
पूर्वभाग
The First Part
প্রথম ভাগের এই বিভাগে কূর্মপুরাণ শুরু হয় শাস্ত্রীয় মঙ্গলাচরণ ও নৈমিষারণ্যের পরিমণ্ডল দিয়ে। সেখানে ঋষিগণ সূত রোমহর্ষণকে ব্যাসপ্রণীত পুরাণ-সংহিতা শ্রবণ করাতে অনুরোধ করেন; ফলে গুরু-পরম্পরা, শ্রবণ ও ধর্মকথার পবিত্রতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে ‘পুরাণ’কে তার প্রধান লক্ষণ দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে—সর্গ, প্রতিসর্গ, বংশ, মন্বন্তর ও বংশানুচরিত। অষ্টাদশ মহাপুরাণের মধ্যে কূর্মপুরাণের স্থান এবং তার অন্তর্গত সংহিতা-বিভাগও উল্লেখিত, যা গ্রন্থের প্রামাণ্যতা ও শাস্ত্রীয় মর্যাদা প্রকাশ করে। কথা পরে সমুদ্র-মন্থনের দিকে অগ্রসর হয়, যেখানে বিষ্ণু কূর্মরূপে মন্দর পর্বতকে ধারণ করেন। এই প্রসঙ্গে শ্রী/লক্ষ্মীকে বিষ্ণুরই মায়াশক্তি—প্রকৃতি, ত্রিগুণাত্মিকা—রূপে ব্যাখ্যা করা হয়: এই শক্তি জীবকে মোহিত করে, আবার বিবেক জাগলে মুক্তির সহায়ও হয়। আদর্শ ভক্ত ইন্দ্রদ্যুম্ন দেবানুগ্রহে জ্ঞান লাভ করেন। তাঁকে বর্ণাশ্রম-ভিত্তিক উপাসনা, কর্মযোগ এবং ত্রিবিধ ভাবনা শেখানো হয়, যা ক্রমে অদ্বৈত ধ্যান ও আত্মসাক্ষাৎকারের দিকে নিয়ে যায়। সাধনার লক্ষ্য কেবল কর্ম নয়—শুদ্ধি, ভক্তি ও জ্ঞানের সমন্বয়। এই বিভাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হরি–হর–শ্রী সমন্বয়। নারায়ণভক্তির সঙ্গে মহেশ্বরের জ্ঞান-ভক্তিতে আরাধনাও অপরিহার্য বলা হয়েছে; বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্ত পরিভাষা বেদান্তমুখী মুক্তিতত্ত্বে একত্রিত, যেখানে লক্ষ্য মায়া ও লৌকিক শ্রী অতিক্রম করে পরম মোক্ষ।
Invocation, Purāṇa Lakṣaṇas, Kurma at the Samudra-manthana, and Indradyumna’s Liberation Teaching (Iśvara-Gītā Prelude)
অধ্যায়ের শুরু নারায়ণ, নর ও সরস্বতীকে প্রণাম করে। নৈমিষারণ্যে ঋষিরা সূত রোমহর্ষণকে ব্যাস-পরম্পরায় প্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ কূর্মপুরাণ শোনাতে অনুরোধ করেন। সূত পুরাণের পাঁচ লক্ষণ ব্যাখ্যা করে অষ্টাদশ মহাপুরাণের তালিকা দেন এবং কূর্মপুরাণকে প্রধান, অন্তর্গত সংহিতা-বিভাগযুক্ত বলে জানান। এরপর ক্ষীরসাগর-মন্থনের প্রসঙ্গ—বিষ্ণু কূর্মরূপ ধারণ করে মন্দরকে ধারণ করেন; ঋষিরা শ্রী-লক্ষ্মীর স্বরূপ জিজ্ঞাসা করেন। ভগবান বলেন, শ্রী/লক্ষ্মী তাঁরই মায়াশক্তি—ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি, যা জগৎকে মোহিত করে সৃষ্টি-লয় ঘটায়, তবে আত্মবিবেকসম্পন্ন ভক্তরা তা অতিক্রম করতে পারে। ইন্দ্রদ্যুম্নের কাহিনি ওঠে—শরণাগতিতে তিনি মায়া পার হন; শ্রী-এর মাধ্যমে ও স্বয়ং নারায়ণের দর্শনে উপদেশ পেয়ে কৃপাজাত জ্ঞান লাভ করেন। প্রভু বর্ণাশ্রমধর্ম, কর্মযোগ ও ত্রিবিধ ভাবনা নির্দেশ করেন এবং জ্ঞান-ভক্তিতে মহেশ্বর পূজার বিশেষ বিধান দিয়ে বৈষ্ণব-শৈব সমন্বয় স্থাপন করেন। শেষে ঋষিরা পূর্ণ উপদেশ শুনতে চান; সূত রসাতলে কূর্মের কথিত বৃত্তান্ত বলার প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরবর্তী অধ্যায়ে সর্গ-প্রতিসর্গ, মন্বন্তর, ভূগোল, তীর্থ ও ব্রতের বিবরণ আসবে বলে ভূমিকা রচনা করেন।
Cosmic Manifestation, Mahāmāyā’s Mandate, Varṇāśrama-Dharma, and the Unity of the Trimūrti
অধ্যায় ১-এর উপসংহার থেকে এগিয়ে কূর্ম অধ্যায় ২-এ ঋষিদের কল্যাণ-প্রশ্নের উত্তর দেন এবং স্মরণ করান যে এই উপদেশ পূর্বে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে বলা হয়েছিল। তিনি পুরাণকে পুণ্যদায়ক, ধর্মপ্রকাশক ও মোক্ষপথ নির্দেশক দিব্য বাণী রূপে সংজ্ঞায়িত করেন। এরপর সৃষ্টিতত্ত্ব—শুধু নারায়ণই বিদ্যমান; যোগনিদ্রা থেকে জাগ্রত হলে ব্রহ্মা প্রকাশিত হন, ব্রহ্মার ক্রোধ থেকে রুদ্রের আবির্ভাব, আর শ্রী নারায়ণী রূপে মহামায়া—অব্যয় মূল-প্রকৃতি—প্রকাশ পান। ব্রহ্মার অনুরোধে তিনি ‘মোহ’ রূপে সৃষ্টিবিস্তারের দায়িত্ব পান, কিন্তু আদেশ থাকে—জ্ঞানযোগী, ধ্যাননিষ্ঠ ব্রাহ্মণ, সত্যভক্ত ও ভগবদাজ্ঞাপরায়ণদের মোহিত করা যাবে না; এতে আধ্যাত্মিক অনাক্রম্যতার নৈতিক বিভাজন স্থাপিত হয়। মনসাপুত্র ঋষি, চার বর্ণ এবং অনাদি বেদস্বরূপ বাক্-এর উদ্ভব হয়; নাস্তিক/পাষণ্ড শাস্ত্রকে অন্ধকারপ্রদ বলা হয়েছে। কালের প্রবাহে অধর্ম বাড়লে বর্ণাশ্রমধর্মের বিধান, গৃহস্থের প্রাধান্য এবং পুরুষার্থক্রমে ধর্মের মোক্ষপর্যবসান ব্যাখ্যা করা হয়। প্রবৃত্তি–নিবৃত্তি যোগে নিবৃত্তিকে মুক্তিদায়িনী বলা, সার্বজনীন সদ্গুণ ও সাধনাভেদে পরলোকগতির বর্ণনা আছে। ‘এক আশ্রম’ যোগীদের প্রশ্নে কূর্ম বলেন—সমাধিনিষ্ঠ সন্ন্যাস ছাড়া পঞ্চম আশ্রম নেই; আশ্রম ও যোগীর প্রকারভেদও নিরূপিত। শেষে সমন্বয়—ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন, বিষ্ণু পালন করেন, শিব প্রলয় করেন; কিন্তু পরম সত্যে বিষ্ণু ও মহাদেব অভিন্ন। ত্রিবিধ উপাসনা, লিঙ্গ/ত্রিপুণ্ড্র, ত্রিশূলচিহ্ন, তিলক ইত্যাদি চিহ্নবিধান বলে উপসংহার—স্বধর্মে ভক্তিসহ পরমেশ্বর আরাধনা করলে অক্ষয় মোক্ষ লাভ হয়; পরবর্তী অধ্যায়ে এই উপাসনা-যোগ-সমন্বয় বিস্তৃত হবে।
Varnāśrama-Krama, Vairāgya as the Ground of Saṃnyāsa, and Brahmārpaṇa Karma-yoga
পূর্ব অধ্যায়ে বর্ণ ও আশ্রমের বিধান শুনে ঋষিরা আশ্রমধর্মের ক্রম জানতে চান। ভগবান কূর্ম ব্রহ্মচর্য, গৃহস্থ, বানপ্রস্থ ও যতি/সন্ন্যাস—এই স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বলেন, তবে যথার্থ জ্ঞান, বিবেক ও তীব্র বৈরাগ্যের মতো ‘যথোচিত কারণ’ উদিত হলে ব্যতিক্রমও মানেন। তিনি গৃহস্থের বিবাহ, যজ্ঞ ও সন্তানধর্ম উল্লেখ করে বলেন—প্রবল বৈরাগ্য থাকলে কিছু আচার অসম্পূর্ণ হলেও তৎক্ষণাৎ সন্ন্যাস গ্রহণ করা যায়, এবং আশ্রমে ফিরে যাওয়া-আসার নিষেধ-নিয়মও নির্দিষ্ট করেন। এরপর শিক্ষা অন্তর্মুখী সাধনায় যায়: ফলাসক্তিহীন কর্ম মুক্তিদায়ক, আর সর্বোচ্চ ভাব ‘ব্রহ্মার্পণ’—সমস্ত কর্ম ও ফল ব্রহ্ম/ঈশ্বরে সমর্পণ। শুদ্ধ কর্মে শান্তি, শান্তিতে ব্রহ্মসাক্ষাৎ; জ্ঞান ও সংযত কর্মে যোগ ও নৈষ্কর্ম্য, শেষে জীবন্মুক্তি ও পরমাত্মা (মহেশ্বর/পরমেশ্বর)-তে লয়। অধ্যায় শেষ করে বলে—এই সমন্বিত বিধান মানলেই সিদ্ধি, লঙ্ঘনে নয়।
Prākṛta Sṛṣṭi and Pralaya: From Pradhāna to Brahmāṇḍa; Trimūrti Samanvaya
চার আশ্রমের উপদেশ শেষ হলে ঋষিরা সৃষ্টির উৎপত্তি, প্রলয় ও পরম শাসকের কথা জানতে চান। শ্রীকূর্মরূপে নারায়ণ পরমেশ্বর/মহেশ্বরকে অব্যক্ত, নিত্য, সর্বান্তর্যামী বলে নিরূপণ করেন এবং ব্রহ্মার ‘রাত্রি’তে গুণসম্যাবস্থাকেই প্রাকৃত প্রলয় বলেন। পরে যোগশক্তিতে প্রভু প্রকৃতি-পুরুষকে উদ্দীপিত করলে মহৎ, ত্রিবিধ অহংকার, মন, তন্মাত্রা ও পঞ্চমহাভূতের ক্রমোৎপত্তি ও পারস্পরিক অনুপ্রবেশ ঘটে। পৃথকভাবে সৃষ্টি করতে না পেরে তত্ত্বসমূহ একত্র হয়ে ব্রহ্মাণ্ড গঠন করে; তার মধ্যে হিরণ্যগর্ভ/ব্রহ্মা উদ্ভূত হন এবং সপ্ত আবরণসহ বিশ্বগঠন বর্ণিত হয়। শেষে এক নির্গুণ পরতত্ত্বই রজসে ব্রহ্মা, সত্ত্বে বিষ্ণু ও তমসে রুদ্র হয়ে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় করেন—ত্রিমূর্তি-সমন্বয়; পরের অধ্যায়ে ব্রাহ্মী সৃষ্টি আলোচিত হবে।
Time-Reckoning (Kāla-gaṇanā): Yugas, Manvantaras, Kalpas, and Prākṛta Pralaya
কূর্মাবতার দ্বিজসমাজকে উপদেশ দিতে দিতে এই অধ্যায়ে সূক্ষ্ম থেকে মহৎ পর্যন্ত কালের গণনা স্পষ্ট করেন। নিমেষ, কাষ্ঠা, কলা, মুহূর্ত থেকে মাস-বর্ষ, তারপর দেবতাদের দিন-রাত্রি (অয়ন) বর্ণিত হয়। চার যুগের চক্র সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশের অনুপাতসহ নির্দিষ্ট করা হয়েছে; যুগগুলি মন্বন্তরে (এক মন্বন্তরে ৭১ চতুর্যুগ) স্থাপিত, আর মন্বন্তরগুলি ব্রহ্মার দিবস-রূপ কল্পে (হাজার যুগচক্র) অন্তর্ভুক্ত—যেখানে ক্রমে ক্রমে মনুরা জগতের শাসন করেন। পরে ব্রহ্মার শতবর্ষের শেষে প্রাকৃত প্রতিসঞ্চারে সকল তত্ত্ব প্রকৃতিতে লীন হয়, এবং ব্রহ্মা, নারায়ণ ও ঈশানও কালের অধীন উদ্ভব-লয় প্রাপ্ত হন—এই তত্ত্বকথা প্রকাশিত। শেষে বর্তমানকে ব্রহ্মার উত্তর পরার্ধে স্থাপন করে, পূর্বে পদ্মকল্প ও বর্তমানে বারাহকল্পের নাম করে, পরবর্তী অধ্যায়ে বারাহকল্পের বিস্তার বর্ণনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
