Uttara Khanda
Gita MahatmyaBhaktiConclusion

Later Section (Uttara Khanda)

The Concluding Section

উত্তরখণ্ড পদ্মপুরাণের বিস্তৃত ভক্তি‑অনুষ্ঠান ও তীর্থ‑তত্ত্বভিত্তিক অংশ। এখানে বৈষ্ণব ভক্তিকে বৈদিক‑সম্মত প্রামাণ্যবোধ এবং ব্যবহারিক ধর্মাচরণের সঙ্গে একত্র করে দেখানো হয়েছে। তীর্থযাত্রা, ব্রতপালন ও দানকে শুদ্ধি ও মুক্তির কার্যকর উপায় হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রারম্ভিক অধ্যায়ে গ্রন্থটি পরম্পরা‑শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে—সূত শঙ্করের নারদকে প্রদত্ত উপদেশ বর্ণনা করেন। এর দ্বারা মঙ্গলাচরণ, গুরু‑শিষ্যধর্ম এবং শাস্ত্রের অধিকার‑পরম্পরা দৃঢ় হয়; একই সঙ্গে উত্তরখণ্ডের অন্তর্গত বিষয়সূচির ইঙ্গিতও মেলে। তীর্থ‑মাহাত্ম্য এখানে মুখ্য—পর্বত‑নদীর মহিমা এবং প্রয়াগ, হরিদ্বার, মথুরা, কুরুক্ষেত্র, সেতুবন্ধ/রামেশ্বর, গয়া প্রভৃতি পুণ্যক্ষেত্রের গৌরবকথা। ক্যালেন্ডার‑পবিত্রতার দিক থেকে কার্তিক, মাঘ, একাদশী‑দ্বাদশী, গ্রহণ ও যোগের মাহাত্ম্য বলা হয়েছে। দানধর্মের নীতি, বিধি ও ফলশ্রুতি ভক্তের আচরণকে পথ দেখায়। বৈষ্ণব পরিচয়চিহ্ন (শঙ্খ‑চক্র), স্তোত্র‑পরম্পরা এবং উমা‑মহেশ সংলাপসংযুক্ত সহস্রনাম‑স্তবের উল্লেখ ভক্তিসাধনাকে দৃঢ় করে। তত্ত্বগতভাবে নামস্মরণ, দর্শন (বিশেষত জগন্নাথ‑দর্শন) ও ব্রতকে সকল বর্ণের জন্য সহজ মোক্ষোপায় বলা হয়েছে; বারবার পাপনাশ ও বিষ্ণু‑সায়ুজ্যের প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত হয়।

Adhyayas in Uttara Khanda

Adhyaya 1

Compendium of Seeds (Opening Index of Topics)

এই অধ্যায় মঙ্গলাচরণে শুরু—ভগবান বিষ্ণু ও মহর্ষি ব্যাসকে প্রণাম করে। এরপর ঋষিগণ সূতকে অনুরোধ করেন অবশিষ্ট পদ্মপুরাণ-উপদেশ শুনাতে, যা ভক্তিকে তীব্র করে। সূত জানান, তিনি মন্দর পর্বতে শঙ্কর যে উপদেশ নারদকে দিয়েছিলেন, সেই কথাই বর্ণনা করবেন। তারপর অধ্যায়টি উত্তরখণ্ডের বিষয়সূচি হয়ে ওঠে—তীর্থ-মাহাত্ম্য (পর্বত, নদী, হরিদ্বার, প্রয়াগ, দ্বারকা, মথুরা, কুরুক্ষেত্র, সেতুবন্ধ/রামেশ্বর, গয়া), এবং বৈষ্ণব আচরণ (তুলসীসেবা, গোপীচন্দন ধারণ, শঙ্খ-চক্র চিহ্ন)। একাদশী-দ্বাদশী, কার্তিক ও মাঘের ব্রত, গ্রহণ-যোগাদির ফল, দানের প্রকার, গুরু-শিষ্যের যোগ্যতা, এবং জগন্নাথের নাম ও দর্শনের উদ্ধারক মহিমাও সংক্ষেপে নির্দেশিত। শেষে পুরাণের ব্যাসকৃতত্ব প্রতিষ্ঠা করে বলা হয়—শ্রবণ ও বিধিপূর্বক দান দ্বারা সকলের, শূদ্রদেরও, পুণ্যলাভ ও কল্যাণসাধন সহজলভ্য।

Adhyaya 2

Rudra’s Grace/Boons (Rudraprasāda)

এই অধ্যায়ে বদরিকাশ্রমের মহিমা কীর্তিত হয়েছে এবং পর্বতসমূহের মধ্যে একে সর্বাধিক পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে। হিমালয়ের শিখরে ভগবান নর-নারায়ণের নিত্য অধিষ্ঠান, এবং তাঁর শ্বেত ও শ্যাম—দ্বিবিধ প্রকাশের কথা বর্ণিত। তীর্থযাত্রার পরিশ্রমও সাধকের জন্য মহাফলপ্রদ বলে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। উত্তরায়ণে সেখানে পূজা-আরাধনা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু তুষারপাতের কারণে কয়েক মাস উপাসনায় বাধা ঘটে; সূর্যের দক্ষিণায়ন শুরু হলে পথ আবার সুগম হয়—এই ঋতুচক্রও উল্লেখিত। অলকানন্দাকে গঙ্গারূপে মান্য করে তার স্নান ও দর্শনে মহাপাপ পর্যন্ত শুদ্ধ হয়—এভাবে তীর্থমাহাত্ম্য দৃঢ় করা হয়েছে। শেষে বরপ্রদান-সংলাপ: শ্রীনারায়ণ রুদ্রকে কৈলাসাধিপতি ও জগতরক্ষক বলে স্তব করেন। রুদ্র স্থায়ী ভক্তি ও এমন খ্যাতি প্রার্থনা করেন যাতে তিনি উপাসকদের মুক্তিদাতা উপকারক রূপে প্রসিদ্ধ হন—এতে শৈব তপস্যা ও বৈষ্ণব অনুগ্রহের মিলন প্রকাশ পায়।

Adhyaya 3

Brahmāgama — Brahmā’s Approach/Teaching (Birth of Jālandhara)

নারদ কাম্যবনে শোকাকুল পাণ্ডবদের কাছে এসে যুধিষ্ঠিরের প্রশ্ন শোনেন—কোন কর্মফলে আমরা এই দুঃখে নিমজ্জিত? নারদ দেহধারী জীবনে দুঃখের অনিবার্যতা ও ভাগ্যের উলট-পালট অবশ্যম্ভাবী—এ কথা বোঝান। উদাহরণ দেন—রাহুর মতো শক্তিমানও পতিত হয়, আর বিষ্ণু, জালন্ধর ও শিবকে ঘিরে ঘটনায় মহাবলীদেরও বিপর্যয় ঘটে। এরপর যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন, জালন্ধর কে এবং শিব কীভাবে তাকে বধ করেন। নারদ বলেন—ইন্দ্র ও দেবগণ দিব্য সংগীত-নৃত্যের সঙ্গে কৈলাসে গমন করেন; শম্ভু ইন্দ্রকে বর দেন, তাতে ইন্দ্রের যুদ্ধগর্ব উন্মত্ত হয়। শিবের ক্রোধ ‘ক্রোধ’ রূপে মূর্ত হয়ে সমুদ্রলোকে ধাবিত হয়; সমুদ্রের সংযোগ থেকে এক মহাশক্তিধর পুত্রের জন্ম হয়। ব্রহ্মা এসে সেই বিস্ময়কর শিশুকে দেখে তার নাম রাখেন ‘জালন্ধর’ এবং আশীর্বাদ করেন—সে দেবতাদের দ্বারা অজেয় হবে, স্বর্গ ও পাতাল উভয় লোকের ভোগ লাভ করবে।

Adhyaya 4

The Marriage of Vṛndā and the Consecration (Coronation) of Jālandhara

এই অধ্যায়ে মহাসাগরের পুত্র সিন্ধুনন্দন/জালন্ধরের বর্ণনা আছে—যৌবনের উগ্র পরাক্রমে সে আকাশ ও সমুদ্রের জীবদের ভীতসন্ত্রস্ত করে, এমনকি তার তেজে বডবানলও পলায়ন করে—এমন মহাজাগতিক প্রতিক্রিয়া উল্লেখিত। সে রাজ্য প্রার্থনা করলে ভৃগুনন্দন শুক্রাচার্যের উপদেশে সাগর জল সরিয়ে এক ভূখণ্ড প্রকাশ করেন, যা ‘জালন্ধর’ নামে পরিচিত হয়। দৈত্য-শিল্পী মায়া রত্নময় রাজধানী নির্মাণ করে; নগরীর ঐশ্বর্য ও শোভা বিস্তারে বর্ণিত। পরে মঙ্গলবাদ্য, জয়ধ্বনি ও আশীর্বাদের মধ্যে জালন্ধরের রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয়; সাগর তাকে দুর্জয় সেনাবল দেন এবং শুক্রাচার্য মৃৎসংজীবনী-গুপ্তবিদ্যা ও যুদ্ধশিক্ষা প্রদান করেন। অপ্সরা স্বর্ণার কন্যা বৃন্দার সঙ্গে গন্ধর্ববিধিতে জালন্ধরের বিবাহ হয়; বৃন্দার পতিব্রতা ধর্ম ও জালন্ধরের নিষ্ঠা প্রশংসিত। শেষে শুক্রমন্ত্র ও জালন্ধরের ক্রমবর্ধমান শক্তি দেবতাদের সঙ্গে সংঘর্ষের ভূমিকা রচনা করে।

Adhyaya 5

The War between the Devas and the Dānavas (Jālandhara’s Campaign Begins)

যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে নারদ বলেন—ক্ষীরসাগর মন্থনের সময় শ্রী, সোম, অমৃত প্রভৃতি রত্ন উদ্ভূত হওয়াতেই জলন্ধরের দেববিদ্বেষের মূল। সেই সমুদ্রজাত ঐশ্বর্য ও স্বর্গ পর্যন্ত দাবি করে জলন্ধর দুর্বারণ নামে দূতকে ইন্দ্রসভায় পাঠায়। ইন্দ্র জবাব দেন—সমুদ্র অধর্মশক্তির সহায় ছিল, তাকে সংযত করতেই মন্থন; জলন্ধরের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। ক্রুদ্ধ জলন্ধর রসাতল ও ভূতলের দানব-দৈত্যদের মহাসেনা সমবেত করে মন্দর–মেরু–ইলাবৃত পথ ধরে অভিযান শুরু করে এবং দেবউদ্যান ধ্বংস করতে থাকে। অমরাবতীতে অশুভ লক্ষণ দেখা দিলে ইন্দ্র বৃহস্পতির পরামর্শে বিষ্ণুর শরণ নেন। শ্রী জলন্ধরের প্রভাব স্মরণ করিয়ে সতর্ক করলেও হরি দেবগণকে নিয়ে যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হন। আদিত্য, রুদ্র, মরুত প্রভৃতি দেবসেনা বিন্যস্ত হয় এবং উভয় পক্ষের সমশক্তিধর বীরদের মুখোমুখি ভয়ংকর দেব–দানব যুদ্ধ শুরু হয়।

Adhyaya 6

Battle Episodes and the Jewel-Origin Account from Balāṅga’s Body

এই অধ্যায়ে দেব–অসুর যুদ্ধের দ্রুত ধারাবিবরণী পাওয়া যায়। হরি কালনেমিকে বধ করেন; রাহু সূর্য ও চন্দ্রের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে ক্ষণকালের জন্য চন্দ্রকে গ্রাস করে; ইন্দ্রসহ দেবগণ বহু অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, আর রুদ্রের বাহিনী নিশুম্ভের সঙ্গে প্রবল সমরে অবতীর্ণ হয়। এরপর কাহিনি ইন্দ্র ও বল (বলি/বালা)-এর মহাযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। নানা অস্ত্র ব্যর্থ হয়, বরদানের ন্যায় কথোপকথন/বিনিময় ঘটে, এবং শেষে বজ্রাঘাতে বলের দেহ খণ্ডিত হয়। সেই ভগ্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে পর্বত-নদীর উৎপত্তি এবং বিশেষত ধাতু ও রত্নের উৎসকথা বলা হয়—নীলম, মাণিক্য, পান্না, মুক্তা, প্রবাল প্রভৃতি দেহতত্ত্ব থেকে উদ্ভূত বলে বর্ণিত। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রভাবতী শোকে বিলাপ করেন। শুক্রের মন্ত্রবাক্যে, জালন্ধরের প্রশ্নের পর, তাঁকে বীরের অঙ্গে লীন হতে নির্দেশ দেওয়া হয়; তিনি প্রভাবতী নদীতে রূপান্তরিত হন, যার জলে উৎকৃষ্ট রত্নকান্তি জন্মায়—শোক, ভূগোল ও পবিত্র বস্তুতত্ত্ব এক পুরাণীয় ধর্মভাবনায় একত্রিত হয়।

Adhyaya 7

The Battle of Jālandhara and Viṣṇu; the Droṇa Mountain Herbs and the Milk Ocean Episode

এই অধ্যায়ে জলন্ধর এবং দেবতাদের মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। ইন্দ্রের ছলনায় ক্রুদ্ধ হয়ে জলন্ধর তাকে পরাজিত করেন, এবং ইন্দ্র হরিকে স্মরণ করতে করতে পলায়ন করেন। এরপর ভগবান বিষ্ণু নন্দক খড়্গ ধারণ করে দৈত্যসেনা সংহার করেন। যখন অসুররা দেবতাদের হত্যা করতে থাকে, তখন বৃহস্পতি ক্ষীরসাগরস্থিত দ্রোণ পর্বত থেকে ওষধি এনে দেবতাদের পুনরুজ্জীবিত করেন। এই রহস্য জানতে পেরে জলন্ধর দ্রোণগিরিকে রসাতলে নিক্ষেপ করেন। শেষে বিষ্ণু ও জলন্ধরের মধ্যে যুদ্ধ হয়, কিন্তু লক্ষ্মীদেবীর অনুরোধে বিষ্ণু তাকে বধ করা থেকে বিরত থাকেন। লক্ষ্মী জলন্ধরকে নিজের ভাই হিসেবে রক্ষা করেন এবং বিষ্ণু তাকে ক্ষীরসাগরে বাস করার বর প্রদান করেন।

Adhyaya 8

Description of Jālandhara’s Sovereign Rule

যুধিষ্ঠির নারদকে জিজ্ঞাসা করেন—সমুদ্রজাত ও দেবতাজয়ী জালন্ধর ‘আত্ম-মন্দিরে’ বিষ্ণুকে প্রতিষ্ঠা করে পরে কী করল। নারদ বলেন, জালন্ধর স্বর্গে আরোহণ করে অমরাবতীর মতো ঐশ্বর্য দেখে—যেখানে ফল নিজে থেকেই ফলিত হয়, স্বর্ণবৃষ্টি ঝরে, এবং অপ্সরাদের সঙ্গে দিব্য ভোগ-বিলাসের সমারোহ থাকে। এই অধ্যায়ে দান ও মন্দির-সেবার ফলও বলা হয়েছে—গোদান, স্বর্ণদান, বস্ত্রদান; ঋতুভেদে দান; শিবমন্দিরে গান-বাদ্যসেবা; এবং চৈত্র মাসে জলসত্র/পানীয়-ব্যবস্থা স্থাপন—এসবের দ্বারা স্বর্গদর্শন ও দিব্যসুখ লাভ হয়। পরে রাজশাসনের কথা আসে: জালন্ধর শুম্ভ ও নিশুম্ভকে নিযুক্ত করে দীর্ঘকাল রাজত্ব করে। তার রাজ্যকে এমন আদর্শ রূপে দেখানো হয়েছে যেখানে মৃত্যু-ভয়, নরকগতি, দারিদ্র্য, হিংসা ও সামাজিক দুঃখ নেই—শক্তি ও ধর্মশৃঙ্খলার ফলে সর্বত্র শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজ করে।

Adhyaya 9

Origin of the Discus Formed from the Gods’ Divine Energy

যুধিষ্ঠির নারদকে জিজ্ঞাসা করলেন—জালন্ধর স্বর্গ দখল করার পর দেবতারা কী করলেন। অমৃত ও যজ্ঞ থেকে বঞ্চিত দেবগণ প্রণায়াম ও ধ্যানে নিমগ্ন পিতামহ ব্রহ্মার শরণ নিলেন। ব্রহ্মা তাঁদের কৈলাসে নিয়ে গেলেন শিবের সাহায্য প্রার্থনা করতে; সেখানে স্তোত্রপাঠ হল এবং নন্দী তাঁদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করালেন। তারপর দেবশক্তির মহাসংযোগ ঘটল—ব্রহ্মার ব্রহ্মাস্ত্রসদৃশ শক্তি, ত্রিনেত্র শিবের তেজ, এবং দেবতাদের সম্মিলিত দীপ্তি; সেই সময় বিষ্ণু (জনার্দন/কেশব) এসে বৈষ্ণব প্রভা প্রকাশ করলেন। অসহনীয় জ্যোতির মধ্যে শিব ভ্রমরী নৃত্য করে তেজের উপর পদাঘাত করলেন; তাঁর পদাঘাত থেকে দিব্য চক্রের উৎপত্তি হল, যা পরে ধারণ ও গোপন করা হয় এবং দৃষ্টির আড়ালে মিলিয়ে যায়—এভাবেই সর্বোচ্চ অস্ত্র চক্রের উৎপত্তিকথা বর্ণিত।

Adhyaya 10

Rahu’s Return from Kailasa (Jalandhara’s Embassy to Shiva)

যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে নারদ জালন্ধরের প্রসঙ্গ বলেন। তিনি শিবের তপস্বী ‘দারিদ্র্য’কে সামনে এনে জালন্ধরকে উসকান, আর জানান—কৈলাসের প্রকৃত ধন হলো পার্বতী/গৌরীর অতুল দীপ্তি। ক্রুদ্ধ সিন্ধুজ জালন্ধর দূতরূপে রাহু/স্বর্ভানু (সৈংহিকেয়)কে কৈলাসে পাঠায়। দ্বারে নন্দী রাহুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে শিবসভায় নিয়ে যান। সেখানে শিব ভয়ংকর-তেজোময় বহুমুখ রূপে বিরাজমান, কিন্তু দেবী তাঁর পাশে দৃশ্যমান নন। রাহু জালন্ধরের উদ্ধত বার্তা পৌঁছে দেয়—গৌরীকে দাবি ও শিবের বশ্যতা প্রত্যাশা—তবু বিপরীতার্থক বাক্যে শিবের পরাত্পরত্বও স্তব করে। শিব নীরব থাকেন; নন্দী তাঁর অভিপ্রায় বুঝে দূতকে বিদায় দেন। মাঝখানে কীর্তিমুখের আবির্ভাব ও আত্মভক্ষণ-ক্ষুধার বিস্ময়কর কাহিনি আছে, যা দেবনিয়ন্ত্রণে সংযত ভক্তির দৃষ্টান্ত। শেষে রাহু ফিরে জানায়—সে গৌরীসদৃশ মোহিনী রূপ ধারণ করে সংবাদ দিয়েছে।

Adhyaya 11

The Defeat of the Demon Army (Opening of the Jālandhara–Śiva Conflict)

দূতের সংবাদে ক্রুদ্ধ হয়ে জালন্ধর অগণিত দানবসেনা সমবেত করল। তাদের ঢাক-ঢোলের গর্জন, পতাকা, ছত্র ও রথের শব্দে মেরু-মন্দর পর্যন্ত কেঁপে উঠল, সর্বত্র জীবসমূহ ভীতসন্ত্রস্ত হলো। এরপর কাহিনি জালন্ধর-পর্বে প্রবেশ করে—সে সমুদ্রলোকে গিয়ে মহাবিষ্ণুর নিকট উপস্থিত হয় এবং সেখান থেকে শঙ্করের দিকে অগ্রসর হয়। গৃহে বৃন্দা যুদ্ধ থেকে বিরত করতে চায় এবং পার্বতীর প্রতি জালন্ধরের কামনা স্মরণ করিয়ে তাকে সতর্ক করে। কৈলাসে পৌঁছে দানব তার মণিময় সৌন্দর্য দেখে বিস্মিত হয় এবং শিবকে ‘তপস্বী’ বলা কীভাবে সম্ভব—এ প্রশ্ন তোলে। শম্ভু গৌরীকে এক উচ্চ শিখরে স্থাপন করে নন্দীশ্বরকে জালন্ধরের সঙ্গে যুদ্ধে নিয়োজিত করেন। নন্দী কাকতুণ্ড নামক বিশাল রথে আরোহণ করে গণসহ অবতরণ করেন; ধোঁয়ার মতো পর্বত থেকে গণেরা নেমে আসে, যুদ্ধ শুরু হয় এবং দানবদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে মহাসংঘর্ষের ভূমিকা রচিত হয়।

Adhyaya 12

Mahādeva Enters the Battle (Śiva’s Arrival for War)

জালন্ধর-চক্রে যুদ্ধক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়। শুম্ভ, নিশুম্ভ ও তাদের সহচর দৈত্যরা শিবের গণদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একের পর এক দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু হয়—শুম্ভের সঙ্গে নন্দী, নিশুম্ভের সঙ্গে মহাকাল; অন্যরা পুষ্পদন্ত, মাল্যবান, বিনায়ক ও স্কন্দের বিরুদ্ধে লড়ে। এই সংঘর্ষে ‘জ্বর’ নামে ব্যক্তরূপ শক্তির উদ্ভব ঘটে, আর ছিন্ন উদর থেকে বহুমস্তক ভয়ংকর দৈত্যের আবির্ভাব এক অদ্ভুত আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বিনায়ক আহত হয়ে করুণ বিলাপ করে। তা শুনে পার্বতী পর্বতশিখরে শম্ভুকে যুদ্ধের জন্য জাগিয়ে তোলেন। মহাদেব বৃষভকে প্রস্তুত করতে আদেশ দেন, নিজে বিধিপূর্বক অস্ত্র-অলংকার ধারণ করে রণযাত্রা করেন। বীরভদ্র, মণিভদ্র প্রমুখ সেনানায়ক ও বিপুল গণবাহিনীসহ তিনি এসে পুনরায় ভয়ংকর সংঘর্ষ ঘটান। শেষে উপমা দেওয়া হয়—যেমন ইন্দ্রিয়সমূহ আত্মাকে আঘাত করে, তেমনি শম্ভুর তীক্ষ্ণ বাণ দৈত্যদের ছিন্নভিন্ন করে পতিত করে।

Adhyaya 13

The Advent of Maheśvara in Connection with Jālandhara’s Illusion

এই অধ্যায়ে জালন্ধর-চক্রের যুদ্ধ চূড়ান্ত তীব্রতায় পৌঁছায়। জালন্ধর (অথবা তার দানব-নায়ক) সদাশিবকে সম্মুখে ডেকে শিবের তপস্যার চিহ্ন, ভস্ম-ত্রিপুণ্ড্র, জটা ও বৃষভবাহনকে বিদ্রূপ করে; অপরদিকে বীরভদ্র ও মণিভদ্র দানবসেনাকে বিধ্বস্ত করে বহু দানবকে নিধন করেন। রণক্ষেত্রে রক্তপাত ও অঙ্গচ্ছেদের বর্ণনায় দানব-অহংকারের পতন নাটকীয়ভাবে প্রকাশিত হয়। এরপর কাহিনি মায়ার দিকে মোড় নেয়। সমুদ্রপুত্র অর্ণবাত্মজ ছল-কৌশল অবলম্বন করে গৌরীর নিকট ছদ্মবেশে “শিব”-কে উপস্থিত করে। পার্বতী ও তাঁর সখীরা রক্তাক্ত ও বিলাপরত সেই “শিব”-কে দেখে এবং স্কন্দ-গণেশ নিহত হয়েছেন—এমন ভ্রমবাণী শুনে গভীর শোকে নিমজ্জিত হন। মায়ামহেশ্বর এমন বাক্য বলেন যা বিভ্রম আরও বাড়ায়; তখন পার্বতী শোকাবস্থায় অনুচিত আচরণ নিবারণ করে ধর্ম-নীতির কথা স্মরণ করান—কিছু অবস্থায় কামসম্ভোগ সম্পূর্ণ অযথোচিত।

Adhyaya 14

Narration of Śrī Mādhava’s Māyā (Divine Strategy) in the Jālandhara Episode

যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে নারদ জালন্ধর-যুদ্ধের সংকট এবং শিব-পার্বতীর উপর নেমে আসা মোহের কাহিনি বলেন। ক্ষীরসাগরে শেষশয্যায় অবস্থানরত বিষ্ণু অন্তরে বিচলিত হয়ে গরুড়কে পাঠান—যুদ্ধের অবস্থা দেখে নিশ্চিত করতে, জালন্ধর হরকে বধ করেছে কি না, নাকি মায়ায় মোহিত করেছে। হরি গরুড়কে মায়া-প্রতিরোধী সিদ্ধিদায়ক এক ঔষধ/গুটিকা প্রদান করেন। গরুড় যুদ্ধক্ষেত্রে ‘মায়া-পশুপতি’ নামে এক ভ্রান্ত রূপ দেখে ক্ষণিক বিভ্রান্ত হন, পরে প্রতারণা বুঝে সংযত হন এবং ফিরে এসে জানান—শিব ও উমা উভয়েই মায়াগ্রস্ত। তখন শ্রীমাধব প্রতিকৌশল স্থির করেন। শেষের সহায়তায় তপস্বীর বেশে আশ্রম স্থাপন করে তিনি মন্ত্র ও মায়ার দ্বারা জালন্ধরের পত্নী বৃন্দাকে লক্ষ্য করেন। বৃন্দার অশুভ স্বপ্ন, ব্রাহ্মণদের দান-প্রতিকার উপদেশ, এবং ভয়ংকর অরণ্যে তার বাধ্য গমন—যেখানে রাক্ষসী হুমকি—এই সবই ধর্মরক্ষার জন্য দিব্য মায়ার গভীরতা ও জালন্ধরের ভাগ্যপরিবর্তনের আসন্ন সন্ধিক্ষণকে প্রকাশ করে।

Adhyaya 15

Vṛndā’s Attainment of Brahman-Status (within the Jālandhara Episode)

জালন্ধর-পর্বে হরি সন্ন্যাসীর বেশে আবির্ভূত হয়ে রাক্ষসের অপহৃতা বৃন্দাকে উদ্ধার করেন। ভীত-সন্ত্রস্ত বৃন্দা আশ্রয় গ্রহণ করে তপোবনের বিস্ময়কর পরিবেশ প্রত্যক্ষ করে; সেখানে দেবশর্মা তপস্বী, ব্যাধ, অপ্সরাগণ ও কামদূতীর প্রসঙ্গও উঠে আসে। পরবর্তীতে হরির মায়ায় স্বামীর রূপ ধারণ করে বৃন্দার সঙ্গে মিলনের ভ্রম সৃষ্টি হয়; বৃন্দার পতিব্রতা-ধর্মই কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু। সত্য উপলব্ধি করে সে ধর্মলঙ্ঘনের নিন্দা করে বিষ্ণুকে শাপ দেয়, এবং তিনি অন্তর্ধান করেন। তারপর বৃন্দা কঠোর তপস্যা করে দেহত্যাগ করে; দেবগণ তার পবিত্রতা স্বীকার করে। এই কাহিনি তুলসী/বৃন্দাবনের উৎপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করে এবং শেষে ব্রহ্মগতি তথা মুক্তিকেই চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে স্থাপন করে, যেখানে দিব্য লীলা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার টানাপোড়েনও প্রকাশ পায়।

Adhyaya 16

Jālandhara Abandons His Illusory Form

যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে নারদ জালন্ধরের মায়া-প্রতারণার কাহিনি বলেন। দানবটি শিবের রূপ ধারণ করে গৌরীর কাছে এসে কামবশে তাঁকে প্রলুব্ধ করতে চায়; কিন্তু গৌরী স্মরণ করেন—শিব কেবল তপস্যার দ্বারাই লাভ্য, তাই তিনি তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর তিনি গঙ্গা–মন্দাকিনীর নিকটে গিয়ে স্নান ও পূজা করে স্বর্ণদীর তীরে উপবেশন করেন। সন্দেহ জাগলে গৌরী সখী জয়াকে পরীক্ষা করতে পাঠান। জালন্ধর কামাতুর হয়ে জয়াকে আলিঙ্গন করতেই তার অসুর-স্বরূপ প্রকাশ পায় এবং তার শক্তি ক্ষয় হতে থাকে। পরিচারিকাদের মধ্যে ভয় ছড়ায়, আর গৌরী পদ্মবনের মধ্যে আত্মগোপন করেন। এদিকে বিষ্ণুর দ্বারা বৃন্দা-অপহরণের সংবাদে যুদ্ধের হিসাব বদলে যায়। চণ্ড-মুণ্ড জালন্ধরকে পুনরায় যুদ্ধে নামতে তাগিদ দেয়; কিন্তু দুর্বারণ বলে—বিষ্ণুর আগে শিবকে গুরুত্ব দাও, কর্মফল অনিবার্য এবং মায়া-প্ররোচিত অপরাধ মহাবিপদের কারণ।

Adhyaya 17

Entry into Śukra’s Womb (within the Jālandhara Episode)

এই অধ্যায়ে জালন্ধর–শিব যুদ্ধ আরও তীব্র হয়। জালন্ধর রক্তে ভরা যুদ্ধক্ষেত্র দেখে বৃষারূঢ় মহেশ্বরের সম্মুখে উপস্থিত হয়। উভয় পক্ষের অস্ত্রবৃষ্টি বাড়তে থাকে; দানবেরা শিবের গণ, বীরভদ্র, মণিভদ্র, নন্দিকেশ্বর ও স্কন্দের সঙ্গে বহু একক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, জয়-পরাজয়ের পালাবদলও ঘটে। শিব দিব্য বাণে জালন্ধরকে বিদ্ধ করলে বিপুল রক্তধারা প্রবাহিত হয় এবং দানবসেনায় আতঙ্ক ছড়ায়; জালন্ধর মূর্ছিত হলে রুদ্র দানবদলকে বিধ্বস্ত করেন। তখন জালন্ধর গুরু শুক্রাচার্যকে আহ্বান করে; তিনি মন্ত্র ও অভিমন্ত্রিত জলে পতিত দানবদের পুনর্জীবিত করেন। ব্রাহ্মণবধ-নিষেধের কারণে শিব সরাসরি বধ না করে নিয়ন্ত্রণের পথ নেন। তিনি ভয়ংকর কৃত্যা প্রকাশ করে আদেশ দেন—শুক্রকে গর্ভসদৃশ বন্ধনে প্রবেশ করিয়ে আবদ্ধ কর, যাতে জালন্ধর নিহত না হওয়া পর্যন্ত পুনরুত্থান বন্ধ থাকে।

Adhyaya 18

The Great Festival of Jālandhara’s Slaying (Jālandhara-vadha)

এই অধ্যায়ে নারদ রাজাকে জালন্ধর-বধের মহোৎসব ও মহাযুদ্ধের কথা জানান। শুম্ভ-নিশুম্ভ প্রমুখ দানবরা বিশাল বাহিনী নিয়ে শিবকে ঘিরে ফেলে এবং জয়া নামের মায়াময়ী গৌরীরূপ সৃষ্টি করে শিবকে বিভ্রান্ত করতে চায়। তখন ব্রহ্মা ও হরি/কৃষ্ণ শিবকে সেই মায়ার স্বরূপ বোঝান; শিবের বোধোদয় হলে ভয়ংকর যুদ্ধ আবার তীব্র হয়। শিবের ভৈরবমূর্তি দেখেও জালন্ধর নির্ভীক থাকে; সে দণ্ড নয়, পরম সায়ুজ্য-মোক্ষের বর প্রার্থনা করে। শেষে চক্র-প্রয়োগের প্রসঙ্গে তার শিরচ্ছেদ হয় এবং দানবদেহের বহুগুণিত বিস্তারও নিবৃত্ত হয়। শিবের অনুমতিতে যোগিনীগণ ও মাতৃকাগণ (ব্রাহ্মী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বারাহী প্রভৃতি) অবশিষ্ট অসুরাংশ ভক্ষণ করে বর লাভ করে; পার্বতী শিবের সঙ্গে পুনর্মিলিত হন। শেষে কর্মের অনিবার্যতা, শ্রবণ-কীর্তনের পুণ্যফল এবং তুলসী-মাহাত্ম্যের দিকে উপদেশ দেওয়া হয়—ভক্তি, কাহিনি-শ্রবণ ও তুলসী-পূজায় পাপক্ষয় হয়ে সমৃদ্ধি ও মুক্তি লাভ হয়।

Adhyaya 19

Account and Glory of Śrīśaila (Śrīśaila Māhātmya)

যুধিষ্ঠির নারদকে জিজ্ঞাসা করেন—পবিত্র শ্রীশৈল পর্বত কোথায়, তার তীর্থ কী, অধিষ্ঠাত্রী দেবতা কে, এবং কোন কোন দিক থেকে তার খ্যাতি বিস্তৃত। নারদ শ্রীশৈলকে পাপনাশক, পরম পুণ্যদায়ক ও মুক্তিদায়িনী তীর্থপর্বত বলে মহিমা বর্ণনা করেন। অধ্যায়ে শ্রীশৈলের তপস্যাময় পবিত্র পরিবেশ ফুটে ওঠে—পুষ্পভরা বন, পাখির কলরব, আশ্রম, নদী ও সরোবর। সেখানে নিয়মনিষ্ঠ ঋষি-সমাজ নানা তপস্যা করেন; কেউ শিবধ্যানে নিমগ্ন, কেউ বিষ্ণুভক্তিতে রত—তবু শ্রীশৈলের অসাধারণ উদ্ধারশক্তি সর্বোচ্চ বলে প্রতিপন্ন। মল্লিকার্জুন সেখানে নিত্য বিরাজমান—শিখরের মাত্র দর্শনেই মুক্তি লাভ হয় বলা হয়েছে। ‘পাতাল’ নামে গঙ্গার উপস্থিতি, স্নান ও দর্শনের পুণ্য, এবং সিদ্ধপুর নামক দিব্য নগরীর বর্ণনা দিয়ে শেষে মোক্ষকামীদের শ্রীশৈল দর্শনে গমন করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

Adhyaya 20

The Glory of Ganga-dvara (Haridwar) and the Prelude to the Sagara Narrative

অধ্যায়ের শুরুতে হরিদ্বার/গঙ্গাদ্বারকে সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যতীর্থ বলে মহিমা করা হয়েছে। যেখানে যেখানে গঙ্গা প্রবাহিত, সেখানেই তীর্থ—দেবতা ও ঋষিদের আবাস, এবং কেশবের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে তা অতিশয় পবিত্র। গঙ্গার অনন্য পবিত্রতার কারণ বলা হয়েছে—তিনি বিষ্ণুপাদোদক, অর্থাৎ ভগবান বিষ্ণুর পদ্মচরণ ধৌত করা জল। এরপর নারদ মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করেন—ভগীরথ কে এবং সকল জীবের কল্যাণের জন্য গঙ্গা কীভাবে আনা হয়েছিল। তখন বংশকথা শুরু হয়—হরিশ্চন্দ্র থেকে রোহিত, তারপর বৃক, সুভাহু, গর এবং সগর। ভৃগুবংশীয় ঔর্ব/ভার্গবের আশ্রয়ে সগরের উত্থান, দিগ্বিজয় ও অশ্বমেধের প্রসঙ্গ বর্ণিত হয়; সেই সূত্রে কপিল মুনির দ্বারা সগরপুত্রদের দগ্ধ হওয়ার ঘটনা বলা হয়, যা পরবর্তীতে ভগীরথের গঙ্গাবতরণ ও পিতৃমুক্তির কারণভূমি রচনা করে।

Adhyaya 21

Haridwar Māhātmya, Beginning with the Account of the Descent/Origin of the Gaṅgā

নারদ শিবকে জিজ্ঞাসা করেন—সগরের ষাট হাজার পুত্রের জন্ম কীভাবে হল। শিব বলেন, ঔর্ব মুনি সগরের দুই রাণীকে বর দেন; সেই বরপ্রভাবে আশ্চর্যভাবে পুত্রদের জন্ম ও তাদের পালন-পোষণের কথা বর্ণিত হয়, এবং বংশধারা ক্রমে ভগীরথ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়। পরে পিতৃকল্যাণের জন্য গঙ্গাকে পৃথিবীতে আনতে ভগীরথের কঠোর তপস্যার কথা আসে। গঙ্গার অবতরণ ঘটে, শিব তাঁর জটায় প্রবল স্রোত ধারণ করেন, এবং গঙ্গা ‘জাহ্নবী’ ও ‘অলকানন্দা’ প্রভৃতি নামে প্রসিদ্ধ হন। এরপর হরিদ্বার তীর্থের মাহাত্ম্য বলা হয়েছে—বিষ্ণু-দর্শন ও গঙ্গাস্নানে মহাপাপও নাশ হয়, শোক দূর হয় এবং বৈকুণ্ঠলাভ হয়। এই কাহিনি শ্রবণকে মহাযজ্ঞ ও মহাদানের সমতুল্য ফলদায়ক বলা হয়েছে, বিশেষত কলিযুগে ভক্তির দ্বারা সহজলভ্য।

Adhyaya 22

The Praise of the Gaṅgā, Prayāga, and Yamunā (Tīrtha-Māhātmya)

এই অধ্যায়ে (উত্তর খণ্ড, অধ্যায় ২২) মহাদেব নারদকে গঙ্গার মহিমা শোনান। বলা হয়েছে—শুধু “গঙ্গা” নাম শ্রবণ, উচ্চারণ বা দর্শন করলেই তৎক্ষণাৎ পাপক্ষয় হয়; কলিযুগে বিশেষ করে মহাপাপও নাশ পায়। এরপর যমুনা ও প্রয়াগ (ত্রিবেণী)-এর তীর্থশক্তিও একইভাবে স্তব করা হয়েছে। স্তুতির সঙ্গে তীর্থাচরণের কথাও এসেছে—অর্ঘ্যদান, স্নানের ফল, মাঘস্নানের মাহাত্ম্য এবং গ্রহণকালে স্নানের সমতুল্য মহাপুণ্য। প্রয়াগকে ‘তীর্থরাজ’ বলে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা করা হয়েছে; কাশী ও গয়াকেও মুক্তিদায়ক সহ-তীর্থরূপে স্মরণ করা হয়েছে। শেষে বলা হয়, এই প্রশস্তি শ্রবণ/পাঠ করলে সর্বতীর্থস্নানের পুণ্য লাভ হয় ও কর্মদোষ নষ্ট হয়—এ বিষয়ে বৈদিক প্রমাণও উদ্ধৃত।

Adhyaya 23

The Greatness of Tulasī and Śālagrāma

এই অধ্যায়ে তুলসী ও শালগ্রামের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। কলিযুগে এদেরকে বিষ্ণুর সান্নিধ্যের বহনযোগ্য আশ্রয়রূপে মান্য করে বলা হয়েছে—তুলসীর প্রতিটি অঙ্গ স্বভাবতই পবিত্র; দর্শন, স্পর্শ ও সেবনে পাপক্ষয় হয়। বিশেষত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় তুলসী-কাঠের মহিমা প্রকাশিত—চিতায় সামান্য তুলসী-কাঠ মিশলেও মহাপাপ নাশ হয়; মৃত ব্যক্তি যমের অধিকার থেকে মুক্ত হয়ে বিষ্ণুদূতদের দ্বারা নীত হয় এবং শেষে হরির সান্নিধ্য লাভ করে। তুলসী-কাঠ দিয়ে হোম, ধূপ, নৈবেদ্য, দীপদান ও চন্দনলেপকে যজ্ঞসম ফলদায়ক বলা হয়েছে। গৃহ ও মন্দিরপরিসরে তুলসী রোপণ, দর্শন, স্পর্শ এবং তার সুবাসে দিকসমূহ শুদ্ধ হয়; তুলসীগন্ধবাহী বায়ুও পবিত্রকারী। তুলসীমূলের মাটি ও ছায়া শ্রাদ্ধাদি পিতৃকর্মকে পবিত্র করে। উপসংহারে শালগ্রামপূজাকে শ্রেষ্ঠ তীর্থসম, সর্বপাপহর ও পরম শুদ্ধিকারক বলা হয়েছে।

Adhyaya 24

The Greatness of Prayāga (Prayāga Māhātmya)

এই অধ্যায়ে প্রয়াগের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। গঙ্গা‑যমুনার সঙ্গমস্থলে, সরস্বতীরও সান্নিধ্যে অবস্থিত প্রয়াগকে ত্রিলোকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও অতুল তীর্থ বলে প্রশংসা করা হয়েছে। প্রভাতে স্নান ও সামর্থ্য অনুযায়ী দান করার বিধান আছে; এতে মহাপাপ নাশ, সমৃদ্ধি, দীর্ঘায়ু এবং শেষে পরম ধামের প্রাপ্তি হয় বলা হয়েছে। অক্ষয়বটের দর্শনমাত্রেই ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি পাপ ক্ষয় হয়; সেখানে পূজা এবং যজ্ঞোপবীত দ্বারা পবিত্র আচ্ছাদনের রীতিও উল্লেখিত। প্রয়াগে বিষ্ণু মাধব রূপে নিত্য অধিষ্ঠান করেন; তাঁর দর্শনে মহাপাপ থেকে মুক্তি লাভ হয়। বিশেষত মাঘ মাসের স্নান অতিশয় ফলদায়ী—বৈকুণ্ঠপ্রাপ্তি ও চতুর্ভুজ রূপের প্রাপ্তি পর্যন্ত দেয়; অল্প স্নানও পাপীদের উদ্ধারকারী বলে ঘোষিত।

Adhyaya 25

Description of the Three-Night Vow of Tulasī

নারদ তুলসীর ত্রিরাত্র-ব্রতের বিধি ও ফল জানতে চান। উমাপতি সদাশিব এক প্রাচীন পাপ-নাশক ব্রতের উপদেশ দেন এবং তার কার্যকারিতা প্রমাণ করতে প্রজাপতি-রাজা ও তাঁর পতিব্রতা রানি চন্দ্ররূপার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন। কার্তিক শুক্ল নবমী থেকে ধারাবাহিক তিন রাত্রি নিয়ম পালন করতে বলা হয়েছে—তুলসী-বৃন্দাবনের নিকটে ভূমিতে শয়ন, সংযম, স্নান, এবং পিতৃ-দেবতর্পণ। লক্ষ্মী–জনার্দনের স্বর্ণ-প্রতিমা নির্মাণ, সংস্কৃত কলশ স্থাপন, পঞ্চামৃত ও মন্ত্রে পূজা, দীপদান, নির্দিষ্ট ফলাদি দ্বারা অর্ঘ্য, এবং রাত্রিজাগরণে পবিত্র কাহিনি শ্রবণ/কীর্তন এই ব্রতের অঙ্গ। শেষে শ্রাদ্ধ, ব্রাহ্মণভোজন ও দান করে ব্রত সমাপ্ত হয়। ফল হিসেবে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ লাভ এবং বিষ্ণুর কৃপায় বৈষ্ণব অবস্থায় প্রতিষ্ঠা লাভের কথা বলা হয়েছে।

Adhyaya 26

Praise of Food-Donation (Anna-dāna Māhātmya)

নারদ জিজ্ঞাসা করেন—ধর্মমতে দান করতে চাইলে কোন কোন দান প্রধান? উমাপতি মহাদেব বলেন, অন্নই দেহধারণের মূল আশ্রয়; সকল প্রাণী, শক্তি ও প্রাণবায়ু অন্ননির্ভর, তাই অন্নদান সর্বদানের মধ্যে অতুল। গৃহস্থের উচিত যথাসময়ে যোগ্য ব্রাহ্মণ, দরিদ্র-দুঃখী এবং ক্লান্ত পথিক/অতিথিকে আহার দান করা; ঈর্ষা, ক্রোধ ও অবজ্ঞা ত্যাগ করে তৎক্ষণাৎ দান করতে হবে। ভিক্ষুকের জাতি বা বৈদিক শাখা বিচার করে দান বিলম্ব করা নিষেধ। ফল হিসেবে অক্ষয় পুণ্য, মহাপাপেরও ক্ষয়, এবং স্বর্গে কল্পবৃক্ষ, দিব্য যান, সরোবর ও প্রাসাদের মতো সমৃদ্ধ ভোগের বর্ণনা আছে। অন্নদানকে এখানে নৈতিক কর্তব্য ও মুক্তিদায়ক সাধনা—উভয়ই বলা হয়েছে।

Adhyaya 27

The Glory of Explaining Dharma: Waterworks, Tree-Planting, Truth, Austerity, and Sacred Reading

অধ্যায় ২৭-এ ধর্মোপদেশে লোকহিত ও অন্তঃশুদ্ধির সংযোগ দেখানো হয়েছে। শুরুতে জলদানকে সর্বশ্রেষ্ঠ দান বলে ঘোষণা করে কূপ, কুয়ো, পুকুর ও জলাশয় নির্মাণের প্রশংসা করা হয়েছে। এই জলাশয় পাপক্ষয় করে, বংশের উন্নতি ঘটায়, এবং বিশেষত গরু, ব্রাহ্মণ, তপস্বী ও সাধারণ মানুষের উপকারে আসে। পুকুরকে সকল প্রাণীর আশ্রয় বলা হয়েছে; ঋতু পরিবর্তনেও অবিরত জলপ্রাপ্তিকে মহাযজ্ঞসম তুল্য পুণ্য বলে গণ্য করা হয়েছে। এরপর বৃক্ষরোপণের মাহাত্ম্য—বৃক্ষ বংশধারার “পুত্র”সদৃশ, অতিথিকে সম্মান দেয় এবং জীবজগতকে পোষণ করে। তারপর সত্যের মহিমা বিস্তারে বলা হয়েছে: যজ্ঞ, মন্ত্র, তপস্যা এবং জগতের স্থিতির ভিত্তি সত্য। নারদ তপস্যার বিস্তারিত জানতে চাইলে তপস্যাকে সর্বত্র ফলদায়ক, এমনকি মহাপাপীরও শুদ্ধিকারক বলা হয়েছে। শেষে পুরাণশিক্ষা, যোগ্য পাত্রকে দান, পুণ্যদানের বিধি এবং বিষ্ণুমন্দিরে ইতিহাস-পুরাণ পাঠকে পরম পুণ্যকর বলা হয়েছে।

Adhyaya 28

The Glory of Explaining (and Hearing) Sacred Scripture

মহাদেব নারদের কাছে এক প্রাচীন পরম্পরাগত কাহিনি আরম্ভ করেন, যেখানে পুরাণ-শ্রবণ ও শাস্ত্র-ব্যাখ্যার সর্বোচ্চ পুণ্য মহিমা বর্ণিত। সেই ধারায় সনৎকুমার ধর্মরাজের নিকট গিয়ে দেখেন—দিব্যলোক থেকে আগত অতিথিদের অর্ঘ্য, প্রণাম ও ভক্তিসহকারে বিশেষ সম্মান দেওয়া হচ্ছে; তখন প্রশ্ন ওঠে, কোন কর্মে তারা এমন আদর লাভ করেছে। ধর্মরাজ বৈদীশ-দেশ ও তীর্থতপস্যা-সম্পর্কিত দৃষ্টান্ত বলেন—এক শাপগ্রস্ত সত্তা প্রসিদ্ধ নদী-সঙ্গম তীর্থে উপবাস করে এবং সেখানেই দেহত্যাগ করলে শাপমুক্ত হয়, পরে বিষ্ণুর সান্নিধ্য লাভ করে। এরপর এক রাজা বিষ্ণুমন্দির নির্মাণ করে জনসমক্ষে পুরাণপাঠ প্রবর্তন করেন; পাঠককে সম্মান করা হয়, গ্রন্থকেও পূজা করা হয়, এবং এক বছরের দান-ভরণপোষণও প্রদান করা হয়। অন্তে বলা হয়—সুগন্ধি, পুষ্প বা বিপুল দানের চেয়ে দেবতারা ইতিिहास–পুরাণ শ্রবণে অধিক তুষ্ট হন। যোগ্য পাঠককে সামান্য স্বর্ণদানও মহাফলদায়ক, আর এই মাহাত্ম্য শ্রবণকারীরা জন্মে জন্মে অমঙ্গল থেকে রক্ষা পায়।

Adhyaya 29

The Greatness of Gopī-candana (Vaiṣṇava Tilaka and Emblems)

উমাপতি (মহাদেব) নারদকে গোপী-চন্দনের উদ্ধারক মাহাত্ম্য শিক্ষা দেন। কলিযুগে শুদ্ধি ও বৈষ্ণব পরিচয়ের প্রধান উপায় হিসেবে তিনি বলেন—দেহে গোপী-চন্দন লেপন ও বৈষ্ণব তিলক-চিহ্ন ধারণ করলে বহু জন্মের মহাপাপ, যেমন ব্রহ্মহত্যা, সুরাপান প্রভৃতি, নাশ হয়। এরপর বারোটি তিলকের বিন্যাস, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ইত্যাদি মুদ্রা ও নাম-মুদ্রা ধারণ, উত্তপ্ত চক্র দ্বারা অঙ্কন-রীতি, এবং তুলসীমালা পরিধানের বিধান বর্ণিত হয়। ভক্ত বৈষ্ণব ব্রাহ্মণকে বিষ্ণুর অভিন্নরূপ বলে মহিমান্বিত করা হয়, বৈষ্ণব-নিন্দার ভয়ংকর দোষ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়, এবং শেষে চিহ্নধারী ভক্তের বিষ্ণুর পরম ধামে গমন নিশ্চিত করা হয়।

Adhyaya 30

The Glory and Procedure of the Year-long Lamp Vow

এই অধ্যায়ে সংवत্সর-দীপব্রত—এক বছর অবিচ্ছিন্ন প্রদীপ জ্বালানোর ব্রত—এর মহিমা ও বিধান বর্ণিত। একে শ্রেষ্ঠ ব্রত বলা হয়েছে; বহু ব্রতের সমষ্টিগত পুণ্যফল দান করে এবং গুরুতর পাপও নাশ করে। হেমন্তকালের শুভ একাদশীতে প্রাতে স্নান করে (সঙ্গমে বা গৃহে মন্ত্রসহ), লক্ষ্মী–নারায়ণের পঞ্চামৃত ও সুগন্ধি জলে অভিষেকসহ পূজা করতে হয়। ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, অর্ঘ্য নিবেদন করে এক বছর অখণ্ড দীপ রক্ষার সংকল্প গ্রহণ করা হয়; শীল-নিয়ম, উপবাস, রাত্রিজাগরণে কীর্তন/পাঠ, ব্রাহ্মণভোজন এবং বছরভর ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে নির্দেশিত। শেষে দীপ-উপকরণ, দক্ষিণা, গাভী/শয্যা/বস্ত্রাদি দানের বিধান আছে। কথায় কাপিলের দীপপূজার প্রভাবে অজান্তেই এক বিড়াল ও এক ইঁদুরও পুণ্যলাভ করে; তারা বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হয়ে পরে রাজকুলে জন্ম নিয়ে সমৃদ্ধি লাভ করে। এতে বোঝানো হয়, দীপসেবার সামান্য সংযোগও মুক্তিমুখী ফল দেয়।

Adhyaya 31

The Janmāṣṭamī (Jayantī Aṣṭamī) Vow: Prior-Birth Merit and Ritual Procedure

নারদ শিবের কাছে এক পবিত্র ব্রত শেখার প্রার্থনা করেন। মহাদেব রাজা হরিশ্চন্দ্রের দৃষ্টান্ত বলেন—তাঁর আশ্চর্য রাজঐশ্বর্য দেখে তার কর্মফল-কারণ জানার কৌতূহল জাগে। হরিশ্চন্দ্র সনৎকুমারের শরণ নেন; তিনি জানান, পূর্বজন্মে হরিশ্চন্দ্র ছিলেন এক ধর্মপরায়ণ বৈশ্য, যিনি দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও কাশীতে জয়ন্তী অষ্টমীতে আদিত্যের সঙ্গে হরির পূজায় ফুল অর্পণ করে ভক্তি নিবেদন করেছিলেন। সেই সামান্য পুণ্যকর্মকে ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজার কন্যা চন্দ্রাবতী রক্ষা ও সম্মান করেছিলেন; তার ফলেই মহাপুণ্য, দিব্যলোকপ্রাপ্তি এবং পরে দেহত্যাগের পর উত্তম গতি লাভ হয়। এরপর ব্রতের বিধান বলা হয়—শ্রাবণ মাসের কৃষ্ণ অষ্টমীই এই ব্রত; রোহিণী নক্ষত্রের যোগ হলে তা ‘জয়ন্তী’ নামে খ্যাত। রত্নভরা কুম্ভ স্থাপন, স্বর্ণপাত্র, যশোদা-গোবিন্দের প্রতিমা, ধূপ-দীপ-নৈবেদ্য ও অলংকারসহ উৎসবপূর্ণ পূজা, গান-বাদ্যসহ আরাধনা এবং শেষে গুরুপূজা ও প্রণামের নিয়ম বিস্তারিতভাবে নির্দেশিত।

