Parvatikhanda
हिमाचलविवाहवर्णनम् — Description of Himācala’s (context for) Marriage / The Himālaya-Marriage Narrative (Chapter Opening)
এই অধ্যায়ে নারদ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেন—দক্ষযজ্ঞে দেহত্যাগের পর সতী কীভাবে পুনরায় গিরিসুতা ও জগদম্বিকা রূপে প্রকাশ পেলেন। ব্রহ্মা একে শিবকথার পবিত্র বৃত্তান্ত বলে ব্যাখ্যা করেন এবং হিমাচলে হরের সঙ্গে সতীর দিব্য লীলার প্রসঙ্গ আনেন। হিমাচলের প্রিয়া মেনা দেবীর ভবিতব্য মাতৃত্ব চিনতে পারেন। দক্ষযজ্ঞে অপমান ও ত্যাগের পর মেনা শিবলোকে ভক্তিভরে দেবীর আরাধনা করেন। সতী অন্তরে মেনার কন্যা হয়ে জন্ম নেওয়ার সংকল্প করে দেহ ত্যাগ করেন, কিন্তু সংকল্পের ধারাবাহিকতা অটুট থাকে। যথাকালে দেবগণের স্তবের মধ্যে সতী মেনার কন্যা রূপে জন্ম নেন—যার ফলে পরবর্তীতে পার্বতীর তপস্যা ও শিবকে পতিরূপে পুনর্প্রাপ্তির ভিত্তি স্থাপিত হয়।
पूर्वगतिवर्णनम् (Pūrvagati-varṇana) — “Description of the Prior Course / Earlier Lineage Account”
এই অধ্যায়ে সন্দেহভঞ্জনের জন্য নারদ ব্রহ্মাকে মেনার উৎপত্তি ও কোনো প্রাসঙ্গিক শাপের কথা জিজ্ঞাসা করেন। ব্রহ্মা পূর্বসৃষ্টির বংশপরম্পরা—দক্ষ, তাঁর সন্তানসন্ততি এবং কশ্যপ প্রভৃতি ঋষিদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক—উল্লেখ করে প্রসঙ্গ স্থাপন করেন। সেই ধারায় স্বধা পিতৃগণের নিকট অর্পিতা হন, এবং স্বধা থেকে মানসজাত, লোকপ্রথায় অযোনিজ বলে খ্যাত তিন কন্যা জন্ম নেন—জ্যেষ্ঠা মেনা, মধ্যমা ধন্যা, কনিষ্ঠা কলাবতী। তাঁদের শুভ নাম শ্রবণ ও কীর্তনকে বিঘ্ননাশক ও মহামঙ্গলদায়ক বলা হয়েছে। আরও বলা হয়, তাঁরা জগৎবন্দিতা, লোকমাতা, যোগিনী এবং ত্রিলোকে বিচরণশীলা পরমজ্ঞানের আধার—এভাবে বংশকথা ভক্তি ও তত্ত্বের উচ্চতায় উন্নীত হয়।
देवस्तुतिः (Deva-stuti) — “Hymn of the Devas / Divine Praise”
অধ্যায় ৩ নারদ–ব্রহ্মা সংলাপরূপ। মেনার শুভ পূর্বকথা ও বিবাহ-আয়োজনের পর নারদ জিজ্ঞাসা করেন—জগদম্বিকা পার্বতীর জন্ম কীভাবে হল এবং কঠোর তপস্যার পরে তিনি কীভাবে হর/শিবকে স্বামী হিসেবে লাভ করলেন। ব্রহ্মা শঙ্করের মঙ্গলময় কীর্তি-শ্রবণের মহিমা বলেন—ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি গুরু পাপও শুদ্ধ হয় এবং কামনা পূর্ণ হয়। এরপর গৃহস্থ পরিবেশে কাহিনি আসে: মেনার বিবাহের পরে গিরিরাজ/হিমাচল গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন, ত্রিলোকে মহোৎসব জাগে। হিমাচল দ্বিজ ও আত্মীয়স্বজনকে সম্মান করেন; তারা আশীর্বাদ দিয়ে নিজ নিজ ধামে ফিরে যান। এভাবে হিমালয়-গৃহকে ধর্ম ও মঙ্গলের কেন্দ্র করে পার্বতীর আবির্ভাব ও দেবস্তুতির ভূমিকা স্থাপিত হয়।
देवसान्त्वनम् (Devasāntvana) — “Consolation/Reassurance of the Gods”
এই অধ্যায়ে দেবতাদের স্তুতিতে প্রসন্ন হয়ে দেবী দুর্গা/জগদম্বার দিব্য আবির্ভাব বর্ণিত। ব্রহ্মা বলেন—রত্নখচিত দিব্য রথে অধিষ্ঠিতা দেবী স্বতেজে পরিবৃতা, অসংখ্য সূর্যের দীপ্তিকেও অতিক্রম করেন। তাঁকে মহামায়া, সদাশিব-বিলাসিনী, ত্রিগুণাময়ী হয়েও নির্গুণা, নিত্যা এবং শিবলোকে নিবাসিনী রূপে তত্ত্বতঃ চিহ্নিত করা হয়েছে—যাতে তাঁর সর্বব্যাপিতা ও পরাত্পরতা প্রকাশ পায়। বিষ্ণু প্রমুখ দেবগণ তাঁর কৃপায় দর্শন লাভ করে সমবেত আনন্দে আপ্লুত হন, বারংবার প্রণাম করেন এবং শিবা, শর্বাণী, কল্যাণী, জগদম্বা, মহেশ্বরী, চণ্ডী, সর্বার্তিনাশিনী ইত্যাদি নামে পুনরায় স্তব করেন। এই দৃশ্যটি উপাসনার ক্রম—আবির্ভাব, বর্ণনা, শরণাগতি ও স্তব—রূপে দেবীকে রক্ষিকা ও দুঃখনাশিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
मेनावरलाभवर्णनम् — Description of Menā’s Attainment of Boons (and the worship leading to Umā’s advent)
অধ্যায় ৫ নারদ–ব্রহ্মা সংলাপরূপ। নারদ জিজ্ঞাসা করেন—দেবী দুর্গা অন্তর্ধান করার পরে দেবতারা স্বধামে ফিরে গেলে হিমালয় ও মেনা কীভাবে তপস্যা ও ভক্তিতে কন্যালাভ করলেন। ব্রহ্মা শঙ্করকে স্মরণ করে বলেন—দু’জনেই শিব-শিবা’র নিরন্তর ধ্যান, স্থির ভক্তিপূজা, দেবীর সম্মান এবং ব্রাহ্মণদের দান ইত্যাদির দ্বারা দেবীকে প্রসন্ন করেন। মেনার দীর্ঘকালীন ব্রত চৈত্র থেকে শুরু হয়ে বহু বছর চলে—অষ্টমীতে উপবাস, নবমীতে নৈবেদ্য অর্পণ। মোদক, বলি/পিষ্ট প্রস্তুতি, পায়স, সুগন্ধি, ফুল ইত্যাদি উপচারে গঙ্গাতীরে মাটির উমামূর্তি নির্মাণ করে নানা অর্ঘ্যে পূজার বিবরণ আছে। তপস্যা→দেবীতুষ্টি→বর/সন্তানলাভ—এই কারণক্রমে মেনার ব্রতভক্তি ফলদায়ক আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
पार्वतीजन्मवर्णनम् / Description of Pārvatī’s Birth
এই অধ্যায়ে দেবীর হিমালয়-গৃহে অবতরণের কারণ ও বিধান বর্ণিত। ব্রহ্মা বলেন—হিমবান ও মেনা সন্তানলাভ এবং দেবকার্যসিদ্ধির জন্য ভক্তিভরে ভবাম্বিকার স্মরণ করেন। তখন পূর্বে দেহ ত্যাগ করা চণ্ডিকা পুনরায় দেহধারণের সংকল্প করেন এবং পূর্ববাক্য সত্য করতে ও মঙ্গলফল দিতে মেনার হৃদয়ে পূর্ণাংশে প্রবেশ করেন। মেনার গর্ভ তেজস্বী ও অলৌকিক; তিনি তেজোমণ্ডলে পরিবৃতা থাকেন এবং দৌহৃদ-লক্ষণসহ শুভ চিহ্ন প্রকাশ পায়। গর্ভধারণ ও জন্মকে সাধারণ জৈব ঘটনা নয়, পবিত্র অবতরণরূপে দেখানো হয়েছে—যথাকালে শিবাংশ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেবীর কৃপাই গর্ভপূর্ণতার নিকট কারণ। ভক্তি, সত্যবচন ও বিশ্বকল্যাণের প্রয়োজন মিলিয়ে পার্বতীজন্মের ভূমিকা রচিত।
पार्वतीबाल्यलीलावर्णनम् — Description of Pārvatī’s Childhood/Birth Festivities
অধ্যায় ৭-এ হিমালয় ও মেনার গৃহে পার্বতীর জন্মক্ষণ এবং তার সামাজিক‑বৈদিক প্রতিক্রিয়া বর্ণিত। ব্রহ্মা মেনার দৃশ্যমান মাতৃস্নেহজনিত রোদন উল্লেখ করেন; রাত্রির পরিবেশে বিশেষ দীপ্তি ও শুভ লক্ষণ দেখা যায়। নবজাতকের কান্না শুনে অন্তঃপুরের নারীরা স্নেহে ছুটে আসে; পরিচারকেরা রাজাকে জানায় যে এই জন্ম অতি মঙ্গলময়, আনন্দদায়ক এবং দেবকার্যসাধক। হিমালয় পুরোহিত ও বিদ্বান ব্রাহ্মণদের সঙ্গে এসে নীলপদ্মপত্রবর্ণা তেজস্বিনী কন্যাকে দেখে পরম হর্ষ লাভ করেন। পরে নগরবাসী নারী‑পুরুষ বাদ্যধ্বনি, মঙ্গলগীত ও নৃত্যে উৎসব করে; রাজা জাতকর্ম সম্পন্ন করে দ্বিজদের দান দেন। এভাবে পার্বতীর আবির্ভাব গৃহের ঘটনা ও বিশ্বমঙ্গলসূচক দैবচিহ্ন—উভয়ই।
