Uttarabhaga
विभूतिविस्तरप्रश्नः / Inquiry into the Expansion of Śiva’s Vibhūti
অধ্যায় ১ শুরু হয় শিববন্দনায়—গৌরীর স্তনস্পর্শিত কেশরচিহ্নে শিবের বক্ষ অলংকৃত, এই প্রতীকী বর্ণনা ভক্তি ও তত্ত্বচিন্তাকে স্থাপন করে। সূত বলেন, উপমনু শিবানুগ্রহ লাভ করার পর মধ্যাহ্ন-অনুষ্ঠান থেকে উঠে বায়ু নৈমিষারণ্যের ঋষিসভায় আসেন। দৈনন্দিন কর্ম সমাপ্ত ঋষিরা তাঁকে দেখে সভামধ্যে প্রস্তুত আসনে বসান। বিশ্ববন্দিত বায়ু স্বচ্ছন্দে বসে প্রভুর মহিমা স্মরণ করে সর্বজ্ঞ, অজেয় মহাদেবের শরণ নেন এবং বলেন—চরাচর সমগ্র জগতই শিবের বিভূতি। এই মঙ্গলবাণী শুনে শুদ্ধ ঋষিরা ‘বিভূতিবিস্তার’ বিস্তারিত জানতে চান এবং প্রশ্নকে উপমনুর তপস্যা ও পাশুপত-ব্রতসিদ্ধি, তথা বাসুদেব কৃষ্ণ প্রভৃতি দৃষ্টান্তের সঙ্গে যুক্ত করেন। ফলে অধ্যায়টি কাহিনির ভূমিকা থেকে শিবের প্রকাশরূপ ও তা উপলব্ধির উপায়ের শাস্ত্রীয় বিবরণের অনুরোধে সেতুর কাজ করে।
पाशुपतज्ञानप्रश्नः — Inquiry into Pāśupata Knowledge (Paśu–Pāśa–Paśupati)
অধ্যায় ২-এ ঋষিগণ পাশুপত-জ্ঞান এবং পাশুপতি (শিব), পশু (বদ্ধ জীব) ও পাশ (বন্ধন)-এর তাত্ত্বিক অর্থ স্পষ্ট করতে অনুরোধ করেন। সূত বলেন, বায়ুই এ বিষয়ে যোগ্য বক্তা; তিনি পূর্বপ্রকাশিত উপদেশ স্মরণ করান—মন্দর পর্বতে মহাদেব শ্রীকণ্ঠ দেবীকে পরম পাশুপত-জ্ঞান দান করেছিলেন। এরপর বায়ু সেই উপদেশকে পরবর্তী প্রসঙ্গে যুক্ত করেন, যেখানে কৃষ্ণ (কৃষ্ণরূপে বিষ্ণু) বিনয়ের সঙ্গে ঋষি উপমনুর কাছে এসে দিব্য জ্ঞান ও শিবের বিভূতি সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে প্রার্থনা করেন। কৃষ্ণের প্রশ্নে মতবাদ-ছক স্পষ্ট হয়—পাশুপতি কে, কারা পশু, কোন কোন পাশে তারা বদ্ধ, এবং মুক্তি কীভাবে হয়। উপমনু শিব-দেবীকে প্রণাম করে উত্তর শুরু করেন, ফলে বন্ধন-মোক্ষ বিশ্লেষণভিত্তিক শৈব সাধনার ভূমি প্রস্তুত হয়।
शिवस्य विश्वव्याप्तिः—अष्टमूर्तिः पञ्चब्रह्म च | Śiva’s Cosmic Pervasion: Aṣṭamūrti and the Pañcabrahma Forms
উপমনু কৃষ্ণকে উপদেশ দেন যে পরমাত্মা মহেশ/শিব স্বীয় মূর্তিসমূহের দ্বারা সমগ্র চরাচর জগৎকে ব্যাপ্ত ও ধারণ করেন। অধ্যায়ে বলা হয়েছে—বিশ্ব শিবের অষ্টমূর্তিতে প্রতিষ্ঠিত, যেন সূত্রে গাঁথা মণি। পরে প্রধান শৈব রূপসমূহ এবং পঞ্চব্রহ্ম তনু—ঈশান, তৎপুরুষ, অঘোর, বামদেব, সদ্যোজাত—কে সর্বব্যাপী রূপে বর্ণনা করা হয়; কিছুই তাঁদের দ্বারা অব্যাপ্ত নয়। ঈশান ক্ষেত্রজ্ঞ/ভোক্তা তত্ত্বের, তৎপুরুষ অব্যক্ত ও গুণময় ভোগ্যবস্তুর, অঘোর বুদ্ধিতত্ত্বের (ধর্মাদি সহ), বামদেব অহংকারের, এবং সদ্যোজাত মনসের অধিষ্ঠাতা। ইন্দ্রিয়-অঙ্গ-বিষয়-ভূত সম্পর্কও দেওয়া হয়েছে—শ্রোত্র–বাক্–শব্দ–ব্যোম, ত্বক্–পাণি–স্পর্শ–বায়ু, চক্ষু–চরণ–রূপ–অগ্নি, রসনা–পায়ু–রস–আপঃ, ঘ্রাণ–উপস্থ–গন্ধ–ভূ। শেষে এই মূর্তিগুলির কীর্তি ও পূজাযোগ্যতাকেই শ্রেয়স্-দায়ক একমাত্র কল্যাণকারণ বলা হয়েছে।
शिवशक्त्यैक्य-तत्त्वविचारः / Inquiry into the Unity of Śiva and Śakti (Para–Apara Ontology)
এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করেন—পরমজ্যোতির্ময় শর্ব (শিব)-এর মূর্তিসমূহে বিশ্ব কীভাবে পরিব্যাপ্ত, এবং স্ত্রী–পুংভাবযুক্ত জগৎকে দিব্য দম্পতি কীভাবে অধিষ্ঠান করেন। উপমনু বলেন, শিব–শিবার শ্রীমদ্-বিভূতি ও যথার্থ স্বরূপ সংক্ষেপেই বলা সম্ভব, বিস্তার অসাধ্য। তিনি শক্তিকে মহাদেবী এবং শিবকে শক্তিমান রূপে নিরূপণ করে বলেন—চরাচর বিশ্ব তাঁদের বিভূতির কেবল লেশমাত্র। পরে চিত্–অচিত্, শুদ্ধ–অশুদ্ধ, পর–অপর এই তত্ত্বভেদ দেখিয়ে বোঝান যে অচেতনের সঙ্গে চেতনার সংযোগে অপর/অশুদ্ধ ক্ষেত্রে সংসার প্রবাহিত হয়; তবু পর ও অপর উভয়ই শিব–শিবার স্বাভাবিক স্বামিত্বাধীন। জগৎ তাঁদের অধীন, তাঁরা জগতের অধীন নন—এই বিশ্বাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। চন্দ্র ও চাঁদের আলোর ন্যায় শিব–শক্তির অভেদ প্রতিপাদিত; শক্তি ব্যতীত শিবের প্রকাশ জগতে স্পষ্ট হয় না।
शिवस्य परापरब्रह्मस्वरूपनिर्णयः / Determination of Śiva as Higher and Lower Brahman
এই অধ্যায়ে উপমন्यु বলেন—চরাচর সমগ্র বিশ্বই দেবদেব শিবের ‘বিগ্রহ’; কিন্তু পাশ-বদ্ধ জীব বন্ধনের ভারে তা উপলব্ধি করতে পারে না। এক তত্ত্বকে নানা ভাবে বলা হয়—অবিকল্প পরম অবস্থাকে না জেনেও ঋষিরা বহুবিধ বাক্যে তা ব্যক্ত করেন—এই একত্ব ও বহুত্বের টানাপোড়েন ব্যাখ্যাত। অপর ব্রহ্ম হলো ভূততত্ত্ব, ইন্দ্রিয়, অন্তঃকরণ ও বিষয়সমষ্টি; পর ব্রহ্ম হলো চিদাত্মক শুদ্ধ চৈতন্য। ‘ব্রহ্ম’ শব্দের ব্যুৎপত্তি (বৃহত্ত্ব/বৃহণত্ব) দেখিয়ে বলা হয়—উভয়ই ব্রহ্মাধিপতি প্রভু শিবেরই রূপ। পরে বিশ্বকে বিদ্যা-অবিদ্যা-গঠিত বলা হয়েছে—বিদ্যা সত্য-অনুগত সচেতন জ্ঞান, অবিদ্যা অচেতন মিথ্যা-গ্রহণ; ভ্রান্তি ও যথার্থ-সংবিতের তুলনায় সিদ্ধান্ত—সৎ ও অসৎ উভয়ের অধীশ্বর শিবই এই দ্বয় ও তাদের জ্ঞানফলের নিয়ন্তা।
Śiva’s Freedom from Bondage and His Cosmic Support (शिवस्य अबन्धत्वं तथा सर्वाधिष्ठानत्वम्)