Cosmic Night, Nārāyaṇa as Brahmā, and the Varāha Raising of the Earth
পূর্ব অধ্যায়ের উপসংহার শেষে কাহিনি প্রলয়াবস্থায় প্রবেশ করে—অন্ধকারে আচ্ছন্ন একরস, স্থির মহাসমুদ্র, যেখানে গতি ও ভেদ নেই। সেখান থেকেই ব্রহ্মার আবির্ভাব; তিনি পরম পুরুষ নারায়ণই, যিনি যোগনিদ্রায় বিশ্বজলে শয়ন করেন। ‘নারায়ণ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি বলা হয়—নারা অর্থ জল, অয়ন অর্থ আশ্রয়/নিবাস। সহস্র-যুগ-পরিমিত রাত্রির শেষে ভগবান ব্রহ্মকার্য ধারণ করে নবসৃষ্টির নিমিত্তকারণ হন। পৃথিবীকে জলে নিমজ্জিত দেখে প্রজাপতি তাকে উদ্ধার করতে সংকল্প করেন এবং বরাহরূপে রসাতলে নেমে দন্তে পৃথিবীকে তুলে আনেন। সিদ্ধ ও ব্রহ্মর্ষিরা হরির স্তব করেন—নির্গুণ ও সগুণ তত্ত্বের সমন্বয়ে ব্রহ্ম, পরমাত্মা, মায়া, মূলপ্রকৃতি, গুণ ও অবতার প্রসঙ্গ উঠে আসে। পৃথিবী স্থিত হলে ভগবান তাকে সমতল করেন, পর্বত স্থাপন করেন এবং দগ্ধ লোকসমূহের পুনর্গঠনের দিকে মন দেন—যা পরবর্তী অধ্যায়ের সৃষ্টিক্রমে গিয়ে মেলে।
Nine Creations (Sarga), Guṇa-Streams of Beings, and Brahmā’s Progeny in Cyclic Time
পূর্ব অধ্যায়ের সৃষ্টিতত্ত্বের দ্বার পেরিয়ে শ্রীকূর্ম বলেন—কল্পের আদিতে তমসের আচ্ছাদনে বীজসদৃশ অব্যক্ত অবস্থা প্রথমে উদ্ভূত হয়। তারপর ‘স্রোতস’ অনুসারে জীবদের বিভাগ—মুখ্য-সর্গ স্থাবর, তির্যক্-স্রোতস পশুজগৎ, ঊর্ধ্ব-স্রোতস দেবগণ, এবং অর্বাক্-স্রোতস মানুষ; সঙ্গে প্রাকৃত ক্রমে মহৎ, তন্মাত্রা ও ঐন্দ্রিয়/বৈকারিক স্তর। পরে ব্রহ্মার মনোজ ঋষিরা বৈরাগ্যে সৃষ্টি স্থগিত করলে ব্রহ্মা মায়ায় বিমূঢ় হন, নারায়ণ হস্তক্ষেপ করে পথ নির্দেশ করেন। ব্রহ্মার শোক-ক্রোধ থেকে নীললোহিত রুদ্রের আবির্ভাব; শঙ্কর মর্ত্যপ্রজা সৃষ্টি করতে অনিচ্ছুক। তখন ব্রহ্মা কালবিভাগ, অধিষ্ঠাত্রী শক্তি, প্রজাপতি এবং তমস-সত্ত্ব-রজঃপ্রধান দেহে দেব-অসুর-পিতৃ-মানুষ—এই চতুর্বর্গের উৎপত্তি করেন। শেষে নীতিধর্মের তত্ত্ব—প্রতি চক্রে জীব পূর্বসংস্কার পুনরাবৃত্তি করে; ধাতা ও মহেশ্বর বৈদিক শব্দে প্রতিষ্ঠিত নাম, কর্ম ও বিধি দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন কার্য নির্ধারণ করেন, যা পরবর্তী অধ্যায়ের সুশৃঙ্খল প্রকাশ ও ধর্মপ্রবাহের ভূমি রচনা করে।
Tāmasa Sarga, the Androgynous Division of Brahmā, and the Lineages of Dharma and Adharma
পূর্ব অধ্যায়ের সৃষ্টিবৃত্তান্তের পর কূর্ম বলেন—ব্রহ্মার নবসৃষ্ট প্রাণীরা বৃদ্ধি পায় না, ফলে ব্রহ্মা বিষণ্ণ হন এবং সিদ্ধান্তকারী বুদ্ধি প্রকাশিত হয়। ব্রহ্মা এক তামস শাসনতত্ত্ব দেখেন যা রজস-সত্ত্বকে আচ্ছাদিত করে; পরে সত্ত্বযুক্ত রজস তমসকে দূর করে, এবং পরিপূরক যুগল উদ্ভব হয়ে প্রজননের দ্বৈততা স্থাপিত হয়। অধর্ম ও হিংসা বৃদ্ধি পেলে ব্রহ্মা অন্ধকারময় দেহ ত্যাগ করে দীপ্ত রূপ ধারণ করেন, নর-নারীতে বিভক্ত হয়ে বিরাজ/বিরাট ও শতরূপাকে সৃষ্টি করেন। এরপর স্বায়ম্ভুব মন্বন্তরের বংশকথা—মনু ও শতরূপা, তাঁদের পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ, এবং দক্ষ-রুচি প্রভৃতির বিবাহসূত্রে সৃষ্টিবিস্তার। দক্ষের কন্যাদের নামোল্লেখ, ধর্মের বিবাহে গুণদেবতা ও কল্যাণকর সন্তানসন্ততি জন্মায়; আর অধর্মবংশ থেকে হিংসা, মিথ্যা, ভয়, নরক, মৃত্যু, রোগ ও শোক—দুঃখচিহ্নিত ঊর্ধ্বরেতস সত্তারা উৎপন্ন হয়। অধ্যায়টি জানায়—এ তামস সর্গ হলেও ধর্মনিয়ম প্রতিষ্ঠায় জগত-সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক।
Brahmā’s Lotus-Birth, the Sealing of the Cosmic Womb, and the Epiphany of Parameśvara (Hari–Hara Samanvaya)
পূর্ব অধ্যায়ে মহত্তত্ত্বাদি থেকে সৃষ্টির বর্ণনার পর ঋষিরা কূর্মরূপ বিষ্ণুকে জিজ্ঞাসা করেন—শম্ভুকে কীভাবে ব্রহ্মার পুত্র বলা হয় এবং ব্রহ্মা কীভাবে পদ্মজ। কূর্ম প্রলয়ের কথা বলেন: তিন লোক অন্ধকারে নিমজ্জিত, এক মহাসমুদ্রে লীন; শেষশয্যায় নারায়ণ যোগনিদ্রায় শয়ন করেন। তাঁর নাভি থেকে সুবাসিত বিশাল পদ্ম উদ্ভূত হয়, তাতে ব্রহ্মার আবির্ভাব। উভয়ের মধ্যে জগতের প্রাধান্য নিয়ে বিতর্ক ওঠে; পরস্পরের দেহে প্রবেশ-দর্শনে বিষ্ণুর অপরিমেয়তা প্রকাশ পায়। ব্রহ্মা নাভিদ্বার দিয়ে বেরিয়ে পদ্মযোনি নামে প্রসিদ্ধ হন; প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ে, বিষ্ণু বলেন ব্রহ্মার মোহ পরমেশ্বরীর মায়া। তখন ত্রিশূলধারী হর-শিব প্রকাশিত হন; বিষ্ণু তাঁকে মহাদেব, প্রধান-পুরুষের অধীশ্বর এবং কালরূপে সৃষ্টি-স্থিতি-লয়কারী বলে চিহ্নিত করেন। শৈবদৃষ্টি লাভ করে ব্রহ্মা শরণ নেন ও স্তব করেন; বরদানে ব্রহ্মার সৃষ্টিকার্য স্থির হয় এবং শিব-বিষ্ণুর অভেদ প্রতিপন্ন হয়—দুজনেই সর্বব্যাপী, প্রকৃতি/পুরুষ ও মায়া/ঈশ্বর রূপে পরিপূরক। এই অদ্বৈত ভক্তি ও যোগজ্ঞানেই পরবর্তী সৃষ্টিপ্রবাহ স্থাপিত হয়।
Madhu–Kaiṭabha, Nārāyaṇa’s Yoga-Nidrā, Rudra’s Manifestation, and the Aṣṭamūrti–Trimūrti Teaching
পূর্ব অধ্যায়ের সমাপ্তির পর কাহিনি এগোয়—বিশ্বেশ্বরের নাভি থেকে উদ্ভূত পদ্মে ব্রহ্মা আসীন। মধু ও কৈটভ নামে ভয়ংকর অসুর আবির্ভূত হলে ব্রহ্মার অনুরোধে নারায়ণ তাদের দমন করেন। এরপর ব্রহ্মাকে অবতরণ করতে বলা হয় এবং বৈষ্ণবী নিদ্রাশক্তি প্রবাহিত হলে ব্রহ্মা বিষ্ণুতে লীন হন। নারায়ণের যোগনিদ্রা অদ্বৈত ব্রহ্ম উপলব্ধিতে পরিণতি পায়; প্রভাতে ব্রহ্মা বৈষ্ণব ধারক-ভাব নিয়ে সৃষ্টি আরম্ভ করেন। প্রথম মানসপুত্র ঋষিরা জাগতিক সৃষ্টি গ্রহণ না করায় ব্রহ্মার মোহ ও ক্রোধ থেকে অশ্রু জন্মে ভূত-প্রেত হয়, এবং তীব্রভাবে রুদ্র প্রকাশিত হন। ব্রহ্মা রুদ্রকে নাম-রূপ, অষ্টমূর্তি, পত্নী, পুত্র ও লোকস্থান নির্ধারণ করে দেন। পরে মহাস্তোত্রে ব্রহ্মা মহাদেবকে ব্রহ্ম, কাল, বেদসার ও সর্বান্তর্যামী বলে স্তব করেন। শিব ব্রহ্মাকে দিব্য যোগ, ঐশ্বর্য, ব্রহ্মনিষ্ঠা ও বৈরাগ্য দান করে ত্রিমূর্তি-সমন্বয় শিক্ষা দেন—একই প্রভু গুণভেদে তিন রূপে প্রকাশিত—এবং অন্তর্ধান হন। তারপর ব্রহ্মা নয় মহাপ্রজাপতি সৃষ্টি করে পরবর্তী বিশ্বতত্ত্বের ভূমি প্রস্তুত করেন।
Devī-tattva, Śakti–Śaktimān doctrine, Kāla–Māyā cosmology, and Māheśvara Yoga instruction
কূর্মভগবান ঋষিসভায় সৃষ্টিতত্ত্বের প্রসঙ্গ তোলেন—ব্রহ্মার তপস্যা থেকে রুদ্রের আবির্ভাব, পুরুষ-নারী তত্ত্বের বিভাজন এবং একাদশ রুদ্রের নিয়োগ। পরে দেবীর অবতরণ—প্রথমে সতী, পরে পার্বতী—এবং শঙ্করের সত্তার সঙ্গে অভিন্ন মহেশ্বরী রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঋষিদের প্রশ্নে কূর্ম গূঢ় পরম উপদেশ দেন: দেবী একা, নিষ্কলা, সর্বব্যাপিনী শক্তি (ব্যোম), উপাধির দ্বারা কার্যকর হয়ে শান্তি, জ্ঞান, প্রতিষ্ঠা ও নিবৃত্তি/সংহাররূপে প্রকাশিত। কালকে সৃষ্টিপ্রলয়ের নিয়ন্তা এবং মায়াকে প্রভুর সেই শক্তি বলা হয় যার দ্বারা জগৎ মোহচক্রে ঘোরে। হিমবানের কাছে দেবীর ভয়ংকর সার্বভৌম রূপ ও পরে পদ্মসদৃশ কোমল রূপ দর্শিত হয়; তার ভিত্তিতে নাম-গুণের বিস্তৃত স্তোত্রে বেদ, সাংখ্য, যোগ ও পুরাণীয় দৃষ্টিতে দেবীতত্ত্ব ব্যাখ্যাত। শেষে দেবী ঈশ্বরশরণাগতি, ধর্ম ও বর্ণাশ্রমের একমাত্র প্রমাণ হিসেবে বেদ, ভ্রান্ত মতের মোহকারিতা, এবং ধ্যান, কর্মযোগ, ভক্তি ও জ্ঞানপথে মুক্তি ও অনাবৃত্তির নির্দেশ দেন। অধ্যায়ের শেষে ভৃগু প্রভৃতি আদ্য ঋষিদের বংশ ও সৃষ্টিধারা পরবর্তী বিষয় হবে বলে ইঙ্গিত করা হয়।