नारद–हिमालयसंवादवर्णनम् (Nārada and Himālaya: Discourse on Pārvatī’s Signs and Destiny)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মার বর্ণিত সংলাপে শিবের প্রেরণায় শিবজ্ঞ নাৰদ হিমালয়ের গৃহে উপস্থিত হন। হিমালয় বিধিপূর্বক তাঁকে সম্মান করে কন্যা পার্বতীকে নাৰদের চরণে অর্পণ করেন এবং ‘জাতক’ বিচাররূপে তার গুণ-দোষ ও ভবিষ্যৎ স্বামীর পরিচয়-ভাগ্য জানতে প্রার্থনা করেন। নাৰদ পার্বতীর লক্ষণ, বিশেষত হাতের লক্ষণ, পরীক্ষা করে শুভ ফল বলেন—তিনি বর্ধমান চন্দ্রের ন্যায়, ‘আদ্য কলা’ ও ‘সর্বলক্ষণশালিনী’, পিতামাতার আনন্দ-যশের কারণ এবং স্বামীর সুখদায়িনী হবেন। অধ্যায়টি পার্বতীর মহিমা প্রতিষ্ঠা করে তাঁর নির্ধারিত শিব-সংযোগকে ধর্ম ও দৈব-ইচ্ছার পরিণতি হিসেবে দেখায়।
स्वप्नवर्णनपूर्वकं संक्षेपशिवचरितवर्णनम् / Dream-Portents and a Concise Account of Śiva’s Career
অধ্যায় ৯ সংলাপরূপে অগ্রসর হয়। ব্রহ্মার কাছ থেকে পূর্বে শোনা শৈব-বৃত্তান্তের পর নারদ জিজ্ঞাসা করেন, এরপর কী ঘটল। ব্রহ্মা বলেন—মেনা হিমালয়ের কাছে গিয়ে শ্রদ্ধাভরে অনুরোধ করেন, গিরিজার বিবাহ যেন লোকাচার অনুযায়ী সুদর্শন, কুলীন ও শুভলক্ষণযুক্ত বরকে দিয়ে হয়, যাতে কন্যা সুখী থাকে। এখানে মাতৃস্নেহ ও ‘নারীস্বভাব’ কাহিনির চালিকা শক্তি। হিমালয় বোঝান—মুনির বাক্য কখনও মিথ্যা নয়, তাই সন্দেহ ত্যাগ করো। স্বপ্ন/শকুন-বর্ণনাকে প্রমাণরূপে তুলে ধরে শেষে শিবচরিত সংক্ষেপে বলা হয়, যাতে বোঝা যায় নির্ধারিত শিব–পার্বতী মিলন সাধারণ মানদণ্ডের ঊর্ধ্বে।
सतीविरहानन्तरं शम्भोश्चरितम् / Śiva’s Conduct After Satī’s Separation
অধ্যায় ১০ প্রশ্নোত্তররূপে বর্ণিত। নারদ ব্রহ্মা (বিধি)-কে জিজ্ঞাসা করেন—সতীর দেহত্যাগের পরে শম্ভু কীভাবে বিরহ সহ্য করলেন, এরপর কী করলেন, কখন ও কেন তপস্যার উদ্দেশ্যে হিমবৎ-প্রদেশে গেলেন, এবং পার্বতীর দ্বারা শিবপ্রাপ্তির অনুকূল পরিস্থিতি কীভাবে সৃষ্টি হল। ব্রহ্মা মঙ্গলময়, পবিত্র ও ভক্তিবর্ধক কাহিনি বলেন—সতীস্মরণে শিব শোকাকুল হয়ে দিগম্বররূপে গৃহস্থধর্ম ত্যাগ করে লোকলোকান্তরে বিচরণ করেন, মাঝে মাঝে দর্শন দেন এবং শেষে পর্বতাঞ্চলে প্রত্যাবর্তন করেন। এই অধ্যায় দেবশোককে যোগবৈরাগ্যরূপে ব্যাখ্যা করে পার্বতীর তপস্যা, কামক্ষয় ও পুনর্মিলনের ভূমি প্রস্তুত করে।
शिवस्य तपोऽनुष्ठानम् — Śiva’s Austerity and Meditation at Himavat (Gaṅgā-Region)
অধ্যায় ১১-এ ব্রহ্মা বর্ণনা করেন যে হিমালয়ের কন্যা—জগৎপূজিতা শক্তি—পিতৃগৃহে অল্পকালেই পরিণত হয়ে আট বছরে উপনীত হন। সতীবিয়োগে দগ্ধ শিব তাঁর জন্মসংবাদ শুনে অন্তরে আনন্দিত হন, যেন পুনর্মিলনের দিব্য পরিকল্পনা পুনরায় সক্রিয় হয়। মন স্থির করে তপস্যা সাধনের জন্য শম্ভু লৌকিক ভঙ্গি ধারণ করে নন্দী, ভৃঙ্গী প্রমুখ শান্ত গণদের সঙ্গে গঙ্গাবতরণ-সম্পর্কিত অতিপবিত্র হিমবৎ অঞ্চলে গমন করেন, যা সঞ্চিত পাপ বিনাশকারী বলে খ্যাত। সেখানে শিব তপস্যা আরম্ভ করে আত্মায় একাগ্র ধ্যানে নিমগ্ন হন; গণরাও তাঁর যোগশৃঙ্খলা অনুসরণ করে, আর অন্যেরা নীরবে দ্বাররক্ষকের দায়িত্ব পালন করে। অধ্যায়ের তত্ত্বকেন্দ্রে আত্মচৈতন্যের স্বরূপ—জ্ঞানজাত, নিত্য, জ্যোতির্ময়, নিরাময়, সর্বব্যাপী, আনন্দময়, অদ্বৈত ও নিরাধার—বর্ণিত হয়ে শিবের তপস্যাকে অদ্বৈত-শৈব দর্শনের জীবন্ত প্রকাশ করা হয়েছে। শেষে শিবের আগমন শুনে হিমবান ঔষধিসমৃদ্ধ শঙ্করশৈলের ঢালে উপস্থিত হন, যা পরবর্তী সংলাপ ও পার্বতীর ভাগ্যবিধানের ভূমিকা রচনা করে।
काली-परिचयः / Himagiri Presents Kālī (Pārvatī) to Śiva
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা কাহিনি সূচনা করেন। হিমগিরি রাজা শুভ ফুল-ফলাদি সংগ্রহ করে ত্রিলোকনাথ শিবের কাছে গিয়ে প্রণাম করেন এবং কন্যাকে এখানে ‘কালী’ নামে পরিচয় দিয়ে শিবপূজা ও সেবার প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিবেদন করেন। তিনি শঙ্করের সম্মতি ও কৃপা প্রার্থনা করেন—সখীদের সঙ্গে যেন সে নিত্য সেবা করতে পারে। তখন শিব যৌবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো সেই কন্যাকে দর্শন করেন; অলংকারময় রূপবর্ণনায় তার পদ্মসম বর্ণ, চন্দ্রসম মুখ, প্রশস্ত নয়ন, সুকোমল অঙ্গ ও অতুল মোহিনী লাবণ্য বর্ণিত হয়, যা ধ্যাননিষ্ঠ মনকেও বিচলিত করতে পারে। এভাবে অধ্যায়টি ভক্তিসেবা ও দেবীর সৌন্দর্য-শক্তির তত্ত্বকে যুক্ত করে পার্বতী-কথার পরবর্তী বিকাশের ভূমি প্রস্তুত করে।
प्रकृतितत्त्व-विचारः / Inquiry into Prakṛti (Nature/Śakti) and Śiva’s Transcendence
অধ্যায় ১৩-এ ভবানী (পার্বতী) গিরিরাজ (হিমালয়)-কে যোগী তপস্বী যে কথা বলেছিলেন তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান এবং পরে প্রকৃতি/শক্তির নির্দিষ্ট স্বরূপ জানতে প্রশ্ন করেন। এখানে তপস্যাকে পরম উপায় বলা হয়েছে এবং প্রকৃতিকে সেই সূক্ষ্ম শক্তি রূপে দেখানো হয়েছে যার দ্বারা সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় সম্পন্ন হয়। পার্বতীর প্রশ্ন তীক্ষ্ণ—শিব যদি পূজ্য এবং লিঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠিত হন, তবে প্রকৃতি ছাড়া তাঁকে কীভাবে ভাবা যায়, আর সেই প্রকৃতির তত্ত্বগত অবস্থান কী? ব্রহ্মা বর্ণনাকারী হিসেবে হাস্য ও প্রসন্ন ভঙ্গিতে বক্তা-পরিবর্তন নির্দেশ করেন। মহেশ্বর বলেন, তিনি তত্ত্বতঃ প্রকৃতির অতীত; সদ্ভক্তদের প্রকৃতিতে অনাসক্তি, নির্বিকারতা এবং লোকাচার থেকে দূরত্বের উপদেশ দেন। পরে কালী প্রশ্ন তোলেন—প্রকৃতি না মানলে শিব কীভাবে তার ঊর্ধ্বে? এতে পরবর্তী শ্লোকগুলিতে সিদ্ধান্ত স্থাপনের ভূমিকা রচিত হয়।
तारकासुर-पूर्ववृत्त-प्रश्नः (Questions on Tārakāsura and Śivā’s tapas) / “Inquiry into Tārakāsura’s origin and Śivā–Śiva narrative”
এই অধ্যায়ে নারদ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেন—তারকাসুর কে, কীভাবে দেবতারা নিপীড়িত হলেন, শঙ্কর কীভাবে কামদেব (স্মর)কে ভস্ম করলেন, এবং আদিশক্তি হয়েও শিবা কীভাবে কঠোর তপস্যা করে শম্ভুকে স্বামী রূপে লাভ করলেন। ব্রহ্মা বংশানুক্রমে প্রসঙ্গ স্থাপন করেন—মরীচি থেকে কশ্যপ, কশ্যপের পত্নীগণ বিশেষত দিতি; সেখান থেকে হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষের জন্ম। বিষ্ণুর নরসিংহ ও বরাহ অবতারে তাদের বিনাশে দেবলোক নিরাপদ হয়; তবু এই কাহিনি ভবিষ্যৎ অসুর-সংকট (তারক) ও শক্তির তপস্যা দ্বারা শিব-শিবার ধর্মরক্ষাকারী হস্তক্ষেপের কারণ-পরম্পরা স্পষ্ট করে।
वराङ्ग्याः सुतजन्म-उत्पातवर्णनम् | Birth of Varāṅgī’s Son and the Description of Portents (Utpātas)