এই অধ্যায়ে উপমনু্যু শাস্ত্রীয় উপদেশরূপে ব্যাখ্যা করেন যে শিব কোনো প্রকার বন্ধনে আবদ্ধ নন—আণব, মায়ীয়, প্রাকৃত, জ্ঞান‑মানসিক, ইন্দ্রিয়, ভূত ও তন্মাত্রা প্রভৃতি। কাল, কলা, বিদ্যা, নিয়তি, রাগ‑দ্বেষ, কর্ম, তার বিপাক এবং সুখ‑দুঃখও তাঁকে বাঁধতে পারে না। বন্ধু‑শত্রু, নিয়ন্তা‑প্রেরক, স্বামী‑গুরু‑রক্ষক ইত্যাদি সম্পর্কসূচক বিশেষণও তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। শেষে বলা হয়, পরমাত্মা শিব সর্বমঙ্গল, স্বশক্তিতে স্বরূপে স্থিত থেকে সকলের অচল অধিষ্ঠান; তাই তিনি ‘স্থাণু’ নামে স্মরণীয়।
शक्तितत्त्ववर्णनम् / Exposition of the Principle of Śakti
এই অধ্যায়ে উপমন्यु শিবের স্বাভাবিকী শক্তির তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি সর্বব্যাপী, সূক্ষ্ম ও আনন্দ-চৈতন্যময়ী; সূর্যালোকের মতো এক হয়েও বহুরূপে প্রকাশিত। ইচ্ছা, জ্ঞান ও ক্রিয়া—এই শক্তিগুলির অগণিত রূপ উল্লেখ করে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় তাঁর বিকিরণ থেকে তত্ত্বসমূহের উদ্ভব বলা হয়েছে। বিদ্যা-অবিদ্যার অধিপতি, পুরুষ ও প্রকৃতি তাঁর ক্ষেত্রেই অবস্থান করে; মহৎ প্রভৃতি সকল বিকার তাঁরই কার্য। শিব ‘শক্তিমান’, আর শক্তি বেদ-শ্রুতি-স্মৃতি, জ্ঞান, ধৃতি এবং জানা-চাওয়া-করা—এই ক্ষমতার ভিত্তি। মায়া, জীব, বিকৃতি এবং সত্-অসতের সমগ্র বিস্তার তাঁর দ্বারা পরিব্যাপ্ত; তাঁর লীলা মোহিতও করে, মুক্তও করে। তাঁর সহিত সর্বেশের জগতে (এখানে) সাতাশ প্রকারে ব্যাপ্তি এবং এই বোধ থেকেই মোক্ষ লাভ—এটাই সিদ্ধান্ত।
शिवज्ञान-प्रश्नः तथा सृष्टौ शिवस्य स्वयमाविर्भावः (Inquiry into Śiva-knowledge and Śiva’s self-manifestation in creation)
এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ শিবপ্রদত্ত ‘বেদসার’-এর যথার্থ বিবরণ চান, যা শরণাগতকে মোক্ষ দেয়। এই তত্ত্ব গভীর, বহুস্তর অর্থবহ এবং ভক্তিহীন বা অযোগ্যদের কাছে অপ্রাপ্য বলে বর্ণিত। এরপর কৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করেন—এই শিক্ষার মধ্যে পূজা কীভাবে হবে, কার অধিকার আছে, এবং জ্ঞান ও যোগের সঙ্গে পথের সম্পর্ক কী। উপমনু বেদাভিপ্রায়সম্মত সংক্ষিপ্ত শৈব-সূত্র বলেন, যা স্তব-নিন্দাহীন ও তৎক্ষণাৎ দৃঢ় বিশ্বাস জাগায়; পূর্ণ বিস্তার অসম্ভব বলে তিনি সারাংশ দেন। পরে সৃষ্টিকথায়, প্রকাশের পূর্বে শিব (স্থাণু/মহেশ্বর) কারণশক্তিসহ স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে প্রভুরূপে প্রতিষ্ঠিত হন এবং তারপর দেবগণের মধ্যে প্রথম ব্রহ্মাকে উৎপন্ন করেন। ব্রহ্মা তাঁর দিব্য জনককে দর্শন করেন এবং শিবও উদ্ভূত ব্রহ্মাকে দেখেন—এই পারস্পরিক দর্শনে প্রতিপন্ন হয় যে সৃজন-ক্ষমতা শিবের পূর্ব স্বপ্রকাশ থেকেই প্রবাহিত।
योगाचार्यरूपेण शर्वावताराः (Śarva’s manifestations as Yoga-Teachers)
অধ্যায় ৯-এ কৃষ্ণ উপমনুকে শর্ব (শিব) সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেন—যুগপরিবর্তনের ধারায় শিব যোগাচার্যের ছলরূপে অবতীর্ণ হয়ে শিষ্য-প্রতিষ্ঠাও করেন। উপমন্যু বারাহকল্পে, বিশেষত সপ্তম মন্বন্তরে, যুগক্রম অনুসারে আটাশ জন যোগাচার্যের নাম গণনা করেন। পরে বলা হয়, প্রত্যেক আচার্যের চারজন শান্তচিত্ত শিষ্য থাকে এবং শ্বেত থেকে শুরু করে শ্বেতাশ্ব, শ্বেতলোহিত, বিকোষ/বিকেশ ও সনৎকুমার-গোষ্ঠী প্রভৃতি নামগুচ্ছসহ শিষ্যদের ক্রমানুসার তালিকা দেওয়া হয়। এ অধ্যায় শৈব যোগ-পরম্পরার বংশানুক্রমিক, তালিকাভিত্তিক পুরাণীয় নির্দেশিকা।
श्रद्धामाहात्म्यं तथा देवीप्रश्नः (The Greatness of Śraddhā and Devī’s Question to Śiva)
এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ উপমনুকে শিবজ্ঞানের পরম জ্ঞানী বলে সম্বোধন করেন এবং বলেন—শিবজ্ঞানের ‘অমৃত’ আস্বাদন করেও তৃপ্তি আসে না। উপমন্যু মন্দর পর্বতে মহাদেব ও দেবীর ধ্যানমগ্ন অন্তরঙ্গ অবস্থান, চারদিকে দেবীসমূহ ও গণদের উপস্থিতি বর্ণনা করেন। সুযোগ বুঝে দেবী প্রশ্ন করেন—আত্মতত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত নয় এমন অল্পবুদ্ধি মানুষ কীভাবে মহাদেবকে প্রসন্ন করতে পারে? ঈশ্বর বলেন—কর্ম, তপস্যা, জপ, আসন-সাধনা বা শুষ্ক জ্ঞান—শ্রদ্ধা ছাড়া সবই নিষ্ফল; শ্রদ্ধাই প্রধান উপায়। স্বধর্ম পালন, বিশেষত বর্ণাশ্রম-নিয়ম মানার দ্বারা শ্রদ্ধা বৃদ্ধি ও রক্ষা পায়। তাই শৃঙ্খলিত আচারসহ অন্তঃশ্রদ্ধাই শিবকৃপা লাভের পথ—শিব দর্শন, স্পর্শ, পূজা ও সম্ভাষণ সুলভ হয়।
भक्ताधिकारि-द्विजधर्म-योगिलक्षणवर्णनम् / Duties of Qualified Devotees and Marks of Yogins
শিব দেবীকে বলেন যে তিনি বর্ণধর্ম এবং যোগ্য ভক্ত ও বিদ্বান দ্বিজ সাধকদের আচরণসংযম সংক্ষেপে বর্ণনা করবেন। ত্রিকাল স্নান, অগ্নিকার্য, ক্রমানুসারে লিঙ্গপূজা, দান-দয়া-ঈশ্বরভাব এবং সকল জীবের প্রতি অহিংসা-সত্যাদি নীতির কথা বলা হয়েছে। অধ্যয়ন-অধ্যাপন-ব্যাখ্যা, ব্রহ্মচর্য, শ্রবণ, তপস্যা, ক্ষমা ও শৌচের বিধান আছে; শিখা, উপবীত, উষ্ণীষ, উত্তরীয় ধারণ, ভস্ম ও রুদ্রাক্ষ ধারণ এবং পর্বদিনে বিশেষত চতুর্দশীতে বিশেষ পূজার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আহারশুদ্ধিতে ব্রহ্মকূর্চ প্রভৃতি নিয়ত সেবন এবং বাসি/অশুদ্ধ খাদ্য, কিছু শস্য, মদ্য ও তার গন্ধ পর্যন্ত বর্জনের কথা বলা হয়েছে। পরে যোগীর লক্ষণ হিসেবে ক্ষমা, শান্তি, সন্তোষ, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য, শিবজ্ঞান, বৈরাগ্য, ভস্মসেবন ও সর্বাসক্তি-নিবৃত্তি, এবং দিনে ভিক্ষাভোজনের মতো কঠোর আচরণ সংক্ষেপে বলা হয়েছে; এভাবে অধ্যায়টি বাহ্য আচরণ, নৈতিক শুদ্ধি ও যোগিক বৈরাগ্যকে একসূত্রে বাঁধে।