Adhyaya 32

Praise of Land-Donation (Bhū-dāna) and the Sin of Land-Theft

যজ্ঞ সমাপ্ত হলে ইন্দ্র বृहস্পতিকে জিজ্ঞাসা করেন—কোন দান অবিনাশী ও সর্বোত্তম? বृहস্পতি বলেন, ভূমিদানই সর্বশ্রেষ্ঠ; এটি স্বর্ণ, গাভী, বস্ত্র ও রত্নদানের সমতুল্য ফল দেয় এবং পৃথিবী ও সূর্য যতদিন থাকে ততদিন তার পুণ্য অক্ষয় থাকে। ভূমির মাপ (গো-চর্ম প্রভৃতি) উল্লেখ করে সংযমী, তপস্বী ব্রাহ্মণদের যোগ্য পাত্র বলা হয়েছে। তারপর কঠোর নিষেধ—দানকৃত ভূমি কেড়ে নেওয়া, সীমানা লঙ্ঘন, ভূমি-বিষয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য, ও ব্রাহ্মণের সম্পত্তি আত্মসাৎ মহাপাপ; এর ফলে নরকগতি, পশুযোনি ও বংশনাশ ঘটে। পাশাপাশি অন্ন-বস্ত্রদান, কূপ/সেতু প্রভৃতি জলকার্য, দীপদান, দক্ষিণা, অহিংসা ও সত্যের পুণ্যও বলা হয়েছে। শেষে ফলশ্রুতি—এই বृहস্পতি-ধর্ম পাঠ করলে আয়ু, জ্ঞান, যশ ও বল বৃদ্ধি পায়।

Adhyaya 33

Daśaratha’s Hymn to Śani (Saturn) and the Pacification of Graha-Affliction

নারদ শিবকে জিজ্ঞাসা করেন—শনি-গ্রহের পীড়া কীভাবে শান্ত হয়। শিব তখন রাজা দশরথের এক গোপন কাহিনি বলেন। জ্যোতিষীরা জানান, শনির গতি থেকে “শাকট-ভেদ” নামে মহাবিপদ ও বারো বছরের দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা। দশরথ বশিষ্ঠ প্রমুখ ব্রাহ্মণ-ঋষিদের পরামর্শ নিয়ে সাহসে নক্ষত্রলোকের দিকে গমন করেন এবং দিব্য অস্ত্রসহ শনি (সৌরি/শনৈশ্চর)-কে সম্মুখীন হন। দশরথের বীর্য দেখে শনি প্রসন্ন হয়ে বর দিতে চান। রাজা প্রার্থনা করেন—শনি যেন রোহিণী নক্ষত্র অতিক্রম না করেন এবং ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ না ঘটান; শনি সেই নিয়ম মেনে নেন। পরে দশরথ ভক্তিভরে পূজা করেন এবং শনি-সূর্য-ভাবযুক্ত তীব্র স্তোত্র পাঠ করেন; শনি গ্রহের স্বভাব ও শান্তির কথা বলেন। শেষে শনি-শান্তির বিধান দেওয়া হয়—শনিবার পাঠ, শমীপাতা পূজা, লোহা ও তিল দান ইত্যাদি। ফলশ্রুতিতে গ্রহদোষ দ্রুত নাশ ও মঙ্গল লাভের প্রতিশ্রুতি আছে।

Adhyaya 34

The Account and Procedure of the Trispṛśā Observance (Trispṛśā-Ekādaśī)

এই অধ্যায়ে নারদ শিবের কাছে ত্রিস্পৃশা-ব্রত (ত্রিস্পৃশা-একাদশী)-এর মাহাত্ম্য ও বিধান জানতে চান। শিব বলেন, কলিযুগে এই ব্রত পাপ ও শোক নাশ করে এবং বিষ্ণু/কৃষ্ণভক্তির দ্বারা মুক্তিদায়ক। এরপর অন্তর্কথায় জাহ্নবী গঙ্গা, স্নানার্থীদের পাপ গ্রহণ করে কলিদোষে ভারাক্রান্ত হয়ে, প্রাচীমাধবের শরণ নেন; মাধব জানান—তীর্থ, যজ্ঞ ও অন্যান্য ব্রতের চেয়েও এই ত্রিস্পৃশা শ্রেষ্ঠ। ত্রিস্পৃশার তিথি-নির্ণয় স্পষ্ট করা হয়—একাদশী-দ্বাদশী-ত্রয়োদশীর বিশেষ সংযোগ এবং দশমী-বেধ (দশমীর স্পর্শ) থাকলে ব্রত পরিত্যাগের সতর্কতা; শ্রীকৃষ্ণের বাণীরূপে শুদ্ধ তিথিতে উপবাস পালনের নির্দেশ আছে। পরে বিধিতে স্বর্ণমূর্তি নির্মাণ, তিল ও রত্নসহ পাত্র/কলস স্থাপন, তুলসী দিয়ে দামোদরের পূজা, অর্ঘ্য-নৈবেদ্য-দীপ, রাত্রিজাগরণ ও কীর্তন, গুরুপূজা, দান এবং ব্রাহ্মণভোজনের কথা বলা হয়েছে। শেষে শ্রবণ-লেখন-আচরণে মহাপুণ্য, পিতৃউদ্ধার ও বহুজনের মুক্তিলাভ—এই ফলশ্রুতি দিয়ে অধ্যায় সমাপ্ত।

Adhyaya 35

The Unmīlanī Vow (Unmīlanī Ekādaśī): Definition, Superiority, and Rite

এই অধ্যায়ে উমাপতি (মহাদেব) নারদকে উন্মীলনী একাদশী-ব্রতের সংজ্ঞা ও মাহাত্ম্য বলেন। এটি অতুলনীয় একাদশী; কেবল শ্রবণমাত্রেই সংসারবন্ধন শিথিল হয়—এমন প্রশংসা করা হয়েছে। বৈষ্ণবসেবার বিশেষ গৌরব বর্ণিত—শালগ্রাম, তুলসী, শঙ্খজল ও পূজাশেষ (প্রসাদ) সম্মান করা, এবং দূর্বা, যব, অক্ষত ও কুশ দিয়ে পূজা করার বিধান দেওয়া হয়েছে। দ্বাদশীর কঠোর আচরণ দশমী-‘বেধ’ বর্জিত ও রাত্রিজাগরণসহ পালন করতে বলা হয়েছে। উন্মীলনীর লক্ষণ—যে একাদশী দিন-রাত্রি ব্যাপী হয়ে প্রভাতেও অবশিষ্ট থাকে; একে সর্বতীর্থের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। এরপর আচারপদ্ধতি বলা হয়—কলশ প্রস্তুতি, শঙ্খে অর্ঘ্য, মাসনাম-আহ্বান, অঙ্গ-আসন ও চিহ্নপূজা, ভক্তিপূর্ণ প্রার্থনা, এবং শেষে গুরুসন্তোষ ও দান। ফল হিসেবে বিষ্ণুর সান্নিধ্যে দীর্ঘকাল বাস লাভের কথা বলা হয়েছে।

Adhyaya 36

The Greatness of Pakṣavardhinī Ekādaśī (Fortnight-Increasing Observance)

শিব–নারদ সংলাপে নারদ জিজ্ঞাসা করেন—পক্ষবর্ধিনী একাদশী-ব্রত কীভাবে মহাপাপ থেকে মুক্তি দেয়। মহাদেব এর তিথি-নির্ণয়, পক্ষ-বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বিধান এবং মহাযজ্ঞফলসদৃশ অসাধারণ পুণ্যের কথা ব্যাখ্যা করেন। এরপর বিস্তারিত বৈষ্ণব পূজা-বিধি বর্ণিত হয়—কলশ স্থাপন, পাত্র-রত্ন-ধান্যাদি সংগ্রহ, মাসানুসারে নামযুক্ত স্বর্ণমূর্তি নির্মাণ, পঞ্চামৃত স্নান, সুগন্ধি অনুলেপন, বস্ত্র-অলংকার অর্পণ ও অর্ঘ্য প্রদান। দেহ-সমর্পণের অঙ্গন্যাসে বিষ্ণুর দিব্য নাম দ্বারা অঙ্গসমূহ নিবেদন করা হয় এবং সংসার-মোচনের প্রার্থনা করা হয়। শেষে নৈবেদ্য, দীপদান, গুরুর সম্মান এবং সারারাত জাগরণ—গান, নৃত্য ও পুরাণ-পাঠসহ—উল্লেখ আছে। ফলশ্রুতিতে পাপক্ষয়, ইচ্ছাপূরণ এবং এই ব্রত পালনকারীদের দৃষ্টান্ত বলা হয়েছে।

Adhyaya 37

The Greatness of the Ekādaśī/Dvādaśī Night-Vigil (Jāgaraṇa)

এই অধ্যায়ে উমাপতি–নারদ সংলাপের মধ্যে মহাদেব একাদশী ও দ্বাদশীর রাত্রিজাগরণ (জাগরণ)‑এর মহিমা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, উপবাসের পূর্ণ ফল জাগরণে সম্পন্ন হয়; রাত্রিতে ঘুমালে ব্রতফল নষ্ট হয়। রাতের প্রহরপ্রহরে কীর্তন, বাদ্য, নৃত্য, পুরাণপাঠ, ধূপ‑দীপ, নৈবেদ্য, সত্যাচরণ, দান ও ইন্দ্রিয়সংযমসহ কেশব/বিশ্বেশ্বরের ভক্তিপূজার বিধান বলা হয়েছে। বৈষ্ণব‑নিন্দা, ছলনা, উপহাস, পরনিন্দা ও সম্প্রদায়বিদ্বেষকে মহাপাপ বলা হয়েছে এবং বিষ্ণু‑শিবের অভেদভাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ঘটি/প্রহর অনুযায়ী জাগরণের পুণ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়—এমন অতিশয়োক্তি সহ পিতৃকল্যাণ ও উদ্ধারের ফলও যুক্ত করা হয়েছে। শেষে দ্বাদশীতে যথাবিধি পারণ (ব্রতভঙ্গ) করার নিয়ম এবং তিথি ক্ষীণ হলে কীভাবে পালন করতে হবে—সে নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

Adhyaya 38

Origin of Ekādaśī and the Slaying of Mura; Greatness of Mahādvādaśī and Ekādaśī Rules

এই অধ্যায়ে নারদের প্রশ্নে মহাদেবের প্রসঙ্গের পর যুধিষ্ঠিরের জিজ্ঞাসায় শ্রীভগবান একাদশী–দ্বাদশীর মাহাত্ম্য ও ব্রতবিধি বর্ণনা করেন। পুনর্বসু নক্ষত্রযুক্ত একাদশী ‘জয়া’, শ্রবণ নক্ষত্রযুক্ত শুক্ল-দ্বাদশী ‘বিজয়া’ এবং বিশেষত পুষ্যযোগে পাপনাশিনী দ্বাদশী ‘জয়ন্তী’ নামে খ্যাত—মহাদ্বাদশী ও একাদশীর শুভসংযোগের গৌরবও বলা হয়। উপবাস, নক্ত ও একভক্তের ভেদ, স্নান-শৌচের শুদ্ধি, আচরণসংযম, পূজা, দীপদান, রাত্রিজাগরণ, দান, উভয় পক্ষেই একাদশীর সমতা, এবং বেধ, ত্রিস্পৃশা দ্বাদশী ও পারণ-সময়ের সূক্ষ্ম নিয়ম নির্দেশিত হয়। এরপর উৎপত্তিকথা: মুর নামক অসুর দেবতাদের দুঃখ দেয়; ইন্দ্রাদি দেবগণ স্তোত্র করে বিষ্ণুর শরণ নেন। ভগবান মুরের সঙ্গে মহাযুদ্ধ করে এক গুহায় বিশ্রাম নিতে গেলে তাঁর দেহ থেকে এক দিব্য কন্যা প্রকাশিত হন—তিনি একাদশী-শক্তি—এবং মুরকে বধ করেন। ভগবান প্রসন্ন হয়ে বর দেন যে একাদশী-ব্রত পালনকারী ভক্তরা ধর্ম, ঐশ্বর্য, সমৃদ্ধি ও মোক্ষ লাভ করবে এবং তাদের পাপ বিনষ্ট হবে।

Adhyaya 39

Mokṣadā (Mokṣā) Ekādaśī: Observance in Mārgaśīrṣa Bright Fortnight and the Liberation of Ancestors

এই অধ্যায়ে মার্গশীর্ষ মাসের শুক্লপক্ষে মোক্ষদা (মোক্ষা) একাদশীর ব্রতবিধি বর্ণিত হয়েছে। তুলসীপাতা, ধূপ ও দীপ দিয়ে ভগবান দামোদরের পূজা, উপবাসের সংযম, এবং রাত্রিজাগরণে গান-স্তব ও কীর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ব্রতের কথা শ্রবণ বা পাঠ করাও মহাপাপ-নাশক এবং মহাযজ্ঞসম ফলদায়ক বলা হয়েছে। এরপর পুরাণীয় দৃষ্টান্তে রাজা বৈখানস স্বপ্নে পিতৃগণকে নরকে যন্ত্রণা ভোগ করতে দেখেন। চম্পক নগরের ব্রাহ্মণেরা তাঁকে ঋষি পর্বতের কাছে নিয়ে যায়; ঋষি জানান, পূর্বজন্মের এক বিশেষ পাপের ফলে পিতৃদের পতন ঘটেছে। তিনি রাজাকে মোক্ষা একাদশী ব্রত পালন করে তার পুণ্য পিতার উদ্দেশ্যে অর্পণ করতে বলেন। ব্রত সম্পন্ন হলে দিব্য লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং পিতা পিতৃদের সঙ্গে মুক্তিলাভ করেন—এভাবে পিতৃ-মোক্ষ ও ব্যক্তিগত মোক্ষদায়িনী হিসেবে ব্রতের মহিমা প্রতিষ্ঠিত হয়।

Adhyaya 40

Saphalā Ekādaśī in the Dark Fortnight of Pauṣa: Observance and Merit

এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে জানান যে পৌষ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী ‘সফলা একাদশী’ নামে প্রসিদ্ধ এবং যজ্ঞ, তীর্থভ্রমণ ও অন্যান্য ব্রতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। নারায়ণ/হরির পূজার বিধান দেওয়া হয়েছে—নারকেল, সুপারি, মাতুলঙ্গ, ডালিম, আমলকী প্রভৃতি ঋতুফল, ধূপ-দীপসহ; বিশেষ করে দীপদান ও বৈষ্ণবদের সঙ্গে রাত্রিজাগরণের মাহাত্ম্য বলা হয়েছে। এরপর লুম্পক নামে এক পাপী রাজপুত্রের মুক্তির কাহিনি বর্ণিত। দুষ্কর্ম ও অপবিত্র আচরণের জন্য সে রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে বনে চোরবৃত্তি করে। সফলা একাদশীর রাতে শীত ও ক্ষুধায় কাতর হয়ে সে বাসুদেব-সম্পর্কিত পবিত্র অশ্বত্থের কাছে থাকে; অজান্তেই তার জাগরণ হয় এবং সংগ্রহ করা ফল গাছের মূলে অর্পণ করে হরির প্রসন্নতা প্রার্থনা করে। বিষ্ণু এই জাগরণ ও ফলার্পণকে সত্য ভক্তি হিসেবে গ্রহণ করেন; আকাশবাণীতে তাকে পুনরায় রাজ্য ও মর্যাদা লাভের বর দেওয়া হয়। শেষে বলা হয়—সফলা একাদশীর শ্রবণ, পাঠ ও পালন মহাপুণ্যদায়ক, রাজসূয় যজ্ঞসম ফলপ্রদ।

Adhyaya 41

Putradā Ekādaśī of the Bright Fortnight of Pauṣa (The Son-Bestowing Ekadashi)

যুধিষ্ঠির পৌষ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, এ একাদশীর নাম ‘পুত্রদা’—পরম পাপনাশিনী ব্রত, যার অধিদেবতা নারায়ণ/কেশব। ভক্তিভরে পালন করলে পুত্রলাভ ও স্বর্গপ্রাপ্তি হয়। এরপর কাহিনি-পর্বে পুলস্ত্য ঋষি ভীষ্মকে এক শুদ্ধিকর উপাখ্যান শোনান। পুত্রহীনতার দুঃখ ও পিতৃঋণ অপূর্ণ থাকার আশঙ্কায় রাজা সুকেতুমান (কেতুমান) রাজসুখ ত্যাগ করে অরণ্যে গমন করেন। অরণ্যের বর্ণনার মধ্যে তিনি এক পবিত্র সরোবর ও আশ্রমসমৃদ্ধ স্থানে পৌঁছে ‘বিশ্বেদেব’ নামে পরিচিত মুনিদের দর্শন পান। তাঁরা জানান আজ পুত্রদা একাদশী এবং বিধিপূর্বক ব্রত পালনের উপদেশ দেন। রাজা উপবাস, পূজা ও পারণ যথাযথভাবে সম্পন্ন করে রাজ্যে ফিরে আসেন; রানি গর্ভধারণ করেন এবং কালে দীপ্তিমান পুত্র প্রসব করেন। অধ্যায়ের ফলশ্রুতি—এই ব্রত শ্রবণ-পাঠও অগ্নিষ্টোম যজ্ঞসম পুণ্য দেয়; আন্তরিকভাবে পালন করলে পাপক্ষয় ও পুত্রপ্রাপ্তি নিশ্চিত।

Adhyaya 42

The Glory and Observance of Ṣaṭ-tilā Ekādaśī (Six-Sesame Vow)

এই অধ্যায়ে মাঘ কৃষ্ণপক্ষের একাদশী ‘ষট্-তিলা’—পাপনাশিনী ব্রতরূপে মহিমাকীর্তিত। শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে এবং অন্তর্নিহিত বর্ণনায় পুলস্ত্য দালভ্যকে শৌচ, ইন্দ্রিয়সংযম, হরিপূজা, রাত্রিজাগরণ, হোম ও নির্দিষ্ট মন্ত্রে অর্ঘ্যদানের বিধান বলেন। ব্রতান্তে ব্রাহ্মণদের সম্মান করে সামর্থ্য অনুযায়ী দান—কলশ, বস্ত্র, পাদুকা ইত্যাদি, বিশেষত কালো তিল এবং সম্ভব হলে কালো গাভী দানের কথা বলা হয়েছে। তিল-সম্পর্কিত ছয় প্রকার আচরণকে মহাপুণ্যদায়ক বলা হয়। পরে একটি দৃষ্টান্তে দেখা যায়: এক ব্রাহ্মণী উপবাসে নিষ্ঠাবান হলেও অন্নদানে ঘাটতির কারণে সীমিত স্বর্গফল পায়। ষট্-তিলা ব্রতের উপদেশে সে সমৃদ্ধি ও মোক্ষাভিমুখ ফল লাভ করে—এতে শিক্ষা দেওয়া হয় যে ভক্তি ও তপস্যা দানের দ্বারা, বিশেষত অন্নদান ও তিলদানের দ্বারা, সম্পূর্ণ হয়।

Adhyaya 43

The Greatness of Jayā Ekādaśī (Māgha, Bright Fortnight)

এই অধ্যায়ে মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের ‘জয়া একাদশী’ ব্রতের মাহাত্ম্য বর্ণিত। শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বলেন—এই একাদশী সর্বপাপহর, ব্রহ্মহত্যার মতো মহাদোষও নাশ করে এবং পিশাচ-অবস্থার মতো অধঃপতন থেকেও উদ্ধার করে। অন্তর্নিহিত দেবকথায় গন্ধর্ব মাল্যবান ও অপ্সরা পুষ্পদন্তী ইন্দ্রের আদেশ অমান্য করে ক্রীড়ায় মগ্ন থাকায় ইন্দ্র তাদের শাপে পিশাচ করে দেন। তারা হিমালয়ে দীর্ঘকাল দুঃখ ভোগ করে; কিন্তু দৈবক্রমে জয়া একাদশীর দিনে অনিচ্ছায় উপবাস, অহিংসা ও রাত্রিজাগরণ পালন হয়ে যায়। বিষ্ণুর প্রভাবে তাদের পিশাচত্ব নষ্ট হয়ে পূর্বদিব্যরূপ ফিরে আসে। স্বর্গে ফিরে তারা বাসুদেব ও জয়া-ব্রতের কৃপা স্বীকার করে; ইন্দ্রও তাদের শুদ্ধি মেনে হরিভক্তির প্রশংসা করেন। শেষে শ্রীকৃষ্ণ একাদশী পালনের ও এই কাহিনি শ্রবণ-পাঠের ফল হিসেবে বৈকুণ্ঠে দীর্ঘবাসের প্রতিশ্রুতি দেন।

Adhyaya 44

The Glory of Vijayā Ekādaśī in the Dark Fortnight of Phālguna (Victory-Granting Fast)

যুধিষ্ঠির ফাল্গুন কৃষ্ণপক্ষের একাদশীর নাম ও মহিমা শ্রীকৃষ্ণের কাছে জানতে চান। শ্রীকৃষ্ণ বলেন—পূর্বে নারদ ব্রহ্মার কাছে যে প্রশ্ন করেছিলেন, তার উত্তরে এই ব্রত ‘বিজয়া একাদশী’ নামে প্রসিদ্ধ; এটি দ্রুত বিজয় প্রদান করে। লঙ্কা-অভিযানে সীতাহরণের পর সমুদ্র পার হওয়ার প্রস্তুতিকালে শোকাকুল রামকে ঋষি বকদাল্ভ্যের শরণ নিতে বলা হয়। ঋষি ‘সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রত’ হিসেবে বিজয়া একাদশীর বিধান দেন—ধান্যসহ কলস স্থাপন, নারায়ণের প্রতিষ্ঠা, একাদশীতে পূজা ও রাত্রিজাগরণ, দ্বাদশীতে দীপদান, জলতীরে পূজা, শেষে কলস ও মহাদান বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণকে দান। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—এ ব্রতে ইহলোকে বিজয়, পরলোকে অক্ষয় কল্যাণ; শ্রবণ-পাঠে বাজপেয় যজ্ঞসম পুণ্য লাভ হয়।

Adhyaya 45

Amalaki Ekadashi (Phalguna Bright Fortnight): Origin, Deity-Body Mapping, and Vigil Procedure

এই অধ্যায়ে বশিষ্ঠ রাজা মান্ধাতাকে বলেন—ধাত্রী/আমলকী বৃক্ষ পরম বৈষ্ণব তীর্থ; এর স্মরণ, স্পর্শ ও ধারণ করলে পুণ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ব্রহ্মার মুখ থেকে নির্গত এক দীপ্ত বিন্দু থেকে এই বৃক্ষের আবির্ভাব—এ কথা শুনে দেবতা ও ঋষিরা বিস্মিত হন। তখন এক অশরীরী বাণী প্রকাশ পেয়ে এর পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং নিজেকে চিরন্তন বিষ্ণু বলে পরিচয় দেয়। এরপর বিষ্ণু ফাল্গুন শুক্লপক্ষে আমলকী একাদশী-ব্রতের শুভ সময় নির্ধারণ করেন—বিশেষত দ্বাদশী তিথি পুষ্য নক্ষত্রের সঙ্গে মিললে মহাফলদায়ক। জাগরণ, পূজা, অর্ঘ্য, প্রদক্ষিণা, সঙ্গীত-স্তোত্রপাঠ, প্রভাতে আরতি এবং ব্রাহ্মণদের দান-ভোজনের বিধান বলা হয়। জাগরণের ফল সহস্র গোদানের সমান এবং বিষ্ণুলোক থেকে পতন না হওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনঃপুনঃ উচ্চারিত হয়।

Adhyaya 46

Pāpamocanī Ekādaśī (The Ekādaśī that Removes Sin) — Caitra Kṛṣṇa Pakṣa

এই অধ্যায়ে চৈত্র কৃষ্ণপক্ষের একাদশীকে ‘পাপমোচনী’ বলা হয়েছে—যা পাপ বিনাশ করে এবং পিশাচ-অবস্থাও দূর করে। শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে জানান, এই কাহিনি লোমশ ঋষি রাজা মান্ধাতাকে বলেছিলেন। কাহিনিতে চৈত্ররথের নিকটে ব্রহ্মচারী মুনি মেধাবিন কামদেবের প্রভাবে অপ্সরা মঞ্জুঘোষার মোহে পড়েন; বহু বছর কেটে যায়, তপস্যা ক্ষয় হতে থাকে। পরে পুণ্যহানির বোধ হলে তিনি তাকে পিশাচী হওয়ার শাপ দেন, কিন্তু করুণায় পাপমোচনী একাদশী-ব্রতকে মুক্তির উপায় বলে দেন। মেধাবিন প্রায়শ্চিত্তের জন্য পিতা চ্যবনের শরণ নেন; চ্যবনও একই একাদশী-ব্রতের বিধান করেন। ব্রতের প্রভাবে মেধাবিন শুদ্ধ হন এবং মঞ্জুঘোষা দিব্যরূপে স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করে। এই উপাখ্যান শ্রবণ-পাঠও মহাপুণ্যদায়ক বলে ঘোষিত।

Adhyaya 47

The Greatness of Kāmadā Ekādaśī (Caitra, Bright Fortnight)

যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন—চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে কোন একাদশী পালিত হয়। শ্রীকৃষ্ণ বসিষ্ঠের দিলীপকে প্রদত্ত পূর্বোপদেশ স্মরণ করে বলেন, এটি ‘কামদা একাদশী’; একাদশী পাপক্ষয়কারী ও মহাফলদায়িনী। এরপর দৃষ্টান্তকথা—নাগপুরে গন্ধর্ব ললিত স্ত্রী ললিতার বিরহে ব্যাকুল হয়ে গানে ভুল করে। এতে ক্রুদ্ধ এক দেবীস্বরূপা নারী তাকে রাক্ষস রূপের শাপ দেন। শোকাতুর ললিতা অরণ্যাশ্রমে এক শান্ত মুনির শরণ নেন; মুনি তাকে কামদা একাদশীর ব্রত—একাদশীর উপবাস ও দ্বাদশীর বিধি সহ—পালন করে তার পুণ্য স্বামীর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করতে বলেন। ব্রত সম্পন্ন হলে শাপ মোচন হয় এবং ললিত পুনরায় গন্ধর্বত্ব লাভ করে। অধ্যায়শেষে শ্রবণ-পাঠনের মাহাত্ম্য ঘোষিত—বাজপেয় যজ্ঞসম ফল এবং মহাপাপ বিনাশের শক্তি; শেষে উমাপতি-নারদ সংলাপের মাধ্যমে সমাপ্তি।

Adhyaya 48

Greatness of Varūthinī Ekādaśī in the Dark Fortnight of Vaiśākha

এই অধ্যায়ে বৈশাখ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীকে ‘বরূথিনী’ বলা হয়েছে এবং তার মাহাত্ম্য বর্ণিত। এই ব্রত সমৃদ্ধিদায়ক, পাপবিনাশক এবং পরম গতি—মোক্ষ—প্রদানকারী; গভীর সংস্কারসদৃশ কলুষও দূর করে বলে বলা হয়েছে। মাণ্ডহাতা ও ধুন্ধুমার প্রভৃতি রাজাদের দৃষ্টান্ত এবং শিবের কপাল-দোষমোচনের প্রসঙ্গ দিয়ে ব্রতের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত। বরূথিনীর পুণ্যকে কঠোর তপস্যা ও গ্রহণকালে দানের সমতুল্য বলা হয়েছে। এরপর দানের শ্রেণিবিন্যাস—অন্নদান, তিলদান, জ্ঞানদান—এবং সমাজধর্মের বিধান আলোচিত; কন্যার ধন লোভ করে ভোগ করার নিন্দা ও কন্যাদানের প্রশংসা করা হয়েছে। দশমী-একাদশী-দ্বাদশীর আচরণনিয়ম, রাত্রিজাগরণ ও মধুসূদন পূজার নির্দেশ আছে; এই কাহিনি শ্রবণ-পাঠে অক্ষয় গতি ও মহাপুণ্য লাভের কথা বলা হয়েছে।

Adhyaya 49

The Greatness of Mohinī (Rāma) Ekādaśī in the Bright Fortnight of Vaiśākha

যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন—বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষে যে একাদশী, তার মাহাত্ম্য কী। শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দিলেন—পূর্বে শ্রীरामচন্দ্র বশিষ্ঠকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “পাপ ও শোক নাশকারী সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রত কোনটি?” বশিষ্ঠ বললেন—এটি মোহিনী (রাম) একাদশী; এটি মোহ দূর করে এবং মহাপাপের স্তূপ বিনাশ করে। এরপর একটি উপাখ্যান: ভদ্রাবতীতে ধর্মপরায়ণ বৈশ্য ধনপালের পঞ্চম পুত্র ধৃষ্টবুদ্ধি কুকর্মে লিপ্ত হয়। তাকে গৃহ থেকে তাড়ানো হয়; পরে সে শিকারি ও অপরাধী হয়ে দারিদ্র্য-দুঃখ ভোগ করে। দৈবক্রমে গঙ্গাস্নানের পর ঋষি কৌণ্ডিন্যের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়; ঋষির বস্ত্রস্পর্শে তার অন্তঃকরণ শুদ্ধ হয়। কৌণ্ডিন্য তাকে মোহিনী একাদশীর ব্রত পালনের উপদেশ দেন। ধৃষ্টবুদ্ধি ব্রত পালন করে পাপমুক্ত হয়, দিব্যরূপ লাভ করে এবং বৈষ্ণব লোক প্রাপ্ত হয়। শেষে বলা হয়েছে—এই ব্রত বহু যজ্ঞের চেয়েও শ্রেষ্ঠ; এর শ্রবণ-পাঠেও মহাপুণ্য হয়।

Adhyaya 50

The Greatness of Aparā Ekādaśī in the Dark Fortnight of Jyeṣṭha

যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন—জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীর নাম ও মাহাত্ম্য কী। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, এ একাদশী ‘অপরা একাদশী’; এটি খ্যাতি, সন্তানলাভ এবং সর্বোপরি গুরুতর পাপও বিনাশ করে। উপদেশরূপে মহাপাপের তালিকা দেওয়া হয়েছে—ব্রাহ্মণহত্যা প্রভৃতি, পরস্ত্রীগমন, মিথ্যা সাক্ষ্য, ওজন-মাপে প্রতারণা, ‘বৈদিক’ পেশার ভান করে জীবিকা, যুদ্ধে ধর্মত্যাগ, এবং গুরুর প্রতি অবমাননা। অপরা-ব্রতকে এই পাপসমূহ দগ্ধকারী বলা হয়েছে। এরপর অপরা একাদশীর পুণ্যকে প্রসিদ্ধ তীর্থফলের সমতুল্য করা হয়েছে—মাঘে প্রয়াগস্নান, গ্রহণকালে কাশীবাস, গয়ায় শ্রাদ্ধ, বৃহস্পতির গমনে গোদাবরী/কৃষ্ণবেণীতে স্নান, বদরীযাত্রা, এবং কুরুক্ষেত্রে গ্রহণকালে দান। শেষে বলা হয়—ত্রিবিক্রম বিষ্ণুর পূজা-সহ উপবাসে বিষ্ণুলোক লাভ হয়, আর শ্রবণ-পাঠও মহাদানের ন্যায় পুণ্য প্রদান করে।

Adhyaya 51

Nirjalā Ekādaśī of the Bright Fortnight of Jyeṣṭha (Bhīma’s Waterless Fast; Pāṇḍava-dvādaśī Fame)

এই অধ্যায়ে জ্যৈষ্ঠ শুক্লপক্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ একাদশীকে ‘নির্জলা’ বলা হয়েছে—যেখানে জল পর্যন্ত ত্যাগ করতে হয়। যুধিষ্ঠিরের প্রশ্ন থেকে আলোচনা শুরু; শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যাখ্যার জন্য ব্যাসদেবের কাছে নির্দেশ করেন। ব্যাস বলেন, কলিযুগে পূর্ণ বৈদিক কর্ম পালন কঠিন, তাই একাদশী পুরাণোক্ত ধর্মের সার ও সহজ সাধনা। ভীমসেন প্রবল ক্ষুধার কারণে বারবার উপবাস রাখতে অক্ষম; তিনি এমন একটিমাত্র ব্রত চান যা সব একাদশীর ফল দেবে। তখন ব্যাস ‘নির্জলা একাদশী’ পালনের বিধান দেন—একাদশীতে অন্ন ও জল সম্পূর্ণ বর্জন; দ্বাদশীতে স্নান, বিষ্ণুপূজা, দান এবং ব্রাহ্মণভোজন। এই ব্রত সকল একাদশীর সমান পুণ্যদায়ী, পাপনাশক, যমদূতভয়হর এবং বিষ্ণুলোকপ্রদ বলে প্রতিশ্রুত। শেষে জলঘট, গোধন বা জলধেনু-প্রতিদান, বস্ত্র, পাদুকা, ছাতা প্রভৃতি দানের কথা বলা হয়েছে; এবং এই আচার ‘পাণ্ডব-দ্বাদশী’ নামে খ্যাতি লাভ করেছে।

Adhyaya 52

The Greatness of Yoginī Ekādaśī (Āṣāḍha Krishna Paksha)

যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন—আষাঢ় কৃষ্ণপক্ষে কোন একাদশী হয়। ভগবান যোগিনী একাদশীকে সর্বোত্তম ব্রত বলে জানান, যা মহাপাপ নাশ করে এবং মুক্তিদায়ক ফল প্রদান করে। এর মাহাত্ম্য পুলস্ত্য ঋষি ভীষ্মকে একটি পুরাণকথার মাধ্যমে বোঝান। কুবেরের (ধনদ) শিবপূজার জন্য ফুল আনার দায়িত্বে থাকা হেমমালী স্ত্রী-আসক্তিতে সময়মতো ফুল আনতে ব্যর্থ হয়। কুবের ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে আঠারো প্রকার কুষ্ঠ, বিচ্ছেদ ও নির্বাসনের শাপ দেন। শিবারাধনার অবশিষ্ট পুণ্যপ্রভাবে স্মৃতি অটুট থাকায় সে হিমালয়ে গিয়ে ঋষি মার্কণ্ডেয়ের শরণ নেয়, সত্য স্বীকার করে উপায় প্রার্থনা করে। মার্কণ্ডেয় তাকে যোগিনী-ব্রতের বিধান দেন। বিধিপূর্বক ব্রত পালনে হেমমালীর কুষ্ঠ দূর হয় এবং শাপ প্রশমিত হয়। শেষে বলা হয়—এই ব্রতের পুণ্য ৮৮,০০০ ব্রাহ্মণকে ভোজন করানোর সমান, আর এই কাহিনি শ্রবণ-পাঠও পাপমুক্তি দেয়।

Adhyaya 53

Devaśayanī Ekādaśī: Hari’s Yogic Sleep, Vāmana Worship, and Cāturmāsya Rules

এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে জানান যে আষাঢ় শুক্ল একাদশীই পরম পুণ্যদায়িনী ‘দেবশয়নী/শয়নী’ ব্রত। এর মহিমা বারবার কীর্তিত—শ্রবণমাত্রেই পাপক্ষয় হয়, স্বর্গ ও মোক্ষ লাভ হয়, এবং একাদশী সর্বজনীন শুদ্ধিকারিণী। সঙ্গে বামন-পূজার মাহাত্ম্যও বলা হয়েছে। বামনাবতার-কথায় বলির ভক্তি, ত্রিবিক্রমের তিন পদক্ষেপে ত্রিলোক আচ্ছাদন, এবং শেষ পদ বলির পৃষ্ঠে স্থাপনের বিবরণ আছে। বলি রসাতলে গমন করেন, তবু বিষ্ণুর অনুগ্রহে তিনি দিব্য বর ও কৃপা লাভ করেন। এরপর হরির ‘যোগনিদ্রা’ ও চাতুর্মাস্য বিধান (শয়নী থেকে কার্তিকী/বোধিনী পর্যন্ত) ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জাগরণ, পূজা এবং মাসভিত্তিক আহার-সংযম—শ্রাবণে শাক, ভাদ্রে দই, আশ্বিনে দুধ, কার্তিকে ডাল/শিম্বীধান্য ত্যাগ—নির্দেশ করে একাদশীর সর্বপাবন শক্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

Adhyaya 54

The Greatness of Kāmikā Ekādaśī (Dark-fortnight Ekādaśī of Śrāvaṇa)

এই অধ্যায়ে শ্রাবণ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীকে ‘কামিকা’ বলা হয়েছে। উমা–মহেশ্বর প্রসঙ্গে বর্ণনা চলতে থাকে; যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন, আর শ্রীকৃষ্ণ নারদকে ব্রহ্মার পূর্বোক্ত উপদেশ স্মরণ করিয়ে কামিকা একাদশীর মাহাত্ম্য বলেন। কামিকা-ব্রতকে মহাপাপ-নাশক ও পরিত্রাণদায়ক বলা হয়েছে। গঙ্গাস্নান, কাশীবাস, নৈমিষারণ্য ও পুষ্করাদি তীর্থের পুণ্য, এমনকি ভূমিদান ও গোদান—এসবের চেয়েও এর ফল শ্রেষ্ঠ বলে প্রতিপাদিত। বিধান হলো হরি/বিষ্ণুর পূজা—বিশেষত তুলসীপাতা ও তুলসীমঞ্জরী দিয়ে—দীপদান এবং রাত্রিজাগরণ। এর ফলে যমভয় দূর হয়, অশুভ জন্ম থেকে রক্ষা মেলে, পিতৃগণ তৃপ্ত হন, এবং যথাবিধি পালনে যোগীদের কৈবল্যলাভ পর্যন্ত ফল বলা হয়েছে।

Adhyaya 55

Pavitrāropaṇī Rite in Śrāvaṇa (Bright Fortnight) and Putradā Ekādaśī

যুধিষ্ঠির শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষে কোন একাদশীর নাম ও মাহাত্ম্য—তা শ্রীকৃষ্ণের কাছে জিজ্ঞাসা করেন। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, এই একাদশী পাপহর এবং ফলদানে বাজপেয় যজ্ঞের সমতুল্য; এরপর কাহিনি গিয়ে পড়ে মাহিষ্মতীর ধর্মপরায়ণ রাজা মহীজিতের ওপর, যিনি ন্যায়বান হয়েও পুত্রহীনতায় ব্যাকুল। তিনি ব্রাহ্মণ ও প্রজাদের সঙ্গে উপায় খুঁজতে থাকেন এবং দীর্ঘজীবী ঋষি লোমশের শরণ নেন। লোমশ পূর্বজন্মের অপরাধ জানান—কূপের কাছে গাভী ও বাছুরকে জল না দেওয়ায় পুত্রলাভে বাধা এসেছে, তবে রাজ্যহানি অনিবার্য নয়। লোমশ শ্রাবণ শুক্লের ‘পুত্রদা একাদশী’ ব্রতকে প্রতিকার হিসেবে নির্দেশ দেন। রাজা ও প্রজারা ব্রত পালন করে পুণ্য অর্পণ করলে রানি গর্ভধারণ করেন এবং পুত্র জন্মায়। পরে দ্বাদশীতে বাসুদেবের উদ্দেশ্যে ‘পবিত্রারোপণী’ বিধি—পবিত্র তৈরির দ্রব্য, অর্পণ-ক্রম, রাত্রিজাগরণ ও সর্বজনের অংশগ্রহণ—বর্ণিত হয়; শেষে ফলশ্রুতি ও উমাপতি–নারদ সংলাপ-পরম্পরায় অধ্যায়সমাপ্তি উল্লেখিত।

Adhyaya 56

The Glory of Bhādrapada Dark-Fortnight Ekādaśī (Ajā/Ajetī Ekādaśī Vrata)

এই অধ্যায়ে ভাদ্রপদ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীকে ‘অজা’ (বা ‘অজেটী’) নামে ঘোষণা করা হয়েছে এবং তাকে পাপনাশিনী বলা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে জানান—হৃষীকেশ (বিষ্ণু)-পূজা, একাদশী-ব্রত পালন এবং এই মাহাত্ম্য কেবল শ্রবণ করলেও শুদ্ধি লাভ হয়। এর প্রভাব বোঝাতে রাজা হরিশ্চন্দ্রের কঠিন দুঃখকথা বলা হয়েছে—রাজ্যচ্যুতি, স্ত্রী-পুত্র বিক্রি, এমনকি নিজেকেও বিক্রি; তবু তিনি সত্যধর্ম ত্যাগ করেন না। ক্লেশে জর্জরিত হয়ে প্রায়শ্চিত্ত চাইলে ঋষি গৌতম তাঁকে ভাদ্রপদ কৃষ্ণ একাদশীর বিধান দেন—উপবাস, রাত্রিজাগরণ ও যথাবিধি আচরণ। ব্রত সম্পন্ন হলে হরিশ্চন্দ্রের পাপ ও দুঃখ তৎক্ষণাৎ নাশ হয়; তিনি স্ত্রীর সঙ্গে পুনর্মিলিত হন, শুভ সন্তান লাভ করেন এবং নগর-পরিজনসহ স্বর্গ ও নির্বিঘ্ন রাজ্যপ্রাপ্তি করেন। শেষে এই কাহিনি শ্রবণ-পাঠকে অশ্বমেধ যজ্ঞসম ফলদায়ক বলা হয়েছে।

Adhyaya 57

The Greatness of Padmā Ekādaśī (Bright Fortnight of Bhādrapada/Nābhaśa)

যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন—নাভশ/ভাদ্রপদ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম কী, কোন দেবতার উদ্দেশ্যে, এবং কীভাবে ব্রত পালন করতে হয়। শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মার নারদকে প্রদত্ত উপদেশ বর্ণনা করেন—এটি ‘পদ্মা একাদশী’, হৃষীকেশ (বিষ্ণু)-নিবেদিত, এবং সর্বোচ্চ পবিত্রকারী ব্রত। এরপর মাহাত্ম্যকথা: ধর্মপরায়ণ রাজা মান্ধাতার রাজ্যে তিন বছর অনাবৃষ্টি দেখা দেয়। প্রজারা জানায়—বৃষ্টি নারায়ণের অধীন; তিনিই পর্জন্যরূপে জগতকে ধারণ করেন। রাজা ব্রহ্মাজাত আঙ্গিরস বংশীয় ঋষির শরণ নেন। ঋষি ধর্মবিঘ্নের কারণ নির্দেশ করে হিংসা ত্যাগ করে পদ্মা একাদশী ব্রত পালনের বিধান দেন। রাজা সকল বর্ণের সঙ্গে বিধিপূর্বক ব্রত ও দান সম্পন্ন করলে মেঘ বর্ষণ করে, শস্যসমৃদ্ধি হয়, প্রজারা সুখী হয়। অধ্যায়ের শেষে এই কাহিনি শ্রবণ-পাঠের মহিমা এবং নির্দিষ্ট দানের ফল প্রশংসিত হয়েছে।

Adhyaya 58

The Greatness of Indirā Ekādaśī (Āśvina Dark Fortnight)

যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে শ্রীকৃষ্ণ আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীর নাম ‘ইন্দিরা’ বলে জানান এবং বলেন—এই ব্রত মহাপাপও বিনাশ করে। এরপর উপদেশমূলক কাহিনি। মাহিষ্মতীর ধর্মপরায়ণ রাজা ইন্দ্রসেনের সভায় নারদ মুনি আগমন করেন। নারদ জানান—রাজার পিতা অসম্পূর্ণ ব্রতের দোষে যমসভায় অবস্থান করছেন; তাঁর মুক্তির জন্য প্রতিকার করতে হবে। নারদ ইন্দিরা-ব্রতের বিধান বলেন—দশমীতে সংযম ও প্রস্তুতি, একাদশীতে উপবাস, বিশেষ করে শালগ্রাম ও হরির পূজা, রাত্রিজাগরণ, এবং দ্বাদশীতে শ্রাদ্ধ ও ব্রাহ্মণভোজন/দান। ব্রত পালনে রাজার পিতা বিষ্ণুলোক লাভ করেন; শ্রবণ-পাঠকারীদেরও পাপক্ষয় ও মুক্তিলাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অধ্যায় শেষ হয়।

Adhyaya 59

The Greatness of Pāpāṃkuśā Ekādaśī (Bright Fortnight of Āśvina)

অধ্যায়ের শুরুতে যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন—আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম ও মাহাত্ম্য কী। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, এ একাদশী ‘পাপাঙ্কুশা’, যার মূল সাধনা পদ্মনাভ (বিষ্ণু)-পূজা, উপবাস, রাত্রিজাগরণ ও হরিনাম-গৌরবকীর্তন। এই ব্রতকে সর্বোচ্চ পাপনাশক, স্বর্গ ও মোক্ষদায়ক এবং মহাযজ্ঞের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ফলপ্রদ বলা হয়েছে। এখানে একাদশীকে তীর্থসম পূর্ণ সাধনরূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়; এমনকি অনিচ্ছাকৃত বা আকস্মিক উপবাসও যমের দণ্ড থেকে রক্ষা করে—এ কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রদায়-নিন্দা নিষিদ্ধ—বৈষ্ণব হয়ে শিবনিন্দা বা শৈব হয়ে বিষ্ণুনিন্দা আধ্যাত্মিক লাভ নষ্ট করে। শেষে পুনরায় ঘোষণা করা হয় যে পাপাঙ্কুশা একাদশী পাপমুক্ত করে হরিলোকে নিয়ে যায়, এবং দানযোগ্য দ্রব্যের উল্লেখ সহায়ক পুণ্যরূপে করা হয়েছে।

Adhyaya 60

The Greatness of Ramā Ekādaśī (Kārttika, Dark Fortnight)

এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে কার্ত্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী—‘রমা’—এর মাহাত্ম্য জিজ্ঞাসা করেন। শ্রীকৃষ্ণ উপদেশ দিতে গিয়ে একটি উপাখ্যান বর্ণনা করেন। রাজা মুচুকুন্দের কন্যা চন্দ্রভাগার বিবাহ হয় শোভনের সঙ্গে। একাদশীর দিন শোভন শ্বশুরবাড়ি আসে; দেহে দুর্বল হলেও সে ভক্তিভরে রমা-একাদশীর উপবাস পালন করে। প্রভাতে তার মৃত্যু হয়, কিন্তু ব্রত-পুণ্যে সে মন্দর পর্বতের নিকটে এক দীপ্তিমান দিব্য নগরী লাভ করে এবং সেখানে ‘সোমশর্মা’ নামে পরিচিত হয়। পরে এক ব্রাহ্মণ চন্দ্রভাগাকে সব সংবাদ জানায়। চন্দ্রভাগা আজীবন শ্রদ্ধাসহ একাদশী-ব্রত পালন করে; বামদেবের দীক্ষা/অভিষেকে সে দিব্য দেহ প্রাপ্ত হয়ে নগরীর পুণ্য স্থির করে এবং স্বামীর সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়। উপসংহারে বলা হয়—কৃষ্ণ ও শুক্ল, উভয় পক্ষের একাদশীর ফল সমান; মাহাত্ম্য শ্রবণে পাপ নাশ হয় এবং বিষ্ণুলোক লাভ হয়।

Adhyaya 61

The Greatness of Prabodhinī (Haribodhinī) Ekādaśī in Kārtika’s Bright Fortnight

এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির কার্তিক শুক্লপক্ষে পালনীয় ব্রতবিধি জানতে চান। শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মা থেকে নারদপ্রাপ্ত উপদেশ অনুসারে প্রাবোধিনী/হরিবোধিনী একাদশীর মাহাত্ম্য বলেন—এ দিন ভগবান বিষ্ণুর “জাগরণ”-দিবস, যার দ্বারা ধর্মের প্রবাহ সক্রিয় হয়। উপবাস এবং বিশেষত রাত্রিজাগরণকে পাপনাশক ও পুণ্যবর্ধক বলা হয়েছে; এর ফল মহাযজ্ঞসমূহের ফলেরও অতীত। বিধিপূর্বক পালন করলে ফল বৃদ্ধি পায়, আর অবহেলা করলে হ্রাস পায়—এ কথা স্পষ্ট করা হয়েছে। হরিকে কেন্দ্র করে নানা আচরণ নির্দিষ্ট—প্রদীপসহ মন্দিরগমন, স্নান-দান-জপ-পূজা জনার্দন-স্মরণে, শঙ্খে অর্ঘ্যদান, গুরুর সম্মান, এবং বৈষ্ণব কাহিনি (ভাগবত প্রভৃতি) শ্রবণ-পাঠ। শেষে কার্তিকের তুলসী-উপাসনার প্রশংসা—একটি তুলসীপত্র অর্পণও মহাপুণ্যদায়ক, বংশশুদ্ধিকারী ও মুক্তিসাধক।

Adhyaya 62

Kamalā-Nāma Ekādaśī Vrata in the Dark Fortnight of Puruṣottama (Adhika Māsa)

অধ্যায় ৬২-এ অধিকমাস (পুরুষোত্তম মাস)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রত ‘কমলা-নামা একাদশী’ সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দেন। মাসের অধিদেবতা, দৈনন্দিন নিয়ম, স্নান, জপ-পাঠ, পূজা-পদ্ধতি, আহার-নিয়ম এবং গৃহে, নদীতীরে, তুলসীর কাছে ও বিষ্ণুর সম্মুখে জপের ফলভেদ—সবই প্রশ্নোত্তররূপে বর্ণিত হয়েছে। এরপর ব্রতবিধি একটি কাহিনির মধ্যে স্থাপিত: অপমানিত এক ব্রাহ্মণের পুত্র ঘুরতে ঘুরতে পুরুষোত্তম কালে প্রয়াগ/ত্রিবেণীতে পৌঁছে হরিমিত্রের আশ্রমে ঋষিদের সঙ্গ লাভ করে এবং তাঁদের সঙ্গে একাদশী পালন করে। মধ্যরাতে লক্ষ্মী (কমলা/পদ্মা) আবির্ভূত হয়ে ব্রতের মহিমা ঘোষণা করেন, সমৃদ্ধি ও বংশধারার স্থায়িত্বের বর দেন এবং পবিত্রকারী ‘শ্রবণ’—ধর্মকথা শোনা—এর বিশেষ গুরুত্ব জানান। শেষে সংক্ষিপ্ত একাদশী-প্রক্রিয়া বলা হয়েছে—মন্ত্রজপ, উপবাস, রাত্রিজাগরণ, দেবস্নান, ব্রাহ্মণভোজন/দান ও পারণের সময়নিয়ম; এর ফলে বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তি, পাপনাশ ও মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

Adhyaya 63

The Greatness and Procedure of Kāmadā Ekādaśī (in the Puruṣottama Month) with Nirjalā Emphasis

এই অধ্যায়ে একাদশী-ব্রতের অতুল মহিমা বর্ণিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বলেন—কলিযুগে একাদশী সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রত; এটি পাপক্ষয় করে এবং ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ—সবই প্রদান করে। যুধিষ্ঠির একাদশী-পালকদের বিষ্ণুরূপ দীপ্তি দেখে প্রশ্ন করেন, তবে কেন কারও কারও মধ্যে পাপরূপ লক্ষিত হয়; শ্রীকৃষ্ণ জানান—ভক্তিসহ শুদ্ধ বিধিতে পালন, বিশেষত নির্জলা (জলবর্জিত) নিয়ম, ব্রতকে পূর্ণ ফলদায়ী করে। দশমীতে সংযত আহার, একাদশীতে নন্দা-তিথিসংযুক্ত নির্জলা উপবাস, রাত্রিজাগরণ ও পুরুষোত্তমের পূজা, এবং দ্বাদশীতে ভদ্রা-তিথিসহ যথাবিধি পারণ—এই ব্রত-রীতি বলা হয়েছে। দশমী/একাদশী/দ্বাদশীতে বর্জনীয় আচরণও নির্দেশিত। শেষে পরমগতি লাভের প্রতিশ্রুতি এবং এই মাহাত্ম্য শ্রবণ-পাঠের ফল সহস্র গোদানের সমান পুণ্য বলা হয়েছে; প্রসঙ্গে পুলস্ত্যের নামোল্লেখ ও উপসংহারে উমাপতি-নারদ সংলাপের ইঙ্গিত আছে।

Adhyaya 64

The Glory of Cāturmāsya (Four-Month Observance)

নারদ মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করেন—যখন হরি যোগনিদ্রায় থাকেন, তখন প্রসিদ্ধ চাতুর্মাস্য-ব্রত কীভাবে পালনীয়। শিব বলেন, আষাঢ় শুক্ল একাদশীতে বিষ্ণুর শয়ন-সংস্কার; সূর্য মিথুনে থাকলে শয়ন এবং তুলায় এলে প্রবোধন ধরা হয়। এই সময়ে কিছু মঙ্গলকর্ম স্থগিত থাকে, আর ভক্তের জন্য বিশেষ নিয়ম নির্দিষ্ট—ভূমিতে শয়ন, আহার-সংযম (ষড়রস ত্যাগ প্রভৃতি), মৌন, শৌচাচার, এবং বিষ্ণু-উপাসনা বৃদ্ধি: বিগ্রহ স্থাপন, পূজা-উপহার, তুলসী-সেবা, নামজপ ও পুরাণ-শ্রবণ। দীর্ঘ ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—চাতুর্মাস্য পালনের পুণ্য মহাযজ্ঞসম, সহস্র অশ্বমেধের তুল্য। নির্দিষ্ট ত্যাগের সঙ্গে নির্দিষ্ট ফল যুক্ত—রূপলাভ, সন্তানপ্রাপ্তি, স্বর্গলোক এবং শেষে বৈকুণ্ঠগতি। অধ্যায়ে অহিংসা, দান, দয়া, সংযমের নীতি শেখানো হয়েছে এবং কলিযুগে নিন্দা, অশৌচ ও কুসঙ্গের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। শেষে বলা হয়, এই ব্রতের কথা শ্রবণ করলেও শুদ্ধিদায়ক পুণ্য লাভ হয়।

