Ramayana - Sundara Kanda
BhaktiCourageDivine grace

Sundara Kanda — Book of Beauty/Excellence (the ‘beautiful’ book, celebrated for its literary and spiritual brilliance)

सुन्दरकाण्ड

সুন্দরকাণ্ড বাল্মীকি রামায়ণের কাহিনি ও অনুভবের মধ্য-সংযোগস্থল—যেখানে রামের বহির্মুখী অনুসন্ধান একক দূত-নায়ক হনুমানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়। তাঁর বুদ্ধি, ভক্তি ও বীর্যই রামকার্যকে লঙ্কার অন্তঃপুর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। মহেন্দ্র পর্বত থেকে সমুদ্র লঙ্ঘন করে লঙ্কাগমন—অন্তরের দৃঢ় সংকল্প কীভাবে মহাজাগতিক কর্মে রূপান্তরিত হয়, তারই মহাকাব্যিক দৃষ্টান্ত। রাত্রিতে লঙ্কায় প্রবেশ করে হনুমান নগরীর ঐশ্বর্য—উদ্যান, প্রাসাদ ও পুষ্পক-বিমান—পর্যবেক্ষণ করেন। এই রাক্ষসী ভোগবিলাসের বিপরীতে অশোকবাটিকায় সীতার ধর্মনিষ্ঠ সংযম ও দুঃখ এক তীব্র নৈতিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। বাহ্য জাঁকজমক বনাম অন্তরের ধর্মবল—এই দ্বন্দ্বেই কাণ্ডের ভাব-আলো জ্বলে ওঠে। কাণ্ডের কেন্দ্র সীতাদর্শন। রাবণের প্রলোভন ও ভয়প্রদর্শনের মধ্যেও বৈদেহী পতিব্রতা-ধর্মে অচল থেকে ধর্মরক্ষা করেন। হনুমান সূক্ষ্ম কূটনীতি ও বিনয়ে নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন, রাম-সুগ্রীব মৈত্রীর কথা বলেন, বিশ্বাস অর্জন করেন এবং অভিজ্ঞানরূপ চূড়ামণি গ্রহণ করেন। সীতার এক মাসের সময়সীমা কাহিনিতে তাড়না ও করুণার গভীরতা বাড়ায়। এরপর কাহিনি নিয়ন্ত্রিত সহিংসতার দিকে মোড় নেয়—অশোকবাটিকা ধ্বংস, লঙ্কার বীরদের সঙ্গে যুদ্ধ, অক্ষবধ, ইন্দ্রজিতের কৌশলে বন্দিত্ব এবং রাবণসভায় দূত-ধর্ম ও দূত-অভয় নিয়ে বিতর্ক। লেজদাহ ও লঙ্কাদহন কেবল কৌশলগত ভীতি সঞ্চার নয়, প্রতীকী শুদ্ধিকরণও; সীতার নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে হনুমানের অনুতাপ প্রশমিত হয়। আদিকাব্যের মধ্যে সুন্দরকাণ্ড বীর-করুণ-অদ্ভুত রসের সংমিশ্রণ, নগর ও প্রকৃতি-বর্ণনার ঐশ্বর্য এবং নৈতিক আলোচনার (শুচিতা, রাজধর্ম, অধ্যবসায়, দূতধর্ম) জন্য বিশেষভাবে পূজিত। দক্ষিণী পাঠপরম্পরায় (IIT কানপুর সংকলিত) কিছু অতিরিক্ত পাঠভেদ ও বিস্তারও সংরক্ষিত, যা বর্ণনার সমৃদ্ধি ও ভক্তিপর গ্রহণ-ইতিহাসকে আরও উজ্জ্বল করে।

Sargas in Sundara Kanda

Sarga 1

समुद्रलङ्घनारम्भः — Commencement of the Ocean-Crossing

এই প্রথম সর্গে হনুমানের সমুদ্রলঙ্ঘন দৃঢ় সংকল্প, পরাক্রম ও বিচক্ষণতার এক সুপরিকল্পিত পরীক্ষা হিসেবে শুরু হয়। সীতার অবস্থান অন্বেষণের সংকল্প করে তিনি রামের কল্যাণসাধনে নিজের দেহ বিশাল করেন; বানরগণ বিস্ময়ে তা প্রত্যক্ষ করে। তারপর দেবগতির ন্যায় আকাশপথে তিনি মহাসমুদ্রের দিকে দ্রুত অগ্রসর হন। সমুদ্রদেবের প্রেরণায় মৈনাক পর্বত অতিথিধর্ম পালন করে বিশ্রামের আশ্রয়রূপে উঠে আসে। মৈনাক ডানাওয়ালা পর্বতদের প্রাচীন কাহিনি এবং ইন্দ্র কর্তৃক তাদের ডানা ছেদন প্রসঙ্গ বলে পারস্পরিক ধর্ম ও আতিথেয়তার মাহাত্ম্য স্মরণ করায়। হনুমান সময়বদ্ধ ব্রত ও কর্তব্যের কারণে বিলম্ব গ্রহণ করেন না; তবু বিনয়ে স্পর্শমাত্রে সম্মান জানিয়ে যাত্রা অব্যাহত রাখেন। এরপর দেবতারা নাগমাতা সুরসাকে হনুমানের শক্তি ও কৌশল পরীক্ষা করতে পাঠান। হনুমান দেহের আকার পরিবর্তন করে তার মুখে প্রবেশ করে পুনরায় বেরিয়ে এসে তার বর পূর্ণ করেন; সুরসা আশীর্বাদ দেন। পরে ছায়াগ্রাহী সিংহিকা তাকে ধরতে উদ্যত হলে হনুমান বিপদ চিনে তার মুখে প্রবেশ করে মর্মস্থান বিদীর্ণ করে তাকে বিনাশ করেন এবং আবার উড়ে যান। সর্গশেষে তিনি অপর তীরে পৌঁছে লঙ্কায় গোপনে প্রবেশের উপযোগী ক্ষুদ্র রূপ ধারণ করে পরবর্তী কার্যপন্থা স্থির করেন—যেখানে শক্তির সঙ্গে সংযম ও বুদ্ধির সমন্বয় প্রকাশ পায়।

210 verses

Sarga 2

लङ्कादर्शनं तथा रात्रौ सूक्ष्मरूपेण प्रवेशोपायचिन्तनम् (Vision of Lanka and Strategy for Nocturnal Entry)

এই সর্গে হনুমান ত্রিকূট পর্বতে এসে লঙ্কার প্রথম বিস্তৃত দর্শন করেন এবং মনে মনে প্রবেশের কৌশল স্থির করতে থাকেন। তিনি নগরীর বাইরে শোভাময় উপবন, সরোবর ও ক্রীড়াবন দেখেন; তারপর পদ্মভরা পরিখা, স্বর্ণপ্রাকার, উচ্চ প্রাসাদ, ধ্বজা ও তোরণে সজ্জিত লঙ্কাকে দেবপুরীর ন্যায় মনে হয়। কিন্তু নিরাপত্তার ভয়ংকর চিত্রও স্পষ্ট হয়—তীক্ষ্ণ অস্ত্রধারী রাক্ষসদের কঠোর প্রহরায় নগরী ভোগবতী বা সাপ-রক্ষিত গুহার মতো প্রতীয়মান। দূতধর্ম স্মরণ করে হনুমান বিচার করেন, প্রকাশ্য যুদ্ধ এখানে অসম্ভব; এমন প্রহরা যে বাতাসও অদেখা পার হতে পারে না, আর অল্প কয়েকজন বানরই এখানে পৌঁছাতে সক্ষম। অতএব তিনি সিদ্ধান্ত নেন—দেশ-কাল মিলিয়ে সাফল্য; সূক্ষ্মরূপ ধারণ করে সন্ধ্যা বা রাত্রিতে গোপনে প্রবেশ, রাবণকে সতর্ক না করে বৈদেহীকে নিয়মিতভাবে অনুসন্ধান। শেষে চন্দ্রোদয়ের বর্ণনা রাত্রিকালের উপযোগিতা দৃঢ় করে এবং পর্যবেক্ষণ থেকে গোপন কর্মে অগ্রসর হওয়ার মুহূর্তটি নির্দেশ করে।

58 verses | Hanuman (internal deliberation / self-addressed reasoning)

Sarga 3

लङ्काप्रवेशः — Hanuman Enters Lanka and Encounters Laṅkā-devatā

এই সর্গে হনুমান লম্বশিখর থেকে রাত্রিতে অতি গোপনে লঙ্কায় প্রবেশ করেন। তিনি নগরীর অপূর্ব নির্মাণশৈলী পর্যবেক্ষণ করেন—সোনার দ্বার, রত্নখচিত ভূমি, বৈডূর্যমণির মঞ্চ ও সিঁড়ি, প্রতিধ্বনিত সংগীত-বাদ্য, এবং পাখিতে ভরা প্রাঙ্গণ। উচ্চ উপমায় লঙ্কাকে অমরাবতী ও বাসব-নগরের ন্যায় দেবনগরী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। লঙ্কার প্রায় অজেয় দুর্গমতা ও সেখানে পৌঁছাতে যে শক্তি প্রয়োজন তা ভেবে হনুমান ক্ষণকাল মনন করেন; পরে শ্রীराम ও লক্ষ্মণের বীর্য স্মরণে তাঁর আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়। তখন লঙ্কার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা (রাক্ষসী-রূপে) প্রকাশ পেয়ে তাঁর পরিচয় ও উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করে এবং প্রবেশ রোধ করতে উদ্যত হয়। সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষে সে প্রথম আঘাত করে; হনুমান নারী বলে অতিরিক্ত ক্রোধ সংযত রেখে পরিমিত বল প্রয়োগে তাকে পরাস্ত করেন। পরাজিতা লঙ্কা-দেবতা ব্রহ্মার বর জানায়—যখন কোনো বানর তাকে বশ করবে, তখন সীতাহরণের ফলে রাবণের রাক্ষসদের বিনাশ আসন্ন—এই সংকেত। এরপর সে হনুমানকে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে দেয় এবং জনকনন্দিনী সীতার অনুসন্ধান অব্যাহত রাখতে অনুমতি দেয়।

51 verses | Hanumān

Sarga 4

लङ्काप्रवेशः — Hanuman’s Stealth Entry and Survey of Lanka

লঙ্কার অধিষ্ঠাত্রী কামরূপিণী লঙ্কাকে দমন করে হনুমান পিছনের পথ ধরে প্রাচীর টপকে শত্রুনগরীতে নিঃশব্দে প্রবেশ করেন (৫.৪.১)। রাত্রিতে প্রবেশকালে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বাঁ পা আগে রাখেন—এটি বৈরী শকুন এবং শত্রুভূমি জয়ের সংকল্পের চিহ্ন (৫.৪.২–৫.৪.৪)। তারপর তিনি লঙ্কার শব্দ-মানচিত্র ও স্থাপত্য-রূপ উভয়ই পর্যবেক্ষণ করেন—রাজপথে মুক্তার মতো পুষ্পসজ্জা, হীরক-জালখচিত প্রাসাদ, পদ্ম ও স্বস্তিকচিহ্নে অলংকৃত প্রাচীর, এবং দীপ্তিময় নগর-রাত্রিশোভা (৫.৪.৩–৫.৪.৭)। হনুমানের অনুসন্ধান বহুইন্দ্রিয়—ত্রিস্থান-ত্রিস্বরের মধুর গান, অলংকার ও নূপুরের ঝংকার, সিঁড়িতে পদধ্বনি, তালি, হাসি-পরিহাস ও কথাবার্তার শব্দ তিনি অভিজাত গৃহসমূহ থেকে শোনেন (৫.৪.১০–৫.৪.১১)। রাক্ষসগৃহে মন্ত্রজপ, স্বাধ্যায় এবং রাবণের উচ্চ স্তবও ধ্বনিত হয়—যা কেবল সামরিকতা নয়, এক জটিল ধর্ম-সংস্কৃতির উপস্থিতি নির্দেশ করে (৫.৪.১২–৫.৪.১৩)। এরপর নিরাপত্তা-তথ্য স্পষ্ট হয়—প্রধান সড়কে দানবসেনার সারি, নগরমধ্যে গুপ্তচর নিয়োগ, এবং নানা আকৃতি-প্রকৃতি, ধ্বজা ও অস্ত্রে সজ্জিত বিভিন্ন বাহিনী (৫.৪.১৪–৫.৪.২২)। শেষে হনুমান রাজদুর্গ-অঞ্চলে পৌঁছান—অন্তঃপুরের সামনে লক্ষসংখ্যক প্রহরা, স্বর্ণতোরণ, পদ্মভরা পরিখা, প্রাচীরবেষ্টনী, এবং স্বর্গসম অন্তর্ভাগে যানবাহন, অশ্ব, গজ, অলংকার ও সুরক্ষিত প্রবেশদ্বার; অতঃপর পরবর্তী কর্মের জন্য তিনি রাবণের অন্তঃপুরে প্রবেশ করেন (৫.৪.২৩–৫.৪.২৯)।

29 verses | Hanuman (as focal agent; primarily observational)

Sarga 5

चन्द्रप्रकाशे लङ्कानिरीक्षणम् — Moonlit Survey of Lanka and the Unfound Sita

এই পঞ্চম সর্গে চন্দ্রালোকের অবিচ্ছিন্ন পটভূমিতে হনুমানের লঙ্কা-অনুসন্ধান বর্ণিত। মধ্যাকাশে স্থিত চন্দ্র যেন শীতল আলোর ছত্র—সে জীবদের শান্ত করে, সমুদ্রকে স্ফীত করে এবং রাত্রিকে পর্যবেক্ষণের উপযোগী করে তোলে। সেই আলোর মধ্যে হনুমান লঙ্কার প্রাসাদ ও গৃহাভ্যন্তর একে একে তন্নতন্ন করে দেখেন। তিনি দেখেন—মদোন্মত্ত রাক্ষসেরা কলহ করে, গর্ব করে, দেহবল প্রদর্শন করে; গৃহসমূহ রথ, অশ্ব, অস্ত্র ও অলংকারে সমৃদ্ধ। নারীরা নানা অবস্থায়—কোথাও স্বামীর পাশে নিদ্রিত, কোথাও হাস্যরত, কোথাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কোথাও প্রিয়কে আলিঙ্গন করে—তারকা, ফুলের মাঝে পাখি, বিদ্যুৎসম অলংকার ইত্যাদি কাব্যোপমায় চিত্রিত। নগরী সামরিকভাবেও সজাগ—ধনুক টানা, যোদ্ধাদের ভারী নিশ্বাস, হাতির গর্জন। তবু সর্বত্র অনুসন্ধান করেও হনুমান জনকনন্দিনী সীতাকে দেখতে পান না। শেষে তিনি সীতার কুলীন জন্ম, ধর্মনিষ্ঠা ও রামভক্তি স্মরণ করে, তাঁর অদর্শনে ক্ষণিক শোক ও বিষাদে নিমগ্ন হন।

27 verses | Hanuman (narrative focalizer / observer)

Sarga 6

राक्षसेन्द्रनिवेशनविचारः (Survey of Ravana’s Residence and Lanka’s Inner Quarters)

ষষ্ঠ সর্গে হনুমান পূর্বে অনুসন্ধান করা প্রাসাদসমূহে সীতাকে না পেয়ে লঙ্কার মধ্যে দ্রুত অথচ সুপরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হন। কামরূপ ধারণ করে ও লাঘব (চপলতা)-র আশ্রয়ে তিনি রাক্ষসরাজের নিবাসে পৌঁছান। সেখানে অগ্নিবর্ণ লাল প্রাচীর, রৌপ্য-স্বর্ণ তোরণ, অন্তঃপুরের স্তরবিন্যাস এবং অলংকারের ঝংকার, দুন্দুভি-শঙ্খধ্বনি ও যজ্ঞকর্মের কলরবে সমুদ্রগর্জনের মতো এক অবিরাম শব্দময় পরিবেশ বর্ণিত হয়েছে। গ্রন্থটি লঙ্কার সামাজিক ও সামরিক পরিমণ্ডলকে চিত্রিত করতে প্রহস্ত, মহাপার্শ্ব, কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ, ইন্দ্রজিত প্রমুখ বহু রাক্ষসনেতার গৃহসমূহের উল্লেখ করে। পরে রাজপ্রাসাদের কেন্দ্রে হনুমান সশস্ত্র প্রহরী, সৈন্যদল, উৎকৃষ্ট অশ্ব এবং মেঘ-পাহাড়সদৃশ যুদ্ধহস্তী দেখেন; পাশাপাশি স্বর্ণ-রত্নের ভাণ্ডার, নানা পাত্র, পালকি, ক্রীড়ামণ্ডপ ও সুশিল্পিত উদ্যান-প্রাঙ্গণের বিপুল ঐশ্বর্য পর্যবেক্ষণ করেন। এই অধ্যায়ের শিক্ষা—সংযত গুপ্তচর্যায় শত্রুর সম্পদ, নিত্য আচার-অনুষ্ঠান ও প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থার যথার্থ মূল্যায়ন করা, কিন্তু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়া। হনুমানের ধর্মসম্মত উদ্দেশ্য সীতান্বেষণ; তাই বেপরোয়া প্রকাশ বা অযথা ঝুঁকি না নিয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে অনুসন্ধান সম্পন্ন করাই শ্রেয়।

42 verses | Hanuman (as focal observer)

Sarga 7

पुष्पकविमानदर्शनम् — The Vision of the Pushpaka and Lanka’s Jewel-like Mansions

এই সর্গে হনুমান লঙ্কার রাজকীয় স্থাপত্য ও পুষ্পক বিমানের নিকট পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি সোনার জালিকাযুক্ত, বৈদূর্য-মণিতে বিভূষিত প্রাসাদসমূহের ঘন ‘জাল’ দেখেন—যেন বিদ্যুৎ-রেখায় জড়ানো মেঘপুঞ্জ, পাখির কলরবে প্রাণবন্ত। শঙ্খ, অস্ত্র, ধনুক-বাণ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ সভাগৃহ ও অস্ত্রাগার, আর চাঁদের আলোয় ঝলমল করা ছাদ-তলাও তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়। সেই গৃহসমূহ ধনরত্নে পূর্ণ, ত্রুটিহীন, যেন দেবশিল্পী মায়ার নির্মাণ—রাবণের সঞ্চিত ঐশ্বর্য ও শক্তির পরিচায়ক। এরপর হনুমান এক অতুল স্বর্ণপ্রাসাদ ও আকাশচারী পুষ্পক বিমান দেখেন—মণিখচিত, মেঘ-আকাশের মতো বর্ণময়, পৃথিবীতে স্বর্গের ন্যায় দীপ্ত। অন্তর্গত অলংকরণ যেন চিত্রিত বিশ্বরূপ: পর্বত, বৃক্ষ, ফুল, সরোবর, পদ্ম, উদ্যান; মণিনির্মিত পাখি, সর্প, অশ্ব, গজ এবং লক্ষ্মীর প্রতীক। এই পর্বতসম, সুগন্ধিত প্রাসাদে পৌঁছে হনুমান পুনরায় সীতার অনুসন্ধানে নগরীতে বিচরণ করেন। সীতাকে না পেয়ে তাঁর মন গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন হয়—ইন্দ্রিয়মুগ্ধ ঐশ্বর্যের মাঝেও কর্তব্যের করুণ তাড়না তাঁকে ব্যথিত করে।

