
The Section on Creation
পদ্মপুরাণের সৃষ্টিখণ্ড পুষ্কর-মাহাত্ম্যকে অবলম্বন করে গ্রন্থের সূচনা করে। এখানে বিশ্বসৃষ্টির আলোচনা কেবল তত্ত্বচর্চা নয়; তীর্থকেন্দ্রিক পবিত্র ভূগোলের মধ্যে শাস্ত্রের প্রামাণ্য ও ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। মঙ্গলাচরণে পুষ্করের জলের স্তব করে তাকে স্নান, দান, জপ ও শ্রবণের জন্য অতিশয় পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে এই খণ্ড সৃষ্টিকে ভগবান বিষ্ণুর পরমাধিপত্যের সঙ্গে যুক্ত করে। পদ্মজ ব্রহ্মাকে পুরাণজ্ঞানের প্রথম গ্রাহক ও প্রচারক রূপে দেখিয়ে বোঝানো হয় যে পুরাণ যুগে যুগে প্রকাশিত দিব্য বাণী এবং একই সঙ্গে ধর্মস্মৃতির সংরক্ষিত ভাণ্ডার। সৃষ্টিবর্ণনার অন্তঃস্রোতে ভক্তির রস প্রবাহিত—হরির সংকল্পেই জগতের বিধান ও ধর্মরক্ষা প্রতিষ্ঠিত। বহুস্তরীয় কথনপরম্পরা—ঋষিগণ, সূত, ব্যাস, ব্রহ্মা ও হরি—গ্রন্থের উৎস ও কর্তৃত্বকে দৃঢ় করে। নৈমিষারণ্যে ধর্মচক্রের প্রতীক পুরাণকে সময়-সংবেদনশীল ‘জীবন্ত’ নিধি হিসেবে চিহ্নিত করে; চক্রের পরিধিতে ক্ষয়চিহ্ন যেখানে, সেই ভূমি সর্বাধিক পুণ্য বলে নির্দেশিত। পাশাপাশি সূতধর্ম—শুদ্ধাচার, শ্রদ্ধা ও লোকহিতের জন্য পুরাণপাঠ—এখানে আদর্শরূপে প্রতিপন্ন। এই খণ্ড পদ্মপুরাণের অন্তর্গত এক প্রকার বিষয়সূচিও—সৃষ্টির প্রকারভেদ, বংশানুক্রম, তীর্থবর্ণনা, রাজধর্ম ও মোক্ষোপায়ের ইঙ্গিত দেয়। সর্বত্র বৈষ্ণব শুদ্ধতা ও বিষ্ণুস্তুতিকে ‘নির্মল’ পুরাণশিক্ষার লক্ষণ বলে তুলে ধরে সৃষ্টিখণ্ড ভক্তি ও বিদ্যার সমন্বয়ে পাঠককে পবিত্র শ্রবণপথে প্রবেশ করায়।
Puṣkara Invocation, the Dharma-Wheel at Naimiṣa, and the Padma Purāṇa Prologue
এই অধ্যায় শুরু হয় পুষ্কর-তীর্থের পবিত্র জলের মঙ্গলাচরণে। এরপর পুরাণ-পরম্পরার বর্ণনা আসে—ব্যাসের শিষ্য-পরম্পরায় প্রাপ্ত সুত (উগ্রশ্রবা)কে ঋষিদের ধর্ম-প্রশ্নের উত্তর দিতে সভায় গমন করতে বলা হয়। নৈমিষারণ্যে ‘ধর্মচক্র’-প্রসঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয়: স্বয়ং প্রভু হরি বলেন, যেখানে চক্রের নেমি ক্ষয় হয় সেই ভূমিই পরম পুণ্যক্ষেত্র। তারপর ভগবান অন্তর্ধান করেন এবং ঋষিগণ দীর্ঘ সত্রযজ্ঞ আরম্ভ করেন। সুতের আগমনে তাঁকে সম্মান করা হয়; শৌনক-প্রমুখ মুনিরা পদ্মপুরাণ শ্রবণ কামনা করেন এবং সৃষ্টিতত্ত্বও জিজ্ঞাসা করেন—পদ্ম থেকে ব্রহ্মার আবির্ভাব প্রভৃতি। প্রস্তাবনায় সুতের পৌরাণিক কর্তব্য, ব্যাসকে নারায়ণরূপে স্তব, এবং পদ্মপুরাণের খণ্ডবিভাগ ও মূল বিষয়—সৃষ্টি, তীর্থমাহাত্ম্য, রাজধর্ম, বংশানুচরিত ও মোক্ষ—সংক্ষেপে নির্দেশিত।
Invocations, Definition and Authority of Purāṇa, Pulastya–Bhīṣma Frame, and the Creation–Dissolution Schema
এই অধ্যায়ের শুরুতে স্তরবদ্ধ মঙ্গলাচরণ আছে—প্রধানের জ্ঞাতা পরমেশ্বরকে, এবং ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব, ইন্দ্র, লোকপাল, সবিতা ও প্রধান ঋষিদের প্রণাম করা হয়। এরপর সৃষ্টিখণ্ডের বিষয়গুলির সংক্ষিপ্ত সূচি দেওয়া হয়—হিরণ্যাণ্ড/ব্রহ্মাণ্ড-সৃষ্টি, কল্প ও মন্বন্তর, দ্বীপ-সমুদ্রের বিভাগ, ধ্রুব ও গ্রহ-নক্ষত্রের গতি, নরকবর্ণনা এবং ত্রিবিধ প্রলয়। পুরাণ অধ্যয়নের পুণ্য ও বেদের অর্থ উদ্ভাসিত করার ক্ষমতাও ঘোষিত হয়। তারপর কাহিনির মোড় ঘোরে। ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—পুলস্ত্য ও ভীষ্মের সাক্ষাৎ কীভাবে হল। গঙ্গাদ্বারে ভীষ্মের তপস্যার ফলে পুলস্ত্য সেখানে উপস্থিত হন। ভীষ্ম সৃষ্টির কারণ ও ক্রম জানতে চান; পুলস্ত্য সাংখ্য-পুরাণীয় তত্ত্ব-উৎপত্তির ধারায় ব্যাখ্যা করে হিরণ্যাণ্ড পর্যন্ত সর্গের কথা বলেন এবং এক পরম প্রভুকেই স্রষ্টা, পালনকর্তা ও সংহারকর্তা রূপে প্রতিষ্ঠা করেন।
Cosmic Time, Cycles of Creation and Dissolution, and the Varāha Uplift of Earth
ভীষ্ম জিজ্ঞাসা করেন—নির্গুণ ব্রহ্মকে কীভাবে সৃষ্টিকর্তা বলা যায়? পুলস্ত্য বলেন—পরমেশ্বরের অচিন্ত্য শক্তির দ্বারাই তিনি সগুণরূপে সৃষ্টির কার্য সম্পাদন করেন। এরপর অধ্যায়ে পবিত্র সময়-পরিমাপ সুসংবদ্ধভাবে বলা হয়—নিমেষ থেকে বর্ষ পর্যন্ত, সন্ধ্যা-সন্ধ্যাংশসহ চার যুগ, মন্বন্তর, এবং ব্রহ্মার দিন-রাত্রি; সঙ্গে নৈমিত্তিক প্রলয়ের পর্যায়ক্রমও নির্দেশিত হয়। তারপর বরাহ-অবতার প্রসঙ্গ: প্রলয়জলে নিমগ্ন পৃথিবী স্তব করে; বিষ্ণু যজ্ঞপুরুষ ও সর্বব্যাপী রূপে বরাহ হয়ে দন্তে পৃথিবীকে তুলে স্থিতি দেন। পরে প্রাকৃত- বৈক্রত প্রভৃতি বহু সর্গ ও কৌমার সর্গের বিবরণ, ব্রহ্মার সৃষ্ট জীবসমূহ, বৈদিক-যজ্ঞরূপের প্রকাশ, বর্ণোৎপত্তি, কর্মানুসারে পুনরাবর্তন, এবং রুদ্রের উৎপত্তি ও নামকরণসহ বংশবিস্তারের কথা বলা হয়েছে।
Durvasa’s Curse, the Churning of the Ocean, and Lakshmi’s Manifestation (Chapter 4)
ভীষ্ম পুলস্ত্যকে জিজ্ঞাসা করেন—লক্ষ্মীর উৎপত্তি ও সংশ্লিষ্ট দেববংশের নানা প্রথা কীভাবে মিলিয়ে বোঝা যায়। পুলস্ত্য বলেন, দুর্বাসার দিব্য মালা ইন্দ্র অবজ্ঞা করায় শ্রীদেবী ত্রিলোক থেকে অন্তর্হিতা হন এবং দেবতারা পরাজিত হতে থাকেন। তখন ব্রহ্মা ও দেবগণ বিষ্ণুর শরণ নেন; বিষ্ণুর নির্দেশে ক্ষীরসাগর মন্থন শুরু হয়, দেব-অসুর মিলিতভাবে মন্দর পর্বত ও বাসুকিকে অবলম্বন করে মন্থন করে। মন্থন থেকে বারুণী, পারিজাত, চন্দ্র (শিব গ্রহণ করেন), কালকূট বিষ (শিব পান করেন), এবং অমৃতসহ ধন্বন্তরি প্রকাশিত হন; শেষে সমুদ্র থেকে শ্রী/লক্ষ্মী আবির্ভূত হয়ে বিষ্ণুর বক্ষস্থলকে আশ্রয়রূপে বরণ করেন। পরে বিষ্ণু মোহিনীসদৃশ নারী-রূপ ধারণ করে দানবদের বিমোহিত করেন এবং অমৃত দেবতাদের প্রাপ্য করেন। এ অধ্যায়ে খ্যাতির মাধ্যমে লক্ষ্মীর আরেক জন্ম-পরম্পরার কথাও স্মরণ করা হয়েছে। ভৃগুর সঙ্গে নগর-বিবাদ থেকে পরস্পর শাপ-প্রতিশাপ ঘটে, যা বিষ্ণুর মানবাবতারের প্রেক্ষাপট রচনা করে; তারপর তিনি যোগনিদ্রায় প্রবেশ করেন। শেষে নারদের স্তব ও ব্রহ্মার বরদানও বর্ণিত।
The Destruction of Dakṣa’s Sacrifice
ভীষ্ম জিজ্ঞাসা করেন—সতী কীভাবে দেহত্যাগ করলেন এবং কেন রুদ্র দক্ষের যজ্ঞ ধ্বংস করলেন। পুলস্ত্য বলেন, গঙ্গাদ্বারে দক্ষ এক মহাযজ্ঞ আয়োজন করেন; সেখানে দেবতা, ঋষি, নানা সত্তা ও সম্পূর্ণ ঋত্বিক-পুরোহিতমণ্ডলী সমবেত হয়। সতী সভা দেখে ব্যথিত হন, কারণ শিবকে আমন্ত্রণ করা হয়নি—এটি সামাজিক ও বৈদিক অপমান। দক্ষ প্রভৃতির কথোপকথনে শঙ্করকে তাঁর তপস্বী-ভয়ংকর রূপ দেখিয়ে নিন্দা করা হয় এবং কর্মতত্ত্বের যুক্তি দিয়ে সতীকে সহ্য করতে বলা হয়; কিন্তু সতী সত্যবচন উচ্চারণ করে যোগাগ্নিতে আত্মদাহ করেন এবং গঙ্গাতীরে তীর্থস্মৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। শোকে পিনাকী গণদের যজ্ঞবিধ্বংসের আদেশ দেন; দেবতারা বিপর্যস্ত হন। তখন দক্ষ দীর্ঘ নমস্কার-স্তোত্রে মহেশ্বরের স্তব করেন; শিব প্রসন্ন হয়ে যজ্ঞফল ও শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন করেন। নারদ সতীর পুনর্জন্ম (হিমবান–মেনার কন্যা) প্রকাশ করেন; পুলস্ত্য তাঁর পুনর্বিবাহসহ কাহিনি সমাপ্ত করেন।
Expansion of Creation through Dakṣa and Kaśyapa: Devas, Dānavas, Nāgas, Birds, and Cosmic Offices
ভীষ্ম দেব, দানব, গন্ধর্ব, নাগ ও রাক্ষসদের উৎপত্তির ক্রমানুসার জানতে চান। পুলস্ত্য বলেন, আদিতে সৃষ্টির এক রীতি ছিল—সংকল্প, দৃষ্টি ও স্পর্শমাত্রে প্রজার বিকাশ; পরে দক্ষের বংশধারা থেকে যৌনজননের দ্বারা বিস্তার শুরু হয়। দক্ষের পুত্র হর্যশ্ব ও শবলাশ্ব নারদের উপদেশে বৈরাগ্য লাভ করে আর ফিরে আসে না; তখন দক্ষ কন্যাসন্তান সৃষ্টি করে ধর্ম, কশ্যপ, সোম প্রভৃতির হাতে অর্পণ করেন। ধর্মের পত্নীদের থেকে বিশ্বেদেব, সাধ্য ও বসুগণের জন্ম; বসুদের নাম ও বংশধরদের বিবরণ দেওয়া হয়। রুদ্র ও তাঁদের গণদের কথাও আছে। কশ্যপের অদিতি, দিতি, দনু, বিনতা, কদ্রূ প্রভৃতি পত্নীদের গর্ভে আদিত্য, দৈত্য-দানব, বিনতা-বংশে গরুড়াদি পক্ষী এবং কদ্রূ-বংশে প্রধান নাগ-সর্পসহ নানা জীবের উৎপত্তি বর্ণিত—মন্বন্তরচক্রে সৃষ্টির ধারাবাহিকতা এভাবেই প্রতিপাদিত।
The Jyeṣṭha Full-Moon Vow, the Birth of the Maruts, and the Outline of Secondary Creation (Manvantaras)
ভীষ্ম পুলস্ত্যকে জিজ্ঞাসা করেন—দিতির গর্ভজাত মরুতেরা কীভাবে দেবতাদের প্রিয় হল। পুলস্ত্য বলেন, সরস্বতীতীরে পুষ্করে দিতি কঠোর তপস্যা করেন এবং বশিষ্ঠের কাছে উপায় জানতে চান; বশিষ্ঠ জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা-ব্রত নির্ধারণ করেন। সেখানে কলশ-স্থাপন, শ্বেত উপচার, ব্রহ্মা ও সাবিত্রী-প্রতিমা পূজা, মন্ত্র, প্রতি মাসে পালন এবং শেষে দানের বিধান আছে; ফল হিসেবে পাপক্ষয়, ঐশ্বর্য ও ব্রহ্ম-সায়ুজ্য প্রতিশ্রুত। ব্রতশেষে কশ্যপ ইন্দ্রবধের উদ্দেশ্যে গর্ভসঞ্চারের ক্রিয়া করেন এবং গর্ভিণীর নিয়মাবলি বলেন। দিতির সামান্য ত্রুটি কাজে লাগিয়ে ইন্দ্র ভ্রূণকে ঊনপঞ্চাশ ভাগে বিভক্ত করে; পরে ব্রহ্মা তাদের ‘মরুত’ নামে অভিহিত করে দেবত্ব ও যজ্ঞভাগ প্রদান করেন। এরপর অধ্যায় প্রাতিসর্গ প্রসঙ্গে পৃথুর দ্বারা বিশ্বাধিপতিদের নিয়োগ এবং মন্বন্তর ও তাদের ঋষিদের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেয়।
Pṛthu’s Earth-Milking, the Etymology of ‘Pṛthivī,’ and the Vaivasvata (Solar) Genealogy
ভীষ্ম জিজ্ঞাসা করেন—রাজাদের ‘পার্থিব’ বলা হয় কেন, আর পৃথিবী কীভাবে নানা নামে পরিচিতা হল। পুলস্ত্য বর্ণনা করেন বেনের পতন ও তার দেহ থেকে বিষ্ণু-অংশরূপে পৃথুর আবির্ভাব। ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথু গোরূপিণী পৃথিবীকে তাড়া করে ‘দোহন’ করেন এবং অন্ন-ঔষধি-সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনেন; দেবতা, ঋষি ও নানা জীব নিজ নিজ বাছুর ও পাত্র নিয়ে পৃথিবী থেকে ভিন্ন ভিন্ন ‘দুগ্ধ’ লাভ করে—এই বিবরণও আসে। পৃথুর আদর্শ শাসন, ভূমি সমতলীকরণ ও প্রজাহিতৈষী ব্যবস্থা বর্ণিত; পৃথুর সঙ্গে সম্পর্কেই পৃথিবী ‘পৃথিবী’ এবং রাজারা ‘পার্থিব’ নামে প্রসিদ্ধ। এরপর বৈবস্বত (সৌর) বংশপরম্পরা প্রসারিত হয়—সঞ্জ্ঞা ও ছায়ার কাহিনি, যমের শাপ ও ধর্মরাজ পদে প্রতিষ্ঠা। ত্বষ্টা সূর্যের তেজ হ্রাস করেন, তাই সূর্যের পা অঙ্কন নিষিদ্ধ—এ কথাও বলা হয়। শরবণে শিব-পার্বতীর অধিকারকালে ইলার লিঙ্গ-পরিবর্তন, বুধ ও পুরুর প্রসঙ্গ, এবং বিস্তৃত সৌর বংশাবলীতে ইক্ষ্বাকুর খ্যাতি ও রঘুবংশে শ্রীরামের স্থান নিরূপিত হয়।
Genealogy of the Ancestors (Pitṛs) and the Procedure of Śrāddha
ভীষ্ম পিতৃদের বংশপরম্পরা এবং শ্রাদ্ধে দেবতারূপে রবি ও সোমের পরিচয় জানতে চান। পুলস্ত্য পিতৃদের শ্রেণিবিভাগ ও তাদের লোকসমূহ—বৈরাজ, সোমপথ, বর্ষিষদ ও সোমপ—বর্ণনা করেন; এরপর কারণকথা হিসেবে অচ্ছোদার পতন, অমাবস্যার পবিত্রীকরণ, এবং সত্যবতী/অষ্টকা ও ব্যাস/বাদরায়ণের সঙ্গে যুক্ত ভবিষ্যদ্বাণীমূলক প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তারপর অধ্যায়টি বিধিনির্দেশমূলক হয়ে শ্রাদ্ধের প্রকার (নিত্য, নৈমিত্তিক, কাম্য), ব্রাহ্মণের যোগ্যতা-অযোগ্যতা, দিকনির্দেশ, প্রাচীনাবীত, পাত্রবিশেষত রৌপ্যপাত্রের প্রশংসা, অর্ঘ্য-অর্পণ, মন্ত্র/পাঠ, পিণ্ডবণ্টন ও পরবর্তী সংযমের বিধান বলে। পার্বণ, সংক্রান্তি, বিষুব-অয়ন, মহালয় ইত্যাদি শুভাশুভ সময়ও নির্ণীত হয়। শেষে শূদ্রদের জন্য মন্ত্রহীন ‘সাধারণ’ শ্রাদ্ধের কথা বলে দানকেই তাদের প্রধান ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
