামবাসীদের ঘিরে তিনি কখনও গান, কখনও হাসি, কখনও কথা, কখনও নৃত্য করেন—দর্শকদের কাছে কখনও দৃশ্যমান, কখনও অদৃশ্য হয়ে ওঠেন। এক সতর্কবাণীও আছে—যেখানে তিনি ক্রীড়াচ্ছলে সেই বাদ্য স্থাপন করেন, সেই গৃহ ‘ভারাক্রান্ত’ হয়ে নষ্ট হয়; এতে দেবতার প্রতি অবমাননা, ভুল পরিচয়, বা অনিয়ন্ত্রিত দিব্য-সান্নিধ্যের অস্থির শক্তির নৈতিক-আচারগত ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পরে লোকেরা ভক্তিভরে শঙ্করের স্তব করতে শুরু করলে প্রভু ‘দিণ্ডিম-রূপে’ প্রকাশিত হন এবং তখন থেকেই তাঁর নাম দিণ্ডিমেশ্বর। এই রূপ/স্থানের দর্শন ও স্পর্শে সর্বপাপমোচনের ফলশ্রুতি বলা হয়েছে।

Āmaleśvara-Māhātmya: Śambhu in Child-Form and the Fruit of Worship (आमलेश्वर-माहात्म्य)
শ্রী মার্কণ্ডেয় সংক্ষিপ্ত অথচ তত্ত্বগর্ভ এক উপাখ্যান বলেন, যা তীর্থ-মাহাত্ম্য ও নীতিশিক্ষা—উভয়ই। তিনি দেবতার “মহৎ চরিত” উল্লেখ করে জানান, কেবল শ্রবণমাত্রেই সর্বপাপ নাশ হয়—এটাই ফলশ্রুতি। কথায় শম্ভু (শিব) শিশুরূপে গ্রাম্য বালকদের সঙ্গে আমলক (আমলা) ফল নিয়ে খেলেন। বালকেরা ফল ছোড়ে, শিব মুহূর্তে তা তুলে আবার ফিরিয়ে দেন; খেলা দিকেদিকে বিস্তৃত হলে তারা উপলব্ধি করে—এই আমলকই পরমেশ্বরের প্রকাশ। শেষে বলা হয়, সকল স্থানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ তীর্থ “আমলেশ্বর”; সেখানে একবারও ভক্তিভরে পূজা করলে পরম পদ লাভ হয়।

Devamārga–Balākeśvara Māhātmya (कन्थेश्वर–बलाकेश्वर–देवमार्ग माहात्म्य)
এই অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় শৈব তীর্থের উৎপত্তি ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। শুরুতেই ফলশ্রুতি—এই কাহিনি কেবল শ্রবণ করলেই সর্বপাপ থেকে মুক্তি মেলে। শিবকে কপালী/কান্তিক রূপে ভৈরবস্বরূপ দেখানো হয়েছে—পিশাচ, রাক্ষস, ভূত, ডাকিনী ও যোগিনীদের পরিবেষ্টিত, প্রেতাসনে আসীন, ভয়ংকর তপস্যারত হয়েও ত্রিলোককে অভয় দানকারী। আষাঢ়ী উপলক্ষে শিবের কন্থা (চাদর/চোগা) যেখানে পতিত হয়, সেখানেই তিনি ‘কন্থেশ্বর’ নামে প্রসিদ্ধ; তাঁর দর্শনে অশ্বমেধসম পুণ্য লাভের কথা বলা হয়েছে। এরপর দেবমার্গে কামনা ও কৃপা বিষয়ে শিক্ষামূলক উপাখ্যান আসে। শিব এক বণিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ‘বলাক’ দ্বারা লিঙ্গ পূরণ/উন্নত করার পরীক্ষা দেন; লোভ ও মোহে বণিক নিজের সঞ্চিত সম্পদ নিঃশেষ করে ফেলে। শিব কৌতুকভরে লিঙ্গ খণ্ডিত করে ‘সম্পূর্ণতা’ ধারণার অহং ভাঙেন; বণিকের স্বীকারোক্তি ও অনুতাপে তাকে অক্ষয় ধন দান করেন। বলাক-অলংকৃত সেই লিঙ্গ লোককল্যাণের ‘প্রত্যয়’ হিসেবে সেখানে স্থিত থাকে; স্থানটি ‘দেবমার্গ’ ও দেবতা ‘বলাকেশ্বর’ নামে খ্যাত হয়। সেখানে দর্শন-पूজায় পাপক্ষয় হয়; পঞ্চায়তনভাবে বলাকেশ্বর আরাধনা রুদ্রলোকপ্রদ, এবং সাধকের দেবমার্গে মৃত্যু হলে রুদ্রলোক থেকে পুনরাগমন হয় না।

