
The Section on Heaven
পদ্মপুরাণের স্বর্গখণ্ড তীর্থযাত্রা ও বিশ্বতত্ত্বের এক সংযোগস্থল। এখানে পবিত্র ভূগোল—তীর্থ, ক্ষেত্র, নদী, পর্বত—ভক্তিমূলক ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত; যেখানে হরি/বিষ্ণু একদিকে অন্তর্যামী প্রভু, অন্যদিকে তীর্থে জীবন্ত উপস্থিতি। পুরাণীয় বর্ণনা ও ঋষিসভা-সংলাপের কাঠামো শ्रोतাকে শ্রদ্ধা ও সাধনায় স্থিত করে। এই খণ্ডে তীর্থসেবাকে মুক্তির সহায়ক ‘সাধন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পবিত্র স্থানের শ্রবণ, স্মরণ ও দর্শন—এসবকে পুণ্যসঞ্চয়কারী কর্ম বলা হয়েছে, যা গুরুতর পাপও ক্ষয় করে মনকে শুদ্ধ করে এবং ভক্তির দিকে প্রবণ করে। ফলশ্রুতির মাধ্যমে ধর্মাচার, শুচিতা ও ভক্তিশ্রবণ এক সুসংহত মানচিত্রে গাঁথা হয়। তত্ত্বগতভাবে স্বর্গখণ্ড পরাত্পর বিষ্ণু (অধোক্ষজ) ও ইহলোকে প্রকাশিত পবিত্রতা (তীর্থরূপ হরি)-কে একত্র করে। তীর্থ কেবল স্থান নয়—ভগবানের করুণাময় সান্নিধ্যের অনুভবক্ষেত্র—এই ভাব বারবার প্রতিপন্ন। সেই সঙ্গে পুরাণপাঠকেও সর্বতীর্থযাত্রার সার ও প্রতিস্থাপক হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়েছে। আরম্ভে বক্তৃপরম্পরা—হরি → ব্রহ্মা → নারদ → ব্যাস → সূত—স্থাপন করে গ্রন্থের প্রামাণ্য নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তী প্রবাহে (সমগ্র খণ্ডে) নানা তীর্থের নাম, মাহাত্ম্য ও ফলশ্রুতি, এবং লয়/প্রলয় প্রভৃতি বিশ্বতাত্ত্বিক প্রশ্নের ইঙ্গিত পাওয়া যায়—যাতে ‘স্বর্গীয়’ পুণ্যলাভের পথ পৃথিবীতেই সহজলভ্য বলে প্রতীয়মান।
Invocation and the Naimiṣa Assembly: Sūta’s Arrival and the Request to Recount the Padma Purāṇa
স্বর্গখণ্ডের প্রথম অধ্যায় গোবিন্দের মঙ্গলাচরণে শুরু হয়। এরপর হিমালয়, বিন্ধ্য, মহেন্দ্র প্রভৃতি পুণ্যভূমি থেকে আগত বেদজ্ঞ ঋষিগণ নৈমিষারণ্যে শৌনকের কাছে উপস্থিত হন; তাঁদের যথাযথ আতিথ্য, সম্মান ও আসনদান করা হয়, এবং কৃষ্ণকেন্দ্রিক ধর্মালোচনা শেষে তাঁরা উপবেশন করেন। তখন ব্যাসশিষ্য সূত রোমহর্ষণ আগমন করেন। ঋষিগণ তাঁকে পূজা করে বক্তৃতার জন্য অনুরোধ করেন এবং বলেন—হরিবিহীন বাক্য আধ্যাত্মিকভাবে নিষ্ফল; হরিই তীর্থরূপে বিরাজমান। তাই তাঁরা হরির পুরাণকথা পুনরায় বিস্তারে শ্রবণ করতে চান। তাঁরা পুণ্যদায়ক তীর্থ, ক্ষেত্র, পর্বত ও নদীর নাম-উৎপত্তি এবং প্রলয়তত্ত্বের উপদেশ জানতে চান। সূত তাঁদের প্রশ্নের প্রশংসা করে ব্যাসকে প্রণাম জানান, পদ্মপুরাণের বিন্যাস (ছয় খণ্ড, ৫৫,০০০ শ্লোক) ও পরম্পরা (হরি→ব্রহ্মা→নারদ→ব্যাস→সূত) উল্লেখ করে শ্রবণফলের মহিমা বর্ণনা করে ‘আদিখণ্ড’ আরম্ভ করেন।
Primordial Creation: From Brahman to the Cosmic Egg
অধ্যায়ের শুরুতে সূত বলেন—আদি সৃষ্টির বর্ণনা পরমাত্মার চিরন্তন স্বরূপ উপলব্ধির উপায়। প্রলয়ের পরে কেবল একটিই জ্যোতি অবশিষ্ট থাকে, যাকে ব্রহ্ম বলা হয়েছে। তারপর সাঙ্কখ্য-ক্রমে প্রধানের উদ্ভব, সেখান থেকে গুণভেদে ত্রিবিধ মহৎ, এবং পরে অহংকারের তিন প্রকার প্রকাশ পায়। তামস অহংকার থেকে তন্মাত্রা, আর তন্মাত্রা থেকে ক্রমে পঞ্চমহাভূত জন্মায়—আকাশে শব্দ, বায়ুতে স্পর্শ, অগ্নিতে রূপ, জলে রস, পৃথিবীতে গন্ধ; প্রতিটি পরবর্তী ভূতে নতুন গুণ যুক্ত হয়। এরপর ইন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রিয় ও মন এবং তাদের কার্যাবলি বলা হয়, এবং দেহধারী জীবের উৎপত্তির জন্য ভৌতিক তত্ত্বগুলির সংযোগ কেন অপরিহার্য তা ব্যাখ্যা করা হয়। এই সমবেত তত্ত্বসমূহ জলরাশির উপর ব্রহ্মাণ্ড-ডিম্ব রূপে স্থিত হয়; তার মধ্যে বিষ্ণু ব্রহ্মারূপ ধারণ করে সৃষ্টি করেন, কল্পান্ত পর্যন্ত পালন করেন এবং শেষে সংহার করে সবকিছুকে নিজের মধ্যে লীন করেন—রক্ষা ও প্রলয়ের রূপ গ্রহণ করে।
Qualities of the Five Great Elements; Description of Sudarśana-dvīpa and Mount Meru
ঋষিগণ সূতকে অনুরোধ করেন—নদী, পর্বত, জনপদ এবং পৃথিবীর বিস্তার সম্যকভাবে বর্ণনা করতে। উত্তরে প্রথমে তত্ত্ববিচার স্থাপিত হয়: পঞ্চমহাভূত জগৎব্যাপী, এবং তাদের গুণ ক্রমে বলা হয়—পৃথিবী সর্বাগ্রে পাঁচ গুণযুক্ত (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ), জলে গন্ধ নেই, তারপর অগ্নি, বায়ু ও আকাশে গুণ ক্রমশ হ্রাস পায়। যখন সত্তাগণ নিজ নিজ সীমা অতিক্রম করে না, তখন সাম্য ও শৃঙ্খলা থাকে; সীমালঙ্ঘনে বৈষম্য, দেহধারীদের সংঘাত, এবং জন্ম-মৃত্যুর ধারাবাহিকতা প্রবাহিত হয়। সূত সতর্ক করেন—অচিন্ত্য বিষয়কে কেবল যুক্তি দিয়ে স্থির করা উচিত নয়। এরপর ভূগোলবর্ণন: সুদর্শন-দ্বীপের বৃত্তাকার রূপ, সমুদ্র ও পর্বতসীমা, পিপ্পল বৃক্ষ ও শশচিহ্নের প্রসঙ্গ। মেরুকে কেন্দ্র করে বর্ষ, পর্বত, দেবসমাজের বিন্যাস এবং গঙ্গার বহু ধারায় প্রকাশের বিবরণ দেওয়া হয়।
Description of Uttara-Kuru and the Meru-Flank Regions (Bhadrāśva, Sudarśana Jambū, Solar Attendants)
ঋষিদের প্রশ্নে সূত মেরুপর্বতের উত্তর পার্শ্বের কথা বলেন। সেখানে উত্তর-কুরু এক সিদ্ধসেবিত পবিত্র দেশ—সুগন্ধি, চিরপুষ্পিত বৃক্ষে ভরা। ‘ক্ষীরিণ’ নামক ইচ্ছাপূরণকারী বৃক্ষ থেকে অমৃতসম দুধ ঝরে, আর সেই দুধজাত বস্তু থেকে বস্ত্র, অলংকার প্রভৃতি মনোরথসিদ্ধ দ্রব্যও লাভ হয়। এখানে কর্মফল ও মানবজন্মের যোগ দেখানো হয়েছে—স্বর্গলোক থেকে পতিত কিছু জীব উত্তর-কুরুতে সুন্দর, কুলীন মানব হয়ে জন্মায়; তারা যুগলরূপে সৌহার্দ্যে বাস করে, রোগহীন, দীর্ঘায়ু ও চিরযৌবনধারী। ভদ্রাশ্বের ভদ্রাশাল বনে কালো আমের রস পান করলে তাদের যৌবন ক্ষয় হয় না। নীল ও নিষধ পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে মহা সुदর্শন জাম্বু বৃক্ষের অবস্থান বর্ণিত, যার থেকে ‘জাম্বুদ্বীপ’ নামের প্রসিদ্ধি। শেষে বলা হয়—ব্রহ্মলোক থেকে পতিত কিছু জন ব্রহ্মঘোষক হয়ে সূর্যের পরিচর্যাকারী হয়; তারা সূর্যে প্রবেশ করে এবং সূর্যের তাপে পরে চন্দ্রেও প্রবেশ করে—এই বিশ্বতত্ত্বের উপাখ্যান দিয়ে অধ্যায় শেষ হয়।
Names of Regions and Mountains: Ramaṇaka, Hiraṇmaya, Airāvata, and the Turn to Vaikuṇṭha
ঋষিগণ বর্ষ, পর্বত ও সেখানকার অধিবাসীদের যথাযথ নাম-তালিকা জানতে চান। সূত মহর্ষি বিশ্ববিন্যাসের বর্ণনা শুরু করেন—শ্বেত পর্বতের দক্ষিণে ও নিষধের উত্তরে রমণক বর্ষ, যেখানে মানুষ উচ্চকুলজাত, গৌরবর্ণ, প্রতিদ্বন্দ্বীহীন এবং অতি দীর্ঘায়ু হয়ে সুখে বাস করে। এরপর নীল ও নিষধের মধ্যবর্তী হিরণ্ময় বর্ষের কথা বলা হয়; সেখানে হৈরণ্বতী নদী প্রবাহিত এবং রত্ন ও স্বর্ণনির্মিত মনোরম প্রাসাদসমূহ দীপ্তিমান। শৃঙ্গবতের পরবর্তী ঐরাবত বর্ষে সূর্যের গতি দেখা যায় না, বার্ধক্যও নেই; সেখানকার জীবেরা পদ্মসম দীপ্ত, সুগন্ধিময়, সংযতচিত্ত এবং অন্নবিহীনভাবেই স্থিত থাকে। শেষে বর্ণনা বৈকুণ্ঠমুখী হয়—বৈকুণ্ঠে হরি স্বর্ণময়, মনোজব রথে অধিষ্ঠিত; তিনিই কর্মশক্তি, ভূততত্ত্বসমূহ এবং যজ্ঞতত্ত্ব (যজ্ঞ/অগ্নি) রূপে প্রকাশিত বলে ঘোষিত।
The Glory of Bhārata-varṣa: Enumerating Mountains, Rivers, and Regions
এই অধ্যায়ে ঋষিগণ সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—পুণ্যদায়ী ও মুক্তিদায়ক ভারতবর্ষের মাহাত্ম্য বর্ণনা করুন। সূত ভারতকে মিত্র ও বৈবস্বত মনুর প্রিয় ভূমি বলে প্রশংসা করেন এবং আদর্শ রাজাদের স্মৃতি ও বংশপরম্পরার উল্লেখে এর পবিত্রতা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর পবিত্র ভূগোলের সুশৃঙ্খল বিবরণ শুরু হয়—সাতটি প্রধান পর্বতশ্রেণির নাম উচ্চারিত হয়। তারপর বহু নদীর তালিকা দেওয়া হয়; নদীগুলিকে দেবস্বরূপ, পাপহরিণী ও তীর্থরূপ শুদ্ধিকারিণী উপস্থিতি হিসেবে কীর্তিত করা হয়। শেষে জনপদ ও জনগোষ্ঠীর গণনা, আর্য–ম্লেচ্ছ সীমার ইঙ্গিতসহ, উপসংহৃত হয়। বলা হয়—এই জ্ঞান অল্প হলেও সাধকের সামর্থ্য অনুযায়ী ধর্ম-অর্থ-কাম এই ত্রিবর্গে ফল প্রদান করে।
Yuga Order, Lifespan Measures, and Traits of Beings in Bhārata-varṣa
ঋষিগণ সূতকে জিজ্ঞাসা করলেন—ভারতবর্ষ ও হিমবতের বিস্তার কত, এবং এখানে জীবদের আয়ু, বল ও শুভ-অশুভ অবস্থার লক্ষণ কী। সূত উত্তরে ভারতবর্ষের যুগ-ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করলেন—কৃত, ত্রেতা, দ্বাপর ও তিষ্য (কলি) যুগ। তিনি আয়ুর মান নির্দিষ্ট করলেন—কৃতে ৪০০০, ত্রেতায় ৩০০০, দ্বাপরে ২০০০; আর তিষ্যে আয়ু অত্যন্ত ক্ষীণ, অস্থির ও দুঃখবহুল হয়। কৃতযুগে প্রজারা বলবান ও রূপবান; ঋষিরা তপস্যায় সমৃদ্ধ এবং ক্ষত্রিয়েরা বীর। ত্রেতায় চক্রবর্তী সম্রাটদের প্রাধান্য; দ্বাপরে তেজের সঙ্গে পারস্পরিক বিনাশের প্রবণতা; আর কলিতে ক্রোধ, লোভ, মিথ্যা, ঈর্ষা, কপটতা ও দ्रोহ প্রবল হয়। মধ্যবর্তী সংক্ষিপ্ত প্রসঙ্গে দ্বাপরের মধ্যভাগ-সম্পর্কে গুণোত্তর, হৈমবত ও হরিবর্ষের নামও উল্লেখিত।