The Greatness of the Ancestors: Ekoddiṣṭa Śrāddha, Āśauca Rules, and Sapiṇḍīkaraṇa
পুলস্ত্য ভীষ্মকে একোद्दিষ্ট শ্রাদ্ধের বিধান এবং সংশ্লিষ্ট আশৌচ-নিয়ম ব্যাখ্যা করেন। বর্ণভেদে ও আত্মীয়তার পরিসীমা অনুযায়ী মৃত্যুশৌচের দিনসংখ্যা নির্ধারিত হয়, এবং জন্মাশৌচকেও সেই মৃত্যাশৌচের সমতুল্য বলা হয়েছে। প্রেতের শান্তির জন্য বারো দিন পিণ্ডদান, জলস্থাপন ও ব্রাহ্মণভোজনের বিধি আছে; একাদশ দিনে বিশেষ ভোজনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এরপর এক বছর পরে সম্পন্ন হওয়া সপিণ্ডীকরণ ক্রিয়ার কথা বলা হয়, যার দ্বারা প্রেত পিতৃগণের মধ্যে সংযুক্ত হয়। মন্ত্র, গোত্র ও সংকল্পের দ্বারা হব্য-কব্য নিবেদন কীভাবে পিতৃদের কাছে পৌঁছায় তা স্পষ্ট করা হয়েছে। অনুচিত দান—বিশেষত শয্যাদান—এর দোষ ও প্রায়শ্চিত্তও উল্লেখিত। শেষে কৌশিকের পুত্রদের থেকে শুরু করে বহু জন্মান্তরের পর ব্রহ্মদত্তের উপাখ্যান শ্রাদ্ধের মহিমা দেখায়—যা যোগসাধনা, সিদ্ধি এবং মুক্তির পরিণতি ঘটায়।
The Glory of Śrāddha at Sacred Fords and the Determination of the Kutapa Time
ভীষ্ম জিজ্ঞাসা করেন—শ্রাদ্ধের যথাযথ সময় কোনটি এবং কোন কোন তীর্থে করলে অধিক ফল লাভ হয়। পুরাণীয় পরম্পরার মধ্যে পুলস্ত্য বলেন, ভারতভূমিতে বহু পিতৃ-তীর্থ আছে—পুষ্কর, নৈমিষারণ্য, কুরুক্ষেত্র, গয়া, নদী-সঙ্গম ও শিবলিঙ্গ-স্থান; সেখানে দান, হোম, জপ ও শ্রাদ্ধ করলে অক্ষয় ফল হয়। এরপর তিনি সময়-নির্ণয় করেন—দিন পনেরো মুহূর্তে বিভক্ত; সন্ধ্যার ‘রাক্ষসী’ কালে শ্রাদ্ধ করা উচিত নয়। মধ্যাহ্নের পর অষ্টম মুহূর্ত ‘কুটপ’ নামে খ্যাত, শ্রাদ্ধের জন্য তা বিশেষ ফলপ্রদ। সত্য, দয়া, সংযম, শান্তি ইত্যাদি ‘অন্তঃতীর্থ’ও প্রশংসিত; আর গয়াকে শ্রাদ্ধের দ্বারা মুক্তিদায়িনী তীর্থ বলে বিশেষভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
Origin of the Lunar Dynasty: Soma’s Rise, the Tārā Abduction War, Budha–Purūravas Genealogy, and Kārtavīrya Arjuna
ভীষ্ম জিজ্ঞাসা করেন—চন্দ্রবংশ কীভাবে উদ্ভূত হল এবং তাতে কোন কোন প্রসিদ্ধ রাজা জন্মেছিলেন। পুলস্ত্য অত্রির তপস্যা থেকে সোম (চন্দ্র)-এর আবির্ভাব, তাঁর দীপ্তি, ঔষধিদের অধিপত্য, দেবসম্মত অভিষেক এবং দিব্য তত্ত্বাবধানে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন বর্ণনা করেন। এরপর সোম বৃহস্পতির পত্নী তারাকে অপহরণ করলে মহাবিপর্যয়কর যুদ্ধ শুরু হয়; শিবের সঙ্গে সংঘর্ষ তীব্র হয়, শেষে ব্রহ্মা মধ্যস্থতা করে সোমকে তারাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করেন। তারার গর্ভে বুধ জন্মান; বুধের পুত্র পুরূরবা। পুরূরবার রাজত্ব, উর্বশীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরবর্তী বংশধারা সংক্ষেপে বলা হয়। পরে যদু-পূরু প্রভৃতি শাখাসহ চন্দ্রবংশের বিস্তার দেখিয়ে শেষে সহস্রবাহু হৈহয় কার্তবীর্য অর্জুনের গৌরব কীর্তিত হয়—বরদান, দিগ্বিজয়, সংঘাত, শাপ এবং তাঁর জন্মকথা পাঠ-শ্রবণের ফলশ্রুতি।
Kroṣṭu–Yādava Lineages, the Syamantaka Jewel, Krishna’s Birth Context, and the Māyāmoha Account
এই অধ্যায়ে পুরস্ত্যের উপদেশ-প্রসঙ্গে বংশানুক্রমে ক্রোষ্টু থেকে উদ্ভূত সাত্বত–বৃষ্ণি–অন্ধক–যাদব বংশধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। যজ্ঞ, দান ও ব্রাহ্মণ-সেবার দ্বারা রাজধর্ম ও রাজবংশের বৈধতা দৃঢ় হয়—এই ভাবটি বারবার প্রতিপাদিত। এরপর স্যমন্তক মণির কাহিনি সংযুক্ত—প্রসেনের ঘটনা, সত্রাজিতের লোভ, জাম্ববান-এর সঙ্গে সংঘর্ষ এবং গোবিন্দ/কৃষ্ণের দ্বারা মণি উদ্ধার। এখানে শ্রীকৃষ্ণের নির্দোষতা, ধৈর্য ও ধর্মসংযমের মাধ্যমে লোকনিন্দা নিবারণের কথা বিশেষভাবে প্রকাশিত। পরে অবতারতত্ত্ব ব্যাখ্যাত—ভৃগুর শাপ ও দেব-অসুর সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে বিষ্ণু কেন মানবলোকে জন্ম নেন। শেষে মায়ামোহ উপাখ্যান জানায়, দৈত্যদের বিভ্রান্ত ও নিরস্ত করতে হরি এক দैব কৌশলে মোহজনক মতবাদ উদ্ভব করান; ফলে মতভ্রষ্টতাও ঈশ্বরীয় বিধানের অধীন।
Rudra’s Removal of Brahmahatyā; Kapālamocana and Avimukta Māhātmya; Origins of Nara and Karṇa (link to Arjuna/Karna query)
ভীষ্মের প্রশ্নে পুলস্ত্য অর্জুনের ‘তিন পিতা’সম্বন্ধীয় জন্মকথা এবং কর্ণের কানীন/সূত পরিচয়ের সূত্র ব্যাখ্যা করেন। সৃষ্টিকালে ব্রহ্মার ক্রোধ থেকে ঘর্মজাত কুণ্ডলী নামে এক যোদ্ধা জন্মায়; সে রুদ্রকে আক্রমণপ্রবণ হলে বিষ্ণুর হুঙ্কারে মোহগ্রস্ত হয়ে শান্ত হয়। পরে কপাল-পাত্রে ভিক্ষার প্রসঙ্গে নর-এর আবির্ভাব ঘটে, যিনি নারায়ণের সঙ্গে যুগলরূপে প্রসিদ্ধ; ঘর্মজাত ও রক্তজাত সত্তাদের দীর্ঘ যুদ্ধ দ্বাপর–কলি সন্ধিক্ষণে ঘটবে বলে স্থগিত থাকে। এরপর ব্রহ্মার পঞ্চমুখ তেজের প্রসঙ্গে রুদ্র পঞ্চম শিরচ্ছেদ করলে ব্রহ্মহত্যা উৎপন্ন হয় এবং শিব কপালিক-ব্রতে আবদ্ধ হন। বিষ্ণু ভস্মধারণ, অস্থিচিহ্ন প্রভৃতি প্রায়শ্চিত্ত নির্দেশ দেন; রুদ্র ভিক্ষাটন করতে করতে অবিমুক্ত/বারাণসীতে গমন করেন। সেখানে কপালমোচন তীর্থে স্নানে কপাল মুক্ত হয় এবং স্নান, দান, হোম ও শ্রাদ্ধের দ্বারা মোক্ষ-সম্পর্কিত পুণ্যলাভের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে।
Puṣkara Mahatmya: Brahmā’s Lotus-Tīrtha, Sacrifice, Initiation, and Kṣetra-Dharma
ভীষ্ম ব্রহ্মার কাশীগমন, বিষ্ণু ও শঙ্করের কৃত্য এবং যজ্ঞের তাৎপর্য জানতে চান। পুলস্ত্য বলেন—বিষ্ণুর নাভিজাত পদ্মের সঙ্গে যুক্ত আদ্য তীর্থরূপে পুষ্কর প্রতিষ্ঠিত হয়। যজ্ঞসঙ্কল্পে ব্রহ্মা স্বধাম থেকে অবতীর্ণ হয়ে এক অপূর্ব অরণ্যে প্রবেশ করেন, বৃক্ষ ও বনদেবতাদের বর দেন এবং সেই দেশকে সর্বোত্তম ক্ষেত্র হিসেবে পবিত্র করে স্থাপন করেন। পদ্মের ভূ-পাতে প্রচণ্ড অভিঘাতে জগৎ কেঁপে ওঠে; দেবগণ বিষ্ণুকে কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি ব্রহ্মার কর্মের রহস্য ব্যাখ্যা করে পুষ্করে পূজার নির্দেশ দেন। অধ্যায়টি পরে আচার ও মুক্তিতত্ত্ব প্রসারিত করে—ব্রাহ্মী দীক্ষা, ব্রহ্মস্নান, যজ্ঞবিধি, ব্রহ্মস্তব, অসুর বজ্রনাভবধ, এবং পুষ্করের উপতীর্থসমূহ (জ্যেষ্ঠ/বৈষ্ণব/কনিষ্ঠ) নিরূপণ। ক্ষেত্রধর্মে ভক্তির শ্রেণিবিভাগ (মানসিক- বাচিক- কায়িক; লৌকিক- বৈদিক- আধ্যাত্মিক), সাংখ্য-যোগসমন্বিত ভক্তি ও আশ্রমাচার বর্ণিত—যার ফলে ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি এবং শেষে মোক্ষলাভ ঘটে।
Brahmā’s Puṣkara Sacrifice: Kokāmukha Tīrtha, Varāha’s Aid, and the Arrival of Gāyatrī
এই অধ্যায়ে ভীষ্ম পুষ্কর-তীর্থের উৎপত্তি ও ব্রহ্মার যজ্ঞের সম্পূর্ণ বিবরণ জানতে চান—ঋত্বিক কারা, ভাগবণ্টন, যজ্ঞদ্রব্য, বেদী ও দক্ষিণা ইত্যাদি। পুলস্ত্য মুনি প্রশ্নভার গ্রহণ করে বলেন, যজ্ঞই সৃষ্টির ভিত্তি; যজ্ঞ থেকেই অগ্নি, বেদ, ঔষধি, জীবসমূহ এবং কালের পরিমাপ-প্রণালী উদ্ভূত। বিষ্ণু কোকামুখ তীর্থ-সংযুক্ত বরাহরূপে প্রকাশিত হয়ে যজ্ঞরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন; দেবতা, ঋষি ও নানা সত্তা সমবেত হয় এবং জগতে প্রশান্তি নেমে আসে। যজ্ঞের প্রধান ঋত্বিক নিযুক্ত হন—ভৃগু হোতা, পুলস্ত্য অধ্বর্যু, মরীচি উদ্গাতা এবং নারদ ব্রহ্মা (যজ্ঞাধ্যক্ষ)। সাবিত্রী বিলম্ব করলে ব্রহ্মা ইন্দ্রকে অন্য পত্নী আনতে আদেশ দেন। ইন্দ্র এক অভীর/গোপী কন্যাকে নিয়ে আসেন; পরবর্তীতে তিনি গায়ত্রী নামে পরিচিতা হন। ব্রহ্মা গন্ধর্ববিবাহে তাঁকে বিবাহ করে সহস্র-যুগব্যাপী যজ্ঞ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেন।
Puṣkara Sacrifice: Gāyatrī’s Marriage, Sāvitrī’s Wrath, Rudra’s Test, and the Tīrtha-Māhātmya
ভীষ্ম জিজ্ঞাসা করেন—ব্রহ্মার পুষ্কর-যজ্ঞে যে আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে রুদ্রের ভূমিকা, বিষ্ণুর অবস্থান এবং গায়ত্রী ও আভীরদের কার্যকলাপ কী ছিল। পুলস্ত্য বর্ণনা করেন—যজ্ঞ সম্পূর্ণ করার জন্য আভীরী কন্যা গায়ত্রীকে ব্রহ্মার পত্নীরূপে গ্রহণ করা হয়; বিষ্ণু শোকগ্রস্ত আভীরসমাজকে সান্ত্বনা দেন এবং ভবিষ্যৎ অবতার-লীলার ইঙ্গিত করেন। এরপর কপালধারী রুদ্র উপস্থিত হলে অনেকে তাঁকে তিরস্কার করে; কিন্তু তিনি বৈদিক অর্ঘ্যে কপালের অপরিহার্যতা প্রমাণ করে যজ্ঞের ন্যায্য ভাগ গ্রহণ করেন। তখন সাবিত্রী এসে ব্রহ্মা ও যাজক দ্বিজদের নিন্দা করেন; ব্রহ্মার সীমিত পূজার কারণস্বরূপ শাপ দেন, ইন্দ্রকেও দোষারোপ করেন এবং বিষ্ণুর ভবিষ্যৎ অবতারে দুঃখভোগের পূর্বাভাস দেন। পরে অধ্যায়টি তীর্থ-মাহাত্ম্যে প্রবেশ করে—পুষ্করের শ্রেষ্ঠত্ব, নানা তীর্থে দেবীর উপাধি-নামসমূহের কীর্তন, স্নান-দান-জপ (বিশেষত গায়ত্রী-জপ) ও কার্ত্তিক রথযাত্রার মহাফল বর্ণিত হয়। শেষে রুদ্রের গায়ত্রী-স্তোত্র এবং দেবীর প্রসন্ন সম্মতিতে কাহিনি সমাপ্ত হয়।
Brahmā’s Puṣkara Sacrifice and the Manifestation of Sarasvatī (with Tīrtha-Merit Teachings)
এই অধ্যায়ে ভীষ্ম গায়ত্রীর অভিষেক/দীক্ষা বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তখন পুলস্ত্য কৃতযুগে ব্রহ্মার আদ্য পুষ্কর-যজ্ঞের বর্ণনা দেন; সেখানে ঋষি, আদিত্য, রুদ্র, বসু, মরুত, নাগ, গন্ধর্ব ও অপ্সরাগণ প্রভৃতি দেবসমাজ সমবেত হয়ে পুষ্করকে মহাযজ্ঞের দিব্য মণ্ডপরূপে প্রতিষ্ঠা করে। এরপর তীর্থতত্ত্ব ব্যাখ্যাত হয়—পুষ্করে সরস্বতীর পঞ্চধারা-প্রকাশ (সুপ্রভা প্রভৃতি নাম), স্নান-দান-শ্রাদ্ধের মহাফল, বিশেষত জ্যৈষ্ঠ-পুষ্কর/জ্যৈষ্ঠকুণ্ডে কর্মফলের বিশেষ মাহাত্ম্য, এবং প্রদক্ষিণা, তর্পণ ও নিবেদনের বিধান। মধ্যখানে মঙ্কণক ঋষির প্রসঙ্গ, যেখানে রুদ্র তপস্যা রক্ষা করে বর প্রদান করেন। পরে ব্রহ্মার কন্যা সরস্বতী বডবাগ্নিকে পশ্চিম সমুদ্রে স্থাপন করতে বহন করতে সম্মত হন; পথে গঙ্গার সঙ্গে তাঁর সংলাপ এবং বিষ্ণুর আশ্বাসও উল্লিখিত। শেষে “নন্দা” নামক উপাখ্যানের বীজ রোপিত হয়—ব্রত, সত্য ও মাতৃভক্তির নীতিশিক্ষার দিকে ইঙ্গিত করে।
The Greatness of Puṣkara: Tripuṣkara Pilgrimage, Sacred Geography, and the Doctrine of Self-Restraint
ভীষ্মের প্রশ্নে পুষ্কর-কেন্দ্রিক তীর্থবিচার শুরু হয়—ঋষিরা তীর্থের শ্রেণিবিভাগ কীভাবে করলেন, প্রধান স্থানগুলি কে প্রতিষ্ঠা করলেন, এবং ত্রিপুষ্কর-যাত্রা কোন বিধিতে সম্পন্ন হবে। পুলস্ত্য প্রথমে তীর্থযাত্রার অন্তর্গত যোগ্যতা বলেন—দমন (আত্মসংযম), সত্য, সমভাব, এবং দান গ্রহণে অনাসক্তি; এই গুণ না থাকলে তীর্থফল স্থায়ী হয় না। তারপর পুষ্করের পবিত্র ভূগোল বর্ণিত—বিষ্ণুর পদচিহ্ন, নাগদের প্রতিষ্ঠিত পঞ্চতীর্থ, তীর্থের সীমা/পরিমাপ, চৈত্রে স্নানবিধি এবং কার্তিকে বিশেষ মাহাত্ম্য। শ্রাদ্ধ, তর্পণ, ব্রাহ্মণভোজন ও তাম্রপাত্রে জলদান প্রভৃতির পুণ্য বলতে বলতে অধ্যায়ে দধীচির অস্থিদান থেকে বজ্রনির্মাণ ও ইন্দ্রের বৃত্রবধ, কালেয় দানবদের রাত্রিকালীন ঋষিহত্যা, বিষ্ণুর উপদেশে অগস্ত্যের সমুদ্রপান ও দেবতাদের দ্বারা দানবনাশ, এবং ব্রহ্মার দ্বারা পুষ্করের শ্রেষ্ঠত্ব ও অগস্ত্যাশ্রমের মহিমা-প্রতিষ্ঠা—এই কাহিনিগুলি একসূত্রে গাঁথা। শেষে দমনধর্মের বিস্তৃত শিক্ষা দেওয়া হয়—লোভ, অনুচিত রাজদান গ্রহণ এবং ক্রোধ নিন্দিত; তীর্থের প্রকৃত ফল বাহ্য আচারে নয়, নৈতিক সংযম ও আত্মজয়ে—এই সিদ্ধান্ত স্থাপন করা হয়।