पञ्चाक्षर-षडक्षरमन्त्र-माहात्म्यम् | The Greatness of the Pañcākṣara/Ṣaḍakṣara Mantra
অধ্যায় ১২-এ শ্রীকৃষ্ণ উপমনুকে পঞ্চাক্ষর মন্ত্রের মহিমা তত্ত্বতঃ বর্ণনা করতে অনুরোধ করেন। উপমন্যু বলেন—এর বিস্তার মহাকাল জুড়েও অপরিমেয়, তাই সংক্ষেপে উপদেশ দেন। মন্ত্রটি বেদ ও শিবাগম—উভয়েই প্রমাণিত, শিবভক্তদের জন্য সম্পূর্ণ সাধন এবং সকল লক্ষ্যসিদ্ধিকারী। অল্প অক্ষরে হলেও অর্থে মহৎ—বেদসার, মোক্ষদায়ক, নিশ্চিত ও স্বয়ং শিবস্বরূপ বলে প্রশংসিত। এটি দিব্য, সিদ্ধিদায়ক, জীবের মনোহর, গভীর ও নির্ভ্রান্ত। মন্ত্ররূপ ‘নমঃ শিবায়’কে আদ্য সূত্ররূপে স্থাপন করা হয়েছে। একাক্ষর ‘ওঁ’কে শিবের সর্বব্যাপী উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং ঈশান প্রভৃতি পঞ্চব্রহ্ম-তত্ত্বসংশ্লিষ্ট সূক্ষ্ম একাক্ষর-বাস্তবতাগুলি মন্ত্রক্রমে নিহিত বলা হয়েছে। ফলে বাচ্য-বাচক ভাবের দ্বারা সূক্ষ্ম ষড়ক্ষরে পঞ্চব্রহ্মতনু শিবই শব্দও অর্থও—এই সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত।
पञ्चाक्षरीविद्यायाḥ कलियुगे मोक्षोपायः | The Pañcākṣarī Vidyā as a Means of Liberation in Kali Yuga
এই অধ্যায়ে দেবী কলিযুগের অবস্থা নির্ণয় করেন—কাল কলুষিত ও দুর্জয়, ধর্ম অবহেলিত, বর্ণাশ্রম-আচার ক্ষয়প্রাপ্ত, সমাজ-ধর্মে সংকট, এবং গুরু–শিষ্য উপদেশ-পরম্পরা ভঙ্গ হয়েছে। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, এমন সীমাবদ্ধতায় শিবভক্তরা কীভাবে মুক্তি পাবে। ঈশ্বর বলেন—তাঁর ‘পরমা বিদ্যা’, হৃদয়-আনন্দদায়িনী পঞ্চাক্ষরী মন্ত্রই আশ্রয়; ভক্তিতে অন্তর্জীবন গঠিত হলে কলিতেও মোক্ষ লাভ হয়। পরে মন-বাক্য-কায়ার দোষে কলুষিত, কর্মে অযোগ্য ও ‘পতিত’ লোকদের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে—তাদের কর্ম কি কেবল নরকই দেয়? শিব পুনরায় প্রতিজ্ঞা করে গোপন রহস্য প্রকাশ করেন—মন্ত্রসহ পূজা (সমন্ত্রক পূজা)ই নিশ্চিত উদ্ধার; পতিত ভক্তও এই বিদ্যায় মুক্ত হতে পারে।
मन्त्रसिद्ध्यर्थं गुरुपूजा–आज्ञा–पौरश्चर्यविधिः / Guru-Authorization, Offerings, and Puraścaraṇa for Mantra-Siddhi
এই অধ্যায়ে মন্ত্রসিদ্ধির জন্য শৈব বিধান বর্ণিত। ঈশ্বর বলেন—গুরুর আজ্ঞা, যথাযথ ক্রিয়া, শ্রদ্ধা এবং নির্দিষ্ট দক্ষিণা/অর্ঘ্য ছাড়া করা জপ নিষ্ফল হয়। শিষ্যকে তত্ত্ববিদ, সদ্গুণসম্পন্ন ও ধ্যাননিষ্ঠ যোগ্য গুরু/আচার্যের কাছে গিয়ে ভাবশুদ্ধি সহ বাক্-মন-দেহ-ধন দ্বারা সেবা করতে হবে; সামর্থ্য অনুযায়ী দীর্ঘকাল গুরুপূজা ও দান করতে হবে এবং বিত্তশাঠ্য (অর্থে প্রতারণা) বর্জন করতে হবে। গুরু প্রসন্ন হলে স্নান, মন্ত্রশুদ্ধ জল ও মঙ্গলদ্রব্যে শুদ্ধি করে, যথোচিত অলংকার ধারণ করে, পবিত্র স্থানে (নদীতীর, সমুদ্রতীর, গোশালা, মন্দির বা শুদ্ধ গৃহে) নির্দোষ তিথি-নক্ষত্র-যোগে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এরপর গুরু শুদ্ধ স্বরে ‘পরম মন্ত্র’ প্রদান করে আজ্ঞা দেন। মন্ত্র ও আজ্ঞা পেয়ে শিষ্য পুরশ্চরণ বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যায় জপ, সংযম ও নিয়ন্ত্রিত আহার-ব্যবহার পালন করে। পুরশ্চরণ সম্পূর্ণ করে নিত্য জপ রক্ষা করলে, শিব ও গুরুর অন্তঃস্মরণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সে সিদ্ধ হয় এবং সাফল্য দানে সক্ষম হয়।
शिवसंस्कार-दीक्षानिरूपणम् (Śivasaṃskāra and the Typology of Dīkṣā)
এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ মন্ত্রের মাহাত্ম্য ও প্রয়োগের পূর্বোক্ত উপদেশের পর “শিবসংস্কার”-এর নির্ভুল বিবরণ চান। উপমনু বলেন, সংস্কার হলো সেই বিধি যা পূজা ও সংশ্লিষ্ট সাধনায় অধিকার দেয়; এটি ষড়ধ্বের শুদ্ধি, জ্ঞানপ্রদান এবং পাশ-বদ্ধতার ক্ষয়সাধন করে, তাই একে দীক্ষাও বলা হয়। শিবাগমীয় পরিভাষায় দীক্ষা তিন প্রকার—শাম্ভবী, শাক্তী ও মান্ত্রী। শাম্ভবী গুরু-মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ ফলদায়িনী; দৃষ্টি, স্পর্শ বা বাক্য মাত্রেই কার্যকর হতে পারে এবং পাশক্ষয়ের মাত্রা অনুযায়ী তীব্রা ও তীব্রতরা—দুই ভাগে বিভক্ত: তীব্রতরা তৎক্ষণাৎ শান্তি/মুক্তি দেয়, তীব্রা জীবদ্দশায় ক্রমে শোধন করে। শাক্তী দীক্ষা গুরু যোগোপায়ে জ্ঞানচক্ষু দ্বারা শক্তির অবতরণ ঘটিয়ে শিষ্যের দেহে প্রবেশ করিয়ে জ্ঞান দান করে; পরবর্তী অংশে মান্ত্রী দীক্ষার ইঙ্গিত রয়েছে।
समयाह्वय-संस्कारः — Rite of ‘Samayāhvaya’ and the Preparatory Layout (Maṇḍapa, Vedi, Kuṇḍas, Maṇḍala, Śiva-kumbha)
অধ্যায় ১৬-এ উপমন्यु শুভ দিনে শুদ্ধ ও নির্দোষ স্থানে প্রারম্ভিক ‘সময়াহ্বয়-সংস্কার’ সম্পাদনের বিধান দেন। এরপর গন্ধ, বর্ণ, স্বাদ ইত্যাদি লক্ষণে ভূমি-পরীক্ষা করে শিল্পিশাস্ত্রানুসারে মণ্ডপ নির্মাণ, বেদি স্থাপন এবং অষ্টদিক অনুসারে বহু কুণ্ডের বিন্যাস বলা হয়েছে; বিশেষত ঈশান (উত্তর-পূর্ব) দিকের ক্রমবিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ, আর পশ্চিমে প্রধান কুণ্ড ঐচ্ছিকভাবে স্থাপনের কথাও আছে। বেদি ছত্র, পতাকা ও মালায় অলংকৃত করে মধ্যভাগে রঙিন চূর্ণে শুভ মণ্ডল আঁকা হয়—ধনীদের জন্য স্বর্ণ/লাল চূর্ণ, দরিদ্রদের জন্য সিঁদুর, শালি/নিবার চূর্ণ ইত্যাদি বিকল্প। পদ্ম-মণ্ডলের পরিমাপ (এক/দুই হাত), কর্ণিকা, কেশর ও পাপড়ির মাপ এবং ঈশান অংশে বিশেষ সাজসজ্জা নির্দিষ্ট। শেষে শস্য, তিল, ফুল ও কুশ ছড়িয়ে লক্ষণযুক্ত শিব-কুম্ভ প্রস্তুত করা হয়, যা পরবর্তী আহ্বানাদি ক্রিয়ার ভূমিকা।
