Yuddhakhanda
त्रिपुरवर्णनम् (Tripura-varṇanam) — “Description of Tripura”
অধ্যায় ১-এ ত্রিপুরবধ-উপাখ্যানের সূচনা। গণেশ ও গৌরী-শঙ্করকে প্রণাম করে সংলাপরূপে কাহিনি শোনার অনুরোধ করা হয়। নারদ জিজ্ঞাসা করেন—রুদ্ররূপ শঙ্কর কীভাবে বিচরণশীল দুষ্টদের বিনাশ করলেন এবং দেবশত্রুদের তিন নগরীকে একটিমাত্র বাণে একই সঙ্গে কীভাবে দগ্ধ করলেন। ব্রহ্মা ব্যাস→সনৎকুমার→ব্রহ্মা→নারদ এই পুরাণ-পরম্পরা উল্লেখ করে বর্ণনার প্রামাণ্য স্থাপন করেন। সনৎকুমার কারণ-প্রস্তাব দেন—স্কন্দ তারকাসুরকে বধ করার পর তার তিন পুত্র জন্মায়: তারকাক্ষ, বিদ্যুন্মালী ও কমলাক্ষ। তারা সংযমী, শক্তিমান, সত্যবাদী, দৃঢ়চিত্ত বীর হলেও দেবদ্রোহী; তাই শিবের হস্তক্ষেপের ভূমিকা রচিত হয়।
देवस्तुतिः (Devastuti) — Hymn/Praise of the Devas
এই অধ্যায়ে ব্যাস ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেন—দেবতারা দুঃখভোগের পরে কীভাবে পুনরায় মঙ্গল লাভ করল। ব্রহ্মা শিবের পদ্মচরণ স্মরণ করে সনৎকুমারের বর্ণনার মাধ্যমে কাহিনি বলেন। ত্রিপুরনাথের তেজ ও মায়া-নামক মায়াবী শিল্পী (তারকাসুর-বংশসংশ্লিষ্ট) এর দমনে দেবতারা দগ্ধ ও পরাভূত হয়ে ব্যাকুল অবস্থায় ব্রহ্মার শরণে আসে। প্রণাম করে তারা নিজেদের কষ্ট জানায় এবং শত্রুনাশের উপায় প্রার্থনা করে। ব্রহ্মা তাদের আশ্বস্ত করে দৈত্য-দানবের ভেদ বোঝান এবং বলেন—প্রকৃত সমাধান শর্ব (শিব) দ্বারাই হবে। তিনি আরও জানান, ব্রহ্মাসংক্রান্তভাবে পোষিত দৈত্যকে ব্রহ্মার হাতে বধ করা ধর্মসঙ্গত নয়; কিন্তু শিবের শক্তি এই সীমা অতিক্রম করে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করবেন। দেবস্তুতি-ই এখানে শিবের অনুগ্রহ আহ্বানের কেন্দ্র, ত্রিপুর-যুদ্ধচক্রে তাঁর হস্তক্ষেপকে বৈধ করে।
भूतत्रिपुरधर्मवर्णनम् (Description of the Dharma/Conduct of the Bhūta-Tripura) — Chapter 3
এই অধ্যায়ে ত্রিপুরবধোপাখ্যানের মধ্যে ত্রিপুরের শাসক ও অধিবাসীদের বধ করা উচিত কি না—এই ধর্মবিচার উঠে আসে। শিব প্রথমে বলেন, বর্তমানে ত্রিপুরাধ্যক্ষ পুণ্যবান; যেখানে পুণ্য কার্যকর, সেখানে কারণ ছাড়া জ্ঞানীরা হত্যা করেন না। তিনি দেবতাদের দুঃখ স্বীকার করেও তারকের পুত্রদের ও তিন পুরবাসীদের অসাধারণ শক্তি এবং তাদের বধের দুরূহতা স্মরণ করান। এরপর তিনি নীতির কথা তুলে ধরে মিত্রদ্রোহকে মহাপাপ বলেন; উপকারীদের প্রতি দ্রোহ গুরুতর দোষ, আর কৃতঘ্নতার প্রায়শ্চিত্ত নেই—এ কথা জানান। দৈত্যরা তাঁর ভক্ত, তাই তাদের বধ দাবি করাও ধর্মসম্মত নয়—এই ইঙ্গিত দিয়ে শিব দেবতাদের বলেন, এসব কারণ বিষ্ণুকে জানাতে। সনৎকুমার বর্ণনা করেন—ইন্দ্রপ্রমুখ দেবগণ প্রথমে ব্রহ্মার কাছে গিয়ে পরে দ্রুত বৈকুণ্ঠে যান, পরবর্তী পরামর্শের জন্য। ফলে অধ্যায়টি ত্রিপুরবধকে কেবল যুদ্ধ নয়, পুণ্য-ভক্তি-মৈত্রী ও বিশ্ব-প্রয়োজনের ভারসাম্যপূর্ণ ধর্মপ্রশ্ন হিসেবে স্থাপন করে।
त्रिपुरदीक्षाविधानम् — Tripura Dīkṣā: Prescriptive Procedure (Chapter on the Ordinance of Initiation)
সনৎকুমার–পারাশর্য সংলাপে এই অধ্যায়ে ত্রিপুর প্রসঙ্গে ধর্মমুখী কার্যকে বাধা বা পরীক্ষা করার জন্য এক দিব্য প্রতিকার বর্ণিত হয়েছে। সনৎকুমার বলেন, বিষ্ণু (অচ্যুত) নিজেরই তেজ থেকে মায়া-নির্মিত এক পুরুষ সৃষ্টি করেন, যার কাজ ধর্মবিঘ্ন ঘটানো। তার মুণ্ডিত মস্তক, বিবর্ণ বস্ত্র, পাত্র ও পোটলি—এবং কাঁপা স্বরে বারবার “ধর্ম” উচ্চারণ—সবই ভণ্ড ধার্মিকতার লক্ষণ। সে বিষ্ণুকে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করে—কাকে পূজা করবে, কী কর্ম করবে, কোন নাম ধারণ করবে, কোথায় বাস করবে। বিষ্ণু তার উৎপত্তি ও দায়িত্ব জানিয়ে বলেন সে বিষ্ণুর দেহজাত, বিষ্ণুর কাজের জন্য নিযুক্ত এবং লোকের কাছে পূজ্য বলে গণ্য হবে; তার নাম ‘অরিহন’ নির্ধারণ করেন, অন্য নাম অশুভ বলেন এবং পরে তার উপযুক্ত স্থান/আবাসের বিধান বলবেন। অধ্যায়টি মায়া, অর্পিত কর্তৃত্ব ও ধর্মের ভুয়া রূপে বিপন্নতার তত্ত্বও ইঙ্গিত করে।
त्रिपुरमोहनम् (Tripuramohana — “The Delusion/Enchanting of Tripura”)
অধ্যায় ৫-এ ব্যাস জিজ্ঞাসা করেন—মায়াবী সন্ন্যাসীর দীক্ষায় দীক্ষিত ও মোহিত দানবরাজের পরে কী ঘটল। সনৎকুমার দীক্ষোত্তর কথোপকথন বর্ণনা করেন। শিষ্যবেষ্টিত, নারদ প্রমুখের সহচর্যে আরিহন্ নামক তপস্বী দানব-শাসককে ‘বেদান্তসার’ নামে পরম গোপন উপদেশ দেন। তিনি বলেন—সংসার অনাদি; চূড়ান্ত কর্তা–কর্ম দ্বৈত নেই, এটি নিজে থেকেই প্রকাশ ও লয় পায়। ব্রহ্মা থেকে তৃণ পর্যন্ত, দেহবন্ধন পর্যন্ত, কেবল আত্মাই একমাত্র প্রভু—দ্বিতীয় নিয়ন্তা নেই। দেব থেকে কীট পর্যন্ত সকল দেহ নশ্বর, কালের মধ্যে বিনাশপ্রাপ্ত। আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুন-প্রবৃত্তি সকল দেহীরই সাধারণ; উপবাসের পর তৃপ্তিও সবার একরূপ। ত্রিপুর কাহিনিতে এই ‘অদ্বৈত’ সদৃশ উপদেশই মায়া হয়ে দানবদের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে শিবের বৃহৎ কৌশলের ভূমি প্রস্তুত করে।
शिवस्तुतिवर्णनम् (Śiva-stuti-varṇanam) — “Description of Hymns in Praise of Śiva”
এই অধ্যায়ে ব্যাস সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেন—ত্রিপুর-দৈত্যনেতারা মোহগ্রস্ত হয়ে শিবপূজা ত্যাগ করলে সমাজ-ধর্মব্যবস্থা (গ্রন্থে বর্ণিত স্ত্রীধর্ম প্রভৃতি) কীভাবে দুরাচারে ভেঙে পড়ে। সনৎকুমার বলেন, হরি (বিষ্ণু) ‘সফলপ্রায়’ হয়ে দেবতাদের সঙ্গে কৈলাসে গিয়ে উমাপতি শিবকে সব সংবাদ জানান। শিবের নিকটে ব্রহ্মা গভীর সমাধিতে অবস্থান করেন; বিষ্ণু মনে সর্বজ্ঞ ব্রহ্মাকে স্মরণ করে শঙ্করের স্পষ্ট স্তব করেন—মহেশ্বর, পরমাত্মা, রুদ্র, নারায়ণ ও ব্রহ্ম রূপে শিবের ঐক্য প্রকাশ করে। পরে বিষ্ণু দণ্ডবৎ প্রণাম করে জলে দাঁড়িয়ে দক্ষিণামূর্তি-সম্পর্কিত রুদ্রমন্ত্র জপ করেন ও শম্ভু/পরমেশ্বর ধ্যান করেন; দেবতারাও মহেশ্বরে মন স্থির করেন। এই অধ্যায়ে স্তুতি-জপ-ধ্যানকে ত্রিপুরযুদ্ধচক্রে ঈশ্বরীয় প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী সমাধানের কার্যকর উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
देवस्तुतिवर्णनम् (Deva-stuti-varṇana) — “Description of the Gods’ Hymn/Praise”
অধ্যায় ৭-এ সনৎকুমার বর্ণনা করেন। শরণ্য ও ভক্তবৎসল শিব সমবেত দেবতাদের প্রার্থনা গ্রহণ করেন। এরপর দেবী পুত্রদের সঙ্গে উপস্থিত হলে বিষ্ণু প্রমুখ দেবগণ তৎক্ষণাৎ সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে মঙ্গলধ্বনি দেন, তবে আগমনের কারণ কিছুক্ষণ নীরবে রাখেন। বিস্ময়ভরা দেবী শিবকে সম্বোধন করে সূর্যসম দীপ্ত, ক্রীড়ালোল ষণ্মুখ স্কন্দকে উৎকৃষ্ট অলংকারে ভূষিত অবস্থায় দেখান। শিব আনন্দে স্কন্দের মুখামৃত পান করছেন যেন, তৃপ্ত হন না; আলিঙ্গন ও স্নেহভরে গন্ধ গ্রহণ করেন, আর সেই স্নেহমগ্নতায় নিজের তেজে দগ্ধ দৈত্যদের কথাও স্মরণ করেন না। এখানে একদিকে দেবস্তব ও শরণাগতি, অন্যদিকে শিবের পারিবারিক লীলা ও রসাস্বাদ—এই দ্বৈত সুরই মূল; শেষে অধ্যায়ের নাম ‘দেবস্তুতিবর্ণন’ বলা হয়েছে।