Vrata–Dāna Compendium at Puṣkara: Puṣpavāhana’s Account and the Ṣaṣṭhī-vrata Purification Rite
এই অধ্যায়ে ভীষ্মের প্রশ্নের উত্তরে পুলস্ত্য পুষ্কর-তীর্থে ব্রত ও দানের মাহাত্ম্য সংকলিতভাবে বর্ণনা করেন। তিনি রাজা পুষ্পবাহনের কাহিনি বলেন—ব্রহ্মা প্রদত্ত স্বর্ণ-পদ্মযুক্ত রথ/কমল-যান লাভের কারণ হিসেবে তপস্যা, নৈতিক রূপান্তর এবং পুষ্কর ও লবণাচলে বিষ্ণু-আরাধনার প্রভাব প্রচেতস মুনির সঙ্গে সংলাপে প্রকাশিত হয়। মধ্যখানে দ্বাদশী-ব্রত ও দানকে কেন্দ্র করে শিকারি দম্পতি ও অনঙ্গবতী গণিকার নীতিকথাও যুক্ত হয়। এরপর বহু ব্রতের নাম, বিধি (একভক্ত, নক্ত, দ্বাদশী-চক্র, চাতুর্মাস্য সংযম ইত্যাদি) এবং দানবিধান (গোদান, স্বর্ণ-পদ্মদান, ত্রিশূল-শঙ্খদান, তিল-ধেনুদান, গৃহ/শয্যাদান প্রভৃতি) ধারাবাহিকভাবে বলা হয়; ফল হিসেবে বিষ্ণুলোক, রুদ্র/শিবলোক, ইন্দ্রলোক, বরুণলোক, সরস্বতীলোক ও ব্রহ্মলোক প্রাপ্তির কথা উল্লেখ থাকে, এবং তীর্থ-গণনায় বায়ুর প্রমাণ উদ্ধৃত হয়। শেষে ষষ্ঠী-ব্রতের শুদ্ধিক্রম—স্নান, গঙ্গা-আহ্বান, মৃৎতিকামন্ত্র, দেব-ঋষি-পিতৃ তর্পণ, সূর্যকে অর্ঘ্য, গৃহ্য পূজা ও ব্রাহ্মণভোজন—বর্ণিত হয়।
Viśokā Dvādaśī Vow, Guḍa-Dhenū (Jaggery-Cow) Gift, and Śaila-Dāna (Mountain-Charity) Rites
এই অধ্যায়ে প্রথমে ধর্মপরায়ণ দীপ্তিমান রাজা ও তাঁর রানি ভানুমতীর প্রশংসা করা হয়েছে। পরে বশিষ্ঠ রাজাকে পূর্বজন্মের কাহিনি শোনান—লীলাবতী নামক গণিকার শিবভক্তির প্রসঙ্গে নিষ্কাম ভক্তি ও পারিশ্রমিক গ্রহণে অস্বীকৃতির পুণ্য এই জন্মে রাজ্য, ঐশ্বর্য ও যশরূপে ফলিত হয়েছে। এরপর বিধিবদ্ধ ধর্মাচার বর্ণিত হয়—আশ্বযুজ মাসের বিষোকা দ্বাদশী ব্রত: উপবাস, লক্ষ্মী–বিষ্ণু পূজা, রাত্রিজাগরণ, বেদী/মণ্ডপ নির্মাণ এবং শেষে শয্যাদান ও গুড়-ধেনু (গুড়ের গাভী) দান। তারপর পাপক্ষয়কারী দশ প্রকার ‘ধেনু’ দানের নিয়ম এবং শৈল-দান (প্রতীকী ‘পর্বত’ দান) বিস্তারে বলা হয়েছে—ধান্য, লবণ, গুড়, স্বর্ণ, তিল, তুলা, ঘি, রত্ন, রৌপ্য, শর্করা ইত্যাদির পর্বত; তাদের মাপ, রূপকল্পনা, লোকপাল স্থাপন, মন্ত্র ও ফলশ্রুতি। শেষে সূর্য-সপ্তমীর নানা ব্রত—কল্যাণা, বিষোকা, ফল, শর্করা, কমলা, মন্দারা, শুভা—উল্লেখ করে শোকহীনতা, স্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও মুক্তির কথা বলা হয়েছে।
Agastya Arghya Rite and the Gaurī & Sārasvata Vows (with Origin Narratives and Merit Statements)
এই অধ্যায়ে প্রথমে সাতটি দিব্য লোকের নাম উল্লেখ করে রাজ্য-ঐশ্বর্য, সৌন্দর্য, দীর্ঘায়ু ও আরোগ্যের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। পুলস্ত্য ঋষি এক পুরাণকথা বলেন—দানবরা সমুদ্রে আশ্রয় নেয়; ইন্দ্র অগ্নি ও বায়ুকে সমুদ্র শুকোতে আদেশ দেন, কিন্তু অসংখ্য প্রাণীর বিনাশের আশঙ্কায় তারা অস্বীকার করে। ফলে শাপে তাদের দেহধারণ ঘটে এবং মিত্র–বরুণের কুম্ভজন্ম-পরম্পরায় বশিষ্ঠ ও অগস্ত্যের জন্মকথা প্রসঙ্গক্রমে আসে; পরে অগস্ত্য সমুদ্র পান করে দেবসঙ্কট নিবারণ করেন। এরপর অধ্যায়টি আচার-অনুষ্ঠানমুখী হয়। প্রভাতে শ্বেত দ্রব্যসহ অগস্ত্য-অর্ঘ্য প্রদান, দান ও নিয়ম পালনের বিধান বলা হয়েছে; ফলশ্রুতি হিসেবে ক্রমে সাত লোক ও বিষ্ণুধাম প্রাপ্তির কথা আছে। পরে দেবীকেন্দ্রিক অনন্ত-তৃতীয়া ব্রত—ন্যাসসদৃশ নমস্কার, পদ্মমণ্ডলে দেবীদের প্রতিষ্ঠা, মাসভিত্তিক পুষ্পবিধি এবং গুরুভক্তির কঠোর নির্দেশ—বর্ণিত। এরপর মাঘ-তৃতীয়ার রসকল্যাণিনী ব্রত, মাসিক সংযম ও দান, এবং শেষে সারস্বত ব্রতে মধুর বাক্য, বুদ্ধি, জনপ্রিয়তা, দীর্ঘায়ু লাভ ও ব্রহ্মলোক-প্রাপ্তির মহিমা বলা হয়েছে।
The Bhīma-Dvādaśī (Kalyāṇinī) Vow and the Anangadāna-Vrata (with a Courtesan-Conduct Discourse)
এই অধ্যায়ে ভীষ্ম রুদ্রপ্রদত্ত বৈষ্ণবধর্ম ও তার ফল জানতে চান। পুলস্ত্য পূর্বকল্পের কাহিনি বলেন—ব্রহ্মা শিবকে জিজ্ঞাসা করেন, অল্প তপস্যায় কীভাবে আরোগ্য, ঐশ্বর্য ও মোক্ষ লাভ হয়; শিব বরাহ-कल्प, বৈবস্বত মন্বন্তর এবং দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের যুগের প্রেক্ষিতে সেই উপদেশ স্থাপন করেন। এরপর বহু তিথিতে উপবাস করতে অক্ষমদের জন্য সহজ ‘ভীম-দ্বাদশী/কল্যাণিনী’ ব্রত বর্ণিত হয়—মাঘ শুক্ল দশমীতে প্রস্তুতি ও সংকল্প, একাদশীতে উপবাস ও রাত্রিজাগরণ, দ্বাদশীতে বিষ্ণুপূজা, হোম, অবিরাম জলধারা-সেবা এবং মহাদান; বিশেষত তেরোটি গাভী ও শয্যা-দান। পরবর্তী উপাখ্যানে শ্রীকৃষ্ণের অপহৃত নারীদের দুঃখ ও ধর্মজিজ্ঞাসা উঠে আসে। দাল্ভ্য ঋষি গণিকার আচরণবিধি ব্যাখ্যা করে নারীদের জন্য ‘অনঙ্গদান-ব্রত’ জানান, যেখানে কামকে নিয়মিত ভক্তি ও পুণ্যে রূপান্তরিত করা হয়।
The Aśūnyaśayanā Vow (Unempty Bed) and the Aṅgāraka Caturthī Observance
ব্রহ্মা শঙ্করকে জিজ্ঞাসা করেন—কোন সাধনায় শোক, রোগ, ভয় ও দুঃখ নাশ হয় এবং ইষ্টফল লাভ হয়। তখন শিব ‘অশূন্যশয়না-ব্রত’-এর উপদেশ দেন, যা শ্রাবণ কৃষ্ণ দ্বিতীয়ায় পালনীয়—সে দিনে লক্ষ্মীসহ কেশব ক্ষীরসাগরে অবস্থান করেন বলে বলা হয়েছে। বিধিপূর্বক বিষ্ণুপূজা, গৃহরক্ষার প্রার্থনা (দাম্পত্যের অখণ্ডতা, অগ্নি ও দেবতার রক্ষা), সংগীত বা তার পরিবর্তে ঘণ্টাধ্বনি, এবং আহার-সংযমের নিয়ম বর্ণিত হয়েছে। এই ব্রতের প্রধান দান—সুসজ্জিত শয্যা যোগ্য বৈষ্ণব গৃহস্থ ব্রাহ্মণ দম্পতিকে প্রদান করা; এতে সৌভাগ্য, শান্তি ও আরোগ্য লাভ হয়। পরে অন্তর্কথায় ভৃগুবংশীয় ভার্গব (শুক্র) বিরোচনকে অঙ্গারক-চতুর্থী ব্রতের কথা বলেন: মঙ্গলবারের চতুর্থীতে ভৌম/মঙ্গল দেবের পূজা, নির্দিষ্ট উপকরণসহ, এবং রূপ, স্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘকাল স্বর্গীয় সম্মানের ফল প্রতিশ্রুত।
The Āditya-Śayana (Ravi-Śayana) Vow: Night-Meal Discipline, Nakṣatra Limb-Worship, and the Unity of Sūrya and Śiva
ভীষ্ম জিজ্ঞাসা করেন—রোগ বা অক্ষমতার কারণে যারা উপবাস করতে পারে না, তাদের জন্য কোন ব্রত উপযুক্ত? পুলস্ত্য বলেন, ‘আদিত্য-শয়ন/রবি-শয়ন’ মহাব্রতে শাস্ত্রসম্মত বিকল্প হিসেবে রাত্রিভোজনের নিয়ম আছে এবং এর সঙ্গে শঙ্করের যথাবিধি পূজা আবশ্যক। অধ্যায়ে ‘সার্বকামিকী’ নামে শুভ কালসংযোগ বলা হয়েছে—রবিবার, সপ্তমী, হস্ত নক্ষত্র ও সূর্য-সংক্রান্তি একত্র হলে। এখানে তত্ত্ব বোঝানো হয়েছে—উমা-মহেশ্বরকে সূর্যনামে পূজা করলে একই সঙ্গে সূর্য ও শিবলিঙ্গের পূজাই সম্পন্ন হয়, কারণ উমাপতি ও রবি—দু’জনের মধ্যে ভেদ মানা হয় না। নক্ষত্রকে দেহাঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করে অঙ্গপূজার বিধান, পরে আহার-নিয়ম, দান ও বিশেষ দান—সুবর্ণ পদ্ম, শয্যা, রত্নসজ্জিত গোধন—বর্ণিত হয়েছে। শেষে প্রার্থনা, গোপনীয়তা ও অধিকার-নিয়ম, এবং প্রতারণা-বর্জনের নৈতিক উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
The Rohiṇī–Candra Śayana Vow (Lunar Bed-Vow with Rohiṇī)
ভীষ্ম এমন এক ব্রত জানতে চান যা বারবার দীর্ঘায়ু, স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, সৎকুলে জন্ম ও বংশবৃদ্ধি দান করে। পুলস্ত্য ঋষি প্রশ্নের প্রশংসা করে পুরাণের গূঢ় ব্রত ‘রোহিণী–চন্দ্রশয়ন’ প্রকাশ করেন। বিধান অনুযায়ী সোমবার, শুক্লপক্ষের পূর্ণিমায় এবং রোহিণী নক্ষত্র প্রভৃতি শুভ যোগে শুদ্ধি করে সর্ষে-মিশ্রিত পঞ্চগব্যে স্নান, মন্ত্রজপ, এবং চন্দ্র-উপাধিতে সোমরূপ নারায়ণের পূজা করতে হয়। স্তোত্র/ন্যাস-রীতিতে দেবদেহের অঙ্গসমূহ নির্দিষ্ট নামে বন্দনা করে পূজা, এবং রোহিণীকে লক্ষ্মীরূপা ও চন্দ্রের পত্নী জেনে আরাধনা নির্দেশিত। আহারে হবিশ্য, মাংসত্যাগ, পবিত্র কাহিনি শ্রবণ, মাসে মাসে ফুলের নিয়ম, এবং এক বছর ব্রতপালন বলা হয়েছে। শেষে শয্যাদান, চন্দ্র ও রোহিণীর স্বর্ণমূর্তি, মুক্তাদান, দুধের কলস স্থাপন ও গোধন দানের বিধান আছে। ফলশ্রুতিতে চন্দ্রলোকে মহৎ ঐশ্বর্য, সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন দুর্লভ, নারী ও ভক্ত শূদ্রেরও অধিকার, এবং পাঠ-শ্রবণে বিষ্ণুধামে সম্মানলাভ বলা হয়েছে।
The Procedure for the Consecration of a Pond
ভীষ্ম সরোবর‑তড়াগ প্রভৃতি জলাধারের প্রতিষ্ঠার সম্পূর্ণ বিধান জানতে চান—পুরোহিতদের যোগ্যতা, বেদী‑মণ্ডপের নকশা, দক্ষিণা, শুভকাল ও নেতৃত্বসহ। পুলস্ত্য বলেন, শুক্লপক্ষ ও উত্তরায়ণে শুভ মুহূর্তে স্থান শুদ্ধ করে চতুষ্কোণ বেদী ও চতুর্মুখ মণ্ডপ নির্মাণ করতে হবে; চারদিকে কুণ্ড ও কাঠের স্তম্ভ স্থাপন করতে হবে। বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের হোতা প্রভৃতি ঋত্বিক, দ্বাররক্ষক ও পাঠক হিসেবে নিয়োগ করে কলস ও উপকরণ স্থাপন করা হয়, এবং ক্ষুদ্র যূপও স্থাপিত হয়। যজমান শুদ্ধি করে রাত্রিকালীন পূর্বকর্ম, মণ্ডল অঙ্কন, বরুণ‑প্রধান ন্যাস, দেবতা‑স্থাপন ও অধিবাসন সম্পন্ন করেন; তারপর ঋগ্‑যজুঃ‑সাম‑অথর্ব বিশেষজ্ঞরা নির্দিষ্ট সূক্ত ও মন্ত্রোচ্চারণসহ বহুদিন হোম করেন। শেষে অলংকার, শয্যা, পাত্র, গাভী ও ভোজনাদি মহাদান বিধেয়। গ্রন্থে বলা হয়েছে—সকল ঋতুতে জল সংরক্ষণ মহাশ্রৌত যজ্ঞসম ফলদায়ক; স্বর্গ প্রদান করে এবং শেষে বিষ্ণুধামে গমন করায়।
Rite of Tree Consecration and the Merit of Planting Sacred Trees
ভীষ্ম বৃক্ষরোপণ ও প্রতিষ্ঠার সম্পূর্ণ ও শুদ্ধ বিধান জানতে চান। পুলস্ত্য ক্রমানুসারে বলেন—যজ্ঞোপকরণ প্রস্তুত করা, ব্রাহ্মণদের সম্মান, বৃক্ষ অলংকরণ, নৈবেদ্য-ধূপ-দীপের আয়োজন, শস্যপূর্ণ কলস স্থাপন, লোকপাল পূজা, অধিবাস, বৈদিক মন্ত্রে অভিষেক এবং বরুণ-সম্পর্কিত জলকর্মে শুদ্ধি; শেষে হোম, দক্ষিণা ও চতুর্থ দিনে উৎসব। এরপর ফলশ্রুতি—এই বিধান শ্রবণ-পাঠে মহাপুণ্য, স্বর্গলাভ ও মোক্ষাভিমুখ ফল হয়; পুত্রহীনদের জন্য বৃক্ষকে ‘পুত্রত্ব’-প্রতীক বলা হয়েছে। অশ্বত্থ, পলাশ, খাদির, নিম প্রভৃতি বৃক্ষরোপণে পৃথক ফল ও দেবতানিবাসের সম্পর্ক উল্লেখ করে বলা হয়—নাম না জেনেও যে বৃক্ষ রোপিত হয়, সেও পুণ্যদায়ক।
The Vow of the Bed of Good Fortune (Saubhāgya-śayana) and the Saubhāgyāṣṭaka
পুলস্ত্য ঋষি ভীষ্মকে ‘সৌভাগ্য-শয়ন’ নামে এক ব্রতের কথা বলেন, যা সকল কামনার ফল দান করে বলে খ্যাত। অধ্যায়ে এর পৌরাণিক উৎপত্তি বর্ণিত—প্রলয়াগ্নিতে জগৎ দগ্ধ হলে সৌভাগ্য-তত্ত্ব একত্র হয়ে বিষ্ণুর বক্ষস্থলে আশ্রয় নেয়; পরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা-প্রসঙ্গে তা প্রকাশিত হয়। দক্ষ তা পান করে রূপ-লাবণ্য লাভ করেন, আর অবশিষ্ট অংশ আটটি মঙ্গলদ্রব্যের সমষ্টি হয়ে ‘সৌভাগ্যাষ্টক’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। দক্ষ থেকে সতী/ললিতার জন্ম, এবং তাঁকে ভোগ ও মোক্ষদাত্রী দেবী রূপে স্তব করা হয়েছে। ভীষ্ম পূজাবিধি জানতে চাইলে পুলস্ত্য বসন্তকালের তৃতীয়ায় স্নানপূর্বক শিব–গৌরীর পূজা, নৈবেদ্য-অর্ঘ্য নিবেদন, অঙ্গন্যাসসদৃশ ক্রমে প্রণাম, এবং ‘সৌভাগ্যাষ্টক’ পাঠের বিধান দেন। এক বছর জুড়ে মাসভেদে আহার-নিয়ম ও আচারের পরিবর্তন, এবং শেষে দান—বিশেষত শয্যা, স্বর্ণমূর্তি, গাভী-বলদ—উল্লেখিত। এর ফলে দাম্পত্যসুখ, ঐশ্বর্য, যশ, স্বর্গলাভ এবং মুক্তিমুখী পুণ্যপ্রাপ্তি বলা হয়েছে।
The Manifestation of Viṣṇu’s Footprints: Vāmana–Trivikrama, Bāṣkali’s Subjugation, and the Rise of Viṣṇupadī (Gaṅgā)