षडध्व-शुद्धिः (Purification of the Six Adhvans / Sixfold Cosmic Path)
অধ্যায় ১৭-এ উপমন्यु বলেন—গুরু শিষ্যের যোগ্যতা/অধিকার পরীক্ষা করে সর্ববন্ধ-বিমুক্তির জন্য ষড়ধ্ব-শুদ্ধি করাবেন বা শিক্ষা দেবেন। এরপর ছয় অধ্ব—কলা, তত্ত্ব, ভুবন, বর্ণ, পদ ও মন্ত্র—প্রকাশের স্তরবদ্ধ ‘পথ’ হিসেবে সংক্ষেপে নিরূপিত। নিবৃত্তি প্রভৃতি পাঁচ কলা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে বাকি পাঁচ অধ্ব এই কলাগুলির দ্বারা ব্যাপ্ত। তত্ত্বাধ্ব শিব-তত্ত্ব থেকে ভূমি পর্যন্ত ২৬ তত্ত্বের ক্রম, শুদ্ধ-অশুদ্ধ-মিশ্র ভেদে ব্যাখ্যাত। ভুবনাধ্ব আধার থেকে উন্মনা পর্যন্ত (উপভেদ বাদে) ষাট সংখ্যক। বর্ণাধ্ব পঞ্চাশ রুদ্ররূপ অক্ষর, পদাধ্ব বহু বিভেদযুক্ত। মন্ত্রাধ্ব পরা বিদ্যায় ব্যাপ্ত; যেমন তত্ত্বেশ্বর শিব তত্ত্বগণনায় গণ্য নন, তেমনি মন্ত্রনায়ক মন্ত্রাধ্বে গণ্য নন—এই উপমা দেওয়া হয়েছে। শেষে বলা হয়েছে, ব্যাপক–ব্যাপ্য ন্যায়সহ ষড়ধ্বের সত্য জ্ঞান না থাকলে অধ্বশোধনের অধিকার হয় না; তাই সাধনার আগে অধ্বের স্বরূপ ও ব্যাপ্তির কাঠামো বুঝতে হবে।
Maṇḍala–Pūjā–Homa Krama (Maṇḍala Worship and Homa Sequence for the Disciple)
অধ্যায় ১৮-এ আচার্যের নির্দেশে মণ্ডল-পূজা ও হোমের সুসংবদ্ধ ক্রম বর্ণিত। স্নানাদি শুদ্ধি সম্পন্ন করে শিষ্য করজোড়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে শিব-মণ্ডলের নিকট গমন করে। গুরু নেত্রবন্ধন পর্যন্ত মণ্ডল প্রকাশ করেন; পরে শিষ্য পুষ্পাবকিরণ করে, এবং যেখানে ফুল পড়ে সেই লক্ষণ দেখে গুরু শিষ্যের নাম/নিয়োগ নির্ধারণ করেন। এরপর শিষ্যকে নির্মাল্য-মণ্ডলে নিয়ে ঈশান (শিব) পূজা করিয়ে শিবানলে আহুতি প্রদান করা হয়। অশুভ স্বপ্ন দেখলে দোষশান্তির জন্য মূলবিদ্যা-মন্ত্রে ১০০, ৫০ বা ২৫ আহুতির বিধান আছে। শিখায় সূত্র বাঁধা, নিবৃত্তি-কলার সঙ্গে যুক্ত আধার-পূজা, বাগীশ্বরী পূজা ও হোম-প্রধান ক্রমও বলা হয়েছে। গুরুর মানসিক ‘যোজনা’ ও অনুমোদিত মুদ্রায় শিষ্যের সর্বযোনিতে একযোগে অধিকার/প্রবেশের ভাব জাগে; মন্ত্র-মুদ্রা-অগ্নির দ্বারা শুদ্ধি, নিয়োগ ও আধ্যাত্মিক সংযোজনই এই অধ্যায়ের মূল।
साधक-दीक्षा तथा मन्त्रसाधन (Puraścaraṇa and the Discipline of the Mantra-Sādhaka)
এই অধ্যায়ে গুরু কীভাবে যোগ্য সাধককে প্রতিষ্ঠা করে শৈব বিদ্যা/মন্ত্র প্রদান করেন, তার বিধিবদ্ধ ক্রম বর্ণিত। উপমন্য়ু মণ্ডলপূজা, কুম্ভস্থাপন, হোম, শিষ্যকে নির্দিষ্ট স্থানে বসানো এবং পূর্বকর্মসমাপ্তি—সবই পূর্বোক্ত ক্রমে বলেন। গুরু অভিষেক করে ‘পরম মন্ত্র’ দান করেন এবং পুষ্পাম্বু দ্বারা শিষ্যের করতলে শৈব জ্ঞান স্পর্শসহ হস্তান্তর করে বিদ্যোপদেশ সম্পন্ন করেন। এই মন্ত্র পরমেষ্ঠিন (শিব)-কৃপায় ইহলোকে ও পরলোকে সিদ্ধিদায়ক বলে প্রশংসিত। শিবের অনুমতি পেয়ে গুরু সাধনা ও শিবযোগ শেখান; শিষ্য বিনিয়োগ স্মরণ করে মন্ত্রসাধনা করে—এটাই মূলমন্ত্রের পুরশ্চরণ। মুমুক্ষুর জন্য অতিরিক্ত আচারগত পরিশ্রম বাধ্যতামূলক নয়, তবু তা শুভ বলে মান্য।
शिवाचार्याभिषेकविधिः / Rite of Consecrating a Śiva-Teacher (Śivācārya Abhiṣeka)
অধ্যায় ২০-এ সংস্কারশুদ্ধ ও পাশুপত-ব্রতপালনকারী যোগ্য শিষ্যকে বিধিপূর্বক শিবাচার্য পদে প্রতিষ্ঠা করার অভিষেক-ক্রম বর্ণিত। পূর্বোক্ত মতে মণ্ডল নির্মাণ করে পরমেশ্বরের পূজা করা হয়। পাঁচটি কলস দিক ও কেন্দ্রে স্থাপিত—পূর্ব/অগ্রে নিবৃত্তি, পশ্চিমে প্রতিষ্ঠা, দক্ষিণে বিদ্যা, উত্তরে শান্তি এবং কেন্দ্রে পরা—এই শক্তি/স্তরসমূহের বিন্যাসসহ। রক্ষাকর্ম, ধৈনবী মুদ্রা, মন্ত্রে কলস-সংস্কার, আহুতি ও শেষে পূর্ণাহুতি সম্পন্ন হয়। শিষ্যকে মাথা অনাবৃত রেখে মণ্ডলে প্রবেশ করিয়ে মন্ত্র-তর্পণাদি পূর্বাঙ্গ করা হয়। পরে আচার্য শিষ্যকে আসনে বসিয়ে অভিষেক করেন, সকলীকরণ করে পঞ্চকলা-রূপের বন্ধন/প্রকাশ ঘটান এবং শিষ্যকে শিবের কাছে সমর্পণ করেন। নিবৃত্তি-কলস থেকে ক্রমান্বয়ে অভিষেকের পর আচার্য ‘শিবহস্ত’ শিষ্যের মস্তকে স্থাপন করে তাকে শিবাচার্যরূপে নিয়োজিত করেন। এরপর পূজা, ১০৮ আহুতির হোম এবং শেষে পূর্ণাহুতিতে সমাপ্তি।
शिवाश्रम-नित्यनैमित्तिककर्मविधिः / Śaiva Āśrama-Duties: Daily and Occasional Rites (Morning Purity & Bath Procedure)
অধ্যায় ২১-এ কৃষ্ণ শিবের নিজ শাস্ত্রানুসারে শৈবাশ্রম সাধকের নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মের স্পষ্ট বিবরণ চান। উপমনু ভোরে ব্রাহ্মমুহূর্তে জাগা, অম্বা (শক্তি) সহ শিবধ্যান, তারপর নির্জনে প্রয়োজনীয় শারীরিক ক্রিয়া সম্পাদনের বিধি বলেন। শৌচ, দন্তধাবন, দন্তকাষ্ঠ না থাকলে বা কিছু তিথিতে নিষেধ থাকলে বিকল্প, এবং বারবার জল দিয়ে কুলকুচি করে মুখশুদ্ধির নির্দেশ আছে। নদী, পুকুর, সরোবর বা গৃহে ‘বারুণ স্নান’-এর পদ্ধতি—স্নানদ্রব্য গ্রহণ, বাহ্য অশুচি দূর করা, মৃৎ দ্বারা শুদ্ধি, স্নানের পর পরিচ্ছন্নতা—বিস্তারিতভাবে বর্ণিত। শুদ্ধ বস্ত্র ধারণ ও পুনঃশুদ্ধির উপর জোর দেওয়া হয়েছে; ব্রহ্মচারী, তপস্বী, বিধবা প্রভৃতির জন্য সুগন্ধি স্নান ও অলংকারসদৃশ আচরণ বর্জনীয়। উপবীত ও শিখা বেঁধে অবগাহন, আচমন, জলে ত্রিমণ্ডল স্থাপন, নিমজ্জিত অবস্থায় মন্ত্রজপ ও শিবস্মরণ, শেষে পবিত্র জলে আত্মাভিষেক—এভাবে দৈনন্দিন দেহচর্চা মন্ত্রকেন্দ্রিক শৈব সাধনায় রূপ পায়।
