
The Section on Brahman
খণ্ড ১ গরুড় পুরাণের সূচনা করে তার ধর্মতাত্ত্বিক কেন্দ্র স্থাপন করে—নারায়ণ (হরি/বাসুদেব)ই পরম ব্রহ্ম, সৃষ্টির উৎপত্তি, পালন ও প্রলয়ের মূল কারণ। অধ্যায়ের শুরুতে বিধিবদ্ধ মঙ্গলাচরণ—নির্মল, সর্বব্যাপী, ইন্দ্রিয়াতীত প্রভুর প্রতি প্রণাম—তারপর প্রধান দেবদেবী ও সরস্বতীর বন্দনা করা হয়, যা শাস্ত্রসম্মত আলোচনাধর্মী পরম্পরার ইঙ্গিত দেয়। নৈমিষারণ্যে শৌনক প্রমুখ ঋষিগণ পুরাণবক্তা সূতের কাছে এসে মৌলিক প্রশ্ন করেন—সত্য ঈশ্বর কে? তাঁর রূপ কী? সৃষ্টি কীভাবে প্রবাহিত হয়? কোন ব্রত ও কোন যোগে তাঁকে লাভ করা যায়? এই জিজ্ঞাসা পুরাণকে ধর্ম, ভক্তি ও যথার্থ তত্ত্ববোধের পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। সূত এরপর গ্রন্থের বংশপরম্পরা দৃঢ় করেন—গরুড় থেকে কশ্যপ, এবং ব্যাস থেকে সূত—এভাবে গুরুপরম্পরায় পবিত্র বাণীর প্রামাণ্যতা প্রকাশ পায়। এতে বোঝা যায়, এ কেবল কাহিনি নয়; শাস্ত্ররূপে উপদেশের ধারাবাহিকতা। পরে তিনি অবতার-তালিকা সংক্ষেপে দেন—মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নরসিংহ, বামন, পরশুরাম, ব্যাস, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, কল্কি প্রভৃতি—এবং দেখান যে জগতের সংকটে ধর্মরক্ষার জন্য ভগবান অবতীর্ণ হন। তাই খণ্ড ১ পরবর্তী অংশের আচার, নীতি ও পরলোক-শিক্ষার আগে এক ‘সিদ্ধান্তদ্বার’ হিসেবে কাজ করে।
Maṅgalācaraṇa, the Sages’ Inquiry, and Hari as Supreme with an Avatāra-Outline
অধ্যায়ের শুরুতে অজ, অব্যয়, অনন্ত, শুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ হরির মঙ্গলাচরণ করা হয়। বাক্শুদ্ধি ও পরম্পরা পবিত্র করতে হরি, রুদ্র, ব্রহ্মা, গণাধিপ ও সরস্বতীকে প্রণাম জানানো হয়। এরপর নৈমিষারণ্যে যজ্ঞপরায়ণ শৌনক প্রমুখ তপস্বী ঋষিরা ধ্যানস্থ, নিষ্কলুষ বিষ্ণুভক্ত পুরাণবক্তা সূতকে প্রশ্ন করেন—পরমেশ্বর কে, সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়ে তাঁর ভূমিকা, ধর্মের উৎপত্তি, তাঁর রূপ, সৃষ্টির তত্ত্ব, কোন ব্রত ও যোগে তাঁকে তুষ্ট করে লাভ করা যায়, তাঁর অবতারসমূহ, এবং তাঁর শাসনে বংশধারা ও বর্ণাশ্রমধর্ম কীভাবে প্রবাহিত হয়। সূত গ্রন্থপরম্পরা জানান (গরুড় থেকে কশ্যপ; ব্যাসের নিকট শ্রুত) এবং নারায়ণকে পরব্রহ্ম ঘোষণা করেন। তারপর অবতারক্রম সংক্ষেপে বলেন—কৌমার শাসন, বরাহের ভূউদ্ধার, কর্মের মধ্যে নৈষ্কর্ম্য উপলব্ধির উপদেশ, নর-নারায়ণের তপস্যা, কপিলের সাংখ্য, দত্তাত্রেয়ের অনুসন্ধান, যজ্ঞ, উরুক্রম, পৃথিবীতে পুনরাবির্ভাব, মৎস্য-কূর্ম-ধন্বন্তরি-মোহিনী, নরসিংহ- বামন-পরশুরাম-ব্যাস, রাজধর্মীয় কীর্তি, রাম-কৃষ্ণ, এবং ভবিষ্যৎ বুদ্ধ ও কল্কি—শেষে বলেন হরির প্রকাশ অসংখ্য। এই ভূমিকা ‘ঈশ্বর কে’ থেকে ‘তাঁর অধীনে ধর্ম-সাধনা’ পর্যন্ত তাত্ত্বিক কাঠামো স্থাপন করে।
Paramparā (Transmission), Rudra’s Viṣṇu-Dhyāna, and the Garuḍa Purāṇa’s Origin-Impulse
অধ্যায় ২-এ ঋষিদের কৌতূহল থেকে কাহিনির স্পষ্ট পরম্পরা স্থাপিত হয়। সূত বদরিকাশ্রমে ব্যাসের কাছে গিয়ে হরির রূপ, সর্গ (সৃষ্টি) ও অন্যান্য পুরাণীয় বিষয় জানতে চান। ব্যাস বলেন—ব্রহ্মা তাঁকে শ্রী-গারুড় পুরাণ শিক্ষা দিয়েছিলেন; আর ব্রহ্মা এর মূল স্থাপন করেন কৈলাসের সেই প্রাচীন প্রসঙ্গে, যেখানে দেবতারা রুদ্রকে জিজ্ঞাসা করেন তিনি কার ধ্যান করেন। রুদ্র দীর্ঘ বিষ্ণু-স্তব ও বিশ্বরূপ-ধ্যানে প্রভুকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম, মহত্তম, এবং যাঁর দেহে সকল লোক প্রতিষ্ঠিত—এভাবে বর্ণনা করেন। পরে ব্রহ্মা ও রুদ্র শ্বেতদ্বীপে যান; সেখানে রুদ্র বিষ্ণুকে পরম তত্ত্ব, ধর্ম, ব্রত, আচার, অবতার, প্রলয় এবং বংশ-মন্বন্তর প্রভৃতি পুরাণ-রূপরেখা সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। বিষ্ণু নিজের সর্বোচ্চতা ও জ্ঞান-যোগ-ধর্ম- বেদের সঙ্গে অভিন্নতা ঘোষণা করে গারুড়-উৎপত্তির সূত্র বলেন—গারুড়ের বর, বিনতার মুক্তি, এবং বিষ্ণু-মহিমা প্রচারকারী এক পুরাণের প্রতিশ্রুতি; যা পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে তত্ত্ব, নিয়ম ও আচার-নৈতিক প্রয়োগের ভূমি প্রস্তুত করে।
Paramparā (Transmission) and Viṣaya-Saṅgraha (Scope) of the Garuḍa Purāṇa
নৈমিষারণ্যে শৌনক প্রমুখ ঋষিরা উপদেশ প্রার্থনা করেন। সূত প্রথমে গরুড়পুরাণের প্রামাণ্য দেব-ঋষি-পরম্পরায় স্থাপন করেন—বিষ্ণু ব্রহ্মাকে, ব্রহ্মা রুদ্রকে, রুদ্র ব্যাসকে এবং ব্যাস সূতকে শিক্ষা দেন; এখন সূত সমবেত ঋষিদের তা শোনান। এরপর তিনি ভবিষ্যৎ অধ্যায়গুলির বিষয়-সংগ্রহ দেন—সৃষ্টিতত্ত্ব, উপাসনা, তীর্থ, লোক-গঠন, মন্বন্তর, বর্ণাশ্রমধর্ম, দান ও রাজধর্ম, বিচার-ব্যবহার, ব্রত, বংশাবলি এবং আয়ুর্বেদের কারণ-চর্চা। শেষে বাসুদেবের কৃপায় গরুড়ের পরিচয় ও কীর্তি (অমৃত-হরণ, চক্র-সম্পর্ক, নাগ-নাশ) মহিমান্বিত করে পাঠকে মঙ্গলদায়ক বলা হয়। এই সংক্ষিপ্তসার পাঠককে ক্রমশ ধর্ম ও ভক্তির ফলপ্রাপ্তির দিকে নিয়ে যায়।
Sṛṣṭi–Pratisṛṣṭi: Viṣṇu as Kāla and the Ninefold Creation Schema
রুদ্র সৃষ্টির ও পুনঃসৃষ্টির, বংশপরম্পরা, মন্বন্তর এবং রাজবংশের ধারাবাহিক বিবরণ চান। হরি জানান—বিষ্ণুই পরম তত্ত্ব, তিনি ব্যক্ত‑অব্যক্ত, পুরুষ ও কাল; তাঁর লীলাতেই সৃষ্টি‑স্থিতি‑প্রলয়ের চক্র আবর্তিত হয়। সাংখ্যসদৃশ ক্রমে অব্যক্ত থেকে আত্মা, বুদ্ধি, মন, তারপর আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও পৃথিবী প্রকাশ পায়। স্বর্ণিম ব্রহ্মাণ্ডে ভগবান চতুর্মুখ ব্রহ্মারূপে স্থাবর‑জঙ্গমের সৃষ্টি করেন; তিনিই পালন করেন এবং যুগান্তে রুদ্ররূপে সংহার করেন—বরাহ অবতারে পৃথিবী উদ্ধারের দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়। পরে প্রাকৃত ও বৈকৃত সৃষ্টির (ইন্দ্রিয়, স্থাবর, তির্যক/পশু, দেব, মানব, অনুগ্রহ প্রভৃতি) তালিকা, ব্রহ্মার দেহ ও ত্যক্ত রূপ (রাত্রি‑দিবস‑সন্ধ্যা) থেকে দেব‑অসুর‑পিতৃ‑মানবাদি উৎপত্তি, এবং শেষে বর্ণ‑আশ্রমধর্ম অনুযায়ী লোকপ্রাপ্তির সম্পর্ক বর্ণিত হয়ে পরবর্তী পুরাণীয় বংশ ও মন্বন্তরচক্রের ভূমিকা স্থাপিত হয়।
Manasa Progenitors, Pitṛ Orders, Dakṣa’s Alliances, and the Dakṣa-Yajña Rupture
সৃষ্টির শৃঙ্খলা স্থাপনের পর ভগবান মানসিকভাবে সৃষ্টি বিস্তার করেন এবং মনোজ প্রজাপতি ও ঋষিদের প্রকাশ করেন, যারা প্রজাবৃদ্ধি ও ধর্মরক্ষার কর্মী হন। এই অধ্যায়ে প্রধান ঋষি ও প্রজাপতিদের তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং পিতৃবংশ—বর্ষিষদ, অগ্নিষ্বাত্ত, কব্যাদ প্রভৃতি—উল্লেখ করে শ্রাদ্ধে হব্যগ্রহণের অধিকার ও ক্রমের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। দক্ষের জন্ম, বামার সঙ্গে বিবাহ, এবং কন্যাদের ধর্ম, ঋষি, অগ্নি ও পিতৃদের কাছে প্রদান—এর ফলে দেববংশ ও নৈতিক শক্তির ব্যক্ত রূপের উৎপত্তি ঘটে। পরে মার্কণ্ডেয়, সোম–দুর্বাসা–দত্তাত্রেয় পরম্পরা, বালখিল্যগণ, এবং অগ্নির পুত্র পাবক–পবমান–শুচি প্রভৃতি বংশধরদের কথা বলা হয়েছে। শেষে দক্ষের অশ্বমেধে সতীর অপমান, দেহত্যাগ ও পুনর্জন্মের প্রসঙ্গ উঠে আসে; এখান থেকেই রুদ্রের যজ্ঞধ্বংস ও দক্ষের শাপের সূত্রপাত, যা পরবর্তী অধ্যায়ে যজ্ঞঅপরাধের ফল ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ধারায় গিয়ে মেলে।
Vamsha of Dhruva and Prithu; Daksha’s Progeny; Enumerations of Devas, Asuras, Nagas, and Birds
হরি ধারাবাহিক বংশবর্ণনা চালিয়ে যান, যেখানে ধর্মময় রাজত্বকে বিশ্বস্থিতির ভিত্তি বলা হয়েছে। উত্তানপাদ থেকে উত্তম ও ধ্রুব জন্মান; ধ্রুববংশ শ্লিষ্টি ও প্রাচীনবর্হি হয়ে অঙ্গ পর্যন্ত গিয়ে অধার্মিক বেণে এসে পৌঁছায়। বেণের অধর্মে ঋষিরা তাকে বধ করেন; তার মথন থেকে প্রথমে নিষাদ, পরে পৃথু প্রকাশিত হন। পৃথু পৃথিবীকে ‘দোহন’ করে প্রজার অন্ন-সমৃদ্ধি ও রাজধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন; তাঁর বংশ সংক্ষেপে উল্লিখিত। এরপর প্রচেতস, মারিষা ও দক্ষের পুনঃসৃষ্টি-প্রয়াস—প্রথমে মানস সন্তানকে হরি নিবৃত্ত করেন, পরে সংযোগে প্রজা উৎপন্ন হয়; নারদের হস্তক্ষেপ, দক্ষের শাপ এবং শিব-সম্পর্কিত টানাপোড়েন স্মরণ করা হয়। দক্ষকন্যাদের নাম ও বিবাহবণ্টন (ধর্ম, কশ্যপ, সোম প্রভৃতি) থেকে বসু, রুদ্র, আদিত্য, মরুত এবং দানব, নাগ, পক্ষী-বংশের উৎপত্তি বর্ণিত; প্রহ্লাদকে বিষ্ণুভক্তির জন্য বিশেষভাবে প্রশংসা করা হয়েছে। শেষে বলা হয়, রাজা-সুর-দানব সকলেই হরির রূপে অন্তর্ভুক্ত—পরবর্তী বিশ্বতত্ত্ব ও ধর্মবর্ণনার ভূমিকা রচিত হয়।
Sūrya–Navagraha Pūjā Upacāra, Śiva–Vaiṣṇava Salutations, and Sarasvatī-Mantra Vidhi
রুদ্রের অনুরোধে ব্যাসের কাছে ‘সূর্য ও দেবতা‑পূজার পরম সার’ জানতে চাইলে হরি এমন এক সাধনা বলেন যা ধর্ম‑কাম‑অধিকার দেয় এবং শুভ আধ্যাত্মিক লক্ষ্যে নিবদ্ধ। প্রথমে সূর্যসিংহাসনস্থ সূর্য ও নবগ্রহ (সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনৈশ্চর, রাহু, কেতু)-এর মন্ত্রসহ প্রণামক্রম, তারপর আসন, আহ্বান, পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয়, স্নান, বস্ত্র, যজ্ঞোপবীত, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ, নমস্কার, প্রদক্ষিণা, বিসর্জন প্রভৃতি উপচারের পূজা‑ক্রম দেওয়া হয়। পরে শিবের অঙ্গ ও পঞ্চমুখ, গৌরী, গুরু‑দেবতা প্রণাম করে, বাসুদেবরূপ নারায়ণকে ব্যূহ‑অবতার, পরিকর ও চিহ্নসহ বন্দনা, শেষে দিকপাল ও বিষ্বক্সেন পর্যন্ত প্রণামপরম্পরা বিস্তৃত হয়। উপাসক হরি‑মন্ত্রে ‘মন্ত্রে মন্ত্রে’ সম্মান অর্পণ করে। এরপর অধ্যায়টি বিষ্ণুশক্তি সরস্বতী‑পূজায় যায়—হ্রীং‑বীজযুক্ত মন্ত্রন্যাস, তাঁর শক্তির বিবরণ, পদ্মাসন প্রস্তুতি এবং সরস্বতী, সূর্য ও অন্যান্য দেবতার জন্য নিজ নিজ মন্ত্রে পবিত্র/যজ্ঞোপবীত স্থাপনের বিধান দিয়ে পরবর্তী আচারবিস্তারের ভূমিকা রচনা করে।
Worship (Pūjā): Vajra-nābha Maṇḍala Construction, Lotus-Seat Design, and Vaiṣṇava Nyāsa
খণ্ড ১-এর আচাৰ-নির্ভর উপদেশের ধারাবাহিকতায় হরি এখানে পূজার পূর্ণ বিধান বলেন। স্নান-শুদ্ধি দিয়ে শুরু করে ভূমি-মণ্ডপ নির্মাণ এবং পাঁচ রঙের গুঁড়ো দিয়ে বজ্র-নাভ মণ্ডল অঙ্কন করা হয়। ষোলো ভাগের মাপজোক, দড়ি/রেখা টেনে নির্দেশ, রেখাসংযোগস্থ ‘নাভি’ নির্ণয়, এবং নির্দিষ্ট ঘূর্ণনে কেন্দ্র ও মধ্যবর্তী স্থান গঠন—সব ধাপে ধাপে বর্ণিত। এরপর পদ্মাসন নির্মাণ—কেশর, কর্ণিকার বিভাজন, পাপড়ি—এবং দ্বারের অনুপাত ও অলংকরণ বলা হয়। রঙতত্ত্ব স্পষ্ট: হলুদ কর্ণিকা, বহুরঙা কেশর, ভিতরে নীল, গাঢ় পাপড়ি; কালো ভরাট ও সাদা রেখা/দ্বার। মণ্ডল সম্পন্ন হলে ন্যাসে অন্তর্নিহিত স্থাপন—হৃদয়ে বিষ্ণু, কণ্ঠে সঙ্কর্ষণ, মস্তকে প্রদ্যুম্ন, শিখায় অনিরুদ্ধ; অঙ্গ ও হাতে ব্রহ্মা ও শ্রীধর। দিক ও কোণে বিন্যাসের পর গন্ধ-উপহারসহ পূজায় পরম পদ লাভের কথা বলে, যা পরবর্তী অধ্যায়ের সাধনা-দক্ষতা ও ভক্তিলাভের ভূমি প্রস্তুত করে।
Dīkṣā Procedure: Homa Measures, Elemental Reconstitution, and Naming by Omen
আচারখণ্ডের কর্মমুখী ধারায় হরি রুদ্র/শিবকে পূর্বদীক্ষিত শিষ্যের দীক্ষা-পদ্ধতি বোঝান। নির্দিষ্ট সময়ে শিষ্যের চোখ বাঁধিয়ে ১০৮ বার মূলমন্ত্রে আহুতি দেওয়া হয়; পুত্রলাভ, সাধকত্ব বা মুক্তিদ গুরু হওয়ার উদ্দেশ্যে সংখ্যা বাড়ে। পরে গুরু শিষ্যদের বাইরে বসিয়ে একাগ্র করান এবং অন্তর্দৃষ্টিতে রুদ্রের বায়বীয় শক্তিতে শোষণ, অগ্নিতে দহন, জলে নিমজ্জন কল্পনা করে জীবের তেজ সংগ্রহ করে ‘জ্যোতি জ্যোতিতে’ লয় করান। আকাশে ওঁকার ধ্যান ও দেহে কারণতত্ত্ব চিন্তনে দেহকারণ থেকে পৃথক ক্ষেত্রজ্ঞের উপলব্ধি শেখানো হয়। এরপর মণ্ডল নির্মাণ (বা প্রতিনিধি দ্বারা), হরি পূজা, হস্ত-পদ্ম ভাবনা; শেষে ‘বিষ্ণুর হস্ত’ শিষ্যের মস্তকে স্থাপন করে শুদ্ধি করা হয়। অধ্যায়ের শেষে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফুল অর্পণ করে নামকরণের শকুন নির্ণয় করা হয়, এবং পরবর্তী অংশের সূক্ষ্ম বিধির ভূমিকা রচিত হয়।
Śrī-nyāsa, Lotus Maṇḍala Construction, and Homa to Mahālakṣmī with Sarasvatī Invocation
আচারখণ্ডের বিধিনির্ভর ধারায় এই অধ্যায়ে সাধারণ পূজা থেকে এগিয়ে শ্রী-কেন্দ্রিক সাধনার কথা বলা হয়েছে। মহালক্ষ্মীর বীজজপ দিয়ে শুরু করে সাধক দেহের ছয় স্থানে নিয়মিত ন্যাস সম্পন্ন করে। এরপর চার দ্বারযুক্ত পদ্মযোনি মণ্ডল নির্মিত হয়, যা আকাশ ও পঞ্চতত্ত্ব, বৈদিক শৃঙ্খলা এবং সূর্য-চন্দ্র প্রভৃতি জ্যোতিষ্ক দ্বারা পরিব্যাপ্ত, রজোগুণপ্রধান বলে বর্ণিত। মণ্ডলের কোণে রক্ষা ও অনুগ্রহের জন্য শুভলক্ষণসহ লক্ষ্মী, দুর্গা, গণ ও গুরু প্রতিষ্ঠা করে শক্তি ও দিশা স্থির করা হয়। পরে ক্ষেত্রপাল আহ্বান করে ভূমি সুরক্ষিত করে হোম করা হয় এবং মহালক্ষ্মী-মন্ত্ররূপে আহুতি প্রদান করা হয়। শেষে সরস্বতীর বীজমন্ত্র ও বাক্-উদ্বোধন সূত্রে পূজা বিস্তার করে পরবর্তী উপাসনা ও সিদ্ধিলাভের উপায়ের ভূমিকা রচিত হয়।
Navavyūha-pūjāvidhi: Bhūta-śuddhi, Nyāsa, Yogapīṭha, Maṇḍala-racanā, Mudrā-prayoga
এই অধ্যায়ে হরি কাশ্যপ-পরম্পরায় প্রাপ্ত নব-ব্যূহ পূজাবিধি শিক্ষা দেন। সাধক প্রথমে প্রাণকে সহস্রারে তুলে অন্তর্ব্যোমে স্থাপন করে, তারপর বীজমন্ত্রে ভূতশুদ্ধি করে—পঞ্চভূতদেহ দগ্ধ ও বিলীন করে চেতনায় বিশ্বব্যাপ্তি ও অমৃতভাবনা সঞ্চার করে। এরপর দীপ্ত মণ্ডলে পীতাম্বর চতুর্ভুজ প্রভুর ধ্যান করে ‘সেই আমি’—এই তাদাত্ম্য-প্রতিফলন স্থাপন করে। তারপর করন্যাস ও দেহন্যাসে ষড়ঙ্গ-রক্ষা (হৃদয়, শির, শিখা, কবচ, নেত্র, অস্ত্র) হৃদয়-মস্তক-চক্ষু-হস্ত ও দিকসমূহে প্রতিষ্ঠা করে। যোগপীঠে ধর্ম-জ্ঞান-বৈরাগ্য-ঐশ্বর্য ও তাদের বিপরীত স্থাপন, অষ্টদিক পদ্ম এবং সূর্য-চন্দ্র-অগ্নির স্তরিত মণ্ডল রচনা হয়। দ্বার ও কোণে কেশবের দিকশক্তি, ব্যূহ-বীজ, গরুড়, সুদর্শন, শ্রী/লক্ষ্মী ও আয়ুধ-চিহ্ন স্থাপন করে, উপর ব্রহ্মা ও নীচে অনন্তকে বিশ্বাধার রূপে ধ্যান করা হয়। শেষে মুদ্রাক্রম, মন্ত্ররূপ, বর্ণ-সম্বন্ধ ও অক্ষর-নির্দেশসহ পুণ্ডরীকাক্ষ-বিদ্যায় অর্ঘ্য-পাদ্যাদি উপচারে পূজা সম্পন্ন করে পরবর্তী অধ্যায়ের প্রয়োগমূলক উপাসনার ভূমি প্রস্তুত হয়।
Pūjā-Anukrama: Bīja-Śuddhi, Nyāsa, Homa, Vyūha-Nyāsa, and Dvārakā Cakra Rakṣā
আচারখণ্ডের ব্যবহারিক ধারায় হরি পূজাকে ফলপ্রসূ করতে ধাপে ধাপে অনুক্রম বলেন। প্রথমে প্রণব/নমঃ স্মরণ ও বীজ-শুদ্ধির দ্বারা দেহশুদ্ধি, তারপর ত্রিবিধ ন্যাস, হৃদয়-পদ্ম (যোগাসন) পূজা, আশ্রয়তত্ত্বে নমস্কার এবং অতিক্রমণীয় নিষেধভাব ত্যাগ। পরে স্বর-স্থাপন ও আয়ুধ-ন্যাসসহ মন্ত্র-প্রতিষ্ঠা, ব্যূহ (বাসুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ) আহ্বান এবং নৃসিংহ, বরাহ, গরুড়, সুদর্শন, দিকপাল প্রভৃতি রক্ষক দেবতার স্থাপন। এরপর হোম—অচ্যুত-লেখন, অগ্নি প্রজ্বালন, মঙ্গল ফলাহুতি, মণ্ডলে বিধান স্থাপন, ১০৮ আহুতি, দিকাহুতি ও পূর্ণাহুতি। শেষে বাক্যাতীত পরতত্ত্বে লয়, দেবতাদের বিসর্জন, এবং গৃহস্থের জন্য দ্বারকা-চক্র মন্ত্রে নিত্য রক্ষা—দৈনন্দিন সাধনা ও বিশেষ ক্রিয়াকে দ্বিগুণ ফলের সঙ্গে যুক্ত করে।
Vaiṣṇava Pañjara: Directional Kavacha of Viṣṇu, His Weapons, and Avatāras
গরুড় পুরাণের ব্রহ্ম/আচার-নির্ভর উপদেশধারায় হরি ভক্তের জন্য জপযোগ্য বৈষ্ণব পঞ্জর/কবচ শেখান, যাতে ভক্তের পরিবেশ বিষ্ণু-রক্ষিত পবিত্র ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। অধ্যায়টি দিক অনুসারে রক্ষা বর্ণনা করে—পূর্বে বিষ্ণু-শরণ ও সুদর্শন চক্র স্থাপন; অন্যান্য দিকে কৌমোদকী, হালধারী সাউনন্দ, প্রহারক গদা, খড়্গ-ঢাল, এবং পদ্মসহ পাঞ্চজন্য শঙ্খ প্রভৃতি অস্ত্রে প্রহরা। এই কবচ অন্তরীক্ষ ও রসাতল পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে গরুড় বাহনরূপে রক্ষা করেন। আকূপার ও মহামীনকে বিশ্বাধার হিসেবে রক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়, এবং শিব, ঈশানী, কাত্যায়নী কর্তৃক দেবরক্ষার স্মরণও আসে। শেষে রক্তবীজাদি শত্রুর উপর বিজয়ের ফলশ্রুতি বলা হয়েছে এবং পরবর্তী অধ্যায়ে স্তোত্র, ব্রত ও পূজাকে রক্ষাসাধন হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
Dhyāna of Hari as the Nirguṇa Witness (Ātman), and the Attainment of Viṣṇu’s Realm
ব্রহ্মখণ্ডে তত্ত্ব-প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায় ভক্তিমূলক পরিচয় থেকে এগিয়ে ধ্যানের সূক্ষ্ম পদ্ধতি নির্দেশ করে। ধ্যানে প্রকাশ পায়—হরিই ধ্যেয় এবং ধ্যানের দ্বারা সেই সত্যই উপলব্ধি হয়। হরি নিজেকে বাসুদেব, দেহে চৈতন্যরূপে অধিষ্ঠিত পরম আত্মা এবং সর্বতোভাবে অসঙ্গ বলে ঘোষণা করেন। দেহ-ইন্দ্রিয়, তারপর মন, তারপর বুদ্ধি—ক্রমে ‘নেতি নেতি’ দ্বারা নাকচ করে প্রভুকে সকল ক্রিয়ার অন্তর্যামী জ্ঞাতা ও সাক্ষী বলা হয়েছে, যিনি তাতে অংশ নেন না। জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্তি তিন অবস্থার নিত্য সাক্ষী আত্মাকে দেখিয়ে গুণাতীত শুদ্ধ চৈতন্য ‘তুরীয়’ প্রকাশিত হয়। শেষে বলা হয়—যে জ্ঞানী ধ্যান করে সে পরম ধাম লাভ করে ও তদ্রূপ হয়; নিত্য পাঠেও বিষ্ণুলোক প্রাপ্তি হয়, ফলে পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে কর্ম, বিধি ও পরলোক-তত্ত্ব এই অদ্বৈত সাক্ষী-দৃষ্টিতে ব্যাখ্যাত হবে।
Vishnu-sahasranāma-style Japa: Vishnu as Cosmic Cause and Inner Self (Antaryāmin)
রুদ্র জনার্দনকে জিজ্ঞেস করেন—কোন মন্ত্রজপ ভয়ংকর সংসার-সাগর থেকে মুক্তি দেয়? হরি বলেন, “সহস্রনাম” দ্বারা স্তবই মুক্তিদায়ক, তারপর বিষ্ণুর বহু উপাধি ও নাম দীর্ঘভাবে গণনা করেন—বামন, ত্রিবিক্রম, নরসিংহ প্রভৃতি রূপ; শুদ্ধতা, জ্যোতি, মঙ্গল ইত্যাদি গুণ; এবং দেবতা, গ্রহ, তত্ত্ব, উদ্ভিদ, নদী ও সকল জীবের উপর তাঁর সর্বাধিপত্য। পরে সৃষ্টির কারণতত্ত্বে বিষ্ণুকে প্রধান, মহৎ, মন, অহংকার, ভূত ও ইন্দ্রিয়সমূহের মূল কারণ বলা হয়। এরপর অন্তর্মুখী ব্যাখ্যায় তিনি অন্তর্যামী—প্রাণ, ইন্দ্রিয়, বাক্ ও দেহক্রিয়ার অন্তর্নিহিত নিয়ন্তা। অধ্যায়ের পরিণতিতে বলা হয়, প্রভু জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্তিতে ব্যাপ্ত এবং তাদের অতীত তুরীয় শুদ্ধ চৈতন্য। ফলশ্রুতিতে পাপনাশ ও জপকারীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন লৌকিক-আধ্যাত্মিক ফলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তী ধর্ম ও মোক্ষোপায়ের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
Dhyāna of Hari and the Procedure of Āditya/Sūrya Worship
সংলাপক্রমে রুদ্র হরিকে বিষ্ণুধ্যান পুনরায় বলতে অনুরোধ করেন। হরি পরম ব্রহ্মকে অবিনশ্বর, সর্বব্যাপী, হৃদয়স্থিত, অকারণ কারণ, অসঙ্গ ও ইন্দ্রিয়াতীত বলে নিরূপণ করেন এবং সতর্ক করেন যে ‘নিষেধ’ বাক্যগুলি প্রভুকে জড় বা অচেতন প্রমাণ করে না। যথার্থ ধ্যানদৃষ্টি স্থাপন করে তিনি ভৃগুকে পূর্বে শেখানো সূর্যোপাসনার বিধি বলেন—খখোল্ক মূলমন্ত্র, শিরঃ-শিখা-কবচ-অস্ত্র সদৃশ ন্যাসাঙ্গ, অগ্নিপ্রাকার ও আদিত্যগায়ত্রী। পরে দিক্অর্ঘ্য/অর্পণ (ধর্মাত্মা ও যমসহ), চতুর্দিক দেবতা, নবগ্রহ নমস্কার, সপ্তাশ্ব-সহস্ররশ্মি আদিত্যকে অর্ঘ্য-আহ্বান এবং শেষে ‘আহ্বানে পুনরাগমন’ ভাবসহ বিসর্জন। এই অধ্যায় অন্তর্জ্ঞানকে শৃঙ্খলিত সৌর লিটুর্জির সঙ্গে যুক্ত করে পরবর্তী সাধনার ভূমি প্রস্তুত করে।
Sūrya-upāsanā: Lotus Mandala, Mudrā, Dik-nyāsa, and the Twelve Ādityas
এই অধ্যায়ে আচাৰ-নির্ভর উপাসনা প্রসঙ্গে হরি (বিষ্ণু) শিবকে ধনদায়ক সূর্য-সাধনার বিধি বলেন। শুদ্ধ স্থানে অষ্টদল পদ্মমণ্ডল নির্মাণ করে আবাহনী মুদ্রায় সূর্যকে আহ্বান, কলশ স্থাপন এবং মন্ত্র-রূপ মুদ্রায় দেবসান্নিধ্য স্থির করা হয়। পরে দিক্-ন্যাসে নির্দিষ্ট দিশায় হৃদয়, শির, শিখা স্থাপন করে ধর্ম, চক্ষু ও রক্ষাস্ত্রাদি বিন্যাসে সুরক্ষিত পবিত্র ক্ষেত্র গঠিত হয়। বহিঃপরিধিতে সোম, লোহিত, সোমপুত্র, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, কেতু ও রাহুকে দিশায় স্থাপন করে জ্যোতিষ্ক-ক্রম মণ্ডলে যুক্ত করা হয়। দ্বিতীয় আবরণে বিষ্ণুর দ্বাদশ রূপ—দ্বাদশ আদিত্য—পূজিত হন; শেষে দেবগণ, জয়া-শক্তি (জয়া, বিজয়া, জয়ন্তী, অপরাজিতা) এবং শেষ-বাসুকি প্রভৃতি নাগদের শ্রদ্ধায় পূজা করে পরবর্তী রক্ষা ও বিস্তারময় উপাসনার প্রবাহ প্রস্তুত করা হয়।
Mṛtyuñjaya/Amṛteśvara Upāsanā: Three-Syllable Mantra, Kavaca, Japa-Phala, and Pūjā-Aṅgas
আচারভিত্তিক উপদেশধারায় সূত বলেন—গরুড় কশ্যপকে যে মৃ্ত্যুঞ্জয়/অমৃতেশ্বর উপাসনা শিখিয়েছিলেন, তা সর্বদেবতাময় সমগ্র উদ্ধার-সাধনা। প্রথমে মন্ত্রগঠন নির্দিষ্ট—প্রণব, হুঁ/জুঁ সদৃশ বীজাক্ষর, এবং বিসর্গযুক্ত তৃতীয় উচ্চারণ—যা মৃত্যু ও দারিদ্র্য চূর্ণ করে বলে ঘোষিত। পরে কবচ ও ত্র্যক্ষরী “মহামন্ত্র”কে পূর্ণপূজার সমতুল্য বলে জপসংখ্যা (১০০, সন্ধ্যায় ১০৮, এবং এক মাস প্রতিদিন ৮০০০) ও অপমৃত্যু, রোগ, শত্রুতা, জরা-ক্ষয় থেকে রক্ষার ফল বলা হয়েছে। ধ্যানে অমৃতেশ্বর শ্বেত পদ্মাসনে অমৃতকলশসহ বর-অভয়মুদ্রায়, সঙ্গে দেবী ঘট ও পদ্মধারিণী। শেষে ষড়ঙ্গবিধি অনুযায়ী পূজাক্রম—অর্ঘ্যপাত্র সংস্কার, আধারশক্তি পূজা, প্রণায়াম, আসনশুদ্ধি, দেবতাত্মকতা ও ন্যাস, আহ্বান ও দ্বারপূজা, উপচার, গীত-নৃত্য, প্রদক্ষিণা, প্রণাম, বিসর্জন—এবং পার্ষদ দেবতা, কালবিভাগ, মাতৃকা, গণ, মহাকাল, যমের অনুচরদের পূজাও বর্ণিত। অমৃতেশ্বর-ভৈরব-হংস-সূর্য নমস্কারের পর শিব, কৃষ্ণ, ব্রহ্মা, গণেশ, চণ্ডিকা, সরস্বতী, মহালক্ষ্মী প্রভৃতি দেবতাকে সম্মান করে অধ্যায়টি পরবর্তী রক্ষামূলক ও পুণ্যদায়ক বিধানের জন্য একটি আদর্শ আচার-ছক স্থাপন করে।
Prāṇeśvara Garuḍa-Mantra: Timing (Velā), Nāga-Grahas, Nyāsa, Haṃsa-Rite, and Viṣa-Cikitsā
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক-আচারধর্মী ধারায় সূত শিবপ্রদত্ত প্রাণেশ্বর গরুড়-মন্ত্রের কথা বলেন, যা সাপের বিষে তৎক্ষণাৎ রক্ষার জন্য। প্রথমে দংশনের স্থান, দেহলক্ষণ, দংশচিহ্ন আড়াল হওয়া এবং প্রাণঘাতী স্থানের ভিত্তিতে বাঁচার সম্ভাবনা নির্ণয় করা হয়। পরে কালবিদ্যা—দিন-রাত্রির অধিপত্যচক্র, ‘নাগভোগ’ ক্রম, গ্রহরূপে গণ্য নাগদেবতাদের তালিকা এবং সন্ধিক্ষণ (ভেলা)-এ প্রয়োগের গুরুত্ব—বর্ণিত। বিষ শরীরে কোথায় প্রকাশ পায় তা স্থির করে মন্ত্রবীজ-গঠন, “ওঁ কুরু কুলে স্বাহা” মন্ত্র, কণ্ঠ-অঙ্গ-চরণে ন্যাস, স্বর-দেহ মানচিত্র ও হংস-সমন্বয় শেখানো হয়। কানে সুতো বাঁধা, পদ্মপত্রে লেখা, অধিক জপ, গরুড়ভাব, প্রণায়ামে বিষ টেনে বের করা ও নীলকণ্ঠ আহ্বানও আছে। শেষে ভেষজ ও ঘৃতভিত্তিক প্রতিষেধ এবং সিদ্ধিমুখী ‘মণি-ব্যাস’ উক্তি দিয়ে পরবর্তী প্রয়োগধর্ম/বিদ্যা-উপদেশের ভূমিকা রচিত।
Śiva-taught Mantra-Weapons, Mudrās, and Rakṣā-Rites (Removal of Kīlaka; Protection from Nāga, Viṣa, Graha, and Storms)
সূতের পুরাণোপদেশ-ধারায় এই অধ্যায়ে মন্ত্র-শস্ত্রের ‘পরম গোপন’ তত্ত্ব উন্মোচিত হয়। শিব রাজবিজয় ও রক্ষার জন্য পাশ, ধনু, চক্র, মুদ্রা, ত্রিশূল ও পরশু—এই মন্ত্রায়ুধের ব্যবহার শেখান। মন্ত্র উদ্ধারণ ও লিখনবিধি, ঈশান-পত্রকের উল্লেখ এবং অষ্টবর্ণ-সমূহের কথা বলা হয়েছে; বীজক্রমে ত্রিশূলে শিব-প্রতিষ্ঠা স্থাপন করা হয়। পরে ত্রিশূল-ধ্যানে নাগবিনাশ, আকাশাভিমুখ ধ্যানে দুষ্ট মেঘ, গ্রহ ও রাক্ষস-উপদ্রব প্রশমন, এবং সংক্ষিপ্ত রক্ষা-মন্ত্র ‘ওঁ জূঁ সূঁ হূঁ ফট্’ প্রদত্ত। ক্ষেত্ররক্ষায় খদিরের আটটি কীলক, ২১ জপের পর রাত্রে পুঁতে কীলক-দোষ নিবারণের বিধান আছে। সদাশিব, গণেশ, ভৈরবের মন্ত্র ও বজ্র-পাশ মুদ্রা বিষ, গ্রাসকারী ভূত/গ্রহবাধা ও শত্রুবল প্রতিহত করতে নির্দেশিত। শেষে প্রণায়াম-ভিত্তিক শক্তিসংস্কার—পূরকে প্রাণভরণ, কুম্ভকে অভিষেক, প্রণবে পোষণ—বলে পরবর্তী আচারবিধির সেতু রচিত হয়েছে।
Pañcopāsanā: Viṣṇu-ādhāra invocation and the kalā-s of Sadyojāta, Vāmadeva, Tatpuruṣa, and Īśāna
সূত ভিন্ন ভিন্ন বিভাগে সম্পাদিত পঞ্চোপাসনার কথা বলেন, যা সংসারিক ফলও দেয় এবং মুক্তিও প্রদান করে। বিধি শুরু হয় ভূঃ-তলে বিষ্ণুকে আদ্য আশ্রয়রূপে মান্য করে বিশ্বার্পণ দ্বারা। পরে “ওঁ হাং” মন্ত্রে সদ্যোজাতকে আহ্বান করা হয় এবং তাঁর অষ্ট কলা—সিদ্ধি, সমৃদ্ধি, ধৃতি, শ্রী, বুদ্ধি, তেজ, স্বধা-আহুতি, স্থৈর্য—বর্ণিত হয়। “ওঁ হীং” মন্ত্রে বামদেব ত্রয়োদশ কলাসহ আহূত হন; রজোগুণ-সম্পর্কিত রক্ষা, ভোগ, কাম, ক্রিয়া এবং মোহ/ত্রাসের ভাব এতে যুক্ত। এরপর ভয়ংকর শক্তির অষ্টক—মনোনমনী, অঘোরা, মোহা, ক্ষুধা, বন্ধনশক্তি, নিদ্রা, মৃত্যু, মায়া—অভিজ্ঞতার বন্ধনক্ষেত্র নির্দেশ করে। তৎপুরুষকে প্রত্যাহার-সংহার, দৃঢ় প্রতিষ্ঠা, সত্যজ্ঞান ও শান্তির উৎস বলে প্রণাম করা হয়। শেষে “হৌং” দ্বারা ঈশান আহ্বানিত হন; তাঁকে অচল ও নির্মল বলে শশিনী, অঙ্গনা, মরীচী, জ্বালিনী প্রভৃতি উপাধিতে স্মরণ করে পরবর্তী অংশের মন্ত্র-দেবতা-ভাব ও ধ্যান-সিদ্ধির ধারাবাহিকতা প্রস্তুত হয়।
Śiva-pūjā: Mantra-phonetics, Nyāsa, Maṇḍala, Dīkṣā and Homa (Supreme Worship Leading to Śiva-sāyujya)
ব্রহ্মখণ্ডের আচার-প্রধান ধারায় সূত শিবপূজা ও দীক্ষার পূর্ণ ক্রম বর্ণনা করেন। তিনি শিবকে শান্ত, সর্বব্যাপী ও নিরুপাধিক বলে নির্ধারণ করে মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনিবিধি (স্বর, বিন্দু, বিসর্গ) এবং ন্যাস ও মহামুদ্রার দ্বারা দেহে স্থাপন-ক্রম নির্দেশ দেন। পূজা অন্তর্গত অর্ঘ্য—ধর্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য, ঐশ্বর্য—থেকে শুরু হয়ে আহ্বান, প্রতিষ্ঠা, পাদ্য-অর্ঘ্য প্রভৃতি বাহ্য ক্রিয়ায় অগ্রসর হয়; আচমন, স্নান ও পূজাকে একত্রিত ব্রতরূপে মান্য করা হয়। পরে হোমের প্রস্তুতিতে অস্ত্রমন্ত্রে রক্ষাচিহ্ন, শক্তিন্যাস, কুণ্ডে জাতবেদসের প্রক্ষেপ, সহায়ক সংস্কার ও প্রায়শ্চিত্তের সংযোগ বলা হয়েছে। মণ্ডলপূজায় পদ্মাসন, অক্ষরচিহ্ন, আট থেকে চৌষট্টি পর্যন্ত বিন্যাস এবং আগ্নেয় অর্ধচন্দ্রাকার কুণ্ড নির্দিষ্ট; শেষে পঞ্চতত্ত্বভিত্তিক দীক্ষা, প্রায়শ্চিত্তার্থ নির্দিষ্ট আহুতি-সংখ্যা ও গোপন অস্ত্রবীজের অন্তিম আহুতি দ্বারা শুদ্ধ সাধকের শিবস্বরূপ-লাভ নিশ্চিত করা হয়েছে।
Śivapūjā-vidhi: Purifications, Sūrya–Graha Mantras, Nyāsa, and Bhūtaśuddhi leading to Śivoham-bhāva
এই অধ্যায়ে সূত আচারভিত্তিক শিবপূজার ধাপে ধাপে বিধি বলেন, যাতে ধর্ম ও কাম সিদ্ধ হয়ে সাধক শিব-স্বভাবের দিকে অভিমুখী হয়। প্রণবমন্ত্রে আচমন, ভস্মবিধি, তর্পণ, স্বধা দ্বারা পিতৃতৃপ্তি, প্রাণায়াম, মার্জন ও গায়ত্রীজপের পর সূর্যোপস্থান এবং শিব-সূর্য ও সূর্য-সম্পর্কিত বিশেষ মন্ত্র উচ্চারিত হয়। পরে বিমলেশের পূজা ও পদ্মা, দীপ্তা প্রভৃতি শক্তিবীজের বিন্যাস কামজয়ের উপায় হিসেবে বলা হয়েছে। রাহু-কেতুসহ গ্রহগুলির বীজাক্ষরে গ্রহপূজা, তারপর ন্যাস ও পুনঃপুন ভূতশুদ্ধিতে অন্তঃপীঠ শুদ্ধ হয়। দ্বারপাল, স্থানদেবতা, দিক্-স্থাপন, উপচারপূজা, জপাহুতি ও কর্মসমর্পণের শেষে অদ্বৈত ঘোষণা—শিবই দাতা, ভোক্তা ও বিশ্ব; সেই শিবই আমি—দিয়ে সমাপ্তি। পরে দ্বিতীয় পূজাপদ্ধতি, নাড়ী- বায়ু- মণ্ডল-ভাবনা সহ বিস্তৃত ভূতশুদ্ধি, সদাশিব ও পঞ্চবক্ত্র শিবধ্যান, এবং পুণ্য, দীর্ঘায়ু ও অকালমৃত্যু-নিবারণের ফল প্রতিশ্রুত।
Gaṇa–Durgā–Tripurā Sādhanā: Bīja-Nyāsa, Śakti Arrays, Mātṛkā/Bhairava Worship, and Maṇḍala Contemplation
সূত ধাপে ধাপে সাধনার বিধি বলেন। প্রথমে গণাসন, গণমূর্তি ও গণাধিপতির পূজা করে স্বর্গফল লাভ ও বিঘ্ননাশ করা হয়। পরে বীজজপ, অঙ্গ/হৃদয়-ন্যাস, দুর্গার পাদুকা (গুরু-পাদুকা), আসন ও রূপের আহ্বান এবং রক্ষামন্ত্র পাঠ। নয় শক্তির ক্রম উল্লেখিত; দুর্গাকে উগ্র চণ্ডিকা/রক্ষিকা রূপে আহ্বান করে অগ্নি-আকাশ সম্পর্কিত মুদ্রা প্রয়োগ করা হয়। এরপর শ্রীত্রিপুরা সাধনা—মন্ত্রসূত্র, পদ্মাসন ধ্যান, অন্তর্ন্যাস, ব্রাহ্মী প্রভৃতি মাতৃকা ও অধিষ্ঠাত্রী শক্তির পূজা। চামুণ্ডা/চণ্ডিকা, বহু ভৈরব, যোগিনীশক্তি ও কামতত্ত্বের উল্লেখ আছে। শেষে পদ্মগর্ভ ত্রিভুজে দুর্গাসহ বটুক, বিঘ্নরাজ, গুরু ও ক্ষেত্রপকে ধ্যান করে ত্রিপুরার রূপে সমাপ্তি; সিদ্ধির জন্য লক্ষ জপ ও হোমের বিধান, পরবর্তী অধ্যায়ে আচারের প্রসঙ্গসহ বিস্তার সূচিত।
Pādukā-Vandana and the Ananta Padmāsana: Mantra-Body of Śiva-Śakti
এই অধ্যায়ে সূত প্রথমে উপদেশের পূর্বে প্রামাণ্য স্থাপনের জন্য বীজ-মন্ত্রে আহ্বান করেন এবং অনন্ত-শক্তি ও আধার-শক্তির পাদুকা পূজার নির্দেশ দেন; পরে কালাগ্নি-রুদ্র, হাটকেশ্বর ও শেষভট্টারক প্রভৃতি রূপের বন্দনা করেন। এরপর ‘অনন্ত’ নামক পদ্মাসনের বিশ্বরূপ ধ্যান বর্ণিত—যাতে পৃথিবী, লোকসমূহ, দ্বীপ, সমুদ্র ও সকল দিক অন্তর্ভুক্ত। তারপর তান্ত্রিক-শৈব তত্ত্বকে মন্ত্র-মানচিত্রের মতো সংক্ষেপে স্থাপন করা হয়—কলা, তত্ত্ব, বর্ণ, নববিধ সূত্র, সদ্যোজাতাদি মন্ত্র-রচনা এবং হৃদয়-সহ অঙ্গন্যাস। শেষে সদাশিব-সাররূপ সিদ্ধজ্ঞানামৃত-সাগরকে জ্যেষ্ঠা-চক্রে রুদ্র-শক্তিসহ চিহ্নিত করে, পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য মন্ত্রক্ষেত্র ও বক্তৃপরম্পরা পবিত্র ও স্থিত করা হয়।
Hasta-Nyāsa and Karāsphālana; Directional and Protective Nyāsa; Worship of the Twelve Maṇḍalas
আচারবিধির ধারাবাহিকতায় সূত সাধারণ আচার থেকে এগিয়ে মন্ত্র-স্থাপনের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া বলেন। প্রথমে হস্ত-ন্যাসে বীজাক্ষর আঙুল, তালু ও হাতের পিঠে স্থাপন করে হাতকে পূজার পবিত্র আধার করা হয়। পরে কব্জি-প্রণাম এবং ‘হুঁ হুঁ’ উচ্চারণসহ দীপ্তরূপে করাস্ফালন মন্ত্রশক্তি জাগ্রত করে। এরপর কুব্জিকা ও অঘোরামুখীকে পূর্ব-দক্ষিণ-পশ্চিম-উত্তর দিকের মুখে এবং হৃদয়, শির, শিখা, কবচ, ত্রিনেত্র, অস্ত্র প্রভৃতি স্থানে ন্যস্ত করে সাধককে মন্ত্রে সিল করে রক্ষা ও অধিকার প্রদান করা হয়। শেষে বারো মণ্ডল—বিশ্ব, তত্ত্ব, গুরুপরম্পরা, কৌল, সাম ও সিদ্ধ-যোগিনী পীঠাদি—নির্দিষ্ট ক্রমে পূজার মানচিত্র দিয়ে পরবর্তী ক্রিয়ার জন্য সম্পূর্ণ স্থাপিত ও সুরক্ষিত মন্ত্রদেহ প্রস্তুত করা হয়।
Umā–Caṇḍī–Raudrī–Māheśvarī Rakṣā-Mantra for Poison-Removal and Enemy-Subjugation
সূত দেবীর উমা, চণ্ডী, রৌদ্রী ও মাহেশ্বরী—এই উগ্র রূপসমূহকে উদ্দেশ করে সংক্ষিপ্ত রক্ষামন্ত্র প্রদান করেন। তিনি তাঁর ভয়ংকর মূর্তির স্তব করে আদেশ দেন—শত্রুকে আঘাত করো, বিভ্রান্ত করো এবং সাধককে রক্ষা করো; রুদ্রও ভৈরব রূপে অবস্থান করেন। স্তোত্রটি পরে বীজাক্ষরসদৃশ তীব্র ধ্বনিযুক্ত কার্যকর মন্ত্রে রূপান্তরিত হয়ে উৎচ্ছাটনের সুর বাড়ায়। ফলশ্রুতিতে সাপের বিষনাশ, বিষদোষভঙ্গ এবং শিশু-পীড়াকারী গ্রহ-প্রেতাদি নিবারণের কথা বলা হয়েছে; পরবর্তী ধর্ম/কর্ম আলোচনার আগে এটি পাঠযোগ্য ব্যবহারিক রক্ষা-বিধান।
Gopāla-pūjāvidhi: Maṇḍala, Dik-devatā, Mantra-aṅga, and Āyudha Installation
সূত গোপাল-পূজার এমন এক ক্রম বলেন, যাতে ভোগ ও মোক্ষ—উভয়ই লাভ হয়, তারপর বিধিপূর্বক মণ্ডল নির্মাণ করেন। দ্বার ও দিকসমূহে দিকপাল, নদী-দেবী, নিধি-দেবতা এবং দ্বারপাল (জয়–বিজয়সহ) স্থাপন করা হয়; চার দ্বারে শ্রী, গণ, দুর্গা ও সরস্বতীর আরাধনা নির্দিষ্ট। কোণদিক ও অগ্নি-বায়ু অঞ্চলে বিশেষ সত্তা-গুণসহ দেবতাদের বিন্যাস, গুরু-প্রসাদন ও পরিচর-পূজা একত্রে বর্ণিত। বিষ্ণুকে তপঃ ও শক্তিসহ প্রতিষ্ঠা, কেন্দ্রে শক্তি ও কূর্মের আধারত্ব, এবং ধর্ম, অনন্ত, পৃথিবী, জ্ঞান, বৈরাগ্য, ঐশ্বর্য ও দীপ্ত আত্মার দিকনির্দেশিত মানচিত্র দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রচিন্তনে ‘কং’ বীজের সঙ্গে ত্রিগুণ-বিবেচনা ও সূর্য-চন্দ্র-অগ্নি-মণ্ডলরূপ পরাজ্ঞানের ধ্যান হয়। শেষে অঙ্গাক্ষর-ন্যাস, সুদর্শনসহ বিষ্ণুর আয়ুধ স্থাপন-पूজা, কৃষ্ণের রাণী ও শ্রীবৎস-কৌস্তুভাদি চিহ্নের বন্দনা করে পরবর্তী বিধির ভূমিকা রচিত।
Trailokya-mohinī-vidyā: Śrīdhara-Mantras, Ritual Arrangement, and Viṣvaksena Dhyāna
