Ramayana - Yuddha Kanda
JusticeResponsibilityConsequence of actions

Yuddha Kanda - (Book of War/Battle)

युद्धकाण्ड

যুদ্ধকাণ্ড বাল্মীকির আদিকাব্যের বীররস ও তত্ত্বচিন্তার শিখর, যেখানে লঙ্কা-অভিযান পরিণতি পায় সীতার পুনরুদ্ধার ও রাবণের পতনে। শুরুতে হনুমান সীতার সন্ধান ও বার্তার সফল প্রতিবেদন দেন; তারপর রাম ও সুগ্রীবের নেতৃত্বে বানরসেনার সংহতি, শৃঙ্খলা ও কৌশলগত প্রস্তুতি দৃঢ় হয়। সমুদ্রতটে রামের সাগরদেবের কাছে বিধিবদ্ধ প্রার্থনা, তিন রাত্রির অনুশীলন, তদনন্তর বিশ্বব্যাপী আলোড়ন, এবং নল-নীল প্রমুখের দ্বারা সেতুবন্ধ—এই সবের মধ্য দিয়ে কাহিনি প্রবেশ করে দুর্গবেষ্টিত, ঐশ্বর্যময় অথচ অশুভ-আভাসময় লঙ্কানগরীতে। এই কাণ্ডের স্বাতন্ত্র্য ‘মন্ত্র’ ও ‘যুদ্ধ’-এর ধারাবাহিক পালাবদল। রাবণের সভায় পরামর্শ-পর্ব, বিভীষণের ধর্মসম্মত উপদেশ, সেই হিতবাক্যের প্রত্যাখ্যান, এবং বিভীষণের রামের শরণাগত হওয়া—এসব যুদ্ধবর্ণনার সঙ্গে সমান্তরালভাবে এগোয়। সেনাবিন্যাস, বীরদের তালিকা ও রণধ্বনির মাঝে রাক্ষস-প্রতিপক্ষরা ঢেউয়ের মতো আবির্ভূত হয়—ধূম্রাক্ষ, বজ্রদংষ্ট্র, প্রহস্ত, কুম্ভকর্ণ, ইন্দ্রজিত—এবং প্রতিটি পরাজয় দেখায় যে অধর্ম শেষ পর্যন্ত কৌশলগত অন্ধতা, একাকিত্ব ও ধ্বংস ডেকে আনে। কবিতা বারবার মহাজাগতিক পরিসরে প্রসারিত—অপশকুন, ঝড়-তুফান, রক্তনদীর চিত্র, প্রলয়োপম উপমা—তবু শোকের অন্তরঙ্গ সুর অটুট থাকে। অশোকবনে সীতার বিলাপ, রামের মানবিক দুর্বলতা, লক্ষ্মণের বীরত্ব, হনুমানের প্রজ্ঞা ও ধৈর্য—যুদ্ধের নৈতিক ভারকে আরও তীক্ষ্ণ করে। ইন্দ্রজিতের মায়াযুদ্ধ, রাম-লক্ষ্মণের স্তম্ভন, সীতাকে তাদের আপাত পরাজয় দেখিয়ে মনোবল ভাঙার চেষ্টা, এবং নিকুম্ভিলা-পর্বে তার যজ্ঞশক্তির প্রতিকার—ধর্মযুদ্ধের সূক্ষ্ম নীতিকে উন্মোচিত করে। সমগ্র মহাকাব্যের কাঠামোতে যুদ্ধকাণ্ড রাজধর্মের চূড়ান্ত পরীক্ষাক্ষেত্র। এখানে শক্তিপ্রয়োগ তখনই ন্যায়সঙ্গত, যখন তা সত্য, সংযম, মিত্রধর্ম, শরণাগত-রক্ষা ও নির্দোষের সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রিত। বিভীষণের শরণাগতধর্ম, বানরদের ঐক্য, সেতুবন্ধের লোকহিতকর উদ্যোগ, এবং কুম্ভকর্ণবধের পর লঙ্কার আত্মবিশ্বাসের ভাঙন—এসবই রাবণের বিরুদ্ধে শেষ পর্যায়ের ভূমি প্রস্তুত করে। এই সংক্ষিপ্তসার IIT কানপুরের দক্ষিণী পাঠ-পরম্পরা অনুসরণ করে, যেখানে কিছু অতিরিক্ত প্রথাগত শ্লোক সংরক্ষিত এবং কিছু যুদ্ধবর্ণনা ও সভার আলোচনা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত।

Sargas in Yuddha Kanda

Sarga 1

प्रथमः सर्गः — Rama Praises Hanuman; Anxiety over Crossing the Ocean

এই সর্গে শ্রীराम হনুমানের সংবাদ শুনে স্নেহভরে তাঁকে বিধিপূর্বক প্রশংসা করেন। মহাসাগর লঙ্ঘন করে কঠোর প্রহরায় রক্ষিত লঙ্কায় প্রবেশ এবং বৈদেহীর অবস্থান নির্ণয়—এই কৃতিত্বকে তিনি প্রায় অতুলনীয় বলে ঘোষণা করেন এবং একে আদর্শ ভৃত্যধর্মের দৃষ্টান্ত রূপে স্থাপন করেন। সঙ্গে সঙ্গে সেবকদের নৈতিক শ্রেণিবিভাগও বলেন: যে ভক্তিসহ কঠিন কর্ম সম্পন্ন করে সে উত্তম; যে রাজাধিরাজের প্রিয় বিষয় আগেভাগে বুঝতে পারে না সে মধ্যম; আর যে অর্পিত দায়িত্বও পালন করে না সে অধম। রাম স্বীকার করেন, হনুমানের সাফল্যে রঘুবংশ রক্ষিত হল, কারণ সীতার অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে। তবু তিনি বেদনামিশ্রিত কণ্ঠে বলেন—এমন প্রীতিকর বাক্য ও সেবার যথোচিত প্রতিদান তিনি তখন দিতে অক্ষম; সেই মুহূর্তে তাঁর কাছে দেওয়ার মতো কেবল আলিঙ্গনই আছে। এরপর আনন্দের কথন কৌশলচিন্তায় রূপ নেয়। সংবাদ সফল হলেও বিশাল, দুরতিক্রম্য সমুদ্রকে সমবেত বানরসেনাসহ কীভাবে পার হওয়া যাবে—এই লজিস্টিক ও অস্তিত্বগত সংকটে রামের মন অস্থির হয়ে ওঠে। শোকস্পর্শিত হলেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাম হনুমানকে কেন্দ্র করে পরামর্শ ও মনন শুরু করেন, আসন্ন সমুদ্রলঙ্ঘনের সমস্যার সমাধান খুঁজতে।

19 verses | Rama

Sarga 2

युद्धकाण्डे द्वितीयः सर्गः — Sugriva’s Counsel: From Grief to Strategy (Bridge to Lanka)

এই সর্গে সুগ্রীব শোকাকুল রামকে দীর্ঘ উপদেশ দেন। তিনি বলেন, ক্ষত্রিয়-নেতার পক্ষে এমন শোক অশোভন; শোক বীর্য ক্ষয় করে এবং কর্মসিদ্ধি নষ্ট করে। তাই তিনি রামকে নিরাশা ত্যাগ করে ধৈর্য ও তেজ ধারণ করতে, প্রয়োজনে সংযত ক্রোধও গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করেন। এরপর সুগ্রীব যুক্তি দেখান—সীতার অবস্থান জানা গেছে এবং ত্রিকূটশিখরে অবস্থিত লঙ্কাও নির্দিষ্ট; অতএব স্থবির হয়ে থাকার কোনো কারণ নেই। তিনি বানর-নায়কদের শক্তি ও উদ্যমের কথা স্মরণ করিয়ে দেন—রামের কার্যে তারা অগ্নিতেও প্রবেশ করতে প্রস্তুত। সুগ্রীবের মূল সিদ্ধান্ত—বরুণের আবাসসম ভয়ংকর সমুদ্র পার না হলে লঙ্কা জয় সম্ভব নয়; তাই আগে সমুদ্রে সেতুবন্ধন আবশ্যক। সেতু নির্মিত হলে এবং সেনা পার হলে বিজয় প্রায় নিশ্চিত—এই বিজয়-মানদণ্ড তিনি বারবার উচ্চারণ করেন। শেষে শুভ নিমিত্তের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি আশ্বাস দেন, রাম ধনু ধারণ করলে তিন লোকের কোনো শত্রুই তাঁর সম্মুখে দাঁড়াতে পারে না।

25 verses

Sarga 3

लङ्कादुर्गवर्णनम् (Description of Lanka’s Fortifications and Forces)

সুগ্রীবের যুক্তিসংগত পরামর্শ শুনে শ্রীराम হনুমানকে আদেশ দিলেন—শত্রুসেনার পরিমাণ, দুর্গে প্রবেশের কঠিন দ্বারগুলির সংখ্যা ও প্রকৃতি, রক্ষাব্যবস্থা এবং রাক্ষসদের আবাসস্থল—সবই নির্ভুলভাবে জানাতে। বাক্‌দক্ষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হনুমান ক্রমান্বয়ে লঙ্কার দুর্গ-ব্যবস্থা বর্ণনা করতে সম্মত হলেন। হনুমান লঙ্কাকে সমৃদ্ধ ও সদা সতর্ক নগরী হিসেবে দেখালেন—রথ, মত্ত হস্তী ও অগণিত রাক্ষসে পরিপূর্ণ; উচ্চ ও প্রশস্ত প্রবেশদ্বার, ধাতু-সংযোজিত কপাট ও লৌহদণ্ডে দৃঢ়; বাণ ও পাথর নিক্ষেপকারী যন্ত্র, এবং শতঘ্নী প্রভৃতি কণ্টকাস্ত্রে প্রস্তুত প্রহরী। নগরীকে ঘিরে রত্নখচিত স্বর্ণপ্রাকার এবং শীতল জলে পূর্ণ গভীর পরিখা—যেখানে মাছ ও কুমির আছে; চলমান সেতু যন্ত্রে তুলে প্রবেশ রুদ্ধ করা হয়। তিনি রাবণের নিরন্তর প্রহরা ও দ্বারভিত্তিক সৈন্যবিন্যাসও জানালেন এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত দিলেন—সমুদ্র অতিক্রম করা গেলে লঙ্কার পতন অবশ্যম্ভাবী। শেষে হনুমান শুভক্ষণে দ্রুত সেনা-সমাবেশের জন্য শ্রীरामকে অনুরোধ করলেন।

34 verses

Sarga 4

समुद्रतट-प्रयाणम् तथा वेलावन-निवेशः (March to the Seacoast and Encampment at the Shore)

হনুমানের লঙ্কা-বৃত্তান্ত শুনে শ্রীराम এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে স্থির সংকল্প করলেন—রাক্ষসদুর্গ ধ্বংস করে সীতাকে উদ্ধার করবেন। তিনি যাত্রাকে শুভ বলে ঘোষণা করলেন; অনুকূল নক্ষত্রযোগ ও মঙ্গল-নিমিত্তের উল্লেখ করে শৃঙ্খলাবদ্ধ অভিযানের নির্দেশ দিলেন। নীলকে অগ্রদলের নেতা করে জল-ফল-মূলসমৃদ্ধ পথ নিশ্চিত করতে এবং রাক্ষসদের দ্বারা রসদ নষ্টের চেষ্টা রোধ করতে বললেন; বানরদেরকে নিম্নভূমি, বনদুর্গ ও গোপন অবস্থানসহ দুর্গম ভূখণ্ডে অনুসন্ধান চালাতে আদেশ দিলেন। তারপর বিশাল বানরসেনা সুসংগঠিত ব্যূহে অগ্রসর হল; খ্যাতনামা সেনানায়কেরা পার্শ্ব ও পশ্চাদ্ভাগ রক্ষা করল। লক্ষ্মণ আকাশীয় লক্ষণ দেখে বিজয়ের শুভসংকেত ব্যাখ্যা করলেন। সেনা সহ্য ও মালয় পর্বতমালা অতিক্রম করে মহেন্দ্র পর্বতে পৌঁছে শেষে বরুণালয়—মহাসাগরের তীরে উপস্থিত হল। সমুদ্রকে আকাশের মতোই সীমাহীন ও দুরতিক্রম্য বলে বর্ণনা করা হয়েছে; তাতে মকর, সর্প ও তিমিঙ্গিল প্রভৃতি ভয়ংকর জলচর বিচরণ করে। তা দেখে শ্রীराम তটবর্তী বেলাবনে শিবির স্থাপনের নির্দেশ দিলেন এবং সমুদ্র পার হওয়ার উপায় নিয়ে পরামর্শের জন্য সভা আহ্বান করলেন—এখানেই সমুদ্র-বাধা অতিক্রমের কৌশলগত বিরতি শুরু হয়।

124 verses

Sarga 5

सेनानिवेशः रामविलापश्च (Encampment on the Northern Shore; Rama’s Lament and Sandhyā)

সর্গের শুরুতে নীল প্রথানুসারে সমুদ্রের উত্তর তীরে বানরসেনার শিবির সুসংগঠিতভাবে স্থাপন করেন। মৈন্দ ও দ্বিবিদ চারদিকে টহল দিয়ে শিবিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। সেনা স্থির হলে শ্রীराम লক্ষ্মণকে সীতাবিরহের দীর্ঘ বিলাপ শোনান। তিনি বলেন, সাধারণ শোক সময়ে কমে, কিন্তু সীতার দর্শন না হওয়ায় তাঁর দুঃখ দিনদিন বেড়ে যায়; সীতার যৌবন ক্ষয় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং রাক্ষসদের মধ্যে তাঁর অসহায় অবস্থার চিন্তা তাঁকে দগ্ধ করে। তিনি কাব্যিক উপমায় বলেন—সীতার জীবিত থাকার সংবাদই তাঁর প্রাণধারণ, যেমন শুকনো ক্ষেত পাশের সেচিত ক্ষেতের আর্দ্রতায় সামান্য সজীব থাকে; আর সীতা রাক্ষসদের মধ্য থেকে তেমনি উদ্ভাসিত হবেন, যেমন শরৎকালের মেঘের আড়াল থেকে চন্দ্রকলার উদয়। এই বিলাপের মধ্যেও তাঁর রক্ষাধর্ম ও সংকল্প দৃঢ়—রাবণকে পরাজিত করে সীতাকে উদ্ধার করতেই হবে। দিনশেষে লক্ষ্মণ তাঁকে সান্ত্বনা দেন; শ্রীराम শোকাকুল হলেও সংযম রেখে সন্ধ্যা-উপাসনা করেন এবং সীতাস্মরণে নিমগ্ন থাকেন।

58 verses | Rama, Lakshmana

Sarga 6

रावणस्य मन्त्रविचारः — Ravana’s Council on Strategy

এই সর্গের শুরুতে রাবণ লঙ্কায় হনুমানের ভয়াবহ কৃত্যের পরিণাম বিচার করেন—অনুপ্রবেশ, ধ্বংস, প্রধান রাক্ষসদের বধ এবং সীতার সফল দর্শন। বিরল লজ্জা/হ্রীতে তিনি মাথা নত করে সমবেত পরামর্শের দিকে ফেরেন এবং স্পষ্ট বলেন—বিজয় মন্ত্র-মূল, অর্থাৎ সুশাসিত পরামর্শেই তার ভিত্তি। এরপর তিনি মানব-প্রচেষ্টা ও উপদেশের গুণকে তিন ভাগে ভাগ করেন—উত্তম, মধ্যম, অধম। উত্তম ব্যক্তি সক্ষম মন্ত্রী ও মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করে, দैব (ধর্মসম্মত উচ্চ ন্যায়-ব্যবস্থা) বিশ্বাসে কাজ করে; মধ্যম একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করে; অধম গুণ-দোষ না দেখে ‘আমি-ই করব’ বলে অহংকারে, দैব-আস্থা ছাড়া এগোয়। রাজনীতি-নীতিতে তিনি পরামর্শেরও স্তর নির্ধারণ করেন—শাস্ত্রসম্মত সর্বসম্মতি শ্রেষ্ঠ; ভিন্ন মতের পর ঐক্যমত হলে তা মধ্যম; আর একতা ছাড়া দলাদলির জেদি বাক্য নিন্দিত। শেষে তৎক্ষণাৎ সংকট—সহস্র বীর বানরে পরিবৃত শ্রীराम লঙ্কা অবরোধ করতে আসছেন; তাই নগর ও সেনা—উভয়ের মঙ্গলকর পরিকল্পনা রাবণ মন্ত্রীদের কাছে চান।

17 verses

Sarga 7

राक्षसपरिषद्वाक्यम् — Counsel of the Rakshasa Court to Ravana

এই সর্গে রাক্ষসদের বৃদ্ধ ও বীর সভাসদরা করজোড়ে রাবণকে সম্বোধন করে। রাজসভাসুলভ আশ্বাস ও যুদ্ধগর্বে তারা তাঁর সংকল্প দৃঢ় করতে চায়—তাদের মতে প্রতিপক্ষ ‘সাধারণ’, তাই রাজাকে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই; তবে শত্রুপক্ষের প্রকৃত শক্তি ও নীতিবুদ্ধি বিচার করতে তাদের সূক্ষ্মতা কম বলেই প্রকাশ পায়। তারা রাবণের পূর্বজয়ের তালিকা স্মরণ করায়—রসাতলে নাগদের দমন, বাসুকি ও তক্ষক পর্যন্ত বশীকরণ; কৈলাসে কুবেরকে অপমান করে পুষ্পকবিমান অধিকার; এবং দানব ময়ের কন্যা মন্দোদরীকে ভয়জনিত মৈত্রীরূপে পত্নী লাভ। মধু প্রভৃতি দানবদের উপর বিজয় এবং ‘যমলোক-সাগর’ সদৃশ মৃত্যুময় বিপদের মধ্যে নেমেও উত্তীর্ণ হওয়ার যুদ্ধচিত্রে তারা রাবণের মহাপরাক্রম গৌরবান্বিত করে। শেষে তারা পরামর্শ দেয়—মহেশ্বরের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করে দুর্লভ বরপ্রাপ্ত, এবং একবার ইন্দ্রকে বন্দি করে তাঁর সঙ্গে লঙ্কায় প্রবেশকারী ইন্দ্রজিতকে প্রেরণ করা হোক; সে বানরসেনা ধ্বংস করবে, এমনকি রামকেও বিনাশ করতে সক্ষম।

27 verses | Ravana (addressee)

Sarga 8

युद्धकाण्डे अष्टमः सर्गः — राक्षससभा-युद्धपरामर्शः (War-Council Boasts and Stratagems)

যুদ্ধকাণ্ডের অষ্টম সর্গে হনুমানের পূর্ববর্তী বিঘ্নসৃষ্টির পর লঙ্কার রাক্ষসসভায় যুদ্ধ-পরামর্শ অনুষ্ঠিত হয়। বহু রাক্ষসনায়ক বিপদের রূপ নির্ণয় করে ও প্রতিকার প্রস্তাব করে। মেঘশ্যাম প্রহস্ত করজোড়ে কথা বলে হনুমানকে তুচ্ছ জ্ঞান করে জানায়—শুধু দম্ভ-পরাক্রমে নয়, উপায় (কৌশলী ছল) ও সতর্কতায়ই জয় সম্ভব। সে প্রস্তাব দেয়, সহস্র কামরূপী রাক্ষস মানববেশে রামের কাছে গিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বাক্যে রাম-লক্ষ্মণকে অস্থির করবে। এরপর সভার ভাষা ক্রমে উগ্র প্রতিজ্ঞায় রূপ নেয়। দুর্মুখ অপমানকে অক্ষম্য বলে ধিক্কার দেয়; বজ্রদংষ্ট্র রক্তলিপ্ত লৌহগদা ধারণ করে; বজ্রহনু প্রভৃতি সুগ্রীব, অঙ্গদ, হনুমান এবং এমনকি রাম-লক্ষ্মণকেও বধ বা ভক্ষণ করার দম্ভ প্রকাশ করে। আরও এক ছল উচ্চারিত হয়—ভরত সেনাসহ আসছেন বলে প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো। এই সর্গে কৌশলী প্রতারণার কথা উঠলেও তা বারবার প্রদর্শনমূলক যুদ্ধ-অহংকারে ঢাকা পড়ে; ধর্মনিষ্ঠ সংকল্প ও অধর্মময় কপটতার নৈতিক বৈপরীত্য এখানে স্পষ্ট হয়।

24 verses

Sarga 9

विभीषणोपदेशः — Vibhishana’s Counsel to Ravana

এই সর্গের শুরুতে রাক্ষসদের যুদ্ধ-সমাবেশের এক প্রায় তালিকাভিত্তিক বর্ণনা দেখা যায়। ইন্দ্রজিত্ প্রমুখ প্রধান রাক্ষসনায়করা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পরিঘ, পট্টিশ, প্রাস, শক্তি, শূল, পরশু, ধনুক-বাণ ও তীক্ষ্ণ খড়্গ ধারণ করে উঠে দাঁড়ায় এবং রাম, লক্ষ্মণ, সুগ্রীব ও হনুমানকে বধ করার সংকল্প ঘোষণা করে। তখন বিভীষণ এগিয়ে এসে সেই সশস্ত্র সমাবেশ থামিয়ে নীতিসংগত, সুবিন্যস্ত উপদেশ প্রদান করেন। তিনি বলেন—সাম, দান, ভেদ এই তিন উপায়ে যা সাধ্য নয়, তাও আগে বিচার করে তবেই বীর্য দ্বারা সাধনীয়; অবজ্ঞা ও হঠকারিতায় নয়, পদ্ধতিগত মূল্যায়নেই সাফল্য আসে। শত্রুকে তুচ্ছ জ্ঞান না করতে তিনি সতর্ক করেন—হনুমানের সমুদ্র-লঙ্ঘন তাদের অসাধারণ ক্ষমতার প্রমাণ—এবং সীতাহরণের মাধ্যমে রাবণের আদ্য অপরাধ ধর্মদৃষ্টিতে কতটা ন্যায়সঙ্গত, তা প্রশ্ন করেন। বিভীষণ শান্তির পথ দেখান—ক্রোধ ত্যাগ করো, ধর্মনিষ্ঠ ও দৃঢ়ব্রত রামের সঙ্গে অর্থহীন বৈরিতা কোরো না, এবং মৈথিলী সীতাকে ফিরিয়ে দাও; নচেৎ লঙ্কা ও রাক্ষসদের সর্বনাশ অনিবার্য। রাবণ উপদেশ শুনে সভা ভঙ্গ করে অন্তঃপুরে প্রবেশ করে; কথাটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও অন্তরে সে সতর্কবাণী গ্রহণ করে না।

23 verses | Vibhishana, Ravana (silent recipient; later action)

Sarga 10

विभीषणोपदेशः — Vibhishana’s Counsel to Ravana and the Catalogue of Omens

প্রভাতে বিভীষণ রাবণের দুর্গবেষ্টিত প্রাসাদে উপস্থিত হন। সেখানে স্বর্ণালঙ্কৃত আসন, বেদপাঠের ধ্বনি ও যজ্ঞ-প্রস্তুতির মহিমা বিরাজমান। শিষ্টাচার রক্ষা করে প্রবেশ করে তিনি মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে রাজঐশ্বর্যে আসীন রাবণকে প্রণাম জানান এবং দেশ-কাল বিচার করে কল্যাণমুখী ‘হিত’ উপদেশ আরম্ভ করেন। বিভীষণ বৈদেহীর লঙ্কায় আগমনের পর থেকে দেখা অশুভ নিমিত্তগুলির বিবরণ দেন—যজ্ঞাগ্নি ঠিকমতো না জ্বলে ধোঁয়া ও স্ফুলিঙ্গ ওঠা; যজ্ঞস্থানে ও হবিতে সাপ ও পিঁপড়ার আবির্ভাব; গৃহপালিত পশু ও যুদ্ধবাহনের অস্বাভাবিক ব্যাকুলতা; কাকের কর্কশ ডাক, নগরের উপর শকুনের সমাবেশ, এবং দ্বারদেশে মাংসভোজী পশুর বজ্রনিনাদ-সদৃশ গর্জন। এসব লক্ষণ থেকে তিনি সিদ্ধান্ত করেন—এগুলির শমন ও প্রায়শ্চিত্ত একটাই, বৈদেহীকে রাঘবের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। তিনি জানান, এ কথা মোহ বা লোভ থেকে নয়; ভয়ে মন্ত্রীরা নীরব। কিন্তু ক্রোধে উন্মত্ত রাবণ নিজের অজেয়তার গর্ব করে উপদেশ প্রত্যাখ্যান করে বিভীষণকে তিরস্কার করে বিদায় দেয়—এইখানেই যুক্তিসঙ্গত পরামর্শ অগ্রাহ্য হয়ে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

30 verses | Vibhishana, Ravana

Sarga 11

रावणस्य सभाप्रवेशः (Ravana Enters the Royal Assembly and Summons Counsel)

যুদ্ধকাণ্ডের ১১তম সর্গে রাবণ মৈথিলীর প্রতি আসক্তিতে ক্ষীণতেজ হয়ে এবং পাপকর্মের সামাজিক পরিণতি স্মরণ করে, অতিবাহিত সময়ের তাড়না উপলব্ধি করে যুদ্ধ-বিষয়ে পরামর্শকে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় মনে করে। তিনি অতিশয় অলংকৃত রথে আরোহণ করে, ভেরী-মৃদঙ্গ ও শঙ্খধ্বনির কোলাহলের মধ্যে, নানা বেশভূষা ও অস্ত্রে সজ্জিত রাক্ষসদের প্রহরায় সভার দিকে অগ্রসর হন। রাজপথে ছত্র-চামর, প্রণাম ও স্তবের সঙ্গে রাজকীয় আড়ম্বরের দৃশ্য ফুটে ওঠে। তারপর তিনি বিশ্বকর্মা-নির্মিত সদা-দীপ্ত সভাগৃহে প্রবেশ করেন—যেখানে স্বর্ণ-রৌপ্য স্তম্ভ, স্ফটিকসদৃশ অন্তর্ভাগ, স্বর্ণবস্ত্রের আচ্ছাদন এবং কঠোর প্রহরা। রত্নখচিত সিংহাসনে বসে রাবণ দ্রুত দূতদের আদেশ দেন—লঙ্কার সর্বত্র থেকে রাক্ষসদের শত্রুবিরোধী এক মহৎ কর্মের জন্য তৎক্ষণাৎ সমবেত করতে। আহ্বানে লঙ্কা পূর্ণ হয়ে ওঠে; সেনানায়করা রথে, অশ্বে, গজে ও পদাতিকভাবে আসে, যান স্থাপন করে পর্বতগুহায় সিংহের ন্যায় সভায় প্রবেশ করে। তারা নিয়ম মেনে আসনে বসে নীরব থাকে। মন্ত্রী, যোদ্ধা এবং শেষে বিভীষণও উপস্থিত হন; চন্দন ও ধূপের সুবাসে সভা ভরে যায়। অস্ত্রধারী বীরদের মাঝে রাবণ বসুদের মধ্যে ইন্দ্রের মতো দীপ্তিমান—রাজনৈতিক জ্যোতি উজ্জ্বল, কিন্তু নৈতিক দৃঢ়তা অন্তরে ভঙ্গুর।

31 verses | Ravana

Sarga 12

युद्धकाण्डे द्वादशः सर्गः — रावणस्य परिषद्-सम्बोधनं कुम्भकर्णस्य नीत्युपदेशश्च (Ravana’s Council Address and Kumbhakarna’s Counsel)

এই দ্বাদশ সর্গে লঙ্কার রাক্ষস-সভায় রাজদরবারীয় যুদ্ধ-পরামর্শ অনুষ্ঠিত হয়। রাবণ সমগ্র রাক্ষসসমাবেশ পর্যবেক্ষণ করে সেনাপতি প্রহস্তকে আদেশ দেন—দুর্গের ভিতরে ও বাইরে চতুরঙ্গিনী বাহিনী মোতায়েন করে নগররক্ষা আরও কঠোর করতে হবে। প্রহস্ত প্রস্তুতির সংবাদ দিলে রাবণ অন্তরঙ্গদের বলেন, তাঁর সব কর্ম মন্ত্র-পরামর্শনির্ভর এবং অকৃতকার্য হয় না; কুম্ভকর্ণ দীর্ঘ নিদ্রায় থাকায় এতদিন এ বিষয়ে অবগত ছিল না। এরপর রাবণ দণ্ডকারণ্য থেকে সীতাহরণের যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে কামবশ আকাঙ্ক্ষা ও সীতার প্রত্যাখ্যানে নিজের ক্ষোভ-ব্যাকুলতা প্রকাশ করে—কাম যখন বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে, তখন শাসনেও সংকট দেখা দেয়। তিনি সমুদ্র অতিক্রমের আশঙ্কাও তোলেন, তবু মানুষের কাছে নিজেকে অজেয় বলে গর্ব করেন; এবং জানান, সুগ্রীবসহ বানরসেনা নিয়ে রাম-লক্ষ্মণ তীরে এসে সীতাকে উদ্ধার করতে উপস্থিত হয়েছে। এই কামমিশ্রিত বিলাপ শুনে কুম্ভকর্ণ পূর্বপরামর্শ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিন্দা করে নীতি ব্যাখ্যা করে—উপায় ও ক্রম না মেনে করা কর্ম ব্যর্থ হয়, তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত শত্রুবলের পরিমাপ করে না। তবু সে শক্তিবলে পরিস্থিতি সংশোধনের প্রতিজ্ঞা করে—রাম-লক্ষ্মণকে বধ ও বানরনেতাদের চূর্ণ করার শপথ করে; রাবণকে আশ্বস্ত করে বলে, তিনি ধৈর্য ও ভোগে স্থিত থাকুন, যুদ্ধভার কুম্ভকর্ণই বহন করবে।

40 verses

Sarga 13

महापार्श्वस्य परामर्शः — Mahāpārśva’s Counsel and Rāvaṇa’s Confession of Brahmā’s Curse

এই সর্গে महापার্শ্ব রাবণকে পরামর্শ দেন যে, তিনি যেন অনুনয়-বিনয় ও শান্তিপুর্ণ পথ ত্যাগ করে বলপ্রয়োগের (দণ্ড) মাধ্যমে সীতাকে ভোগ করেন। রাবণ এই পরামর্শে প্রীত হয়ে ব্রহ্মার অভিশাপের কথা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, অতীতে পুঞ্জিকস্থলা নামক এক অপ্সরার শ্লীলতাহানির কারণে ব্রহ্মা তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, ভবিষ্যতে কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করলে রাবণের মস্তক শতধা বিদীর্ণ হবে। এই কারণেই তিনি সীতাকে স্পর্শ করতে পারছেন না। পরিশেষে, রাবণ নিজের অসীম শক্তির দম্ভোক্তি করে বলেন যে, তিনি রামের সেনাবাহিনীকে ধূলিসাৎ করবেন এবং ইন্দ্র বা বরুণও তার গতিরোধ করতে অক্ষম।

21 verses

Sarga 14

विभीषणोपदेशः (Vibhīṣaṇa’s Counsel to Rāvaṇa and the Rākṣasa Court)

এই সর্গে লঙ্কার রাজসভায় সাধ্য-অসাধ্য, ন্যায়-অন্যায় ও রাষ্ট্রনীতি নিয়ে গম্ভীর বিতর্ক ওঠে। রাবণের অবস্থান ও কুম্ভকর্ণের গর্জন শোনার পর বিভীষণ নীতিনির্ভর উপদেশ দেন—রামবিরোধী লক্ষ্য অসম্ভব, আর অধর্মের সংকল্প থেকে স্বর্গসম সাফল্য আসে না। তিনি উপমা দেন—যে সাঁতার জানে না সে সমুদ্র পার হতে পারে না; এবং শক্তি-তুলনা করে ধর্মনিষ্ঠ শ্রীরামের বীর্য ও রণ-প্রাধান্য স্পষ্ট করেন। বিভীষণ বারবার অনুরোধ করেন, লঙ্কার সর্বনাশের আগে অবিলম্বে সীতাকে শ্রীরামের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে; নচেৎ বজ্রসম বাণে লঙ্কার নেতাদের মস্তক ছিন্ন হবে। প্রহস্ত দম্ভভরে বলে, দেবতা বা অন্য কারও ভয় নেই; তখন বিভীষণ আরও কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে জানান, রাঘবের সামনে রাক্ষস-শ্রেষ্ঠরাও টিকতে পারবে না। এরপর আলোচনা রাজনীতির রোগে গিয়ে পৌঁছায়—রাবণকে কাম-ক্রোধাদি ব্যসনে চালিত, হঠকারী এবং নিজেরই কৃতকর্মের বন্ধনে আবদ্ধ, যেন সহস্রফণী সর্পে জড়ানো বলা হয়। শেষে মন্ত্রী-নীতির বচন—শত্রুর শক্তি, নিজের সামর্থ্য এবং রাষ্ট্রের উন্নতি-অবনতির সম্ভাবনা বিচার করে, কেবল রাজকল্যাণের উদ্দেশ্যেই বিচক্ষণ পরামর্শ দিতে হয়।

22 verses

Sarga 15

विभीषण–इन्द्रजित् संवादः (Vibhishana and Indrajit: Counsel, Boast, and Rebuttal)

এই পঞ্চদশ সর্গে রাক্ষসসেনাপতি মেঘনাদ (ইন্দ্রজিত) ও বিভীষণের মধ্যে তীক্ষ্ণ বাক্যযুদ্ধ সংঘটিত হয়। বৃহস্পতিসদৃশ প্রজ্ঞাবান বিভীষণের সতর্কবাণীকে ইন্দ্রজিত ভীরুতা ও অযোগ্যতার লক্ষণ বলে তুচ্ছ করে। সে বিভীষণকে কুলে বীর্যহীন বলে অপমান করে এবং দম্ভভরে বলে—রাম-লক্ষ্মণ তো সাধারণ মানুষ; এক সাধারণ রাক্ষসও যুদ্ধে তাদের বধ করতে পারে। নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে সে শৌর্যগাথা গায়—একদা ইন্দ্রকে পরাভূত করেছে এবং ঐরাবতকে বশ করেছে—এভাবে রাম-লক্ষ্মণকে ‘সাধারণ মানব’ বলে খাটো করে। বিভীষণ নীতিবোধে উত্তর দেন—ইন্দ্রজিত বিচারবুদ্ধিতে অপরিণত, বাক্যে আত্মবিনাশী, এবং সর্বনাশ আসন্ন জেনেও রাবণের পথ আঁকড়ে মোহগ্রস্ত। তিনি মিথ্যা মৈত্রী ও অনিষ্টকর পরামর্শের দোষ নির্দেশ করে বাস্তবসম্মত উপায় বলেন—সীতা দেবীকে ধনরত্ন ও অলংকারসহ রামের কাছে সমর্পণ করা হোক, যাতে শোক নিবারিত হয় এবং লঙ্কার সর্বনাশ রোধ হয়। এই সর্গে দম্ভময় সামরিক অহংকারের বিপরীতে ধর্মসম্মত রাষ্ট্রনীতি ও বাস্তব ঝুঁকি-বিবেচনার মহিমা প্রতিপন্ন হয়।

14 verses

Sarga 16

विभीषणोपदेशे रावणस्य परुषवाक्यम् (Ravana’s Harsh Reply to Vibhishana’s Counsel)

এই ষোড়শ সর্গে সভামধ্যে ‘হিতোপদেশ’-কে কেন্দ্র করে গভীর বিচ্ছেদ দেখা দেয়। বিভীষণ রাবণের মঙ্গল কামনায় হিতবাক্য বলেন, কিন্তু কালচোদিত রাবণ কঠোর বাক্যে প্রত্যুত্তর দেয়। সে অনার্যের সঙ্গে মৈত্রীর নিষ্ফলতা বোঝাতে ধারাবাহিক উপমা আনে—পদ্মপত্রে জলের না-লাগা, মধু আস্বাদন করেও কৃতঘ্ন ভ্রমর, স্নান করেও মলিন গজ, আর শরৎ-মেঘের গর্জন হলেও বৃষ্টি না-হওয়া—ধর্মহীন স্থানে সদ্গুণের বন্ধ্যাত্বই এতে প্রতিপন্ন করে। আরও বলে, এমন কথা অন্য কেউ বললে তৎক্ষণাৎ দণ্ড দিত। ন্যায়বাদী বিভীষণ গদা ধারণ করে চার রাক্ষসসহ উঠে আকাশে আরোহণ করে রাবণকে ভর্ৎসনা করেন—জ্যেষ্ঠভ্রাতা সম্মানীয়, কিন্তু তুমি ধর্মপথ থেকে বিচ্যুত। তিনি নীতিসার উচ্চারণ করেন: মিষ্টভাষী অনেক, কিন্তু অপ্রিয় হলেও কল্যাণকর সত্য বলার ও শোনার লোক বিরল। তিনি সতর্ক করেন, রাবণ মৃত্যুপাশে আবদ্ধ; রামের জ্বলন্ত বাণে সে বিদ্ধ হবে—কালের গ্রাসে মহাবীরও পতিত হয়। শেষে জ্যেষ্ঠের হিতৈষী হয়ে বলা কথার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, নিজেকে ও লঙ্কাকে রক্ষা করতে উপদেশ দিয়ে, তিনি বিদায় নেন; বর্ণনাকার বলেন—মৃত্যুর নিকটে যারা, তারা বন্ধুর শুভ পরামর্শ গ্রহণ করে না।

