
मण्डल 10
The Closing Collection
মণ্ডল ১০ ঋগ্বেদের সর্বশেষ ও সর্বাধিক বিস্তৃত গ্রন্থ। এতে এমন সূক্ত সংরক্ষিত আছে যা যজ্ঞীয় স্তব থেকে এগিয়ে স্পষ্ট দার্শনিক, সামাজিক ও নৈতিক প্রতিফলনে প্রবেশ করে। এখানে সৃষ্টিতত্ত্ব ও অনুমাননির্ভর চিন্তার মৌলিক পাঠ (বিশেষত নাসদীয় সূক্ত) রয়েছে; পাশাপাশি জীবন-চক্রের আচার—বিশেষ করে অন্ত্যেষ্টি—এবং রক্ষা ও বিজয়ের প্রার্থনার সূক্তও আছে। অনুবাক-স্তরের বিষয়বস্তু ‘মন্ত্র/ব্রহ্মণ’-কে এক অন্তর্লীন, রুদ্রসদৃশ শক্তি হিসেবে তুলে ধরে, যা প্রেরিত বাক্ (বাচ্) দ্বারা ঋত/শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে; এবং তার সঙ্গে একটি পরিপূরক ধারাও ইঙ্গিতিত।
Sukta 10.1
ঋগ্বেদ ১০.১ মণ্ডল ১০-এর সূচনা করে অগ্নির আহ্বানে—তাঁকে অন্ধকার থেকে প্রথম দীপ্ত উদ্ভাস, উষাদের পূর্বে স্থিত, এবং সকল নিবাসকে আলোয় পরিপূর্ণকারী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সূক্ত অগ্নির বহুরূপের স্তব করে, যা আহুতির দ্বারা সদা নবীন হয়, এবং তাঁকে মানব গোত্রসমূহের হোতৃ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে—যিনি প্রার্থনা বহন করেন এবং দেবতাদের যজ্ঞে আনেন।
Sukta 10.2
এই সূক্তে অগ্নিকে আহ্বান করা হয়েছে—তাঁকে সর্বকনিষ্ঠ ও সর্বাধিক সক্ষম হোতৃ রূপে, যিনি ঋতু (যথাযথ ঋতু/সময়) জানেন এবং যজ্ঞে দেবতাদের তাঁদের যথোচিত ক্রমে সঠিকভাবে “স্থাপন” করতে পারেন। এতে অগ্নির কাছে প্রার্থনা করা হয় যে তিনি দেবতাদের পুষ্ট করুন, দিব্য বিধানে মানুষের যে ত্রুটি-ভ্রান্তি ঘটে তা সংশোধন করুন, এবং উপাসকদের অন্তরে প্রজ্বলিত থাকুন—পিতৃয়াণ (পূর্বপুরুষদের পথ) পর্যন্ত জেনে যজ্ঞকর্মকে দীপ্তিময় সাফল্যে পরিচালিত করুন।
Sukta 10.3
এই সংক্ষিপ্ত অগ্নি-সূক্তে অগ্নিদেবকে উগ্র অথচ মঙ্গলময়, বিবেচক শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে; তাঁর বিস্তীর্ণ দীপ্তি অন্ধকার দূর করে যজমানকে স্পষ্টতার “উষা”-র দিকে নিয়ে যায়। এখানে অগ্নিকে স্নেহময় সখা-সঙ্গী রূপে প্রজ্বালিত করা হয় এবং প্রার্থনা করা হয়—তিনি যেন সু-যোজিত অশ্বসহ দ্রুত আগমন করেন, যজ্ঞাসনে অধিষ্ঠিত হন, এবং স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যে হবি ও সংকল্পকে বহন করেন।
Sukta 10.4
এই সূক্তে অগ্নির স্তব করা হয়েছে—তাঁকে প্রাচীন রাজা ও গৃহস্বামী রূপে, যিনি যজমানের আশ্রয় হন, যেমন অনুর্বর ভূমিতে জীবনদায়ী প্রস্রবণ। এতে অগ্নির গোপন অথচ সক্রিয় স্বভাবের বিস্ময় প্রকাশ পেয়েছে—তিনি লুকিয়ে শুয়ে থাকেন, তারপর হঠাৎ উদ্ভাসিত হয়ে আহুতির ‘রস’ আস্বাদন করেন—এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে যেন তিনি পরিবার, সন্তানসন্ততি, দেহের অখণ্ডতা ও জীবনের ধারাবাহিক পথ রক্ষা করেন। সার্বিকভাবে এটি সফল যজ্ঞের আহ্বান এবং সমৃদ্ধি ও বংশধারার ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রার্থনা।
Sukta 10.5
এই রহস্যময় সূক্ত এক গোপন একক মহাজাগতিক তত্ত্বকে ধ্যান করে—যা অগ্নি–সূর্য রূপে, অন্তর্নিহিত অগ্নি ও সৌর দ্রষ্টা হিসেবে অনুভূত—যে ‘সমুদ্র’-এর মতো প্রাচুর্য ধারণ করে এবং জীবনের প্রস্রবণের মধ্যে স্থাপিত গোপন পথকে প্রকাশ করে। এটি গোপন পুষ্টি, ঋত (সত্য-ব্যবস্থা)-এর পথসমূহ, এবং অদিতির বিশালতায় সৎ ও অসৎ-এর সৃষ্টিতাত্ত্বিক আলিঙ্গনের চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়; এবং শেষে অগ্নিকে ঋত-এর প্রথমজাত, তথা শক্তি ও প্রাচুর্য—উভয়ের উৎস—রূপে প্রতিষ্ঠা করে।
Sukta 10.6
এই সূক্তে অগ্নির স্তব করা হয়েছে—তাঁকে দীপ্তিমান, সর্বপ্রকাশক উপস্থিতি হিসেবে, যিনি গায়ককে আশ্রয় দেন এবং যজ্ঞের অর্ঘ্যকে ফলপ্রসূ করেন। অগ্নিকে দ্রুত দূত রূপে মহিমান্বিত করা হয়েছে; স্তোত্রে আনন্দিত হয়ে তিনি দেবতাদের যজ্ঞের দিকে আকর্ষণ করেন এবং নিজেই প্রথম ‘হব্য’—আদিম আহুতি—হয়ে ওঠেন। মন্ত্রগুলিতে অগ্নির মহত্ত্ব, তাঁর প্রাচীন কিরণসমূহ, এবং আদ্য দেবশক্তিগুলিকে জাগিয়ে তোলা ও বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উচ্চারিত।
Sukta 10.7
এই সংক্ষিপ্ত অগ্নি-সূক্তে স্বস্তি (কল্যাণ) প্রার্থনা করা হয়েছে—স্বর্গ ও পৃথিবী, উভয় দিক থেকেই। অগ্নির কাছে নিবেদন করা হয় যেন তিনি যজ্ঞ ও সৎ/ধর্মসম্মত জীবনের উপযোগী “সর্বজনীন আয়ু” (viśvāyus) প্রতিষ্ঠা করেন। গৃহে অগ্নির অভিভাবকত্বে তীক্ষ্ণ, বিজয়ী ধী (প্রজ্ঞা/অন্তর্দৃষ্টি) লাভের কামনা করা হয়েছে, এবং শেষে তাঁকে সহায়ক, রক্ষক, জীবনদাতা ও সৎপথে দেহের সংরক্ষক হতে প্রার্থনা করা হয়।
Sukta 10.8
এই সূক্তে অগ্নির স্তব করা হয়েছে—তাঁকে এক মহাজাগতিক শক্তি রূপে, যার আলোক-ধ্বজ স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যে পদচারণা করে, যিনি জলে জলে বৃদ্ধি পান এবং ঋত (বিশ্ব-নিয়ম/কসমিক অর্ডার) রক্ষা করেন। এতে অগ্নির বহু পরিচয় উন্মোচিত—দ্রষ্টা-আলোক, বরুণ-সদৃশ বিধি ও ধর্মের ধারক, অপাং নপাত, এবং যজ্ঞ-দূত যিনি অর্ঘ্য-আহুতি দেবতাদের কাছে পৌঁছে দেন। পাশাপাশি, ইন্দ্রের বিশ্বরূপ-বধের পৌরাণিক প্রসঙ্গ স্মরণ করে দেখানো হয়েছে যে ঔদ্ধত্যের উপর সুশৃঙ্খল শক্তির বিজয় ঘটে।
Sukta 10.9
ঋগ্বেদ ১০.৯ ‘আপঃ’ (জল)-কে উদ্দেশ করে রচিত স্তোত্র। এখানে জলকে আনন্দ, পুষ্টি, শক্তি, নির্মল দৃষ্টি ও আরোগ্যের উৎস হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে। কবি তাদের কাছে প্রাণশক্তি এবং ঔষধসদৃশ শুদ্ধিকরণের প্রার্থনা করেন; এবং শেষে তাদের ‘রস’ (সার)-এর সঙ্গে অন্তরঙ্গ সংযোগের অনুভূতিতে উপনীত হন, যার ফলে অগ্নিও সেই নবীকৃত, দীপ্তিময় অবস্থায় আহূত হয়।
Sukta 10.10
এই সংলাপধর্মী সূক্তে প্রসিদ্ধ যম–যমী সংলাপ উপস্থাপিত হয়েছে, যেখানে যমী মানববংশের ধারাবাহিকতার জন্য মিলনের অনুরোধ জানায়, আর যম সংযম ও ঋত (মহাজাগতিক বিধি)-সম্মত আচরণে অবিচল থাকে। সূক্তটি কামনা ও বিধির মধ্যকার টানাপোড়েনকে নাটকীয়ভাবে প্রকাশ করে এবং দেখায় যে সামাজিক ও মহাজাগতিক নিয়ম সচেতন নির্বাচন ও আত্মসংযমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। শেষে যম, যমীকে অন্যত্র মঙ্গলময় ও বিধিসঙ্গত মিলনের দিকে নির্দেশ করে, এবং সীমালঙ্ঘনের বদলে সামঞ্জস্য (সংবিদ্)কে গুরুত্ব দেয়।
Sukta 10.11
মণ্ডল ১০-এর এই উত্তরকালীন সূক্তে ঋত (বিশ্ব-শৃঙ্খলা)-এর সর্বজ্ঞ রক্ষক বরুণকে অদিতির জীবনদায়িনী শক্তি এবং যজ্ঞের যথাযথ সময় (ঋতু)-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এরপর কার্যকর পুরোহিতীয় অগ্নি হিসেবে অগ্নির দিকে মোড় নিয়ে প্রার্থনা করা হয়—তিনি আহ্বান-স্তোত্রে পুষ্ট হোন, প্রাচুর্যসহ নিকটে আসুন, এবং দেবগণ ও দুই লোককে যজ্ঞে উপস্থিত করুন।
Sukta 10.12
এই সূক্তে দ্যাবা-পৃথিবী (স্বর্গ ও পৃথিবী)-র বিশাল পরিসরে হোতৃ (আহ্বানকারী পুরোহিত) রূপে অগ্নিকে আহ্বান করা হয়েছে, এবং যজ্ঞকে সেই উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে যার দ্বারা মর্ত্যরা দেবতাদের নিকটবর্তী হওয়ার যোগ্য হয়। এটি ঋত (মহাজাগতিক সত্য/শৃঙ্খলা) ও সত্য বাক্যের আদিম দর্শন থেকে শুরু করে, দিব্য বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে কি না—এই অনুসন্ধানী আত্মজিজ্ঞাসায় অগ্রসর হয়; এবং শেষে অগ্নির কাছে সরাসরি প্রার্থনা করে—তিনি যেন শোনেন, ধনবাহী রথ জোয়ালেন, এবং দুই লোককে যজ্ঞে উপস্থিত করেন।
Sukta 10.13
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে “প্রাচীন বাক্/ব্রহ্ম” (pūrvyaṃ brahma)‑কে এক যুগল দেবশক্তি (vām)‑এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, এবং প্রার্থনা করা হয়েছে যে পরিশোধিত স্তোত্রধ্বনি প্রেরিত ঋষির জন্য নিশ্চিত পথের মতো অগ্রসর হোক। এরপর এটি বাক্ ও রূপের এক প্রতীকী, প্রায় ছন্দোময়‑যজ্ঞীয় বিশ্লেষণে প্রবেশ করে—পাঁচ পদক্ষেপ, চার‑পদী মাত্রা, এবং অবিনশ্বর অক্ষর (akṣara)—যাতে গায়ক ঋত, অর্থাৎ সত্য‑ব্যবস্থা,‑র সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিতে পারে। সমাপ্তিতে সাতটি প্রবহমান স্রোত ও দীপ্ত দ্বৈততার চিত্র এক মিলিত, পুষ্ট পূর্ণতার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে পরিপূরক শক্তিদ্বয় একত্রে সত্যের কর্মকে ধারণ করে।
Sukta 10.14
এই সূক্তটি অন্ত্যেষ্টি ও পিতৃ-আহ্বানের স্তোত্র, যা প্রয়াতকে যম বৈবস্বতের নিকট গমন করতে পথনির্দেশ করে—তিনি সেই প্রথম, যিনি ‘অগ্রে গমন করে’ বহুজনের জন্য পথ আবিষ্কার করেছিলেন। এতে নিরাপদ যাত্রার প্রার্থনা, পিতৃগণের মধ্যে স্থিত ও শান্ত বিশ্রামস্থানের কামনা, এবং পরলোককে ভয়ের বিশৃঙ্খলা নয়, বরং ধর্মসম্মত, সুসংবদ্ধ ও নিয়মশাসিত এক লোকরূপে প্রতিষ্ঠার নিবেদন করা হয়েছে।
Sukta 10.15
ঋগ্বেদ ১০.১৫ একটি পিতৃ-সূক্ত, যেখানে আচারানুষ্ঠানে পিতৃগণকে—অধম, মধ্যম ও উত্তম—আহ্বান করা হয় যেন তাঁরা উঠে জীবিতদের কাছে আসেন, তাদের ডাক শুনে নিবেদনকৃত অর্ঘ্য/হবি গ্রহণ করেন। এতে পিতৃলোককে সোম, ঋত (বিশ্ব-নিয়ম) এবং যমের শাসনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে, এবং দেহধারী সত্তার জন্য রক্ষা, আশীর্বাদ ও প্রাণশ্বাসের ‘জীবন-পথ’ সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়ার প্রার্থনা করা হয়েছে।
Sukta 10.16
ঋগ্বেদ ১০.১৬ হলো অগ্নি জাতবেদসকে উদ্দেশ করে রচিত এক অন্ত্যেষ্টি-সূক্ত। এতে দাহাগ্নির কাছে প্রার্থনা করা হয়—তিনি যেন মৃতকে রূপান্তরিত করেন, কিন্তু কোনো হিংস্র ‘ছড়িয়ে-ছিটিয়ে’ দেওয়া ছাড়া; এবং সেই ব্যক্তিকে পিতৃদের (পূর্বপুরুষদের) কাছে পিতৃলোকে পৌঁছে দেন। সূক্তে অগ্নিকে সতর্ক মনোবাহক (psychopomp) রূপে দেখানো হয়েছে—দেহকে যাত্রার জন্য ‘রান্না/পরিপক্ব’ করা, যা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয় তা রক্ষা করা, এবং পিতৃলোকে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত করা। এতে পাত্র/আহুতি-সংক্রান্ত আচারচিত্রও আছে, এবং শেষে এক শান্তিকরণ অংশে অগ্নিকে শীতল ও দীপ্ত করা হয়, যাতে ক্রিয়া শুভভাবে সম্পন্ন হয়।
Sukta 10.17
এই সূক্তে ত্বষ্টৃ তাঁর কন্যা (সরণ্যূ)-র জন্য কনে-নির্মাণ এবং বিবস্বৎ–যম-সম্পর্কিত আখ্যানকে এক পৌরাণিক-যজ্ঞীয় বুননে গাঁথা হয়েছে। বিবাহ ও রূপান্তরের প্রতীকের মাধ্যমে এটি গমন/অতিক্রম, বংশধারা এবং লোকসমূহের বিধান/শৃঙ্খলার কথা বলে। পরে এটি পিতৃশক্তি ও শুদ্ধিকারী তত্ত্ব—সরস্বতী, আপঃ (জল) এবং দুধ-বহনকারী ঔষধি—এর দিকে ফিরে পুষ্টি, নির্দোষ প্রেরণা, এবং বাক্শক্তির পরিশোধন ও মাধুর্যপ্রদানের প্রার্থনা করে। সার্বিকভাবে এটি এক সীমান্তবর্তী (লিমিনাল) সূক্ত, যা মহাজাগতিক বংশানুক্রম, আচার এবং অন্তর্নবীকরণকে যুক্ত করে।
Sukta 10.18
ঋগ্বেদ ১০.১৮ একটি পরবর্তী ঋগ্বৈদিক অন্ত্যেষ্টি-সূক্তমালা, যা মৃত ও জীবিতের মধ্যবর্তী সীমারেখাকে আচারগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এতে সম্প্রদায় থেকে মৃত্যুকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান আছে, দেহ ও কবর/সমাধির যথাযথ বিধি-অনুষ্ঠানের নির্দেশ আছে, এবং যারা বেঁচে থাকে—বিশেষত গৃহস্থ পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—তাদের জন্য সামাজিক ও প্রাণশক্তির ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়।
Sukta 10.19
ঋগ্বেদ ১০.১৯ একটি অপোত্রেয় (অপশক্তি-নিবারক) ও পুনরুদ্ধারমূলক সূক্ত; এতে বারবার ক্ষতিকর শক্তি, বিভ্রান্তি/ভ্রান্তপথ এবং এনস্ (অপবিত্রতা/পাপ)‑কে “ফিরে যেতে” আদেশ করা হয়, এবং অগ্নি–সোমের কাছে উপাসকের মধ্যে রয়ি (সমগ্রতা, সমৃদ্ধি, প্রাণশক্তি) পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করা হয়। এর ভাষা যেন বাচনিক ঔষধ—ক্ষয়কে উল্টে দেয়, যা বিচ্যুত হয়েছে তাকে ফিরিয়ে আনে, এবং সর্বদিক থেকে রক্ষাকবচের শৃঙ্খলা পুনরায় স্থাপন করে।
Sukta 10.20
এই সূক্তের শুরুতে বাতা—প্রেরণাদায়ী প্রাণ/বায়ু—এর কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে, যেন তিনি উপাসকদের মধ্যে ‘ভদ্র’ অর্থাৎ শুভ প্রেরণা প্রবাহিত করেন, যা মনকে যথাযথভাবে পরিচালিত করে। এরপর সূক্তটি অগ্নির দিকে ফিরে যায়—যিনি যজ্ঞের নিরাপদ পথ ও শান্তি; এবং শেষে কবি প্রেরিত বাক্য অর্পণ করেন, যা পুষ্টি, শক্তি এবং অস্তিত্বে স্থিতিশীল নিবাস কামনা করে।
Sukta 10.21
এই সূক্তে যজ্ঞের হোতৃ হিসেবে অগ্নিকে বরণ করা হয়েছে এবং তাঁকে দীপ্তিমান শোধক রূপে স্তব করা হয়েছে—যিনি ক্রিয়াকে সফল করেন ও মনকে প্রসারিত করেন। এতে অগ্নির প্রাচীন জন্ম ও বংশধারার (অথর্বণ, বিবস্বৎ, যম) স্মরণ আছে; তাঁকে লোকান্তরের দূত এবং সেই শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রগুলির মধ্যে জীবন ও অন্তর্দৃষ্টির নতুন “অঙ্কুর” রোপণ করেন। উদ্দেশ্য দ্বিবিধ—বাহ্যত যথাবিধি প্রজ্বালিত অগ্নির দ্বারা যজ্ঞসিদ্ধি, আর অন্তরঙ্গে অগ্নির শোধক শিখায় দীপ্ত, স্থির ইচ্ছাশক্তির জাগরণ।
Sukta 10.22
ইন্দ্রকে উদ্দেশ করে এই সূক্তটি এক তীক্ষ্ণ অনুপস্থিতির প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়—“আজ ইন্দ্রকে কোথায় শোনা যায়?”—এবং সেই সংশয়কে অনুপ্রাণিত বাক্যের মাধ্যমে আহ্বানে রূপ দেয়, যা তাঁকে উপস্থিত করে। এরপর ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করা হয় যেন তিনি উপাসকদের দমনকারী শত্রু, বিধিবহির্ভূত দস্যু/দাস শক্তিকে পরাজিত করেন। শেষে সোম-অর্ঘ্যের আমন্ত্রণ: ইন্দ্র পান করুন, গায়কের রক্ষা করুন, এবং প্রাচুর্যপূর্ণ, দীপ্তিমান ধন ও কল্যাণ দান করুন।
Sukta 10.23
ঋগ্বেদ ১০.২৩ একটি সংক্ষিপ্ত ইন্দ্র-স্তোত্র, যেখানে কবি-যজমান ইন্দ্রকে বজ্রধারী রথযোদ্ধা রূপে আহ্বান করেন—যিনি সীমা ভেঙে অগ্রসর হন এবং নিজের মিত্র-সহযোগীদের মধ্যে ধন ও শক্তি বণ্টন করেন। চিত্রকল্পগুলি উজ্জ্বল ও দেহগত—ইন্দ্রের দাড়ি কাঁপছে, তাঁর বাহিনী চলমান, বৃষ্টি ও বায়ু সাড়া দিচ্ছে—যা যুদ্ধশক্তিকে উর্বরতা এবং সোম-উদ্দীপিত উল্লাসের সঙ্গে যুক্ত করে। স্তোত্রের পরিণতিতে প্রার্থনা করা হয় যে দ্রষ্টা বিমদার সঙ্গে ইন্দ্রের বন্ধুত্ব অটুট থাকুক এবং উপাসকদের জন্য মঙ্গলজনক হোক।
Sukta 10.24
