Srstikhanda
मुनिप्रश्नवर्णनम् (Description of the Sages’ Questions)
অধ্যায় ১ মঙ্গলশ্লোক দিয়ে শুরু, যেখানে শিবকে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের একমাত্র কারণ, শুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ, মায়াতীত হয়েও মায়ার আশ্রয়রূপে স্তব করা হয়েছে। এরপর পুরাণীয় সংলাপের পটভূমি স্থাপিত হয়—নৈমিষারণ্যে শৌনকপ্রমুখ ঋষিগণ বিদ্যেশ্বরসংহিতার (বিশেষত সাধ্যসাধন-খণ্ডের) শুভ কাহিনি শুনে ভক্তিভরে সূতের কাছে আসেন। তাঁরা সূতকে আশীর্বাদ করে বলেন, তাঁর বাক্যধারায় জ্ঞানামৃতের অক্ষয় মাধুর্য প্রবাহিত; তাই আরও শৈবধর্মোপদেশ প্রার্থনা করেন। ব্যাসের কৃপায় সূতের প্রামাণ্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাঁকে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎজ্ঞ বলা হয়। এভাবে এই অধ্যায় শিবতত্ত্বের মহিমা, প্রধান বক্তা-শ্রোতার পরিচয়, এবং ভক্তিপূর্ণ প্রশ্ন ও মনোযোগী শ্রবণকে শৈবজ্ঞান লাভের যথার্থ ভঙ্গি হিসেবে নির্ধারণ করে আসন্ন সৃষ্ট্যুপাখ্যানের দ্বার উন্মোচন করে।
नारदतपोवर्णनम् (Nārada’s Austerities Described)
এই অধ্যায়ে সূত নারদের পরিচয় দেন—ব্রহ্মার পুত্র, সংযমী ও তপস্যায় নিবিষ্ট। তিনি দ্রুতস্রোতা দিব্য নদীর তীরে হিমালয়ের উপযুক্ত গুহা-প্রদেশ খুঁজে এক দীপ্তিময়, অলংকৃত আশ্রমে পৌঁছে দীর্ঘ তপস্যা করেন—দৃঢ় আসন, মৌন, প্রাণায়াম ও বুদ্ধিশুদ্ধি। শেষে “অহং ব্রহ্ম” এই অদ্বৈত ভাবনায় সমাধি লাভ করে ব্রহ্মসাক্ষাৎকারমুখী জ্ঞান অর্জন করেন। নারদের তপোবলে বিশ্বে আলোড়ন ওঠে; শক্র/ইন্দ্র ভীত হয়ে এটিকে নিজের আধিপত্যের হুমকি মনে করে বিঘ্ন সৃষ্টির জন্য স্মর/কামদেবকে আহ্বান করেন এবং কামশক্তি দিয়ে নারদের ধ্যান ভাঙতে বলেন।
नारदमोहवर्णनम् — Description of Nārada’s Delusion
অধ্যায় ৩ সংলাপরূপে শুরু হয়। ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—বিষ্ণু চলে যাওয়ার পরে কী ঘটল এবং নারদ কোথায় গেলেন। ব্যাসের মাধ্যমে সূত বলেন, শিবের ইচ্ছায় মায়াবিদ বিষ্ণু তৎক্ষণাৎ এক আশ্চর্য মায়া বিস্তার করেন। মুনিদের পথে এক বিশাল, মনোমুগ্ধকর নগরী দেখা দেয়—বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যে অতুল, নারী-পুরুষে পরিপূর্ণ এবং চতুর্বর্ণ-ব্যবস্থাসহ সম্পূর্ণ সমাজরূপে সুশৃঙ্খল। সেখানে ধনবান ও পরাক্রমী রাজা শীলনিধি কন্যার স্বয়ংবর উপলক্ষে মহোৎসব করছেন। চার দিক থেকে সুশোভিত রাজপুত্ররা কন্যা জয়ের আশায় উপস্থিত হয়। এই বিস্ময় দেখে নারদ মোহগ্রস্ত হন; কৌতূহল ও কামনা বেড়ে তিনি রাজার দ্বারের দিকে অগ্রসর হন—যেখানে মায়া, আকর্ষণ ও অহং-শিক্ষার ধর্মতত্ত্ব প্রকাশ পেতে থাকে।