Adhyaya 65

The Concluding Observance (Udyāpana) of the Cāturmāsya Vows

এই অধ্যায়ে চাতুর্মাস্য ব্রতসমূহের অপরিহার্য সমাপ্তি-অনুষ্ঠান ‘উদ্যাপন’-এর মাহাত্ম্য বর্ণিত। নারদ সমাপনবিধি জানতে চাইলে উমাপতি শিব বলেন—উদ্যাপন না করলে ব্রতের ফল সম্পূর্ণ লাভ হয় না, আর অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ আচরণে গুরুতর কর্মফল/পাপের আশঙ্কা থাকে। চাতুর্মাস্য শেষে জগন্নাথ জাগ্রত হলে ব্রতী ব্রাহ্মণদের নিকট গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে, দেবতার প্রসাদ কামনা করে এবং ব্রতে যে বস্তু ত্যাগ করা হয়েছিল তার পরিবর্তে প্রতিদান দেয়—যেমন তেল ত্যাগ করলে ঘি, ঘি ত্যাগ করলে দুধ ইত্যাদি। এরপর ব্রতভেদে দান ও ভোজনের বিধান: মৌন-দিনে স্বর্ণসহ তিলের পিণ্ড/লাড্ডু, ভোজন-দিনে দই-ভাত, রাত্রিভোজন-ব্রতে ষড়রস আহার, স্বর্ণসহ গাভী-বলদ, দীপদান (স্বর্ণদীপসহ), পাদুকা, শস্য-ফল, গোলা/ভাণ্ডার ইত্যাদি। শেষে শঙ্খ-চক্র-গদাধারী অনাদি বিষ্ণুর শুদ্ধ পূজা করে পাপনাশক প্রভুর আশ্রয়ে ব্রতের পূর্ণতা সম্পন্ন হয়।

Adhyaya 66

Propitiation of Yama (Crossing the Vaitaraṇī through the Dvādaśī/Vaitaraṇī-vrata)

এই অধ্যায়ে নারদ নরকভয় ও ভয়ংকর বৈতরণী নদী অতিক্রমের উপায় জানতে যমের আরাধনার বিধি প্রশ্ন করেন। মহাদেব উত্তর দিতে গিয়ে মুদ্গল মুনির উপাখ্যান বলেন—যমকিঙ্কররা ভুলবশত তাঁকে ধরে নিয়ে যায়, আর সেই উপলক্ষে যমধর্মরাজ কৃষ্ণপক্ষের দ্বাদশীকে ‘বৈতরণী-ব্রত’ রূপে ঘোষণা করে তার উদ্ধারকারী মহিমা ব্যাখ্যা করেন। এরপর ব্রতাচরণের নিয়ম বিস্তারিতভাবে বলা হয়—উপবাস, তীর্থস্নান (মাটি/গোময়/তিলসহ) ও মন্ত্রপাঠ, গোবিন্দ-বিষ্ণুর পূজা, পাত্র-প্রস্তুতি ও মণ্ডল রচনা, যম ও চিত্রগুপ্তের আহ্বান-নমস্কার, এবং বৈতরণী/জয়া দেবীর বন্দনা। তুলসীসেবা, তিলক/শস্ত্রচিহ্ন ধারণ, গোপূজা প্রভৃতি অঙ্গকর্মসহ ফল হিসেবে পাপনাশ, যমভয়-নিবারণ ও বৈতরণী নিরাপদে পার হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

Adhyaya 67

The Glory of Gopī-candana (Sacred Vaiṣṇava Clay)

এই অধ্যায়ে গোপী-চন্দন (গোপিকা-চন্দন)-এর মাহাত্ম্য বর্ণিত। বৈষ্ণব তিলক/লেপনের জন্য এই পবিত্র মাটি ‘চলমান তীর্থ’ ও গৃহশুদ্ধিকারী বলে ঘোষিত; যেখানে এটি রাখা থাকে সেখানে শোক, মোহ ও অমঙ্গল স্থিত হয় না, পিতৃগণ প্রসন্ন হন এবং বংশবৃদ্ধি ঘটে। গোপী-পুষ্কর-সম্পর্কিত এই মাটি দেহশুদ্ধিকারী ও রোগনাশক—লেপন করলে পবিত্রতা লাভ হয়। এর ধারণকে মোক্ষদায়ক বলা হয়েছে এবং সকল তীর্থ-ক্ষেত্রের দ্বারা প্রশংসিত বলে উল্লেখ আছে; তুলসী-কাষ্ঠ ও তুলসীমূলের মাটির সঙ্গে এর পবিত্রতার সাদৃশ্যও দেখানো হয়েছে। গোপী-চন্দনকে হরি-চন্দনের সঙ্গে বেটে লেপ প্রস্তুত করার বিধান বলা হয়। শেষে পাপক্ষয়ের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি—মহাপাপীরও তৎক্ষণাৎ শুদ্ধি এবং বিষ্ণুর পরম ধামে গমন—এই ফল ঘোষণা করা হয়েছে।

Adhyaya 68

Glorification and Characteristics of the Vaiṣṇavas

এই অধ্যায়ে মহেশ্বর (শিব) নারদকে বৈষ্ণবদের লক্ষণ ও মহিমা বর্ণনা করেন। যে বিষ্ণু-নিষ্ঠ, ভক্তিসহকারে ক্ষমা, দয়া, তপস্যা, সত্য, শৌচ প্রভৃতি সদ্গুণ ধারণ করে এবং হিংসাময় ধর্ম ত্যাগ করে—তাকেই বৈষ্ণব বলা হয়েছে। বাহ্যচিহ্ন হিসেবে তুলসীমালা ধারণ, দ্বাদশ তিলক ধারণ এবং শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মাদি বিষ্ণুর চিহ্ন বহনের কথা বলা হয়। তাঁদের দর্শনমাত্রেই পবিত্রতা লাভ হয়; তাঁরা বংশপরম্পরাকে উদ্ধার করতে সক্ষম, আর কলিযুগে পবিত্রতায় ‘বিষ্ণুর সমান’ বলে প্রশংসিত। শিব আরও উপদেশ দেন—বৈষ্ণবদের সম্মান, পূজা ও অন্নদান মহাপুণ্যদায়ক; তা সর্বদেবতার পূজার তুল্য এবং ব্রাহ্মণভোজনের ফলকেও বহুগুণ বৃদ্ধি করে।

Adhyaya 69

The Śravaṇa–Dvādaśī Vow (Akṣaya Merit on the Śravaṇa Nakṣatra Dvādaśī)

নারদ শিবকে জিজ্ঞাসা করেন—যারা কঠোর উপবাস করতে পারে না, তাদের জন্য একটিমাত্র সর্বশ্রেষ্ঠ দ্বাদশী-ব্রত কী? শিব ভাদ্রপদ শুক্ল দ্বাদশীকে, শ্রবণ নক্ষত্রযুক্ত (বিশেষত বুধবার হলে) ‘অক্ষয়’ ফলদায়িনী বলেন—সেদিন দান, জপ ও পূজা অবিনাশী পুণ্য দেয়। বিধানে সঙ্গমে স্নান, জলভরা কলশে জনার্দনের স্থাপন, ঘিয়ে রান্না অন্ন নিবেদন, রাত্রি জাগরণ, প্রাতে পূজা, গোবিন্দ-মন্ত্র জপ এবং বিদ্বান ব্রাহ্মণকে ভোজন-দান নির্দেশিত। পুলস্ত্য পরে এক প্রাচীন কাহিনি বলেন। এক বণিক ভয়ংকর মরুভূমিতে পথ হারিয়ে প্রেতদের মধ্যে পড়ে; সেখানে এক প্রেত স্বীকার করে যে সে শ্রবণ-দ্বাদশীতে জলাশয় ও খাদ্যদান করেছিল, তাই প্রতিদিন বহু প্রেতকে তৃপ্ত করতে পারে, কিন্তু নাস্তিকতার দোষে প্রেতত্ব ছাড়তে পারে না। সে বণিককে গুপ্তধন উদ্ধার করতে ও গয়াশীর্ষে নাম-গোত্রসহ শ্রাদ্ধ করতে বলে; তাতে প্রেত মুক্ত হয়। বণিক এরপর প্রতি বছর সঙ্গমে শ্রবণ-দ্বাদশী পালন করে এবং শেষে বৈকুণ্ঠ লাভ করে।

Adhyaya 70

The Three-Nights Vow at a River

নারদ শিবকে জিজ্ঞাসা করেন—এমন উপদেশ কী, যাতে দুঃখ আর দেখা না দেয়। উমাপতি শিব ‘নদী-ত্রিরাত্র-ব্রত’-এর কথা বলেন, যা আষাঢ় ও বর্ষাকালে, নদী যখন প্লাবিত থাকে, তখন পালন করা সর্বোত্তম। এতে প্রভাতে স্নান, নদী-উপাসনা, উপবাস (অথবা একবেলা আহার), অখণ্ড প্রদীপ দান, নদী ও বরুণের আহ্বান-পূজা এবং জলে শয়নকারী কেশব (অনন্ত)-এর প্রতিষ্ঠা ও আরাধনা বিধেয়। ভক্তরা অর্ঘ্য, ঋতুফল এবং ঘিয়ে রান্না করা নৈবেদ্য নিবেদন করে তিন রাত্রি শুচিতা রক্ষা করেন। শেষে হবিশ্যান্ন দিয়ে পারণ করে গাভী, বস্ত্র, তিল, স্বর্ণ প্রভৃতি দান, বরুণের প্রতিমা/মণ্ডল ও পাত্র-রত্নাদি দান, ব্রাহ্মণভোজন এবং গুরুর সম্মান করেন। এর ফল—আরোগ্য, দীর্ঘায়ু, সমৃদ্ধি, সন্তানলাভ, স্বর্গীয় মর্যাদা এবং নরকগতি থেকে রক্ষা।

Adhyaya 71

The Greatness and Transmission of the Viṣṇu Thousand Names (Dialogue of Śiva and Nārada)

নৈমিষারণ্যের ঋষিরা সূতকে প্রশংসা করে জিজ্ঞাসা করেন—নারদ কীভাবে হরিনামের মাহাত্ম্য জানলেন। সূত বলেন—নারদ মেরুতে গিয়ে ব্রহ্মাকে প্রশ্ন করেন, বিশেষত কলিযুগে কোন সাধন প্রধান; ব্রহ্মা জানান, নামজপই মুখ্য পথ। তিনি হরিনামের পাপনাশক শক্তি, তীর্থযাত্রা ও প্রায়শ্চিত্তের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ফলদায়কতা বর্ণনা করে নারদকে কৈলাসে পাঠান, কারণ শিব পরম বৈষ্ণব এবং সম্পূর্ণ গূঢ় রহস্য তাঁরই জানা। কৈলাসে নারদ বিশ্বেশ্বর শিবের কাছে বিষ্ণুর সহস্রনাম প্রার্থনা করেন। শিব পার্বতীকে পূর্বে প্রদত্ত গোপন উপদেশ স্মরণ করিয়ে ঋষি-ছন্দ- বীজ-শক্তি-কীলক- বিনিয়োগ ও ন্যাস প্রভৃতি বিধান জানান, তারপর সহস্রনাম ও তার ফল পাঠ করেন। শেষে গোপনীয়তা, যোগ্যতা ও ভক্তিসহ জপের নির্দেশ দেওয়া হয়, এবং শিব এক নাম ‘রাম’-এর প্রতি নিজের বিশেষ প্রীতি প্রকাশ করেন।

Adhyaya 72

The Greatness of Viṣṇu’s Thousand Names

এই অধ্যায়ে শ্রীমহাদেব গিরিকন্যাকে বিষ্ণু-সহস্রনামের মহিমা শোনান। তিনি বলেন, কলিযুগে এটি সর্বজনীন ও সহজ মোক্ষসাধন; নিত্য পাঠে সকল বর্ণের কল্যাণ হয় এবং বিশেষভাবে শূদ্রদের অধিকারও উল্লেখিত। সম্পূর্ণ পাঠ সম্ভব না হলেও আংশিক পাঠেই বিষ্ণুর পরম ধাম লাভ হয়—এ কথা তিনি দৃঢ়ভাবে জানান। শিব বিন্যাস-শুদ্ধি বজায় রেখে, একাগ্রচিত্তে ও অমনোযোগী না হয়ে পাঠ করতে উপদেশ দেন; দাস্যভাবসহ ভক্তিতে পাঠই ফলদায়ক। সহস্রনামে সকল তীর্থ ও পবিত্র নদীর সান্নিধ্য নিহিত—এমন ফলশ্রুতি দেওয়া হয়েছে; আয়ু, ঐশ্বর্য, সন্তান-वंশবৃদ্ধি এবং যাত্রাজনিত দোষ থেকে মুক্তির কথাও বলা হয়। শেষে বলা হয়, তুলসীসহ বিষ্ণুর একটি নাম নিবেদন করলেও তা মহাযজ্ঞের বিপুল পুণ্যের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।

Adhyaya 73

Rāma Protective Hymn (Rāma-Rakṣā Stotra/Kavaca)

উত্তরখণ্ডের শিব–নারদ সংলাপে মহাদেব রাম-রক্ষা-স্তোত্রের পরিচয় দেন এবং তার বিধান জানান—ঋষি বিশ্বামিত্র, দেবতা শ্রী রাম, ছন্দ অনুষ্টুপ, এবং বিষ্ণু-প্রসন্নতার জন্য জপই এর বিনিয়োগ। এরপর কবচরীতিতে শ্রী রাম ও তাঁর দিব্য নামসমূহ স্মরণ করে হৃদয়, কণ্ঠ, নাভি, হাত, পা, চোখ, কান, জিহ্বা প্রভৃতি অঙ্গ-ইন্দ্রিয়ের রক্ষাক্রম বর্ণিত হয়। পাঠফলে দীর্ঘায়ু, সুখ, প্রজ্ঞা, সমৃদ্ধি ও অটল সুরক্ষা, এবং শেষে মুক্তিলাভের কথাও বলা হয়েছে। ব্রহ্মা→নারদ→সৎজনদের অনুমোদিত পরম্পরায় এই স্তোত্র প্রচারিত—এ কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ঘুমের সময়, গৃহে বা চলার পথেও পাঠ করলে পুণ্য বৃদ্ধি পায়।

Adhyaya 74

The Dharma of Charity: Sattvic Tapas and the Supremacy of the Householder

অধ্যায় ৭৪ (প.পু. ৬.৭৪) ধর্মকে অর্থ, কাম ও মোক্ষের মূল বলে মহিমা করে। তপস্যাকে গুণভেদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—সাত্ত্বিক তপ ঊর্ধ্বগতি ও শুদ্ধির কারণ, আর রাজস-তামস তপ কামনা, নিষ্ঠুরতা ও জাগতিক ফললালসায় বেঁধে ফেলে। এরপর গৃহস্থধর্মের শক্ত সমর্থন দেখা যায়—যে ইন্দ্রিয়সংযম করে, তার গৃহই বনসম হয়ে ওঠে। গৃহস্থকে শ্রেষ্ঠ আশ্রম বলা হয়েছে, কারণ অন্নদান ও অতিথিসেবার দ্বারা সে সন্ন্যাসী-তপস্বীদের ধারণ করে। পূজা ও নিত্যকর্মের পর শুভকালে দান করতে বলা হয়েছে, এবং অন্যায় উপার্জিত ধন দানের দোষও নির্দেশ করা হয়েছে। শেষে পাপাচরণের দুর্গতির বিপরীতে দানের শোধনশক্তি তুলে ধরে বলা হয়েছে—শুদ্ধ উৎসের ধন যথাবিধি দান করলে তা সমৃদ্ধি, স্বর্গ এবং শেষ পর্যন্ত বৈষ্ণব ধামের প্রাপ্তি ঘটায়।

Adhyaya 75

The Greatness of Gaṇḍikā Tīrtha (Gaṇḍakī River & Śālagrāma Field)

এই অধ্যায়ে মহাদেব উমাকে গণ্ডিকা (গণ্ডকী) তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। গণ্ডকীকে গঙ্গাসদৃশ পবিত্র বলা হয়েছে এবং একে বিষ্ণুর নিজ ক্ষেত্র হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়েছে, যেখানে শালগ্রাম-শিলা নানা রূপে প্রকাশ পায়। ঋষি, দেবতা ও সিদ্ধাদি দিব্যগণ সেখানে বিরাজ করেন; নদীর দর্শন বা স্পর্শমাত্রেই মহাপাপও ক্ষয় হয়—এ কথা প্রতিপাদিত। আষাঢ় মাসে বিশেষ তীর্থযাত্রা, এক মাসব্যাপী ব্রত, স্নান, দান এবং তারক-মন্ত্রের অবিরাম জপের বিধান দেওয়া হয়েছে। দ্বিজ সাধকদের শঙ্খ-চক্রাদি বৈষ্ণব-চিহ্ন ধারণ করতে বলা হয়েছে, যা মোক্ষলাভ ও ‘প্রকৃত বৈষ্ণব’ পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। শেষে শ্রেষ্ঠতার ঘোষণা—গণ্ডিকার তুল্য তীর্থ নেই, দ্বাদশীর তুল্য ব্রত নেই, এবং কেশবের ঊর্ধ্বে কোনো দেবতা নেই।

Adhyaya 76

The Hymn for Auspicious Occasions and the Rites for the Departed

উমা–মহেশ্বর সংলাপে মহাদেব এক মুক্তিদায়ক স্তোত্র ও তার সঙ্গে যুক্ত মহিমা-অনুষ্ঠানের কথা বলেন। তিনি জানান, এই স্তবের আশ্রয়ে মহাপাপীও উদ্ধার পেতে পারে এবং শুভ উপলক্ষে এর পাঠ বিশেষ কল্যাণকর। এরপর পুরাণীয় পরম্পরায় ব্রহ্মা নারদকে যে স্তোত্র শোনান, তা বর্ণিত হয়—সেখানে পরম সত্তাকে নারায়ণ/বিষ্ণু এবং রাঘব (রাম) রূপে এক ও অভিন্ন বলা হয়েছে। বিরাট্-রূপের কসমিক বর্ণনা, যজ্ঞ, ওঁকার, বষট্ ও ঋত্বিক-ভাবের সমতা দেখিয়ে বৈদিক যজ্ঞসম পুণ্যফল প্রতিপাদিত। ব্যবহারিক নির্দেশে মৃত্যুকালে স্মরণ, তিন সন্ধ্যায় জপ, পিণ্ডদানের পর শ্রাদ্ধে বিশেষ ফল, গোপনীয়ভাবে রক্ষা, লিখে দান, এবং বৈষ্ণব চিহ্ন (শঙ্খ-চক্র) ও তুলসীমালা ধারণের কথা আছে। ফলশ্রুতিতে পিতৃগণের বিষ্ণুধামে গমন, জাগতিক বৃদ্ধি ও শেষে মোক্ষ লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

Adhyaya 77

The Rite and Narrative of Ṛṣi-pañcamī (Rishi Panchami Vrata)

মহাদেব পার্বতীকে বলেন—এমন এক পরম ব্রত আছে যা সন্তান ও সৌভাগ্য বৃদ্ধি করে। এরপর উপাখ্যানে দেখা যায়, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ দেবশর্মা শ্রাদ্ধ অত্যন্ত বিধিপূর্বক করেন ও অতিথিসেবা করেন; তবু তাঁর গৃহের এক বলীবর্দ (বৃষ) ও এক শূনী (কুকুরী) কথা বলে জানায় যে অশৌচ-অপবিত্রতা ও অবহেলা-জনিত কর্মফলে তারা দুঃখ ভোগ করছে। দেবশর্মা বুঝতে পারেন—এরা তাঁরই পিতা-মাতা, পূর্বদোষে পশুযোনিতে জন্মেছে। তিনি ঋষিদের, বিশেষত বসিষ্ঠের শরণ নেন। এক ঋষি পূর্বজন্মের কারণ ব্যাখ্যা করে ভাদ্রপদ শুক্ল পঞ্চমীতে ‘ঋষি-পঞ্চমী’ ব্রতকে প্রায়শ্চিত্তরূপে নির্দেশ দেন—সপ্তর্ষি পূজা, মণ্ডল ও কলশ স্থাপন, ঋষ্যন্ন নিবেদন, দক্ষিণা ও জপ-পাঠ। এই ব্রত অশৌচ-সম্পর্কিত পাপ নাশ করে, পিতৃমুক্তি প্রদান করে এবং ব্রতচারীদের শেষে বিষ্ণুলোক প্রাপ্তি ঘটায়।

Adhyaya 78

Apāmārjana Hymn and Rite of Purification (Disease–Poison–Graha Pacification)

এই অধ্যায়ে ‘আপামার্জন’ নামে শুদ্ধিকরণ-অনুষ্ঠানকে রোগ, বিষ, গ্রহদোষ, ভূতবাধা ও অভিচার প্রভৃতির প্রশমনের শ্রেষ্ঠ উপায় বলা হয়েছে। মহাদেব পার্বতীকে জানান যে এর প্রামাণ্য পরম্পরা ব্রহ্মা থেকে পুলস্ত্য, পুলস্ত্য থেকে দালভ্য পর্যন্ত প্রবাহিত; এবং বিষ্ণুকে ব্রত-উপবাসে সন্তুষ্ট করলে বিপদ আসে না, ধর্ম অবহেলা করলে মানুষ নানা পীড়ায় আক্রান্ত হয়। মূল বিধিতে বিষ্ণু-ন্যাস আছে—ভগবানের নাম ও অবতারসমূহকে দেহের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করে, পরে পবিত্র কুশা ঘাস দিয়ে মার্জন করে শুদ্ধি সম্পন্ন করা হয়। দীর্ঘ স্তোত্রে বিষ্ণু, নৃসিংহ এবং বিশেষত সুদর্শনচক্রের আহ্বান করে জ্বর, বিষ, প্রেতবাধা ও গ্রহগ্রহণ ছিন্ন করার প্রার্থনা করা হয়। শেষে ফলশ্রুতি, লোভাদি দোষ থেকে বিরত থাকার উপদেশ এবং জনার্দনের উপসংহার—কুশা বিষ্ণুর দেহজাত, তা আরোগ্য ও শান্তি দান করে।

Adhyaya 79

The Greatness of the Apāmārjanaka (Cleansing Hymn/Rite)

এই অধ্যায়ে অপামার্জনক নামক পরম আশ্চর্য শুদ্ধি-স্তোত্র/বিধির মহিমা বর্ণিত। উমাপতি মহাদেব শৈলজাকে বলেন—একাগ্রচিত্তে এর জপ বিশেষ করে পুত্রকামনায় অত্যন্ত ফলদায়ক, আর নিত্য জপকারীর নানা অভীষ্ট সিদ্ধ হয়। বর্ণভেদে ফলও নির্দিষ্ট—ব্রাহ্মণের বিদ্যা, ক্ষত্রিয়ের রাজ্য-ঐশ্বর্য, বৈশ্যের ধনসমৃদ্ধি, শূদ্রের ভক্তিবৃদ্ধি; তদুপরি শ্রবণ ও জপের দ্বারা সকলেরই ভক্তি-পুণ্য বৃদ্ধি ঘটে। এর পুণ্যকে সামবেদের সমতুল্য বলা হয়েছে এবং তাৎক্ষণিক পাপনাশের কথাও বলা হয়। সঙ্গে বৈষ্ণব আচারের নির্দেশ—ভূর্জপত্রে লিখে ধারণ করা, এক শ্লোক পাঠের পরও তুলসী অর্পণ, তুলসীমালা ধারণ এবং শঙ্খ-চক্রাদি বৈষ্ণব চিহ্ন ধারণ। রক্ষাকর্মে শিশুদের রোগ, গ্রহদোষ, ভূত-প্রেত বাধা, বিষ ও খিঁচুনি/অপস্মার প্রভৃতি উপদ্রব প্রশমনের কথা আছে। শেষে বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তি ও পরম মুক্তির ফল ঘোষিত, এবং ভাগবতদের পরিবার-উদ্ধারক রূপে প্রশংসা করা হয়েছে।

Adhyaya 80

The Glory of Viṣṇu (Viṣṇu-Māhātmya): Bhakti as the Highest Dharma

শিব–পার্বতী সংলাপে মহাদেব ঘোষণা করেন যে বিষ্ণুর মাহাত্ম্য শ্রবণমাত্রেই মুক্তিদায়ক। এরপর তিনি কথোপকথনের ধারাবাহিক উদাহরণ আনেন—যুধিষ্ঠির ভীষ্মকে জিজ্ঞাসা করেন, নানা মতের মধ্যে ‘পরম’ ধর্ম কোনটি এবং তার নির্ণয় কীভাবে হবে। ভীষ্ম প্রাচীন পুণ্ডরীক–নারদ কাহিনি বলেন। পুণ্ডরীক কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করে তীর্থযাত্রা শেষে শালগ্রামে গিয়ে মন্ত্রনিষ্ঠ ভক্তিতে নারায়ণকে ধ্যান করে এবং বিষ্ণুর প্রত্যক্ষ দর্শন লাভ করে। নারদ ও ব্রহ্মা এক সিদ্ধান্ত স্থাপন করেন—ধর্ম, বেদ, যজ্ঞ এবং সমগ্র বিশ্বই নারায়ণের উপর প্রতিষ্ঠিত। শেষে ভগবান বিষ্ণু পুণ্ডরীককে দিব্য সান্নিধ্য দান করেন এবং নামস্মরণ ও অষ্টাক্ষর মন্ত্র “ওঁ নমো নারায়ণায়”কে সর্বজনীন ফলপ্রদ, বিশেষত কলিযুগে অত্যন্ত কার্যকর বলে মহিমা প্রকাশ করেন।

Adhyaya 81

The Greatness of the Gaṅgā (Ganga Mahatmya)

পার্বতী শিবকে অনুরোধ করেন—গঙ্গার মাহাত্ম্য আবার বিস্তারিতভাবে বলুন। এরপর কাহিনি মহাভারতের অন্তর্গত পর্বে প্রবেশ করে—শরশয্যায় শায়িত ভীষ্মকে ঘিরে ঋষিগণ সমবেত; যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেন কোন কোন দেশ, পর্বত ও আশ্রম সর্বাধিক পুণ্যদায়ক। ভীষ্ম এক প্রাচীন উপাখ্যান বলেন—শিবি রাজার সঙ্গে সম্পর্কিত উঞ্ছবৃত্তিধারী আদর্শ গৃহস্থ-তপস্বীর কাছে এক সিদ্ধ এসে উপদেশ দেন। সিদ্ধ বলেন, ত্রিপথগা গঙ্গার কৃপায় যেসব ভূমি পবিত্র, সেগুলিই ধন্য; গঙ্গাস্নান, গঙ্গাজল পান, এমনকি ‘গঙ্গা’ নাম স্মরণ বা উচ্চারণমাত্রেই পাপ নাশ হয়—তপস্যা, সন্ন্যাস ও শত শত যজ্ঞের ফলকেও তা অতিক্রম করে। প্রয়াগ/বেনী, গঙ্গাদ্বার, কনখল, কুশাবর্ত প্রভৃতি তীর্থের বিশেষ প্রশংসা করা হয়। এগুলিকে বৈকুণ্ঠগমনের সোপান ও পুনর্জন্মবন্ধন থেকে মুক্তির দ্বার বলা হয়েছে।

Adhyaya 82

Glories and Characteristics of Servant-Vaiṣṇavas (Marks of a Vaiṣṇava and Proper Worship)

পার্বতী শিবের কাছে বৈষ্ণবদের লক্ষণ ও মহিমা জানতে চান। মহেশ্বর বলেন—যে বৈষ্ণব শুচি, সত্যবাদী, ক্ষমাশীল, দয়ালু, অনাসক্ত, বেদ-অনুসন্ধানে রত, অতিথি-সেবক, অগ্নিহোত্র পালনকারী এবং সর্বভূত-হিতৈষী; তার দেহে শঙ্খ-চক্রাদি বৈষ্ণবচিহ্নও প্রকাশ পায়। ভক্তদের নিন্দা করলে বারবার অধম যোনিতে জন্ম হয়—এমন কঠোর সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে। এরপর অর্চনার বিধান—ধাতু বা শিলায় গোপাল/কৃষ্ণের মূর্তি নির্মাণ, শালগ্রাম ও দ্বারাবতী-শিলার সম্মান, আগম-वैদিক মন্ত্রে প্রতিষ্ঠা এবং ষোড়শোপচারে পূজা। শিব বিষ্ণু-শিবের অভেদ ঘোষণা করেন এবং সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ মিশিয়ে উপাসনা করার নিন্দা করেন। নারদ, প্রহ্লাদ, অম্বরীষ, ধ্রুব এবং কলিযুগে শূদ্র ভক্ত হরিদাস—এই দৃষ্টান্তগুলি ভক্তির সর্বজনীনতা প্রকাশ করে।

Adhyaya 83

The Great Swing Festival (Dolā-mahotsava)

উমার মাসভিত্তিক উৎসব-ব্রত জানার অনুরোধে মহেশ্বর চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে ডোলামহোৎসবের বিধান বলেন। বিশেষত একাদশীতে ভগবান কৃষ্ণ/বিষ্ণুকে দোলায় অধিষ্ঠিত করে সর্বসমক্ষে পূজা করার কথা বলা হয়েছে এবং কলিযুগে দর্শনের শুদ্ধিকারক মহিমা গীত হয়েছে—মহাপাপীও প্রভুর দর্শনে ও স্নেহভরে দোলা দোলালে পাপমুক্ত হয়ে কল্যাণ লাভ করে। এখানে দেব, নাগ, গন্ধর্ব, অপ্সরা ও ঋষিদের মহাসমাবেশের বর্ণনা আছে। গায়ত্রী-রীতিতে উপাসনা, “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” মন্ত্রজপ, ষোড়শোপচার পূজা, অঙ্গ/কর/শারীরক ন্যাস, শ্রী (লক্ষ্মী) সহ প্রতিষ্ঠা, পাঁচ বাদ্যসহ আরতি, অর্ঘ্য নিবেদন, গুরুকে দক্ষিণা, বৈষ্ণবদের মধ্যে বিতরণ এবং ভক্তিগীতি-নৃত্যের বিধান—এইভাবে উৎসবকে আচার ও সামূহিক ভক্তির মিলনরূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

Adhyaya 84

The Great Festival of Damanaka (Spring Damana Blossom Rite)

এই অধ্যায়ে চৈত্র মাসের দমনক-মহোৎসবের বিধান বর্ণিত হয়েছে। শুক্লপক্ষের দ্বাদশী প্রধান তিথি, আর তার পূর্বে একাদশীর রাত্রিতে জাগরণসহ পূজা করতে বলা হয়েছে। এটি বৈষ্ণব উৎসব হলেও সর্বতোভদ্র মণ্ডলে কামদেব (কন্দর্প/মদন) ও রতির প্রতিষ্ঠা, দিক্‌-অনুসারে মন্ত্রন্যাস এবং কাম-গায়ত্রী ১০৮ বার জপের নির্দেশ আছে। এরপর কেশব/জগন্নাথ ও জনার্দনের লক্ষ্মীসহ পূজা, রাত্রিজাগরণ, এবং দমন (দমনা) লতা-ডাল ও পুষ্প দিয়ে অর্ঘ্য-নৈবেদ্যাদি অর্পণের কথা বলা হয়েছে। শেষে গান-বাজনা-নৃত্য, জলক্রীড়া, গুরুকে দক্ষিণা দান এবং সমবেত ভোজনের বিধান আছে। মহাদেব বলেন—জগন্নাথ পূজার মধ্যেই শিবপূজাও অন্তর্ভুক্ত; এই উৎসবের দর্শনমাত্রেই মহাপাপ ক্ষয় হয়। কুলসমৃদ্ধি, সহস্র গোধনের তুল্য মহাপুণ্য এবং বসন্তকালের পুষ্পভক্তিতে মুক্তিলাভের ফল প্রশংসিত।

Adhyaya 85

The Great Festival of the Lord’s Repose (Śayana) in Water

এই অধ্যায়ে মহাদেব উমাকে বলেন—জলে অধিষ্ঠিত হরি, কেশব-জনার্দন-মাধব বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে ঋতুভিত্তিক এক বৈষ্ণব ব্রত পালন করতে হবে। বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠে, বিশেষত একাদশী–দ্বাদশীর সময়, গান-বাদ্য-নৃত্যসহ মহোৎসব করা উচিত। মাটির বেদীতে “বিষ্ণুর শয্যা” নির্মাণ করে শীতল সুগন্ধি জল প্রস্তুত করে, শালগ্রামরূপে—অথবা গোপাল/রাম প্রভৃতি মূর্তিরূপে—বিষ্ণুকে প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয়েছে। জলে দাঁড়িয়ে তুলসী-সুগন্ধিত জলে নির্দিষ্ট মন্ত্রে পূজা করতে হবে; দ্বাদশীর রাত্রিতে বিশেষ আরাধনা ও জাগরণ বিধেয়। এর ফল অপরিসীম—বহু যজ্ঞের সমান পুণ্য, বংশশুদ্ধি, যমযাতনা থেকে মুক্তি, বংশের নরকরক্ষা এবং শেষে সাযুজ্য/মোক্ষ। তবে পাঁচটি প্রবৃত্তি—অশ্রদ্ধা, পাপবুদ্ধি, নাস্তিকতা, চিরসংশয় ও কেবল যুক্তিবাদ—ফলপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধক বলে সতর্ক করা হয়েছে।

Adhyaya 86

Pavitrāropaṇa: The Rite of Offering the Consecrated Pavitra to Viṣṇu

এই অধ্যায়ে মহাদেব পার্বতীকে শ্রাবণ মাসের বার্ষিক ‘পবিত্রারোপণ’ ব্রতের বিধান বলেন। বছরের পূজার পরিপূর্ণতা ও ভক্তিবৃদ্ধির জন্য বিষ্ণুর উপর পবিত্র-সূত্র/পবিত্র-মালা অর্পণের মাহাত্ম্য বর্ণিত। পবিত্র তৈরির উপকরণ হিসেবে ক্ষৌম/সূত, রৌপ্য, স্বর্ণ ইত্যাদি ও অভাবে বিকল্প, তিন তন্তুর নির্মাণ, ধৌতকরণ, গাঁটের সংখ্যা, সুগন্ধি-রঞ্জন/বর্ণের নিয়ম, এবং লিঙ্গ বা প্রতিমার অনুপাতে ধারণ করানোর পদ্ধতি নির্দেশ করা হয়েছে। শুক্ল-কৃষ্ণ পক্ষের তিথি অনুসারে দেবতা-বিনিয়োগ, পবিত্রকে পেটিকায় রেখে অধিবাস, স্থাপন ও প্রোক্ষণ-অভিষেকের ক্রম বলা হয়। গাঁটে গাঁটে শক্তির আহ্বান, মুদ্রাক্রম, মন্ত্রজপ—বিশেষত “ক্লীং কৃষ্ণায়”—এবং শেষে নৈবেদ্য, দীপমালা, গুরুপূজা, বৈষ্ণব-সম্মান ও কেশবের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা নির্দিষ্ট। এই অনুষ্ঠানকে ‘উৎসবরাজ’ বলা হয়েছে; ভক্তিসহ করলে তা মহাপবিত্রকারী এবং সকলের জন্যই সাধ্য ও ফলপ্রদ।

Adhyaya 87

Monthly Flower-Offerings (Calendrical Floral Worship)

অধ্যায় ৮৭ ‘মাসিক-পুষ্প’ উমা–মহেশ্বর সংলাপের আবহে বিষ্ণু (কেশব, মাধব, জনার্দন, গোবিন্দ, জগন্নাথ)-পূজার জন্য মাসভিত্তিক পুষ্প ও পবিত্র পত্র নিবেদনের বিধান জানায়। চৈত্র থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত কোন মাসে কোন ফুল ও পাতা—চম্পক, ইউথিকা/মল্লিকা, বিল্বপত্র, পদ্ম, রক্তপুষ্প, কেতকীপত্র, কদম্ব, তুলসী, অতসী, দূর্বা, বকুল, পুন্নাগ প্রভৃতি—অর্পণীয়, তা মহাদেব দেবীকে উপদেশ দেন; কোথাও ঋতুচিহ্ন (বর্ষাকাল, সূর্যের বৃষরাশিতে গমন)ও উল্লেখিত। পুনঃপুনঃ বলা হয়েছে—দেবাধিদেবের পূজায় সকল দেবতার পূজা সম্পন্ন হয়, পাপক্ষয় হয়, ইষ্টফল লাভ হয় এবং শেষে বৈকুণ্ঠপ্রাপ্তি ঘটে। তাই পুষ্পভক্তিকে সহজ সাধনা ও মুক্তির পথরূপে মহিমা দেওয়া হয়েছে।

Adhyaya 88

The Greatness of Kārtika: The Pārijāta Tree Episode and the Tulāpuruṣa Gift

এই অধ্যায়ে কার্তিক-মাসের মহিমা বর্ণিত হয়েছে। নারদ মুনি কল্পবৃক্ষজাত দিব্য পুষ্প নিয়ে দ্বারকায় আসেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে সম্মান করে সেই ফুল রাণীদের মধ্যে বিতরণ করেন, কিন্তু অসাবধানতাবশত সত্যভামা উপেক্ষিত হন; তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে অন্তঃপুরে সরে যান। তাঁকে শান্ত করতে কৃষ্ণ গরুড়কে ডেকে সত্যভামাসহ ইন্দ্রলোকে যান এবং পারিজাত বৃক্ষ প্রার্থনা করেন; ইন্দ্র আপত্তি করলেও ভগবান বৃক্ষটি উপড়ে দ্বারকায় নিয়ে আসেন। এরপর সত্যভামা নারদকে জিজ্ঞাসা করেন—জন্মে জন্মে এমন স্বামী কীভাবে লাভ করা যায়। নারদ ‘তুলাপুরুষ-দান’-এর বিধান বলেন। সত্যভামা পারিজাতসহ শ্রীকৃষ্ণকে তুলায় ওজন করে বিধিপূর্বক নারদকে দানরূপে অর্পণ করেন; নারদ প্রসন্ন হয়ে প্রস্থান করেন। পরে কৃষ্ণ সত্যভামার পূর্বজন্মের পুণ্যকথা এবং এই তত্ত্ব প্রকাশ করেন যে ভক্তির নানা পথ শেষ পর্যন্ত তাঁরই শরণে একত্রিত হয়।

Adhyaya 89

Account of Satyā’s Previous Birth (Kārttika-vrata Phala)

শ্রীকৃষ্ণ সত্যাকে তার পূর্বজন্মের কাহিনি শোনান। এক নারী পিতা ও স্বামীর আশ্রয় হারিয়ে দীর্ঘদিন শোকে বিলাপ করে; পরে ধর্মে প্রত্যাবর্তন করে বিষ্ণুভক্তিতে সংযমী জীবন গ্রহণ করে এবং একাদশী ও কার্ত্তিক-ব্রত অবিচলভাবে পালন করে। মহাদেব এই যুগ্ম ব্রতের অসামান্য মাহাত্ম্য ঘোষণা করে ভোগ ও মোক্ষ—উভয় ফলের প্রতিশ্রুতি দেন। অধ্যায়ে কার্ত্তিকের আচরণসমূহ বলা হয়েছে—প্রভাতে স্নান (তুলা-সূর্য যোগ), মন্দির পরিষ্কার, শুভ তিলকধারণ, দীপদান, তুলসী-সেবা ও রাত্রিজাগরণ ইত্যাদি। বলা হয়, এসব কর্ম মহাপাপীকেও মুক্তিদায়ক। বার্ধক্যে সে গঙ্গাস্নান করে এবং বিষ্ণুদূতেরা তাকে বৈকুণ্ঠে নিয়ে যায়; কার্ত্তিক-ব্রতকে ভগবৎসান্নিধ্য ও চিরঅবিচ্ছেদের প্রত্যক্ষ কারণরূপে দেখানো হয়েছে।

Adhyaya 90

The Resolve/Undertaking to Slay Śaṅkhāsura (and the Greatness of Kārttika & Ekādaśī)

এই অধ্যায়ে সত্যভামা প্রশ্ন করেন—যেহেতু সময়ের সকল বিভাগই ভগবানের রূপ, তবে কার্ত্তিক মাস কেন ‘শ্রেষ্ঠ’ এবং একাদশী কেন ‘প্রিয়’? শ্রীকৃষ্ণ দেবদেবেশ্বর রূপে উত্তর দিতে গিয়ে নারদের প্রাচীন সংলাপ স্মরণ করান, যেখানে কার্ত্তিকের মাহাত্ম্য ব্যাখ্যাত। কথায় আছে, সাগরপুত্র শঙ্খাসুর দেবতাদের পরাজিত করে বেদ অপহরণ করে জলে লুকিয়ে রাখে; বেদসমূহ ভয়ে জলরাশিতে অন্তর্হিত হয়। তখন ব্রহ্মা, ইন্দ্রসহ ত্রয়স্ত্রিংশ দেব স্তব, দীপ, উপচার, সঙ্গীত-সংকীর্তন ও রাত্রিজাগরণ দ্বারা বিষ্ণুকে জাগিয়ে শরণ নেন। ভগবান প্রসন্ন হয়ে বর প্রদান করেন এবং কার্ত্তিক-ব্রতের বিধান স্থাপন করেন—আশ্বিন শুক্ল একাদশী থেকে প্রবোধিনী/উদ্বোধিনী একাদশী পর্যন্ত জাগরণ, স্নান, পূজা, দীপদান ও ভজন-কীর্তন। তিনি শঙ্খাসুর বধ করে বেদ পুনরুদ্ধারের সংকল্প করেন এবং বলেন—এই সাধনায় শুদ্ধি, ভগবৎকৃপা ও শেষে বিষ্ণুলোক লাভ হয়।

Adhyaya 91

The Glory of Prayāga (Prayāga Māhātmya): Recovery of the Vedas and the King of Tīrthas

এই অধ্যায়ে অবতার-কথা ও তীর্থতত্ত্ব একত্র করে প্রয়াগের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ভগবান বিষ্ণু মৎস্যরূপ ধারণ করে ক্রমে পাত্র ও জলরাশিতে বিস্তার লাভ করেন এবং শঙ্খ/শঙ্খাসুরকে বধ করেন। এরপর তিনি ঋষিদের আদেশ দেন—জলে ছড়িয়ে পড়া বেদ সংগ্রহ করে আনতে; ঋষিরা বেদকে বেদাঙ্গ ও যজ্ঞবিধিসহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, ফলে যজ্ঞধর্ম পুনরুজ্জীবিত হয় এবং অশ্বমেধ-প্রসঙ্গে দেবগণ বর প্রার্থনা করেন। ভগবান প্রয়াগকে ব্রহ্মক্ষেত্র ও ‘তীর্থরাজ’ রূপে চিরখ্যাতি দান করেন। কেবল দর্শনেই মহাপাপক্ষয়, বিধিপূর্বক শ্রাদ্ধে পিতৃউদ্ধার, এবং প্রভুর সান্নিধ্যে দেহত্যাগকারীর মোক্ষ—এই ফল ঘোষিত। বিশেষত মাঘ মাসে সূর্য মকরে থাকলে প্রাতঃস্নানকে অতিশয় পুণ্যদায়ক ও মুক্তিলাভের নিকটতর উপায় বলা হয়েছে।

Adhyaya 92

Description of Observances (Kārttika Vow: Purity, Worship, and Devotional Performance)

এই অধ্যায়ে রাজা পৃথু নারদকে অনুরোধ করেন—কার্ত্তিক (এবং মাঘ) স্নান-ব্রত, আচরণবিধি ও ব্রত-সমাপ্তির যথাযথ পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে জানাতে। উত্তরখণ্ডের পরম্পরাগত বর্ণনাশৈলীতে (পুলস্ত্য–ভীষ্ম-ধারার ইঙ্গিতে) বলা হয়—আশ্বিন শুক্ল একাদশীতে কার্ত্তিক-ব্রত আরম্ভ, ব্রাহ্মমুহূর্তে জাগরণ, এবং কঠোর শৌচ-শুদ্ধি পালন। বিশেষ করে মলত্যাগের পর শুদ্ধির বিধান আশ্রম/অবস্থাভেদে (ব্রহ্মচারী, বানপ্রস্থ, যতি, পথিক, নারী/শূদ্র প্রভৃতি) নিরূপিত; মুখ-দন্ত-শুদ্ধি, বনস্পতির প্রার্থনা, এবং কিছু দিনে দাঁত মাজা নিষেধ ও দন্তকাষ্ঠ/উপকরণের নিয়মও বলা হয়েছে। এরপর মন্দিরকেন্দ্রিক ভক্তি—বিষ্ণু (এবং শিব) পূজা, কীর্তন, কীর্তনকারদের সম্মান—প্রধান হয়ে ওঠে। কলিযুগে শিক্ষা দেওয়া হয়, যেখানে ভক্তরা হরির নামগান করে, সেখানেই বিষ্ণু অধিষ্ঠান করেন। শেষে দেবতাভেদে গ্রহণীয়/বর্জনীয় ফুলের বিধান ও ক্ষমাপ্রার্থনা (ক্ষামাযাচনা) দেওয়া হয়েছে; ব্রতীর পাপক্ষয় এবং পূর্বপুরুষসহ বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তির ফল প্রতিশ্রুত।

Adhyaya 93

Description of the Bathing Rite (Kārtika Vrata Snāna and Allied Observances)

এই অধ্যায়ে কার্তিক-ব্রতের স্নানবিধি ধাপে ধাপে বর্ণিত। রাত্রির অন্তে বা প্রভাতে সাধক প্রথমে পুণ্যজলে স্নান করে, পরে ক্রমে অধিক পুণ্যদায়ক জলাশয়ে স্নান করতে করতে শেষে তীর্থস্নান করে—যার ফল ‘অনন্ত’ বলা হয়েছে। তিনি সংকল্প করে বিষ্ণুকে স্মরণ করেন, তীর্থ ও অধিষ্ঠাত্রী দেবতাদের অর্ঘ্য দেন, এবং হরি/দামোদরকে (রাধাসহ) আহ্বান-স্তব-মন্ত্রে পূজা করেন। জলে প্রবেশের সময় ভাগীরথী গঙ্গা, বিষ্ণু, শিব ও সূর্যের স্মরণ করতে বলা হয়েছে। আশ্রমভেদে স্নানদ্রব্য নির্দিষ্ট—গৃহস্থের জন্য তিল ও আমলকী-চূর্ণ প্রভৃতি, আর ত্যাগীদের জন্য তুলসীমূলের মাটি; আমলকী ও তিল মেশানোর ক্ষেত্রে কিছু তিথি নিষিদ্ধ। নারীদের ও শূদ্রদের জন্য বৈদিকের পরিবর্তে পৌরাণিক মন্ত্রে কর্ম করার বিধানও উল্লেখ আছে। এরপর তর্পণ, ব্রাহ্মণভোজন ও ব্রাহ্মণপূজার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে—ব্রাহ্মণসম্মান দেবসম্মানেরই সমান। শেষে মহাদেব দেবীকে তুলসীপূজার বিধি বলেন; কার্তিক-ব্রত পালনে সর্বাঙ্গীন কল্যাণ, পুণ্যবৃদ্ধি ও বৈকুণ্ঠপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি ঘোষিত।

Adhyaya 94

Description of Observances: Disciplines of the Kārttika (Ūrja) Vow

এই অধ্যায়ে নারদ রাজাকে কার্ত্তিক/ঊর্জা-ব্রতের শুদ্ধাচার ও ভক্তিময় বিধান জানান। মাংস, মধু, মদ্য, কিছু ডাল ও তেল, পেঁয়াজ-রসুন এবং কয়েক প্রকার লাউ-কুমড়ো জাতীয় শাকসবজি বর্জনের নির্দেশ আছে; আরও বলা হয়েছে—ব্যবসায়-দূষিত দুধ, তামার পাত্রে রাখা দুধ, পুকুরের জল, এবং স্বার্থপরভাবে রান্না করা আহারও ‘আমিষসম’ অশুচি। আচরণে ব্রহ্মচর্য, মাটিতে শয়ন, পাতায় আহার, নির্দিষ্ট সময়ে সংযত ভোজন, এবং নরকচতুর্দশী ব্যতীত তেল-মর্দন সংযম বিধেয়। সামাজিক নীতিতে বিশ্বাসঘাতকতা, পরস্ত্রীগমন, অন্যের অন্ন/উপহার গ্রহণ, দেব-গুরু-ভক্তদের নিন্দা নিষিদ্ধ। তিথি অনুসারে কিছু শাক বর্জনের তালিকাও আছে; ভোজনের আগে বিষ্ণুকে অংশ নিবেদন ও ব্রাহ্মণকে ভোজন করিয়ে তবেই নিজে খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। শেষে ব্রতের মহিমা যজ্ঞেরও ঊর্ধ্বে ঘোষিত—যমদূত পালায়, দেবগণ ভক্তকে রক্ষা করেন, ভূত-প্রেতের উপদ্রব নাশ হয়, এবং ফলস্বরূপ বৈকুণ্ঠলাভ হয়।

Adhyaya 95

Description of the Udyāpana (Concluding Rite) of the Ūrja/Kārttika Vrata

এই অধ্যায়ে শুদ্ধ চতুর্দশীতে ঊর্জা/কার্ত্তিক ব্রতের উদ্যাপন (সমাপ্তি-অনুষ্ঠান) বিধান বলা হয়েছে। ব্রতী তুলসীকে কেন্দ্র করে মণ্ডপ নির্মাণ করে, দ্বারপাল স্থাপন করে, সর্বতোভদ্র মণ্ডল অঙ্কন করে এবং পঞ্চরত্নে ভূষিত ঢাকনাযুক্ত কলস স্থাপন করে। পরে শ্রীসহিত বিষ্ণুর ষোড়শোপচার পূজা করে, ইন্দ্র ও লোকপালদেরও যথাবিধি অর্চনা করে। উপবাস ও রাত্রিব্যাপী হরিজাগরণ এখানে প্রধান—গান, বাদ্য, কীর্তন এবং বিষ্ণুলীলার পাঠের মাধ্যমে জাগরণ করলে মহাশুদ্ধি ও বিপুল পুণ্য লাভ হয় বলা হয়েছে। পূর্ণিমায় পত্নীসহ ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ করে ভোজন করানো, নির্দিষ্ট মন্ত্রে হোম করা, দক্ষিণা প্রদান এবং কপিলা গাভী দান করার নির্দেশ আছে। গুরুজনকে সম্মান করে সংস্কৃত প্রতিমা তাঁকে অর্পণ করা হয়। শেষে ঘোষণা করা হয়েছে—এই উদ্যাপনে পুণ্য কোটি গুণ বৃদ্ধি পায় এবং ব্রতী বিষ্ণুর সান্নিধ্য লাভ করে।

Adhyaya 96

Description of the Origin of Jālandhara (Prelude to Tulasī/Vṛndā Greatness)

এই অধ্যায়ে পৃথু ঊর্জাব্রতে তুলসীমূল-পূজার বিশেষ তাৎপর্য এবং কেন তুলসী বিষ্ণুর সর্বাধিক প্রিয়—তা বিস্তারিত জানতে চান। নারদ প্রাচীন কাহিনি বলেন: ইন্দ্রসহ দেবগণ কৈলাসে গিয়ে এক ভীষণ তেজোময় সত্তাকে দেখেন। ইন্দ্রের বজ্রাঘাতেও সে দমে না; রুদ্রশক্তির প্রভাবে দেবগণ বিপন্ন হন। তখন বৃহস্পতী শিবস্তব করে শরণ প্রার্থনা করেন; প্রসন্ন শম্ভু নিজের দাহক তেজ সংহরণ করে সেই সত্তাকে সিন্ধু-গঙ্গা-সংযোগস্থ সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন। সমুদ্রে সে সত্তা কাঁদতে কাঁদতে শিশুরূপে প্রকাশ পায়; তার ক্রন্দনে লোকসমূহ কেঁপে ওঠে। ব্রহ্মা এসে সমুদ্রের শ্রদ্ধা গ্রহণ করে শিশুটির পরিচয় নির্ণয় করেন এবং বলেন—ব্রহ্মার নয়নে জল রুদ্ধ হয়েছিল বলে তার নাম ‘জালন্ধর’। ভবিষ্যদ্বাণী হয়, রুদ্র ব্যতীত কেউ তাকে জয় করতে পারবে না। অভিষেকের পর সে শুক্রাচার্যের সহায়তায় শক্তিশালী হয় এবং কালনেমির কন্যা বৃন্দাকে বিবাহ করে—এভাবেই পরবর্তী তুলসী/বৃন্দা-মাহাত্ম্যের ভূমিকা রচিত হয়।

Adhyaya 97

The Victory (Conquest) of Amarāvatī

পরাজিত দৈত্যরা পাতাল থেকে উঠে ভৃগুবংশীয় (শুক্র/ভার্গব)-এর কাছে এসে সমুদ্র-মন্থন ও রাহুর শিরচ্ছেদের প্রসঙ্গ স্মরণ করায়। সমুদ্রপুত্র জলন্ধর ঘস্মর নামক দূতকে দেবেন্দ্রের কাছে পাঠিয়ে মন্থনের বিবরণ ও রত্নসমূহের হিসাব দাবি করে। ইন্দ্রের উত্তর এবং ঈশ্বরের ব্যাখ্যায় বৈরিতা আরও তীব্র হয়। অমরাবতীতে ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়। শুক্র সংজীবনী বিদ্যায় দৈত্যদের পুনর্জীবিত করেন, আর অঙ্গিরা দ্রোণ-প্রদেশের ঔষধিতে দেবতাদের বারবার উদ্ধার করেন। এ কথা জেনে জলন্ধর দ্রোণ পর্বত তুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে দেবদের সুবিধা ভেঙে দেয়। তখন দেবগণ পলায়ন করে; জলন্ধর অমরাবতীতে প্রবেশ করে অসুরদের পদে বসায় এবং ইন্দ্রপক্ষকে গোপনে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে—কার্তিক-মাহাত্ম্য ধারায় এটি অমরাবতীর সাময়িক অসুর-বিজয়।

Adhyaya 98

Jalaṃdhara’s Entrance (Rise to Power and Viṣṇu’s Response)