Genealogies from Dakṣa’s Daughters: Ṛṣi Lines, Agni-Forms, Pitṛ Classes, and the Transition to Manu’s Progeny
এই অধ্যায়ে সূত পূর্ববর্তী বংশবর্ণনা সমাপ্ত করে দক্ষ-কন্যাদের ধারার সঙ্গে যুক্ত প্রধান সন্ততিদের ক্রম বলেন। ভৃগু ও খ্যাতি থেকে লক্ষ্মীর জন্ম, আয়তি-নিয়তির মাধ্যমে ধাতা-বিদাতার মেরু-কুলে বৈবাহিক সংযোগ, তাঁদের থেকে প্রাণ ও মৃকণ্ডু এবং মৃকণ্ডু থেকে মার্কণ্ডেয়ের উৎপত্তি উল্লেখিত। আরও ঋষি-সন্তান গণনা করা হয়—ক্ষমা থেকে পুলহ, অনসূয়া থেকে অত্রি এবং সোম, দুর্বাসা, দত্তাত্রেয় ও স্মৃতি; সঙ্গে চন্দ্র-সম্পর্কিত সিনীবালী, কুহূ, রাকা, অনুমতিও বলা হয়। এরপর যজ্ঞতত্ত্বে অগ্নিবংশ: স্বাহার তিন অগ্নি—পাবক, পবমান ও শুচি—উৎপত্তি ও কার্যভেদসহ, রুদ্রস্বভাব এবং তপস্বীদের যজ্ঞ-অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ আসে। পিতৃগণ অগ্নিষ্বাত্ত ও বর্হিষদ—এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত; স্বধা থেকে মেনা ও বৈতরণী জন্মায়, মেনার হিমবৎ ও গঙ্গার সঙ্গে যোগ দেখিয়ে দেবীর যোগশক্তির স্মরণ করা হয়। শেষে দক্ষ-কন্যা-সন্ততি বর্ণনা শেষ করে, পরবর্তী অংশে মনুর প্রজাসৃষ্টি ও মন্বন্তর-ক্রমে প্রবেশের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
Svāyambhuva Lineage to Dakṣa; Pṛthu’s Devotion; Pāśupata Saṃnyāsa; Dakṣa–Satī Episode
পূর্ব অধ্যায়ের পর সূত স্বায়ম্ভুব-মনুর সৃষ্টিবংশধারা এগিয়ে নেন—উত্তানপাদ থেকে ধ্রুব, এবং ক্রমে রাজা পৃথু (বৈন্য) আবির্ভূত হন; তিনি জীবকল্যাণের জন্য পৃথিবীকে ‘দোহন’ করে সমৃদ্ধি আনেন। সূত নিজের পুরাণীয় উৎপত্তিও জানান—হরি পौरাণিক সূতরূপে প্রকাশিত—ফলে পুরাণপাঠ ধর্মসম্মত জীবিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এরপর রাজধর্ম থেকে সন্ন্যাসের দিকে গতি: শিখণ্ডন/সুশীল নামক রাজবংশীয় বৈরাগ্য লাভ করে হিমালয়ে মন্দাকিনী ও ধর্মপদ তীর্থে গিয়ে বেদজাত স্তোত্রে শিবের উপাসনা করেন এবং পাশুপত আচার্য শ্বেতাশ্বতর থেকে সন্ন্যাসবিধি ও মুক্তিদায়ী মন্ত্রের দীক্ষা গ্রহণ করেন। পরে বংশবিস্তার—হবির্ধান → প্রাচীনবর্হিষ → দশ প্রচেতস → দক্ষ—বর্ণিত হয়। শেষে দক্ষ-রুদ্র বিরোধ, সতীর আত্মদাহ, পার্বতীর শিবসংযোগ ও রুদ্রের শাপের প্রসঙ্গ এসে ভক্তি, অপরাধ ও তপস্যার ফল এবং শৈব-বৈষ্ণব সমন্বয়ের মাধ্যমে কাহিনি সম্পূর্ণ হয়।
Dakṣa-yajña-bhaṅgaḥ — Dadhīci’s Teaching and the Destruction of Dakṣa’s Sacrifice
পূর্ব অধ্যায়ের পর নৈমিষারণ্যের ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—বৈবস্বত মন্বন্তরের উৎপত্তি কী এবং শিবের শাপের পরে দক্ষের কী পরিণতি হল। সূত বলেন, দক্ষ গঙ্গাদ্বারে পুনরায় যজ্ঞ করেন; দেবতারা শিবকে বাদ দিয়ে উপস্থিত হন। দধীচি শঙ্করকে যজ্ঞভাগ থেকে বঞ্চিত করায় দক্ষকে তিরস্কার করে তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন—পরমেশ্বরকে স্থূল প্রতিমা-ধারণায় সীমাবদ্ধ করা যায় না; নারায়ণ ও রুদ্র একই কালতত্ত্ব, যজ্ঞের অন্তর্যামী সাক্ষী। তমস ও মায়ায় আচ্ছন্ন দক্ষপক্ষ অনড় থাকে; দধীচি বিরোধী ব্রাহ্মণদের কলিতে বহির্বৈদিক প্রবণতার শাপ দেন। দেবী পূর্ব অপমান স্মরণ করে যজ্ঞবিনাশ চান; শিব বীরভদ্র ও ভদ্রকালীকে রুদ্রগণসহ প্রেরণ করেন, তারা যজ্ঞমণ্ডপ ধ্বংস করে, দেবতাদের অপমান করে, বিষ্ণুর অগ্রগতিও রোধ করে। ব্রহ্মার মধ্যস্থতায় শিব আবির্ভূত হয়ে স্তব গ্রহণ করেন, বলেন সকল যজ্ঞে তাঁর পূজা আবশ্যক, দক্ষকে ভক্তির উপদেশ দেন এবং কল্পান্তে গণেশরূপে ভবিষ্যৎ গতি দান করেন। পরে ব্রহ্মা বিষ্ণু-রুদ্রের অদ্বৈততা ও নিন্দা-বর্জনের কথা বলে কাহিনি দক্ষের সন্তান ও কন্যাদের বংশবৃত্তান্তের দিকে এগিয়ে দেন।
Dakṣa’s Progeny, Nṛsiṃha–Varāha Avatāras, and Andhaka’s Defeat (Hari–Hara–Śakti Synthesis)
পূর্ব সৃষ্টিবর্ণনার পর সূত দক্ষের নির্দিষ্ট সৃষ্টিকর্ম বলেন—মানস সৃষ্টিতে বৃদ্ধি না হলে দাম্পত্য-সংযোগে প্রজনন শুরু হয়। দক্ষের কন্যাদের বিবাহ (ধর্ম, কশ্যপ, সোম প্রভৃতি) এবং ধর্মের পত্নীদের গর্ভে বিশ্বেদেব, সাধ্য, মরুত ও অষ্ট বসুর জন্ম, তাদের প্রসিদ্ধ বংশধারা (ধ্রুব থেকে কাল, প্রভাস থেকে বিশ্বকর্মা ইত্যাদি) বর্ণিত। কশ্যপবংশে দিতির গর্ভে হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষ জন্মায়; হিরণ্যকশিপুর বরবল-নির্ভর অত্যাচারে দেবগণ ব্রহ্মার শরণ নেয়, ব্রহ্মা ক্ষীরসাগরে হরির স্তব করে বিষ্ণুকে সর্বদেব-আত্মা রূপে প্রার্থনা করেন। বিষ্ণু নৃসিংহ অবতারে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন; পরে হিরণ্যাক্ষের উপদ্রবে বরাহ অবতারে রসাতল থেকে পৃথিবী উদ্ধার হয়। এরপর প্রহ্লাদের ভক্তি এক ব্রাহ্মণের শাপে বিচলিত হয়ে সংঘর্ষের পর পুনরায় বিবেক ও হরিশরণে স্থিত হয়—সংস্কার, মোহ ও ভক্তির পুনরুদ্ধারের দৃষ্টান্ত। তারপর অন্ধক-প্রসঙ্গে উমার প্রতি কামনা থেকে শিব কালভৈরব রূপে আবির্ভূত; গণ, মাতৃকা ও বিষ্ণুর সহায়ক প্রকাশসমূহ যুদ্ধ বিস্তার করে। মধ্যভাগে প্রভু নিজেকে নারায়ণ ও গৌরী উভয়ই বলে অদ্বৈত ঐক্য শেখান এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদ নিবারণ করেন। শূলে বিদ্ধ অন্ধক শুদ্ধ হয়ে বেদান্তময় স্তব করে—রুদ্রই নারায়ণ ও ব্রহ্ম—এবং গণপদ লাভ করে। শেষে ভৈরব-মহিমা ও কাল-মায়া-ধারক নারায়ণের বিশ্বধারণ স্মরণ করে পরবর্তী ধর্ম, উপাসনা ও যোগতত্ত্বের ভূমিকা রচিত হয়।
Virocana–Bali, Aditi’s Tapas, and the Vāmana–Trivikrama Episode
অন্ধক দমনের পর দैত্যবংশের কাহিনি এগোয়। প্রহ্লাদের পুত্র বিরোচন তিন লোককে বিরল ধর্মনীতি দিয়ে শাসন করে। বিষ্ণুর প্রেরণায় সনৎকুমার এসে এই দৈত্য-ধর্মনিষ্ঠার প্রশংসা করেন এবং আত্মজ্ঞানরূপ পরম গোপন ধর্ম উপদেশ দেন; বিরোচন বৈরাগ্য নিয়ে রাজ্য বালির হাতে দেন। বালি ইন্দ্রকে জয় করে দেবতাদের বিষ্ণুশরণে পাঠায়। অদিতি বাসুদেবকে হৃদয়-পদ্মে ধ্যান করে কঠোর তপস্যা করেন; বিষ্ণু প্রকাশ হয়ে তাঁর স্তব গ্রহণ করেন—যেখানে তিনি কাল, নরসিংহ, শेष, কালরুদ্র এবং শম্ভু/শিব রূপেও একত্বে বন্দিত—এবং পুত্র হওয়ার বর দেন। বালির নগরে অমঙ্গল লক্ষণে প্রহ্লাদ বিষ্ণুর অবতারের কথা জানিয়ে শরণাগতি শেখান; বালি আশ্রয় চাইতেও ধর্মমতে প্রজারক্ষা করে। বিষ্ণু উপেন্দ্ররূপে জন্ম নিয়ে বেদাধ্যয়ন ও সদাচারের আদর্শ স্থাপন করেন, পরে যজ্ঞে বামন হয়ে তিন পদ ভূমি চান। ত্রিবিক্রম হয়ে তিনি পৃথিবী-অন্তরীক্ষ-স্বর্গ আচ্ছাদিত করেন, ব্রহ্মাণ্ড-আবরণ ভেদ করে গঙ্গার অবতরণ ঘটান—ব্রহ্মা নাম দেন। বালি নিজেকে সমর্পণ করলে বিষ্ণু তাকে পাতালে পাঠিয়ে প্রলয়ে পরম ঐক্যের প্রতিশ্রুতি দেন, ইন্দ্রের রাজ্য ফিরিয়ে দেন, আর জগৎ ভক্তিযোগের ‘মহাযোগ’ স্তব করে—পরবর্তী বালিভক্তি ও প্রহ্লাদ-নির্দেশিত কর্মবিধির সূচনা হয়।
Bāṇa’s Śiva-bhakti and the Genealogy of Kaśyapa’s Descendants (Manvantara Lineages)
এই অধ্যায়ে পূর্বভাগের বংশ-আখ্যান এগিয়ে যায়। বলির পুত্র বাণ মহাবলী অসুর; শঙ্করের তীব্র ভক্ত হয়েও সে ইন্দ্র ও দেবগণকে পীড়িত করে। দেবতারা মহাদেবের শরণ নিলে শিব ক্রীড়াচ্ছলে এক তীরেই তার নগর দগ্ধ করেন; তবু বাণের রুদ্রাশ্রয় ও লিঙ্গকেন্দ্রিক ভক্তি শিবের সার্বভৌমত্ব এবং ভক্তির রক্ষাশক্তি—অসুরের প্রতিও—প্রকাশ করে। পরে দনুর ভয়ংকর পুত্রগণ (তারা, শম্বর প্রভৃতি), সুরসার নাগ ও বহুশির আকাশচারী, অরিষ্টার গন্ধর্ব, কদ্রুর নাগবংশ (অনন্ত থেকে), তাম্রার ছয় কন্যা, সুরভির গোষ্ঠী-পরম্পরা, ইরার উদ্ভিদসৃষ্টি এবং খসা থেকে যক্ষ-রাক্ষসের উৎপত্তি ক্রমান্বয়ে বর্ণিত হয়। বিনতার পুত্র গরুড় ও অরুণ তপস্যায় মহাপদ লাভ করে—গরুড় বিষ্ণুর বাহন, অরুণ রুদ্রপ্রসাদে সূর্যের সারথি। শেষে মন্বন্তরান্তে এই কাহিনি শ্রবণে পাপনাশক পুণ্য এবং যুগচক্রে দেবপ্রহরণদের পুনর্জন্মের কথা বলে প্রলয়-আবর্তন ও পুনর্স্থাপনের পুরাণীয় ধারার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে।