नारदस्य विष्णूपदेशवर्णनम् — Nārada and Viṣṇu: Instruction after Delusion
অধ্যায় ৪-এ সৃষ্ট্যুপাখ্যান এগিয়ে যায় এবং বিমোহিত নারদের কাহিনি বর্ণিত হয়। শিবের গণদের প্রতি যথোচিত শাপ প্রদান করেও শিবেচ্ছায় তিনি এখনও জাগ্রত নন; হরির কৃত ছল স্মরণ করে অসহ্য ক্রোধে তিনি বিষ্ণুলোকে গমন করেন। সেখানে বিষ্ণুকে দ্বিচারিতা ও জগৎ-মোহিনী শক্তির অভিযোগ করে, মোহিনী-প্রসঙ্গ এবং অসুরদের অমৃতের বদলে বারুণী বিতরণের কথা তুলে ধরে কঠোর বাক্য বলেন। এই তিরস্কারের মাধ্যমে মায়ার শাসন প্রকাশ পায়—দৈব কৌশল নৈতিক বিশৃঙ্খলা নয়, বরং উচ্চতর শৈব-ইচ্ছার অধীন নিয়ন্ত্রিত লীলা। পরবর্তী অংশে বিষ্ণুর উপদেশ নারদের প্রতিক্রিয়াশীল বোধকে শান্ত করে, ক্রোধ প্রশমিত করে এবং দেবতাদের ভূমিকা ও বিশ্বকার্যে মোহের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে।
नारदप्रश्नवर्णन (Nāradapraśna-varṇana) — “Account of Nārada’s Inquiry”
এই অধ্যায়ে সূত বলেন—হরি (বিষ্ণু) অন্তর্ধান করলে নারদ পৃথিবী ভ্রমণ করতে করতে বহু শিবরূপ ও শিবলিঙ্গ দর্শন করেন, যেগুলি ভুক্তি ও মুক্তিদাতা বলে বর্ণিত। সেখানে দুই শিবগণ তাঁকে চিনে ভক্তিভরে প্রণাম করে, তাঁর চরণ ধরে পূর্বশাপমোচনের প্রার্থনা জানায়। তারা বলে—তারা স্বভাবে অপরাধী নয়; এক রাজার কন্যার স্বয়ংবরের সময় মায়ামোহে বিভ্রান্ত হয়ে পূর্বে দোষ ঘটেছিল। নারদের শাপও পরমেশ্বরের প্রেরণায় হয়েছে বলে তারা মানে এবং ফলকে নিজেদের কর্মফল বলে গ্রহণ করে, কারও উপর দোষারোপ করে না। তাদের ভক্তিপূর্ণ বাক্য শুনে নারদ স্নেহসহ অনুতপ্ত হন এবং অনুগ্রহের পথে অগ্রসর হন; এতে কর্মদায়িত্ব, ঈশ্বরীয় বিধান, বিনয় ও মিলন, এবং লিঙ্গদর্শনের পবিত্রতা একত্রে প্রকাশ পায়।
विष्णूत्पत्तिवर्णनम् (Description of the Origin/Manifestation of Viṣṇu)