न्यासत्रैविध्य-भूतशुद्धि-प्रक्रिया (Threefold Nyāsa and the Procedure of Elemental Purification)
অধ্যায় ২২-এ উপমনু তিনপ্রকার ন্যাসের বিধান ব্যাখ্যা করেন—স্থিতি (স্থিতিকরণ), উৎপত্তি (প্রকাশ) ও সংহৃতি (লয়), যা বিশ্বপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রথমে আশ্রমভেদে (গৃহস্থ, ব্রহ্মচারী, যতি, বানপ্রস্থ) ন্যাসের শ্রেণিবিভাগ, পরে স্থিতিন্যাস ও উৎপত্তিন্যাসের দিক-ক্রম এবং সংহৃতিতে বিপরীত ক্রম বলা হয়েছে। এরপর বর্ণ-ন्यासে বিন্দুসংযোজন, আঙুল ও করতলে শিব-প্রতিষ্ঠা, দশ দিশায় অস্ত্রন্যাস এবং পঞ্চভূতাত্মক পঞ্চকলার ধ্যান বর্ণিত। হৃদয়, কণ্ঠ, তালু, ভ্রূমধ্য ও ব্রহ্মরন্ধ্র—এই সূক্ষ্ম দেহকেন্দ্রে স্থাপন করে বীজমন্ত্রে গ্রন্থন করা হয়; পঞ্চাক্ষরী বিদ্যার জপে শুদ্ধি সম্পন্ন হয়। পরে প্রাণনিগ্রহ, অস্ত্রমুদ্রায় ভূতগ্রন্থি ছেদন, সুষুম্না পথে আত্মার ব্রহ্মরন্ধ্র দিয়ে নির্গমন ও শিবতেজে একীভবন নির্দেশিত। বায়ু দ্বারা শোষণ, কালাগ্নিতে দহন, কলার লয় এবং অমৃত-প্লাবনে বিদ্যাময় দেহ পুনর্গঠন হয়। শেষে করন্যাস, দেহন্যাস, অঙ্গন্যাস, সন্ধিস্থলে বর্ণন্যাস, ষড়ঙ্গন্যাস, দিগ্বন্ধ ও সংক্ষিপ্ত বিকল্পও দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য দেহ-আত্মশোধন করে শিবভাব লাভ ও পরমেশ্বরের যথাযথ পূজাযোগ্যতা।
पूजाविधान-व्याख्या (Pūjāvidhāna-vyākhyā) — Exposition of the Procedure of Worship
অধ্যায় ২৩-এ উপমন्यु শিবের নিজস্ব উপদেশে শিবাকে প্রদত্ত পূজাবিধানের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেন। সাধক প্রথমে অন্তর্যাগ (আভ্যন্তর যাগ) সম্পন্ন করে, ইচ্ছানুসারে হোমাদি অগ্নিকর্ম যোগ করে, তারপর বহির্যাগে প্রবৃত্ত হয়। মানসিক বিন্যাস, পূজাদ্রব্যের শুদ্ধি ও ধ্যানের পর বিঘ্ননাশের জন্য বিনায়কের বিধিপূর্বক পূজা নির্দেশিত। এরপর দক্ষিণ ও উত্তরে অবস্থানকারী নন্দীশ ও সুয়শস প্রভৃতি পরিচরদের মানসে সম্মান করে সিংহাসন/যোগাসন অথবা ‘ত্রি-তত্ত্ব’ লক্ষণযুক্ত শুদ্ধ পদ্মাসন নির্মাণ করা হয়। সেই আসনে সাম্ব শিবের বিশদ ধ্যান—অতুল, অলংকৃত, চতুর্ভুজ, ত্রিনেত্র, নীলকণ্ঠ-প্রভাযুক্ত, সর্পাভরণধারী; বরদ-অভয় মুদ্রা এবং মৃগ ও টঙ্ক ধারণকারী—বর্ণিত। শেষে শিবের বামপার্শ্বস্থিত মাহেশ্বরীর প্রতি চিন্তন করে শিব–শক্তি যুগলতত্ত্বকে পূজাক্রমে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
पूजास्थानशुद्धिः पात्रशोधनं च — Purification of the Worship-Space and Preparation of Ritual Vessels
এই অধ্যায়ে উপমন्यु শিবপূজার উপযুক্ত পরিবেশ গঠনের শুদ্ধিক্রম বলেন। মূলমন্ত্রে জল ছিটিয়ে পূজাস্থান শুদ্ধ করা, চন্দন-সুগন্ধি জলে ভেজানো পুষ্প স্থাপন, অস্ত্রমন্ত্রে বিঘ্ননাশ, পরে অবগুণ্ঠন ও বর্মবন্ধন করে দিক্দিগন্তে অস্ত্রবিন্যাসে পূজাক্ষেত্র রক্ষা—এসব নির্দেশ আছে। তারপর দর্ভা বিছিয়ে প্রোক্ষণাদি দ্বারা শৌচ, সকল পাত্রশোধন ও দ্রব্যশুদ্ধি করা হয়। প্রোক্ষণী, অর্ঘ্য, পাদ্য ও আচমনীয়—এই চার পাত্র ধুয়ে, ছিটিয়ে ‘শিবজল’ দ্বারা সংস্কার করতে বলা হয়েছে। পাত্রে ধাতু-রত্ন, সুগন্ধ, ফুল, শস্য, পত্র ও দর্ভা প্রভৃতি মঙ্গলদ্রব্য যোগ এবং পাত্রভেদে উপাদান নির্দিষ্ট—স্নান/পানের জলে শীতল সুগন্ধ, পাদ্যে উশীর-চন্দন, এলাচ-কপুরাদি গুঁড়ো; অর্ঘ্যে কুশাগ্র, অক্ষত, যব/গম/তিল, ঘি, সর্ষে, ফুল ও ভস্ম। স্থান→রক্ষা→পাত্র→জল→উপহার—এই ক্রমে পবিত্রীকরণই অধ্যায়ের মূল ভাব।
आवरणपूजाविधानम् / The Procedure of Āvaraṇa (Enclosure) Worship
এই অধ্যায়ে উপমন्यु পূজার এক প্রযুক্তিগত পরিশিষ্ট বলেন—হবিস্-অর্পণ, দীপদান ও নীরাজনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কখন ও কীভাবে আবরণ-অর্চনা করতে হবে। শিব–শিবা কেন্দ্রস্থ করে বৃত্তাকার আবরণ-পূজার ক্রম নির্ধারিত; প্রথম আবরণে মন্ত্রজপ থেকে শুরু করে দিকানুসারে ক্রমে বিস্তার ঘটে। ঐশান্য, পূর্ব, দক্ষিণ, উত্তর, পশ্চিম, আগ্নেয় প্রভৃতি দিকক্রম বর্ণিত এবং ‘গর্ভ-আবরণ’কে অন্তঃস্থ মন্ত্রসমষ্টিরূপ আবরণ বলা হয়েছে। বাহ্য আবরণে ইন্দ্র(শক্র), যম, বরুণ, কুবের(ধনদ), অগ্নি(অনল), নৈঋতি, বায়ু/মারুত প্রভৃতি লোকপাল ও শক্তিদের স্থাপন-আহ্বান করা হয়। অঞ্জলি বেঁধে সুখাসনে বসে ‘নমঃ’ সূত্রে প্রত্যেক দেবতার নাম উচ্চারণ করে পূজার বিধান দেওয়া হয়েছে। সমগ্র অধ্যায়টি শিব-শক্তিকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে লিটুর্জিক মানচিত্রে রূপ দেয়।
पञ्चाक्षरमाहात्म्यम् / The Greatness of the Pañcākṣarī (Five-Syllable) Mantra
অধ্যায় ২৬-এ উপমনু শিক্ষা দেন যে অন্য তপস্যা বা যজ্ঞপথের চেয়ে শিব-মন্ত্রভক্তি শ্রেষ্ঠ। শুরুতে ব্রহ্মহত্যা, সুরাপান, চৌর্য, গুরু-শয্যা লঙ্ঘন, মাতৃ-পিতৃবধ, বীর বা ভ্রূণহত্যা ইত্যাদি মহাপাপের উল্লেখ আছে। পরে বলা হয়েছে—পরমকারণ শিবকে বিশেষত পঞ্চাক্ষরী মন্ত্রে আরাধনা করলে এসব পাপ ক্রমে ক্ষয় হয় এবং বারো বছরের ধাপে ধাপে শুদ্ধির মাধ্যমে মুক্তির পথ প্রসারিত হয়। একান্ত শিবভক্তি, ইন্দ্রিয়সংযম ও ভিক্ষা-নির্ভর নিয়মিত জীবন—এটাই ‘পতিত’ বলেও গণ্য ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট। কেবল জলব্রত, বায়ুভক্ষণ ইত্যাদি কঠোর তপস্যা নিজে থেকেই শিবলোকে পৌঁছায় না; কিন্তু পঞ্চাক্ষরীভক্তিতে একবারের পূজাও মন্ত্রের গৌরবে শিবধামে নিয়ে যায়। তপ ও যজ্ঞ, সর্বধন দক্ষিণা দিলেও, শিবমূর্তিপূজার তুল্য নয়; পঞ্চাক্ষরে পূজারী ভক্ত বাঁধা থাকুক বা পরে মুক্ত হোক—নিশ্চয়ই মুক্তি লাভ করে। রুদ্র/অরুদ্র স্তোত্র, ষড়ক্ষর, সূক্তমন্ত্র ইত্যাদি ভিন্ন রূপের কথাও আছে, তবে সিদ্ধান্তকারী হলো শিবভক্তি।