Description and Measurements of Śākadvīpa (with Oceans, Mountains, Varṣas, and Rivers)
এই অধ্যায়ে সপ্তদ্বীপ-জগতবর্ণনা এগিয়ে যায়। প্রথমে জম্বুদ্বীপের বিস্তার ও জম্বুপর্বতের পরিমাপ বলা হয়, তারপর তার দ্বিগুণ বিস্তৃত লবণসমুদ্রের উল্লেখ আসে। এরপর জম্বুদ্বীপের দ্বিগুণ শাকদ্বীপের পরিচয় দেওয়া হয়, যা ক্ষীরসমুদ্রে পরিবেষ্টিত বলে বর্ণিত। তারপর শাকদ্বীপের অন্তর্গত বিন্যাস—রত্নময় পর্বতসমূহ (মেরু প্রভৃতি সহ মলয়, জলধার, রৈবতক, শ্যামগিরি ও দুর্গশৈল), বর্ষবিভাগ এবং পর্বত-ব্যক্তিনাম-সম্পর্কিত নাম-পরম্পরা/বংশসংকেত—উপস্থাপিত হয়। সেখানে শিবভক্তি, সিদ্ধ ও চারণের উপস্থিতি, চৌর্যহীনতা এবং দণ্ডনির্ভর রাজশাসনের অভাবের কথা বলা হয়েছে। গঙ্গাধারা ও বহু পবিত্র নদীর নামও উচ্চারিত হয়। শেষে ঋষিগণ আরও বিস্তারিত বিবরণ প্রার্থনা করেন—এই অধ্যায়টি যেন বিস্তৃত বর্ণনার দ্বাররূপে দাঁড়ায়।
Description of Continents, Oceans, Regions, and the Measure of the World
অধ্যায়ের শুরুতে সূত উত্তরদ্বীপসমূহের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন; পরে অন্তর্লীন সংলাপে পুলস্ত্য বিশ্বভূগোলের বিস্তৃত বিবরণ দেন। ঘৃত, দধিরস, সুরা ও ক্ষীরের সমুদ্র; সমুদ্রবেষ্টিত পর্বতমালা; এবং ক্রমে ক্রমে আকারে বৃদ্ধি পেতে থাকা দ্বীপগুলির তালিকা এখানে বর্ণিত। মনঃশিলা, কৃষ্ণ, মহাক্রৌঞ্চ, গোমন্ত প্রভৃতি পবিত্র স্থানের উল্লেখ আছে এবং নারায়ণ/কেশবকে দিব্য রত্নসমূহের অধিষ্ঠাতা ও রক্ষক রূপে দেখানো হয়েছে। সুনামা, সুদুর্ধর্ষ, হেমপর্বত, কুমুদ, পুষ্পবান, কুশেশয়, হরিগিরি প্রভৃতি পর্বত; এবং ঔদ্ভিদ থেকে কপিল পর্যন্ত বর্ষ-প্রদেশগুলির গণনা করা হয়েছে, ক্রৌঞ্চাদি পর্বতের সঙ্গে যুক্ত অঞ্চলবিভাগও বলা হয়েছে। কিছু দেশে মৃত্যু-রোগ-অরাজকতার অভাবসহ আদর্শ সমাজের চিত্র আছে; ঈশ্বরকে একধর্মের ধারক ও লোকের ব্যক্তিগত পালক-রাজা বলা হয়েছে। শেষে মহাবিশ্ব-ব্যবস্থাধারী পর্বত ও দিক্গজদের বর্ণনা; শ্রবণফলে সমৃদ্ধি, তেজবৃদ্ধি ও পিতৃতৃপ্তি লাভ হয়—এ ফলশ্রুতি পার্বণী ক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত।
Inquiry into Sacred Fords and the Merit of Earth-Circumambulation (Narada–Yudhishthira; Entry into the Dilipa–Vasistha Episode)
ঋষিগণ পৃথিবীর পরিমাপ ও নদীনালার বিবরণ শুনে সন্তুষ্ট হয়ে সুতকে অনুরোধ করলেন—সমস্ত পবিত্র তীর্থের পূর্ণ বর্ণনা এবং প্রত্যেক তীর্থের বিশেষ ফল যেন বলা হয়। সুত বললেন, এ প্রশ্ন মহাপুণ্যদায়ক, এবং তিনি প্রাচীন এক সংলাপের সূত্রপাত করলেন—বনবাসকালে পাণ্ডবদের নিকট, ধর্মে অটল দ্রৌপদীসহ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে নারদের সাক্ষাৎ। নারদকে শ্রদ্ধাভরে অভ্যর্থনা করা হল। তিনি যুধিষ্ঠিরকে বর দিতে প্রস্তুত হয়ে প্রশ্ন করতে বললেন। তখন ধর্মপুত্র জিজ্ঞাসা করলেন—যে ব্যক্তি তীর্থভক্তিতে সমগ্র পৃথিবী পরিক্রমা করে, তার পূর্ণ ফল কী? নারদ উত্তরে দৃষ্টান্তরূপে দিলীপ–বসিষ্ঠ প্রসঙ্গ আনলেন—ভাগীরথীর গঙ্গাদ্বারে দিলীপ রাজা তर्पণ ও বিধিবদ্ধ কর্ম সম্পন্ন করছিলেন; বসিষ্ঠ আগমন করলে রাজা পূজা করলেন, ঋষি প্রসন্ন হলেন—এভাবেই তীর্থফল-উপদেশের ভূমিকা রচিত হল।
Description of the Fruits of Pilgrimage (Puṣkara Tīrtha Māhātmya)
এই অধ্যায়ে বিনয়, ইন্দ্রিয়সংযম ও সত্যবাদিতাকে ঋষিকে তুষ্টকারী যোগ্যতা বলা হয়েছে; এ গুণে দেব/পিতৃসান্নিধ্য বা দর্শনের সম্ভাবনাও জাগে। এরপর পৃথিবী-পরিক্রমার ফল এবং সামগ্রিকভাবে তীর্থধর্মের তত্ত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। উপদেশে বলা হয়—তীর্থযাত্রার ‘প্রকৃত ফল’ কেবল সংযমীদেরই লাভ হয়: যারা দেহ-মন নিয়ন্ত্রিত, ছলনা ও অহংকারমুক্ত, সন্তুষ্ট, শুচি, সত্যনিষ্ঠ ও সমদর্শী, এবং ভক্তিসম্পন্ন। তারপর ব্যয়বহুল যজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়, যা দরিদ্রের পক্ষে দুর্লভ; তীর্থযাত্রা যজ্ঞসম বা তদপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুণ্যদায়িনী। পুষ্করকে সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থরূপে মহিমান্বিত করা হয়েছে—তার স্মরণমাত্রেই পাপশুদ্ধি; সেখানে ব্রহ্মার নিবাস; দেব-পিতৃপূজা, স্নান এবং এক ব্রাহ্মণকে ভোজন করালেও অশ্বমেধ ও দীর্ঘকালীন অগ্নিহোত্রের তুল্য মহাপুণ্য লাভ হয়।
Pilgrimage Itinerary: Jambū-path and Associated Tīrthas (Merit of Aśvamedha/Agniṣṭoma)
এই অধ্যায়ে স্বর্গখণ্ডের অন্তর্গত তীর্থযাত্রার পথনির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বশিষ্ঠ মুনি রাজাকে বলেন—শুভ প্রদক্ষিণা করে পিতৃ, দেব ও ঋষিদের সম্মানিত জাম্বূ-পথে প্রবেশ করতে। এরপর ক্রমান্বয়ে দুলিকার আশ্রম, অগস্ত্যাশ্রম, কন্যাশ্রম ও ধর্মারণ্য, যযাতিপতন, মহাকাল, কোটিতীর্থ, উমাপতির পবিত্র স্থান এবং ভদ্রবট/ঈশানক্ষেত্রের উল্লেখ আছে। যাত্রাপথে সংযত আহার, একাকী প্রবেশ, পিতৃ-দেব পূজা ও স্বল্প উপবাসের বিধান করা হয়েছে; নর্মদায় তর্পণকৃত পুণ্য বিশেষভাবে প্রশংসিত। এই তীর্থসেবায় অশ্বমেধ ও অগ্নিষ্টোম যজ্ঞসম তুল্য ফল, সমৃদ্ধি, স্বর্গে সম্মান এবং শিবকৃপায় গণপতি-সম পদলাভের কথা বলা হয়েছে।
Narmadā Māhātmya with the Praise of Amarakantaka Tīrthas
এই অধ্যায়ে বসিষ্ঠের নর্মদা-স্তব স্মরণ করে প্রশ্ন ওঠে—তিনি কেন সর্বত্র প্রসিদ্ধ পাপহরিণী তীর্থ? নারদ নর্মদাকে নদীশ্রেষ্ঠা বলে ঘোষণা করেন—তিনি সকল প্রাণীকে পার করান এবং পাপ বিনাশ করেন। অন্য নদী বিশেষ স্থানে পবিত্র বা কালের পরে শুদ্ধিদায়িনী; কিন্তু নর্মদা সর্বত্রই পবিত্র, কেবল দর্শনেই শুদ্ধি দেন—এই তুলনামূলক নদীতত্ত্ব বর্ণিত। এরপর পশ্চিম কলিঙ্গ অঞ্চলে অবস্থিত অমরকণ্টককে ত্রিলোক-পাবন পবিত্র পর্বত বলা হয়েছে, যেখানে ঋষিগণ সিদ্ধি লাভ করেন। সেখানে স্নান, একরাত্রি উপবাস, ব্রহ্মচর্য, সংযম, অহিংসা এবং জনেশ্বর ও রুদ্রকোটী প্রভৃতি স্থানে শ্রাদ্ধ-পিণ্ডদান করলে পিতৃগণ অতিশয় তৃপ্ত হন ও স্বর্গীয় ফল লাভ হয়; শেষে রুদ্রলোকপ্রাপ্তি ও শুভ পুনর্জন্মের ফলশ্রুতি ঘোষিত।
Origin of Jaleśvara Tīrtha and the Devas’ Appeal to Śiva against Bāṇa/Tripura (Nārada’s Mission)
এই অধ্যায়ে নর্মদাকে সর্বপবিত্র নদীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে মহিমা করা হয়েছে এবং তার তীরে অবস্থিত নানা তীর্থের পরিচয় দেওয়া হয়েছে; পরে প্রসিদ্ধ জलेশ্বর-তীর্থের উৎপত্তিকথা বলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাহিনি অগ্রসর হয়। প্রাচীন কালে ঋষিগণ, ইন্দ্র ও মরুদ্গণ ভয়ংকর দানব বাণ এবং তার চলমান দিব্য নগরী ত্রিপুরার আতঙ্কে শিবের স্তব করে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। নর্মদাতীরে মহেশ্বর তাঁদের আশ্বস্ত করেন এবং ত্রিপুরা-বধের উপায় চিন্তা করে নারদকে ডেকে দ্রুত ত্রিপুরায় প্রেরণ করেন। নারদ রত্নময় নগরীতে প্রবেশ করলে বাণ তাঁকে সম্মান করে। নারদ গৃহজনকে, বিশেষত অনৌপম্যাকে, তিলধেনু-দান, শুভ তিথি ও সংক্রান্তি-সন্ধিক্ষণে নারীদের উপবাস-ব্রত প্রভৃতি পুণ্যকর্মের উপদেশ দেন। তিনি ব্যক্তিগত দান গ্রহণ না করে দরিদ্র ব্রাহ্মণদের দান করতে বলেন এবং প্রস্থান করেন; তাঁর গমনে ত্রিপুরায় এক সূক্ষ্ম ‘ভেদ’ বা অশান্তির বীজ রোপিত হয়।
The Burning of Tripura and the Sacred Greatness of Amarakāṇṭaka (Jvāleśvara on the Narmadā)
নর্মদাতীরে হরেশ্বরক্ষেত্রে রুদ্র ত্রিপুর-বধের আয়োজন করেন। দেবতা ও বৈদিক তত্ত্বসমূহে গঠিত এক দিব্য রথ ও অস্ত্র-ব্যবস্থা প্রস্তুত হয়; তারপর শরে বিদ্ধ ত্রিপুর প্রলয়সম অগ্নিতে ফেটে পড়ে। দিগ্দাহ, উৎপাত ও ভয়ংকর লক্ষণ দেখা দেয়; কাতর প্রাণীরা, বিশেষত নারীরা, অগ্নিকে দোষারোপ করে বিলাপ করে। বৈশ্বানর/অগ্নি বলে—সে ঈশ্বরের আদেশেই কাজ করছে, স্বেচ্ছায় নয়। এই ধ্বংসের মধ্যেই দানব বাণ শিবের অনন্য সর্বাধিপত্য উপলব্ধি করে। সে মস্তকে লিঙ্গ ধারণ করে টোটক ছন্দে স্তোত্র নিবেদন করে শরণ প্রার্থনা করে; প্রসন্ন শঙ্কর তাকে অভয়, রক্ষা ও অবধ্যতার বর দেন। পরিশেষে মহাজাগতিক ঘটনার স্মৃতি তীর্থ-মাহাত্ম্যে রূপ নেয়—ত্রিপুর-পতনের সঙ্গে যুক্ত অংশ/প্রকাশ শ্রীশৈল ও অমরকণ্টকে শৈব-সান্নিধ্য স্থাপন করে। নর্মদার অমরকণ্টকে সেই দাহস্মৃতি ‘জ্বালেশ্বর’ নামে প্রসিদ্ধ। গ্রহণকালে স্নান ও অমরকণ্টক-যাত্রায় মহাপুণ্য এবং রুদ্রলোকপ্রাপ্তি কথিত।