অধ্যায় ৬-এ ব্রহ্মা লোককল্যাণের উদ্দেশ্যে করা পুণ্য প্রশ্নের শিক্ষামূলক উত্তর দেন। তিনি বলেন, এই উপদেশ শ্রবণে সর্বপাপ বিনাশ হয় এবং তিনি ‘অনাময়’ নির্দোষ শিবতত্ত্ব ব্যাখ্যা করবেন। এরপর প্রলয়াবস্থা বর্ণিত—চরাচর জগত্ লয় হলে সর্বত্র তমোময় অন্ধকার; সূর্য-চন্দ্র, দিন-রাত্রি, অগ্নি, বায়ু, পৃথিবী ও জলেরও অভাব। নেতিবাচক বর্ণনায় বলা হয়—দৃশ্য গুণ নেই, শব্দ-স্পর্শ নেই, গন্ধ-রূপ অব্যক্ত, রস নেই, দিক-নির্দেশও নেই। ব্রহ্মা স্বীকার করেন, শিবতত্ত্বকে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুও যথার্থভাবে সম্পূর্ণ জানতে পারেন না। তা মন-বাক্যের অতীত, নাম-রূপ-বর্ণহীন, না স্থূল না সূক্ষ্ম; যোগীরা অন্তরাকাশে তা দর্শন করেন। এই অপ্রকাশ্য শিবভূমির উপরেই বিষ্ণুর প্রকাশের কথা স্থাপিত—অব্যক্ত প্রলয় থেকে সৃষ্টির ক্রমে প্রবেশের মুহূর্তে বিষ্ণুর আবির্ভাব।
विष्णु-ब्रह्म-विवाद-वर्णनम् (Description of the Viṣṇu–Brahmā Dispute and Brahmā’s Confusion)
অধ্যায় ৭-এ নিদ্রিত নারায়ণের নাভি থেকে উদ্ভূত পদ্ম থেকে ব্রহ্মার আবির্ভাব বর্ণিত। সেই পদ্ম অপরিমেয় ও দীপ্তিময়, সৃষ্টির মহাবিস্তারের প্রতীক। চতুর্মুখ হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মা নিজ পরিচয় জানলেও মায়ার প্রভাবে পদ্মের ঊর্ধ্বে নিজের জনককে চিনতে পারেন না; তিনি নিজের সত্তা, উদ্দেশ্য ও উৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন করেন। এই বিভ্রান্তি মহেশ্বরের লীলা-রূপ মায়ামোহন দ্বারা ঘটিত বলা হয়েছে। অধ্যায়টি শেখায়—কারণত্ব ও শ্রেষ্ঠতার বিষয়ে উচ্চ দেবতাও সংশয়ে পড়তে পারেন; মোহ দূর হলে এবং প্রকাশের অন্তরালে পরম তত্ত্বকে চিনলে তবেই সম্যক জ্ঞান হয়। অজ্ঞতাই পরবর্তী বিরোধের মূল—এ কথাই স্থাপন করা হয়েছে।
शब्दब्रह्मतनुवर्णनम् — Description of the Form of Śabda-Brahman
এই অধ্যায়ে শব্দ/নাদকে ব্রহ্ম-শিবের প্রকাশরূপ হিসেবে তত্ত্বগতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ব্রহ্মা বলেন—দীনজনের প্রতি করুণাময় ও অহংকারনাশক শম্ভু দেবগণের দর্শনপ্রার্থনার প্রেক্ষিতে সাড়া দেন। তখন স্পষ্ট ও দীর্ঘ (প্লুত) ‘ওঁ’ ধ্বনি-নাদ উদ্ভূত হয়। বিষ্ণু ধ্যানমগ্ন হয়ে সেই মহাধ্বনির উৎস অনুসন্ধান করেন এবং লিঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে ওঁকারের অকার, উকার, মকার ও অন্ত্য নাদ প্রত্যক্ষ করেন। সূর্যমণ্ডল, অগ্নিতেজ, চন্দ্রশীতল জ্যোতি ও স্ফটিক-শুদ্ধির দীপ্ত উপমায় বর্ণ, দিক ও তত্ত্বস্তর নির্দেশিত হয়েছে। শেষে তুরীয়াতীত, নির্মল, নিষ্কল, নির্ঘাত পরতত্ত্ব—অদ্বৈত, শূন্যসদৃশ, বাহ্য-অন্তর ভেদাতীত, তবু উভয়ের আধার—এইভাবে প্রতিপাদিত।