अग्निकार्य-होमविधिः (Agnikārya and Homa Procedure)
অধ্যায় ২৭-এ উপমনু অগ্নিকার্য ও হোমবিধির ক্রমানুসার ব্যাখ্যা দেন। কুণ্ড, স্থণ্ডিল, বেদি বা লৌহ/নব-শুভ মৃৎপাত্রে উপযুক্ত স্থানে অগ্নি স্থাপন, সংস্কার দ্বারা শুদ্ধিকরণ করে মহাদেবের পূজা, তারপর হোমাহুতি প্রদানের বিধান বলা হয়েছে। কুণ্ডের মাপ (এক-দুই হস্ত ইত্যাদি), বৃত্ত বা চতুষ্কোণ আকার, বেদি-মণ্ডল নির্মাণ, কেন্দ্রে অষ্টদল পদ্ম, এবং অঙ্গুল-প্রমাণ (২৪ অঙ্গুল = এক কর/হস্ত) উল্লেখ আছে। এক থেকে তিন মেখলা, স্থির ও শোভন মৃণ্ময় নির্মাণ, যোনিরূপের বিকল্প, দিক-নির্দেশ, কুণ্ড/বেদিতে গোবর-জল লেপন ও মণ্ডলকে গোবর-জলে শুদ্ধ করার কথাও আছে। সমগ্র অধ্যায়টি মহাদেব-কেন্দ্রিক শৈব হোমের আচার-স্থাপত্য নকশা।
नैमित्तिकविधिक्रमः (Occasional Rites and Their Procedure)
অধ্যায় ২৮-এ উপমন्यु শিবাশ্রম-অনুসারীদের জন্য নৈমিত্তিক ব্রত ও আচারের বিধিক্রম নির্দিষ্ট করেন, যা শিবশাস্ত্র-সম্মত পথে প্রতিষ্ঠিত। মাসিক ও পক্ষিক সূচিতে অষ্টমী, চতুর্দশী ও পার্বণ তিথিতে, এবং অয়ন-পরিবর্তন, বিষুব ও গ্রহণের মতো বিশেষ কালে পূজা-বৃদ্ধির নির্দেশ আছে। প্রতি মাসে ব্রহ্মকূর্চ প্রস্তুত করে তা দিয়ে শিবাভিষেক, উপবাস, এবং অবশিষ্ট অংশ ভক্ষণ—একে ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি গুরুদোষেরও উৎকৃষ্ট প্রায়শ্চিত্ত বলা হয়েছে। এরপর মাস-নক্ষত্রভিত্তিক কর্ম ও দান: পৌষে পুষ্য নক্ষত্রে নীরাজন, মাঘে মঘায় ঘৃত-কম্বল দান, ফাল্গুনান্তে মহোৎসব আরম্ভ, চৈত্রে চিত্রা পূর্ণিমায় দোলা-বিধি, বৈশাখে বিশাখায় পুষ্পোৎসব, জ্যৈষ্ঠে মূলায় শীতল জলঘট দান, আষাঢ়ে উত্তরাষাঢ়ায় পবিত্রারোপণ, শ্রাবণে মণ্ডল-সজ্জা, এবং পরে নির্দিষ্ট নক্ষত্রে জলক্রীড়া/প্রোক্ষণাদি। সমগ্র অধ্যায়টি ব্রত-পূজা-দান-উৎসবের এক লিতুর্জিক্যাল ক্যালেন্ডাররূপ নকশা।
काम्यकर्मविभागः — Taxonomy of Kāmya (Desire-Motivated) Śaiva Rites
অধ্যায় ২৯‑এ শ্রীকৃষ্ণ উপমনুকে জিজ্ঞাসা করেন—শিবধর্মের অধিকারীদের নিত্য‑নৈমিত্তিক কর্তব্যের পাশাপাশি কি কাম্যকর্মও আছে? উপমন্যু ফলকে ঐহিক, আমুষ্মিক ও উভয়ফলদায়ী—এই তিন ভাগে বিভক্ত করে সাধনার রূপ বলেন: ক্রিয়াময়, তপোময়, জপ‑ধ্যানময় ও সর্বময়; এবং ক্রিয়ার মধ্যে হোম, দান, অর্চনা প্রভৃতি ক্রমও নির্দেশ করেন। তিনি জানান, শক্তিসম্পন্নেরই ক্রিয়াকর্মে পূর্ণ ফল হয়, কারণ শক্তি পরমাত্মা শিবের আজ্ঞা/অনুমোদন; তাই শিবাজ্ঞাধারী কাম্যবিধি পালন করবে। পরে শৈব ও মাহেশ্বরদের অন্তঃ‑বহিঃ ক্রমে সম্পাদিত, ইহলোক‑পরলোক উভয় ফলদায়ী কর্মের কথা বলে তিনি স্পষ্ট করেন—‘শিব’ ও ‘মাহেশ্বর’ তত্ত্বত অভিন্ন; শৈবরা জ্ঞান‑যজ্ঞে, মাহেশ্বররা কর্ম‑যজ্ঞে নিবিষ্ট—অতএব একদল অন্তর্মুখী, অন্যদল বহির্মুখী, কিন্তু বিধি মূলত একই।
द्वितीयतृतीयावरणपूजाक्रमः | The Sequence of the Second and Third Enclosure Worship (Āvaraṇa-pūjā)
অধ্যায় ৩০ শৈব মণ্ডল-উপাসনায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় আবরণ-পূজার ক্রমকে বিধিবদ্ধভাবে ব্যাখ্যা করে। শুরুতে শিব-শিবার নিকটে হেরম্ব গণেশ ও ষণ্মুখ স্কন্দকে গন্ধ প্রভৃতি উপচারে পূজার নির্দেশ আছে। এরপর প্রথম আবরণে ঈশান দিক থেকে দিকক্রমে প্রত্যেক দেবতাকে তাঁর শক্তিসহ (সশক্তিক) পূজা করে সদ্যান্ত পর্যন্ত ক্রম সম্পন্ন করা হয়। শিব ও শিবার জন্য হৃদয়াদি ষড়ঙ্গের পূজা অগ্নিদিক প্রভৃতি স্থানে বিন্যাসসহ বলা হয়েছে; বাম প্রভৃতি আট রুদ্র তাঁদের বামা-শক্তিসহ দিকগুলিতে ক্রমানুসারে (ঐচ্ছিকভাবে) পূজ্য। তারপর দ্বিতীয় আবরণে দিকপত্রে শক্তিসহ শিব-রূপ স্থাপন—পূর্বে অনন্ত, দক্ষিণে সূক্ষ্ম, পশ্চিমে শিবোত্তম, উত্তরে একনেত্র; মধ্যদিকের পত্রে একরুদ্র, ত্রিমূর্তি, শ্রীকণ্ঠ ও শিখণ্ডীশ প্রভৃতিও শক্তিসহ। দ্বিতীয় আবরণে চক্রবর্তিন-রূপ রাজাদের পূজা এবং তৃতীয় আবরণে অষ্টমূর্তির শক্তিসহ বন্দনা—শক্তি-সংযোগেই পূজা পূর্ণ—এই তত্ত্ব প্রতিপাদিত।
पञ्चावरणमार्गस्थं योगेश्वरस्तोत्रम् (Pañcāvaraṇa-mārga Stotra to Yogeśvara Śiva)
অধ্যায় ৩১-এ উপমন्यु কৃষ্ণকে সম্বোধন করে পঞ্চাবরণ-মার্গের কাঠামোয় উপদিষ্ট ‘যোগেশ্বর শিব’-এর পুণ্য স্তোত্র ঘোষণা করেন। স্তোত্রে ঘন ঘন ‘জয় জয়’ ও ‘নমঃ’ উচ্চারণের মাধ্যমে শিবের বহু মহিমাময় উপাধি বিন্যস্ত হয়। শিবকে জগতের একমাত্র অধীশ্বর, স্বয়ং শুদ্ধ চৈতন্য, বাক্ ও মন অতিক্রান্ত পরতত্ত্ব রূপে বন্দনা করা হয়েছে—তিনি নিরঞ্জন, নিরাধার হয়েও সর্বাধার, নিষ্কারণোদয়, নিরন্তর পরমানন্দ এবং মোক্ষ-শান্তির পরম কারণ। সর্বব্যাপিতা, অপ্রতিহত শক্তি, অতুল ঐশ্বর্য ও অবিনাশিত্ব প্রতিপাদিত হয়ে এই অধ্যায় পাঠ-লিতুর্গি ও তত্ত্বসার হিসেবে ভক্তের মনকে স্তরে স্তরে ধ্যানে পরিচালিত করে কর্মসমাপ্তি ও আধ্যাত্মিক সিদ্ধির দিকে নিয়ে যায়।