এই সূক্তটি সোম-অর্ঘ্য নিবেদনের আহ্বান; এতে ইন্দ্রকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন তিনি মধুরসে সমৃদ্ধ পেষিত সোম পান করেন এবং উপাসকদের মধ্যে সহস্রগুণ ‘রয়ি’ (ধন, প্রাচুর্য, প্রাণপূর্ণতা) প্রতিষ্ঠা করেন। ইন্দ্রের উল্লাস ও দানশীলতার সঙ্গে সঙ্গে, সূক্তটি স্মরণ করায় যে বিমদার আহ্বানে অশ্বিনৌ (নাসত্যদ্বয়) গোপন মধুরতা ‘মন্থন’ করে প্রকাশ করেছিলেন। শেষে প্রার্থনা করা হয়—বাহিরের যাত্রা ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন যেন ‘মধুময়’—শুভ, সমৃদ্ধ ও সুরক্ষিত—হয়ে ওঠে।
Sukta 10.25
এই সূক্তে সোম (অন্ধস্)‑এর প্রশংসা করা হয়েছে—তাঁকে সেই প্রেরণাদাতা বলা হয়েছে, যিনি উপাসকের মধ্যে মঙ্গলময় শ্বাস/প্রাণ সঞ্চার করেন: মনের স্বচ্ছতা (মনস্), দক্ষতা/কুশলতা (দক্ষ) এবং সৎ‑ইচ্ছাসম্পন্ন সংকল্প (ক্রতু)। এতে সোমের উল্লাসদায়ক ‘মদ’‑এরও গৌরবগান আছে, যা চিন্তাকে প্রসারিত করে, দ্রষ্টা ও দাতাকে শক্তি দেয়, এবং অক্ষমতা (যেমন ‘অন্ধ ও খোঁড়া’) অতিক্রম করিয়ে বৃদ্ধি ও সিদ্ধি/প্রাপ্তির দিকে নিয়ে যায়।
Sukta 10.26
এই সূক্তে পথ ও যাত্রার দিব্য পথপ্রদর্শক পূষণকে আহ্বান করা হয়েছে। তাঁর কাছে প্রার্থনা—তিনি যেন প্রাণশক্তির রথকে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ পথে স্থাপন করেন এবং উপাসকের আহ্বান শ্রবণ করেন। সংক্ষিপ্ত মন্ত্রসমূহে বাহ্য যাত্রাকে অন্তর্গত সঠিক দিশার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে—সুশৃঙ্খল প্রেরণা, সু-যোজিত শক্তি, এবং দ্রষ্টা ও যজমানের জন্য বাধা-অপসারণ।
Sukta 10.27
এই সূক্তটি ইন্দ্রের বিধানকারী শক্তি ছাড়া ব্যবহৃত ক্ষমতার এক তীক্ষ্ণ নৈতিক‑মনস্তাত্ত্বিক সমালোচনা। যারা শক্তি বা যজ্ঞপেয় গ্রহণ করে, তবু ‘অনিন্দ্রাঃ’ থেকে যায়, তারা হিংসা, উলটপালট ও আত্মঘাতী প্রতিঘাতে পতিত হয়। উল্টোচিত্রের নীতিবাক্যসম (পতিত হয়েও জাগ্রত, মাথার বিপরীতে মাথা স্থাপন) দিয়ে এটি বিকৃত সত্তার রোগনির্ণয় করে এবং সাধককে আহ্বান জানায়—অন্তরের ‘প্রাণশক্তি’ ও স্বর/স্বর্গ (সূর্যলোক)-এর দর্শন গোপন না করে, ন্যায্য পরিপূর্তির সংগ্রামে তা প্রকাশ করতে।
Sukta 10.28
এই সূক্তটি মূলত ইন্দ্রের কণ্ঠে আত্মঘোষণা: তিনি জন্ম থেকেই মহাশক্তিমান, প্রতিটি কর্মে বীরোচিত কীর্তি সাধন করেন, এবং বৃত্রবধ করে ও আবদ্ধ/রুদ্ধ সম্পদ উদার যজমান/উপাসকের জন্য মুক্ত করে দেওয়ার জন্য প্রশংসিত হন। এই বীরত্বের সুরের পাশাপাশি সূক্তে একটি যজ্ঞীয়-সামাজিক ইঙ্গিতও আছে—আগমনকারী প্রতিদ্বন্দ্বী/অতিথিকে অন্ন ও সোম দিয়ে আপ্যায়ন করা এবং পরে তাকে তৃপ্ত করে গৃহে প্রেরণ করা—যার মাধ্যমে ইন্দ্রের শক্তিকে শৃঙ্খলা, সমৃদ্ধি ও ন্যায্য বণ্টনের রক্ষক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
Sukta 10.29
এই সূক্তে ইন্দ্রের প্রশংসা করা হয়েছে—তাঁকে চির-কার্যকর সহায় রূপে, যিনি “শুদ্ধ” স্তোম (স্তোত্র) দ্বারা জাগ্রত হন এবং বহু রাত্রি ও দিবস জুড়ে মানবসমাজের জন্য হোতৃর ন্যায় কাজ করে অন্ধকারের মধ্যে আলোকে আহ্বান করেন। এখানে পারস্পরিকতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে: প্রেরিত বাক্ ও আহুতি পরস্পরকে পুষ্ট করে, এবং ইন্দ্রের স্ববল যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করে তা সুশৃঙ্খল করে—সংঘর্ষের মাঝখানে তিনি রথের মতো দৃঢ়ভাবে স্থির থাকেন, আবার ভদ্রা সুমতি (মঙ্গলময় সম্যক্-মনোভাব) দ্বারা প্রণোদিত হয়ে অগ্রসর হন। সার্বিকভাবে, এই সূক্ত উপাসকের জন্য সংগ্রামের মধ্যে ইন্দ্রের সঙ্গ, বিজয় এবং অন্তর্দীপ্ত স্বচ্ছতা প্রার্থনা করে।
Sukta 10.30
এই সূক্তে ‘আপঃ’ (জল)-এর প্রশংসা করা হয়েছে—তাদেরকে জীবন্ত, দিব্য শক্তি হিসেবে, যারা মাধুর্য, শুদ্ধি ও মঙ্গলময় আশ্রয় যজ্ঞে এবং মানবজীবনে বহন করে আনে। জলের এই কল্যাণকর দানকে মিত্র–বরুণের মহান ‘ধাসি’ (ধারণকারী সমর্থন/আধার)-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। শেষে এক আচার-দৃশ্য উপস্থিত হয়, যেখানে ইন্দ্রের জন্য সোম পেষণ চলাকালে জল ‘বর্হিস্’-এ এসে আসন গ্রহণ করে।
Sukta 10.31
এই সূক্তে বিশ্বে দেবাঃ (সমস্ত দেবতা)-কে একক, দ্রুত-সহায়ক সমষ্টিগত দেবশক্তি হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। গায়ক প্রার্থনা করেন—তাঁর স্তব যেন তাঁদের কাছে পৌঁছায় এবং তাঁরা উপাসককে দুঃখ-কষ্ট ও বাঁকা/কুটিল পথ থেকে পার করে দেন। ক্রমে সূক্তটি অন্তর্মুখী হয়ে মহাজাগতিক প্রতীকের দিকে যায়—গাভীকে প্রাচীন, বিস্তৃত আলো/জ্ঞানরূপে এবং “অসুরের গর্ভ”কে একীভূত উৎসরূপে তুলে ধরে—এবং শেষে ঋত (সত্য-শৃঙ্খলা) ও তার অক্ষয়, অবিরাম বৃদ্ধির ঘোষণা করে।
Sukta 10.32
ঋগ্বেদ ১০.৩২ উত্তর-গ্রন্থের একটি ইন্দ্র-স্তোত্র, যেখানে দানশীল মঘবান ইন্দ্রকে সোম-নিষ্পেষণে আসন গ্রহণ করতে, নিঃসৃত সোমরসের সারকে জাগ্রত হয়ে গ্রহণ করতে, এবং “উভয়”—অর্ঘ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও তা থেকে উদ্ভূত সমৃদ্ধি—দান করতে আহ্বান করা হয়েছে। দেব-অন্বেষী পথ, রক্ষাকারী শক্তি এবং মধুময় প্রাচুর্যের চিত্রের মধ্য দিয়ে স্তোত্রটি অগ্রসর হয়ে শেষ পর্যন্ত শুভ যজ্ঞকর্ম সম্পন্ন করার সংকল্পে এবং সোমকে অন্তরে “হৃদয়ে” ধারণ করার অঙ্গীকারে উপনীত হয়—বাহ্য যজ্ঞকে অন্তর্গত ভক্তির সঙ্গে যুক্ত করে।
Sukta 10.33
এই সূক্তে পূষণকে ‘অন্তরে’ বহন করা অন্তর্নিহিত পথপ্রদর্শক রূপে দেখানো হয়েছে, আর বিশ্বে দেবাঃ বিপদ, ভয় ও শত্রুতাপূর্ণ শক্তির বিরুদ্ধে সমষ্টিগত রক্ষক হিসেবে অবস্থান করেন। এতে যাত্রা ও সুরক্ষার ভাব নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে মিশে যায়: দেবতাদের ব্রত (ঋত/মহাজাগতিক বিধান) লঙ্ঘন করা উচিত নয়, এবং সত্য বিস্তার আসে ‘যথাযথ যোজন’—অর্থাৎ শৃঙ্খলিতভাবে নিজেকে দিব্য শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্যে যুক্ত করা।
Sukta 10.34
ঋগ্বেদ ১০.৩৪-এর প্রসিদ্ধ “জুয়া-সূক্ত” প্রথম-পুরুষে উচ্চারিত এক বিলাপ, যেখানে পাশাকে এক মোহিনী ও ভয়ংকর শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে—যা মনকে মত্ত করে এবং গৃহ, ধন ও সুনাম ধ্বংস করে। প্রাণবন্ত স্বীকারোক্তি ও সামাজিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে এই স্তোত্রটি উপদেশমূলক সতর্কবাণীতে পরিণত হয়: আসক্তির বিপদ থেকে সাবধান থাকতে, সংযম অবলম্বন করতে, পুনর্মিলন ঘটাতে এবং শৃঙ্খলিত জীবনে ফিরে যেতে আহ্বান জানায়।
Sukta 10.35
এই সূক্তে প্রভাতে জাগ্রত পবিত্র অগ্নিসমূহ—অগ্নির বহুরূপ—কে অভিবাদন জানানো হয়েছে; তারা ইন্দ্রসদৃশ শক্তিতে উদ্দীপ্ত হয়ে আলো, ঋত (বিশ্ব-শৃঙ্খলা) এবং দিনের পথে নিরাপদ গমন দান করে। এরপর আহ্বানটি বিশ্বধারক শক্তিগুলির দিকে (উষা, দ্যাবাপৃথিবী, আপঃ/জল) প্রসারিত হয় এবং প্রার্থনা করা হয় যে ‘ঋতের দিব্য বাণী’ উপাসককে পরিপূর্ণ করুক, আর দেবগণের রক্ষাকবচে নির্ভয়তা ও সমৃদ্ধি উদিত হোক।
Sukta 10.36
এই সূক্তটি এক বিস্তৃত ‘বিশ্বেদেবাঃ’ আহ্বান, যেখানে উষা ও রাত্রি, দ্যৌ–পৃথিবী, আদিত্যগণ, ইন্দ্র, মরুত, আপঃ (জল) প্রভৃতি বহু মহাজাগতিক শক্তিকে উপাসকের জন্য রক্ষা ও ঋত (সঠিক বিধান/শৃঙ্খলা)-এর একক পরিসরে একত্র করা হয়েছে। গণনামূলক স্তব ও প্রার্থনার ধারায় এটি যজ্ঞ, প্রাণশক্তি এবং জীবনের পথে নিরাপদ অগ্রযাত্রার জন্য দেব-‘অবঃ’ (সহায়তা/রক্ষা) প্রার্থনা করে। শেষে দিকসমূহসহ সর্বব্যাপীভাবে সবিতৃকে আহ্বান করে ‘সর্বতাতি’ (সমগ্রতা/পূর্ণ কল্যাণ) প্রেরণা দিতে এবং দীর্ঘায়ু দান করতে অনুরোধ জানিয়ে সূক্তটি পরিসমাপ্ত হয়।
Sukta 10.37
এই সূক্তে সূর্যকে মিত্র–বরুণের দূরদর্শী “চক্ষু” রূপে বন্দনা করা হয়েছে—তিনি ঋত (সত্য-শৃঙ্খলা)-এর ধারক; তাঁর উদয়ে জগতসমূহ প্রকাশিত, পরিমাপিত ও রক্ষিত হয়। এতে নির্মল দৃষ্টি, কল্যাণ এবং বৈরিতা থেকে সুরক্ষার প্রার্থনা আছে; পাশাপাশি প্রায়শ্চিত্তের সুরও রয়েছে—বাক্য বা মনে সংঘটিত দোষ যেন অপসৃত হয় এবং উপাসকের কাছ থেকে সরে অন্যত্র প্রবাহিত হয়।
Sukta 10.38
এই সংক্ষিপ্ত ত্রিষ্টুভ স্তোত্রটি যুদ্ধক্ষেত্রে ইন্দ্রকে আহ্বান করে—সংঘর্ষের মুহূর্তে তিনি যেন গর্জে ওঠেন, বিজয় নিশ্চিত করেন, এবং ঝলমলে আক্রমণের মধ্যে “গো/রশ্মি” (গাভী/কিরণ) লাভ করেন। এতে প্রার্থনা করা হয়েছে যে ইন্দ্র উপাসকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী যে-কোনো শত্রুকে—দাস হোক বা আর্য—নিষ্ক্রিয় করে দিন। শেষে শক্তিমান বৃষ ইন্দ্রকে অনুরোধ করা হয়, তিনি যেন নিজের বন্ধন খুলে, প্রতিযোগী টানাপোড়েন থেকে সরে এসে, দ্রুত সাহায্যে উপস্থিত হন।
Sukta 10.39
এই সূক্তে অশ্বিনদ্বয় (নাসত্যা)-এর দ্রুতগামী, সর্বত্র বিচরণশীল রথকে আহ্বান করা হয়েছে—যেন তাঁরা রাত্রিতে ও ঊষাকালে এসে যজমানের ডাকে সাড়া দেন, ঠিক যেমন পিতাকে নাম ধরে অন্তরঙ্গভাবে ডাকা হয়। এতে তাঁদের উদ্ধার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বাক্ষরকর্মের প্রশংসা করা হয়েছে—যৌবন নবীকরণ, ভক্তকে বিপদ থেকে রক্ষা, এবং চলনশক্তি ও অঙ্গ-সম্পূর্ণতা ফিরিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি এই স্তোত্রকেই এক সুচারু নির্মিত নিবেদনরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা তাঁদের আনন্দিত করে নিকটে টেনে আনে।
Sukta 10.40
এই সূক্তটি উষাকালে রথারূঢ় দিব্য চিকিৎসক অশ্বিনৌকে উদ্দেশ করে এক তীব্র, স্নেহময় আহ্বান—তাঁরা কোথায় আছেন এবং আজ কার কাছে তাঁদের অভ্যর্থনা হচ্ছে তা জিজ্ঞাসা করে। এতে তাঁদের দ্রুতগামী রথ, বংশে-বংশে প্রসারিত কল্যাণদানের শক্তি, এবং প্রসিদ্ধ উদ্ধারকর্মের প্রশংসা করা হয়েছে—দুর্বলকে উপশম, অসহায়ের রক্ষা, এবং বাধাগ্রস্ত ‘ঘেরা/আবরণ’ খুলে দেওয়া যাতে সমৃদ্ধি ও আরোগ্য প্রবাহিত হতে পারে। কবির লক্ষ্য হলো যথাসময়ে, অর্থাৎ প্রভাতে, এই যুগল দেবতাকে যজমানের গৃহে আকর্ষণ করা এবং জীবনের সন্ধিক্ষণগুলি সাফল্যে অতিক্রমের জন্য শান্তি, মঙ্গল ও সুগম গতি লাভ করা।
Sukta 10.41
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে প্রভাতকালের দিব্য গতি আহ্বান করা হয়েছে—উষার দীপ্ত আগমন তাঁর প্রতীকী রথসহ, এবং সকালের সোম-পেষণের দিকে অশ্বিনদের দ্রুত উপস্থিতি। এখানে ঊষাকে যজ্ঞের সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যেখানে প্রেরিত বাক্, সুশৃঙ্খল যজ্ঞকর্ম এবং দেবতাদের আগমন একত্রিত হয়; এবং দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করা হয় যেন তাঁরা জাগ্রত হয়ে যজ্ঞ ও তার গায়ক-ঋত্বিজদের শক্তি দান করেন।
Sukta 10.42
এই সূক্তটি সোমে বলবর্ধিত ইন্দ্রের উদ্দীপক আহ্বান। গায়কেরা অনুরোধ করেন—এক শক্তিশালী স্তোম (স্তব) যেন “এগিয়ে নিয়ে যাওয়া” হয়, ঠিক যেমন এক নির্ণায়ক নিক্ষেপ শ্রেষ্ঠ লাভ এনে দেয়। ইন্দ্রকে প্রার্থনা করা হয় শত্রুদের দূরে তাড়িয়ে দিতে, গবাদি পশু ও শস্যে প্রাচুর্য দান করতে, এবং এমন অনুপ্রাণিত ধী (প্রজ্ঞা/চিন্তা) দিতে যা বাজ—শক্তি ও বিজয়-সম্পদ—এর ধনভাণ্ডার হয়ে ওঠে। শেষের রক্ষা-সূত্র নিরাপত্তার বৃত্তকে প্রসারিত করে: বृहস্পতিকে সব দিক থেকে রক্ষার জন্য ডাকা হয়, আর ইন্দ্র সম্মুখভাগ ও অন্তর্মধ্যকে রক্ষা করেন; ফলে মিত্রদের ও অন্তঃশক্তির জন্য বরিবস—মুক্ত পরিসর ও নির্বিঘ্ন গতি—সৃষ্টি হয়।
Sukta 10.43
এই সূক্তে ইন্দ্রের একত্রিত স্তব করা হয়েছে—উদার দাতা ও যুদ্ধজয়ী শক্তি হিসেবে—যাঁকে ঋষির প্রেরিত ভাবনা ভালোবাসার সঙ্গীদের মতো প্রিয়জনকে আলিঙ্গন করতে উদ্গ্রীব হয়ে খোঁজে। এতে ইন্দ্রকে অনুরোধ করা হয় তিনি যেন গোত্রসমূহের মধ্যে বিচরণ করেন, সমৃদ্ধি (গোধন/ধন) দৃশ্যমান করেন, এবং শক্তিশালী সোম-অর্ঘ্যের দ্বারা উপাসককে বৈরিতা ও শত্রুতার উপর জয়ী করেন। শেষাংশে সর্বাঙ্গীন রক্ষার প্রার্থনা—বৃহস্পতি যেন চারদিক থেকে পাহারা দেন এবং ইন্দ্র যেন পথে তাঁর সঙ্গীদের জন্য ‘প্রশস্ত অবকাশ’ (বরিবস্) উন্মুক্ত করেন।
Sukta 10.44
এই সূক্তে ইন্দ্রের আহ্বান করা হয়েছে—আত্মসংযমী, ঋত (ধর্ম/নিয়ম)-সম্মত সেই শক্তি, যে সোম-আনন্দের দিকে দ্রুত ধাবিত হয় এবং তার বিশাল বৃষ্ণি (বীরশক্তি) দিয়ে সব প্রতিরোধ অতিক্রম করে। এতে প্রশংসার সঙ্গে উপদেশও জড়ানো: ‘প্রথম, দেব-আহূত’ অগ্রগামীরা দুর্লঙ্ঘ্য গৌরব অর্জন করে, আর অযোগ্যরা যজ্ঞের ‘নৌকা’য় উঠতে পারে না ও ডুবে যায়। শেষ প্রার্থনা সর্বদিকের রক্ষায় প্রসারিত—পেছন দিক থেকে বৃহস্পতির রক্ষা থাকুক, আর ইন্দ্র তাঁর সঙ্গীদের জন্য নিরাপদ, প্রশস্ত পরিসর উন্মুক্ত করুন।
Sukta 10.45
এই সূক্তে অগ্নিকে জাতবেদস্ ও বৈশ্বানর রূপে স্তব করা হয়েছে। এতে তাঁর ‘ত্রিবিধ জন্ম’—স্বর্গে, মানুষের মধ্যে, এবং জলে—অনুসরণ করে বর্ণনা করা হয়েছে, এবং বলা হয়েছে যে সৎ-সংকল্প ও দক্ষ প্রয়োগে তাঁকে নিরন্তর প্রজ্বালিত করা হয়। অগ্নিকে শোধক, পথপ্রদর্শক, এবং মর্ত্যের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত অমর উপস্থিতি হিসেবে দেখানো হয়েছে; তাঁর ধোঁয়া ও দীপ্তি স্বর্গে উঠে যায়। সূক্তের শেষে দ্যৌ ও পৃথিবীর শান্ত আহ্বান এবং বীরশক্তিতে সমৃদ্ধ রয়ি (পূর্ণতা/সমৃদ্ধি)-র জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে।
Sukta 10.46
এই সূক্তে অগ্নির প্রশংসা করা হয়েছে আদ্য হোতৃ হিসেবে—যাঁকে দেবতা ও মানুষ উভয়েই সমভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, যিনি আহুতি বহনকারী এবং সামষ্টিক জীবনে ঋত (সঠিক বিধান/শৃঙ্খলা) প্রতিষ্ঠাকারী। অগ্নিকে ‘জলের কোলে’ আসীন বলেও চিত্রিত করা হয়েছে, আবার গৃহের ভিতরে ও গর্ভসদৃশ আবরণে গোপনে নিহিত রূপেও। তিনি মানুষকে একত্র করেন এবং ধর্মের ‘যুগ’ দ্বারা চালিত করে সমৃদ্ধি ও পূর্বপুরুষদের পুনরুজ্জীবিত গৌরবের দিকে নিয়ে যান।
Sukta 10.47
এই সূক্তে ইন্দ্রের কাছে ‘চিত্র’ (বহুরূপ, দীপ্তিমান) ও ‘বৃষণ’ (বলবান, পরাক্রান্ত) ‘রয়ি’—এমন ধন—অবিরাম প্রার্থনা করা হয়েছে; যা কেবল বস্তুগত সমৃদ্ধিই নয়, বিজয়ী শক্তি (বাজ) এবং আলোকময় বৃদ্ধি-ও বটে। বক্তারা ইন্দ্রের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ঘোষণা করেন (“আমরা আপনার ডান হাত ধরেছি”) এবং তাঁকে গাভী/রশ্মির রক্ষক বলে প্রশংসা করে, স্বর্গ ও পৃথিবীর আশীর্বাদে মহান, অতুলনীয় নিবাস এবং দৃঢ়, নিরাপদ ভিত্তি প্রার্থনা করেন।
Sukta 10.48