অধ্যায় ১৫-এ ব্রহ্মা বর্ণনা করেন যে বরাঙ্গী গর্ভধারণ করে পূর্ণসময়ে এক মহাকায়, প্রখর তেজস্বী পুত্র প্রসব করেন; তার দীপ্তি যেন দশ দিক আলোকিত করে (১–২)। সঙ্গে সঙ্গে জগতে ভয় ও বিশৃঙ্খলার সূচক দুঃখদ উৎপাত দেখা দেয় (৩)। স্বর্গ, পৃথিবী ও অন্তরীক্ষ—এই তিন স্তরে উৎপাতগুলিকে ‘অনর্থ-সূচক’ বলে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে (৪)। উল্কাপাত, ভয়ংকর শব্দসহ বজ্রপাত, শোকবাহী ধূমকেতু (৫), ভূমিকম্প ও পর্বতকম্পন, দিগ্দাহ/দিশাজ্বালা, নদী ও বিশেষত সমুদ্রের উত্তাল মন্থন (৬), ধূলিধ্বজা তুলতে থাকা প্রচণ্ড ঝড়ে মহাবৃক্ষ উপড়ে যাওয়া (৭), বারবার সূর্য-পরিবেষ্টনী/হ্যালো যা মহাভয় ও কল্যাণহানির লক্ষণ (৮), রথগর্জনাসদৃশ পর্বতগুহার বিস্ফোরণ (৯), এবং গ্রামে শেয়াল- পেঁচা প্রভৃতির অশুভ ক্রন্দন, বিকৃত হুংকার ও মুখ থেকে অগ্নি নির্গমনের মতো ভয়াল চিত্র (১০) বলা হয়েছে। এভাবে এই জন্মকে কেবল দেহগত নয়, প্রকৃতির অস্থিরতার মাধ্যমে লোকব্যবস্থার সম্ভাব্য পরিণতির ইঙ্গিতসহ মহাগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
तारकपीडितदेवशरणागतिḥ — The Devas Seek Refuge from Tāraka
অধ্যায় ১৬-এ ব্রহ্মা এক মহাসঙ্কট বর্ণনা করেন—বরপ্রভাবে উদ্ধত অসুর তারক দেবগণকে (নির্জরদের) ভীষণভাবে নিপীড়ন করছে। দেবরা প্রজাপতি/লোকেশের শরণে গিয়ে হৃদয়ভরা স্তব (অমরানুতি) নিবেদন করে; সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তাদের উদ্দেশ্য জানতে চান। বিনীত ও ব্যথিত দেবরা জানায়, তারক তাদের নিজ নিজ পদ থেকে বলপূর্বক উৎখাত করেছে এবং দিন-রাত নিরন্তর তাড়না করে; পালালেও সর্বত্র তারই মুখোমুখি হতে হয়। অগ্নি, যম, বরুণ, নিরৃতি, বায়ু প্রভৃতি দিকপালসহ বহু দেবপদ তার অধীন হওয়ায় লোকধর্ম ও বিশ্ব-প্রশাসন বিপর্যস্ত হয়েছে। স্তব→অনুগ্রহ→দুঃখ-নিবেদন→পদসমূহের তালিকা—এই আবেদনরীতিতে অধ্যায়টি শিবকেন্দ্রিক সমাধান ও (পার্বতীখণ্ডে) শক্তির অপরিহার্যতার ভূমিকা রচনা করে।
काम-शक्र-संवादः / Dialogue of Kāma and Śakra (Indra)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা বলেন—অধর্মী ও প্রবল তারকাসুরের অত্যাচারে দেবতারা বিপন্ন হয়ে সরে যায়। তখন শক্র (ইন্দ্র) যুদ্ধের পথ না নিয়ে এক ভিন্ন উপায় হিসেবে কামদেবকে (স্মর/মনমথ) স্মরণ করেন। স্মরণমাত্রেই কাম বসন্ত প্রভৃতি পরিকর ও রতি সহ, বিজয়োচ্ছ্বাসে তৎক্ষণাৎ উপস্থিত হয়ে প্রণাম করে ইন্দ্রের উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করে। ইন্দ্র কামের প্রশংসা করে বলেন, এ কাজ ইন্দ্রেরই নয়—কামেরও কর্তব্য; তিনি কামকে অন্য সহায়কদের ঊর্ধ্বে স্থান দেন। ইন্দ্র জানান, জয়ের দুই অস্ত্র—বজ্র ও কাম; বজ্র ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু কামের শক্তি অচ্যুত। ‘যা লোককল্যাণ করে তাই সর্বাধিক প্রিয়’—এই নীতিতে কামকে পরম বন্ধু জেনে প্রয়োজনীয় কর্ম সম্পাদনের অনুরোধ করেন। এতে বলপ্রয়োগের সীমা ও ধর্মার্থে কামশক্তির কৌশলগত ভূমিকা প্রকাশ পায়।
वसन्त-प्रभावः तथा काम-उद्दीपन-वर्णनम् | Spring’s Influence and the Arousal of Kāma
অধ্যায় ১৮-এ ব্রহ্মা বলেন—শিবের মায়ার মোহে কাম (স্মর) এক বিশেষ স্থানে এসে উপস্থিত হয়। তারপর বসন্তের বিস্তৃত বর্ণনা শুরু হয়; বসন্ত-ধর্ম সর্বদিক জুড়ে ছড়িয়ে মহাদেবের তপস্যাস্থল (উদাহরণে ‘ঔষধিপ্রস্থ’) পর্যন্ত পৌঁছে প্রকৃতিকে অস্বাভাবিকভাবে পুষ্পিত ও ইন্দ্রিয়-উত্তেজক করে তোলে। আম্র ও অশোক-কানন, কৈরব ফুল, ভ্রমর, কোকিলের কূজন, চাঁদের আলো ও মৃদু বাতাস—সবই ‘কাম-উদ্দীপন’ উপাদান হয়ে জীবের মনে কামনা জাগায়। বলা হয়েছে, কম সচেতনরাও তখন কামবন্ধনে আবদ্ধ হয়, যখন বিশ্ব-পরিস্থিতি অনুকূল হয়। এই প্রকৃতি-চিত্রণ অলংকারমাত্র নয়; গুণক্ষোভ ও ভাব-সংক্রমণের ব্যাখ্যামূলক মানচিত্র, যা পরে শিবের তপঃশান্তির বিরুদ্ধে কামের উদ্দেশ্য এবং কাম-ধর্মের নৈতিক টানাপোড়েনের ভূমি প্রস্তুত করে।
कामप्रहारः — The Subduing of Kāma (Desire) / Kāma’s Assault and Its Futility
এই অধ্যায়ে নারদের প্রশ্নে ব্রহ্মা পরবর্তী ঘটনা বলেন। শিবের পরম তপস্যার সময়ে মনে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলে শিব তার কারণ অনুসন্ধান করেন এবং নিজেই ভাবেন—পরস্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ ধর্মবিরোধী ও শ্রুতি-সীমা লঙ্ঘন। তারপর দিক্সমূহ পর্যবেক্ষণ করে তিনি বামদিকে ধনুক টানা, গর্বে-মোহে অন্ধ কামদেবকে দেখেন। কাম ‘অমোঘ’ অস্ত্র নিক্ষেপ করলেও পরমাত্মা শঙ্করের সংস্পর্শে তা ‘মোঘ’ হয়ে নিষ্ফল হয়, তার তেজ স্তিমিত হয় এবং শিবের ক্রোধ জাগে। অধ্যায়টি বোঝায়—কাম পরমেশ্বরকে বাঁধতে পারে না; মনোক্ষোভও ধর্ম ও যোগবিবেক দিয়ে বিচার করে ঈশ্বরীয় কর্তৃত্বে প্রশমিত হয়।
तृतीयनेत्राग्निनिवृत्तिः / Quelling the Fire of the Third Eye (Vāḍava Fire Placed in the Ocean)
এই অধ্যায়ে নারদ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেন—শিবের তৃতীয় নয়ন থেকে নির্গত দাহক অগ্নিশক্তির পরিণতি কী এবং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কী। ব্রহ্মা বলেন, শিবের তৃতীয় নয়নের অগ্নিতে কামদেব ভস্মীভূত হলে ত্রিলোকে মহাভয় ছড়িয়ে পড়ে; দেবতা ও ঋষিরা আশ্রয়ের জন্য ব্রহ্মার কাছে আসেন। ব্রহ্মা শিবকে স্মরণ করে, তাঁর অনুগ্রহলব্ধ শক্তিতে সেই বিশ্ববিধ্বংসী অগ্নিকে স্থিত ও সংযত করেন এবং লোকহিতার্থে তাকে ‘বাডব/বডবা অগ্নি’ রূপে সমুদ্রে স্থাপন করেন। সাগর (সিন্ধু) পুরুষরূপ ধারণ করে ব্রহ্মাকে শ্রদ্ধায় অভ্যর্থনা জানায়। শিক্ষাটি—তপস্যাজাত প্রলয়কর তেজও বিধিপূর্বক যথাস্থানে স্থাপিত হলে নিয়ন্ত্রিত হয়ে জগতের কল্যাণ সাধন করে।
कामदाहोत्तरवृत्तान्तः / Aftermath of Kāma’s Burning (Pārvatī’s Fear and Himavān’s Consolation)
এই অধ্যায়ে নারদ ও ব্রহ্মার প্রশ্নোত্তররূপে কামদাহের পরবর্তী ঘটনা বর্ণিত। নারদ জিজ্ঞাসা করেন—শিবের তৃতীয় নয়নের অগ্নিতে স্মর (কাম) ভস্মীভূত হয়ে সমুদ্রে প্রবেশ করার পর কী ঘটল, পার্বতী এরপর কী করলেন, সখীদের সঙ্গে কোথায় গেলেন এবং পরিস্থিতি কীভাবে এগোল। ব্রহ্মা বলেন—কাম দগ্ধ হওয়ার মুহূর্তে আকাশমণ্ডলে এক মহা বিস্ময়কর, ব্যাপক শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়; তা শিবের তেজোময় অতিমানবীয় ক্রিয়ার তৎক্ষণাৎ বিশ্বচিহ্নস্বরূপ। সেই দৃশ্য ও শব্দে পার্বতী ভীত ও বিচলিত হয়ে সখীদের সঙ্গে দ্রুত নিজ গৃহে ফিরে যান। একই শব্দে পর্বতরাজ হিমবানও বিস্মিত হন; কন্যার কথা স্মরণ করে তিনি ব্যথিত হয়ে তাকে খুঁজতে বের হন। শম্ভুর বিরহ (বা দূরত্ববোধ) থেকে কাঁদতে থাকা পার্বতীকে দেখে হিমবান সান্ত্বনা দেন, অশ্রু মুছিয়ে ‘ভয় কোরো না’ বলেন, কোলে তুলে প্রাসাদে নিয়ে যান এবং তাঁর অস্থিরতা প্রশমিত করেন। অধ্যায়টি কামদাহোত্তর মানসিক প্রতিক্রিয়া, পারিবারিক মধ্যস্থতা ও ধর্মমার্গে পার্বতীর সংকল্প স্থিত হওয়ার ধারাকে নির্দেশ করে, যা শেষে শিব-সংযোগের দিকে অগ্রসর হয়।
गिरिजाया तपोऽनुज्ञा (Permission for Girijā’s Austerities)