रुद्ररथ-निर्माणवर्णनम् / Description of Rudra’s Divine Chariot Construction
অধ্যায় ৮ সংলাপরূপে বিন্যস্ত। ব্যাস সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেন—শিবের উদ্দেশ্যে বিশ্বকর্মা নির্মিত ‘দেবময়’ রুদ্ররথ কেমন। সনৎকুমার শিবের পদপদ্ম স্মরণ করে রথকে ‘সর্বলোকময়’, স্বর্ণময় ও সর্বসম্মত বলে বর্ণনা করেন। ডান-বাম অংশ সূর্য ও সোমের সঙ্গে যুক্ত; চক্রে ষোলো কলা/অর, এবং ঋক্ষ-নক্ষত্র অলংকাররূপে স্থাপিত। বারো আদিত্য অরগুলিতে, ছয় ঋতু নেমি-নাভিরূপে, আর অন্তরীক্ষ প্রভৃতি লোক রথের অঙ্গ হয়ে ওঠে। উদয়-অস্ত পর্বত, মন্দর ও মহামেরু ভিত্তি ও স্তম্ভ হয়ে তার স্থিতি প্রকাশ করে। এভাবে শিবের ধর্মকার্যে সমগ্র বিশ্ব এক দিব্য যানে সমবেত হয়েছে।
दिव्यरथारोहणम् — Śiva’s Ascent on the Divine Chariot (Pre-battle Portents)
অধ্যায় ৯-এ যুদ্ধের পূর্বক্ষণে শিবের মহাদিব্য রথে আরোহণের মহিমা বর্ণিত। সনৎকুমার বলেন—ব্রহ্মা নিগম/বেদকে অশ্বরূপে কল্পনা করে রথ সাজিয়ে শূলিন শিবকে বিধিপূর্বক অর্পণ করেন। সর্বদেবময় শিব ঋষি ও দেবগণের স্তবের মধ্যে, ব্রহ্মা-বিষ্ণু ও লোকপালদের উপস্থিতিতে রথে ওঠেন; বেদজাত অশ্বেরা প্রণাম করে, পৃথিবী কেঁপে ওঠে, পর্বত দুলে যায়, শेषনাগ ভারে কাতর হয়। ধরণীধর-সম্পর্কিত এক বাহক ক্ষণিকের জন্য বৃষেন্দ্ররূপে রথ ধারণ করলেও শিবের তেজে সেই ধারণা টলে যায়। পরে সারথি লাগাম ধরে অশ্বদের স্থির করে রথের গতি সাম্য রাখে। এই অধ্যায়ে দেব-ক্রম, মহাজাগতিক পূর্বলক্ষণ এবং বেদ-প্রতীকী রথ-অশ্বের মাধ্যমে শিবের অপরিমেয় তেজ ও যুদ্ধযাত্রার ধর্মতাত্ত্বিক তাৎপর্য প্রকাশ পায়।
त्रिपुरदाहवर्णनम् | Tripura-dāha-varṇanam (Description of the Burning of Tripura)
এই অধ্যায়ে সনৎকুমার ত্রিপুরদাহের ঠিক পূর্বপর্ব বর্ণনা করেন। শম্ভু/মহেশ্বর রথারূঢ় হয়ে সম্পূর্ণ অস্ত্রসজ্জায় অতুল তীর প্রস্তুত করেন এবং স্থির যুদ্ধভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ তপস্যাসদৃশ একাগ্রতা ধারণ করেন। লক্ষ্যভেদের সূক্ষ্মতায় অঙ্গুষ্ঠ-সম্পর্কিত এক গণনায়কের উল্লেখ আসে, যা দেবযুদ্ধের বিধিবদ্ধ নিখুঁততা বোঝায়। তখন আকাশবাণী শোনা যায়—আক্রমণের আগে বিনায়ক (গণেশ)-পূজা আবশ্যক, নচেৎ ত্রিপুরবিনাশ অগ্রসর হবে না। শিব বিনায়ককে পূজা করে ভদ্রকালীকে আহ্বান করেন; বিনায়ক প্রসন্ন হলে ত্রিপুরের দর্শন/অবস্থান নির্ণয়ের ধারাবাহিকতা এগোয় এবং বলা হয়—সর্বপূজ্য পরব্রহ্ম মহেশ্বর কর্তা হলে ‘অন্যের’ কৃপায় নয়, বিধি ও সংকল্পেই সিদ্ধি ঘটে।
त्रिपुरदाहानन्तरं देवभयः ब्रह्मस्तुतिश्च — Fear of the Gods after Tripura’s Burning and Brahmā’s Praise
অধ্যায় ১১-এ ব্যাস প্রশ্ন করেন—ত্রিপুর সম্পূর্ণ দগ্ধ হওয়ার পরে মায়া ও ত্রিপুরাধিপতিরা কোথায় গেল; শম্ভুকথার ভিত্তিতে পূর্ণ বিবরণ চান। সূত বলেন, সনৎকুমার শিবচরণ স্মরণ করে ব্যাখ্যা শুরু করেন এবং শিবের কর্মকে পাপনাশক ও লীলাময় বলে বর্ণনা করেন। এরপর রুদ্রের অপ্রতিম তেজে দেবতারা বিস্মিত ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে; শিবরূপ সর্বদিকে জ্বলন্ত, কোটি সূর্যসম এবং প্রলয়াগ্নিসদৃশ—এ দৃশ্য দেব, ঋষি এমনকি ব্রহ্মাকেও ভীত করে তোলে। সবাই বিনীতভাবে ভক্তিভরে দাঁড়ায়, আর ব্রহ্মা অন্তরে সংযত থেকেও ভয়ে দেবসমেত স্তব-স্তোত্রে প্রবৃত্ত হন—শিবের পরম রূপ দর্শনের পরে স্তুতিই যথোচিত প্রতিক্রিয়া।
मयस्य शिवस्तुतिः — Maya’s Hymn to Śiva (and Śiva’s Gracious Response)
অধ্যায় ১২-এ সনৎকুমার বর্ণনা করেন—প্রসন্ন শিবকে দেখে ময় দানব, যিনি পূর্বে শিবের করুণায় ‘অদগ্ধ’ ছিলেন, আনন্দসহ শিবের কাছে এসে বারবার দণ্ডবৎ প্রণাম করেন। পরে উঠে তিনি দীর্ঘ স্তব করেন—শিবকে দেবদেব/মহাদেব, ভক্তবৎসল, কল্পবৃক্ষসম দাতা, নিরপেক্ষ, জ্যোতিরূপ, বিশ্বরূপ, পবিত্র ও পবিত্রকারী, রূপময় ও রূপাতীত, এবং জগতের কর্তা-ভর্তা-সংহর্তা বলে সম্বোধন করেন। তিনি নিজের স্তবের অক্ষমতা স্বীকার করে ‘স্তুতিপ্রিয় পরেশ্বর’-এর শরণাগত হয়ে রক্ষার প্রার্থনা জানান। সনৎকুমার বলেন, শিব স্তব শুনে প্রসন্ন হয়ে ময়কে সম্মানসহকারে সম্বোধন করেন—পরবর্তী উপদেশ/বরের সূচনা।
कैलासमार्गे शङ्करस्य परीक्षा — Śiva Tests the Approachers on the Kailāsa Path
অধ্যায় ১৩-এ বর্ণনা পরম্পরায় গাঁথা—ব্যাস শিবের কর্ম ও নির্মল কীর্তির বিস্তারিত জানতে চান; সূত সনৎকুমারের উত্তর জানান। এরপর জীব ও ইন্দ্র (শক্র/পুরন্দর) তীব্র ভক্তিতে কৈলাসে শিবদর্শনে যাত্রা করে। তাদের আগমন জেনে শিব তাদের জ্ঞান ও অন্তর্ভাব পরীক্ষা করতে স্থির করেন এবং পথের মধ্যভাগে দিগম্বর, জটাধারী, তপস্বী-দীপ্ত, ভয়ংকর-অদ্ভুত রূপে দাঁড়িয়ে পথ রুদ্ধ করেন। শিবকে না চিনে পদমর্যাদার অহংকারে ইন্দ্র জিজ্ঞাসা করে—তুমি কে, কোথা থেকে এসেছ, শম্ভু গৃহে আছেন কি না, নাকি অন্যত্র গেছেন। এই ঘটনার মাধ্যমে পরিচয়-অপরিচয়, প্রতিষ্ঠাগত গর্বের বিপদ এবং বিনয়-প্রজ্ঞায় দেবদর্শনের শিষ্টাচার প্রকাশ পায়।
शिवतेजसः समुद्रे बालरूपप्रादुर्भावः (Śiva’s Tejas Manifesting as a Child in the Ocean)
অধ্যায় ১৪-এ ব্যাস–সনৎকুমার সংলাপ চলতে থাকে। ব্যাস জিজ্ঞাসা করেন—ভালনেত্র/ত্রিনেত্র থেকে উদ্ভূত স্বয়ম্ভূ শিবতেজ লবণসমুদ্রে নিক্ষেপ করলে কী ফল হয়। সনৎকুমার বলেন, সিন্ধু–গঙ্গার সমুদ্রসঙ্গমে সেই তেজ মুহূর্তে বালরূপে প্রকাশ পায়। শিশুর ভয়ংকর ক্রন্দনে পৃথিবী কেঁপে ওঠে, স্বর্গলোক যেন বধির হয়ে স্তব্ধ হয়, আর লোকপালসহ সকল প্রাণী আতঙ্কিত হয়। দেবতা ও ঋষিরা এই অশুভ-অদ্ভুত লক্ষণ সামলাতে না পেরে পিতামহ, লোকগুরু, পরমেষ্ঠী ব্রহ্মার শরণে গিয়ে প্রণাম ও স্তবতি করে কারণ ও প্রতিকার জানতে চান; পরবর্তী সমাধানের ভূমিকা রচিত হয়।
राहोः शिरच्छेदन-कारणकथनम् / The Account of Rāhu’s Beheading (Cause and Background)
অধ্যায় ১৫ শুরু হয় জলন্ধরের রাজসভায়। সমুদ্রজাত অসুররাজ জলন্ধর রাণীসহ অসুরদের মাঝে আসীন, তখন দ্যুতিময় ভৃগুবংশীয় শুক্রাচার্য আগমন করে যথাযোগ্য সম্মান লাভ করেন। বরপ্রভাবে নিশ্চিন্ত জলন্ধর সভায় ছিন্নশির রাহুকে দেখে জিজ্ঞাসা করে—কে তার শিরচ্ছেদ করল এবং সম্পূর্ণ ঘটনা কী। শুক্রাচার্য মনে শিবের চরণকমল স্মরণ করে ইতিহাসধর্মী ধারায় পূর্বকথা বলেন; বিরোচনপুত্র বলি ও হিরণ্যকশিপুবংশের প্রসঙ্গ তুলে দেবাসুর সংঘাতে মায়া, পুণ্য ও প্রতিফলের কারণ-পরম্পরায় রাহুর অবস্থার ব্যাখ্যা দেন। এই অধ্যায় রাজকীয় অনুসন্ধানকে শিক্ষামূলক বর্ণনায় রূপ দিয়ে পরবর্তী সংঘর্ষের ইঙ্গিত করে।
देवाः वैकुण्ठगमनम् तथा विष्णोः अवतारस्तुतिः | Devas Go to Vaikuṇṭha and Praise Viṣṇu’s Avatāras
১৬ অধ্যায়ে দৈত্যদের আক্রমণে ভীত দেবতারা প্রজাপতিকে সামনে রেখে বৈকুণ্ঠে গমন করেন। সেখানে তাঁরা ভগবান বিষ্ণুর স্তুতি করেন এবং মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, বামন, পরশুরাম, রাম ও কৃষ্ণ অবতারের লীলা স্মরণ করে রক্ষার প্রার্থনা জানান।