জলন্ধরের ভয়ে ইন্দ্রসহ দেবগণ কাঁপতে থাকেন এবং বিষ্ণু-স্তোত্র গেয়ে তাঁর অবতার, রক্ষাকারী করুণা ও বিশ্ব-ব্যবস্থার কার্যাবলি স্তব করেন। নারদ বলেন—এই স্তোত্রের নিত্য পাঠে হরির কৃপায় দুঃখ-সঙ্কট দূর হয়। তখন শ্রীভগবান দয়ায় গরুড়ারূঢ় হয়ে লক্ষ্মীর সঙ্গে কথা বলেন—তোমার ভ্রাতা জলন্ধর দেবদের নিধন করছে, কিন্তু সে রুদ্রাংশজাত, ব্রহ্মার বিধানে প্রতিষ্ঠিত, আর লক্ষ্মীর সম্পর্ক বিবেচনায় তাকে আমি বধ করব না। এরপর ভয়ংকর যুদ্ধ হয়; অস্ত্র ভেঙে যায়, গরুড় আহত হয়ে পতিত হয়, পরে মুষ্টিযুদ্ধ শুরু হয়। জলন্ধরের বীর্যে সন্তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু বর দেন। জলন্ধর প্রার্থনা করে—লক্ষ্মীসহ ভগবান যেন তার গৃহে বাস করেন। ভগবান সম্মতি দিয়ে তার নগরে যান; তারপর জলন্ধর বিশ্ব-কার্যের পদসমূহ পুনর্বিন্যস্ত করে ধর্ম ও সমৃদ্ধিসহ লোকসমূহ শাসন করে।

Adhyaya 99

Dialogue of the Messenger: The Jalandhara Episode (and the Manifestation of Kirtimukha)

নারদ কৈলাসে উমাসহ মহাদেবকে অপূর্ব ঐশ্বর্যে বিরাজমান দেখে সেই সমৃদ্ধির বর্ণনা করেন। এতে জালন্ধরের অহং ভেঙে যায়—সত্য সমৃদ্ধি পার্বতী-রূপ ‘রত্ন’ ছাড়া পূর্ণ নয়। পার্বতীর সৌন্দর্যের কথা শুনে কামে উন্মত্ত জালন্ধর সিংহিকার পুত্র রাহুকে দূত করে কৈলাসে পাঠায়। রাহুর উদ্ধত বার্তায় শিবের ভ্রূমধ্য থেকে এক ভয়ংকর পুরুষ আবির্ভূত হয়ে রাহুকে আক্রমণ করে। রাহু শরণ নিলে ঈশ্বর তাকে নিয়ন্ত্রিত দূত হিসেবে মুক্ত করেন। সেই ভয়ংকর সত্তা খাদ্য চাইলে শিব তাকে নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভক্ষণ করতে আদেশ দেন; শেষে কেবল মুখ/শির অবশিষ্ট থাকে। তখন শিব তার নাম ‘কীর্তিমুখ’ রেখে দ্বাররক্ষক নিযুক্ত করেন এবং শিবপূজার ফলপ্রাপ্তির জন্য প্রথমে তার পূজা আবশ্যক বলেন। মুক্ত রাহু ফিরে সব সংবাদ জালন্ধরকে জানায়।

Adhyaya 100

The Slaying of the Demon Army

জালন্ধর ক্রোধে বিপুল দৈত্যসেনা নিয়ে কৈলাসের দিকে অগ্রসর হয়। দেবতারা গোপনে শঙ্করের কাছে এসে প্রার্থনা করেন—‘সমুদ্রপুত্র’কে বধ করে তাঁদের রক্ষা করুন। শিব বিষ্ণুকে আহ্বান করে জিজ্ঞাসা করেন, জালন্ধরকে আগে কেন হত্যা করা হয়নি; বিষ্ণু বলেন, অংশ-সম্পর্ক ও আত্মীয়তার বন্ধন তাঁকে নিবৃত্ত করে, তাই শিবই কর্তব্য সম্পাদন করুন। শিব জানান, সাধারণ অস্ত্রে সে বধ্য নয়; দেবতাদের সম্মিলিত তেজ প্রয়োজন। দেবতাদের তেজ এক মহাপুঞ্জে পরিণত হলে শিব সেখান থেকে পরম সুদর্শন অস্ত্র প্রকাশ করেন এবং বজ্রও নির্মাণ করেন। এরপর কৈলাসে শিবের গণ-প্রমথ ও দৈত্যদের মধ্যে ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়; ভূমি ও আকাশ জুড়ে সংহার ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রের মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যায় পতিত দানবরা বারবার জীবিত হয়ে ওঠে, ফলে গণেরা সন্ত্রস্ত হয়। তখন রুদ্রের মুখ থেকে ভয়াল কৃত্যা উদ্ভূত হয়ে যুদ্ধের গতি বদলে দেয়; দৈত্যসেনা ভেঙে পড়তে থাকে, যদিও কয়েকজন প্রধান দৈত্যনায়ক প্রতিরোধ ধরে রাখতে চেষ্টা করে।

Adhyaya 101

The Defeat of the Demon Army

পদ্মপুরাণের উত্তরখণ্ডের (৬.১০১) এই অধ্যায়ে কার্ত্তিক-মাহাত্ম্যের শ্রীকৃষ্ণ–সত্যভামা সংলাপ-পরিসরে যুদ্ধের চূড়ান্ত দৃশ্য বর্ণিত। নারদ জানান, ক্রুদ্ধ দানবেরা শিবের গণনেতা নন্দী, ভৃঙ্গী ও ষণ্মুখ/কার্ত্তিকেয়ের দিকে ধেয়ে আসে। এরপর ভীষণ সংঘর্ষ শুরু হয়; নিশুম্ভ কার্ত্তিকেয়ের ময়ূরকে আঘাত করে এবং শক্তিধরকে নিপাতিত করে; নন্দী ও কালনেমি পরস্পর প্রবল আঘাত বিনিময় করে। লম্বোদর গণেশ শুম্ভের সঙ্গে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হন; ইঁদুরবাহন বিদ্ধ হলে তিনি নেমে শুম্ভকে বধ করে পুনরায় বাহনে আরোহণ করেন। তখন বীরভদ্র ভৈরব, বেতাল, যোগিনী ও পিশাচ প্রভৃতি বিশাল ভূতগণসহ উপস্থিত হয়ে ভয়ংকর নাদে পৃথিবী কাঁপিয়ে দানবসেনাকে ছত্রভঙ্গ করে দেন। শেষে জালন্ধর প্রবেশ করে বহু গণকে পর্যুদস্ত করে; কার্ত্তিকেয়ের শরে বিদ্ধ হয়ে সে পাল্টা আঘাত করে, কিন্তু বীরভদ্রের প্রতিঘাতে পতিত হয়। এভাবেই দানবসেনার পরাজয় সম্পূর্ণ হয়ে অধ্যায়ের মূল ভাব পরিসমাপ্ত হয়।

Adhyaya 102

The Description of the Demon’s Deceit (Jālandhara’s Illusion and Stratagem)

বীরভদ্র পতিত হলে শিব বৃষভে আরূঢ় হয়ে পুনরায় যুদ্ধে প্রবেশ করেন। তিনি গণদের সাহস জাগিয়ে দানবদের ছত্রভঙ্গ করেন। শিবের তীক্ষ্ণ শরবৃষ্টিতে অসুরসেনা বিপর্যস্ত হয়; খড়্গরোমা প্রভৃতি প্রধান অসুর নিহত বা অক্ষম হয়, আর অন্যেরা দিগ্বিদিক পালায়। তখন জালন্ধর স্বয়ং রুদ্রকে আহ্বান করে। নিরস্ত্র হয়েও সে নিবৃত্ত হয় না; শেষে গন্ধর্ব-মায়া সৃষ্টি করে—গান, নৃত্য ও বাদ্যের মোহে শিবকে বিভ্রান্ত করে। সেই সুযোগে জালন্ধর গৌরীর দিকে ধাবিত হয়ে ভয়ংকর শিবসদৃশ রূপ ধারণ করে; কিন্তু পার্বতীকে দেখামাত্র তার শক্তি ক্ষীণ হয়ে সে জড়বৎ হয়ে পড়ে। গৌরী অন্তর্ধান করে মানসসরোবর গমন করেন এবং বিষ্ণুর শরণ নেন। শ্রীভগবান বিষ্ণু বলেন—জালন্ধর তার পত্নীর পতিব্রত্য-শক্তিতে রক্ষিত, তাই দেবতাদের প্রতিশোধ সীমাবদ্ধ। মায়া লুপ্ত হলে শিব কৌশল বুঝে পুনরায় যুদ্ধোদ্যত হন, আর জালন্ধর আবার শরবৃষ্টি নিক্ষেপ করে।

Adhyaya 103

Vṛndā’s Entry into the Funeral Fire (Self-Immolation) and the Breaking of Fidelity by Māyā

কার্তিক-মাহাত্ম্যের পরিসরে শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে বলেন—জালন্ধরের শক্তি ক্ষয় করতে বিষ্ণু মায়ার দ্বারা বৃন্দার অটল পতিব্রতা-নিষ্ঠা ভঙ্গ করার কৌশল নেন। বৃন্দা অশুভ স্বপ্ন ও লক্ষণ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পালায়; রাক্ষসদের ভয়ে সে এক নীরব তপস্বীর শরণ নেয়। সেই মুনি দ্রুত দূত (দুই “বানর”) পাঠিয়ে জালন্ধরের মৃত্যুসংবাদ আনান। শোকে বিহ্বল বৃন্দা স্বামীকে পুনর্জীবিত করার প্রার্থনা করে; মুনি একটি উপায় জানান। তখন “জালন্ধর” ফিরে এসে তাকে আলিঙ্গন করে, কিন্তু বৃন্দা বুঝে যায়—এ বিষ্ণুর ছদ্মবেশ। ক্রুদ্ধ হয়ে সে হরির আচরণ নিন্দা করে এবং শাপ দেয়—রামাবতারে বনবাস, সীতাহরণ ও বানর-সহায়তার পূর্বাভাস ঘটে। শেষে বৃন্দা যজ্ঞাগ্নিতে প্রবেশ করে সতী হয়; বিষ্ণু ভস্মলিপ্ত ও বিষণ্ণ হয়ে থাকেন—এখানে মায়া, বিশ্ব-প্রয়োজন এবং ব্রতধর্মের পবিত্রতার টানাপোড়েন প্রকাশ পায়।

Adhyaya 104

The Slaying of Jālandhara (and the Prakṛti Hymn Episode)

জালন্ধর শিবকে বিভ্রান্ত করতে দুঃখার্ত গৌরীর মায়াময় প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি করে; তাতে শিবের অন্তরে ক্ষণিক আলোড়ন জাগে। জালন্ধরের বাণে আহত শিব বিষ্ণুর প্রেরণায় জাগ্রত হয়ে ভয়ংকর রৌদ্ররূপ ধারণ করেন, দানবদের ছত্রভঙ্গ করেন এবং শুম্ভ‑নিশুম্ভকে অভিশাপ দেন—তারা সকলের কাছে অজেয় হবে, কিন্তু গৌরীর হাতে নিহত হবে। পুনরায় মহাযুদ্ধে শিব সুদর্শন চক্র নিক্ষেপ করে জালন্ধরের শিরচ্ছেদ করেন; অসুরের তেজ রুদ্রের মধ্যে লীন হয়, দেবতারা আনন্দিত হয়। এরপর দেখা যায়, বৃন্দার সৌন্দর্যে বিষ্ণু মোহিত হয়ে স্থির হয়ে আছেন। শিব দেবতাদের মোহিনী/মায়াকে অনুসন্ধান করতে বলেন; তখন দেবগণ মূল‑প্রকৃতির স্তব করেন—তাঁকেই গুণত্রয়ের উৎস ও জগতের ক্রিয়াপ্রবাহের কারণ বলে মানেন, এবং তিন সন্ধ্যায় পাঠ করলে দারিদ্র্য, মোহ ও শোক নাশ হয় বলে ঘোষণা করেন। ভারতী (সরস্বতী) দীপ্ত জ্যোতির্মণ্ডলরূপে আবির্ভূত হয়ে গুণভেদে ত্রিরূপ—গৌরী, লক্ষ্মী ও স্বরা—উপদেশ দেন; দেবীগণ বিষ্ণুর অবস্থানস্থলে বপনের জন্য ‘ক্ষেত্র‑বীজ’ প্রদান করে দেবকার্যসিদ্ধির পথ দেখান।

Adhyaya 105

The Greatness of Dhātrī (Āmalakī) and Tulasī

এই অধ্যায়ে কার্তিক মাসে ধাত্রী (আমলকী) ও তুলসীর পরম মাহাত্ম্য উৎপত্তিকথা ও আচরণবিধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ছড়িয়ে-পড়া বীজ থেকে ধাত্রী, মালতী ও তুলসীর উদ্ভবের কথা বলা হয়েছে এবং তাদের ত্রিগুণের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। পরে বৃক্ষরূপে নারীর ন্যায় প্রকাশিত রূপ দেখে বিষ্ণুর বিস্ময় ও আকাঙ্ক্ষার প্রসঙ্গ আসে; বিশেষ অনুগ্রহে ধাত্রী ও তুলসীকে অনন্য কৃপাদায়িনী বলা হয়েছে এবং “বর্বরী” নামের নিন্দা করা হয়েছে। এরপর বিধান অংশে বলা হয়—কার্তিকে তুলসীমূলে নিকটে পূজা করা, গৃহে তুলসীবন রক্ষা করা নিজেই তীর্থ; সেখানে যমদূতদের প্রবেশ হয় না। তুলসী-ধাত্রী-সম্পর্কিত দান, নৈবেদ্য ও শ্রাদ্ধকর্মে মহাপুণ্য ও মুক্তিলাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং প্রসিদ্ধ নদী-তীর্থসম পুণ্যফল উল্লেখ করা হয়েছে। শেষে নির্দিষ্ট সময়ে পাতা তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, আর এই উৎপত্তিকথা শ্রবণ পাপনাশক ও পিতৃকল্যাণকর বলা হয়েছে।

Adhyaya 106

Episode of Kalahā (The Allegory of Quarrel and Karmic Consequence)

উত্তরখণ্ডের কার্ত্তিক-মাহাত্ম্যে শ্রোতা ঊর্জা-ব্রতের পবিত্র মহিমা ও পূর্বদৃষ্টান্ত জানতে চান। তখন নারদ একটি উপাখ্যান বলেন—ধর্মদত্ত নামে বিষ্ণুভক্ত, দ্বাদশাক্ষর মন্ত্রে নিষ্ঠাবান ও অতিথি-সেবায় পরায়ণ, কার্ত্তিক মাসে রাত্রির শেষে হরির জাগরণ করতে বের হন। পথে তিনি রাক্ষসীসদৃশ ভয়ংকর এক নারীর সম্মুখীন হন; হরিনাম স্মরণ এবং তুলসী-মিশ্রিত জলের স্পর্শে তার পাপ নষ্ট হয়। সে প্রণাম করে নিজের পূর্বকর্ম জানায়—সে ছিল ‘কলহা’, কলহপ্রিয়া স্ত্রী; স্বামীর ধর্ম অবহেলা করে বিষপানে মৃত্যুবরণ করেছিল। যমসভায় চিত্রগুপ্ত তার কোনো পুণ্য না পেয়ে কঠোর ফল নির্ধারণ করেন—নীচ যোনিতে জন্ম ও প্রেতত্ব প্রভৃতি। দীর্ঘ দুঃখভোগের পর সে ধর্মদত্তের করুণা প্রার্থনা করে, পুনর্জন্ম ও প্রেতজীবনের ভয় প্রকাশ করে; এবং বোঝানো হয় যে কার্ত্তিক-ভক্তি ও তুলসী-স্পর্শ শুদ্ধি ও মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষার কারণ হয়।

Adhyaya 107

The Episode of Quarrel: Liberation from Preta-hood through Kārtika-vrata Merit

এই অধ্যায়ে প্রেত-অবস্থার দুঃখ ও তার মোচনের পথ বর্ণিত। ধর্মদত্ত লক্ষ্য করেন যে প্রেতের পক্ষে তীর্থসেবা, দান বা ব্রতাচরণ—সাধারণ প্রায়শ্চিত্ত—নিজে করা সম্ভব নয়। করুণাবশে তিনি আজীবন পালিত কার্তিক-ব্রতের অর্ধেক পুণ্য ‘কলহ’ নামের প্রেত-নারীকে দান করেন এবং বলেন—যজ্ঞ ও তীর্থযাত্রার চেয়েও কার্তিক-ব্রতের মাহাত্ম্য অতুল। এরপর তিনি শুদ্ধিকর্ম করেন—তুলসী-মিশ্রিত জল দিয়ে স্নান/প্রোক্ষণ করান এবং দ্বাদশাক্ষর মন্ত্র শ্রবণ করান। সঙ্গে সঙ্গে প্রেতত্ব নাশ হয়; কলহ দীপ্তিমান দিব্যরূপ ধারণ করে কৃতজ্ঞতা জানায়। তখন বিষ্ণুরূপ গণ/দিব্য সহচরসহ এক স্বর্গীয় রথ এসে তাকে নিয়ে যায়; ধর্মদত্ত বিষ্ণুভক্ত বলে প্রশংসিত হন। শেষে বিষ্ণুপূজা ও নামস্মরণের পরম ফল (ধ্রুব, গজেন্দ্র ইত্যাদি প্রসঙ্গের ইঙ্গিতসহ) উল্লেখ করে বলা হয়—কার্তিকভক্তি ও পুণ্য-বণ্টনের ফলে ধর্মদত্ত বৈকুণ্ঠসান্নিধ্য লাভ করবেন এবং পরবর্তীতে সূর্যবংশে রাজজন্ম (দশরথ-ধারা) প্রাপ্ত হবেন।

Adhyaya 108

The Episode of Quarrel (Tulasi vs. Royal Splendor in Viṣṇu Worship)

এই অধ্যায়ে বিষ্ণুকে প্রকৃতপক্ষে কী তুষ্ট করে—রাজকীয় ঐশ্বর্য না শুদ্ধ ভক্তি—এই বিষয়ে শিক্ষামূলক বিবাদ বর্ণিত। শুরুতে (নারদ–ধর্মদত্ত সংলাপের পর) গণেরা এক প্রাচীন কাহিনি বলে: কান্তিপুরীর রাজা কোল/কোলেশ্বর সমৃদ্ধ রাজ্য ও যজ্ঞ-গৌরবে খ্যাত হয়ে অনন্তশয়ন তীর্থে যান। সেখানে বিষ্ণুদাস নামক ব্রাহ্মণ বৈদিক স্তোত্র পাঠ করে তুলসীপাতা ও জল দিয়ে বিষ্ণুপূজা করেন; সেই তুলসী-অর্চনা রাজাদের রত্নখচিত উপহারকে যেন আচ্ছাদিত করে দেয়, ফলে রাজা ক্রুদ্ধ হন। বিষ্ণুদাস রাজার অহংকার ভেঙে প্রশ্ন করেন—তিনি কি কখনও সত্য বৈষ্ণব ব্রত পালন করেছেন? বিবাদের মীমাংসা বিষ্ণুর প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতেই সম্ভব—এই বোধ জাগে। এরপর রাজা মুদ্গলের তত্ত্বাবধানে বৈষ্ণব সত্র শুরু করেন, আর বিষ্ণুদাস পাঁচটি সাধনায় অবিচল থাকেন—মাঘ/ঊর্জ ব্রতে তুলসী-সেবা, একাদশীতে উপবাস ও দ্বাদশাক্ষরী জপ, প্রতিদিন ষোড়শোপচার পূজা (শুভ কলাসহ), নিরন্তর স্মরণ, এবং বিধিপূর্বক উদ্‌যাপন—যাতে ঐশ্বর্যের চেয়ে ভক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

Adhyaya 109

The Episode of Quarrel (Viṣṇudāsa and the Cōḷa King; Devotion Beyond Rivalry)

কার্তিক-মাহাত্ম্যের কাহিনিতে বিষ্ণুদাস নামে এক নিয়মনিষ্ঠ বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ সন্ধ্যা-উপাসনা কখনও ত্যাগ করেন না এবং হরিকে নৈবেদ্য না দিয়ে আহার করেন না। তাঁর রান্না করা নৈবেদ্য সাত দিন ধরে বারবার চুরি হয়; সপ্তম দিনে পাহারা দিতে গিয়ে তিনি দেখেন এক ক্ষুধার্ত চাণ্ডাল তা নিতে এসেছে। শাস্তি না দিয়ে করুণায় তিনি ঘি দিতে উদ্যত হন; তখনই সেই ‘চোর’ মূর্ছিত হয়ে পড়ে এবং স্বয়ং ভগবান নারায়ণরূপে প্রকাশিত হন। ভগবান বিষ্ণুদাসকে সাযুজ্য দান করে দিব্য উৎসবের মধ্যে বৈকুণ্ঠে নিয়ে যান। এদিকে দীক্ষিত চোলরাজ সুশীল উপলব্ধি করেন—প্রতিদ্বন্দ্বিতার বশে করা যজ্ঞ-দান বিষ্ণুকে তত সন্তুষ্ট করে না, যতটা করে নির্মল ভক্তি। পরে যজ্ঞাগ্নিতে আত্মসমর্পণের নাটকীয় ঘটনার ফলে বিষ্ণু প্রকাশিত হয়ে ভক্তকে উন্নীত করেন। অধ্যায়ের সিদ্ধান্ত—ভগবদ্দর্শনের পরম কারণ ভক্তিই।

Adhyaya 110

Description of the Gaṇas’ Former Merits (Jaya–Vijaya’s Prior Deeds and Liberation)

ধর্মদত্ত জিজ্ঞাসা করলেন—ভগবান বিষ্ণুর দ্বারপাল জয়–বিজয় কেন এমন বিশেষ রূপ ধারণ করেছিলেন। গণেরা বলল, পূর্বজন্মে তারা কঠোর বৈষ্ণব সাধনায় নিবিষ্ট ছিল—ইন্দ্রিয়সংযম, ধর্মাচরণ, বিষ্ণুব্রত পালন এবং অষ্টাক্ষর মন্ত্রের নিরন্তর জপ; এর ফলেই তারা হরির প্রত্যক্ষ দর্শন পেয়েছিল। মরুত্তের যজ্ঞে আমন্ত্রিত হয়ে তারা ধন লাভ করে, কিন্তু ভাগবণ্টনে কলহ বাধে; পরস্পরের শাপে বিজয় কুমির এবং জয় হাতি (মাতঙ্গ) হয়। তারা বিষ্ণুর শরণ নিলে ভগবান ভক্তের বাক্যের অচ্যুততা রক্ষা করে বলেন—শাপফল ভোগের পর তারা আবার তাঁর ধামে প্রত্যাবর্তন করবে। গণ্ডকী তীরে পুনর্জন্মে স্মৃতি অটুট থাকে; কার্তিক স্নানের সময় কুমির হাতিটিকে ধরলে হরি আবির্ভূত হয়ে সুদর্শনে উদ্ধার করেন এবং সায়ুজ্য/সারূপ্যসদৃশ নৈকট্য দান করে বৈকুণ্ঠে নিয়ে যান। সেই স্থান ‘হরিক্ষেত্র’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। শেষে একাদশী-ব্রত, প্রভাতস্নান, ব্রাহ্মণ–গো–বৈষ্ণব সেবা ও আহারসংযমের বিধান বলা হয়েছে; আজীবন ভক্তি ও ব্রতাচরণে বিষ্ণুর পরম পদ লাভ হয়—এই ফলশ্রুতি ঘোষিত।

Adhyaya 111

Description of the Greatness of Kṛṣṇā–Veṇī (Kṛṣṇāveṇī Māhātmya)

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণা–বেণী অঞ্চল ও তাদের সঙ্গমের মহাশক্তির কথা বলা হয়েছে। নারদ বলেন—কৃষ্ণা নদী শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপ, আর বেণীতে মহেশ্বরের অধিষ্ঠান; তাই তাদের মিলন ব্রহ্মার পক্ষেও অবর্ণনীয়, এবং অতিশয় পুণ্যপ্রদ। কাহিনি চাক্ষুষ মন্বন্তরে ফিরে যায়। সহ্য পর্বতে ব্রহ্মা দেব-ঋষিদের সঙ্গে যজ্ঞ আরম্ভ করেন। বিষ্ণুপত্নী স্বরা আহূতা হলেও দেরিতে আসেন; শুভ মুহূর্ত রক্ষায় গায়ত্রীকে ব্রহ্মার ডানদিকে বসিয়ে দীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। স্বরা তা দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে দেবতা ও পরিস্থিতিকে শাপ দেন; পাল্টা শাপে দেবতাদের অংশ নদীরূপে প্রকাশ পায়—বিষ্ণুর অংশ কৃষ্ণা, শিব জটা-রূপ বেণী থেকে প্রকাশিত, এবং সহ্য থেকে বহু নদী উৎপন্ন হয়। গায়ত্রী ও স্বরা পশ্চিমমুখে সাবিত্রী রূপে প্রবাহিত হন। এই কাহিনি শ্রবণ ও প্রচার করলে তীর্থদর্শন-স্নানের সমান পুণ্য লাভ হয়।

Adhyaya 112

Account of the Shares (Portions) of Merit and Sin

উত্তরখণ্ডের কার্ত্তিক-মাহাত্ম্যে শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে প্রথমে ভক্তিমূলক প্রাধান্য—তুলসী, কার্ত্তিকব্রত, একাদশী ও দ্বারকার ভগবৎপ্রিয়তা—স্মরণ করিয়ে দেন, তারপর কর্মফলের সূক্ষ্ম ধর্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। সত্যভামার বিস্ময়—অন্যের দানকৃত পুণ্যে কীভাবে মুক্তি সম্ভব—এই প্রশ্নে তিনি সঙ্গ ও সামাজিক সংস্পর্শে পুণ্য-পাপের “অংশ” লাভের বিধান জানান। সহবাস/ঘনিষ্ঠতা, একসঙ্গে আহার, অধ্যাপন-যাজনাদি সেবা, একই আসন বা যান ভাগ করা, স্পর্শ, বাক্য, প্রশংসা, এমনকি দেখা-শোনা-স্মরণ—এসবের দ্বারা অনুপাতে ফলভাগ প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। নিন্দা-অপবাদ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ; নিন্দুকের পুণ্য নিন্দিত ব্যক্তির কাছে চলে যায়—এমন সতর্কতা আছে। বিনা পারিশ্রমিকে সেবা পুণ্যবর্ধক, এবং রাজধর্ম, ঋণ, চৌর্যদূষিত পুণ্য, গুরু-শিষ্য, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র প্রভৃতির মধ্যে পারিবারিক ফলবণ্টনের নিয়মও আলোচিত।

Adhyaya 113

The Account of Dhaneśvara (Salvation through Kārttika Association)

শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে ধনেশ্বরের কাহিনি শোনান। ধনেশ্বর ছিল পতিত ব্রাহ্মণ—পাপময় বাণিজ্য ও নানা আসক্তিতে নিমগ্ন। কার্ত্তিক মাসে সে মাহিষ্মতীতে এসে নর্মদার তীরে ব্রতধারীদের আচরণ দেখে: স্নান, জপ, পুরাণ-পাঠ, কীর্তন, এবং তুলসী ও মালা দিয়ে বিষ্ণু-পূজা। নিজের মধ্যে বিশেষ ভক্তি-সংকল্প না থাকলেও, বৈষ্ণবদের দর্শন-স্পর্শ-সংলাপ ও বিষ্ণুনামের শ্রবণে তার অজান্তেই রক্ষাকারী পুণ্য সঞ্চিত হয়। উৎসবের মধ্যেই সাপের কামড়ে তার আকস্মিক মৃত্যু হয় এবং তাকে যমলোকে নেওয়া হয়। চিত্রগুপ্ত তার ব্যক্তিগত পুণ্যের হিসাব না পেয়ে যম কুম্ভীপাক নরকে কঠোর দণ্ডের আদেশ দেন; কিন্তু নরকে প্রবেশ করতেই তা শীতল হয়ে যায়। বিস্ময়ে কারণ জিজ্ঞাসা করলে নারদ জানান—কার্ত্তিকে ব্রতীদের সৎসঙ্গ ও সেবায় যে পুণ্যাংশ লাভ হয়, তা পরিত্রাণদায়ক। ফলে ধনেশ্বর তৎক্ষণাৎ যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পায়, যদিও অবশিষ্ট কর্মফল পরে মৃদু রূপে ভোগ করে—ভক্তসঙ্গ কর্মের কঠোরতাকে প্রশমিত করে, এই শিক্ষাই এখানে প্রকাশিত।

Adhyaya 114

Account of Dhaneśvara: The Tour of Hells and the Liberating Power of Kārttika

কার্ত্তিক-মাহাত্ম্যের প্রসঙ্গে পুলস্ত্য ঋষি ভীষ্মকে বলেন—এক অন্তর্কথায় যমের সহচর প্রেতপ ধনেশ্বর/কুবেরকে নরক-ভ্রমণে নিয়ে যান, যাতে কর্মফলের প্রতিফল স্পষ্ট হয়। তপ্তবালুকা, ক্রকচ, অসিপত্রবন-গোষ্ঠী, অর্গলা, কূটশাল্মলী, রক্তপূয়, কুম্ভীপাক প্রভৃতি নরকের ভয়ংকর বর্ণনার সঙ্গে জানানো হয়—অতিথি-অবজ্ঞা, গুরু-অগ্নি-ব্রাহ্মণ-দেবতার প্রতি হিংসা বা অসম্মান, সজ্জনের কাজে বাধা, স্ত্রী/ধনে বিশ্বাসঘাতকতা, নিষিদ্ধ ভক্ষণ ও পরনিন্দা, এবং সম্পর্কভঙ্গ ইত্যাদি পাপের ফল সেখানে ভোগ করতে হয়। এরপর শাস্তিবর্ণনা থেকে মুক্তির উপায়ে গতি বদলায়—কার্ত্তিক-ব্রত পালনকারীদের সঙ্গ ও দর্শন মহাপুণ্যদায়ক, যা নরকস্থ প্রাণীকেও উদ্ধার করতে সক্ষম। শেষে কুবেরের অনুচর ধনযক্ষের কথা বলা হয়, যিনি অযোধ্যায় এক তীর্থ প্রতিষ্ঠা করেন; এবং দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করা হয়—অটল কার্ত্তিক-ব্রতীর কেবল দর্শনেই ঘোর পাপীরও মুক্তি হতে পারে।

Adhyaya 115

Praise of the Aśvattha and Vaṭa (Sacred Fig and Banyan)

এই অধ্যায়ে কার্ত্তিক-মাহাত্ম্যের ব্রতসমাপ্তির বিধান বলা হয়েছে। হরিজাগরণ (রাত্রি জাগরণ), প্রভাতস্নান, তুলসী-সেবা, উদ্যাপন এবং দীপদান—এই পাঁচটি প্রধান আচরণকে ব্রত-সম্পূর্ণকারী বলা হয়েছে; এতে ভুক্তি ও মুক্তি—উভয় ফল লাভ হয়। রোগ, জলাভাব বা পথে বাধা এলে ব্রত রক্ষার সংকট-ধর্মও নির্দেশিত—নামস্মরণে, যে-কোনো মন্দিরে, অশ্বত্থের মূলে বা তুলসী-কাননে অনুষ্ঠান করা যায়। গান-নৃত্য, দান-সহায়তা, পুণ্য ভাগ করে দেওয়া, এমনকি কেবল অনুষ্ঠান দেখা বা স্তব করলেও পুণ্য বৃদ্ধি পায়। অশ্বত্থ ও বটের সেবাকে ব্রতপূর্তির সমান মর্যাদা দিয়ে তাদের বিশেষ মাহাত্ম্য বলা হয়েছে—অশ্বত্থকে বিষ্ণু-স্বরূপ, বটকে রুদ্র-স্বরূপ এবং পলাশকে ব্রহ্মা-স্বরূপ রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। শেষে পার্বতীর শাপকথা বর্ণিত—অগ্নির মাধ্যমে দেবতাদের হস্তক্ষেপে ক্রুদ্ধ হয়ে পার্বতী দেবগণকে বৃক্ষরূপ হওয়ার শাপ দেন; এর দ্বারা পুরাণোক্ত বৃক্ষপূজার ধর্মীয় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

Adhyaya 116

The Episode of Alakṣmī (Why Alakṣmī Dwells at the Aśvattha)

ঋষিরা বোধি/অশ্বত্থ বৃক্ষের স্পর্শ-অস্পর্শ বিধান, বিশেষত শনিবারে, জিজ্ঞাসা করলে সূত সমুদ্র-মন্থনের উপাখ্যান বলেন। বিষ্ণু লক্ষ্মীকে গ্রহণ করার পর লক্ষ্মী অনুরোধ করেন—জ্যেষ্ঠা/অলক্ষ্মী (দুর্ভাগ্যের দেবী)কে আগে সম্মান দিতে হবে। বিষ্ণু অলক্ষ্মীকে তপস্বী উদ্দালকের কাছে অর্পণ করেন; কিন্তু অলক্ষ্মী বেদধ্বনি ও যজ্ঞশুদ্ধিতে পূর্ণ আশ্রমে থাকতে অস্বীকার করে, জুয়া, চুরি, পরস্ত্রীগমন, হিংসা, মদ্যপান এবং বৃদ্ধ-ব্রাহ্মণ অবমাননা ইত্যাদি অধর্মাচারপূর্ণ স্থানে বাস করতে চায়। উদ্দালক তাকে অশ্বত্থের গোড়ায় রেখে চলে গেলে পরিত্যক্ত অলক্ষ্মী বিলাপ করে। লক্ষ্মীর প্রার্থনায় বিষ্ণু তাকে সান্ত্বনা দিয়ে নির্দেশ দেন—অলক্ষ্মীর স্থায়ী নিবাস অশ্বত্থেই হবে; এই বৃক্ষ তাঁর অংশজাত। গৃহস্থের অশ্বত্থ-পূজা ও এই কাহিনি শ্রবণ-কীর্তনে শ্রী স্থির থাকে; ঊর্জা-ব্রত ও কার্তিক মাসের পুণ্য মোক্ষপ্রদ বলে ঘোষিত।

Adhyaya 117

Kārtika Māhātmya: The Glory and Procedure of Bathing in the Month of Kārtika

এই অধ্যায়ে বহুস্তরীয় বর্ণনা-পরম্পরা দেখা যায়। সত্যা শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন—কার্তিক মাস কেন সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। শ্রীকৃষ্ণ জানান, এর মহিমা এক প্রাচীন ঘোষণায় নিহিত, যা সূত পূর্বে শৌনককে বলেছিলেন; এরপর সূত সেই পুরাতন সংলাপ তুলে ধরেন, যেখানে ষণ্মুখ/স্কন্দ কার্তিক-ব্রত, কার্তিক-স্নান এবং সংশ্লিষ্ট বৈষ্ণব আচারের বিস্তারিত বিধান জানতে চান। ঈশ্বর/শিব প্রশ্নটির প্রশংসা করে বলেন, কার্তিকের পুণ্য তীর্থযাত্রা ও দানের থেকেও অধিক। তিনি কলিযুগের প্রেক্ষিতে স্নানতত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন এবং স্নানের চার প্রকার—বায়ব্য, বারুণ, দিব্য ও ব্রাহ্ম্য—উল্লেখ করে যোগ্যতা ও ফলশ্রুতি জানান। কার্তিক ও মাঘ মাসে স্নান করলে পাপক্ষয়, অভীষ্টলাভ এবং দীপদান, তুলসীসেবা, গোপীচন্দন, পুষ্প, নৈবেদ্য, তীর্থজল, দীপাবলি/প্রবোধিনী, দান ও উপবাস প্রভৃতির মহিমা বর্ণিত হয়েছে।

Adhyaya 118

Questions and Answers on Kārtika Observance, Gifts, and Purifying Disciplines

এই অধ্যায়ে সূত কার্তিক-মাহাত্ম্যের অন্তর্গত শিব–স্কন্দ সংলাপ বর্ণনা করেন। মহাদেব বলেন, কলিযুগে কার্তিক (ঊর্জা) বৈষ্ণবদের শ্রেষ্ঠ মাস; এই সময়ে দেবসান্নিধ্য বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায় এবং পুণ্য দ্রুত ফল দেয়। এরপর দানের বিধান ও দানগুলির তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্ব বলা হয়েছে—অন্নদান, গোদান, ভূমিদান, বিদ্যাদান, স্বর্ণাদি দান ইত্যাদির মাহাত্ম্য বর্ণিত। কন্যাদান ও বিবাহ বিষয়ে উপযুক্ত সময়, পাত্রতা এবং সতর্কতার নির্দেশও দেওয়া হয়। পরে কার্তিক-ব্রতের শুদ্ধাচার—অন্যের রান্না করা অন্ন বর্জন (চান্দ্রায়ণ/কৃচ্ছ্রের তুল্য ফল), তেল-মধু-কাঁসার পাত্র ও সমবেত ভোজন ত্যাগ, নিরামিষ সংযম, নদীতে স্নান, দীপদান, বৈষ্ণব-সেবা, দামোদরের সম্মুখে প্রভাতে জাগরণ, পদ্ম ও তুলসী দিয়ে পূজা—এসব বলা হয়েছে। শেষে নির্মাল্য, শঙ্খ-সংস্কৃত জল ও পাদোদককে পাপনাশক ও পরিশুদ্ধিকারী উপায় বলা হয়েছে।

Adhyaya 119

Account and Procedure of the Month-long Fast (within Kārttika-māhātmya)

এই অধ্যায়ে তীর্থ-মাহাত্ম্য ও ব্রত-তত্ত্ব একসূত্রে বর্ণিত। শুরুতে মাঘ-স্নানের প্রশংসা এবং নিয়ম-সংযমসহ স্নানের মোক্ষদায়িনী শক্তি বলা হয়েছে। এরপর শূকরক্ষেত্রের বরাহ-প্রধান পবিত্র ভূগোলের মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়—সেখানে পুণ্য সীমাহীন হয়, এমনকি অমানব জীবও সেই প্রভাবে রূপান্তর/উদ্ধার লাভ করে। কাশী, বেণী/প্রয়াগ, গঙ্গাসাগর ও কুরুক্ষেত্রের তুলনামূলক পুণ্যফল উল্লেখ করে শূকরক্ষেত্রস্থিত হরি-মন্দিরের অতুল বিশেষত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শেষে মাসোপবাস (এক মাসব্যাপী উপবাস)-এর বিধি দেওয়া হয়েছে—গুরুর অনুমতি, বৈষ্ণব যজ্ঞ ও সহায়ক প্রায়শ্চিত্ত; প্রতিদিন পুষ্প, গন্ধ-অনুলেপন, দীপ, স্তব ইত্যাদিতে হরিপূজা, বাক্-সংযম, অহিংসা এবং ইন্দ্রিয়ভোগ-পরিহার। দ্বাদশীতে হরিস্নাপন, তেরোজন ব্রাহ্মণকে ভোজন, দক্ষিণা, এবং স্বর্ণময় আত্মপ্রতিমাসহ শয্যা/খাট দান নির্দিষ্ট। উপসংহারে অপূর্ণ আচারের পূর্তির জন্য ব্রাহ্মণদের কাছে বিনয়প্রার্থনা এবং ‘মাসব্রত-বৃত্তান্ত’ নামে কলফোন আছে।

Adhyaya 120

The Glory of Śālagrāma (Śālagrāma-śilā Worship and Its Fruits)

এই অধ্যায়ে শালগ্রাম-শিলার মহিমা বর্ণিত হয়েছে। শালগ্রামকে স্বয়ংপ্রকাশ বিষ্ণুর প্রত্যক্ষ অধিষ্ঠান বলা হয়েছে, যেখানে ত্রিলোকের অবস্থান। শিলার দর্শন, প্রণাম, স্নান, পূজা এবং তার তীর্থজল পান করলে পাপক্ষয় হয়; এমনকি কেবল নমস্কার করলেও মুক্তিলাভের প্রশংসা করা হয়েছে। পূজার জন্য সহজ উপচার—জল, গন্ধ, দীপ, ধূপ, নৈবেদ্য, গীত ও স্তোত্র—বিধান করা হয়েছে। বিশেষ করে কার্ত্তিক মাসে কেশবের সামনে স্বস্তিক/মণ্ডল অঙ্কন করে আরাধনা করলে মহাপুণ্য হয়। লিঙ্গপূজার পুণ্য স্বীকার করেও শালগ্রামপূজাকে শ্রেষ্ঠ, শুদ্ধি ও অর্ঘ্য-গ্রহণে নির্ণায়ক সাধনা বলা হয়েছে। পরবর্তী অংশে চক্ররেখা, গহ্বর, বর্ণ ও আকৃতির লক্ষণ ধরে শালগ্রামের বিভিন্ন রূপ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বাসুদেব, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ, নারায়ণ, বরাহ, মৎস্য প্রভৃতি দেবরূপের নাম বলা হয়েছে; কোনটি পূজ্য বা অপূজ্য তাও স্পষ্ট করা হয়েছে। শেষে বলা হয়েছে—শালগ্রামপূজার ফল দেবতারাও গণনা করতে পারেন না, এতই তার অপরিমেয় মাহাত্ম্য।

Adhyaya 121

Description of the Greatness of the Lamp, Fragrance, and the Dhātrī (Āmalakī) Tree

এই অধ্যায়ে কার্তিক-মাহাত্ম্যের প্রসঙ্গে কলিযুগের তিন শ্রেষ্ঠ ভক্তিসাধন—ধাত্রী/আমলকী, তুলসী এবং দীপদান—এর মহিমা বর্ণিত। মহাদেব গুহকে বলেন, ধাত্রীবৃক্ষের তলায় পিণ্ডদান করলে পিতৃগণ মুক্তি লাভ করেন। আমলকী ফল ধারণ, আমলকীর মালা ও গৃহে তার পবিত্র উপস্থিতি পুণ্যবর্ধক; তুলসীমালা ও দ্বারকা-মৃত্তিকা বিষ্ণুর অধিষ্ঠানের লক্ষণ হিসেবে কথিত। শালগ্রাম পূজা ও পুষ্পার্পণকে অশ্বমেধযজ্ঞসম ফলদায়ক বলা হয়েছে। পরে কার্তিক মাসে ঘি বা তিলতেলের দীপ দানের সময়-স্থান ও বিধি নির্দেশ করা হয় এবং ইঁদুর, শিকারি, অবহেলিত নারী, লীলাবতী ও গোপাল প্রভৃতির দৃষ্টান্তে দীপদানের মহাশক্তি প্রকাশিত। উপসংহারে বলা হয়—দীপদানের পুণ্যপ্রভাবে অবহেলিত পিতৃগণও পরিত্রাণ লাভ করেন।

Adhyaya 122

The Greatness of Dīpāvalī: Yama-lamp, Naraka Caturdaśī Bath, Kaumudī (Bali Worship), Govardhana/Cow Honor, and Yamadvitīyā

এই অধ্যায়ে কার্ত্তিক-মাহাত্ম্যের অন্তর্গত দীপাবলিকে বহুদিনব্যাপী বিধি-ক্রমে বর্ণনা করা হয়েছে। স্কন্দের প্রশ্নের উত্তরে মহাদেব দীপাবলির উদ্দেশ্য, অধিদেবতা, দান ও উৎসবাচার বলেন। ত্রয়োদশীতে গৃহের বাইরে যম-দীপ স্থাপন করলে অকালমৃত্যু নিবারিত হয়। চতুর্দশীতে প্রভাতের পূর্বে তেল-মর্দন স্নান—তেলে লক্ষ্মী ও জলে গঙ্গার ভাব রেখে—আপামার্গাদি উদ্ভিদসহ স্নান করে, পরে যম ও চিত্রগুপ্তের নামে তर्पণ করতে বলা হয়েছে। অমাবস্যায় অগ্নিপূজা, দেব-পিতৃকর্ম, পার্বণ-শ্রাদ্ধ, ব্রাহ্মণভোজন ও নগরোৎসবের বিধান আছে। এরপর লক্ষ্মী-জাগরণ, শিব-পার্বতীর পাশা-ক্রীড়া, অলক্ষ্মী-নিষ্কাশন, গোবর্ধন ও গোমাতার পূজা, এবং কৌমুদী উৎসবে বলি-আরাধনা ও রাত্রিজাগরণের কথা বলা হয়। শেষে যমদ্বিতীয়ায় যমপূজা করে গৃহে না খেয়ে ভগ্নীর হাতে আহার ও দান করলে স্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও রক্ষার ফল প্রতিশ্রুত।

Adhyaya 123

Account and Procedure of the Month-long Fast

এই অধ্যায়ে মাসোপবাস (এক মাসব্যাপী উপবাস)কে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রত বলে মহিমা কীর্তন করা হয়েছে। বলা হয়েছে—অন্যান্য ব্রত, তীর্থসেবা, দান এবং মহাশ্রৌত যজ্ঞে যে পুণ্য লাভ হয়, তার সংক্ষিপ্ত সমাহার এই এক ব্রতেই প্রাপ্ত হয়। ব্রত গ্রহণের আগে গুরুর অনুমতি, পূর্বে বৈষ্ণব ব্রতাচরণ, দেহের সামর্থ্য বিচার এবং শুদ্ধির জন্য প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতি পূর্বশর্ত নির্দেশ করা হয়েছে; সকল আশ্রমে নারী-পুরুষ, এমনকি বিধবারও অধিকার স্বীকৃত। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে একাদশী থেকে শুরু করে ঠিক ত্রিশ দিন নিয়মে ব্রত পালন করতে হয়। এই সময়ে বাসুদেবের নিরন্তর আরাধনা—দিনে তিনবার মন্দিরপূজা, পুষ্প-চন্দন-কপুর-জাফরানাদি নিবেদন, নৈতিক সংযম এবং কেবল বিষ্ণুনাম উচ্চারণ—প্রধান বিধান। দ্বাদশীতে সমাপনী ক্রিয়ায় বিষ্ণু ও গরুড়ের পূজা, ব্রাহ্মণদের (বিশেষত তেরোজন) ভোজন-সম্মান, দক্ষিণা, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং শয্যা/প্রতিমা-দানরূপ প্রতীক দান করে শেষে বিষ্ণুলোক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হয়।

Adhyaya 124

Kārttika Māhātmya: Prabodhinī (Devotthānī) Ekādaśī, Night Vigil (Jāgaraṇa), and the Bhīṣma-pañcaka Vow

এই অধ্যায়ে কার্ত্তিক মাসের প্রবোধিনী/হরিবোধিনী একাদশীর মাহাত্ম্য বর্ণিত। বলা হয়েছে, একদিনের উপবাসই মহাযজ্ঞসম ফলদায়ক, পাপনাশক এবং পুণ্যবর্ধক। এরপর ‘জাগরণ’-এর উদ্ধারক শক্তি বলা হয়—রাত্রিতে বিষ্ণুপূজা, ভজন-কীর্তন, বাদ্য, দীপদান, নৈবেদ্য, সত্য, দান ও সংযমী একাগ্র ভক্তিসেবায় মুক্তি লাভ হয় এবং পুনর্জন্ম নিবারিত হয়। তারপর কার্ত্তিকের দৈনন্দিন উপাসনার বিধি প্রসারিত—পুরুষসূক্ত পাঠ, পাঞ্চরাত্র পদ্ধতি, নামজপ, সহস্রনাম পাঠ এবং গজেন্দ্রমোক্ষ কাহিনি পাঠ/শ্রবণ। স্কন্দের প্রশ্নে ভীষ্ম-পঞ্চক ব্রত শেখানো হয়—একাদশী থেকে পাঁচদিন স্নান, পিতৃতর্পণ, নির্দিষ্ট মন্ত্রে ভীষ্মতর্পণ, ধাতুসমূহ দ্বারা পঞ্চবিধ পূজা, কঠোর নিয়ম, এবং অর্ঘ্যাদি নিবেদন ও শুদ্ধির জন্য নিয়ত আহারগ্রহণের ক্রম। শেষে মাহাত্ম্য গোপনীয়ভাবে যোগ্যজনকে প্রদান করার প্রশংসা করা হয়েছে; পাঠক/গুরুকে সম্মান করা বিষ্ণু-সম্মানের সমান বলা হয়েছে। এই মাহাত্ম্য শ্রবণ ও ধারণ করলে জাগতিক কল্যাণ ও পরম মুক্তি লাভ হয়।

Adhyaya 125

The Greatness of Māgha: Dialogue of Vasiṣṭha and King Dilīpa (Māgha Bath, Charity, and Karmic Causality)

ঋষিগণ পূর্বে বর্ণিত কার্ত্তিক-মাহাত্ম্যের প্রশংসা করে সূতকে মাঘ-মাহাত্ম্য বলতে অনুরোধ করেন। কাহিনি অন্তর্লীন সংলাপে প্রবেশ করে—পার্বতী শিবের কাছে মাঘ-মাসের ব্রত, স্নান ও দানের বিধান জানতে চান; শিব মাঘের অতুল পবিত্রতা ও ফল ব্যাখ্যা করেন। দৃষ্টান্তে দেখা যায়, শিকারে গিয়ে রাজা দিলীপ এক বৈখানস তপস্বীর সাক্ষাৎ পান; তিনি দিলীপকে মাঘ-স্নানের বিধি ও ফল জানার জন্য বশিষ্ঠের কাছে পাঠান। বশিষ্ঠ (এবং ভৃগু) বলেন—মাঘে বিশেষত প্রভাতে উন্মুক্ত জলে স্নান সর্বশ্রেষ্ঠ; সঙ্গে তিল-দান, গো-দান, পাদুকা-দান, কমণ্ডলু/জলপাত্র-দান এবং ব্রাহ্মণ-ভোজন মহাপুণ্যদায়ক। এরপর কর্মফলের উদাহরণ: ব্যাঘ্রমুখ বিদ্যাধর ভৃগুর কাছে নিজের বিকৃতির কারণ জিজ্ঞাসা করে। ভৃগু জানান—একাদশীর পর তেল-সেবন/তৈলাভ্যঙ্গের মতো ক্ষুদ্র দোষও কালে পরিণত হয়ে বিকৃতি আনে; প্রতিকার হলো মণিকূট/মণিপর্বতের নিকট পবিত্র নদীতে কঠোর নিয়মে মাঘ-ব্রত পালন। উপসংহারে বলা হয়, দানসহ মাঘ-স্নান পুণ্য, সমৃদ্ধি ও পাপক্ষয় দেয় এবং শেষে মোক্ষ—পুনর্জন্মে অনাবর্তন—প্রদান করে।

Adhyaya 126

The Slaying of Sunda and Upasunda (within the Māgha Bath Glorification)

এই অধ্যায় (PP.6.126) মাঘ-মাহাত্ম্যের অন্তর্গত। এখানে পুরাণীয় বর্ণনার স্তরবিন্যাস দেখা যায়—বসিষ্ঠ রাজা দিলীপকে উপদেশ দেন এবং দত্তাত্রেয় কর্তৃক সহস্রার্জুন (কার্তবীর্য অর্জুন)-কে প্রদত্ত শিক্ষার কথা বলেন; পাশাপাশি উত্তরখণ্ডের ব্রত-আলোচনায় পুলস্ত্য–ভীষ্ম সংলাপ-পরম্পরার ছায়াও উপস্থিত। মকর রাশিতে সূর্য অবস্থানকালে প্রভাতে করা মাঘ-স্নানকে সর্বোচ্চ প্রায়শ্চিত্ত বলা হয়েছে—দান, ব্রত ও তপস্যার চেয়েও শ্রেষ্ঠ, মহাপাতক পর্যন্ত বিনাশকারী। দেহের অনিত্যতা ও অসারতা স্মরণ করিয়ে দ্রুত ধর্মাচরণের তাগিদ দেওয়া হয়। দৃষ্টান্তে কুব্জিকা নাম্নী এক বিধবা রেবা–কপিলা সঙ্গমে বারংবার মাঘ-স্নান করে দিব্য ফল লাভ করে। শেষে সে তিলোত্তমা রূপে প্রকাশিত হয়ে সুন্দ ও উপসুন্দ দানবদ্বয়ের পারস্পরিক বিনাশের কারণ হয়—এতে মাঘ-অনুষ্ঠানের বিশ্বরক্ষাকারী শক্তি উজ্জ্বল হয়।

Adhyaya 127

Liberation of the Rākṣasa (The Greatness of Māgha Bathing at Prayāga/Veṇī)

এই অধ্যায়ে সূর্য মকর রাশিতে অবস্থানকালে মাঘ-স্নানের অতুল মহিমা ঘোষিত হয়েছে। জল স্বভাবতই পবিত্র এবং মাঘ মাস সকল পুণ্যকর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠ—এ কথা বলা হয়েছে। ব্রতবিধানে উন্মুক্ত স্থানে স্নান, আহার-সংযম, দিনে তিনবার বিষ্ণু-পূজা, অখণ্ড দীপদান, ঘৃত ও তিল দিয়ে হোম, এবং তেল, তুলা, কম্বল, বস্ত্র, অন্ন প্রভৃতি দান—অল্প স্বর্ণও—এবং একাদশী-অনুসারী উদ্যাপন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এরপর তীর্থ-মাহাত্ম্য ক্রমে বৃদ্ধি করে দেখানো হয়েছে—গৃহস্নান থেকে কূপ-তটাক-নদী, দেবখাত ও সঙ্গম পর্যন্ত পুণ্য বাড়ে; কিন্তু সর্বোচ্চ হলো প্রয়াগ/বেণী, যেখানে গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী (সীতা–অসিতা) সঙ্গম পাপ দগ্ধ করে। কাহিনিতে কাঞ্চনমালিনী নাম্নী অপ্সরা মাঘব্রত করে অর্জিত পুণ্য অন্যকে দান করেন; তাতে এক বৃদ্ধ রাক্ষস মুক্ত হয়ে দিব্যরূপ ধারণ করে এবং নিজের কর্মফল-কারণও বর্ণনা করে। সীতা-অসিতায় ইন্দ্রের শুদ্ধি ও শিব-পার্বতীর প্রয়াগে তৎক্ষণাৎ পাপনাশের বচনও প্রমাণরূপে উল্লিখিত। শেষে এই উপদেশ শ্রবণকে রক্ষাকারী ও ধর্মবর্ধক বলা হয়েছে।

