Opening the text

बालकाण्ड
The Book of Childhood
বালকাণ্ড রামায়ণের স্থাপত্যভিত্তি। এখানে কাব্যের জন্ম (কাব্য-জন্ম), শ্রীরামের ধর্মময় স্বরূপ-প্রতিষ্ঠা, এবং বংশ, যজ্ঞ ও বিশ্ব-ব্যবস্থার সেই পূর্বশর্তগুলি বর্ণিত হয়, যা পরবর্তীতে মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় সংঘাতকে অনিবার্য করে তোলে। সূচনায় বাল্মীকির নারদের কাছে জিজ্ঞাসা এবং নারদপ্রদত্ত “রামায়ণ-কথা-সংক্ষেপ” কাহিনির নকশা ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি স্থির করে। এরপর ক্রৌঞ্চ-পক্ষীর করুণ ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রথম শ্লোকের উদ্ভব—করুণারস-নির্ভর এক কাব্যধর্মের ঘোষণা—রামায়ণকে নৈতিক-সৌন্দর্যশিক্ষার পবিত্র মাধ্যম হিসেবে বৈধতা দেয়। বাল্মীকি কাব্য রচনা করে কুশ ও লবকে অর্পণ করেন; পাঠ, গীত, রস ও স্বর-তালবিন্যাসসহ পরিবেশন-পরম্পরার গুরুত্বও এখানে স্পষ্ট। কাহিনির ধারায় অযোধ্যার আদর্শ রাজনীতি ও দশরথের রাজধর্মের বর্ণনা আসে, কিন্তু উত্তরাধিকারহীনতার যজ্ঞ-সঙ্কটও দেখা দেয়। অশ্বমেধ ও পুত্রেষ্টি যজ্ঞ, ঋষ্যশৃঙ্গের ভূমিকা, এবং দিব্য পায়স-বিতরণের ফলে চার রাজপুত্রের জন্ম হয়; রামকে বিষ্ণুর আংশিক অবতাররূপে প্রতিপন্ন করা হয়। এতে রাজবংশের ধারাবাহিকতা ও ধর্মরক্ষার দैব পরিকল্পনা একত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় প্রধান পর্ব বিশ্বামিত্রের আহ্বানে শুরু। রাম রাজধর্ম ও তপোধর্মের সমন্বয়ে দীক্ষিত হন, দিব্যাস্ত্র লাভ করেন, এবং তাটকা-বধ, মারীচ-সুবাহুকে দমন ও যজ্ঞরক্ষার মাধ্যমে লোকরক্ষার প্রথম মহান কর্ম সম্পাদন করেন। পাশাপাশি গঙ্গাবতরণ, সগরপুত্রদের কাহিনি এবং বিশ্বামিত্রের নিজস্ব রূপান্তর-আখ্যানের মতো কারণকথা প্রবাহিত হয়, যা তপস্যার শক্তি, বংশপরম্পরা ও ধর্মব্যবস্থার গভীরতা উন্মোচন করে। গৌতমাশ্রমে অহল্যার মুক্তি রামকে শুদ্ধিকারী ও ধর্ম-প্রতিষ্ঠাকারী অনুগ্রহের প্রতীক করে তোলে। মিথিলায় জনকের সভায় শিবধনু প্রদর্শন, রামের দ্বারা ধনুতে জ্যা আরোপ ও ভঙ্গ, এবং সীতাস্বয়ংবর-জয় কাণ্ডের শিখর। এরপর চার ভ্রাতার বিবাহ—রাম-সীতা, লক্ষ্মণ-ঊর্মিলা, ভরত-মাণ্ডবী, শত্রুঘ্ন-শ্রুতকীর্তি—রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মৈত্রীকে সুদৃঢ় করে। পরশুরামের সঙ্গে সাক্ষাৎ এক আচারগত-প্রতীকী মুহূর্ত, যেখানে রামের শ্রেষ্ঠত্বের দ্বারা যুদ্ধ-তেজ ও দैব কর্তৃত্বের স্থানান্তর সূচিত হয়। IIT কানপুরে সংরক্ষিত দক্ষিণী পাঠ-পরম্পরায় বালকাণ্ডে কিছু অতিরিক্ত প্রাচীন শ্লোক ও বিস্তারও দেখা যায়, যা যজ্ঞবিধি, বংশলতিকা ও উপদেশমূলক কাঠামোকে আরও সামনে আনে। এইভাবে ২৪,০০০ শ্লোকের আদিকাব্যের জীবন্ত ধারায় বালকাণ্ড করুণা, ধর্ম, যজ্ঞ, তপস্যা ও রাজনীতিকে একসূত্রে বেঁধে রামকথার ভিত্তি স্থাপন করে।
श्रीमद्रामायणकथासङ्क्षेपः / The Ramayana in Synopsis (Narada’s Summary to Valmiki)
প্রথম সর্গটি ভূমিকারূপে সমগ্র রামায়ণকথার সংক্ষিপ্তসার প্রদান করে। তপস্যা ও স্বাধ্যায়ে নিবিষ্ট মহর্ষি বাল্মীকি নারদকে জিজ্ঞাসা করেন—জগতে কি এমন আদর্শ মানব আছেন যিনি সত্যবাদী, কৃতজ্ঞ, সংযমী, বীর ও পরোপকারী, সর্বগুণসম্পন্ন? নারদ উত্তর দেন—ইক্ষ্বাকুবংশে শ্রীरामই সেই ধর্মাত্মা পুরুষ; তারপর তিনি রামের চরিতকে সুসংবদ্ধভাবে সংক্ষেপে বর্ণনা করেন—রামের মহৎ গুণাবলি, দশরথের যুবরাজাভিষেকের সংকল্প, কৈকেয়ীর বরদানে বনবাস, এবং সীতা ও লক্ষ্মণের সহগমন। এরপর দশরথের মৃত্যু, ভরত রাজ্য গ্রহণ না করে পাদুকাকে রাজচিহ্ন করে শাসন পরিচালনা, দণ্ডকারণ্যে ঋষিসেবা, বিরাধবধ, অগস্ত্যের নিকট থেকে দিব্যাস্ত্রলাভ, শূর্পণখা-প্রসঙ্গ ও জনস্থানযুদ্ধ বলা হয়। পরে মারীচের কৌশলে রাবণের সীতাহরণ, জটায়ুর বীরমৃত্যু ও অন্ত্যেষ্টি, কবন্ধবধ ও শবরীর দর্শন, হনুমানের মাধ্যমে সুগ্রীবের সঙ্গে মৈত্রী, বালিবধ এবং বানরদের সীতান্বেষণ—সবই সংক্ষেপে আসে। হনুমানের সমুদ্রলঙ্ঘন করে লঙ্কায় সীতাদর্শন ও প্রত্যাবর্তন, নলের সেতুবন্ধ, লঙ্কাবিজয়, রাবণবধ, অগ্নিপরীক্ষা, বিভীষণের অভিষেক, অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন ও রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা—এইভাবে কাহিনি সমাপ্ত হয়। শেষে ফলশ্রুতিতে বলা হয়, এই পবিত্র রামায়ণ পাঠ-শ্রবণে সকলের বিদ্যা, সমৃদ্ধি ও পুণ্যলাভ হয়।
द्वितीयः सर्गः · श्लोकप्रादुर्भावः (The Manifestation of the Śloka)
নারদকে যথাযথ সম্মান দিয়ে বিদায় করার পর বাল্মীকি গঙ্গার নিকট তমসা নদীর তীরে স্নানের জন্য যান। সেখানে শান্ত ও পবিত্র তীর্থ দেখে তিনি শিষ্য ভরদ্বাজকে সেই স্থানের শুচিতা ও সৌন্দর্য জানান। নিকটবর্তী বনে তিনি মধুরস্বরে গীত গাইতে থাকা অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী ক্রৌঞ্চ-পাখির এক জোড়া দেখেন। তখন পাপবুদ্ধি ও নিষ্ঠুরতায় প্ররোচিত এক নিষাদ শিকারি পুরুষ ক্রৌঞ্চকে বধ করে; স্ত্রী পাখির করুণ বিলাপে বাল্মীকির হৃদয়ে দয়া ও ক্রোধ জাগে। সেই শোক-ক্রোধ থেকেই তাঁর মুখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছন্দোবদ্ধ শাপরূপ বাক্য বেরিয়ে আসে—যা প্রথম শ্লোক হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়। বাল্মীকি সেই বাক্যের স্বরূপ চিন্তা করে তার চার পাদ, সমান অক্ষরমাত্রা ও লয়মাধুর্য প্রকাশ করেন। আশ্রমে ফিরে ঘটনাটিতে নিমগ্ন থাকতেই ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে শ্লোকের সত্যতা স্বীকার করেন এবং এই ছন্দেই শ্রীरामের সমগ্র ইতিহাস রচনার আদেশ দেন; গোপন ঘটনাসহ সত্য জ্ঞান দান করেন। তিনি রামায়ণের চিরস্থায়ী মহিমা ও বাল্মীকির অমর খ্যাতি ভবিষ্যদ্বাণী করে অন্তর্ধান হন। এরপর শিষ্যরা বারবার সেই শ্লোক আবৃত্তি করে, আর বাল্মীকি নবপ্রকাশিত ছন্দে সম্পূর্ণ মহাকাব্য রচনার সংকল্প গ্রহণ করেন।
तृतीयः सर्गः (Bālakāṇḍa 3): Vālmīki’s Yogic Verification and the Epic Synopsis
নারদমুনির কাছ থেকে সম্পূর্ণ রামকথা শ্রবণ করে ধর্মাত্মা বাল্মীকি আরও স্পষ্ট জ্ঞান লাভের ইচ্ছা করেন (১.৩.১)। তিনি আচমন করে শুচি হয়ে কুশাসনে বসে করজোড়ে তপস্যা ও ধর্মের দ্বারা ঘটনাপ্রবাহের সত্যতা অনুসন্ধান করতে লাগলেন (১.৩.২)। তখন যোগদৃষ্টিতে তিনি রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, দশরথ এবং সমগ্র রাজ্যকে প্রত্যক্ষের মতো দেখলেন—হাতে আমলক ফলের ন্যায় স্পষ্ট (১.৩.৬); তাঁদের বাক্য, হাস্য, সংকল্প এবং কর্মফল পর্যন্ত যথার্থভাবে উপলব্ধি করলেন (১.৩.৩–১.৩.৫)। এই সত্যদর্শনের পর বাল্মীকি স্থির করলেন—ধর্মকে প্রধান লক্ষ্য করে, কাম ও অর্থকে যথোচিতভাবে সংযোজিত করে এমন এক মহাকাব্য রচনা করবেন, যা রত্নসমৃদ্ধ সাগরের মতো এবং শ্রবণ ও মনকে আনন্দ দেবে (১.৩.৭–১.৩.৮)। এরপর এই সর্গে রামায়ণের প্রধান পর্বগুলির বিস্তৃত সংক্ষিপ্তসার দেওয়া হয়—রামের জন্ম ও গুণ, বনবাস, মিত্রতা ও সহায়তা, লঙ্কাযাত্রা, যুদ্ধ, রাজ্যাভিষেক, এবং উত্তরকাণ্ডে বর্ণিত পরবর্তী ঘটনাবলি (১.৩.১০–১.৩.৩৮); ফলে এটি কাব্যের পরিসরের এক অন্তর্নিহিত সূচিপত্ররূপে কাজ করে।
कुशिलवगानप्रशंसा · The Commissioning and Public Performance of the Rāmāyaṇa
এই চতুর্থ সর্গে রামায়ণকে রচিত, শিক্ষণীয় এবং জনসমক্ষে গেয়-আবৃত্তিযোগ্য ‘ইতিহাস-কাব্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দিব্য ঋষি বাল্মীকি শ্রীरामের সম্পূর্ণ জীবনচরিত—রাজ্য পুনরুদ্ধার পর্যন্ত—সংকলন করেন এবং গ্রন্থের মানদণ্ডও নির্দিষ্ট করেন: চব্বিশ হাজার শ্লোক, ছয় কাণ্ড, এবং অতিরিক্ত উত্তরকাণ্ড। এরপর কবি ভাবেন—কে এই কাব্য যথাযথভাবে অভিনীত/গীত-পাঠ করতে সক্ষম। এ সময় তপস্বী-বেশে কুশ ও লব উপস্থিত হয়। তারা ধর্মজ্ঞ রাজপুত্র হিসেবে পরিচিত হয় এবং বাল্মীকি তাদের দীক্ষা দেন, যাতে এই কাব্য ‘বেদের উপবৃংহণ’ (vedopabṛṃhaṇa) হয়। তাদের পরিবেশনার বর্ণনায় সঙ্গীতশাস্ত্রীয় লক্ষণও আসে—আবৃত্তি ও গান, তিন তাল-প্রমাণ, সাত স্বর, তন্ত্রীবাদ্যের সময়-নিয়ম, এবং নানা রস—ফলে রামায়ণ বহুমাধ্যম সাংস্কৃতিক কীর্তি হিসেবে উদ্ভাসিত হয়। ঋষিসভা ও নগরপথে তাদের গীত-পাঠ শুনে শ্রোতাদের চোখে অশ্রু আসে, প্রশংসা ধ্বনিত হয়, এবং দান-উপহার অর্পিত হয়। পরে শ্রীराम তাদের সাক্ষাৎ করেন, রাজপ্রাসাদে সাদরে আতিথ্য দেন এবং রাজসভায় বিধিবৎ পাঠের অনুরোধ করেন; সেখানে পরিবেশনা এমন প্রত্যক্ষ অনুভূতি জাগায়, যেন অতীত ঘটনাই বর্তমান হয়ে উঠেছে।
अयोध्यानगरवर्णनम् (Description of Ayodhya and the Ikshvaku Royal Setting)
এই পঞ্চম সর্গে প্রজাপতি/মনু থেকে আরম্ভ করে বিজয়ী রাজাদের প্রাচীন সার্বভৌম ধারাকে ইক্ষ্বাকু বংশের সঙ্গে সংযুক্ত করে রামায়ণ-কথার মহিমা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরযূ-তীরে অবস্থিত কোসলদেশের উল্লেখ করে, পরম্পরায় মনু-নির্মিত বলে খ্যাত অযোধ্যাকে আদর্শ রাজধানীরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। অযোধ্যা যোজনায় পরিমিত, সুপরিকল্পিত রাজপথে বিন্যস্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ নাগরিক-ব্যবস্থায় সমৃদ্ধ ও রুচিশীল। পরিখা ও প্রাচীরের দৃঢ় প্রতিরক্ষা, দ্বার ও বাজার, কারিগর ও বণিক, প্রাসাদ ও রত্নখচিত গৃহ, বাদ্য-গীতের ধ্বনি, উদ্যান ও আম্রকানন, এবং খাদ্য-সামগ্রীর প্রাচুর্য—এই সব নগরকাব্যে একে চিত্রিত করা হয়েছে। এখানে সহস্র সহস্র মহারথী ধনুর্বিদ্যায় ও অরণ্যযুদ্ধে দক্ষ; প্রজারা বেদ-বেদাঙ্গে পারদর্শী, যজ্ঞকর্মে নিয়ত, দানশীল ও সত্যনিষ্ঠ। এই ধর্মসমৃদ্ধ নগরপরিবেশে রাজা দশরথের অবস্থান দেখিয়ে অযোধ্যাকে ন্যায়শাসনের স্থানিক প্রতিমা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
अयोध्यावर्णनम् · Description of Ayodhya under Daśaratha
এই ষষ্ঠ সর্গে প্রথমে রাজা দশরথের রাজধর্মময় পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তিনি বেদবিদ্যায় পারদর্শী, সর্বসংগ্রহে (প্রশাসনে) দক্ষ, দূরদর্শী, নগর ও জনপদের প্রিয়, যুদ্ধকুশলী, যজ্ঞপরায়ণ এবং জিতেন্দ্রিয়; তাঁর শাসন মনুর ন্যায় প্রজারক্ষাকারী বলে তুলনা করা হয়েছে। এরপর অযোধ্যার সমৃদ্ধি ও শুচিতার বর্ণনা আসে। নাগরিকেরা অলংকৃত, সুসজ্জিত, খাদ্য-সম্পদে পরিপূর্ণ এবং দৃশ্যমান দারিদ্র্যহীন। চুরি, নিষ্ঠুরতা, নাস্তিকতা, মিথ্যা, অদক্ষতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার অনুপস্থিতি বিশেষভাবে বলা হয়েছে; দানশীলতা, আহারে তৃপ্তি এবং কাম-ক্রোধাদি সংযম সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত। ব্রাহ্মণেরা স্বধর্মনিষ্ঠ, বেদাঙ্গবিদ, অধ্যয়ন ও দানে নিবেদিত এবং দান গ্রহণ ও গৃহজীবনে সংযত। বর্ণব্যবস্থা সুশৃঙ্খল—ক্ষত্রিয়েরা ব্রাহ্মণদের সম্মান করে, বৈশ্যেরা ক্ষত্রিয়দের অনুসারী, শূদ্রেরা তিন বর্ণের সেবা করে। শেষে অযোধ্যার সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তি—বীর যোদ্ধা, প্রসিদ্ধ দেশজাত উৎকৃষ্ট অশ্ব এবং খ্যাত বংশের বলবান গজ—উল্লেখ করে নগরকে সুদৃঢ়, অজেয় এবং ইন্দ্রসদৃশ রাজার দ্বারা শাসিত বলা হয়েছে।
अमात्य-गुणवर्णनम् (The Virtues of Daśaratha’s Ministers and the Order of Governance)
এই সর্গে রাজা দশরথের অধীনে অযোধ্যার শাসনব্যবস্থার একটি প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। প্রথমে অমাত্যদের গুণ বর্ণিত—তাঁরা সদাচারী, মন্ত্রজ্ঞানে পারদর্শী এবং ইঙ্গিতজ্ঞানে (অন্তর্নিহিত অভিপ্রায় বোঝায়) দক্ষ; সর্বদা রাজার প্রিয় ও হিত—উভয়ের দিকেই নিবদ্ধ। এরপর তাঁদের সংখ্যা আট এবং নাম—ধৃষ্টী, জয়ন্ত, বিজয়, সিদ্ধার্থ, অর্থসাধক, অশোক, মন্ত্রপাল ও সুমন্ত্র—উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে পরম সম্মানিত রাজপুরোহিত বশিষ্ঠ ও বামদেব উপস্থিত, যা রাজনীতি-বুদ্ধি ও বৈদিক যজ্ঞ-অধিকার—দুইয়ের সমন্বয়কে প্রকাশ করে। মন্ত্রীদের শিক্ষিত, সংযমী, সত্যবাদী, বাক্য ও কর্মে একরূপ এবং লোকব্যবহারে দক্ষ বলা হয়েছে; পাশাপাশি কোষ-সমৃদ্ধি ও সেনাবিন্যাসেও তাঁরা সক্ষম। দণ্ডনীতি নিরপেক্ষ—সময়ে ও পরিমিতভাবে দণ্ড হয়, নিজের পুত্রের প্রতিও; কিন্তু নির্দোষকে আঘাত করা হয় না, এবং ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়রা মন, বাক্য, কর্মে কষ্ট পায় না। ফলে নগর ও রাষ্ট্রে নৈতিক শৃঙ্খলা ও প্রশান্তি বিরাজ করে—মিথ্যাবাদ নেই, ব্যভিচার নেই, সর্বত্র শান্ত স্বভাব ও সুস্থিতি। শেষে বলা হয়েছে, এই অমাত্য-পরিবেশই দশরথের গৌরব ও কার্যকর শাসনের মূল—মন্ত্রগোপন, সন্ধি-যুদ্ধের বিচার, ধর্মনীতিতে দক্ষতা এবং প্রীতিকর বাক্য। গুপ্তচরব্যবস্থা, ধর্মনিষ্ঠা ও অতুল সার্বভৌমত্বের কথাও বিশেষভাবে এসেছে; রাজার দীপ্তি উদীয়মান সূর্যের ন্যায় বর্ণিত।
अष्टमः सर्गः · Daśaratha Resolves on the Aśvamedha (Horse-Sacrifice) for Progeny
এই অষ্টম সর্গে ধর্মজ্ঞ ও মহাতেজস্বী রাজা দশরথ পুত্রহীনতার দুঃখে চিন্তিত হন। মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি শাস্ত্রসম্মত উপায় স্থির করেন—অশ্বমেধ যজ্ঞের দ্বারা পুত্রলাভ করবেন। তিনি সুমন্ত্রকে আদেশ দেন আচার্য ও ঋত্বিক ব্রাহ্মণদের আহ্বান করতে। সুমন্ত্র বশিষ্ঠসহ বেদবিদ্ সুয়জ্ঞ, বামদেব, জাবালি ও কাশ্যপকে নিয়ে আসেন। রাজা বিনীতভাবে জানান যে পুত্রাভাব তাঁর দুঃখের কারণ; তাই তিনি বিধিপূর্বক অশ্বমেধ করতে চান এবং যজ্ঞের ক্রম ও নিয়ম সম্পর্কে তাঁদের পরামর্শ চান। ব্রাহ্মণগণ এই সংকল্প অনুমোদন করেন, যজ্ঞসামগ্রী প্রস্তুত ও যজ্ঞাশ্ব মুক্ত করার নির্দেশ দেন এবং আশ্বাস দেন—ধর্মসম্মত সংকল্পে কাম্য পুত্র অবশ্যই লাভ হবে। দশরথ আনন্দিত হয়ে মন্ত্রীদের বলেন—সব উপকরণ সংগ্রহ করো, সরযূর উত্তর তীরে যজ্ঞভূমি নির্মাণ করো, এবং কল্পবিধি অনুসারে প্রায়শ্চিত্ত ও মঙ্গলকর্ম সম্পন্ন করো। তিনি সতর্ক করেন—শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ নির্দোষ হওয়া চাই; পণ্ডিত ব্রহ্মরাক্ষসরা যজ্ঞের ‘ছিদ্র’ খোঁজে, আর ত্রুটিযুক্ত যজ্ঞ যজমানের সর্বনাশ ডেকে আনে। শেষে তিনি রাণীদের দীক্ষা গ্রহণের আদেশ দেন; সংবাদে তাঁদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
ऋश्यशृङ्गानयनकथा · The Account of Bringing Ṛśyaśṛṅga (and the Remedy for Drought)
