
Kaumarika Khanda
This section is framed around southern coastal sacred geography (dakṣiṇa-sāgara / southern ocean littoral) and a cluster of five tīrthas presented as potent yet perilous due to aquatic guardians (grāha). The narrative treats the shoreline as a liminal ritual zone where pilgrimage merit, danger, and release (śāpa-mokṣa) converge, and where Kaumāra/Kumāreśa associations mark the region as a site of Skanda-linked sanctity.
66 chapters to explore.

Pañca-Tīrtha Prabhāva and the Grāha-Śāpa Liberation (पञ्चतीर्थप्रभावः ग्राहशापमोचनं च)
অধ্যায়ের শুরুতে ঋষিরা দক্ষিণ সমুদ্রতটে অবস্থিত পাঁচটি পবিত্র তীর্থের মাহাত্ম্য এবং কেন এগুলিকে সর্বতীর্থ-যাত্রার সমফলদায়ক বলা হয়—তা জানতে চান। উগ্রশ্রবা কুমার-সম্পর্কিত এক পবিত্র কাহিনি অবলম্বনে জানান যে এই পাঁচ তীর্থের শক্তি অসাধারণ। এরপর রাজবীর অর্জুন (ফাল্গুন) সেই তীর্থগুলিতে যান। তপস্বীরা বলেন, সেখানে স্নানকারীদের ‘গ্রাহ’ ধরে ফেলে বলে লোকেরা ভয়ে এড়িয়ে চলে। অর্জুন বলেন, ধর্মসাধনাকে ভয় দিয়ে রুদ্ধ করা উচিত নয়; তিনি বিশেষত সৌভদ্র তীর্থে জলে নামেন, গ্রাহের কবলে পড়েন এবং তাকে বলপূর্বক জল থেকে টেনে তোলেন। তখন সেই গ্রাহ অলংকারভূষিতা এক দিব্য নারী—অপ্সরায় রূপান্তরিত হয়। অপ্সরা জানায়, সে ও তার সখীরা এক ব্রাহ্মণ তপস্বীর তপস্যায় বিঘ্ন ঘটাতে গিয়েছিল; সেই ব্রাহ্মণ তাদের নির্দিষ্ট কাল জলচর গ্রাহ হওয়ার শাপ দেন এবং বলেন—মহাপুরুষের হাতে জল থেকে উত্তোলিত হলেই মুক্তি হবে। পরে ব্রাহ্মণের উপদেশে কামসংযম, গৃহস্থধর্মের শৃঙ্খলা, বাক্-আচরণের নিয়ম এবং উচ্চ-নীচ আচরণের পার্থক্য জীবন্ত নীতিচিত্রে প্রকাশ পায়। নারদ পথপ্রদর্শক হয়ে শপ্তদের দক্ষিণের পঞ্চতীর্থে নির্দেশ দেন; অর্জুনের ক্রমান্বয়ে স্নানে তাদের শাপমোচন ঘটে। শেষে অর্জুন প্রশ্ন করেন—ধর্মপথে এমন বাধা কেন অনুমোদিত, আর শক্তিশালী রক্ষকেরা কেন তা নিবারণ করলেন না—এভাবেই পরবর্তী ব্যাখ্যার সূত্রপাত হয়।

Nārada–Arjuna संवादः: तीर्थयात्रा-नीतिः, स्थाणु-भक्ति, दानधर्मस्य प्रशंसा
এই অধ্যায়ে তীর্থযাত্রার নীতি ও দানধর্মের মহিমা গভীরভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। সূত বলেন—অর্জুন দেব-সম্মানিত নারদের কাছে উপস্থিত হন। নারদ অর্জুনের ধর্মবুদ্ধির প্রশংসা করে জিজ্ঞাসা করেন, বারো বছরের দীর্ঘ তীর্থভ্রমণে ক্লান্তি বা বিরক্তি জন্মেছে কি না। এখানেই মূল তত্ত্ব স্থাপিত—তীর্থফল কেবল ভ্রমণে নয়, বরং হাত-পা ও মনের সংযমযুক্ত সাধনায় নির্ভর করে। অর্জুন তীর্থের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শকে শ্রেষ্ঠ মেনে বর্তমান পবিত্র প্রসঙ্গের গুণ জানতে চান। তারপর নারদ ব্রহ্মলোকের বৃত্তান্ত জুড়ে দেন—ব্রহ্মা দূতদের কাছে এমন আশ্চর্য ঘটনার কথা জানতে চান, যার শ্রবণও পুণ্যদায়ক। সুश्रবা জানান, সরস্বতী তীরে কাত্যায়নের প্রশ্নে সারস্বত মুনি সংসারের অস্থিরতা বাস্তবভাবে বোঝান এবং ‘স্থাণু’ (শিব)-ভক্তিতে আশ্রয় নিতে, বিশেষত দান করতে উপদেশ দেন। দানকে সর্বাধিক কঠিন ও সমাজে যাচাইযোগ্য তপস্যা বলা হয়েছে, কারণ এতে কষ্টার্জিত ধন ত্যাগ করতে হয়; এতে ক্ষয় নয়, বৃদ্ধি হয় এবং এটি সংসারসাগর পার হওয়ার নৌকা। দেশ-কাল, পাত্রের যোগ্যতা ও চিত্তশুদ্ধি অনুযায়ী দানের বিধান এবং প্রসিদ্ধ দাতাদের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। শেষে নারদ নিজের দারিদ্র্য ও দানকর্মের ব্যবহারিক সমস্যার কথা স্মরণ করে বলেন—শুদ্ধ অভিপ্রায় ও বিবেকই এই সাধনার কেন্দ্র।

Reva-Śuklatīrtha and Stambha-tīrtha: Pilgrimage Purification and Ancestral Rites (Revā–Mahī–Sāgara Saṅgama Narrative)
এই অধ্যায়ে নারদের তীর্থভ্রমণ ও সংলাপধারা বর্ণিত। তিনি রেবা (নর্মদা) তীরে ভৃগুর আশ্রমে এসে রেবাকে পরম পবিত্র, “সর্বতীর্থময়ী” এবং দর্শন, স্তব ও বিশেষত স্নানে মহাফলদায়িনী বলে শ্রবণ করেন। রেবার শ্বুক্লতীর্থকে পাপনাশক ঘাট বলা হয়েছে—সেখানে স্নান করলে কঠোর অশৌচ ও গুরু দোষও নাশ হয়। ভৃগু পরে মহী–সাগর সঙ্গম ও প্রসিদ্ধ স্তম্ভতীর্থের কাহিনি বলেন—সেখানে স্নানকারী জ্ঞানীরা পাপমুক্ত হয়ে যমলোকের ভয় এড়ায়। এরপর সংযমী ঋষি দেবশর্মার প্রসঙ্গ আসে; তিনি গঙ্গা–সাগরে পিতৃতর্পণে নিবিষ্ট, কিন্তু সুভদ্রের মুখে শোনেন যে মহী–সাগর সঙ্গমে করা শ্রাদ্ধ-তর্পণ পিতৃদের অধিক তৃপ্তি দেয়। স্ত্রী ভ্রমণে অস্বীকৃতি জানালে দেবশর্মা দুর্ভাগ্য ও গৃহকলহে কাতর হন। সুভদ্র উপায় দেন—দেবশর্মার পক্ষ থেকে তিনি সঙ্গমে শ্রাদ্ধ-তর্পণ সম্পন্ন করবেন; বিনিময়ে দেবশর্মা তাঁর সঞ্চিত তপঃপুণ্যের অংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। শেষে ভৃগু সঙ্গমের অসাধারণ মাহাত্ম্য ঘোষণা করেন, আর নারদ সেই পবিত্র স্থান দর্শন ও তার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার সংকল্প পুনর্নবীকরণ করেন।

दानतत्त्व-व्याख्या (Doctrine of Dāna: Intent, Means, and Outcomes) / “Nārada Explains the Taxonomy of Giving”
এই অধ্যায়ে নারদের এক বাস্তব ধর্মসংকট উত্থাপিত—তিনি নিরাপদ স্থান/ভূমি লাভ করতে চান, কিন্তু প্রতিগ্রহ (দোষযুক্ত গ্রহণ) করে পাপের ভাগী হতে চান না। শুরুতেই ধনের নৈতিক শ্রেণিবিভাগ বলা হয়েছে—শুক্ল (শুদ্ধ), শবল (মিশ্র), কৃষ্ণ (অন্ধকারময়); এবং ধর্মকার্যে ব্যবহারে যথাক্রমে দেবত্ব, মনুষ্যত্ব বা তির্যক্ত্ব ফল হয়—এ কথা কর্মফলসহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এরপর সৌরাষ্ট্রে এক জনসমক্ষে ঘটনা: রাজা ধর্মবর্মা দানতত্ত্ব-সম্পর্কিত এক রহস্যময় শ্লোক শোনেন—দুই কারণ, ছয় ভিত্তি, ছয় অঙ্গ, দুই ‘বিপাক’, চার প্রকার, ত্রিবিধ শ্রেণি ও দাননাশক তিনটি—এগুলির সঠিক ব্যাখ্যার জন্য তিনি বড় পুরস্কার ঘোষণা করেন। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে নারদ ধারাবাহিক ব্যাখ্যা দেন: কারণ—শ্রদ্ধা ও শক্তি; ভিত্তি—ধর্ম, অর্থ, কাম, লজ্জা, হর্ষ, ভয়; অঙ্গ—দাতা, গ্রহীতা/পাত্র, শুচিতা, দানবস্তু, ধর্মসংকল্প, যথোচিত দেশ-কাল; বিপাক—পাত্রের গুণ অনুসারে পরলোকীয় ও ইহলোকীয় ফল; প্রকার—ধ্রুব, ত্রিক, কাম্য, নৈমিত্তিক; শ্রেণি—উত্তম/মধ্যম/অধম; নাশক—দান করে পরে অনুতাপ, অশ্রদ্ধায় দান, অপমানসহ দান। শেষে রাজা কৃতজ্ঞ হয়ে নারদের পরিচয় জেনে তাঁর উদ্দেশ্যে ভূমি ও ধন দানে প্রস্তুত হন।

Adhyāya 5: Nārada’s Search for Worthy Recipients and Sutanu’s Doctrinal Replies (Mātṛkā–Gṛha–Lobha–Brāhmaṇa-bheda–Kāla)
এই অধ্যায়ে নারদ রৈবত পর্বতের দিকে অগ্রসর হয়ে ‘ব্রাহ্মণদের কল্যাণার্থে’ দানধর্ম নিয়ে নৈতিক অনুসন্ধান শুরু করেন। অপাত্রকে দান দিলে তা নিষ্ফল—এ কথা বলা হয়; যে ব্রাহ্মণ অশিক্ষিত বা সংযমহীন, সে অন্যকে পার করাতে পারে না, সে যেন হালবিহীন নৌকা। দানে দেশ-কাল, উপায়, দ্রব্য ও শ্রদ্ধার শুদ্ধতা জরুরি, আর পাত্রতা কেবল বিদ্যায় নয়—বিদ্যা ও আচারের যুগল উপস্থিতিতেই প্রতিষ্ঠিত। নারদ বারোটি কঠিন প্রশ্ন নিয়ে কালাপগ্রামে যান, যেখানে বহু আশ্রম ও শ্রুতি-শিক্ষিত ব্রাহ্মণেরা তর্কে রত। তারা প্রশ্নগুলো সহজ মনে করলেও উত্তর দেয় এক বালক—সুতনু—যিনি ধারাবাহিক ব্যাখ্যা দেন। তিনি ওঁকারসহ মাতৃকা-বর্ণসমূহ গণনা করেন এবং ‘অ-উ-ম্’ ও অর্ধমাত্রাকে সদাশিব-তত্ত্বরূপে ব্যাখ্যা করেন; ‘পাঁচ-পাঁচের বিস্ময়কর গৃহ’কে তত্ত্বসমষ্টির মানচিত্র বলে সদাশিব পর্যন্ত নির্দেশ করেন। ‘বহুরূপা নারী’কে বুদ্ধি এবং ‘মহামকর’কে লোভ বলে তার নৈতিক পরিণামও বর্ণনা করেন। সুতনু বিদ্যা ও নিয়মের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণদের আট প্রকার ভেদ বলেন এবং যুগাদি-মন্বন্তরাদি কালচিহ্নকে অক্ষয় পুণ্যদায়ক হিসেবে উল্লেখ করেন। শেষে চিন্তাপূর্বক কর্মে জীবন-পরিকল্পনা, বেদান্তে কথিত অর্চিস ও ধূম—দুই পথ, এবং শ্রুতি-স্মৃতিবিরুদ্ধ দেব-ধর্মনিন্দাকারী পথ পরিত্যাগের উপদেশ দিয়ে অধ্যায় সমাপ্ত হয়।

Brahmaṇa-parīkṣā, ‘Caurāḥ’ as Inner Vices, and Cira-kārī Upākhyāna (Testing of Brahmins; inner ‘thieves’; the parable of deliberate action)
এই অধ্যায়ে নারদ শাতাতপ প্রমুখ ব্রাহ্মণদের সঙ্গে সংলাপে মিলিত হন। পারস্পরিক সম্মান ও জিজ্ঞাসার পর নারদ জানান—পৃথিবী‑সমুদ্রের সঙ্গমস্থ মহাতীর্থের নিকটে একটি শুভ ব্রাহ্মণ‑আসন/বসতি স্থাপন এবং সেখানে ব্রাহ্মণদের যোগ্যতা পরীক্ষা করাই তাঁর উদ্দেশ্য। স্থানে ‘চোর’ আছে বলে আশঙ্কা ওঠে; কিন্তু কাহিনি ব্যাখ্যা করে যে এ চোর বাহিরের নয়, অন্তরের শত্রু—কাম, ক্রোধ ইত্যাদি—এবং অসাবধানতায় তপস্যা‑ধনও লুপ্ত হতে পারে। এরপর কেদার থেকে কলাপ/কলাপক অভিমুখে যাত্রাপথের নির্দেশ, গুহ/স্কন্দের পূজা, স্বপ্নাদেশ, এবং পবিত্র মাটি‑জল দিয়ে চোখে অঞ্জন ও দেহে লেপন করে গুহাপথ দেখা ও অতিক্রমের বিধান বর্ণিত হয়। পরে সঙ্গমে সমবেত স্নান, তর্পণ, জপ ও ধ্যান, এবং এক দিব্য সমাবেশের উল্লেখ আসে। অতিথি‑প্রসঙ্গে কপিল ভূমিদান‑ব্যবস্থার জন্য ব্রাহ্মণ প্রার্থনা করেন; এতে অতিথিধর্মের মাহাত্ম্য ও অবহেলার ফল প্রকাশ পায়। ক্রোধ‑তাড়াহুড়োর বিতর্ক থেকে ‘চিরকারী’ উপাখ্যান—পুত্র পিতার হঠকারী আদেশ তৎক্ষণাৎ না করে বিবেচনায় বিলম্ব করে মহাপাপ রোধ করে—কঠিন কর্মে ধৈর্য ও বিচারকে প্রশংসা করা হয়। শেষে কলিযুগে শাপের প্রভাব, প্রতিষ্ঠাকর্ম এবং স্থাপিত তীর্থের দেবসম্মতি দিয়ে অধ্যায় সমাপ্ত।

Indradyumna-Kīrti-Punaruddhāraḥ (Recovery of Indradyumna’s Fame) and Nāḍījaṅgha’s Account of Ghṛtakambala-Śiva Worship
অর্জুন পূর্বের প্রশংসা শুনে নারদকে জিজ্ঞাসা করে—পৃথিবীর দুর্দশার কারণ কী, এবং বৃহত্তর উৎসকথা বিস্তারিত বলুন। নারদ আদর্শ রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের কথা বলেন—দানশীল, ধর্মজ্ঞ, জনকল্যাণে নিবেদিত; যিনি বহু দান, যজ্ঞ, সরোবর ও দেবালয় নির্মাণ প্রভৃতি কর্ম করেছেন। তবু ব্রহ্মা তাঁকে জানান—শুধু পুণ্যে স্বর্গস্থিতি স্থায়ী নয়; তিন লোক জুড়ে নির্মল ও বিস্তৃত কীর্তি (নিষ্কল্মষা কীর্তি) চাই, কারণ কাল স্মৃতিকে ক্ষয় করে। ইন্দ্রদ্যুম্ন পৃথিবীতে নেমে দেখেন তাঁর নাম বিস্মৃত। দীর্ঘজীবী সাক্ষীর সন্ধানে তিনি নৈমিষারণ্যে মার্কণ্ডেয়ের কাছে যান; মার্কণ্ডেয়ও তাঁকে স্মরণ করতে পারেন না, তবে প্রাচীন বন্ধু নাড়ীজঙ্ঘের কথা বলেন। নাড়ীজঙ্ঘও ইন্দ্রদ্যুম্নকে মনে করতে না পেরে নিজের দীর্ঘায়ুর কারণ বর্ণনা করে—শৈশবে ঘৃতপাত্রে স্থাপিত শিবলিঙ্গের প্রতি অপরাধ, পরে অনুতাপে ঘৃত দিয়ে লিঙ্গ আচ্ছাদন করে ‘ঘৃতকম্বল-শিব’ পূজা, ফলে শিবকৃপায় গণত্ব লাভ। পরে অহংকার ও কামে পতন; গালব ঋষির পত্নীকে অপহরণের চেষ্টা করায় শাপে বক (বগলা) হওয়া, এবং শেষে শাপশমন—গুপ্ত কীর্তি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে ইন্দ্রদ্যুম্নের মুক্তিপথে অংশীদার হওয়া। অধ্যায়টি রাজধর্ম, কালের প্রভাব, এবং ভক্তির সঙ্গে নৈতিক সংযমের গুরুত্ব একত্রে তুলে ধরে।

अखण्डबिल्वपत्रार्चन-दीर्घायुः शापकथा च (Unbroken Bilva-Leaf Worship, Longevity, and the Curse Narrative)
এই অধ্যায়ে বহু কণ্ঠে ধর্মতত্ত্বের আলোচনা এগোয়। নারদ প্রসঙ্গ তোলেন—রাজা (ইন্দ্রদ্যুম্নকে মানদণ্ডরূপে স্মরণ করা হয়) মার্কণ্ডেয়ের কঠোর উক্তি শুনে গভীর দুঃখে বিচলিত হন। এখানে সত্য ও মিত্রধর্ম মুখ্য; একবার দেওয়া প্রতিজ্ঞা বা কথা ব্যক্তিগত ক্ষতি হলেও পালনীয়—উদাহরণ দিয়ে সত্যনিষ্ঠার নৈতিক গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। দলটি আত্মদাহের পথ ত্যাগ করে শিবধামে তীর্থযাত্রার সিদ্ধান্ত নেয়; কৈলাসে গিয়ে প্রাকারকর্ণ নামের এক পেঁচার সঙ্গে পরামর্শ করে। সে জানায়, পূর্বজন্মে সে ঘণ্ট নামক ব্রাহ্মণ ছিল এবং অখণ্ড বিল্বপত্রে লিঙ্গপূজা ও ত্রিকাল ভক্তির ফলে তার অসাধারণ দীর্ঘায়ু হয়েছে। শিব প্রত্যক্ষ হয়ে বর দেন; পরে কাহিনি সামাজিক-নৈতিক ভ্রষ্টতায় মোড় নেয়—বলপূর্বক গন্ধর্ব-বিবাহসদৃশ আচরণে শাপ পড়ে, সে পেঁচা (রাত্রিচর) রূপে পরিণত হয়। শাপে শর্ত থাকে—ইন্দ্রদ্যুম্নকে শনাক্ত করতে সাহায্য করলে সে পূর্বরূপ ফিরে পাবে; এভাবে বিল্বপত্র-উপাসনা, কর্মফল, প্রতিজ্ঞাপালন ও বিবাহধর্ম একসূত্রে গাঁথা।