Adhyaya 128

The Greatness of Māgha Bathing; The Piśāca-Deliverance Episode; the Yogasāra Hymn to Viṣṇu

অধ্যায় ১২৮-এ মাঘ-স্নানের পরম মাহাত্ম্য ঘোষিত হয়েছে। বশিষ্ঠ দিলীপকে বলেন—হরি-উপাসনা ও দানের সঙ্গে মাঘে স্নান যজ্ঞ, ব্রত ও তপস্যার চেয়েও শ্রেষ্ঠ; এমনকি পাকা পাপও তাৎক্ষণিকভাবে নাশ করে। এরপর ‘পিশাচ-মোচন’ কাহিনি—অচ্ছোদ-তীর্থে ব্রতস্থ ব্রহ্মচারীকে পাঁচ অপ্সরা (প্রমোদিনী, সুশীলা, সুস্বরা, সুতারা, চন্দ্রিকা) কামাতুর হয়ে উৎপীড়ন করে; পারস্পরিক অভিশাপে সকলেই পিশাচসদৃশ হয়ে যায়। লোমশ বলেন, মাঘ-স্নানই একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত। পরে মাঘমাসে নানা নদী ও তীর্থে স্নানের ফলের তালিকা দেওয়া হয় এবং প্রয়াগের শ্রেষ্ঠত্ব বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর বৈষ্ণব তপস্বী দেবদ্যুতি ‘যোগসার’ স্তোত্রে বিষ্ণুর সাক্ষাৎ দর্শন লাভ করেন; ফলশ্রুতিতে রক্ষা, শুদ্ধি ও মুক্তির প্রতিশ্রুতি আছে। শেষে আবার পিশাচ-মোচনের প্রসঙ্গ পরবর্তী বিষয় হিসেবে ইঙ্গিতিত হয়।

Adhyaya 129

Marriage of the Gandharva Maidens (within Māgha-māhātmya; includes piśāca redemption and Prayāga praise)

মাঘ-মাহাত্ম্যের বশিষ্ঠ–দিলীপ সংলাপে এই অধ্যায়ে দ্রাবিড়দেশীয় রাজা চিত্রনাম (দ্রাবিড়)-এর পতনের কথা বলা হয়েছে। বিষ্ণু-বিদ্বেষে সে বৈষ্ণবদের নিপীড়ন করে, ফলে বহু নরকে ভোগ করে শেষে পিশাচ-যোনিতে জন্মায়। ঋষি দেবদ্যুতি সেই পিশাচকে দেখে তার স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন—প্রয়াগে মাঘ-ব্রত ও মাঘ-স্নান, বিশেষত গঙ্গা/বেণীর জল গ্রহণ, নিশ্চিত মুক্তির পথ। মধ্যে দীর্ঘ উপাখ্যানে কেরলের এক ব্রাহ্মণের প্রেতাবস্থা, কर्पটীক ভ্রমণকারীর প্রসঙ্গ, এবং সারস ও বানরের নীতিকথামূলক সংলাপ আছে—যেখানে কর্মফলের অনিবার্যতা ও পুরোহিত-অধর্মের দুঃফল প্রকাশ পায়। গঙ্গাজলের স্পর্শে প্রেতের মুক্তি ঘটে এবং সীতাসিত/প্রয়াগে মাঘস্নানে পিশাচও শুদ্ধ হয়ে দিব্য/রাজস মর্যাদা লাভ করে। শেষে প্রয়াগ-মাহাত্ম্যের প্রশস্তি, গন্ধর্ব-কন্যাদের শুদ্ধি ও বিবাহ-অনুষ্ঠান, এবং মহেশ (শিব)-এর অনুমোদনে অধ্যায় সমাপ্ত।

Adhyaya 130

Glorification of the Greatness of Devotion to Viṣṇu (Bhakti-Māhātmya)

এই অধ্যায়ে “পরা-ভক্তি”র লক্ষণ নিরূপিত হয়েছে—ভগবান বিষ্ণুতে মন সম্পূর্ণভাবে নিবিষ্ট থাকা, এবং বিষ্ণু-প্রদত্ত ধর্ম ও করুণার সঙ্গে সঙ্গত আচরণ। ভক্তিকে তিন গুণে ভাগ করা হয়েছে: সাত্ত্বিক (শ্রেষ্ঠ), রাজসিক (মধ্যম) ও তামসিক (অধম)। অহংকার, দম্ভ, ঈর্ষা, কপট, খ্যাতিলোভ, বিষয়াসক্তি বা পরহিংসার উদ্দেশ্যে করা সাধনা ভক্তিকে তামসে নামিয়ে আনে—এমন সতর্কবাণী আছে। রাজসিক ভক্তি ভেদবুদ্ধি রেখে প্রতিমা-উপাসনা প্রভৃতির মাধ্যমে, কর্মফলের অবশিষ্ট ক্ষয়ের জন্য করা হয় বলে বলা হয়েছে। সাত্ত্বিক ভক্তি হলো বুদ্ধি ও মন সম্পূর্ণ সমর্পণ করে হরির স্থির সেবা, গোবিন্দে অচঞ্চল অনুরাগ ও শুদ্ধ ভাব। এখানে কঠোরভাবে বলা হয়েছে—যারা কেবল কর্মকাণ্ডে আসক্ত হয়ে বিষ্ণু ও তাঁর ভক্তদের নিন্দা করে, তারা বৈদিক ধর্মের বহির্ভূত। অপরদিকে গোবিন্দভক্তদের দ্বারা দেবতারা প্রসন্ন হন, বিঘ্ন নাশ হয়, লক্ষ্মীর নিবাস ঘটে, এবং মহাতীর্থসমূহ যেন তাদের দেহে অধিষ্ঠান করে; শেষতঃ তীব্র ভক্তি বর্ণভেদ না দেখে মুক্তি প্রদান করে—এই ফলশ্রুতি ঘোষিত।

Adhyaya 131

The Greatness of Worship of the Śālagrāma Stone

এই অধ্যায়ে মহাদেব দেবী পার্বতীকে শালগ্রাম-শিলার মাহাত্ম্য বোঝান। শালগ্রামকে বিষ্ণুর বিশেষ সান্নিধ্য-রূপ, পরম পবিত্র আশ্রয় বলা হয়েছে; কেবল দর্শনেই গুরুতর পাপ পর্যন্ত নাশ হয়—এ কথা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। বর্ণভেদে পূজ্য শালগ্রামের সংখ্যা নির্ধারিত—ব্রাহ্মণের জন্য পাঁচ, ক্ষত্রিয়ের জন্য চার, বৈশ্যের জন্য তিন, আর অন্যদের জন্য এক। শূদ্রেরাও বিধিপূর্বক পূজা করলে, এমনকি শুধু দর্শন করলেও, মুক্তি লাভ করতে পারে—এ কথাও বলা হয়েছে। এরপর মূর্তি-পূজার প্রসঙ্গ থেকে ভক্ত-পূজার দিকে গুরুত্ব সরে যায়। বৈষ্ণবদের দর্শনে উপপাপক ও মহাপাপক নাশ হয়, দেহ-বাক্য-মন দ্বারা কৃত কর্ম শুদ্ধ হয় এবং বহু প্রজন্মের কল্যাণ ঘটে। শেষে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী চতুর্ভুজ হরির ধ্যান করে, এমন ভক্তদের সেবা, অন্নদান ও পূজার দ্বারা বৈকুণ্ঠপ্রাপ্তির সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।

Adhyaya 132

Remembrance of Vishnu (The Greatness of Smaraṇa and Bhakti)

পার্বতী জিজ্ঞাসা করেন—অনন্ত বাসুদেবের এমন কোন স্মরণ আছে, যাতে মোহ আর ফিরে না আসে? মহাদেব বলেন, অবিচ্ছিন্ন স্মরণই প্রকৃত স্মরণ—যেমন তৃষ্ণার্ত জলকে, শীতে কাতর অগ্নিকে, আর প্রেমিক প্রিয়তমাকে সর্বদা মনে রাখে, তেমনই ভগবানের নাম-রূপ-গুণ হৃদয়ে নিরন্তর স্থির রাখতে হবে। এরপর ভক্তির কারণ ব্যাখ্যা করা হয়—সৎসঙ্গ থেকেই ভক্তি জাগে, আর ভক্তিই পরম সাধন। জনার্দনের প্রতি যে-কোনো ভাব, এমনকি বৈরভাবও, শেষ পর্যন্ত তাঁর ধামে পৌঁছানোর কারণ হতে পারে। ধন, বিদ্যা বা স্বর্গফলদায়ী যজ্ঞকর্মের চেয়ে নামস্মরণ ও অন্তরের ভাবকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে; অজামিলের দৃষ্টান্তে নামের মহিমা প্রকাশ পায়। শেষাংশে বিষ্ণুতত্ত্বের সর্বব্যাপিতা, মন ও কর্মের বন্ধন-পর্যালোচনা এসে উপসংহার দেয়—স্মরণ ও ভক্তি পাপক্ষয় করে, ভয়হীনতা দেয় এবং বৈকুণ্ঠপ্রাপ্তি ঘটায়।

Adhyaya 133

Description of the Sacred Tīrthas of Jambūdvīpa (and the Supremacy of Viṣṇu’s Name)

অধ্যায়ের শুরুতে পার্বতী জम्बূদ্বীপ—‘দ্বীপসমূহের রাজা’—এর পবিত্র তীর্থগুলির ক্রমানুসার বর্ণনা জানতে চান। মহাদেব সর্বব্যাপী দিব্যসত্তার কথা বলে স্থির করেন যে বিষ্ণুই পরম তত্ত্ব, এবং তিনিই তীর্থরূপে জগতে প্রকাশিত। এরপর জम्बূদ্বীপের তীর্থ ও ক্ষেত্রগুলির তালিকামূলক বিবরণ আসে—পুষ্কর, বারাণসী, নৈমিষারণ্য, প্রয়াগ প্রভৃতি মুক্তিদায়ক মহাতীর্থ, এবং নানা অঞ্চলের দেবস্থান, পর্বত, আশ্রম, নদী-সরোবর ইত্যাদি পুণ্যক্ষেত্র। উপদেশের শেষে শ্রেষ্ঠতার ক্রম দেখানো হয়: বাহ্য তীর্থের ঊর্ধ্বে মনের ব্রহ্ম-তীর্থ, আর সর্বোচ্চ বিষ্ণুর নাম-রূপ তীর্থ, যা মহাপাপও শুদ্ধ করে। শ্রবণ-পাঠের মাহাত্ম্য, শ্রাদ্ধে তার উপযোগিতা, এবং বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তির ফল ঘোষিত হয়।

Adhyaya 134

The Glory of the Vetravatī River (Vetravatī Māhātmya)

মহাদেব পার্বতীকে বেত্রবতী নদীর মাহাত্ম্য বলেন—এ নদীতে স্নান, এমনকি দর্শন বা স্পর্শও মহাপাপ প্রশমিত করে এবং প্রলয় পর্যন্ত পাপক্ষয়কারী বলে ঘোষিত। বৃত্রের খনিত ‘মহাগম্ভীর’ নামক গভীর কূপ থেকে পাপনাশিনী দেবী-সরিতা প্রকাশিত হন; সেই বেত্রবতীকে গঙ্গাসমা বলে স্তব করা হয়েছে। এরপর দৃষ্টান্ত—এক দুষ্ট বিষ্ণুনিন্দক রাজা (বা উদ্ধৃত অংশে ‘বিদারুণ’ নামক পাপী) ব্রাহ্মণ ও বেদের নিন্দার ফলে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়; কিন্তু বেত্রবতীর জলে স্নান করলে রোগমুক্ত হয়ে মনঃশুদ্ধি লাভ করে। তার অন্তরে বিষ্ণুভক্তি জাগে; নিয়মিত স্নান, দান ও যজ্ঞাদি করে শেষে বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হয়। অধ্যায়টি সর্বজনীন ফল ঘোষণা করে—ব্রাহ্মণসহ সকল বর্ণ, এমনকি বহিরাগত ও বেদনিন্দকরাও স্নানে পবিত্র হয়; বিশেষত কার্ত্তিক ও মাঘ মাসে এবং সঙ্গমস্থলে। খেটক ও সংশ্লিষ্ট তীর্থস্থানগুলিও দেবতীর্থরূপে মহিমান্বিত।

Adhyaya 135

The Greatness of Sābhramatī and the Manifestation of the Kāśyapī Gaṅgā

এই অধ্যায়ে শ্রীমহাদেব পার্বতীকে সাব্ভ্রমতী তীর্থের মাহাত্ম্য শোনান। তিনি বলেন, কশ্যপ অর্বুদ পর্বতে ও সরস্বতীর নিকটে কঠোর তপস্যা করলে শিব প্রসন্ন হয়ে নিজের জটা থেকে গঙ্গাকে প্রকাশ করেন এবং কাশ্যপী গঙ্গার প্রবাহ স্থাপন করেন। এই গঙ্গার কেবল দর্শনেই মহাপাপ নাশ হয়—এ কথা বিশেষভাবে ঘোষিত। এরপর নানা নদী ও প্রসিদ্ধ তীর্থের তালিকা দেওয়া হয় এবং যুগভেদে নদীর নাম—কৃতবতী, গিরিকর্ণিকা, চন্দনা ও সাব্ভ্রমতী—উল্লেখ করা হয়। স্নান, শ্রাদ্ধ ও দানের বিশেষ ফল, বিশেষত কার্তিক মাসে এবং প্লক্ষাবতরণ, কেশরন্ধ্র, ব্রহ্মচারিক প্রভৃতি ঘাটে, বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। মুহূর্তশাস্ত্র অনুযায়ী কুটুপ প্রভৃতি শুভ সময় ও নিষিদ্ধ কাল নির্দেশ করে পিতৃতৃপ্তিকারক ক্রিয়ার প্রশংসা করা হয়। শেষে সূর্যবংশীয় রাজা ব্রহ্মদত্তের উপাখ্যানের মাধ্যমে ব্রহ্মচারীশে শিবের নিত্য সান্নিধ্য ও বরপ্রদ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়; ইহলোকে সমৃদ্ধি ও শৈবসাধনালাভের সঙ্গে পূর্বোক্ত পুণ্যের পরম ফল হিসেবে বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তির কথাও সমন্বয়ে বলা হয়েছে।

Adhyaya 136

The Greatness of Nanditīrtha

উমা নন্দিকুণ্ড থেকে প্রবাহিত নদীর পবিত্র গতি এবং অর্বুদ পর্বতের পরে প্রতিষ্ঠিত তীর্থসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে মহাদেব বলেন—কপালমোচন/কপালকুণ্ডই শ্রেষ্ঠ তীর্থ। সেখানেই তিনি ব্রহ্মার কপালের ভার ত্যাগ করেছিলেন, তাই স্থানটি সর্বপাপহর ও অতিশয় পবিত্র। এরপর পুলস্ত্য–ভীষ্ম সংলাপরীতিতে তীর্থমাহাত্ম্য বর্ণিত হয়—দেব, সিদ্ধ, গন্ধর্ব ও অপ্সরারা সেখানে নিয়ত গমন করে। সেখানে স্নান, কপালেশের পূজা, একরাত্রি উপবাস এবং ব্রাহ্মণভোজন করলে মহাযজ্ঞসম ফল লাভ হয় ও মোক্ষপ্রাপ্তি ঘটে। উদাহরণে সৌদাস (মিত্রসহ) শাপে রাক্ষসভাবপ্রাপ্ত হয়ে ব্রহ্মহত্যাদোষে ক্লিষ্ট ছিল; সাব্রহ্মতী/নন্দিতীর্থ-সম্পর্কিত এই তীর্থে স্নান করে সে শুদ্ধ হয়, এবং সেখানে করা শ্রাদ্ধ পিতৃগণকে উন্নীত করে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়—এই মাহাত্ম্য শ্রবণে পাপ নাশ হয়, বিষ্ণুর সাযুজ্য লাভ হয়; মহেশ্বরের স্তব প্রলয় পর্যন্ত শোক থেকে রক্ষা করে।

Adhyaya 137

Śveta-tīrtha (The White Sacred Ford) and the Rise of the Seven Rivers

এই অধ্যায়ে নন্দীর অঞ্চলে উৎসারিত এক পবিত্র নদীর পথ বর্ণিত হয়েছে; ব্রাহ্মণ ও ঋষিসেবিত অরণ্যে প্রবেশ করে সে নদী সাতটি ধারায় বিভক্ত হয়। ধারাগুলির নাম—সাব্ভ্রমতী, সেটিকা, বল্কিনী, হিরণ্ময়ী, হস্তিমতী, বেত্রবতী এবং দেবোপাধিসংযুক্ত সপ্তম ধারা—এভাবে উল্লেখিত; বেত্রবতীকে বৃত্রের কূপ থেকে দেবীরূপে উদ্ভূত বলা হয়েছে। এরপর বিকীর্ণ-তীর্থ ও সপ্তনদ্যুদয়কে শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের শ্রেষ্ঠ স্থানরূপে মহিমা দেওয়া হয়েছে। এখানে কৃত পিতৃকর্ম গয়ার সমতুল্য ফলদায়ক এবং লুপ্ত/অবহেলিত পিতৃবিধির ত্রুটি সংশোধনকারী বলে ঘোষিত। পরে শ্বেতোদ্ভব বা শ্বেত-তীর্থে শিবের ভস্ম থেকে শ্বেতা (শ্বেতগঙ্গা) নদীর আবির্ভাবের কথা বলা হয়; সেখানে স্নান, তিন রাত্রির ব্রত ও মহাকালেশ্বর দর্শনে রুদ্রলোক লাভ হয়, আর বিল্বপত্রসহ শিবপূজায় ইষ্টবর প্রাপ্তি ঘটে।

Adhyaya 138

The Glory of Gaṇatīrtha (at Bakulāsaṅgama)

এই অধ্যায়ে মহাদেব দেবী উমাকে গণেশ-কেন্দ্রিক তীর্থপরিক্রমার মাহাত্ম্য শোনান। চন্দনা নদীর তীরে অবস্থিত গণতীর্থ, যা ‘ত্রিবিষ্টপ’ নামেও খ্যাত, এবং বকুলা-সঙ্গমে প্রতিষ্ঠিত বকুলেশ দেবতার কথা বলা হয়েছে। ত্রিবিষ্টপে পূর্ণিমায় স্নান করলে ব্রহ্মহত্যার মতো মহাপাপও নাশ হয়; আর কৃষ্ণাষ্টমীতে উপবাস করে বকুলা-সঙ্গমে স্নান করলে স্বর্গলাভ হয়—এমন ফল বলা হয়েছে। বকুলেশের দর্শন গণেশ্বরের কৃপায় গণপতির ন্যায় সিদ্ধি প্রদান করে; এবং এই কাহিনি শ্রবণ গঙ্গাস্নানের সমান পুণ্যদায়ক বলে ঘোষিত। চন্দ্রবংশীয় রাজা বিশ্বদত্ত দীর্ঘ তপস্যার পর গাণপত্য পথে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দৃষ্টান্ত হন; ঋষিদেরও নিত্য গণেশসেবায় রত দেখানো হয়েছে। ফলশ্রুতিতে সন্তান, ধন, বিদ্যা ও মোক্ষের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেষে হরি-হর অভেদ—শিবই বিষ্ণু, বিষ্ণুই শিব—এই তত্ত্ব উপদেশিত হয়েছে।

Adhyaya 139

The Glory of Agnipāleśvara (Agni-tīrtha, Pāleśvara, and Liberation through Śrāddha)

মহেশ্বর উমাকে বলেন—সাভ্রমতী নদীর উত্তর তীরে অগ্নি-তীর্থ এবং নিকটবর্তী পালেশ্বর পীঠ অতি পবিত্র। সেখানে চণ্ডী ও যোগমাতৃগণ সিদ্ধি দান করেন। ভক্তকে তিন রাত্রির ব্রত পালন করে ঈশান/চণ্ডিকেশ্বরের দর্শন করতে হবে এবং মাতৃ-তীর্থের কাছে ভ্রমতীর জলে স্নান করতে হবে। বিশেষত গোকুরা নদীর সঙ্গে সাভ্রমতীর সঙ্গমস্থলে তিলগুঁড়োসহ শ্রাদ্ধ, পিণ্ডদান, তিলোদক-দান ও ব্রাহ্মণভোজন করলে অপরিমেয় পুণ্য ও দুষ্ট ভূতপ্রেতাদি থেকে নির্ভয়তা লাভ হয়। এরপর নীতিকথা—কুকর্দম নামে এক পাপী রাজা প্রেত হয়েছিল; কিন্তু পূর্বজন্মে ব্রাহ্মণরূপে বেদপাঠ, শিবপূজা ও অতিথিসেবা করার অবশিষ্ট পুণ্যে সে গুরুর আশ্রমে পৌঁছায়। কহোড় ব্রাহ্মণের অনুগ্রহে এবং বারবার তীর্থে শ্রাদ্ধকর্ম সম্পাদনের ফলে কুকর্দম ও সংশ্লিষ্ট প্রেতগণ মুক্তি লাভ করে। এতে বোঝানো হয়—তীর্থকর্ম ও গুরুর নির্দেশ মহাপাপও মোক্ষের পথে রূপান্তরিত করতে পারে।

Adhyaya 140

The Glory of the Sacred Ford of Hiraṇyāsaṅgama

এই অধ্যায়ে হিরণ্যাসঙ্গম নামে সঙ্গম-তীর্থের মহিমা বর্ণিত। মহাদেবীকে শিব বলেন—প্রাচীন কাহিনিতে গঙ্গা সাত ধারায় বিভক্ত হয়, যার সপ্তম ধারা ‘হিরণ্য়া’ নামে প্রসিদ্ধ। ঋক্ষু ও মঞ্জুময় পর্বতের মধ্যবর্তী সত্যবান পর্বতের নিকটে এই সঙ্গম; এখানে স্নান ও জলপান পাপক্ষয়কারী। স্থানটি বনস্থলীর সঙ্গে সম্পর্কিত, হরি-নারায়ণের কৃপা প্রদান করে এবং এখানে হিরণ্যাসঙ্গমেশ্বরের পূজা বিশেষ ফলদায়ক; নর-নারায়ণের তপস্যা ও উর্বশীর আবির্ভাবও স্মরণ করা হয়। এখানে স্নানের ফল সহস্র কপিলা গাভী-দানসম, দশ অশ্বমেধসম, গ্রহণকালে পালিত ব্রতসম এবং তুলাপুরুষ-দানসম বলে কথিত। হিরণ্যাক্ষের তপস্যা, জনমেজয়ের স্বর্ণদেহ লাভ, এবং বিশ্বামিত্রের শুদ্ধিস্নানে শিবলোকপ্রাপ্তি—এগুলি উদাহরণরূপে উল্লিখিত। সকল বর্ণের মানুষের জন্য এই তীর্থে অধিকার আছে; শ্রদ্ধায় সেবা করলে মহাপুণ্য লাভ হয়।

Adhyaya 141

The Greatness of Madhurāditya (Mathurā Tīrtha and the Mandavya–Dharma–Vidura Legend)

এই অধ্যায়ে হিরণ্যাসঙ্গমের নিকটে ধর্মাবতী–গঙ্গার সঙ্গমতীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। সেখানে স্নান করলে স্বর্গলাভ হয় এবং তীর্থস্থানে শ্রাদ্ধ করলে পিতৃঋণ থেকে মুক্তি মেলে—এমন ফলশ্রুতি বলা হয়েছে। এরপর মথুরাকে পাপনাশিনী তীর্থরূপে মহিমান্বিত করা হয়েছে, যেখানে মধুসূদন হরির দর্শন পরম ফলদায়ক। কংসবধের পর শ্রীকৃষ্ণের গমন-প্রসঙ্গ স্মরণ করিয়ে মধুরাদিত্য ও মধুরার্ক পূজার প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়। পরে মাণ্ডব্য–ধর্ম–বিদুরের কারণকথা আসে: মিথ্যা অপরাধে মাণ্ডব্য ঋষিকে শূলে বিদ্ধ করা হয়; তিনি প্রত্যক্ষ ধর্মকে প্রশ্ন করেন। ধর্ম জানান, শৈশবে করা এক নিষ্ঠুর কর্মের প্রতিফলই এই দণ্ড; মাণ্ডব্যের শাপে ধর্ম বিদুররূপে জন্ম নেন। বিদুর সাব্ভ্রমতী–ধর্মাবতী সঙ্গমে স্নান করে শূদ্রত্ব-কলঙ্ক ত্যাগ করেন—তীর্থযাত্রা যে কর্মদোষ ও সামাজিক দুঃখ শোধন করে, তা এখানে প্রতিপন্ন।

Adhyaya 142

The Greatness of Kapitīrtha (Kapīśvara/Kapīśvarāditya) and the Transition from Kambu-tīrtha

এই অধ্যায়ে কম্বু-তীর্থের মাহাত্ম্য সমাপ্ত করে কপি-তীর্থ/কপীশ্বর (কপীশ্বরাদিত্য)-এর গৌরব বর্ণিত হয়েছে। কম্বু-তীর্থে স্নান, পিতৃ-তর্পণ, নারায়ণ-পূজা এবং বিধিপূর্বক ব্রাহ্মণদের দান করলে বিষ্ণুলোক-প্রাপ্তি ও সন্তানলাভের বর মেলে—বিশ্বামিত্রের কঠোর তপস্যা ও বিষ্ণু-ধ্যানকে তার দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা হয়েছে। এরপর তীর্থযাত্রীকে কপীশ্বরে যেতে বলা হয়, যার যোগ রাম–রাবণ যুদ্ধ ও বানরদের সেতু নির্মাণের কাহিনির সঙ্গে। সেখানে দর্শন ও স্নান, বিশেষত চৈত্র শুক্ল অষ্টমীতে, ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি মহাপাপ নাশ করে, সৌন্দর্য ও ভোগ প্রদান করে এবং বল, ধর্ম ও পুত্রপ্রাপ্তির কামনা পূর্ণ করে—এ কথা মহাদেবের বাণীতে ঘোষিত।

Adhyaya 143

The Greatness of the Saptadhārā Sacred Ford (including Ekadhārā and Maṅkī-tīrtha origins)

এই অধ্যায়ে প্রথমে একধারা-তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। সেখানে স্নান করে রাত্রি-ব্যাপী উপবাস করার বিধান বলা হয়েছে; এতে পাপক্ষয়, ভয় থেকে রক্ষা এবং অশুভের দ্রুত বিনাশ ঘটে। স্বামিদেবেশের পূজা বংশোন্নতি ও কুলশুদ্ধির কারণ বলে প্রশংসিত। এরপর সপ্তধারা (সপ্তসারস্বত) তীর্থকে সর্বশ্রেষ্ঠ পবিত্র তীর্থসমষ্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে—শিবের জটায় গঙ্গার অবতরণ এবং ‘সাত ধারার’ অলৌকিক প্রতীকের সঙ্গে এর যোগ। সপ্তধারায় শ্রাদ্ধ করলে পিতৃগণ বিশেষ তৃপ্ত হন—এ কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। শেষে কৌষীতক-পুত্র ঋষি মঙ্কির উপাখ্যান আছে—বেদাচরণে দৃঢ় মুনি পুত্রচিন্তায় গুরুর শরণ নেন এবং সাব্ভ্রমতী নদীতীরে তপস্যা করেন। তপস্যার ফলে মঙ্কিতীর্থ প্রকাশ পায়, যা পুত্রপ্রদ ও মনোবাঞ্ছা-সিদ্ধিদায়ক; দ্বাপরে পাণ্ডবরা তা সক্রিয় করে সপ্তধারা-রূপে প্রসিদ্ধ করেন।

Adhyaya 144

The Glory of Khaṇḍa-tīrtha and Brahmavallī (Brahma-tīrtha)

অধ্যায় ১৪৪-এ ব্রহ্মবল্লী/ব্রহ্মতীর্থ এবং খণ্ডতীর্থ (বৃষতীর্থ)-এর মহিমা বর্ণিত হয়েছে। সাব্রহ্মতী ও ব্রহ্মবল্লী জলের সঙ্গমস্থ ব্রহ্মবল্লীকে প্রয়াগ ও গয়ার সমতুল্য শ্রাদ্ধ-তীর্থ বলা হয়েছে; এখানে পিণ্ডদান করলে পিতৃগণ বারো বছর তৃপ্ত থাকেন। গ্রহণকালে দান বিশেষভাবে বহুগুণ পুণ্যদায়ক; স্নান করে তুলসীমালা ধারণপূর্বক নারায়ণ-স্মরণ করলে স্বর্গ ও বৈকুণ্ঠগতি লাভ হয় এবং শঙ্খ-চক্র-গদাধারী দিব্যরূপ প্রাপ্তির ফল কথিত। পরবর্তী অংশে খণ্ডতীর্থের কাহিনি—গোলোকে এক ঘটনার ফলে শাপগ্রস্ত কিছু গাভী পৃথিবীতে পতিত হয়, কিন্তু ব্রহ্মবল্লীর নিকট খণ্ড-সরোবরেতে বিধিপূর্বক স্নান করে তারা পুনরায় স্বর্গে গমন করে। এখানে গোমাতা ও বৃষভের পূজা, সুবর্ণধেনু প্রভৃতি দান, গোহ্রদে পিতৃতর্পণ এবং পিপল ও পাঁচটি আমলকী বৃক্ষরোপণের বিধান আছে। এর ফলে গোলোক, পিতৃলোক ও হরিধাম প্রাপ্তি এবং অক্ষয় পুণ্যফল প্রতিশ্রুত।

Adhyaya 145

Mahatmya of Saṅgameśvara Tirtha and the Curse of the Hastimatī River

এই অধ্যায়ে সঙ্গমেশ্বর তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণিত। যেখানে হস্তিমতী নদী সাব্ভ্রমতীর সঙ্গে মিলিত হয় (কোথাও গঙ্গার সঙ্গেও সম্পর্কিত বলা হয়েছে), সেই সঙ্গম ত্রিলোকে প্রসিদ্ধ। সেখানে স্নান ও মহেশ্বরের দর্শনে পাপক্ষয় হয় এবং রুদ্রলোক লাভ হয়। এরপর কারণকথা—কৌণ্ডিন্য ঋষি নদীতীরে দীর্ঘ তপস্যা করেন, যেখানে হৃষীকেশ নারায়ণের পূজা চলে। দৈবযোগে বর্ষাকালে প্রবল বন্যায় আশ্রম ও সঞ্চিত দ্রব্য ভেসে যায়। শোক ও বিঘ্নে ব্যথিত হয়ে ঋষি নদীকে শাপ দেন—কলিযুগে তুমি নির্জলা হবে; তখন তার নাম হয় ‘বহিশ্চরী’। তবু সঙ্গমেশ্বর তীর্থের প্রভাব নষ্ট হয় না; কেবল দর্শনেই ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি মহাপাপও বিনষ্ট হয়।

Adhyaya 146

The Greatness of Rudra-Mahālaya (Kedāra) as a Liberating Tīrtha

এই অংশে রুদ্র-মহালয়—কেদার নামে পরিচিত—কে রুদ্রের দ্বারা স্বয়ম্ভূরূপে প্রকাশিত ও নির্মিত এক অনন্য তীর্থধাম বলা হয়েছে। এখানে পিতৃকার্য বিশেষত শ্রাদ্ধ করার বিধান আছে; কেদারে শ্রাদ্ধ করলে পিতা ও পিতামহগণ তৃপ্ত হন, আনন্দ লাভ করেন এবং রুদ্রের পরম ধামে গমন করেন—এমন মহিমা কীর্তিত। মহামন্দির-প্রাঙ্গণে ষাঁড়/বৃষভ ছেড়ে দেওয়াকে গুরুতর দোষ বলা হয়েছে। কার্তিক ও বৈশাখ মাসে তীর্থযাত্রা করলে রুদ্রের সান্নিধ্য মেলে এবং সংসার-দুঃখ থেকে মুক্তি হয়। কেদারের জলে স্নান ও পান পুনর্জন্ম-নাশক কর্ম বলে প্রশংসিত; গঙ্গা ও ভ্রমতীকে সর্বজনহিতার্থে প্রতিষ্ঠিত বলে জানিয়ে তীর্থের ‘রুদ্র-মহালয়’ খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

Adhyaya 147

The Glory of Khaḍga-tīrtha: Darśana and Worship of Khaṅgeśvara/Viśveśvara

এই অধ্যায়ে মহাদেব দেবী গিরিজাকে বিরল পাপহর ‘খড়্গ-তীর্থ’-এর মাহাত্ম্য বলেন। সেখানে স্নান করে খঙ্গেś্বর/খড়্গধারেশ্বর শিবের দর্শন লাভ এবং পরে বিধিপূর্বক পূজা করলে মহাপুণ্য হয়; বিশেষ করে কার্ত্তিক মাসে এই আরাধনাকে অতিশয় ফলদায়ক বলা হয়েছে। বৈশাখ মাসে দর্শন করলে রাজ্যলাভ ও কর্তৃত্বের ফলশ্রুতি উল্লেখ আছে। ভগবানকে নিত্যসন্নিহিত ও ইচ্ছাপূরক রূপে বর্ণনা করে, পুষ্প, ধূপ, নৈবেদ্য, দীপ, ফল ও বিল্বপত্র দ্বারা বিশ্বেশ্বর/বিশ্বেশ্বরের পূজাবিধি বলা হয়েছে। এর ফলে কুদশা-নিবারণ, স্বর্গপ্রাপ্তি, ধন-ধান্য ও পরিবারসমৃদ্ধি লাভের কথা ঘোষিত।

Adhyaya 148

Mālar̄ka Sun-Tīrtha at Citrāṅgavadana (Gayā-tīrtha): Merits, Vows, and Boons

এই অধ্যায়ে সাব্ভ্রমতী নদীর তীরে চিত্রাঙ্গবদনে অবস্থিত পরম পবিত্র গয়া-তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণিত। সেখানে সূর্যরূপ ‘মালার্ক’ দেবতা অধিষ্ঠিত; কামনা-পূরণকারী ও মন্দার বৃক্ষসহ আম, নিম, কদম্ব, কাশ্মর্য, অশ্বত্থ, তিন্দুক প্রভৃতি বৃক্ষরাজিতে শোভিত পুণ্যবনের কথা বলা হয়েছে। মালার্কের দর্শন ও স্নানে কুষ্ঠরোগ নাশ হয়—এমন ফলশ্রুতি ঘোষিত। নারীরা সেখানে বৈদিক অভিষেক-অনুষ্ঠান করলে সন্তানলাভ হয়; আর ভাস্করভক্তের দ্বারা সেখানে সম্পন্ন সন্ধ্যা-স্নান, জপ, হোম, স্বাধ্যায় ও দেবপূজা অক্ষয় ফল প্রদান করে। মহাদেব দেবেশীকে উদ্দেশ করে ঐ স্থানে সূর্যব্রত পালনের প্রশংসা করেন—ইহলোকে সুখ ও পরলোকে সূর্যলোকপ্রাপ্তির জন্য। এক রাজার মালার্ক-কৃপায় পুত্রলাভের দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে; নিয়মিত উপবাস ও পূজায় মুক্তির অংশীদারিত্বের কথাও বলা হয়। বশিষ্ঠপ্রমুখ ঋষি ও ইন্দ্রপ্রমুখ দেবগণের উপস্থিতিতে ক্ষেত্রের পবিত্রতা বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত।

Adhyaya 149

The Glory of Candaneśvara (Āmodasthāna) on the Sābhramatī River

এই অধ্যায়ে মহাদেব পার্বতীকে সাব্ভ্রমতী নদীর তীরে অবস্থিত চন্দনেশ্বর—যাকে আমোদস্থান বলা হয়—এই তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। নিকটবর্তী ঘাটগুলির তুলনায় এটিকে শ্রেষ্ঠ, শোকনাশক ও মহাপুণ্যদায়ক বলা হয়েছে; তটে এক দিব্য চন্দনবৃক্ষের উল্লেখ আছে এবং তীর্থপ্রভাবে লিঙ্গ-প্রাকট্যের কথাও বলা হয়। মহাভারতের স্মৃতি হিসেবে ভীমের প্রসঙ্গ আসে—দুঃশাসনের রক্ত পান করে ভয়ংকর প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করে, রক্তলিপ্ত হাতে দ্রৌপদীর কেশবন্ধন সম্পন্ন করে তিনি দ্বিজদের দান দিয়ে তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে পড়েন। এখানে স্নান, জলপান ও পিতৃতর্পণ নরকনিবারক এবং রুদ্রলোকপ্রদ বলে ঘোষিত। যথাশক্তি পূজা করার বিধান আছে; এক জেলে-রাজাও বারবার পূজাকারী হিসেবে স্মরণীয়। শিব তীর্থের বিস্তার, আমলকীর পুণ্যে পবিত্র শুভফলের ফলপ্রাপ্তি এবং নিয়মমাফিক অর্ঘ্যদানের নির্দেশ দিয়ে উপদেশ সমাপ্ত করেন।

Adhyaya 150

The Greatness of Jāmbavata (Jambū) Tīrtha and Jāmbavanteśvara

এই অধ্যায়ে জাম্বূ/জাম্ববত তীর্থের মহিমা বর্ণিত হয়েছে। কলিযুগে এটিকে ‘স্বর্গে ওঠার সোপান’ বলা হয়েছে; এখানে স্নান করলে পাপক্ষয় হয়। দশাঙ্গ পর্বতে জাম্ববান দেবগণের পূজিত জাম্ববন্তেশ্বর নামে এক পবিত্র লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন, যা দেবতাদের আরাধ্য। রামায়ণ-স্মৃতিতে রাবণবধ ও সীতাপ্রাপ্তির পর জয়ধ্বনি ও ঢাক-ঢোলের শব্দ ওঠে, এবং বিজয়ী দল সেই ঘাটে স্নান করে পবিত্রতা লাভ করে। মহাদেব উমাকে বলেন—জাম্ববন্তেশ্বরে স্নান করলে রুদ্রলোকে সম্মান মেলে, আর রামস্মরণে সংসারবন্ধন ক্ষয় হয়। শেষে তত্ত্বঘোষণা—রাম ও রুদ্র অভিন্ন। ‘রাম’ নামের জপ যুগে যুগে সকল সিদ্ধি দেয়; আর দান, বিশেষত ভূমিদান, জাম্ববন্তেশের দর্শনে সহস্রগুণ ফলপ্রদ হয়।

Adhyaya 151

The Glory of Dhavaleśvara (Indragrāma Tīrtha and the Dhavala Liṅga)

উমার প্রশ্নে মহাদেব বলেন—অন্য ঘাটের পর ইন্দ্রগ্রাম নামে এক তীর্থ আছে, যেখানে ইন্দ্র ভয়ংকর পাপ থেকে মুক্ত হন। তিনি নমুচির সঙ্গে ইন্দ্রের সন্ধি ও ফেন দিয়ে নমুচিবধের কথা বলেন; তার পর ব্রহ্মহত্যারূপ পাপ ইন্দ্রকে গ্রাস করে। বৃহস্পতির উপদেশে ইন্দ্র উত্তর তীরে স্নান করে শিবকে ধবলেশ্বর/ইন্দ্রলিঙ্গ রূপে প্রতিষ্ঠা করেন এবং শান্তি লাভ করেন। এই তীর্থে পূর্ণিমা, অমাবস্যা, সংক্রান্তি ও গ্রহণকালে স্নান-पूজার বিধান আছে। শ্রাদ্ধ, ব্রাহ্মণভোজন, গোদান ও রুদ্রমন্ত্রজপে বহুগুণ পুণ্য হয়। মাঝখানে ধনী বৈশ্যভক্ত নন্দী ও এক কিরাতের উপাখ্যান—কিরাতের মাংসাদি ও বাহ্যত অশুচি মনে হওয়া নিবেদনও তীব্র ভক্তিতে শুদ্ধ হয়; শিব প্রকাশ হয়ে তাকে গণপদ দেন এবং উভয় ভক্তকে উন্নত করেন। শেষে তীর্থের তারক প্রতিশ্রুতি ও দেবগাভীর দুধার্পণে লিঙ্গের ‘ধবল’ হওয়ার কারণকথা বলা হয়েছে।

Adhyaya 152

The Greatness of Bālāpendra (Bālāpa) Sacred Ford

মহাদেবী পার্বতীকে শিব বলেন—সাব্ভ্রমতী/অভ্রমতী নদীতীরে ‘বালাপ’ নামে এক পরম তীর্থ আছে, যা ভোগ ও মোক্ষ—উভয়ই প্রদান করে। এর মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয় ঋষি কণ্বের কন্যা বালাবতীর কাহিনিতে। তিনি সাবিত্রী-সূর্যব্রত অবলম্বন করে কঠোর তপস্যায় সূর্যদেবকে স্বামীরূপে কামনা করেন। সূর্যদেব পরীক্ষা করতে ছদ্মবেশে এসে পাঁচটি কুল/বরই ফল রান্না করতে দেন এবং তাঁর অটল নিয়ম-নিষ্ঠা প্রত্যক্ষ করেন; তিনি অগ্নিতে বারবার নিজের পদযুগল পর্যন্ত অর্পণ করার মতো দুঃসহ তপস্যা সহ্য করেন। তাতে সন্তুষ্ট হয়ে সূর্যদেব স্বদিব্যরূপ প্রকাশ করে বর দেন, তাঁর নামেই তীর্থের নাম ‘বালাপ’ স্থাপন করেন এবং নিজলোকে বাসের প্রতিশ্রুতি দেন। অধ্যায়ে স্নান, তিন রাত্রির অনুশাসন, সূর্যোদয় দর্শন, এবং রবিবার, সংক্রান্তি, সপ্তমী ও গ্রহণকালে বিশেষ ফলের কথা বলা হয়েছে। গুড়-ধেনু, লাল গাভী ও বলদ দান, গুড়মিশ্রিত ক্ষীর নিবেদন, এবং রক্তবর্ণ সূর্যের পুষ্পপূজা বিধেয়। আরেক দৃষ্টান্তে—পরিত্যক্ত বৃদ্ধ মহিষ এবং অস্থি-নিক্ষেপে কান্যকুব্জের এক রাজপুত্রের জাতিস্মরতা—দ্বারা অক্ষয় পুণ্য, শ্রাদ্ধফল ও তীর্থে মহিষেশ্বর প্রতিষ্ঠা-পূজার মাহাত্ম্য বোঝানো হয়েছে। উপসংহার—এখানে স্নান মহা-নদীর পুণ্যের সমান এবং পুনর্জন্ম নাশ করে।

Adhyaya 153

The Greatness of Durdharṣeśvara

মহাদেব পর্বতকন্যা দেবীকে দুর্ধর্ষেশ্বর-তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন। এই তীর্থের কেবল স্মরণেই পুণ্য লাভ হয় ও পাপ ক্ষয় হয়; এখানে স্নান, পূজা ও শিবদর্শনে দুর্ধর্ষেশের কৃপায় দোষ-কলুষ নাশ হয়। দেব–অসুর সংঘর্ষের পরে ভৃগুপুত্র উশনস্ (শুক্র) কঠোর ব্রত পালন করে ত্র্যম্বক শিবের আরাধনা করেন এবং মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ করেন। তাই উশনস্-তীর্থ/কাব্যতীর্থ প্রসিদ্ধ হয়। আরেক দৃষ্টান্তে বৃত্রের কাছে পরাজিত ইন্দ্র বृहস্পতির শরণ নেন। গুরু তাঁকে আভ্রমতী নদীতীরে, যেখানে দুর্দ্ধর অবস্থান করেন, সেখানে যেতে বলেন। ইন্দ্র স্নান করে শিবপূজা করলে শিব প্রসন্ন হয়ে বর দেন এবং রক্ষিত পাশুপত অস্ত্র প্রদান করেন; সেই অস্ত্রে বৃত্র নিহত হয়। অতএব এই ঘাটে স্নান-পূজা ও শিবদর্শনে পাপ বিনাশ নিশ্চিত।

Adhyaya 154

The Greatness of Dhāreśvara / Khaṅgadhārā Tīrtha (Hidden Tīrtha and Incidental Śivarātri Worship)

এই অধ্যায়ে সাব্ভ্রমতী নদীতীরে অবস্থিত ‘খঙ্গধারা’ নামক পরম পবিত্র, কিন্তু কলিযুগে গোপন তীর্থের কথা বলা হয়েছে, যেখানে রুদ্র খঙ্গধার/ধারেশ্বর রূপে বিরাজমান। মহাদেব পার্বতীকে এক প্রাচীন কাহিনি শোনান—চণ্ড নামে এক হিংস্র শিকারি (পুষ্কস/পুষ্কসেন) মাঘ শুক্ল চতুর্দশীর রাতে বরাহ শিকারের উদ্দেশ্যে শ্রী/বিল্ব গাছে জেগে থাকে। ক্রোধে সে পাতা ছেঁড়ে ফেলে; সেগুলি নীচের শিবলিঙ্গে পড়ে, আর তার অজান্তেই জাগরণ, উপবাস ও পত্রার্পণ শিবপূজায় পরিণত হয়। এরপর স্ত্রীর প্রসঙ্গ, কুকুরের মাংস ভক্ষণ, এবং শিকারির বৈরাগ্যের দিকে মোড় নেওয়া বর্ণিত হয়। শেষে সে আত্মবলিদানের চেষ্টা করলে শিবের গণেরা তাকে নিবৃত্ত করে শিবলোকে নিয়ে যায়। তীর্থ গোপন থাকার কারণ হিসেবে বিশ্বামিত্রের শাপের কথা বলা হয়েছে—এক তাঁতি শিবকে মাংস নিবেদন করায় সেই শাপ ঘটে; তবু ভক্তিভরে মাটির প্রতিমাতেও পূজা করলে পাপ তৎক্ষণাৎ নাশ হয়—এই তীর্থের মহিমা প্রতিষ্ঠিত হয়।

Adhyaya 155

The Greatness of Dugdheśvara (Dugdhatīrtha)

এই অধ্যায়ে খড়্গধারার দক্ষিণে, সাব্ভ্রমতী নদীতীরে এবং চন্দ্রভাগা–গঙ্গার সঙ্গমের নিকটে অবস্থিত দুগ্ধেশ্বর/দুগ্ধতীর্থকে সর্বশ্রেষ্ঠ পবিত্র তীর্থরূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মহাদেব পার্বতীকে বলেন—এখানে স্নান, দান, জপ, পূজা ও তপস্যার ফল অক্ষয় হয়; এমনকি এই মাহাত্ম্য শ্রবণ করলেও পাপ নাশ হয়ে রুদ্রলোক লাভ হয়। দৈত্যদের কাছে পরাজিত দেবতারা সাহায্যের জন্য ঋষি দধীচির শরণ নেন। দধীচি দেবহিতার্থে দেহত্যাগ করেন, যাতে তাঁর অস্থি দিয়ে অস্ত্র নির্মাণ হয়; সুরভীর লেহনে মাংস অপসারিত হয়। দধীচির পত্নী সুবর্চা দেবতাদের অভিশাপ দেন, এবং তাঁদের পুত্র পিপ্পলাদকে রুদ্রের অবতার বলা হয়। শেষে ঋষির তপোবলে নদীতীরে দুধ থেকে স্বয়ং এক লিঙ্গ প্রকাশ পায় এবং তা ‘দুগ্ধেশ্বর’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। এই তীর্থে কৃত সকল সৎকর্ম অবিনাশী—এটাই অধ্যায়ের সিদ্ধান্ত।

Adhyaya 156

The Glory of the Candreśvara Sacred Ford at the Candrabhāgā Confluence

এই অধ্যায়ে দুগ্ধেশ্বরের পূর্বদিকে চন্দ্রভাগা নদীর সঙ্গমে অবস্থিত পরম পবিত্র তীর্থের কথা বলা হয়েছে, যেখানে মহাদেব ‘চন্দ্রেশ্বর’ রূপে অধিষ্ঠান করেন। সোমের দীর্ঘ তপস্যা এবং নদীতীরে শুক্রের তপস্যার ফলে এই ক্ষেত্রের মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়; তাই লিঙ্গের নাম ‘চন্দ্রেশ্বর’ এবং তীর্থসমূহের মধ্যে এর শ্রেষ্ঠত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে স্নান, তীর্থজল পান, নিত্য ধ্যান ও শিবপূজা করলে ধর্ম-অর্থ লাভ এবং মহাপাপ নাশ হয় বলা হয়েছে। রুদ্রমন্ত্র জপ, বৃষোৎসর্গ, তিল-পিণ্ডসহ শ্রাদ্ধ ও দান বিশেষ প্রশংসিত। কলিযুগে তীর্থ গোপন হয়ে যাওয়ার প্রথা এবং দৃশ্যমান স্বর্ণলিঙ্গের উল্লেখ আছে; তীরে বটগাছ রোপণ করলে দীর্ঘ কাল পর্যন্ত শিবলোকে বাসের ফল বলা হয়েছে।

Adhyaya 157

The Glory of Pippalāda Tīrtha: Dadhīca, the Kṛtyā, and the Hidden Ford in Kali-yuga

মহাদেব পার্বতীকে বলেন—দুগ্ধেশ্বরের নিকটে সাব্ভ্রমতী নদীর তীরে ‘পিপ্পলাদা’ নামে এক পবিত্র ও মনোরম তীর্থ আছে, যা কলিযুগে গূঢ় থাকে। এই তীর্থ দধীচির সঙ্গে যুক্ত; পিতৃঋণ থেকে মুক্তি চাইলে ভক্তরা দধীচির পবিত্র স্থানে গিয়ে স্নান করে এবং সেই জলের পান করলে মহাপুণ্য লাভ হয়—শ্রুতি মতে তা ব্রহ্মহত্যার মতো পাপও নাশ করে। পার্বতী জিজ্ঞাসা করেন—কৃত্যা কেন সৃষ্টি হল, আগে সে কী করেছিল। শিব বলেন—কাহোড়ের ধর্মপরায়ণ পুত্র দধীচি এখানে কঠোর তপস্যা করতে এসেছিলেন; তখন কোলাসুর তপস্যায় বিঘ্ন ঘটাতে উপস্থিত হয়। তা দেখে দধীচি বধার্থে কৃত্যা সৃষ্টি করেন; কৃত্যা কোলাসুরকে বধ করে, আর সেই ঘটনাতেই তীর্থের শক্তি ও মাহাত্ম্য প্রসিদ্ধ হয়। শিব আরও বলেন—কর্মবন্ধন মোচনের জন্য পিপ্পল বৃক্ষ রোপণের বিধান আছে; ভক্তিভরে পিপ্পল রোপণ করলে পাপক্ষয় ও ঋণমোচন হয় বলে গণ্য।

Adhyaya 158

The Greatness of Nimbārka-deva Tīrtha (Picu-mandāraka and the Twelve Names of Sūrya)

মহাদেব বলেন—সাভ্রমতী/ভ্রমতী নদীর তীরে ‘পিচু-মন্দারক’ নামে এক পবিত্র তীর্থ আছে, যা রোগনাশক ও পরিশুদ্ধিকারী। এর মাহাত্ম্য একটি পুরাকথায় ব্যাখ্যাত: দানবদের কাছে পরাজিত দেবতারা সূক্ষ্মরূপ ধারণ করে নির্দিষ্ট বৃক্ষে আশ্রয় নেন—শিব বিল্বে, বিষ্ণু অশ্বত্থে, ইন্দ্র শিরীষে এবং সূর্য নিম্বে—যতক্ষণ না বিষ্ণু দৈত্য ‘কোলাহল’-কে দমন করেন। তাই যে বৃক্ষসমূহ দেবাশ্রয়ী, সেগুলি দেবতাস্বরূপ বলে কর্তন নিষিদ্ধ। সূর্যের সেই বিশ্রামস্থান থেকেই পিচু-মন্দারক তীর্থের উদ্ভব। সেখানে স্নান করে রবি-উপাসনা করলে ইষ্টফল লাভ হয়। অধ্যায়ে সূর্যের দ্বাদশ নাম/উপাধি জপের বিধান আছে; এতে পুণ্য, ধন, সন্তান ও জন্মজন্মান্তরে উন্নতি হয়। বিশেষত পরম ‘নিম্বার্ক তীর্থে’ স্নান ও তার জল পান করলে মোক্ষপ্রাপ্তি হয় বলে বলা হয়েছে।

Adhyaya 159

The Glory of Siddhakṣetra: Koṭarākṣī’s Manifestation and Aniruddha’s Hymn

মহাদেব পার্বতীকে সিদ্ধক্ষেত্রের অতুল মহিমা জানান এবং তা অনিরুদ্ধ–উষা প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেন। বাণাসুরের নগরে আনা অনিরুদ্ধ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েও কোটরাক্ষীর স্মরণ করে। দেবীকে আদ্যা বৈষ্ণবী শক্তি, রক্ষাকারিণী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে; শ্রীকৃষ্ণ নদীতীরে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাণাসুর পরাজিত হলে অনিরুদ্ধের স্তবের দ্বারা দেবীর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য প্রতিপন্ন হয়। এরপর তীর্থফল বলা হয়—এক বছর স্নান করে কোটরাক্ষীর দর্শনে সমৃদ্ধি লাভ হয়; সিদ্ধতীর্থে স্নান ও কোটরবাসিনীর দর্শনে রুদ্রলোকে সম্মান মেলে। শিব বলেন, কেবল স্মরণেও মুক্তি হয় এবং বিশেষ স্নান ও স্তোত্রপাঠের বিধান দেন। কোটরাক্ষীকে নানা দেবীনামের সঙ্গে অভিন্ন, পরম তীর্থ বলা হয়েছে; তাঁর দর্শনে পাপ বিনাশ হয়।