এই নবম সর্গে সূত সুমন্ত্র একান্তে মহারাজ দশরথকে জানান যে তিনি ব্রাহ্মণ-উপদেশের ধারায় প্রচলিত এক প্রাচীন দৃষ্টান্ত শুনেছেন। বলা হয়, ঋষিসভায় রাজবংশে সন্তানলাভের প্রসঙ্গে সনৎকুমারের পূর্ব বক্তৃতা থেকেই এই কাহিনি প্রসারিত। সেখানে বিভাণ্ডকের আশ্রমে ঋশ্যশৃঙ্গের নির্জন লালন-পালন, কঠোর ব্রহ্মচর্য, নিয়ম-সেবা ও যাগ-আচার পালনের কথা বর্ণিত। অন্যদিকে অঙ্গদেশে রাজা রোমপাদের আচরণভঙ্গের ফলে ভয়ংকর অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তিনি বিদ্বান ব্রাহ্মণদের কাছে নিয়ম-আচরণসহ প্রায়শ্চিত্তের উপায় জানতে চান। ব্রাহ্মণরা বলেন—ঋশ্যশৃঙ্গকে সম্মানসহ আনো এবং বিধিপূর্বক শান্তাকে তাঁর সঙ্গে বিবাহে অর্পণ করো; তাতে বৃষ্টি ফিরবে এবং প্রজাবৃদ্ধি হবে। মন্ত্রীরা প্রথমে ঋষির তপোবলে ভীত হয়ে দোষের আশঙ্কায় শর্ত-শর্তাদি ভাবেন, পরে কার্যকর উপায় স্থির করেন। শেষে গণিকারা মধ্যস্থ হয়ে ঋশ্যশৃঙ্গকে নিয়ে আসে; তাঁর আগমনে বৃষ্টি নামে, শান্তার বিবাহ সম্পন্ন হয়, এবং ঋষি সন্তানলাভ ও কল্যাণের কারণ হন। এ কথা শুনে দশরথ আনন্দিত হয়ে সুমন্ত্রকে অনুরোধ করেন—ঋশ্যশৃঙ্গকে আনার পদ্ধতি আরও বিস্তারিত বলো, কারণ এই দৃষ্টান্ত তাঁর নিজের বংশবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও যুক্ত।
ऋश्यशृङ्ग-आनयनम् (Bringing Ṛśyaśṛṅga to Aṅga and His Marriage to Śāntā)
দশরথের অনুরোধে মন্ত্রীসভায় সুমন্ত্র পূর্বকথা বর্ণনা করেন—কীভাবে ঋষ্যশৃঙ্গকে রোমপাদের রাজ্যে আনা হয়েছিল। রোমপাদের পুরোহিত ও মন্ত্রীরা এক ‘নিরপায়’ (ঝুঁকি-হ্রাসকারী) উপায় স্থির করেন—অরণ্যে প্রতিপালিত, নারী ও নগরসুখে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ তপস্বীকে সুসজ্জিত গণিকাদের দ্বারা আকৃষ্ট করা হবে। তারা বিভাণ্ডকের আশ্রমের নিকট বনে প্রবেশ করে সুযোগের অপেক্ষা করে। সংযোগক্রমে ঋষ্যশৃঙ্গ তাদের দেখে; তারা পরিচয় ও জীবিকার কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি নিজেকে বিভাণ্ডকের পুত্র বলে জানান এবং অর্ঘ্য-পাদ্য, মূল-ফল প্রভৃতিতে বিধিপূর্বক আতিথ্য করেন। পিতার প্রত্যাবর্তনের ভয়ে তারা সরে যায়, কিন্তু মিষ্টান্ন ও খাদ্য রেখে যায়; ঋষ্যশৃঙ্গ সেগুলিকে ‘ফল’ বলে মনে করেন—তাঁর নিষ্কলুষতা ও নতুন ইন্দ্রিয়ানুভবের আকর্ষণ প্রকাশ পায়। পরদিন তিনি আবার সেই স্থানে আসেন। নারীরা তাঁকে নিজেদের ‘আশ্রমপদে’ আমন্ত্রণ জানিয়ে ধীরে ধীরে অঙ্গদেশের দিকে নিয়ে যায়। তাঁর আগমনে পর্জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করেন—শুভ পুনরুদ্ধারের লক্ষণ। রোমপাদ সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে পূজা-উপহারে তাঁকে বরণ করেন, বিভাণ্ডকের ক্রোধের আশঙ্কায় অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন, এবং শেষে কন্যা শান্তার সঙ্গে ঋষ্যশৃঙ্গের বিধিসম্মত বিবাহ সম্পন্ন করেন। এই সর্গে তপশক্তি, রাজনীতি ও লোককল্যাণ (বৃষ্টি-উর্বরতা) একসূত্রে গাঁথা।
ऋष्यशृङ्गानयनम् · Bringing Ṛśyaśṛṅga to Ayodhyā (Bālakāṇḍa, Sarga 11)
এই সর্গে সুমন্ত্র রাজসভায় তাঁর বর্ণনা অব্যাহত রেখে সনৎকুমারের প্রাচীন উপদেশকে পরম্পরার প্রমাণরূপে স্মরণ করান। এখানে দশরথের ধর্মনিষ্ঠ চরিত্র এবং অঙ্গবংশের সঙ্গে—রোমপাদ ও শান্তার মাধ্যমে—কৌশলগত মৈত্রীবন্ধনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। এরপর ভবিষ্যদ্বাণী থেকে কার্যসাধনে অগ্রসর হয়ে দশরথ বশিষ্ঠের পরামর্শ ও সম্মতি নিয়ে রাণী ও মন্ত্রীদের সঙ্গে রোমপাদের দেশে যান; বন ও নদী অতিক্রম করে তপোজ্যোতিতে দীপ্ত ঋষ্যশৃঙ্গকে দর্শন করেন। রোমপাদ বন্ধুত্বের ভিত্তিতে বিশেষ আতিথ্যে দশরথকে সম্মান করেন; পারস্পরিক সম্পর্ক শুনে ঋষ্যশৃঙ্গও যথাযোগ্য প্রতিসৎকার করেন। এক সপ্তাহ অবস্থানের পর দশরথ সন্তানলাভ ও ধর্মপুণ্যের জন্য মহাযজ্ঞ (পুত্রেষ্টি) সম্পাদনের উদ্দেশ্যে শান্তা ও তাঁর স্বামীকে অযোধ্যায় আসার অনুরোধ করেন; রোমপাদ সম্মতি দেন এবং শান্তাসহ ঋষ্যশৃঙ্গ যাত্রা করেন। দশরথ প্রত্যাবর্তনে দ্রুত দূত পাঠিয়ে প্রস্তুতি করান; সজ্জিত অযোধ্যায় শঙ্খ-দুন্দুভির ধ্বনিতে প্রবেশ করে ব্রাহ্মণদের অগ্রে স্থান দেন। অন্তঃপুরে শাস্ত্রসম্মত আতিথ্য হয়, আর শান্তার আগমনে রাজনারীদের আনন্দ বৃদ্ধি পায়—এভাবে এই সর্গ পুত্রেষ্টি-যজ্ঞ ও চার পুত্রের জন্মের পথে শুভ সূচনা স্থাপন করে।
द्वादशः सर्गः · Aśvamedha-saṅkalpa (Daśaratha resolves on the Horse Sacrifice)
এই দ্বাদশ সর্গে অযোধ্যার রাজা দশরথ বংশধারা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং সন্তানহীনতার দুঃখে প্রেরিত হয়ে শাস্ত্রবিধি অনুসারে অশ্বমেধ যজ্ঞ করার আনুষ্ঠানিক সংকল্প গ্রহণ করেন। বসন্তকালে তিনি ঘোষণা করেন যে নিয়মভঙ্গ না করে যজ্ঞ সম্পন্ন করবেন এবং ঋষ্যশৃঙ্গের তপোবলের আধ্যাত্মিক প্রভাবে যজ্ঞফল নিশ্চিত হবে। এরপর তিনি সুমন্ত্রকে আদেশ দেন—বশিষ্ঠ, সুয়জ্ঞ, বামদেব, জাবালি, কাশ্যপ প্রমুখ প্রধান ঋত্বিজ ও বিদ্বান ব্রাহ্মণদের আহ্বান করতে। সমবেত পুরোহিতগণ “সাধু” বলে রাজার সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন, যজ্ঞসামগ্রী সংগ্রহ ও যজ্ঞাশ্বকে বিধিপূর্বক মুক্ত করার নির্দেশ দেন এবং ধর্মময় বুদ্ধির ফলস্বরূপ অতীব পরাক্রমশালী চার পুত্র লাভের প্রতিশ্রুতি দেন। পরে সরযূ নদীর উত্তর তীরে যজ্ঞভূমি নির্ধারণ, শান্তিকর্ম সম্পাদন এবং কল্পবিধি মেনে সব আয়োজনের নির্দেশ হয়। সতর্ক করা হয় যে ব্রহ্মরাক্ষসেরা যজ্ঞে ‘ছিদ্র’ খোঁজে; যজ্ঞে ত্রুটি হলে যজমানেরও বিপদ ঘটে। শেষে মন্ত্রীরা আদেশ কার্যকর করতে থাকেন, ব্রাহ্মণেরা নিজ নিজ স্থানে প্রত্যাবর্তন করেন এবং রাজা প্রাসাদে ফিরে যান—সংকল্প থেকে বাস্তব প্রয়োগের সূচনা ঘটে।
हयमेध-यज्ञोपक्रमः · Commencement of the Aśvamedha Preparations
এক বছর পূর্ণ হলে বসন্ত পুনরায় ফিরে আসে। পুত্রলাভের উদ্দেশ্যে রাজা দশরথ অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতি শুরু করতে যজ্ঞমণ্ডপে প্রবেশ করেন। বশিষ্ঠ যজ্ঞের তত্ত্বাবধায়ক হয়ে বিধি-নিয়ম নির্দেশ দেন—বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের সঙ্গে স্থপতি, ইটকার, কাঠমিস্ত্রি, খননকারী, কারিগর, হিসাবরক্ষক এবং নট-গায়ক প্রভৃতি দক্ষ কর্মীদেরও সমবেত করে যজ্ঞের পরিকাঠামো সুসম্পন্ন করতে হবে। বশিষ্ঠ বিশেষভাবে আতিথ্য ও অবমাননা-পরিহারের কথা বলেন। ব্রাহ্মণদের এবং নগর-গ্রাম থেকে আগত অতিথিদের জন্য প্রচুর আবাস প্রস্তুত থাকবে; প্রথামাফিক অন্ন-পানীয়, সম্মান ও বিনোদনের ব্যবস্থা হবে; সকল বর্ণের মানুষ এবং যজ্ঞকর্মে নিয়োজিত শ্রমিকদের প্রতিও সমাদর প্রদর্শিত হবে। তিনি সতর্ক করেন—অবজ্ঞাসহ দান করলে তা দাতারই অকল্যাণ ডেকে আনে। এরপর তিনি সুমন্ত্রকে আদেশ দেন ধর্মপরায়ণ রাজাদের সর্বদিক থেকে আমন্ত্রণ জানাতে—মিথিলার জনক, কাশীর রাজা, কেকয়-নৃপতি, অঙ্গের রোমপাদ এবং পূর্ব-দক্ষিণ, সিন্ধু-সৌবীর ও সৌরাষ্ট্র প্রভৃতি অঞ্চলের শাসকদেরও। দূত প্রেরিত হয়; রাজারা উপহারসহ উপস্থিত হন; বশিষ্ঠ সফল আতিথ্য ও প্রস্তুতির সংবাদ দেন। শুভ দিনে দশরথ যজ্ঞস্থলে গমন করেন এবং বশিষ্ঠ-প্রধান ব্রাহ্মণসমাজ, অগ্রে ঋষ্যশৃঙ্গকে রেখে, শাস্ত্রবিধি অনুসারে যজ্ঞকর্ম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে।
अश्वमेधप्रवृत्तिः · Commencement and Performance of Daśaratha’s Aśvamedha
এই সর্গে সরযূ নদীর উত্তর তীরে এক বছর পূর্ণ করে ফিরে আসা যজ্ঞাশ্বকে কেন্দ্র করে দশরথের অশ্বমেধ যজ্ঞের বিধিবদ্ধ পরিচালনা বর্ণিত হয়েছে। ঋষ্যশৃঙ্গের নেতৃত্বে বেদজ্ঞ ঋত্বিকেরা কোনো ত্রুটি না রেখে সवन, প্রবর্গ্য, উপসদ এবং ক্রমানুসারে আহুতি সম্পন্ন করেন। যজ্ঞের সঙ্গে জনকল্যাণের চিত্রও উজ্জ্বল—ব্রাহ্মণ, তপস্বী, সন্ন্যাসী, আশ্রিতজন, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও রোগী সকলের জন্য প্রচুর অন্ন-জল বিতরণ করে রাজা দানশীলতা ও সর্বজনীন যজ্ঞ-ব্যবস্থা প্রকাশ করেন। এরপর যজ্ঞ-নির্মাণের বিধান আসে—বিল্ব, খদির, পর্ণিন, শ্লেষ্মাতক ও দেবদারু কাঠে বহু যূপ স্থাপন, স্বর্ণালংকার এবং নির্দিষ্ট মাপ-নিয়ম পালন করা হয়। ইট দিয়ে গরুড়াকৃতি, স্বর্ণপক্ষসম অগ্নিবেদী নির্মিত হয়, যাতে আঠারোটি অগ্নিকুণ্ড থাকে। শাস্ত্রানুসারে পশু, পাখি, সাপ ও জলচর প্রভৃতির ব্যবস্থা করা হয়; কৌশল্যা যজ্ঞাশ্বের চারদিকে নির্দিষ্ট ক্রিয়া সম্পাদন করেন এবং ঋত্বিকেরা মন্ত্রোচ্চারণসহ আহুতি সমাপ্ত করেন। শেষে রাজা দক্ষিণা হিসেবে পৃথিবী দান করতে চান; কিন্তু ঋত্বিকেরা রাজ্যভার গ্রহণ না করে ধন-সম্পদ দানই প্রার্থনা করেন। তখন দশরথ বিপুল সম্পদ ও সম্মান দান করেন; ঋষ্যশৃঙ্গ তাঁকে চার পুত্রলাভের আশীর্বাদ দেন—যার দ্বারা বংশধারা ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যসহ রামায়ণের কাহিনি অগ্রসর হয়।
पञ्चदशः सर्गः · देवकृत-प्रार्थना, रावणवधोपायः, विष्णोः मानुषावतारनियोजनम् (Sarga 15: The Devas’ Petition, the Means to Slay Ravana, and Vishnu’s Commission to Incarnate as Man)
ঋশ্যশৃঙ্গ চিন্তা করে দশরথকে বললেন যে তিনি অথর্বশির মন্ত্র অনুসারে বিধিপূর্বক পুত্রিয়েষ্টি যজ্ঞ সম্পন্ন করবেন। এরপর তিনি অগ্নিতে আহুতি দিয়ে যজ্ঞ আরম্ভ করলেন; দেবতা ও গন্ধর্ব-যক্ষ প্রভৃতি সকলেই নিজ নিজ যজ্ঞভাগ গ্রহণের জন্য সমবেত হলেন। অন্যদিকে দেবসভায় দেবতারা ব্রহ্মাকে নিবেদন করলেন—ব্রহ্মার বরপ্রভাবে শক্তিমান রাবণ ত্রিলোককে পীড়িত করছে এবং ইন্দ্রের উপরও আক্রমণ করতে উদ্যত; সে ঋষি, যক্ষ, গন্ধর্ব, অসুর ও ব্রাহ্মণদের অপমান করে সীমা লঙ্ঘন করছে। ব্রহ্মা বরদানের ফাঁক স্মরণ করালেন—রাবণ মানুষকে তুচ্ছ জেনে তাদের থেকে অবধ্যতা চাননি; অতএব কেবল মানবের দ্বারাই তার বধ সম্ভব। তখন বিষ্ণু উপস্থিত হলেন এবং স্তোত্রে পূজিত হলেন। দেবতারা প্রার্থনা করলেন—তিনি চতুর্ভাগে বিভক্ত হয়ে দশরথের তিন রাণীর গর্ভে পুত্ররূপে জন্ম নিন এবং মানবদেহে লোককণ্টক রাবণকে তার সহচরদেরসহ বিনাশ করুন। বিষ্ণু আশ্বাস দিলেন—ভয় ত্যাগ করো; আমি রাবণ ও তার পক্ষধরদের ধ্বংস করে ধর্মপরায়ণ রাজা হয়ে মানবলোকে অবস্থান করব—এবং অবতারের জন্য দশরথকে পিতা রূপে গ্রহণ করার সংকল্প করলেন।
पायसप्रादुर्भावः · The Manifestation of the Divine Payasa and the Avatara Resolution
এই সর্গে দैব পরিকল্পনা ও যজ্ঞকর্ম একসূত্রে বাঁধা। সর্বজ্ঞ হয়েও নারায়ণ বিষ্ণু দেবতাদের কাছে সংযত বাক্যে রাবণবধের উপায় বলেন—ব্রহ্মার বরদানে রাবণ দেব-গন্ধর্ব-যক্ষ প্রভৃতি অমানবদের দ্বারা অবধ্য, কিন্তু মানুষের দ্বারা নয়; তাই দেবতারা বিষ্ণুকে মানবদেহ ধারণের অনুরোধ করেন। বিষ্ণু দশরথকে পিতা হিসেবে নির্বাচন করে তাঁর পুত্রীয়েষ্টি যজ্ঞের সঙ্গে অবতার-সংকল্পকে মিলিয়ে দেন। যজ্ঞাগ্নি থেকে তেজোময় প্রাজাপত্য পুরুষ আবির্ভূত হন। তিনি রৌপ্যঢাকনাযুক্ত স্বর্ণপাত্রে দিব্য পায়স এনে দেন—যা পুত্রপ্রদ, সমৃদ্ধিদায়ক ও আরোগ্যবর্ধক বলে ঘোষিত। দশরথ ভক্তিভরে তা গ্রহণ করে সেই দিব্য পুরুষকে প্রদক্ষিণ করেন এবং নির্দিষ্ট ভাগে কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রার মধ্যে পায়স বিতরণ করেন। পায়স সেবনের পর অল্পদিনেই রাণীরা গর্ভধারণ করেন। পুত্রলাভের আশায় রাজা দশরথের মনঃক্লেশ দূর হয়ে আনন্দ ফিরে আসে; তার তুলনা করা হয় স্বর্গে পূজিত বিষ্ণুর প্রসন্নতার সঙ্গে। এভাবে যজ্ঞফলই অবতারের মানবজন্ম-পরম্পরার তৎক্ষণাৎ চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে।
सप्तदशः सर्गः · देवसंवादः तथा वानर-ऋक्ष-उत्पत्तिः (Divine Council and the Generation of Vanara Allies)
এই সপ্তদশ সর্গে মহাকাব্যের কার্যকারণ-ধারা স্পষ্ট হয়। বিষ্ণু যখন দশরথের পুত্ররূপে অবতীর্ণ হওয়ার সংকল্প করেন, তখন ব্রহ্মা সমবেত দেবগণকে নির্দেশ দেন—রাম/বিষ্ণুর সহায়তার জন্য কামরূপতা-সম্পন্ন, অতিদ্রুত, বুদ্ধিমান ও যুদ্ধনিপুণ শক্তিশালী সঙ্গী সৃষ্টি করো। এরপর প্রধান প্রধান বানর-নেতাদের দিব্য জন্মের বিবরণ দেওয়া হয়—ইন্দ্রের পুত্র বালি, সূর্যের পুত্র সুগ্রীব, বায়ুর পুত্র হনুমান, অগ্নির পুত্র নীল, বিশ্বকর্মার পুত্র নল, বৃহস্পতির পুত্র তারা, বরুণের পুত্র সুষেণ, পর্জন্যের পুত্র শরভ এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের পুত্র মৈন্দ ও দ্বিবিদ। ব্রহ্মা জাম্ববানের পূর্বসৃষ্টির কথাও বলেন—হাই তোলার সময় ব্রহ্মার মুখ থেকে তাঁর আবির্ভাব, যা প্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্বের ইঙ্গিত। পরে দেব, ঋষি, গন্ধর্ব, যক্ষ, নাগ, সিদ্ধ, বিদ্যাধর প্রভৃতি অপ্সরা, নাগকন্যা ও গন্ধর্বী নারীদের দ্বারা অসংখ্য বনবাসী বানর-ঋক্ষ-সেনা উৎপন্ন করেন। তারা শিলা ও বৃক্ষকে অস্ত্র করে, নখ-দন্তে আঘাত হানে, পর্বত কাঁপানো বল ও সমুদ্র লঙ্ঘনের বেগ ধারণ করে; আর বালিকে ভল্লুক, গোপুচ্ছ-বানর ও কপিদের রক্ষক করা হয়। সর্গটি স্পষ্ট করে যে এই সৃষ্টি ভবিষ্যতে দশগ্রীব রাবণের বিরুদ্ধে রামের সহায়তার উদ্দেশ্যেই।
पुत्रजन्मोत्सवः · Birth of the Princes and Viśvāmitra’s Arrival (Bālakāṇḍa 18)
দশরথের মহাযজ্ঞসমূহ সম্পন্ন হলে দেবতারা তাঁদের নির্ধারিত হবি-ভাগ গ্রহণ করে স্বস্ব ধামে প্রত্যাবর্তন করলেন। রাজাও দীক্ষাবিধি যথাযথ পালন করে রাণী, মন্ত্রী ও সেনাসহ পুনরায় অযোধ্যায় প্রবেশ করলেন। আগত রাজন্যবর্গকে সম্মানসহ বিদায় দেওয়া হল; ঋষ্যশৃঙ্গ শান্তাসহ রোমপাদের সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে গেলেন। ছয় ঋতুর এক পূর্ণ আবর্ত অতিক্রান্ত হলে রামের জন্মলগ্নের জ্যোতিষ-সংযোগ বিস্তারিত বলা হয়—চৈত্র মাসে, শুক্লপক্ষের নবমীতে, পুনর্বসু নক্ষত্রে (অদিতি-দৈবত), পাঁচ গ্রহ উচ্চস্থানে এবং কর্কট লগ্নে। কৌশল্যা বিষ্ণুর অংশরূপ শ্রীरामকে প্রসব করলেন। কৈকেয়ী বিষ্ণুর চতুর্থাংশ ভরতকে, আর সুমিত্রা লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন—বিষ্ণুর অংশ—দ্বয়কে প্রসব করলেন; ভরতের জন্য পুষ্য/মীন লগ্ন এবং যমজদের জন্য আশ্লেষা/কর্কট লগ্নের উল্লেখ আছে। অযোধ্যায় মহোৎসব শুরু হল—গন্ধর্বগান, অপ্সরানৃত্য, দিব্য দুন্দুভির ধ্বনি ও পুষ্পবৃষ্টি। রাজা বিপুল দান করলেন এবং বশিষ্ঠের দ্বারা নামকরণাদি সংস্কার সম্পন্ন করালেন। চার কুমারের বেদবিদ্যা, বীরত্ব, প্রজাহিতচিন্তা ও ধনুর্বিদ্যার প্রশংসা করা হয়েছে; বিশেষ করে লক্ষ্মণের রামের প্রতি প্রাণসম অনুরাগ এবং শত্রুঘ্নের ভরতের প্রতি দৃঢ় স্নেহ প্রকাশিত। এদিকে দশরথ যখন পুত্রদের বিবাহের কথা ভাবছেন, তখন মহর্ষি বিশ্বামিত্র অযোধ্যায় আগমন করলেন। রাজা বিধিপূর্বক অর্ঘ্যাদিতে তাঁকে সংবর্ধনা দিলেন; বিশ্বামিত্র রাজ্যের কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। দশরথ বিস্তৃত আতিথ্য করে সেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন, তাতে তপস্বী মুনি পরম সন্তুষ্ট হলেন।