এই অধ্যায়ে পার্বতীর তপস্যার সংকল্প সামাজিক অনুমোদনের মাধ্যমে স্থির হয়। দেবমুনি প্রস্থান করলে পার্বতী আনন্দিত হয়ে হর-প্রাপ্তির জন্য তপস্যায় মন স্থাপন করেন। সখী জয়া ও বিজয়া মধ্যস্থ হয়ে প্রথমে হিমবানকে প্রণাম করে পার্বতীর অভিপ্রায় জানায় এবং বলে—তপস্যার দ্বারাই শিবসাধন ও কুলের ভাগ্যসিদ্ধি। হিমবান সম্মতি দেন, তবে মেনার অনুমোদনও আবশ্যক বলেন এবং ফলকে বংশের জন্য নিশ্চিত মঙ্গলময় ঘোষণা করেন। পরে সখীরা মাতার নিকট গিয়ে অনুমতি সংগ্রহে উদ্যোগী হয়। এভাবে বনবাসী তপস্যা ধর্মসম্মত, উদ্দেশ্যপূর্ণ সাধনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী প্রস্তুতি ও অরণ্যগমনের ভূমিকা রচিত হয়।
पार्वत्याः तपः—हिमालयादिभिः उपदेशः / Pārvatī’s Austerity and Counsel from Himālaya and Others
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা পার্বতীর শিবলাভের জন্য দীর্ঘ তপস্যার কথা বলেন। শিবের প্রত্যক্ষ দর্শন না হলেও পার্বতী সখীদের সঙ্গে পরমার্থ-নিশ্চয়ে তপ আরও কঠোর করেন। তখন হিমালয় পরিবারসহ এসে তাঁকে নিবৃত্ত করতে চান—অতিতপে দেহ ক্ষয় হবে, রুদ্র দেখা দেন না, তিনি বিরক্ত; গৃহে ফিরে যাও। কামদহন স্মরণ করিয়ে শিবের দুর্লভতা বোঝান এবং আকাশের চাঁদের মতো অগ্রাহ্য—এমন উপমা দেন। পরে মেনা ও সহ্যাদ্রি, মেরু, মন্দর, মৈনাক, ক্রৌঞ্চ প্রভৃতি পর্বতরাজ নানা যুক্তিতে গিরিজাকে ফেরাতে চেষ্টা করেন। সংসারী উপদেশ ও অচল আধ্যাত্মিক সংকল্পের সংঘাতই এই অধ্যায়ের কেন্দ্র, যা পরবর্তী দিব্য প্রতিক্রিয়ার ভূমি রচনা করে।
देवस्तुतिः—नन्दिकेश्वरविज्ञप्तिः—शम्भोः समाधेः उत्थानम् (Devas’ Hymn, Nandikeśvara’s Petition, and Śiva’s Rising from Samādhi)
এই অধ্যায়ে দেবগণ রুদ্র/শিবের একাগ্র স্তব করেন—ত্রিনেত্র, মদনান্তক প্রভৃতি উপাধি উচ্চারণ করে—তাঁকে জগতের পিতা, পরম আশ্রয় ও দুঃখনাশক রূপে বন্দনা করেন। পরে করুণাবশত নন্দিকেশ্বর দেবদের দুর্দশা নিবেদন করেন—অসুরদের দ্বারা পরাভূত ও অপমানিত দেবগণ দীনবন্ধু ও ভক্তবৎসল শম্ভুর শরণ চান। শম্ভু গভীর ধ্যান-সমাধিতে নিমগ্ন ছিলেন; ধীরে ধীরে চক্ষু মেলে সমবেত দেবদের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। স্তব–নিবেদন–অনুগ্রহময় উত্তর—এই ধারায় কৃপাই পুনরুদ্ধারের কেন্দ্র বলে প্রকাশ পায়।
गिरिजातपः-परीक्षा तथा सप्तर्षि-आह्वानम् (Girijā’s Austerity-Test and the Summoning of the Seven Sages)
এই অধ্যায়ে নারদ জিজ্ঞাসা করেন—ব্রহ্মা-বিষ্ণু প্রমুখ দেবতা ও সমবেত ঋষিগণ প্রস্থান করার পরে শম্ভু কীভাবে, কত সময়ে বর প্রদান করতে উদ্যোগী হলেন। ব্রহ্মা বলেন—দেবগণ স্বধামে ফিরে গেলে ভবা গিরিজার তপস্যা পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে সমাধিতে প্রবেশ করেন; শিবকে স্বয়ংসম্পূর্ণ, পরাত্পর, নিরবিঘ্ন হয়েও ঈশ্বর, বৃষভধ্বজ, হর রূপে বর্ণনা করা হয়। এরপর গিরিজার তীব্র তপস্যার কথা আসে, যা রুদ্রকেও বিস্মিত করে; সমাধিস্থ হয়েও শিব ‘ভক্তাধীন’। তিনি মনে মনে বসিষ্ঠাদি সপ্তর্ষিকে আহ্বান করেন; স্মরণমাত্রে তাঁরা উপস্থিত হয়ে মহেশানের ভক্তিভরে স্তব করেন এবং স্মরণ করা হয়েছে বলে কৃতজ্ঞতা জানান। পরবর্তী অংশে তপঃপরীক্ষা, ঋষিদের ধর্ম-আচারগত মধ্যস্থতা ও বরদানের শর্তসহ ক্রম নির্দেশিত।
पार्वत्याः तपः-परीक्षा (Śiva Tests Pārvatī’s Austerity)
এই অধ্যায়ে ঋষিগণ প্রস্থান করার পর দেবী পার্বতীর তপস্যার আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা শুরু হয়। শঙ্কর স্বয়ং তাঁর তপোব্রত ও সংকল্পের দৃঢ়তা যাচাই করতে ছদ্মবেশ ধারণ করে দণ্ড-ছত্রধারী জ্যোতির্ময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ/জটিল তপস্বীর রূপ নেন; তাঁর তেজে অরণ্য আলোকিত হয়। তিনি সেই স্থানে আসেন যেখানে পার্বতী বেদীতে শুচি হয়ে উপবিষ্ট, সখীদের পরিবেষ্টিত, চন্দ্রকলার ন্যায় শান্ত ও দীপ্তিমতী। পার্বতী অতিথিকে পূর্ণ সম্মানে অর্ঘ্যাদি দিয়ে সাদরে পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। ছদ্মবেশী শিব নিজেকে লোকহিতকারী ভ্রমণশীল তপস্বী বলে পরিচয় দিয়ে পার্বতীর বংশ ও এত কঠোর তপের উদ্দেশ্য প্রশ্ন করেন—অধিকারপূর্ণ বাক্যে চ্যালেঞ্জ এনে তাঁর উদ্দেশ্য, বিবেক ও ভক্তির অচলতা পরীক্ষা করার জন্য।
सत्यप्रतिज्ञा-तपःसंवादः (Pārvatī’s Vow of Truth and the Dialogue on Her Tapas)
অধ্যায় ২৭-এ পার্বতী এক দ্বিজ/জটিল তপস্বীকে বলেন যে তিনি নিজের সম্পূর্ণ বৃত্তান্ত কোনো বিচ্যুতি ছাড়া সত্যভাবে বর্ণনা করবেন। তিনি মন, বাক্য ও কর্ম—এই তিন স্তরে সত্যের প্রতিষ্ঠা করেন এবং শঙ্করলাভের দুষ্করতা জেনেও দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেন। ব্রহ্মার বর্ণনার প্রেক্ষিতে, পার্বতীর কথা শুনে সেই ব্রাহ্মণ জিজ্ঞাসা করেন দেবী ঘোর তপস্যায় কী অর্জন করতে চান এবং প্রথমে প্রস্থান করতে উদ্যত হন; তখন পার্বতী তাঁকে থেকে গিয়ে কল্যাণকর কথা বলার অনুরোধ করেন। দ্বিজ সম্মত হয়ে বলেন, ভক্তিভরে শুনতে প্রস্তুত থাকলে তিনি তত্ত্ব প্রকাশ করবেন। এই অধ্যায়ে পার্বতীর সত্যনিষ্ঠা, সংকল্প ও শৃঙ্খলিত সাধনা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী উপদেশে—আকাঙ্ক্ষার স্বরূপ ও গুরুবাক্যে বোধ (বয়ুন) কীভাবে জাগে—তার দিকে সেতুবন্ধন ঘটে।
पार्वतीवाक्यं—शिवस्य परब्रह्मत्व-निरूपणम् (Pārvatī’s Discourse: Establishing Śiva as Parabrahman)
অধ্যায় ২৮-এ পার্বতী এক অদ্ভুত ছদ্মবেশী আগন্তুকের সামনে দৃঢ়ভাবে জানান যে তিনি এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বুঝেছেন এবং বিরোধী কথা বা কূটতর্কে আর বিভ্রান্ত হবেন না। এরপর তিনি সংক্ষেপে তত্ত্ব স্থাপন করেন—শিব মূলত নির্গুণ পরব্রহ্ম, কিন্তু কার্য-কারণোপাধির সংযোগে সগুণরূপে প্রকাশিত হন; তাই জন্ম, বয়স, সীমা ইত্যাদি সাধারণ মানদণ্ড তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। পার্বতী সদাশিবকে সকল বিদ্যার চিরন্তন আধার বলে শিবের ‘শিক্ষার প্রয়োজন’ ধারণাকে অসংগত বলেন। তিনি জানান, সৃষ্টির আদিতে বেদ শিবেরই ‘নিঃশ্বাস’স্বরূপ প্রকাশিত—এতে বেদের প্রামাণ্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আদিসত্তাকে কাল-পরিমাপে মাপা নিষিদ্ধ হয়। শেষে বলা হয়, যারা শঙ্করকে শক্তির অধিপতি জেনে ভক্তিতে পূজা করে তারা স্থায়ী ক্ষমতা—প্রায়ই ত্রিশক্তিরূপে—লাভ করে; ভক্তি কেবল মতসম্মতি নয়, দিব্য শক্তিতে অংশীদারিত্ব।
पार्वतीप्रार्थना—हिमवत्पार्श्वे भिक्षुरूपेण याचनम् | Pārvatī’s Request: Śiva to Seek Her in Beggar-Form at Himālaya’s Court