Genealogies of Kaśyapa and Pulastya; Rise of Brahmavādin Lines and Rākṣasa Branches
পূর্ব অধ্যায় (১৭) সমাপ্তির পর সূত কশ্যপের তপস্যার কথা বলেন—সৃষ্টির ধারাবাহিকতার জন্য স্থায়ী গোত্র-শাখা প্রতিষ্ঠা করতে। কশ্যপের দুই মহাত্মা পুত্র বৎসর ও অসিত; তাঁদের থেকে নৈধ্রুব, রৈভ্য ও রৈভ্যগণ, সুমেধার মাধ্যমে কুণ্ডপায়িনগণ, এবং অসিত থেকে দেবল প্রভৃতি ব্রহ্মবাদী বংশ বিস্তার লাভ করে; শেষে কাশ্যপের তিন শাখা—শাণ্ডিল্য, নৈধ্রু ও বারৈভ্য—নির্দেশিত হয়। এরপর কাহিনি পুলস্ত্য-বংশে প্রবেশ করে—ইলবিলা ও বিশ্রবা-পরম্পরায়; তাঁদের পত্নী ও সন্তানদের মধ্যে কুবের (বৈশ্রবণ) এবং প্রসিদ্ধ রাক্ষস রাবণ, কুম্ভকর্ণ, শূর্পণখা, বিভীষণসহ তপোবলে সমৃদ্ধ রুদ্রভক্ত অন্যান্য পৌলস্ত্য রাক্ষসদের উল্লেখ আছে। আরও বলা হয় পুলহের পশু ও ভূতপ্রজা, ক্রতুর নিঃসন্তানতা, ভৃগু থেকে শুক্রের জন্ম, এবং দক্ষ–নারদ শাপ-প্রসঙ্গে বসিষ্ঠ-বংশ (শক্তি, পরাশর, ব্যাস) ও শুকের বংশধরদের কথা। অধ্যায়ের শেষে কশ্যপ থেকে রাজবংশীয় উত্তরাধিকারের দিকে পরবর্তী প্রবাহের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
Sūrya-vaṃśa Genealogy and the Supremacy of Tapas: Gāyatrī-Japa, Rudra-Darśana, and Śatarudrīya Upadeśa
এই অধ্যায়ে সৃষ্টিকথা থেকে নিয়ন্ত্রিত মানব-ইতিহাসে প্রবেশ করা হয়েছে। সূর্যের পত্নী ও সন্তানদের উল্লেখ করে মনু থেকে ইক্ষ্বাকু প্রভৃতি রাজাদের মাধ্যমে সূর্যবংশের ধারাবাহিকতা মন্ধাতা ও পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের পর্যন্ত বর্ণিত। পরে বংশের এক রাজা ধর্মপুত্রলাভের জন্য নারায়ণ/বাসুদেবের ভক্তি করতে নির্দেশ পান—ভক্তিকে বংশ ও ধর্মের উৎপাদক রূপে দেখানো হয়। এরপর এক আদর্শ রাজর্ষি বিজয় ও অশ্বমেধের পর ঋষিদের জিজ্ঞাসা করেন—যজ্ঞ, তপস্যা না সন্ন্যাস, কোনটি পরম শ্রেয়; বহু মুনি একমত হন যে যজ্ঞ ও গৃহস্থধর্ম ক্রমে বনপ্রস্থে পরিণত হয়, কিন্তু শাস্ত্রসার তপস্যাই মোক্ষদায়িনী। রাজা পুত্রকে রাজ্য দিয়ে বর্ণাশ্রম-শাসন বজায় রেখে দীর্ঘ গায়ত্রীজপ করেন এবং ব্রহ্মার বর হিসেবে দীর্ঘায়ু লাভ করেন। আরও তপস্যায় তিনি নীলকণ্ঠ অর্ধনারীশ্বর রুদ্রের দর্শন পান, শতরুদ্রিয় জপ ও ভস্মাচরণের উপদেশ গ্রহণ করে ব্রহ্মলোক ও সূর্যমণ্ডল অতিক্রম করে মহেশ্বরপদে আরূঢ় হন। শেষে শ্রবণফলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অধ্যায় সমাপ্ত।
Ikṣvāku-vaṃśa (Genealogy) culminating in Rāma; Setu-liṅga Māhātmya; Continuation through Kuśa and Lava
এই অধ্যায়ে পুরাণ-ইতিহাসের ধারায় ত্রিধন্বা থেকে সগর ও ভাগীরথ পর্যন্ত ইক্ষ্বাকু বংশের বর্ণনা আছে এবং শিবের আশ্রয়ে গঙ্গা-অবতরণের মাহাত্ম্য প্রকাশিত হয়েছে। পরে রঘু, দশরথ ও শ্রীराम পর্যন্ত বংশক্রম এসে রামায়ণের প্রধান ঘটনাগুলি সংক্ষেপে বলা হয়—সীতার স্বয়ংবর ও ধনুর্ভঙ্গ, কৈকেয়ীর বর ও রামের বনবাস, সীতাহরণ, সুগ্রীবের সঙ্গে মৈত্রী, হনুমানের দূতকার্য, লঙ্কায় সেতুবন্ধন ও রাবণবধ। এরপর বিজয়ের পর সেতু-তীর্থে রাম লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে মহাদেবের পূজা করেন; পার্বতীসহ শিব প্রকাশ হয়ে বর দেন—সেখানে দর্শন ও সমুদ্রস্নানে পাপ নাশ হয়, সেখানে কৃত কর্ম অক্ষয় হয় এবং জগত্স্থিতি পর্যন্ত শিব সেখানে বিরাজ করবেন। শেষে রামের ধর্মময় রাজত্ব, অশ্বমেধ-সংযুক্ত শঙ্করার্চনা, কুশ-লবের মাধ্যমে বংশপ্রবাহ এবং ইক্ষ্বাকু-বংশ শ্রবণের ফলশ্রুতি বলা হয়েছে।
Genealogies from Purūravas to the Haihayas; Jayadhvaja’s Vaiṣṇava Resolve, Sage-Adjudication, and the Slaying of Videha
রোমহর্ষণ চন্দ্রবংশের ধারাবাহিক বর্ণনায় ঐল পুরূরবাস থেকে আয়ু, নহুষ ও যযাতি পর্যন্ত বংশপরম্পরা বলেন। যযাতি যদু, তুর্বসু, দ্রুহ্যু ও পূরুর মধ্যে রাজ্যবিভাগ করে ধর্মসম্মত রাজধর্মের মানচিত্র স্থাপন করেন। পরে যাদব/হৈহয় ধারায় কার্তবীর্য অর্জুন (সহস্রবাহু) ও তাঁর বংশধরদের কথা আসে। রাজভ্রাতাদের মধ্যে বিতর্ক ওঠে—রাজাদের প্রধান উপাস্য রুদ্র না বিষ্ণু; সত্ত্ব-রজস-তমস গুণতত্ত্বে আলোচনা হয়। সপ্তর্ষি সিদ্ধান্ত দেন—ইষ্টদেবতার পূজা গ্রহণীয়, তবে রাজাদের অধিদেবতা বিশেষত বিষ্ণু (এবং ইন্দ্র)। তখন দানব বিদেহ আক্রমণ করলে জয়ধ্বজ নারায়ণ স্মরণ করে দিব্য সহায়তা পান; চক্রপ্রকাশে শত্রু নিহত হয়। পরে বিশ্বামিত্র বিষ্ণুর পরমত্ব, বর্ণাশ্রমধর্মে নিষ্কাম উপাসনা শেখান; অন্য ভ্রাতারা রুদ্রযজ্ঞ করেন। শেষে ফলশ্রুতি শ্রবণে শুদ্ধি ও বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দেয় এবং পরবর্তী সঠিক উপাসনা ও নিয়মিত ভক্তির উপদেশের ভূমিকা রচনা করে।
Durjaya, Urvaśī, and the Expiation at Vārāṇasī (Genealogy and Sin-Removal through Viśveśvara)
পূর্ব অধ্যায়ের পর সূত জয়ধ্বজ থেকে তালজঙ্ঘ পর্যন্ত এবং যাদব শাখাগুলির বংশবৃত্তান্ত বলে বীতিহোত্রের ধারাকে অনন্ত ও দুর্জয় পর্যন্ত স্থাপন করেন। এরপর উপদেশমূলক কাহিনিতে কালীন্দীর তীরে দুর্জয় অপ্সরা উর্বশীতে মোহিত হয়ে বারবার আসক্তিতে জড়ায়। রাজধানীতে ফিরে তার পতিব্রতা স্ত্রী অন্তরের লজ্জা বুঝে ভয় নয়, শুদ্ধির পথ দেখায়; দুর্জয় প্রায়শ্চিত্তের জন্য কণ্ব মুনির শরণ নেয়। গন্ধর্বের মালা হরণ ও উন্মত্ত বিচরণে পুনরায় পতন, তারপর জাগরণ ও দীর্ঘ তপস্যা ঘটে। তপস্যায় সন্তুষ্ট কণ্ব বারাণসী তীর্থ, গঙ্গাস্নান, দেব-পিতৃ তর্পণ ও বিশ্বেশ্বর লিঙ্গদর্শনের বিধান দেন—যাতে পাপ ক্ষয় হয়। শুদ্ধ দুর্জয় রাজ্যে ফিরে সুপ্রতীককে জন্ম দেয়; পরবর্তী ক্রোষ্টু বংশধারার সূচনা শ्रोतাদের পাপনাশক বলে নির্দেশিত।
Genealogies of Yadus and Vṛṣṇis; Navaratha’s Refuge to Sarasvatī; Rise of Sāttvata Tradition; Prelude to Kṛṣṇa-Balarāma Incarnation
এই অধ্যায়ে পুরাণীয় ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ বংশতালিকা বিস্তৃত হয়ে যদু–বৃষ্ণি পরিবেশে এসে মিলিত হয়। এরপর ধর্মদৃষ্টান্তে রাজা নবরথ রাক্ষসের তাড়ায় সরস্বতী-রক্ষিত এক গোপন পরম আশ্রয়ে পৌঁছে স্তোত্রে তাঁকে বাক্, যোগশক্তি ও জগতের উৎসরূপে বন্দনা করে শরণ নেন; দীপ্তিমান এক রক্ষক আবির্ভূত হয়ে আক্রমণকারীকে বিনাশ করে। নবরথ নিজ রাজধানীতে সরস্বতী-পূজা প্রতিষ্ঠা করে রাজধর্মকে ভক্তি ও শক্তির সঙ্গে যুক্ত করেন। পরে বংশধারায় সত্ত্বত নারদের নির্দেশে বাসুদেব-কেন্দ্রিক পবিত্র শাস্ত্র প্রচার করে ‘সাত্ত্বত’ পরম্পরা প্রবর্তন করেন। শেষে সংকর্ষণ (বলরাম) ও কৃষ্ণ (বাসুদেব)-এর জন্মপ্রসঙ্গের ভূমিকা আসে, যেখানে বিষ্ণুর অবতরণ, দেবীর যোগনিদ্রা কৌশিকী এবং শিবের বরদ ভূমিকা একত্রে সমন্বিত। অধ্যায়ের শেষে কৃষ্ণের রুদ্রকে পুত্ররূপে লাভের জন্য তপস্যার পূর্বাভাস দিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ের সূত্র স্থাপিত হয়।
Viṣṇu at Upamanyu’s Āśrama: Pāśupata Tapas, Darśana of Śiva, and Boons from Devī
পূর্ব অধ্যায়ের পর সূত নতুন প্রসঙ্গ বলেন। স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েও ভগবান হৃষীকেশ (বিষ্ণু/কৃষ্ণ) পুত্রলাভের জন্য ঘোর তপস্যা করতে উপমনু ঋষির যোগাশ্রমে যান। আশ্রমটি তীর্থসমৃদ্ধ বৈদিক পরিবেশ—ঋষিগণ, অগ্নিহোত্রকারী, রুদ্রজপী তপস্বী, গঙ্গার পবিত্র প্রবাহ ও স্থাপিত ঘাট-তীর্থে পূর্ণ। উপমনু বিষ্ণুকে বাক্যের পরম পদ জেনে অভ্যর্থনা করেন এবং বলেন—ভক্তি ও কঠোর তপস্যায় শিব দর্শনীয়; তিনি পাশুপত ব্রত ও তার যোগশাসন প্রদান করেন। বিষ্ণু ভস্মধারণসহ রুদ্রজপ করেন; তখন দেবীসহ শিব দেবতা, গণ ও আদ্য ঋষিদের পরিবেষ্টিত হয়ে প্রকাশিত হন। কৃষ্ণের দীর্ঘ স্তোত্রে শিবকে গুণের উৎস, অন্তর্জ্যোতি ও দ্বৈতাতীত আশ্রয় বলা হয়—হরি-হর সমন্বয়ের দৃষ্টান্ত। শিব-দেবী পরমার্থে অভেদ ঘোষণা করে বর দেন; কৃষ্ণ শিবভক্ত পুত্র প্রার্থনা করেন, তা মঞ্জুর হয়। পরে দেবত্রয় কৈলাসের দিকে যাত্রা করেন, পরবর্তী কাহিনি সূচিত হয়।