इंद्रद्युम्नपरिज्ञानोपाख्यानम् (The Inquiry into King Indradyumna: Friendship, Vow, and the Gṛdhra’s Past)
অধ্যায় ৯-এ সংলাপের মাধ্যমে নীতি ও ধর্মের এক গভীর উপাখ্যান এগিয়ে যায়। পূর্বজন্মের কারণ শুনে নাড়ীজঙ্ঘ আক্ষেপ করে যে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পরিচয়/অনুসন্ধান এখনও সম্পূর্ণ হয়নি; বন্ধু-ধর্ম রক্ষা ও প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য সে সঙ্গীদের সঙ্গে অগ্নিপ্রবেশের কঠোর সিদ্ধান্ত প্রস্তাব করে। তখন উলূক বাধা দিয়ে অন্য উপায় বলে—গন্ধমাদন পর্বতে এক দীর্ঘজীবী গৃধ্র থাকে, তার প্রিয় সখা; সে হয়তো ইন্দ্রদ্যুম্নকে চিনতে পারে। তারা গৃধ্রের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করে। গৃধ্র জানায়, বহু কল্পে সে ইন্দ্রদ্যুম্নকে দেখেনি, নামও শোনেনি—এতে সবার শোক বাড়ে। এরপর গৃধ্র নিজের পূর্বজন্মের কাহিনি বলে—সে একসময় চঞ্চল বানর ছিল; শিবের দামনক-উৎসবে স্বর্ণদোলনা ও লিঙ্গের নিকটে অজান্তে অংশ নিয়ে ভক্তদের প্রহারে তীর্থস্থানে মৃত্যুবরণ করে। পরে কাশীর অধিপতির পুত্র কুশধ্বজ রূপে জন্ম নিয়ে দীক্ষা ও যোগসাধনায় শিবভক্ত হয়। পরবর্তীতে কামবশে অগ্নিবেশ্যের কন্যা অপহরণ করায় ঋষির শাপে সে গৃধ্র হয়। ঋষি শর্ত দেন—যেদিন সে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পরিচয় নির্ণয়ে সহায়তা করবে, সেদিনই শাপমুক্তি হবে। এভাবে বন্ধুত্বনীতি, প্রতিজ্ঞার যুক্তি, উৎসব-পুণ্য এবং শাপ-মোক্ষের শর্তাধীন বিধান একত্রে প্রকাশ পায়।

Indradyumna–Mantharaka-saṃvādaḥ (Dialogue of Indradyumna and the Tortoise Mantharaka)
নারদের বৃত্তান্ত শুনে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন শোক ও বিস্ময়ে ব্যাকুল হন। তিনি শকুনের কথার সত্যতা জানতে চান এবং আসন্ন মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করেন। সবাই প্রসিদ্ধ মানস-সরোবরের দিকে যান, গোপন বিষয়জ্ঞ কচ্ছপ মন্থরকের পরামর্শ নিতে। তাদের আসতে দেখে মন্থরক জলে লুকিয়ে পড়ে; তখন ঋষি কৌশিক এটিকে আতিথ্য-ধর্মভঙ্গ বলে তিরস্কার করেন এবং অতিথি-সৎকারের শ্রেষ্ঠতা ও অতিথি-বিমুখতার পাপত্ব ব্যাখ্যা করেন। মন্থরক বলে—সে আতিথ্য জানে, কিন্তু ইন্দ্রদ্যুম্নকে ভয় পায়; পূর্বে রৌচকপুরে রাজার যজ্ঞে যজ্ঞাগ্নিতে তার পিঠ পুড়ে গিয়েছিল, সেই ক্ষত এখনও আছে, তাই আবার দগ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় সে সরে গেছে। এই কথা বলতেই আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি ও দিব্য সঙ্গীত ধ্বনিত হয়, রাজার পুনরুদ্ধারিত কীর্তি প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এক দিব্য রথ আবির্ভূত হয়; দেবদূত জানায় যে ইন্দ্রদ্যুম্নের কীর্তি পুনর্জাগ্রত হয়েছে এবং তাকে ব্রহ্মলোকে আহ্বান করে। সে বলে—পৃথিবীতে যতদিন কীর্তি থাকে, ততদিন স্বর্গেও অবস্থান থাকে; আর পুকুর, কূপ, উদ্যান প্রভৃতি ‘পূর্ত’ কর্ম পুণ্যবর্ধক। রাজা বন্ধুত্ব ও অনুগতিতে সঙ্গীদেরও সঙ্গে নিতে চান। দূত জানায়—তারা শাপগ্রস্ত পতিত শিবগণ, শাপান্ত পর্যন্ত অপেক্ষমাণ; মহাদেব ব্যতীত তারা স্বর্গ কামনা করে না। ইন্দ্রদ্যুম্নও পুনঃপতনের ভয়যুক্ত স্বর্গ প্রত্যাখ্যান করে শিবগণের সান্নিধ্যই বরণ করেন। পরে তিনি কচ্ছপের দীর্ঘায়ুর কারণ জিজ্ঞাসা করলে মন্থরক ‘দিব্য, পাপনাশক’ শিব-মাহাত্ম্যের কাহিনি ও ফলশ্রুতি সূচনা করে—শ্রদ্ধায় শ্রবণে শুদ্ধি হয়, আর তার দীর্ঘায়ু ও কচ্ছপ-রূপ শম্ভুর কৃপায় প্রাপ্ত।

Kūrma’s Past-Life Account: Śiva-Temple Merit, Ethical Lapse, and the Curse into Tortoisehood
এই অধ্যায়ে কূর্ম ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজাকে নিজের পূর্বজন্মের স্মৃতি ধর্ম-নৈতিক শিক্ষারূপে শোনান। শৈশবে তিনি ব্রাহ্মণ শাণ্ডিল্য ছিলেন; বর্ষাকালে বালি-মাটি দিয়ে পঞ্চায়তন-বিন্যাসসহ একটি শিবমন্দির নির্মাণ করে লিঙ্গের সামনে পুষ্পপূজা, গান ও নৃত্য করেন। পরবর্তী জন্মগুলিতেও শিবভক্তি, দীক্ষা ও শিবালয় নির্মাণকে মহাপুণ্য বলা হয়েছে এবং নানা উপাদানে শিবগৃহ নির্মাণের ফলশ্রুতি বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু অজরত্বের অসাধারণ বর পেয়ে সেই ভক্ত রাজা জয়দত্ত হয়ে নৈতিক শৈথিল্যে পতিত হন এবং পরস্ত্রী-অনুসরণে ধর্মসীমা লঙ্ঘন করেন; এর ফলে আয়ু, তপস্যা, যশ ও ঐশ্বর্য নষ্ট হয়—এটাই মূল কারণ বলে দেখানো হয়েছে। ধর্মব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় যম শিবের কাছে অভিযোগ করেন; শিব অপরাধীকে কূর্মযোনিতে শাপ দেন, তবে ভবিষ্যৎ এক কল্পে মুক্তির নির্দেশও দেন। যজ্ঞ-সম্পর্কিত দগ্ধচিহ্নের স্মৃতি কূর্মের পিঠে উল্লেখিত, তীর্থসদৃশ শুদ্ধিকর প্রভাবের ইঙ্গিত আছে, এবং শেষে ইন্দ্রদ্যুম্ন বিবেক-বৈরাগ্য গ্রহণ করে দীর্ঘজীবী লোমশ মুনির নিকট উপদেশ নিতে স্থির করেন—সৎসঙ্গ যে তীর্থের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, তা প্রতিপন্ন হয়।

कूर्माख्यानम् (Kūrmākhyāna) — The Discourse on Kūrma and the Teaching of Lomaśa
এই অধ্যায়ে নারদের বর্ণনার ভিতর দিয়ে বহু-কণ্ঠ ধর্মসংলাপ গড়ে ওঠে। ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজা প্রমুখ এক মহাতপস্বীর সাক্ষাৎ পান, যিনি ‘মৈত্র’ পথের সাধক—অহিংসা ও সংযত বাক্যের দ্বারা এমন মহিমান্বিত যে পশুরাও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। কূর্ম ইন্দ্রদ্যুম্নকে পরিচয় করিয়ে দেন—রাজা স্বর্গলাভ নয়, খ্যাতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও আত্মকল্যাণ কামনা করেন; তাই শিষ্যরূপে তাঁর জন্য উপদেশ প্রার্থনা করা হয়। লোমশ সংসার-নির্মাণ ও আসক্তির কঠোর সমালোচনা করেন—গৃহ, আরাম, যৌবন, ধন ইত্যাদির উপর নির্ভর সব প্রচেষ্টা অনিত্য; মৃত্যু সব কেড়ে নেয়, তাই বৈরাগ্য ও ধর্মাচরণই স্থিতিশীল পথ। এরপর ইন্দ্রদ্যুম্ন লোমশের আশ্চর্য দীর্ঘায়ুর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। লোমশ পূর্বজন্মের কাহিনি বলেন—একসময় তিনি দরিদ্র ছিলেন, কিন্তু একবার আন্তরিক ভক্তিতে শিবলিঙ্গ স্নান করিয়ে পদ্মফুলে পূজা করেছিলেন; সেই এককর্মের ফলে স্মৃতিসহ পুনর্জন্ম লাভ করে তপস্যা-ভক্তির পথে অগ্রসর হন। শিব তাঁকে সম্পূর্ণ অমরত্ব নয়, বরং কল্পচক্র-পর্যন্ত দীর্ঘায়ুর বর দেন; সময় ঘনিয়ে এলে দেহের লোম ঝরে পড়া তার লক্ষণ। শেষে রহস্যরূপে বলা হয়—পদ্মপূজা, প্রণবজপ ও শিবভক্তি মহাপাপও শোধন করে; আর ভারতভূমিতে মানবজন্ম, শিবভক্তি ইত্যাদি ‘দুর্লভ’ স্মরণ করিয়ে ক্ষণস্থায়ী জগতে শিবপূজাকেই প্রধান আশ্রয় ও করণীয় শিক্ষা ঘোষণা করা হয়।

Mahī–Sāgara-saṅgama Māhātmya and the Indradyumneśvara Liṅga (महीसागर-संगम-माहात्म्य एवं इन्द्रद्युम्नेश्वर-लिङ्ग)
এই অধ্যায়ে বহুজনের কথোপকথনের মাধ্যমে ভক্তি, তীর্থ-মাহাত্ম্য ও আচারবিধি প্রকাশিত হয়েছে। রাজা লোমশ ঋষির নিকটে থাকার সংকল্প করেন এবং শিব-দীক্ষা গ্রহণ করে লিঙ্গ-পূজা করতে চান; এখানে বলা হয়েছে যে সৎসঙ্গ তীর্থসেবার থেকেও শ্রেষ্ঠ। অভিশাপে পীড়িত পক্ষী/পশু প্রভৃতি জীব মুক্তির জন্য এমন এক স্থান প্রার্থনা করে যা সকল তীর্থের ফল দেয়; নারদ তাঁদের বারাণসীতে অবস্থানরত যোগী সংবর্তের কাছে যেতে বলেন এবং রাত্রিপথে তাঁর পরিচয়-লক্ষণও নির্দেশ করেন। সংবর্ত মহী–সাগর-সঙ্গমের পরম মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন—মহী নদীর পবিত্রতা এবং সেখানে স্নান-দানাদি প্রয়াগ ও গয়া প্রভৃতি প্রসিদ্ধ তীর্থের সমান বা অধিক ফলদায়ক বলে ফলশ্রুতিতে ঘোষিত। অমাবস্যায় শনি-যোগ, ব্যতীপাতাদি বিশেষ যোগ, শনি ও সূর্যকে অর্ঘ্য-অর্পণ, অর্ঘ্য-মন্ত্র, এবং জলে ডান হাত তুলে সত্য-পরীক্ষার বিধি ইত্যাদি আচার-প্রযুক্তিও দেওয়া হয়েছে। যাজ্ঞবল্ক্য–নকুল সংলাপে কঠোর বাক্যের দোষ, সদাচার এবং শৃঙ্খলা ব্যতীত বিদ্যার অপূর্ণতা শেখানো হয়। শেষে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে ‘ইন্দ্রদ্যুম্নেশ্বর’ (মহাকাল-সম্পর্কিত) নামকরণ হয়; শিব ভক্তদের সাযুজ্য/সারূপ্য সদৃশ ফল দান করেন এবং সঙ্গমের অসাধারণ মুক্তিদায়িনী শক্তি পুনরায় নিশ্চিত করেন।

कुमारेश्वर-माहात्म्यप्रश्नः तथा वज्राङ्गोपाख्यान-प्रस्तावः (Inquiry into the Glory of Kumāreśvara and Prelude to the Vajrāṅga Narrative)
এই অধ্যায়ে অর্জুন কুমারনাথ/কুমারেশ্বরের মাহাত্ম্য ও সংশ্লিষ্ট চরিত্রদের উৎপত্তি সম্পর্কে বিস্তৃত ও নির্ভুল বিবরণ জানতে চান। নারদ বলেন—কুমারেশ্বরের দর্শন, শ্রবণ, ধ্যান, পূজা এবং বৈদিক বিধিতে আরাধনা মহাপবিত্রকারী; অধ্যায়টি ধর্মাচরণ ও সাধনার পথও নির্দেশ করে। এরপর বংশ-সৃষ্টি-ক্রমের প্রসার ঘটে—দক্ষের কন্যাগণ, তাঁদের ধর্ম, কশ্যপ, সোম প্রভৃতির সঙ্গে সংযোগ, এবং সেখান থেকে দেব ও অন্যান্য বংশের উৎপত্তি। দিতির পুত্রশোক, তার তপস্যা, ইন্দ্রের হস্তক্ষেপে মরুৎদের জন্ম, এবং পুনরায় দিতির এক দুর্ধর্ষ পুত্রপ্রার্থনা বর্ণিত হয়; কশ্যপের বরদানে বজ্রসম অবধ্য দেহধারী বজ্রাঙ্গের জন্ম হয়। বজ্রাঙ্গের সঙ্গে ইন্দ্রের সংঘর্ষে ব্রহ্মা নীতি উপদেশ দেন—শরণাগত শত্রুকে মুক্ত করাই বীরধর্ম; রাজ্যলোভ ত্যাগ করে তপস্যায় প্রবৃত্ত হও। ব্রহ্মা বরাঙ্গীকে পত্নী হিসেবে দেন; দীর্ঘ তপস্যায় ইন্দ্র তার ব্রতভঙ্গের চেষ্টা করলেও সে ক্ষমা, ধৈর্য ও স্থৈর্যে অটল থাকে—তপই পরম ‘ধন’ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়। শেষে বজ্রাঙ্গ দুঃখিত পত্নীকে সান্ত্বনা দিয়ে গার্হস্থ্যনীতি ও তপস্যার আদর্শ একত্রে দৃঢ় করেন, এবং কুমারেশ্বর-সম্পর্কিত ফলশ্রুতির ধারাও বজায় থাকে।

Tārakotpattiḥ, Tapasā Vara-prāptiś ca (Birth of Tāraka and the Boon Earned through Austerity)
এই অধ্যায়ে কৌমার-কথাচক্রের মূল কারণ-পরম্পরা প্রকাশিত—দুঃখ থেকে প্রার্থনা, প্রার্থনা থেকে ধর্মচিন্তা, আর চিন্তা থেকে তপস্যা; তপস্যাই বিশ্বশক্তির বিন্যাস বদলে দেয়। পরিত্যাগ ও দুঃখে জর্জরিত বরাঙ্গী এমন পুত্র প্রার্থনা করে যে তার ভয় ও অপমানের অবসান ঘটাবে। দৈত্যনেতা অসুররূপে চিত্রিত হলেও দাম্পত্য-রক্ষার নীতিধর্ম উচ্চারণ করে; স্ত্রীকে ‘জায়া, ভার্যা, গৃহিণী, কলত্র’ প্রভৃতি ধর্ম-সংলগ্ন নামে স্মরণ করে, পীড়িত স্ত্রীর অবহেলাকে নৈতিক বিপদ বলে দেখায়। ব্রহ্মা অতিরিক্ত কঠোর তপস্যার সংকল্প সংযত করে ‘তারক’ নামক মহাবল পুত্রের আশ্বাস দেন। বরাঙ্গী সহস্র বছর গর্ভ ধারণ করে; তারকের জন্মে মহোৎপাত ও জগত্-কম্পন ঘটে, যা তার আবির্ভাবের বিশ্বব্যাপী ফল নির্দেশ করে। অসুরসম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারক প্রথমে আরও ঘোর তপস্যা, পরে দেবজয়—এই কৌশল স্থির করে। পারিয়াত্রে সে পাশুপত দীক্ষা গ্রহণ করে পাঁচ মন্ত্র জপ করে, দীর্ঘ তপস্যা ও অঙ্গচ্ছেদন-সদৃশ কঠোর হোমে দেবতাদের তেজে ভীত করে তোলে। ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হলেও মৃত্যুনিয়মে সম্পূর্ণ অজেয়তা দেন না; তারক শর্তযুক্ত বর পায়—সাত দিনের অধিক বয়সী এক শিশুই তাকে বধ করতে পারবে। শেষে তারকের সমৃদ্ধ রাজসভা, ঐশ্বর্য ও শক্তিসংহতির চিত্রে অধ্যায় সমাপ্ত হয়।

Tāraka’s Mobilization and Bṛhaspati’s Nīti: The Deva–Asura War Preparations (तारक-सेनासंयोजनं बृहस्पति-नीतिविचारश्च)
এই অধ্যায়ে দেব–অসুর মহাযুদ্ধের পূর্বে উভয় পক্ষের প্রস্তুতি ও উত্তেজনা বৃদ্ধি বর্ণিত। প্রথমে তারক মানবধর্মের অবক্ষয় সমালোচনা করে—রাজত্বকে বুদ্বুদ-সম ক্ষণস্থায়ী বলে, আর নারী, পাশা ও মদ্যভোগের নেশাকে ‘পৌরুষ’ (সঙ্কল্পশক্তি/পুরুষার্থ) নষ্টকারী বলে উল্লেখ করে। তারপর সে দেবসম্বন্ধীয় ত্রিলোক-সমৃদ্ধি দখলের জন্য দ্রুত সেনা সাজানোর আদেশ দেয়; মহারথ ও অলংকৃত চিহ্ন-ধ্বজ নির্দিষ্ট করে। নারদ জানান, অসুরসেনাপতি গ্রাসন রথ, বাহন ও বহু নেতাকে সমবেত করে পশু, রাক্ষস ও পিশাচ-আকৃতির ভয়ংকর পতাকা-চিহ্নসহ বিশাল বাহিনীকে ব্যূহবদ্ধ করে; সংখ্যা, বিন্যাস, যান ও ধ্বজ-ঐশ্বর্যের বিবরণ শক্তি ও ভীতিসঞ্চারের তালিকা হয়ে ওঠে। পরে কাহিনি দেবপক্ষে মোড় নেয়। দূতরূপে বায়ু ইন্দ্রকে অসুরবলের সংবাদ দেন। ইন্দ্র বৃহস্পতির নীতি-পরামর্শ চান; তিনি সাম, দান, ভেদ ও দণ্ড—এই চার উপায় ব্যাখ্যা করে বলেন, অধর্মে অটল শত্রুর ক্ষেত্রে সামাদির ফল হয় না, তাই দণ্ডই কার্যকর প্রতিকার। ইন্দ্র সম্মতি দিয়ে অস্ত্রপূজা করান, যমকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন এবং দেবগণসহ গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস, পিশাচ, কিন্নর প্রভৃতি মিত্রদের ধ্বজ ও বাহনসহ সমবেত করেন। শেষে ঐরাবতে আরূঢ় ইন্দ্রের মহিমাময় আবির্ভাব আসন্ন সংঘর্ষকে ধর্মরক্ষার নীতিনির্দেশিত অভিযান হিসেবে স্থাপন করে।

Grasana–Yama Saṅgrāmaḥ (The Battle of Grasana and Yama) / ग्रसन–यमसंग्रामः
এই অধ্যায়ে নারদের বর্ণনায় দেব ও অসুর সেনার মহাসংঘর্ষ শুরু হয়। শঙ্খ-ভেরী-নগাড়ার ধ্বনি, হাতি-ঘোড়া-রথের গর্জনে যুদ্ধক্ষেত্র যেন যুগান্তের সমুদ্র-উথালপাথালের মতো অশান্ত হয়ে ওঠে। তারপর বর্শা, গদা, কুঠার, শক্তি, তোমর, অঙ্কুশ ও বাণের ঘন বর্ষণে দিকদিগন্ত অন্ধকারে ঢেকে যায়; যোদ্ধারা একে অপরকে না দেখেই আঘাত করে বিভ্রান্ত হয়। ভাঙা রথ, পতিত গজ, আর রক্তধারার নদী যুদ্ধভূমিকে ভয়ংকর করে তোলে; মাংসভোজী প্রাণীরা আকৃষ্ট হয় এবং সীমান্ত-প্রকৃতির কিছু গণও সেখানে আনন্দ পায় বলে বলা হয়েছে। এরপর কাহিনি দ্বন্দ্বযুদ্ধে কেন্দ্রীভূত—অসুরনায়ক গ্রসন যম (কৃতান্ত)-এর মুখোমুখি হয়। উভয়ে বাণবৃষ্টি, গদা ও দণ্ডাঘাত এবং নিকটযুদ্ধে কুস্তি পর্যন্ত করে। গ্রসনের প্রচণ্ড আক্রমণে যমের কিঙ্কররা পর্যুদস্ত হয় এবং যম নিজেও প্রহৃত হয়ে নিস্তেজপ্রায় বলে প্রতীয়মান হয়; গ্রসন বিজয়গর্জন করে সেনা পুনর্গঠিত করে। অধ্যায়টি কাল ও দণ্ডের অধিকার এবং বিশ্বশাসনের সামনে মানবীয় ‘পৌরুষ’-এর ভঙ্গুরতা স্মরণ করায়; দেবগণ বিচলিত হয় এবং যুদ্ধক্ষেত্র কাঁপতে থাকে।