शिवतत्त्ववर्णनम् (Śiva-tattva-varṇana) — “Description/Exposition of the Principle of Śiva”
অধ্যায় ৯-এ ভক্তি ও স্তবের প্রতিউত্তরে শিবের কৃপাময় আত্মপ্রকাশ এবং প্রামাণ্য জ্ঞান-প্রদান বর্ণিত। ব্রহ্মা বলেন, মহাদেব পরম প্রসন্ন হয়ে করুণানিধি রূপে প্রকাশিত হন—পঞ্চবক্ত্র, ত্রিনয়ন, জটাধারী, ভস্মলিপ্ত দেহ, অলংকারভূষিত ও বহুবাহু; এ রূপ কেবল সাজসজ্জা নয়, দিব্য প্রকাশের নিদর্শন। বিষ্ণু ব্রহ্মার সঙ্গে স্তোত্রপাঠ করে শ্রদ্ধায় শিবের নিকট গমন করেন। তখন শিব স্বশ্বাস-রূপে নিগম প্রদান করেন এবং বিষ্ণুকে জ্ঞান উপদেশ দেন; পরবর্তীতে ব্রহ্মাও সেই পরমাত্মা থেকে জ্ঞান লাভ করেন—অর্থাৎ প্রকাশ অনুগ্রহ-নির্ভর। এরপর বিষ্ণুর প্রশ্ন ওঠে—কীভাবে শিবকে প্রসন্ন করা যায়, যথাবিধি পূজা ও ধ্যান কীভাবে, কীভাবে অনুকূল/বশ্য করা যায়, এবং শিবের আদেশে কোন কর্ম করণীয়—এভাবে শিবতত্ত্বভিত্তিক শৈব আচারের বিধান স্থাপিত হয়।
रुद्र-विष्णोः ऐकत्व-उपदेशः तथा धर्म-आज्ञा (Instruction on Rudra–Viṣṇu Unity and Divine Injunctions)
এই অধ্যায়ে পরমেশ্বর রুদ্র-শিব বিষ্ণুকে বিশ্ব-প্রশাসন ও ভক্তিধর্মের বিধান দেন। তিনি আদেশ করেন যে বিষ্ণু সর্বলোকে সম্মানিত ও পূজ্য থাকবেন এবং ব্রহ্মার সৃষ্ট জগতে দুঃখ বৃদ্ধি পেলে দৃঢ়ভাবে কার্য করে সমষ্টিগত ক্লেশ নিবারণ করবেন। কঠিন কর্ম ও প্রবল শত্রু দমনে শিব সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ধর্মযশ বিস্তার ও জীবতারণের জন্য বিষ্ণুকে নানা অবতার গ্রহণ করতে বলেন। মূল তত্ত্ব—রুদ্র ও হরি পরস্পরের ধ্যানযোগ্য এবং তাদের মধ্যে প্রকৃত ভেদ নেই; তত্ত্বত, বরদানে ও লীলাতেও ঐক্যই সত্য। আরও বলা হয়, যে রুদ্রভক্ত বিষ্ণুর নিন্দা করে সে পুণ্য হারিয়ে শিবাজ্ঞায় নরকে পতিত হয়; বিষ্ণু ভোগ-মোক্ষদাতা, ভক্তদের পূজ্য, এবং ধর্মরক্ষায় নিগ্রহ-অনুগ্রহ উভয়ই করেন।
लिङ्गपूजनसंक्षेपः (Concise Teaching on Liṅga Worship / Śiva-arcana-vidhi)
অধ্যায় ১১-এ ঋষিগণ সূতকে শৈবকথার পবিত্রকারী শক্তির প্রশংসা করেন এবং বিশেষ করে লিঙ্গোৎপত্তির আশ্চর্য, মঙ্গলময় কাহিনি স্মরণ করেন—যার শ্রবণে দুঃখ নাশ হয়। ব্রহ্মা–নারদ সংলাপের ধারাবাহিকতায় তাঁরা শিবার্চনা-বিধি স্পষ্টভাবে জানতে চান—কীভাবে পূজা করলে শিব প্রসন্ন হন; প্রশ্নে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সকল বর্ণ অন্তর্ভুক্ত। সূত একে ‘রহস্য’ বলে যেভাবে শুনেছেন ও