Adhyāya 25 — Liṅga-māhātmya (The Chapter on the Liṅga): Hari’s Śiva-Worship and the Fiery Pillar Theophany
এই অধ্যায়ে হরি–হর ঐক্যের স্পষ্ট প্রকাশ আছে। শ্রীকৃষ্ণ কৈলাসে দিব্য বিহার করেন; তাঁর সৌন্দর্য ও মায়ায় দেবগণ ও দেবাঙ্গনীরা বিমুগ্ধ হয়। দ্বারকায় বিরহবেদনা জাগে; গরুড় দৈত্য‑রাক্ষসদের আক্রমণ থেকে নগর রক্ষা করেন, নারদের সংবাদে কৃষ্ণ প্রত্যাবর্তন করেন। ফিরে এসে তিনি মধ্যাহ্ন সূর্যোপাসনা, তर्पণ, লিঙ্গরূপ ভূতেশ (শিব)‑পূজা এবং ঋষিদের ভোজন করিয়ে ধর্মাচরণে তত্ত্বজ্ঞান স্থাপন করেন। মার্কণ্ডেয় জিজ্ঞাসা করেন—পরম কৃষ্ণ কাকে পূজা করেন? কৃষ্ণ বলেন, আত্মতত্ত্ব প্রকাশ ও ভয়নাশক পুণ্যের জন্য তিনি ঈশান শিবকে লিঙ্গপূজায় আরাধনা করেন। তিনি লিঙ্গকে অব্যক্ত, অবিনাশী জ্যোতি বলে বর্ণনা করে ব্রহ্মা‑বিষ্ণুর আদিবিবাদ অনন্ত অগ্নিস্তম্ভ‑লিঙ্গে নিবৃত্ত হয়ে শিবপ্রকাশ, বরদান ও লিঙ্গপূজার প্রতিষ্ঠার কাহিনি বলেন। শেষে ফলশ্রুতি—পাঠ/শ্রবণে পাপক্ষয় ও নিত্য জপের বিধান।
Kṛṣṇa’s Departure, Kali-yuga Dharma, and the Prohibition of Śiva-Nindā (Hari–Hara Samanvaya)
এই অধ্যায়ে বংশ‑অবতারবৃত্তান্ত এগিয়ে নিয়ে কৃষ্ণের সন্তান (সাম্ব ও অনিরুদ্ধ) সংক্ষেপে উল্লিখিত হয়; তাঁর অসুরনিধন ও জগতের পুনর্বিন্যাস স্মরণ করিয়ে পরম জ্ঞানে নিজ পরমধামে গমনের সংকল্প বলা হয়। ভৃগু প্রমুখ ঋষি দ্বারকায় আসেন; রামের উপস্থিতিতে তাঁদের সম্মান করে কৃষ্ণ আসন্ন প্রস্থান ঘোষণা করেন এবং জানান যে কলিযুগ ইতিমধ্যেই উদিত, ফলে নৈতিক অবক্ষয় ঘটবে। ব্রাহ্মণকল্যাণার্থে তাঁর ত্রাণকারী আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রচারের নির্দেশ দেন; ভগবানের একবার স্মরণও কলিজ পাপ নাশ করে এবং নিত্য বৈদিক বিধিতে পূজা পরম পদ দেয়। পরে হরি‑হর সমন্বয় স্পষ্ট হয়—নারায়ণভক্তি স্বীকৃত, কিন্তু মহেশ্বর‑নিন্দা ও বিদ্বেষ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ; শিবনিন্দকদের যজ্ঞ‑তপ‑জ্ঞান নিষ্ফল হয় বলে সতর্ক করা হয়। শেষে শিববিরোধী শাপগ্রস্ত বংশ এড়াতে বলা, ঋষিদের প্রস্থান, কৃষ্ণের নিজ বংশ সংহরণ এবং পাঠ‑শ্রবণের ফলশ্রুতি বর্ণিত হয়ে পরবর্তী জিজ্ঞাসার ভূমিকা রচিত হয়।
Yuga-Dharma: The Four Ages, Decline of Dharma, and the Rise of Social Order
কৃষ্ণের পরমধামে গমনের পরে অন্ত্যকর্ম সম্পন্ন করে শোকে বিহ্বল অর্জুন পথে ব্যাসদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে উপদেশ চান। ব্যাস ভয়ংকর কলিযুগের আগমন ঘোষণা করেন এবং বলেন—কলিতে পাপক্ষয়ের শ্রেষ্ঠ আশ্রয় ও প্রায়শ্চিত্তস্থান বারাণসী; তিনি সেখানে গমন করবেন। অর্জুনের অনুরোধে তিনি সংক্ষেপে যুগধর্ম বলেন—কৃতযুগে ধ্যান, ত্রেতায় জ্ঞান, দ্বাপরে যজ্ঞ, কলিতে দান; যুগানুসারে অধিষ্ঠাত্রী দেবতার কথাও বলেন এবং সব যুগেই রুদ্র-উপাসনার স্থায়িত্ব প্রতিপাদন করেন। এরপর ধর্মের চার পাদ থেকে এক পাদে ক্রমক্ষয়ের বর্ণনা—কৃতে স্বাভাবিক সাম্য, ত্রেতায় গৃহবৃক্ষের আবির্ভাব ও লোপ, লোভের উত্থান, শীত-উষ্ণ দ্বন্দ্ব, আচ্ছাদন, বাণিজ্য ও কৃষির শুরু। সংঘর্ষ বাড়লে ব্রহ্মা ক্ষত্রিয়, বর্ণাশ্রম-ব্যবস্থা ও অহিংস যজ্ঞ প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বাপরে মতভেদ, বেদের বিভাগ, রজ-তমের প্রাবল্য; তাতে বৈরাগ্য, বিবেক ও আত্মচিন্তা জাগে। শেষে দ্বাপরে ধর্মের অস্থিরতা ও কলিতে প্রায় লুপ্তি পুনরুক্ত হয়ে, অবনত কালে ধর্মধারণের পরবর্তী উপদেশের ভূমিকা রচিত হয়।
Kali-yuga Doṣas, the Supremacy of Rudra as Refuge, and the Closure of the Manvantara Teaching
পূর্ব অধ্যায়ের সমাপ্তির পর ব্যাস তিষ্য/কলিযুগের লক্ষণ বলেন—সমাজ ও যজ্ঞকর্মে বিশৃঙ্খলা, দুর্ভিক্ষ‑অনাবৃষ্টি‑রোগে ভয়, বেদাধ্যয়ন ও শ্রৌত‑স্মার্ত আচারের ক্ষয়। বর্ণাশ্রম সমালোচনায় দ্বিজদের দুরাচার, বিধির সংকর, এবং বাহ্যত ত্যাগী কিন্তু অন্তরে শূন্য ধর্মাচরণকে কালের প্রভাবে যুগান্তদোষ বলা হয়েছে। এরপর গ্রন্থ নির্দেশ দেয়—কলিতে রুদ্র/মহাদেবই পরাত্পর প্রভু, একমাত্র শুদ্ধিকারক ও আশ্রয়; নমস্কার, ধ্যান ও দান বিশেষ ফলপ্রদ। তারপর শিবের দীর্ঘ স্তোত্রে তাঁর বিশ্বব্যাপী ও যোগময় স্বরূপ বর্ণিত হয়ে তাঁকে সংসার-তারণকারী বলা হয়। আরও বলা হয়, এক মন্বন্তর ও এক কল্প জানলে সকল চক্রের নিয়ম বোঝা যায়। শেষে অর্জুনের অচল ভক্তি, ব্যাসের আশীর্বাদ, এবং ব্যাস যে বিষ্ণুর প্রকাশ—এই স্পষ্ট স্বীকৃতি দিয়ে ধর্ম‑ভক্তি শিক্ষার ধারাবাহিকতার ভূমিকা রচিত হয়।
Avimukta-Māhātmya — Vyāsa in Vārāṇasī and Śiva’s Secret Teaching of Liberation
ব্যাস বারাণসীতে এসে গঙ্গাতীরে বিশ্বেশ্বরের পূজা করেন। সেখানকার ঋষিগণ তাঁকে সম্মান করে মহাদেব-আশ্রিত পাপনাশক মোক্ষধর্ম শুনতে চান। জৈমিনি ধ্যান, ধর্ম, সাংখ্য-যোগ, তপ, অহিংসা, সত্য, সন্ন্যাস, দান, তীর্থসেবা ও ইন্দ্রিয়নিগ্রহ—এগুলির মধ্যে কোনটি প্রধান এবং আরও কোনো গূঢ় রহস্য আছে কি না, তা নির্ণয় করতে বলেন। ব্যাস প্রাচীন প্রকাশ শোনান—মেরুতে দেবীর প্রশ্নের উত্তরে শিব বলেন, পরম গোপন তত্ত্ব ‘অবিমুক্ত’ অর্থাৎ কাশী; এ শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র, যেখানে কর্ম অক্ষয় হয়, পাপ ক্ষয় হয় এবং সমাজে বর্জিতরাও মুক্তি পেতে পারে। কাশীতে মৃত্যু নরকনিবারক ও পরম পদদায়ক; অন্যান্য তীর্থের কথা বলেও শিব কাশীকেই সর্বোচ্চ বলেন, সেখানে গঙ্গার বিশেষ শক্তি ও কাশীতে সিদ্ধ ধর্মকর্মের দুর্লভতা জানান। উপদেশের পরিণতি ‘তারক ব্রহ্ম’—মহাদেব অন্তকালে যে জ্ঞান দেন—এবং যোগে অবিমুক্ত-তত্ত্বকে ভ্রূমধ্য, নাভি, হৃদয় ও মস্তকে অন্তর্ন্যাস করার কথায়। শেষে ব্যাস শিষ্যসহ কাশীতে বিচরণ করে পরবর্তী মোক্ষোপদেশের সূত্রপাত করেন।
Oṅkāra-Liṅga and the Secret Pañcāyatana Liṅgas of Kāśī: Kṛttivāseśvara-Māhātmya
কাশী-তীর্থের প্রসঙ্গে সূত বলেন—ব্যাস শিষ্যসহ বিশাল ওঙ্কার-লিঙ্গে গমন করেন; এটি প্রণবস্বরূপ এবং শুদ্ধি ও মুক্তির প্রত্যক্ষ উপায় বলে স্তূত। অধ্যায়ে ওঙ্কার-লিঙ্গকে পঞ্চায়তন-পূজায় প্রকাশিত ‘পরাবিদ্যা’ এবং পাশুপত ‘পঞ্চার্থ’ (শান্তি/অতীতত্ব, জ্ঞান, প্রকাশ-শক্তি, প্রতিষ্ঠা, সংহার)–এর আধার বলা হয়েছে। এরপর বারাণসীর গোপন ভূগোলে পাঁচ গুপ্ত লিঙ্গ—কৃত্তিবাসেশ্বর, মধ্যমেশ্বর, বিশ্বেশ্বর, ওঙ্কার ও কপর্দেশ্বর—উল্লেখিত, যা কেবল শিবকৃপায় জানা যায়। ব্যাস কৃত্তিবাসেশ্বরে পৌঁছে শোনেন—পূজারত ব্রাহ্মণদের হত্যায় উদ্যত গজরূপ দানবকে বধ করে শিব ‘কৃত্তিবাস’ নামে খ্যাত হন। শেষে বলা হয়, কৃত্তিবাসে অচল আশ্রয় নিলে এক জীবনেই মোক্ষ লাভ হয়; সিদ্ধ, রুদ্র ও শতরুদ্রীয় বৈদিক পাঠ তার প্রমাণ।
Kapardeśvara at Piśācamocana — Liberation of a Piśāca and the Brahmapāra Hymn
পূর্ব অধ্যায়ের সমাপ্তির পর সূত তীর্থযাত্রার ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। ঋষিরা গুরুকে প্রণাম করে পিশাচমোচন তীরে শূলধারী শিবের অবিনশ্বর লিঙ্গ ‘কপর্দেশ্বর’ দর্শনে যান। স্নান ও পিতৃতর্পণের পর তারা এক ভয়ংকর অথচ প্রকাশক ঘটনা দেখে—মন্দিরের কাছে বাঘ একটি হরিণীকে হত্যা করে; তারপর দিব্য জ্যোতির আবির্ভাব, দেবগণের উপস্থিতি ও পুষ্পবৃষ্টি ঘটে, যা স্থানের অসাধারণ মহিমা জানায়। বিস্মিত জৈমিনি প্রমুখ অচ্যুত/ব্যাসের কাছে কপর্দেশ্বরের মাহাত্ম্য জানতে চান। ব্যাস বলেন—এ তীর্থে পাপক্ষয়, বিঘ্ননাশ এবং ছয় মাসে যোগসিদ্ধি লাভ হয়। এরপর দৃষ্টান্তে তপস্বী শঙ্কুকর্ণ এক ক্ষুধার্ত পিশাচকে দেখেন; সে স্বীকার করে, কাশীতে বিশ্বেশ্বর দর্শন করেও পূজা-দান অবহেলা করায় সে অধঃপতিত হয়েছে। শঙ্কুকর্ণের উপদেশে সে স্নান করে কপর্দেশ্বর স্মরণ করে সমাধিতে প্রবেশ করে দিব্যরূপ ধারণ করে, রুদ্র-প্রভাময় বেদ-রূপ মণ্ডলে গমন করে। শঙ্কুকর্ণ ‘ব্রহ্মপারা’ নামক বেদান্তস্তব গেয়ে অদ্বৈত জ্ঞান-আনন্দময় লিঙ্গের প্রকাশ লাভ করে তাতেই লীন হন। শেষে নিত্য শ্রবণ-পাঠের ফলশ্রুতি ও ঋষিদের সেখানে থেকে পূজার সংকল্প বর্ণিত।
