
Purushottama Jagannatha Mahatmya
This section is anchored in the sacred landscape of Puruṣottama-kṣetra on the eastern seacoast (sāgarasyottare tīre), associated with the southern bank of a “mahānadī” and the prominence of Nīlācala/Nīlaparvata. The narrative situates the site as a concealed yet preeminent pilgrimage field, describing features such as the Nīlādri interior, a celebrated water-body (Rauhiṇa-kuṇḍa), and the coastal-sand terrain associated with tīrtha-rāja imagery. The geography is presented as both physical and theological: a place where the omnipresent deity is said to be especially perceivable through embodied forms and localized rites.
49 chapters to explore.

Puruṣottama-kṣetra-prastāvaḥ (Introduction to the Glory of Puruṣottama-kṣetra)
অধ্যায়টি প্রথাগত মঙ্গলাচরণে শুরু—নারায়ণ, নর-নরোত্তম, সরস্বতী ও ব্যাসকে প্রণাম করে শ্রুতি-পরম্পরার পবিত্র পরিবেশ স্থাপন করা হয়। ঋষিরা জৈমিনিকে জিজ্ঞাসা করেন: সর্বাধিক পবিত্র পুরুষোত্তম-ক্ষেত্র কী, সর্বব্যাপী প্রভু কীভাবে দারু-তনু (কাঠের দেহ) রূপে দৃশ্যমান হন, এবং এই ক্ষেত্রের উৎপত্তি কী। জৈমিনি একে ‘পরম-রহস্য’ বলে অবিশ্বাসীদের জন্য অনুপযুক্ত ঘোষণা করে বর্ণনা শুরু করেন। সৃষ্টি ও তীর্থ-প্রতিষ্ঠার পর ব্রহ্মা ত্রিবিধ দুঃখে ক্লিষ্ট জীবদের ধারণভার বহন করে বিষণ্ণ হন এবং মুক্তির একমাত্র কারণ বিষ্ণুর স্তব করতে স্থির করেন। তাঁর স্তোত্রে ভক্তিসহ অদ্বৈত ভাব প্রকাশ পায়—ভগবানই স্রষ্টা, পালনকর্তা ও সাক্ষী; জগৎ তাঁর আশ্রিত প্রকাশ। তখন গরুড়ধ্বজ, শঙ্খ-চক্র-গদাধারী ভগবান আবির্ভূত হয়ে ব্রহ্মার প্রশ্নের উত্তর দেন। ভগবান সমুদ্রের উত্তরে ও এক মহানদীর দক্ষিণে নীলপর্বত/নীলাচলে শোভিত এক গোপন উপকূলীয় অঞ্চলের কথা জানান এবং বলেন, এই ক্ষেত্র সৃষ্টি-প্রলয়চক্রের অতীত। তিনি বটমূলের নিকট ও প্রসিদ্ধ রৌহিণ-কুণ্ডের পাশে অন্তর্লোকের নির্দেশ দেন; তার জলে শুদ্ধ জন সান্নিধ্য/সায়ুজ্য প্রভৃতি মুক্তিলাভ করে। শেষে ব্রহ্মাকে সেখানে গিয়ে অপূর্ব মহিমা দর্শনের আদেশ দিয়ে ভগবান অন্তর্ধান করেন।

Yama’s Hymn to Nīlamādhava and the Jurisdiction of Puruṣottama-kṣetra (यमस्तवः तथा क्षेत्रमहिमा)
এই অধ্যায়ে জৈমিনি নীলাদ্রির কাহিনি বলেন। সেখানে ব্রহ্মা এসে এক আশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন—করুণায় পূর্ণ এক পুকুরে একটি কাক স্নান করে, নীলমণির মতো দীপ্ত নীলমাধবকে দর্শন করামাত্র পাখির দেহ ত্যাগ করে শঙ্খ-চক্র-গদাধারী বিষ্ণুরূপ ধারণ করে। ঋষিরা সিদ্ধান্ত করেন—বিষ্ণুভক্তিতে কিছুই দুরূহ নয়; মানবীয় আচার-অধিকারের সীমা ছাড়িয়েও মুক্তি সম্ভব, তাই এই ক্ষেত্রের অসাধারণ ত্রাণশক্তি প্রমাণিত। এরপর ধর্মরাজ যম জগন্নাথের কাছে গিয়ে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে দীর্ঘ স্তোত্র পাঠ করেন—বিষ্ণুকে সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়ের কারণ, জগতের অন্তঃস্থ আশ্রয়, অনাদি-অনন্ত করুণাময় তত্ত্ব, বরাহ-নৃসিংহাদি অবতারে প্রকাশিত এবং লক্ষ্মীর অবিচ্ছেদ্য সহচর বলে বন্দনা করেন। ভগবান প্রসন্ন হয়ে শ্রী (লক্ষ্মী)কে ইঙ্গিত করেন; শ্রী যমকে জানান—পুরুষোত্তম-ক্ষেত্র দেবদম্পতির ‘অপরিত্যাজ্য’ ধাম, সেখানে সাধারণ কর্মফল-পরিপাক ও দণ্ডাধিকার কার্যকর নয়; সেখানে বাসকারীদের পাপ অগ্নিতে তুলোর মতো দগ্ধ হয়, পশুপাখিরও। বিনীত যম ক্ষেত্রের পরিমাপ, বাসের বিধান, ফল, তীর্থ, অধিষ্ঠান-নীতি এবং যে গূঢ় কারণে ঐ পবিত্র সীমায় জীবেরা তাঁর অধীনে থাকে না—তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রার্থনা করেন।

मार्कण्डेय-प्रलयदर्शनं तथा पुरुषोत्तमक्षेत्र-शाश्वत्यप्रतिपादनम् (Markandeya’s Pralaya Vision and the Eternality of Puruṣottama-kṣetra)
এই অধ্যায়ে ক্ষেত্র-মাহাত্ম্য ও পুরুষোত্তম-ক্ষেত্রের শাশ্বতত্ব স্তরে স্তরে প্রকাশিত হয়েছে। প্রলয়ের সময় সমগ্র জগৎ এক মহাসমুদ্রে নিমজ্জিত—এমন দৃশ্যের মধ্যে ঋষি মার্কণ্ডেয় আশ্রয়হীন হয়ে ভ্রমণ করেন। তখন তিনি পুরুষোত্তম-ক্ষেত্রসদৃশ এক স্থির স্থান দেখেন, যেখানে মহা ন্যগ্রোধ (বটবৃক্ষ) অচলভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এক দিব্য শিশুকণ্ঠ তাঁকে ভিতরে প্রবেশ করতে আহ্বান করে; প্রবেশ করলে তিনি শঙ্খ-চক্র-গদাধারী নারায়ণের দর্শন পান এবং প্রভুর করুণা, গুণাতীততা ও দয়ার জন্য স্বেচ্ছায় দেহধারণের মহিমা স্তব করেন। ভগবান তাঁকে দিব্য বটবৃক্ষ দর্শন ও শিশুরূপের মুখে প্রবেশ করতে বলেন। ভিতরে মার্কণ্ডেয় চতুর্দশ লোক, দেবতা-ঋষি, সমুদ্র, নগর, নাগলোক ও শेषসহ সমগ্র বিশ্ববিন্যাস প্রত্যক্ষ করেন—যাতে বোঝা যায় সৃষ্টিজগৎ মায়ার দ্বারা প্রকাশিত হলেও ভগবানের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। বাইরে ফিরে তিনি প্রলয়ের মধ্যে সৃষ্টির এই বৈপরীত্য জিজ্ঞাসা করলে নারায়ণ ব্যাখ্যা করেন—এই ক্ষেত্র ‘শাশ্বত’; এখানে সৃষ্টিলয় ও সংসারবন্ধনের পারমার্থিক নিবারণ ধরা হয়, এবং এখানে প্রবেশ মুক্তিমুখী স্থিতির লক্ষণ। শেষে মার্কণ্ডেয় সেখানে বাসব্রত গ্রহণ করেন। ভগবান আশ্বাস দেন—ভবিষ্যতে এক তীর্থ প্রতিষ্ঠিত হবে; তপস্যা ও শিবপূজা (প্রভুর ‘দ্বিতীয় দেহ’ রূপে) দ্বারা তিনি মৃত্যুকে জয় করবেন। জৈমিনি সেই নামপ্রসিদ্ধ গর্তের কারণকথা, তার আচারফল, সমুদ্রতটীয় ক্ষেত্রের ভৌগোলিক বর্ণনা এবং যমেশ্বরের সংযম-রূপ ও যমপাশ-শমনশক্তির কথাও বলেন।

Kapālamocana–Vimalā–Nṛsiṃha-Guardianship and the Conch-Shaped Map of Puruṣottama Kṣetra (कपालमोचन–विमला–नृसिंह-रक्षा तथा शंखाकार-क्षेत्रवर्णनम्)
অধ্যায় ৪-এ পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের শঙ্খাকার (শঙ্খ-আকার) পবিত্র ভূগোল বিশদে বর্ণিত হয়েছে—যার ‘মস্তক’ ও ‘অন্তর্ভাগে’ ক্রমে ক্রমে মুক্তিদায়ক তীর্থস্থান বিন্যস্ত। শ্রীদেবী জানান, এই ক্ষেত্র নারায়ণের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে প্রতিষ্ঠিত; সমুদ্রজলের স্পর্শে পবিত্র হওয়া অঞ্চলগুলির উল্লেখ করে স্থানীয় তীর্থকে ‘তীর্থরাজ’ মর্যাদা দেওয়া হয়। রুদ্র-কথায় ব্রহ্মার কপাল বহনকারী রুদ্র এখানে কপালমোচন-লিঙ্গে এসে ভারমুক্ত হন; এই লিঙ্গের দর্শন-पूজায় মহাপাপও নাশ হয় বলা হয়েছে। পরে বিমলা-শক্তির ভুক্তি-মুক্তিদান, ‘নাভি’ অঞ্চলে কুণ্ড-বরগাছ-শক্তির ত্রয়ী, এবং প্রলয়-সংযুক্ত বিশ্বতত্ত্বসহ রোহিণী-কুণ্ডের চিরস্থায়ী জলাধাররূপ বর্ণনা আসে; ক্ষেত্রের মধ্যে মৃত্যু হলে যমের অধিকার থাকে না—এই স্থানভিত্তিক মুক্তিতত্ত্ব জোর দিয়ে বলা হয়েছে। রক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্বেদী রক্ষার্থে দিক্দিগন্তে আট শক্তির অবস্থান নির্দিষ্ট করা হয়েছে—বরগাছের মূলে মঙ্গলাঃ, পশ্চিমে বিমলাঃ, শঙ্খের পৃষ্ঠে সর্বমঙ্গলাঃ, এবং কালরাত্রি, চণ্ডরূপা প্রভৃতি অন্যান্য শক্তি—নাম ও স্থানসহ। জৈমিনি আরও বলেন, অঞ্চলের চারদিকে মহেশ্বরের আট লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত, যাতে বৈষ্ণব কেন্দ্রকে শৈব প্রহরায় রক্ষার পুরাণীয় সমন্বয় প্রকাশ পায়। ভবিষ্যদ্বাণীমূলক অংশে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের আগাম ভক্তি, বিশ্বকর্মার নির্মিত দারুমূর্তির চতুর্বিধ আবির্ভাব এবং ব্রহ্মার অংশগ্রহণে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। শেষে ‘দারুব্রহ্ম’-এর রহস্য প্রতিপাদিত—এ কেবল কাঠ নয়, প্রকাশিত মুক্তিস্থান; দর্শনমাত্রে কর্মবন্ধ দ্রুত ক্ষয় হয়, এবং দৃষ্টান্তে দেখানো হয় যে ঘোর পাপীরাও পুরুষোত্তমে এসে তৎক্ষণাৎ শুদ্ধি লাভ করে।

Puṇḍarīka–Ambarīṣa: Upavāsa, Darśana, and the Theology of Nāma
জৈমিনি বর্ণনা করেন—দুই ব্রাহ্মণ ভক্ত পুণ্ডরীক ও অম্বরীষ নীচ সঙ্গ ত্যাগ করে শুদ্ধ আহার ও ব্রত গ্রহণ করেন এবং বিষ্ণুধ্যানে নিমগ্ন হয়ে নীলাদ্রিতে পৌঁছান। বিধি অনুসারে তীর্থরাজের জলে স্নান করে তাঁরা মন্দিরদ্বারে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে দর্শন প্রার্থনা করেন; তৎক্ষণাৎ দর্শন না হলে অনশন/উপবাস গ্রহণ করে নাম-কীর্তনকে শুদ্ধির সাধনা হিসেবে অব্যাহত রাখেন। তখন দিব্য প্রকাশে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী শ্রীবিষ্ণু, দিব্য অলংকারে ভূষিত, পাশে লক্ষ্মীসহ প্রকাশিত হন; দীপ, চামর, ধূপ, ছত্র বহনকারী পরিচারক এবং সিদ্ধ, মুনি, গন্ধর্ব প্রভৃতি তাঁকে পরিবেষ্টন করে। ভক্তদ্বয় উচ্চ জ্ঞান লাভ করে দীর্ঘ স্তব করেন—পুণ্ডরীক নারায়ণের পরাত্পরতা, কামনাপ্রসূত সাধনার নিষ্ফলতা ও নামের সর্বোচ্চ মাহাত্ম্য বলেন; অম্বরীষ বিশ্বরূপের প্রশংসা করে অচঞ্চল ভক্তি ও দুঃখ-নিবারণ প্রার্থনা করেন। স্বপ্নসদৃশ দর্শনের পর তাঁরা পুনরায় ধামের চতুর্বিধ প্রকাশ দেখেন—বলভদ্র ও সুভদ্রাসহ—এবং দারুব্রহ্ম মূর্তিকে প্রত্যক্ষ প্রকাশরূপে মানেন। শেষে ফলশ্রুতি—এই আখ্যান শ্রবণ ও কীর্তনে শুদ্ধি হয় এবং বিষ্ণুলোক লাভ হয়।

Utkala-deśa-varṇana and Puruṣottama-kṣetra Identification (उत्कलदेशवर्णनम् / पुरुषोत्तमक्षेत्रनिर्णयः)
ষষ্ঠ অধ্যায়ে ঋষিগণ জিজ্ঞাসা করেন—পরম পুরুষোত্তম-ক্ষেত্র কোথায়, যেখানে নারায়ণ দারুরূপে (কাঠের মূর্তিরূপে) প্রত্যক্ষ প্রকাশিত হন বলে খ্যাত। জৈমিনি উত্তর দেন যে দক্ষিণ সমুদ্রতটে অবস্থিত উৎকলদেশ সর্বাপেক্ষা পবিত্র, অসংখ্য তীর্থ ও পুণ্যদায়ক আশ্রয়ে সমৃদ্ধ। এরপর আদর্শ সমাজচিত্র অঙ্কিত হয়—বেদাধ্যয়ন ও যজ্ঞে নিবিষ্ট ব্রাহ্মণ, নারায়ণের বিধানে লক্ষ্মী-সমন্বিত গৃহস্থসমৃদ্ধি, লজ্জা-সত্য- বৈষ্ণবভক্তি ও লোকহিতবোধে পরিপূর্ণ জনসমাজ, এবং প্রজারক্ষা ও দানে প্রতিশ্রুত ক্ষত্রিয়শাসন। কৃষি, বাণিজ্য, গো-রক্ষা, শিল্পকলা ও কারুশিল্পের বিকাশের সঙ্গে অতিথিসেবা ও দানধর্মের দৃঢ়তা বর্ণিত। শেষে ঋতুচক্রের নিয়মিততা, সময়মতো বৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক বিপর্যয়ের অভাব, এবং নানা বৃক্ষ-পুষ্প-ফল ও উদ্যানের প্রাচুর্যের কথা বলা হয়। ঋষিকুল্যা ও সুবর্ণরেখার মধ্যবর্তী ভূমিকে নির্দেশ করে পুরুষোত্তমকে ‘ভূস্বর্গ’ রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং পূর্বোক্ত তীর্থযাত্রাপথে তার অবস্থান নির্ণীত হয়।