এই সূক্তে ইন্দ্র প্রথম পুরুষে আত্মঘোষণা করেন—ধন, বিজয় এবং যজমানকে ‘ভোজন’ (ভোজ্যাংশ/উপভোগ) যথাযথভাবে বণ্টনের উপর তাঁর আদিকালীন অধিপত্য ঘোষণা করে। ইন্দ্র স্মরণ করেন কীভাবে তিনি সেই প্রতিপক্ষদের পরাভূত করেছিলেন যারা তাঁর বিরুদ্ধে বলকে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, এবং তিনি আদিত্য, বসু ও রুদ্রিয়—এই দেবগোষ্ঠীগুলির মধ্যে নিজের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অজেয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। সূক্তটি স্তোত্রধর্মী; এটি ইন্দ্রের রক্ষাকবচে আস্থা বাড়ায় এবং আহুতি ও যথার্থ বাক্ (সম্যক্ বাণী)-এর কার্যকারিতা দৃঢ় করে।
Sukta 10.49
ঋগ্বেদ ১০.৪৯ একটি ইন্দ্র-আত্মস্তুতি: ইন্দ্র প্রথম পুরুষে কথা বলে বিজয়, বিস্তার এবং যজ্ঞের যথাযথ বিধান/শৃঙ্খলার পেছনে নিজের সার্বভৌম কর্তৃত্ব ঘোষণা করেন। এই সূক্তে ইন্দ্রকে স্তোত্রগায়ককে প্রাচীন ঐশ্বর্য দানকারী, যজমানকে জাগ্রতকারী, এবং বাধা-আবরণ (বৃত্রসদৃশ শক্তি) নির্ণায়কভাবে ভেঙে দেওয়াকারী রূপে দেখানো হয়েছে; পরিশেষে অপ্রতিরোধ্য প্রেরণা (চ্যৌত্ন) দ্বারা দেব ও মানুষের মধ্যে সর্বব্যাপী হয়ে ওঠেন।
Sukta 10.50
এটি একটি ইন্দ্র-স্তুতি, যেখানে ইন্দ্রকে ‘বিশ্বানর/বিশ্বভূ’—সর্বব্যাপী, জগৎ-ধারক শক্তি—রূপে প্রশংসা করা হয়েছে; তিনি সোমে আনন্দিত হন এবং ব্রহ্মণ (পবিত্র বাণী) দ্বারা মহিমান্বিত হন। স্তোত্রে ইন্দ্রকে প্রতিটি সোম-নিষ্পেষণ ও প্রতিটি মানবিক সংগ্রামে অগ্রগণ্য শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে; তাঁর খ্যাতি ও বীর্য-পরাক্রমকে উভয় লোকই সেবা করে। শেষে অনুপ্রাণিত কবিদের ভূমিকা জোর দিয়ে বলা হয়েছে—যাঁরা ব্রহ্মণ ‘নির্মাণ’ করেন, যাতে ইন্দ্রের কৃপা ও দানলাভের পথে দ্বার উন্মুক্ত হয়।
Sukta 10.51
এই সূক্তে অগ্নি জাতবেদসকে সৃষ্টির আদ্যগ্নি রূপে দেখানো হয়েছে—যিনি আদিম জলে প্রবেশ করেন, বহু রূপ ধারণ করেন, এবং সকল জন্মের জ্ঞাতা ও ধারক হয়ে ওঠেন। এরপর স্তোত্রটি বর্তমান যজ্ঞকর্মে ফিরে আসে: অগ্নিকে মানব-প্রজ্বালনে নিজ আসনে অধিষ্ঠিত হতে, ‘দেব-নেতৃ পথ’ খুলে দিতে, এবং আহুতি বহন করতে আহ্বান করা হয়, যাতে সমগ্র যজ্ঞ তাঁর মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
Sukta 10.52
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তটি এক আত্মপ্রতিফলিত হোতৃ-দীক্ষার আখ্যান, যেখানে অগ্নি (পুরোহিত-স্বরূপ কণ্ঠ) বিশ্বে দেবাঃ-কে অনুরোধ করেন—সঠিক যজ্ঞপথ, নিজের নির্ধারিত অংশ, এবং আহুতি যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়ার বিধি তাঁকে শিক্ষা দিতে। এরপর দেবগণ তাঁকে ‘হব্যবাহ’—আহুতি-বাহক—রূপে প্রতিষ্ঠা করেন, যিনি বাধা অতিক্রম করতে পারেন এবং সুশৃঙ্খল পরিমাপে যজ্ঞকে যথাযথভাবে বিন্যস্ত করেন; পরিশেষে বিছানো বরহিষের উপর তাঁকে হোতৃ-পদে অভিষিক্ত/প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
Sukta 10.53
এই সূক্তে যজমানদের সত্য হোতৃর অনুসন্ধান চিত্রিত—যজ্ঞের অন্তর্নিহিত জ্ঞাতা অগ্নি, যিনি “আমাদের থেকেও প্রাচীন” এবং অন্তরে আসীন, উপাসকের মধ্যে দেব-উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। এতে আচারগত প্রতিমা (সূত্র, বয়ন, আলোর পথ) মন ও বাক্যের অন্তর্মুখ শৃঙ্খলার সঙ্গে বোনা হয়েছে, এবং শেষে সৃজনশীল গর্ভধারণের এক দর্শনে উপনীত হয়—যেখানে যজ্ঞশক্তি নারীতত্ত্বগুলির গর্ভে স্থাপিত হয়ে যথার্থ নির্মাণ (কার) দ্বারা বিজয় লাভ করে।
Sukta 10.54
এই সংক্ষিপ্ত ইন্দ্র-স্তোত্রে দেবতার প্রসিদ্ধ পরাক্রম স্মরণ করা হয়েছে: আতঙ্কিত দ্যৌ ও পৃথিবীও তাঁকে আহ্বান করে, আর তিনি কেবল নিজের ওজস্ (বল) দ্বারা দাস-শক্তিকে পরাভূত করে দেবগণকে রক্ষা করেন। এতে ইন্দ্রের গভীর, ‘আসুরিক’ (সার্বভৌম) নামগুলির ইঙ্গিতও আছে এবং তাঁকে অন্তর্দীপ্তির এক নীতি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে—“আলোর মধ্যে স্থাপিত আলো”—যখন কবি সমৃদ্ধি ও সন্তানলাভকে শক্তিশালী করতে এক প্রভাবশালী ব্রহ্মণ (পবিত্র বাক্য/সূক্তি) নিবেদন করেন।
Sukta 10.55
ইন্দ্র (মঘবান)-কে নিবেদিত এই সূক্তে সোমবল-সঞ্জাত বীর যোদ্ধার প্রশস্তি ও গূঢ়, পরস্পরবিরোধী ভাবনাচিন্তা একত্র হয়েছে—গোপন নাম, কাল এবং উলট-পালটের রহস্য, যেখানে ধূসর বার্ধক্য যেন ‘যৌবনকে গ্রাস’ করে। এতে ইন্দ্রের দ্বারা দ্যৌ-পৃথিবীর ধারণ, দুর্বলের রক্ষা, এবং শেষে যুদ্ধোদ্দীপনায় দস্যুদের তাড়িয়ে ঋত/শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্মরণ আছে। সার্বিকভাবে এটি একদিকে স্তোত্র, অন্যদিকে ইন্দ্রের সেই গোপন শক্তির ধ্যান, যা সাধারণ প্রত্যাশাকে উল্টে দেয়।
Sukta 10.56
এই সূক্তে এক “তৃতীয় আলো”-র পথপ্রদর্শন নিয়ে ধ্যান করা হয়েছে, যা সাধককে এক উচ্চতর মিলনস্থলে নিয়ে যায়; সেখানে দেহধারী সত্তা দীপ্তিমান হয় এবং দেবতাদের প্রিয় হয়ে ওঠে। এতে আরও বলা হয়েছে যে পিতৃশক্তি ও দিব্য শক্তি ছড়িয়ে থাকা শক্তিগুলিকে আবার দেহে একত্র করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে, ফলে কঠিন পারাপার নিরাপদ হয় এবং সন্তানসন্ততিকে নিম্ন ও উচ্চ—উভয় লোকেই স্থাপন করা যায়।
Sukta 10.57
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তটি সোম-যজ্ঞে নিয়োজিত যজমানদের জন্য রক্ষাকারী ও পুনরুদ্ধারকারী প্রার্থনা। এতে ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করা হয়—যেন যজ্ঞকারীরা সৎপথ থেকে বিচ্যুত না হন এবং বৈরী শক্তির বাধায় রুদ্ধ না হন। এরপর এটি অন্তর্মুখী হয়ে মনস্ (মন)-এর প্রত্যাবর্তন ও স্থিতি আহ্বান করে—সঠিক সংকল্প (ক্রতু), বিবেচনা/দক্ষতা (দক্ষ), প্রাণ-জীবন, এবং অন্তর্জ্যোতি রূপে সূর্যের দর্শন যেন অব্যাহত থাকে। শেষে সোমের ব্রতসমূহ (সম্যক কর্ম-নিয়ম) অনুসারে সামঞ্জস্যের ঘোষণা—পুনঃপ্রাপ্ত মনকে দেহে ধারণ করে এবং ফলপ্রদ সৃজনশক্তি/সন্ততি (প্রজা) লাভ করে।
Sukta 10.58
এই সূক্তটি এক চিকিৎসামূলক আহ্বান—ভ্রাম্যমাণ মন (মনস্)কে স্মরণ করে আবার জীবিত দেহে এবং ‘জীবনের গৃহ’ (ক্ষয়)‑এ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য; বিশেষত যখন কল্পচিত্রে তা যমের দিকে, অর্থাৎ মৃত্যুমুখী টানের দিকে, সরে যেতে চায়। ধ্রুবপদসদৃশ পংক্তিগুলি মন কোথায় কোথায় চলে যেতে পারে (মৃত্যু, জল, উদ্ভিদ, অতীত ও ভবিষ্যৎ ইত্যাদি) তা একে একে গণনা করে, এবং গায়কেরা আচারগতভাবে তাকে ‘ফিরিয়ে’ এনে জীবন, সংহতি/সামঞ্জস্য ও কল্যাণের ধারাবাহিকতার জন্য পুনঃস্থাপন করেন।
Sukta 10.59
এই সূক্তটি একটি আয়ুষ্য (জীবন-রক্ষাকারী) প্রার্থনা—যেখানে প্রাণশক্তিকে অনুরোধ করা হয় “আরও দূরে, সদা-নবীন” ধারাবাহিক জীবনে অগ্রসর হতে, এবং ক্ষয় ও বিলয়ের শক্তি নিরৃতি-কে দূরে তাড়িয়ে দিতে। এতে দৃষ্টি, শ্বাস এবং জীবনের রস/আনন্দ পুনরুদ্ধারের প্রার্থনা আছে, এবং উদীয়মান সূর্যকে দীর্ঘকাল, নির্বিঘ্নে দর্শনের কামনা—যা নবজীবন ও মঙ্গললক্ষণ। শেষের রক্ষামূলক অংশে পোষক শক্তিসমূহ (এবং ইন্দ্রের প্রেরণা) আহ্বান করা হয় দুঃখ-কষ্ট দূর করতে, যাতে উপাসকের গায়ে কোনো অনিষ্ট না লাগে।
Sukta 10.60
এই সূক্তটি এক দীপ্তিমান, প্রশংসিত শক্তির প্রতি শ্রদ্ধাভরে অগ্রসর হওয়া থেকে শুরু করে ক্রমে জীবন-ফেরানো ও আরোগ্যের সুরে প্রবেশ করে—শ্বাস-প্রশ্বাস ও প্রাণশক্তিকে ফিরে আসতে আহ্বান করে, আত্মীয়তার বন্ধন পুনর্নিশ্চিত করে, এবং পীড়িতকে “বেরিয়ে এসো/সামনে এসো” বলে উঠে আসতে উদ্দীপিত করে। শেষে মানব-হস্তকে ‘বিশ্বভেষজ’—সর্বজনীন ঔষধ—রূপে অভিষিক্ত করা হয়: এক মঙ্গলস্পর্শ, যা কল্যাণ ও শান্তি সঞ্চার করে।
Sukta 10.61
ঋগ্বেদ ১০.৬১ একটি পরবর্তী কালের ত্রিষ্টুভ্ সূক্ত, যেখানে মন্ত্রশক্তি (ব্রহ্মন্)কে রুদ্র-সদৃশ উগ্র শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে—এক অন্তর্লীন “যুদ্ধ”-এ সক্রিয়, যেখানে অনুপ্রাণিত বাক্ ও যথার্থ সংকল্প বৈরী বিভাজন ভেঙে যজ্ঞকে ঐক্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। এটি অঙ্গিরস/বৃহস্পতি-ধারার বিজয়ী শব্দশক্তির চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়, দীপ্ত অগ্নি-তত্ত্বকে ‘ভর্গ/অগ্নি’ নামে অভিহিত করে—যিনি ত্রিবিধ ভিত্তিতে দেবগণকে আসীন করেন—এবং শেষে বিশ্বে দেবাঃ-কে আহ্বান করে, যাতে ঐক্য ও স্বচ্ছ বিবেচনার জন্য সহায়তা মেলে।
Sukta 10.62
এই সূক্তে অঙ্গিরসদের আহ্বান করা হয়েছে—ঋষিশক্তির এক সমষ্টিগত বংশপরম্পরা হিসেবে—যাঁরা যজ্ঞ ও দক্ষিণার দ্বারা ইন্দ্রের মৈত্রী এবং ‘অমৃতত্ব’-এর অংশ লাভ করেছিলেন। এতে অগ্নি থেকে তাঁদের অগ্নিময় জন্মের স্মরণ আছে, নবগ্ব ও দশগ্ব রূপে তাঁদের প্রসিদ্ধ সংঘের কথাও আছে, এবং তাঁদের কাছে প্রার্থনা করা হয় যেন তাঁরা মানব যজমানকে ‘ধরে নেন’—দাতা মনুকে রক্ষা করেন, দক্ষিণাকে দ্রুত ফলপ্রদ করেন, এবং আয়ু বৃদ্ধি করেন, যাতে সম্প্রদায় বাজ (প্রাচুর্য, বিজয়ী শক্তি) অর্জন করতে পারে।
Sukta 10.63
ঋগ্বেদ ১০.৬৩ একটি পরবর্তী কালের, বিস্তৃত আহ্বান-স্তোত্র, যেখানে বিশ্বে দেবাঃকে ডাকা হয়েছে এবং বর্তমান যজ্ঞ-উপাসনাকে আদিম ও রাজ-যজ্ঞীয় আদর্শ—বিবস্বান, মনু, যযাতি ও নহুষ—এর বংশধারায় স্থাপন করা হয়েছে। এই সূক্তে বহু দেবতা (ইন্দ্র, অগ্নি, মিত্র-বরুণ, ভাগ, দ্যাবাপৃথিবী, মরুত্ এবং আদিত্যগণ) একত্রিত হয়ে সংঘাতে রক্ষা, অর্জন-প্রাপ্তিতে সাফল্য, এবং এমন যথার্থ, প্রেরিত প্রশস্তি/বাণীর প্রার্থনা করে যা যজমানকে ঋত-এর সঙ্গে সঙ্গত রাখে।
Sukta 10.64
এই সূক্তটি এক অনুসন্ধানী আহ্বানে শুরু হয়: কবি প্রশ্ন করেন—দেবগণের মধ্যে কে সত্যিই শোনেন, আনন্দ দান করেন, এবং উপাসকের দিকে রক্ষাকারী সহায়তা নিয়ে মুখ ফেরান। পরে এটি বিস্তৃত হয়ে সমগ্র দেবশক্তির প্রতি সমবেত প্রার্থনায় পরিণত হয়—বিশেষত জীবন-পোষক আপঃ (জল) ও নদীনদীর প্রতি—এবং শেষে ঋত-রক্ষক ও সুরক্ষার সার্বভৌম ধারক আদিত্যগণ ও অদিতির প্রশস্তিতে পরিসমাপ্ত হয়।
Sukta 10.65
এই সূক্তটি বিশ্বে দেবাঃ-কে উদ্দেশ করে এক বিস্তৃত আহ্বান; এতে বহু প্রধান বৈদিক শক্তির নাম স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে তাদের কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে যে তারা “একসঙ্গে একমত হয়ে” যজ্ঞকে স্থিত রাখুন এবং মানবকল্যাণ সাধন করুন। এতে ঋত (মহাজাগতিক শৃঙ্খলা), ধারণকারী পিতা-মাতা দ্যৌ-পৃথিবী, এবং দেবতাদের রক্ষাকারী ও সর্বব্যাপী পথপ্রদর্শক শক্তি একসূত্রে গাঁথা হয়েছে; শেষে দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি (মঙ্গল/কল্যাণ) প্রার্থিত।
Sukta 10.66
এই সূক্তে ‘বিশ্বে দেবাঃ’—অর্থাৎ ‘সকল দেবতা’—কে আহ্বান করা হয়েছে; তাঁরা সর্বশ্রোতা এবং যজ্ঞীয় দীপ্তিতে উজ্জ্বল শক্তি, যাঁরা যজ্ঞ প্রতিষ্ঠা করেন এবং উপাসককে কল্যাণ (স্বস্তি)-এর পথে অগ্রসর করেন। তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ইন্দ্রসহ, তাঁদের ঋত-এর ধারক ও বর্ধক রূপে প্রশংসা করা হয়েছে; বৃত্র-সংগ্রামের পর জলমুক্তির মতো বিজয়কথায় তাঁরা স্মরণীয়। সূক্তের শেষে বসিষ্ঠ সকল লোকের ঊর্ধ্বে অধিষ্ঠিত অমরদের প্রতি প্রণতি নিবেদন করে, সুদূরপ্রসারী সমৃদ্ধি ও অবিরাম রক্ষার প্রার্থনা করেন।
Sukta 10.67
এই সূক্ত (ঋগ্বেদ ১০.৬৭) ইন্দ্রের বিজয়-শক্তির স্তব করে, যা অঙ্গিরস/বৃহস্পতি-ধারার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। প্রেরিত বাক্ (ধী/উক্থ) ‘আবিষ্কৃত’ ও ‘জন্মপ্রাপ্ত’ হয়, এবং সেই বাক্-বলেই সঞ্চয়কারী/রোধকারীদের ভেদ করে ধন, আলো ও জীবনের স্রোত মুক্ত হয়। অয়াস্যকে সেই ঋষি রূপে দেখানো হয়েছে যিনি চতুর্থ মাত্রা/শক্তির উচ্চারণ করেন; আর পৌরাণিক পরিসরে বাধা (অহি, অর্বুদ) চূর্ণ হওয়া ও সপ্ত নদীর মুক্তির স্মৃতি জাগে। উদ্দেশ্য একদিকে প্রশস্তিমূলক, অন্যদিকে কার্যকর—ইন্দ্রকে (এবং সহচর ব্রাহ্মণিক শক্তিকে) আহ্বান করে প্রাচুর্য উন্মুক্ত করা ও সম্প্রদায়কে রক্ষা করা।
Sukta 10.68
বৃহস্পতিকে নিবেদিত এই সূক্তে প্রেরিত বাক্শক্তি (ব্রহ্মণ)-এর উদ্দাম প্রবাহের স্তব করা হয়েছে, যা গোপনতার গুহা ভেঙে আলো ও সত্যের দীপ্ত “গাভী”গুলিকে মুক্ত করে। এতে অঙ্গিরস/বৃহস্পতির পৌরাণিক বিজয়ের স্মরণ আছে—গুপ্ত নামের সন্ধান, ডিমের মতো শিলাখণ্ড বিদীর্ণ করা, এবং উপাসকদের জন্য জ্যোতির্ময় প্রাচুর্য প্রকাশ করা। শেষে কবিরা তাঁদের সম্পন্ন যজ্ঞকর্ম অর্পণ করে বৃহস্পতির কাছে জীবনসমৃদ্ধি, শক্তি ও মানবসমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করেন।
Sukta 10.69
এই সূক্তে অগ্নির স্তব করা হয়েছে—তাঁকে মঙ্গলময়, দীপ্তিমান অগ্নি হিসেবে, যিনি সুমিত্রা (সৎ-মৈত্রী) এবং যজ্ঞের অগ্রভাগে যথাযথ প্রজ্বালনের মাধ্যমে বধ্র্যশ্ব ও তার জনগণকে পথ দেখান। এতে অগ্নির বিস্তৃত শক্তির প্রশংসা করা হয়েছে—মানব প্রচেষ্টায় পরিশুদ্ধ হয়ে তিনি দীপ্তিমানদের মধ্যে উজ্জ্বলভাবে জ্বলে ওঠেন—এবং শেষে প্রাচীন বৃত্রহন অগ্নির কাছে রক্ষার প্রার্থনা করা হয়, যাতে তিনি বৈরী শক্তির বিরুদ্ধে উপাসকদের উপর প্রহরীর মতো অবস্থান করেন।
Sukta 10.70
এই ত্রিষ্টুভ স্তোত্রটি অগ্নিকে প্রজ্বালিত করা এবং ঘৃত-উজ্জ্বল আহুতি ইळার আসনে স্থাপন করার মাধ্যমে শুরু হয়; অগ্নির কাছে প্রার্থনা করা হয় যে তিনি পৃথিবীতে ঋত-বুদ্ধির শক্তি হয়ে উদিত হন এবং উপাসনাকে ঊর্ধ্বে বহন করেন। এরপর এটি এক প্রান্ত-লিটুর্জিক দর্শনে প্রসারিত হয়—উষা ও রাত্রিকে আহ্বান করা হয় যাতে তারা যজ্ঞের সুশৃঙ্খল ‘গর্ভে’ দেবতাদের আসন দেন—এবং পরিণামে অগ্নিকে আহ্বায়ক রূপে স্থাপন করে, যিনি বরুণ, ইন্দ্র, মরুত্ ও বিশ্বদেবগণকে যজ্ঞাসনে এনে অন্তর ও বহির্পূর্তির সিদ্ধি দান করেন।
Sukta 10.71
এই সূক্তে বাচ্ (প্রেরিত বাক্/বাণী)-এর রহস্য নিয়ে চিন্তা করা হয়েছে—বৃহস্পতির নির্দেশনায় তা প্রথম প্রবাহিত হয়, এবং যেখানে সত্য “নাম” ও নির্ভুল অর্থ গুহায় লুকোনো ধনের মতো গোপনে নিহিত থাকে। এটি তাদের মধ্যে পার্থক্য করে যারা কেবল ফাঁপা ধ্বনি শোনে, আর যারা যথার্থ সঙ্গী/পথপ্রদর্শককে ধারণ করে এবং সেই কারণে বাক্যে নিজেদের অংশ লাভ করে। শেষে পবিত্র বাক্কে ছন্দ, পুরোহিতীয় ভূমিকা এবং যজ্ঞের যথাযথ মাপজোক ও বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানো হয়েছে—বাচ্ই আচার ও অন্তর্দৃষ্টির সংগঠক বুদ্ধি।
Sukta 10.72