অধ্যায় ২৯-এ নারদ–ব্রহ্মার সংলাপ এগিয়ে যায়। নারদের প্রশ্নে ব্রহ্মা বলেন, পার্বতীর কথার পর কী ঘটল। হর অন্তরে আনন্দিত হয়ে পার্বতীর স্নেহময় নির্দেশ গ্রহণ করেন। পার্বতী তাঁকে স্বামী বলে স্মরণ করিয়ে দেন দক্ষযজ্ঞ ধ্বংসের প্রসঙ্গ এবং তারকাসুরে পীড়িত দেবতাদের দুঃখ। তিনি করুণাবশে তাঁকে পত্নী হিসেবে গ্রহণ করতে প্রার্থনা করেন, তবে ধর্ম ও লোকাচার অনুযায়ী প্রকাশ্য বিধি চান—পিতৃগৃহে যাওয়ার অনুমতি চান এবং বলেন, হিমবতের কাছে ভিক্ষুরূপে এসে লীলাবশে বিধিপূর্বক তাঁর হাত প্রার্থনা করুন। এতে ধর্মসম্মতি, যশ ও তপস্বী-পরিচয়ের সঙ্গে গৃহস্থ-বিবাহের সমন্বয় এবং দিব্য মিলনের প্রকাশ্য স্বীকৃতির ভূমিকা স্থাপিত হয়।
पार्वत्याः पितृगृहगमनं तथा मङ्गलस्वागतम् | Pārvatī’s Return to Her Father’s House and the Auspicious Welcome
অধ্যায় ৩০ নারদ–ব্রহ্মা সংলাপরূপ। হরি স্বধামে গমন করার পর নারদ জিজ্ঞাসা করেন—‘সর্বমঙ্গলা়’ পার্বতী এরপর কী করলেন এবং কোথায় গেলেন। ব্রহ্মা বলেন, পার্বতী গান-নৃত্যে (মেনাসহ) সমবেত সভাকে বিমোহিত করে সখীদের সঙ্গে নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে মহাদেবকে স্মরণ করতে করতে পিতৃগৃহে রওনা হন। তাঁর আগমনের সংবাদে মেনা ও হিমাচল আনন্দে উদ্বেল হয়ে দিব্যযানে স্বাগত জানাতে বের হন; পুরোহিত, নগরবাসী, বন্ধু ও আত্মীয়স্বজন সমবেত হয়। মৈনাক প্রমুখ ভ্রাতারা জয়ধ্বনি দিতে দিতে অগ্রসর হয়। রাজপথ সাজানো হয়, মঙ্গলঘট স্থাপিত হয়, চন্দন-অগুরু-কস্তুরী ও ফল-শাখা প্রভৃতি সুগন্ধি মূল্যবান দ্রব্যে স্বাগতমণ্ডপ সমৃদ্ধ হয়; ব্রাহ্মণ, মুনি, নারী ও নর্তকীরাও অংশ নেয়। এভাবে পার্বতীর গৃহ্য ও দৈব পরিসরের মধ্যবর্তী যাত্রা মঙ্গলময় জনসম্মুখ স্বাগত-আচার দ্বারা চিত্রিত।
देवगुरुप्रेषणम् (Himālaya Mission of the Gods’ Preceptor / The Gods Send Their Guru)
অধ্যায় ৩১-এ ব্রহ্মা নারদকে জানান যে ইন্দ্রপ্রমুখ দেবগণ হিমালয় ও তাঁর কন্যা পার্বতীর শিবের প্রতি অব্যভিচারিণী পরাভক্তি উপলব্ধি করেছেন। দেবরা বিচার করেন—হিমালয় যদি একনিষ্ঠ ভক্তিতে কন্যাকে ত্রিশূলধারী শিবকে দেন, তবে তিনি তৎক্ষণাৎ দিব্যত্ব, শিবলোকপ্রাপ্তি এবং শেষে মোক্ষ লাভ করবেন; আর ‘রত্নগর্ভা’ পৃথিবীর জন্য হিমালয়ের প্রস্থানকে অসংখ্য রত্নের আধার সরে যাওয়ার মতো বলে তাঁর মহত্ত্ব বোঝানো হয়। তারা স্থির করে—হিমালয় স্থাবরত্ব ত্যাগ করে দিব্যরূপ ধারণ করবেন, কন্যাকে পিনাকধারীর কাছে সমর্পণ করবেন, মহাদেবের সঙ্গে সারূপ্য, বরভোগ এবং শেষে মুক্তি পাবেন। এরপর দেবগণ তাঁদের গুরুর কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ করেন—তিনি হিমালয়ের আবাসে গিয়ে উদ্দেশ্য সাধন করুন। কৌশলটি বাক্যনির্ভর ও প্রতিকূল—গুরু শিবের নিন্দা করবেন, যাতে বিপরীত প্রভাবে হিমালয় দ্রুত বিবাহে সম্মতি দেন; কারণ দুর্গা শিব ব্যতীত অন্য কাউকে বর মানেন না।
मेना-हिमालयसंवादः (Menā’s Counsel to Himālaya; Response to Slander of Śiva)
এই অধ্যায়ে এক বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ শম্ভু (শিব)-এর নিন্দা করে। তা শুনে মেনা গভীর দুঃখ ও ক্রোধে হিমালয়কে বলেন—শৈব মহর্ষিদের কাছে গিয়ে প্রমাণসহ সত্য যাচাই করো; তবু নিন্দিত রুদ্রকে কন্যাদান করবেন না বলে দৃঢ় সংকল্প করেন। তিনি বিষপান, জলে ঝাঁপ, প্রাণত্যাগ বা অরণ্যে গমন—এমন শপথসদৃশ হুমকি দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অপরদিকে বিরহে কাতর শম্ভু সপ্তর্ষিকে স্মরণ করেন; তারা কল্পবৃক্ষসম দ্রুত উপস্থিত হন, আর অরুন্ধতীও সিদ্ধির মতো এসে পৌঁছান। সেই দীপ্তিমান ঋষিদের দর্শনে হর নিজের জপ থামিয়ে পরামর্শ-সভায় প্রবৃত্ত হন; নিন্দাজনিত সংকট, ঋষি-প্রমাণ, গৃহধর্ম ও পরম সত্যের টানাপোড়েন এবং দেব-ঋষি-মধ্যস্থতার ইঙ্গিত এখানে ফুটে ওঠে।
शिवशिवयोर्जगत्पितृमातृत्व-प्रतिपादनं तथा मेनायाः विमोहः (Śiva–Śivā as Cosmic Father and Mother; Menā’s Delusion and the Sages’ Intervention)
অধ্যায় ৩৩-এ ঋষিরা হিমালয়কে শঙ্করের কাছে কন্যাদান করতে অনুরোধ করেন—কারণ শিব জগত্পিতা ও শিবা জগন্মাতা; তাই এই বিবাহ কেবল সামাজিক নয়, তত্ত্বগত। তাঁরা বলেন, এতে হিমালয়ের জন্ম ‘সার্থক’ হবে এবং সম্পর্কের যুক্তিতে তিনি জগদ্গুরুরও ‘গুরু’সম মর্যাদা পাবেন। ব্রহ্মা হিমালয়ের উত্তর বর্ণনা করেন—আগেই গিরীশের ইচ্ছানুসারে সম্মতি ছিল, কিন্তু এক বৈষ্ণব-মনস্ক ব্রাহ্মণ শিব সম্পর্কে বিপরীত কথা বলে বুদ্ধিবিভ্রম ঘটায়। ফলে মেনা জ্ঞানভ্রষ্ট হয়ে ভিক্ষু-যোগীরূপী রুদ্রকে বর মানতে অস্বীকার করে কোপাগারে চলে যান এবং উপদেশ সত্ত্বেও জেদ ধরে থাকেন। হিমালয়ও ‘ভিক্ষুক-রূপ’ মহেশকে কন্যা দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ঋষিদের মাঝে নীরব হন। তখন সপ্তর্ষি শিবের মায়ার স্তব করে অরুন্ধতীকে—প্রজ্ঞা ও পতিব্রতা ধর্মে প্রসিদ্ধ—মেনা ও পার্বতীর কাছে দ্রুত পাঠান, যাতে সঠিক বোধ ফিরে আসে এবং নির্ধারিত মিলন সম্পন্ন হয়।
अनरण्य-वंशवर्णनम् तथा पिप्पलादस्य कामोत्पत्तिः (Genealogy of King Anaraṇya and Pippalāda’s arousal of desire)
বসিষ্ঠ মনু থেকে উদ্ভূত রাজবংশের পরিচয় দিয়ে সপ্তদ্বীপাধিপতি রাজা অনরণ্যের কথা বলেন—তিনি শম্ভুর আদর্শ ভক্ত। ভৃগুকে পুরোহিত করে তিনি বহু যজ্ঞ করেন, কিন্তু ইন্দ্রপদ পর্যন্ত প্রস্তাবও গ্রহণ করেন না; এতে বৈরাগ্য ও শিবভক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়। এরপর রাজ্যের বহু পুত্র, এক অতি প্রিয় কন্যা (সুন্দরী/পদ্মা) এবং বহু সৌভাগ্যবতী রাণীর উল্লেখ আসে। কন্যা যৌবনে পৌঁছালে একটি পত্র/বার্তা প্রেরিত হয়। পরে পিপ্পলাদ ঋষি আশ্রমে ফিরতে গিয়ে নারীদের সঙ্গে রতিক্রীড়ায় মগ্ন, কামশাস্ত্রে পারদর্শী এক গন্ধর্বকে দেখেন। সেই দৃশ্য তপস্বীর মনেও কামোদ্রেক ঘটায় এবং বিবাহ/গৃহস্থজীবন (দার-সংগ্রহ) ভাবনা জাগে। অধ্যায়টি ইন্দ্রিয়-সংস্পর্শে তপস্যার বিচ্যুতি ও পরবর্তী সমাধানের ভূমিকা স্থাপন করে।
अनरण्यसुता–पिप्पलादचरितम् / The Episode of Anaraṇya’s Daughter and Sage Pippalāda
এই অধ্যায়ে সংলাপের ভিতর সংলাপ চলতে থাকে। নারদ ব্রহ্মাকে অনরণ্য-কাহিনির পরিণতি, বিশেষত কন্যাদানের পর কী ঘটল তা জিজ্ঞেস করেন। ব্রহ্মা বলেন—গিরিবর/শৈলেশ শ্রদ্ধাভরে বশিষ্ঠকে প্রশ্ন করেন, পিপ্পলাদকে স্বামী হিসেবে পেয়ে অনরণ্যের কন্যা পরে কী করল। বশিষ্ঠ পিপ্পলাদকে বৃদ্ধ, সংযমী, কামনাহীন তপস্বী রূপে বর্ণনা করেন; তিনি বনাশ্রমে তার সঙ্গে সন্তোষে বাস করেন, আর স্ত্রী লক্ষ্মীর মতো নারায়ণের সেবা যেমন, তেমনি কর্মে-মনসে-বচনে পরম ভক্তিতে স্বামীর সেবা করে। এরপর ধর্মদেব মায়াবলে পথে অলংকৃত ষাঁড়রূপে আবির্ভূত হন, স্বর্ণদী নদীতে স্নানে যাত্রারত স্ত্রীর অন্তর্ভাব পরীক্ষা করতে; পরবর্তী শ্লোকগুলি এই ধর্ম-পরীক্ষা ও তার নীতিগত সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর।