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মখণ্ডের ক্রিয়াতান্ত্রিক ধারায় একটি নির্দিষ্ট প্রয়োগ বর্ণিত হয়েছে। রাজচিহ্ন ও ধ্বজসহ ভগবানের পূজা, সঙ্গে বিষ্বক্সেন এবং শ্রীসহ কৃষ্ণের আরাধনা নির্দেশিত। হরি ‘ত্রৈলোক্য-মোহিনী’ বিধিকে পরম সিদ্ধি—পুরুষোত্তম-প্রাপ্তির উপায় বলেন এবং শ্রীধর-কেন্দ্রিক মন্ত্রে ধর্ম, কাম প্রভৃতি পুরুষার্থসিদ্ধির কথাও জানান। মূল মন্ত্রে বীজাক্ষর ও বশীকরণ/আকর্ষণ এবং দ্রুত সিদ্ধিদায়ক আদেশবাচক পদ আছে; পরে ‘ত্রৈলোক্য-মোহন’ শ্রীধর/পুরুষোত্তম/বিষ্ণুর নমস্কার-মন্ত্র দেওয়া হয়েছে, যা পৃথক বা সংক্ষিপ্তভাবে সাধ্য। এরপর আসন স্থাপন, মন্ত্রসহ দেবতা-রূপ স্থাপন, হোমাদি ষড়ঙ্গ এবং চক্র-গদা-খড়্গ প্রভৃতি আয়ুধবিন্যাসের বিধান আসে। শেষে লক্ষ্মী ও গরুড়সহ সশস্ত্র বিষ্বক্সেনের ধ্যান করে সর্বার্থসিদ্ধির ফল প্রতিশ্রুত।
The Procedure of Worship (Śrīdharapūjā-vidhi)
খণ্ড ১-এর আচারভিত্তিক ধারায় সূত শ্রীধর (বিষ্ণু)-কে সপরিবার পূজার সম্পূর্ণ ক্রম বর্ণনা করেন। সাধক হৃদয়, শির, শিখা, কবচ, নেত্র ও অস্ত্রস্থানে ন্যাস-মন্ত্র স্থাপন করে, বৈষ্ণব মুদ্রা করে শঙ্খ-চক্র-গদাধারী শ্রীধররূপে আত্ম-ধ্যান করে। শুভচিহ্নাঙ্কিত পবিত্র মণ্ডলে আসনপূজা থেকে শুরু করে ধর্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য, ঐশ্বর্য ও তাদের বিপরীতগুলিকে স্মরণ করে বিস্তৃত প্রণাম নিবেদন করা হয়। পরে হরির আহ্বান, শ্রী (লক্ষ্মী), দিব্য অলংকার-অস্ত্র, দিকপাল, গুণ এবং বিষ্বক্সেনের পূজা সম্পন্ন হয়। উপচারের পর ১০৮ বার মন্ত্রজপ, হৃদয়ে স্ফটিকপ্রভ প্রভুর অন্তর্ধ্যান এবং শ্রীনিবাস/শ্রীপতিকে পুনঃপুনঃ নমস্কাররূপ স্তোত্র পাঠ করা হয়। শেষে ফলশ্রুতি পাপনাশ ও বিষ্ণুর পরম ধামপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তী আচারশিক্ষার ভূমিকা রচনা করে।
Viṣṇu-pūjāvidhi: Śuddhi, Nyāsa, Dhyāna, Āsana-devatā Pūjā, Upacāras, and Stotra
উপদেশ-সংলাপে রুদ্র জগন্নাথকে জিজ্ঞাসা করেন—সংসার-সমুদ্র পার করার উপাসনা-পদ্ধতি কী। হরি ক্রমান্বয়ে বিষ্ণু-উপাসনার বিধি বলেন—স্নান, সন্ধ্যা ও শুদ্ধ আচমন; তারপর মূলমন্ত্র-ন্যাস ও মূলমন্ত্রের প্রকাশ, যা রোগ, পাপ ও গ্রহদোষ নাশ করে। এরপর বীজাক্ষরসহ অঙ্গ-ন্যাস (নমঃ, স্বাহা, বষট্, হুঁ, বৌষট্, ফট্), যথাযথ মুদ্রা এবং হৃদয়স্থিত শ্বেত-দীপ্ত শঙ্খচক্রধারী, শ্রীবৎস-কৌস্তুভ-চিহ্নিত বিষ্ণুর ধ্যান। ওঁকারে অণ্ড-রচনা ও ভেদ করে বিশ্ব-দর্শন, তারপর আত্মপূজা ও আসন/আধার-দেবতার পূজা—নদী, নিধি-দেবতা, দ্বারশক্তি, কূর্ম-অনন্ত, গুণ, পদ্ম-চিহ্ন ও শক্তিদের বিস্তৃত প্রণাম। পরে স্নান, বস্ত্র, আচমন, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ, চরু প্রভৃতি উপচার, প্রদক্ষিণা, জপ ও অঙ্গপূজা; শেষে বিষ্ণুস্তোত্রে তাঁকে অক্ষয় ব্রহ্ম ও জগতের নিয়ন্তা বলা হয়। অধ্যায়ে বলা হয়—শুধু জপ, শ্রবণ বা শ্রবণ করালেও বিষ্ণুলোক লাভ হয়; পরবর্তী অংশে মন্ত্রভক্তির গূঢ় প্রয়োগের ভূমিকা রচিত হয়।
Pañcatattva-Pūjā: The Fivefold Vyuha of Hari, Mantras, Nyāsa, Maṇḍala, and Stotra
শিব হরির কাছে ‘পঞ্চতত্ত্ব-পূজা’ শেখাতে অনুরোধ করেন, যার দ্বারা সত্য জ্ঞানেই পরম পদ লাভ হয়। বিষ্ণু বলেন—এক অবিনশ্বর পরমাত্মা মায়ার মধ্যে পাঁচ ব্যূহে প্রতিষ্ঠিত: বাসুদেব, সংকর্ষণ, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ ও নারায়ণ; এবং তাদের পরিচয়-মন্ত্র প্রদান করেন। এরপর পূজা-ক্রম: স্নান, সন্ধ্যা, আচমন দ্বারা শুদ্ধি; আসনস্থ সাধনা ও অন্তর্গত ‘শোষণ’ প্রভৃতি ক্রিয়া; ব্রহ্মাণ্ড-দর্শন; হৃদয়-পদ্মে বাসুদেব থেকে ক্রমে ব্যূহ-ধ্যান। ব্যাপক ও অঙ্গ-ন্যাসে নির্দিষ্ট অক্ষর-মন্ত্র, আধার-দেবতা, আয়ুধ, শক্তি ও দিকপালদের বিস্তৃত নমস্কার, এবং মণ্ডল-পূজায় স্বস্তিক-চিহ্ন, পদ্মদল, কেশর, দিকনির্ধারিত স্থাপন, নীচে নাগ ও উপরে ব্রহ্মার বিন্যাস বর্ণিত। উপচার, জপ ও সমর্পণের পরে স্তোত্র-পাঠ, শরণাগতি ও জ্ঞান-প্রার্থনা; শেষে পঞ্চমহাভূতসহ বিষ্ণু-চিন্তন করে বিসর্জন। পাঠক-শ্রোতার বিষ্ণুলোক-প্রাপ্তি ও শিবের বাসুদেব-পরমভক্তি দেখিয়ে অধ্যায়টি আচারের পরবর্তী বিধির আদর্শ স্থাপন করে।
The Ninefold Rite (Navavidhi): Worship of Sudarśana-Cakra and the Disease-Destroying Hymn
আচারভিত্তিক রক্ষাকর্মের ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে রুদ্র হরির কাছে গ্রহদোষ ও রোগনাশক সুদর্শন-চক্র পূজার বিধি জানতে চান। হরি ক্রমবিধি বলেন—স্নানে শুদ্ধি, প্রণব-সহ সুদর্শন মূলমন্ত্রে ন্যাস, হৃদয়-পদ্মে দিব্য চক্র ধ্যান, কিরীটধারী প্রভুকে মণ্ডলে আহ্বান, উপচার-অর্ঘ্যাদি নিবেদন এবং ১০৮ জপ। পরে স্তোত্রে সুদর্শনকে সহস্র সূর্যসম দীপ্ত, সহস্র-অর ‘নয়ন’স্বরূপ, পাপ ও দানবনাশক, গ্রহাতীত শক্তি, কাল-মৃত্যু-ভৈরবরূপ হয়েও কৃপালু রক্ষক বলে স্তব করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে রোগমুক্তি, নিয়মানুশীলনে পাপদাহ এবং বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তির যোগ্যতা প্রতিপাদিত।
Hayagrīva Pūjāvidhi: Root Mantra, Nyāsa, Maṇḍala-Devatā Worship, and Stotra
পূজাবিধির ধারাবাহিকতায় রুদ্র হরিকে আবার দেবপূজার উপদেশ দিতে অনুরোধ করেন, বিষয়ের প্রতি তাঁর অতৃপ্ত আনন্দ প্রকাশ পায়। হরি হয়গ্রীব-পূজার সম্পূর্ণ পদ্ধতি বলেন—প্রথমে মূলমন্ত্র, তারপর হৃদয়–শির–শিখা–কবচ–নেত্র–অস্ত্র অঙ্গমন্ত্র দিয়ে সাধকের মন্ত্রদেহ প্রতিষ্ঠা। স্নান-আচমনাদি শুদ্ধির পর বীজাক্ষরে ভূতশুদ্ধি-সদৃশ স্থিতিকরণ, ব্রহ্মাণ্ড-ভাবনা এবং হয়গ্রীবের তেজোময় রূপধ্যান। এরপর মণ্ডল ও আসনপূজায় অধিষ্ঠাতা রুদ্রগণ, দ্বারদেবতা, পবিত্র নদী, নিধিদেবতা, গরুড়, শক্তি, আধার/কূর্ম/অনন্ত/পৃথিবী-সমর্থন, গুণ ও ক্রিয়াযোগশক্তির আরাধনা; পরে উপচার ও নৈবেদ্যাদি নিবেদন। দিকপাল, বিষ্বক্সেন, অনন্ত ও দিব্যায়ুধ পূজা পর্যন্ত বিস্তার, শেষে হয়গ্রীবস্তোত্র ও হৃদয়কমল ধ্যান। অধ্যায়টি ভক্ত জপকারীদের পরম ধামের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তী ফলশ্রুতির সঙ্গে সেতুবন্ধ করে।
Gāyatrī-nyāsa, Pāda-bheda, and Purificatory Power in Sādhana
আচার-খণ্ডের ধারাবাহিকতায় হরি শঙ্করকে গায়ত্রীর পূর্বকর্ম ও সাধনার বিধি শেখান। তিনি গায়ত্রীর বৈদিক প্রামাণ্য স্থাপন করেন—ঋষি বিশ্বামিত্র, দেবতা সবিতা—এবং ত্রিমূর্তিতে তার তাত্ত্বিক অবস্থান বলেন: ব্রহ্মা শির, রুদ্র শিখা, বিষ্ণুর হৃদয়ে নিবাস। ‘তিন লোকের আধার’ এই তত্ত্ববোধকে বারো লক্ষ জপের কঠোর অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। মন্ত্রের পাদভেদ স্পষ্ট—জপে ত্রিপাদ, অর্চনায় চতুষ্পাদ—যাতে ছন্দ ও উপাসনা একসঙ্গে মেলে। এরপর পা থেকে শুরু করে প্রাণ-মর্মস্থান হয়ে মস্তক পর্যন্ত বিন্যাস/ন্যাসের অঙ্গস্থাপন এবং দিকবিন্যাসের বিধান আসে। সাধনাকালে বর্ণদর্শন ও বর্ণক্রমের ভিন্নতাও উল্লেখিত, যা ধ্যানানুভবের ইঙ্গিত। শেষে মহাশুদ্ধির ফল বলা হয়—হাতে স্পর্শিত ও চোখে দৃষ্ট বস্তু পবিত্র হয়—গায়ত্রীকে পরম পবিত্রকারিণী রূপে স্থাপন করে পরবর্তী অধ্যায়ের মন্ত্র-উপাসনার ভূমিকা রচিত হয়।
Sandhyā-Upāsanā Vidhi: Prāṇāyāma, Water Purification, Aghāmarpaṇa, Sūrya Worship, Nyāsa, and Gāyatrī Japa
হরি সন্ধ্যা-উপাসনার ক্রম ব্যাখ্যা করেন—ওঁ, ব্যাহৃতি ও গায়ত্রী-শির সহ ত্রিবিধ প্রণায়াম, যা দেহ- বাক্- মনসের দোষ শোধন করে। এরপর আচমন ও সময়ভেদে আহ্বান—সন্ধ্যায় অগ্নি-ভাব, প্রাতে সূর্য-ভাব, মধ্যাহ্নে জলশুদ্ধি মন্ত্রসহ—বিধিবদ্ধ। কুশা দ্বারা মন্ত্র-প্রোক্ষণ ও ‘আপো হি ষ্ঠা…’ ঋক্ পাঠে শুদ্ধি, এবং রজঃ-তমঃজাত জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তি-রূপ নয় দোষের অপসারণ করা হয়। বারোবার ‘ত্রিপদাষ্ট’ প্রকারে জল নিক্ষেপ করে অঘামর্পণ, পরে ‘উদুত্যং’ ও ‘চিত্রম্’ সূক্তে সূর্যপূজা সম্পূর্ণ হয়। গায়ত্রী-জপ প্রাতে দাঁড়িয়ে, সন্ধ্যায় বসে, নির্দিষ্ট সংখ্যায় জন্ম-যুগান্তরের পাপ ক্ষয় করে। শেষে হৃদয়-শির-শিখা-কবচ-নেত্র-অঙ্গ-দিক্-ন্যাসের গূঢ় বিধান দিয়ে ত্রিপদা গায়ত্রীকে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের সার এবং তুরীয় লাভের নির্মল পথ বলা হয়েছে।
Gāyatrī-Kalpa: Sandhyā-Japa, Devī-Namaskāra, and Homa for Dharma, Kāma, and Moksha
ব্রহ্মখণ্ডে আচার ও মন্ত্রশুদ্ধির ধারাবাহিকতায় হরি গায়ত্রী-कल्प ব্যাখ্যা করেন—গায়ত্রীর শ্রেষ্ঠত্ব, পাপনাশিনী শক্তি এবং জপের গণনা (১০৮/১০০৮)। তিন সন্ধ্যার পরে সাধক আচমন করে দেবীকে পাপহরিণী রূপে আহ্বান করে। ‘ভূর্ভুবঃস্বঃ’ সহ গায়ত্রী, সাবিত্রী, সরস্বতী, বেদমাতা প্রভৃতি নাম-রূপের দীর্ঘ স্তোত্র-আহ্বান আসে, যেখানে বিশ্বতত্ত্ব, ভক্তি ও মন্ত্র একত্রিত। এরপর সমিধা ও ঘৃত দিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যায় হোম, বৃহৎ আহুতি-বিধান, এবং চন্দন বা স্বর্ণময় প্রতিমা পূজার কথা বলা হয়। শেষে পুরশ্চরণসদৃশ সমাপ্তি—আহারসংযমসহ ১,০০,০০০ জপ ও ২০,০০০ আহুতি—ধর্ম, কাম ও মোক্ষসহ ইষ্টসিদ্ধি প্রদান করে। উপসংহারে ‘যথেষ্টং গচ্ছ’ প্রকার অনুমতি-মন্ত্রে দেবীকে বিদায় দিয়ে পরবর্তী ধর্মাচারের প্রবাহে প্রবেশ করানো হয়।
Durgā Pūjā, 108-Nāma Japa, and Protective Homa in Preta-Kalpa Observance
প্রেতকল্পে প্রয়াত আত্মার যাত্রারক্ষা ও জীবিতদের মঙ্গলস্থৈর্য রক্ষার জন্য হরি সাধারণ কর্মের পর দেবীকেন্দ্রিক রক্ষাবিধান বলেন। নবমী থেকে ‘হ্রীং’ সম্বোধনে দুর্গাকে ‘রক্ষিকা’ রূপে পূজা করে গৌরী, কালী, উমা, ভদ্রা, কান্তি, সরস্বতী প্রভৃতি রূপের আহ্বান নির্দেশিত। প্রেতযাত্রার তৃতীয় দিন থেকে মঙ্গলা়, বিজয়া, লক্ষ্মী, শিবা ও নারায়ণীর ক্রমপূজা রক্ষাহানি নিবারণে বলা হয়েছে। অধ্যায়ে দেবীর ১৮/২৮/১২/৮/৪ ভুজার ধ্যান, অস্ত্র-চিহ্নসহ বিস্তারিত আছে। পরে ১০৮ নামমালাকে মন্ত্রজপ ধরে নির্দিষ্ট জপসংখ্যা ও তিল-ত্রিমধুর হোম, বিকল্পে মহামাংসাদি হোমের বিধান। শেষে রক্ষাপ্রার্থনা ও বলিগ্রহণ উল্লেখ করে পরবর্তী আচারগুলির ভূমিকা স্থাপন করা হয়েছে।
Sūrya-pūjā-vidhi: Gateway Deities, Lotus-Mandala, Nyāsa, Navagrahas, and Arghya
আচার-কেন্দ্রিক উপদেশধারায় রুদ্র জনার্দনকে সংক্ষেপে ও স্পষ্টভাবে দেবপূজার বিধি পুনরুক্ত করতে বলেন, যেখানে সূর্যকে বিষ্ণুর রূপ এবং ভুক্তি-মুক্তিদাতা বলা হয়েছে। বাসুদেব ধাপে ধাপে আচাররূপ দেন—প্রথমে দ্বার-দেবতা-সম্পর্কিত উচ্চৈঃশ্রবস, অরুণ, দণ্ডিন, পিঙ্গলকে মন্ত্রনমস্কার; তারপর কেন্দ্রে প্রভূত/অমল পূজা ও কোণ-দিকের দেবতা (বিমলা, সারা, আধার, পরমমুখ)। এরপর পদ্মমণ্ডল ও কর্ণিকা-প্রতীক, দীপ্তা প্রভৃতি শক্তির ক্রম সার্বতোমুখী পর্যন্ত; হৃদয়মন্ত্র ও বীজসহ আহ্বান, স্থাপন, সন্নিরোধন/সকলীকরণ ইত্যাদি ন্যাস। সূর্যধ্যান—রক্তপ্রভা, শ্বেতপদ্ম, একচক্র রথ—মূলমন্ত্র, মুদ্রা ও ন্যাসসহ। দিকবিন্যাসে রুদ্ররূপ এবং নবগ্রহের পৃথক নমস্কার-পূজা। শেষে ৮০০০ জপ, চণ্ডতেজের আরাধনা, অর্ঘ্য প্রস্তুতি ও অর্পণভঙ্গি; গণপতি ও গুরুপূজার পর বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তির ফলশ্রুতি বলা হয়েছে, যা পরবর্তী অধ্যায়গুলির জন্য আদর্শ বিধি।
Māheśvara-pūjā-vidhi: Nyāsa, Maṇḍala-āvāhana, Kalā-salutations, and Upacāra Worship
সংলাপে শঙ্কর হরিকে জিজ্ঞাসা করেন—সিদ্ধিদায়ক মাহেশ্বর পূজা কীভাবে করতে হয়। হরি ধাপে ধাপে বিধান বলেন: স্নান ও আচমন, আসন গ্রহণ, ন্যাস, এবং মণ্ডলে হরকে (মহেশ্বরকে) তাঁর পরিজনসহ আহ্বান। পরে “হাঁ” বীজ-মন্ত্রে আসন ও দ্বার-দেবতা—গণপতি, সরস্বতী, নন্দী, মহাকাল, গঙ্গা, লক্ষ্মী, মহাকালী, অস্ত্র—এবং বাস্তুপতি ব্রহ্মা, গুরুগণ, তত্ত্বাধার, ছন্দ, শক্তি ও অঙ্গদেবতাদের রক্ষাকবচরূপে নমস্কার-পূজা করা হয়। এরপর সত্যের অষ্ট কলা এবং বামদেব, তৎপুরুষ, অঘোর, ঈশান-সম্পর্কিত কলাসমূহ, দিকপাল ও লোকাধিপতিদের প্রণাম বর্ণিত। শেষে আহ্বান-সন্নিধান-সংহার-স্থিরীকরণ, তত্ত্বন্যাস, মুদ্রা, ধ্যান, ধূপ-দীপ-নৈবেদ্য ও গান-বাদ্য-নৃত্যসহ পূর্ণ উপচার এবং মূলমন্ত্র জপকে পাপনাশক রুদ্রোপাসনা বলা হয়েছে।
Viśvāvasu-Prayoga (Marriage Mantra), Kālarātri/Ṛkṣakarṇī Invocation, and Yantra-Rakṣā at Twilight
পুরাণীয় সংলাপধারায় বাসুদেব প্রথমে বিশ্বাবসু গন্ধর্ব—‘কন্যাদের অধিপতি’—কে উদ্দেশ করে এক মন্ত্র শেখান; তার জপে স্ত্রীলাভের উপায় বলা হয়েছে। পরে উগ্র দেবী কালরাত্রি, যিনি ঋক্ষকর্ণী রূপে পরিচিতা, তাঁর আহ্বান করা হয়; নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সময়বদ্ধ মৃত্যু বা ধ্বংসশক্তি প্রার্থনা করা হয় এবং তিথি, নক্ষত্র বা উপবাসের কোনো নিয়ম নেই বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। সন্ধ্যাকালে ক্রোধসহ হাতে রক্ত মেখে লিঙ্গের উপর মন্ত্র জপ করে কাঁচা মাটির পাত্র ভাঙা হয়—বশীকরণ ও বাধা-ভেদের প্রতীকী কর্ম। শেষে রক্ষাযন্ত্রকে নমস্কার করে শত্রুকে স্তম্ভিত, মোহিত ও বিদীর্ণকারী শক্তির কাছে ভয় ও বিপদ থেকে রক্ষার প্রার্থনা করা হয়। অধ্যায়ের শেষে শুক্রগ্রহ পীড়িত জ্যোতিষ-লক্ষণ উল্লেখ করে পরবর্তী আলোচনার ভূমিকা রচিত হয়।
Pavitrāropaṇa-vidhi (Rite of Investing/Offering the Pavitra Sacred Thread)
আচারভিত্তিক উপদেশের ধারাবাহিকতায় হরি এখানে শৈব সংশোধন ও রক্ষাকর্ম—পবিত্রারোপণ-বিধি—বর্ণনা করেন, যাতে পূজায় বিঘ্ন না ঘটে। আচার্য/সাধক এবং যোগ্য দীক্ষিত (পুত্রক, সময়ী প্রভৃতি) কোন মাস ও তিথিতে এই কর্ম করবেন, কী উপকরণ লাগবে (সোনা/রূপা/তামা ও তুলোর সুতো, শ্রেষ্ঠত অবিবাহিতা কন্যার প্রস্তুত), সুতো ভাঁজ/ত্রিগুণ করা, গাঁটকে নির্দিষ্ট মন্ত্রে শুদ্ধ করার নিয়ম বলা হয়েছে। সুতোর অধিষ্ঠাত্রী ‘তন্তু-দেবতা’, জপসংখ্যা, গাঁটের ব্যবধান এবং প্রকৃতি থেকে সর্বমুখী পর্যন্ত নামযুক্ত গাঁটের তালিকা দেওয়া আছে। পরে বিধি পূর্ণ লিঙ্গপূজায় বিস্তৃত—স্নান, উপচার-অর্ঘ্য, দিকরক্ষার্থে রক্ষাদ্রব্য স্থাপন, গৃহপরিক্রমায় সুতো বাঁধা ও ছিদ্রযুক্ত রক্ষক বসানো, হোম ও ভূতবলি, আহ্বান ও রাত্রিজাগরণ, তারপর অভিমন্ত্রিত পবিত্র স্থাপন। শেষে শিবতত্ত্ব-বিদ্যাতত্ত্ব-আত্মতত্ত্বের মন্ত্রনমস্কার, ত্রুটি-শুদ্ধির প্রার্থনা, অগ্নিতে সমর্পণ, গুরুকে দক্ষিণা, ব্রাহ্মণভোজন ও বিসর্জন—এভাবে বাধানিবারণ ও সমাপনকর্মের আদর্শ রূপ স্থাপিত হয়।
Pavitrāropaṇa-vidhi (Rite of Investing Hari with the Pavitra)
আচারনির্ভর বার্ষিক পূজার ফল স্থায়ী রাখতে হরি পবিত্রারোপণ-বিধি শেখান, যা ভোগ ও মোক্ষ—উভয়েরই উপায়। দেব–অসুর যুদ্ধে দিব্য রক্ষার সঙ্গে যুক্ত গ্রৈবেয়ক (কণ্ঠালংকার) চিহ্নের উৎপত্তিকথা পবিত্রকে নামযুক্ত বররূপে প্রতিষ্ঠা করে। বর্ষাকালে পবিত্র-পূজা অবহেলিত হলে বার্ষিক পূজা নিষ্ফল হয়; তাই পূর্ণিমা পর্যন্ত তিথি অনুসারে পবিত্রারোপণ করতে হবে, বিষ্ণুর জন্য দ্বাদশী প্রধান, এবং ব্যতীপাত, অয়নান্তর ও গ্রহণে বিশেষ পালনীয়। বর্ণাশ্রমভেদে রেশম, তুলা, মসৃণ বস্ত্র, কুশ, শণ-ছাল ইত্যাদি দ্রব্য, ত্রিগুণিত ও পুনঃত্রিগুণিত তন্তু-নির্মাণ, তন্তু ও দড়িতে দেবতা-সম্বন্ধ, মাপজোক এবং বিমান/স্থণ্ডিল প্রভৃতি স্থান নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অভ্যঙ্গ, দিক্বিন্যাস, বাসুদেব-মন্ত্রে সংস্কার, রক্ষাচক্র, নৈবেদ্য, রাত্রি-স্থাপন ও জাগরণ, প্রাতঃপূজা, দান-সমাপন এবং পূর্ণতা-প্রার্থনার ক্রমে এই অধ্যায় বার্ষিক পূজার শাস্ত্রসম্মত সমাপ্তির প্রস্তুতি দেয়।
Brahma-dhyāna: From Purification to Samādhi (Meditation on Brahman and Viṣṇu)
এই অধ্যায়ে হরি সাধককে বাহ্য পবিত্রতা ও আচার থেকে অন্তর্মুখ ব্রহ্মধ্যানে প্রবৃত্ত করেন, যাতে মায়ার বন্ধন ক্ষয় হয়। তিনি আত্মাকে দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, প্রাণ, গুণ ও সকল উপাধির অতীত বলে নিরূপণ করে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ (তুরীয়) বোধে স্থিতিকেই সমাধি বলেন। রথ-দৃষ্টান্তে আত্মা রথী, বুদ্ধি সারথি, মন লাগাম—বিবেকনির্দেশিত সংযত মন পরমধাম ও পুনর্জন্মমুক্তি দেয়। যম-নিয়ম থেকে সমাধি পর্যন্ত যোগাঙ্গ বর্ণিত; স্থিরতা কঠিন হলে হৃদয়-পদ্মে বিষ্ণুর রূপ ধ্যানের করুণ অনুমতি আছে। শালগ্রামাদি পবিত্র শিলায় বিষ্ণুর সন্নিধি স্বীকার করে মন্দির-প্রতিমা-উপাসনা ও অন্তর্ধ্যানের সেতু স্থাপিত। শেষে কাম্য স্বর্গফলের তুলনায় ধ্যান, স্তব ও নামজপে নিষ্কাম মোক্ষের শ্রেষ্ঠতা ঘোষিত।
Śālagrāma-lakṣaṇa: Viṣṇu Stotra, Vyūha/Avatāra Identification, and Temple-Fruition
ব্রহ্মখণ্ডের ধারাবাহিক উপদেশে হরি এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য জানান—শালগ্রামের লক্ষণ এবং তার স্পর্শে শুদ্ধিকর শক্তির বর্ণনা। প্রথমে কেশব, নারায়ণ, মাধব, গোবিন্দ, ত্রিবিক্রম, শ্রীধর, হৃষীকেশ, দামোদর প্রভৃতি নামে বিষ্ণু-স্তোত্র ও নমস্কার ধারাবাহিকভাবে আসে, যেখানে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম চিহ্নের মাহাত্ম্য বিশেষভাবে উচ্চারিত। পরে ব্যবহারিক প্রতিমালক্ষণে রং, আকৃতি, ছিদ্র, রেখা, বিন্দু, দ্বার ও চক্রচিহ্নের ভিত্তিতে চতুর্ব্যূহ এবং নৃসিংহ, বরাহ, বামন, কপিল, হয়গ্রীব, মৎস্য, বৈকুণ্ঠ প্রভৃতি রূপের পরিচয় নির্ণয় করা হয়। ২ থেকে ১২ পর্যন্ত সংখ্যাবিন্যাসে বহু রূপ-নামের মানচিত্র দেখিয়ে বলা হয়েছে যে স্তোত্রপাঠ স্বর্গপ্রদ। শেষে অন্যান্য দেবতার প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ এনে ঘোষণা করা হয়—যথাবিধি সম্মানিত বাস্তু/মন্দিরে সঠিক পূজায় চার পুরুষার্থ সিদ্ধ হয়, এবং পরবর্তী মন্দির-প্রতিষ্ঠা ও পূজা-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা স্থাপিত হয়।
Vāstu-pūjā, Vāstu-maṇḍala Deities, Site Computations, and Doorway/Tree Prescriptions
এই অধ্যায়ে গরুড়পুরাণের ব্যবহারধর্মে হরি সাধারণ ধর্মকর্তব্য থেকে এগিয়ে বাস্তু-প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। ঈশান দিক থেকে শুরু করে বাস্তু-মণ্ডলের স্থল-গ্রিডে পূজাবিধি, বসতি ও প্রধান নির্মাণে দেবতাদের স্থাপন, বাহ্য-অন্তঃচক্র এবং ব্রহ্মা-কেন্দ্রিক নবখণ্ড মূল-মণ্ডল বর্ণিত। এরপর বেদী-মণ্ডপ, রান্নাঘর, ভাণ্ডার, গোশালা, জলাঞ্চল, অস্ত্রস্থান, দক্ষিণে অতিথিশালা এবং বিষ্ণু-আশ্রমের সীমানা ও অলংকরণ-নিয়ম আসে। ৬৪ পদের দ্বিতীয় মণ্ডল ও নানা রক্ষক-সত্তার বিন্যাসে সুরক্ষা-পরিধি বিস্তৃত হয়। ক্ষেত্রফল-শেষ গণনা (আট/নয় ভাগ, নক্ষত্র-শেষ, জীব-শেষ) দ্বারা ‘জীব’দোষযুক্ত অস্থির ভূমিতে নির্মাণ বর্জনের বিধান দেওয়া হয়েছে। শেষে দ্বার-মাপ, দিকভেদে ফল এবং বিশেষত ঈশানে শুভ বৃক্ষরোপণ উল্লেখ করে পরবর্তী অধ্যায়ের ভূমিকা রচিত।
Prāsāda-Lakṣaṇa: Temple Proportions, Śikhara Ratios, Liṅga–Pīṭha Measures, and Auspicious Ground-Plans
ব্রহ্মখণ্ডের শাস্ত্রীয় ধারাকে এগিয়ে নিয়ে সূত শৌনকের কাছে প্রাসাদ (মন্দির) পরিকল্পনা ও মাপজোকের ভক্তিমিশ্রিত প্রযুক্তিবর্ণনা দেন। শুরুতে ৬৪-পদ বাস্তুমণ্ডল, দিকচিহ্ন, চতুষ্কোণ রচনা, দ্বারসংখ্যা ও প্রাচীর-বিন্যাস বলা হয়। পরে দেওয়ালের উচ্চতা, শিখরের উচ্চতা (দেওয়ালের দ্বিগুণ), প্রদক্ষিণাপথের প্রস্থ, গর্ভগৃহের কেন্দ্র নির্মাণ এবং মুখমণ্ডপ প্রভৃতি প্রক্ষেপ অংশের বিধান আসে। এরপর লিঙ্গ ও পীঠের সমন্বিত অনুপাত, এবং মূল একক থেকে দ্বারের মাপ নির্ণয় করা হয়। মণ্ডপ পরিকল্পনা ও যোনিভেদসহ ভূমিরূপ—বর্গ, আয়ত, বৃত্ত, দীর্ঘ, অষ্টভুজ—এবং সমৃদ্ধি, রাজ্য, দীর্ঘায়ু ও কুলকল্যাণদায়ক শুভ চিহ্ন ও নকশা বর্ণিত। শেষে গোপুর, নাট্যশালা, উপদেবালয়, দ্বাররক্ষক, মঠ ইত্যাদি সহ মন্দির-পরিসর সাজিয়ে পূজান্তে বাসুদেবকে সর্বান্তর্যামী বলে ঘোষণা করা হয়, যিনি নিবেদন গ্রহণ করে গৃহকে পবিত্র করেন।
Devatā-Pratiṣṭhā: Maṇḍapa Construction, Dikpāla Worship, Kalaśa-Abhiṣeka, Nyāsa and Homa Procedures
খণ্ড ১-এর আচাৰবিধান অনুসারে সূত দেবতা-প্রতিষ্ঠার সম্পূর্ণ ক্রম বর্ণনা করেন—শুভ মুহূর্ত ও যোগ্য আচার্য নির্বাচন, উপচার নিবেদন, এবং নির্দিষ্ট মাপে মণ্ডপ, স্তম্ভ, দ্বার ও মধ্য বেদী নির্মাণ। পরে দিক অনুসারে কুণ্ড প্রস্তুতি, দিকপাল স্থাপন-আরাধনা, অস্ত্র-ন্যাস, ব্যাহৃতি-প্রণব দ্বারা শুদ্ধিকরণ ও কলশ/বর্ধনী বিন্যাসের বিধান আছে। বাস্তুদোষ শান্তির জন্য বাস্তোষ্পতি ও গণকে বলি, তারপর শোভাযাত্রাসহ প্রতিষ্ঠা, লক্ষণোদ্ধার, নেত্রোন্মীলন এবং পঞ্চগব্য, ঔষধি, ফল ও ‘চার সমুদ্রের’ জলে স্তরক্রমে অভিষেক সম্পন্ন হয়। শেষে অগ্নি-স্থাপন, বিস্তৃত বৈদিক পাঠ, শত-সহস্র হোম, পূর্ণাহুতি, দিকপালদের বলি, বিধিবৎ বিসর্জন ও দক্ষিণা/গোদানে সমাপ্তি করে প্রতিষ্ঠিত সান্নিধ্য দৃঢ় করা হয়।
Varṇāśrama Dharma, Ethical Virtues, and Aṣṭāṅga-Yoga Culminating in ‘Ahaṃ Brahma’
পূর্বের প্রতিষ্ঠা-বিষয় থেকে সরে এসে ব্রহ্মা ব্যাসকে ধর্মকে জীবনের শৃঙ্খলা ও মুক্তির সাধনা হিসেবে পুনঃকেন্দ্রিত করে বলেন। তিনি বর্ণধর্ম নিরূপণ করেন—ব্রাহ্মণের ষট্কর্ম (যজন, যাজন, দান, প্রতিগ্রহ, অধ্যাপন, অধ্যয়ন), ক্ষত্রিয়ের ধর্মদণ্ডে রক্ষা, বৈশ্যের কৃষি ও যজ্ঞ-অধ্যয়নের পোষণ, এবং শূদ্রের সেবা, সত্য জীবিকা ও সরল নিবেদন। এরপর আশ্রমব্যবস্থা—ব্রহ্মচর্য (উপকুর্বাণ/নৈষ্ঠিক), গৃহস্থ (উদাসীন/সাধক), বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসের স্তর—ঋণপরিশোধ ও বৈরাগ্যের দ্বারা মোক্ষপথ দেখায়। ক্ষমা, দয়া, অলোভ, সত্য, সন্তোষ, অহিংসা, মৃদুভাষণ ইত্যাদি নৈতিক গুণ বাহ্যধর্মকে অন্তঃশুদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করে। পরে অষ্টাঙ্গযোগ—যম-নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম (পূরক-কুম্ভক-রেচক), প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান, সমাধি—সংক্ষেপে বর্ণিত। শেষে ‘অহং ব্রহ্ম’—দেহ-মনাতীত অদ্বৈত উপলব্ধি—সংসারমোচনের চূড়ান্ত মুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
Āhnika-Dharma: Dawn Purification, Sandhyā-Upāsanā, Tarpana, Pañca-Mahāyajñas, and Aśauca Rules
ব্রহ্মা ব্রাহ্মমুহূর্ত থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ নিত্যধর্মচক্র ব্যাখ্যা করেন—ধর্ম ও অর্থের চিন্তা, অন্তরে হরির ধ্যান, এবং প্রাতঃস্নানের মাধ্যমে কঠোর শৌচ, যা সকল মঙ্গলকর্মের দ্বাররক্ষক। যারা পূর্ণস্নান করতে অক্ষম তাদের জন্য বিকল্প শুদ্ধি, ছয় প্রকার স্নানের বিধান, এবং শেষে মানসিক ও যোগিক শুদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এরপর সন্ধ্যা-উপাসনা—আচমন, কুশ ও জলে মন্ত্রশুদ্ধি, গায়ত্রীজপ, প্রাণায়াম, এবং বৈদিক সূর্যস্তোত্রে সূর্যোপাসনা—উল্লেখ করে বলা হয় যে সন্ধ্যা যজ্ঞাধিকার ও আধ্যাত্মিক উন্নতি রক্ষা করে। তারপর গৃহস্থধর্ম—অগ্নিহোত্র/হোম, গুরুসেবা, স্বাধ্যায়, মধ্যাহ্ন স্নাননিয়ম, এবং অঘমর্ষণ, ‘আপো হি ষ্ঠা’, মার্জন প্রভৃতি জলকর্ম—সংযুক্ত হয়েছে। শেষে যজ্ঞোপবীতের অবস্থানভেদে তर्पণবিধি, পুরুষসূক্ত ও ‘তদ্ বিষ্ণোঃ’ দ্বারা দেবপূজা, এবং পঞ্চমহাযজ্ঞ—বৈশ্বদেব, ভূতবলি, অতিথিসৎকার, জীবকে আহারদান, নিত্য শ্রাদ্ধ—বর্ণিত। উপসংহারে বর্ণ ও আশ্রমভেদে আশৌচের সময়সীমা জানিয়ে পরবর্তী শৌচধর্ম আলোচনার ভূমিকা রচিত হয়েছে।
Dāna-dharma: Threefold Classification, Right Recipients, Auspicious Timing, and Fruits of Gifts
খণ্ড ১-এর আচাৰবিধি-উপদেশের ধারাবাহিকতায় ব্রহ্মা সাধারণ ধর্ম থেকে ‘অনুত্তম’ দানধর্মে প্রবেশ করেন। তিনি স্থির করেন যে ধর্মপথে অর্জিত ধন যোগ্য পাত্রকে দান করলে ইহলোকের মঙ্গল ও মোক্ষ—উভয়ই লাভ হয়। দানকে নিত্য, নৈমিত্তিক ও কাম্য—এই তিন ভাগে বিভক্ত করে, দাতার সংকল্প, সাত্ত্বিকতা এবং পাত্রযোগ্যতা (বিদ্বান ব্রাহ্মণ, ব্রহ্মচারী, ব্রহ্মজ্ঞ) অনুযায়ী দানের শুদ্ধি ও শক্তি নির্ণয় করেন। বৈশাখে বিশেষ বিধান—পূর্ণিমা উপবাস, মধু-তিল-ঘৃতসহ বারোজন ব্রাহ্মণকে ভোজন, ধর্মরাজকে নিবেদন, দ্বাদশী ব্রত ও বিষ্ণুপূজা—পাপনাশক বলে বর্ণিত। জলদান থেকে তৃপ্তি, অন্নদান থেকে অক্ষয় সুখ, দীপদান থেকে দৃষ্টিশক্তি, স্বর্ণদান থেকে দীর্ঘায়ু, ভূমিদান থেকে সর্বসিদ্ধি—এমন ফল-নিয়ম দেখিয়ে ভূমিদান ও বিদ্যাদানকে বিশেষ রূপান্তরকারী বলা হয়েছে। সংক্রান্তি, গ্রহণ, প্রয়াগ ও গয়ার মতো তীর্থে দানের ফল বৃদ্ধি পায়; দানে বাধা দেওয়া ও দুর্ভিক্ষে মজুতদারি নিষিদ্ধ।
Prāyaścitta for Mahāpātakas (Great Sins), Vows, Tīrtha, and Sin-Destroying Observances
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক ধর্মোপদেশে ব্রহ্মা সাধারণ নীতির পর মহাপাতকের প্রায়শ্চিত্তের নির্দিষ্ট বিধান ব্যাখ্যা করেন। তিনি মহাপাতক ও এমন পাপীদের সঙ্গদোষ নির্ধারণ করে ব্রহ্মহত্যার জন্য বনবাস ও কঠোর ব্রত, সুরাপানের জন্য শুদ্ধিকর্ম, এবং চুরি ও গুরু-তল্প অপরাধের কঠিন ফল ও প্রতিকার ক্রমে বলেন। এরপর সর্বপাপ-নাশক উপায়—সর্বদান, চন্দ্রায়ণ/কৃচ্ছ্র ব্রত, তীর্থযাত্রা (বিশেষত গয়া প্রভৃতি), অমাবস্যা পূজা, চতুর্দশী উপবাস, তিলজল দিয়ে যমকে নমস্কার ও অর্ঘ্য—প্রশংসা করেন। ব্রহ্মচর্য, ভূমিশয়ন, ব্রাহ্মণ-সম্মান, ষষ্ঠী উপবাসের পর সূর্যোপাসনা এবং একাদশীতে জনার্দন পূজাকেও শক্তিশালী শোধন বলা হয়েছে। শেষে পতিব্রতা-ধর্মে গৃহস্থ আদর্শ স্থাপন করে বিষ্ণু থেকে ব্রহ্মা পর্যন্ত উপদেশ-পরম্পরা দেখিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ের ভূমিকা রচনা করা হয়েছে।
The Eight Nidhis: Guna-Based Types of Wealth, Giving, Hoarding, and Public Benefit
পূর্ব আলোচনার ধারাবাহিকতায় হরির ‘অষ্টনিধি’ প্রসঙ্গে সূত ব্রহ্মার উত্তর জানান এবং নিধিগুলিকে দেহধারী স্বভাবরূপে লক্ষণ ও আচরণ দ্বারা চেনার কথা বলেন। পদ্ম ও মহাপদ্ম সাত্ত্বিক—পদ্মচিহ্নধারীরা দয়ালু, ধন অর্জনে সক্ষম এবং ধর্মমতে দান করেন, বিশেষত তপস্বী, বেদজ্ঞ আচার্য ও যোগ্য পাত্রকে। মকর অস্ত্র-সঞ্চয়, রাজস-তামস শক্তিলালসা, রাজাদের সঙ্গে জোট এবং সংঘর্ষে বিনাশের কারণ। কচ্ছপ/কচ্ছপী অবিশ্বাস, কৃপণতা ও জড় সঞ্চয়ের লক্ষণ; গোপন ধন রাজশক্তি কেড়ে নিতে পারে—এমন সতর্কতা আছে। অধ্যায়ে মিশ্র (রজস/তমস) প্রবণতা—ভোগে ব্যয়, প্রশংসালোভ, পক্ষবদল—এবং সাত্ত্বিক ‘নীল’ ধরনের কথা বলা হয়েছে, যারা প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করে পুকুর, উদ্যান ইত্যাদি লোকহিত কর্মে দান করেন। শেষে বলা হয় মিশ্র দৃষ্টিতে মিশ্র ফল হয় এবং পরবর্তী অধ্যায়ে হরির বিশ্বকোষাদি বিস্তৃত তত্ত্বকথার ভূমিকা রচিত হয়।
Names of Priyavrata’s Sons; Division of the Seven Continents; Sapta-dvīpa and Meru Description; Nābhi–Ṛṣabha–Bharata Lineage
পুরাণকথার ধারাবাহিকতায় হরি প্রিয়ব্রতের পুত্রদের নাম বলেন এবং মেধাগ্নিবাহুর বংশে যোগধারার উল্লেখ করে রাজধর্মের সঙ্গে বৈরাগ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর বংশবৃত্তান্ত থেকে ভূগোলবর্ণনায় গতি—পৃথিবীর পরিমাপ, সপ্তদ্বীপের নাম, এবং ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্যের সপ্তসমুদ্র দ্বারা তাদের পরিবেষ্টন; প্রতিটি পরবর্তী দ্বীপ ও সমুদ্র আকারে দ্বিগুণ হয়। জম্বুদ্বীপের কেন্দ্রভাগে মেরু পর্বত; তার প্রস্থ, উচ্চতা, ভূগর্ভস্থ বিস্তার ও শিখর-পরিমাপ, এবং চারপাশের অঞ্চল ও বর্ষপর্বতের বিন্যাস বর্ণিত হয়। পরে আবার রাজবংশে ফিরে জম্বুদ্বীপাধিপতির সঙ্গে যুক্ত নয় পুত্র, নাভির প্রসঙ্গ, ঋষভের জন্ম, তারপর ভরত ও পরবর্তী শাসকদের বংশপরম্পরা বলা হয়। এ অধ্যায় বিশ্বমানচিত্র ও পবিত্র ইতিহাসকে যুক্ত করে পরবর্তী আলোচনার ভূমি প্রস্তুত করে।
Jambūdvīpa Orientation: Meru-Centered Varṣas, Dvīpas, Kulaparvatas, Rivers, and Janapadas
পুরাণীয় বিশ্ববিন্যাসের ধারাবাহিকতায় হরি রুদ্রকে মেরু-কেন্দ্রিক জম্বুদ্বীপের দিকনির্দেশিত বিন্যাস বর্ণনা করেন। কেন্দ্রে ইলাবৃত, আর চারদিকে দিক অনুসারে ভদ্রাশ্ব, হিরণ্বান, কিম্পুরুষ, ভারত, হরিবর্ষ, কেতুমাল, রম্যক ও কুরু—এই বর্ষসমূহ স্থাপিত, যা সুশৃঙ্খল মহাজাগতিক ভূগোল প্রকাশ করে। এরপর ভারতের বাইরে দ্বীপাঞ্চল ও দিকভিত্তিক সীমান্তবাসী জনসমষ্টি (কিরাত, যবন, অন্ধ্র, তুরুষ্ক প্রভৃতি) উল্লেখ করে সমাজস্মৃতিকে বিশ্বতত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তারপর বিন্ধ্য, পারিয়াত্র প্রভৃতি কুলপর্বত এবং নর্মদা, তাপী, গোদাবরী, সরস্বতী, কাবেরী ইত্যাদি পবিত্র নদীর বিস্তৃত তালিকা দেওয়া হয়—যেগুলি পবিত্রকারী ও পুণ্যবাহী। শেষে মধ্যদেশ ও পার্শ্বদিকের জনপদ-জনগণ—পাঞ্চাল, কুরু, কলিঙ্গ, বঙ্গ, দ্রাবিড়, গান্ধার, কাশ্মীর ইত্যাদি—গণনা করা হয়। এই অধ্যায় পরবর্তী তীর্থ, ধর্মাচার ও ভারতের কর্মক্ষেত্র-রূপ প্রতিষ্ঠার জন্য ভূগোল-ধর্মীয় ভিত্তি স্থাপন করে।
Sapta-dvīpa Catalog: Plakṣa to Puṣkara, Mānasottara, and the Lokāloka Boundary
হরি মধ্যলোকের সুশৃঙ্খল গঠনকে ধারাবাহিক দ্বীপসমূহের মাধ্যমে বর্ণনা করেন। প্লক্ষ-দ্বীপ থেকে শুরু করে তিনি মেধাতিথির সাত পুত্রকে শাসক রূপে উল্লেখ করেন এবং সেখানকার নদীগুলির নাম বলেন। পরে শাল্মলি-দ্বীপে তার অধিপতি বপুষ্মান, বর্ষ-বিভাগ, পর্বত ও নদীর বিবরণ দেন। এরপর কুশ-দ্বীপে জ্যোতিষ্মতের পুত্রগণ, মন্দরাদি পর্বত এবং পাপ-নাশিনী নদীগুলি; ক্রৌঞ্চ-দ্বীপে দ্যুতিমান-এর পুত্র, নদী ও অঞ্চলের নাম; এবং শাক-দ্বীপে সাত পুত্রসহ নদী/প্রদেশের তালিকা প্রদান করেন। তারপর মানসোত্তর পর্বতের যোজন-পরিমাপ স্পষ্ট করে বিশ্ব-স্থাপত্যের প্রসঙ্গ তোলেন। পুষ্কর-দ্বীপকে মধুর জলের সমুদ্রে পরিবেষ্টিত বলেন। শেষে জনশূন্য স্বর্ণভূমি, লোকালোক পর্বত, তার বাইরে অন্ধকার এবং ব্রহ্মাণ্ডের আবরণ-সীমা উল্লেখ করে পরবর্তী তত্ত্বচর্চার ভূমিকা রচনা করেন।
Pātāla and Naraka Enumeration; Brahmāṇḍa-Āvaraṇa and Nārāyaṇa’s Pervasion
পুরাণীয় পরলোক-মানচিত্রণ অব্যাহত রেখে হরি রুদ্রকে প্রথমে পৃথিবী ও অধোলোকের উল্লম্ব বিস্তার পরিমাপ করে জানান এবং অতল থেকে পাতাল পর্যন্ত সাতটি পাতালের নাম করেন। তাদের নানা ভূপ্রকৃতি ও দানব-নাগাদি বাসিন্দাদের বর্ণনা দিয়ে, সেই মহাজাগতিক ভূগোলে অবস্থিত ভয়ংকর নরকসমূহের উল্লেখ করেন—বৈতরণী, অসিপত্রবন, পূয়বহ, উষ্ণবীচি প্রভৃতি। বিষপ্রয়োগ, অস্ত্রহিংসা, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি পাপের সঙ্গে নরকগুলির যোগ স্থাপন করে কর্মবিপাকের নির্ভুল নৈতিক বিধান দেখান। এরপর আলোচনা প্রসারিত হয়ে ব্রহ্মাণ্ডের আবরণ-ক্রম বলে—জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ ও সূক্ষ্ম তত্ত্ব, মহৎ ও প্রধান পর্যন্ত। শেষে নারায়ণের সর্বব্যাপিতা ঘোষণা করে শাস্তি-ভূগোল থেকে একীভূত বিশ্ব-তত্ত্বের দিকে গমন সূচিত হয়।
Measurements of the Sun’s Chariot, the Wheel of Time, and the Retinues of the Solar Months; Chariots of Soma and the Grahas
পুরাণীয় বিশ্ব-শৃঙ্খলার ধারাবাহিক ব্যাখ্যায় হরি শিবকে ভাস্করের রথের পরিমাপ ও নির্মাণ—যুগ, অক্ষ, চক্র-গঠন এবং বর্ষচক্রে প্রতিষ্ঠিত কালচক্র—বর্ণনা করেন, যাতে সময়কে দিব্যভাবে বিন্যস্ত এক যন্ত্ররূপে বোঝা যায়। এরপর সূর্যের সাত অশ্বকে বৈদিক ছন্দের সঙ্গে একীভূত করা হয়, ফলে পরিমাপের বিষয় থেকে মন্ত্রাধিষ্ঠিত পবিত্রতার দিকে প্রসঙ্গ সরে যায়। তারপর মাসভেদে সূর্যমণ্ডলের অধিষ্ঠাত্রী সত্তাগণ—আদিত্য, ঋষি, নাগ, গন্ধর্ব ও অপ্সরা—উল্লিখিত হয়; তারা স্তব-গান করে সূর্যের সঙ্গে গমন করে এবং তাঁর কিরণ ‘সংগ্রহ’ করে জগতে বিতরণ করে। পরে সোম এবং কয়েক গ্রহের (শুক্র, ভৌম, বৃহস্পতি, শনৈশ্চর) রথ ও অশ্ব, তাদের বর্ণ, উপাদান ও গতি সংক্ষেপে বলা হয়—বিশেষত শনির ধীর গতি ও বৃহস্পতির প্রতিটি রাশিতে এক বছর অবস্থান। শেষে বৈষ্ণব বিশ্বতত্ত্ব স্থাপিত হয়: সকল লোক ও ভূদৃশ্য হরিরই দেহ, তাই এই জ্যোতির্বর্ণনা ভক্তির জন্য, কেবল তথ্য নয়।
Nakṣatra-Devatā Enumeration and Muhūrta Rules for Travel, Rites, and Yogas
পূর্বের বিশ্বতাত্ত্বিক পরিমাপের পর সূত বলেন—কেশব রুদ্রের জন্য জ্যোতিষশাস্ত্রের বিস্তৃত উপদেশ সংক্ষেপ করে, মহাবিশ্বের গঠন থেকে ব্যবহারিক কালনির্বাচন পর্যন্ত এক সেতু স্থাপন করেন। হরি প্রথমে নক্ষত্রগুলির অধিদেবতার তালিকা দেন, তারপর যোগিনী-দিকনিয়ম ও যাত্রা-সতর্কতা জানান। অধ্যায়টি কার্যত এক মুহূর্ত-নির্দেশিকা—ভ্রমণের জন্য শুভ নক্ষত্র, বস্ত্র/আবরণ-সংক্রান্ত ক্রিয়ার বিশেষ গোষ্ঠী, এবং ‘পার্শ্বমুখ’ ও ‘ঊর্ধ্বমুখ’ নক্ষত্রকে বীজবপন, যানচালনা, নৌযাত্রা ও রাজাভিষেকের সঙ্গে যুক্ত করে। পরে তিথির গুণ, গ্রহজনিত ‘দগ্ধ’ তিথি এবং রাশি-ভিত্তিক যাত্রা-বর্জন বর্ণিত। শেষে অমৃত, সিদ্ধি প্রভৃতি শুভ যোগ ও বিষ, ব্যতীপাত/পরিঘ/বৈধৃতি প্রভৃতি অশুভ যোগ নির্ধারণ করে সংস্কার বনাম যাত্রার উপদেশ—জন্মসংস্কারে শতভিষার প্রশংসা, কিন্তু প্রস্থানে কয়েকটি নক্ষত্রের প্রবল অশুভতার সতর্কবার্তা। পরবর্তী অংশে মুহূর্ত-নিয়ম আরও সূক্ষ্ম হবে—এ ইঙ্গিতও আছে।