इन्द्रद्युम्नचरित-प्रवेशः तथा श्रीपुरुषोत्तमक्षेत्र-निर्देशः (Indradyumna’s Quest and the Topography of Śrī-Puruṣottama-Kṣetra)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের কাল-দেশ ও কীভাবে তিনি বিষ্ণুর মূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ নিলেন তা জিজ্ঞাসা করেন। জৈমিনি জানান, ইন্দ্রদ্যুম্ন কৃতযুগের আদর্শ রাজা—সত্যনিষ্ঠ, সংযমী, বিষ্ণুভক্ত, বিদ্যাপৃষ্ঠপোষক এবং মহাযজ্ঞের কর্তা। পূজার সময় সভায় রাজা জগন্নাথকে প্রত্যক্ষ দর্শনের জন্য ‘উত্তম ক্ষেত্র’ কোথায় তা জানতে চান। দেশভ্রমণকারী এক বক্তা পূর্বসমুদ্রের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ওড়্রদেশের কথা বলেন—বনে বেষ্টিত নীলগিরি/নীলাচল, পাপহরণকারী কল্পবৃক্ষ-উদ্যান, এবং স্পর্শমাত্রে মুক্তিদায়ক রৌহিণ-কুণ্ড। সেখানে স্নান ও দর্শনকে মহাযজ্ঞসম ফলদায়ক বলা হয়। শবরদের বসতি ও ‘শবরদীপক’ আশ্রমকে সীমানির্দেশ ও বিষ্ণুধামের পথে প্রবেশদ্বাররূপে উল্লেখ করা হয়। এক জটিল তপস্বী, যিনি স্থানটি নিজে দেখেছেন, দিব্য সুগন্ধ, পুষ্পবৃষ্টি এবং পশু বা অজ্ঞ লোকেরও উদ্ধারক্ষমতার অলৌকিক লক্ষণ বর্ণনা করে অন্তর্ধান হন; এতে রাজার সংকল্প আরও দৃঢ় হয়। এরপর রাজা পুরোহিতের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিদ্যাপতিকে অনুসন্ধানে পাঠান। বিদ্যাপতি স্তোত্রভাবনায় বিষ্ণুকে স্মরণ করতে করতে ওড়্রভূমিতে পৌঁছে বিষ্ণুচিহ্নধারী ভক্তদের দেখে শবরদীপকে যান; সেখানে শবরবৃদ্ধ বিশ্বাবাসু তাঁকে গ্রহণ করেন। বিদ্যাপতি আতিথ্য প্রত্যাখ্যান করে নীলমাধবের প্রত্যক্ষ দর্শন প্রার্থনা করেন—যার ফলে দেবপ্রকাশ ও ক্ষেত্রপ্রতিষ্ঠার দিকে কাহিনি অগ্রসর হয়।

रौहिणकुण्डतीर्थमहिमा, नीलमाधवदर्शनं, शबरभक्तिवृत्तान्तः (Rauhiṇa-kuṇḍa Tīrtha Merit, Vision of Nīlamādhava, and the Śabara Devotee Narrative)
অধ্যায় ৮-এ ব্রাহ্মণ অতিথির অনুরোধ ও আতিথ্যধর্মের চাপ থেকে শবরনেতা বিশ্বাবসু চিন্তা করে এবং বংশপরম্পরায় শোনা পুরাণবৃত্তান্ত স্মরণ করে—রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন আসবেন, মহাযজ্ঞ করবেন এবং বিষ্ণুর চতুর্বিধ দারুরূপ প্রতিষ্ঠা করবেন; তখন নীলমাধবের পূর্বের গোপন সান্নিধ্য পরিবর্তিত হবে। তাই তিনি নীলমাধবকে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। কাঁটায় ভরা অন্ধকার বনপথে ব্রাহ্মণকে নিয়ে তিনি রৌহিণ-কুণ্ডে পৌঁছান—এটি মহাতীর্থ, যেখানে স্নান করলে বৈকুণ্ঠলাভ হয় বলা হয়েছে। নিকটে কামদ বটবৃক্ষ, যার ছায়া ঘোর পাপ নাশ করে। এই দুই স্থানের মধ্যবর্তী উপবনে ব্রাহ্মণ স্নান করে পরম, সর্বব্যাপী, অন্তর্যামী ও জগতাধার ভগবানের দীর্ঘ স্তোত্র পাঠ করেন এবং পরে প্রণব-মন্ত্র জপ করেন। পরে কাহিনি শবর আশ্রমে ফিরে আসে; সেখানে অসাধারণ আতিথ্যের কারণ বলা হয় দেবপূজার অবশেষ—দেবগণ জগন্নাথের জন্য ভোগ আনেন, আর শবরসমাজ বিষ্ণুর নির্মাল্য গ্রহণ করে জীবনধারণ করে, যা রোগ, জরা ও পাপ হরণকারী। ব্রাহ্মণ স্থায়ী মৈত্রী ও বনবাসী ভক্তি চান; বিশ্বাবসু জানান, আসন্ন আচ্ছাদনের ফলে ইন্দ্রদ্যুম্ন নীলমাধবকে প্রত্যক্ষ দেখবেন না, তবে স্বপ্নে নির্দেশ পেয়ে চতুর্বিধ দারুমূর্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। শেষে রাজার বসতি স্থাপনের প্রস্তুতি ও ব্রাহ্মণের অবন্তীর দিকে যাত্রা বর্ণিত।

Adhyāya 9: Darśana-viraha, Ākāśavāṇī, and Vidyāpati’s Return with Nirmālya (Theology of Absence and Sacred Proof)
এই অধ্যায়ে জৈমিনি মাধব-অর্চনার সময়ের এক আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করেন। প্রবল ঝড় ও সোনালি বালুর ঘূর্ণিতে আচার বিঘ্নিত হয়; ধ্যান থেকে উঠে দেবতারা মাধবকে না দেখে ব্যাকুল হয়ে বিলাপ করেন। তাঁদের শোক থেকে দর্শন-নির্ভর ধর্মতত্ত্ব প্রকাশ পায়—দেবদর্শনই জীবনের অর্থ, কোথাও অপরাধ হয়েছে কি না তা ভাবেন, এবং পুনরায় দর্শন না হওয়া পর্যন্ত তপস্যা ও বনবাসের সংকল্প করেন। তখন অশরীরী বাণী জানায়—আগামী দিনে পৃথিবীতে প্রত্যক্ষ দর্শন বিরল হবে; তবু সেই স্থানে প্রণাম করলেই ফল লাভ হবে। কারণ জানতে দেবতাদের স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মার শরণ নিতে বলা হয়। অন্যদিকে নীলমাধব দর্শনের পর বিদ্যাপতি পরম পুণ্যক্ষেত্র প্রদক্ষিণ করেন; বৃক্ষ, পাখি, জলধারা, পদ্ম ইত্যাদিতে ভরা পবিত্র ভূগোলের ঘন বর্ণনা আসে। সন্ধ্যায় তিনি অবন্তীতে ফিরে এলে পূর্বসূচিত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন; বিদ্যাপতি মাধবের নির্মাল্য-সম্পর্কিত এক মালা নিবেদন করেন। রাজা স্তোত্রে জগন্নাথকে স্রষ্টা-রক্ষক-সংহারক এবং আর্তের আশ্রয় বলে বন্দনা করেন। বিদ্যাপতি নীলেন্দ্র-মণি-পাষাণের প্রাচীন রূপ, মালার আশ্চর্য স্থায়িত্ব, এবং সেই ক্ষেত্রে ইহলৌকিক মঙ্গল ও মোক্ষ—উভয়েরই সহলাভের কথা বলে, শেষে জগন্নাথের করুণাময় উদ্ধারক মুখদর্শনের মহিমা প্রতিষ্ঠা করেন।

Nīlādri-kṣetra-varṇana and Viṣṇu-bhakti-lakṣaṇa (Description of Nīlādri and the Definition of Devotion)
এই অধ্যায়ে দুটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত অংশ আছে। (১) ইন্দ্রদ্যুম্নের প্রশ্নের উত্তরে বিদ্যাপতি পুরুষোত্তমে এক দিব্য দর্শনের কথা বলেন—স্বর্গীয় সুগন্ধ, দেবসঙ্গীত, পুষ্পবৃষ্টি এবং দেবতাদের দ্বারা সম্পাদিত সেবা-উপচার। এরপর তিনি ক্ষেত্রের পরিমাপ, চিরসবুজ বটবৃক্ষ, রোহিণী-কুণ্ড, দেবতার অবস্থান এবং নীলা-মূর্তির সূক্ষ্ম বর্ণনা দেন—আসনভঙ্গি, অঙ্গবিন্যাস, অলংকার, লক্ষ্মী, শेष, গরুড়, সুদর্শন প্রভৃতি সহচর রূপ। দর্শনকে বিরল, কর্মফল-নির্ভর এবং সাধারণ আচারকর্মের ঊর্ধ্বে বলা হয়েছে। (২) ইন্দ্রদ্যুম্ন সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস, মন্দির নির্মাণ ও দীর্ঘকাল পূজার সংকল্প করেন। নারদ এসে রাজাদের ভক্তিভাবকে সমর্থন করেন এবং ভক্তির তত্ত্ব বিন্যস্ত করেন—সংসারদুঃখের একমাত্র কার্যকর প্রতিকার ভক্তি; তা তামসী, রাজসী, সাত্ত্বিকী এবং চতুর্থ নির্গুণ/অদ্বৈতাভিমুখ ভক্তিতে বিভক্ত। সত্য বৈষ্ণবের লক্ষণ—সংযম, অহিংসা, দয়া ও পরহিত—উল্লেখিত। এভাবে তীর্থভূগোল, মূর্তিবর্ণনা ও ভক্তিধর্ম একত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়।

इन्द्रद्युम्नस्य नीलाचलयात्रा-निश्चयः तथा मङ्गलाभिषेकः (Indradyumna’s Resolve for the Nīlācala Pilgrimage and Auspicious Consecrations)
অধ্যায় ১১-এ ভক্তিপ্রসূত তীর্থযাত্রার সূচনা ও বিধিবদ্ধ ক্রম বর্ণিত। নারদের উপদেশ শুনে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সাধুসঙ্গের মোক্ষদায়ক মাহাত্ম্য প্রকাশ করে নীলমাধব ও পুরুষোত্তম-ক্ষেত্রে পৌঁছানোর প্রত্যক্ষ নির্দেশ চান। নারদ ক্ষেত্রের তীর্থসমূহ, তার রক্ষাশক্তি এবং দর্শনে ভক্তি-বৃদ্ধির কথা জানাতে সম্মত হন। রাজা পঞ্চমী, বুধবার, পুষ্য নক্ষত্র ও উৎকৃষ্ট লগ্ন নির্ধারণ করে শুভ যাত্রাকাল স্থির করেন এবং নীলাচলে রাষ্ট্রসমর্থিত দীর্ঘাবাসসহ যাত্রার ঘোষণা দেন। রাজপরিবার, পুরোহিত-ঋত্বিক, কারিগর, বণিক, শিল্পী, পশুচিকিৎসক, প্রশাসক ও নানা পেশার লোকজনের তালিকা দিয়ে দেখানো হয়—এই যাত্রা এক বৃহৎ সামাজিক সমাবেশ। এরপর যাত্রা-অভিষেক ও রক্ষাকর্ম সম্পন্ন হয়—বৈদিক-পৌরাণিক আশীর্বাদ, হোম, শান্তিপাঠ, নবগ্রহ-শমন, মঙ্গলবস্ত্র-অলংকার ধারণ, বাদ্যসহ শোভাযাত্রা, ব্রাহ্মণদের দান ও মন্দিরপ্রবেশ। শেষে সীমারক্ষক দেবতা নরসিংহ ও নিকটস্থ দেবী (দুর্গা)-র দর্শন করে রথ-সেনাসহ অগ্রসর হয়; উৎকলসীমায় চার্চিকা দেবীর স্থানে স্তব করে নির্বিঘ্ন নীলাচল-দর্শনের প্রার্থনা জানায় এবং নদী-অরণ্য অঞ্চলে শিবির স্থাপন করে বৈষ্ণব বৃদ্ধ ও সেবকদের সম্মান অব্যাহত রাখে। রাত্রিবাস ও প্রস্থানের শৃঙ্খলা, দানের ন্যায্য বণ্টন এবং সমন্বিত গমনবিধি দিয়ে অধ্যায় শেষ হয়।

Indradyumna’s Pilgrimage Inquiry; Nārada’s Account of Śiva–Viṣṇu and the Designation of Puruṣottama-kṣetra (नीलाचल–विरजामण्डल–एकाम्रवन-प्रसंगः)
এই অধ্যায়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পূর্ব উপদেশে উৎসাহিত হয়ে নিজের সাধনাকে ধর্মফলদায়ক মনে করে ঋষি নারদকে পথপ্রদর্শক করে যাত্রা শুরু করেন। তিনি নিত্যকর্ম সম্পন্ন করে জগন্নাথের পূজা করেন এবং ওড্রদেশ-সংলগ্ন পথে একাম্রবনের দিকে অগ্রসর হন; নদী পার হন ও উপাসনার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শুনে বুঝতে পারেন নিকটে আরাধনা চলছে। রাজা জিজ্ঞাসা করেন—এই ধ্বনি কি নীলাচলের প্রভুর, না অন্য দেবতার? নারদ বলেন, এই অঞ্চল রক্ষিত ও দুর্জ্ঞেয়; অসাধারণ সৌভাগ্য ও ইন্দ্রিয়সংযমে তবেই তা লাভ হয়। এরপর রাজা শিবের ভয় ও আশ্রয় সম্পর্কে জানতে চান। নারদ পুরাণপ্রসিদ্ধ পূর্বকথা বলেন—পার্বতীসহ শিবের গৃহ্য প্রসঙ্গ, কাশী/অবিমুক্তের প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি, কাশীরাজের ঘটনা যেখানে বিষ্ণুর সুদর্শন-প্রয়োগ ঘটে, এবং শেষে শিবের নারায়ণকে স্তব করে শরণাগতি। বিষ্ণু শিবকে একাম্রবনে বাস করতে নির্দেশ দেন এবং দক্ষিণ সমুদ্রতটে নীলাচল ও বিরজা-মণ্ডলচিহ্নিত পুরুষোত্তম-ক্ষেত্রকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও মোক্ষদায়ক বলে তার বিস্তার ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। পুনরায় যাত্রাকথায় ফিরে ইন্দ্রদ্যুম্ন একাম্রবনে পৌঁছে তীর্থস্নান, দান-অর্ঘ্যাদি করেন, কোটীশ্বরের পূজা করেন এবং শিবের আশ্বাস (সময়-নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিসহ) লাভ করেন। শেষে নীলাচলে হরির সান্নিধ্যের দিকে অগ্রসর হওয়া এবং মন-বচনে স্মরণ-কীর্তনে স্থিত থাকার কথা দিয়ে অধ্যায় সমাপ্ত হয়।