विश्वामित्रस्य यज्ञरक्षा-याचना (Visvamitra Requests Rama for Yajna-Protection)
এই সর্গে রাজসভায় যুক্তিপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে বিশ্বামিত্র দশরথের বিনীত বাক্যের উত্তর দিয়ে যজ্ঞের সংকট প্রকাশ করেন। তিনি জানান—রূপপরিবর্তনকারী রাক্ষস মারীচ ও সুবাহু যজ্ঞ সমাপ্তির নিকটে বেদীতে মাংস ও রক্ত বর্ষণ করে অনুষ্ঠান নষ্ট করে দেয়। যজ্ঞশৃঙ্খলায় আবদ্ধ ঋষি ক্রোধে শাপ দেন না; ধর্মসম্মত প্রতিকার হিসেবে রাজসাহায্যই গ্রহণ করেন। বিশ্বামিত্র অনুরোধ করেন—দশরথ যেন জ্যেষ্ঠপুত্র, বীর ও স্বপরাক্রমে সত্য রামকে মাত্র দশ রাত্রির জন্য যজ্ঞরক্ষায় অর্পণ করেন, যাতে নির্ধারিত সময়ে যজ্ঞ সম্পন্ন হয়। তিনি আশ্বাস দেন—তাঁর তত্ত্বাবধানে এবং রামের দিব্য তেজে রাক্ষসদ্বয় টিকতে পারবে না; তিনি এমন আশীর্বাদ দেবেন যাতে তিন লোক জুড়ে রামের খ্যাতি বিস্তৃত হয়। আরও বলেন—বসিষ্ঠপ্রমুখ ঋষি ও মন্ত্রীদের সম্মতি নিয়েই রামকে প্রেরণ করা উচিত। সর্গের শেষে পিতৃস্নেহ ও রাজধর্মের টানাপোড়েনে দশরথ ভীত, শোকাকুল ও শারীরিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েন; এই দৃশ্যেই কর্তব্য ও স্নেহের সংঘাত নাটকীয়ভাবে প্রকাশ পায়।
राज्ञः शङ्का-प्रत्याख्यानम् (Daśaratha’s Objections to Sending Rāma): Bala Kanda, Sarga 20
বিশ্বামিত্রের প্রার্থনা শুনে রাজা দশরথ মুহূর্তের জন্য সংযম হারান। পিতৃধর্ম ও রাজনীতির যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন—রাম এখনও ষোলো বছরের কম, মায়াবী রাক্ষস-যুদ্ধে সম্পূর্ণ প্রশিক্ষিত নয়; আর পুত্রবিচ্ছেদ তিনি সহ্য করতে পারবেন না। তিনি বিকল্প প্রস্তাব দেন—সমগ্র অক্ষৌহিণী সেনা, অভিজ্ঞ বীরযোদ্ধা, এমনকি নিজে গিয়েও সহায়তা করবেন; কিন্তু রাজপুত্রকে নিয়ে যাওয়া অনুচিত—এ কথা তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন। নিজের বার্ধক্য এবং বহু কষ্টে, তপস্যা-প্রার্থনার ফলে রামকে লাভ করার দুর্লভতার কথা স্মরণ করিয়ে তিনি আবেগ ও বংশগত দায়ের গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলেন। তারপর রাক্ষসদের শক্তি, বংশ, আকার, রক্ষক এবং উপযুক্ত প্রতিরোধ-কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চান। বিশ্বামিত্র পুলস্ত্যবংশের প্রসঙ্গ এনে জানান—ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত রাবণ তিন লোককে পীড়িত করে; সে নিজে যজ্ঞে সরাসরি বাধা দেয় না, কিন্তু মারীচ ও সুবাহুকে প্ররোচিত করে বিঘ্ন ঘটায়। শেষে মুনির ক্রোধ ঘৃতাহুতিতে প্রজ্বলিত যজ্ঞাগ্নির মতো উর্ধ্বমুখী হয়—তপস্যাবলে প্রতিষ্ঠিত ধর্মকে অমান্য করলে তৎক্ষণাৎ নৈতিক ও রাজনৈতিক পরিণতি অনিবার্য, এই ইঙ্গিত দিয়ে।
बालकाण्डे एकविंशः सर्गः · Daśaratha’s Promise, Vasiṣṭha’s Counsel, and Viśvāmitra’s Weapon-Lore
এই সর্গে রাজধর্মের কেন্দ্রবিন্দু—প্রতিজ্ঞা পালন—নিয়ে তীব্র ধর্মবিচার দেখা যায়। স্নেহবশত দাশরথ অন্তরে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে রামকে না পাঠানোর অনুরোধ করেন; এতে বিশ্বামিত্র ক্রুদ্ধ হন এবং প্রতিজ্ঞাভঙ্গের গুরুতরতা বোঝাতে জগতের কম্পন প্রভৃতি অশুভ-সংকেত প্রকাশ পায়। তখন ধর্মের স্থিতিকারক বিচারক রূপে বশিষ্ঠ মধ্যস্থতা করেন। তিনি দাশরথকে ইক্ষ্বাকুবংশের আদর্শ বলে স্মরণ করিয়ে দেন—দেওয়া বাক্য ত্যাগ করলে পূর্বের যজ্ঞ ও দানের পুণ্য নষ্ট হয়; সত্যরক্ষা রাজমর্যাদা ও লোকবিশ্বাসের মূল। এরপর প্রসঙ্গ ঘুরে যায় বিশ্বামিত্রের রক্ষাশক্তি ও অস্ত্রবিদ্যার মহিমায়। তাঁকে ধর্মাত্মা, পরাক্রম ও বুদ্ধিতে অতুল, এবং ত্রিলোকে অস্ত্রসমূহের অনন্য জ্ঞানী বলে প্রশংসা করা হয়। ভৃশাশ্বের ধর্মশীল পুত্রগণ এবং দক্ষকন্যা জয়া ও সুপ্রভা—যাঁদের থেকে শত দীপ্তিমান অস্ত্রসত্তা উৎপন্ন—এই অস্ত্রবংশকথা বলা হয়; বিশ্বামিত্র সেগুলি যথাযথ জানেন এবং নতুন অস্ত্রও সৃষ্টি করতে সক্ষম। শেষে দাশরথ সংযতচিত্তে সম্মতি দেন এবং পুত্রকল্যাণ ও রাজপ্রতিষ্ঠা রক্ষার্থে রামকে বিশ্বামিত্রের সঙ্গে প্রেরণের অনুমতি দেন।
बलातिबलोपदेशः · The Instruction of Bala and Atibala
এই সর্গে রাজরক্ষার দায়িত্বের বিধিসম্মত রূপান্তর হয়ে তপস্বী-অভিভাবকত্বে অর্পণ এবং রামের কাছে প্রথম স্পষ্ট মন্ত্রবিদ্যা-প্রদান বর্ণিত। বশিষ্ঠের পরামর্শে দশরথ লক্ষ্মণসহ রামকে আহ্বান করেন; পিতা-মাতা ও রাজপুরোহিতের স্বস্ত্যয়নাদি মঙ্গলকর্ম সম্পন্ন হলে রাজপুত্রকে বিশ্বামিত্রের হাতে সমর্পণ করেন। যাত্রার সূচনা যেন বিশ্ববিধানের অনুমোদনে—পরাগহীন মৃদু বাতাস, পুষ্পবৃষ্টি, এবং দিব্য দুন্দুভি-শঙ্খধ্বনি—এই শুভলক্ষণে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বামিত্র অগ্রে চলেন, আর দুই ভ্রাতা ধনুর্ধর ও দীপ্তিমান হয়ে অনুসরণ করেন। তাঁদের বহু-ফণী নাগের ন্যায় এবং শিবের পশ্চাতে গমনকারী স্কন্দ-বিশাখের ন্যায় মহোপমায় বর্ণনা করা হয়েছে—আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের অধীনে সংযত বীর্য ও শাস্ত্রসজ্জা প্রকাশ পায়। সরযূর দক্ষিণ তীরে অর্ধ যোজনাধিক পথ অতিক্রম করে মুনি রামকে জল গ্রহণ করে আচমনসদৃশ শুদ্ধি করতে বলেন এবং ‘বলা’ ও ‘অতিবলা’—এই যুগ্ম বিদ্যা/মন্ত্র প্রদান করেন। এর ফল—ক্লান্তি, জ্বর ও দেহক্ষয় থেকে মুক্তি; নিদ্রা বা অসাবধানতায়ও রাক্ষসদের দ্বারা অজেয় রক্ষা; এবং জপে ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ। রাম শুদ্ধ হয়ে বিদ্যা গ্রহণ করলে শরৎসূর্যের ন্যায় আরও দীপ্তিমান হন। পরে তিনজন সরযূতীরে কুশশয্যায় রাত্রিযাপন করেন; মুনির কোমল বাক্য ও গুরু-শিষ্য সেবাধর্মে সেই বিশ্রাম পবিত্রতা লাভ করে।
कामाश्रम-प्रवेशः / Entry into Kāma’s Hermitage at the Sarayū-Gaṅgā Confluence
প্রভাতে বিশ্বামিত্র রাম ও লক্ষ্মণকে জাগিয়ে সন্ধ্যা-উপাসনা ও নিত্যকর্ম সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেন। স্নান, তर्पণ ও জপ শেষ করে দুই রাজপুত্র বিনীতভাবে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়। অগ্রসর হয়ে তারা সরযূ ও দেবী ত্রিস্রোতা গঙ্গার পুণ্য সঙ্গম দর্শন করে এবং সেখানে এক প্রাচীন আশ্রম দেখে, যেখানে দীর্ঘকাল সাধনরত ঋষিরা সহস্রাব্দব্যাপী কঠোর তপস্যা করেছেন। কৌতূহলে ভ্রাতৃদ্বয় জিজ্ঞাসা করে—এ কার আশ্রম? বিশ্বামিত্র বলেন, এ স্থান কন্দর্প/কামের সঙ্গে সম্পর্কিত। একদা শিবের কঠোর ধ্যানকালে কাম বিঘ্ন ঘটালে শিবের ক্রোধদৃষ্টির অগ্নিতে কাম দগ্ধ হয়ে অশরীরী হয়; তাই তার নাম ‘অনঙ্গ’, এবং এই অঞ্চলও অনঙ্গ-সম্পর্কে প্রসিদ্ধ। এরপর পবিত্র দুই নদীর মধ্যবর্তী সেই আশ্রমে তারা রাত্রিযাপন করে। তপোবলে আশ্রমবাসী মুনিরা তাদের চিনে অর্ঘ্য-পাদ্য প্রভৃতি দিয়ে আতিথ্য করেন; সায়ংসন্ধ্যা বিধিমতো পালিত হয়। বিশ্বামিত্র শৃঙ্খলাবদ্ধ আচার, তীর্থভূমির মাহাত্ম্য এবং সীমালঙ্ঘনকারী কামনার নৈতিক পরিণতি বোঝাতে শিক্ষামূলক কাহিনি শোনান।
गङ्गा-सरयू-सङ्गमः, मलद-करूश-देशकथा, ताटकावनप्रवेशोपदेशः (The Confluence of Gaṅgā and Sarayū; the Tale of Malada-Karūśa; Counsel on Tātakā’s Forest)
উজ্জ্বল প্রভাতে রাম ও লক্ষ্মণ নিত্যকর্ম সম্পন্ন করে বিশ্বামিত্রের সঙ্গে নদীতীরে গেলেন। তপস্বীরা শুভ নৌকা এনে দিলেন; সবাই গঙ্গা পার হলেন। মাঝধারায় প্রবল গর্জন-সদৃশ শব্দ শুনে রাম কারণ জিজ্ঞাসা করলে বিশ্বামিত্র বললেন—যেখানে গঙ্গা সরযূর নিকট সঙ্গমাভিমুখে প্রবাহিত হয়, সেই সঙ্গমস্থলে এই নিনাদ ওঠে; অতএব একাগ্রচিত্তে উভয় নদীকে প্রণাম করো। দুই ভ্রাতা ভক্তিভরে গঙ্গা-সরযূকে নমস্কার করে দক্ষিণ তীরে পৌঁছালেন। তারপর তাঁরা এক অচেনা, ভয়ংকর অরণ্য দেখলেন—ঘন বৃক্ষরাজি, অশুভ পশুপক্ষীর ডাক, সর্বত্র আতঙ্কের আভাস। রামের প্রশ্নে বিশ্বামিত্র সেই দেশের পূর্বসমৃদ্ধির কথা বললেন—মলদ ও করূশ—যেন দেবশিল্পীদের নির্মিত। বৃত্রবধ-পরবর্তী ইন্দ্রের শুদ্ধির পর এই ভূমি বর লাভ করে এবং সেই নামেই প্রসিদ্ধ হয়। কালের প্রবাহে মারীচের জননী, রূপান্তরিণী ভয়ংকর যক্ষী তাটকা অঞ্চলটি দখল করে প্রজাদের ত্রাস দিতে লাগল ও পথ অবরুদ্ধ করল। তখন বিশ্বামিত্র রামকে আদেশ দিলেন—তপস্বীর অনুমতিতে এ ধর্মকর্ম; নিজ পরাক্রমে এই ‘কণ্টক’ দূর করে দেশকে নিরাপদ করো।
ताटकावृत्तान्तः · The Account of Tāṭakā and the Royal Duty to Protect
এই পঁচিশতম সর্গে বিশ্বামিত্র ও রামের মধ্যে উপদেশমূলক সংলাপ রচিত। রাম ঋষির আদেশকে শ্রদ্ধাভরে গ্রহণ করে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন তোলেন—যক্ষদের শক্তি সীমিত বলা হয়, তবে কীভাবে এক নারীর মধ্যে সহস্র হস্তীর সমান বল থাকতে পারে? বিশ্বামিত্র তখন বংশ ও কারণসহ কাহিনি বলেন—যক্ষ সুকেতু তপস্যা করলে ব্রহ্মা প্রসন্ন হয়ে কন্যা তাটকাকে দান করেন এবং তাকে অসাধারণ, সহস্র-গজতুল্য শক্তি প্রদান করেন। তাটকার বিবাহ সুন্দের সঙ্গে হয় এবং তাদের পুত্র মারীচ জন্মায়; পরে শাপবশে সে রাক্ষসত্ব লাভ করে। সুন্দ নিহত হলে তাটকা ও মারীচ অগস্ত্যকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়; তখন অগস্ত্য মারীচকে রাক্ষসরূপ ধারণের শাপ দেন এবং তাটকাকে যক্ষীরূপ ত্যাগ করে ভয়ংকর নরভক্ষিণী রাক্ষসী হতে শাপ দেন। এরপর বিশ্বামিত্র রাজধর্মের নীতি স্থাপন করেন—প্রজারক্ষা, চাতুর্বর্ণ্য-ব্যবস্থা, গোরক্ষা ও ব্রাহ্মণরক্ষা রাজাদের সনাতন কর্তব্য; তাই অধর্মের বিপদ দূর করতে অপরাধী নারী হলেও দণ্ড দিতে দ্বিধা করা উচিত নয়। ইন্দ্রের মন্থরা-বধ ও বিষ্ণুর কাব্যা (ভৃগুপত্নী)-বিনাশের দৃষ্টান্ত দিয়ে এই সর্গ রাজরক্ষার অধিকার ও ন্যায়সঙ্গত বলপ্রয়োগের ভিত্তি ব্যাখ্যা করে।
ताटकावधः (The Slaying of Tāṭakā)
এই সর্গে বিশ্বামিত্রের নির্দেশ শুনে শ্রীराम নিজের কর্তব্যের যুক্তি প্রকাশ করেন—দশরথের আদেশ পালন, কৌশিক মুনির বচন মান্য করা এবং গো‑ব্রাহ্মণ‑হিত ও জনকল্যাণের জন্য রাক্ষসদমন। এরপর রাম ধনুকে জ্যা টানলে তার টংকারে বনভূমি আতঙ্কিত হয়, আর সেই শব্দে ক্রুদ্ধ তাটকা ছুটে আসে। রাম তার ভয়ংকর রূপ দেখে প্রথমে সংযত প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবেন—নারী হওয়ার কারণে হত্যা না করে তার শক্তি ও গতি নষ্ট করা। কিন্তু তাটকা মায়াবলে ধূলিঝড় সৃষ্টি করে, পাথর বর্ষণ করে, অদৃশ্য হয় ও রূপ বদলায়। তখন বিশ্বামিত্র ভুল করুণার অবসান করতে বলেন এবং স্মরণ করিয়ে দেন যে সন্ধ্যায় রাক্ষসী শক্তি বৃদ্ধি পায়। রাম শব্দভেদী দক্ষতায় তার কৌশল ভেঙে দেন, পাথরবর্ষা প্রতিহত করেন এবং বজ্রের মতো ধেয়ে আসা তাটকার বক্ষে তীর বিদ্ধ করে তাকে বধ করেন। ইন্দ্রপ্রমুখ দেবগণ রামের প্রশংসা করেন এবং বিশ্বামিত্রকে যোগ্য রাজপুত্রকে দিব্যাস্ত্র দানের পরামর্শ দেন। সন্ধ্যা নামলে শাপমুক্ত বনে তারা শিবির স্থাপন করে; বিশ্বামিত্র স্নেহভরে রামকে আশীর্বাদ করেন এবং প্রভাতে আশ্রমে যাত্রার পরিকল্পনা করেন।
अस्त्रप्रदानम् · Bestowal of Divine Astras to Rama
রাত্রিবিশ্রামের পর মহর্ষি বিশ্বামিত্র রামের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে স্নেহ ও অনুমোদনে তাঁকে সম্পূর্ণ দিব্যাস্ত্রসম্ভার দান করার সংকল্প প্রকাশ করেন এবং মঙ্গলাশীর্বাদ দেন। এরপর তিনি চক্র, পাশ, গদা, বজ্র প্রভৃতি সহ নানা নামধারী দিব্যাস্ত্রের তালিকাবদ্ধ বিবরণ ক্রমানুসারে উচ্চারণ করেন। শুচি হয়ে পূর্বমুখে অবস্থান করে মহর্ষি অনুত্তম মন্ত্রসমূহ বিধিপূর্বক প্রদান করে অস্ত্রসমূহ রামের হাতে সমর্পণ করেন। তখন অস্ত্রগুলির অধিষ্ঠাত্রী শক্তিগণ স্বয়ং প্রকাশিত হয়ে রামের অনুগত পরিচারকের ন্যায় উপস্থিত হয়। রাম সেগুলি গ্রহণ করে মনে অধিকার স্থাপন করে আদেশ দেন—‘আমার মনে অবস্থান করো’; অর্থাৎ অযথা প্রয়োগ নয়, সংযমিত স্মরণ ও ধর্মনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই কর্তব্য। শেষে রাম বিশ্বামিত্রকে প্রণাম করে পরবর্তী যাত্রার জন্য প্রস্তুত হন।
अस्त्रग्रहणं संहारोपदेशश्च · Receiving the Astras and Instruction on Withdrawal
শুদ্ধিকর্ম সম্পন্ন হলে মহামুনি বিশ্বামিত্র বিধিপূর্বক রামকে দিব্য অস্ত্রসমূহ অর্পণ করেন। কাহিনির ভাষায় রাম তখন ‘দেবতাদের কাছেও অজেয়’; তবু তিনি কেবল অস্ত্রলাভেই তৃপ্ত নন—অস্ত্রের সংহার, অর্থাৎ প্রত্যাহার/নিবৃত্তির প্রক্রিয়া ও মন্ত্র জানতে চান। এতে শক্তির সংযম, নৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও ধর্মসম্মত প্রয়োগের ভাব প্রকাশ পায়। বিশ্বামিত্র সংহার-মন্ত্র উপদেশ দিয়ে ভৃশাশ্বের পুত্ররূপে বর্ণিত তেজস্বী, রূপপরিবর্তনশীল বহু অস্ত্রের নামক্রমে দান করেন। এরপর অস্ত্রদেবতারা দেহধারী দীপ্তিময় রূপে—কেউ অঙ্গার-কালো, কেউ ধোঁয়ার মতো, কেউ সূর্য-চন্দ্রসম উজ্জ্বল—অঞ্জলি বেঁধে রামের কাছে এসে সেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। রাম তাদের আদেশ করেন, ‘আমার মনে নিবাস করো; প্রয়োজনে সহায় হও’, তারপর বিদায় দেন। তারা প্রদক্ষিণ করে প্রস্থান করে। পথে অগ্রসর হতে হতে রাম পর্বতের কাছে মেঘের মতো ছায়াময় এক বনখণ্ড দেখেন—পশুপাখিতে ভরা, মধুর কলরবে মুখর। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, এটি কার আশ্রম; এবং বিশ্বামিত্রের যজ্ঞে বাধা দানকারী রাক্ষসদের উৎপত্তি ও অবস্থান কোথায়—তাও জানতে চান, যাতে পরবর্তী রক্ষাকর্ম স্থির হয়।
सिद्धाश्रम-प्रसङ्गः (Siddhashrama and the Vāmana Narrative)
রামের ‘ওই বনটি কী?’ প্রশ্নে বিশ্বামিত্র সিদ্ধাশ্রমের প্রাচীন কাহিনি বর্ণনা করেন। তিনি জানান, এই আশ্রমের পবিত্রতা ভগবান বিষ্ণুর যোগ-তপস্যায় প্রতিষ্ঠিত—দেবশ্রেষ্ঠ বিষ্ণু এখানে তপস্যা করেছিলেন। পরে বৈরোচনি বলি দেবতাদের জয় করে ত্রিলোকে রাজত্ব স্থাপন করলে অগ্নি প্রমুখ দেবগণ দেবহিতার্থে বিষ্ণুর শরণ নিয়ে ‘মায়াযোগে’ বামনরূপ ধারণ করার প্রার্থনা করেন। কাশ্যপ-অদিতির প্রসঙ্গে অদিতির সহস্রবর্ষ তপস্যা, বিষ্ণুর স্তব ও বরদান বর্ণিত হয়; ‘অদিতি, আমি তোমার পুত্র হব’—এই অনুরোধেই বামনাবতারের কারণ প্রকাশ পায়। বামন ভগবান তিন পদক্ষেপে বলিকে আক্রমণ করে ত্রিলোক ইন্দ্রকে পুনরায় দান করেন; তাই এই আশ্রম ‘শ্রমনাশন’ নামে খ্যাত। এরপর বিশ্বামিত্র রাম-লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধাশ্রমে গমন করেন; আশ্রমবাসী মুনিগণ রাজপুত্রদের পূজা-সত্কার করেন। বিশ্রামের পর রাম-লক্ষ্মণ বিশ্বামিত্রকে দীক্ষার জন্য অনুরোধ করেন এবং তিনি সংযত ইন্দ্রিয়ে দীক্ষায় প্রবেশ করেন। প্রভাতে দুই ভাই সন্ধ্যোপাসনা, জপ, অগ্নিহোত্রাদি সম্পন্ন করে বিশ্বামিত্রকে প্রণাম করেন; অধ্যায়টি আশ্রমরক্ষাধর্মের প্রস্তুতি-ভাব নিয়ে সমাপ্ত হয়।