Graha-daśā, Rāśi-adhipatya, Śakuna (Omens), and Nakṣatra-Lakṣaṇa on the Solar Diagram
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশ অব্যাহত রেখে হরি সূর্য থেকে শুক্র পর্যন্ত (রাহুসহ) গ্রহ-দশার কাল ও সংক্ষিপ্ত দশা-ফল বলেন—দুঃখ বা সমৃদ্ধি, ক্ষতি বা রাজ্য-ঐশ্বর্য—যাতে শ্রোতা জ্যোতিষদৃষ্টিতে জীবনের পর্ব বুঝতে পারে। এরপর মেষ থেকে মীন পর্যন্ত রাশির অধিপতি নির্ধারণ করে গ্রহপ্রভাব ব্যাখ্যার ভিত্তি স্থাপন করেন। পরে ‘দ্বি-আষাঢ়’ অবস্থা এবং সূর্য কর্কটে থাকলে বিষ্ণুর শয়নের কথা বলে জ্যোতির্বিদ্যা ও ব্রতাচরণের সময়কে যুক্ত করেন। তারপর যাত্রা-শকুন—ডান/বাম দিকের দর্শন, শুভ বস্তু-ব্যক্তি, অশুভ দৃশ্য—এবং হেঁচকি-সংক্রান্ত দিকফল ও মৃত্যুশকুন বর্ণিত। শেষে ভাস্করকে মানবাকারে কল্পনা করে দেহের বিভিন্ন অঙ্গে অর্ঘ্য-চিহ্ন ও নক্ষত্র স্থাপনের লাক্ষণিক পদ্ধতি দেন; তাতে অল্পায়ু, ধনলাভ, মিষ্টান্নভোজন, চৌর্যভয়, সন্তোষ, দেবতুল্য মর্যাদা ইত্যাদি ফল নির্ণীত হয়।
Candra-sthiti, Dvādaśa-avasthā, Nakṣatra-śubha-aśubha, Yātrā-dik, and Graha-bhāva-phala
এই অধ্যায়ে হরি সাধারণ শুভাচার থেকে অগ্রসর হয়ে চন্দ্র-নির্ভর মুহূর্ত-নির্ণয়ের শিক্ষা দেন। চন্দ্রের সপ্তম স্থানে ও উপচয়-ভাবগুলিতে অবস্থানকে শুভ বলা হয়েছে এবং কয়েকটি শুক্ল তিথিকে বিশেষ মঙ্গলময় বলা হয়েছে। এরপর চন্দ্রের দ্বাদশ অবস্থা ও তাদের ফল—শোক, ভোগ, জ্বর, কাঁপুনি, সুখ, রাজসম্মান, কলহ, সম্পর্কলাভ, ধন, পূজা, বিপদ/ভয়, সিদ্ধি/বিজয় এবং দ্বাদশে অনিবার্য মৃত্যুফল—বর্ণিত। পরে নক্ষত্রভিত্তিক শকুন, পুনর্মিলন ও রোগমুক্তির ইঙ্গিত, কৃত্তিকা-মঘা-অনুরাধা প্রভৃতি আরম্ভ-নক্ষত্র অনুযায়ী যাত্রার দিক-ক্রম, উত্তরযাত্রার বিধান এবং বিবাহ, যাত্রা, প্রতিষ্ঠায় সদা শুভ নক্ষত্রের তালিকা দেওয়া হয়েছে। শেষে লগ্ন থেকে দ্বাদশ ভাব পর্যন্ত গ্রহস্থানের ফল ও রাশি-যুগল/ষড়ষ্টক সম্পর্ক দিয়ে স্নেহ ও শ্রেষ্ঠতা বিচার করে পরবর্তী জ্যোতিষ-ফল ও কালনিয়মের ভূমিকা রচিত।
Lakṣaṇas of Men: Feet, Shanks, Hair, Genitals, Abdomen, and Lines of Longevity (Forehead & Palm)
ব্রহ্মখণ্ডের লক্ষণ-শাস্ত্র ধারায় হরি শঙ্কর/রুদ্রকে বলেন—দেহের বাহ্যচিহ্ন ভাগ্য, দারিদ্র্য, রাজযোগ, সন্তান ও আয়ুর ইঙ্গিত দেয়। অধ্যায় শুরু হয় শুভ পাদলক্ষণে (কোমল, ঘামহীন, পদ্মসদৃশ), তারপর অশুভ বিকৃতি (রুক্ষ/ফ্যাকাশে নখ, আঙুল ফাঁক, সঙ্কুচিত সন্ধি) বর্ণিত। জঙ্ঘার ক্ষেত্রে লোম ও গঠন বিচার হয়; হাতির পায়ের মতো জঙ্ঘা উৎকৃষ্ট। পরে দেহলোম, হাঁটু ও জননেন্দ্রিয়ের লক্ষণকে দারিদ্র্য, রোগ, সন্তানলাভ ও স্বভাবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এবং মণিকে প্রাণশক্তি ও ধনবৃদ্ধির নিমিত্ত বলা হয়েছে। উদরের আকৃতি ও মূত্রচিহ্ন সমৃদ্ধি বা দীনতার সূচক। শেষে কপালের রেখা ও করতলের রেখা—ত্রিশূল/পরশু চিহ্ন, রেখার সংখ্যা-স্বচ্ছতা, এবং আয়ুরেখার গতি ও সমাপ্তি—দিয়ে দীর্ঘায়ু নির্ণয় শেখানো হয়েছে। কর্মফলের চিহ্ন পড়ে ধর্মপথে সংশোধনের পদ্ধতি এই অধ্যায়ে প্রতিষ্ঠিত।
Strīlakṣaṇa: Auspicious Marks, Domestic Ideals, and Saubhāgya Practices
আচারভিত্তিক উপদেশধারায় হরি স্ত্রীলক্ষণ বিচার করে নারীর শুভত্ব ও তার বংশবৃদ্ধি, সমৃদ্ধি এবং দাম্পত্যস্থায়িত্বে প্রভাব ব্যাখ্যা করেন। প্রথমে কুঞ্চিত কেশ, মুখাকৃতি, দক্ষিণাবর্ত নাভি, বর্ণ ও করতলের রঙ ইত্যাদি দেহচিহ্ন উল্লেখ করে কিছু লক্ষণকে উন্নতি ও পতিব্রতা-ভাবের সূচক বলেন, আর কিছু সংযোগকে বৈধব্য বা শোকের পূর্বলক্ষণ বলে সতর্ক করেন। পরে লাল/কালো রেখার নিমিত্ত ও গৃহধর্মের নীতি—কাজে সুবুদ্ধি পরামর্শ, কার্যসম্পাদনে সক্ষম সহায়তা, মাতৃস্নেহে পালন এবং দাম্পত্যে সৌভাগ্যরক্ষা—প্রদর্শিত হয়। কর-পদচিহ্নে অঙ্কুশ, চক্র, পদ্ম, মৎস্য, হাল, প্রাকার-দ্বাররেখা ইত্যাদিকে রাণীত্ব বা রাজবিবাহের লক্ষণ বলা হয়েছে; বিপরীত লক্ষণকে দাস্য বা বৈবাহিক ক্ষতির কারণ বলা হয়। শেষে চোখ, দাঁত, ত্বক ও পায়ে তেলমর্দন প্রভৃতি সৌভাগ্য-উপায় এবং শুভ পাদলক্ষণ-প্রশংসা দিয়ে দেহসংযম ও গৃহসমন্বয়কে ধর্মের সহায়ক রূপে স্থাপন করা হয়েছে।
Purusha-Strī-Lakṣaṇa (Samudrika-śāstra): Marks of Kingship, Wealth, Longevity, and Conduct
হরি সমুদ্রপ্রণীত সামুদ্রিক-শাস্ত্রের উপদেশ শুরু করেন এবং বলেন—দেহলক্ষণ চিনলে পূর্বকর্ম ও ভবিষ্যৎ প্রবৃত্তির বিচার হয়। প্রথমে পুরুষলক্ষণ: পদ্মসদৃশ তলপা, তাম্রবর্ণ নখ, দৃঢ় পিণ্ডলি ও উরু, সমতুল দেহ ও বক্ষ, শঙ্খসদৃশ গ্রীবা, সুগঠিত হাত ও হস্তরেখা; মুখ-চক্ষুর চিহ্ন থেকে রাজত্ব, ঐশ্বর্য, সন্তান ও আয়ুর ইঙ্গিত দেওয়া হয়। অশুভ লক্ষণ—ফাটা পা, বিকৃত দেহ, অসম বক্ষ, অনিয়মিত ভ্রূ, দুর্গন্ধ, ত্রুটিযুক্ত নখ—দারিদ্র্য, দাসত্ব, নির্বাসন বা নৈতিক দোষের ফল বলে বলা হয়েছে। বিনয় ও মৃদুতা সৌভাগ্য বাড়ায়, কুটিল আচরণ মর্যাদা নষ্ট করে—কর্মকারণ স্পষ্ট। পরে স্ত্রীলক্ষণে রাণীসুলভ চিহ্ন—মসৃণ তাম্রপদ, গভীর নাভি, ত্রিবলী কটি, পূর্ণ স্তন, পদ্মসদৃশ করতল, নীলপদ্মনয়ন, অর্ধচন্দ্রভ্রূ; কর-পদরেখা থেকে দাম্পত্যস্থিরতা ও দীর্ঘায়ু, আর অশুভ লক্ষণ থেকে শোক, অসতীত্ব বা গৃহক্ষয়ের ইঙ্গিত। শেষে বলা হয়—সুষম গঠন গুণের লক্ষণ, বিকৃতি দোষের লক্ষণ; পরবর্তী ব্যাখ্যার ভূমিকা রচিত হয়।
Śālagrāma–Sudarśana-Vyūha Nirūpaṇa, Tīrtha-Saṅgraha, Samvatsara-Nāma, and Mantra-Rakṣā
আচারখণ্ডের ব্যবহারিক ধারায় এই অধ্যায়ে প্রথমে চক্র-লক্ষণ শালগ্রামকে সুদর্শন ও লক্ষ্মী-নারায়ণের অভিন্ন পরম উপাস্য রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পরে ব্যূহ ও সংশ্লিষ্ট রূপগুলির ধারাবাহিক পরিচয়, চক্রে ‘অনন্ত’, ‘সুদর্শনা’ প্রভৃতি নাম-চিহ্নের বিন্যাস, এবং যথাযথ উপাসনায় সিদ্ধি লাভের কথা বলা হয়েছে। এরপর প্রধান তীর্থ ও নদীর নামসংগ্রহ করে ঘোষণা করা হয় যে শালগ্রাম ও দ্বারকার সঙ্গম মোক্ষদায়ক। তারপর সংবৎসর-নামগুলির তালিকা দিয়ে বোঝানো হয়—নামই শুভ-অশুভের ইঙ্গিত বহন করে। রুদ্রের পঞ্চস্বর ও পঞ্চাগ্নি-চিত্রের মাধ্যমে তিথি, বার, নক্ষত্র, মাস অনুযায়ী ফল নির্ণয় এবং কালালীঙ্গা প্রভৃতি প্রাণঘাতী অশুভ যোগের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। শেষে মন্ত্রজপ ও রক্ষাকবচের বিধান—ভূর্জপত্রে পবিত্র রঞ্জকে বীজ, মৃত্যুঞ্জয়, গণ, লক্ষ্মী মন্ত্র লিখে ধারণ করলে জয় ও রক্ষা—উপদেশ দিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ের আচার-প্রযুক্তিগত নির্দেশের ভূমিকা রচনা করা হয়েছে।
Nirūpaṇa (Nāḍī–Svara-Nirūpaṇam): Breath Currents, Omens, and Action-Timing
এই অধ্যায়ে জ্যোতিষশাস্ত্র অংশের উপসংহার ঘোষণা করে বাহ্য লক্ষণ থেকে দেহগত চিহ্নে গমন করা হয়েছে। সূত বলেন—হরি থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান হর গৌরীর কাছে অন্তর্গত বিদ্যা হিসেবে প্রকাশ করেন; গ্রহ ও পঞ্চভূত দেহের প্রাণপ্রবাহ ও নাড়ির সঙ্গে যুক্ত। নাভির নীচের কন্দ ও নাড়ির বিস্তার বর্ণনা করে ইড়া (বাম, চন্দ্র), পিঙ্গলা (ডান, সূর্য) ও মধ্য নাড়িকে প্রধান বলা হয়েছে; শীতল/তীক্ষ্ণ স্বভাব অনুযায়ী সেবা, ধ্যান, বাণিজ্য, রাজকার্য, ভ্রমণ, যুদ্ধ, মৈথুন ও উগ্র ক্রিয়ায় সাফল্য-ব্যর্থতার লক্ষণ দেয়। পরে শকুন-বিচার—দিক, স্ফুরণ, সামনে-পেছনের ইঙ্গিত, অক্ষর/স্বর-নিমিত্ত এবং কোন অবস্থায় প্রশ্ন নিষ্ফল হয়। শেষে যোগমুখী উপদেশ: শ্বাস ও লক্ষণ দেখে মৃত্যুর সন্নিকটতা বোঝা, দেহের ভূত-অক্ষ ও মধ্যস্তম্ভ জেনে পার্শ্ব-বিক্ষেপ ত্যাগ করে স্থৈর্য ও মুক্তির পথে অগ্রসর হওয়া—শুধু ভবিষ্যদ্বাণী নয়, অন্তর্মুখী সাধনার দিকে নির্দেশ।
Ratna-parīkṣā: Vajra (Diamond/Thunderbolt) — Origin, Types, Testing, Defects, Weights, and Royal Auspiciousness
পূর্ব অধ্যায়ের ধারাবাহিকতায় সূত রত্ন-পরীক্ষার প্রসঙ্গ আনেন। দেবহিতার্থে অসুর বলের বধ থেকে রত্ন-বীজের উৎপত্তি; তার খণ্ড নানা দেশে পতিত হয়ে নানা রত্ন হয়—রক্ষাকারী দ্রব্য, পাপ-নাশক বস্তু ও দোষযুক্ত পাথরের ভেদও বলা হয়েছে। এরপর বিশেষভাবে বজ্র/হীরা—ইন্দ্রের বজ্রায়ুধ, ‘মাধ্ব’ নামেও পরিচিত—এর দেশভেদে প্রকার এবং বর্ণভেদে দেবতা ও বর্ণ-সম্পর্কিত শ্রেণিবিভাগ দেওয়া হয়। তীক্ষ্ণ অগ্র, সমতা, রেখা-বিন্দু-ফাটলহীন হীরা শ্রেষ্ঠ; ভাঙা শৃঙ্গযুক্ত পাথর রাখা নিষেধ। নির্দোষ হীরা ধারণে ঐশ্বর্য, রক্ষা, বিষ-সাপ-আগুন-চোর ও অভিচার থেকে মুক্তি বলা হয়েছে। চালদানা ও সর্ষেদানায় ওজনমান, উৎকৃষ্ট রত্নের মূল্য, দোষানুসারে মূল্যহ্রাস, ক্ষার-চিহ্ন ও শাণ-পাথরে পরীক্ষা ইত্যাদি শেষে রাজার রত্নদীপ্ত মুকুটকে ধর্মসম্মত বিজয়ী রাজত্বের লক্ষণ বলে পরবর্তী অধ্যায়ে অন্যান্য রত্নশাস্ত্রের ভূমিকা রচিত হয়েছে।
मुक्ता-उत्पत्ति-भेदाः, मूल्य-मान-निर्णयः, शोधन-परीक्षा-लक्षणानि (Pearl Sources, Valuation, Refinement, and Identification)
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারধর্ম ও বস্তুসংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় সূত মুনি মুক্তা-শাস্ত্রের রীতিতে মুক্তার বিবরণ দেন—আটটি প্রাচীন উৎপত্তিস্থান এবং প্রাচুর্য ও ছিদ্রযোগ্যতার কারণে ঝিনুকজাত মুক্তার শ্রেষ্ঠত্ব। এরপর বিরল, বিশেষত সর্প-সম্পর্কিত মুক্তার কথা শুভক্ষণ ও রক্ষাবিধির সঙ্গে বলা হয়, যেখানে আচার-অনুষ্ঠানের কার্যকারিতা, অলৌকিক রত্নলাভ ও রাজ্যসমৃদ্ধি একত্রে প্রতিভাত। তারপর অধ্যায়টি ওজন-পরিমাপ, মান ও মূল্যস্তর নির্ণয় করে মুক্তা-মূল্যায়নের একটি মান্য অর্থনৈতিক ব্যাকরণ স্থাপন করে। শেষে নরম করা, সেদ্ধ করা, শোধন ও পরীক্ষা (বর্ণবিকার পরীক্ষা সহ) এবং উত্তম মুক্তার লক্ষণ—শ্বেততা, গোলাকৃতি, মসৃণতা, যথাযথ ভার, দীপ্তি, নির্মলতা ও পরিচ্ছন্ন সূক্ষ্ম ছিদ্র—উপস্থাপন করে, কাহিনিভিত্তিক উৎস থেকে যাচাইযোগ্য মানদণ্ডে পাঠককে নিয়ে যায়।
The Examination of Pearls and Padmarāga (Ruby): Origins, Marks, Defects, and Valuation
ব্রহ্মখণ্ডের লোকধর্ম ও মঙ্গলাচরণের ব্যবহারিক উপদেশে এই অধ্যায়ে রত্নবিদ্যাকে পবিত্র ভূগোল ও কর্ম-কারণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সূত বলেন—লঙ্কার গর্বিত অধিপতির কারণে সূর্যের গতি ব্যাহত হলে রত্নপ্রদ ‘রাবণ-গঙ্গা’ নদীর উদ্ভব ও খ্যাতি ঘটে; তার তীর রাত্রিতে ঝলমল করে এবং তার জলে পদ্মরাগ, নীলমণি ও কুরুবিন্দ প্রভৃতি রত্ন জন্মায়। এরপর কাব্যিক বর্ণনা ছেড়ে রত্নপরীক্ষার নিয়ম দেওয়া হয়—রং ও দীপ্তি, ওজন, কঠোরতা, স্বচ্ছতা ও আকারের যথাযথ সমন্বয়। দোষযুক্ত পাথর সত্য রত্নের মতো দেখালেও বর্জনীয়, কারণ তা অমঙ্গল আনে; সূক্ষ্ম ভুয়া চিহ্ন ধরতে বিচক্ষণতা জরুরি। পদ্মরাগকে উৎপত্তিস্থানভেদে (কলশপুর, সিংহল, তুম্বুরু) শ্রেণিবদ্ধ করে লক্ষণ ও পরীক্ষা বলা হয়েছে, এবং নীচ রত্নে উত্তম সংগ্রহ নষ্ট হয়—এ সতর্কতাও আছে। শেষে হীরার ওজনমানের তুলনায় মূল্যনির্ধারণের নীতি জানিয়ে বলা হয়েছে—রং বা দীপ্তি সামান্য কমলেই রত্নের মূল্য ভেঙে যায়।
Marakata (Emerald): Mythic Origin, Anti-Poison Virtue, Qualities, Defects, and Proper Wearing
এই অধ্যায়ে সূত বলেন—দানবাধিপতির কাছ থেকে তীব্র পিত্তদ্রব্য পেয়ে বাসুকি দ্রুত উড়ে পালায়। গরুড় আক্রমণ করলে বাসুকি সুগন্ধ উপত্যকায় তুলসী-লেপিত তুরুস্ক বৃক্ষের কাছে সেই দ্ৰব্য ফেলে, পরে মাণিক্য পর্বতের নিকট লক্ষ্মী-সম্পর্কিত অঞ্চলে গমন করে। পিত্তের সামান্য অংশ পড়ে গেলে গরুড় তা ধরে, কিন্তু মূর্ছিত হয়ে নাসারন্ধ্র দিয়ে বের করে দেয়—এই স্থান থেকেই মিথ্যকথায় মরকত (পান্না) উৎপত্তি বলা হয়। গ্রন্থ মরকত-ভূমিকে কঠোর হলেও বিষনাশক ঔষধিগুণে অনন্য বলে প্রশংসা করে; মন্ত্র ও সাধারণ চিকিৎসার অতীত বিষও সেখানে উৎপন্ন দ্রব্যে শান্ত হয়। এরপর উৎকৃষ্ট পান্নার লক্ষণ—গাঢ় সবুজ বর্ণ, অন্তর্জ্যোতি, নির্মলতা, মনপ্রসন্নতা—এবং দোষ—ছোপ, অশুদ্ধি, দানা/বালি, ফাটল, আলকাতরা-লেপ—তথা সদৃশ বস্তু (ভল্লাটকী, পুত্রিকা, কাঁচ) উল্লেখিত। শেষে ধর্ম্য নির্দেশ—নির্দোষ পান্না সোনায় বসিয়ে ধারণ করা উচিত, বিশেষত যোদ্ধাদের; মূল্য উচ্চ, দোষে মূল্য দ্রুত কমে।
Indranīla (Blue Sapphire): Source-Myth, Grades, Tests, Substitutes, and Price
রত্নশাস্ত্রের ধারায় সূত প্রথমে ইন্দ্রনীলের উৎপত্তিকে পবিত্র ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত করেন—প্রবাল ও লবালি-বিক্ষিপ্ত সমুদ্রতটে দৈত্যের পতিত নয়ন নীল পদ্মের মতো দীপ্ত, ফলে তটভূমি নীলম-খচিত প্রদেশের মতো ঝলমল করে। এরপর নীলমের বর্ণ-রূপ ও কান্তি, মাটি-পাথরের সঙ্গে মিশ্র জন্ম এবং মেঘচ্ছায়া-জাত দোষের কথা বলা হয়। মাণিক্যের ন্যায়ই এর ত্রিবিধ শ্রেণি ও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য, তবে অগ্নি-পরীক্ষায় অযত্ন হলে কর্মদোষ ও অমঙ্গল ঘটে—এই সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। কাচ, উৎপল-পাথর, করবীর-পাথর, স্ফটিক প্রভৃতি বৈদূর্যাভাসের ভেদ দেখানো হয়; ইন্দ্রনীলে বজ্রসম মধ্যদীপ্তি এবং মহানীলে প্রবল নীলতা বিস্তারের শক্তি বিশেষ লক্ষণ। শেষে মূল্যনিয়ম—মাণিক্যের মাষ-হিসাবের মতো নীলমের মূল্য সুবর্ণ-হিসাবে, এবং পরবর্তী রত্নবিভাগের ভূমিকা রচিত হয়।
Vaidūrya (Cat’s-eye) Examination: Origin, Auspicious Marks, Imitations, and Valuation Measures
সূত এই অধ্যায়কে প্রামাণ্য রত্ন-পরীক্ষা শিক্ষা বলে পরিচয় করান—প্রথমে ব্রহ্মা উপদেশ দেন, পরে ব্যাস কর্কেট ও ভীষ্মকের প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন। প্রলয়ে সমুদ্র মন্থিত হলে এবং দানবের গর্জন-নাদ থেকে নানা বর্ণের বৈদূর্য (লহসুনিয়া/ক্যাটস-আই) উৎপন্ন হয়ে ত্রিলোকের ভূষণ বলে খ্যাত। এরপর শুভ-অশুভ লক্ষণ নির্ণয়—গাঢ় নীল-সবুজ দীপ্তি শুভ, কাকপক্ষের মতো ঝিলিক অশুভ; নির্দোষ পাথর ভোগ-সমৃদ্ধি দেয়, দোষযুক্ত ক্ষতি করে, তাই সূক্ষ্ম পরীক্ষা জরুরি। কাচ, স্ফটিকসদৃশ বস্তু ও ধূমস্ফটিক ইত্যাদি নকলের কথা বলে সতর্ক করা হয়েছে; আঁচড়-প্রতিরোধ, হালকাভাব ও উজ্জ্বলতা দেখে চেনার উপায় দেওয়া। মূল্যায়নে উৎকৃষ্ট বৈদূর্যের দাম ইন্দ্রনীলের সমান এবং নির্দোষ রত্ন সঠিকভাবে গাঁথা/ক্রমে সাজালে মূল্য বহুগুণ বাড়ে। শেষে মাষক, শাণ, পাল, ধরণ প্রভৃতি ওজন-মান রত্নমূল্য নির্ধারণে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।
Puṣparāga, Padmarāga, Kaukaṇṭaka, and Indranīla: Origins, Visual Marks, Value, and Phala
ব্রহ্মখণ্ডের তালিকাভিত্তিক উপদেশধারায় সূত রত্নবিদ্যার প্রসঙ্গ আনেন। হিমালয়ে দেবশত্রুর চর্ম থেকে পুষ্পরাগ রত্নের উৎপত্তির পৌরাণিক কাহিনি বলা হয়েছে। এরপর দীপ্তি ও বর্ণ অনুযায়ী পরিচয় নির্ণয়—পদ্মরাগ ফিকে হলুদাভ মনোহর, রঙ ঘন হলে লালিমা বৃদ্ধি পায়; লাল-হলুদ ভেদকে ‘কৌকণ্টক’ বলা হয়। লাল/হলুদ/স্বচ্ছ/তামাটে এবং নীল-সাদাটে, মসৃণ (স্নিগ্ধ) ও গুণসম্পন্ন হওয়া মূল্যায়নের লক্ষণ। ইন্দ্রনীল ‘সু-নীল’, অর্থাৎ গভীর উৎকৃষ্ট নীল। শেষে বৈদূর্য (ক্যাটস-আই) সদৃশ মূল্য ও রত্নধারণের ফল—বিশেষত নারীদের পুত্রপ্রদ প্রভাব—উল্লেখ করে পরবর্তী অধ্যায়ের রত্নবিভাগ ও ধর্মোপযোগিতার ভূমিকা রচিত হয়।
Karketana (Karketa) Lakṣaṇa: Origin, Color-Forms, Purity Marks, and Ritual Efficacy
পূর্ব অধ্যায় (৭৪) শেষের ধারাবাহিকতায় সূত কার্কেতন রত্নের বিশেষ বিবরণ দেন। পুরাণীয় উৎপত্তি—বায়ু দৈত্যনায়কের নখ পদ্মবনে নিক্ষেপ করলে সেখান থেকে বায়ুশক্তিসম্পন্ন কার্কেতন জন্মায়। এর রঙ রক্ত/চন্দ্র/মধু/অগ্নির মতো তাম্র-হলুদ; কখনও নীল বা শ্বেতও হতে পারে, আর রূপবিকৃতি রোগ বা দোষের লক্ষণ। শ্রেষ্ঠ রত্নের শুভ লক্ষণ—মসৃণ শুদ্ধতা, সমবর্ণতা, হলদে আভা, ভারী হওয়া, বিচিত্র দীপ্তি থাকলেও ফাটল, ক্ষত ও সর্পদোষ না থাকা। পরে বিধি—সোনার পাতায় মুড়ে পবিত্র অগ্নিতে উত্তপ্ত করা, যতক্ষণ না দীপ্ত হয়; এতে রোগনাশ, কলির অনিষ্ট প্রশমন, দীর্ঘায়ু, বংশসমর্থন ও সুখলাভ বলা হয়েছে। সিদ্ধ কার্কেতন ধারণে মান, ধন, আত্মীয়, তেজ ও আনন্দ বৃদ্ধি পায়; দোষযুক্ত সদৃশ পাথর থেকে সতর্ক করা হয়েছে। শেষে শাস্ত্রজ্ঞদের দ্বারা রঙ-রূপ ও নবসূর্যসম উজ্জ্বলতা পরীক্ষা করে মূল্য নির্ধারণের কথা বলে পরবর্তী রত্নবিচারের ভূমিকা রচিত হয়েছে।
Himavat Ratna-utpatti, Bhīṣma-maṇi Praśaṃsā, and Pitṛ-tarpaṇa Phala
এই অধ্যায়ে আচার-প্রধান আলোচনা চলতে থাকে এবং রত্নবিদ্যাকে পবিত্র ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। উত্তর হিমালয়ে এক পৌরাণিক ঘটনার ফলে শ্রেষ্ঠ রত্নখনির উৎপত্তি হয়, যেখানে দীপ্তিমান ও দৃঢ় রত্ন-গঠন জন্মায়। সেখান থেকে ভীষ্ম-মণির মহিমা কীর্তিত—ধারণ করলে তা সমৃদ্ধি ও রক্ষা দেয়; পরিধানকারীর দর্শনমাত্রেই ভয়ংকর বনজ প্রাণী পালায়। একটি শ্লোকে পাঠগত অসুবিধা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যেখানে পাণ্ডিত্যপূর্ণ যাচাই প্রয়োজন। পরে শারীরিক রক্ষা থেকে যাগ-আচারগত রক্ষায় গমন: পিতৃ-তর্পণ পিতৃগণের দীর্ঘ তৃপ্তি দেয় এবং বিষভয়, তত্ত্বজনিত ও সামাজিক ভয়সহ কঠিন উপদ্রব নিবারণ করে। শেষে বিবেক নির্দেশ—অশুভ, নিস্তেজ রত্ন বর্জনীয়, এবং দেশ-কাল অনুযায়ী দুর্লভতা ও দূরত্ব বিচার করে মূল্য নির্ণয় করতে হবে; এতে পরবর্তী আচার ও বিচারের আলোচনার সেতু রচিত হয়।
Pulaka-Lakṣaṇa (Auspicious Horripilation), Sacred Designs, and Inauspicious Omens
সূত বর্ণনা করেন যে ভক্তরা পর্বত, নদী ও উত্তরের পবিত্র তীর্থভূমি অতিক্রম করে এক দীপ্ত দেবপ্রকাশের প্রতিষ্ঠা করে তীর্থভিত্তিক অভিষেক ও ভক্তিভাবে পূজা করেন। পরে শারীরিক-লক্ষণে পুলক (রোমাঞ্চ)-এর শুভ প্রকারগুলি ফুল, বীজ, অঞ্জন, মধু, পদ্মতন্তু, গন্ধর্বাগ্নি ও কলাগাছের কাণ্ডের দীপ্তির উপমায় বলা হয়—ভক্তির আবেগ দেহচিহ্নে ধরা পড়ে। শঙ্খ, পদ্ম, ভ্রমর ও সূর্যচিহ্নযুক্ত, পবিত্র সূত্রে গাঁথা চিহ্ন/অলংকারকে শুদ্ধ ও সমৃদ্ধিদায়ক বলা হয়েছে। শেষে কাক ও মাংস-মাখা শ্বান, শৃগাল, নেকড়ে, শকুন প্রভৃতিকে মৃত্যুসূচক অশুভ নিমিত্ত বলে এড়াতে বলা হয়, এবং পল-এর দামের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে।
Rudrākṣa-maṇi Lakṣaṇas: Origin in the Narmadā and Auspicious Color-Signs
আচারখণ্ডের ব্যবহারিক-আধ্যাত্মিক উপদেশ এগিয়ে নিয়ে সূত একটি কারণকথা বলেন—এক সত্তা অগ্নিরূপ ধারণ করে দানবের অভিপ্রায় পূর্ণ করে সেই শক্তিকে নর্মদার নিম্নভূমিতে নিক্ষেপ করে। সেখান থেকেই রুদ্রাক্ষ-মণি প্রকাশ পায়; তার লক্ষণ—ইন্দ্রগোপের মতো দাগ-ছিট, টিয়া-আভাযুক্ত সামান্য বাঁক, এবং পীলু ফলের সমান আকার; বাহ্য বৈচিত্র্য থাকলেও তত্ত্ব এক—এ কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। পরে শকুন-বিচার: অত্যন্ত শুদ্ধ ‘পটল’ যদি মধ্যচন্দ্রের মতো ফ্যাকাশে দেখা যায়, তা নীলমণির মতো বা বজ্রবর্ণ ধারণ করে সমৃদ্ধি ও পরিচারক-লাভের কারণ হয়। এভাবে ধর্মফল ও লোক-আধ্যাত্মিক মঙ্গলের সঙ্গে লক্ষণের যোগ স্থাপন করা হয়েছে।
Lāṅgalī and the Crystal-like Taila: Purity, Value, and Sin-Destroying Merit
ব্রহ্মখণ্ডের ধারায় সূত এই অধ্যায়ে কাবেরী ও বিন্ধ্য অঞ্চল, এবং যবন, চীন ও নেপাল দেশের উল্লেখ করেন। লাঙ্গলী নামক ঔষধি প্রয়োগে এক দানবের মেদ ছড়িয়ে নষ্ট হয়, আর সেখান থেকে স্ফটিকসদৃশ ‘তৈল’ উৎপন্ন হয়—আকাশের মতো নির্মল, পদ্মতন্তু ও শঙ্খের মতো শ্বেত, সামান্য বিচিত্র বর্ণযুক্ত। পরে শিক্ষা দেওয়া হয়—রত্নের তুলনা নেই, আর পাপহরণকারী বস্তু সর্বশ্রেষ্ঠ; দক্ষ সংস্কারেই তৎক্ষণাৎ মূল্য প্রকাশ পায়। এভাবে পৌরাণিক কারণ ও ব্যবহারিক ধর্ম মিলিয়ে শুচিতা ও কারুকার্যকে পদার্থের পবিত্রতা ও পুণ্যদায়ক শক্তির উৎস বলা হয়েছে।
Vidruma (Coral): Origin, Color-Types, Qualities, and the Introduction to Testing Pulaka, Rudhirākṣa, Sphaṭika, and Vidruma
ব্রহ্মখণ্ডের রত্ন-লক্ষণ প্রসঙ্গে সূত এই অধ্যায়ের পরিচয় দিয়ে বিদ্রুম (মূঙ্গা)-এর পৌরাণিক উৎপত্তি বলেন—শেষনাগ বলির অন্ত্র কেলা প্রভৃতি পর্বতে নিক্ষেপ করেন, সেখান থেকেই বিদ্রুম জন্মায়। পরে বর্ণভেদ ও দেশভেদ নিরূপিত হয়; গুঞ্জা/জবা-কুসুমের ন্যায় খরগোশের রক্তবর্ণ লাল প্রবালকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, অন্য রঙও স্বীকৃত। মূল্যনীতিতে বলা হয়, নীচ উৎসের প্রবাল সর্বোচ্চ মর্যাদা পায় না, তবে দক্ষ কারুকার্যে মূল্য বৃদ্ধি সম্ভব। শেষে বিদ্রুমের ফল—সমৃদ্ধি, শস্যলাভ ও বিষনিবারক রক্ষা—উল্লেখ করে পুলক ও রুধিরাক্ষ, এবং স্ফটিক ও বিদ্রুমের পরীক্ষা-পদ্ধতি শেখাবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ের ভূমিকা রচিত হয়।
Tīrtha-Māhātmya: Catalog of Sacred Places and the Supreme Inner Tīrtha
রত্নপরীক্ষার আলোচনা শেষ করে কাহিনি তীর্থতত্ত্বে প্রবেশ করে। সূত গঙ্গার বিশেষ মাহাত্ম্য ঘোষণা করে গঙ্গাদ্বার, প্রয়াগ ও গঙ্গাসাগরের মতো প্রধান প্রবেশস্থানগুলির নাম করেন; প্রয়াগকে ভোগ ও মোক্ষদায়ী বলা হয়েছে। এরপর বারাণসী, কুরুক্ষেত্র, প্রভাস, দ্বারকা, কেদার, বদরিকাশ্রম, কাবেরী, গোদাবরী, নর্মদা-সঙ্গম, তাপ্তী প্রভৃতি নদী-সঙ্গম এবং উজ্জয়িনীর মহাকাল, প্রভাসের সোমনাথ, কামরূপের কামাখ্যা ইত্যাদি দেবধামসহ সর্বভারতীয় তীর্থভূগোল বিস্তৃত হয়। স্নান, দান, জপ, তপ, শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের ফলপ্রদতা বলার পর গ্রন্থ ‘অন্তর্তীর্থ’-এর কথা তোলে—সংযম, শুচিতা ও ব্রহ্মধ্যানই শ্রেষ্ঠ তীর্থযাত্রা। শেষে ব্রহ্মা দক্ষাদিসহ ব্যাসকে সম্বোধন করে গয়াকে পিতৃদের অক্ষয় পুণ্যদায়ী ও ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তির সর্বোত্তম তীর্থ বলে পুনরায় ঘোষণা করেন, পরবর্তী তীর্থ-কর্মোপদেশের ভূমিকা স্থাপিত হয়।
Gayā-māhātmya: Gayāsura, Viṣṇu’s Establishment, and the Fruits of Śrāddha at Gayā
ব্রহ্মা ব্যাসকে গয়া-মাহাত্ম্য আরম্ভ করে বলেন—এটি সংসারসুখ ও মোক্ষ উভয়ই দেয়। গয়াসুরের ভয়ংকর তপস্যায় জীবকুল কষ্ট পায়; দেবতারা হরির শরণ নেয়। বিষ্ণু জানান, শিব-স্বভাবের সঙ্গে সংযুক্ত উপায়েই সমাধান হবে; শেষে গয়াসুরকে কীকট দেশে এনে বিষ্ণুর শক্তিতে বধ করা হয়। ফলে গদাধর বিষ্ণু গয়ায় মোক্ষদাতা রূপে বিরাজ করেন; লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠা ও ব্রহ্মার সান্নিধ্যও বর্ণিত, এবং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে স্থানটিকে পুণ্যক্ষেত্র ঘোষণা করা হয়। অধ্যায়ে গয়ায় যজ্ঞ, স্নান, শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের ফল—স্বর্গ/ব্রহ্মলোক লাভ ও নরকনিবারণ—উল্লেখিত। ব্রহ্মার যজ্ঞ, নদী-সরোবর ও কামধেনুর প্রসঙ্গ, এবং দানগ্রহণকারী ব্রাহ্মণদের শাপের কাহিনি তীর্থের সামাজিক-আচার অর্থনীতিকে দেখায়। উপসংহারে বলা হয়, গয়া-শ্রাদ্ধ মহাপাপ নাশ করে এবং যথাবিধি ক্রিয়া না হওয়া মৃতদেরও মুক্তি দেয়; এর পুণ্য অপরিমেয়।
Gayā-kṣetra and Phalgu Tīrtha: Sites, Rites, and the Liberation of the Pitṛs
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা পবিত্র ভূগোলের মাধ্যমে ধর্মবিধান করে গয়াকে পিতৃকার্যের শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র বলেন। তিনি মুন্ডপৃষ্ঠ, গয়া-ক্ষেত্র ও গয়া-শির/ফল্গু তীর্থের পরিসীমা নির্ধারণ করেন এবং জনার্দন, সূর্য ও প্রধান লিঙ্গ-দেবতার দর্শন, গায়ত্রী/সাবিত্রীসহ সন্ধ্যা, স্নান-তর্পণ, শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানকে ঋণ-পাপমোচন এবং পিতৃদের ব্রহ্মলোক/মোক্ষপ্রাপ্তির উপায় রূপে জানান। কূপ, সরোবর, বন, আশ্রম, পদচিহ্ন প্রভৃতি তীর্থের তালিকা যাত্রাপথের মতো সাজানো, যেখানে ২১ জন/২১ প্রজন্মের উদ্ধারের কথা, অক্ষয় পুণ্য ও পুনর্জন্মমুক্তির ফল উল্লেখ আছে। যোগ্য ব্রাহ্মণভোজন, বৃষোৎসর্গ এবং অল্প সামগ্রীতেও পিণ্ডার্পণের বিধিমাপক স্থির হয়। শেষে সাধককে বহু গয়া-তীর্থে পিতৃতারক কর্ম চালিয়ে যেতে বলে পরবর্তী বিধিবিস্তারের ভূমিকা রচিত হয়।
Gayā-yātrā-vidhi: Multi-day Śrāddha Route, Pitṛ-devatās, and Akṣaya Merit at Gayā
ব্রহ্মখণ্ডের তীর্থকেন্দ্রিক ধর্মোপদেশে ব্রহ্মা গয়া-যাত্রা ও শ্রাদ্ধ/পিণ্ডদানের দিনভিত্তিক ক্রমবিধি বলেন। যাত্রী নিয়মিত শ্রাদ্ধ করে প্রদক্ষিণ করবে, দান গ্রহণ এড়াবে; যাত্রাপথও পিতৃদের উপকার করে। মুণ্ডন-উপবাসে কিছু ব্যতিক্রম উল্লেখিত, এবং গয়ায় দিন-রাত শ্রাদ্ধের বিশেষ শক্তি বলা হয়েছে। কনখল, ফল্গু-তীর্থ, ধর্মারণ্য, ব্রহ্মতীর্থ, ব্রহ্মসভা, গয়াশীর্ষ, রুদ্রপদ, অক্ষয়বট—প্রতিটি স্থানের সঙ্গে নির্দিষ্ট ফল (বাজপেয়/রাজসূয়/অশ্বমেধ তুল্য, অক্ষয় দান, মুক্তি) যুক্ত। পিতৃ-দেবতার আহ্বান ও গদাধর দর্শনকে পিতৃঋণ নাশক বলা হয়। বিশাল ও তার পূর্বপুরুষদের কাহিনি পিণ্ডদানে প্রেতমোচন দেখায়। শেষে লুপ্তকর্ম, মৃতশিশু/গর্ভপাত, অদাহিত মৃত প্রভৃতি উপেক্ষিতদেরও ফলভোগের কথা বলে পরবর্তী অধ্যায়ের ভূমিকা রচিত।
Gayā Śrāddha at Preta-śilā: Universal Piṇḍa-dāna for Ancestors and the Unrescued Dead
ব্রহ্মা গয়া-ক্ষেত্রে প্রেতশিলায় স্নান করে বরুণ-সংস্কৃত জলে পিণ্ডদানসহ শ্রাদ্ধ-ক্রম নির্ধারণ করেন। মন্ত্রের দ্বারা এর উপকারভোগী কেবল পিতৃ ও মাতৃবংশ নয়; মাতামহ-পরম্পরা, শিশু ও গর্ভপাতজাত প্রাণ, নামহীন ও কুলহীন, এবং বংশচ্ছেদে যাদের শ্রাদ্ধ বন্ধ হয়েছে—তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অকাল বা হিংসামৃত্যুপ্রাপ্ত, যমের বিধানে কষ্টভোগী প্রেত, এমনকি পশু বা উদ্ভিদযোনিতে পুনর্জাত জীবও পিণ্ডের অংশ পায়। কর্তা প্রার্থনা করেন—পিণ্ড যেন স্থায়ী আশ্রয় হয় এবং আত্মীয়-অনাত্মীয় ও পূর্বজন্মের বন্ধুরা সকলেই তৃপ্ত হন। শেষে গয়ায় ব্রহ্মা, ঈশান প্রভৃতি দেবসাক্ষ্যে ঋণত্রয়মোচন কামনা করে অক্ষয়বট, ব্রহ্মসরোবর, গয়াশির প্রভৃতি তীর্থের মাহাত্ম্য ঘোষণা করা হয়; পরবর্তী অধ্যায়ে গয়া-শ্রাদ্ধের বিধি ও ফল বিস্তারের ভূমিকা রচিত হয়।
Pretaśilā at Gayā: Muṇḍapṛṣṭha, Gadādhara’s Manifestation, and the Fruits of Śrāddha & Deity-Worship
ব্রহ্মা শ্রোতাদের কাছে গয়ায় প্রেতশিলার মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করেন। ধর্ম-আধিষ্ঠিত এই পবিত্র শিলা সর্বদেবময়; গয়াসুরের মস্তক/পৃষ্ঠে অবস্থিত বলে একে ‘মুণ্ডপৃষ্ঠ’ বলা হয়। ব্রহ্মসরসের প্রবাহমুখ, পদ্মবন এবং অরবিন্দ/ক্রৌঞ্চপাদ প্রভৃতি পর্বতের উল্লেখে তীর্থজালের পবিত্র ভূগোল প্রতিষ্ঠিত হয়; এখানে শ্রাদ্ধ করলে পিতৃগণ ব্রহ্মলোক লাভ করেন। পরে স্থানকথা থেকে তত্ত্বে গমন—আদি গদাধারী ভগবান হরি/গদাধর ব্যক্ত-অব্যক্ত, মৎস্য থেকে কল্কি পর্যন্ত অবতারে প্রকাশিত। এরপর গদাধর ও সংশ্লিষ্ট দেবতাদের পূজোপচার ও দানক্রম বলা হয়, এবং ফলশ্রুতিতে সমৃদ্ধি, সন্তান, বিজয় ও মুক্তির কথা ঘোষিত। উপসংহার—গয়ায় পূজা ও শ্রাদ্ধে কর্তা ও পূর্বপুরুষ উভয়েই উন্নীত হয়ে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন; অধ্যায়টি গয়া-রীতিকে বৈষ্ণব-প্রাধান্যসহ বহুদেব তীর্থাচরণের সমন্বিত মোক্ষপথ রূপে স্থাপন করে।
Manvantara Catalog: Fourteen Manus, Their Sons, Saptarishis, Indras, Deva-Hosts, and the 18 Vidyās
গয়া-মাহাত্ম্য সমাপ্ত করে হরি মন্বন্তরগুলির সুসংবদ্ধ বিবরণ শুরু করেন। স্বায়ম্ভুব মনু থেকে ক্রমে চৌদ্দ মনু, তাঁদের পুত্রগণ, সপ্তর্ষি, ইন্দ্র এবং দেবগণের তালিকা দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে দানবীয় বাধা ও তার প্রশমন উল্লেখিত—বিষ্ণু মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, হংস, ময়ূর, গজ, অশ্ব প্রভৃতি উপযুক্ত রূপ ধারণ করে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। বৈবস্বত মনুর অংশে ইক্ষ্বাকু প্রভৃতি মানব-বংশধারা এবং আদিত্য, রুদ্র, বসু, মরুত, অশ্বিন, বিশ্বেদেবদের গণনা বিস্তৃত হয়। শেষে ব্যাসরূপে বিষ্ণুই পুরাণ ও অষ্টাদশ বিদ্যা-স্থান রচনার উৎস বলে প্রতিপাদিত, যা পরবর্তী শাস্ত্রসম্মত উপদেশের ভূমি প্রস্তুত করে।
Ruci and the Pitṛs: On Marriage, Debts (Ṛṇa), and Desireless Karma
সূত মর্কণ্ডেয়-প্রদত্ত পিতৃকেন্দ্রিক উপাখ্যান শুরু করেন। বৈরাগী ঋষি রুচি, যিনি আশ্রম-চিহ্নের বাইরে থাকেন, তাঁরই পিতৃগণ এসে বিবাহ না করার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। পিতৃগণ গৃহস্থধর্ম ব্যাখ্যা করেন—দেব, পিতৃ, ঋষি, অতিথি ও আশ্রিতদের সম্মান, যজ্ঞ-দান-অতিথিসেবায় নিত্য ঋণশোধ; ‘স্বাহা’ ও ‘স্বধা’ তার লক্ষণ। রুচি বলেন, মমত্বই দুঃখের মূল; গৃহসঞ্চয়ে নয়, জ্ঞানে আত্মশুদ্ধি। পিতৃগণ জ্ঞান ও শৌচের মূল্য মানলেও বলেন, বিধিবদ্ধ কর্তব্য ত্যাগে দোষ জন্মায়; কেবল আচারেই মোক্ষ নয়, তবে নিষ্কাম কর্ম জ্ঞানের পরিপাককে সহায় করে। শেষে তারা পতনের কঠোর সতর্কতা দিয়ে অন্তর্ধান হন; মর্কণ্ডেয় বর্ণনা শেষ করে পরবর্তী ধারায় ব্যবহারধর্ম ও পিতৃকর্মকে বাধ্য কর্তব্যরূপে স্থাপন করেন।
Pitṛ-Stuti, Tarpaṇa, and the Ritual Power of Recitation in Śrāddha
মার্কণ্ডেয় রুচির অবিবাহিত থাকার দুঃখ ও পিতৃউদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা বর্ণনা করেন। কঠোর তপস্যার পর ব্রহ্মা তাঁকে গার্হস্থ্যধর্মে প্রবৃত্ত হতে বলেন এবং সাফল্যের মূল হিসেবে পিতৃপূজাকে স্থাপন করেন। রুচি নির্জন নদীতীরের বালুচরে তর্পণ করে বিস্তৃত পিতৃস্তোত্র পাঠ করেন—স্বর্গ‑পৃথিবী‑পাতাল, এবং স্বধা, পিণ্ড, হোম প্রভৃতি রূপে পিতৃগণকে বন্দনা করেন। পিতৃগণ মহাজ্যোতিরূপে প্রকাশিত হয়ে তাঁকে স্ত্রী, ‘রৌচ্য’ খ্যাতি (রৌচ্য মন্বন্তর) ও সন্তান‑সমৃদ্ধির বর দেন। পরে বিধান—শ্রাদ্ধে, বিশেষত ব্রাহ্মণভোজনকালে, এই স্তোত্র পাঠে কর্ম অক্ষয় হয়, ঋতুভেদে নির্দিষ্ট বছর পর্যন্ত পিতৃতৃপ্তি বৃদ্ধি পায় এবং যেখানে গ্রন্থ রক্ষিত থাকে সেখানে পিতৃসন্নিধি থাকে। অনুচিত ধন, কাল, দেশ ও অপাত্রদানের দোষও নির্দেশ করে শ্রাদ্ধনীতির শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
Pramlaucā’s appearance and Ruci’s marriage to Māninī
মার্কণ্ডেয়ের কথাক্রমে নদীর মধ্যভাগ থেকে প্রম্লৌচা নামের অপ্সরা অন্যান্য দিব্য অপ্সরাদের সঙ্গে আবির্ভূত হয়। সে অতিমধুর বাক্যে মহর্ষি রুচির অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। এরপর কাহিনি ধর্মপথে মোড় নেয়—বরুণপুত্র পুষ্করের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপূর্ব তেজস্বিনী সুন্দরী মানিনীকে রুচির ধর্মপত্নী রূপে প্রদান করা হয়। তাঁদের মিলনে প্রজ্ঞাবান পুত্র মনুর জন্ম হবে—এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। রুচি জল থেকে মানিনীকে তুলে শাস্ত্রবিধি অনুসারে বিবাহক্রিয়া সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট পাণিগ্রহণে সমাপ্ত করেন। এই অধ্যায় বংশধারা, ধর্ম-ধারাবাহিকতা ও মনুর পরবর্তী ভূমিকার সূচনা করে।
Brahman Beyond the Elements and the Three States (Turīya) — Dhyāna Leading to Brahma-realization
এই অধ্যায়ে সূত বলেন—ব্রতনিষ্ঠা, সংযমিত আচরণ, পূজা, ধ্যান, স্তোত্রপাঠ ও মন্ত্রজপের দ্বারা হরির ধ্যান সাধিত হয়। এরপর পরমসত্তার কঠোর নৈর্ব্যক্তিক/নিষেধাত্মক বর্ণনা—তিনি দেহ-মন-ইন্দ্রিয়ের অতীত, দেশ-কাল ও ভূতগুণের অতীত, গুণ-বাসনা, শোক-মোহ, জরা-মৃত্যু, উৎপত্তি ও প্রলয়ে অস্পৃষ্ট। তিনি জীবসমূহ ও চেতনার তিন অবস্থার নিয়ন্তা হয়েও নিরবয়ব, নামহীন, কারণাতীত; তাঁকেই তুরীয় বলা হয়েছে। বেদান্তকে এই তত্ত্বজ্ঞান লাভের উপায় বলা হয়, শব্দ-রস-স্পর্শ-রূপ-গন্ধের অতীতত্বও নির্দেশিত; শেষে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’—এই আত্মসাক্ষাৎকার উচ্চারিত। পরে সাধনায় নির্দেশ—আত্মসংযমী সাধক মহাদেবের ধ্যান করলে ব্রহ্মস্থিতি লাভ করে। শেষ শ্লোকে বৃষধ্বজকে প্রশ্ন করে পরবর্তী অধ্যায়ের আলোচনার সূত্রপাত করা হয়েছে।
Viṣṇu-dhyāna: Saguṇa Iconography, Nirguṇa Framework, and the Vāsudeva Insight