17 verses | Valmiki (narrator), Hanuman (focal observer)

Sarga 8

पुष्पकविमानदर्शनम् (Vision of the Pushpaka Aerial Chariot)

এই সর্গে হনুমান লঙ্কার অন্তঃপুর-প্রাসাদের ভেতরের পথ ধরে অগ্রসর হতে হতে প্রাসাদের মধ্যভাগে স্থিত পুষ্পক বিমান দর্শন করেন। অধ্যায়টি প্রধানত বস্তু-বর্ণনাময়—বিমানটি রত্নখচিত, হীরক-ভূষিত এবং দগ্ধ-সুবর্ণের জালিযুক্ত জানালায় সজ্জিত বলে বর্ণিত। এর নির্মাণ বিশ্বকর্মার কৃত বলে বলা হয়েছে, এবং তার কারুকার্য সাধারণ পরিমাপের অতীত—সূর্যপথে প্রদীপের মতো দীপ্তিমান। বর্ণনায় জোর দিয়ে বলা হয়, তাতে কিছুই অগঠিত বা তুচ্ছ নয়—সবই অমূল্য ও অনন্য, যেন দেবমানককেও অতিক্রম করে। এতে লঙ্কার রাজঐশ্বর্য ও অতিমানবীয় সম্পদের ইঙ্গিত মেলে। বিমানটি প্রভুর সংকল্পানুসারে মনেই ইচ্ছিত স্থানে পৌঁছাতে সক্ষম, বহু বিশেষ বিশ্রামস্থানসমৃদ্ধ, এবং পর্বতশৃঙ্গের ন্যায় বহু বিস্ময়কর কুঞ্জর-শিখর ও প্রাসাদ-স্তম্ভে অলংকৃত। শেষে সহস্র সহস্র দ্রুতগামী ও ভয়ংকর রাত্রিচর ভূতগণের দ্বারা তার বহনের উল্লেখ আছে। হনুমান তার সৌন্দর্য দেখে মনে করেন, তা বসন্তের মোহনীয়তাকেও ছাপিয়ে যায়। এভাবে লঙ্কার ঐশ্বর্য ও হনুমানের সংযমী পর্যবেক্ষণধর্মী ধর্মকার্য—দুইয়ের বৈপরীত্য একসঙ্গে প্রতিফলিত হয়।

7 verses | Hanuman (as focal observer)

Sarga 9

पुष्पकविमानवर्णनम् — Description of the Pushpaka Vimana and Ravana’s Inner Palace

এই সর্গে হনুমান বৈদেহী সীতার সন্ধানে রাক্ষসরাজের প্রধান প্রাসাদ-পরিসরটি পদ্ধতিগতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। বর্ণনা তখন স্থাপত্য ও সৌন্দর্য-শাস্ত্রসম্মত বিশদে প্রবেশ করে—এক বিশাল কেন্দ্রীয় প্রাসাদসমষ্টি, এবং তার পর রত্নখচিত পুষ্পক-বিমান। বলা হয়, বিশ্বকর্মা ব্রহ্মার জন্য এটি নির্মাণ করেছিলেন; কুবের তপস্যায় তা লাভ করেন; আর রাবণ বলপূর্বক কেড়ে নেয়—ফলে ন্যায্য অর্জন ও হিংস্র দখলের নৈতিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়। বিভিন্ন প্রকার স্বর্ণ, স্ফটিক, নীলমণি, প্রবাল, মুক্তা প্রভৃতি উপাদান; স্তম্ভ, জালিযুক্ত জানালা, সিঁড়ি, মঞ্চ ইত্যাদি অঙ্গ; এবং ধূপ, ফুল, খাদ্য ও মদ্যের সুগন্ধে ভরা পরিবেশ—কাব্যিক উপমায় লঙ্কার ঐশ্বর্যকে একদিকে মোহময়, অন্যদিকে ধর্মবিরোধী অসঙ্গতিতে চিহ্নিত করা হয়। সুগন্ধের পথ ধরে হনুমান রাবণের প্রিয় সভাকক্ষে পৌঁছান, যেখানে উল্লাসের পর অসংখ্য নারী নিদ্রিত; তাদের অলংকার ও ভঙ্গি পদ্ম, তারা, নদী ও লতার সঙ্গে তুলিত। শেষে হনুমানের ধর্মসম্মত সিদ্ধান্ত—এই নারীদের মধ্যে কেবল সীতাই রাবণের সঙ্গে স্বেচ্ছায় যুক্ত নন; তাই অপহরণকে অনার্য কর্ম বলে নিন্দা আরও তীক্ষ্ণ হয়।

73 verses | Hanuman (internal reflections)

Sarga 10

रावणान्तःपुरे शयनदर्शनम् (Hanumān Observes Rāvaṇa’s Inner Apartments and Sleeping Court)

এই সর্গে হনুমান গোপন পর্যবেক্ষকের মতো বিচরণ করে রাবণের অন্তঃপুরের অপূর্ব শয়নকক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে স্ফটিক ও মণিখচিত শয্যা, স্বর্ণালঙ্কৃত আসবাব, মালা, দীপ, সুগন্ধি, চন্দন-লেপন প্রভৃতি দ্বারা সাজানো ভোগবিলাসের ঐশ্বর্য বর্ণিত হয়—যেন আচারসম্মত এক রাজসিক আয়োজন। তারপর তিনি রাক্ষসরাজ রাবণকে নিদ্রিত অবস্থায় দেখেন—মেঘসম, সন্ধ্যারক্ত আকাশে বিদ্যুৎসম, মন্দরপর্বতসম, আর গঙ্গাতীরে হাতির ন্যায়—যার দেহে যুদ্ধবীর্যের চিহ্ন স্পষ্ট। তার সর্পসদৃশ শ্বাস-প্রশ্বাসে হনুমান ক্ষণিক ভীত হন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সংযম ফিরে পেয়ে পুনরায় সতর্ক থাকেন। এরপর অন্তঃপুরের নারীরা—নর্তকী, গায়িকা ও পরিচারিকা—বাদ্যযন্ত্র ও অলঙ্কারসহ উৎসবের ক্লান্তিতে নিদ্রিত এক দৃশ্যরূপে প্রতিভাত হয়। হনুমান মন্দোদরীকে দেখে তার রূপ-সজ্জায় সীতাই ভেবে মুহূর্তের আনন্দ পান; কিন্তু ধর্মবুদ্ধিতে পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন, তিনি সীতা নন। এভাবে রাজভোগের অতিশয়তার পাশে অন্বেষকের নৈতিক বিচক্ষণতা ও সুন্দর্কাণ্ডের অনুসন্ধান-প্রবাহ অগ্রসর হয়।

54 verses | Hanuman (as focal perceiver)

Sarga 11

रावणान्तःपुर-पानभूमि-विचयः (Hanumān’s Survey of Rāvaṇa’s Inner Palace and Banquet Hall)

এই সর্গে হনুমান পূর্বের একটি অনুমান ত্যাগ করে সীতার বিষয়ে নতুন করে বিচার করেন। তিনি স্থির করেন—রামের বিরহে থাকা নারী ঘুম, অলংকার, ভোজন‑পান বা অন্য কোনো পুরুষের প্রতি আকর্ষণে প্রবৃত্ত হতে পারে না; দেবরাজ হলেও নয়, কারণ রামের সমান কেউ নেই। এরপর তিনি রাবণের অন্তঃপুরে প্রবেশ করে পানভূমি (ভোজ‑পানশালা) পর্যবেক্ষণ করেন। সেখানে নানা প্রকারে প্রস্তুত মাংস, লেহ্য‑পেয়‑ভোজ্য দ্রব্য, রাগ‑ষাডব প্রভৃতি মধুর রস, সোনা‑রূপা‑স্ফটিকের পাত্র, ছড়ানো মালা‑ফল, উপচে পড়া পানীয়, শয্যা‑আসন—সব মিলিয়ে কক্ষটি যেন আগুন ছাড়াই দীপ্ত। উল্লাস‑বিলাসের পর ঘুমন্ত নারীদের মধ্যে রাবণকেও তিনি দীপ্তিমানরূপে দেখেন। অন্তঃকক্ষসমূহ সম্পূর্ণভাবে অনুসন্ধান করেও তিনি জানকীকে পান না। তখন ধর্মসংকোচ জাগে—অন্যের অন্তঃপুরে ঘুমন্ত নারীদের দেখা কি অধর্ম? হনুমান স্থির করেন, তাঁর মন বিষয়াসক্ত নয়, ধর্মে প্রতিষ্ঠিত; আর নারীর অনুসন্ধানে নারীদের মধ্যেই দৃষ্টি দিতে হয়। এই সিদ্ধান্তে তিনি পানভূমি ত্যাগ করে অন্যত্র সীতার সন্ধানে অগ্রসর হন।

47 verses | Hanumān (internal deliberation)

Sarga 12

द्वादशः सर्गः — हनूमतः अन्तःपुरविचयः (Hanuman’s Search Through Ravana’s Inner Apartments)

এই সর্গে হনুমান লঙ্কার মধ্যস্থ মহাপ্রাসাদ-সমূহে পুনরায় শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সূক্ষ্ম অনুসন্ধান করেন। সীতাদর্শনের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তিনি লতাগৃহ, চিত্রশালা, শয়নকক্ষ, ভোজনসভা, ক্রীড়াগৃহ, উদ্যানপথ, ভূগর্ভস্থ কক্ষ, দেবালয় এবং অন্তঃপুরের ভেতরে ভেতরে থাকা নানা নিবাসে প্রবেশ করে প্রায় কোনো স্থানই অদেখা রাখেন না। এখানে প্রধানত হনুমানের অন্তর্চিন্তা প্রকাশ পায়—কার্য ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা, সীতার ভয়ে বা হিংসায় মৃত্যুর সম্ভাবনা, এবং সমুদ্রপারে অপেক্ষমাণ বানরদের (জাম্ববান ও অঙ্গদ প্রমুখ) প্রত্যাশা ও ধর্মকার্যের ফলাফল নিয়ে ভাবনা। নৈতিক বাঁকে তিনি হতাশা ত্যাগ করেন; “অনির্বেদ” (অবসাদহীন ধৈর্য)কেই সমৃদ্ধি ও সিদ্ধির মূল বলে গ্রহণ করে সর্বোত্তম প্রয়াসে পুনরায় স্থির হন। শেষে বহু আশ্চর্য নারী—বিদ্যাধর ও নাগকন্যা—এবং নানা ভীতিকর রূপের রাক্ষসী পরিচারিকাদের দেখা মিললেও জনকনন্দিনী, রাঘবপ্রিয়া সীতা পাওয়া যায় না; শোক বাড়ে, তবু অধ্যবসায়ই পথ—এই বোধ আরও দৃঢ় হয়।

25 verses | Hanuman (internal monologue)

Sarga 13

रावणभवनपरिक्रमणं हनूमतः शोकविचारश्च (Hanuman’s Circuit of Ravana’s Palace and the Crisis of Deliberation)

এই সর্গে হনুমান মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের ন্যায় লঙ্কার প্রাচীরে অবতরণ করে রাবণের প্রাসাদ চারদিকে পরিক্রমা করেন, কিন্তু সীতাকে খুঁজে পান না। তখন সীতার অনুপস্থিতির নানা সম্ভাবনা তিনি ভাবেন—অপহরণের সময় সমুদ্রে পতিত হওয়া, রাক্ষসদের হাতে নিহত বা ভক্ষিত হওয়া, রাম-স্মরণজনিত শোকে প্রাণত্যাগ করা, অথবা খাঁচাবন্দি পাখির মতো গোপন কারাগারে আবদ্ধ থাকা। এরপর অনুমান থেকে ফলবিচারে তিনি প্রবেশ করেন—যদি সংবাদ না নিয়ে ফিরে যান, তবে রাম, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, অন্তঃপুরের রাণীগণ, সুগ্রীব, রুমা, তারা, অঙ্গদ এবং সমগ্র বানরসমাজের উপর শোক ও মৃত্যুর ধারাবাহিক বিপর্যয় নেমে আসবে। তিনি অগ্নিতে প্রবেশ, জলে ডুব, বা উপবাসে আত্মবিসর্জনের কথা ভাবলেও আত্মহত্যাকে অধর্ম ও বহু দোষের কারণ জেনে পরিত্যাগ করেন; জীবিতেরই মঙ্গলসিদ্ধি হয়—এই সিদ্ধান্তে স্থির হন। অতঃপর তিনি অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার সংকল্প করেন; অশোকবাটিকাকে এখনও অনাবিষ্কৃত স্থান জেনে দেবতা ও সহায়দের প্রণাম করে নবনিশ্চয়ে সেই উপবনের দিকে অগ্রসর হন। সর্গের শেষে তিনি উপবনের রক্ষিত পবিত্রতা স্মরণ করে সফলতার প্রার্থনা করেন।

69 verses

Sarga 14

अशोकवनिकाविचारः (Survey of the Aśoka Grove and its Enchanted Landscape)

এই সর্গে হনুমান সংযত গতিতে প্রাসাদের সীমানায় অবতরণ করে বৈদেহীকে গোপনে অনুসন্ধান করতে অশোকবনিকা প্রবেশ করেন। তাঁর দ্রুত চলনে ফুলে-ফলে ভরা বৃক্ষগুলি কেঁপে উঠে নানা বর্ণের পুষ্পবৃষ্টি ঝরায়; পাখিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে উড়ে যায়; উপবনটি যেন বসন্তের মূর্ত প্রতিমা। কাব্যময় উপমায় বৃক্ষদের পরাজিত জুয়াড়ির সঙ্গে এবং বনিকাকে এলোমেলো কেশবতী তরুণীর সঙ্গে তুলনা করে এই শারীরিক আলোড়নকে অর্থবহ রসায়নে রূপ দেওয়া হয়েছে। হনুমান সেখানে নির্মিত ঐশ্বর্য দেখেন—মণি, স্বর্ণ ও রৌপ্যে পাতা পথ; রত্নসোপানযুক্ত সরোবর, স্ফটিকতল, পদ্মবন ও জলপাখিতে ভরা জলাশয়; কৃত্রিম হ্রদ ও প্রাসাদ, যেন বিশ্বকর্মার নির্মাণ। তিনি এক প্রধান স্বর্ণাভ শিংশুপা বৃক্ষ লক্ষ্য করেন—স্বর্ণমঞ্চে পরিবেষ্টিত, বাতাসে নূপুরধ্বনির মতো ঝংকার তোলে। তাতে আরোহণ করে তিনি ভাবেন, বনবাসে অভ্যস্ত ও সন্ধ্যা-উপাসনাপরায়ণা সীতা নিকটবর্তী শুভ জলস্থানে আসতে পারেন। অতঃপর ঘন পাতা ও পুষ্পের আড়ালে নিজেকে গোপন করে হনুমান সতর্ক প্রহরায় থাকেন এবং রাণীর আবির্ভাবের প্রতীক্ষা করেন।

52 verses | Hanuman

Sarga 15

अशोकवनिकायां सीतादर्शनम् (Sita Seen in the Ashoka Grove)

এই পঞ্চদশ সর্গে হনুমান শিংশুপা-বৃক্ষের উপর থেকে অশোকবাটিকাকে চারিদিকে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি উদ্যানের অলংকার-সমৃদ্ধি, পুষ্পপ্রভার বৈচিত্র্য, নন্দন ও চৈত্ররথের ন্যায় তার শোভা এবং সহস্র অশোকবৃক্ষের বর্ণনা দেন। মাঝখানে তিনি চৈত্যপ্রাসাদসদৃশ এক উচ্চ ভবন দেখেন—সহস্র স্তম্ভে আশ্রিত, কৈলাসের মতো শুভ্রপ্রভ, প্রবালসোপান ও তপ্তকাঞ্চন বেদিকায় ভূষিত। তারপর তিনি রাক্ষসীদের পরিবেষ্টিত, মলিন বস্ত্রধারিণী, উপবাসে কৃশ, বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকা এক নারীর দর্শন পান। উপমার শৃঙ্খলে তাঁর শোকাবস্থা প্রকাশিত—ধূমাবৃত শিখা, মেঘাবৃত চন্দ্রপ্রভা, রোহিণী-পীড়নের ন্যায় ইত্যাদি। হনুমানের ‘এ সীতাই’ এই নিশ্চিতি লক্ষণ-কারণে ক্রমে দৃঢ় হয়; রাম পূর্বে যে অলংকার-চিহ্ন বলেছিলেন তা দেখে তিনি প্রমাণ লাভ করেন, এবং পরিত্যক্ত বস্ত্র-ভূষণের স্মরণে কাহিনির প্রমাণ-শৃঙ্খল পূর্ণ হয়। শেষে সীতাদর্শনে আনন্দিত হয়ে তিনি মনে মনে রামের কাছে গিয়ে প্রভুর প্রশংসা করেন—এই সর্গে দূতের যাচাই (প্রমাণ-সংগ্রহ) এবং করুণা-সহ বিবেকের সহাবস্থানই প্রধান শিক্ষা।

55 verses

Sarga 16

षोडशः सर्गः (Sarga 16): Hanumān’s Recognition of Sītā and Renewed Lament

এই সর্গে হনুমান অশোকবাটিকায় দেখা নারীর পরিচয় অন্তরে যাচাই করে নিশ্চিত হন—তিনি সীতাই। সীতার সৌন্দর্য ও রামের গুণ স্মরণ করতে করতেই তাঁর শোক পুনরায় জাগে, কিন্তু তা কৌশলী বোধে সংযত থাকে—হনুমান মনে করেন, রাম-লক্ষ্মণের পরাক্রম জানার কারণেই সীতা স্থিরচিত্তে ধৈর্য ধারণ করছেন। এরপর তিনি ‘সীতার জন্য’ সংঘটিত মহাযুদ্ধগুলির কারণ-পরম্পরা স্মরণ করেন—বালিবধ, কবন্ধ ও বিরাধের নিধন, এবং জনস্থানে খর, ত্রিশিরা, দূষণসহ চৌদ্দ হাজার রাক্ষসের বিনাশ; পাশাপাশি সুগ্রীবের রাজ্যপুনরুদ্ধারকেও সেই ধারার ফল বলে দেখান। নিজের সমুদ্র-লঙ্ঘন ও লঙ্কা-অন্বেষণকে সীতাপ্রাপ্তির সেবা বলে স্থির করেন এবং বলেন—সীতার জন্য বিশ্ব উল্টে দেওয়া যুদ্ধও ধর্মসঙ্গত। তিনি সীতার পরিচয়চিহ্ন আরও স্পষ্ট করেন—জনকের কন্যা, কর্ষণরেখা থেকে জন্ম, পতিব্রতা, দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ। আগে যিনি রাম-লক্ষ্মণের রক্ষায় ছিলেন, আজ তিনি রাক্ষসীদের প্রহরায় বন্দিনী—এই বৈপরীত্যে করুণা ঘনীভূত হয়। হিমাহত পদ্ম, বিরহিণী চক্রবাকী, অশোকপুষ্প ও চন্দ্রালোকে শোকবৃদ্ধির উপমায় বন্দিত্বের মানসিক ও সৌন্দর্যগত উলটপালট চিত্রিত করে হনুমান সিদ্ধান্তে পৌঁছে শিংশুপা বৃক্ষে গোপনে সতর্ক দৃষ্টিতে অবস্থান করেন।