Māhātmya of the Kāverī–Narmadā Confluence (Patreśvara Tīrtha): Sin-Removal and Merit
এই অধ্যায়ে কাবেরী–নর্মদার সঙ্গমকে বিশ্ববিখ্যাত পাপহর তীর্থরূপে মহিমা করা হয়েছে। যুধিষ্ঠির-প্রধান ঋষিগণ ‘সঙ্গমের সত্য কাহিনি কী এবং পাপীও কীভাবে মুক্তি পায়’—এই প্রশ্ন করলে পুলস্ত্য মুনি ভীষ্মকে সেই বৃত্তান্ত বলেন। কুবের এই ঘাটে একশো দিব্যবর্ষ তপস্যা করেন। মহাদেব শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন—কুবের যক্ষদের আদ্য প্রতিষ্ঠাতা ও অধিপতি হবেন; পরে নিজ বংশে তাঁর অভিষেক সম্পন্ন হয়। এর দ্বারা তীর্থফল নির্দেশিত—এখানে স্নান ও শিবপূজায় অশ্বমেধযজ্ঞসম পুণ্য লাভ হয় এবং রুদ্রলোক প্রাপ্তি ঘটে; দীর্ঘ স্বর্গসুখ ভোগের পর পুণ্যক্ষয়ে ধর্মপরায়ণ রাজা হয়ে পুনর্জন্ম হয়। এই জলের পান চন্দ্রায়ণব্রতসম পুণ্য দেয়; স্থানটি ‘পত্রেশ্বর’ নামে পাপনাশে শ্রেষ্ঠ বলে খ্যাত।
Narmadā Tīrtha-Māhātmya: Patreśvara and the Sequence of Sacred Fords
এই অধ্যায়ে নারদ ও পুরাণবক্তা রাজাকে (যুধিষ্ঠিরকেও) উদ্দেশ করে নর্মদার উত্তর তীরের তীর্থযাত্রার ক্রম বর্ণনা করেন। যাত্রা শুরু হয় পত্রেশ্বর থেকে—এক যোজন বিস্তৃত, সর্বপাপহর তীর্থ বলে খ্যাত। পরপর তীর্থে স্নান করলে ক্রমে দেবলোকীয় আনন্দ, ইচ্ছিত রূপলাভ, দীর্ঘ দিব্যভোগ, ব্রহ্মলোকে সম্মান, রুদ্রলোকে গমন, গোলোকপ্রাপ্তি এবং এমনকি অপরাজেয়ত্ব পর্যন্ত ফল বলা হয়েছে। ইন্দ্রজিত, মেঘরাব/মেঘনাদ, ব্রহ্মাবর্ত, অঙ্গারেশ্বর, কপিলা-তীর্থ, কাঞ্চী-তীর্থ, কুণ্ডলেশ্বর, পিপ্পলেশ্বর ও বিমলেশ্বর/দেবশিখা প্রভৃতি বহু তীর্থ ও শিবলিঙ্গস্থানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। শেষে নর্মদাকে রুদ্রসম্ভূতা ও নদীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে মহিমা কীর্তন করা হয়; স্তোত্রাংশে নিত্য পাঠে বর্ণানুসারে ফল, এবং নর্মদাস্মরণকে নিত্য পোষণ ও শুদ্ধির উৎস বলা হয়েছে—যা ব্রহ্মহত্যার মতো মহাপাপ থেকেও মুক্তি দেয়।
Tīrtha-Māhātmya Sequence: Sacred Fords, Baths, Gifts, and Śrāddha (Narmadā-Belt Itinerary)
এই অধ্যায়ে (স্বর্গখণ্ড) নর্মদা-তটের তীর্থমাহাত্ম্যের ধারাবাহিক যাত্রাপথ বর্ণিত। পুলস্ত্য মুনি রাজা/ভীষ্মকে উদ্দেশ করে বলেন—প্রতি তীর্থে বিধিপূর্বক স্নান, উপবাস, দান (স্বর্ণ, গোদান, বৃষোৎসর্গ) এবং পিতৃকর্ম—পিণ্ডদান ও শ্রাদ্ধ—অবশ্য পালনীয়। স্কন্দ-তীর্থ, আঙ্গিরস, লাঙ্গল, বটেশ্বর, সঙ্গমেশ্বর, ভদ্রতীর্থ, অঙ্গারেশ্বর, অয়োনিসঙ্গম, পাণ্ডবেশ্বরক, কম্বোটিকেশ্বর, চন্দ্রভাগা, শক্র-তীর্থ, ব্রহ্মাবর্ত, কপিলা-তীর্থ, নর্মদেশ্বর, মাসেশ্বর, নাগেশ্বর, কালেশ্বর, অহল্যা-তীর্থ, সোম-তীর্থ, স্তম্ভ-তীর্থ, যোধনীপুর (বিষ্ণু-তীর্থ), অমোহক এবং সিদ্ধেশ্বর/কুসুমেশ্বর—প্রতিটির বিশেষ বিধান ও ফল উল্লেখ করা হয়েছে। এই তীর্থসেবায় জন্মান্তরের পাপ ক্ষয় হয়, অক্ষয় পুণ্য সঞ্চিত হয়, রুদ্র/সোম/সূর্যলোকে সম্মান লাভ হয়, সমৃদ্ধি ও রাজ্যসৌভাগ্য বৃদ্ধি পায় এবং অজেয়তা প্রাপ্তি ঘটে। বিশেষত সিদ্ধেশ্বরে প্রাতঃকালে পূজার দ্বারা মুক্তিলাভের কথাও বলা হয়েছে।
The Greatness of Śukla Tīrtha: Bathing, Fasting, Charity, and Śiva Worship
এই অধ্যায়ে প্রথমে ভক্তকে মহাপুণ্যদায়ক তীর্থসমূহের দিকে প্রবৃত্ত করা হয়, তারপর শুক্ল-তীর্থের উৎপত্তি ও সর্বোচ্চ মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়। হিমালয়ের এক দিব্য পরিবেশে উমাসহ মহাদেব গণসমূহে পরিবৃত হয়ে আসীন; সেখানে এক প্রার্থনাকারী (বা মার্কণ্ডেয়) সংসার-অতিক্রমের সহজ পথ এবং পাপ-নাশক শ্রেষ্ঠ তীর্থ জানতে চান। শিব শুক্ল-তীর্থের প্রশংসা করেন—এখানে স্নান করলে ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি ঘোর পাপও নাশ হয়। গ্রহণকাল ও তিথি-পর্বের সন্ধিক্ষণে এর পুণ্য বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়, এবং এর পরিক্রমা এক যোজন পর্যন্ত বিস্তৃত বলা হয়েছে। ব্রতবিধানে দিন-রাত উপবাস, রাত্রিজাগরণ গান-নৃত্যসহ, প্রভাতে স্নান, ঘৃতাভিষেকসহ শিবপূজা, গুরুকে ভোজন করানো ও সত্যধর্মে দান করার নির্দেশ আছে। এতে অক্ষয় ফল, দিব্য ভোগ, এবং শেষে পুনর্জন্মমুক্তি ও শিবলোকে সম্মান লাভ হয়।
Pilgrimage Sequence on Sacred Fords (Narmadā Region): Bhṛgu-tīrtha, Śiva-vratas, and Merit Amplification
এই অধ্যায়ে পুলস্ত্য ঋষি ভীষ্মকে নর্মদা-তীরের তীর্থযাত্রার ক্রম বর্ণনা করেন। নরক-তীর্থ, গো-তীর্থ, কপিলা, গণেশ্বর, ভৃগু-তীর্থ, গৌতমেশ্বর, এরণ্ডী, কনখল, ঈশ-তীর্থ, বরাহ-তীর্থ, সোম-তীর্থ, রুদ্রকন্যা, দেবতীর্থ ও শিখিতীর্থ প্রভৃতিতে স্নান-উপাসনা এবং নির্দিষ্ট তিথিতে—জ্যৈষ্ঠ চতুর্দশী, অঙ্গারক-যোগ, শ্রাবণ কৃষ্ণ-চতুর্দশী, ভাদ্রপদ অমাবস্যা, দ্বাদশী ও পূর্ণিমা—ব্রত পালনের বিধান বলা হয়েছে। কপিলা গরু দান, ব্রাহ্মণভোজন, তর্পণ ও গ্রহণকালে দানকে পুণ্যবৃদ্ধিকারী ও পাপক্ষয়কারী বলা হয়েছে। মধ্যে ভৃগু–শিব–পার্বতীর উপাখ্যান আসে। ভৃগুর “করুণাভ্যুদয়” স্তোত্রে মহাদেব প্রসন্ন হয়ে বর দেন এবং রুদ্রবেদী প্রদান করে ভৃগু-তীর্থকে প্রতিষ্ঠা করেন; এ তীর্থ পাপনাশক, এবং সেখানে মৃত্যু পর্যন্ত মুক্তিদায়ক বলে কীর্তিত। অধ্যায়ে পুনঃপুনঃ বলা হয়—এখানকার আচার অশ্বমেধ যজ্ঞসম ফলদায়ক, এবং ভক্ত রুদ্রলোক বা বিষ্ণুলোক লাভ করে পুনর্জন্মে প্রত্যাবর্তন করে না।
Narmadā Pilgrimage Itinerary: Sequence of Tīrthas, Rites, and Fruits
এই অধ্যায়ে নারদ রাজেন্দ্রকে পুলস্ত্যের বচনানুসারে নর্মদা-তীরের তীর্থযাত্রার ক্রম শোনান। নর্মদা-মণ্ডলের নানা তীর্থের নাম ও ধারাবাহিকতা বর্ণিত হয়েছে, এবং সেখানে স্নান, উপবাস, দীপদান, পিতৃদের উদ্দেশে পিণ্ড-তর্পণ, ও বৃষভদান প্রভৃতি দানের বিধান বলা হয়েছে। প্রত্যেক তীর্থের নির্দিষ্ট ফল উল্লেখিত—পাপক্ষয়, ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি মহাদোষের নাশ, পুত্র-পশু-ধনলাভ ও কামনা-সিদ্ধি, নরকভয় থেকে মুক্তি এবং পুনর্জন্ম-নিবৃত্তি। আরও বলা হয়েছে পিতৃলোক, রুদ্রলোক, ব্রহ্মলোক প্রাপ্তি, ইন্দ্রসম রাজ্যৈশ্বর্য বা গণেশ্বর-পদ লাভের কথা। শেষে বিমলেশ্বর/সাগরেশ্বর প্রসঙ্গের শ্রেষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই মাহাত্ম্য শ্রবণ-পাঠ সকল বর্ণের জন্য, এমনকি মন্দবুদ্ধির জন্যও, মহাশুভফলদায়ক বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
Narmadā (Revā) Tīrtha Greatness: The Gandharva Maidens’ Curse Narrative (Acchodā Episode Begins)
অধ্যায় ২২-এ প্রথমে রেবা/নর্মদার মহাতীর্থ-মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়, তাঁর নামস্মরণ ও জলের এক ফোঁটাও অশুচিতা দগ্ধ করে পাপক্ষয় করে এবং মুক্তিদান করে; তাই নর্মদা সর্বতীর্থশ্রেষ্ঠা। রাজার প্রশ্নে কাহিনি এগোয়। অচ্ছোদা সরোবরতীরে গৌরীপূজায় নিবিষ্ট পাঁচ গন্ধর্ব/অপ্সরা-কন্যা—প্রমোহিনী, সুশীলা, সুস্বরা, সুতারা ও চন্দ্রিকা—যৌবন, কলানৈপুণ্য ও ভক্তিতে উজ্জ্বল বলে বর্ণিত। সেখানে এক সুদর্শন ব্রহ্মচারী আসে; তাকে দেখে তারা কামাবিষ্ট হয়ে তাকে নিজেদের করতে চায়, কিন্তু সে আশ্রমধর্ম ও বিবাহকর্মের যথাকাল-নিয়ম ব্যাখ্যা করে তাদের নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করে। বিবাদ তীব্র হলে পরস্পর শাপ ঘটে—ব্রহ্মচারী তাদের পিশাচী হওয়ার শাপ দেয়, আর তারাও তাকে তদ্রূপ শাপ দেয়। ফলে সকলেই ভয়ংকর অবস্থায় পতিত হয়। এই উপাখ্যান দেখায়, পবিত্র স্থানে থেকেও অধর্মপ্রসূত আকাঙ্ক্ষার ফল কঠিন এবং কর্মবিপাক অনিবার্য; এখানেই অচ্ছোদা-পর্বের সূচনা।
The Greatness of the Revā (Narmadā): Release from the Piśāca Curse
লোমশ মুনি আগমন করলে ক্ষুধাতুর পিশাচেরা তাঁর কাছে আসে, কিন্তু তাঁর তেজ সহ্য করতে না পেরে দূর থেকেই দণ্ডবৎ প্রণাম করে শরণ প্রার্থনা করে। তাদের একজন আবেদনকারী বলে—সৎসঙ্গের মহিমা এমন যে, প্রসিদ্ধ তীর্থে স্নান করলেও সাধুসমাগমের তুল্য পুণ্য হয় না। তারা নিজেদের পরিচয় দেয়—আমরা গন্ধর্বকন্যা ও এক ব্রাহ্মণপুত্র; পরস্পরের শাপে পিশাচরূপে পতিত হয়েছি। করুণাবশত লোমশ ধর্মপথে স্মৃতি-প্রত্যাবর্তন ও শাপক্ষয়ের উপায় জানান এবং একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত নির্ধারণ করেন—রেবা (নর্মদা) নদীতে বিধিপূর্বক স্নান। অধ্যায়ে রেবার পাপনাশিনী ও মুক্তিদায়িনী শক্তি প্রশংসিত হয়েছে; অন্যান্য নদীর ফলের তুলনা ও প্রধান প্রধান নদীর নামও উল্লিখিত। রেবাজলের এক ফোঁটাতেই তারা শুদ্ধ হয়ে দিব্যরূপ লাভ করে, নর্মদার স্তব করে, বিবাহ ও পূজা সম্পন্ন করে বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হয়। এই কাহিনি শ্রবণও পাপনাশক বলে ঘোষিত।