পুরাণীয় উপদেশধারায় রুদ্র হরিকে অনুরোধ করেন—যে বিষ্ণুধ্যানে সাধক কৃতকৃত্য হয়, তা পুনরায় বলুন। হরি ধ্যানকে দুই ভাগে—নির্গুণ ও সগুণ—বলে সগুণ ধ্যানের রূপ বর্ণনা করেন: বিষ্ণুর দীপ্ত জ্যোতি, শুভ শ্বেত দেহ, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম, মুকুট ও অলংকার, বনমালা, শ্রীবৎস-কৌস্তুভ এবং মকর-কুণ্ডল। এরপর প্রতিমা-চিন্তা থেকে তত্ত্বে প্রসারিত হয়—ঋষি, দেব ও অসুরও যাঁকে পূজে; যিনি সর্বভূতে অন্তর্যামী, সূর্য-অগ্নি-জলাদিতে ব্যাপ্ত এবং গ্রহাদিজনিত ক্লেশ নাশ করেন। শেষে ‘আমি বাসুদেব’ এই দৃঢ় বোধে আত্মধ্যান ও হরি-হরের সার-একত্ব প্রতিপাদিত হয়। এমন ধ্যান ও জপে পরম গতি লাভের প্রতিশ্রুতি, যাজ্ঞবল্ক্যের দৃষ্টান্ত এবং শংকরকেও ধ্যানের প্রেরণায় অধ্যায় সমাপ্ত।
Yājñavalkya on the Sources of Dharma and the Saṁskāras of the Twice-Born
আচারখণ্ডের নীতিনির্ধারিত জীবনের প্রসঙ্গে মহেশ্বর হরিকে জিজ্ঞাসা করেন—প্রাচীনকালে যাজ্ঞবল্ক্য কীভাবে ধর্ম উপদেশ দিয়েছিলেন। হরি বলেন, মিথিলায় ঋষিরা যাজ্ঞবল্ক্যের নিকট এসে বিষ্ণু-কেন্দ্রিক ধ্যানসমাধিস্থ অবস্থায় প্রদত্ত শিক্ষা লাভ করেন। যাজ্ঞবল্ক্য প্রথমে ধর্মের দেশ-নির্ণয় ও শাস্ত্রার্থ-নির্ণয় করেন—যেখানে কৃষ্ণমৃগ বিচরণ করে তা ধর্মভূমি, এবং পুরাণ, ন্যায়, মীমাংসা ও ধর্মশাস্ত্রের সহায়ক শাস্ত্রসমূহের সঙ্গে মিলিয়ে ধর্ম বোঝার নির্দেশ দেন। তিনি বেদকে মূল ভিত্তি বলে প্রধান ধর্মশাস্ত্র-প্রামাণ্য আচার্যদের উল্লেখ করে আচরণ নির্ণয়ে পরম্পরা-ভিত্তিক কাঠামো স্থাপন করেন। দান, সংযম, অহিংসা প্রভৃতি গুণে ধর্ম কার্যকর হয় এবং যোগসাক্ষাৎকারকে পরম ধর্ম বলা হয়। সংশয়ে বেদ–ধর্মজ্ঞদের পরিষদ বা আত্মজ্ঞ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করা হয়েছে। পরে চার বর্ণের কর্তব্য ও দ্বিজদের সংস্কার-ক্রমের সূচনা করে গৃহ্যকর্ম, দায়িত্ব ও আশ্রমধর্মের পরবর্তী বিস্তারের ভূমিকা রচনা করা হয়েছে।
Upanayana Timing, Brahmacarya Rules, Ācamana & Sandhyā Observance
আচারভিত্তিক উপদেশে যাজ্ঞবল্ক্য দ্বিজ-শৃঙ্খলাকে সুসংবদ্ধ করেন। তিনি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের উপনয়নের নির্দিষ্ট বয়স স্থির করে দীক্ষাকে শৌচ ও সদাচার-অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত করেন। দিক-শিষ্টাচার, মাটি ও জল দ্বারা শুদ্ধি, এবং আচমনের বিধি—আসন, মুখের দিক, ব্রহ্মতীর্থ-প্রয়োগ, হস্ততীর্থের বিভাগ ও জলের গুণ—বিস্তারিত বলা হয়। এরপর নিত্য শুদ্ধিকারক কর্ম—স্নান, মার্জন, প্রাণায়াম, সূর্যোপস্থান ও গায়ত্রী-জপ—ব্যাহৃতি, প্রণব ও শিরসসহ বর্ণিত হয় এবং উভয় সন্ধ্যায় অগ্নিকর্ম স্থাপিত হয়। গুরু-কেন্দ্রিক ব্রহ্মচর্যে ভিক্ষা, বিনয়, আহার-সংযম, আচার্য/উপাধ্যায়/ঋত্বিকের লক্ষণ, উপনয়ন না হলে ব্রাত্যত্বের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। নিত্য হোম ও বেদপাঠের ফল এবং প্রয়োজনে অনুমোদিত প্রতিনিধির দ্বারা কর্তব্য সম্পাদন করলেও ব্রহ্মলোক-প্রাপ্তির সিদ্ধান্তে অধ্যায়টি পরবর্তী আচরণ-অধ্যায়গুলির ভিত্তি স্থাপন করে।
An exposition of varṇa-dharma as taught by Yājñavalkya
আচার-কাণ্ডের ধারাবাহিকতায় যাজ্ঞবল্ক্য ব্রহ্মচর্য সমাপ্তির পর গৃহস্থধর্মের দায়িত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি কন্যা-নির্বাচনে চরিত্র, স্বাস্থ্য, অসপিণ্ড-অগোত্র সম্পর্ক, উপযুক্ত বয়স ইত্যাদি মানদণ্ড দেন এবং শূদ্রা স্ত্রীসহ বর্ণসংকরকে কাম্য বলে মানেন না; বর্ণভেদে স্ত্রীর সংখ্যাও উল্লেখ করেন। বিবাহের নানা রূপ তালিকাভুক্ত করে ব্রাহ্ম বিবাহকে শ্রেষ্ঠ বলেন এবং আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস, পৈশাচ প্রভৃতিকে বর্ণভিত্তিক অনুমতি ও নিন্দাসহ ক্রমানুসারে স্থাপন করেন। ধর্ম্য বিবাহ, যজ্ঞদক্ষিণা ও দানকে বংশশুদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কন্যাদান-নিয়ম, পরিত্যাগ/অপহরণের দণ্ড, বংশরক্ষায় ক্ষেত্রজ/নিয়োগসদৃশ ব্যবস্থা এবং ব্যভিচারের শাস্তি বর্ণিত। নারীর আচারগত শুচিতা স্বীকার করেও ব্যভিচার ও গর্ভহত্যার মতো মহাপাপের কঠোর সতর্কতা দেওয়া হয়। শেষে দাম্পত্য-সামঞ্জস্য, ভরণপোষণ, ঋতুকাল, অশুভ দিন বর্জন ও মানরক্ষাভিত্তিক গৃহশাসনের আদর্শ তুলে ধরে পরবর্তী গৃহস্থাচারের ভূমিকা রচিত হয়।
Saṅkara-jāti-nirṇaya and Gṛhastha-ācāra: Daily Rites, Purity, Anadhyāya, and Food Discipline
যাজ্ঞবল্ক্য প্রথমে বলেন যে তিনি সংকর-জাতি ও গৃহস্থ-আচার সম্পর্কিত বিধান শিক্ষা দেবেন। অনুলোম ও প্রতিলোম সংযোগ থেকে উৎপন্ন নানা মিশ্র বংশের উল্লেখ করে তিনি জানান, এ ধরনের জন্ম আদর্শ সমাজ-ব্যবস্থার বাইরে গণ্য; তবু বহু প্রজন্মে ক্রমোন্নতির দ্বারা দ্বিজত্বের স্বীকৃতি সম্ভব বলা হয়েছে। এরপর গৃহস্থের নিত্যকর্ম নির্ধারিত হয়—বিবাহাগ্নিতে স্মার্ত পূজা, শৌচ, প্রাতঃসন্ধ্যা, সূর্যোদ্দেশ্যে হোম, বেদ-শাস্ত্র অধ্যয়ন, পিতৃ ও দেব-অর্ঘ্য/যজ্ঞ, পঞ্চমহাযজ্ঞ-রূপ বলি, এবং কঠোর অতিথিসেবা; অতিথিকে কখনও ফিরিয়ে না দেওয়া, গুরু, স্নাতক ও রাজাকে সম্মান করা। পরে বর্ণধর্ম, অহিংসা-সত্য-শৌচ প্রভৃতি সাধারণ গুণ, এবং ত্রুটিহীন যজ্ঞ ও অশুদ্ধ যজমান বর্জনের নিয়ম বলা হয়। শেষে আচরণগত নিষেধ, অপবিত্রতা-পরিহার, অনধ্যায়ের বিধি, বিস্তৃত খাদ্যসংযম—নিষিদ্ধ আহার ও প্রায়শ্চিত্তসহ—এবং কর্মফলের সতর্কবাণী: অধর্মে পশুহিংসা নরকে নিয়ে যায়, আর ত্যাগ ও প্রার্থনা হরির পথে নিয়ে যায়।
Purification of Substances (Dravya-Śuddhi) and Rules of Ācamana
আচারকাণ্ডের ব্যবহারিক ধর্মধারায় যাজ্ঞবল্ক্য দ্রব্য-শুদ্ধির বিধান দেন। স্বর্ণ-রৌপ্যপাত্র, শঙ্খ, দড়ি, চর্মাদি নির্দিষ্ট উপায়ে শুদ্ধ হয়; আসন ও পাত্র জল দিয়ে, স্রুব/হোম-চামচ ও শস্য ছিটিয়ে ও অগ্নিতাপে। কাঠ/শৃঙ্গের উপকরণ ঘষে-খুঁটে ও ধুয়ে, উল ও রেশম উষ্ণ জল ও গোমূত্রে শুদ্ধ করা হয়। এরপর আচরণগত দোষ—স্ত্রীমুখের দিকে তাকিয়ে ভিক্ষাভোজন, পুনরায় রান্না করা, ধুলোযুক্ত, কীট/চুলে দূষিত আহার—পাপকর্ম বলে গণ্য। ভস্ম, ঝাড়ু/মার্জন, ক্ষারজল-অম্লজল-সাধারণ জল দ্বারা ধাতুশুদ্ধি, ‘অদৃষ্ট অশুচি’র স্বীকৃতি, গন্ধ ও প্রলেপ দূর করতে মাটি-জলের প্রধানতা বলা হয়েছে। গরু পান করে মাটিতে গড়িয়ে পড়া জল ও কুকুর/চাণ্ডাল-স্পর্শে পতিত মাংস অযোগ্য। স্নান, পান, হাঁচি, নিদ্রা, ভোজন, জনসমাগমের পর বারবার আচমন বিধেয়; পাঁচ ক্ষেত্রে আচমনের বদলে কর্ণস্পর্শ নির্দিষ্ট—শুদ্ধাচারের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
Dāna-vidhi: Pātra-nirṇaya, Go-dāna-mahima, and Rules of Acceptance
আচারবিষয়ক উপদেশে যাজ্ঞবল্ক্য দানের পাত্র-ক্রম নির্ধারণ করেন—বিধিনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ, আর তপস্যাসম্পন্ন ব্রহ্মবিদ সর্বোচ্চ। অযোগ্য ব্যক্তি দান গ্রহণ করবে না; এতে দাতা ও গ্রহীতা উভয়েরই অনিষ্ট হয়। সামর্থ্য অনুযায়ী শ্রদ্ধাসহ নিত্য, বিশেষত নির্দিষ্ট তিথি-উৎসবে, দান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর গো-দানের বিধান—শিংয়ে স্বর্ণ, খুরে রৌপ্য, সঙ্গে পাত্র ও দক্ষিণা; এর মহাফল স্বর্গলাভ ও পিতৃউদ্ধার, এবং গর্ভবতী গাভীকে প্রসব পর্যন্ত পৃথিবীতুল্য বলা হয়েছে। ব্রাহ্মণ-সেবার করুণ কর্ম—পরিচর্যা, ক্লান্তি দূর করা, পূজা, পদপ্রক্ষালন, ভোজনোত্তর শৌচ—পুণ্যদায়ক। ভূমি, দীপ, অন্ন, বস্ত্র, ঘৃত, আশ্রয়, জল, শয্যা ইত্যাদি দানের প্রশংসা করে শেষে বিদ্যাদানকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে; বেদার্থ, ইতিহাস বা পুরাণ লিখিয়ে দেওয়াও তাতে অন্তর্ভুক্ত। শেষে শ্রবণ ও গ্রহণের সীমা—অধম বাক্য পরিহার, কিছু প্রয়োজনীয় বস্তু প্রত্যাখ্যান না করা, কিন্তু নিষিদ্ধ উৎস থেকে দান না নেওয়া—উল্লেখ করে ধর্মনৈতিক কাঠামো স্থাপন করা হয়েছে।
Śrāddha Vidhi: Kāla (Timing), Pātra (Recipient), and Karma (Procedure) for Pitṛ-tarpaṇa and Piṇḍa
শ্রাদ্ধপ্রসঙ্গে যাজ্ঞবল্ক্য শ্রাদ্ধের যথাযথ কাল ও জ্যোতিষ-সংযোগ নির্ণয় করেন—অমাবস্যা, অষ্টকা, অয়ন/সংক্রান্তি, বিষুব, ব্যতীপাত, গ্রহণ ইত্যাদি এবং শুভাশুভ লক্ষণ। পরে পাত্র-ব্যবস্থা বলেন—দেবদের মধ্যে অগ্নি প্রধান, মানুষের মধ্যে শ্রোত্রিয়; যোগ্য বিদ্বান ও আত্মীয়দের তালিকা দিয়ে পতিত, দুরাচারী ও অবৈষ্ণবকে বর্জনীয় করেন। এরপর ক্রমিক বিধি—আগের দিন ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রণ, প্রাতে আসন-ব্যবস্থা, দেব-পিতৃ অর্ঘ্য/হবির দিক ও সংখ্যা-নিয়ম, কুশ-পবিত্র প্রস্তুতি, বিশ্বেদেব ও পিতৃ আহ্বান, দেবের জন্য যব ও পিতৃদের জন্য তিল, পিতৃকর্মে অপসব্য, অর্ঘ্য প্রদান, গায়ত্রী-ব্যাহৃতি ও ঋক্ জপ, সংযত ভোজন, ত্রুটি হলে পুনঃশুদ্ধি, পিণ্ড ও অক্ষয়-উদক, দক্ষিণা, ‘স্বধা’ উচ্চারণ ও বিসর্জন। একোদ্দিষ্ট ও সপিণ্ডীকরণ ভেদ (নারীদেরও অনুমতি), খাদ্যভেদে পিতৃ-তৃপ্তির কাল এবং তিথি-নক্ষত্র অনুযায়ী ফল-নিয়োগও উল্লেখিত।
Vināyaka-pīḍā: Omens, Purification, Crossroads Offerings, and Ambikā Svastyayana
আচারখণ্ডের এই অধ্যায়ে যাজ্ঞবল্ক্য বিনায়ক-পীড়ার লক্ষণ ও প্রতিকারবিধি বলেন। অশুভ স্বপ্ন (গভীর জল, মুণ্ডিত পুরুষ) এবং ধারাবাহিক ব্যর্থতা—বিষণ্ণতা, কাজ ভেস্তে যাওয়া, শত্রুসমাগম, রাজ্যহানি, বিবাহে বিলম্ব, গর্ভপাত—এসবকে নিমিত্ত বলা হয়েছে। পরে ধাপে ধাপে উপশমন: ফ্যাকাশে সর্ষে ও ঘিয়ে অশৌচ নিবারণ; মাটি, রোচনা, সুগন্ধি দ্রব্য ও গুগ্গুলু দিয়ে অভ্যঙ্গ-স্নানের আয়োজন, একই রঙের চার কলসে জল এনে বিধিপূর্বক স্থাপন। পবমান মন্ত্রে শুদ্ধি, বরুণ-সূর্য-বৃহস্পতি-ইন্দ্র-বায়ু-সপ্তর্ষির আশীর্বাদে মস্তক ও ইন্দ্রিয় থেকে দুর্ভাগ্য দূর করার প্রার্থনা। স্নানের পর সর্ষের তেলে স্নুহী-ক্ষীর ও উদুম্বর মিশিয়ে লেপ, কুশা প্রভৃতি দিয়ে নির্দিষ্ট আহুতি। শেষে চৌমাথায় কুষ্মাণ্ড ও রাজপুত্রকে নানা খাদ্য ও মদ্যসহ বলি, তারপর অম্বিকাকে অর্ঘ্য দিয়ে রূপ, যশ, শ্রী, পুত্র ও ইষ্টসিদ্ধি কামনা। ব্রাহ্মণভোজন, দান, গুরুকে বস্ত্র, নবগ্রহপূজা ও সূর্যভক্তিতে শুভ পুণ্য স্থির হয়।
Graha-yajña-vidhi (Procedure for the Planetary Sacrifice)
আচারভিত্তিক ক্রিয়াবিধির ধারাবাহিকতায় যাজ্ঞবল্ক্য শান্তি, ঐশ্বর্য এবং গ্রহদোষ ও অভিচারজনিত কষ্টনিবারণের জন্য প্রতিকারমূলক ও সমৃদ্ধিদায়ক গ্রহযজ্ঞের বিধান দেন। প্রথমে সূর্য থেকে কেতু পর্যন্ত নবগ্রহের নাম উল্লেখ করে ধাতু ও দ্রব্যের সঙ্গে যুক্ত বর্ণভেদ অনুযায়ী বস্ত্রে গ্রহপ্রতিমা অঙ্কনের নিয়ম বলেন। পরে প্রতিমাস্নান, গ্রহোপযোগী দ্রব্যে হোম, এবং বলি, গন্ধ ও ধূপার্পণ—বিশেষত গুগ্গুলুধূপ—নির্দেশিত। মন্ত্রোচ্চারণের কঠোর ক্রম, সমিধার ধারাবাহিক তালিকা (অর্ক, পলাশ, খদির, অপামার্গ, পিপ্পল, ঔদুম্বর, শমী, দূর্বা, কুশ) এবং রান্না করা হব্যের বিবরণ (মধু-ঘৃত, দধি, গুড়ভাত, ক্ষীরান্ন, ষাষ্টিক হবি, পিঠা, মাংস ও নানা অন্ন) দেওয়া হয়েছে। শেষে দক্ষিণার দ্রব্যসমূহ জানিয়ে বলা হয়, নিয়মিত গ্রহপূজায় রাজ্যপ্রাপ্তি ও অন্যান্য সমৃদ্ধি লাভ হয়; পরবর্তী অধ্যায়ে প্রয়োগ, কাল ইত্যাদি আরও বিশদ হবে।
Vānaprastha-Dharma: Forest Discipline, Vows, Seasonal Tapas, and Equanimity
আচারখণ্ডের আশ্রম-নির্দেশে যাজ্ঞবল্ক্য বনপ্রস্থধর্ম বর্ণনা করেন। পুত্রদের হাতে পত্নীর ভার অর্পণ করে (অথবা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে) গৃহত্যাগ করে অরণ্যে গমন করতে বলেন। বৈদিক বিধানে অগ্নি রক্ষা, দেব-পিতৃ-অতিথি পূজা, ক্ষমা ও শৌচ পালন, এবং হাল না চালিয়ে প্রাপ্ত আহারে জীবনধারণের কথা আছে। জটা-দাড়ি ধারণ, তিন সন্ধ্যায় স্নান, দান গ্রহণ না করা, প্রয়োজনীয় বস্তু মিতভাবে সংগ্রহ—এসব লক্ষণও বলা হয়েছে। আশ্বযুজে প্রক্রিয়াজাত/রান্না খাদ্য ত্যাগ, দন্তোলূখলিক আদর্শে অল্পাহার, চন্দ্রায়ণ ব্রত, ভূমিশয়ন, এবং ঋতু-তপস্যা—গ্রীষ্মে পঞ্চাগ্নি, বর্ষায় স্থাণ্ডিলে শয়ন, শীতে ভেজা বস্ত্রসহ যোগ—নির্দেশিত। শেষে শিক্ষা: আঘাত বা সম্মান—উভয় অবস্থায় সমচিত্ত, সন্তুষ্ট ও অক্রোধী থাকা; এটাই পরবর্তী ত্যাগের ভিত্তি।
Bhikṣu-Dharma and the Paramahaṃsa Ideal
আচারখণ্ডের ধারাবাহিকতায় যাজ্ঞবল্ক্য বলেন—বৈদিক কর্তব্য ও দক্ষিণাসহ যজ্ঞ-অর্ঘ্য যথাবিধি সম্পন্ন করার পর ভিক্ষুর ধর্ম কী। প্রাজাপত্য-ব্রতের শেষে তিনি যজ্ঞাগ্নিকে অন্তরে স্থাপন করে শান্ত, সর্বভূত-হিতৈষী হন এবং ত্রিদণ্ড ও কমণ্ডলু ধারণ করেন। ভোগস্থল এড়িয়ে কেবল ভিক্ষার জন্য গ্রামে প্রবেশ করেন, সন্ধ্যার পরে নীরবে, দৃষ্টি আকর্ষণ না করে ভিক্ষা চান। পরে তপস্বীদের স্তরভেদ—অল্প ভ্রমণকারী ও লোভমুক্ত সাধু পরমহংস হতে পারেন; অথবা একদণ্ড ধারণ করে যমসদৃশ সংযম-নিয়মে জীবনযাপন করেন। উপসংহারে যোগসিদ্ধি ও দেহত্যাগে মোক্ষের কথা, এবং দান, অতিথিসেবা ও শ্রাদ্ধে নিবেদিত গৃহস্থেরও মুক্তিলাভ—শৃঙ্খলিত কর্ম ও অন্তর্বৈরাগ্যের মিলনে মোক্ষপথ প্রকাশিত।
Karma-vipāka: Rebirths and Bodily Marks Resulting from Specific Sins
প্রেতকল্পের পরলোক-উপদেশে যাজ্ঞবল্ক্য বলেন—নরকভোগে মহাপাপ ক্ষয় হলে জীব কর্মানুসারে আবার দেহধারণ করে। ব্রহ্মহত্যা ও সুরাপানে অধম পশুযোনি; সোনা, অন্ন, ধান্য, ফল, গবাদি পশু, বস্ত্র, লবণ চুরিতে কীট, ইঁদুর, পাখি, বানরাদি জন্ম, আর মানবদেহে বিকলাঙ্গতা ও দারিদ্র্য ঘটে। গুরুর শয্যা লঙ্ঘন (গুরুপত্নীগমন) উদ্ভিদযোনি দেয়; নিন্দা ও বিশ্বাসঘাত থেকে দুর্গন্ধ, পচা মুখের মতো ইন্দ্রিয়কলঙ্ক ও সামাজিক হীনতা প্রকাশ পায়। শেষে বলা হয়—এমন জন্মসমূহের পর কলুষ নাশ হলে জীব পুনরায় শুভলক্ষণ, সম্পদ এবং যোগসাধনার উপযোগী উচ্চ মানবাবস্থা লাভ করতে পারে—ফলভোগ থেকে শুদ্ধি ও ধর্মপুনর্বাসের দিকে অগ্রসরতা।
Prāyaścitta: Catalogue of Sins, Narakas, and Graded Expiations (Kṛcchra–Cāndrāyaṇa–Japa)
এই অধ্যায়ে আচারখণ্ডের ধারায় অধঃপতনের কারণ-শৃঙ্খল বলা হয়েছে—বিহিত কর্তব্য অবহেলা, নিন্দিত কর্মাচরণ ও ইন্দ্রিয়-অসংযম। প্রায়শ্চিত্তে ব্যক্তি ও সমাজে ধর্মীয় সাম্য ফিরে আসে; প্রায়শ্চিত্ত না করলে নরকগতি—এ কথা বলে নানা নরকের নাম ক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর মহাপাতক—ব্রহ্মহত্যা, সুরাপান, স্বর্ণচৌর্য, গুরুতল্পগমন—এবং কামদোষ, প্রতারণামূলক জীবিকা, অযোগ্য উপদেশ/দানগ্রহণ, নিষিদ্ধ দ্রব্যের বাণিজ্য, কর্তব্যত্যাগ প্রভৃতি উপপাপের শ্রেণিবিন্যাস আছে। তারপর স্বীকারোক্তি ও তপস্যাময় জীবন, ব্রাহ্মণবধে দীর্ঘ ব্রত, মদ্যপান-স্বর্ণচুরি-গুরুতল্পের জন্য নির্দিষ্ট দণ্ডপ্রায়শ্চিত্ত, গোহত্যা, বর্ণভেদে হত্যাপাপ, পশু ও উদ্ভিদহিংসার বিশেষ প্রায়শ্চিত্ত দেওয়া হয়েছে। শেষে সান্তপন, মহাসান্তপন, পর্ণকৃচ্ছ্র, পাদকৃচ্ছ্র, প্রাজাপত্য, অতীকৃচ্ছ্র, পরাক, সৌম্যকৃচ্ছ্র, তুলাপুরুষ, চন্দ্রায়ণ প্রভৃতি প্রধান ব্রত সাজিয়ে জপ-প্রাণায়াম ও যম-নিয়মকে নৈতিক ভিত্তি বলে স্থায়ী ধর্মশৃঙ্খলার ভূমিকা স্থাপন করা হয়েছে।
Āśauca and Udaka-kriyā: Post-Cremation Conduct, Eligibility, and Purifiers
প্রেতকল্পের এই অধ্যায়ে যাজ্ঞবল্ক্য মৃত্যুর পরপরই করণীয় আচারের ধারাবাহিক নির্দেশ দেন। আত্মীয়েরা শ্মশানে গিয়ে যমসূক্ত পাঠ করে এবং আচরণ-নিয়ম অনুসারে সপ্তম বা দশম দিন থেকে উদক-ক্রিয়া (জল-তর্পণ) শুরু করে; দিকনির্দেশ ও মন্ত্রও নির্দিষ্ট। মাতামহ, গুরু ও গুরুপত্নীর জন্যও উদকদান, এবং কামোদকার যোগ্য পাত্র—পুত্র, বন্ধু, ভগ্নীপুত্র, শ্বশুর, পুরোহিত—উল্লেখিত; কিন্তু পাষণ্ডী/পতিত, ব্রাত্য, মদ্যপ-মত্ত, আত্মহত্যাকারী প্রভৃতি অযোগ্য। পরে গৃহপ্রবেশ-শুদ্ধি—নিম চিবানো, আচমন, অগ্নি ও জল বহন, গোবর ও সর্ষে স্পর্শ, পাথরে পা রাখা—ইত্যাদি; কোথাও কেবল দর্শনে, কোথাও স্নান ও সংযমে অশৌচ দূর হয়। তিন দিন প্রেতভোজনকে পিণ্ড-ধর্মের অঙ্গ বলা হয়েছে, নৈশিকী-ব্রত এবং বয়স ও মৃত্যুকারণভেদে অশৌচের মেয়াদও। শেষে শৌচের সাধারণ শোধক—কাল, অগ্নি, তপ, জপ, উপবাস—গ্রাহ্য নিবেদন এবং ব্যবসা-জীবিকায় ধর্মসীমা জানিয়ে পরবর্তী প্রেতকর্ম ও শ্রাদ্ধবিধির ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে।
Varṇāśrama-ācāra, Aśauca (Sūtaka) Regulations, and Prāyaścitta with Funeral-Rite Notes
আচারখণ্ডের ধর্মশিক্ষা অব্যাহত রেখে সূত জানান—পরাশর ব্যাসকে বলেছেন, ধর্ম জানা যায় শ্রুতি‑স্মৃতি‑সদাচার দ্বারা; কলিযুগে দান প্রধান, এবং কর্মফল দ্রুত পরিপক্ব হয়। এরপর নিত্যাচারের ষট্কর্ম—সন্ধ্যা, স্নান, জপ, হোম, দেবপূজা ও অতিথি‑সেবা—নির্দেশিত হয়; বর্ণানুসারে জীবিকা এবং নিষিদ্ধ আহার, চুরি, পরস্ত্রী‑সংগ ইত্যাদি ধর্মপতনের কারণও বলা হয়েছে। তারপর জন্ম‑মৃত্যুর আশৌচের বিস্তৃত বিধান—বর্ণ, আত্মীয়তার স্তর ও পরিস্থিতি অনুসারে শুদ্ধিকাল; দূরস্থ মৃত্যু, দাঁত না ওঠা শিশু, গর্ভপাত, ভঙ্গব্রত পুনঃস্থাপন প্রভৃতি বিশেষ প্রসঙ্গসহ। কিছু পেশা/অবস্থায় তৎক্ষণাৎ শুদ্ধি, বিবাহ‑যজ্ঞে আশৌচ‑বিঘ্নের নিয়ম, শববহন, আত্মহত্যা/বিষ/ফাঁসি ইত্যাদি ক্ষেত্রও উল্লেখিত। শেষে দাহসংস্কার, অরণিমন্থন, অর্ঘ্য‑পিণ্ডাদির ফলশ্রুতি এবং বর্ণভেদে পশু‑মানববধের প্রায়শ্চিত্তের স্তরবিন্যাস দিয়ে পরবর্তী অধ্যায়গুলির ভূমিকা রচিত হয়েছে।
Nītisāra: Virtuous Association, Household Dharma, and Kāla (Time) as the Supreme Regulator
আচারভিত্তিক উপদেশের ধারায় সূত নীতিসারের সংক্ষিপ্ত শিক্ষা দেন—অর্থশাস্ত্রসম্মত প্রজ্ঞায় প্রতিষ্ঠিত, যা সংসারে স্থিতি ও পরলোকে পুণ্য আনে। প্রথমে ‘সঙ্গ-নীতি’: সজ্জনের সঙ্গ করো, দুষ্টকে বর্জন করো, তুচ্ছ বাক্য ত্যাগ করো, ভুল ঘনিষ্ঠতায় শত্রুকে শক্তি দিও না; কুসঙ্গ ও গৃহকলহে বিদ্যাও নষ্ট হয়। এরপর ‘কাল’কে অজেয় নিয়ন্তা বলা হয়েছে—দৃশ্য ক্রম ও সূক্ষ্ম অন্তর্গত গতিতে সে সকলকে পরিপক্ব করে বিলীন করে। বৃহস্পতির ইন্দ্রকে উপদেশের দৃষ্টান্তে শাস্ত্রের প্রামাণ্য, বিবেক ও বিজয়ের ফল প্রতিষ্ঠিত। নিন্দা, লোভ, পরস্ত্রীগমন, পরাশ্রয়ী জীবন ইত্যাদি সংযম নির্দেশিত, এবং ব্যবহারিকভাবে আত্মীয়তা ও বিশ্বাসের পুনর্নির্বচন আছে। শেষভাগে গৃহস্থধর্ম, শুভ পত্নীর লক্ষণ ও ধ্বংসাত্মক গৃহদোষের সতর্কতা; শেষে স্মরণ—যৌবন, ঔষধ, নিরাপত্তা সবই কালের গ্রাসে, তাই অনিত্যবোধে পরবর্তী নীতিগুলি স্থিত।
Nīti for Calamity, Wealth, Friendship, Charity, and Restraint of Kāma
সূত অস্থির সময়ে ধর্ম রক্ষার জন্য নীতি-সংগ্রহ বলেন। তিনি অগ্রাধিকার স্থির করেন—ধন পরিবার রক্ষা করতে পারে, কিন্তু সর্বাগ্রে আত্মরক্ষা। পরের পদক্ষেপ বিচার না করে নিরাপদ ভূমি ত্যাগ নয়; বিপদ, কৃপণতা বা প্রতারণায় দুষ্ট দেশ, রাজা ও বন্ধুত্ব পরিত্যাজ্য। ক্ষমতা বন্ধু টানে, পতনে প্রকৃত অনুগত চেনা যায়; বিপদে, গোপনে, যুদ্ধে ও অভাবে চরিত্রের পরীক্ষা হয়। ভিন্ন স্বভাবের লোককে বোঝানোর উপায় এবং নিজের ক্ষতি ও গৃহকষ্ট গোপন রাখার পরামর্শ আছে। সঞ্চয় ও কৃপণতা নিন্দিত—দানহীন ধন শোক আনে, ধনের জন্য পাপ মৃত্যুর পরও অনুসরণ করে। পরে সংযমের কথা—বিদ্যা ও ধর্ম ধীরে বাড়ে; অসংযত কামনা অতৃপ্ত, তাই নিয়ন্ত্রণ ও সদাচার অপরিহার্য। শেষে ধর্মের সূক্ষ্মতা জানিয়ে মহাজন-মার্গ অবলম্বনের নির্দেশ এবং ধন, সত্য, যোগ ও রাজ্য থেকে পতনের ফল সংক্ষেপে বলা হয়েছে।
Nīti-Upadeśa: Discernment, Proper Use of Resources, and Social Strategy
আচারখণ্ডের ব্যবহারিক ধর্মশিক্ষা অব্যাহত রেখে সূত শৌনক ও সমবেত ঋষিদের নীতিসূক্তি শোনান। তিনি সতর্ক করেন—অনিত্যকে ধাওয়া করলে স্থায়ী লাভও নষ্ট হয়; বিদ্যা ও সমৃদ্ধি অন্তর্গত সামর্থ্যের উপর নির্ভর—বাকশক্তি, হজমশক্তি, সৎসঙ্গে সংযত কামনা এবং দানের ইচ্ছা। বেদের ফল অগ্নিহোত্রে, মঙ্গল সদাচারে, বিবাহের ফল প্রেম ও সন্তান, আর ধনের ফল দান ও ধর্ম্য ভোগে—এভাবে নির্ণয় করা হয়। পরে সামাজিক প্রজ্ঞা—বিবাহ ও বংশবিচার, সন্দেহজনক উৎস থেকেও কখন উত্তম উপদেশ/স্বর্ণ/বিদ্যা গ্রহণযোগ্য, এবং রাজমিত্রতার অস্থিরতা। গৃহশাসনে কাজ বণ্টন, পুত্রশিক্ষা, বিপদে শত্রুকেও কাজে লাগানো, মানুষ ও অলংকার যথাস্থানে স্থাপন। শত্রুনীতিতে দুষ্টের সঙ্গে সন্ধি বর্জন, মিষ্টভাষী দূতের প্রতি সতর্কতা, এক শত্রু দিয়ে অন্যকে দমন, এবং অভ্যাসগত অপরাধীর নিজের গতিতেই পতন। শেষে ভাগ্য ও সময়োচিত কর্ম, ব্যবহারিক বিষয়ে অযথা লজ্জা ত্যাগ, সুস্থ রাষ্ট্রে বাসের লক্ষণ, এবং সর্বজ্ঞতার দাবি নয়—জ্ঞানমাত্রার বোধই প্রজ্ঞা।
Characteristics of the King and His Servants (Rāja-dharma, Nīti, and Ethical Revenue)
সূত রাজাধিরাজের নিত্যকর্তব্য বলেন—সত্য ও ধর্মে পৃথিবী রক্ষা, শত্রু দমন, এবং ন্যায়ে শাসন। রাজস্ব গ্রহণে ফুল তোলা ও দুধ দোহনের উপমা—প্রয়োজনমতোই গ্রহণ, শোষণ করলে প্রজার সমৃদ্ধি নষ্ট হয়। এরপর অনিত্যতা—রাজ্য ও ধন অস্থির, জরা-ব্যাধি এগোয়, আয়ু ক্ষয় হয়; তাই রাজা কল্যাণকর কর্ম গ্রহণ করে, দ্বিজদের সম্মান করে, হরির আরাধনা করবে। শাসননীতি—অধিকার চাই যাতে ধর্মসম্মত বাক্য বাধাপ্রাপ্ত না হয়; ধন সঞ্চয় রক্ষার্থে এবং শেষে ব্রাহ্মণদের দানের জন্য। ওঙ্কার ও পবিত্রতা পুষ্টি-আরোগ্য আনে। শাস্ত্র রাজার চক্ষু; অবিনীত পুত্র, ভৃত্য, মন্ত্রী ও পুরোহিত দ্রুত সর্বনাশ ঘটায়। বিপদে সমতা, কলা ও দণ্ডনীতির চর্চা, ক্রোধ-হুমকি সংযম, ভোগের সময়ও শত্রু-সতর্কতা, ষড়বিধ উদ্যোগ; তবু ফল না এলে দৈবও মান্য—এমন উপদেশ।
Sevaka-parīkṣā (Testing and Appointment of Servants) and Rājadharma Outcomes
আচারখণ্ডের রাজনীতি ও সদাচারের ধারাবাহিকতায় সূত কর্মচারীদের তিন শ্রেণি (উত্তম, মধ্যম, অধম) নিরূপণ করে বলেন—প্রকৃতি অনুযায়ী কাজেই তাদের নিয়োগ করা উচিত। স্বর্ণপরীক্ষার ন্যায় চার প্রকার পরীক্ষা—শৃঙ্খলা, আচরণ, দক্ষতা ও কর্ম—উপস্থাপিত। এরপর কোষাধ্যক্ষ, রত্নপরীক্ষক, সেনাপতি, প্রতীহার, লেখক, দূত, ধর্মাধ্যক্ষ/বিচারক, রাঁধুনি, চিকিৎসক ও রাজপুরোহিতের আদর্শ যোগ্যতা বর্ণিত। অবিশ্বাস্য স্বভাবের লোকদের নিয়োগে নিষেধ, এবং দুষ্ট ব্যক্তি বিদ্বান হলেও বিপজ্জনক বলা হয়েছে। নিষ্ঠুর, লোভী, প্রতারক, ভীতু বা অদক্ষ কর্মচারী ত্যাগ, দুর্গে অস্ত্রসঞ্চয়, শক্তি সঞ্চয়ে সন্ধি, এবং মূর্খকে পদ না দেওয়ার নীতি নির্দেশিত। শেষে বলা হয়—কর্মচারীদের কর্মে রাজার সমৃদ্ধি সূক্ষ্মভাবে ওঠানামা করে; প্রশাসন ও ধর্ম অবিচ্ছেদ্য।
Sat-saṅga, Dharma-Nīti, Karma-Phala, Śauca, and Vairāgya (Overcoming Grief)
সূত শৌনককে বলেন, ধর্মের ভিত্তি হলো সৎসঙ্গ নির্বাচন—বিদ্বানরা সদ্গুণের আধার, মূর্খরা দোষ প্রকাশ করে; তাই দুষ্টদের সমৃদ্ধির মধ্যে থাকার চেয়ে সংযমীদের সঙ্গে বন্দিত্বেও থাকা শ্রেয়। এরপর নীতিশিক্ষা—কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে, আর রাজা মৌমাছির মতো প্রজার ‘পুষ্প’কে কষ্ট না দিয়ে ধীরে ধীরে রাজস্ব সংগ্রহ করবে, যাতে ধন ও পুণ্য বিন্দু বিন্দু করে বাড়ে। পরে কর্মফল ও নিয়তির কথা—পদ, বীরত্ব বা জ্যোতিষীয় শুভতা পূর্বকর্মের পরিপাককে ঠেকাতে পারে না; পাণ্ডব, বলি, রাবণ ও সীতার দৃষ্টান্তে বোঝানো হয় যে প্রত্যেকে নিজের কর্মই ভোগ করে, কোনো আশ্রয় তা এড়াতে পারে না। শৌচের মূল বলা হয়েছে খাদ্যশুদ্ধি, সত্য, মনঃপবিত্রতা, ইন্দ্রিয়সংযম, দয়া ও দেহপরিচ্ছন্নতা; বাহ্য আচার অপেক্ষা চরিত্রই প্রধান। শেষে শোকনাশক দৃষ্টি—গাছ ছেড়ে পাখির উড়ে যাওয়ার মতো বিচ্ছেদ স্বাভাবিক; আসক্তি থেকে ভয় ও দুঃখ জন্মায়; সন্তোষ, অন্তঃস্থিরতা ও বর্তমানমুখী মনোযোগে বিলাপ দূর হয়, পরবর্তী ধর্মফল-ব্যবস্থার উপদেশের ভূমি প্রস্তুত হয়।
Nīti on Friendship (Mitra), Discretion, Restraint, Health-Regimens, Prosperity (Śrī), and Family Dharma
সূত শৌনককে উপদেশ দেন—মৈত্রী ও বৈর স্বভাবগত নয়, পরিস্থিতি থেকে জন্মায়; তবু সত্য বন্ধু বিরল, বিশ্বাসের আশ্রয়। সৌহার্দ রক্ষায় জুয়া, ধনের অপব্যয় ও গোপন ব্যভিচার বর্জন, ইন্দ্রিয়সংযম ও বিবেক—দোষ ও মন্ত্র গোপন রাখা—জোর দিয়ে বলা হয়েছে। নীতিতে মৃদুতা-তীক্ষ্ণতার পরিমিত ব্যবহার এবং মিত্রের প্রতিও সতর্কতা; মন রক্ষা জরুরি, কারণ দেহের বল-প্রাণ মনেই নির্ভর। আয়ু-নীতিতে আহার-বিহারের বিধি (রাতে দই, দিনে ঘুম, ভোরে সহবাস, শৌচাচার ইত্যাদি) ও শুভাশুভ লক্ষণ (ধূলি, ছায়া) উল্লেখ করে আচরণকে দীর্ঘায়ু ও লক্ষ্মীর নিবাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পরে সন্তান-পরম্পরা—এক সদ্গুণী পুত্রও বংশকে উন্নীত করে; বয়সভেদে শিক্ষা-শাসন, পিতৃবিয়োগে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার রক্ষকধর্ম। শেষে দানের ছলে চুরি, দেব-ব্রাহ্মণ অপরাধ নিষিদ্ধ, আর কৃতঘ্নতাকে বিশেষত অপ্রায়শ্চিত্ত্য বলে গৃহধর্মকে কর্মফল ও হরিনামের মোক্ষ-মূল্যের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
Nīti-saṅgraha: Conduct, Association, Kali-yuga Decline, and the Supremacy of Vidyā
আচারভিত্তিক উপদেশধারায় সূত নীতিবাক্যের ঘন সংকলন দেন—দুষ্ট সঙ্গ, দুর্নীতিগ্রস্ত বন্ধু, অন্যায় রাজা ও অস্থির সম্পর্ক এড়াতে বলেন। কলিযুগে ধর্ম-তপস্যা-সত্য ক্ষয় হয়, সমাজে উলটপালট ও লোভ বাড়ে—এ কথা স্পষ্ট করা হয়েছে। মূল সূত্র ‘সঙ্গ’: ঘনিষ্ঠতা, একসঙ্গে থাকা ও অন্ন ভাগাভাগিতে অশুচি ও পাপ সংক্রমিত হতে পারে, তাই সঙ্গ, খাদ্য-আদানপ্রদান ও বিশ্বাসে সতর্কতা জরুরি। এরপর সংযম, মানরক্ষা, বিবেকচর্চা এবং যৌবন-ধন-ক্ষমতা-জোটের ক্ষণস্থায়িত্ব স্মরণ করানো হয়। ঋণ, রোগ, দুষ্টের প্রতিকার, রাজনৈতিক নির্ভরতা এবং ভয়-দারিদ্র্যের লক্ষণ নিয়ে ব্যবহারিক পরামর্শ আছে। শেষে বিদ্যাকে সর্বশ্রেষ্ঠ নিরাপদ ধন ও কুলীনতার কারণ বলে মহিমান্বিত করে, বিষ্ণু→শৌনক/শঙ্কর→ব্যাস→সূত পরম্পরার উল্লেখে অধ্যায়ের প্রামাণ্য স্থাপন করা হয়।
Vows and Deity-Worship According to Tithi (Pratipadā to Amāvāsyā), plus Weekdays, Nakṣatras, and Yogas
আচার-নির্ভর উপদেশের ধারাবাহিকতায় ব্রহ্মা ব্যাসকে মাসিক ব্রত-ব্যবস্থা বলেন, যেখানে শুভ তিথি-নক্ষত্র-বারের সংযোগে হরির পূজা করা হয়। একভুক্ত, নক্তভোজন, উপবাস ইত্যাদি সাধারণ নিয়মে ভগবান প্রসন্ন হয়ে ধন, ধান্য, পুত্র, রাজ্য, বিজয় প্রভৃতি ফল দেন। এরপর তিথি অনুযায়ী দেবতা-নির্দেশ—প্রতিপদায় বৈশ্বানর ও কুবের (এবং পোষ্য, শ্রী ও অশ্বিনী-রূপে ব্রহ্মা), দ্বিতীয়ায় যম ও লক্ষ্মী-নারায়ণ, তৃতীয়ায় গৌরী, বিঘ্নেশ ও শঙ্কর, চতুর্থীতে চতুর্ব্যূহ, পঞ্চমীতে হরি, ষষ্ঠীতে কার্ত্তিকেয় ও রবি, সপ্তমীতে ভাস্কর, অষ্টমী-নবমীতে দুর্গা/মাতৃগণ ও দিকপাল, দশমীতে যম ও চন্দ্র, একাদশীতে ঋষিগণ, দ্বাদশীতে হরি, ত্রয়োদশীতে কাম, চতুর্দশীতে মহেশ্বর; এবং চতুর্দশী-পূর্ণিমার সঙ্গে ব্রহ্মা ও পিতৃদের সম্পর্ক বলা হয়েছে। শেষে অমাবস্যায় বার-নক্ষত্র-যোগ পূজার বিস্তার করে পরবর্তী অংশে এই কালভিত্তিক আচার ও ফলবিশেষের ব্যাখ্যার ভূমিকা রচিত হয়েছে।
Vyāsāṅga Trayodaśī: Month-by-Month Śiva Worship, Dantadhāvana Observances, and Udyāpana
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা মার্গশীর্ষ শুক্ল ত্রয়োদশী (ব্যাসাঙ্গ) কেন্দ্র করে একটি সুবিন্যস্ত বার্ষিক ব্রত নির্ধারণ করেন। সারা বছর মাসভেদে শিবপূজার নিয়ম—বিশেষ ফুল, পত্র, সুগন্ধি ও নৈবেদ্য—বর্ণিত হয়েছে। দন্তধাবন (দাতুন) শুচিতা-আচরণ ও নিবেদন—উভয় রূপে বারবার যুক্ত; মাস অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দন্তকাষ্ঠ এবং মধু, কর্পূর, চন্দন, অগুরু, লবঙ্গ প্রভৃতি সহায়ক দ্রব্য নির্দিষ্ট। মার্গশীর্ষ থেকে কার্তিক পর্যন্ত ক্রম চলতে চলতে বছরের শেষে পদ্মপূজায় সমাপ্তি নির্দেশিত। পরে উদ্যাপনে স্বর্ণমণ্ডলে অনঙ্গ প্রতিষ্ঠা, তিল ও চাল দিয়ে বিস্তৃত হোম, সঙ্গীতসহ রাত্রিজাগরণ, প্রভাতে পূজা, ব্রাহ্মণকে দান এবং গাভী ও ব্রাহ্মণভোজনের বিধান আছে। শেষে এই উদ্যাপন-পদ্ধতিকে সকল ব্রতের সাধারণ আদর্শ বলে আচারখণ্ডের পরবর্তী নির্দেশের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
Akhaṇḍa-Dvādaśī Vrata: Mārgaśīrṣa Fast, Viṣṇu-Pūjā, and Four-Month Dāna
এই অধ্যায়ে আচাৰ-প্রধান ধারায় ব্রহ্মা মোক্ষ-সহায়ক ‘অখণ্ড-দ্বাদশী’ ব্রত বর্ণনা করেন। মাৰ্গশীৰ্ষ শুক্লপক্ষে কেবল গোময়াদি গব্য পদার্থে জীবনধারণ করে উপবাস, এবং দ্বাদশীতে ভগবান বিষ্ণুর পূজা বিধেয়। পরে চার মাসব্যাপী দান-নিয়ম যুক্ত হয়—পাঁচ প্রকার শস্যভরা পাত্র ব্রাহ্মণকে মন্ত্রসহ দান করে সাত জন্মের পুণ্য ‘অখণ্ড’ থাকুক বলে প্রার্থনা করা হয়। ভক্তের পুণ্য-ধারাবাহিকতাকে পুরুষোত্তম বিষ্ণুর অখণ্ড বিশ্বরূপের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে চৈত্রাদি মাসে সত্তু-দান, শ্রাবণাদি মাসে ঘৃতসহ অর্পণ দ্বারা সমাপ্তি-লক্ষণ, শেষে স্বর্গলাভ ও কুলকল্যাণ বলা হয়েছে; একদিনের ভক্তি কীভাবে দীর্ঘ ধর্মাচরণে প্রসারিত হয় তা দেখানো হয়েছে।
Agastya Arghya Vrata—Timing, Mantra, and Dāna फल
আচারনিষ্ঠ ব্রতক্রমে ব্রহ্মা ঋষি অগস্ত্যকে উদ্দেশ করে এক বিশেষ ব্রতের বিধান বলেন, যা ভোগ ও মোক্ষ—উভয়ই প্রদান করে। সূর্যোদয়ের আগে এবং তিন দিনের শুভ সময়সীমার মধ্যে প্রতিমাপূজা, অগস্ত্যকে অর্ঘ্যদান ও প্রদোষকালে জাগরণ নির্দিষ্ট। দই, অক্ষত, ফল, ফুল ইত্যাদি নিবেদন করে শেষে পাঁচ রঙে সজ্জিত স্বর্ণ-রৌপ্যযুক্ত দান করার কথা বলা হয়েছে। “অগস্ত্যঃ খনমান…” মন্ত্রে সাত শস্যভরা পাত্রে দই ও চন্দনলেপন করে অর্ঘ্য দেওয়া হয় এবং কুম্ভযোনি জন্ম ও মিত্র-বরুণ বংশের স্তব করা হয়। শূদ্র ও নারীরাও ত্যাগ-দান দ্বারা অংশ নিতে পারে; তবে ব্রাহ্মণকে স্বর্ণসহ জলকলস ও দক্ষিণা দান করে সাত ব্রাহ্মণকে ভোজন করাতে হবে। এক বছর পালন করলে পূর্ণ পুণ্যফল লাভ হয়।
Rambhā-Tṛtīyā Vrata: annual cycle of Devī worship, offerings, and dāna
ব্রহ্মা রম্ভা-তৃতীয়া ব্রতবিধি বর্ণনা করেন। মার্গশীর্ষ শুক্ল তৃতীয়ায় উপবাস করে কুশা-সংস্কৃত জলে বিল্বপত্রে গৌরী পূজা করতে হয়। এরপর মাসে মাসে তীর্থ/পবিত্র স্থানে (কদম্বাদি) পূজা, মরুবক, কর্পূর, কৃসর, মণ্ডক মিষ্টি, নীলপদ্ম ইত্যাদি নৈবেদ্য ও নির্দিষ্ট দন্তকাষ্ঠের বিধান আছে। ফাল্গুনে গোমতী পূজা গীতসহ ও কুন্দ দন্তকাষ্ঠ; চৈত্রে দমনক শাখা, বিশালাক্ষী/শ্রীমুখী/টগর আরাধনা; বৈশাখ–আষাঢ়ে কর্ণিকার, নারায়ণীর জন্য শতপত্র পদ্ম ও মাধবী পূজা। শ্রাবণ–কার্তিকে তিল, বিল্ব, ক্ষীরান্ন, উদুম্বর দন্তকাষ্ঠ, পদ্মপূজা, রাজপুত্রীকে জিরা ও জবা ফুল, এবং কৃসর নৈবেদ্য। বছরের শেষে পঞ্চগব্য, পদ্মজা লক্ষ্মী পূজা, পত্নীসহ ব্রাহ্মণভোজন; শেষে শৌচ-প্রধান সমাপন—উমা-মহেশ্বর পূজা, গুড় অর্পণ, রাত্রিজাগরণ, বস্ত্র-ছত্র-স্বর্ণ-বাদ্য দান ও প্রাতে গোদান—আচারখণ্ডের পরবর্তী ব্রত-দান-শৌচ বিধির ভূমিকা।
Cāturmāsya Observances—Commencement, Austerities, and Fruits
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা চাতুর্মাস্য-ব্রতের আরম্ভবিধি বলেন। আষাঢ়ের পূর্ণিমা-ঋতুর সঙ্গে যুক্ত শুভ একাদশীতে কেশবের পূজা করে নির্বিঘ্ন সিদ্ধির প্রার্থনা করতে হয়, এবং মাঝপথে মৃত্যু এলে যেন কৃপায় ব্রত সম্পূর্ণ হয়—এমন নিবেদনও করতে বলা হয়েছে। এরপর স্নান, আচমন, পূজা, মন্ত্রজপ ও সংযমিত জীবনযাপনের সমন্বিত নিত্যাচার বর্ণিত, যা পাপ নাশ করে। তপস্যা তীব্রতা অনুযায়ী ফল দেয়—চার মাস একভক্তে বিষ্ণুলোক; মদ্য-মাংস-মাদক ও তেল ত্যাগে বিষ্ণুর প্রসাদ এবং কৃচ্ছ্রব্রতের সমান পুণ্য। একরাত্রি ও ত্রিরাত্রি উপবাসে স্বর্গগমন ও শ্বেতদ্বীপপ্রাপ্তি; চন্দ্রায়ণ, প্রাজাপত্য, পরাক প্রভৃতি বিষ্ণুধাম ও মোক্ষদায়ক। শেষে যব, দুগ্ধ, পঞ্চগব্য, ফল-মূলাদি সাত্ত্বিক আহারকে ব্রত-সহায়ক বলে পরবর্তী বিধিবিস্তারের ভূমিকা রচিত।
Māsopavāsa Vrata for Hari (From Āśvina Ekādaśī to Viṣṇu Utthāna): Saṅkalpa, Niyamas, and Pāraṇa
ব্রহ্মা বিষ্ণু-প্রসন্নতার জন্য এক মহৎ মাসোপবাস-ব্রত শিক্ষা দেন। এই ব্রত বনপ্রস্থ, সন্ন্যাসী ও নারীরাও পালন করতে পারেন। আশ্বিন শুক্ল একাদশীতে উপবাস করে ‘আমি নিরাহার থেকে হরির পূজা করব’—এই স্পষ্ট সংকল্প নিয়ে শুরু করে বিষ্ণুর উত্ত্থান পর্যন্ত ত্রিশ দিন নিয়মে পালন করা হয়। আশ্বিন ও কার্তিকের শুক্ল দ্বাদশীতে বিশেষ পূজা করা হয় এবং ব্রত সম্পূর্ণ হওয়ার আগে মৃত্যু হলেও যেন ভঙ্গ না গণ্য হয়—এমন প্রার্থনা করা হয়। প্রতিদিন হরিপূজা, ত্রিকাল স্নান, সুগন্ধি/ইত্র বর্জন এবং মন্দিরাচার অনুযায়ী তেল-মর্দন ও সুগন্ধি লেপ নিষিদ্ধ। দ্বাদশীতে ভক্তিভরে পূজা করে ব্রাহ্মণদের ভোজন করিয়ে পারণ করে ব্রত সমাপ্ত হয়। করুণাবশত মাঝপথে অচেতন হলে দুধ ইত্যাদি হালকা গ্রহণ ব্রত নষ্ট করে না; এতে সংসারসুখ ও মুক্তি—উভয় ফলের কথা বলা হয়েছে।