এই সৃষ্টিতত্ত্বমূলক সূক্তটি দেবতাদের “জন্ম” (জন্ম) ও তাদের বিন্যাস/ক্রমবদ্ধ উদ্ভব নিয়ে চিন্তা করে; সৃষ্টি এখানে এক ক্রমোন্নত প্রকাশ, যা প্রেরিত বাক্ এবং পরবর্তী অন্তর্দৃষ্টির দ্বারা সত্যভাবে “দেখা” যায়। এটি দক্ষ ও অদিতিকে কেন্দ্র করে এক পরস্পরবিরোধী বংশপরম্পরা অনুসরণ করে, এবং শেষে অদিতির সাত পুত্র ও মার্তাণ্ডের প্রত্যাবর্তনের প্রসঙ্গে উপনীত হয়—যেখানে প্রকাশের মধ্যেই অমরত্ব ও মর্ত্যতা যুগপৎভাবে উদ্ভূত হয় বলে ব্যক্ত হয়।
Sukta 10.73
এই ত্রিষ্টুভ্ সূক্তে ইন্দ্রের জন্ম, বৃদ্ধি ও বিজয়ী শক্তির প্রশস্তি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, মরুতরা—সহচর ও বলবর্ধক—তাঁকে প্রতিবন্ধক শক্তিগুলিকে উৎখাত করার জন্য আরও প্রবল করে তোলে। সৃষ্টিতত্ত্বমূলক চিত্রকল্প ও যুদ্ধজয়ের বর্ণনা থেকে এগিয়ে সূক্তটি অন্তর্দীপনের দিকে মোড় নেয়: ঋষিরা ইন্দ্রকে প্রার্থনা করেন যেন তিনি অন্ধকার গড়িয়ে সরিয়ে দেন, চোখে দৃষ্টি পূর্ণ করেন, এবং গোপন ধনের মতো তাদের বন্ধন থেকে মুক্ত করে প্রকাশ্যে আনেন।
Sukta 10.74
এই সূক্তে সমষ্টিগত দীপ্তিমান শক্তিসমূহ—বসুগণ—এর প্রশংসা করা হয়েছে; তারা সাধকের জন্য নানাবিধ দেবীয় সহায়ক, যাদের দ্বারা তপস্যাময় অন্তঃপ্রয়াস, আলোকিত অন্তর্দৃষ্টি এবং দ্যৌ‑পৃথিবীকে একত্রকারী যজ্ঞকর্মের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ হয়। এরপর সূক্ত ইন্দ্রের দিকে ফিরে যায়—তিনি সেই নির্ণায়ক শক্তি, যিনি সাধককে আলো ও প্রাচুর্যের সমৃদ্ধ ‘ভাণ্ডার’-এ পার করিয়ে দেন; তাঁর বহুবিধ শক্তি এবং সাধকের কাম্য সিদ্ধি সম্পাদনের সামর্থ্য এখানে দৃঢ়ভাবে ঘোষিত।
Sukta 10.75
এই সূক্তটি জলদেবতা (আপঃ)-দের মহিমান্বিত স্তব, যেখানে বিশেষভাবে সিন্ধুকে নদীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক দ্রুতগামী ও সর্ববিজয়ী রূপে উচ্চকিত করা হয়েছে। এতে বহু পবিত্র নদীর নাম উচ্চারণ করে তাদের আহ্বান করা হয়েছে যেন তারা কবির স্তোমে যোগ দেয়। নদীগুলিকে জীবন্ত শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে—যারা বল, পুষ্টি এবং ঋত-সম্যক গতি বহন করে; এবং এই ঘোষণা উচ্চারিত হয় ‘বিবস্বতের আসনে’—সূর্য-দীপ্ত সেই প্রেক্ষিতে, যেখানে শৃঙ্খলা ও সত্য প্রতিষ্ঠিত।
Sukta 10.76
এই সূক্তটি ঋগ্বেদের পরবর্তী পর্যায়ের এক স্তোত্র, যেখানে মরুতদের সঙ্গে ইন্দ্রকে উদ্দীপিত ও শক্তিশালী করা হয়। এতে যুগল বিশ্ব (রোদসী) এবং যুগল দিনকে আহ্বান করে আলোক ও শক্তির ভেদনে যজমানের জন্য “প্রশস্ত অবকাশ” উন্মুক্ত করার প্রার্থনা করা হয়েছে। এখানে যজ্ঞের শক্তিসমূহ—বিশেষত সোম-পেষণ পাথর এবং দক্ষ ঋত্বিজদের—প্রশংসা করা হয়েছে; তাঁদের তীব্র ও সংহত কর্মে অর্ঘ্য কার্যকর হয়, ফলে স্বর্গীয় ও পার্থিব—উভয় স্তরেই—ধন ও বল প্রবাহিত হয়।
Sukta 10.77
এই সূক্তে মরুতদের স্তব করা হয়েছে—দীপ্তিমান ঝড়-গণ হিসেবে—যাদের “বর্ষণ” একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে আশীর্বাদ। তারা উদ্দেশ্যময় শৃঙ্খলায় অগ্রসর হয়, যেন সুপরিচালিত যজ্ঞ। মেঘের ছিটে, সূর্যরশ্মি, বাজপাখি ও দূরগামী অশ্বের মতো উজ্জ্বল উপমার মাধ্যমে তাদের রক্ষাশক্তিকে আহ্বান করা হয়েছে—যেন তারা অনিষ্ট দূর করে, প্রেরিত চিন্তাকে দৃঢ় করে এবং যজ্ঞকে দীপ্ত করে তোলে। শেষে নিবেদন করা হয়েছে যে এই সর্বাধিক “যজ্ঞ-যোগ্য” শক্তিগণ রথবেগী প্রেরণা এবং যজ্ঞক্রিয়ায় বৃদ্ধি পেতে থাকা মহিমাকে রক্ষা করুন।
Sukta 10.78
এই সূক্তে মরুতদের প্রশংসা করা হয়েছে—তাঁদের নির্দোষ, দীপ্তিমান ও দ্রুতগামী শক্তি হিসেবে, যারা প্রেরিত ঋষি, বীর রাজা এবং উচ্ছ্বসিত জলধারার ন্যায়। তাঁরা বল, জ্যোতি ও বিজয়ময় গতি দান করেন। স্তোত্রের মধ্যেই তাঁদের সখ্যপূর্ণ উপস্থিতি প্রার্থিত হয়েছে, এবং গায়কদের সৌভাগ্যবান করে তোলার ও সেই স্থায়ী “রত্ন” দ্বারা সমৃদ্ধ করার নিবেদন করা হয়েছে, যা মরুতরা প্রাচীন কাল থেকে ধারণ করে আসছেন।
Sukta 10.79
এই সূক্তে মর্ত্যদের মধ্যে বিচরণকারী এক ভয়ংকর অথচ কল্যাণকর অমর শক্তির ধ্যান করা হয়েছে—যার সর্বাধিক সঙ্গত পরিচয় অগ্নি, তাঁর ভক্ষণকারী ও রূপান্তরকারী রূপে। এখানে অগ্নিকে সর্বগ্রাসী “গর্ভ” বলা হয়েছে, যে নিজের দুই মাতা—দ্যৌ (স্বর্গ) ও পৃথিবী—কেই আহার করে; পরে তাঁকে এমন এক যোজক শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা বিচ্ছিন্ন/বিপরীত শক্তিগুলিকে শাসিত করে একত্র করে, এবং শেষে মিত্র ও বসুগণের অধীনে ঋত (সত্য-ব্যবস্থা) অনুযায়ী সামঞ্জস্য ও সুশৃঙ্খলতার পরিণতি ঘটায়।
Sukta 10.80
এই সংক্ষিপ্ত অগ্নিসূক্তে দিব্য অগ্নির স্তব করা হয়েছে—যিনি কার্যকর শক্তি, বীর্য ও সমৃদ্ধ গঠনদানের দাতা, এবং পৃথিবী ও স্বর্গ—এই দুই লোকের মধ্যে চলাচল করে তাদের সুর মিলিয়ে দেন। এতে অগ্নির কাছে প্রার্থনা করা হয় যে তিনি আহুতি উচ্চতর লোক পর্যন্ত প্রসারিত করুন, অস্তিত্বে তাঁর বহু ধাম/আসন স্থিত রাখুন, গায়ককে রক্ষা করুন, এবং “মহৎ দ্রবিণ” (ধন/সত্তার বিপুল পূর্ণতা) দান করুন।
Sukta 10.81
এই সূক্তে সর্ব-নির্মাতা বিশ্বকর্মার স্তব করা হয়েছে—তাঁকে যাজ্ঞিক ঋষি-পুরোহিত রূপে, যিনি লোকসমূহকে যেন ‘অর্পণ’ করে গূঢ় গভীরতা থেকে সৃষ্টিকে প্রতিষ্ঠা করেন। এতে বিস্ময়ময় সৃষ্টিতত্ত্ব-অনুসন্ধানী প্রশ্ন উঠে আসে—স্বর্গ ও পৃথিবী কীভাবে গঠিত হল—এবং শেষে বিশ্বকর্মাকে বাকস্পতী (বাণীর অধিপতি) বলে প্রত্যক্ষ আহ্বান জানানো হয়, যেন তিনি উপাসনা গ্রহণ করেন এবং কল্যাণ ও রক্ষা দান করেন।
Sukta 10.82
ঋগ্বেদ ১০.৮২ বিশ্বকর্মাকে এক গোপন মহাজাগতিক কারিগর হিসেবে ভাবনা করে—যিনি প্রথম সীমারেখা স্থাপন করেন, এবং তাতেই দ্যৌ ও পৃথিবী প্রসারিত হয়ে শৃঙ্খলিত আকাশে স্থান পায়। স্তোত্রটি প্রশংসা ও অনুসন্ধানের মধ্যে দোলায়মান: প্রাচীন ঋষিদের নির্মাতার উদ্দেশে নিবেদিত আহুতি-অর্ঘ্যকে সম্মান করে, আবার সতর্কও করে যে কেবল আবৃত্তি ও তর্ক-অনুমান করলে, দৃশ্যরূপের আড়ালে আচ্ছন্ন সত্য স্রষ্টাকে মিস করা যায়। এর উদ্দেশ্য হলো যজ্ঞ ও চিন্তাকে সেই এক রূপদাতা বুদ্ধির দিকে পুনঃকেন্দ্রীভূত করা, যিনি বহুত্বকে গড়ে এক সঙ্গত সমগ্রে পরিণত করেন।
Sukta 10.83
এই সূক্তে মন্যু—দিব্য ক্রোধ/উদ্দীপনা—কে আহ্বান করা হয়েছে, যিনি ইন্দ্রের বিজয়ী শক্তির সহচর এক দেবসম ক্ষমতা। উপাসক প্রার্থনা করেন, যুদ্ধে মন্যু যেন তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়ে রথে জোতা থাকে, যাতে বৃত্র-সদৃশ বাধা ও শত্রু শক্তিকে দমন করা যায়। মন্যুকে স্বয়ংজাত, অপ্রতিরোধ্য এবং সর্বত্র সক্রিয় বলে প্রশংসা করা হয়েছে, এবং তাঁর কাছে নিবেদন করা হয়েছে—‘আমাদের মধ্যে শক্তি স্থাপন করো’—অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বাহ্য সংঘর্ষ উভয়ের জন্য। সূক্তের পরিণতিতে ঘনিষ্ঠ সঙ্গের চিত্র আসে—মন্যু ডান হাতে পাশে—এবং তা মধুর সার (সোম/মধুমিশ্র নিবেদন) অর্পণের দ্বারা সিলমোহরিত, গোপন অন্তঃপানের জন্য।
Sukta 10.84
এই সূক্তে মন্যু—যুদ্ধ-উন্মাদনা, ধর্মসম্মত তেজ ও অদম্য সংকল্প—কে দেবসখা রূপে আহ্বান করা হয়েছে; তিনি মরুত-সদৃশ যুদ্ধশক্তিগুলিকে এক রথে জুড়ে প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে তাড়িয়ে দেন। তিনি গোত্রে-গোত্রে (viśaṃ-viśam) বিজয়ের জন্য শৃঙ্খলা ও প্রশিক্ষণ দেন, বাক্যকে অবিচ্ছিন্ন রণ-ধ্বনিতে পরিণত করেন, এবং সমন্বিত সমৃদ্ধি ও রক্ষার প্রার্থনা করেন; শেষে কামনা করা হয় যে শত্রুরা অন্তর্ভয়ে গ্রাসিত হয়ে আবদ্ধ হোক এবং সরে যাক।
Sukta 10.85
ঋগ্বেদ ১০.৮৫ প্রসিদ্ধ ‘সূর্যা-বিবাহ’ (বৈদিক বিবাহ) সূক্ত, যেখানে বিবাহকে সত্য (সত্যতা) ও ঋত (সঠিক বিধান/ধর্ম-শৃঙ্খলা)-এর ভিত্তিতে এক মহাজাগতিক কর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সূক্ত দম্পতিকে পারস্পরিক ঐক্য, প্রজনন-সমৃদ্ধি, বন্ধনসৃষ্টিকারী শক্তি থেকে রক্ষা, এবং আদিত্যগণ, সোম ও সূর্য কর্তৃক ধারিত দীপ্তিমান বিধানে প্রতিষ্ঠিত জীবনের আশীর্বাদ প্রদান করে।
Sukta 10.86
ঋগ্বেদ ১০.৮৬ একটি প্রাণবন্ত সংলাপ-সূক্ত, যার কেন্দ্রে ইন্দ্র ও রহস্যময় বৃষাকপি; কথোপকথনে ইন্দ্রাণীও প্রবেশ করেন, এবং বারবার প্রশস্তি ধ্বনিত হয়—“ইন্দ্র সকলের ঊর্ধ্বে।” হাস্যরসাত্মক, গৃহস্থালি আবহের অন্তরালে এই সূক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আনুগত্য, এবং সোম-উদ্দীপিত শক্তিকে যথাযথ পথে প্রবাহিত করার প্রশ্ন তোলে, যাতে ইন্দ্রের সার্বভৌম বল পুনরায় প্রতিষ্ঠিত ও নিশ্চিত হয়। এতে লোককথার অনুষঙ্গ (উর্বরতা, আরোগ্য, অসাধারণ জন্ম)ও সংরক্ষিত—যা ইন্দ্রের সেই সামর্থ্যের চিহ্ন, যা সত্তাদের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উত্তোলন করতে পারে।
Sukta 10.87
এই সূক্তটি অগ্নিকে ‘রক্ষোহণ’—রাক্ষস ও যাতুধানদের সংহারক—রূপে এক তীব্র রক্ষামূলক আহ্বান। এতে প্রার্থনা করা হয়েছে যে তিনি দিন-রাত উপাসকদের রক্ষা করুন এবং শত্রু শক্তিকে ভেঙে দিন। মন্ত্র ও যজ্ঞাগ্নির তেজকে এটি বারবার এক সক্রিয় ‘অস্ত্র’ করে তোলে—যা অদৃশ্য অনিষ্ট, অভিশাপ ও জাদুটোনাকে দগ্ধ করে, উন্মোচিত করে এবং তাড়িয়ে দিয়ে দূর করে। সূক্তটির উদ্দেশ্য অপোত্রোপায়িক (অপশকুন-নিবারক): শুদ্ধিকরণ, যজ্ঞবিধির সুরক্ষা, এবং অগ্নির প্রজ্বলিত ইচ্ছাশক্তির দ্বারা অন্তর্গত দৃঢ়তা গঠন।
Sukta 10.88
এই সূক্তে অগ্নির স্তব করা হয়েছে—অজরা, স্বর্গস্পর্শী সেই অগ্নি, যিনি হব্য পান করেন এবং ঋত (বিশ্ব-নিয়ম) দ্বারা লোকসমূহকে ধারণ করেন। এতে স্মরণ করা হয় যে দেবতারা অগ্নিকে ত্রিবিধ রূপে উৎপন্ন ও নির্মাণ করেছিলেন, এবং তাঁকে বৃদ্ধির রূপান্তরকারী করেছিলেন—যিনি উদ্ভিদকে পক্ব/পরিপক্ব করেন ও জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন। সূক্তে মাতরিশ্বনকে অগ্নির বাহক হিসেবে আহ্বান করা হয়েছে, এবং উষার আলোর বিস্তারকে যথাযথভাবে যজ্ঞ ও ঋত্বিক-পুরোহিত-ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
Sukta 10.89
এই সূক্তে ইন্দ্রকে সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বজয়ী শক্তি হিসেবে বিস্তৃতভাবে স্তব করা হয়েছে—যিনি দীপ্তিমান লোকসমূহ উন্মোচন করেন, “নদী”-সীমা অতিক্রম করে উপচে পড়েন, এবং তাঁর উপাসকদের জন্য বিজয়, ধন ও মঙ্গল নিশ্চিত করেন। এতে বারবার স্বর্গ, পৃথিবী, জল ও পর্বতের উপর ইন্দ্রের সার্বভৌম কর্তৃত্ব ঘোষণা করা হয়েছে, এবং তাঁকে প্রার্থনা করা হয়েছে যেন তিনি সংঘর্ষে ও শান্ত যজ্ঞকর্মে আহ্বান শুনে বৃত্রসদৃশ বাধা-অবরোধ বিনাশ করেন। উদ্দেশ্যটি উৎসবধর্মীও বটে, ব্যবহারিকও—জীবনের “ভরণ” (ভরা) এবং পূর্ণ সমৃদ্ধি-লাভ (বাজসাতি) অর্জনে ইন্দ্রের রক্ষা, শক্তি ও প্রাচুর্য আহ্বান করা।
Sukta 10.90
পুরুষ সূক্তে ‘পুরুষ’—সর্বব্যাপী বিশ্ব-পুরুষ—কে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে তিনি সমগ্র জগতকে নিজের মধ্যে ধারণ করেও তাকে অতিক্রম করেন। এখানে সৃষ্টিকে এক আদিম যজ্ঞরূপে প্রতিপাদিত করা হয়েছে; সেই যজ্ঞ থেকেই বিশ্ব, বেদ এবং সামাজিক-জাগতিক কার্যবিভাগ এক অখণ্ড সত্তার সুশৃঙ্খল প্রকাশ হিসেবে উদ্ভূত হয়। এই স্তোত্রের উদ্দেশ্য ধ্যানমূলক ও আচারমূলক—যজ্ঞ ও ধর্মকে একক মহাজাগতিক আদর্শ-প্রতিমায় প্রতিষ্ঠা করা।
Sukta 10.91
ঋগ্বেদ ১০.৯১ একটি অগ্নি-সূক্ত, যেখানে অগ্নিকে সদা-জাগ্রত গৃহস্থালির উপস্থিতি এবং সর্বজনীন হোতৃ হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে, যিনি যজ্ঞকে কার্যকর ও সফল করেন। এখানে অগ্নিকে দীপ্তিমান বুদ্ধি (মতি/মেধা) রূপে দেখানো হয়েছে, যা যথাযথ অর্পণ ও দেবতাদের সঙ্গে যথোচিত সঙ্গ স্থাপন করে এবং উপাসকদের জন্য বিস্তৃত, বীরোচিত ঐশ্বর্য দান করে।
Sukta 10.92
এই সূক্তে অগ্নির প্রশংসা করা হয়েছে—যজ্ঞের রথচালক ও কুল-পুরোহিত (হোতৃ) রূপে, রাত্রির অতিথি রূপে, যিনি শুষ্ক সমিধায় জ্বলে উঠে প্রজ্বলিত হন এবং স্বর্গের দিকে দীপ্ত কেতুর মতো ঊর্ধ্বগামী হন। এতে তাঁর অপ্রতিরোধ্য শক্তির মহিমা কীর্তিত—এতই মহান যে সূর্যের গতি এবং ইন্দ্রসদৃশ বীর্যও স্মরণে আসে—এবং প্রাচীন অঙ্গিরস ঋষি-পরম্পরা ও সোম-নিষ্পেষণের উপকরণগুলির উল্লেখ রয়েছে, যা আচার এবং অন্তর্দৃষ্টির জন্য এক সুস্পষ্ট পথ স্থাপন করে।
Sukta 10.93
এই সূক্তে দ্যাবাপৃথিবী—স্বর্গ ও পৃথিবী—কে আহ্বান করা হয়েছে, সেই বিশাল, মাতৃস্বরূপ যুগলকে, যারা জগতসমূহকে ধারণ করে এবং প্রবল ও হিংস্র শক্তির আক্রমণ থেকে অবিরত রক্ষা দেন। সূক্ত এগোতে থাকলে প্রার্থনা প্রসারিত হয়ে ঋত-শৃঙ্খলার এক দর্শনে পরিণত হয়: যজ্ঞকর্ম ‘মানবসীমার অতীত’ হয়ে ওঠে, এবং বহু শক্তির মহাজাগতিক বিন্যাসকে যজমানের কল্যাণার্থে পূর্ব থেকেই স্থাপিত ও নিশ্চিত বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
Sukta 10.94
এই সূক্তে সোম-পেষণ-পাথর (গ্রাবাণঃ/অদ্রয়ঃ) কাব্যিকভাবে জীবন্ত, বাক্সম্পন্ন শক্তি হিসেবে ব্যক্ত হয়েছে; তাদের ছন্দোবদ্ধ ঠকঠক ধ্বনি ইন্দ্রের উদ্দেশে নিবেদিত স্তোত্র-গান হয়ে ওঠে। এতে সোম-পেষণের প্রক্রিয়া ও পবিত্রতা—তার ধ্বনি, গতি-ত্বরিতা এবং সুশৃঙ্খল চলন—উদ্যাপিত হয়; আর পাথরগুলিকে এমন কর্মী রূপে দেখানো হয় যারা সোমের সার নির্যাস মুক্ত করে এবং যজ্ঞের মধ্যে প্রেরিত বাক্ (বাচ্) জাগ্রত করে।
Sukta 10.95
ঋগ্বেদ ১০.৯৫ মর্ত্য রাজা পুরূরবা (ঐল) ও অপ্সরা উর্বশীর মধ্যে এক নাটকীয় সংলাপ, যেখানে মানব আকাঙ্ক্ষা ও দিব্য শর্তের টানাপোড়েন উন্মোচিত হয়। তীক্ষ্ণ বাক্যবিনিময়ের মাধ্যমে প্রেমকে এমন এক শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে যা উন্নীতও করতে পারে, আবার ভেঙেও দিতে পারে; এবং শেষে মানব-পক্ষকে মর্ত্যতার অধীন স্থির করেও সন্তান ও যজ্ঞের দ্বারা স্বর্গীয় অংশীদারিত্বের একটি পথ খোলা রাখে।
Sukta 10.96
ঋগ্বেদ ১০.৯৬ উত্তর-মণ্ডলের একটি ইন্দ্র-স্তুতি, যেখানে ইন্দ্রকে—বিশেষত হরিবৎ, অর্থাৎ “কপিশ-রঙা যুগল (হরী) যাঁর”—প্রেরিত বাক্যের মাধ্যমে স্তোত্রে প্রবেশ করতে এবং মধুময় সোম পান করতে আহ্বান করা হয়েছে। এই সূক্তে বারবার ইন্দ্রের দুই হরী (যুগল অশ্ব/গতিশীল শক্তি)কে দ্রুত, বিজয়ী গতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যা আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করে, সাধককে স্থিত করে, এবং আনন্দ, বল ও সাফল্য দান করে। শেষে সরাসরি যজ্ঞীয় আহ্বান জানানো হয়—পূর্বের পেষণ/সোম-নিষ্পেষণগুলি পাশে রেখে বর্তমান সোম-অর্ঘ্যকে ইন্দ্রের নিজস্ব অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে।