বুঝেছেন সেভাবেই বলার প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরম্পরা স্থাপন করেন—ব্যাস সনৎকুমারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, উপমন्यु শুনেছিলেন, কৃষ্ণ জেনেছিলেন, আর ব্রহ্মা পূর্বে নারদকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। এরপর ব্রহ্মা বলেন, লিঙ্গপূজন এত বিস্তৃত যে শতবর্ষেও সম্পূর্ণ বলা যায় না, তাই সংক্ষেপে উপদেশ দেবেন। এভাবে অধ্যায়টি শ্রবণের মুক্তিদায়কতা, পরম্পরার প্রামাণ্যতা এবং লিঙ্গপূজার সংক্ষিপ্ত অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ রূপরেখা প্রদান করে।
सेवातत्त्वप्रश्नः — The Question of Whom to Serve (Sevā) for the Removal of Suffering
এই অধ্যায়ে নারদ শিবনিষ্ঠ প্রজাপতি ব্রহ্মার প্রশংসা করে আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যা চান। ব্রহ্মা পূর্বকথা বলেন—তিনি ঋষি ও দেবগণকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষীরসাগরের তীরে, ভগবান বিষ্ণুর ধামে গমন করেন। সেখানে বিষ্ণু শিবচরণকমল স্মরণ করে ব্রহ্মা ও সুর-ঋষিদের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। দেবতারা করজোড়ে প্রশ্ন করেন—‘দুঃখনাশের জন্য কার নিত্যসেবা করা উচিত?’ ভক্তবৎসল বিষ্ণু করুণায় সত্য সেবা-ভক্তির লক্ষণ, তার ফল এবং মুক্তিদায়ক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন, এবং শিবকে পরম আশ্রয়রূপে ইঙ্গিত করেন।
पूजाविधिः (Pūjā-vidhiḥ) — The Supreme Procedure of Worship (Morning Observances)
অধ্যায় ১৩-এ ব্রহ্মা এক ‘অতুল’ পূজাবিধি ঘোষণা করেন, যা সকল কাম্য ফল ও সুখ প্রদান করে। ভোরে ব্রাহ্মমুহূর্তে জাগরণ, সাম্বক শিবের স্মরণ, বিশ্বকল্যাণার্থে জাগরণ-প্রার্থনা, এবং নিজের নৈতিক অক্ষমতা নিবেদন করে মহাদেবের হৃদয়স্থিত নিয়োগকেই আশ্রয় মানার কথা বলা হয়েছে। এরপর শৌচবিধি—গুরুপাদ স্মরণ, যথাযথ দিক মেনে মল-মূত্র ত্যাগ, মাটি ও জলে দেহশুদ্ধি, হাত-পা ধোয়া, দন্তধাবন ও বারংবার আচমন—বিস্তারিত নির্দেশিত। কিছু তিথি ও বারে দন্তধাবন বর্জনীয়; শ্রাদ্ধ, সংক্রান্তি, গ্রহণ, তীর্থ, উপবাস ইত্যাদিতে দেশ-কালানুসারে নিয়ম মানার কথা আছে। সারাংশে, আনুষ্ঠানিক অর্ঘ্য-উপচারের আগেই স্মরণ, শুদ্ধি ও শুভ সময়ানুশাসনে পূজার সূচনা স্থাপিত।
पुष्पार्पण-विनिर्णयः (Determination of Flower-Offerings to Śiva)