Kārtika Vrata, Bhīṣma-pañcaka, and Ekādaśī Timing (Tithi & Pāraṇa Rules)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা কার্তিক-মাসের ব্রতকে কেন্দ্র করে বিশেষ উপদেশ দেন—প্রস্তুতিস্বরূপ স্নান, বিষ্ণু-আরাধনা এবং আহার-সংযম (একবার ভোজন, রাত্রিভোজন, না-চাওয়া অন্ন, দুধ/ফল/শাক-নিয়ম বা উপবাস) পাপক্ষয়কারী ও হরি-প্রাপ্তির সাধন বলে জানান। তিনি ব্রতগুলির মধ্যে হরি-ব্রতকে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং কার্তিকের ভীষ্ম-পঞ্চককে অন্যান্য ঋতুব্রতের ঊর্ধ্বে স্থান দেন। শুক্লপক্ষ একাদশীতে ত্রিকাল স্নান, সঙ্গীতসহ হরি-পূজা, পিতৃ-তর্পণ, মৌন, ঘৃত-অর্ঘ্য, পঞ্চগব্য-সিদ্ধ জলে সেবা, অভ্যঙ্গ, পাঁচ দিন গুগ্গুল ধূপ, পরমান্ন নৈবেদ্য ও ১০৮ মন্ত্রজপের বিধান আছে। “ওঁ নমো বাসুদেবায়” মন্ত্রে হোম, পদ্ম-বিল্ব-গন্ধ-শস্য দিয়ে হরির অঙ্গপূজা দিনক্রমে, ভূমিশয়ন ও পঞ্চগব্য-পান—পঞ্চম দিনে সমাপন বলা হয়েছে। পরে তিথি-ধর্মে একাদশীর মাহাত্ম্য, দ্বাদশীতে পারণ অপরিহার্য (সূতক/মৃতকেও), এবং তিথি-সন্ধি অনুযায়ী অতিরিক্ত উপবাস-নিয়ম উল্লেখ করে পরবর্তী অধ্যায়গুলির ভূমিকা রচনা করা হয়েছে।
Śivarātri Vrata: Timing, Accidental Merit, and the Complete Night-Vigil Procedure
আচারভিত্তিক ব্রত-অনুশাসনের ধারাবাহিকতায় ব্রহ্মা গৌরীর শিবকে করা প্রশ্নকে ভিত্তি করে শিবরাত্রি-ব্রতকথা বলেন। এতে ব্রতের তিথি-নির্ণয় এবং ভোগ ও মোক্ষদায়ী ফল প্রতিপাদিত। পরে দৃষ্টান্ত—পাপী নিষাদরাজ সুন্দরসেনক অর্বুদে শিকার করে ক্ষুধার্ত অবস্থায় পুকুরের কাছে রাত কাটায় এবং অজান্তে লিঙ্গোপাসনার মতো কাজ করে ফেলে—পাতা অর্পণ, জল ছিটানো/অভিষেক, স্পর্শ ও সারারাত জাগরণ। মৃত্যুর পর যমদূত তাকে ধরে, কিন্তু শিবদূতরা তাদের পরাজিত করে রাজাকে মুক্ত করে; তার কুকুরও শুদ্ধ হয়ে শিবের নিকটে গণসেবক হয়। শেষে অজ্ঞানকৃত সীমিত পুণ্য ও জ্ঞানপূর্বক অক্ষয় পুণ্যের ভেদ দেখিয়ে ব্রতবিধি বলা হয়—উপবাস, পঞ্চগব্য/অমৃতস্নান, গুরুশরণ, মন্ত্র, হোম, চার প্রহরে পূজা, প্রাতে প্রায়শ্চিত্ত, ভোজন-দান ও দীর্ঘ অনুশীলন—কথা থেকে সাধনায় সেতুবন্ধন করে।
Ekādaśī-Vrata Nirṇaya: Avoiding Daśamī-Viddha and Establishing Trimīśrā
আচারভিত্তিক ব্রত-কাল নির্ণয়ে পিতামহ একাদশী পালনের সিদ্ধান্ত-পদ্ধতি বলেন। চক্রবর্তী মান্ধাতা আদর্শ; মূল নিয়ম—উভয় পক্ষের একাদশীতে আহার নয়। দশমী-বিদ্ধা (দশমীর সঙ্গে মিশ্র) একাদশী উপবাস নিষিদ্ধ; গন্ধারীর এমন পালনে শতপুত্র-নাশ ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। একাদশী দ্বাদশীতে প্রসারিত হলে হরির সান্নিধ্য, আর দশমীতে প্রসারিত হলে আসুরী প্রভাব—এই ভেদ দেখানো হয়। শাস্ত্রবাক্যে বিরোধ ও সংশয়ে দ্বাদশী গ্রহণ করে ত্রয়োদশীতে পারণ করতে বলা হয়; একাদশীর অল্পাংশ থাকলেও উপবাস ও দ্বাদশীতেও সংযম রাখতে নির্দেশ। শেষে একাদশী-দ্বাদশী-ত্রয়োদশীর ‘ত্রিমীশ্রা’ পাপনাশিনী; রাজা রুক্মাঙ্গদের জাগরণ, পুরাণশ্রবণ, বিষ্ণুপূজা ও দৃঢ় একাদশী-ব্রতে মুক্তির কাহিনি বলা হয়েছে।
Upāsanā-krama: Maṇḍala-rakṣā, Dvāra-devatā-sthāpana, Lotus-Cosmology, and Aniruddha-Nārāyaṇa Pūjā
এই অধ্যায়ে গরুড়পুরাণের ব্যবহারিক ধর্মধারায় ব্রহ্মা সাধারণ ধর্মলক্ষ্য থেকে এগিয়ে এমন স্পষ্ট উপাসনা-বিধি বলেন, যা সংসারসিদ্ধি ও মোক্ষ—উভয়ই দেয়। প্রথমে উপাসনাকে ‘পরম গতি’র প্রত্যক্ষ উপায় বলা হয়েছে; তারপর পবিত্র ক্ষেত্র নির্মাণ—রক্ষামণ্ডল অঙ্কন, দ্বারদেবতা ও নদীদেবতার প্রতিষ্ঠা, এবং দ্বারশ্রী, দণ্ড, প্রচণ্ড প্রভৃতি সীমা-শক্তির পূজা করে প্রবেশ ও সীমানা সুরক্ষিত করা হয়। পরে বাস্তুপুরুষের পূজা এবং কেন্দ্রে কূর্ম ও অনন্তের উপর অধিষ্ঠিত আধারশক্তি স্থাপন করে বেদীর নীচে বিশ্বাধার স্থির করা হয়। কমল-রূপকে গুণ ও তত্ত্বাদি নৈতিক-অধিবিদ্যাগত বিভাগ প্রতীকীভাবে বিন্যস্ত করে মণ্ডলের সঙ্গে তাদের যোগ দেখানো হয়েছে। শেষে দুর্গা, গণেশ, সরস্বতী, ক্ষেত্রপাল প্রভৃতি কোণরক্ষকের পূজা, আসন ও প্রতিমার বন্দনা, বাসুদেব-বল স্মরণ, এবং অনিরুদ্ধরূপে নারায়ণ-পূজা (অঙ্গ ও আয়ুধ বন্দনা সহ) বর্ণিত—যা পরবর্তী মন্ত্র-ন্যাসাদি অধ্যায়ের ভূমি প্রস্তুত করে।
Bhīma-Dvādaśī (Ekādaśī) Māhātmya and Varāha-Pūjā Vidhi
খণ্ড ১-এর ধর্মোপদেশে ব্রহ্মা মাঘ-শুক্লে ভীমের পালিত ভীম-দ্বাদশী (একাদশী)কে আদর্শ ব্রতরূপে বর্ণনা করেন—এটি পিতৃঋণ নাশ করে ও পুণ্য বৃদ্ধি করে। পরে একাদশীর সর্বজনীন মহিমা বলা হয়—নক্ষত্র গণনা ছাড়াও এটি মহাপাতক পর্যন্ত পাপ নাশ করতে সক্ষম; আর নীতিমূলক উপমায় সতর্ক করা হয় যে ধর্মের ছদ্মে অধর্ম, মিথ্যা, লোভ, অহংকারপ্রসূত তপস্যা ও অসংযমী আচরণ কল্যাণ ও পুণ্য নষ্ট করে। অধ্যায়টি একাদশীকে প্রসিদ্ধ তীর্থ ও নানা ক্রিয়ার তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে, হরির দিনকে দান-জপ-যজ্ঞেরও ঊর্ধ্বে স্থাপন করে। এরপর বিধি—পাত্র/কলশে স্বর্ণ বরাহ-পুরুষ স্থাপন, অঙ্গাঙ্গ পূজা ও নমস্কার, রাত্রিজাগরণে পুরাণ-শ্রবণ, দক্ষিণাসহ পূজাসামগ্রী দান এবং সংযত পারণ। ফলশ্রুতি—ত্রিবিধ ঋণমোচন ও বারবার শিশুজন্ম এড়ানোর প্রতিশ্রুতি; অন্তঃসংযমকে আচার-ফলসিদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করে পরবর্তী ব্রত-আচার আলোচনার ভূমিকা রচিত হয়।
Vrata-Niyama: Fasting Purity, Brahmakūrcha, Naktāhāra, and Kāla-Nirṇaya (Ritual Timing)
আচারভিত্তিক উপদেশে ব্রহ্মা ব্যাসকে বলেন—ব্রত তপস্যারূপ, যা হরিকে প্রসন্ন করে। ব্রত অক্ষুণ্ণ রাখতে ত্রিসন্ধ্যা-স্নান, ভূমিশয়ন, ইন্দ্রিয়নিগ্রহ, সঙ্গ-সংযম এবং অগ্নিতে পঞ্চশোধন হোমের বিধান দেওয়া হয়েছে। উপবাসে খাদ্য, পাত্র, অলংকার, সাজসজ্জা ও কেশপরিচর্যার নিষেধ-নিয়ম এবং প্রাতঃকালের পঞ্চগব্য-সম্পর্কিত শৌচাচার বর্ণিত। নক্তাহার অর্থ নক্ষত্রদর্শনের পরে আহার; অনুচিত রাত্রিভোজনের জন্য প্রায়শ্চিত্তও বলা হয়েছে। ব্রহ্মকূর্চ ব্রতের পরিমাপ ও মন্ত্র উল্লেখিত। পরে অগ্ন্যাধান, দীক্ষা, যজ্ঞ, দান, ব্রত, বৃষোৎসর্গ, চূড়া, উপনয়ন প্রভৃতির ধর্ম, মলমাসে শুভকর্ম বর্জন, চান্দ্র/সৌর/সাবন মাসভেদ ও তিথিসংযোগ নির্ণয় করা হয়েছে। শেষে ঋতুমতী অবস্থায় ব্রতবিঘ্ন, ভঙ্গের প্রায়শ্চিত্ত এবং অক্ষম হলে প্রতিনিধি দ্বারা কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থা দিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ের ভূমিকা রচিত।
Tithi-Vrata Vidhāna: Śikhī-vrata (Pratipadā), Tṛtīyā Devī/Śrīdhara rites, Gaṇeśa Caturthī Mantra-Nyāsa, and Nāga Pañcamī
আচারনিষ্ঠ ব্রতবিধির ধারায় ব্রহ্মা ব্যাসকে তিথি অনুসারে ব্রতসমূহ বলেন। প্রতিপদায় শিখী-ব্রত: একভুক্ত, চৈত্রকালে ব্রহ্মাপূজা, হোম এবং কপিলা গাভী দান—বৈশ্বানর লোকপ্রাপ্তি। তৃতীয়ায় শ্রীসহ শ্রীধরের সমৃদ্ধি-আরাধনা, শয্যা/ফলাদি দান ও প্রার্থনা; পাশাপাশি উমা–শিব–অগ্নি পূজা, হবিশ্য ও দমনক সহ, শেষে শয্যা ও সজ্জিত গৃহের মহাদান এবং দেবীর বহু নামস্মরণ। চতুর্থীতে গণেশ চতুর্থীর বিধান: মাঘে তিলসহ উপবাস, প্রণবযুক্ত মূলমন্ত্র, বীজন্যাস, উপচারক্রম, গণপতি গায়ত্রী, গণ/কুষ্মাণ্ডক আহুতি—বিদ্যা, ঐশ্বর্য, সন্তান, স্বর্গ ও মোক্ষফল। পঞ্চমীতে নাগপূজা: প্রধান নাগদের নাম, দ্বারে অঙ্কন/লেখন, দুধ-ঘি নৈবেদ্য, বিষ ও সাপের কামড় থেকে রক্ষা—পরবর্তী ব্রততালিকার সূচনা।
Phala-Saptamī and Vijayā-Saptamī: Bhādrapada Worship, Feeding, Mantra, and Sevenfold Saptamī Restraints
আচার-নির্দেশের ধারায় ব্রহ্মা ভাদ্রপদ মাসকে কার্ত্তিকেয়-পূজার জন্য মহাপুণ্যদায়ক বলেন; এ সময় স্নান ও দান করলে অক্ষয় পুণ্য লাভ হয়। এরপর সপ্তমী-ব্রতের বিধান—অন্যকে ভোজন করানো, ব্রাহ্মণদের সম্মানসহ ভোজ দেওয়া এবং সংক্ষিপ্ত মন্ত্রে সূর্যদেবকে আহ্বান করে পূজা। সপ্তমীতে নিয়মস্নান ও সূর্যোপাসনা, অষ্টমীতে মরিচ দিয়ে উপবাসভঙ্গ। খেজুর, নারকেল বা মাতুলুঙ্গ প্রভৃতি ফল নিবেদন করে মার্তাণ্ডের তুষ্টি ও সর্বকামসিদ্ধি প্রার্থনা, শেষে পায়স-ভোজন ও দক্ষিণা। পরে বিজয়া-সপ্তমীকে ধন ও পুত্রলাভের কঠোর ব্রত বলা হয়েছে—পাকা অন্ন ত্যাগ, উপবাসে ক্ষুধা ও অহংকার জয়। শেষে সপ্তমীর সাত নিষেধ—ধান্য, পাত্র, মাংস, মদ্য, মধু, প্রসাধন, তিল—সংযমে ইষ্টফলপ্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে।
Dūrvāṣṭamī Vrata and Rohiṇī-Yukta Kṛṣṇāṣṭamī: Mantras, Arghya, and Viṣṇu-Nāma Salutations
আচারখণ্ডে কালনির্ভর ধর্মের ধারাবাহিকতায় ব্রহ্মা ভাদ্রপদ শুক্লা-অষ্টমীর উপবাস ও দূর্বাঘাসসহ শিবপূজার বিধান বলেন, এবং তাতে সূর্য ও গণেশেরও সংযোজন থাকে। পরে কৃষ্ণা-অষ্টমীর প্রসঙ্গে—রোহিণী নক্ষত্র যুক্ত হলে মধ্যরাতে হরিপূজা, বিদ্ধা তিথির সিদ্ধান্ত ও পারণের সময় নির্ধারণ শেখানো হয়। এরপর গোবিন্দকে যোগ, যজ্ঞ ও বিশ্ব-সার্বভৌমত্ব রূপে স্তব, শুদ্ধ বেদীতে শঙ্খপাত্রে নিবেদন, চন্দ্র ও রোহিণীকে অর্ঘ্য, এবং যশোদাসহ বিষ্ণুর নানা নাম-রূপে অর্ঘ্যদানের ক্রমবিধি বর্ণিত। শেষে হরিস্মরণ দুষ্কর্মীরও রক্ষাকর—এই রক্ষামন্ত্রে অধ্যায় সমাপ্ত, এবং পরবর্তী ব্রত ও ফলশ্রুতির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
Budhāṣṭamī / Mahārudra Vrata: Procedure, Mantra, and the Story of Kauśika and Vijayā
আচারখণ্ডের ব্রতবর্ণনা চলতে থাকে। ব্রহ্মা প্রথমে কৃষ্ণাষ্টমী-ব্রতের ফল বলেন—বছরভর রাত্রিভোজন ও গোদান করলে সদ্গতি এবং ইন্দ্রপদ পর্যন্ত লাভ হয়। এরপর পৌষ মাসের (শুক্লপক্ষ) শ্রেষ্ঠ অষ্টমী-অনুষ্ঠান ‘মহারুদ্র’ ব্রত নির্দেশ করেন এবং সর্বাধিক শুভ যোগ জানান—উভয় পক্ষেই অষ্টমী যদি বুধবারে পড়ে, তা ‘বুধাষ্টমী’। অধ্যায়ে বিধিনিয়ম (যোগ্য ঋত্বিক, পরিমিত চাল), ভক্তিভোজন (আমপাতার পুটুলিতে, কুশাসনে), কলম্বিকা-আম্লিকা সহ নিবেদন, জলাশয়ে বুধের পঞ্চোপচার পূজা, দক্ষিণা, ‘বুং’ বীজমন্ত্র ও স্বাহান্ত হোমবাক্য, এবং পদ্মদলের মাঝে শ্যামবর্ণ ধনুর্বাণধারী দেবতার ধ্যান বর্ণিত। কথায় কৌশিক ও বিজয়া দেবীসদৃশ নারীদের ব্রত দেখে প্রসাদ গ্রহণ করে; পরে যম-সংক্রান্ত বন্ধন, পারিবারিক জটিলতা ও কর্মফলের নাটকীয় মোড়ের পর ব্রতপ্রভাবে মুক্তি লাভ করে—যা সমৃদ্ধি, রক্ষা ও মুক্তির সেতু হিসেবে ব্রতের মাহাত্ম্য দেখায়।
Aśokāṣṭamī and Mahānavamī: Durgā Navamī-vrata, mantra-nyāsa, forms, weapons, and offerings
ব্রহ্মার ধর্মোপদেশের ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে প্রথমে চৈত্রে পুনর্বসু‑যুক্ত অশোকাষ্টমীতে শোকনাশক উদ্ভিদ‑সম্পর্কিত বিধি বলা হয়েছে, তারপর আশ্বযুজে উত্তরাষাঢ়া‑যুক্ত মহানবমীতে স্নান‑দান প্রভৃতির অক্ষয় ফল নির্দেশ করা হয়েছে। এরপর স্বতন্ত্র নবমী‑ব্রত ও দুর্গাপূজার বিধান, এবং জয়কামী রাজাদের জন্য জপ, হোম ও কন্যাভোজনের সহায়ক আচার উল্লেখ আছে। দুর্গামন্ত্র দিয়ে হৃদয়াদি স্থানে ও আঙুলে ন্যাসের নিয়ম বোঝানো হয়েছে; ত্রিশূল‑খড়্গ থেকে বই, বস্ত্র ও মণ্ডল পর্যন্ত পূজাসামগ্রী বর্ণিত। উগ্র দেবীনাম ও অস্ত্রসমূহ গণনা করা হয়েছে, মাপা খড়্গ ও ত্রিশূল পূজার নির্দেশও আছে। শেষে কালী/কালিকা প্রভৃতিকে দিকানুসারে বলি‑অর্পণ দেখিয়ে পরবর্তী শক্তিমুখী বিস্তৃত ক্রিয়াক্রমের ইঙ্গিত দেয়।
Mahākauśika Mantra, Nirṛti Bali, and Mahānavamī Victory-Rites
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক আচারবিধিতে ব্রহ্মা মহাকৌশিক মন্ত্রকে মহাশক্তিশালী বলে জানান এবং তার তৎক্ষণাৎ প্রয়োগ নির্দেশ করেন—অপদ্রব-নিবারণ ও রক্ষার জন্য নিরৃতি দেবীর উদ্দেশে বলি-সংস্কার। পরে রাজকীয় আচার: রাজা স্নান করে ময়দার লেই দিয়ে ছাতা নির্মাণ করে, তাতে তরবারির আঘাত করে স্কন্দ ও বিশাখকে অর্পণ করেন—শুদ্ধি, প্রতীকী যুদ্ধ ও বীর-আশ্রয়ের সমন্বয়। এরপর রাত্রিকালে মাতৃকাপূজা, দেবীদের তালিকা, দুর্গা ও ক্ষমা-শিবা-ধাত্রী প্রভৃতিকে নমস্কার; দুধে অভিষেক এবং নারী-কন্যাদের অংশগ্রহণ। শেষে দান—ব্রাহ্মণভোজন ও ভিন্নমত তপস্বীদেরও তৃপ্তি—এবং শোভাযাত্রায় ধ্বজ-পতাকা-বস্ত্রাদি নিবেদন; ফলশ্রুতি, মহানবমী পূজায় বিজয়, রাজ্য ও সমৃদ্ধি লাভ হয়।
Damanaka-Navamī, Digdaśamī-vrata, and Ekādaśī Ṛṣi-Pūjā
আচারখণ্ডের ব্রত-তালিকায় ব্রহ্মা আশ্বিন শুক্ল নবমীর বিধান দেন—ব্রতী একভুক্ত থাকবে, দেবীর পূজা করবে, ব্রাহ্মণকে সম্মান করবে এবং লক্ষ্মী-মন্ত্র ও রক্ষার্থ ‘বীর’ মন্ত্র জপ করবে। পরে চৈত্র শুক্ল নবমীতে দমনক গুচ্ছ দিয়ে দেবীপূজাই ‘দমনক-নবমী’; এতে আয়ু, আরোগ্য, শ্রী, ও শত্রুজয় লাভ হয়। এরপর দশমীতে ‘দিগ্দশমী-ব্রত’—একভুক্ত শেষে দান, দশটি গাভী ও দিক-চিহ্নিত স্বর্ণ প্রতীক দান; ফল ব্রহ্মাণ্ড-অধিপত্যসম মহাপুণ্য। একাদশীকে ‘ঋষি-পূজা’ বলা হয়েছে; মরীচি থেকে নারদ পর্যন্ত ঋষিদের নাম করে পূজা করলে ধন, পুত্র, সম্মান ও ঋষিলোক প্রাপ্তি হয়। শেষে চৈত্রারম্ভে দমন-মালা দিয়ে পূজা ও তিথির নাম—অষ্টমী ‘অশোকা’, নবমী ‘বীরা’—উল্লেখ করে মাসিক ব্রত-প্রণালীর সঙ্গে সংযোগ দেখানো হয়েছে।
Śravaṇa-Dvādaśī Vrata (Vijayā/Mahātī Dvādaśī): Vāmana-Kumbha Worship, Restraints, and Jāgaraṇa
ব্রহ্মা শ্রবণ-দ্বাদশী ব্রত ব্যাখ্যা করেন—শ্রবণ নক্ষত্রযুক্ত একাদশী–দ্বাদশীকে ‘বিজয়া’ বলা হয়; ভক্তিসহ রাত্রি-উপবাস ও ভিক্ষা না করে অর্জিত দ্রব্যে হরিপূজা করলে অক্ষয় ফল হয়। কেবল উপবাস বা ভিক্ষাজীবনই দ্বাদশী-আচরণ নয়; কাঁসার পাত্র, মাংস, মধু, লোভ ও মিথ্যা বাক্য ত্যাগ আবশ্যক। দ্বাদশীর নিয়মে পরিশ্রম, সহবাস, দিবানিদ্রা, অঞ্জন, শিলায় রান্না খাদ্য ও মসুর ডাল বর্জন বলা হয়েছে। ভাদ্রপদে বিশেষ যোগ ‘মহাতী দ্বাদশী’ প্রশংসিত; সঙ্গম-তীর্থে স্নান (বিশেষত বুধবার শুভ হলে) বিধেয়। রত্নখচিত কলসে স্বর্ণ বামন স্থাপন করে পূজা, বাসুদেব-শ্রীধর-কৃষ্ণ-শ্রীপতি-কেশব প্রভৃতি নামে অঙ্গপ্রণাম, ঘৃতযুক্ত পায়স, মোদক ও কলসাদি নিবেদন, এবং সারারাত জাগরণ। শেষে গোবিন্দকে বুধ ও শ্রবণের সঙ্গে একাত্ম বলে স্তব করে পরবর্তী ব্রতকথায় গ্রহ-নক্ষত্র ও বৈষ্ণব পূজার সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
Vratas, Nakṣatra Observances, Naivedya Rules, and Tithi-wise Devatā Worship
এই অধ্যায়ে আচারধারায় ক্যালেন্ডার-নিয়মভিত্তিক ব্রতকর্ম বিস্তৃত হয়েছে। নদীতীরে বিশেষত ব্রাহ্মণকে জলঘট দান করলে পাপক্ষয় ও কাম্যসিদ্ধি হয় বলা হয়েছে। মদনক-ত্রয়োদশী ব্রত এবং শিব-চতুর্দশী–অষ্টমী ব্রতের সমাপ্তি উল্লেখ করে কার্তিকে ধাম-ব্রত (গৃহ/আবাস দান) বিধান করা হয়েছে, যার ফল সূর্যলোকপ্রাপ্তি। অমাবস্যায় পিতৃদের উদ্দেশে অর্ঘ্য-দানকে অক্ষয় বলা হয়েছে; বার-ব্রত ও মাসিক নক্ষত্র-ব্রতে অচ্যুত-পূজার নির্দেশ আছে। মাসভেদে কর্ম—মার্গশীর্ষে কেশব-পূজা, ঘৃতাহুতি ও কৃসরা নৈবেদ্য, আষাঢ়ে মিষ্টি পায়স দান, পঞ্চগব্য স্নান, রাত্রিভোজন-নিয়ম—ইত্যাদি বর্ণিত। নৈবেদ্য বিসর্জন পর্যন্ত নৈবেদ্য, পরে নির্মাল্য; পাঞ্চরাত্রজ্ঞরা নৈবেদ্য ভক্ষণ করেন না। অচ্যুত-প্রার্থনায় পাপনাশ ও সমৃদ্ধি কামনা এবং বহু-বৎসর উপবাসের ফল বলা হয়েছে। শেষে তিথি-অনুসারে দেবতাদের তালিকা—অগ্নি, অশ্বিন, শ্রী, যম, পার্বতী, নাগ, কার্ত্তিকেয়, সূর্য, মাতৃগণ, তক্ষক, ইন্দ্র, কুবের, ঋষি, হরি, কাম, মহেশ্বর, ব্রহ্মা ও পিতৃ—দিয়ে পরবর্তী নির্দেশের ভিত্তি স্থাপিত।
Dynasties of Kings: From Manu to Ikṣvāku, Śrī Rāma, and Janaka (Sūryavaṁśa Genealogy)
এই অধ্যায়ে হরি (বিষ্ণু) বংশবৃত্তান্ত শুরু করেন—বিষ্ণু থেকে ব্রহ্মা, ব্রহ্মা থেকে দক্ষ প্রভৃতি সৃষ্টিপ্রবর্তক, তারপর বিবস্বান, মনু ও মনুর বংশধরদের কথা। মনুর বহু শাখা (ইক্ষ্বাকু, শর্যতি ইত্যাদি) উল্লেখিত; কর্মফলের ইঙ্গিত (যেমন গো-হত্যা) ও সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন (নাভাগের বৈশ্যত্বে প্রবেশ)ও বলা হয়। প্রধান ধারা ইক্ষ্বাকুবংশে মন্ধাতা, হরিশ্চন্দ্র, সগর ও তাঁর পুত্রগণ, অংশুমান–দিলীপ–ভগীরথের দ্বারা গঙ্গাবতরণ পর্যন্ত গিয়েছে। পরে রঘুবংশে দশরথ ও চার ভ্রাতা—শ্রীরাম, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন—এবং কুশ-লব ও পরবর্তী উত্তরাধিকারীরা বর্ণিত। শেষে মিথিলাবংশে শীরধ্বজ জনক ও সীতার প্রসঙ্গ আসে; উপসংহারে বলা হয়—জনকের দুই ধারায় যোগই ধারক আশ্রয়, রাজবংশকথাকে আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে যুক্ত করে পরবর্তী বংশবর্ণনার ভূমিকা রচিত হয়।
Chandravamsa and Yadu Lineage: From Soma to the Vrishnis, Krishna’s Family, and the Transition to Puru
পূর্বে বর্ণিত সূর্যবংশের পর হরি চন্দ্রবংশের সূচনা করেন—নারায়ণ থেকে ব্রহ্মা, তারপর অত্রি, সেখান থেকে সোম; পরে বুধ–পুরূরবা ধারার বিবরণ। এরপর বহু রাজশাখা বিস্তার লাভ করে—কুশ ও গাধি-সম্পর্কিত ঋষি ও রাজারা (বিশ্বামিত্র এবং পরশুরামের মাতৃবংশ), কাশীর রাজপরম্পরা (দিবোদাস, প্রতর্দন), এবং হৈহয় ধারা যা কার্তবীর্য অর্জুন পর্যন্ত পৌঁছায়। বিশেষভাবে যদুবংশ ও তার বৃ্ষ্ণি, সাত্বত, অন্ধক, ভোজ প্রভৃতি শাখা তুলে ধরে অক্রূর, উগ্রসেন, কংস, বসুদেব, দেবকী, রোহিণী, বলরাম ও শ্রীকৃষ্ণকে এক সুসংহত বংশতালিকায় স্থাপন করা হয়েছে। শূরের বংশধরদের সঙ্গে কুন্তী ও পাণ্ডবদের যোগ, শিশুপাল ও মিত্রকুলের উল্লেখ, এবং কৃষ্ণের রাণী ও প্রধান উত্তরাধিকারী (প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ, বজ্র) সংক্ষেপে বলা হয়েছে। শেষে অনু-সম্পর্কিত ধারায় কর্ণের নাম করে পরবর্তী গতি—বৃষসেনের পরম্পরা ও পুরুবংশ—ঘোষণা করা হয়।
Vaṁśānukīrtana: From Janamejaya’s Line to Bharata–Kuru–Pāṇḍava Descendants
হরি ব্রহ্মখণ্ডের বংশানুকীর্তন এগিয়ে নিয়ে জনমেজয় থেকে শুরু করে নানা শাখায় বিস্তৃত রাজবংশের উত্তরাধিকার ক্রমে গণনা করেন। শকুন্তলার মাধ্যমে দুষ্যন্ত–ভরত বংশ, গর্গ ও শিনি প্রভৃতি পার্শ্বশাখা, এবং পাঞ্চাল ধারায় দিবোদাস, সোমক, পৃষত, দ্রুপদ, ধৃষ্টদ্যুম্ন ইত্যাদি নাম উল্লিখিত হয়। পরে সংবরণ থেকে কুরু, এবং শান্তনু, ভীষ্ম, বিচিত্রবীর্য, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, বিদুর পর্যন্ত কুরুবংশ সংক্ষেপে একত্রিত করে কৌরব–পাণ্ডব ও পরিক্ষিত প্রভৃতি বংশধরদের উল্লেখ করা হয়। শেষ শ্লোকে জানানো হয়—পরবর্তী অংশে জনমেজয়ের বিশেষ বিবরণ ও তাঁর পরবর্তী রাজাদের কাহিনি আসবে; এই অধ্যায়টি পূর্বপুরুষ-তালিকা থেকে পরবর্তী রাজ-কালক্রমে সেতুর মতো।
Dynastic Enumeration and the Threefold Pralaya (वंशानुकीर्तनं—प्रलयत्रयवर्णनम्)
পুরাণীয় ধারায় হরি ধারাবাহিকভাবে রাজাদের নামসহ গণনা করেন—প্রথমে শাসকদের তালিকা, তারপর ইক্ষ্বাকু-বংশের ব্যক্তিবর্গ (বৃহদ্বল ও তাঁর বংশধর), এবং পরে সুমিত্রের উল্লেখ থেকে শুরু করে মাগধ/বার্হদ্রথ রাজপরম্পরা। ইতিহাসের এই বিস্তার স্থাপন করে তিনি নীতিগত সিদ্ধান্ত দেন—পরবর্তী রাজারা অধার্মিক হবে, কিন্তু অবিনাশী নারায়ণই সত্য কল্যাণ ও সমৃদ্ধি দান করেন। এরপর তিন প্রলয়—নৈমিত্তিক, প্রাকৃতিক ও আত্যন্তিক—বর্ণিত হয়; স্থূল ও সূক্ষ্ম তত্ত্ব ক্রমে লীন হয়ে শেষে জীব অব্যক্ত ও পরমাত্মায় প্রবেশ করে। উপসংহার: রাজা ও জগৎ নশ্বর, তাই পাপ ত্যাগ করে ধর্মে স্থির থেকে হরির শরণ নিতে হবে।
Hari’s Avatāras and the Cosmic Power of Pativratā-Dharma
ব্রহ্মার উপদেশের ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে হরির অবতারকথা ধর্মরক্ষার রূপে সংক্ষেপে বলা হয়েছে—মৎস্য হয়গ্রীবকে বধ করে বেদ উদ্ধার করেন; কূর্ম মন্দর পর্বত ধারণ করেন, ক্ষীরসাগর মন্থনে ধন্বন্তরি অমৃতসহ আবির্ভূত হন; মোহিনী দেবতাদের অমৃত প্রাপ্তি নিশ্চিত করেন; বরাহ হিরণ্যাক্ষকে বধ করে পৃথিবী উদ্ধার করেন; নৃসিংহ হিরণ্যকশিপুকে সংহার করে বেদ-ধর্ম রক্ষা করেন; পরশুরাম ক্ষত্রিয় দম্ভ দমন করে পৃথিবী দান করেন; এবং রামের বনবাস থেকে রাবণবধ ও যজ্ঞসহ ধর্মরাজ্য পর্যন্ত বর্ণিত হয়। এরপর সীতার বন্দিত্বেও অচল পতিব্রতা-ধর্মের মহিমা আলোচিত হয়। দৃষ্টান্তে কৌশিকের কুষ্ঠ, স্ত্রীর চরম সেবা, শূলে বিদ্ধ মাণ্ডব্য ঋষির সঙ্গে সংযোগ, তাঁর শাপের প্রতিউত্তরে স্ত্রীর ব্রত—‘সূর্য উঠবে না’, ফলে দীর্ঘ অন্ধকার ও দেবভয়। ব্রহ্মা দেবতাদের অনসূয়ার শরণ নিতে বলেন; তাঁর অনुष্ঠানে সূর্যোদয় ও প্রাণপ্রবাহ ফিরে আসে। শেষে সীতার পতিব্রতা শক্তি অনসূয়ারও ঊর্ধ্বে বলা হয়ে পরবর্তী ধর্মকেন্দ্রিক দৃষ্টান্তের ভূমিকা রচিত হয়।
रामायणकथासंक्षेपः — ब्रह्मोक्तो रामावतारवृत्तान्तः
পুরাণীয় ধারায় ধর্মশিক্ষার জন্য ব্রহ্মা সংক্ষেপে রামায়ণ কাহিনি বলেন। বিষ্ণুর নাভি-কামল থেকে ব্রহ্মা, তারপর মरीচি, কশ্যপ, রবি, মনু, ইক্ষ্বাকু, রঘু ও দশরথ—এই বংশধারা। রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্নের জন্ম; বিশ্বামিত্রের কাছে দিব্যাস্ত্রলাভ, তাটকা ও সুবাহু বধ। জনকের যজ্ঞে সীতাবিবাহ, আর ভ্রাতাদের কুশধ্বজের কন্যাদের সঙ্গে বিবাহ। রামের অভিষেক কাইকেয়ীর বরদাবিতে রুদ্ধ হয়; সীতা-লক্ষ্মণসহ চৌদ্দ বছরের বনবাস। দশরথের মৃত্যুতে ভরত রাজ্য গ্রহণ করেন না। অরণ্যে শূর্পণখা প্রসঙ্গ, খরের সেনাবধ; মারীচের মায়ায় রাবণের সীতাহরণ। সুগ্রীবের সঙ্গে মৈত্রী, বালীবধ, অনুসন্ধানদল; হনুমান সাগর লঙ্ঘন করে সীতাকে দেখে লঙ্কা দহন করে চিহ্ন নিয়ে ফেরেন। বিভীষণ শরণ নেন; সেতুবন্ধ, যুদ্ধে ইন্দ্রজিত ও রাবণ বধ। পুষ্পকে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করে রাম ধর্মরক্ষক রাজা হন, যজ্ঞ ও গয়া-শ্রাদ্ধে পিণ্ডদান করেন, কুশ-লবকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং শেষে অযোধ্যাবাসীদের সঙ্গে স্বর্গারোহণ করে মোক্ষাভিমুখ রাজধর্মের আদর্শ স্থাপন করেন।
Harivaṁśa-saṅkṣepa: Kṛṣṇa’s Avatāra Deeds, Dynastic Continuity, and Post-departure Succession
ব্রহ্মা হরির বংশপরিচয় ঘোষণা করে বলেন, বসুদেব-দেবকীর গর্ভে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম এবং ধর্মরক্ষার্থে তাঁর কীর্তি—পূতনা-বধ, ব্রজরক্ষা (শকট উল্টানো, যমলার্জুন ভেদন), কালিয়-দমন, ধেনুকাসুর-বধ। পরে গোবর্ধন ধারণে তাঁর সার্বভৌমত্ব প্রকাশ পায় ও ইন্দ্র সম্মান জানায়; আরিষ্ট ও কেশী প্রভৃতি দুষ্টশক্তি বিনাশে ভারহরণ হয়ে জনসমাজে আনন্দ স্থাপিত হয়। এরপর রঙ্গভূমিতে চাণূর-মুষ্টিক বধ ও কংসনিধনে রাজধর্ম প্রতিষ্ঠা হয়। ব্রহ্মা প্রধান রাণীসমূহ, বৃহৎ পরিবার ও বংশবৃদ্ধির কথাও বলেন—প্রদ্যুম্নের শম্ভরবধ, অনিরুদ্ধের উষা-বিবাহ, বাণপুরীতে শিবের সঙ্গে ধর্মযুদ্ধ ও বাণের বাহুচ্ছেদ। শেষে নরকাসুরবধ, পারিজাত প্রসঙ্গ, এবং কৃষ্ণপ্রস্থানের পর বজ্রের রাজত্ব, মথুরায় উগ্রসেনের স্থিতিশীল শাসন ও দিব্য রক্ষার পুনঃপ্রতিষ্ঠা উল্লেখিত।
Mahābhārata-saṅkṣepa and Avatāra-kāraṇa (Brahmā’s Synopsis of the Epic and the Logic of Divine Descents)
ব্রহ্মা বলেন—শ্রীকৃষ্ণ মহাযুদ্ধের মধ্যে পৃথিবীর ভার অপসারণের যে উপায় করলেন, সেই কারণেই তিনি সংক্ষেপে ভারতকথা বলবেন। তিনি চন্দ্রবংশের বংশানুক্রম শান্তনু‑ভীষ্ম পর্যন্ত, ব্যাসের নিয়োগে কুরুবংশের ধারাবাহিকতা, ধৃতরাষ্ট্র‑পাণ্ডু‑বিদুর এবং কৌরব‑পাণ্ডবদের জন্ম উল্লেখ করেন। লাক্ষাগৃহের অত্যাচার ও পলায়ন, একচক্রায় বকাসুর-বধ, দ্রৌপদীর স্বয়ংবর, ইন্দ্রপ্রস্থে রাজ্যবিভাগ, রাজসূয়, অর্জুনের সুভদ্রা-হরণ, দিব্যাস্ত্রলাভ ও অগ্নির তৃপ্তি পর্যন্ত প্রসঙ্গ আসে। পাশাখেলা থেকে বনবাস, বিরাটে অজ্ঞাতবাস, সন্ধি ব্যর্থ হয়ে বিশাল সেনাসমাবেশে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরু হয়। ভীষ্মের শরশয্যা ও ধর্মোপদেশ, দ্রোণের পতন, কর্ণবধ, শল্যের মৃত্যু, দুর্যোধনের গদাযুদ্ধ, অশ্বত্থামার রাত্রিকালীন সংহার—সবই সংক্ষেপে বলা হয়েছে। শেষে যুধিষ্ঠিরের সান্ত্বনা, শ্রাদ্ধকর্ম, রাজত্ব ও অশ্বমেধ। উপসংহারে অবতারতত্ত্ব—যাদববংশের বিনাশ, ভগবানের নাম, বিষ্ণুধামে গমন, দেবদ্বেষীদের মোহিত করতে বুদ্ধাবতার, এবং শম্ভলে কল্কির ভবিষ্যৎ জন্মে অধর্মদহন; এ কাহিনি শ্রবণ স্বর্গীয় পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে।
Roganidāna: Definitions, Fivefold Diagnostic Method, and Doṣa-wise Causes
ধন্বন্তরি–সুশ্রুত পরম্পরার ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে ‘রোগ’ শব্দের বহু সমার্থক ও সংজ্ঞা উল্লেখ করে চিকিৎসাজ্ঞানের পঞ্চাঙ্গ কাঠামো স্থাপন করা হয়েছে—নিদান, পূর্বরূপ, রূপ, উপশয় ও সম্প্ৰাপ্তি। অস্পষ্ট পূর্বলক্ষণ কীভাবে ধীরে ধীরে স্পষ্ট রোগরূপে প্রকাশ পায় তা ব্যাখ্যা করে, এবং উপশয়কে ব্যবহারিক নির্ণয়-চিকিৎসা পরীক্ষা বলে—যা উপশম আনে তা সাত্ম্য, যা ব্যর্থ বা বৃদ্ধি করে তা অসাত্ম্য। এরপর সব রোগের মূলকে দোষ/মল প্রकोপে স্থির করে কারণ-মানচিত্র দেয়: অতিশ্রম, ভ্রমণ, ভয়-শোক, অতিমৈথুন, রাত্রিভোজন ও গ্রীষ্মাচরণে বাত বৃদ্ধি; কটু-অম্ল, তাপ, ক্রোধ এবং শরৎ/দুপুর/মধ্যরাত্রির তীব্রতায় পিত্ত বৃদ্ধি; মধুর-লবণ, স্নিগ্ধ-গুরু-শীত আহার, অলসতা, দিবানিদ্রা ও অজীর্ণে কফ বৃদ্ধি, বিশেষত আম অবস্থায়। বিরুদ্ধ ও অনিয়মিত আহারে সন্নিপাত হয়—এ সতর্ক করে; ধাতুদূষণ, অন্তর্বায়ু, গ্রহদোষসদৃশ দ্বন্দ্ব, নক্ষত্রাদি, প্রসূতি-উপদ্রব, পাপ ও ভুল চিকিৎসাকেও কারণ বলে, পরবর্তী অধ্যায়ে জ্বরাদি রোগের সংখ্যা-বল-কালক্রমভেদ বর্ণনার ভূমিকা রচনা করে।
Jvara-Nidāna-Lakṣaṇa: Causes, Doṣic Types, Āma/Nirāma Stages, and Prognosis of Fever
পুরাণীয়-আয়ুর্বেদীয় উপদেশধারায় ধন্বন্তরি জ্বরকে সর্বরোগের মধ্যে প্রধান বলে নিরূপণ করেন এবং রুদ্রের ক্রোধ ও মোহজাত স্বকৃত দোষ/পাপকে তার কারণরূপে দেখান। তিনি স্থান ও দেহভেদে (বিভিন্ন প্রাণীতে) জ্বরের প্রকারভেদ বলেন, কফজ জ্বরের লক্ষণ বর্ণনা করেন এবং নীতিবাক্য স্থাপন করেন—নিদান অনুযায়ী পথ্য-অপথ্য ও চিকিৎসা না হলে রোগ বৃদ্ধি পায়। ক্ষুধা, বল, ভারভাব ও দোষের গতি দ্বারা আমজ্বর ও নিরামজ্বর পৃথক করা হয়েছে; বাত-পিত্ত, কফ-বাত, কফ-পিত্ত এবং বিশেষত ত্রিদোষজ সন্নিপাত জ্বরের লক্ষণ, হলুদ-হলুদ চোখ ও অগ্নিনাশের মতো প্রগনোসিস-সূচক চিহ্ন উল্লেখিত। আঘাত, সংস্পর্শ, শাপ, অভিচার, বিষ, গ্রহাবেশ এবং ক্রোধ-ভয়-শোক-কাম ইত্যাদি মানসিক কারণকে এক কাঠামোয় এনে মন-শরীরের যৌথ উৎপত্তি দেখানো হয়েছে। বর্ষা-শরৎ-বসন্তে প্রাকৃত/বৈকৃত জ্বর, এবং স্রোতস ও ধাতুতে রস থেকে অস্থি-মজ্জা পর্যন্ত গভীর হওয়া বিষম/সতত জ্বর ব্যাখ্যা করে শেষে লাঘব, রুচি-ফেরা, স্থিরচিত্ত, ক্ষুধা, ঘাম/হাঁচি ইত্যাদিকে আরোগ্যের লক্ষণ বলে পরবর্তী চিকিৎসা আলোচনার ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে।
Raktapitta Nidāna and Cikitsā: Causes, Signs, Srotas-Spread, and Śodhana Priority
ব্রহ্মখণ্ডে ধন্বন্তরির চিকিৎসা-উপদেশের ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে ‘রক্তপিত্ত’কে পিত্তপ্রকোপজনিত রক্তস্রাবরোগ বলা হয়েছে। উষ্ণ, তীক্ষ্ণ, বিদাহী রস ও কোদ্রব প্রভৃতি রুক্ষ/স্থূল শস্য অতিসেবনে—বিশেষত পিত্তপ্রকৃতির ব্যক্তিদের—পিত্ত বৃদ্ধি পেয়ে রক্তকে পাতলা ও জটিল করে। রক্তের ভিত্তি গন্ধ-রং এবং তার উৎপত্তি যকৃত ও প্লীহা থেকে—এ কথা বলা হয়েছে। মাথা ভার, অরুচি, ধোঁয়াটে দৃষ্টি, টক ঢেকুর, দুর্গন্ধযুক্ত বমি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি—এসব পূর্বলক্ষণ; অস্বাভাবিক লালচে বর্ণ, মাছের মতো দুর্গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস, চোখ ও ধাতুতে হলুদ/সবুজাভ আভা—নিদানচিহ্ন। স্বপ্ন-নিমিত্তে মানসিক বিকার আসন্নতার ইঙ্গিতও আছে। দোষের তাপ সর্বস্রোতে ছড়িয়ে ঊর্ধ্ব-অধঃ রক্তপাত এবং রোমকূপ দিয়ে স্রাব ঘটায়। চিকিৎসায় শোধন প্রধান—পিত্তে বিশেষত বিরেচন; কফ যুক্ত হলে বমনও অনুমোদিত। মধুর ও কষায় সহায়ক দ্রব্যের নির্দেশ আছে; মিশ্রদোষে রোগ অসাধ্য হতে পারে। শেষে কর্মফলের যোগ দেখিয়ে পরবর্তী প্রয়োগ, সংযম ও নীতিনিয়মকে প্রতিরোধক চিকিৎসা হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে।
Kāsa-bheda: The Fivefold Classification of Cough and Its Clinical Signs
ধন্বন্তরির চিকিৎসোপদেশের ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে কাস (কাশি) দ্রুত বেড়ে ওঠা ব্যাধি বলে তৎক্ষণাৎ শনাক্তকরণের গুরুত্ব বলা হয়েছে। প্রথমে কাসের পাঁচ ভেদ—বাতজ, পিত্তজ, কফজ, ক্ষতজ (আঘাত/অতিশ্রমজনিত) ও ক্ষয়জ (রাজযক্ষ্মা-সম্পর্কিত)—স্থির করা হয়। বিকৃত বায়ু ঊর্ধ্বগামী হয়ে কণ্ঠে উঠে বিশেষ শব্দ ও দেহক্লেশ সৃষ্টি করে—এই পথ বর্ণিত। বাতজে শুষ্কতা, কর্কশ ধ্বনি, বিদ্ধব্যথা ও অল্প-কষ্টসাধ্য কফ; পিত্তজে পীততা, তিক্ততা, জ্বর, তৃষ্ণা, পিত্ত/রক্তবমন ও ধোঁয়াটে দৃষ্টি; কফজে ভারভাব, শ্লেষ্মলেপ, বমিভাব, নাসা-জড়তা ও ঘন স্নিগ্ধ কফ—এগুলি লক্ষণ। পরে ক্ষতজ কাসে রক্তমিশ্র কফ ও তীব্র বক্ষঃশূল, আর ক্ষয়জে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজসদৃশ মিশ্র কফ, ক্ষীণতা, অস্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা ও অবনতির চিহ্ন বলা হয়েছে। শেষে সাধ্য ও যাপ্য রোগভেদ করে, বিশেষত ক্ষতজ-ক্ষয়জকে অধিকাংশে যাপ্য বলে সতর্ক করা হয়েছে যে অবহেলায় শ্বাসকষ্ট, বমন, স্বরহানি ও অন্যান্য ব্যাধিবৃদ্ধি ঘটে—পরবর্তী চিকিৎসাক্রমের ভূমিকা রচিত হয়।
Śvāsa-nidāna: Etiology, Types, Symptom Progression, and Fatal Prognosis
গরুড়পুরাণের ব্রহ্মখণ্ডের চিকিৎসা-প্রসঙ্গে ধন্বন্তরি সাধারণ রোগকারণ থেকে সরে এসে শ্বাস (শ্বাসকষ্ট) রোগের বিশেষ নিদান ব্যাখ্যা করেন। কাশি-জনিত দোষপ্রকোপ, অজীর্ণ-আম ও উদরবিকার, বিষ, জ্বর, ধোঁয়া-ধূলি ও শীতাদি পরিবেশগত উত্তেজক, মর্মাঘাত এবং শীতল জলসেবন—এগুলি তিনি প্রধান হেতু বলেন। শ্বাসের পাঁচ প্রকার উল্লেখ করে বক্ষদেশে কফ দ্বারা প্রাণবায়ুর আবরণ ও স্রোতস দূষণকে কেন্দ্রস্থ করেন। পরে পূর্বরূপ থেকে ধাপে ধাপে লক্ষণবৃদ্ধি দেখান—বায়ুর বিপরীত গতি, গলায় ঘড়ঘড় শব্দসহ কাশি, মূর্ছা, পীনস/কফ, শোয়ায় শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধি, মুখশোষ ও ঠান্ডায় অবনতি। বলবান রোগীর ক্ষেত্রে যাপ্য অবস্থা পৃথক করেন, আর জ্বর ও বারংবার মূর্ছাযুক্ত রূপকে দুরারোগ্য বলেন। শেষে অরিষ্টলক্ষণ—প্রলাপ, কান্তিহানি, ঊর্ধ্বদৃষ্টি, মূত্র-পায়খানা রোধ, মুখ-কানে কফ জমা ও মর্মভেদী শূল—বর্ণনা করে পরবর্তী অধ্যায়ের চিকিৎসা-প্রসঙ্গের ভূমি রচনা করেন।
Hikkā-nidāna: Causes, Types, and the Grave Yamalā/Veginī Hiccup
পুরাণীয়-আয়ুর্বেদীয় শিক্ষাধারায় ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে হিক্কা (হেঁচকি)-র নিদান বলেন। তিনি জানান, এর মূল কারণ শ্বাসরোগের মতোই; পূর্বলক্ষণ ও প্রকৃতি-ভিত্তিক ভেদ চিনতে হবে। বায়ুপ্রধান নানা প্রকার উল্লেখ করে তিনি বলেন—রুক্ষ ও উত্তেজক আহার, ক্ষুধাজনিত খিঁচুনি, এবং সমপরিমাণে খাওয়া-দাওয়ার পরই পরিশ্রম ইত্যাদি কারণে মৃদু হিক্কা হয়, যা অল্প আহার গ্রহণে কমে যেতে পারে। এরপর বিলম্বে দেখা দেওয়া অমঙ্গলসূচক হিক্কার কথা আসে, যা ‘যমদূত’-সংশ্লিষ্ট বলে বর্ণিত—হজমের সময় বাড়ে এবং হজম শেষ হলে তবেই প্রশমিত হয়। যমলা/বেগিনী/পরিণামবতী প্রকারে মাথা-ঘাড় কাঁপা, প্রলাপ, বমি ও অতিসার, চোখ ঘোরা, হাই তোলা, ইন্দ্রিয়ক্ষয়, পক্ষাঘাতসদৃশ দুর্বলতা, বাক্ ও স্মৃতিলোপ, এবং নাভি/অন্ত্রদেশ থেকে সাপের মতো ঊর্ধ্বমুখী চেপে ধরা বেগের উল্লেখ আছে। বৃদ্ধ ও দীর্ঘদিন ক্ষয়প্রাপ্তদের জন্য সতর্কতা দেওয়া হয়েছে; শেষে বলা হয়, হিক্কা ও শ্বাস প্রায়ই জীবনের অন্তিম কালে প্রকাশ পায়—চিকিৎসা-প্রগনোসিসকে মৃত্যুচিন্তার সঙ্গে যুক্ত করে।
Rajayakshma Nidana: Causes, Pathogenesis, Symptoms, and Prognosis
গরুড়পুরাণের ব্রহ্মখণ্ডে দেহধর্ম-নির্ভর চিকিৎসাবিষয়ে ধন্বন্তরি সাধারণ নির্দেশ থেকে সরে রাজযক্ষ্মা (যক্ষ্মা/ক্ষয়/শোষ) রোগের নিদান বলেন। তিনি একে রাজাসদৃশ সর্বব্যাপী ভয়ংকর ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করেন। রস ধাতু থেকে শুরু করে ধাতুশোষ, অতিসাহসী পরিশ্রম, প্রাকৃতিক বেগ দমন, এবং শুক্র-ওজ ও স্নিগ্ধতার ক্ষয়—এগুলি কারণ। পরে ত্রিদোষ প্রकोপ ঘটে—বাতের দ্বারা সর্বাঙ্গ অস্থিরতা, স্রোতস অবরোধ বা অতিস্রাব, হৃদয়-উরঃপীড়া, সর্দি, জ্বর, অরুচি, বমিভাব-বমি, পাণ্ডুতা ও ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা। অমঙ্গল স্বপ্ন ও ভীতিকর অনুভব অবনতির পূর্বলক্ষণ। বাত-পিত্ত-কফ প্রাধান্য অনুযায়ী লক্ষণ (দাহ, অতিসার, রক্তবমি, কফস্রাব, ভারীভাব, মন্দাগ্নি) পৃথক করে শেষে বলা হয়—অত্যধিক ক্ষয় ও ইন্দ্রিয়হ্রাস হলে চিকিৎসা বর্জনীয়; নচেৎ চিকিৎসা করণীয়।