कपोतेश्वर-बिल्वेश-माहात्म्य (Kapoteśvara and Bilveśvara: Theological Discourse on Sacred Origins)
অধ্যায় ১৩-এ ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—কপোটেশস্থলী কীভাবে প্রসিদ্ধ হল, আর কপোট ও ঈশ কে। জৈমিনি বলেন, এক সময় কুশস্থলী ছিল অনুর্বর ও আতিথ্যহীন—তীক্ষ্ণ কুশাঘাস ও কাঁটায় ভরা, জলহীন ও শূন্যপ্রায়। সেখানে ধূর্জটি/মহেশ্বর বিষ্ণুর একান্ত ভক্তিতে পূজ্য হওয়ার সংকল্প করেন; বাহ্য উপকরণের বদলে অন্তর্যাগ গ্রহণ করে বায়ুভক্ষণাদি কঠোর তপস্যা করেন। ভগবান প্রসন্ন হয়ে সমৃদ্ধি দান করেন; স্থানটি বৃন্দাবন-সদৃশ জল, বৃক্ষ, ফুল ও পাখিতে শোভিত হয়। শিব তপস্যায় ‘কপোট-সদৃশ’ হন এবং মুরারির আদেশে উমাসহ কপোটেশ্বর রূপে সেখানে অধিষ্ঠান করেন, ত্র্যম্বক-ভাবেও পূজিত হন। এরপর বিল্বেশ-মাহাত্ম্য। পাতালের দৈত্যরা জগৎকে বিপন্ন করলে দেবকীগর্ভসম্ভব ভগবান তীর্থে স্নান করে নীলমাধবকে প্রণাম করেন, বিল্বফল অর্পণ করে শিবের পরাত্পর স্তব করেন, এক ‘বিবর’ পথ লাভ করে পাতালে অবতরণ করেন, দৈত্যদের বধ করে ফিরে এসে তাদের পুনরুত্থান রোধে শিবকে দ্বাররোধক রূপে প্রতিষ্ঠা করেন। শেষে বিল্বেশ্বর দর্শন-पूজার খ্যাতি ও ফল এবং দুই মাহাত্ম্যের সার এই অধ্যায়ের মূল বিষয় বলে উপসংহার টানা হয়।

नीलमाधव-अन्तर्धान, राजविषाद, तथा अश्वमेध-क्रतु-प्रतिज्ञा (The Disappearance of Nīlamādhava and the King’s Resolve for Sacrificial Preparation)
এই অধ্যায়ে ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—রথে আরূঢ় হয়ে নারদ ও রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন কোথায় গেলেন। জৈমিনি বলেন, তাঁরা নীলকণ্ঠের নিকটবর্তী ক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হলেন; পথে রাজার বাম চোখ ও বাহু কাঁপতে থাকে—অশুভ লক্ষণ। রাজা এটিকে পুণ্যযাত্রার ব্যর্থতার আশঙ্কা ভেবে নারদের কাছে কর্মদোষ, ধর্মপালন ও প্রজার কল্যাণ বিষয়ে উদ্বিগ্ন প্রশ্ন করেন। নারদ বোঝান—শুভ উদ্যোগে বাধা আসা স্বাভাবিক; অনেক সময় তা মঙ্গলফলের পূর্বলক্ষণ। এরপর নারদ গূঢ় সংবাদ দেন—বিদ্যাপতি যে নীলমাধবকে পূর্বে দেখেছিলেন, তিনি মানবলোকে অন্তর্ধান করেছেন; পাতালবাসে গমন করে মর্ত্যে দুর্লভ হয়েছেন। এ কথা শুনে রাজা মূর্ছিত হন; অনুচররা শীতল জল, চন্দন ও পাখা দিয়ে তাঁকে জাগিয়ে তোলে, আর নারদ যোগধৈর্যে তাঁকে স্থির রাখেন। রাজা বিলাপ করেন—রাজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, পণ্ডিতেরা স্থানত্যাগ করবেন, চাষের জমি পরিত্যক্ত হবে; হরিদর্শন না হলে পুত্রকে সিংহাসনে বসিয়ে প্রায়োপবেশ (উপবাসে দেহত্যাগ) করবেন বলে স্থির করেন। নারদ সান্ত্বনা দেন—ভগবানের লীলা অনির্ণেয়; ব্রহ্মার পক্ষেও মায়া ভেদ করা কঠিন। তিনি উপায় বলেন—পুরুষোত্তম-ক্ষেত্রে থেকে বহু অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন কর; যজ্ঞশেষে তুমি বিষ্ণুকে দারুতনু (কাষ্ঠমূর্তি) রূপে দর্শন করবে, এবং নারদ নিজে সেই রূপগুলির প্রতিষ্ঠা করবেন। শেষে নির্দেশ—নীলকণ্ঠের নিকট শঙ্খাকৃতি ক্ষেত্রের সমতল যজ্ঞভূমিতে স্থায়ী যজ্ঞশালা নির্মাণ করে নীলাদ্রি-সম্পর্কিত নরসিংহরূপ দর্শন করো এবং ব্রহ্মার আদেশে বিলম্ব না করে ক্রতু আরম্ভ করো।

Nṛsiṃha-darśana and the Nyagrodha Mokṣa-sthāna: Indradyumna Guided by Nārada
এই অধ্যায়ে তীর্থযাত্রীরা নীলকণ্ঠ (শিব) ও দুর্গাকে যথাযথ সম্মান ও পূজা নিবেদন করে নীলাচল/নীলভূধরের দিকে অগ্রসর হন—এতে বৈষ্ণব-শৈব-শাক্ত পরম্পরার প্রতি শিষ্টাচারপূর্ণ তীর্থনীতি প্রকাশ পায়। পথ ঘন অরণ্য, অসম ভূমি ও ভয়ংকর প্রহরীদের দ্বারা রক্ষিত; যেন এক সীমান্ত-পর্ব, যেখানে প্রবেশের জন্য ইন্দ্রিয়সংযম ও সঠিক পথনির্দেশ অপরিহার্য। পথ না পেয়ে তারা বিভ্রান্ত হলে নারদ তাদের শিখরে নিয়ে যান। সেখানে ভগবান নৃসিংহরূপে ভয়ংকর অথচ উদ্ধারক হিসেবে প্রকাশিত হন—দৈত্য বিদীর্ণ করছেন, বিশ্বাগ্নির ন্যায় তেজে দীপ্ত; তাঁর দর্শনমাত্রেই মহাপাপ নাশ হয় বলা হয়েছে। ইন্দ্রদ্যুম্ন বলেন, নৃসিংহ সাধারণ মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য আরাধ্য, কিন্তু সাধু-মধ্যস্থতা ও ভগবৎকৃপায় তিনি সুলভ হন। এরপর নারদ এক গোপন শুদ্ধিকারী মুক্তিস্থান জানান—এক বিশাল ন্যগ্রোধ (বট) বৃক্ষ, যার ছায়া ও সান্নিধ্যও রূপান্তরকারী। আলোচনায় ভগবানের প্রকাশ-গোপন তত্ত্ব আসে: যুগে যুগে তিনি করুণাবশে বাহ্য কারণ ছাড়াই প্রকাশিত হন, আবার আচ্ছন্ন থাকেন, এবং অন্য তীর্থেও অংশরূপে দীপ্ত হতে পারেন। ইন্দ্রদ্যুম্ন নাম ও দর্শনকে মুক্তিদায়ক জেনে শরণাগতি প্রার্থনা করেন, অজামিলের দৃষ্টান্তে দেখান যে কৃপা যান্ত্রিক কর্মফলের ঊর্ধ্বে; শেষে অশরীরী বাণী নারদের ব্রহ্ম-সম্পর্কিত নির্দেশ মানতে বলে পরবর্তী আচারের শাস্ত্রীয় অনুমোদন স্থাপন করে।

नरसिंहप्रत्यर्चाप्रतिष्ठा—इन्द्रद्युम्नस्तोत्रं च (Narasiṃha Image-Consecration and Indradyumna’s Hymn)
জৈমিনি বর্ণনা করেন—মহাযজ্ঞে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের অটল বিশ্বাস ও দৃঢ় সংকল্প দেখে নারদ মুনি প্রসন্ন হন। তিনি রাজাকে নীলকণ্ঠের নিকটে এক মহাচন্দনবৃক্ষের কাছে অগ্রসর হতে বলেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে নরসিংহের সান্নিধ্যে এই ক্রিয়া অসাধারণ ফল দেবে। সেখানে পশ্চিমমুখী নরসিংহ-মন্দির নির্মাণের ব্যবস্থা হয়; নারদের স্মরণমাত্রে বিশ্বকর্মার পুত্র মানব-রূপে শিল্পশাস্ত্র-নিপুণ কারিগর হয়ে এসে চার দিনের মধ্যেই অপূর্ব প্রাসাদ সম্পূর্ণ করেন। এরপর মঙ্গলধ্বনি, পুষ্পবৃষ্টি ও দিব্য লক্ষণ প্রকাশ পায়; নারদ প্রতিষ্ঠাযোগ্য নরসিংহ-প্রত্যর্চা নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। ইন্দ্রদ্যুম্ন প্রদক্ষিণা ও সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে দীর্ঘ স্তোত্র পাঠ করেন, যেখানে নরসিংহ/বিষ্ণুকে পরম, সর্বব্যাপী এবং দুঃখ-সংশয়নাশক রূপে স্তব করা হয়েছে। পরে ফলশ্রুতি বলা হয়—শম্ভুসহ নরসিংহের দর্শন, স্তোত্রপাঠ, তিথি-নক্ষত্রানুসারে ব্রত (যেমন শুক্লপক্ষের দ্বাদশী স্বাতীযুক্ত, বৈশাখ চতুর্দশী) এবং পঞ্চামৃতাদি দ্বারা অভিষেক পাপক্ষয়, ইচ্ছাপূরণ, যজ্ঞতুল্য ফল ও ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি দেয়; মন্দিরের নিকটে কৃত কর্ম নরসিংহের কৃপায় বহুগুণ পুণ্যফল প্রদান করে।

Indradyumna’s Royal Assembly and the Initiation of the Thousand Aśvamedhas (Narrative of Ritual Preparation and Divine Re-manifestation)
অধ্যায় ১৭-এ ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—পবিত্র ক্ষেত্রে নরসিংহ-প্রতিষ্ঠার পরে রাজা কী করলেন। জৈমিনি বলেন, ইন্দ্রদ্যুম্ন এক বিশাল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজসভা আহ্বান করেন, যেখানে ইন্দ্র-প্রধান দেবগণ, বহু ঋষি, চার বেদের সাঙ্গোপাঙ্গ পণ্ডিত, ধর্মবিশারদ এবং নানা সম্প্রদায়ের অতিথিরা যথাযথ ক্রমে উপস্থিত হন। উঁচু সভামণ্ডপ ও আদর্শ যজ্ঞস্থলের ন্যায় যাগশালা নির্মিত হয়—সৌন্দর্য, শুচিতা ও বিধিব্যবস্থাকে যজ্ঞশুদ্ধিরই অঙ্গ হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাজা ইন্দ্রসহ সকলকে উপযুক্ত দান, আতিথ্য ও সংযত শিষ্টাচারে সম্মান করেন। তারপর ব্যক্তিগত কামনা নয়, যজ্ঞপুরুষের উদ্দেশ্যে অশ্বমেধ যজ্ঞ করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। দেবতারা তাঁর সত্যনিষ্ঠা স্বীকার করে পূর্ব প্রতিশ্রুতি স্মরণ করান—ভগবান করুণায় ‘দারব দেহ’ (কাষ্ঠদেহ) ধারণ করে পুনরায় প্রকাশিত হবেন; এই উদ্যোগ ত্রিলোক শুদ্ধির সহায়ক। এরপর দীক্ষা, অগ্নি-স্থাপন, পাত্র ও অন্নবণ্টন, সর্বস্তরে অবিরাম আতিথ্য এবং যজ্ঞকে ঘিরে আশ্চর্য সমৃদ্ধির বর্ণনা আসে। কর্ম নির্দোষ, ঋত্বিকগণ বিদ্বান, এবং যজ্ঞসত্রে ভক্তিময় কাহিনি-শ্রবণও চলতে থাকে। শেষে স্বপ্ন-সংকেতের মাধ্যমে হরির কার্যকলাপের রহস্যময় অথচ কৃপাসংযুক্ত স্বভাব প্রকাশ পায়।

भगवद्द्रुमप्रादुर्भावः एवं प्रतिमानिर्माण-नियमाः (The Manifestation of the Divine Tree and Protocols for Image-Making)
এই অধ্যায়ে রাজসভার সুত্যা ও অশ্বমেধ-সম্পর্কিত যজ্ঞের মহিমা বর্ণিত হয়েছে—নিয়মিত পাঠ, স্তোত্র, দান ও শৃঙ্খলাবদ্ধ আচার চলতে থাকে। এমন সময় বিল্বেশ্বরের নিকট সমুদ্রতটে, আংশিক সমুদ্রে অবস্থানকারী, দীপ্তিমান ও সুগন্ধি এক আশ্চর্য বৃক্ষ আবির্ভূত হয়; তাতে শঙ্খ-চক্রের চিহ্ন দেখা যায়, যা অপৌরুষেয় দিব্য লক্ষণ বলে গণ্য হয়। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন নারদের শরণ নেন। নারদ ব্যাখ্যা করেন—এটি পূর্বদর্শনজাত পুণ্যের পরিণতি এবং বিষ্ণুর প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত; কোথাও একে দেহগত চিহ্ন (যেমন পতিত কেশ) বৃক্ষরূপে প্রকাশ পাওয়ার ভাবনার সঙ্গেও মিলিয়ে দেখা হয়। রাজা অবভৃথ-স্নান সম্পন্ন করে মহোৎসব করেন, মহাবেদীতে বৃক্ষ স্থাপন করে বিস্তৃত পূজা নিবেদন করেন। যখন প্রশ্ন ওঠে—বিষ্ণুর প্রতিমা কে নির্মাণ করবে—নারদ দেবকার্যের অগম্যতা স্বীকার করেন। তখন আকাশবাণী কঠোর বিধান দেয়: দিব্য শিল্পী (বৃদ্ধ কারিগরের রূপে) পনেরো দিন রক্ষিত যজ্ঞপরিসরে আবদ্ধ থেকে কাজ করবেন; নির্মাণ কেউ দেখবে না, এবং শব্দ ও কৌতূহলকে আধ্যাত্মিক বিপদের কারণ বলা হয়। শেষে প্রকাশ পায়—সেই শিল্পী স্বয়ং নারায়ণ, মানববেশে থেকে বিধিপ্রক্রিয়ার মধ্যে দেবকর্তৃত্ব গোপন রাখছেন।