हिमालयस्य निर्णयः — शिवाय पार्वत्याः प्रदाने (Himālaya’s Resolution to Give Pārvatī to Śiva)
অধ্যায় ৩৬-এ বশিষ্ঠের উপদেশের পর হিমালয়ের রাজ্যে এক পরামর্শসভা বসে। ব্রহ্মা বলেন—হিমালয় বিস্মিত হয়ে মেরু, সহ্য, গন্ধমাদন, মন্দর, মৈনাক, বিন্ধ্য প্রভৃতি পর্বতরাজদের ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, বশিষ্ঠবাক্যের আলোকে কী করা উচিত। পর্বতগণ দৃঢ়ভাবে বলেন—আর দ্বিধা নয়; বিষয়টি উচ্চতর উদ্দেশ্যে স্থির। পার্বতী দেবকার্যের জন্য আবির্ভূতা, তাই তাঁকে শিবের কাছেই সমর্পণ করা উচিত, যিনি শিব-ইচ্ছার বাহক অবতারতুল্য। এ সিদ্ধান্ত কেবল পারিবারিক নয়, ধর্ম ও বিশ্ববিধানের অনিবার্য নির্দেশ। তা শুনে হিমালয় পরম আনন্দিত হন; গিরিজার হৃদয়েও অন্তরানন্দ জাগে। পরে অরুন্ধতী যুক্তি ও ইতিহাস-উদাহরণে মেনার সংশয় দূর করেন। মেনা স্বচ্ছচিত্তে অরুন্ধতী ও অতিথিদের সৎকার করে শিবকে পার্বতী দানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং দিব্য বিবাহের পরবর্তী আচার-প্রস্তুতিতে গৃহকে প্রস্তুত করেন।
निमन्त्रण-पत्रिका-प्रेषणम् (Dispatch of the Invitation Letter) / Himālaya Sends the Wedding Invitation to Śiva
এই অধ্যায়ে নারদ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেন—সপ্তর্ষিরা চলে যাওয়ার পরে হিমবান কী করলেন। ব্রহ্মা বলেন, আনন্দিত ও উদারচিত্ত হিমবান মেরু প্রভৃতি পর্বত-আত্মীয়দের ডেকে পরামর্শ করেন। গুরু-নির্দেশ ও স্নেহবশে তিনি পুরোহিত গর্গকে শিবের উদ্দেশে শুভ লগ্ন-পত্রিকা/নিমন্ত্রণপত্র রচনা করতে বলেন। পরে শুভ দ্রব্য ও উপহারসহ দূতদের কৈলাসে পাঠানো হয়। দূতেরা শিবের সান্নিধ্যে গিয়ে তিলক, প্রণাম ও যথাযথ সম্ভাষণসহ পত্রিকা প্রদান করে; ভগবান শিব তাদের বিশেষ সম্মান দেন। দূতদের সফল অভ্যর্থনায় হিমালয় আনন্দিত হন এবং নানা দেশে আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের নিমন্ত্রণ করে দিব্য বিবাহের আয়োজন বিস্তার করেন। এখানে শিষ্টাচার, শুভ লগ্ন ও নিমন্ত্রণ-ব্যবস্থার ধর্মীয় বিধান প্রকাশিত।
हिमवतः सुमङ्गलोत्सव-नगररचना (Himavān’s Auspicious Festival Preparations and City Adornment)
অধ্যায় ৩৮-এ শৈলেশ্বর হিমবান তাঁর কন্যার কল্যাণার্থে নিজ নগরে মহাশুভ উৎসবের আয়োজন করেন। প্রধান দ্বারে নন্দী প্রহরী রূপে স্থাপিত হন এবং তাঁরই এক কৃত্রিম প্রতিরূপও বসানো হয়; উভয়ই স্ফটিকসম উজ্জ্বল হয়ে দ্বারপ্রান্তের পবিত্র সমতা ও শোভা বাড়ায়। পথসমূহ জল ছিটিয়ে শুদ্ধ করা হয়, প্রতিটি দ্বার রম্ভা প্রভৃতি অলংকার ও মঙ্গলদ্রব্যে সজ্জিত হয়। প্রাঙ্গণে রম্ভাস্তম্ভ, বস্ত্র-সূত্রবন্ধন, নবপল্লব, মালতী-মালা ও দীপ্ত তোরণ স্থাপন করা হয় এবং চার দিকেই মঙ্গলবস্তু রাখা হয়। পরে হিমবান বিশ্বকর্মাকে আহ্বান করে বিশাল মণ্ডপ ও সুন্দর বেদিকা নির্মাণ করান; সেখানে কৃত্রিম স্থাবর রচনা জঙ্গমের মতো, আর জঙ্গম উপাদান স্থাবরের মতো মনে হয়ে বিস্ময় ও পূর্ণতার ভাব জাগায়। সমগ্র অধ্যায়টি শুদ্ধ পথ, রক্ষিত দ্বার, দিকনির্দেশিত মঙ্গলস্থাপন ও কেন্দ্র-মণ্ডপসহ আচারস্থানের নকশা হিসেবে উপস্থাপিত, গর্গের নির্দেশে প্রস্তাব-যোগ্য।
मङ्गलपत्रिकाग्रहणम् — Reception of the Auspicious Marriage Invitation
অধ্যায় ৩৯ নারদ–ব্রহ্মা সংলাপ। নারদ জিজ্ঞাসা করেন—মঙ্গলপত্রিকা (বিবাহ-নিমন্ত্রণ/স্বীকৃতিপত্র) পেয়ে শশিমৌলি শঙ্কর কী করলেন। ব্রহ্মা বলেন—শিব আনন্দে পত্রিকা গ্রহণ করেন, প্রীতিতে হাসেন এবং দূতদের যথোচিত সম্মান দেন; এতে দেবত্বের সঙ্গে লোকাচারের শোভন আদর্শ প্রকাশ পায়। তিনি পত্রিকাটি বিধিপূর্বক পাঠ করিয়ে নিয়মমাফিক গ্রহণ করেন এবং বিবাহ-স্বীকৃতি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। দূতদের জানান—তাদের কাজ সফল; তারা তাঁর বিবাহে উপস্থিত থাকবে, কারণ তিনি বিবাহ গ্রহণ করেছেন। দূতেরা প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করে আনন্দে ফিরে যায় এবং সফল দূত্যের সংবাদ প্রচার করে। শুরুতে এই কাহিনি শ্রবণকে মঙ্গলদায়ক ও পাপনাশক বলা হয়েছে; শিবের লীলা পরাত্পরতা ও সামাজিক নিয়মের সমন্বয় ঘটায়। পরবর্তী শ্লোকগুলি বিবাহ-প্রস্তুতির দিকে অগ্রসর হয়ে মঙ্গলের আধ্যাত্মিক শক্তি ও শিবের কৃপাময় অধিপত্য প্রকাশ করে।
गणसमागमः (Śiva Summons the Gaṇas for the Great Festival)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা শিবের মহোৎসব উপলক্ষে গণসমাবেশের কাহিনি বলেন। শিব নন্দী ও সমবেত গণদের আহ্বান করে হিমাচলপুরের দিকে যাত্রার আদেশ দেন, সঙ্গী হতে বলেন এবং কিছু গণকে পিছনে প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য রেখে দেন। পরে শঙ্খকর্ণ, কেকরাক্ষ, বিকৃত, বিশাখ, পারিজাত, সর্বান্তক, বিকৃতানন, কপালাখ্য, সন্দারক, কন্দুক, কুণ্ডক, বিষ্টম্ভ, পিপ্পল, সন্নাদক প্রভৃতি গণনায়কদের নাম ও তাদের কোটি, দশকোটি, সহস্রকোটি, কোটিকোটি পরিমাণ বিশাল বাহিনী উল্লেখ করা হয়। এই বর্ণনায় শিবের সার্বভৌমত্ব, গণদের শৃঙ্খলা এবং মহোৎসবের নাদ-অনুষ্ঠানময় পরিবেশ মহিমায় প্রকাশিত।
हिमालयगृहे नारदस्य आगमनम् तथा विश्वकर्मनिर्मितवैभववर्णनम् — Nārada’s Arrival at Himālaya’s Palace and the Description of Viśvakarman’s Marvels
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা শিব–পার্বতী বিবাহ-প্রসঙ্গে দূত-ব্যবস্থার কাহিনি বলেন। শঙ্করীর সম্মতি নিয়ে হরি (বিষ্ণু) প্রথমে নারদকে হিমালয়ের নিবাসে পাঠান। নারদ পরমেশ্বরকে প্রণাম করে হিমাচলের গৃহে পৌঁছান। সেখানে বিশ্বকর্মা নির্মিত আশ্চর্য কৃত্রিম বৈভব দেখা যায়—রত্নখচিত মণ্ডপ, স্বর্ণকলশ-শোভিত শিখর, দিব্য অলংকার, সহস্র স্তম্ভের ভিত্তি ও অপূর্ব বেদিকা। বিস্মিত নারদ ‘পর্বতরাজ’ হিমবানকে জিজ্ঞাসা করেন—বিষ্ণু-প্রমুখ দেবগণ, ঋষি, সিদ্ধাদি কি এসে পৌঁছেছেন, এবং বৃষারূঢ় গণপরিবৃত মহাদেব কি বিবাহার্থে আগমন করেছেন? হিমবান যথার্থ উত্তর দেন; পরবর্তী শ্লোকে বিবাহ-প্রস্তুতি, আগমন ও আচার-প্রোটোকল বর্ণিত হয়।
ईश्वरागमनं हिमवदादि-समागमश्च / The Arrival of Īśvara and the Assembly of Himālaya, Devas, and Mountains
অধ্যায় ৪২-এ ঈশ্বর শিবের হিমালয়ের নিকটে আগমন এবং তদনন্তর মহাসমাবেশের বর্ণনা আছে। ব্রহ্মা বলেন—শিবের আগমনের সংবাদ শুনে হিমালয় আনন্দিত হয়ে দর্শনের আয়োজন করেন; পর্বতগণ ও ব্রাহ্মণদের প্রেরণ করে নিজেও ভক্তিভরে দ্রুত অগ্রসর হন। দেবতা ও পর্বত-সমূহ বিশাল, সুশৃঙ্খল, সেনাসদৃশ বিন্যাসে সমবেত হয়; পারস্পরিক বিস্ময় ও আনন্দ জাগে, যেন পূর্ব-পশ্চিম সমুদ্রের মিলন। ঈশ্বরকে সম্মুখে দেখে হিমালয় প্রণামের নেতৃত্ব দেন; সকল পর্বত ও ব্রাহ্মণ সদাশিবকে নত হয়। পরে বৃষভে অধিষ্ঠিত, শান্তমুখ, অলংকৃত, দিব্য অঙ্গে দীপ্তিমান, সূক্ষ্ম বস্ত্রধারী, রত্নমুকুটধারী, মৃদু হাস্য ও নির্মল জ্যোতিতে উজ্জ্বল শিবের ঘন মূর্তিবর্ণনা এসে দর্শন-নির্ভর ভক্তি, বিনয় ও বিশ্বসমঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করে।