Pilgrimage Itinerary and Merits: Sindhu–Sarasvatī–Ocean Confluences and Named Tīrthas
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে নারদের মাধ্যমে এবং অন্তর্নিহিত ঋষিবাণী (পুলস্ত্য প্রভৃতি) দ্বারা বসিষ্ঠ-কথিত তীর্থমাহাত্ম্যের ধারাবাহিক বিবরণ চলতে থাকে। তীর্থযাত্রীর জন্য ব্রহ্মচর্য, ইন্দ্রিয়সংযম, সংযত আহার ও নিয়মপালন অপরিহার্য বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ সিন্ধু অঞ্চলে চর্মণ্বতী, অর্বুদ, বসিষ্ঠাশ্রম, পিঙ্গা-তীর্থ, প্রভাস, সরস্বতী–সাগর-সঙ্গম, বরদান, দ্বারাবতী, পিণ্ডারক, তিমী/তিমিরাত্র, বসুধারা, সিন্ধুতম, ব্রহ্মতুঙ্গ, রেণুকা-তীর্থ, পঞ্চনদ, ভীমা, গিরিকুঞ্জ ও বিমলা প্রভৃতি নামিত তীর্থের যাত্রাপথ বর্ণিত। প্রত্যেক স্থানে স্নান, পূজা, প্রদক্ষিণা ও পিতৃতর্পণের ফলশ্রুতি বলা হয়েছে—মহাযজ্ঞসম পুণ্য, বিপুল গোদানসম ফল, পাপক্ষয়, স্বর্গে সম্মান এবং শেষ পর্যন্ত পুনর্জন্ম থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি।
Merits of Vitastā, Devikā, Rudrakoṭī and Sarasvatī Sacred Fords
অধ্যায় ২৫-এ কাশ্মীর-সম্পর্কিত বিতস্তা নদী থেকে শুরু করে নানা তীর্থের ধারাবাহিক যাত্রা বর্ণিত হয়েছে, যেখানে শ্রৌত যজ্ঞের মহিমা সহজ তীর্থাচরণে সুলভ হয়ে ওঠে। বিতস্তায় স্নান ও পিতৃতর্পণকে বাজপেয় যজ্ঞের সমতুল্য ফলদায়ক বলা হয়েছে। এরপর মালদা তীর্থে সন্ধ্যাকালীন স্নান-সন্ধ্যা, এবং সাত-শিখা অগ্নিতে চরু-হোমের বিধান আছে; এই হোমকে বিপুল গোদান ও মহাযজ্ঞের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ফলদায়ক বলে প্রশংসা করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে রুদ্রের ধামে প্রবেশে অশ্বমেধের ফল লাভের কথা বলা হয়। দেবিকা তীর্থকে বিশ্বখ্যাত শৈবস্থান হিসেবে কীর্তিত করা হয়েছে এবং ব্রাহ্মণ-উৎপত্তির প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কামাখ্যা প্রভৃতি নামোল্লিখিত স্থানে দর্শনে সিদ্ধি ও মৃত্যুভয়-নাশক নির্ভয়তা লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এরপর ‘দীর্ঘসত্র’ নামে এক দিব্য যাগসত্রের উল্লেখ আছে—যাত্রা শুরু করলেই যার পুণ্য সঞ্চিত হয়। সরস্বতীর গুপ্ত হয়ে পুনরায় প্রকাশিত প্রবাহকে চমসোদ্ভেদ, শিবোদ্ভেদ, নাগোদ্ভেদ, শশয়ান/পুষ্করা প্রভৃতি তীর্থের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; কার্তিক-স্নান, রুদ্রকোটীর মুনি-প্রসঙ্গ, এবং শেষে চৈত্রের শুভ তিথিতে সঙ্গমে জনার্দন-পূজার মাধ্যমে অধ্যায় সমাপ্ত।
Kurukṣetra and Sarasvatī Tīrthas: Pilgrimage Itinerary and the Sanctification of Rāma-hrada (Paraśurāma’s Lakes)
এই অধ্যায়ে কুরুক্ষেত্র ও সরস্বতী-তীর্থমালাকে কেন্দ্র করে তীর্থযাত্রার সুসংবদ্ধ পথনির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শ্রদ্ধা, সংযত আহার, প্রয়োজনে ব্রহ্মচর্য এবং বিধিপূর্বক স্নান—এই নিয়মাচরণে তীর্থযাত্রা মহাযজ্ঞসম ফল দেয় এবং সহস্র গোধন প্রভৃতি মহাদানের তুল্য পুণ্য লাভ হয়। বহু তীর্থ (কিছু ‘দ্বারপাল’ তীর্থসহ) একে একে উল্লেখ করে প্রত্যেকটির বিশেষ ফল ও প্রাপ্তিলোক—ব্রহ্মলোক, সূর্যলোক, নাগলোক, বিষ্ণুলোক ইত্যাদি—বর্ণিত হয়েছে। মধ্যভাগে রামহ্রদে ভৃগুরাম পরশুরামের স্মৃতি-কথা যুক্ত হয়। তাঁর পিতৃগণ পিতৃভক্তির প্রশংসা করে তপস্যার দ্বারা প্রায়শ্চিত্তের পথ দেখান এবং বর দেন যে তাঁর হ্রদসমূহ বিশ্ববিখ্যাত তীর্থ হবে। সেখানে স্নান ও পিতৃতর্পণে দুর্লভ বর, পাপশুদ্ধি ও কল্যাণসিদ্ধি লাভ হয়—এভাবে ভূগোল, পিতৃকর্ম ও মুক্তিচিন্তা এক ভক্তিময় মানচিত্রে একত্রিত হয়েছে।
Tīrtha-Māhātmya of the Sarasvatī Region and the Praise of Kurukṣetra (Pilgrimage Merits)
এই অধ্যায়ে সরস্বতী-অঞ্চলের তীর্থসমূহ ও কুরুক্ষেত্রের মাহাত্ম্য ধারাবাহিক তীর্থযাত্রার রূপে বর্ণিত। শুরু হয় কন্যা-তীর্থ ও ব্রহ্মযোনি/ব্রহ্মার ধাম থেকে; পরে সোম-তীর্থ ও সপ্তসারস্বতে মঙ্কণক ঋষির উপাখ্যান—আনন্দোন্মত্ত নৃত্য, শিবের হস্তক্ষেপ, এবং স্নানের পর পূজার মহিমা—বিশেষভাবে বলা হয়েছে। এরপর ঔশনস, কপালমোচন, অগ্নি-তীর্থ, বিশ্বামিত্র-তীর্থ, পৃথূদক, মধুস্রব, সরস্বতী–অরুণা-সঙ্গম, শতসহস্রক/সাহস্রক, রেণুকা-তীর্থ, পঞ্চবট, কুরু-তীর্থ, অস্থিপুর, স্থাণুবট, বদরী, দধীচি, কন্যাশ্রম, সংনিহিতী, গঙ্গা-হ্রদ প্রভৃতি বহু তীর্থের নামক্রম দেওয়া হয়েছে। স্নান, উপবাস, শ্রাদ্ধ ও দেবপূজাকে বারবার শ্রৌত যজ্ঞের সমতুল্য ফলদায়ক বলা হয়েছে এবং শেষে কুরুক্ষেত্রের সীমানির্ণয় ও তার পরম পবিত্রতার বিস্তৃত স্তব করা হয়েছে।
Tīrtha-Māhātmya: Dharmatīrtha, Plakṣādevī Sarasvatī, Śākambharī, and Suvarṇa (Kṛṣṇa–Rudra Episode)
এই অধ্যায়টি তীর্থ-মাহাত্ম্যকে কেন্দ্র করে এক ধারাবাহিক তীর্থযাত্রার বর্ণনা। শুরু হয় ধর্মতীর্থ দিয়ে—ধর্মের তপস্যায় প্রতিষ্ঠিত এই স্থানে স্নান ও সেবায় ধর্মবৃদ্ধি, মনঃসংযম এবং বংশশুদ্ধির ফল বলা হয়েছে। এরপর কলাপ ও সৌগন্ধিক অরণ্যের কথা আসে; সেখানে প্রবেশমাত্রেই পাপক্ষয় হয় এবং দিব্য সত্তাদের সান্নিধ্য লাভ হয়। তারপর সরস্বতীকে ‘প্লক্ষাদেবী’ রূপে স্তব করা হয়েছে—উইঢিবি/ভাল্মীক থেকে উদ্ভূত জল এবং ঈশানাধ্যুষিত ভাল্মীকি-ঘাটে স্নান-দান অশ্বমেধ ও মহাদানের তুল্য, বরং বহুগুণ পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে। পরে সুগন্ধা, শতকুম্ভা, পঞ্চযজ্ঞ, ত্রিশূলপাত্র প্রভৃতি তীর্থের ক্রমবর্ণনা, যেখানে গণপতির পার্ষদদের সান্নিধ্য ও পুণ্যবৃদ্ধির কথা আছে। শেষাংশে রাজগৃহে দেবী শাকম্ভরীর মাহাত্ম্য—তিন রাত্রি সংযমসহ অবস্থান এবং শাক-আহারভিত্তিক ব্রতের বিধান। ‘সুবর্ণ’ তীর্থে কৃষ্ণ রুদ্রের আরাধনা করে বর লাভ করেছিলেন—এই প্রসঙ্গে শৈব কৃপায় মহাফল প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে; ধূমাবতী ও নরথাবর্তে প্রদক্ষিণা এবং মহাদেবের অনুগ্রহে অধ্যায়ের উপসংহার।
The Greatness of the Kāliṇdī (Yamunā): Merit of Bathing, Charity, and Faith
এই অধ্যায়ে কালীন্দী (যমুনা) নদীর তীর্থ-মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। নারদ রাজাকে তীর্থযাত্রা ও কালীন্দীতটে স্নানের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন এবং বলেন—সেখানে স্নান করলে অশুভ ভাগ্য, পাপ ও ভয় থেকে রক্ষা হয়, আয়ু, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী অংশে যমুনাস্নানের ফলকে পুষ্কর, কুরুক্ষেত্র ও অবিমুক্তের মতো প্রসিদ্ধ তীর্থের সমান বা তদপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। শ্রদ্ধাসহকারে করা কর্ম পূর্ণ ফল দেয়, আর শ্রদ্ধাহীন আচার-অনুষ্ঠান অন্যত্রও অর্ধফলমাত্র দেয়—এ কথা নানা উপমায় বোঝানো হয়েছে; কালীন্দীকে কামধেনু ও চিন্তামণির ন্যায় পাপনাশিনী, ইচ্ছাপূরিণী ও ভক্তি-উদ্দীপক বলা হয়েছে। মথুরার সঙ্গে যুক্ত হলে কালীন্দী বিশেষভাবে মোক্ষদায়িনী—এ কথাও উচ্চারিত। শেষে নীতিবচনে বলা হয়, কপটতা, ক্রোধ, অবহেলা, বাক্য-অশুচিতা ও অশ্রদ্ধায় ধর্ম, তপস্যা, বিদ্যা, দান, মন্ত্র ও ব্রত নষ্ট হয়; অতএব সাধনার মূল ভিত্তি শ্রদ্ধা।
The Legend of Hemakuṇḍala: Charity, Decline of the Sons, and Yama’s Judgment
নারদ রাজাকে কৃতযুগের এক প্রাচীন উপাখ্যান শোনান। নিষধ দেশে বৈশ্য হেমকুণ্ডল বাণিজ্য ও কৃষিকর্মে বিপুল স্বর্ণ সঞ্চয় করেন; বার্ধক্যে সেই ধন ধর্মকার্যে নিয়োজিত করেন—বিষ্ণু ও শিবের মন্দির নির্মাণ, পুকুর‑বাওড়ি খনন, উদ্যান রোপণ, প্রতিদিন অন্নদান, পথিকদের আশ্রয় এবং অতিথিসেবা ও প্রায়শ্চিত্তাদি পালন করেন। শেষে তিনি অরণ্যে গিয়ে গোবিন্দের আরাধনা করে বৈষ্ণব লোক লাভ করেন। তাঁর পুত্র শ্রীকুণ্ডল ও বিকুণ্ডল অহংকারে অধর্মাচারী হয়ে সম্পদ ভোগবিলাসে নষ্ট করে দারিদ্র্যে পতিত হয়; পরে চৌর্যবৃত্তি করে নির্বাসিত হয়ে শিকারি হয়। হিংস্র মৃত্যুর পর যমদূতেরা তাদের যমসভায় নিয়ে যায়; চিত্রগুপ্তের বিবরণ অনুসারে যম একজনকে রৌরব নরকে প্রেরণ করেন, অপরজনকে স্বর্গ দান করেন।
Karma, Non-Violence, Tīrtha & Gaṅgā Merit, Vaiṣṇava Protection, Śālagrāma Worship, and Ekādaśī as Deliverance