28 verses

Sarga 17

विभीषणागमनम् (Vibhīṣaṇa’s Arrival and the Debate on Refuge)

এই সর্গে শরণাগত-ধর্ম ও রাজনীতির সতর্কতা—উভয়েরই বিচার প্রধান হয়ে ওঠে। রাবণকে তিরস্কার করে এবং সীতাকে ফিরিয়ে দিতে উপদেশ দিয়ে বিভীষণ চার সঙ্গীসহ লঙ্কা ত্যাগ করেন ও রামের নিকটে আসেন। তিনি উত্তর তীরের কাছে আকাশে স্থির থেকে নিজেকে রাবণের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বলে পরিচয় দেন, সীতাহরণ ও অশোকবাটিকায় তাঁর বন্দিত্বের কথা জানান, এবং রাঘবের শরণ প্রার্থনা করে নিজের আগমনের সংবাদ পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেন। সুগ্রীব রাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিতে ঘটনাটিকে সন্দেহের চোখে দেখেন—রূপান্তরকারী রাক্ষস গুপ্তচর হতে পারে; তাই কঠোর ব্যবস্থা, সতর্ক প্রহরা, ব্যূহরক্ষা, পরামর্শের গোপনীয়তা ও গুপ্তচরব্যবস্থা জোরদার করার কথা বলেন। রাম সুগ্রীবের যুক্তিসঙ্গত সতর্কবাণী গ্রহণ করে বানর-মন্ত্রীদের মত চান; অঙ্গদ, শরভ, জাম্ববান ও মৈন্দ নজরদারি ও সাবধানী জিজ্ঞাসাবাদের পরামর্শ দেন। হনুমান আচরণ-লক্ষণ বিচার করে বলেন—বিভীষণের বাক্য, বিনয়, ধৈর্য ও স্থৈর্যে অশুভ অভিপ্রায়ের চিহ্ন নেই; গোপন উদ্দেশ্য সাধারণত স্বর ও আচরণেই ধরা পড়ে। এভাবে অধ্যায়টি নীতিসতর্কতার সঙ্গে শরণ প্রদানের ধর্মবিচারকে একত্র করে।

157 verses | Vibhīṣaṇa, Sugrīva, Rāma, Aṅgada, Śarabha, Jāmbavān, Mainda, Hanumān

Sarga 18

शरणागति-धर्मनिर्णयः (Decision on Refuge and Dharma) / Rama’s Vow of Protection and the Acceptance of Vibhishana

অষ্টাদশ সর্গে সিদ্ধান্তের সন্ধিক্ষণে বিভীষণের শরণাগমনকে কেন্দ্র করে বানরশিবিরে সংশয় দেখা দেয়। হনুমানের সংবাদ শুনে শ্রীराम প্রসন্ন হয়ে বলেন যে তিনি বিভীষণ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন এবং সকল শুভাকাঙ্ক্ষীকে শুনতে আহ্বান করেন। সুগ্রীব সন্দেহ প্রকাশ করে মনে করেন বিভীষণ রাবণের প্রেরিত গুপ্তচর হতে পারে; তাই তাকে সংযত করা বা বন্দি করার পরামর্শ দেন। শ্রীराम প্রথমে নিজের অজেয়তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পরে ধর্মনীতির কথা স্থাপন করেন। তিনি দৃষ্টান্ত দেন—অঞ্জলি বেঁধে যে শরণ চায়, সে শত্রু হলেও তাকে আঘাত করা উচিত নয়; শত্রুকেও অতিথির মতো রক্ষা করা কবুতরীর আতিথ্যধর্মের কাহিনি এবং কন্দু মুনির স্মৃতিধর্মবচন উল্লেখ করে তিনি শরণাগত-ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। অবশেষে শ্রীराम দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন—যে কেউ একবারও “আমি শরণ নিলাম” বলে, সে বিভীষণ হোক, সুগ্রীব হোক বা স্বয়ং রাবণ, তাকে তিনি অভয় দেবেন। এই ধর্মবচনে সুগ্রীবের মন পরিবর্তিত হয়; বিভীষণের শুদ্ধতা উপলব্ধি করে তিনি তাকে গ্রহণ ও তৎক্ষণাৎ মৈত্রী স্থাপনের অনুরোধ করেন। তারপর শ্রীराम বিভীষণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অগ্রসর হন; রাজধর্মে শরণাগতির নীতির এক স্থায়ী ভিত্তি হিসেবে এই অধ্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

38 verses

Sarga 19

विभीषणाभिषेकः — The Consecration of Vibhishana and Counsel on Crossing the Ocean

এই সর্গে রামের অভয়দানকে কেন্দ্র করে বিভীষণের সঙ্গে মৈত্রী এক প্রকাশ্য, বিধিবদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে বৈধতার অনুষ্ঠানরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভীষণ অবতরণ করে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম জানায়, লঙ্কার পূর্ব-সম্পর্ক ত্যাগ করে রামের শরণ গ্রহণ করে এবং নিজের প্রাণ ও রাজ্য-ভাগ্য রামের অধীনে সমর্পণ করে। রাম সংযতভাবে তাকে আশ্বাস দেন এবং রাক্ষসদের শক্তি-দুর্বলতার গোপন বিবরণ জানতে চান। বিভীষণ রাবণের বরপ্রাপ্ত প্রায় অজেয়তা, কুম্ভকর্ণের মহাবল-পরাক্রম, প্রহস্তের পূর্বজয়খ্যাতি, ইন্দ্রজিতের অগ্নিকর্মে প্রাপ্ত অদৃশ্যতা, অন্যান্য সেনাপতি এবং লঙ্কার বিশাল ও নিষ্ঠুর বাহিনীর কথা বিস্তারিত জানায়। তখন রাম দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন—রাবণবধের পর বিভীষণকে লঙ্কার রাজা স্থাপন করবেন—এবং সেই প্রতিজ্ঞা তৎক্ষণাৎ কার্যরূপে সম্পন্ন করেন। লক্ষ্মণ সমুদ্রজল এনে বানরনায়কদের সম্মুখে বিভীষণের অভিষেক করেন; তিনি রাক্ষসরাজরূপে প্রতিষ্ঠিত হন এবং সর্বত্র জয়ধ্বনি ওঠে। শেষে হনুমান ও সুগ্রীব সমুদ্র পার হওয়ার উপায় জিজ্ঞাসা করলে বিভীষণ সাগরের শরণ নিতে বলেন এবং সগরবংশের সঙ্গে রামের বংশগত সম্পর্ক স্মরণ করিয়ে দেন। সুগ্রীব এ পরামর্শ রামকে জানায়; রাম সম্মতি দিয়ে তীরে কুশ বিছিয়ে বসেন, লঙ্কাগমনের পরবর্তী ধর্মসম্মত কৌশলের জন্য প্রস্তুত হন।

42 verses | Vibhīṣaṇa, Rāma, Hanūmān, Sugrīva, Lakṣmaṇa

Sarga 20

दूत-नीति, शुक-प्रसङ्गः (Envoy-Ethics and the Episode of Śuka)

এই বিংশ সর্গে গুপ্তচর-পর্যবেক্ষণ, কূটনৈতিক বার্তা ও যুদ্ধনীতির প্রকাশ্য পরীক্ষা একত্রে দেখা যায়। রাক্ষস গুপ্তচর শার্দূল সুগ্রীবের শিবিরে প্রবেশ করে ধ্বজশোভিত বানর-ঋক্ষসেনা পর্যবেক্ষণ করে এবং রাবণকে জানায়—এ বাহিনী লঙ্কার দিকে দ্বিতীয় এক অপরিমেয় সমুদ্রের মতো অগ্রসর হচ্ছে; সে সমুদ্রতীরে অবস্থানরত রাম-লক্ষ্মণ ও সেনাবিস্তারের বিশালতাও বর্ণনা করে। এরপর রাবণ শুককে দূত করে সুগ্রীবের কাছে পাঠায়। শুক সুগ্রীবের বংশ ও বলের প্রশংসা করলেও রাবণের অপরাধকে লঘু করে দেখায় এবং লঙ্কার অজেয়তার দাবি তোলে—উদ্দেশ্য বানরদের মনোবল ভাঙা ও মৈত্রীতে বিভেদ ঘটানো। শুক পাখির রূপ নিয়ে আকাশ থেকে কথা বললে ক্রুদ্ধ বানররা তাকে আক্রমণ করে; তখন সে স্মরণ করায়—দূতকে হত্যা করা ধর্মবিরুদ্ধ, এবং সত্য দূত কেবল প্রভুর বার্তা বহন করে, নিজের পক্ষ থেকে অনধিকার বাক্য যোগ করে না। রাম দূতধর্ম রক্ষায় হস্তক্ষেপ করে শুককে মুক্ত করতে আদেশ দেন। নিরাপদে শুক পুনরায় কথা বললে সুগ্রীবের দৃঢ় প্রত্যুত্তর শোনা যায়, যা রাবণের কাছে পৌঁছাতে বলা হয়—রাবণের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী; গোপনে পালিয়েও বা দেবাশ্রয় নিলেও রক্ষা নেই; আর সীতাহরণ ও জটায়ুবধের পাপের নৈতিক অভিযুক্তি তার উপর আরোপিত। অঙ্গদ শুককে গুপ্তচর সন্দেহ করে ধরে রাখার কথা তোলে, কারণ সে সেনার পরিমাপ করে ফেলেছে; এভাবে নিরাপত্তা-চিন্তা ও দূত-রক্ষার নীতি—দুইয়ের ভারসাম্য স্থাপিত হয়।

36 verses | Śārdūla, Rāvaṇa, Śuka, Rāma, Sugrīva, Aṅgada

Sarga 21

सागरप्रतीक्षा-क्रोधप्रादुर्भावः (Rama’s Vigil at the Ocean and the Rise of Wrath)

সমুদ্রতীরে শ্রীराम কুশ বিছিয়ে পূর্বমুখে বসে সাগরকে অঞ্জলি নিবেদন করলেন এবং নিয়মবদ্ধ ব্রতে শয়ন করে প্রহর গুনলেন। তিন রাত্রি অতিক্রান্ত হলেও ‘নদীপতি’ সাগর যথোচিত সম্মান পেয়েও কোনো প্রত্যুত্তর-রূপে প্রকাশ পেল না। তখন সংযম ভেঙে ধর্মসম্মত ক্রোধ উদিত হল। রাম লক্ষ্মণকে নীতিবচন বললেন—শান্তি, ক্ষমা, সরলতা ও মধুর বাক্যকে কখনও কখনও নির্গুণ বা অহংকারী লোক দুর্বলতা বলে ধরে; কেবল আপসের পথেই খ্যাতি ও বিজয় স্থির হয় না। বানরসেনার পারাপারের জন্য তিনি সাগরকে শুকিয়ে দেওয়া বা সর্পসদৃশ বাণে তাকে দমন করার সংকল্প করে ভয়ংকর ধনু রজ্জু করলেন। বাণ জলে জ্বলে পড়তে লাগল, ঢেউ পর্বতের মতো উথলে উঠল, শঙ্খ-শুক্তি ঘূর্ণিত হল, ধোঁয়া উঠল, পাতালের নাগ ও দানবেরা কাতর হয়ে পড়ল। তখন সৌমিত্রি এগিয়ে এসে ধনু ধরে রামকে নিবৃত্ত করলেন এবং বিনীতভাবে বললেন—“এতই যথেষ্ট।”

33 verses | Rama, Lakshmana (Saumitrī)

Sarga 22

सागरप्रशमनम् / The Pacification of the Ocean and the Building of Nala’s Bridge

এই বাইশতম সর্গে অচলাবস্থা থেকে উপায়ের পথে কাহিনি এগোয়। সমুদ্রের বাধায় ক্রুদ্ধ শ্রীराम ব্রহ্মাস্ত্র-তেজে সাগরকে পাতাল পর্যন্ত শুকিয়ে দেবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন; সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বায়ু, ঘন মেঘ, বিদ্যুৎ, অন্ধকারে জগৎ অস্থির হয় এবং দৃশ্য-অদৃশ্য সত্তারা ভয়ে কাঁপতে থাকে। তখন সাগরাধিপতি (বরুণালয়) রাজসিক দিব্যরূপে উদিত হয়ে পঞ্চমহাভূতের স্বভাব যে অতিক্রম করা যায় না তা জানান, এবং ধর্মসম্মত বিকল্প দেন—সেতুবন্ধন করে স্থির পারাপারের পথ নির্মাণ করা হোক। তিনি আরও প্রার্থনা করেন, শ্রীरामের অমোঘ বাণ দ্ৰুমকূল্য অঞ্চলের পাপী দস্যু-উপদ্রবীদের দণ্ড দিতে ব্যবহৃত হোক। শ্রীराम সেইমতো বাণ নিক্ষেপ করেন; ফলে ‘মরুকান্তার’ নামে প্রসিদ্ধ শুষ্ক প্রদেশ, লবণাক্ত জলের উথাল দেওয়া ‘ব্রণ’ কূপ, এবং বরদানে এক নতুন শুভ পথের উদ্ভব হয়। এরপর সাগর বিশ্বকর্মার পুত্র নলকে দেবসম দক্ষ স্থপতি বলে সেতু-নির্মাণের দায়িত্ব দেন; নল তা গ্রহণ করেন। বানরসেনা বৃক্ষ, শিলা ও পর্বতখণ্ড সংগ্রহ করে অল্প কয়েক দিনে দ্রুত সেতু নির্মাণ করে; দেবতা ও ঋষিরা বিস্ময়ে তা দেখে শ্রীरामকে আশীর্বাদ করেন। এই সর্গে ধর্মরক্ষায় ক্রোধ-সংযম, স্বভাবতত্ত্বের শিক্ষা এবং জনকল্যাণকর নির্মাণনীতি একসূত্রে গাঁথা।

87 verses | Rama, Sagara (Lord of the Ocean / Varunalaya), Nala, Sugriva

Sarga 23

निमित्तदर्शनम् (Portents Before the March to Laṅkā)

এই তেইশতম সর্গে রাম নিমিত্তদর্শী হয়ে সৌমিত্র লক্ষ্মণকে আলিঙ্গন করে যুদ্ধযাত্রার ব্যবস্থা নির্দেশ দেন। তিনি আদেশ করেন—শীতল জল ও ফলসমৃদ্ধ নিরাপদ বনবিশ্রামস্থল প্রস্তুত করতে, সেনাদল ভাগ করতে এবং ব্যূহবদ্ধ হয়ে সতর্ক প্রহরায় স্থিত থাকতে। তারপর রাম ভয়ংকর অশুভ লক্ষণগুলির ব্যাখ্যা করেন—ধূলিভরা ঝড়, ভূমি ও পর্বতের কম্পন, বৃক্ষপতন, মাংসবর্ণ মেঘ থেকে রক্তসদৃশ বিন্দুবৃষ্টি, আতঙ্কজনক গোধূলি, সূর্য থেকে অগ্নিপিণ্ড পতনের মতো দৃশ্য, সূর্যের দিকে কাতর পশুর ক্রন্দন, এবং চন্দ্র-সূর্যের অস্বাভাবিক বর্ণ ও প্রভামণ্ডল। রাম জানান, এগুলি ভয়ে স্থবির হওয়ার কারণ নয়; বরং ভল্লুক-বানর ও রাক্ষসদের মধ্যে বৃহৎ ক্ষয়ক্ষতি এবং সিদ্ধান্তমূলক সংঘর্ষের আসন্নতার পূর্বসংকেত। অবশেষে তৎক্ষণাৎ অভিযান শুরু হয়—বানরসেনা রাবণের নগরীর দিকে অগ্রসর হয়, রাম ধনু হাতে অগ্রভাগে চলেন, সুগ্রীব ও বিভীষণ গর্জন করতে করতে এগিয়ে যান। বানরযোদ্ধারা রামের মনোবল বাড়াতে উল্লাসপূর্ণ কীর্তি প্রদর্শন করে, ধর্মযুদ্ধের সংকল্পকে দৃঢ় করে।

16 verses | Rama

Sarga 24

लङ्कानिरीक्षणं व्यूहविन्यासश्च (Survey of Lanka and Deployment of the Battle Formation)

এই সর্গে প্রকাশ্য যুদ্ধের ঠিক পূর্বমুহূর্তের উত্তেজনা ফুটে ওঠে। শ্রীरामের আদেশে স্থিত ও সুসংবদ্ধ বানরসেনা শুভ নক্ষত্রমণ্ডলের মধ্যে শরৎপূর্ণিমার চাঁদের মতো দীপ্তিমান, তারপর সমুদ্রের বেগে অগ্রসর হয়ে পৃথিবী কাঁপিয়ে তোলে। লঙ্কা থেকে ভয়ংকর ভেরি-ঢাকের নিনাদ ওঠে; বানররা আরও উচ্চ গর্জনে জবাব দেয়, আর রাক্ষসদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। সীতাবিরহে শোকাকুল রাম লঙ্কার আকাশছোঁয়া প্রাসাদশ্রেণি, শ্বেত মেঘসম বিমানের মতো রথ-গৃহ, এবং চৈত্ররথ-উদ্যানের ন্যায় মনোরম বাগিচার শোভা দেখান। পাখি, কোকিল ও মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর বৃক্ষরাজির সৌন্দর্যও তিনি বর্ণনা করেন। এরপর শাস্ত্রসম্মত ব্যূহবিন্যাস নির্দেশ দেন—মধ্যভাগে অঙ্গদ নীলসহ, দক্ষিণ পার্শ্বে ঋষভ, ডান পার্শ্বে গন্ধমাদন; অগ্রভাগে রাম-লক্ষ্মণ। জাম্ববান ও সুষেণ ভল্লনায়কদের সঙ্গে ‘মধ্যদেশ’ রক্ষা করেন, আর পশ্চাতে সুগ্রীব অবস্থান নেন। ব্যূহবদ্ধ সেনা আকাশের মেঘপুঞ্জের মতো জ্যোতির্ময়; বানররা পর্বতশিখর ও বৃক্ষকে অস্ত্র করে লঙ্কা চূর্ণ করতে উদ্যত হয়। ব্যূহ সম্পূর্ণ হলে দূত শুককে মুক্ত করা হয়; সে ভীত হয়ে রাবণের কাছে ফিরে বানরদের ক্রোধ, সেতুবন্ধনের পর রামের আগমন জানিয়ে বলে—অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নিন, সীতাকে ফিরিয়ে দিন অথবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। রাবণ রক্তচক্ষু ক্রোধে গর্জে ওঠে, দেবতাদের বিরুদ্ধেও সীতাকে না দেওয়ার দম্ভ করে এবং নিজের বাণের ‘অগ্নি’ অপ্রতিরোধ্য বলে সংঘর্ষকে অনিবার্য করে তোলে।

45 verses | Rama, Lakshmana, Sugriva, Suka, Ravana

Sarga 25

शुकसारण-चारप्रवेशः (Suka and Sāraṇa’s Espionage and Release)

দশরথনন্দন শ্রীराम বানরসেনা সহ সমুদ্র অতিক্রম করে সেতুবন্ধন সম্পন্ন করেছেন—এ সংবাদ শুনে রাবণ উদ্দীপ্ত হয়ে তার মন্ত্রী-গুপ্তচর শুক ও সারণকে শত্রুশিবিরে গোপনে প্রবেশের আদেশ দেয়। তাদের দায়িত্ব ছিল সেনাবলের পরিমাণ নির্ণয়, প্রধান বানরবীর ও দক্ষ সেনানায়কদের পরিচয় জানা, সেতু-নির্মাণের অবস্থা দেখা, পর্বত-গুহা-তট-অরণ্য-উদ্যান প্রভৃতিতে শিবিরগুলির অবস্থান খুঁজে বের করা, এবং শ্রীराम-লক্ষ্মণের সংকল্প, বীর্য ও অস্ত্রশক্তি বিচার করা। বানরবেশে তারা শিবিরে ঢুকে সেনার অপরিমেয় বিস্তার ও গর্জনে হতবাক হয়ে পড়ে। বিভীষণ তাদের গোপন পরিচয় বুঝে ধরে শ্রীरामের কাছে উপস্থিত করেন। মৃত্যুভয়ে কাঁপতে থাকা গুপ্তচরদের দেখে শ্রীराम শান্ত হাস্য ও ধর্মমর্যাদায় বলেন—দূত ও নিরস্ত্রকে হত্যা করা উচিত নয়; তোমরা যা দেখার দেখেছ, আর কিছু বাকি থাকলে বিভীষণ সব দেখিয়ে দেবে—এবং তাদের মুক্তি দেন। শ্রীराम রাবণের উদ্দেশে বার্তা দেন—যে শক্তিতে সীতাকে অপহরণ করেছিলে, সেই শক্তি প্রদর্শন কর; প্রভাতে দেখবে লঙ্কার দুর্গরক্ষা ও রাক্ষসবল কীভাবে ভেঙে চূর্ণ হবে। লঙ্কায় ফিরে শুক-সারণ শ্রীरामের ধর্মনিষ্ঠা এবং চার নেতার—রাম, লক্ষ্মণ, বিভীষণ ও সুগ্রীব—ভয়ংকর সামর্থ্যের কথা জানিয়ে মৈথিলীকে ফিরিয়ে দিয়ে সন্ধি করাই শ্রেয় বলে উপদেশ দেয়।

34 verses

Sarga 26

वानरमुख्य-परिचयः (Catalogue of Principal Vānara Leaders)

এই সর্গে লঙ্কার অন্তরে গুপ্তচর-ভিত্তিক তথ্যবিনিময়ের দৃশ্য রচিত হয়েছে। সারণ রাবণকে স্পষ্ট ও কল্যাণকর উপদেশ দেন; কিন্তু রাবণ দম্ভভরে তা প্রত্যাখ্যান করে ঘোষণা করে—সমগ্র জগতের বিরোধ হলেও সে সীতাকে সমর্পণ করবে না। এরপর প্রত্যক্ষভাবে শত্রুবল নির্ণয় করতে রাবণ শুক ও সারণকে সঙ্গে নিয়ে এক উচ্চ, তুষারশুভ্র প্রাসাদের উপর আরোহণ করে সমুদ্রতট জুড়ে বিস্তৃত বিপুল বানরসেনা প্রত্যক্ষ করে। অগণিত বাহিনী দেখে সে সারণকে জিজ্ঞাসা করে—বানরদের মধ্যে কারা শ্রেষ্ঠ, সুগ্রীবের প্রধান পরামর্শদাতা কারা, এবং কোন কোন সেনানায়ককে বিশেষ ভয় করা উচিত। সারণ তখন সুশৃঙ্খল তালিকায় প্রধান প্রধান নায়কের পরিচয় দেন—সুগ্রীবের বাহিনীর অগ্রভাগে নীল; বালিপুত্র ও যুবরাজ অঙ্গদ, যে সরাসরি যুদ্ধ-আহ্বান জানায়; সেতু-কার্যে প্রসিদ্ধ নল; এবং অন্যান্য দলনেতা—শ্বেত, কুমুদ, রম্ভ, শরভ, পনস, বিনত, ক্রোধন, গবয়। তিনি তাদের দেহলক্ষণ, বাসস্থান/পর্বত-সম্পর্ক, সৈন্যসংখ্যা এবং লঙ্কার প্রতি আক্রমণাত্মক সংকল্প বর্ণনা করেন। এই অধ্যায়টি কাব্যরসের সঙ্গে রাষ্ট্রনীতি-সম্মত হুমকি-মূল্যায়ন মিলিয়ে শত্রুপক্ষের ‘যুদ্ধবিন্যাস’ সদৃশ পরিচিতি প্রদান করে।

48 verses

Sarga 27

वानर-ऋक्ष-सेना-प्रशंसा (Cataloguing the Vanara and Bear Forces)

এই সর্গে যুদ্ধের পূর্বে এক প্রকার সামরিক ‘দৃশ্য-পরিচয়’ দেওয়া হয়েছে। বক্তা রাক্ষসরাজকে “রাজন্” বলে সম্বোধন করে রাঘবের উদ্দেশ্যে সমবেত বানর-ঋক্ষ (ভালুক) মিত্রসেনার কথা জানায়—তারা সকলেই রাঘবকার্যে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত, “রাঘবার্থে পরাক্রান্ত”। এরপর উজ্জ্বল উপমা ও পরিচয়সহ প্রধান প্রধান নেতাদের উল্লেখ আছে—হর, যার বহুরঙা দীপ্ত লেজ; ভয়ংকর ঋক্ষেরা কালো ঝড়-মেঘের ন্যায়; তাদের অধিপতি ধূম্র, যিনি ঋক্ষবানে বাস করেন এবং নর্মদার জল পান করেন বলে প্রসিদ্ধ। জাম্ববান পর্বতসম, নেতা-শ্রেষ্ঠ; দেবাসুরযুদ্ধে ইন্দ্রের সহায়ক ও বরপ্রাপ্ত। ধম্ব ভয়াল হরীশ্বর, ইন্দ্রের মতো পরিবৃত; সন্নদন বানরদের ‘পিতামহ’সদৃশ বিপুলকায়, যিনি একদা ইন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেও অপরাজিত ছিলেন। ক্রোধন/ক্রথন কৈলাসে কুবেরের জাম্বুবৃক্ষের নিকটে বাস করে; প্রমথি ধুলো উড়িয়ে দ্রুতগামী সেনা পরিচালনা করে; সেতু দর্শনের পর গবাক্ষ গোলাঙ্গুল বাহিনীসহ অবস্থান করে; কেসরী স্বর্ণপর্বতে নিত্য ফল-মধুর মধ্যে ক্রীড়া করে; আর শতবলী সূর্যোপাসক হয়ে লঙ্কা চূর্ণ করার সংকল্পে স্থির। শেষে মিত্রসেনার পরিমাণ ও শক্তি অপরিমেয় বলে ঘোষিত—তারা পৃথিবীর পর্বতসমূহকেও স্থানচ্যুত করতে সক্ষম। এই বর্ণনা শত্রুকে ভীত করা ও স্বপক্ষের মনোবল বাড়ানোর মহাকাব্যিক ভাষ্য।

48 verses | Rāvaṇa (addressee)

Sarga 28

शुकवाक्यं (Śuka’s Report on the Vānara Host) / Śuka Describes the Allied Forces to Rāvaṇa

সারণের বিবরণ শোনার পর শূক রাবণকে সুসংবদ্ধ গুপ্তচর-প্রতিবেদন জানায়। সে অগ্রসরমান বানর-জোটকে দুর্জয় বলে বর্ণনা করে—রূপান্তর-নিপুণ, দেবতুল্য পরাক্রমশালী, প্রতিরোধ করা কঠিন। তারপর প্রধান নেতাদের পরিচয় দেয়: মৈন্দ ও দ্বিবিদ প্রায় অমরসম যোদ্ধা; হনুমান মারুতাত্মজ—সমুদ্র লঙ্ঘনকারী, রূপ পরিবর্তনকারী, এবং লঙ্কায় পূর্বদূতকার্যে (লেজদাহসহ) প্রমাণিত বীরত্বসম্পন্ন। এরপর শূক মানব প্রধানদের কথা তোলে। শ্রীरामকে ইক্ষ্বাকুবংশীয় অতিরথ, অচল ধর্মনিষ্ঠ, ব্রহ্মাস্ত্রাদি দিব্যাস্ত্র ও বিশ্বভেদী ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী বলে জানায়; লক্ষ্মণকে রামের অপরিহার্য “ডান হাত”, নীতি ও যুদ্ধে দক্ষ সহায়ক বলে উল্লেখ করে। রামের বামদিকে বিভীষণকে অভিষিক্ত রাজা হিসেবে, রাবণবিরোধী শিবিরে স্থিত বলে জানায়। সেনার বিপুলতা বোঝাতে শঙ্খু, মহাশঙ্খু, বৃন্দ, পদ্ম, খর্ব, সমুদ্র, ওঘ, মহৌঘ প্রভৃতি সংখ্যাশব্দে পরিমাপ করে এবং শেষে সতর্ক করে—জ্বলন্ত গ্রহসম এই মহাসেনা দেখে রাবণকে পরাজয় এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

44 verses

Sarga 29

शुकसारणनिग्रहः / Ravana Rebukes Suka and Sārana; Spies Reconnoiter Rama’s Camp

এই সর্গে চরনীতি-নির্ভর রাজকীয় গোয়েন্দা-চক্র—রাজসভা থেকে শিবির পর্যন্ত তথ্যপ্রবাহ—স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। শূকের প্রতিবেদন শুনে রাবণ বানরসেনার মহাসমাবেশ এবং রামের প্রধান সহায়দের—রামের ‘ডান বাহু’সম লক্ষ্মণ, সুগ্রীব, অঙ্গদ, হনুমান, জাম্ববান ও অন্যান্য সেনানায়কদের—বিবরণ পায়। অন্তরে সে কেঁপে উঠলেও বাহিরে ক্রোধ প্রদর্শন করে। যুদ্ধের আগে শত্রু-প্রশংসা করার জন্য সে শূক ও সারণকে তিরস্কার করে, একে রাজনীতি ও মন্ত্রীধর্মে ব্যর্থতা এবং আনুগত্যহানি বলে গণ্য করে; শাস্তির হুমকি দেয়, কিন্তু পূর্বসেবার কথা স্মরণ করে সংযত হয়ে তাদের হত্যা না করে বিদায় দেয়। এরপর রাবণ মহোদরকে আদেশ দেয় দক্ষ গুপ্তচর ডেকে আনতে এবং তাদের রামের অভিপ্রায়, দৈনন্দিন আচরণ ও অন্তরঙ্গ পরামর্শমণ্ডলী পরীক্ষা করতে বলে। শার্দূলের নেতৃত্বে তারা ছদ্মবেশে সুবেল অঞ্চলে পৌঁছে ধর্মাত্মা বিভীষণের দ্বারা শনাক্ত হয়; শার্দূল ধরা পড়ে। বানররা তাদের হত্যা করতে উদ্যত হলে রামের করুণা হস্তক্ষেপ করে, শার্দূলসহ সকলকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। ভীত-সন্ত্রস্ত ও তাড়িত হয়ে তারা লঙ্কায় ফিরে এসে সুবেলের নিকটে অবস্থানরত রামের দুর্জয় বানরবাহিনীর শক্তির বিবরণ দশগ্রীবকে জানায়; এই কৌশলগত মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে সর্গ সমাপ্ত হয়।

30 verses

Sarga 30

शार्दूलचरवृत्तान्तः (Saardula’s Spy-Report on Rama’s Camp and the Vanara Host)

এই সর্গে লঙ্কার গুপ্তচররা জানায় যে রাঘব সুবেল পর্বতে অচল-দৃঢ় এক বিশাল সেনা নিয়ে শিবির স্থাপন করেছেন। সংবাদে রাবণ মুহূর্তের জন্য বিচলিত হয়ে নিজের চর শার্দূলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে; শার্দূলের ভয়-চিহ্নিত চেহারাই বানরদের কঠোর প্রহরার প্রমাণ হয়ে ওঠে। শার্দূল বলে—সে সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে, প্রহারিত হয়, জনসমক্ষে ঘোরানো হয় এবং শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়—যাতে রামের শিবিরের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা স্পষ্ট হয়। সে আরও জানায় যে শিলা-পাথর দিয়ে সমুদ্র পূরণ করে সেতুকর্ম সম্পন্ন হয়েছে এবং রাম লঙ্কার দ্বারপ্রান্তে অবস্থান নিয়েছেন; বানরদের যুদ্ধবিন্যাসকে সে গরুড়-ব্যূহের ন্যায় বর্ণনা করে। শার্দূল রাবণকে দ্বিমুখী সিদ্ধান্তের কথা বলে—সীতাকে ফিরিয়ে দাও, নতুবা যুদ্ধ গ্রহণ করো, রাম প্রাচীরের কাছে পৌঁছানোর আগেই। রাবণ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে—দেবসমূহ একত্র হলেও সে সীতাকে দেবে না—এবং বানরসেনার সংখ্যা, বংশ ও শক্তির তালিকা চায়। শার্দূল সুগ্রীব, জাম্ববান, হনুমান, নীল, অঙ্গদ, মৈন্দ, দ্বিবিদ প্রমুখ প্রধান বীরদের নাম করে, অনেকের দিব্য বংশোদ্ভবের কথাও উল্লেখ করে এবং সেনার বিপুলতা জোর দিয়ে বলে—দশ কোটি বানর। শেষে জানায়, অবশিষ্ট বিবরণ অতিবিস্তৃত বলে সম্পূর্ণ বলা সম্ভব নয়। ফলে এই অধ্যায় একদিকে কৌশলগত তথ্যভাণ্ডার, অন্যদিকে শৃঙ্খলিত ধর্মপক্ষ ও একগুঁয়ে রাজসত্তার নৈতিক-মানসিক প্রতিচ্ছবি।

35 verses | Ravana, Spies (collective report)

Sarga 31

मायाशिरोप्रदर्शनम् (The Display of the Illusory Head of Rāma)

এই সর্গে লঙ্কার গুপ্তচররা রাবণকে জানায় যে রামের “অচঞ্চল” বানরসেনা সুবেল পর্বতে অবস্থান নিয়ে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। বিচলিত রাবণ সভা ডেকে পরামর্শ করলেও সরাসরি যুদ্ধ না করে মনস্তাত্ত্বিক কৌশল গ্রহণ করে। সে মায়াবিদ্যায় পারদর্শী রাক্ষস বিদ্যুজ্জিহ্বকে ডেকে রাঘবের মিথ্যা মস্তক ও ধনুক মায়ায় নির্মাণের আদেশ দেয়। এরপর সীতার মনোবল ভাঙার অভিপ্রায়ে রাবণ অশোকবাটিকায় যায়। সেখানে সীতা মাটিতে বসে, মাথা নত করে, স্বামীর ধ্যানে নিমগ্ন—রাক্ষসীদের প্রহরায় পরিবেষ্টিত। রাবণ ভয় ও চাপের ভাষায় বলে যে প্রহস্তের নেতৃত্বে রাত্রিকালীন আক্রমণে রাম ও প্রধান বানররা নিহত হয়েছে; তারপর কথার “প্রমাণ” হিসেবে সেই কৃত্রিম মস্তক সীতার সামনে স্থাপন করায় এবং পরে রামের প্রসিদ্ধ ধনুকও দেখায়। এই অধ্যায়ে যুদ্ধের প্রচার-যুদ্ধের রূপ স্পষ্ট—ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যা সংবাদ ও সাজানো প্রমাণ দিয়ে আত্মসমর্পণ করানোর চেষ্টা; আর সীতার একনিষ্ঠতা ও স্থৈর্য তার পূর্বাবস্থাতেই ইঙ্গিতিত।

46 verses | Rāvaṇa, Vidyujjihva

Sarga 32

सीताविलापः (Sītā’s Lament over the Illusory Head and Bow)