सिद्धाश्रम-यज्ञरक्षणम् · Protection of Viśvāmitra’s Sacrifice at Siddhāśrama
এই সর্গে দেশ‑কালজ্ঞ ও বাক্নিপুণ রাম‑লক্ষ্মণ বিশ্বামিত্রকে জিজ্ঞাসা করেন—রাত্রিতে রাক্ষসেরা কখন আসবে, যাতে যজ্ঞ রক্ষা করা যায়। ঋষিগণ নির্দেশ দেন, বিশ্বামিত্রের দীক্ষা ও মৌনব্রত চলাকালে ছয় রাত্রি যজ্ঞরক্ষায় স্থির থাকতে হবে। ষষ্ঠ দিনে যজ্ঞের তেজ বৃদ্ধি পায়; ঋত্বিক, কুশ, স্রুক, সমিধা ও হব্যদ্রব্যের মধ্যে বেদী অগ্নিশিখায় দীপ্ত হয়ে ওঠে। তখন আকাশে ভয়ংকর শব্দ ওঠে। মারীচ ও সুবাহু অনুচরসহ মায়াবলে আকাশ আচ্ছাদিত করে রক্তবৃষ্টি বর্ষণ করে বেদী অপবিত্র করতে আসে। রাম তৎক্ষণাৎ লক্ষ্মণকে সতর্ক করে ধর্মানুগ ‘মানবাস্ত্র’ প্রয়োগ করেন—প্রাণহরণের উদ্দেশ্য নয়—ফলে মারীচ শত যোজন দূরে উত্তাল সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হয়; মূর্ছিত হলেও নিহত হয় না। এরপর রাম অবশিষ্ট নির্মম যজ্ঞবিঘ্নকারীদের বিনাশের প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি দিব্য ‘আগ্নেয়াস্ত্র’ দ্বারা সুবাহুকে বধ করেন এবং ‘বায়ব্যাস্ত্র’ দিয়ে অন্য রাক্ষসদের সংহার করেন। যজ্ঞ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলে বিশ্বামিত্র রামের প্রশংসা করেন—গুরুর আজ্ঞা সিদ্ধ হলো, ‘সিদ্ধাশ্রম’ নাম সত্য হলো। ঋষিগণ বিজয়ী ইন্দ্রের ন্যায় রামকে সম্মান জানান।
सिद्धाश्रमात् शोणातटं प्रस्थानम् · Departure from Siddhāśrama and the Invitation to Janaka’s Yajña (Bow of Mithilā)
সিদ্ধাশ্রমে বিশ্বামিত্রের উদ্দেশ্য সফল হওয়ার পর কাহিনি উত্তরদিকে মিথিলার যাত্রায় প্রবেশ করে। রাম ও লক্ষ্মণ কৃতার্থ ও আনন্দিত হয়ে রাত্রি যাপন করেন, প্রভাতে নিত্যকর্ম ও প্রাতঃস্নান-আচার সম্পন্ন করে ঋষির আদেশ পালনে নিজেদের প্রস্তুত শিষ্য-সেবক রূপে নিবেদন করেন—তপস্যা ও যজ্ঞ-শৃঙ্খলার মধ্যে সংযত সেবাধর্ম প্রকাশ পায়। এরপর ঋষিসমাজ মিথিলায় রাজা জনকের আসন্ন পরমধার্মিক যজ্ঞের সংবাদ দেন এবং রামকে সেখানে এক আশ্চর্য “ধনুরত্ন” দর্শনের আমন্ত্রণ জানান। সেই ধনুক ভয়ংকর, অপরিমেয় শক্তিসম্পন্ন এবং একদা দেবতাদের দ্বারা যজ্ঞসভায় প্রদত্ত—এমন বর্ণনা করা হয়; তার অপ্রাপ্যতা এমন যে দেব, গন্ধর্ব, অসুর, রাক্ষস এমনকি মহাবলী রাজা ও রাজপুত্ররাও তাকে টানতে তো দূরের কথা, তুলতেও পারেন না। জনকের প্রাসাদে তা যজ্ঞফল-রূপ পবিত্র বস্তু হিসেবে সুগন্ধি, চন্দন, ধূপ ও আগরু দিয়ে পূজিত—রাজচিহ্নও, আচারবস্তুও। বিশ্বামিত্র ঋষিদের সঙ্গে বনদেবতাদের বিদায় জানিয়ে যাত্রা করেন; পাখি ও মৃগও কিছুদূর অনুসরণ করে, পরে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় দল শোণা নদীর তীরে বিশ্রাম নেয়; স্নান করে অগ্নি প্রজ্বলিত করে বিশ্বামিত্রের সঙ্গে বসেন। সেই সুশোভিত অঞ্চলের দৃশ্য দেখে রামের কৌতূহল জাগে, যা পরবর্তী কারণকথার ভূমিকা রচনা করে।
कुशवंशवर्णनम् · The Line of Kuśa and the Disfigurement of Kuśanābha’s Daughters by Vāyu
এই সর্গে বালকাণ্ডের ধর্ম-মানচিত্রের মধ্যে কুশবংশের এক সংক্ষিপ্ত বংশকথা স্থাপিত হয়েছে। ব্রহ্মাজাত, তপোনিষ্ঠ ও সজ্জন-সম্মানপরায়ণ কুশের পরিচয় দেওয়া হয়। তাঁর চার পুত্র—কুশাম্ব, কুশনাভ, অধূর্তরজস ও বসু—ধর্মপূর্বক রাজ্যশাসন করেন এবং নগর প্রতিষ্ঠা করেন: কৌশাম্বী, মহোদয়, ধর্মারণ্য ও গিরিব্রজ। বসুর দেশ ‘বসুমতী’ নামে খ্যাত; পাঁচ পর্বতের মধ্যে প্রসিদ্ধ সুমাগধী/মাগধী নদীর উল্লেখসহ ভূগোলবর্ণনাও আছে। এরপর কাহিনি কুশনাভের শত কন্যার দিকে মোড় নেয়—অপ্সরা ঘৃতাচীর গর্ভে জন্ম, উদ্যানের অলংকারময় পরিবেশে তাদের রূপবর্ণনা করা হয়। তাদের যৌবন-সৌন্দর্য দেখে বায়ু বিবাহপ্রস্তাব দেন এবং অমরত্ব ও অজর যৌবনের প্রতিশ্রুতি দেন। কন্যারা পিতৃ-আজ্ঞাকেই বিবাহধর্ম বলে মান্য করে বায়ুকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তপস্বীদের তেজশক্তির কথা স্মরণ করায়। ক্রুদ্ধ বায়ু তাদের অঙ্গে প্রবেশ করে কুঁজো করে বিকৃত করেন। লজ্জিত ও অশ্রুসিক্ত কন্যারা পিতার কাছে ফিরে আসে; কুশনাভ ধর্মভঙ্গের আঘাত চিন্তা করে অন্তর্মুখ হয়ে সমাধিস্থ হন—এই ঘটনা নীতিশিক্ষা ও কাহিনির সন্ধিক্ষণ হয়ে ওঠে।
कुशनाभकन्याशतविवाहः · The Marriage of Kuśanābha’s Hundred Daughters (and the Birth of Brahmadatta)
এই সর্গে পরস্পর-সংযুক্ত দুইটি নীতিধর্মের কাহিনি বর্ণিত। প্রথমে কুশনাভের একশো কন্যা সর্বব্যাপী বায়ুদেবের বলপূর্বক প্রলোভনের কথা পিতাকে জানায় এবং বলে—বিবাহ বিষয়ে তাদের স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেই; যে কোনো প্রস্তাব পিতৃসম্মতির পথেই গ্রহণযোগ্য। কুশনাভ তাদের একমততা ও ক্ষমাশীলতার প্রশংসা করে বলেন, ক্ষমা বংশরক্ষাকারী এবং ধর্মধারণকারী মহাশক্তি। এরপর বংশপরম্পরা ও বিধির দ্বারা সমাধান প্রকাশ পায়। ব্রহ্মচারী তপস্বী চূলী, ঊর্মিলার কন্যা গন্ধর্বী সোমদার ভক্তিসেবায় প্রসন্ন হয়ে তাকে মনোজাত পুত্র ব্রহ্মদত্ত প্রদান করেন; তিনি পরে কাম্পিল্যের রাজা হন। কুশনাভ মন্ত্রীদের সঙ্গে দেশ-কাল ও উপযুক্ত বর বিচার করে ব্রহ্মদত্তকেই বর স্থির করে একশো কন্যাকে তাঁর হাতে সমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। ব্রহ্মদত্ত বিধিপূর্বক পাণিগ্রহণ করামাত্র কন্যাদের বিকৃতি ও দুঃখ তৎক্ষণাৎ দূর হয়—ধর্মসম্মত বিবাহে সমাজ ও দেহের সামঞ্জস্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত। শেষে বিবাহকর্ম সম্পন্ন হয় এবং সোমদা পুত্রের যথোচিত আচরণ দেখে আনন্দিত হয়ে অনুমোদন করেন।
कुशिकवंश-प्रसङ्गः / Genealogy of the Kuśika Line and the Kausikī River
এই সর্গে বিশ্বামিত্র রামকে নিজের বংশপরিচয় ও দেশবৃত্তান্তের কথা সম্পূর্ণ করে শোনান। ব্রহ্মদত্তের বিবাহোত্তর প্রস্থান হলে কুশনাভের পুত্রেষ্ঠি যজ্ঞের প্রসঙ্গ ওঠে এবং তাতে গাধির জন্ম হয়। বিশ্বামিত্র গাধিকেই নিজের পিতা বলে পরিচয় দেন এবং কুশ-বংশজাত হওয়ায় তাঁর “কৌশিক” উপাধির কারণ ব্যাখ্যা করেন। এরপর তিনি জ্যেষ্ঠা ভগিনী সত্যবতীর পুণ্যকথা বলেন—ঋচীক মুনির সঙ্গে বিবাহের পর তিনি স্বামীর অনুগামী হয়ে স্বর্গে গমন করেন এবং পরে হিমবত্ পর্বত থেকে প্রবাহিত মহতী কৌশিকী নদীরূপে লোককল্যাণার্থে পুনরাবির্ভূত হন। শেষে রাত্রির নীরব চিত্র—নিস্তব্ধ বৃক্ষ, বিশ্রান্ত পশু, তারাভরা আকাশ ও উদিত চন্দ্র; আর যক্ষ-রাক্ষস ও মাংসভোজী নিশাচরদের বিচরণ। বিশ্বামিত্রের কথন শেষ হলে ঋষিগণ তাঁকে প্রশংসা করেন, এবং রাম-লক্ষ্মণ বিশ্রামের জন্য শয়নে যান।
गङ्गाजन्मवर्णनम् / The Origin of the Ganga (Tripathagā Narrative)
প্রভাতে শোণ নদীর তীরে বিশ্বামিত্র রামকে জাগিয়ে প্রাতঃকর্ম ও অগ্রযাত্রার ব্যবস্থা করেন। স্নান-আদি বিধি সম্পন্ন হলে রাম জিজ্ঞাসা করেন—গভীর, বালুচর-শোভিত শোণ কীভাবে পার হওয়া যাবে; তখন বিশ্বামিত্র পূর্ব ঋষিদের অনুসৃত প্রতিষ্ঠিত পথেই চলতে নির্দেশ দেন। অর্ধদিন নানা অরণ্য অতিক্রম করে তারা জাহ্নবী (গঙ্গা) নদীর কাছে পৌঁছায়—তপস্বীদের পূজিতা, হংস-ক্রৌঞ্চ প্রভৃতি পাখিতে মুখর ও মনোরম। গঙ্গাতীরে শিবির স্থাপন করে তারা স্নান করে, পিতৃদের উদ্দেশে তর্পণ দেয়, অগ্নিহোত্র সম্পন্ন করে এবং পবিত্র অবশেষ গ্রহণ করে। শুদ্ধ নদীতটে সবাই বিশ্বামিত্রকে ঘিরে শান্তচিত্তে অবস্থান করে। তখন রাম গভীর প্রশ্ন করেন—গঙ্গাকে ‘ত্রিপথগা’ কেন বলা হয়, এবং তিনি কীভাবে তিন লোককে পবিত্র করে শেষে সমুদ্রে প্রবেশ করলেন? এই প্রশ্নে প্রেরিত হয়ে বিশ্বামিত্র গঙ্গাজন্মকথা শুরু করেন—পর্বতরাজ হিমবান, মহান ধাতুনিধি, এবং তাঁর পত্নী মনোরমা (মেরুর কন্যা)–এর দুই কন্যা: জ্যেষ্ঠা গঙ্গা ও কনিষ্ঠা উমা। দেবকার্যের জন্য দেবতারা গঙ্গাকে প্রার্থনা করলে হিমবান ধর্মানুসারে ত্রিলোকের মঙ্গলের জন্য তাঁকে দান করেন; দেবতারা কৃতার্থ হয়ে প্রস্থান করে। উমা কঠোর তপস্যা করে রুদ্রের সঙ্গে বিবাহ লাভ করেন। শেষে বিশ্বামিত্র গঙ্গাকে স্বর্গগামিনী, পাপহারিণী দিব্য নদী বলে প্রতিষ্ঠা করেন।
बालकाण्ड सर्ग ३६ · गङ्गा-प्रभवप्रश्नः, शिवतेजोधारणं, कार्त्तिकेय-जन्म, उमाशापः
রাম ও লক্ষ্মণ বিশ্বামিত্রের বর্ণনা শুনে তা প্রশংসা করে জিজ্ঞাসা করেন—গঙ্গা কেন ‘ত্রিপথগা’ নামে খ্যাত এবং কোন কর্মে তাঁর পবিত্রতা প্রতিষ্ঠিত। তখন বিশ্বামিত্র শিব ও উমাকে কেন্দ্র করে কারণকথা আরম্ভ করেন। শিব-উমার মিলন শত দিব্যবর্ষ স্থায়ী হলেও সন্তান হয় না। ব্রহ্মার নেতৃত্বে দেবগণ আশঙ্কা করেন—শিবের তেজ থেকে যদি পুত্র জন্মায়, তবে তার প্রভাব লোকসমূহের পক্ষে অসহনীয় হবে। তাঁরা শিবকে প্রার্থনা করেন ত্রিলোকের কল্যাণে সেই তেজ সংযত করে ধারণ করতে। শিব সম্মত হন, কিন্তু জিজ্ঞাসা করেন—তেজ সরে গেলে কে তা ধারণ করবে? দেবগণ ধারাকে (পৃথিবীকে) পাত্ররূপে নির্দিষ্ট করেন। শিব তেজ পৃথিবীতে নিক্ষেপ করেন; বায়ুর সহায়তায় অগ্নি তা গ্রহণ করে বহন করে। তাতে শ্বেতপর্বত ও দীপ্ত শরবণ-অরণ্য প্রকাশ পায়, এবং সেখানে অগ্নিজাত মহাবীর কার্ত্তিকেয়ের জন্ম হয়। দেবর্ষিগণ শিব-উমার পূজা করেন; কিন্তু বিঘ্নে ক্রুদ্ধ উমা দেবদের শাপ দেন—তাদের পত্নীরা নিঃসন্তান হবে; আর পৃথিবীকে শাপ দেন—সে বহু রূপ ও বহু অধিপতির অধীনা হবে, পুত্রপ্রসবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকবে। এরপর বিশ্বামিত্র ‘পর্বতনন্দিনী’ প্রসঙ্গ সমাপ্ত করে গঙ্গাজন্মকথার দিকে অগ্রসর হন।
कुमारसम्भवः · गङ्गायां तेजोनिक्षेपः (The Birth of Kumāra/Skanda and the Deposition of Śiva’s Energy through Gaṅgā)
এই সর্গে বিশ্বামিত্র রামকে এক পৌরাণিক ব্যাখ্যা শোনান। উমার অচ্যুত বাক্যের ফলে দেবতারা নিজেদের পত্নীদের দ্বারা সন্তানলাভ করতে অক্ষম হন; তখন তাঁরা ব্রহ্মার শরণ নিয়ে নতুন সেনাপতি প্রার্থনা করেন। ব্রহ্মা ধর্মসম্মত উপায় নির্দেশ করেন—অগ্নি শিব/ঈশ্বরের তেজ বহন করে দিব্য গঙ্গার মাধ্যমে এক পুত্র উৎপন্ন করবেন, এবং এই ব্যবস্থা উমার কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে। দেবতারা রত্নখচিত কৈলাসে গিয়ে অগ্নিকে অনুরোধ করেন গঙ্গায় শিবতেজ নিক্ষেপ করতে। গঙ্গা দিব্যরূপ ধারণ করলেও ক্রমবর্ধমান অগ্নিতেজ ধারণ করতে পারেন না; অগ্নির নির্দেশে তিনি হিমবতের ঢালে গর্ভ স্থাপন করে নিজের প্রবাহে তা বহিয়ে দেন। পৃথিবীর স্পর্শে ‘জাতরূপ’ (স্বর্ণ) ও অন্যান্য ধাতু-খনিজ উৎপন্ন হয়—এভাবেই হিমালয়ের স্বর্ণবনের কারণ ব্যাখ্যাত হয়। এরপর কুমারের জন্ম হয়; কৃত্তিকারা ধাত্রী নিযুক্ত হওয়ায় তিনি কার্ত্তিকেয় নামে খ্যাত হন। গঙ্গার প্রবাহে ‘স্কন্ন’ (বহে নেমে আসা) হওয়ার কারণে তাঁর নাম স্কন্দও প্রচলিত। কোমল দেহ হলেও তিনি সহজাত বীর্যে দানবসেনাকে পরাভূত করেন, এবং দেবতারা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাপতি পদে প্রতিষ্ঠা করেন। শেষে বলা হয়—কার্ত্তিকেয়ের ভক্তিপূর্বক প্রণাম করলে দীর্ঘায়ু, সন্তানলাভ এবং স্কন্দলোকপ্রাপ্তি হয়।
सगरस्य पुत्रलाभः · Sagara’s Boons, Progeny, and the Rise of the Sixty Thousand
বিশ্বামিত্র মুনি পূর্বকথা শেষ করে অযোধ্যার প্রাচীন নৃপতি সগরের কথা বলেন—ধর্মপরায়ণ হলেও তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর দুই রানি: বিদর্ভরাজকন্যা কেশিনী এবং অরিষ্টনেমির কন্যা সুমতি, যিনি অপরূপা এবং সুপর্ণ (গরুড়)-এর ভগিনী বলে প্রসিদ্ধ। সগর দুই রানি সহ হিমবতের ভৃগুপ্রস্রবণে দীর্ঘ তপস্যা করেন। প্রসন্ন হয়ে মহর্ষি ভৃগু বর দেন—এক রানি একমাত্র পুত্র লাভ করবেন, যিনি বংশধারা রক্ষা করবেন; অন্য রানি ষাট হাজার পুত্র লাভ করবেন। রানি দু’জন বরটির প্রকৃতি জেনে পছন্দ করার অনুমতি পেলে কেশিনী এক বংশধর পুত্রের বর গ্রহণ করেন, সুমতি গ্রহণ করেন বহুপুত্রের বর। কালে কেশিনীর গর্ভে অসমঞ্জস জন্মায়; সে সরযূতে শিশুদের নিক্ষেপ করে নিষ্ঠুর কর্মে কুখ্যাত হয়, প্রজাপীড়নের কারণে সগর তাকে নির্বাসিত করেন। কিন্তু তার পুত্র অংশুমান বীর ও সর্বজনপ্রিয়। সুমতি কুমড়োর মতো এক গর্ভপিণ্ড প্রসব করেন; তা ফেটে ষাট হাজার পুত্রে পরিণত হয়, যারা ঘৃতভরা ঘটিতে প্রতিপালিত হয়ে যৌবনে পৌঁছে। শেষে সগর যজ্ঞ আরম্ভের সংকল্প করেন—যার দ্বারা পরবর্তী বংশ ও যজ্ঞ-ইতিহাসের ধারাবাহিকতা শুরু হয়।
सगरयज्ञाश्वहरणम् · The Stolen Sacrificial Horse of Sagara
পূর্বকথা শেষ হলে প্রসন্ন ও মনোযোগী রাম বিশ্বামিত্রকে অনুরোধ করলেন—সগরের পূর্বপুরুষেরা কীভাবে যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, তা বিস্তারিত বলুন। তখন বিশ্বামিত্র সগর-উপাখ্যান শুরু করলেন—হিমালয় ও বিন্ধ্যের মধ্যবর্তী দেশে সগরের যজ্ঞ চলছিল, আর যজ্ঞাশ্ব রক্ষার জন্য অংশুমানকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। পর্বদিনে (পূর্ণিমা/সমাপ্তির দিনে) বাসব ইন্দ্র রাক্ষস-রূপ ধারণ করে যজ্ঞীয় অশ্ব চুরি করে নিলেন। ঋত্বিজেরা সভায় সগরকে জানালেন—যজ্ঞে দোষ পড়লে অমঙ্গল হবে, তাই অবিলম্বে অশ্ব উদ্ধার করা চাই। সগর দীক্ষিত অবস্থায় অংশুমান ও পুরোহিতবর্গসহ সেখানে থেকেই তাঁর ষাট হাজার পুত্রকে আদেশ দিলেন—সমুদ্রবেষ্টিত পৃথিবী জুড়ে খোঁজ করো, ধারাবাহিকভাবে খনন করতে থাকো, যতক্ষণ না অশ্ব ও চোরের সন্ধান মেলে। রাজপুত্রেরা উদ্যমে হীরের মতো তীক্ষ্ণ নখ, লাঙল ও বর্শা দিয়ে বিস্তীর্ণ ভূমি বিদীর্ণ করতে লাগল। ভূমি-মথনে ভয়ংকর শব্দ উঠল এবং পাতালের জীবসমূহও নিহত হতে লাগল। তখন বিচলিত দেবতা, গন্ধর্ব, অসুর ও নাগেরা ব্রহ্মার কাছে গিয়ে নিবেদন করল—সগরের পুত্রেরা ‘যজ্ঞ-বিঘ্নকারী’ সন্দেহে প্রাণীদের সংহার করছে, আর সমগ্র পৃথিবী ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
सगरपुत्राणां रसातलगमनम् · The Descent of Sagara’s Sons and the Wrath of Kapila