অধ্যায় ১৪-এ ঋষিরা সূতকে জিজ্ঞাসা করেন—শিবপূজায় কোন কোন ফুল অর্পণ করলে কী ফল (ফল) নিশ্চিতভাবে লাভ হয়। সূত বলেন, এই ‘পুষ্পার্পণ-বিনির্ণয়’ পূর্বে নারদের প্রশ্নে ব্রহ্মা নিরূপণ করেছিলেন—এভাবে পরম্পরা-প্রমাণে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত। এরপর কমল, বিল্বপত্র, শতপত্র, শঙ্খপুষ্প প্রভৃতি ফুল ও অর্পণদ্রব্যের নাম এবং তাদের ফল—লক্ষ্মী/সমৃদ্ধি, পাপক্ষয়, লক্ষ-সংখ্যায় অর্পণে বিশেষ ফল—ইত্যাদি বর্ণিত হয়। প্রস্হ, পাল, টঙ্ক প্রভৃতি মানদণ্ডে ফুলের পরিমাণ/গণনার সমতা দেখিয়ে আচারকে মান্য ও নিয়মিত করা হয়েছে। লিঙ্গপূজা, অক্ষত/তণ্ডুল, চন্দনলেপ, জলধারা-অভিষেক ইত্যাদি পূজাঙ্গের উল্লেখে বোঝানো হয় যে ফুল-অর্পণ বৃহত্তর শিবপূজা-বিধানের অংশ। সারকথা, যথাযথ দ্রব্য-মান-ভাবসহ অর্পণে কাম্য সিদ্ধি থেকে শিবমুখী নিষ্কামতা পর্যন্ত ফলপ্রাপ্তির নির্দেশই এই অধ্যায়।
हंस-वराह-रूपग्रहण-कारणम् (The Reason for Assuming the Swan and Boar Forms)
অধ্যায় ১৫ লিঙ্গ-প্রসঙ্গের পরবর্তী কথোপকথনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। নারদ ব্রহ্মাকে পূর্বে শ্রুত শৈব-পবিত্র কাহিনির প্রশংসা করে জিজ্ঞাসা করেন—তারপর কী ঘটল এবং সৃষ্টির প্রক্রিয়া কীভাবে চলল। ব্রহ্মা বলেন, নিত্য-শিব-রূপে ভগবান শিব অন্তর্ধান করলে তিনি ও বিষ্ণু গভীর প্রশান্তি ও আনন্দ অনুভব করেন। এরপর জগতের সৃষ্টি ও পালন-শাসনের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মা হংস-রূপ এবং বিষ্ণু বরাহ-রূপ ধারণ করেন। নারদ সন্দেহ তোলেন—অন্য রূপ ত্যাগ করে এই দুই রূপই কেন? সূত প্রসঙ্গে ব্রহ্মা প্রথমে শিব-পদ স্মরণ করে ব্যাখ্যা দেন—হংসের ঊর্ধ্বগামী স্থির গতি ও তত্ত্ব-অতত্ত্ব বিবেক (দুধ-জল পৃথক করার উপমা) এই রূপগ্রহণের প্রতীকী ও কার্যগত কারণ। অধ্যায়টি দেখায়, দেবরূপগুলি সৃষ্টিকার্য ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার চিহ্নবাহী এবং শিবের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে।
सृष्टिक्रमवर्णनम् / Description of the Sequence of Creation