Arocaka (Loss of Appetite): Nidāna, Doṣa-Lakṣaṇa, and Doṣaja Vomiting (Chardi) Markers
ধন্বন্তরি–সুশ্রুত সংলাপের ধারায় এই অধ্যায়ে অরোচককে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—দোষ জিহ্বা ও হৃদ্দেশে আশ্রয় নিয়ে রস ও ক্ষুধা নষ্ট করলে রুচিহানি ঘটে; দোষসম্মিলন ও মানসিক ক্লেশজনিত আরেক অবস্থাও বলা হয়েছে। ক্রমে উদান-বায়ু প্রবল হয়ে দেহের অপবিত্রতা বের করে দেয়, এবং তেজ, লালা ও স্বাদ কমে যায়। পরে বমি (ছর্দি) রোগের ভেদ-নির্ণয়—নাভি/পিঠের শূল ও পার্শ্ববেদনা থেকে বারবার বমন হয়। বাতজ ছর্দি ফেনিল, পিত্ত-রঞ্জিত, ঢেকুরসহ, শ্বাস-কাস বাড়ায়, শুষ্কতা ও স্বরক্ষয় আনে; পিত্তজ ধূম্র-সবুজাভ-হলুদ, রক্তমিশ্র, অম্ল-তিক্ত-কটু, তৃষ্ণা-মূর্ছা-দাহযুক্ত; কফজ স্নিগ্ধ, ঘন, হলুদ, মধুর-লবণ, অধিক ও দীর্ঘস্থায়ী, মাছি আকর্ষণ ও রোমাঞ্চসহ। শেষে দুর্গন্ধ, শোথ, অতিমধুর আঠালো ভাব, অলসতা, হৃদয়-অস্থিরতা, কাস ইত্যাদি তীব্র দুষণচিহ্নযুক্ত রোগী এড়াতে বলা হয়েছে এবং কৃমি ও দূষিত আহারজনিত কৃমিজ কারণ—শূল, কাঁপুনি, বমিভাব—উল্লেখ করে পরবর্তী চিকিৎসা আলোচনার ভূমিকা রচিত হয়েছে।
Causes and Signs of Hṛdroga (Heart Disease) and Tṛṣṇā (Pathological Thirst)
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক জ্ঞানধারায় ধন্বন্তরি সুश्रুত-ধাঁচের নিদানে হৃদরোগকে দোষভেদে ভাগ করেন—বাত, পিত্ত, কফ, সন্নিপাত এবং কৃমিজ। বাতজ হৃদরোগে শূন্যতা, বিদীর্ণ ব্যথা, কঠোরতা, অবশতা, ভয়, কাঁপুনি, শ্বাসরোধ ও অনিদ্রা; পিত্তজে তৃষ্ণা, দাহ, ঘাম, অম্লপিত্তসদৃশ বমি ও ধোঁয়াটে জ্বর; কফজে ভারীভাব, পাথরের মতো জড়তা, কাশি, আলস্য, অতিনিদ্রা, অরুচি ও জ্বর। এক ভয়ংকর রূপে করাতের মতো হৃদয় ছিঁড়ে যায়—দ্রুত ও প্রায়ই প্রাণঘাতী। পরে তৃষ্ণা ব্যাখ্যা—জিহ্বামূল, গলা, ক্লোম ও তালুর দ্ৰববাহী স্রোত শুকিয়ে গেলে পিপাসা হয়; অশুভ লক্ষণ মুখশুষ্কতা, স্বরহানি, আহারবিমুখতা, প্রলাপ, ঢেঁকুর, মাথা ঘোরা ও ইন্দ্রিয়বিকার। কারণ হিসেবে আম, রক্তাবরোধ, উষ্ণতা বৃদ্ধি, হঠাৎ ঠান্ডা জলপান, অতিপান ও অতিসংস্কৃত স্নিগ্ধ আহার; ক্ষয়, জ্বর ও দীর্ঘ রোগে তৃষ্ণা উপদ্রব-চিহ্ন—পরবর্তী চিকিৎসা-নিয়মের ভূমিকা।
Madātyaya Nidāna and Lakṣaṇa: Liquor’s Qualities, Tridoṣa Presentations, and Fainting Signs
ধন্বন্তরির বৈদ্য-ধর্মোপদেশের ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে মদ্যের গুণ বর্ণনা করে সতর্ক করা হয়েছে যে তার বাহ্য ‘উজ্জ্বলতা’ আসলে ওজঃক্ষয় ও মানসিক অস্থিরতা ঢেকে রাখে। মদ্যপতা ধাপে ধাপে মন ও আচরণের বিচ্যুতি—অস্থিরতা, মোহ (মদ), লজ্জাহীন কর্ম, বিবেকভ্রংশ—এবং এর ফল মৃত্যু-পরবর্তীও প্রসারিত। পরে চিকিৎসাবর্ণনায় মদাত্যয়কে বাতজ, পিত্তজ, কফজ ও সন্নিপাতজ বলা হয়েছে; সাধারণ লক্ষণ—বিভ্রান্তি, হৃদয়দেশে ব্যথা, অতিসার, তৃষ্ণা, জ্বর, ক্লান্তি, অনিদ্রা, ঘাম ও স্রোতোবাধা। দোষভেদে বর্ণপরিবর্তন, খিটখিটে ভাব, গভীর চিন্তা, এবং রক্ত ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মিশ্র জটিলতার লক্ষণও দেওয়া আছে। মূর্ছা/তমঃপ্রবেশের ভেদ দর্শনলক্ষণে—আকাশ লাল/হলুদ/মেঘাচ্ছন্ন দেখা—এবং পরবর্তী ঘাম, দাহ, ভারভাব ইত্যাদিতে নির্ণীত। শেষে বলা হয়েছে সংযম ও ঔষধে দোষবেগ প্রশমিত হয়; তাই দ্রুত রক্ষা-চিকিৎসা করে রোগীকে ধ্বংসাত্মক কর্ম থেকে বাঁচাতে হবে, যা পরবর্তী উপদেশের সেতু।
Arśa-nidāna: Causes, Prodrome, Doṣa-types, and Complications of Hemorrhoids
ব্রহ্মখণ্ডের আয়ুর্বেদ-ধর্মশিক্ষার ধারায় ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে অর্শ (বাওয়াসির) সম্বন্ধে বলেন—দোষে ত্বক, মাংস ও মেদ দূষিত হলে গুদে পেরেকের মতো বাধাদানকারী গাঁট সৃষ্টি হয়। কারণ দুই স্তরে: অতিভোজন, মদ্যপান, অনিয়মিত আচরণ, প্রাকৃতিক বেগ দমন, ও কামাচার-দোষ; এবং গভীর কারণ—জন্মগত/বংশগত প্রবণতা ও কর্মদোষ, যেমন পিতামাতার প্রতি অপরাধ বা অগ্নিচৌর্য ইত্যাদি। অপানবায়ুর ভূমিকা ও গুদভাঁজে মল-অশুদ্ধি ও অবরোধে নিম্নগতি রুদ্ধ হয়ে দাহ জাগে—এ কথা বলা হয়েছে। পূর্বলক্ষণ—অগ্নিমান্দ্য, কোষ্ঠকাঠিন্য, শ্রোণিবেদনা, মাথা ঘোরা, গড়গড় শব্দ, টক ঢেকুর; জটিলতা—গ্রহণী, গুল্ম, উদররোগ, পাণ্ডু, শোথ, মূত্রবিকার। শেষে বাত-পিত্ত-কফপ্রধান রূপ ব্যথা, বর্ণ, স্রাব, স্পর্শ ও আকৃতিতে পৃথক করে, অবহেলায় দ্রুত গুদাবরোধ ও পেট ফাঁপার সতর্কতা দিয়ে পরবর্তী দোষশমন চিকিৎসার প্রয়োজন নির্দেশ করা হয়।
Atīsāra (Diarrhoea) and Grahaṇī-doṣa: Causes, Prodromal Signs, Doṣa-wise Symptoms, and Major-Disease Status
ব্রহ্মখণ্ডের স্বাস্থ্যোপদেশে ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে অতিসার ও গ্রহণী-দোষের সুসংবদ্ধ নিদান বলেন। তিনি অতিসারের ছয় কারণ উল্লেখ করেন—বাতজ, পিত্তজ, কফজ, সন্নিপাতজ, ভয়জ ও শোকজ—এবং যে আহার‑বিহার বাত বাড়িয়ে অপানকে বিচলিত করে, অগ্নি দুর্বল করে ও মিশ্র হজমবিকার ঘটায়, তা বর্ণনা করেন। পরে পূর্বরূপ ও দোষভেদে লক্ষণ—বাধাগ্রস্ত ও বেদনাযুক্ত মলত্যাগ, পিত্তদূষিত দাহযুক্ত দুর্গন্ধ মল, এবং কফপ্রধান ভারীভাবসহ পিচ্ছিল আঠালো মল—স্পষ্ট করা হয়। অতিসারকে সাম ও নিরাম ভাগে বলা হয়েছে; রক্ত মিশলে তীব্রতা বাড়ে। অতিসারের সময় সংযম না রাখলে তা দীর্ঘস্থায়ী গ্রহণী-বিকারে রূপ নেয়—কৃশতা, তৃষ্ণা, অরুচি, মাথা ঘোরা, উদরফাঁপা ও নানা উপদ্রব দেখা দেয়। শেষে গ্রহণীকে অষ্ট মহারোগের অন্তর্ভুক্ত করে পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি নিয়ম‑চিকিৎসার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
Nidāna of Mūtraghāta and Aśmarī: Doṣa-based Types, Signs, and Named Urinary Syndromes
ধন্বন্তরি–সুশ্রুত সংলাপের ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে মূত্রঘাত (মূত্রাবরোধ)-এর নিদান বর্ণিত। শ্রোণি-প্রদেশে মূত্রেন্দ্রিয় ও নাড়ির অবস্থান এবং মূত্রবাহী শিরার মাধ্যমে মূত্র ভরে বস্তুি (মূত্রাশয়)-এ পৌঁছায়—এ কথা বলা হয়েছে। কষ্টমূত্রতাকে প্রমেহ প্রভৃতি বৃহত্তর মূত্ররোগের সঙ্গে যুক্ত করে বাত, পিত্ত, কফ অনুযায়ী মূত্রের বর্ণ, দাহ, শোথ, ভারভাব ও প্রবাহের অনিয়মের লক্ষণ নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কফমূল অশ্মরী (পাথরি)-র পূর্বলক্ষণ হিসেবে উদরফাঁপা ও ব্যথা, পাথরি/কণা সৃষ্টির প্রক্রিয়া, শুক্র রুদ্ধ বা বিকৃত হলে শুক্রাশ্মরী এবং পাথরি ভেঙে শর্করা (কঙ্কর) হওয়ার কথাও আছে। পরে নামযুক্ত অবরোধজনিত রোগ—বাতবস্তি, বাতাষ্ঠীলা, বাতকুণ্ডলিকা, মূত্রাতীত, মূত্রগ্রন্থি, মূত্রশুক্র, উদাবর্তজনিত মল-মিশ্রণ, উষ্ণবাত—ইত্যাদি গণনা করে শেষে মূত্রসাদে মূত্র শুকিয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক বর্ণের উল্লেখ করা হয়েছে। এই নিদান-সংগ্রহ পরবর্তী চিকিৎসা (স্নেহন, স্বেদন, বস্তি, অশ্মরী-ব্যবস্থাপনা) আলোচনার ভিত্তি স্থাপন করে।
Prameha-Nidāna-Lakṣaṇa-Bheda: Etiology, Signs, Varieties, and Complications of Meha
ব্রহ্মখণ্ডের ধর্মসম্মত ব্যবহারিক উপদেশে ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে প্রমেহের নির্ণয়-লক্ষণ-ভেদ ব্যাখ্যা করেন। দোষভেদে প্রকার গণনা করে মূত্রকে প্রধান দर्पণ ধরা হয়—রং, ঘোলাভাব, মাধুর্য, সান্দ্রতা/চিক্কণতা ও তাপ দেখে বিচার। মধুমেহকে ভয়ংকর পরিণতি বলা হয়েছে—অতিসন্তর্পণে কফজ বা ধাতুক্ষয়ে বায়ুপ্রাধান্য—যেখানে মধুর মতো মিষ্টি মূত্র, অজীর্ণ, অরুচি, বমি, তন্দ্রা, কাশি ও সর্দি থাকে। কফে শূল-জ্বর, পিত্তে দাহ-তৃষ্ণা, বায়ুতে উদাবর্ত, কম্পন ও হৃদয়/কণ্ঠের কাঁপুনি-ধড়ফড় উপদ্রব; অবহেলায় দাহযুক্ত নানা আকারের পিড়কা/ফোঁড়া দেখা দেয়। কফবর্ধক আহার-বিহার ও অলসতা কারণ; ফল নির্ভর করে দোষপ্রাধান্য, দীর্ঘকালীনতা ও দিষ্টের উপর—পরবর্তী চিকিৎসা/আচরণ নির্দেশের জন্য এটি সেতু রচনা করে।
Vidradhi–Gulma Nidāna (Causes and Signs of Abscess and Abdominal Mass)
ব্রহ্মখণ্ডের চিকিৎসা-নীতিতে ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে বলেন—অযথা আহার-বিহার, ভঙ্গি ও রক্তদূষক অভ্যাসে দোষ-ধাতু বিকৃত হয়ে ‘বিদ্রধি’ নামে বেদনাদায়ক ফোঁড়া/স্ফীতি জন্মায়। বাত, পিত্ত, কফ ও সন্নিপাতভেদে রং, ব্যথার প্রকৃতি, পাকার ধরণ এবং জ্বর, তৃষ্ণা, মূর্ছা ইত্যাদি লক্ষণ নিরূপিত; নাভি, বস্তি, প্লীহা, ক্লোম, হৃদয়, কুঁচকি ও গুদদেশে অবস্থানভেদে বিশেষ লক্ষণও বলা হয়েছে। পরে বায়ু-অবরোধ ও বেগধারণে মূত্র-অণ্ডকোষীয় স্ফীতি এবং গভীর উদরগ্রন্থি ‘গুল্ম’-এর লক্ষণ—গড়গড় শব্দ, কোষ্ঠকাঠিন্য, মূত্রকষ্ট ও মন্দাগ্নি—বর্ণিত। নারীদের ঋতুরোধ ও বাতপ্রকোপজনিত ‘রক্তগুল্ম’ গর্ভসদৃশ মনে হতে পারে এবং কখনও পরে বিদ্রধিরূপে পেকে ওঠে। শেষে পূর্বলক্ষণ, আনাহ, অষ্টহীলা প্রভৃতি সহগামী অবস্থা উল্লেখ করে ভেদ-নিদান ও গুরুতরতার চিহ্ন স্থাপন করা হয়েছে।
Udara-roga Nidāna: Causes, Doṣa-Types, Spleen/Liver Enlargement, and Udakodara
ব্রহ্মখণ্ডের চিকিৎসা-উপদেশে ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে বলেন—অগ্নি দুর্বল হলে অজীর্ণ, মলসঞ্চয় ও প্রাণ–অপানের বাধা ঘটে; ফলে উদরফুলে ওঠে এবং দেহক্ষয় বাড়ে। সাধারণ লক্ষণ—রুক্ষতা, কৃশতা, আলস্য, শিরাজালের মতো রেখা, গুড়গুড় শব্দ, অরুচি ও শক্তিহানি। দোষভেদে—বাতজে তীব্র শূল, শ্যাম-রক্তাভ বর্ণ ও অস্বাভাবিক শব্দ; পিত্তজে জ্বর-দাহ, তিক্ত স্বাদ, হলুদ-সবুজ বর্ণ; কফজে ভারীভাব, তন্দ্রা, শ্বেত বর্ণ ও স্নিগ্ধতা; সন্নিপাতে মিশ্র লক্ষণসহ ভ্রম-মূর্ছা। কারণ—অতিভোজন, উত্তেজনা, অনুচিত পরিশ্রম/ভ্রমণ-আরোহণ, অপথ্য পানীয়, বমন ও ক্ষয়রোগ। পরে বামে প্লীহা-বৃদ্ধি ও ডানে যকৃত-সদৃশ বিকার, এবং হজমবিকৃতি থেকে অর্শ, উদাবর্ত, কোষ্ঠকাঠিন্য ও দুর্গন্ধযুক্ত বেদনাদায়ক বায়ুর কথা বলা হয়েছে। শেষে ছিদ্রোদর/পরিস্ত্রাবী ও উদকোদর (জলসঞ্চয়) বর্ণিত; দ্রুত জল জমে উপদ্রব হলে তা সর্বাধিক দুরারোগ্য—পরবর্তী চিকিৎসার ভূমিকা।
Pāṇḍu-Śotha Nidāna: Doṣa-wise Signs, Complications, and Prognosis
ব্রহ্মখণ্ডের আয়ুর্বেদোপদেশে ধন্বন্তরি সুश्रুতকে পাণ্ডু ও শোথের নিদান ও লক্ষণের সুসংবদ্ধ মানচিত্র প্রদান করেন। তিনি বলেন, প্রকুপিত দোষ—বিশেষত পিত্ত—নাড়ী পথে সঞ্চরিত হয়ে রসাদি ধাতুকে দূষিত করে; ফলে হলুদ-হলুদ বর্ণবিকার, ভারভাব, আম-সম্পর্কিত শৈথিল্য ও বহু অঙ্গের দুর্বলতা দেখা দেয়। বাত/পিত্ত/কফ-প্রাধান্য অনুযায়ী লক্ষণভেদ, তীব্র অবস্থায় মিশ্র ও আচ্ছন্ন লক্ষণ, এবং ক্ষয়, বিকৃত মল, পিত্তানুগ শোথ, কুম্ভ-কামলা ও হালীমকের দিকে অগ্রগতির মতো উপদ্রবের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। পরে পাণ্ডুর প্রধান সহচর লক্ষণ শোথের স্বরূপ—স্রোতোবরোধ ও নিচয়জাত ঘনীভূত স্ফীতি—ব্যাখ্যা করে, আঘাতজ ও বিষজসহ নয় প্রকার শোথ এবং আহার-বিহার, পরিশ্রম ও বিষ-সংস্পর্শজনিত কারণসমূহ গণনা করা হয়। শেষে নরম, চলনশীল, নবীন শোথ সাধ্য এবং গভীর, অন্তর্গত কারণে সৃষ্ট শোথ অসাধ্যপ্রায় বলে নির্ণয় করে পরবর্তী চিকিৎসা আলোচনার ভূমিকা স্থাপিত হয়।
Visarpa Nidāna-Lakṣaṇa (Causes, Types, and Prognosis of Rapidly Spreading Eruptive Disorders)
ধন্বন্তরির সুश्रুত-উপদেশের ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে ‘বিসর্প’ নিরূপিত—অন্তরে কুপিত দোষ বাহিরে উঠে ত্বকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; ক্লান্তি, ভয়, বেগধারণ, এবং অগ্নি ও বলের আকস্মিক ক্ষয়ে তা জন্মায়। বায়ু, পিত্ত ও কফ-প্রধান রূপগুলি ব্যথার প্রকৃতি, ছড়ানোর গতি, বর্ণ, ভার/চুলকানি ও জ্বরসদৃশ লক্ষণে পৃথক করা হয়েছে; মিশ্রদোষ ও সন্নিপাতে এটি ছোট ফোসকার মতো দেখালেও ক্ষতের মতো স্রাব হয়। গুরুতর ভেদে অগ্নি-বিসর্প মর্মপথে ছড়িয়ে তীব্র যন্ত্রণা, নিদ্রাভঙ্গ, শ্বাসকষ্ট ও মূর্ছা ঘটায়; গ্রন্থি-বিসর্পে মালার মতো গাঁট, রক্তস্রাব, তীব্র ব্যথা, জ্বর ও দেহক্ষয়; কर्दম-বিসর্প গভীর পাকা, দুর্গন্ধযুক্ত, পচনধর্মী ও শবগন্ধময়। শেষে পূর্বাভাস—একদোষজ সাধ্য, দ্বিদোষজ উপদ্রব না থাকলে সাধ্য; কিন্তু সন্নিপাত, মর্মগত ও ধাতুনাশক রূপ অসাধ্য, তাই পরবর্তী চিকিৎসায় সূক্ষ্ম বিচার আবশ্যক।
Kuṣṭha-bheda-lakṣaṇa-nidāna and Śvitra (Kilāsa) Prognosis
ব্রহ্মখণ্ডে ধন্বন্তরির চিকিৎসা-উপদেশে এই অধ্যায়ে সাধারণ কারণ থেকে সরে কুষ্ঠের বিশেষ নিদান বলা হয়েছে। বিরুদ্ধ আহার ও শত্রুভাবাপন্ন পাপাচার স্রোতস দূষিত করে; ফলে ত্বক, রক্ত, মাংস ও মেদ বিকৃত হয়ে বাইরে বর্ণবৈচিত্র্য, চুলকানি, দাহ, অবশতা, ফোলা, ফাটল ও কীটসদৃশ উপদ্রব দেখা দেয়। ত্রিদোষ ও তাদের সংযোগ অনুযায়ী কুষ্ঠের মহৎ ও ক্ষুদ্র ভেদ, এবং লক্ষণ—কপালসদৃশ শুষ্কতা, উদুম্বরফলসদৃশ স্ফীতি, বৃত্তাকার দদ্রু, ফোস্কাযুক্ত পুণ্ডরীক, মাছের আঁশের মতো কিটিম—ইত্যাদি বর্ণিত। দোষ-প্রাধান্য ও ধাতু-গভীরতা (ত্বক থেকে রক্ত/মাংস/মেদ, পরে অস্থি/মজ্জা/শুক্র) দেখে সাধ্য-যাপ্য-কৃচ্ছ্রসাধ্য নির্ণয় শেখানো হয়েছে। শ্বিত্র/কিলাসের দোষানুসারী রং ও স্তরভেদ, এবং ক্ষতস্থানের ভিত্তিতে পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছে। শেষে সংস্পর্শ ও যৌথ ব্যবহৃত বস্তু দ্বারা রোগ ছড়ায়—এ কথা বলে শৌচ ও চিকিৎসা-শৃঙ্খলার দিকে সেতু রচনা করা হয়েছে।
Krimi-nidāna: Types of External and Internal Parasites and Their Symptoms
ব্রহ্মখণ্ডে ধন্বন্তরির চিকিৎসা-বিবরণে এই অধ্যায়ে কৃমিকে বাহ্য ও অন্তঃ—দুই ভাগে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। প্রথমে মলজাত বাহ্য কৃমি—চুল ও বস্ত্রে আশ্রিত ইউকা (উকুন) ও লিক্ষা (ডিম)—যা চুলকানি, ফোলা ও ফুসকুড়ি ঘটায়। পরে কফজাত অন্তঃকৃমি, যা পাকস্থলী থেকে উৎপন্ন হয়ে কখনও বাইরে বেরোয় এবং কুষ্ঠসদৃশ ত্বকরোগ বাড়ায়; গুড়, দুধ, দই, মাছ ও সদ্য রান্না ভাতের মতো মধুর-গুরু আহারে এরা বৃদ্ধি পায়। এদের সাপাকৃতি, কেঁচোর মতো, অঙ্কুরের মতো নানা রূপ এবং অন্ত্রভোজী, উদর-জড়ানো, হৃদয়ভোজী, গুদকৃমি ইত্যাদি ভেদ; লক্ষণে বমিভাব, শুষ্কতা, অজীর্ণ, জ্বর, অবরোধ ও কৃশতা বলা হয়েছে। এরপর রক্তজাত সূক্ষ্ম জীবের উল্লেখ আছে, কুষ্ঠাদি ব্যাধির সঙ্গে যাদের নাম জড়িত। শেষে পাক্বাশয়ে উৎপন্ন মলজাত কৃমির নাম-লক্ষণ—শূল, কোষ্ঠকাঠিন্য, গুদচুলকানি-দাহ, পাণ্ডুতা ও অস্বাভাবিক দেহচালনা—বর্ণিত হয়ে পরবর্তী চিকিৎসার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
Vāta-vyādhi Nidāna and Lakṣaṇa: Obstruction, Dhātu-Seating, and Major Neuromuscular Entities
দোষশিক্ষার ধারাবাহিকতায় ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে বলেন—দেহের স্রোতস্/পথে অবরোধই বিকৃত বায়ুর প্রধান কারণ। তিনি স্বাভাবিক ও প্ররোচিত ক্রিয়ার ভেদ বোঝান এবং বলেন, নাড়ি-চ্যানেল দোষে পূর্ণ হলে প্রকুপিত বাত শূল, উদরফাঁপা, গুড়গুড় শব্দ, কোষ্ঠকাঠিন্য, স্বর ও দৃষ্টির দুর্বলতা, পিঠ-কোমরের জড়তা ঘটায়। পরে অঙ্গস্থান ও ধাতু-আশ্রয় অনুযায়ী লক্ষণ—ত্বকে শুষ্কতা ও ফুসকুড়ি, অন্ত্রে অবরোধ, ক্ষয়, আর অস্থি-মজ্জা-শুক্রে বসলে গভীর ব্যথা ও অস্থিরতা, অস্বাভাবিক স্রাব ও শোথসদৃশ কষ্ট—ক্রমে বর্ণিত। গুরুতর বাতরোগের তালিকায় আছে আক্ষেপণ (খিঁচুনি) ও শেষপর্যায়ের লক্ষণ, চোয়াল-জিহ্বা স্তম্ভ হয়ে বাক্বিঘ্ন, এবং শিরোমুখের রোগ—অর্দিত ও পক্ষাঘাত; শুষ্ক, কালচে, যন্ত্রণাময় শিরোরোগকে অসাধ্য বলা হয়েছে। শেষে বাহুক, বিপূচী, খোঁড়া/পঙ্গুতা, ঊরুস্তম্ভ, ক্রোষ্টুকশীর্ষ, বাতকণ্টক, গৃধ্রসী, পাদহর্ষ ও পাদদাহ প্রভৃতি অঙ্গ-সন্ধির বিকার উল্লেখ করে, আহার-বিহার, আম-অবরোধ ও দোষ-মিশ্রণকে সিদ্ধান্তকারী বলে পরবর্তী চিকিৎসার ভূমিকা রচনা করা হয়েছে।
Nidāna of Vātarakta and Āvaraṇa of Vāyu; Doṣa-wise Lakṣaṇas and Triphalā-Yoga Remedies
ব্রহ্মখণ্ডের চিকিৎসা-ধর্মোপদেশের ধারাবাহিকতায় ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে বাতরক্তের কারণ বলেন—বিরুদ্ধ ও অনিয়মিত আহার-বিহার, মানসিক উত্তেজনা এবং নিদ্রাবিকার অগ্নিকে দুর্বল করে রক্তকে দূষিত করে; ফলে কুপিত বায়ু বিকৃত পথে চলতে থাকে। শুরুতে জড়তা ও ছড়িয়ে পড়া ব্যথা, পরে ধাতুতে প্রবেশ, সন্ধিতে স্থিতি, বর্ণবিকার, পাকা/পুঁজ হওয়া এবং শেষে খোঁড়াভাবের সম্ভাবনা বর্ণিত। বাত, রক্ত, পিত্ত ও কফ-প্রাধান্য অনুযায়ী লক্ষণভেদ ও সাধ্য-অসাধ্য নিয়ম দেওয়া হয়েছে—একদোষজ সহজসাধ্য, ত্রিদোষজ বর্জনীয়, আর রক্তপিত্ত সর্বাধিক ভয়ংকর। এরপর পাঁচ বায়ু (প্রাণ, ব্যান, সমান, উদান, অপান)-এর দোষকারক কারণ ও রোগ, এবং ‘আবরণ’ তত্ত্ব—বায়ু, দোষ ও ধাতুর পারস্পরিক প্রতিবন্ধ—এর লক্ষণ ও উপদ্রব বলা হয়েছে। শেষে চিকিৎসায় ত্রিফলা-ভিত্তিক যোগ, সহায়ক ঔষধসহ, নানা রূপে উপযুক্ত মাত্রায় গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
Cikitsā-sāra: Doṣa Nidāna–Lakṣaṇa, Agni, Ajīrṇa/Āma Cikitsā, Daśamūla, and Prognostic Signs
নিদান-অংশের পর ধন্বন্তরি জীবরক্ষার জন্য সংক্ষিপ্ত কিন্তু ‘সিদ্ধ সার’ চিকিৎসাসার বলেন। তিনি আহার-রস ও আচরণগত কারণে বায়ু, পিত্ত, কফের প্রকোপের কারণ গণনা করেন এবং প্রতিটি দোষ ও মিশ্র/ত্রিদোষ অবস্থার লক্ষণসমূহ জানান। দোষ-ধাতু-মল সমতা-ই স্বাস্থ্য—এই তত্ত্ব স্থাপন করে দোষের গুণ-আসন ও রসের দ্বারা বৃদ্ধি-শমন নীতি ব্যাখ্যা করেন। এরপর চিকিৎসার চতুষ্পাদ এবং দেশ, কাল, বয়স, অগ্নি, প্রকৃতি, বল, মন-শরীর অবস্থা বিচার করে সিদ্ধান্তের বিধান দেন। অজীর্ণ/আম চিকিৎসায় আমে বমন, অতিরিক্ত অম্লতায় শীতোপচার, অবরোধজনিত শূলে স্বেদন ও লবণজল, এবং ক্রমবর্ধমান দোষাবরোধে উদরলেপ; পথ্য-অপথ্য ও অনুপানও বলা হয়। শেষে পঞ্চমূল/দশমূলের প্রয়োগ, ক্বাথ-ঘৃত/তৈল, বস্তি, পান, অভ্যঙ্গ, নস্যের অনুপাত, এবং আয়ু-লক্ষণ (মৃত্যুসন্নিকট চিহ্ন) বর্ণিত; বৈদ্য-মিত্র-গুরু সম্মান ও ইন্দ্রিয়সংযমকে প্রাণরক্ষার নীতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
Anupāna and the Doṣa-Effects of Foods, Waters, Dairy, Oils, and Preparations
ধন্বন্তরির চিকিৎসা-উপদেশে এই অধ্যায়ে সাধারণ হিতাহিত-বিবেচনা থেকে এগিয়ে ‘অনুপান’ বিধি ও বিস্তৃত খাদ্য-দ্রব্যবিজ্ঞান বলা হয়েছে। ধান্য (চালের নানা জাত, বাজরা, যব, গম), ডাল (মুদ্গ, মাষ, কুলত্থ, চণক, মসুর), শাক-সবজি, ফল (ডালিম, লেবুজাতীয়, আমলকি, হরীতকী, তেঁতুল, আম) এবং মসলা (শুণ্ঠি, মরিচ, পিপ্পলী, হিং, যবানি/আজওয়াইন, জিরা) — এগুলির দ্বারা বাত-পিত্ত-কফ কীভাবে প্রশমিত বা বৃদ্ধি পায় এবং গুল্ম, প্রমেহ, রক্তপিত্ত, গ্রহণী, কাশি-শ্বাস ইত্যাদিতে কী প্রভাব পড়ে তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। পরে লবণ-ক্ষার ও জলের সূক্ষ্ম বিভাগ (বৃষ্টি, নদী, কূপ, পুকুর, প্রস্রবণ; সূর্য-চন্দ্র-আলোকিত; সেদ্ধ-শীতল; বাসি) দিয়ে উৎস ও প্রস্তুতির সঙ্গে দোষফল যুক্ত করা হয়েছে। শেষে দুধের প্রকার, দই-ছানা/মাঠা, ঘি, তেল, মধু, আখজাত দ্রব্য, কিণ্বিত পানীয় ও চিকিৎস্য যবাগূ-যূষের কথা বলে বর্ণবিকার ও বিষলক্ষণে সতর্কতা নির্দেশ করা হয়েছে; পরবর্তী অংশে রোগতত্ত্ব ও বিষবিদ্যার দিকে গতি স্বাভাবিক হয়।
Dhanvantari’s Therapeutics: Jvara to Vraṇa (Fever, GI Disorders, Bleeding, Respiratory, Urinary, Swelling, and Wound Care)
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক আয়ুর্বেদ ধারায় ধন্বন্তরি দোষ ও রোগভেদ অনুসারে চিকিৎসা সাজান। তিনি অষ্টবিধ জ্বর দিয়ে শুরু করে তৃষ্ণা-শমন, পাচন, বিরেচন ও নস্য দ্বারা সংজীবনের উপায় বলেন। এরপর জ্বরজনিত অতিসার, তারপর গ্রহণী ও অর্শে অগ্নি-প্রতিষ্ঠাকে মুখ্য করে তাজা তক্র ইত্যাদি সহজ পথ্য নির্দেশ করেন। পরে পাণ্ডু-কামলা ও রক্তপিত্তে মধু-শর্করা সহায় এবং স্তম্ভক উদ্ভিদগোষ্ঠীর কথা আছে; সঙ্গে কাস, শ্বাস, হিক্কা, স্বররোগ, বমি এবং গ্রহ/অপস্মার/উন্মাদ চিকিৎসাও বর্ণিত। তারপর বাতরক্ত, কোষ্ঠকাঠিন্য/উদাবর্ত/আনাহ, গুল্ম, মূত্রাবরোধ ও মেহ, এবং স্থূলতা ও উদরবৃদ্ধিতে নিয়মভিত্তিক নির্দেশ আসে। শেষে শোথ, গ্রন্থি-বিদ্রধি ও সুসংবদ্ধ ব্রণচিকিৎসা—শোধন-প্রক্ষালন, শীতোপচার, ব্রণকৃমিনাশন ও গুগ্গুলু-ভিত্তিক সহায়—দিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ের ধারাবাহিকতা স্থাপন করা হয়েছে।
Treatment of Nāḍī-vraṇa, Bhagandara, Upadaṃśa, Fractures, Kuṣṭha/Śvitra, Āmlapitta, ENT–Eye Disorders, and Bleeding Conditions
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক চিকিৎসা-উপদেশে ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে ক্রিয়াভিত্তিক সংক্ষিপ্ত বিধান দেন। প্রথমে নাড়ী-ব্রণ—ছেদন করে পরে সাধারণ শোধন-রোপণ; নাড়ীপথ, সংক্রমিত ঘা, খোসপাঁচড়া ও ভগন্দরেতে গুগ্গুলু–ত্রিফলা-ভিত্তিক অন্তঃঔষধ ও ঔষধতেল নির্দেশিত। উপদংশে শুদ্ধিকরণ ও পুঁজ হওয়া রোধ, এবং নিম, ত্রিফলা, খদির, গুড়ূচী-প্রধান ক্বাথ, লেপ ও ঘৃত। ভগ্ন/স্খলনে শীতোপচার, উষ্ণ সেঁক-পোল্টিস, কুশ-বাঁধন, পুষ্টিকর আহার, এবং রসুন-মধু-ঘৃত ও গুগ্গুলু-যোগে অস্থিসন্ধান। পরে কুষ্ঠ, দদ্রু, শ্বিত্রে বমন-রেচন-রক্তমোক্ষণসহ শোধন, লেপ-উদ্বর্তন, রসায়ন ও খদির-জল সেবন। আম্লপিত্তে তিক্ত ক্বাথ, ঘৃত ও পিপ্পলী-গুড়; এরপর ফুসকুড়ি ও ক্ষুদ্র শল্যকর্মে ছেদন-দাহ। শেষে মুখ-কর্ণ-নাসা-নেত্ররোগে অঞ্জন/নস্য/লেপ, শিরোরোগ ও সূর্যাবর্ত, এবং অসৃগ্দর-প্রদর ও পিত্তজনিত রক্তস্রাবে পানীয়-যোগ দিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ের ধারাবাহিকতা স্থাপিত।
Strīroga–Prasūti–Bāla Cikitsā, Viṣa-haraṇa, Rasāyana, Ṛtucaryā, Pañcakarma-saṅgraha
খণ্ড ১-এর আয়ুর্বেদ-প্রবাহে ধন্বন্তরি সুश्रুতকে যোনি-ব্যাপদ ও স্ত্রীরোগ বিষয়ে উপদেশ দেন—বাত-শমনকে প্রধান করে যোনি-শূল, পার্শ্ব/হৃদরোগ, গুল্ম ও অর্শের জন্য যৌগিক ঔষধ বলেন। ফাটল/ব্রণ, দুর্গন্ধ ও অতিরিক্ত রক্তস্রাবে লেপ ও ঔষধ-ঘৃত, পরে গর্ভধারণ ও সন্তানবৃদ্ধিকারী প্রস্তুতি, গর্ভিণীর শূল-শমন এবং সুখপ্রসবের সহায়ক বাহ্যপ্রয়োগ বর্ণিত। এরপর স্তন্যবৃদ্ধি, ধাত্রী-দুগ্ধশোধন, শিশুর জন্য রসায়নপ্রায় লেহ্য ও বমন, কাশি, জ্বর, অতিসার, চর্মরোগ ইত্যাদির চিকিৎসা; গ্রহপীড়ায় স্নান-অভ্যঙ্গ ও রক্ষা-মন্ত্রবলি বিধানও আছে। বিষহরণ অংশে বিষ ও সর্পদংশের প্রতিষেধ, তারপর রসায়নক্রম—হরীতকীর ঋতুভিত্তিক সেবন, জ্বরোত্তর পুনর্বলন, আয়ু ও বীর্যবর্ধক যোগ। শেষে ঋতুচর্যা ও আহারনীতি, শিরো/নস্যাদি কর্ম এবং বমন-রেচন-বস্তি সহ পঞ্চকর্মের সংক্ষিপ্ত নির্দেশ, কোষ্ঠপরীক্ষা ও বস্তিযন্ত্র-মাত্রা উল্লেখ করে পরবর্তী অধ্যায়ের ভূমিকা স্থাপিত।
Rasa-Dravya Varga: Sweet, Sour, Salty, Pungent, Bitter, Astringent; Snehana and Svedana Guidelines
ধন্বন্তরির চিকিৎসা‑উপদেশ অব্যাহত রেখে এই অধ্যায়ে ষড়রসের ভিত্তিতে আহার ও ঔষধকে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রথমে মধুর রসের দলে শস্য, দুগ্ধ, পুষ্টিকর রস, মধু ও কিছু ফল‑কন্দের গুণ বলা হয়েছে—দাহ ও মূর্ছা প্রশমন, ইন্দ্রিয়প্রসাদ, এবং শ্বাসকষ্ট ও গ্রন্থি‑শোথে লেপপ্রয়োগের নির্দেশও আছে। পরে আম্ল ফল ও সन्धान/গাঁজনজাত দ্রব্যের দীপন‑পাচন উপকারিতা এবং অতিসেবনে দাহ, ক্ষতবৃদ্ধি, দাঁতের সংবেদনশীলতা ইত্যাদি দোষ উল্লেখিত। লবণ‑ক্ষার শোধন ও পাচনকারী হলেও অতিভোগে স্রোত অবরোধ করে। কটু ও তিক্ত দ্রব্য কফহর ও রুচিবর্ধক, কিন্তু বেশি হলে শোষণ ও রুক্ষতা বাড়ায়। কষায় রস শোষক‑রোপক, তবে অতিসেবনে হৃদয়কষ্ট ও অতিরিক্ত শুষ্কতা। এরপর দশমূলসহ নানা ঔষধগণ এবং কর্মবিধি—স্নেহে ঘৃতের শ্রেষ্ঠতা, দোষানুসারে সংযোগ, রোগীর বল অনুযায়ী মাত্রা, সম্যক্ স্নেহনের লক্ষণ, ও স্বেদনের বিধি‑নিষেধ—বর্ণিত হয়ে পরবর্তী চিকিৎসা আলোচনার সেতু রচিত হয়েছে।
Preparations of Medicated Ghee and Oils (Ghṛta–Taila Yoga); Brāhmī-ghṛta and Nārāyaṇa Taila
ব্রহ্মখণ্ডের জীবনধারণকারী ব্যবহারিক উপদেশের ধারাবাহিকতায় ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে স্নেহকল্পনা শেখান—নির্দিষ্ট ভেষজসমষ্টি, পরিমিত অনুপাত ও নিয়ন্ত্রিত তাপে ঘৃত‑তৈল সিদ্ধ করার বিধি। শুরুতে মেধ্য দ্রব্য (শঙ্খপুষ্পী, বচা, সোমা, ব্রাহ্মী) উল্লেখ করে ‘ব্রাহ্মী‑ঘৃত’ নামক যোগ বলা হয়েছে; কণ্টকারীরস ও দুধে সিদ্ধ এই ঘৃত শ্রুতি‑শক্তি ও মেধা বৃদ্ধি করে। পরে রোগনাশক নানা ঘৃত‑তৈল, সুগন্ধি বাতশামক তৈল মৃদু আঁচে রান্না করে রৌপ্যপাত্রে সংরক্ষণের কথাও আছে। অধ্যায়ের প্রধান অংশ ‘নারায়ণ‑তৈল’ (এবং সমঘৃত), যা বিষ্ণুর অনুগ্রহস্বরূপ গভীর বাতব্যাধি, ধাতুগত বিকার, বিকলতাসদৃশ অবস্থা, কুষ্ঠ, জরা‑জনিত দুর্বলতা ও যৌনদৌর্বল্যে মহৌষধ। শেষে ভগন্দর (ফিস্টুলা)‑এর বিশেষ তৈল, গণ্ডমালা‑র জন্য আজমোদা‑ভিত্তিক তৈল, এবং দগ্ধচিকিৎসায় আগে শোধন তারপর কোমলকারী‑রোপণ তৈল প্রয়োগের ক্রম নির্দেশিত।
Jvara-Chikitsa: Doṣa-wise Fever Management, Medicated Waters, and Escalation Therapies
বিষ্ণুর ধন্বন্তরি-রূপ ও সুश्रুত-পরম্পরার স্মরণ করিয়ে হরি শঙ্করকে জ্বরচিকিৎসার সুসংবদ্ধ পদ্ধতি বলেন। প্রথমে সাধারণ বিধি—লঙ্ঘন/উপবাস, সেদ্ধ জল পান, ও বাতাস থেকে আশ্রয়। পরে দোষভেদে চিকিৎসা: বাতজ্বরে গুডূচী–মুস্তক; পিত্তজ্বরে ঘৃত ও শীতল সুগন্ধ দ্রব্য (উশীর, চন্দন প্রভৃতি); কফজ্বরে শুণ্ঠী–দুরালভা সহ ঘৃত। নিম্ব, ধান্যা/ধনে, পটোল, ত্রিফলা ইত্যাদি ক্বাথ অগ্নি দীপ্ত করে ও বাতানুলোমন করে। সন্নিপাতজ্বরে হলুদ–নিম্ব–ত্রিফলা–মুস্তক–দেবদারু যোগ এবং কটুরোহিণী–পটোল ক্বাথ ত্রিদোষশামক বলা হয়েছে। তৃষ্ণায় দোষ-লক্ষণ অনুযায়ী উষ্ণ বা অতিশীতল জল, আর বাতজ্বরে বিল্বাদি পঞ্চমূল সহায়ক। অত্যন্ত গুরুতরে (অচেতনতা) পাদতল ও ললাটে দাহকর্ম এবং তিক্তগণ দ্রব্যে দুধসহ বিরেচন প্রভৃতি শক্ত চিকিৎসাও অনুমোদিত। এভাবে অধ্যায়টি কোমল নিয়ম থেকে শোধন পর্যন্ত জ্বরকে প্রধান নির্ণয়-চিকিৎসার অক্ষ হিসেবে স্থাপন করে।
Keśa-vardhana, Pālitā-nāśa, Śiraḥ-roga and Karṇa-śūla Cikitsā (Hair Growth, Greying Reversal, Head & Ear Remedies)
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশ অব্যাহত রেখে এই অধ্যায়ে শির ও ইন্দ্রিয়রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট যোগসমূহ সংকলিত। শুরুতে কেশবর্ধন ও কেশঘন করার প্রয়োগ (দগ্ধ হাতির দাঁতের লেপ, ভৃঙ্গরাজ-সংস্কৃত তেল, গুঞ্জা-ভিত্তিক লেপ) বলা হয়েছে; পরে টাক পড়া ও কেশের রুক্ষতা ইত্যাদিতে আমবীজ, আমলকি, করঞ্জ, লাখ প্রভৃতির চিকিৎসা। এরপর শিরঃশৌচ—উকুন নাশ এবং ভৃঙ্গরাজ, ত্রিফলা, নীলী, লৌহচূর্ণ ও টক কাঞ্জিক দ্বারা কেশ কালো/শ্যাম করার বিধান। তারপর শিরোরোগের আলোচনা এবং শেষে কর্ণচিকিৎসা—তীব্র কর্ণশূল, দুর্গন্ধ, কৃমি ও স্রাবে ঔষধতেল ও কর্ণপূরণ বোঁটা, লবণ-ভিত্তিক ও মূত্র-ভিত্তিক প্রস্তুতিও আছে। উপসংহারে দেহপুষ্টির জন্য মর্দন-অভ্যঙ্গ, পাদপ্রক্ষালন ও বলবর্ধক লেপের উল্লেখ করে পরবর্তী গৃহ্যচিকিৎসামূলক অধ্যায়গুলির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
Netra–Nāsa–Mukha Cikitsā, Vraṇa/Bhasma Prayoga, Jvara–Vāta Remedies, and Protective/Uccāṭana Procedures
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশধারায় এই অধ্যায়ে নানা ঔষধ-প্রয়োগ ও কিছু মন্ত্রকর্ম সংক্ষিপ্তভাবে সন্নিবেশিত। প্রথমে নেত্ররোগে তিমির/পটলাদি দৃষ্টিবিভ্রম দূর করতে, ব্যথা কমাতে ও নেত্রগত বাত শান্ত করতে বহু অঞ্জন-লেপ এবং নিত্য নেত্র-প্রক্ষালনের বিধান বলা হয়েছে। পরে নাসারোগ, শিরোরোগ ও কণ্ঠব্যাধিতে নস্যপ্রয়োগ, এবং মুখ-দন্তরক্ষায় দুর্গন্ধ, দাঁত ঢিলা হওয়া ও ‘দন্তকৃমি’জনিত ক্ষয়ের প্রতিকার আসে। এরপর বর্ণপ্রসাদন লেপ, অগ্নিদীপক পানীয়, বিষম জ্বর, বাতশূল ও জড়তা নিবারণ, এবং নিদ্রাজনক প্রয়োগ উল্লেখিত। শেষভাগে ক্ষত ও দাহচিকিৎসায় ঘৃত, তেল, রজন/গন্ধ, মৌমাছির মোম, লবণ ও ভেষজ লেপ, এবং দ্রুত ক্ষতভরাটের ফলশ্রুতি আছে। শেষে রক্ষামন্ত্র, উচ্চাটন/বশ্যজাতীয় বিধি, সাপ-পোকা তাড়ানোর উপায় ও কিছু নিবেদনের নিষ্ফলতার কথা বলে শুদ্ধি-রক্ষা ও গৃহস্থকল্যাণের পুরাণীয় ভাব প্রকাশ পায়।
Vashikarana–Stambhana Prayogas and Garbha-Sambhava Yogas
এই অধ্যায়ে পুরাণ-সংকলনরীতিতে হরি মন্ত্র, ঔষধ, ধূপ, তিলক, অঞ্জন ও মন্ত্রিত নিবেদন-প্রয়োগসমূহ গণনা করেন। শুরুতে তাম্বূল-মিশ্রণ ও সংক্ষিপ্ত মন্ত্রে বশীকরণ, পরে বাধ্যকরণ/বিঘ্নসৃষ্টিকারী প্রয়োগ—আজ্ঞাবহতা, গৃহকলহ, এবং রাজার দ্বারে প্রবেশলাভের মতো বিশেষ ফল বর্ণিত। ‘চোর-নিবারিণী’ নামে এক রক্ষাবিদ্যা নির্দিষ্ট জপসংখ্যা ও বন্ধন-প্রভাবসহ উল্লেখিত, এরপর মন্ত্রিত পুষ্পে দ্রুত প্রভাবের উপায়। দেহবিন্দু ও চন্দ্রকলার মানচিত্রে কামশাস্ত্রীয় কলা ও আকর্ষণ-বিদ্যার প্রসঙ্গ স্থাপিত। শেষে আকর্ষণ থেকে গর্ভসম্ভব যোগে গমন করে পানীয় ও লেপে গর্ভধারণ, পুত্রলাভ এবং বিকৃত গর্ভনিবারণের বিধান বলে মন্ত্রপ্রযুক্তি ও গৃহস্থফলকে এক ধারাবাহিক প্রয়োগজ্ঞান হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।
Domestic Therapeutics for Teeth, Ears, Women’s Kleda, Digestion, Poison-Check, and Eye Disorders
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশধারায় হরি গৃহস্থের কাজে লাগা সংক্ষিপ্ত চিকিৎসা বলেন। প্রথমে ক্ষার/খনিজ ও রঞ্জক-কাঠ দিয়ে দাঁত-মাখন, পরে হরীতকী-ক্বাথ দিয়ে শোধন করে দাঁতে লালচে আভা আনার বিধি। এরপর কর্ণরোগে মূলক-রস ও উষ্ণ অর্কপত্র-রস কর্ণপূরণে স্রাব ও ব্যথা নিবারণ, আর কর্ণকৃমিতে হলুদ-নিম-মরিচাদি মিশ্র তীক্ষ্ণ তেল নির্দেশ। নারীদের অতিরিক্ত ক্লেদে প্রিয়ঙ্গু, মধুকা, ধাতকী, উৎপল, মঞ্জিষ্ঠা, লোধ্র, লাখ ও কপিত্থ-রস সিদ্ধ তেল প্রশংসিত। হজম ও বিষ-প্রতিকারে ক্ষার-লবণ-মধুর যোগ; মাতুলুঙ্গ ও কলার রস বিষ দমন করে তেলসদৃশ দুষ্ট আহার দ্রুত বের করে ও স্রাব রোধ করে। শেষে বিডঙ্গ-ভদ্র-মুস্তা-বিশ্বভেষজ গোমূত্রে বেটে বড়ি অজীর্ণ/বিশূচিকায়, এবং শঙ্করী নেত্রলেপ (পটোল-মধু; শোথে গোমূত্র) বলা হয়েছে।
Dhūpa-Lepa-Mantra-Prayoga: Vaśīkaraṇa, Rakṣā, Jvara-nāśa, and Stambhana Applications
ব্রহ্মখণ্ডের প্রয়োগধর্মী ধারায় হরি ধূপ, লেপ ও মন্ত্রের নানা যোগ ও বিধান বলেন। প্রথমে আকর্ষণ ও সামাজিক প্রিয়তা বৃদ্ধিকারী ধূপ, পরে সহবাসকালে ইন্দ্রিয়নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবসাধক লেপের কথা আছে। রক্ত চামুণ্ডাকে উদ্দেশ করে বশীকরণ-মন্ত্র জপসংখ্যাসহ এবং সিদ্ধ তিলক-বিধি দেওয়া হয়েছে। এরপর লবণ ও পশুজাত দ্রব্যের মিশ্রণ, পুরুষকে পরস্ত্রীগমন থেকে নিবৃত্তকারী ঔষধ, এবং মহিষীর মাখন-দুধ-ঘৃতযুক্ত চিকিৎসাযোগ বর্ণিত। কন্যত্ব পুনঃস্থাপনের যোনিগোলিকা, চাতুর্থিক/ডাকিনীদোষজনিত জ্বররক্ষার ধূপ, কীটনিবারক ধূমন এবং শেষে যোনি/ভগ স্তম্ভনের প্রক্রিয়া বলা হয়েছে।
Bhāiṣajya-yoga: Lehyas for Kāsa–Śvāsa–Hikkā, Blood-Pacifying Drinks, Udvartana Depilation, and Dental Brightening
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশ ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়ে হরি শিবকে দ্রুতফলদায়ী নানা ভৈষজ্য-যোগ শেখান। শুরুতে তাম্রপাত্রে তাম্বূল, ঘৃত, মধু ও লবণ দুধের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যথাশমন ও চক্ষুহিতের কথা বলা হয়েছে। এরপর হরীতকী–বচা–কুষ্ঠ–ব্যোষের সঙ্গে হিঙ্গু ও মনঃশিলা মিশিয়ে লেহ্য, এবং পিপ্পলী–ত্রিফলা মধুসহ লেহ্য নাসাবন্ধ, কাস ও তীব্র শ্বাসকষ্ট নিবারণে নির্দেশিত; চিত্রককে পিপ্পলী-ভস্মচূর্ণসহ শ্বাস–কাস–হিক্কা প্রশমনে যোগ করা হয়েছে। পরে নীলোৎপল, শর্করা, মধুক ও পদ্মককে তণ্ডুলোদকে মিশিয়ে শীতল রক্তদোষ-শামক পানীয়, আর শুকনো আদা, শর্করা ও মধুর ছোট গুটিকা কণ্ঠস্বর মধুর করে বলে বলা হয়েছে। তারপর বাহ্য পরিচর্যায় আসে—হরিতাল, শঙ্খচূর্ণ/ভস্ম, কলাপাতা-ভস্ম, তুম্বিনী ফল, লাখরস ইত্যাদি এবং চুন, মনঃশিলা, সৈন্ধবকে ছাগলের মূত্রে বেটে তৈরি উদ্বর্তনে লোম অপসারণের বিধান। শেষে মুখে ধারণের নিয়মে দাঁত পরিষ্কার, সাদা ও মসৃণ হয়—দৈনন্দিন শুচিতাকে শাস্ত্রীয় অনুশাসনের সঙ্গে যুক্ত করে অধ্যায় সমাপ্ত।
Ṛtucaryā, Āhāra–Aushadha Prayoga, Viṣa-haraṇa, and Mantra Procedures