এই সর্গে ভীত দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নেন। ব্রহ্মা বলেন—এ সবই পূর্বনির্ধারিত; পৃথিবীকে ধারণ করছেন স্বয়ং বাসুদেব, যিনি কপিল-রূপে অবস্থান করেন। অতএব সগরের পুত্রদের দ্বারা ভূমি বিদীর্ণ হওয়া এবং শেষে তাদের বিনাশ অনিবার্য, কারণ তারা কপিলের প্রতি অপরাধ করবে। ব্রহ্মা সগরকে নির্দেশ দেন—অশ্বচোরকে খুঁজতে পুনরায় খনন চালাতে হবে। সগরের ষাট হাজার পুত্র রসাতলের দিকে নামতে নামতে চার দিগ্গজকে দেখেন—পূর্বে বিরূপাক্ষ, দক্ষিণে মহাপদ্ম, পশ্চিমে সৌমনস এবং উত্তরে ভদ্র—পর্বতসম বিশাল, পৃথিবীধারক। তাদের মাথা নড়ার ফলেই পুণ্যদিনে ভূমিকম্প হয়—এই ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। তারা সকলকে প্রণাম করে ঈশান কোণে খনন করতে করতে কপিল মুনি (চিরন্তন বাসুদেব) এবং নিকটে চরে বেড়ানো যজ্ঞাশ্বকে দেখতে পায়। কপিলকেই চোর ভেবে তারা অস্ত্র-সরঞ্জাম নিয়ে ধেয়ে যায়, দোষারোপ করে এবং তাঁর ক্রোধ উদ্রেক করে। কপিলের এক বাক্যেই তারা ভস্মীভূত হয়। এই সর্গে অজ্ঞতাজনিত ভুল-পরিচয়, যজ্ঞের তাড়না এবং সিদ্ধপুরুষের প্রতি অধর্মের ভয়াবহ পরিণতি স্পষ্ট হয়।
अंशुमान् · अश्वान्वेषणम्, दिशागजसंवादः, कपिलदाहवृत्तान्तः, गङ्गोपदेशः (Anshuman’s Search for the Horse and the Counsel to Bring Ganga)
রাজা সগর যখন দেখলেন তাঁর পুত্রেরা বহুক্ষণ অনুপস্থিত, তখন তিনি বীর্য, বিদ্যা ও বংশগৌরবে সমুজ্জ্বল পৌত্র অংশুমানকে আহ্বান করে যজ্ঞাশ্ব-হরণকারী চোর ও নিখোঁজ রাজপুত্রদের সন্ধানে পাঠালেন। তাঁকে ধনুর্বাণ ও অস্ত্র ধারণ করতে, সাধুজনকে সম্মান করতে এবং যজ্ঞের বিঘ্ন দূর করে যজ্ঞ সম্পূর্ণ করার নির্দেশ দিলেন। অংশুমান সগরপুত্রদের খনিত ভূগর্ভপথ ধরে অগ্রসর হয়ে দিকরক্ষক দিগ্গজদের দর্শন করলেন, যাঁদের নানা জীব শ্রদ্ধা করে। তিনি তাঁদের প্রদক্ষিণ করে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করলে দিগ্গজেরা আশ্বাস দিলেন—তিনি অশ্বসহ প্রত্যাবর্তন করবেন। এরপর তিনি সগরের ষাট হাজার পুত্রকে ভস্মীভূত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে শোক করলেন এবং নিকটে যজ্ঞাশ্বকে চরে বেড়াতে দেখলেন। পিণ্ডোদক-তর্পণের জন্য জল খুঁজে না পেয়ে তিনি গরুড় (সুপর্ণ/বৈনতেয়)কে দর্শন করলেন। গরুড় বললেন—কপিল মুনির তেজে তারা দগ্ধ হয়েছে; সাধারণ জলে ক্রিয়া যথাযথ নয়, কেবল হিমবানের জ্যেষ্ঠা কন্যা গঙ্গাই ভস্ম পবিত্র করে স্বর্গগতি দিতে পারেন। নির্দেশমতো অংশুমান অশ্ব নিয়ে দ্রুত ফিরে এসে সব সংবাদ সগরকে জানালেন; সগর শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন, তবে তখনও গঙ্গা অবতরণের উপায় স্থির করতে পারলেন না। দীর্ঘকাল রাজত্ব করে তিনি শেষে স্বর্গে গমন করলেন।
गङ्गावतरण-प्रार्थना (Bhagīratha’s Petition for the Descent of Gaṅgā)
এই সর্গে সগরপুত্রদের মুক্তির উদ্দেশ্যে ইক্ষ্বাকুবংশের ধারাবাহিক কাহিনি এগিয়ে যায়। সগরের মৃত্যুর পর প্রজারা ধর্মপরায়ণ অংশুমানকে রাজা স্থাপন করে। পরে অংশুমান দিলীপের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে হিমালয়ের পবিত্র শিখরে কঠোর তপস্যা করেন, কিন্তু উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ না করেই স্বর্গলাভ করেন। দিলীপ পূর্বপুরুষদের বিপর্যয়ে শোকাহত হয়ে গঙ্গার অবতরণ ও জলক্রিয়ার উপায় খুঁজে না পেয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন থাকেন; তখন তাঁর ধর্মাত্মা পুত্র ভগীরথের জন্ম হয়। দিলীপ দীর্ঘকাল যজ্ঞসহ রাজ্যশাসন করে ভগীরথকে অভিষিক্ত করেন এবং পুণ্যবলে ইন্দ্রলোকে গমন করেন। সন্তানহীন ভগীরথ বংশধারা রক্ষা ও পিতৃমুক্তির সংকল্পে মন্ত্রীদের হাতে শাসনভার দিয়ে গোকর্ণে দীর্ঘকাল পঞ্চতপস্যা করেন—উর্ধ্ববাহু, সংযত ইন্দ্রিয়, মাসে একবার আহার। তাঁর তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে ব্রহ্মা আবির্ভূত হন। ভগীরথ গঙ্গাজল দ্বারা সগরপুত্রদের মুক্তির জন্য জলক্রিয়া এবং ইক্ষ্বাকুবংশের ধারাবাহিকতার বর প্রার্থনা করেন। ব্রহ্মা বর দেন, তবে বলেন—গঙ্গার প্রবল বেগ ধারণ করতে কেবল শিবই সক্ষম; অতএব প্রথমে শিবকে প্রার্থনা করতে হবে। এরপর ব্রহ্মা দেবগণের সঙ্গে স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করেন।
गङ्गावतरणम् (The Descent of the Gaṅgā and Bhagiratha’s Fulfilment)
ব্রহ্মা প্রস্থান করলে ভগীরথ গঙ্গার অপ্রতিরোধ্য বেগ সংযত করতে শিবের শরণ নেন। তিনি এক বছর কঠোর তপস্যা করেন—এক পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে স্থির হয়ে—এবং মহাদেবকে প্রার্থনা করেন যেন তিনি পর্বতজাত গঙ্গাকে শিরে ধারণ করেন। তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে শিব তা গ্রহণ করেন। গঙ্গা ক্ষণিক অহংকারে শিবকে গ্রাস করে পাতালে টেনে নিতে উদ্যত হলে, শিবের জটাজালের গহ্বরে সে আবদ্ধ হয়ে স্থির হয়ে যায়। ভগীরথ পুনরায় তপস্যা করলে শিব গঙ্গাকে বিন্দু বিন্দু করে মুক্ত করেন; সে ‘বিন্দুসর’ নামে পরিচিত হয়ে সাত ধারায় বিভক্ত হয়—পূর্বমুখী তিনটি (হ্লাদিনী, পাবনী, নলিনী), পশ্চিমমুখী তিনটি (সুচক্ষু, সীতা, সিন্ধু) এবং সপ্তম ধারা ভগীরথের রথ অনুসরণ করে। দেবতা, ঋষি, গন্ধর্ব, যক্ষ, সিদ্ধ ও জলচরগণ ফেনরাশি, বিদ্যুৎসম দীপ্তি ও নির্মল জ্যোতির মধ্যে সেই অবতরণ প্রত্যক্ষ করেন। পরে গঙ্গার স্রোত ঋষি জহ্নুর যজ্ঞে আঘাত করলে ক্রুদ্ধ জহ্নু গঙ্গাজল পান করেন; পরে কানের দ্বারা তাকে মুক্ত করেন—তাই গঙ্গা ‘জাহ্নবী’ নামে খ্যাত হয়। শেষে গঙ্গা ভগীরথের সঙ্গে সমুদ্রে গিয়ে পাতালে প্রবেশ করে সগরপুত্রদের ভস্ম ধৌত করে তাদের শুদ্ধি ও স্বর্গারোহণ সাধন করে—কর্ম, তীর্থজল ও মুক্তিফলের পবিত্র যোগসূত্র প্রকাশ করে।
गङ्गावतरण-समापनः (Conclusion of the Descent of Gaṅgā)
এই সর্গে গঙ্গাবতরণের উপাখ্যানের সমাপ্তি ঘটে। ভগীরথ গঙ্গাকে সমুদ্র পর্যন্ত নিয়ে এসে পরে পৃথিবীর অধোলোকদেশে অবতরণ করেন, যেখানে সগরের পুত্রেরা ভস্মীভূত হয়ে পড়ে আছে। গঙ্গাজলে সেই ভস্ম প্লাবিত হতেই ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে তাদের মুক্তি ও স্বর্গারোহণ নিশ্চিত করেন—পিতৃউদ্ধার যে দैবসম্মত ও ক্রিয়াসিদ্ধ, তা প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রহ্মা গঙ্গাকে ‘ভাগীরথী’ ও ‘ত্রিপথগা’ নামে প্রতিষ্ঠা করেন—ত্রিলোক-পাবনী দিব্য নদী, ভগীরথের ব্রতস্মৃতিতে লোকের কাছে চিরস্মরণীয়। তিনি ভগীরথকে সকল পূর্বপুরুষের জন্য সালিল-ক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে আদেশ দেন এবং স্পষ্ট করেন যে সগর, অংশুমান ও দিলীপ যে ব্রত সম্পন্ন করতে পারেননি, ভগীরথ তা সিদ্ধ করেছেন। ব্রহ্মা ভগীরথের প্রতিজ্ঞাপূর্তির প্রশংসা করে বলেন, এতে তাঁর কীর্তি লাভ ও ‘ধর্মে মহৎ পদ’ প্রাপ্তি হয়েছে; গঙ্গাস্নান ও শুদ্ধাচরণের উপদেশও দেন। এরপর ব্রহ্মা স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করেন; ভগীরথ বিধিপূর্বক জলকর্ম সম্পন্ন করে শুদ্ধ হয়ে রাজধানীতে ফিরে কৃতার্থভাবে রাজ্য শাসন করেন, প্রজারা শোক-চিন্তামুক্ত হয়ে আনন্দিত হয়। শেষে ফলশ্রুতি—এই পুণ্যকথা শ্রবণ বা পাঠ করলে পুণ্য, সমৃদ্ধি, দীর্ঘায়ু, সন্তানলাভ, দেব-পিতৃসন্তোষ এবং পাপনাশ হয়।
विशालानगरीप्रवेशः · Entry toward Viśālā and the Indra-Kṣīrodamathana Legend
সর্গ ৪৫-এ বিশ্বামিত্রের পূর্বকথা (বিশেষত গঙ্গাবতরণ) শুনে রাম বিস্মিত হন এবং সারারাত সেই পুণ্যবৃত্তান্ত ধ্যান করেন। প্রভাতে তিনি বিনীতভাবে মুনিকে জানান—ধ্যানমগ্নতার ফলে রাত্রি যেন ক্ষণমাত্র কেটে গেছে। এরপর সকলেই পুণ্য ঋষিদের সঙ্গে সম্পর্কিত নৌকায় ত্রিপথগা গঙ্গা পার হয়ে উত্তর তীরে পৌঁছান, তপস্বীসমূহকে সম্মান করেন এবং স্বর্গসদৃশ শোভাময় বিশালানগরী দর্শন করেন। রাম করজোড়ে বিশালার রাজবংশ ও উৎপত্তির কথা জিজ্ঞাসা করলে বিশ্বামিত্র শক্র (ইন্দ্র) কেন্দ্রিক প্রাচীন উপাখ্যান শুরু করেন। দেব ও দানবেরা অমৃতলাভের জন্য ক্ষীরসাগর মন্থনের সিদ্ধান্ত নেয়; মন্দর পর্বত মন্থনদণ্ড এবং বাসুকি নাগ দড়ি হয়। মন্থনে প্রথমে হালাহল বিষ উঠলে দেবগণ রুদ্র/শঙ্করের শরণ নেন; হরির উপদেশে শিব বিষ গ্রহণ করেন, আর বিষ্ণু কূর্মরূপে মন্দরকে ধারণ করেন। তারপর ধন্বন্তরি, অপ্সরা, বারুণী, উচ্চৈঃশ্রবা, কৌস্তুভ মণি এবং শেষে অমৃত প্রকাশ পায়। অমৃত নিয়ে দেব-দানব সংঘর্ষে বিষ্ণু মোহিনী রূপ ধারণ করে দেবদের অমৃত প্রদান করেন; ফলে ইন্দ্রের অধিকার সুদৃঢ় হয়। এভাবে গঙ্গাতীরের যাত্রা ও বিশালাপ্রবেশকে পৌরাণিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে প্রশ্নোত্তরধর্মী শিক্ষামূলক বর্ণনা গঠিত হয়।
दितितपः-शक्रपरिचर्या-गर्भभेदः (Diti’s Penance, Indra’s Service, and the Severing of the Embryo)
এই সর্গে দিতির শোক ও সংকল্পের মাধ্যমে দেব–অসুর নৈতিক টানাপোড়েন প্রকাশ পায়। দেবতাদের হাতে পুত্রবধের পর দিতি মরীচিপুত্র কশ্যপের কাছে প্রার্থনা করেন—ইন্দ্রবধে সক্ষম এমন এক পুত্র যেন তিনি লাভ করেন; তিনি কঠোর তপস্যার প্রতিজ্ঞা করে সেই জন্মের অনুমতি চান। কশ্যপ শর্তসাপেক্ষে বর দেন—সহস্র বছর শৌচ ও সংযম অটুট রাখলে ত্রিলোকাধিপতি পুত্র জন্মাবে। এরপর দিতি কুশপ্লবনে তীব্র তপস্যা আরম্ভ করেন। ইন্দ্র আসন্ন বিপদ বুঝে প্রকাশ্য সংঘর্ষ না করে কৌশলে সেবা গ্রহণ করেন। তিনি অগ্নি, কুশ, জল, ফল-মূল প্রভৃতি তপস্যার উপকরণ জোগান দেন এবং দিতির ক্লান্তি দূর করতেও নিজে উপস্থিত থাকেন। তপস্যা সম্পূর্ণ হতে দশ বছর বাকি থাকতেই দিতি প্রসন্ন হয়ে বলেন—ইন্দ্র এক ভ্রাতা লাভ করবে এবং বিজয়ে অংশীদার হবে। মধ্যাহ্নে দিতি অশুচি ভঙ্গিতে, মাথার দিকে পা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। এই শৌচভঙ্গের সুযোগে ইন্দ্র গর্ভে প্রবেশ করে ভ্রূণকে সাত ভাগে ছিন্ন করেন এবং বারবার “মা রুদঃ” (কাঁদো না) উচ্চারণ করেন—যা থেকে মরুতদের নাম ও উৎপত্তির ব্যাখ্যা মেলে। দিতি জেগে উঠে বধ নিষেধ করেন; ইন্দ্র সরে এসে নিজের কৃত্য স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং বলেন—অশৌচের কারণেই সুযোগ পেয়েছিলেন। সর্গটি তপস্যার সঙ্গে শৌচ-সংযমের অপরিহার্যতা এবং সামান্য শৃঙ্খলাভঙ্গেও বিশ্বব্যবস্থার ফল পাল্টে যেতে পারে—এই নীতিবোধ প্রতিষ্ঠা করে।
दितेर्गर्भभङ्गो मरुत्प्रतिष्ठा च (Diti’s Severed Embryo and the स्थापना of the Maruts; Viśālā-nagara Lineage)
এই সর্গে একদিকে দেবকথা, অন্যদিকে স্থানীয় রাজবংশের বৃত্তান্ত—দুইকে জুড়ে পবিত্র ভূগোলকে কাহিনির স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দিতি তাঁর গর্ভ সাত খণ্ডে বিদীর্ণ হওয়ায় শোকে কাতর হয়ে অজেয় ইন্দ্রের কাছে বিনীতভাবে বলেন—এতে ইন্দ্রের কোনো দোষ নেই; নিজেরই প্রমাদ/ব্রতভঙ্গের ফলেই এই বিপর্যয়। তিনি ক্ষতিকে বিশ্বকল্যাণে রূপ দিতে প্রার্থনা করেন, সেই সাত খণ্ড যেন ‘মরুত’ হয়ে ওঠে—বায়ুর বিভাগ ও দিকসমূহের রক্ষক দেবতা। ইন্দ্র অঞ্জলি বেঁধে সম্মতি দেন এবং তাঁদের লোক ও দিক জুড়ে বিচরণের দিব্য ক্ষমতা নিশ্চিত করেন; মা ও পুত্রগণ কৃতার্থ হয়ে স্বর্গে গমন করেন। এরপর কাহিনি স্থান-নির্মাণে প্রবেশ করে—যে দেশে পূর্বে ইন্দ্র বাস করতেন, সেই দেশের উল্লেখ হয়। ইক্ষ্বাকুর ধর্মাত্মা পুত্র বিশাল (অলম্বুষার গর্ভজাত) বৈশালী নগরী প্রতিষ্ঠা করেন; পরম্পরায় হেমচন্দ্র, সুচন্দ্র, ধূম্রাশ্ব, সঞ্জয়, সহদেব, কুশাশ্ব, সোমদত্ত, ককুত্স্থ প্রভৃতি রাজাদের নাম বলা হয়, যা বর্তমান রাজা সুমতিতে এসে সম্পূর্ণ হয়। শেষে অতিথিসেবার বিধান অনুযায়ী রাত্রিযাপন স্থির হয় এবং জনকের সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বসংকেত দেওয়া হয়; সুমতি স্বয়ং বেরিয়ে এসে বিশ্বামিত্রকে অভ্যর্থনা করে মুনির আগমনকে নিজের সৌভাগ্য বলে ঘোষণা করেন।
अहल्याशापवर्णनम् (The Account of Ahalyā’s Curse and the Deserted Hermitage near Mithilā)
এই সর্গে রাম-লক্ষ্মণ মিথিলার পথে যজ্ঞীয় আতিথ্য-সত্কার ও পবিত্র ভূগোলের ধারায় অগ্রসর হন। কুশল-প্রশ্নের পর রাজা সুমতি তাঁদের বিশিষ্ট অতিথিরূপে সম্মান করে এক রাত্রি নিবাস দেন; পরদিন তাঁরা জনকের শুভ নগরী মিথিলার দিকে যাত্রা করেন, যাকে সমবেত ঋষিগণ ভক্তিভরে প্রশংসা করেন। মিথিলার নিকটে রাম এক প্রাচীন, মনোহর কিন্তু নির্জন আশ্রম দেখে বিশ্বামিত্রকে তার ইতিহাস জিজ্ঞাসা করেন। বিশ্বামিত্র বলেন—এটি দেবতাদেরও পূজিত মহর্ষি গৌতমের আশ্রম; সেখানে গৌতম ও অহল্যা বহু বছর তপস্যা করেছিলেন। সুযোগ পেয়ে ইন্দ্র গৌতমের বেশ ধারণ করে মিলনের প্রার্থনা করে; অহল্যা ইন্দ্রকে চিনেও কৌতূহল ও প্রবৃত্তিবশে সম্মতি দেন। তপোবলে দীপ্ত গৌতম প্রত্যাবর্তন করে প্রতারণা প্রকাশ করেন—ইন্দ্রকে বীর্যহানির শাপ দেন এবং অহল্যাকে দীর্ঘকাল অদৃশ্য থেকে আশ্রমে বায়ুভক্ষণ ও ভস্মশয্যায় শয়ন করে প্রায়শ্চিত্ত করতে নির্দেশ দেন। শাপের মধ্যেই ভবিষ্যৎ-উদ্ধারের বিধান আছে—বনে প্রবেশকারী শ্রীराम যখন এসে তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করবেন, তখন অহল্যা শুদ্ধ হয়ে পুনরায় স্বরূপ লাভ করবেন। এরপর গৌতম হিমবতে তপস্যার জন্য গমন করেন; সেই আশ্রম অপরাধ, প্রায়শ্চিত্ত ও মুক্তির পবিত্র স্মারকস্থানে পরিণত হয়।
अहल्याशापमोक्षः · The Release of Ahalya and Indra’s Restoration
এই সর্গে দেবযজ্ঞের এক অলৌকিক প্রসঙ্গের সঙ্গে নৈতিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাহিনি জড়িয়ে আছে। গৌতম মুনির তপস্যায় বিঘ্ন ঘটানো ও পরস্ত্রী-সীমা লঙ্ঘনের ফলে শাপগ্রস্ত ইন্দ্র নিজের ক্ষতি ও লজ্জায় বিলাপ করে এবং অগ্নিকে অগ্রে রেখে দেবতাদের কাছে প্রতিকার প্রার্থনা করে। অগ্নির নির্দেশে পিতৃদেবগণ এক মেষের অণ্ডকোষ ইন্দ্রের দেহে সংযোজন করেন; এর ফলে যজ্ঞপরম্পরায় অণ্ডকোষহীন মেষও হব্যরূপে গ্রহণীয়—এমন রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বিশ্বামিত্র রামকে গৌতমাশ্রমে প্রবেশ করতে বলেন—রামের আগমন পর্যন্ত শাপে অদৃশ্য থাকা অহল্যার মুক্তি রামেই নির্ধারিত। বিশ্বামিত্রের সঙ্গে রাম-লক্ষ্মণ অহল্যাকে দর্শন করেন; কুয়াশায় আচ্ছন্ন চন্দ্রালোকে যেমন দীপ্তি, তেমনি সূর্যসম তেজ—এমন উপমায় তাঁর তপস্যাজাত শুদ্ধ জ্যোতি বর্ণিত হয়। শাপকাল শেষ হলে দুই ভ্রাতা তাঁর চরণ স্পর্শ করেন; অহল্যা পাদ্য-অর্ঘ্য প্রভৃতি দ্বারা আতিথ্য পালন করেন। তখন পুষ্পবৃষ্টি, দুন্দুভিনাদ, গন্ধর্ব-অপ্সরাদের গীত-নৃত্যসহ দেবোৎসব ঘটে। গৌতম মুনি অহল্যার সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়ে রামকে সম্মান করেন এবং আবার তপস্যায় প্রবৃত্ত হন। পরে রাম মিথিলার দিকে অগ্রসর হন।
यज्ञवाटप्रवेशः जनक-विश्वामित्रसंवादश्च (Arrival at the Sacrificial Ground and Janaka’s Reception)