Adhyaya 160

Glory of the ‘King of Tīrthas’: Vāmana’s Presence, Māgha Dvādaśī Gifts, and Pitṛ Offerings

এই অধ্যায়ে ‘তীর্থরাজ’ নামে খ্যাত এক মহাতীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। সাত নদীসমন্বিত ও চন্দন-সুগন্ধি জলে পরিপূর্ণ এই তীর্থে স্নান করলে অন্য তীর্থের তুলনায় শতগুণ অধিক পুণ্য লাভ হয়, কারণ সেখানে স্বয়ং ভগবান বামনের সান্নিধ্য বিরাজমান বলে বলা হয়েছে। মাঘ মাসের আচারে বিশেষ করে দ্বাদশীর বিধান দেওয়া হয়েছে। দ্বাদশীতে তিল-ধেনু দান পাপ নাশ করে এবং শত পুরুষ পর্যন্ত বংশোদ্ধার করে। পিতৃদের উদ্দেশে তিল-মিশ্রিত জলে তর্পণ করার শৃঙ্খলা শেখানো হয়েছে; এটিকে সহস্রবর্ষব্যাপী শ্রাদ্ধের সমান ফলদায়ক বলা হয়েছে। শেষে গুড়-মেশানো ক্ষীর দিয়ে ব্রাহ্মণভোজনের মহিমা বলা হয়—এখানে একজনকে ভোজন করালে অন্যত্র সহস্রজনকে ভোজন করানোর সমান ফল হয়।

Adhyaya 161

The Greatness of Somatīrtha and the Manifestation of Someśvara (Soma-liṅga)

এই অধ্যায়ে সাভ্রমতী নদীর তীরে অবস্থিত গুপ্ত-তীর্থ সোমতীর্থের মহিমা বর্ণিত হয়েছে, যেখানে ভব (শিব) ‘কালাগ্নি’—সময়ের দাহক অগ্নিরূপ—হিসেবে স্মরণীয়। সেখানে স্নান ও সোমেশ্বর শিবের দর্শনে সোমের ন্যায় পুণ্য লাভ হয়; ইহলোকে যশ-ঐশ্বর্য এবং পরলোকে শিবলোকে মঙ্গলময় গতি প্রদান করে। শিব পার্বতীকে পাপনাশক প্রাচীন কাহিনি শোনান—ঋষি কৌষীতকি প্রথমে পত্রাহার, পরে বায়্বাহার করে আত্মধ্যানে স্থিত হয়ে কঠোর তপস্যা করেন। তপস্যায় প্রসন্ন মহেশ্বর বর দেন; ঋষি সেখানে লিঙ্গের আবির্ভাব ও দেবতার ‘সোমেশ্বর’ নামে খ্যাতি প্রার্থনা করেন। ফলে সোমতীর্থ ‘সোমলিঙ্গ’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। পরিশেষে রুদ্রজপ, বিল্বপত্র-চন্দন-ফল-পুষ্পাদি অর্ঘ্য, সোমবার তীর্থযাত্রা ইত্যাদি সাধন ও তার ফল বলা হয়েছে। এতে পুত্র, ধন, রাজ্যলাভ, পাপক্ষয় এবং শেষে শিবের পরম ধামে প্রাপ্তি ঘটে।

Adhyaya 162

The Greatness of Kāpotikā/Kāpota Tīrtha: Ancestor Rites, Vaiśākha Bathing, and Guest-Dharma

পার্বতী কপোতিকা়/কাপোত তীর্থের নামের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। মহাদেব সাব্ভ্রমতী নদীর প্রবাহসংলগ্ন এই পবিত্র তীর্থের বিধান বলেন—শ্রাদ্ধাঙ্গরূপে পিণ্ডদান ও তর্পণ, কাক‑শ্বান প্রভৃতি প্রাণীর উদ্দেশে অর্ঘ্য/অন্নদান, এবং তিথি‑ঋতু অনুসারে ভক্তি। বিশেষত বৈশাখে সেখানে স্নান করে প্রাচীনেশ্বর নামে ঈশানের পূজা শ্বেত সর্ষে দ্বারা করলে নিজের ও পিতৃপুরুষের মুক্তি লাভ হয়। তীর্থের নামকথা একটি উপাখ্যানে প্রকাশিত—বিষ্ণুভক্ত এক কবুতর, বিষ্ণুপবিত্র দ্বাদশীতে অতিথিরূপে আগত বাজের মাংস‑প্রার্থনায় নিজের দেহই দান করে অতিথিধর্ম রক্ষা করে; তাতেই তীর্থের শুদ্ধিকারী মহিমা প্রতিষ্ঠিত হয়। শেষে সর্বজনীন ধর্মবাণী—অতিথিকে সর্বদা সম্মান করো; অতিথিসৎকারে সর্বপুণ্য ও শেষপর্যন্ত বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তি হয়।

Adhyaya 163

The Glory of Go-tirtha (Sacred Ford of the Cows)

এই অধ্যায়ে কাশ্যপ-সরোবরের নিকটে অবস্থিত গো-তীর্থের মহিমা বর্ণিত হয়েছে। মহাদেব বলেন, সেখানে স্নান করলে ব্রহ্মহত্যা-সম মহাপাপসহ গুরুতর পাপও বিনষ্ট হয়। তীর্থের নাম ও শক্তির কারণরূপে একটি কাহিনি আছে—পূর্বপাপে কালো হয়ে যাওয়া গাভীগণ সেখানে স্নান করে পুনরায় শ্বেতবর্ণ লাভ করে; এই গোরূপান্তর কর্মশুদ্ধির প্রত্যক্ষ নিদর্শন। এরপর গো-মাতাদের নিত্য পূজা ও সেবাকে ধর্মরূপে প্রশংসা করা হয়েছে; গোসেবায় মানুষ নিজের মাতৃঋণ থেকে মুক্ত হয়। শেষে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি গো-তীর্থে স্নান করে শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের দুধেল গাভী দান করে, সে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হয়।

Adhyaya 164

The Glory of Kaśyapa Tīrtha: Kuśeśvara, Kaśyapa’s Sacred Pond, and the Sin-Destroying Gaṅgā

এই অধ্যায়ে মহাদেবীকে উদ্দেশ করে মহাদেব কাশ্যপ-নামক তীর্থের মহিমা বর্ণনা করেন। যেখানে একসময় বিরাট সরোবর ছিল এবং পর্বত-দেবতার গঠনের সঙ্গে তার যোগ বলা হয়েছে, সেখানে দীপ্তিমান দেবতা কুশেশ্বর বিরাজমান এবং ঋষি কাশ্যপের পবিত্র কুণ্ড শোভা পায়। এখানে স্নান করলে নরকে পতন হয় না; ব্রাহ্মণেরা অগ্নিহোত্র ও বৈদিক ভক্তিতে স্থিত থেকে স্থানটিকে পবিত্র রাখেন। কাশ্যপা-দেশকে কাশীর সমতুল্য বলা হয়েছে, যেন ঋষিদের দ্বারা গঠিত ও সংস্কৃত। কাশ্যপের তপস্যায় শিবের জটা থেকে গঙ্গার অবতরণ ঘটেছিল—এখানে গঙ্গার দর্শনমাত্রেই মহাপাপ নাশ হয়। গোদান, রথদান প্রভৃতি দান এবং দানসহ শ্রাদ্ধের প্রশংসা করা হয়েছে। শেষে বলা হয়, কলিযুগে কাশ্যপ তীর্থের তুল্য তীর্থ নেই; দেব-ঋষিরা তীর্থেশ্বরের কৃপায় শুদ্ধ হয়ে এখানে বাস করেন।

Adhyaya 165

The Greatness of Vijayī Tīrtha (with Bhūtālaya–Bhūteśvara–Ghaṭeśvara–Vaidyanātha sequence)

এই অধ্যায়ে প্রায়শ্চিত্ত ও মুক্তিদায়ক তীর্থযাত্রার ক্রম বর্ণিত। প্রথমে ভূতালয় নামক পাপনাশক তীর্থের কথা বলা হয়েছে—যেখানে বটবৃক্ষের চিহ্ন এবং পূর্বদিকে চন্দন-চিহ্ন নির্দেশক। সেখানে স্নান, বিশেষত কৃষ্ণাষ্টমীতে উপবাসসহ কালো তিল দান করলে প্রেতত্বের ভয় দূর হয় ও প্রেতদোষ নাশ হয়; পিতৃদের উদ্দেশে তিলসহ জলঘট দানকে পূর্বপুরুষের মুক্তিদায়ক বলা হয়েছে। চতুর্দশী ও অষ্টমীতে প্রভাতে শুদ্ধ জলে স্নান করে নামোচ্চারণ করলে প্রেত-অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ হয়—এমন বিধান আছে। এরপর শ্রীভূতেশ্বরের মাহাত্ম্য কীর্তিত, যিনি ভূতভয় নিবারণ করেন। তারপর সাব্ভ্রমতীর নিকটে শ্রেষ্ঠ ঘটেশ্বরের প্রশংসা; সেখানে প্লক্ষবৃক্ষ পূজায় ইষ্টসিদ্ধি হয়। শেষে বৈদ্যনাথের নির্দেশ—যেখানে যথাবিধি পিতৃতৃপ্তি করলে সর্বযজ্ঞফল, বিজয় ও পাপনাশ লাভ হয়।

Adhyaya 166

The Greatness of Pāṇḍurārya Tīrtha

এই অধ্যায়ে (উত্তরখণ্ড) পুলস্ত্য ঋষি ভীষ্মকে বৈদ্যনাথেরও পরবর্তী এক পরম তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন। এটি ‘দেব-তীর্থ’ নামে খ্যাত এবং সাব্ভ্রমতী নদীতীরে অবস্থিত পাণ্ডুরার্যা দেবীর পবিত্র ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত; শিবও দেবীকে সম্বোধন করে এর মহিমা প্রকাশ করেন। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়-প্রসঙ্গ ও নকুলের দক্ষিণ দিগ্বিজয়ের স্মৃতির সঙ্গে এই স্থানের যোগে এটি ‘পাণ্ডুরার্য’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। তীর্থাচরণ হিসেবে সাব্ভ্রমতীতে স্নান, পাণ্ডুরার্যাকে প্রণাম এবং এক বছর ধরে সঞ্চিত পূজার ফল অর্পণের বিধান আছে। এতে ভুক্তি ও মুক্তি, অষ্টসিদ্ধি এবং বুদ্ধির বিশেষ উন্নতি লাভ হয়। পুলস্ত্য আরও বলেন—এখানে দেহত্যাগ করলে কৈলাসপ্রাপ্তি হয় এবং চণ্ডেশ্বরের গণে স্থান মেলে; হনুমানের সমুদ্রলঙ্ঘন-শক্তির উৎসও এখানে তাঁর তপস্যা বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।

Adhyaya 167

Gaṇa-tīrtha (The Sacred Ford of Gaṇanātha)

এই অধ্যায়ে তীর্থযাত্রার এক সূক্ষ্ম ধারাবাহিকতা বর্ণিত হয়েছে। প্রথমে চণ্ডেশ-তীর্থের কথা—যেখানে চণ্ডেশ্বর বিরাজমান, সমৃদ্ধি দান করেন, এবং কেবল দর্শনেই জেনে বা না-জেনে কৃত পাপ নাশ হয়। শিব পার্বতীকে বলেন, ‘চণ্ডেশের নগরী’ সমবেত দেবতাগণ নির্মাণ করেছিলেন। এরপর সাব্ভ্রমতী/ভ্রমতী নদীর নিকটে দেবী-প্রতিষ্ঠিত গাণপত্য/গণ-তীর্থের মাহাত্ম্য বলা হয়; সেখানে স্নানকে মুক্তিদায়ক বলা হয়েছে। শেষে ফলশ্রুতিতে বলা হয়—রুদ্রভক্ত সেখানে শ্রাদ্ধ করলে সকল যজ্ঞের সমান পুণ্য লাভ হয়; পিতৃদের উদ্দেশে অর্ঘ্য দ্রুত ফল দেয়, গণনাথের কৃপায়; এবং ব্রাহ্মণকে বৃষভ-দান করলে পরম পদ প্রাপ্তি হয়।

Adhyaya 168

The Glory of Vārtraghnī (the Vṛtra-Slayer Confluence)

মহাদেব পার্বতীকে বার্ত্রঘ্নী-তীর্থের মাহাত্ম্য বলেন। সেখানে স্নান করলে অশেষ পুণ্য লাভ হয় এবং তিল-পিণ্ড-শ্রাদ্ধ করলে বংশশুদ্ধি ও পিতৃতৃপ্তি ঘটে। পার্বতী নদীর নামের ব্যুৎপত্তি ও ইন্দ্র কেন সেখানে এসেছিলেন—তা জানতে চান। শিব যুধিষ্ঠির–ভীষ্মের প্রাচীন কথোপকথনের সূত্র ধরে বৃত্র ও ইন্দ্রের দীর্ঘ যুদ্ধবৃত্তান্ত বর্ণনা করেন। পরাজিত ইন্দ্র আশ্রয় নিয়ে সঙ্গমে শিবদর্শন পায়; শিবের ভস্ম থেকে ‘ভস্মগাত্র/ভূতেশ্বর’ লিঙ্গ প্রকাশিত হয়, যার দর্শনে ব্রহ্মহত্যা-দোষ নাশ হয়। বৃত্রবধের পর ব্রহ্মহত্যা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে ইন্দ্রকে গ্রাস করে। ব্রহ্মা তার প্রস্থান স্থির করে পাপের চতুর্থাংশ অগ্নি, উদ্ভিদ, অপ্সরা ও জলে বণ্টন করেন; পরে মানুষের কিছু বিশেষ দোষাচরণে সেই অংশগুলি প্রত্যাহৃত হয়। ইন্দ্র তীর্থে তপস্যা করে শুদ্ধ হয়ে স্বর্গ লাভ করে; অধ্যায়ের শেষে তীর্থের মাহাত্ম্য পুনরায় ঘোষিত হয়।

Adhyaya 169

Varaha Tirtha: The Sacred Ford of Yajñavarāha and the Ocean-Confluence

এই অধ্যায়ে সমুদ্রতটে এক পবিত্র সঙ্গমের মাহাত্ম্য বর্ণিত—যেখানে বৃত্রঘ্নী নদী ভদ্রা/সুভদ্রা নদীর সঙ্গে বরুণের সাগরে মিলিত হয়। সেখানে স্নান ও শুদ্ধ জলে তर्पণ/অর্ঘ্য দান মহাপুণ্যদায়ক বলে ঘোষিত, এবং তীর্থের পবিত্রতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বরাহ-লীলার প্রসঙ্গ আসে। যজ্ঞবরাহরূপে ভগবান বিষ্ণু দানবদের পরাজিত করে সাগরে মন্থন ও ক্রীড়া করেন এবং কাদায় লিপ্ত হয়ে উঠে আসেন। পার্বতীর অনুরোধে মহাদেব প্রাচীন বরাহচরিত বলেন—দেবতাদের কার্যসিদ্ধির জন্য হরি বরাহরূপ ধারণ করে পৃথিবীকে উদ্ধার করেন এবং কর্দমালয় থেকে উদ্ভূত হন। এই উদ্ভব থেকেই বরাহতীর্থের প্রাদুর্ভাব; এখানে স্নানে মুক্তি লাভ হয় এবং শ্রাদ্ধ করলে পিতৃগণের মোচন ঘটে—কর্তা ও পূর্বপুরুষেরা আনন্দময় লোক প্রাপ্ত হন।

Adhyaya 170

The Sacred Ford of the Confluence (Saṅgama Tīrtha)

এই অধ্যায়ে ‘সঙ্গম-তীর্থ’-এর মাহাত্ম্য বর্ণিত—যেখানে গঙ্গা ভৃমতী নদী ও সমুদ্রে মিলিত হয়, সেই সঙ্গমকে সর্বতীর্থের শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। বিধিপূর্বক স্নান ও দান করার নির্দেশ আছে; বলা হয়েছে, এতে গুরুতর পাপও লয় পায়। এখানে শ্রাদ্ধকর্ম করারও বিশেষ প্রশংসা করা হয়েছে—এর ফলে বংশধারার মঙ্গল হয় এবং পিতৃলোকপ্রাপ্তি ঘটে বলে ফলশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অতিশয়োক্তি হিসেবে সমুদ্র–গঙ্গা সঙ্গমে ব্রহ্মহত্যার মতো দোষও মোচন হয় বলা হয়েছে। শেষে বলা হয়, যেখানে মানুষ তীর্থ চিনতে পারে না, সেখানে শিবের নামে উৎকৃষ্ট তীর্থ প্রতিষ্ঠা করা উচিত; তারপর ‘সঙ্গম-তীর্থ’ অধ্যায়ের কলফোনে সমাপ্তি।

Adhyaya 171

The Greatness of the True Tīrtha: Praise of the Āditya Ford

এই অধ্যায়ে পবিত্র সঙ্গমের নিকটে অবস্থিত ‘আদিত্য’ নামে পরম পুণ্য তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। মহাদেব শিব নিজে এর অতুল মহিমা ঘোষণা করে একে সর্বশ্রেষ্ঠ ও পাপ-নাশক তীর্থরূপে প্রশংসা করেন। এরপর বিধানমূলক নির্দেশ আসে—সাধকরা পুষ্করে স্নান করে পুনরায় পূজা করবে, অর্কফুল ও করবীর-পুষ্প দিয়ে দেবপূজা সম্পন্ন করবে। সেই স্থানে নিয়মিত শ্রাদ্ধ ও দান করার কথাও বলা হয়েছে। এই তীর্থের শক্তি এমন যে কেবল দর্শনমাত্রেই মহাপাতকে আচ্ছন্ন ব্যক্তিরও পুণ্যলাভ হয়। শেষে উত্তরখণ্ডে অধ্যায়ের শিরোনামসহ উপসংহার উল্লেখিত।

Adhyaya 172

The Glory of Nīlakaṇṭha

মহাদেব পার্বতীকে জানান যে পূর্বে উল্লিখিত তীর্থঘাটের পরেও এক অতিপবিত্র স্থান আছে, যা নীলকণ্ঠের উচ্চতর তীর্থ নামে প্রসিদ্ধ। বিশেষ করে মোক্ষকামী সাধকদের জন্য সেখানে গমন ও সেবন শ্রেষ্ঠ বলে তিনি নির্দেশ দেন। শিব বলেন, বিল্বপত্র, ধূপ ও দীপ নিবেদনসহ নীলকণ্ঠের দর্শন অত্যন্ত ফলপ্রদ; এতে ভক্তেরা মনোবাঞ্ছিত বর লাভ করে। এই দেবসত্তা উপবাস ও একান্তবাসের মতো তপস্যাগুণকে প্রিয় করেন, তবু ভক্তের প্রার্থনায় দ্রুত প্রসন্ন হয়ে কৃপা বর্ষণ করেন। শেষে তিনি উল্লেখ করেন যে কলিযুগে এই তীর্থ/দেবতার আরেক নাম ‘কাশ্যপী’ হবে—যুগভেদে নাম ও স্মরণাচারের পরিবর্তনের পুরাণপ্রসিদ্ধ ইঙ্গিত।

Adhyaya 173

The Glory of the Sābhramatī (Sabharmati) River-Confluence

উমা–মহেশ্বর সংলাপে মহাদেব সাব্ভ্রমতী (সবরমতী) নদীর সেই তীর্থের মহিমা বর্ণনা করেন, যেখানে তা দুর্গা নামে আরেক নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে সঙ্গম সৃষ্টি করে এবং পরে সমুদ্রাভিমুখে প্রবাহিত হয়। শিব বলেন, এই সঙ্গমে স্নান করা উচিত; বিশেষত কলিযুগে এখানে তীর্থযাত্রীরা দোষ ও পাপ থেকে মুক্ত হয়। তিনি আরও নির্দেশ দেন যে স্নানের পাশাপাশি সঙ্গমস্থলে শ্রাদ্ধকর্ম, ব্রাহ্মণভোজন এবং বিধিপূর্বক দান করা মহাপুণ্যদায়ক—বিশেষ করে গোধন ও মহিষ দান। এই তীর্থকে অতিশয় পবিত্র ও পাপনাশক বলা হয়েছে; কেবল দর্শনমাত্রেও পাপক্ষয় ও মুক্তিলাভের সহায়তা হয়। নদীর পবিত্রতা গঙ্গার সঙ্গে তুলিত, এবং কলিযুগে এর ফল দীর্ঘস্থায়ী—শেষে বলা হয়, এর গুণ সম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করা অসম্ভব।

Adhyaya 174

The Manifestation of Narasiṃha (Narasimha Vrata and Maulistāna Tīrtha)

এই অধ্যায়ে মহাদেব পার্বতীকে এক দুর্লভ ব্রতের কথা বলেন, যা ভয়ংকর পাপও নাশ করে। এরপর ভক্তকল্যাণার্থে শ্রী নৃসিংহের আবির্ভাবের প্রসঙ্গ ওঠে এবং পার্বতী নৃসিংহের পরম ধাম ও ব্রতের গূঢ় তত্ত্ব জানতে চান। পরে প্রহ্লাদ ও নৃসিংহের সংলাপে বলা হয়—পরম ব্রতের শক্তিতে ভক্তি জাগে, মহাপাপ ক্ষয় হয় এবং অসামান্য ফল লাভ হয়। বৈশাখ শুক্ল চতুর্দশীতে ব্রত পালনের বিধান, শুভ যোগ-নক্ষত্র, স্নান, মণ্ডল-কলশ স্থাপন, লক্ষ্মীসহ স্বর্ণ নৃসিংহ প্রতিষ্ঠা, পঞ্চামৃত অভিষেক, ষোড়শোপচার পূজা, রাত্রিজাগরণ, পুরাণপাঠ, বৈষ্ণব শ্রাদ্ধ এবং দান-দক্ষিণার নিয়ম বিস্তারিতভাবে নির্দেশিত। পশ্চিমে সিন্ধু-তীরবর্তী মৌলিস্থান তীর্থকে এই ব্রতের বিশেষ ক্ষেত্র বলা হয়েছে; হারীত ও লীলাবতীর দীর্ঘ তপস্যায় সেখানে নৃসিংহের স্থায়ী সান্নিধ্য প্রতিষ্ঠিত। শ্রবণ, পাঠ ও ব্রতাচরণে মুক্তিলাভের ফলশ্রুতি দিয়ে অধ্যায় সমাপ্ত।

Adhyaya 175

Gītā Māhātmya: The Suśarmā Narrative and the Merit of Reciting the First Chapter

পার্বতী ভগবদ্গীতার মাহাত্ম্য জানতে চান। তখন মহাদেব প্রাচীন বিষ্ণু–লক্ষ্মী সংলাপ বর্ণনা করেন। লক্ষ্মী জিজ্ঞাসা করেন, বিষ্ণু কেন ক্ষীরসাগরে শয়ন করেন; বিষ্ণু বলেন—তিনি অন্তর্মুখী সমাধিতে নিজের মাহেশ্বর-রূপ দর্শন করেন এবং দ্বৈততা ও ধারণার চরম সীমা অতিক্রম করে আত্মতত্ত্বের উপদেশ দেন। এরপর গীতাকে ব্যাসদেবের দ্বারা বেদ-শাস্ত্রসমুদ্র মন্থন করে আহৃত সার বলা হয়েছে—অষ্টাদশ অধ্যায়ের এক দিব্য ‘দেহ’, যার বাক্য সংসার-পাশ ছিন্ন করে। ফলশ্রুতিতে বলা হয়, আংশিক অধ্যয়নও মহাপুণ্যদায়ক; সুশর্মার পতন, বহু জন্মান্তর এবং শেষে গীতার প্রথম অধ্যায় শ্রবণ/পাঠে শুদ্ধ হয়ে গৃহস্থেরও সহজলভ্য মুক্তির দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে।

Adhyaya 176

Gītā Māhātmya: The Greatness of the Second Chapter (The Tale of Ajāpāla/Mitravān and Devaśarman)

গীতা-মাহাত্ম্যে দেবশর্মা নামক কর্মকাণ্ডে পারদর্শী ব্রাহ্মণ কেবল যজ্ঞ-যাগ দ্বারা চূড়ান্ত শান্তি না পেয়ে মোক্ষের সন্ধান করেন। সন্ন্যাসী মুক্তকর্মা তাঁকে গোপাল-আচার্য ও আত্মজ্ঞानी মিত্রবান (অজাপাল)-এর কাছে নিয়ে যান; সেখানে তিনি উপদেশ লাভ করেন। মিত্রবান কর্মফল-নির্ভর এক অন্তর্কথা শোনান—রাজসদৃশ এক পতিত ব্যক্তি নরকভোগ করে পুনর্জন্ম পায়; এক নারী দাকিনী-ভাব প্রাপ্ত হয়ে অধঃপতিত হয় এবং পরে ছাগলরূপে জন্মায়; এক হিংস্র পুরুষ ব্যাঘ্র/দ্বীপী রূপে জন্মগ্রহণ করে। ত্র্যম্বকের লিঙ্গস্থিত বনাশ্রমে শিকারী ও শিকারের বৈরিতা প্রশমিত হয়; কারণ জানতে তারা প্রশ্ন করে। কপি বলে—এক তপস্বী শিলায় ভগবদ্গীতা লিখে নিয়মসহ পাঠের বিধান দেন, বিশেষত দ্বিতীয় অধ্যায়ের; তাতে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ভয় ও দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে গভীর প্রশান্তি জন্মায়। দেবশর্মা সেই অনুশাসন পালন করে পরম, পুনরাবর্তনহীন অবস্থায় উপনীত হন।

Adhyaya 177

The Glory of the Gītā: The Saving Power of Reciting Chapter Three

এই অধ্যায়ে গীতা-মাহাত্ম্যের অন্তর্গত তৃতীয় অধ্যায় পাঠের উদ্ধারশক্তি বর্ণিত। জড় নামের এক ব্রাহ্মণ স্বধর্ম ত্যাগ করে পরস্ত্রীগমন, জুয়া, মদ্যপান, শিকার ও চৌর্য প্রভৃতি পাপে লিপ্ত হয়। শেষে দুষ্টদের হাতে নিহত হয়ে মৃত্যুর পর ভয়ংকর প্রেতাবস্থায় দুঃখ ভোগ করে। তার বেদজ্ঞ ধার্মিক পুত্র পিতাকে খুঁজতে বারাণসীর দিকে যাত্রা করে; কিন্তু যে বৃক্ষতলে পিতার মৃত্যু হয়েছিল, সেখানেই সন্ধ্যা করে ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায় পাঠ করে। তখন এক আশ্চর্য ও ভীতিকর দিব্য লক্ষণ দেখা দেয়, এবং পিতা দীপ্তিমান বিমানে আবির্ভূত হয়ে জানায়—গীতা-পাঠের সান্নিধ্য মাত্রেই আমার বন্ধন ছিন্ন হয়ে মুক্তি লাভ হয়েছে। পিতা পুত্রকে শ্রাদ্ধাদি কর্ম করতে ও নরকে পতিত আত্মীয়দের উদ্দেশ্যে পুণ্য-সংক্রমণ করতে উপদেশ দেয়। পরে যম প্রভৃতি বিষ্ণুর স্তব করেন; মধুসূদন যমকে নিজ নির্ধারিত কর্তব্য পালন করতে আদেশ দেন, আর গীতা ও পুণ্যদান-সংযোগে বহু জীবের মুক্তির কথা প্রসারিত হয়।

Adhyaya 178

Gītā-māhātmya: The ‘Sin-Cutting’ Tīrtha and the Badarī Curse Narrative (Chapter 178)

এই অধ্যায়ে গীতা-মাহাত্ম্যের ধারাবাহিকতায় ‘চতুর্থ ব্রত’ বলা হয়েছে—শ্রদ্ধাভরে স্মরণ ও পাঠ, যার ফলে অধঃপতিত অবস্থাতেও মুক্তি ঘটে এবং বদরী (কুল/বরই) বৃক্ষত্বের মতো হীন দশা থেকে উদ্ধার পেয়ে স্বর্গারোহণ লাভ হয়। বারাণসীতে বিশ্বেশ্বরের নিকটে সংযমী ভরতকে কেন্দ্র করে একটি দৃষ্টান্ত-কথা আসে। গঙ্গাতীরে শাপে বদরী-বৃক্ষ হয়ে থাকা দুই সত্তার প্রসঙ্গে দেখানো হয় যে গীতার স্মরণ-পাঠ শাপমোচন ও উন্নতির কারণ। এরপর গোদাবরীর ‘চ্ছিন্নপাপ’ তীর্থে সত্যতপা ঋষির কঠোর ঋতুচর্য তপস্যা বর্ণিত। তাঁর তপোবলে ভীত ইন্দ্র (পুরন্দর) দুই অপ্সরাকে বিঘ্ন করতে পাঠান; তাদের নৃত্যে ক্ষুব্ধ ঋষির শাপে তারা বদরী-বৃক্ষে পরিণত হয়। শেষে বলা হয়—প্রতিদিন ভক্তিভরে গীতা-পাঠ মন শুদ্ধ করে, সমত্ব স্থির করে এবং প্রায়শ্চিত্তরূপে মুক্তির পথে নিয়ে যায়।

Adhyaya 179

The Greatness (Māhātmya) of the Bhagavad Gītā (Chapter 5)

এই অধ্যায়ে ভগবদ্গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের ‘পঞ্চম’ মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। পিঙ্গল নামে এক দ্বিজ বৈদিক কর্তব্য ত্যাগ করে নৃত্য-গীত ও দুষ্কর্মে আসক্ত হয়। তার স্ত্রী অরুণা ক্রোধে তাকে হত্যা করে; উভয়ে নরকে দুঃখ ভোগ করে পরে শকুন ও স্ত্রী-টিয়া পাখি হয়ে জন্মায়। পূর্বশত্রুতার বশে তারা আবার সংঘর্ষে জড়ায় এবং জলের কাছে, মানুষের খুলি-সমূহের মধ্যে, হিংস্র মৃত্যুবরণ করে। বৈবস্বত যম বলেন—মৃত্যুকালে আকস্মিক স্নান থেকেও অপ্রত্যাশিত পুণ্য উৎপন্ন হয়েছিল, যা তাদের পাপক্ষয় করে ইষ্টলোকলাভের যোগ্যতা দেয়। কারণ জিজ্ঞাসা করলে যম জানান, গঙ্গাতীরে বুদ্ধ্বা নামক এক সন্ন্যাসী সর্বদা গীতার পঞ্চম অধ্যায় পাঠ করতেন; সেই পাঠের পবিত্রতা খুলি-পাত্রের জলের স্পর্শের মাধ্যমে তাদের শুদ্ধ করে। এরপর তারা দিব্য রথে পরম বৈষ্ণব ধামে আরোহণ করে—গীতার পঞ্চম অধ্যায় যে সঞ্চিত পাপেরও ঊর্ধ্বে শোধনকারী, তা এই দৃষ্টান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়।

Adhyaya 180

Glory of the Bhagavad Gītā, Chapter 6 (Dhyāna-yoga)

উত্তরখণ্ডের এই অধ্যায়ে (৬.১৮০) ভগবদ্গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়—ধ্যানযোগের—মোক্ষদায়িনী মহিমা ঘোষিত হয়েছে। কাহিনি গোদাবরীতীরে প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে তীর্থযাত্রার ধারায় কাশী-विश्वেশ্বর, গয়া-গদাধর, কেদার, দ্বারকা, সোমনাথ, অবন্তিকা-মহাকাল, ওংকার, শ্রীশৈল-মল্লিনাথ, বিট্ঠল, ব্রহ্মগিরি-ত্র্যম্বক, মথুরা এবং কাশ্মীরের মাণিক্যেশ্বর পর্যন্ত বিস্তৃত। এরপর দৃষ্টান্তে হংসেরা রাজা জ্ঞানশ্রুতির তেজকে ঋষি রৈক্যের তেজের তুলনায় তুচ্ছ বলে। রাজা সারথিকে পাঠিয়ে রৈক্যকে খুঁজে আনেন, দান-উপহার দেন, কিন্তু তিরস্কৃত হয়ে বিনীতভাবে তাঁর মহিমার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। রৈক্য জানান—প্রতিদিন গীতার ষষ্ঠ অধ্যায় পাঠই তাঁর অসহনীয় তেজের উৎস; রাজাও তা শিখে পাঠ করেন, এবং এই এক অধ্যায়ের নিত্যপাঠকেও মুক্তি নিশ্চিত বলা হয়েছে।

Adhyaya 181

The Glory of the Bhagavad Gītā’s Seventh Chapter

এই অধ্যায়ে ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের মহিমা অমৃতসম শ্রবণীয় বলে বর্ণিত। পাটলিপুত্রের ব্রাহ্মণ শঙ্কুকর্ণ ধনলোভে পিতৃশ্রাদ্ধ ও দেবকর্ম অবহেলা করে কেবল সম্পদ সঞ্চয়ে মগ্ন থাকে। সাপের দংশনে তার মৃত্যু হয় এবং সে গোপন ধনের রক্ষক সর্পরূপে পুনর্জন্ম লাভ করে। স্বপ্নসংকেত ও মুখোমুখি কথোপকথনে পুত্রেরা সত্য জানতে পারে; কেউ লোভে আক্রমণ করতে চায়, আর কেউ পিতৃভক্তিতে মুক্তির উপায় খোঁজে। সর্পরূপ শঙ্কুকর্ণ বলে—সাধারণ তীর্থসেবা, দান, তপস্যা বা যজ্ঞে তার বন্ধন কাটে না। মুক্তির পথ হলো গীতার সপ্তম অধ্যায়ের সম্মান—বিশেষত নিজের শ্রাদ্ধদিনে শ্রদ্ধাভরে ‘সপ্তাধ্যায়ী-বিদ্’ (সাত অধ্যায়ে পারদর্শী) ব্রাহ্মণকে ভোজন করিয়ে যথোচিত সৎকার করা। পুত্রেরা তা পালন করলে শঙ্কুকর্ণ দিব্যরূপ লাভ করে মুক্ত হয়, এবং ধন ধর্মকার্য ও জনকল্যাণে ব্যয়িত হয়।

Adhyaya 182

Mahatmya of the Gita’s Eighth Chapter: Liberation through Hearing Half a Verse

শিব পার্বতীকে ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের মাহাত্ম্য বলেন—যা পরম আনন্দ ও মোক্ষদায়িনী। আমর্দক নগরে এক পাপিনী বারাঙ্গনা-রক্ষিকা মৃত্যুর পরে তালগাছ হয়ে জন্মায়। তার নিকটে এক দম্পতি ব্রহ্ম-রাক্ষস রূপে দুঃখ ভোগ করে মুক্তির উপায় প্রার্থনা করে। তাদের পূর্বকথায় আছে—দিবজ নামের তাঁতি ও তার লোভিনী স্ত্রী কুমতি; সামান্য দানও না দেওয়ার ফলে মৃত্যুর পরে তারা ভয়ংকর যন্ত্রণা পায়। কুমতি যখন ব্রহ্ম, অধ্যাত্ম ও কর্ম বিষয়ে প্রশ্ন করে, তখন সেই তালগাছ গীতার অষ্টম অধ্যায়ের মাত্র অর্ধশ্লোক শ্রবণ করেই বৃক্ষদেহ ত্যাগ করে ব্রাহ্মণরূপ লাভ করে; আর ব্রহ্ম-রাক্ষস দম্পতিও মুক্তি পায়। দেবদুন্দুভি, পুষ্পবৃষ্টি ও বিমানে আরোহনের মতো স্বর্গীয় লক্ষণ দেখা যায়। পরে কাশীতে ভাবশর্মার তপস্যা ও অর্ধশ্লোক জপে শিব প্রসন্ন হন; বিষ্ণুর অনুগ্রহে সে ও তার বংশ স্থায়ী সুখ লাভ করে—একে অষ্টম অধ্যায়ের শক্তির সামান্য অংশমাত্র বলা হয়েছে।

Adhyaya 183

The Greatness of the Bhagavad Gītā (Chapter 9)

শ্রীমহাদেব হিমালয়কন্যা পার্বতীকে ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের মহিমা উপদেশ দিতে আরম্ভ করেন। এরপর কাহিনি মাহিষ্মতীতে গিয়ে পৌঁছায়, যেখানে শৈব ব্রাহ্মণ মাধব যজ্ঞে একটি ছাগ বলি দিতে উদ্যত। ছাগটি কথা বলে উঠে বলির ফলপ্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং কর্ম-কারণ ব্যাখ্যা করে—পূর্বজন্মে সে শাস্ত্রজ্ঞ যাজক ছিল, কিন্তু চণ্ডিকা-উপাসনার সঙ্গে যুক্ত অশাস্ত্রীয় হত্যাকর্মে অভিশপ্ত হয়ে বানর, কুকুর, ঘোড়া হয়ে শেষে ছাগরূপে জন্ম নিয়েছে। তারপর সে কুরুক্ষেত্রে সূর্যগ্রহণকালে আরেক দৃষ্টান্ত বলে—এক রাজার মহাদানে কালপুরুষ প্রকাশিত হলে পাপ চাণ্ডালরূপে দেহধারণ করে এক ব্রাহ্মণকে আঁকড়ে ধরে। সেই ব্রাহ্মণ অন্তরে গীতার নবম অধ্যায় জপ করলে পাপমুক্ত হয়। অধ্যায়ের উপসংহার—প্রতিদিন নবম অধ্যায় পাঠ করলে কুদানজনিত বিপদ অতিক্রম হয় এবং মুক্তিলাভ ঘটে।

Adhyaya 184

The Greatness of the Bhagavad-gītā (Supremacy of the Tenth Chapter: Vibhūti Yoga)

অধ্যায় ১৮৪-এ গীতা-মাহাত্ম্য আরও বিস্তৃত হয়ে বলা হয়েছে—ভগবদ্গীতা বেদের ‘প্রাণ’, আর তার দশম অধ্যায় ‘বিভূতি-যোগ’ সর্বশ্রেষ্ঠ। শিব–পার্বতীর প্রশ্নোত্তর এবং উত্তরখণ্ডের বহুস্তরীয় কাহিনি-প্রবাহে কাশীর মোক্ষসীমার মধ্যে কেন এই জ্ঞান গোপন ও সংরক্ষিত থাকে, তা প্রকাশ পায়। কাশীতে ‘ধীরা-ধীরা’ নামে সিদ্ধ ব্রাহ্মণ বৈরাগ্য ও জ্ঞাননিষ্ঠ জীবনের আদর্শ দেখান; প্রথম-পুরুষ বর্ণনায় ভৃঙ্গিরিটি-সংক্রান্ত সাক্ষাৎকারগুলি সেই রহস্যকে উন্মোচিত করে। এরপর ব্রহ্মার হংস-রূপ খগ এসে পদ্ম নিবেদন করে মহাদেবের স্তোত্র পাঠ করে এবং অপরাধজনিত অন্ধকার-পতনের কথা জানায়। তখন পদ্মকন্যা পঞ্চপদ্মা/পদ্মিনী কর্মকারণের বিধান ব্যাখ্যা করে বলেন—গীতার দশম অধ্যায় শ্রবণ ও পাঠ করলে পাপ নাশ হয়, মহাপতিতেরও মুক্তি ঘটে এবং জীবন্মুক্তি লাভ হয়। শেষে এই শ্রবণ-ফল সকল নারী-পুরুষ ও সকল আশ্রম-অবস্থার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য বলে উপসংহার টানা হয়েছে।

Adhyaya 185

Gītā-Māhātmya and the Glory of Ekādaśī: The Liberating Power of the Viśvarūpa Chapter

দেবীর প্রশ্নের উত্তরে মহাদেব একাদশী ও ভগবদ্গীতার বিশ্বরূপ-অধ্যায়ের মাহাত্ম্য থেকে নির্বাচিত এক কাহিনি সংক্ষেপে বলেন। প্রণীতা নদীর তীরে মেঘঙ্কর অঞ্চলে বিষ্ণুর সান্নিধ্য এবং নিকটবর্তী মেখলা, নরসিংহ ও গণেশ তীর্থের প্রশংসা বর্ণিত হয়। সেখানে বাসুদেবভক্ত ব্রাহ্মণ-যোগী সুনন্দ গীতার একাদশ অধ্যায় পাঠ করে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন। তীর্থযাত্রায় তিনি এমন এক গ্রামে পৌঁছান, যেখানে করুণা-ভঙ্গজনিত শাপে জন্ম নেওয়া নরভক্ষক রাক্ষস লোকজনকে গিলে খাচ্ছিল। বিশ্বরূপ-অধ্যায়/মন্ত্রে জল অভিমন্ত্রিত করে রাক্ষসের উপর ছিটালে রাক্ষস ও তার গিলে খাওয়া অসংখ্য যাত্রী মুক্তি পায় এবং সকলেই চতুর্ভুজ বৈষ্ণব রূপ ধারণ করে। শেষে স্পষ্ট করা হয়—একাদশীর পুণ্য, বিশ্বরূপ-অধ্যায়ের শ্রবণ-পাঠ এবং সাধুসঙ্গের দ্বারা এই ফল লাভ হয়; ভক্তরা বিষ্ণুর পরম ধামে আরোহন করে।

Adhyaya 186

The Glory of the Bhagavad Gītā (Kolhāpura–Mahālakṣmī Narrative)

এই অধ্যায়ে কোলহাপুরকে পরম শক্তিপীঠ রূপে মহিমা করা হয়েছে—যেখানে ভোগ ও মোক্ষ উভয়ই লাভ হয়; নগরের ঐশ্বর্য ও ধর্মপরায়ণ জনজীবনের বর্ণনাও আছে। রাজা বৃহদ্রথের এক পুত্র রাজকুমার শ্রীমহালক্ষ্মীর দর্শনে এসে স্নান, পিতৃতর্পণ প্রভৃতি করে, তারপর দীর্ঘ শক্তিস্তব পাঠ করে—যেখানে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়তত্ত্ব, যোগের অন্তর্লীন সাধনা (চক্র, নাদ-বিন্দু-কলা) এবং দেবীর বহুরূপতা একত্রে প্রকাশিত। দেবী প্রসন্ন হয়ে তাকে ‘সিদ্ধ-সমাধি’ নামক ব্রাহ্মণ সিদ্ধের কাছে পাঠান। সেই সিদ্ধ দেবতাদের বাধ্য করে চুরি যাওয়া অশ্বমেধের অশ্ব ফিরিয়ে আনেন এবং উত্তপ্ত তেলে শুকিয়ে যাওয়া দেহধারী রাজা বৃহদ্রথকে পুনর্জীবিত করেন। নিজের শক্তির উৎস জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেন—ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের অবিরাম পাঠই তাঁর সিদ্ধির কারণ; এভাবে ভক্তিপাঠকে সিদ্ধি ও মোক্ষের প্রত্যক্ষ উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

Adhyaya 187

Gītā-māhātmya: The Glory of the Thirteenth Chapter (A Harihara-pura Exemplum of Fall and Release)

দেবী ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য জানতে চান। মহাদেব তার ‘সমুদ্রসম’ গৌরব বর্ণনা করতে সম্মত হন। কাহিনিতে তুঙ্গভদ্রা-তীরে হরিহরপুরের একটি নীতিদৃষ্টান্ত আসে—ব্রাহ্মণ হরিদীক্ষিত ও তার স্ত্রী দুরাচারা, যে নিত্য অপরাধ, মদ্যপান ও কুকর্মে আসক্ত হয়ে রাতে ক্রীড়াবনে যায়। বসন্তের চাঁদের আলোয় কামমোহ, বিভ্রম এবং বিচ্ছেদ-বিলাপের দৃশ্য গড়ে ওঠে। সেখানে সে এক বাঘের মুখোমুখি হয়; বাঘটি নিজের পূর্ব মানবজন্মের পতনের কথা স্বীকার করে—লোভ, অনুচিত পুরোহিত-ব্যবসা ও শোষণমূলক আচরণের ফলে সে বাঘযোনি লাভ করে পাপীদের ভক্ষণকারী হয়েছে। দুরাচারা নিহত হয়ে যমলোকে নীত হয়, দীর্ঘকাল নরকযন্ত্রণা ভোগ করে নিম্ন যোনিতে পতিত হয়। শেষে পুণ্যসান্নিধ্য এবং গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায় বারবার শ্রবণ-পাঠের দ্বারা তার মুক্তি ঘটে; চাণ্ডালদেহ থেকে মুক্ত হয়ে সে দিব্য গতি লাভ করে।

Adhyaya 188

The Greatness of the Gītā (Liberation through Recitation and Contact-Merit)

অধ্যায়ের শুরুতে মহাদেব ভবানীকে বলেন—তিনি আরও মোক্ষদায়ক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করবেন; তাই ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায় শ্রদ্ধায় শ্রবণ করতে হবে। এরপর কাহিনি কাশ্মীরদেশে, সরস্বতীর সঙ্গে যুক্ত শুদ্ধ বাক্‌প্রসিদ্ধ অঞ্চলে প্রবেশ করে। সেখানে বন্ধুত্বে আবদ্ধ দুই রাজা শিকারের ছলে এক কুকুরী ও এক খরগোশকে নিয়ে বাজি ধরে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার নাটকীয় ঘটনায় কুকুরী ও খরগোশ এমন কাদা/জলের স্পর্শ পায়, যা গীতার চতুর্দশ অধ্যায় নিত্য পাঠকারী ব্রাহ্মণ বৎসের পদপ্রক্ষালন থেকে উৎপন্ন। সেই স্পর্শ-পুণ্যে তারা নীচ জন্ম ত্যাগ করে দিব্য রথে স্বর্গে গমন করে। বৎসের শিষ্য (ঘটনায় স্বকন্ধর নামে পরিচিত) রাজাকে তাদের কর্মফল ব্যাখ্যা করে—জুয়াড়ি ব্রাহ্মণের পাপ, পরস্ত্রীগমন ও হিংসা; জন্মান্তরে বৈর চলতে থাকে, কিন্তু পবিত্র গীতাপাঠের সঙ্গ ও সংস্পর্শে তা ক্ষয় হয়। শেষে রাজাও বিশ্বাসসহ গীতা অধ্যয়ন করে পরম পদ লাভ করে।

Adhyaya 189

The Greatness of the Bhagavad Gītā (Chapter 15 Emphasis)

মহাদেব পার্বতীকে ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের মহিমা ঘোষণা করেন। এরপর এক অন্তর্নিহিত কাহিনি—গৌড়দেশে নরসিংহ ‘কৃপালু’ নামে এক রাজা যুদ্ধবৈভব ও প্রতাপে রাজত্ব করতেন। সরভ-ভেরুণ্ড নামে এক নিষ্ঠুর যোদ্ধা রাজহত্যা করে; পরে রোগে মরে সে সিন্ধুদেশে কৃশোদর ঘোড়া হয়ে জন্মায়। সেই ঘোড়া কিনে রাজাকে উপহার দেওয়া হয়। বনে শিকারে গেলে বাতাসে ভেসে আসা গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের এক অর্ধশ্লোক রাজার কাছে পড়ে; রাজা তা উচ্চস্বরে পাঠ করেন। সেই অক্ষরধ্বনি শুনেই ঘোড়াটি তৎক্ষণাৎ মুক্তি লাভ করে প্রাণত্যাগ করে, আর সরভ-ভেরুণ্ড প্রকাশ পেয়ে কথা বলে স্বর্গে আরোহন করে। রাজা আশ্রমের ব্রাহ্মণের কাছে কারণ জানতে চাইলে তিনি পূর্বকর্ম ও গীতা-শ্রবণের উদ্ধারশক্তি ব্যাখ্যা করেন। রাজা মঙ্গলকর্ম সম্পন্ন করে পুত্রকে রাজ্যে স্থাপন করেন এবং শেষে নিজেও মোক্ষ লাভ করেন।

Adhyaya 190

The Glory of the Bhagavad Gītā (Greatness of the Sixteen Chapters)

মহাদেব পার্বতীকে জানান যে তিনি ভগবদ্গীতার ষোলোটি অধ্যায়ের মহিমা ব্যাখ্যা করবেন। এরপর কাহিনি গুর্জর দেশে সौरাষ্ট্রিক নগরে গিয়ে পৌঁছায়, যেখানে কাব্যিক অলংকারে প্রশংসিত রাজা খঙ্গবাহু রাজত্ব করেন। সেখানে দন্তাবল/অরিমর্দন নামে এক মত্ত হাতি শৃঙ্খল ছিঁড়ে লোকজনকে পদদলিত করে ভয়ংকর আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঠিক তখনই এক ব্রাহ্মণ গীতার ষোলো অধ্যায়ের শ্লোক—বিশেষত ষোড়শ অধ্যায়-সম্পর্কিত—মৃদু স্বরে জপ করতে করতে নির্বিঘ্নে চলে যায়; রাজা এই বিস্ময় দেখে কারণ জিজ্ঞাসা করেন। ব্রাহ্মণ বলেন, প্রতিদিন গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের কয়েকটি শ্লোক পাঠ করলে সিদ্ধি ও রক্ষা লাভ হয়। রাজা তাঁকে সম্মান করে বিপুল দান দেন, গীতা-মন্ত্র/শ্লোক গ্রহণ করে অনুশীলন করেন; পরে তিনি নির্ভয়ে হাতির সম্মুখীন হয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং যুবরাজের অভিষেক সম্পন্ন করেন। শেষে বলা হয়, ষোড়শ অধ্যায়ের প্রভাবে তিনি পরম গতি—মোক্ষ—লাভ করেন।

Adhyaya 191

Glory of the Seventeenth Chapter of the Bhagavad Gītā (Duhshasana’s Liberation as an Elephant)

ঈশ্বর (শিব) পার্বতীকে ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের “সমুদ্রসম” মহিমা জানান এবং তাঁর অনুরোধে একটি দৃষ্টান্ত বলেন। মূঢ় ও অহংকারী দুঃশাসন ক্রুদ্ধ হাতির সঙ্গে জড়িত এক দুর্ঘটনায় হিংস্রভাবে মৃত্যুবরণ করে; বাসনা-সংস্কারের ফলে সে হাতির যোনিতে জন্ম নিয়ে পরে রাজপরিবারের সংস্পর্শে আসে (সিংহল/মালব প্রসঙ্গ)। ভয়ংকর রোগে আক্রান্ত সেই হাতি বলে—ঔষধ, দান বা সাধারণ মন্ত্রজপ যথেষ্ট নয়; কেবল যোগ্য ব্রাহ্মণের দ্বারা নিয়মিত গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের জপ-পাঠেই শান্তি হবে। রাজা নরবর্মা তা করালে দুঃশাসন হাতিদেহ ত্যাগ করে দিব্য বিমানে দীপ্তিমান হয়ে প্রকাশ পায় এবং নিজের কর্মফল-কথা জানায়। শেষে বলা হয়—সপ্তদশ অধ্যায় বারংবার জপ করলে নরবর্মার দ্রুত মুক্তি লাভ হয়; গীতা-জপকে সরাসরি মোক্ষসাধন রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

Adhyaya 192

Glory of the Bhagavad Gītā (Greatness of the Eighteen Chapters; Five Gītā Verses as Crest-Jewel of Merit)

পার্বতী শিবকে অনুরোধ করেন—ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়সমূহের, বিশেষত অষ্টাদশ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য প্রকাশ করতে। শিব বলেন, গীতা শাস্ত্রসার—অজ্ঞান ও ত্রিবিধ তাপ নাশ করে, যমদূতদের দমন করে এবং রোগশমনী। তিনি উপমার দ্বারা গীতার শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপন করেন—যেমন রসের মধ্যে অমৃত, তীর্থের মধ্যে পুষ্কর, তেমনি গ্রন্থসমূহের মধ্যে গীতা সর্বোত্তম। এরপর ইন্দ্রের উপাখ্যান। ইন্দ্র এক “নতুন ইন্দ্র”কে দেখে দুঃখ করে যে ধর্মকর্ম ও তীর্থযাত্রা অবহেলা করেছে, এবং বিষ্ণুর শরণ নেয়। বিষ্ণু জানান—অষ্টাদশ অধ্যায়ে অবস্থিত গীতার পাঁচটি শ্লোক পাঠ/জপ পরম পুণ্য-শিরোমণি; তাতে ইন্দ্রত্ব ও মোক্ষ লাভ হয়। ইন্দ্র গোদাবরী তীরে এক ব্রাহ্মণকে পায়, যিনি গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়সমূহ নিয়মিত পাঠ করেন; সেই পুণ্যের প্রভাবে ইন্দ্র বিষ্ণু-সায়ুজ্য লাভ করে। শেষে বলা হয়—এই মাহাত্ম্য শ্রবণ করলে সর্বপাপ নাশ হয় এবং সকল যজ্ঞের ফল প্রাপ্ত হয়।

Adhyaya 193

The Greatness of the Śrīmad Bhāgavata (Bhāgavata Māhātmya)