अध्याय १७ — देवपलायनं, विष्णोः प्रतियुद्धं, जलंधरक्रोधः (Devas’ Rout, Viṣṇu’s Counterattack, and Jalandhara’s Wrath)
এই অধ্যায়ে সনৎকুমার যুদ্ধক্ষেত্রে বিপর্যয়ের কথা বলেন। শক্তিশালী দৈত্যরা শূল, পরশু, পট্টিশ প্রভৃতি অস্ত্রে দেবতাদের আঘাত করে; আহত ও আতঙ্কিত দেবগণ যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তা দেখে হৃষীকেশ বিষ্ণু গরুড়ারূঢ় হয়ে দ্রুত এসে দৈত্যদের সঙ্গে প্রতিযুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। শঙ্খ, খড়্গ, গদা ও শার্ঙ্গ ধনু ধারণ করে তিনি ক্রোধদীপ্ত শৃঙ্খলায় যুদ্ধ করেন; শার্ঙ্গের টঙ্কার ত্রিলোকে প্রতিধ্বনিত হয়। তাঁর বাণে বহু দিতিজ যোদ্ধার শিরচ্ছেদ হয়, আর সुदর্শন ভক্তরক্ষার প্রতীক হয়ে তাঁর হাতে জ্বলে ওঠে। গরুড়ের পক্ষবায়ুতে দৈত্যসেনা ঝড়ের মেঘের মতো ছিটকে পড়ে। সৈন্যদল বিপন্ন দেখে দেবভয়ংকর জলন্ধর ক্রোধে ফেটে পড়ে; তখন এক বীর হরির পাশে যুদ্ধ করতে অগ্রসর হয়, এবং পরবর্তী মুখ্য সংঘর্ষের ভূমিকা রচিত হয়।
देवशरणागति-नारदप्रेषणम् | The Devas Take Refuge in Śiva; Nārada Is Sent
এই অধ্যায়ে সনৎকুমার দেবতাদের দুঃখের কথা বলেন—মহা অসুর (জলন্ধর-সম্পর্কিত) এর অত্যাচারে তারা বিচলিত ও স্থানচ্যুত। দেবগণ একত্রে শিবের শরণাগতি গ্রহণ করে মহেশ্বরকে বরদাতা ও ভক্তরক্ষক বলে স্তব করেন। সর্বকামদ ও ভক্তবৎসল শিব দেবকার্যের জন্য নারদকে আহ্বান করে প্রেরণ করেন। শিবভক্ত জ্ঞানী নারদ ইন্দ্রাদি দেবদের কাছে গেলে তারা আসন, প্রণাম ও সম্মানে তাঁকে গ্রহণ করে। এরপর দেবতারা জলন্ধরের বলপ্রয়োগে উৎখাত হওয়ার অভিযোগ নিবেদন করে; ফলে পরবর্তী দैব হস্তক্ষেপের সূত্রপাত স্থাপিত হয়।
जालन्धरस्य दूतप्रेषणम् — Jalandhara Sends an Envoy to Kailāsa (The Provocation of Śiva)
নারদের প্রস্থানের পর জালন্ধর শিবের রূপ ও ঐশ্বর্য সম্পর্কে জেনে বিচলিত হন। তিনি সিংহিকেয় নামক এক দূতকে কৈলাসে পাঠান। দূত শিবকে একজন শ্মশানবাসী যোগী হিসেবে উপহাস করে এবং জালন্ধরের আধিপত্য ঘোষণা করে পার্বতীকে দাবি করে।
राहोर्विमोचनानन्तरं जलन्धरस्य सैन्योद्योगः — Rahu’s Aftermath and Jalandhara’s Mobilization
এই অধ্যায়ে সূতের বর্ণনায় ব্যাস সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেন—রহস্যময় ‘পুরুষ’ রাহুকে মুক্ত করার পর সে কোথায় গেল। সনৎকুমার বলেন, যে স্থানে মুক্তি ঘটেছিল, তা লোকমুখে ‘বর্বর’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। রাহু পুনরায় গর্ব ও স্থৈর্য লাভ করে জলন্ধরের নগরীর দিকে ফিরে যায় এবং ঈশ (শিব)-এর কার্যক্রমের সংবাদ জানায়। তা শুনে সিন্ধুপুত্র, দৈত্যশ্রেষ্ঠ জলন্ধর ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে সংযম ত্যাগ করে অসুরসেনা সমবেত করার আদেশ দেয়; কালনেমি প্রমুখ, শুম্ভ-নিশুম্ভ এবং কালক/কালকেয়, মৌর্য, ধূম্র ইত্যাদি নানা বংশ ও নেতাদের নাম করে যুদ্ধের জন্য আহ্বান করে।
द्वन्द्वयुद्धवर्णनम् / Description of the Duel-Combats
এই অধ্যায়ে সনৎকুমার বর্ণনা করেন—শিবের প্রধান গণনায়ক নন্দীশ্বর, ভৃঙ্গি/ইভমুখ ও ষণ্মুখ (কার্ত্তিকেয়)কে দেখে দানবেরা ক্রুদ্ধ হয়ে সুশৃঙ্খল দ্বন্দ্বযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিশুম্ভ কার্ত্তিকেয়কে লক্ষ্য করে পাঁচটি বাণে তাঁর ময়ূরবাহনের হৃদয়ে আঘাত করে, ফলে বাহনটি মূর্ছিত হয়ে পড়ে যায়। কার্ত্তিকেয় পাল্টা আক্রমণে নিশুম্ভের রথ ও অশ্বদের বিদ্ধ করেন এবং তীক্ষ্ণ শরে তাকে আহত করে যুদ্ধগর্জন করেন; কিন্তু নিশুম্ভও প্রতিঘাত করে, কার্ত্তিকেয় শক্তি তুলতে গেলে নিজের শক্তি নিক্ষেপে তাঁকে দ্রুত ভূমিতে ফেলেন। অন্যদিকে নন্দীশ্বর ও কালনেমির দ্বন্দ্বে নন্দী আঘাত করে কালনেমির রথের অশ্ব, ধ্বজ, রথ ও সারথি পর্যন্ত ছিন্ন করেন; ক্রুদ্ধ কালনেমি তীক্ষ্ণ বাণে নন্দীর ধনুক কেটে দেয়। যুদ্ধকৌশলের ক্রমবৃদ্ধি, যুদ্ধযন্ত্র অক্ষম করার প্রতীক এবং আঘাতের মধ্যেও বীরধৈর্য—এসব তুলে ধরে অধ্যায়টি পরবর্তী পালাবদল ও দৈব-ধর্মব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভূমি রচনা করে।
रुद्रस्य रणप्रवेशः तथा दैत्यगणानां बाणवृष्टिः (Rudra Enters the Battlefield; the Daityas’ Arrow-Storm)
অধ্যায় ২২-এ সনৎকুমার বর্ণনা করেন—বৃষভবাহন রুদ্র রৌদ্ররূপে, যেন ক্রীড়াস্মিত মুখে, রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। তাঁকে দেখে পূর্বে পরাজিত গণেরা পুনরায় সাহস পায়, গর্জে উঠে দানবদের উপর ঘন বাণবৃষ্টি নিক্ষেপ করে যুদ্ধে ফিরে আসে। শঙ্করের দর্শনে দানবেরা পাপের মতো ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে থাকে। তাদের পশ্চাদপসরণ দেখে জালন্ধর চণ্ডীশের দিকে ধেয়ে এসে সহস্র সহস্র বাণ ছোড়ে। নিশুম্ভ-শুম্ভ প্রভৃতি দানবরাজ ক্রোধে শিবের দিকে অগ্রসর হয়ে ‘বাণ-অন্ধকারে’ গণদের ঢেকে অঙ্গচ্ছেদ করে শৈবসেনাকে চাপে ফেলে। তখন শিব আগত বাণজাল ছিন্ন করে নিজের অস্ত্রে আকাশ পূর্ণ করেন; প্রবল প্রতিঝড়ে দানবেরা কাতর হয়ে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে। এতে রুদ্রের শ্রেষ্ঠত্ব ও দানবশক্তির ভঙ্গুরতা প্রকাশ পায়।
वृन्दायाः दुष्स्वप्न-दर्शनं तथा पातिव्रत्य-भङ्गोपक्रमः / Vṛndā’s Ominous Dreams and the Prelude to the Breach of Chastity
অধ্যায় ২৩ সংলাপরূপে রচিত। ব্যাস সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেন—জালন্ধরের প্রসঙ্গে হরি (বিষ্ণু) কী কর্ম করলেন এবং কীভাবে ধর্ম পরিত্যক্ত হল। সনৎকুমার বলেন, বিষ্ণু জালন্ধরের দিকে গিয়ে বৃন্দার পাতিব্রত্য-শক্তি ভাঙার কৌশল শুরু করেন, কারণ সেই শক্তিই দৈত্যের বল ও অজেয়তার সঙ্গে গূঢ়ভাবে যুক্ত। এরপর মায়াজনিত দুঃস্বপ্নে বৃন্দা কষ্ট পায়—স্বামীকে অশুভ বিকৃত রূপে দেখে (নগ্ন, তেলমাখা, অন্ধকার-সংযুক্ত, দক্ষিণমুখে গমনরত) এবং তার নগরী সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে বলে মনে হয়। জেগে উঠে সে সূর্যকে ম্লান/দোষযুক্ত দেখে, ভয় ও শোকে আচ্ছন্ন হয়, এবং উঁচু স্থানে বা উদ্যানেও সখীদের সঙ্গে শান্তি পায় না। এই অধ্যায়ে কারণ-পরম্পরা স্থাপিত হয়—দৈব মায়া মনকে বিচলিত করে, অমঙ্গল লক্ষণ ধর্মভঙ্গের ইঙ্গিত দেয়, এবং পরবর্তী পাতিব্রত্য-ভঙ্গের ভূমিকা প্রস্তুত করে।
जलंधरयुद्धे मायाप्रयोगः — Jalandhara’s Māyā in the Battle with Śiva
অধ্যায় ২৪-এ জলন্ধর–শিব সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। ব্যাস সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেন—এরপর যুদ্ধে কী ঘটল এবং দৈত্যকে কীভাবে দমন করা হবে। যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে গিরিজা অদৃশ্য; বৃষধ্বজ ত্র্যম্বক তা মায়াজনিত অন্তর্ধান বুঝে সর্বশক্তিমান হয়েও লীলার জন্য ‘লৌকিকী গতি’ অবলম্বন করে ক্রোধ ও বিস্ময় প্রকাশ করেন। জলন্ধর তীরবৃষ্টি করে, শিব সহজেই তা ছিন্ন করে রুদ্রের অপ্রতিহত শক্তি দেখান। এরপর জলন্ধর মায়া সৃষ্টি করে গৌরীকে রথে বাঁধা, কাঁদতে থাকা, শুম্ভ-নিশুম্ভ প্রভৃতি দানবদের দ্বারা আবদ্ধ দেখায়—শিবের মনোবল ভাঙতে। শিব কিছুক্ষণ নীরব, মুখ নত, অঙ্গ শিথিল ও নিজের পরাক্রম ভুলে যাওয়ার মতো হন—মায়ার পরীক্ষামূলক নাট্যরূপ। তারপর জলন্ধর শিবের শির, বক্ষ ও উদরে বহু তীর নিক্ষেপ করে, পরবর্তী ঘটনার ভূমিকা রচনা করে।