मन्त्रसिद्धिः, प्रतिबन्धनिरासः, श्रद्धा-नियमाः (Mantra Efficacy, Removal of Obstacles, and the Role of Faith/Discipline)
অধ্যায় ৩২-এ উপমন्यु কৃষ্ণকে বলেন—ইহ-পর উভয় সাফল্যদায়ক সাধনার কথা থেকে তিনি বিশেষভাবে এই জন্মেই শৈব ফল লাভের উপায় ব্যাখ্যা করেন: পূজা, হোম, জপ, ধ্যান, তপস্যা ও দানের সমন্বিত অনুশাসন। প্রথমে মন্ত্র ও তার অর্থ যথার্থভাবে জেনে মন্ত্র-সংসাধন/সংস্কার করা আবশ্যক; তার ভিত্তিতেই ক্রিয়া ফলপ্রসূ হয়। এরপর ‘প্রতিবন্ধ’ নামে অদৃষ্ট শক্তিশালী বাধার কথা বলা হয়েছে, যা সিদ্ধ মন্ত্রের ফলও রুদ্ধ করতে পারে। বাধার লক্ষণ দেখা দিলে তাড়াহুড়ো না করে শকুনাদি লক্ষণ পরীক্ষা করে প্রায়শ্চিত্ত ও শমন করতে বলা হয়েছে। ভুল বিধি বা মোহে করা কর্ম নিষ্ফল হয় এবং লোকহাস্য ডেকে আনে; দৃশ্যফল-কর্মে অবিশ্বাস শ্রদ্ধাহীনতার লক্ষণ, শ্রদ্ধাহীন ফল পায় না। দেবতার দোষ নয়—বিধিপূর্বক করলে ফল দেখা যায়। শেষে বলা হয়েছে, বাধা দূর হলে সিদ্ধ সাধক বিশ্বাস-শ্রদ্ধায় স্থির থাকে; ইচ্ছা করলে ব্রহ্মচর্য ও নিয়ত আহার (রাত্রে হবিষ্য, পায়স, ফল) গ্রহণ করে সিদ্ধি লাভ করে।
केवलामुष्मिकविधिः — The Rite for Exclusive Otherworldly Attainment (Liṅga-Abhiṣeka and Padma-Pūjā Protocol)
উপমনু এক অতুলনীয় ব্রত ঘোষণা করেন, যা সম্পূর্ণ ‘অমুষ্মিক’ (পরলোকসাধক) বিধি—তিন লোকেই এর তুল্য কর্ম নেই। তিনি বলেন, এই ব্রত সকল দেবতাই করেছেন—বিশেষত ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র; ইন্দ্র ও লোকপালগণ; সূর্যাদি নবগ্রহ; বিশ্বামিত্র-বাসিষ্ঠ প্রমুখ ব্রহ্মবিদ মহর্ষি; এবং শিবভক্ত ঋষি যেমন শ্বেত, অগস্ত্য, দধীচি। নন্দীশ্বর, মহাকাল, ভৃঙ্গীশ প্রভৃতি গণেশ্বর, এমনকি দৈত্য, শেষাদি মহানাগ, সিদ্ধ, যক্ষ, গন্ধর্ব, রাক্ষস, ভূত ও পিশাচরাও এ অনুষ্ঠান করেছে। এই ব্রতে সকলেই নিজ নিজ পদ লাভ করে, দেবগণ দেবত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়—ব্রহ্মা ব্রহ্মত্ব, বিষ্ণু বিষ্ণুত্ব, রুদ্র রুদ্রত্ব, ইন্দ্র ইন্দ্রত্ব, গণেশ গণেশত্ব প্রাপ্ত হন। পরে বিধান—শ্বেত চন্দনে সুগন্ধিত জলে লিঙ্গাভিষেক, প্রস্ফুটিত শ্বেত পদ্মে পূজা, প্রণাম, এবং যথালক্ষণ সুন্দর পদ্মাসন নির্মাণ; সামর্থ্য থাকলে স্বর্ণ-রত্নে শোভিত করে, কেশরজালের মধ্যভাগে ক্ষুদ্র লিঙ্গ স্থাপন।
लिङ्गप्रतिष्ठा-माहात्म्यम् / The Greatness of Liṅga Installation
এই অধ্যায়ে লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠা ও বেরা/প্রতিমা-স্থাপনাকে তৎক্ষণাৎ ফলদায়ক বিধি বলা হয়েছে, যা নিত্য, নৈমিত্তিক ও কাম্য সিদ্ধি প্রদান করে। উপমনু বলেন—জগৎ লিঙ্গময়; সবই লিঙ্গে প্রতিষ্ঠিত, আর লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হলে স্থিতি, শৃঙ্খলা ও মঙ্গল প্রতিষ্ঠা পায়। কৃষ্ণের প্রশ্নে লিঙ্গের স্বরূপ, মহেশ্বরের ‘লিঙ্গী’ভাব এবং কেন শিব লিঙ্গরূপে পূজিত—তা ব্যাখ্যা করা হয়। লিঙ্গ অব্যক্ত, ত্রিগুণ-সম্পর্কিত, সৃষ্টি-লয়ের মূল, অনাদি-অনন্ত এবং জগতের উপাদান-কারণ; সেই মূল প্রকৃতি/মায়া থেকে চরাচর জগৎ উদ্ভূত। শুদ্ধ-অশুদ্ধ-শুদ্ধাশুদ্ধ ভেদে দেবতাদের অবস্থানও নির্দেশিত। অতএব ইহ-পর কল্যাণার্থে পূর্ণ প্রয়াসে লিঙ্গ-প্রতিষ্ঠা করা উচিত; এটি শিবের আজ্ঞায় বিশ্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার মহাকর্ম।
प्रणवविभागः—वेदस्वरूपत्वं लिङ्गे च प्रतिष्ठा (The Division of Oṃ, Its Vedic Forms, and Its Placement in the Liṅga)
এই অধ্যায়ে প্রণব (ॐ)কে ব্রহ্ম/শিবের পরম নাদ-চিহ্ন এবং বৈদিক প্রকাশের বীজরূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উপমনু ‘ॐ’চিহ্নিত অনুরণিত ধ্বনির আবির্ভাব বর্ণনা করেন, যা রজস ও তমসের আচ্ছাদনে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু প্রথমে বুঝতে পারেন না। পরে একাক্ষরকে চার ভাগে বিশ্লেষণ করা হয়—অ, উ, ম (তিন মাত্রা) এবং নাদরূপ অর্ধমাত্রা। এগুলিকে লিঙ্গের স্থান-প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়—অ দক্ষিণে, উ উত্তরে, ম মধ্যভাগে, আর নাদ শিখরে শ্রুত; এবং বেদের সঙ্গে—অ=ঋগ্বেদ, উ=যজুর্বেদ, ম=সামবেদ, নাদ=অথর্ববেদ। গুণ, সৃষ্টিকার্য, তত্ত্ব, লোক, কলা/অধ্ব ও সিদ্ধিসদৃশ শক্তির স্তরে স্তরে সম্পর্ক দেখিয়ে মন্ত্র-veda-জগত্গঠনকে শৈব দৃষ্টিতে পরস্পরব্যাখ্যামূলক করা হয়েছে।
लिङ्ग-बेर-प्रतिष्ठाविधिः / The Procedure for Installing the Liṅga and the Bera (Icon)
অধ্যায় ৩৬ উপদেশমূলক সংলাপ। কৃষ্ণ শিবপ্রদত্ত লিঙ্গ ও বের (প্রতিমা)-প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠ বিধি জানতে চান। উপমন्यु ক্রম নির্দেশ করেন—অশুভবর্জিত শুভ দিন (বিশেষত শুক্লপক্ষ) নির্বাচন, শাস্ত্রমাপ অনুযায়ী লিঙ্গ নির্মাণ, ভূমি পরীক্ষা করে শুভ স্থান নির্ধারণ। প্রারম্ভিক উপচারে প্রথমে গণেশপূজা, তারপর স্থানশুদ্ধি ও লিঙ্গকে স্নানস্থানে নিয়ে যাওয়া। শিল্পশাস্ত্র মতে স্বর্ণলেখনী দিয়ে কুঙ্কুমাদি রঞ্জকে রেখাঙ্কন/অঙ্কন করা হয়। লিঙ্গ ও পিণ্ডিকাকে মাটি-জল মিশ্রণ ও পঞ্চগব্য দ্বারা শোধন করে বেদিকা-সহ পূজা করা হয়। পরে দিব্য জলাশয়ে নিয়ে অধিবাসের জন্য স্থাপন করা হয়। অধিবাস-মণ্ডপ তোড়ণ, আবরণ, দরভা-মালা, অষ্টদিগ্গজ, অষ্ট দিকপাল-কলস ও অষ্টমঙ্গল চিহ্নে সজ্জিত; দিকপালদের পূজা হয়। মধ্যস্থ বৃহৎ পীঠে পদ্মাসন-চিহ্ন দিয়ে পরবর্তী প্রতিষ্ঠা-ক্রিয়া শুদ্ধি, দিক্নিয়ম ও দেবক্রমে অগ্রসর হয়।