Āvirbhāva of the Four Forms at Nīlādri and the Protocols of Icon-Covering (Jagannātha–Balabhadra–Subhadrā–Sudarśana)
এই অধ্যায়ে ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকা মঙ্গললক্ষণ বর্ণিত হয়েছে—দিব্য সুগন্ধ, দেববাদ্যের ধ্বনি ও সূক্ষ্ম বৃষ্টি—যা নীলাদ্রিতে ভগবানের আবির্ভাবের সন্নিকটতা জানায়। দর্শনমাত্রেই দেবগণ ও যজ্ঞ-আচার-নিপুণ জনেরা আনন্দিত হয়ে হরির পূজায় প্রবৃত্ত হন। এখানে চার রূপের প্রকাশ নির্দিষ্ট করা হয়েছে—জগন্নাথ (বিষ্ণু/জনার্দন), বলভদ্র (অনন্ত/শেষ, জগতধারক), সুভদ্রা (শ্রী/লক্ষ্মী-শক্তির সর্বব্যাপী রূপ), এবং সুদর্শন (নিত্য চক্র, এখানে পৃথক বিগ্রহরূপেও)। তত্ত্বগতভাবে কৃষ্ণ ও বলরামের অভেদ ঘোষণা করা হয়েছে; সামাজিক নামভেদ কেবল লোকব্যবহার। বিগ্রহ-রক্ষার বিধানও দেওয়া হয়েছে—প্রতিমাগুলি দৃঢ়ভাবে আবৃত করে পরে নিজ নিজ বর্ণে রঞ্জিত করতে হবে; আবরণ অপসারণ নিষিদ্ধ, এবং তার ফল হিসেবে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, সন্তানহানি প্রভৃতি সামাজিক বিপর্যয়ের কথা বলা হয়েছে। সুন্দরভাবে রঞ্জিত দর্শন পাপক্ষয়কারী বলে প্রশংসিত। মন্দির-ব্যবস্থার নির্দেশে নীলাদ্রির নির্দিষ্ট স্থানে বৃহৎ ও স্থিতিশীল দেবালয় নির্মাণ করে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা, এবং বিশ্বাবসু শবরভক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত বংশকে নিয়মিত সেবা ও উৎসবকার্যে নিযুক্ত করার কথা আছে। শেষে রাজা আবেগে অভিভূত হন; মুনি করুণাময় প্রভুর পূজা-স্তবের উপদেশ দেন—যথাবিধি স্তব করলে ভগবান অভীষ্ট ফল দান করেন।

इन्द्रद्युम्नस्तुतिः, पूजाविधानम्, इन्द्रद्युम्नसरः-प्रशंसा च (Indradyumna’s Hymn, Worship Procedure, and the Praise of Indradyumna Lake)
এই অধ্যায়ে তিনটি ধারাবাহিক অংশ আছে। (১) নারদের প্রেরণায় রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন জগন্নাথ/বিষ্ণুর দীর্ঘ স্তব করেন। তিনি দেহের অশুচিতা ও কর্মক্ষয়ের ক্লেশ স্মরণ করে ভগবানের পদপদ্মের পবিত্রতাকেই আশ্রয় মানেন; বিষয়সুখকে ‘পরিণাম’-জনিত দুঃখের কারণ বলে সংসার থেকে উদ্ধার প্রার্থনা করেন। স্তবে বিষ্ণুকে বিশ্বরূপ ও পরম শরণ হিসেবে স্বীকার করে দাস্যভাব ও শরণাগতি প্রকাশ পায়। (২) পরে নারদ নারায়ণকে বহু উপাধিতে স্তব করেন; রাজা, শ্রোত্রিয়, ঋষি ও বিভিন্ন বর্ণের প্রতিনিধিরা একত্রে সমবেত স্তব করে। ইন্দ্রদ্যুম্ন বাসুদেবসহ বলভদ্র, ভদ্রা/সুভদ্রা ও সুদর্শনের বিধিবৎ পূজা করেন; দ্বাদশাক্ষর মন্ত্রের প্রয়োগ এবং বেদপ্রসিদ্ধ স্তোত্রপাঠের নির্দেশ দেন। এরপর ব্রাহ্মণদের বিপুল দান ও মহাদান সম্পন্ন হয়। (৩) গোদানকালে গাভীর খুরের ছাপ থেকে একটি গর্ত সৃষ্টি হয়ে দানজলে পূর্ণ হয় এবং তা মহাপুণ্য তীর্থে পরিণত হয়—ইন্দ্রদ্যুম্ন-সরোবর নামে খ্যাত। সেখানে স্নান ও অর্ঘ্যদানে মহাযজ্ঞসম ফল ও পিতৃকল্যাণের কথা বলা হয়েছে। শেষে রাজা শুভক্ষণে মন্দির নির্মাণ শুরু করেন, কারিগরদের সম্মান ও উৎসবের আয়োজন করেন এবং নানা দেশের সম্পদ জগন্নাথের প্রাসাদের জন্য নিবেদন করে রাজসমৃদ্ধিকে ঈশ্বরসেবায়ই সার্থক মনে করেন।

दारुमूर्तेः श्रौतप्रामाण्यं, दर्शनमुक्तिः, प्रासादनिर्माण-प्रतिष्ठा च (Vedic Authority of the Wooden Icon, Liberation through Darśana, and Temple Construction & Consecration)
এই অধ্যায়ে জৈমিনির বর্ণিত সংলাপের মাধ্যমে কাহিনি এগোয়। ঋগ্বেদ ও বেদান্তে পারদর্শী এক ব্রাহ্মণ রাজাকে ধন্য বলে প্রশংসা করেন—তিনি দারুমূর্তি (কাঠের বিগ্রহ)-র প্রকাশ প্রত্যক্ষ করেছেন; এবং বলেন, এই ‘অপৌরুষ’ রূপের পূজায় দুর্লভ মোক্ষ লাভ হয়। নারদ উত্তর দেন—বেদ ব্যতীত বিষ্ণুর ধর্মব্যবস্থা চলে না; অবতার ও তাঁর আরাধনা শ্রুতি-প্রসিদ্ধ, অর্থাৎ বেদ-প্রমাণিত। দেবতাকে বেদান্তে জ্ঞেয় পুরুষের সঙ্গে যুক্ত করে অর্চাকে মানবকল্যাণ (নিঃশ্রেয়স)-এর কার্যকর, অনুমোদিত মাধ্যম বলা হয়। এরপর ওড্রদেশ ও সেই ক্ষেত্রের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়, যেখানে সাধারণ চোখেও ‘রূপে ব্রহ্ম’ দর্শন হয়; পাশাপাশি কর্মপথের জটিলতা ও দেহধারীদের অস্থিরতার কথাও স্মরণ করানো হয়। তবু মূল জোর দেওয়া হয় সহজলভ্যতায়—মাত্র দর্শনেই মুক্তি সম্ভব; সমাজের প্রান্তিক দর্শকরাও ফল থেকে বঞ্চিত নয়; নিয়মযুক্ত ভক্তির পরিণতি সায়ুজ্য বলে ঘোষিত। পরে নারদ উপনিষদের অর্থের প্রকাশের কথা জানিয়ে ব্রহ্মার অভিপ্রায় জেনে রাজাকে মহামন্দির নির্মাণ ও নরসিংহ-প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। রাজা প্রতিষ্ঠা-মহোৎসবে ব্রহ্মার উপস্থিতি প্রার্থনা করেন; দক্ষ শিল্পী ও বিপুল সম্পদে নির্মাণ সম্পন্ন হয় এবং মন্দিরের অভূতপূর্ব শোভা প্রশংসিত হয়। শেষে নারদ রাজার অদ্বৈত ভক্তি স্বীকার করে বলেন—যা কর্ম, দান, ব্রত, অধ্যয়ন ও তপস্যায় দুরূহ, তা অচল ভক্তিতে সহজসাধ্য; প্রতিষ্ঠার পর ভবিষ্যৎ উৎসব ও দিব্য বরদানের আশা এবং নারদ-ঋষিদের পুনরাগমনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

ब्रह्मलोकगमनम् एवं ब्रह्मसभा-प्रवेशः | Ascent to Brahmaloka and Entry into Brahmā’s Assembly
এই অধ্যায়ে মন্দিরকেন্দ্রিক ভক্তি থেকে ঊর্ধ্বে উঠে ব্রহ্মলোকগমনের মহিমা বর্ণিত হয়েছে। জৈমিনি বলেন—রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যাত্রার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করলে মনোজব পুষ্পরথ উপস্থিত হয়। নারদের সঙ্গে রাজা শ্রীকৃষ্ণ/জগন্নাথকে রাম প্রভৃতি সহ প্রদক্ষিণ করে বারবার প্রণাম করেন এবং ব্রহ্মলোকযাত্রার অনুমতি প্রার্থনা করেন। তাঁরা সূর্যমণ্ডলীয় স্তর ও ধ্রুবলোক অতিক্রম করে ঊর্ধ্বলোকসমূহে আরোহণ করেন; উচ্চতর জগতে সিদ্ধগণ তাঁদের দর্শন করে সম্মান জানান। ভাগবতচরিত মনশুদ্ধিকারী—এই বাণী প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং বিষ্ণুভক্তির ফলে রাজার দ্রুত অগ্রগতি প্রকাশ পায়। তবু মানবিক উদ্বেগ থাকে—অনুপস্থিতিতে জগন্নাথ-প্রাসাদ নির্মাণ লোভে কলুষিত বা বিলম্বিত হতে পারে, কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। ঋষি আশ্বাস দেন যে ব্রহ্মলোক রোগ-জরা-মৃত্যুহীন; দেবসমর্থন সদা বিদ্যমান, এবং ধর্ম ও বিশ্বব্যবস্থার অনুকূল কর্মে বিঘ্নের সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। এরপর ব্রহ্মলোকের ধ্বনি ও সমাজচিত্র ফুটে ওঠে—স্বাধ্যায়ের গম্ভীর ধ্বনি, ইতিহাস-পুরাণ, ছন্দ ও কল্পশাস্ত্রের সুশৃঙ্খল অধ্যয়ন, এবং ব্রহ্মার সভা যেখানে ব্রহ্মর্ষি ও মুক্তসত্তারা সমবেত। শেষে সভাদ্বারে দ্বারপাল শ্রদ্ধাভরে নারদকে অভ্যর্থনা করে প্রবেশাধিকার দেন, ভক্তিসংবলিত ঋষিনেতৃত্বাধীন অভিযানের মর্যাদা ঘোষণা করে।

Indradyumna’s Audience with Brahmā and the Disclosure of Puruṣottama’s Manifest Form (इन्द्रद्युम्नस्य ब्रह्मदर्शनं पुरुषोत्तमप्रादुर्भाव-रहस्यम्)
এই অধ্যায়ে ব্রহ্মার সভায় এক রাজকীয়-ধর্মতাত্ত্বিক পর্ব বর্ণিত। নারদ রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের আগমনের সংবাদ দেন, আর দ্বাররক্ষক মণিকোডর আগন্তুকের অসাধারণ মর্যাদা ও প্রবেশ-নিয়ম স্মরণ করিয়ে লোকপাল ও বিশ্ব-প্রশাসকদের উপস্থিতি নির্দেশ করে। ব্রহ্মা দিব্যগীতে নিমগ্ন থেকেও কেবল দৃষ্টিমাত্রে প্রবেশের অনুমতি দেন; ইন্দ্রদ্যুম্ন বিনয়ে প্রণাম করে এবং দেবপ্রিয় বলে প্রশংসিত হয়, তারপর ব্রহ্মা তার অভিপ্রায় জিজ্ঞাসা করেন। ইন্দ্রদ্যুম্ন নিজের আরম্ভ করা মন্দিরে জগন্নাথ (পুরুষোত্তম)-এর প্রতিষ্ঠা প্রার্থনা করে এবং তত্ত্বগতভাবে ব্রহ্মার কর্তৃত্ব ও জগন্নাথের পরমত্বের অভেদ ঘোষণা করে। দুর্বাসা অপেক্ষমাণ দেবতা ও লোকপালদের পক্ষ থেকে নিবেদন করেন, কিন্তু ব্রহ্মা বলেন—শুদ্ধ কর্মফল ও ভক্তির কারণে ইন্দ্রদ্যুম্নের যোগ্যতা তাদের থেকেও উচ্চ। এরপর ব্রহ্মা সময়ের রহস্য প্রকাশ করেন—তার গানের মধ্যেই মহাকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, রাজার বংশ লুপ্ত, কেবল দেবতা ও মন্দির অবশিষ্ট। ব্রহ্মা ইন্দ্রদ্যুম্নকে পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে প্রতিষ্ঠার আয়োজন সম্পূর্ণ করতে বলেন এবং সহায়ক দেবগণের সঙ্গে নিজেও আসবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। শেষে দেবগণকে উপদেশ দেন—শ্রীপুরুষোত্তমক্ষেত্র নীলাদ্রিতে পুরুষোত্তম যুগযুগান্তরেও বিরাজমান, দারুময় দেহধারী প্রকাশরূপে পূজিত; সেই রূপের দর্শন ও পূজা কঠোর যোগতপস্যা ছাড়াই শুদ্ধি ও মুক্তি দান করে।

Deva-stuti to Jagannātha and Planning the Prāsāda-Pratiṣṭhā (देवस्तुतिः जगन्नाथस्य तथा प्रासादप्रतिष्ठासंभारविचारः)
এই অধ্যায়ে জৈমিনি ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজার জগন্নাথের কাছে আবেগভরা আগমন বর্ণনা করেন। রাজা দণ্ডবৎ প্রণাম করেন, বারবার নমস্কার জানান, প্রদক্ষিণা করেন এবং স্তোত্রময় ভাষায় প্রভুকে সম্বোধন করেন। এরপর দেবগণ উপস্থিত হয়ে দীর্ঘ স্তুতি পাঠ করেন, যেখানে জগন্নাথকে সর্বব্যাপী বিশ্বপুরুষ, বৈদিক ছন্দ, যজ্ঞ, সকল জীব ও সমাজব্যবস্থার উৎস এবং অন্তর্যামী রূপে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ প্রদানকারী একমাত্র ঈশ্বর বলে ঘোষণা করা হয়। স্তুতির পর কাহিনি প্রশংসা থেকে কার্য-পরিকল্পনায় প্রবেশ করে। সবাই নরসিংহ-ক্ষেত্রে পূজা করে নীলাচলের শিখরভাগে যায় এবং সেখানে এক আশ্চর্য প্রাসাদ দেখে—অতিবিশাল, আকাশস্পর্শী, মানবসাধ্যের অতীতপ্রায় এবং দীর্ঘকাল স্থায়ী। ইন্দ্রদ্যুম্ন পূর্বের দিব্য নির্দেশ স্মরণ করে মন্দির-প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সাম্ভার সংগ্রহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন; দেবগণ নিজেদের সীমাবদ্ধতা জানান, কিন্তু পদ্মনিধি দেবানুমতিতে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। তখন ব্রহ্মা-প্রেরিত নারদ এসে শাস্ত্রানুসারে উপকরণ-ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠা-বিধির ক্রম নির্দেশ করেন এবং পদ্মনিধিকে সংগ্রহের দায়িত্ব দেন। শেষে নারদের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা হয়, আর রাজা ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠা-পদ্ধতির নির্দেশনা প্রার্থনা করেন—এভাবেই স্তুতি থেকে আচার-পরিকল্পনার সেতু রচিত হয়।