এই সর্গে দুইটি প্রবাহ একসঙ্গে চলে—(১) অশোকবাটিকায় সীতার তীব্র শোক-বিলাপ, এবং (২) রাবণের যুদ্ধ-পরামর্শের জন্য মন্ত্রীসভা আহ্বানের প্রশাসনিক উদ্যোগ। রাবণ মায়ার দ্বারা সাজানো দৃশ্য দেখায়—যেন শ্রীरामের ছিন্ন মস্তক ও তাঁর প্রসিদ্ধ ধনুক। সীতা চোখ, বর্ণ, কেশকুঞ্চ ইত্যাদি লক্ষণে চিনতে পারেন বলে মনে হয়; চূড়ামণির শুভ-সম্পর্ক স্মরণ করে মূর্ছিত হয়ে পড়েন এবং দীর্ঘ বিলাপ শুরু করেন। তাঁর বাক্যে কখনও দোষারোপ (বিশেষত কৈকেয়ীর প্রতি), কখনও আত্মগ্লানি, আবার কখনও ‘কাল’-তত্ত্বের চিন্তা—সময় যে বুদ্ধি নষ্ট করে ও রক্ষাকবচ ভেঙে দেয়—এই ভাবনা ঘুরে ফিরে আসে। তিনি এক ধর্ম-পরাডক্স দেখান: নীতি ও বিপদ-নিবারণজ্ঞ রামও মৃত্যুর অধীন হলেন; লক্ষ্মণের একাকী প্রত্যাবর্তনে কৌশল্যার সর্বনাশসম শোক কল্পনা করেন; এবং বীরদেহের যথোচিত সংস্কার না হয়ে শ্বাপদদের আহার হওয়া সামাজিক-ধর্মীয় বিচ্ছেদ বলে আক্ষেপ করেন। শেষে রাবণকে অনুরোধ করেন—স্বামীর সঙ্গে মৃত্যুতেই যেন তাঁকে মিলিয়ে দেয়। রাবণ মন্ত্রীদের কাছে যেতে বেরোতেই সেই মস্তক ও ধনুক অদৃশ্য হয়ে যায়—এ যে মায়া ও বাধ্য করার কৌশল, তা প্রকাশ পায়। এরপর দৃশ্য শাসনকার্যে মোড় নেয়: প্রহরী প্রহস্তের আগমনের সংবাদ দেয়; রাবণ মন্ত্রীদের সমবেত করে কারণ না জানিয়ে ঢাক-নগাড়ায় সৈন্যসমাবেশের আদেশ দেন এবং রামের বিরুদ্ধে করণীয় বিষয়ে আনুষ্ঠানিক পরামর্শ শুরু করেন।

44 verses | Sītā, Rāvaṇa

Sarga 33

सरमा-सीता संवादः (Saramā Consoles Sītā; Preparations in Laṅkā)

এই সর্গে অশোকবনিকা-সদৃশ বন্দিত্বস্থানে শোকে বিহ্বল, প্রায় মূর্ছিত বৈদেহী সীতাকে দেখে করুণাময়ী রাক্ষসী সরমা তাঁর কাছে এসে সান্ত্বনা দেন। তিনি জানান, সীতা ও রাবণের কথোপকথন তিনি গোপনে শুনেছেন; তাই রাবণ উদ্বিগ্ন—কারণ রামকে ঘুমের মধ্যে ছল করে হত্যা করা যায় না, এবং তাঁর বধ অসম্ভব বলেই মনে হয়। সরমা আরও বলেন, বৃক্ষকে অস্ত্ররূপে ধারণকারী বানরযোদ্ধারা রামের রক্ষায় সুরক্ষিত; ইন্দ্ররক্ষিত দেবতাদের মতো তাদের বধ করা দুষ্কর। এরপর তিনি রামের মহিমা পুনঃপুন প্রকাশ করেন—ধর্মাত্মা, খ্যাতিমান, ধনুর্ধর, প্রশস্তবক্ষ, অজেয়; লক্ষ্মণও সহরক্ষক। সরমা সংবাদ দেন যে রাম সমুদ্র অতিক্রম করে দক্ষিণ তীরে সেনাসহ অবস্থান করছেন; গুপ্তচররা লঙ্কায় এই খবর পৌঁছে দিয়েছে; রাবণ মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শে রত। তারপর লঙ্কার যুদ্ধসজ্জার শব্দমালা শোনা যায়—ঢাক-ঢোল, ঘণ্টাধ্বনি, রথ-অশ্ব-গজের গর্জন, অস্ত্র-কবচের প্রস্তুতি—যা আসন্ন যুদ্ধের ইঙ্গিত। শেষে সরমা ধর্মোপদেশ দেন—সীতা যেন দিবাকর সূর্যের শরণ নেন, যিনি জীবসমূহের ভাগ্যনিয়ন্তা।

39 verses

Sarga 34

सरमायाḥ सीतासान्त्वनम् तथा रावणनिश्चयश्रवणम् (Saarana Consoles Sita and Reports Ravana’s Resolve)

এই সর্গে যুদ্ধকাণ্ডের মধ্যেও এক শান্ত, নীতিময় অন্তর্বর্তী পর্ব দেখা যায়। সময়জ্ঞানী, মৃদু হাস্যসহ ভাষিণী সরমা সীতাকে সান্ত্বনা দেন; সীতার শোক যেন বৃষ্টিতে শুষ্ক ভূমি সিক্ত হলে যেমন প্রশমিত হয় তেমনই কমে আসে। সীতা রাবণের মায়া, বারবারের ভয় দেখানো এবং অশোকবাটিকায় রাক্ষসীদের কঠোর নজরদারিতে উদ্বিগ্ন হয়ে সত্য যাচাই করা সংবাদ চান—রাবণের স্থির সিদ্ধান্ত কী, তা জানতে সরমাকে অনুরোধ করেন। সরমা রাবণের কাছে গিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে তার পরামর্শ শুনে দ্রুত ফিরে আসেন। সীতা তাকে আলিঙ্গন করে আসন দেন এবং রাবণের অভিপ্রায়ের সত্য কথা বলতে অনুরোধ করেন। সরমা জানান—রাবণের মাতা কৈকসী ও বৃদ্ধ মন্ত্রী অবিদ্ধ মৈথিলীকে সম্মানসহ মুক্তি দিতে বলেন। তারা রামের শক্তির প্রমাণও তুলে ধরেন—জনস্থান ধ্বংস, হনুমানের সমুদ্রলঙ্ঘন ও রাক্ষসনিধন। কিন্তু রাবণ কৃপণের মতো ‘ধন’ আঁকড়ে ধরে, যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুই তাকে বাধ্য না করলে সে মুক্তি দেবে না—এই দৃঢ় সংকল্প করে। শেষে ঢাক-শঙ্খধ্বনি ও বানরদের কোলাহলে পৃথিবী কেঁপে ওঠে; রাক্ষস অনুচররা বিষণ্ণ হয়, আর রাজার দোষে আসন্ন কৌশলগত পতনের অশুভ সংকেত প্রকাশ পায়।

28 verses

Sarga 35

माल्यवानुपदेशः — Malyavan’s Counsel, Portents in Laṅkā, and the Proposal of Alliance

সর্গ ৩৫-এ রামের সেনা শঙ্খ-দুন্দুভির মহাধ্বনিতে যুদ্ধাভিমুখে অগ্রসর হয়। সেই অশুভ গর্জন শুনে লঙ্কায় রাবণ সভায় এসে মন্ত্রীদের পরামর্শ চায় এবং তাদের খ্যাত বীরত্ব সত্ত্বেও নীরবতার জন্য কঠোর ভর্ত্সনা করে। তখন নানা অনিষ্ট-নিমিত্ত দেখা দেয়—অস্বাভাবিক মেলামেশা, গৃহ-যজ্ঞাদি আচারে বিশৃঙ্খলা, ভয়ংকর স্বপ্ন, পাখি-পশুর প্রতিকূল চিৎকার, এবং রক্তবৃষ্টি—যা লঙ্কার সর্বনাশের লক্ষণ। এই পরিস্থিতিতে প্রবীণ উপদেষ্টা মাল্যবান (রাবণের মাতামহ) সুসংবদ্ধ নীতিবচন বলেন। তিনি জানান, বিদ্যা ও ন্যায়ে প্রতিষ্ঠিত রাজাই রাজ্য রক্ষা করতে পারে; শক্তি ক্ষীণ হলে জ্ঞানী রাজা অবজ্ঞাপূর্ণ বিরোধ নয়, সন্ধি-বন্ধনই গ্রহণ করে। মাল্যবান সীতাকে ফিরিয়ে দিতে বলেন—কারণ তিনিই যুদ্ধের মূল কারণ—এবং ঘোষণা করেন যে দैবশক্তি রামের পক্ষে; সমুদ্র-সেতু নির্মাণের অলৌকিকতা দেখে তিনি রামকে মানবদেহে বিষ্ণুরূপ বলে চিহ্নিত করেন। শেষে রাবণের অনমনীয়তা দেখে মাল্যবান নীরব হয়ে যান; প্রত্যাখ্যাত সদুপদেশের করুণ পরিণতির ইঙ্গিত এতে স্পষ্ট হয়।

38 verses | Rāvaṇa, Mālyavān

Sarga 36

माल्यवानुपदेशः—रावणक्रोधः तथा लङ्काद्वाररक्षा-व्यवस्था (Malyavan’s Counsel, Ravana’s Anger, and the Fortification of Lanka)

এই সর্গে নীতি-ধর্মের এক সংক্ষিপ্ত নাট্যরূপ দৃশ্য দেখা যায়। কালের বশে পতিত রাবণ মাল্যবানের মঙ্গলময় উপদেশ সহ্য করতে পারে না। ভ্রূকুটি কুঞ্চিত করে ও চোখ ঘুরিয়ে সে ক্রোধ প্রকাশ করে এবং মন্ত্রীকে অভিযুক্ত করে যে তিনি শত্রুপক্ষের পক্ষপাত বা কারও প্ররোচনায় কঠোর কথা বলছেন। রাবণ নিজের অহংকারকে অটল বলে ঘোষণা করে—নত হওয়ার চেয়ে ভেঙে পড়াই শ্রেয়; জেদকে সে জন্মগত স্বভাব বলে অতিক্রম-অযোগ্য মনে করে। সেতুবন্ধকে সে কেবল দৈব-সংযোগ বলে তুচ্ছ করে এবং বলে, বানরদের সঙ্গে পার হলেও রাম জীবিত ফিরে আসবেন না। রাবণের ক্রোধ বুঝে মাল্যবান কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে শিষ্ট আশীর্বাদ জানিয়ে সরে যান। এরপর রাবণ মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করে লঙ্কার ‘অতুল’ দ্বাররক্ষা-ব্যবস্থা স্থাপন করে—পূর্বদ্বারে প্রহস্ত, দক্ষিণদ্বারে মহাপার্শ্ব ও মহোদর, পশ্চিমদ্বারে ইন্দ্রজিৎ (এবং মহামায়া), উত্তরদ্বারে শুক ও সারণ; আর নগরের মধ্যভাগে শক্তিশালী বিরূপাক্ষকে দৃঢ় সংরক্ষিত বাহিনী হিসেবে বসায়। এই প্রতিরক্ষা আদেশ দিয়ে ভাগ্যচালিত রাবণ নিজেকে কৃতকৃত্য মনে করে, মন্ত্রীদের বিদায় দিয়ে তাঁদের আশীর্বাদ গ্রহণ করে অন্তঃপুরে প্রবেশ করে।

22 verses

Sarga 37

लङ्काद्वारव्यूहवर्णनम् / Disposition at the Gates of Lanka

এই সর্গে লঙ্কা-অভিযানের ঠিক পূর্বমুহূর্তে নগরীর দ্বারসমূহে রাক্ষস-প্রতিরক্ষার বিন্যাস ও রামসেনার কৌশল নির্ধারণ বর্ণিত। সুগ্রীব, হনুমান, জাম্ববান, অঙ্গদ, নল প্রমুখ বানরনায়করা লঙ্কার নিকটে এসে পরামর্শ করেন। বিভীষণ মন্ত্রী-স্তরের গুপ্তচর-সংবাদ জানান—তাঁর দূতেরা পক্ষীরূপে লঙ্কায় প্রবেশ করে রাবণের দুর্গব্যবস্থা, দ্বাররক্ষা ও সৈন্যবিন্যাস পর্যবেক্ষণ করে সুসংবদ্ধ তথ্য নিয়ে ফিরে এসেছে। প্রতিরক্ষা স্থানভেদে বিভক্ত—পূর্বদ্বারে প্রহস্ত, দক্ষিণদ্বারে মহাপার্শ্ব ও মহোদর, পশ্চিমদ্বারে নানা অস্ত্রধারীসহ ইন্দ্রজিৎ, উত্তরদ্বারে স্বয়ং রাবণ (উদ্বিগ্ন ও ক্রুদ্ধ, তবু কঠোর প্রহরায়), এবং নগরমধ্যভাগে বিরূপাক্ষ। হাতি, রথ, অশ্ব ও বিপুল পদাতিকের উল্লেখ যুদ্ধের ব্যাপ্তি প্রকাশ করে। এরপর শ্রীराम দায়িত্ববণ্টন করেন—পূর্বে প্রহস্তকে প্রতিহত করতে নীল, দক্ষিণে দক্ষিণদ্বারের সেনাপতিদের মোকাবিলায় অঙ্গদ, পশ্চিমে ইন্দ্রজিতের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হনুমান, আর উত্তরদ্বার দিয়ে প্রবেশে লক্ষ্মণসহ স্বয়ং শ্রীराम অগ্রসর হন; মধ্যভাগে সুগ্রীব, জাম্ববান ও বিভীষণ অবস্থান করবেন। শেষে পরিচয়-নিয়ম ঘোষিত হয়—বানররা মানববেশ ধারণ করবে না; কেবল সাতজন (রাম, লক্ষ্মণ ও বিভীষণসহ নির্বাচিত কয়েকজন) মানবাকৃতিতে যুদ্ধ করবে। অতঃপর শ্রীराम সুবেল পর্বতে আরোহণ করে সেনাসহ লঙ্কার দিকে অগ্রসর হওয়ার সংকল্প করেন।

38 verses | Vibhīṣaṇa, Rāma

Sarga 38

सुवेलारोहणम् (The Ascent of Suvela and the First Full View of Laṅkā)

এই সর্গে শ্রীराम সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি সুবেল পর্বতে আরোহণ করবেন এবং সেখানে রাত্রিযাপন করে রাক্ষসদের দুর্গনগরী লঙ্কাকে পর্যবেক্ষণ করবেন। তিনি সুগ্রীবকে পরিকল্পনা জানান এবং বিভীষণকে ধর্মজ্ঞ, মন্ত্রজ্ঞ ও বিধিজ্ঞ বলে স্বীকার করে সঙ্গে রাখেন। সীতাহরণের প্রতিশোধ ও রাবণের অধর্ম-উলটানো নীতির দমন—এই অভিযানকে তিনি ধর্মসম্মত কর্তব্যরূপে স্থাপন করেন। “রাক্ষসাধম” নাম উচ্চারিত হলে যে ক্রোধ জাগে, তা ন্যায়সঙ্গত ক্রোধ; আর তিনি রাজনৈতিক-নৈতিক সতর্কবাণী দেন—একজনের দুষ্কর্ম সমগ্র বংশকে বিপদে ফেলতে পারে। এরপর সমন্বিতভাবে আরোহণ শুরু হয়—ধনুর্বাণধারী লক্ষ্মণ অনুসরণ করেন; সুগ্রীব মন্ত্রীদের সঙ্গে এবং বিভীষণ সহযাত্রী হন। হনুমান, অঙ্গদ, নীল, মৈন্দ, দ্বিবিদ, জাম্ববান, সুষেণ, ঋষভ প্রমুখ বানর-নায়কেরা শত শত সৈন্য নিয়ে বায়ুবেগে পর্বতে ওঠে। সুবেলশিখর থেকে তারা লঙ্কাকে আকাশে ঝুলে থাকা মতো দেখে—দীপ্ত দ্বার, প্রাচীর ও কালো রাক্ষসসারিতে ঘেরা, যেন দ্বিতীয় এক জীবন্ত প্রাচীর। যুদ্ধোৎসুক বানরসেনা রামের সামনে নানা ধ্বনি তোলে; সূর্যাস্তের পর চন্দ্রালোকে রাত্রিতে রাম সুবেলের শৈলে বিশ্রাম নেন, বিভীষণের বিধিপূর্বক সম্মানে, লক্ষ্মণ ও সকল ইউথপতির সঙ্গে—যুদ্ধের পূর্বে পর্যবেক্ষণ, মৈত্রী ও ধর্মসংকল্পে স্থিত এক শান্ত মুহূর্তে সর্গের সমাপ্তি হয়।

19 verses | Rama

Sarga 39

लङ्कादर्शनम् (Viewing Laṅkā and its Forest-Gardens)

সুবেল পর্বতে রাত্রিজাগরণ করে থাকা বানর-প্রধানেরা লঙ্কার বন ও উদ্যানসমূহ দর্শন করল। সেখানে কোকিল, সারস, ময়ূর ও ভ্রমরের কলধ্বনিতে উপবনগুলি মুখর; পুষ্পগন্ধবাহী সমীরণে সে সব কুঞ্জ আরও মনোহর হয়ে উঠেছিল। রূপপরিবর্তনে সক্ষম কতক বানর আনন্দে সেই বনে প্রবেশ করল; আর অন্য সেনানায়কেরা সুগ্রীবের অনুমতি পেয়ে পতাকা-ধ্বজশোভিত নগরীর দিকে দ্রুত ধাবিত হল—গর্জনে পাখি ও বৃহৎ পশুদের ভীত করে, ধূলিরাশি উড়িয়ে। তারপর দৃষ্টি ওঠে ত্রিকূট শিখরে—পুষ্পাচ্ছন্ন, দীপ্তিমান ও প্রায় অগম্য—যার উপর লঙ্কা প্রতিষ্ঠিত; নগরীর বিস্তার ও দৈর্ঘ্যের কথাও নির্দেশিত হয়। আকাশরেখায় উচ্চ গোপুর, স্বর্ণ-রৌপ্য প্রাকার এবং মেঘপুঞ্জসদৃশ প্রাসাদসমূহ দৃশ্যমান; মধ্যস্থ এক ভবনকে বৈষ্ণবধামের ন্যায় বলা হয়েছে। সহস্রস্তম্ভবিশিষ্ট এক প্রাসাদ, শত রাক্ষস দ্বারা রক্ষিত, লঙ্কার বিশেষ অলংকাররূপে উল্লেখিত। শেষে শ্রীराम লক্ষ্মণ ও বানরসেনাসহ রত্নভূষিত, সমৃদ্ধ ও কৌশলনির্মিত দ্বারযুক্ত সেই মহানগরী দেখে বিস্মিত হন। এই লঙ্কাদর্শনের পর কাহিনি অবরোধ ও সংঘর্ষের প্রস্তুতির দিকে অগ্রসর হয়।

29 verses | Rama (observational presence), Sugriva (as authorizing figure, referenced)

Sarga 40

सुवेलारोहणं रावण-सुग्रीव-नियुद्धम् (Ascent of Suvela and the Ravana–Sugriva Duel)

এই সর্গে শ্রীराम সুগ্রীব ও বানরসেনার সঙ্গে সুবেলা পর্বতে আরোহণ করে ত্রিকূটশিখরে অবস্থিত লঙ্কা পর্যবেক্ষণ করেন—যা বিশ্বকর্মার নির্মিত বলে খ্যাত। সেখানে তিনি রাবণকে এক উচ্চ গোপুরের উপর দাঁড়িয়ে দেখতে পান—শ্বেত চামর দ্বারা সেবিত, বিজয়ছত্রে শোভিত, রক্তচন্দনে লিপ্ত, অলংকারে ভূষিত এবং ঐরাবত-সম্পর্কিত ক্ষতচিহ্নযুক্ত; রাজচিহ্নে সমৃদ্ধ এই রাক্ষসরাজ একই সঙ্গে ভয়ংকর লক্ষ্যরূপে প্রতিভাত হয়। রাবণকে দেখে সুগ্রীব সংযত ক্রোধে উঠে ঘোষণা করেন যে তিনি ‘লোকনাথ’ শ্রীरामের অনুগত সেবক। তিনি সরাসরি আক্রমণ করে রাবণের মুকুট ধরে মাটিতে ফেলে দেন—এটি রাজমর্যাদার অপমান ও পরাভবের প্রতীক হয়ে ওঠে। এরপর ঘনিষ্ঠ মল্লযুদ্ধ শুরু হয়—পাছাড়, প্রতিপাছাড়, জড়িয়ে ধরা, বৃত্তাকারে পদচালনা, ছলপ্রহার ও নানা ‘যুদ্ধমার্গ’-এর বর্ণনা আসে, ফলে বীররস তীব্র হয়। রাবণ প্রাণঘাতী প্রতিশোধের হুমকি দেয় এবং মায়া দ্বারা সুবিধা নিতে চায়; কিন্তু সুগ্রীব তার কৌশল বুঝে তাকে ক্লান্ত করে বিচ্ছিন্ন হন এবং বানরদের মধ্য দিয়ে শ্রীरामের কাছে ফিরে আসেন। এতে শ্রীरामের যুদ্ধোৎসাহ ও সেনার মনোবল বৃদ্ধি পায়; সুবেলা-লঙ্কার ভূগোল, সেবাধর্ম ও পতিত মুকুটের রাজচিহ্ন—সবই ক্ষমতার সংঘর্ষের মানচিত্ররূপে যুক্ত হয়।

30 verses | Sugriva, Ravana

Sarga 41

युद्धलक्षण-निमित्तदर्शनं तथा लङ्काद्वारव्यूहः (War Omens and the Encirclement of Lanka’s Gates)

এই সর্গে যুদ্ধের অশুভ লক্ষণ দেখে শ্রীराम সুগ্রীবকে আলিঙ্গন করেন এবং লক্ষ্মণকে নির্দেশ দেন—শীতল জল, ফলবতী অরণ্য ও সম্পদসমৃদ্ধ স্থান অধিকার করে সেনাকে ভাগ করে সুশৃঙ্খল ব্যূহে স্থাপন করতে। এরপর প্রলয়সম নিদর্শনের তালিকা আসে—প্রচণ্ড ঝড়, ভূমি ও পর্বতের কম্পন, রক্তমিশ্রিত বৃষ্টি, অশুভ পশুপক্ষীর ডাক, গ্রহ-নক্ষত্রের মলিনতা—যাতে যুদ্ধ কেবল রাজনীতি নয়, ধর্ম-অধর্মের মহাজাগতিক সংকট বলে প্রতিভাত হয়। বানরসেনা দ্রুত অগ্রসর হয়ে লঙ্কার নিকটে আসে; নগরীর সৌন্দর্য ও দুর্ভেদ্য দুর্গরচনা বর্ণিত হয়ে তার প্রায় অজেয়তা প্রকাশ পায়। শ্রীराम উত্তরদ্বার অবরুদ্ধ করেন; পূর্বে নীল, দক্ষিণে অঙ্গদ, পশ্চিমে হনুমান, মধ্যভাগে সুগ্রীব অবস্থান নেন; লক্ষ্মণ বিভীষণের সঙ্গে বিপুল সৈন্য মোতায়েন করেন। তারপর কৌশলরূপে দূতকার্য—শ্রীराम অঙ্গদকে দূত করে দশগ্রীব রাবণের কাছে কঠোর ধর্মসম্মত বার্তা পাঠান: বৈদেহীকে ফিরিয়ে দাও, নচেৎ ধর্মানুসারে বিনাশ হবে এবং বিভীষণ ন্যায়সঙ্গত রাজ্য লাভ করবে। অঙ্গদ বার্তা প্রদান করে শক্তি-পরীক্ষার জন্য ধৃত হন, পায়ের আঘাতে প্রাসাদের একাংশ ভেঙে ফিরে আসেন; এতে রাবণের ক্রোধ জ্বলে ওঠে এবং অবরোধের অপ্রত্যাবর্তনীয় গতি নিশ্চিত হয়।

100 verses | Rama, Sugriva, Angada, Ravana

Sarga 42

लङ्काप्राकारारोहणम् / Assault on Lanka’s Ramparts and the Opening Clash

এই সর্গে অবরোধের অবস্থা থেকে প্রকাশ্য যুদ্ধের দিকে রূপান্তর দেখানো হয়েছে। রাক্ষস গুপ্তচররা রাবণকে জানায় যে রাম ও বানরসেনা লঙ্কার উপকণ্ঠ ও প্রবেশপথগুলি কার্যত দখল করে নিয়েছে; এতে রাবণ ক্রুদ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ সৈন্যসমাবেশ ও যুদ্ধসজ্জার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে সীতার দুঃখ স্মরণে ব্যাকুল শ্রীराम শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান আদেশ করেন; বানররা সিংহনাদ করে গাছ, শিলা ও পর্বতশিখরকে অস্ত্ররূপে তুলে নিয়ে অগ্রসর হয়। তারা প্রাচীর ও দ্বার বেয়ে ওঠে, জলভরা পরিখা মাটি-কাঠ-আবর্জনা দিয়ে ভরাট করে, এবং কৈলাসসদৃশ উঁচু গোপুর ও স্বর্ণতোরণ ভেঙে নগরদ্বারের দিকে ধেয়ে যায়। এরপর নগরদ্বারগুলিতে শিবিরবিন্যাস হয়—পূর্বে কুমুদ, দক্ষিণে শতবলী, পশ্চিমে সুসেন, উত্তরে রাম লক্ষ্মণ ও সুগ্রীবসহ; গবাক্ষ, ধূম্র এবং বিভীষণ মন্ত্রীদের সঙ্গে সহায়তা ও রক্ষার জন্য স্থাপিত হন। রাবণ সর্বসাধারণ রাক্ষসদের বেরিয়ে এসে যুদ্ধ করতে আদেশ দেয়; ঢাক-ভেরি ও শঙ্খধ্বনি উঠতে থাকে, যার প্রতিধ্বনি পর্বত, পৃথিবী, আকাশ ও সমুদ্র পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। শেষে ভয়ংকর মল্লযুদ্ধ শুরু হয়—রাক্ষসরা গদা, শক্তি, ত্রিশূল, খড়্গ ও ভিন্দিপাল দিয়ে আঘাত করে, বানররা বৃক্ষ-শিলা, নখ ও দাঁত দিয়ে প্রতিঘাত করে; রণভূমি রক্ত-মাংসের কাদায় ভরে বিস্ময়কর ব্যাপ্তির দৃশ্য হয়ে ওঠে।

47 verses | Ravana, Rama

Sarga 43

द्वन्द्वयुद्धप्रवृत्तिः (Dvandva-Yuddha: The Onset of Single Combats)

এই সর্গে লঙ্কার রণক্ষেত্রে বানর ও রাক্ষসদের মধ্যে ভয়ঙ্কর দ্বন্দ্বযুদ্ধের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। রাবণের বাহিনী প্রচণ্ড গর্জন ও যুদ্ধসজ্জা নিয়ে বানরদের আক্রমণ করে। সুগ্রীব প্রঘসের সাথে এবং লক্ষ্মণ বিরূপাক্ষের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। শ্রীরামচন্দ্র অগ্নিক, রশ্মিকেতু, সুপ্তঘ্ন এবং যজ্ঞকোপ নামক চার রাক্ষসকে তীক্ষ্ণ বাণের দ্বারা শিরশ্ছেদ করেন। হনুমান জম্বুমালীর শক্তিশেলের আঘাতে আহত হয়েও তার রথে আরোহণ করে চপেটাঘাতে তাকে বধ করেন। অন্যান্য যুদ্ধে, নল প্রতপনের চোখ উপড়ে ফেলেন, মৈন্দ বজ্রমুষ্টিকে মুষ্টির আঘাতে ধরাশায়ী করেন এবং দ্বিবিদ অশন প্রভকে শাল গাছের আঘাতে হত্যা করেন। নীল নিকুম্ভের বাণবৃষ্টি সহ্য করে রথের চাকা দিয়ে তাকে সারথিসহ বধ করেন। সুষেণ গদার আঘাত সহ্য করে বিদ্যুন্মালীকে বিশাল শিলাখণ্ড দিয়ে চূর্ণ করেন। যুদ্ধের শেষে রণক্ষেত্র ভাঙা অস্ত্র, মৃতদেহ ও রক্তের স্রোতে পূর্ণ হয়ে দেবাসুর যুদ্ধের মতো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

45 verses

Sarga 44

चतुश्चत्वारिंशः सर्गः (Sarga 44): निशायुद्धम्, धूलिरुधिरप्रवाहः, इन्द्रजितो मायायुद्धम्

বানর ও রাক্ষসদের ঘোর সংঘর্ষে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণঘাতী রাত্রিযুদ্ধ শুরু হয়, আর অন্ধকারে যুদ্ধ হয়ে ওঠে বিভ্রান্তিময় ও বিশৃঙ্খল। ঘোড়া ও রথচক্রের ধুলো দৃষ্টি‑শ্রবণ আচ্ছন্ন করে; রণক্ষেত্র রক্ত‑কাদার মতো দেখায়। ঢাক‑ঢোল, শঙ্খ, বাঁশি, গর্জন এবং ত্রিকূটের গুহায় প্রতিধ্বনিত শব্দ মিলিয়ে ভয়ংকর শব্দজগৎ সৃষ্টি হয়। অন্ধকারে পরিচয় ভুলে অনেকে বন্ধু‑শত্রু ভেদ না করে নিজেদের লোককেও আঘাত করে বসে। রামের দীপ্ত বাণ দিকগুলো আলোকিত করে তাঁর দিকে ধেয়ে আসা রাক্ষসদের সংহার করে; কয়েকজন নামকরা রাক্ষস বাণবিদ্ধ হয়ে প্রাণশেষ নিয়ে পিছিয়ে যায়। এদিকে অঙ্গদ দৃঢ় আঘাতে ইন্দ্রজিতের রথের ঘোড়া ও সারথিকে বধ করে রথকে অচল করে দেন; এতে দেবতারা ও বানরসেনা প্রশংসা করে। ক্রুদ্ধ ইন্দ্রজিত এরপর গোপন যুদ্ধের আশ্রয় নেয়—অদৃশ্য হয়ে সাপের মতো বাণ নিক্ষেপ করে, রাম‑লক্ষ্মণকে আহত করে এবং শেষে বাণের জালে দুই ভ্রাতাকে বেঁধে ফেলে। এভাবে প্রকাশ্য যুদ্ধ থেকে মায়া‑নির্ভর, মনোবল ভাঙার কৌশলে যুদ্ধ আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

39 verses | Rāma, Lakṣmaṇa

Sarga 45

इन्द्रजितः अन्तर्धानयुद्धं — Indrajit’s Concealed Assault and the Fall of Rama and Lakshmana

এই সর্গে ইন্দ্রজিত অন্তর্ধান (অদৃশ্য) কৌশল ও ঘন শরবর্ষণে যুদ্ধের গতি উল্টে দেয়। রাম ইন্দ্রজিতের অবস্থান জানতে দশজন বানরনায়ককে নানা দিকে অনুসন্ধানে পাঠান। বানররা আকাশে লাফিয়ে উপড়ে নেওয়া বৃক্ষকে অস্ত্র করে এগোয়, কিন্তু ইন্দ্রজিতের দ্রুত ও নিপুণভাবে নিক্ষিপ্ত বাণ তাদের থামিয়ে দেয়; অন্ধকার ও গোপনতার কারণে আক্রমণকারীকে দেখা যায় না—মেঘে ঢাকা সূর্যের মতো। অদৃশ্য অবস্থায় ইন্দ্রজিত রাম-লক্ষ্মণকে সম্বোধন করে বলে, যুদ্ধে তাকে ইন্দ্রও চিনতে পারে না, এবং সে দুই ভাইকে যমলোক পাঠাবে। তারপর নানা প্রকার অগ্রযুক্ত বাণ ও সাপসদৃশ নাগপাশের অবিরাম বর্ষণে সে মর্মস্থানে বাণ গেঁথে তাদের বেঁধে ক্লান্ত করে তোলে; এত দ্রুত তারা আচ্ছন্ন হয় যে প্রতিআক্রমণ করতে পারে না। প্রথমে রাম পতিত হন; রামকে পড়ে যেতে দেখে লক্ষ্মণ শোকে ভেঙে পড়েন। বানরসেনা চারদিকে জড়ো হয়ে পতিত রাজপুত্রদ্বয়ের জন্য বিলাপ করে। গ্রন্থে দেহজুড়ে ক্ষতের সম্পূর্ণতা বিশেষভাবে বলা হয়েছে—আঙুল-পরিমাণ স্থানও অবিদ্ধ থাকে না—এবং ছলযুদ্ধের নৈতিক ভার ও মানবদেহের ভঙ্গুরতার ওপর করুণ ধ্যান ফুটে ওঠে।

28 verses | Indrajit (Ravaṇi), Rama, Lakshmana

Sarga 46

शरबन्धनम् (The Binding by Arrows) / Indrajit’s Illusory Assault and the Vanaras’ Consolation

এই সর্গে লঙ্কাযুদ্ধে এক গভীর বিপর্যয় দেখা দেয়। বানরনেতারা আকাশ ও ভূমি তন্নতন্ন করে খুঁজে রাম ও লক্ষ্মণকে শরবন্ধে (বাণজালে) আবদ্ধ, নিস্তেজ ও নিশ্চল অবস্থায় পতিত দেখতে পান। এই দৃশ্য দেখে সমগ্র বানরসেনায় শোকের ঢেউ ওঠে এবং যুদ্ধকৌশলে মুহূর্তে স্তব্ধতা নেমে আসে। মায়ায় আচ্ছন্ন ইন্দ্রজিতকে সাধারণ কেউ দেখতে পায় না; বরপ্রসাদে বিভীষণই তাকে চিনতে পারেন। ইন্দ্রজিত গর্বভরে ঘোষণা করে—খর-দূষণবধকারী দুই ভ্রাতা বাণবিদ্ধ হয়ে এমন অবস্থায় পড়েছে যে দেব-ঋষিদের সমাবেশও নাকি তাদের মুক্ত করতে পারবে না। সে আতঙ্ক বাড়াতে নীল, মৈন্দ, দ্বিবিদ, জাম্ববান, হনুমান, গবাক্ষ, শরভ ও অঙ্গদ প্রমুখ প্রধান বানরদেরও আহত করে এবং রাক্ষসদের ডেকে আবদ্ধ রাজপুত্রদ্বয়কে দেখায়; রাম নিহত—এই ভ্রান্ত বিশ্বাসে লঙ্কায় উচ্চ জয়ধ্বনি ওঠে। ইন্দ্রজিত লঙ্কায় ফিরে গেলে সুগ্রীব ভয়ে আচ্ছন্ন হন। তখন বিভীষণ পবিত্র জলে শান্তিসদৃশ ক্রিয়া করে সকলকে স্থির করেন এবং বলেন—রামের মৃত্যু বিধিলিখিত নয়, তাই হতাশা ত্যাগ করে সেনার মনোবল রক্ষা করো। শেষে ইন্দ্রজিত রাবণের কাছে ‘বিজয়’-সংবাদ জানায়; রাবণ তাকে আলিঙ্গন করে শরজালে রাজপুত্রদ্বয়ের তেজহানির বিবরণ শোনে।

50 verses

Sarga 47

पुष्पकविमानेन सीताया युद्धभूमिदर्शनम् (Sita Shown the Battlefield in the Pushpaka)

এই সর্গে ইন্দ্রজিত কার্যসিদ্ধি হয়েছে মনে করে লঙ্কায় প্রত্যাবর্তন করে। তার আপাত সাফল্যে বানরনেতারা রাঘবকে ঘিরে সতর্ক প্রহরাবলয় গড়ে তোলে; সামান্য নড়াচড়াকেও রাক্ষস-অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় তারা লক্ষ্য করে। রাবণ উল্লসিত হয়ে ত্রিজটা-সহ রাক্ষসী পরিচারিকাদের আদেশ দেয়—অশোকবনিকা থেকে সীতাকে পুষ্পক বিমানে এনে যুদ্ধভূমি দেখাতে, যেন রাম-লক্ষ্মণ নিহত—এমন দৃশ্য দেখিয়ে তার দৃঢ়তা ভেঙে দেওয়া যায়। লঙ্কা সাজানো হয় এবং ঘোষণা করা হয় যে দুই ভ্রাতা যুদ্ধে নিহত। ত্রিজটার সঙ্গে সীতা পতিত বানরসেনা ও রাক্ষসদের বিজয়োৎসবমুখর আচরণ দেখে। পরে শরশয্যায় অচেতন রাম-লক্ষ্মণকে, ভগ্ন বর্ম ও ধনুকসহ দেখে তিনি তাদের মৃত মনে করে গভীর শোকে লুটিয়ে পড়েন ও বিলাপ করেন। অধ্যায়টি প্রতারণাময় বিজয়োল্লাসের বিপরীতে সীতার অটল ভক্তি-নিষ্ঠা এবং বন্দিনীর আশাকে ভাঙার নৈতিক মূল্যকে তুলে ধরে।

24 verses | Rāvaṇa, Rākṣasīs (Sītā’s attendants), Sītā

Sarga 48

सीताविलापः—त्रिजटासान्त्वनं च (Sita’s Lament and Trijata’s Consolation)