বৈকুণ্ডল নামে এক বৈশ্য স্বর্গে গিয়ে দেখে যে তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নরকে যন্ত্রণা ভোগ করছে। বিস্মিত হয়ে সে দেবদূতকে কারণ জিজ্ঞাসা করে। দেবদূত বলেন—প্রত্যেকে নিজের কর্মফলই ভোগ করে; ব্রাহ্মণের সঙ্গে সদ্ভাব ও মাঘ মাসে যমুনা-তীর্থে স্নান ইত্যাদি পুণ্যকর্মের ফলে বৈকুণ্ডল স্বর্গলাভ করেছে। এরপর অধ্যায়ে ধর্মের বিস্তৃত উপদেশ আছে—অহিংসাই পরম ধর্ম; হিংসাকারীদের যমযাতনা ও অধম যোনিতে পুনর্জন্মের কথা বলা হয়েছে। দান, সত্য, সংযম, শুচিতা, তীর্থাচরণের বিধি, এবং গঙ্গার অতুল পবিত্রতা বর্ণিত; প্রাণায়াম ও মন্ত্রজপকে শুদ্ধিকারক বলা হয়েছে। কামাচার-নীতি এবং পিতা-মাতা ও গুরুর সম্মানও নির্দেশিত। বৈষ্ণবদের উপর যমের অধিকার নেই—এ কথা বিশেষভাবে ঘোষিত। শালগ্রাম পূজা ও একাদশী ব্রতকে মুক্তিদায়ক বলা হয়েছে। শেষে বৈকুণ্ডল পূর্বজন্মে সন্ন্যাসীদের আতিথ্য থেকে অর্জিত পুণ্য ভ্রাতাকে দান করে; ভ্রাতা নরক থেকে মুক্ত হয়ে উভয়ে স্বর্গে গমন করে। শ্রবণ-পাঠকারীদের জন্যও মহাপুণ্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
Sequential Description of Pilgrimage Fords and Their Merits (Tīrtha-Itinerary)
অধ্যায় ৩২-এ তীর্থযাত্রার ক্রমানুসার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। নারদ (এবং পুরাণীয় উপদেশধর্মী বচন) রাজা/ভারতকে সম্বোধন করে সুগন্ধ তীর্থ, রুদ্রাবর্ত, গঙ্গা–সরস্বতী-সঙ্গম, কর্ণহ্রদ (যেখানে শঙ্কর-উপাসনা বিধেয়), কুব্জাম্রক এবং অরুন্ধতীর বটবৃক্ষের কথা বলেন। সেখানে সামুদ্রক স্নান ও তিন রাত্রির উপবাসকে বিশেষ পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে; পরে ব্রহ্মাবর্তে গমনের নির্দেশ আছে। এরপর যমুনা ও তার উৎস, দর্ভী-সংক্রমণ, এবং সিন্ধুর উৎসতীর্থের উল্লেখ করে সিন্ধুতে পাঁচ রাত্রি অবস্থান ও স্বর্ণদানকে মহাফলপ্রদ বলা হয়েছে। ঋষিকুল্যায় বসিষ্ঠ ও উশনসের ‘পুণ্যপ্রবাহ’, ভৃগুতুঙ্গে এক মাস শাকাহার-ব্রত, বীরপ্রমোক্ষে কার্ত্তিক/মাঘ মাসের বিশেষ মাহাত্ম্য, সন্ধ্যা-তীর্থ ও বিদ্যা-তীর্থে জ্ঞানলাভ, মহালয়-সম্পর্কিত উপবাসবিধি, মাহেশ্বর দর্শনে বংশপরম্পরার কল্যাণ, এবং বেতসিকা, সুন্দরিকা, ব্রাহ্মণিকা ও নৈমিষে প্রবেশমাত্রে পাপনাশ—এই সব তীর্থমাহাত্ম্য সংক্ষেপে উপস্থাপিত।
The Greatness of Avimukta (Kāśī/Vārāṇasī) and the Doctrine of Liberation-in-One-Life
যুধিষ্ঠির নারদের কাছে বারাণসী (কাশী)-র মহিমা বিস্তারে জানতে চান। নারদ বলেন—মেরুশিখরে প্রাচীন এক সংলাপে দেবী পার্বতী মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কঠিন যোগ ও বৈদিক সাধনা ছাড়া কীভাবে দ্রুত ভগবানের দর্শন লাভ করা যায়, গোপন উপায় কী। শিব উত্তর দেন—অবিমুক্ত/বারাণসী তাঁর পরম গুহ্য ক্ষেত্র, যেন পরম জ্ঞানই; সেখানে বাস, পূজা এবং বিশেষত সেখানেই দেহত্যাগ মোক্ষদায়ক। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে শিব স্বয়ং ‘তারক ব্রহ্ম’ উপদেশ দেন—এতেই এক জন্মেই মুক্তির তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত। অধ্যায়ে কাশীকে অন্যান্য তীর্থের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে; মহাপাপী ও নানা প্রাণীর পাপক্ষয় পর্যন্ত অসাধারণ ফল ঘোষণা করা হয়েছে। তাই মোক্ষার্থীদের অটল সংকল্পে মৃত্যুপূর্ব পর্যন্ত কাশীতে বাস করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
The Glory of the Oṃkāra Pañcāyatana Liṅga and Kāśī’s Secret Five Liṅgas
অধ্যায়ের শুরুতে নারদ শুদ্ধ ও দীপ্তিমান ওঁকার-লিঙ্গের স্তব করেন; তার স্মরণমাত্রেই পাপ ক্ষয় হয়। এরপর স্বর্গখণ্ডের বর্ণনাকার কাশীতে পঞ্চায়তন/পাশুপত জ্ঞানের পরম মাহাত্ম্য বলেন—এখানে মহাদেব পঞ্চরূপে অধিষ্ঠিত থেকে মুক্তি দান করেন। মৎস্যোদরী নদীতীরে ‘গোচর্ম-পর্যন্ত’ সীমাবদ্ধ এক ক্ষুদ্র তীর্থকে সর্বোচ্চ ওঁকারেশ্বর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারপর শম্ভুর কৃপায় মাত্র জ্ঞাত গোপন পাঁচ লিঙ্গের পরিক্রমা উল্লেখিত—কৃত্তিবাসেশ্বর, মধ্যমেশ্বর, বিশ্বেশ্বর, ওঁকার ও কন্দর্পেশ্বর। পরে কৃত্তিবাসেশ্বরের মহিমা দানব-হস্তী প্রসঙ্গে প্রকাশ পায়: নিত্যপূজারত ব্রাহ্মণদের রক্ষায় শিব আবির্ভূত হয়ে দানবকে বধ করেন এবং তার চর্ম ধারণ করায় ‘কৃত্তিবাস’ নামে প্রসিদ্ধ হন। শেষে বারাণসীর তপস্বী ও বৈদিক ব্রাহ্মণদের প্রশংসা—শতরুদ্রিয় পাঠ, অন্তর্মুখ ধ্যান ও শিবনিষ্ঠা। কৃত্তিবাসের শরণ নিলে দ্রুত মোক্ষ লাভ হয়—এই সিদ্ধান্তে অধ্যায় সমাপ্ত।
Glorification of Vārāṇasī: Kapardīśvara Liṅga and the Piśācamocana Tīrtha
এই অধ্যায়ে নারদ রাজাকে কাশী (বারাণসী)-স্থিত পরম পুণ্যদায়ক কপর্দীশ্বর লিঙ্গ এবং নিকটবর্তী পিশাচমোচন তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন। সেখানে স্নান ও পিতৃতর্পণ করলে পাপক্ষয় হয় এবং ভোগ ও মোক্ষ—উভয় ফল লাভ হয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। উদাহরণে দেখা যায়, বাঘসদৃশ এক দৈত্যের তাড়া খেয়ে এক হরিণী বারবার কপর্দীশ্বরের প্রদক্ষিণ করে; তখন এক দিব্য প্রকাশ ঘটে, যা ক্ষেত্রের উদ্ধারশক্তির নিদর্শন। পরে তপস্বী শঙ্কুকর্ণ এক ক্ষুধার্ত পিশাচের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন—সে পূর্বে অবহেলাকারী ব্রাহ্মণ ছিল; কপর্দীশ্বর স্মরণ করে পিশাচমোচন কুণ্ডে স্নান করায় সে মুক্ত হয়ে দিব্য জ্যোতিতে ঊর্ধ্বলোকে গমন করে। শঙ্কুকর্ণ রুদ্রের পরম তত্ত্বময় স্তব করেন; দীপ্তিমান লিঙ্গ প্রকাশিত হয় এবং তিনি তাতে লীন হন; শেষে শ্রবণ-পাঠের ফলশ্রুতি বলা হয়েছে।
The Glory of Vārāṇasī: Madhyameśvara and the Mandākinī Rite
এই অধ্যায়ে কাশী/বারাণসীর মহিমা মধ্যমেশ্বর লিঙ্গকে কেন্দ্র করে বর্ণিত। সেখানে মহাদেব দেবীসহ রুদ্রগণের মধ্যে নিত্য অধিষ্ঠান করেন। কাহিনিতে আরও বলা হয়—হৃষীকেশ/কৃষ্ণ এক বছর সেখানে ভস্মলেপন করে রুদ্রের উপদেশ অধ্যয়ন করেন এবং ব্রহ্মচারী শিষ্যদের সঙ্গে পাশুপত ব্রত পালন করেন। তখন শিব নীললোহিত রূপে প্রকাশিত হয়ে বর দেন—যাঁরা বিধিপূর্বক গোবিন্দের পূজা করেন, তাঁরা সর্বব্যাপী ও সর্বাধিপ জ্ঞান এবং অচল ভক্তি লাভ করেন। পরে তীর্থফল বলা হয়েছে: এখানে স্নান ও শিবদর্শন, এবং মন্দাকিনীতে স্নান—কামনা পূর্ণ করে, ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি মহাপাতকও নাশ করে, এবং পরম ধামে পৌঁছে দেয়। মধ্যমেশ্বর পূজায় জ্ঞান, দান, তপ, শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের ফল প্রাপ্ত হয়; এখানে কৃত কর্ম সাত পুরুষকে পবিত্র করে, বিশেষত সূর্যগ্রহণে আচমনসহ করলে। পুণ্য দশগুণ বৃদ্ধি পায়, আর ভক্তিভরে এই মাহাত্ম্য শ্রবণকে সর্বোচ্চ অবস্থাদায়ক বলা হয়েছে।
The Glory of Vārāṇasī (Catalogue of Tīrthas and a Liṅga-Installation Episode)
এই অধ্যায়ে বারাণসীর তীর্থ-মাহাত্ম্য ভক্তিভরে বর্ণিত। নারদ যুধিষ্ঠিরকে উদ্দেশ করে তীর্থ-তালিকা আরম্ভ করেন; পরে প্রয়াগ, বিশ্বরূপ, গৌরী-তীর্থ, কপালমোচন, মণিকর্ণী প্রভৃতি বহু পবিত্র স্থানের নাম উল্লেখ করে তাদের মহিমা প্রকাশ করা হয়। মাঝখানে লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠার একটি সংক্ষিপ্ত কাহিনি আছে—ব্রহ্মা প্রাচীন লিঙ্গ স্থাপন করতে এলে বিষ্ণু আগে থেকেই তা প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রহ্মার প্রশ্নে বিষ্ণু রুদ্রের প্রতি অচঞ্চল ভক্তি ঘোষণা করে বলেন, এই লিঙ্গ রুদ্রের নামেই প্রসিদ্ধ হবে। শেষে বলা হয়, বারাণসীর তীর্থ অগণিত; যুগের পর যুগেও তাদের সম্পূর্ণ বর্ণনা করা অসম্ভব।
The Glory of Gayā and the Pilgrimage Circuit of Allied Tīrthas
এই অধ্যায়ে নারদের প্রশ্নে পুলস্ত্য গয়াক্ষেত্রের মহিমা ও বারাণসী-পরবর্তী বিস্তৃত তীর্থপরিক্রমার কথা বলেন। গয়ার দর্শনমাত্রেই অশ্বমেধযজ্ঞসম পুণ্য লাভ হয়; বিশেষ করে অক্ষয়বটের নিকটে স্নান করে পিতৃদের উদ্দেশ্যে তর্পণ-শ্রাদ্ধ করলে বংশোদ্ধার ও অক্ষয় ফল প্রাপ্তি ঘটে বলে বর্ণিত। এরপর বহু সহায়ক তীর্থের ধারাবাহিক বিবরণ আসে—ব্রহ্মসর/যূপ, ধেনুক, গৃধ্রবট, সাবিত্রীস্থান, যোনিদ্বার, ফল্গু, ধর্মপৃষ্ঠ, ব্রহ্মতীর্থ, রাজগৃহ, মণিনাগ, অহল্যাসর, জনককূপ, গণ্ডকী-শালগ্রাম, মাহেশ্বরপদ, তীর্থকোটি প্রভৃতি। এসব স্থানে স্নান, অভিষেক, ভস্মসহ স্নান, উপবাস, তিল-ধেনুদান ও অন্যান্য দানের দ্বারা বাজপেয়, রাজসূয়, অগ্নিষ্টোম যজ্ঞসম ফল এবং সোম, সূর্য, ইন্দ্র, বিষ্ণু ও মহেশের লোকপ্রাপ্তি প্রতিশ্রুত হয়েছে।
Account of Various Sacred Tīrthas (Pilgrimage Merits and Prayāga Supremacy)