Kubera–Daitya Saṅgrāma: Kujambha, Nirṛti, Varuṇa, Candra, and Divākara in Cosmic Conflict
নারদ দীর্ঘ যুদ্ধবৃত্তান্ত বর্ণনা করেন। ধনাধিপ কুবের প্রথমে জম্ভের সঙ্গে সংঘর্ষে অবতীর্ণ হন; ঘন অস্ত্রবৃষ্টির মধ্যেও কুবেরের প্রসিদ্ধ গদা জম্ভকে বিধ্বস্ত করে। এরপর কুজম্ভ শরজাল ও ভারী অস্ত্রে আক্রমণ বাড়িয়ে কিছুক্ষণ কুবেরকে পরাভূত করে ধন-রত্ন ও যানবাহন লুণ্ঠনের চেষ্টা করে। যুদ্ধ বিস্তৃত হলে নিরৃতি প্রবেশ করে দানবসেনাকে ছত্রভঙ্গ করেন। দানবেরা তামসী মায়া সৃষ্টি করে অন্ধকারে সকলকে স্তব্ধ করে দেয়, কিন্তু সাৱিত্র অস্ত্র সেই তমসা দূর করে। বরুণ পাশে কুজম্ভকে বেঁধে আঘাত করেন; তখন দানবনায়ক মহিষ বরুণ ও নিরৃতিকে ভয় দেখালে তারা ইন্দ্রের আশ্রয়ের দিকে সরে যায়। চন্দ্র শীতাস্ত্র প্রয়োগে দানবদলকে অবশ করে দেয়; হতাশ দানবদের কালনেমি তিরস্কার করে এবং মানবাকৃতি মায়া ও অগ্নিসদৃশ বিস্তার ঘটিয়ে শীতের প্রভাব উল্টে দেয়। শেষে দিবাকর (সূর্য) আবির্ভূত হয়ে অরুণকে কালনেমির দিকে চালাতে বলেন এবং শম্বর-ইন্দ্রজালাদি মায়াযুক্ত আক্রমণ নিক্ষেপ করেন; বিভ্রমে দানবেরা দেবদেরই দানব মনে করে পুনরায় হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। অধ্যায়ের শিক্ষা—বিবেকহীন শক্তি চঞ্চল, আর অস্ত্র-মায়া ও দেবরক্ষায় বিশ্বধর্মের ভারসাম্য পুনঃস্থাপিত হয়।

कालनेमिवधप्रसङ्गः — The Episode of Kālanemi’s Defeat and the Devas’ Appeal to Viṣṇu
এই অধ্যায়ে ক্রোধ ও মোহে আচ্ছন্ন কালনেমি অসুর নিমির রূপ ভুল বুঝে যুদ্ধকে ভয়ংকরভাবে বাড়িয়ে তোলে। নিমির প্ররোচনায় সে ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে, ফলে দেবসেনায় আতঙ্ক ছড়ায়; তবে প্রতিকার দ্বারা সেই অস্ত্র প্রশমিত হয়। এরপর ভাস্কর (সূর্য) তীব্র তাপময় ভয়াল রূপ ধারণ করে অসুরদলকে দগ্ধ করেন; তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা, তৃষ্ণা ও মহাবিনাশ নেমে আসে। তখন কালনেমি মেঘসদৃশ রূপ নিয়ে শীতল বৃষ্টিতে পরিস্থিতি উল্টে দেয়, নিজের পক্ষকে চাঙ্গা করে অস্ত্রবৃষ্টিতে দেবতা ও সহচরদের বিপুল ক্ষতি ঘটায়। অশ্বিনীকুমাররা তীক্ষ্ণ বাণ ও বজ্রাস্ত্র-প্রভাবে তার রথযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করেন; কালনেমি চক্র, গদা প্রভৃতি অস্ত্রে পাল্টা আঘাত করে এবং পরে নারায়ণাস্ত্র প্রসঙ্গও উত্থাপিত হয়। ইন্দ্রের অবস্থা সংকটাপন্ন হলে ও মহাজাগতিক অমঙ্গলচিহ্ন ঘনীভূত হলে দেবগণ বিধিপূর্বক স্তব করে বাসুদেবের শরণ নেন। বিষ্ণু যোগনিদ্রা থেকে জেগে গরুড়ারূঢ় হয়ে আসেন, অসুরদের আঘাত নিজের মধ্যে ধারণ করে কালনেমির সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। অস্ত্রবিনিময় ও নিকটযুদ্ধের শেষে বিষ্ণু নির্ণায়ক প্রহারে তাকে আহত ও বশীভূত করেন, তবে ভবিষ্যতে চূড়ান্ত বিনাশের ইঙ্গিত দিয়ে সাময়িক অবকাশ দেন; ভয়ে তার সারথি তাকে বিশ্বেশ্বরের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।

Viṣṇu–Dānava Saṅgrāma: Astrayuddha and the Fall of Grasana
নারদ এক মহাযুদ্ধের কাহিনি বলেন, যেখানে বহু দানব ভয়ংকর পশু ও যানবাহনে চড়ে নারায়ণ (বিষ্ণু)-এর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিমি, মথন, শুম্ভ, জম্ভ, সেনাপতি গ্রসন ও মহিষ প্রমুখ নামসহ উপস্থিত হয়। প্রথমে তীক্ষ্ণ বাণের বর্ষা, পরে বিষ্ণু ধনুক ছেড়ে গদা ধারণ করে স্তরে স্তরে নিক্ষিপ্ত অস্ত্রকে প্রত্যস্ত্রে প্রতিহত করেন। গ্রসন মুক্ত রৌদ্রাস্ত্রকে ব্রহ্মাস্ত্রে নিবারণ করে। তখন বিষ্ণু ভীতিসঞ্চারী কালদণ্ডাস্ত্র প্রয়োগ করেন; এতে দানবসেনা বিপর্যস্ত হয়, যদিও পরে প্রতিস্ত্রে তা রুদ্ধ হয়। এরপর বিষ্ণু সুদর্শন চক্রে গ্রসনকে নিশ্চিতভাবে বধ করেন। ঘনিষ্ঠ যুদ্ধে কিছু অসুর গরুড় ও বিষ্ণুকে আঁকড়ে ধরে; বিষ্ণু ঝাঁকিয়ে তাদের সরিয়ে আবার অস্ত্রযুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। মথন অল্পক্ষণেই বিষ্ণুর গদায় নিহত হয়। মহিষ প্রবল আক্রমণ করলেও পদ্মজ ব্রহ্মার পূর্ববাণী অনুযায়ী সে নারীর হাতে বধ্য—এই নিয়তির কারণে বিষ্ণু তাকে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর হাত থেকে মুক্ত করেন। শুম্ভ উপদেশে পশ্চাদপসরণ করে; জম্ভ গর্বে গরুড় ও বিষ্ণুকে ভারী আঘাতে সাময়িকভাবে অচেতন করে, কিন্তু বিষ্ণু স্থির হলে পালায়। অধ্যায়ে অস্ত্রতত্ত্বের ক্রম, নিয়তির নীতি ও সেনাপতি-বধে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা প্রতিফলিত।

Jambha–Tāraka Saṅgrāma, Nārāyaṇāstra, and Kāla-Upadeśa (जंभतारकसंग्रामः कालोपदेशश्च)
এই অধ্যায়ে নারদ দেখেন—দৈত্যরা পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে, আর ইন্দ্র দ্বিধাগ্রস্ত। ইন্দ্র বিষ্ণুর শরণ নেন; বিষ্ণু জানান যে তিনি শত্রু বিনাশে সক্ষম, তবে বরদান ও শর্তের কারণে কিছু বিধিনিষেধ আছে—তাই সঠিক লক্ষ্য জাম্ভ এবং যথাযথ উপায় অবলম্বনের নির্দেশ দেন। এরপর দেবসেনার ব্যূহ রচিত হয়; একাদশ রুদ্র-অংশকে অগ্রসর করে পাঠানো হয়, এবং তাদের হস্তক্ষেপে গজাসুর বধ ও চর্ম-পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উঠে আসে। তারপর দীর্ঘ অস্ত্রযুদ্ধ শুরু হয়—মৌশল, শৈল, বজ্র, আগ্নেয়, বারুণ, বায়ব্য, নারসিংহ, গারুড় প্রভৃতি অস্ত্র পরস্পর প্রতিঅস্ত্রে প্রশমিত হয়; পাশুপত/অঘোর-মন্ত্রের সংযোগে অস্ত্র-শাসনের তাত্ত্বিক বিধানও প্রকাশ পায়। শেষে বিষ্ণু-প্রভাবিত বাণের ধারায় জাম্ভ পতিত হয়; দৈত্যরা তারকের কাছে পালায়। তারক দেবতাদের পরাভূত করলে বিষ্ণু কপিরূপ ছলে তারকের সভায় প্রবেশ করে কাল ও কর্ম বিষয়ে উপদেশ দেন—রাজত্বের অনিত্যতা, কর্তৃত্ব-মোহ, এবং ধর্মের অপরিহার্যতা। তারক সেই শিক্ষা মান্য করে দেবতাদের নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট কালের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদান করে; অধ্যায়ের শেষে কালের অধীন প্রতিনিধিত্বশীল ক্ষমতার মাধ্যমে বিশ্ব-কার্যের পুনর্বণ্টন ঘটে।

Virāṭ-stuti, Tāraka-vadha-upāya, and Rātri’s Commission for the Goddess’s Rebirth (विराट्स्तुति–तारकवधोपाय–रात्र्यादेशः)
এই অধ্যায়ে নারদ বর্ণনা করেন—তারকের প্রাবল্যে ক্লিষ্ট দেবতারা রূপান্তরিত হয়ে গোপনে স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মার শরণ নেন। ব্রহ্মা তাঁদের আশ্বাস দেন এবং বিরাট-স্তব গ্রহণ করেন; সেখানে পাতাল থেকে স্বর্গ পর্যন্ত লোকসমূহকে দিব্য দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে, সূর্য-চন্দ্র, দিকসমূহ ও প্রাণপথও বিশ্ব-শরীরের অঙ্গরূপে প্রতিপন্ন। এরপর দেবতারা জানান যে তারক এক পবিত্র তট/তীর্থ ধ্বংস করেছে, দেবশক্তি হরণ করেছে এবং জগতের আনুগত্য উল্টে দিয়েছে। ব্রহ্মা বরদানের সীমা ব্যাখ্যা করে বলেন—তারক প্রায় অবধ্য—তবু ধর্মসম্মত উপায় আছে: সাত দিনের এক দিব্য শিশু তারকবধ করবে; আর পূর্বসতী দেবী হিমাচলের কন্যারূপে পুনর্জন্ম নিয়ে শঙ্করের সঙ্গে মিলনের জন্য তপস্যাই সিদ্ধির অপরিহার্য সাধন হবে। ব্রহ্মা রাত্রি (বিভাবরী)-কে আদেশ দেন মেনার গর্ভে প্রবেশ করে দেবীর বর্ণ শ্যামল করতে—যা ভবিষ্যৎ কালী/চামুণ্ডা-রূপ ও দানববধের পূর্বাভাস। শেষে দেবীর শুভ জন্মক্ষণে বিশ্বে সাম্য, ধর্মমুখী প্রবৃত্তি, প্রাকৃতিক প্রাচুর্য এবং দেব-ঋষি, পর্বত, নদী ও সমুদ্রের আনন্দোৎসবের বর্ণনা রয়েছে।

Nārada–Himavat-saṃvāda: Pārvatyāḥ Pati-nirdeśa (Narada’s Dialogue with Himavat on Pārvatī’s Destined Spouse)
এই অধ্যায়ে পবিত্র ভূগোল ও গৃহধর্মের প্রসঙ্গে সংলাপধর্মী কাহিনি এগোয়। নারদ শৈলজা দেবী (পার্বতী)-র দেবী ও অপ্সরাদের সঙ্গে ক্রীড়ার বর্ণনা করেন; পরে মেরুতে ইন্দ্র (শক্র) তাঁকে স্মরণ করে আহ্বান করেন। ইন্দ্র অনুরোধ করেন—শৈলজার জন্য হর (শিব)-ই একমাত্র যোগ্য বর, তাই এই মিলনের জন্য নারদ যেন উদ্যোগ নেন। নারদ হিমালয়ে এসে হিমবানের সম্মান লাভ করেন এবং পর্বতের মহিমা—আশ্রয়, জল, তপস্যার উপকরণ দিয়ে জীবধারণ—প্রশংসা করেন। মেনা বিনয় ও ভক্তিতে উপস্থিত হন; লজ্জাশীলা কিশোরী পার্বতীকে পরিচয় করানো হয়। নারদ মেনাকে সৌভাগ্য, গৃহলক্ষ্মী-ধর্ম ও বীরসন্তানের আশীর্বাদ দেন। মেনা যখন পার্বতীর ভবিষ্যৎ স্বামী সম্পর্কে জানতে চান, নারদ প্রথমে বিপরীতধর্মী লক্ষণ বলেন—অজন্মা, দিগম্বর, দরিদ্র, উগ্র—যাতে হিমবান ব্যথিত হন এবং মানবজন্মের দুর্লভতা, গৃহস্থাশ্রম ও ধর্মপালনের কঠিনতা নিয়ে চিন্তা ওঠে। শেষে নারদ রহস্য উন্মোচন করেন—পার্বতী জগন্মাতা, তাঁর নির্ধারিত পতিই চিরন্তন শঙ্কর; তিনি অজন্মা হয়েও সর্বত্র বর্তমান, ‘দরিদ্র’ হয়েও সর্বদাতা—এইভাবে শিবের পরত্ব ও অন্তর্যামিত্বের তত্ত্ব স্পষ্ট করে অধ্যায় সমাপ্ত হয়।

Kāma’s Mission, Śiva’s Yoga, and the Burning of Manmatha (कामदहनप्रसङ्गः)
এই অধ্যায়ে নারদ হিমালয়ের সঙ্গে পূর্ব কথোপকথনের সংবাদ দেন। ভবিষ্যৎ দেবীর উত্তান ডান হাতকে তিনি সকল জীবের প্রতি চিরস্থায়ী ‘অভয়’ মুদ্রা বলে ব্যাখ্যা করেন। এরপর নারদ জানান—জগতের কল্যাণার্থে এক মহান দেবকার্য বাকি আছে, তা হলো হিমালয়-কন্যা দেবী (পার্বতী) ও শিবের পুনর্মিলন। নারদের প্রেরণায় ইন্দ্র কাম (মনমথ)-কে আহ্বান করেন। কাম তপস্বী-বেন্তান্তিক নীতিতে আপত্তি তোলে—কামনা জ্ঞানকে আচ্ছাদিত করে, জ্ঞানীদের শত্রু, তাই শাস্ত্রে নিন্দিত। ইন্দ্র বলেন, কামের তিন রূপ (তামস, রাজস, সাত্ত্বিক); নিয়ন্ত্রিত ইচ্ছাই সংসারকার্য সিদ্ধ করে, আর শুদ্ধ কামনা উচ্চ উদ্দেশ্যেও সহায়ক হতে পারে। কাম বসন্ত ও রতির সঙ্গে শিবাশ্রমে গিয়ে শিবকে গভীর সমাধিতে দেখেন এবং ভ্রমরের গুঞ্জনের অজুহাতে সূক্ষ্ম বিঘ্ন ঘটিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। শিব তা উপলব্ধি করে তৃতীয় নয়নের অগ্নি নিক্ষেপ করেন; কাম ভস্মীভূত হয়। অগ্নির প্রাবল্য বিশ্বদাহের আশঙ্কা জাগালে শিব তা চন্দ্র, ফুল, সঙ্গীত, ভ্রমর, কোকিল ও ভোগরসে বিভক্ত করে স্থাপন করেন—ফলে জীবের মধ্যে বিরহ-তৃষ্ণার আগুন অব্যাহত থাকে। রতি শোকে কাতর হলে শিব সান্ত্বনা দেন—দেহধারী জগতে কাম শক্তি রূপান্তরে কার্যকর থাকবে। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, বিষ্ণু যখন বাসুদেবের পুত্ররূপে অবতীর্ণ হবেন, তখন কাম তাঁর পুত্র (প্রদ্যুম্ন) রূপে পুনর্জন্ম নেবে এবং রতির দাম্পত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

पार्वतीतपः–ब्रह्मचारिवेषधरीश्वरीक्षण–स्वयंवरप्रसंगः | Pārvatī’s Austerity, Śiva’s Brahmacārin Test, and the Svayaṃvara Episode
অধ্যায়ের শুরুতে অর্জুন নারদকে অনুরোধ করেন—সতী-বিচ্ছেদ ও স্মর (কাম) দহন-পরবর্তী শিবের অভিপ্রায়সংক্রান্ত “অমৃতসম” কাহিনি পুনরায় বলতে। নারদ তপস্যাকে মহাসিদ্ধির মূল কারণ রূপে স্থাপন করেন—তপস্যা ছাড়া দেহশুদ্ধি, যোগ্যতা ও মহৎ কর্মের সাফল্য হয় না। এরপর পার্বতীর দুঃখ ও দৃঢ় সংকল্প বর্ণিত হয়। তিনি কেবল ভাগ্যবাদকে খণ্ডন করে বলেন—ফল নির্ধারিত হয় দৈব, পুরুষার্থ ও স্বভাবের সংযোগে; তপস্যা প্রমাণিত সাধন। পিতা-মাতার অনিচ্ছাসত্ত্বেও সম্মতি নিয়ে তিনি হিমালয়ে ক্রমে আহারসংযম করেন—অল্পাহার থেকে প্রায় প্রাণধারণমাত্র, শেষে প্রায় সম্পূর্ণ উপবাস; সঙ্গে প্রণবজপ ও ঈশ্বরধ্যানে একাগ্রতা। শিব ব্রহ্মচারী-বেশে এসে ধর্ম-তত্ত্বের পরীক্ষা নেন; কৃত্রিম ডুবে যাওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে পার্বতীর ধর্মপ্রাধান্য ও অটল ব্রত প্রকাশ পায়। পরে তিনি শিবের বৈরাগ্যচিহ্নগুলিকে নিন্দা-সদৃশ করে তাঁর বিবেক যাচাই করেন; পার্বতী শ্মশান, সর্প, ত্রিশূল ও বৃষভকে বিশ্বতত্ত্বের প্রতীক বলে শাস্ত্রসম্মত ব্যাখ্যা দেন। তখন শিব স্বরূপ প্রকাশ করে তাঁকে গ্রহণ করেন এবং হিমবতকে স্বয়ংবর আয়োজনের নির্দেশ দেন। স্বয়ংবরে দেবতা ও বহু সত্তা সমবেত হয়। শিব ক্রীড়ায় শিশুরূপে আবির্ভূত হয়ে দেবাদের অস্ত্র স্থবির করে নিজের সার্বভৌমত্ব দেখান। ব্রহ্মা লীলা চিনে স্তব শুরু করান এবং দেবতারা দিব্যদৃষ্টি লাভ করে শিবকে যথার্থ দেখেন। পার্বতী শিবকে বরমালা পরান, সভা জয়ধ্বনি তোলে—অধ্যায় তপস্যা, বিবেক ও কৃপা-তত্ত্বের মহিমা প্রতিষ্ঠা করে।

शिवपार्वतीविवाहः (Śiva–Pārvatī Vivāha: The Cosmic Wedding and Ritual Protocol)
এই অধ্যায়ে শিব–পার্বতীর বিবাহের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা ও তার মহাজাগতিক আয়োজন বর্ণিত। ব্রহ্মা মহাদেবকে বিবাহ আরম্ভ করতে প্রার্থনা করেন; তখন রত্নখচিত বিশাল নগর ও বিবাহমণ্ডপ নির্মিত হয়। দেবতা, ঋষি, গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়; তবে বৈরী দৈত্যদের বাদ দেওয়া হয়, যাতে এই অনুষ্ঠান বিশ্ব-লিটুর্জির মতো পবিত্র রূপ পায়। বিভিন্ন দেবতা শিবকে অলংকার ও চিহ্ন প্রদান করেন—চন্দ্রশেখর, কপর্দা-বিন্যাস, মুণ্ডমালা, বস্ত্র ও অস্ত্রাদি। অসংখ্য গণ ও দিব্য বাদ্যকার সমবেত হয়; ঢাক-ঢোল, গান-নৃত্য এবং বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে বরযাত্রা অগ্রসর হয়। হিমালয়ের সভায় বিধিগত প্রশ্ন ওঠে—লাজাহোমে কনের ভাইয়ের অনুপস্থিতি এবং বরের কুল/গোত্র নির্ণয়। বিষ্ণু উমার ভ্রাতারূপে আবির্ভূত হয়ে উভয় সমস্যার সমাধান করেন এবং সম্পর্ক-যুক্তি দ্বারা বিধিশুদ্ধি রক্ষা করেন। ব্রহ্মা হোতা হয়ে যজ্ঞ সম্পন্ন করেন; ব্রহ্মা, অগ্নি ও ঋষিদের হবি ও দক্ষিণা প্রদান করা হয়। শেষে ফলশ্রুতি জানায়—এই বিবাহকথা শ্রবণ বা পাঠ করলে স্থায়ী মঙ্গলবৃদ্ধি ও শুভসমৃদ্ধি লাভ হয়।