देवस्तुतिः — Hymn of Praise by the Devas (Devastuti)
অধ্যায় ২৫-এ সনৎকুমার বর্ণনা করেন—ব্রহ্মা ও সমবেত দেবতা-ঋষিরা ভক্তিভরে প্রণাম করে দেবদেবেশ শিবের বিধিবৎ স্তব করেন। স্তোত্রে শিবের শরণাগতবৎসলতা ও ভক্তদের দুঃখনিবারণ প্রধান। দেবগণ শিবের পরস্পরবিরোধী মহিমা প্রকাশ করেন—লীলায় বিস্ময়কর, ভক্তিতে সহজলভ্য, কিন্তু অশুদ্ধের কাছে দুর্লভ; বেদও যাঁকে সম্পূর্ণ ধরতে পারে না, তবু মহাত্মারা তাঁর গূঢ় মহিমা নিত্য গায়। শিবকৃপা সাধনার সামর্থ্য সম্পর্কে সাধারণ ধারণা উল্টে দিতে পারে; তিনি সর্বব্যাপী ও অবিকার, সত্যভক্তিতে প্রকাশিত। যদুপতি ও তাঁর পত্নী কলাবতী, এবং রাজা মিত্রসহ ও মদয়ন্তী—এঁরা ভক্তিতে পরম সিদ্ধি ও কৈবল্য লাভ করেন। সমগ্র অধ্যায়টি কাহিনির মধ্যে স্থাপিত তত্ত্বময় স্তোত্র, যা ভক্তি→দিব্যপ্রকাশ→মুক্তির পথ নির্দেশ করে।
विष्णुचेष्टितवर्णनम् / Account of Viṣṇu’s Stratagem and Its Aftermath
অধ্যায় ২৬-এ যুদ্ধোত্তর কথোপকথন চলতে থাকে। ব্যাস সনৎকুমারকে বৈষ্ণব প্রসঙ্গের স্পষ্ট বিবরণ জিজ্ঞাসা করেন—বৃন্দাকে মোহিত করার পর বিষ্ণু কী করলেন এবং কোথায় গেলেন। দেবতারা নীরব হলে শরণাগতবৎসল শম্ভু সান্ত্বনা দিয়ে বলেন—দেবহিতার্থে তিনি জলন্ধরকে বধ করেছেন এবং জিজ্ঞাসা করেন সকলের মঙ্গল হয়েছে কি না; তাঁর কর্ম লীলামাত্র, স্বরূপে কোনো বিকার নেই। এরপর দেবগণ রুদ্রের স্তব করে জানান—বিষ্ণুর প্রচেষ্টায় বৃন্দা প্রতারিত হয়ে অগ্নিতে প্রবেশ করে পরম গতি লাভ করেছেন; কিন্তু তাঁর সৌন্দর্যে বিষ্ণু নিজেও শিবমায়ায় বিমূঢ় হয়ে চিতাভস্ম ধারণ করে বিভ্রান্ত থাকেন। এই অধ্যায়ে দিব্য কর্তৃত্ব ও মোহগ্রস্ততার বৈপরীত্য, শিবের মায়াধিপত্য এবং ধর্মব্যবস্থায় প্রতারণার নৈতিক ফল স্পষ্ট হয়।
शङ्खचूडवधकथनम् / The Account of Śaṅkhacūḍa’s Slaying
অধ্যায় ২৭-এ সনৎকুমার ব্যাসকে বলেন—এই কাহিনি কেবল শ্রবণমাত্রেই অচল শিবভক্তি দৃঢ় করে ও পাপ নাশ করে। দেবতাদের উপদ্রবকারী দৈত্যবীর শঙ্খচূড়ের পরিচয় দেওয়া হয় এবং ইঙ্গিত থাকে যে রণক্ষেত্রে শিবের ত্রিশূলেই তার বধ হবে। এরপর পুরাণীয় কারণ-ক্রমে বংশপরিচয়—মরীচিপুত্র কশ্যপ ধর্মপরায়ণ প্রজাপতি; দক্ষ তাঁর তেরো কন্যা কশ্যপকে দেন, যাদের দ্বারা সৃষ্টির বিস্তার ঘটে (অপরিসীম বলে সংক্ষেপে)। কশ্যপপত্নীদের মধ্যে দনু প্রধান; তার বংশে বিপ্রচিত্তি ও তার পুত্র দম্ভ—ধার্মিক, সংযমী ও বিষ্ণুভক্ত—উল্লেখিত হয়ে শঙ্খচূড়-সংঘাতের নৈতিক ভূমি স্থাপিত হয়।
शङ्खचूडकृततपः—ब्रह्मवरकवचप्राप्तिः / Śaṅkhacūḍa’s Austerity—Brahmā’s Boon and the Bestowal of the Kavaca
সনৎকুমার বর্ণনা করেন যে জৈগীষব্যের উপদেশে শঙ্খচূড় পুষ্করে কঠোর নিয়মে তপস্যা করেন। গুরুর কাছ থেকে ব্রহ্মবিদ্যা পেয়ে তিনি সংযত ইন্দ্রিয় ও একাগ্রচিত্তে জপ করেন। ব্রহ্মলোকের আচার্য ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে দানবনায়ককে বর চাইতে বলেন। শঙ্খচূড় প্রণাম করে স্তব করে দেবতাদের বিরুদ্ধে অবধ্যতা প্রার্থনা করেন; ব্রহ্মা প্রসন্ন হয়ে তা দান করেন। আরও দেন সর্বমঙ্গল ও জয়প্রদ দিব্য রক্ষাকবচ—মন্ত্ররূপ শ্রীকৃষ্ণকবচ। এরপর ব্রহ্মা নির্দেশ দেন, তুলসীকে সঙ্গে নিয়ে বদরীতে গিয়ে ধর্মধ্বজের কন্যা তুলসীর সঙ্গে সেখানে বিবাহ সম্পন্ন করতে। ব্রহ্মা অন্তর্ধান করেন; তপস্যাসিদ্ধ শঙ্খচূড় কবচ ধারণ করে দ্রুত বদরিকাশ্রমের দিকে যাত্রা করেন, যা পরবর্তী সংঘর্ষ ও নৈতিক পরিণতির ভূমি প্রস্তুত করে।
शङ्खचूडकस्य राज्याभिषेकः तथा शक्रपुरीं प्रति प्रस्थानम् | Śaṅkhacūḍa’s Coronation and March toward Indra’s City
এই অধ্যায়ে সনৎকুমার বলেন—শঙ্খচূড় গৃহে ফিরে বিবাহ সম্পন্ন করলে দানবরা তার তপস্যা ও বরলাভ স্মরণ করে আনন্দিত হয়। দেবগণ গুরুসহ এসে তার তেজ ও কর্তৃত্ব স্বীকার করে শ্রদ্ধাভরে স্তব করে। শঙ্খচূড়ও আগত কুলগুরুকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে। অসুরগুরু শুক্র দেব-দানবের স্বাভাবিক বৈর, অসুরদের পূর্বপরাজয়, দেবদের জয় এবং ফলাফলে ‘জীব-সাহায্য’ (দেহধারীদের সহায়ক ভূমিকা) ব্যাখ্যা করেন। আনন্দিত অসুররা উৎসব করে উপহার দেয়। সকলের সম্মতিতে গুরু শঙ্খচূড়কে দানব ও সহচর অসুরদের অধিপতি হিসেবে রাজ্যাভিষেক করেন। অভিষিক্ত শঙ্খচূড় রাজসদৃশ দীপ্ত হয়ে দৈত্য-দানব-রাক্ষসের বিশাল সেনা সমবেত করে রথে আরূঢ় হয়ে শক্রপুরী (ইন্দ্রের নগরী) জয় করতে অগ্রসর হয়।
शिवलोकप्रवेशः (Entry into Śivaloka through successive gateways)
অধ্যায় ৩০-এ স্তরবদ্ধ দ্বার অতিক্রম করে শিবলোকে প্রবেশের বিধিবৎ প্রক্রিয়া বর্ণিত। সনৎকুমার বলেন, আগত দেবতা (বর্ণনায় ব্রহ্মা/রামেশ্বর) ‘মহাদিব্য’ শিবলোকে পৌঁছান—যা নিরাধার ও অভৌতিক। বিষ্ণু অন্তরে আনন্দ নিয়ে রত্নশোভিত দীপ্তিময় লোক দর্শন করে প্রথম দ্বারে আসেন; সেখানে গণেরা উপস্থিত। দ্বারপালরা রত্নসিংহাসনে আসীন, শ্বেতবস্ত্রধারী, মণিভূষিত; শৈব লক্ষণে পঞ্চমুখ, ত্রিনেত্র, ত্রিশূলাদি অস্ত্রধারী, ভস্ম ও রুদ্রাক্ষে অলংকৃত। প্রণাম করে বিষ্ণু শিবদর্শনের উদ্দেশ্য নিবেদন করলে অনুমতি (আজ্ঞা) পেয়ে তিনি অন্তরে প্রবেশ করেন। এভাবে পনেরোটি দ্বার পর্যন্ত একই রীতি পুনরাবৃত্ত হয়। শেষে মহাদ্বারে নন্দীর দর্শন; স্তব ও নমস্কারের পর নন্দী অনুমতি দেন, এবং বিষ্ণু আনন্দসহ অন্তঃপ্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। অধ্যায়টি শিবসান্নিধ্যের জন্য ভক্তি, স্তুতি ও অনুমোদিত প্রবেশের গুরুত্ব প্রকাশ করে।
शिवस्य आश्वासनं हरि-ब्रह्मणोः तथा शङ्खचूडवृत्तान्तकथनम् / Śiva’s Reassurance to Hari and Brahmā; Account of Śaṅkhacūḍa’s Origin
অধ্যায় ৩১-এ সনৎকুমার বলেন, হরি (বিষ্ণু) ও বিধি (ব্রহ্মা)-র উদ্বিগ্ন বাক্য শুনে শম্ভু (শিব) মৃদু হাসি সহ বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে তাঁদের আশ্বাস দেন—“ভয় ত্যাগ করো; শঙ্খচূড়কে কেন্দ্র করে যে বিষয় উঠেছে, তার পরিণাম অবশ্যই শুভ হবে।” শিব জানান, শঙ্খচূড়ের সম্পূর্ণ সত্যবৃত্তান্ত তিনি জানেন এবং তা পূর্বজন্মের কৃষ্ণভক্ত গোপ সুদামার সঙ্গে যুক্ত। শিবের আদেশে হৃষীকেশ কৃষ্ণরূপ ধারণ করে মনোরম গোলোকে অবস্থান করেন; সেখানে “আমি স্বাধীন” এই ভ্রমে নানা লীলা চলতে থাকে। এই প্রবল মোহ দেখে শিব স্বমায়া প্রয়োগ করে সঠিক বোধ আচ্ছন্ন করেন এবং শাপ উচ্চারণের ব্যবস্থা করেন—যার কর্মসূত্রে পরে শঙ্খচূড়-সংঘাতের কারণ গড়ে ওঠে। লীলা শেষ হলে শিব মায়া প্রত্যাহার করেন; সকলের জ্ঞান ফিরে আসে, মোহমুক্ত হয়ে তাঁরা বিনয়ে শিবের শরণ নেন, লজ্জায় সব স্বীকার করে রক্ষা প্রার্থনা করেন। শিব প্রসন্ন হয়ে পুনরায় নির্ভয় হতে বলেন এবং জানান সবই তাঁর বিধানের অধীন—এই অধ্যায় ভয়, মোহ ও প্রতিপক্ষের দैব-উৎপত্তির তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে।