Śṛṅgitīrtha-Māhātmya (Glory of Śṛṅgī Tīrtha): Mokṣa and Piṇḍadāna
এই অধ্যায়ে শ্রী মার্কণ্ডেয় সংক্ষিপ্ত উপদেশ দেন যে দেহধারী জীবের মুক্তিলাভের জন্য শ্রীঙ্গিতীর্থে তীর্থযাত্রা করা উচিত। তীর্থটিকে “মোক্ষদ” বলা হয়েছে এবং দৃঢ়ভাবে বলা হয়েছে—যে ব্যক্তি সেখানে দেহত্যাগ করে, সে নিঃসন্দেহে মোক্ষ প্রাপ্ত হয়। একই সঙ্গে এই স্থানকে পিতৃঋণ ও পূর্বপুরুষ-ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে পিণ্ডদান করলে মানুষ পিতৃঋণ থেকে মুক্ত (অনৃণ) হয়; এবং অর্জিত পুণ্যে শুদ্ধ হয়ে “গাণেশ্বরী গতি” নামে শৈব জগত-ব্যবস্থায় উচ্চতর পরলোকগতিতে পৌঁছায়। এভাবে অধ্যায়টি মোক্ষ, পিতৃকর্তব্য ও তীর্থাচরণকে একত্রে স্থাপন করে।

Aṣāḍhī Tīrtha Māhātmya (Glory of the Aṣāḍhī Sacred Ford)
মার্কণ্ডেয় রাজাকে উদ্দেশ করে বলেন—অষাঢ়ী তীর্থে গমন করো; সেখানে মহেশ্বর “কামিক” (ইচ্ছাপূরণকারী) রূপে বিরাজমান। এরপর তিনি তীর্থটির মাহাত্ম্য বর্ণনা করে জানান যে এটি “চাতুর্যুগ”—চার যুগেই সমান ফলদায়ক—এবং সকল পবিত্র স্থানের মধ্যে অতুলনীয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে, এই তীর্থে স্নান করলে মানুষ রুদ্রের পরিচর্যাকারী হয়, অর্থাৎ শিবের সান্নিধ্য ও সেবার অধিকার লাভ করে। আরও বলা হয়, যে ব্যক্তি এই তীর্থে প্রাণত্যাগ করে তার গতি অপরিবর্তনীয়; নিঃসন্দেহে সে রুদ্রলোক প্রাপ্ত হয়। এভাবে অধ্যায়টি তীর্থযাত্রা, স্নানকর্ম এবং মুক্তিলাভের নিশ্চয়তাকে সংক্ষিপ্ত ধর্মীয় নির্দেশরূপে একত্র করে।

एरण्डीसङ्गमतīर्थमाहात्म्य (Glory of the Eraṇḍī Confluence Tīrtha)
এই অধ্যায়ে ঋষি মার্কণ্ডেয় সংক্ষেপে তীর্থ-উপদেশ প্রদান করেন। তিনি এরণ্ডী-সঙ্গমকে দেবতা ও অসুর—উভয়েরই পূজিত, অতিশয় পবিত্র ও শ্রেষ্ঠ সঙ্গম-তীর্থ বলে তার মহিমা প্রতিষ্ঠা করেন। যাত্রীকে ইন্দ্রিয় ও মন সংযত রেখে উপবাস করতে এবং বিধি অনুসারে স্নান করতে বলা হয়েছে। এই সাধনায় শুদ্ধি লাভ হয় এবং ব্রহ্মহত্যার মতো ঘোর পাপভার থেকেও মুক্তি মেলে—এমন তত্ত্ব এখানে ঘোষিত। শেষে ফলশ্রুতি—যে ভক্ত এই তীর্থে দেহত্যাগ করে, সে নিঃসন্দেহে রুদ্রলোক প্রাপ্ত হয়ে অনাবর্তনীয় গতি, অর্থাৎ পুনর্জন্মহীন পথ লাভ করে।

जमदग्नितीर्थ-माहात्म्यं तथा कार्तवीर्यार्जुन-परशुराम-चरितम् (Jamadagni Tīrtha Māhātmya and the Kārtavīrya–Paraśurāma Narrative)
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে অত্যন্ত প্রশংসিত জামদগ্নি-তীর্থের কথা বলেন, যেখানে জনার্দন/বাসুদেবের মানব-রূপে কল্যাণকর লীলার সঙ্গে সিদ্ধির প্রসঙ্গ যুক্ত। এরপর হৈহয়-রাজ সহস্রবাহু কার্তবীর্য অর্জুন শিকারে বেরিয়ে জামদগ্নির আশ্রমে উপস্থিত হয়। কামধেনু/সুরভীর অলৌকিক শক্তিতে ঋষি অতিথি-সৎকার করেন; ঐ সমৃদ্ধির উৎস জেনে রাজা গাভীটি দাবি করে এবং অসংখ্য সাধারণ গাভী বিনিময়ে দিলেও জামদগ্নি সম্মতি দেন না। তখন সংঘর্ষ শুরু হয়—জামদগ্নি তপোবলে ‘ব্রহ্মদণ্ড’ প্রয়োগ করেন, আর কামধেনুর দেহ থেকে অস্ত্রধারী দল উদ্ভূত হয়ে যুদ্ধ তীব্র করে তোলে। শেষে কার্তবীর্য ও তার সহায় ক্ষত্রিয়রা জামদগ্নিকে হত্যা করে; এতে পরশুরাম প্রতিশোধের ব্রত নেন—বারংবার ক্ষত্রিয় বংশ ধ্বংস করে সমন্তপঞ্চকে পাঁচটি রক্ত-হ্রদ সৃষ্টি করে পিতৃকার্য সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে পিতৃগণ ও ঋষিরা সংযমের উপদেশ দেন এবং ঐ হ্রদসমূহের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে পুণ্যক্ষেত্র হিসেবে পবিত্র করা হয়। অধ্যায়ের শেষে নর্মদা–সাগর সঙ্গমে আচারবিধি বলা হয়েছে—সরাসরি স্পর্শে সতর্কতা, স্পর্শন-মন্ত্র, স্নান, অর্ঘ্যদান ও বিসর্জন; এবং ফলশ্রুতি হিসেবে বলা হয়, ভক্তিভরে জামদগ্নি ও রেণুকার দর্শন করে এই ক্রিয়াগুলি করলে শুদ্ধি, পিতৃউদ্ধার ও দিব্যলোকে শুভবাস লাভ হয়।