এই অধ্যায়ে পুষ্করের ‘পদচিহ্ন-মার্গ’ কেন পূজ্য—তার কারণ বলা হয়েছে; এটি বিষ্ণুর ত্রিবিক্রম লীলার পৃথিবীতে অঙ্কিত পদচিহ্ন। কৃতযুগে দানবরাজ বাষ্কলি তিন লোক দখল করে বৈদিক যজ্ঞ-ধর্মে বিঘ্ন ঘটায়। তখন ইন্দ্রসহ দেবগণ ব্রহ্মার শরণ নেন। ব্রহ্মা সমাধিতে বিষ্ণুকে আহ্বান করলে বিষ্ণু বামনরূপে আবির্ভূত হয়ে কৌশল জানান—‘তিন পদ ভূমি’ দান চাওয়া হবে। বাষ্কলির নগর, তার দানশীলতা ও দাতৃ-রাজধর্মের গুণ বর্ণিত। শুক্রাচার্য দান না করতে উপদেশ দেন, পুরোহিত দান ও সৃষ্টিসীমার কথা স্মরণ করান; তবু বাষ্কলি সত্যব্রত রক্ষা করতে দান দিতে স্থির হন। বামন ত্রিবিক্রম হয়ে এক পদে পৃথিবী, দ্বিতীয় পদে স্বর্গ, তৃতীয় পদে মহৎ স্থান পরিমাপ করেন। তাঁর অঙ্গুষ্ঠ-নখের ক্ষত থেকে বৈষ্ণবী/বিষ্ণুপদী গঙ্গা প্রকাশ পায়। শেষে তীর্থফল বলা হয়েছে—বিষ্ণুর পদচিহ্ন দর্শন ও সেখানে স্নান করলে মহাপুণ্য, পাপক্ষয় এবং বিষ্ণুলোক লাভ হয়।
The Account and Merit of Śivadūtī (with the Nāga-tīrtha at Puṣkara)
ভীষ্ম পুলস্ত্যকে জিজ্ঞাসা করেন—পুষ্কর-সম্পর্কিত নানা কারণকথা কী: বাষ্কলির বন্ধন, বলির উপর বিষ্ণুর বামন–ত্রিবিক্রম পদক্ষেপ, নাগ-তীর্থের উৎপত্তি, পিশাচদের উদ্ভব এবং শিবদূতীর আবির্ভাব। পুলস্ত্য ধারাবাহিকভাবে এই উপাখ্যানগুলি বর্ণনা করেন। কথার কেন্দ্রে আসে নাগ-সঙ্কট: নাগেরা জীবসমূহকে ভীষণভাবে উৎপীড়ন করলে প্রজারা ব্রহ্মার শরণ নেয়। ব্রহ্মা নাগদের শাপ দেন—ভবিষ্যতে গরুড় তাদের ভক্ষণ করবে এবং জনমেজয়ের সর্পসত্র ঘটবে; তবু এক সন্ধি স্থাপন করে পাতাললোক তাদের আবাসরূপে নির্দিষ্ট করেন। আশ্রয়প্রার্থী নাগেরা পুষ্করে এসে পৌঁছালে সেখানে জল উদ্ভূত হয়ে নাগ-কুণ্ড/নাগ-তীর্থ সৃষ্টি হয়। শ্রাবণ পঞ্চমীতে স্নান ও শ্রাদ্ধের পুণ্য এবং কিছু আহার-নিয়মও বলা হয়েছে। পরে অসুরযুদ্ধ (রুরু) প্রসঙ্গে দেবীর রৌদ্রী শক্তি কালরাত্রি/চামুণ্ডা শিবদূতী রূপে প্রকাশিত হয়ে মাতৃগণের সঙ্গে দেবতাদের রক্ষা করেন। রুদ্রের সঙ্গে ‘অন্ন’ ও যথাযথ দানধর্ম নিয়ে বিতর্ক-সংলাপ, দানের শুদ্ধতা ও প্রার্থনার মর্যাদা নিরূপিত হয়। শেষে স্তোত্র, বরদান ও ফলশ্রুতি—এই কাহিনি শ্রবণ, পাঠ ও লিখনে রক্ষা, সমৃদ্ধি ও মুক্তির ফল প্রতিশ্রুত।
The Tale of the Five Pretas and the Glory of Puṣkara & the Eastern Sarasvatī
ভীষ্ম পুলস্ত্যকে জিজ্ঞাসা করেন—প্রেতভাব কীভাবে জন্মায় এবং কীভাবে তার মুক্তি হয়। পুলস্ত্য একটি দৃষ্টান্ত বলেন—নিয়মনিষ্ঠ এক ব্রাহ্মণ তীর্থযাত্রী পথে পাঁচ ভয়ংকর প্রেতের সাক্ষাৎ পান। তারা নিজেদের কর্মদোষ, পাপরূপ নাম-পরিচয়, এবং যেখানে গৃহশৌচ ও ধর্ম অবহেলিত সেখানে কী নোংরা আহার তাদের ভাগ্যে জোটে—সবই জানায়। ব্রাহ্মণ তাদের প্রতিকারধর্ম শেখান—কৃচ্ছ্র ও চন্দ্রায়ণ প্রভৃতি ব্রত, অগ্নিরক্ষণ, সমভাব, অতিথি ও গুরুর সেবা, শ্রাদ্ধের যথাকাল পালন, দান, এবং গোমাতা ও তীর্থের প্রতি ভক্তি। এরপর তিনি প্রেতত্বের কারণ স্পষ্ট করেন—স্বজনত্যাগ, মহাপাতক, অশুচি সম্পর্কের অন্নসেবন, বিশ্বাসঘাত, এবং নাস্তিকতায় দক্ষিণা গোপন। তারপর প্রসঙ্গ যায় পুষ্কর-মাহাত্ম্যে—কার্তিক মাসের বিশেষ যোগ, আহ্বানমন্ত্র, পূর্বমুখী সরস্বতীর (প্রাচী) প্রকাশ, এবং স্নান-দান ও পিণ্ড/তর্পণের মহাফল। দেবস্তুতির সঙ্গে শুদ্ধাবট/আদিতীর্থ প্রভৃতি আদিতীর্থের প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়।
Mārkaṇḍeya’s Birth and Boon; Puṣkara’s Glory; Rāma’s Śrāddha; Refuge-Hymn to Śiva
ভীষ্ম জিজ্ঞাসা করেন—পুষ্করে রাম কীভাবে মার্কণ্ডেয়ের উপদেশ পেলেন এবং তাঁদের সাক্ষাৎ কীভাবে ঘটল। পুলস্ত্য বলেন—মৃকণ্ডুর ঘরে মার্কণ্ডেয়ের জন্ম হয়, কিন্তু এক জ্ঞানী তাঁর অল্পায়ুর ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তখন উপনয়ন সম্পন্ন হয়; সপ্তর্ষিরা ব্রহ্মার কাছে প্রার্থনা করলে ব্রহ্মা মার্কণ্ডেয়কে নিজের সমান দীর্ঘায়ুর বর দেন। এরপর পুষ্কর-মাহাত্ম্য প্রসঙ্গ। রাম পুষ্করে গিয়ে অত্রি ও মার্কণ্ডেয়ের সঙ্গে মিলিত হন এবং কুতপ-কালে দশরথের শ্রাদ্ধ বিধিপূর্বক করেন—সময়, উপকরণ ও নিয়মের বিস্তারিতসহ। স্বপ্ন-দর্শন ও পিতৃ-সান্নিধ্য পিতৃতত্ত্বের মহিমা প্রকাশ করে। মর্যাদা পর্বতে রাম শিবের শরণাগতি-স্তোত্র দীর্ঘভাবে পাঠ করেন। রুদ্র প্রসন্ন হয়ে আশীর্বাদ ও বর দেন এবং দেবকার্য সম্পাদনের জন্য দিব্য আদেশ প্রদান করেন; তীর্থ, শ্রাদ্ধকর্ম ও অবতার-উদ্দেশ্য একত্রে সংযুক্ত হয়।
Brahmā’s Puṣkara Sacrifice: Ṛtvij System, Sāvitrī’s Reconciliation, Tīrtha-Catalogue, Śrāddha & Initiation Rites, and Vrata Fruits
ভীষ্ম ব্রহ্মার পুষ্করে সম্পাদিত পিতামহ-যজ্ঞের কাল, ঋত্বিজ-ব্যবস্থা ও দক্ষিণা সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। পুলস্ত্য পুষ্করকে যজ্ঞভূমি বলে ষোলো ঋত্বিজের বিন্যাস, তাদের পদ ও প্রধান ঋষি-দেবতার নিয়োগ বর্ণনা করেন; অবভৃথের শেষে দিক্-লোকসম মহাদক্ষিণার কথাও বলেন। এরপর সাবিত্রী অসন্তুষ্ট হলে যজ্ঞে বিঘ্ন দেখা দেয়। কেশব দূত হয়ে লক্ষ্মীর সহায়তায় এবং শঙ্কর-পার্বতীর মধ্যস্থতায় সাবিত্রীকে প্রসন্ন করেন; সাবিত্রী ফিরে এসে গায়ত্রীকে ক্ষমা/মিলন দিয়ে যজ্ঞ শান্ত করেন, আর রুদ্র বর ও তীর্থ-নামের পরিচয় দেন। পরে পুষ্কর-মাহাত্ম্য বিস্তৃত হয়—তীর্থস্নান-দর্শনের আরোগ্য, ঐশ্বর্য ও পাপক্ষয়ফল, স্তোত্র, ১০৮ পবিত্র স্থানে দেবরূপের তালিকা, মণ্ডল-কলশ স্থাপন, দীক্ষাসদৃশ বিধি, শ্রাদ্ধ-নিয়ম ও গ্রহশান্তি কর্ম। শেষে স্বেত রাজার দৃষ্টান্ত শুরু হয়—অন্নদান রোধ করায় স্বর্গেও তার ক্ষুধা জাগে।
The Supremacy of Food-Charity and the Rāma–Śambūka Episode (Child Revived through Rājadharma)
এই অধ্যায়ে পুরাণের প্রামাণ্য পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে অন্নদানকে সর্বশ্রেষ্ঠ দান বলা হয়েছে—অন্নই প্রাণধারণের মূল, এবং তার দ্বারাই ইন্দ্রের ঐশ্বর্যও স্থিত থাকে। এরপর পুলস্ত্য, অগস্ত্যের বর্ণনা অনুসারে, রাবণবধের পর রঘুবংশীয় শ্রীरामের প্রসঙ্গ বলেন। ঋষিগণ এসে অর্ঘ্য-সত্কার গ্রহণ করে বিদায় নেন এবং কোনো অবশিষ্ট কর্তব্যের ইঙ্গিত রেখে যান। পরে শ্রীराम এক ব্রাহ্মণকে দেখেন, যে মৃত পুত্রকে বহন করে বিলাপ করছে এবং রাজ্যে অধর্ম-অব্যবস্থার দায় রাজাকেই দিচ্ছে। নারদ যুগধর্ম ব্যাখ্যা করেন—রাজ্যে নিষিদ্ধ তপস্যা চললে তার পাপাংশ রাজাকেও বহন করতে হয়। राम অনুসন্ধান করে শম্বূক নামক শূদ্র তপস্বীকে কঠোর তপস্যায় রত দেখে দণ্ড দেন; দেবগণ স্তব করে বর প্রদান করেন। राम ব্রাহ্মণপুত্রের পুনর্জীবনের বর চান, এবং শিশু তৎক্ষণাৎ জীবিত হয়ে ওঠে।
Rāma’s Meeting with Agastya: Gift-Ethics (Dāna) and the Tale of King Śveta
দেবগণ দিব্য বিমানে প্রস্থান করলে কাকুত্স্থ রাম তাঁদের অনুসরণ করে অগস্ত্য মুনির আশ্রমে উপস্থিত হন। সীতা-প্রসঙ্গ ও শূদ্র-বধের কারণে শোকে ভারাক্রান্ত রাম ধর্মোপদেশ প্রার্থনা করেন। অগস্ত্য সাদরে তাঁকে গ্রহণ করে বিশ্বকর্মা-নির্মিত এক দিব্য অলংকার দান করেন; তখন প্রশ্ন ওঠে—ক্ষত্রিয় কি ব্রাহ্মণের দান গ্রহণ করতে পারে, এবং কোন দান ধর্মসম্মত? অগস্ত্য প্রাচীন উপাখ্যান বলেন—লোকপালদের অংশ থেকে রাজধর্মের প্রতিষ্ঠা, আর দান ও অতিথি-সেবাই তার ভিত্তি। বিদর্ভের রাজা শ্বেত ব্রহ্মলোক লাভ করেও নিজের যুগে অতিথি-সৎকারের অভাবের দোষে ক্ষুধায় কাতর হন; পিতামহ ব্রহ্মা অগস্ত্যের আগমন পর্যন্ত কঠোর প্রায়শ্চিত্ত নির্ধারণ করেন। অগস্ত্যের কৃপায় শ্বেত মুক্ত হয়ে সেই অলংকার প্রদান করেন; এভাবে রাজধর্ম, দাননীতি ও অতিথিধর্ম একত্রে মুক্তিদায়ক রূপ পায়।
The Origin of the Daṇḍaka Forest and Rāma’s Dharma-Judgment (Vulture vs. Owl)
এই অধ্যায়ে পুলস্ত্যের প্রশ্নে অগস্ত্য প্রাচীন উপাখ্যান বলেন। মনু ‘দণ্ড’—ধর্মসম্মত শাস্তি ও শাসননীতি—সম্বন্ধে উপদেশ দেন; তারই ধারায় রাজা দণ্ডের উত্থান। কিন্তু তিনি কামবশে ভার্গবী অরাজাকে অধর্মে পীড়িত করলে শুক্র (উশনস) ক্রুদ্ধ হন। তাঁর শাপে ধূলিবৃষ্টির ন্যায় মহাবিপর্যয় নেমে আসে; শত যোজন বিস্তৃত অঞ্চল জনশূন্য হয়ে ‘দণ্ডকারণ্য’ নামে দণ্ডফলরূপে প্রসিদ্ধ হয়। এরপর রামের প্রত্যক্ষ ধর্মাচরণ বর্ণিত। সন্ধ্যা-উপাসনার পর তিনি গৃধ্র ও পেঁচার বিবাদ বিচার করে সভায় সত্যভাষণ ও জ্যেষ্ঠদের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা দেন। তখন অশরীরী বাণী জানায়—গৃধ্র পূর্বজন্মে ব্রহ্মদত্ত ছিল, গৌতমের শাপে এই গতি; রামের দর্শনমাত্রেই তার মুক্তি ঘটে। ন্যায়কে করুণায় সংযত করা এবং ধর্মময় রাজধর্মের পবিত্র শক্তি এখানে প্রতিষ্ঠিত।
The Establishment of Vāmana at Kānyakubja and the Sanctification of Setu
ভীষ্ম জিজ্ঞাসা করলেন—শ্রীরাম কীভাবে কান্যকুব্জে বামনমূর্তি প্রতিষ্ঠা করলেন এবং সেই প্রতিমা কোথা থেকে এল। পুলস্ত্য বললেন—রামের ধর্মময় রাজ্যশাসন চলছিল, তবু লঙ্কায় বিভীষণের শাসনব্যবস্থা নিয়ে তাঁর চিন্তা ছিল। তাই রাম ভরত ও সুগ্রীবকে সঙ্গে নিয়ে পুষ্পকবিমানে যাত্রা করে রামায়ণের প্রধান প্রধান স্থান পুনরায় দর্শন করেন, বানরদের সঙ্গে মিলিত হন এবং লঙ্কায় প্রবেশ করেন; সেখানে বিভীষণ তাঁকে সসম্মানে অভ্যর্থনা করে। কেকসী ও সরমাও উপস্থিত হয়ে সীতার অবস্থান নিয়ে আলোচনা করে। বায়ু দেবতা বলিবন্ধনের সঙ্গে সম্পর্কিত এক বৈষ্ণব বামনমূর্তি প্রকাশ করে জানান—এটি কান্যকুব্জে প্রতিষ্ঠিত হবে; রাম সেই মূর্তি নিয়ে অগ্রসর হন। অপব্যবহার রোধে রাম সেতু ভেঙে দেন, রামেশ্বর/জনার্দন পূজার প্রবর্তন করেন, শিবের কাছ থেকে সেতু-বর লাভ করে দীর্ঘ রুদ্রস্তব পাঠ করেন। পুষ্করে ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে রামকে বিষ্ণুরূপ বলে স্বীকৃতি দেন ও পরবর্তী করণীয় নির্দেশ করেন; শেষে রাম গঙ্গাতীরে বামন প্রতিষ্ঠা করে নিত্যপূজা ও ধর্মসংস্থার রক্ষার উপদেশ দেন।
Yoga-Sleep, Cosmic Dissolution, and the Lotus of Creation (with Mārkaṇḍeya’s Vision)
ভীষ্ম বামনের পরেও বিষ্ণুর মহিমা জানতে চান এবং পদ্মনাভের রহস্য জিজ্ঞাসা করেন—নাভি থেকে পদ্ম কীভাবে উদ্ভূত হয়, পাদ্ম মহাকল্পে সৃষ্টি কীভাবে প্রবাহিত হয়, আর প্রলয়ের সময় ভগবান কেন যোগনিদ্রায় অবস্থান করেন। পুলস্ত্য যুগধর্মের অবক্ষয়, ব্রহ্মার দিবা-রাত্রির পরিমাপ, এবং ভগবানের দ্বারা তত্ত্বসমূহের ক্রমশ লয় ঘটিয়ে প্রলয়ের বিধান ব্যাখ্যা করেন। এরপর কাহিনি মার্কণ্ডেয়ের আশ্চর্য দর্শনে প্রবেশ করে—তিনি যেন ভগবানের দ্বারা গ্রাসিত হন এবং দিব্য দেহের অন্তরে অসংখ্য লোকলোকান্তর প্রত্যক্ষ করেন। মহাপ্রলয়-সমুদ্রে বটশাখায় শায়িত বাল-নারায়ণের দর্শন ঘটে। নারায়ণ নিজেকে কাল, ভূততত্ত্ব, দেবতা, বেদ, সাংখ্য-যোগ—সমস্তের সমষ্টি বলে পরিচয় দেন; মায়ার রহস্য ও যুগে যুগে রক্ষার কথা বলেন, এবং শেষে নাভিপদ্ম থেকে পুনরায় সৃষ্টির উদ্ভবের ক্রম প্রকাশ করেন।
Brahmā’s Lotus-Birth, Puṣkara-Creation Imagery, Madhu–Kaiṭabha, and Early Genealogies