शिवदूतस्य शङ्खचूडकुलप्रवेशः — The Śiva-Envoy’s Entry into Śaṅkhacūḍa’s City
এই অধ্যায়ে সনৎকুমার বলেন, দেবতাদের অভিপ্রায় ও ঘনিয়ে আসা কালের বিধান অনুসারে মহেশ্বর শঙ্খচূড়ের বধ স্থির করলেন। শিব পুষ্পদন্ত নামে নিজের দূতকে দ্রুত শঙ্খচূড়ের কাছে পাঠালেন। প্রভুর আজ্ঞাবলে দূত অসুর-নগরে পৌঁছায়—যার ঐশ্বর্য ইন্দ্রপুরীকেও ছাপিয়ে এবং কুবেরের আবাসের চেয়েও অধিক দীপ্ত। নগরে প্রবেশ করে সে দ্বাদশদ্বারবিশিষ্ট, দ্বাররক্ষকে পরিবেষ্টিত রাজপ্রাসাদ দেখে; নির্ভয়ে উদ্দেশ্য জানালে তাকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়, যেখানে সে বিস্তৃত ও সুসজ্জিত অন্তঃপ্রাসাদ প্রত্যক্ষ করে। পরে রত্নাসনে অধিষ্ঠিত শঙ্খচূড়কে দানবনায়কদের মাঝে এবং বিপুল সশস্ত্র বাহিনীর দ্বারা পরিবৃত দেখে সে বিস্মিত হয়। তখন পুষ্পদন্ত রাজাকে সম্বোধন করে নিজেকে শিবদূত পরিচয় দিয়ে শঙ্করের বার্তা নিবেদন করে, যার ফলে পরবর্তী দূতসংবাদ ও যুদ্ধের উত্তেজনা সূচিত হয়।
शिवस्य सैन्यप्रयाणम् तथा गणपतिनामावलिः (Śiva’s Mobilization for War and the Catalogue of Gaṇa Commanders)
এই অধ্যায়ে উপদেশ-শ্রবণ থেকে সরাসরি যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি দেখানো হয়েছে। সনৎকুমার বলেন—উসকানিমূলক বাক্য শুনে গিরীশ রুদ্র সংযত ক্রোধে বীরভদ্র, নন্দী, ক্ষেত্রপাল ও অষ্টভৈরবদের ডেকে সকল গণকে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে যুদ্ধে প্রস্তুত হতে আদেশ দেন। তিনি স্কন্দ ও গণেশ—দুই কুমারকে নিজের অধীনে অগ্রসর হতে বলেন, ভদ্রকালীকে নিজ বাহিনীসহ অগ্রযাত্রার নির্দেশ দেন এবং নিজে শঙ্খচূড়-বধার্থে ত্বরিত প্রস্থান ঘোষণা করেন। এরপর মহেশানের সেনাসহ যাত্রা ও বীরগণদের উল্লাসপূর্ণ অনুসরণ বর্ণিত। শেষে বীরভদ্র, নন্দী, মহাকাল, বিশালাক্ষ, বাণ, পিঙ্গলাক্ষ, বিকম্পন, বিরূপ, বিকৃতি, মণিভদ্র প্রভৃতি গণনায়কদের নামতালিকা এবং কোটিগণাদি সংখ্যা-সহ তাদের সামরিক বিন্যাসের আনুষ্ঠানিক নিবন্ধ দেওয়া হয়েছে।
शिवदूतगमनानन्तरं शङ्खचूडस्य तुलसीसम्भाषणं युद्धप्रस्थान-तत्परता च / After Śiva’s Messenger Departs: Śaṅkhacūḍa’s Counsel with Tulasī and Readiness for War
এই অধ্যায়ে ব্যাস সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেন—শিবদূত চলে যাওয়ার পরে দৈত্যরাজ শঙ্খচূড় কী করল। সনৎকুমার বলেন, শঙ্খচূড় অন্তঃপুরে গিয়ে তুলসীকে শিবের বার্তা জানায়, যুদ্ধে যাওয়ার সংকল্প করে এবং তার কাছ থেকে দৃঢ় ‘শাসন’ প্রার্থনা করে। শিবের আহ্বানের গাম্ভীর্য সত্ত্বেও দম্পতি ভোগ-ক্রীড়া ও নানা কলায় মগ্ন থাকে—এতে শঙ্করের কর্তৃত্বের প্রতি অনাদর প্রকাশ পায়। ব্রহ্মমুহূর্তে উঠে সে প্রাতঃকর্ম ও নিত্যকর্ম সম্পন্ন করে এবং প্রচুর দান দেয়, যেন ধর্মাচরণের বাহ্য রূপ দেখায়। পরে পুত্রকে রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করে ধনভাণ্ডার ও প্রশাসন তার হাতে দেয়, তুলসীকেও তার তত্ত্বাবধানে রাখে। কাঁদতে থাকা তুলসী তাকে নিবৃত্ত করতে চাইলে সে নানা আশ্বাসে সান্ত্বনা দেয়। শেষে বীর সেনাপতিকে ডেকে সম্মান করে আদেশ দেয় এবং সজ্জিত হয়ে যুদ্ধ-প্রস্তুতিতে প্রবৃত্ত হয়; গৃহ থেকে রণক্ষেত্রে যাত্রার সেতু রচিত হয়।
शङ्खचूडदूतागमनम् — The Arrival of Śaṅkhacūḍa’s Envoy (and Praise of Śiva)
অধ্যায় ৩৫-এ সনৎকুমার যুদ্ধচক্রের মধ্যে এক কূটনৈতিক ঘটনার বর্ণনা দেন। শঙ্খচূড়-সম্পর্কিত দৈত্যপক্ষ এক অত্যন্ত বিদ্বান দূতকে শঙ্করের কাছে পাঠায়। দূত বটমূলের নীচে আসীন শিবকে দর্শন করে—কোটি সূর্যের ন্যায় দীপ্ত, যোগাসনে স্থিত, সংযত দৃষ্টি ও মুদ্রাযুক্ত। এরপর ঘন বিশেষণ-স্তবকে শিবকে বলা হয়: শান্ত, ত্রিনয়ন, ব্যাঘ্রচর্মধারী, অস্ত্রধারী, ভক্তদের মৃত্যুভয়হর, তপস্যার ফলদাতা, সর্বসমৃদ্ধির কর্তা; তিনি বিশ্বনাথ/বিশ্ববীজ/বিশ্বরূপ এবং নরক-সমুদ্র পার করানোর পরম কারণ। দূত অবতরণ করে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানায়; শিবের বামে ভদ্রকালী ও সম্মুখে স্কন্দের উপস্থিতিতে শুভ আশীর্বাদ লাভ করে। তারপর প্রণামোত্তর বিধিসম্মত আনুষ্ঠানিক ভাষণ শুরু করে, যা পরবর্তী আলোচনা/সতর্কতা/দাবির ভূমিকা রচনা করে।
शिवदूतेन युद्धनिश्चयः तथा देवदानवयुद्धारम्भः (Śiva’s Envoy and the Commencement of the Deva–Dānava War)
অধ্যায় ৩৬-এ সনৎকুমার বর্ণনা করেন—শিবদূত শঙ্খচূড়ের কাছে শিবের বার্তা সম্পূর্ণ বিবরণ ও দৃঢ় অভিপ্রায়সহ পৌঁছে দেয়। তা শুনে শক্তিশালী দানবরাজ শঙ্খচূড় স্বেচ্ছায় যুদ্ধ গ্রহণ করে, মন্ত্রীদের সঙ্গে বাহনে আরোহন করে শঙ্করের বিরুদ্ধে সেনাকে আদেশ দেয়। অপরদিকে শিবও দেবতাদের সঙ্গে দ্রুত নিজ সেনা সমবেত করেন এবং স্বয়ং লীলাভাবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়—বাদ্যধ্বনি, কোলাহল ও বীরনাদ চারদিকে ছড়ায়। এরপর ধর্মানুসারে দেব-দানবদের যুগল-যুদ্ধের তালিকা আসে: ইন্দ্র–বৃষপর্বা, সূর্য–বিপ্রচিত্তি, বিষ্ণু–দম্ভ, কাল–কালাসুর, অগ্নি–গোকর্ণ, কুবের–কালকেয়, বিশ্বকর্মা–মায়া, মৃত্যু–ভয়ংকর, যম–সংহার, বরুণ–কালম্বিকা, বায়ু–চঞ্চল, বুধ–ঘটপৃষ্ঠ, শনৈশ্চর–রক্তাক্ষ প্রভৃতি।
देवपराजयः — शङ्करशरणागमनं स्कन्दकालीयुद्धं च | Devas’ Defeat, Refuge in Śaṅkara, and the Battle of Skanda and Kālī
অধ্যায় ৩৭-এ সনৎকুমার দানবদের হাতে দেবসেনার পরাজয়ের কথা বলেন। অস্ত্রাঘাতে ক্ষতবিক্ষত ও ভীত দেবতারা পালিয়ে যায়, পরে ফিরে এসে পরম আশ্রয় বিশ্বেশ্বর শঙ্করের শরণ নেয় ও রক্ষার প্রার্থনা করে। শিব তাদের আর্তি শুনে প্রতিপক্ষের প্রতি ক্রুদ্ধ হলেও করুণ দৃষ্টিতে দেবদের অভয় দান করেন এবং নিজের গণদের বল-তেজ বৃদ্ধি করেন। শিবের আদেশে হারাত্মজ, তারকান্তক স্কন্দ নির্ভয়ে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করে বৃহৎ দানববাহিনী ধ্বংস করেন। একই সঙ্গে কালী রক্তপান ও শিরচ্ছেদের ভয়ংকর কর্মে যুদ্ধের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তোলে। পরাজয়→শরণাগতি→দিব্য শক্তিদান→প্রচণ্ড পাল্টা আক্রমণ—এই ধারায় শিবকেই রক্ষা ও বিজয়ের নির্ণায়ক কারণ রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
अध्याय ३८ — काली-शंखचूड-युद्धे अस्त्रप्रयोगः (Kālī and Śaṅkhacūḍa: Mantra-Weapons and Surrender in Battle)