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা নারদকে সৃষ্টির সূক্ষ্ম ক্রম ও প্রতিষ্ঠার বিধান জানান। তিনি শব্দাদি সূক্ষ্ম তত্ত্ব থেকে পঞ্চীকরণে আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও পৃথিবীর স্থূল উৎপত্তি, পরে পর্বত-সমুদ্র-বৃক্ষাদি সৃষ্টি এবং কলা ও যুগচক্রের দ্বারা কালের বিন্যাস বর্ণনা করেন। এত করেও তৃপ্ত না হয়ে তিনি সাম্ব শিবের ধ্যান করেন; তারপর চক্ষু, হৃদয়, মস্তক ও প্রাণাদি থেকে সাধক এবং প্রধান ঋষিদের উৎপন্ন করেন। সংকল্প থেকে ধর্ম প্রকাশিত হয়—যা সকল সাধনার সর্বজনীন উপায়; ব্রহ্মার আদেশে সে মানব রূপ ধারণ করে সাধকদের মাধ্যমে প্রসারিত হয়। এরপর ব্রহ্মা নানা অঙ্গ থেকে বহু প্রজা সৃষ্টি করে দেব-অসুর প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন দেহে নিয়োজিত করেন। শেষে শঙ্করের অন্তঃপ্রেরণায় তিনি নিজের দেহ বিভক্ত করে দ্বিরূপ হন, শিবশাসিত বিভেদময় সৃষ্টিপ্রবাহের সূচনা নির্দেশ করেন।
कैलासगमनं कुबेरसख्यं च — Śiva’s Journey to Kailāsa and His Friendship with Kubera
অধ্যায় ১৭ সংলাপরূপে বর্ণিত। সূত বলেন—ব্রহ্মার পূর্বোক্ত কথা শুনে নারদ পুনরায় শ্রদ্ধাভরে জিজ্ঞাসা করেন: শঙ্করের কৈলাসে আগমন কীভাবে, কুবের (ধনদ)-এর সঙ্গে তাঁর সখ্যের কারণ কী, এবং সেখানে পূর্ণ মঙ্গলময় শিবাকৃতিতে ভগবান কী করলেন। ব্রহ্মা কাহিনি বলতে সম্মত হয়ে প্রথমে পটভূমি দেন—কাম্পিল্য নগরে যজ্ঞদত্ত নামে এক বিদ্বান দীক্ষিত ছিলেন, বৈদিক ক্রিয়া ও বেদাঙ্গে পারদর্শী, দানশীল ও সম্মানিত। তাঁর পুত্র গুণনিধি উপনয়ন-শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও গোপনে জুয়ায় আসক্ত হয়, বারবার মায়ের ধন নিয়ে জুয়াড়িদের সঙ্গ করে। এভাবে অধ্যায়টি নীতি-শিক্ষার ধারা স্থাপন করে—ধর্ম ও বিদ্যার বিপরীতে গোপন পাপ, ধনহানি এবং পরবর্তী কুবের-শিব সম্পর্ককে কর্ম ও ভক্তির যুক্তিতে ব্যাখ্যার ভূমিকা রচনা করে।
दीक्षितपुत्रस्य दैन्यचिन्ता तथा शिवरात्र्युपासनाप्रसङ्गः / The Initiate’s Son in Distress and the Occasion of Śivarātri Worship
অধ্যায় ১৮-এ ব্রহ্মা নারদকে দীক্ষিতপুত্র (দীক্ষিতাঙ্গজ)‑এর কাহিনি বলেন। পূর্ববৃত্তান্ত শুনে সে নিজের আগের আচরণকে নিন্দা করে অজানা দিকে রওনা হয়। কিছুদূর গিয়ে জীবিকা ও সামাজিক মর্যাদার দুশ্চিন্তায় সে হতাশ ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে; বিদ্যার অভাব ও ধনের অপ্রতুলতা স্মরণ করে, টাকা বহনে চোরের ভয় আর টাকা না থাকলে অনিশ্চয়তা—দুইই বিচার করে। যাজক বংশে জন্মেও মহাদুর্ভাগ্যে পতিত হওয়ায় সে বিলাপ করে এবং মনে করে বিধি/ভাগ্য কর্মফল অনুসারে ভবিষ্যৎকে অনুসরণ করে। ভিক্ষাও ঠিকমতো চাইতে পারে না, আশেপাশে পরিচিত