Koṭīśvara Tīrtha Māhātmya (कोटीश्वरतीर्थमाहात्म्य) — Multiplication of Merit at Koṭīśvara on the Narmadā
এই অধ্যায়ে মুনি মার্কণ্ডেয় নর্মদার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত পরম তীর্থ কোটিেশ্বরের মাহাত্ম্য ও তত্ত্বব্যাখ্যা করেন। এখানে স্নান, দান এবং সাধারণভাবে যে কোনো কর্ম—শুভ বা অশুভ—‘কোটি-গুণ’, অর্থাৎ কোটি গুণ ফলপ্রদ হয়—এটাই মূল সিদ্ধান্ত। কোটিতীর্থের প্রামাণ্য প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয় যে দেব, গন্ধর্ব ও শুদ্ধ ঋষিগণ এখানে দুর্লভ সিদ্ধি লাভ করেছেন। এই স্থানে মহাদেব ‘কোটিেশ্বর’ রূপে প্রতিষ্ঠিত; দেবাদিদেবেশের কেবল দর্শনমাত্রেই অতুল সিদ্ধি প্রাপ্তির উপায় হিসেবে বর্ণিত। অধ্যায়ে দিকনির্ভর ধর্মভূগোলও নির্ধারিত—দক্ষিণমার্গের তপস্বীদের পিতৃলোক-সম্পর্ক, আর নর্মদার উত্তর তীরের শ্রেষ্ঠ মুনিদের দেবলোক-সম্পর্ক—একে শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত বলা হয়েছে। ফলে তীর্থমাহাত্ম্য, স্থানে-কর্মফলবৃদ্ধি এবং নদীতীর-লোকতত্ত্ব একত্রে গাঁথা হয়েছে।

लोटणेश्वर-रेवासागर-सङ्गम-माहात्म्य (Lotaneśvara at the Revā–Sāgara Confluence: Ritual Procedure and Merit)
মার্কণ্ডেয় রাজশ্রোতাকে লোটণেশ্বর তীর্থের দিকে নির্দেশ করেন। নর্মদার উত্তর তীরে অবস্থিত এই পরম শৈব তীর্থে দর্শন ও পূজায় বহু জন্মের সঞ্চিত পাপও ক্ষয় হয়। নর্মদার পবিত্রতা শুনে যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন—সব তীর্থের ফলদানকারী সর্বশ্রেষ্ঠ এক তীর্থ কোনটি; উত্তরে রেবা–সাগর সঙ্গমের মাহাত্ম্য বলা হয়—সমুদ্র ভক্তিভরে রেবাকে গ্রহণ করে এবং সমুদ্রে লিঙ্গের আবির্ভাবের কথা নর্মদার পবিত্রতাকে লিঙ্গোৎপত্তি-তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করে। অধ্যায়ে আচারের ক্রম দেওয়া হয়েছে—কার্ত্তিক ব্রত, বিশেষত চতুর্দশীর উপবাস, নর্মদাস্নান, তর্পণ ও শ্রাদ্ধ, রাত্রিজাগরণসহ লোটণেশ্বর পূজা, এবং প্রাতে সমুদ্র আহ্বান ও স্নানের মন্ত্রসহ বিধান। স্নানের পরে ‘লুঠন/লোটন’ নামে এক বিশেষ পরীক্ষা—যাত্রী গড়াগড়ি দিয়ে নিজের পাপকর্ম না ধর্মকর্মের লক্ষণ বোঝে; তারপর বিদ্বান ব্রাহ্মণ ও লোকপাল-প্রতিনিধিদের সামনে পূর্ব দুষ্কৃত্যের স্বীকারোক্তি করে পুনরায় স্নান করে যথাবিধি শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—সঙ্গমস্নান ও লোটণেশ্বর পূজায় অশ্বমেধসম পুণ্য, দান ও শ্রাদ্ধে মহৎ স্বর্গফল, এবং ভক্তিসহ শ্রবণ-পাঠে রুদ্রলোকপ্রাপ্তি ও মুক্তিমুখী ফল লাভ হয়।