এই অধ্যায়ে সনৎকুমার রণক্ষেত্রে শক্তির ভয়ংকর মহিমা বর্ণনা করেন। দেবী কালী যুদ্ধভূমিতে প্রবেশ করে সিংহনাদ করেন; তাতে দানবেরা মূর্ছিত হয়, আর গণ ও দেবসেনা আনন্দোচ্ছ্বাসে গর্জে ওঠে। উগ্রদংষ্ট্রা, উগ্রদণ্ডা, কোটবী প্রভৃতি ভয়ংকর রূপ দেবীর সঙ্গে অট্টহাস্য করে, রণভূমিতে নৃত্য করে এবং মধু/মধ্বীক পান করে—যা বিশ্বকম্পনকারী শক্তির লক্ষণ। শঙ্খচূড় কালীর মুখোমুখি হয়; দেবী প্রলয়াগ্নিসদৃশ অগ্নি নিক্ষেপ করেন, সে বিষ্ণুচিহ্নিত কৌশলে তা প্রতিহত করে। পরে দেবী নারায়ণাস্ত্র প্রয়োগ করলে তার বিস্তারে শঙ্খচূড় দণ্ডবৎ প্রণাম করে বারবার নমস্কার জানায়; শরণাগতির ফলে অস্ত্র প্রত্যাহৃত হয়—বিনয়ে মহাবল শান্ত হয় এই নীতি প্রকাশ পায়। এরপর দেবী মন্ত্রসহ ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করেন, দানবরাজ পাল্টা ব্রহ্মাস্ত্রে জবাব দেয়; যুদ্ধটি মন্ত্র-নিয়ন্ত্রিত বৈধ মহাশক্তির বিনিময় ও নম্রতার ধর্মকে তুলে ধরে।
शिवशङ्खचूडयुद्धवर्णनम् / Description of the Battle between Śiva and Śaṅkhacūḍa
এই অধ্যায়ে ব্যাস জিজ্ঞাসা করেন—কালীর কথা শুনে শিব কী করলেন ও কী বললেন। সনৎকুমার বলেন, পরমেশ্বর শঙ্কর মৃদু হাস্যে কালিকে আশ্বস্ত করেন এবং ব্যোমবাণী শুনে গণসহ স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করেন। তিনি মহাবৃষভ নন্দীর উপর আরূঢ় হয়ে বীরভদ্র, ভৈরব ও ক্ষেত্রপাল প্রভৃতি রক্ষকগণের সঙ্গে উপস্থিত হন এবং শত্রুর কাছে মৃত্যুর মতো দীপ্তিমান বীররূপ ধারণ করেন। শিবকে দেখে শঙ্খচূড় বিমান থেকে নেমে ভক্তিভরে প্রণাম করে, তারপর যোগবলে আবার উঠেই ধনুক ধারণ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। শতবর্ষব্যাপী ভয়ংকর যুদ্ধ চলে, তীরের প্রবল বর্ষা হয়। শঙ্খচূড়ের ভীষণ অস্ত্র শিব সহজেই ছিন্ন করেন; রুদ্র দুষ্টদণ্ডকারী ও সজ্জনের আশ্রয় হয়ে শত্রুর উপর অস্ত্রবৃষ্টি বর্ষণ করেন।
शङ्खचूडस्य मायायुद्धं तथा माहेश्वरास्त्रप्रभावः | Śaṅkhacūḍa’s Māyā-Warfare and the Power of the Māheśvara Astra
এই অধ্যায়ে যুদ্ধের বর্ণনা বাহ্য সংঘর্ষ থেকে শক্তিতত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করে। সেনাবিনাশ দেখে দানবনায়ক শঙ্খচূড় ক্রুদ্ধ হয়ে শিবকে সম্মুখযুদ্ধে আহ্বান করে এবং রণক্ষেত্রে অটল থাকার ঘোষণা দেয়। সে শঙ্করের দিকে ধেয়ে এসে দিব্যাস্ত্রের প্রবল বর্ষণ ও বৃষ্টির মতো শরবৃষ্টি নিক্ষেপ করে। পরে সে নানা প্রকার মায়া—গুপ্ত, ভয়সঞ্চারী এবং দেবতাদের পক্ষেও দুর্বোধ্য—প্রকাশ করে। শিব সেই মায়িক প্রপঞ্চ দেখে লীলাভাবে সর্বমায়ানাশক, পরম দীপ্তিমান মাহেশ্বরাস্ত্র প্রয়োগ করেন। শিবতেজে দানবের মায়া তৎক্ষণাৎ ভেঙে পড়ে এবং পূর্বে শক্তিশালী অস্ত্রগুলিও নিষ্প্রভ হয়ে যায়। শিব শূল ধারণ করে চূড়ান্ত আঘাতে অগ্রসর হলে অশরীরী বাণী সংযমের প্রার্থনা জানায়—শিব মুহূর্তে বিশ্বও সংহার করতে সক্ষম; এক দানববধ ক্ষমতার প্রশ্ন নয়, নির্ধারিত কাল ও ধর্মবিধানের বিষয়। অধ্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, মায়া ও অস্ত্র শর্তাধীন সত্য, কিন্তু শিবের সার্বভৌমত্ব পরম।
तुलसी-शङ्खचूडोपाख्यानम् — Viṣṇu’s Disguise and the Tulasī Episode (Prelude to Śaṅkhacūḍa’s Fall)
এই অধ্যায়ে ব্যাস জিজ্ঞাসা করেন—নারায়ণ কীভাবে তুলসীর গর্ভে বীর্যাধান করেন। সনৎকুমার বলেন, শিবের নির্দেশে ও দেবতাদের উদ্দেশ্য সাধনে বিষ্ণু মায়াবলে শঙ্খচূড়ের রূপ ধারণ করে তুলসীর গৃহে উপস্থিত হন। দ্বারে আগমন, দুন্দুভি-ধ্বনি, জয়ধ্বনি এবং তুলসীর আনন্দময় অভ্যর্থনা বর্ণিত—তিনি জানালা দিয়ে দেখেন, মঙ্গলাচার সম্পন্ন করেন, ব্রাহ্মণদের ধন দান করেন, নিজেকে অলংকৃত করেন এবং স্বামী-রূপে আগত ব্যক্তির পাদপ্রক্ষালন করে প্রণাম করেন। এই দিব্য ছদ্মবেশ যুদ্ধপ্রসঙ্গে শঙ্খচূড়ের রক্ষাকবচ ভাঙার ধর্মোপায়, যা সংঘাতের মহাজাগতিক সমাধানকে এগিয়ে দেয়; ভক্তি, প্রতারণা ও বিধির প্রয়োজনীয়তার নৈতিক টানাপোড়েনও প্রকাশ পায়।
अन्धक-प्रश्नः — Inquiry into Andhaka (Genealogy and Nature)
অধ্যায় ৪২-এ নারদ শঙ্খচূড়-বধ শ্রবণ করে তৃপ্ত হন এবং মহাদেবের ব্রাহ্মণ্য-আচরণ ও ভক্তদের আনন্দদায়ক মায়া-লীলা স্তব করেন। ব্রহ্মা স্মরণ করান—জলন্ধর-বধের সংবাদ শুনে ব্যাস ব্রহ্মাজাত ঋষি সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: শিব কীভাবে শরণাগতদের রক্ষক এবং বহু লীলায় ভক্তবৎসল প্রভু। সনৎকুমার ব্যাসকে শুভ চরিত শুনতে আহ্বান করেন—পূর্বের মহাসংঘর্ষের পর বারবার আরাধনা করে অন্ধক কীভাবে শিবগণের মধ্যে গণপত্য পদ লাভ করেছিল। এরপর ব্যাস প্রশ্ন করেন: অন্ধক কে, তার বংশ কী, স্বভাব কেমন, এবং সে কার পুত্র; স্কন্দের কাছ থেকে অনেক জেনেও তিনি সনৎকুমারের কৃপায় সম্পূর্ণ, গূঢ় বিবরণ চান।
हिरण्यकशिपोः क्रोधः तथा देवप्रजाकदनम् — Hiraṇyakaśipu’s Wrath and the Affliction of Devas and Beings
অধ্যায় ৪৩ প্রশ্নোত্তর ধারায় বর্ণিত। ব্যাস মুনি সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেন—বরাহরূপে হরির দ্বারা দেবদ্রোহী অসুর (হিরণ্যাক্ষ) নিহত হওয়ার পর কী ঘটেছিল। সনৎকুমার বলেন, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হিরণ্যকশিপু শোক ও ক্রোধে আচ্ছন্ন হয়ে মৃতের উদ্দেশে করোদক প্রভৃতি শ্রাদ্ধ-উদকক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রতিশোধের সংকল্প করে। সে বীর, হত্যাপ্রিয় অসুরদের আদেশ দেয় দেবতা ও প্রজাকে পীড়িত করতে। দুষ্টবুদ্ধি অসুরদের অত্যাচারে জগৎ অস্থির হয়; দেবতারা স্বর্গ ত্যাগ করে পৃথিবীতে গোপনে বিচরণ করতে থাকে। এই অধ্যায় পূর্ব বিজয়ের পরবর্তী সঙ্কট ও দেবতাদের ব্রহ্মা প্রভৃতি উচ্চ কর্তৃত্বের শরণ নেওয়ার প্রয়োজনকে সূচিত করে।
हिरण्यनेत्रस्य तपः — Hiraṇyanetra’s Austerity and the Boon
সনৎকুমার বর্ণনা করেন—হিরণ্যাক্ষের পুত্র হিরণ্যনেত্রকে তার মদ্যপ, ঠাট্টাবাজ ভাইয়েরা সভায় উপহাস করে ও রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়। তারা বলে, সে রাজ্যশাসনের অযোগ্য; রাজ্য ভাগ করে বা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে। অন্তরে আহত হয়ে হিরণ্যনেত্র মৃদুবচনে তাদের শান্ত করে রাতে নির্জন অরণ্যে চলে যায়। সেখানে সে ভয়ংকর তপস্যা করে—এক পায়ে দাঁড়িয়ে, উপবাস, কঠোর ব্রত, অগ্নিতে আত্মসমর্পণসদৃশ হোম; দীর্ঘ কালে দেহ স্নায়ু‑অস্থিমাত্র হয়। দেবগণ বিস্ময় ও ভয়ে ধাতা পিতামহ ব্রহ্মার স্তব করে আশ্রয় নেয়। ব্রহ্মা এসে তপস্যা নিবৃত্ত করে বিরল বর দিতে বলেন। হিরণ্যনেত্র প্রণাম করে রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও প্রহ্লাদ প্রমুখ যারা তার রাজ্য কেড়ে নিয়েছে তাদের অধীনতা প্রার্থনা করে; বরপ্রভাবে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ও তপস্যার পুণ্য বনাম রাজলোভের নৈতিক টানাপোড়েন সূচিত হয়।
अन्धकादिदैत्ययुद्धे वीरकविजयः — Vīraka’s Victory over Andhaka’s Forces