Sukta 10.97
ঋগ্বেদ ১০.৯৭ একটি আরোগ্য-স্তোত্র, যেখানে ওষধী—সমষ্টিগত দেবশক্তি রূপে ঔষধি উদ্ভিদসমূহ—কে আহ্বান করা হয়েছে যেন তারা দেহে সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে রোগ, বিশেষত যক্ষ্মা (ক্ষয়/পীড়া), দূর করে দেয়। সূক্তটি উদ্ভিদগুলিকে আদিম, বহুরূপী এবং দেবতুল্যভাবে প্রতিষ্ঠিত বলে প্রশংসা করে, এবং ভেষজ চিকিৎসাকে কেবল শারীরিক প্রতিকার নয়, ক্ষতি ও বৈরিতার বিরুদ্ধে পবিত্র রক্ষাকবচ হিসেবেও উপস্থাপন করে।
Sukta 10.98
এই সূক্তটি বৃষ্টিআহ্বান, যা এক পবিত্র আখ্যানের কাঠামোয় রচিত। রাজা শান্তনুর পুরোহিতরূপে দেবাপি বृहস্পতির কাছ থেকে প্রাপ্ত শক্তিসম্পন্ন বাক্যের দ্বারা পর্জন্যের বৃষ্টি আগমনের পথ উন্মুক্ত করেন। বृहস্পতিকে মন্ত্রের অধিপতি ও দেবসমন্বয়ের কর্তা হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে—তিনি মিত্র, বরুণ, পূষণ, আদিত্যগণ, বসুগণ ও মরুতগণের মতো সহচর দেবতাদের মাধ্যমে কার্য করে জল, উর্বরতা এবং সামষ্টিক কল্যাণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। সমাপ্ত অংশে অগ্নির কাছে রক্ষার প্রার্থনা করা হয় এবং সমুদ্র ও স্বর্গ থেকে ‘জলের প্রাচুর্য’ মুক্ত হয়ে বর্ষিত হওয়ার আবেদন জানানো হয়।
Sukta 10.99
এই সূক্তে ইন্দ্রের প্রশস্তি গঠিত হয়েছে ক্লাসিক বৃত্র-বধের কাঠামোয়—বজ্রের নির্মাণ ও নিক্ষেপ, বাধাদানকারী শক্তির ভেদন, এবং উপাসকের জন্য সমৃদ্ধির দ্বার উন্মোচন। বীর-পুরাণের সঙ্গে নৈতিক ও সামাজিক সুর মিশেছে—ইন্দ্র সত্যবাদীদের রক্ষা করেন, শত্রুদের দুর্গ চূর্ণ করেন, এবং ইষা (প্রেরণাময় উদ্যম), ঊর্জ (জীবনীশক্তি) ও সুক্ষিতি (নিরাপদ বাসস্থান) দান করেন। শেষের ‘পিঁপড়ে’ ইন্দ্রের দিকে অগ্রসর হওয়ার চিত্রটি বোঝায়—বিনয়ী, অবিচল ভক্তিই দैব বৃদ্ধি ও সর্বজনীন দীপ্তির পথ।
Sukta 10.100
এই সূক্তে ইন্দ্রকে উদ্দীপিত আহ্বান জানানো হয়েছে—তিনি যেন “দৃঢ়ভাবে স্থির” থাকেন, সোমের দ্বারা জাগ্রত হন, এবং উপাসকদের বিজয়ময় ভোগ, বৃদ্ধি ও রক্ষা দান করেন। ইন্দ্রের বীরশক্তির সঙ্গে সवিতৃকে যজ্ঞকর্ম পরিচালনা ও সুরক্ষার জন্য আহ্বান করা হয়েছে, এবং অদিতিকে বারবার সেই বিস্তৃত “সমগ্রতা” রূপে বেছে নেওয়া হয়েছে, যা সত্য, অখণ্ডতা এবং অসত্যের আবরণ থেকে মুক্ত স্বাধীনতাকে রক্ষা করে।
Sukta 10.101
এই সূক্তটি সমমনস্ক সঙ্গীদের একটি দলকে সমবেত জাগরণ-আহ্বান জানায়—যেন তারা একসঙ্গে অগ্নিকে প্রজ্বালিত করে যজ্ঞকে গতিশীল করে, উষা ও দধিক্রাবণকে আহ্বান করে, এবং ইন্দ্রকে ‘ইন্দ্রবৎ’ শক্তিদায়ক সহায় হিসেবে গ্রহণ করে। রথ-নির্মাণ, “অশ্ব” (প্রাণশক্তি) উদ্দীপিত করা, এবং নাদ/পাত্র ভরার মতো উজ্জ্বল চিত্রকল্পে যজ্ঞকে সমন্বিত, দক্ষ কর্মরূপে দেখানো হয়েছে—যা বল, সমৃদ্ধি ও বিজয়ী গতি এনে দেয়। শেষে এটি দৃঢ় শ্রমে প্রবৃত্ত করে এবং স্পষ্টভাবে ইন্দ্রকে সোমপানের জন্য ডেকে সাহায্য দানের প্রার্থনা করে।
Sukta 10.102
ইন্দ্রকে উদ্দেশ করে এই সূক্তটি রথ-প্রতিযোগিতার প্রাণবন্ত ভাষায় রচিত। এতে দেবতার কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে—তিনি যেন ধাবক, রথের যুগল অশ্বদল এবং যশ ও ধনের লাভকে রক্ষা করেন। ইন্দ্রকে দক্ষতা, বেগ ও বিজয়মুখী গতি-প্রবাহের অধিপতি হিসেবে উদ্যাপন করা হয়েছে—যিনি সমগ্র চলমান জগতকে “দেখেন” এবং দৌড় জেতানো যুগ্ম শক্তিকে বল দান করেন। বাহ্যিক চিত্রকল্পের অন্তরালে এটি সঠিক দিশা, কার্যকর উপায় এবং যুদ্ধ ও জীবন-প্রচেষ্টায় বাধা অতিক্রম করে জয়ের প্রার্থনা।
Sukta 10.103
এই সূক্তটি ইন্দ্রের প্রতি এক যুদ্ধ-আহ্বান—তাঁকে দ্রুতগামী, অচঞ্চল-দৃষ্টিসম্পন্ন, একক বীর-চ্যাম্পিয়ন রূপে ডাকা হয়েছে, যিনি শত্রু-সেনাদলকে চূর্ণ করেন এবং আর্য সমাজের জন্য বাধাগ্রস্ত পথ ও স্থান উন্মুক্ত করেন। এতে যুদ্ধে বিজয়, নিজ সৈন্যবাহিনীর রক্ষা, এবং ইন্দ্রের নেতৃত্বে অগ্রসর হয়ে জয়লাভের জন্য প্রয়োজনীয় সাহস ও সংহতির প্রার্থনা করা হয়েছে।
Sukta 10.104
এই সূক্তে ‘বহু-আহূত’ ইন্দ্রকে—যাঁকে কপিশ (তামাটে) অশ্বরা বহন করে—অতি ত্বরায় যজ্ঞে এসে সদ্য নিষ্পেষিত সোম পান করতে জরুরি আহ্বান জানানো হয়েছে। এখানে ইন্দ্রকে প্রার্থনা-শ্রোতা, যজ্ঞপথের জ্ঞাতা, এবং বাধাদানকারী শক্তি (বৃত্র-সদৃশ প্রতিরোধ) বিনাশকারী বিজয়ী বীর হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে; সংগ্রামে সহায়তা এবং ধন, বল ও পূর্ণ সমৃদ্ধি লাভের জন্য তাঁকে কামনা করা হয়েছে।
Sukta 10.105
এই সূক্তটি ইন্দ্রের (এখানে “বসু” উপাধিতে সম্বোধিত) এক উদ্দীপ্ত স্তব। এতে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে—স্তোত্রটি কবে সত্যিই তাঁকে “প্রসন্ন” করবে—এবং তাঁর সহায়তার প্রাণশক্তিময় ভিত্তি হিসেবে সোম-নিষ্পেষণের আহ্বান করা হয়েছে। এতে ইন্দ্রের নির্মিত শক্তি ও দক্ষতার স্মরণ করা হয় (ঋভু ও মাতরিশ্বনের ন্যায়), এবং শেষে কুৎসকে রক্ষা করা ও দস্যু-বধে তাঁর বিজয়ের স্মৃতিতে উপনীত হয়—এই কথা নিশ্চিত করে যে স্তব ও মৈত্রী/মিত্রতা তাঁর সিদ্ধান্তমূলক সহায়তাকে আকর্ষণ করে।
Sukta 10.106
এই সূক্তে যুগল দিব্য শক্তি—অর্থাৎ অশ্বিনদ্বয়—কে আহ্বান করা হয়েছে, যেন তাঁরা তাঁদের রথসহ আগমন করেন, প্রেরিত চিন্তার বিস্তার ঘটান, এবং দক্ষ কারিগরের মতো প্রাণশক্তিকে গতিময় করেন। এতে তাঁদের দ্রুত, সুর-সমন্বয়কারী কর্মের প্রশংসা করা হয়েছে এবং ‘বাজ’ (বল), আনন্দ, ও জীবনশক্তির “অজরা” বৃদ্ধি প্রার্থিত হয়েছে; শেষে উপাসকের অন্তস্তম কামনা পূর্ণ করার নিবেদন রয়েছে।
Sukta 10.107
এই সূক্তে দক্ষিণার প্রশংসা করা হয়েছে—সেই পবিত্র ও যথাযথভাবে নিবেদিত দান, যা যজ্ঞকে পূর্ণ (পূর্তি) করে এবং উপাসককে অন্ধকার থেকে বের করে প্রশস্ত, আলোকময় পথে নিয়ে যায়। এখানে দানকে কেবল সাধারণ দয়া-দান নয়, বরং অভিষিক্ত শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে—যা পুরোহিতদের কার্য সিদ্ধ করে, সামাজিক শৃঙ্খলা ধারণ করে, এবং রক্ষা, সমৃদ্ধি ও বিজয়ের ফল প্রদান করে।
Sukta 10.108
ঋগ্বেদ ১০.১০৮-এ এক নাটকীয় সংলাপ দেখা যায়, যেখানে ইন্দ্রের দ্রুত দূত সরমা রসা নদীর ওপারে “গাভী” (আলো/সম্পদ/ধনরত্ন) লুকিয়ে রাখা পণিদের মুখোমুখি হন। সূক্তটির মূল সুর প্ররোচনা, প্রত্যাখ্যান ও সতর্কবাণী: পণিরা ঘুষ ও বিভ্রান্তির মাধ্যমে সরমাকে ভুল পথে নিতে চায়, কিন্তু সরমা ঋত (সত্য-শৃঙ্খলা)-এর পক্ষে অবিচল থেকে গোপন ধনের ন্যায্য পুনরুদ্ধারের কথা বলেন। উপসংহারে বৃহস্পতির উদ্ঘাটনকারী শক্তির ইঙ্গিত আছে—যা গোপন থাকা গাভী, সোম, পবিত্র উপকরণ এবং স্বয়ং ঋষিদেরও খুঁজে বের করে, যাতে আলো প্রকাশিত হয়ে অগ্রসর হতে পারে।
Sukta 10.109
এই সূক্তে এক গুরুতর “ব্রহ্ম-কিল্বিষ” (পবিত্র ঋত-ব্যবস্থা ও ব্রাহ্মণীয় পবিত্রতার বিরুদ্ধে অপরাধ) আলোচিত হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে কীভাবে মহাজাগতিক শক্তিসমূহ—বিশেষত ঋতের মধ্যে প্রবহমান দিব্য আপঃ (জল)—প্রথমে দোষ এবং পরে তার প্রতিকার/প্রায়শ্চিত্তের কথা বলে। এতে ক্ষতিপূরণ ও প্রত্যর্পণ (যা অন্যায়ভাবে নেওয়া হয়েছে তা ফিরিয়ে দেওয়া), দেব-আপঃ দ্বারা শুদ্ধি, এবং দেবতাদের সঙ্গে পুনরায় সামঞ্জস্যে প্রবেশের উপর জোর দেওয়া হয়েছে; শেষে নবীকৃত উপাসনা ও ঋতে যথাযথ প্রতিষ্ঠা লাভে উপনীত হয়, যেখানে মাতরিশ্বনের আহ্বানও আছে।
Sukta 10.110
এই সূক্তে প্রজ্বালিত গৃহ্য অগ্নি—অগ্নি জাতবেদস—কে কেন্দ্র করা হয়েছে; তিনি হোতৃ ও দিব্য দূতরূপে মানুষের আহুতি ও অভিপ্রায় দেবতাদের কাছে বহন করেন। এখানে যজ্ঞকে ঋত অনুযায়ী সুশৃঙ্খল গতিরূপে দেখানো হয়েছে, যেখানে উষা ও রাত্রির মতো পরিপূরক শক্তিগুলি আচার্যের ছন্দ ও নিয়মকে সমর্থন করে; এবং শেষে স্বাহা-সংস্কৃত আহুতি নিবেদন করা হয়, যাতে দেবগণ তা গ্রহণ করে অংশভোগ করেন।
Sukta 10.111
এই সূক্ত প্রেরিত মনীষীদের আহ্বান করে—তারা যেন তাদের মনীষা (গঠিত অন্তর্দৃষ্টি) উন্মেষিত করে এবং সত্য ও সিদ্ধ কর্মের দ্বারা বিজয় ও রক্ষার জন্য ইন্দ্রকে “প্রবৃত্ত” করে। এতে ইন্দ্রের আদর্শ কীর্তি স্মরণ করা হয়েছে—বজ্র দ্বারা বৃত্রকে বিদীর্ণ করা এবং অধার্মিকদের মায়া ছিন্নভিন্ন করা—তারপর সেই মহাজাগতিক জয়কে বর্তমান লাভে রূপান্তরিত করা হয়েছে: নদীগুলির সমুদ্রমুখী প্রবাহ, ধন-সম্পদের আগমন, এবং উপাসকের কাছে সত্যবাক্য (সূনৃতা)-র প্রাপ্তি।
Sukta 10.112
এই সূক্তটি প্রভাতকালে ইন্দ্রের উদ্দেশে সোম-আহ্বান; এতে তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছে যে তিনি নিংড়ানো সোমকে তাঁর “প্রথম পান” হিসেবে গ্রহণ করুন এবং শত্রু শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর বিজয়ী শক্তিকে জাগ্রত করুন। এতে সোম-পাত্রের উপর ইন্দ্রের প্রাচীন ও ন্যায্য অধিকার প্রশংসিত হয়েছে, মধুময় পানীয়ের প্রতি দেবতাদের যৌথ আকাঙ্ক্ষা উদ্যাপিত হয়েছে, এবং শেষে প্রার্থনা করা হয়েছে—ইন্দ্র যেন সংগ্রামরত উপাসকদের প্রতি দৃষ্টি দেন, যুদ্ধে জয় দান করেন, এবং যা বণ্টিত নয় বলে মনে হয় সেখান থেকেও সম্পদ ভাগ করে দেন।
Sukta 10.113
এই সূক্তে ইন্দ্রের শক্তির উদ্দীপিত উত্থান স্তুত হয়—দ্যাবা-পৃথিবী ও বিশ্বে দেবাঃ তাঁর বলকে সমর্থন করেন, বিশেষত যখন সোম তাঁর সংকল্প ও বুদ্ধিকে সঞ্জীবিত করে। এতে তাঁর বৃত্রবধ কীর্তি স্মরণ করা হয়েছে—যে অন্ধকার জলধারাকে রুদ্ধ করে রেখেছিল, তা বিদীর্ণ করা—এবং সেই বিজয়কে বর্তমানের জন্য প্রার্থনায় রূপ দেওয়া হয়েছে: আমাদের রক্ষা, দুঃখ-কষ্টের পার হয়ে নিরাপদ গমন, এবং উপাসকদের জন্য প্রশস্ত ও স্থিতিশীল ভিত্তি দান।
Sukta 10.114
ঋগ্বেদ ১০.১১৪ একটি ধাঁধা-ধর্মী সূক্ত, যা যজ্ঞের গোপন স্থাপত্যের কথা বলে—কীভাবে অগ্নি (মাতরিশ্বন) এবং জ্ঞানশক্তিসমূহ (বিশ্বে দেবাঃ) ছন্দ, সংখ্যা ও প্রেরিত বাক্যের মাধ্যমে ঋত-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে কর্মকে “মেপে” সম্পন্ন করার কথা আছে—ছন্দ নির্ধারণ, বিশ্ব-গণনার বিন্যাস, এবং ঋক্ ও সামনের দ্বারা যজ্ঞ-রথকে অগ্রসর করা—যাতে স্বর্গীয় পুষ্টি লাভ হয় এবং শ্রম ও নিয়তির যথাযথ বণ্টন নিশ্চিত হয়।
Sukta 10.115
এই অগ্নিসূক্তে অগ্নিদেবকে এক বিস্ময়কর “যুব শিশু” রূপে স্তব করা হয়েছে—যার বৃদ্ধি তাঁর দুই মাতাকেও অতিক্রম করে এবং যিনি একই সঙ্গে মানুষ ও দেবতার মধ্যে মহান দূতের ভূমিকা গ্রহণ করেন। এতে যজ্ঞের ঋত-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করার, হবি বহন করার, এবং গায়ক-ঋষি ও নেতা-দ্রষ্টাদের—বিশেষত কণ্ব বংশধারা—রক্ষা করার তাঁর শক্তি তুলে ধরা হয়েছে; এবং শেষে বষট্-ধ্বনি ও বারংবার নমস্ উচ্চারণের সঙ্গে এক লিটুর্জিক উত্থানে পরিণতি পায়।
Sukta 10.116
এই সূক্তে ইন্দ্রকে তৎক্ষণাৎ আহ্বান করা হয়েছে—তিনি যেন সোম পান করে তাঁর পূর্ণ বিজয়ী শক্তিতে উদিত হন, যাতে তিনি বৃত্রসদৃশ বাধাদানকারী প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার করেন এবং উপাসকদের সমৃদ্ধি রক্ষা করেন। এতে যুদ্ধময় চিত্রকল্প—শত্রু ও জাদুটোনা/অভিচারী শক্তিকে কেটে ফেলা—এর সঙ্গে যুক্ত আছে এক যজ্ঞীয়-কাব্যিক ক্রিয়া: ঋষির বাক্য নৌকার মতো ছুটে চলে, দেবতাদের কাছে স্তব পৌঁছে দেয়, ধন, পথ-উন্মোচন এবং নিরাপদ পারাপারের জন্য।
Sukta 10.117
ঋগ্বেদ ১০.১১৭ একটি পরবর্তী কালের, উপদেশমূলক সূক্ত, যা দানশীলতার ধর্ম শিক্ষা দেয়: সম্পদ প্রবাহিত হওয়ার জন্যই, আর যে ভাগ করে দিতে অস্বীকার করে সে আধ্যাত্মিক ও সামাজিকভাবে পরিত্যক্ত হয়। এতে দান (পৃণ্-)কে ঋত (মহাজাগতিক বিধান)-এর সঙ্গে সঙ্গত আচরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং সতর্ক করা হয়েছে যে সঞ্চয়, কৃপণতা ও অভাবীদের অবহেলা ক্ষয় ডেকে আনে, কিন্তু ভাগ করে দেওয়া দাতা ও সমাজ—উভয়কেই ধারণ করে।
Sukta 10.118
এই সংক্ষিপ্ত অগ্নি-সূক্তে যথাবিধি প্রজ্বালিত হলে যজ্ঞাগ্নির ঊর্ধ্বগমন চিত্রিত হয়েছে—সে ঘৃতেতে আনন্দ পায় এবং শত্রু ‘ভক্ষক’ (অত্রিণ)কে নিধন করে আহুতি রক্ষা করে। এখানে অগ্নির স্তব করা হয়েছে অমর গৃহপতি (গৃহের অধিপতি) রূপে; মর্ত্যদের মধ্যে তাঁকে আহ্বান করা হয় যাতে তিনি রক্ষা করেন, শুদ্ধ করেন এবং যজ্ঞবিধিকে যথাযথ ক্রমে প্রতিষ্ঠা করেন।
Sukta 10.119
এই সূক্তটি অনুপ্রাণিত আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল, আত্মপ্রতিফলিত উচ্ছ্বাস। বক্তা নিজের মধ্যে শক্তি, লাভ এবং জগতের সঙ্গে সমতা/সমমর্যাদার উদয় অনুভব করে এবং বারবার জিজ্ঞাসা করে—এ কি “সোমের জলধারা থেকে” আসে? ধ্রুবপদের মতো পুনরাবৃত্ত ছন্দে এখানে সোমকে কেবল নিংড়ানো পানীয় নয়, বরং আনন্দের দীপ্ত, জলীয় ক্ষেত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা চিন্তা, সাহস ও সক্ষমতাকে উন্নীত করে। সূক্তের পরিণতি দেবসেবার প্রস্তুতিতে—নিজেকে “সু-নির্মিত গৃহ” করে তোলা, যা দেবতাদের কাছে হবি/অর্ঘ্য বহন করার উপযুক্ত।
Sukta 10.120
ঋগ্বেদ ১০.১২০ একটি বীররসপূর্ণ, যুদ্ধমুখর স্তোত্র, যেখানে সদ্য-উদিত, বিশ্বে অগ্রগণ্য বিজয়ী শক্তি—উগ্র রূপে ইন্দ্র—এর প্রশংসা করা হয়েছে; তিনি তৎক্ষণাৎ শত্রুদের দমন করেন এবং বাধা অপসারণ করে পথ প্রশস্ত করেন। কবি ‘মন্ত্র/ব্রহ্মণ’কে সক্রিয় সহায়ক হিসেবে দেখান, যা দেবতার অস্ত্র ও গতি-প্রবাহকে শাণিত করে—অন্তর্লোকের প্রেরণাকে বহির্জগতের বিজয়ের সঙ্গে যুক্ত করে। উপসংহারে ইন্দ্রকে অথর্বণীয় কর্তৃত্বে স্বীকৃত এক বিশ্বাত্মক সত্তা হিসেবে স্থাপন করা হয়, যাকে সহায়ক মাতৃ/ভগিনী শক্তিগুলি ধারণ করে ও বৃদ্ধি করে।
Sukta 10.121
এই সূক্তে সৃষ্টির আদ্য নীতি—হিরণ্যগর্ভ, “স্বর্ণগর্ভ”—কে ধ্যান করা হয়েছে; তিনি একমাত্র প্রভু, যিনি স্বর্গ ও পৃথিবীকে ধারণ করেন এবং যাঁর থেকে সকল প্রাণীর উদ্ভব। প্রতিটি ঋচা অনুসন্ধানী ধ্রুবপদ “কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম” (“আমরা কোন দেবতাকে হবিঃ অর্পণ করব?”) দিয়ে শেষ হয়, যা বহু রূপের অন্তরালে একের প্রতি বিস্ময় প্রকাশ করে। শেষ ঋচায় এই অনুসন্ধানের নিষ্পত্তি হয়—প্রজাপতিকে সেই সর্বব্যাপী প্রভু বলে নাম করা হয়, যাঁর কাছে পূর্ণতা ও সমৃদ্ধির জন্য কামনা ও অর্ঘ্য সমর্পিত হয়।