Mādhayameśvara-māhātmya — Vyāsa at Mandākinī and the Pāśupata Vision
পবিত্র তীর্থভ্রমণের ধারাবাহিকতায় সূত বলেন—কপর্দেশের নিকটে বাসের পর ব্যাস মধ্যমেশ্বর দর্শনে যাত্রা করেন। ঋষিসেবিত ও অতিশয় পবিত্র মন্দাকিনীতে স্নান করে তিনি দেব-ঋষি-পিতৃদের উদ্দেশে তর্পণাদি সম্পন্ন করেন এবং পুষ্পে ভবা/ঈশানকে পূজা করেন। ভস্মধারী, বেদপাঠ, ওঁ-ধ্যান ও ব্রহ্মচর্যে স্থিত পাশুপত ভক্তরা ব্যাসকে চিনে সম্মান জানায়; তিনি বেদবিভাজক এবং শিবাংশে শুকের প্রকাশের কারণ—এ কথাও উঠে আসে। ব্যাস নির্বাচিত যোগীদের গূঢ় পরম উপদেশ দেন; তারপর নির্মল জ্যোতি উদ্ভাসিত হয় এবং ঋষিরা অন্তর্ধান করেন—তাৎক্ষণিক যোগফলপ্রাপ্তির লক্ষণ। পরে তিনি শিষ্যদের মধ্যমেশের মাহাত্ম্য বলেন—এখানে রুদ্রদের সঙ্গে শিব-দেবী আনন্দ করেন; কৃষ্ণও এখানে পাশুপত ব্রত পালন করে নীললোহিতের বর লাভ করেছিলেন। অধ্যায়ে তীর্থফল বর্ণিত—ব্রহ্মহত্যা পর্যন্ত পাপনাশ, পরলোকে উত্তম গতি, ক্রিয়াকর্মে সাত পুরুষ শুদ্ধি, এবং গ্রহণপুণ্য বহুগুণ বৃদ্ধি; শেষে ব্যাস সেখানেই মহেশ্বর পূজা করে পরবর্তী তীর্থোপদেশের ভূমি প্রস্তুত করেন।
Vārāṇasī (Avimukta) Māhātmya and the Catalogue of Guhya-Tīrthas
পূর্ব অধ্যায়ের শেষে সূত বলেন—পরাশর্য ভগবান ব্যাস জৈমিনি প্রমুখ ঋষিদের সঙ্গে বহু গুপ্ত-তীর্থ ও আয়তন পরিক্রমা করেন। এরপর প্রয়াগসহ আরও অধিক পুণ্য বলে বর্ণিত নানা তীর্থের দীর্ঘ তালিকা আসে—অগ্নি, বায়ু, যম, সোম, সূর্য, গৌরী ইত্যাদি দেবতা ও শক্তির সঙ্গে যুক্ত তীর্থসমূহ। পরে ব্রহ্মতীর্থে প্রাচীন লিঙ্গকে কেন্দ্র করে বিষ্ণুর দ্বারা দিব্য লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠার কাহিনি বলা হয়, যেখানে শৈব-वैষ্ণব ঐক্য ও সমান শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়। তারপর অবিমুক্ত কাশীতে ব্যাস স্নান, পূজা, উপবাস, শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করে শিষ্যদের বিদায় দিয়ে ত্রিসন্ধ্যা-স্নান, ভিক্ষা ও ব্রহ্মচর্যসহ নিয়মিত জীবন গ্রহণ করেন। ভিক্ষার সংকটে ক্রোধ উঠলে দেবী শিবা আবির্ভূত হয়ে ভিক্ষা দেন, ক্রোধ নিবারণ করেন এবং চতুর্দশী ও অষ্টমীতে বিধিবদ্ধ প্রবেশের সীমিত অনুমতি দেন। শেষে অবিমুক্ত-মাহাত্ম্য শ্রবণ/পাঠে পরম গতি লাভের কথা এবং নদীতট ও মন্দিরে পিতৃ-দেবকর্মের শুদ্ধ বিধি, জপ ও পবিত্রতাকে মোক্ষের সরাসরি উপায় বলা হয়েছে—সংযমযুক্ত ভক্তি ও ক্ষেত্রধর্মের গুরুত্বের ভূমিকা রচিত হয়।
Prayāga-māhātmya — The Greatness of Prayāga and the Discipline of Pilgrimage
অবিমুক্তের প্রশংসার পর ঋষিরা সূতকে প্রয়াগের মাহাত্ম্য বলতে অনুরোধ করেন। সূত যুদ্ধোত্তর শোকাকুল যুধিষ্ঠিরকে মার্কণ্ডেয়ের উপদেশ শোনান—হিংসার পাপ থেকে মুক্তির জন্য রাজা শুদ্ধির উপায় চান। মার্কণ্ডেয় প্রয়াগকে সর্বোচ্চ পাপনাশক, প্রজাপতির ক্ষেত্র বলে বর্ণনা করেন; সেখানে ব্রহ্মা ও রুদ্র অধিষ্ঠাতা এবং দেবতারা গঙ্গা–যমুনার সঙ্গম রক্ষা করেন। দর্শন, নামকীর্তন, স্মরণ এবং তীর্থের মাটি-জল স্পর্শের ক্রমশ ফল বলা হয়; সঙ্গমে মৃত্যু বিশেষ পবিত্র এবং পরলোকগতি (স্বর্গ, ব্রহ্মলোক, রাজত্বসহ পুনর্জন্ম) উল্লেখিত। পরে ধর্মরক্ষার জন্য পবিত্র দোআব অঞ্চলে দান গ্রহণ, বিশেষত ভূমি/গ্রাম গ্রহণ, নিন্দিত এবং তীর্থে সতর্কতার উপদেশ দেওয়া হয়। শেষে দানের প্রশংসা, বিশেষ করে অলংকৃত দুগ্ধবতী গাভী দান, রুদ্রলোকে দীর্ঘ সম্মানদায়ক বলা হয়েছে।
Prayāga–Gaṅgā Tīrtha-māhātmya and Rules of Pilgrimage (Yātrā-vidhi)
এরপর মার্কণ্ডেয় তীর্থসেবনের বিধি ব্যাখ্যা করে প্রয়াগ (গঙ্গা–যমুনা সঙ্গম)-এর মাহাত্ম্যকে কেন্দ্রস্থ করেন। যাত্রায় নৈতিক নিয়ম আরোপিত—লোভ বা প্রদর্শনের জন্য বাহনে জাঁকজমকপূর্ণ ভ্রমণ নিষ্ফল ও নিন্দিত; বিশেষত বলদ/বৃষে চড়ে প্রয়াগযাত্রা মহাপাপজনক, ফলে পিতৃগণ তর্পণ গ্রহণ করেন না—এমন সতর্কতা দেওয়া হয়। পরে প্রয়াগের শ্রেষ্ঠত্ব বলা হয়—স্নান ও অভিষেক রাজসূয়/অশ্বমেধ সদৃশ ফলদায়ক, প্রয়াগ অসংখ্য তীর্থের সংহতি, এবং সঙ্গমে মৃত্যু যোগীর পরম অবস্থায় নিয়ে যায়। এরপর নাগস্থান, প্রতিষ্ঠাণ, হংসপ্রপতন, উর্বশীতট, সন্ধ্যাবট, কোটিতীর্থ প্রভৃতি উপতীর্থের ব্রত-শর্ত ও ফল বর্ণিত। শেষে গঙ্গাস্তব—ত্রিপথগা গঙ্গা গঙ্গাদ্বার, প্রয়াগ ও সাগরসঙ্গমে বিশেষ দুর্লভ; কলিযুগে পরম আশ্রয়, পাপনাশিনী ও নরকনিবারিণী—এভাবে তীর্থধর্ম ও মোক্ষচিন্তার ভূমিকা স্থাপিত হয়।
Prayāga-māhātmya and Ṛṇa-pramocana-tīrtha — Māgha-snāna, Austerities, and Release from Debts
পূর্ব অধ্যায়ের সমাপ্তির পর মার্কণ্ডেয় প্রয়াগের মাঘ-মাসের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। গঙ্গা–যমুনার সঙ্গমকে পরম পবিত্র বলে স্তব করেন এবং বলেন, এর পুণ্য গো-দান প্রভৃতি মহাদানের সমতুল্য। অন্তর্বেদীতে কর্ষাগ্নি-সহ নানা তপস্যা, স্নান, দান, জপ ইত্যাদি আচারের কথা এবং তাদের ফল ধারাবাহিকভাবে বলা হয়েছে—সোমলোক ও ইন্দ্রলোক লাভ, পরে পতন, ধর্মপরায়ণ রাজকুলে পুনর্জন্ম, ভোগ, এবং আবার সেই তীর্থে ফিরে এসে নতুন পুণ্য ও শুদ্ধি। সঙ্গমে নিমজ্জন, উল্টো হয়ে স্রোত পান, এমনকি পাখিদের জন্য দেহ-সমর্পণের মতো কঠোর উদাহরণে দেখানো হয় যে তপস্যা ও তীর্থ একত্রে পাপ ক্ষয় করে দেহ-সীমা অতিক্রম করিয়ে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উৎকর্ষ দেয়। পরে প্রয়াগের দক্ষিণে যমুনার উত্তর তীরে ঋণপ্রমোচন তীর্থের পরিচয়—এক রাত বাস ও স্নানে ঋণমুক্তি, সূর্যলোক প্রাপ্তি এবং স্থায়ী ঋণহীনতা; এভাবে বৃহৎ প্রয়াগ-স্তব থেকে নির্দিষ্ট উপতীর্থের দিকে বর্ণনা অগ্রসর হয়।
Yamunā–Gaṅgā Tīrtha-Māhātmya: Agni-tīrtha, Anaraka, Prayāga, and the Tapovana of Jāhnavī
মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে তীর্থোপদেশ অব্যাহত রাখেন। সূর্যকন্যা যমুনা, গঙ্গার উৎস-সম্পর্কযুক্ত, পরম পবিত্রা—তার স্মরণ ও স্তব দূর থেকেও পাপ নাশ করে। যমুনার দক্ষিণ তীরে অগ্নিতীর্থ এবং তার পশ্চিমে ধর্মরাজের অনরক উল্লেখিত; সেখানে স্নান ও ক্রিয়া, বিশেষত কৃষ্ণপক্ষ চতুর্দশীতে ধর্মরাজের উদ্দেশে তর্পণ, মহাপাপমোচন ও স্বর্গলাভ দেয়। পরে প্রয়াগের বিস্তৃত তীর্থজাল বর্ণিত হয় এবং জাহ্নবী গঙ্গাকে সর্বলোকের তীর্থসমূহের আধাররূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়—যেখানে গঙ্গা প্রবাহিত, সেখানেই তপোবন ও সিদ্ধিক্ষেত্র। দেবীসহ মহেশ্বর যেখানে বটেশ্বররূপে অবস্থান করেন, সেই স্থান স্বয়ং তীর্থ। শেষে উপদেশের গোপনীয়তা ও যোগ্যতা, এবং নিত্য শ্রবণ-পাঠে শুদ্ধি, পাপনাশ ও রুদ্রলোকপ্রাপ্তির ফলশ্রুতি বলা হয়েছে।
Dvīpa-Varṣa Vibhāga and the Priyavrata–Agnīdhra Lineage (Cosmic Geography and Royal Succession)
পূর্ব অধ্যায়ের শেষে নৈমিষারণ্যের ঋষিরা সূতকে জগত্-মণ্ডলের নিশ্চিত বিবরণ চাইতে থাকেন—দ্বীপ, সমুদ্র, পর্বত, নদী এবং দিব্য ব্যবস্থা। সূত বিষ্ণুকে স্মরণ করে স্বায়ম্ভুব মনুর পুত্র প্রিয়ব্রতের কথা বলেন; তাঁর পুত্রগণ সাত দ্বীপের অধিপতি হন, ফলে রাজসত্তাও বিশ্বব্যবস্থার এক অঙ্গ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। অধ্যায়ে দ্বীপ-রাজাদের নাম ও তাদের সাতটি করে বর্ষের উল্লেখ আছে; পরে জম্বুদ্বীপে অগ্নীধ্রের শাসন এবং মেরুর চারদিকে অবস্থিত নয়টি বিভাগের (বর্ষের) ভৌগোলিক অবস্থান বর্ণিত হয়। এরপর ধর্মবিচার—কিছু অঞ্চলে দ্বিজদের মুক্তি বর্ণাশ্রম-নিয়ন্ত্রিত স্বধর্ম পালনের দ্বারা সাধিত হয়। তারপর রাজবংশকথা: নাভি থেকে ঋষভ, যাঁর বৈরাগ্য ও যোগসিদ্ধি পাশুপত-সদৃশ উপলব্ধির মাধ্যমে রাজত্ব থেকে সন্ন্যাসের আদর্শ দেখায়। ভরত ও পরবর্তী রাজাদের মাধ্যমে বংশধারা প্রবাহিত হয়ে পরের অধ্যায়গুলির জন্য ভূগোল ও ধর্মময় শাসনের সঙ্গে মুক্তির যোগ স্থাপন করে।