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক আচারের ধারায় হরি হরকে ঋতুচর্যা ও আহার–ঔষধপ্রয়োগ শেখান। শুরুতে ঋতুভেদে দই সেবনের নিয়ম, পরে বুদ্ধি ও বলবর্ধক খাদ্য এবং বর্ণ, কেশ ও প্রাণশক্তি বৃদ্ধির রসায়ন-প্রয়োগ বলা হয়েছে। এরপর অজীর্ণ/পরিণামশূল, ক্ষয়রোগ ও লোমনাশক প্রলেপের চিকিৎসা আসে। দাহশমন, অগ্নিনিগ্রহের ক্রিয়া এবং চলমান জল স্থির করার মন্ত্রও বর্ণিত। দ্বারে অশুচি বা অমঙ্গল বস্তু পুঁতে রাখা নিষেধ, আর রক্তপুষ্প অর্পণ ও তিলক দ্বারা প্রভাব বিস্তারের বিধিও আছে। শেষে বিষহরণ, বিশেষত বিচ্ছু-বিষে মন্ত্রসহ ভেষজ-খনিজ উপায়, এবং গুল্ম/অবরোধ, রক্তস্রাব, প্রসবসাহায্য ও রক্তাতিসারের প্রতিকার দিয়ে অধ্যায়টি সমাপ্ত।
Bhaiṣajya-Prayoga: Remedies for Grahaṇī, Jvara, Apasmāra, and Kuṣṭha (with Mantra Applications)
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশধারাকে এগিয়ে নিয়ে এই অধ্যায়ে হরি চন্দ্রশেখর রুদ্রকে সম্বোধন করে সাধারণ চিকিৎসা থেকে সরে নির্দিষ্ট বহু ঔষধ-যোগের ঘন তালিকা দেন। গ্রহণী ও অতিসারে মরিচ, শুণ্ঠী, কুটজ ও দুধের সংমিশ্র প্রস্তুতি; হরীতকী ও ত্রিফলাকেন্দ্রিক বিরেচন-শোধন; এবং ঊরু-স্তম্ভ ও স্নায়ুগত বাতের জন্য ছাগদুগ্ধ-ক্বাথ ও গুগ্গুলু-গুটিকার বিধান বলা হয়েছে। পরে অপস্মারে শঙ্খপুষ্পী-ছাগদুগ্ধপ্রয়োগ, রক্তপিত্তের উপায়, ও বমন-নিবারক মুখভর্তি চূর্ণের উল্লেখ আছে। জ্বরে মন্ত্রসাধনা—ফুলের উপর জপ, কানে ঔষধ বাঁধা, ধূপন—এবং শেষে খোসপাঁচড়া সদৃশ ফুসকুড়ি, কুষ্ঠ, ক্ষত, অর্শ ও প্লীহাবৃদ্ধিতে তেল-লেপাদি বাহ্য চিকিৎসা। দোষ-যুক্তি, আহারবিহার ও আচার-প্রভাব মিলিয়ে পুরাণীয় চিকিৎসার রীতি এখানে প্রতিপাদিত।
Bhāiṣajya-yoga (Remedial Formulas), Rakṣā-prayoga (Protections), and Adbhuta-kriyā (Wonder-Working Procedures)
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক ধারায় হরি গৃহচিকিৎসা ও মন্ত্র-সংযুক্ত কর্মপদ্ধতির নানা প্রয়োগ বলেন। শুরুতে সিধ্ম ও কুষ্ঠের জন্য লেপ ও পান-যোগ, পরে দৃষ্টিআবরণ, অর্শ, ভগন্দর ও মূত্রকৃচ্ছ্র প্রভৃতিতে হরীতকী, ত্রিফলা, গুগ্গুলু, যবক্ষার ইত্যাদি আয়ুর্বেদীয় দ্রব্যের বিধান আসে। এরপর রক্ষাপ্রয়োগ ও অদ্ভুত ক্রিয়া—ধূপন ও তেল দ্বারা অদৃশ্যতা-প্রাপ্তির কথা, লেপ ও নির্দিষ্ট মন্ত্রে দাহশমন ও অগ্নিনিবারণ, এবং জ্বর ও অর্শে মূল বেঁধে তাবিজ-রক্ষা। পরে বীর্যবর্ধক/গর্ভপ্রদ যোগ, আকর্ষণের জন্য অভ্যঙ্গাদি, এবং সংক্ষেপে রজত-সুবর্ণ উৎপাদনের রসবিদ্যার উল্লেখ। শেষে পাণ্ডু, মুখ-দন্তরোগ, বিষনাশ, শিরোরোগ, গর্ভস্থাপনের হলুদ ঔষধ, গলগণ্ড সদৃশ স্ফীতি, প্লীহাবিকার, বাত-পিত্ত শূল ও জঠর-হৃদয় অঞ্চলের উপশম-উপায়ে অধ্যায় সমাপ্ত হয়। মন্ত্র-ঔষধ-ক্রিয়ার সংযোগে পুরাণীয় ‘প্রয়োগ-গ্রন্থ’ শৈলী প্রতিষ্ঠিত।
Gaṇapati-Mantra Siddhi, Vighna-Nivāraṇa Rites, Vśīkaraṇa-Style Applications, and Cikitsā (Therapeutic Formulas)
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশধারায় এই অধ্যায়ে হরি ‘আঁ গণপতয়ে’ দিয়ে গণপতি-মন্ত্র নির্দিষ্ট করেন এবং জপসংখ্যা (৮,০০০ সহ), শিখা-বন্ধন ও কালো তিল-ঘৃত হোমের বিধি বলেন—যাতে সমৃদ্ধি, বাক্-প্রভাব এবং বিবাদে জয়, বিশেষত রাজকীয়/প্রশাসনিক ক্ষেত্রে, লাভ হয়। পরে হ্রীং বীজসহ আকর্ষণ/প্রভাব বিস্তারের প্রয়োগ, মনঃশিলা-গোরোচনা-কুঙ্কুমের তিলক, ধূপ-সুগন্ধ মিশ্রণ ও লেপনাদি দ্রব্যভিত্তিক ক্রিয়া বর্ণিত, যা সামাজিক ও কাম্য সম্পর্কের গতিবিধি বদলাতে সহায়ক। শেষে আয়ুর্বেদীয় ভঙ্গিতে পরিণাম-শূল, গ্রাহণী, অতিসার, বিশূচিকা সদৃশ ব্যাধি, মেহ, শ্বাসকষ্ট, চক্ষুরোগ (ঝিল্লি/অপাসিটি, রাত্র্যন্ধতা) ও দন্তকৃমির চিকিৎসা দিয়ে বাধা-নিবারণকে দেহারোগ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
Bhāiṣajya-yoga for Prameha, Mutra-roga, Arśa, Bhagandara, and Agni-dīpana
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশধারায় এই অধ্যায়ে মূত্রবহ স্রোতসংশ্লিষ্ট রোগ, প্রমেহ, মূত্ররোধ, শর্করা/কঙ্করসদৃশ মূত্রবিকার, গ্রন্থি ও গলগণ্ড, ক্ষত-রক্তস্রাব, এবং অর্শ ও ভগন্দর বিষয়ে নির্দিষ্ট ভৈষজ্য-যোগ সংকলিত হয়েছে। হরি প্রমেহে মধুসহ গুড়ূচী সেবন এবং তিল-দধি-ঘৃতযুক্ত মূলপানকে সহায়ক চিকিৎসা বলেন। শঙ্কর মূত্ররোধে ক্বাথ ও হিক্কার উপশমে সৌবরচল লবণের উপযোগ যোগ করেন। রুদ্রশর্করা, পাণ্ডুশর্করা প্রভৃতিতে মূলপ্রস্তুতি, গ্রন্থি-গলগণ্ডে লেপ, পুরুষব্যাধিতে লেপ ও গুটিকা, এবং ভগন্দরে জলৌকা-চিকিৎসার বিধান আছে। ত্রিফলা-জলে ঘষে রক্তস্তম্ভন এবং অর্শের বহু যোগ—স্নুহীক্ষীর-সিদ্ধ হলুদ গুটিকা, বিল্বফল, কালো তিল, পালাশক্ষার ও ত্রিকটু-যুক্ত ঘৃত—বর্ণিত। শেষে শুণ্ঠী, ক্ষার-লবণ ও উষ্ণ অনুশীলনে অগ্নিদীপনকে গুরুত্ব দিয়ে পরবর্তী আহার-পাচনের উপদেশে সেতুবন্ধ করা হয়েছে।
Rasāyana for Longevity: Milk-Based Regimens, Triphalā, Palāśa, and Bhr̥ṅgarāja (Śrāvaṇa & Puṣya Observances)
আচারখণ্ডের ব্যবহারিক ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে হরি কর্তৃক শিবকে প্রদত্ত রসায়ন-বিধির ক্রম বর্ণিত হয়েছে। দুধকেন্দ্রিক আহার ও ভেষজচূর্ণের গুণ বলা হয়েছে। হস্তিকর্ণ পাতার চূর্ণ দুধের সঙ্গে সেবনে রোগনাশ ও বলবৃদ্ধি; মধু-ঘৃতযুক্ত দুধ দীর্ঘায়ুপ্রদ। নিত্য দই সেবনে বিদ্যা, আকর্ষণ ও দেহদৃঢ়তা লাভের কথা আছে। চুল ও টক কাঁজি/অম্ল-গ্রুয়েল সংক্রান্ত দণ্ডপ্রসঙ্গ দেহভোগের নৈতিক সীমা স্মরণ করায়। ত্রিফলা মধুসহ আয়ু, দীপ্তি, দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং বলি-পলিত রোধ করে; অন্য প্রয়োগে দৃষ্টি ফিরে আসা, চুল কালো হওয়া ও টাক পড়া কমার কথাও বলা হয়েছে। শেষে কালনির্দিষ্ট রসায়ন—শ্রাবণে প্রস্তুত পলাশবীজ হরিকে প্রণাম করে নিত্য সেবন, এবং পুষ্য নক্ষত্রে সংগৃহীত ভৃঙ্গরাজমূল সৌবীরের সঙ্গে গ্রহণে বল, দীর্ঘায়ু ও শ্রুতিধরতা—এভাবে শৃঙ্খলা, সময় ও ভক্তির ফল নির্দেশিত।
Remedial Formulas for Wounds (Vraṇa), Sinus/Fistula (Nāḍī-vraṇa), Swellings (Granthikā), and Bhūta/Graha Afflictions
এই অধ্যায়ে হরি শঙ্করকে চিকিৎসামূলক ধর্মজ্ঞান প্রদান করেন। প্রথমে তীব্র ক্ষতে অপামার্গ-মূলরস প্রলেপে রক্তপাত রোধ ও পচন/পুঁজ হওয়া নিবারণের কথা বলা হয়েছে। পরে ক্ষতে আটকে থাকা শল্য/কাঁটা ইত্যাদি বের করতে রুদ্র-লাঙ্গলিকা, চেক্ষু ও দরভা-যোগে অভ্যঙ্গের বিধান আছে। নাড়ী-ব্রণ শান্ত করতে বালা বা মেষশৃঙ্গী মূলের প্রলেপ, আর শক্তিশালী উপায় হিসেবে মহিষখুরজাত দ্রব্য, কোদ্রবের গুঁড়ো ও হিঙ্গুমূলচূর্ণে নাড়ী-ব্রণ নাশের কথা বলা হয়েছে। রক্তদোষে ব্রহ্মযষ্টি ফলের প্রলেপ এবং যবভস্ম, বিডঙ্গ, গন্ধ-পাষাণ, শুকনো আদার গুঁড়ো রক্তে ভাবিত করে বিশেষ ঔষধ প্রস্তুতির নির্দেশ আছে। গ্রন্থিকা/ফোঁড়ায় গোধা-মেদ, সৌভাঞ্জন বীজ, এবং সরিষা অম্লহীন মথার সঙ্গে প্রয়োগের কথা। শেষে রক্ষা-বিধি: শ্বেত অপরাজিতা নস্য ও বহু দ্রব্যের প্রলেপে ভূত দূর হয়; অঞ্জন গ্রহ-আবেশ নিবারণ করে; গুগ্গুল ধূপে পেঁচার লেজ মিশিয়ে গ্রহদোষ প্রশমিত হয়; চতুর্থক জ্বরের পরে আচরণ-নিয়মও রক্ষার্থে বলা হয়েছে।
Mantra-Pūta Auṣadhi-Prayoga: Roots, Amulets, and Protections from Disease and Graha/Bhūta Affliction
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশধারায় হরি নীললোহিতকে মন্ত্রপূত ঔষধ ও রোগ-গ্রহ/ভূতপীড়া নিবারণের রক্ষাকর্ম শেখান। প্রথমে অপরাজিতার রসে চোখের পর্দা/ঘোলাটে ভাবের চিকিৎসা ও গোক্ষুরকের মূল দিয়ে দাঁতের ব্যথা উপশম। পরে নারীদের বিষয়ে—ঋতুকালে দুধসহ উপবাস, এবং শ্বেতার্কের মূল/ফুলের ক্রিয়ায় উদরের গাঁট নাশ ও গর্ভসিদ্ধি। জ্বর ও আত্মা-গ্রহপীড়া প্রতিরোধে পলাশ-আপামার্গের মূল, বিচ্ছু-মূলের প্রস্তুতি; সুতো/তাবিজ দিন-রাত রক্ষা করে এবং রাতভর রাখা জলের সঙ্গে সেবনে বিষশমনও হয়। লজ্জালুকা দিয়ে বৈর উৎপাদনের প্রয়োগে সতর্কতাও বলা হয়েছে। এরপর পাথা ও গোগৃহীত বিষহর, কামলা সদৃশ রোগে শিরীষ ও লাল চিত্রকের কান-প্রয়োগ, ক্ষয়ে শ্বেতকোকিলাক্ষা ছাগলের দুধে, রক্তবাতে নারিকেল-পুষ্প ছাগলের দুধে। শেষে বিশেষ তাবিজ—সুদর্শনা-মূল গ্রহ/ভূত ও ত্রিদিন-জ্বর নিবারক, গুঞ্জা বিষ ও অপস্মার নাশক, কৃষ্ণচতুর্দশীতে নীললোহিত-বিধি বন্যপশুভয় শান্ত করে, আর বিষ্ণুক্রান্তা কানে ধারণে কুমিরভয়াদি থেকে রক্ষা—এভাবে পরবর্তী অধ্যায়ের ধারণ-মন্ত্রচিকিৎসার ভূমিকা প্রস্তুত হয়।
Therapeutic Formulations for Glandular Swelling, Skin Diseases, Heat-Afflictions, Bleeding Disorders, Respiratory Complaints, and Vomiting
ব্রহ্মখণ্ডের উপদেশমুখর ধারায় এই অধ্যায়ে হরির প্রামাণ্য বাক্যে নির্দিষ্ট নানা চিকিৎসা-প্রয়োগ সংকলিত হয়েছে। শুরুতে গণ্ডমালা ও গ্রীবা‑বাহুর ব্যথায় একক ও যৌগিক ঔষধের বিধান, পরে গুপ্তাঙ্গ ও স্তনরোগে লেপাদি এবং কান্তি‑বলবর্ধক প্রয়োগ বলা হয়েছে। এরপর কুষ্ঠ, দদ্রু, স্ক্যাবিস/চুলকানি ও সিধ্মায় বহু লেপ, ক্ষার, তক্র ও গো-মূত্রভিত্তিক প্রস্তুতি, মাসব্যাপী নিয়ম ও কঠোর পদ্ধতি নির্দেশ আছে। তারপর দুর্গন্ধনাশ ও গ্রীষ্মতাপজনিত উপদ্রব রোধে দেহমর্দন, দুধস্নান ও বর্ণপ্রসাদক ঘর্ষণচূর্ণের কথা বলা হয়েছে। শেষে রক্তপিত্ত, জন্ডিস, পাণ্ডু, পীনস, স্বরভঙ্গ, কাশি (ঔষধধূমসহ), তৃষ্ণা‑জ্বর ও ত্রিবিধ বমির জন্য পানীয়-প্রয়োগ, এবং গুডূচী-মধু ও বিল্বমূলজলকে স্থিতি ও দীপনের উপসংহাররূপে দেখিয়ে পরবর্তী চিকিৎসা-বিবরণের সেতু রচনা করা হয়েছে।
Viṣa-hara Yogas: Puṣya-Nakṣatra Remedies for Serpents, Stings, and Compounded Poisons
গরুড়পুরাণের ব্যবহারিক ধর্মোপদেশে হরি শিবকে নানা বিষের বিরুদ্ধে রক্ষাবিধি ও প্রতিষেধ-যোগ শেখান। অধ্যায়ের শুরু পুষ্য-দিনে পুনর্নবা, শাল্মলি, অর্ক, লজ্জালুকা প্রভৃতি মূল সংগ্রহ এবং তর্ক্ষ্য/গরুড়-মূর্তি ধারণে সাপের দৃষ্টিতে ‘অদৃশ্য’ হয়ে সুরক্ষার ভাব দিয়ে। পরে সাপ, বিচ্ছু, মৌমাছি, মাকড়সা ইত্যাদির দংশন-দংশ, এবং গর-বিষ ও মুখ-দাঁতের বিষজনিত যন্ত্রণায় পানীয় চিকিৎসা (ভাতের মাড়-ঘি, দুধভিত্তিক প্রস্তুতি, চিনি-যষ্টিমধু, চালকুমড়োর রস) ও বাহ্য লেপ (লবণ, ভেষজ, খনিজ মিশ্রণ) তালিকাভুক্ত। কুকুর-ব্যাঙজনিত উপদ্রব, ঘরের ইঁদুরের বিষ ও নেশা/মোহের ক্ষতিতেও উপায় আছে; শেষে ঘোড়ার চুলকানিতে স্থানীয় লেপচিকিৎসা। সারাংশে এটি পবিত্র সংলাপে গাঁথা এক চিকিৎসা-হস্তপুস্তক, যেখানে যথাকাল, যথাদ্রব্য ও দেবসম্মত আচরণে বিপদ নিবারণ ও শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপনের কথা জোর দেওয়া হয়েছে।
Bhaiṣajya-yogas: Digestive Modakas, Vāta-Śamana Oils, Karṇa-Roga Tailas, Kuṣṭha/Śvitra Applications, Vraṇa-Cikitsā, and Medhya Preparations
ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশধারায় হরি নানা ভৈষজ্য-যোগ ও তাদের প্রয়োগক্ষেত্র বলেন। শুরুতে চিত্রক, শূরণ, শুণ্ঠী, মরিচ, পিপ্পলী-মূল, বিদঙ্গ, মুশলিকা, ত্রিফলা ও গুড় দিয়ে মোদকসদৃশ পিণ্ড অজীর্ণ এবং যকৃত্-প্লীহাজনিত রোগে নির্দেশিত। পরে দশমূলাদি গোষ্ঠী ও বল্য ভেষজে সিদ্ধ মহা বাতশামক তেল পান, নস্য ও অভ্যঙ্গে, এমনকি পশুচিকিৎসাতেও, উপকারী বলা হয়েছে। এরপর কর্ণরোগে সর্ষে/ক্ষার-তেল ও লেবু-কলার রসে সিদ্ধ তেল কর্ণশূল, স্রাব, বধিরতা ও কর্ণকীটে ব্যবহৃত। তারপর সুগন্ধি ও ত্বক-উপকারী তেল দুর্গন্ধ, চুলকানি ও কুষ্ঠে, আর গোমূত্রপাকে সিদ্ধ তেল পামা/দদ্রু ও শ্বিত্রে শক্তিশালী প্রতিকার। ক্ষত, রক্তপাত ও ফোঁড়ায় ক্বাথ, লেপ ও অঞ্জনাদি উপায় বলা হয়েছে। শেষে মেধ্য ঘৃত ও বচা-ভিত্তিক বিধান স্মৃতি, শিক্ষাশক্তি ও কীর্তি বৃদ্ধির জন্য বর্ণিত, দেহচিকিৎসাকে বুদ্ধি-আধ্যাত্মিক লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করে।
Auṣadha-Yoga: Medicinal Powders, External Therapies, Fumigation, and Vishnu as Supreme Remedy
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মখণ্ডের ব্যবহারিক উপদেশধারায় হরি (বিষ্ণু)-প্রদত্ত নানা ঔষধ-যোগের সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হয়েছে। পেঁয়াজ, জিরা, কুষ্ঠ, অশ্বগন্ধা, আজমোদা, বচা, ত্রিকটু ইত্যাদি তীক্ষ্ণ সুগন্ধি দ্রব্যের চূর্ণ এবং ব্রাহ্মী-রসসিক্ত ঘি মধুর সঙ্গে সাত দিন সেবনে মনঃশুদ্ধি ও বুদ্ধি-তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। পরে সর্ষে, বচা, হিং, করঞ্জ, দেবদারু, মঞ্জিষ্ঠা, ত্রিফলা, শুকনো আদা, শিরীষ, হলুদ-যুগল প্রভৃতি যোগ নস্য, লেপ ও উদ্বর্তনরূপে অপস্মারসদৃশ রোগ, বিষদোষ, উন্মাদ, ক্ষয়, দুর্ভাগ্য, জ্বর ও ভূতভয়ে প্রয়োগযোগ্য বলা হয়েছে। ছাঁচে বেটে তেল-মর্দন ও ঘর্ষণ-মালিশে খোসপাঁচড়া/চর্মরোগ ও চুলকানি উপশমের নির্দেশ আছে। বহু লবণ, লৌহচূর্ণ, ত্রিবৃত ও সূরণ দই, গোমূত্র ও দুধে রান্না করে অগ্নিদীপন, শূল, মূত্রবেদনা ও প্লীহা/উদররোগে উপকারী বলা হয়েছে। শেষে পশুজাত দ্রব্যের ধূপ জ্বর ও মানসিক অস্থিরতায় উল্লেখ করে, বিষ্ণুর স্মরণ-পূজা-স্তবই পরম ঔষধ—এই ভক্তিমূলক সিদ্ধান্তে অধ্যায়টি সমাপ্ত।
Vaiṣṇava-kavaca: Vishnu’s Protective Armor Against Fear, Disease, Poison, and Hostile Forces
এই অধ্যায়ে হরি ‘শুভ বৈষ্ণব-কবচ’ শিক্ষা দেন, যা দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধে শম্ভুকেও রক্ষা করতে প্রাচীনকালে ব্যবহৃত হয়েছিল—এতে কবচের প্রামাণ্য ও প্রাচীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধক প্রথমে ঈশান ও বিষ্ণুকে প্রণাম করে কবচ ধারণ করে: বিষ্ণু/কৃষ্ণ/হরি/জনার্দন সম্মুখ-পশ্চাৎ, শির ও হৃদয় রক্ষা করেন; হৃষীকেশ ও কেশব মন ও বাক্য; বাসুদেব-সংকর্ষণ চক্ষু ও কর্ণ; প্রদ্যুম্ন-অনিরুদ্ধ ঘ্রাণ ও ত্বক রক্ষা করেন। সুদর্শন, গদা, হল, ধনুক, খড়্গ, শঙ্খ, পদ্ম প্রভৃতি আয়ুধ-চিহ্ন পার্শ্ব, অঙ্গ ও গতি পর্যন্ত সুরক্ষা বিস্তার করে, আর গরুড় কর্মসিদ্ধি দেন। অবতারগণ জল, বন ও বিপদস্থলে রক্ষা করেন; বিশ্বরূপাদি ধন, দেহ-সমতা ও পাপশুদ্ধি দান করেন। মৃত্যুসদৃশ ভয়ের দর্শনে প্রেরিত হয়ে সাধক পুণ্ডরীকাক্ষ/অচ্যুতের শরণ নেয়; ‘দেবদেব’-স্মরণে প্রায় অজেয়তার ফল বলা হয়েছে। শেষে বিস্তৃত মন্ত্রপ্রয়োগ—হোম ও দিক্-আদেশে ভূত, জ্বর, বিষ, গ্রহপীড়া তাড়ানো হয় এবং চতুর্ব্যূহ আহ্বানে রোগনাশ; নিত্য রক্ষাপাঠ হিসেবে এর ব্যবহার নির্দেশিত।
Stuti to Vāsudeva and the Vyūhas; Dharma-Jñāna as the Path to the Lotus-Feet
হরি অধ্যায়ের সূচনা করেন সাত রাত্রির উপদেশের ঘোষণা দিয়ে, যা সকল সৎ পুরুষার্থ পূর্ণ করে এবং শ্রোতাকে শ্রদ্ধায় শিক্ষার জন্য প্রস্তুত করে। সঙ্গে সঙ্গে বাণী স্তোত্ররূপ ধারণ করে—বাসুদেব এবং প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ, সঙ্কর্ষণ এই ব্যূহত্রয়কে প্রণাম, প্রভুকে শুদ্ধ চৈতন্য ও পরমানন্দ রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অদ্বৈত দৃষ্টিতে বলা হয়, সকল রূপই তাঁর রূপ; আবার বিশ্বতত্ত্বও প্রকাশিত—জগৎ তাঁর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত, তাঁর থেকেই উৎপন্ন, এবং কল্পে কল্পে তাঁর মধ্যেই পুনঃপুনঃ বিকশিত হয়। তিনি মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়-প্রাণাতীত, আকাশের ন্যায় অন্তর্বাহ্য ব্যাপ্ত, অবর্ণনীয় ব্রহ্ম। শেষে ‘ধর্ম নামে জ্ঞান’-এর দ্বারা পদ্মচরণে শরণাগতি-ভক্তির পথ নির্দিষ্ট হয়, এবং চিত্রকেতুর সেই জ্ঞানেই বিদ্যাধরত্ব লাভের দৃষ্টান্ত দিয়ে ফলপ্রদতা নিশ্চিত করা হয়। এই প্রারম্ভিক প্রার্থনা পরবর্তী অধ্যায়গুলির জন্য ভক্তি, অদ্বৈত ও ধর্মকেন্দ্রিক উপলব্ধির ভিত্তি স্থাপন করে।
Viṣṇu-dharma Rakṣā: Nyāsa and Nārāyaṇa-Kavaca (Protective Invocation of Viṣṇu and His Avatāras)
হরি ‘বিষ্ণুধর্ম’ নামে পবিত্র জ্ঞানসমষ্টির মাহাত্ম্য বলেন, যা ভক্তকে ইন্দ্রসম ঐশ্বর্যে উন্নীত করে। এরপর তিনি নির্দিষ্ট ন্যাসবিধি দেন—পা থেকে মস্তক পর্যন্ত ওঁ-উৎপন্ন অক্ষরে অঙ্গন্যাস, দ্বাদশাক্ষরী ‘নমো নারায়ণায়’ দ্বারা করন্যাস, হৃদয়ে প্রণব স্থাপন, শিরোমণিতে পূর্ণ মন্ত্র, এবং ভ্রূমধ্যে ওঁ স্থাপন। পরে কবচপাঠে বিষ্ণুর রূপসমূহকে রক্ষক রূপে নিয়োগ করা হয়—জলে মৎস্য, আকাশে ত্রিবিক্রম, পৃথিবীতে বামন/বরাহ, অরণ্য-পাহাড়ে নরসিংহ ও রাম; আর অন্তর্দোষ—ক্রোধ, অজ্ঞান, পাষণ্ড, রোগ, পাপ—নিবারণে নাগ, ব্যাস, বুদ্ধ, কল্কি। প্রভাত থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত সময়রক্ষাও নির্দিষ্ট, এবং চক্র, কৌমোদকী, শঙ্খ, পদ্ম, গরুড়, শার্ঙ্গ, শেষ প্রভৃতি দ্বারা সুরক্ষা দৃঢ় হয়। ফলশ্রুতিতে জপকারী আত্মসংযম, পাপ-রোগমুক্তি ও স্বর্গপ্রাপ্তি লাভ করে, যা পরবর্তী ধর্ম-উপাসনা নির্দেশের সেতু।
Mantra-Nyāsa and Elemental Maṇḍalas: Nāga Invocation and Garuḍa–Bhairava Dhyāna for Protection
ধন্বন্তরি গরুড়-বিদ্যার পরম্পরা (গরুড়→সুমিত্র→কাশ্যপ) স্থাপন করে পঞ্চভূত-অধিপত্য ও মন্ত্রোচ্চারণের শুদ্ধতায় সাধনাকে ভিত্তি দেন। তিনি শিবের ষড়ঙ্গ ন্যাস, বীজ-গঠন এবং জপ-স্থাপন (হৃদয়, করতল, দেহ, কর্ণ, নয়ন) দ্বারা সিদ্ধির বিধান বলেন। সাধক ভৌতিক মণ্ডল ধ্যান করবে—চতুষ্কোণ পৃথিবী, বৃত্তাকার জল, বিন্দুসহ অগ্নি-চক্র/ত্রিভুজ, কৃষ্ণ বায়ু-গোলক, স্ফটিক-অমৃতসদৃশ আকাশ—এবং দিক ও লোক অনুযায়ী নাগদের নিয়োগ করবে। আঙুল-সন্ধি ন্যাস, ব্যাপক স্থাপন, ‘ওঁ…নমঃ’ দ্বারা মন্ত্র-আবরণ ও আট শ্রেণির নাগ আহ্বান ক্রমে সম্পন্ন হয়; শেষে ‘ওঁ স্বাহা’ তর্ক্ষ্য (গরুড়) রূপে প্রকাশিত হয়। দেহে পৃথিবী, অগ্নি (নাভি থেকে কণ্ঠ), বায়ু ও আকাশ স্থাপন, দিকানুসারে শিবাঙ্গ পূজা এবং পদ্ম-রচনায় অষ্টনাগ আসন বর্ণিত। শেষে বিষ ও দুষ্ট আত্মা-প্রেত নাশের জন্য বিশ্বরূপ গরুড় ও ভৈরব ধ্যান, এবং মহেশ্বরের গৌরীকে উপদেশ-পরম্পরার পরবর্তী অংশের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
Nityaklinnā Tripurā Sādhana and the Jvālāmukhī-Krama
এই অধ্যায়ে ভৈরব নিত্যক্লিন্না ত্রিপুরার মন্ত্র‑পূজা‑বিধান শেখান—বীজসূত্র, রেখা/গুণ‑ন্যাস, রক্ষাকারী প্রারম্ভিক ক্রিয়া এবং শেষে অস্ত্র‑ফট্। পরে সাধক দিক্‑পরিক্রমা করে অসিতাঙ্গ, রুরু, জালন্ধর, বটুক প্রভৃতি ভৈরবরূপকে তাঁদের শক্তি/মাতৃকার সঙ্গে দিক ও কোণে পূজা করে, ফলে সুরক্ষিত যাগক্ষেত্র গঠিত হয়। এরপর রতি‑প্রীতি সহ কামদেবের আরাধনা হয় এবং বলা হয় ধ্যান, পূজা, জপ ও হোমে দেবী ভক্তের জন্য সিদ্ধা হন। তারপর রোগনাশের উদ্দেশ্যে জ্বালামুখী‑ক্রম বর্ণিত—মধ্যে ত্রিপুরা প্রতিষ্ঠা করে চারদিকে নিত্যারুণা, মদনাতুরা, মহামোহা প্রভৃতি শক্তি, ব্রাহ্মণী থেকে অপরাজিতা পর্যন্ত মাতৃগণ এবং পদ্মের বাইরে অতিরিক্ত শক্তি স্থাপন করা হয়। যথাযথ ক্রম ও স্থাপনাই প্রতিকার ও রক্ষার ফল নির্ধারণ করে।
Dhvaja–Dhūmra–Paśu-Ākṛti Śakuna: Interpreting Banner, Smoke, and Animal-Form Omens by Stations
ভৈরব প্রথমে সূর্য, দেবী, গণগণ ও সোমকে স্মরণ করে শুভ মানসিক‑আচারসহ স্বতঃস্ফূর্ত চিহ্ন (ত্রিরেখা, মূত্রচিহ্নসদৃশ, ঝরঝরে/টপটপে, বা দিকজাত) লিখন‑দর্শনের বিধান দেন। পরে তিনি আটটি শকুনরূপ ক্রমে বলেন—ধ্বজ, ধূম্র, সিংহ, শ্বান, বৃষভ, গর্দভ, গজ ও কাক—যা নাম‑মন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত/চিহ্নিত। অধ্যায়ের মূল অংশে ধ্বজস্থান, ধূম্রস্থান, সিংহস্থান, শ্বানস্থান, বৃষস্থান, গর্দভস্থান, গজদিক ও কাকস্থানে এসব রূপ দেখা গেলে ফল কী—রাজ্যলাভ, মান, বিজয়, বিবাহযোগ, আরোগ্য, ধন‑ধান্যবৃদ্ধি; অথবা কলহ, রোগ, গৃহভঙ্গ, পদহানি, কলিযুগের শোক ও বিদেশযাত্রা। এটি পরবর্তী শকুনতত্ত্বের ব্যবহারিক শ্রেণিবিন্যাস স্থাপন করে।
Vāyu-Jaya and the Omens of Nāḍī Flow (Elemental and Fortnightly Indicators)
আচারনির্ভর কর্মে শুভ অবস্থা নির্বাচন প্রসঙ্গে ভৈরব দেবীকে চার প্রকার শুভাচার শেখান—বায়ু, অগ্নি, জল (বরুণ) ও শক্র (ইন্দ্র), যা বাম/ডান/মধ্য অবস্থান ও কালচক্রের সঙ্গে যুক্ত। অগ্নির গতি ঊর্ধ্বমুখী, জলতত্ত্ব নিম্নে থাকে, আর মহেন্দ্র মধ্যস্থ; শুক্লপক্ষে বামে ও কৃষ্ণপক্ষে ডানে সরে যায় বলা হয়েছে। প্রতিপদা প্রভৃতি সময়ে ‘বিপরীত’ নাড়ীপ্রবাহ ও অন্যান্য বিরুদ্ধ লক্ষণ ক্ষয় ও বাধার সূচক; দিন-রাতে ষোলো সংক্রান্তির কথাও আছে। নিয়ম দেওয়া হয়েছে—বায়ু অল্পক্ষণও অস্থির হলে স্বাস্থ্যহানি বোঝা যায়। ডান নাসার প্রবাহ ভোজন ও মৈথুনে সহায়, বাম নাসার প্রবাহ সাধারণত সকল উদ্যোগে শুভ; ইন্দ্র/বরুণ বায়ুকে অনিষ্টহীন বলা হয়েছে। শেষে দিকনির্দেশিত বায়ুর সঙ্গে বৃষ্টির শকুন যুক্ত করে পরবর্তী সময়নির্ণয় ও সিদ্ধান্তবিধির ভূমিকা রচিত হয়েছে।
Aśva–Gaja Āyurveda: Marks, Defects, Wounds, Doṣa-Therapy, and Protective Rites
এই অধ্যায়ে ধন্বন্তরি সাধারণ আয়ুর্বেদের পর রাজকীয় বাহন—প্রথমে অশ্ব, পরে গজ—এর চিকিৎসা বর্ণনা করেন। তিনি অশ্বের অশুভ ও ত্রুটিযুক্ত লক্ষণ (ভয়ংকর “যম-রূপ” সহ) উল্লেখ করে তেমন অশ্ব বর্জনের কথা বলেন এবং জাত/আকারভেদ সংক্ষেপে জানান। এরপর রক্ষাবিধান—রেবন্ত পূজা, হোম, ব্রাহ্মণ-দান, এবং সর্ষে, নিম, গুগ্গুলু, ঘৃত প্রভৃতির ধূপ/তাবিজ। চিকিৎসায় ক্ষতকে বাহ্য (আগন্তুক) ও অন্তর্গত (দোষ-জন্তুজ) দুই ভাগে দেখিয়ে দোষভেদে পাকা হওয়া ও লক্ষণ বলেন। শোধন-রোপণ যোগে এরণ্ডমূল, হলুদ, চিত্রক, রসুন-লবণ, নিমের বড়ি, যৌগিক চূর্ণ; কুষ্ঠ ও আলসারের নির্দেশ, মাতুলুঙ্গ-মাংসী নস্য, মাত্রা-বৃদ্ধি ও ঋতু-নিষেধ দেওয়া হয়েছে। আহারে দোষানুসারে খাদ্য, হজম ও সর্বাঙ্গ রোগে গুগ্গুলু-ক্রম, ত্রিফলা-গোমূত্র প্রয়োগও আছে। শেষে একই সমন্বিত পদ্ধতি হাতির জন্য—চারগুণ মাত্রা, মহামারী-শান্তির উপাসনা, এবং ত্রিফলা, পঞ্চকোল, দশমূল, বিডঙ্গ, গুডূচী, নিম ইত্যাদির সংক্ষিপ্ত ঔষধতালিকা—উপস্থাপিত।
Strīroga–Prasava Cikitsā, Bāla-Rakṣā, Rasāyana and Vājīkaraṇa Prayogas
পুরাণীয় ব্যবহারিক ধর্ম ও দেহকল্যাণের ধারায় হরি শিবকে গৃহস্থের নাগালে থাকা চিকিৎসা ও বিধি শেখান। প্রথমে নারীদের প্রসববেদনা ও গর্ভিণীর কষ্টে পুনর্নবা, আপামার্গ, রুদ্রেন্দ্রবারুণী প্রভৃতি মূল-লেপ/যোগ; পরে স্তন্যবৃদ্ধিতে ভূমি-কূষ্মাণ্ড/চালের গুঁড়ো দুধে, এবং জরায়ুশূল, প্রদর, রক্তগুল্ম ইত্যাদিতে চূর্ণ, ক্বাথ ও শীতল উপায়। গর্ভপাত-নিবারণ ও প্রসব-প্রবর্তনে হিং-সৈন্ধব সেবন এবং মূল-বাঁধন/উচ্চারণজাত প্রতীককর্মও বলা হয়েছে। এরপর শিশু-রক্ষায় গোরোচনা তিলক, চিনি-কুষ্ঠযুক্ত পানীয়, ও শঙ্খনাভি, বচা, কুষ্ঠ, লোহা দিয়ে তাবিজ। শেষে রসায়ন ও বাজীকরণে পলাশভিত্তিক মেধা-দীর্ঘায়ু, নবীকরণ ও বাক্-প্রসাদ, সুগন্ধ ও আয়ুবর্ধক সূত্র, এবং পারদ-যোগ ও কালো ডাল-দুধের বল/বীর্যবর্ধক প্রয়োগ—সবই মঙ্গল, পাপনাশক ও জীবনবর্ধক সাধনা হিসেবে উপস্থাপিত।
Upāyas for Cattle and Horses: Bonding, Parasites, Wounds, Swellings, and Mane Itching
খণ্ড ১-এর ব্যবহারিক ধর্মবিষয়ে এই অধ্যায়ে সাধারণ আচারের পর গ্রামীণ পশুপালনে দেখা দেওয়া সংকটের নির্দিষ্ট উপায় বলা হয়েছে। হরি গাভীর নিজের দুধে লবণ মিশিয়ে বাছুরের প্রতি তার স্নেহ পুনঃস্থাপনের পদ্ধতি জানান। এরপর পরজীবী/কৃমি দূরীকরণ, ক্ষত ও ত্বক-পরিচর্যা, এবং জলীয় ফোলা কমানোর বিধান আসে—বরুণফলের রস, রুদ্রজয়া-লেপ, শরপুঙ্খা-লবণযোগ, আর ঘোড়ার কেশর/অয়ালের চুলকানিতে ঘৃতকুমারী (অ্যালো) প্রয়োগ। চাল, ঘোল ও দুধের খাদ্যপ্রস্তুতি পশু ও মানুষের উভয়েরই উপকারে আসে—এ কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। পাশাপাশি কর্মফলের সতর্কতা—গুঞ্জার মূল ভক্ষণ ‘গোজঙ্গনাভিপাত’ নামে নৈতিক পতনের সঙ্গে যুক্ত। অধ্যায়টি পরবর্তী উপায় ও আচরণবিধির ধারাবাহিকতায় নিয়ে যায়।
Oṣadhi-nāma-nirdeśa: Paryāya (Synonyms) of Herbs, Minerals, and Classical Measures
ধন্বন্তরির মাধ্যমে সুश्रুতকে প্রদত্ত চিকিৎসা-উপদেশের ধারাবাহিকতায় সূত ঔষধের নামসমূহ সংক্ষেপে ঘোষণা করেন। এই অধ্যায়টি মূলত পরিভাষা-ও-পর্যায়বাচীর তালিকা—একই দ্রব্যের বহু আঞ্চলিক ও শাস্ত্রীয় নাম একত্রে দেওয়া হয়েছে; যেমন গুড়ূচীর প্রসিদ্ধ পর্যায়, নিমের ‘অরিষ্ট’ নাম, পদ্মের নানা শব্দ, মরিচ ও শুণ্ঠি ইত্যাদি। উদ্ভিদের পাশাপাশি রজন/গন্ধ, লবণ, ক্ষার এবং রসশাস্ত্রের প্রধান দ্রব্য গন্ধক ও পারদও উল্লেখিত, ফলে ঔষধবিদ্যার ব্যাপ্তি বোঝা যায়। পরে ত্র্যূষণ (ত্রিকটু), ত্রিজাতক/চতুর্জাতক, পঞ্চকোল প্রভৃতি সংযোজিত গোষ্ঠী ও গৃহ্য-ঔষধি সমাহার নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এরপর কর্ষ, পাল, কুডব, প্রস্থ, আঢক, দ্রোণ, তুলা ইত্যাদি ওজন-পরিমাপ এবং তরল মাপে দ্বিগুণ নিয়ম বলা হয়েছে। শেষে এগুলিকে বন/বন্য ঔষধের নাম বলে পরবর্তী প্রসঙ্গে—কুমারের দ্বারা শব্দগুলির নিরুক্তি/ব্যুৎপত্তি ব্যাখ্যা—উপস্থাপিত হয়।
Sup–Tiṅ Foundations: Prātipadika, Vibhaktis/Kārakas, and Lakāras (Tense–Mood System)
কুমার অধ্যায়ের উদ্দেশ্য জানান—প্রচলিত শুদ্ধ শব্দ চেনা এবং নবশিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়া। প্রথমে সুপ্ (নামপদ-প্রত্যয়) ও তিঙ্ (ক্রিয়াপদ-প্রত্যয়) দ্বারা ‘পদ’-এর লক্ষণ নির্ধারিত হয়, পরে অর্থবহ মূলরূপ ‘প্রাতিপদিক’ ব্যাখ্যা করে সম্বোধন ও ভূমিকা-পরিবর্তনে তার নির্দেশক্ষমতা বলা হয়। এরপর কারক অনুসারে বিভক্তি—দ্বিতীয়া কর্ম, তৃতীয়া করণ এবং কখনও কর্তা, চতুর্থী সম্প্রদান, পঞ্চমী অপাদান/বিচ্ছেদ, ষষ্ঠী স্বত্ব/সম্বন্ধ ও বিশেষ শব্দ-পরিবেশ, সপ্তমী অধিকরণ (স্থান/কাল/অবস্থা)। রক্ষা-প্রকাশ, কর্মপ্রবচনীয়-নির্ভর বিভক্তি-নির্ণয়, ‘অনু’সহ বীপ্সা, এবং প্রয়াস/গতি প্রসঙ্গে দ্বিতীয়া-চতুর্থীর নমনীয় প্রয়োগের বিশেষ টীকা আছে। ‘নমঃ, স্বস্তি, স্বধা, স্বাহা, অলং, বষট্’ ইত্যাদি যজ্ঞ-নিয়ত উক্তি ও ‘-তুম্’ দ্বারা ভাববাচকতা উল্লেখিত। পরের অংশে ক্রিয়ারূপ—পুরুষ-প্রত্যয়, পরস্মৈপদ/আত্মনেপদ, আজ্ঞার্থ রূপ, এবং লকার-ব্যবস্থা (লট্, লঙ্, লোট্, লিঙ্, লিট্, লৃট্, লৃঙ্, লেট্ প্রভৃতি) ও কৃৎ-রূপে ভাব/কর্ম/কর্তৃবাচকতা ব্যাখ্যা করা হয়। এই ব্যাকরণ-সংহতি পরবর্তী ধর্ম ও যজ্ঞবাক্যের সূক্ষ্ম অর্থ উপলব্ধিতে সহায়।
Dṛṣṭānta on Siddhi: Pitṛ-Procedure, Non-Delusion, and Vyākaraṇa Classifications
সমবেত ব্রাহ্মণদের প্রতি সূতের উপদেশ চলতে থাকে; প্রাচীন পরম্পরা থেকে নেওয়া এক দৃষ্টান্তে তিনি দেখান কীভাবে আধ্যাত্মিক সিদ্ধি নিশ্চিত হয়। অধ্যায়ে গূঢ় শব্দ-ধ্বনি টীকা (দুর্লভ অক্ষর-প্রয়োগসহ) আছে এবং পিতৃ-সম্পর্কিত ক্রিয়াকে সঠিক নয় ও অনুবন্ধ প্রভৃতি উপাঙ্গসহ বিধিবদ্ধভাবে যুক্ত করা হয়েছে। পরে মিথ্যা বর্ণনা—কল্পিত পারাপার, বানানো চিত্রকল্প, ভয়ংকর রূপ যা শ্মশানের বাস্তবতা ঢাকে—এসব দ্বারা বিভ্রান্ত না হয়ে বিবেকসহ ‘এগিয়ে যাও’ বলা হয়েছে। এরপর ভগবান (ভবান)-স্মরণকে ভববন্ধন অতিক্রমের শক্তি বলা হয় এবং কর্তৃত্ব, প্রচেষ্টা ও সম্মান নিয়ে চিন্তা করা হয়। তারপর প্রস্থানকারী ব্যক্তির সঙ্গে চলা সূক্ষ্ম সহচর-তত্ত্ব ছায়া ইত্যাদি উপমায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শেষে সংক্ষিপ্ত ব্যাকরণ-শিক্ষা—সমাসের প্রকার উদাহরণসহ, তদ্ধিত গঠন, লিঙ্গতালিকা, সর্বনাম/সীমিত বিভক্তি-শ্রেণি, কিছু ক্রিয়ারূপ, এবং ‘পূর্ব’ শব্দ ও সুপ/তিঙ্ ব্যবস্থা—পরবর্তী শিক্ষার ব্যাখ্যার ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে।
Chandaḥśāstra: Mātrā–Varṇa, Guru–Laghu, Gaṇa, and Metre Types
ব্রহ্মখণ্ডের বিশ্বকোষসদৃশ উপদেশ ধারাবাহিক রেখে সূত ছন্দশাস্ত্রের প্রযুক্তিগত আলোচনা শুরু করেন। প্রথমে মঙ্গলাচরণে বিষয়কে পবিত্র করে তিনি ছন্দের ভিত্তি—মাত্রা ও বর্ণ—সংজ্ঞায়িত করেন এবং পদ্যের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত গণ-সমষ্টির পরিচয় দেন; বিশেষভাবে বলেন যে আর্যা ছন্দ সর্বত্র চার-অক্ষরের গুচ্ছে চলে। দীর্ঘ স্বর, ব্যঞ্জনান্ত, বিসর্গ, অনুস্বার ও যুক্তব্যঞ্জনের দ্বারা গুরু (দুই-মাত্রা) অক্ষর নির্ণয়ের নিয়ম, এবং পাদান্তে ঐচ্ছিক গুরুত্বও উল্লেখিত। সন্ধি বা ক্রমের ফলে কোথাও অস্বাভাবিক ছন্দগণনা হলে শ্লোক-চার্যা ও অতি-বিচ্ছেদ ইত্যাদি শব্দে পাঠভেদ নির্ণয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। শেষে পাদের সংজ্ঞা দিয়ে ছন্দকে সম, অর্ধসম ও বিষম শ্রেণিতে ভাগ করে পরবর্তী অধ্যায়ের প্রস্তুতি করা হয়।
Āryā-Chandas Lakṣaṇa; Gīti-Bheda; Vaitālīya-Vaktra; Mātrā-to-Varṇa Transition
সূত এখানে আর্যা (গাথা) ছন্দের লক্ষণ বলেন—বিজোড়/জোড় পাদে নির্দিষ্ট গণ-নিয়ম, সপ্তম অক্ষরের বিধান, এবং পথ্যা (নিয়মিত) ও বিপুলা (বিস্তৃত) রীতির পার্থক্য, যেখানে সীমিত অতিক্রম অনুমোদিত। পরে কপলা প্রভৃতি অন্তর্গত বিন্যাস থেকে উপভেদ ও আর্যা-জাতির প্রধান চিহ্ন উল্লেখিত। এরপর গীতি, উপগীতি, উদ্গীতির বিভাগ—প্রথমার্ধ, দ্বিতীয়ার্ধ বা পারস্পরিক বিনিময়ের নিয়ম উভয় অর্ধে প্রযোজ্য কি না তার ভিত্তিতে। মাত্রা-বণ্টনে বিজোড় পাদে ৬ ও জোড় পাদে ৮ মাত্রা, ঔপচ্ছন্দসিক স্থান ও গণ-সঞ্জ্ঞাও বলা হয়েছে। বৈতালীয় ছন্দের ‘বক্ত্র’ (উদ্ঘাটন) ভেদ—নিয়মিত/অনিয়মিত—এবং অচলধৃতি, চিত্রা, পদাকুলক প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট রূপের উল্লেখ আছে। শেষে বলা হয়, মাত্রাভিত্তিক ছন্দের পর এখন বর্ণভিত্তিক ছন্দ ব্যাখ্যা করা হবে।
Nāmāṣṭottara-dviśata: Gaṇa–Chandas–Yati Catalogue and Mnemonic Coding
সূত এই অধ্যায়কে ছন্দশাস্ত্রের গূঢ়, সংকেতময় শিক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যেখানে অক্ষর ও ‘গণ’ ছন্দ ও তার ভেদের পরিচয়চিহ্ন। গায়ত্রী থেকে শুরু করে উষ্ণিক ও অনুষ্টুভ-উৎপন্ন সম্প্রসারণ, তারপর বৃহতী–পঙ্ক্তি বিন্যাস, এবং আদ্য/অন্ত্য গণ দ্বারা নির্ধারিত উপজাতি-ভেদ ব্যাখ্যা করা হয়। পিঙ্গল-প্রসিদ্ধ ত্রিষ্টুভ শ্রেণিবিভাগ, নামযুক্ত বৃত্ত, এবং যতি (নিয়ন্ত্রিত বিরাম/ছেদ) বিধি মন্ত্রসদৃশ ধ্বনি-সূত্রে স্মরণীয় করা হয়েছে। অধ্যায়টি বারবার ছন্দনামকে গণসমষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে দেয়—কখনও ছন্দের ‘চাল’ ও রসধারী গতি, কখনও বিরতি/যতি-সংযমের ভাব। শেষে অতিধৃতি, কৃতি, অতিকৃতি, সংকৃতি প্রভৃতি উচ্চতর ছন্দ ও মিশ্র রূপ, এবং হঠাৎ চণ্ডবৃত্তি-প্রপাত, দণ্ডক ইত্যাদি ভয়ংকর নামের তালিকা দিয়ে পরবর্তী নৈতিক-লোকতাত্ত্বিক গণনার ইঙ্গিত দেয়।
Chandas-Lakṣaṇa: Upacitraka, Vegavatī, Bhadravirāṭ, Viparītākhyānaka, Vaitālīya (Aparavaktra)
ব্রহ্মখণ্ডের ছন্দঃশাস্ত্র প্রসঙ্গে সূত পাদভেদে গণ-বিন্যাস দেখে ছন্দ চেনার নিয়ম বলেন। প্রথমে উপচিত্রক ছন্দের লক্ষণ—বিষম পাদে ‘স-স-স-ল-গা’ ক্রম এবং সম পাদের পরিপূরক বিধি—উল্লেখ করে মধ্যভাগের দ্রুত/লঘু গতি জোর দিয়ে বোঝানো হয়। বিষম চরণে ‘গ’ গণের শর্তসাপেক্ষ ব্যবহার এবং অন্যত্র ন, জ, জ্য প্রভৃতি বিকল্পও বলা হয়েছে। পরে বেগবতী, ভদ্রবিরাট ইত্যাদির জন্য বিষম ও সম (দ্বিতীয়/চতুর্থ) পাদের পৃথক নির্ণায়ক গণসমষ্টি, এবং কেতুমতীর লক্ষণও দেওয়া হয়। এরপর আখ্য্যানধর্মী ছন্দে বিপরীতাখ্যানককে পিঙ্গল-প্রদত্ত বিষম/সম পাদ-রূপরেখায় ব্যাখ্যা করা হয়। শেষে বৈতালীয়—অপরবক্ত্র নামেও পরিচিত—কে নির্দিষ্ট গণগুচ্ছসহ এক অউপচ্ছন্দসিক সহচর ছন্দ হিসেবে দেখিয়ে পুরাণপাঠে ছন্দ-পরিচয়ের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে।
Chandas-Nirṇaya: Āpīḍa to Gāthā—Pāda, Gaṇa, and Special Substitutions
এই অধ্যায়ে পুরাণীয় ধারায় ছন্দ-নির্ণয়ের সহায়ক বিদ্যা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সাধারণ লক্ষণের পর পাদভিত্তিক অক্ষরসংখ্যা ও গণবিন্যাস অনুযায়ী নামযুক্ত বৃত্ত নির্ধারণ করা হয়। প্রথমে ‘উপর-নিচে চার ধাপ’—এই বিস্তৃত নির্ণায়ক সূত্র, তারপর প্রথম পাদের শেষে বিশেষ গণযুগ্ম দ্বারা আপীড় (সর্বল) চিহ্নিত। আরকজ-ধাঁচের প্রথম পাদের সঙ্গে অষ্টাক্ষর বিন্যাস কোন পাদে আছে তার ভিত্তিতে কলিকা ও লবলী পৃথক, আর চার পাদেই অষ্টাক্ষর হলে অমৃতধারা। পরে চার প্রকার ‘পদ’ ও ঊর্ধ্বক্রম সংক্ষিপ্ত গণসূত্রে, এবং সৌরভক ও ললিতের তৃতীয়-পাদ ক্রম দেওয়া হয়েছে। উদ্গতা ও উপস্থিত-প্রচুপিতের ক্ষেত্রে পাদে-পাদে গণবিন্যাস এবং শেষে ‘-ঘ্রৌ’ থাকলে বিশেষ রূপান্তর বিধান বলা হয়েছে। উপসংহারে বলা হয়—পাদ-অক্ষরে অনিয়ম বা অউল্লেখিত মাত্রা থাকলে, দশধর্ম-ধাঁচের মতো, তাকে গাথা বলে গণ্য করতে হবে।
Prastāra–Naṣṭa Procedures and Enumeration of Chandas (Laghu–Guru Computation)