Sukta 10.122
এই সূক্তে অগ্নির প্রশংসা করা হয়েছে—গৃহের শুভ, অ-শত্রুভাবাপন্ন “অতিথি” এবং অপরিহার্য হোতৃ, যিনি মানুষ ও দেবতাদের মধ্যে হবি ও আশীর্বাদ বহন করেন। এতে প্রার্থনা করা হয় যে অগ্নি ধন ও প্রাণশক্তির প্রাচুর্যপূর্ণ “ধারা” মুক্ত করুন, যজমানের গৃহে প্রজ্বলিত হয়ে শুদ্ধ হোন, এবং যজমানদের জন্য স্থায়ী কল্যাণ ও বৃদ্ধি নিশ্চিত করুন। বসিষ্ঠ-বংশ স্পষ্টভাবে এই আহ্বানের দাবি জানায়, ফলে এই স্তোত্রটি আচারগত প্রশংসা ও রক্ষার এক জীবন্ত পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যে স্থাপিত হয়।
Sukta 10.123
ঋগ্বেদ ১০.১২৩-এ বেনাকে এক দীপ্ত, মধ্যস্থ শক্তি হিসেবে স্তব করা হয়েছে—যাকে প্রায়ই গন্ধর্ব–সূর্য-সম্বন্ধিত এক সমুচ্চয় (কমপ্লেক্স) রূপে পাঠ করা হয়—যিনি জন্ম, প্রকাশ/উদ্ঘাটন এবং মহাজাগতিক বিপরীতের মিলনকে প্রেরণা দেন। স্তোত্রগুলি গর্ভস্থ আলোর তীব্র চিত্র, জল (আপঃ) ও সূর্যের সঙ্গম, এবং কাম-প্রতীকী স্বর্গীয় মিলনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে শেষে “বিন্দু/রশ্মি”-র দ্বারা তিন লোক জুড়ে ঋত (ব্যবস্থা) প্রতিষ্ঠার কথায় পরিসমাপ্ত হয়।
Sukta 10.124
এই সূক্তে প্রধানত অগ্নিকে আহ্বান করা হয়েছে—যজ্ঞে আগমন করে পথপ্রদর্শক ও হবি-বাহক অগ্রগামী অগ্নি রূপে—যিনি সামনে এগিয়ে স্থায়ী আলোর দ্বারা দীর্ঘ অন্ধকার দূর করেন। স্তবগুলির অগ্রগতিতে সূক্তটি অগ্নির সীমা ছাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট সার্বভৌমত্ব/অধিপত্যের বিষয়ও স্পর্শ করে—ঋত বনাম অসত্য (বরুণ), বৈরী শক্তির ক্ষয়, এবং শেষে প্রতীকী চিত্রকল্পের মাধ্যমে ইন্দ্রের স্বীকৃতি—যা উত্তর-ঋগ্বৈদিক প্রবণতা নির্দেশ করে: একটিমাত্র আচার-আধ্যাত্মিক গতিপ্রবাহে বহু দেবতাকে বুনে নেওয়া।
Sukta 10.125
ঋগ্বেদ ১০.১২৫ প্রসিদ্ধ দেবী-সূক্ত, যেখানে বাক্ (বাণী) প্রথম পুরুষে নিজেকে সর্বব্যাপী দিব্য শক্তি রূপে ঘোষণা করে—যে প্রতিটি দেবতা ও সকল মহাজাগতিক ক্রিয়ার সঙ্গে থাকে এবং তাদের ধারণ করে। স্তোত্রটি জানায় যে প্রেরিত বাণী কর্তৃত্ব দান করে, মানুষকে ঋষি বা ব্রহ্মা করে তোলে, এবং স্বর্গ ও পৃথিবীর সীমা অতিক্রম করে বিস্তার লাভ করে—ফলে বাক্ সৃষ্টির, জ্ঞানের ও সার্বভৌম অধিকার/প্রভুত্বের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক নীতি হিসেবে প্রকাশিত হয়।
Sukta 10.126
এই সূক্তটি আদিত্যদের—বরুণ, মিত্র ও আর্যমণ—কেন্দ্র করে রচিত এক রক্ষাকারী ও মুক্তিদায়ক প্রার্থনা। তারা ‘একসঙ্গে এক মন’ হয়ে অগ্রসর হন এবং উপাসককে বৈরিতা, পাপ ও দুর্ভাগ্য অতিক্রম করিয়ে নিয়ে যান। পরে স্তোত্রটি দেবীয় সহায়কদের বৃহত্তর জোটে প্রসারিত হয়—মরুতসহ রুদ্র, ইন্দ্র, অগ্নি ও বসুগণ—এবং মঙ্গল (স্বস্তি), বন্ধন/ক্লেশ থেকে মুক্তি, ও আরও পূর্ণ ও স্থিত প্রাণশক্তিসম্পন্ন জীবনে নিরাপদ গমন কামনা করে।
Sukta 10.127
এই সূক্তে রাত্রী দেবীর স্তব করা হয়েছে—তিনি এক দিব্য শক্তি, যিনি বহু আলোর সঙ্গে প্রকাশিত হন, সকল দীপ্তি একত্র করেন এবং জগতকে নীরবতা ও নিরাপত্তায় স্থিত করেন। এখানে রাত্রীর কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে যেন তিনি বিচরণশীল প্রাণীদের ও অন্তরের অস্থিরতাকে শান্ত করেন, গৃহস্থালিকে রক্ষা করেন, এবং কবির এই স্তোত্রকে শান্তি ও মঙ্গললাভের অন্বেষকের নিবেদনরূপে গ্রহণ করেন।
Sukta 10.128
এই সূক্তটি বিজয় ও রক্ষার প্রার্থনা; এতে অগ্নিকে সংঘর্ষে তেজ/বর্চসের অন্তর্গত ও বহিরঙ্গ সেনাপতি হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে এবং কামনা করা হয়েছে যে সকল দিক ও শক্তি অনুকূল হোক। অগ্নির অধিপত্যের স্তব থেকে এটি প্রসারিত হয়ে বৃহত্তর দেবসমাবেশকে আহ্বান করে—দেবীগণ, বিশ্বদেবগণ, সোম, ইন্দ্র–অগ্নি এবং দেবশ্রেণি (বসু, রুদ্র, আদিত্য)—যাতে সন্তানলাভ, দেহের অখণ্ডতা/রক্ষা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাভব নিশ্চিত হয়।
Sukta 10.129
নাসদীয় সূক্ত উৎসের রহস্য নিয়ে ধ্যান করে এবং ‘অস্তিত্ব’ ও ‘অনস্তিত্ব’-এর আগে কী ছিল—এই বিষয়ে সহজ নিশ্চিততাকে অস্বীকার করে। এটি অবিভক্ত, আচ্ছাদিত অবস্থা থেকে মন/চেতনার প্রথম সঞ্চালন এবং কামনা/ইচ্ছার উদ্ভব পর্যন্ত এক সূক্ষ্ম গতির আভাস দেয়, এবং বারবার জ্ঞানের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই স্তোত্রের উদ্দেশ্য কোনো কঠোর, নিশ্চিত সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা করা নয়; বরং পরম তত্ত্ব—‘তদ্ একম্’—এর সামনে বিস্ময়, অনুসন্ধান এবং শ্রদ্ধামিশ্রিত অজ্ঞেয়তাকে পবিত্র করে তোলা।
Sukta 10.130
এই সূক্তে যজ্ঞকে (বলিদান/অনুষ্ঠান) এক মহাজাগতিক তাঁত হিসেবে দেখানো হয়েছে—দিব্য “কর্মপ্রবাহ” দ্বারা সর্বদিকে প্রসারিত এক জাল, যা পিতৃগণ বুনে দেন এবং প্রেরণাপ্রাপ্ত ঋষিরা ধারণ করে রাখেন। একই সঙ্গে এতে দেবতা ও বৈদিক ছন্দ (ছন্দस्)-এর মধ্যে এক চিন্তাশীল মানচিত্রায়নও আছে, যা ইঙ্গিত করে যে যথার্থ যজ্ঞীয় বাক্ এবং সঠিক মাত্রা-পরিমাপই বিশ্ব-শৃঙ্খলা (ঋত)-র কার্যকর প্রকাশ।
Sukta 10.131
এই উত্তরকালীন ঋগ্বৈদিক সূক্তে ইন্দ্রকে আহ্বান করা হয়েছে—তিনি যেন চার দিকের রক্ষক হয়ে প্রতিটি দিক থেকে আসা শত্রু শক্তিকে দূরে নিক্ষেপ করেন, যাতে উপাসকেরা তাঁর বিস্তৃত আশ্রয়ে (শর্মন) আনন্দ করতে পারে। এতে রক্ষামূলক, অপদেবতা-নিবারক প্রার্থনার সঙ্গে পৌরাণিক স্মরণ (অশ্বিনদের সঙ্গে নমুচি-প্রসঙ্গসহ) মিশে আছে, যাতে ইন্দ্রের বিজয়ী শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সামষ্টিক কল্যাণ সুরক্ষিত থাকে। সূক্তের পরিণতি এই কামনায়—আমরা দেবতার কল্যাণময় মনে নিবাস করি এবং ক্ষুদ্রতম শত্রুতাও বহু দূরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
Sukta 10.132
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে অশ্বিনদের প্রশংসা করা হয়েছে—তাঁরা দ্রুতগামী, কল্যাণকারী সহায়ক, যাঁরা সত্য যজমানকে শক্তি দেন। দ্যৌ ও পৃথিবীকে সহায়ক মহাজাগতিক শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যারা উপাসকের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করে। এতে এক তীক্ষ্ণ রাজ-নৈতিক সুরও আছে—বরুণকে সর্বরাজ হিসেবে আহ্বান করা হয়েছে, যিনি পাপ সংযত করেন এবং অন্যায়ের অবসান ঘটান। সূক্তের শেষে ব্যক্তিগত সাক্ষ্যধর্মী প্রার্থনা—অশ্বিনদের অগ্রসর সহায়তা যেন গায়কদের দুঃখ-কষ্ট ও সংকটের পারাপারে বহন করে নিয়ে যায়।
Sukta 10.133
এই সাত ঋচাবিশিষ্ট ইন্দ্রসূক্তটি রক্ষা ও বিজয়ের জন্য এক যুদ্ধপ্রার্থনা। গায়কেরা ইন্দ্রকে জগত্-নির্মাতা ও বৃত্রহন্তা রূপে জাগিয়ে তোলে—যেন তিনি নিকট যুদ্ধে তাদের পাশে দাঁড়ান এবং শত্রুবাহিনীকে বিভ্রান্ত করেন। ধ্রুবপদের মতো বারবার প্রার্থনা করা হয়—প্রতিপক্ষের ধনুকের ডোর যেন ঢিলে হয়ে যায় এবং আক্রমণকারীরা যেন নিচে দমিত হয়; শেষে আসে প্রাচুর্যের বর—স্তোতৃ কবির প্রতি ইন্দ্রের দান সহস্রধারায় প্রবহমান, ঐশ্বর্যদায়িনী গাভীর মতো উজাড় হয়ে ঝরে পড়ুক।
Sukta 10.134
এই সূক্তে ইন্দ্রের স্তব করা হয়েছে—তাঁকে বিশাল, বিশ্ব-বিস্তৃত সার্বভৌম রূপে; তাঁর শক্তি কেবল বীরত্বময় নয়, বরং দেবী জনিত্রী—শুভ মাতৃশক্তি—দ্বারা প্রসূত সৃজনক্ষমতাও। এতে ইন্দ্রের মহাজাগতিক কর্ম (দ্যৌ ও পৃথিবীর বিস্তার, প্রতিপক্ষকে ঝেড়ে ফেলা) সোম-পেষকের প্রতি তাঁর প্রত্যক্ষ সহায়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, এবং ‘রয়ি’—প্রাচুর্য ও পরিপূর্ণতা—দানের কথা বলা হয়েছে। শেষে আছে অসাম্প্রদায়িক ভক্তির অঙ্গীকার—কোনো দেবতাকে বাধা না দেওয়া—এবং ‘মন্ত্র-শ্রবণ’-এর মাধ্যমে অন্তর্মুখী আরোহনের ইঙ্গিত, যেন যথার্থ শ্রবণে ডানা মেলে ঊর্ধ্বে ওঠা।
Sukta 10.135
এই সংক্ষিপ্ত, রহস্যময় সূক্তে যমের লোক ও পিতৃ-পথ নিয়ে ধ্যান করা হয়েছে। পিতৃগণকে এক “সুন্দর পাতাবহুল বৃক্ষ”-এ অধিষ্ঠিত রূপে কল্পনা করা হয়, যেখানে যম দেবগণের সঙ্গে সংলাপ করেন, এবং প্রয়াত পিতা সেই প্রাচীন পথে আনন্দ লাভ করেন। এক যুবকের রথকে গতিময় করা এবং বাহকস্বরূপ অনুসরণকারী সামন্-গানের ধাঁধাময় চিত্রকল্পের মাধ্যমে সূক্তটি ইঙ্গিত দেয় যে সুশৃঙ্খল পবিত্র বাক্ এবং যথাযথ অর্ঘ্য-অর্পণ আত্মার যাত্রা, পথনির্দেশ ও মুক্তিকে সহায়তা করে।
Sukta 10.136
এই সূক্তে কেশিন বা মুনি—দীর্ঘকেশী, অনুপ্রাণিত তপস্বী—এর স্তব করা হয়েছে। তাঁকে এক সীমান্তবর্তী ও দীপ্তিমান সত্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি অগ্নি ও বিষের মতো বিপরীতকে ধারণ করেন এবং নানা লোকের মধ্যে অবাধে বিচরণ করেন। মুনিকে বায়ু-চালিত, দেব-প্রেরিত এবং ‘দেবদের দেব’-এর সহচর বলা হয়েছে; এতে বৈদিক আদর্শ হিসেবে অন্তর্গত স্বাধীনতা, অনুপ্রেরণা ও দর্শনশক্তির প্রকাশ ঘটে।
Sukta 10.137
এই সংক্ষিপ্ত আরোগ্য-সূক্তে সমষ্টিগত দেবতাদের পুনরুদ্ধারকারী শক্তি রূপে আহ্বান করা হয়েছে—যাতে তাঁরা পতিত/অবল ব্যক্তিকে আবার বল ও সামর্থ্যে তুলে ধরেন, এমনকি রোগটি যদি কোনো দোষ বা ভুলের সঙ্গে যুক্ত বলেও ধরা হয়। এতে প্রার্থনা, রক্ষাকবচস্বরূপ আশীর্বাদ, এবং ‘মন্ত্র-স্পর্শ’ নামক আচার-মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়ার সংযোগ আছে; যা যক্ষ্মা (ক্ষয়কারী ব্যাধি) দূর করে অখণ্ডতা ও অনাময়তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
Sukta 10.138
এই সংক্ষিপ্ত ইন্দ্র-সূক্তে দেবতার প্রসিদ্ধ সাফল্যগুলি স্মরণ করা হয়েছে: তিনি বাল (Vala) নামক আবরণকারী শক্তিকে চূর্ণ করেন, উষা ও জলধারাকে মুক্ত করেন, এবং সাপসদৃশ সংকোচনের বিরুদ্ধে কুৎসের জন্য বিজয় নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে এটি ইন্দ্রকে কেবল যুদ্ধনায়ক নয়, বিশ্ব-ব্যবস্থাপক রূপেও উন্নীত করে—মাসসমূহের মাধ্যমে সময়ের বিধান/ঋত প্রতিষ্ঠা করা এবং ‘অযজ্বন’ (যে যজ্ঞ করে না) কে যজ্ঞোপযুক্ত করে তোলার কৃতিত্বও তাঁরই বলে মানে।
Sukta 10.139
এই সূক্তে সavitṛ-এর উষা-প্রেরণা—আলোরূপে তাঁর স্থির উদয়—কে Pūṣan-এর পথপ্রদর্শক ও রক্ষাকারী গতি সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; তিনি সকল লোককে “দেখে” তাদের পালন ও সুরক্ষা করেন। এরপর এটি এক পৌরাণিক-যজ্ঞীয় দৃষ্টিতে প্রসারিত হয়, যেখানে আপঃ, গন্ধর্ব (বিশ্বাবসু) এবং ইন্দ্র একত্রে ঋতকে প্রকাশ করেন—গুপ্ত সীমারেখা, দীপ্ত দিগন্ত, এবং পাথরসদৃশ আবরণে রুদ্ধ ধন/অমৃত (শক্তি)-এর মুক্তি।
Sukta 10.140
এই ছয়-ঋচাযুক্ত সূক্তে অগ্নির স্তব করা হয়েছে—তাঁকে ব্যাপক-দীপ্ত, সর্ব-আলোকদায়ী শক্তি রূপে, যাঁর রশ্মি ও বল উপাসকের মধ্যে বিজয়দায়ক পূর্ণতা (বাজ) প্রতিষ্ঠা করে। এতে প্রার্থনা করা হয় যে অগ্নি জনসমাজের মধ্যে প্রসারিত হোন, যজমানকে ধন ও কার্যকর সংকল্পশক্তি (ক্রতু) দ্বারা সমৃদ্ধ করুন, এবং ঘোষণা করা হয় যে প্রতিটি যুগে মানবজাতি আশীর্বাদের জন্য অগ্নিকে অগ্রে স্থাপন করে, তাঁকে দিব্য, ঋত-বহনকারী নেতা হিসেবে গেয়ে থাকে।
Sukta 10.141
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তটি একটি সামূহিক আহ্বান, যেখানে অগ্নি, সোম, আদিত্যগণ, বিষ্ণু, সূর্য এবং বিশেষত ইন্দ্র–বায়ু সহ বৃহস্পতিকে—এই প্রধান বৈদিক শক্তিগুলিকে একত্র করে উপাসকদের প্রতি অনুকূলভাবে মুখ ফেরাতে ও সাহায্য করতে প্রার্থনা করা হয়েছে। এর ব্যবহারিক লক্ষ্য সমৃদ্ধি ও রক্ষা, এবং সামাজিক লক্ষ্য ঐক্য—যাতে সভায় সকলেই একত্র হলে ‘এক শুভ মন’ বা একমনা হয়ে ওঠে।
Sukta 10.142
এই সংক্ষিপ্ত অগ্নি-সূক্তে উপাসকের অগ্নির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা প্রকাশিত—তাঁকেই একমাত্র নিশ্চিত আশ্রয় জেনে। এতে অনিষ্টকারী ও বিধিভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে “ত্রি-রক্ষিত” সুরক্ষার প্রার্থনা করা হয়েছে। এরপর অগ্নিকে একত্রকারী ও শৃঙ্খলা-স্থাপনকারী শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি বহু গতিকে এক সঠিক পথে আনেন। শেষে মঙ্গলজনক বৃদ্ধি ও জলের চিত্রকল্প আসে—দূর্বা ঘাস, হ্রদ ও পদ্ম—যা দেবতার আগমন-গমনের সঙ্গে সঙ্গী হয়ে থাকে।
Sukta 10.143
এই সংক্ষিপ্ত অশ্বিন-স্তোত্রে নাসত্যা যুগলকে আহ্বান করা হয়েছে—তাঁরা দ্রুত উদ্ধারক ও নবজীবনদাতা, যাঁরা জীবনে শক্তি, সক্ষমতা এবং সঠিক গতি পুনঃস্থাপন করেন। অত্রি ও কক্ষীবন্ত প্রভৃতি ঋষিদের প্রতি তাঁদের পুনরুজ্জীবক সহায়তার স্মরণ করে কবি প্রার্থনা করেন, তাঁরা যেন উপাসকের “প্রশস্ত আসনে” আগমন করেন, সম্প্রদায়কে বিপদ-দুর্গতি অতিক্রম করে নিরাপদে পার করান, এবং তাদেরকে উপচে-পড়া পুষ্টি ও সদ্ভাবনায় পরিপূর্ণ করেন।
Sukta 10.144
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে পেষিত সোম (ইন্দু)-কে এক জীবন্ত, ধাবমান শক্তি হিসেবে বন্দনা করা হয়েছে—যা “অমর্ত্য” প্রাপকের উদ্দেশে নিবেদিত এবং যার পরিণত লক্ষ্য স্পষ্টতই ইন্দ্র। সোমকে অশ্বের ন্যায় দ্রুতগামী, প্রাণধারক ও বিচক্ষণ (দক্ষ) বলা হয়েছে; আর সুপর্ণ/শ্যেন-প্রতীকের সূত্রে তাকে দূর অতীত-পারের দেশ থেকে আনা এক অমূল্য ধনরূপে চিত্রিত করা হয়েছে। সূক্তটির উদ্দেশ্য হলো সোমকে সেই শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যা প্রাণবল, সংকল্প (ক্রতু) এবং দেবীয় বিজয়কে বৃদ্ধি করে।
Sukta 10.145
এই সংক্ষিপ্ত স্তোত্রটি একটি ব্যবহারিক ওষধি-সূক্ত—একটি মন্ত্র-প্রয়োগ, যেখানে শক্তিশালী উদ্ভিদ-শক্তিকে আহ্বান করে “সপত্নী” (প্রতিদ্বন্দ্বী/বাধাদানকারী উপস্থিতি) দূর করা হয় এবং আকর্ষণ, সামঞ্জস্য ও ন্যায্য মিলন পুনঃস্থাপিত হয়। বক্তা আচারানুষ্ঠানে সেই ভেষজকে “খনন করে” তুলে এনে তাকে জয়দায়ক, বশীকরণকারী শক্তি হিসেবে প্রয়োগ করে, যাতে কাম্য ব্যক্তির মন ঘুরে—বাছুরের দিকে দৌড়ানো গাভীর মতো—ফিরে আসে, আর প্রতিদ্বন্দ্বীকে বহু দূরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
Sukta 10.146