Haṃseśvara-Tīrtha Māhātmya (The Glory of the Haṃseśvara Sacred Ford)
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে রেবার (নর্মদা) দক্ষিণ তীরে মাতৃতীর্থ থেকে দুই ক্রোশ দূরে অবস্থিত এক শ্রেষ্ঠ তীর্থের কথা বলেন—হংসেশ্বর, যা মনঃক্লেশ ও বৈমনস্য নাশকারী। এই অধ্যায়ে তীর্থের উৎপত্তি-কথা বর্ণিত। কশ্যপবংশে জন্ম নেওয়া এক হংস, ব্রহ্মার বাহনরূপে পরিচিত, দক্ষযজ্ঞের বিশৃঙ্খলার সময় ভয়ে নির্দেশ না মেনে পালিয়ে যায়। ব্রহ্মা তাকে ডেকেও ফিরে না পেয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে শাপ দেন; ফলে হংসের পতন ঘটে। শাপে দগ্ধ হংস ব্রহ্মার শরণে গিয়ে পশুস্বভাবের সীমাবদ্ধতা জানায়, প্রভুকে ত্যাগ করার দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ব্রহ্মার দীর্ঘ স্তব করে—তাঁকে একমাত্র স্রষ্টা, জ্ঞানের উৎস, ধর্ম-অধর্মের নিয়ন্তা এবং শাপ-অনুগ্রহশক্তির মূল বলে বন্দনা করে। তখন ব্রহ্মা উপদেশ দেন—তপস্যায় শুদ্ধ হয়ে রেবায় স্নান-সেবা করতে এবং তীরে মহাদেব/ত্র্যম্বককে প্রতিষ্ঠা করতে। বলা হয়, সেখানে শিবপ্রতিষ্ঠা করলে বহু যজ্ঞ ও মহাদানের ফল লাভ হয় এবং গুরুতর পাপও মোচন হয়। হংস তপস্যা করে নিজের নামে শঙ্করকে ‘হংসেশ্বর’ রূপে প্রতিষ্ঠা করে পূজা করে উচ্চ গতি লাভ করে। শেষে ফলশ্রুতিতে হংসেশ্বর তীর্থযাত্রার বিধান—স্নান, পূজা, স্তোত্রপাঠ, শ্রাদ্ধ, দীপদান, ব্রাহ্মণভোজন এবং সময়নিয়মে শিবপূজা। এর ফলে পাপনাশ, হতাশা দূরীভূত হওয়া, স্বর্গে সম্মান এবং যথাযথ দানসহ শিবলোকে দীর্ঘবাসের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

तिलादा-तीर्थमाहात्म्य / Tilādā Tīrtha Māhātmya (The Glory of the Tilādā Pilgrimage Site)
মার্কণ্ডেয় এক শ্রেষ্ঠ তীর্থ ‘তিলাদা’-র মাহাত্ম্য বলেন, যা এক ক্রোশ পথের মধ্যেই অবস্থিত। সেখানে জাবালি ‘তিলপ্রাশন’ ও দীর্ঘ তপস্যার দ্বারা শুদ্ধি লাভ করে। কিন্তু তার পূর্বজীবন ছিল কলুষিত—পিতামাতাকে ত্যাগ, অনুচিত কামনা, প্রতারণা ও সমাজনিন্দিত কর্মের ফলে সে জনসমালোচিত ও সমাজচ্যুত হয়। তখন সে তীর্থভ্রমণ করে নর্মদায় বারবার স্নান করে এবং অণিবাপান্তের নিকট দক্ষিণ তীরে বাস স্থাপন করে। সেখানে সে তিলকে অবলম্বন করে ধাপে ধাপে কঠোর ব্রত পালন করে—একভক্ত, একান্তর, তিন/ছয়/বারো দিনের নিয়ম, পক্ষ ও মাসব্যাপী ব্রত, এবং কৃচ্ছ্র ও চন্দ্রায়ণ প্রভৃতি মহাব্রত; বহু বছর ধরে এই সাধনা চলে। শেষে ঈশ্বর প্রসন্ন হয়ে তাকে পবিত্রতা ও সালোক্য দান করেন। জাবালি প্রতিষ্ঠিত দেবতা ‘তিলাদেশ্বর’ নামে প্রসিদ্ধ হন এবং তিলাদা তীর্থ পাপনাশক বলে খ্যাতি পায়। অধ্যায়ে বিধানও আছে—চতুর্দশী, অষ্টমী ও হরির দিনে বিশেষ পূজা; তিল-হোম, তিল-লেপন, তিল-স্নান ও তিলজল ব্যবহার। লিঙ্গে তিল পূরণ ও তিলতেলে দীপ জ্বালালে রুদ্রলোকপ্রাপ্তি এবং সাত পুরুষের শুদ্ধি হয়। শ্রাদ্ধে তিল-পিণ্ড দিলে পিতৃগণ দীর্ঘকাল তৃপ্ত থাকেন এবং পিতৃকুল, মাতৃকুল ও পত্নীকুল—এই কুলত্রয়ের উন্নতি বলা হয়েছে।