32 verses | Hanumān (internal monologue / lament)

Sarga 17

सप्तदशः सर्गः — Hanuman Beholds Sita in the Ashoka Grove

এই সর্গে শীতল, নির্মল ও কলঙ্কহীন চন্দ্রোদয় হয়। নীল জলে রাজহাঁসের মতো চাঁদ—এমন স্তরে স্তরে উপমায় তার দীপ্তি বর্ণিত, আর সেই জ্যোৎস্না যেন ধর্মকার্যে নিয়োজিত হনুমানের সহায় হয়ে ওঠে। বৈদেহীকে খুঁজতে গিয়ে হনুমান প্রথমে রক্ষাব্যবস্থা লক্ষ্য করেন—বিকট দেহ, পশুমুখী মিশ্ররূপ, লোহার শূল-মুদ্গর প্রভৃতি অস্ত্রধারী রাক্ষসীরা এক বিশাল বৃক্ষকাণ্ড ঘিরে বসে আছে; এখানে ভয় একক প্রতিপক্ষ নয়, সুসংগঠিত সন্ত্রাসেরই চিত্র। সেই বৃক্ষের তলায় তিনি অবশেষে সীতাকে চিনতে পারেন—নিষ্প্রভ, ধূলিধূসর, শোকে জর্জরিত; তবু পতিব্রতা ধর্ম ও রামপ্রেমে অন্তরে দীপ্তিময়। উল্কা মাটিতে পতিত, শরৎচন্দ্রকলার উপর মেঘের আচ্ছাদন, অব্যবহৃত বীণার মতো—এমন উপমায় তাঁর অবস্থা প্রকাশিত; কিন্তু বাহ্য দুঃখের মধ্যেও তাঁর ধর্ম অক্ষুণ্ণ—এটাই প্রতীয়মান। হনুমানের আনন্দ সংযত—স্বস্তির অশ্রু ঝরে, মনে মনে রাম-লক্ষ্মণকে প্রণাম করেন, এবং সীতার নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখতে পাতার আড়ালে লুকিয়ে থেকে পরবর্তী কর্ম সতর্কভাবে সম্পন্ন করেন।

32 verses | Hanumān (internal response implied)

Sarga 18

अष्टादशः सर्गः (Sarga 18): रावणस्य प्रमदावनप्रवेशः — Ravana’s entry into the women’s grove

হনুমান্ পুষ্পিত অশোকবাটিকায় বৈদেহী সীতার অনুসন্ধান চালিয়ে যান; রাত্রি ক্ষয় হতে থাকে, প্রভাত সন্নিকট। তখন মঙ্গলবাদ্যের ধ্বনিতে দশগ্রীব রাবণ জাগ্রত হয়—মালা ও বস্ত্র এলোমেলো, মন সীতায় আসক্ত, কামভাব গোপন নয়; উঠে সে অলংকার ধারণ করে। বৃক্ষ, সরোবর, পক্ষী ও মৃগে সমৃদ্ধ উদ্যান, মণি-স্বর্ণ তোরণে শোভিত পথ অতিক্রম করে সে অশোকবাটিকায় প্রবেশ করে। তার পশ্চাতে দীপ, চামর, জলকলস, আসন, মদিরা এবং চন্দ্রপ্রভা-সম ছত্র বহনকারী নারীরা চলে; প্রধান রাণীরা নিদ্রা ও মদে বিহ্বল, মেঘের চারদিকে বিদ্যুতের ন্যায়, অলংকার ও প্রসাধন বিশৃঙ্খল অবস্থায় অনুসরণ করে। হনুমান্ নূপুর-মেখলার শব্দ শোনেন, বহু তেলদীপের আলোয় দ্বারে রাবণকে দেখেন এবং পাতার আড়ালে গোপনে থেকে তার কামাতুর, দম্ভিত, মদোন্মত্ত, মনোবব-সদৃশ রূপ পর্যবেক্ষণ করেন। সীতাকে দেখার বাসনায় রাবণ আবার উপবনের অন্তরে অগ্রসর হয়; সর্গের শেষে অত্যাচারী শক্তি ও অচল ধর্ম-ধৈর্যের আসন্ন সংঘাতের ইঙ্গিত মেলে।

32 verses | Hanuman (internal recognition/assessment), Ravana (implied intent; no extended dialogue in the given verses)

Sarga 19

सीताव्यथा-वर्णनम् / Sītā’s Distress and Rāvaṇa’s Attempt at Coercive Allurement

এই সর্গে রাবণ অশোকবাটিকায় বন্দিনী সীতার কাছে আসে। রাক্ষসরাজকে দেখামাত্র সীতা ভয়ে কেঁপে ওঠেন—বাতাসে দুলতে থাকা কলাগাছের উপমায় তাঁর দেহ-মনস্তাপের কম্পন প্রকাশিত হয়। এরপর ধারাবাহিক উপমানের মাধ্যমে তাঁর সৌভাগ্য ও স্থৈর্যের ক্ষয়চিত্র আঁকা হয়—তিনি যেন ম্লান যশ, অবমানিত শ্রদ্ধা, বিঘ্নিত পূজা, ব্যর্থ আশা, নষ্ট পদ্মলতা, বীরহীন সেনা, অন্ধকারে ঢাকা দীপ্তি, শুকিয়ে যাওয়া নদী, এবং রাহুগ্রস্ত পূর্ণচন্দ্র। এই প্রতীকগুলি অপহরণজনিত নৈতিক বিশৃঙ্খলাকে জাগতিক-যাগ্য-দৈব চিহ্নে প্রতিফলিত করে, তবু সীতার অন্তর্নিহিত ধর্ম অটুট থাকে। উপবাস, শোক, চিন্তা ও ভয়ে তিনি কৃশ হলেও তপস্যার দ্বারা তাঁকে আধ্যাত্মিকভাবে ‘ধনবতী’ বলা হয়েছে। শেষে রাবণ নানা প্রলোভনে তাঁকে আকর্ষণ করতে চায়; সীতা রামভক্তিতে অচল থাকলে সে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এতে জবরদস্তি ও অটল পতিব্রতা-নিষ্ঠার নৈতিক বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়।

23 verses | Rāvaṇa

Sarga 20

रावणस्य सीताप्रलोभनम् (Ravana’s Persuasion and Coercive Courtship of Sita)

এই সর্গে রাবণ শোকাকুল, তপস্বিনী-সদৃশ সীতাকে—যিনি রাক্ষসী প্রহরিণীদের দ্বারা পরিবেষ্টিতা—‘মধুর ও সজীব বাক্যে’ সম্বোধন করে। তার কথায় প্রলোভন ও ভয়প্রদর্শন পালাক্রমে আসে। সে মালা, চন্দন, ধূপ, বস্ত্র, অলংকার প্রভৃতি ভোগবিলাস, গান-নৃত্য-বাদ্যসহ ইন্দ্রিয়সুখের আয়োজন, এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা—অন্তঃপুরের অধিকার, বিপুল ধন-ভূমি—দানের প্রতিশ্রুতি দেয়; এমনকি জনককে জয়-উপহার ও সম্মান দেওয়ার কথাও তোলে। রাবণ সীতার অতুল সৌন্দর্যের প্রশংসা করে, অলংকার ধারণে প্ররোচিত করে এবং ক্ষণস্থায়ী যৌবনের যুক্তি দেখিয়ে তাকে দ্রুত সম্মত হতে বলে। পাশাপাশি সে নিজের অজেয় বীর্য ও শক্তির গর্ব করে রামের সামর্থ্যকে খাটো করে—রামকে বনবাসী, দরিদ্র, এমনকি সম্ভবত মৃত বলেও ইঙ্গিত করে, এবং দাবি করে যে রাম লঙ্কা থেকে সীতাকে উদ্ধার করতে পারবেন না। ফলে এই অধ্যায়ে সীতার দৃশ্যমান বৈরাগ্য ও অস্বীকৃতির প্রেক্ষিতে রাবণের বলপ্রয়োগী প্ররোচনার—ঐশ্বর্য-প্রতিশ্রুতি, সৌন্দর্য-স্তব, ও স্বামীনিন্দা—একটি সুস্পষ্ট চিত্র অঙ্কিত হয়।

36 verses | Ravana

Sarga 21

सीताया रावणं प्रति धर्मोपदेशः (Sita’s Dharmic Admonition to Ravana)

এই সর্গে রাবণের উদ্ধত প্রস্তাব শুনে সীতা সংযত অথচ অটল ভাষায় উত্তর দেন। তিনি দু’জনের মাঝে একখণ্ড তৃণ স্থাপন করে সীমারেখা টানেন এবং ধর্মের স্তরিত সমালোচনা করেন—রাজাকে কামসংযমী হতে হবে, পরস্ত্রীকে নিজের স্ত্রীর মতো রক্ষা করতে হবে, আর জ্ঞানীদের সদুপদেশ মানতে হবে। তিনি বলেন, অধর্মী শাসকের হাতে রাজ্য অনিবার্যভাবে ধ্বংসের পথে যায়; রাবণই নিজের কুলবিনাশের কারণ। এরপর উপমার দ্বারা রাঘবের সঙ্গে নিজের অবিচ্ছেদ্যতা প্রকাশ করেন—যেমন সূর্যের সঙ্গে তার জ্যোতি, তেমনই তত্ত্বদর্শী ব্রাহ্মণের সঙ্গে বিদ্যা। তারপর সীতা নীতিপথ দেখান—রাবণ যেন রামের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে এবং সীতাকে ফিরিয়ে দেয়; এটাই কল্যাণের একমাত্র উপায়। এরপর তিনি রামের যুদ্ধময় আগমনের পূর্বাভাস দেন—ধনুকের মেঘগর্জন-সম টংকার, লঙ্কার উপর বাণবৃষ্টি, এবং সীতার অবশ্যম্ভাবী উদ্ধার; যেমন বিষ্ণু বামনরূপে অসুরদের কাছ থেকে শ্রী পুনরুদ্ধার করেছিলেন। শেষে তিনি কাপুরুষোচিত অপহরণের নিন্দা করে বলেন—রামের প্রতিশোধ থেকে কোনো আশ্রয়ই রক্ষা করতে পারবে না।

34 verses | Sita, Ravana

Sarga 22

रावणस्य तर्जनं सीताया धर्मोक्तिः (Ravana’s Threats and Sita’s Dharma-Centered Reply)

অশোকবনে সীতার তীক্ষ্ণ তিরস্কারে উন্মত্ত রাবণ ভয়ংকর হুমকি দেয়। সে দুই মাসের সময়সীমা বেঁধে রাক্ষসীদের আদেশ করে—সাম, দান, ভেদ, দণ্ড; প্রলোভন, ছল ও শাস্তি—পালাক্রমে সব কৌশলে সীতাকে বশ করতে। সীতার বিপদ দেখে দিব্য ও গন্ধর্ব-কন্যারা শোকে বিহ্বল হয়ে নীরব ইশারায় তাকে সান্ত্বনা দিতে চায়; বন্দিনী সীতার নৈতিক একাকিত্ব আরও স্পষ্ট হয়। সীতা স্থির হয়ে ধর্মনিষ্ঠ যুক্তিতে জবাব দেয়। রাবণের মন্ত্রীদের ধিক্কার করে বলে—তারা তাকে অধর্ম থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি; রামের প্রতি নিজের একান্ত পতিব্রত বন্ধন ঘোষণা করে; এবং অপহরণের এই অধর্মের অনিবার্য প্রতিফল—দণ্ড ও বিনাশ—অবশ্যই আসবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে। এরপর রাবণের ভয়াল ঐশ্বর্যের মহাবর্ণনা—মেঘশ্যাম দেহ, সিংহগতি, রত্নালঙ্কারে দীপ্ত—বাহ্য মহিমা ও অন্তরের নৈতিক কলুষতার তীব্র বৈপরীত্য দেখায়। পুনরায় ভীতি প্রদর্শন করে সে বিকটাকৃতি রাক্ষসীদের হাতে সীতাকে চাপের মধ্যে ফেলে দেয়; ধান্যমালিনী তাকে সীতার প্রসঙ্গ থেকে সরিয়ে ভোগে প্রবৃত্ত করতে চায়। রাবণ প্রাসাদে ফিরে যায়; সীতা কাঁপলেও ধর্মে অটল থেকে জোরজবরদস্তির পরাজয় ও রাবণের পতনের ইঙ্গিত দেয়।

46 verses

Sarga 23

राक्षसी-भर्त्सना (The Demonesses’ Coercive Counsel to Sītā)

রাবণ সীতাকে সরাসরি চাপ ও প্রলোভন দেখিয়ে শেষে সেখান থেকে চলে যায় এবং অশোকবাটিকায় প্রহরার রাক্ষসীদের আদেশ দেয়। তারা তৎক্ষণাৎ ভিড় করে সীতাকে ঘিরে ধরে এবং কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা ও ভয় প্রদর্শন করতে থাকে। তাদের কথাবার্তা ক্রমে তীব্রতর হয়—রাবণের বংশমর্যাদা (পুলস্ত্য → বিশ্রবা → রাবণ) তুলে ধরে তাকে মহান বলে প্রতিষ্ঠা করে, আর জোরপূর্বক বিবাহকে “সৌভাগ্য” হিসেবে দেখিয়ে সীতাকে প্রলুব্ধ করে। একজটা, হরিজটা, প্রঘসা, বিকটা ও দুর্মুখী নানা কৌশলে কথা বলে—দেবতা, ইন্দ্র, নাগ, গন্ধর্ব, দানবদের উপর বিজয়ের দাবি; ঐশ্বর্য-রত্ন-অন্তঃপুরের লোভ; এবং মহাজাগতিক ভীতি—ভয়ে সূর্য ও বায়ুও নাকি সংযত হয়, প্রকৃতিও ফুল-জল নিবেদন করে। শেষে তারা ছদ্ম-কল্যাণের ভঙ্গিতে চূড়ান্ত হুমকি দেয়—“আমাদের উপদেশ মানো, নইলে মৃত্যু।” এই সর্গে সম্মতি-নির্ভর ধর্ম ও ভয়-নির্ভর দমননীতির নৈতিক বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়, এবং লঙ্কাবন্দিত্বে সীতার নিঃসঙ্গতা এক মহৎ নৈতিক পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে উজ্জ্বল হয়।

21 verses | Rāvaṇa, Rākṣasīs (Ekajaṭā, Harijaṭā, Praghasā, Vikaṭā, Durmukhī), Sītā (addressed; largely silent in the cited verses)

Sarga 24

सीताभर्त्सना — The Ogresses’ Threats to Sita and Her Vow of Fidelity

এই সর্গে অশোকবাটিকায় রাবণের আদেশে বহু রাক্ষসী সীতার কাছে এসে কখনও প্রলোভন, কখনও ভয় দেখিয়ে তাঁর দৃঢ়তা ভাঙতে চেষ্টা করে। তারা কঠোর ভাষায় সীতাকে অন্তঃপুরে যেতে ও রাবণকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে বলে; ঐশ্বর্য, ভোগ ও রাজশক্তির কথা তুলে ধরে এটিকে অনিবার্য বলে প্রচার করে। সীতা ধর্মনিষ্ঠভাবে প্রত্যাখ্যান করেন—মানবী নারী রাক্ষসের স্ত্রী হতে পারে না; মৃত্যুভয় দেখালেও তিনি রামকে ত্যাগ করবেন না। তিনি বিবাহধর্ম ব্যাখ্যা করে বলেন, রামই তাঁর গুরু ও বিধিসম্মত স্বামী; দারিদ্র্য বা রাজ্যচ্যুতি হলেও তিনিই তাঁর আশ্রয়। এরপর শচী–ইন্দ্র, অরুন্ধতী–বশিষ্ঠ, রোহিণী–চন্দ্র, লোপামুদ্রা–অগস্ত্য, সুকন্যা–চ্যবন, সাবিত্রী–সত্যবান, দময়ন্তী–নল প্রভৃতি পতিব্রতা নারীদের দৃষ্টান্ত দিয়ে নিজের অটলতা দৃঢ় করেন। রাক্ষসীরা ক্রুদ্ধ হয়ে কুঠার, ত্রিশূল ইত্যাদি অস্ত্রের হুমকি দেয়, অঙ্গচ্ছেদ ও ভক্ষণ করার ভয় দেখায় এবং তৎক্ষণাৎ হত্যার কথা বলে। সীতা অশ্রুসজল হয়ে শিংশুপা বৃক্ষের কাছে সরে যান; গোপনে থাকা হনুমান নীরবে সব শুনতে থাকেন—এ দৃশ্য নৈতিক সাক্ষ্যও, আবার উদ্ধারযাত্রার জন্য কৌশলগত তথ্যও।

48 verses | Sita, Vinatā (rākṣasī), Vikaṭā (rākṣasī), Praghasā (rākṣasī), Ajāmukhī (rākṣasī), Śūrpaṇakhā (rākṣasī)

Sarga 25

सीताविलापः (Sita’s Lament amid Rākṣasī Threats)

সুন্দরকাণ্ডের ২৫তম সর্গে অশোকবাটিকায় রাক্ষসী প্রহরিণীদের বারবার কঠোর হুমকি শুনে সীতার অন্তর্লোকের ঘনীভূত চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি কাঁদেন, কাঁপেন, ভয়ে নিজের মধ্যে গুটিয়ে যান; উপমার ধারায় সেই ভয় দেহলক্ষণে প্রকাশ পায়—নেকড়ে-ঘেরা হরিণী, ঝড়ে ভেঙে পড়া কলাগাছ, সাপের মতো বেণী ইত্যাদি। ফুলে-ফলে ভরা অশোকশাখা আঁকড়ে ধরে তিনি রামের কথা ভাবেন এবং বিলাপে ভেঙে পড়েন। তিনি ‘রাম’ ও ‘লক্ষ্মণ’ বলে ডাকেন, আর শাশুড়ি কৌশল্যা ও সুমিত্রার স্মরণে করুণ আর্তনাদ করেন। এরপর তিনি নীতিবাক্যের মতো এক উপলব্ধি জানান—অকালমৃত্যু বিরল বা অসম্ভব বলে শোনা যায়, যদিও জীবন অসহনীয় মনে হয়; তাই এই বন্দিত্ব ক্ষণিক বিপদ নয়, দীর্ঘ ধর্মপরীক্ষা। তিনি রাক্ষস-বিবাহ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন; কঠোর নজরদারির মধ্যে একাকী থেকেও তাঁর নৈতিক স্থৈর্য অটুট থাকে, হতাশা ও প্রাণত্যাগের ইচ্ছা জাগলেও।

20 verses | Sita (Vaidehi/Maithili/Janakatmaja), Raksasis (ogress guards)