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে অরণ্যানী—অরণ্যের জীবন্ত উপস্থিতি—এর প্রশংসা করা হয়েছে। তাঁকে নির্ভয়, অধরা, এবং সমৃদ্ধভাবে পোষণদাত্রী, তবু গ্রামজীবনের অতীত এক শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এতে অরণ্যের রহস্যময় ধ্বনিপ্রপঞ্চ—ডাক, খটখট শব্দ, আর কল্পিত কণ্ঠস্বর—ধরা পড়ে, যা নিঃসঙ্গতাকে দেবীয়, স্নেহময় ও লালনকারী আবহে রূপান্তরিত করে। সূক্তের শেষে অরণ্যানীকে সুগন্ধিময়, প্রাচুর্যপূর্ণ, এবং বন্য প্রাণীদের জননী বলে বন্দনা করা হয়েছে—যিনি লাঙলের স্পর্শে অক্ষত।
Sukta 10.147
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে ইন্দ্রের স্তব করা হয়েছে তাঁর ‘মন्यु’—তাঁর প্রথমজাত ক্রোধশক্তির মাধ্যমে, যা বৃত্রকে বিদীর্ণ করে আবদ্ধ জলধারাকে মুক্ত করেছিল, ফলে দ্যৌ ও পৃথিবী পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। এরপর সূক্তটি সামাজিক ও যজ্ঞীয় পরিসরে এসে প্রার্থনা করে—ইন্দ্র যেন উদার দাতাদের কথা শোনেন এবং স্নেহশীল পিতার মতো উপাসকদের স্থান, সম্পদ, রক্ষা ও ন্যায্য বণ্টন বৃদ্ধি করেন।
Sukta 10.148
এই সংক্ষিপ্ত ইন্দ্র-স্তোত্রে সোম-নিষ্পেষকদের প্রশংসাই মুখ্য; ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করা হয় ‘সুবিতা’—অর্থাৎ শুভ গমনপথ ও যথার্থ সাফল্য—এবং সেই প্রাণোদ্দীপক ‘বাজ’ আনতে, যা তাঁর বিপুল বীরশক্তির সহচর। কবি উপাসনাকে পারস্পরিক আনন্দ হিসেবে দেখান: মানুষ সোম ও পুষ্টিদায়ক হবি দিয়ে ইন্দ্রকে প্রীত করে, আর ইন্দ্র প্রতিদানে তাদের অন্তর্নিহিত শক্তি ও দেহধারী জীবনকে ধারণ করেন। স্তোত্রের পরিণতি ঘটে বিস্তৃত পৃথিবী থেকে ওঠা এক জীবন্ত আহ্বানে—দ্রুত অশ্বেরা প্রেরিত বাক্যকে ইন্দ্রের ঘৃত-উজ্জ্বল আসনের দিকে বহন করে।
Sukta 10.149
সাবিতৃ (দিব্য প্রেরক)-কে নিবেদিত এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে তাঁর সেই বিশ্ব-নিয়ামক ‘যোজন/সংযোজন’ শক্তির প্রশংসা করা হয়েছে, যার দ্বারা পৃথিবী ও দ্যৌ স্থির হয়ে যথাযথ ক্রমে প্রতিষ্ঠিত থাকে, এবং অন্তরিক্ষ ও সমুদ্র অপ্রতিহত নিয়মের সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। এরপর ধর্মানুসারে চলমান সাবিতৃর পক্ষীসদৃশ প্রতীক (গরুত্মান)-এর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়, এবং শেষে কবির জাগ্রত, ভক্তিময় সতর্কতা প্রকাশ পায়—সাবিতৃর উদ্দীপক প্রেরণার অপেক্ষায়, যেমন কেউ সোমের দীপ্ত রশ্মির জন্য প্রহরা দেয়।
Sukta 10.150
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে হব্যবাহন, জাতবেদস অগ্নিকে আহ্বান করা হয়েছে—তিনি যেন আদিত্য, রুদ্র ও বসু প্রভৃতি প্রধান দেবগণের সঙ্গে একত্রে আগমন করেন এবং মৃळীকা (আরোগ্যদায়ী কৃপা) প্রদান করেন। অগ্নির প্রশংসা করা হয়েছে নিত্য-নব প্রজ্বলিত অগ্নি হিসেবে, যিনি দেবতাদের আহ্বান করেন এবং উপাসকদের জন্য রক্ষাকারী ও মঙ্গলময় উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেন। শেষ মন্ত্রে খ্যাতনামা ঋষি ও রাজাদের প্রতি অগ্নির পূর্ব সহায়তার স্মরণ করা হয়েছে, যাতে সেই স্মৃত দৃষ্টান্তের ভিত্তিতে বর্তমান সহায়তা প্রার্থনা করা যায়।
Sukta 10.151
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে ‘শ্রদ্ধা’ (বিশ্বাস/সম্মতি)কে এমন এক গোপন শক্তি হিসেবে ব্যক্ত করা হয়েছে, যা যজ্ঞকে কার্যকর করে—অগ্নিকে প্রজ্বলিত করে, আহুতিকে উর্ধ্বে তোলে, এবং ভগের মাধ্যমে কল্যাণকর ভাগ্য/অংশ নির্ধারণ নিশ্চিত করে। প্রার্থনা করা হয় যে শত্রু শক্তির মধ্যে দেবতারা যে অটল আস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই একই আস্থা যজমানের উদ্দেশ্যেও প্রতিষ্ঠিত হোক। দিনের তিন সন্ধিক্ষণ—উষা, মধ্যাহ্ন ও সূর্যাস্ত—জুড়ে শ্রদ্ধাকে আহ্বান করা হয়, যাতে সত্যাভিমুখ সংকল্প হৃদয়ে দৃঢ় হয়।
Sukta 10.152
এই সংক্ষিপ্ত ইন্দ্র-স্তোত্রে দিব্য শাসক-শক্তিকে অব্যর্থ সহায় রূপে আহ্বান করা হয়েছে, যিনি তাঁর সঙ্গীকে অজেয় করেন। এতে ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা—তিনি যেন বাধাদানকারী শক্তি (রক্ষস্, মৃধঃ, বৃত্র) চূর্ণ করেন, শত্রুদের ক্রোধ ছত্রভঙ্গ করেন, এবং শত্রু-আঘাতের বিরুদ্ধে বিস্তৃত আশ্রয় (শর্ম) প্রতিষ্ঠা করেন। সার্বিকভাবে, এটি সংঘাত, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব/অস্থিরতার মুখোমুখি ব্যক্তিদের জন্য সংক্ষিপ্ত রক্ষাকবচ ও বিজয়-প্রার্থনা।
Sukta 10.153
এই সংক্ষিপ্ত ইন্দ্র-সূক্তে কর্মে প্রবৃত্ত ‘কর্মকারীদের’ মধ্যে দেবতার নবজাগ্রত উপস্থিতির প্রশংসা করা হয়েছে; তারা বীরশক্তি (সুবীর্য) লাভ ও ভাগ করে নিতে তাঁর কাছে আসে। এতে ইন্দ্রের চিরপরিচিত বিশ্বকীর্তি—বৃত্রবধ, অন্তরীক্ষের বিস্তার, এবং দ্যৌকে স্থিতি দিয়ে ধারণ করা—স্মরণ করা হয়েছে; এবং শেষে তাঁকে সেই সর্বাধিপতি শক্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যিনি ওজস্ (সংকেন্দ্রিত পরাক্রম) দ্বারা সকল সত্তাকে অতিক্রম করেন। এই স্তোত্রের উদ্দেশ্য রক্ষা, বল এবং সফল সম্পাদনের জন্য ইন্দ্রের বিজয়ী শক্তিকে আহ্বান করা।
Sukta 10.154
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তটি অন্ত্যেষ্টি/পিতৃ-সম্পর্কিত প্রার্থনা; এতে প্রার্থনা করা হয়েছে যে প্রয়াতজনকে সেই ধন্য সঙ্গের কাছে পৌঁছে দেওয়া হোক, যেখানে সোম মধুর রসে, ঘৃতসদৃশ দীপ্তিতে এবং পবিত্র হব্য-অর্ঘ্যরূপে প্রবাহিত হয়। এতে ‘সুগত’—অর্থাৎ শুভগতিপ্রাপ্ত—জনদের নানা শ্রেণির নাম করা হয়েছে: যুদ্ধে বীর, আত্মোৎসর্গকারী, মহান দাতা, এবং তপস্যাজাত ঋষি-দ্রষ্টা; আর যমের অধীনে তাদের জ্যোতির্ময় লোক লাভ করুক—এই মর্মে আত্মার জন্য নিবেদন করা হয়েছে।
Sukta 10.155
এই সংক্ষিপ্ত অপোত্রপায়িক (অপশকুন-নিবারক) সূক্তে আরায়ি—অভাব, শত্রুভাবাপন্ন দারিদ্র্য ও দুর্ভাগ্য—কে প্রবলভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে আদেশ করা হয় দূর, জনশূন্য স্থানে (পর্বত, নদীর অপর তীর) চলে যেতে। দুঃখ-দুর্দশাকে হেঁকে সরিয়ে দিতে ও আঘাত হানতে সক্ষম সহায় শক্তি ‘শিরিম্বিঠ’-কে আহ্বান করা হয়। শেষে অগ্নি ও ‘গো/আলোক’-কে কেন্দ্র করে এক আত্মবিশ্বাসী রক্ষাকবচের ঘোষণা—এই সুরক্ষিত বৃত্ত অজেয়।
Sukta 10.156
এই সংক্ষিপ্ত অগ্নি-সূক্তে প্রেরিত ভাবনা ও স্তবের দ্বারা অগ্নিকে প্রতিযোগিতায় দ্রুত অশ্বের মতো অগ্রসর হতে উদ্দীপিত করা হয়, যাতে উপাসক বারংবার প্রাচুর্য (ধনং-ধনম্) লাভ করে। এতে প্রার্থনা করা হয়েছে যে অগ্নি বিস্তৃত ও দৃঢ় সম্পদ—আলো, গবাদি পশু এবং দ্রুত শক্তি—নিয়ে আসুন, অন্তর্গত পণি (সঞ্চয়ী, বাধাদানকারী প্রবণতা)কে নিপাত করুন, এবং জনগণের ধ্বজ-আলোর মতো এই স্তোত্রের প্রতি জাগ্রত হন।
Sukta 10.157
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে বিশ্বে দেবাঃ-সহ ইন্দ্রকে আহ্বান করা হয়েছে, যাতে তিনি “লোকসমূহকে যথাযথ ক্রমে স্থাপন” করেন—অস্তিত্বের নানা স্তর ও মানবজীবনে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে প্রার্থনা করা হয়েছে যে ইন্দ্র, আদিত্য ও মরুতদের সঙ্গে, আমাদের দেহধারী প্রাণশক্তির রক্ষক হন; এবং শেষে পবিত্র রশ্মি-গীত (অর্ক) অন্তর্মুখী করে স্বধা—নিজস্ব অন্তর্নিহিত বিধান ও ধারণক্ষমতা—পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
Sukta 10.158
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তটি রক্ষা ও আরোগ্যের প্রার্থনা; এতে তিন লোক জুড়ে ত্রয়ী বিশ্ব-রক্ষককে আহ্বান করা হয়েছে—স্বর্গে সূর্য, মধ্যলোকে/অন্তরিক্ষে বায়ু (বাত), এবং পৃথিবীতে অগ্নি—যাতে উপাসকের সর্বস্তরে নিরাপত্তা স্থাপিত হয়। এরপর সূক্তটি দৃষ্টি (চক্ষুস্) পুনরুদ্ধার ও প্রসারণের দিকে ফিরে যায়, এবং যে দেবশক্তিগুলি দৃষ্টিকে স্থাপন, স্থিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করে তাদের কাছে বাহ্য ও অন্তর্দৃষ্টি—উভয়েরই নির্মল দর্শন দানের প্রার্থনা করে। শেষে কামনা করা হয়, সূর্য যেন ‘সম্পূর্ণরূপে দৃশ্যমান’ হয়ে ধরা দেন, এবং মানুষের দৃষ্টি আলোকিত হয়ে বিস্তৃতভাবে দেখতে পারে।
Sukta 10.159
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তটি নারীর প্রথম-পুরুষ কণ্ঠে—যা প্রায়ই কনে বা স্ত্রীর বাণী হিসেবে পাঠ করা হয়—যেখানে তিনি উদীয়মান সূর্য এবং ভাগ (যিনি প্রত্যেককে তার ন্যায্য অংশ প্রদান করেন)কে আহ্বান করেন, যাতে দাম্পত্য-সংযোগ, সমৃদ্ধি ও সামাজিক কর্তৃত্ব সুদৃঢ় হয়। এটি ‘সপত্নী’ (প্রতিদ্বন্দ্বিনী স্ত্রী/নারী) এবং সুর-সামঞ্জস্য ভঙ্গকারী ক্ষয়কারী শক্তির বিরুদ্ধে এক বিজয়-চর্ম/বিজয়-মন্ত্ররূপে কাজ করে, এবং গৃহলক্ষ্মীকে ইন্দ্রের দ্বারা দৃষ্টান্তিত বিজয়ী শক্তির সঙ্গে সঙ্গত করে।
Sukta 10.160
এই সংক্ষিপ্ত ইন্দ্র-সূক্তে দেবতাকে নিবিড়ভাবে আহ্বান করা হয়েছে—তিনি যেন বর্তমান যজমানের সঙ্গেই অবস্থান করেন এবং সদ্য নিংড়ানো, প্রবল সোমরসকে রক্ষা করেন। এতে প্রার্থনা করা হয় যে ইন্দ্র যজ্ঞস্থলে তাঁর অশ্বদের জোয়াল খুলে এখানেই বিশ্রাম নিন, প্রতিদ্বন্দ্বী পৃষ্ঠপোষকদের টানে যেন “দূরে টেনে নেওয়া” না হন, এবং উপাসককে ইন্দ্রের চিরাচরিত দান—গাভী, অশ্ব ও বিজয়দায়ক শক্তি—প্রদান করুন। সূক্তটি জোর দিয়ে বলে যে সম্পূর্ণ হৃদয়ে, দেব-আকাঙ্ক্ষী নিবেদনই ইন্দ্রের অনুগ্রহ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে।
Sukta 10.161
এই সংক্ষিপ্ত ভৈষজ্য/আয়ুষ্য সূক্তে ইন্দ্র ও অগ্নির যুগল শক্তিকে আহ্বান করা হয়েছে, যাতে তাঁরা ভুক্তভোগীকে আঁকড়ে ধরা ও ক্ষয়সাধক রোগব্যাধি এবং অদৃশ্য “গ্রাহী” (গ্রাসকারী/ধারক) থেকে মুক্ত করেন। হবিস্ (আহুতি) ও পবিত্র বাক্শক্তির প্রভাবে রোগীকে প্রতীকীভাবে “ফিরিয়ে আনা” হয়—দৃষ্টি, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও আয়ুষ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়—এবং তাকে দুরিত (দুঃখ, দুর্ভাগ্য, কুমার্গ/ভ্রান্ত গতি) অতিক্রম করিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
Sukta 10.162
এই সংক্ষিপ্ত রক্ষামূলক সূক্তে ব্রহ্মশক্তিতে বলীয়ান অগ্নিকে ‘রক্ষোহা’ (শত্রু/অশুভ শক্তির বিনাশক) রূপে আহ্বান করা হয়েছে, যাতে তিনি গর্ভে প্রবেশ করে গর্ভধারণ ও সন্তান-সন্ততিকে বিপন্নকারী ক্ষয়কর, কুখ্যাত উপস্থিতিকে তাড়িয়ে দেন। এতে অনুপ্রবেশের নানা রূপের উল্লেখ আছে—শরীরের কাছে লুকিয়ে থাকা, যোনির ভিতরে সরে/হেঁটে ঢুকে পড়া, এবং স্বপ্ন ও অন্ধকারের মাধ্যমে বিভ্রম সৃষ্টি করা—এবং বারবার আদেশ করা হয়েছে যে অপসারণকারী শক্তি সেই বিপদকে দূরে হেঁকে দিক। সূক্তটি উচ্ছেদমূলক-চিকিৎসামূলক প্রার্থনা হিসেবে উর্বরতা, গর্ভাবস্থা এবং বংশধারার ধারাবাহিকতা রক্ষার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত।
Sukta 10.163
এই সংক্ষিপ্ত চিকিৎসামন্ত্রটি ‘উপড়ে ফেলা/বের করে আনা’ (vṛh-) ধরনের এক ‘এক্সট্র্যাকশন’ সূত্র, যার লক্ষ্য ক্ষয়কারী ব্যাধি ‘যক্ষ্মন্’কে রোগীর দেহের প্রতিটি অংশ থেকে শিকড়সহ উৎখাত করা। স্তবক ধরে ধরে এতে দেহের নানা অঞ্চল—মস্তক ও ইন্দ্রিয় থেকে শুরু করে কোমর, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, কেশ এবং সন্ধি পর্যন্ত—নাম করে রোগকে আচারগতভাবে পৃথক করা হয় এবং দেহের অখণ্ডতা/সম্পূর্ণতা পুনঃস্থাপিত হয়। এখানে আহ্বানিত শক্তি প্রধানত মন্ত্র নিজেই এবং নাম ধরে রোগকে চিহ্নিত করা, তার অবস্থান নির্ধারণ করা ও তাকে বহিষ্কার করার চিকিৎসামূলক ক্রিয়ায় নিহিত।
Sukta 10.164
ঋগ্বেদ ১০.১৬৪ একটি অপশকুন-নিবারক ও প্রায়শ্চিত্তমূলক সূক্ত, যা মনকে নিরৃতি (ক্ষয়, বিনাশ, দুর্ভাগ্য) থেকে ফিরিয়ে জীবন, বিস্তার এবং মঙ্গলময় দিকের দিকে সচেতনতা পুনর্নিবেশিত করে। এতে প্রার্থনা করা হয় যে জাগ্রত বা নিদ্রায়—ভয়, অভিশাপ, বা বিভ্রান্ত/কুদ্দেশ্যপূর্ণ অভিপ্রায়ে—কৃত দোষসমূহ শুদ্ধিকারী শক্তি (বিশেষত অগ্নি) দ্বারা অপসারিত হোক, এবং যজমানের কাছ থেকে অশুভ সংকল্পকে প্রতিরক্ষামূলকভাবে স্থানান্তর করে দূরে পাঠিয়ে আচারকে সুরক্ষিতভাবে সম্পন্ন করা হোক।
Sukta 10.165
এই সংক্ষিপ্ত অপোত্রপায়িক (অপশকুন-নিবারক) সূক্তে সকল দেবতাকে একত্রে সম্বোধন করে একটি অমঙ্গলসূচক লক্ষণ দূর করার প্রার্থনা করা হয়েছে—একটি কবুতরের আবির্ভাব, যা নিরৃতি (দুর্ভাগ্য, বিনাশ/বিলয়)-র দূত বলে ধরা হতে পারে। মন্ত্র-ঋচের দ্বারা সূক্তটি ‘নিষ্কৃতি’ (মুক্তি/পরিত্রাণ) সম্পাদন করে এবং সকল জীবিত সমৃদ্ধি—দুই-পদ ও চতুষ্পদ—বিশেষত যজ্ঞাগ্নির পরিসর/অগ্নিস্থানের চারদিকে—রক্ষার কামনা করে।
Sukta 10.166
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তটি এক প্রতিযোগিতামূলক, আত্ম-প্রতিষ্ঠাকারী মন্ত্র, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপর প্রাধান্য চাওয়া হয়েছে—সমকক্ষদের মধ্যে “বৃষভ” হওয়া, শত্রুদের দমনকারী হওয়া, এবং সমৃদ্ধি ও মর্যাদার অধিকারী হওয়া। এতে ইন্দ্রসদৃশ বিজয়-ভাষার সঙ্গে বাকস্পতির (বাক্/বাণীর অধিপতি) প্রতি তীক্ষ্ণ আবেদন যুক্ত হয়েছে—প্রতিপক্ষের কথা/বাক্যকে সংযত ও রুদ্ধ করতে; শেষে উজ্জ্বল চিত্রকল্পে দেখানো হয়, প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিচ থেকে বাধ্য হয়ে চিৎকার করে উঠবে, যেন জল থেকে উঠে আসা ব্যাঙ।
Sukta 10.167
এই সংক্ষিপ্ত ইন্দ্র-সূক্তটি সোম-নিষ্পেষণের আহ্বানরূপে বিন্যস্ত: মধুর সোম ইন্দ্রের জন্য ঢালা হয়; তাঁকে নিষ্পেষিত পাত্রের অধিপতি এবং ‘রয়ি’—বীরশক্তিসহ প্রাচুর্য—দাতা বলে বন্দনা করা হয়েছে। এতে ইন্দ্রের বিজয়, অর্থাৎ ‘স্বঃ’ (দীপ্তিমান স্বর্গ) জয়, সোম, বরুণ ও বৃহস্পতির দ্বারা রক্ষিত ঋত (যজ্ঞীয় শৃঙ্খলা)-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; এবং শেষে কবির সক্রিয় ভূমিকা সামনে আনা হয়েছে—অর্ঘ্য প্রস্তুত করা ও স্তোম (স্তবগান) রচনা/গঠন করার কর্মে।
Sukta 10.168
এই সংক্ষিপ্ত বাত-স্তুতি সূক্তে বায়ুকে এক অদৃশ্য, তবু নিঃসন্দেহে অনুভূত শক্তি হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে: তাঁর রথ বজ্রগর্জনের মতো ধ্বনিত হয়, স্বর্গকে স্পর্শ করে এবং পৃথিবীর ধুলো উড়িয়ে দেয়। মধ্যাকাশে বাতের অবিরাম গতি ও তাঁর রহস্যময় উৎস নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে; শেষে তাঁকে দেবতাদেরই “আত্মা” এবং জগতের গর্ভ/ভ্রূণ বলে চিহ্নিত করে, অর্ঘ্য-হবির যোগ্য ঘোষণা করে।
Sukta 10.169