Measure of the Three Worlds, Planetary Spheres, and Sūrya as the Root of Trailokya
পুরাণের বিশ্ববর্ণনা অব্যাহত রেখে সূত ঋষিদের কাছে সংক্ষেপে ত্রিলোকের পরিমাপ ও ব্রহ্মাণ্ড-ডিম্ব থেকে উদ্ভূত লোকসমূহের ক্রমোন্নতি ব্যাখ্যা করেন। ভূলোক সূর্য-চন্দ্রের কিরণযাত্রা দ্বারা নির্ধারিত, ভুবর্লোক তারই সমবিস্তৃত, আর স্বর্গ ধ্রুব পর্যন্ত ঊর্ধ্বে প্রসারিত—যেখানে বায়ুর বিভাগসমূহ ক্রিয়াশীল। এরপর যোজনামাপে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডল এবং ক্রমে বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, সপ্তর্ষি ও শেষে ধ্রুবের অবস্থান নিরূপিত হয়; ধ্রুবকে জ্যোতির্চক্রের স্থির কেন্দ্র বলে, সেখানে নারায়ণ ধর্মরূপে অধিষ্ঠিত—এ কথাও বলা হয়। পরে সূর্যের রথ, কালচক্র ও সপ্ত অশ্বের সঙ্গে বৈদিক ছন্দের যোগ দেখানো হয়। শেষে সূর্যকে ত্রিলোকব্যাপী কিরণধারী, সকল দীপ্ত সত্তার মূল তেজ এবং আদিত্যদের তাঁর কার্যাংশ বলে মহিমা প্রদান করে উপাসনার ভূমিকা প্রস্তুত করা হয়।
Sūrya’s Celestial Car: Ādityas, Ṛṣis, Gandharvas, Apsarases, Nāgas, and the Two-Month Cosmic Cycle
পুরাণীয় শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় সূত সূর্যরথে আরোহন, রথসজ্জা ও সহচর দেবগণের বিবরণ দেন। দ্বাদশ আদিত্য ঋতুচক্র অনুসারে নিয়মিত সেবা করেন, ফলে সূর্যের শক্তি শৃঙ্খলিত দিব্য কর্মে স্থিত থাকে। ঋষিরা বৈদিক ছন্দে স্তব করেন; গন্ধর্ব-অপ্সরারা ষড়জাদি স্বরক্রমে সংগীত-নৃত্য ও ঋতুভিত্তিক তাণ্ডবে পূজা করে। সারথি রশি-যুগ সাজায়; নাগরা প্রভুকে বহন করে; রাক্ষস প্রভৃতি ভয়ংকর গণও নির্দিষ্ট ক্রমে অগ্রসর হয়—সমস্তই নিয়মের অন্তর্গত। বালখিল্যরা উদয় থেকে অস্ত পর্যন্ত সূর্যকে অনুসরণ করে তাপ, বৃষ্টি, দীপ্তি, বায়ুপ্রবাহ ও অশুভ কর্মক্ষয় সাধন করে। শেষে মহাদেব/মহেশ্বরকেই ভানু (সূর্য) রূপে প্রতিপাদন করে সূর্যকে প্রজাপতি ও বেদময় বলা হয়েছে—শৈব-वैষ্ণব সমন্বয় ও যুগকালে রক্ষাতত্ত্বের ভূমিকা প্রস্তুত হয়।
Solar Rays, Planetary Nourishment, Dhruva-Bondage of the Grahas, and the Lunar Cycle
পূর্ব অধ্যায়ে মহাদেবকে কাল ও জগত্-ক্রমের বিধাতা বলে স্থাপন করে, এই অধ্যায়ে আদিত্য (সূর্য)কে স্বর্গীয় ব্যবস্থার কার্যকর অক্ষরূপে ধরে সূক্ষ্ম জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিশ্বতত্ত্ব বলা হয়েছে। সূর্যের প্রধান রশ্মিগুলি গণনা করে দেখানো হয় যে সেগুলি বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি প্রভৃতি গ্রহকে পোষণ করে এবং ঋতুগত তাপ, বৃষ্টি, শীতের ফল সৃষ্টি করে—এভাবে জ্যোতির্বিদ্যা জীবনধারণ ও যজ্ঞ-অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়। মাসভেদে সূর্যের অধিষ্ঠাতা দেবতা—বরুণ, পূষণ, অংশ, ধাতা, ইন্দ্র, সবিতা, বিবস্বান, ভগ, পর্জন্য, ত্বষ্টা, মিত্র, বিষ্ণু—রশ্মিসংখ্যা ও ঋতুর বর্ণসহ সম্বন্ধিত করা হয়েছে। পরে সূর্যাধীন আট গ্রহের ধ্রুবের সঙ্গে ‘প্রবহ-বায়ু’ নামক বায়ুদোরে বাঁধা থাকা এবং সোমচন্দ্রের ক্ষয়-বৃদ্ধির নিয়ম—দেবতাদের দ্বারা ‘পান’ ও সূর্যরশ্মিতে পুনঃপূরণ—ব্যাখ্যা করা হয়। শেষে গ্রহরথের বর্ণনা দিয়ে ধ্রুবকে স্থির কেন্দ্র বলে পুনরায় ঘোষণা করে, পরবর্তী বিশ্বতত্ত্ব বা ধর্মবিষয়ক আলোচনার ভূমি প্রস্তুত করা হয়েছে।
Cosmic Realms Above Dhruva, the Pātālas Below, and the Foundation of Pralaya (Ananta–Kāla)
পূর্ব অধ্যায়ের সমাপ্তি-চিহ্নের পর সূত ধ্রুবের ঊর্ধ্বে মহর্লোক, জনলোক, তপোলোক ও সত্যলোক (ব্রহ্মলোক) পর্যন্ত লোকসমূহের পরিমাপ ও সেখানে অধিষ্ঠিত ঋষি-দেবতাদের বর্ণনা করেন। এরপর বর্ণনা মোক্ষতত্ত্বে প্রবেশ করে—সিদ্ধ তপস্বী ও যোগীরা ‘এক দ্বার’ দিয়ে পরম পদ লাভ করে, এবং বিষ্ণুই শঙ্কর—এই শৈব-वैষ্ণব সমন্বয় স্পষ্ট করা হয়। ব্রহ্মপুরীর ঊর্ধ্বে অগ্নিবেষ্টিত দীপ্তিমান রুদ্রলোক জ্ঞানীদের ধ্যানের বিষয়; কামনাহীন ব্রহ্মচারী, ব্রহ্মঘোষক ও মহাদেবভক্তদের জন্য তা প্রাপ্য। তারপর কাহিনি পাতালসমূহে (মহাতল প্রভৃতি) নেমে তাদের বর্ণ, ঐশ্বর্য, নাগ-অসুর-রাজাদের বাসস্থান ও নীচের নরকগুলির উল্লেখ করে। শেষে অনন্ত/শেষকে বিশ্বাধার, বৈষ্ণব মূর্তি ও কালাগ্নিরুদ্ররূপে দেখিয়ে, সেখান থেকেই কালের উদ্ভব ও প্রলয়ে জগত্সংহারের ভিত্তি স্থাপন করা হয়।
Bhūrloka-Vyavasthā — The Seven Dvīpas, Seven Oceans, and the Meru-Centered Order of Jambūdvīpa
পূর্ববর্তী বর্ণনায় ব্রহ্মাণ্ডের চতুর্দশ লোকবিভাগের উপসংহার টেনে সূত ভূলোকের “নিশ্চিত বিবরণ” শুরু করেন এবং মহাজাগতিক কাঠামো থেকে মানচিত্রিত পবিত্র পৃথিবীর ভূগোলের দিকে অগ্রসর হন। এখানে সাত দ্বীপ—জম্বূ (প্রধান), তারপর প্লক্ষ, শাল্মল, কুশ, ক্রৌঞ্চ, শাক ও পুষ্কর—এবং তাদের বেষ্টনকারী সাত সমুদ্র ক্রমে বৃহত্তর বিস্তৃতিতে বলা হয়েছে: লবণজল, ইক্ষুরস, সুরা, ঘৃত, দধি, ক্ষীর ও মধুর জল। জম্বূদ্বীপকে কেন্দ্রে স্থাপন করে স্বর্ণময় মেরুকে পৃথিবী-পদ্মের কর্ণিকার ন্যায় অক্ষ বলা হয়; তার উচ্চতা, ভূগর্ভে নিমজ্জন ও প্রস্থের পরিমাপও উল্লেখিত। মেরুর চারদিকে বর্ষসমূহের বিন্যাস—দক্ষিণে ভারত, কিম্পুরুষ, হরিবর্ষ; উত্তরে রম্যক, হিরণ্ময়, উত্তরকুরু; পূর্বে ভদ্রাশ্ব; পশ্চিমে কেতুমাল; কেন্দ্রে ইলাবৃত—এবং সহায়ক পর্বত মন্দর, গন্ধমাদন, বিপুল, সুপার্শ্ব বর্ণিত। বন, সরোবর ও বহু পুণ্যপর্বতের তালিকায় মেরু-পরিসর পবিত্র হয়; শেষে সিদ্ধ ও ঋষিদের ব্রহ্মনিষ্ঠ যোগশান্ত বাসের চিত্র দিয়ে পরবর্তী অধ্যায়গুলির ধর্ম-আধ্যাত্মিক ভূগোলের ভূমিকা রচিত হয়।
Meru-Topography: Cities of Brahmā and the Dikpālas; Descent of Gaṅgā; Varṣa-Lotus and Boundary Mountains
এই অধ্যায়ে সূত মেরুকেন্দ্রিক বিশ্ববিন্যাস বর্ণনা করে মেরুর ঊর্ধ্বে ব্রহ্মার পরমপুরীর কথা বলেন। তার নিকটে দিকানুসারে দেবনগরীসমূহ—ব্রহ্মার সন্নিধানে শম্ভুর দীপ্ত ধাম, পূর্বে ইন্দ্রের অমরাবতী, দক্ষিণে অগ্নির তেজোবতী, আরও দক্ষিণে যমের সংযমনী, পশ্চিমে নিরৃতির রক্ষোবতী, পশ্চিম দিগ্ভাগে বরুণের শুদ্ধবতী, উত্তরে বায়ুর গন্ধবতী, সোমের কান্তিমতী এবং ঈশান-শ্রাইনসহ দুর্লভ শঙ্করনগরী (যশোবতী)। বেদজ্ঞ ও যজ্ঞকারী, জপ-হোমপরায়ণ, সত্যনিষ্ঠ, তামসিক আচরণানুগ, ঈর্ষাহীন তীর্থসেবী ও প্রাণায়ামসাধক নিজ নিজ লোক লাভ করে। পরে গঙ্গার পবিত্র অবতরণ—বিষ্ণুর পদ থেকে উৎপন্ন হয়ে চন্দ্রমণ্ডল প্লাবিত করে ব্রহ্মপুরীতে নেমে চার ধারায় বিভক্ত হয়: সীতা, আলকানন্দা, সুচক্ষু ও ভদ্রা; তারা বর্ষদেশ অতিক্রম করে সমুদ্রে গমন করে। শেষে মেরুর চারদিকে পদ্মাকৃতি লোকসংস্থান ও বর্ষসীমা নির্ধারক পর্বতমালার উল্লেখ করে পরবর্তী ভূগোল-বিবরণের ভূমিকা রচনা করে।
Jambūdvīpa Varṣas, Bhārata as Karmabhūmi, and the Sacred Hydro-Topography of Dharma
পূর্ব অধ্যায়ের সমাপ্তির পর সূত জম্বুদ্বীপের কেতুমাল, ভদ্রাশ্ব, রম্যক, হিরণ্ময়, কুরু, কিম্পুরুষ, হরিবর্ষ, ইলাবৃত ও চন্দ্রদ্বীপ প্রভৃতি বর্ষে মানুষের বর্ণ, আহার ও বিস্ময়কর দীর্ঘায়ুর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন। এরপর শোক-ভয়হীন, নিত্যভক্তিতে স্থিত আদর্শ বর্ষগুলির কথা থেকে তিনি ভারতবর্ষে আসেন—যেখানে বহু বর্ণ, নানা জীবিকা ও সীমিত আয়ু থাকায় এটিই ‘কর্মভূমি’, এবং যজ্ঞ, যুদ্ধ ও বাণিজ্যের মাধ্যমে ধর্মের আচরণ হয়। অধ্যায়ে হিমবৎ, বিন্ধ্য, সহ্য, মলয়, শুক্তিমৎ ও ঋক্ষবৎ পর্বত এবং সেখান থেকে উৎপন্ন পবিত্র নদীগুলির দীর্ঘ তালিকা ও নদীতীরবর্তী জনপদসমূহ উল্লেখিত। শেষে চার যুগকে ভারতবর্ষ-নির্দিষ্ট বলে জানিয়ে, কিম্পুরুষাদি আট বর্ষে ক্ষুধা-শ্রম-দুঃখের অভাব এবং ভারতে রূপান্তরকারী কর্মের ক্ষেত্র—এই বৈপরীত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