Vāsava Tīrtha Māhātmya (वसवतीर्थमाहात्म्य) — Foundation by the Eight Vasus and the Merit of Śiva-Pūjā
মার্কণ্ডেয় নর্মদা-তীরে এক ক্রোশ-পরিসরের মধ্যে অবস্থিত ‘বাসব’ নামে পরম তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন, যা অষ্ট বসু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ধরা, ধ্রুব, সোম, আপ, অনিল, অনল, প্রত্যুষ ও প্রভাস—এই বসুগণ পিতৃশাপে পীড়িত হয়ে ‘গর্ভবাস’-দুঃখে পতিত হন। মুক্তির আশায় তাঁরা নর্মদার এই তীর্থে এসে ভবানীপতি মহাদেবের কঠোর তপস্যা ও আরাধনা করেন। বারো বছর পরে শিব স্বয়ং প্রকাশিত হয়ে তাঁদের অভীষ্ট বর দেন; বসুগণ নিজেদের নামে সেখানে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে আকাশপথে প্রস্থান করেন, আর স্থানটি ‘বাসব-তীর্থ’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। অধ্যায়টি ভক্তিধর্মও নির্দিষ্ট করে—এই তীর্থে সামর্থ্য অনুযায়ী শিবপূজা করতে হবে; পত্র, পুষ্প, ফল, জল ইত্যাদি যা মেলে তাই দিয়ে অর্চনা, বিশেষত দীপদান মহাপুণ্যকর। শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে বিশেষ ফল, অথবা নিয়মিত সাধ্যানুযায়ী পূজার বিধান আছে। ফলশ্রুতিতে শিবসান্নিধ্য, গর্ভবাস-নিবারণ, দারিদ্র্য ও শোকনাশ, স্বর্গে সম্মান এবং একদিন বাস করলেও পাপনাশের কথা বলা হয়েছে। শেষে ব্রাহ্মণভোজন, বস্ত্রদান ও দক্ষিণা প্রদানের কর্তব্য উল্লেখিত।

Koṭīśvara Tīrtha Māhātmya (कोटीश्वरतीर्थमाहात्म्य) — The Merit of Koṭīśvara at the Revā–Ocean Confluence
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে রেবা (নর্মদা) ও সাগরের সঙ্গমস্থলে, এক ক্রোশ-পরিসরের মধ্যে অবস্থিত পরম তীর্থ ‘কোটীশ্বর’-এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। এখানে ভক্তিভরে স্নান, দান, জপ, হোম ও অর্চনা করলে তার ফল ‘কোটি-গুণ’ বৃদ্ধি পায়—এটাই অধ্যায়ের মূল তত্ত্ব। রেবা-সাগর মিলনের অপূর্ব দর্শন করতে দেব, গন্ধর্ব, ঋষি, সিদ্ধ ও চারণগণও সেখানে সমবেত হন। স্নানের পর ভক্তি অনুযায়ী শিব (কোটীশ্বর) প্রতিষ্ঠা করে বিল্বপত্র, অর্কফুল, ঋতুযুক্ত উপহার, ধুতুরা, কুশ প্রভৃতি দ্বারা মন্ত্রসহ উপচার, ধূপ-দীপ ও নৈবেদ্য অর্পণ করে পূজা করতে বলা হয়েছে। এই তীর্থসেবী যাত্রী ও তপস্বীদের পিতৃলোক-দেবলোক প্রভৃতি উচ্চ গতি লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পৌষ কৃষ্ণ অষ্টমী বিশেষ পুণ্যদিন; তদুপরি চতুর্দশী ও অষ্টমীতে নিয়মিত পূজা ও যোগ্য ব্রাহ্মণভোজন প্রশস্ত বলা হয়েছে।

Alikā’s Austerity at Revā–Sāgara Saṅgama and the Manifestation of Alikeśvara (अलिकेश्वर-माहात्म्य)
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে এক তীর্থকেন্দ্রিক নৈতিক সংকট ও তার নিষ্কৃতির কথা বলেন। চিত্রসেন-বংশসংশ্লিষ্ট গন্ধর্বী অলিকা ঋষি বিদ্যানন্দের সঙ্গে দশ বছর বাস করে; পরে অজ্ঞাত কারণে ঘুমন্ত স্বামীকে হত্যা করে। সে পিতা রত্নবল্ভকে জানালে পিতা-মাতা কঠোর নিন্দা করে তাকে ত্যাগ ও নির্বাসিত করেন, তাকে পতিঘ্নী, গর্ভঘ্নী, ব্রহ্মঘ্নী ইত্যাদি পাপী বলে দোষারোপ করেন। দুঃখে ভগ্ন অলিকা ব্রাহ্মণদের কাছে প্রায়শ্চিত্ত-তীর্থ জানতে চায়। তারা রেবা–সাগর সঙ্গমের পাপহর তীর্থের কথা বলে। সেখানে সে নিরাহার, ব্রত-নিয়ম, কৃচ্ছ্র/অতিকৃচ্ছ্র ও চন্দ্রায়ণ প্রভৃতি তপস্যা, এবং শিবধ্যান-উপাসনা দীর্ঘকাল করে। পার্বতীর প্রেরণায় প্রসন্ন শিব আবির্ভূত হয়ে তাকে শুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং বর দেন—সে যেন সেখানে নিজের নামে শিবকে প্রতিষ্ঠা করে, পরে স্বর্গলাভ করবে। অলিকা স্নান করে শঙ্করের প্রতিষ্ঠা করে—এই লিঙ্গ ‘অলিকেশ্বর’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। সে ব্রাহ্মণদের দান করে, পরে পরিবারের সঙ্গে মিলন ঘটে এবং শেষে দিব্য বিমানে গৌরীলোক প্রাপ্ত হয়। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—এ তীর্থে স্নান ও উমাসহ মহাদেব পূজায় মন-বাক্য-কায়ার পাপ নাশ হয়; দ্বিজভোজন ও দীপদান রোগশমন করে; ধূপপাত্র, বিমান-প্রতিমা, ঘণ্টা ও কলস দানে উৎকৃষ্ট স্বর্গসিদ্ধি লাভ হয়।