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মার নাভি-কামল থেকে আবির্ভাব ও সৃষ্টির আদিরূপ বর্ণিত। পৃথিবীকে ‘রসা-দেবী’ বলা হয়েছে; পদ্মনালীর তন্তুগুলিকে দিব্য পর্বতরূপে কল্পনা করে তাদের মধ্যে জম্বুদ্বীপের অবস্থান দেখানো হয়, এবং পুষ্কর-সৃষ্টির চিত্রকল্প উন্মোচিত হয়। এরপর রজঃ–তমঃজাত মধু ও কৈটভ ব্রহ্মাকে আক্রমণ করে; কিন্তু বিষ্ণুকে চিনে স্তব করে। শ্রীভগবান ভবিষ্যৎ বর দান করে শেষে তাদের দমন করেন এবং বিশ্ব-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ব্রহ্মা তপস্যা করেন; নারায়ণ অন্য রূপে প্রকাশিত হন, কপিলের উপস্থিতিও উল্লেখিত। তারপর লোকসৃষ্টি ও মনসাপুত্র বংশধারা প্রসারিত হয়। দক্ষকন্যা, কশ্যপ, আদিত্য, দৈত্য–দানব প্রভৃতির দীর্ঘ বংশানুক্রম আসে; শেষে পুরাণ শ্রবণ-পাঠের ফলশ্রুতি এবং দেবতাদের বিষ্ণুশরণ ও বিজয়-আশ্বাস দিয়ে মহাযুদ্ধ-প্রসঙ্গের সূচনা ইঙ্গিতিত হয়।
The Tārakāmaya War: Divine Mustering, Māyā Countermeasures, Aurva Fire, and Viṣṇu’s Slaying of Kālanemi
এই অধ্যায়ে তারকাময় যুদ্ধের জন্য দেবতাদের সমাবেশ ও প্রস্তুতি বর্ণিত হয়েছে। ইন্দ্রের মহাযাত্রা, দিকপালদের নিজ নিজ দিশায় স্থাপন, এবং সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি ও বরুণ প্রভৃতি বিশ্বশক্তির রণপ্রবেশের কথা বলা হয়েছে। অসুরেরা ময়-এর দ্বারা মায়া বিস্তার করে; কিন্তু সোমের শীতল প্রভাব ও বরুণের পাশ দ্বারা দেবতারা সেই মায়া ভেদ করে মোহ নাশ করেন। এরপর ধর্মোপদেশমূলক অংশে ব্রহ্মচর্যের মাহাত্ম্য, মনোজ সৃষ্টির তত্ত্ব, এবং ঔর্ব/ঔর্বাগ্নির উৎপত্তি বর্ণিত হয়। এই ঔর্বাগ্নি সমুদ্রে বডবামুখ রূপে স্থাপিত, যা প্রলয়কালে জগত্দাহক অগ্নি হয়ে ওঠে। যুদ্ধ তীব্র হলে কালনেমি উঠে কিছু সময়ের জন্য বিশ্বকে দমন করে; তখন বিষ্ণু (গদাধর/ত্রিবিক্রম) স্বীয় মহিমা বিস্তার করে চক্র দ্বারা কালনেমিকে বধ করেন। শেষে দিকপালরা পুনরায় স্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত হন, যজ্ঞধর্মের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, এবং বিষ্ণু ব্রহ্মার সঙ্গে ব্রহ্মলোকে গমন করেন।
The Birth of Tāraka and the Prelude to the Deva–Asura War (Topic-based Title)
ভীষ্ম শিবের মহিমা ও গুহ (কার্ত্তিকেয়)-এর উৎপত্তির সংক্ষিপ্ত বিবরণ জানতে চান। পুলস্ত্য মুনি দিতির বংশের কাহিনি শুরু করেন—বজ্রসদৃশ অঙ্গবিশিষ্ট দৈত্যরাজ বজ্রাঙ্গ জন্ম নিয়ে ইন্দ্রকে পরাজিত করে বন্দী করে। তখন ব্রহ্মা ও কশ্যপ এসে তাকে শান্ত করেন; বজ্রাঙ্গ ইন্দ্রকে মুক্ত করে এবং তপস্যার নির্দেশ পায়। ব্রহ্মা তাকে বরাঙ্গীকে পত্নীরূপে দেন; দু’জনে দীর্ঘকাল কঠোর তপস্যা করেন। ইন্দ্র ভয়ংকর রূপ ধারণ করে বরাঙ্গীকে বিচলিত করতে চায়, কিন্তু তার ব্রত অটুট থাকে। ব্রহ্মা বর প্রদান করেন; পরে বরাঙ্গী পুত্র প্রার্থনা করলে তারক জন্মায়, যার জন্মে জগৎ কেঁপে ওঠে। তারক তপস্যা করে শর্তযুক্ত বর লাভ করে—সাত দিনের শিশুই কেবল তাকে বধ করতে পারবে। সে বিরাট অসুরবাহিনী নিয়ে দেবতাদের পরাস্ত করে এবং লোকপালদের আবদ্ধ করে। ইন্দ্র বৃহস্পতির কাছে চার নীতির উপদেশ নিলেও যুদ্ধ অনিবার্য হয়—এভাবেই দেব–অসুর যুদ্ধের ভূমিকা রচিত হয় এবং কার্ত্তিকেয়ের নির্ধারিত হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়।
Means to Slay Tāraka: Girijā’s Birth, Kāma’s Burning, and Umā’s Austerities
এই অধ্যায়ে দৈত্য-উপদ্রবে দেবতাদের পরাজয় ও অপমানের কথা বলা হয়েছে। দেবগণ ব্রহ্মার শরণে গিয়ে বিশ্বদেহ ও সূক্ষ্ম-স্থূল তত্ত্বসমূহের মহিমা বর্ণনা করে স্তব করেন। ব্রহ্মা জানান—তারক বধ নির্দিষ্ট বিধিতে হবে; শিবের বিবাহের পরেই নির্ধারিত বধকারী জন্ম নেবে, তাই গিরিজার জন্মসাধনের জন্য তিনি নিশা/বিভাবরীকে দেবকার্যে নিয়োজিত করেন। নারদ ইন্দ্রের সঙ্গে পরিকল্পনা করে হিমালয়ের কাছে গিয়ে বোঝান যে শিব ‘অজ’, তাই ‘অজের স্বামী এখনও জন্মেনি’—এই আপাত বিরোধ তত্ত্বত মীমাংসিত। ইন্দ্র কামদেবকে শিবের কামভাব জাগাতে পাঠান; কাম পুষ্পশর নিক্ষেপ করলে শিবের তৃতীয় নয়নের অগ্নিতে দগ্ধ হয়। রতি শোকে শিবের স্তব করে বর লাভ করে—কাম ‘অনঙ্গ’ রূপে অবস্থান করবে। পরে উমার কঠোর তপস্যা, সপ্তর্ষিদের দ্বারা তাঁর সংকল্প-পরীক্ষা এবং উমার অটল প্রত্যুত্তর বর্ণিত।
Umā’s Austerity, Kauśikī’s Manifestation, and Skanda’s Birth Leading to Tāraka’s Defeat
অধ্যায় ৪৪-এ শিব–পার্বতীর কথোপকথন থেকে কাহিনি শুরু। শিবের ‘কৃষ্ণা’ উক্তিতে উমা ক্রুদ্ধ হন; পরনিন্দার দোষ স্মরণ করে গৌরী-ভাব লাভের জন্য কঠোর তপস্যার সংকল্প নেন। এদিকে দ্বাররক্ষক বীরকের প্রসঙ্গে এক দৈত্য উমার রূপ ধারণ করে শিবের কাছে প্রবেশ করতে চায়, কিন্তু দেহচিহ্নের অভাবে ধরা পড়ে এবং শিবের দ্বারা নিহত হয়। ব্রহ্মার অনুগ্রহ ও উমার তপস্যায় তাঁর শ্যাম আবরণ খসে পড়ে; সেই আবরণ থেকেই কৌশিকী/চণ্ডিকা সিংহবাহিনী রূপে দেবকার্যে নিযুক্ত হন। পরে অগ্নি ও কৃত্তিকাদের মাধ্যমে স্কন্দ/কুমারের আবির্ভাব, অভিষেক এবং দেবতাদের সঙ্গে তারকাসুরের যুদ্ধ বর্ণিত। শেষে কুমার তারককে বধ করেন; ফলশ্রুতিতে পাঠক-শ্রোতার যশ, ঐশ্বর্য ও নির্ভয়তা লাভের কথা বলা হয়েছে।
Narasiṃha’s Greatness and the Slaying of Hiraṇyakaśipu (Boon, Portents, and Cosmic Restoration)
ভীষ্ম হিরণ্যকশিপুর বধ, নরসিংহের মহিমা ও পাপ-নাশের কথা জানতে চান। পুলস্ত্য বলেন—দৈত্যরাজ কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মাকে প্রসন্ন করে; ব্রহ্মা উপস্থিত হলে হিরণ্যকশিপু নানা সূক্ষ্ম শর্তে এমন বর প্রার্থনা করে যাতে সে প্রায় অজেয় ও বিশ্ব-স্বরূপ বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। দেবতারা বরভঙ্গ না করেও তার পরিণাম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় চাইলে ব্রহ্মা আশ্বাস দেন—যথাসময়ে বিষ্ণু ধর্মসম্মতভাবে তাকে বিনাশ করবেন। বর পেয়ে হিরণ্যকশিপু ঋষিদের নিপীড়ন করে এবং ত্রিলোক জয় করে। দেবতারা বিষ্ণুর শরণ নিলে ভগবান তাদের অভয় দেন এবং বর-পরিহারী বিস্ময়কর নরসিংহ রূপ ধারণ করেন। কাহিনিতে হিরণ্যকশিপুর রত্নখচিত সভা, অনুচরবর্গ ও ভয়ংকর অমঙ্গল-লক্ষণ বর্ণিত হয়; যুদ্ধে অস্ত্র ও মায়া ব্যর্থ হয়। নরসিংহ দৈত্যসেনা ধ্বংস করে অত্যাচারী হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন এবং বিশ্বে স্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। দেবতারা স্তব করে বলেন—তিনি ব্রহ্মা, রুদ্র, ইন্দ্র, যজ্ঞ এবং পরম পুরাণ-স্বরূপ; সর্বদেবময় পরমেশ্বর।
Slaying of Andhaka; Hymn to the Sun; Glory of Brahmins; Gayatri Nyasa and Pranayama
ভীষ্মের অনুরোধে পুলস্ত্য অন্ধক-উপাখ্যানের মাধ্যমে ভবা/ভৈরবস্বরূপ শিবের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। কাম ও উগ্রতায় উন্মত্ত দৈত্য অন্ধক পার্বতী ও দেবতাদের উৎপীড়ন করতে উদ্যত হলে ভীত ইন্দ্র কৈলাসে গিয়ে শিবের শরণ নেন। শিব অভয় দান করে ভয়ংকর বিশ্বরূপ ধারণ করে অন্ধকের সঙ্গে যুদ্ধ করেন; যুদ্ধে তমসা ও মায়া ছেয়ে গেলে সূর্য (দিবাকর) মানব রূপে আবির্ভূত হয়ে অন্ধকার দূর করেন এবং দেবগণ তাঁর বিস্তৃত স্তব করেন। অন্ধকের রক্তবিন্দু থেকে বহু অন্ধক জন্মাতে থাকলে শিব মাতৃকাদের সৃষ্টি করেন; তারা রক্ত পান করে সেই বৃদ্ধি রোধ করে। শেষে অন্ধক শূলে বিদ্ধ হয়ে অনুতাপে ভক্তিতে প্রবৃত্ত হয় এবং উন্নতি লাভ করে গণত্ব/নতুন নাম প্রাপ্ত হয়। এরপর ধর্মোপদেশে ব্রাহ্মণ-মহিমা, সেবা-দান ও যজ্ঞে তাদের অপরিহার্যতা, এবং যোগ্য ব্রাহ্মণ ও গুরুর লক্ষণ ব্যাখ্যা করা হয়। পরে গায়ত্রী-তত্ত্বের বিশদ আলোচনা—দেবতা সবিতা, অক্ষর-দেবতা, প্রণায়াম ও ন্যাসের বিধি—এবং জপ, শ্রবণ ও শিক্ষাদানের ফলশ্রুতি দিয়ে অধ্যায় সমাপ্ত হয়।
Brahmin Conduct, Purificatory Baths, and the Garuḍa–Nectar Episode (Illustrative Narrative)
এই অধ্যায়ে নারদ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেন—কোন আচরণে ব্রাহ্মণ ‘অধম’ হয়ে পড়ে। ব্রহ্মা নিত্যকর্মের গুরুত্ব বোঝান—সন্ধ্যা-উপাসনা, পিতৃতর্পণ, মন্ত্র-ব্রত, শৌচ-শুদ্ধি, স্বাধ্যায় ও বিদ্যা; এবং ব্রাহ্মণের জন্য নিন্দিত পেশা ও অধঃপতনকারী আচরণগুলিও উল্লেখ করেন। এরপর শুদ্ধিস্নানের প্রকারভেদ বলা হয়—আগ্নেয় (ভস্মস্নান), বারুণ (জলস্নান), ব্রাহ্ম ( ‘আপো হিষ্ঠা’ প্রভৃতি মন্ত্রে), বায়ব্য (গোধূলি দ্বারা), এবং দৈব (বৃষ্টি-সূর্য-জল দ্বারা)। মন্ত্রস্নানকে তীর্থস্নানের তুল্য পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে। পরে দৃষ্টান্তকথা—গরুড়ের ক্ষুধার প্রসঙ্গ, ব্রাহ্মণদের অবধ্যতা, বিষ্ণুর সহিষ্ণুতা ও স্বরূপপ্রকাশ; তারপর বিনতাকে মুক্ত করতে গরুড়ের অমৃত-অন্বেষণ। শেষে ফলশ্রুতি—এই কাহিনি শ্রবণে পাপক্ষয় হয়।
Right Conduct, Offenses Against Brāhmaṇas, Truthfulness, and the Greatness of the Cow (Go-Māhātmya)
অধ্যায় ৪৮ শুরু হয় এক পতিত দ্বিজের কাহিনি দিয়ে—চাণ্ডালত্বে পতিত হয়ে সে কশ্যপের শরণ নেয়। কশ্যপ তাকে প্রায়শ্চিত্তের বিধান দেন: গায়ত্রী-জপ, মন্ত্রজপ ও হোম, চন্দ্রায়ণাদি ব্রত, হরির পবিত্র তিথিতে উপবাস, তীর্থস্নান এবং অবিরাম হরি-স্মরণ; এর ফলে সে পুনরায় ব্রাহ্মণ্য লাভ করে স্বর্গগতি প্রাপ্ত হয়। এরপর নারদ–ব্রহ্মা সংলাপে ব্রাহ্মণদের অবমাননা বা হিংসার ভয়ংকর কর্মফল বর্ণিত—রৌরব, মহারৌরব, তাপন, কুম্ভীপাক প্রভৃতি নরক, রোগপ্রসঙ্গ (কুষ্ঠের নানা ভেদ) এবং অশৌচ-নিয়ম। ব্রহ্মহত্যার লক্ষণ ও আততায়ী-বধের মতো ব্যতিক্রমও স্পষ্ট করা হয়। ধর্মাংশে জীবিকার শুদ্ধ পথ—উঞ্ছবৃত্তি, অধ্যাপন, যাজন, এবং বিপদে সীমিত বাণিজ্য—সত্যকে পরম ধর্ম, ও বাণিজ্য-কৃষিতে নৈতিক সংযম নির্দেশিত। শেষে গো-মাহাত্ম্য: গোর বিশ্বতাত্ত্বিক মর্যাদা (বেদ ও অগ্নির সমতুল্য), পঞ্চগব্যের ব্যবহার, মন্ত্র, নিত্য গো-স্পর্শের পুণ্য, এবং গাভী ও বৃষ-দানের বিস্তৃত ফলশ্রুতি বর্ণিত।
Brahmin Right Conduct: Morning Remembrance, Bathing, Purification, and Tarpaṇa Method
নারদ জিজ্ঞাসা করেন—ব্রাহ্মণের তেজ কীভাবে বৃদ্ধি পায় এবং কীভাবে ক্ষয় হয়। ব্রহ্মা আhnika-র সুসংবদ্ধ বিধান বলেন—রাত্রির অন্তে/প্রভাতে উঠেই দেবতা ও আদর্শ মহাপুরুষদের স্মরণ, তারপর শৌচাচার: দিক-নিয়ম মেনে মলত্যাগ, দন্তকাষ্ঠ দ্বারা দন্তধাবন, সন্ধ্যায় সংযম, এবং সময়ভেদে সরস্বতীর ধ্যান। এরপর মৃৎ-লেপনের পাপহর মন্ত্রসহ বিধি, বৈদিক স্নানের নানা প্রকার, এবং জলকে বিষ্ণুর অধিষ্ঠান বলে জলের তত্ত্ব-মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়। তারপর পিতৃ-তর্পণ-পদ্ধতি শেখানো হয়—উপযুক্ত সময়, কুশ ও কালো তিলের ব্যবহার, হস্তমুদ্রা, দিকাভিমুখ, বস্ত্রশুদ্ধি, এবং যে নিষেধ মানলে তর্পণ নিষ্ফল হয়। শেষে শৌচ, শিষ্টাচার, বর্জনীয় আচরণ, বাক্-নীতি ইত্যাদি সদাচার-নিয়ম বিস্তারে বলে উপসংহার করা হয়—সদাচার স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করে।
The Five Great Sacrifices: Supremacy of Honoring Parents, Pativrata Dharma, Truthfulness, and Śrāddha