এই অধ্যায়ে সূত ছন্দশাস্ত্রের কারিগরি বিধান বলেন। তিনি জানান, প্রস্তার ‘লা’ দিয়ে শুরু হয় এবং পরের বিন্যাস আগের ধারা অনুসারে গঠিত হয়। এরপর ‘নষ্ট’ পদ্ধতি—সংখ্যা ও তার ক্রমাগত অর্ধাংশ জোড় না বিজোড় দেখে ‘লা’ বা ‘গুরু’ স্থাপন করে ছন্দের বিন্যাস পুনর্গঠন—ব্যাখ্যা করেন। মাঝখানে আচরণ-উপদেশ: দোষ দূর করতে তার বিপরীত গুণ গ্রহণ করতে হয়, আর যে বিধি দু’বার বলা হয়েছে তা একত্র শৃঙ্খলা হিসেবে একবার পালনীয়। গণনায় বারবার অর্ধ করা, ভাগশেষ ধরা, শূন্য থেকে দ্বিগুণ করে এগোনো, এবং শেষে ‘প্রাপ্ত মানের দ্বিগুণ থেকে দুই বিয়োগ’ করে চাহিত সংখ্যা নির্ণয় বলা হয়। পূর্ণতার উপর পূর্ণতা ও মেরুর বিশালতার উপমা দিয়ে শেষে নিয়ম দেন—লঘু/গণ/বৃত্তের সংখ্যা পেতে দ্বিগুণ করে এক কমাতে হয়। প্রস্তার ও নষ্ট—উৎপাদক ও বিপরীত-সূচক—দুই চাবিই এখানে প্রতিষ্ঠিত।
Ācāra-Nirṇaya: Varṇa-Āśrama Dharma, Śauca, Snāna, Sandhyā, Japa, Tarpaṇa, and Gṛhastha-Dinacaryā
পুরাণীয় ধর্মশিক্ষার ধারাবাহিকতায় সূত শৌনককে জানান—হরির উপদেশ ব্রহ্মা হয়ে ব্যাসের মাধ্যমে যে আচারের বিধান এসেছে, এই অধ্যায়ে তারই কাঠামো। এখানে ধর্মের ভিত্তি শ্রুতি, স্মৃতি ও শিষ্টাচার; সত্য, দান, দয়া, দম প্রভৃতি গুণকে মূল ধরে ধর্মকে জ্ঞান ও মোক্ষের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পরে বর্ণভিত্তিক জীবিকা ও আশ্রমধর্ম (ব্রহ্মচর্য থেকে পরিব্রাজ্য) সংক্ষেপে বলা হয়। তারপর গৃহস্থের দৈনন্দিন নিয়ম—ব্রহ্মমুহূর্তে ওঠা, সন্ধ্যা, মলত্যাগের বিধি, মাটি-জল দিয়ে শৌচের পরিমাপ, আচমন ও অঙ্গস্পর্শ-শুদ্ধি, দন্তধাবন এবং প্রভাতস্নানের প্রধান্য—ব্যবহারিকভাবে বর্ণিত। স্নানে পাপক্ষয়, মন্দেহাসুর থেকে সূর্যরক্ষায় সন্ধ্যার আবশ্যকতা, স্বহস্তে হোমের মহিমা এবং ওঁ ও গায়ত্রীজপের কেন্দ্রীয়তা উল্লেখিত। পূজাক্রম, তर्पণবিধি, দানের নীতি ও ধনের প্রকারভেদ বলে শেষে এই আচারশিক্ষা পাঠ/শ্রবণে স্বর্গীয় পুণ্যফল প্রতিশ্রুত হয়।
Snāna-Śauca Krama: Varuṇa–Āpaḥ Mantras, Aghamarṣaṇa, Sūrya-Upasthāna, and Sarva-Tarpaṇa
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা স্নান-শৌচের ক্রম নির্ধারণ করেন। মাটি/মৃৎ, গোবর, তিল, দর্ভ, ফুল ইত্যাদি শুদ্ধিদ্রব্য একান্ত স্থানে সাজিয়ে, মাটি ও গোবর ভাগ করে, পা-হাত ধুয়ে, যজ্ঞোপবীতের যথাযথ ভঙ্গিতে আচমন করা হয়। পরে ঋগ্বৈদিক মন্ত্র (যেমন “উরুং রাজন্…”) সহ জলকর্ম ও প্রদক্ষিণা, জল নেড়ে “যে তে…” (শতমিতি) এবং বরুণ-স্তোত্রে বরুণপাশ থেকে মুক্তি প্রার্থনা করা হয়। “ইদং বিষ্ণুঃ”, “আপো অস্মান্…” প্রভৃতি মন্ত্রে মাটির লেপন, নিমজ্জন, পাত্রশুদ্ধি এবং ক্রমে বরুণমন্ত্র ও অবভৃথ-প্রায় প্রার্থনা সম্পন্ন হয়। এরপর আপঃসূক্ত, পাবমানী (যেমন “হিরণ্যবর্ণাঃ”), অঘমর্ষণ ও দ্রুপদা-পাঠ, এবং বিকল্পে প্রণব/গায়ত্রী জপ বা বিষ্ণুধ্যানের মাধ্যমে জলকে বিষ্ণুস্মরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। স্নানান্তে শুচিবস্ত্র পরে সূর্যোপস্থান, সৌর-অনুবাকসহ জপযজ্ঞ, শ্রী-মেধা-ধৃতি প্রভৃতি মঙ্গলদেবীর আহ্বান, এবং শেষে সকল জীবের তৃপ্তির জন্য ত্রিশ অঞ্জলিতে সর্বতর্পণ করা হয়।
Tarpaṇa-vidhi (Rite of Water-libations) for Devas and Pitṛs
পুরাণের আচাৰ-ভিত্তিক উপদেশে ব্রহ্মা তर्पণকে দেবতা ও পিতৃদের তৃপ্তিদায়ক কর্ম বলে পরিচয় দিয়ে মন্ত্রসহ প্রাপকের মানচিত্র/ক্রম নির্দিষ্ট করেন। সাধক প্রথমে মোদ-প্রমোদ, বিঘ্ন, ছন্দ, বেদ, ঔষধি, কাল (বর্ষ ও তার বিভাগ) এবং সর্বপ্রাণীকে উদ্দেশ করে সার্বজনীন শান্তি-তর্পণ করে অর্পণক্ষেত্র শুদ্ধ করেন। পরে ঋষি, প্রজাপতি ও লোকপালদের তর্পণ করে যজ্ঞোপবীত ধারণে নীবীতী থেকে প্রাচীনাবীতী হয়ে স্পষ্ট পিতৃবিধিতে প্রবেশ করেন। ‘স্বধা’সহ পিতা–পিতামহ–প্রপিতামহ, মাতৃপক্ষীয় পূর্বপুরুষ এবং অগ্নিষ্বাত্ত, সোমপ, বর্হিষদ প্রভৃতি পিতৃশ্রেণিকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়; যম, ধর্মরাজ, কাল ও চিত্রগুপ্তকে প্রণাম করা হয়। শেষে পুত্রহীন মৃত গোত্রজনদেরও অন্তর্ভুক্ত করে বলা হয়—গোত্রের কেউ বাদ পড়বে না; এভাবেই শ্রাদ্ধ-সম্পর্কিত কর্মের লিটুর্জিক ছাঁচ ও প্রাপক-শ্রেণিবিন্যাস স্থাপিত হয়।
Vaiśvadeva-Homa: Establishing Vaiśvānara, Sending Away Impurity, and the Svāhā Recipient-List
আচারভিত্তিক নিত্যকর্মের ধারাবাহিকতায় ব্রহ্মা বৈশ্বদেব-হোমের লক্ষণ ব্যাখ্যা করেন। সাধক পবিত্র অগ্নি প্রজ্বালন করে প্রোক্ষণে শুদ্ধি সাধন করে এবং এমন মন্ত্র পাঠ করে যা (ক) ‘অশুচির ধারা’কে যমলোকের দিকে প্রেরণ করে, (খ) জাতবেদস্/বৈশ্বানরকে দেবতাদের নিকট হবি বহনকারী জ্ঞানী বাহক হিসেবে স্থাপন করে। অরণি থেকে উৎপন্ন, ত্রিকালে জাগ্রত বৈশ্বানরকে শোধক রূপে আহ্বান করা হয়। এরপর স্বাহা-আহুতি ক্রমান্বয়ে প্রজাপতি থেকে বিশ্বেদেব, ব্রহ্মা, জল, ঔষধি ও বনস্পতি-নাথ, গ্রহশক্তি, অধিদেবতাসহ দেবগণকে নিবেদন করা হয়; পরে ইন্দ্রের অনুচর, যম ও যমদূত, দিবাচর প্রাণী এবং ভূমিসংযুক্ত পিতৃদের উদ্দেশে। শেষে ভ্রাম্যমাণ, দীন ও ক্ষতিকর ভূতদেরও পুষ্টির ভাগ দিয়ে পুষ্টিপতির কাছে আহার-সমৃদ্ধি প্রার্থনা করা হয়; চাণ্ডাল-লোক ও কাক পর্যন্ত স্মরণ করে সর্বব্যাপী দৈনন্দিন ধর্ম ও শান্তির যুক্তি স্থাপন করা হয়।
Gāyatrī–Sandhyā Upāsanā: Śuddhi, Nyāsa, and Japa-Viniyoga
ব্রহ্মা বলেন—শুদ্ধি সর্বাগ্রে পুণ্ডরীকাক্ষ (বিষ্ণু)-স্মরণে প্রতিষ্ঠিত হয়; এতে বৈদিক আচার ভক্তিমূলক ভিত্তি পায়। পরে তিনি গায়ত্রীর ঋষি, ছন্দ, দেবতা ও ত্রিপাদ-রূপ নির্দিষ্ট করে, দেহে বিশ্ব-ভাবনা আরোপসহ উপনয়ন-উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ জানান। ভূঃ থেকে সত্যং পর্যন্ত ব্যাহৃতিসহ উচ্চতর উচ্চারণে ন্যাস, এবং অঙ্গ-মন্ত্রে রক্ষা ও শক্তি-প্রদান নিরূপিত। ‘ওঁ’ উচ্চারণক্রম, জল-শুদ্ধি ও সূর্য-আহ্বান শেখানো হয়—সূর্যকে চরাচর সত্তার দিব্য চক্ষু ও আত্মা রূপে ধ্যান। গায়ত্রী-জপের বিনিয়োগে বিশ্বামিত্র, গায়ত্রী ছন্দ, সবিতা দেবতা স্পষ্ট; বাতধাঃ-ধাঁচের পুনরাবৃত্তি ও শেষে দেবীর বিধিবৎ বিসর্জনে অধ্যায়টি নিত্যকর্ম/সংস্কার-ক্রমের পূর্ণ লিটুর্জিক ধারা সম্পন্ন করে।
Śrāddha Vidhi (Pārvaṇa-Śrāddha): Invitations, Arghya, Protective Rites, Piṇḍa Offering, Dakṣiṇā, and Visarjana
আচারভিত্তিক উপদেশধারায় ব্রহ্মা ব্যাসকে শ্রাদ্ধের সম্পূর্ণ ক্রম শেখান, যা সংসারকল্যাণ ও মোক্ষ-সম্পর্কিত পুণ্য প্রদান করে। প্রথমে যোগ্য ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ করা হয় এবং উপবীতের অবস্থান ও দেবতীর্থ/পিতৃতীর্থ অনুযায়ী পৃথক জল-অর্ঘ্যপ্রদান দ্বারা দেবকার্য ও পিতৃকার্যের ভেদ দেখানো হয়। আগে বিশ্বেদেবাদের আহ্বান, আসনদান, যব ছিটিয়ে অপহত-রক্ষা, তারপর অর্ঘ্য, সুগন্ধি ও অনুমতি-মন্ত্রে পূজা সম্পন্ন হয়। পরে পিতৃ ও মাতৃপক্ষসহ পিতৃদের আহ্বান, তিল-অর্পণ, পাত্রসংস্কার, কব্যবাহন অগ্নিতে আহুতি এবং সর্ষে-রক্ষাবিধি করা হয়। ভোজন করিয়ে তৃপ্তি-প্রশ্নের পর কুশের উপর নিয়মিতভাবে পিণ্ড স্থাপন, গায়ত্রী-ব্যাহৃতি ও ‘মধু’ ঋক্ পুনঃপাঠ, তিলোদক, বংশবৃদ্ধির আশীর্বাদ ও স্বধা-পাঠ হয়। শেষে দক্ষিণা, পিণ্ডসমাপ্তি যাচাই ও বিসর্জন-মন্ত্র; বলা হয়েছে এই বিধি পাঠ বা পালন করলে পাপ নাশ হয়, পিতৃদের অক্ষয় ফল ও ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি পর্যন্ত মঙ্গল হয়, এবং গৃহস্থাচারকে পরলোককল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করে।
Śrāddha-bheda-nirūpaṇa: Nitya, Vṛddhi, Nāndīmukha, and Ekoḍḍiṣṭa Procedures
পূর্বোক্ত শ্রাদ্ধবিধানের পর ব্রহ্মা নিত্য, বৃদ্ধি, নান্দীমুখ ও একোড্ডিষ্ট—এই বিশেষ শ্রাদ্ধভেদগুলির লক্ষণ ব্যাখ্যা করেন। নিত্য-শ্রাদ্ধে সংকল্প ও আসনাদি উপচার থাকে, কিন্তু বিশ্বেদেব আহ্বান করা হয় না। বৃদ্ধি-শ্রাদ্ধ শুভ পারিবারিক উপলক্ষে; এতে পূর্বমুখে বসা, দক্ষিণোপবীত, যব-বাদর-কুশ প্রভৃতি দ্রব্য, দেবতীর্থে ক্রিয়া এবং শেষে নমস্কার নির্দিষ্ট। নান্দীমুখ শ্রাদ্ধে প্রথমে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের সাক্ষীরূপে নিমন্ত্রণ, পরে প্রপিতামহী-পিতামহী প্রভৃতি নারী-পিতৃদের পৃথক নিমন্ত্রণ; তারপর দেব-পিতৃ-বৃদ্ধদের কাছে ক্রমান্বয়ে অনুমতি প্রার্থনা ও অচ্ছিদ্র মন্ত্রে দৃঢ়ীকরণ। শেষে নামসহ পিতার বার্ষিক একোড্ডিষ্ট—নিমন্ত্রণ, পাদ্য, আসন, জপস্থিতি, অতিথিশ্রাদ্ধ; পরে দক্ষিণমুখে বামোপবীত হয়ে ‘অগ্নিদগ্ধা’ ইত্যাদি সহ ধারাবাহিক জলদান ‘স্বধা’তে সমাপ্ত, অবশিষ্ট ‘পূর্ববৎ’।
Sapiṇḍīkaraṇa-Śrāddha Vidhi (One-Year Concluding Rite)
শ্রাদ্ধবিধির ধারাবাহিকতায় ব্রহ্মা বর্ষশেষে সম্পাদিত সপিণ্ডীকরণ-শ্রাদ্ধের বিধান বলেন, যাতে প্রয়াতের পিতৃলোকগমন সম্পূর্ণ হয়। অপরাহ্ণকাল নির্ধারণ, পিতৃবংশ-প্রতিনিধি ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণক্রম, আসনবিন্যাস, দেবতাদের আহ্বান, এবং কুশ ও আচ্ছাদনসহ তিনটি পিতৃপাত্র প্রস্তুতি (অচ্ছিদ্র-নির্ণয়সহ) বর্ণিত। পরে পাত্রগুলি ক্রমে উন্মুক্ত করে ঐক্য-মন্ত্র পাঠে পিতামহ ও প্রপিতামহের জল/সার পিতার পিতৃপাত্রে মিশিয়ে সপিণ্ড-সংযোগ স্থাপন করা হয়। এরপর অর্ঘ্য, অপোশান, বিকিরণ, তৃপ্তি-প্রশ্ন, ‘প্রেত’ নামে নির্দিষ্ট পিতার উদ্দেশে পিণ্ডদান, পিণ্ডবিভাগ ও পিতৃপাত্রে স্থাপন, এবং পিণ্ডচালন সম্পন্ন হয়। শেষে অনুমতি, দক্ষিণমুখী জলধারা, দক্ষিণা, আশীর্বাদ, বিসর্জন ও বিদায়; উপসংহারে শ্রাদ্ধকে বিষ্ণুরই স্বরূপ বলা হয়েছে।
Dharma-sāra: Dāna-mahātmyam, Karma-vāda, and the Conquest of Grief and Greed
ব্রহ্মা–শঙ্করের উপদেশধারার ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায়ে ধর্মকে সংক্ষিপ্তভাবে কার্যকর নীতিতে রূপ দেওয়া হয়েছে। শোককে আত্মিক ক্ষয়কারী বলে বর্জন করতে বলা হয়েছে এবং কর্মকেই সুখ-দুঃখের একমাত্র নির্মাতা বলা হয়েছে। দানকে পরম ধর্ম হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়েছে, আর ভীত প্রাণীর প্রাণরক্ষা-কার্যকেও সমান মহাপুণ্য বলা হয়েছে। তপ, ব্রত, যজ্ঞ, স্নান ইত্যাদি ধর্মানুগ হলে তবেই ফলদায়ক; অধর্মযুক্ত হলে নরকের কারণ, আর সত্য, ক্ষমা ও পবিত্র কর্মে ভক্তি স্বর্গপ্রদ। লোভকে ক্রোধ, বিদ্বেষ, মোহ, ছল, অহংকার ও ঈর্ষার মূল বলে দেখিয়ে এগুলি ত্যাগে শান্তি লাভের কথা বলা হয়েছে। ভূমি, গাভী, অন্ন, কন্যাদান, বৃষোৎসর্গ, তীর্থসেবা, শাস্ত্রশ্রবণ, কূপ-উদ্যান প্রভৃতি লোকহিত দানের তালিকা দিয়ে শেষে বলা হয়েছে—তীর্থের চেয়েও শ্রেষ্ঠ সৎসঙ্গ, যা তৎক্ষণাৎ ফল দেয়। শেষে সনাতনধর্মের মূল গুণাবলি উল্লেখ করে পরবর্তী প্রয়োগধর্ম ও কর্মফল-আলোচনার ভূমিকা রচিত হয়েছে।
Prāyaścitta for Food-Contact, Social Contact, Aśauca Periods, and Formal Penance Systems
আচারখণ্ডের ব্যবহারিক ধর্মশিক্ষা অব্যাহত রেখে ব্রহ্মা দৈনন্দিন জীবনে শুচিতা-অশুচিতার লক্ষণ ব্যাখ্যা করেন—বিশেষত উচ্ছিষ্ট, দূষিত অন্ন-জল, মল-মূত্রাদি স্পর্শ, ঋতুমতী-দোষ, জন্ম-মৃত্যুর আশৌচ এবং কিছু লঙ্ঘনজনিত অপরাধ। দোষের মাত্রা ও ব্যক্তির অবস্থান অনুযায়ী প্রায়শ্চিত্ত নির্ধারিত—উপবাস, স্নান, আচমন, মন্ত্রজপ (বিশেষ করে বহু সংখ্যক গায়ত্রী), পঞ্চগব্য সেবন, এবং কৃচ্ছ্র, সান্তপন, চন্দ্রায়ণ, প্রাজাপত্য, পরাক প্রভৃতি ব্রত। প্রবাহমান জল, বাতাসে উড়ে আসা ধুলো ও বিশেষ পরিস্থিতির ছাড়—এমন ব্যতিক্রমী শুদ্ধিনিয়মও বলা হয়েছে। শেষে প্রায়শ্চিত্তের রূপ ও পরিমাপ, এবং পঞ্চগব্যের উপাদান ও পরিমাণ নির্দিষ্ট করে পরবর্তী আচারবিষয়ের জন্য ‘আচার-সংশোধন’ পদ্ধতি মান্য করা হয়।
Yuga-Dharma, Kalpa Measure, Purāṇa Definitions, and the Kali-Yuga Power of Nāma-Kīrtana
ব্রহ্মা পূর্বোক্ত মুনিধর্মের উপদেশ সমাপ্ত করে বলেন—তর্পণ, হোম, সন্ধ্যা, ধ্যান ও সংযত একাগ্রতা—সবই বিষ্ণুকে তুষ্ট করারই রূপ; তিনিই ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ চার পুরুষার্থ দান করেন। এরপর সূত বিশ্বকাল ও প্রলয়ের কথা বলেন: কল্প হলো ব্রহ্মার এক দিন, যেখানে সহস্র যুগচক্র; কৃত, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিতে ধর্ম ক্রমে ক্ষয় হয়, গুণ-স্বভাব, সমাজব্যবস্থা ও আয়ুও কমে। মাঝখানে পুরাণীয় ইতিহাস—বিষ্ণুর রক্ষাকারী অবতরণ, ব্যাসের দ্বারা বেদের বিভাগ, এবং পুরাণ-পরম্পরার প্রচার—উপস্থাপিত হয়। পঞ্চলক্ষণ দ্বারা পুরাণের সংজ্ঞা স্থির করে অষ্টাদশ মহাপুরাণ, উপপুরাণ ও অষ্টাদশ বিদ্যার তালিকা দেওয়া হয়। কলিযুগের বিকৃতি—দুর্নীতিগ্রস্ত রাজা, ভণ্ড তপস্বী, দুর্বল যজ্ঞকর্ম—বর্ণনা করে সিদ্ধান্ত হয়: কলিতে হরিনাম-কীর্তনই মুক্তির সর্বাধিক সহজ সাধন।
Naimittika and Prākṛtika Pralaya (Periodic and Primordial Dissolution)
সূত শৌনককে উপদেশ দিতে দিতে এই অধ্যায়ে কল্পান্তের পর্বগুলি বর্ণিত হয়েছে। প্রথমে নৈমিত্তিক প্রলয়—চার যুগের সহস্র চক্র শেষে শতবর্ষ অনাবৃষ্টি হয়, সাত সূর্য উদিত হয়ে ত্রিলোক শুষ্ক করে এবং তাপ পাতাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তখন ভগবান বিষ্ণু মুখ থেকে মেঘ প্রকাশ করে শতবর্ষ বৃষ্টি বর্ষণ করান; শেষে মহাপ্লাবনে সর্বত্র জলই থাকে, চল-অচল সকলের বিনাশে হরি একাই অনন্তশয্যায় শয়ন করেন। পরে প্রাকৃতিক প্রলয়—যোগশক্তিতে বিশ্ব-প্রত্যাহার, ব্রহ্মলোকে পৌঁছানো জীবদের অগ্রগতি, এবং ব্রহ্মার আয়ু শেষ হলে ব্রহ্মাণ্ড ভেঙে লয়। শেষে পৃথিবী থেকে পুরুষ পর্যন্ত লয়ক্রম বলে, বিষ্ণুর বিশ্রাম ও অব্যক্ত থেকে ক্রমান্বয়ে পুনঃসৃষ্টি—প্রলয় থেকে নবসৃষ্টির সেতু—প্রতিপাদিত হয়েছে।
Saṃsāra-cakra, Preta’s 12-day Transit to Yama, Re-embodiment, and Karma-Vipāka Catalog of Sins and Rebirths
প্রেতকল্পের পরলোক-উপদেশ অব্যাহত রেখে সূত বলেন—ত্রিবিধ দুঃখ ও সংসারচক্রের স্বরূপ-বিবেক থেকে মুক্তির পথ উদ্ভাসিত হয়। দেহত্যাগের পর জীব সূক্ষ্মদেহ ধারণ করে, যমদূতরা তাকে বারো দিনের মধ্যে যমের কাছে নিয়ে যায়; এই সময় শ্রাদ্ধের তিলোদক ও পিণ্ড প্রেতের আহার হয়। পাপের ফল নরক, পুণ্যের ফল স্বর্গ—কিন্তু উভয়ই সাময়িক; পরে আবার গর্ভজন্ম। কলল থেকে অঙ্কুর পর্যন্ত ভ্রূণবিকাশ, জীবনের নানা অবস্থায় মায়ার আচ্ছাদন এবং পুনর্মৃত্যু—এভাবেই চক্র সম্পূর্ণ হয়। এরপর কর্মবিপাক-তালিকায় চৌর্যের নানা প্রকার, কামদোষ, প্রতারণা, কৃতঘ্নতা, নিষ্ঠুরতা, গুরু-বৃদ্ধের অবমাননা, যজ্ঞ-শ্রাদ্ধে বাধা ইত্যাদি পাপের জন্য কীট, পাখি, পশু, দানবীয় রূপে অধঃপতিত জন্ম এবং কিছু চোরের জন্য রৌরব প্রভৃতি ভয়ংকর নরকের উল্লেখ আছে। শেষে দয়া, সত্য, হিতবাক্য, বেদপ্রামাণ্য, গুরু-দেব-ঋষিসেবা স্বর্গলক্ষণ এবং অষ্টাঙ্গযোগকে পরমসিদ্ধি বলে পরবর্তী অধ্যায়ের ভূমিকা রচিত হয়।
Mahāyoga: Detachment from ‘I/Mine’, Aṣṭāṅga Practice, Oṁkāra and Aham-Brahmāsmi Contemplation
সূত ‘পরম মহাযোগ’-এর কথা বলেন, যা ভোগ ও মোক্ষ—উভয়ই দেয়। দত্তাত্রেয় আলর্ককে উপদেশ দেন—‘আমার’ বোধই দুঃখের মূল, ‘আমার নয়’ বোধে দুঃখের অবসান। বন্ধন ‘আমি’ বীজ থেকে বৃক্ষের মতো জন্মায়, ‘আমার’ হয়ে ঘন হয়, ধন‑স্ত্রী‑পরিবারের শাখায় বিস্তার লাভ করে এবং অবিদ্যায় পুষ্ট হয়; সত্য জ্ঞান সেই বৃক্ষ ছেদন করে আত্মাকে পরমে লীন করে। এরপর সাধনার পথ—যম‑নিয়ম, আসন‑স্থৈর্য, মিত প্রণায়াম, প্রত্যাহার ও ধারণা; অন্তঃকেন্দ্রে একাগ্রতা এবং দশপ্রকার ধারণা যা অক্ষর পর্যন্ত নিয়ে যায়। ওঁকারকে অ‑উ‑ম, গুণসংশ্লিষ্ট মাত্রাসহ বিশ্লেষণ করে নির্গুণ ‘অর্ধমাত্রা’র ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। শেষে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ ধ্যান বারবার করে স্থূল‑সূক্ষ্ম পরিচয় অতিক্রম করতে বলা হয়। জপ, পূজা, দান, ব্রত প্রভৃতি শুদ্ধাচার জ্ঞানের সহায়; জ্ঞানহানি যোগীর পতন ঘটাতে পারে—এই সতর্কতা দিয়ে নারায়ণের একান্তভক্তিকেই চূড়ান্ত উপায় বলা হয়েছে, এবং পরবর্তী শিক্ষার ভূমিকা রচিত হয়েছে যে নিয়মিত সাধনা জ্ঞান স্থির করে পুনরায় বন্ধনে পতন রোধ করে।
Bhakti-māhātmya: The Marks of the Vaiṣṇava and the Liberating Power of Exclusive Devotion
সূত বলেন, সাধনার কেন্দ্র একটাই—হরি কেবল ভক্তিতে প্রসন্ন হন, আর জীবনের নিশ্চিত ফল হলো নিরন্তর বিষ্ণু-স্মরণ। সেবা, নিত্যকর্ম ও শাস্ত্র-শ্রবণে ভক্তি দৃঢ় হয়; অশ্রু, রোমাঞ্চ, কম্পন ইত্যাদি দেহগত ভাব অন্তর্লীনতার লক্ষণ। ভাগবতের পরিচয় সংযম, নিজ হাতে পূজা, জগতের প্রতি মঙ্গলভাব এবং ভক্তদের প্রতি স্নেহ-গৌরব। সামাজিক ও আচারগত উচ্চনীচতা গৌণ; অষ্টবিধ ভক্তি বহিরাগতকেও পবিত্র করে সম্মানযোগ্য করে তোলে। ভক্তি যজ্ঞ ও বিদ্যার চেয়ে শ্রেষ্ঠ; শরণাগতদের প্রতি করুণায় নির্ভয়তা দেয় এবং যম বৈষ্ণবদের উপর অধিকার অস্বীকার করেন। দুষ্টও একান্ত ভক্তিতে ধার্মিক হয়ে শান্তি পায়; নারায়ণ-শরণে মায়া অতিক্রম হয়। শেষে বিষ্ণুকে পরম ব্রহ্ম বলে বৈদিক সিদ্ধান্ত স্থাপন করে, মোহগ্রস্ত মন তা না বোঝার সতর্কতা দেয়; পরবর্তী আচারের আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ভক্তিকেই চাবিকাঠি করা হয়েছে।
Nāma-mahātmya: Liberation through Salutation, Chanting, and the Mantra “Namo Nārāyaṇāya”
সূত অনাদি, অজন্মা, অবিনাশী মোক্ষ-কারণ—অন্তর্যামী সর্বসাক্ষী বিষ্ণুকে প্রণাম করে অধ্যায় শুরু করেন। এরপর ভক্তির তর্ক তীব্র হয়: চক্রধারী প্রভুকে সামান্য নমস্কারও বন্ধনের ‘তৃণসম’ শক্তিকে ভীত করে; কৃষ্ণে একবার শরণাগতি পতিতকেও উত্তোলিত করে। সাষ্টাঙ্গ প্রণাম ও শ্রদ্ধাভরে নমস্কার মহাযজ্ঞের চেয়েও শ্রেষ্ঠ; কৃষ্ণকে একবার নত হওয়াই সংসারের ‘কূপবৎ অরণ্য’ পার করায়। ব্যবহারিক নির্দেশ—যে অবস্থাতেই থাকো, “নমো নারায়ণায়” মন্ত্রে আশ্রয় নাও। নাম সহজলভ্য হলেও মোহ জীবকে নরকে টানে; তবু নাম-মহিমা অক্ষয়, সহস্র মুখেও বর্ণনাতীত। নাম উচ্চারণ ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত, স্বপ্নেও, পাপ নাশ করে, যমপুরীতে প্রবেশ রোধ করে; নাম-সংকীর্তন অগ্নির মতো মলিনতা দগ্ধ করে। শেষে যুগধর্ম বলা হয়—পূর্বযুগে ধ্যান-জপ-পূজায় যা মেলে, কলিযুগে কেশবস্মরণে তা লাভ; তাই নামই দীর্ঘ মৃত্যুপথের পাথেয়, পরলোক-শিক্ষার পূর্বভূমিতে ভক্তিকে চূড়ান্ত প্রতিকার স্থাপন করে।
Hari-Pūjā: Puruṣa-sūkta, Bhakti-Supremacy, and Consequences of Neglect
আচারখণ্ডের ধারাবাহিকতায় সূত সহজ ও সর্বসাধ্য হরি-পূজার বিধি বলেন—ফুল ও জল অর্পণ করে পুরুষসূক্ত পাঠসহ বিষ্ণুর আরাধনা। অধ্যায়টি এটিকে মহাজাগতিক নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করে: বিষ্ণু সর্বব্যাপী, সকল জীবের কর্মপ্রবৃত্তি তাঁর থেকেই, তাই তাঁর পূজায় সমগ্র সৃষ্টিরই সম্মান হয়। এরপর কর্মফল ও পরলোকীয় জবাবদিহি—বিষ্ণু-উপাসনা অবহেলা মহাপাপ, যমের তিরস্কার ও নরকযন্ত্রণা ডেকে আনে। তবু করুণার কথা আছে: উপকরণ না থাকলে কেবল জল অর্পণও যথেষ্ট। আত্মীয়ের সহায় সীমিত, ঈশ্বরের কৃপাই পরম—এ কথা বলে শেষে জানায়, বাহ্য আচার ও লৌকিক সিদ্ধির চেয়ে ভক্তিই সত্য পূর্ণতা ও মুক্তজনের সঙ্গের মূল; পরবর্তী অংশে আরও শৃঙ্খলা ও ফলের ইঙ্গিত দেয়।
Nārāyaṇa-Smaraṇa as the Supreme Dharma, Expiation, and Yogic Purifier
ধর্ম ও সাধনার প্রসঙ্গে সূত মৈত্রেয়কে বলেন—শাস্ত্রসমীক্ষার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র নারায়ণ-স্মরণ। তীর্থ, দান, তপস্যা, যজ্ঞ, প্রাণায়াম প্রভৃতি বাহ্য পুণ্যের তুলনায় স্মরণ ও ধ্যানের অতিশয় শক্তি ঘোষিত—এটি কর্মবীজ নাশ করে এবং আচার-অনুষ্ঠানের ত্রুটিও পূরণ করে। পরে যোগপ্রয়োগে বলা হয়: জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তিতে চিত্তবৃত্তি অচ্যুতাশ্রিত; সিদ্ধ ধারণা হলো দৈনন্দিন কর্মের মধ্যেও অবিচল একাগ্রতা। এরপর ধ্যানমূর্তি—সূর্যমণ্ডলে পদ্মাসনে দীপ্ত নারায়ণ, শঙ্খ-চক্রধারী—সাকার ধ্যানের স্পষ্ট রূপ দেয়। শেষে সর্বজনীন অধিকার দেখিয়ে বলা হয়, শরণাগত চিত্তে পশুও উন্নতি পায়; স্বর্গও পরম ফলের বাধা হতে পারে; এবং শিশুপালের বৈর-স্মরণেও মুক্তি উদাহরণ হয়ে প্রমাণ করে যে অন্তর্মুখী স্মরণই গতি ও মোক্ষ নির্ধারণ করে।
Śiva’s Narasiṃha-Stotra and the Pacification of the Mātṛgaṇas
সূত শৌনক-পরম্পরায় প্রাপ্ত শিবোক্ত নরসিংহ-স্তোত্রের কথা বলেন। মাতৃগণ বিশ্ব ভক্ষণ করার অনুমতি চাইলে শিব নিষেধ করে স্মরণ করান—তাদের ধর্ম রক্ষা; কিন্তু তারা অবজ্ঞা করে ত্রিলোক গ্রাস করতে থাকে। সৃষ্ট জীব নাশ করতে অনিচ্ছুক শিব হরির নরসিংহরূপ ধ্যান করেন; ধ্যানানুরূপ সেই দেবতা প্রকাশিত হন, এমন ভয়ংকর দীপ্ত যে দেবতারাও কষ্টে দর্শন করেন। শিব নরসিংহের জ্যোতির্ময়, ভয়াল সার্বভৌমত্ব ও লোকরক্ষাশক্তি স্তব করে মাতৃগণকে সংযত করার প্রার্থনা করেন। নরসিংহ জিহ্বা থেকে বাগীশ্বরকে প্রকাশ করে দেবতা ও মাতৃগণকে সমবেত করেন, শান্তি-ক্ষেম স্থাপন করে অন্তর্ধান হন। শেষে ফলশ্রুতি—নিয়মিত জপ-ধ্যানে ইষ্টসিদ্ধি ও শোকনাশ; শিব নরসিংহ-উপাসনা প্রতিষ্ঠা করেন এবং মাতৃগণ-সম্পর্কিত অনুগ্রহ-পরম্পরা বর্ণিত হয়।
Kula-amṛta: Śiva’s Teaching to Nārada on Viṣṇu-Dhyāna and Mokṣa
সূত ‘কুলামৃত’ নামে এক গোপন স্তোত্রের কথা বলেন, যা নারদের প্রশ্নে শিব উচ্চারণ করেছিলেন। কাম-ক্রোধ, সুখ-দুঃখের দ্বন্দ্ব ও ইন্দ্রিয়বিষয়ে আসক্তিতে আবদ্ধ জীবের দুঃখ দেখে নারদ জন্ম-মৃত্যুর সাগর পার হওয়ার উপায় জানতে চান। শিব বলেন—তৃণ থেকে ব্রহ্মা পর্যন্ত সকলেই মায়ার ঘুমে যেন নিদ্রিত; জাগরণ কেবল ভগবৎকৃপায় হয়। ক্ষমতা-ভোগের মদ ও স্ত্রী-পুত্র-কুলাসক্তি সর্বনাশের কারণ; অজ্ঞতা নিজেই নিজের বাঁধন, যেমন রেশমকীট কোকুনে নিজেকে বেঁধে ফেলে। তিনি বারবার মূল সাধন বলেন—অজ, সর্বব্যাপী, বাক্-মনাতীত, সর্বলোকসাক্ষী বিষ্ণু/বাসুদেবের নিরন্তর ধ্যানেই মোক্ষ, মহাযজ্ঞেরও ঊর্ধ্বে। শেষে সূত ফলশ্রুতি জানান—এই স্তোত্র শ্রবণ বা পাঠ মহাপাপ নাশ করে পরম, অচঞ্চল পদে পৌঁছে দেয় এবং পরবর্তী পুরাণোপদেশে ভক্তিকেই মুক্তির চালিকা শক্তি হিসেবে স্থাপন করে।
Mṛtyvaṣṭaka of Mārkaṇḍeya: Refuge in Viṣṇu and the Withdrawal of Death
প্রেতকল্পে আয়ু ও মৃত্যুনিয়ন্ত্রক শক্তির আলোচনায় সূত মুনি মার্কণ্ডেয়-কথিত ‘মৃত্য্বষ্টক’ স্তোত্র উপস্থাপন করেন, যার কেন্দ্র দামোদর/বিষ্ণুতে শরণাগতি। স্তোত্রে বিষ্ণুকে অধোক্ষজ, শঙ্খ-চক্রধারী এবং বরাহ, বামন, নরসিংহ, জনার্দন, মাধব প্রভৃতি অবতার-নামে স্তব করা হয়; শেষে সহস্রশীর্ষ, ব্যক্ত-অব্যক্ত, অন্তরাত্মা ও বিশ্বদেহী ইত্যাদি মহাবিশ্বব্যাপী বিশেষণ আসে। কাহিনির ফল তৎক্ষণাৎ—স্তোত্র শ্রবণমাত্রেই বিষ্ণুদূতদের প্রভাবে মৃত্যু পশ্চাদপসরণ করে, ভক্তিজাত দিব্য রক্ষার ইঙ্গিত দেয়। পরে বলা হয়, এই স্তোত্র মঙ্গলময়, পুণ্যদায়ক ও ‘মৃত্যু-শমক’; ত্রিকালে নিয়মিত জপ এবং অচ্যুতে চিত্ত স্থির থাকলে অকালমৃত্যু নিবারিত হয়। শেষে হৃদয়-পদ্মে দীপ্ত, অপরিমেয় নারায়ণের ধ্যানের মাধ্যমে যোগী ‘মৃত্যু জয়’ করে—পরবর্তী মৃত্যু-সংক্রান্ত ক্রিয়া ও পরলোক-অবস্থার শিক্ষার সেতু রচনা করে।
Acyuta/Vāsudeva Stotra: Avatāra-Salutations, Ritual Totality, Forgiveness Prayer, and Phalaśruti
পুরাণীয় গুরু–শিষ্য ধারায় সূত শৌনককে জানান যে তিনি ব্রহ্মা নারদের প্রশ্নে যে বরদায়ী বাসুদেব/অচ্যুত স্তোত্র শিক্ষা দিয়েছিলেন, তা হুবহু নিত্যপাঠের জন্য প্রদান করবেন। ব্রহ্মা স্তোত্রে বারবার বাসুদেবকে নমস্কার করেন—শ্রীবৎসচিহ্ন, পদ্মমালা, পীতাম্বর, শेषশয্যা প্রভৃতি বৈষ্ণব লক্ষণ স্মরণ করে—এবং নৃসিংহ, বামনের বলি-প্রসঙ্গ, বরাহ, পরশুরাম, কৃষ্ণের গোকুল-লীলা ইত্যাদি অবতার-স্মরণে স্তব বিস্তার করেন। পরে স্তোত্র সর্বাত্মক তত্ত্বে পৌঁছায়: হরিই গুরু ও শিষ্য, মন্ত্র ও মণ্ডল, ন্যাস ও মুদ্রা, যজ্ঞ ও ঋত্বিক, দেবতা ও জীব, তত্ত্ব ও অন্তঃকরণ—সবই; যোগ ও বেদান্তে জ্ঞেয় নির্গুণ, অদ্বৈত পরব্রহ্মরূপে তাঁকে বর্ণনা করা হয়। এরপর অপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ক্ষমা-প্রার্থনা এবং দেহাসক্তি ও বাহ্যাচার-মাত্র থেকে মুক্ত অচঞ্চল ভক্তি প্রার্থিত হয়। শেষে ফলশ্রুতি বলে—পূজা ও তিন সন্ধ্যায় পাঠ করলে মোক্ষসহ বহু কল্যাণ লাভ হয়, এবং পরবর্তী আচার ও মুক্তিমুখী সাধনার ভূমিকা প্রস্তুত হয়।
Brahma-vidyā through Yoga: Restraint, Pranava Japa, and Samādhi leading to Mokṣa
এই অধ্যায়ে সূত ব্রহ্মখণ্ডের মুক্তিদায়ক উপদেশকে যোগসাধনার জীবন্ত পথ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। সাধক ব্রহ্ম/বিষ্ণুর সঙ্গে নিজের ঐক্য ভাববে, তবে স্মরণ করানো হয়—অন্তর্লীন প্রভুর ফল পূজা ও ধর্মের আশ্রয় ছাড়া স্থির হয় না। এরপর পাপের চার প্রবাহ নির্দেশ করে সংযমের বিধান দেওয়া হয়—সত্য ও মিতভাষণ, অহিংসা, অচৌর্য, ব্রহ্মচর্য/ইন্দ্রিয়নিগ্রহ এবং আহারে সংযম। জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তি অবস্থার আলোচনা করে তাদের অতীত তুরীয়—শুদ্ধ, নিষ্ক্রিয় চৈতন্য—প্রদর্শিত হয়। সূক্ষ্মদেহকে ‘অষ্টপুর’ পদ্ম (পাঁচ বিষয়গুণ ও তিন গুণ) রূপে বর্ণনা করে প্রকৃতি ও মন-দেহ-সমষ্টি অতিক্রম করাই মোক্ষ বলা হয়েছে। যোগের ছয় উপায়—প্রাণায়াম, জপ, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান, সমাধি—বিস্তারসহ বলা হয়; ওঁকারের মাত্রা-পরিমাপ, “ওঁ নমো বিষ্ণবে” ও গায়ত্রীজপ প্রশংসিত। সমাধি অদ্বৈত দর্শনরূপ, যোগবিঘ্ন সম্পর্কে সতর্কতা, এবং শেষে ঘোষণা—মোক্ষ বাহ্য আচার নয়, অন্তর্নিয়ম ও প্রত্যক্ষ উপলব্ধি থেকেই; পরবর্তী অধ্যায়ের স্থায়ী অভ্যাস ও জ্ঞানভক্তির সেতু রচিত হয়।
Atma-Jnana as the Direct Means to Moksha: Advaita, Maya, and the Three States
ব্রহ্মখণ্ডের মুক্তি-শিক্ষা এগিয়ে নিয়ে ভগবান নারদকে আত্মজ্ঞান বিষয়ে নির্ণায়ক উপদেশ দেন। মুক্তিদায়ক তত্ত্ব অদ্বৈত; সাংখ্যসদৃশ বিবেকের ভাষায়ও তা ব্যাখ্যাত, আর যোগ বলা হয়েছে মনের একাগ্রতা—যা উপলব্ধিতে সহায়। যজ্ঞ, দান, তপস্যা, তীর্থযাত্রা ইত্যাদি কেবল পুণ্য দেয়, কিন্তু নিজে নিজে মোক্ষ দেয় না; শ্রবণ–মনন–নিদিধ্যাসনে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ বোধ জাগে। জাগ্রৎ–স্বপ্ন–সুষুপ্তি এই ‘ত্রিপুরা’ মায়ার নির্মাণ; দেহাতীত সর্বব্যাপী সাক্ষী অচল ও কর্মাতীত। রজ্জু-সাপ, শুক্তি-রূপ্য, মরীচিকা দৃষ্টান্তে অবিদ্যার নাম-রূপ আরোপ বোঝানো হয়েছে। মায়া-বিচার মায়াকে প্রকাশ করে বিলীন করে; হৃদয়ের বাসনা ক্ষয় ও জ্ঞান-প্রদীপ স্থির হলে জীবন্মুক্তি লাভ হয়। এই অধ্যায় পরবর্তী উপদেশের ভিত্তি হিসেবে সব ধর্মাচরণকে ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকারের প্রাধান্যে স্থাপন করে।
Gītā-sāra: The Self as Witness and the Inner Ascent into Brahman
ব্রহ্মখণ্ডের মুক্তিমুখী ধারায় ভগবান অষ্টাঙ্গ-যোগ ও বেদান্ত-বিবেকে পরিপক্ব সাধকের জন্য ‘গীতা-সার’ ঘোষণা করেন। তিনি পরম লক্ষ্য আত্ম-সাক্ষাৎকার স্থির করে দেহ, ইন্দ্রিয় ও দুঃখবদ্ধ অহংকার থেকে আত্মার ভিন্নতা বোঝান। হৃদয়-আকাশে আত্মার স্বয়ংজ্যোতি অগ্নি ও আলোর উপমায় প্রকাশিত; ইন্দ্রিয় নিজের ভিত্তি ধরতে পারে না, কিন্তু সর্বজ্ঞ ক্ষেত্রজ্ঞ তাদের জানেন। কর্মমল ক্ষয় হলে জ্ঞান প্রদীপের মতো বস্ত্রকে আলোকিত করে; দর্পণ-উপমায় আত্ম-প্রত্যভিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রের প্রকাশ ব্যাখ্যা হয়। শেষে ধাপে ধাপে ইন্দ্রিয় মনেতে, মন অহংকারে, অহংকার বুদ্ধিতে, বুদ্ধি প্রকৃতিতে, প্রকৃতি পুরুষে, পুরুষ ব্রহ্মে লীন—‘আমি ব্রহ্ম, পরম জ্যোতি’ ধ্যান দ্বারা। উপসংহারে জ্ঞান-যজ্ঞকে অশ্বমেধ-রাজসূয়/বাজপেয়ের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলে পরবর্তী ব্রহ্মখণ্ডে আচার অপেক্ষা উপলব্ধির প্রাধান্য সূচিত।
Yoga’s Limbs and Dharma as the Ground of Liberation
আচারখণ্ডের ব্যবহারিক নীতিশিক্ষা অব্যাহত রেখে ভগবান যোগের অঙ্গসমূহ গণনা করে সেগুলিকে ধর্মে প্রতিষ্ঠা করেন। অহিংসা মানে হিংসা-নিবৃত্তি, সত্য মানে প্রিয় ও হিতকর সত্যবচন, আর অস্তেয় মানে অদত্ত বস্তু গ্রহণ না করা। ব্রহ্মচর্য দেহ‑মন‑বাক্যে কামভোগের সম্পূর্ণ ত্যাগ, অপরিগ্রহ দুঃসময়েও অর্জন‑সঞ্চয় না করার দৃঢ়তা। নিয়মে বাহ্য‑আন্তর শৌচ, সন্তোষ, এবং তপস্যাকে দেহক্ষয় নয়—একাগ্রতা-কেন্দ্রিক সাধনা বলা হয়েছে; স্বাধ্যায় জপের দ্বারা শুদ্ধি। হরির স্তব, স্মরণ ও পূজাকে ধ্যানরূপ ভক্তি হিসেবে দেখিয়ে স্বস্তিক, পদ্ম, অর্ধাসন প্রভৃতি আসনের সহায়তা উল্লেখিত। শেষে প্রাণ ও প্রাণায়ামকে শ্বাসসংযম এবং অসৎ বিষয় থেকে ইন্দ্রিয়সংযম বলে পরবর্তী প্রত্যাহার/ধ্যানের ভূমি প্রস্তুত করা হয়।
From Brahman to the Elements: Subtle–Gross Body, Prāṇa, States of Consciousness, and Mahāvākya Realization
গরুড় পুরাণের উপদেশধারায় এই অধ্যায়ে ভগবান সৃষ্টির ক্রম ব্যাখ্যা করেন—ব্রহ্ম থেকে আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও পৃথিবী; তারপর সূক্ষ্ম উপকরণের উদ্ভব—কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি ও পঞ্চপ্রাণ। পঞ্চীকরণ প্রক্রিয়ায় সূক্ষ্ম তত্ত্ব থেকে স্থূল জগৎ ও স্থূল দেহের উৎপত্তি বোঝানো হয় এবং ঘট–মৃৎ দৃষ্টান্তে কার্য-কারণের অবিচ্ছেদ্যতা প্রতিপাদিত হয়। অন্তর্মুখী হয়ে জীবকে জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তির সাক্ষী বলা হয়েছে; সমাধির সূচনায় বিবেক স্থির করা ও আরোপিত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র লয় করার উপদেশ দেওয়া হয়। শেষে স্পষ্ট অদ্বৈত শিক্ষা—ব্রহ্ম নিত্য শুদ্ধ চৈতন্য; ‘তত্ত্বমসি’ ও ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ মহাবাক্যে মুক্তিদায়ক আত্মজ্ঞান নির্দেশ করে অবস্থাতীত নিরন্তর নিদিধ্যাসনের পথে প্রেরণা দেয়।
Gāruḍa-Māhātmya and Tārkṣya-Stotra: Fruits of Hearing/Reciting and the Power of Garuḍa’s Praise
এই অধ্যায়ে পূর্বোক্ত উপদেশের উপসংহাররূপে গারুড় পুরাণকে ‘সারভূত’ ধর্মশাস্ত্র বলা হয়েছে—যার শ্রবণে দেবতারাও পার্থিব সিদ্ধি ও মোক্ষ লাভ করেন। হরি থেকে রুদ্র, ব্রহ্মা থেকে ঋষিগণ, ব্যাস থেকে সূত, এবং সূত থেকে নৈমিষারণ্যে শৌনক—এই পরম্পরা দেখিয়ে পুরাণ-শ্রবণকে বেদ-সংগঠন ও ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। শ্রবণ, পাঠ, পাঠ করানো, লিপিবদ্ধ করা, প্রতিলিপি করানো, পাণ্ডুলিপি দান ও সংরক্ষণ—প্রত্যেকটির ফল সংকল্পানুসারে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষরূপে বর্ণিত। বেদানুগ পুরাণ অযোগ্যকে নির্বিচারে শেখানো নিষেধ, তবে যোগ্য সমবেত শ্রবণ প্রশস্ত। পরে তার্ক্ষ্য (গরুড়) স্তোত্রে অমৃত-হরণ, বিনতার মুক্তি, সর্পজিহ্বা-বিভাজন, গজ-কচ্ছপ প্রসঙ্গ, ইন্দ্রের বজ্র ও সুপর্ণোতি ইত্যাদি স্মরণ করে গরুড়ের অপ্রতিরোধ্য শক্তি ও রক্ষাকর প্রভাব বলা হয়েছে; তাঁর ধ্যানে বিষনাশও ঘটে। শেষে শৌনকের সন্ধ্যা-ধ্যান ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ এবং বিষ্ণুকৃপায় মুক্তি—দীর্ঘ শ্রবণ থেকে জ্ঞানোদয়ের স্বাভাবিক পরিণতি—রূপে প্রতিষ্ঠিত।
The chapter explicitly identifies Nārāyaṇa alone as the Divine (parama-brahman and paramātman), the sovereign even over the lords of the gods, from whom creation, preservation, and dissolution arise.
Śaunaka and the assembled ṛṣis seek a definitive purāṇic conclusion on īśvara-tattva—who is worthy of worship, meditation, and the source of dharma—so that their sacrificial culture and spiritual practice rest on correct metaphysical grounding.
They ask about the Supreme Lord’s identity and form, the mechanics of creation, the means to please Him (vrata/observances), the yoga by which He is attained, His avatāras, the rise of dynasties, and the regulation of varṇa-āśrama duties.
By placing Nārāyaṇa as the object of worship and meditation, the chapter frames dharma (social and ritual order) and yoga (attainment) as converging in Viṣṇu-centered theism—where observances and disciplined practice culminate in realization of the Supreme.
Read Garuda Purana in the Vedapath app
Scan the QR code to open this directly in the app, with audio, word-by-word meanings, and more.