विघ्नपतिप्रादुर्भावः, गणेशमर्यादा-प्रतिपादनं, तथा उमा-शंकरनर्मसंवादः (Manifestation of Vighnapati, Norms of Merit, and the Uma–Śaṅkara Dialogue)
এই অধ্যায়ে নারদ মন্দর পর্বতে শিব–দেবীর দিব্য গৃহস্থ-পরিবেশ বর্ণনা করেন। তারকাসুরে পীড়িত দেবগণ স্তোত্রসহ শঙ্করের শরণ নেন। সেই স্তবের সান্নিধ্যেই দেবীর দেহের উবটন-মল থেকে গজানন ‘বিঘ্নপতি’ প্রকাশিত হন; দেবী তাঁকে পুত্ররূপে গ্রহণ করেন এবং শিব তাঁর বীর্য ও করুণাকে নিজের তুল্য বলে প্রশংসা করেন। এরপর বিঘ্ন-নীতির বিধান বলা হয়—যারা বেদধর্ম ত্যাগ করে, শিব/বিষ্ণুকে অস্বীকার বা নিন্দা করে, কিংবা সমাজ-আচার উল্টে দেয়, তাদের জীবনে বারংবার বাধা, গৃহকলহ ও অশান্তি থাকে; আর যারা শ্রুতি-ধর্ম, গুরু-সম্মান ও সংযম পালন করে, তাদের বিঘ্ন নাশ হয়। দেবী জনকল্যাণের ‘মর্যাদা’ স্থাপন করেন—কূপ, পুকুর, সরোবর নির্মাণে পুণ্য, কিন্তু বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা তার চেয়েও শ্রেষ্ঠ ফলদায়ক; জীর্ণোদ্ধার করলে দ্বিগুণ ফল হয় বলে বলা হয়েছে। পরে শিবের গণদের নানা রূপ, বাসস্থান ও আচরণের তালিকা আসে; তাদের মধ্যে বীরক নামক এক অনুচরকে দেবী স্নেহপূর্ণ আচারসহ পুত্রবৎ গ্রহণ করেন। শেষে উমা–শঙ্করের নর্ম-সংলাপ—বাক্য, বর্ণ-উপমা ও পারস্পরিক অভিযোগে—অর্থবোধ, আঘাত ও সম্পর্ক-নীতির সূক্ষ্ম শিক্ষা দেয়।

गिरिजातपः-नियमनम् — Pārvatī’s Austerity and Protective Boundary near Śiva
অধ্যায়ে নারদ বর্ণনা করেন—প্রস্থানকালে গিরিজা (পার্বতী) পর্বতের দীপ্তিময় দেবী কুসুমামোদিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যিনি শিখরনাথ শিবের ভক্ত। দেবী স্নেহভরে জিজ্ঞাসা করেন কেন তিনি চলেছেন; গিরিজা জানান, শঙ্করকে কেন্দ্র করে সংঘাত থেকেই এই বিচ্ছেদ। দেবীর নিত্যসান্নিধ্য ও মাতৃসুলভ রক্ষার কথা স্মরণ করে গিরিজা একটি ধর্ম-ব্যবহারিক নির্দেশ দেন—যদি অন্য কোনো নারী পিনাকিন (শিব)-এর নিকট আসে, তবে পুত্র/অনুচর যেন তা জানায়, এবং যথোচিত প্রতিকার হবে। এরপর গিরিজা এক মনোরম উচ্চশিখরে গিয়ে অলংকার ত্যাগ করে বল্কল পরিধান করে তপস্যা শুরু করেন—গ্রীষ্মে পঞ্চাগ্নি সহ্য, বর্ষায় জল-নিয়ম। তাঁর পুত্র/রক্ষক বীরককে শিবের সন্নিধিতে সীমারক্ষা ও প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণের দায় দেওয়া হয়; সে সম্মতি দিয়ে (গজবক্ত্র বলে সম্বোধিত) আবেগভরে প্রার্থনা করে—আমাকেও সঙ্গে নিন, কারণ আমাদের ভাগ্য এক, এবং ছলনাময় বিরোধীদের ধর্মপথে জয় করা কর্তব্য। এই কাহিনি তপোনিয়ম, সম্পর্কধর্ম ও পবিত্র সান্নিধ্যের নিয়ন্ত্রিত মর্যাদা শিক্ষা দেয়।

आर्बुदाख्यानम् (Arbuda-ākhyāna) and Kaumāra Narrative Cycle: Pārvatī’s Tapas, Māyā-Discernment, and Skanda’s Investiture
এই অধ্যায়ে নারদের বর্ণনায় বহু পর্বের এক তাত্ত্বিক কাহিনি প্রকাশ পায়। গিরিজা পর্বতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কুসুমামোদিনীকে দর্শন করে উচ্চ শিখরে কঠোর তপস্যায় প্রবৃত্ত হন এবং ঋতুভেদে শীত-উষ্ণ-বর্ষার কষ্ট সহ্য করে তপের মহিমা প্রকাশ করেন। একই সময়ে অন্ধক-বংশসংশ্লিষ্ট অসুর আডি ব্রহ্মার কাছ থেকে শর্তযুক্ত বর পায়—রূপ পরিবর্তিত হলে তবেই তার মৃত্যু—এবং ছল করে শিবের নিকটে এসে উমার মতো রূপ ধারণ করে অনিষ্ট করতে চায়; শিব দেহচিহ্ন দেখে প্রতারণা বুঝে তাকে নিবৃত্ত করেন, ফলে মায়ার বিরুদ্ধে বিবেকের জয় প্রতিপন্ন হয়। ভ্রান্তিতে গিরিজা ক্রোধে পুত্রসম দ্বাররক্ষক বীরককে শাপ দেন; কিন্তু কাহিনি জানায়, এই শাপই বিধির পথ—বীরক শিলা থেকে মানবজন্ম নিয়ে ভবিষ্যতে পুনরায় সেবা করবে। অর্বুদ/অর্বুদারণ্যের মাহাত্ম্য ও অচলেশ্বর-লিঙ্গের তারক শক্তি বিশেষভাবে প্রশংসিত। ব্রহ্মা গিরিজাকে রূপান্তরের বর দেন, যার ফলে কৌশিকী দেবীর আবির্ভাব; তাঁকে সিংহবাহন, রক্ষাকর্ম ও দানবদমন দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর কৌমার সৃষ্টিচক্র: স্বাহা অগ্নির সঙ্গে প্রসঙ্গে ছয় ঋষিপত্নীর রূপ ধারণ করেন (অরুন্ধতী ব্যতীত), রুদ্রতেজের সঞ্চার ও নিক্ষেপ ঘটে, এবং স্কন্দ/গুহের জন্ম ও বৃদ্ধি বর্ণিত হয়। বিশ্বামিত্র প্রদত্ত ১০৮-এর অধিক নামের স্তোত্র রক্ষাকারী ও পবিত্রকারী বলে ঘোষিত। বালক স্কন্দের যুদ্ধপ্রদর্শনে দেবগণ বিচলিত; ইন্দ্রের বজ্র থেকে শাখ-নৈগমেয় প্রভৃতি ও মাতৃগণ উদ্ভূত হয়; শেষে স্কন্দ সেনাপতি পদ গ্রহণ করে ইন্দ্রের রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। শ্বেতপর্বতে দেবোৎসব ও পিতামাতার সঙ্গে পুত্রের মিলন—ক্রোধের ফল, স্তোত্র-যজ্ঞভাগ এবং অর্বুদক্ষেত্রের পবিত্র ভূগোল—সব মিলিয়ে শিক্ষাময় মানচিত্র রচিত হয়।

Skanda’s Senāpati-Abhiṣeka at the Mahī–Ocean Confluence (महीसमुद्रसंगमे स्कन्दाभिषेकः)
অধ্যায় ৩০-এ নারদ শ্বেতপর্বত থেকে দক্ষিণদিকে তারক-বধের উদ্দেশ্যে অগ্রসরমান স্কন্দকে প্রত্যক্ষ করেন। গ্রহ, উপগ্রহ, বেতাল, শাকিনী, উন্মাদ, অপস্মার, পিশাচ প্রভৃতি বিঘ্নসৃষ্টিকারী সত্তার উল্লেখ করে সংযমিত আচরণ, নিয়ম ও ভক্তির দ্বারা রক্ষার উপদেশ দেওয়া হয়। এরপর কাহিনি মহী নদীতীরে গিয়ে মহী-মাহাত্ম্য স্তবের মাধ্যমে মহী–সমুদ্র সঙ্গমকে সর্বতীর্থসার বলে প্রতিষ্ঠা করে। সেখানে স্নান ও পিতৃতর্পণকে সর্বত্র ফলদায়ক বলা হয়েছে; জল লবণাক্ত হলেও তার রূপান্তরকারী দিব্য শক্তি নানা দৃষ্টান্তে ব্যাখ্যাত। দেব-ঋষিগণ তখন স্কন্দের সেনাপতি-অভিষেক বিধিপূর্বক আরম্ভ করেন। অভিষেক-দ্রব্য সমবেত হয়, মন্ত্রশুদ্ধ হোম সম্পন্ন হয়; প্রধান ঋত্বিকদের মধ্যে ব্রহ্মা ও কপিলের নাম উল্লিখিত। হোমকুণ্ডে মহাদেব লিঙ্গরূপ প্রকাশ করে আচার-সত্যতার এক অলৌকিক প্রমাণ দেন। শেষে অংশগ্রহণকারী দেবতা, লোকশ্রেণি ও নানা সত্তার বৃহৎ তালিকা দেওয়া হয়; স্কন্দকে দান, অস্ত্র, পার্ষদ এবং বিস্তৃত মাতৃগণ প্রদান করা হয়। স্কন্দের ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ও দেবগণের বরদানে প্রস্তুতির মাধ্যমে অধ্যায়টি তীর্থমাহাত্ম্য, অভিষেক-লিতুর্জি, রক্ষাধর্ম ও নেতৃত্বের দিব্য অনুমোদনকে একত্র করে সমাপ্ত হয়।

Guha’s March to Tārakapura and the Deva-Host: Oath, Mobilization, and Stuti (गुहस्य तारकपुराभियानम्)
অধ্যায়ে নারদ বর্ণনা করেন—দেবতারা গুহ (স্কন্দ)-এর কাছে বর চান, পাপী তারককে বধ করার জন্য। গুহ সম্মতি দিয়ে ময়ূরে আরোহণ করে যুদ্ধযাত্রা শুরু করেন এবং ধর্মের শর্ত ঘোষণা করেন—যারা গাভী ও ব্রাহ্মণকে অপমান করে, তাদের তিনি কখনও রেহাই দেবেন না; ফলে এই যুদ্ধ জয়লাভের লোভ নয়, ধর্মরক্ষার সংকল্প। এরপর মহা সমাবেশ—শিব পার্বতীসহ সিংহযুক্ত দীপ্ত রথে অগ্রসর হন, ব্রহ্মা রশি ধারণ করেন; কুবের, ইন্দ্র, মরুত, বসু, রুদ্র, যম, বরুণ এবং অস্ত্র-উপকরণের দেবরূপ সহযাত্রী হন। পশ্চাতে বিষ্ণু সমগ্র ব্যূহ রক্ষা করে চলেন। উত্তর তীরে তাম্রবর্ণ প্রাচীরের নিকটে সেনা থামে; স্কন্দ তারকপুরের সমৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করেন। তারপর কূটনীতি—ইন্দ্র দূত পাঠানোর প্রস্তাব দেন; দূত তারককে কঠোর বার্তা দেয়, বেরিয়ে না এলে নগর ধ্বংস হবে। অশুভ লক্ষণে বিচলিত তারক বিপুল দেবসেনা দেখে এবং ‘মহাসেন’ স্কন্দের জয়ধ্বনি ও স্তোত্র শুনে; শেষে আনুষ্ঠানিক স্তুতিতে দেবশত্রু বিনাশের প্রার্থনা করা হয়।

Tārakāsura–Vadhasya Prastāvaḥ (Prelude to the Slaying of Tāraka) / The Battle with Tāraka and the Release of Śakti
অধ্যায় ৩২-এ যুদ্ধ ও তত্ত্ববিচার একসঙ্গে ঘনীভূত। নারদের সংবাদে অসুররাজ তারক মন্ত্রীদের ডেকে রণঢাক বাজিয়ে সেনা সমাবেশ করে দেবতাদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়। ভয়ংকর যুদ্ধে কিছু সময় দেবগণ বিপর্যস্ত হয়; কালনেমির আঘাতে ইন্দ্র আহত ও স্তব্ধ হয়ে পড়েন। পরে ইন্দ্র, শঙ্কর, বিষ্ণু প্রমুখ দেবতা পৃথক পৃথক অসুরনায়কদের সঙ্গে সংঘর্ষে অবতীর্ণ হন এবং যুদ্ধের গতি পাল্টাতে থাকে। এরপর নীতি-ধর্মের বিতর্ক ওঠে। তারককে ‘রুদ্রভক্ত’ বলা হয়েছে শুনে স্কন্দ তাকে আঘাত করতে দ্বিধা করেন; বিষ্ণু বলেন—যে জীবহিংসা করে ও ধর্মের বিরোধিতা করে, সে প্রকৃত ভক্ত হতে পারে না। তারক রুদ্রের রথে আক্রমণ করলে শিব কৌশলে সরে যান; দেবতাদের সম্মিলিত প্রতিআক্রমণে এক মুহূর্তে বিশ্ব যেন অস্থির হয়ে ওঠে। বিষ্ণুর ক্রোধ উপদেশে সংযত হয়, স্কন্দকে স্মরণ করানো হয় তাঁর উদ্দেশ্য—সজ্জনের রক্ষা ও দুষ্টের বিনাশ। শেষে তারকের মস্তক থেকে ব্যক্তরূপা ‘শক্তি’ প্রকাশ পেয়ে জানায়, তপস্যায় সে অর্জিত হলেও পুণ্যক্ষয়ের সীমায় সে তাকে ত্যাগ করছে। সঙ্গে সঙ্গে স্কন্দ শক্তি-অস্ত্র নিক্ষেপ করেন; তা তারকের হৃদয় বিদ্ধ করে এবং বিশ্বে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। শুভ বায়ু, দিকশান্তি ও দেবস্তবের পর ক্রৌঞ্চ পর্বতে বাণের বিরুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশে কৌমার অভিযান এগিয়ে যায়।

Tārakavadhānantara-śoka, Dharmopadeśa, and Tri-liṅga-pratiṣṭhā (प्रतिज्ञेश्वर–कपालेश्वर-स्थापनम्)
অধ্যায় ৩৩-এ নারদ তারকের পতিত দেহের বর্ণনা দেন এবং দেবতাদের বিস্ময় প্রকাশ পায়। বিজয়ী হয়েও স্কন্দ (গুহ) নৈতিক উদ্বেগে শোকাকুল হন; উৎসব-স্তব থামিয়ে বলেন—রুদ্রভক্তির সঙ্গে যুক্ত শত্রুকে বধ করার কারণে প্রায়শ্চিত্তের পথ নির্দেশ করা হোক। তখন বাসুদেব শ্রুতি-স্মৃতি-ইতিহাস-পুরাণের প্রমাণে বোঝান—হিংস্র ও অনর্থকারী দুষ্কৃতিকে দমন করলে দোষ হয় না; সমাজধর্ম রক্ষায় এমন দমন অপরিহার্য। এরপর তিনি উচ্চতর প্রায়শ্চিত্ত ও মুক্তিমার্গ বলেন—রুদ্রারাধনা, বিশেষত লিঙ্গপূজা, সব প্রায়শ্চিত্তের শ্রেষ্ঠ। শিবের মহিমা হালাহল ধারণ, শিরে গঙ্গা, ত্রিপুর-যুদ্ধের প্রতীক এবং দক্ষযজ্ঞের সতর্ক দৃষ্টান্তে প্রকাশিত হয়। লিঙ্গে জল ও পঞ্চামৃতাভিষেক, পুষ্পার্চনা, নৈবেদ্য ইত্যাদি বিধান এবং লিঙ্গপ্রতিষ্ঠার মহাফল—বংশোদ্ধার ও রুদ্রলোকপ্রাপ্তি—বর্ণিত। শিব নিজে হরি-শিব অভেদ ঘোষণা করে সাম্প্রদায়িক সৌহার্দকে তত্ত্ব হিসেবে স্থাপন করেন। স্কন্দ তিনটি লিঙ্গ প্রতিষ্ঠার সংকল্প করেন; বিশ্বকর্মা নির্মাণ করেন এবং প্রতিষ্ঠার বিবরণ আসে—প্রতিজ্ঞেশ্বর, কপালেশ্বর প্রভৃতি নাম, অষ্টমী ও কৃষ্ণচতুর্দশী ব্রত, নিকটবর্তী শক্তিপূজা, ‘শক্তিচ্ছিদ্র’ স্থান এবং এক বিশেষ তীর্থের প্রশংসা—যেখানে স্নান ও জপে শুদ্ধি ও পরলোকে উত্তরণ লাভ হয়।

कुमारेश्वर-लिङ्गप्रतिष्ठा, तीर्थमाहात्म्य, स्तव-फलश्रुति (Kumarēśvara Liṅga Installation, Tīrtha-Greatness, and Hymn’s Fruits)
অধ্যায়ের শুরুতে নারদ বলেন—ব্রহ্মা তৃতীয় লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করতে চান; স্বভাবতই মঙ্গলময় হলেও তিনি তাকে আরও দৃষ্টিনন্দন, মনোহর ও ফলপ্রদ রূপে স্থাপন করার সংকল্প করেন। দেবতারা স্কন্দের আনন্দের জন্য এক মনোরম সরোবর সৃষ্টি করে গঙ্গা প্রভৃতি প্রধান তীর্থের জল সেই কুণ্ডে একত্র করেন। বৈশাখের শুভ তিথিতে ব্রহ্মা ও ঋত্বিকেরা রুদ্র-মন্ত্রসহ বিধিপূর্বক প্রতিষ্ঠা, হোম ও অর্ঘ্য সম্পন্ন করেন; গন্ধর্ব-অপ্সরারা বাদ্য-গীতে উৎসব করেন। স্কন্দ স্নান করে ‘সর্বতীর্থজল’ দিয়ে লিঙ্গাভিষেক করেন এবং পাঁচ মন্ত্রে পূজা করেন; শিব লিঙ্গের অন্তর থেকে পূজা গ্রহণ করেন বলে বর্ণিত। স্কন্দ নিবেদনগুলির ফল জানতে চাইলে শিব বিস্তারিতভাবে বলেন—লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা ও মন্দির নির্মাণে শিবলোকে দীর্ঘবাস লাভ হয়। ধ্বজা, সুগন্ধি, দীপ, ধূপ, নৈবেদ্য, ফুল, বিল্বপত্র, ছত্র, সঙ্গীত, ঘণ্টা ইত্যাদি দানে স্বাস্থ্য, ঐশ্বর্য, খ্যাতি, জ্ঞান ও পাপক্ষয় প্রভৃতি নির্দিষ্ট ফল মেলে। কুমারেশ্বরকে ‘গুপ্তক্ষেত্র’-এ শিবসন্নিধি বলে স্থাপন করা হয়েছে, যেমন বারাণসীতে বিশ্বনাথ। স্কন্দ দীর্ঘ শৈব স্তোত্র পাঠ করেন; যে প্রাতে-সায়ে জপ করে, শিব তাকে কল্যাণফল দেন। এরপর তীর্থবিধি—মহীসাগর-সঙ্গমে বিশেষ চন্দ্র-সূর্য উপলক্ষে স্নান-পূজায় মহাপুণ্য হয়। অনাবৃষ্টি নিবারণের জন্য বহু রাত্রি সুগন্ধিজলে অভিষেক, অর্ঘ্য, ব্রাহ্মণভোজন, হোম, দান ও রুদ্রজপের বিধান আছে; এতে বৃষ্টি ও সমাজকল্যাণ প্রতিশ্রুত। নিয়মিত পূজায় জাতিস্মৃতি, তীর্থে মৃত্যু হলে রুদ্রলোকে গতি, এবং কপর্দী (গণেশ) দ্বারা বিঘ্ননাশ নিশ্চিত বলা হয়েছে। শেষে পরশুরাম প্রভৃতি ভক্তের দৃষ্টান্ত ও নির্দেশ—মাহাত্ম্য পাঠ/শ্রবণে ইষ্টফল, শ্রাদ্ধে পাঠে পিতৃকল্যাণ, গর্ভবতীকে শোনালে শুভ সন্তানলাভ।