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তটি আরোগ্য ও সমৃদ্ধির প্রার্থনা। এতে আনন্দদায়ক বায়ু (বাত) যেন অনুকূলে প্রবাহিত হয়—এই আহ্বান করা হয়েছে, যাতে জীবনদায়িনী ঔষধি (ওষধী) সবল হয়ে পুষ্টিদায়ক হয়ে ওঠে। দেহকল্যাণকে এটি মহাজাগতিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করে: রুদ্রের কাছে রক্ষাকারী অনুগ্রহ প্রার্থিত, আর পুষ্টিদায়ক “শক্তি”সমূহকে নিরাপদ গোṣ্ঠ/গোষ্ঠে (সুরক্ষিত, দীপ্তিময় জীবনক্ষেত্র ও প্রাণশক্তির প্রতীক) স্থিত হতে আমন্ত্রণ জানানো হয়—ইন্দ্র, সোম ও প্রজাপতির বৃহত্তর অনুমোদনের অধীনে।
Sukta 10.170
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে সূর্যকে পরম, সর্বব্যাপী মহাজ্যোতি (বৃহৎ, বিভ্রাট্) রূপে স্তব করা হয়েছে—যিনি সোম-মধু পান করে প্রাণশক্তি ও যজ্ঞকে স্থিত ও সুদৃঢ় করেন। এখানে সূর্যকে স্বয়ংস্থিত, বায়ু-প্রেরিত গতিতে চলমান, জীবসমূহের রক্ষক, বহুরূপে দীপ্তি বিকিরণকারী এবং বিশ্বকর্মার মহাজাগতিক কারুকার্য ও সর্বদেবের আশ্রয়ে সকল লোককে ধারণকারী বলে চিত্রিত করা হয়েছে।
Sukta 10.171
এই সংক্ষিপ্ত ইন্দ্র-সূক্তে বারবার দেবতাকে সেই রূপে সম্বোধন করা হয়েছে, যিনি থেমে থাকা বা গোপন বিষয়কে সামনে আনেন—রথ, সংকল্প, এমনকি সূর্যকেও। কবি ইন্দ্রের প্রশংসা করেন যে তিনি সোম-অর্পণকারীর আহ্বান শোনেন, মর্ত্যকে বাঁধনস্বরূপ নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করেন, এবং সীমাবদ্ধকারী শক্তির ঊর্ধ্বে আলোককে অগ্রসর করেন।
Sukta 10.172
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে উষার আগমনকে জীবন ও যজ্ঞের জন্য যথার্থ ‘পথ’ (বর্তনী) পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে: অন্ধকার দূর হয়, রশ্মি/গাভীগণ একত্রিত হয়, এবং কর্ম আবার সুশৃঙ্খল গতিতে ফিরে আসে। এখানে নবীকরণকে একই সঙ্গে এক মহাজাগতিক ঘটনা (উষা আলোক পুনঃস্থাপন করেন) এবং এক আচার-মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া (যজ্ঞ ও চেতনায় ধারাবাহিকতার ‘সূত্র’ পুনঃপ্রতিষ্ঠা) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
Sukta 10.173
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তটি ‘রাষ্ট্র’ (সার্বভৌমত্ব)-বিষয়ক এক মন্ত্র-প্রার্থনা, যা আচারগতভাবে শাসককে (অথবা শাসন-নীতিকে) ‘ধ্রুব’—অচল ও অটল—স্থিতিতে প্রতিষ্ঠা করে, যাতে রাজ্য হাতছাড়া না হয়। এতে রাজনৈতিক শৃঙ্খলাকে মহাজাগতিক ঋত-শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হয়েছে—দ্যৌ, পৃথিবী, পর্বত এবং চলমান জগৎকে দৃঢ়তার আদর্শ হিসেবে আহ্বান করা হয়—তারপর সোম ও ইন্দ্রকে (পরম্পরায় সহায়ক অন্যান্য রাজদেবতাসহ) প্রজাদের স্বেচ্ছা আনুগত্য এবং কর/উপহার নিশ্চিত করার জন্য প্রার্থনা করা হয়।
Sukta 10.174
এই সংক্ষিপ্ত ত্রিষ্টুভ স্তোত্রটি রাষ্ট্র/অভীবর্ত—অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব ও বিজয়—লাভের প্রার্থনা। এতে ব্রহ্মণস্পতির কাছে যজমানকে সুশৃঙ্খল কর্তৃত্ব ও সাফল্যের দিকে “ফিরিয়ে/ঘুরিয়ে” দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে, এবং আদর্শ হিসেবে ইন্দ্রের বিজয়ী ‘ঘুরে দাঁড়ানো’ স্মরণ করা হয়েছে। স্তোত্রটি প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু শক্তির উপর রক্ষামূলক প্রাধান্য ও তাদের দমন কামনা করে, এবং শেষে অভিষিক্ত আহুতি ও দেবানুগ্রহের কার্যকারিতায় ‘অসপত্ন’—অর্থাৎ ‘প্রতিদ্বন্দ্বীহীন’—হয়ে ওঠার নিশ্চয়তা দেয়।
Sukta 10.175
এই সংক্ষিপ্ত উত্তর-মণ্ডলের যাগীয় সূক্তে গ্রাবাণঃ (সোম-নিষ্পেষণ পাথর)কে সম্বোধন করে তাদেরকে নিষ্পেষণ-ফলকে নিজ নিজ স্থানে বসে সোম নিংড়াতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। দেব-প্রেরক সবিতৃকে আহ্বান করা হয়, যাতে তিনি এই উপকরণগুলিকে ধর্মানুসারে, বিধিসম্মত গতিতে প্রবৃত্ত করেন, ফলে যজমানের সোম-নিষ্পেষণ দেবতাদের জন্য—বিশেষত ‘শক্তিমান’ (প্রায়ই ইন্দ্র)—বল ও উল্লাস দান করে।
Sukta 10.176
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে দিব্য কারিগর-শক্তি ঋভুদের এবং তাদের ‘পুত্রদের’ আহ্বান করা হয়েছে—যে শক্তিগুলি মহৎ কর্মকে বিস্তার ও পরিপূর্ণ করে, এবং পৃথিবীকে মাতৃ-গাভীর মতো জেনে সেখান থেকে পোষণ গ্রহণ করে। এরপর সূক্তটি যজ্ঞক্রিয়ার নিজস্ব কার্যকারিতার দিকে ফেরে: দেবসন্ধানী হোতা ও অগ্নি, যারা সুনিয়ন্ত্রিত রথের মতো অগ্রসর হয় এবং আমাদের অন্তরে রক্ষার জন্য ‘নির্মিত’ হয়, জীবনের পরিসরকে অমর উৎসের দিকে প্রসারিত করে।
Sukta 10.177
এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত রহস্যময় সূক্তে পতঙ্গ—“ডানাওয়ালা” সৌর-তত্ত্ব—কে ধ্যান করা হয়েছে; তিনি চেতনার গোপন সূর্য, যাকে ঋষিরা হৃদয় ও মন দ্বারা উপলব্ধি করেন। এতে সূর্য-পাখিকে অসুরের মায়া (সার্বভৌম রূপদায়িনী/আকার-দানের শক্তি) এবং মরীচি (আলোকপ্রভা-কিরণসমূহ)-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; আর বাক্ (প্রেরিত বাণী)-কেও, যা ঋত (সত্য-ব্যবস্থা) এর স্থানে রক্ষিত।
Sukta 10.178
এই সংক্ষিপ্ত দুই-ঋচের সূক্তে তার্ক্ষ্যকে আহ্বান করা হয়েছে—তাঁকে দ্রুতগামী, দেবপ্রেরিত রক্ষক রূপে, যিনি যাত্রা ও সংঘর্ষের বিপদমাঝে নিরাপদ গমন এবং বিজয় নিশ্চিত করেন। কবি ‘স্বস্তি’ (কল্যাণ) প্রার্থনা করেন; কাম্য সহায়তাকে তিনি ইন্দ্রের দান এবং এমন এক নৌকার সঙ্গে তুলনা করেন, যা আসা-যাওয়ার পথে অক্ষত রেখে মানুষকে নিরাপদে পার করে দেয়।
Sukta 10.179
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তটি এক আচারগত আহ্বান—উঠো, দেখো, এবং যথাসময়ে অনুষ্ঠিত যজ্ঞে ইন্দ্রের ন্যায্য অংশ নিবেদন করো। এতে নিবেদনের প্রস্তুতি (শ্রাত)—বিশেষত মধ্যাহ্ন সवन/মধ্যাহ্ন-প্রেসিং—এর উপর জোর দেওয়া হয়েছে, এবং ইন্দ্রকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে যেন তিনি আসেন, সঙ্গীদের মাঝে আসন গ্রহণ করেন, এবং আনন্দসহ দধি/পিষ্ট হবি পান করেন; এর দ্বারা কর্মটি ঋত (বিশ্ব-ব্যবস্থা) অনুসারী বলে নিশ্চিত হয়।
Sukta 10.180
এই সংক্ষিপ্ত ইন্দ্র-সূক্তে বহুল আহূত বীর ইন্দ্রকে ডাকা হয়েছে—তিনি যেন শত্রুদের পরাভূত করেন এবং “ডান হাতে ধন আনেন”, অর্থাৎ শুভ, বিধিসম্মত ও ন্যায়সঙ্গত শক্তির দ্বারা সমৃদ্ধি দান করেন। ইন্দ্রকে পর্বতভ্রমণকারী ভয়ংকর এক পশুরূপে চিত্রিত করা হয়েছে—তিনি অস্ত্র শাণিত করেন, বৈরী বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করেন এবং এক প্রশস্ত, নিরাপদ পরিসর উন্মুক্ত করেন, যেখানে দেবগণ (এবং উপাসকের উচ্চতর শক্তিসমূহ) নির্বিঘ্নে কার্য করতে পারে।
Sukta 10.181
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে ভাবনা করা হয়েছে—যজ্ঞের শক্তি কীভাবে সঠিক বিন্যাসের দ্বারা ‘বহন’ হয়ে কার্যকর হয়: অনুষ্টুপ্ ছন্দ, প্রেরণাজাত আবিষ্কার, এবং যথাযথ যাজ্ঞিক বাক্ (যজুস্) এর মাধ্যমে। এতে যজ্ঞকর্মের সিদ্ধিকে দেবত্রয়ের উৎসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে—ধাতৃ বিধাতা হিসেবে, সবিতৃ প্রবর্তক/প্রেরক হিসেবে, এবং বিষ্ণু সর্বব্যাপী হিসেবে—যাঁদের দ্বারা যজ্ঞের গোপন আসন, আদিম সূত্রসমূহ, এবং সৌর ‘ঘর্ম’ (যজ্ঞ-তাপ) উদ্ধার হয়ে পুনরায় যজ্ঞক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়।
Sukta 10.182
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে নারাশংসকে আহ্বান করা হয়েছে যেন তিনি যজমানকে রক্ষা করেন—বিশেষত প্রয়াজ (পূর্ব-আহুতি) ও অনুয়াজ (পরবর্তী-আহুতি) কালে—এবং যজ্ঞক্রিয়ায় শান্তি ও মঙ্গল নিশ্চিত করেন। এতে প্রার্থনা করা হয় যে ক্ষতিকর বাক্য (অশস্তি) ও কুদৃষ্টি/দুর্মতি দূরে নিক্ষিপ্ত হোক, এবং শত্রু শক্তি—বিশেষ করে ব্রহ্মণ (পবিত্র মন্ত্র-রচনা) বিরোধী রাক্ষসরা—অগ্নিময় রক্ষাশক্তির দ্বারা দগ্ধ ও বিনষ্ট হোক।
Sukta 10.183
ঋগ্বেদের উত্তরপর্বের এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে তপস্যাজাত এক জননশক্তিকে আহ্বান করা হয়েছে—সে যেন “জন্ম নেয়” এবং সন্তান, বিশেষত কাম্য পুত্র, ও সমৃদ্ধি দান করে। ঋষি দাবি করেন, তিনি অন্তর্দৃষ্টিতে এই শক্তিকে দেখেছেন: সে সচেতন, ঋতুচক্র অনুসারে শ্রমসাধ্যভাবে কর্মরত, এবং দেহধারী। পরিণামে প্রথম-পুরুষে এক অন্তর্বাসিনী সৃষ্টিশক্তির উদ্ঘাটন ঘটে—যিনি উদ্ভিদের মধ্যে ভ্রূণ স্থাপন করেন এবং নানা লোকজগৎ জুড়ে জন্মপ্রক্রিয়াকে ধারণ ও পোষণ করেন।
Sukta 10.184
ঋগ্বেদ ১০.১৮৪ একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী জনন-স্তোত্র, যেখানে সৃষ্টির নানা দিব্য কারিগর-শক্তিকে আহ্বান করে গর্ভধারণ স্থাপন ও তার রক্ষার প্রার্থনা করা হয়েছে। এতে বিষ্ণুকে ‘গর্ভাশয় প্রস্তুত করতে’ বলা হয়, ত্বষ্টৃকে দেহ-রূপ গড়তে, প্রজাপতি ও ধাত্রকে ভ্রূণকে সঞ্চারিত করে যথাস্থানে স্থাপন করতে; এরপর সিনীভালী, সরস্বতী ও অশ্বিনদ্বয়কে আহ্বান করে গর্ভসঞ্চার নিশ্চিত করা এবং দশম মাসে পূর্ণকাল প্রসব পর্যন্ত শিশুকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার প্রার্থনা করা হয়।
Sukta 10.185
এই সংক্ষিপ্ত তিন-ঋচা-সমৃদ্ধ সূক্তে ‘তিন’ আদিত্য—মিত্র, আর্যমণ ও বরুণ—কে আহ্বান করা হয়েছে; তাঁরা ঋত (মহাজাগতিক শৃঙ্খলা)-এর বিশাল ভিত্তি এবং মানবজীবনের রক্ষক। তাঁদের দীপ্তিমান শক্তি ও অপ্রতিরোধ্য অভিভাবকত্ব প্রার্থনা করা হয়, যাতে শত্রু শক্তি ও অশুভ বাক্য পথের উপর কর্তৃত্ব লাভ করতে না পারে। সূক্তের পরিণতিতে বলা হয়—অদিতির পুত্রগণ যাকে অনুগ্রহ করেন, সেই মর্ত্যকে তাঁরা অবিরত আলো ও প্রাণশক্তি দান করেন।
Sukta 10.186
এই সংক্ষিপ্ত তিন-ঋচাযুক্ত স্তোত্রে বাত (প্রাণরূপ বায়ু)-কে কল্যাণকারী চিকিৎসক রূপে আহ্বান করা হয়েছে—যিনি হৃদয়ে শান্তি ও আনন্দ আনেন এবং জীবনশ্বাসকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে জীবনের পূর্ণতায় পৌঁছে দেন। এখানে বাতকে পিতা, ভ্রাতা ও বন্ধু বলে সম্বোধন করে সম্পর্ককে আরও গভীর করা হয়েছে। শেষে প্রার্থনা করা হয়, বাতের নিজ আবাসে সঞ্চিত বলে বিশ্বাসিত “অমৃত-ধন” থেকে আমাদের একটি অংশ দান করা হোক—অর্থাৎ অব্যাহত জীবনের জন্য পোষক, মৃত্যুহীন প্রাণশক্তি।
Sukta 10.187
এই সংক্ষিপ্ত অগ্নি-সূক্তে বারবার অগ্নিকে জগতসমূহের পরাক্রান্ত “বৃষভ” বলে আহ্বান করা হয়েছে এবং প্রার্থনা করা হয়েছে—তিনি যেন উপাসককে শত্রু শক্তির ওপারে বহন করে নিয়ে যান, বাহ্য প্রতিপক্ষেরও এবং অন্তর্গত প্রতিরোধেরও ঊর্ধ্বে। অগ্নির প্রশংসা করা হয়েছে সেই দীপ্ত শক্তি হিসেবে, যিনি তাঁর নির্মল শিখায় রক্ষস্ (বিকৃতি/বিঘ্ন সৃষ্টিকারী শক্তি) দমন করেন; এবং সেই অতীত-লৌকিক অগ্নি হিসেবে, যিনি “দূর তীরে জন্মগ্রহণকারী”, যজ্ঞ ও বাক্কে নিরাপত্তা ও বিজয়ের পথে পরিচালিত করেন।
Sukta 10.188
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে জাতবেদস অগ্নিকে আহ্বান করা হয়েছে এবং তাঁর ‘অশ্ব’—তাঁর দ্রুত, কার্যকর শক্তি—কে অনুরোধ করা হয়েছে যেন সে এসে প্রস্তুত বরহিসে, অর্থাৎ পবিত্র যজ্ঞভূমিতে, আসন গ্রহণ করে। এরপর কবি উদার দাতা অগ্নির উদ্দেশে সুগঠিত স্তব উত্থাপন করেন, এবং শেষে অগ্নির দীপ্ত রশ্মিসমূহকে ডাকেন—যে রশ্মি হব্যকে দেবতাদের কাছে বহন করে—যেন তারা যজ্ঞকে অগ্রসর করে এবং সফলভাবে সম্পন্ন করায়।
Sukta 10.189
এই সংক্ষিপ্ত, অত্যন্ত প্রতীকধর্মী সূক্তে বিচিত্রবর্ণ আলোর এক দীপ্ত “গাভী”-র গতি অনুসৃত হয়েছে—যাকে প্রায়ই ঊষা বা সূর্যের আলোকচ্ছটা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়—যে মাতা (পৃথিবী)-র সামনে পদক্ষেপ করে পিতা (দ্যৌ/স্বর্গ)-এর দিকে অগ্রসর হয়। এরপর এতে সেই মহাজাগতিক শক্তির চিত্র অঙ্কিত হয়, যা “শ্বাস বাইরে ও ভিতরে” নেয়, এবং ছন্দোময় গতির মাধ্যমে স্বর্গকে প্রকাশ করে। শেষে সূর্যরূপ “পাখি” (পতঙ্গ)-এর দর্শন ঘটে, যার মধ্যে বাক্ (বাণী/শব্দ) প্রতিষ্ঠিত—যে প্রতিটি ঊষা ও প্রতিটি দিনে বহু লোকধামে দীপ্তিমান হয়ে ওঠে।
Sukta 10.190
এই সংক্ষিপ্ত সৃষ্টিতত্ত্বমূলক সূক্তে সৃষ্টির সুশৃঙ্খল বিকাশ বর্ণিত: তপস্ (সৃজন-উষ্ণতা) থেকে ঋত ও সত্যের উদ্ভব; তারপর রাত্রি ও বিশ্ব-সমুদ্রের প্রকাশ; এবং সেখান থেকে বর্ষ/সংবৎসর, যা দিন-রাত্রির পরিমাপক। শেষে ধাতৃ—ব্যবস্থাপক/বিধাতা—সূর্য ও চন্দ্রকে স্থাপন করেন এবং স্বর্গ, পৃথিবী, অন্তরিক্ষ ও স্বঃ—এই স্তরিত লোকসমূহ প্রতিষ্ঠা করে ঘোষণা করেন যে বিশ্ব বোধগম্য, নিয়মবদ্ধ ঋত-শৃঙ্খলার উপর প্রতিষ্ঠিত।
Sukta 10.191
এই সংক্ষিপ্ত সূক্তে অগ্নি প্রজ্বালনকে মানুষের মধ্যে ঐক্য-সৌহার্দ্যের প্রজ্বালনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে: যেমন একত্রিত ইন্ধনে অগ্নি পূর্ণতায় জ্বলে ওঠে, তেমনি একত্রিত সংকল্পে সমাজ শক্তিশালী হয়। এতে অভিন্ন বাক্, অভিন্ন মন এবং অভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের প্রার্থনা করা হয়েছে, এবং যজ্ঞকে সেই ব্যবহারিক উপায় রূপে দেখানো হয়েছে যার দ্বারা বহুর মধ্যে “এক চেতনা” গঠিত হয়।
It is widely regarded as a late compilation because it gathers many seers and styles and includes more explicit philosophical speculation, social themes, and life-cycle rites than the family books. Its contents range from ritual praise to reflective hymns on creation, speech, law (ṛta), and death.
The best-known are RV 10.129 (Nāsadīya Sūkta on creation and uncertainty), RV 10.121 (Hiraṇyagarbha on the cosmic origin), RV 10.125 (Vāc Sūkta on the divinity of speech), and RV 10.14–10.15 (Yama and the Fathers in funerary context).
They emphasize two complementary strands: mantra (brahman) as an inner, forceful power that breaks hostile divisions and restores right order through inspired speech, and protection/victory through cosmic guardianship—especially Night’s shelter and Agni’s commanding, protective agency. Together they frame Mandala 10 as both reflective and practical: metaphysical inquiry alongside rites and safeguards for human life.
Read Rig Veda in the Vedapath app
Scan the QR code to open this directly in the app, with audio, word-by-word meanings, and more.