এই সর্গে ইন্দ্রজিত্‌ মায়াবলে রাম-লক্ষ্মণকে পতিত দেখিয়ে সীতাকে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করায়। তা দেখে সীতা অচেতনপ্রায় হয়ে বিলাপ করেন এবং নিজেকে বিচার করতে করতে বিধবা-দুঃখে নিমগ্ন হন। তিনি বলেন—ব্রাহ্মণ, জ্যোতিষী ও যজ্ঞ-আচার্যরা যে সৌভাগ্য, মাতৃত্ব এবং স্বামীর সঙ্গে রাজ্যাভিষেকের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা মিথ্যা প্রমাণিত হল। এরপর তিনি স্ত্রী-লক্ষণসমূহের এক বিশেষ তালিকা দেন—পদ্মচিহ্নিত পদযুগল, মণির ন্যায় বর্ণচ্ছটা, সমানুপাত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ইত্যাদি—এবং যুক্তি করেন যে এমন শুভলক্ষণ বিপর্যয়ের সঙ্গে কীভাবে মিলতে পারে; নিমিত্তশাস্ত্র ও জীবিত যন্ত্রণার সংঘাত এখানে স্পষ্ট হয়। তার শোক পরে নিজের থেকে সরে কৌশল্যার প্রতি উদ্বেগে রূপ নেয়—যিনি তপস্বিনীর মতো জীবনযাপন করে পুত্রদর্শনের আশায় আছেন; তাঁর সম্ভাব্য দুঃখ স্মরণে সীতার নৈতিক বেদনা আরও গভীর হয়। তখন সীতার প্রতি সহানুভূতিশীল রাক্ষসী ত্রিজটা তাঁকে সান্ত্বনা দেন—রাম-লক্ষ্মণের মুখমণ্ডল ও দেহশোভায় মৃত্যুলক্ষণ নেই, সেনাবাহিনীর আচরণও নেতার পতনের পর যেমন ভেঙে পড়ে তেমন নয়, আর শুভ পুষ্পকবিমানও যদি তাঁরা সত্যিই মৃত হতেন তবে সীতাকে বহন করত না। ত্রিজটা সত্যের আশ্বাস দিয়ে মোহ ও শোক ত্যাগ করতে বলেন। শেষে সীতা পুষ্পকে লঙ্কায় ফিরে অশোকবনে প্রবেশ করেন; কিন্তু সেখানে আবার ‘রাজপুত্র’ রাম-লক্ষ্মণের স্মরণে সান্ত্বনার মধ্যেও তাঁর গভীর শোক পুনরুজ্জীবিত হয়।

37 verses | Sita, Trijata

Sarga 49

शरबन्धनविलापः (The Lament under the Net of Arrows)

এই সর্গে ভয়ংকর অস্ত্রাঘাতের পরিণতি বর্ণিত। রণক্ষেত্রে শ্রীराम ও লক্ষ্মণ ‘শরবন্ধ’—বাণের জাল—দ্বারা আবদ্ধ, রক্তক্ষরণে ক্লান্ত, সাপের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে পড়ে আছেন। সুগ্রীব ও বানরসেনা তাঁদের ঘিরে শোকে কাঁদতে থাকে। ধৈর্য ও সংযমের শক্তিতে শ্রীराम পুনরায় চেতনা লাভ করে লক্ষ্মণের করুণ অবস্থা দেখে দীর্ঘ বিলাপ শুরু করেন। তিনি বলেন—ভ্রাতৃহীন জীবনের মূল্য কী, লক্ষ্মণ না থাকলে সীতার উদ্ধারও তাঁর কাছে অর্থহীন। কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রাকে এই সংবাদ কীভাবে জানাবেন—এই চিন্তায় তিনি ব্যাকুল হন। নিজেকে অধম ও পাপী বলে নিন্দা করে লক্ষ্মণের অটল কোমলতা, উসকানি পেলেও কঠোর না হওয়া স্বভাবের প্রশংসা করেন এবং তাঁর বীরত্বকে কার্তবীর্য ও ইন্দ্রের অস্ত্রশক্তির সঙ্গে অতিশয় তুলনা করে স্মরণ করেন। তারপর শ্রীराम সুগ্রীবকে নির্দেশ দেন—সেনাসহ সমুদ্র পার হয়ে প্রত্যাবর্তন কর; অঙ্গদ, নীল ও নলকে অগ্রভাগে রাখ। এই বিপর্যয় দैবজনিত, মানুষ তা অতিক্রম করতে পারে না; মিত্রদের কর্তব্য সম্পন্ন হয়েছে—এ কথা তিনি জানান। এ শুনে বানররা আরও বিলাপ করে। তখন গদাধারী বিভীষণ উপস্থিত হলে যুদ্ধের বিভ্রান্তিতে বানররা ক্ষণিক তাঁকে ইন্দ্রজিত মনে করে আতঙ্কিত হয়—যুদ্ধকালীন বিভ্রম ও মনোবলের ভঙ্গুরতা প্রকাশ পায়।

32 verses

Sarga 50

सुपर्णागमनम् (Garuda’s Arrival and the Release from the Serpent-Arrow Bond)

এই পঞ্চাশতম সর্গে যুদ্ধক্ষেত্রের এক মহাসঙ্কট এবং তার নিরসন উপদেশ, ঔষধ-বিদ্যা ও দিব্য হস্তক্ষেপে প্রকাশিত। সুগ্রীব ভীত সন্ত্রস্ত বানরদের দেখে ভয়ের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। অঙ্গদ জানায়—ইন্দ্রজিত মায়াবলে সর্পরূপ বাণ সৃষ্টি করে রাম-লক্ষ্মণকে বেঁধে ‘শরশয্যা’য় পতিত করেছে। তখন বিভীষণ এসে প্রথমে সন্দেহের পাত্র হন; পরে দুই রাজপুত্রকে বিদ্ধ দেখে শোকে ভেঙে পড়ে রাবণপক্ষের কপট কৌশল নিন্দা করেন এবং নিজের অসহায়তা প্রকাশ করেন। সুগ্রীব তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে রাবণের পরাজয় নিশ্চিত বলে জানান এবং সুসেনের পরামর্শ চান। সুসেন দেবাসুর-যুদ্ধের চিকিৎসা-স্মৃতি থেকে বলেন—ক্ষীরোদ-প্রদেশের চন্দ্র ও দ্রোণ পর্বত থেকে সঞ্জীবকরণী ও বিশল্যকরণী প্রভৃতি দুর্লভ ঔষধ আনতে হবে; এ কাজে হনুমানই যোগ্য। কিন্তু পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার আগেই আকাশে প্রবল আলোড়ন ও দ্বীপের বৃক্ষপতন গরুড়াগমনের লক্ষণ হয়। সর্পগুলি পালায়; গরুড় রাম-লক্ষ্মণকে স্পর্শ করে বাণক্ষত দূর করেন এবং মুহূর্তে তাঁদের তেজ, বল, স্মৃতি ও ধৈর্য ফিরিয়ে দেন। তিনি নিজেকে রামের বন্ধু বলে পরিচয় দেন, যুদ্ধে রাক্ষসদের বিশ্বাস না করতে সতর্ক করেন, বিজয় ও সীতালাভের শুভ ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং প্রদক্ষিণ করে প্রস্থান করেন। এরপর বানরসেনা সিংহনাদ, ভেরী-শঙ্খধ্বনিতে উল্লসিত হয়ে পুনরায় লঙ্কাদ্বারের দিকে অগ্রসর হয়।

66 verses

Sarga 51

धूम्राक्षप्रेषणम् (The Dispatch of Dhūmrākṣa)

এই ৫১তম সর্গে লঙ্কার নেতৃত্বে কৌশলগত ও মানসিক এক মোড় দেখা যায়। বানরদের উল্লাসময় গর্জন শুনে রাবণ অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের আভাস পায় এবং গুপ্তচর পাঠাতে আদেশ দেয়। আতঙ্কিত রাক্ষসরা প্রাচীরে উঠে সুগ্রীবের সুরক্ষিত বাহিনী দেখে এবং নিশ্চিত সংবাদ আনে—ইন্দ্রজিতের ভয়ংকর শরবন্ধনে আবদ্ধ রাম ও লক্ষ্মণ এখন মুক্ত, যেন হাতি দড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। ভয় সংযত করে দূতেরা সংক্ষিপ্ত ও নিয়ন্ত্রিত ভাষায় সব জানায়। এতে রাবণের মনে উদ্বেগ ও ক্রোধ বাড়ে; নিজের সেনার নিরাপত্তা এবং অস্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ জাগে। তখন সে ধূম্রাক্ষকে ডেকে অবিলম্বে বেরিয়ে রাম ও বানরদের আঘাত করতে নির্দেশ দেয়। বিভিন্ন অস্ত্র, রথ, অশ্ব ও গজসহ সেনা সমবেত হয়। ধূম্রাক্ষ স্বর্ণালঙ্কৃত, গাধা-যোজিত রথে চড়ে পশ্চিম দ্বারের দিকে অগ্রসর হয়, যেখানে হনুমান অবস্থান করছেন। পথে শকুন, রক্তলক্ষণ, প্রতিকূল বায়ু, অন্ধকার ও ভূকম্পের মতো অমঙ্গলসূচক নিদর্শন সর্বনাশের ইঙ্গিত দেয়; তবু সে এগিয়ে গিয়ে রাঘব-রক্ষিত বিশাল বানরবাহিনী প্রত্যক্ষ করে।

36 verses

Sarga 52

धूम्राक्षवधः (The Slaying of Dhumrākṣa)

এই ৫২তম সর্গে রাক্ষস-সেনাপতি ধূম্রাক্ষ পুনরায় রণক্ষেত্রে ফিরে এসে বানরদের যুদ্ধনাদ উসকে দেয় এবং ভয়ংকর সংঘর্ষ শুরু হয়। রাক্ষসরা তীর, শূল, গদা, লৌহদণ্ড প্রভৃতি অস্ত্রে আঘাত হানে; বানররা গাছ, শিলা, পর্বতখণ্ড এবং হাত-পা, দাঁত-নখ দিয়ে প্রতিরোধ করে। ধনুকের টংকার, ঘোড়ার হ্রেষা ও হাতির গর্জনকে কবি ‘রণ-গান্ধর্ব’—যেন যুদ্ধের সঙ্গীত—রূপে নান্দনিকভাবে বর্ণনা করেন। ধূম্রাক্ষ তীরবৃষ্টিতে বানরসেনাকে ছত্রভঙ্গ করে কিছুক্ষণ প্রাধান্য লাভ করে। তখন পীড়িত মিত্রসেনাকে দেখে হনুমান দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসেন; তিনি এক বিশাল শিলা ধূম্রাক্ষের রথে নিক্ষেপ করলে রথ চূর্ণ হয় এবং ধূম্রাক্ষকে লাফ দিয়ে নামতে হয়। এরপর দ্বন্দ্ব তীব্র হয়—ধূম্রাক্ষ কণ্টকযুক্ত গদা দিয়ে হনুমানকে আঘাত করে, কিন্তু হনুমান অবিচল থেকে এক পর্বতশিখর তার মস্তকে নিক্ষেপ করে ধূম্রাক্ষকে বধ করেন। অবশিষ্ট রাক্ষসরা ভয়ে লঙ্কায় পালায়, আর বানররা হনুমানের বীরত্বকে বন্দনা করে; এতে যুদ্ধের বৃহৎ প্রবাহে বানরসেনার মনোবল ও নেতৃত্ব আরও দৃঢ় হয়।

38 verses

Sarga 53

युद्धकाण्डे त्रिपञ्चाशः सर्गः — धूम्राक्षवधश्रवणं, वज्रदंष्ट्रप्रेषणं, अङ्गद-राक्षसयुद्धम् (Ravana Dispatches Vajradamshtra; Portents and Angada’s Assault)

ধূম্রাক্ষের বধের সংবাদ শুনে রাবণ ক্রোধে দগ্ধ হয়ে ওঠে। সে সাপের মতো ফোঁসফোঁস করে, দীর্ঘ উষ্ণ নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে বজ্রদংষ্ট্র নামক রাক্ষস-যোদ্ধাকে ডেকে কঠোর আদেশ দেয়—রাম, সুগ্রীব এবং সমগ্র বানরসেনাকে বধ করো। এরপর যুদ্ধ-প্রস্তুতির বর্ণনা আসে। রাক্ষসনায়কেরা অলংকার-ভূষিত বস্ত্র পরে, হাতি ও অন্যান্য বাহনে আরূঢ় হয়ে সম্পূর্ণ সজ্জিত বাহিনীসহ দক্ষিণদ্বার দিয়ে বেরিয়ে পড়ে—সেখানে অঙ্গদ প্রহরায় আছে। যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে অশুভ লক্ষণ দেখা দেয়—উল্কাপাত, শেয়ালের ডাক, হিংস্র পশুর অস্থিরতা—যা রাক্ষসদের আসন্ন বিনাশের ইঙ্গিত; তবু বজ্রদংষ্ট্র সাহস সঞ্চয় করে রণে প্রবেশ করে। বানরেরা দশ দিক মুখরিত করে বিজয়ধ্বনি তোলে, আর যুদ্ধ ঘনিষ্ঠ সংঘর্ষে পরিণত হয়—গাছ, শিলা, মুষ্টি ও হাঁটু অস্ত্র হয়ে ওঠে। বজ্রদংষ্ট্রের তীরবৃষ্টিতে বানরদল ভীত-সন্ত্রস্ত হয়; তখন ক্রুদ্ধ অঙ্গদ একটি বৃক্ষ তুলে রাক্ষস-ব্যূহ চূর্ণ করে দেয়। রণক্ষেত্র মৃতদেহ, ছিটকে পড়া অলংকার ও অস্ত্রে আচ্ছন্ন হয়, আর রাক্ষসসেনা বাতাসে তাড়িত মেঘপুঞ্জের মতো টলমল করতে থাকে।

33 verses

Sarga 54

वज्रदंष्ट्रवधः — The Slaying of Vajradaṃṣṭra (Angada’s Duel)

এই সর্গে অঙ্গদ কর্তৃক বজ্রদংষ্ট্রের বধ এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণিত হয়েছে। বানর সেনাদের আক্রমণে ক্রুদ্ধ হয়ে রাক্ষস বজ্রদংষ্ট্র বাণবর্ষণ শুরু করেন, যার ফলে রণক্ষেত্র ছিন্নভিন্ন দেহ ও রক্তে পূর্ণ হয়ে যায়। এই দৃশ্য দেখে ভীত বানররা অঙ্গদের শরণাপন্ন হলে, বালিপুত্র অঙ্গদ অসীম সাহসের সাথে রাক্ষস সেনাপতির মোকাবিলা করেন। উভয়ের মধ্যে প্রথমে বাণ এবং পরে গদা, বৃক্ষ ও শিলা দ্বারা তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের চরম পর্যায়ে অঙ্গদ শ্রান্ত না হয়ে ক্ষিপ্রগতিতে উঠে দাঁড়ান এবং একটি তীক্ষ্ণ তরবারির আঘাতে বজ্রদংষ্ট্রের মস্তক ছেদন করেন। রাক্ষসরা তাদের নেতার পতন দেখে ভয়ে লঙ্কার দিকে পলায়ন করে এবং বানররা অঙ্গদের জয়ধ্বনি করতে থাকে।

38 verses

Sarga 55

अकम्पन-प्रेषणम् तथा कपि-राक्षस-रणवर्णनम् (Akampana Dispatched; The Vanara–Rakshasa Battle and Omens)

বালিপুত্র অঙ্গদের হাতে বজ্রদংষ্ট্র নিহত হয়েছে—এই সংবাদ শুনে রাবণ সেনাপতিকে সম্বোধন করে অবিলম্বে অকম্পনকে যুদ্ধে পাঠাতে আদেশ দেন। তিনি অকম্পনের প্রশংসা করেন—তিনি শৃঙ্খলাবদ্ধ সেনানায়ক, রক্ষক, রণপ্রিয় কৌশলী এবং সর্বাস্ত্রে পারদর্শী। আদেশ পেয়ে রাক্ষস-সেনা দ্রুত বেরিয়ে পড়ে; অকম্পন স্বর্ণালঙ্কৃত রথে মেঘগর্জন-বিদ্যুৎসম ধ্বনির আবহে রণক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হয়। যাত্রাকালে শুভ আবহাওয়া থাকলেও দিন হঠাৎ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে, প্রবল বাতাস বয়ে যায়, পাখি ও পশু ভয়ংকর স্বরে চিৎকার করে—অশুভ উৎপাত দেখা দেয়। অকম্পন সেগুলি উপেক্ষা করে যুদ্ধভূমিতে প্রবেশ করে। তারপর বানর ও রাক্ষসদের ভয়ংকর সংঘর্ষ শুরু হয়। ধুলো উড়ে রক্তবর্ণ হয়ে আকাশ ঢেকে ফেলে; পতাকা, অস্ত্র, ঘোড়া ও যোদ্ধাদের অবয়ব পর্যন্ত আড়াল হয়, আর সেই বিভ্রান্তিতে বন্ধু-শত্রুর ভেদ না রেখে সবাই পরস্পরকে আঘাত করতে থাকে। রক্তে ধুলো বসে যায় এবং ভূমি মৃতদেহ ও ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ভরে ওঠে। গাছ, শিলা, গদা, শক্তি ও বাহুদণ্ডে নিকটযুদ্ধ চলতে থাকে; অকম্পন রাক্ষসদের উজ্জীবিত করে সারি গুছিয়ে দেয়, আর বানরনায়ক কুমুদ, নল ও মৈন্দ পাল্টা আক্রমণে শত্রুসেনা চূর্ণ করে।

31 verses | Ravana

Sarga 56

अकम्पनवधः — The Slaying of Akampana (Hanuman’s rout of the Rakshasa host)

এই সর্গে হনুমান কর্তৃক রাক্ষস সেনাপতি অকম্পনের বধ এবং বানর সেনার বিজয়ের বর্ণনা করা হয়েছে। বানরদের পরাক্রম দেখে ক্রুদ্ধ অকম্পন তার সারথিকে রথ এগিয়ে নেওয়ার আদেশ দেন এবং বাণবর্ষণ করে বানরদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। বানরদের এই দুর্দশা দেখে হনুমান তাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। হনুমানকে দেখে বানররা পুনরায় সাহস সঞ্চয় করে এবং তাঁর নেতৃত্বে একত্রিত হয়। অকম্পন ও হনুমানের মধ্যে এক ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়। অকম্পন যখন বাণবৃষ্টি করছিলেন, তখন হনুমান একটি পর্বতশৃঙ্গ উৎপাটন করে নিক্ষেপ করেন, যা অকম্পন মাঝপথেই খণ্ড-বিখণ্ড করে দেন। অবশেষে, হনুমান একটি অশ্বকর্ণ বৃক্ষ উপড়ে নিয়ে অকম্পনের মাথায় আঘাত করেন, যার ফলে সেই রাক্ষসের মৃত্যু হয়। অকম্পনের মৃত্যুতে রাক্ষসরা লঙ্কায় পালিয়ে যায় এবং রাম, লক্ষ্মণ ও সুগ্রীব হনুমানের বীরত্বের প্রশংসা করেন।

39 verses | Akampana

Sarga 57

प्रहस्तनिर्याणम् — Prahasta’s Departure and the Muster of the Rakshasa Host

অকম্পনের বধে সৃষ্ট বিস্ময় কাটতেই রাবণ ক্রোধে দগ্ধ, অথচ মুখে বিবর্ণ হয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করে লঙ্কার প্রতিরক্ষা-স্থানগুলি পরিদর্শন করে। নগরকে হঠাৎ বিপন্ন দেখে সে যুদ্ধবিশারদ প্রহস্তকে ডেকে বলে—এই সংকটের উপশম হবে কেবল দৃঢ় যুদ্ধ-নেতৃত্বে; ভার বহন করতে সে নিজে, কুম্ভকর্ণ, ইন্দ্রজিৎ ও নিকুম্ভও সক্ষম, তবু অবিলম্বে সেনা সমাবেশের দায়িত্ব প্রহস্তের উপর অর্পণ করে। প্রহস্ত পূর্বের আলোচনা স্মরণ করিয়ে হিতবচনে বলে—সীতাকে ফিরিয়ে দেওয়াই কল্যাণকর, নচেৎ যুদ্ধ অনিবার্য; তবু প্রভুভক্তি ঘোষণা করে, প্রাপ্ত সম্মান-উপহার স্বীকার করে এবং রণে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত থাকে। প্রহস্ত সেনাপতিদের আদেশ দেয় মহারাক্ষস বাহিনী জড়ো করতে। অচিরেই লঙ্কা ভারী অস্ত্রে সজ্জিত, গজসম বীরদের ভিড়ে পূর্ণ হয়; অগ্নিহোত্র, ব্রাহ্মণ-সত্কার, অভিষিক্ত মাল্যাদি মঙ্গলকর্ম চলতে থাকে। সर्पধ্বজ, স্বর্ণজাল-শোভিত, গর্জনময় রথে উঠে সে সহচরদের সঙ্গে যাত্রা করে; ঢাক-ভেরি, শঙ্খধ্বনি ও ভয়ংকর হুঙ্কারে দিক্‌দিগন্ত মুখরিত হয়। এরপর ঘোর অমঙ্গল লক্ষণ দেখা দেয়—বামদিকে ঘুরে উড়তে থাকা মাংসভোজী পাখি, উল্কাপাত, প্রবল ঝড়, শেয়ালের ডাক, রক্তবৃষ্টি, ধ্বজে গৃধ্রের বসা, আর সারথির চাবুক পিছলে যাওয়া—বাহ্য জাঁকজমকের মধ্যেও সর্বনাশের ইঙ্গিত। বানরসেনা গাছ ও শিলাখণ্ড হাতে প্রস্তুত হয়; উভয় পক্ষের চ্যালেঞ্জ-ধ্বনি বাড়তে থাকে। প্রহস্ত পতঙ্গের মতো অগ্নিতে প্রবেশ করে বিজয়লোভে বানরবাহিনীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে—অহংকার, অমঙ্গল-চিহ্নিত আগ্রাসন ও যুদ্ধের করুণ গতির শিক্ষা প্রকাশ করে।

46 verses

Sarga 58

प्रहस्तवधः (The Slaying of Prahasta)

এই সর্গে শ্রীराम যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল বাহিনীসহ অগ্রসরমান ভয়ংকর রাক্ষস সেনাপতি প্রহস্তকে দেখে স্থিরচিত্তে বিভীষণকে জিজ্ঞাসা করেন—এ কে? বিভীষণ জানান, এ রাবণের সেনাপতি প্রহস্ত; বীরত্ব ও অস্ত্রবিদ্যায় প্রসিদ্ধ, লঙ্কার সেনাবাহিনীর বৃহৎ অংশের অধিনায়ক। তারপর উভয় পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়—শিলাবৃষ্টি ও বাণবৃষ্টি, তলোয়ার, বর্শা, তোमर, মুগুর, লৌহদণ্ড প্রভৃতি অস্ত্রে যুদ্ধক্ষেত্র ভরে ওঠে এবং প্রচুর প্রাণহানি ঘটে। রক্ত, দেহ ও ভগ্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ভরা ‘রক্তনদী’-সদৃশ উপমায় যুদ্ধের নির্মম মূল্য স্পষ্ট হয়। প্রহস্ত নিজে প্রবেশ করে বাণঝড়ে বানরসেনায় ত্রাস সৃষ্টি করে। তখন নীল তার মোকাবিলা করেন; বাণবিদ্ধ হয়েও তিনি উপড়ানো বৃক্ষ দিয়ে আঘাত করেন, প্রহস্তের ধনুক ভেঙে দেন এবং তাকে ভারী মুগুর নিয়ে নিকটযুদ্ধে নামতে বাধ্য করেন। শেষে নীল এক মহাশিলা প্রহস্তের মস্তকে নিক্ষেপ করলে তার মাথা চূর্ণ হয়ে সে নিহত হয়। সেনাপতির পতনে রাক্ষসসেনা শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে লঙ্কার দিকে সরে যায়; শ্রীराम ও লক্ষ্মণ নীলের প্রশংসা করেন এবং বানররা কৌশলগত বিজয়ে আনন্দধ্বনি তোলে।

61 verses

Sarga 59

युद्धकाण्डे एकोनषष्टितमः सर्गः — Rāvaṇa’s Assault on Nīla and Lakṣmaṇa; Hanumān Bears Rāma

প্রহস্তের মৃত্যুর পর লঙ্কাপতি রাবণ স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন এবং বানর সেনার ওপর প্রবল আক্রমণ চালান। সুগ্রীবের আক্রমণ প্রতিহত করে তিনি বানরদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। নীল রাবণের রথের ওপর উঠে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু রাবণ আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতে নীলকে ভূপাতিত করেন। এরপর রাবণ ও লক্ষ্মণের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। রাবণ ব্রহ্মার দেওয়া শক্তিশালী 'শক্তি' শেল নিক্ষেপ করে লক্ষ্মণের বক্ষ বিদীর্ণ করেন, যার ফলে লক্ষ্মণ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। রাবণ লক্ষ্মণকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে হনুমান বজ্রকঠিন মুষ্টির আঘাতে রাবণকে প্রতিহত করেন এবং লক্ষ্মণকে উদ্ধার করে রামের কাছে নিয়ে যান। পরিশেষে, শ্রীরাম হনুমানের কাঁধে চড়ে রাবণের রথ ও মুকুট ধ্বংস করেন। রাবণকে ক্লান্ত ও অস্ত্রহীন দেখে রাম তাকে হত্যা না করে বলেন, 'তুমি ক্লান্ত, লঙ্কায় ফিরে বিশ্রাম নিয়ে পরে এসো।' এই সর্গে রামের বীরত্ব ও মহানুভবতা প্রকাশ পায়।

146 verses | Rāma, Rāvaṇa, Lakṣmaṇa (Saumitri), Hanumān, Vibhīṣaṇa

Sarga 60

कुम्भकर्णविबोधनम् (The Awakening of Kumbhakarna)

এই সর্গে রামচন্দ্রের বাণাঘাতে অপমানিত রাবণ লঙ্কায় ফিরে এসে নিজের বিপদকে পূর্বশাপ ও ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে ব্যাখ্যা করে। বেদবতীর অপমানজনিত পাপ, উমা, নন্দীশ্বর, রম্ভা, বরুণ-কন্যা প্রমুখের অভিশাপ এবং ব্রহ্মার সতর্কবাণী—মানুষের হাতেই সর্বনাশ আসবে—এসব স্মরণ করে সে নগরদ্বারে প্রতিরক্ষা কঠোর করতে আদেশ দেয়। শেষ অবলম্বন হিসেবে ব্রহ্মশাপে দীর্ঘনিদ্রায় নিমগ্ন মহাবলী কুম্ভকর্ণকে অবিলম্বে জাগাতে নির্দেশ করে। বহু রাক্ষস ক্রমে নানা উপায়ে তাকে জাগাতে উদ্যত হয়—ভোজন-পান ও সুগন্ধ, শঙ্খ-ভেরী-মৃদঙ্গের প্রচণ্ড ধ্বনি, গদা ও বৃক্ষ দিয়ে আঘাত, জল ঢালা, বেঁধে প্রহার, এমনকি তার দেহের উপর হাতি চালানো পর্যন্ত। অবশেষে ক্ষুধা ও আঘাতে তার তন্দ্রা ভাঙে। প্রলয়রূপে সে জাগে—মুখ পাতালসম, চোখ জ্বলন্ত গ্রহের মতো—এবং বিপুল মাংস, রক্ত, চর্বি ও মদ্য পান করে জরুরি কারণ জানতে চায়। মন্ত্রী যূপাক্ষ জানায়, বিপদ দেবতাদের নয়—মানুষ রাম ও লক্ষ্মণ এবং বানরসেনাই লঙ্কাকে বিপর্যস্ত করছে; পূর্বে লঙ্কার ক্ষতি ও রাবণের অল্পের জন্য রক্ষা পাওয়ার কথাও বলে। কুম্ভকর্ণ তৎক্ষণাৎ জয়ের প্রতিজ্ঞা করে বেরিয়ে পড়ে; তার পদচারণায় পৃথিবী কেঁপে ওঠে। তাকে দেখে বানরনেতারা আতঙ্কিত হয়—অনেকে পালায়, অনেকে রামের শরণ নেয়—এবং পরবর্তী যুদ্ধপর্বের আগে এক গভীর মানসিক মোড় সূচিত হয়।

97 verses

Sarga 61

कुम्भकर्णदर्शनम् — The Appearance of Kumbhakarna and the Account of His Might

তখন শ্রীराम ধনুক ধারণ করে মুকুটধারী, পর্বতসম বিশাল কুম্ভকর্ণকে দেখলেন। তাঁর অতিকায় দেহ দেখে বানরসেনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। রাম বিভীষণকে জিজ্ঞাসা করলেন—এ অদ্ভুত পুরুষ কে; বিভীষণ বললেন—ইনি বিশ্রবার পুত্র কুম্ভকর্ণ, যিনি একদা ইন্দ্র ও যমের বাহিনী পর্যন্ত পরাজিত করেছিলেন, এবং যাঁর স্বাভাবিক বল বরপ্রাপ্তির উপর নির্ভর অন্য রাক্ষসনায়কদেরও অতিক্রম করে। এরপর অতীতকথা বলা হয়—জন্ম থেকেই কুম্ভকর্ণের ভয়ংকর ক্ষুধা; তিনি জীবজন্তু ও মানুষ গিলে লোককে ত্রস্ত করতেন। ইন্দ্র বজ্রাঘাত করলে কুম্ভকর্ণ ঐরাবতের দন্ত দিয়ে ইন্দ্রকে আঘাত করেন। দেবতা ও সকল প্রাণী ব্রহ্মার শরণ নিলেন এবং তাঁর অত্যাচার জানালেন—ভক্ষণ, দেবতাদের উপর আক্রমণ, আশ্রমধ্বংস, পরস্ত্রী অপহরণ। ব্রহ্মা তাঁকে মৃতসম নিদ্রার শাপ দিলেন; রাবণ বংশমর্যাদা ও ন্যায়ের কথা তুলে প্রতিবাদ করলে ব্রহ্মা স্থির করলেন—ছয় মাস নিদ্রা, এক দিন জাগরণ; কিন্তু সেই এক দিনের ক্ষুধাও জগতের জন্য ভয়ংকর। বর্তমান যুদ্ধে ফিরে বিভীষণ বানরদের মনোবল রক্ষার উপদেশ দিলেন। শ্রীराम নীলকে আদেশ করলেন—সেনা সাজিয়ে লঙ্কার দ্বার, পথ ও পারাপার রক্ষা করতে; বানরেরা গাছ, শিলা ও পর্বতশিখর হাতে সজ্জিত হয়ে মেঘপুঞ্জের মতো ঘন যুদ্ধবিন্যাস গড়ে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিল।

40 verses

Sarga 62

कुम्भकर्णस्य प्रबोधनम् — The Awakening and Commissioning of Kumbhakarna

এই সর্গে লঙ্কার অন্তঃপুরে কুম্ভকর্ণকে জাগিয়ে তোলার ঘটনা এক রাজনৈতিক-মানসিক পর্ব হিসেবে প্রকাশ পায়। ঘুমে আচ্ছন্ন ও মদে মাতাল হলেও তিনি ‘রাক্ষস-ব্যাঘ্র’ সদৃশ ভয়ংকর; সহস্র সহচরের পরিবেষ্টনে, পুষ্পবৃষ্টিতে সম্মানিত হয়ে, তিনি রাজপথ ধরে অগ্রসর হন। স্বর্ণজাল-খচিত, সূর্যসম দীপ্ত রাক্ষসরাজার প্রাসাদে প্রবেশ করে এমন বৃহৎ পদক্ষেপে এগোন যে পৃথিবী কেঁপে ওঠে বলে মনে হয়। পুষ্পকাসনে বসা রাবণ অন্তরে উদ্বিগ্ন; ভাইকে দেখে আনন্দে উঠে তাকে আলিঙ্গন করে সম্মানসহ আসনে বসান। তখন কুম্ভকর্ণ ক্রোধে রক্তবর্ণ নয়নে প্রশ্ন করেন—“আমাকে কেন জাগানো হল? তুমি কাকে ভয় করছ?” রাবণ রামের ভয় স্বীকার করেন—রাম ও সুগ্রীব সমুদ্র পার হয়ে সেনাসহ এসে পড়েছেন; লঙ্কার উদ্যান ধ্বংস, বহু রাক্ষস নিহত, অথচ বানররা যুদ্ধে অক্ষয় বলেই প্রতীয়মান। ক্লান্ত নগরী রক্ষার জন্য তিনি প্রার্থনা করেন, যেখানে এখন শিশু ও বৃদ্ধই অধিক অবশিষ্ট; দেব-অসুরবিজয়ে কুম্ভকর্ণের পূর্বকীর্তি স্মরণ করে তাকে আদেশ দেন—শত্রুসেনাকে এমন ছত্রভঙ্গ করো, যেমন বায়ু বর্ষামেঘকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

23 verses | Kumbhakarna, Ravana

Sarga 63

कुम्भकर्णोपदेशः — Kumbhakarna’s Counsel and War-Boast to Ravana

লঙ্কায় রাবণের শোকবিলাপ শুনে কুম্ভকর্ণ প্রথমে উপহাসভরে হাসে, পরে গম্ভীর নীতিবচনে প্রবৃত্ত হয়। সে বলে—রাজাকে নীতিবিকল্পগুলির মধ্যে শ্রেয়টিকে বিচার করে, মন্ত্রীদের সঙ্গে, সময়-পরিস্থিতি ও পরিণাম জেনে কাজ করতে হয়। সান্ত্ব (সমঝোতা), দান, ভেদ ও বিক্রম (পরাক্রম-প্রয়োগ)—এই উপায়গুলি কালানুযায়ী এককভাবে বা মিলিয়ে প্রয়োগযোগ্য; ধর্ম-অর্থ-কামের ক্রমবদ্ধ সামঞ্জস্যই রাজধর্ম। সে সতর্ক করে—অশিক্ষিত ও উদ্ধত উপদেষ্টাকে, এবং শত্রুর সঙ্গে যোগসাজশকারী মন্ত্রীকে পরিহার করতে হবে; পরামর্শকালে তাদের আচরণ সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ জরুরি। এই তিরস্কারে রাবণ ক্ষুব্ধ হয়ে অতীতচিন্তা ত্যাগ করে তৎক্ষণাৎ কার্যকর পরামর্শ দাবি করে। তখন কুম্ভকর্ণ কোমল স্বরে রাবণকে আশ্বাস দেয়—আমি তোমাকে রক্ষা করব—এবং নিজেকে যুদ্ধের নির্ণায়ক অস্ত্ররূপে নিবেদন করে। সে অতিশয় বীরদম্ভে প্রতিজ্ঞা করে—রাম, লক্ষ্মণ, সুগ্রীব ও হনুমানকে বিনাশ করব, এমনকি দেবতাদেরও যুদ্ধে আহ্বান করব। এই সর্গে তাই রাষ্ট্রনীতির গাম্ভীর্য ও যুদ্ধোন্মাদ গর্জন পাশাপাশি এসে যুদ্ধের প্রাক্কালে উপদেশ কীভাবে উদ্দীপক সমর-ভাষণে রূপান্তরিত হয় তা দেখায়।

58 verses

Sarga 64

महोदर-वाक्यं कुम्भकर्ण-प्रतिषेधः (Mahodara’s Counsel and the Critique of Kumbhakarna’s Solo Assault)

লঙ্কার রাজসভায় এই সর্গটি মন্ত্রণা-তর্কের রূপে গঠিত। কুম্ভকর্ণের একাকী যুদ্ধে নামার মত শুনে মহোদর তীক্ষ্ণ ভর্ৎসনা করেন এবং বলেন—এমন একলা সংঘর্ষের যুক্তি অচিন্তিত ও নীতিবিরুদ্ধ। তিনি জনস্থানে পূর্বে রামের হাতে রাক্ষসদের বিনাশের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে রামের প্রমাণিত পরাক্রম ও সেই ভয়ের স্থায়িত্ব স্মরণ করান। উপমায় তিনি দেখান—রাম ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায়, আবার নিদ্রিত সর্পের ন্যায় যাকে জাগানো উচিত নয়; অতএব সরাসরি উসকানি দেওয়া কৌশলগতভাবে অযৌক্তিক। এরপর মহোদর সমালোচনা ছেড়ে একটি নির্দিষ্ট, যদিও নৈতিকভাবে সন্দেহজনক, পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন। মহোদর, দ্বিজিহ্ব, সম্হ্রাদি, কুম্ভকর্ণ ও বিতর্দন—এই পাঁচ যোদ্ধা একত্রে বেরিয়ে রামের মুখোমুখি হবে; ফল যা-ই হোক, নগরে প্রচার ছড়াতে হবে যে ‘রাম ও লক্ষ্মণকে গিলে ফেলা হয়েছে’, যাতে জনমনে মানসিক ধাক্কা লাগে। সেই গুজবকে কাজে লাগিয়ে রাবণকে উপদেশ দেওয়া হয়—সে যেন গোপনে সীতার কাছে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেয়, ধন-ধান্য ও রত্নের প্রলোভন দেখায়, এবং ভয়, শোক ও একাকিত্বের চাপে তাকে বশ করার চেষ্টা করে। এভাবে অধ্যায়টি ঝুঁকি-সম্পদ-সময়ের নীতি-বিচারকে একদিকে, আর প্রতারণামূলক তথ্য-রাজনীতিকে অন্যদিকে পাশাপাশি রেখে দেখায়—পরামর্শ কৌশলে সূক্ষ্ম হলেও ধর্মবোধে কলুষিত হতে পারে।