जयस्तम्भ-स्थापनम् तथा स्तम्भेश्वर-लिङ्गप्रतिष्ठा (Installation of the Victory Pillar and the Stambheśvara Liṅga)
এই অধ্যায়ে নারদের প্রসঙ্গ ধরে দেবগণ গুহা-স্কন্দের নিকট করজোড়ে প্রার্থনা করেন—যুদ্ধে শত্রুকে জয় করলে বিজয়ীর প্রথা অনুযায়ী জয়চিহ্নযুক্ত স্তম্ভ (জয়স্তম্ভ) স্থাপন করা উচিত। স্কন্দের বিজয়স্মৃতির জন্য তাঁরা বিশ্বকর্মা-নির্মিত উৎকৃষ্ট স্তম্ভ স্থাপনের প্রস্তাব দেন, যা মহৎ লিঙ্গ-পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত। স্কন্দ সম্মতি দিলে ইন্দ্র (শক্র) প্রমুখ দেবতা যুদ্ধক্ষেত্রে জাম্বূনদ-স্বর্ণসম দীপ্ত স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করেন; চারপাশের পবিত্র ভূমি রত্নসদৃশ অলংকারে শোভিত হয়। অপ্সরারা গান-নৃত্যে আনন্দ প্রকাশ করে, বিষ্ণু বাদ্যসঙ্গতে সহায় হন, আর আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি দেবানুমোদনের লক্ষণ। এরপর স্মৃতিস্তম্ভ থেকে দেবতার দিকে কাহিনি যায়—স্কন্দ, ত্রিনেত্র প্রভুর পুত্র, স্তম্ভেশ্বর নামে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। নিকটে তিনি একটি কূপ নির্মাণ করেন, যার গভীর থেকে গঙ্গার উদ্ভব বলা হয়েছে—জলপবিত্রতা ও লিঙ্গপবিত্রতার মিলন। মাঘ কৃষ্ণ চতুর্দশীতে কূপস্নান করে পিতৃতর্পণ করলে গয়া-শ্রাদ্ধসম পুণ্য লাভ হয়। সুগন্ধ ও পুষ্পে স্তম্ভেশ্বর পূজা করলে বাজপেয় যজ্ঞসম মহাফল; অমাবস্যা-পূর্ণিমায় শ্রাদ্ধ, বিশেষত ভূমি-সমুদ্র-সংযোগের ভাবনায়, স্তম্ভেশ্বর আরাধনাসহ করলে পিতৃগণ তৃপ্ত হন, পাপ নাশ হয় এবং রুদ্রলোকে উন্নতি লাভ হয়। শেষে বলা হয়—রুদ্র স্কন্দের প্রীতির জন্য এই উপদেশ দেন এবং সকল দেবতা প্রতিষ্ঠাকে প্রশংসা করেন।

सिद्धेश्वरलिङ्ग-स्थापनम् तथा सिद्धकूप-माहात्म्यम् (Establishment of Siddheśvara Liṅga and the Glory of Siddhakūpa)
এই অধ্যায়ে স্থল ও সমুদ্রের সঙ্গমে স্কন্দের পূর্বে প্রতিষ্ঠিত বহু লিঙ্গ দর্শন করে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণ সমবেত হন। বিচ্ছিন্নভাবে পূজা করার অসুবিধা বিবেচনা করে তাঁরা সমষ্টিগত ভক্তি ও অঞ্চলের স্থিতির জন্য একটিমাত্র মঙ্গলময় লিঙ্গ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। মহেশ্বরের অনুমতিতে ব্রহ্মা-নির্মিত লিঙ্গ স্থাপিত হয়, গুহ তার নাম দেন ‘সিদ্ধেশ্বর’; পরে এক পবিত্র সরোবর খনন করে নানা তীর্থজলে পূর্ণ করা হয়। এরপর পাতালের সংকট বর্ণিত—তারকযুদ্ধের পর পালিয়ে আসা নাগেরা প্রলম্ব দানবের অত্যাচারের কথা জানায়। স্কন্দ তাঁর শক্তিকে পাতালে প্রেরণ করেন; তিনি ভূমি বিদীর্ণ করে প্রলম্বকে বধ করেন, এবং যে ফাটল সৃষ্টি হয় তা শুদ্ধিকারী পাতাল-গঙ্গার জলে ভরে ওঠে। স্কন্দ এই স্থানকে ‘সিদ্ধকূপ’ নামে অভিহিত করে কৃষ্ণাষ্টমী ও চতুর্দশীতে স্নান, সিদ্ধেশ্বর-পূজা ও শ্রাদ্ধের বিধান দেন; পাপক্ষয় ও স্থায়ী ফলপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দেন। ক্ষেত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে সিদ্ধাম্বিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষেত্রপাল নিয়োগ (চৌষট্টি মহেশ্বরসহ) এবং আরম্ভসিদ্ধির জন্য সিদ্ধিবিনায়ক স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে। শেষে ফলশ্রুতিতে পাঠ-শ্রবণে সমৃদ্ধি, রক্ষা এবং অবশেষে ষণ্মুখের লোকের সান্নিধ্য লাভের কথা প্রশংসিত।

बर्बरीतीर्थमाहात्म्य-प्रस्तावना तथा सृष्टि-भूगोलवर्णनम् (Barbarī Tīrtha Prologue and Cosmography of Creation)
অধ্যায়ের শুরুতে নারদ অর্জুনকে বর্বরী/বারবারী তীর্থের মাহাত্ম্য বলার প্রতিশ্রুতি দেন। এখানে বর্বরিকাকে ‘কুমারী’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে এবং কৌমারিকাখণ্ডকে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ—চার পুরুষার্থদায়ক বলা হয়েছে। অর্জুন কুমারীর কাহিনি বিস্তারিতভাবে, সৃষ্টিতে কর্মভেদ কীভাবে জন্মায় এবং ভারতখণ্ডের গঠন জানতে চান। নারদ তত্ত্বসমৃদ্ধ সৃষ্টিক্রম ব্যাখ্যা করেন—অব্যক্ত থেকে, প্রধান ও পুরুষের যুগল তত্ত্বে মহৎ, তারপর ত্রিগুণভেদে অহংকার, তন্মাত্রা, ভূতসমূহ, মনসহ একাদশ ইন্দ্রিয় এবং এভাবে চব্বিশ তত্ত্বের পূর্ণ বিন্যাস। এরপর ব্রহ্মাণ্ডকে বুদবুদসদৃশ অণ্ডরূপে বর্ণনা করা হয়; ঊর্ধ্বে দেবলোক, মধ্যভাগে মানবলোক এবং অধঃস্থলে নাগ-দৈত্য প্রভৃতির নিবাস। তারপর সাত দ্বীপ ও তাদের চারদিকে ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের সমুদ্রের কথা বলা হয়। মেরুর পরিমাপ, দিকপर्वত, বন ও সরোবর, সীমাপর্বত এবং জম্বুদ্বীপের বর্ষবিভাগ বর্ণিত; ঋষভের বংশধর নাভিপুত্র-পরম্পরায় ভরত থেকে ‘ভারত’ নামের উৎপত্তি বলা হয়েছে। শাক, কুশ, ক্রৌঞ্চ, শাল্মলি, গোমেদ ও পুষ্কর দ্বীপের রাজা ও বিভাগ, এবং বায়ু, জাতবেদস/অগ্নি, আপঃ, সোম, সূর্য ও ব্রহ্ম-চিন্তন—এই দেবতত্ত্বগুলির প্রতি জপ-স্তব-ধ্যানরূপ ভক্তি নির্দেশ করে অধ্যায়টি ঊর্ধ্বলোকের বিন্যাসের প্রসঙ্গে অগ্রসর হয়।

रथ-मण्डल-लोकविन्यासः (Cosmography of Chariots, Spheres, and Lokas)
এই অধ্যায়ে নারদের বর্ণনায় বিশ্বজগতের জ্যোতিষ-রচনা ও লোকবিন্যাসের সূক্ষ্ম আলোচনা আছে। সূর্যমণ্ডল ও সূর্যরথের গঠন—অক্ষ, চক্র, পরিমাপ—বর্ণিত হয়েছে; সূর্যের সাত অশ্বকে বৈদিক ছন্দ (গায়ত্রী, বৃহতী, উষ্ণিক্, জগতি, ত্রিষ্টুভ্, অনুষ্টুভ্, পংক্তি)-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সূর্যোদয়-সূর্যাস্তকে প্রকৃত বিলয় নয়, দর্শনে প্রকাশ-অপ্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করা হয়; উত্তরায়ণ-দক্ষিণায়ণে রাশিপথ ও গতি-ভেদের কথা কুমোরের চাকার উপমায় বোঝানো হয়েছে। সন্ধ্যাকালে সূর্যকে ক্ষতি করতে উদ্যত সত্তাদের সংঘাতের উল্লেখ আছে এবং গায়ত্রীশুদ্ধ জলে অর্ঘ্য/তর্পণসহ সন্ধ্যাবিধিকে ধর্মরক্ষা ও নৈতিক সুরক্ষার উপায় বলা হয়েছে। পরে চন্দ্রমণ্ডল, নক্ষত্রমণ্ডল, গ্রহদের অবস্থান ও রথ, সপ্তর্ষিমণ্ডল পর্যন্ত ক্রম এবং ধ্রুবকে জ্যোতিষচক্রের ধুরা/কেন্দ্ররূপে স্থাপন করা হয়েছে। ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জনঃ, তপঃ, সত্য—এই সাত লোকের নাম, পারস্পরিক দূরত্ব ও কৃতক-অকৃতক স্বভাবের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। শেষে গঙ্গার বিশ্বস্থিতি এবং সাত বায়ু-স্কন্ধের কথা বলা হয়েছে, যারা আকাশীয় ব্যবস্থাকে বেঁধে ঘোরায়; এখান থেকেই পাতালবর্ণনার দিকে সংক্রমণ ঘটে।

Pātāla–Naraka Cosmography and the Barkareśvara–Stambhatīrtha Māhātmya (कालमान-वर्णन सहित)
অধ্যায় ৩৯-এ পাতাল ও নরকের বিস্তৃত, নীতিশিক্ষামূলক বিবরণ পাওয়া যায়। নারদ অতল থেকে পাতাল পর্যন্ত সাতটি পাতাললোককে অপূর্ব শোভাময় বলে বর্ণনা করেন—যেখানে দানব, দৈত্য ও নাগদের বাস; এবং ব্রহ্মা-প্রতিষ্ঠিত ‘শ্রীহাটকেশ্বর’ নামক মহালিঙ্গের কথা জানান। এরপর পাতাললোকগুলির নীচে অবস্থিত বহু নরকের নাম ও স্বরূপ বলা হয়, এবং মিথ্যা সাক্ষ্য, হিংসা, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার, গুরু-অতিথি-ধর্ম লঙ্ঘন, অধর্মাচরণ ইত্যাদি পাপকে নির্দিষ্ট নরকের সঙ্গে যুক্ত করে কর্মফলের শিক্ষা দেওয়া হয়। তারপর বিশ্ব-ব্যবস্থার আলোচনা আসে—কালাগ্নি, অনন্ত, দিগ্গজ এবং জগতকে ঘিরে থাকা ‘কটাহ’ (ব্রহ্মাণ্ড-আবরণ) বর্ণিত হয়। নিমেষ থেকে শুরু করে যুগ, মন্বন্তর ও কল্প পর্যন্ত সময়-পরিমাপের ধারাবাহিক গণনা এবং কয়েকটি নামযুক্ত কল্পের উল্লেখও থাকে। পরে স্তম্ভতীর্থের মাহাত্ম্য: সমুদ্র-ভূমি-সঙ্গমে পূর্বজন্মের কারণে বর্করীমুখী কুমারীকা তপস্যা ও তীর্থকর্মে শুদ্ধি লাভ করে ‘বর্করেশ্বর’ প্রতিষ্ঠা করেন; ‘স্বস্তিক-কূপ’ প্রসিদ্ধ হয়। সেখানে দাহ ও অস্থি-বিসর্জনের স্থায়ী শুভফল বলা হয়েছে। শেষে ভারতখণ্ডের বংশানুক্রমিক বিভাগ, প্রধান পর্বত ও নদীর উৎস, এবং বহু অঞ্চলের গ্রাম/বন্দর-সংখ্যাসহ পুরাণীয় পবিত্র ভূগোল এক প্রকার গেজেটিয়ারের মতো উপস্থাপিত হয়।

Mahākāla-prādurbhāva and the Discourse on Tarpaṇa, Śrāddha, and Yuga-Dharma (महाकालप्रादुर्भावः)
অর্জুন নারদের কাছে জিজ্ঞাসা করেন—এক বিশেষ তীর্থে মহাকাল কে, এবং তাঁকে কীভাবে লাভ করা যায়। নারদ বারাণসীতে তপস্বী মাণ্ডির কাহিনি বলেন; তিনি দীর্ঘকাল রুদ্র-জপ করে পুত্রপ্রার্থনা করেন। শিব তাঁকে মহাশক্তিশালী সন্তান দেন, কিন্তু সেই শিশু বহু বছর গর্ভে থেকে ‘কাল-মার্গ’ (কর্মগত গতি) নিয়ে ভয় প্রকাশ করে এবং মুক্তির ‘অর্চিস্-পথ’-এর ইঙ্গিত দেয়। শিবের অনুগ্রহে ও ব্যক্ত রূপে ‘বিভূতি’সমূহের সহায়তায় শিশুর জন্ম হয়; তার নাম হয় ‘কালভীতি’। কালভীতি পাশুপত ভক্ত হয়ে তীর্থযাত্রা করেন এবং বিল্ববৃক্ষতলে কঠোর মন্ত্রজপে নিমগ্ন হয়ে পরমানন্দে স্থিত হন; তিনি স্থানটির অসাধারণ পবিত্রতা ও ফলদায়ক শক্তি উপলব্ধি করেন। শতবর্ষ ব্রতে এক রহস্যময় ব্যক্তি জল দিতে আসে; শুচিতা, বংশপরিচয়-জ্ঞান ও দান গ্রহণের নীতিতে বিতর্ক হয়, শেষে এক গর্ত জলভরে হ্রদে পরিণত হওয়ার অলৌকিক ঘটনা ঘটে। সেই ব্যক্তি অন্তর্ধান করে, এবং বিশাল স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ প্রকাশিত হয়; দেবোৎসব হয়। কালভীতি বহুমুখ শিবস্তোত্র করেন; শিব দর্শন দিয়ে বর দেন—স্বয়ম্ভূ লিঙ্গে নিত্যসান্নিধ্য, সেখানে পূজা-দান অক্ষয় ফলদায়ক, এবং নিকটস্থ কূপে স্নান ও পিতৃতর্পণে সর্বতীর্থফল, সঙ্গে বিশেষ তিথি-নিয়ম। পরে রাজা করন্ধম এসে প্রশ্ন করেন—জল-অর্ঘ্য পিতৃদের কাছে কীভাবে পৌঁছে, এবং শ্রাদ্ধ কীভাবে কার্যকর হয়। মহাকাল সূক্ষ্ম তত্ত্বগ্রহণ (ইন্দ্রিয়-তন্মাত্রার মাধ্যমে), মন্ত্রসহ অর্পণের আবশ্যকতা, এবং দর্ভ, তিল, অক্ষত ব্যবহারের রক্ষাকারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি চার যুগের প্রধান ধর্ম বলেন—কৃতে ধ্যান, ত্রেতায় যজ্ঞ, দ্বাপরে নিয়মাচার, কলিতে দান—এবং কলিযুগের অবস্থা ও ধর্মপুনরুত্থানের ইঙ্গিতও জানান।

Adhyāya 41 — Deva-tāratamya-vicāra, Pāpa-vibhāga, Śiva-pūjā-vidhi, and Ācāra-saṅgraha (Mahākāla’s Instruction)
এই অধ্যায়ে করণ্ধমের প্রশ্নের উত্তরে মহাকাল সুসংবদ্ধ ধর্ম-উপদেশ প্রদান করেন। প্রথমে দেব-তারতম্য-বিচার—কেউ শিবকে, কেউ বিষ্ণুকে, কেউ ব্রহ্মাকে মোক্ষের পথ বলে প্রশংসা করে; মহাকাল সরল ‘শ্রেষ্ঠতা’ দাবির বিপদ দেখিয়ে নৈমিষারণ্যের ঋষিদের পূর্বকথা স্মরণ করান, যেখানে বহু দেবরূপের সম্মান স্বীকৃত হয়। এরপর পাপ-বিভাগ—মানসিক, বাক্যগত ও শারীরিক দোষ; শিব-দ্বেষকে অত্যন্ত ভয়ংকর বলা হয়েছে; মহাপাতক, উপপাতক এবং প্রতারণা, নিষ্ঠুরতা, শোষণ, নিন্দা প্রভৃতি সামাজিক-নৈতিক অপরাধের স্তরও বর্ণিত। তারপর সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিধিবদ্ধ শিব-পূজা-পদ্ধতি—পূজার সময়, শুচিতা (ভস্মধারণসহ), মন্দিরে প্রবেশ ও পরিস্কার, জলপাত্র (গডুক) প্রস্তুতি, নিবেদন, ধ্যান, মন্ত্রপ্রয়োগ (মূলমন্ত্রসহ), অর্ঘ্য, ধূপ-দীপ-নৈবেদ্য, নীরাজন এবং শেষে স্তোত্র ও অপরাধ-ক্ষমা প্রার্থনা। পরে গৃহস্থ-ভক্তের জন্য আচার-সংগ্রহ—সন্ধ্যা-অনুষ্ঠান, বাক্-সংযম, দেহশুচিতা, জ্যেষ্ঠ ও পবিত্র সত্তার প্রতি শ্রদ্ধা, এবং ধর্মরক্ষার ব্যবহারিক নিয়ম। শেষে দেবসমাজ মহাকালকে সম্মান করে, লিঙ্গ ও তীর্থের খ্যাতি প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং শ্রবণ-পাঠ-পূজা করলে যে ফল লাভ হয় তা বলা হয়।

Aitareya-Māhātmya and Ekādaśī-Jāgara: Vāsudeva Installation, Bhāva-Śuddhi, and Liberation Theology
এই অধ্যায় তিনটি সংযুক্ত প্রবাহে গঠিত। প্রথমে নারদ তীর্থ-তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন—বাসুদেব ব্যতীত তীর্থ অসম্পূর্ণ। তিনি দীর্ঘ যোগ-উপাসনা ও অষ্টাক্ষর জপ করে সর্বজনকল্যাণের জন্য বিষ্ণুর এক ‘কলা’ সেখানে প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করেন; ভগবান বিষ্ণু সম্মতি দেন এবং বাসুদেবের প্রতিষ্ঠায় স্থানটির বিশেষ নাম-খ্যাতি ও আচার-প্রামাণ্য স্থির হয়। দ্বিতীয় অংশে কার্ত্তিক শুক্ল একাদশীর ব্রতবিধি—নির্দিষ্ট জলে স্নান, পঞ্চোপচার পূজা, উপবাস, রাত্রিজাগরণে কীর্তন/পাঠ/বাদ্য, ক্রোধ-অহংকার ত্যাগ ও দান। ভক্তি-নৈতিক গুণাবলির আদর্শ তালিকা দিয়ে বলা হয়, যথার্থ জাগরণ সম্পন্ন করলে পুনর্জন্ম হয় না। তৃতীয় অংশে উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত। অর্জুনের প্রশ্নে নারদ ঐতরেয়ের বংশ, অবিরাম মন্ত্রজপের ফলে তার নীরব-সদৃশ অবস্থা এবং গৃহের টানাপোড়েন বলেন। ঐতরেয় দেহধারী জীবনের সর্বব্যাপী দুঃখ, বাহ্য শুদ্ধির অপ্রতুলতা ও ভাবশুদ্ধির অপরিহার্যতা বোঝিয়ে নির্বেদ→বৈরাগ্য→জ্ঞান→বিষ্ণু-সাক্ষাৎকার→মোক্ষের ক্রম স্থাপন করেন। বিষ্ণু প্রকাশিত হয়ে স্তোত্র গ্রহণ করেন, বর দেন, স্তোত্রের ‘অঘা-নাশন’ শক্তি ঘোষণা করেন এবং কোটিতীর্থ ও হরিমেধস প্রসঙ্গ নির্দেশ করেন; শেষে ঐতরেয় বাসুদেব-অনুস্মৃতিতে মুক্তি লাভ করে।