এই সর্গে মিথিলার যজ্ঞবাটে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার ক্রম বর্ণিত হয়েছে। বিশ্বামিত্রের নেতৃত্বে রাম ও লক্ষ্মণ ঈশান দিকে অগ্রসর হয়ে যজ্ঞ-পরিসরে পৌঁছান। সেখানে সহস্র সহস্র বেদবিদ ব্রাহ্মণ, তপস্বীদের কুটির এবং রথ-শকটে ভরা শিবির দেখে রাম উপযুক্ত নিবাসস্থানের কথা জিজ্ঞাসা করেন; বিশ্বামিত্র জলসন্নিকটে এক শান্ত স্থান নির্ধারণ করেন। বিশ্বামিত্রের আগমনের সংবাদ পেয়ে রাজা জনক পুরোহিত শतानন্দকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে স্বাগত জানান, আর ঋত্বিজরা মন্ত্রোচ্চারণসহ অর্ঘ্য প্রদান করেন। পরস্পরের কুশলপ্রশ্ন ও যজ্ঞের অগ্রগতি জেনে মর্যাদানুসারে আসনবিন্যাস হয়। জনক বলেন, বিশ্বামিত্রের উপস্থিতিতেই যজ্ঞ সফল; এখনও বারো দিন বাকি, দেবতারা তাঁদের ভাগ গ্রহণ করতে আগমন করবেন। এরপর জনক ভক্তিভরে কৌতূহল প্রকাশ করে জিজ্ঞাসা করেন—এই দুই দীপ্তিমান, অস্ত্রধারী, সমবর্ণ-সমদেহ এবং যেন দিব্য যুবক কারা। বিশ্বামিত্র তাঁদের দশরথের পুত্র বলে পরিচয় দিয়ে সংক্ষেপে যাত্রাবৃত্তান্ত বলেন—সিদ্ধাশ্রমে অবস্থান, রাক্ষসনিধন, বিশালার দর্শন, অহল্যার দর্শন ও গৌতমের সঙ্গে সাক্ষাৎ—এবং শিবের মহাধনু দেখাই তাঁদের উদ্দেশ্য; তারপর তিনি নীরব হন, এবং রাজসভা-যজ্ঞবাটের এই দৃশ্য সমাপ্ত হয়।
शतानन्दोपदेशः · Śatānanda’s Welcome to Rāma and the Prelude to Viśvāmitra’s History
এই সর্গে আশ্রমকেন্দ্রিক সংলাপের মাধ্যমে আতিথ্যধর্ম, অহল্যার পুনরুদ্ধার এবং বংশ-ইতিহাস শিক্ষারূপে যুক্ত হয়েছে। গৌতমের জ্যেষ্ঠপুত্র, তপস্যায় দীপ্তিমান শतानন্দ বিশ্বামিত্রের আগমন সংবাদ শুনে এবং রামকে দেখে আনন্দ-বিস্ময়ে অভিভূত হন। তিনি বিশ্বামিত্রকে জিজ্ঞাসা করেন—রামকে কি অহল্যা দর্শন করানো হয়েছে, অহল্যা কি বনজ হব্য দিয়ে পূজা-সম্মান করেছেন, ইন্দ্রের অপরাধসংক্রান্ত প্রাচীন কাহিনি কি রামকে বলা হয়েছে, এবং রামের উপস্থিতিতে কি অহল্যার গৌতমের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটেছে। বিশ্বামিত্র জানান—যা করণীয় ছিল তার কিছুই বাদ পড়েনি; অহল্যা গৌতমের সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হয়েছেন, যেমন রেণুকা জমদগ্নির সঙ্গে। এরপর শतानন্দ রামকে বিধিপূর্বক স্বাগত জানান এবং বিশ্বামিত্রকে অচিন্ত্যকর্মা ব্রহ্মর্ষি বলে স্তব করেন; তাঁকে রামের রক্ষক-অভিভাবক রূপে প্রতিষ্ঠা করে রামের যাত্রাকে ঋষিপরম্পরার অনুমোদিত পথনির্দেশে স্থাপন করেন। তারপর সর্গটি ইতিহাসবর্ণনায় প্রবেশ করে—বিশ্বামিত্রের পূর্ব রাজত্ব, ধর্মময় শাসন, এবং কুশ → কুশনাভ → গাধি → বিশ্বামিত্র এই বংশপরম্পরা। শেষে বশিষ্ঠের আশ্রমের উজ্জ্বল চিত্রণ—দ্বিতীয় ব্রহ্মলোকের ন্যায়; সিদ্ধ, চারণ, দেবর্ষি, ব্রহ্মর্ষি ও নানা তপস্যাচারীদের সমাবেশ, যেখানে কেউ জলাহারী, কেউ বায়ুভোজী, কেউ পত্র-ফল-মূলভোজী—এবং এখানেই আসন্ন বশিষ্ঠ–বিশ্বামিত্র সাক্ষাতের ভূমিকা রচিত হয়।
वसिष्ठ-आतिथ्यं (Vasiṣṭha’s Hospitality to Viśvāmitra and the Summoning of Śabalā/Kāmadhenu)
এই ৫২তম সর্গে আতিথ্যধর্মের বিধানকে কেন্দ্র করে রাজশক্তি ও তপঃশক্তির এক আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার ফুটে ওঠে। মহাবলী ও বীর বিশ্বামিত্র আনন্দভরে বশিষ্ঠের আশ্রমে এসে শ্রদ্ধাভরে প্রণাম করেন। বশিষ্ঠ তাঁকে সাদরে গ্রহণ করে আসন দেন এবং বনফল-মূল প্রভৃতি দিয়ে প্রথামাফিক আতিথ্য করেন। এরপর উভয়ের মধ্যে কুশল-প্রশ্নোত্তর চলে—তপস্যা, অগ্নিহোত্র, শিষ্যসমাজ ও আশ্রমের বৃক্ষপর্যন্ত; তারপর বশিষ্ঠ রাজধর্মের দৃষ্টিতে রাজাকে জিজ্ঞাসা করেন—প্রজা, ভৃত্য, কোষাগার, সেনা, মিত্র ও উত্তরাধিকারীদের কল্যাণ কেমন। দীর্ঘ সৌহার্দ্যপূর্ণ কথোপকথনের পরে বশিষ্ঠ রাজা ও তাঁর সৈন্যবাহিনীর জন্য আরও বিস্তৃত আপ্যায়নের প্রস্তাব দেন। বিশ্বামিত্র প্রথমে বিনয়ে বলেন—ফল-মূল ও ঋষিদর্শনই যথেষ্ট; কিন্তু বশিষ্ঠ বারবার অনুরোধ-আগ্রহ করেন। সম্মতি পেলে বশিষ্ঠ চিত্রবর্ণা গাভী শবলা (কামধেনু)কে আহ্বান করে আদেশ দেন—ষড়রসসমৃদ্ধ প্রচুর ভোজন-পানীয়, পানীয়-খাদ্য-লেহ্য-চোষ্য সবই উৎপন্ন করতে। এতে আশ্রমসমৃদ্ধি, তপোবল এবং অতিথিপূজার ধর্মময় অর্থনীতি উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পায়।
शबलाप्रार्थना-वसिष्ठप्रतिज्ञा (The Request for Śabalā and Vasiṣṭha’s Refusal)
এই সর্গে বশিষ্ঠের আশ্রমে শবলা (কামধেনু)-র শক্তিতে যে অপূর্ব আতিথ্য সম্পন্ন হয়, তা দেখে বিশ্বামিত্র অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে প্রশংসা করেন; কিন্তু রাজাধিকার দেখিয়ে শবলাকে ‘রত্ন’ বলে দাবি করেন। তিনি বিনিময়ে প্রথমে এক লক্ষ গাভী দিতে চান, পরে প্রস্তাব বাড়িয়ে চৌদ্দ হাজার স্বর্ণভূষিত হাতি, চারটি শ্বেত অশ্বযুক্ত আটশো স্বর্ণরথ, এগারো হাজার উৎকৃষ্ট অশ্ব, এবং শেষে এক কোটি তরুণী গাভীসহ অসীম রত্ন ও স্বর্ণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বশিষ্ঠ বারবার দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন—শবলাই তাঁর রত্ন, ধন ও প্রাণ; ধর্মবান ব্যক্তির কীর্তির মতোই তিনি শবলা থেকে বিচ্ছিন্ন নন। তিনি জানান, হব্য-কব্য অর্পণ, অগ্নিহোত্র পালন, বলি-হোম, স্বাহা-বাসট্কারের সিদ্ধি এবং বিদ্যাশাখার প্রবাহ পর্যন্ত শবলানির্ভর; তাই পবিত্র সম্পদকে পণ্য করে কেনাবেচা করা যায় না। এভাবে ব্রহ্মর্ষির স্বাতন্ত্র্য ও ধর্মসম্মত তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠিত হয়। শেষে বিশ্বামিত্রের অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়—অর্থবলসমর্থ রাজকীয় অধিগ্রহণ ও ধর্মবলসমর্থ তপো-যজ্ঞাধিকার—এই দুইয়ের নৈতিক সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
शबलाहरणम् · The Attempted Seizure of Sabalā (Kāmadhenu) and the Triumph of Brahmic Power
এই সর্গে ক্ষাত্রবল (রাজশক্তির দমনক্ষমতা) ও ব্রহ্মবল (ব্রহ্মর্ষির তপস্যা ও যজ্ঞীয় কর্তৃত্ব)–এর এক ন্যায়িক ও আধ্যাত্মিক সংঘর্ষ প্রকাশ পায়। বশিষ্ঠ যখন কামধেনু শবলা (সাবলা) দান করতে অস্বীকার করেন, তখন বিশ্বামিত্র বলপ্রয়োগে তাকে টেনে নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। শবলা দুঃখে ভাবে—গুরু কি তাকে পরিত্যাগ করেছেন? তারপর রাজসেবকদের বন্ধন ছিন্ন করে সে সরাসরি বশিষ্ঠের শরণ নেয়। বশিষ্ঠ জানান, তিনি তাকে ত্যাগ করেননি; রাজা বল করে হরণ করছে। তিনি বিশ্বামিত্রের রাজমর্যাদা ও অক্ষৌহিণী সেনার পার্থিব শক্তি স্বীকার করলেও, তার ঊর্ধ্বে ব্রহ্মবলের ইঙ্গিত দেন। শবলা তত্ত্বগতভাবে ঘোষণা করে—ব্রাহ্মণবল ক্ষত্রিয়বলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, দিব্য ও অপরিমেয়। বশিষ্ঠের আদেশে সে নিজের ‘হুম্ভা’ ধ্বনি থেকে পপ্লবদের সৃষ্টি করে, যারা বিশ্বামিত্রের সেনাকে পরাভূত করে; তারা নিহত হলে শক ও যবন মিশ্রিত বাহিনী উদ্ভূত হয়ে অবশিষ্ট সেনাদলকে দগ্ধ করে তাড়িয়ে দেয়। বিশ্বামিত্র অস্ত্র নিক্ষেপ করে এই সৃষ্ট বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে। এভাবে অধ্যায়টি রাজনৈতিক বল, অলৌকিক সৃষ্টিশক্তি এবং মন্ত্রনির্ভর অস্ত্রশক্তির স্তরবিন্যাস দেখিয়ে বিশ্বামিত্রের ব্রহ্মর্ষি-পদলাভের আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তোলে।
कामधेनुसैन्यप्रादुर्भावः · Kamadhenu’s Forces, Visvamitra’s Austerities, and Vasishta’s Wrath
এই সর্গে ক্ষাত্রবল ও ব্রহ্মতেজের সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। বিশ্বামিত্রের সেনা যখন অস্ত্রবলে পর্যুদস্ত হয়, তখন বশিষ্ঠ কামধেনুকে যোগশক্তিতে নতুন নতুন বাহিনী সৃষ্টি করতে আদেশ দেন। কামধেনুর দেহ ও নিনাদ থেকে নানা দল উদ্ভূত হয়ে অল্পক্ষণেই বিশ্বামিত্রের সমগ্র সৈন্যদল ধ্বংস করে দেয়। ক্রুদ্ধ বিশ্বামিত্রের পুত্রেরা অস্ত্র হাতে বশিষ্ঠের দিকে ধেয়ে আসে, কিন্তু মহর্ষির একমাত্র ‘হুঙ্কার’-এ তারা ভস্মীভূত হয়। পুত্রহারা ও সৈন্যহারা রাজা শোকে নিমজ্জিত হন; ক্ষত্রিয়রীতি অনুসারে অবশিষ্ট এক পুত্রকে রাজ্যে স্থাপন করে তিনি হিমালয়ের ঢালে মহাদেবকে প্রসন্ন করতে তপস্যায় প্রবৃত্ত হন। শিব বরদাতা রূপে আবির্ভূত হলে বিশ্বামিত্র ধনুর্বেদের শাখা-প্রশাখা ও গূঢ় রহস্যসহ সকল দিব্য ও অমানুষ অস্ত্রের জ্ঞান প্রার্থনা করেন এবং তা লাভ করেন। বরলাভে তাঁর অহংকার বৃদ্ধি পায়। বশিষ্ঠকে পরাজিত মনে করে তিনি আশ্রমে ফিরে এসে এমন অস্ত্র নিক্ষেপ করেন যে তপোবন দগ্ধ হতে থাকে; ঋষি, শিষ্য, পশু ও পক্ষী ভয়ে পালায়। বশিষ্ঠ সকলকে আশ্বস্ত করে ক্রোধে বিশ্বামিত্রের দুষ্কর্ম নিন্দা করেন এবং যমদণ্ডসম দণ্ড উত্তোলন করেন—অহংকারী হিংসার বিরুদ্ধে ব্রহ্মতেজের আসন্ন প্রবল প্রতিঘাতের সূচনা করে।
बालकाण्ड ५६: विश्वामित्र-वसिष्ठ अस्त्रसंघर्षः (Visvamitra and Vasistha: Contest of Divine Weapons)
এই সর্গে ক্ষত্রিয়-শক্তি (শস্ত্র/অস্ত্র) ও ব্রাহ্মণ-তেজের তাত্ত্বিক সংঘর্ষ প্রকাশিত হয়েছে। বশিষ্ঠের বাক্য শুনে মহাবলী বিশ্বামিত্র অগ্নেয়াস্ত্র তুলে আঘাতের আদেশ দেন; কিন্তু বশিষ্ঠ তাঁর ব্রহ্মদণ্ডের তেজে তা নিস্তেজ করে দেন—এতে বোঝানো হয় যে ব্রাহ্মণ-তেজ অস্ত্রবলের ঊর্ধ্বে। এরপর বিশ্বামিত্র বরুণ, রৌদ্র, ঐন্দ্র, পাশুপত প্রভৃতি এবং মোহন, স্বাপন, ধর্মচক্র, বিষ্ণুচক্র ইত্যাদি বহু বিশেষ অস্ত্র একে একে প্রয়োগ করেন। তাতে ত্রিলোক ভয়ংকর দৃশ্যে কেঁপে ওঠে; কিন্তু ব্রহ্মার পুত্র বশিষ্ঠ দণ্ডের শক্তিতে সেগুলি যেন ‘গ্রাস’ করে নিবারণ করেন। শেষে বিশ্বামিত্র ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করলে তিন জগৎ, দেবতা-ঋষি-গন্ধর্ব ও মহা নাগগণও আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। বশিষ্ঠ ব্রাহ্মণ-শক্তিতে ব্রহ্মাস্ত্রও সংহরণ করেন এবং ক্রোধরূপ ধারণ করে রোমকূপ থেকে অগ্নিশিখা প্রকাশ করেন। ঋষিগণ তাঁর স্তব করে লোককল্যাণের জন্য সংযম প্রার্থনা করেন। অপমানিত বিশ্বামিত্র উপলব্ধি করেন—ব্রহ্ম-তেজ ক্ষত্রিয়-বলকে অতিক্রম করে; তাই ব্রহ্মত্ব লাভের উদ্দেশ্যে তিনি মহাতপস্যার সংকল্প গ্রহণ করেন।
विश्वामित्रस्य दक्षिणतपः तथा त्रिशङ्कोः स्वशरीरेण स्वर्गगमनाभिलाषः (Visvamitra’s Southern Austerity and Trisanku’s Bodily Ascent Aspiration)
বিশ্বামিত্র পূর্ব অপমান ও বশিষ্ঠের সঙ্গে জন্মানো বৈর স্মরণ করে প্রধান রাণীসহ দক্ষিণ দিকে গমন করেন। সেখানে ফল-মূল আহার করে, ইন্দ্রিয়সংযমে স্থিত থেকে তিনি ভয়ংকর তপস্যা আরম্ভ করেন। সহস্র বছর তপস্যার পর ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে তাঁকে কেবল ‘রাজর্ষি’ উপাধি দেন; এতে বিশ্বামিত্রের অসন্তোষ বৃদ্ধি পায় এবং উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষায় তিনি পুনরায় আরও কঠোর তপস্যায় প্রবৃত্ত হন। এদিকে ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা ত্রিশঙ্কু, সত্যবাদী ও সংযমী, এক অভূতপূর্ব সংকল্প করেন—নিজ দেহসহ স্বর্গে গমন করবেন। মহাযজ্ঞের দ্বারা তা সিদ্ধ করতে চাইলে বশিষ্ঠ ‘এ অসম্ভব’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তখন ত্রিশঙ্কু দক্ষিণ দেশে বশিষ্ঠের শত তপস্বী পুত্রের কাছে বিনীতভাবে শরণ নিয়ে তাঁদেরকে যজ্ঞের ঋত্বিক হতে অনুরোধ করেন, যাতে দেহসহ স্বর্গারোহণ সম্ভব হয়। এই সর্গে তপোবল, যজ্ঞাধিকার এবং ধর্মসম্মত আকাঙ্ক্ষার সীমা—এই বিষয়গুলি পাশাপাশি প্রতিভাত হয়।
त्रिशङ्कुशापः · Trishanku’s Curse and Appeal to Viśvāmitra
এই সর্গে যজ্ঞাধিকার, গুরু-পরম্পরার সীমা এবং নির্ধারিত আচার্যকে এড়িয়ে অন্য পথ নেওয়ার নৈতিকতা নিয়ে সুসংবদ্ধ বিতর্ক উঠে আসে। রাজা ত্রিশঙ্কু দেহসহ স্বর্গারোহণের বাসনায় বশিষ্ঠকে প্রার্থনা করেন, কিন্তু বশিষ্ঠ সম্মতি দেন না। তখন ত্রিশঙ্কু বশিষ্ঠের শত পুত্রের কাছে যান; তারা সত্যনিষ্ঠ গুরুকে অতিক্রম করে অন্য উপায় খোঁজার জন্য রাজাকে তিরস্কার করে এবং একে ইক্ষ্বাকু বংশের পুরোহিত-পরম্পরার অবমাননা বলে গণ্য করে। ত্রিশঙ্কু যখন বলে যে সে অন্য উপায় গ্রহণ করবে, ক্রুদ্ধ পুত্রগণ তাকে চাণ্ডাল হওয়ার শাপ দেয়। শাপ রাত্রির মধ্যেই ফলিত হয়—দেহে ও সামাজিক অবস্থায় স্পষ্ট চিহ্ন দেখা দেয়; মন্ত্রী, প্রজা ও অনুচররা ভয়ে তাকে ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। একাকী ও বিষণ্ণ ত্রিশঙ্কু বিশ্বামিত্রের শরণ নেয়; বিশ্বামিত্র করুণায় কারণ জিজ্ঞাসা করেন। ত্রিশঙ্কু নিজের ব্রতসদৃশ সংকল্প, বহু যজ্ঞের পুণ্য, ধর্মময় রাজ্যশাসন ও সত্যনিষ্ঠার কথা জানায় এবং বলে যে বিধি যেন তার পুণ্যকে আঘাত করেছে। সে বিশ্বামিত্রকে অনুরোধ করে—মানবপ্রচেষ্টায় ভাগ্যকে প্রতিহত করতে। ফলে এই অধ্যায়ে ধর্ম, কর্তৃত্ব, শাপের কার্যকারিতা এবং পুরুষার্থ–দৈব টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়।
विश्वामित्रस्य शरणागति-प्रशंसा तथा वासिष्ठपुत्र-शापः (Visvamitra grants refuge; the curse upon Vasishta’s sons)
এই সর্গে শরণাগতি-ধর্ম, যজ্ঞের শাস্ত্রসম্মত মর্যাদা এবং তপস্বীর বাক্যের দণ্ডশক্তি সুসংবদ্ধভাবে প্রকাশিত। শাপে চাণ্ডাল-রূপপ্রাপ্ত রাজাকে দেখে বিশ্বামিত্র করুণায় তাকে আশ্বাস দেন, তার দুর্দশার সত্যতা স্বীকার করে স্পষ্টভাবে শরণ প্রদান করেন। এরপর তিনি শিষ্যদের আদেশ দেন—আসন্ন যজ্ঞে সহায়তার জন্য বহু ঋষি ও ব্রহ্মবাদীদের আহ্বান করো, এবং আমার আদেশের প্রতি যে কেউ অবমাননা করলে তা-ও যথাযথভাবে জানাবে। শিষ্যরা ফিরে জানায় যে নানা দেশ থেকে ব্রাহ্মণরা এসেছেন, তবে মহোদয়ের বিষয়ে ব্যতিক্রম/জটিলতা দেখা দিয়েছে। তারা বশিষ্ঠের শতপুত্রের ক্রুদ্ধ আপত্তিও জানায়—এক ক্ষত্রিয় কীভাবে পুরোহিত হবে, বিশেষত চাণ্ডালের জন্য; এবং এমন যজমান-সম্পর্কিত হবি ভক্ষণ করলে অমঙ্গল হবে। এ কথা শুনে বিশ্বামিত্রের ক্রোধ শাপে রূপ নেয়—অপরাধীরা নীচ যোনিতে জন্ম নেবে ও কঠোর জীবিকায় দিন কাটাবে; আর মহোদয় দীর্ঘকাল নিষাদ-রূপে দুঃখময় জীবন ভোগ করবে। শেষে ঋষিসভায় বিশ্বামিত্র নীরব থাকেন, ধর্মসীমা ও তপস্বীকে অবজ্ঞার ভয়ংকর ফল স্মরণ করিয়ে।
त्रिशङ्कुस्वर्गारोহণम् · Trishanku’s Bodily Ascent and the New Constellations