অধ্যায় ৪৫-এ সনৎকুমার অন্ধক-যুদ্ধের ধারাবাহিক বর্ণনা দেন। কামদেবের বাণে মোহিত, মদোন্মত্ত ও চিত্তবিভ্রান্ত অন্ধক বিশাল দৈত্যসেনা নিয়ে অগ্রসর হয়; পথকে পতঙ্গের আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার মতো প্রাণঘাতী ও বাধাবহুল বলা হয়েছে। পাথর, বৃক্ষ, বিদ্যুৎ, জল, অগ্নি, সর্প, অস্ত্র ও ভূতুড়ে ভয়ের ভয়ংকর পরিবেশেও শিবগণ বীরক অজেয় থেকে অনুপ্রবেশকারীর পরিচয় জিজ্ঞাসা করে। এরপর সংক্ষিপ্ত কিন্তু সিদ্ধান্তমূলক সংঘর্ষে দৈত্য পরাজিত হয়; ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ফিরে যায় এবং তার উৎকৃষ্ট তরবারি ভেঙে গেলে পালিয়ে যায়। পরে প্রহ্লাদপক্ষ, বিরোচন, বলি, বাণ, সহস্রবাহু, শম্বর, বৃত্র প্রভৃতি প্রধান দৈত্যেরা যুদ্ধে নামে, কিন্তু বীরক তাদের ছত্রভঙ্গ করে অনেককে বিদীর্ণ করে; সিদ্ধগণ বিজয়ধ্বনি তোলে। রক্ত-কাদায় ভরা রণক্ষেত্র ও শবভোজী পাখির ভয়াল চিত্রের সঙ্গে শিক্ষা—কামমোহিত শক্তি শিবের গণবল ও ধর্মনিয়তির সামনে অবশ্যম্ভাবীভাবে ভেঙে পড়ে।
गिलासुर-आक्रमणम् तथा शिवसैन्य-समाह्वानम् — The Assault of Gila and Śiva’s Mobilization
অধ্যায় ৪৬-এ সনৎকুমার বলেন—‘গিল’ নামে দানবরাজ গদা হাতে বিশাল সেনা নিয়ে দ্রুত অগ্রসর হয়ে মহেশ্বরের পবিত্র দুর্গ ‘গুহামুখ’ ভেদ করতে উদ্যত হয়। দানবরা বিদ্যুৎসম উজ্জ্বল অস্ত্রে দ্বার ও উদ্যানপথ ভাঙে, বৃক্ষ-লতা, জল ও দেবপ্রাঙ্গণের সৌন্দর্য-শৃঙ্খলা নষ্ট করে সীমালঙ্ঘনকারী আক্রমণ চালায়। তখন শূলপাণি কপর্দী পিনাকী হর নিজের শক্তি স্মরণ করে সেনা সমাহ্বান করেন; মুহূর্তে দেবগণ (অগ্রে বিষ্ণু), ভূত-গণ, গণ, প্রেত-পিশাচ প্রভৃতি রথ, গজ, অশ্ব, বৃষভাদি বাহনসহ সমবেত হয়। তারা ভক্তিভরে প্রণাম করে বীরককে সেনাপতি মানে এবং মহেশ্বরের আদেশে যুদ্ধে গমন করে। পরবর্তী যুদ্ধকে যুগান্তসম, সীমাহীন ও মহাজাগতিক বলে বর্ণনা করা হয়েছে—অপবিত্রতার বিরুদ্ধে পুনঃধর্মস্থাপনের সংঘর্ষ।
शुक्रस्य जठरस्थत्वं तथा मृत्युशमनी-विद्या (Śukra in Śiva’s belly and the death-subduing vidyā)
অধ্যায় ৪৭-এ ব্যাস বিস্ময়ে প্রশ্ন করেন—দৈত্যদের আচার্য ভৃগুনন্দন শুক্রকে ত্রিপুরারি শিব নাকি “গ্রাস” করেছিলেন, তা কীভাবে সম্ভব? মহাযোগী পিনাকী শিবের উদরে অবস্থানকালে শুক্রের কী ঘটেছিল, প্রলয়সম জঠরাগ্নি কেন তাঁকে দগ্ধ করল না, এবং শিবের উদর-গৃহ থেকে তিনি কোন উপায়ে বেরিয়ে এলেন—এসবের বিশদ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। পরে শুক্রের শিব-উপাসনার কাল, পদ্ধতি ও ফল, বিশেষত পরম মৃত্যু-শমনী বিদ্যা/মন্ত্রলাভের কথা জিজ্ঞাসিত হয়। অন্ধক কীভাবে গণপত্য পদ পেল এবং এই প্রসঙ্গে শূলের আবির্ভাব কীভাবে ঘটল—সবই শিবলীলার দৃষ্টিতে ব্যাখ্যাত। ব্রহ্মা জানান, ব্যাসের কথা শুনে সনৎকুমার শঙ্কর–অন্ধক যুদ্ধ ও ব্যূহরচনার প্রেক্ষিতে প্রামাণ্য উপদেশ দেন। অধ্যায়টি দেখায়—দিব্য গ্রাসে বিনাশ নেই, ভক্তি ও মন্ত্রজ্ঞান রক্ষাকারী, এবং যুদ্ধকথা শৈব বিশ্বদর্শনে স্থাপিত।
शुक्रनिग्रहः — The Seizure/Neutralization of Śukra (Kāvya) and the Daityas’ Despondency
এই অধ্যায়ে ব্যাস সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেন—রুদ্র যখন কাব্য/শুক্রাচার্যকে গ্রাস করে নিরস্ত করলেন, তখন দৈত্যদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল। সনৎকুমার উপমার শৃঙ্খলে তাদের মনোবলভঙ্গ বর্ণনা করেন—হাতহীন হাতি, শিংহীন ষাঁড়, মস্তকহীন সভা, অধ্যয়নহীন ব্রাহ্মণ, শক্তিহীন যজ্ঞকর্মের মতো; কারণ শুক্রই ছিল তাদের সৌভাগ্যের কার্যকর অঙ্গ। নন্দীর দ্বারা শুক্র হরণে যুদ্ধোৎসুক দৈত্যরা গভীর বিষাদে ডুবে যায়। তাদের উদ্যমহানি দেখে অন্ধক ভাষণ দেয়—এটি নন্দীর ছল, আর ভৃগুবংশীয় গুরুর অভাবে তাদের সাহস, বীর্য, গতি, খ্যাতি, সত্ত্ব, তেজ ও পরাক্রম একযোগে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এই বর্ণনা যুদ্ধের পরবর্তী মোড়ের জন্য দৈত্যদের কৌশলগত দুর্বলতা ও গুরুনির্ভরতা স্পষ্ট করে।
शुक्रोत्पत्तिः तथा महेश्वरदर्शनम् (Śukra’s Emergence and the Vision of Maheśvara)
অধ্যায় ৪৯-এ সনৎকুমার শিবের এক বিস্তৃত স্তোত্র-মন্ত্র উচ্চারণ করেন, যেখানে তাঁর ঐশ্বর্য, কালরূপ, তপস্যা, উগ্র মূর্তি ও সর্বব্যাপিতা বর্ণিত। সেই মন্ত্রের প্রভাবে শুক্র উদর-আবরণ থেকে উদ্ভূত হয়ে লিঙ্গ-মার্গ দিয়ে বেরিয়ে আসেন—এটি অলৌকিক জন্ম ও শিবাধীন প্রতীকী পুনর্জন্মের ইঙ্গিত। পরে গৌরী পুত্রলাভের উদ্দেশ্যে তাঁকে গ্রহণ করেন এবং বিশ্বেশ্বর তাঁকে অজর-অমর, দীপ্তিমান ‘দ্বিতীয় শঙ্কর’-সদৃশ রূপ দেন। পৃথিবীতে তিন হাজার বছর থাকার পর শুক্র মহেশ্বর থেকে পুনর্জন্ম নিয়ে মুনি ও বেদজ্ঞানের আধার হন। এরপর তিনি পরমেশ্বরের দর্শন লাভ করেন এবং নিকটে দৈত্য অন্ধককে কঠোর তপস্যায় শূলে শুকিয়ে থাকা অবস্থায় দেখেন—অন্ধক-কাহিনির ভূমিকা। বিরূপাক্ষ, নীলকণ্ঠ, পিনাকী, কপর্দী, ত্রিপুরঘ্ন, ভৈরব প্রভৃতি উপাধিতে শিবের বহুরূপ, ভয়ংকর ও রক্ষাকারী শক্তি এবং ত্রিলোকেশ্বরত্ব প্রকাশ পায়।
मृत्युञ्जय-विद्या-प्रादुर्भावः (The Manifestation/Transmission of the Mṛtyuñjaya Vidyā)
এই অধ্যায়ে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় সনৎকুমার ব্যাসকে শিবের ‘মৃত্যুঞ্জয়’ রূপসংশ্লিষ্ট মৃত্যু-নিবারক পরা বিদ্যার উৎপত্তি ও ফল জানান। ভৃগুবংশীয় কাব্য ঋষি বারাণসীতে গিয়ে বিশ্বেশ্বরকে ধ্যান করে দীর্ঘ তপস্যা করেন; তপোবলে বিদ্যার প্রকাশ ঘটে। পরে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা, শুভ কূপ নির্মাণ, নির্দিষ্ট পরিমাণে পঞ্চামৃত দিয়ে বারংবার অভিষেক, সুগন্ধি স্নান-লেপন ও বিপুল পুষ্পার্ঘ্যের বিধান বর্ণিত; উদ্ভিদ-পুষ্পের তালিকা শুদ্ধি, সৌরভ ও ভক্তি-সমৃদ্ধির সূচক। ‘মৃতসঞ্জীবনী’ নামে এই শুদ্ধ বিদ্যা মহাতপস্যাজাত শক্তি, যা শিবভক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলে মৃত্যুভয় নিবারণ করে ও প্রাণশক্তি পুনঃস্থাপন করে।
गाणपत्यदानकथा (Bāṇāsura Receives Gaṇapatya; Genealogical Prelude)
অধ্যায় ৫১ সংলাপের ধারায় শুরু হয়। ব্যাস সনৎকুমারকে শশিমৌলি শিবের চরিত বর্ণনা করতে অনুরোধ করেন—বিশেষত কীভাবে শিব স্নেহবশত বাণাসুরকে ‘গাণপত্য’ (গণ-সম্পর্ক/গণাধিকার) প্রদান করেছিলেন। সনৎকুমার একে শিবলীলা ও পুণ্যদায়ক ইতিহাসরূপে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর অধ্যায়টি পুরাণীয় বংশপরম্পরার ভূমিকা রচনা করে—ব্রহ্মার মানসপুত্র মরীচি, তাঁর পুত্র কশ্যপ, যিনি সৃষ্টির বিস্তারের প্রধান কারক বলে বর্ণিত। কশ্যপের দক্ষকন্যাদের সঙ্গে বিবাহের কথা আসে; তাঁদের মধ্যে দিতি জ্যেষ্ঠা এবং দৈত্যদের জননী। দিতির গর্ভে জন্ম নেয় দুই মহাবলী পুত্র—জ্যেষ্ঠ হিরণ্যকশিপু ও কনিষ্ঠ হিরণ্যাক্ষ। এই বংশ-প্রস্তাবনা পরবর্তী অসুরবংশ ও বাণের আবির্ভাবের কারণভূমি স্থাপন করে এবং প্রশ্ন তোলে—অসুর হয়েও কীভাবে কেউ শিবের কৃপা ও গণপদ লাভ করতে পারে।
बाणासुरस्य शङ्करस्तुतिः तथा युद्धयाचनम् | Bāṇāsura’s Praise of Śiva and Petition for Battle