এই অধ্যায়ে শ্রীমদ্ভাগবতকে সর্বোচ্চ পুরাণ এবং কলিযুগের পরিত্রাণ-উপায় রূপে মহিমা করা হয়েছে। শিব-পার্বতী সংলাপ ও নৈমিষারণ্যে সূত-শৌনক সংলাপের স্তরিত বর্ণনায় শ্রোতারা ভাগবতের মহিমা, তার পরম্পরা-উৎপত্তি এবং ভক্তি থেকে বিবেক, জ্ঞান ও বৈরাগ্য কীভাবে জন্মায়—তা জানতে চান। বলা হয়, ভাগবত শ্রবণ-পাঠনে হরিধাম লাভ হয়; বর্ষব্যাপী, মাসব্যাপী এবং বিশেষত সাতদিনের ‘ভাগবত-সপ্তাহ’ মুক্তিদায়ক। অন্তর্কথায় নারদ কলির অবক্ষয়ে ব্যথিত হয়ে বৃন্দাবনে এসে ভক্তিকে যুবতী রূপে দেখেন; কিন্তু তার পুত্র জ্ঞান ও বৈরাগ্য জরা-জীর্ণ ও নিষ্ক্রিয়। বৃন্দাবনের প্রভাবে ভক্তি নবীন হয়, কিন্তু পুত্রদ্বয় তেমন জাগে না; তখন কলিকে কেন সহ্য করা হয় এবং পুনরুদ্ধার কীভাবে ঘটে—এই প্রশ্ন ওঠে। উত্তরে কেশব-সংকীর্তন ও ভাগবত-কথার প্রচারকেই প্রধান পথ বলা হয়েছে, যার দ্বারা ভক্তি বিস্তার লাভ করে এবং জ্ঞান-বৈরাগ্য পুনর্জাগ্রত হয়।

Adhyaya 194

The Greatness of the Śrīmad Bhāgavata

এই অধ্যায়ে কলিযুগের দোষ ও তার প্রতিকার পুরাণীয় বহুস্তরীয় সংলাপে প্রকাশিত। সূত কাহিনির সূত্র ধরেন; অন্তর্কথায় নারদ, সনকাদি কুমারগণ এবং দিব্য ‘ব্যোমবাণী’ পথনির্দেশ করেন। এখানে ভক্তিকে শ্রীকৃষ্ণের সর্বাধিক প্রিয় শক্তি ও কলিতে মুক্তির একমাত্র কার্যকর উপায় বলা হয়েছে; ভক্তিহীন জ্ঞান, কর্ম, তপস্যা ও কেবল বৈদিক অধ্যয়নকে অপর্যাপ্ত প্রতিপন্ন করা হয়। মুক্তিকে জ্ঞান ও বৈরাগ্যের জননী রূপে দেখানো হয়েছে, যিনি পাষণ্ডতা ও অবহেলায় কলিতে ক্ষীণ হয়ে পড়েন; বেদ-বিদান্ত ও গীতা-পাঠে তাঁদের জাগানোর চেষ্টা কলিদোষে সম্পূর্ণ সফল হয় না। তখন ব্যোমবাণী এক গোপন ‘ধর্মকর্ম’-এর ইঙ্গিত দেয়; নারদ কুমারদের নিকট গমন করলে তাঁরা প্রতিকার বলেন—‘জ্ঞানযজ্ঞ’, যা বিশেষত শ্রীমদ্ভাগবত-কথা শ্রবণ ও প্রবচনরূপে সিদ্ধ। শ্রীমদ্ভাগবতকে বেদ-উপনিষদের সাররস, কলিদোষনাশক এবং সর্বগৃহে ভক্তি-জ্ঞান-বৈরাগ্য বিকাশকারী বলে মহিমা কীর্তন করা হয়েছে।

Adhyaya 195

Bhāgavata Māhātmya: The Jñāna-Yajña at Gaṅgādvāra and the Seven-Day Bhāgavata Hearing

এই অধ্যায়ে কলিযুগে সর্বসাধ্য সাধনা হিসেবে ভাগবত-সপ্তাহ (সাতদিনের শ্রবণ)–এর বিধি ও মুক্তিদায়ক কারণ বর্ণিত। নারদ শ্রীশুকের উপদেশে দীপ্ত ‘জ্ঞান-যজ্ঞ’ সম্পাদনের সংকল্প করেন—ভক্তি, জ্ঞান ও বৈরাগ্য লাভের জন্য। কুমারগণ তাঁকে গঙ্গাদ্বারের নিকট পবিত্র নদীতীরে যজ্ঞ স্থাপন করতে বলেন; সেই ক্ষেত্র-মাহাত্ম্যে হৃদয় কোমল হয় এবং শত্রুতা প্রশমিত হয়। সেখানে ঋষি, শাস্ত্র, তীর্থ ও নানা লোকের জীবসমূহ মিলিত হয়ে এক মহাসভা গঠন করে এবং যজ্ঞ-তীর্থের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ভাগবতের মহিমা ঘোষণা করে। ভাগবতকে দ্বাদশ স্কন্ধযুক্ত ও অষ্টাদশ সহস্র শ্লোকসমৃদ্ধ বলা হয়েছে; নিত্যপাঠ প্রশংসিত, আর স্বল্পায়ু ও দুর্বল কলিযুগীয়দের জন্য সাতদিনের শ্রবণকে সর্বোত্তম ও সহজ সাধন বলা হয়েছে। উদ্ধব–কৃষ্ণ প্রসঙ্গে গ্রন্থের প্রামাণ্য প্রতিষ্ঠিত—শ্রীকৃষ্ণ নিজের তেজ ভাগবতে স্থাপন করে তাকে হরির বাণীমূর্তি করেন। কথার আরম্ভে ভক্তি স্বয়ং প্রকাশিত হয়ে কৃষ্ণকথায় নবযৌবনা হয় এবং আশ্রয় প্রার্থনা করে; কুমারগণ তাকে দয়ালু গোবিন্দভক্তদের মধ্যে বাস করতে বলেন, যেখানে মনোনিগ্রহ ও হরিতে একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।

Adhyaya 196

Greatness of the Seven-Day Sacred Narration (Saptāha): The Beginning of the Ātmadeva–Dhuṃdhulī–Gokarṇa Narrative

অধ্যায়ের শুরুতে বৈষ্ণব ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে ভগবান হরির অবতরণ ও উৎসবময় পরিবেশের বর্ণনা আছে, যা কলিযুগের অমঙ্গল দূর করে। লোকের বিস্মৃতি দেখে নারদ কুমারদের জিজ্ঞাসা করেন—কলিযুগে শুদ্ধির উপায় কী এবং সাত দিনের হরিকথা-শ্রবণরূপ ‘সপ্তাহ-যজ্ঞ’ কীভাবে সকলকে পবিত্র করে। কুমাররা বলেন, সপ্তাহ সর্বজনীন পবিত্রকারী—ঘোর পাপীরও পাপ নাশ করে এবং ভক্তি বৃদ্ধি করে। এরপর তুঙ্গভদ্রা তীরে প্রাচীন কাহিনি শুরু হয়—নিঃসন্তান ব্রাহ্মণ আত্মদেব ও কলহপ্রিয়া স্ত্রী ধুন্ধুলী। এক সিদ্ধ যোগী সাত জন্ম পর্যন্ত পুত্রলাভ হবে না বলে জানান, তবু ব্রতসহ একটি ফল দেন। ধুন্ধুলী ছল করে গর্ভধারণ এড়িয়ে যায়; ফলে দুষ্ট পুত্র ধুন্ধুকারী এবং দিব্য বৎসরূপ পুত্র গোকর্ণ জন্মায়। ধুন্ধুকারী সংসার নষ্ট করে; গোকর্ণ বৈরাগ্য ও ভক্তির উপদেশ দেন। শেষে আত্মদেব বনবাসে গিয়ে হরিধাম লাভ করেন।

Adhyaya 197

Liberation of Dhundhukārī the Preta: Glory of the Seven-Day Bhāgavata Recitation and the Sūrya Hymn

আত্মদেবের প্রয়াণের পরে ধুন্ধুকারী মাকে ভয় দেখিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে, আর সেই আতঙ্কেই মাতার মৃত্যু হয়। গোকর্ণ মাতার প্রেতকর্ম সম্পন্ন করে তীর্থযাত্রায় বের হন এবং গয়ায় শ্রাদ্ধও করেন। ধুন্ধুকারী পাপাচারে লিপ্ত থেকে শেষে বারাঙ্গনাদের হাতে নিহত হয়ে প্রেত হয়; জলহীন অবস্থায় তৃষ্ণা ও যন্ত্রণায় সে কাতর থাকে। সে ফিরে এসে গোকর্ণের সামনে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে নিজের পাপ স্বীকার করে এবং বলে—শুধু গয়া-শ্রাদ্ধে তার মুক্তি হয়নি। গোকর্ণ বিদ্বান ব্রাহ্মণদের সঙ্গে পরামর্শ করেন; তাঁরা সূর্যদেবের স্তব করেন। তখন ভাস্কর উপায় জানান—সাতদিনের শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ (সপ্তাহ) এবং ‘বাঞ্ছা-চিন্তামণি’ স্তোত্র। তুঙ্গভদ্রা নদীতীরে গোকর্ণ সপ্তাহ আয়োজন করলে সপ্তম দিনে ধুন্ধুকারী প্রেতবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে বৈকুণ্ঠে গমন করে। পরে দ্বিতীয় সপ্তাহে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে এবং শ্রোতাসমেত সকলের গোলোকগমন বর্ণিত হয়। এভাবে ভাগবত-কথাশ্রবণকে সর্বজনের মুক্তিদায়ক বলা হয়েছে।

Adhyaya 198

Procedure and Merit of the Seven-Day Śrīmad Bhāgavata Recitation

এই অধ্যায়ে কলিযুগে শ্রীমদ্ভাগবত-সপ্তাহকে যজ্ঞসম পূর্ণ সাধনা রূপে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। শুভ মুহূর্ত, মাস, তিথি, বার, নক্ষত্র নির্বাচন, মণ্ডপ ও আসন-বিন্যাস, বক্তার যোগ্যতা ও সেবাবিধি, এবং গণেশ, দেবী, শিব, বিষ্ণু, ব্রহ্মা, সূর্য পূজার পর গ্রন্থরূপে হরির পূজা করার নিয়ম বলা হয়েছে। প্রতিদিন পাঠের ছন্দ, উপবাস, অক্ষম হলে ন্যূনতম নিবেদন, ব্রত-আহার ও সত্য-শৌচাদি নৈতিক সংযমও নির্দেশিত। পরবর্তী কাহিনিতে শুকদেবের আগমন, কীর্তনের মধ্যে হরির আবির্ভাব ও বরদান প্রদানের বর্ণনা আছে। কুমারগণ কলিযুগে সপ্তাহের বিশেষ ফলপ্রদতা স্তব করেন; ব্যাস–নারদ–শুক–সূত পরম্পরায় ভাগবত-প্রবাহ স্মরণ করিয়ে পুরাণসমূহের মধ্যে ভাগবতের শ্রেষ্ঠত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

Adhyaya 199

Procedure and Theology of Indra’s Sacrifice at the Kāliṇdī (Yamunā) Tīrtha

ঋষিদের অনুরোধে সূত বলেন—সৌভরি যুধিষ্ঠিরকে কালীন্দী (যমুনা)-র মাহাত্ম্য এবং বৈকুণ্ঠ-সম্পর্কিত পরম তীর্থের কথা উপদেশ দিয়েছেন। এরপর কাহিনি কালীন্দী-তীরের মনোরম খাণ্ডব অরণ্যে যায়, যেখানে নারদ ও পর্বতের কাছে রাজা শিবি অরণ্যে দেখা আশ্চর্য যজ্ঞ-লক্ষণ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। নারদ বর্ণনা করেন—নৃসিংহ হিরণ্যকশিপুকে বধ করে ইন্দ্রের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলে শক্র হরিকে সম্মান জানাতে যজ্ঞ করতে চান। বৃহস্পতির নির্দেশে তিনি খাণ্ডব–কালীন্দী তটে মহাযজ্ঞ সম্পন্ন করেন; তখন বিষ্ণু ব্রহ্মা ও শিবসহ উপস্থিত হয়ে যজ্ঞকে অনুগ্রহ করেন। এরপর তত্ত্বকথা প্রকাশ পায়—ত্রিমূর্তির একত্ব, মায়ার দ্বারা বহুত্বের প্রতীতি, এবং ভক্তির সর্বজন-কল্যাণকর শক্তি। শেষে ভক্তিধর্মের নীতি বলা হয়: দেবতাদের নিন্দা না করা, বৈদিক আচরণ মানা, এবং স্বীকৃত ভক্তির প্রকারসমূহ অনুসরণ করা।

Adhyaya 200

The Bhilla and the Lion’s Ascension to Vaikuṇṭha (Indraprastha & Nigamodbodhaka Tīrtha-Māhātmya)

এই অধ্যায়ে ইন্দ্রপ্রস্থকে ‘সর্বতীর্থ’ স্বরূপ পবিত্র ক্ষেত্র বলা হয়েছে। বিষ্ণুর কৃপায় ইন্দ্র বহু যজ্ঞ ও মহাদানের দ্বারা এই অঞ্চলকে পুণ্যময় করেন; এখানে প্রয়াগ, কাশী, শিব-কাঞ্চী, গোকর্ণ, দ্বারকা, কোসল/মধুবন, বদরী, হরিদ্বার, পুষ্কর, নৈমিষ/কালাঞ্জর প্রভৃতি তীর্থের ফল যেন এই ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠিত। শেষে ‘নিগমোদ্বোধক’ তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণিত—যেখানে স্নানে নিগমের বোধ জাগে এবং পূর্বজন্মের স্মৃতি লাভ হয়। পরবর্তীতে ইন্দ্র ব্রাহ্মণরূপে ‘বিষ্ণুশর্মা’ হয়ে অবতীর্ণ হন এবং পিতা ‘শিবশর্মা’র সঙ্গে সংসার ত্যাগ করে সেই তীর্থে গমন করেন; স্নানাদিতে তাঁর পূর্বজন্মস্মৃতি উদিত হয়। সেই স্থানের নিকটে এক ভিল্ল শিকারি ও এক সিংহ মৃত্যুবরণ করলে তীর্থপ্রভাবে তারা দিব্য দেহ লাভ করে; হরির পার্ষদগণ তাদের বৈকুণ্ঠে নিয়ে যান। এতে প্রতিষ্ঠিত হয়—পবিত্র ক্ষেত্রের মহিমা ও ভক্তি জন্মভেদ এবং গুরুতর পাপকেও অতিক্রম করায়।

Adhyaya 201

The Glory of the Kāliṃdī (Yamunā) Tīrtha

এই অধ্যায়ে কালীন্দী (যমুনা) তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে, এই পবিত্র তীর্থের প্রভাবে মহাপাপীও হরিধাম লাভ করতে পারে। তা প্রত্যক্ষ করে এক ব্রাহ্মণ স্নানে প্রবৃত্ত হয়—শৌচ-শুদ্ধি করে ‘অশ্বক্রান্তা’ মন্ত্রে মৃৎতিলক ধারণ করে, হরিস্মরণসহ বারবার অবগাহন করে, গঙ্গা ও সপ্ত পবিত্র পুরীর স্মরণ করে; পরে সন্ধ্যা, তर्पণ এবং বিষ্ণুপূজা সম্পন্ন করে। স্নানের ফলে তার পূর্বজন্মস্মৃতি জাগে এবং অন্তর্নিহিত কাহিনি শুরু হয়—সন্তানহীন বৈশ্য শরভের দুঃখ, ঋষি দেবলের নির্ণয় ও উপদেশ, এবং গৌরীপূজা যথাবিধি সম্পাদনের অপরিহার্যতা। এখানে ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের কর্তৃত্ব ও বিধিভঙ্গের ফল স্পষ্ট করা হয়েছে। শেষে আরও শুদ্ধি-উপদেশরূপে দিলীপ–নন্দিনী উপাখ্যানের ভূমিকা স্থাপিত হয়।

Adhyaya 202

The Glory of Kāliṃdī (Yamunā) — Opening of the Dilīpa Episode (Progeny Obstruction and Remedy)

দেবলা ঋষি ধর্মপরায়ণ কোসলরাজ দিলীপের আশ্চর্য কাহিনি শুরু করেন। দিলীপ দান, যজ্ঞ, পূজা ও জনকল্যাণে সদা নিবিষ্ট, তবু তাঁর সন্তান হয় না। তিনি মনে করেন—সমস্ত ঐশ্বর্য ও সংযম থাকা সত্ত্বেও অপত্যহীনতা এক দুঃখজনক দাগ; পবিত্র তিথিতে ব্রহ্মচর্য পালন করে তিনি রানি সুদক্ষিণার সঙ্গে গুরু বশিষ্ঠের আশ্রমে যান। বশিষ্ঠের আশ্রম শান্তিময়—বেদের ধ্বনি অনুরণিত, আর পশুরাও পরস্পর বৈরহীন। আতিথ্য গ্রহণের পর বশিষ্ঠ কারণ জানান: পূর্বে কামধেনুর প্রতি যথোচিত শ্রদ্ধায় ত্রুটি হয়েছিল—প্রদক্ষিণা ও প্রণামের অবহেলায় তাঁর শাপ লাগে, ফলে সন্তানলাভ রুদ্ধ হয়। প্রতিকার হিসেবে তিনি কামধেনুর কন্যা নন্দিনী/শুভাহ্বয়া গাভীর সেবা ও অরণ্যে রক্ষার বিধান দেন এবং যথাযথ উপাসনায় পুত্রপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দেন।

Adhyaya 203

The Glory of Kāliṃdī (Yamunā)

এই অধ্যায়ে রাজা দিলীপ রাণীসহ গুরু বশিষ্ঠের কামধেনু নন্দিনীর কঠোর বিনয় ও নিষ্ঠায় সেবা করেন। একুশ দিন ধরে তিনি নন্দিনীর চলা, আহার ও বিশ্রামের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে গুরুসেবার ব্রত পালন করেন। তারপর নন্দিনী তাঁদের হিমালয়ের এক গুহায় নিয়ে যান, সেখানে এক সিংহ নন্দিনীকে ধরে ফেলে। দিলীপ তীর ছুঁড়তে উদ্যত হলেও দেবশক্তিতে স্থবির হয়ে যান। সিংহ মানববাণীতে বলে যে সে কুম্ভোদর নামক শিবগণ, দেবীর আদেশে এই পবিত্র স্থানের রক্ষাকর্তা। দিলীপ ধর্ম ও গুরু-ভক্তিকে সর্বোচ্চ জেনে গোরক্ষার্থে নিজের দেহ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হন। তখন সিংহ অন্তর্ধান করে; নন্দিনী জানান এটি ছিল পরীক্ষা, বর প্রদান করেন এবং বিধিপূর্বক তাঁর দুধ পান করতে বলেন। বশিষ্ঠ সাফল্য নিশ্চিত করেন; অচিরেই রঘুর জন্ম হয়, এবং এই কাহিনি পাঠ-শ্রবণে পার্থিব পুণ্যফল লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

Adhyaya 204

Glorification of Kālindī (Yamunā): The Nigamodbodhaka Tīrtha at Indraprastha

শিবশর্মা বিষ্ণুশর্মাকে বলেন—বৈশ্য শরভ ও তাঁর স্ত্রী পুত্রলাভের জন্য চণ্ডিকার আরাধনা করেন। অম্বিকা তাঁদের ইন্দ্রপ্রস্থে কালিন্দী (যমুনা)-তীরে সর্বপুণ্যময় ‘নিগমোদ্বোধক’ তীর্থের নির্দেশ দেন, যা বৃহস্পতির প্রতিষ্ঠিত; সেখানে স্নানে বৈদিক জ্ঞান জাগ্রত হয় এবং কামনা পূর্ণ হয়। স্নান, শত গো-দান ও পিতৃতর্পণ সম্পন্ন হলে শিবশর্মার গর্ভধারণ ঘটে; পরে পিতা গৃহভার পুত্রকে দিয়ে গোবিন্দভক্তি ও বৈরাগ্যে প্রবৃত্ত হন। এরপর তীর্থ-মাহাত্ম্যে শরভের রোগ, এক লোভী পথিকের প্রতারণা এবং যাত্রীদলের উপর রাক্ষস বিকটের আক্রমণের কথা আসে। তীর্থজলের স্পর্শে বিকট পূর্বজন্মস্মৃতি লাভ করে, নিজের মহাপাপ স্বীকার করে এবং সংশোধিত হয়ে ধর্মপথে ফিরে আসে। শেষে এই ‘তীর্থরাজ’ ভক্তি ও পবিত্র জলের দ্বারা কর্মবন্ধন ক্ষয় করে—বিষ্ণু গরুড়ারূঢ় হয়ে প্রকাশিত হন এবং শরভকে সঙ্গে নিয়ে বৈকুণ্ঠে গমন করেন।

Adhyaya 205

The Episode of Nigamabodha (Liberation at the Sacred Ford)

কালীন্দী-মাহাত্ম্যের প্রসঙ্গে মহাদেব পার্বতীকে বলেন—ইন্দ্রপ্রস্থের নিকটে এক মহাতীর্থ আছে, যেখানে স্নান-সেবা করলে অপরিমেয় পুণ্য লাভ হয়। সেই তীর্থে এক রাক্ষস গোরক্ষা-রূপ ধর্মকর্ম করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে; পরে দিব্য বিমানে আরোহন করে সে দিব্য গতি প্রাপ্ত হয়। এতে তীর্থের মহিমা ও ধর্মের উদ্ধারশক্তি—অপরের ক্ষেত্রেও—প্রকাশ পায়। এরপর কথায় একনিষ্ঠ হরিভক্তির মাহাত্ম্য বলা হয়: ব্রহ্মা-শিব-ইন্দ্রপদ লাভের বাসনা ত্যাগ করে পুরুষোত্তমের উপাসনায় স্থিত থাকা এবং তীর্থে বাস করাই শ্রেয়। শিবশর্মা নিজের পূর্বজন্মের কাহিনি বলেন—বিষ্ণুধ্যানে নিমগ্ন থাকায় দুর্বাসার শাপে পুনর্জন্ম হয়; অনুতাপে সন্তুষ্ট হয়ে দুর্বাসা বর দেন যে এই তীর্থে মৃত্যু হলে পুনর্জন্মের বন্ধন ছিন্ন হবে। শেষে শ্রদ্ধাভরে শ্রবণকেও মহাযজ্ঞসম পুণ্যদায়ক বলা হয়েছে, এবং সেখানে প্রাণীও মরলে চতুর্ভুজ রূপ লাভ করে—এ কথাও ঘোষিত।

Adhyaya 206

Description and Moral-Theological Significance of Dvārakā (within the Indraprastha/Kāliṃdī Māhātmya frame)

নারদ তীর্থ-মাহাত্ম্যের প্রসঙ্গে ইন্দ্রপ্রস্থ-অঞ্চলের অন্তর্গত “দ্বারকা”-র মাহাত্ম্য স্থাপন করে রাজা শিবির সঙ্গে কথোপকথনে কাম্পিল্যের একটি নীতিকথা বলেন। এক দীপ্তিমান ব্রাহ্মণ—গায়ক ও তপস্বী—নগরে প্রবেশ করলে নগরীর নারীরা অকারণে কামাসক্ত হয়ে পড়ে। রাজা মন্ত্র-জাদুর সন্দেহ করেন; ব্রাহ্মণ জানান, এটি কোনো মায়া নয়—অসংযত ইন্দ্রিয়ই কারণ। নগরবাসী সমাজভাঙনের ভয়ে শঙ্কিত হয়, আর নারীরা তাকে ধরতে উদ্যত হয়। ব্রাহ্মণ স্ত্রীধর্মের উপদেশ দেন—পতিব্রত ও স্বামী-সেবা/পূজাই বিষ্ণু-পূজার সমান; পরপুরুষাসক্তি কামজাত মহাপাপ। মন-বাক্য-কর্মের দোষে নরকগতি, দুঃখভোগ এবং দানব/রাক্ষসী যোনিতে জন্মের কথা তিনি সতর্ক করে বলেন। উপদেশে নারীরা সংযমে ফিরে আসে। পরবর্তীতে দैববিপাকে যুদ্ধ, লুণ্ঠন ও বিপর্যয় নেমে আসে; কিছু নারী বিষপানে আত্মবিনাশ করে এবং রাক্ষসী-যোনি লাভ করে—এমন ফলশ্রুতি বলা হয়। অধ্যায়ের শেষে মহাদেব শিব পার্বতীকে জানান, অন্য প্রিয়ের প্রতি ভক্তি-আসক্তিও পাপের কারণ; যে সুখ স্বর্গসম মনে হলেও শেষে অধঃপতন আনে, তা ত্যাগ করাই ধর্ম।

Adhyaya 207

The Glory of the Kāliṃdī (Yamunā) and the Dvārakā Tīrtha: Vimala, Haridatta, and the Son-Granting Bath

এই অধ্যায়ে নারদ মুনি রাজা শিবির প্রশ্নের উত্তরে হিমালয়ের ব্রাহ্মণ বিমলের পবিত্র কাহিনি বলেন। বিষ্ণুর কৃপায় বিমলের পুত্র হরিদত্ত জন্মায়। হরিদত্ত বেদ অধ্যয়ন করে বৈরাগ্য গ্রহণ করে সংসার ত্যাগের পথে অগ্রসর হলে মাতা গভীর শোকে ভেঙে পড়েন। বিমল তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন—হরি-ভক্তি ও মোক্ষ চঞ্চল পার্থিব সম্পর্কের চেয়ে শ্রেষ্ঠ; কিন্তু স্ত্রী বংশধারা রক্ষার চিন্তায় উদ্বিগ্ন থাকেন। অতঃপর বিমল তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে মধ্যরাতে ব্রহ্মার উপদেশ লাভ করেন, যেখানে পূর্বে শ্রীভগবান বিষ্ণুর ঘোষণায় কালীন্দী/যমুনা-প্রদেশসংযুক্ত ইন্দ্রপ্রস্থ ও বিশেষত দ্বারকা-তীর্থের অতুল পুণ্য বর্ণিত। দ্বারকায় স্নান করে নামস্মরণসহ বিমল পুত্রপ্রাপ্তির প্রার্থনা করেন; দিব্যবাণীতে বর দান হয়। তিনি দ্বারকার জল সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেন এবং পরে মালয় পর্বতের এক ব্রাহ্মণ বন্ধুকেও সেই পরম তীর্থের অন্বেষণে প্রেরণা দেন।

Adhyaya 208

The Narrative and Glory of Dvārakā (Dvārakā Māhātmya)

দ্বারকায় বিমল ও এক ব্রাহ্মণ বিষ্ণুভক্তি লাভের উদ্দেশ্যে স্নান করেন। তখন আকাশবাণী ঘোষণা করে—এই তীর্থ ভক্তিকে জাগ্রত করে এবং অজ্ঞতা-জাত মোহ দূর করে। দুই ব্রাহ্মণ সংসার-সম্পর্কের ক্ষণস্থায়িত্ব চিন্তা করে শ্রীপতির শরণ গ্রহণ করেন। পরে এক ভ্রমণকারী ব্রাহ্মণ জলহীন অঞ্চলে পৌঁছালে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর রাক্ষসীরা তাকে গ্রাস করতে ধেয়ে আসে; তিনি বৈদিক মন্ত্রে আত্মরক্ষা করেন। তিনি দ্বারকাসহ তীর্থপরিক্রমার কাহিনি বললে এবং পাত্রে রাখা দ্বারকার জল তাদের উপর ছিটালে, তাদের পূর্বকর্মের স্মৃতি ফিরে আসে; তারা রাক্ষসী দেহ ত্যাগ করে অপ্সরা হয়ে স্বর্গে আরোহণ করে। শেষে ফলশ্রুতি বলা হয়েছে—দ্বারকা-মাহাত্ম্য শ্রবণ মহাদানের সমান ফলদায়ক; ভক্তি, পুত্রলাভ ও স্বর্গপ্রাপ্তি প্রদান করে।

Adhyaya 209

The Greatness of Kāliṇdī (Sacred River/Tīrtha Greatness)

এই অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির সৌভরিকে জিজ্ঞাসা করেন—নারদ যে তীর্থের মাহাত্ম্য বলেছেন, তার মহিমা কী। সেই সূত্রে অন্তর্গত কাহিনি উঠে আসে: দ্বারকার গৌরব শুনে রাজা শিবি নারদকে প্রশ্ন করেন, আর নারদ চন্দ্রভাগা-তটের নিকটে সংঘটিত পাপ-নাশক উপাখ্যান বর্ণনা করেন। অপরাধী নাপিত চণ্ডক চুরির উদ্দেশ্যে সদাচারী ব্রাহ্মণ মুকুন্দকে হত্যা করে। মৃত্যুকালে মুকুন্দ অন্যের দোষ না দেখে একে নিজের কর্মফল বলে গ্রহণ করেন। মা ও স্ত্রীর শোকবিলাপের মধ্যে গুরু বেদায়ন এসে দেহ-আত্মার বিবেক শেখান—আত্মা ইন্দ্রিয়াতীত, অজ, অবিনশ্বর; তার জন্ম-মৃত্যু নেই। শেষে বলা হয়, কোশলা/কালিন্দীর কৃপায় মহাপাপীও স্বর্গগতি লাভ করতে পারে—তীর্থ-মাহাত্ম্য ও অন্তর্দৃষ্ট বৈরাগ্য একত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়।

Adhyaya 210

The Mukunda Episode: Kośalā Tīrtha on the Yamunā and Release from Guru-Offense

নারদ কালীন্দী-মাহাত্ম্যে রাজাকে বলেন—দুই ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী অস্থির পুটলি নিয়ে যমুনাতীরে ইন্দ্রপ্রস্থ অঞ্চলে এসে রাত্রিযাপন করেন। খাদ্যের সন্ধানে ঘুরতে থাকা এক কুকুর কাপড়ের পুটলি টেনে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে এবং অস্থিগুলি যমুনাজলে ফেলে দেয়—এভাবে অজান্তেই কোশলা-তীর্থে অস্থি-বিসর্জন সম্পন্ন হয়। সঙ্গে সঙ্গে দিব্য বিমানে মুকুন্দ আবির্ভূত হয়ে গুরু বেদায়নকে প্রণাম করে নিজের কাহিনি জানান। মুকুন্দ বলেন—নাপিত চণ্ডকের হাতে নিহত হয়ে তিনি সংযমনীতে নীত হন; যমদূতেরা রৌরব প্রভৃতি নরকের যন্ত্রণা দেখায়। যম ব্রহ্মার আদেশ অনুসারে গুরুদ্রোহ ও পিতা-মাতার অবহেলার কঠোর ফল ঘোষণা করেন। কিন্তু কোশলা-তীর্থের মহিমায় গুরু-অপরাধজনিত পাপ বিনষ্ট হয় এবং তাঁর স্বর্গগতি নিশ্চিত হয়। শেষে বলা হয়—অতিথি ব্রাহ্মণের সেবা ও যথাযথ শ্রাদ্ধাদি কর্ম পূর্বে সম্পন্ন হওয়ায়ও মুক্তি ত্বরান্বিত হয়; তাই কালীন্দীর গৌরবে কোশলাকে ‘তীর্থরাজ’ বলা হয়েছে।

Adhyaya 211

Mukunda and Caṇḍaka: Brahmin-Slaying, Royal Justice, and the Kośala Tīrtha’s Saving Power

নারদ শিবাকে উদ্দেশ করে মুকুন্দ-কথার পর নাপিত চণ্ডকের উপাখ্যান বলেন। চণ্ডক ব্রাহ্মণ মুকুন্দকে হত্যা করে; নগরবাসীরা রাজার কাছে অপরাধ জানায়। রাজা রাজধর্ম অনুসারে অপরাধী ধরার আদেশ দেন, মন্ত্রী চণ্ডককে গ্রেপ্তার করে উপস্থিত করে। রাজা স্থির করেন—চন্দ্রভাগা-তীর্থের পবিত্র সীমার মধ্যে পাপীকেও বহিষ্কৃত গণ্য করা হয় না, তাই তীর্থসীমার ভিতরে দণ্ডকার্য করা উচিত নয়। অতএব নদীর ওপারে নিয়ে চণ্ডকের শিরচ্ছেদ করা হয়। কর্মফলে সে পরে মারবে ভয়ংকর সাপে জন্মায়। পরবর্তীতে সেই সাপ এক ব্রাহ্মণের পিতৃঅস্থিভর্তি কলস/পেটিকার মধ্যে প্রবেশ করে, যা গঙ্গায় বিসর্জনের জন্য বহন করা হচ্ছিল। অযোধ্যার কোশল-তীর্থে সাপটি নিহত হলে চণ্ডক দিব্যগতি লাভ করে এবং তীর্থের মহিমা স্তব করে। একই স্থানে অস্থিবিসর্জনে ব্রাহ্মণের পিতা-মাতা তৎক্ষণাৎ স্বর্গারোহণ করেন—শ্রাদ্ধ, তীর্থ-মাহাত্ম্য ও পিতৃকর্মের শক্তি প্রকাশ পায়।

Adhyaya 212

Description of the Glory of Kośalā (Indraprastha/Śakraprastha; Dakṣiṇa-Kośalā)

এই অধ্যায়ে রাজাকে উপদেশের আকারে তীর্থ-মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। কোসলার ইন্দ্রপ্রস্থ/শক্রপ্রস্থকে সর্বতীর্থের শ্রেষ্ঠ, ভোগ ও মোক্ষদাতা এবং বিষ্ণুপ্রিয় ‘কন্যা’সদৃশ বলা হয়েছে। বদরিকাশ্রম বা নারায়ণধামে যেতে উদ্যত এক মুক্তিকামী ব্রাহ্মণকে অন্তর্নিহিত উপদেশদাতা নানা উপমা-প্রবাদে নিবৃত্ত করেন—কোসলাকে ত্যাগ করা উচিত নয়, কারণ এখানেই বৈরাগ্য ও মুক্তি সহজে লাভ হয়। এরপর শ্রীভগবান হরি তেজোময় রূপে প্রকাশিত হয়ে ইন্দ্রপ্রস্থকে তীর্থসমূহের অগ্রগণ্য ঘোষণা করেন এবং বলেন—সর্বত্র ফলদাতা আমি নিজেই অন্তরাত্মা। সেই ব্রাহ্মণ বিষ্ণুর পদ/ভাবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পরমগতি লাভ করেন। দক্ষিণদেশীয় ব্রাহ্মণসঙ্গীরা সেখানে উপবাস করে দেহত্যাগ করেন, স্তোত্রে বিষ্ণুকে স্তব করে সারূপ্য এবং পরবর্তীতে সেবাভাব প্রাপ্ত হন। এই তীর্থ ‘দক্ষিণ-কোশলা’ নামে প্রসিদ্ধ; ‘উত্তর-কোশলা’ রামাবতার ও রাবণবধের সঙ্গে যুক্ত বলা হয়েছে। এই মাহাত্ম্য শ্রবণ করলে কলিযুগের মলিনতা দূর হয়ে বিষ্ণুচরণপ্রাপ্তি হয়—এমন ফলশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

Adhyaya 213

The Greatness of the Yamunā: Viśrānti/Nṛpaviśrānti, Madhuvana, and Deliverance through Śrāddha

এই অধ্যায়ে কালীন্দী (যমুনা) তীরে মধুবন এবং বিশ্রান্তি-তীর্থসমূহের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে নৃপবিশ্রান্তি ঘাটে শ্রীকোল (বরাহ) রূপে ভগবান বিষ্ণুর অধিষ্ঠান এবং সেখানে স্নান-দান প্রভৃতির মহাফল প্রশংসিত। এরপর একটি দৃষ্টান্তকথা আছে—দরিদ্র ব্রাহ্মণ কুশল অশুচরিত্রা স্ত্রীর কারণে সর্বনাশপ্রাপ্ত হয়। তার মৃত্যুর পরে স্ত্রী ভক্তির ভান করে, পরে পাপার্জিত ধনে পুত্র কুণ্ডের উপনয়ন করায়; পুত্র নারায়ণভক্ত হয়ে দিব্যলোকে গমন করে। স্ত্রী পাপে নিমগ্ন থেকে অপরাধ ও রোগে জর্জরিত হয়ে সংস্কারবিহীন মৃত্যু বরণ করে, রৌরব নরকে নীত হয় এবং পরে শ্মশানে টিকটিকিরূপে জন্মায়। পুত্র তাকে চিনে জানায়—সত্য তীর্থে দেহত্যাগ বা বিষ্ণুশরণই মুক্তির উপায়; বিশেষত হরিপ্রস্থ–মধুবনে শ্রাদ্ধ-পিণ্ডদান গয়া-শ্রাদ্ধের চেয়ে শতগুণ অধিক ফলদায়ক।

Adhyaya 214

The Glory of Madhuvana: Viśrānti Tīrtha, Śrāddha, and Lineage-Liberation

এই অধ্যায়ে মধুবন (বিশ্রান্তি-তীর্থ)-এর তীর্থমাহাত্ম্যের মধ্যে শ্রাদ্ধ-প্রয়োগের সূক্ষ্ম বিধান বর্ণিত। মুনিপুত্র মধুবনে এসে বিষ্ণুর আহ্বান করে, ব্রাহ্মণদের যথাবিধি আসনে বসায়, অর্ঘ্যাদি প্রদান করে, পিণ্ডদানসহ শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করে। ফলে পিতৃগণ দিব্য বিমানে আবির্ভূত হয়ে জানান—মধুবনে কৃত শ্রাদ্ধ তাঁদের রাক্ষস, গিরগিটি, শূকর/কুকুর এবং স্থাবর প্রভৃতি অধম যোনি থেকে মুক্ত করে স্বর্গীয় গতি দান করে। শেষে বিশ্রান্তি-তীর্থে স্বয়ং শ্রীহরি দর্শন দিয়ে ভক্তকে বৈকুণ্ঠে নেন; তীর্থসেবা, শ্রাদ্ধ ও ভক্তির সংযোগকে বংশ-উদ্ধারক মোক্ষপথ রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

Adhyaya 215

Description of Madhuvana (Madhuvana Māhātmya Episode)

এই অধ্যায়ে (উত্তরখণ্ড, কালীন্দী-মাহাত্ম্য) মধুবনের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে এক বংশ-ধর্মসংক্রান্ত সংশয় নিরসনের মাধ্যমে—তারাপুত্র বুধ কীভাবে বৃহস্পতির গৃহের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েও চন্দ্রবংশের প্রতিষ্ঠাতা হলেন। সৌভরির নিবেদনে রাজা শিবির প্রশ্নের উত্তরে নারদ হরিদ্বারের জ্যৈষ্ঠ শুক্ল দশমীর সভার কথা বলেন, যেখানে বুধকে সম্মান করা হয়; সেখানে এক মুনিপুত্র তাঁকে ‘ব্যভিচারিণীর পুত্র’ বলে নিন্দা করে। এরপর কাহিনিতে চন্দ্রের দ্বারা তারাহরণ, দেব–অসুর সংঘর্ষ, ব্রহ্মার দ্বারা বিবাদ-নিবারণ, বুধের জন্ম ও পিতৃত্ব-নির্ণয়ের জন্য বুধের দাবি, এবং শেষে চন্দ্রের বুধকে পুত্ররূপে স্বীকৃতি—এসব বিবৃত হয়। বুধ নিন্দাকারী বালককে ‘কুণ্ড’ (গর্ত) হওয়ার শাপ দেন, পরে শাপ লঘু করে তাকে নপুংসক করে উপনয়নের পর প্রত্যাবর্তনের সুযোগ দেন। শেষে ফলশ্রুতি—মধুবন-মাহাত্ম্য শ্রবণ/পাঠ অশ্বমেধসম পুণ্য দেয় এবং বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তি ঘটায়।

Adhyaya 216

Description of the Badarikā Hermitage (Sad-Badarī Tīrtha Māhātmya)

নারদ রাজাকে যমুনাতীরে অবস্থিত সদ্-বদরী (বদরিকাশ্রম) তীর্থের আশ্চর্য মাহাত্ম্য শোনান। মগধদেশের আদর্শ গৃহস্থ ব্রাহ্মণ দেবদাস ও তাঁর স্ত্রী উত্তমা বার্ধক্য আসন্ন দেখে এবং পুত্র অঙ্গদকে গৃহভার বহনে সক্ষম জেনে মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে তীর্থযাত্রা ও তপস্যার সংকল্প করে গৃহত্যাগ করেন। পথে তাঁদের সঙ্গে এক সিদ্ধ পুরুষের সাক্ষাৎ হয়; তিনি বদরীর মহিমা বর্ণনা করেন। সিদ্ধ বলেন—কপিল মুনি বদরীতে এলে সেখানে এক তৃষার্ত মহিষ পূর্বজন্মস্মৃতি লাভ করে স্বীকার করে যে সে পূর্বে কলিঙ্গের পাপী রাজা ছিল, দুর্বাসার শাপে মহিষযোনি পেয়েছে। কপিল মুনি জানান এটি বিষ্ণুর বদরী তীর্থ এবং স্নানের উপদেশ দেন; তখন ইন্দ্র অবতীর্ণ হন, রাজা মহিষদেহ ত্যাগ করে দিব্যরূপ ধারণ করে কপিল ও বিষ্ণুর স্তব করে স্বর্গে গমন করে। সিদ্ধ দেবদাসকে বদরীতে যেতে উৎসাহ দেন; সেখানে স্নান করলে দেবদাসের জ্যেষ্ঠ পুত্র সিদ্ধি লাভ করে—এমন ফলশ্রুতি বলা হয়। অধ্যায়ের উপসংহার—সদ্-বদরী সর্বোত্তম, পাপহারী, সর্বকামপ্রদ এবং পুনর্জন্মনাশক তীর্থ।

Adhyaya 217

Description of Haridvāra (at Śakraprastha/Indraprastha)

এই অধ্যায়ে বদরী ও শক্রপ্রস্থের প্রশংসা থেকে অগ্রসর হয়ে শক্রপ্রস্থ/ইন্দ্রপ্রস্থস্থিত হরিদ্বার-তীর্থের বিশেষ মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। নারদ তীর্থের গৌরব বলার প্রতিশ্রুতি দেন এবং একটি দৃষ্টান্ত বলেন—শিশুহত্যা ও চৌর্যে কুখ্যাত চাণ্ডাল কালিগ কুরুক্ষেত্রের সূর্যপর্বে এক ধনী বৈশ্যকে লুট করতে মধ্যরাতে যায়। চুরি ব্যর্থ হলে সংঘর্ষ হয় এবং কালিগসহ কয়েকজন নিহত হয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে সেই মৃতেরা দিব্য বিমানে প্রকাশ পেয়ে স্থানটির অসাধারণ উদ্ধারশক্তি ঘোষণা করে—মহাপাপী, এমনকি শিব-অপরাধীরও এখানে কল্যাণ হয়। বিশেষ করে অস্থি-বিসর্জনের ফল বলা হয়েছে: তীর্থের নিকটে মৃত্যু ও অস্থি জলে নিক্ষেপ করলে স্বর্গারোহণ, এমনকি সত্যলোক/ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি ঘটে। এরপর নীতিশিক্ষা—সজ্জনদের পরোপকার করা উচিত, ক্ষতি নিয়ে অনুতাপ বা প্রতিহিংসায় মন ভারী করা উচিত নয়। শেষে শ্রবণফলকে মহাদান ও ব্রতসম তুল্য বলে হরিদ্বারকে চার পুরুষার্থ ও বৈকুণ্ঠদায়ী শ্রেষ্ঠ তীর্থরূপে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; উপসংহারে পুলস্ত্যের পুনঃপ্রবেশের ইঙ্গিতও আছে।

Adhyaya 218

The Account of Puṇḍarīka and Bharata: Puṣkara Tīrtha’s Liberating Grace (with Godāvarī Snāna and Dāna)

নারদ রাজাকে পুষ্কর-তীর্থের আশ্চর্য মহিমা বর্ণনা করেন—এটি শিবের অনুগ্রহদায়ক এবং বিষ্ণুর প্রীতিকর। বলা হয়, ভগবান বিষ্ণু একসময় পুণ্ডরীকের গৃহে এক মাস অবস্থান করেছিলেন; এই তীর্থের প্রভাবে পুণ্ডরীকের পাপী কনিষ্ঠ ভ্রাতা ভরতও মুক্তি লাভ করে। এরপর বিদর্ভদেশীয় বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ মালব, সিংহস্থ বৃহস্পতির শুভকালে গোদাবরীতে স্নান ও কেবল যোগ্য পাত্রকে স্বর্ণদান করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তিনি ভগ্নীপুত্র পুণ্ডরীককে শ্রেষ্ঠ পাত্র জেনে অর্ধেক ধন দান করেন; পুণ্ডরীকও পরে শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণদের দান বিতরণ করে। ফেরার পথে পুণ্ডরীক ভরতকে গুরুতর আঘাতে মৃত্যুপথযাত্রী অবস্থায় দেখে। ভরত মৃত্যুর পর দিব্য বিমানে আরোহন করে, নিজের মহাপাপ স্বীকার করে অনুতাপ জানায় এবং বলে—পুষ্কর-তীর্থের কৃপাবলেই সে এই গতি পেয়েছে; এতে তীর্থপ্রভাবের সঙ্গে অনুশোচনা ও ভক্তিভাবের যোগ প্রকাশিত হয়।

Adhyaya 219

Description of the Greatness of Puṣkara (Puṣkara Tīrtha Māhātmya)

এই অধ্যায়ে পুষ্কর-তীর্থের উদ্ধারকারী মাহাত্ম্য দুইটি ঘটনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। প্রথমে পাপাচারী বলে পরিচিত ভরত জানায়—জুয়ায় পাওয়া অর্থ দিয়ে সে এক অনাথ মৃত শিশুর কেউ না থাকায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে; দেহ গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে দাহ ও শ্রাদ্ধাদি বিধি পালন করে। সেই পুণ্যের ফলে সে পুষ্কর-তীরে পৌঁছে, এবং তার নিজের ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন হলে তীর্থের কৃপায় স্বর্গলাভ করে। পরবর্তী ঘটনায় ভক্ত ব্রাহ্মণ পুণ্ডরীক অত্রিতীর্থসম ফল কামনা করে স্নান করে এবং প্রার্থনা করে—মাঘ মাসে হরি যেন তার গৃহে বাস করেন। বিষ্ণু (মাধব/গোবিন্দ) স্বয়ং এসে পূজিত হন, মহাসত্কারে আপ্যায়িত হয়ে সমগ্র মাঘ মাস সেখানে অবস্থান করেন। মাঘান্তে গরুড় এসে পুণ্ডরীককে পুষ্করে নিয়ে যায়; সেখানে সে গোবিন্দের সঙ্গে সাযুজ্য-মুক্তি লাভ করে। শেষে বলা হয়—এই মাহাত্ম্য শ্রবণ-পাঠ করলে মহাপুণ্য হয়, অশ্বমেধের ফলও লাভ হয়।

Adhyaya 220

Description of Indraprastha (within the Kāliṃdī-māhātmya)

এই অধ্যায়ে প্রয়াগকে ‘তীর্থরাজ’ বলে সর্বোচ্চ মহিমায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নারদের প্রশ্নে পুলস্ত্য বলেন—গন্ধর্ব বিশ্বাবসু সুমেরুতে ব্রহ্মার সভায় গিয়ে দেখেন, ব্রহ্মাসনের নিকটে ইন্দ্রপ্রস্থ/শক্রপ্রস্থ বিশেষ সম্মানে ভূষিত; আর অন্যান্য মহাতীর্থ যেন সেবকের মতো সেখানে উপস্থিত। এই অলৌকিক দৃশ্য তীর্থভূগোলের মর্যাদাক্রমকে দেবসান্নিধ্যের দ্বারা প্রকাশ করে। এরপর একটি দৃষ্টান্তকথা আসে। মাহিষ্মতীর ধনাঢ্য গণিকা মোহিনী বহু পাপে লিপ্ত ছিল; কিন্তু বার্ধক্য ও নরকভয়ে সে ধর্মপথে ফিরে জনহিতকর কর্ম ও দান শুরু করে। অরণ্যে বিশ্বাসঘাতে আহত হয়ে মৃত্যুপথযাত্রী মোহিনীর সামনে প্রয়াগজল বহনকারী এক বৈখানস ঋষি উপস্থিত হন; তাঁর ছিটানো সেই জলস্পর্শই মোহিনীর পরিত্রাণের কারণ হয়। ফলে তার পুনর্জন্ম দ্রাবিড়দেশে রাণীরূপে ঘটে, এবং হেমাঙ্গীর প্রসঙ্গে তীর্থমাহাত্ম্য যে কর্মরূপান্তর ও নবজীবন দেয়—তা প্রতিপন্ন হয়।

Adhyaya 221

Description of Prayāga (within the Greatness of Indraprastha)

এই অধ্যায়ে রানি হেমাঙ্গী এক পবিত্র চিত্রিত গ্রন্থ প্রদর্শন করেন, যেখানে অবতারসমূহ, লোকালোক পর্বত, সাত দ্বীপ ও সাত সমুদ্রের বিবরণ আছে। ভারতবর্ষের নদী এবং ইন্দ্রপ্রস্থ ও প্রয়াগের তীর্থমাহাত্ম্য দেখে তাঁর পূর্বজন্ম স্মরণ হয়—তিনি মোহিনী নামে এক গণিকা ছিলেন, দস্যুদের হাতে নিহত; তখন এক বৈখানস তপস্বী তাঁকে প্রয়াগজল পান করান, সেই পুণ্যে তিনি পুনর্জন্মে রানি হন। হেমাঙ্গী রাজা বীরবর্মাকে বলেন, প্রয়াগে গিয়ে স্নান-দেবপূজা না করা পর্যন্ত তিনি আহার করবেন না। আকাশবাণী তাঁর কথাকে সত্য বলে স্বীকৃতি দেয় এবং ইচ্ছাপূর্তির জন্য তীর্থযাত্রা ও বিধিস্নানের নির্দেশ দেয়। প্রয়াগের শিবতীর্থে রাজা দুই দীপ্তিমান দেবতার স্তব করেন; তখন হরি ও ব্রহ্মা প্রকাশ হয়ে হেমাঙ্গীর প্রশংসা করেন—ভোগাসক্ত স্বামীকে তিনি ধর্মপথে এনেছেন। তাঁরা সত্যলোক ও বৈকুণ্ঠপ্রাপ্তির বর দেন এবং এই অধ্যায় শ্রবণ-পাঠের ফলশ্রুতি ঘোষণা করেন।

Adhyaya 222

The Greatness of the Sevenfold Tīrtha and the Origin of Bhīma-kuṇḍa (via Indraprastha)

এই অধ্যায়ে তীর্থ-মাহাত্ম্য কাশী থেকে গোকর্ণ, শিব-কাঞ্চী এবং শেষে যমুনাতীরের ইন্দ্রপ্রস্থ/শক্রপ্রস্থ পর্যন্ত প্রবাহিত। কাশীতে কাক, সর্প ও শিম্শপা-বৃক্ষের মুক্তির কাহিনি বলা হয়েছে—পূর্বজন্মের দোষে তারা পতিত হলেও সামান্য এক পুণ্যকর্ম (রক্ষা-সহায়তা) দ্বারা উদ্ধার লাভ করে; এতে কাশীর মোক্ষদায়িনী মহিমা প্রকাশ পায়। এরপর বলা হয়, এই ক্ষেত্রসমূহে দেহান্ত হলে বিরল পরলোকগতি লাভ হয়—গোকর্ণে শিবভক্ত শিবসদৃশ পদ পায়, আর শিব-কাঞ্চীতেও শিবভক্তির পরিণতি আশ্চর্যভাবে বৈকুণ্ঠপ্রাপ্তি। এক দীর্ঘ দৃষ্টান্তে শিবভক্ত ব্রাহ্মণের পরলোকে গমনকালে শিবগণ ও হরিদূতদের মধ্যে বিতর্ক ওঠে, যা শিব ও বিষ্ণুর প্রসন্ন সমন্বয়ে মীমাংসিত হয়। শেষে ইন্দ্রপ্রস্থের পবিত্রতা স্নান ও বার্ষিক প্রদক্ষিণার বিধানে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাজসূয়-প্রসঙ্গে শিশুপালবধের সঙ্গে যুক্ত ভীমকুণ্ডের উৎপত্তিকথা বলা হয়। সেখানে স্নান ও পরিক্রমাকে মহাপুণ্যদায়ক বলা হয়েছে।

Adhyaya 223

Instruction on Knowledge (Mantra of Lakṣmī–Nārāyaṇa and the Path of Surrender)

এই অধ্যায়ে সংসার-বন্ধন ছিন্ন করার শ্রেষ্ঠ উপায় হিসেবে “মন্ত্ররত্ন” বর্ণিত হয়েছে, যা লক্ষ্মী–নারায়ণ মন্ত্ররূপে প্রতিষ্ঠিত। শৌনকের প্রশ্নে সূত বলেন—বসিষ্ঠ রাজা দিলীপকে এই গূঢ় উপদেশ দিয়েছিলেন। এরপর বর্ণনা পরম্পরায় গভীর হয়: যোগিগণ ব্রহ্মাকে প্রশ্ন করেন; ব্রহ্মা জানান, তিনি স্বয়ং নারায়ণের কাছ থেকে এই রহস্য লাভ করেছেন; আর নারদ তা মহর্ষিদের কাছে প্রচার করেন। এখানে অধিকার নির্ধারিত হয় বর্ণের দ্বারা নয়, একান্ত ভক্তি ও সম্পূর্ণ শরণাগতির দ্বারা। অবিশ্বাসী, অহংকারী, লোভী বা অসংযমী ব্যক্তিকে এই মন্ত্রোপদেশ না দেওয়ার বিধান আছে। বৈষ্ণব-চিহ্ন ধারণ, যোগ্য গুরু নির্বাচন, পূজা, হোম (১০৮/১০০৮), ন্যাস-মুদ্রা, চক্র-শঙ্খ চিহ্নাঙ্কন, অভিষেক ও মন্ত্রোপদেশসহ দীক্ষা-প্রক্রিয়া বলা হয়েছে। শেষে সিদ্ধান্ত—নারায়ণেই একমাত্র আশ্রয়; তাঁর শরণ নিলেই মুক্তি।