योगप्रकारनिर्णयः (Classification and Definition of Yoga)
এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ ‘পরম-দুর্লভ’ যোগের যথার্থ বিবরণ চান—অধিকার, অঙ্গ, বিধি, প্রযোজন এবং মৃত্যুর কারণ-নির্ণয়—যাতে সাধক আত্মবিনাশ এড়িয়ে তৎক্ষণাৎ ফল লাভ করতে পারে। উপমন्यु শৈব দৃষ্টিতে যোগকে শিবে স্থিরচিত্তের দৃঢ় অবস্থান বলে নিরূপণ করেন, অন্তঃকরণের চঞ্চল বৃত্তি-নিগ্রহের পর তা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর যোগের পাঁচ প্রকার ক্রমান্বয়ে বলা হয়—মন্ত্রযোগ, স্পর্শযোগ (প্রাণায়াম-সম্পর্কিত), ভাবযোগ, অভাবযোগ এবং সর্বোচ্চ মহাযোগ। মন্ত্রজপ ও অর্থচিন্তা, প্রাণনিয়মন, ভাবধ্যান এবং দৃশ্য-প্রপঞ্চের সত্যে লয়—এই লক্ষণে সমর্থ ধ্যান থেকে ক্রমে সূক্ষ্ম নির্বিকল্প লীনতা পর্যন্ত সাধনার শ্রেণিবিন্যাস উপস্থাপিত।
अन्तराय-उपसर्ग-विवेचनम् / Analysis of Yogic Obstacles (Antarāyas) and Upasargas
এই অধ্যায়ে উপমন्यु যোগসাধকদের পথে যে অন্তরায় (বিঘ্ন) আসে তার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেন। তিনি দশটি প্রধান বাধা বলেন—আলস্য, তীব্র রোগ, প্রমাদ, পথ বা সাধনাস্থান বিষয়ে সংশয়, চিত্তের অস্থিরতা, অশ্রদ্ধা, বিপর্যয় (উল্টো বিচার), দুঃখ, বিষণ্ণতা/দৌর্মনস্য, এবং বিষয়াসক্ত চিত্তবিক্ষেপ। পরে প্রতিটির লক্ষণ নির্ণয় করেন—রোগ দেহ ও কর্মকারণজাত, সংশয় বিকল্পের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত বোধ, অস্থিরতা মননের ভিত্তিহীনতা, অশ্রদ্ধা যোগপথে ভাবশূন্যতা, বিপর্যয় ভ্রান্ত দৃষ্টি। দুঃখকে তিন ভাগে—আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক, আধিদৈবিক; বিষণ্ণতা অপূর্ণ কামনা থেকে, আর বিক্ষেপ নানা বিষয়ের দিকে মনের ছড়িয়ে পড়া। এসব বিঘ্ন প্রশমিত হলে যোগীর কাছে সিদ্ধির নিকটতার ‘দৈব’ উপসর্গও দেখা দিতে পারে, যা ভুল বুঝলে বিভ্রান্তি আনে। ছয় উপসর্গ—প্রতিভা, শ্রবণ, বার্তা, দর্শন, আস্বাদ, বেদনা। অধ্যায়ের লক্ষ্য—বিঘ্ন ও অদ্ভুত লক্ষণ চিনে সাধনাকে মোক্ষের দিকে স্থির রাখা।
ध्यानप्रकारनिर्णयः / Determination of the Modes of Meditation (on Śrīkaṇṭha-Śiva)
অধ্যায় ৩৯-এ শ্রীকণ্ঠ-শিবকে কেন্দ্র করে ধ্যানের ক্রমবদ্ধ সাধনা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উপমনু বলেন, যোগীরা শ্রীকণ্ঠকে ধ্যান করেন, কারণ তাঁর স্মরণমাত্রেই তৎক্ষণাৎ অভীষ্টসিদ্ধি হয়। মন স্থির করার জন্য স্থূল (বিষয়-আশ্রিত) ধ্যান, তারপর সূক্ষ্ম ও নির্বিষয় প্রবৃত্তির ভেদ দেখানো হয়েছে। শিবকে সরাসরি চিন্তা করলে সর্বসিদ্ধি লাভ হয়; অন্য রূপ ধ্যান করলেও অন্তরে শিবরূপকে মূল আশ্রয় করে স্মরণ করতে বলা হয়েছে। ধ্যানকে পুনরাবৃত্তিজনিত স্থৈর্য বলা হয়েছে—সবিশয় থেকে নির্বিষয়ের দিকে গতি। ‘নির্বিষয়’কে বুদ্ধিসন্ততির ধারাবাহিক প্রবাহ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা নিরাকার আত্মবোধের দিকে ঝোঁকে। সবীজ-নির্বীজ ধ্যানে প্রথমে সবীজ, শেষে নির্বীজের উপদেশ; প্রाणায়াম থেকে শান্তি প্রভৃতি ক্রমিক ফলও উল্লিখিত।
अवभृथस्नान-तीर्थयात्रा-तेजोदर्शनम् | Avabhṛtha Bath, Tīrtha-Pilgrimage, and the Vision of Divine Radiance
অধ্যায় ৪০-এ উপদেশ থেকে অগ্রসর হয়ে আচার-অনুষ্ঠান ও তীর্থযাত্রার বর্ণনা আছে। সূত বলেন, বায়ু যাদব ও উপমনুর প্রসঙ্গে জ্ঞানযোগের কাহিনি মুনিদের শুনিয়ে অন্তর্ধান করেন। এরপর নৈমিষারণ্যের ঋষিরা প্রভাতে সত্রযজ্ঞের সমাপ্তির জন্য অবভৃথস্নান করতে যান। ব্রহ্মার আদেশে দেবী সরস্বতী মধুর জলে পূর্ণ শুভ নদীরূপে প্রকাশিত হন; ঋষিরা স্নান করে যজ্ঞ সম্পন্ন করেন। শিব-সম্পর্কিত জলে দেবতাদের তर्पণ করে পূর্বঘটনা স্মরণে বারাণসীর পথে যাত্রা করেন। পথে হিমবত থেকে দক্ষিণমুখে প্রবাহিত ভাগীরথী (গঙ্গা) তে স্নান করে এগিয়ে যান। বারাণসীতে পৌঁছে উত্তরবাহিনী গঙ্গায় নিমজ্জিত হয়ে বিধিমতে অবিমুক্তেশ্বর লিঙ্গের পূজা করেন। প্রস্থানকালে আকাশে কোটি সূর্যের ন্যায় দীপ্ত, সর্বদিকে ব্যাপ্ত এক মহাদ্ভুত দিব্য তেজ দর্শন করেন; ভস্মলিপ্ত পাশুপত সিদ্ধগণ শতশত এসে সেই তেজে লীন হয়ে শৈব পরমসিদ্ধি ও শিবশক্তির অতীন্দ্রিয় অবস্থানের ইঙ্গিত দেন।
स्कन्दसरः (Skandasara) — तीर्थवर्णनम् / Description of the Skandasara Sacred Lake
অধ্যায় ৪১-এ সূত মুনি তীর্থকেন্দ্রিক বর্ণনা দেন। ‘স্কন্দসর’ নামে এক পবিত্র সরোবরের অবস্থান ও স্বরূপ বলা হয়েছে—সমুদ্রসম বিস্তৃত, কিন্তু জল মধুর, শীতল, নির্মল ও সহজলভ্য। স্ফটিকময় তট, ঋতুপুষ্প, পদ্ম ও জলজ উদ্ভিদ, আর মেঘের মতো তরঙ্গ মিলিয়ে এক ‘পৃথিবীতে স্বর্গীয় আকাশ’সদৃশ দৃশ্য রচিত হয়। এরপর মুনি ও মুনিকুমাররা স্নান ও তীর্থজল সংগ্রহের বিধি পালন করেন; ভস্ম, ত্রিপুণ্ড্র, শ্বেতবস্ত্র ও নিয়ত আচারে শৈব তপস্বীর লক্ষণ ফুটে ওঠে। ঘট, কলস, কমণ্ডলু, পত্রপাত্র ইত্যাদি জলবহন উপকরণ উল্লেখিত এবং জল সংগ্রহের উদ্দেশ্য—নিজের জন্য, অন্যের জন্য, বিশেষত দেবতাদের জন্য—বর্ণিত। এভাবে স্থান-সৌন্দর্য থেকে আচরণবিধি ও তীর্থজলের পুণ্য-ব্যবস্থা পর্যন্ত সবই শিবকেন্দ্রিক শুদ্ধি ও পুণ্যের ভাব প্রকাশ করে।