এই অধ্যায়ে সনৎকুমার শিবের পরমত্ব ও ভক্তবৎসল্য প্রকাশকারী আরেকটি উপাখ্যান বলেন। অসুর বাণ তাণ্ডব নৃত্য করে পার্বতীপ্রীয় শঙ্করকে প্রসন্ন করে। দেব সন্তুষ্ট জেনে সে নতশিরে, কৃতাঞ্জলি হয়ে দেবদেব মহাদেব, সকল দেবের শিরোমণি বলে স্তব করে। সে জানায়—বরপ্রদত্ত সহস্র বাহু যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় বোঝা হয়ে উঠেছে; যম, অগ্নি, বরুণ, কুবের, ইন্দ্র প্রভৃতিকে জয় করার অহংকার দেখিয়ে সে ‘যুদ্ধের আগমন’ প্রার্থনা করে, যেখানে শত্রুর অস্ত্রে তার বাহুগুলি ভাঙবে ও ক্ষতবিক্ষত হবে। ভক্তি ও শিবকৃপা একদিকে, আর অসুরীয় গর্ব ও হিংসালালসা অন্যদিকে—এই দ্বন্দ্ব থেকেই শিবের শোধনমূলক সংঘর্ষ-ব্যবস্থার ভূমিকা রচিত হয়।
बाणासुरस्य क्रोधाज्ञा तथा अन्तःपुरयुद्धारम्भः (Bāṇāsura’s Wrathful Command and the Onset of Battle at the Inner Palace)
বাণাসুর ক্রুদ্ধ হয়ে অন্তঃপুরে দিব্যলীলায় মগ্ন এক যুবককে দেখেন। তিনি তাকে শত্রু মনে করে বধ ও বন্দী করার আদেশ দেন। দশ হাজার সৈন্য পাঠানো হয়। যাদব বীর একটি পরিঘ নিয়ে যমরাজের মতো যুদ্ধ করেন এবং শত্রুদের বিনাশ করেন।
अनिरुद्धापहरणानन्तरं कृष्णस्य शोणितपुरगमनम् तथा रुद्रकृष्णयुद्धारम्भः | After Aniruddha’s Abduction: Kṛṣṇa Marches to Śoṇitapura and the Rudra–Kṛṣṇa Battle Begins
অধ্যায় ৫৪-এ ব্যাস সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেন—কুম্ভাণ্ডের কন্যা অনিরুদ্ধকে অপহরণ করার পর শ্রীকৃষ্ণ কী করলেন। সনৎকুমার বলেন, নারীদের বিলাপ চারদিকে ধ্বনিত হয়, কৃষ্ণ শোকে বিহ্বল হন এবং অনিরুদ্ধ অদৃশ্য থাকায় সময় দুঃখে কাটে। নারদ অনিরুদ্ধের বন্দিত্ব ও অবস্থার সংবাদ আনেন, ফলে বৃষ্ণিদের উৎকণ্ঠা আরও বাড়ে। সব কথা জেনে কৃষ্ণ যুদ্ধের সংকল্প করেন, গরুড় (তার্ক্ষ্য) ডেকে দ্রুত শোণিতপুরের দিকে যাত্রা করেন। প্রদ্যুম্ন, যুযুধান (সাত্যকি), সাম্ব, সারণ ও রাম-কৃষ্ণের অন্যান্য সহচরগণ সঙ্গে যান। বারো অক্ষৌহিণী সেনা নিয়ে তারা চারদিক থেকে বাণের নগরী ঘেরাও করে উদ্যান, প্রাচীর, মিনার ও দ্বার ভেঙে ফেলে। আক্রমণ দেখে বাণ সমবল নিয়ে ক্রোধে বেরিয়ে আসে। বাণের পক্ষে রুদ্র (শিব) পুত্র ও প্রমথগণসহ নন্দীতে আরূঢ় হয়ে উপস্থিত হন, এবং রুদ্র-নেতৃত্বে কৃষ্ণপক্ষ ও বাণরক্ষকদের মধ্যে ভয়ংকর, বিস্ময়কর যুদ্ধ শুরু হয়।
अध्याय ५५ — बाणस्य पुनर्युद्धप्रवृत्तिः (Bāṇa’s Renewed Engagement in Battle)
অধ্যায় ৫৫-এ বাণ–কৃষ্ণ যুদ্ধের ধারাবাহিকতা আরও তীব্র হয়। কৃষ্ণের প্রত্যস্ত্র পূর্বের বিপদ নিবারণ করার পর সূত, ব্যাসের প্রশ্ন ও সনৎকুমারের উত্তরের স্তরিত বর্ণনা শাস্ত্রীয় প্রামাণ্যতা প্রকাশ করে। ব্যাস জিজ্ঞাসা করেন—সেনা প্রতিহত হলে বাণ কী করল? সনৎকুমার বলেন, এটি কৃষ্ণ ও শঙ্করের এক আশ্চর্য লীলা। রুদ্র পুত্র ও গণসহ ক্ষণিক বিশ্রামে থাকতেই বলিপুত্র দৈত্যরাজ বাণ ক্ষয়প্রাপ্ত সেনা দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে পুনরায় যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয় এবং নানা অস্ত্রশস্ত্রে প্রবল আক্রমণ চালায়। প্রতিউত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বীরোচিত আত্মবিশ্বাসে গর্জন করে বাণকে তুচ্ছ জ্ঞান করেন এবং শার্ঙ্গ ধনুর নাদ এমনভাবে তুলেন যে স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী আকাশ ধ্বনিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে যুদ্ধের উত্তেজনা, নাদ-শক্তি ও দৈত্যবলকে অতিক্রমকারী দैব সামর্থ্য স্পষ্ট হয়।
बाणस्य शोकः शिवस्मरणं च — Bāṇa’s Grief and the Turn to Śiva-Remembrance
অধ্যায় ৫৬-এ নারদ সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেন—কৃষ্ণ অনিরুদ্ধ ও তার পত্নীকে নিয়ে দ্বারকায় চলে যাওয়ার পর বাণ কী করল। সনৎকুমার বাণের গভীর বিষাদ ও নিজের ভুল-বিচারের স্মরণে অনুতাপের কথা বলেন। তখন শিবগণদের অগ্রণী নন্দীশ্বর শোকাতুর অসুর-ভক্ত বাণকে উপদেশ দেন—অতিরিক্ত গ্লানি ত্যাগ করো, ঘটনাকে শিবের ইচ্ছা বলে মানো, শিব-স্মরণ বৃদ্ধি করো এবং নিয়মিত মহোৎসব/উৎসব-আরাধনা পালন করো। এই উপদেশে বাণ স্থির হয়, দ্রুত শিবধামে গিয়ে প্রণাম করে, বিনয়ে অশ্রু ফেলে, স্তোত্রগান, সাষ্টাঙ্গ প্রণাম ও বিধিবদ্ধ অঙ্গভঙ্গিতে ভক্তি প্রকাশ করে। শেষে সে নির্দিষ্ট মুদ্রাসহ প্রধান তাণ্ডব নৃত্য করে। কাহিনি শোক থেকে ভক্তিচর্চায় রূপান্তরিত হয়ে শিবের করুণা ও স্মরণ-পূজা-শরণাগতির পরিবর্তনশীল শক্তি প্রকাশ করে।
गजासुरतपः–देवलोकक्षोभः (Gajāsura’s Austerities and the Disturbance of the Worlds)
সনৎকুমার ব্যাসকে গজাসুর-বধের পূর্বকথা শোনান। দেবী মহিষাসুরকে বধ করলে দেবগণ স্বস্তি পায়; কিন্তু মহিষাসুরের বীর পুত্র গজাসুর পিতৃবধ স্মরণ করে প্রতিশোধের জন্য ভয়ংকর তপস্যার সংকল্প করে। সে হিমালয়ের উপত্যকায় অরণ্যে গিয়ে বাহু উঁচু করে, দৃষ্টি স্থির রেখে বিধাতা ব্রহ্মাকে লক্ষ্য করে অজেয়তার বর চাইতে তপ করে। বরলাভে সে শর্ত রাখে—নারী-পুরুষের দ্বারা, বিশেষত কামবশ লোকের দ্বারা, যেন সে অবধ্য থাকে; বর-ছিদ্রের ইঙ্গিত। তার তপস্যায় মস্তক থেকে অগ্নিতেজ নির্গত হয়; নদী-সমুদ্র ক্ষুব্ধ হয়, গ্রহ-নক্ষত্র টলে পড়ে, দিকদিগন্ত জ্বলে ওঠে, পৃথিবী কাঁপে। দেবগণ স্বর্গ ত্যাগ করে ব্রহ্মলোকে গিয়ে বিপদের কথা জানায়; এভাবেই শিবের হস্তক্ষেপে অসুর-ভয় নিবারণের ভূমিকা রচিত হয়।
दुन्दुभिनिर्ह्रादनिर्णयः / Dundubhinirhrāda’s Stratagem: Targeting the Brāhmaṇas
সনৎকুমার ব্যাসকে প্রহ্লাদের আত্মীয় অসুর দুন্দুভিনির্হ্রাদের কাহিনি বলেন। বিষ্ণুর হাতে হিরণ্যাক্ষ নিহত হলে দিতি শোকে ভেঙে পড়েন; দুন্দুভিনির্হ্রাদ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে মায়াবী দৈত্যরাজ হিসেবে দেবতাদের জয়ের উপায় ভাবতে থাকে। সে বিশ্লেষণ করে যে দেবশক্তি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, যজ্ঞ-ক্রতু দ্বারা পুষ্ট; ক্রতু আসে বেদ থেকে, আর বেদ প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মণদের উপর। তাই ব্রাহ্মণদের দেবব্যবস্থার মূল আশ্রয় মনে করে সে বারবার ব্রাহ্মণবধে উদ্যত হয়, বেদ-পরম্পরা ও যজ্ঞের কার্যক্ষমতা নষ্ট করতে। এই অধ্যায়ে ব্রাহ্মণ→বেদ→যজ্ঞ→দেববল এই কারণশৃঙ্খল স্থাপিত হয় এবং পবিত্র ধারকদের প্রতি হিংসার ধর্মীয় নিন্দা উচ্চারিত হয়।
विदलोत्पलदैत्ययोरुत्पत्तिः देवपराजयः ब्रह्मोपदेशः नारदप्रेषणम् (Vidalotpala Daityas, Defeat of the Devas, Brahmā’s Counsel, and Nārada’s Mission)
অধ্যায় ৫৯-এ সনৎকুমার ব্যাসকে বলেন—বরপ্রভাবে অবধ্য দানব বিদলা ও উৎপল যুদ্ধগর্বে ত্রিলোককে তৃণসম জ্ঞান করে দেবতাদের পরাজিত করে। প্রতিকার চাইতে দেবগণ ব্রহ্মার শরণ নেন; ব্রহ্মা উপদেশ দেন যে এদের বধ দেবী (শিবা)-র দ্বারাই নির্ধারিত, তাই শিবের সঙ্গে শক্তির স্মরণে স্থির থাকো। উপদেশ পেয়ে দেবতারা সান্ত্বনা নিয়ে নিজ নিজ ধামে ফেরেন। পরে শিবপ্রেরিত নারদ দানবলোকে গিয়ে এমন বাক্য বলেন যে তারা মায়ায় মোহিত হয়ে দেবীকে অধিকার করার সংকল্প করে—এতেই তাদের পতনের পথ প্রস্তুত হয়। শেষে ‘সমাপ্তো’য়ং যুদ্ধখণ্ডঃ…’ ধরনের কলফন কিছু পাঠে খণ্ডসমাপ্তি ও পাঠস্তর নির্দেশ করে।