Bhattāditya-pratiṣṭhā, Sūrya-stuti (aṣṭottara-śata-nāma), and Arghya-vidhi at Kāmarūpa
এই অধ্যায়ে সংলাপরূপে নারদ অর্জুনকে জনকল্যাণার্থে সম্পাদিত সূর্যভক্তির বিবরণ শোনান। শুরুতে সূর্যকে জগতের ধারক, সকল প্রাণীর পোষক ও সর্বব্যাপী নিয়ন্তা বলে তত্ত্বগত স্তব করা হয় এবং বলা হয়—স্মরণ, স্তব ও নিত্যপূজায় পার্থিব সিদ্ধি ও রক্ষা উভয়ই লাভ হয়। পরে নারদের দীর্ঘ তপস্যার কথা আসে; তার ফলে সূর্য স্বয়ং প্রকাশিত হয়ে বর দেন যে তাঁর ‘কামরূপ-কলা’ সেখানে চিরস্থায়ীভাবে বিরাজ করবে। এরপর নারদ ‘ভট্টাদিত্য’ নামে দেবতার প্রতিষ্ঠা করেন এবং অষ্টোত্তর-শতনাম ধাঁচে বিস্তৃত সূর্যস্তোত্র নিবেদন করেন—যেখানে সূর্যকে বিশ্বশাসক, চিকিৎসক, ধর্মসমর্থক ও দুঃখ-রোগ-নাশক রূপে নানা উপাধিতে স্মরণ করা হয়েছে। তারপর অর্জুনের অনুরোধে অর্ঘ্যবিধির বিস্তারিত নির্দেশ দেওয়া হয়—প্রাতঃশৌচ ও শুদ্ধি, মণ্ডল নির্মাণ, অর্ঘ্যপাত্রের দ্রব্য, দ্বাদশরূপ সূর্যের ধ্যান, আহ্বান-মন্ত্র, এবং পাদ্য, স্নান, বস্ত্র, যজ্ঞোপবীত, অলংকার, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, নৈবেদ্য প্রভৃতি উপচার; শেষে ক্ষমাপ্রার্থনা ও বিসর্জন। শেষে ক্ষেত্রমাহাত্ম্যে বনকুণ্ড, মাঘ শুক্ল সপ্তমীতে স্নান, রথপূজা ও রথযাত্রা, এবং মহাতীর্থসম ফলের প্রতিশ্রুতি বর্ণিত; ভট্টাদিত্যের নিত্যসান্নিধ্যে পাপনাশ ও ধর্মবৃদ্ধির কথা পুনরুচ্চারিত হয়।

दिव्य-शपथ-प्रकरणम् (Divya Ordeals and Oath-Procedure Discourse)
প্রমাণ না থাকলে দীর্ঘস্থায়ী বিবাদে ‘দিব্য’—অর্থাৎ সত্য-পরীক্ষার বিধান স্পষ্ট করে জানতে অর্জুন অনুরোধ করেন। নারদ স্বীকৃত দিব্যসমূহের তালিকা দিয়ে বলেন, শপথ ও দিব্য-প্রক্রিয়া রাজধর্মে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই—বিবাদ, অভিযোগ ও গুরুতর অপরাধে—নিয়মমাফিক প্রয়োগযোগ্য। অধ্যায়ে বারবার বলা হয়েছে, মিথ্যা শপথ দেবসাক্ষীদের কাছে গোপন নয়—সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, পৃথিবী, জল, হৃদয়/অন্তঃকরণ, যম, দিন-রাত্রি, সন্ধ্যা ও ধর্ম সাক্ষী; কপট বা তুচ্ছভাবে শপথ গ্রহণ সর্বনাশ ডেকে আনে। এরপর তুলা/ঘট-ভিত্তিক ওজন-দিব্য, বিষ-দিব্য, উত্তপ্ত লোহা দ্বারা অগ্নি-দিব্য, তপ্তমাষ/স্বর্ণ-গ্রহণ, ফাল/জিহ্বা-পরীক্ষা, তণ্ডুল-পদ্ধতি (বিশেষত চুরির ক্ষেত্রে) এবং জল-দিব্য (ডুবিয়ে রাখার সময়) ইত্যাদির ধাপে ধাপে নিয়ম, উপকরণ, মাপ, অধিকারী ও উত্তীর্ণ-অনুত্তীর্ণ লক্ষণ বর্ণিত হয়। সবশেষে বলা হয়—এগুলি শাসক ও কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রিত উপায়; দক্ষ, নিরপেক্ষ পরিচালনা ও প্রতারণা-নিবারণের সুরক্ষা ছাড়া প্রয়োগ করা উচিত নয়।

बहूदकतīर्थे नन्दभद्र-सत्यव्रतसंवादः (Nandabhadra–Satyavrata Dialogue at Bahūdaka Tīrtha)
অধ্যায় ৪৫-এ নারদ কামরূপের বহূদক তীর্থে এই কথোপকথনের স্থান নির্ধারণ করেন। তিনি তীর্থের নামকরণ ও পবিত্রতার কারণ ব্যাখ্যা করেন—কপিল মুনির তপস্যা এবং কপিলেশ্বর লিঙ্গের প্রতিষ্ঠা এই স্থানকে মহিমান্বিত করেছে। এরপর নন্দভদ্রকে নীতিবান আদর্শ পুরুষ রূপে দেখানো হয়—মন, বাক্য ও কর্মে সংযমী, শিবভক্ত, এবং প্রতারণাহীন ন্যায্য জীবিকা (অল্প লাভে সৎ বাণিজ্য) অবলম্বনকারী। তিনি যজ্ঞ, সন্ন্যাস, কৃষি, রাজ্যাধিকার বা তীর্থযাত্রার বাহ্যিক প্রশংসা গ্রহণ করেন না; শুচিতা ও অহিংসা ছাড়া এসবের ফল নেই বলে বলেন। তাঁর মতে দেবতাদের তুষ্ট করে এমন আন্তরিক ভক্তিই সত্য যজ্ঞ, আর পাপত্যাগেই আত্মশুদ্ধি ঘটে। পাশের সংশয়বাদী সত্যব্রত নন্দভদ্রের দোষ খুঁজতে এসে পুত্র ও পত্নী-বিয়োগের দুঃখকে ধর্ম ও লিঙ্গপূজার বিরুদ্ধে প্রমাণ বলে ধরে। তিনি বাক্যের গুণ-দোষের প্রযুক্তিগত আলোচনা করে ‘স্বভাব’কেই কারণ মানা ঈশ্বর-অস্বীকারমূলক মত পেশ করেন। নন্দভদ্র জবাব দেন—অধর্মীদেরও দুঃখ হয়; দেবতা ও বীরদের লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত দিয়ে লিঙ্গপূজার সমর্থন করেন এবং অলংকারময় কিন্তু অসংগত বাক্য থেকে সাবধান করেন। শেষে তিনি বহূদক-কুণ্ডের দিকে যাত্রা করেন এবং বেদ, স্মৃতি ও ধর্মসম্মত যুক্তি—এই প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত ধর্মকেই কর্তৃত্ব বলে পুনর্নিশ্চিত করেন।

Bahūdaka-kuṇḍa Māhātmya and the Instruction on Guṇas, Karma, and Detachment (बाहूदककुण्डमाहात्म्यं तथा गुणकर्मवैराग्योपदेशः)
এই অধ্যায়ে বহূদক-কুণ্ডের তীরে কপিলেশ্বর-লিঙ্গ পূজা করে নন্দভদ্র সংসারের বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন—নির্লেপ প্রভু কেন দুঃখ, বিচ্ছেদ ও স্বর্গ-নরকের অসম গতি-সমৃদ্ধ জগৎ সৃষ্টি করলেন। তখন সাত বছরের এক রোগাক্রান্ত বালক এসে ব্যাখ্যা করে—শারীরিক ও মানসিক দুঃখের নির্দিষ্ট কারণ আছে; মানসিক যন্ত্রণার মূল ‘স্নেহ’ (আসক্তি), সেখান থেকে রাগ, কাম, ক্রোধ ও তৃষ্ণা জন্মায়। নন্দভদ্র জিজ্ঞাসা করেন—অহংকার, কাম, ক্রোধ ত্যাগ করেও কীভাবে ধর্মাচরণ সম্ভব। বালক প্রকৃতি-পুরুষ, গুণের উদ্ভব, অহংকার, তন্মাত্রা ও ইন্দ্রিয়ের প্রকাশ বর্ণনা করে বলে—রজস ও তমসকে সত্ত্ব দ্বারা শোধন করাই সাধনার পথ। ভক্তেরও দুঃখ কেন হয়—পূজার শুদ্ধি-অশুদ্ধি, কর্মফলের অনিবার্যতা এবং ঈশ্বর-কৃপা—কৃপায় কারও ফলভোগ সংক্ষিপ্ত হয়, কারও বহু জন্মে ক্ষয় হয়। শেষে বালক পূর্বজন্মের কাহিনি প্রকাশ করে—কপট উপদেশক নরকে দণ্ডিত হয়ে বহু যোনিতে ঘুরে বেড়ায়, পরে ব্যাসদেবের সারস্বত মন্ত্রে অনুগ্রহ পায়। সে বহূদকে বিধান দেয়—সপ্তাহব্যাপী উপবাস ও সূর্যজপ, নির্দিষ্ট তীর্থে দাহ, অস্থি-বিসর্জন এবং বহূদকে ভাস্কর-মূর্তি প্রতিষ্ঠা। ফলশ্রুতিতে স্নান, দান, তर्पণ, সেবা-ভোজন, নারীদের আতিথ্য, যোগাভ্যাস ও শ্রদ্ধাপূর্ণ শ্রবণে পুণ্য এবং মোক্ষাভিমুখ ফল প্রতিশ্রুত।

Śakti-vyāpti, Digdevī-sthāpana, Navadurgā-pratiṣṭhā, and Tīrtha-phalapradāna (Chapter 47)
অধ্যায় ৪৭-এ শক্তির তত্ত্ব সুসংবদ্ধভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শক্তি নিত্য প্রকৃতি ও সর্বব্যাপিনী—যেমন পরমেশ্বরের সর্বব্যাপ্তি; ভক্তি ও অভিমুখতায় তিনি মোক্ষদায়িনী, আর অবজ্ঞা ও বিমুখতায় বন্ধনকারিণী। শক্তিকে অবহেলা করলে আধ্যাত্মিক পতন ঘটে—বারাণসীর পতিত যোগীদের দৃষ্টান্তে তা দেখানো হয়েছে। এরপর দিকভিত্তিক পূজাভূগোল নির্ধারিত হয়—চার দিশায় চার মহাশক্তির প্রতিষ্ঠা: পূর্বে সিদ্ধাম্বিকা, দক্ষিণে তারা (কূর্ম-প্রসঙ্গসহ বৈদিক শৃঙ্খলা-রক্ষায় যুক্ত), পশ্চিমে ভাস্করা (সূর্য-নক্ষত্রাদির তেজোপ্রদা), উত্তরে যোগনন্দিনী (যোগশুদ্ধি ও সনকাদি ঋষিদের সঙ্গে সম্পর্কিত)। তারপর তীর্থে নবদুর্গার প্রতিষ্ঠা: ত্রিপুরা, কোলম্বা (রুদ্রাণী-সম্পর্কিত কূপ; মাঘ অষ্টমীতে স্নানবিশেষ; মহাতীর্থসমূহের চেয়েও শ্রেষ্ঠতার দাবি), কপালেশী, সুবর্ণাক্ষী, ‘চর্চিতা’ নামে মহাদুর্গা (বীর্যদায়িনী; ভবিষ্যৎ-দৃষ্টান্তে বন্ধনমুক্ত বীর), ত্রৈলোক্যবিজয়া (সোমলোকজাত), একবীরা (প্রলয়শক্তি), হরসিদ্ধি (রুদ্রদেহসম্ভূতা; ডাকিনী-বিঘ্ননাশিনী), এবং ঈশান কোণে চণ্ডিকা/নবমী (চণ্ড-মুণ্ড, অন্ধক, রক্তবীজ-যুদ্ধপ্রসঙ্গ)। নবরাত্রি পূজায় বলি, পূপ, নৈবেদ্য, ধূপ, গন্ধ প্রভৃতি নিবেদন নির্দেশিত, এবং পথ-চৌরাস্তা ইত্যাদি জনসমক্ষে রক্ষাফল কথিত। ভূতমাতা/গুহাশক্তি উপদ্রবী সত্তাদের সীমা বেঁধে বৈশাখ-দর্শা দিনে নির্দিষ্ট উপহারে পূজা করলে বর প্রদান করেন। উপসংহারে তীর্থকে বহু স্থানে বহু দেবীর আবাস বলে দেখিয়ে, ধর্মশৃঙ্খলা, রক্ষা ও ইষ্টসিদ্ধির জন্য বিধিপূর্বক আরাধনাকেই প্রধান উপায় বলা হয়েছে।

स्तम्भतीर्थमाहात्म्ये सोमनाथवृत्तान्तवर्णनम् (Somanātha Account within the Glory of Stambha-tīrtha)
অধ্যায়ের শুরুতে নারদ ঘোষণা করেন যে স্তম্ভতীর্থ-মাহাত্ম্যের অন্তর্গত সোমনাথের মহিমা তিনি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করবেন; শ্রবণ ও পাঠকে পাপমোচনের উপায় বলা হয়েছে। তেজস্বী দুই ব্রাহ্মণ ঊর্জয়ন্ত ও প্রালেয় প্রভাস ও তার তীর্থসমূহের প্রশংসামূলক একটি শ্লোক শুনে তীর্থস্নানের জন্য যাত্রার সংকল্প করেন। বন-নদী অতিক্রম করে নর্মদা পার হয়ে তারা এমন এক পবিত্র অঞ্চলে পৌঁছায় যেখানে ভূমি ও সমুদ্রের মিলনচিত্র দেখা যায়; ক্লান্তি, ক্ষুধা ও তৃষ্ণা তীর্থযাত্রার শৃঙ্খলার পরীক্ষা হয়ে ওঠে। সিদ্ধলিঙ্গের কাছে তারা লুটিয়ে পড়ে এবং সিদ্ধনাথকে প্রণাম করে। সেই সীমান্ত-অবস্থায় লিঙ্গের প্রাদুর্ভাব, আকাশবাণী ও পুষ্পবৃষ্টির কথা বলা হয়েছে; প্রালেয় সোমনাথসম ফল লাভ করে এবং সমুদ্রতীরে প্রতিষ্ঠিত এক লিঙ্গের নির্দেশ পাওয়া যায়। পরে কাহিনি প্রভাসে ফিরে এসে দুই যাত্রীর সঙ্গে যুক্ত ‘দ্বৈত সোমনাথ’ ভাবকে প্রকাশ করে। এরপর হাটকেশ্বর প্রসঙ্গ—ব্রহ্মা কর্তৃক লিঙ্গপ্রতিষ্ঠার বর্ণনা এবং একটি সুশৃঙ্খল স্তোত্র, যেখানে শিবের বিশ্বরূপ (অষ্টমূর্তি-সদৃশ—সূর্য/অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, আকাশ-শব্দ প্রভৃতি) গণনা করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, ব্রহ্মার স্তোত্র শ্রবণ-পাঠ ও হাটকেশ্বর স্মরণ করলে অষ্টবিধ শিবে সাযুজ্য/সান্নিধ্য লাভ হয় এবং ভূমি-সমুদ্র সঙ্গমস্থলে পুণ্যতীর্থের প্রাচুর্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

Jayāditya-Māhātmya and the Discourse on Karma, Rebirth, and the ‘Twofold Food’
অর্জুন মহীনগরকে প্রতিষ্ঠিত প্রধান তীর্থগুলির বিবরণ জানতে চান। নারদ স্থানটির পরিচয় দিয়ে জয়াদিত্য (সূর্যরূপ)‑এর মাহাত্ম্য বলেন—তাঁর নামস্মরণে রোগশমন ও হৃদয়ের কামনা পূর্ণ হয়, আর দর্শনও অত্যন্ত মঙ্গলজনক। নারদ পূর্বকথা শোনান: তিনি সূর্যলোকে গেলে ভাস্কর জিজ্ঞাসা করেন, নারদ যে স্থানে ব্রাহ্মণদের বসিয়েছেন তারা কেমন। নারদ প্রশংসা বা নিন্দা—উভয়েরই নৈতিক বিপদ উল্লেখ করে দেবতাকেই প্রত্যক্ষ যাচাই করতে বলেন। তখন ভাস্কর বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বেশে তটভূমিতে এসে হারীতের নেতৃত্বে স্থানীয় ব্রাহ্মণদের দ্বারা অতিথিরূপে সমাদৃত হন। অতিথি ‘পরম‑ভোজন’ চান। হারীতপুত্র কমঠ বলেন, ভোজন দুই প্রকার—একটি সাধারণ, যা দেহ তৃপ্ত করে; অন্যটি পরম, যা ধর্মোপদেশের শ্রবণ‑শিক্ষণে আত্মা/ক্ষেত্রজ্ঞকে পুষ্ট করে। পরে অতিথি জন্ম‑লয় ও ভস্ম হওয়ার পর জীবের গতি জানতে চাইলে কমঠ সাত্ত্বিক, তামস ও মিশ্র কর্মভেদে স্বর্গ, নরক, তির্যক ও মানবযোনিতে পুনর্জন্মের পথ ব্যাখ্যা করেন। অধ্যায়ে গর্ভসৃষ্টি ও গর্ভযন্ত্রণার বর্ণনা এবং শেষে দেহকে ক্ষেত্রজ্ঞের ‘গৃহ’ বলে কর্ম‑জ্ঞান দ্বারা মোক্ষ, স্বর্গ ও নরকপ্রাপ্তির সিদ্ধান্ত স্থাপিত হয়।

Śarīra–Brahmāṇḍa-sāmya, Dhātu–Nāḍī-vyavasthā, and Karma–Preta-yātrā (Body–Cosmos Correspondence and Post-mortem Ethics)
এই অধ্যায়টি সংলাপরূপে এক তাত্ত্বিক-ধর্মীয় আলোচনা। অতিথি দেহলক্ষণ জানতে চাইলে কমঠ বলেন—মানবদেহই ব্রহ্মাণ্ডের সূক্ষ্ম প্রতিরূপ; পাতাল থেকে সত্যলোক পর্যন্ত লোকস্তরগুলি দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে মানচিত্রের মতো স্থাপিত। এরপর সাত ধাতু (ত্বক, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা, শুক্র), অস্থি ও নাড়ীর সংখ্যা, প্রধান অঙ্গ ও অন্তঃঅবয়বের বিবরণ দেওয়া হয়। তারপর কার্যকর শারীরবিদ্যা—প্রধান নাড়ী (সুষুম্না, ইড়া, পিঙ্গলা), পাঁচ বায়ু (প্রাণ, অপান, সমান, উদান, ব্যান) ও তাদের কর্ম-সম্পর্কিত ভূমিকা, পাচনাগ্নির পাঁচ ভেদ (পাচক প্রভৃতি) এবং কফ/সোমের নানা দিক (ক্লেদক, বোধক, তर्पণ, শ্লেষ্মক, আলম্বক ইত্যাদি) ব্যাখ্যা করা হয়। আহার রস হয়ে ক্রমে রক্তাদি ধাতুতে রূপান্তরিত হয়, আর মল বারোটি মল-আশ্রয় দিয়ে নির্গত হয়। এরপর নীতিশিক্ষা—দেহকে পুণ্যসাধনের যন্ত্র হিসেবে রক্ষা করতে হবে; দেশ-কাল ও সামর্থ্য অনুসারে কর্মফল নির্ধারিত হয়। শেষে মৃত্যু ও পরলোকযাত্রা—জীব কর্মানুসারে দেহের রন্ধ্র দিয়ে বেরিয়ে অতিবাহিক রূপ ধারণ করে যমলোকে গমন করে, বৈতরণী-প্রসঙ্গের মুখোমুখি হয় এবং প্রেতলোকের অবস্থাগুলি ভোগ করে। শ্রাদ্ধ, দান-উপহার, বার্ষিক ক্রিয়া ও সপিণ্ডীকরণ প্রেতত্ব লাঘবে সহায়ক; উপসংহার—মিশ্র কর্মে কর্মমাত্রা অনুযায়ী স্বর্গ-নরকের মিশ্র গতি লাভ হয়।