36 verses | Mahodara, Kumbhakarna, Ravana

Sarga 65

कुम्भकर्णप्रस्थानम् — Kumbhakarna’s Departure for Battle

এই সর্গে কুম্ভকর্ণের সভামন্ত্রণা ধীরে ধীরে অস্ত্রসজ্জা ও যুদ্ধযাত্রার আচারময় পর্বে রূপ নেয়। তিনি মহোদরের নিরুৎসাহপূর্ণ কথাকে তিরস্কার করে ক্ষাত্রধর্ম ঘোষণা করেন—বীরত্বের প্রমাণ আত্মপ্রশংসা নয়, কর্ম; এবং সমষ্টিগত কৌশলগত ব্যর্থতার প্রায়শ্চিত্ত করতে তিনি রণক্ষেত্রে যাবেন। রাবণ মহোদরের ভয়কে ‘রামভয়’ বলে চিহ্নিত করে কুম্ভকর্ণকে আশ্বস্ত করেন, তাঁর অতুল শক্তি ও সদিচ্ছার প্রশংসা করে বানরসেনা ও দুই রাজপুত্রকে বিনাশ করতে অনুরোধ করেন। কুম্ভকর্ণ প্রতিজ্ঞা করেন—রামকে বধ করে রাবণের ভয় দূর করবেন; তিনি একাই অগ্রসর হওয়ার প্রস্তাব দেন, কিন্তু রাবণ একাকী দম্ভের বিপদ স্মরণ করিয়ে রক্ষিত অগ্রযাত্রার আদেশ দেন। এরপর রাজকীয় অলংকার-অনুষ্ঠান: মালা, বাহুবন্ধ, আংটি, নানা ভূষণ, মুকুট, কুণ্ডল, মেখলা ও কবচ তাঁকে পরানো হয়; অগ্নি, চন্দ্র এবং নারায়ণ/ত্রিবিক্রমের ন্যায় উপমায় তাঁর বর্ণনা করা হয়। ঢাক-শঙ্খধ্বনি, রথ-হস্তী-অশ্ব ও নানা বাহনের সঙ্গে তিনি প্রস্থান করেন; তখন ঘন কালো মেঘে বিদ্যুৎ, শেয়ালের ডাক, চক্কর কাটা পাখি, তাঁর অস্ত্রে শকুনের বসা, উল্কাপাত, সূর্যের ম্লানতা ও বায়ুর স্তব্ধতা—অশুভ লক্ষণ দেখা দেয়। তবু নিয়তির টানে তিনি এগিয়ে যান; প্রাচীর অতিক্রম করে বানরসারিতে ভয় সঞ্চার করেন, তাঁর গর্জনে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে—রাজসিক আড়ম্বর ও বাক্যদম্ভের বিপরীতে অমঙ্গল-সংকেত এই সর্গের মূল সুর।

57 verses

Sarga 66

कुम्भकर्णप्रस्थानम् तथा अङ्गदप्रेरणा (Kumbhakarna’s sortie and Angada’s rallying of the Vanaras)

এই ৬৬তম সর্গে কুম্ভকর্ণের প্রস্থানজনিত ভয়াবহ মনোবল-সঙ্কট এবং তার পর সমাধান বর্ণিত হয়েছে। পর্বতশৃঙ্গসম বিশাল কুম্ভকর্ণ দ্রুত লঙ্কার সীমা অতিক্রম করে এমন গর্জন করে যে সমুদ্র পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয়। তাকে ‘দেবতাদের পক্ষেও অজেয়’ মনে করে বানরসেনা আতঙ্কে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়—কেউ পিছনে না তাকিয়ে পালায়, কেউ সমুদ্রে পড়ে যায়, কেউ গুহা-পাহাড়-গাছে আশ্রয় নেয়, আর কেউ মৃতপ্রায় হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তখন বালিপুত্র অঙ্গদ যুদ্ধনেতারূপে হস্তক্ষেপ করে সবাইকে ফিরতে আদেশ দেয়। সে বলে, অস্ত্র ফেলে পালানো লোকলজ্জার কারণ; ধর্মযুদ্ধে মৃত্যু শ্রেয়—জয় হলে কীর্তি, আর নিহত হলে ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি। আগে যে বীরত্বের বড়াই করা হয়েছিল, এখন সেই কথার সঙ্গে এই ভীতি মেলে না—এ কথাও সে কঠোরভাবে স্মরণ করায়। বানররা জানায়, কুম্ভকর্ণ ভয়ংকর ধ্বংস সাধন করেছে এবং প্রাণ প্রিয়; তবু অঙ্গদের দৃঢ় আহ্বান ও হনুমানের সহায়ক উপদেশে তাদের সাহস ফিরে আসে। ঋষভ, শরভ, মৈন্দ, ধূম্র, নীল, কুমুদ, সুষেণ, গবাক্ষ, রম্ভা, তারা, দ্বিবিদ, পনস ও হনুমান প্রমুখ নেতারা দ্রুত পুনরায় রণক্ষেত্রে অগ্রসর হয়। তারা কুম্ভকর্ণের দিকে শিলা ও পুষ্পিত বৃক্ষ নিক্ষেপ করে, কিন্তু সেগুলি তার অঙ্গে আঘাত লেগে চূর্ণ হয়ে যায়—তার ভয়ংকর স্থিতি প্রকাশ পায় এবং যুদ্ধ পুনরায় তীব্র হয়।

34 verses

Sarga 67

कुम्भकर्णवधः — The Slaying of Kumbhakarna

এই সর্গে কুম্ভকর্ণের প্রলয়ঙ্করী শক্তি এবং বানর সেনার ভয়ের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। অঙ্গদের উৎসাহে বানররা পুনরায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়। হনুমান ও অন্যান্য বীররা গাছ ও পাথর দিয়ে আক্রমণ করলেও কুম্ভকর্ণ তাদের প্রতিহত করে এবং বানরদের গ্রাস করতে থাকে। অবশেষে শ্রীরাম স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। তিনি দিব্য বাণের সাহায্যে কুম্ভকর্ণের হাত ও পা ছিন্ন করেন। সবশেষে ইন্দ্রাস্ত্র প্রয়োগ করে রাম কুম্ভকর্ণের মস্তক ছেদন করেন। রাক্ষস বীরের মৃত্যুতে দেবতারা আনন্দিত হন এবং বানর সেনার আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে।

180 verses

Sarga 68

कुम्भकर्णवधश्रवणेन रावणविलापः (Ravana’s Lament on Hearing of Kumbhakarna’s Slaying)

এই সর্গে যুদ্ধক্ষেত্রের ফল থেকে কাহিনি রাক্ষসসভায় তার মানসিক প্রতিক্রিয়ার দিকে মোড় নেয়। দূতেরা রাবণকে জানায়—কুম্ভকর্ণ অল্প সময়ে বানরসেনাকে ছত্রভঙ্গ করে বহু বানরকে গ্রাস করে ভয়ংকর সংহার ঘটালেও, শেষ পর্যন্ত মহিমান্বিত রাঘব শ্রীरामের হাতে নিহত হয়েছে। তার দেহের বিভীষিকাময়, অতিমানবীয় চিত্র বর্ণিত হয়—পর্বতসম শরীর রামের বাণে ছিন্নভিন্ন হয়ে বিকৃত ধড়ে পরিণত, প্রচুর রক্তক্ষরণে লঙ্কার এক দ্বার পর্যন্ত রুদ্ধ হয়ে আছে; ফলে পরাজয় নগরের জন্যও অমঙ্গলের লক্ষণ হয়ে ওঠে। সংবাদ শুনে রাবণ প্রথমে মূর্ছিত হয়, পরে জেগে উঠে দীর্ঘ বিলাপ করে। সে কুম্ভকর্ণকে নিজের “ডান বাহু” বলে সম্বোধন করে প্রশ্ন তোলে—দেব-দানবের গর্বভঞ্জন বীর কীভাবে রামের হাতে পতিত হল? সে একে কাল/দৈবের অপ্রতিরোধ্য বিধান বলে মানে; আকাশে দেব-ঋষিদের আনন্দধ্বনি ও উপহাস কল্পনা করে এবং বানরদের আরও সাহসী হয়ে লঙ্কার প্রাচীর বেয়ে উঠে আসার সঙ্কট দেখে। বিলাপ ক্রমে আত্ম-অভিযোগে রূপ নেয়—রাবণ উপলব্ধি করে, এ পূর্ব অধর্মের বিপাক; বিশেষত ধর্মাত্মা বিভীষণকে তাড়িয়ে দেওয়া ও তার হিতোপদেশ অগ্রাহ্য করার ফল। শেষে সে স্থির করে—রাঘবকে বধ না করলে জীবন মূল্যহীন; শোকে ভেঙে সে আবার লুটিয়ে পড়ে, এবং কাহিনি বীরোচিত প্রতিরোধ থেকে ভাগ্যছায়িত মরিয়া সংকল্পের দিকে অগ্রসর হয়।

24 verses | Rāvaṇa

Sarga 69

त्रिशिरा-प्रबोधनम् तथा नरान्तक-वधः (Trisira’s Counsel and the Slaying of Naranthaka)

এই সর্গে কুম্ভকর্ণ-বধের পর রাবণের শোক ও বিলাপের দৃশ্য থেকে কাহিনি দ্রুত যুদ্ধের তীব্রতায় প্রবেশ করে। ত্রিশিরা রাবণকে তিরস্কার করে রাজধর্ম স্মরণ করায়—রাজাকে সংযম ও ধৈর্যে স্থিত থাকতে হয়; নিজের বরদান ও দিব্য অস্ত্রশস্ত্র স্মরণ করে শত্রুর বিরুদ্ধে দৃঢ় হতে হয়। এই উপদেশে রাবণ পুনরুজ্জীবিত হয়ে ত্রিশিরা, অতিকায়, দেবান্তক, নরান্তক, মহোদর ও মহাপার্শ্ব—এই ছয় শ্রেষ্ঠ রাক্ষস-নায়ককে অভিষিক্ত করে, হাতি-রথ-অশ্ব ও গুরু অস্ত্রে সুসজ্জিত করে যুদ্ধে প্রেরণ করে। রণক্ষেত্রে তাদের অগ্রযাত্রা ঘন মেঘের মতো; অপরদিকে বানর-নায়কেরা গর্জন করে বৃক্ষ উপড়ে ও পর্বত তুলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ভয়ংকর সংঘর্ষে নরান্তক দীপ্ত শক্তি (বল্লম)-হাতে বানরসেনা ছিন্নভিন্ন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সুগ্রীব তা দেখে অঙ্গদকে আদেশ দেন—অশ্বারূঢ় ওই আক্রমণকারীকে নিবৃত্ত কর। অঙ্গদ নিরস্ত্র হয়ে নখ-দন্তকেই স্বাভাবিক অস্ত্র বলে ঘোষণা করে নরান্তককে আহ্বান জানায়—বজ্রসম শক্তি নিক্ষেপ কর। সে আঘাত সহ্য করে; তারপর করাঘাতে নরান্তকের ঘোড়াকে ভূমিতে ফেলে দেয়। নরান্তকের মুষ্টিঘাতও সহ্য করে অঙ্গদ প্রতিঘাতে এমন প্রবল ঘুষি মারে যে তার বক্ষ বিদীর্ণ হয় এবং নরান্তক নিহত হয়। দেবতা ও বানরেরা আকাশভরা জয়ধ্বনি তোলে; অঙ্গদের এই দুষ্কর বিজয় সেনার মনোবল পুনরুদ্ধারকারী কীর্তি হিসেবে স্বীকৃত হয়।

96 verses | Trisira, Ravana, Sugriva, Angada

Sarga 70

त्रिशिरा–देवान्तक–महोदर–मत्त (महापार्श्व) वधः | Slaying of Trisira, Devantaka, Mahodara, and Matta (Mahaparsva)

এই সর্গে রাবণের প্রধান সেনাপতি—ত্রিশিরা, দেবান্তক, মহোদর এবং মহাপার্শ্বের (মত্ত) বধের বর্ণনা করা হয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে মহোদর, দেবান্তক এবং ত্রিশিরা সম্মিলিতভাবে অঙ্গদকে আক্রমণ করে। অঙ্গদ মহোদরের হাতিকে হত্যা করে তার দাঁত উপড়ে দেবান্তককে আঘাত করেন। তখন হনুমান ও নীল অঙ্গদকে সাহায্য করতে আসেন। হনুমান তাঁর বজ্রতুল্য মুষ্টির আঘাতে দেবান্তককে যমালয়ে প্রেরণ করেন এবং নীল একটি বিশাল শিলা নিক্ষেপ করে মহোদরকে বধ করেন। এরপর হনুমান ও ত্রিশিরার মধ্যে ঘোর যুদ্ধ হয়। হনুমান ত্রিশিরার সমস্ত অস্ত্র ব্যর্থ করে দেন এবং শেষে ত্রিশিরার তলোয়ার কেড়ে নিয়ে তার তিনটি মস্তক ছেদন করেন। সর্গের শেষে, মহাপার্শ্ব (মত্ত) গদা নিয়ে বানরদের আক্রমণ করলে, বানর বীর ঋষভ তার গদা কেড়ে নিয়ে তাকে হত্যা করেন। প্রধান বীরদের মৃত্যু দেখে রাক্ষস বাহিনী রণেভঙ্গ দিয়ে পলায়ন করে।

67 verses

Sarga 71

अतिकायवधः (The Slaying of Atikāya)

এই সর্গে রাবণের পুত্র অতীকায়—পর্বতসম বিশাল, ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত রক্ষাকবচে সুরক্ষিত—রাক্ষসসেনা ও স্বজনদের আহত-নিহত দেখে ক্রোধে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করে। দূর থেকে রথারূঢ় সেই মহাবীরকে দেখে শ্রীराम বিভীষণকে জিজ্ঞাসা করেন; বিভীষণ জানান, সে ধান্যমালিনীর পুত্র, অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী, এবং বরপ্রাপ্ত কবচের ফলে সাধারণ অস্ত্রে প্রায় অবধ্য। অতীকায় বানরবাহিনীকে ত্রস্ত করে যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে আহ্বান জানায়। লক্ষ্মণ এগিয়ে এসে গর্বোক্তি ও ধর্মসম্মত বাক্যবিনিময়ে বলেন—বীরত্ব কথায় নয়, কর্মে প্রমাণিত। এরপর অগ্নি, সূর্য, ইন্দ্র, বায়ু, যম, ত্বষ্টৃ/ইষীক প্রভৃতি অস্ত্রের ধারাবাহিক প্রয়োগে আকাশে শরের সংঘর্ষ হয়, কিন্তু অতীকায়ের অভেদ্য কবচ ভাঙে না। সাপসদৃশ এক শরে লক্ষ্মণ ক্ষণিক স্তম্ভিত হলেও দ্রুত সংযত হয়ে অতীকায়ের রথের অশ্ব, সারথি ও ধুরা ভেঙে দেন। তখন বায়ুদেব গূঢ় কথা প্রকাশ করেন—বররক্ষিত কবচ ভেদ করতে পারে কেবল ব্রাহ্ম অস্ত্র। লক্ষ্মণ ব্রাহ্মাস্ত্র আহ্বান করলে বিশ্ব কেঁপে ওঠে; সেই দিব্য শর প্রতিরোধ অতিক্রম করে অতীকায়ের মুকুটধারী মস্তক ছিন্ন করে ফেলে। অবশিষ্ট রাক্ষসরা আতঙ্কে লঙ্কার দিকে পালায়, বানরসেনা লক্ষ্মণের জয়গান করে, আর তিনি দ্রুত শ্রীरामের নিকট প্রত্যাবর্তন করেন।

116 verses

Sarga 72

अतिकायवधश्रवणं रावणस्य लङ्कारक्षाविधानम् (Ravana’s Reaction to Atikaya’s Death and the Fortification Orders for Lanka)

এই সর্গে রাবণ সংবাদ পান যে মহাবীর লক্ষ্মণ অতিকায়কে বধ করেছেন। এ কথা শুনে তিনি শোক ও ক্রোধে অস্থির হয়ে ওঠেন এবং রাম ও বানরসেনার হাতে লঙ্কার একের পর এক প্রধান সেনাপতি ও প্রসিদ্ধ যোদ্ধার পতন স্মরণ করে রাক্ষসদের অজেয়তার গর্ব ক্ষয়মান দেখেন। তিনি ইন্দ্রজিতের দিব্যাস্ত্রে রাম-লক্ষ্মণকে বেঁধে ফেলার ঘটনা মনে করে বিস্মিত হন—যে বন্ধন দেব-গন্ধর্বের কাছেও অচ্ছেদ্য বলে গণ্য ছিল, তা কীভাবে ভেঙে গেল; এতে প্রতিপক্ষের অচিন্ত্য শক্তি তাঁর বোধের অতীত বলে মনে হয়। এরপর বিলাপ ছেড়ে রাবণ প্রশাসনিক আদেশ দেন—সমগ্র নগরে কঠোর প্রহরা বসাতে হবে। দ্বার, প্রবেশ-নির্গমন পথ ও সৈন্য-চৌকির বারবার পরীক্ষা করতে হবে; বিশেষ করে অশোকবনে, যেখানে সীতাকে রক্ষা করা হচ্ছে, সেখানে নিরাপত্তা আরও দৃঢ় করতে হবে। তিনি রাত্রিচরদের নির্দেশ দেন সন্ধ্যা, মধ্যরাত্রি ও প্রভাতে—সর্বক্ষণ বানরদের গতিবিধি নজরে রাখতে, এবং সেনা স্থির থাকুক বা অগ্রসর হোক—সদা প্রস্তুত থাকতে। আদেশ পেয়ে রাক্ষসরা তৎক্ষণাৎ উঠে প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা কার্যকর করে। রাবণ নিজে পুত্রবধের ব্যক্তিগত বিপর্যয়ে অন্তরে দগ্ধ হয়ে, ক্রোধের কাঁটার মতো যন্ত্রণা বুকে নিয়ে, বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে নিজের প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করেন।

25 verses | Rāvaṇa

Sarga 73

इन्द्रजितः ब्रह्मास्त्र-यागः तथा वानरसेनाविध्वंसः (Indrajit’s Brahmastra Rite and the Crushing of the Vanara Host)

সর্গ ৭৩-এ অবশিষ্ট রাক্ষসেরা রাবণের কাছে এসে দেবান্তক, ত্রিশিরা ও অতীকায় প্রমুখ প্রধান বীরদের নিহত হওয়ার সংবাদ জানায়। এই সংবাদে রাবণ শোক ও যুদ্ধ-কৌশলগত উদ্বেগে বিহ্বল হলে ইন্দ্রজিৎ তাকে সান্ত্বনা দেয় এবং রাম-লক্ষ্মণকে নিপাত করার প্রতিজ্ঞা করে। শঙ্খ-ভেরী, ঢাক-ঢোল, ছত্র-চামর ও রাজসামরিক আড়ম্বরসহ সে যাত্রা করে। রণক্ষেত্রে পৌঁছে ইন্দ্রজিৎ চারদিকে রক্ষাব্যূহ স্থাপন করে অগ্নিহোম সম্পন্ন করে; সেখানে অস্ত্রশস্ত্রকেই যজ্ঞদ্রব্যরূপে নিবেদন করা হয়। ধোঁয়াহীন প্রজ্বলিত অগ্নিতে বিজয়ের শুভলক্ষণ প্রকাশ পায়; অগ্নিদেব আহুতি গ্রহণ করেন। এরপর ইন্দ্রজিৎ ব্রহ্মাস্ত্র আহ্বান করে রথ ও ধনুকে অভিমন্ত্রিত করে, ফলে গ্রহ-নক্ষত্র পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। মায়ায় আচ্ছন্ন থেকে সে বাণ ও অস্ত্রের জালবৃষ্টি বর্ষণ করে, যাতে বানরসেনা বিধ্বস্ত হয় এবং হনুমান, সুগ্রীব, অঙ্গদ, জাম্ববান, নল প্রমুখ প্রধান যোদ্ধা আহত হন। রাম ব্রহ্মাস্ত্রের দিব্য উৎস চিনে লক্ষ্মণকে স্থৈর্যসহকারে সহ্য করতে বলেন। রাম-লক্ষ্মণকে বিদ্ধ ও সেনাকে হতাশ দেখে ইন্দ্রজিৎ বিজয়গর্জন করে লঙ্কায় ফিরে রাবণকে সাফল্যের সংবাদ জানায়।

75 verses | Ravana, Indrajit (Meghanada/Ravani), Rama, Lakshmana

Sarga 74

औषधिपर्वताहरणम् / The Retrieval of the Herb-Bearing Mountain

এই সর্গে ইন্দ্রজিতের ব্রহ্মাস্ত্র-জাল নিক্ষেপে রাম ও লক্ষ্মণ অচেতন হন এবং বানরসেনায় ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটে। নেতৃত্বে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়লে প্রাজ্ঞশ্রেষ্ঠ বিভীষণ বলেন—স্রষ্টা-প্রদত্ত অস্ত্রকে সম্মান করার ফলে এই বিপদ অনিবার্য; এই বাণীতে তিনি সেনানায়কদের স্থির করেন। তিনি হনুমানের সঙ্গে আহত ও পতিতদের পরিদর্শন করে তীরে বিদ্ধ বৃদ্ধ জাম্ববানকে দেখেন; জাম্ববান দৃষ্টিহীন হলেও কণ্ঠস্বর শুনে বিভীষণকে চিনে নেন এবং বলেন—সবার বাঁচার আশা হনুমানের জীবন ও কর্মের উপরেই নির্ভর। হনুমান বিনীতভাবে কাছে এসে জাম্ববানের মনোবল ফিরিয়ে দেন। তখন জাম্ববান স্পষ্ট নির্দেশ দেন—সমুদ্র পেরিয়ে হিমবতে গিয়ে ঋষভ ও কৈলাসের মধ্যবর্তী ঔষধি-পর্বত খুঁজে চার ঔষধি—মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরণী ও সন্ধানকরণী—আনতে হবে। হনুমানের উড্ডয়নে পৃথিবী ও সমুদ্র কেঁপে ওঠে, পর্বত চাপে ভাঙে; হিমালয়ে ঔষধিগুলি লুকিয়ে পড়লে হনুমান সম্পূর্ণ শিখর উপড়ে নিয়ে ফিরে আসেন। ঔষধির সুবাসেই রাম-লক্ষ্মণ ও বানরযোদ্ধারা তৎক্ষণাৎ সজীব হন, ক্ষত প্রশমিত হয় এবং জোটবদ্ধ সেনা পুনরায় যুদ্ধক্ষম হয়ে ওঠে।

77 verses | Vibhīṣaṇa, Jāmbavān, Hanumān

Sarga 75

लङ्कादाह-प्रचोदनं तथा वानर-राक्षस-समरारम्भः (The Burning of Lanka and the Outbreak of Battle)

এই সর্গে সুগ্রীব হনুমান ও বানরবীরদের কর্মসিদ্ধির উপায় জানান—কুম্ভকর্ণবধ ও কুমারদের বিনাশের পর রাবণের প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়েছে। সূর্যাস্তে বানরেরা জ্বলন্ত মশাল হাতে লঙ্কার দিকে অগ্রসর হয়ে গোপুর, প্রতোली ও প্রাসাদসমূহে অগ্নি প্রজ্বালিত করে। অগুরু-হরিচন্দন, ক্ষৌম-কৌশেয় বস্ত্র, মুক্তা-মণি-বজ্র-প্রবাল, অশ্ব-গজ-রথের সামগ্রী, চর্ম-কবচ ও অস্ত্রসমূহ—সবই আগুনে দগ্ধ হয়। গৃহগুলি বজ্রাহত পর্বতশিখরের মতো ভেঙে পড়ে, তোরণ বিদ্যুতের মতো দীপ্ত হয়; রাত্রিতে লঙ্কা যেন কিঞ্চুক-পুষ্পে আচ্ছাদিত। নারীদের আর্তনাদ ধোঁয়ার সঙ্গে দূরে শোনা যায়, মুক্ত হাতি-ঘোড়ায় নগর উত্তাল সাগরের মতো কাঁপতে থাকে। এই সময় রাম-লক্ষ্মণ শল্যহীন হয়ে ধনুক ধারণ করেন; রামের ধনুর্জ্যার ধ্বনি বানর-রাক্ষসের কোলাহল ছাপিয়ে ওঠে এবং তাঁর শরে লঙ্কাদ্বারের গোপুর ভেঙে পড়ে। রাক্ষসনায়কেরা সজ্জিত হয়; ক্রুদ্ধ রাবণ কুম্ভকর্ণপুত্র কুম্ভ-নিকুম্ভ এবং ইউপাক্ষ, শোণিতাক্ষ, প্রজঙ্ঘ, কম্পন প্রভৃতিকে প্রেরণ করে। উভয় সেনার অলংকারদীপ্তিতে আকাশ চন্দ্র-তারার মতো জ্বলে ওঠে; তারপর বৃক্ষ-শৈল-মুষ্টি ও অসি-শূল-গদা-প্রাস-তোমরে ভয়ংকর বানর-রাক্ষস যুদ্ধ শুরু হয়, এবং উভয় পক্ষের ক্ষয়-লাভ ‘দশ-সপ্ত’ অনুপাতে বর্ণিত।

71 verses

Sarga 76

युद्धे अङ्गद-मैन्द-द्विविद-राक्षसयुद्धम्; कुम्भस्य प्रादुर्भावः तथा सुग्रीवेण पराभवः (Sarga 76: Angada and the Vanara chiefs battle Kampana, Prajaṅgha, Yūpākṣa, Śoṇitākṣa; Kumbha enters and is checked by Sugrīva)

এই সর্গে বানর ও রাক্ষসদের মধ্যে এক ভয়ানক যুদ্ধের বর্ণনা করা হয়েছে। বালিপুত্র অঙ্গদ অসীম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে একটি পর্বতশৃঙ্গের আঘাতে কম্পন নামক রাক্ষসকে বধ করেন। এরপর শোণিতাক্ষ, প্রজঙ্ঘ এবং যূপাক্ষ অঙ্গদকে আক্রমণ করলে, অঙ্গদের মামা মৈন্দ ও দ্বিবিদ তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। এই যুদ্ধে অঙ্গদ প্রজঙ্ঘকে, দ্বিবিদ শোণিতাক্ষকে এবং মৈন্দ যূপাক্ষকে হত্যা করেন। রাক্ষস বীরদের পতনের পর কুম্ভকর্ণের পুত্র কুম্ভ রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেন এবং তাঁর তীরবর্ষণে বানর সেনাকে বিপর্যস্ত করে তোলেন। তাঁর বাণে অঙ্গদ প্রমুখ বীররাও আহত হন। অবশেষে বানররাজ সুগ্রীব কুম্ভের মোকাবিলা করেন। সুগ্রীব প্রথমে কুম্ভের ধনুক ভেঙে দেন এবং পরে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হন। পরিশেষে, সুগ্রীব তাঁর বজ্রতুল্য মুষ্টির আঘাতে কুম্ভকে বধ করেন, যার ফলে রাক্ষস বাহিনীর মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

94 verses | Sugriva

Sarga 77

निकुम्भवधः — The Slaying of Nikumbha (Hanuman’s Duel)

যুদ্ধকাণ্ডের ৭৭তম সর্গে সুগ্রীবের হাতে নিজের ভ্রাতার পতন দেখে নিকুম্ভ ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বানর-নেতৃত্বের মুখোমুখি হয়। সে মহেন্দ্রশিখর-সদৃশ মঙ্গলময় পরিঘ (লোহার গদা) ধারণ করে গর্জন করতে করতে এমন বেগে ঘোরায় যে আকাশ যেন আবর্তিত হচ্ছে—এমন উপমায় তার ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ প্রকাশ পায়। এই দৃশ্য দেখে উভয় পক্ষের সেনাই মুহূর্তের জন্য ভয়ে স্থবির হয়ে যায়; যুদ্ধক্ষেত্রে মনোবলের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। কেবল হনুমান অচল থাকেন এবং বক্ষ উন্মুক্ত করে দাঁড়ান। নিকুম্ভের পরিঘ আঘাত করামাত্রই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়—হনুমানের অতিমানবীয় স্থৈর্য এবং কেবল নিষ্ঠুর বলপ্রয়োগের অসারতা প্রকাশিত হয়। হনুমান তৎক্ষণাৎ প্রবল মুষ্টিঘাত করেন; নিকুম্ভ তাঁকে ধরে তুলে নিলেও বাঁধা অবস্থাতেই তিনি আবার আঘাত করেন। পরে মুক্ত হয়ে হনুমান নিকুম্ভকে ভূমিতে আছাড় দেন, বক্ষে আরোহন করে শক্তিতে তার গ্রীবা মুচড়ে ভেঙে দেন এবং দ্বন্দ্বের সমাপ্তি ঘটান। বানররা উল্লসিত হয়, রাক্ষসদলে ভয় ছড়ায়; এরপর কাহিনি রাম ও রাক্ষস-যোদ্ধা (মকর)কে কেন্দ্র করে আরও তীব্র সংঘর্ষের দিকে অগ্রসর হয়।

24 verses | Valmiki (narrator)

Sarga 78

मकराक्षस्य निर्गमनम् — The Deployment of Makaraksha and Ravana’s Fury

নিকুম্ভ ও কুম্ভের মৃত্যুসংবাদ শুনে রাবণ শোক ও ক্রোধে দগ্ধ হলেন। তিনি খর-পুত্র, বিস্তৃতনয়ন মকরাক্ষকে ডেকে আদেশ দিলেন—রাম, লক্ষ্মণ ও বানরসেনাকে বিনাশ কর। মকরাক্ষ যুদ্ধ-আত্মবিশ্বাসে সেই আদেশ গ্রহণ করে রাবণকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণা করল। সে রথ ও সৈন্যসজ্জা করিয়ে রথে আরোহণ করল এবং রাক্ষসদের নির্দেশ দিল—তার আগে এগিয়ে গিয়ে যুদ্ধ শুরু করতে। তখন রূপান্তরকারী ভয়ংকর রাক্ষসদল গজসম ভর নিয়ে সেনাপতিকে ঘিরে পৃথিবী কাঁপাতে কাঁপাতে অগ্রসর হল; ভেরী, শঙ্খধ্বনি ও করতাল-নিনাদে যুদ্ধের শব্দমালা উঠল। যাত্রাপথে অশুভ নিমিত্ত দেখা দিল—সারথির চাবুক পড়ে গেল, ধ্বজা ভেঙে পড়ল, অশ্বরা ক্লান্ত হয়ে অশ্রু ফেলল, ধূলিধূসর কঠোর বাতাস বইল; তবু তারা লক্ষণ উপেক্ষা করে রাম-লক্ষ্মণের দিকে এগিয়ে গেল।

21 verses

Sarga 79

मकराक्षवधः (The Slaying of Makarākṣa)

এই সর্গে লঙ্কাযুদ্ধের মধ্যে খরপুত্র মকরাক্ষ আবির্ভূত হলে বানরনেতারা উদ্দীপ্ত হয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। বৃক্ষ, শিলা ও অস্ত্রবৃষ্টিতে বানর–রাক্ষসদের ভয়ংকর সংঘর্ষ শুরু হয়। মকরাক্ষ দণ্ডকারণ্য-সংক্রান্ত পুরাতন বৈর স্মরণ করিয়ে রামকে দ্বন্দ্বে আহ্বান করে এবং যমলোকে পাঠানোর হুমকি দেয়; শ্রীराम বাক্যজয়ে নয়, কর্মেই প্রমাণ দিতে চান বলে খরের বাহিনীধ্বংসের কথা স্মরণ করান। এরপর উভয় পক্ষের তীব্র শরবৃষ্টি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলে; দেবগণও বিস্ময়ে সেই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন। শ্রীराम মকরাক্ষের রথ ভেঙে তাকে পদযুদ্ধে বাধ্য করেন। তখন রাক্ষস রুদ্রদত্ত জ্বলন্ত ভয়ংকর শূল—জগত্সংহারসম—উত্তোলন করে নিক্ষেপ করে; দেবতারাও আতঙ্কিত হন। শ্রীराम তিনটি বাণে আকাশেই সেই শূল ছিন্ন করেন; পরে পাৱকাস্ত্র সংযোজিত করে মকরাক্ষকে বিদ্ধ করেন, তার হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে সে পতিত হয়। সেনাপতির পতন দেখে রাক্ষসরা রামের বাণভয়ে লঙ্কার দিকে পলায়ন করে।

41 verses

Sarga 80

इन्द्रजितो यज्ञानुष्ठानं अन्तर्धानं च (Indrajit’s Rite and the Invisible Assault)

মকরাক্ষের মৃত্যুসংবাদে রাবণ ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে তৎক্ষণাৎ প্রতিশোধের কথা ভাবল এবং পুত্র ইন্দ্রজিত্‌ (রাবণি)-কে যুদ্ধে নামতে আদেশ দিল। ইন্দ্রজিত্‌ প্রথমে রাক্ষস-বিধি অনুসারে অগ্নিহোম করল—অস্ত্রশস্ত্রকে যজ্ঞোপকরণরূপে সাজানো হল, লাল বস্ত্র পরিধান করা হল, লোহার স্রুবাদি ব্যবহৃত হল, আর অর্ঘ্যর জন্য কালো ছাগল ধরা হল। ধোঁয়াহীন স্বর্ণাভ জ্বালায় আহুতি পড়তেই বিজয়ের শুভ লক্ষণ দেখা দিল; দেব-দানব-রাক্ষসদের তৃপ্ত করে সে অলংকৃত রথে আরোহণ করে অন্তর্ধান করল। অদৃশ্য অবস্থায় সে আকাশ থেকে শরবর্ষণ করতে লাগল এবং ধোঁয়া-কুয়াশার অন্ধকার সৃষ্টি করে দিকচিহ্ন মুছে দিল; শব্দ ও রূপ আড়াল হয়ে গেল। রাম ও লক্ষ্মণ দিব্যাস্ত্র নিক্ষেপ করেও অদৃশ্য মায়াবী শত্রুকে স্পর্শ করতে পারলেন না; শত শত বানর নিহত হতে লাগল। লক্ষ্মণ ব্যাপকভাবে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের কথা বললে রাম ধর্মনীতির কথা স্মরণ করিয়ে বাধা দিলেন—একজনের জন্য বহুজনকে বিনাশ করা উচিত নয়; লুকিয়ে থাকা, শরণাগত, পলায়নরত, যুদ্ধ না-করা বা অসতর্কদেরও হত্যা করা ধর্মসঙ্গত নয়। এরপর রাম স্থির করলেন, মায়াবী ইন্দ্রজিতকে লক্ষ্য করে নিখুঁতভাবে অস্ত্র প্রয়োগ করবেন এবং তার দ্রুত বধের উপায় ভাবতে লাগলেন; বানরসেনাও প্রস্তুত রইল।

43 verses

Sarga 81

इन्द्रजितो मायासीतावधः — Indrajit’s Illusory Sita Episode and Hanuman’s Rebuke

এই সর্গে ইন্দ্রজিত্ রাঘবের অভিপ্রায় বুঝে লঙ্কার ভিতরে সরে যায় এবং রাক্ষসদের নিহত হওয়ার স্মৃতি মনে করে ক্রোধে উন্মত্ত হয়। সে পশ্চিম দ্বার দিয়ে বেরিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাম-লক্ষ্মণকে দেখে মায়া প্রয়োগ করে—রাক্ষসদের পাহারায় রথে এক মায়াময়ী সীতাকে বসিয়ে বানরসেনাকে বিভ্রান্ত করতে এগিয়ে আসে। বানররা ঝাঁপিয়ে পড়ে; হনুমান অগ্রভাগে থেকে অস্ত্রস্বরূপ পর্বতশৃঙ্গ বহন করে রথের কাছে পৌঁছায়। একবেণী, ধূলিধূসর দেহ, তপস্বিনীর মতো চেহারা দেখে সে তাকে মৈথিলী ভেবে শঙ্কিত ও ব্যথিত হয়। ইন্দ্রজিত্ নাটকীয়ভাবে তার কেশ ধরে আঘাত করে এবং বলে—শত্রুকে কষ্ট দিতে নারীর উপর আঘাতও ন্যায্য। হনুমান এই কাজকে নীচ ও অধর্ম বলে ধিক্কার দেয় এবং ইন্দ্রজিতের আসন্ন মৃত্যু ও পরবর্তী অপযশের ভবিষ্যদ্বাণী করে। তারপর ইন্দ্রজিত্ সকলের সামনে তলোয়ার দিয়ে সেই মায়াসীতাকে ‘বধ’ করে বানরদের প্রচেষ্টা বৃথা বলে ঘোষণা করে। মুহূর্তে বানরদল শোকে ভেঙে পালাতে থাকে, আর ইন্দ্রজিত্ গর্জে উল্লাস করে—এ মায়া যুদ্ধজয়ের জন্য নয়, মনোবল ভাঙার অস্ত্র।