Vimaleśvara-Tīrtha Māhātmya (विमलेश्वरतीर्थमाहात्म्य) — The Glory of the Vimaleśvara Sacred Site
মার্কণ্ডেয় অবন্তীখণ্ডে বিমলেশ্বর নামে এক মহাতীর্থের মাহাত্ম্য বলেন—এক ক্রোশ-পরিসরে অবস্থিত এই তীর্থে স্নান, পূজা ও তপস্যা পাপশুদ্ধি ও মনোবাঞ্ছিত ফল প্রদান করে। উদাহরণক্রমে বলা হয়—ত্বষ্টার পুত্র ত্রিশিরাকে বধ করার পর ইন্দ্র এখানে স্নান করে শুদ্ধ হন; এক তপস্বী ব্রাহ্মণ তপস্যায় দীপ্তিমান ও নির্মল হন; ভানু কঠোর তপ ও শিবকৃপায় বিকৃত রোগ থেকে মুক্তি পান। বিভাণ্ডকের পুত্র (ঋষ্যশৃঙ্গ) সামাজিক জড়াজড়ি থেকে জন্মানো অশৌচ উপলব্ধি করে স্ত্রী শান্তার সঙ্গে রেবা–সাগর সঙ্গমে বারো বছর নিয়ম পালন করেন; কৃচ্ছ্র ও চন্দ্রায়ণ ব্রত দ্বারা ত্র্যম্বককে তুষ্ট করে ‘বৈমল্য’ লাভ করেন। দারুবন প্রসঙ্গে শর্বাণীর প্রেরণায় শিব নর্মদা–সাগর সঙ্গমে এক শুদ্ধ স্থান প্রতিষ্ঠা করেন এবং লোককল্যাণকারী রূপে ‘বিমলেশ্বর’ নামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। ব্রহ্মার তিলোত্তমা-সৃষ্টি থেকে যে নৈতিক অস্থিরতা জন্মায়, তা মৌন, ত্রিবার স্নান, শিবস্মরণ ও সঙ্গমে পূজার দ্বারা প্রশমিত হয়ে পুনরায় পবিত্রতা ফিরে আসে। শেষে বিধান—এখানে স্নান ও শিবপূজা পাপ নাশ করে ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি দেয়; অষ্টমী, চতুর্দশী ও উৎসবদিনে উপবাস-দর্শনে সঞ্চিত পাপ ক্ষয় হয়ে শিবধাম লাভ হয়; বিধিমত শ্রাদ্ধে পিতৃঋণ মোচন। স্বর্ণ, শস্য, বস্ত্র, ছাতা, পাদুকা, কমণ্ডলু দান, ভক্তিগীতি-নৃত্য-পাঠ এবং মন্দির নির্মাণকে মহাপুণ্য বলা হয়েছে।

Revā-Māhātmya and Narmadā-Yātrā Vidhi (Expiatory Rules and Yojana Measure)
এই অধ্যায়ে সংলাপরূপে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে রেবা/নর্মদার অতুল পবিত্রতার কথা বলেন। তিনি রেবাকে মহাদেবের প্রিয়া, ‘মাহেশ্বরী গঙ্গা’ ও ‘দক্ষিণ গঙ্গা’ বলে মহিমান্বিত করেন এবং সতর্ক করেন যে অবিশ্বাস, নিন্দা ও অবমাননা সাধনার ফল নষ্ট করে। শাস্ত্রসম্মত আচরণ ও শ্রদ্ধা-নির্ভর কর্মই ফলদায়ক; খেয়ালখুশি ও কামনাপ্রসূত আচরণে সিদ্ধি আসে না। এরপর নর্মদা-যাত্রার নীতিবিধি দেওয়া হয়—ব্রহ্মচর্য, সংযত আহার, সত্যভাষণ, প্রতারণা বর্জন, বিনয়, এবং ক্ষতিকর সঙ্গ ত্যাগ। তীর্থকর্ম হিসেবে স্নান, দেবপূজা, প্রযোজ্য স্থানে শ্রাদ্ধ/পিণ্ডদান, এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রাহ্মণভোজন/দান নির্দেশিত। পরে প্রায়শ্চিত্তের স্তরবিন্যাসে যাত্রাদূরত্ব (বিশেষত ২৪ যোজন) কৃচ্ছ্র প্রভৃতি ফলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়; সঙ্গম ও প্রসিদ্ধ স্থানে ফলবৃদ্ধি গুণিতভাবে বলা হয়েছে। শেষে অঙ্গুল, বিতস্তি, হস্ত, ধনু, ক্রোশ, যোজন ইত্যাদি মাপের সংজ্ঞা ও নদীর প্রস্থ/পরিমাপ অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস দিয়ে রেবা-যাত্রাকে নিয়মবদ্ধ শুদ্ধিকরণের পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