Jayāditya-pratiṣṭhā, Karma-phala Lakṣaṇa, and Sūrya-stuti (जयादित्यप्रतिष्ठा—कर्मफललक्षण—सूर्यस्तुति)
এই অধ্যায়ে তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত ধারা দেখা যায়। প্রথমে পরলোক ও কর্মফল নিয়ে সংশয় দূর করতে কামঠ ‘কর্ম-ফল-লক্ষণ’ সুসংবদ্ধভাবে বলেন—হিংসা, চুরি, প্রতারণা, ব্যভিচার, গুরুর অবমাননা এবং গাভী-ব্রাহ্মণাদি পীড়ন ইত্যাদি পাপের অনুপাতে দেহে রোগ, অঙ্গবৈকল্য, দারিদ্র্য ও সমাজে লাঞ্ছনার মতো অবস্থাই ফলরূপে প্রকাশ পায়। এই তালিকা নৈতিক নিশ্চিততা স্থির করার শিক্ষামূলক নির্দেশ। এরপর ধর্মকেন্দ্রিক উপসংহার—ধর্মে উভয় লোকেই সুখ, অধর্মে দুঃখ; শুদ্ধ কর্মযুক্ত স্বল্পায়ুও উভয় লোকবিরোধী দীর্ঘায়ুর চেয়ে শ্রেয়। শেষে নারদ ও ব্রাহ্মণগণ কামঠের বচন প্রশংসা করেন। সূর্যদেব আবির্ভূত হয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বর দেন। ব্রাহ্মণরা স্থায়ী উপস্থিতি প্রার্থনা করলে সূর্য ‘জয়াদিত্য’ নামে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ভক্তদের দারিদ্র্য ও রোগনাশের প্রতিশ্রুতি দেন। কামঠ স্তোত্র পাঠ করেন; সূর্য রবিবার ও বিশেষত আশ্বিন মাস, কোটিতীর্থে স্নান, পূজার উপকরণ ও বিধি নির্দিষ্ট করে শুদ্ধি ও সূর্যলোকপ্রাপ্তির ফল বলেন, এবং শেষে প্রসিদ্ধ তীর্থসম পুণ্যফল ঘোষণা করেন।

कोटितीर्थमाहात्म्यवर्णनम् (Koti-tīrtha Māhātmya: The Glory and Ritual Efficacy of Koti Tirtha)
এই অধ্যায়ে অর্জুন নারদকে জিজ্ঞাসা করেন—কোটিতীর্থ কীভাবে জন্মাল, কে নির্মাণ করল এবং কেন এর ফল এত প্রশংসিত। নারদ বলেন, ব্রহ্মাকে ব্রহ্মলোক থেকে আনা হলে তিনি অসংখ্য তীর্থ স্মরণ করেন; স্মরণমাত্রেই স্বর্গ, পৃথিবী ও পাতালের তীর্থসমূহ নিজ নিজ লিঙ্গসহ উপস্থিত হয়। স্নান-উপাসনার পর ব্রহ্মা মানসে এক সরোবর নির্মাণ করে বিধান দেন—সব তীর্থ সেই সরোবরেই অধিষ্ঠান করবে এবং সেখানে এক লিঙ্গের পূজা সকল লিঙ্গপূজার সমান গণ্য হবে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—কোটিতীর্থে স্নান করলে গঙ্গাসহ সকল নদী ও তীর্থের ফল লাভ হয়; শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানে পিতৃগণের অক্ষয় তৃপ্তি হয়; কোটীশ্বর পূজায় কোটি-লিঙ্গ পূজার পুণ্য মেলে। পরে ঋষিদের দৃষ্টান্তে ক্ষেত্রের মাহাত্ম্য স্থির হয়—অত্রি দক্ষিণে অত্রীশ্বর স্থাপন করে জলাশয় সৃষ্টি করেন; ভরদ্বাজ ভরদ্বাজেশ্বর প্রতিষ্ঠা করে তপস্যা ও যজ্ঞ করেন; গৌতম অহল্যার জন্য কঠোর তপস্যা করলে অহল্যা ‘অহল্যা-সরস’ নির্মাণ করেন—সেখানে স্নান ও গৌতমেশ্বর পূজায় ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি বলা হয়েছে। দানের নীতি স্পষ্ট: শ্রদ্ধায় এক ব্রাহ্মণকে ভোজন করালে ‘কোটি’ তৃপ্ত হয় এবং এখানে দান বহু গুণ ফল দেয়; কিন্তু দানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে না দিলে গুরুতর পাপের ফল ভোগ করতে হয়। মাঘ, মকর-সংক্রান্তি, কন্যা-সংক্রান্তি ও কার্তিকে ফল বিশেষ বৃদ্ধি পায়, কোটি-যজ্ঞসম পুণ্য বলা হয়েছে; শেষে এই স্থানে মৃত্যু, দাহ ও অস্থিবিসর্জনের মাহাত্ম্য বাক্যের অতীত বলে কোটিতীর্থের অসামান্যতা ঘোষণা করা হয়েছে।

त्रिपुरुषशालामाहात्म्य–नारदीयसरोमाहात्म्य–द्वारदेवीपूजाफलवर्णनम् (Chapter 53: Glory of the Trīpuruṣa Śālā, Nārādīya Pond, and Gate-Goddess Worship Results)
এই অধ্যায়ে নারদের বাণীতে তীর্থ-মাহাত্ম্য ও রক্ষাবিধির সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আছে। পবিত্র স্থানের লুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা শুনে নারদ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর—ত্রিদেবকে প্রসন্ন করে বর চান, যাতে স্থানটি অদৃশ্য না হয় এবং তার খ্যাতি চিরস্থায়ী থাকে; ত্রিদেব তাঁদের অংশ-উপস্থিতির দ্বারা সেখানে স্থায়ী রক্ষা প্রদান করেন। এরপর এক ধর্ম-রক্ষার ব্যবস্থা বলা হয়েছে—পণ্ডিত ব্রাহ্মণরা নির্দিষ্ট সময়ে বেদপাঠ করবেন (পূর্বাহ্নে ঋক্, মধ্যাহ্নে যজুঃ, তৃতীয় প্রহরে সাম) এবং উপদ্রব হলে শালার সম্মুখে শাপবাক্য উচ্চারণ করে শত্রুর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভস্মীভূত হওয়ার ঘোষণা করবেন—এটি পূর্ববরের রক্ষাপ্রতিজ্ঞার কার্যকর রূপ। তারপর নারদীয় সরোবরের মাহাত্ম্য: নারদ একটি সরোবর খনন করে সর্বতীর্থের শ্রেষ্ঠ জল এনে তাতে পূর্ণ করেন। সেখানে স্নান, শ্রাদ্ধ ও দান—বিশেষত আশ্বিন মাসে রবিবার—পিতৃপুরুষকে দীর্ঘকাল তৃপ্ত করে; দানকে ‘অক্ষয়’ ফলদায়ক বলা হয়েছে। কদ্রুর শাপমোচনের জন্য নাগদের তপস্যা এবং শেষে নাগেশ্বর-লিঙ্গ প্রতিষ্ঠার কথাও আছে; সেখানে পূজায় মহাপুণ্য ও সাপ-ভয় নিবারণ হয়। শেষে দ্বার-সম্পর্কিত দেবী—‘অপর-দ্বারকা’ ও নগরদ্বারের দ্বারবাসিনী—এর কথা বলা হয়েছে; কুণ্ডস্নান করে চৈত্র কৃষ্ণ নবমী ও আশ্বিন নবরাত্রি প্রভৃতি তিথিতে পূজা করলে বিঘ্ননাশ, অভীষ্টসিদ্ধি, সমৃদ্ধি ও সন্তানলাভের ফলশ্রুতি বর্ণিত।

Nārada’s Wandering, Dakṣa’s Curse, and the Kārttika Prabodhinī Rite at Nārada-kūpa (नारदचापल्य-शापकथा तथा प्रबोधिनी-विधिः)
এই অধ্যায়ে পুরাণীয় কথন-পরম্পরায় বহুস্তর সংলাপ গড়ে ওঠে। নারদ মুনি কার্ত্তিক শুক্লপক্ষে প্রবোধিনী তিথিতে নিজের উপাসনার কথা জানিয়ে বলেন—এই ব্রতে কলিযুগজনিত দোষ দূর হয় এবং মুক্তির পথ সুদৃঢ় হয়। অর্জুনের দীর্ঘদিনের সন্দেহ—সমদর্শী, সংযমী ও মোক্ষপরায়ণ নারদ কেন কলিতে ক্ষতবিক্ষত জগতে বায়ুর মতো চঞ্চল হয়ে সর্বদা ঘুরে বেড়ান? সূত এই কথোপকথন বর্ণনা করে হারীত বংশীয় ব্রাহ্মণ বাব্হ্রব্যকে আনেন; তিনি কৃষ্ণের কাছ থেকে শোনা কারণ ব্যাখ্যা করেন। অন্তর্কথায় কৃষ্ণ সমুদ্র-সঙ্গম অঞ্চলে গিয়ে পিণ্ডদান ও মহাদান করেন, গুহেশ্বরসহ নানা লিঙ্গের বিধিপূর্বক পূজা করেন, কোটিতীর্থে স্নান করেন এবং নারদকে সম্মান জানান। উগ্রসেনের প্রশ্নে কৃষ্ণ বলেন—সৃষ্টিপথে বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগে দক্ষ নারদকে শাপ দিয়েছিলেন; তাই তাঁর নিরন্তর ভ্রমণ ও লোককে উদ্দীপিত/উস্কে দেওয়ার খ্যাতি হয়েছে। তবু সত্যনিষ্ঠা, একাগ্রতা ও ভক্তির কারণে তিনি কলুষিত হন না। কৃষ্ণ দীর্ঘ স্তোত্রে নারদের গুণ (ইন্দ্রিয়সংযম, অকপটতা, স্থৈর্য, শাস্ত্রজ্ঞান, অদ্বেষ) কীর্তন করে নিয়মিত পাঠকদের নারদ-কৃপা প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর বিধান—কার্ত্তিক শুক্ল দ্বাদশী (প্রবোধিনী) তে নারদ-কূপে স্নান করে যত্নসহকারে শ্রাদ্ধ করতে হবে; তপস্যা, দান ও জপ এখানে অক্ষয় ফলদায়ক। “ইদং বিষ্ণু” মন্ত্রে বিষ্ণুকে জাগিয়ে, পরে নারদকেও প্রবোধিত করে পূজা করতে হবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রাহ্মণদের ছাতা, বস্ত্র (ধোতি) ও কমণ্ডলু দান করতে হবে। ফলশ্রুতি—পাপক্ষয় হয়, কলির উপদ্রব জন্মায় না, এবং সংসারদুঃখ প্রশমিত হয়।

गौतमेश्वरलिङ्गमाहात्म्यं तथा अष्टाङ्गयोगोपदेशः (Gautameśvara Liṅga Māhātmya and Instruction on Aṣṭāṅga Yoga)
এই অধ্যায়ে গোপন পবিত্র ক্ষেত্রের (গুপ্ত-ক্ষেত্র) মাহাত্ম্য শুনে জিজ্ঞাসু নারদের কাছে আরও বিশদ জানতে চান। নারদ প্রথমে গৌতমেশ্বর লিঙ্গের উৎপত্তি ও ফল বলেন—ঋষি গৌতম (অক্ষপাদ) গোদাবরীর তীরে অহল্যার প্রসঙ্গসহ কঠোর তপস্যা করে যোগসিদ্ধি লাভ করেন এবং লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। মহালিঙ্গে স্নান, চন্দনলেপ, পুষ্পার্চনা ও গুগ্গুল ধূপ—এসব পূজা পাপশোধক, এবং মৃত্যুর পরে রুদ্রলোক প্রভৃতি উচ্চ গতি দানকারী বলে বর্ণিত। এরপর অর্জুনের যোগ-প্রশ্নে নারদ যোগকে ‘চিত্তবৃত্তিনিরোধ’ রূপে সংজ্ঞায়িত করে অষ্টাঙ্গযোগ ব্যাখ্যা করেন—যম (অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহ) ও নিয়ম (শৌচ, তুষ্টি/সন্তোষ, তপ, জপ/স্বাধ্যায়, গুরু-ভক্তি)। প্রাণায়ামের প্রকার, পরিমাপ, ফল ও সতর্কতা; প্রত্যাহার, ধারণা (প্রাণের অন্তর্গমন ও স্থিতি), শিবকেন্দ্রিক ধ্যান এবং সমাধিতে ইন্দ্রিয়-সংযমের কথা বলা হয়। অধ্যায়ে সাধনার বাধা-উপসর্গ, সাত্ত্বিক আহার, স্বপ্ন ও দেহলক্ষণে মৃত্যুসূচক নিদর্শন, এবং নানা সিদ্ধির তালিকা—শেষে অণিমা প্রভৃতি অষ্ট মহাসিদ্ধি—উল্লেখিত। সিদ্ধিতে আসক্তি বর্জনের উপদেশ দিয়ে মোক্ষকে পরমাত্মার সঙ্গে আত্মার তাদাত্ম্যরূপে স্থাপন করা হয়েছে; এবং বিশেষত আশ্বিন মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশীতে অহল্যা-সরসে স্নান ও লিঙ্গপূজা করলে শুদ্ধি ও ‘অক্ষয়’ অবস্থা লাভ হয়—এই ফলশ্রুতি পুনরুক্ত।

ब्रह्मेश्वर–मोक्षेश्वर–गर्भेश्वरमाहात्म्यवर्णनम् (Brahmeśvara, Mokṣeśvara, and Garbheśvara: A Māhātmya of Sacred Liṅgas and Tīrthas)
এই অধ্যায়ে সংলাপরীতিতে নারদ তীর্থ-প্রতিষ্ঠা ও লিঙ্গ-মাহাত্ম্যের ধারাবাহিক কাহিনি এবং তার আচারবিধি বর্ণনা করেন। সৃষ্টির প্রেরণায় ব্রহ্মা সহস্র বছর কঠোর তপস্যা করলে শঙ্কর প্রসন্ন হয়ে বর দেন। এরপর ব্রহ্মা নগরের পূর্বদিকে মহাপাপ-নাশক ব্রহ্মসরস খনন করেন এবং তার তীরে, যেখানে শঙ্করের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি বলা হয়েছে, মহালিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে স্নান, পিতৃদের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান, সামর্থ্য অনুযায়ী দান ও ভক্তিপূজা—বিশেষত কার্ত্তিক মাসে—বিধেয়; এর পুণ্য পুষ্কর, কুরুক্ষেত্র ও গঙ্গাতীর্থসমের তুল্য বলা হয়েছে। পরবর্তী অংশে মোক্ষলিঙ্গের মাহাত্ম্য—মোক্ষেশ্বর নামে শ্রেষ্ঠ লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা এবং দর্ভাগ্র দিয়ে খোঁড়া কূপের কথা আসে, যেখানে ব্রহ্মা কমণ্ডলু থেকে সরস্বতীকে এনে জীবের মোক্ষ-কল্যাণে স্থাপন করেন। কার্ত্তিক শুক্ল চতুর্দশীতে সেই কূপে স্নান করে তিল-পিণ্ড অর্পণ করলে ‘মোক্ষতীর্থ’ ফল লাভ হয় এবং বংশে বারবার প্রেত-অবস্থা ফিরে আসে না—এমন ফলশ্রুতি আছে। শেষে জয়াদিত্যকূপ তীর্থে গর্ভেশ্বরের পূজায় পুনঃপুনঃ গর্ভে পতন নিবারণের কথা বলা হয়েছে; শ্রদ্ধায় শ্রবণকেও পরিশুদ্ধিকারী ও ফলদায়ক বলা হয়েছে।

नीलकण्ठमाहात्म्यवर्णनम् | Nīlakaṇṭha Māhātmya (Glorification of Nīlakaṇṭha)
অধ্যায়টি নারদের বক্তব্য দিয়ে সংলাপরূপে শুরু হয়। নারদ ও ব্রাহ্মণগণ মহেশ্বরকে প্রসন্ন করে লোককল্যাণের জন্য পবিত্র মহীনগরকে শঙ্করের প্রতিষ্ঠা করেন। অত্রীশের উত্তরে অবস্থিত শ্রেষ্ঠ কেদার-লিঙ্গের কথা বলা হয়েছে, যা মহাপাপ বিনাশকারী। বিধিক্রম নির্দিষ্ট—অত্রিকুণ্ডে স্নান, বিধিমতে শ্রাদ্ধ, অত্রীশকে প্রণাম, তারপর কেদারের দর্শন; এভাবে করলে ব্যক্তি ‘মুক্তিভাগী’ হয়। পরে কোটিতীর্থে স্নান করে নীলকণ্ঠ রুদ্রের দর্শন এবং জয়াদিত্যকে নমস্কার করলে রুদ্রলোক প্রাপ্তি বলা হয়েছে। কূপে স্নান করে মহাজনেরা জয়াদিত্যকে পূজা করেন; তাঁর কৃপায় বংশ নষ্ট হয় না—এমন রক্ষাবচনও আছে। শেষে ফলশ্রুতি—মহীনগরকের সম্পূর্ণ মাহাত্ম্য শ্রবণে সকল পাপ থেকে মুক্তি।

स्तम्भतीर्थ-गुप्तक्षेत्र-कारणकथनम् (The Origin of the Hidden Sacred Field and the Rise of Stambha-tīrtha)
অর্জুন নারদকে জিজ্ঞাসা করেন—অতিশয় মহাশক্তিসম্পন্ন হয়েও কেন একটি তীর্থক্ষেত্রকে “গুপ্তক্ষেত্র” বলা হয়। নারদ প্রাচীন এক কাহিনি বলেন—অগণিত তীর্থদেবতা ব্রহ্মার সভায় এসে আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্বের সিদ্ধান্ত জানতে চান। ব্রহ্মা সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থকে একটিমাত্র অর্ঘ্য দিতে চান, কিন্তু ব্রহ্মা ও তীর্থসমূহ সহজে কার শ্রেষ্ঠতা নির্ণয় করতে পারেন না। তখন “মহী-সাগর-সঙ্গম” নামক যৌগিক তীর্থ নিজ শ্রেষ্ঠত্বের তিনটি কারণ জানায়—গুহা/স্কন্দের দ্বারা লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠার যোগ, নারদের স্বীকৃতি ইত্যাদি। ধর্মদেব আত্মপ্রশংসাকে নিন্দা করেন—সৎগুণ থাকলেও সাধুজনের উচিত নিজে তা ঘোষণা না করা—এবং ফলস্বরূপ স্থানটি “অপ্রসিদ্ধ” হবে বলে বিধান দেন; এই স্তম্ভ (অহংকার/জেদ) থেকেই “স্তম্ভতীর্থ” নামের উৎপত্তি। গুহা শাপের কঠোরতা নিয়ে আপত্তি তুললেও নীতিকে মান্য করে বলেন—কিছু কাল ক্ষেত্রটি গুপ্ত থাকবে, পরে স্তম্ভতীর্থরূপে প্রসিদ্ধ হয়ে সর্বতীর্থফল প্রদান করবে। এরপর বিশেষ করে শনিবার অমাবস্যা-ব্রত প্রভৃতির ফলের তুলনা বর্ণিত হয়, যা বহু মহাতীর্থযাত্রার সমতুল্য বলা হয়েছে। শেষে ব্রহ্মা অর্ঘ্য প্রদান করে তীর্থের মর্যাদা স্বীকার করেন, আর নারদ বলেন—এই কাহিনি শ্রবণমাত্রেই পাপক্ষয় ও পবিত্রতা লাভ হয়।

Ghaṭotkaca’s Mission and the Kāmākhya-Ordained Marriage Alliance (घटोत्कचप्रेषणम्—कामाख्यावाक्येन मौर्वीविवाहनिश्चयः)
অধ্যায়ের শুরুতে শৌনক সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—পূর্বে উল্লিখিত অলৌকিক পবিত্রতা ও ‘সিদ্ধলিঙ্গ’ প্রসঙ্গে কারা সংশ্লিষ্ট, তাঁদের কীর্তি কী, এবং কৃপায় সিদ্ধি কীভাবে লাভ হয়। সূত (উগ্রশ্রবা) বলেন, তিনি দ্বৈপায়ন ব্যাসের নিকট থেকে শ্রুত পরম্পরা অনুসারে কাহিনি বলবেন। এরপর কাহিনি মহাভারত-পরিবেশে প্রবেশ করে—পাণ্ডবেরা ইন্দ্রপ্রস্থে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সভায় আলোচনায় রত, তখন ঘটোৎকচ উপস্থিত হয়। ভ্রাতৃগণ ও বাসুদেব তাকে সমাদর করেন; যুধিষ্ঠির তার কুশল, রাজ্যশাসন ও মাতার অবস্থার কথা জিজ্ঞাসা করেন। ঘটোৎকচ জানায়, সে শৃঙ্খলা রক্ষা করছে, মাতার আদেশে পিতৃভক্তি পালন করছে এবং কুলমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে চায়। তারপর যুধিষ্ঠির ঘটোৎকচের উপযুক্ত বিবাহ বিষয়ে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শ নেন। কৃষ্ণ প্রাগ্জ্যোতিষপুরের এক ভয়ংকর পরাক্রমশালিনী কন্যার কথা বলেন—দৈত্য মুর (নরক-সম্পর্কিত) এর কন্যা। তিনি স্মরণ করান, পূর্ব সংঘর্ষে দেবী কামাখ্যা হস্তক্ষেপ করে তাকে বধ না করতে আদেশ দেন, যুদ্ধ-বর প্রদান করেন এবং নির্ধারিত বন্ধনের কথা জানান—সে ঘটোৎকচের পত্নী হবে। কন্যার শর্ত—যে তাকে দ্বন্দ্বে পরাজিত করবে, তাকেই সে বিবাহ করবে; বহু প্রার্থী তাতে নিহত হয়েছে। সভায় বিতর্ক ওঠে—যুধিষ্ঠির বিপদের আশঙ্কা করেন, ভীম ক্ষাত্রধর্ম ও দুঃসাধ্য কর্মের প্রয়োজনীয়তা বলেন, অর্জুন দেববাণী সমর্থন করেন, কৃষ্ণ দ্রুত উদ্যোগের নির্দেশ দেন। ঘটোৎকচ বিনয়ে মিশন গ্রহণ করে পিতৃকুলের মান রক্ষার সংকল্প করে; কৃষ্ণ আশীর্বাদ ও কৌশল দিয়ে তাকে বিদায় দেন, এবং সে আকাশপথে প্রাগ্জ্যোতিষের দিকে যাত্রা করে।