Sarga 26

सीताविलापः — Sita’s Lament and Prophecy of Lanka’s Ruin

এই সর্গে জনকনন্দিনী সীতা রাক্ষসীদের ভয়ভীতি ও অপমানের মধ্যে অশ্রুসিক্ত, নতশির, ব্যাকুল গতিতে নিজের অন্তর্দহন প্রকাশ করেন। তিনি রাবণকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন—বাম পা দিয়েও তাকে স্পর্শ করবেন না; কাটা পড়া, ভাঙা বা দগ্ধ হওয়া মেনে নেবেন, তবু তার গ্রহণ নয়। এরপর তিনি রামের বিলম্বের কারণ ভাবেন—রাম কি তাঁর অবস্থান জানেন না, নাকি কোনো উদাসীনতা? কিন্তু রামের স্বভাব স্মরণ করে সেই সন্দেহও তিনি খণ্ডন করেন। জনস্থানে রাক্ষসনিধন ও বিরাধবধ স্মরণ করে বলেন—সমুদ্রবেষ্টিত লঙ্কাও রামের বাণকে রোধ করতে পারবে না। সীতা লঙ্কার আসন্ন ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী করেন—চিতার ধোঁয়া, শকুনের আনাগোনা, রাক্ষসগৃহে বিধবাদের ক্রন্দন; অধর্মের ফল অবশ্যম্ভাবী বিপর্যয়। শেষে গভীর বিষাদে তিনি বিষ নিয়ে আত্মহননের চিন্তাও করেন, তবু রামের ধর্ম ও চরিত্রে অটল আস্থা রাখেন এবং রাক্ষসদের অধর্মকে নিন্দিত ও দণ্ডযোগ্য বলে স্থির করেন।

52 verses | Sita (Janakatmaja)

Sarga 27

त्रिजटास्वप्नवर्णनम् (Trijata’s Dream-Omens and the Rakshasis’ Reversal)

সীতার দৃঢ় তিরস্কারের পর ক্রুদ্ধ কয়েকজন রাক্ষসী রাবণের কাছে গিয়ে সংবাদ দেয়, আর কয়েকজন ফিরে এসে তৎক্ষণাৎ হিংসার ভয় দেখাতে থাকে। তখন বৃদ্ধা রাক্ষসী ত্রিজটা মধ্যস্থ হয়ে তাদের থামায় এবং ভয়ংকর অথচ শুভলক্ষণসূচক এক স্বপ্ন বর্ণনা করে উত্তেজনা প্রশমিত করে। স্বপ্নে রাম ও লক্ষ্মণ দীপ্ত শ্বেতবর্ণে দিব্যযানে আগমন করেন—প্রথমে রাজহংস-যুক্ত দন্তময় পালকিতে, পরে পুষ্পক বিমানে। বৈদেহী সীতা রামের সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়ে মহাহস্তীর উপর আরূঢ়া দেখা যায়; চন্দ্র-সূর্য স্পর্শ করছে যেন—এই ক্রীড়া বিশ্ব-ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়। এরপর স্বপ্ন রাবণের জন্য অশুভ দৃশ্য দেখায়—তেলমাখা, মত্ত, পুষ্পক থেকে পতিত, দক্ষিণ দিক (যমপথ) অভিমুখে টেনে নেওয়া হচ্ছে; কখনও বরাহ, কখনও গাধার মতো নীচ বাহনে আরূঢ়, মলিনতা ও অন্ধকারে নিমজ্জিত। এই অমঙ্গল কুম্ভকর্ণ ও রাবণের পুত্রদের প্রতিও প্রসারিত হয়; কিন্তু বিভীষণ একাই শ্বেত শুভবস্ত্র-অলংকারে ভূষিত, চতুর্দন্ত হস্তীর উপর উন্নীত, বাদ্যধ্বনি ও মঙ্গলনাদের মধ্যে শুভরূপে প্রকাশিত। ত্রিজটা এই নিমিত্তের অর্থ ব্যাখ্যা করে—বৈদেহীর শীঘ্র সিদ্ধি, রাবণের বিনাশ ও রামের বিজয়; তাই সে রাক্ষসীদের নিষ্ঠুরতা ত্যাগ করে ক্ষমা প্রার্থনা ও সান্ত্বনাময় বাক্য গ্রহণের উপদেশ দেয়। অধ্যায়ের শেষে সীতার দেহে শুভ লক্ষণ দেখা দেয়—চোখ/অঙ্গের স্পন্দন, উরুর কম্পন—এবং এক পাখি মধুর স্বরে বারবার ডাকতে থাকে, যেন আনন্দের আহ্বান। এভাবে কাহিনি জবরদস্তি থেকে সরে এসে ধর্মফলের আসন্নতায় জাগ্রত দায়বোধ ও জবাবদিহিতার দিকে মোড় নেয়।

50 verses | Sita, Trijata, Rakshasis (collectively)

Sarga 28

सीताविलापः (Sita’s Lament and Resolve under Threat)

অশোকবাটিকায় রাবণের কঠোর ও অপ্রিয় বাক্য শুনেই সীতার মন তৎক্ষণাৎ বিচলিত হয়ে ওঠে। তিনি সিংহের কবলে পড়া নবগজশাবকের মতো অসহায়—রাক্ষসীদের বেষ্টনী ও ভয়ংকর হুমকির মধ্যে দাঁড়িয়ে ভাবেন, ‘বৃদ্ধেরা বলেন অকালে মৃত্যু হয় না; তবু আমি কেন এই করুণ ভয়ে বেঁচে আছি? বজ্রাহত পর্বতশিখরের মতো আমার হৃদয় কেন ভেঙে পড়ে না?’ রাবণের প্রতি কোনো স্নেহ বা সম্মতি তিনি গ্রহণ করেন না—অযোগ্যকে যেমন ব্রাহ্মণ মন্ত্র দেন না, তেমনি তিনি রাবণকে মন দিতে পারেন না। রাম সময়মতো না এলে রাক্ষসেরা তাঁকে খণ্ড-বিখণ্ড করবে—এই আশঙ্কায় তিনি কাঁপতে থাকেন। তিনি রাম, লক্ষ্মণ ও মাতৃগণকে ডেকে বিলাপ করেন এবং হরিণ-প্রসঙ্গকে ‘কাল’-এর প্রলোভন বলে মনে করেন, যা তাঁকে দুই ভ্রাতাকে দূরে পাঠাতে বাধ্য করেছিল। হতাশায় তিনি বিষ বা অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যার কথাও ভাবেন; তারপর ফুলে ভরা শিংশুপা গাছের কাছে গিয়ে ডাল আঁকড়ে ধরেন এবং যমলোকে যাওয়ার উপায় হিসেবে নিজের কেশবেণী ধরেন। কিন্তু রাম-লক্ষ্মণ ও তাঁদের বংশ স্মরণ করতেই তাঁর দেহে শুভ লক্ষণ প্রকাশ পায়—যা শোক দূর করে সাহস ফিরিয়ে দেয়; সর্গের শেষে আত্মহননের ভাবনার বিপরীতে এই মঙ্গল-সংকেতই ভারসাম্য আনে।

19 verses | Sita

Sarga 29

निमित्तप्रादुर्भावः — Auspicious Omens Arise for Sita

সুন্দরকাণ্ডের ২৯তম সর্গে অশোকবাটিকায় শিম্শুপা-বৃক্ষতলে দুঃখে জর্জরিত সীতার মনে এক নির্ণায়ক মোড় আসে। আনন্দশূন্য যন্ত্রণার মধ্যেই তাঁর দেহে একের পর এক শুভ-নিমিত্ত প্রকাশ পায়—বাম চোখের স্পন্দন, প্রিয়তমের শয্যা-সদৃশ বাম বাহুর কাঁপন, এবং বাম উরুর স্পন্দন; এগুলি স্পষ্টভাবে রামের সঙ্গে পুনর্মিলনের পূর্বলক্ষণ বলে বর্ণিত। ধূলিধূসর স্বর্ণাভ বস্ত্র সামান্য সরে যাওয়াও অনুকূল লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। এই নিমিত্তগুলি প্রাচীনপ্রসিদ্ধ এবং সিদ্ধপুরুষদের দ্বারা সমর্থিত—এ কথা বলে পাঠ সীতার অন্তঃশক্তিকে পুনর্জাগরিত করে। গ্রন্থে তাঁর নবজাগ্রত আনন্দকে তুলনা করা হয়েছে এমন এক বীজের সঙ্গে, যা তাপ ও বাতাসে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বৃষ্টিতে আবার প্রাণ ফিরে পায়। শেষে সীতার মুখ রাহুমুক্ত চন্দ্রের মতো দীপ্ত হয়; ক্লান্তি ও ভয়ের স্থানে শান্ত, আনন্দ-আলোকিত স্থৈর্য আসে, এবং কাহিনি আশার উন্মেষ ও আসন্ন কর্মের জন্য প্রস্তুত হয়।

8 verses | Valmiki (narrator)

Sarga 30

हनुमता सीतासंवादोपायचिन्ता — Hanuman’s Deliberation on How to Address Sita

এই সর্গে অশোকবনে গোপনে থাকা হনুমান সীতা, ত্রিজটার স্বপ্নবৃত্তান্ত এবং রাক্ষসীদের হুমকি-ধমকির কথোপকথন শুনে দূতধর্মের সূক্ষ্ম নীতি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন। তিনি বোঝেন—সীতার সংবাদ না নিয়ে ফিরে গেলে রামের কাছে জবাবদিহি বিপন্ন হবে এবং বানরসেনার সমগ্র উদ্যোগ নিষ্ফল হয়ে পড়বে। কিন্তু তিনি এটাও বিবেচনা করেন যে হঠাৎ প্রকাশ্যে কথা বললে বৈদেহী তাঁকে রাবণের ছদ্মবেশ মনে করে ভীত হতে পারেন; তাতে আতঙ্ক, চিৎকার, সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া, ধরা পড়া এবং এমন ক্লান্তি ঘটতে পারে যা সমুদ্র পার হয়ে প্রত্যাবর্তনকে অসম্ভব করে তুলবে। অতএব দ্বৈত সংকট—নীরবতা সীতাকে হতাশায় মৃত্যুপথে ঠেলে দিতে পারে, আর অসময়ে বাক্য বললে অভিযানই ভেঙে পড়তে পারে। শেষে হনুমান স্থির করেন—ধর্মসম্মত, কোমল এবং রামের গুণকীর্তনে ভরা প্রশংসাবাক্য দিয়ে ধীরে ধীরে সীতার কাছে যাবেন। তিনি এমন মধুর, মানববোধ্য ও বিশ্বাসজাগানিয়া ভাষা বেছে নেন যাতে সীতা অস্থির না হয়ে শুনতে পারেন এবং নিরাপদে সংলাপ শুরু হয়।

44 verses | Hanuman

Sarga 31

सुन्‍दरकाण्डे एकत्रिंशः सर्गः — Hanuman’s Sweet Address to Sita and Sita’s Recognition

এই সর্গে হনুমান বহুপ্রকার চিন্তা করে বৈদেহীর কাছে মধুর ও বিশ্বাসজাগানো ভাষায় ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে শুরু করেন। তিনি ইক্ষ্বাকু বংশ ও দশরথের রাজধর্ম-গুণের কথা বলেন, এবং রামকে ধনুর্ধরদের শ্রেষ্ঠ ও ধর্মরক্ষক রূপে বর্ণনা করে যথার্থ বংশপরিচয় ও নৈতিক চরিত্রের মাধ্যমে নিজের কথার প্রামাণ্য স্থাপন করেন। তারপর তিনি বনবাস, জনস্থান-সংঘর্ষ এবং খর-দূষণের বধের বিবরণ দেন; সীতাহরণকে রাবণের প্রতিশোধমূলক কর্ম বলে দেখান, যা মায়ায় হরিণরূপ ধারণের ছলনার দ্বারা সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি রামের সঙ্গে সুগ্রীবের মৈত্রী, বালীর মৃত্যু এবং পরে সহস্র সহস্র কামরূপী বানরের সর্বদিকে অনুসন্ধানযাত্রার কথাও জানান। নিজের সমুদ্রলঙ্ঘনকে দূতকার্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে হনুমান বলেন—রাম যে সীতার বর্ণনা দিয়েছিলেন, ঠিক সেই সীতাকেই তিনি পেয়েছেন—এবং থেমে যান। বিস্মিত সীতা সতর্কভাবে চারদিকে তাকান, শিংশুপা বৃক্ষের দিকে দৃষ্টি দেন, এবং শেষে উদীয়মান সূর্যের মতো দীপ্তিমান বায়ুপুত্র—সুগ্রীবের মন্ত্রী হনুমানকে দেখেন; রামস্মরণে তাঁর মনে পুনরায় আনন্দের সঞ্চার হয়।

19 verses | Hanuman, Sita (responsive perception rather than extended speech)

Sarga 32

Sundarakāṇḍa Sarga 32 — Sītā’s Perplexity and Recognition of Hanumān

এই সর্গে অশোকবাটিকায় হনুমানের সঙ্গে সীতার প্রথম, মনস্তাত্ত্বিকভাবে জটিল সাক্ষাৎকার বর্ণিত। তিনি ডালপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকা, বিদ্যুৎসম দীপ্তিমান, ফ্যাকাশে/শ্বেত আচ্ছাদনে আবৃত এক কপিরূপ দর্শন করেন; সেই দৃশ্য তাঁর শোকাকুল চিত্তকে আরও টলিয়ে দেয়। ভয়, অচেতনতা ও পুনরায় আত্মবিশ্লেষণের মধ্যে দোল খেতে খেতে তিনি ভাবেন—এ কি স্বপ্ন, কোনো লক্ষণ, না কি শোকজনিত বিভ্রম? রাম-বিরহে নিদ্রাহীনতার কারণে তাঁর বোধও অস্থির—এ কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেন, এবং “পূর্ণচন্দ্রমুখ” রামের বিচ্ছেদে মন বারবার কেঁপে ওঠে। তিনি বারংবার রাম ও লক্ষ্মণের নাম উচ্চারণ করে বিচার করেন—মনোরথ তো নিরাকার, কিন্তু সামনে যে বক্তা, সে তো সাকার রূপে উপস্থিত; অতএব এটি কেবল মনের কল্পনা নয়। শেষে তিনি ইন্দ্র, বৃহস্পতি/বাচস্পতি, স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা ও অগ্নিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে প্রার্থনা করেন—এই বানরের বাক্য যেন সত্য হয়। শোকাহত অবস্থায়ও সত্য যাচাইয়ের নৈতিক-বৌদ্ধিক সতর্কতা কীভাবে জাগে, এই সর্গে তা অন্তর্মুখী সংলাপে সূক্ষ্মভাবে প্রকাশিত।

14 verses | Sita

Sarga 33

हनूमत्सीतासंवादः (Hanumān–Sītā Dialogue and Identity Verification)

এই সর্গে অশোকবাটিকায় হনুমানের সতর্ক অগ্রসরতা ও পরিচয়-নিশ্চয়ের ধারাবাহিকতা বর্ণিত। তিনি বৃক্ষ থেকে নেমে বিনীত, অনভয়কর রূপে আসেন; মাথায় অঞ্জলি রেখে প্রণিপাত করেন এবং মধুর বাক্যে সীতাকে সম্বোধন করে নিজের শ্রদ্ধাপূর্ণ উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। প্রথমে লক্ষণ দেখে তিনি পরিচয় যাচাই করেন—অশ্রুপাত, গভীর দীর্ঘশ্বাস ও ভূমি-স্পর্শে তিনি বুঝতে পারেন তিনি দেবী নন, মানবদেহধারিণী; আবার গুণ-লক্ষণে রাজকুলসম্ভবা বলেও অনুমান করেন। তারপর তিনি স্পষ্ট পরীক্ষা দেন—যদি আপনি জনস্থান থেকে রাবণ কর্তৃক অপহৃত রামের পত্নী সীতা হন, তবে নিজেই তা বলুন। রামের গুণকীর্তনে সীতা আশ্বস্ত হয়ে বংশ ও জীবনীসূত্রে নিজের পরিচয় দেন—দশরথের সঙ্গে সম্পর্ক, জনকের কন্যা হওয়া, রামের সঙ্গে বিবাহ, একত্রে কাটানো সমৃদ্ধ দিনের স্মৃতি, এবং কৈকেয়ীর বরপ্রার্থনায় রাজ্যাভিষেকের প্রস্তুতি ভঙ্গ হওয়া। তিনি রামের সত্যনিষ্ঠ আচরণ, রাজবস্ত্র ত্যাগ, নিজের বনগমনের সিদ্ধান্ত, লক্ষ্মণের প্রস্তুতি, বনপ্রবেশ, এবং শেষে রাবণের অপহরণ ও দুই মাসের সময়সীমার কথা বলেন। এভাবে ধর্মসম্মত আত্মপরিচয় ও বিস্তারিত বর্ণনায় সন্দেহ দূর হয়ে স্বীকৃত পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

31 verses

Sarga 34

सीताहनूमद्भाषणम् — Sita Tests the Messenger; Hanuman Offers Reassurance

সুন্দরকাণ্ডের ৩৪তম সর্গে অশোকবাটিকায় সীতা ও হনুমানের এক গভীর যাচাই-সংলাপ ঘটে। হনুমান কাছে এসে প্রণাম করলে শোক ও ভয়ে বিহ্বল সীতা জনস্থানের পূর্ব প্রতারণা স্মরণ করে তাঁকে রাবণের ছদ্মবেশ বলে সন্দেহ করেন। রাক্ষসদের কামরূপত্ব (রূপ বদলানোর ক্ষমতা) ভাবতে ভাবতে তিনি কখনও আতঙ্কিত, কখনও অন্তর্দৃষ্টিতে আশ্বস্ত হন; তিনি বলেন—এঁর সান্নিধ্যে আমার মনে প্রীতি ও শান্ত সুখ জাগে, তাই এটি শত্রুর মায়া হওয়া উচিত নয়। হনুমান আদর্শ দূতের মতো নিজেকে রামের দূত বলে পরিচয় দেন, রাম-লক্ষ্মণ-সুগ্রীবের কুশলবার্তা জানান এবং সূর্য, চন্দ্র, বিষ্ণু, বৈশ্রবণ প্রভৃতির উপমায় শ্রীरामের গুণগান করে বিশ্বাসযোগ্যতা স্থাপন করেন। তবু সীতার মনে স্বপ্ন না বাস্তব, ভ্রম না সত্য—এই দ্বন্দ্ব চলতে থাকে; শেষে হনুমান স্পষ্টভাবে অনুরোধ করেন সন্দেহ ত্যাগ করে বিশ্বাস করতে। সর্গের শিক্ষা—বিপদে যাচাই কঠোর হওয়া চাই, কিন্তু করুণা ও সত্যভাষণ জোরজবরদস্তি ছাড়াই আস্থা ফিরিয়ে আনে।

41 verses

Sarga 35

रामलक्षणवर्णनम् (Description of Rama and Lakshmana; Alliance Narrative to Sita)