অধ্যায় ৩৯-এ বহু তীর্থ—নদী, সঙ্গম, সরোবর, বন ও পর্বত—ক্রমে বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি তীর্থে ত্রিরাত্র-ব্রত, স্নান, দান, জপ প্রভৃতি আচরণের বিধান ও তার ফল বলা হয়েছে; সেই ফল অশ্বমেধ, বাজপেয়, অগ্নিষ্টোম, রাজসূয় প্রভৃতি মহাযজ্ঞ এবং সহস্র-গোদান, বৃষদান ইত্যাদি দানের সমতুল্য বলে ঘোষিত। এরপর প্রয়াগের, বিশেষত গঙ্গা–যমুনা সঙ্গমের, সর্বোচ্চ মাহাত্ম্য বিস্তারে প্রতিপাদিত হয়। সেখানে নামশ্রবণ-স্মরণ, দর্শন, নমস্কার, স্নান ও দানে পুণ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, পাপ ক্ষয় হয় এবং বংশপরম্পরায় উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। তুঙ্গক বনের প্রসঙ্গ বেদধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভাবও স্মরণ করায়। শেষে নারদ ও বশিষ্ঠকে কেন্দ্র করে রাজযশের (দিলীপ-দৃষ্টান্ত) সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—এই অধ্যায় পাঠে বুদ্ধি, ঐশ্বর্য, সন্তান, জয় ও স্বর্গলাভ হয়; আর যাত্রা অসম্ভব হলে মানস তীর্থযাত্রাও পুণ্যকর বলে স্বীকৃত।
Praise of Pilgrimage (Tīrtha) and Prelude to the Greatness of Prayāga
অধ্যায়টি পূর্ববর্তী তীর্থ-তালিকার উপসংহার টেনে জানায় যে সকল তীর্থই ‘বিষ্ণুর দেহ’, এবং একটিমাত্র তীর্থের সান্নিধ্যও মুক্তির কারণ হতে পারে। কলিযুগে তীর্থের কথা শ্রবণ ও তীর্থ-সেবা পাপক্ষয়ের প্রধান উপায় বলে প্রশংসিত; তবু সর্বতীর্থ-স্নানের চেয়েও ব্রাহ্মণ-সেবাকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। ‘দ্বিজ-পদ’—ব্রাহ্মণের চরণ/ব্রাহ্মণকে পবিত্র আশ্রয়রূপে—তার নিত্য পূজার নির্দেশ দেওয়া হয়। অশ্বত্থ, তুলসী ও গোর প্রদক্ষিণায় সর্বতীর্থ-ফল লাভের কথাও বলা হয়েছে। এরপর ঋষিগণ প্রয়াগের বিস্তৃত মাহাত্ম্য জানতে চান। সূত তখন প্রাচীন এক কথোপকথন শুরু করেন—ভারতযুদ্ধের পরে শোকাকুল যুধিষ্ঠিরের কাছে মার্কণ্ডেয় ঋষি আসেন। যুধিষ্ঠির প্রায়শ্চিত্ত ও উচ্চতর জ্ঞান প্রার্থনা করলে মার্কণ্ডেয় তাঁকে সাংখ্য, যোগ এবং বিশেষত প্রয়াগের পথে নির্দেশ দেন, প্রয়াগকে পুণ্যবানদের জন্য সর্বোত্তম তীর্থ বলে মহিমা কীর্তন করেন।
The Glory of Prayāga: Merit of Bathing, Remembrance, and Divine Protection
অধ্যায়ের শুরুতে যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন—প্রাচীন কালে কীভাবে প্রয়াগে গমন করা যেত এবং সেখানে মৃত্যু, স্নান ও বাসের ফল কী। মার্কণ্ডেয় বলেন, তিনি ঋষিদের এক প্রাচীন উপদেশ-সংলাপ থেকে এ কথা শুনেছেন। প্রয়াগকে প্রজাপতির পরম পবিত্র ক্ষেত্র বলা হয়েছে; তার বিস্তৃত অঞ্চলে নাগদের বাস, আর দেবতাদের সমন্বিত রক্ষাকবচ রয়েছে—ব্রহ্মা ও দেবগণ, ইন্দ্র, হরি, সূর্য এবং মহেশ্বর, বিশেষত বটবৃক্ষের নিকটে। এখানে মুক্তিদায়ক সাধনার ধাপে ধাপে ফল বলা হয়েছে—প্রয়াগ স্মরণ, দর্শন, নামোচ্চারণ, সেখানকার মাটি লাভ, স্নান ও জলপান—প্রতিটি পাপক্ষয় করে, বর প্রদান করে এবং বংশপরম্পরায়ও শুদ্ধি আনে। গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী স্নানের ফল সত্য, অহিংসা ও ধর্মনিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত। যে সাধকরা নিয়মে সেখানে বাস করেন—যেমন এক ব্রহ্মচারীর এক মাস অবস্থান—তারা ইষ্টফল ও শুভ জন্ম লাভ করে।
The Greatness of Prayāga: Fruits of Pilgrimage, Remembrance, and Cow-Gift
এই অধ্যায়ে প্রয়াগের পরম মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। গঙ্গা–যমুনার সঙ্গমে গমন ও স্নানমাত্রেই পাপক্ষয় হয়; দুঃখক্লিষ্ট লোকেরাও যদি সেখানে বাস করতে যায়, তাদের ধর্মলাভ নষ্ট হয় না—এ কথা বলা হয়েছে। সঙ্গমে দেহত্যাগকারীদের পরলোকফল উল্লেখ করা হয়েছে—দিব্য বিমানপ্রাপ্তি, গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের সঙ্গে আনন্দভোগ, এবং পুণ্য ক্ষয় হলে সমৃদ্ধ বংশে পুনর্জন্ম। বিশেষভাবে ‘স্মরণ’-এর মাহাত্ম্য প্রকাশিত: প্রয়াগকে স্মরণ করলেই তীর্থফল লাভ হয়, আর মৃত্যুকালে প্রয়াগস্মরণকারী ব্রহ্মলোকে গমন করে। অতঃপর দানধর্মের প্রসঙ্গ, বিশেষত সঙ্গমে যোগ্য ব্রাহ্মণকে গো-দান করার বিধান ও মহাফল। গো-দানে স্বর্গীয় সম্মান, নরকভয় থেকে রক্ষা, এবং সকল দানের মধ্যে গো-দানকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে।
Glorification of Prayāga (The Gaṅgā–Yamunā Confluence)
এই অধ্যায়ে গঙ্গা–যমুনার সঙ্গমস্থল প্রয়াগকে সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থরূপে মহিমা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রয়াগের নামমাত্র শ্রবণ বা তার মাটির স্পর্শেও পাপক্ষয় হয়। তীর্থযাত্রার ধর্মসম্মত পদ্ধতি নির্দেশিত—নিয়মসহ স্নান, সামর্থ্য অনুযায়ী দান এবং শুদ্ধ সংকল্প; লোভ বা মোহে করা কর্মের ফল নষ্ট হয়। এখানে দেবতা, ঋষি, পিতৃগণ, নাগ এবং স্বয়ং হরি প্রয়াগে সমবেত হন—এ কথা বর্ণিত। অক্ষয়বটের মূলের প্রসঙ্গে প্রলয়-স্মৃতি ও রুদ্রলোকের যোগ ইঙ্গিতিত। প্রতিষ্টান, হংসপ্রপাতন, উর্বশী-তট, কোটিতীর্থ ও দশাশ্বমেধক প্রভৃতি উপতীর্থের নাম করে তাদের দর্শন-স্নানে অশ্বমেধ/রাজসূয়সম পুণ্য লাভের কথা বলা হয়েছে। শেষে হরিদ্বার, প্রয়াগ ও গঙ্গাসাগরে গঙ্গার বিশেষ তরণশক্তি প্রশংসিত।
The Greatness of Prayāga (Merits of Māgha Rites and Northern River Fords)
এই অধ্যায়ে প্রয়াগ-মাহাত্ম্যের ধারাবাহিকতায় সঙ্গম-অঞ্চলের নানা তীর্থ ও সময়নির্দিষ্ট আচারের কথা বলা হয়েছে। উত্তর গঙ্গাতীরে ‘মানসা’ ঘাটের মাহাত্ম্য বর্ণিত—সেখানে তিন রাত্রি উপবাস মহাপুণ্যদায়ক, এমনকি কেবল স্মরণ করলেও উদ্ধারলাভ হয় বলে প্রশংসা করা হয়েছে। গঙ্গায় দেহত্যাগকারীদের পরলোকগতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে—দিব্য ভোগ, বিমানযাত্রা, নির্দিষ্ট কাল স্বর্গবাস; পুণ্য ক্ষয় হলে ধনবান বংশে পুনর্জন্ম এবং কখনও রাজত্বলাভ। মাঘ মাসে সঙ্গম-তীর্থযাত্রাকে বিপুল গোদানসম তুল্য বলা হয়েছে; মাঘব্রতে পঞ্চাগ্নি তপস্যাকে বহুদিন স্নানের পুণ্যের সমান গণ্য করা হয়েছে। অতঃপর প্রয়াগের দক্ষিণে, যমুনার উত্তর তীরে ‘ঋণপ্রমোচন’ তীর্থের উল্লেখ আছে—এক রাত্রি অবস্থানেই ঋণবন্ধন মোচন হয় এবং সূর্যলোকপ্রাপ্তি ঘটে বলে বলা হয়েছে।
Glorification of the Yamunā (Yamuna Mahatmya) and Prayāga’s Step-by-Step Aśvamedha Merit
এই অধ্যায়ে প্রয়াগ-মাহাত্ম্য আরও বিস্তৃত হয়। প্রয়াগের পাঁচ যোজন পরিধির পবিত্র পরিক্রমা-ক্ষেত্রে তপস্যা ও তীর্থযাত্রার “অক্ষয় ফল” নির্ধারিত হয়েছে—সেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে অশ্বমেধযজ্ঞসম পুণ্য লাভ হয়। মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে বলেন, এই ফলপ্রাপ্তির মূল শর্ত শ্রদ্ধা; শ্রদ্ধায় রোগনাশ, পাপনাশ এবং পিতৃ-পরম্পরা ও বংশধরদেরও উদ্ধার সাধিত হয়। এরপর যমুনা-মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়। যমুনার দিব্য উৎপত্তি গঙ্গার উৎসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলা হয়েছে; দূর থেকেও তাঁর নামস্মরণে পাপ ক্ষয় হয়। যমুনাজলে স্নান, পান বা সংশ্লিষ্ট তীর্থে দেহত্যাগ করলে শুদ্ধি, বংশোন্নতি ও স্বর্গগতি লাভ হয়; অগ্নিতীর্থ, হরবর-তীর্থ এবং বিরজা/আদিত্য তীর্থের বিশেষ ফল উল্লেখ আছে। শেষে এই কাহিনি পাঠ ও শ্রবণকে তৎক্ষণাৎ পাপনাশক বলা হয়েছে।
Prayāga’s Supremacy Among Tīrthas: Faith, Yoga, Charity, and the Ethics of Attainment
এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির স্মরণ করেন ব্রহ্মার উক্তি—তীর্থ অগণিত। তারপর কথোপকথনে তীর্থের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে: প্রয়াগ প্রসিদ্ধ হলে কুরুক্ষেত্রকে কেন শ্রেষ্ঠ বলা হয়, আর একটিমাত্র স্থানেরই বা প্রশংসা কীভাবে যুক্তিসঙ্গত? মārkaṇḍেয় বলেন, তত্ত্ব উপলব্ধির দ্বার হলো শ্রদ্ধা; পাপে বিদ্ধ মন স্পষ্ট সত্যকেও বিশ্বাস করতে পারে না। শাস্ত্রপ্রমাণে প্রয়াগের মাহাত্ম্য ঘোষিত হয়—অসংখ্য জন্মে দুর্লভ যোগলাভ, ব্রাহ্মণকে রত্নাদি মূল্যবান দানের বিশেষ ফল, এবং প্রয়াগে দেহত্যাগে যোগৈক্যের সিদ্ধি। ব্রহ্ম সর্বব্যাপী বলে সর্বত্র পূজা সম্ভব—এ কথা মানলেও প্রয়াগকে ‘তীর্থরাজ’ রূপে বিশেষভাবে উচ্চাসনে স্থাপন করা হয়। নৈতিক সতর্কতা দেওয়া হয়: প্রধান পবিত্রতার নিন্দা উন্নতি রুদ্ধ করে; চুরি করে পরে দানের আড়াল দিলে শুদ্ধি হয় না; পাপীরা নরকে পতিত হয়। শেষে সত্য ও অসত্যের ফলের বিবরণ পরবর্তীতে বলা হবে—এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে অধ্যায় শেষ হয়।
The Greatness of Prayāga: Confluence Theology and the Totality of Tīrthas