এই সর্গে বিশ্বামিত্রের তপোবল ও ত্রিশঙ্কুর দেহসহ স্বর্গারোহণের আকাঙ্ক্ষা ঘিরে এক গভীর ধর্ম-সংকটের বর্ণনা আছে। পূর্বের বশিষ্ঠবংশের সঙ্গে বিরোধ স্মরণ করে বিশ্বামিত্র যজ্ঞ আরম্ভ করেন এবং দেবতাদের হবি-ভাগ গ্রহণের জন্য আহ্বান করেন; কিন্তু দেবগণ উপস্থিত হন না। তখন তিনি নিজের প্রতিজ্ঞাশক্তিতে যজ্ঞের বল ত্রিশঙ্কুর পক্ষে প্রবাহিত করে তাকে সশরীরে স্বর্গে উঠতে আদেশ দেন। ইন্দ্র গুরু-শাপে কলুষিত বলে ত্রিশঙ্কুকে অযোগ্য গণ্য করে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাকে উল্টোভাবে মাথা নিচে করে পতিত হতে বলেন। পতনের মধ্যেই ত্রিশঙ্কু বিশ্বামিত্রের শরণ নেয়; বিশ্বামিত্র তাকে থামিয়ে ক্রোধে দক্ষিণ দিগন্তে নতুন সপ্তর্ষি ও নক্ষত্রমালা সৃষ্টি করেন, এমনকি নতুন ইন্দ্র সৃষ্টিরও সংকল্প প্রকাশ করেন। ঋষি, সুর ও অসুরদের সভা আতঙ্কিত হয়ে সমাধানে আসে—ত্রিশঙ্কু বিশ্বামিত্র-সৃষ্ট নতুন আকাশমণ্ডলে উল্টো অবস্থায়ও দীপ্তিমান হয়ে মধ্যাকাশে স্থির থাকবে, এবং সৃষ্ট নক্ষত্রসমূহ লোকস্থিতি যতদিন থাকবে ততদিন স্থায়ী হবে। এই অধ্যায়ে গুরু-শাপ, দেবলোকের দ্বাররক্ষা এবং ঋষির অটল প্রতিজ্ঞার শক্তির মধ্যে টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়।
शुनःशेफविक्रयः · The Sale of Śunaḥśepa for the Sacrifice
এই সর্গে তপস্বীদের আশ্রম-পরিবর্তন ও রাজযজ্ঞের সংকট একসঙ্গে বর্ণিত। অরণ্যে ঋষিদের অন্যত্র গমন লক্ষ্য করে বিশ্বামিত্র দক্ষিণদিকের এক বাধাস্বরূপ অঞ্চল এড়িয়ে সকলকে পশ্চিমের বিস্তৃত প্রদেশে পুষ্করে নিয়ে যান এবং তীব্র তপস্যার উপযুক্ত শ্রেষ্ঠ তপোবন বলে সেখানে নিবাস স্থির করেন। অন্যদিকে অযোধ্যার রাজা অম্বরীষ যজ্ঞ আরম্ভ করেন; কিন্তু ইন্দ্র নির্দিষ্ট যজ্ঞপশু অপহরণ করায় যজ্ঞসিদ্ধি বিপন্ন হয়। ঋত্বিকগণ একে রাজদোষজনিত বলে ধরে নিয়ে অবিলম্বে বিকল্প—পশু অথবা মানব—আনতে নির্দেশ দেন। অম্বরীষ বহু দেশে অনুসন্ধান করে বিপুল গোরূপ মূল্য দিতে সম্মত হন এবং শেষে ভৃগুতুণ্ডে ব্রহ্মর্ষি ঋচীককে পরিবারসহ দেখতে পান। রাজা যজ্ঞার্থ এক পুত্র ক্রয় করতে প্রার্থনা করেন; ঋচীক জ্যেষ্ঠ পুত্র বিক্রি করতে অস্বীকার করেন, আর মাতা কনিষ্ঠ শুনককে ছাড়তে চান না। পিতামাতার পক্ষপাত বুঝে মধ্যম পুত্র শুনঃশেফ নিজেই আত্মসমর্পণ করে; অম্বরীষ এক লক্ষ গোর বিনিময়ে তাকে ক্রয় করে দ্রুত প্রস্থান করেন—যজ্ঞব্রতের কঠোরতা, পারিবারিক আসক্তি ও যজ্ঞের অনিবার্যতা থেকে জন্ম নেওয়া নৈতিক চাপকে প্রকাশ করে।
शुनश्शेफरक्षा-विश्वामित्रशापः (Sunassepha’s Rescue and Visvamitra’s Curse)
এই সর্গে পুষ্কর-তীর্থের পবিত্র ভূগোলে রাজা অম্বরীষের যজ্ঞ-সংকট স্থাপিত হয়েছে। শুনশ্শেফকে সঙ্গে নিয়ে রাজা মধ্যাহ্নে বিশ্রাম নেন। দুঃখাকুল বালক শুনশ্শেফ সেখানে মাতুল বিশ্বামিত্রকে অন্যান্য ঋষিদের সঙ্গে তপস্যায় রত দেখে ধর্মবাক্যে আশ্রয় প্রার্থনা করে—ঋষি সর্বজনের রক্ষক, আর যজ্ঞ অধর্মের দ্বারা সম্পূর্ণ হওয়া উচিত নয়। বিশ্বামিত্র তাকে সান্ত্বনা দিয়ে নিজের পুত্রদের বলেন, অগ্নিতুষ্টি ও যজ্ঞরক্ষার জন্য তারা যেন স্বয়ং বলিস্থানে প্রতিস্থাপিত হয়। পুত্রেরা আত্মগরিমায় এ প্রস্তাবকে ঘৃণ্য ও অনৈতিক বলে প্রত্যাখ্যান করে। তখন ক্রুদ্ধ বিশ্বামিত্র তাদের শাপ দেন—তারা সহস্র বছর শ্বমাংস-ভোজী হয়ে পতিত বংশের ন্যায় জীবন যাপন করবে। পরে তিনি শুনশ্শেফকে দুইটি দিব্য গাথা/মন্ত্র শিক্ষা দেন—প্রথমে অগ্নির স্তব, তারপর ইন্দ্র ও উপেন্দ্রের আহ্বান। শুনশ্শেফ যজ্ঞমণ্ডপে ফিরে বৈষ্ণব যূপে পবিত্র রজ্জুতে বাঁধা পড়ে, লাল অলংকারে সজ্জিত হয়। তার স্তোত্রে ইন্দ্র প্রসন্ন হয়ে তাকে দীর্ঘায়ু দান করেন; অম্বরীষ যজ্ঞ সম্পূর্ণ করে বহুগুণ ফল লাভ করেন। শেষে বিশ্বামিত্র পুষ্করে দীর্ঘ তপস্যায় পুনরায় প্রবৃত্ত হয়ে যজ্ঞের ধারাবাহিকতা, শরণাগত-রক্ষা ও তপস্বীর ক্রোধের ভয়ংকর প্রান্তসীমা প্রকাশ করেন।
विश्वामित्रस्य तपोविघ्नः, मेनकाप्रसङ्गः, महर्षिपदप्रदानम् (Visvamitra’s Austerity Obstructed; Menaka Episode; Conferment of Maharshi Status)
এই সর্গে তপস্যার পরীক্ষা ও দেবপ্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বর্ণিত। বিশ্বামিত্র সহস্র বছর কঠোর তপ করে শেষে স্নান-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলে দেবগণ তপস্যার “ফল” দিতে উপস্থিত হন; কিন্তু কাহিনি এটিকে তাঁর আধ্যাত্মিক পরিপক্বতার এক পরীক্ষা হিসেবে স্থাপন করে। পুষ্করে অপ্সরা মেনকার মাধ্যমে কাম-প্রলোভন আসে। কামবশত বিশ্বামিত্র তাঁকে আশ্রমে বাস করতে আহ্বান করেন, আর দিন-রাত্রির অজুহাতে দশ বছর কেটে যায়। পরে অনুতাপে তিনি এটিকে তপস্যার বিঘ্ন বলে উপলব্ধি করেন; মধুর বাক্যে মেনকাকে বিদায় দিয়ে নৈষ্ঠিক বুদ্ধিতে আজীবন ব্রহ্মচর্যের সংকল্প নেন এবং কৌশিকী নদীতীরে, পরে উত্তর পর্বতে, আরও কঠোর তপস্যায় প্রবৃত্ত হন—যাতে দেবতারা শঙ্কিত হন। দেবপরামর্শের পর ব্রহ্মা তাঁকে “মহার্ষি” পদ প্রদান করেন। বিশ্বামিত্র নির্বিকার থেকে বলেন—ইন্দ্রিয়জয় না হলে এই পদার্থক নয়; ব্রহ্মা জানান, এখনও পূর্ণ সংযম সিদ্ধ হয়নি, এবং প্রস্থান করেন। শেষে বিশ্বামিত্র ঊর্ধ্ববাহু, বায়ুভক্ষণ, পঞ্চতপ ও ঋতুসহিষ্ণু তপস্যা বৃদ্ধি করেন; দেবভয় পুনরায় জাগে, ইন্দ্র রম্ভাকে প্রেরণের পরিকল্পনা করেন—তপস্যার সঙ্গে ইন্দ্রিয়জয়ের অপরিহার্যতা পুনরুচ্চারিত হয়।
रम्भा-प्रलोभनम् · Rambhā’s Temptation and Viśvāmitra’s Curse
এই ৬৪তম সর্গে প্ররোচনার সামনে তপস্যার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়। দেবহিতার্থে সহস্রাক্ষ ইন্দ্র বসন্তকালে কন্দর্পের সহায়তা ও হৃদয়-হরণকারী কোকিল-গানের আবহে অপ্সরা রম্ভাকে কৌশিক বিশ্বামিত্রকে কাম-মোহে প্রলুব্ধ করতে পাঠান। মুনির শাপের ভয়ে রম্ভা সন্ত্রস্ত হলেও অপূর্ব রূপ ধারণ করে আশ্রমের দিকে অগ্রসর হয়। বিশ্বামিত্র অতুলনীয় কোকিলধ্বনি শুনে ও রম্ভাকে দেখে ইন্দ্রের কৌশল বুঝে যান। ক্রোধে তিনি রম্ভাকে দশ হাজার বছর শিলারূপে থাকার শাপ দেন, এবং বলেন—তপস্যাসম্পন্ন এক তেজস্বী ব্রাহ্মণ ভবিষ্যতে তাকে মুক্ত করবেন। শাপ উচ্চারণের পর মুনির অনুতাপ জাগে; তিনি একে ইন্দ্রিয়-অসংযমজনিত তপঃক্ষয় বলে মনে করে ক্রোধ ও বাক্য ত্যাগ, প্রাণনিগ্রহ এবং দীর্ঘকাল নিরাহার তপস্যার সংকল্প নেন—ব্রাহ্মণ্য লাভের জন্য এক সহস্রবর্ষের অতুল সাধনা। এইভাবে দেবীয় হস্তক্ষেপ, নৈতিক দায় এবং তপোবলের অন্তর্গত হিসাব একত্রে প্রতিপন্ন হয়।
विश्वामित्रस्य ब्राह्मर्षित्वप्राप्तिः · Viśvāmitra Attains Brahmarṣi Status
এই সর্গে শतानন্দ বিশ্বামিত্রের ক্ষত্রিয়-তপস্বী থেকে ব্রহ্মর্ষি হওয়ার চূড়ান্ত উত্তরণ বর্ণনা করেন—তপস্যার শক্তি, প্রলোভন-পরীক্ষা এবং ত্রিলোকের উপর তার প্রভাব স্পষ্ট করে। বিশ্বামিত্র হিমবৎ-প্রদেশ ত্যাগ করে পূর্বদিকে কঠোর তপস্যায় প্রবৃত্ত হন। তিনি এক সহস্র বছর মৌনব্রত পালন করেন। ব্রতশেষে ইন্দ্র ব্রাহ্মণরূপে এসে প্রস্তুত অন্ন ভিক্ষা করেন; বিশ্বামিত্র বাক্য না বলে সব অন্ন দান করে আরও কঠিন সাধনায় প্রবেশ করেন—আরও এক সহস্র বছর প্রাণনিগ্রহ করে তপ করেন। তখন তাঁর মস্তক থেকে ধোঁয়া উঠতে থাকে এবং তিন লোক অস্থির হয়ে ওঠে—অন্ধকার নেমে আসে, পৃথিবী কাঁপে, সমুদ্র উত্তাল হয়, পর্বত বিদীর্ণ হয়, সূর্যের দীপ্তি ম্লান হয়। দেবতারা ভীত হয়ে ব্রহ্মার নেতৃত্বে তাঁকে শান্ত করতে আসেন, সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং স্বীকার করেন যে তীব্র তপস্যায় তিনি ব্রাহ্মণ্য লাভ করেছেন। বিশ্বামিত্র আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে বশিষ্ঠের অনুমোদন চান; দেবতাদের অনুরোধে বশিষ্ঠ তাঁকে ‘ব্রহ্মর্ষি’ বলে মান্য করেন এবং মৈত্রী স্থাপন করেন। এরপর প্রসঙ্গ মিথিলায় ফিরে আসে—শतानন্দ কাহিনি সমাপ্ত করেন; জনক রাম-লক্ষ্মণের সামনে করজোড়ে বিশ্বামিত্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং সন্ধ্যাকর্মের জন্য অবকাশ চান, তারপর সকলেই যথোচিত সম্মানে বিশ্রামে গমন করেন।
शिवधनुर्न्यासकथा तथा सीतोत्पत्तिविवाहशुल्क-निश्चयः (The Bow of Śiva: Its Deposit, Sītā’s Origin, and the Prowess-Brideprice Vow)
প্রভাতে রাজা জনক নিত্যকর্ম সম্পন্ন করে মহর্ষি বিশ্বামিত্রকে, এবং তাঁর সঙ্গে আগত রাম ও লক্ষ্মণকে যথাবিধি অভ্যর্থনা করে সেবার নিবেদন করেন। তখন বিশ্বামিত্র জানান—দুই রাজপুত্র জনকের তত্ত্বাবধানে রক্ষিত সেই অতুলনীয় শিবধনু দর্শন করতে চান। জনক ধনুর ইতিহাস বর্ণনা করেন—দক্ষযজ্ঞের সময় রুদ্র ধনু ধারণ করে দেবতাদের ভয় প্রদর্শন করেন, কারণ তাঁরা তাঁর যজ্ঞভাগ উপেক্ষা করেছিল; ভীত দেবগণ শঙ্করের শরণ নিয়ে স্তব করেন, মহাদেব প্রসন্ন হলে সেই ধনু পরম্পরায় রক্ষিত হয়ে জনকের বংশে ন্যস্ত হয়। এরপর জনক সীতার আবির্ভাবের কথা বলেন—যজ্ঞক্ষেত্র শুদ্ধ করতে লাঙল চালানোর সময় ভূমি থেকে তিনি প্রকাশিত হন; তিনি অযোনিজা, এবং জনক তাঁকে কন্যারূপে লালন-পালন করেন। জনক বিবাহের কঠোর শর্ত স্থির করেন—যে বীর সেই ধনু তুলতে ও তাতে জ্যা আরোপ করতে সক্ষম, সেই সীতার বর হবে। অনেক রাজা এসে চেষ্টা করেও ধনু তুলতে পারেননি; জনক তাঁদের অক্ষম জেনে প্রত্যাখ্যান করেন। অপমানিত রাজারা এক বছর মিথিলা অবরোধ করে নগরকে ক্লান্ত করে তোলে। তখন জনক তপস্যা করে দিব্য চতুরঙ্গ বাহিনী লাভ করে আক্রমণকারীদের পরাজিত করেন; তারা পলায়ন করে। শেষে জনক রাম-লক্ষ্মণকে দীপ্তিমান ধনু দেখাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন এবং বলেন—রাম যদি তা তুলে জ্যা আরোপ করতে পারেন, তবে সীতাকে রামের হাতে সমর্পণ করবেন।
शिवधनुर्दर्शनं · रामेण धनुर्भङ्गश्च (The Showing of Śiva’s Bow and Rama’s Breaking of It)
মিথিলায় বিশ্বামিত্রের অনুরোধে রাজা জনক পূজিত দিব্য শিবধনু আনতে আদেশ দিলেন। মন্ত্রীরা লোহার সিন্দুকে রেখে আটচাকার রথে অত্যন্ত কষ্টে তা বহন করে আনল—ধনুর অতিমানবীয় ভার ও পবিত্রতা এতে স্পষ্ট হল। জনক বিশ্বামিত্র ও রাজপুত্রদের জানালেন যে দেব, অসুর, রাক্ষস, গন্ধর্ব, যক্ষ, নাগ ও কিন্নর—অতিবলবান হয়েও—এই ধনু কখনও টানতে বা ধারণ করতে পারেনি। বিশ্বামিত্রের ইঙ্গিতে রাম সিন্দুক খুলে ধনু স্পর্শ, উত্তোলন ও জ্যা আরোপের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তারপর সহস্র দর্শকের সামনে অনায়াসে ধনু তুলে জ্যা পরিয়ে টান দিতেই ধনু মাঝখান থেকে ভেঙে গেল। মেঘগর্জনের মতো ভয়ংকর শব্দ হল, ভূমি কেঁপে উঠল; জনক, বিশ্বামিত্র ও দুই রাঘব ছাড়া অধিকাংশ লোক মূর্ছিত হয়ে পড়ল। পরিস্থিতি শান্ত হলে জনক রামের অচিন্ত্য বীর্যকে বন্দনা করে ‘বীর্য-শুল্ক’ ব্রত পূর্ণ হয়েছে বলে ঘোষণা করলেন এবং সীতাকে রামের হাতে সমর্পণের সংকল্প নিলেন। এরপর তিনি দূত পাঠালেন অযোধ্যায়—দশরথকে আহ্বান করতে এবং সমগ্র ঘটনা যথাযথভাবে জানাতে।
जनकदूतागमनम् · The Arrival of Janaka’s Messengers in Ayodhya
এই সর্গে মিথিলার ধনুর্ভঙ্গ-ঘটনার সংবাদ থেকে অযোধ্যার রাজকীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কূটনৈতিক সেতু রচিত হয়েছে। জনকের দূতেরা তিন দিনের যাত্রা ও তিন রাত্রির পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে অযোধ্যায় প্রবেশ করে প্রাসাদের দ্বাররক্ষীদের মাধ্যমে রাজদর্শনের অনুমতি প্রার্থনা করে। সভায় প্রবেশ করে তারা বৃদ্ধ দশরথকে বিনয়মধুর বাক্যে প্রণাম জানায় এবং জনকের বারংবার কুশলপ্রশ্ন নিবেদন করে—রাজা, আচার্য ও পুরোহিতদের মঙ্গল কামনা করে; যজ্ঞাগ্নিকে অগ্রে স্থাপন করে ধর্মবিধির শুদ্ধতা প্রকাশ পায়। তারপর তারা জনসমক্ষে স্থির হওয়া সিদ্ধান্তমূলক সংবাদ জানায়—মহাসভায় রাম দিব্য ধনু ভেঙেছেন; ফলে জনকের পূর্বপ্রতিজ্ঞা পূর্ণ হয়েছে যে সীতা ‘বীর্য-শুল্ক’ অর্থাৎ পরাক্রমের পুরস্কাররূপে সেই বীরকেই দেওয়া হবে। জনক দশরথের সম্মতি চান, আচার্য ও কুলপুরোহিতসহ দ্রুত মিথিলায় আসার আমন্ত্রণ জানান এবং রাজকুমারদের দর্শনে উভয় কুলের সমান আনন্দ হবে—এ আশ্বাস দেন। দূতদের কথা শেষ হলে দশরথ আনন্দিত হয়ে বশিষ্ঠ, বামদেব, অন্যান্য মন্ত্রী ও সমবেত ঋষিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সকলেই সম্মতি দিলে রাজা পরদিনই মিথিলাগমনের ঘোষণা করেন—এভাবেই সংবাদ থেকে রাজকর্মে অগ্রসর হওয়ার পর্ব শুরু হয়।
एकोनसप्ततितमः सर्गः · Daśaratha’s Departure to Videha and Marriage Arrangements
এই সর্গে রাত্রি অতিবাহিত হলে রাজা দশরথ আচার্য ও আত্মীয়বর্গসহ সুমন্ত্রকে নির্দেশ দেন। কোষাধ্যক্ষরা প্রচুর ধন ও নানাবিধ রত্ন নিয়ে অগ্রে যাত্রা করবে, রথ-হস্তি-অশ্ব-পদাতিক চতুরঙ্গিনী সেনা দ্রুত যানসহ প্রস্তুত হবে, এবং জনকের দূতেরা ত্বরার অনুরোধ করায় বিলম্ব নিবারণের জন্য বসিষ্ঠ, বামদেব, জাবালি, কাশ্যপ, মার্কণ্ডেয়, কাত্যায়ন প্রমুখ ব্রাহ্মণঋষিরা আগে অগ্রসর হবেন। এইভাবে সমগ্র দল যাত্রা করে চার দিনে বিদেহে পৌঁছে। আগমনের সংবাদ পেয়ে জনক শ্রদ্ধাপূর্ণ আতিথ্যের আয়োজন করেন এবং বৃদ্ধ দশরথকে ‘দিষ্ট্যা’ বলে মঙ্গলবচনে অভ্যর্থনা জানান। তিনি এই সাক্ষাৎকে রাজপুত্রদের বীর্যের ফল বলে গণ্য করেন, বসিষ্ঠের আগমনকে দেবসমাজে ইন্দ্রসদৃশ বলে প্রশংসা করেন, এবং রঘুবংশের সঙ্গে ঐক্যকে বাধা-নাশ ও বংশমর্যাদা-বৃদ্ধির কারণ বলে ঘোষণা করেন। তিনি প্রার্থনা করেন—প্রভাতে যজ্ঞ সমাপ্ত হলে ঋষিসম্মত বিবাহ-সংস্কার সম্পন্ন হোক। দশরথ ধর্মবোধসম্পন্ন সংযত বাক্যে প্রস্তাব গ্রহণ করে ন্যায়সম্মত উপদেশ অনুসারে চলার অঙ্গীকার করেন। তারপর ঋষি ও রাজাগণ পরস্পর আনন্দে রাত্রি যাপন করেন; জনক যজ্ঞকর্ম এবং কন্যাদ্বয়ের মঙ্গলক্রিয়া সম্পূর্ণ করেন।
वंशवर्णनम् तथा विवाहप्रार्थना · Genealogy of the Ikshvaku Line and the Proposal for Marriage
প্রভাতে নিত্যকর্ম ও যজ্ঞাদি সম্পন্ন করে মিথিলায় রাজা জনক প্রধান পুরোহিত শतानন্দকে সম্বোধন করে রাজকার্যের সমন্বয় আরম্ভ করেন। তিনি দূত পাঠিয়ে ইক্ষুমতী নদীতীরে সাঙ্কাশ্যায় অবস্থানকারী কনিষ্ঠ ভ্রাতা কুশধ্বজকে আহ্বান করেন। কুশধ্বজ দ্রুত এসে জনককে প্রণাম করেন এবং রাজোচিত সম্মানে আসনে অধিষ্ঠিত হন। একই সময়ে মিথিলার সভা দশরথকেও আমন্ত্রণ জানায়; প্রধান মন্ত্রী সুদামন দূতরূপে প্রেরিত হন। দশরথ ঋষি, আচার্য, পুরোহিত, মন্ত্রী ও স্বজনসহ মিথিলায় উপস্থিত হয়ে যথোচিত সৎকার লাভ করেন। দশরথ আচার-অনুষ্ঠানের বিষয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ বক্তা হিসেবে বশিষ্ঠকে নিযুক্ত করেন, এবং বিশ্বামিত্রও সম্মতি প্রদান করেন। তখন বশিষ্ঠ ব্রহ্মা থেকে মरीচি, কশ্যপ, বিবস্বান, মনু এবং ইক্ষ্বাকু বংশের ধারাবাহিক বর্ণনা করে দশরথ ও তাঁর পুত্রদের পর্যন্ত বংশানুক্রম উচ্চারণ করেন। এই বংশবর্ণনা শুদ্ধ বংশ, সত্যনিষ্ঠা ও রাজধর্মের গৌরবকে প্রমাণিত করে। শেষে বশিষ্ঠ জনকের কাছে স্পষ্ট প্রার্থনা করেন—রাম ও লক্ষ্মণের সঙ্গে জনকের দুই কন্যার বিবাহ দান করা হোক; পুণ্যসমতা ও বংশোচিত ধর্ম্যতার মিলনরূপে এই বিবাহ প্রতিষ্ঠিত হয়।