এই সর্গে বৈদেহী (সীতা) হনুমানের বলা রামকথা মধুর ও সান্ত্বনাময় স্বরে শুনে তাঁকে যাচাইযোগ্য বিবরণ জিজ্ঞাসা করেন—তিনি কোথায় রামকে দেখেছেন, লক্ষ্মণকে কীভাবে চিনেছেন, এবং বানর–মানব মৈত্রী কীভাবে স্থাপিত হল। হনুমান তাঁর বিশ্বাস স্থাপনের জন্য প্রথমে শ্রীरामের প্রথাগত লক্ষণ‑ধর্মবর্ণনা দেন—তিনি সর্বজীবের রক্ষক, চাতুর্বর্ণ্য ও মর্যাদার পালনকর্তা, ব্রহ্মচর্য‑নিয়মে সংযত, নীতি‑শাস্ত্র ও বৈদিক বিদ্যায় প্রশিক্ষিত, এবং শুভ দেহলক্ষণে বিভূষিত; এই বর্ণনাই সীতার কাছে প্রমাণরূপে কাজ করে। এরপর তিনি জোটের উৎপত্তি বলেন—সীতান্বেষণে রাম‑লক্ষ্মণ ঋষ্যমূক পর্বতে নির্বাসিত সুগ্রীবের সঙ্গে মিলিত হন; হনুমান পরিচয় করিয়ে দেন; বন্ধুত্ব হয় এবং বালিবধ ও সীতান্বেষণের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সন্ধি স্থাপিত হয়। বালি নিহত হলে সুগ্রীব কিষ্কিন্ধা পুনরুদ্ধার করে দশ দিকেই অনুসন্ধানদল প্রেরণ করেন। দক্ষিণ অনুসন্ধানে অঙ্গদের নেতৃত্বে হতাশা ও প্রায়োপবেশনের সংকল্প, তারপর সম্পাতির প্রকাশ—সীতা রাবণের নিবাসে আছেন—এবং হনুমানের সমুদ্রলঙ্ঘন করে লঙ্কায় গমন—সবই তিনি বর্ণনা করেন। শেষে হনুমান নিজেকে রামের দূত ও বায়ুপুত্র বলে পরিচয় দিয়ে রামের কুশল সংবাদ দেন এবং শীঘ্র উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেন; ফলে সীতা যুক্তি ও পরিচয়ের দ্বারা তাঁকে বিশ্বাস করে পুনরায় আনন্দ লাভ করেন।

89 verses | Sita (Vaidehi/Janaki/Maithili), Hanuman (Pavanatmaja; Sugriva-sachiva)

Sarga 36

सीताप्रत्यय-प्रदानम् (Sita’s Recognition and Reassurance by the Envoy)

এই সর্গে দূত ও বন্দিনী মহারাণীর মধ্যে ‘প্রত্যয়’ স্থাপিত হয় বিধিবদ্ধ কূটনৈতিক বিনিময়ে। হনুমান নিজেকে শ্রীरामের দূত বলে পরিচয় দিয়ে রামনামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় (মুদ্রিকা) সীতার হাতে দেন—এটি প্রমাণচিহ্নরূপে তাঁর বাক্যকে নিশ্চিত করে। সীতার সংশয় ধীরে ধীরে প্রশমিত হয়ে স্বস্তি ও ভক্তিপূর্ণ প্রশংসায় রূপ নেয়; তিনি হনুমানের শত-যোজন সমুদ্রলঙ্ঘন ও রাক্ষসদুর্গে নির্ভীক প্রবেশের মহিমা কীর্তন করেন। এরপর সীতা ‘কচ্চিত্…’ ধাঁচের ধারাবাহিক প্রশ্নে রামের কুশল, স্থৈর্য, নীতি (দ্বিবিধ/ত্রিবিধ উপায়), মিত্রসম্বন্ধ, দৈব অনুগ্রহ এবং ভরত, সুগ্রীব ও লক্ষ্মণের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চান। হনুমান আশ্বাস দেন—শ্রীराम অচিরেই বৃহৎ বানর-ঋক্ষসেনা নিয়ে অগ্রসর হবেন; তিনি সমুদ্রকেও স্তব্ধ করতে সক্ষম, এবং যে-কোনো বাধার বিরুদ্ধে তাঁর সংকল্প অপ্রতিরোধ্য। হনুমান রামের তপস্বী সংযম ও তীব্র বিরহের কথাও জানান—নিদ্রাহীনতা, বারবার সীতানাম উচ্চারণ, এবং তাঁকে উদ্ধার করার একাগ্র সাধনা। শেষে সীতার শোক কিছু প্রশমিত হলেও রামের দুঃখের প্রতি সহানুভূতিতে তা আরও গভীর হয়; চন্দ্র-মেঘ-ঋতুচিত্রে বিরহভাব প্রকাশিত। দক্ষিণী পাঠে পুনর্মিলনের শপথ-প্রতিজ্ঞার অংশও রক্ষিত আছে, যেখানে পুনরুক্ত পদসংখ্যা/ক্রম প্রতিজ্ঞাকে আরও দৃঢ় করে।

47 verses

Sarga 37

हनूमत्सीतासंवादः — Hanuman’s Offer of Rescue and Sita’s Dharmic Refusal

হনুমানের মুখে রামের শোকসংবাদ শুনে সীতা ধর্মভিত্তিক উত্তর দেন। তিনি রামের গুণ, ধৈর্য ও বীর্য স্মরণ করে তাঁর বিজয় অবশ্যম্ভাবী বলেন, রাবণের নির্ধারিত সময়সীমার কথা উল্লেখ করেন এবং লঙ্কার অন্তর্গত পরামর্শের কথাও জানান—যার মধ্যে নালা (বিভীষণের কন্যা) মারফত পৌঁছানো সংবাদও ইঙ্গিতিত। হনুমান তৎক্ষণাৎ উদ্ধারপ্রস্তাব দেন—সীতাকে পিঠে বসিয়ে সমুদ্র পার করিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন এবং লঙ্কাকেও বহন করতে সক্ষম বলে নিজের শক্তি ঘোষণা করেন। সীতা তাঁর ক্ষুদ্রাকৃতি দেখে বিস্মিত হয়ে সম্ভাব্যতা প্রশ্ন করেন; তখন হনুমান পর্বতসম বিশাল রূপ ধারণ করে সামর্থ্য প্রমাণ করেন। সীতা তাঁর শক্তি ও বেগ স্বীকার করেও নীতি ও কৌশলের কারণে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন—উড্ডয়নে পতনের আশঙ্কা, সশস্ত্র রাক্ষসদের বাধা, আকাশযুদ্ধের অনিশ্চয়তা, এবং একাই হনুমানের জয় হলে রামের ন্যায্য যশ ক্ষুণ্ণ হতে পারে। তিনি বলেন, রাজমর্যাদা ও ন্যায়ের কাহিনি রক্ষার জন্য রামই রাবণকে বধ করে তাঁকে উদ্ধার করবেন। শেষে সীতা অনুরোধ করেন, হনুমান যেন দ্রুত লক্ষ্মণ ও বানরসেনাসহ রামকে লঙ্কায় নিয়ে আসেন, যাতে ব্যক্তিগত বিষাদ সমন্বিত কর্মে পরিণত হয়।

66 verses | Sita (Vaidehi, Maithili), Hanuman (Marutatmaja)

Sarga 38

अभिज्ञानप्रदानम् — The Token of Recognition (Chūḍāmaṇi) and the Crow Episode Recalled

এই সর্গে হনুমান সীতার বাক্য ও শীল-সদাচার যাচাই করে রামের নিশ্চিত বিশ্বাসের জন্য একটি অভিজ্ঞান (চিহ্ন) প্রার্থনা করেন, যাতে রাম নিঃসন্দেহে জানেন যে হনুমান সত্যিই সীতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সীতা স্মৃতিনির্ভর প্রমাণ দেন—চিত্রকূটের নিকটে মন্দাকিনীর তীরে সিদ্ধাশ্রমে এক কাক (পরে ইন্দ্রপুত্র বলে পরিচিত) বারবার তাঁকে আঘাত করত। তখন রাম জেগে উঠে দর্ভের ফলায় ব্রহ্মাস্ত্র সংযোজিত করে কাকটির দিকে নিক্ষেপ করেন। কাকটি তিন লোক জুড়ে পালাল, কোথাও আশ্রয় পেল না; শেষে রামের শরণে এসে পড়ল। রাম করুণার সঙ্গে ন্যায়বিচার করে তার প্রাণ রক্ষা করেন এবং প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ তার ডান চোখ নষ্ট করেন। এই ঘটনা স্মরণ করে সীতা শোক ও ধর্মবোধে প্রশ্ন তোলেন—একটি কাকের জন্য যদি ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ হয়, তবে আমার অপহর্তা রাবণ এখনও কেন দণ্ডিত নয়? হনুমান সীতাকে সান্ত্বনা দেন, রাম-লক্ষ্মণের গভীর বেদনার কথা জানান এবং লঙ্কাধ্বংসের আশ্বাস দেন। তিনি বার্তা জানতে চাইলে সীতা শুভ চূড়ামণি নিশ্চিত অভিজ্ঞানরূপে প্রদান করেন। হনুমান ভক্তিভরে তা গ্রহণ করে সীতাকে প্রদক্ষিণ করেন এবং রামের কার্যে মন স্থির করে প্রত্যাবর্তনে প্রস্তুত হন।

73 verses | Hanuman, Sita

Sarga 39

अभिज्ञानमणि-प्रदानम् — The Signet Jewel as Proof and the Consolation of Sita

সুন্দরকাণ্ডের ৩৯তম সর্গে সীতা ও হনুমানের মধ্যে দূতকার্যের আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা ‘অভিজ্ঞান’ দ্বারা স্থাপিত হয়। সীতা হনুমানকে এমন এক মণি/অলংকার দেন, যা রাম অন্তরঙ্গভাবে চেনেন—যাতে বার্তা পৌঁছালে কোনো সংশয় না থাকে। তিনি হনুমানকে নিজের কুশল সংবাদ জানাতে এবং রামকে জীবিত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করতে অনুরোধ করতে বলেন; ধর্মার্থে উচ্চারিত বাক্য যে ধর্ম-উৎপাদক, তাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। হনুমান শিরে অঞ্জলি রেখে প্রণাম করে আশ্বাস দেন—রামের পরাক্রম অতুল, সুগ্রীবের বিপুল বানর-ঋক্ষসেনা শীঘ্রই উপস্থিত হবে, এবং মহাসাগরও অসাধারণ সহায়তায় অতিক্রম করা সম্ভব। সীতা সান্ত্বনা পেলেও সমুদ্রের দুরতিক্রম্যতা ইত্যাদি বাস্তব শঙ্কা প্রকাশ করেন এবং অনুরোধ করেন হনুমান যেন কিছুক্ষণ থাকেন, কারণ তাঁর প্রস্থান শোক বাড়ায়। হনুমান কৌশলগতভাবে আবার ভরসা দেন, হতাশা ত্যাগ করতে বলেন, এবং রাম-লক্ষ্মণের আসন্ন আগমন, লঙ্কাধ্বংস, রাবণবধ ও পুনর্মিলনের ভবিষ্যৎ ঘোষণা করেন। এই সর্গে প্রমাণ, উপদেশ ও মনোবলবর্ধন—ধর্মসম্মত উদ্ধারযুদ্ধের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে একসূত্রে গাঁথা।

54 verses | Sita (Janaki, Vaidehi, Maithili), Hanuman (Marutatmaja, Maruti)

Sarga 40

अभिज्ञानदानम् / The Gift of Recognition (Sita’s Token and Resolve)

এই সর্গে সীতা ও হনুমানের নিবিড় সংলাপ শোককে রূপ দেয় নিশ্চিত প্রমাণ ও কার্যসিদ্ধির উপযোগী সংবাদে। হনুমানের আশ্বাস শুনে সীতা করুণ কণ্ঠে বলেন—রামবিহনে তিনি আর মাত্র এক মাস প্রাণ ধারণ করতে পারবেন। তিনি রাবণের লোলুপ, হিংস্র দৃষ্টি এবং রাক্ষসীদের অবিরাম ভয় দেখানো ও অসহনীয় মানসিক চাপের কথা জানান। হনুমান স্থিরতা দানকারী উপদেশ দেন—শপথ করে বলেন, রাম ও লক্ষ্মণ বিরহে দগ্ধ; এখন যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় শোক না করতে বলেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, রাবণবধের পর লঙ্কা ভস্মীভূত হবে এবং সীতাকে পুনরায় রামের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এরপর রামের আনন্দ ও বিশ্বাস দৃঢ় করতে হনুমান আরও একটি ‘অভিজ্ঞান’ (পরিচয়-চিহ্ন) চান। সীতা বলেন, শ্রেষ্ঠ পরিচয় তিনি আগেই দিয়েছেন; তবু তিনি নিজের চূড়ামণি প্রদান করেন এবং তার প্রমাণমূল্য বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। হনুমান ভক্তিভরে তা গ্রহণ করে প্রণাম করেন ও প্রস্থান প্রস্তুত করেন। উড্ডয়নের জন্য দেহ বৃহৎ করতে থাকলে সীতা অশ্রুসজল হয়ে রাম, লক্ষ্মণ, সুগ্রীব ও মন্ত্রীদের আশীর্বাদ পাঠান। তিনি হনুমানকে অনুরোধ করেন তাঁর দুঃখ ও রাক্ষসদের হুমকি যথাযথভাবে জানাতে, এবং উদ্ধারকে ‘শোকসাগর’ পার হয়ে পুনরায় ধর্ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পথ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

25 verses | Sita (Vaidehi/Janakatmaja), Hanuman (Marutatmaja/Vayusuno)

Sarga 41

प्रमदावनविध्वंसः | The Devastation of the Pleasure-Garden (Ashoka Vatika)

সীতার বাক্যে সম্মানিত হয়ে হনুমান সরে এসে অবশিষ্ট কর্তব্য নিয়ে চিন্তা করেন। তিনি সাম, দান ও ভেদ—এই উপায়গুলি বিচার করে স্থির করেন যে বলগর্বিত রাক্ষসদের বিরুদ্ধে কেবল দণ্ড/পরাক্রমই তাদের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ করবে এবং কৌশলে তাদের মনোবল নরম করবে। সীতাদর্শন—এই প্রধান সাফল্য অক্ষুণ্ণ রেখে রাবণকে সৈন্যসমাবেশে বাধ্য করতে তিনি নিয়ন্ত্রিত এক অশান্তি সৃষ্টির সংকল্প নেন। অশোকবাটিকার নন্দনসদৃশ সৌন্দর্য প্রশংসা করেও তিনি শুষ্ক অরণ্যে অগ্নির মতো তা ধ্বংস করবেন বলে স্থির করেন, যাতে ক্রুদ্ধ লঙ্কাধিপ অশ্ব-রথ-গজসহ, ত্রিশূল ও লৌহবল্লমধারী সৈন্য পাঠায়। তারপর হনুমান গাছ উপড়ে ফেলে দেন, পুকুর ও নির্মাণভাগ ভেঙে দেন, পশু ও সর্পাদি ছত্রভঙ্গ করেন; উদ্যান দावানলে দগ্ধ অরণ্যের মতো হয়ে ওঠে, আর লতাগুলি বিশৃঙ্খল নারীর মতো কাঁপতে থাকে। লঙ্কেশ্বরের গভীর অপ্রসন্নতা ঘটিয়ে তিনি দ্বারদেশে অবস্থান করেন—দৃঢ় সংকল্পে দীপ্ত—এবং একাই বহু যোদ্ধার সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকেন।

21 verses | Hanuman

Sarga 42

द्विचत्वारिंशः सर्गः (Sarga 42): Omens in Laṅkā, Report to Rāvaṇa, and the Kinkara Assault

এই সর্গে লঙ্কার অমঙ্গলজনক লক্ষণসমূহ বর্ণিত হয়েছে। পাখির আর্তনাদ, বৃক্ষ পতন এবং পশুদের পলায়ন রাক্ষসদের জন্য অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। অশোকবন তছনছ হতে দেখে রাক্ষসীরা সীতাকে সেই বানর সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সীতা কৌশলী উত্তর দিয়ে বলেন, 'সাপই কেবল সাপের পা চেনে', অর্থাৎ রাক্ষসদের মায়া কেবল রাক্ষসরাই বুঝতে পারে। এরপর রাক্ষসীরা রাবণকে জানায় যে এক বিশাল বানর সীতার সাথে কথা বলেছে এবং কেবল শিংশপা গাছটি ছাড়া পুরো বাগান ধ্বংস করেছে। এই সংবাদে রাবণের ক্রোধ জ্বলে ওঠে এবং তার চোখ থেকে তেলের ফোঁটার মতো অশ্রু ঝরতে থাকে। তিনি হনুমানকে ধরার জন্য আশি হাজার 'কিঙ্কর' নামক রাক্ষস সেনাকে আদেশ দেন। হনুমান নিজের আকার বিশাল করে 'জয় শ্রীরাম'-এর জয়ধ্বনি করেন এবং একটি বিশাল লোহার পরিঘ (iron beam) দিয়ে সেই বিশাল বাহিনীকে ধ্বংস করেন। এই সংহারের খবর পেয়ে রাবণ প্রহস্ত-পুত্রকে যুদ্ধের জন্য প্রেরণ করেন।

43 verses | Sita (Vaidehi/Janaki), Rakshasis (ogresses of Ashoka Vatika), Hanuman (Marutatmaja), Ravana (Raksasesvara)

Sarga 43

चैत्यप्रासाद-विध्वंसः (Destruction of the Chaitya Palace and Hanuman’s Proclamation)

কিঙ্করদের বধ করার পর হনুমান চিন্তা করলেন যে উদ্যান ধ্বংস করা হয়েছে, কিন্তু এই বিশাল 'চৈত্যপ্রাসাদ' এখনও অক্ষত। তাই নিজের শক্তি প্রদর্শনের জন্য তিনি মেরুশৃঙ্গের ন্যায় সেই প্রাসাদের শিখরে আরোহণ করলেন এবং সিংহনাদ করলেন। তিনি রাম, লক্ষ্মণ ও সুগ্রীবের জয়ধ্বনি দিয়ে নিজেকে রামের দাস ও শত্রুসৈন্যের বিনাশকারী হিসেবে ঘোষণা করলেন। সেই শব্দ শুনে শত শত রক্ষী অস্ত্র নিয়ে তাঁকে ঘিরে ফেলে। ক্রুদ্ধ হনুমান একটি স্বর্ণখচিত স্তম্ভ উপড়ে নিয়ে তা ঘোরাতে লাগলেন, যার ফলে অগ্নি উৎপন্ন হয়ে প্রাসাদটি ভস্মীভূত হলো। রক্ষীদের বধ করে আকাশে দাঁড়িয়ে তিনি পুনরায় ঘোষণা করলেন যে সুগ্রীবের অধীনে কোটি কোটি শক্তিশালী বানর রয়েছে এবং ইক্ষ্বাকুনাথ রামের সাথে শত্রুতার কারণে লঙ্কা ও রাবণের ধ্বংস অনিবার্য।

25 verses

Sarga 44

जम्बुमालिवधः (The Slaying of Jambumali)