परार्थतीर्थयात्राफलनिर्णयः | Determining the Merit of Pilgrimage Performed for Another
অধ্যায় ২২৮-এ ধর্মকেন্দ্রিক সংলাপ। যুধিষ্ঠির মুনি মার্কণ্ডেয়কে জিজ্ঞাসা করেন—অন্যের কল্যাণে (পরার্থ) করা তীর্থযাত্রার ফল কতটা। মুনি কর্ম-এজেন্সির ধাপ ব্যাখ্যা করেন—সর্বোত্তম নিজে ধর্মাচরণ; অক্ষম হলে সমবর্ণ (সবর্ণ) বা নিকট আত্মীয়ের দ্বারা যথাযথভাবে করানো উচিত, কিন্তু অনুপযুক্ত প্রতিনিধির হাতে দিলে ফল ক্ষুণ্ণ হয়। এরপর প্রতিনিধি-তীর্থযাত্রা ও আকস্মিকভাবে সংঘটিত যাত্রার ফলের অনুপাত নির্ধারণ করা হয় এবং পূর্ণ যাত্রার ফল ও কেবল স্নানের ফল পৃথক করে বলা হয়। পিতা-মাতা, বয়োজ্যেষ্ঠ, গুরু এবং বিস্তৃত আত্মীয়বর্গকে যোগ্য ভোক্তা হিসেবে গণ্য করে সম্পর্কের নৈকট্য অনুযায়ী পুণ্যের অংশ নির্ধারিত—পিতা-মাতার ভাগ বেশি, দূর সম্পর্কের ভাগ কম। শেষে ঋতুকালভেদে কিছু সময় নদীকে ‘রজস্বলা’ ধরে জলকর্মে সংযমের বিধান এবং কয়েকটি ব্যতিক্রমের উল্লেখ আছে।

नर्मदाचरितश्रवणफलप्रशंसा | Praise of the Fruits of Hearing the Narmadā Narrative
এই অধ্যায়ে ঋষি মার্কণ্ডেয় রাজা/ভূপালকে উপসংহারধর্মী ধর্মতত্ত্ব শোনান। তিনি বলেন, দেবসভায় উচ্চারিত ও শিবপ্রিয় এই পুরাণকথা সংক্ষেপে এখন তোমার কাছে পৌঁছে দেওয়া হল। নর্মদার উৎস, মধ্যপ্রবাহ ও মোহনায় সর্বত্র অসংখ্য তীর্থ বিস্তৃত—এই কথা তিনি বিশেষভাবে জানান। এরপর ফলশ্রুতি—নর্মদা-চরিত শ্রবণ বহু বেদপাঠ ও মহাযজ্ঞের চেয়েও অধিক পুণ্যদায়ক, এবং নানা তীর্থে স্নানের সমতুল্য। এতে শিবলোকপ্রাপ্তি ও রুদ্রগণের সান্নিধ্য লাভ হয়; তীর্থের দর্শন, স্পর্শ, স্তব বা কেবল শ্রবণেই পাপক্ষয় ঘটে। বর্ণভেদে ও নারীদের ক্ষেত্রেও ফল উল্লেখ করা হয়েছে, এবং বলা হয়েছে যে গুরুতর অপরাধও নর্মদা-মাহাত্ম্য শুনলে শুদ্ধ হয়। শেষে পূজা-উপহারসহ আরাধনা, গ্রন্থ লিখে দ্বিজকে দান, এবং সর্বজনমঙ্গল কামনায় আশীর্বাদ—এইসবের সঙ্গে রেবা/নর্মদাকে জগৎ-পাবনী ও ধর্মপ্রদা বলে স্তব করা হয়েছে।

Revā-Tīrthāvalī-Prastāvaḥ (Introduction to the Catalogue of Revā Tīrthas)
অধ্যায় ২৩০ হলো রেবা-তীর্থমালার এক প্রস্তাবনা ও সংক্ষিপ্ত সূচি। সূত, মার্কণ্ডেয়-প্রদত্ত উপদেশের সূত্রে পূর্বকথা সমাপ্ত করে জানান যে রেবা-মাহাত্ম্য সাররূপে ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে; এখন ওঙ্কার থেকে আরম্ভ করে শুভ ‘তীর্থাবলী’ বর্ণিত হবে। শুরুতে সোম, মহেশ, ব্রহ্মা, অচ্যুত, সরস্বতী, গণেশ ও দেবীর বন্দনা করে দেবীস্বরূপ পবিত্রকারিণী নর্মদাকে বিশেষ প্রণাম করা হয়। এরপর দীর্ঘ কাহিনি নয়, বরং দ্রুতগতিতে বহু তীর্থনাম, সঙ্গমস্থান, আবর্ত, লিঙ্গস্থাপন এবং পবিত্র বন-আশ্রমের নাম একত্রে তালিকাভুক্ত করা হয়—যেন যাত্রাপথের নির্দেশিকা। শেষে পাঠবিধি ও ফলশ্রুতি বলা হয়েছে: সজ্জনদের মঙ্গলের জন্য এই তীর্থাবলী রচিত; এর পাঠে দৈনিক, মাসিক, ঋতুগত ও বার্ষিক পাপক্ষয় হয়, শ্রাদ্ধ ও পূজায় বিশেষ ফল লাভ হয়, পরিবারসহ শুদ্ধি এবং স্বীকৃত ধর্মকর্মের তুল্য পুণ্য অর্জিত হয়।