এই অধ্যায়ে প্রয়াগের পরম মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। নৈমিষ, পুষ্কর, গো-তীর্থ, সিন্ধু-মুখ, কুরুক্ষেত্র, গয়া ও গঙ্গাসাগর প্রভৃতি প্রসিদ্ধ তীর্থের তুলনায় প্রয়াগকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। বলা হয়, অসংখ্য তীর্থ চিরকাল প্রয়াগে নিবাস করে; তাই সঙ্গমই সমগ্র তীর্থফলের সংক্ষিপ্ত সমাহার। জাহ্নবী গঙ্গাকে তিন অগ্নিকুণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রয়াগ থেকে ‘প্রবর তীর্থ’ রূপে নির্গত হতে দেখা যায়; দেববাণী—বায়ু—তাঁকে পৃথিবী ও অন্তরিক্ষে দেবত্বের সাররূপে সর্বজনীনভাবে স্তব করে। পরে উপদেশ দেওয়া হয় যে এই মাহাত্ম্য ‘রহস্য’, যোগ্য পাত্রকে বেছে তবেই প্রদানীয়। প্রয়াগের শ্রবণ-স্মরণ পাপক্ষয় করে, পূর্বজন্মস্মৃতিসহ অসাধারণ স্মৃতিশক্তি দেয়, পিতৃপুরুষের উন্নতি সাধন করে এবং স্বর্গলাভ করায়—এমনকি অন্য তীর্থ প্রয়াগের পুণ্যের ষোড়শাংশেরও সমান নয়।
Glorification of Prayāga (Prayāga Māhātmya)
যুধিষ্ঠির প্রয়াগের পবিত্র কাহিনি শুনে মুক্তিদায়ক উপদেশ প্রার্থনা করেন। তখন মার্কণ্ডেয় ত্রিমূর্তির তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন—ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা, বিষ্ণু পালনকর্তা, আর রুদ্র কল্পান্তে বিশ্ব সংহার করেন, তবু তিনি অব্যয় ও অমর। এরপর বলা হয়, এই তত্ত্ব প্রয়াগে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত—সেখানে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের নিবাস। প্রয়াগের তীর্থ-পরিক্রমা পাঁচ যোজন বিস্তৃত, এবং সর্বত্র পাপহর রক্ষক দেবতাদের অবস্থান বর্ণিত। গ্রন্থ নৈতিক গুরুত্ব আরও তীব্র করে জানায়—প্রয়াগে সামান্য পাপও নরকের কারণ হতে পারে, যা তীর্থের সূক্ষ্ম ধর্ম-মর্যাদা প্রকাশ করে। প্রয়াগকে প্রজাপতির পবিত্র ক্ষেত্র, শুদ্ধিদায়ক ও পুণ্যপ্রদ বলে শেষে স্থিতিশীল রাজ্য, ঐক্য ও সদাচারের উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
The Glory of Prayāga (Mahātmyā of the Confluence)
এই অধ্যায়ে সূত পাণ্ডবদের ধর্মনিষ্ঠ আচরণ বর্ণনা করেন—ব্রাহ্মণ, গুরু ও বৃদ্ধদের যথোচিত সম্মান ও সেবা। এরপর বাসুদেবের আগমন ঘটে এবং যুধিষ্ঠিরের রাজধর্মে পুনর্নিবেদন ও অভিষেক-সংকল্প দৃঢ় হয়। মার্কণ্ডেয়ের মঙ্গলময় আবির্ভাব এবং যুধিষ্ঠিরের দানশীলতা কাহিনির নৈতিক-আচারভিত্তি স্থাপন করে। তারপর প্রয়াগ-মাহাত্ম্য প্রকাশিত হয়—প্রয়াগের কীর্তন ও শ্রবণ পাপক্ষয় করে বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তি দেয়; প্রয়াগস্মরণমাত্রও উদ্ধারক; সেখানে গমন ও নিবাস উভয়ই শুদ্ধিদায়ক। ব্যয়বহুল যজ্ঞ দরিদ্রের পক্ষে দুর্লভ—এই কথা বলে ‘গুপ্ত’ উপদেশ দেওয়া হয় যে তীর্থযাত্রা ও অন্তর্গুণ—অক্রোধ, সত্য, ব্রতস্থৈর্য, সর্বভূতে সমদৃষ্টি, অহংত্যাগ—সম্পূর্ণ তীর্থফল প্রদান করে এবং যজ্ঞফলেরও অতীত। বিশেষত মাঘমাসে গঙ্গাভক্তিকে সর্বজনীন মহাধর্মরূপে মহিমা করা হয়েছে।
Praise of Devotion to Viṣṇu (The Supremacy of Hari’s Name over All Tīrthas)
ঋষিগণ জিজ্ঞাসা করেন—তীর্থসেবার ফল কী, এবং এমন কোন একক কর্ম আছে যা সকল তীর্থের সম্মিলিত পুণ্য দান করে। উত্তরে উপদেশ বাহ্য তীর্থকর্মের চেয়ে হরিভক্তিকে মুখ্য করে, কর্মযোগের সঙ্গে নামস্মরণকে শ্রেষ্ঠ বলে প্রতিষ্ঠা করে। অধ্যায়ে বারবার বলা হয়—হরি/কৃষ্ণনাম জপ, হরির পরিক্রমা, বিষ্ণুমূর্তির দর্শন, তুলসীর সেবা ও বিষ্ণুপ্রসাদ (শেষ) গ্রহণ পাপ নাশ করে এবং সকল পবিত্র স্নান ও মন্ত্রফলের সমান ফল দেয়। জন্মভেদ নির্বিশেষে ভক্তরা পূজনীয়; আর হরিকে অন্য দেবতার সমান ভাবা আধ্যাত্মিক বিপদের কারণ বলে নিন্দিত। শেষে কর্মযোগসহ কৃষ্ণ/বিষ্ণুর স্থির উপাসনাই কৃপা ও মুক্তির নিশ্চিত পথ—এ কথা উপসংহারে বলা হয়েছে।
Teaching on Karma-yoga (Discipline of Action as Worship)
ঋষিগণ সূতকে জিজ্ঞাসা করলেন—যে কর্মযোগে হরি প্রসন্ন হন এবং মোক্ষ লাভ হয়, তা ব্যাখ্যা করুন। সূত বললেন, পূর্বে দীপ্তিমান মুনিরা ব্যাসকে একই প্রশ্ন করেছিলেন; তখন ব্যাস মনু-প্রজাপতি প্রদত্ত সনাতন বিধান অবলম্বনে ব্রাহ্মণ-প্রধান কর্মযোগের উপদেশ দেন। এখানে আচারের বিধানই মুখ্য—উপনয়নের সময়, ব্রহ্মচারীর লক্ষণ (দণ্ড, মেখলা, অজিন), যজ্ঞোপবীতের উপাদান ও ধারণ-পদ্ধতি, উপবীত/নিবীত/প্রাচীনাবীতের প্রয়োগ, সন্ধ্যা-উপাসনা ও অগ্নিকর্ম। সহজ নিবেদন দিয়ে পূজা, বর্ণানুসারে প্রণাম-শিষ্টাচার, এবং ‘গুরু’ চিহ্নিত করে সেবা—মাতা-পিতা, আচার্য, বয়োজ্যেষ্ঠ, আর নারীদের ক্ষেত্রে স্বামী—বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। শেষে ব্রাহ্মণের আশীর্বাদদাতা-রূপ ও বর্ণসমূহে গুরুস্থান প্রতিষ্ঠা করে বলা হয়—সংযত আচরণ ধর্মরক্ষা, আর হরিকে নিবেদিত কর্মই ভক্তিরূপ কর্মযোগ।
Procedure of Ācamana and Rules of Ritual Purity (Śauca)
অধ্যায় ৫২ (পদ্মপুরাণ ৩.৫২) শৌচ ও আচমনের বিধানকে নির্দেশরূপে উপস্থাপন করে। ভোজন, নিদ্রা, স্নান, থুতু ফেলা, মল-মূত্রাদি ত্যাগ, মিথ্যা ভাষণ, চৌরাস্তা/শ্মশান প্রভৃতি স্থানের স্পর্শ এবং নানা সামাজিক সংস্পর্শের পরে পুনরায় শুদ্ধির জন্য আচমন বা শৌচ আবশ্যক—এমন উপলক্ষগুলি এখানে বলা হয়েছে; বসার ভঙ্গি, দিক-নিয়ম, জলের বিশুদ্ধতা ও মনোযোগের কথাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এরপর হাতে অবস্থিত ‘তীর্থ’ (ব্রহ্মতীর্থ প্রভৃতি) কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা ব্যাখ্যা করে আচমনের ক্রমে মুখ, চোখ, নাসিকা, কর্ণ, হৃদয়, শির, স্কন্ধ ইত্যাদি স্পর্শের বিধি বলা হয়েছে এবং এই স্পর্শ-ক্রিয়াগুলি নির্দিষ্ট দেবতাদের প্রীতিদায়ক বলে ব্যাখ্যাত। শেষে অশৌচ অবস্থায় বস্তু-ব্যবহার, মল-মূত্র ত্যাগের নিষিদ্ধ স্থান এবং জনসমক্ষে/পবিত্র স্থানে শিষ্টাচারের অতিরিক্ত নিয়ম দিয়ে অধ্যায়টি সমাপ্ত হয়।
Teaching of Karma-yoga (Student Conduct, Vedic Study, and Gāyatrī Supremacy)
অধ্যায় ৫৩‑এ ব্রহ্মচারীর শৃঙ্খলাকে কর্মযোগরূপে নির্ধারণ করা হয়েছে। গুরুর প্রতি পরম ভক্তি, দেহ‑বাক্‑সংযম, শৌচ, বিনয়, গুরুসেবা ও আচরণবিধি, এবং গুরুর সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা, পরিহাস বা অবমাননা নিষিদ্ধ—এসব নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর বৈদিক নিয়মাবলি—নিত্য স্বাধ্যায়, প্রণব (ॐ)‑এর যথাযথ ব্যবহার, চার বেদ ও পুরাণের সঙ্গে সম্পর্কিত হোম‑দানাদি—বর্ণিত হয়। শেষে গায়ত্রী‑জপের সর্বোচ্চ মহিমা ঘোষণা করে তাকে বেদের সার বলে, বেদপাঠের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ফলদায়ক বলা হয়েছে। পরে বেদোপাকরণ‑কাল, ঋতুভেদে অধ্যয়নের সময়সীমা, এবং অনধ্যায় (পাঠবিরতি)‑র বহু কারণ—ঝড়‑বৃষ্টি, বজ্র‑গর্জন, অশুভ লক্ষণ, অশৌচ, বিশেষ তিথি, মৃত্যু ইত্যাদি—বিস্তারিত বলা হয়েছে। উপসংহারে অর্থচিন্তা ছাড়া কেবল মুখস্থ পাঠকে নিন্দা করে, মনুস্মৃতি প্রভৃতি অনুসারে আজীবন সংযমসহ অধ্যয়ন‑আচরণের উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
The Duties and Conduct of the Graduate (Snātaka) and the Householder
অধ্যায় ৫৪ (পদ্মপুরাণ ৩.৫৪) স্নাতকের জন্য বেদ‑বেদাঙ্গ অধ্যয়ন সমাপ্ত করে গুরুকে সম্মান জানিয়ে সমাবর্তন‑স্নান করে গৃহস্থধর্মে প্রবেশের সংক্ষিপ্ত ধর্মবিধি বর্ণনা করে। দণ্ড, বস্ত্র, যজ্ঞোপবীত, কমণ্ডলু ধারণ, শৌচ‑পরিচ্ছন্নতা, কেশ‑শ্মশ্রু বিন্যাস ও উপযুক্ত বর্ণ‑বেশভূষা প্রভৃতি বাহ্য আচারের নিয়মও বলা হয়েছে। এরপর সামাজিক কর্তব্য—নিজ গোত্রের বাইরে যোগ্য কন্যা নির্বাচন, বিবাহের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ ও নিষিদ্ধ তিথি/চন্দ্রদিন বর্জন, এবং গৃহ্যাগ্নি প্রতিষ্ঠা—উপদেশ দেওয়া হয়। কর্তব্য অবহেলায় নরকপ্রাপ্তির ভয় দেখিয়ে সন্ধ্যা‑উপাসনা, শ্রাদ্ধ, সত্যবাদিতা, সংযম, দয়া‑করুণা, শ্রুতি‑স্মৃতি ও পিতৃপরম্পরা অনুসরণ এবং দাম্পত্যনিষ্ঠার গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। শেষে ক্ষমা, দয়া, বিজ্ঞান ও সত্যকে প্রধান গুণ বলা হয় এবং বিষ্ণু/হৃষীকেশকে জানা‑ই পরম জ্ঞান বলে নির্ণীত। পাঠ‑শ্রবণ‑উপদেশকারীর জন্য ব্রহ্মলোকে সম্মানলাভের ফলশ্রুতি ঘোষিত।
Prohibitions and Rules of Right Conduct (Ācāra): Theft, Speech, Purity, Residence, and Social Boundaries