সুন্দরকান্ডের ৪৪তম সর্গে জম্বুমালীর বধের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। কিঙ্করদের মৃত্যুর সংবাদে ক্রুদ্ধ রাবণ প্রহস্ত-পুত্র জম্বুমালীকে হনুমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রেরণ করেন। রক্তবর্ণের মালা ও বস্ত্র পরিহিত জম্বুমালী তার ধনুকের টঙ্কারে দিকবিদিক প্রকম্পিত করে তোরণদ্বারে উপবিষ্ট হনুমানের ওপর বাণবর্ষণ শুরু করেন। তাঁর তীক্ষ্ণ বাণে হনুমানের মুখমন্ডল ও বক্ষ বিদ্ধ হয়। আহত হনুমান ক্রুদ্ধ হয়ে একটি বিশাল শিলা নিক্ষেপ করেন, কিন্তু জম্বুমালী তা বাণের আঘাতে চূর্ণ করে দেন। এরপর হনুমান একটি শাল গাছ উপড়ে নিয়ে আক্রমণ করলে, জম্বুমালী তাও কেটে ফেলেন। অবশেষে, হনুমান একটি লৌহদণ্ড (পরিঘ) তুলে নিয়ে প্রচণ্ড বেগে ঘুরিয়ে জম্বুমালীর বক্ষে আঘাত করেন। সেই আঘাতে জম্বুমালীর দেহ, রথ ও ধনু চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় এবং সে মৃত্যুবরণ করে। এই সংবাদে রাবণ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে মন্ত্রিপুত্রদের যুদ্ধের আদেশ দেন।

20 verses

Sarga 45

मन्त्रिणां सुतयुद्धम् — Battle with the Sons of the Ministers

এই সর্গে রাবণ লঙ্কার প্রতিরক্ষা আরও কঠোর করে মন্ত্রীদের সাত পুত্রকে যুদ্ধে পাঠান। তারা অগ্নিসদৃশ দীপ্তিমান, ভারী অস্ত্রে সজ্জিত এবং বীরত্বে প্রতিযোগিতাপরায়ণ। সোনালি জাল-অলংকৃত, পতাকা ও দণ্ডচিহ্নযুক্ত অশ্বযোজিত রথে তারা রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসে। তাদের রথগর্জন মেঘগর্জনের মতো, আর ধনুকের ঝলক বিদ্যুতের মতো দীপ্ত। নগরের প্রধান তোরণে তারা হনুমানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তীরবৃষ্টিতে মুহূর্তের জন্য তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। হনুমান আকাশে উঠে তাদের তীরধারা ও রথের গতি নিষ্ফল করে দেন; মেঘের মধ্যে বায়ুদেবের ন্যায় তিনি আকাশে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। তারপর তিনি নিকটযুদ্ধে নেমে করতল, পদ, মুষ্টি, নখ, বক্ষ ও উরু দিয়ে প্রবল আঘাত করেন; মন্ত্রীপুত্রেরা পতিত হয় এবং তাদের সেনা চারদিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালায়। পরিণামে হাতির বিকট চিৎকার, ঘোড়ার লুটিয়ে পড়া, ভাঙা রথের স্তূপ—সব মিলিয়ে লঙ্কা ভয়ংকর আর্তনাদ ও রক্তধারায় প্রতিধ্বনিত হয়। এই শক্তিশালী শত্রুদের বধ করে হনুমান আবার তোরণের দিকে অগ্রসর হন, আরও সংঘর্ষের সন্ধানে—যেখানে মনোবল ভাঙলে বাহিনী কীভাবে ভেঙে পড়ে এবং অলংকৃত শক্তির চেয়ে নিয়ন্ত্রিত বেগের শ্রেষ্ঠতা প্রকাশ পায়।

17 verses

Sarga 46

षट्चत्वारिंशः सर्गः — Ravana Deploys Five Generals; Hanuman Destroys the Commanders and the Remaining Host

মন্ত্রীপুত্রদের মৃত্যুর সংবাদে রাবণ শোকাহত হলেও তা গোপন রেখে নতুন কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি বিরূপাক্ষ, যূপাক্ষ, দুর্ধর, প্রঘস এবং ভাসকর্ণ—এই পাঁচজন মহাবীর সেনাপতিকে হনুমানকে বন্দী করার নির্দেশ দিলেন। রাবণ তাঁদের সতর্ক করে বললেন যে, এই বানর সাধারণ কেউ নন; বালী বা সুগ্রীবের চেয়েও এর তেজ ও পরাক্রম অনেক বেশি। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং কাল ও স্থান বিবেচনা করে যেন তাঁরা যুদ্ধ করেন। সেনাপতিরা তোরণদ্বারে হনুমানকে ঘিরে ফেললেন। দুর্ধর বাণবর্ষণ শুরু করলে হনুমান বিশাল রূপ ধারণ করে রথসহ তাকে চূর্ণ করলেন। এরপর বিরূপাক্ষ ও যূপাক্ষ আকাশ থেকে আক্রমণ করলে হনুমান একটি শাল গাছ উপড়ে তাঁদের বধ করলেন। শেষে প্রঘস ও ভাসকর্ণ অস্ত্র নিয়ে ধেয়ে এলে পবনপুত্র একটি পর্বতশৃঙ্গ উপড়ে তাঁদের বিনাশ করলেন। পঞ্চ সেনাপতি ও তাঁদের বাহিনীকে ধ্বংস করার পর, হনুমান প্রলয়কালের কালের (মৃত্যু) ন্যায় তোরণদ্বারে অবস্থান করলেন।

39 verses | Ravana (Daśagrīva)

Sarga 47

अक्षवधः (The Slaying of Prince Aksha) — Sundarakāṇḍa Sarga 47

এই সর্গে লঙ্কার প্রতিক্রিয়া এক निर्णায়ক পর্যায়ে পৌঁছায়। পাঁচ সেনাপতির সপরিবার-সহবাহন বিনাশের সংবাদ শুনে রাবণ নীরবে ইঙ্গিত করে পুত্র অক্ষকে যুদ্ধে পাঠান। অক্ষ সভা থেকে উঠে স্বর্ণখচিত ধনুক ধারণ করে আটটি দ্রুত অশ্বযোজিত, দীপ্তিমান ও অস্ত্রসম্ভারে পূর্ণ রথে আরূঢ় হয়ে হনুমানের দিকে অগ্রসর হয়; রথের আকাশগামী ক্ষমতা, অস্ত্রসমৃদ্ধি ও রাজঐশ্বর্যের বর্ণনা তার রাজশক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। যুদ্ধের শুরুতেই অক্ষ তিনটি তীক্ষ্ণ বিষলেপিত বাণে হনুমানের মস্তকে আঘাত করে। তখন মহা-নিমিত্ত দেখা দেয়—পৃথিবীর ক্রন্দন, সূর্যের ম্লানতা, বায়ুর স্তব্ধতা, পর্বতের কম্পন ও সমুদ্রের ক্ষোভ—যা দ্বন্দ্বের মহিমা বাড়ায়। হনুমান অক্ষের যৌবন, একাগ্রতা ও যুদ্ধকুশলতা প্রশংসা করে ক্ষণমাত্র ভাবেন—এমন যোগ্য যুববীরকে বধ করা কি ন্যায়সঙ্গত? পরে স্থির করেন, অনিয়ন্ত্রিত বীর্য অবহেলিত অগ্নির মতোই বৃদ্ধি পায়। অতঃপর হনুমান আট অশ্বকে নিধন করে রথ ভেঙে ফেলেন এবং আকাশেই অক্ষকে পায়ে ধরে ঘুরিয়ে ভূমিতে আছাড় মারেন। এতে রাবণের মনে ভয়, আর ঋষি ও দেবগণের মধ্যে বিস্ময় জাগে। সর্গশেষে হনুমান তোরণদ্বারে ফিরে যমসম হয়ে পরবর্তী ধ্বংসের জন্য দাঁড়ান—লঙ্কার প্রচলিত প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দিয়ে।

38 verses | Hanuman (internal deliberation)

Sarga 48

इन्द्रजित्प्रेषणम्—ब्रह्मास्त्रबन्धः, हनूमद्ग्रहणं, रावणसभाप्रवेशः (Indrajit’s Deployment—Brahmāstra Binding, Hanuman’s Capture, Entry into Ravana’s Court)

অক্ষবধের পর রাক্ষসরাজ রাবণ ক্রোধ সংযত করে ইন্দ্রজিতকে আদেশ দেন—সেনানাশ না করে শত্রুকে দমন করতে হবে, নিজের ও প্রতিপক্ষের বল বিচার করতে হবে এবং অস্ত্রবিদ্যা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তখন পৈতামহাস্ত্রে সমৃদ্ধ ইন্দ্রজিত দিব্য রথে, চার অশ্বযুক্ত রথে, হনুমানের দিকে যাত্রা করে। দুই মহাবেগবানের যুদ্ধ সর্বপ্রাণীর মনোহর ও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে; ইন্দ্রজিতের ‘অমোঘ’ শরও লক্ষ্যভেদ করতে না পারায় সে হনুমানকে গ্রহনের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে। হনুমান ব্রহ্মাস্ত্রবন্ধন চিনে, মুক্ত হওয়ার শক্তি থাকা সত্ত্বেও, পিতামহের আদেশ মান্য করে বন্ধন গ্রহণ করেন—কৌশলগত লাভে রাবণের দর্শন ও কার্যসিদ্ধির জন্য। রাক্ষসরা শণবল্ক ও বৃক্ষছাল দিয়ে বেঁধে দিলে, অস্ত্রবন্ধন অন্য বন্ধন সহ্য না করতে পেরে নিবৃত্ত হয়। ইন্দ্রজিত হনুমানকে সভায় নিয়ে যায়; রাক্ষসরা নানা দণ্ডের পরামর্শ করে; রাবণ বৃদ্ধ মন্ত্রীদের কাছে হনুমানের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে। তখন হনুমান নিজের পরিচয় দিয়ে জানায়—সে ‘হরীশ্বর’ শ্রীरामের দূত।

61 verses

Sarga 49

रावणदर्शनम् — Hanuman Beholds Ravana in Court

এই সর্গে রাক্ষসেরা হনুমানকে বেঁধে অপমানজনকভাবে টেনে রাবণের সভায় উপস্থিত করে। সেই অবমাননায় হনুমান বিস্মিত হন, কিন্তু ক্রোধ সংযত রাখেন; তাঁর চোখ রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে, তবু তিনি ধৈর্য ধরে রাবণকে দর্শন করেন। এরপর সভার রাজকীয় দৃশ্য বর্ণিত হয়। রাবণের রূপ অলংকারময় তালিকায় ফুটে ওঠে—মুক্তোজাল-জড়ানো স্বর্ণমুকুট, হীরক-মণির ভূষণ, রেশমবস্ত্র, রক্তচন্দনের লেপ, এবং দেহে বিচিত্র অলংকরণ। তাঁর দশ মস্তক মন্দর পর্বতের শিখরের ন্যায় ভয়ংকর; তাঁকে মেরুপর্বতে বর্ষাভারী মেঘের মতো এবং চার সমুদ্রে পরিবেষ্টিত জগতের মতো উপমায় তাঁর সার্বভৌমত্ব ও ব্যাপ্তি প্রকাশ করা হয়। চামরধারী সজ্জিত পরিচারকবর্গের সঙ্গে দুর্ধর, প্রহস্ত, মহাপার্শ্ব ও নিকুম্ভ—এই চার প্রধান মন্ত্রীও গর্বিত ও পরামর্শে দক্ষ রূপে উপস্থিত। পরে হনুমানের অন্তর্চিন্তা ধর্মের দৃষ্টিতে এই দৃশ্যকে বিচার করে। তিনি রাবণের রূপ, সাহস, বল ও তেজ স্বীকার করেন এবং বলেন—অধর্ম না থাকলে সে দেবতাদেরও রক্ষক হতে পারত; কিন্তু তার নিষ্ঠুর, লোকনিন্দিত কর্ম এবং সর্বনাশা ক্রোধশক্তিই তাকে ভয়ের কারণ করেছে। এভাবে অধ্যায়টি রাজঐশ্বর্য ও নৈতিক ব্যর্থতাকে পাশাপাশি রেখে ধর্মকেন্দ্রিক ক্ষমতার মূল্যায়ন তুলে ধরে।

20 verses | Hanuman (internal reflection)

Sarga 50

रावण-प्रहस्त-हनूमद्वार्ता (Ravana and Prahasta Question Hanuman)

লঙ্কার রাজসভায় হনুমানের বিচারসদৃশ জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। রাবণ ক্রুদ্ধ হলেও অন্তরে সংশয়ে পড়ে; সামনে দাঁড়ানো দীপ্তিমান ‘পিঙ্গল-নয়ন’ বানরকে দেখে সে মনে মনে ভাবে—এ কি শাপে ফিরে-আসা নন্দী, না অন্য কোনো ভয়ংকর অদ্ভুত সত্তা? তখন সে মন্ত্রী প্রহস্তকে আদেশ দেয়—এই বন্দীর জন্ম, উদ্দেশ্য, রাজউদ্যান ধ্বংস এবং রাক্ষসী প্রহরীদের ভীতসন্ত্রস্ত করার কারণ জিজ্ঞেস করো। প্রহস্ত কূটনৈতিক ও সংযত ভাষায় আশ্বাস দেয়—সত্য বললে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি হতে পারে; এবং সন্দেহ তোলে, সে কি ইন্দ্র, যম, বরুণ, কুবের/বৈশ্রবণ, কিংবা বিষ্ণুর প্রেরণায় আগত কোনো গুপ্তচর-দূত? হনুমান স্পষ্টভাবে বলে—সে দেবতাদের প্রেরিত নয়, কুবেরের সঙ্গে তার কোনো মৈত্রী-সন্ধি নেই; সে বানরজাতিতে জন্মেছে। উদ্যানধ্বংস ও যুদ্ধ ছিল দর্শনলাভের উপায় এবং আক্রমণকারী রাক্ষসদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা; ব্রহ্মার বরদানের কারণে সে স্বেচ্ছায় বন্ধন মেনে নিয়েছিল। শেষে সে জানায়—সে মহাবলী রাঘবের দূত, রাজাকে মঙ্গলকর উপদেশ ও হিতবাণী পৌঁছে দিতে এসেছে।

19 verses

Sarga 51

हनूमदुपदेशः रावणस्य च कोपः (Hanuman’s Counsel to Ravana and Ravana’s Wrath)

এই সর্গে হনুমান রাবণের প্রতাপ প্রত্যক্ষ করে বিধিবদ্ধ দূতবাক্য উচ্চারণ করেন—সংযত, মিতার্থ ও অর্থগম্ভীর। তিনি নিজেকে সুগ্রীবের দূত ও শ্রীরামের দাস বলে পরিচয় দিয়ে ঘটনাক্রম বলেন: সীতা ও লক্ষ্মণসহ রামের বনবাস, সীতাহরণ, ঋষ্যমূকে সুগ্রীবের সঙ্গে মৈত্রী, রামের এক বাণে বালিবধ, এবং পরে সুগ্রীবের নির্দেশে দিক্‌দিগন্ত ও নানা লোকধামে বিশাল অনুসন্ধানদল প্রেরণ। হনুমান নিজের শত-যোজন সমুদ্রলঙ্ঘনের কথা জানিয়ে নিশ্চিত করেন যে তিনি রাবণের গৃহে সীতাকে দেখেছেন। তারপর তিনি ধর্মের যুক্তি স্থাপন করেন—পরস্ত্রীহরণ মূলনাশক অধর্ম, তপস্যা ও বিবেকখ্যাত রাজাধিরাজের পক্ষে অযোগ্য। তিনি রাম-লক্ষ্মণের অপ্রতিরোধ্য বীর্য স্মরণ করিয়ে সীতাকে লঙ্কার জন্য ‘কালরাত্রি’সম ভয়ংকর বিপদ বলেন এবং জানকীকে ফিরিয়ে দেওয়াই ত্রিকালহিত (অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সকলের কল্যাণকর) পথ বলে উপদেশ দেন। এই তীক্ষ্ণ কিন্তু মর্যাদাসম্পন্ন বাক্য শুনে রাবণ ক্রুদ্ধ হয়ে হনুমানকে বধ করার আদেশ দেয়; ফলে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ভেঙে পড়ে।

46 verses | Hanuman, Ravana

Sarga 52

दूतधर्म-परामर्शः (Envoy-Immunity and Royal Counsel in Ravana’s Court)

এই সর্গে হনুমানের ভাষণ শুনে রাবণ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে এবং দূত হনুমানকে বধ করার আদেশ দেয়। সে দাবি করে, ‘পাপীকে হত্যা করলে পাপ হয় না’। তখন রাজধর্মের রক্ষক ও নীতিবিদ বিভীষণ সেই আদেশে সম্মতি দেন না। তিনি বলেন, দূতবধ রাজধর্মবিরুদ্ধ এবং স্বীকৃত দূতধর্ম ও কূটনৈতিক প্রথার লঙ্ঘন; অতএব দূতকে হত্যা নিষিদ্ধ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে দূতদের ক্ষেত্রে শাস্ত্রসম্মত বিকল্প দণ্ড—অঙ্গচ্ছেদ, প্রহার, মুণ্ডন, বিকৃতি ইত্যাদি—বিধেয় হতে পারে, কিন্তু প্রাণদণ্ড নয়। বিভীষণ কৌশলগত দিক থেকেও বোঝান—হনুমানকে মারলে লাভ নেই; সমুদ্র পার হয়ে ফিরতে সক্ষম বার্তাবাহক সে-ই, তাকে নষ্ট করলে বার্তা-প্রত্যাবর্তনের সুযোগ হারাবে এবং অনুকূল শর্তে নির্ণায়ক যুদ্ধের সম্ভাবনাও নষ্ট হতে পারে। তাই তিনি পরামর্শ দেন, দূতের উপর নয়—রাম ও লক্ষ্মণের উপর শক্তি প্রয়োগ করা হোক। শেষে রাবণ বিভীষণের উপদেশ গ্রহণ করে; এই সর্গে শিক্ষা—রাষ্ট্রনীতি ক্রোধকে যুক্তায়ুক্ত বিচার দ্বারা সংযত করে।

27 verses | Ravana, Vibhishana

Sarga 53

लाङ्गूलदाह-पर्यटनम् (The Burning Tail and the Parade through Laṅkā)

এই ৫৩তম সর্গে ন্যায়নীতি ও কৌশল—দুইয়েরই ধারাবাহিকতা দেখা যায়। বিভীষণের উপদেশ শুনে যে দূতবধ নিন্দিত, রাবণ হনুমানকে হত্যা না করে শাস্তি নির্ধারণ করে—বানরদের অলংকারস্বরূপ প্রিয় লেজে আগুন লাগিয়ে লঙ্কার চৌরাস্তা ও রাজপথে ঘুরিয়ে প্রদর্শন করতে হবে। রাক্ষসেরা তুলোর কাপড় পেঁচিয়ে তেলে ভিজিয়ে লেজে আগুন ধরায়; জনতা জড়ো হয়, আর নগরের প্রকাশ্য স্থান রাজশক্তির ভীতি-প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়। পুনরায় বাঁধা হনুমান পরিস্থিতি বিচার করেন—ইচ্ছা করলে রাক্ষসদের বিনাশ করতে পারেন, তবু রামের প্রীতির জন্য অপমান সহ্য করেন এবং দিবালোকে লঙ্কার দুর্গ-ব্যবস্থা আবার পর্যবেক্ষণ করেন। এদিকে সীতা নির্মম সংবাদ শুনে নিজের সতীত্ব ও তপস্যার প্রতিজ্ঞাবলে অগ্নিদেবকে প্রার্থনা করেন—হনুমানের জন্য যেন শিখা শীতল হয়; সত্যই আগুন তাঁকে ক্ষতি করে না। হনুমান এটিকে সীতার পুণ্য, রামের তেজ এবং বায়ুদেবের সহায়তাজনিত রক্ষা বলে মনে করেন। নগরদ্বারে পৌঁছে তিনি বন্ধন ছিঁড়ে দেহবিস্তার করেন, তোরণের কাছে থাকা লৌহগদা তুলে প্রহরীদের বধ করেন এবং লঙ্কার উপর রশ্মিমালায় ভূষিত সূর্যের মতো দীপ্ত হন—আসন্ন দাহলীলা ও অবরোধের কাব্যিক পূর্বাভাস দিয়ে।