Rathatraya-nirmāṇa–pratiṣṭhāvidhi (Construction and Consecration Protocol for the Three Chariots)
এই অধ্যায়ে জৈমিনি বর্ণনা করেন—নারদ শাস্ত্র পরামর্শ করে লিখিত নির্দেশ রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে দেন। রাজা পদ্মনিধিকে স্বর্ণমণ্ডপ ও উপযুক্ত আবাস নির্মাণ এবং বিশ্বকর্মার সহায়তায় প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রস্তুতের আদেশ দেন। এরপর তিন রথের (রথত্রয়) নির্মাণ ও প্রতীক-নির্দেশ আসে—বাসুদেবের রথ গরুড়চিহ্নিত, সুভদ্রার রথ পদ্মধ্বজ, আর বলভদ্রের রথ তাল/শীর বা লাঙল-ধ্বজযুক্ত; চাকার সংখ্যা ও অনুপাতও নির্দিষ্ট করা হয়। পরে ধর্মবাণী—যথাবিধি প্রতিষ্ঠা (প্রতিষ্ঠা) ছাড়া দেবতাকে রথে, মণ্ডপে বা নগরে স্থাপন করা উচিত নয়; তাতে কর্ম নিষ্ফল হয়। নারদ প্রতিষ্ঠাবিধি বলেন—ঈশান কোণে মণ্ডপ নির্মাণ, মণ্ডল অঙ্কন, কুম্ভ স্থাপন; কুম্ভে পঞ্চদ্রুম কষায়, গঙ্গা প্রভৃতি তীর্থজল, পল্লব, মাটি, সুগন্ধি, রত্ন, ঔষধ, পঞ্চগব্য ভরে নরসিংহ ও বিষ্ণুকে মন্ত্ররাজ-বিধিতে আহ্বান, নির্দিষ্ট হোমসংখ্যা ও আহুতি। পরে ছিটানো জল, ধূপ, বাদ্য দ্বারা রথশুদ্ধি এবং সুপর্ণ-গরুড় প্রতিষ্ঠা বিশেষ স্তোত্রে সম্পন্ন হয়। দক্ষিণা, ব্রাহ্মণভোজন, বলভদ্রের পৃথক মন্ত্র (লাঙল-ধ্বজসহ) ও সুভদ্রার জন্য লক্ষ্মীসূক্ত, এবং পৃথক হবি-অংশ নির্ধারিত। শোভাযাত্রায় দেবতা ও দিক্পালদের বলি, বৈষ্ণব গায়ত্রী, বিষ্ণুসূক্ত, বামদেব প্রভৃতি পাঠ হয়। অক্ষ, জোয়াল, ধ্বজ বা প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হলে যে অমঙ্গললক্ষণ দেখা দেয়, তার শাস্তি-হোম ও শান্তি-প্রায়শ্চিত্ত, সর্বস্বস্তি/শান্তি এবং গ্রহশান্তির উপদেশ দিয়ে অধ্যায় শেষ হয়।

गालराजस्य वैष्णवभावः प्रतिष्ठासंभारदर्शनं च (Gāla’s Vaiṣṇava Turn and the Vision of the Consecration Preparations)
এই অধ্যায়ে জৈমিনি-প্রসঙ্গে নীলপর্বতের নিকটে মন্দিরসংলগ্ন প্রতিষ্ঠা-পরিসর দ্রুত ও শৃঙ্খলাভাবে প্রস্তুত হওয়ার বর্ণনা আছে। ইন্দ্রদ্যুম্নের আদেশে বিশ্বকর্মা এক মহিমান্বিত সভামণ্ডপ নির্মাণ করেন এবং পূজা-উৎসবের জন্য হোমদ্রব্য, সমিধা, কুশ, নৈবেদ্য, সঙ্গীত ও নৃত্যসহ সকল উপকরণ সমবেত হয়। এরপর গালরাজার কথা আসে—তিনি পূর্বে মাধবের শিলামূর্তি প্রতিষ্ঠা করে ক্ষুদ্র মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। ইন্দ্রদ্যুম্নের অসাধারণ উদ্যোগ শুনে তিনি প্রথমে বিরোধের ভাব নিয়ে আসেন, কিন্তু দৃশ্য দেখে বিস্মিত হয়ে অনুসন্ধান করেন। যখন জানতে পারেন যে ইন্দ্রদ্যুম্ন ব্রহ্মলোক-সম্পর্কিত দেবপ্রেরিত রাজপুরুষ এবং নারদ ও পদ্মনিধি তাঁর সহচর, তখন তিনি একে অতুল ধর্মকার্য বলে মানেন এবং প্রতি বছর এমন মহোৎসব করার সংকল্প করেন। বিনয়ে পূর্ব অজ্ঞতা স্বীকার করে তিনি প্রতিষ্ঠিত দারুময় হরিস্বরূপকে প্রত্যক্ষ ত্রাণদায়ক বলে গ্রহণ করেন। ইন্দ্রদ্যুম্ন গালের ভক্তিরাজত্ব স্বীকার করে বলেন—হরির বিগ্রহ যথাবিধি প্রতিষ্ঠা করলে দেহবন্ধন থেকে মুক্তি হয় এবং বিষ্ণুর পরম পদ লাভ হয়। তিনি গালকে নিত্য নৈবেদ্য, প্রদক্ষিণা-যাত্রা ও উৎসবসেবার দায়িত্ব দেন। শেষে দিব্য দুন্দুভি, মঙ্গলধ্বনি, পুষ্পবৃষ্টি ও সুগন্ধের মধ্যে দিকপাল, ঋষি ও শিল্পীদের সহিত পিতামহ ব্রহ্মার বিমানের অবতরণ ঘটে; গাল ও সমবেত সকলেই প্রণাম করে ভক্তিভাবে ব্রহ্মদর্শনে আপ্লুত হয়।

अध्याय २७: रत्नसोपानावतरणं, स्तुतयः, प्रतिष्ठा च (Chapter 27: Descent by the jeweled stairway, hymns, and consecration)
এই অধ্যায়ে জগন্নাথ-মন্দির প্রাঙ্গণে এক মহাদিব্য সমাবেশের বর্ণনা আছে। আকাশযান ও মন্দির-অঞ্চলের মধ্যে রত্নখচিত স্বর্ণসোপান প্রকাশিত হয়; সমবেত সকলেই তা বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে। পদ্মযোনি পিতামহ ব্রহ্মা সেই সোপান বেয়ে অবতরণ করেন; গন্ধর্বরা স্তব করে এবং বিধিপথে তাঁকে অগ্রসর করা হয়। দেব, পিতৃ, সিদ্ধ, বিদ্যাধর, যক্ষ, গন্ধর্ব ও অপ্সরাগণ এই পবিত্র দৃশ্যে উপস্থিত থাকেন। ব্রহ্মা রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে সম্বোধন করে তাঁর অতুল সৌভাগ্য ও সর্বলোকের অংশগ্রহণের কথা নিশ্চিত করেন। এরপর ব্রহ্মা জগন্নাথের দীর্ঘ স্তব করেন—বেদান্তীয় ভাষায় মায়া, অদ্বৈত, সর্বব্যাপ্তি ও পরাত্পরত্বের দ্বারা ভগবানের স্বরূপ প্রকাশিত হয়। পরে বলভদ্রকে বিশ্বাধার, শेष-নারায়ণ-স্বরূপ বলে স্তব করেন এবং সুভদ্রাকে বিষ্ণুমায়া/শক্তি রূপে বহু দেবীর সঙ্গে অভিন্ন বলে বন্দনা করেন; সুদর্শনকে দীপ্তিময় পথপ্রদর্শক ও অজ্ঞাননাশক বলা হয়। শেষে আচার-প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হয়—শান্তি ও পৌষ্টিক কর্মের জন্য ভারদ্বাজের নিয়োগ, নির্দিষ্ট দিকসমূহে দেবতাদের স্থাপন, এবং মন্ত্র ও বৈদিক স্তোত্র (শ্রীসূক্ত ও পুরুষসূক্তের ইঙ্গিত) সহ জনসমক্ষে প্রতিষ্ঠা/অভিষেক। তিথি নির্দিষ্ট—বৈশাখ শুক্ল অষ্টমী, পুষ্যযোগযুক্ত, বৃহস্পতিবার; সেই দিনে স্নান-দান-তপস্যা-হোম অক্ষয় ফল দেয়, এবং কৃষ্ণ (জগন্নাথ), রাম (বলভদ্র) ও সুভদ্রার ভক্তিপূর্ণ দর্শনে বহু জন্মের পাপ নাশ হয়ে মুক্তির সহায় হয়।

Nṛsiṃha-Mantrarāja, Dāru-Mūrti, and the Vedic Interpretation of Jagannātha (नृसिंहमन्त्रराज-दारुमूर्ति-वेदव्याख्या)
এই অধ্যায়ে ইন্দ্রদ্যুম্ন প্রমুখের সম্মুখে ক্রমে প্রকাশিত হয় এক তেজোময়, ভীষণ নৃসিংহ-সদৃশ আবির্ভাব—জ্বলন্ত জিহ্বা, বহু নয়ন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, বিশ্বরূপের ন্যায় বর্ণনা—যা ভয়ের সঙ্গে ভক্তিমিশ্রিত সংকোচ জাগায়। নারদ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেন, অনুগ্রহের জন্য আবির্ভূত রূপ কেন এত ভীতিকর; ব্রহ্মা বলেন, এটি শিক্ষামূলক—যাতে জগন্নাথের দারু (কাষ্ঠ) মূর্তিকে লোকেরা কেবল জড় বস্তু বলে অবজ্ঞা না করে, এবং অবিবেকীদের কাছে দেবতার ব্রহ্মত্ব প্রকাশ পায়। এরপর অথর্ব-পরম্পরাসংযুক্ত ‘নৃসিংহ-মন্ত্ররাজ’-এর মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়—এটি সর্বোচ্চ সাধন, চতুর্বর্গ (ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ) প্রদানকারী, ক্ষুদ্র কামনার ঊর্ধ্বে মহাফলদায়ক। ইন্দ্রদ্যুম্ন দীক্ষা লাভ করে ‘দিব্য-সিংহ’কে নমস্কার-স্তোত্রে স্তব করেন। শেষে ব্রহ্মা সিদ্ধান্ত দেন—আদি-রূপ নরসিংহ; দারুমূর্তিকে ‘প্রতিমা-বুদ্ধি’ দিয়ে দেখা উচিত নয়, তা পরব্রহ্মই, দুঃখভঞ্জনকারী ও অখণ্ড আনন্দদাতা। দার্শনিক আলোচনায় শব্দ-ব্রহ্ম ও পর-ব্রহ্মের ঐক্য, শব্দ-অর্থের পারস্পরিক নির্ভরতা ব্যাখ্যা করা হয়; এবং দেবরূপগুলিকে চার বেদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়—বলভদ্র/ঋগ্বেদ, নৃসিংহ/সামবেদ, সুভদ্রা/যজুর্বেদ, চক্র/অথর্ববেদ। ভেদাভেদ মতে এক প্রভুই বহু রূপে প্রকাশিত। নীলাচলে দারুমূর্তি-রূপ গোবিন্দের শুদ্ধ কর্ম- বাক্-মন দ্বারা পূজার বিধান, মন্ত্ররাজের অতুল্যতা, এবং নীলাচল তটে ন্যগ্রোধমূলের কাছে উপাসনায় দিব্যধাম-প্রাপ্তি ও মোক্ষফল ঘোষণা করা হয়েছে।

Jyeṣṭha-snāna and Guṇḍicā-yātrā: Ritual Calendar, Site-Permanence, and Phalaśruti in Puruṣottama-kṣetra
অধ্যায় ২৯-এ জৈমিনি বর্ণনা করেন—পূর্ব ঘটনার পর লোকসংগ্রহের জন্য হৃদয়ে কমলাসন/পদ্মযোনি ব্রহ্মাকে আহ্বান করা হয় এবং পূর্বে প্রকাশিত বিষ্ণুর রূপসমূহ পুনরায় প্রত্যক্ষ হয়। বলভদ্রের পূজা দ্বী-ষড়াক্ষর মন্ত্রে, নারায়ণের পূজা পৌরুষসূক্তে, আর চক্রের পূজা দেবীসূক্ত ও দ্বাদশাক্ষর বিধানে—এভাবে স্তরবদ্ধ লিটুর্জিক ক্রম প্রকাশিত। এরপর ব্রহ্মা রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের বহু জন্মের ভক্তির পরিণতি হিসেবে দর্শনের কথা জানিয়ে দেশ–কাল–ব্রত–উপচার বিষয়ে নির্দেশ চান। দেব দারু-দেহ প্রতিমারূপে বর দেন—অচল ভক্তি এবং মন্দিরের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তিনি এই পবিত্র স্থানে অবস্থান ত্যাগ করবেন না; এতে স্থানের স্থায়িত্ব-তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর জ্যৈষ্ঠ মহাস্নানের বিধি, বটবৃক্ষের উত্তরে নির্দিষ্ট কূপকে সর্বতীর্থরূপে মান্য করা, ক্ষেত্রপাল ও দিকপালদের উদ্দেশে বলি, মঙ্গলবাদ্যের সঙ্গে স্বর্ণকুম্ভে জল আহরণ, এবং জগন্নাথের রাম(বলভদ্র) ও সুভদ্রাসহ স্নান—এসব নির্দিষ্ট করা হয়; স্নানদর্শনকে পুনর্জন্মবন্ধন ছেদনকারী বলা হয়েছে। স্নানের পরে অলংকৃত মণ্ডপে স্থাপন ও কিছু সময় দর্শন-নিষেধ (অনবসর সদৃশ)ও নির্দেশিত। পরবর্তী অংশে গুন্ডিচা ‘মহাযাত্রা’, আষাঢ় শুক্ল দ্বিতীয়া (পুষ্য নক্ষত্রসহ) প্রভৃতি শুভ তিথি, গুন্ডিচা-ভূমির অতিশয় পুণ্যত্ব, এবং উত্তান, শয়ন, পরিবর্তন, মার্গ-প্রাবরণ, পুষ্যস্নান; ফাল্গুনের দোল/ঝুলনোৎসব; চৈত্র- বৈশাখের আচার ও অক্ষয় তৃতীয়ার অনুলেপনাদি বিধান বর্ণিত। শেষে জগন্নাথ ব্রহ্মার সঙ্গে এক-ইচ্ছা ঘোষণা করেন, ক্ষেত্রের পূজা ও সেখানে মৃত্যুতে মুক্তিদায়ক ফল নিশ্চিত করেন, এবং ইন্দ্রদ্যুম্নকে সকল যাত্রা ও উৎসব যথাবিধি পরিচালনার আদেশ দেন।

Jyeṣṭha-snānavidhi at Mārkaṇḍeya-vaṭa and Sindhu-snānā: A Pilgrimage-Ritual Sequence
অধ্যায় ৩০-এ ঋষিগণ শ্রীপতির জন্ম-স্নান প্রভৃতি উৎসবের নির্ভুল বিধান জানতে চান এবং ইন্দ্রদ্যুম্নের ধর্মানুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আশ্চর্য কাঠের বিগ্রহ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। জৈমিনি জ্যৈষ্ঠ-মাসকেন্দ্রিক এক সুসংবদ্ধ ব্রতক্রম বলেন—শুক্ল দশমীতে বাক্-সংযমের ব্রত নিয়ে বহু-পর্বের তীর্থ-অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমে মাৰ্কণ্ডেয়-বটে পঞ্চতীর্থ-বিধিতে স্নান; পরে শৈব-ক্রমে ভৈরবের অনুমতি প্রার্থনা, বৈদিক জলকর্ম ও অঘমর্ষণ-পাঠসহ স্নান, বৃষ-আরাধনা ও লিঙ্গ-স্পর্শাদি পূজা—যা মহাযজ্ঞসম ফলদায়ক বলা হয়েছে। এরপর বিষ্ণুকেন্দ্রিক পর্ব—বিষ্ণুরূপ ন্যগ্রোধের দর্শন ও প্রদক্ষিণা, যানরূপে গরুড়ের বন্দনা, এবং দেবগৃহে প্রবেশ করে জগন্নাথের পূজা (মন্ত্ররাজ, পুরুষসূক্ত বা দ্বাদশাক্ষর মন্ত্রে)। বর্ণানুসারে বিধিপূজার অধিকার উল্লেখ আছে; অন্যদের জন্য দর্শন ও নামস্মরণে ভক্তির পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। পরে সমুদ্র-স্নানের বিস্তৃত লিতুর্গি—উগ্রসেন প্রভৃতি রক্ষক ও ‘স্বর্গদ্বার’ প্রবেশস্থল থেকে অনুমতি, মণ্ডল নির্মাণ, মন্ত্রন্যাস, প্রাণায়াম ও দিক্-বিষ্ণুরূপে কবচ। তীর্থে ‘তীর্থরাজ’কে বিষ্ণুর জলরূপে আহ্বান করে অঘমর্ষণ, পঞ্চবারুণ ক্রিয়া, অন্তর্বাহ্য শুদ্ধি ও নির্দিষ্ট জল-অর্ঘ্য সম্পন্ন হয়; দীর্ঘসঞ্চিত পাপক্ষয় ও স্থায়ী মঙ্গল প্রার্থিত হয়। শেষে জল-অন্ন-বস্ত্র-সুগন্ধি নৈবেদ্যাদি অর্পণ, সিন্ধুরাজে কর্মফল বহুগুণ বৃদ্ধির কথা, এবং রাম-কৃষ্ণ-সুভদ্রার প্রণাম ও রূপস্মরণে অধ্যায় সমাপ্ত।