35 verses | Hanuman, Indrajit (Ravaṇi)

Sarga 82

इन्द्रजित्-हनूमद्-युद्धं तथा निकुम्भिलायां होमः (Indrajit vs Hanuman; Indrajit’s Nikumbhila rite)

যুদ্ধকাণ্ডের ৮২তম সর্গে ইন্দ্রজিতের (মেঘনাদের) বজ্রগর্জন-সদৃশ নাদ শুনে বানর-প্রধানেরা ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। তখন মারুতাত্মজ হনুমান তাদের পলায়ন রোধ করে যুদ্ধোৎসাহ হারানোর জন্য তিরস্কার করেন, পুনরায় সারিবদ্ধ করে সম্মুখসমরে ফিরতে আদেশ দেন। উদ্দীপ্ত বানররা বৃক্ষ ও পর্বতশিখর তুলে গর্জন করতে করতে আক্রমণ করে; হনুমান অগ্নির ন্যায় শত্রুসেনার মধ্যে প্রবেশ করে বহু রাক্ষসকে নিধন করেন। হনুমান এক মহাশিলা রাবণিপুত্রের রথের দিকে নিক্ষেপ করেন; সারথি কৌশলে রথ সরিয়ে নেয়, ফলে শিলা ইন্দ্রজিতকে আঘাত না করে ভূমি বিদীর্ণ করে যেখানে পড়ে সেখানে সৈন্যদলকে চূর্ণ করে। বানরদের বৃক্ষ-শিলা-বৃষ্টি চলতে থাকে, আর ইন্দ্রজিত ও তার অনুচররা তীরবৃষ্টি এবং ত্রিশূল, খড়্গ, শক্তি, গদা প্রভৃতি অস্ত্রে নিকটযুদ্ধে প্রতিউত্তর দেয়। শত্রুপংক্তি রুদ্ধ করে হনুমান কৌশলগত কারণে বানরসেনাকে পশ্চাদপসরণ করতে বলেন—রামের কার্যই সর্বোচ্চ; ‘সীতা নিহত’ এই গুরুতর সংবাদ রামকে জানিয়ে সুগ্রীবসহ সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা উচিত। হনুমানকে রামের দিকে যেতে দেখে ইন্দ্রজিত নিকুম্ভিলায় রক্তহোমের অনुष্ঠানে গমন করে; সেখানে বিধিজ্ঞ রাক্ষসদের উপস্থিতিতে যজ্ঞাগ্নি সূর্যের ন্যায় দীপ্ত হয়ে ওঠে—যুদ্ধ ও আচারশক্তির সন্ধিক্ষণে সর্গের সমাপ্তি ঘটে।

28 verses | Hanumān, Indrajit (Rāvaṇi)

Sarga 83

त्र्यशीतितमः सर्गः (Sarga 83) — Hanumān Reports Sītā’s ‘Slaying’; Rāma Collapses; Lakṣmaṇa’s Counter-Discourse on Dharma and Artha

এই সর্গে রাক্ষস ও বানরের তীব্র যুদ্ধ-গর্জন শুনে শ্রীराम পশ্চিমদ্বারে হনুমানের সহায়তার জন্য ঋক্ষরাজ জাম্ববানকে সেনা পাঠাতে নির্দেশ দেন। যুদ্ধক্লান্ত বানরদের সঙ্গে হনুমান এসে এক ভয়াবহ সংবাদ জানায়—রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ তাদের চোখের সামনে কাঁদতে থাকা সীতাকে আঘাতে নিপাতিত করেছে। এ কথা শুনে শোকে আচ্ছন্ন রাম ছিন্নমূল বৃক্ষের মতো ভূমিতে লুটিয়ে পড়েন। বানরনায়কেরা তাঁকে তুলে পদ্ম-উৎপল-সুগন্ধি জল ছিটিয়ে শান্ত করেন, যেন অদম্য অগ্নিশিখা প্রশমিত করা হচ্ছে। তারপর লক্ষ্মণ ব্যথিত রামকে আলিঙ্গন করে তীক্ষ্ণ যুক্তিতে ধর্ম-সঙ্কট তুলে ধরেন—যদি ধর্মপরায়ণ, সংযমী ব্যক্তি দুঃখ ভোগ করে আর অধার্মিক সমৃদ্ধ হয়, তবে ধর্ম নিষ্ফল বলে মনে হয়। তিনি প্রশ্ন করেন, ধর্মের ফল কি প্রত্যক্ষ, নাকি নিয়তিই সব কিছুর কারণ, এবং রাজধর্মে ‘সত্যভাষণ’ সর্বত্র কীভাবে মানানসই। এরপর অর্থশাস্ত্রসুলভ বাস্তবতা দেখান—সমৃদ্ধিই সম্পর্ক, কর্ম ও গুণকে ধারণ করে; অর্থত্যাগে উদ্যোগ ভেঙে পড়ে ও ভুল বাড়ে। শেষে লক্ষ্মণ ইন্দ্রজিতজনিত শোককে পরাক্রমে নিবারণের সংকল্প করে রামকে তাঁর মহাত্ম্য স্মরণ করিয়ে কর্তব্যে দৃঢ় হতে অনুরোধ করেন।

44 verses | Rāma, Hanumān, Lakṣmaṇa

Sarga 84

निकुम्भिला-यज्ञविघ्नोपदेशः (Counsel to Disrupt the Nikumbhilā Rite)

এই সর্গে যুদ্ধক্ষেত্রে মানসিক সংকট ও সুবিবেচিত উপদেশে তার নিরসন দেখানো হয়েছে। সৈন্যবিন্যাস স্থির করে বিভীষণ ফিরে এসে দেখেন—রাম লক্ষ্মণের কোলের উপর শোকমূর্ছিত; হনুমানের সংবাদকে ইন্দ্রজিতের দ্বারা সীতাবধ বলে ভুল বোঝায় রাম মোহগ্রস্ত হয়েছেন। লক্ষ্মণ কারণ জানান, তখন বিভীষণ উত্তেজনা থামিয়ে বলেন—এ কথা অসম্ভব; রাবণ সীতাকে হত্যা করবে না। এটি বানরসেনাকে বিচলিত করতে রচিত মায়া-প্রতারণা। এরপর বিভীষণ মূল কৌশল প্রকাশ করেন—ইন্দ্রজিত নিকুম্ভিলা-ক্ষেত্রে হোমযজ্ঞ করতে যাচ্ছে; যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলে সে অতিদুর্জয় হবে, যুদ্ধে দেবতাদের কাছেও যেন অদৃশ্য। তাই বিলম্ব না করে সেনাকে অগ্রসর করতে হবে, মিথ্যা শোক ত্যাগ করতে হবে এবং লক্ষ্মণকে পাঠাতে হবে—যজ্ঞভঙ্গ করে ইন্দ্রজিতকে বধ্য করতে। এভাবে বিবেক ও সময়োচিত নীতিই শোক থেকে ধর্মসম্মত কর্মে সেতু রচনা করে।

23 verses | Lakshmana

Sarga 85

निकुम्भिला-यज्ञविघ्नः — Vibhishana’s Counsel and Lakshmana’s March to Nikumbhila

এই ৮৫তম সর্গে শোকে মুহ্যমান শ্রীराम ক্ষণিক বিভীষণের কথা ঠিকমতো ধরতে পারেন না; পরে মন সংযত করে তিনি স্পষ্টভাবে পুনরায় বলতে অনুরোধ করেন। বিভীষণ জানান—বানরসেনা যথাযথভাবে ভাগ করে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করা হয়েছে। তিনি রামকে বলেন, দুর্বলকারী উদ্বেগ ত্যাগ করুন, কারণ তা শত্রুপক্ষের সাহস বাড়ায়; সীতাকে উদ্ধার ও রাক্ষসদের বিনাশের জন্য নতুন উদ্যমে উদ্যোগী হতে হবে। তারপর বিভীষণ জরুরি গোপন সংবাদ দেন—রাবণিপুত্র ইন্দ্রজিত নিকুম্ভিলায় যজ্ঞ করতে গেছে। সেই যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলে বরপ্রভাবে রাম-পক্ষ কার্যত সর্বনাশের মুখে পড়বে; যজ্ঞে বিঘ্ন না ঘটলে রামকেও বধ করা সম্ভব—এমন দুর্বলতা সেই বরের সঙ্গে যুক্ত। অতএব সিদ্ধান্ত হয়—লক্ষ্মণকে অবিলম্বে প্রেরণ করতে হবে; হনুমানের নেতৃত্বে সমগ্র বানরসেনা তাঁর সঙ্গে থাকবে, জাম্ববান রক্ষাকর্তা হবেন, আর মায়াবিদ্যায় পারদর্শী বিভীষণ সহায়তার জন্য পশ্চাতে অনুসরণ করবেন। রাম ইন্দ্রজিতের ব্রহ্মাস্ত্র-প্রয়োগ ও মায়াকৌশল স্মরণ করে অভিযান অনুমোদন করেন। লক্ষ্মণ অস্ত্র ধারণ করে রামকে প্রণাম করেন, তৎক্ষণাৎ কর্মসিদ্ধির প্রতিজ্ঞা করে দ্রুত নিকুম্ভিলার দিকে অগ্রসর হন; তিনি ভয়ংকর রাক্ষস-ব্যূহে এমনভাবে প্রবেশ করেন যেন অন্ধকারের আবরণ।

36 verses | Rama, Lakshmana

Sarga 86

इन्द्रजितः कर्माननुष्ठानात् उत्थाय हनूमन्तं प्रति प्रस्थानम् / Indrajit Abandons the Unfinished Rite and Moves Against Hanuman

তখন বিভীষণ লক্ষ্মণকে কার্যোপযোগী উপদেশ দিলেন—মেঘ-শ্যাম রাক্ষসসেনাকে দ্রুত ভেঙে দাও, যাতে রাবণপুত্র ইন্দ্রজিত্ প্রকাশ্যে আসে এবং তার অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তাকে আঘাত করা যায়। এরপর ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হল; আকাশ যেন বাণ, বৃক্ষ ও পর্বতশিখরে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। বানর ও ভল্লুকেরা স্বাভাবিক অস্ত্রেই প্রবল আক্রমণ চালাতে লাগল। নিজ সেনার আর্তনাদ শুনে দুর্জয় ইন্দ্রজিত্ অসমাপ্ত কর্ম ত্যাগ করে উঠল। সে অরণ্যের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে প্রস্তুত রথে আরোহণ করল এবং মেঘের দীপ্তি, রক্তচক্ষু ও মৃত্যুর ন্যায় ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হল। রাক্ষসদের দ্বারা লক্ষ্মণ পরিবেষ্টিত দেখে হনুমান বিশাল বৃক্ষ তুলে প্রলয়াগ্নির মতো শত্রুপংক্তি দগ্ধ করতে লাগলেন। সহস্র রাক্ষস ত্রিশূল, খড়্গ, শক্তি, লৌহদণ্ড, পরশু, ঘন, ভিন্দিপাল প্রভৃতি নানা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হনুমানের দিকে ধেয়ে এল। তখন ইন্দ্রজিত্ সারথিকে বানরশ্রেষ্ঠের দিকে রথ চালাতে আদেশ দিল এবং রথ থেকে বাণবৃষ্টি নামল। হনুমান সেই আঘাত সহ্য করে প্রত্যক্ষ আহ্বান জানালেন। বিভীষণ লক্ষ্মণকে সতর্ক করলেন—ইন্দ্রজিত্ হনুমানের দিকে অগ্রসর; তৎক্ষণাৎ নিধন করো। লক্ষ্মণ রথস্থ ইন্দ্রজিত্‌কে চিনে পাল্টা বাণবৃষ্টি শুরু করলেন।

35 verses

Sarga 87

न्यग्रोध-प्रवेश-निवारणम् (Preventing Indrajit’s Banyan-Tree Rite) / Indrajit Confronts Vibhishana

বিভীষণ লক্ষ্মণকে যথাযথ উপদেশ দিয়ে তাকে এক বনাঞ্চলে নিয়ে যান এবং মেঘ-শ্যাম, ভয়ংকর এক ন্যগ্রোধ (বটগাছ) দেখান। তিনি জানান, ইন্দ্রজিত সেখানে হোম-অর্ঘ্য নিবেদন করে মন্ত্রবলে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং যুদ্ধে প্রাণঘাতী সুবিধা লাভ করে; তাই ইন্দ্রজিত ন্যগ্রোধে প্রবেশ করার আগেই লক্ষ্মণকে জ্বলন্ত বাণে তার রথ, অশ্ব ও সারথিকে ধ্বংস করতে হবে। লক্ষ্মণ ধনুক টানটান করে, টঙ্কার তুলে, সেই মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকেন। তখন দীপ্তিময় রথে ইন্দ্রজিত আবির্ভূত হয়ে সম্মুখযুদ্ধের আহ্বান জানায়। এরপর কঠোর বাক্যবিনিময় ঘটে—ইন্দ্রজিত বিভীষণকে স্বজন ত্যাগ করে ‘অপরের’ শরণ নেওয়ার জন্য তিরস্কার করে এবং বলে, দোষ থাকলেও নিজের পক্ষ ছাড়া উচিত নয়। বিভীষণ ধর্মকে আশ্রয় করে বলেন—রাক্ষসকুলে জন্ম হলেও তিনি নিষ্ঠুর কর্ম ত্যাগ করেছেন; অধর্মের সঙ্গ বিষধর সাপ ঝেড়ে ফেলা বা জ্বলন্ত গৃহ ত্যাগ করার মতো। তিনি রাবণের দোষ—চৌর্য, পরস্ত্রীহরণ, মিত্রে অবিশ্বাস, ঋষিহত্যা, দেবদ্বেষ, অহংকার, ক্রোধ ও বৈরভাব—উল্লেখ করে বলেন, এগুলিই মেঘে পর্বতঢাকা মতো তার কল্যাণ ঢেকে দিয়েছে এবং লঙ্কার বিনাশ সন্নিকট। শেষে তিনি সতর্ক করেন—ইন্দ্রজিত মৃত্যুপাশে আবদ্ধ; লক্ষ্মণের বাণের সম্মুখীন হয়ে সে জীবিত ফিরবে না।

30 verses | Vibhishana, Lakshmana, Indrajit (Meghanada)

Sarga 88

इन्द्रजित्–लक्ष्मण संवादः तथा युद्धप्रवृत्तिः (Indrajit and Lakshmana: War-Boasts, Rebuke, and the Clash)

এই সর্গে ইন্দ্রজিৎ ও লক্ষ্মণের বাদানুবাদ এবং পরবর্তী তীরন্দাজি যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। বিভীষণের পরামর্শ শুনে ইন্দ্রজিৎ রাগে অন্ধ হয়ে কালো ঘোড়ায় টানা সুসজ্জিত রথে চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। তিনি লক্ষ্মণকে যমালয়ে পাঠানোর হুমকি দেন এবং বলেন যে তাঁর মৃতদেহ শকুনে খুবলে খাবে। তিনি মূলত ভয় দেখিয়ে লক্ষ্মণকে দমানোর চেষ্টা করেন। লক্ষ্মণ নির্ভীকভাবে এবং ক্ষাত্র-ধর্ম মেনে এর উত্তর দেন। তিনি বলেন, কেবল মুখের কথায় নয়, কাজের মাধ্যমেই বীরত্ব প্রমাণিত হয়। তিনি আরও বলেন যে, অদৃশ্য হয়ে যুদ্ধ করা চোরের লক্ষণ, প্রকৃত বীরের নয়। এরপর উভয়ের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। ইন্দ্রজিৎ বিষধর সাপের মতো তীক্ষ্ণ তীর নিক্ষেপ করেন, কিন্তু লক্ষ্মণ 'ধূমবিহীন অগ্নি'র মতো দেদীপ্যমান থাকেন। লক্ষ্মণ ইন্দ্রজিতের বুকে পাঁচটি তীর বিদ্ধ করেন এবং ইন্দ্রজিৎ তিনটি তীরের মাধ্যমে পাল্টা আঘাত করেন। দুই মহাবীরের এই সমানে-সমান যুদ্ধ গ্রহ-নক্ষত্রের সংঘাতের মতো প্রতীয়মান হয়।

36 verses

Sarga 89

इन्द्रजित्–लक्ष्मणयोर् घोरः शरयुद्धः (Indrajit and Lakshmana’s Fierce Exchange of Arrows)

এই ৮৯তম সর্গে লক্ষ্মণ ও ইন্দ্রজিতের দ্বন্দ্ব বাক্-যুদ্ধ ও শর-যুদ্ধের পালাবদলে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ক্রোধ সংযত রেখে লক্ষ্মণ নিখুঁত লক্ষ্যভেদে বাণ নিক্ষেপ করেন; তাঁর ধনুকের টঙ্কার রাক্ষসনায়কের মনে অস্থিরতা আনে। বিভীষণ ইন্দ্রজিতের মুখের ফ্যাকাশে ভাবকে মানসিক ভাঙনের লক্ষণ বলে বুঝতে পারেন। ইন্দ্রজিত পূর্বযুদ্ধে লক্ষ্মণের অচেতন হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে বিদ্রূপে উসকায়, স্মৃতিকে চ্যালেঞ্জ করে এবং ‘যমালয়’-এর পথে আহ্বান জানায়। তারপর উভয়ের মধ্যে বাণবৃষ্টি শুরু হয়—লক্ষ্মণ বাণ বর্ষণ করেন, ইন্দ্রজিত লক্ষ্মণ, হনুমান ও বিভীষণকে বিদ্ধ করে; ঢাল-কবচ ও ধ্বজচিহ্ন ভেঙে চুরমার হয়। কাহিনিতে সহনশীলতার ওপর জোর—কেউ সরে যায় না, ক্লান্তিও প্রকাশ পায় না। আকাশ বাণের জালে আচ্ছন্ন, যেন প্রলয়কালের মেঘ। রক্তধারা জলপ্রপাতের মতো ঝরে, আহত দেহ ফুলে-ভরা বৃক্ষের মতো দীপ্ত—এ এক যুদ্ধশিক্ষা: স্থৈর্য, নির্ভুলতা এবং মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা না ছাড়া। শেষে বিভীষণ অজেয়প্রায় লক্ষ্মণকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন, মিত্রধর্ম ও রণসেবার বার্তা দিয়ে।

42 verses | Indrajit (Rāvaṇi), Lakshmana, Vibhishana

Sarga 90

इन्द्रजित्-लक्ष्मणयुद्धम् तथा वानरप्रोत्साहनम् (Indrajit–Lakshmana Battle and the Rallying of the Vanaras)

যুদ্ধকাণ্ডের ৯০তম সর্গে লঙ্কাযুদ্ধের এক নির্ণায়ক পর্যায় দুইটি স্রোতে এগোয়—(১) বিভীষণের কৌশলগত উৎসাহবাণী দ্বারা বানরনেতাদের উদ্দীপনা বৃদ্ধি এবং (২) লক্ষ্মণ ও ইন্দ্রজিত্‌ (রাবণি)-এর ভয়ংকর দ্বন্দ্বযুদ্ধের তীব্রতা। লক্ষ্মণ ও ইন্দ্রজিত্‌ উভয়েই জয়ের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যেন দুই যুদ্ধোন্মত্ত গজ পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত; বিভীষণ অগ্রভাগে অবস্থান করে যুদ্ধ প্রত্যক্ষ ও নির্দেশ প্রদান করেন। বিভীষণ ইতিপূর্বে নিহত প্রধান প্রধান রাক্ষস সেনাপতিদের নাম উল্লেখ করে অবশিষ্ট সংঘর্ষকে এক সংকীর্ণ লক্ষ্যে কেন্দ্রীভূত করেন—রাক্ষস প্রতিরোধের প্রধান স্তম্ভ এখন ইন্দ্রজিত্‌, রাবণ কেবল শেষ ব্যতিক্রম। রামের পক্ষে ভাইয়ের পুত্রকে আঘাত করতে হওয়ার ধর্মসংকট ও আত্মীয়বধের নৈতিক মূল্যও তিনি প্রকাশ করেন। বানরশ্রেষ্ঠরা এই আহ্বানে আরও উল্লসিত হয়ে রণোৎসাহে জেগে ওঠে। এরপর যুদ্ধচিত্র আরও উগ্র হয়—জাম্ববান্‌ বানরসেনাসহ অস্ত্রধারী রাক্ষসদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রবৃত্ত হন; হনুমান লক্ষ্মণকে রথ থেকে নামিয়ে উপড়ে আনা শালবৃক্ষ দিয়ে রাক্ষস সারি বিধ্বস্ত করেন। লক্ষ্মণ–ইন্দ্রজিত্‌-এর শরবৃষ্টি এত দ্রুত যে ধনুর্হস্তের গতি চোখে পড়ে না; আকাশ বাণজালে আচ্ছন্ন হয়, অন্ধকার ও অমঙ্গললক্ষণ ঘনীভূত হয়, আর যুদ্ধধ্বনি দেবাসুর-সংগ্রামের মতো প্রতীয়মান হয়। তারপর মোড় ঘোরে—সৌমিত্রি ইন্দ্রজিতের চার অশ্বকে বিদ্ধ করেন; ভল্লবাণে সারথির শিরচ্ছেদ হয়; ইন্দ্রজিত ক্ষণকালের জন্য নিজেই সারথির কাজ করেন। বানরনেতারা লাফিয়ে উঠে অশ্ববধ করে, ফলে ইন্দ্রজিতকে পদযুদ্ধে নামতে হয়। লক্ষ্মণ ঘন বাণবর্ষণে তাকে প্রতিহত করেন; ইন্দ্রজিতের বিষণ্ণতা দেখে বানরদের মনোবল বৃদ্ধি পায়। সর্গের শেষে ইন্দ্রজিত পদে অগ্রসর হয় এবং লক্ষ্মণ তার নব শরবৃষ্টিকে রোধ করে তার পতনের দিকে গতি সুদৃঢ় করেন।

54 verses | Vibhīṣaṇa

Sarga 91

इन्द्रजित्-वधः (The Slaying of Indrajit)

যুদ্ধকাণ্ডের ৯১তম সর্গে সৌমিত্র লক্ষ্মণ ও রাবণিপুত্র ইন্দ্রজিতের মধ্যে নির্ণায়ক দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয়। ইন্দ্রজিত স্বর্ণালঙ্কৃত রথ প্রস্তুত করে পুনরায় রণাঙ্গনে প্রবেশ করে লক্ষ্মণ ও বিভীষণকে তীব্র বাণবৃষ্টিতে আক্রমণ করে; বানর-নেতাদেরও সে অসাধারণ লাঘব ও শরবৃষ্টির প্রদর্শনে বিপর্যস্ত করে। লক্ষ্মণ তার ধনুকগুলি ছিন্ন করেন, বারবার বিদ্ধ করে আহত করেন এবং সারথিকে নিধন করে রথের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেন; ফলে অশ্বগুলি দিশাহীন হয়ে ঘুরতে থাকে। বিভীষণও সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ক্রোধ ও নিয়তির তাড়নায় ইন্দ্রজিত প্রথমে অগ্ন্যস্ত্র, পরে অসুরাস্ত্র প্রয়োগ করে—যা অস্ত্রবৃষ্টির ন্যায় প্রকাশ পায়। লক্ষ্মণ সৌর্য ও মাহেশ্বর প্রতিকারাস্ত্রে সেগুলি প্রতিহত করেন; দেবগণ প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে তাঁকে রক্ষা করেন। শেষে লক্ষ্মণ অজেয় ঐন্দ্রাস্ত্র ধারণ করে সত্যবচনে তার কার্যকারিতা অভিষিক্ত করে নিক্ষেপ করেন; তাতে ইন্দ্রজিতের মস্তক ছিন্ন হয় এবং লোকত্রাসের অবসান ঘটে। দেবদুন্দুভি ধ্বনিত হয়, পুষ্পবৃষ্টি নামে, আর রাক্ষসসেনা ভেঙে পালিয়ে যায়।

97 verses

Sarga 92

युद्धकाण्डे द्विनवतितमः सर्गः — Indrajit’s Fall, Rama’s Embrace, and Sushena’s Battlefield Healing

এই সর্গে ইন্দ্রজিতের পতনের পরপরই ঘটনার বিবরণ আছে। রক্তমাখা ও শরবিদ্ধ লক্ষ্মণ শ্রীरामকে ইন্দ্রজিত-বধের ভয়ংকর সংবাদ জানান; বিভীষণও রাক্ষসকুমারের মস্তকচ্ছেদের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তখন শ্রীराम লক্ষ্মণের কীর্তি বৃদ্ধি করে প্রকাশ্যে প্রশংসা করেন এবং ভ্রাতৃস্নেহে তাঁকে কোলে টেনে নিয়ে বারবার শরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত দেহ পরীক্ষা করে সান্ত্বনা দেন। শ্রীराम এই ঘটনাকে রাবণের যুদ্ধক্ষমতার নির্ণায়ক ক্ষয় বলে মনে করেন এবং বলেন—শোকাকুল রাবণ অচিরেই বৃহৎ বাহিনী নিয়ে বেরিয়ে আসবে; তিনি তাকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করতে প্রস্তুত। এরপর যুদ্ধক্ষেত্রের চিকিৎসা ও মিত্রসেনার কল্যাণের প্রসঙ্গ আসে—শ্রীराम সুṣeṇa-কে ডেকে লক্ষ্মণ, বিভীষণ এবং আহত ঋক্ষ ও বানরযোদ্ধাদের শর অপসারণ ও চিকিৎসার নির্দেশ দেন। সুṣeṇa নাসারন্ধ্র দিয়ে গ্রহণযোগ্য পরম ঔষধ প্রয়োগ করেন; তৎক্ষণাৎ লক্ষ্মণ বিশল্য, বেদনাহীন ও সুস্থ হয়ে ওঠেন। মিত্রনায়কেরা আনন্দিত হন, এবং এই প্রায় অসম্ভব কৃত্যের প্রশংসায় সমগ্র সেনার মনোবল প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায়।

28 verses | Lakshmana, Vibhishana, Rama

Sarga 93

Sarga 93: Rāvaṇa’s Grief and Fury after Indrajit’s Fall; Move to Slay Vaidehī and Ministerial Restraint

এই সর্গে পৌলস্ত্য রাবণের মন্ত্রীরা লক্ষ্মণের হাতে—বিভীষণের সহায়তায়—মেঘনাদ/ইন্দ্রজিতের নিহত হওয়ার শোকসংবাদ জানায়। সংবাদ শুনে রাবণ প্রথমে মূর্ছিত হয়, তারপর পুত্রশোকে বিলাপ করে, এবং শেষে তার ক্রোধ প্রলয়সম হয়ে ওঠে। তার ভ্রূকুটি প্রলয়-সমুদ্রের মতো, মুখ থেকে অগ্নি-ধূম্র নির্গমনের মতো, আর অশ্রু জ্বলন্ত প্রদীপের তেলের মতো ঝরে—এভাবে উপমায় তার মানসিক অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে। ব্রহ্মদত্ত অখণ্ড কবচ ও ভয়ংকর ধনুকের কথা স্মরণ করে সে বরবল ও দিব্যাস্ত্রের নিরাপত্তা ঘোষণা করে, রাক্ষসদের যুদ্ধোৎসাহ পুনরুজ্জীবিত করে এবং রাম-লক্ষ্মণের বিরুদ্ধে নতুন আক্রমণের সংকল্প প্রকাশ করে। কিন্তু শোক প্রতিশোধকে ভুল পথে টেনে নিয়ে যায়—সে বৈদেহী সীতাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়ে খড়্গ হাতে অশোকবনের দিকে ধাবিত হয়; রাক্ষসরা তাকে অজেয় মনে করে উল্লসিত হয়। এরপর সীতার দৃষ্টিকোণ আসে—ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে হনুমানের পূর্বপ্রস্তাবিত উদ্ধার গ্রহণ না করার জন্য নিজেকে ধিক্কার দেয় এবং রাম ও কৌশল্যার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়। তখন ধর্মপরায়ণ মন্ত্রী সুপার্শ্ব রাবণকে নিবৃত্ত করে—নারীহত্যা অধর্ম; ক্রোধের লক্ষ্য হওয়া উচিত যুদ্ধক্ষেত্র, সীতা নয়। উপদেশ মান্য করে রাবণ ফিরে আসে এবং পুনরায় সভার দিকে অগ্রসর হয়—ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে সরে সামষ্টিক যুদ্ধধর্মে সাময়িক প্রত্যাবর্তন ঘটে।

68 verses | Rāvaṇa, Sītā (Vaidehī/Maithilī), Suparśva (amātya)

Sarga 94

रावणस्य सभाप्रवेशः — रामस्य शरवृष्ट्या राक्षससेनाविनाशः (Ravana Enters Council; Rama’s Arrow-Storm Destroys the Rakshasa Host)

সর্গ ৯৪-এ রাবণ শোক ও ক্রোধে দগ্ধ হয়ে সভায় প্রবেশ করে এবং সেনানায়কদের কাছে করজোড়ে নিবেদন করে—আক্রমণকে একটিমাত্র লক্ষ্যে, অর্থাৎ রামের উপর, কেন্দ্রীভূত করতে হবে। সে হাতি, ঘোড়া, রথ ও পদাতিক—চার বাহিনীর সম্মিলিত মোতায়েনের আদেশ দেয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়। বাণ, গদা, খড়্গ, পরশু, গাছ ও শিলা পরস্পরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়; রণক্ষেত্র ধুলো ও রক্তে আচ্ছন্ন—রক্তধারা যেন নদী, দেহগুলি ভাসমান কাষ্ঠ, আর যুদ্ধযন্ত্রগুলি তীর ও বৃক্ষের মতো দৃশ্যমান। আহত বানররা রামের শরণ নেয়। তখন রাম রাক্ষসসেনার মধ্যে প্রবেশ করে অপ্রতিরোধ্য বাণবৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গন্ধর্ব-সম্পর্কিত পরমাস্ত্র প্রয়োগ করেন। তাঁর গতিতে রাক্ষসদের দৃষ্টি বিভ্রান্ত হয়—তারা বহু রাম দেখতে পায়, রামকে প্রত্যক্ষ করতে পারে না, আর মোহে ক্রুদ্ধ হয়ে পরস্পরকেই আঘাত করে। অল্প সময়ের মধ্যেই রাক্ষসবাহিনীর বিপুল বিনাশ ঘটে; অবশিষ্টরা লঙ্কায় পলায়ন করে। দেবগণ রামের প্রশংসা করেন, এবং রাম সুগ্রীব, বিভীষণ, হনুমান, জাম্ববান, মৈন্দ ও দ্বিবিদকে বলেন—এমন দিব্য অস্ত্রবল কেবল তাঁর ও ত্র্যম্বক (শিব)-এরই অধিকার।

39 verses | Ravana, Rama

Sarga 95

युद्धकाण्डे पञ्चनवतितमः सर्गः (Sarga 95: Lamentation in Laṅkā and the Causal Chain of Enmity)

এই সর্গে যুদ্ধবিধ্বংসের হিসাব ও তার কারণ-পরম্পরার আত্মসমালোচনামূলক বিচার দেখা যায়। রাবণের প্রেরিত অগ্নিবর্ণ অশ্বযুক্ত বাহিনী, পতাকাবিশিষ্ট স্বর্ণালঙ্কৃত রথ, লৌহদণ্ডধারী যোদ্ধা ও মায়াবী রাক্ষসেরা—সবাই রামের তীক্ষ্ণ, দীপ্ত, স্বর্ণভূষিত শরবৃষ্টিতে নিপাতিত হয়; রামের অক্লিষ্ট-কর্মতা, অর্থাৎ অক্লান্ত কার্যসাধন, বিশেষভাবে প্রতিভাত। তারপর রাক্ষসী নারীরা ও অবশিষ্ট জনসমাজ একত্র হয়ে স্বামী-পুত্র-স্বজনের জন্য বিলাপ করে এবং প্রশ্ন তোলে—এই শত্রুতার শৃঙ্খল কোথা থেকে শুরু হল? শূর্পণখার রামের প্রতি দুর্ভাগ্যজনক কামনা, তার নিন্দিত আক্রমণ, তার ফলেই খর-দূষণের বিনাশ, এবং শেষে সীতাহরণ। রামের বীর্যের “পর্যাপ্ত প্রমাণ” হিসেবে বিরাধবধ, জনস্থান-অভিযান, খর-দূষণ-ত্রিশিরা-কবন্ধ- বালিবধ এবং সুগ্রীবের পুনঃপ্রতিষ্ঠা স্মরণ করা হয়; বিভীষণের ধর্মসম্মত উপদেশ রাবণ প্রত্যাখ্যান করেছে—এ কথাও উচ্চারিত। সমষ্টিগত ভয় ঘনীভূত হয়—লঙ্কা যেন শ্মশানভূমি, অমঙ্গল লক্ষণ দেখা দেয়, আর রামকে রুদ্র, বিষ্ণু, ইন্দ্র কিংবা অন্তক (মৃত্যু) সদৃশ বলা হয়। ব্রহ্মার বরস্মরণে বোঝানো হয়—দেব-দানব-রাক্ষসদের থেকে রাবণ নিরাপদ ছিল, কিন্তু মানুষের থেকে নয়; তাই মানবজন্ম রামই তার পতনের উপায়। শেষে নারীরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে করুণ ক্রন্দনে ভেঙে পড়ে—যুদ্ধ এখানে শুধু সামরিক পরাজয় নয়, নৈতিক বিচার ও কর্মফলের প্রতিফলন।

41 verses

Sarga 96

युद्धाय रावणस्य निर्याणं तथा उत्पातदर्शनम् (Ravana’s Mobilization for War and the ظهور of Fatal Portents)

লঙ্কাজুড়ে বিলাপধ্বনি শুনে রাবণ নগরের ব্যাকুলতা ও যুদ্ধের গৃহস্থ-জীবনে পড়া গভীর আঘাত উপলব্ধি করে ক্ষণকাল থেমে যায়। তারপর ক্রোধে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে মহোদর, মহাপার্শ্ব ও বিরূপাক্ষকে দ্রুত আদেশ দেয়—অবশিষ্ট নিশাচরদের যুদ্ধের জন্য সমবেত করো। দম্ভভরা শপথে সে ঘোষণা করে—রাঘব ও লক্ষ্মণকে যমালয়ে পাঠাব, খর, কুম্ভকর্ণ, প্রহস্ত ও ইন্দ্রজিতের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব, আর মেঘসম বাণবৃষ্টিতে বানরসেনাকে ধ্বংস করব। রাক্ষসরা নানাবিধ অস্ত্র ধারণ করে রথে চড়ে গর্জন করতে করতে অভিযানে বেরিয়ে পড়ে। রাবণ ধনু উঁচিয়ে দীপ্তিময় হয়ে অগ্রসর হতেই ভয়াবহ অমঙ্গললক্ষণ দেখা দেয়—সূর্য ম্লান হয়, দিক অন্ধকারে ঢেকে যায়, উল্কাপাত ও রক্তবৃষ্টি ঘটে, পশুপক্ষী অশুভ ধ্বনি তোলে, এবং তার বাম চোখ ও বাহু কাঁপে। তবু সে থামে না; তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়, আর তার স্বর্ণপুচ্ছ বাণ বানরসারিতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি করে।

44 verses

Sarga 97

सप्तनवतितमः सर्गः (Yuddha Kāṇḍa 97): Sugrīva’s Onslaught and the Fall of Virūpākṣa