Revātīrtha-stabaka-nirdeśaḥ (Enumeration of Tīrtha Clusters on the Revā)
এই অধ্যায়ে সূত, পার্থকে মার্কণ্ডেয়ের সংক্ষিপ্ত উপদেশ অনুযায়ী রেবা (নর্মদা) নদীর উভয় তীরে অবস্থিত ‘তীর্থ-স্তবক’—অর্থাৎ তীর্থসমূহের গুচ্ছ—সম্বন্ধে তালিকাভিত্তিক, প্রযুক্তিগত বর্ণনা প্রদান করেন। রেবাকে ‘কল্পলতা’ রূপে কল্পনা করা হয়েছে, যার পুষ্প হলো তীর্থ; এরপর ওঙ্কারতীর্থ থেকে পশ্চিম সমুদ্র পর্যন্ত নানা সঙ্গমের সুসংবদ্ধ গণনা দেওয়া হয়, উত্তর ও দক্ষিণ তীরের বিভাজনসহ, এবং রেবা–সমুদ্র সঙ্গমকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়। পরবর্তী অংশে মোট সংখ্যা ও শ্রেণিবিভাগ আসে—পরিচিত চারশো তীর্থসহ—এবং দেবতা-প্রকার অনুযায়ী বৃহৎ শৈব গোষ্ঠী, সঙ্গে বৈষ্ণব, ব্রাহ্ম ও শাক্ত গোষ্ঠীর উল্লেখ করা হয়। তারপর বহু সঙ্গম, উপবন, গ্রাম ও প্রসিদ্ধ স্থানে গুপ্ত ও প্রকাশ তীর্থের পরিমাণ (শত থেকে লক্ষ-কোটি পর্যন্ত) নির্দিষ্ট করা হয়—কপিলা-সঙ্গম, অশোকবনিকা, শুক্লতীর্থ, মহীষ্মতী, লুঙ্কেশ্বর, বৈদ্যনাথ, ব্যাসদ্বীপ, করঞ্জা-সঙ্গম, ধূতপাপ, স্কন্দতীর্থ প্রভৃতি—এবং শেষে বলা হয়, তীর্থসমূহের পূর্ণ বিস্তার বর্ণনার অতীত।

रेवामाहात्म्य-समापनम् (Conclusion of the Revā/Narmadā Māhātmya and Phalaśruti)
এই অধ্যায়ে রেবাখণ্ডের নর্মদা-মাহাত্ম্যের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি করা হয়েছে। সূত ব্রাহ্মণসমাজকে জানান যে মার্কণ্ডেয় যেভাবে পূর্বে পাণ্ডুপুত্রকে উপদেশ দিয়েছিলেন, সেই রেবামাহাত্ম্যই তিনি যথাক্রমে বর্ণনা করেছেন এবং তীর্থসমূহের গুচ্ছও ক্রমানুসারে সম্পূর্ণভাবে বলা হয়েছে। রেবাকথা ও রেবাজলকে অতিশয় পবিত্র ও পাপনাশক বলা হয়েছে; নর্মদাকে শৈব-উৎসারিত, জগতের কল্যাণার্থে প্রতিষ্ঠিত দিব্য নদী হিসেবে প্রতিপাদন করা হয়েছে। রেবার তীর্থগুলির ঘনত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব অতিশয়োক্তিভাবে উল্লেখ করে বলা হয়—কলিযুগে রেবাস্মরণ, পাঠ ও সেবা বিশেষ ফলদায়ক। ফলশ্রুতিতে শ্রবণ-পাঠকে বেদাধ্যয়ন ও দীর্ঘ যজ্ঞের চেয়েও অধিক ফলপ্রদ বলা হয়েছে এবং কুরুক্ষেত্র, প্রয়াগ, বারাণসী প্রভৃতি প্রসিদ্ধ তীর্থের সমান পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে। গ্রন্থ-ভক্তির নীতি নির্দেশ করা হয়—লিখিত গ্রন্থ গৃহে রাখা, পাঠক ও গ্রন্থকে দান-অর্ঘ্য দিয়ে সম্মান করা; এতে সংসারসমৃদ্ধি, সামাজিক মঙ্গল এবং পরলোকে শিবলোকের সান্নিধ্য লাভ হয়। গুরুতর পাপও দীর্ঘকাল শ্রবণে প্রশমিত হয়—শেষে শিব থেকে বায়ু, ঋষিগণ এবং সূত পর্যন্ত পরম্পরা পুনরায় ঘোষিত হয়।
The section emphasizes the glory of the Revā/Narmadā as a purifying sacred presence whose banks and waters are treated as tīrtha-space, integrating hymn, doctrine, and pilgrimage cartography.
The discourse repeatedly frames Revā’s waters and riverbanks as instruments of removing dūrīta (moral and ritual impurity), presenting bathing, remembrance, and reverential approach as merit-generating ethical guidelines.
Chapter 1 introduces the inquiry into Revā’s location and Rudra-linked origin (śrī-rudra-sambhavā), setting up subsequent tīrtha narratives; it also embeds a meta-legend on Purāṇic authority and compilation attributed to Vyāsa and earlier divine transmission.