Divine Abodes on the Mountains — A Sacred Survey of Jambūdvīpa (Kailāsa to Siddha Realms)
পুরাণীয় বিশ্বভূগোল-বর্ণনা এগিয়ে নিয়ে সূত জম্বূদ্বীপ-সম্পর্কিত এক মহিমান্বিত পর্বতাঞ্চলের কথা বলেন—যেখানে দেব, সিদ্ধ, যক্ষ, গন্ধর্ব ও মহাযোগীরা বাস করেন; সমগ্র ভূদৃশ্যই জীবন্ত তীর্থ। শুরুতে স্ফটিকময় আকাশপ্রাসাদ ও ভূতেশ/শিবের নিত্য পূজা; পরে কৈলাস, মন্দাকিনী এবং পদ্মভরা নদী-সরোবরের পবিত্রতা ও পুণ্যফল বর্ণিত। এরপর বিষ্ণু-লক্ষ্মী, ইন্দ্র-শচী, ব্রহ্মা-সাবিত্রী, দুর্গার মাহেশ্বরী রূপ, বিষ্ণুধ্যানে নিমগ্ন গরুড়, এবং বিদ্যাধর, গন্ধর্ব, অপ্সরা, যক্ষ ও রাক্ষসদের নগরসমূহের ধারাবাহিক উল্লেখ আছে। জৈগীষব্য প্রভৃতি যোগাশ্রম অন্তর্দমন ও সাধনার ভিত্তি স্থাপন করে; মস্তকের শিখরে ঈশান-ধ্যানের উপদেশও স্পষ্ট। শেষে অসংখ্য সিদ্ধ-লিঙ্গ ও আশ্রমের কথা বলে জম্বূদ্বীপের ব্যাপ্তি সংক্ষেপে জানিয়ে পরবর্তী বিস্তৃত আলোচনার ভূমিকা রচিত হয়।
Sapta-dvīpa Cosmography and the Vision of Śvetadvīpa–Vaikuṇṭha
পুরাণীয় বিশ্বমানচিত্রের ধারাবাহিকতায় সূত জাম্বুদ্বীপের পরবর্তী দ্বীপ-মহাদেশগুলির বর্ণনা দেন—প্রতিটি দ্বিগুণ বিস্তৃত এবং পৃথক পৃথক সমুদ্রে পরিবেষ্টিত। প্লক্ষদ্বীপে কুলপর্বত ও নদীসমূহ, ধর্মময় স্বাচ্ছন্দ্য এবং সোমপূজার ফলে সোমসায়ুজ্য ও দীর্ঘায়ু লাভের কথা বলা হয়েছে। এরপর শাল্মলী, কুশ, ক্রৌঞ্চ ও শাকদ্বীপ—প্রত্যেকটিতে সাত পর্বত, সাত প্রধান নদী, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী/বর্ণ এবং ভক্তির অধিষ্ঠাতা দেবতা হিসেবে ক্রমে বায়ু, ব্রহ্মা, রুদ্র (মহাদেব) ও সূর্য; তাঁদের কৃপায় সারূপ্য, সালোকতা প্রভৃতি স্তরভেদে প্রাপ্তি হয়। শেষে ক্ষীরসমুদ্রবেষ্টিত শ্বেতদ্বীপে রোগ-ভয়-লোভ-প্রতারণাহীন সত্তারা যোগ, মন্ত্র, তপস্যা ও জ্ঞানের দ্বারা নারায়ণকে ভজনা করে। বৈকুণ্ঠ/নারায়ণপুরের দিব্য নগরচিত্রে শेषশয্যায় শায়িত হরি ও তাঁর পদতলে শ্রীকে দেখা যায়। উপসংহারে সিদ্ধান্ত—নারায়ণ থেকেই জগতের উৎপত্তি, তাঁর মধ্যেই স্থিতি, প্রলয়ে তাঁর মধ্যেই লয়; তিনিই পরম গতি।
Puṣkara-dvīpa, Lokāloka, and the Measure of the Brahmāṇḍa (Cosmic Egg)
দ্বীপ‑সমুদ্রের ধারাবাহিক বর্ণনায় এই অধ্যায়ে পুষ্কর‑দ্বীপের কথা বলা হয়েছে—শাক‑দ্বীপের দ্বিগুণ বিস্তৃত, মধুজলসমুদ্রে পরিবেষ্টিত। এখানে একমাত্র বৃত্তাকার পর্বত মনসোত্তর এবং দ্বীপের অন্তর্গত নাম‑বিভাগ—মানস্য অঞ্চল, পর্বতবেষ্টিত মণ্ডল, মহাবীত/ধাতকীখণ্ড—উল্লেখিত। এরপর ভূগোল থেকে তত্ত্বে গমন: এক মহিমান্বিত ন্যগ্রোধ (বট) পূজ্য অক্ষরূপে স্থিত, ব্রহ্মার সান্নিধ্য, শিব ও নারায়ণের ধাম ঘোষিত; দেবতা ও যোগীঋষিরা অর্ধ‑হর অর্ধ‑হরি রূপ হরিহরকে বন্দনা করেন। তারপর স্বর্ণসীমাভূমি ও লোকালোক পর্বত—আলোকলোক ও বহিরন্ধকারের সীমারেখা—বর্ণিত। শেষে ব্রহ্মাণ্ডতত্ত্ব: অবিনাশী প্রধান/প্রকৃতি থেকে অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড উৎপন্ন, প্রত্যেকটিতে চতুর্দশ লোক ও তাদের অধিদেবতা বিদ্যমান। এতে বিশ্বচিত্র সমাপ্ত হয়ে অব্যক্তকে ব্রহ্ম ও পরমেশ্বরের সর্বব্যাপ্তিকে ধ্যানজ্ঞানরূপে নির্দেশ করে।
Manvantaras, Indras, Saptarṣis, and the Seven Sustaining Manifestations; Vyāsa as Nārāyaṇa
পুরাণীয় আলোচনায় ঋষিরা অতীত-ভবিষ্যৎ মন্বন্তর এবং দ্বাপরে ব্যাসের আবির্ভাবসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ চান, বিশেষত কলিযুগে বেদশাখা-বিভাগ ও অবতারের দ্বারা ধর্ম কীভাবে রক্ষিত হয়। সূত প্রথম ছয় মনুর কথা বলে বর্তমান সপ্তম বৈবস্বত মন্বন্তর স্থির করেন এবং প্রত্যেক মন্বন্তরে দেবগণ, সেই সময়ের ইন্দ্র ও সাত সপ্তর্ষির নাম উল্লেখ করেন। এরপর বলা হয়, প্রতিটি মন্বন্তরে ভগবান এক ধারক অংশরূপে প্রকাশিত হন; বৈবস্বতে তিনি বামনরূপে ত্রিলোকের অধিকার ইন্দ্রকে দান করে রাজ্যব্যবস্থা পুনর্বিন্যস্ত করেন। তারপর কেশব/নারায়ণকে সৃষ্টিকর্তা-স্থিতিকারী-সংহারক, সর্বব্যাপী এবং চতুর্ব্যূহ—বাসুদেব, সংকর্ষণ/শেষ (কালরূপ), প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ—রূপে গুণকার্যের সমন্বয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। শেষে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসকে স্বয়ং নারায়ণ, অনাদি পরমের একমাত্র জ্ঞাতা বলা হয়েছে; এতে বিশ্বব্যবস্থা, বেদবিভাগ ও মুক্তিজ্ঞান—সবই যুগে যুগে ভগবানের আবির্ভাবের ধারায় যুক্ত হয়।
Lineage of Vyāsas, Division of the Veda, and Vāsudeva/Īśāna as the Veda-Known Supreme
এই অধ্যায়ে সূত ধর্ম ও শ্রুতির রক্ষার্থে মন্বন্তর ও দ্বাপর-চক্রে বেদের বিন্যাসের পূর্বব্যবস্থা বর্ণনা করেন এবং ব্যাসদের পরম্পরা উল্লেখ করেন, যা পরাশর-পুত্র কৃষ্ণ দ্বৈপায়নে এসে পূর্ণ হয়। ব্যাসের কর্তৃত্ব কেবল বংশগত নয়, অনুগ্রহজাত—ঈশানের আরাধনা করে সাম্ব (শিব)-দর্শনে তিনি বেদ-বিভাজক হন। পরে পৈলকে ঋগ্বেদ, বৈশম্পায়নকে যজুর্বেদ, জৈমিনিকে সামবেদ, সুমন্তুকে অথর্ববেদ এবং সূতকে ইতিহাস-পুরাণ প্রদান করা হয়; চাতুর্হোত্র যাজ্ঞিক ব্যবস্থার যুক্তিও বলা হয়। শেষে ওঙ্কারের ব্রহ্ম থেকে উদ্ভব, বেদপ্রতিপাদ্য পরম বাসুদেব এবং বেদস্বরূপ মহাদেবের কথা বলে হরি-হর সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা কেবল পাঠ নয়, বেদান্ত-জ্ঞানমুখী পথ নির্দেশ করে।
Incarnations of Mahādeva in Kali-yuga (Vaivasvata Manvantara) and the Nakulīśa Horizon
দ্বাপরযুগের ব্যাস-অবতার প্রসঙ্গ শেষ করে সূত বৈবস্বত মন্বন্তরের কলিযুগে মহাদেবের প্রকাশসমূহের তালিকা শুরু করেন। কলির আদিতে শম্ভু হিমালয়ের শিখরে (চগল) শ্বেতরূপে আবির্ভূত হন; সেখানে দীপ্তিমান, বেদ-সিদ্ধ ব্রাহ্মণ ঋষিরা শিষ্য হয়ে আদর্শ স্থাপন করেন। এরপর শ্বেত-সম্পর্কিত প্রধান ব্যক্তিত্ব, উপাধি, তীর্থ ও নামের ক্রমানুসার বর্ণনা এবং বৈবস্বত মন্বন্তরে মোট আটাশটি শৈব অবতারের স্পষ্ট সংখ্যা দেওয়া হয়। কলির অন্তে ভগবান এক তীর্থে দেহধারী নকুলীশ্বররূপে প্রকাশিত হয়ে পাশুপত-মার্গের দিগন্ত ও গুরু-শিষ্য পরম্পরা প্রতিষ্ঠা করেন। বিস্তৃত শিষ্য/ঋষি-তালিকায় তপস্যা, যোগ, ব্রহ্মবিদ্যা এবং ব্রাহ্মণদের জন্য বৈদিক ধর্ম-ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা জোর দিয়ে বলা হয়। শেষে ভবিষ্যৎ সাবর্ণ মনুদের ইঙ্গিত, স্নানের পর মন্দিরে বা নদীতীরে শ্রবণ-পাঠের ফলশ্রুতি, এবং নারায়ণ-বিষ্ণুর কূর্মরূপে প্রণাম করে অধ্যায় সমাপ্ত।
It establishes Purāṇic authority and outlines a mokṣa-oriented synthesis (samanvaya): Śrī as Viṣṇu’s Māyā-Śakti, liberation through jñāna and Karma-yoga within Varnāśrama, and the instruction to worship Maheśvara through knowledge and devotion while taking Nārāyaṇa as the supreme refuge.
Adhyāya 1 contains an Ishvara-Gita-like discourse where the Lord defines the supreme Brahman, explains vibhūti, cause–effect (avyakta–jagat), pravṛtti (divine cosmic activity), and prescribes threefold bhāvanā and Karma-yoga leading to non-dual realization.
Śrī is presented as Viṣṇu’s own supreme power—Māyā/Prakṛti constituted of the three guṇas—by which the universe is projected and withdrawn; yet she does not prevail over those who worship the Supreme through jñāna and consecrated action.