এই সর্গে রাবণের প্রচণ্ড বাণবৃষ্টির পর যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে ওঠে। জ্বলন্ত তীরের আঘাত সহ্য করতে না পেরে বানররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, আর ভূমি ছিন্নভিন্ন দেহে আচ্ছন্ন হয়। বহু বানর-যোদ্ধাকে বিপর্যস্ত করে রাবণ কৌশল বদলে রাঘব (শ্রীরাম)-এর দিকে অগ্রসর হয়। এ দৃশ্য দেখে সেনাপতি সুগ্রীব ছত্রভঙ্গ বাহিনীকে স্থির রাখতে সুসেণকে ব্যূহ-রক্ষায় নিয়োগ করেন এবং নিজে গাছকে অস্ত্র করে সামনে এগিয়ে যান; অন্যান্য ইউথপতিরাও শিলা ও বৃক্ষ নিয়ে সঙ্গে চলেন। সুগ্রীব মেঘের শিলাবৃষ্টির মতো পাথর বর্ষণ করে রাক্ষস-সারিকে বিধ্বস্ত করেন, ফলে তারা টলমল করতে থাকে। তখন বিরূপাক্ষ নামক রাক্ষস-বীর নিজের নাম ঘোষণা করে মত্ত হস্তীর পিঠে চড়ে সুগ্রীব ও বানর-অগ্রভাগে তীর নিক্ষেপ করে রাক্ষসদের মনোবল জাগায়। বৃক্ষাঘাত, শিলানিক্ষেপ, খড়্গাঘাত, মুষ্টি ও করতল-প্রহারে উভয়ের তীব্র দ্বন্দ্ব চলে। শেষে সুগ্রীবের বজ্রসম করতলাঘাতে বিরূপাক্ষ ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে; রক্ত জলপ্রপাতের মতো গড়িয়ে পড়ে। বানররা উল্লসিত হয়, আর রাক্ষস-সেনা স্তম্ভিত ও বিশৃঙ্খল হয়ে যায়।

36 verses

Sarga 98

महोदरवधः (The Slaying of Mahodara)

যুদ্ধকাণ্ডের অষ্টনবতিতম সর্গে মহোদরবধ বর্ণিত হয়েছে। নিজের সেনাবল ক্ষয় ও বিরূপাক্ষের পতনে ক্রুদ্ধ রাবণ মহোদরকে ‘বিজয়ের আশা’ বলে মনে করে রাজানুগ্রহের ঋণ শোধ করতে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শনের আদেশ দেন। মহোদর পতঙ্গের মতো অগ্নিতে ঝাঁপিয়ে বানরসেনার মধ্যে প্রবেশ করে বহু বানরকে নিধন করে এবং সৈন্যদলকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বানররা বিপর্যস্ত হলে সুগ্রীব তাদের আশ্বস্ত করে স্বয়ং মহোদরের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ক্রমে শিলানিক্ষেপ, শালবৃক্ষকে গদার মতো ব্যবহার, পরিঘ (লোহার দণ্ড) প্রয়োগ, গদাযুদ্ধ এবং শেষে খড়্গ-ঢালযুদ্ধ—এভাবে সংঘর্ষ তীব্রতর হয়। গ্রীষ্মমধ্যাহ্নে শুকিয়ে যাওয়া হ্রদের মতো সেনার ক্লান্তি এবং বিদ্যুৎসহ মেঘের মতো দুই যোদ্ধার গর্জন—এই উপমায় যুদ্ধের রুদ্রতা প্রকাশ পায়। শেষে মহোদর যখন দেহে গেঁথে থাকা খড়্গ টেনে বের করতে ব্যস্ত, তখন সুগ্রীব তার মস্তক ছিন্ন করেন। এতে রাক্ষসদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে তারা পলায়ন করে, বানররা উল্লাসে জয়ধ্বনি তোলে, আর রাবণের ক্রোধ আরও গভীর হয়—যুদ্ধের মোড় ঘোরানো ও সংকটে নেতৃত্বধর্মের নৈতিক দৃষ্টান্তরূপে এই অধ্যায় প্রতিষ্ঠিত।

38 verses

Sarga 99

Mahāpārśva-vadhaḥ — The Slaying of Mahāpārśva (Angada’s Counterstrike)

সুগ্রীবের হাতে মহোদর নিহত হলে তা দেখে মহাপার্শ্বর ক্রোধ প্রবল হয়ে ওঠে। সে ভয়ংকর শরবৃষ্টিতে অঙ্গদের বানরসেনাকে বিপর্যস্ত করে—কোথাও অঙ্গচ্ছেদ, কোথাও গভীর ক্ষত; অগ্রভাগ কিছুক্ষণ হতাশ ও বিচলিত হয়ে পড়ে। এই মনোবলভঙ্গ দেখে অঙ্গদ এগিয়ে এসে লৌহপরিঘ নিক্ষেপ করে মহাপার্শ্বকে রথ থেকে ফেলে দেয়; একই সঙ্গে জাম্ববান এক বিশাল শিলা ছুড়ে রাক্ষসদের রথসারিতে আঘাত করে, অশ্ব হত্যা করে রথ ভেঙে দেয়। চেতনা ফিরে পেয়ে মহাপার্শ্ব আবার আক্রমণ নবীকরণ করে—অঙ্গদকে বিদ্ধ করে, জাম্ববান ও গবাক্ষকেও আহত করে। তখন অঙ্গদ ভয়ংকর পরিঘ তুলে ঘুরিয়ে মহাপার্শ্বকে আঘাত করে এবং কাছে গিয়ে করতলাঘাতও করে। মহাপার্শ্ব পাল্টা যুদ্ধকুঠার নিক্ষেপ করলে অঙ্গদ তা এড়িয়ে যায়। শেষে অঙ্গদ বক্ষ-হৃদয়স্থলে লক্ষ্য করে এক নির্ণায়ক মুষ্টিপ্রহার করে; মহাপার্শ্বর হৃদয় বিদীর্ণ হয় এবং সে রাক্ষস মৃত হয়ে পতিত হয়। বানররা বিজয়নাদ করে, লঙ্কার প্রাসাদসমূহ কেঁপে ওঠে; সেই কোলাহল শুনে রাবণ পুনরায় যুদ্ধে মনোনিবেশ করে—যুদ্ধের গতি ও মানসিক চাপ দুটোই তীব্রতর হয়।

26 verses

Sarga 100

रावण–रामयुद्धप्रारम्भः (The Intensification of the Rama–Ravana Duel)

মহোদর, মহাপার্শ্ব ও মহাবলী বিরূপাক্ষ নিহত হলে রাবণ প্রবল ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠে এবং সারথিকে দ্রুত অগ্রসর হতে আদেশ দেয়। তার রথের গর্জনে যেন দিক্‌বিদিক্‌ কেঁপে ওঠে। তখন সে ব্রহ্মদত্ত তামসাস্ত্র সংযোজিত করে; অন্ধকারে রণক্ষেত্র আচ্ছন্ন হয়, বানরসেনা দগ্ধ ও বিহ্বল হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়, আর ভূমি জুড়ে ধূলির ঘূর্ণি উঠতে থাকে। পলায়মান বানরদের দেখে এবং রাবণের অগ্রগতি বুঝে শ্রীराम লক্ষ্মণসহ দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন—দুজনকে বিষ্ণু ও ইন্দ্রের ন্যায় মহাতেজস্বী বলা হয়েছে, আর রামের ধনুক যেন আকাশ স্পর্শ করে। এরপর উভয় পক্ষের অবিরাম শরবর্ষা শুরু হয়—আকাশেই বাণ ছেদন, হাতের অসামান্য কৌশল, রথের বৃত্তাকার গতি; দৃশ্য যেন রাহু সূর্য-চন্দ্রের নিকটে এসেছে, আর আকাশ বিদ্যুৎরেখাযুক্ত মেঘে ঘন হয়ে উঠেছে। রাবণ নারাচের বৃষ্টি দিয়ে রামের ললাট লক্ষ্য করে; রাম নির্বিকারভাবে তা সহ্য করে রৌদ্রাস্ত্র প্রয়োগ করেন, কিন্তু রাবণের কবচ আঘাত শোষণ করে। তখন রাবণ রাক্ষসাধিষ্ঠিত মায়াবী অস্ত্রজাল নিক্ষেপ করে—পশুমুখ ও পঞ্চশির সাপসদৃশ বাণ; রাম অগ্ন্যধিষ্ঠিত সূর্য, চন্দ্র, কেতু, গ্রহ ও বিদ্যুৎসম ক্ষেপণাস্ত্রে সেগুলি বিদীর্ণ করে সহস্র খণ্ডে ভেঙে দেন। শত্রু অস্ত্র নিবারিত দেখে বানরনায়কেরা আনন্দিত হয়, আর সুগ্রীব দাশরথির অক্লান্ত যুদ্ধক্ষমতার জয়ধ্বনি করেন।

51 verses | Rāvaṇa, Sugrīva

Sarga 101

शक्तिप्रहारः (Ravana’s Shakti Javelin and Lakshmana’s Wounding)

এই সর্গে রাম ও রাবণের মধ্যে যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করে। রাম রাবণের নিক্ষিপ্ত দিব্য অস্ত্রগুলিকে প্রতিহত করেন। এরপর লক্ষ্মণ রাবণের রথের ধ্বজা ও সারথিকে বিনাশ করেন এবং বিভীষণ গদাঘাতে রাবণের অশ্বগুলিকে হত্যা করেন। ক্রুদ্ধ রাবণ বিভীষণকে লক্ষ্য করে এক জ্বলন্ত শক্তি নিক্ষেপ করেন, কিন্তু লক্ষ্মণ তা মাঝপথে খণ্ডন করেন। তখন রাবণ ময়দানব নির্মিত আটটি ঘণ্টা যুক্ত এক ভয়ানক মহাশক্তি লক্ষ্মণের প্রতি নিক্ষেপ করেন, যা তাঁর বক্ষভেদ করে এবং তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। রাম শোকাতুর হয়েও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে লক্ষ্মণের বক্ষ থেকে সেই শক্তি উৎপাটন করে ভেঙে ফেলেন। তিনি হনুমান ও সুগ্রীবকে লক্ষ্মণের রক্ষার নির্দেশ দিয়ে প্রতিজ্ঞা করেন যে, আজ পৃথিবী হয় রাবণহীন হবে, নতুবা রামহীন।

63 verses | Ravana, Rama

Sarga 102

लक्ष्मण-प्राणरक्षा: (Lakshmana’s Revival by the Herb-Mountain)

এই সর্গে যুদ্ধক্ষেত্রে এক গুরুতর চিকিৎসা-সংকট এবং তার ধর্মনৈতিক প্রতিধ্বনি বর্ণিত। রাবণের শক্তি (বল্লম)-আঘাতে লক্ষ্মণ রক্তাক্ত হয়ে নিস্তেজ পড়ে যান। তাঁকে দেখে শ্রীरामের সংযম ভেঙে যায়; ভাইকে হারালে বিজয়, জীবন, এমনকি যুদ্ধের উদ্দেশ্যও অর্থহীন—এমন শোকাকুল প্রশ্নে তিনি ডুবে যান। তখন বৈদ্য সুṣeণ যুক্তিসঙ্গত নির্ণয়ে রামকে সান্ত্বনা দেন—লক্ষ্মণের মুখে এখনও দীপ্তি আছে, হৃদয় ও অঙ্গে জীবনের লক্ষণ বিদ্যমান; তাই হতাশা ত্যাগ করতে বলেন। তিনি হনুমানকে ঔষধি-পর্বতে পাঠান চার মহৌষধি আনতে—সবর্‍ণকরণী, সावर্‍ণ্যকরণী, সঞ্জীবকরণী ও সন্ধানী। হনুমান পৃথক করে চিনতে না পেরে দক্ষিণ শিখরসহ পুরো পর্বতই উপড়ে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসেন। সুṣeণ ঔষধি সংগ্রহ করে পিষে নাসারন্ধ্র দিয়ে লক্ষ্মণকে প্রয়োগ করেন; বিদ্ধ অস্ত্রের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে লক্ষ্মণ উঠে দাঁড়ান। বানরনেতারা আনন্দিত হন; রাম অশ্রুসজল নয়নে লক্ষ্মণকে বুকে টেনে নেন। লক্ষ্মণ রামকে উপদেশ দেন—প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে রাবণবধ সম্পূর্ণ করুন; ব্যক্তিগত শোককে ধর্ম, প্রতিশ্রুতি-পালন ও লোকন্যায়ের অধীন স্থাপন করুন।

49 verses | Rama (Raghava), Sushena, Hanuman, Lakshmana (Saumitrि)

Sarga 103

ऐन्द्ररथप्रदानम् — Indra’s Chariot Offered to Rāma; The Duel Intensifies

এই সর্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—শ্রীराम ভূমিতে দাঁড়িয়ে, আর রাবণ রথে আরূঢ়; তাই দেবতা ও দিব্যসত্তারা বলেন, এ যুদ্ধ সমান নয়। তাঁদের অমৃতসম বাক্য শুনে ইন্দ্র মাতলি সারথিকে আদেশ দেন—দিব্য রথ যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে গিয়ে শ্রীरामকে তাতে আরোহন করাও। মাতলি স্বর্ণালঙ্কৃত, সবুজ অশ্বযুত রথ নিয়ে উপস্থিত হন এবং ইন্দ্রের যুদ্ধসামগ্রী নিবেদন করেন—মহাধনু, অগ্নিদীপ্ত কবচ, সূর্যসম তীর, ও শুভ নির্মল শক্তি। তিনি শ্রীरामকে প্রণাম করে বিজয়ের জন্য ইন্দ্রের দান ঘোষণা করেন এবং নিজে সারথি হতে প্রার্থনা করেন। শ্রীराम শ্রদ্ধায় প্রদক্ষিণ করে রথে আরোহন করেন, তেজে দীপ্তিমান হন। এরপর যুদ্ধ আরও ভয়ংকর হয়। রাবণ রাক্ষসাস্ত্র নিক্ষেপ করে; তার তীর বিষধর সাপের মতো চার দিক ভরে দেয়। শ্রীराम গরুড়াস্ত্রে প্রতিহত করেন; সাপ-তীর সোনালি সুপর্ণরূপ ধারণ করে বিনষ্ট হয়। রাবণ আবার ঘন শরবৃষ্টি করে মাতলিকে আঘাত করে, রথের ধ্বজ ছিন্ন করে এবং ইন্দ্রের অশ্বদের আহত করে; দেব-ঋষি ও বানরনেতারা উদ্বিগ্ন হন। শেষে গ্রহযোগ, সূর্যের ম্লানতা ও সমুদ্রের অশান্তির মতো অমঙ্গলচিহ্নে সর্গ সমাপ্ত হয়—যা রাম–রাবণ সংঘর্ষের মহাজাগতিক গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।

39 verses | Lakṣmaṇa, Rāma, Indra (Śakra), Mātali

Sarga 104

रावणशूलप्रक्षेपः — Ravana Hurls the Trident; Rama Counters with Indra’s Javelin

এই সর্গে রাম ও রাবণের যুদ্ধ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। শ্রীরামের ক্রুদ্ধ মুখমণ্ডল দর্শন করে পর্বতমালা কম্পিত হয়, সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠে এবং আকাশে অশুভ মেঘরাশি বিচরণ করতে থাকে। দেবতা, গন্ধর্ব ও ঋষিগণ প্রলয়কাল সদৃশ এই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন। রাবণ রক্তবর্ণ নেত্রে বজ্রের ন্যায় কঠিন ও ঘণ্টাধ্বনিযুক্ত এক ভয়ঙ্কর শূল গ্রহণ করে এবং রামকে বধ করার সংকল্প নিয়ে তা নিক্ষেপ করে। সেই শূলটি বিদ্যুতের মালার ন্যায় জ্বলতে জ্বলতে ধাবিত হয়। রামচন্দ্র বাণবর্ষণ করে সেই শূলকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু শূলটি পতঙ্গের ন্যায় সেই বাণসমূহকে ভস্মীভূত করে দেয়। তখন ক্রুদ্ধ রাম মাতলি আনীত ইন্দ্রের 'শক্তি' অস্ত্র গ্রহণ করেন, যা প্রলয়কালের উল্কার ন্যায় দেদীপ্যমান ছিল। রাম সেই শক্তি নিক্ষেপ করে রাবণের শূলটি চূর্ণ করেন। এরপর রাম তীক্ষ্ণ বাণের আঘাতে রাবণের অশ্বগুলিকে বধ করেন এবং রাবণের বক্ষ ও ললাট বিদীর্ণ করেন। রক্তাক্ত রাবণকে তখন পুষ্পিত অশোক বৃক্ষের ন্যায় প্রতীয়মান হয়, যিনি যন্ত্রণায় ও ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন।

32 verses | Ravana, Devas (collective acclamation), Asuras (collective acclamation)

Sarga 105

रावणक्रोधः—रामस्य परुषवाक्यम् (Ravana’s Fury and Rama’s Harsh Admonition)

এই সর্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধের এক মানসিক মোড় প্রকাশ পায়। কাকুত্স্থের শরে বিদ্ধ হয়ে যুদ্ধগর্বী রাবণ তীব্র ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং ঘন বাণবৃষ্টিতে মুহূর্তে রণক্ষেত্রকে অন্ধকার করে তোলে। কিন্তু রাম অচল পর্বতের মতো অবিচল; বাণজাল ছিন্ন করে সূর্যকিরণের ন্যায় সেই বৃষ্টি সহ্য করেন। রামের দেহে রক্তচিহ্ন ফুটে উঠলে তা পরাজয়ের লক্ষণ নয়—প্রস্ফুটিত কিঞ্চুকবৃক্ষের মতো সহিষ্ণুতা ও স্থৈর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। এরপর রামের ক্রোধ নৈতিক অভিযোগে রূপ নেয়। তিনি রাবণকে ‘সত্যিকারের বীর’ বলে মানতে অস্বীকার করেন, কারণ অসহায় সীতাকে সে চোরের মতো অপহরণ করেছে—এ আচরণ মর্যাদা ও স্বীকৃত চরিত্রধর্মের বিরুদ্ধ। রামের বাক্য আরও তীক্ষ্ণ হয়ে যুদ্ধ-ভবিষ্যদ্বাণীর রূপ ধারণ করে—ছিন্ন মস্তক, শকুন, বিদীর্ণ অন্ত্রের চিত্র—যা একদিকে মনস্তাত্ত্বিক আঘাত, অন্যদিকে ধর্মবিচার। রামের যুদ্ধশক্তি যেন দ্বিগুণ হয়; আত্মজ্ঞান ও শুভনিমিত্তে অস্ত্রসমূহ তাঁর কাছে স্বয়ং প্রকাশিত হয় বলে বর্ণিত, এবং তিনি আক্রমণ বাড়ান। রামের বাণবৃষ্টি ও বানরদের শিলাবর্ষণের যুগপৎ চাপে রাবণ মানসিক বিভ্রান্তিতে পড়ে, যথাযথ প্রতিউত্তর দিতে পারে না; তখন তার সারথি তাকে রণক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেয়—মনোবল ও কর্তৃত্বের সাময়িক ভাঙন সূচিত হয়।

31 verses

Sarga 106

रावण-सारथि-संवादः (Ravana and the Charioteer: Counsel, Omens, and Battlefield Conduct)

এই সর্গে যুদ্ধক্ষেত্রে সাময়িক পশ্চাদপসরণের মুহূর্তে রাবণ ও তার সারথির মধ্যে তীব্র সংলাপ দেখা যায়। ক্রোধে রক্তবর্ণ নয়ন, মোহগ্রস্ত ও ভাগ্যচালিত রাবণ শত্রুর সামনে রথ ফিরিয়ে নেওয়ায় সারথিকে ভর্ৎসনা করে—তাকে ভীরু, অদক্ষ, এমনকি শত্রুপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশকারী বলেও সন্দেহ করে। সারথি সংযত ও নীতিনিষ্ঠ ভাষায় জানায়—তার ভয় নেই, বিশ্বাসঘাতকতাও নেই; প্রভুর কল্যাণের জন্যই সে রথ ঘুরিয়েছে। সে বলে, সারথির কর্তব্য সময়-স্থান, লক্ষণ-অপলক্ষণ, যোদ্ধার অবস্থা, বাহিনীর বল-দুর্বলতা এবং অশ্বদের ক্লান্তি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া; ঘোড়া অবসন্ন ছিল এবং অশুভ নিমিত্ত দেখা দিয়েছিল, তাই কৌশলগত পুনর্বিন্যাস ধর্মসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত। রাবণ তার কথায় প্রসন্ন হয়ে সারথির প্রশংসা করে, শুভ হস্তালঙ্কার দান করে এবং অবিলম্বে রাঘবের দিকে অগ্রসর হতে আদেশ দেয়। রথ দ্রুত গিয়ে রামের রথের সম্মুখে উপস্থিত হয়, এবং ক্রোধপ্রসূত আদেশ ও বিচক্ষণ পরামর্শের টানাপোড়েন আবার স্পষ্ট হয়।

27 verses

Sarga 107

आदित्यहृदयम् (Aditya Hridayam Upadeśa — Agastya’s Instruction to Rāma)

এই সর্গে যুদ্ধক্ষেত্রে রাম মুহূর্তের জন্য সংঘর্ষের তীব্রতায় ভারাক্রান্ত হন, আর তাঁর সম্মুখে রাবণ সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন দেবগণের সঙ্গে ঋষি অগস্ত্য উপস্থিত হন—নির্ণায়ক যুদ্ধের সাক্ষী হতে—এবং রামকে “গুহ্যং সনাতনম্” বলে আদিত্যহৃদয় স্তোত্রের উপদেশ দেন। অগস্ত্য সূর্য/আদিত্যকে জগতের নিয়ন্তা, দেব-প্রাণী ও যজ্ঞধর্মের অন্তর্যামী শক্তি, সৃষ্টিকর্তা ও সংহারক, অন্ধকার ও শীত নিবারক, জ্যোতিষ্কদের অধিপতি এবং বৈদিক কর্মের উৎস ও ফলরূপ বলে বন্দনা করেন। তিনি একাগ্র উপাসনা ও ত্রিকাল পাঠের বিধান দিয়ে শোকক্ষয়, উদ্বেগনাশ এবং বিজয়সিদ্ধির কথা জানান। রাম আচমন করে আদিত্যকে ধ্যান করেন ও স্তোত্র জপ করেন; তাঁর চিত্ত স্বচ্ছ ও আনন্দিত হয়। তিনি ধনুর্ধারণ করে দৃঢ় সংকল্পে রাবণবধের জন্য অগ্রসর হন; শেষে সূর্যদেবের অনুমোদনপূর্ণ ত্বরিত আহ্বানে যুদ্ধের আসন্ন সাফল্যের ইঙ্গিত মেলে।

33 verses

Sarga 108

रावणरथवैभव–निमित्तदर्शन–राममातलिसंवादः (Ravana’s Chariot, Portents, and Rama–Matali Instructions)

এই সর্গে প্রথমে রাবণের রথের অপূর্ব বর্ণনা—গন্ধর্বনগরের ন্যায় বিচিত্র, ধ্বজা-পতাকায় ভারী, স্বর্ণশৃঙ্খলে অলংকৃত অশ্বে যুক্ত, যুদ্ধক্ষেত্রে ভয় সঞ্চারকারী। দ্বন্দ্ব তীব্র হলে শ্রীराम রাবণের রথের উগ্র অগ্রসরতা দেখে মাতলিকে বলেন—তার উল্টো, উন্মত্ত ও বেপরোয়া গতি আত্মবিনাশের লক্ষণ। এরপর তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন—সতর্ক থাকো, শত্রুর দিকে সোজা রথ চালাও, মনকে বিভ্রান্ত হতে দিও না, স্থির দৃষ্টিতে লাগাম সংযত রাখো। মাতলি সন্তুষ্ট হয়ে দক্ষতায় রথ চালান এবং চাকার ধুলো উড়িয়ে রাবণকে অস্থির করেন। রাবণ শ্রীरामকে বাণে আঘাত করে; শ্রীराम ইন্দ্রসম শক্তিশালী ধনুক ধারণ করে প্রতিউত্তরে দৃঢ় হন। উভয়ে সিংহের ন্যায় পরস্পরের বধে উদ্যত হয়ে মুখোমুখি দাঁড়ান; দেবগণও এই দ্বন্দ্ব দর্শনে সমবেত হন। এরপর রাবণের চারদিকে ভয়ংকর অশুভ লক্ষণ দেখা দেয়—রক্তবৃষ্টি, ঘূর্ণায়মান বায়ু, শকুন ও শেয়াল, ধুলোয় আচ্ছন্ন দিক, উল্কাপাত, মেঘহীন বজ্রাঘাত ইত্যাদি; আর শ্রীरामের পক্ষে বিজয়সূচক শুভ লক্ষণ উদিত হয়। এই নিমিত্ত বুঝে শ্রীराम বিজয়নিশ্চয়ে দৃপ্ত হয়ে অধিক পরাক্রমে শত্রুর অন্ত সাধনে অগ্রসর হন।

36 verses

Sarga 109

राघव-रावणयोः घोर-द्वैरथ-युद्धम् (The Fierce Chariot-Duel of Rama and Ravana)

এই সর্গে শ্রীराम ও রাবণের ভয়ংকর দ্বৈরথ-যুদ্ধ আরও তীব্রতর হয়—যার প্রাবল্য জগতের জন্যও আতঙ্কজনক বলে বর্ণিত। উভয় পক্ষের সেনারা ক্ষণকালের জন্য নিজেদের যুদ্ধ থামিয়ে, অস্ত্র উঁচিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায় এবং বিস্ময়ে এই নির্ণায়ক দ্বন্দ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করে। ক্রোধে উন্মত্ত রাবণ শ্রীरामের রথধ্বজ লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করে; কিন্তু ধ্বজ ছিন্ন হয় না—শরগুলি রথ ছুঁয়ে পড়ে যায়। তখন শ্রীराम সংযত ক্রোধে রাবণের ধ্বজদণ্ড/কেতু শর দিয়ে কেটে ফেলেন; দণ্ড ভূমিতে পতিত হতেই রাবণের দাহ্য ক্রোধ আরও প্রজ্বলিত হয়। প্রতিশোধে রাবণ শরবৃষ্টি বর্ষণ করে এবং মায়াবলে বৃহৎ ‘শস্ত্রবৃষ্টি’ সৃষ্টি করে—গদা, লৌহদণ্ড, চক্র, মুদ্গর, পর্বতশিখর, বৃক্ষ, ত্রিশূল ও পরশু প্রভৃতি। উভয় দিকের শরজালে আকাশ ঘনভাবে আচ্ছন্ন হয়ে দ্বিতীয় আকাশের মতো দেখায়; কোনো অস্ত্রই বৃথা যায় না—লক্ষ্যে বিদ্ধ হয় বা আকাশে পরস্পর সংঘর্ষে পতিত হয়। এভাবে প্রহার-প্রতিপ্রহারে যুদ্ধ চলতে থাকে; পরস্পরের অশ্বদের উপরও আঘাত আসে। ধ্বজভঙ্গের অপমানে রাবণের ক্রোধ চরমে ওঠে এবং দ্বৈরথ-যুদ্ধ কিছুক্ষণ অত্যন্ত রোমহর্ষক, উগ্র ও কোলাহলময় হয়ে ওঠে।

29 verses | Rama (Rāghava/Kākutstha), Ravana (Daśagrīva)

Sarga 110

रामरावणयोर्युद्धवैषम्यं तथा रावणशिरश्छेदनम् (Rama–Ravana Duel Intensifies; Ravana’s Heads Severed and Reappear)

এই ১১০তম সর্গে শ্রীराम ও রাবণের দ্বন্দ্ব সর্বজীবের দৃষ্টিতে এক মহাবিস্ময়কর দৃশ্যে পরিণত হয়। দেবসমাজ, সিদ্ধ-চারণ ও গন্ধর্বরা বিস্ময় ও উদ্বেগ নিয়ে যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন। রথদ্বয়ের দ্রুত ঘূর্ণন, অগ্রসর হওয়া ও পশ্চাদপসরণে সারথিদের কৌশল এবং প্রতিঘাতের সমতা প্রকাশ পায়। রাবণ বজ্রনিনাদ-সদৃশ বাণে রামের সারথি মাতলিকে লক্ষ্য করে, কিন্তু মাতলি অচঞ্চল থাকেন। তখন শ্রীराम ব্যক্তিগত আঘাতে নয়, সহায়কের অপমানকে কেন্দ্র করে ধর্মসম্মত ক্রোধে প্রতিউত্তর দেন। বাণ ও গুরু অস্ত্র—গদা, মুদ্গর, লৌহদণ্ড প্রভৃতি—এর প্রচণ্ড আঘাতে বিশ্বে আলোড়ন ওঠে: সমুদ্র ক্ষুব্ধ হয়, পাতালবাসীরা ব্যাকুল হয়, পৃথিবী কাঁপে, সূর্যের দীপ্তি ম্লান হয় এবং বায়ু স্তব্ধপ্রায় হয়ে যায়। দেব ও ঋষিগণ গৌ-ব্রাহ্মণের মঙ্গল কামনা করে স্বস্তিবাচন করেন এবং রামের বিজয় আহ্বান করেন—যুদ্ধের ধর্মময় দিগন্তকে স্পষ্ট করে। শ্রীराम রাবণের একটি মস্তক ছেদন করেন, কিন্তু তৎক্ষণাৎ আরেকটি মস্তক উদ্ভূত হয়; বারবার শিরচ্ছেদেও রাক্ষসরাজের অন্ত হয় না। সর্বাস্ত্রবিদ রাম ভাবেন—যে বাণ পূর্বে নিশ্চিত ফল দিত, তা এখন কেন নিষ্ফলপ্রায় মনে হচ্ছে। সর্গশেষে যুদ্ধ অবিরাম চলতে থাকে এবং মাতলি কথা বলতে উদ্যত হন—রাবণের প্রাণাধার ও তাকে নিধনের যথার্থ উপায়ের গূঢ় সংবাদ প্রকাশ করবেন যেন।

39 verses | Mātali (introduced as about to speak)

Sarga 111

रावणवधः — The Slaying of Ravana (Brahmāstra Discharge)

এই সর্গে মহাকাব্যের চূড়ান্ত মুহূর্তটি সংক্ষিপ্ত অথচ দৃঢ় বিন্যাসে প্রকাশিত। সারথি‑পরামর্শদাতা মাতলি রামকে স্মরণ করিয়ে দেন যে রাবণের বিনাশের নির্দিষ্ট ক্ষণে পিতামহ‑প্রদত্ত ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করতে হবে। তখন রাম অগস্ত্য থেকে প্রাপ্ত মহাশর গ্রহণ করেন; শরের বিশ্বতাত্ত্বিক নির্মাণ বর্ণিত—বায়ু, অগ্নি, সূর্য, পর্বত ও আকাশ তার অধিষ্ঠাতা—যাতে অস্ত্র কেবল হিংসা নয়, ধর্ম‑যজ্ঞময় শক্তির প্রযুক্তি হিসেবে প্রতিভাত হয়। বেদোক্ত বিধিতে শক্তি সংযোজিত করে রাম শর সংধান করেন; পৃথিবী কেঁপে ওঠে, জীবসমূহ আতঙ্কিত হয়। সংযত ক্রোধে তিনি শর নিক্ষেপ করেন; ইন্দ্রের বজ্রসম সেই শর রাবণের বক্ষ বিদীর্ণ করে প্রাণবায়ু হরণ করে এবং কর্তব্য সম্পন্ন করে নীরবে তূণীরে ফিরে আসে। রাবণ পতিত হলে তার ধনুক পড়ে যায়, রাক্ষসেরা ছত্রভঙ্গ হয়, বানররা বিজয়ধ্বনি তোলে। আকাশে দুন্দুভি বাজে, পুষ্পবৃষ্টি হয়, সুগন্ধি বায়ু প্রবাহিত হয়, দেবগণ “সাধু” বলে প্রশংসা করেন। তারপর বিশ্বে সাম্য ফিরে আসে—ভূমি স্থির, দিকসমূহ উজ্জ্বল, সূর্য স্থিত—মিত্রগণ রামকে সম্মান জানায়; রাম দেবসমাজে ইন্দ্রের ন্যায় দীপ্তিমান হন।

34 verses

Sarga 112

रावणवधोत्तरं विभीषणशोकः—क्षत्रधर्मोपदेशः (Vibhishana’s Lament after Ravana’s Fall; Instruction on Kshatriya-Dharma)

এই সর্গে রাবণের মৃত্যুর পরপরই যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য বর্ণিত। ভাইকে নিহত অবস্থায় দেখে বিভীষণ শোকে ভেঙে পড়েন এবং উচ্চ উপমায় রাবণকে স্মরণ করেন—যেন “রাক্ষসরাজ-বৃক্ষ” রাঘব-ঝড়ে ভেঙে পড়েছে, ইক্ষ্বাকু-সিংহ মত্ত গজকে উল্টে দিয়েছে, আর রাম-মেঘের বর্ষায় রাক্ষস-অগ্নি নিভে গেছে। রাবণের সঙ্গে লঙ্কার শাসন-শৃঙ্খলা ও প্রাণশক্তিও যেন লুপ্ত হলো—এমন বিশ্ববিপর্যয়ের মতো তিনি বিলাপ করেন: সূর্য পতিত, চন্দ্র অন্ধকার, অগ্নি নির্বাপিত। রাম সংযত নীতিবচনে বলেন—ক্ষত্রধর্ম অনুসারে যুদ্ধে পতিত বীর শোকের যোগ্য নয়; যুদ্ধে জয় কখনও সম্পূর্ণ ও চিরস্থায়ী নয়; এবং তিন লোকের ভয়ংকরও কালের অধীন। এ কথা শুনে বিভীষণ রাবণের অন্ত্যেষ্টি-সংস্কার করার অনুমতি চান, তার যজ্ঞ-সংস্কার ও আচার-যোগ্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং বলেন—মৃত্যুর সঙ্গে বৈর শেষ হয়। রাম সম্মতি দেন এবং যুদ্ধ থেকে সংস্কার-কর্মে, তথা রাজ-ধর্ম ও বিধি-স্থিতির পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন।

25 verses

Sarga 113

रावणवधदर्शनम् — Lament of the Rākṣasa Women upon Seeing Rāvaṇa Slain

এই সর্গে রাবণের মৃত্যুর পরপরই লঙ্কার নাগরিক ও অন্তঃপুরের জীবনে যে তীব্র শোক নেমে আসে, তার চিত্র ফুটে ওঠে। শোকবিহ্বল রাক্ষসী নারীরা অন্তঃপুর থেকে ছুটে এসে রক্ত-কাদায় মাখা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে; ছিন্ন দেহ ও পতিত মৃতদেহের মধ্যে তারা স্বামী ও স্বজনদের খুঁজে বেড়ায়। তারা রাবণের বিপুল দেহ—কালো পর্বতস্তূপের ন্যায়—দেখে তার অঙ্গে লুটিয়ে পড়ে; কেউ আলিঙ্গন করে, কেউ পা ও গ্রীবা আঁকড়ে ধরে, কেউ মাটিতে গড়াগড়ি খায়, কেউ মূর্ছা যায়, আর কেউ পদ্মের উপর শিশিরবিন্দুর মতো অশ্রু দিয়ে তার মুখ স্নিগ্ধ করে ভিজিয়ে দেয়। তাদের বিলাপ ক্রমে ভাবনামূলক ও শিক্ষামূলক হয়ে ওঠে। যে রাবণ একদা ইন্দ্র, যম, গন্ধর্ব, ঋষি ও দেবতাদেরও ভীত করত, আজ সে এক মর্ত্য বীরের হাতে নিহত হয়ে অসহায়—এই বৈপরীত্য তারা স্মরণ করে। তারা কারণও নির্দিষ্ট করে—হিতৈষী উপদেশ অমান্য করা, বিশেষত বিভীষণের কথা না শোনা, সীতাহরণ ও সীতাকে বন্দি রাখা; এর ফলেই তাদের সমাজের ‘মূলচ্ছেদ’ ঘটেছে। শেষে তারা দैবের অপ্রতিরোধ্য গতি স্বীকার করে—ধন, ইচ্ছা, পরাক্রম বা রাজাদেশ কিছুই তাকে ফিরিয়ে দিতে পারে না; ক্রৌঞ্চ/কুররী পাখির মতো করুণ আর্তনাদে যুদ্ধকাণ্ডের মধ্যে এক শোকগাথার ছন্দ বজায় থাকে।

26 verses | Rākṣasī women (Rāvaṇa’s wives/antaḥpura women, collective lament)