44 verses | Ravana, Hanuman, Sita

Sarga 54

लङ्कादाहः — The Burning of Lanka (Catuḥpañcāśaḥ Sargaḥ)

এই সর্গে হনুমান সীতাদর্শন ও সংবাদ-কার্য সম্পন্ন করে লঙ্কায় অবশিষ্ট কর্তব্য—দুর্গস্তরে দণ্ডপ্রদর্শন ও ভীতিসঞ্চার—স্থির করেন। লেজে জ্বলা অগ্নিকে তিনি অস্ত্ররূপে গ্রহণ করে ছাদে-ছাদে লাফিয়ে প্রহস্ত, মহাপার্শ্ব, বজ্রদংষ্ট্র, শুক, সারণ, ইন্দ্রজিত, জম্বুমালী, সুমালী প্রভৃতি প্রধান রাক্ষসদের গৃহসহ বহু অভিজাত রাক্ষস-আবাস দগ্ধ করেন; কিন্তু ধর্মবিবেচনায় বিভীষণের গৃহ অক্ষত রাখেন—ধর্মনিষ্ঠ মিত্রকে চিহ্নিত করার জন্য। এরপর তিনি রাবণের প্রধান প্রাসাদে পৌঁছান—মেরু-মন্দরসম, মণি-রত্নখচিত দীপ্তিময়—এবং তা অগ্নিসাৎ করেন। যুগান্ত-মেঘের ন্যায় গর্জন করতে করতে তিনি আগুন ছড়ান; প্রবল বায়ুতে দাহ আরও বেড়ে যায়। সোনার জালিকা, মুক্তা-রত্নমণ্ডিত স্তম্ভ ও অলংকৃত নির্মাণ ভেঙে পড়ে, গলিত ধাতু প্রবাহিত হয়; পালাতে থাকা রাক্ষস ও তাদের পরিবারে আতঙ্ক ও হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে। শেষে কালাগ্নি ও প্রলয়-উপমায় লঙ্কাদাহের মহিমা বর্ণিত হয়। রাক্ষসেরা ভাবতে থাকে—এ কি ইন্দ্র, যম, রুদ্র, বিষ্ণু, না স্বয়ং কাল? দেবগণ হনুমানের সংযত অথচ ভয়ংকর পরাক্রমের প্রশংসা করেন। ফলে প্রধান আক্রমণের পূর্বেই লঙ্কার মনোবল ও অবকাঠামো গভীরভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

50 verses | Hanuman

Sarga 55

लङ्कादाहानन्तरचिन्ता — Hanuman’s Post-Conflagration Self-Examination and Assurance of Sita’s Safety

লেজের আগুনে লঙ্কা জ্বালিয়ে পরে সমুদ্রে তা নিভিয়ে হনুমান দগ্ধ নগরী পর্যবেক্ষণ করেন এবং হঠাৎ ভয় ও আত্মগ্লানিতে আচ্ছন্ন হন। তিনি ক্রোধের নৈতিক দোষ বিশ্লেষণ করেন—ক্রোধ বিবেক নষ্ট করে, কঠোর বাক্য বের করে আনে, গুরুজনের প্রতিও হিংসা ঘটাতে পারে, আর যে কোনো অনুচিত কাজকেও যেন বৈধ বলে মনে করায়। তাঁর মনে আশঙ্কা জাগে—লঙ্কা দহন করতে গিয়ে কি তিনি অভিযানের মূল, সীতার নিরাপত্তাই নষ্ট করে ফেললেন? এই ভাবনা থেকে আত্মহননের চিন্তা পর্যন্ত ওঠে, এবং ইক্ষ্বাকু বংশে রাম, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন ও সুগ্রীবের মিত্রবাহিনীর ওপর বিপর্যয়ের ধারাবাহিক কল্পনা তাঁকে গ্রাস করে। তারপর শুভ নিমিত্ত ও ধর্মসম্মত যুক্তিতে তাঁর মন শান্ত হয়। জানকীর পতিব্রতা শুচিতা, তপস্যা, সত্যনিষ্ঠা এবং রামের রক্ষাশক্তির ফলে তিনি অগ্নিতে অদাহ্য—যেন ‘অগ্নি অগ্নিকে দগ্ধ করতে পারে না’। তিনি দেবচারণদের বাণী শোনেন—লঙ্কা দগ্ধ হয়েছে, কিন্তু জানকী দগ্ধ হননি; এ এক আশ্চর্য ঘটনা। প্রমাণ, নিমিত্ত ও প্রশংসায় আশ্বস্ত হয়ে হনুমান স্থির করেন—প্রত্যক্ষভাবে আবার সীতাকে দেখে তবেই তিনি ফিরে যাবেন এবং সফল সংবাদ নিয়ে রামের কাছে যাত্রা করবেন।

34 verses | Hanuman

Sarga 56

षट्पञ्चाशः सर्गः — वैदेही-आश्वासनम् तथा अरिष्टारोहणम् (Consoling Sita and Ascending Mount Arishta)

এই সর্গে হনুমানের সীতার সঙ্গে সাক্ষাৎ সমাপ্ত হয় এবং প্রত্যাবর্তনের মহালঙ্ঘনের সূচনা ঘটে। হনুমান শিংশুপা-বৃক্ষের কাছে ভক্তিভরে প্রণাম করে বৈদেহীর অক্ষত অবস্থার সত্য সাক্ষ্য দেন—দূতের প্রথম ধর্ম সত্যদর্শন ও মর্যাদাসম্পন্ন ভাষণ (৫.৫৬.১)। এরপর সীতা ভর্তৃস্নেহে হনুমানের সামর্থ্য স্বীকার করে নীতিবাক্য বলেন—রামের উদ্ধারকর্ম তাঁর যুদ্ধযোগ্য বীর্য প্রকাশ করুক; লঙ্কা শরবৃষ্টিতে পর্যুদস্ত হোক এবং সীতার পুনরুদ্ধার রামের মর্যাদার অনুরূপ হোক (৫.৫৬.২–৫)। হনুমান যুক্তিসহ আশ্বাস দেন যে রাম শীঘ্রই শ্রেষ্ঠ বানর ও ভল্লুকসেনা নিয়ে এসে তাঁর শোক নাশ করবেন, তারপর বিধিপূর্বক বিদায় নেন (৫.৫৬.৬–৮)। এরপর দৃশ্য আরিষ্ট পর্বতে সরে যায়। পর্বতকে কাব্যরীতিতে জীবন্তের মতো বর্ণনা করা হয়েছে—মেঘাবৃত, ধাতু-মণির দীপ্তি, বেদপাঠের ন্যায় কলকল ধারা ও প্রতিধ্বনিত জলপ্রপাত। হনুমান পর্বতে আরোহণ করে দেহ বিস্তার করেন; তাঁর ভার-প্রচণ্ডতায় শিলা চূর্ণ হয়, বৃক্ষ কাঁপে, সিংহ ভীত হয়, বিদ্যাধরীরা বিচলিত হয়, দিব্য সত্তারা আকাশে উড়ে যায়; পর্বত যেন দেবে গিয়ে সমতল হয়ে ওঠে (৫.৫৬.৯–৩৩)। শেষে হনুমান অনায়াসে আকাশে লাফিয়ে তরঙ্গাহত লবণসমুদ্র অতিক্রম করতে উদ্যত হন, উত্তর তীরে গিয়ে রামের সঙ্গে পুনর্মিলনের জন্য (৫.৫৬.৩৪)।

34 verses | Hanuman, Sita (Vaidehi/Janaki)

Sarga 57

सप्तपञ्चाशः सर्गः — Hanumān’s Return, Roar of Success, and the Announcement “Sītā Seen”

এই সর্গে হনুমান লঙ্কা থেকে উত্তর তীরের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর উড্ডয়নকে দীর্ঘ এক জ্যোতির্ময়-সমুদ্রোপমায় বর্ণনা করা হয়েছে—আকাশ যেন সমুদ্র; চন্দ্র-সূর্য পদ্ম ও জলপাখির মতো, নক্ষত্রমণ্ডলী জলচর, মেঘ তটের উদ্ভিদ, আর বায়ু-উত্থিত ঢেউ তরঙ্গের ন্যায়। হনুমান মেঘপুঞ্জে বারবার আবির্ভূত ও অন্তর্হিত হন, মেঘাবৃত চন্দ্রের মতো। তাঁর সিংহনাদ বজ্রগর্জনের তুল্য; চোখে দেখার আগেই তা সাফল্যের সংবাদ দেয়। অপেক্ষমাণ বানররা বিষণ্ণতা ত্যাগ করে উৎকণ্ঠিত আনন্দে জাগে। জাম্ববান নাদের গুণ শুনেই সিদ্ধি অনুমান করেন—এমন বিজয়ধ্বনি ব্যর্থতা থেকে জন্মায় না। হনুমান মহেন্দ্র পর্বতে অবতরণ করলে তাঁকে অর্ঘ্য-নমস্কারে অভ্যর্থনা করা হয়। এরপর তিনি সংক্ষিপ্ত অথচ সিদ্ধান্তমূলক বার্তা দেন—“দৃষ্টা সীতা”—সীতাকে দেখা হয়েছে; তিনি অশোকবাটিকায় রাক্ষসীদের প্রহরায় দুঃখিত অবস্থায় আছেন। শেষে সকল বানর আনন্দোৎসবে মেতে উঠে লঙ্কা, সীতা ও রাবণের বিস্তারিত বিবরণ শোনার জন্য প্রস্তুত হয়।

51 verses | Jāmbavān, Hanumān, Aṅgada

Sarga 58

सुन्दरकाण्डे अष्टपञ्चाशः सर्गः — हनुमद्वृत्तान्तकथनम्, सीताभिज्ञान-प्रदानम्, लङ्कादाह-वर्णनम्

মহেন্দ্র পর্বতের শিখরে বানরসেনা আনন্দিত হয়। জাম্ববান হনুমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ বিবরণ দিতে বলেন—কোন কথা প্রকাশ করা উচিত, আর কোনটি কৌশলে গোপন রাখা প্রয়োজন। হনুমান বলেন সমুদ্রযাত্রার ঘটনা—সুরসার পরীক্ষা, সিংহিকার আক্রমণ; তারপর গোপনে লঙ্কায় প্রবেশ এবং অশোকবাটিকায় রাক্ষসীদের পাহারায় থাকা সীতার দর্শন। তিনি রাবণের ভয় দেখানো ও প্রলোভন, সীতার অটল সতীত্ব ও ধর্মনিষ্ঠা, ত্রিজটার শুভ স্বপ্ন-উপদেশ, এবং ইক্ষ্বাকু বংশের স্মরণ করে কথোপকথন শুরু করার পদ্ধতিও বর্ণনা করেন। এরপর পারস্পরিক পরিচয় সম্পন্ন হয়—হনুমান সীতাকে প্রণাম করে রামের অঙ্গুরীয় (মুদ্রিকা) অভিজ্ঞান হিসেবে দেন; সীতা রামের জন্য মূল্যবান রত্ন প্রদান করে বলেন, এমনভাবে সংবাদ দিও যাতে রাম দ্রুত আসেন, এবং দুই মাসের সীমা স্মরণ করিয়ে দেন। তারপর হনুমান পরিকল্পিতভাবে তাণ্ডব করেন—উদ্যান ধ্বংস করেন, একের পর এক রাক্ষসদলকে পরাজিত করেন, অক্ষকে বধ করেন; শেষে ইন্দ্রজিতের ব্রহ্মাস্ত্রে আবদ্ধ হন। বিভীষণের হস্তক্ষেপে দূতধর্ম নিয়ে আলোচনা হলেও শাস্তিস্বরূপ লেজে আগুন দেওয়া হয়—আর সেই আগুনেই লঙ্কা দগ্ধ হয়। সীতার নিরাপত্তা নিয়ে হনুমানের উদ্বেগ শুভ লক্ষণ ও দিব্য ঘোষণায় দূর হয়—সীতা অক্ষত। এরপর তিনি বানরদের কাছে ফিরে এসে বিবরণ সম্পূর্ণ করেন এবং পরবর্তী কৌশলগত পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত করেন।

166 verses

Sarga 59

हनूमद्वृत्तान्तः—वानरबलप्रशंसा च (Hanuman’s Report and Praise of the Vanara Host)

পূর্ব কথন সমাপ্ত করে হনুমান জাম্ববান প্রমুখ জ্যেষ্ঠ বানরদের কাছে নিজের কর্মবৃত্তান্ত আরও বিস্তারে নিবেদন করেন। তিনি বলেন—ইন্দ্রজিত যদি ব্রহ্মাস্ত্র, ঐন্দ্রাস্ত্র, রৌদ্রাস্ত্র, বায়ব্যাস্ত্র, বারুণাস্ত্র প্রভৃতি ভয়ংকর দিব্যাস্ত্রও প্রয়োগ করে, তবু তিনি লঙ্কা ও রাবণের সেনাবল ধ্বংস করতে সক্ষম; এবং অনুমতি চান যাতে তিনি প্রবল প্রতিঘাত করেন—অবিরাম শিলাবৃষ্টির মতো আঘাতে শত্রুবলকে চূর্ণ করেন। এরপর তিনি বানরসেনার যুদ্ধসম্পদের সুসংযত প্রশংসা করেন—জাম্ববানের অচল-সম দৃঢ়তা, বালিপুত্রের একাই রাক্ষসদল বিনাশে যথেষ্ট হওয়া, পনস ও নীলের উরু-জঙ্ঘার অতিদ্রুত বেগ, এবং অশ্বিনীকুমার-বংশজাত মৈন্দ ও দ্বিবিদের প্রায় অবধ্যতা (ব্রহ্মার বর, অমৃতপান) ইত্যাদি। লঙ্কায় তাঁর প্রকাশ্য ঘোষণা—“রামের জয় নিশ্চিত; আমি কোসলরাজের দাস”—এ কথাও তিনি স্মরণ করান, যা ধর্মনিষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের রূপ। শেষে তিনি অশোকবাটিকায় শিংশুপা বৃক্ষতলে সীতার অবস্থার নিখুঁত বর্ণনা দেন—রাক্ষসীদের দ্বারা পরিবেষ্টিতা, কৃশকায়া, তবু রামভক্তিতে অটল; রাবণকে প্রত্যাখ্যান করে, কখনও মৃত্যুসংকল্পেও স্থির হয়। কিন্তু রাম-সুগ্রীব মৈত্রীর সংবাদ পেয়ে তিনি শান্ত হয়ে বিশ্বাস স্থাপন করেন। আরও বলা হয়—সীতার পতিব্রতা-তেজেই রাবণ বিনষ্ট হতে পারত, কিন্তু তিনি তা করেন না; রাবণের মৃত্যু রামের হাতেই হোক—এই ধর্মনীতি রক্ষা করেন। অতএব সভাকে পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করতে আহ্বান জানানো হয়।

36 verses | Hanuman

Sarga 60

अङ्गदवाक्यम्—सीताहरण-प्रतिवेदन-धर्मविचारः (Angada’s Counsel on Reporting Without Sita)

এই সর্গে হনুমান সীতাদর্শনের সংবাদ দেওয়ার পর বানরদের মধ্যে গভীর পরামর্শ শুরু হয়। বালিপুত্র অঙ্গদ বলেন—সীতাকে সঙ্গে না এনে রামের কাছে ফিরে যাওয়া ‘অযুক্ত’; শুধু “দেখেছি, কিন্তু আনিনি” বলা বীরত্বখ্যাত বানরযোদ্ধাদের মর্যাদার সঙ্গে মানায় না। তিনি দেব-দানবদের মধ্যেও অতুলনীয় বানরদের লম্ফনশক্তি ও পরাক্রম স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সীতাকে উদ্ধার করা সম্ভব—এটি কেবল আকাঙ্ক্ষা নয়। অঙ্গদ তৎক্ষণাৎ কর্মপ্রস্তাব দেন—হনুমান ইতিমধ্যেই বহু প্রধান রাক্ষসকে নিস্তেজ করেছেন, এখন অবশিষ্ট কাজ জানকীকে গ্রহণ করে দ্রুত প্রস্থান। তখন জাম্ববান সংযতভাবে বলেন—অঙ্গদের উদ্দেশ্য ধর্মসম্মত, কিন্তু কার্যসিদ্ধি রামের স্থির অভিপ্রায় ও আদেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে করতেই হবে; সামর্থ্য থাকলেই নয়, অনুমোদিত পথও চাই। এই অধ্যায়ে তাই আবেগপ্রসূত উদ্ধার-উদ্যোগ ও আদেশানুগ ধর্মনীতি—দুইয়ের তুলনা করে সমষ্টিগত কর্মের শাসন-নৈতিকতা নিরূপিত হয়।

6 verses

Sarga 61

मधुवनप्रवेशः — The Vanaras Enter Madhuvana (Honey-Grove Episode)

জাম্ববান-এর উপদেশ গ্রহণ করে অঙ্গদ প্রমুখ প্রত্যাবর্তনকারী বানরনেতারা মহেন্দ্র পর্বত থেকে হনুমানের সঙ্গে যাত্রা করেন। তাঁরা হনুমানের সাফল্য প্রশংসা করতে করতে শ্রীरामের কার্যে নিবেদিত থাকার মানসিক প্রস্তুতি নেন। পথে তাঁরা সুগ্রীবের প্রসিদ্ধ মধুবনে পৌঁছান—ইন্দ্রবনের ন্যায় মনোরম উপবন, যার রক্ষক সুগ্রীবের মাতুল দধিমুখ। আনন্দে উদ্বেল বানররা মধুপান করার অনুমতি অঙ্গদের কাছে প্রার্থনা করে। অঙ্গদ জাম্ববান-এর সম্মতি নিয়ে অনুমোদন দেন; তারপর গান-নৃত্যসহ তারা মধু পান করে উল্লাসে মেতে ওঠে। কিন্তু উল্লাস ক্রমে উচ্ছৃঙ্খলতায় রূপ নেয়—উদ্যান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বৃক্ষ ও পুষ্প নষ্ট হয়, মত্ততায় সকলের সংযম লুপ্ত হয়। দধিমুখ ধমক, বাধা, বিবাদ ও সান্ত্বনা—বিভিন্ন উপায়ে শাসন করতে চান, কিন্তু মাতাল বানররা তাঁকে অপমান ও প্রহার করে এবং মধুবন লুণ্ঠন চালিয়ে যায়। এই সর্গটি এক সংক্রমণ-চিত্র—মিশনের সাফল্য সামূহিক উচ্ছ্বাসে পরিণত হয়ে শাসন, কর্তৃত্ব ও সংযমের সীমা পরীক্ষা করে, এরপর হনুমানের কৃত্য রাজসভায় নিবেদন করার দিকে কাহিনি অগ্রসর হয়।