जनककुलवर्णनम् तथा सीतोर्मिलादानम् (Janaka’s Genealogy and the Bestowal of Sita and Urmila)
এই সর্গে রাজসভায় শিষ্ট ও বিধিবদ্ধ কথোপকথন দেখা যায়। ইক্ষ্বাকুবংশের বৃত্তান্ত শুনে জনক ঋষি বশিষ্ঠকে বলেন—কন্যাদানের সময় মহৎ কুলের উচিত নিজের বংশপরিচয় সম্পূর্ণভাবে উচ্চারণ করা; এটাই ধর্মসম্মত নিয়ম। এরপর তিনি বিদেহবংশের ধারাবাহিকতা বর্ণনা করেন—খ্যাতনামা রাজা নিমি থেকে শুরু করে মিথি (মিথিলার নির্মাতা) এবং পরপর জনকগণের বংশধারা, শেষে হ্রস্বরোমা; তাঁর দুই পুত্র—জনক (বক্তা) ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা কুশধ্বজ। পিতার বনপ্রস্থান, নিজের রাজ্যাভিষেক, ধর্মময় শাসন এবং কুশধ্বজকে স্নেহভরে রক্ষা করার কথাও তিনি জানান। তারপর রাজনৈতিক সংকট আসে—সাঙ্কাশ্যের রাজা সুধন্বা শৈব ধনুক ও সীতাকে দাবি করে। জনক তা প্রত্যাখ্যান করেন, যুদ্ধে তাকে বধ করে সাঙ্কাশ্যে কুশধ্বজকে রাজা স্থাপন করেন। শেষে জনসমক্ষে বিবাহঘোষণা—জনক আনন্দসহকারে সীতাকে রামের হাতে এবং ঊর্মিলাকে লক্ষ্মণের হাতে অর্পণ করেন; বৈধ-আচারগত নিশ্চিততার জন্য দানবাক্য তিনবার ঘোষণা করেন। দাশরথিকে গোদান ও পিতৃকর্মের নির্দেশ দিয়ে শুভক্ষণ নির্ধারণ করেন—মখ নক্ষত্রোদয়ে, উত্তর-ফাল্গুনীতে তৃতীয় দিনে বিবাহ।
वैवाहिकसंबन्ध-निश्चयः / Fixing the Mithila-Ayodhya Marital Alliance
এই সর্গে মিথিলা ও অযোধ্যার রাজবংশের বৈবাহিক মৈত্রী সভার সংলাপ ও আচার-প্রস্তুতির মাধ্যমে স্থির হয়। জনকের বংশবর্ণনার পর বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠের সমর্থনে, ইক্ষ্বাকু ও বিদেহ বংশের অতুল গৌরব তুলে ধরে ‘সদৃশ’ (উপযুক্ত) বিবাহের পরামর্শ দেন—সীতার সঙ্গে রামের, ঊর্মিলার সঙ্গে লক্ষ্মণের; এবং কুশধ্বজের দুই কন্যাকে ভরত ও শত্রুঘ্নের সঙ্গে বিবাহ দেওয়ার প্রস্তাবও করেন। জনক করজোড়ে সেই উপদেশ গ্রহণ করে নিজের বংশকে ধন্য মনে করেন এবং ফাল্গুনী নক্ষত্রযুক্ত, ভগ-প্রজাপতির প্রশস্ত মুহূর্তে বিবাহ স্থির করেন। তিনি ঋষিদের আসন প্রদান করে মিথিলা ও অযোধ্যার রাজক্ষমতার সমতা ঘোষণা করেন এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য যথোচিত কর্তৃত্বকে আহ্বান জানান। দশরথ কৃতজ্ঞতায় প্রশংসা করে পরে পুত্রদের কল্যাণার্থে শ্রাদ্ধকর্ম ও দীক্ষাসহ গো-দান সম্পন্ন করেন। তিনি ব্রাহ্মণদের বিপুল সংখ্যক গাভী দান করেন—যেগুলি বস্ত্র, অলংকার ও মূল্যবান দ্রব্যে সজ্জিত। শেষে দশরথ পুত্রপরিবৃত দীপ্তিমান রূপে লোকপালদের মধ্যে প্রজাপতির ন্যায় প্রতিভাত হন—দানযজ্ঞের পবিত্রতায় এই রাজনৈতিক বন্ধনও ধর্মময় হয়ে ওঠে।
त्रिसप्ततितमः सर्गः (Sarga 73): Mithilā Vivāha · Kanyādāna and the Fourfold Marriage Rites
এই সর্গে মিথিলায় বিবাহ-সংস্কারের বিধিবদ্ধ সম্পাদন বর্ণিত হয়েছে। সেই দিনই ভরত-এর মামা যুধাজিৎ উপস্থিত হন, আর দশরথ আদর্শ গো-দান করে রাজধর্মের দানশীলতাকে শুভক্ষণে সংযুক্ত করেন। আতিথ্য ও প্রাতঃকর্ম সম্পন্ন করে রাম ও তাঁর ভ্রাতৃগণ পূর্ণ অলংকৃত হয়ে, বিবাহ-পূর্ব আচার শেষ করে, বশিষ্ঠ প্রমুখ মহর্ষিদের অগ্রে রেখে দশরথের নিকট উপস্থিত হন। বশিষ্ঠ জনককে কন্যাদাতা রূপে বিবাহকার্য আরম্ভ করতে অনুরোধ করেন। জনক আনন্দসহকারে বলেন—নিজ গৃহে সংকোচের কী আছে; তাঁর কন্যাগণ বেদীতে প্রস্তুত। তিনি বশিষ্ঠকে বৈবাহিক ক্রিয়া পরিচালনার দায়িত্ব দেন; বশিষ্ঠ বেদী নির্মাণ ও অলংকরণ করে অগ্নি প্রতিষ্ঠা করেন এবং মন্ত্রোচ্চারণসহ আহুতি প্রদান করেন। জনক সীতাকে অগ্নি ও রামের সম্মুখে এনে কন্যাদান করেন—সীতার হাত রামের হাতে অর্পণ করে ‘সহধর্মচারিণী’ বলে ঘোষণা করেন। তখন ‘সাধু’ ধ্বনি, দিব্য দুন্দুভি ও পুষ্পবৃষ্টি দ্বারা দেবসম্মতি প্রকাশ পায়। পরে জনক উর্মিলাকে লক্ষ্মণকে, মাণ্ডবীকে ভরতকে এবং শ্রুতকীর্তিকে শত্রুঘ্নকে প্রদান করেন; চার রাজকুমার বশিষ্ঠের অনুমতিতে চার হাত গ্রহণ করে অগ্নি ও বেদী প্রদক্ষিণ করে বিবাহ সম্পন্ন করেন। গন্ধর্ব-অপ্সরাদের গীতবাদ্য ও উৎসবে মণ্ডপ মুখরিত হয়; শেষে নবদম্পতিরা নিজ নিজ অন্তঃপুরে গমন করেন, আর দশরথ, ঋষিগণ ও স্বজনেরা তাঁদের সঙ্গে এগিয়ে দেন।
परशुरामप्रादुर्भावः · The Appearance of Parasurama on the Return from Mithila
রাত্রি অতিবাহিত হলে বিশ্বামিত্র রঘুবংশীয় দুই রাজকুমারকে আশীর্বাদ করে উত্তর পর্বতদিক—হিমালয়ের অভিমুখে প্রস্থান করলেন। এরপর দশরথ জনকের নিকট বিদায় নিয়ে অযোধ্যার পথে যাত্রা শুরু করলেন; জনকও কিছুদূর পর্যন্ত সঙ্গে গেলেন এবং কন্যাধনরূপে বিপুল দান দিলেন—অসংখ্য গোরু, উৎকৃষ্ট বস্ত্র, স্বর্ণ-রত্নাদি, দাস-দাসী এবং চতুরঙ্গিনী সেনা (হস্তী, অশ্ব, রথ, পদাতিক)। অগ্রে ঋষিগণ চলতে থাকলে হঠাৎ অশুভ-সদৃশ পক্ষীর কোলাহল শোনা গেল, আর হরিণেরা ডানদিকে শুভ লক্ষণ দেখিয়ে চলল। মিশ্র নিমিত্তে বিচলিত রাজা বশিষ্ঠকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন—পক্ষীর ধ্বনি এক মহৎ, দিব্য ও কঠোর ঘটনার পূর্বাভাস, কিন্তু হরিণ শমন ও মঙ্গল নির্দেশ করে; অতএব শোক ত্যাগ করো। তখনই ঝড়-বৃষ্টি ও ঘোর অন্ধকারে সূর্য আচ্ছন্ন হল; ছাইয়ের মতো ধূলি সেনাদলকে ঢেকে দিল, অনেকেই মূর্ছিত হল, কিন্তু রাজা, তাঁর পুত্রগণ ও প্রধান ঋষিগণ স্থিরচিত্ত রইলেন। সেই ভয়ংকর অন্ধকারে তাঁরা ভৃগুবংশীয় জামদগ্ন্য পরশুরামকে দেখলেন—জটাধারী, দীপ্তিমান, হাতে পরশু, বিদ্যুৎসম ধনুক ও প্রধান বাণসহ, ত্রিপুরঘ্ন শিবের ন্যায় ভয়াবহ। পূর্বে তাঁর ক্ষত্রিয়-সংহারী ক্রোধ স্মরণ করে মুনিগণ শঙ্কিত হয়ে অর্ঘ্য প্রদান করে মধুর বাক্যে তাঁকে শান্ত করলেন। পরশুরাম সম্মান গ্রহণ করে সরাসরি রাম দাশরথির সঙ্গে কথা আরম্ভ করলেন—যার দ্বারা পরবর্তী সংঘাতে তপোবল, ক্ষাত্রবীর্য ও ধর্মসংযমের পরীক্ষা স্থাপিত হল।
जामदग्न्य-रामसंवादः · Parashurama Confronts Rama with the Vaishnava Bow
এই সর্গে শিবধনু ভাঙার পর এক গভীর ও সংকটপূর্ণ সংলাপ শুরু হয়। জামদগ্ন্য পরশুরাম এসে রামের অসাধারণ কীর্তির কথা স্বীকার করেন এবং বিশ্বকর্মা-নির্মিত অজেয় বৈষ্ণব ধনু উপস্থিত করেন। তিনি দুইটি দিব্য ধনুর উৎপত্তিকথা বলেন—একটি ত্রিপুর-বধের প্রসঙ্গে রুদ্রকে দেওয়া হয়েছিল, আর অন্যটি বিষ্ণুর কাছে অর্পিত ছিল। পরে ব্রহ্মার প্রেরণায় দেবতাদের জিজ্ঞাসা থেকে শিব ও বিষ্ণুর শক্তি-পরীক্ষার ঘটনা ঘটে; বিষ্ণুর ‘হুঙ্কার’-এ শিবের ধনু নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, এবং দেব-ঋষিরা বিষ্ণুকেই শ্রেষ্ঠ বলে মান্য করেন। পরশুরাম এরপর বৈষ্ণব ধনুর মানব-পরম্পরা জানান—বিষ্ণু → ঋচীক → জমদগ্নি → পরশুরাম। তিনি কার্তবীর্য অর্জুনের হাতে পিতা জমদগ্নির অন্যায় হত্যার কথা স্মরণ করে, প্রতিশোধে ক্ষত্রিয়-সংহার এবং পরে নিজের নিবৃত্তির কথাও বলেন। রাজা দশরথ পুত্রদের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করেন, কিন্তু পরশুরাম তা উপেক্ষা করেন। তিনি রামকে আহ্বান করেন—বৈষ্ণব ধনুতে জ্যা আরোপ করে বাণ সংধান কর; রাম সফল হলে দ্বন্দ্বযুদ্ধ হবে—এভাবেই ক্ষত্রিয়ধর্ম, সংযম ও ন্যায্য ক্ষমতার পরীক্ষা স্থাপিত হয়।
बालकाण्डे षट्सप्ततितमः सर्गः · Rāma Subdues Paraśurāma; the Vaiṣṇava Arrow Is Discharged
পরশুরামের কঠোর চ্যালেঞ্জ শুনে শ্রীराम ধর্মসম্মত ভাষায় উত্তর দিলেন। পিতা দশরথের মর্যাদা রক্ষার্থে তিনি বিবাদ বাড়াতে চাননি, তবু উসকানির যথাযথ জবাব দিলেন। পরশুরাম তাঁকে ক্ষত্রিয়ধর্মে অক্ষম মনে করছেন—এ কথা বুঝে রাম মুহূর্তে ভার্গব ধনু ও বাণ গ্রহণ করে ধনু নত করে জ্যা আরোপ করলেন; সেই দৃশ্যে সমগ্র জগৎ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। রাম স্পষ্ট বললেন—পরশুরাম ব্রাহ্মণ এবং বিশ্বামিত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আছে, তাই তিনি তাঁকে বধ করবেন না; কিন্তু বৈষ্ণব বাণ বৃথা যেতে পারে না। অতএব তিনি বিকল্প দিলেন—পরশুরামের পাদগতি (চলনশক্তি) নষ্ট করবেন, অথবা তপস্যায় অর্জিত লোকসমূহ বিনষ্ট করবেন। তখন পরশুরাম নিজের প্রতিজ্ঞা স্মরণ করে—কাশ্যপকে পৃথিবী দান করে রাত্রিতে পৃথিবীতে না থাকার—অনুরোধ করলেন, বাণ যেন তাঁর তপস্যালব্ধ লোকগুলিতেই নিক্ষিপ্ত হয়। ব্রহ্মাসহ দেবগণ, গন্ধর্ব ও অন্যান্য দিব্য সত্তা এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে সমবেত হলেন। পরশুরাম রামকে বিষ্ণুরূপে চিনে লজ্জাহীনভাবে পরাজয় স্বীকার করলেন, রামের প্রদক্ষিণ করে মহেন্দ্র পর্বতের দিকে প্রস্থান করলেন। তারপর দিকসমূহ অন্ধকারমুক্ত হল, এবং দেব-ঋষিরা রামের ধনুর্ধারণ-পরাক্রমের প্রশংসা করলেন।
सप्तसप्ततितमः सर्गः · Ayodhya Return, Bridal Reception, and Bharata’s Departure
পরশুরাম বিদায় নিলে দশরথের উৎকণ্ঠা প্রশমিত হয়। রাম সমগ্র ঘটনা নিবেদন করেন; রাজা তাঁকে বক্ষে টেনে নিয়ে এই মুহূর্তকে পিতা–পুত্র উভয়েরই নবজন্মসদৃশ মনে করেন। এরপর চতুরঙ্গিনী সেনাসহ সবাই অযোধ্যার দিকে অগ্রসর হয়; ধ্বজা-পতাকা, তূর্যধ্বনি, জলছিটানো পথ ও পুষ্পবিক্ষিপ্ত রাজপথে রাজধানী শোভিত হয়—লোকসমক্ষে রাজধর্মের বৈধতা আচার-অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্তঃপুরে কৌশল্যা, সুমিত্রা, কৈকেয়ী ও অন্যান্য রাজমহিষীরা সীতা, ঊর্মিলা, মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্তি—এই নববধূদের মঙ্গলাভ্যর্থনা করেন। তাঁরা শুভাচার পালন করে কুলদেবতার মন্দিরে পূজা দেন, কুবের-ভবনসদৃশ বাসভবনে প্রবেশ করেন এবং ব্রাহ্মণদের গাভী, ধন ও শস্য দান করে তৃপ্ত করেন—পুণ্যসঞ্চয় ও সামাজিক পারস্পরিকতার ধর্মনীতি প্রকাশ পায়। পরে কেকয়দেশের যুধাজিৎ এসে ভরতকে নিয়ে যেতে চান। দশরথ সভায় ভরতকে অনুরোধ করেন; ভরত শত্রুঘ্নসহ সকলকে প্রণাম করে প্রস্থান করেন। ভরতের অনুপস্থিতিতে রাম ও লক্ষ্মণ পিতৃসেবা ও রাজকার্যে আরও নিবিষ্ট হন; রাম–সীতার দাম্পত্যকে নীরব হৃদয়-সংলাপের ঐক্যরূপে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে গার্হস্থ্যধর্ম নীতিধর্মেরই প্রসার।
Vālmīki learns Rāma’s story from Nārada; moved by the krauñca-bird tragedy, he utters the first śloka and composes the Ramayana, taught to Kuśa and Lava for public performance. In Ayodhyā, Daśaratha’s heirlessness leads to Aśvamedha/Putreṣṭi and the births of Rāma and his brothers. Viśvāmitra takes Rāma and Lakṣmaṇa to protect sacrifices; Rāma receives divine astras, kills Tātakā, and defeats Mārīca/Subāhu. Traveling through sacred landscapes, they reach Mithilā; Rāma breaks Śiva’s bow, wins Sītā, and the brothers marry. On return, Paraśurāma challenges Rāma but yields, affirming Rāma’s supremacy.
Bālakāṇḍa centers on the establishment of dharma as both an inner virtue and a public responsibility. It presents Rāma as the exemplary human—truthful, self-controlled, compassionate, and resolute—whose greatness is not merely martial but ethical. The book also defines legitimate authority through ritual and counsel: Daśaratha’s sacrifices, Vasiṣṭha’s guidance, and Viśvāmitra’s ascetic mandate collectively show that power must be authorized by dharma, not preference. Finally, the origin of the first śloka demonstrates that moral emotion (karuṇā) can be a disciplined source of knowledge and art, transforming grief into a universally instructive poem.
Major episodes include: Nārada’s synopsis to Vālmīki; the krauñca-bird incident and first śloka; composition and performance transmission via Kuśa and Lava; Daśaratha’s Aśvamedha and Putreṣṭi; the births of Rāma, Lakṣmaṇa, Bharata, and Śatrughna; Viśvāmitra taking Rāma and Lakṣmaṇa to protect sacrifice; slaying of Tātakā; defeat of Mārīca and killing of Subāhu; liberation of Ahalyā; arrival at Mithilā and breaking of Śiva’s bow; the four marriages; and the concluding confrontation with Paraśurāma, ending in his withdrawal.
The principal figures are Vālmīki and Nārada (framing and authorization of the epic), Daśaratha and his queens (dynastic and ritual preconditions), Rāma and Lakṣmaṇa (heroic initiation), Viśvāmitra and Vasiṣṭha (ascetic and ritual authority), Ṛṣyaśṛṅga (ritual catalyst for progeny), Janaka and Sītā (Mithilā arc and marriage), Śatānanda and Ahalyā (purification/restoration), antagonists such as Tātakā, Mārīca, and Subāhu (yajña-disruption), and Paraśurāma (theological-martial rival whose yielding confirms Rāma’s supremacy).
Bālakāṇḍa supplies the epic’s enabling conditions: the poem’s own origin and intended mode of transmission; the Ikṣvāku dynasty’s legitimacy; Rāma’s birth as a divinely purposed event; and Rāma’s early formation through ascetic discipline, weapon-knowledge, and sacrificial protection. The Mithilā marriage secures alliances and introduces Sītā as the narrative’s ethical and emotional center. The Paraśurāma episode functions as a threshold: it closes the “origins” phase by confirming Rāma’s unmatched prowess and prepares the transition to the courtly and political developments that will culminate in exile and the larger conflict.
Key lessons include: (1) righteous governance requires moral restraint, generosity, and protection of the vulnerable; (2) duty may demand painful relinquishment of personal attachment (Daśaratha’s consent to Viśvāmitra); (3) spiritual power (tapas) must be ethically governed, as seen in Viśvāmitra’s struggles with anger and temptation; (4) ritual and hospitality are portrayed as civilizational duties that sustain social and cosmic order; and (5) restoration is possible—Ahalyā’s liberation exemplifies reintegration and the transformative force of purity and grace.
Read Valmiki Ramayana in the Vedapath app
Scan the QR code to open this directly in the app, with word-by-word meanings, Sanskrit recitation where available, and more.