Sarga 114

रावणस्य अन्त्येष्टिः — Ravana’s Funeral Rites and the Ethics of Post-War Conduct

এই সর্গে যুদ্ধের পরবর্তী পরিণতি বর্ণিত। রাক্ষসী নারীদের বিলাপ ওঠে; মন্দোদরী ও প্রধান রাণী শোকে ভেঙে পড়ে পূর্বলক্ষণ স্মরণ করেন—হনুমানের ‘দুর্গম’ লঙ্কায় প্রবেশ এবং সমুদ্রের উপর বানর-সেতু—এবং এগুলিকে রামের অতিমানবীয় মহিমার চিহ্ন বলে ব্যাখ্যা করেন। রাবণের পতনকে অধর্মের ফল, বিশেষত সীতাহরণের পাপজনিত কর্মফল হিসেবে স্থাপন করা হয়। এরপর নীতির গুরুত্বপূর্ণ বাঁক: রাম বলেন, মৃত্যুর পরে শত্রুতা স্থায়ী নয়; অতএব পতিত রাজাকে যথাবিধি অন্ত্যেষ্টি দিতে হবে। বিভীষণ লঙ্কায় প্রবেশ করে পুরোহিত, যজ্ঞাগ্নি, চন্দন ও সুগন্ধি দ্রব্য সংগ্রহ করে, অলংকৃত শববাহন প্রস্তুত করে অন্ত্যেষ্টি-যাত্রা আয়োজন করেন। রাক্ষসরা বেদসম্মত পিতৃমেধ-ক্রমে বেদীস্থাপন, আহুতি ও দাহকর্ম সম্পন্ন করে; পরে বিভীষণ বিধবাদের সান্ত্বনা দিয়ে বিনীতভাবে রামের কাছে প্রত্যাবর্তন করেন। শেষে রাম দিব্যাস্ত্র সংবরণ করে ক্রোধ ত্যাগ করেন ও কোমলতায় প্রত্যাবর্তন করেন—বিজয়ের মধ্যেও মর্যাদার আদর্শ প্রকাশ করে।

126 verses | Mandodarī, Rāma, Vibhīṣaṇa

Sarga 115

विभीषणाभिषेकः (Vibhīṣaṇa’s Consecration) and Hanumān’s Commission to Sītā

রাবণের পতনের পর দেবতা, গন্ধর্ব ও দানবেরা নিজ নিজ বিমানে স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করে। তারা বিজয়ের মঙ্গলকথা বলতে বলতে শ্রীरामের পরাক্রম, বানরসেনার অভিযান, সুগ্রীবের পরামর্শ, লক্ষ্মণের ভক্তি ও বীরত্ব, সীতার পতিব্রতা নিষ্ঠা এবং হনুমানের অসামান্য শৌর্যের প্রশংসা করে। তখন শ্রীराम ইন্দ্রের সারথি মাতলিকে যথাবিধি বিদায় দেন; দিব্য রথসহ তিনি স্বর্গে ফিরে যান। পরে শ্রীराम সুগ্রীবকে আলিঙ্গন করে শিবিরে প্রত্যাবর্তন করেন। শ্রীराम লক্ষ্মণকে আদেশ দেন—লঙ্কায় বিভীষণকে অভিষেক করে রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে, তাঁর ভক্তি, আনুগত্য ও পূর্বসেবার কথা স্মরণ করিয়ে। লক্ষ্মণ স্বর্ণকলশ আনান; দ্রুতগামী বানরনায়কেরা সমুদ্রজল এনে দেয়। উৎকৃষ্ট সিংহাসনে বিভীষণকে বসিয়ে, মন্ত্রোচ্চারণসহ শাস্ত্রবিধি অনুসারে, স্পষ্টতই “রামের আদেশে” রাক্ষসদের মধ্যেই তাঁর অভিষেক সম্পন্ন হয় এবং ন্যায়সঙ্গত রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। রাক্ষস ও বানরেরা আনন্দে শ্রীरामকে প্রণাম করে। বিভীষণ প্রজাদের সান্ত্বনা দেন; দধি, অক্ষত, মিষ্টান্ন, লাজা, পুষ্প প্রভৃতি মঙ্গলদ্রব্য গ্রহণ করে শ্রীराम ও লক্ষ্মণকে অর্পণ করেন; শ্রীराम তাঁর স্নেহের মর্যাদা রাখতে তা গ্রহণ করেন। শেষে শ্রীराम বিভীষণের অনুমতি নিয়ে হনুমানকে নির্দেশ দেন—লঙ্কায় প্রবেশ করে বৈদেহী সীতাকে শুভ সংবাদ জানাতে এবং তাঁর বার্তা নিয়ে দ্রুত ফিরে আসতে।

26 verses | Rāma, Lakṣmaṇa (Saumitri), Vibhīṣaṇa

Sarga 116

सीतासान्त्वनम् / Hanuman Consoles Sita with the News of Victory

যুদ্ধোত্তর কালে নতুন শাসনব্যবস্থায় লঙ্কায় সম্মানিত হয়ে হনুমান যথোচিত শিষ্টাচারসহ নগরে প্রবেশ করে অশোকবাটিকায় সীতার কাছে যান। সেখানে তিনি সীতাকে শারীরিকভাবে ক্ষীণ, বিষণ্ণ এবং রাক্ষসী প্রহরীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত দেখেন। হনুমান রামের বার্তা জানান—রাবণ নিহত, লঙ্কা বিভীষণের অধীনে নিরাপদ, অতএব আর ভয়ের কারণ নেই; বন্দিত্বের অবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে। এ কথা শুনে সীতা আনন্দে বাকরুদ্ধ হন। পরে কৃতজ্ঞতায় দূতকে উপহার দিতে চান, কিন্তু বলেন—শুভ সংবাদই সর্বশ্রেষ্ঠ, তার তুল্য কোনো ধন নেই। হনুমান সীতাকে ভয় দেখানো রাক্ষসীদের প্রতি প্রতিশোধমূলক শাস্তির প্রস্তাব করলে সীতা প্রতিহিংসা নাকচ করেন—নিজ দুঃখকে ভাগ্য ও পূর্বপরিস্থিতির ফল বলে মানেন এবং ধর্মসম্মত নীতি স্মরণ করান যে আদেশাধীন অপরাধীদের প্রতিও সংযম ও করুণা রাখা উচিত। হনুমান সীতার নৈতিক কর্তৃত্ব মেনে রামের জন্য উত্তরবার্তা চান; সীতা স্বামীর দর্শনকামনা প্রকাশ করেন। শেষে হনুমান দ্রুত ফিরে রাঘবকে সীতার কথাগুলি যথাক্রমে অবিকৃতভাবে জানিয়ে দেন, বার্তা ও অভিপ্রায়ের শুদ্ধ ধারাবাহিকতা স্থাপন করে।

54 verses

Sarga 117

सीतासमीपगमनम् / Sītā Brought Near to Rāma (Public Witness and Protocol)

এই সর্গে যুদ্ধজয়ের পর নৈতিক বিচারপর্বে প্রবেশের দৃশ্যটি সংযত সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নির্মিত। বহুশ্রুত হনুমান রামকে সব সংবাদ জানিয়ে অনুরোধ করেন—যাঁর জন্য সমগ্র অভিযান, সেই শোকাকুল মৈথিলীকে দর্শন করুন। রাম অশ্রুসজল হয়ে কিছুক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকেন, তারপর বিভীষণকে আদেশ দেন—সীতাকে স্নান করিয়ে, চন্দনাদি লেপন করে, বস্ত্র-অলংকারে সুশোভিত করে উপস্থিত করতে। সীতা প্রথমে স্নান না করেই রামদর্শন চাইলে বিভীষণ রামাজ্ঞা পালনের কথা বলে তাঁকে সম্মত করান। এরপর বহু রাক্ষসের প্রহরায় দীপ্ত পালকিতে সীতাকে আনা হয়। তাঁর আগমনের সংবাদে রামের মনে আনন্দ, ক্ষোভ ও ক্রোধ—তিনটি ভাব একসঙ্গে জাগে; ব্যক্তিগত পুনর্মিলন ও লোকসম্মতির টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়। রাম সীতাকে কাছে আনতে বলেন; বিভীষণ ভিড় সরাতে চাইলে রাম বাধা দেন—“এরা আমারই লোক।” তিনি নীতিবচন উচ্চারণ করেন—আপদ, সংঘর্ষ বা যজ্ঞাদি প্রসঙ্গে নারীর প্রকাশ্যে উপস্থিতি স্বয়ং দোষ নয়; সীতার তাঁর নিকটে আসাতেও কোনো কলঙ্ক নেই। তারপর রাম পালকি সরিয়ে সীতাকে পদব্রজে, বানরদের সম্মুখে দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে আসতে আদেশ করেন—সমষ্টিগত সাক্ষ্যকে দৃঢ় করতে। লক্ষ্মণ, সুগ্রীব ও হনুমান রামের কঠোর ভঙ্গি দেখে বিচলিত হন এবং সীতার প্রতি অসন্তোষের আশঙ্কা করেন। সীতা লজ্জাভরে এগিয়ে রামের মুখের দিকে তাকান; দীর্ঘদিনের দুঃখ প্রশমিত হয়—আবেগমুক্তির সুরে সর্গ শেষ হলেও পরবর্তী নৈতিক পরীক্ষার ইঙ্গিত রয়ে যায়।

36 verses | Hanumān, Rāma, Vibhīṣaṇa, Sītā (Vaidehī/Maithilī)

Sarga 118

सीताप्रत्याख्यानम् / Rama’s Post-Victory Address to Sītā (Public Opinion and Royal Duty)

যুদ্ধশেষে রাম নিকটে দাঁড়ানো সীতাকে দেখে হৃদয়ে সঞ্চিত ক্রোধ ও আশঙ্কা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাবণবধে অপমান মোচন হয়েছে, প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হয়েছে এবং সহায়কদের শ্রম সফল হয়েছে—হনুমানের সমুদ্রলঙ্ঘন ও লঙ্কাদহন, সুগ্রীবের নীতি ও সেনাশ্রম, এবং বিভীষণের শরণাগমন। এরপর রাজধর্ম ও কুলখ্যাতির প্রসঙ্গে রাম ঘোষণা করেন—এই যুদ্ধকর্ম ‘সীতার জন্য’ নয়, বরং বংশের মর্যাদা, সদাচার ও লোকাপবাদ থেকে রক্ষার জন্য। তিনি জানান, একদিকে ব্যক্তিগত স্নেহ, অন্যদিকে জনবাদভীতি—হৃদয় দ্বিধাবিভক্ত। কঠোর যুক্তিতে বলেন, পরের গৃহে থাকা ও কামদৃষ্টিতে দেখা স্ত্রীকে গ্রহণ করা অনুচিত; তাই সীতা যেখানে ইচ্ছা যান—এবং লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব বা বিভীষণকে আশ্রয়দাতা হিসেবে ইঙ্গিতও করেন। এই বাক্যে সীতা অশ্রুসজল, কাঁপতে কাঁপতে হাতির আঘাতে লতার মতো ভেঙে পড়েন—শারীরিক উদ্ধার-পরবর্তী জনসমক্ষে প্রত্যাখ্যানের মানসিক আঘাত এতে প্রকাশ পায়।

25 verses

Sarga 119

सीताया अग्निप्रवेशः (Sita’s Ordeal by Fire / Agni-Pariksha)

এই সর্গে সভামণ্ডলে রামের লোকনিন্দা-আশ্রিত কঠোর বাক্য বৈদেহীকে গভীরভাবে আহত করে। সীতা যুক্তিসংগতভাবে উত্তর দেন—সাধ্বী নারীর বিচার ‘গাম্য/অশিষ্ট নারীদের’ আচরণ দেখে করা উচিত নয়; বন্দিত্বে দেহ পরবশ হতে পারে, কিন্তু মন-হৃদয়ের অভিপ্রায় অকলুষ থাকে। তিনি দাম্পত্যের দীর্ঘ অন্তরঙ্গতা ও বিশ্বাস স্মরণ করিয়ে বলেন, যদি সন্দেহই চূড়ান্ত হয়, তবে উদ্ধারকর্ম ও মিত্রদের পরিশ্রম সবই অর্থহীন হয়ে পড়বে। বাক্যবিতণ্ডা থেকে ধর্মীয় প্রমাণের পথে গিয়ে তিনি লক্ষ্মণকে চিতা প্রস্তুত করতে অনুরোধ করেন—সভায় প্রত্যাখ্যাত হলে আত্মদাহই তাঁর শেষ মর্যাদাপূর্ণ পথ। লক্ষ্মণ ক্রুদ্ধ হলেও রামের নীরব সংকেত বুঝে অগ্নি প্রজ্বলিত করেন; রাম মৃত্যুর মতো অটল সংকল্পে স্থির, কেউ তাঁকে নিবৃত্ত করতে পারে না। সীতা প্রদক্ষিণা করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের প্রণাম জানান, দিকপাল ও দেবগণকে এবং অগ্নিদেবকে সাক্ষী করে বাক্য-মন-কর্মে নিজের পতিব্রতা-নিষ্ঠা ঘোষণা করেন। তারপর তিনি নির্ভয়ে জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করেন; মানুষ, বানর, রাক্ষস ও দেবসমাজ বিস্ময়, বিলাপ ও জয়ধ্বনিতে এই জনসমক্ষে সাক্ষ্যনির্ভর পরীক্ষার সাক্ষী হয়ে ওঠে।

36 verses

Sarga 120

रामस्तवः — ब्रह्मणा रामस्य नारायणत्वप्रकाशनम् (Rama-Stava: Brahma Reveals Rama’s Nārāyaṇa Identity)

যুদ্ধোত্তর মানবিক শোক থেকে এই সর্গে কাহিনি এগিয়ে যায় এক গভীর ধর্মতাত্ত্বিক প্রকাশের দিকে। প্রজাদের বিলাপ শুনে রাম অশ্রুসজল নয়নে কিছুক্ষণ থেমে যান—রাজধর্মে জনমনের প্রতি দায়বদ্ধতার গুরুত্ব এখানে স্পষ্ট। তারপর সূর্যসম দীপ্তিমান বিমানে দেবসমূহ লঙ্কায় উপস্থিত হন—কুবের (বৈশ্রবণ), পিতৃগণের সঙ্গে যম, ইন্দ্র, বরুণ, ষড়্‌নেত্র বৃষধ্বজ মহেশ্বর এবং ব্রহ্মা—এবং এক মহাদেবসভা গঠিত হয়, যা সাম্প্রতিক ঘটনাকে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিতে পুনর্ব্যাখ্যা করে। দেবগণ প্রশ্ন তোলেন—স্রষ্টা ও প্রভু বলে যাঁকে বলা হয়, সেই রাম কীভাবে সীতার অগ্নিপরীক্ষার কষ্টকে উপেক্ষা করলেন বলে মনে হয়? এতে দিব্য সর্বজ্ঞতা ও মানব-ভূমিকায় আচরণের টানাপোড়েন প্রকাশ পায়। রাম বলেন, তিনি নিজেকে দশরথের মানবপুত্র বলেই জানেন; তাঁর প্রকৃত উৎস ব্রহ্মা যেন স্পষ্ট করেন। তখন ব্রহ্মা দীর্ঘ স্তবে রামকে নারায়ণ/বিষ্ণু রূপে প্রকাশ করেন—যজ্ঞ ও ওঁকার-স্বরূপ, আদি-মধ্য-অন্ত, দিক্‌সমূহ ও সর্বভূতে ব্যাপ্ত পালনকারী তত্ত্ব, এবং ত্রিবিক্রম-বামন হয়ে বলিকে বেঁধে রাখার কীর্তি। শেষে ঘোষণা হয়, রাবণবধ অবতারকার্যের পরিপূর্ণতা; আর এই প্রাচীন স্তব পাঠ করলে সিদ্ধি লাভ হয় ও অপযশ থেকে রক্ষা মেলে—সর্গটি তাই কাহিনির সমাপ্তি ও উপাসনামূলক প্রমাণ—উভয়ই।

33 verses | Rama (Raghava, Kakutstha, Dasharatha-atmaja), Brahma (creator, foremost of Brahmavids)

Sarga 121

अग्निपरीक्षासाक्ष्यं (Agni’s Testimony and Sītā’s Revalidation)

এই সর্গে যুদ্ধকাহিনির বিচারধর্মী ও দেবতাত্ত্বিক পরিসমাপ্তি সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ব্রহ্মার ভাষণের পর অগ্নি (বিভাবসু/হব্যবাহন/পাবক) ‘লোক‑সাক্ষী’ রূপে অগ্নিকুণ্ড থেকে উদিত হয়ে বৈদেহীকে বহন করে রামচন্দ্রের কাছে ফিরিয়ে দেন—সীতা দীপ্তিময়, অক্ষত ও অপরিবর্তিত পবিত্র রূপে প্রকাশিত হন। অগ্নি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে সীতা বাক্যে, মনে, বুদ্ধিতে এবং দৃষ্টিতেও রামের প্রতি অবিচল; রাক্ষসীদের পাহারা, প্রলোভন ও ভয়‑হুমকির মধ্যেও তিনি কখনও ভক্তি ও শুচিতা থেকে বিচ্যুত হননি। এরপর রাম জনবিশ্বাসের নীতিগত যুক্তি ব্যাখ্যা করেন—তিন লোকেই সীতার পবিত্রতা সুপরিচিত, কিন্তু রাবণের অন্তঃপুরে দীর্ঘকাল অবস্থানের কারণে সমাজে সন্দেহ জাগতে পারত; তাই ‘লোক‑প্রত্যয়’ প্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি অগ্নিপ্রবেশ অনুমোদন করেছিলেন, ব্যক্তিগত সংশয় থেকে নয়। তিনি সীতাকে এমন অপ্রাপ্য শিখার সঙ্গে তুলনা করেন যা দুষ্টের চিন্তাতেও স্পর্শযোগ্য নয়, এবং বলেন—যেমন নিজের যশ বা স্বয়ং সত্তাকে ত্যাগ করা যায় না, তেমনি সীতাকেও তিনি ত্যাগ করতে পারেন না। শেষে রাম উপদেশ গ্রহণ করে প্রশংসিত হন এবং পত্নীর সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত সুখ লাভ করেন।

22 verses

Sarga 122

दशरथदर्शनम् — Dasharatha’s Epiphany and Benedictions (Sarga 122)

এই সর্গে যুদ্ধসমাপ্তির পর দেবদর্শন ও উপদেশের ধারাবাহিকতা দেখা যায়। মহেশ্বর রাঘবের মঙ্গলবচন শুনে মঙ্গল নির্দেশ দেন—রাম যেন অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করেন, ভরত ও কৌশল্যা, কৈকেয়ী, সুমিত্রা—রানীদের সান্ত্বনা দেন, ইক্ষ্বাকু-রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সুদৃঢ় করেন, রাজধর্ম পালন করেন, অশ্বমেধ প্রভৃতি যজ্ঞ সম্পাদন করেন এবং ব্রাহ্মণদের দান করেন—এভাবে রণধর্ম থেকে নাগরিক ধর্মে উত্তরণ সম্পূর্ণ হয়। এরপর মহেশ্বর বিমানে অধিষ্ঠিত দশরথকে প্রকাশ করেন। রাম-লক্ষ্মণ প্রণাম করেন। দীপ্তিমান দশরথ রামকে আলিঙ্গন করে কোলে বসিয়ে পিতৃস্নেহে বলেন—রামবিহীন স্বর্গের সম্মানও আনন্দহীন; আজ বনবাসের সমাপ্তি ও শত্রুনাশ দেখে আমি কৃতার্থ। কৈকেয়ীর বনবাস-প্রার্থনার বেদনা স্মরণ করেও তিনি ভরত ও কৈকেয়ীর প্রতি অনুগ্রহ রাখতে বলেন; রাম প্রার্থনা করেন, ভয়ংকর শাপ যেন তাঁদের স্পর্শ না করে। দশরথ লক্ষ্মণের ভক্তিসেবার প্রশংসা করে আশীর্বাদ দেন এবং সীতাকে ধৈর্য ও পতিধর্ম বিষয়ে কোমল উপদেশ দেন—রামই তাঁর পরম আশ্রয়। শেষে দশরথ বিমানে ইন্দ্রলোকে গমন করেন; পিতা-পুত্রের বিচ্ছেদের আচারগত পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে কাহিনি অযোধ্যা-পুনরুদ্ধারের পথে অগ্রসর হয়।

39 verses

Sarga 123

इन्द्रवरदानम् / Indra Grants Boons: Restoration of the Vanara Host

যুদ্ধোত্তর এই সর্গে দেবসংবাদরূপে এক শান্ত সংহতির দৃশ্য দেখা যায়। মহেন্দ্র (পাকশাসন, সহস্রাক্ষ) অঞ্জলি-বদ্ধ রামকে বলেন—“বর চাও।” তখন রাম ব্যক্তিগত কিছু না চেয়ে সমষ্টিগত কল্যাণ প্রার্থনা করেন—যে বানর ও ঋক্ষেরা তাঁর উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে যমলোকে গিয়েছে, তারা সকলেই পুনর্জীবিত হোক, ক্ষত-মুক্ত হোক এবং স্বজনদের সঙ্গে পুনর্মিলিত হোক; আর বানরদের বাসস্থানগুলোতে ঋতুবহির্ভূত পুষ্প-ফল সমৃদ্ধি লাভ করুক, নদীগুলি নির্মল ও পূর্ণপ্রবাহে প্রবাহিত হোক। ইন্দ্র এই মহান ও নিশ্চিত বর দান করেন। সঙ্গে সঙ্গে পতিত ও আহত বানর-ঋক্ষেরা যেন নিদ্রা থেকে জেগে উঠে দাঁড়ায়—বল ও তেজে পূর্ণ, বিস্ময়ে অভিভূত। দেবগণ রাম-লক্ষ্মণকে স্তব করে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের উপদেশ দেন—বানরদের বিদায় দেওয়া, মৈথিলীকে সান্ত্বনা দেওয়া, ভরত-শত্রুঘ্নের সঙ্গে মিলন, মাতৃগণের দর্শন এবং অভিষেক গ্রহণ। তারপর দেবতারা সূর্যপ্রভ বিমানে ইন্দ্রের সঙ্গে প্রস্থান করেন। রাম বিধিপূর্বক বানরসেনাকে বিশ্রামের জন্য অব্যাহতি দেন; পুনরুজ্জীবিত সেই সেনা নবশোভা ও দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

24 verses

Sarga 124

पुष्पकविमान-प्रस्थानम् (The Pushpaka Vimāna Offered and the Return Prepared)

এক রাত্রি বিশ্রামের পর বিভীষণ শ্রীरामকে প্রণাম করে বিজয়ের অবস্থা জিজ্ঞাসা করল। তারপর স্নান, অনুলেপন, বস্ত্র, অলংকার, চন্দন ও মাল্য প্রভৃতি শৃঙ্গার-নিপুণ পরিচারকদের দ্বারা সুসজ্জিত আতিথ্য নিবেদন করে শ্রীराम ও বানরনায়কদের শীতলোপচার গ্রহণ করতে অনুরোধ করল। শ্রীराम সংযত অথচ ত্বরিত নীতিতে বললেন—চিত্ৰকূটে ভরত যে প্রার্থনা করেছিল, যা আমি তখন গ্রহণ করিনি, এখন সেই ভরতের দর্শনের জন্যই আমার হৃদয় দ্রুত ধাবিত; রাণীদের ও নগরবাসীদের আবেদনও স্মরণে আছে। তখন বিভীষণ পুষ্পক বিমান অর্পণ করল—সূর্যসম দীপ্ত, মেঘসম বিস্তৃত, ইচ্ছামতো চলনশীল (কামগ), অজেয় এবং মনসম বেগবান। সে জানাল, এটি কুবেরের বাহন; রাবণ যুদ্ধ করে কেড়ে নিয়েছিল, আর এখন রামের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত। শ্রীराम দীর্ঘকাল থাকা প্রত্যাখ্যান করে প্রস্থানের অনুমতি চাইলেন এবং বিমান প্রস্তুত করতে বললেন। বিমান আনা হল—স্বর্ণময় অলংকরণ, মণিবেদী, ধ্বজ, ঘণ্টা, মুক্তাখচিত গবাক্ষ; বিশ্বকর্মা-নির্মিত, মেরুর মতো মহৎ। তার বিশালতা দেখে রাম-লক্ষ্মণ বিস্মিত হয়ে তাতে আসন গ্রহণ করলেন; এখানেই যুদ্ধশেষ থেকে গৃহযাত্রার দিকে কাহিনির মোড় ঘোরে।

30 verses | Vibhīṣaṇa, Rama

Sarga 125

पुष्पकारोहणम् (Boarding the Puṣpaka; Honoring the Allies and Departure for Ayodhyā)

এই সর্গে জয়ের পর শান্তি, কৃতজ্ঞতা ও অযোধ্যা-প্রস্থানের মঙ্গলময় রূপান্তর বর্ণিত। বিভীষণ ফুলে সজ্জিত কুবের-স্বত্বাধীন পুষ্পক বিমানটি শ্রীরামের কাছে নিবেদন করে দূরে দাঁড়িয়ে বিনীতভাবে নির্দেশ চান। লক্ষ্মণের উপস্থিতিতে শ্রীরাম চিন্তা করে নীতিবাক্য বলেন—যুদ্ধের ভার বহনকারী বনচারী বানরাদি মিত্রদের রত্ন-ধন দিয়ে সম্মানিত করা উচিত; কৃতজ্ঞতাই রাজধর্মের বৈধতা ও স্থিতি রক্ষা করে, আর অকৃতজ্ঞ, গুণহীন শাসকের সেনা দ্রুত বিমুখ হয়ে পড়ে। বিভীষণ সেইমতো মূল্যবান সম্পদ বিতরণ করেন। মিত্রসেনা সম্মানিত হলে শ্রীরাম উৎকৃষ্ট বিমানে আরোহণ করেন। সমবেত জনতার সামনে লজ্জাবতী সীতাকে শ্রীরাম স্নেহালিঙ্গনে গ্রহণ করে বিমানে বসান। এরপর শ্রীরাম সুগ্রীবসহ বানরদের কিষ্কিন্ধায় প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেন এবং বিভীষণকে লঙ্কায় নিরাপদ, ধর্মসম্মত রাজ্যলাভের আশীর্বাদ করেন। মিত্ররা অযোধ্যায় গিয়ে রামের অভিষেক দর্শন ও কৌশল্যাকে প্রণাম করতে চাইলে শ্রীরাম সম্মতি দেন; সকলেই বিমানে ওঠে। রামের অনুমতিতে পুষ্পক আকাশে উড্ডীন হয়, আর যুদ্ধোত্তর ন্যায়োজ্জ্বল সার্বভৌমত্বের প্রতীক হয়ে শ্রীরাম কুবেরের ন্যায় দীপ্তিমান হন।

27 verses | Vibhīṣaṇa, Rāma

Sarga 126

पुष्पकविमानयात्रा—सेतुबन्धादि-दर्शनम् (Pushpaka Aerial Journey and Survey of Sacred Landmarks)

যুদ্ধোত্তরে পুষ্পক বিমানে রাম সীতাকে সঙ্গে নিয়ে আকাশপথে যাত্রা করেন এবং স্মৃতির সূত্রে পথে পথে স্থানপরিচয় করিয়ে দেন। রামের অনুমতিতে হংসসদৃশ, মধুর-ধ্বনিযুক্ত পুষ্পক ঊর্ধ্বে উঠে চলমান দৃষ্টিবিন্দু হয়ে ওঠে। রাম রক্তসিক্ত যুদ্ধক্ষেত্র দেখিয়ে প্রধান প্রধান রাক্ষস-নিহতদের নাম এবং তাঁদের বধকারীদের ক্রমান্বয়ে উল্লেখ করেন—যুদ্ধসমাপ্তির আনুষ্ঠানিক হিসাব ও দায়বদ্ধতার নিবন্ধনরূপে। এরপর বর্ণনা পবিত্র ভূগোলের দিকে মোড় নেয়—সমুদ্রতট, নলের নির্মিত সেতু (নলসেতু), বরুণের আবাস গর্জমান সাগর, হনুমানের গমনস্মৃতিসংযুক্ত বিশ্রামপর্বত, এবং ত্রিলোকবন্দিত পাপনাশক সেতুবন্ধ তীর্থ রাম সীতাকে দর্শন করান। তারপর কিষ্কিন্ধা ও ঋষ্যমূক, পম্পা ও শবরীর অঞ্চল, জনস্থান ও জটায়ুর পতনস্থান, খর–দূষণ–ত্রিশিরা প্রসঙ্গের ভূমি, গোদাবরী ও অগস্ত্যাশ্রম, সুতীক্ষ্ণ ও শরভঙ্গের আশ্রম, অত্রির নিবাস, বিরাধের অঞ্চল, চিত্রকূট, যমুনা ও ভরদ্বাজাশ্রম, গঙ্গা, শৃঙ্গিবের (গুহ), সরযূ অতিক্রম করে শেষে অমরাবতীর ন্যায় দীপ্ত অযোধ্যা দর্শন হয়; সীতা ভক্তিভরে প্রণাম করেন। সমান্তরালে সীতা তারা ও অন্যান্য বানরী নারীদের অযোধ্যায় সঙ্গে নেওয়ার অনুরোধ করেন। রাম সম্মতি দেন, সুগ্রীব গৃহস্থালির দলকে আহ্বান করেন, এবং সীতাদর্শনে উৎসুক সেই নারীরা পুষ্পকে আরোহণ করে যাত্রায় যোগ দেয়।

57 verses

Sarga 127

भरद्वाजाश्रम-समागमः / Meeting Bharadvaja at the Hermitage (Homeward Blessings)

নির্বাসন-কাল নির্দিষ্ট তিথিতে সম্পূর্ণ হলে রাম ও লক্ষ্মণ ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে এসে ভক্তিভরে প্রণাম করেন। রাম অযোধ্যার কুশল—প্রজাদের সমৃদ্ধি, ভরত-এর শাসনব্যবস্থা এবং রাণীদের মঙ্গল—জানতে চান; এতে যুদ্ধলক্ষ্য থেকে নাগরিক পুনঃস্থাপনা ও রাজধর্মে প্রত্যাবর্তনের সুর স্পষ্ট হয়। ভরদ্বাজ স্নেহভরে জানান—ভরত তপস্বীর ন্যায় বেশ ধারণ করে রামের পাদুকা সামনে স্থাপন করে তাঁরই প্রতীক্ষায় আছেন; এটি অর্পিত সার্বভৌমত্ব ও অটল আনুগত্যের চিহ্ন। মুনি বলেন, তপস্যাবলে ও শিষ্যদের সংবাদে রামের সমগ্র যাত্রাপথ তাঁর জানা—ঋষি-ব্রাহ্মণরক্ষার্থে সীতাহরণ, মারীচ ও কবন্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ, পম্পায় আগমন, সুগ্রীবের সঙ্গে মৈত্রী, বালীবধ, হনুমানের সীতাসন্ধান ও লঙ্কাদাহ, নলের সেতুবন্ধ, রাবণনিধন এবং দেবপ্রদত্ত অনুগ্রহ। ভরদ্বাজ অর্ঘ্য দিয়ে বর প্রার্থনার সুযোগ দেন। রাম চান—অযোধ্যাগমনপথে ঋতুবিরুদ্ধ হলেও অমৃতগন্ধ ফল-পুষ্পে পথ সমৃদ্ধ হোক। মুনির সম্মতিতে কয়েক যোজন জুড়ে প্রকৃতি রূপান্তরিত হয়—শুষ্ক বৃক্ষ ফলবান হয়, পত্রহীন বৃক্ষ পুনরায় পল্লবিত হয়, সর্বত্র মধুরসের প্রাচুর্য দেখা দেয়; প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ধর্মের শুভ লক্ষণরূপে তা প্রকাশ পায়।

23 verses

Sarga 128

अयोध्याप्रत्यागमन-सन्देशः (Hanuman Sent Ahead to Ayodhya)

পুষ্পক বিমানে বসে অযোধ্যা দর্শন করতে করতে শ্রীराम প্রত্যাবর্তনযাত্রার প্রধান স্মৃতিচিহ্নগুলি মনে করেন—সমুদ্রের নিকট গমন, সাগরদেবের আবির্ভাব, সেতুবন্ধন, রাবণবধ এবং দেবপ্রদত্ত বরসমূহ। তারপর তিনি হনুমানকে দ্রুত দূতরূপে অযোধ্যায় প্রেরণ করেন। রাম হনুমানকে নির্দেশ দেন—ভরত-এর অন্তর্ভাব বাহ্য লক্ষণ দেখে যাচাই করতে: মুখবর্ণ, দৃষ্টি ও বাক্যভঙ্গি থেকে; কারণ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত রাজ্যসমৃদ্ধি কখনও কখনও সৎজনকেও প্রলোভিত করতে পারে। সংবেদনশীল সিংহাসন-পরিবর্তনের আগে রাজনৈতিক যাচাইয়ের এক নীতিপদ্ধতি এখানে স্থাপিত হয়। হনুমান মানব-রূপে অতি দ্রুত গমন করে গঙ্গা–যমুনার সঙ্গম অতিক্রম করেন, শৃঙ্গবেরপুরে পৌঁছে গুহকে রামের কুশলবার্তা ও যাত্রাবৃত্তান্ত জানান। পরে নন্দিগ্রামের পথে তিনি ভরতের তপস্বীসদৃশ রাজ্যপালন দেখেন—কৃশ দেহ, বৈরাগ্যপূর্ণ বেশ, রামের পাদুকাকে রাজচিহ্ন করে প্রতীকী শাসন, এবং পাশে মন্ত্রী, পুরোহিত ও সেনানায়কগণ। হনুমান রামের বিজয়, সীতার পুনরুদ্ধার ও শীঘ্র মিলনের সংবাদ দিলে ভরত আনন্দে বিহ্বল হয়ে মূর্ছিত হন, হনুমানকে আলিঙ্গন করেন এবং শুভ সংবাদে বিপুল দান প্রদান করেন; রামের প্রতি অটল আনুগত্য ও ধর্মময় শাসনকে তিনি পুনরায় দৃঢ় করেন।

46 verses | Rama, Hanuman, Bharata, Guha

Frequently Asked Questions

Yuddhakāṇḍa frames war as a dharmic necessity rather than a celebration of violence: force becomes legitimate only when subordinated to truth, restraint, and the protection of the wronged. The narrative repeatedly contrasts Rāma’s disciplined adherence to counsel, alliance-ethics, and vows with Rāvaṇa’s pride-driven rejection of wise advice. Vibhīṣaṇa’s defection and Rāma’s granting of asylum further establish rājadharma as the capacity to recognize virtue even in an enemy camp. The book thus presents adharma not merely as “sin” but as strategic blindness that collapses sovereignty from within.

Key episodes include: Hanumān’s report and the march to the sea; Rāma’s observance and confrontation with Sāgara; construction and crossing of the setu; reconnaissance and the siege of Laṅkā; Vibhīṣaṇa’s counsel, rejection, and asylum; successive gate-battles and the fall of leading commanders (e.g., Dhumrākṣa, Vajradaṃṣṭra, Prahasta); Indrajit’s māyā that temporarily disables Rāma and Lakṣmaṇa and the counter-operation against his ritual power (Nikumbhilā); Kumbhakarṇa’s awakening, rampage, and death; and the tightening of the campaign toward the final confrontation with Rāvaṇa and the recovery of Sītā.

The central figures are Rāma and Lakṣmaṇa (leaders of the righteous campaign), Sītā (the moral and emotional center), Hanumān and Sugrīva (vānaras coalition leadership), and Vibhīṣaṇa (insider counselor who joins Rāma). The principal antagonists are Rāvaṇa (king of Laṅkā), Indrajit/Meghanāda (ritual and illusion warfare specialist), and Kumbhakarṇa (colossal champion). Aṅgada and Jāmbavān function as prominent vānaras leaders who stabilize morale and lead assaults.

Yuddhakāṇḍa is the epic’s decisive resolution-phase: it transforms the quest and alliance-building of earlier books into direct confrontation, adjudicating the moral claims established in Araṇya and Kiṣkindhā and operationalized in Sundara through Hanumān’s mission. It also prepares the ethical aftermath addressed in the concluding book (Uttarakāṇḍa), where questions of kingship, public scrutiny, and the costs of restoring order are explored. Structurally, it is the hinge where private suffering (Sītā’s captivity, Rāma’s grief) becomes a public test of sovereignty and dharma.

The book teaches that (1) power without counsel and humility becomes self-destructive; (2) perseverance and clarity can be restored even after catastrophic reversals; (3) righteous leadership includes ethical alliance-making and protection of those who seek refuge; (4) grief is real and voiced, yet duty demands action guided by principle; and (5) adharma ultimately erodes both personal judgment and political stability, leading to downfall despite material strength.

Read Valmiki Ramayana in the Vedapath app

Scan the QR code to open this directly in the app, with audio, word-by-word meanings, and more.

Continue reading in the Vedapath app

Open in App