ভীষ্ম পুলস্ত্যকে জিজ্ঞাসা করেন—সর্বজনস্বীকৃত সর্বোচ্চ পুণ্য কী। পুলস্ত্য ব্যাসের উপদেশ বর্ণনা করেন, যেখানে দ্বিজ শিষ্যদের ‘পঞ্চ মহাযজ্ঞ’ বলা হয়েছে—মাতা‑পিতার (এবং স্বামীর) পূজা‑সেবা, সমত্বভাব, মিত্রদ্রোহ বর্জন, এবং শ্রীবিষ্ণুভক্তি। এর মধ্যে বিশেষ করে পিতৃ‑মাতৃসেবাকে যজ্ঞ‑তীর্থের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলা হয়। তীর্থভ্রমণের অহংকারে থাকা নরোত্তম সারস/বক‑ঘটনায় শিক্ষা পেয়ে মূক নামক বাডব‑চাণ্ডালের কাছে যান; জন্মে চাণ্ডাল হলেও পিতা‑মাতার নিষ্ঠাসেবায় তিনি আচরণে ব্রাহ্মণসম। বিষ্ণু ছদ্মবেশে পথ দেখিয়ে শুভার পতিব্রতা‑ধর্ম, তুলাধারের সত্য ও সমদৃষ্টি, এবং সজ্জনাদ্রোহকের কামজয়—এই আদর্শগুলি তুলে ধরেন। শেষে পিতৃযজ্ঞ/শ্রাদ্ধবিধি, গ্রহণকালের বিশেষ পুণ্য, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া‑কর্তব্য ও প্রায়শ্চিত্তের কথা বলা হয়; উপসংহার—পিতা‑মাতার সম্মান ও সেবা-ই হরিধামপ্রাপ্তির নিশ্চিত পথ।
The Glory of the Devoted Wife (Pativratā) and the Māṇḍavya Curse: Sunrise Halted and Restored
এই অধ্যায়ে আদর্শ পতিব্রতার মহিমা বর্ণিত। এক ব্রাহ্মণী কুষ্ঠরোগী স্বামীর অটল সেবা করে; স্বামীর মন যখন এক গণিকার প্রতি আকৃষ্ট হয়, তখন সেই সাধ্বী গণিকার গৃহে গিয়ে শুচি-পরিচর্যা করে তাকে প্রসন্ন করে এবং রাত্রিতে স্বামীকে কাঁধে বহন করে তার ইচ্ছা পূরণে বের হয়। পথে শূলবিদ্ধ মাণ্ডব্য মুনির স্পর্শে তাঁর সমাধি ভঙ্গ হয়। ক্রুদ্ধ মুনি শাপ দেন—সূর্যোদয়ে স্বামী ভস্মীভূত হবে। তখন পতিব্রতা নিজের তপোবলে সূর্যোদয় রোধ করে; জগতে অন্ধকার ও সংকট নেমে আসে। ইন্দ্রসহ দেবগণ ব্রহ্মার শরণ নেয়। ব্রহ্মা সমাধান করেন—সূর্যোদয় পুনরায় হোক, শাপফলও প্রকাশ পাক; কিন্তু ব্রহ্মার বরদানে স্বামী পুনর্জন্মে মনমথসদৃশ দীপ্তিমান হয় এবং দম্পতি স্বর্গ লাভ করে। শেষে এই কাহিনি শ্রবণ-পাঠের ফলশ্রুতি বলা হয়েছে।
The Account of Women (Householder Ethics, Fault, Merit, and Govinda-Nāma as Purification)
এই অধ্যায়ে এক দ্বিজ ভগবান্ হরিকে জিজ্ঞাসা করেন—কর্মদোষ থেকে দুঃখ কীভাবে জন্মায়; মাণ্ডব্যের শূলারোপণ এবং নৈতিক অপরাধ থেকে কুষ্ঠরোগ প্রভৃতির উৎপত্তির প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়। শ্রীভগবান গৃহস্থধর্মের শাসন, কামদোষজনিত বিপদ, বংশদূষণ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণ ব্যাখ্যা করেন; বর্ণনার মধ্যে উমা–নারদ সংলাপও অন্তর্ভুক্ত হয়। এখানে পরস্ত্রীগমন, নির্যাতন, পরিত্যাগ, অনুচিত সম্পর্ক ইত্যাদি অপরাধ ও তাদের নরকফল বর্ণিত। পরে শুদ্ধির উপায় বলা হয়—গোবিন্দ-নামের স্মরণ ও কীর্তন অগ্নির মতো পাপদাহক, মহাপাতকও নাশ করে। পরিশেষে পুরাণ শ্রবণ-পাঠের পুণ্য, দানবিধি, বীজদান, বিবাহসংক্রান্ত দান, বিবাহযোগ্যতা এবং কন্যামূল্য/বধূমূল্য নিষেধ প্রভৃতি নির্দেশ দিয়ে শ্রবণফলশ্রুতিতে অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়।
Narrative of the Śūdra’s Renunciation of Greed (with the Tulādhāra Greatness Prelude)
অধ্যায় ৫৩-এ দ্বিজ তুলাধারার সম্পূর্ণ জীবনকথা ও মাহাত্ম্য জানতে চান। শ্রীভগবান বলেন—সত্য ও অলোভই ধর্মের সর্বাধিক ভারী মানদণ্ড; বহু যজ্ঞের সংখ্যার চেয়েও এগুলি শ্রেষ্ঠ, এবং জগতের স্থিতি-ধারণে এদের প্রভাব আছে। যুধিষ্ঠির, বলি ও হরিশ্চন্দ্র প্রভৃতির দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি সত্যনিষ্ঠা ও নির্লোভতার মহিমা প্রকাশ করেন। এরপর এক শূদ্রের শিক্ষামূলক কাহিনি আসে। সে চরম দরিদ্র হয়েও চুরি করে না; “পাওয়া” বস্ত্র ও গোপন ধন দেখিয়ে পরীক্ষা করা হলেও লোভে পড়ে না। ধন যে আসক্তি, বন্ধন, মোহ ও সমাজভয় বাড়ায়—এ কথা বুঝে সে অনাসক্তি গ্রহণ করে। দেবগণ তাকে প্রশংসা করেন; পরীক্ষক সন্ন্যাসী (ক্ষপণক) নিজেকে বিষ্ণু বলে প্রকাশ করে বর দিয়ে তাকে স্বর্গারোহণ করান। শেষে তুলাধারার অতুল সত্যনিষ্ঠা এবং শ্রবণ-পাঠে পাপক্ষয় ও যজ্ঞফললাভের ফলশ্রুতি বলা হয়েছে।
The Abduction/Seduction of Ahalyā and Indra’s Mark (Sahasrākṣa)
এই অধ্যায়ে অহল্যা‑প্রসঙ্গকে কামনা ও অসংযমের নৈতিক দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমে হিংসা‑দ্রোহহীন সমভাবের দুর্লভ গুণের প্রশংসা করা হয়। ব্রহ্মার কন্যা অহল্যার বিবাহ গৌতম ঋষির সঙ্গে হয়; গৌতম আশ্রমের বাইরে গেলে ইন্দ্র কামবশে ছল করে আশ্রমে এসে প্রতারণামূলক মিলনে প্রবৃত্ত হয়। গৌতম অন্তঃশুদ্ধি ও জ্ঞানদৃষ্টিতে অপরাধ বুঝে শাপ দেন—ইন্দ্রের দেহে যোনিচিহ্ন প্রকাশ পায়, যা পরে ‘সহস্রাক্ষ’ অর্থাৎ ‘হাজার চোখ’ নামে রূপান্তরিত বলে বলা হয়; আর অহল্যাকে পথের ধারে শীর্ণ, অস্থিমাত্র অবস্থায় থাকার দণ্ড দেওয়া হয়। করুণায় শাপ শিথিল হয়—ভবিষ্যতে শ্রীरामের দর্শন/স্পর্শে অহল্যার মুক্তি হবে এবং তিনি পুনরায় গৌতমের সঙ্গে মিলিত হবেন। লজ্জিত ইন্দ্র জলে তপস্যা‑ভক্তি করে দেবী ইন্দ্রাক্ষী (জগন্মাতা)‑র স্তব করেন। দেবী প্রসন্ন হয়ে বর দেন, কলঙ্ককে খ্যাতিতে পরিণত করে ইন্দ্রের মর্যাদা ও তেজ পুনঃস্থাপন করেন এবং দেবতাদের ক্ষেত্রেও কামনার ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেন।
The Origin of the Lauhitya River (and the King of Tīrthas)
এই অধ্যায়ে কাম-সংযমের কঠিনতা ও তীর্থ-মাহাত্ম্য দুইটি সতর্কতামূলক কাহিনির মাধ্যমে প্রকাশিত। প্রথমে গঙ্গাতীরে অবস্থানকারী এক পূজ্য পরমহংস ব্রাহ্মণের সামনে এক অপরূপা নারী উপস্থিত হয়। ভয়, আকর্ষণ ও ধর্মবোধের টানাপোড়েনে তিনি তাকে প্রত্যাখ্যান করেন, কিন্তু রাত্রিতে মানসিক অস্থিরতা চরমে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু ঘটে; লোকেরা কারণ জিজ্ঞাসা করে—এতে কাম যে স্থৈর্য ভেঙে দেয় তা স্পষ্ট হয়। পরবর্তী অংশে ঘটনা মহাজাগতিক রূপ পায়। ব্রহ্মা শান্তনুর পত্নী অমোঘাকে দেখে কামাবিষ্ট হন; তাঁর বীর্য পতিত হয়। দম্পতি সেই ঘটনাকে ধর্মসম্মতভাবে গ্রহণ ও পরিচালনা করলে এক পরম পবিত্র ‘তীর্থরাজ’ প্রকাশিত হয়, যা লৌহিত্য নদীর উৎপত্তির সঙ্গে যুক্ত। শেষে পরশুরাম ক্ষত্রিয়বধের পাপ থেকে শুদ্ধি চান। বহু নদীতে স্নান করেও মুক্তি না পেয়ে ডানদিকে ঘূর্ণায়মান আবর্ত/কুণ্ডে তাঁর পরশু শুদ্ধ হয়। ফলে এই তীর্থকে মোক্ষদায়ক ও পাপহর বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়—কাম দমন কঠিন, কিন্তু তীর্থসেবা ও ভক্তি পুনরায় পবিত্রতা দান করে।
The Five Narratives (Pañcākhyāna): Desire, Forbearance, Devotion, and Merit of Hearing
এই অধ্যায়ে ‘পঞ্চাখ্যান’ রূপে একাধিক নীতিশিক্ষামূলক কাহিনি একত্রে গাঁথা হয়েছে। শুরুতে শৈব প্রসঙ্গ—শিবের নারীদের সঙ্গে ক্রীড়া-আসক্তি, গৌরী/উমার যোগদৃষ্টিতে তা উপলব্ধি, এবং ক্রোধে ‘ক্ষেমঙ্করী’ রূপ ধারণ করে প্রবেশ করে শাপ প্রদান; যার ফলে সেই নারীদের ভাগ্য ও সামাজিক অবস্থান চিহ্নিত হয়। এরপর ধর্ম-নীতি ও ভক্তির উপদেশ—কাম (ইচ্ছা)-এর প্রবল শক্তি স্বীকার করা হয়েছে, যা মহত্তম দেবতাদেরও স্পর্শ করতে পারে; আর ক্ষমা (ক্ষান্তি)কে প্রভুত্বদায়িনী ও কল্যাণশাসনের মূল বলে প্রশংসা করা হয়েছে। বৈষ্ণব অংশে হরি ভক্তের গৃহে সহজলভ্য, পিতা-মাতার সেবা সর্বোচ্চ ধর্ম, এবং নিষ্কপট পূজাই শ্রেষ্ঠ—এ কথা প্রতিষ্ঠিত হয়। শেষে ফলশ্রুতি জানায়, এই পঞ্চাখ্যান শ্রবণ-পাঠ করলে অমঙ্গল থেকে রক্ষা হয় এবং মহাদান ও তীর্থযাত্রার সমতুল্য পুণ্য লাভ হয়।
Praise of Digging Wells and Building Water-Reservoirs (The Merit of Water-Works)
এই অধ্যায়ে জলকে ধর্ম ও যজ্ঞের ভিত্তি বলা হয়েছে। জলেই প্রাণধারণ, শুচিতা, শ্রাদ্ধ, কৃষিকর্ম ও দৈনন্দিন জীবন চলে; তাই কূপ, পুকুর ও পুষ্করিণী নির্মাণকে সর্বোচ্চ জনকল্যাণকর দান হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে। এর ফল কল্পকালব্যাপী স্বর্গলাভ এবং বিন্দু-বিন্দু জলের মতো ক্রমবর্ধমান পুণ্যের রূপকে বর্ণিত; জন্মান্তর পর্যন্ত ও সকল বর্ণ-শ্রেণির জন্য এর উপকার বিস্তৃত। কথাপ্রসঙ্গে ধনদান ও জলপ্রদানের তুলনা করা হয়। এক ধনী ব্যক্তি, শিব-সম্পর্কিত কূপ/পুষ্করিণীর উপকারক এবং ঈর্ষাপ্রসূত পুত্রের প্ররোচনায় এক পরীক্ষা ঘটে; জলকর্মে একটি শিলাখণ্ড নিক্ষেপ করা হয় এবং ধর্ম সাক্ষী হয়ে পুণ্যের তুল্যমূল্য নির্ণয় করায়। সিদ্ধান্ত হয়—জল-ব্যবস্থার পুণ্য শ্রেষ্ঠ, স্থায়ী ও অক্ষয়। শেষে বলা হয়েছে, অবমাননা দুঃখ বাড়ায়; আর এই ধর্মকথা প্রচার ও শ্রবণ পাপ নাশ করে, পুণ্য বৃদ্ধি করে এবং মুক্তির পথে সহায় হয়।
Praise of the Merits of Sacred Ponds, Tree-Planting, and Water-Charities
এই অধ্যায়ে ব্যাসদেব দ্বিজোত্তম শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন যে বৃক্ষরোপণ ও বৃক্ষরক্ষা থেকে যে পুণ্য জন্মায়, তা জলাশয়ের নিকটে করলে অপরিমেয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। নদীতট, সরোবর, পুকুর, জলাধার ও পদ্মপুকুরের কাছে করা সৎকর্ম অক্ষয় ফলদায়ক এবং পিতৃপুরুষ ও বংশধর—উভয়েরই কল্যাণসাধক বলে বর্ণিত। অশ্বত্থ (পিপ্পল) বৃক্ষকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিশেষভাবে মহিমা করা হয়েছে। তাকে স্পর্শ করা, প্রদক্ষিণ করা ও পূজা করা পাপনাশক, ঐশ্বর্যবর্ধক, দীর্ঘায়ু, পুত্রলাভ ও স্বর্গপ্রদ—এমন ফল দেয়; কিন্তু তাকে কাটা বা ক্ষতি করা ভয়ংকর নরকফলদায়ক বলে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এরপর জনকল্যাণমূলক দানের কথা বিস্তার করে বলা হয়—পুষ্করিণী/ট্যাঙ্ক নির্মাণ, প্রপা (পানীয়জল বিতরণের স্থান) স্থাপন এবং ধর্মঘট/জলঘট দান। এগুলি স্থায়ী পুণ্যভাণ্ডার, মুক্তিসহায়ক, এবং প্রজন্মান্তরে পিতৃপুরুষ ও সন্তানদের উপকার করে; ফলে পরিবেশরক্ষা ও জলসেবাকে ভক্তিময় ধর্মকর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
Merit of Causeways and Crossings, Temple Construction Rewards, and the Rudrākṣa Mahātmya
এই অধ্যায়ে লোককল্যাণধর্ম ও ভক্তির আচার একসূত্রে গাঁথা। শুরুতে সেতু/ঘাট ও পারাপারের পথ (আলিন/অলি) নির্মাণের মহাপুণ্য বর্ণিত—জনসাধারণের উপকারে স্থায়ী স্বর্গফল ও পাপক্ষয় ঘটে। এরপর কর্মফলের দৃষ্টান্ত: এক চোর চিত্রগুপ্তের খতিয়ানে প্রায় পুণ্যশূন্য দেখা যায়, কিন্তু গরুর মাথা তুলে ধরা/ধরে রাখা মতো ক্ষুদ্র কর্মে সামান্য রাজপুরস্কার পায়। সেই ঘটনাই তার পরিবর্তনের সূচনা; পরে সে জনহিতকর কাজ, দান, সেতু নির্মাণ ও ধর্মময় শাসন করে, এবং চিত্রগুপ্তের সুপারিশে ও ধর্মরাজের সম্মতিতে বিষ্ণুলোক লাভ করে। পরে বিষ্ণু, শিব, দেবী, গণপতি ও সূর্যের মন্দির নির্মাণ ও বিগ্রহ-প্রতিষ্ঠার ফলশ্রুতি বলা হয়েছে; মন্দিরসম্পদ চুরি/অপব্যবহার এবং মন্দিরসেবকদের শোষণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শেষে রুদ্রাক্ষ-মাহাত্ম্য—ত্রিপুর-উপাখ্যান থেকে উৎপত্তি, দর্শন-স্পর্শ-ধারণের ফল, জপমালার বিধি, মুখভেদ অনুযায়ী মন্ত্র-ন্যাসসহ বিস্তারিত, এবং শ্রবণ-পাঠের মহাপুণ্য বর্ণিত।
The Glory of Dhātrī (Āmalakī) and Tulasī: Ekādaśī Observance and Protection from Preta States
স্কন্দ শিবের কাছে পবিত্র ফল-উদ্ভিদের শুদ্ধিকারক মহিমা জানতে চান। মহাদেব ধাত্রী/আমলকীকে সর্বোচ্চ পবিত্রকারী বলে বর্ণনা করেন—রোপণ, দর্শন, স্পর্শ, নামস্মরণ, ভক্ষণ, রসে স্নান এবং বিষ্ণুকে অর্পণ করলে পাপক্ষয়, সমৃদ্ধি ও মুক্তি লাভ হয়। একাদশী-সংযুক্ত স্নান-উপবাসাদি বিধি বিশেষভাবে প্রশংসিত, এবং কিছু বার-তিথিতে (বিশেষত রবিবার/সপ্তমী প্রভৃতি) নিষেধও বলা হয়েছে। অন্তর্গাথায় এক ব্যাধ/চণ্ডাল আমলকী খেয়ে মৃত্যুবরণ করেও এমন পবিত্র হয় যে যমদূতরাও তাকে স্পর্শ করতে পারে না—ফলের উদ্ধারক শক্তি প্রকাশ পায়। এরপর প্রেত/পিশাচ-অবস্থার কারণস্বরূপ কর্মসমূহের তালিকা ও প্রতিকার—বেদপাঠ, পূজা, ব্রত এবং আমলকীর ব্যবহার—উপদেশ দেওয়া হয়। শেষে তুলসীকে হরিপূজার শ্রেষ্ঠ পত্র-পুষ্প বলা হয়েছে; তার সান্নিধ্য অমঙ্গল সত্তা দূর করে, পাপ নাশ করে এবং ভুক্তি ও মোক্ষ প্রদান করে।