मेना-शिवदर्शन-प्रस्थानम् | Menā’s Quest to Behold Śiva (Departure for Śiva’s Darśana)
অধ্যায় ৪৩-এ মেনা প্রকাশ করেন যে তিনি গিরিজার প্রভু ভগবান শিবকে স্বচক্ষে দর্শন করে জানতে চান—কোন শিব-রূপের জন্য এত পরম তপস্যা করা হয়েছে। ব্রহ্মা বলেন, অজ্ঞতা ও সীমিত বিচারবুদ্ধির বশে তিনি মুনির সঙ্গে সঙ্গে শিবদর্শনের জন্য চন্দ্রশালার দিকে তৎক্ষণাৎ রওনা হন। মেনার অন্তর্গত অহংকার-গর্ব বুঝে শিব এক আশ্চর্য লীলা আরম্ভ করেন এবং বিষ্ণুকে সম্বোধন করেন; ব্রহ্মাও তেজোময় রূপে এসে স্তূত হন। শিব বিষ্ণু ও ব্রহ্মাকে পৃথকভাবে গিরিদ্বারের দিকে যেতে বলেন এবং পরে নিজে অনুসরণ করবেন। বিষ্ণু দেবতাদের আহ্বান করলে সবাই উৎসাহে যাত্রার প্রস্তুতি নেয়। মেনাকে শিরোগৃহ/উপরি কক্ষে এমন এক দৃশ্য দেখানো হয় যা হৃদয়ে বিভ্রান্তি ও আবেগ-অস্থিরতা জাগায়—শিক্ষামূলক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত। সময় হলে মেনা এক শুভ, দীপ্তিময় সেনা-পরিবার দেখে তার ‘সাধারণ’ জাঁকজমকে আনন্দিত হন। অগ্রে সুন্দর গন্ধর্বরা উৎকৃষ্ট বস্ত্র-অলংকারে সজ্জিত; পরে নানা যান, বাদ্য, পতাকা ও অপ্সরাদের দল—এই ঐশ্বর্যপূর্ণ শোভাযাত্রা পরবর্তী অংশে বাহ্য মূল্যায়নের ভ্রান্তি ভেঙে শিবের পরাত্পর তত্ত্ব প্রকাশের ভূমিকা রচনা করে।
मेनायाः क्रोध-विलापः — Menā’s Lament and Reproach (to the Sage)
অধ্যায় ৪৪-এ ব্রহ্মা বলেন, হিমবানের পত্নী ও পার্বতীর জননী মেনা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে আবার প্রবলভাবে বিচলিত হন। তিনি বিলাপ করতে করতে ঋষির প্রতি তীক্ষ্ণ ভর্ৎসনা করেন—শিবের সঙ্গে পার্বতীর নির্ধারিত বিবাহ সম্পর্কে পূর্বের আশ্বাসের ফল উল্টো হয়েছে, পরবর্তী ঘটনাগুলি যেন প্রতারণা বা বিপরীত ফলদায়ক। পার্বতীর কঠোর তপস্যাকে তিনি ‘দুঃখের ফল’ বলে আখ্যা দেন এবং কুলমান-সম্মান, গৃহস্থালির স্থিতি নষ্ট হওয়া, আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন; উপদেশদাতা মুনির প্রতি বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগও তোলেন। ক্রোধে কন্যার সিদ্ধান্তকে কটুকথার রূপকে ব্যাখ্যা করেন—সোনা ছেড়ে কাঁচ নেওয়া, চন্দন ছেড়ে কাদা বেছে নেওয়া, রাজহাঁস উড়ে যেতে দিয়ে কাক ধরা—মূল্যের উলটাপালটা ও বেদনাময় নির্বাচন বোঝাতে। এই অধ্যায়ে মাতৃশোক ও সামাজিক উদ্বেগকে শিব–পার্বতী মিলনের দিব্য উদ্দেশ্যের বিপরীতে স্থাপন করে পরবর্তী সমাধানের ভূমি প্রস্তুত হয়।
शिवरूपदर्शनम् (Menā’s Vision of Śiva’s Divine Form)
অধ্যায় ৪৫-এ ব্রহ্মার বিবরণ ও নারদের প্রত্যক্ষ বাক্যের মাধ্যমে কাহিনি এগোয়। বিষ্ণুর অনুরোধে দেবকার্য সিদ্ধির জন্য নারদ শম্ভুর কাছে গিয়ে নানাবিধ স্তোত্রে তাঁর স্তব করেন। নারদের বাক্যে প্রসন্ন হয়ে শিব করুণাময়, পরম ও দিব্য এক আশ্চর্য রূপ প্রকাশ করেন। সেই দর্শনে আনন্দিত নারদ মেনার কাছে ফিরে এসে তাঁকে শিবের অতুল রূপ দর্শনের জন্য অনুরোধ করেন। মেনা বিস্মিত হয়ে স্বয়ং শিবের তেজ ও মঙ্গলময় সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করেন—কোটি সূর্যের ন্যায় দীপ্তি, নিখুঁত অঙ্গ, বিচিত্র বসন, বহু অলংকার, শান্ত হাসি, উজ্জ্বল বর্ণ এবং শিরে চন্দ্রকলার শোভা। দেবকার্য→স্তব→কৃপাময় প্রকাশ→মেনার সাক্ষ্য→রূপবর্ণনা—এই ধারাই অধ্যায়ের মূল।
महेश्वरागमनं तथा नीराजन-सत्कारवर्णनम् / The Arrival of Maheśvara and the Rite of Welcome (Nīrājana)
অধ্যায় ৪৬-এ হিমাচলের গৃহে মহেশ্বরের মঙ্গলময় আগমনের বর্ণনা আছে। শিব গণ, দেবতা ও ঋষিদের সঙ্গে আনন্দঘন, সর্বসমক্ষে শোভাযাত্রায় উপস্থিত হন। গৃহিণী মেনা যথাযথ সৎকারের প্রস্তুতি নিতে অন্তঃপুরে যান। এরপর সতী/পার্বতী ঋষি ও নারীগণের সঙ্গে নীরাজনের জন্য দীপপাত্র হাতে দ্বারপ্রান্তে আসেন। মেনা শঙ্করকে একমুখ, ত্রিনয়ন, মৃদু হাস্য, দীপ্তবর্ণ, রত্নমুকুট-অলংকার-হার-বস্ত্র ও চন্দন-অগুরু-কস্তুরী-কুঙ্কুমে বিভূষিত দেখে দর্শন ও সৎকারের পবিত্র মিলন উপলব্ধি করেন।
दुर्गोपवीत-रचना तथा शिवामलङ्कारोत्सवः | The Making of the Durgopavīta and Pārvatī’s Auspicious Adornment Festival
অধ্যায় ৪৭-এ পার্বতী (শিবা)-র শুভকর্ম ও উৎসবের আচারবিধি বর্ণিত। ব্রহ্মা বলেন, পর্বতরাজ হিমালয় আনন্দসহকারে বৈদিক মন্ত্র ও শিবমন্ত্রের সঙ্গে ‘দুর্গোপবীত’ নির্মাণ করান—যাতে বৈদিক আচারের সঙ্গে শৈব বিধির সমন্বয় প্রকাশ পায়। হিমালয়ের অনুরোধে বিষ্ণু প্রমুখ দেবতা ও ঋষিগণ অন্তঃপুরে প্রবেশ করে সাক্ষী হন; শ্রুতি ও ভাব-আচারের নিয়মে শুদ্ধিকর্ম সম্পন্ন হয়। পরে শিবপ্রদত্ত বলে খ্যাত অলংকারে পার্বতীকে সাজানো হয়; স্নান, সখী ও ব্রাহ্মণ নারীদের দ্বারা নীরাজন, এবং নতুন অপ্রযুক্ত বস্ত্র, কঞ্চুকী, হার, স্বর্ণকঙ্কণ ইত্যাদিতে ভূষণ করা হয়। বাহ্য জাঁকজমকের মধ্যেও তিনি অন্তরে শিবধ্যানে স্থিত থাকেন। শেষে ব্রাহ্মণাদি সকলকে দান, গীত-বাদ্য ও সমবেত আনন্দে উৎসব সর্বত্র মঙ্গল বিস্তার করে।
गोत्र-प्रवर-प्रश्नः तथा तिथ्यादि-कीर्तनं (Gotra–Pravara Inquiry and Proclamation of Auspicious Time)
অধ্যায় ৪৮-এ বিবাহানুষ্ঠানের এক আনুষ্ঠানিক পর্ব বর্ণিত। গর্গাচার্যের প্রেরণায় হিমবান ও মেনা কন্যাদানের জন্য প্রস্তুত হন; মেনা অলংকৃত হয়ে স্বর্ণকলস বহন করে উপস্থিত হন। পর্বতরাজ হিমবান গৃহপুরোহিতদের সঙ্গে বরকে পাদ্যাদি অর্ঘ্য দিয়ে অভ্যর্থনা করেন এবং বস্ত্র, চন্দন ও অলংকারে সম্মান জানান। এরপর তিনি পঞ্জিকা-বিদ্যায় পারদর্শী ব্রাহ্মণদের তিথি ও অন্যান্য শুভলক্ষণ ঘোষণা করতে অনুরোধ করেন; তারা আনন্দে তা উচ্চারণ করেন। তারপর শম্ভুর অন্তঃপ্রেরণায় হিমাচল শিবের গোত্র, প্রবর, বংশ, নাম, বেদ ও শাখা জানতে চান; সর্বাতীত শিব নীরব হয়ে যান, দেব-ঋষিদের বিস্ময় জাগে। তখন শিবপ্রেরিত বীণাবাদক ব্রহ্মবিদ নারদ এসে শিবের অগোত্র-অপ্রবর পরমতত্ত্ব প্রকাশ করে সামাজিক বিধির ধারাও রক্ষা করেন।
अध्याय ४९ — विवाहानुष्ठाने ब्रह्मणः काममोहः (Brahmā’s Enchantment by Desire during the Wedding Rites)