অধ্যায় ৫৫-এ আচারের ঘন বিধান সংকলিত হয়েছে। শুরুতে অহিংসা, সত্য ও অচৌর্য—এই মূল সংযমগুলি বলা হয়েছে; পরে চুরির সূক্ষ্ম রূপও ব্যাখ্যা করা হয়েছে—ঘাস, জল ইত্যাদিরও পরস্ব হরণ—এবং ব্রাহ্মণ ও দেবসম্পত্তি আত্মসাৎকে মহাপাপ বলে সতর্ক করা হয়েছে। দান ও ভিক্ষার নিয়ম, ভণ্ড ব্রত ও কৃত্রিম সন্ন্যাসের নিন্দা, গুরু ও দেবতার প্রতি আনুগত্যের মহিমা, আর পরনিন্দা ও বেদ-নিন্দাকে প্রায় অপ্রায়শ্চিত্ত্য দোষরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর দ্বিজদের সামাজিক মেলামেশার সীমা, বাসস্থান ও দেশাচারের বিধি, এবং শুচিতা-শিষ্টাচার সম্পর্কিত দীর্ঘ নিষেধমালা আসে—কী দেখা/বলা/ছোঁয়া/খাওয়া উচিত, কোথায় থাকা উচিত ইত্যাদি। জল, অগ্নি, গাভী, মন্দির ও বয়োজ্যেষ্ঠদের নিকটে আচরণের মর্যাদাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সারকথা, বাক্সংযম, আহার-নিয়ম, সঙ্গ-নিয়ন্ত্রণ ও দেহাচরণ শুদ্ধ রেখে ধর্ম রক্ষা করাই এই অধ্যায়ের লক্ষ্য।
Rules of Edible and Inedible Foods
এই অধ্যায়ে অন্নকে শুচিতা ও ধর্মফলের বাহন রূপে দেখিয়ে খাদ্যবিধি সুসংহতভাবে বলা হয়েছে। দ্বিজদেরকে আপৎকাল ব্যতীত শূদ্রের অন্ন গ্রহণে সতর্ক করা হয়; নিন্দিত খাদ্য ভক্ষণে কর্মদোষ, সামাজিক অবনতি এবং পুনর্জন্মজনিত দুঃখফল উল্লেখ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ দাতা ও নিন্দিত পেশার তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং কোন কোন কারণে অন্ন অশুচি হয় তা বলা হয়েছে—পশুর স্পর্শ, অশৌচাবস্থায় থাকা ব্যক্তির সংস্পর্শ, বাসি হওয়া, পোকা লাগা ও নানা দূষণ। কিছু শূদ্র-সম্পর্কিত খাদ্য ও দ্রব্যের সীমিত গ্রহণযোগ্যতা দেখিয়ে পরে ঝাল/গাঁজনজাত বস্তু, নির্দিষ্ট উদ্ভিদ, পাখি ও পশু ইত্যাদির নিষেধ বিস্তারে বর্ণিত। মাংস ভক্ষণ কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত; কেবল যজ্ঞার্পণ বা চরম প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সামান্য ব্যতিক্রম ইঙ্গিত করা হয়েছে। মদ্যপান দ্বিজদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; বিধিভঙ্গ করলে রৌরব নরকপ্রাপ্তি ও ধর্মাধিকারহানির উপসংহার টানা হয়েছে।
Determination of the Householder’s Dharma (Dāna: Types, Recipients, Timing, and Fruits)
এই অধ্যায়ে গৃহস্থধর্মের মেরুদণ্ড হিসেবে দানধর্মকে সুসংবদ্ধভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শ্রদ্ধাসহকারে যোগ্য পাত্রকে দান করলে তা ভোগ ও মোক্ষ—উভয়ই প্রদান করে। দানের বিভাগ—নিত্য, নৈমিত্তিক (প্রায়শ্চিত্ত/উপলক্ষ্যভিত্তিক), কাম্য (ইচ্ছাপূরণার্থ) এবং ভগবৎপ্রীত্যর্থ নিষ্কাম ‘বিমল’ দান—এগুলির শ্রেষ্ঠত্বক্রম নিরূপিত। গৃহস্থকে পরিবার-প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থেকে দান করতে বলা হয়েছে; পাত্র হিসেবে শাস্ত্রজ্ঞ, সংযমী, সদাচারী ব্রাহ্মণকে গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে, মূর্খ-নাস্তিক-পাষণ্ডকে নয়। ভূমি, অন্ন, বিদ্যা, স্বর্ণ, জল, দীপ, গাভী, ঔষধ ইত্যাদি দানের বিশেষ ফলশ্রুতি বর্ণিত—ইহলোকে সমৃদ্ধি, যশ, আরোগ্য এবং পরলোকে স্বর্গাদি লাভ, শেষে মুক্তি। দানের কাল-দেশও নির্দেশিত: বিশেষত বৈশাখব্রত, অমাবস্যা/একাদশী/দ্বাদশী, গ্রহণ, সংক্রান্তি ও তীর্থস্থানে দান অধিক ফলদায়ক। শেষে রাজা ও দাতাদের উপদেশ—দুর্ভিক্ষকালে প্রজাপালন ও দান-সহায়তা অবহেলা করা উচিত নয়। লোভে দান ত্যাগ এবং অযোগ্য বা লোভী ব্যক্তির দানগ্রহণ—উভয়ই নিন্দিত ও পাপজনক বলে ঘোষিত।
Dharma of the Conduct of the Vānaprastha Āśrama (Forest-Dweller Discipline)
এই অধ্যায়ে বনপ্রস্থকে তৃতীয় আশ্রম বলে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। গৃহস্থধর্ম যথাযথভাবে পালন করে বংশ প্রতিষ্ঠিত হলে শুভকালে অরণ্যে গমন করতে বলা হয়েছে। সেখানে অগ্নি রক্ষা, দেবতা ও পিতৃপুরুষের পূজা, অতিথি-সেবা, মিতাহার, শৌচাচার, বল্কলাদি পরিধান ও কেশ-শ্মশ্রু সংযম, বেদাধ্যয়ন, অগ্নিহোত্র ও পঞ্চ-মহাযজ্ঞ, অমাবস্যা-পূর্ণিমা এবং ঋতুযজ্ঞের বিধান বর্ণিত। গ্রাম্য খাদ্য, উপহার ও দান গ্রহণ নিষিদ্ধ; অহিংসা, সত্য এবং রাত্রিনিয়ম বিশেষভাবে প্রশংসিত। যৌনসংগমকে ব্রতভঙ্গকারী বলা হয়েছে এবং ঘটলে প্রায়শ্চিত্তের নির্দেশ আছে। ক্রমে নানা তপস্যার কথা বলে শেষে অন্তর্যাগ, যোগসাধনা, উপনিষদ্-জপ এবং মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে ঐচ্ছিক আত্মসমর্পণরূপ শেষ সাধনার কথাও বলা হয়েছে।
Exposition of the Duties of Ascetics (Saṃnyāsa-Dharma)
এই অধ্যায়ে ব্যাস সন্ন্যাস-ধর্মের বিধান ব্যাখ্যা করেন। বনপ্রস্থের পর সন্ন্যাসকে চতুর্থ আশ্রম বলা হয়েছে এবং জোর দিয়ে বলা হয়—সত্য সন্ন্যাস কেবল প্রকৃত বৈরাগ্য থেকে জন্মায়, বাহ্যিক বেশভূষা মাত্রে নয়। সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্বে প্রাজাপত্য, আগ্নেয় প্রভৃতি প্রস্তুতিমূলক শুদ্ধিকর্মের উল্লেখও আছে। এরপর সন্ন্যাসীদের তিন ভাগ করা হয়েছে—জ্ঞান-সন্ন্যাসী, বেদ-সন্ন্যাসী (একান্ত বেদাধ্যয়নে নিবিষ্ট) এবং কর্ম-সন্ন্যাসী (কর্মত্যাগী)। এদের মধ্যে তত্ত্বজ্ঞ জ্ঞাননিষ্ঠ সন্ন্যাসীকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে; তিনি বাহ্য লক্ষণ ও বাধ্যতামূলক কর্তব্যের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। ভিক্ষুকাচারে নির্ভয়তা, অপরিগ্রহ, সমতা, ব্রহ্মচর্য, অহিংসা, সত্য, সাবধানে পদচারণা, ছাঁকা জল পান, এক বছর স্থায়ী বাস-আসক্তি না রাখা এবং সংযত ভিক্ষা গ্রহণের বিধান আছে। নিত্য স্বাধ্যায়, সন্ধ্যায় গায়ত্রীজপ, প্রণব-ধ্যান ও বেদান্তমুখী সাধনায় সাধক ব্রহ্মসাক্ষাৎকারের যোগ্য হন।
Dharma of the Renunciant: Alms Discipline, Meditation, and Expiations
এই অধ্যায়ে সন্ন্যাসীর ধর্ম ও আচরণবিধি বর্ণিত। জীবিকা ভিক্ষা দ্বারা (অথবা ফল‑মূল দ্বারা) নির্বাহের কথা বলে ভিক্ষা‑শিষ্টাচারের কঠোর নিয়ম দেওয়া হয়েছে—দিনে একবার ভিক্ষা, অল্প কথা, সীমিত গৃহে গমন, অল্পক্ষণ দাঁড়ানো, শৌচ‑শুদ্ধি, ধৌতকর্ম ও আচমন ইত্যাদি। ভোজনকালে সূর্যকে নিবেদন, প্রাণ‑আহুতি‑রূপে কয়েক গ্রাস, এবং সন্ধ্যা‑জপসহ ধ্যানসাধনার সমন্বয়ও নির্দেশিত। এরপর হৃদয়‑পদ্মে ধ্যান, ওঁকারান্ত লয় এবং পরম জ্যোতির তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেই পরম আলোকে অদ্বৈতভাবে মহাদেব/শিব রূপে প্রতিপাদন করা হয়, আবার মুক্তিদায়ক ধ্যানবিষয় হিসেবে বিষ্ণু/নারায়ণের স্মরণও আছে। কাম, অসত্য, চৌর্য, হিংসা ও আহারভঙ্গ প্রভৃতি দোষের জন্য প্রায়শ্চিত্ত—সান্তপন, কৃচ্ছ্র, চন্দ্রায়ণ, প্রাজাপত্য—এবং প্রाणায়ামের সংখ্যা বলা হয়েছে। শেষে যোগ্য ব্যক্তিকেই গোপন উপদেশ দিতে ও অযোগ্য থেকে রক্ষা করতে বলা হয়েছে।
Supremacy of Hari-Bhakti in Kali-yuga; Warnings on Sensual Attachment; Praise of Brāhmaṇas, Purāṇa-Listening, and Gaṅgā
এই অধ্যায়ে কলিযুগে হরি-ভক্তির সর্বোচ্চ মাহাত্ম্য ঘোষণা করা হয়েছে। বর্ণাশ্রমের কর্ম ও সামাজিক কর্তব্য ফলদায়ক হলেও, মুক্তির ক্ষেত্রে হরিভক্তিই শ্রেষ্ঠ—গোবিন্দে একনিষ্ঠতা, হরিনাম-সংকীর্তন, শ্রবণ ও স্মরণকে প্রধান সাধন বলা হয়েছে। এরপর ভক্তির প্রতিবন্ধক হিসেবে বিষয়াসক্তি, কাম-ক্রোধ এবং লোকদেখানো ধার্মিকতার কঠোর নিন্দা করা হয়, যাতে বৈরাগ্য জাগে ও মন স্থির হয়। নিজের সম্পদ ও শক্তি বৈষ্ণবকার্যে নিয়োজিত করে নিরন্তর হরিগুণগান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্রাহ্মণদের বিষ্ণুর প্রকাশরূপ বলে প্রশংসা করা হয়েছে; তাঁদের প্রণাম, পূজা ও অন্নদান মহাপুণ্যদায়ক। নিত্য পুরাণশ্রবণ অগ্নির মতো পাপ দগ্ধ করে; গঙ্গাকে তরলরূপ বিষ্ণু এবং ভক্তিদায়িনী বলা হয়েছে। তাই ব্রাহ্মণ, পুরাণ, গঙ্গা, গাভী ও অশ্বত্থ (পিপ্পল) বৃক্ষে বিষ্ণুর দৃশ্য রূপ জেনে ভক্তি বিস্তার করতে বলা হয়েছে।
Viṣṇu as the Embodied Purāṇas and the Merit of Hearing the Svarga-khaṇḍa
অধ্যায়ের শুরুতে সূত ভগবান বিষ্ণুর ত্রাণদায়ক মহিমা ঘোষণা করেন। এরপর পুরাণসমূহের এক দিব্য “দেহতত্ত্ব” বর্ণিত হয়—বিষ্ণুই পুরাণ-প্রকাশের সমগ্র দেহ; পদ্মপুরাণকে তাঁর হৃদয় বলা হয়েছে এবং অন্যান্য মহাপুরাণকে অঙ্গ, ত্বক, মজ্জা ও অস্থিরূপে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এর দ্বারা পদ্মপুরাণকে হরির প্রত্যক্ষ পবিত্র প্রকাশধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তারপর ফলশ্রুতি—একটি অধ্যায়ও শ্রবণ বা পাঠ করালে পাপক্ষয় হয়; বিশেষত স্বর্গখণ্ড শ্রবণে মহাপাপীরও শুদ্ধি ঘটে। ক্রমে দেবলোকাদি উচ্চতর লোকপ্রাপ্তি, শেষে ব্রহ্মলোক, সত্যজ্ঞান ও নির্বাণলাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। উপসংহারে সৎসঙ্গ, তীর্থস্নান, উত্তম ধর্মকথা শ্রবণ এবং হরিনামে গোবিন্দভজনের উপদেশ দেওয়া হয়।