इन्द्रद्युम्न-सरोवर-स्नानविधिः, नरसिंहपूजा, तथा ज्येष्ठाभिषेक-महोत्सव-विधानम् (Indradyumna Lake Bathing Rite, Narasiṃha Worship, and the Jyeṣṭha Snāna/Abhiṣeka Festival Procedure)
এই অধ্যায়ে ইন্দ্রদ্যুম্ন-সরোবরের তীর্থপ্রবেশ ও শুদ্ধিস্নানবিধি বর্ণিত হয়েছে; অশ্বমেধ-সম্পর্কিত পবিত্রীকরণের ফলে এই সরোবর মহাপুণ্যময় বলে প্রতিপাদিত। সেখানে স্নান করে বিধিনিষেধ মান্য করে দেবসেবা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর হরির রক্ষাকারী রূপ নৃসিংহের স্থানীয় ভক্তি-উপাসনা—মন্ত্রসহ পূজা এবং চন্দন, আগুরু, কর্পূর, পায়স, মোদক, ফল ও নানা প্রস্তুত ভোগ নিবেদনের ক্রমসহ তালিকা দেওয়া হয়েছে। পরে জ্যৈষ্ঠ স্নান/অভিষেক মহোৎসবের নিয়মাবলি আসে—জগন্নাথকে বলভদ্র ও সুভদ্রাসহ স্নানাভিষেক, সজ্জিত মঞ্চ নির্মাণ, পবিত্র কলসে সুগন্ধি জলের আয়োজন, শোভাযাত্রার শৃঙ্খলা এবং অবহেলা-বর্জনের সেবাধর্মীয় সতর্কতা। সর্বত্র ‘বিশ্বাস’কে কার্যসিদ্ধির মূল শর্ত বলা হয়েছে; স্নানদর্শনমাত্রেই দীর্ঘদিনের পাপমল ক্ষয়, পার্থিব মঙ্গল ও মুক্তিমুখী ফলের কথা শ্রুতিফলে ঘোষিত। শেষে অবশিষ্ট তীর্থজল স্বাস্থ্য ও আয়ুস্থিতির জন্য কল্যাণকর এবং দর্শকসকলেরও পুণ্যবৃদ্ধি হয়—এভাবে উপসংহার টানা হয়েছে।

Dakṣiṇāmūrti-darśana and the Jyeṣṭha-pañcaka Vrata (महाज्यैष्ठी–ज्येष्ठपञ्चकव्रतवर्णनम्)
অধ্যায় ৩২ দুইটি ঘনিষ্ঠ ধারায় অগ্রসর। প্রথমে জৈমিনি উৎসব-পরিসরে দক্ষিণমুখে অগ্রসর ভগবানকে (বলভদ্র/রাম ও সুভদ্রাসহ) দর্শনের বিধি ও তাৎপর্য বলেন—সুগন্ধ, মালা, নৈবেদ্য, সঙ্গীত-নৃত্যসহ পূজা, শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ ও ভক্তদের সম্মান; এবং এই দর্শন মহাযাগাদি কর্মের ফলকে সংক্ষিপ্তভাবে একত্র করে, মানুষের পক্ষে বিরল লাভ—এ কথা প্রতিপাদিত। দ্বিতীয় অংশে ঋষিদের প্রশ্নের উত্তরে ‘জ্যৈষ্ঠ স্নান-প্রদর্শন’-এর নিশ্চিত ফল লাভের জন্য জ্যৈষ্ঠ-পঞ্চক ব্রত নির্দিষ্ট হয়, যার পরিসমাপ্তি শুভ মহা-জ্যৈষ্ঠী পূর্ণিমায়। দশমী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত প্রতিদিন সংকল্প, বৈষ্ণব আচার্য নির্বাচন, বারংবার তীর্থস্নান, বিষ্ণুর রূপসমূহ (মধুসূদন, নারায়ণ, যজ্ঞবরাহ, প্রদ্যুম্ন, নৃহরি) স্থাপন ও পূজা—নির্দিষ্ট দ্রব্য, মন্ত্র, নৈবেদ্য, দীপ, জাগরণ; মূলমন্ত্রে হোম, পুরোহিতকে দক্ষিণা, গোধন ও স্বর্ণাদি দান, ব্রাহ্মণভোজনের বিধান আছে। শেষে বলা হয়—এই ব্রতের পূণ্য স্নান-দর্শনের ফলের সমতুল্য, আর মধ্যবর্তী নির্জলা একাদশীকে বিশেষ পূণ্যসঞ্চয়কারী শ্রেষ্ঠ ব্রতরূপে মহিমা দেওয়া হয়েছে।

Mahāvedī-mahotsava and Tri-Ratha Yātrā Protocols (महावेदीमहोत्सव-त्रिरथविधानम्)
জৈমিনি মহাবেদী-মহোৎসবের ক্রমানুসার বিধান বর্ণনা করেন, যার কেন্দ্র গুন্ডিচা মণ্ডপ পর্যন্ত জনসমক্ষে রথযাত্রা। শুরুতে বৈশাখ শুক্লপক্ষের তৃতীয়া (এবং পরে আষাঢ় শুক্লপক্ষের সময়) নির্দিষ্ট করে কালের নোঙর দেওয়া হয়েছে। এরপর আচার্য ও দক্ষ শিল্পীদের নির্বাচন, বিধিপূর্বক অরণ্যে প্রবেশ, অগ্নি স্থাপন, মন্ত্রনিয়ন্ত্রিত হোম, এবং দিকপাল ও স্থানরক্ষকদের উদ্দেশে বলিদান—এসব প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। তারপর নিয়ন্ত্রিতভাবে কাঠ কর্তন, তার অভিষেক-সংস্কার, এবং তিনটি রথ নির্মাণের সূক্ষ্ম বিবরণ—গঠন, অলংকরণ, তোরণ-দ্বার, ধ্বজা-পতাকা, প্রতীকচিহ্ন (বিশেষত গরুড়ধ্বজ)—উপস্থাপিত। নাগরিক ব্যবস্থাপনায় যাত্রাপথ সুগন্ধি দ্বারা শুদ্ধকরণ, প্রদীপ, বাদ্য, নৃত্য-গীত, পতাকা, এবং জনসমাবেশের শৃঙ্খলা ও আচরণবিধিও অন্তর্ভুক্ত। শেষে ফলশ্রুতি-ধর্মোপদেশে বলা হয়েছে—রথারূঢ় দেবতার দর্শন, স্তব, প্রদক্ষিণা, নিবেদন, কিংবা অনায়াসে সঙ্গে চলাও মহাপবিত্রকারী; শাস্ত্রসম্মত বলে বারবার নিশ্চিত করা হয়েছে। গ্রীষ্মে শীতলীকরণ-ক্রিয়া, সন্ধ্যায় বহু প্রদীপে আলোকসজ্জা, এবং মহাবেদী-পরিসরের গুন্ডিচা মণ্ডপে দেবতাদের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অধ্যায় সমাপ্ত।

महावेदी-योगः, पितृकार्यविधिः, वनजागरण-व्रतम् (Mahāvedī-yoga, Pitṛkārya-vidhi, and the Vanajāgaraṇa Vrata)
জৈমিনি অশ্বমেধাঙ্গ-সম্পর্কিত পবিত্র জলাশয়ের নিকটে এবং নরসিংহের দক্ষিণ প্রদেশে শ্রীজগন্নাথের প্রকাশ্য উপস্থিতির কথা বলেন। এরপর গন্ধ, পুষ্প, দীপ, নৈবেদ্য, এবং গান-নৃত্যসহ পূজার বিধান বর্ণিত হয়। কাল-দেশের তত্ত্বও বলা হয়েছে—বিন্দুতীর্থ তট/গুণ্ডিচা-মণ্ডপে ভগবান এক সপ্তাহ অবস্থান করেন এবং প্রতি বছর পুনরাগমনের ঘোষণা দেন; তখন ‘সমস্ত তীর্থ’ সেখানে অধিষ্ঠিত বলে গণ্য হয়। সাত দিনের মধ্যে নিয়ত স্নান ও দর্শন, তারপর নিকটস্থ নরসিংহ মন্দিরে প্রণাম করে মহাবেদীর দিকে গমন নির্দিষ্ট। প্রভুর সান্নিধ্যে কৃত কর্মের ফল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়; এই ক্ষেত্রের বিশেষ যোগে একটিমাত্র দানও সর্বদানের সমতুল্য ফলদায়ক বলা হয়েছে। এরপর পিতৃকার্যে শ্রাদ্ধের শ্রেষ্ঠ সময় নির্ধারিত—মঘা নক্ষত্র, পঞ্চমী তিথি এবং ইন্দ্রদ্যুম্ন সরোবরের দুর্লভ সংযোগ। নীলকণ্ঠ ও নরসিংহের মধ্যবর্তী স্থানে শ্রদ্ধাসহকারে শ্রাদ্ধ করলে ‘শত পিতৃ’ মুক্তি লাভ করেন—এমন ফলশ্রুতি আছে। শেষে বনজাগরণ ব্রত: আষাঢ় শুক্ল তৃতীয়া থেকে সাত দিন মৌন/নিয়ম, দীপ রক্ষা, জপ ও উপবাস; অষ্টম দিনে কলশ স্থাপন ও পূজা, গৃহ্যরীতিতে হোম (বৈষ্ণবী গায়ত্রীসহ), দক্ষিণা ও ব্রাহ্মণভোজন। সাধকের অভিপ্রায় অনুসারে চতুর্বিধ পুরুষার্থ লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

रथरक्षाविधिः तथा दक्षिणाभिमुखयात्रा-माहात्म्यम् (Ratha-Protection Rite and the Glory of the South-Facing Procession)
অধ্যায় ৩৫-এ রথরক্ষার সূক্ষ্ম আচারবিধি এবং বিষ্ণু/জগন্নাথের দক্ষিণাভিমুখ যাত্রার দুর্লভ, মোক্ষদায়ক মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। জৈমিনি ধ্বজে অধিষ্ঠিত দেবতাদের নিত্যপূজার ক্রম বলেন—গন্ধ, পুষ্প, অক্ষত, মালা, উৎকৃষ্ট উপহার, গীত-নৃত্য, ধূপ-দীপ ও নৈবেদ্য নিবেদনসহ। দিকপালদের এবং ভূত-প্রেত-পিশাচাদি সীমান্ত সত্তাদের উদ্দেশে বলি/উপহার দেওয়ার বিধানও আছে, যাতে ভয়ংকর বিঘ্ন রথযাত্রাকে বাধা না দেয়। এরপর নীতিগত ও ব্যবহারিক নির্দেশ—অযোগ্য ব্যক্তি এবং পশু-পাখি যেন রথে না ওঠে, উৎসব পরিচালনা শৃঙ্খলিত থাকে। অষ্টমী-নবমীর ধারায় রথকে দক্ষিণমুখী করে বস্ত্র, মালা, পতাকা, চামর ইত্যাদিতে সাজিয়ে দেবতাদের স্থাপন/আবাস দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দক্ষিণাভিমুখ যাত্রাকে দুর্লভ বলে পরিশ্রম, ভক্তি ও শ্রদ্ধায় সম্পাদনের উপদেশ দেওয়া হয় এবং পূর্ববর্তী যাত্রার সঙ্গে একত্রে এটিকেও মুক্তিদায়িনী বলা হয়েছে। এই যাত্রায় হৃষীকেশের সঙ্গে সুভদ্রা ও বলভদ্র/রামের দর্শন-আরাধনায় শুদ্ধি লাভ হয়, বৈকুণ্ঠ বা ব্রহ্মলোক/শক্রলোক প্রাপ্তির কথাও আছে; অধ্যায়টি শ্রবণ-পাঠ করলেও পাপমল ক্ষয় হয় বলে ফলশ্রুতি জানায়।

शयनोत्सव-चातुर्मास्यव्रतनिर्णयः | Śayanotsava and the Discipline of the Cāturmāsya Vrata
অধ্যায় ৩৬-এ জৈমিনি বিষ্ণুর শয়নকালীন আচারের বিধি ও তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। আষাঢ় থেকে কার্ত্তিক পর্যন্ত চাতুর্মাস্যকে বিশেষ পুণ্যসময় বলা হয়েছে। এই সময় শ্রী পুরুষোত্তম ক্ষেত্র, জগন্নাথের সান্নিধ্যে বাস করলে অল্পদিনেই ঘনীভূত পূণ্যফল লাভ হয়—অন্যত্র দীর্ঘবাসের তুলনায় তা শ্রেষ্ঠ বলে বারবার উল্লেখ আছে। আষাঢ় শুক্ল একাদশীতে শয়নোৎসবের নিয়ম: মণ্ডপ নির্মাণ, শয়নকক্ষ শুদ্ধ ও সুশোভিত করা, অলংকৃত শয্যা প্রস্তুত, এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তিনটি প্রতিমা স্থাপন। প্রতিমাগুলিকে স্নান-শৃঙ্গার করে স্তোত্রপ্রার্থনায় ভগবানকে শয়নে আহ্বান করা হয় এবং বিধিপূর্বক ‘শয়ন’ করানো হয়। এরপর চার মাস ব্রত-নিয়ম পালন—কিছু খাদ্য ও আচরণ বর্জন, জপ-পাঠ, কৃষ্ণ/কেশব/নৃসিংহ/বিষ্ণুকে নমস্কার, এবং নিয়ন্ত্রিত আহারবিধি। মাসান্তে বা কার্ত্তিকে পারণ, ব্রাহ্মণভোজন ও সম্মান, সামর্থ্য অনুযায়ী দান, এবং পূর্ণ বিধি করতে অক্ষমদের জন্য ভীষ্ম-পঞ্চক প্রভৃতি সংক্ষিপ্ত বিকল্পও বলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে এই অনুশাসনকে শুদ্ধিদায়ক ও উত্তম পরলোকগতির সহায় বলা হয়েছে, এবং নানা কর্মফলের ঊর্ধ্বে ভক্তিকেই একত্রীকরণকারী মূলনীতি হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে।