শিব–পার্বতীর বিবাহানুষ্ঠানে ব্রহ্মা বিধিকর্ম বর্ণনা করেন। তাঁর নির্দেশে পুরোহিতেরা যজ্ঞাগ্নি স্থাপন করে; শিব ঋগ্–যজুঃ–সাম মন্ত্রে হোম করেন এবং মৈনাক (কালীদেবীর ভ্রাতা) প্রথামতো লাজাঞ্জলি অর্পণ করে। পরে শিব ও কালী/পার্বতী বিধি ও লোকাচার অনুসারে অগ্নি প্রদক্ষিণা করেন। ঠিক তখন শিবের মায়ায় মোহিত ব্রহ্মা দেবীর পদ/নখে চন্দ্রকলার মতো অপূর্ব সৌন্দর্য দেখে কামে আচ্ছন্ন হন; বারবার তাকাতে তাকাতে সংযম হারিয়ে তাঁর বীর্য ভূমিতে পতিত হয়। লজ্জিত হয়ে তিনি পায়ে ঘষে ঢেকে দিতে চান। মহাদেব এ কথা জেনে প্রবল ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রহ্মাকে দণ্ড দিতে উদ্যত হন, ফলে সকল জীবের মধ্যে আতঙ্ক ও ভয় ছড়িয়ে পড়ে। এই অধ্যায়ে বৈদিক বিবাহরীতির মধ্যে কাম, মায়া ও শিবের শাসক-রূপের তাৎপর্য প্রকাশ পায়।
वैवाहिकानुष्ठानसमापनं दानप्रशंसा च / Completion of Wedding Rites and Praise of Gifts (Dāna)
এই অধ্যায়ে শিব–পার্বতীর বিবাহোত্তর আচারক্রম বর্ণিত। ব্রহ্মা নারদকে বলেন—শিবের আদেশে ঋষিসভাসহ শিরো’ভিষেক, মঙ্গলদর্শন, হৃদয়ালম্বন এবং স্বস্তিপাঠ মহোৎসবসহ সম্পন্ন হয়। দ্বিজ আচার্যের নির্দেশে শিব শিবার মস্তকে সিন্দূর পরিয়ে দেন; পার্বতী অপূর্ব দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে ‘গিরিজা’ নামে প্রসিদ্ধ হন। পুরোহিতের কথায় দম্পতিকে এক আসনে বসানো হয়—দাম্পত্য ঐক্য ও লোকমঙ্গল প্রকাশ পায়। পরে নিজ স্থানে ফিরে আনন্দে সংস্রব-প্রাশন সমাপনকর্ম করেন। বিবাহযজ্ঞ সমাপ্ত হলে শিব লোককল্যাণার্থে ব্রহ্মাকে পূর্ণপাত্র দান করেন এবং আচার্য ও ব্রাহ্মণদের গোদানসহ স্বর্ণ, রত্ন প্রভৃতি বহু শুভ দান প্রদান করেন। শেষে দেবতা ও সকল জীবের মধ্যে জয়ধ্বনিসহ সর্বজনীন আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে—যেন কর্মের বিশ্বসমর্থন।
कामभस्म-प्रार्थना: रत्याः शङ्करं प्रति विनयः / Rati’s Supplication to Śaṅkara regarding Kāma’s Ashes
অধ্যায় ৫১ শিব–পার্বতীর বিবাহোৎসবের পুণ্য পরিবেশে নিবেদন ও অনুগ্রহের কাহিনি। ব্রহ্মা এই মুহূর্তকে অনুকূল সময় বলে নির্দেশ করেন, তারপর রতি শঙ্করের কাছে বিধিবদ্ধ বিলাপ ও তত্ত্বসম্মত যুক্তি পেশ করেন—(১) নিজের ধর্ম ও জীবনধারণ, (২) সর্বত্র উৎসবের মধ্যে তাঁর একাকী শোকের অসঙ্গতি, (৩) ত্রিলোকে শিবের অনন্য সর্বশক্তিমত্তা। তিনি ভস্মীভূত স্বামী কামদেবকে পুনরুদ্ধারের নির্দিষ্ট প্রার্থনা করেন। এখানে দয়া-করুণা এবং শিবের স্বোক্ত সত্য রক্ষার গুরুত্ব প্রকাশ পায়, যা করুণ সমাধানের ইঙ্গিত দেয়। শেষে রতি কামভস্ম শঙ্করের সামনে রেখে অশ্রুসিক্ত হন; এই ভস্মই পরবর্তী পুনর্জীবন ও কামের ধর্মসম্মত পুনঃস্থাপনের কেন্দ্রবিন্দু।
भोजन-आह्वान-प्रकरणम् — The Episode of Invitation and the Divine Feast
অধ্যায় ৫২-এ শ্রেষ্ঠ পর্বত হিমবান মহাভোজের জন্য মনোরম ভোজন-প্রাঙ্গণ প্রস্তুত করেন। তিনি শুদ্ধিকরণ ও লেপন করিয়ে সুগন্ধি ও নানা মঙ্গলদ্রব্যে স্থানটি সাজান, তারপর দেবতা ও অন্যান্য দিব্য সত্তাদের ‘নিজ নিজ অধিপতিসহ’ আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণ শুনে ভগবান (এখানে অচ্যুত-রূপে নির্দেশিত) দেবগণ ও পরিচারকদের সঙ্গে আনন্দিত হয়ে আগমন করেন। হিমবান বিধিমতো অভ্যর্থনা করে তাঁদের গৃহাভ্যন্তরে যথোচিত আসনে বসান এবং নানা প্রকার আহার পরিবেশন করান। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোজনানুমতি ঘোষণা করা হয়; তখন সকল দেবতা সারিবদ্ধভাবে হাস্য-আলাপে ভোজন করেন এবং সদাশিবকে সর্বাগ্রে সম্মান দেন। নন্দী, ভৃঙ্গী, বীরভদ্র প্রভৃতি শিবগণ ও ইন্দ্রসহ লোকপালদের অংশগ্রহণে আতিথ্য, মর্যাদা ও ক্রমাধিকার দ্বারা বিশ্বব্যবস্থা প্রকাশ পায়।
गिरिराजस्य शिवनिमन्त्रणम् / The Mountain-King Invites Śiva (Hospitality to Śiva and the Devas)
এই অধ্যায়ে বিষ্ণু প্রমুখ দেবতা ও ঋষিগণ নিজেদের নিত্যকর্ম সম্পন্ন করে গিরির দিকে অগ্রসর হন। তখন গিরিরাজ (হিমালয়) স্নান করে শুদ্ধ হয়ে ইষ্টদেবের পূজা করেন, নগরবাসী ও স্বজনদের একত্র করে আনন্দসহকারে দেবসমাজকে আতিথ্য দিতে নিজের নিবাসে যান। তিনি শম্ভু/মহেশানকে যথাবিধি সম্মান জানিয়ে প্রার্থনা করেন—দেবতাদের সঙ্গে ভগবান যেন কয়েকদিন তাঁর গৃহে অবস্থান করেন। তিনি শিবদর্শনের পবিত্র ও রূপান্তরকারী শক্তির স্তব করেন এবং দেবসমেত শিবের আগমনে গৃহধন্যতা ঘোষণা করেন। দেবতা ও ঋষিরাও গিরিরাজের পুণ্য, যশ ও সদ্গুণের প্রশংসা করে বলেন—ত্রিলোকে তাঁর সমান কেউ নেই, কারণ পরব্রহ্ম মহেশান ভক্তানুকম্পায় তাঁর দ্বারে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁরা মনোরম আবাস, বহুবিধ সম্মান ও অপূর্ব ভোজনের প্রশংসা করেন এবং ইঙ্গিত দেন—যেখানে দেবী শিবাম্বিকা বিরাজ করেন সেখানে অভাব থাকে না, সব নিবেদন পূর্ণ ও প্রাচুর্যময় হয়। এভাবে আতিথ্যকে আচারসম্মত ভক্তি রূপে দেখিয়ে শিব-শক্তির সান্নিধ্যে গৃহকে পবিত্র তীর্থসম করে তোলা হয়েছে।
पार्वत्याः यात्रासंस्कारः तथा पातिव्रत्योपदेशः / Preparations for Girijā’s Auspicious Journey and the Teaching on Pātivratya
অধ্যায় ৫৪-এ ব্রহ্মা বলেন—সপ্তর্ষিগণ হিমগিরিকে অনুরোধ করেন যেন তিনি কন্যা দেবী গিরিজার জন্য যথোচিত যাত্রা-সংস্কার ও শুভ যাত্রার আয়োজন করেন। বিরহের তীব্রতায় হিমগিরি কিছুক্ষণ বিষণ্ণ হয়ে পরে সংযত হয়ে সম্মতি দেন। তিনি মেনাকে সংবাদ পাঠান; মেনা আনন্দ-শোক মিশ্র অনুভবে শ্রুতি ও কুলাচার অনুসারে নানা উৎসব ও বিধি সম্পন্ন করেন এবং গিরিজাকে উৎকৃষ্ট বস্ত্র, রত্ন ও রাজোচিত অলংকারে সজ্জিত করেন। তখন এক সাধ্বী দ্বিজপত্নী গিরিজাকে পাতিব্রত্যের পরম ব্রত শিক্ষা দেন—ধর্মবর্ধক বাক্য স্নেহসহকারে শোনো, পাতিব্রতা নারী পূজ্যা ও পাপনাশিনী। যে নারী স্বামীকে পরমেশ্বর জেনে প্রেমসহকারে সেবা করে, সে ইহলোকে সমৃদ্ধি পায় এবং শেষে স্বামীর সঙ্গে শিবপদ লাভ করে; এভাবে আচার ও ধর্মোপদেশ মিলিয়ে আসন্ন দিব্য বিবাহের পথ প্রস্তুত হয়।
प्रस्थान-विरह-विलापः (Departure and Lament in Separation)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা বলেন—এক ব্রাহ্মণী দেবীকে এক বিশেষ ব্রত শেখান, তারপর মেনাকে সম্বোধন করে দেবীর যাত্রা/প্রস্থান আয়োজন করেন। সবাই সম্মতি দিলেও বিরহে স্নেহাতিশয়ে কান্না, বারবার আলিঙ্গন ও করুণ বিলাপ শুরু হয়। পার্বতীর নিজস্ব বিলাপ বিশেষভাবে বর্ণিত। শোক ছড়িয়ে পড়ে—শৈলপ্রিয়া/শিবা ও অন্যান্য দেবপত্নী মূর্ছা যান, সকল নারী কাঁদেন, এমনকি যোগীশ্বর শিবও দূরে যেতে যেতে অশ্রুপাত করেন। হিমালয় সন্তান, মন্ত্রী ও শ্রেষ্ঠ দ্বিজদের নিয়ে দ্রুত এসে পার্বতীকে বুকে জড়িয়ে ‘কোথায় যাচ্ছ?’ বলে বারবার জিজ্ঞেস করে মোহশোকে ভেঙে পড়েন। পরে জ্ঞানী ও করুণ পুরোহিত অধ্যাত্মবিদ্যায় সকলকে সান্ত্বনা দিয়ে স্থির করেন। পার্বতী ভক্তিভরে মাতা-পিতা ও গুরুকে প্রণাম করেন, তবু মহামায়া হয়েও লোকাচার অনুসারে বারবার ক্রন্দন করেন—এভাবেই পুরাণীয় রীতি প্রকাশ পায়।