23 verses | Jāmbavān, Aṅgada, Dadhimukha

Sarga 62

मधुवनभङ्गः — The Disruption of Madhuvana and Dadhimukha’s Complaint

এই সর্গে মৈথিলী (সীতা)-সম্পর্কে সফল সংবাদ পেয়ে বানরসেনার আনন্দ উচ্ছ্বসিত হয়। হনুমান তাদের নির্ভয়ে মধুবনের রাজ-মধু পান করার অনুমতি দেন; অঙ্গদ হনুমানের সিদ্ধকর্ম স্মরণ করিয়ে সকলের সামনে সেই অনুমতি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে। তখন বানররা উল্লাসে মধুবনের দিকে ছুটে যায়। মধুপানে ক্রমে উন্মত্ততা বাড়ে—বড় পাত্রে পান, মৌচাক ছোড়াছুড়ি, চিৎকার-গান, টলতে টলতে ক্রীড়া, মাটিতে শুয়ে পড়া, এমনকি কিছু অশোভন আচরণও দেখা যায়। উদ্যানরক্ষক মধুপালরা প্রহৃত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়। মধুবনের নিযুক্ত রক্ষক দধিমুখ—সুগ্রীবের বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়—তাদের বলপ্রয়োগে থামাতে এলে সংঘর্ষ বাধে। মদোন্মত্ত অঙ্গদ দধিমুখকে কঠোরভাবে দমন করে; দধিমুখ আহত হয়ে ক্ষণকাল অচেতন হয়। জ্ঞান ফিরে পেয়ে সে সরে দাঁড়ায় এবং মধুবনকে পূর্বপুরুষ-প্রদত্ত, রাজরক্ষিত ও নিষিদ্ধ উপবন বলে সুগ্রীবের কাছে অভিযোগ জানাতে স্থির করে। দ্রুত উড়ে সে সুগ্রীবের কাছে—যেখানে রাম ও লক্ষ্মণও উপস্থিত—প্রণাম করে অভিযোগ নিবেদনের জন্য প্রস্তুত হয়। এই সর্গে সাফল্যের উল্লাসের সঙ্গে ক্ষমতা, সম্পত্তি ও শৃঙ্খলার নীতিবোধের সতর্কতাও প্রকাশ পায়।

39 verses

Sarga 63

दधिमुख-विज्ञापनम् / Dadhimukha Reports the Madhuvana Incident

এই সর্গে বানর-রাজ্যে এক প্রকার রাজদরবারি-আইনি অনুসন্ধানের আবহ সৃষ্টি হয়। মধুবনের নিযুক্ত রক্ষক দধিমুখ সুগ্রীবের চরণে প্রণাম করে জানায়—অন্বেষণ থেকে প্রত্যাবর্তিত অঙ্গদ-প্রমুখ দল সংরক্ষিত মধুবনে প্রবেশ করে মধু ও ফল ভক্ষণ করেছে এবং প্রহরীদের বলপূর্বক প্রতিহত করেছে। লক্ষ্মণ দধিমুখের দুঃখের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। তখন সুগ্রীব যুক্তিবিচারে বলেন—এমন উল্লাসময় সীমালঙ্ঘন ব্যর্থতার পরে ঘটে না; নিশ্চয়ই সীতার সংবাদ মিলেছে। তিনি বিশেষ করে অনুমান করেন, হনুমানই সীতাকে দেখেছেন, কারণ তাঁর মধ্যে সাধন-ক্ষমতা, দৃঢ় সংকল্প, বুদ্ধি ও প্রমাণিত পরাক্রম সুপ্রতিষ্ঠিত। এভাবে শৃঙ্খলাভঙ্গকে কর্তব্যসিদ্ধির লক্ষণ রূপে ব্যাখ্যা করে সুগ্রীব রাম-লক্ষ্মণকে আনন্দিত করেন। তারপর তিনি আদেশ দেন—হনুমানসহ নেতৃবৃন্দকে দ্রুত উপস্থিত করা হোক, যাতে সীতাদর্শনের বিস্তারিত কথা প্রত্যক্ষভাবে শোনা যায়।

29 verses | Sugriva, Dadhimukha, Lakshmana

Sarga 64

अङ्गद-प्रत्यागमनम् — Angada’s Return and the Confirmation of Sītā’s Discovery

এই ৬৪তম সর্গে কার্যসিদ্ধির পর আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন ও রাজসভায় পুনঃপ্রবেশের ধারা প্রকাশ পায়। সুগ্রীবের নির্দেশে সন্তুষ্ট দধিমুখ প্রণাম করে মধুবন-প্রসঙ্গ থেকে সভামণ্ডলের দিকে অগ্রসর হন; পূর্বে বাধা দেওয়ার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং সংযম অবলম্বনের অনুরোধ জানান। অন্যদিকে যুবরাজ হয়েও অঙ্গদ অহংকারহীন নেতৃত্ব দেখান—সফলতার পরে বিলম্ব অনুচিত বলে তিনি সেনার সম্মতি চান এবং স্পষ্ট বলেন যে পদমর্যাদার জোরে তিনি আদেশ চাপিয়ে দেবেন না। বানররা তাঁর বিনয় প্রশংসা করে বলে, তাঁর আদেশ ছাড়া গমন সম্ভব নয়; তখন গর্জনধ্বনি তুলে সেনা আকাশপথে যাত্রা করে। তাদের আগমনের পূর্বে শোকাকুল রামকে সুগ্রীব অনুমান-যুক্তিতে সান্ত্বনা দেন—পৈতৃক মধুবনের ধ্বংস ও অঙ্গদের নিশ্চিন্ত ভঙ্গি সাফল্যের লক্ষণ; এবং এই কৃতিত্ব বিশেষভাবে হনুমানেরই বলে তিনি নির্দেশ করেন। শেষে হনুমান প্রণাম করে প্রত্যক্ষ সংবাদ দেন—সীতাকে দেখা গেছে; তিনি দেহে সুস্থ এবং রামের প্রতি ভক্তিতে অটল। এ সংবাদে রাম ও লক্ষ্মণ তৎক্ষণাৎ আনন্দিত হন এবং সভায় হনুমানের নির্ণায়ক দক্ষতার সর্বজনীন স্বীকৃতি ঘটে।

40 verses | Dadhimukha, Angada, Vanara troops (hariyūthapāḥ), Sugriva, Hanuman

Sarga 65

सीतावृत्तान्तनिवेदनम् / Report of Sītā’s Condition and Tokens of Recognition

প্রস্রবণ পর্বতে প্রত্যাবর্তিত বানরগণ শ্রীराम, লক্ষ্মণ ও সুগ্রীবকে প্রণাম করে, যুবরাজ অঙ্গদকে সম্মুখে স্থাপন করে সীতার সংবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে নিবেদন করতে শুরু করে। বৈদেহী জীবিত ও অক্ষত আছেন শুনে শ্রীराम সূক্ষ্ম বিবরণ জানতে চান—তিনি কোথায় আছেন এবং শ্রীरामের প্রতি তাঁর মনোভাব কী। তখন সকলেই সীতাবৃত্তান্তে সর্বাধিক পারদর্শী হনুমানকে কথা বলতে অনুরোধ করে। হনুমান দিক্‌প্রণাম করে সীতাকে স্মরণ করে সমুদ্রলঙ্ঘন, দক্ষিণ তীরে অবস্থিত লঙ্কার অবস্থান এবং অশোকবাটিকায় বন্দিনী সীতার দর্শনের কথা বলেন। তিনি জানান—ভয়ংকর রাক্ষসীদের প্রহরায় সীতা বারবার ভীতিপ্রদর্শনে আক্রান্ত, শোকে নিমগ্ন, একবেণীধারিণী, নগ্ন ভূমিতে শয়নরত, শীতের পদ্মের মতো বিবর্ণ; রাবণকে প্রত্যাখ্যান করে প্রাণত্যাগে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইক্ষ্বাকুবংশের প্রশংসা ও রাম–সুগ্রীব মৈত্রীর সংবাদ জানিয়ে তিনি সীতার বিশ্বাস অর্জন করেন। সীতা অভিজ্ঞানরূপে চিত্রকূটের কাক-প্রসঙ্গ বলেন এবং চূড়ামণি প্রদান করে নির্দেশ দেন—সুগ্রীবের শ্রবণে সব কথা শ্রীरामকে জানাতে; আর সতর্ক করেন যে তিনি আর মাত্র এক মাস ধৈর্য ধারণ করবেন। হনুমান ক্রমানুসারে সব সংবাদ নিবেদন করে চূড়ামণি শ্রীरामের হাতে দেন; তখন দুই রাজপুত্রের মনে স্বস্তি ও শোকনিবারণ প্রকাশ পায়।

27 verses | Rama, Hanuman, Sita

Sarga 66

चूडामणि-दर्शनम् — Rama Receives Sita’s Token and Questions Hanuman

সুন্দরকাণ্ডের ৬৬তম সর্গে হনুমানের সফল প্রত্যাবর্তনের তৎক্ষণাৎ আবেগময় ও কৌশলগত প্রভাব বর্ণিত হয়েছে। সীতার চূড়ামণি হাতে পেয়ে শ্রীराम তা বুকে চেপে ধরেন এবং লক্ষ্মণের সঙ্গে অশ্রুপাত করেন—উদ্বেগময় অনিশ্চয়তা থেকে নিশ্চিত জ্ঞানে উত্তরণের এই চিহ্ন। এরপর তিনি সুগ্রীব ও উপস্থিত সকলকে জানান, এই রত্নটি বিবাহকালে জনক (বৈদেহ) প্রদত্ত, কুলের পবিত্র স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত; তাই এর প্রামাণ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সীতাস্মরণ আরও তীব্র হয়। শোক ও পরিচয়ের ভাব উপমায় ফুটে ওঠে—বাছুরকে দেখে যেমন গাভীর দুধ আপনা-আপনি গলে প্রবাহিত হয়, তেমনি রামের হৃদয় দ্রবীভূত হয়; আর শরৎচন্দ্র যেমন মেঘে আচ্ছন্ন থাকে, তেমনি রাক্ষসীদের মধ্যে সীতার গোপন দীপ্তি আড়ালিত। শ্রীराम বারবার হনুমানকে অনুরোধ করেন সীতার কথা বিস্তারিত বলতে—তৃষ্ণার্তের জলের মতো তা প্রাণধারণকারী; এতে সত্য সাক্ষ্যের জ্ঞানমূল্য ও দূতবাক্যের সান্ত্বনাদায়ক শক্তি প্রকাশ পায়। শেষে সীতার অবস্থান জেনে রাম এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারেন না এবং ভয়ংকর রাক্ষসীদের মাঝে সীতার কোমলতার কথা ভেবে করুণায় উদ্বেল হন—ধর্মসম্মত দ্রুত কর্মের নৈতিক তাগিদ এই সর্গে দৃঢ় হয়।

15 verses | Rama, Hanuman

Sarga 67

अभिज्ञानवृत्तान्त-प्रत्यायनम् (Token of Recognition and the Crow–Brahmāstra Episode)

এই সর্গে হনুমান শ্রীरामের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ নিবেদন করেন। তিনি সীতার কথাগুলি সম্পূর্ণভাবে পৌঁছে দেন এবং দূতের সত্যতা প্রমাণ ও বিচ্ছেদের মধ্যে বিশ্বাস স্থির করার জন্য একটি ‘অভিজ্ঞান’—পরিচয়‑চিহ্নস্বরূপ বৃত্তান্তও বলেন। সীতা চিত্রকূটের ঘটনা স্মরণ করান—ইন্দ্রজাত এক কাক তাঁকে আঘাত করে। তখন ক্রুদ্ধ হলেও ধর্মনিষ্ঠ রাম দর্ভ‑তৃণের ফলায় ব্রহ্মাস্ত্র সংযোজন করেন। সেই অস্ত্র তিন লোক জুড়ে কাককে তাড়া করে; দেব‑ঋষিদের কাছে আশ্রয় না পেয়ে কাক শেষ পর্যন্ত রামের শরণে ফিরে আসে। রাম দিব্যাস্ত্রকে নিষ্ফল করতে না পেরে করুণায় তার প্রাণ রক্ষা করে কেবল ডান চোখ বিদ্ধ করেন—এতে রামের শক্তি, সংযম ও শরণাগত‑বৎসলতা স্পষ্ট হয়। এরপর সীতা বেদনার সঙ্গে প্রশ্ন করেন—এমন সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রাক্ষসদের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ কেন প্রয়োগ হচ্ছে না। হনুমান শপথ করে আশ্বাস দেন যে রাম‑লক্ষ্মণ শোকে আচ্ছন্ন হলেও সিদ্ধান্তমূলক কর্মের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শেষে সীতা নিজের কেশ/বস্ত্রে সংরক্ষিত দিব্য মণি রামের জন্য স্পর্শযোগ্য পরিচয়‑চিহ্ন হিসেবে দেন এবং রাক্ষসীদের হুমকির মধ্যে তাঁর দুঃখ, কুশল ও অটল পতিব্রতা নিষ্ঠার সংবাদ পৌঁছে দিতে বলেন।

37 verses | Hanumān, Sītā (quoted testimony), Rāma (as addressee; recalled speech)

Sarga 68

सीताया यशोधर्मविचारः — Sita’s Counsel on Honor, Rescue-Strategy, and Hanuman’s Reassurance

এই সর্গে সীতা হনুমানের প্রতি স্নেহ ও রামের প্রতি প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে উদ্ধারের পদ্ধতি নিয়ে তীব্র তাগিদে কথা বলেন। তিনি হনুমানকে দুঃসাধ্য কর্মের জন্য দ্রুত কোনো উপায় জানাতে অনুরোধ করেন এবং একাই কাজ সম্পন্ন করার তাঁর অসাধারণ ক্ষমতা স্বীকার করেন; তবে লক্ষ্যকে রামের ন্যায্য যশ ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিকে ফেরান। সীতা বলেন, তাঁর উদ্ধার যেন রাবণের কপট ও ভীতিপ্রদ অপহরণের মতো না হয়; বরং রাম লঙ্কার দুর্গরক্ষা ও শত্রুবলকে প্রকাশ্য সমরে দমন করে যথোচিত বীরত্ব প্রদর্শন করুন, যাতে রাজধর্মসম্মত সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে। সীতার বিনীত ও যুক্তিসংগত বাক্য শুনে হনুমান কার্যসিদ্ধির আশ্বাস দেন। তিনি জানান, বানর-ঋক্ষ সেনার অধিপতি সুগ্রীব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; তাঁর অধীনে দ্রুতগামী ও শক্তিশালী বাহিনী আছে, যারা বাধাহীনভাবে চলতে পারে, এমনকি পৃথিবী পরিক্রমণ করতেও সক্ষম। সমুদ্র অতিক্রমের আশঙ্কা দূর করে হনুমান সেনাশক্তির সামর্থ্য ব্যাখ্যা করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে রাম ও লক্ষ্মণ শীঘ্রই লঙ্কাদ্বারে উপস্থিত হবেন। হনুমানের শুভ ও শান্তিদায়ক বাক্যে সীতা ধৈর্য লাভ করেন; কৌশলগত নিশ্চয়তার সঙ্গে তাঁর মনও স্থিত হয়।

29 verses | Sita, Hanuman

Frequently Asked Questions

Sundara Kanda foregrounds dharmic agency under extreme constraint: Sītā’s unwavering moral autonomy (pativratā-dharma) and Hanumān’s disciplined service (bhakti expressed as competent action). The book repeatedly teaches anirveda—refusal to succumb to despair—as the psychological foundation of righteous success, voiced explicitly during the search. It also develops dūta-dharma (envoy ethics): the messenger must speak truthfully, act strategically, and avoid unnecessary harm, while the receiving king is expected to respect envoy-immunity—an ideal articulated through Vibhīṣaṇa’s counsel. Finally, it critiques adharma in kingship: Rāvaṇa’s coercive desire and disregard for wise counsel are presented as the seed of political ruin. The ‘beauty’ of the book lies in this fusion of inner virtue, lucid speech, and effective action.

Key episodes include: (1) Hanumān’s resolve and leap across the ocean; (2) nocturnal entry and reconnaissance of Laṅkā, including palace and Pushpaka-vimāna descriptions; (3) discovery of Sītā in the Aśoka grove; (4) Rāvaṇa’s proposals and threats and Sītā’s refusal; (5) Hanumān’s self-revelation and narration of Rāma’s alliance with Sugrīva; (6) receipt of the cūḍāmaṇi and Sītā’s urgent message; (7) destruction of the grove and defeat of multiple rākṣasa forces, including Akṣa; (8) capture and court dialogue with Rāvaṇa, with debate on messenger treatment; (9) tail-burning and the burning of Laṅkā; and (10) Hanumān’s return and report to Rāma, catalyzing the next campaign.

The principal figures are Hanumān (the emissary and heroic protagonist), Sītā (the captive queen and ethical center), and Rāvaṇa (the coercive antagonist). Supporting but significant roles include Trijaṭā (compassionate rākṣasī and bearer of auspicious dreams), Vibhīṣaṇa (advocate of rāja-dharma and messenger immunity), Indrajit (strategic warrior who subdues Hanumān), Akṣa (prince slain by Hanumān), and on the vanara side Aṅgada, Jāmbavān, and Sugrīva (leaders who receive the report and prepare for war). Rāma and Lakṣmaṇa frame the book’s conclusion through grief, recognition of the token, and renewed resolve.

Structurally, Sundara Kanda bridges the search-phase (Kiṣkindhā Kāṇḍa) and the war-phase (Yuddha Kāṇḍa). It supplies the decisive intelligence—Sītā’s location, condition, and the political-military texture of Laṅkā—while also delivering the emotional catalyst through the cūḍāmaṇi and Sītā’s message. Thematically, it shifts the epic from uncertainty to actionable certainty: Rāma’s grief becomes directed purpose, the alliance with the vanaras gains concrete objective, and Laṅkā’s vulnerability is demonstrated through Hanumān’s reconnaissance and conflagration. In reception-history, this book also stands as a self-contained devotional narrative centered on Hanumān’s exemplary service.

Major lessons include: (1) perseverance without despair (anirveda) as a practical and ethical discipline; (2) the power of truthful, timely speech—Hanumān wins trust through careful narration and restraint; (3) moral steadfastness under coercion—Sītā’s refusal models integrity and agency; (4) strategic action guided by purpose rather than impulse, even when force is used; and (5) good governance requires listening to wise counsel—Rāvaṇa’s rejection of dharmic advice is portrayed as self-destructive. The book thus teaches that devotion and righteousness are not merely sentiments but forms of intelligent, accountable action.

Read Valmiki Ramayana in the Vedapath app

Scan the QR code to open this directly in the app, with audio, word-by-word meanings, and more.

Continue reading in the Vedapath app

Open in App