दक्षिणायन-पूजा, नैवेद्य-शुद्धि, तथा श्वेतराज-उपाख्यानम् | Dakṣiṇāyana Worship, Purifying Naivedya, and the Legend of King Śveta
জৈমিনি দক্ষিণায়ন/সংক্রান্তি-সংলগ্ন এক শুভ সময়ের কথা বলে মন্দিরাভিমুখ পূজাক্রম নির্দেশ করেন—দেবতার পঞ্চামৃত-স্নান, অগুরু-কপূর-চন্দনাদি সুগন্ধ দ্রব্যে অনুলেপন, মালা-অলংকার-বস্ত্র-দীপে সাজানো এবং নানা খাদ্য-নৈবেদ্য অর্পণ। পুরুষোত্তমের পূজা দর্শন করলে পুণ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়; দর্শন পাপহর ও বিষ্ণুলোক-প্রদ বলে ঘোষিত। এরপর নৈবেদ্য-শুদ্ধির বিধান—বৈষ্ণব অগ্নি স্থাপন, উৎকৃষ্ট চরু রান্না, শুদ্ধ অগ্নিতে আহুতি, এবং দিক্পাল ও সংশ্লিষ্ট দেবতাদের উদ্দেশে দিশাভেদে বলি-বিতরণ; এতে আচার-শাসন স্থানভিত্তিকভাবে বিন্যস্ত হয়। নর্মাল্য/নৈবেদ্যের উদ্ধারক শক্তি বর্ণিত—আস্বাদন, গন্ধগ্রহণ, দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শ ও দেহে প্রয়োগের দ্বারা ক্রমে শুদ্ধি লাভ হয়। তারপর শ্বেতরাজের উপাখ্যান—ভক্ত রাজা শ্বেত প্রতিদিন মহাভোগ নিবেদন করেন এবং ভাবেন, মানুষ-প্রস্তুত ভোগ কি ভগবান গ্রহণ করেন? তিনি এক দিব্য দর্শনে ভগবানকে দিব্য ঐশ্বর্যে ভোজন করতে দেখেন। রাজা দীর্ঘ তপস্যা ও মন্ত্রজপ করলে নৃসিংহ/নৃহরি প্রকাশ হয়ে সান্নিধ্য, দীর্ঘ সমৃদ্ধ রাজত্ব ও শেষে সায়ুজ্য দান করেন; এবং বট ও সাগর প্রভৃতি সীমাচিহ্নের মধ্যবর্তী অঞ্চলকে মোক্ষক্ষেত্র স্থির করেন—সেখানে মৃত্যু হলে মুক্তি, আর নর্মাল্য-সেবী ভক্তদের অকালমৃত্যু থেকে রক্ষার আশ্বাসও দেওয়া হয়।

निर्माल्य-उच्छिष्ट-माहात्म्य (The Glory of Jagannātha’s Consecrated Remnants)
অধ্যায় ৩৮ পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের মধ্যে নৈবেদ্য, নির্মাল্য ও উচ্ছিষ্টের তাত্ত্বিক মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করে। এখানে বলা হয়েছে, জগন্নাথের ভোগের পর অবশিষ্ট প্রসাদ ও নির্মাল্য অতি পবিত্র—তার স্পর্শ ও গ্রহণ অপবিত্র করে না; বরং পাপ নাশ করে, রোগ প্রশমিত করে এবং সংসারকল্যাণ সাধন করে। কলিযুগে ধর্মক্ষয় ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে সহজলভ্য ভক্তিমার্গের মহিমা প্রকাশ করা হয়েছে। এরপর শাণ্ডিল্য নামের এক বিদ্বান ব্রাহ্মণ “অযোগ্য” ভেবে দেবতার উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন; ফলে তিনি ও তাঁর পরিবার দুঃখ-কষ্টে পতিত হন। প্রার্থনা ও দর্শনে তিনি দেখেন, ভগবান স্বয়ং অবশিষ্ট প্রসাদ বিতরণ করছেন; সেই প্রসাদ গ্রহণ/লেপনে তৎক্ষণাৎ আরোগ্য হয় এবং তিনি বোঝেন—ক্ষেত্রবিশেষের দিব্য বিধান সাধারণ সংশয়কে অতিক্রম করতে পারে। শেষে দর্শন, প্রণাম, দান ও নির্মাল্য-সেবার দ্বারা ক্ষেত্রের মোক্ষদায়িনী শক্তি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

Adhyāya 39 — पार्श्वपर्यायणोत्सवः, उत्थापनमहोत्सवः, तथा दामोदर-चातुर्मास्यव्रतविधानम् (Parśva-paryāyaṇa, Utthāpana festival, and Dāmodara Cāturmāsya-vrata procedure)
এই অধ্যায়ে ঋষিগণ তীর্থযাত্রার ফল ও বিধি সম্পর্কে নির্দিষ্ট বিবরণ চান। জৈমিনি কর্মকে নৈতিক-মানসিক দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করেন—অহংকারবর্জিত ও ভগবৎ-প্রীতির উদ্দেশ্যে করা কর্ম সাত্ত্বিক ও মোক্ষাভিমুখী; খ্যাতি-প্রতিযোগিতামূলক কর্ম রাজসিক; আর সংকীর্ণ স্বার্থসাধনের জন্য করা কর্ম তামসিক। এরপর জগন্নাথ-কেন্দ্রিক বার্ষিক মন্দিরোৎসব ও ব্রতবিধান ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়। ভাদ্রপদ শুক্লপক্ষে হরিবাসরে পার্শ্ব-পর্যায়ণোৎসব—দেবতার শয়নকক্ষে প্রবেশ, প্রার্থনা, নৈবেদ্য-উপহার, চামর-ব্যজন, অনুলেপন ও ভোজন-প্রদর্শন ইত্যাদি; এতে স্থায়ী পুণ্যলাভের কথা বলা হয়েছে। কার্ত্তিকে উত্তাপন-মহোৎসব—পূর্ণিমা রাত্রে পূজা, শুক্ল একাদশী পর্যন্ত উৎকৃষ্ট ব্রত পালন, নির্দিষ্ট মন্ত্রে কোমল জাগরণ, তারপর সঙ্গীত-নৃত্যসহ মহাভিষেক: পঞ্চামৃত, নারিকেল/ফলরস, সুগন্ধি জল, তুলসীচূর্ণ ও চন্দনলেপ। চাতুর্মাস্য সমাপনে দামোদর প্রতিমা-প্রতিষ্ঠা (স্বর্ণ বা শালগ্রাম-আধারিত), মণ্ডপ-মণ্ডল নির্মাণ, দীপদান, দেবর্ষি ও ব্রাহ্মণদের বিষ্ণুরূপে সম্মান, অষ্টাক্ষর মন্ত্রে হোম এবং শেষে দক্ষিণা, গাভী, শস্যাদি দান নির্দিষ্ট। ফলশ্রুতিতে কাম্যসিদ্ধি, মহাযজ্ঞ ও মহাদানের তুল্য শুদ্ধি এবং যথাবিধি পালনে বিষ্ণুলোকপ্রাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে।

प्रावरणोत्सववर्णनम् | Description of the Prāvaraṇa (Winter-Covering) Festival
অধ্যায় ৪০-এ জৈমিনির বাণীতে মাৰ্গশীর্ষ মাসের শুক্লপক্ষে পালিত প্রावरणোৎসবের বিধান বলা হয়েছে। পঞ্চমীর রাত্রিতে ‘বাসো-ধিবাস’ দ্বারা প্রস্তুতি শুরু হয়। দেবমণ্ডপে দেবতার সম্মুখে অষ্টদল পদ্মমণ্ডল নির্মাণ করে দিক্পালদের দিক্দিশায় পূজা, ক্ষেত্রপাল ও গণাধিপ (গণেশ)-কে প্রসন্ন করা হয়; বাহিরে রক্ষার্থে চণ্ড ও প্রচণ্ডের আরাধনা করা হয়। তারপর কলশ স্থাপন করে মন্ত্রপূর্বক প্রোক্ষণ/অভিষেক করা হয়। একুশটি দিব্য বস্ত্রকে গন্ধ-ধূপে সংস্কৃত করে মন্ত্রন्यासে প্রতিষ্ঠা করে আচ্ছাদিত রাখা হয় এবং রক্ষামন্ত্রে সুরক্ষিত করা হয়। রাত্রি জুড়ে গান-নৃত্যসহ অবিরাম পূজা চলে, আর অরুণোদয়ে পুনরায় প্রাতঃপূজা হয়। অতঃপর ছত্র, ধ্বজ, চামর, দোল, বাদ্য, নৃত্য ও পুষ্পবৃষ্টিসহ উৎসবমুখর শোভাযাত্রায় বস্ত্রসমূহ প্রকাশ্যে আনা হয়; মন্দির তিনবার প্রদক্ষিণ করে দেবতাকেও তিনবার বিধিপূর্বক ঘোরানো হয়। পরে মুখ বাদ দিয়ে দেহকে ‘সাত-সাত’ বস্ত্রে আবৃত করা হয়; তাম্বূল, কর্পূরলতা-প্রস্তুতি ইত্যাদি নিবেদন করে দূর্বা-অক্ষতে পূজা ও নীরাজন সম্পন্ন হয়। ফলশ্রুতিতে মোহ-নাশ ও শীত-বায়ু প্রভৃতি দ্বন্দ্ব থেকে রক্ষার কথা বলা হয়েছে; ব্রাহ্মণ, গুরু, অন্যান্য দেবালয় ও দরিদ্রদের শীতবস্ত্র দান প্রশংসিত, এবং অতুল বররূপে দেবকৃপা প্রতিশ্রুত।

पुष्याभिषेकविधिवर्णनम् (Description of the Puṣya Ablution/Festival Rite)
এই অধ্যায়ে জৈমিনি ব্রহ্মার পূর্বোপদেশ অনুসারে হরি/পুরুষোত্তমের পুষ্য-স্নান/অভিষেক মহোৎসবের বিধি ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করেন। পৌষ মাসে পূর্ণিমা তিথিতে পুষ্য নক্ষত্রের যোগ হলে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। একাদশীতে অঙ্কুরার্পণ দিয়ে সূচনা, তারপর কয়েক দিন ধরে মন্দিরে নিত্য পূজা, সঙ্গীত-নৃত্য, নৈবেদ্য-উপহার এবং রাত্রিতে বলির বিধান আছে। চতুর্দশীর রাত্রিতে বিশেষ আয়োজন—নির্দিষ্ট সংখ্যায় বহু কুম্ভ ও ঘৃতপূর্ণ পাত্র স্থাপন, দেবতার সম্মুখে (বিশেষত সর্বতোভদ্র) মণ্ডল রচনা, শুভ দর্পণসহ বৃহৎ ভিত্তি স্থাপন এবং সারারাত্রি জাগরণসহ অভিনয়-গীতাদির মাধ্যমে আরাধনা। প্রভাতে পালাশ সমিধায় হোম করা হয়; ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ আহুতি দিয়ে শেষে মন্ত্রসহ পুরুষোত্তমকে পূর্ণাহুতি নিবেদন করা হয়। পরে পুরুষসূক্ত দ্বারা কুম্ভসমূহ সংস্কৃত করে অচ্ছিদ্রধারায় দেবতার স্নান করানো হয়; সঙ্গে শ্রীসূক্ত, গায়ত্রী ও বৈষ্ণবী মন্ত্রজপ এবং সুগন্ধি জল ব্যবহৃত হয়। স্নানান্তে নির্মাল্য অপসারণ, গন্ধ-চন্দন, অলংকার-বাস্ত্র, মাল্যধারণ, অষ্টায়ুধ স্থাপন, রত্নছত্রের নীচে পূজা এবং লক্ষ্মীর সহচর্য-ভাবসহ আরাধনা নির্দেশিত। শঙ্খধ্বনি, চামর-ব্যজন, মঙ্গলগীত-নৃত্য, বন্দিদের পাঠ, বারংবার জয়ধ্বনি এবং দূর্বা-অক্ষত দিয়ে ত্রিবার অর্ঘ্য—এসব জনসমক্ষে পালিত হয়। শেষে শুদ্ধ স্বর্ণপাত্রে ঘৃতদীপ ও কর্পূরবতী দিয়ে আরতি, প্রতিমার মুখের নিকটে পরিশুদ্ধ তাম্বূল, আচার্যকে দক্ষিণা ও ব্রাহ্মণ-সম্মান। ফলশ্রুতিতে সর্বকামসিদ্ধি ও বৈষ্ণব পদপ্রাপ্তি, রাজ্যপুনর্লাভ, ঐশ্বর্য, নিঃসন্তানের সন্তানলাভ এবং দারিদ্র্যনাশের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একে ধর্মনিয়মযুক্ত ও সমাজস্থিতিকারী উৎসব বলা হয়েছে।

मकरसंक्रमविधिवर्णनम् / Description of the Makarasaṅkrānti (Uttarāyaṇa) Rite
এই অধ্যায়ে জৈমিনি উত্তরায়ণের কালসীমা নির্ধারণ করেন—সূর্য মৃগরাশিতে প্রবেশ করে সংক্রান্তি ঘটলেই ‘উত্তরগতি’ শুরু হয়। সংক্রান্তিকালকে পিতৃগণ, দেবতা ও দ্বিজসমাজের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং মহাপুণ্যদায়ক বলা হয়েছে। এরপর শ্রীনারায়ণ/শ্রীপুরুষোত্তমের বলভদ্র ও সুভদ্রাসহ উৎসববিধি বর্ণিত—স্নান, ‘মন্ত্র-রাজ’ দ্বারা পূজা, প্রদক্ষিণা, এবং রাত্রিতে দীপ, ছত্র, ধ্বজা, বাদ্য, নৃত্যসহ শোভাযাত্রা (ভ্রমণ)। দেবতার প্রদক্ষিণা-দর্শনের প্রতিটি পর্যায়ে ক্রমশ শুদ্ধিলাভের ফল নির্দিষ্ট করা হয়েছে। প্রভাতে অভিষেক ও অলংকারের পর সুগন্ধি দ্রব্যযুক্ত পবিত্র অন্ন, দুধ-ঘৃতাদি মিশ্র নৈবেদ্য নিবেদন করে প্রার্থনা করা হয় যে সমগ্র জগৎ প্রভুর আশ্রিত। শেষে ফলশ্রুতি—উৎসবে অংশগ্রহণে দানাদি কর্মের ফল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, কামনা পূর্ণ হয় এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিতে সহায়তা মেলে।

Phālguṇa Dolārohaṇa-Utsava Vidhi (Phālguṇa Swing-Festival Rite for Govinda/Puruṣottama)
অধ্যায় ৪৩-এ জৈমিনি ফাল্গুন মাসে গোবিন্দ/পুরুষোত্তমের ডোলারোহণ (ঝুলন-উৎসব) জনকল্যাণার্থে দেবলীলা-রূপে সর্বজনীন বিধানসহ বর্ণনা করেন। মন্দিরের সম্মুখে অলংকৃত মণ্ডপ নির্মাণ, উঁচু স্তম্ভ, চারদ্বারযুক্ত বর্গাকার পরিকল্পনা এবং ভদ্রাসন স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চতুর্দশীর রাত্রে ডোলামণ্ডপের নিকটে হোমবিধি নিরূপিত—আচার্য নির্বাচন, মন্থনজাত অগ্নি উৎপাদন, ভূমিশোধন, আহুতি প্রদান এবং যাত্রা সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অগ্নির রক্ষা। পরে বিগ্রহ স্থাপন ও পূজা হয়, এবং তত্ত্বগতভাবে বলা হয় যে প্রতিমায় পুরুষোত্তমের প্রকাশ ঘটে। শঙ্খধ্বনি, ধ্বজা, দীপ, বাদ্য ও জয়ধ্বনির সঙ্গে দেবতাকে স্নানমণ্ডপে নিয়ে পঞ্চামৃত দ্বারা মহাস্নাপন করা হয়; শ্রীসূক্ত প্রভৃতি বৈদিক পাঠে আচ্ছাদিত করে অলংকার ও প্রদক্ষিণা সম্পন্ন হয়। যাত্রার পরিক্রমা-সংখ্যা—সাতবার করে পুনরাবৃত্তি ও শেষে পূর্ণ গণনা—উল্লেখিত। ফলশ্রুতিতে বলা হয়েছে, দোলায় অধিষ্ঠিত কৃষ্ণদর্শন মহাপাপ ও আধ্যাত্মিক-আধিভৌতিক-আধিদৈবিক ক্লেশ নাশ করে; যজমান উচ্চ মর্যাদা, আদর্শ রাজসমৃদ্ধি এবং ব্রাহ্মণ্য বিদ্যা-জ্ঞান লাভ করেন।