নেই, আশ্রয় নেই; মাতৃস্নেহের স্মৃতিও এখানে অনুপস্থিত। গাছতলায় সন্ধ্যা পর্যন্ত ভাবতে ভাবতে কাহিনিতে বিপরীত দৃশ্য আসে—নগর ছেড়ে এক মাহেশ্বর ভক্ত লোকজনসহ উপহার নিয়ে শিবরাত্রির উপবাসে ঈশানের পূজায় যাচ্ছে। এইভাবে অসহায়তা ও কর্মবন্ধনের মুখে শৈব ব্রত‑পূজাকে আশ্রয়, পুণ্য ও নতুন পথে ফেরার উপায় হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে।
अलकापतेः तपः-लिङ्गप्रतिष्ठा च वरप्राप्तिः / The Lord of Alakā: Austerity, Liṅga-Establishment, and the Receiving of a Boon
অধ্যায় ১৯-এ ব্রহ্মা পূর্বকল্পের প্রসঙ্গ বর্ণনা করে আলকাপতি (বৈশ্রবণ/কুবের)-এর ভক্তির দৃষ্টান্ত দেন। পদ্মকল্পে পুলস্ত্য থেকে বিশ্রবা এবং তাঁর থেকে বৈশ্রবণ জন্মান; বিশ্বকর্মা-নির্মিত আলকা নগরী তাঁর ভোগ্য ও শাস্য রাজধানী বলা হয়েছে। এরপর আলকাপতি ত্র্যম্বক শিবকে প্রসন্ন করতে ভয়ংকর তপস্যা করেন এবং ভক্তির প্রভাব দেখিয়ে কাশী (চিত্প্রকাশিকা)-র দিকে যাত্রা করেন। সাধনায় অন্তরে শিব-জাগরণ, অনন্য ভক্তি, স্থির ধ্যান, কাম-ক্রোধ ত্যাগ এবং তপোঅগ্নিতে শুদ্ধ হয়ে শিবৈক্য-ভাব অর্জনের কথা আছে। তিনি শাম্ভব লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে সদ্ভাব-পুষ্পে পূজা করেন। দীর্ঘ তপস্যার ফলে বিশ্বেশ্বর প্রসন্ন হয়ে প্রকাশিত হন এবং বরদাতা রূপে আলকাপতিকে বর চাইতে বলেন; লিঙ্গপ্রতিষ্ঠা-ধ্যান-বৈরাগ্যই দর্শন ও বরপ্রাপ্তির কারণরূপে প্রতিপাদিত।
शिवागमन-नाद-समागमः (Śiva’s Advent, the Drum-Sound, and the Cosmic Assembly)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মা নারদকে কুবের-সম্পর্কিত কৈলাসে শিবের আগমনের আদর্শ কাহিনি শোনান। বিশ্বেশ্বর শিব কুবেরকে নিধিপতিত্বের বর দিয়ে নিজের প্রকাশরীতি ভাবেন—রুদ্র ব্রহ্মার হৃদয়জাত পূর্ণাংশ, নির্মল ও পরমতত্ত্বের অভিন্ন; হরি ও ব্রহ্মা যাঁকে সেবা করেন, তবু তিনি তাঁদের ঊর্ধ্বে। রুদ্র সেই রূপেই কৈলাসে গিয়ে কুবের-ক্ষেত্রের প্রসঙ্গে মহাতপস্যা করতে ও বন্ধুভাবে বাস করতে স্থির করেন। তারপর তিনি ঢক্কার ঘন, বিস্ময়কর নাদ করেন—যা আহ্বান ও প্রেরণার সংকেত। সেই নাদ শুনে বিষ্ণু, ব্রহ্মা, দেবগণ, মুনি, সিদ্ধ, আগম-নিগমের মূর্ত প্রতীক, এবং সুর-অসুরসহ নানা স্থানের প্রমথ ও গণেরা উৎসবের মতো প্রত্যাশায় সমবেত হয়। শেষে গণদের সংখ্যা ও মর্যাদা গণনা করে শিবগণের মহাবিশ্বব্যাপী মহিমা প্রকাশ করা হয়।