The Greatness of the Hymn to Tulasī
এই অধ্যায়ে দ্বিজ ব্রাহ্মণেরা হরির কাছে প্রার্থনা করেন—পুণ্যদায়ক তুলসী-স্তোত্রের মহিমা প্রকাশ করতে। ব্যাস স্কন্দপুরাণে পূর্বে ঘোষিত কথার স্মরণ করিয়ে এই স্তোত্র-পরম্পরাকে প্রামাণ্য করেন; পরে শৃঙ্খলাবদ্ধ শিষ্যরা শাতানন্দের নিকট এসে কল্যাণকর ও পুণ্যবর্ধক উপদেশ জানতে চায়। শাতানন্দ তুলসীদেবীর স্তব-রূপ মহিমা বর্ণনা করেন—তাঁর নামস্মরণ ও দর্শনে পাপক্ষয় হয়, তাঁর পত্রে শালগ্রাম/কেশবের পূজা পবিত্র হয়, এবং বিষ্ণুকে তুলসী অর্পণকারীর উপর যমের অধিকার নষ্ট হয়। গোমতী, বৃন্দাবন, হিমালয়, দণ্ডকারণ্য, ঋষ্যমূক প্রভৃতি স্থানে তুলসীর দিব্য অবস্থান উল্লেখ করে ফলশ্রুতি বলা হয়। বিশেষত দ্বাদশী-রাত্রিতে জাগরণসহ পাঠ করলে অপরাধ মোচন, গৃহে মঙ্গল, সমৃদ্ধি, স্বাস্থ্য এবং অটল বৈষ্ণবভক্তি লাভ হয়।
The Greatness of the Gaṅgā: Purification, Ancestor Rites, and Liberation
এই অধ্যায়ে দ্বিজদের প্রশ্নের উত্তরে ব্যাস গঙ্গা-মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। গঙ্গার নামস্মরণ, দর্শন, স্পর্শ, স্নান, জলপান এবং পিণ্ড-তিলোদক প্রভৃতি পিতৃকর্মের দ্বারা মহাপাপ পর্যন্ত নাশ হয়—এটাই মূল শিক্ষা। কলিযুগে গঙ্গাভক্তির বিশেষ ফলপ্রদতা বলা হয়েছে; সংক্রান্তি, ব্যতীপাত, গ্রহণ ইত্যাদি পুণ্যকালে গঙ্গাসেবায় স্বর্গলাভ, পুনর্জন্ম-নিবারণ এবং মোক্ষপ্রাপ্তির কথা পুনঃপুনঃ উচ্চারিত। মধ্যে বায়ু প্রভৃতির প্রসঙ্গে তীর্থগণনা করে গঙ্গার সর্বতীর্থ-শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। একটি স্তোত্র ও “মূলমন্ত্র” প্রদান করে গঙ্গাকে বিষ্ণুপাদোদকী ও নারায়ণী রূপে স্তব করা হয়েছে। নারদ-ব্রহ্মা সংলাপে তাঁর উৎপত্তি ও অবতরণকথা আসে—বিষ্ণুর চরণজল, শিবের জটায় ধারণ, এবং ভগীরথের দ্বারা পৃথিবীতে অবতরণ। শেষে ফলশ্রুতি—এই অধ্যায় শ্রবণ/পাঠ/পাঠনে গঙ্গাস্নানসম পুণ্য হয় এবং পিতৃগণেরও উন্নতি ঘটে।
The Hymn to Gaṇapati (and the Rule of Worshipping Gaṇeśa First)
এই অধ্যায়ে পুলস্ত্য স্মরণ করান সেই পূর্বপ্রসঙ্গ, যখন সঞ্জয় ভীষ্মকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—দেবপূজার যথার্থ ক্রম কী এবং কার পূজায় সকল কর্মে নিশ্চিত ফলসিদ্ধি হয়। উদ্ধৃত সংলাপে ব্যাসের উপদেশে স্থির হয় যে বিঘ্ননাশের জন্য সর্বাগ্রে গণেশের ‘প্রথম-পূজা’ করাই বিধেয়; তবেই যজ্ঞ, ব্রত, তীর্থাদি কর্ম ফলপ্রদ হয়। এরপর একটি দৃষ্টান্তকথা—পার্বতী ‘মহাবুদ্ধি’ নামক দিব্য মোদক প্রদান করে ‘কে শ্রেষ্ঠ’ এই প্রতিযোগিতা স্থাপন করেন। গণেশ পিতা-মাতার প্রদক্ষিণা করে দেখান যে পিতামাতাই সকল তীর্থফলের সমান; তাই তাঁর এই আচরণ তীর্থযাত্রা, ব্রত ও যজ্ঞের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলে মান্য হয় এবং সকল আচার্যে গণেশের অগ্রপূজার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। শেষে চতুর্থী পূজা ও উপবাসের বিধান, স্তোত্রপাঠের কাঠামো এবং দ্বাদশ নাম জপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সিদ্ধি, রক্ষা, বিঘ্নশান্তি এবং পরিশেষে স্বর্গলাভের ফলশ্রুতি ঘোষিত।
The Hymn to Gaṇapati (Gaṇa-aṣṭaka) and Its Merit
এই অধ্যায়ে ব্যাস এক পবিত্র, সিদ্ধিদায়ক গণপতি-স্তোত্রের শুভ ঘোষণা করেন। এরপর ‘নমঃ’ প্রভৃতি প্রণামবাক্যে একদন্ত, মহাকায়, স্বর্ণপ্রভ, সর্প-যজ্ঞোপবীতধারী, চন্দ্রশেখর, বিঘ্নেশ্বর এবং গণদের যুদ্ধপ্রস্তুত নেতা শ্রীগণেশের রূপ ও মহিমা বর্ণিত হয়; যাঁকে দেবগণসহ সিদ্ধ-গন্ধর্ব-যক্ষ প্রভৃতি সকলেই সর্বত্র বন্দনা করে। পরে ফলশ্রুতি বলা হয়েছে—ভক্তিভরে যে পাঠ করে বা শ্রবণমাত্রও করে, সে সিদ্ধি লাভ করে, রুদ্রলোকে সম্মান পায়, রাজাসদৃশ মর্যাদা ও ত্রিলোকে প্রভাব অর্জন করে, এবং সাত জন্ম পর্যন্ত দারিদ্র্য থেকে রক্ষা পায়। শেষে ‘গণপতি-স্তোত্র (গণাষ্টক)’ নামে অধ্যায়ের সমাপ্তি-উল্লেখ আছে।
The Slaying of the Kālakeyas and the Greatness of Vināyaka Worship
এই অধ্যায়ে ব্যাস বিনায়ক-উপাসনার বিধি ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। নান্দীমুখ প্রভৃতি শ্রাদ্ধকর্মে গণেশ-পূজা, মন্ত্রপ্রয়োগে কলশাদি পাত্রের সংস্কার, এবং সর্বদৃশ্য স্থানে হেরম্বের স্থাপন বা লিখন—এগুলির ফলে যজ্ঞকর্মে সিদ্ধি, রক্ষা, বিদ্যা, সমৃদ্ধি ও রোগ-শোকনাশ হয় বলে বলা হয়েছে। দক্ষিণ লৌহিত্য-তীরে ‘বনিতা’ নামক স্থানে বিনায়ক লিঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠিত—তার দর্শন, স্পর্শ ও প্রদক্ষিণায় পবিত্রতা, স্বর্গলাভ এবং দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণের ফল প্রতিপাদিত। পরে কাহিনিতে দেবতারা গণেশ-পূজা অবহেলায় পরাজিত হয়ে শম্ভুর শরণ নেন। শিব তাঁদের গণপতির আরাধনায় নিয়োজিত করেন; প্রসন্ন গণেশ বিজয়বর দান করে তাঁদের হরির নিকট প্রেরণ করেন। বিষ্ণু দেবসেনাকে সংগঠিত করে হিরণ্যাক্ষ প্রভৃতি অসুরবলের সঙ্গে মহাযুদ্ধ করান; কালকেয় সেনাপতির পতন ঘটে। শিক্ষা—বিঘ্নহর্তার পূজা পূর্বে, তবেই জয় ও সিদ্ধি।
The Slaying of Kāleya
ভ্রাতৃহত্যা দেখে দৈত্য কালেয় ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ধনুক-বাণ নিয়ে চিত্ররথের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন ইন্দ্র (পাকশাসন)-পুত্র জয়ন্ত সামনে এসে তাকে প্রতিহত করেন। যুদ্ধক্ষেত্রেই ধর্মবাণী উচ্চারিত হয়—যে শত্রু ইতিমধ্যে ভগ্ন, ক্লান্ত ও পীড়িত, তাকে আঘাত করা মূর্খতা; ধর্মযুদ্ধের নিয়মে স্থিত হয়ে যুদ্ধ করো। কিন্তু কালেয়ের ক্রোধ প্রশমিত হয় না; সে জয়ন্তকে বধ করার শপথ করে। এরপর দীর্ঘ দ্বন্দ্ব শুরু হয়—প্রথমে বাণযুদ্ধে, পরে গদাযুদ্ধে, শেষে খড়্গ-ঢাল নিয়ে; গদাযুদ্ধকে প্রতীকীভাবে বহু বছরের ন্যায় দীর্ঘ বলা হয়েছে। অবশেষে জয়ন্ত প্রাধান্য লাভ করে কালেয়কে চুলের মুঠি ধরে টেনে ধরে এবং শিরচ্ছেদ করে। দেবগণ ‘জয়’ ধ্বনি দিয়ে আনন্দিত হন, আর দৈত্যসেনা পরাজয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালায়।
The Slaying of Bala–Nāmuci
এই অধ্যায়ে হিরণ্যাক্ষ দানব-দৈত্যদের যুদ্ধের জন্য আহ্বান করে; তাদের সেনা ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে আকাশমণ্ডল আচ্ছন্ন করে। অপরদিকে দেবগণ—রুদ্র, সাধ্য, বিশ্বদেব ও বসুগণ—সমবেত হন; স্কন্দ ও গণপও যোগ দেন, এবং বিষ্ণু (জিষ্ণু)-এর নেতৃত্বে দেবসেনা অগ্রসর হয়। তারপর ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়—অস্ত্রশস্ত্রের প্রবল বর্ষা, অমঙ্গল লক্ষণ ও প্রকৃতির বিকার দেখা দেয়। রক্তধারা প্রবাহিত হয়ে পৃথিবীকে যেন “রক্তসাগর” করে তোলে, নদীগুলিও উল্টো স্রোতে বইতে থাকে। স্কন্দের তেজস্বী অবতরণে বহু দৈত্য যমলোকে পতিত হয়; ইন্দ্র ও বিষ্ণু দানবীয় আক্রমণ প্রতিহত করেন। শেষে বল নামক মহাদৈত্য দেবতাদের অত্যন্ত পীড়িত করে। ইন্দ্রের ক্রোধে তীব্র দ্বন্দ্ব হয় এবং অস্ত্রাঘাতে দানববীর (বল–নামুচি) পতন ঘটে। দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি সহ আনন্দ করেন, আর অবশিষ্ট দৈত্যরা পালিয়ে যায়।
The Slaying of Muci
বাল ও নমুচি নিহত হলে দানব মুচি শোক ও ক্রোধে ইন্দ্রের সম্মুখে এসে অভিযোগ করে বলে—তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নিহত হয়েছে। ইন্দ্র যুদ্ধদৃঢ় সংকল্পে উত্তর দেন যে তিনি শরবৃষ্টিতে মুচিকে ভূমিসাৎ করবেন; কাহিনিতে মুচির উন্মত্ত আক্রমণকে মোহজনিত আত্মবিনাশ বলে দেখানো হয়েছে, যেন পতঙ্গ আগুনে ঝাঁপ দেয়। এরপর ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়। মুচি তীর নিক্ষেপ করে ইন্দ্রের সারথি মাতলি ও ঐরাবত হাতিকে আঘাত করে, কিন্তু ইন্দ্রও প্রবল প্রতিঘাতে তাকে দমন করেন। শেষে মুচি লৌহগদা তুলে ধেয়ে এলে ইন্দ্র তৎক্ষণাৎ বজ্র নিক্ষেপ করে তাকে নিপাত করেন। মুচির পতনে পৃথিবী কেঁপে ওঠে, দেবগণ উল্লসিত হন, দানবেরা পালায়; ফলে দেবশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং আসুরী হিংসা প্রশমিত হয়।
The Slaying of Tāreya
এই অধ্যায়ে পার্বতী-হরপুত্র স্কন্দ (গুহ) ও দৈত্যনেতা তারেয়ের মধ্যে ভয়ংকর রণসংগ্রামের বর্ণনা আছে। তারেয় বারবার তীরবৃষ্টি করে এবং বৈশ্বানর, রৌদ্র, অঘোর প্রভৃতি নামে ভীষণ শক্তি/অস্ত্র প্রয়োগ করে, এমনকি জগত্-সংহারক ভীতিপ্রদ রূপও প্রকাশ করে। স্কন্দ বিশাখ প্রমুখ সহচরদের সঙ্গে সেই সব আক্রমণ প্রতিহত করেন; আকাশেই অস্ত্রের সংঘর্ষ ঘটে। সোনালি পালকযুক্ত দীপ্ত তীর দৈত্যকে বিদ্ধ করে, রক্তধারা বসন্তের ফুলঝরার মতো ছিটকে পড়ে—যুদ্ধের তীব্রতা ক্রমে চূড়ায় ওঠে। শেষে তারেয় পরাজিত হয়ে ভূমিতে পতিত হয়, তার পতনে পৃথিবী কেঁপে ওঠে। এরপর দেবগণ স্কন্দের বিধিপূর্বক পূজা-স্তব করেন এবং এই বিজয়কে বিশ্ব-রক্ষা ও ধর্মপ্রতিষ্ঠার নিদর্শনরূপে ঘোষণা করা হয়।
The Slaying of Devāntaka, Durdharṣa, and Durmukha
এই অধ্যায়ে ধর্মের প্রতিষ্ঠা যুদ্ধবর্ণনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। দেবান্তক দানব গর্জন করতে করতে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তবু তাকে ‘ধর্মযুদ্ধের নিয়ম’ মেনে যুদ্ধ করতে দেখা যায়। উপদেশধর্মী বাক্যে বলা হয়—ধর্ম-অজ্ঞতা অবশ্যম্ভাবীভাবে কাল ও মৃত্যুকে অগ্রদূত করে ডেকে আনে। শমন/যম ধর্মদণ্ডের অধিকারী রূপে, আর কাল মৃত্যুতত্ত্বের প্রতীক রূপে যুদ্ধে উপস্থিত। এরপর অস্ত্র-শস্ত্রের প্রবল বিনিময় ঘটে; তীরবৃষ্টি প্রলয়সম বলে তুলনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত শমনের আঘাতে দেবান্তক নিহত হয়ে পতিত হয়। তারপর দুর্ধর্ষ ও দুর্মুখ ক্রুদ্ধ হয়ে শমনের দিকে ধেয়ে আসে; বর্শা, দণ্ড, ত্রিশূল ও খড়্গ প্রভৃতি অস্ত্রে ভয়ংকর সংঘর্ষ হয়। অধ্যায়টি দেখায়—অধর্মের পরিণতি পতন, আর দैব ন্যায় নির্লিপ্তভাবে নিযুক্ত শক্তির মাধ্যমে কার্যকর হয়; অবশিষ্ট দানবসেনা চারদিকে পালিয়ে যায়।
The Second Slaying of Namuci
দেব-দৈত্যের পুনরায় সংঘর্ষে দৈত্যনায়ক নমুচি ক্রুদ্ধ হয়ে সাপের মতো তীক্ষ্ণ বাণবর্ষণে দেবতাদের বিপর্যস্ত করে তোলে। তখন ইন্দ্র উচ্ছৈঃশ্রবা-যোজিত রথে, সারথি মাতলির সহায়তায় আরোহন করে নমুচির মুখোমুখি হন। নমুচি অহংকারে বলে—ক্ষুদ্রদের বধে গৌরব নেই; সে ইন্দ্রকে হত্যা করে স্বর্গরাজ্য দখল করবে। ইন্দ্র তার ফাঁপা বাক্য নিন্দা করে বীরত্ব প্রমাণের আহ্বান জানান। দীর্ঘক্ষণ অসাধারণ ধনুর্বিদ্যার যুদ্ধ চলে; বাণে বাণ প্রতিহত হয়, অস্ত্রের তীব্রতা ক্রমে বাড়ে। এরপর নমুচি মায়া প্রয়োগ করে ত্রিলোকে ঘোর অন্ধকার ছড়িয়ে দেয়, ফলে উভয় পক্ষই বিভ্রান্ত হয়। কৌশল বুঝে হরি প্রতিঅস্ত্র দ্বারা সেই অন্ধকার নিবারণ করেন এবং ইন্দ্রকে চূড়ান্ত আঘাতের পথ করে দেন। নমুচি ঐরাবতকে ধরে ইন্দ্রকে টেনে নামালেও শেষ পর্যন্ত ইন্দ্র তার মস্তকচ্ছেদ করেন। দেবতা, গন্ধর্ব ও ঋষিগণ আনন্দে জয়ধ্বনি করে ধর্মের বিজয় উদ্যাপন করেন।
The Slaying of Madhu (Establishment of the Name ‘Madhusūdana’)