ज्येष्ठपञ्चकव्रतवर्णनम् (Description of the Jyeṣṭha Pañcaka Vrata / Annual Twelve-Form Viṣṇu Worship)
জৈমিনি এক বছরব্যাপী সুসংবদ্ধ ব্রতবিধান বলেন, যেখানে বারো মাসে ক্রমান্বয়ে হরির বারোটি নামধারী মূর্তি পূজিত হয়। সাধককে নিয়মিতভাবে বারোটি করে ফুল ও ফল, মিষ্টান্ন নৈবেদ্য এবং আসনাদি উপচার অর্পণ করতে বলা হয়েছে। এরপর স্তোত্রমালায় বিষ্ণুকে আদিসঙ্কটে রক্ষক, জগতের পালনকর্তা, ত্রিবিক্রম, বামন, শ্রীধর, হৃষীকেশ, পদ্মনাভ, দামোদর, কেশব, নারায়ণ, মাধব ও গোবিন্দ রূপে স্মরণ করে সংসারবন্ধন থেকে উদ্ধার ও ব্রতসিদ্ধির প্রার্থনা করা হয়। বার্ষিক চক্র সম্পূর্ণ হলে সমাপন-অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট—মণ্ডলে বারো কলশের মধ্যে বারোটি স্বর্ণ বিষ্ণুমূর্তি প্রতিষ্ঠা, পঞ্চামৃতস্নান, দ্বাদশাক্ষর মন্ত্রে পূজা। পরে সঙ্গীত-নৃত্য, ব্রাহ্মণভোজন, দান (গোদানসহ), দীপদান ও হোমের মাধ্যমে মহোৎসব সম্পন্ন হয়। ফলশ্রুতিতে এই ব্রতকে সর্বকামসাধক, উচ্চ মর্যাদা ও মহাপুণ্যদায়ক বলা হয়েছে; নারদ বহু বছর পালন করে মুক্তিমুখী অবস্থায় পৌঁছেছিলেন—এমন দৃষ্টান্তও দেওয়া হয়।

Damanakabhañjana-vidhi (The Rite of Damanaka and the ‘Breaking’ of Damanāsura)
অধ্যায় ৪৫-এ ঋষিগণ ভগবানের প্রিয় দ্বাদশ পুণ্যযাত্রা/ব্রতের মধ্যে অবশিষ্ট দুইটির কথা জিজ্ঞাসা করেন। জৈমিনি তখন বসন্তিকা যাত্রার বিধান বলেন, যা দমনভঞ্জিকা নামেও প্রসিদ্ধ। চৈত্র শুক্ল ত্রয়োদশীতে দমনক নামে পবিত্র ঘাস/ঔষধি সংগ্রহ, পদ্মাকৃতি মণ্ডল অঙ্কন এবং তার মধ্যে যথাবিধি পূজিত দেবমূর্তি প্রতিষ্ঠার ক্রম এখানে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এই ক্রিয়া নিশীথে, অর্থাৎ মধ্যরাত্রিতে সম্পন্ন হয়; কারণ সেই সময়েই দেবতা দমনাসুরকে ভেঙে/পরাজিত করেছিলেন—এই পৌরাণিক ঘটনার সঙ্গে দমনকের যোগ স্থাপন করা হয়েছে। সাধক দমনককে দৈত্যের রূপান্তর বলে ধ্যান করে, আনুষ্ঠানিক সম্বোধন নিবেদন করে, ঘাসটি দেবতার হাতে অর্পণ করে এবং অবশিষ্ট রাত্রি ভক্তিগীতি ও নৃত্যাদি দ্বারা কাটায়। সূর্যোদয়ে দমনককে অগ্রে রেখে দেবতাকে জগদীশ (জগন্নাথ)-এর নিকট নিয়ে গিয়ে পূজা অব্যাহত রাখা হয়; পরে দমনক হরির শিরে সুগন্ধি ও মঙ্গলঘাসরূপে স্থাপন করা হয়। ফলশ্রুতিতে দুঃখ হ্রাস, পরম সুখলাভ, পাপনাশ এবং ভক্তের বিষ্ণুলোকে বাসের কথা বলা হয়েছে।

Akṣaya-yātrā Vidhi and Candana-lepana: Dakṣa’s Stuti and Jagannātha’s Phalaśruti (अक्षययात्राविधिः चन्दनलेपः दक्षस्तुतिः फलश्रुतिश्च)
জৈমিনি ‘অক্ষয়-যাত্রা’র মোক্ষাভিমুখী, সূক্ষ্ম ও ক্রমানুসারী বিধান বর্ণনা করেন। বৈশাখের শুক্লপক্ষে এই উৎসব পালনের কথা বলা হয়েছে, এবং অভ্যাসবশত মানসিক বন্ধনে আবদ্ধ লোকেরাও এতে অংশ নিতে পারে। চতুষ্কোণ মণ্ডপ, উঁচু বেদি, পরিচ্ছন্ন বস্ত্র ও মধ্যস্থ আসন স্থাপন করে আচার শুরু হয়। এরপর চন্দনকে আগুরু, কুঙ্কুম, কস্তুরী, কর্পূর প্রভৃতি সুগন্ধ দ্রব্যের সঙ্গে মিশিয়ে সংরক্ষণ করা হয়; মন্ত্র-মুদ্রায় রক্ষা করে প্রভাতে শ্রীকৃষ্ণ/জগন্নাথের সন্নিধিতে নিয়ে যাওয়া হয়। শঙ্খ, চামর, ছত্রাদি রাজোপচারে পূজা, মন্ত্র-প্রোক্ষণ ও ধীরে ধীরে লেপন সম্পন্ন হয়; বৈদিক স্তোত্র, জয়ধ্বনি, সঙ্গীত-নৃত্য এবং নৈবেদ্য নিবেদন একসঙ্গে চলে। কথাপ্রসঙ্গে কলিযুগে প্রজাপতি দক্ষ করুণায় দুঃখিত মানবসমাজের জন্য এই বিধি পালন করে সংসারদুঃখ থেকে উদ্ধার প্রার্থনা করে স্তব করেন। জগন্নাথ প্রসন্ন হয়ে বর প্রদান করেন এবং ঘোষণা করেন—এই যাত্রা ত্রিতাপ নাশ করে ও কাম্য ফল দেয়; মহাযাত্রার একবার দর্শনও মুক্তিমুখী ফলদায়ক। শেষে জগন্নাথের সত্যতা, অন্যান্য সাধনার তুলনায় দর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব, এবং পুরুষোত্তমক্ষেত্রে ‘দারুব্রহ্ম’ দর্শনে দেহবন্ধনমোচনের কথা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

विभूतिरूपेण हर्युपासनाफलनिर्णयः | Results of Worshipping Hari through Diverse Vibhūti-Forms
অধ্যায় ৪৭-এ ঋষিগণ শাস্ত্রজ্ঞ সর্বজ্ঞ আচার্যকে সম্বোধন করে বলেন—তাঁরা দেবতার যাত্রা-রূপ মহিমা শুনেছেন, যা পাপ নাশ করে। তাঁরা প্রশ্ন করেন, একই দেবতা কামনাপ্রার্থীকে কীভাবে ‘সর্বকামদাতা’ হন, আর সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পূজিত হলে কীভাবে সমৃদ্ধি দান করেন? জৈমিনি উত্তর দেন—জগতে চল-অচল যত উৎকর্ষ ও মহিমা, সবই বিষ্ণুর বিভূতি; একমাত্র পরমেশ্বরই সমৃদ্ধির উৎস ও দাতা। ‘যেমনভাবে উপাসনা, তেমনই প্রাপ্তি’—এই নীতিতে বিষ্ণুই ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ চার পুরুষার্থের একীভূত পথ। ধর্মের পথ বহু বিধি-নিষেধে জটিল ও নির্ণয়কঠিন; অর্থ ও কাম তারই উপর প্রতিষ্ঠিত। তবু ভগবান সহজেই ধর্ম-অর্থ-কামকে বৃদ্ধি করেন; বিষ্ণুকে স্বয়ং ধর্ম এবং ধর্ম ও জগতের অধীশ্বর বলা হয়েছে। এরপর বিভূতি-উপাসনার ফল বলা হয়—হরিকে শক্ররূপে পূজলে ঐশ্বর্য, ধাত্রৃরূপে বংশবৃদ্ধি, সনৎকুমাররূপে দীর্ঘায়ু, পৃথুরূপে জীবিকা-সমৃদ্ধি, বাচস্পতিরূপে গঙ্গাদি তীর্থফল, ভাস্বতরূপে অন্তরের অন্ধকারনাশ, অমৃতাংশুরূপে অতুল সৌভাগ্য, বাক্/জ্ঞানাধিপতিরূপে তত্ত্বজ্ঞান-প্রভুত্ব, যজ্ঞেশ্বররূপে যজ্ঞফল, এবং কুবেররূপে প্রচুর ধন লাভ হয়। শেষে নীলাচলে দীনজনের অনুগ্রহার্থে কাষ্ঠদেহে যেন বিরাজমান করুণাময় প্রভুর কথা স্মরণ করিয়ে ঋষিদের সেখানে গিয়ে শান্তচিত্তে বাস করতে, পদ্মচরণে শরণ নিতে, অভিপ্রেত ভোগ দীর্ঘকাল পেতে এবং শেষে ইচ্ছানুসারে মোক্ষ/কৈবল্য লাভ করতে বলা হয়েছে।

अष्टचत्वारिंशोऽध्यायः (Chapter 48): Indradyumna’s Instruction to the King and the Phalaśruti of Puruṣottama-kṣetra
অধ্যায় ৪৮-এ ঋষিরা জিজ্ঞাসা করেন—মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ হলে হরি যে বর ও দ্বাদশ যাত্রার নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেগুলি কী। জৈমিনি বলেন, জগন্নাথের (ব্রহ্মসদৃশ পরাত্পর মহিমাময়) কাছ থেকে বর পেয়ে ইন্দ্রদ্যুম্ন নিজ জীবনকে কৃতার্থ মনে করেন এবং বিপুল উপহার-অর্ঘ্যসহ বিধিপূর্বক সেই বারোটি যাত্রা সম্পন্ন করান। এরপর তিনি কাহিনির অপর রাজা (গালরাজ/শ্বেত)-কে উপদেশ দেন—তার বিদ্যা ও ভক্তির প্রশংসা করে বলেন, ভগবানই সর্বজগতের গুরু; বিগ্রহ-আরাধনাকে কেবল কাঠ-পাথরের বস্তু বলে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। প্রভু বিশ্বরূপ হয়েও ভক্তদের জন্য দারুময় রূপ গ্রহণ করেন, কল্পবৃক্ষের মতো সহজলভ্য, তবু তপস্বীদের কাছেও তত্ত্বত দুর্জ্ঞেয়। পরে নীতিধর্ম নির্দেশিত হয়—প্রজাদের সঙ্গে মহোৎসব রক্ষা করা, পৈতৃক ধর্ম-প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ করা, এবং ত্রিসন্ধ্যা-উপাসনা বিশেষত নরসিংহ-পূজা নিত্য করা; এতে পরম শান্তি লাভ হয়। শেষে ইন্দ্রদ্যুম্ন ব্রহ্মলোকে গমন করেন এবং শক্তিশালী ফলশ্রুতি বলা হয়—এই মাহাত্ম্য শ্রবণ-পাঠে মহাপুণ্য, বৃহৎ বৈদিক যজ্ঞসম ফল, সমৃদ্ধি, দীর্ঘায়ু ও পাপক্ষয় হয়; এবং অবিশ্বাসী বা বিদ্বেষীদের কাছে এটি গোপন রাখার নির্দেশও থাকে।

पुराणश्रवणविधिः (Procedure and Ethics of Purāṇa-Śravaṇa)
অধ্যায় ৪৯ জৈমিনি মুনি ও ঋষিদের সংলাপরূপ। ঋষিরা জগন্নাথ-মাহাত্ম্য-সম্পর্কিত পুরাণ-শ্রবণের সম্পূর্ণ (সাঙ্গ) বিধি, তার ফল এবং সহায়ক আচরণ-নিয়ম বিস্তারিত জানতে চান। জৈমিনি বলেন—প্রথমে সংকল্প, তারপর এমন যোগ্য ব্রাহ্মণ-বাচক নির্বাচন করতে হবে যিনি শুদ্ধ বংশজাত, শান্ত স্বভাবের, শাস্ত্রার্থে পারদর্শী এবং আচার-অনুষ্ঠানে উপযুক্ত। বাচককে ব্যাসসম জ্ঞান করে সম্মান করার নির্দেশ আছে—মালা, চন্দন, মূল্যবান আসনে বসানো, এবং গন্ধ-পুষ্প-নৈবেদ্যাদি দ্বারা ব্যাস-পূজা। শ্রোতার নিয়মও নির্দিষ্ট—স্নান, শ্বেত বস্ত্র, শঙ্খ-চক্র তিলক, মনে বিষ্ণুর ধ্যান, মনোযোগী ভঙ্গিতে বসা, অনর্থক কথা ও বিচলিত ভাবনা ত্যাগ, এবং শাস্ত্র, গুরু, দেবতা, মন্ত্রকর্ম, তীর্থ ও বয়োজ্যেষ্ঠদের উপদেশে শ্রদ্ধা-विश्वাস দৃঢ় করা। প্রতিদিন সমাপ্তিতে হরি/কৃষ্ণ/জগন্নাথের জয়ধ্বনি বা কীর্তন, এবং শেষে বাচকের অলংকার, ব্রাহ্মণভোজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী দক্ষিণা প্রদান আবশ্যক। দক্ষিণা-বিহীন কর্মকে নিষ্ফল বলে ‘অসম্পূর্ণতা’র দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। শেষে ঋষিরা সামান্য দান করে প্রণাম জানিয়ে বিদায় নেন—এভাবেই পুরাণ-শ্রবণের কার্যকর ধর্ম-নৈতিক বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়।
It presents Puruṣottama-kṣetra as a supremely purifying field where the deity’s presence is uniquely accessible, and where residence, darśana, and contact with site-specific waters are narratively tied to liberation-oriented merit.
Merits include darkness-removal through recitation, sin-diminution through proximity and residence, and soteriological benefits connected to seeing the deity and engaging with the kṣetra’s tīrtha waters (e.g., promised pāpa-kṣaya and soteriological attainments).
Key legends include the explanation of why the deity is present in Puruṣottama-kṣetra, the disclosure of the site’s concealed status (hidden by divine māyā), and the revelation of landmarks such as Nīlādri and Rauhiṇa-kuṇḍa within a Brahmā–Bhagavān instructional frame.