घटोत्कच–मौर्वी संवादः (Ghaṭotkaca and Maurvī: Contest of Power, Question, and Marriage Settlement)
এই অধ্যায়ে সূত রাজসভা-ঘন বীররসপূর্ণ এক কাহিনি বলেন। ঘটোৎকচ প্রাগ্জ্যোতিষের বাইরে এসে বহু-তলা স্বর্ণময় প্রাসাদ দেখে—সঙ্গীত ও পরিচারকদের কোলাহলে তা দীপ্ত। দ্বারে কর্ণপ্রাবরণা নামের দ্বাররক্ষিণী তাকে সতর্ক করে যে মুরার কন্যা মৌর্বীকে পেতে আগে বহু বর প্রাণ হারিয়েছে; সে আবার ভোগ-সেবা দেওয়ার প্রস্তাবও দেয়, কিন্তু ঘটোৎকচ তা প্রত্যাখ্যান করে নিজেকে ‘অতিথি’ হিসেবে বিধিপূর্বক অভ্যর্থনা দাবি করে। মৌর্বী তাকে প্রবেশ করিয়ে তীক্ষ্ণ বংশ-সম্পর্কের ধাঁধা তোলে—অধর্মে বিকৃত গৃহপরিস্থিতিতে ‘নাতনি’ না ‘কন্যা’—এই আত্মীয়তার জট কীভাবে বোঝা যায়। উত্তর না পেয়ে সে ভয়ংকর সত্তাদের দল ছেড়ে দেয়; ঘটোৎকচ সহজেই তাদের দমন করে মৌর্বীকে বশে আনে এবং শাস্তি দিতে উদ্যত হলে মৌর্বী পরাজয় স্বীকার করে তার শ্রেষ্ঠত্ব মানে। এরপর ঘটোৎকচ বলে গোপন বা অনিয়মিত মিলন ধর্মসম্মত নয়; সে মৌর্বীর স্বজন, বিশেষত ভগদত্তের অনুমতি চায় এবং তাকে শক্রপ্রস্থে নিয়ে যায়। সেখানে বাসুদেব ও পাণ্ডবদের সম্মতিতে শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন হয়, উৎসব হয়, পরে দম্পতি নিজ রাজ্যে ফেরে। শেষে তাদের পুত্র বর্বরীক জন্মায় ও দ্রুত বড় হয়; দ্বারকায় বাসুদেবের কাছে যাওয়ার সংকল্প উল্লেখ করে বংশ, ধর্ম ও ভবিষ্যৎ কাহিনির যোগ স্থাপন করা হয়।

महाविद्यासाधने गाणेश्वरकल्पवर्णनम् | Mahāvidyā-Sādhana and the Gaṇeśvara Ritual Protocol
অধ্যায় ৬১-এ দ্বারকার রাজসভায় এক ধর্মতাত্ত্বিক সাক্ষাৎকারের পর সাধনার বিধান বর্ণিত হয়েছে। ঘটোৎকচ পুত্র বর্বরীককে নিয়ে দ্বারকায় এলে নগররক্ষীরা প্রথমে তাকে শত্রু রাক্ষস মনে করে; পরে তিনি ভক্ত ও দর্শনপ্রার্থী বলে পরিচিত হন। সভায় বর্বরীক শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করে—ধর্ম, তপস্যা, ধন, ত্যাগ, ভোগ ও মোক্ষ—এত মতের মধ্যে প্রকৃত ‘শ্রেয়স’ কী? শ্রীকৃষ্ণ বর্ণভিত্তিক নীতি বলেন—ব্রাহ্মণের স্বাধ্যায়-সংযম-তপ, ক্ষত্রিয়ের বলবৃদ্ধি, দুষ্টদমন ও সজ্জনরক্ষা, বৈশ্যের গোপালন-কৃষি-বাণিজ্যজ্ঞান, শূদ্রের দ্বিজসেবা ও শিল্পকর্মসহ মৌল ভক্তিধর্ম। বর্বরীক ক্ষত্রিয়জাত হওয়ায় শ্রীকৃষ্ণ তাকে প্রথমে দেবী-আরাধনার দ্বারা অতুল বল অর্জনের নির্দেশ দেন। গুপ্তক্ষেত্রে দিগ্দেবী ও দুর্গার নানা রূপের পূজা, অর্ঘ্য ও স্তবে দেবীরা প্রসন্ন হয়ে বল, ঐশ্বর্য, যশ, কুলকল্যাণ, স্বর্গ এবং মোক্ষও দান করেন। শ্রীকৃষ্ণ তাকে ‘সুহৃদয়’ নামে অভিহিত করে সেখানে প্রেরণ করেন; ত্রিকাল পূজার পর দেবীরা প্রকাশ হয়ে শক্তিদান করেন এবং বিজয়লাভের সহচর্যার্থে সেখানে বাস করতে বলেন। পরে বিজয় নামক এক ব্রাহ্মণ বিদ্যাসিদ্ধি কামনায় আসে; স্বপ্নাদেশে দেবীরা তাকে সুহৃদয়ের সহায়তা নিতে বলেন। এরপর রাত্রিকালীন সাধনার ক্রম—উপবাস, মন্দিরপূজা, মণ্ডল নির্মাণ, রক্ষাকীল স্থাপন, অস্ত্রসংস্কার, এবং বিঘ্ননাশ ও অভীষ্টসিদ্ধির জন্য গণপতি-মন্ত্রসহ তিলক-পূজা-হোমের বিস্তারিত বিধান—উপস্থাপিত হয়ে অধ্যায়-কলফনে সমাপ্ত হয়।

Kṣetrapāla-sṛṣṭi, Kālīkā-prasāda, Vaṭayakṣiṇī-pūjā, and Aparājitā Mahāvidyā
শৌনক সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—গণপ/ক্ষেত্রপাল (পবিত্র ক্ষেত্রের রক্ষক-স্বামী) কীভাবে উৎপন্ন হল। সূত বলেন, দারুক নামের ভয়ংকর দানবে দেবতারা পরাজিত ও উৎখাত হয়ে শিব ও দেবীর শরণ নেন এবং জানান—অর্ধনারীশ্বর-তত্ত্ব ব্যতীত তাকে অন্য দেবতারা জয় করতে পারবেন না। তখন পার্বতী হরের কণ্ঠস্থিত ‘অন্ধকার’ শক্তি থেকে কালিকাকে প্রকাশ করেন, নাম দেন এবং শত্রুনাশের আদেশ করেন। কালিকার ভয়াল গর্জনে দারুক ও তার অনুচররা বিনষ্ট হয়, কিন্তু বিশ্বে অস্থিরতা দেখা দেয়। শান্তির জন্য রুদ্র শ্মশানে কাঁদতে থাকা শিশুরূপে আবির্ভূত হন; কালিকা তাকে স্তন্যদান করেন, আর সেই শিশু যেন ক্রোধমূর্তিকে পান করে দেবীকে কোমল করে তোলে। দেবতাদের আশঙ্কা থাকলে শিশুরূপ মহেশ্বর আশ্বাস দেন এবং নিজের মুখ থেকে চৌষট্টি শিশুসদৃশ ক্ষেত্রপাল সৃষ্টি করে স্বর্গ, পাতাল ও চতুর্দশভুবনসম্ভূত ভূলোকে তাদের অধিকার নির্ধারণ করেন। এরপর ক্ষেত্রপাল-পূজার সংক্ষিপ্ত বিধান—নবাক্ষর মন্ত্র, দীপ, এবং কালো উড়দ ও চাল মিশ্র নৈবেদ্য; অবহেলায় যজ্ঞফল নিষ্ফল হয় ও অশুভ সত্তারা ফল গ্রাস করে। স্তোত্রে বন, জল, গুহা, চৌরাস্তা, পর্বত প্রভৃতি স্থানে অবস্থানকারী রক্ষকদের নাম-স্থান বলা হয়েছে। পরে বটযক্ষিণীর কাহিনি—বিধবা সুনন্দা তপস্যা ও নিত্যপূজায় দেবীকে প্রকাশ করেন; শিব বিধান দেন, যে আমার পূজা করেও বটযক্ষিণীর পূজা না করে তার ফল শূন্য। বটযক্ষিণীর সহজ মন্ত্র-প্রার্থনা নারী-পুরুষ উভয়ের কাম্যসিদ্ধি দান করে। শেষে বিজয় ‘পরম বৈষ্ণবী’ অপরাজিতা মহাবিদ্যার আরাধনা ও স্তব করেন; দীর্ঘ রক্ষামন্ত্রে অগ্নি-জল-বায়ু, চোর-পশু, শত্রুকৃত্য, রোগভয় ইত্যাদি থেকে রক্ষা, জয় ও বাধানাশের প্রতিশ্রুতি—এবং নিত্যজপে বৃহৎ আচার ছাড়াই বিঘ্ন দূর হয় বলা হয়েছে।

Barbarīka’s Night Vigil, Defeat of Obstacle-Makers, and the Nāga-Established Mahāliṅga (Routes to Major Kṣetras)
সূত বলেন—রাত্রিকালে বিজয় বল‑অতিবল মন্ত্রে অগ্নিহোত্র করেন। রাতের প্রহরে প্রহরে বিঘ্নসৃষ্টিকারীরা আসে—ভয়ংকর রাক্ষসী মহাজিহ্বা মুক্তির জন্য অহিংসা ও ভবিষ্যৎ উপকারের ব্রত গ্রহণ করে; পর্বতসম প্রতিদ্বন্দ্বী রেপালেন্দ্র/রেপালা বর্বরীকার প্রবল প্রতিঘাতে পরাস্ত হয়; এবং শাকিনী‑নেত্রী দুহদ্রুহা দমন হয়ে নিহত হয়। এরপর তপস্বীর বেশে এক ব্যক্তি যজ্ঞকে সূক্ষ্ম জীবহিংসা বলে নিন্দা করে; বর্বরীক শাস্ত্রসম্মত যজ্ঞে এ অভিযোগ মিথ্যা বলে তাকে তাড়িয়ে দেন, তখন সে দৈত্যরূপ প্রকাশ করে। অনুসরণে বহুপ্রভা নগরে গিয়ে বিপুল দৈত্যবাহিনী ধ্বংস হয়; বাসুকি‑প্রমুখ নাগেরা কৃতজ্ঞ হয়ে বর দেন—বিজয়ের কর্ম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হোক। পরে কল্পবৃক্ষতলে রত্নময় মহালিঙ্গ দেখা যায়, যা নাগকন্যারা পূজা করে। তারা জানায়—শেষনাগ তপস্যায় এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং এখান থেকে চার দিকের পথ—পূর্বে শ্রীপর্বত, দক্ষিণে শূর্পারক, পশ্চিমে প্রভাস, উত্তরে গোপন ক্ষেত্র যেখানে সিদ্ধলিঙ্গ। বিজয় যুদ্ধভস্মের তাবিজ দিতে চাইলে বর্বরীক বৈরাগ্যে অস্বীকার করেন; কিন্তু দেববাণী কৌরবদের কাছে গেলে অনিষ্টের সতর্কতা দিলে তিনি গ্রহণ করেন। দেবগণ বিজয়কে “সিদ্ধসেন” উপাধি দিয়ে ব্রতসমাপ্তি ও ধর্মশৃঙ্খলার স্থিতি ঘোষণা করেন।

भीमेश्वरलिङ्गप्रतिष्ठा तथा तीर्थाचारोपदेशः (Bhimeshvara Liṅga स्थापना and Instruction on Tīrtha Conduct)
এই অধ্যায়ে দ্যূতপরাজয়ের পর বনবাসে তীর্থযাত্রার সময়ে পাণ্ডবদের দেবীকুণ্ডে নীতি-আচারগত বিরোধ বর্ণিত। দ্রৌপদীসহ ক্লান্ত পাণ্ডবরা চণ্ডিকার পবিত্র স্থানে এসে পৌঁছায়। তৃষ্ণার্ত ভীম কুণ্ডে নেমে জল পান ও স্নান করতে উদ্যত হলে যুধিষ্ঠির বিধিসম্মত আচরণের কথা স্মরণ করান। তখন সুহৃদয় নামক এক প্রহরীসদৃশ ব্যক্তি ভীমকে তিরস্কার করে বলে—এ জল দেবস্নানের জন্য নিবেদিত; বাইরে পা ধুয়ে তবে কাছে যেতে হয়, নচেৎ অভিষিক্ত জল অপবিত্র হয় এবং তীর্থে অসাবধানতা মহাপাপ ডেকে আনে। ভীম দেহধর্ম ও তীর্থে স্নানের সাধারণ বিধান দেখিয়ে প্রতিবাদ করে; বিবাদ যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। অতিশয় বলবান বার্বারীক ভীমকে পরাস্ত করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হয়, কিন্তু রুদ্রের আদেশে সে থেমে যায়; রুদ্র আত্মীয়তার রহস্য প্রকাশ করে জানান, এ দোষ অজ্ঞতাবশত ঘটেছে। বার্বারীক অনুতাপে আত্মবিনাশ করতে চাইলে দেবী-সংযুক্ত দেবীগণ অনিচ্ছাকৃত অপরাধের শাস্ত্রীয় বিচার বুঝিয়ে তাকে নিবৃত্ত করেন এবং কৃষ্ণের হাতে তার নির্ধারিত, মহৎ মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করেন। শেষে মিলন ঘটে, পাণ্ডবরা পুনরায় তীর্থস্নান করে এবং ভীম ভীমেশ্বর লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। জ্যৈষ্ঠ কৃষ্ণ চতুর্দশীর ব্রত ও তার ফল—জন্মগত দোষশুদ্ধি ও পাপনাশ—উল্লেখিত; ভীমেশ্বর লিঙ্গকে শ্রেষ্ঠ লিঙ্গসম ফলদায়ক ও পাপহর বলা হয়েছে।

Devī-stuti, Bhīmasena’s Reversal, and the Prophetic Mapping of Kali-yuga Devī-Sthānas (Ekānaṃśā / Keleśvarī / Durgā / Vatseśvarī)
সূত বলেন—তীর্থে সাত রাত্রি অবস্থানের পর যুধিষ্ঠির প্রাতে শৌচ-স্নান করে দেবী ও লিঙ্গসমূহের পূজা করেন, ক্ষেত্র প্রদক্ষিণ করেন এবং প্রস্থানকালে স্তোত্র পাঠ করেন। এরপর তিনি মহাশক্তি দেবীর শরণ নেন—শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় ভগিনী একানংশা রূপে তাঁকে সম্বোধন করে সর্বব্যাপী বিশ্বরূপিণীর রক্ষা প্রার্থনা করেন। ভীম (বায়ুপুত্র) নীতিবাক্যরূপে বিরোধিতা করে বলেন—মোহকারিণী ‘প্রকৃতি’তে আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়; বিদ্বানকে মহাদেব, বাসুদেব, অর্জুন ও ভীমেরই স্তব করা উচিত, আর নিষ্ফল বাক্য আত্মিক ক্ষতি আনে। যুধিষ্ঠির প্রত্যুত্তরে বলেন—দেবী সকল জীবের জননী, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব কর্তৃক পূজিতা; অতএব অবমাননা অনুচিত। সঙ্গে সঙ্গে ভীমের দৃষ্টিহানি ঘটে—একে দেবীর অপ্রসাদ জেনে তিনি সম্পূর্ণ শরণাগতি গ্রহণ করে দীর্ঘ স্তোত্রে ব্রাহ্মী, বৈষ্ণবী, শাম্ভবী প্রভৃতি রূপ, দিকশক্তি, গ্রহসম্বন্ধ এবং লোক-পতালব্যাপ্তি বর্ণনা করে চক্ষুদৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়ার প্রার্থনা করেন। দেবী তেজোময়ী রূপে প্রকাশিত হয়ে ভীমকে সান্ত্বনা দেন, পূজ্যজনের নিন্দা ত্যাগ করতে বলেন এবং ধর্মসংস্থাপনে বিষ্ণুর সহায়িকা হিসেবে নিজের উদ্ধারক ভূমিকা জানান। পরে তিনি কলিযুগের ভবিষ্যৎ দেবীস্থান-তীর্থের নির্দেশ দেন—লোহাণা, লোহাণাপুর, মহীসাগরের নিকট ধর্মারণ্য, অট্টালজ, গয়াত্রাড়; ভবিষ্যৎ ভক্ত কেলো, বৈলাক, বৎসরাজ; শুক্ল সপ্তমী, শুক্ল নবমী প্রভৃতি তিথি; এবং ফল—মনস্কামনা সিদ্ধি, সন্তানলাভ, স্বর্গ, মোক্ষ, বিঘ্ননাশ, রোগশমন ও দৃষ্টিলাভ। শেষে পাণ্ডবরা বিস্মিত হয়ে তীর্থযাত্রা অব্যাহত রাখেন, বর্বরীক প্রতিষ্ঠা করে অন্য তীর্থে গমন করেন।

बर्बरीक-शिरःपूजा, गुप्तक्षेत्र-माहात्म्य, कोटितीर्थ-फलश्रुति (Barbarīka’s Severed Head, Guptakṣetra Māhātmya, and Koṭitīrtha Phalaśruti)
অধ্যায় ৬৬-এ সূতবর্ণিত যুদ্ধশিবিরের কথোপকথন উঠে আসে। তেরো বছর পরে কুরুক্ষেত্রে পাণ্ডব-কৌরবেরা সমবেত হয়; বীরগণনা ও কত সময়ে জয় সম্ভব—এ নিয়ে তর্ক চলে। অর্জুন প্রবীণদের দীর্ঘ যুদ্ধ-প্রতিজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিজের সিদ্ধান্তক্ষমতা প্রকাশ করে; তখন ভীমের পৌত্র বর্বরিক (সূর্যবর্চা) এসে বলে, সে এক মুহূর্তেই যুদ্ধ শেষ করতে পারে। সে বিশেষ তীর ছুড়ে দুই সেনার মর্মস্থানে ভস্ম/রক্তসদৃশ চিহ্ন বসিয়ে কৌশল দেখায়, কয়েকজনকে বাদ দিয়ে; ধর্মশপথবদ্ধ হয়ে সে দ্রুত প্রতিপক্ষ নিধনের কথা বললে সভা বিস্মিত হয়। এরপর শ্রীকৃষ্ণ সুদর্শন চক্রে বর্বরিকের শিরচ্ছেদ করেন। দেবী ও সহচরী দেবীগণ এসে জানান—জগতের ভারহরণ-যোজনার জন্য যুদ্ধের নির্ধারিত গতি রক্ষা করা আবশ্যক ছিল, আর ব্রহ্মার শাপে বর্বরিকের মৃত্যু অনিবার্য। বর্বরিকের মস্তক পুনর্জীবিত হয়ে পূজ্য হয়; তাকে পর্বতশিখরে বসিয়ে যুদ্ধদর্শনের বর দেওয়া হয় এবং ভক্তদের দীর্ঘকাল পূজা ও আরোগ্যলাভের প্রতিশ্রুতি মেলে। পরে গুপ্তক্ষেত্র, কোটিতীর্থ ও মহীনগরকের মাহাত্ম্য বর্ণিত—স্নান, শ্রাদ্ধ, দান ও শ্রবণ-পাঠে শুদ্ধি, সমৃদ্ধি ও মুক্তি (রুদ্রলোক/বিষ্ণুলোক) লাভের কথা বলা হয়েছে। বর্বরিক-স্তোত্র ও ফলশ্রুতি শ্রবণ-পাঠের পুণ্যফল স্থির করে।
The section emphasizes a southern coastal tīrtha-cluster whose sanctity is described as exceptionally merit-yielding, yet pedagogically guarded by danger, highlighting that spiritual benefit is coupled with ethical resolve and right intention.
Merit is associated with bathing and disciplined conduct at the five tīrthas, with narratives implying purification, restoration from curse-conditions, and alignment with higher lokas through devotional and ethical steadiness.
Key legends include the account of Arjuna (Phālguna) approaching the five tīrthas, the grāha episode leading to an apsaras’ restoration, and Nārada’s role in directing afflicted beings toward the pilgrim-hero for release.