এই অধ্যায়ে দেব–অসুর যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব বর্ণিত। দৈত্য মধু হরি (নারায়ণ, মাধব, কেশব)-এর সম্মুখে এসে যুদ্ধনীতিভঙ্গের অভিযোগ তোলে এবং মায়া বিস্তার করে রণক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ঘটায়; মায়ার প্রভাবে দেবতারা পরস্পরকে শত্রু ভেবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, আর অসুরেরা দেবরূপ ধারণ করে দেখা দেয়। ভগবান বিষ্ণু তীক্ষ্ণ বাণ ও সুদর্শন চক্র দ্বারা সেই ছলনা চিনে নিয়ে দেবরূপধারী অসুরদের সংহার করেন এবং অসংখ্য শিরচ্ছেদ করেন। মধু পরে হর/শিবের রূপ, তারপর দেবীর রূপ ধারণ করে দেবসেনা ও বিষ্ণুকে বিচলিত করতে চায়; স্কন্দও মোহগ্রস্ত হলে ধাতা ব্রহ্মা উপদেশ দিয়ে তাঁর বিভ্রম দূর করেন। শেষে মধুর সৃষ্ট পতনশীল পর্বতাদি বাধা হরি বিনষ্ট করেন এবং মধুকে বধ করেন। তখন দেবগণ ভগবানের মহিমা ঘোষণা করে তাঁকে “মধুসূদন” নামে প্রতিষ্ঠা করেন—মায়াজয় ও অধর্মনিগ্রহের চিহ্নরূপে এই নাম প্রসিদ্ধ হয়।
The Slaying of Vṛtrāsura
এই অধ্যায়ে বৃত্রাসুর ও ইন্দ্র (শক্র)-এর মধ্যে ক্রমে তীব্রতর মহাযুদ্ধ বর্ণিত হয়েছে। প্রথমে গজযুদ্ধ ও রথযুদ্ধ, পরে ঘন তীরবৃষ্টি, শক্তি-আঘাত, এবং শেষে গদা, খড়্গ ও ঢাল নিয়ে নিকটসমর শুরু হয়। আকাশে শাম্ভব ও বৈষ্ণব দিব্যাস্ত্রের সংঘর্ষে স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ে; তাতে উভয় পক্ষের সেনা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং যুদ্ধক্ষেত্র প্রায় শূন্য হয়ে ওঠে। বৃত্র মায়াবলে পর্বতসমষ্টির মতো ভয়ংকর রূপ ধারণ করে, আবার নানা ভীতিকর জীবের ঝাঁক সৃষ্টি করে; ইন্দ্র সেগুলি ছিন্নভিন্ন করে দমন করেন। দেবতা ও সিদ্ধগণ সেই ভয়াবহ গদাযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন। শেষে ইন্দ্র প্রাধান্য লাভ করে বৃত্রকে কেশ ধরে টেনে শিরচ্ছেদ করেন; দেবগণ জয়ধ্বনি, দুন্দুভি-নিনাদ ও অপ্সরাদের নৃত্যে বিজয়োৎসব করেন, আর দৈত্যরা পালিয়ে যায়।
The Crushing of the Traipuras (Gaṇeśa’s Battle with Tripura’s Son)
এই অধ্যায়ে দেবতা ও দৈত্যদের ভয়ংকর যুদ্ধের বর্ণনা আছে, যেখানে বিনায়ক/হেরম্ব (লম্বোদর) মুখোমুখি হন ত্রিপুরের পুত্র ত্রৈপুরী/ত্রিপুরানন্দনের। দৈত্য পিতৃহত্যার প্রতিশোধের ঘোষণা করে, কিন্তু গণেশ ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তিতে বলেন—তার পূর্বপুরুষ দেবহিতের বিরোধী ছিল, তাই তার বিনাশ ন্যায়সঙ্গত। এরপর তীর, পরশু, খড়্গ, গদা প্রভৃতি অস্ত্রের ঘন বিনিময়ে যুদ্ধ তীব্র হয়। গণেশ একের পর এক দৈত্যবীরকে প্রতিহত করে ভূমিসাৎ করেন; ত্রৈপুরী আহত হয়ে পুনর্জীবিত হয় এবং হাতিতে চড়ে ফিরে এসে দেবসেনাকে বিপর্যস্ত করে। তখন দেবগণ ভয়ে বিনায়কের শরণ নেন। শেষে উভয়ের আঘাত-প্রতিঘাতে ও পশুযুদ্ধের প্রতীকময় চিত্রে সংঘর্ষ চূড়ান্তে পৌঁছে। গণেশের প্রভাবে দৈত্য ও তার হাতি পতিত হয়; ঋষিরা স্তব করেন, দেবতারা জয়ধ্বনি দেন, এবং বৃহত্তর যুদ্ধ আবার চলতে থাকে।
Hymn of Victory: Varāha, the Slaying of Hiraṇyākṣa, and the Praise of Viṣṇu
এই অধ্যায়ে দেব–দৈত্য মহাযুদ্ধের কাহিনি বর্ণিত। দেবতারা বহু দৈত্যকে পরাস্ত করলেও দানবরাজ হিরণ্যাক্ষ উজ্জ্বল রথে এসে দেবসেনাকে বিপর্যস্ত করে; ভীত দেবগণ হরি/কেশবের শরণ নেন। তখন বিষ্ণু স্বয়ং হিরণ্যাক্ষের মুখোমুখি হয়ে দীর্ঘ ও ভয়ংকর দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হন, যার ফলে জগত্মণ্ডলে মহাক্ষোভ দেখা দেয়। হিরণ্যাক্ষ পৃথিবীকে টেনে রসাতলে নিয়ে যায়। বিষ্ণু বরাহরূপ ধারণ করে পাতালে অবতীর্ণ হন, নিমজ্জিত ধরিত্রীকে দর্শন করে দন্তদ্বয়ে তুলে পুনরায় স্থিত করেন। পরবর্তী সংঘর্ষে সুদর্শনচক্রের দ্বারা হিরণ্যাক্ষ নিহত হয়। এরপর দেবগণ ‘বিজয়স্তোত্র’ পাঠ করে বিষ্ণুর নানা অবতারকে প্রণাম জানিয়ে তাঁর পরাক্রম স্তব করেন। শেষে ফলশ্রুতিতে শ্রবণ ও পাঠের দ্বারা পুণ্য, জয় এবং অভীষ্টসিদ্ধির কথা ঘোষিত হয়েছে।
The Marks of Merit and the Destinies of Beings (Divine vs Demonic Traits)
সঞ্জয় জিজ্ঞাসা করেন—যুদ্ধে নিহত অসুর-দৈত্যদের গতি কী, শত্রুর মুখোমুখি হয়ে লড়ে মরলে আর ভয়ে পালিয়ে মরলে ফল কি এক? ব্যাস বলেন—যে বীর শত্রুর সম্মুখে প্রাণ ত্যাগ করে, সে তৎক্ষণাৎ দিব্য ভোগসহ স্বর্গীয় গতি লাভ করে; কিন্তু যে কাপুরুষ পালায়, ছল করে বা অধর্মভাবে হত্যা করে, তার পরিণতি নরক। এরপর অধ্যায়ে মানুষের মধ্যে দানবসদৃশ, প্রেতসদৃশ, যক্ষসদৃশ ও দেবতুল্য স্বভাব চেনার “লক্ষণ” বলা হয়—শুচিতা-অশুচিতা, সত্য-মিথ্যা, দেবতা ও ব্রাহ্মণের প্রতি শ্রদ্ধা বা বিদ্বেষ, দয়া-নির্দয়তা, সামাজিক নীতি ও আচরণ, এবং লোভ-ক্রোধাদি দোষ। শেষে ধর্মাচরণের মহিমা কীর্তিত—পূজা, দান, সংযম, সত্য, বৈষ্ণবদের সম্মান ও ব্রাহ্মণসেবা জগতকে ধারণকারী পুণ্য; এই উপদেশ শ্রবণে শ্রোতাদের মঙ্গলফল প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
The Arkāṅga Saptamī (Bhāskara Saptamī) Vow: Origin of Sūrya, Pacification of Rays, and Māgha Saptamī Observance
এই অধ্যায়ে বৈশম্পায়ন জিজ্ঞাসা করেন—চিরদীপ্ত আকাশনাথ সূর্য কে, এবং কোন শক্তিতে তিনি সর্বত্র বন্দিত। ব্যাস বলেন—সূর্য ব্রহ্মার থেকে উদ্ভূত ব্রহ্মতেজ, যিনি চন্দ্রের সঙ্গে জগতকে ধারণ করেন; আদিতে তাঁর কিরণ এত তীব্র ছিল যে দেবতা ও লোকসমূহ দুঃখ পেতে থাকে। তখন দেবগণ ব্রহ্মার শরণ নেন; বিশ্বকর্মা বজ্রসদৃশ চক্র নির্মাণ করে সূর্যকিরণ সংযত/ছেদন করেন, আর সেই অংশ থেকেই দিব্য অস্ত্র জন্ম নেয়—বিশেষত বিষ্ণুর সুদর্শনচক্র। এরপর ধর্মবিধান—মাঘ শুক্ল সপ্তমী (কোটিভাস্করা/ভাস্করী সপ্তমী) ও ‘অর্কাঙ্গ সপ্তমী’ ব্রত পালনের নিয়ম বলা হয়। তিথি-শর্ত, অর্ঘ্যদান, উপবাস ও আহারসংযম, মন্ত্র, ধ্যানরূপ, পারণবিধি এবং ফলশ্রুতি বর্ণিত—পাপশুদ্ধি, আরোগ্য, সমৃদ্ধি, স্বর্গসুখ এবং শেষে মোক্ষলাভের প্রতিশ্রুতি সহ।
Appeasement Rite of the Sun (Sunday Vrata, Mantra, and Healing Praise)
এই অধ্যায়ে স্কন্দের প্রশ্নে মহাদেব সূর্য-শান্তি ও রবিবার-ব্রতের বিধান বলেন। রবিবারে লাল ফুলসহ অর্ঘ্য দান, শুচিতা পালন, রাতে একবার আহার এবং হবিশ্যান্ন গ্রহণের নির্দেশ আছে; বিশেষত রবিবার যদি সপ্তমী বা সংক্রান্তির সঙ্গে মিলে যায়, তবে ব্রতের শক্তি ও ফল বহুগুণ হয়। পূজাক্রমে শুদ্ধি, মণ্ডল স্থাপন, লাল পদ্মাসনে দ্বিভুজ সূর্যের ধ্যান, এবং গন্ধ-ধূপ-দীপ-নৈবেদ্য-জলাদি নিবেদন করে মুদ্রাসহ পূজা করতে বলা হয়েছে। পরে গায়ত্রীসদৃশ সৌর মন্ত্র, মাসানুসারে দ্বাদশ আদিত্যের উল্লেখ, এবং স্তোত্রে সূর্যকে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-রুদ্রতত্ত্বরূপে বন্দনা করা হয়েছে। শেষে “ওঁ হ্রাঁ হ্রীঁ সঃ …” মূলমন্ত্র, সূর্যাবর্ত-জল দ্বারা রোগশমন, এবং গোপনীয়তা ও অধিকার-নিয়ম উপদেশিত। ফলশ্রুতিতে আরোগ্য, পাপনাশ, ঐশ্বর্য, স্বর্গ ও মোক্ষপ্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে।
The Account of King Bhadreśvara (Sun-worship, healing, and heavenly ascent)
মধ্যদেশের স্বশাসিত রাজা ভদ্রেশ্বর তপস্যা ও ব্রতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। হঠাৎ তাঁর কুষ্ঠরোগ দেখা দিল এবং করতলে সাদা দাগ উঠল। চিকিৎসকদের শরণ নিলেও উপশম না হওয়ায় তিনি ব্রাহ্মণ ও মন্ত্রীদের ডেকে পাপ ও দুঃখ নাশের সর্বপবিত্র উপায় জানতে চাইলেন। ব্রাহ্মণরা ভাস্কর/সূর্যের ভক্তিপূর্বক উপাসনার বিধান দিলেন—প্রতিদিন অর্ঘ্যদান, মন্ত্রজপ এবং ‘অর্কাঙ্গ-ব্রত’। নির্দিষ্ট ফুল, শস্য, ফল, সুগন্ধি-লেপ ইত্যাদি দিয়ে এবং উদুম্বর-পাত্রে অর্ঘ্য নিবেদন করে, রাণী ও অন্তঃপুরের নারীদের সহভাগিতায় পূজা করতে বলা হল। কালের প্রবাহে রোগ দূর হল; সূর্যদেব প্রত্যক্ষ হয়ে বর দিলেন, রাজাকে স্বর্গলাভ ও স্থায়ী কল্যাণ দান করলেন এবং তাঁর ব্রাহ্মণ-মন্ত্রীরা ও প্রজাদের জন্যও চিরমঙ্গল নিশ্চিত করলেন। অধ্যায়ের শেষে বলা হয়েছে—ভাস্করের এই গূঢ় উপদেশ শ্রবণ বা পাঠ করলে মহাপুণ্য হয়; এটি যমকে জানানো হয়েছিল এবং ব্যাস পৃথিবীতে প্রচার করেছিলেন।
Somārcana — Worship and Pacification of Soma (Moon) within Graha-Rites
এই অধ্যায়ে দ্বিজের প্রশ্নে বৈশম্পায়ন সূর্য থেকে শুরু করে গ্রহশান্তির প্রতিকার বর্ণনা করেন। গ্রহদেরকে পুণ্য-পাপের ফল ভোগ করানোর মাধ্যম বলা হয়েছে, যার দ্বারা জীবের সঞ্চিত কর্ম ক্ষয় হয়। সূর্যকে কালস্বরূপ, উগ্র ও সৌম্য—উভয় গুণে সমন্বিত সর্বাধিপতি শক্তি হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে। এরপর আচারের বিধান—নির্দিষ্ট পাতা, ঘি ও হোম, এবং উদ্ধৃত মন্ত্র দ্বারা শান্তি; রোগনিবারণ ও হত্যা/বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আহুতি, সঙ্গে বার ও তিথির নিয়ম—যেমন রবিবার সূর্যোপাসনা, শুক্লপক্ষে সপ্তমী/পূর্ণিমায় আরোগ্যলাভ। পরে সোমের মাহাত্ম্য—সর্বব্যাপিতা, সৃষ্টি থেকে প্রলয় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ, অমৃতস্বরূপতা এবং সূক্ষ্মদেহে মস্তকের শিখরে চন্দ্রস্থিতির কল্পনা—এইভাবে স্তব করা হয়েছে। প্রভাতে জপযোগ্য সোমমন্ত্র, প্রণাম, এবং দানবিধি—পাত্র, ঘৃতমিশ্র দই ইত্যাদি ব্রাহ্মণকে শ্রদ্ধায় দান—ফলে সৌন্দর্য, ঐশ্বর্য ও স্থির মঙ্গলপ্রাপ্তি বলা হয়েছে।
The Origin and Worship of Bhauma (Mars/Lohitāṅga)
এই অধ্যায়ে ব্যাসের প্রশ্নে বৈশম্পায়ন লোহিতাঙ্গ/ভৌম (মঙ্গল)-এর উৎপত্তি, তাঁর ভয়ংকর শক্তি এবং কেন এক দেবগ্রহকে ক্রূর বলা হয়—তা ব্যাখ্যা করেন। কাহিনি অন্ধক-উপাখ্যানে প্রবেশ করে: বিষ্ণুর বরপ্রভাবে অন্ধক দৈত্য দেবতাদের পরাজিত করলে দেবগণ বিধি/ধাতা ব্রহ্মার শরণ নেন। পার্বতীকে কেন্দ্র করে মোহ, কাম ও সীমালঙ্ঘনের ফলে অন্ধক শিবের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়; নন্দী ভৃগুপুত্র শুক্রকে আবদ্ধ করেন এবং শিব তাঁকে গ্রাস করেন—ফলে মহাযুদ্ধ আরও প্রবল হয়। শেষে শিব অন্ধককে দমন করে তার বৈরভাবকে সেবায় রূপান্তরিত করেন; সে গণ হয়ে ভৃঙ্গীরিটি নামে পরিচিত হয়—পুরাণের শিক্ষা যে শত্রুতাও ভক্তিসেবায় পরিণত হতে পারে। দেবতাদের উদ্দেশে শিবের বচনের পর তাঁর বীর্য নির্গত হয়; সেই গর্ভ পৃথিবীতে পতিত হয়ে ভৌমরূপে জন্মায়—ভূমিজ, তবু হর-অংশজাত, তাই মঙ্গলের তীক্ষ্ণতা শৈব তেজের সঙ্গে যুক্ত। অতঃপর শান্তি-উপাসনার বিধান বলা হয়: মঙ্গলবার ও চতুর্থী তিথিতে লাল অর্ঘ্য, ত্রিকোণ মণ্ডল অঙ্কন করে পূজা; এতে বুদ্ধি, ধন ও মঙ্গলফল লাভ হয়।
Description of the Worship of the Planets
ভীষ্মের অনুরোধে পুলস্ত্য গ্রহ-প্রশমন ও গ্রহ-প্রসন্নতার বিধান বর্ণনা করেন। প্রথমে বুধ (মার্কারি)-এর বিশেষ পূজা, তারপর একই রীতিতে গুরু (বৃহস্পতি), ভাৰ্গব/শুক্র, শনি, রাহু ও কেতুর উপাসনার কাঠামো প্রসারিত করা হয়। মণ্ডল-রূপ (তীরাকৃতি, পঞ্চকোণ, মানবাকৃতি, বৃত্ত/ধ্বজাকৃতি), রঙিন গুঁড়ো, গন্ধ, ফুল, বস্ত্র ইত্যাদির বিধান এবং অশুভ দশা-পর্বে করণীয় উপায় উল্লেখিত। রত্ন, ধাতু, শস্য ও গাভী-অশ্বাদি দানের কথা গ্রহানুসারে শান্তির জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি ও রাহুর সংক্ষিপ্ত স্তোত্রধর্মী আহ্বান এবং শেষে গ্রহ-মন্ত্রের আরম্ভ-পদও দেওয়া আছে। উপসংহারে এই শিক্ষা পুণ্যদায়ক, বৈষ্ণব-সন্নিহিত ও সর্বজনীন বলে ঘোষিত; বিশেষত কলিযুগে দান—তার মধ্যে অভয়দান—কে সর্বোচ্চ ধর্ম বলা হয়েছে।