Adhyaya 224

The Glory of Sudarśana (and the Marks of Vaiṣṇava Worship)

অধ্যায় ২২৪ শুরু হয় রাজর্ষি দিলীপের ভক্তিপ্রশ্নে—অক্ষয় হরিভক্তি কীভাবে লাভ করা যায়। এরপর স্মৃতিপটে কৈলাসের প্রসঙ্গ আসে; সেখানে গিরিজা (পার্বতী) মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করেন, বিষ্ণুভক্তি কীভাবে সর্বজনের মুক্তিদাত্রী ও পাপনাশিনী। শিব উপনিষদীয় ভঙ্গিতে নারায়ণকে পরম সত্য, সর্বাধার ও পরম মোক্ষদাতা বলে প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর বৈষ্ণব উপাসনার নির্দিষ্ট চিহ্ন ও আচরণ বলেন—ঊর্ধ্বপুণ্ড্র ধারণ, মন্ত্রজপ, নামস্মরণ, শ্রবণ-কীর্তন, দ্বাদশী ব্রত, তুলসী রোপণ-সেবা, এবং বিশেষত শঙ্খ-চক্র (এবং পঞ্চায়ুধ) চিহ্ন ধারণ। শেষে তিনি জানান, বাহ্য বৈষ্ণব চিহ্নের সঙ্গে অন্তরের বৈষ্ণবতা—বৈরাগ্য, করুণা, আত্মজ্ঞান ও শুদ্ধাচার—একত্র না হলে তা পূর্ণ হয় না। অন্তর ও বাহিরের সামঞ্জস্যই সত্য ভক্তির লক্ষণ।

Adhyaya 225

The Greatness of the Ūrdhva-puṇḍra (Vaiṣṇava Vertical Tilaka)

উত্তরখণ্ডের ২২৫তম অধ্যায়ে মহাদেব শঙ্কর গিরিজাকে ঊর্ধ্ব-পুণ্ড্র (বৈষ্ণব উল্লম্ব তিলক)-এর মাহাত্ম্য ও বিধান বলেন। বলা হয়েছে, তিলকের মধ্যবর্তী ফাঁকে হরি (জনার্দন) ও শ্রী সদা বিরাজ করেন; তাই তিলকধারীর দেহ নিজেই মন্দিরস্বরূপ হয় এবং তিলকসহ জপ, দান, হোম, পূজা প্রভৃতি কর্ম অক্ষয় পুণ্য প্রদান করে। অন্যদিকে ঊর্ধ্ব-পুণ্ড্রবিহীন আচার-অনুষ্ঠানের নিষ্ফলতা এবং কখনও দোষের আশঙ্কাও উল্লেখিত। তিলকের যথার্থ রূপ—সোজা, দণ্ডাকার, এবং নির্দিষ্ট মাপে মধ্যখানে অবকাশ—এভাবে নিয়ম স্থির করা হয়েছে। ভেঙ্কটাদ্রি-মৃত্তিকা, গঙ্গাতটের মাটি, তুলসীমূলের মাটি এবং প্রধান তীর্থক্ষেত্রের পবিত্র মৃত্তিকা তিলকের জন্য প্রশস্ত বলা হয়েছে। বর্ণ ও নারী-পুরুষভেদে পুণ্ড্রের সংখ্যা/পরিমাপ, এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিষ্ণুনামের ন্যাস ও ধ্যান-ক্রমও বর্ণিত।

Adhyaya 226

Instruction on the Meaning of Mantras (Vaiṣṇava Nyāsa, Guru-Authority, and Aṣṭākṣarī Exegesis)

এই অধ্যায়ে উমা–মহেশ্বর সংলাপের আবরণে বৈষ্ণবমুখী উপদেশ প্রদান করা হয়েছে। প্রথমে গুরুর যোগ্যতা নির্ধারিত—মন্ত্র অবশ্যই বৈষ্ণব আচার্যের নিকট থেকে গ্রহণ করতে হবে; অতি বৈদিক পাণ্ডিত্য থাকলেও অবৈষ্ণব ব্যক্তি গুরু হতে পারেন না। দীক্ষার লক্ষণ হিসেবে তাপ (মুদ্রাঙ্কন/দাগ), ঊর্ধ্বপুণ্ড্র ধারণ এবং বৈষ্ণব নাম গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এরপর ন্যাসকে সর্বোচ্চ সাধনা বলে প্রতিষ্ঠা করে তাকে প্রপত্তি/শরণাগতির সমতুল্য বলা হয়। পরে অষ্টাক্ষরী ‘ॐ নমো নারায়ণায়’ মন্ত্রের ব্যাখ্যা করা হয়েছে—প্রণবের প্রাধান্য এবং মন্ত্রাঙ্গ (ঋষি, দেবতা, ছন্দ, বীজ, শক্তি) নির্দিষ্ট করা হয়। শেষে নারায়ণকে সর্বব্যাপী পরমেশ্বর এবং জীবকে চিরনির্ভর দাসরূপে বর্ণনা করে বলা হয়েছে—মন্ত্রসিদ্ধি অর্থজ্ঞানসহই সম্পূর্ণ হয়।

Adhyaya 227

Description of the Threefold Divine Opulence (Tripād-vibhūti) and Viṣṇu’s Supreme Abode

উমা মন্ত্রের অর্থ ও ঈশ্বরের স্বরূপ জানতে প্রার্থনা করলে মহেশ্বর বলেন—হরি নারায়ণই পরমাত্মা, সর্বব্যাপী; তবু শ্রীসহ ভোগ-লীলার জন্য তিনি মঙ্গলময় দিব্য রূপ ধারণ করেন। লক্ষ্মী তাঁর অবিচ্ছেদ্য শক্তি—বিষ্ণুর ন্যায় সর্বত্র ব্যাপ্ত; শ্রী, ভূ, নীলা প্রভৃতি নানা নামে স্তূত, এবং তাঁর জপ্য নাম ও আহ্বান সমৃদ্ধি দান করে বলে বর্ণিত। এরপর ত্রিপাদ-বিভূতির তত্ত্ব প্রকাশিত হয়—এই জগৎ এক পাদমাত্র, আর চিরন্তন তিন পাদ প্রকৃতি/প্রধানের অতীত, বিরজা নদীর ওপারে অবস্থিত। কাল, গুণমায়া, সৃষ্টি ও প্রলয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে শেষে বৈকুণ্ঠধামের দীপ্তিময় বর্ণনা করা হয়—সূর্য ও অগ্নির অতীত সেই পরম আকাশ; জ্ঞান ও ভক্তিতে প্রাপ্য, মোক্ষরূপ এবং পুনরাগমনহীন।

Adhyaya 228

Description of the Supreme Sky (Paramavyoma) and Related Matters

এই অধ্যায়ে শ্রীমহাদেব গিরিজাকে পরমব্যোম/বৈকুণ্ঠের শুদ্ধ-সত্ত্বময় মহিমা বর্ণনা করেন। বিরজা নামে পবিত্র মধ্য-ধাম এবং নিঃশ্রেয়স, নির্বাণ, কৈবল্য, মোক্ষরূপ মুক্তির কথা বলে তিনি ত্রিপাদ-বিভূতির পরম পদকে মহিমান্বিত করেন। পরে বৈকুণ্ঠের নগর-প্রাসাদময় অলংকৃত চিত্র, তার অন্তর্গত অযোধ্যা-পুরী, দ্বাররক্ষক, নানা শক্তি এবং মহালক্ষ্মীসহ সিংহাসনাসীন ভগবানের দর্শন উপস্থিত হয়। এরপর ব্যূহসমূহ ও দিকভেদে ধামগুলির বিন্যাস, আবরণ-পরিক্রমা এবং দ্বয়-মন্ত্র ও একান্ত ভক্তি যে যাগ-যজ্ঞাদি কর্মপথের চেয়েও শ্রেষ্ঠ—এই সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। শেষভাগে গুণমিশ্র জগতে ভগবানের অন্তর্ব্যাপ্তি কীভাবে ঘটে তা আলোচিত; মহামায়া বিষ্ণুর স্তব করে সৃষ্টির প্রার্থনা জানায়, এবং প্রকৃতি–পুরুষ থেকে মহৎ, অহংকার, গুণ, তন্মাত্রা, মহাভূত, ব্রহ্মাণ্ড ও চতুর্দশ লোকের উৎপত্তিক্রম সংক্ষেপে বলা হয়।

Adhyaya 229

Distinctions among Viṣṇu’s Vyūhas (Fourfold Emanations) and the Vaiṣṇava Realms

পার্বতী শিবকে জিজ্ঞাসা করেন—সৃষ্টি কীভাবে ঘটে এবং ভগবানের অবতারসমূহ কারা। শিব সৃষ্টিকথা বলেন—তত্ত্বসমূহের উদ্ভব, মহাসমুদ্রের প্রকাশ, হরির যোগনিদ্রায় প্রবেশ; তারপর নাভিকমল থেকে ব্রহ্মার আবির্ভাব, বিষ্ণুর স্তব এবং ভগবানের দ্বারা সৃষ্টিকর্মের প্রবর্তন। এই প্রসঙ্গে রুদ্রের জন্মবৃত্তান্তও আসে এবং বলা হয় যে সংহারকার্যে তিনি সংকর্ষণের অংশরূপে প্রতিষ্ঠিত। পরে বিষ্ণুর অন্তর্যামী-রূপ ও দশাবতার সংক্ষেপে উল্লেখিত হয়। অধ্যায়ের মূল বক্তব্য চার ব্যূহ—বাসুদেব, সংকর্ষণ, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ—এবং তাঁদের পরম ধাম—বৈকুণ্ঠ, “নিত্য” লোক, শ্বেতদ্বীপ ও ক্ষীরসাগর—এর পার্থক্য-নিরূপণ। উপসংহার—মন্ত্রজপ ও একান্ত দাস্যভক্তি স্বর্গের অনিত্য ফলের ঊর্ধ্বে, পুনর্জন্মহীন মোক্ষ প্রদান করে।

Adhyaya 230

Description of the Fish Incarnation (Matsyāvatāra)

উমা–মহেশ্বর সংলাপে পার্বতী জিজ্ঞাসা করেন, মধুসূদন কীভাবে রাক্ষসদের বধ করেছিলেন, এবং মৎস্য ও কূর্ম অবতার থেকে আরম্ভ করে হরির অবতার-মহিমার বিস্তৃত বিবরণ শুনতে চান। শিব প্রদীপ থেকে প্রদীপ প্রজ্বালনের উপমায় বোঝান—ভগবান স্বেচ্ছায় প্রকাশিত হন; পরাত্পর স্বরূপ, ব্যূহ/বিভব প্রকাশ এবং অর্চা-রূপে (প্রতিমায় অধিষ্ঠান) তাঁর কৃপাময় উপস্থিতির তত্ত্ব তিনি ব্যাখ্যা করেন। এরপর আদ্য বংশপরম্পরা বলা হয়—মরীচি থেকে কশ্যপ; অদিতির গর্ভে দেবগণ, দিতির গর্ভে প্রবল অসুর-রাক্ষস, যাদের মধ্যে হয়গ্রীব ও হিরণ্যাক্ষ প্রধান। এক দানব বেদ অপহরণ করে গিলে সমুদ্রে লুকিয়ে থাকে; ফলে ধর্ম ও বর্ণাশ্রম-ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়। ব্রহ্মা ও দেবতারা ক্ষীরসাগরের তীরে ভগবানের স্তব করেন। তখন হরি মৎস্যরূপ ধারণ করে সমুদ্রে প্রবেশ করেন, দানবকে বধ করে বেদ ব্রহ্মার কাছে ফিরিয়ে দেন; পরে ব্যাসরূপে বেদের বিভাগ স্পষ্ট করে জগতকে রক্ষা করেন এবং কার্যসিদ্ধ হলে অন্তর্ধান করেন।

Adhyaya 231

The Account of Durvāsā’s Curse

উমা–মহেশ্বর সংলাপে রুদ্র কূর্মাবতারের প্রয়োজনীয়তার কারণ বর্ণনা করেন। স্বর্গে সম্মানিত দুর্বাসা ইন্দ্রকে পারিজাতের মালা দেন; ইন্দ্রের ঐরাবত তা পায়ে মাড়িয়ে ফেলে দেয়। এতে ক্রুদ্ধ দুর্বাসা ইন্দ্র ও ত্রিলোকের ঐশ্বর্য-সমৃদ্ধি নাশের শাপ দেন। ফলে লক্ষ্মী অন্তর্হিতা হন, ধর্মকর্ম ক্ষীণ হয়, অনাবৃষ্টি, ক্ষুধা ও যজ্ঞাদি অবনতি দেখা দেয়। দেবগণ অন্যান্য সত্তাসহ ব্রহ্মার শরণ নেন। ব্রহ্মা কারণ নির্ণয় করে তাঁদের ক্ষীরসাগরে নিয়ে গিয়ে অষ্টাক্ষর মন্ত্র ও পৌরুষসূক্ত দ্বারা নারায়ণের আরাধনা করান। বিষ্ণু আবির্ভূত হয়ে বর দেন এবং মন্দর পর্বত ও বাসুকিকে ব্যবহার করে সমুদ্র মন্থনের নির্দেশ দেন; লক্ষ্মীর পুনরাবির্ভাবের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, কূর্মরূপে তিনি পর্বত ধারণ করবেন।

Adhyaya 232

Churning of the Milk Ocean: Shiva’s Drinking of Kālakūṭa, the ظهور of Mahālakṣmī, and the Greatness of the Three-Name Mantra

সমুদ্র-মন্থনে দেবতা ও দানবেরা মন্দর পর্বত উপড়ে মথনী করে, আর নারায়ণ কূর্মরূপে তাকে ধারণ করেন। বাসুকি দড়ি হয়; ঋষিরা উপবাস ও নিয়ম পালন করে শ্রীসূক্ত পাঠ করেন এবং একাদশীতে সহস্রনাম জপ করেন। প্রথমে কালকূট বিষ উঠে আসে; ভয়ে সবাই পালাতে থাকে। শঙ্কর সকলকে আশ্বস্ত করে নারায়ণকে ধ্যান করে “অচ্যুত, অনন্ত, গোবিন্দ”—এই ত্রিনাম মন্ত্রে বিষকে দমন করেন; মন্ত্রফল হিসেবে মৃত্যু-ভয়, বিষ, রোগ ও অগ্নিভয় থেকে রক্ষা বলা হয়েছে। পুনরায় মথনে জ্যেষ্ঠা দেবীর আবির্ভাব হয়; অশৌচ, অপবিত্রতা ও অধর্মাচারযুক্ত অমঙ্গল গৃহে তাঁর বাস নির্ধারিত হয়। এরপর বারুণী, সুরা, অপ্সরা, গন্ধর্ব, ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবা, ধন্বন্তরি, পারিজাত, সুরভি, সোম, তুলসী ও জগদ্ধাত্রী প্রভৃতি প্রকাশিত হন। শেষে মহালক্ষ্মী প্রকাশিত হন। দেবগণ শ্রীসূক্তে তাঁর স্তব করে প্রার্থনা করেন যেন তিনি বিষ্ণুর বক্ষস্থলে অবস্থান করেন; লক্ষ্মীর প্রতিষ্ঠায় জগতে সর্বত্র সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য ও মঙ্গল বিস্তার লাভ করে।

Adhyaya 233

Account of the Ekādaśī Fast and the Merit of Dvādaśī Worship

উমা–মহেশ্বর সংলাপে শিব বলেন—একাদশী ব্রত সর্ববিপদনাশক ও পরম পুণ্যদায়ক। একাদশীর ধারাবাহিকতায় দ্বাদশীতে শ্রদ্ধা, জাগরণ ও ভক্তিসহ পুরুষোত্তমের পূজা বিষ্ণুর অতি প্রিয়; দ্বাদশীতে তুলসী ও শ্রী (লক্ষ্মী)-সহ জনার্দনের আরাধনা করলে বন্ধন ছিন্ন হয় এবং ভগবানের পরম ধাম লাভ হয়। আর যে মায়ামোহে এ পূজা অবহেলা করে, সে পাপে পতিত হয়ে নরকফল ভোগ করে—এমন উপদেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর কাহিনি ক্ষীরসাগরে গিয়ে পৌঁছায়—শেষশয্যায় শায়িত বিষ্ণু কূর্মরূপে প্রকাশিত হন। দেবগণ স্তব করে শেষ ও দিক্‌গজদের সহায়তার জন্য বর প্রার্থনা করলে ভগবান সপ্তদ্বীপসমেত পৃথিবী ধারণ করার অঙ্গীকার করে তাদের অনুগ্রহ করেন। শেষে বিষ্ণুর আজ্ঞাপালনে নিবিষ্ট সিদ্ধ যোগী ও মুনিদের মহিমা, শ্রী-প্রসঙ্গ, কূর্ম-মহিমা এবং একাদশী–দ্বাদশী ক্রমবিধির সার সংক্ষেপে উপসংহৃত হয়।

Adhyaya 234

The Glory of Dvādaśī (Twelfth Lunar Day Observance)

পার্বতী দ্বাদশী-ব্রতের বিধি ও বিষ্ণু-পূজার ক্রম জানতে চান এবং একাদশীর পাপ-নাশক মহিমা ব্যাখ্যা করতে শিবকে অনুরোধ করেন। মহাদেব ও অন্তর্নিহিত উপদেশমূলক শ্লোকসমূহ একাদশী-উপবাসকে মহাযজ্ঞের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, পাপ থেকে রক্ষাকারী সর্বোত্তম আশ্রয় এবং ব্রতসমূহের মধ্যে প্রধান বলে প্রশংসা করেন। এরপর ব্রতাচরণের নিয়ম বলা হয়—দশমী/একাদশীর তিথি-মিশ্রণ বর্জন, অরুণোদয়ে নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন, এবং দ্বাদশীতে পারণ অবশ্যই করা, দ্বাদশীর অল্পাংশ অবশিষ্ট থাকলেও। দশমীতে সংযম, আমলকী-স্নান, রাত্রিকালীন পূজা ও জাগরণ, তুলসী-অর্ঘ্য, লক্ষ্মী–নারায়ণ পূজা, ১০৮ বার আরতি, ক্ষীর/পায়স নৈবেদ্য, পুরুষসূক্ত ও লক্ষ্মীসূক্তে ১০৮ আহুতি হোম, ব্রাহ্মণ-ভোজন ও শাস্ত্র-পাঠের বিধান আছে। শেষে বলা হয়—এইভাবে বিষ্ণু দ্রুত প্রসন্ন হয়ে ভক্তকে বর প্রদান করেন।

Adhyaya 235

Description of the Origin of Heretical Sects

পার্বতী জিজ্ঞাসা করেন—পাষণ্ডদের কেন বর্জন করা উচিত এবং শিব কেন বাহ্যত খুলি, ভস্ম, অস্থি প্রভৃতি “অবৈদিক” চিহ্ন ধারণ করেন। মহাদেব গোপন ইতিহাস বলেন—স্বায়ম্ভুব মন্বন্তরে বিষ্ণুভক্ত প্রবল দৈত্যরা অজেয় হয়ে উঠলে দেবতারা হরির শরণ নেন। বিষ্ণু রুদ্রকে আদেশ দেন—শত্রুদের মোহিত করতে বাহ্যত পাষণ্ডসদৃশ আচরণ গ্রহণ করে তামস পুরাণ ও ভ্রান্ত মতগ্রন্থ প্রচার করো, কিন্তু অন্তরে নারায়ণভক্তি অটুট রাখো। অধ্যায়ে পাষণ্ডের লক্ষণ হিসেবে বাসুদেব-বিরোধ, শ্রুতি-স্মৃতি থেকে বিচ্যুতি ও সম্প্রদায়চিহ্নধারণ উল্লেখ আছে; আবার অন্তঃশুদ্ধি রক্ষায় শ্রীराम ধ্যান করে তারক-মন্ত্র জপকে মুক্তিদায়ক বলা হয়েছে।

Adhyaya 236

Account of Tāmasa Scriptures (Guṇa-classification of Śāstras, Purāṇas, and Smṛtis)

দেবী পার্বতী মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করেন—যে ব্রাহ্মণদের ভক্তিহীন বলা হয়, তাদের দ্বারা প্রচারিত “তামস” শাস্ত্রগুলি কোনগুলি এবং তাদের স্বরূপ কী। শিব (অথবা বর্ণনাকারী) পাশুপত প্রভৃতি শৈব মত, কণাদের বৈশেষিক, গৌতমের ন্যায়, কপিলের সাংখ্য, চার্বাক ইত্যাদি মতের নাম করে এগুলিকে বৈষ্ণব-পথের বিরুদ্ধ/ভিন্ন বলে উল্লেখ করেন। এরপর দৈত্যদের মোহিত করার জন্য বিষ্ণুর বুদ্ধ-অবতারে প্রচারিত “মিথ্যা” বৌদ্ধ-উপদেশের বিতর্কমূলক বিবরণ আসে; কলিযুগে মায়াবাদকেও প্রতারণামূলক শাস্ত্র বলে নিন্দা করা হয়। পরে অষ্টাদশ পুরাণের ত্রিগুণভিত্তিক বিভাগ দেখিয়ে কয়েকটিকে তামস পুরাণ বলা হয় এবং স্মৃতিশাস্ত্রগুলিকেও গুণানুসারে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। শেষে তামস সঙ্গ ত্যাগের উপদেশ দিয়ে হরিসম্বন্ধীয় শিক্ষায় প্রসঙ্গ ফিরে যায়।

Adhyaya 237

Narration of the Varāha (Boar) Incarnation

রুদ্র পার্বতীকে বলেন—শ্বেতদ্বীপে হরির ধামে দ্বারপাল জয় ও বিজয় সনকাদি কুমারদের অবমাননা করলে কুমারগণ তাদের শাপ দেন। ভগবান যদিও তাদের পতন নির্ধারণ করেন, তবু আশীর্বাদ দেন যে ভক্তি নষ্ট হবে না; তাই দাস্য ও বৈরভাবযুক্ত জন্মে তারা অবতীর্ণ হয়। এই পতনই দিতির পুত্র হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষ রূপে প্রকাশ পেয়ে, দিব্য অপরাধ থেকে অবতার-কারণসূত্র স্থাপন করে। হিরণ্যাক্ষ ক্রোধে পৃথিবীকে টেনে রসাতলে নিয়ে যায়; দেবতারা ভয়ে নারায়ণের শরণ নেন। বিষ্ণু বরাহরূপে আবির্ভূত হয়ে দানবকে বধ করেন এবং পৃথিবীকে উদ্ধার করে যথাস্থানে স্থাপন করেন। দেবতারা বেদ-স্বরূপ স্তোত্রে প্রশংসা করেন—ঋক্, সাম, যজুঃ এবং ওঙ্কারকে ভগবানেরই স্বরূপ বলেন। শেষে বলা হয়, এই স্তোত্র পাঠ ও প্রাতে জাগরণে সমৃদ্ধি লাভ হয়; এরপর রুদ্র নরসিংহ অবতারের কাহিনিতে প্রবেশ করেন।

Adhyaya 238

The Manifestation (Appearance) of Narasiṃha

উমাকে মহেশ্বর বলেন—ভ্রাতৃহত্যার শোকে হিরণ্যকশিপু কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মার কাছ থেকে এমন বর লাভ করল যে সে নানা উপায়ে অবধ্য হয়ে উঠল। সেই শক্তিতে সে দেবগণকে পরাজিত করে যজ্ঞভাগও নিজের অধিকারভুক্ত করল। পরে সে কল্যাণীকে বিবাহ করে প্রহ্লাদকে পুত্ররূপে পেল; প্রহ্লাদ জন্ম থেকেই হরিভক্ত এবং নারায়ণই পরব্রহ্ম—এই ঘোষণা করত। এতে ক্রুদ্ধ হিরণ্যকশিপু অস্ত্র, সাপ, হাতি, আগুন, বিষ প্রভৃতি বহু উপায়ে প্রহ্লাদকে হত্যা করতে চাইল, কিন্তু মন্ত্রস্মরণ ও হরিনাম-চিন্তনে সে অক্ষত রইল। বিষ্ণুর সর্বব্যাপ্তি প্রমাণ করতে স্তম্ভে হরিকে দেখাতে বললে, প্রহ্লাদের অটল বিশ্বাসে সেই স্তম্ভ থেকেই ভগবান নরসিংহ আবির্ভূত হন, বিশ্বরূপ প্রকাশ করে দানবকে বধ করেন এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। লক্ষ্মী ও দেবগণ তাঁর উগ্র রূপ শান্ত করেন; প্রহ্লাদ বর লাভ করে রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। অধ্যায়ের শেষে নিত্য শ্রবণের মহাফল প্রশংসিত হয়েছে।

Adhyaya 239

The Manifestation (Advent) of Vāmana

মহাদেব উমাকে বলেন—প্রহ্লাদ থেকে বিরোচন পর্যন্ত বলির বংশপরম্পরা তিনি বর্ণনা করেন এবং বলি রাজার ধর্মনিষ্ঠ রাজত্বের প্রশংসা করেন। তাঁর শাসনে স্বতঃস্ফূর্ত সমৃদ্ধি দেখা দেয়, প্রজারা হৃষীকেশের পূজা করে; কিন্তু বলির দিগ্বিজয়ে ইন্দ্রসহ দেবগণ পরাভূত হয়ে অধীনতা স্বীকার করে। জগতের ভারসাম্য রক্ষায় কশ্যপ ও অদিতি শ্রীহরির উদ্দেশ্যে পয়োব্রত পালন করেন। তখন শ্রীসহ বিষ্ণু শঙ্খ-চক্র-গদাধারী, কৌস্তুভভূষিত, পীতাম্বরধারী রূপে প্রকাশিত হন এবং কশ্যপের স্তোত্র গ্রহণ করেন। প্রসন্ন হয়ে ভগবান বর দেন—কশ্যপ দেবহিতার্থে তাঁকে পুত্ররূপে প্রার্থনা করেন, আর অদিতি চান তিনি উপেন্দ্র/বামন হয়ে কৌশলে বলিকে পরাজিত করে ত্রিলোক ইন্দ্রকে ফিরিয়ে দিন। ভগবান সম্মতি দিয়ে অন্তর্ধান করে অদিতির গর্ভে প্রবেশ করেন; এদিকে বলি দীর্ঘ সোমযজ্ঞ আরম্ভ করেন—এভাবেই বামনাবতারের ভূমিকা স্থাপিত হয়।

Adhyaya 240

The Manifestation of Vāmana (and Trivikrama), Bali’s Gift, and Gaṅgā’s Sanctifying Origin

মহাদেব উমাকে বলেন—অদিতির গর্ভে ভগবান বিষ্ণু বামনরূপে আবির্ভূত হন। দেবগণ তাঁর স্তব করেন, আর তিনি ব্রহ্মচারীর বেশে বলি দানবরাজার যজ্ঞে উপস্থিত হন। বলি যথাযথ আতিথ্য-সত্কার করে তিন পা মাপের ভূমি দান করতে সম্মত হন, যদিও শুক্রাচার্য সতর্ক করেন যে ভিক্ষুকটি স্বয়ং বিষ্ণু। তারপর বামন ত্রিবিক্রমরূপে বিরাট হয়ে দুই পদক্ষেপে পৃথিবী ও স্বর্গ আচ্ছাদিত করেন। ব্রহ্মা ভগবানের পদপ্রক্ষালন করলে অক্ষয় পবিত্র জল উৎপন্ন হয়; তা মন্দাকিনী, ভোগবতী ও গঙ্গা নামে বিভিন্ন লোকধারায় প্রবাহিত হয়ে দর্শন, স্পর্শ, পান বা নামোচ্চারণমাত্রেই পবিত্র করে। শেষে বিষ্ণু দানবদের জন্য রসাতল নির্দিষ্ট করেন, বলিকে স্থায়ী ঐশ্বর্য দান করেন এবং ইন্দ্রের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে অন্তর্ধান হন—এইভাবে শিব বামন-মাহাত্ম্য সমাপ্ত করেন।

Adhyaya 241

The Deeds of Paraśurāma (Life of Jāmadagnya and the Slaying of Kārttavīrya)

উমা–মহেশ্বর সংলাপে মহাদেব জামদগ্নির তপস্যার কথা বলেন। তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ইন্দ্র তাঁকে সুরভি/শবলা কামধেনু দান করেন; তার ফলে আশ্রমে সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। তখন হৈহয় রাজা কার্ত্তবীর্য অর্জুন কামধেনুর প্রতি লোভ করে; জামদগ্নি না মানলে সে বলপূর্বক গাভী কেড়ে নেয় এবং সংঘর্ষে জামদগ্নিকে হত্যা করে মহাপাপ করে। এরপর জামদগ্ন্য পরশুরাম—যাঁকে বিষ্ণুর শক্ত্যাবেশ অংশ বলা হয়েছে—কাশ্যপের কাছ থেকে বৈষ্ণব মন্ত্রদীক্ষা লাভ করে কেশবের কাছ থেকে দিব্য শক্তি ও অস্ত্রশস্ত্র পান। তিনি পিতৃহত্যার প্রতিশোধে কার্ত্তবীর্যকে বধ করেন, পরে বৃহত্তরভাবে ক্ষত্রিয়-দমন অভিযান চালান; অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন এবং পৃথিবী ব্রাহ্মণদের দান করেন। শেষে তত্ত্বকথা বলা হয়—শক্ত্যাবেশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্বাধীন দেবতা রূপে পূজা করা উচিত নয়; পূর্ণ অবতার রাম ও কৃষ্ণই মুক্তিদাতা।

Adhyaya 242

Rāma Narrative Commencement and the Sanctity of Ayodhyā (Umā–Maheśvara Frame)

এই অধ্যায়ে উমা–মহেশ্বর সংলাপে স্বায়ম্ভুব মনুর নৈমিষারণ্যে হরির দীর্ঘ উপাসনা বর্ণিত। হরি প্রসন্ন হয়ে বর দেন—তিন জন্মে তিনি মনুর পুত্ররূপে অবতীর্ণ হবেন, যাতে অবতারের উদ্দেশ্যপূর্ণ অবতরণ ও ধর্মস্থাপনা প্রতিপন্ন হয়। এরপর শিববরপ্রভাবে রাবণের উত্থান, দেবতাদের সংকট এবং বিষ্ণুর রামরূপে জন্মগ্রহণের সংকল্প কথিত। অযোধ্যার মহিমা মুক্তিদায়িনী ধামরূপে কীর্তিত—যেখানে বিষ্ণুর নিবাস। দশরথের পুত্রেষ্টি যজ্ঞে দিব্য পায়স লাভ ও রামসহ চার ভ্রাতার জন্ম, এবং জনকের ক্ষেত্রে সীতার আবির্ভাব বর্ণনা করা হয়েছে। তাড়কা-বধ, যজ্ঞরক্ষা, অহল্যা-মোচন, শিবধনু ভঙ্গ, পরশুরামের দমন, বনবাস, সীতাহরণ, বানর-মৈত্রী, লঙ্কাযুদ্ধ, রাবণবধ, অগ্নিপরীক্ষায় সীতার শুদ্ধি-প্রমাণ এবং অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন—এই সব প্রসঙ্গে ভক্তি, শরণাগতি ও ধর্মপুনঃপ্রতিষ্ঠার শিক্ষা প্রকাশ পায়।

Adhyaya 243

Rāma’s Consecration (Abhiṣeka), Śiva’s Hymn to Sītā–Rāma, and the Hymn’s Phalaśruti

এই অধ্যায়ে শুভ মুহূর্তে শ্রী রামের রাজ্যাভিষেকের বর্ণনা আছে। বশিষ্ঠ প্রমুখ ঋষিগণ মন্ত্রোচ্চারণ, হোম, পবিত্র জল ও মঙ্গলদ্রব্য দ্বারা বিধিপূর্বক অভিষেক সম্পন্ন করেন। শ্রী রাম ও সীতা দিব্য ঐশ্বর্যে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন; আকাশে শুভ লক্ষণ প্রকাশ পায়। লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব, জাম্ববান, হনুমান ও বিভীষণ প্রমুখ সহচরগণ সেবাকর্ম ও আচার-অনুষ্ঠানে নিয়োজিত থাকেন। ভক্তিতে বিগলিত মহাদেব (শিব) শ্রীসীতা-রামের মহাস্তব করেন—রামকে পরব্রহ্ম এবং সীতাকে শক্তি/লক্ষ্মীরূপে স্বীকার করে, তাঁদের বিষ্ণু-শ্রী, শিব-গৌরী প্রভৃতি দিব্য যুগলের সঙ্গে একাত্ম বলে প্রকাশ করেন। পরে শ্রী রাম স্তোত্রের ফলশ্রুতি বলেন—রক্ষা, সমৃদ্ধি, বিজয়, ঐশ্বর্য ও দ্রুত সিদ্ধি লাভ হয়। শেষে দেবগণ ও অনুচররা স্তোত্র পাঠ করতে করতে প্রস্থান করেন।

Adhyaya 244

Narration of Śrī Rāma’s Deeds (Sītā’s Vindication, Lakṣmaṇa’s Departure, and Rāma’s Return to His Divine Abode)

উমা–মহেশ্বর সংলাপে মহেশ্বর শ্রীरामের রাজত্বের অন্তিম পর্ব বর্ণনা করেন। দীর্ঘকাল ধর্মময় শাসন সত্ত্বেও রাবণের গৃহে সীতার অবস্থান নিয়ে লোকনিন্দা ওঠে; তখন রাম তাঁকে বাল্মীকির আশ্রমে প্রেরণ করেন, সেখানে কুশ ও লবের জন্ম ও প্রতিপালন হয়। রাম বহু মহাযজ্ঞ সম্পন্ন করেন এবং অশ্বমেধে সীতার স্বর্ণপ্রতিমা স্থাপন করেন। পরবর্তীতে বাল্মীকি সীতাকে সভায় আনেন। সীতা জনকের সঙ্গে ধরিত্রীকে সাক্ষী করে সত্যক্রিয়ায় নিজের পবিত্রতা প্রকাশ করেন; ধরিত্রী তাঁকে গ্রহণ করেন এবং সীতা পরম ধামে আরূঢ় হন। এরপর কাল রামকে স্বধামে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানায়; অবিচ্ছেদ-নিয়ম রক্ষার্থে দুর্বাসার প্রসঙ্গে লক্ষ্মণ সরযূতে প্রবেশ করে আত্মসমর্পণ করেন। রাম কুশ-লবকে রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করে বিভীষণ ও হনুমান প্রমুখকে উপদেশ দেন এবং সকল অনুচরসহ সরযূতীরে গমন করেন। ব্রহ্মা ও দেবগণের স্তবের মধ্যে তিনি নিজের বৈষ্ণব দিব্য স্বরূপে পুনঃ প্রবেশ করেন। এই কাহিনির পাঠ ও শ্রবণ পরম পবিত্র ও মোক্ষদায়ক বলে ঘোষিত।

Adhyaya 245

The Slaying of Kaṁsa (and the Descent of Kṛṣṇa)

পার্বতী কৃষ্ণের পাপ-নাশক জীবনকথা শুনতে চাইলে মহাদেব যাদববংশ, দেবকীর বিবাহ এবং সেই আকাশবাণীর কথা বলেন—দেবকীর অষ্টম সন্তান কংসকে বধ করবে। ভয়ে কংস বসুদেব-দেবকীকে কারাগারে বন্দি করে প্রথম ছয় শিশুকে হত্যা করে; অনন্তের অংশ গর্ভ-পরিবর্তনে রোহিণীর গর্ভে গিয়ে সংকর্ষণ (বলরাম) হন, আর বিষ্ণু কৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ হন; যশোদার গৃহে যোগমায়ার জন্ম হয়। এ অধ্যায়ে ব্রজলীলার প্রধান ঘটনাগুলি সংক্ষেপে আছে—পূতনা-বধ, শকটভঙ্গ, দামোদরলীলা, কালিয়দমন, কেশীবধ ও গোবর্ধনধারণ; সঙ্গে ব্রহ্মা, ইন্দ্র ও অক্রূরের বেদান্তভাবপূর্ণ স্তবও যুক্ত। অক্রূর রাম-কৃষ্ণকে মথুরায় নিয়ে যান; কৃষ্ণ ধনু ভাঙেন, কুবলয়াপীড়কে বধ করেন, চানূর-মুষ্টিককে পরাজিত করে শেষে কংসকে সংহার করে ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও পৃথিবীর ভার লাঘব করেন।

Adhyaya 246

The Liberation of Mucukunda

এই অধ্যায়ে যাদবদের গঠনমূলক সংস্কার ও শিক্ষা বর্ণিত—উপনয়ন এবং সান্দীপনি গুরুর আশ্রমে বেদাধ্যয়ন। কংসবধের পর রাজনৈতিক-সামরিক সংকট ঘনীভূত হয়; জরাসন্ধ মথুরা অবরোধ করে। শ্রীকৃষ্ণ দিব্য রথ ও অস্ত্রসহ চতুর্ভুজ তেজোময় রূপ প্রকাশ করে বিপুল সেনা বিনাশ করেন; বলদেব জরাসন্ধকে দমন করলেও শ্রীকৃষ্ণের আদেশে তাকে মুক্ত করেন—কৌশলগত সংযম প্রতিষ্ঠার জন্য। পরবর্তীতে জরাসন্ধের সঙ্গে কালযবন মিত্র হয়ে মথুরা আক্রমণ করে। তখন শ্রীকৃষ্ণ সমুদ্র থেকে ভূমি লাভ করে দ্বারাবতী নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং এক রাত্রিতেই প্রজাদের সেখানে স্থানান্তরিত করেন। ধাওয়া করতে থাকা কালযবনকে তিনি এক গুহায় নিয়ে যান, যেখানে নিদ্রিত মুনিরাজ-রাজা মুচুকুন্দ শয়ন করছিলেন। জাগ্রত হয়ে তাঁর ক্রোধাগ্নির শক্তিতে কালযবন ভস্মীভূত হয়। মুচুকুন্দ ভগবানের স্তব করে মোক্ষ প্রার্থনা করেন। শ্রীভগবান তাঁকে মুক্তির বর দেন; তিনি চিরন্তন দিব্য লোক লাভ করে প্রভু-সদৃশ দিব্য রূপ প্রাপ্ত হন।

Adhyaya 247

The Destruction of the Vidarbha Army

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণচরিত অব্যাহত থাকে। মুচুকুন্দ যবনকে বধ করে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় মুক্তি লাভ করেন। ক্রুদ্ধ জরাসন্ধ রাম ও কৃষ্ণের বিরুদ্ধে অভিযান করে, কিন্তু পরাজিত হয়ে নিজ নগরে প্রত্যাবর্তন করে; এরপর দুই ভ্রাতা মথুরা ত্যাগ করে দ্বারকার দিকে যাত্রা করেন। বিশ্বকর্মা নির্মিত দিব্য সভামণ্ডপ ও সিংহাসন শ্রীকৃষ্ণকে অর্পিত হয়, এবং উগ্রসেনসহ বহু রাজা সমবেত হন। রৈবত-কন্যা রেবতীর সঙ্গে বলরামের বিবাহের প্রসঙ্গও আসে। পরে কাহিনি বিদর্ভে—ভীষ্মকের কন্যা রুক্মিণী, যিনি লক্ষ্মীর অংশ ও বিষ্ণুর নিত্য সহচরী বলে পরিচিতা, শিশুপালের সঙ্গে বিবাহে বাধ্য হন; তিনি ব্রাহ্মণ দূতের মাধ্যমে কৃষ্ণকে বার্তা পাঠান। দুর্গাপূজার সময় কৃষ্ণ রুক্মিণীকে হরণ করেন; অনুসরণকারী রাজাদের বলরাম বিনাশ করেন, আর রুক্মীকে মুণ্ডিত করে লাঞ্ছিত অবস্থায় মুক্ত করা হয়।

Adhyaya 248

Narration of Rukmiṇī’s Marriage

এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় প্রত্যাবর্তন এবং বৈদিক বিধি অনুসারে রুক্মিণীর বিবাহ-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার কথা বর্ণিত। দেবদুন্দুভি ধ্বনিত হয় ও পুষ্পবৃষ্টি ঘটে—যাতে এই বিবাহের অলৌকিক মঙ্গলতা প্রকাশ পায়। বলভদ্র, বসুদেব, উগ্রসেন, অক্রূর প্রমুখ যাদবগণ উপস্থিত হন; নন্দ-যশোদা গোপ-গোপীসহ আগমন করেন; ব্রাহ্মণ ঋত্বিজেরা মন্ত্রোচ্চারণে বিবাহকর্ম সম্পাদন করে দম্পতিকে আশীর্বাদ করেন। দান, আতিথ্য ও আগত রাজা-ব্রাহ্মণদের যথোচিত সম্মান—ধর্মরাজ্য ও গৃহস্থধর্মের আদর্শ তুলে ধরে। শেষে জাতবেদ (অগ্নি)-এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, গুরুজন ও ব্রাহ্মণদের প্রণাম এবং অতিথিদের বিধিবৎ বিদায় সম্পন্ন হয়। তারপর শ্রীকৃষ্ণ ও রুক্মিণী দিব্য প্রাসাদে নারায়ণ-শ্রীর ন্যায় সুখে বাস করেন; ঋষি ও দেবগণ তাঁদের প্রশংসা করেন।

Adhyaya 249

Narration of the Marriage(s) of Śrī Vāsudeva (Kṛṣṇa): Syamantaka, Naraka, and the Pārijāta

এই অধ্যায়ে শ্রীবাসুদেব (কৃষ্ণ)-এর প্রধান প্রধান রাণীদের পরিচয় ও তাঁদের বিবাহের প্রসঙ্গ—স্বয়ংবর, বীরত্ব ও ধর্মরক্ষার প্রেক্ষিতে—সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। এরপর স্যমন্তক মণির কাহিনি: প্রसेন-এর মৃত্যু, জনসাধারণের কৃষ্ণ-সন্দেহ, সত্য উদ্ঘাটনের জন্য অনুসন্ধান, গুহায় জাম্ববান-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ, দশ রাত্রি যুদ্ধ, শেষে বাসুদেবের দিব্যত্ব উপলব্ধি; তারপর মণি প্রত্যর্পণ ও জাম্ববতীর সঙ্গে বিবাহ। পরবর্তীতে পৃথিবীপুত্র নরকাসুর বধ, দেবলোকীয় ধনরত্ন উদ্ধার, এবং ষোলো হাজার কন্যার ধর্মসম্মত বিবাহের কথা বলা হয়েছে। স্বর্গে শচীর দ্বারা সত্যভামার অবমাননা হলে কৃষ্ণ পারিজাত বৃক্ষ নিয়ে আসেন, ইন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেন এবং সমঝোতায় তা কিছু কালের জন্য দ্বারকায় স্থাপন করেন। এখানে বলা হয়েছে, ভাদ্রপদ শুক্ল চতুর্থীতে চন্দ্রদর্শনে মিথ্যা অপবাদ-দোষ ঘটতে পারে; আর স্যমন্তক-কথা শ্রবণ মিথ্যা বাক্য ও অপবাদের পাপ নাশ করে।

Adhyaya 250

Narration of the Battle with Bāṇāsura (Aniruddha–Uṣā Episode and Hari–Hara Encounter)

এই অধ্যায়ে যাদববংশের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে—শ্রীকৃষ্ণ ও রুক্মিণীর গর্ভে মদনাংশ প্রদ্যুম্নের জন্ম, পরে অনিরুদ্ধের আবির্ভাব। উষা স্বপ্নে এক দিব্য যুবককে দেখে প্রেমাসক্ত হয়; সখী চিত্রলেখা নানা প্রতিচিত্র এঁকে সেই যুবককে অনিরুদ্ধ বলে চিনে মায়াবলে দ্বারকা থেকে তাঁকে মাহিষ্মতীতে এনে দেয়। ঘটনা প্রকাশ পেলে অনিরুদ্ধ বাণাসুরের প্রহরীদের পরাস্ত করেন, কিন্তু নাগপাশ অস্ত্রে আবদ্ধ হন। তখন শ্রীকৃষ্ণ সেনাসহ উপস্থিত হন। বরদানে বাধ্য শঙ্কর (রুদ্র) বাণকে রক্ষা করতে হরির সঙ্গে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধে তাপজ্বর ও শীতজ্বর প্রকাশ পায়; হরি-হর যুদ্ধশ্রবণ রোগনাশক ও পুণ্যদায়ক বলে প্রশংসিত। শ্রীকৃষ্ণ মোহনাস্ত্রে শঙ্করকে স্তম্ভিত করেন; পার্বতী প্রার্থনা করলে শঙ্কর শ্রীকৃষ্ণের পরমত্ব স্তব করে শরণ নেন। শ্রীকৃষ্ণ বাণাসুরের বহু বাহু ছেদন করেও তাঁকে বধ করেন না; দয়ায় জীবনদান করে সন্ধি স্থাপন করেন। অনিরুদ্ধ মুক্ত হন, উষা-অনিরুদ্ধের বিবাহ বিধিপূর্বক সম্পন্ন হয় এবং সকলেই দ্বারকায় প্রত্যাবর্তন করেন।

Adhyaya 251

Destruction of the Kṛtyā Performed by Pauṇḍraka’s Son

কাশীর রাজা পৌণ্ড্রক বারো বছর কঠোর শৈব তপস্যা করেন—উপবাস, মন্ত্রজপ এবং শেষে ভয়ংকর পুরশ্চরণ, যেখানে তিনি নিজের নয়ন-পদ্ম পর্যন্ত অর্ঘ্যরূপে নিবেদন করেন। তাতে প্রসন্ন শূলপাণি শিব তাঁকে বিষ্ণু-সদৃশ রূপ ও চিহ্ন প্রদান করেন। এই বর পেয়ে পৌণ্ড্রক নিজেকে “বাসুদেব” বলে ঘোষণা করে জগৎকে মোহিত করতে থাকে; নারদের প্ররোচনায় তিনি অক্ষৌহিণী সেনা নিয়ে দ্বারকার দিকে অগ্রসর হন। যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সেনাবাহিনী ধ্বংস করেন, কৃত্রিম চিহ্ন কেড়ে নেন এবং সুদর্শন চক্রে পৌণ্ড্রকের শিরচ্ছেদ করেন। পরে তাঁর পুত্র দণ্ডপাণি শৈব ক্রিয়ায় কৃষ্ণবধের উদ্দেশ্যে কৃত্যা সৃষ্টি করে; কিন্তু সুদর্শনের ভয়ে তা উল্টো বারাণসীর দিকে পালায়। সেখানে চক্র কৃত্যাকে বিনাশ করে, দণ্ডপাণিকে বধ করে এবং কাশী দগ্ধ করে শেষে কৃষ্ণের হস্তে প্রত্যাবর্তন করে।

Adhyaya 252

Description of Śrī Kṛṣṇa’s Departure to His Own Abode

মহাদেব উমাকে শ্রীকৃষ্ণচরিতের সংক্ষিপ্ত কাহিনি বলেন, যার পরিণতি স্বধাম-গমনে। কংসবধের পরে জরাসন্ধ যাদবদের পীড়িত করে; তখন কৃষ্ণ ভীম ও অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে ব্রাহ্মণবেশে প্রবেশ করে মল্লযুদ্ধে জরাসন্ধকে বধ করেন এবং বন্দী রাজাদের মুক্ত করেন। পরে রাজসূয় যজ্ঞ সম্পন্ন হয়; শিশুপাল বধপ্রাপ্ত হয়ে তিন জন্মের পর মুক্তি লাভ করে, দন্তবক্রও নিহত হয়ে হরিতে লীন হয়। ভগবান বৃন্দাবনকে অনুগ্রহ করে দ্বারকায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং দরিদ্র ব্রাহ্মণ-মিত্রের পিঠুকা গ্রহণ করে তাকে সমৃদ্ধি দান করেন। এরপর কুরুক্ষেত্রের পরিণাম, নারায়ণলোক থেকে এক ব্রাহ্মণের পুত্রদের ফিরিয়ে আনা, যাদবদের শাপ ও আত্মবিনাশ, শিকারির বাণে ভগবানের চরণবিদ্ধ হওয়া এবং শেষে বৈকুণ্ঠে আরোহন বর্ণিত। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে—কৃষ্ণলীলার শ্রবণ-পাঠ ও “নমঃ কৃষ্ণায়” জপ পাপ নাশ করে পরম ধাম প্রদান করে।

Adhyaya 253

Procedure for Worship of Viṣṇu and Exposition of Vaiṣṇava Conduct

অধ্যায়ের শুরুতে পার্বতী হরির মহিমা এবং রাম ও কৃষ্ণের বিস্ময়কর লীলা আরও শুনতে আকুল হন। তখন মহাদেব উপদেশরূপে বিষ্ণুর নিকটবর্তী হওয়ার বাস্তব উপায় হিসেবে অর্চা-উপাসনার বিধান ব্যাখ্যা করেন। তিনি স্বয়ংব্যক্ত (স্বপ্রকাশ) ও প্রতিষ্ঠিত (প্রতিষ্ঠা-কৃত) মূর্তির ভেদ দেখিয়ে বলেন—মানুষের পূজার জন্য কোথায়, কেন বিষ্ণু বিশেষভাবে সন্নিহিত হন, এবং প্রধান প্রধান ক্ষেত্র-তীর্থের উল্লেখ করেন। এরপর বর্ণানুযায়ী ভক্তিচর্চা, শ্রুতি–স্মৃতি-সম্মত আচরণের অপরিহার্যতা, এবং দৈনিক পূজাক্রম (শৌচ-শুদ্ধি, মন্ত্রজপ, তিলক, অর্ঘ্য-উপহার, নৈবেদ্য, হোম, অতিথি-সৎকার ইত্যাদি) সংক্ষেপে অথচ স্পষ্টভাবে বলা হয়। যক্ষ-ভূতাদি পূজা ও অপবিত্র আহার বর্জনের নির্দেশ দিয়ে শেষে ঘোষণা করা হয়—বৈষ্ণবদের সম্মান করা, প্রত্যক্ষ বিষ্ণুপূজার থেকেও শ্রেষ্ঠ ফল প্রদান করে।

Adhyaya 254

The Narration of the One Hundred and Eight Names of Śrī Rāmacandra

উত্তরখণ্ডের এই অধ্যায়ে পুরাণীয় বহুস্তরীয় কথাবিন্যাসে উমা দেবী শিবের গোপন বৈষ্ণবধর্ম-উপদেশের প্রশংসা করে বিষ্ণু-পূজার অনুমতি চান। তিনি গুরু বামদেবের শরণ নিয়ে মন্ত্র ও বিধি গ্রহণ করেন; হৃষীকেশের আরাধনা এবং প্রতিদিন বিষ্ণু-সহস্রনাম জপের নির্দেশ লাভ করেন। এরপর মহাদেব ঘোষণা করেন—‘রাম’ এক নামই সহস্রনামের সমতুল্য; এই রহস্য প্রকাশ করে তিনি শ্রী রামচন্দ্রের ১০৮ নামের স্তোত্রচক্র প্রবর্তন করেন। শেষে ফলশ্রুতিতে বলা হয়, এই সংলাপ ও নামসমূহ শ্রবণ-জপ করলে পাপক্ষয়, বিঘ্ননাশ, ইষ্টসিদ্ধি হয় এবং শেষে বৈকুণ্ঠলাভ ঘটে; আরও বলা হয়, শিবের বাহ্য উপদেশ কখনও মোহ সৃষ্টি করলেও গোপন সত্য বৈষ্ণব-পরমত্বই প্রতিষ্ঠা করে।

Adhyaya 255

The Account of Bhṛgu’s Test (Bhṛgu’s Examination of the Gods)

রাজা দিলীপ বসিষ্ঠকে জিজ্ঞাসা করলেন—পরম পূজ্য রুদ্র কেন নিন্দিত লিঙ্গ–যোনি-রূপ গ্রহণ করেছিলেন? বসিষ্ঠ প্রাচীন উপাখ্যান বললেন: মন্দর পর্বতে ঋষিদের মধ্যে বিতর্ক উঠল—মোক্ষদাতা শ্রেষ্ঠ দেবতা কে, আর কার পাদোদক ও উচ্ছিষ্ট/প্রসাদ সর্বাধিক শুদ্ধিকারক। তখন তারা ব্রহ্মা, রুদ্র ও বিষ্ণুকে পরীক্ষা করতে ভৃগুকে প্রেরণ করলেন। কৈলাসে নন্দী ভৃগুকে বাধা দিলে ভৃগু রুদ্রকে নিন্দিত রূপের শাপ দেন। ব্রহ্মলোকে ব্রহ্মা যথোচিত সম্মান না করায় তাকেও পূজার অযোগ্য বলে নিন্দা করা হয়। বৈকুণ্ঠে ভৃগু বিষ্ণুর বক্ষে পদাঘাত করলে জনার্দন ক্রোধ না করে বিনয়ে ব্রাহ্মণ-পাদরজের মহিমা প্রকাশ করেন এবং নিজের শুদ্ধ সত্ত্বগুণ প্রকাশিত করেন। ভৃগুর সংবাদে ঋষিরা বিষ্ণুর পরমত্ব স্বীকার করে মন্ত্র ও নিয়ম-শৃঙ্খলা লাভ করেন। অধ্যায়ের শেষে একান্ত বিষ্ণু-উপাসনা, প্রসাদ-নির্মাল্য সংক্রান্ত শৌচবিধি, শ্রাদ্ধকর্তব্য এবং পাঠ-শ্রবণের মহাফল বিধান করা হয়েছে।